CastFM
টেক্সট সাইজ
120%
মার্জিন
5%
লাইন স্পেসিং
1.5

অক্ষয়কুমায়ের শ্বশুর হিন্দুসমাজে ছিলেন, কিন্তু তাঁহার চালচলন অত্যন্ত নব্য ছিল। মেয়েদের তিনি দীর্ঘকাল অবিবাহিত রাখিয়া লেখা পড়া শিখাইতে ছিলেন। লোকে আপত্তি করিলে বলিতেন আমরা কুলীন, আমাদের ঘরে ত চিরকালই এইরূপ প্রথা।

তাঁহার মৃত্যুর পর বিধবা জগত্তারিণীর ইচ্ছা, লেখা পড়া বন্ধ করিয়া মেয়েগুলির বিবাহ দিয়া নিশ্চিন্ত হন। কিন্তু তিনি ঢিলা প্রকৃতির স্ত্রীলোক, ইচ্ছা যাহা হয় তাহার উপায় অন্বেষণ করিয়া উঠিতে পারেন না। সময় যতই অতীত হইতে থাকে, আর পাঁচজনের উপর দোষারোপ করিতে থাকেন।

জামাতা অক্ষয়কুমার পূরা নব্য। শ্যালীগুলিকে তিনি পাস করাইয়া নব্যসমাজের খোলাখুলি মন্ত্রে দীক্ষিত করিতে ইচ্ছুক। সেক্রেটাবিয়েটে তিনি বড় রকমের কাজ করেন, গরমের সময় তাঁহাকে সিম্‌লা পাহাড়ে আপিস করিতে হয়, অনেক রাজঘরের দূত, বড় সাহেবের সহিত বোঝা পড়া করাইয়া দিবার জন্য বিপদে আপদে তাঁহার হাতে পায়ে আসিয়া ধরে। এই সকল নানা কারণে শ্বশুর বাড়িতে তাঁহার পসার বেশি। বিধবা শ্বাশুড়ি তাঁহাকেই অনাথা পরিবারের অভিভাবক বলিয়া জ্ঞান করেন। শীতের কয়মাস শ্বাশুড়ির পীড়াপীড়িতে তিনি কলিকাতায় তাঁহার ধনী শ্বশুর গৃহেই যাপন করেন। সেই কয়মাস তাঁহার শ্যালীসমিতিতে উৎসব পড়িয়া যায়।

সেইরূপ কলিকাতা বাসের সময় একদা শ্বশুর বাড়িতে স্ত্রী পুরবালার সঙ্গে অক্ষয়কুমারের নিম্নলিখিত মত কথাবার্তা হয়:–

পুরবালা। তোমার নিজের বোন্ হলে দেখ্তুম কেমন চুপ করে বসে থাক্তে! এতদিনে এক একটির তিনটি চারিটি করে পাত্র জুটিয়ে আন্তে! ওরা আমার বোন কি না—

অক্ষয়। মানব চরিত্রের কিছুই তোমার কাছে লুকোনো নেই। নিজের বোনে এবং স্ত্রীর বোনে যে কত প্রভেদ তা এই কাঁচা বয়সেই বুঝে নিয়েছ! তা ভাই শ্বশুরের কোনও কন্যাটিকেই পরের হাতে সমর্পণ করতে কিছুতেই মন সরে না—এ বিষয়ে আমার ঔদার্য্যের অভাব আছে তা স্বীকার করতে হবে।

পুরবালা সামান্য একটু রাগের মত ভাব করিয়া গম্ভীর হইয়া বলিল—দেখ তোমার সঙ্গে আমার একটা বন্দোবস্ত করতে হচ্চে।

অক্ষয়। একটা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ত মন্ত্র পড়ে’ বিবাছের দিনেই হয়ে গেছে, আবার আর একটা!—

পুরবালা। ওগো, এটা তত ভয়ানক নয়! এটা হয়ত তেমন অসহ্য না হতেও পারে।

অক্ষয় যাত্রার অধিকারীর মত হাত নাড়িয়া বলিল—সখি, তবে খুলে বল!—বলিয়া ঝিঝিটে গান ধরিল—

কি জানি কি ভেবেছ মনে,
খুলে বল ললনে!
কি কথা হায় ভেসে যায়,
ঐ ছলছল নয়নে!

এইখানে বলা আবশ্যক, অক্ষয়কুমার ঝোঁকের মাথায় দুটাে চারটে লাইন গান মুখে মুখে বানাইয়া গাহিয়া দিতে পারিতেন। কিন্তু কখনই কোন গান রীতিমত সম্পূর্ণ করিতেন না। বন্ধুর বিরক্ত হইয়া বলিতেন, তোমার এমন অসামান্য ক্ষমতা কিন্তু গান গুলো শেষ কর না কেন? অক্ষয় ফস্ করিয়া তান ধরিয়া তাহার জবাব দিতেন―

সখা, শেষ করা কি ভালো?
তেল ফুরোবার আগেই আমি নিবিয়ে দেব আলো!

এইরূপ ব্যবহারে সকলে বিরক্ত হইয়া বলে অক্ষয়কে কিছুতেই পারিয়া উঠা যায় না।

পুরবালাও ত্যক্ত হইয়া বলিলেন—ওস্তাদজি থাম! আমার প্রস্তাব এই যে, দিনের মধ্যে একটা সময় ঠিক কর যখন তোমার ঠাট্টা বন্ধ থাকবে,—যখন তোমার সঙ্গে দুটো একটা কাজের কথা হতে পারবে!

অক্ষয়। গরীবের ছেলে, স্ত্রীকে কথা বল্তে দিতে ভরসা হয় না, পাছে খপ্ করে বাজুবন্দ চেয়ে বসে! (আবার গান)

পাছেচেয়ে বসে আমার মন,
আমিতাই ভয়ে ভয়ে থাকি,
পাছেচোখে চোখে পড়ে বাঁধা
আমিতাইত তুলিনে আঁখি!

পুরবালা। তবে যাও!

অক্ষয়। না, না, রাগারগি না! আচ্ছ যা বল তাই শুনব! খাতায় নাম লিখিয়ে তোমার ঠাট্টানিবারিণী সভার সভ্য হব! তোমার সাম্নে কোন রকমের বেয়াদবী করব না!—তা কি কথা হচ্ছিল! শ্যালীদের বিবাহ! উত্তম প্রস্তাব!

পুরবালা গম্ভীর বিষণ্ণ হইয়া কহিল—দেখ, এখন বাবা নেই। মা তোমারি মুখ চেয়ে আছেন। তোমারি কথা শুনে এখনো তিনি বেশি বয়স পর্য্যন্ত মেয়েদের লেখা পড়া শেখাচ্চেন। এখন যদি সৎপাত্র না জুটিয়ে দিতে পার তাহলে কি অন্যায় হবে ভেবে দেখ দেখি!

অক্ষয় দুর্লক্ষণ দেখিয়া পূর্ব্বাপেক্ষ কথঞ্চিৎ গম্ভীর হইয়া কহিলেন— আমিত তোমাকে বলেইছি তোমরা কোন ভাবনা কোরো না। আমার শ্যালীপতিরা গোকূলে বাড়চেন।

পুরবালা। গোকুলটি কোথায়?

অক্ষয়। যেখান থেকে এই হতভাগ্যকে তোমার গোষ্ঠে ভর্ত্তি করেছ। আমাদের সেই চিরকুমার সভা।

পুরবালা সন্দেহ প্রকাশ করিয়া কছিল —প্রজাপতির সঙ্গে তাদের যে লড়াই!

অক্ষয়। দেবতার সঙ্গে লড়াই করে পারবে কেন? তাঁকে কেবল চটিয়ে দেয় মাত্র! সেই জন্যে ভগবান প্রজাপতির বিশেষ ঝোঁক ঐ সভাটার উপরেই। সরা-চাপা হাঁড়ির মধ্যে মাংস যেমন গুমে গুমে সিদ্ধ হতে থাকে—প্রতিজ্ঞার মধ্যে চাপা থেকে সভ্যগুলিও একেবারে হাড়ের কাছ পর্য্যন্ত নরম হয়ে উঠেছেন—দিব্যি বিবাহ-যোগ্য হয়ে এসেছেন—এখন পাতে দিলেই হয়। আমিও ত এককালে ঐ সভার সভাপতি ছিলুম!

আনন্দিত পুরবাল বিজয়গর্ব্বে ঈষৎ হাসিয়া জিজ্ঞাসা করিল— তোমার কি রকম দশাটা হয়েছিল!

অক্ষয়। সে আর কি বলব! প্রতিজ্ঞ ছিল স্ত্রীলিঙ্গ শব্দ পর্য্যন্ত মুখে উচ্চারণ করব না, কিন্তু শেষকালে এমনি হল যে, মনে হত শ্রীকৃষ্ণের ষোল-শ গোপিনী যদি বা সম্প্রতি দুষ্প্রাপ্য হন অন্ততঃ মহাকালীর চৌষট্টি হাজার যোগিনীর সন্ধান পেলেও একবার পেট ভরে প্রেমালাপটা করে নিই—ঠিক সেই সময়টাতেই তোমার সঙ্গে সাক্ষাৎ হল আর কি!

পুত্রবালা। চৌষটি হাজারের সখ্ মিট্ল?

অক্ষয়। সে আর তোমার মুখের সাম্নে বলব না! জাঁক হবে। তবে ইসারায় বল্তে পারি মা কালী দয়া করেছেন বটে! —এই বলিয়া পুরবালার চিবুক ধরিয়া মুখটি একটু খানি তুলিয়া সকৌতুক স্নিগ্ধ প্রেমে একবার নিরীক্ষণ করিয়া দেখিলেন। পুরবালা কৃত্রিম কলহে মুখ সরাইয়া লইয়া কহিলেন—তবে আমিও বলি, বাবা ভোলানাথের নন্দী ভৃঙ্গীর অভাব ছিল না, আমাকে বুঝি তিনি দয়া করেছিলেন?

অক্ষয়। তা হতে পারে, সেই জন্যেই কার্ত্তিকটি পেয়েছ!

পুরবালা। আবার ঠাট্টা সুরু হলো?

অক্ষয়। কার্ত্তিকের কথাটা বুঝি ঠাট্টা? গা ছুঁয়ে বল্চি ওটা আমার অন্তরের বিশ্বাস!

এমন সময় শৈলবালার প্রবেশ। ইনি মেজ বোন্। বিবাহের এক মাসের মধ্যে বিধবা। চুলগুলি ছোট করিয়া ছাঁটা বলিয়া ছেলের মত দেখিতে। সংস্কৃত ভাষায় অনার দিয়া বি, এ পাস করিবার জন্য উৎসুক।

শৈল আসিয়া বলিল—মুখুজ্জে মশায়, এইবার তোমার ছোট দুটি শ্যালীকে রক্ষা কর।

অক্ষয়। যদি অরক্ষণীয়া হয়ে থাকেন ত আমি আছি। ব্যাপারটা কি?

শৈল। মার কাছে তাড়া খেয়ে রসিক দাদা কোথা থেকে একজোড়া কুলীনের ছেলে এনে হাজির করেছেন, মা স্থির করেছেন তাদের সঙ্গেই তাঁর দুই মেয়ের বিবাহ দেবেন।

অক্ষয়। ওরে বাস্রে! একেবারে বিয়ের এপিডেমিক্‌! প্লেগের মত! এক বাড়িতে এক সঙ্গে দুই কন্যেকে আক্রমণ! ভয় হয় পাছে আমাকেও ধরে।—বলিয়া কালাংড়ায় গান ধরিয়া দিলেন—

বড় থাকি কাছাকাছি,

তাই ভয়ে ভয়ে আছি!

নয়ন বচন কোথায় কখন্ বাজিলে বাঁচি না বাঁচি!

শৈল। এই কি তোমার গান গাবার সময় হলো?

অক্ষয়। কি করব ভাই! রসুনচৌকি বাজাতে শিখিনি, তা হলে ধরতুম। বল কি, শুভকর্ম্ম! দুই শ্যালীর উদ্বাহবন্ধন! কিন্তু এত তাড়াতাড়ি কেন?

শৈল। বৈশাখ মাসের পর আস্চে বছরে আকাল পড়বে, আর বিয়ের দিন নেই!

পুরবালা নিজের স্বামিটী লইয়া সুখী, এবং তাহার বিশ্বাস যেমন করিয়া হোক্ স্ত্রীলোকের একটা বিবাহ হইয়া গেলেই সুখের দশা। সে মনে মনে খুসী হইয়া বলিল, তোরা আগে থাক্তে ভাবিস্ কেন শৈল, পাত্র আগে দেখা যাক্ত।

ঢিলা লোকদের স্বভাব এই যে, হঠাৎ একদা অসময়ে তাহারা মন স্থির করে, তখন ভাল মন্দ বিচার করিবার পরিশ্রম স্বীকার না করিয়া একদমে পূর্ব্বকার সুদীর্ঘ শৈথিল্য সারিয়া লইতে চেষ্টা করে। তখন কিছুতেই তাহাদের আর এক মুহূর্ত্ত সবুর সয় না। কর্ত্রী ঠাকুরাণীর সেইরূপ অবস্থা! তিনি আসিয়া বলিলেন, বাবা অক্ষয়!

অক্ষয়। কি মা!

জগৎ। তোমার কথা শুনে আর ত মেয়েদের রাখতে পারিনে!— ইহার মধ্যে এইটুকু আভাস ছিল যে, তাঁহার মেয়েদের সকল প্রকার দুর্ঘটনার জন্য অক্ষয়ই দায়ী।

শৈল কহিল—মেয়েদের রাখ্তে পার না বলেই কি মেয়েদের ফেলে দেবে মা!

জগৎ। ঐ ত! তোদের কথা শুনলে গায়ে জ্বর আসে। বাবা অক্ষয়, শৈল বিধবা মেয়ে, ওকে এত পড়িয়ে পাস করিয়ে কি হবে বল দেখি? ওর এত বিদ্যের দরকার কি?

অক্ষয়। মা, শাস্ত্রে লিখেছে, মেয়ে মানুষের একটা না একটা কিছু উৎপাত থাক চাই—হয় স্বামী, নয় বিদ্যে, নয় হিষ্টিরিয়া। দেখনা, লক্ষ্মীর আছেন বিষ্ণু, তাঁর আর বিদ্যের দরকার হয় নি,—তিনি স্বামীটিকে এবং পেঁচাটিকে নিয়েই আছেন,—আর সরস্বতীর স্বামী নেই, কাজেই তাকে বিদ্যে নিয়ে থাক্তে হয়।

জগৎ। ত যা বল বাবা, আস্চে বৈশাখে মেয়েদের বিয়ে দেবই!

পুরবালা। হা ঁমা, আমার ও সেই মত। মেয়ে মান্সের সকাল সকাল বিয়ে হওয়াই ভাল!

শুনিয়া অক্ষয় তাহাকে জনান্তিকে বলিয়া লইল, তা ত বটেই! বিশেষতঃ যখন একাধিক স্বামী শাস্ত্রে নিষেধ, তখন সকাল সকাল বিয়ে করে সময়ে পুষিয়ে নেওয়া চাই!

পুরবালা। আঃ কি বক্‌্! মা শুনতে পাবেন!

জগৎ। রসিক কাকা আজ পাত্র দেখাতে আস্বেন, তা চল্ মা পুরি, তাদের জলখাবার ঠিক করে রাখিগে।

আনন্দে উৎসাহে মার সঙ্গে পুরবালা ভাণ্ডার অভিমুখে প্রস্থান করিল।

মুখুজ্জে মশায়ের সঙ্গে শৈলর তখন গোপন কমিটি বসিল। এই শ্যালীভগিনীপতি দুটি পরস্পরের পরম বন্ধু ছিল। অক্ষয়ের মত এবং রুচির দ্বারাই শৈলর স্বভাবটা গঠিত। অক্ষয় তাঁহার এই শিষ্যাটিকে যেন আপনার প্রায় সমবয়স্ক ভাইটির মত দেখিতেন—স্নেহের সহিত সৌহার্দ্দ্য মিশ্রিত। তাহাকে শ্যালীর মত ঠাট্টা করিতেন বটে কিন্তু তাহার প্রতি বন্ধুর মত একটি সহজ শ্রদ্ধা ছিল।

শৈল কহিল—আর ত দেরী করা যায় না মুখুজ্জে মশায়! এইবার তোমার সেই চিরকুমার সভার বিপিনবাবু এবং শ্রীশবাবুকে বিশেষ একটু তাড়া না দিলে চল্চে না। আহা ছেলে দুটি চমৎকার! আমাদের নেপ আর নীরর সঙ্গে দিব্যি মানায়! তুমি ত চৈত্রমাস যেতে না যেতে আপিস্ ঘাড়ে করে সিম্লে যাবে, এবারে মাকে ঠেকিয়ে রাখা শক্ত হবে!

অক্ষয়। কিন্তু তাই বলে সভাটিকে হঠাৎ অসময়ে তাড়া লাগালে যে চম্কে যাবে! ডিমের খোলা ভেঙে ফেল্লেই কিছু পাখী বেরয় না। যথোচিত তা’ দিতে হবে, তাতে সময় লাগে।

শৈল একটুখানি চুপ করিয়া রহিল—তার পরে হঠাৎ হাসিয়া বলিয়া উঠিল—বেশত তা দেবার ভার আমি নেব মুখুজ্জে মশায়!

অক্ষয়। আর একটু খোলসা করে বল্তে হচ্চে।

শৈল। ঐ ত দশ নম্বরে ওদের সভা? আমাদের ছাদের উপর দিয়ে দেখন্-হাসির বাড়ি পেরিয়ে ওখানে ঠিক যাওয়া যাবে। আমি পুরুষবেশে ওদের সভার সভ্য হব, তার পরে সভা কতদিন টেঁকে আমি দেখে নেব!

অক্ষয় নয়ন বিস্ফারিত করিয়া মুহূর্ত্তকাল স্তম্ভিত থাকিয়া উচ্চ হাস্য করিয়া উঠিল। কহিল, আহা কি আপশোষ যে, তোমার দিদিকে বিয়ে করে সভ্য নাম একেবারে জন্মের মত ঘুচিয়েছি, নইলে দলেবলে আমি সুদ্ধ ত তোমার জালে জড়িয়ে চক্ষু বুজে মরে পড়ে থাক্তুম! এমন মুখের ফাড়াও কাটে! সখী তবে মনোযোগ দিয়ে শোন,—

(সিন্ধু ভৈরবীতে গান)
ওগো হৃদয়-বনের শিকারী!
মিছে তারে জালে ধরা যে তোমারি ভিখারী!
সহস্রবার পায়ের কাছে আপনি যে জন ম’রে আছে,
নয়নবাণের খোঁচা খেতে সে যে অনধিকারী!

শৈল কহিল—ছি মুখুজ্জে মশায় তুমি সেকেলে হয়ে যাচ্চ! ঐ সব নয়ন বাণটান গুলোর এখন কি আর চলন আছে? যুদ্ধবিদ্যার যে এখন অনেক বদল হয়ে গেছে!

ইতিমধ্যে দুই বোন্ নৃপবালা, নীরবালা, ষোড়শী এবং চতুর্দশী প্রবেশ করিল। নৃপ শান্ত স্নিগ্ধ, নীর তাহার বিপরীত, কৌতুকে এবং চাঞ্চল্যে সে সর্ব্বদাই আন্দোলিত।

নীর আসিয়াই শৈলকে জড়াইয়া ধরিয়া জিজ্ঞাসা করিল—মেজদিদি ভাই, আজ কারা আস্বে বল ত?

নৃপ। মুখুজ্জেমশায় আজ কি তোমার বন্ধুদের নিমন্ত্রণ আছে? জলখাবারের আয়োজন হচ্চে কেন?

অক্ষয়। ঐত! বই পড়ে পড়ে চোক কানা করলে—পৃথিবীর আকর্ষণে উল্কাপাত কি করে ঘটে সে সমস্ত লাখ দুলাখ ক্রোশের খবর রাখ, আর আজ ১৮ নম্বর মধুমিস্ত্রির গলিতে কার আকর্ষণে কে এসে পড়চে সেটা অনুমান করতেও পারলে না?

নীর। বুঝেছি ভাই, সেজদিদি!—বলিয়া নৃপর পিঠে একটা চাপড় মারিল এবং তাহার কানের কাছে মুখ রাখিয়া অল্প একটু গলা নামাইয়া কহিল—তোর বর আস্চে ভাই, তাই সকালবেলা আমার বাঁ চোখ নাচ্ছিল!

নৃপ তাহাকে ঠেলিয়া দিয়া কহিল, তোর বাঁ চোখ নাচ্লে আমার বর আসবে কেন?

নীরু কহিল, তা ভাই, আমার বাঁ চোখটা না হয় তোরি বরের জন্যে নেচে নিলে তাতে আমি দুঃখিত নই! কিন্তু মুখুজ্জে মশায়, জলখাবারত দুটি লোকের জন্যে দেখলুম, সেজদিদি কি স্বয়ম্বরা হবে না কি?

অক্ষয়। আমাদের ছোড়দিদিও বঞ্চিত হবেন না।

নীরু। আহা মুখুজ্জে মহাশয়, কি সুসংবাদ শোনালে? তোমাকে কি বক্শিষ দেব! এই নাও আমার গলার হার—আমার দু’হাতের বালা।

শৈল ব্যস্ত হইয়া বলিল—আঃ ছিঃ হাত খালি করিস্নে।

নীরু। আজ আমাদের বরের অনারে পড়ার ছুটি দিতে হবে মুখুজ্জে মশায়!

নৃপ। আঃ কি বর বর করছিস্! দেখত ভাই মেজদিদি।

অক্ষয়। ওকে ঐজন্যেইত বর্ব্বরা নাম দিয়েছি। অয়ি বর্ব্বরে, ভগবান তোমাদের ক’টি সহোদরাকে এই একটি অক্ষয় বর দিয়ে রেখেছেন, তবু তৃপ্তি নেই?

নীরু! সেই জন্যেইত লোভ আরো বেড়ে গেছে!

নৃপ তাহার ছোট বোনকে সংযত করা অসাধ্য দেখিয়া তাহাকে টানিয়া লইয়া চলিল। নীরু চলিতে চলিতে দ্বারের নিকট হইতে মুখ ফিরাইয়া কহিল—এলে খবর দিয়ো মুখুজ্জে মশায়, ফাঁকি দিয়ে না! দেখ্চত সেজদিদি কি রকম চঞ্চল হয়ে উঠেছে।

সহাস্যে সস্নেহে দুই বোনকে নিরীক্ষণ করিয়া শৈল কহিল—মুখুজ্জে মশায়, আমি ঠাট্টা করচিনে—আমি চিরকুমার সভার সভ্য হব। কিন্তু আমার সঙ্গে পরিচিত একজন কাউকে চাইত। তোমার বুঝি আর সভ্য হবার জো নেই?

অক্ষয়। না আমি পাপ করেছি। তোমার দিদি আমার তপস্যা ভঙ্গ করে আমাকে স্বর্গ হতে বঞ্চিত করেছেন।

শৈল। তাহলে রসিকদাদাকে ধরতে হচ্চে। তিনি ত কোন সভার সভ্য না হয়েও চিরকুমার ব্রত রক্ষা করেচেন।

অক্ষয়। সভ্য হলেই এই বুড়ে বয়সে ব্রতটি খোয়াবেন। ইলিষ মাছ অম্নি দিব্যি থাকে, ধরলেই মারা যায়—প্রতিজ্ঞাও ঠিক তাই, তাকে বাঁধ্লেই তার সর্ব্বনাশ।

এমন সময় সম্মুখের মাথায় টাক, পাঁকা গোঁফ, গৌরবর্ণ দীর্ঘাকৃতি রসিকদাদা আসিয়া উপস্থিত হইলেন। অক্ষয় তাঁহাকে তাড়া করিয়া গেল—কহিল, ওরে পাষণ্ড, ভণ্ড, অকাল কুষ্মাণ্ড!

রসিক প্রসারিত দুই হস্তে তাহাকে সম্বরণ করিয়া কহিলেন—কেনহে,—মত্তমন্থর কুঞ্জ-কুঞ্জর পুঞ্জ-অঞ্জনবর্ণ।

অক্ষয়। তুমি আমার শ্যালীপুষ্পবনে দাবানল আন্তে চাও?

শৈল। রসিকদাদা, তোমারই বা তাতে কি লাভ?

রসিক। ভাই, সইতে পারলুম না কি করি। বছরে বছরেই তোর বোনদের বয়স বাড়চে, বড় মা আমারই দোষ দেন কেন? বলেন, দুবেলা বসে বসে কেবল খাচ্চ, মেয়েদের জন্যে দুটো বর দেখে দিতে পার না! আচ্ছা ভাই আমি না খেতে রাজি আছি, তা হলেই বর জুটবে,—না, তোর বোন্দের বয়স কম্তে থাকৃবে? এদিকে যে দুটির বর জুট্চে না, তাঁরাত দিব্যি খাচ্চেন দাচ্চেন! শৈল ভাই, কুমারসম্ভবে পড়েছিস্, মনে আছে ত?—

স্বয়ং বিশীর্ণ দ্রুমপর্ণ বৃত্তিতা
পরাহি কাষ্ঠা তপসস্তয়া পুনঃ
তদপ্যপাকীর্ণ মতঃ প্রিয়ংবদাং
বদন্ত্যপর্ণেতি চ তাং পুরাবিদঃ—

তা ভাই দুর্গা নিজের বর খুঁজতে খাওয়া দাওয়া ছেড়ে তপস্যা করেছিলেন—কিন্তু নাৎনীদের বর জুট্চে না বলে আনি বুড়া মানুষ খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দেব, বড়মার একি বিচার! আহা শৈল, ওটা মনে আছে ত? তদপ্যপাকীর্ণমতঃ প্রিয়ংবদাং—

শৈল। মনে আছে দাদা, কিন্তু কালিদাস এখন ভাল লাগ্চে না।

রসিক। তা হলেত অত্যন্ত দুঃসময় বলতে হবে।

শৈল। তাই তোমার সঙ্গে পরামর্শ আছে।

রসিক। তা রাজি আছি ভাই। যে রকম পরামর্শ চাও, তাই দেব। যদি “হাঁ" বলাতে চাও “হাঁ” বল্ব, “না” বলাতে চাও না” বল্ব। আমার ঐ গুণটি আছে। আমি সকলের মতের সঙ্গে মত দিয়ে যাই বলেই সবাই আমাকে প্রায় নিজের মতই বুদ্ধিমান ভাবে।

অক্ষয়। তুমি অনেক কৌশলে তোমার পসার বঁচিয়ে রেখেচ, তার মধ্যে তোমার এই টাক একটি।

রসিক। আর একটি হচ্চে—যাবৎ কিঞ্চিন্ন ভাবতে—তা’ আমি বাইরের লোকের কাছে বেশি কথা কইনে—

শৈল। সেইটে বুঝি আমাদের কাছে পুষিয়ে নাও!

রসিক। তোদের কাছে যে ধরা পড়েছি।

শৈল। ধরা যদি পড়ে থাক ত চল—যা বলি তাই করতে হবে।— বলিয়া পরামর্শের জন্য শৈল তাঁহাকে অন্য ঘরে টানিয়া লইয়া চলিল।

অক্ষয় বলিতে লাগিল—অ্যাঁ, শৈল! এই বুঝি! আজ রসিক দা হলেন, রাজমন্ত্রী! আমাকে ফাঁকি!

শৈল যাইতে যাইতে পশ্চাৎ ফিরিয়া হাসিয়া কহিল—তোমার সঙ্গে আমার কি পরামর্শের সম্পর্ক মুখুজ্জে মশায়? পরামর্শ যে বুড়ো না হলে হয় না।

অক্ষয় বলিল—তবে রাজমন্ত্রীপদের জন্যে আমার দরবার উঠিয়ে নিলুম।—বলিয়া শূন্য ঘরের মধ্যে দাঁড়াইয়া হঠাৎ উচ্চৈঃস্বরে খাম্বাজে গান ধরিলেন—

আমি কেবল ফুল জোগাব
তোমার দুটি রাঙা হাতে,
বুদ্ধি আমার খেলেনাক
পাহারা বা মন্ত্রণাতে!

বাড়ির কর্ত্তা যখন বাঁচিয়া ছিলেন তিনি রসিককে খুড়া বলিতেন। রসিক দীর্ঘকাল হইতে তাঁহার আশ্রয়ে থাকিয়া বাড়ির সুখ দুঃখে সম্পূর্ণ জড়িত হইয়াছিলেন। গিন্নি অগোছালো থাকাতে কর্ত্তার অবর্ত্তমানে তাহার কিছু অযত্ন অসুবিধা হইতেছিল এবং জগত্তারিণীর অসঙ্গত ফরমাস্ খাটিয়া তাঁহার অবকাশের অভাব ঘটয়াছিল। কিন্তু তাঁহার এই সমস্ত অভাব অসুবিধা পূরণ করিবার লোক ছিল শৈল। শৈল থাকাতেই মাঝে মাঝে ব্যামোর সময় তাঁহার পথ্য এবং সেবার ত্রুটি হইতে পারে নাই; এবং তাহারই সহকারিতায় তাঁহার সংস্কৃত সাহিত্যের চর্চ্চা পুরা দমেই চলিয়াছিল।

রসিকদাদা শৈলবালার অদ্ভূত প্রস্তাব শুনিয়া প্রথমটা হাঁ করিয়া রছিলেন, তাহার পর হাসিতে লাগিলেন, তাহার পর রাজি হইয়া গেলেন। কহিলেন, ভগবান হরি নারী-ছদ্মবেশে পুরুষকে ভুলিয়ে ছিলেন, তুই শৈল যদি পুরুষ-ছদ্মবেশে পুরুষকে ভোলাতে পারিস্ তাহলে হরিভক্তি উড়িয়ে দিয়ে তোর পূজোতেই শেষ বয়সটা কাটাব। কিন্তু মা যদি টের পান?

শৈল। তিন কন্যাকে কেবলমাত্র স্মরণ করেই মা মনে মনে এত অস্থির হয়ে ওঠেন যে, তিনি আমাদের আর খবর রাখতে পারেন না। তাঁর জন্যে ভেবো না।

রসিক। কিন্তু সভায় কি রকম করে সভ্যতা করতে হয় সে আমি কিছুই জানিনে।

শৈল। আচ্ছা সে আমি চালিয়ে নেব।


( ২ )

শ্রীশ ও বিপিন।

শ্রীশ। তা যাই বল অক্ষয়বাবু যখন আমাদের সভাপতি ছিলেন তখন আমাদের চিরকুমার সভা জমেছিল ভাল। হাল সভাপতি চন্দ্রবাবু কিছু কড়া।

বিপিন। তিনি থাক্তে রস কিছু বেশি জমে উঠেছিল—চিরকৌমার্য্যব্রতের পক্ষে রসাধিক্যটা ভাল নয় আমার ত এই মত।

শ্রীশ। আমার মত ঠিক উলটাে। আমাদের ব্রত কঠিন বলেই রসের দরকার বেশি। রুক্ষ মাটিতে ফসল ফলাতে গেলে কি জল সিঞ্চনের

( ২ )

শ্রীশ ও বিপিন।

শ্রীশ। তা যাই বল অক্ষয়বাবু যখন আমাদের সভাপতি ছিলেন তখন আমাদের চিরকুমার সভা জমেছিল ভাল। হাল সভাপতি চন্দ্রবাবু কিছু কড়া।

বিপিন। তিনি থাক্তে রস কিছু বেশি জমে উঠেছিল—চিরকৌমার্য্যব্রতের পক্ষে রসাধিক্যটা ভাল নয় আমার ত এই মত।

শ্রীশ। আমার মত ঠিক উলটাে। আমাদের ব্রত কঠিন বলেই রসের দরকার বেশি। রুক্ষ মাটিতে ফসল ফলাতে গেলে কি জল সিঞ্চনের প্রয়োজন হয় না? চিরজীবন বিবাহ করব না এই প্রতিজ্ঞাই যথেষ্ট তাই বলেই কি সব দিক থেকেই শুকিয়ে মরতে হবে?

বিপিন। যাই বল, হঠাৎ কুমার সভা ছেড়ে দিয়ে বিবাহ করে অক্ষয়বাবু আমাদের সভাটাকে যেন আল্গা করে দিয়ে গেছেন। ভিতরে ভিতরে আমাদের সকলেরি প্রতিজ্ঞার জোর কমে গেছে।

শ্রীশ। কিছুমাত্র না। আমার নিজের কথা বল্তে পারি, আমার প্রতিজ্ঞার বল আরো বেড়েছে। যে ব্রত সকলে অনায়াসেই রক্ষা করতে পারে তার উপরে শ্রদ্ধা থাকে না।

বিপিন। একটা সুখবর দিই শোন।

শ্রীশ। তোমার বিবাহের সম্বন্ধ হয়েছে না কি?

বিপিন। হয়েছে বৈ কি—তোমার দৌহিত্রীর সঙ্গে। —ঠাট্টা রাখ, পূর্ণ কাল কুমার সভার সভ্য হয়েছে।

শ্রীশ। পুর্ণ! বল কি! তাহলে ত শিলা জলে ভাস্ল!

বিপিন। শিলা আপনি ভাসে না হে! তাকে আর কিছুতে অকুলে ভাসিয়েচে। আমার যথাবুদ্ধি তার ইতিহাসটুকু সঙ্কলন করেচি।

শ্রীশ। তোমার বুদ্ধির দৌড়টা কি রকম শুনি।

বিপিন। জানই ত, পূর্ণ সন্ধ্যাবেলায় চন্দ্রবাবুর কাছে পড়ার নোট নিতে যায়। সেদিন আমি আর পুর্ণ একসঙ্গেই একটু সকাল সকাল চন্দ্র বাবুর বাসায় গিয়েছিলেম। তিনি একটা মীটিং থেকে সবে এসেছেন। বেহারা কেরোসিন্ জেলে দিয়ে গেছে—পূর্ণ বইয়ের পাত ওল্টাচ্চে, এমন সময়—কি আর বলব ভাই, সে বঙ্কিমবাবুর নভেল বিশেষ—একটি কন্যা পিঠে বেণী ফুলিয়ে—

শ্রীশ। বল কি হে বিপিন?

বিপিন। শোনই না। এক হাতে থালায় করে চন্দ্রবাবুর জন্য়ে জলখাবার, আর এক হাতে জলের গ্লাস নিয়ে হঠাৎ ঘরের মধ্যে এসে উপস্থিত। আমাদের দেখেই ত কুন্ঠিত, সচকিত, লজ্জায় মুখ রক্তিমবর্ণ। হাত জোড়া, মাথায় কাপড় দেবার জো নেই। তাড়াতাড়ি টেবিলের উপর খাবার রেখেই ছুট্। ব্রাহ্ম বটে কিন্তু তেত্রিশ কোটির সঙ্গে লজ্জাকে বিসর্জ্জন দেয় নি এবং সত্য বলচি শ্রীকেও রক্ষা করেছে।

শ্রীশ। বল কি বিপিন, দেখতে ভাল বুঝি?

বিপিন। দিব্যি দেখ্তে। হঠাৎ যেন বিদ্যুতের মত এসে পড়ে পড়াশুনোয় বজ্রাঘাত করে গেল।

শ্রীশ। আহা, কই, আমি ত একদিনো দেখিনি! মেয়েটি কে হে!

বিপিন। আমাদের সভাপতির ভাগ্নী, নাম নির্ম্মলা।

শ্রীশ। কুমারী?

বিপিন। কুমারী বই কি। তার ঠিক পরেই পূর্ণ হঠাৎ আমাদের কুমার সভায় নাম লিখিয়েছে।

শ্রীশ। পূজারি সেজে ঠাকুর চুরি করবার মতলব?

একটি প্রৌঢ় ব্যক্তির প্রবেশ।

বিপিন। কি মশায়, আপনি কে?

উক্তব্যক্তি। অজ্ঞে আমার নাম শ্রীবনমালী ভট্টাচার্য্য, ঠাকুরের নাম ৺ রামকমল ন্যায়চুঞ্চু, নিবাস—

শ্রীশ। আর অধিক আমাদের ঔৎসুক্য নেই। এখন কি কাজে এসেচেন সেইটে—

বন। কাজ কিছুই নয়। আপনার ভদ্রলোক আপনাদের সঙ্গে আলাপ পরিচয়—

শ্রীশ। কাজ আপনার না থাকে আমাদের আছে। এখন, অন্য কোনো ভদ্রলোকের সঙ্গে যদি আলাপ পরিচয় করতে যান তাহলে আমাদের একটু—

বন। তবে কাজের কথাটা সেরে নিই।

শ্রীশ। সেই ভাল।

বন। কুমারটুলির নীলমাধব চৌধুরী মশায়ের দুটি পরমাসুন্দরী কন্যা আছে—তাঁদের বিবাহযোগ্য বয়স হয়েচে—

শ্রীশ। হয়েছে ত হয়েছে, আমাদের সঙ্গে তার সম্বন্ধটা কি!

বন। সম্বন্ধ ত আপনারা একটু মনোযোগ করলেই হতে পারে। সে আর শক্ত কি! আমি সমস্তই ঠিক করে দেব।

বিপিন। আপনার এত দয়া অপাত্রে অপব্যয় করচেন।

বন। অপাত্র! বিলক্ষণ! আপনাদের মত সৎপাত্র পাত্র কোথায়! আপনাদের বিনয়গুণে আরো মুগ্ধ হলেম।

শ্রীশ। এই মুগ্ধভাব যদি রাখ্তে চান তা হলে এই বেলা সরে পড়ুন। বিনয়গুণে অধিক টান সয় না।

বন। কন্যার বাপ যথেষ্ট টাকা দিতে রাজি আছেন।

শ্রীশ। সহরে ভিক্ষুকের ত অভাব নেই। ওহে বিপিন, একটু পা চালিয়ে এগোও—কাঁহাতক রাস্তায় দাঁড়িয়ে বকাবকি করি? তোমার আমোদ বোধ হচ্চে কিন্তু এরকম সদালাপ আমার ভাল লাগে না।

বিপিন। পা চালিয়ে পালাই কোথায়? ভগবান এঁকেও যে লম্ব এক জোড়া পা দিয়েচেন।

শ্রীশ। যদি পিছু ধরেন তাহলে ভগবানের সেই দান মানুষের হাতে পড়ে খোয়াতে হবে।


(৩)

মুকুজ্জেমশায়!

অক্ষয় বলিলেন—আজ্ঞা কর!

শৈল কহিল—কুলীনের ছেলে দুটোকে কোন ফিকিরে তাড়াতে হবে!

অক্ষয় উৎসাহপূর্ব্বক কহিলেন—তা ত হবেই। বলিয়া রামপ্রসাদী সুরে গান জুড়িয়া দিলেন—

দেখব কে তাের কাছে আসে!

তুই রবি একেশ্বরী, একলা আমি রৈব পাশে!

শৈল হাসিয়া জিজ্ঞাসা করিল...একেশ্বরী?

অক্ষয় বলিলেন, না হয় তোমরা চার ঈশ্বরীই হলে, শাস্ত্রে আছে অধিকন্তু ন দোষায়।

শৈল কহিল—আর, তুমিই একলা থাকবে? ওখানে বুঝি অধিকন্তু খাটে না?

অক্ষয় কহিলেন, ওখানে শাস্ত্রের আর একটা পবিত্র বচন আছে—সর্ব্বমত্যন্তগর্হিতং।

শৈল। কিন্তু মুখুজ্জেমশায়, ও পবিত্র বচনটা ত বরাবর খাটবে না। আরও সঙ্গী জুটবে।

অক্ষয় বলিলেন—তােমাদের এই একটি শালার জায়গায় দশশালা বন্দোবস্ত হবে? তখন আবার নূতন কার্যবিধি দেখা যাবে। ততদিন কুলীনের ছেলেটেলেগুলােকে ঘেঁষ্তে দিচ্চিনে!

এমন সময় চাকর আসিয়া খবর দিল দুটি বাবু আসিয়াছে। শৈল কহিল, ঐ বুঝি তারা এল। দিদি আর মা ভাঁড়ারে ব্যস্ত আছেন, তাঁদের অবকাশ হবার পূর্ব্বেই ওদের কোন মতে বিদায় করে দিয়ো।

অক্ষয় জিজ্ঞাসা করিলেন, কি বক্শিষ মিলবে?

শৈল কহিল—আমরা তােমার সব শালীরা মিলে তােমাকে শালীবাহন রাজা খেতাব দেব।

অক্ষয়। শালীবাহন দি সেকেণ্ড?

শৈল। সেকেণ্ড হতে যাবে কেন? সে শালীবাহনের নাম ইতিহাস থেকে একেবারে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তুমি হবে শালীবাহন দি গ্রেট্!

অক্ষয়। বল কি? আমার রাজ্যকাল থেকে জগতে নূতন শাল প্রচলিত হবে? এই বলিয়া অত্যন্ত সাড়ম্বর তানসহকারে ভৈরবীতে গান ধরিলেন—

তুমি আমায় করবে মস্ত লোক!
দেবে লিখে রাজার টকে প্রসন্ন ঐ চোখ!

শৈলবালার প্রস্থান। ভৃত্য আদিষ্ট হইয়া দুটি ভদ্রলোককে উপস্থিত করিল। একটি বিসদৃশ লম্বা, রোগা, বুট জুতাপরা, ধুতি প্রায় হাঁটুর কাছে উঠিয়াছে, চোখের নীচে কালি পড়া, ম্যালেরিয়া রোগীর চেহারা; বয়স বাইশ হইতে বত্রিশ পর্য্যন্ত যেটা খুসি হইতে পারে। আর একটি বেঁটেখাটো, অত্যন্ত দাড়ি গোঁফসঙ্কুল, নাকটি বটিকাকার, কপালটি ঢিবি, কালোকোলো, গোলগাল।

অক্ষয় অত্যন্ত সৌহার্দ্য সহকারে উঠিয়া অগ্রসর হইয়া প্রবলবেগে শেক্হ্যাণ্ড করিয়া দুটি ভদ্রলোকের হাত প্রায় ছিঁড়িয়া ফেলিলেন। বলিলেন, আসুন মিষ্টার ন্যাথানিয়াল, আসুন মিষ্টার জেরেমায়া, বসুন বসুন! ওরে বরফ জল নিয়ে আয়রে, তামাক দে!

রোগ লোকটি সহসা বিজাতীয় সম্ভাষণে সঙ্কুচিত হইয়া মৃদুস্বরে বলিল, আজ্ঞে আমার নাম মৃত্যুঞ্জয় গাঙ্গুলি।

বেঁটে লোকটি বলিল—আমার নাম শ্রীদারুকেশ্বর মুখোপাধ্যায়!

অক্ষয়। ছি মশায়! ও নামগুলো এখনো ব্যবহার করেন বুঝি? আপনাদের ক্রিশ্চান নাম?

আগন্তুকদিগকে হতবুদ্ধি নিরুত্তর দেখিয়া কহিলেন—এখনো বুঝি নামকরণ হয়নি? তা তাতে বিশেষ কিছু আসে যায় না, ঢের সময় আছে!

বলিয়া নিজের গুড়গুড়ির নল মৃত্যুঞ্জয়ের হাতে অগ্রসর করিয়া দিলেন। সে লোকটা ইতস্ততঃ করিতেছে দেখিয়া বলিলেন বিলক্ষণ। আমার সামনে আবার লজ্জা! সাত বছর বয়স থেকে লুকিয়ে তামাক খেয়ে পেকে উঠেছি। ধোঁয়া লেগে লেগে বুদ্ধিতে ঝুল পড়ে গেল! লজ্জা যদি করতে হয় তাহলে আমার ত আর ভদ্র সমাজে মুখ দেখাবার জো থাকে না!

তখন সাহস পাইয়া দারুকেশ্বর মৃত্যুঞ্জয়ের হাত হইতে ফস্ করিয়া নল কাড়িয়া লইয়া ফড়্ ফড়্ শব্দে টানিতে আরম্ভ করিল! অক্ষয় পকেট হইতে কড়া বর্ম্মা চুরোট বাহির করিয়া মৃত্যুঞ্জয়ের হাতে দিলেন। যদিচ তাহার চুরোট অভ্যাস ছিল না, তবু সে সদ্যস্থাপিত ইয়ার্কির খাতিরে প্রাণের মায়া পরিত্যাগ করিয়া মৃদুমন্দ টান দিতে লাগিল এবং কোন গতিকে কাশি চাপিয়া রাখিল।

অক্ষয় কহিলেন—এখন কাজের কথাটা সুরু করা যাক্! কি বলেন?

মৃত্যুঞ্জয় চুপ করিয়া রহিল, দারুকেশ্বর বলিল—তা’নয়ত কি? শুভস্য শীঘ্রং!—বলিয়া হাসিতে লাগিল, ভাবিল ইয়ার্কি জমিতেছে।

তখন অক্ষয় গম্ভীর হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, মুর্গি না মাট্ন?

মৃত্যুঞ্জয় অবাক্ হইয়া মাথা চুলকাইতে লাগিল। দারুকেশ্বর কিছু না বুঝিয়া, অপরিমিত হাসিতে আরম্ভ করিল। মৃত্যুঞ্জয় ক্ষুব্ধ লজ্জিত হইয়া ভাবিতে লাগিল, এরা দুজন ত বেশ জমাইয়াছে, আমিই নিরেট বোকা!

অক্ষয় কহিলেন,—আরে মশায়, নাম শুনেই হাসি! তা হলেত গন্ধে অজ্ঞান এবং পাতে পড়্লে মারাই যাবেন! তা যেটা হয় মনস্থির করে বলু—মুর্গি হবে না মাট্ন হবে?

তখন দুজনে বুঝিল আহারের কথা হইতেছে। ভীরু মৃত্যুঞ্জয় নিরুত্তর হইয়া ভাবিতে লাগিল। দারুকেশ্বর লালায়িত রসনায় একবার চারিদিকে চাহিয়া দেখিল!

অক্ষয় কহিলেন—ভয় কিসের মশায়? নাচ্তে বসে ঘোম্টা? শুনিয়া দারুকেশ্বর দুই হাতে দুই পা চাপড়াইয়া হাসিতে লাগিল। কহিল, তা মুর্গিই ভাল, কট্‌লেট্, কি বলেন?

লুদ্ধ মৃত্যুঞ্জয় সাহস পাইয়া বলিল, মাটানটাই বা মন্দ কি ভাই! চপ্‌!—বলিয়া আর কথাটা শেষ করিতে পারিল না।

অক্ষয়। ভয় কি দাদা, দুই হবে। দোমনা করে খেয়ে সুখ হয় না।—চাকরকে ডাকিয়া বলিলেন—ওরে, মোড়ের মাথায় যে হোটেল আছে সেখান থেকে কলিমদি খানসামাকে ডেকে আন্ দেখি!

তাহার পর অক্ষয় বুড়ো আঙুল দিয়া মৃত্যুঞ্জয়ের গা টিপিয়া মৃদুস্বরে কহিলেন—বিয়ার, না শেরি?

মৃত্যুঞ্জয় লজ্জিত হইয়া মুখ বাঁকাইল। দারুকেশ্বর সঙ্গীটিকে বদরসিক বলিয়া মনে মনে গালি দিয়া কহিল—হুইস্কির বন্দোবস্ত নেই বুঝি?

অক্ষয় তাহার পিঠ চাপড়াইয়া কহিলেন—নেইত কি? বেঁচে আছি কি করে? বলিয়া যাত্রার সুরে গাহিয়া উঠিলেন —

অভয় দাও ত বলি আমার wish কি,
একটি ছটাক্ সোডার জলে পাকি তিন পোয়া হুইস্কি!

ক্ষীণ প্রকৃতি মৃত্যুঞ্জয়ও প্রাণপণে হাস্য করা কর্ত্তব্য বোধ করিল এবং দারুকেশ্বর ফস্ করিয়া একটা বই টানিয়া লইয়া টপাটপ্ বাজাইতে আরম্ভ করিল

অক্ষয় দুলাইন গাহিয়া থামিবামাত্র দারুকেশ্বর বলিল দাদা, ওটা শেষ করে ফেল! বলিয়া নিজেই ধরিল, “অভয় দাও ত বলি আমার wish কি;”—মৃত্যুঞ্জয় মনে মনে তাহাকে বাহাদুরী দিতে লাগিল।

অক্ষয় মৃত্যুঞ্জয়কে ঠেলা দিয়া কহিলেন, ধরনা হে, তুমি ও ধর!—

সলজ্জ মৃত্যুঞ্জয় নিজের প্রতিপত্তি রক্ষার জন্ত মৃদুস্বরে যোগ দিল— অক্ষয় ডেস্ক্ চাপড়াইয়া বাজাইতে লাগিলেন। এক জায়গায় হঠাৎ থামিয়া গম্ভীর হইয়া কহিলেন—হাঁ, হাঁ, আসল কথাটা জিজ্ঞাসা করা হয় নি। এদিক ত সব ঠিক—এখন আপনারা কি হলে রাজি হন?

দারুকেশ্বর কহিল,—আমাদের বিলেতে পাঠাতে হবে।

অক্ষয় কহিলেন—সে ত হবেই। তার না কাট্লে কি শ্যাম্পেনের ছিপি খোলে? দেশে আপনার মত লোকের বিদ্যে বুদ্ধি চাপ থাকে, বাঁধন কাট্লেই একেবারে নাকে মুখে চোখে উছ্লে উঠবে।

দারুকেশ্বর অত্যন্ত খুসি হইয়া অক্ষয়ের হাত চাপিয়া ধরিল, কহিল, দাদা, এইটে তোমাকে করে দিতেই হচ্চে! বুঝলে?

অক্ষয় কহিলেন, সে কিছুই শক্ত নয়। কিন্তু ব্যাপটাইজ্ আজই ত হবেন?

দারুকেশ্বর ভবিল ঠাট্টাটা বোঝা যাইতেছেন। হাসিতে হাসিতে জিজ্ঞাসা করিল, সেটা কি রকম?

অক্ষয় কিঞ্চিৎ বিস্ময়ের ভ’বে কহিলেন—কেন, কথাইত আছে, রেভারেণ্ড্ বিশ্বাস আজ রাত্রেই আসচেন। ব্যাপটিজম্ না হলে ত ক্রিশ্চান্ মতে বিবাহ হতে পারে না!

মৃত্যুঞ্জয় অত্যন্ত ভীত হইয়া কহিল—ক্রিশ্চান মতে কি মশায়?

অক্ষয় কহিলেন—আপনি যে আকাশ থেকে পড়লেন। সে হচ্চে না—ব্যাপটাইজ্ যেমন করে হোক্, আজ রাত্রেই সারতে হচ্চে। কিছুতেই ছাড়ব না।

মৃত্যুঞ্জয় জিজ্ঞাসা করিল—আপনারা ক্রিশান না কি?

অক্ষয়। মশায়, ন্যাকামি রাখুন! যেন কিছুই জানেন না।

মৃত্যুঞ্জয় অত্যন্ত ভীত ভাবে কহিল—মশায়, আমরা হিঁদু, ব্রাহ্মণের ছেলে, জাত খোয়াতে পারব না!

অক্ষয় হঠাৎ অত্যন্ত উদ্ধতস্বরে কহিলেন—জাত কিসের মশায়! এ দিকে কলিমদ্দির হাতে মুর্গি খাবেন বিলেত যাবেন, আবার জাত!

মৃত্যুঞ্জয় ব্যস্ত-সমস্ত হইয়া কহিল—চুপ, চুপ, চুপ করুন! কে কোথা থেকে শুনতে পাবে।

তখন দারুকেশ্বর কহিল,—ব্যস্ত হবেন না মশায়, একটু পরামর্শ করে দেখি!—বলিয়া মৃত্যুঞ্জয়কে একটু অন্তরালে ডাকিয়া লইয়া বলিল, বিলেত থেকে ফিরে সেই ত একবার প্রায়শ্চিত্ত কর্ত্তেই হবে—তখন ডবল্ প্রায়শ্চিত্ত করে একেবারে ধর্ম্মে ওঠা যাবে। এ সুযোগটা ছাড়লে আর বিলেত যাওয়াট ঘটে উঠবে না! দেখলি ত কোন শ্বশুরই রাজি হল না। আর ভাই, ক্রিশ্চানের হুঁকোয় তামাকই যখন খেলুম তখন ক্রিশ্চান হতে আর বাকি কি রৈল?—এই বলিয়া অক্ষয়ের কাছে আসিয়া কহিল—বিলেত যাওয়াটা ত নিশ্চয় পাকা? তা হলে ক্রিশচান হ’তে রাজি আছি।

মৃত্যুঞ্জয় কহিল, কিন্তু আজ রাতটা থাক্।

দারুকেশ্বর কহিল—হতে হয় ত চট্পট্ সেরে ফেলে পাড়ি দেওয়াই ভাল—গোড়াতেই বলেছি শুভস্য শীঘ্রং।

ইতিমধ্যে অন্তরালে রমণীগণের সমাগম। দুই থালা ফল মিষ্টান্ন লুচি ও বরফ জল লইয়া ভৃত্যের প্রবেশ। ক্ষুণ্ণ দারুকেশ্বর কহিল—কই মশায়, অভাগার অদৃষ্টে মুর্গি বেটা উড়েই গেল না কি? কট্‌লেট্ কোথায়?

অক্ষয় মৃদুস্বরে বলিলেন—আজকের মত এইটেই চলুক!

দারুকেশ্বর কহিল—সে কি হয় মশায়! আশা দিয়ে নৈরাশ! শ্বশুর বাড়ি এসে মটন চাপ খেতে পাব না? আর এ যে বরফ জল মশায়, আমার আবার সর্দ্দির ধাত, সাদা জল সহ্য হয় না! বলিয়া গান জুড়িয়া দিল—“অভয় দাওত বলি আমার wish কি” ইত্যাদি। অক্ষর মৃত্যু ঞ্জয়কে কেবলি টিপিতে লাগিলেন এবং অস্পষ্ট স্বরে কহিতে লাগিলেন, ধরনা হে, তুমিও ধর না—চুপচাপ কেন;—সে ব্যক্তি কতক ভয়ে কর্তক লজ্জায় মৃদু মৃদু যোগ দিতে লাগিল! গানের উচ্ছাস থামিলে অক্ষয় আহার পাত্র দেখাইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন—নিতান্তই কি এটা চলবে না?

দারুকেশ্বর ব্যস্ত হইয়া কহিল, না মশায়, ও সব রোগীর পথ্যি চলবে না! মুর্গি না খেয়েই ত ভারতবর্ষ গেল! বলিয়া ফড়ফড়করিয়া গুড় গুড়ি টানিতে লাগিল। অক্ষয় কানের কাছে আসিয়া লক্ষ্মৌ ঠুংরিতে ধরাইয়া দিলেন—

কত কাল রবে বল ভারতরে
শুধু ডাল ভাত জল পথ্য করে!

শুনিয়া দারুকেশ্বর উৎসাহসহকারে গানটা ধরিল এবং মৃত্যুঞ্জয়ও অক্ষয়ের গোপন ঠেলা খাইয়া সলজ্জভাবে মৃদু মৃদু যোগ দিতে লাগিল।

অক্ষয় আবার কানে কানে ধরাইয়া দিলেন—

দেশে অন্নজলের হল ঘোর অনটন
ধর হুইস্কি সোডা আর মুর্গিমটন!

অমনি দারুকেশ্বর মাতিয়া উঠিয়া উৰ্দ্ধস্বরে ঐ পদটা ধরিল এবং অক্ষয়ের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠের প্রবল উৎসাহে মৃত্যুঞ্জয় ও কোন মতে সঙ্গে সঙ্গে যোগ দিয়া গেল।

অক্ষয় পুনশ্চ ধরাইয়া দিলেন—

যাও ঠাকুর চৈতন চুটুকি নিয়া!
এস দাড়ি নাড়ি কলিমদ্দি মিঞা!

যতই উৎসাহসহকারে গান চলিল, দ্বারের পার্শ্ব হইতে উসখুস শব্দ শুনা যাইতে লাগিল এবং অক্ষয় নিরীহ ভালমানুষটির মত মাঝে মাঝে সেই দিকে কটাক্ষপাত করিতে লাগিলেন।

এমন সময় ময়লা ঝাড়ন হাতে কলিমদ্দি আসিয়া সেলাম করিয়া দাঁড়াইল। দারুকেশ্বর উৎসাহিত হইয়া কহিল,—এই যে চাচা। আজ রান্নাটা কি হয়েছে বল দেখি!

সে অনেক গুলা ফর্দ দিয়া গেল। দারুকেশ্বর কহিল কোনটাই ত মন্দ শোনাচে না হে! (অক্ষয়ের প্রতি) মশায়, কি বিবেচনা করেন? ওর মধ্যে বাদ দেবার কি কিছু আছে?

অক্ষয় অন্তরালের দিকে কটাক্ষ করিয়া কহিলেন—সে আপনারা যা ভাল বোঝেন!

দারুকেশ্বর কহিল, আমার ত মত, ব্রাহ্মণেত্যো নমঃ বলে সব কটাকেই আদর করে নিই!

অক্ষয়। তা ত বটেই, ওঁরা সকলেই পূজ্য!
কলিমদ্দি সেলাম করিয়া চলিয়া গেল। অক্ষয় কিঞ্চিৎ গলা চড়াইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, মশায়রা কি তাহলে আজ রাত্রেই ক্রিশ্চান হতে চান?

খানার আশ্বাসে প্রফুল্লচিত্ত দারুকেশ্বর কহিল—আমার ত কথাই আছে, শুভস্য শীঘ্রং। আজই ক্রিশ্চান হব, এখনি ক্রিশ্চান হব, ক্রিশ্চান হয়ে তবে অন্য কথা! মশায়, আর ঐ পুঁই শাক কলাইয়ের ডাল খেয়ে প্রাণ বাঁচে না! আনুন আপনার পাদ্রি ডেকে! বলিয়া পুনশ্চ উচ্চস্বরে গান ধরিল—

যাও ঠাকুর চৈতন-চুটুকি নিম্ন,
এস দাড়ি নাড়ি কলিমন্দি মিঞা!

চাকর আসিয়া অক্ষয়ের কানে কানে কহিল—মাঠাকুরুণ একবার ডাক্‌চেন।

অক্ষয় উঠিয়া দ্বারের অন্তরালে গেলে জগত্তারিণী কহিলেন—এ কি! কান্ডটা কি?

অক্ষয় গম্ভীরমুখে কহিলেন—মা সে সব পরে হবে এখন ওরা হুইস্কি চাচ্চে, কি করি? তোমার পায়ে মালিশ করবার জন্যে সেই যে ব্রাণ্ডি এসেছিল, তার কি কিছু বাকি আছে?

জগত্তারিণী হতবুদ্ধি হইয়া কহিলেন, বল কি বাছা? ব্রাণ্ডি খেতে দেবে?

অক্ষয় কহিলেন, কি করব মা, শুনেইছ ত, ওর মধ্যে একটা ছেলে আছে যার জল খেলেই সর্দ্দি হয়, মদ না খেলে আর একটীর মুখে কথাই বের হয় না!

জগত্তারিণী কহিলেন—ক্রিশ্চান্ হবার কথা কি বল্‌চে ওরা?

অক্ষয় কহিলেন—ওরা বলচে হিঁদু হয়ে খাওয়া দাওয়ার বড় অসুবিধে, পুঁইশাক কড়াইয়ের ডাল খেয়ে ওদের অসুখ করে!

জগত্তারিণী অবাক হইয়া কহিলেন; তাই বলে কি ওদের আজ রাতেই মুর্গি খাইয়ে ক্রিশ্চান্ করবে নাকি?

অক্ষয় কহিলেন, তা মা ওরা যদি রাগ করে চলে যায় তা হলে দুটি পাত্র এখনি হাতছাড়া হবে। তাই ওরা যা বলচে তাই শুন্‌তে হচ্চে, আমাকে শুদ্ধ মদ ধরাবে দেখচি।

পুরবালা কহিলেন—বিদায় কর, বিদায় কর, এখনি বিদায় কর!

জগত্তারিণী ব্যস্ত হইয়া কহিলেন—বাবা, এখানে মুর্গি খাওয়া টাওয়া হবে না, তুমি ওদের বিদায় করে দাও। আমার ঘাট হয়েছিল আমি রসিক কাকাকে পাত্র সন্ধান কর্‌তে দিয়েছিলুম! তাঁর দ্বারা যদি কোন কাজ পাওয়া যায়!

রমণীগণের প্রস্থান। অক্ষয় ঘরে আসিয়া দেখেন, মৃত্যুঞ্জয় পলায়নের উপক্রম করিতেছে এবং দারুকেশ্বর হাত ধরিয়া তাহাকে টানাটানি করিয়া রাখিবার চেষ্টা করিতেছে। অক্ষয়ের অবর্ত্তমানে মৃত্যুঞ্জয় অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা করিয়া সন্ত্রস্ত হইয়া উঠিয়াছে। অক্ষয় ঘরে প্রবেশ করিবামাত্র মৃত্যুঞ্জয় রাগের স্বরে বলিয়া উঠিল, না মশায় আমি ক্রিশ্চান্ হতে পারব না, আমার বিয়ে করে কাজ নেই।

অক্ষয় কহিলেন, তা মশায়, আপনাকে কে পায়ে ধরাধরি কর্‌চে!

দারুকেশ্বর কহিল, আমি রাজি আছি মশায়!

অক্ষয় কহিলেন, রাজি থাকেন ত গির্জ্জেয় যান মশায়! আমার সাত পুরুষে ক্রিশ্চান্ করা ব্যব্‌সা নয়!

দারুকেশ্বর কহিল—ঐ যে কোন্ বিশ্বাসের কথা বল্লেন—

অক্ষয়। তিনি টেরেটির বাজারে থাকেন, তাঁর ঠিকানা লিখে দিচ্চি।

দারুকেশ্বর। আর বিবাহটা?

অক্ষয়। সেটা এ বংশে নয়।

দারুকেশ্বর। তাহলে এতক্ষণ পরিহাস করছিলেন মশায়? খাওয়াটাও কি—

অক্ষয়। সেটাও এ ঘরে নয়।

দারুকেশ্বর। অন্ততঃ হোটেলে?

অক্ষয়। সে কথা ভাল।— বলিয়া টাকার ব্যাগ হইতে গুটিকয়েক টাকা বাহির করিয়া দুটিকে বিদায় করিয়া দিলেন।

তখন নৃপর হাত ধরিয়া টানিয়া নীরবালা বসন্তকালের দম্‌কা হাওয়ার মত ঘরের মধ্যে আসিয়া প্রবেশ করিল। কহিল, মুখুজ্জে মশায়, দিদি ত দুটির কোনটিকেই বাদ দিতে চান্ না!

নৃপ তাহার কপোলে গুটি দুই তিন অঙ্গুলির আঘাত করিয়া কহিল, ফের মিথ্যে কথা বলচিস্?

অক্ষয়। ব্যস্ত হস্‌নে ভাই, সত্য মিথ্যের প্রভেদ আমি একটু একটু বুঝ্‌তে পারি।

নীরু। আচ্ছা মুখুজ্জে মশায়, এ দুটি কি রসিক দাদার রসিকতা, না আমাদের সেজ দিদিরই ফাঁড়া?

অক্ষয়। বন্দুকের সকল গুলিই কি লক্ষ্যে গিয়ে লাগে? প্রজাপতি টার্গেট প্র্যাক্‌টিস্ করছিলেন, এ দুটো ফসকে গেল। প্রথম প্রথম এমন গোটাকতক হয়েই থাকে। এই হতভাগ্য ধরা পড়বার পূর্ব্বে তোমার দিদির ছিপে অনেক জলচর ঠোকর দিয়ে গিয়েছিল, বঁড়শি বিঁধল কেবল আমারি কপালে!—বলিয়া কপালে চপেটাঘাত করিলেন!

নৃপ। এখন থেকে রোজই প্রজাপতির প্র্যাক্‌টিস চল্‌বে না কি মুখুজ্জে মশায়? তা হলে ত আর বাঁচা যায় না!

নীরু।কেন ভাই দুঃখ করিস্? রোজই কি ফস্কাবে? একটা না একটা এসে ঠিক মতন পৌঁছবে।

রসিকের প্রবেশ।

নীরু। রসিক দাদা, এবার থেকে আমরাও তোমার জন্যে পাত্রী জোটাচ্চি।

রসিক। সে ত সুখের বিষয়!

নীরু। হাঁ! সুখ দেখিয়ে দেব! তুমি নিজে থাক হোগ্‌লার ঘরে, আর পরের দালানে আগুন লাগাতে চাও! আমাদের হাতে টীকে নেই? আমাদের সঙ্গে যদি লাগ, তা হলে তোমার দু-দুটো বিয়ে দিয়ে দেব— মাথায় যে ক’টি চুল আছে সাম্‌লাতে পারবে না!

রসিক। দেখ্ দিদি, দুটো আস্ত জন্তু এনেছিলুম বলেই ত রক্ষে পেলি, যদি মধ্যম রকমের হত, তা হলেই ত বিপদ ঘট্‌ত। যাকে জন্তু বলে চেনা যায় না, সেই জন্তুই ভয়ানক।

অক্ষয়। সে কথা ঠিক। মনে মনে আমার ভয় ছিল, কিন্তু একটু পিঠে হাত বুলাবামাত্রই চট্‌পট্ শব্দে ল্যাজ নড়ে উঠ্‌ল। কিন্তু মা বল্‌চেন কি?

রসিক। সে যা বল্‌চেন সে আর পাঁচজনকে ডেকে ডেকে শোনাবার মত নয়। সে আমি অন্তরের মধ্যেই রেখে দিলুম! যা হোক্ শেষে এই স্থির হয়েছে, তিনি কাশীতে তাঁর বোনপোর কাছে যাবেন, সেখানে পাত্রের ও সন্ধান পেয়েছেন, তীর্থদর্শনও হবে।

নীরু। বল কি, রসিক দাদা! তা হলে এখানে আমাদের রোজ রোজ নতুন নতুন নমুনে দেখা বন্ধ?

নৃপ। তোর এখনো সখ্ আছে নাকি?

নীরু। এ কি সখের কথা হচ্চে? এ হচ্চে শিক্ষা। রোজ রোজ অনেক গুলি দৃষ্টান্ত দেখ্‌তে দেখ্‌তে জিনিষটা সহজ হয়ে আস্‌বে; যেটিকে বিয়ে করবি সেই প্রাণীটিকে বুঝ্‌তে কষ্ট হবে না।

নৃপ। তোমার প্রাণীকে তুমি বুঝে নিয়ো, আমার জন্যে তোমার ভাবতে হবে না!

নীরু। সেই কথাই ভাল—তুইও নিজের জন্যে ভাবিস্ আমিও নিজের জন্যে ভাব্‌ব—কিন্তু রসিক দাদাকে আমাদের জন্যে ভাব্‌তে দেওয়া হবে না।

নৃপ নীরুকে বলপূর্ব্বক টানিয়া লইয়া গেল। শৈলবালা ঘরে প্রবেশ করিয়াই বলিল -রসিকদা তোমার ত মার সঙ্গে কাশী গেলে চল্‌বে না —আমরা যে চিরকুমার সভার সভ্য হব—আবেদন পত্রের সঙ্গে প্রবেশিকার দশটা টাকা পাঠিয়ে দিয়ে বসে আছি।

অক্ষয় কহিলেন, মার সঙ্গে কাশী যাবার জন্যে আমি লোক ঠিক করে দেব এখন, সে জন্যে ভাবনা নেই।

শৈল। এই যে মুখুজ্জে মশায়! তুমি তাদের কি বানর বানিয়েই ছেড়ে দিলে—শেষকালে বেচারীদের জন্যে আমার মায়া করছিল!

অক্ষয়। বানর কেউ বানাতে পারে না শৈল, ওটা পরম প্রকৃতি নিজেই বানিয়ে রাখেন। ভগবানের বিশেষ অনুগ্রহ থাকা চাই! যেমন কবি হওয়া আর কি। ল্যাজই বল কবিত্বই বল ভিতরে না থাক্‌লে জোর করে টেনে বের করবার জো নেই!

পুরবালা প্রবেশ করিয়া কেরোসিন্ ল্যাম্পটা লইয়া নাড়িয়া চাড়িয়া কহিল—বেহারা কি রকম আলো দিয়ে গেছে, মিট্‌মিট্ করচে! ওকে বলে বলে পারা গেল না!

অক্ষয়। সে বেটা জানে কিনা অন্ধকারেই আমাকে বেশি মানায়।

পুরবালা। আলোতে মানায় না? বিনয় হচ্ছে না কি? এট। ত নতুন দেখ্‌চি।

অক্ষয়। আমি বল্‌ছিলুম, বেহারা বেটা চাঁদ বলে আমাকে সন্দেহ করেচে!

পুর। ওঃ তাই ভাল! তা ওর মাইনে বাড়িয়ে দাও! কিন্তু রসিক দাদা, আজ কি কাণ্ডটাই করলে!

রসিক। ভাই, বর ঢের পাওয়া যায় কিন্তু সবাই বিবাহযোগ্য হয় না, সেইটের একটা সামান্য উদাহরণ দিয়ে গেলুম।

পুর। সে উদাহরণ না দেখিয়ে দুটো একটা বিবাহযোগ্য বরের উদাহরণ দেখলেই ত ভাল হত!

শৈল। সে ভার আমি নিয়েছি দিদি।

পুর। তা আমি বুঝেছি! তুমি আর তোমার মুখুজ্জে মশায়ে মিলে ক’দিন ধরে যে রকম পরামর্শ চল্‌চে একটা কি কাণ্ড হবেই।

অক্ষয়। কিষ্কিন্ধ্যাকাণ্ড ত আজ হয়ে গেল।

রসিক। লঙ্কাকাণ্ডের আয়োজনও হচ্চে, চিরকুমার সভার স্বর্ণলঙ্কায় আগুন লাগাতে চলেছি।

পুর। শৈল তার মধ্যে কে?

রসিক। হনুমান ত নয়ই।

অক্ষয়। উনিই হচ্চেন স্বয়ং আগুন।

রসিক। এক ব্যক্তি ওঁকে ল্যাজে করে নিয়ে যাবেন।

পুর। আমি কিছু বুঝ্‌তে পারচিনি! শৈল, তুই চিরকুমার সভায় যাবি না কি!

শৈল। আমি যে সভ্য হব!

পুর। কি বলিস্ তার ঠিক নেই! মেয়ে মানুষ আবার সভ্য হবে কি!

শৈল। আজকাল মেয়েরাও যে সভ্য হয়ে উঠেছে। তাই আমি শাড়ি ছেড়ে চাপকান ধরব ঠিক করেছি।

পুর। বুঝেছি, ছদ্মবেশে সভ্য হ’তে যাচ্চিস্ বুঝি! চুলটাত কেটেইচিস্, ঐটেই বাকি ছিল। তোমাদের যা খুসি কর, আমি এর মধ্যে নেই।

অক্ষয়। না, না, তুমি এ দলে ভিড়ো না! আর যার খুসি পুরুষ, হোক, আমার অদৃষ্টে তুমি চিরদিন মেয়েই থেকো—নইলে ব্রীচ্ অফ্ কন্ট্রাক্ট—সে বড় ভয়ানক মকদ্দমা!—বলিয়া সিন্ধুতে গান ধরিলেন—

চির-পুরাণো চাঁদ!
চির দিবস এমনি থেকো আমার এই সাধ!
পুরাণো হাসি পুরাণো সুধা, মিটায় মম পুরাণো ক্ষুধা,
নূতন কোন চকোর যেন পায় না পরসাদ!

পুরবালা রাগ করিয়া চলিয়া গেল। অক্ষয়-শৈলবালাকে আশ্বাস দিয়া কহিলেন—ভয় নেই! রাগটা হয়ে গেলেই মনটা পরিষ্কার হবে—একটু অনুতাপও হবে—সেইটেই সুযোগের সময়।

রসিক।

কোপো যত্র ভ্রুকুটি রচনা, নিগ্রহো যত্র মৌনং,
যত্রান্যোন্যস্মিতমনুনয়ং, যত্র দৃষ্টিঃ প্রসাদঃ,

শৈল। রসিক দাদা তুমি ত দিব্যি শ্লোক আউড়ে চলেচ—কোপ জিনিষটা কি, তা মুখুজ্জে মশায় টের পাবেন।

রসিক। আরে ভাই, বদল করতে রাজি আছি! মুখুজ্জে মশায় যদি শ্লোক আওড়াতেন আর আমার উপরেই যদি কোপ পড়ত তা হলে এই পোড়া কপালকে সোনা দিয়ে বাঁধিয়ে রাখ্‌তুম। কি দিদি, ঐ জলখাবারের থালা দুটি ত মান করে নি, বসে গেলে বোধ হয় আপত্তি নেই?

অক্ষয়। ঠিক ঐ কথাটাই ভাব্‌ছিলুম।

উভয়ে আহারে উপবেশন করিলেন, শৈলবালা পাখা লইয়া বাতাস করিতে লাগিলেন।


(৪)

আহারের পর শৈলবালা ডাকিল—মুখুজ্জে মশায়!

অক্ষয় অত্যন্ত ত্রস্তভাব দেখাইয়া কহিলেন—আবার মুখুজ্জে মশায়! এই বালখিল্য মুনিদের ধ্যানভঙ্গ ব্যাপারের মধ্যে আমি নেই!

শৈলবালা। ধ্যানভঙ্গ আমরা করব। কেবল মুনিকুমার গুলিকে এই বাড়িতে আনা চাই।

অক্ষয় চক্ষু বিস্ফারিত করিয়া কহিলেন—সভাসুদ্ধ এইখানে উৎপাটিত করে আন্‌তে হবে? যত দুঃসাধ্য কাজ সবই এই একটিমাত্র মুখুজ্জে মশায়কে দিয়ে?

শৈলবালা হাসিয়া কহিল, মহাবীর হবার ঐত মুস্কিল! যখন গন্ধমাদনের প্রয়োজন হয়েছিল তখন নল নীল অঙ্গদকে ত কেউ পোছেও নি!

অক্ষয় গর্জন করিয়া কহিলেন, ওরে পোড়ারমুখী, ত্রেতাযুগের পোড়ারমুখোকে ছাড়া আর কোন উপমাও তোর মনে উদয় হল না? এত প্রেম!

শৈলবালা কহিল—হাঁ গো এতই প্রেম!

অক্ষয় ভৈরোঁতে গাহিয়া উঠিলেন—

পোড়া মনে শুধু পোড়া মুখখানি জাগে রে!
এত আছে লোক, তবু পোড়া চোখে
আর কেহ নাহি লাগে রে!

আচ্ছা, তাই হবে! পঙ্গপাল ক’টাকে শিখার কাছে তাড়িয়ে নিয়ে আস্‌ব। তাহলে চট্‌করে আমাকে একটা পান এনে দাও। তোমার স্বহস্তের রচনা!

শৈল। কেন দিদির হস্তের—

অক্ষয়। আরে দিদির হস্ত ত জোগাড় করেইচি, নইলে পাণিগ্রহণ কি জন্যে? এখন অন্য পদ্মহস্ত গুলির প্রতি দৃষ্টি দেবার অবকাশ পাওয়া গেছে।

শৈল। আচ্ছা গো মশায়! পদ্মহস্ত তোমার পানে এমনি চুন মাখিয়ে দেবে যে, পোড়ার মুখ আবার পুড়বে!

অক্ষয় গাহিলেন—

যারে মরণ দশায় ধরে
সে যে শতবার করে মরে।
পোড়া পতঙ্গ যত পোড়ে তত
আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়ে!

শৈল। মুখুজ্জে মশায় ও কাগজের গোলাটা কিসের?

অক্ষয়। তোমাদের সেই সভ্য হবার আবেদন পত্র এবং প্রবেশিকার দশটাকার নোট পকেটে ছিল, ধোবা বেটা কেচে এমনি পরিষ্কার করে দিয়েছে, একটা অক্ষরও দেখতে পাচ্চিনে। ও বেটা বোধ হয় স্ত্রীস্বাধীনতার ঘোরতর বিরোধী, —তাই তোমার ঐ পত্রটা একেবারে আগাগোড়া সংশোধন করে দিয়েছে।

শৈল। এই বুঝি! অক্ষয়। চারটিতে মিলে স্মরণশক্তি জুড়ে বসে আছ, আর কিছু কি মনে রাখ্‌তে দিলে?

সকলি ভুলেছে ভোলামন
ভোলেনি ভোলেনি শুধু ঐ চন্দ্রানন।

১০ নম্বর মধুমিস্ত্রির গলিতে একতলার একটি ঘরে চিরকুমার সভার অধিবেশন হয়। বাড়িটি সভাপতি চন্দ্রমাধব বাবুর বাসা। তিনি লোকটি ব্রাহ্ম কালেজের অধ্যাপক। দেশের কাজে অত্যন্ত উৎসাহী; মাতৃভূমির উন্নতির জন্য ক্রমাগতই নানা মৎলব তাঁহার মাথায় আসিতেছে। শরীরটি কৃশ কিন্তু কঠিন, মাথাটা মস্ত, বড় দুইটি চোখ অন্যমনস্ক খেয়ালে পরিপূর্ণ। প্রথমটা সভায় সভ্য অনেকগুলি ছিল। সম্প্রতি সভাপতি বাদে তিনটিতে আসিয়া ঠেকিয়াছে। যুথভ্রষ্টগণ বিবাহ করিয়া গৃহী হইয়া রোজগারে প্রবৃত্ত। এখন তাঁহারা কোনপ্রকার চাঁদার খাতা দেখিলেই প্রথমে হাসিয়া উড়াইয়া দেন, তাহাতেও খাতাধারী টিঁকিয়া থাকিবার লক্ষণ প্রকাশ করিলে গালি দিতে আরম্ভ করেন। নিজেদের দৃষ্টান্ত স্মরণ করিয়া দেশহিতৈষীর প্রতি তাঁহাদের অত্যন্ত অবজ্ঞা জন্মিয়াছে।

বিপিন, শ্রীশ, এবং পূর্ণ তিনটি সভ্য কালেজে পড়িতেছে, এখনো সংসারে প্রবেশ করে নাই। বিপিন ফুটবল্ খেলে, তাহার শরীরে অসামান্য বল, পড়াশুনা কখন্ করে কেহ বুঝিতে পারে না, অথচ চট্‌পট্‌ একজামিন পাস করে। শ্রীশ বড় মানুষের ছেলে, স্বাস্থ্য তেমন ভাল নয় তাই বাপ মা পড়াশুনার দিকে তত বেশী উত্তেজনা করেন না—শ্রীশ নিজের খেয়াল লইয়া থাকে। বিপিন এবং শ্রীশের বন্ধুত্ব অবিচ্ছেদ্য।

পূর্ণ গৌরবর্ণ, একহারা, লঘুগামী, ক্ষিপ্রকারী, দ্রুতভাষী, সকল বিষয়ে গাঢ় মনোেযোগ, চেহারা দেখিয়া মনে হয় দৃঢ় সংকল্প কাজের লোক।

সে ছিল চন্দ্রমাধব বাবুর ছাত্র। ভালরূপ পাশ করিয়া ওকালতী দ্বারা সুচারুরূপ জীবিকা নির্ব্বাহ করিবার প্রত্যাশায় সে রাত জাগিয়া পড়া করে। দেশের কাজ লইয়া নিজের কাজ নষ্ট করা তাহার সংকল্পের মধ্যে ছিল না। চিরকৌমার্য্য তাহার কাছে অত্যন্ত মনোহর বলিয়া বোধ হইত না। সন্ধ্যাবেলায় নিয়মিত আসিয়া সে চন্দ্রবাবুর নিকট হইতে পাস করিবার উপযুক্ত নোট লইত; এবং সে মনে মনে নিশ্চয় জানিত যে, চিরকৌমার্য্য ব্রত না লওয়াতে এবং নিজের ভবিষ্যৎ মাটি করিবার জন্য লেশমাত্র ব্যগ্র না হওয়াতে তাহার প্রতি চন্দ্রমাধব বাবুর শ্রদ্ধামাত্র ছিল না, কিন্তু সেজন্য সে কখনো অসহ্য দুঃখানুভব করে নাই। তাহার পরে কি ঘটিল তাহা সকলেই জানেন।

সে দিন সভা বসিয়াছে। চন্দ্রমাধব বাবু বলিতেছেন, আমাদের এই সভার সভ্যসংখ্যা অল্প হওয়াতে কারো হতাশ্বাস হবার কোন কারণ নেই—

তাঁহার কথা শেষ না হইতেই রুগ্নকায় উৎসাহী শ্রীশ বলিয়া উঠিল—হতাশ্বাস! সেইত আমাদের সভার গৌরব! এ সভার মহৎ আদর্শ এবং কঠিনবিধান কি সর্ব্বসাধারণের উপযুক্ত! আমাদের সভা অল্প লোকের সভা।

চন্দ্রমাধব বাবু কার্য্যবিবরণের খাতাটা চোখের কাছে তুলিয়া ধরিয়া কহিলেন—কিন্তু আমাদের আদর্শ উন্নত এবং বিধান কঠিন বলেই আমাদের বিনয় রক্ষা করা কর্ত্তব্য; সর্ব্বদাই মনে রাখা উচিত আমরা আমাদের সংকল্প সাধনের যোগ্য না হতেও পারি। ভেবে দেখ পূর্ব্বে আমাদের মধ্যে এমন অনেক সভ্য ছিলেন যাঁরা হয়ত আমাদের চেয়ে সর্ব্বাংশে মহত্তর ছিলেন, কিন্তু তাঁরাও নিজের সুখ এবং সংসারের প্রবল আকর্ষণে একে একে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছেন। আমাদের কয় জনের পথেও যে প্রলোভন কোথায় অপেক্ষা করচে তা কেউ বল্‌তে পারে না। সেই জন্য আমরা দম্ভ পরিত্যাগ করব, এবং কোন রকম শপথেও বদ্ধ হতে চাইনে— আমাদের মত এই যে, কোন কালে মহৎ চেষ্টাকে মনে স্থান না দেওয়ার চেয়ে চেষ্টা করে অকৃতকার্য্য হওয়া ভাল।

পাশের ঘরে ঈষৎ মুক্ত দরজার অন্তরালে একটি শ্রোত্রী এই কথায় যে একটুখানি বিচলিত হইয়া উঠিল, তাহার অঞ্চলবদ্ধ চাবির গোচ্ছায় দুই একটা চাবি যে একটু ঠুন্ শব্দ করিল তাহা পূর্ণ ছাড়া আর কেহ লক্ষ্য করিতে পারিল না।

চন্দ্রমাধব বাবু বলিতে লাগিলেন, আমাদের সভাকে অনেকেই পরিহাস করেন; অনেকেই বলেন তোমরা দেশের কাজ কর্‌বার জন্য কৌমার্য্য ব্রত গ্রহণ কর্‌চ, কিন্তু সকলেই যদি এই মহৎ প্রতিজ্ঞায় আবদ্ধ হয় তা হলে পঞ্চাশ বৎসর পরে দেশে এমন মানুষ কে থাক্‌বে যার জন্যে কোন কাজ করা কারো দরকার হবে। আমি প্রায়ই নম্র নিরুত্তরে এই সকল পরিহাস বহন করি; কিন্তু এর কি কোন উত্তর নেই?—বলিয়া তিনি তাঁহার তিনটী মাত্র সভ্যের দিকে চাহিলেন।

পূর্ণ নেপথ্যবাসিনীকে স্মরণ করিয়া সোৎসাহে কহিল—আছে বৈ কি। সকল দেশেই একদল মানুষ আছে যারা সংসারী হবার জন্যে জন্মগ্রহণ করেনি, তাদের সংখ্যা অল্প। সেই কটিকে আকর্ষণ করে এক উদ্দেশ্যবন্ধনে বাঁধবার জন্যে আমাদের এই সভা—সমস্ত জগতের লোককে কৌমার্য্যব্রতে দীক্ষিত কর্‌বার জন্যে নয়। আমাদের এই জাল অনেক লোক্‌কে ধর্‌বে এবং অধিকাংশকেই পরিত্যাগ কর্‌বে, অবশেষে দীর্ঘকাল পরীক্ষার পর দুটি চারটি লোক থেকে যাবে। যদি কেউ জিজ্ঞাসা করে তোমরাই কি সেই দুটি চারিটী লোক তবে স্পর্ধাপূর্ব্বক কে নিশ্চয়রূপে বল্‌তে পারে। হাঁ আমরা জালে আকৃষ্ট হয়েছি এই পর্য্যন্ত কিন্তু পরীক্ষায় শেষ পর্য্যন্ত টিঁক্‌তে পারব কি না তা অন্তর্যামীই জানেন। কিন্তু আমরা কেউ টিক্‌তে পারি বা না পারি, আমরা একে একে স্খলিত হই বা না হই, তাই বলে আমাদের এই সভাকে পরিহাস করবার অধিকার কারো নেই। কেবল যদি আমাদের সভাপতি মশায় একমাত্র থাকেন, তবে আমাদের এই পরিত্যক্ত সভাক্ষেত্র সেই এক তপস্বীর তপঃপ্রভাবে পবিত্র উজ্জ্বল হয়ে থাকবে, এবং তাঁর চিরজীবনের তপস্যার ফল দেশের পক্ষে কখনই ব্যর্থ হবে না।

কুন্ঠিত সভাপতি কার্য্যবিবরণের খাতা খানি পুনর্ব্বার তাঁহার চোখের অত্যন্ত কাছে ধরিয়া অন্যমনস্কভাবে কি দেখিতে লাগিলেন। কিন্তু পূর্ণর এই বক্তৃতা যথাস্থানে যথাবেগে গিয়া পৌঁছিল। চন্দ্রমাধব বাবুর একাকী তপস্যার কথায় নির্ম্মলার চক্ষু ছল ছল করিয়া আসিল এবং বিচলিত বালিকার চাবির গোছর ঝনক শব্দ উৎকর্ণ পূর্ণকে পুরস্কৃত করিল।

বিপিন চুপ করিয়া ছিল, এতক্ষণ পরে সে তাহার জলদমন্দ্র গম্ভীর কণ্ঠে কহিল—আমরা এ সভার যোগ্য কি অযোগ্য, কালেই তার পরিচয় হবে, কিন্তু কাজ করাও যদি আমাদের উদ্দেশ্য হয় তবে সেটা কোনো এক সময়ে শুরু করা উচিত। আমার প্রশ্ন এই— কি কর্‌তে হবে?

চন্দ্রমাধব উজ্জ্বল উৎসাহিত হইয়া বলিয়া উঠিলেন, এই প্রশ্নের জন্য আমরা এতদিন অপেক্ষা করেছিলাম, কি কর্‌তে হবে? এই প্রশ্ন যেন আমাদের প্রত্যেককে দংশন করে অধীর করে তোলে, কি কর্‌তে হবে? বন্ধুগণ কাজই একমাত্র ঐক্যের বন্ধন। এক সঙ্গে যারা কাজ করে তারাই এক! এই সভায় আমরা যতক্ষণ সকলে মিলে একটা কাজে নিযুক্ত না হব ততক্ষণ আমরা যথার্থ এক হতে পারব না। অতএব বিপিন বাবু, আজ এই যে প্রশ্ন কর্‌চেন—কি করতে হবে—এই প্রশ্নকে নিব্‌তে দেওয়া হবে না। সভ্যমহাশয়গণ, আপনারা উত্তর করুন্ কি করতে হবে?

দুর্ব্বল দেহ শ্রীশ অস্থির হইয়া বলিয়া উঠিল আমাকে যদি জিজ্ঞাসা করেন কি করতে হবে, আমি বলি আমাদের সকলকে সন্ন্যাসী হয়ে ভারতবর্ষের দেশে দেশে গ্রামে গ্রামে দেশহিতব্রত নিয়ে বেড়াতে হবে, আমাদের দলকে পুষ্ট করে তুল্‌তে হবে, আমাদের এই সভাটিকে সূক্ষ্ম সূত্র স্বরূপ করে সমস্ত ভারতবর্ষকে গেঁথে ফেলতে হবে।

বিপিন হাসিয়া কহিল; সে ঢের সময় আছে, যা কালই সুরু করা যেতে পারে এমন একটা কিছু কাজ বল। “মারি ও গণ্ডার লুঠি ত ভাণ্ডার” যদি পণ করে বস, তবে গণ্ডারও বাঁচবে ভাণ্ডারও বাঁচবে, তুমিও যেমন আরামে আছ তেমনি আরামে থাকবে। আমি প্রস্তাব করি, আমরা প্রত্যেকে দুটি করে বিদেশী ছাত্র পালন করব, তাদের পড়া শুনো এবং শরীর মনের সমস্ত চর্চ্চার ভার আমাদের উপর থাক্‌বে।

শ্রীশ কহিল-এই তোমার কাজ। এর জন্যই আমরা সন্ন্যাসধর্ম গ্রহণ করেছি? শেষকালে ছেলে মানুষ কর্‌তে হবে, তাহলে নিজের ছেলে কি অপরাধ করেছে?

বিপিন বিরক্ত হইয়া কহিল, তা যদি বল তাহলে সন্ন্যাসীর ত কর্ম্মই নেই; কর্ম্মের মধ্যে ভিক্ষে আর ভ্রমণ আর ভণ্ডামি!

শ্রীশ রাগিয়া কহিল, আমি দেখ্‌চি আমাদের মধ্যে কেউ কেউ আছেন এসভার মহৎ উদ্দেশ্যের প্রতি যাঁদের শ্রদ্ধামাত্র নেই, তাঁরা যত শীঘ্র এ সভা পরিত্যাগ করে সন্তানপালনে প্রবৃত্ত হন ততই আমাদের মঙ্গল!

বিপিন আরক্তবর্ণ হইয়া বলিল—নিজের সম্বন্ধে কিছু বল্‌তে চাইনে কিন্তু এ সভায় এমন কেউ কেউ আছেন, যাঁরা সন্ন্যাস গ্রহণের কঠোরতা এবং সন্তানপালনের ত্যাগ স্বীকার দুয়েরই অযোগ্য, তাঁদের—

চন্দ্রমাধব বাবু চোখের কাছ হইতে কার্য্যবিবরণের খাতা নামাইয়া কহিলেন, উত্থাপিত প্রস্তাব সম্বন্ধে পূর্ণ বাবুর অভিপ্রায় জান্‌তে পারলে আমার মন্তব্য প্রকাশ করবার অবসর পাই।

পূর্ণ কহিল, অদ্য বিশেষরূপে সভার ঐক্য বিধানের জন্য একটা কাজ অবলম্বন করবার প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু কাজের প্রস্তাবে ঐক্যের লক্ষণ কি রকম পরিস্ফুট হয়ে উঠেছে সে আর কাউকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখাবার দরকার নেই। ইতিমধ্যে আমি যদি আবার একটা তৃতীয় মত প্রকাশ করে বসি তাহলে বিরোধানলে তৃতীয় আহুতি দান করা হবে—অতএব আমার প্রস্তাব এই যে সভাপতি মশায় আমাদের কাজ নির্দ্দেশ করে দেবেন এবং আমরা তাই শিরোধার্য্য করে নিয়ে বিনা বিচারে পালন করে যাব, কার্য্যসাধন এবং ঐক্য সাধনের এই এক মাত্র উপায় আছে।

পাশের ঘরে এক ব্যক্তি আবার একবার নড়িয়া চড়িয়া বসিল এবং তাহার চাবি ঝন্ করিয়া উঠিল।

বিষয়কর্ম্মে চন্দ্রমাধব বাবুর মত অপটু কেহ নাই কিন্তু তাঁহার মনের খেয়াল বাণিজ্যের দিকে। তিনি বলিলেন, আমাদের প্রথম কর্ত্তব্য ভারতবর্ষের দারিদ্র্যমোচন, এবং তার আশু উপায় বাণিজ্য। আমরা কয়জনে বড় বাণিজ্য চালাতে পারিনে, কিন্তু তার সূত্রপাত করতে পারি। মনে কর আমরা সকলেই যদি দিয়াশলাই সম্বন্ধে পরীক্ষা আরম্ভ করি। এমন যদি একটা কাটি বের করতে পারি যা সহজে জ্বলে, শীঘ্র নেবে না এবং দেশের সর্ব্বত্র প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়, তা হলে দেশে সস্তা দেশালাই নির্ম্মাণের কোন বাধা থাকে না।—এই বলিয়া জাপানে এবং য়ুরোপে সবসুদ্ধ কত দেশালাই প্রস্তুত হয়,তাহাতে কোন্ কোন্ কাঠের কাঠি ব্যবহার হয়, কাঠির সঙ্গে কি কি দাহ্যপদার্থ মিশ্রিত করে, কোথা হইতে কত দেশালাই রপ্তানি হয়, তাহার মধ্যে কত ভারতবর্ষে আসে এবং তাহার মূল্য কত, চন্দ্রমাধববাবু তাহা বিস্তারিত করিয়া বলিলেন। বিপিন শ্রীশ নিস্তব্ধ হইয়া বসিয়া রহিল। পূর্ণ কহিল, পাকাটি এবং খ্যাংরা কাঠি দিয়ে শীঘ্রই পরীক্ষা করে দেখ্‌ব।—শ্রীশ মুখ ফিরাইয়া হাসিল।

এমন সময় ঘরের মধ্যে অক্ষয় আসিয়া প্রবেশ করিলেন। কহিলেন, মশায় প্রবেশ করতে পারি?

ক্ষীণদৃষ্টি চন্দ্রমাধব বাবু হঠাৎ চিনিতে না পারিয়া ভ্রূকুঞ্চিত করিয়া অবাক্ হইয়া চাহিয়া রহিলেন। অক্ষয় কহিলেন, মশায় ভয় পাবেন না এবং অমন ভ্রূকুটি করে আমাকেও ভয় দেখাবেন না—আমি অভূতপূর্ব্ব নই—এমন কি, আমি আপনাদেরই ভূতপূর্ব্ব—আমার নাম—

চন্দ্রমাধব বাবু তাড়াতাড়ি উঠিয়া কহিলেন আর নাম বলতে হবে না— আসুন্ আসুন্ অক্ষয় বাবু—

তিন তরুণ সভ্য অক্ষয়কে নমস্কার করিল। বিপিন ও শ্রীশ দুই বন্ধু সদ্যোবিবাদের বিমর্ষতায় গম্ভীর হইয়া বসিয়া রহিল; পূর্ণ কহিল, মশায়, অভূতপূর্ব্বর চেয়ে ভূতপূর্ব্বকেই বেশী ভয় হয়!

অক্ষয় কহিলেন—পূর্ণ বাবু বুদ্ধিমানের মত কথাই বলেছেন। সংসারে ভূতের ভয়টাই প্রচলিত। নিজে যে ব্যক্তি ভূত অন্যলোকের জীবনসম্ভোগটা তার কাছে বাঞ্ছনীয় হতে পারেই না, এই মনে করে মানুষ ভূতকে ভয়ঙ্কর কল্পনা করে। অতএব সভাপতিমশায়, চিরকুমার সভার ভূতটিকে সভাথেকে ঝাড়াবেন, না পূর্ব্ব সম্পর্কের মমতা বশতঃ একখানি চৌকি দেবেন, এইবেলা বলুন!

“চৌকি দেওয়াই স্থির” বলিয়া চন্দ্রবাবু একখানি চেয়ার অগ্রসর করিয়া দিলেন। “সর্ব্ব সম্মতিক্রমে আসন গ্রহণ করলুম” বলিয়া অক্ষয়বাবু বসিলেন; বলিলেন আপনারা আমাকে নিতান্ত ভদ্রতা করে বস্‌তে বল্লেন বলেই যে আমি অভদ্রতা করে বসেই থাক্‌ব আমাকে এমন অসভ্য মনে করবেন না—বিশেষতঃ পান তামাক এবং পত্নী আপনাদের সভার নিয়মবিরুদ্ধ অথচ ঐ তিনটে বদ্‌ অভ্যাসই আমাকে একেবারে মাটি করেছে সুতরাং চট্‌পট্‌ কাজের কথা সেরেই বাড়িমুখো হতে হবে।

চন্দ্রবাবু হাসিয়া কহিলেন, আপনি যখন সভ্য নন্‌ তখন আপনার সম্বন্ধে সভার নিয়ম নাই খাটালেম— পান তামাকের বন্দোবস্ত বোধ হয় করে দিতে পারব কিন্তু আপনার তৃতীয় নেশাই—

অক্ষয়। সেটি এখানে বহন করে আনবার চেষ্টা কর্‌বেন না, আমার সে নেশাটি প্রকাশ্য নয়!

চন্দ্রবাবু পান তামাকের জন্য সনাতন চাকরকে ডাকিবার উপক্রম করিলেন। পূর্ণ কহিল আমি ডাকিয়া দিতেছি বলিয়া উঠিল;—পাশের ঘরে চাবি এবং চুড়ি এবং সহসা পলায়নের শব্দ একসঙ্গে শোনা গেল।

অক্ষয় তাহাকে থামাইয়া কহিলেন, “যস্মিন্ দেশে যদাচারঃ” যতক্ষণ আমি এখানে আছি ততক্ষণ আমি আপনাদের চিরকুমার—কোন প্রভেদ নেই! এখন আমার প্রস্তাবটা শুনুন্।

চন্দ্রবাবু টেবিলের উপর কার্য্যবিবরণের খাতাটির প্রতি অত্যন্ত ঝুঁকিয়া পড়িয়া মন দিয়া শুনিতে লাগিলেন।

অক্ষয় কহিলেন আমার কোন মফস্বলের ধনী বন্ধু তাঁর একটি সন্তানকে আপনাদের কুমার সভার সভ্য কর্‌তে ইচ্ছা করেচেন।

চন্দ্রবাবু বিস্মিত হইয়া কহিলেন, বাপ ছেলেটির বিবাহ দিতে চান না!

অক্ষয়। সে আপনারা নিশ্চিন্ত থাকুন—বিবাহ সে কোনক্রমেই করবে না আমি তার জামিন রইলুম। তার দূর সম্পর্কের এক দাদা সুদ্ধ সভ্য হবেন। তাঁর সম্বন্ধেও আপনারা নিশ্চিন্ত থাক্‌তে পারেন, কারণ যদিচ তিনি আপনাদের মত সুকুমার নন কিন্তু আপনাদের সকলের চেয়ে বেশী কুমার, তাঁর বয়স ৬০ পেরিয়ে গেছে—সুতরাং তাঁর সন্দেহের বয়সটা আর নেই, সৌভাগ্যক্রমে সেটা আপনাদের সকলেরই আছে।

অক্ষয়বাবুর প্রস্তাবে চিরকুমার সভা প্রফুল্ল হইয়া উঠিল, সভাপতি কহিলেন সভ্যপদপ্রার্থীদের নাম ধাম বিবরণ—

অক্ষয়। অবশ্যই তাঁদের নাম ধাম বিবরণ একটা আছেই—সভাকে তার থেকে বঞ্চিত করতে পারা যাবে না—সভ্য যখন পাবেন তখন নাম ধাম বিবরণ সুদ্ধই পাবেন। কিন্তু আপনাদের এই একতালার স্যাঁতসেঁতে ঘরটি স্বাস্থ্যের পক্ষে অনুকূল নয়; আপনাদের এই চিরকুমার ক’টির চিরত্ব যাতে হ্রাস না হয় সেদিকে একটু দৃষ্টি রাখ্‌বেন!

চন্দ্রবাবু কিঞ্চিৎ লজ্জিত হইয়া খাতাটি নাকের কাছে তুলিয়া লইয়া বলিলেন—অক্ষয় বাবু আপনি জানেন ত আমাদের আয়—

অক্ষয়। আয়ের কথাটা আর প্রকাশ করবেন না, আমি জানি ও আলোচনাটা চিত্তপ্রফুল্লকর নয়। ভাল ঘরের বন্দোবস্ত করে রাখা হয়েছে সে জন্যে আপনাদের ধনাধ্যক্ষকে স্মরণ কর্‌তে হবে না। চলুন না আজই সমস্ত দেখিয়ে শুনিয়ে আনি!

বিমর্ষ বিপিন শ্রীশের মুখ উজ্জ্বল হইয়া উঠিল। সভাপতিও প্রফুল্ল হইয়া উঠিয়া চুলের মধ্যদিয়া বারবার আঙুল বুলাইতে বুলাইতে চুলগুলাকে অত্যন্ত অপরিষ্কার করিয়া তুলিলেন। কেবল পূর্ণ অত্যন্ত দমিয়া গেল। সে বলিল, সভার স্থান পরিবর্ত্তনটা কিছু নয়। অক্ষয় কহিলেন,—কেন, এবাড়ি থেকে ওবাড়ি করলেই কি আপনাদের চিরকৌমার্য্যের প্রদীপ হাওয়ায় নিবে যাবে?

পূর্ণ। এ ঘরটি ত আমাদের মন বোধ হয় না!

অক্ষয়। মন্দ নয়। কিন্তু এর চেয়ে ভাল ঘর সহরে দুষ্প্রাপ্য হবে না!

পূর্ণ। আমার ত মনে হয় বিলাসিতার দিকে মন না দিয়ে খানিকটা কষ্টসহিষ্ণুতা অভ্যাস করা ভাল!

শ্রীশ কহিল, সেটা সভার অধিবেশনে না করে সভার বাইরে করা যাবে।

বিপিন কহিল—একটা কাজে প্রবৃত্ত হোলেই এত ক্লেশ সহ্য করবার অবসর পাওয়া যায় যে, অকারণে বলক্ষয় করা মূঢ়তা।

অক্ষয়। বন্ধুগণ, আমার পরামর্শ শোন, সভাঘরের অন্ধকার দিয়ে চিরকৌমার্য্য ব্রতের অন্ধকার আর বাড়িয়োনা। আলোক এবং বাতাস স্ত্রীলিঙ্গ নয় অতএব সভার মধ্যে ওদুটোকে প্রবেশ কর্‌তে বাধা দিয়ে না। আরো বিবেচনা করে দেখ, এস্থানটি অত্যন্ত সরস, তোমাদের ব্রতটি তদুপযুক্ত নয়। বাতিকের চর্চ্চা কর্‌চ কর, কিন্তু বাতের চর্চ্চা তোমাদের প্রতিজ্ঞার মধ্যে নয়। কি বল শ্রীশ বাবু বিপিন বাবুর কি মত?

দুই বন্ধু বলিল —ঠিক কথা। ঘরটা একবার দেখেই আসা যাক্ না।

পূর্ণ বিমর্ষ হইয়া নিরুত্তর রহিল। পাশের ঘরেও চাবি একবার ঠুন্ করিল, কিন্তু অত্যন্ত অপ্রসন্ন সুরে!

(৫)

অক্ষয় বলিলেন—স্বামীই স্ত্রীর একমাত্র তীর্থ। মান কি না?

পুরবালা। আমি কি পণ্ডিত মশায়ের কাছে শাস্ত্রের বিধান নিতে এসেছি? আমি মার সঙ্গে আজ কাশী চলেছি এই খবরটি দিয়ে গেলুম।

অক্ষয়। খবরটি সুখবর নয়—শোনবামাত্র তোমাকে শাল দোশালা বক্‌শিশ দিয়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে না।

পুরবালা। ইস্, হৃদয় বিদীর্ণ হচ্চে! না? সহ্য করতে পারচ না?

অক্ষয়। আমি কেবল উপস্থিত বিচ্ছেদটার কথা ভাব্‌চি নে— এখন তুমি দুদিন না রইলে, আরো ক’জন রয়েছেন, এক রকম করে এই হতভাগ্যের চলে যাবে। কিন্তু এর পরে কি হবে? দেখ, ধর্ম্ম কর্ম্মে স্বামীকে এগিয়ে যেয়ো না,—স্বর্গে তুমি যখন ডব্‌ল্ প্রোমোশন্ পেতে থাক্‌বে আমি তখন পিছিয়ে থাক্‌ব-তোমাকে বিষ্ণুদূতে রথে চড়িয়ে নিয়ে যাবে, আর আমাকে যমদূতে কানে ধরে হাঁটিয়ে দৌড় করাবে—

(গান)

পরজ

স্বর্গে তোমায় নিয়ে যাবে উড়িয়ে,
পিছে পিছে আমি চলব খুঁড়িয়ে!
ইচ্ছা হবে টিকির ডগা ধরে
বিষ্ণু দূতের মাথাটা দিই গুঁড়িয়ে।

পুরবালা আচ্ছা, আচ্ছা, থাম!

অক্ষয়। আমি থামব, কেবল তুমিই চল্‌বে। ঊনবিংশ শতাব্দীর এই বন্দোবস্ত? নিতান্তই চল্‌লে?

পুরবালা। চল্লুম।

অক্ষয়। আমাকে কার হাতে সমর্পণ করে গেলে?

পুরবালা। রসিক দাদার হাতে।

অক্ষয়। মেয়ে মানুষ, হস্তান্তর করবার আইন কিছুই জান না! সেই জন্যেই ত বিরহাবস্থায় উপযুক্ত হাত নিজেই খুঁজে নিয়ে আত্মসমর্পণ করতে হয়।

পুরবালা। তোমাকে ত বেশী খোঁজাখুঁজি করতে হবে না!

অক্ষয়। তা হবে না। (গান)-কাফি।

কার হাতে যে ধরা দেব প্রাণ;
(তাই) ভাবতে বেলা অবসান!
ডান দিকেতে তাকাই যখন, বাঁয়ের লাগি কাঁদেরে মন
বাঁয়ের দিকে ফিরলে তখন দক্ষিণেতে পড়ে টান!

আচ্ছা আমার যেন সান্ত্বনার গুটি দুই তিন সদুপায় আছে কিন্তু তুমি

বিরহ যামিনী কেমনে যাপিবে,
বিচ্ছেদ তাপে যখন তাপিবে
এপাশ ওপাশ বিছানা মাপিবে,
মকর কেতনে কেবলি শাপিবে,

পুরবালা। রক্ষে কর, ও মিলটা ঐ খানেই শেষ কর!

অক্ষয়। দুঃখের সময় আমি থাম্‌তে পারিনে—কাব্য আপনি বেরতে থাকে। মিল ভাল না বাস অমিত্রাক্ষর আছে, তুমি যখন বিদেশে থাকবে আমি “আর্তনাদ বদ্ কাব্য” বলে একটা কাব্য লিখ্‌ব—সখি আর আরম্ভটা শোন—(সাড়ম্বরে)

বাষ্পীয় শকটে চড়ি নারী চূড়ামণি
পুরবালা চলি যবে গেলা কাশীধামে
বিকালে, কহ হে দেবি অমৃত ভাষিণী
কোন্ বরাঙ্গনে বরি বরমাল্যদানে
যাপিলা বিচ্ছেদ মাস শ্যালীত্রয়ীশালী
শ্রীঅক্ষয়!

পুরবালা। (সগর্ব্বে) আমার মাথা খাও, ঠাট্টা নয়, তুমি একটা সত্যিকার কাব্য লেখনা!

অক্ষয়। মাথা খাওয়ার কথাটা যদি বল্লে, আমি নিজের মাথাটি খেয়ে অবধি বুঝেছি ওটা সুখাদ্যের মধ্যে গণ্য নয়। আর ঐ কাব্য লেখা, ও কার্য্যটাও সুসাধ্য বলে জ্ঞান করিনে। বুদ্ধিতে আমার এক জায়গায় ফুটো আছে, কাব্য জম্‌তে পারে না—ফস্ ফস্ করে বেরিয়ে পড়ে।

তুমি জান আমার গাছে ফল কেন না ফলে!
যেমনি ফুলটি ফুটে ওঠে আনি চরণতলে!

কিন্তু আমার প্রশ্নের ত কোন উত্তর পেলুম না। কৌতূহলে মরে যাচ্চি। কাশীতে যে চলেছ, উৎসাহটা কিসের জন্যে? আপাততঃ সেই বিষ্ণু দূতটাকে মনে মনে ক্ষমা করলুম, কিন্তু ভগবান্ ভূতনাথ ভবানীপতির অনুচরগুলোর উপর ভারি সন্দেহ হচ্চে। শুনেছি নন্দী ও ভূঙ্গি অনেক বিষয়ে আমাকেও জেতে, ফিরে এসে হয়ত এই ভূতটিকে পছন্দ না হতেও পারে!

অক্ষয়ের পরিহাসের মধ্যে একটু যে অভিমানের জ্বালা ছিল, সেটুকু পুরবালা অনেক্ষণ বুঝিয়াছে। তাহা ছাড়া, প্রথমে কাশী যাইবার প্রস্তাবে তাহার যে উৎসাহ হইয়াছিল, যাত্রার সময় যতই নিকটবর্ত্তী হইতে লাগিল ততই তাহা ম্লান হইয়া আসিতেছে।

সে কহিল—আমি কাশী যাব না।

অক্ষয়। সে কি কথা! ভূতভাবনের যে ভৃত্যগুলি একবার মরে ভূত হয়েছে—তারা যে দ্বিতীয়বার মরবে!

রসিকের প্রবেশ।

পুরবালা। আজ যে রসিকদাদার মুখ ভারি প্রফুল্ল দেখাচ্চে?

রসিক। ভাই, তোর রসিকদাদার মুখের ঐ রোগটা কিছুতেই ঘুচল না। কথা নেই বার্ত্তা নেই প্রফুল্ল হয়েই আছে—বিবাহিত লোকেরা দেখে’ মনে মনে রাগ করে।

পুরবালা। শুন্‌লে ত, বিবাহিত লোক! এর একটা উপযুক্ত জবাব দিয়ে যাও!

অক্ষয়। আমাদের প্রফুল্লতার খবর ও বৃদ্ধ কোথা থেকে জানবে? সে এত রহস্যময় যে, তা উদ্ভেদ করতে আজ পর্য্যন্ত কেউ পারলে না, —সে এত গভীর যে আমরাই হাত্‌ড়ে খুঁজে পাইনে, হঠাৎ সন্দেহ হয় আছে কি না।

পুরবালা “এই বুঝি!” বলিয়া রাগ করিয়া চলিয়া যাইবার উপক্রম করিল।

অক্ষয় তাহাকে ধরিয়া ফিরাইয়া কহিল—দোহাই তোমার এই লোকটির সাম্‌নে রাগারাগি কোরো না—তাহলে ওর আস্পর্ধা আরো বেড়ে যাবে।—দেখ দাম্পত্য তত্ত্বানভিজ্ঞ বৃদ্ধ, আমরা যখন রাগ করি তখন স্বভাবতঃ আমাদের কণ্ঠস্বর প্রবল হয়ে উঠে, সেইটেই তোমাদের কর্ণগোচর হয়; আর অনুরাগে যখন আমাদের কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসে, কানের কাছে মুখ আন্‌তে গিয়ে মুখ বারম্বার লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে পড়তে থাকে, —তখন ত খবর পাও না!

পুরবালা। আঃ-চুপ কর!

অক্ষয়। যখন গয়নার ফর্দ্দ হয় তখন বাড়ীর সরকার থেকে স্যাকরা পর্য্যন্ত সেটা কারো অবিদিত থাকে না কিন্তু বসন্ত নিশীথে যখন


পুরবালা। আঃ—থাম!

অক্ষয়। বসন্ত-নিশীথে প্রেয়সী—

পুরবালা। আঃ—কি বক্‌চ তার ঠিক নেই!

অক্ষয়। বসন্তনিশীথে যখন প্রেয়সী গর্জ্জন করে বলেন, আমি কালই বাপের বাড়ি চলে যাব, আমার একদণ্ড এখানে থাক্‌তে ইচ্ছে নেই—আমার হাড় কালী হল—আমার—

পুরবালা। হাঁগো মশায়, কবে তোমার প্রেয়সী বাপেরবাড়ি যাব বলে বসন্তনিশীথে গর্জ্জন করেছে?

অক্ষয়। ইতিহাসের পরীক্ষা? কেবল ঘটনা রচনা করে নিষ্কৃতি নেই? আবার সন তারিখ সুদ্ধ মুখে মুখে বানিয়ে দিতে হবে? আমি কি এত বড় প্রতিভাশালী?

রসিক। (পুরবালার প্রতি) বুঝেছ ভাই, সোজা করে ও তোমার কথা বল্‌তে পারে না—ওর এত ক্ষমতাই নেই—তাই উল্টে বলে; আদরে না কুলোলে গাল দিয়ে আদর করতে হয়!

পুরবালা। আচ্ছা মল্লিনাথজি, তোমার আর ব্যাখ্যা করতে হবে না। মা যে শেষকালে তোমাকেই কাশী নিয়ে যাবেন স্থির করেছেন।

রসিক। তা বেশ ত, এতে আর ভয়ের কথাটা কি? তীর্থ যাবার ত বয়সই হয়েছে। এখন তোমাদের লোল কটাক্ষে এ বৃদ্ধের কিছুই করতে পারবে না—এখন চিত্ত চন্দ্রচূড়ের চরণে—

মুগ্ধস্নিগ্ধবিদগ্ধমুগ্ধমধুরৈর্লোলৈঃ কটাক্ষৈরলং
চেতশ্চুম্বতি চন্দ্রচূড়চরণধ্যানামৃতে বর্ত্ততে।

পুরবালা। সে ত খুব ভাল কথা—তোমার উপরে আর কটাক্ষের অপব্যয় কর্‌তে চাই নে—এখন চন্দ্রচূড় চরণে চল—তাহলে মাকে ডাকি!

রসিক। (করজোড়ে) বড়দিদি ভাই, তোমার মা আমাকে সংশোধনের বিস্তর চেষ্টা করচেন, কিন্তু একটু অসময়ে সংস্কার কার্য্য আরম্ভ করেচেন—এখন তাঁর শাসনে কোন ফল হবে না! বরঞ্চ এখনো নষ্ট হবার বয়স আছে, সে বয়সটা বিধাতার কৃপায় বরাবরই থাকে, লোল কটাক্ষটা শেষকাল পর্য্যন্ত খাটে, কিন্তু উদ্ধারের বয়স আর নেই। তিনি এখন কাশী যাচ্চেন, কিছুদিন এই বৃদ্ধ শিশুর বুদ্ধিবৃত্তির উন্নতিসাধনের দুরাশা পরিত্যাগ করে শান্তিতে থাকুন—কেন তোরা তাঁকে কষ্ট দিবি।

জগত্তারিণীর প্রবেশ।

জগত্তারিণী। বাবা তা হলে আসি।

অক্ষয়। চল্লে না কি মা? রসিকদাদা যে এতক্ষণ দুঃখ করছিলেন যে তুমি—

রসিক। (ব্যাকুলভাবে) দাদার সকল কথাতেই ঠাট্টা! মা, আমার কোন দুঃখ নেই—আমি কেন দুঃখ করতে যাব?

অক্ষয়। বল্‌ছিলে না, সে, বড়মা একলাই কাশী যাচ্চেন, আমাকে সঙ্গে নিলেন না?

রসিক। হাঁ, সে ত ঠিক কথা! মনে ত লাগ্‌তেই পারে—তবে কি না মা যদি নিতান্তই—

জগত্তারিণী। না বাপু, বিদেশে তোমার রসিকদাদাকে সাম্‌লবে কে? ওঁকে নিয়ে পথ চল্‌তে পারব না।

পুরবালা। কেন মা, রসিকদাদাকে নিয়ে গেলে উনি তোমাকে দেখতে শুন্‌তে পার্ত্তেন।

জগত্তারিণী। রক্ষে কর, আমাকে আর দেখে শুনে কাজ নেই। তোমার রসিকদাদার বুদ্ধির পরিচয় ঢের পেয়েছি।

রসিকদাদা। (টাকে হাত বুলাতে বুলাইতে) তা মা, যেটুকু বুদ্ধি আছে তার পরিচয় সর্ব্বদাই দিচ্চি—ও ত চেপে রাখবার জো নেই—ধরা পড়তেই হবে। ভাঙা চাকাটাই সব চেয়ে খড় খড় করে—তিনি যে ভাঙা সেটা পাড়াসুদ্ধ খবর পায়। সেই জন্যেই বড়মা চুপচাপ করে থাক্‌তেই চাই, কিন্তু তুমি যে আবার চালাতেও ছাড় না!

নিজের শৈথিল্যে যাহার কিছুই মনের মত হয় না, সর্ব্বদা ভর্ৎসনা করিবার জন্য তাহার একটা হতভাগ্যকে চাই। রসিকদাদা জগত্তারিণীর বহিস্থিত আত্মগ্লানি বিশেষ।

জগত্তারিণী। আমি তাহলে হারাণের বাড়ি চল্লুম, একেবারে তাদের সঙ্গে গাড়িতে উঠ্‌ব—এর পরে আর যাত্রার সময় নেই। পুরো, তোরাত দিনক্ষণ মানিস্‌নে, ঠিক সময়ে ইষ্টেশনে যাস্!

তাঁহার কন্যাজামাতার অসামান্য আসক্তি মা বেশ অবগত ছিলেন। পঞ্জিকার খাতিরে শেষ মুহূর্ত্তের পূর্ব্বে তাহাদের বিচ্ছেদ সংঘটনের চেষ্টা তিনি বৃথা বলিয়াই জানিতেন।

কিন্তু পুরবালা যখন বলিল, মা আমি কাশী যাব না—সেটা তিনি বাড়াবাড়ি মনে করিলেন। পুরবালার প্রতি তাঁহার বড় নির্ভর। সে তাঁহার সঙ্গে যাইতেছে বলিয়া তিনি নিশ্চিন্ত আছেন। পুরবালা স্বামীর সঙ্গে সিম্‌লা যাতায়াত করিয়া বিদেশ ভ্রমণে পাকা হইয়াছে; পুরুষ অভিভাবকের অপেক্ষা পুরবালাকেই তিনি পথসঙ্কটে সহায়রূপে আশ্রয় করিয়াছেন। হঠাৎ তাহার অসম্মতিতে বিপন্ন হইয়া জগত্তারিণী তাঁহার জামাতার মুখের দিকে চাহিলেন।

অক্ষয় তাঁহার শ্বাশুড়ির মনের ভাব বুঝিয়া কহিলেন—সে কি হয়? তুমি মার সঙ্গে না গেলে ওঁর অসুবিধা হবে। আচ্ছা মা, তুমি এগোও, আমি ওকে ঠিক সময়ে ষ্টেশনে নিয়ে যাব। জগত্তারিণী নিশ্চিন্ত হইয়া প্রস্থান করিলেন। রসিক দাদা টাকে হাত বুলাইতে বুলাইতে বিদায় কালীন বিমর্ষতা মুখে আনিবার জন্য চেষ্টা করিতে লাগিলেন।

অক্ষয়। কে মশায়! আপনি কে?

“আজ্ঞে মশায়, আপনার সহধর্ম্মিণীর সঙ্গে আমার বিশেষ সম্বন্ধ আছে” বলিয়া পুরুষ বেশধারী শৈল অক্ষয়ের সঙ্গে শেক হ্যাণ্ড্, করিল।

শৈল। মুখুজ্জেমশায় চিন্‌তে ত পারলে না?

পুরবালা। অবাক্‌ করলি! লজ্জা করচে না?

শৈল। দিদি, লজ্জা যে স্ত্রীলোকের ভূষণ—পুরুষের বেশ ধরতে গেলেই সেটা পরিত্যাগ করতে হয়। তেমনি আবার মুখুজ্জেমশায় যদি মেয়ে সাজেন, উনি লজ্জায় মুখ দেখাতে পারবেন না। রসিক দাদা, চুপ করে রৈলে যে।

রসিক। আহা শৈল! যেন কিশোর কন্দর্প! যেন সাক্ষাৎ কুমার, ভবানীর কোল থেকে উঠে এল! ওকে বরাবর শৈল বলে দেখে আস্‌চি, চোখে অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল, ও সুন্দরী, কি মাঝারি, কি চলনসই সে কথা কখনো মনেও ওঠেনি—আজ ঐ বেশটি বদল করেছে বলেই ত ওর রূপ খানি ধরা দিলে! পুরো দিদি, লজ্জার কথা কি বল্‌চিস্‌ আমার ইচ্ছে করচে ওকে টেনে নিয়ে ওর মাথায় হাত দিয়ে আশীর্ব্বাদ করি!

পুরবালা শৈলের তরুণ সুকুমার প্রিয়দর্শন পুরুষ মূর্ত্তিতে মনে মনে মুগ্ধ হইতেছিল। গভীর বেদনার সহিত তাহার কেবলি মনে হইতেছিল, আহা শৈল আমাদের বোন না হয়ে যদি ভাই হত! ওর এমন রূপ এমন বুদ্ধি ভগবান সমস্তই ব্যর্থ করে দিলেন। পুরবালার স্নিগ্ধ চোখ দুইটী ছল ছল করিয়া উঠিল।

অক্ষয় স্নেহাভিষিক্ত গাম্ভীর্যের সহিত ছদ্মবেশিনীকে ক্ষণকাল নিরীক্ষণ করিয়া বলিলেন—সত্যি বলছি শৈল, তুমি যদি আমার শ্যালী না হয়ে আমার ছোট ভাই হতে তা হলেও আমি আপত্তি করতুম না।

শৈল ঈষৎ বিচলিত হইয়া কহিল, আমিও কর্ত্তুম না মুখুজ্জেমশায়! বাস্তবিক ইহারা দুই ভাইয়ের মতই ছিল। কেবল সেই ভ্রাতৃভাবের সহিত কৌতুকময় বয়স্যভাব মিশ্রিত হইয়া কোমল সম্বন্ধ উজ্জল হইয়া উঠিয়াছিল।

পুরবালা শৈলকে বুকের কাছে টানিয়া কহিল, এই বেশে তুই কুমার সভার সভ্য হতে যাচ্চিস্ শৈল?

শৈল। অন্য বেশে হতে গেলে যে ব্যাকরণের দোষ হয় দিদি! কি বল রসিক দাদা!

রসিক। তা ত বটেই, ব্যাকরণ বাঁচিয়ে ত চলতেই হবে। ভগবান পাণিনি বোপদেব এঁরা কি জন্যে জন্মগ্রহণ করেছিলেন? কিন্তু ভাই শ্রীমতী শৈলবালার উত্তর চাপ্ কান্ প্রত্যয় করলেই কি ব্যাকরণ রক্ষে হয়!

অক্ষয়। নতুন মুগ্ধবোধে তাই লেখে। আমি লিখে পড়ে দিতে পারি চিরকুমার সভার মুগ্ধদের কাছে শৈল যেমন প্রত্যয় করাবে তাঁরা তেমনি প্রত্যয় যাবেন। কুমারদের ধাতু আমি জানি কি না।

পুরবালা একটুখানি দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া শৈলকে কহিল—তোর মুখুজ্জেমশায়কে আর এই বুড়ো সমবয়সীটিকে নিয়ে তোর খেলা তুই আরম্ভ কর—আমি মার সঙ্গে কাশী চল্লুম।

পুরবালা এই সকল নিয়মবিরুদ্ধ ব্যাপার মনে মনে পছন্দ করিত না। কিন্তু তাহার স্বামীর ও ভগিনীটির- বিচিত্র কৌতুক লীলায় সর্ব্বদা বাধা দিতেও তাহার মন সরিত না। নিজের স্বামী-সৌভাগ্যের কথা স্মরণ করিয়া বিধবা বোনটির প্রতি তাহার করুণা ও প্রশ্রয়ের অন্ত ছিল না। ভাবিত, হতভাগিনী যেমন করিয়া ভুলিয়া থাকে থাক্। পুরবালা জিনিষপত্র গুছাইতে গেল।

এমন সময় নৃপবালা ও দীরবালা ঘরে প্রবেশ করিয়াই পলায়নোদ্যত হইল। নীর দরজার আড়াল হইতে আর একবার ভাল করিয়া তাকাইয়া “মেজদিদি” বলিয়া ছুটিয়া আসিল—কহিল, মেজদিদি তােমাকে ভাই জড়িয়ে ধর্ত্তে ইচ্ছে করছে, কিন্তু ঐ চাপকানে বাধ্‌ছে। মনে হচ্চে তুমি যেন কোন্ রূপকথার রাজপুত্র, তেপান্তর মাঠ পেরিয়ে আমাদের উদ্ধার করতে এসেচ।

নীরর সমুচ্চ কণ্ঠস্বরে আশ্বস্ত হইয়া নৃপও ঘরে প্রবেশ করিয়া মুগ্ধ নেত্রে চাহিয়া রহিল। নীর তাহাকে টানিয়া লইয়া কহিল, অমন করে লােভীর মত তাকিয়ে আছিস্ কেন? যা মনে করছিস্ তা নয়, ও তাের দুষ্যন্ত নয়―ও আমাদের মেজদিদি!

রসিক।

ইয়মধিকমনােজ্ঞা চাপ্‌কানেনাপি তন্বী
কিমিব হি মধুরানাং মণ্ডনং নাকৃতীনাম্!

অক্ষয়। মূঢ়ে, তােরা কেবল চাপ্‌কানটা দেখেই মুগ্ধ! গিল্টির এত আদর? এদিকে যে খাঁটি সােনা দাঁড়িয়ে হাহাকার করচে।

নীর। আজ কাল খাঁটি সােনার দর যে বড় বেশি, আমাদের এই গিল্টিই ভাল! কি বল ভাই মেজদিদি! বলিয়া শৈলর কৃত্রিম গোঁফটা একটু পাকাইয়া দিল।

রসিক। (নিজেকে দেখাইয়া) এই খাঁটি সােনাটি খুব সস্তায় যাচ্চে ভাই—এখনাে কোন ট্যাঁকশালে গিয়ে কোন মহারাণীর ছাপটি পর্য্যন্ত পড়েনি!

নীর। আচ্ছা বেশ, সেজদিদিকে দান করলুম। (বলিয়া রসিক দাদার হাত ধরিয়া নৃপর হাতে সমর্পণ করিল)। রাজি আছিস্ ত ভাই?

নৃপ। তা আমি রাজি আছি।―বলিয়া রসিকদাদাকে একটা চৌকীতে বসাইয়া সে তাহার মাথার পাকাচুল তুলিয়া দিতে লাগিল।

নীর শৈলর কৃত্রিম গোঁফে তা দিয়া পাকাইয়া তুলিবার চেষ্টা করিতে লাগিল। শৈল কহিল—আঃ কি কর্‌চিস্ আমার গোঁফ পড়ে যাবে!

রসিক। কাজ কি, এদিকে আয়না ভাই, এ গোঁফ কিছুতেই পড়বে না।

নীর। আবার! ফের! সেজদিদির হাতে সঁপে দিলুম কি কর্ত্তে? আচ্ছা রসিক দাদা, তোমার মাথার দুটো একটা চুল কাঁচা আছে, কিন্তু গোঁফ আগাগোড়া পাকালে কি করে?

রসিক। কারো কারো মাথা পাক্‌বার আগে মুখটা পাকে!

নীর। দিদিদের সভাটা কোন্ ঘরে বস্‌বে মুখুজ্জে মশায়?

অক্ষয়। আমার বসবার ঘরে।

নীর। তাহলে সে ঘরটা একটু সাজিয়ে গুজিয়ে দিইগে!

অক্ষয়। যতদিন আমি সে ঘরটা ব্যবহার করচি, একদিনও সাজাতে ইচ্ছে হয় নি বুঝি?

নীর। তোমার জন্যে ঝড়ু বেহারা আছে তবু বুঝি আশা মিট্‌ল না?

পুরবালার প্রবেশ।

পুর। কি হচ্চে তোমাদের?

নীর। মুখুজ্জেমশায়ের কাছে পড়া বলে নিতে এসেছি দিদি। তা উনি বলচেন ওঁর বাইরের ঘরটা ভাল করে ঝেড়ে সাজিয়ে না দিলে উনি পড়াবেন না। তাই সেজদিদিতে আমাতে ওঁর ঘর সাজাতে যাচ্চি! আয় ভাই!

নৃপ। তোর ইচ্ছে হয়েছে তুই ঘর সাজাতে যা না—আমি যাবনা!

নীর। বাঃ, আমি একা খেটে মরব, আর তুমি সুদ্ধ তার ফল পাবে সে হবে না!―নৃপকে গ্রেফতার করিয়া লইয়া নীর চলিয়া গেল।

পুর। সব গুছিয়ে নিয়েছি। এখনো ট্রেণ যাবার দেরী আছে বোধ হয়।

অক্ষয়। যদি মিস্ করতে চাও তাহলে ঢের দেরি আছে।

পুর। তা হলে চল, আমাকে ষ্টেশনে পৌঁছিয়ে দেবে। চল্লুম রসিক দাদা—তুমি এখানে রইলে, এই শিশুগুলিকে একটু সাম্‌লে রেখ! (প্রণাম)

রসিক। কিছু ভেবো না দিদি, এরা সকলে আমাকে যে রকম বিপরীত ভয় করে, টুঁ শব্দটি করতে পারবে না।

শৈল। দিদি ভাই, তুমি একটু থাম! আমি এই কাপড়টা ছেড়ে এসে তােমাকে প্রণাম করচি।

পুর। কেন! ছাড়তে মন গেল যে?

শৈল। না ভাই, এ কাপড়ে নিজেকে আর এক জন বলে মনে হয় তােদের গায়ে হাত দিতে ইচ্ছে হয় না। রসিক দাদা এই নাও, আমার গোঁফটা সাবধানে রেখে দাও, হারিয়াে না!


(৬)

শ্রীশ তাহার বাসায় দক্ষিণের বারান্দায় একখানা বড়হাতা ওয়ালা কেদারার দুই হাতার উপর দুই পা তুলিয়া দিয়া শুক্লসন্ধ্যায় চুপচাপ বসিয়া সিগারেট ফুঁকিতেছিল। পাশে টিপায়ের উপর রেকাবীতে একটি গ্লাস বরফ দেওয়া লেমনেড ও স্তূপাকার কুন্দফুলের মালা।

বিপিন পশ্চাৎ হইতে প্রবেশ করিয়া তাহার স্বাভাবিক প্রবল গম্ভীর কণ্ঠে ডাকিয়া উঠিল—কি গাে সন্ন্যাসী ঠাকুর!

শ্রীশ তৎক্ষণাৎ হাতা হইতে পা নামাইয়া উঠিয়া বসিয়া উচ্চৈঃস্বরে হাসিয়া উঠিল—কহিল, এখনো বুঝি ঝগড়া ভুল্‌তে পার নি?

শ্রীশ কিছুক্ষণ আগেই ভাবিতেছিল, একবার বিপিনের ওখানে যাওয়া যাক্। কিন্তু শরৎ সন্ধ্যার নির্ম্মল জ্যোৎস্নার দ্বারা আবিষ্ট হইয়া নড়িতে পারিতেছিল না। একটি গ্লাস্ বরফশীতল লেমনেড ও কুন্দফুলের মালা আনাইয়া জ্যোৎস্নাশুভ্র আকাশে সিগারেটের ধূমসহযোগে বিচিত্র কল্পনাকুণ্ডলী নির্ম্মাণ করিতেছিল।

শ্রীশ। আচ্ছা ভাই, শিশুপালক, তুমি কি সত্যি মনে কর আমি সন্ন্যাসী হতে পারিনে?

বিপিন। কেন পার্ব্বে না! কিন্তু অনেকগুলি তল্পিদার চেলা সঙ্গে থাকা চাই।

শ্রীশ। তার তাৎপর্য্য এই যে, কেউ বা আমার বেলফুলের মালা গেঁথে দেবে, কেউবা বাজার থেকে লেমনেড ও বরফ ভিক্ষে করে আন্‌বে, এই ত? তাতে ক্ষতিটা কি? যে সন্ন্যাস ধর্ম্মে বেলফুলের প্রতি বৈরাগ্য এবং ঠাণ্ডা লেমনেডের প্রতি বিতৃষ্ণা জন্মায় সেটা কি খুব উঁচুদরের সন্ন্যাস?: বিপিন। সাধারণ ভাষায় ত সন্ন্যাসধর্ম্ম বলতে সেই রকমটাই বোঝায়।

শ্রীশ। ঐ শোন! তুমি কি মনে কর ভাষায় একটা কথার একটা বৈ অর্থ নেই? এক জনের কাছে সন্ন্যাসী কথাটার যে অর্থ, আর একজনের কাছেও যদি ঠিক সেই অর্থ ই হয় তা হলে মন বলে একটা স্বাধীন পদার্থ আছে কি কর্ত্তে?

বিপিন। তোমার মন সন্ন্যাসী কথাটার কি অর্থ করচেন আমার মন সেইটি শোনবার জন্য উৎসুক হয়েছেন!

শ্রীশ। আমার সন্ন্যাসীর সাজ এই রকম—গলায় ফুলের মালা, গায়ে চন্দন, কানে কুণ্ডল, মুখে হাস্য। আমার সন্ন্যাসীর কাজ মানুষের চিত্ত আকর্ষণ। সুন্দর চেহারা, মিষ্টি গলা, বক্তৃতায় অধিকার, এ সমস্ত না থাকলে সন্ন্যাসী হয়ে উপযুক্ত ফল পাওয়া যায় না। রুচি বুদ্ধি কার্য্যক্ষমতা ও প্রফুল্লতা, সকল বিষয়েই আমার সন্ন্যাসী সম্প্রদায়কে গৃহস্থের আদর্শ হতে হবে।

বিপিন। অর্থাৎ একদল কার্ত্তিককে ময়ুরের উপর চড়ে রাস্তায় বেরতে হবে।

শ্রীশ। ময়ূর না পাওয়া যায়, ট্রাম, আছে, পদব্রজেও নারাজ নই। কুমার সভা মানেই ত কার্ত্তিকের সভা। কিন্তু কার্ত্তিক কি কেবল সুপুরুষ ছিলেন? তিনিই ছিলেন স্বর্গের সেনাপতি।

বিপিন। লড়াইয়ের জন্যে তাঁর দুটি মাত্র হাত, কিন্তু বক্তৃতা করবার জন্যে তাঁর তিন জোড়া মুখ।

শ্রীশ। এর থেকে প্রমাণ হয় আমাদের আর্য্য পিতামহরা বাহুবল অপেক্ষা বাক্যবলকে তিন গুণ বেশী বলেই জান্‌তেন। আমিও পালোয়ানীকে বীরত্বের আদর্শ বলে মানিনে।

বিপিন। ওটা বুঝি আমার উপর হ’ল?

শ্রীশ। ঐ দেখ! মানুষকে অহঙ্কারে কি রকম মাটি করে। তুমি ঠিক করে রেখেচ, পালোয়ান বল্লেই তোমাকে বলা হল! তুমি কলিযুগের ভীমসেন! আচ্ছা এস, যুদ্ধং দেহি! একবার বীরত্বের পরীক্ষা হয়ে যাক্!

এই বলিয়া দুই বন্ধু ক্ষণকালের জন্য লীলাচ্ছলে হাত কাড়াকাড়ি করিতে লাগিল। বিপিন হঠাৎ “এইবার ভীমসেনের পতন” বলিয়া ধপ করিয়া শ্রীশের কেদারাটা অধিকার করিয়া তাহার উপরে দুই পা তুলিয়া দিল; এবং “উঃ অসহ তৃষ্ণা” বলিয়া লেমনেডের গ্লাসটি এক নিঃশ্বাসে খালি করিল। তখন শ্রীশ তাড়াতাড়ি কুন্দফুলের মালাটি সংগ্রহ করিয়া—“কিন্তু বিজয় মাল্যটি আমার” বলিয়া সেটা মাথায় জড়াইল এবং বেতের মোড়াটার উপরে বসিয়া কহিল আচ্ছা ভাই সত্যি বল, একদল শিক্ষিত লোক যদি এই রকম সংসার পরিত্যাগ করে’ পরিপাটি সজ্জায় প্রফুল্ল প্রসন্ন মুখে গানে এবং বক্তৃতায় ভারতবর্ষের চতুর্দ্দিকে শিক্ষা বিস্তার করে’ বেড়ায় তাতে উপকার হয় কি না?

বিপিন এই তর্কটা লইয়া বন্ধুর সঙ্গে আর ঝগড়া করিতে ইচ্ছা করিল না―কহিল, আইডিয়াটা ভাল বটে!

শ্রীশ। অর্থাৎ শুন্‌তে সুন্দর কিন্তু কর্ত্তে অসাধ্য! আমি বল চি অসাধ্য নয় এবং আমি দৃষ্টান্ত দ্বারা তার প্রমাণ করব। ভারতবর্ষে সন্ন্যাসধর্ম্ম বলে একটা প্রকাণ্ড শক্তি আছে, তার ছাই ঝেড়ে তার ঝুলিটা কেড়ে নিয়ে তার জটা মুড়িয়ে তাকে সৌন্দর্য্য এবং কর্ম্মনিষ্ঠায় প্রতিষ্ঠিত করাই চিরকুমার সভার একমাত্র উদ্দেশ্য। ছেলে পড়ান এবং দেশলাইয়ের কাটি তৈরি করবার জন্যে আমাদের মত লোক চিরজীবনের ব্রত অবলম্বন করে নি। বল বিপিন, তুমি আমার প্রস্তাবে রাজি আছ কি না?

বিপিন। তোমার সন্ন্যাসীর যে রকম চেহারা গলা এবং আস বাবের প্রয়োজন আমার ত তার কিছুই নেই। তবে তল্পিদার হয়ে পিছনে যেতে রাজি আছি! কানে যদি সোনার কুণ্ডল, অন্তত চোখে যদি সোনার চস্‌মাটা পরে’ যেখানে সেখানে ঘুরে বেড়াও তা হলে একটা প্রহরীর দরকার, সে কাজটা আমার দ্বারা কতকটা চল্‌তে পারবে!

শ্রীশ। আবার ঠাট্টা।

বিপিন। না ভাই ঠাট্টা নয়। আমি সত্যিই বলছি তোমার প্রস্তাবটাকে যদি সম্ভবপর করে’ তুলতে পার তা হলে খুব ভালই হয়। তবে এরকম একটা সম্প্রদায়ে সকলেরই কাজ সমান হতে পারে না, যার যেমন স্বাভাবিক ক্ষমতা সেই অনুসারে যোগ দিতে পারে।

শ্রীশ। সে ত ঠিক কথা। কেবল একটি বিষয়ে আমাদের খুব দৃঢ় হতে হবে, স্ত্রীজাতির কোন সংস্রব রাখ্‌ব না!

বিপিন। মাল্যচন্দন অঙ্গদকুণ্ডল সবই রাখতে চাও কেবল ঐ একটা বিষয়ে অত বেশী দৃঢ়তা কেন?

শ্রীশ। ঐ গুলো রাখচি বলেই দৃঢ়তা। যে জন্যে চৈতন্য তাঁর অনুচরদের স্ত্রীলোকের সঙ্গ থেকে কঠিন শাসনে রেখেছিলেন। তাঁর বর্ম্ম, অনুরাগ এবং সৌন্দর্য্যের ধর্ম্ম, সে জন্যেই তার পক্ষে প্রলোভনের ফাঁদ অনেক ছিল।

বিপিন। তা হলে ভয়টুকুও আছে!

শ্রীশ। আমার নিজের জন্য লেশমাত্র নেই। আমি আমার মনকে পৃথিবীর বিচিত্র সৌন্দর্য্যে ব্যাপ্ত করে রেখে দিই, কোনও একটা ফাঁদে আমাকে ধরে কার সাধ্য, কিন্তু তোমরা যে দিনরাত্রি ফুট্‌বল্‌ টেনিস ক্রিকেট নিয়ে থাক―তোমরা একবার পড়লে ব্যাট্‌বল্‌ গুলিডাণ্ডা সব সুদ্ধ ঘাড়মোড় ভেঙে পড়বে।

বিপিন। আচ্ছা ভাই, সময় উপস্থিত হলে দেখা যাবে।

শ্রীশ। ও কথা ভাল নয়! সময় উপস্থিত হবে না, সময় উপস্থিত হতে দেব না। সময় ত রথে চড়ে আসেন না―আমরা তাঁকে ঘাড়ে করে নিয়ে আসি―কিন্তু তুমি যে সময়টার কথা বলচ তাকে বহন অভাবে ফিরতেই হবে।

পূর্ণবাবুর প্রবেশ।

উভয়ে। এস পূর্ণ বাবু!

বিপিন তাহাকে কেদারাটা ছাড়িয়া দিয়া একটা চৌকী টানিয়া লইয়া বসিল। পূর্ণর সহিত শ্রীশ ও বিপিনের তেমন ঘনিষ্ঠতা ছিল না বলিয়া তাহাকে দুজনেই একটু বিশেষ খাতির করিয়া চলিত।

পূর্ণ। তোমাদের এই বারান্দায় জ্যোৎস্নাটির মন রচনা কর নি―মাঝে মাঝে থামের ছায়া ফেলে ফেলে সাজিয়েছ ভাল!

শ্রীশ। ছাদের উপর জ্যোৎস্না রচনা করা প্রভৃতি কতকগুলি অত্যাশ্চর্য্য ক্ষমতা জন্মাবার পূর্ব্ব হতেই আমার কাছে। কিন্তু দেখ পূর্ণ বাবু, ঐ দেশলাই করা টরা ও গুলো আমার ভাল আসে না।

পূর্ণ। (ফুলের মালার দিকে চাহিয়া) সন্ন্যাসধর্ম্মেই কি তোমার অসামান্য দখল আছে না কি?

শ্রীশ। সেই কথাইত হচ্ছিল। সন্ন্যাসধর্ম্ম তুমি কাকে বল শুনি!

পূর্ণ। যে ধর্ম্মে দর্জ্জি ধোবা নাপিতের কোন সহায়তা নিতে হয় না, তাঁতীকে একেবারেই অগ্রাহ্য করিতে হয়, পিয়ার্সসােপের বিজ্ঞাপনের দিকে দৃক্পাত করতে হয় না―

শ্রীশ। আরে ছিঃ, সে সন্ন্যাসধর্ম্ম ত বুড়াে হয়ে মরে গেছে—এখন নবীন সন্ন্যাসী বলে’ একটা সম্প্রদায় গড়্তে হবে—

পূর্ণ। বিদ্যাসুন্দরের যাত্রায় যে নবীন সন্ন্যাসী আছেন তিনি মন্দ দৃষ্টান্ত নন্—কিন্তু তিনি ত চিরকুমার সভার বিধানমতে চলেন নি।

শ্রীশ। যদি চল্তেন তা হলে তিনিই ঠিক দৃষ্টান্ত হতে পার্ত্তেন। সাজে সজ্জায় বাক্যে আচরণে সুন্দর এবং সুনিপুণ হতে হবে—

পূর্ণ। কেবল রাজকন্যার দিক থেকে দৃষ্টি নামাতে হবে এই ত? বিনি সুতোর মালা গাঁথতে হবে কিন্তু সে মালা পরাতে হবে কার গলায় হে?

শ্রীশ। স্বদেশের! কথাটা কিছু উচ্চ শ্রেণীর হয়ে পড়ল, কি করব বল, মালিনী মাসী এবং রাজকুমারী একেবারেই নিষিদ্ধ কিন্তু ঠাট্টা নয় পূর্ণ বাবু—

পূর্ণ। ঠাট্টার মত মােটেই শোনাচ্চেনা—ভয়ানক কড়া কথা, একেবারে খট্খটে শুক্‌নো!

শ্রীশ। আমাদের চিরকুমার সভা থেকে এমন একটি সন্ন্যাসী সম্প্রদায় গঠন করতে হবে যারা রুচি, শিক্ষা ও কর্ম্মে সকল গৃহস্থের আদর্শ হবে। যারা সঙ্গীত প্রভৃতি কলাবিদ্যায় অদ্বিতীয় হবে, আবার লাঠি তলােয়ার খেলা, ঘােড়ায় চড়া, বন্দুক লক্ষ্য করায় পারদর্শী হবে—

পূর্ণ। অর্থাৎ মনােহরণ এবং প্রাণ হরণ দুই কর্ম্মেই মজবুত হবে। পুরুষ দেবী চৌধুরাণীর দল আর কি।

শ্রীশ। বঙ্কিম বাবু আমার আইডিয়াটা পূর্ব্বে হতেই চুরি করে রেখেছেন—কিন্তু ওটাকে কাজে লাগিয়ে আমাদের নিজের করে নিতে হবে।

পূর্ণ। সভাপতি মশায় কি বলেন?

শ্রীশ। তাঁকে ক’দিন ধরে বুঝিয়ে বুঝিয়ে আমার দলে টেনে নিয়েছি। কিন্তু তিনি তাঁর দেশলাইয়ের কাঠি ছাড়েন নি। তিনি বলেন সন্ন্যাসীরা কৃষিতত্ত্ব বস্তুতত্ত্ব প্রভৃতি শিখে গ্রামে গ্রামে চাষাদের শিখিয়ে বেড়াবে―এক টাকা করে শেয়ার নিয়ে একটা ব্যাঙ্ক খুলে বড় বড় পল্লীতে নূতন নিয়মে এক একটা দোকান বসিয়ে আস্‌বে—ভারতবর্ষের চারিদিকে বাণিজ্যের জাল বিস্তার করে দেবে। তিনি খুব মেতে উঠেছেন।

পূর্ণ। বিপিন বাবুর কি মত?

বিপিনের মতে শ্রীশের এই কল্পনাটি কার্য্যসাধ্য নয়, কিন্তু শ্রীশের সর্ব্বপ্রকার পাগ্‌লামিকে সে স্নেহের চক্ষে দেখিত;― প্রতিবাদ করিয়া শ্রীশের উৎসাহে আঘাত দিতে তাহার কোনমতেই মন সরিত না। সে বলিল—যদিচ আমি নিজেকে শ্রীশের নবীন সন্ন্যাসী সম্প্রদায়ের আদর্শ পুরুষ বলে জ্ঞান করিনে কিন্তু দল যদি গড়ে ওঠে ত আমিও সন্ন্যাসী সাজ্‌তে রাজি আছি।

পূর্ণ। কিন্তু সাজ্‌তে খরচ আছে মশায়—কেবল কৌপীন নয় ত― অঙ্গদ, কুণ্ডল, আভরণ, কুন্তলীন, দেল খোস―

শ্রীশ। পূর্ণ বাবু ঠাট্টাই কর আর যাই কর, চিরকুমার সভা সন্ন্যাসী সভা হবেই। আমরা একদিকে কঠোর আত্মত্যাগ করব, অন্যদিকে মনুষ্যত্বের কোন উপকরণ থেকে নিজেদের বঞ্চিত করব না― আমরা কঠিন শোর্য্য এবং ললিত সৌন্দর্য্য উভয়কেই সমান আদরে বরণ করব―সেই দুরূহ সাধনায় ভারতবর্ষে নবযুগের আবির্ভাব হবে

পূর্ণ। বুঝেছি শ্রীশবাবু—কিন্তু নারী কি মনুষ্যত্বের একটা সর্ব্বপ্রধান উপকরণের মধ্যে গণ্য নয়? এবং তাঁকে উপেক্ষা করলে ললিত সৌন্দর্য্যের প্রতি কি সমাদর রক্ষা হবে? তার কি উপায় করলে?

শ্রীশ। নারীর একটা দোষ নরজাতিকে তিনি লতার মত বেষ্টন করে ধরেন, যদি তাঁর দ্বারা বিজড়িত হবার আশঙ্কা না থাক্‌ত, যদি তাঁকে রক্ষা করেও স্বাধীনতা রক্ষা করা যেত, তা হলে কোন কথা ছিল না। কাজে যখন জীবন উৎসর্গ করতে হবে তখন কাজের সমস্ত বাধা দূর করতে চাই—পাণিগ্রহণ করে ফেল্‌লে নিজের পাণিকেও বন্ধ করে ফেল্‌তে হবে, সে হলে চল্‌বে না পূর্ণবাবু।

পূর্ণ। ব্যস্ত হোয়না ভাই, আমি আমার শুভ বিবাহে তোমাদের নিমন্ত্রণ করতে আসিনি। কিন্তু ভেবে দেখ দেখি, মনুষ্য জন্ম আর পাব কি না সন্দেহ―অথচ হৃদয়কে চিরজীবন যে পিপাসার জল থেকে বঞ্চিত করতে যাচ্চি তার পূরণস্বরূপ আর কোথাও আর কিছু জুট্‌বে কি? মুসলমানের স্বর্গে হুরি আছে হিন্দুর স্বর্গেও অপ্সরার অভাব নেই, চিরকুমার সভার স্বর্গে সভাপতি এবং সভ্যমহাশয়দের চেয়ে মনোরম আর কিছু পাওয়া যাবে কি!

শ্রীশ। পূর্ণবাবু বল কি? তুমি যে―

পূর্ণ। ভয় নেই ভাই, এখনো মরিয়া হয়ে উঠিনি। তোমার এই ছাদভরা জ্যোৎস্না আর ঐ ফুলের গন্ধ কি কৌমার্য্যব্রতরক্ষার সহায়তা করবার জন্যে সৃষ্ট হয়েছে? মনের মধ্যে মাঝে মাঝে যে বাষ্প জমে আমি সেটাকে উচ্ছ্বসিত করে দেওয়াই ভাল বোধ করি—চেপে রেখে নিজেকে ভোলাতে গেলে কোন্ দিন চিরকুমারব্রতের লোহার বয়লার খানা ফেটে যাবে। যাই হোক্ যদি সন্ন্যাসী হওয়াই স্থির কর ত আমিও যোগ দেব―কিন্তু আপাততঃ সভাটাকে ত রক্ষা করতে হবে।

শ্রীশ। কেন? কি হয়েছে?

পূর্ণ। অক্ষয় বাবু আমাদের সভাকে যে স্থানান্তর করবার ব্যবস্থা করচেন এটা আমার ভাল ঠেক্‌চে না।

শ্রীশ। সন্দেহ জিনিষটা নাস্তিকতার ছায়া। মন্দ হবে, ভেঙে যাবে, নষ্ট হবে এ সব ভাব আমি কোন অবস্থাতেই মনে স্থান দিইনে। ভালই হবে—যা হচ্চে বেশ হচ্চে―চিরকুমার সভার উদার বিস্তীর্ণ ভবিষ্যৎ আমি চোখের সম্মুখে দেখ তে পাচ্চি—অক্ষয় বাবু সভাকে এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে নিমন্ত্রণ করে তার কি অনিষ্ট কর্‌তে পারেন? কেবল গলির এক নম্বর থেকে আরেক নম্বরে নয়, আমাদের যে পথে পথে দেশে দেশে সঞ্চরণ করে বেড়াতে হবে! সন্দেহ শঙ্কা উদ্বেগ এগুলো মন থেকে দূর করে দাও পূর্ণবাবু―বিশ্বাস এবং আনন্দ না হলে বড় কাজ হয় না!

পূর্ণ নিরুত্তর হইয়া বসিয়া রহিল। বিপিন কহিল―দিনকতক দেখাইযাক্ না—যদি কোন অসুবিধার কারণ ঘটে তা হলে স্বস্থানে ফিরে আসা যাবে—আমাদের সেই অন্ধকার বিবরটি ফস্‌ করে কেউ কেড়ে নিচ্ছে না!

হায়, পূর্ণের হৃদয় বেদনা কে বুঝিবে?

অকস্মাৎ চন্দ্রমাধব বাবুর সবেগে প্রবেশ। তিন জনের সসম্ভ্রমে উত্থান।

চন্দ্র। দেখ আমি সেই কথাটা ভাবছিলুম―

শ্রীশ। বসুন!

চন্দ্র। না, না, বস্‌ব না, আমি এখনি যাচ্চি! আমি বল্‌ছিলুম, সন্ন্যাসব্রতের জন্যে আমাদের এখন থেকে প্রস্তুত হতে হবে। হঠাৎ একটা অপঘাত ঘট্‌লে, কিংবা সাধারণ জ্বরজালায়, কি রকম চিকিৎসা সে আমাদের শিক্ষা করতে হবে―ডাক্তার রামরতন বাবু ফি রবিবারে আমাদের দুঘণ্টা করে বক্তৃতা দেবেন বন্দোবস্ত করে এসেছি।

শ্রীশ। কিন্তু তাতে অনেক বিলম্ব হবে না?

চন্দ্র। বিলম্ব ত হবেই, কাজটিত সহজ নয়। কেবল তাই নয়―আমাদের কিছু কিছু আইন অধ্যয়নও দরকার। অবিচার অত্যাচার থেকে রক্ষা করা, এবং কার কতদূর অধিকার সেটা চাষাভূষোদের বুঝিয়ে দেওয়া আমাদের কাজ।

শ্রীশ। চন্দ্রবাবু বসুন্

চন্দ্র। না শ্রীশবাবু, বস্‌তে পারচিনে, আমার একটু কাজ আছে। আর একটি আমাদের করতে হচ্চে—গোরুর গাড়ি, ঢেঁকি, তাঁত প্রভৃতি আমাদের দেশী অত্যাবশ্যক জিনিষগুলিকে একটু আধ্‌টু সংশোধন করে যাতে কোন অংশে তাদের শস্তা বা মজবুৎ বা বেশী উপযোগী করে তুল্‌তে পারি সে চেষ্টা আমাদের করতে হবে। এবারে গর্ম্মির ছুটিতে কেদারবাবুদের কারখানায় গিয়ে প্রত্যহ আমাদের কতকগুলি পরীক্ষা করা চাই।

শ্রীশ। চন্দ্রবাবু অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছেন—(চৌকি অগ্রসরকরণ)।

চন্দ্র। না, না, আমি এখনি যাচ্ছি। দেখ আমার মত এই যে, এই সমস্ত গ্রামের ব্যবহার্য্য সামান্য জিনিষগুলির যদি আমরা কোন উন্নতি করতে পারি তা হলে তাতে করে চাষাদের মনের মধ্যে যে রকম আন্দোলন হবে, বড় বড় সংস্কার কার্য্যেও তেমন হবে না। তাদের সেই চিরকেলে ঢেঁকি ঘানির কিছু পরিবর্ত্তন করতে পারলে তবে তাদের সমস্ত মন সজাগ হয়ে উঠবে, পৃথিবী যে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে নেই এ তারা বুঝতে পারবে―

শ্রীশ। চন্দ্রবাবু বসবেন না কি?

চন্দ্র। থাক্ না। একবার ভেবে দেখ আমরা যে এতকাল ধরে শিক্ষা পেয়ে আস্‌চি, উচিত ছিল আমাদের ঢেঁকি, কুলো থেকে তার পরিচয় আরম্ভ হওয়া। বড় বড় কল-কারখানা ত দূরের কথা, ঘরের মধ্যেই আমাদের সজাগ দৃষ্টি পড়ল না। আমাদের হাতের কাছে যা আছে আমরা না তার দিকে ভাল করে চেয়ে দেখলুম, না তার সম্বন্ধে কিছুমাত্র চিন্তা করলুম। যা ছিল তা তেমনিই রয়ে গেছে। মানুষ অগ্রসর হচ্চে অথচ তার জিনিষপত্র পিছিয়ে থাকচে, এ কখনো হতেই পারে না। আমরা পড়েই আছি―ইংরাজ আমাদের কাঁধে করে বহন করছে, তাকে এগোনো বলে না! ছোট খাটো সামান্য গ্রাম্য জীবনযাত্রা পল্লীগ্রামের পঙ্কিল পথের মধ্যে বদ্ধ হয়ে অচল হয়ে আছে, আমাদের সন্ন্যাসী সম্প্রদায়কে সেই গরুর গাড়ির চাকা ঠেল্‌তে হবে—কলের গাড়ির চালক হবার দুরাশা এখন থাক্‌! কটা বাজ্‌ল শ্রীশবাবু?

শ্রীশ। সাড়ে আটটা বেজে গেছে।

চন্দ্র। তা হলে আমি যাই। কিন্তু এই কথা রইল, আমাদের এখন অন্য সমস্ত আলোচনা ছেড়ে নিয়মিত শিক্ষাকার্য্যে প্রবৃত্ত হতে হবে এবং―

পূর্ণ। আপনি যদি একটু বসেন চন্দ্রবাবু তাহলে আমার দুই একটা কথা বলবার আছে―

চন্দ্র। না আজ আর সময় নেই―

পূর্ণ। বেশী কিছু নয় আমি বল্‌ছিলুম আমাদের সভা―

চন্দ্র। সে কথা কাল হবে পূর্ণবাবু―

পূর্ণ। কিন্তু কালই ত সভা বস্‌চে―

চন্দ্র। আচ্ছা তা হলে পরশু, আমার সময় নেই―

পূর্ণ। দেখুন, অক্ষয় বাবু যে―

চন্দ্র। পূর্ণবাবু আমাকে মাপ করতে হবে, আজ দেরি হয়ে গেছে। কিন্তু দেখ, আমার একটা কথা মনে হচ্ছিল যে, চিরকুমার সভা যদি ক্রমে বিস্তীর্ণ হয়ে পড়ে তাহলে আমাদের সকল সভ্যই কিছু সন্ন্যাসী হয়ে বেরিয়ে যেতে পারবেন না—অতএব ওর মধ্যে দুটি বিভাগ রাখা দরকার হবে―

পূর্ণ। স্থাবর এবং জঙ্গম।

চন্দ্র। তা সে যে নামই দাও। তা ছাড়া অক্ষয়বাবু সে দিন একটি কথা যা বল্লেন সেও আমার মন্দ লাগ্‌ল না। তিনি বলেন, চিরকুমার সভার সংস্রবে আর একটি সভা রাখা উচিত যাতে বিবাহিত এবং বিবাহসংকল্পিত লোকদের নেওয়া যেতে পারে। গৃহী লোকদেরও ত দেশের প্রতি কর্ত্তব্য আছে। সকলকেই সাধ্যমত কোন না কোন হিতকর কাজে নিযুক্ত থাক্‌তে হবে—এইটে হচ্ছে সাধারণ ব্রত। আমাদের একদল কুমারব্রত ধারণ করে দেশে দেশে বিচরণ করবেন, একদল কুমারব্রত ধারণ করে একজায়গায় স্থায়ী হয়ে বসে কাজ করবেন, আর একদল গৃহী নিজ নিজ রুচি ও সাধ্য অনুসারে একটা কোন প্রয়োজনীয় কাজ অবলম্বন করে দেশের প্রতি কর্ত্তব্য পালন করবেন। যাঁরা পর্য্যটক্ সম্প্রদায়ভুক্ত হবেন তাঁদের ম্যাপ প্রস্তুত, জরিপ, ভূতত্ত্ববিদ্যা, উদ্ভিদ বিদ্যা, প্রাণিতত্ত্ব প্রভৃতি শিখতে হবে, তাঁরা যে দেশে যাবেন সেখানকার সমস্ত তথ্য তন্ন তন্ন করে সংগ্রহ করবেন―তা হলেই ভারতবর্ষীয়ের দ্বারা ভারতবর্ষের যথার্থ বিবরণ লিপিবদ্ধ হবার ভিত্তি স্থাপিত হতে পারবে—হণ্টার সাহেবের উপরেই নির্ভর করে কাটাতে হবে না―

পূর্ণ। চন্দ্রবাবু যদি বসেন তা হলে একটা কথা―

চন্দ্র। না—আমি বল্‌ছিলুম―যেখানে যেখানে যাব সেখানকার ঐতিহাসিক জনশ্রুতি এবং পুরাতন পুঁথি সংগ্রহ করা আমাদের কাজ হবে—শিলালিপি, তাম্রশাসন এগুলোও সন্ধান করতে হবে—অতএব প্রাচীন লিপি পরিচয়টাও আমাদের কিছুদিন অভ্যাস করা আবশ্যক।

পূর্ণ। সে সব ত পরের কথা, আপাততঃ―

চন্দ্র। না, না, আমি বল্‌চিনে সকলকেই সব বিদ্যা শিখতে হবে, তা হলে কোন কালে শেষ হবে না। অভিরুচি অনুসারে ওর মধ্যে আমরা কেউবা একটা কেউবা দুটো তিনটে শিক্ষা করব―

শ্রীশ। কিন্তু তা হলেও―

চন্দ্র। ধর, পাঁচ বছর। পাঁচ বছরে আমরা প্রস্তুত হয়ে বেরতে পারব। যারা চিরজীবনের ব্রত গ্রহণ করবে, পাঁচ বছর তাদের পক্ষে কিছুই নয়। তা ছাড়া এই পাঁচ বছরেই আমাদের পরীক্ষা হয়ে যাবে―যাঁরা টিকে থাক্‌তে পারবেন তাঁদের সম্বন্ধে আর কোন সন্দেহ থাকবে না।

পূর্ণ। কিন্তু দেখুন, আমাদের সভাটা যে স্থানান্তর করা হচ্চে,―

চন্দ্র। না পূর্ণবাবু আজ আর কিছুতেই না, আমার অত্যন্ত জরুরী কাজ আছে। পূর্ণবাবু আমার কথাগুলো ভাল করে চিন্তা করে দেখো। আপাততঃ মনে হতে পারে অসাধ্য― কিন্তু তা নয়। দুঃসাধ্য বটে―তা ভাল কাজ মাত্রই দুঃসাধ্য। আমরা যদি পাঁচটি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ লোক পাই তা হলে আমরা যা কাজ করব তা চিরকালের জন্য ভারতবর্ষকে আচ্ছন্ন করে দেবে।

শ্রীশ। কিন্তু আপনি যে বলছিলেন গোরুর গাড়ীর চাকা প্রভৃতি ছোট ছোট জিনিষ―

চন্দ্র। ঠিক কথা, আমি তাকেও ছোট মনে করে উপেক্ষা করিনে― এবং বড় কাজকেও অসাধ্য জ্ঞান করে ভয় করিনে―

পূর্ণ। কিন্তু সভার অধিবেশন সম্বন্ধেও―

চন্দ্র। সে সব কথা কাল হবে পূর্ণবাবু! আজ তবে চল্লুম!

(চন্দ্রবাবুর দ্রুতবেগে প্রস্থান)

বিপিন। ভাই শ্রীশ, চুপচাপ যে! এক মাতালের মাৎলামী দেখে অন্য মাতালের নেশা ছুটে যায়। চন্দ্রবাবুর উৎসাহে তোমাকে সুদ্ধ দমিয়ে দিয়েছে।

শ্রীশ। না হে, অনেক ভাববার কথা আছে। উৎসাহ কি সব সময়ে কেবল বকাবকি করে? কখনো বা একেবারে নিস্তব্ধ হয়ে থাকে, সেইটেই হল সাংঘাতিক অবস্থা।

বিপিন। পূর্ণবাবু হঠাৎ পালাচ্চ যে?

পূর্ণ। সভাপতি মশায়কে রাস্তায় ধরতে যাচ্চি―পথে যেতে যেতে যদি দৈবাৎ আমার দুটো একটা কথায় কর্ণপাত করেন।

বিপিন। ঠিক উল্টো হবে। তাঁর যে কটা কথা বাকি আছে সেই গুলো তোমাকে শোনাতে শোনাতে কোথায় যাবার আছে সে কথা ভুলেই যাবেন।

বনমালীর প্রবেশ।

বন। ভাল আছেন শ্রীশ বাবু? বিপিনবাবু ভাল ত? এই যে পূর্ণবাবুও আছেন দেখ্‌চি! তা বেশ হয়েছে। আমি অনেক বলে কয়ে সেই কুমারটুলির পাত্রী দুটিকে ঠেকিয়ে রেখেছি।

শ্রীশ। কিন্তু আমাদের আর ঠেকিয়ে রাখ্‌তে পারবেন না। আমরা একটা গুরুতর কিছু করে ফেল্‌ব।

পূর্ণ। আপনারা বসুন শ্রীশ বাবু। আমার একটা কাজ আছে।

বিপিন। তার চেয়ে আপনি বসুন পূর্ণবাবু। আপনার কাজটা আমরা দুজনে মিলে সেরে দিয়ে আসছি।

পূর্ণ। তার চেয়ে তিনজনে মিলে সারাই ত ভাল।

বন। আপনার ব্যস্ত হচ্ছেন দেখচি। আচ্ছা, তা আর এক সময় আস্‌ব।


(৭)

চন্দ্রমাধব বাবু যখন ডাকিলেন―“নির্ম্মল,” তখন একটা উত্তর পাইলেন বটে, “কি মামা,” কিন্তু সুরটা ঠিক বাজিল না। চন্দ্রবাবু ছাড়া আর যে কেহ হইলে বুঝিতে পারিত সে অঞ্চলে অল্প একটুখানি গোল আছে।

“নির্ম্মল, আমার গলার বোতামটা খুঁজে পাচ্চিনে!”

“বোধ হয় ঐখানেই কোথাও আছে।”

এরূপ অনাবশ্যক এবং অনির্দ্দিষ্ট সংবাদে কাহারও কোন উপকার নাই, বিশেষতঃ যাহার দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ। ফলতঃ এই সংবাদে অদৃশ্য বোম সম্বন্ধে কোন নূতন জ্ঞানলাতের সহায়তা না করিলেও নির্ম্মলার মানসিক অবস্থা সম্বন্ধে অনেকটা আলোক বর্ষণ করিল। কিন্তু অধ্যাপক চন্দ্রমাধব বাবুর দৃষ্টিশক্তি সেদিকেও যথেষ্ট প্রখর নহে। তিনি অন্য দিনের মতই নিশ্চিত নির্ভরের ভাবে কহিলেন—একবার খুঁজে দেখত ফেনি!

নির্ম্মলা কহিল—তুমি কোথায় কি ফেল আমি কি খুঁজে বের করতে পারি?

এতক্ষণে চন্দ্রবাবুর স্বভাবনিঃশঙ্ক মনে একটুখানি সন্দেহের সঞ্চার হইল— স্নিগ্ধ কণ্ঠে কহিলেন—তুমিই ত পার নির্ম্মল! আমার সমস্ত ত্রুটি সম্বন্ধে এত ধৈর্য্য আর কার আছে?

নির্ম্মলার রুদ্ধ অভিমান চন্দ্রবাবুর স্নেহম্বরে অকস্মাৎ অশ্রুজলে বিগলিত হইবার উপক্রম করিল; নিঃশব্দে সম্বরণ করিবার চেষ্টা করিতে লাগিল।

তাহাকে নিরুত্তর দেখিয়া চন্দ্রমাধববাবু নির্ম্মলার কাছে আসিলেন এবং যেমন করিয়া সন্দিগ্ধ মোহরটি চোখের খুব কাছে ধরিয়া পরীক্ষা করিতে হয় তেমনি করিয়া নির্ম্মলার মুখখানি দুই আঙুল দিয়া তুলিয়া ক্ষণকাল দেখিলেন এবং গম্ভীর মৃদু হাস্যে কহিলেন, নির্ম্মল আকাশে একটুখানি মালিন্য দেখচি যেন! কি হয়েছে বল দেখি?

নির্ম্মলা জানিত চন্দ্রমাধব অনুমানের চেষ্টাও করিবেন না। যাহা স্পষ্ট প্রকাশমান নহে তাহা তিনি মনের মধ্যে স্থানও দিতেন না। তাঁহার নিজের চিত্ত যেমন শেষ পর্য্যন্ত স্বচ্ছ অন্যের নিকটও সেইরূপ একান্ত স্বচ্ছতা প্রত্যাশা করিতেন।

নির্ম্মলা ক্ষুব্ধস্বরে কহিল―এত দিন পরে আমাকে তোমাদের চিরকুমার সভা থেকে বিদায় দিচ্চ কেন? আমি কি করেছি?

চন্দ্রমাধববাবু আশ্চর্য্য হইয়া কহিলেন—চিরকুমার সভা থেকে তোমাকে বিদায়? তোমার সঙ্গে সে সভার যোগ কি?

নির্ম্মলা। দরজার আড়ালে থাক লে বুঝি যোগ থাকে না? অন্ততঃ সেই যতটুকু যোগ তাই বা কেন যাবে?

চন্দ্রবাবু। নির্ম্মল, তুমিত এ সভার কাজ করবে না—যারা কাজ করবে তাদের সুবিধার প্রতি লক্ষ্য রেখেই―

নির্ম্মলা। আমি কেন কাজ করব না? তোমার ভাগ্নে না হয়ে ভাগ্নী হয়ে জন্মেছি বলেই কি তোমাদের হিতকার্য্যে যোগ দিতে পারব না? তবে আমাকে এত দিন শিক্ষা দিলে কেন? নিজের হাতে আমার সমস্ত মন প্রাণ জাগিয়ে দিয়ে শেষকালে কাজের পথ রোধ করে দাও কি বলে?

চন্দ্রমাধববাবু এই উচ্ছ্বাসের জন্য কিছুমাত্র প্রস্তুত ছিলেন না। তিনি যে নির্ম্মলাকে নিজে কি ভাবে গড়িয়া তুলিয়াছিলেন তাহা নিজেই জানিতেন না। ধীরে ধীরে কহিলেন―নির্ম্মল, এক সময়ে ত বিবাহ করে, তোমাকে সংসারের কাজে প্রবৃত্ত হতে হবে―চিরকুমার সভার কাজ―

“বিবাহ আমি করব না!”

“তবে কি করবে বল?”

“দেশের কাজে তোমার সাহায্য করব।”

“আমরা ত সন্ন্যাস ব্রত গ্রহণ করতে প্রস্তুত হয়েছি!”

“ভারতবর্ষে কি কেউ কখনো সন্ন্যাসিনী হয়নি?”

চন্দ্রমাধববাবু স্তম্ভিত হইয়া হারানো বোতামটার কথা একেবারে ভুলিয়া গেলেন। নিরুত্তর হইয়া দাঁড়াইয়া রহিলেন।

উৎসাহদীপ্তিতে মুখ আরক্তিম করিয়া নির্ম্মলা কহিল—মামা, যদি কোন মেয়ে তোমাদের ব্রত গ্রহণের জন্যে অন্তরের সঙ্গে প্রস্তুত হয় তবে প্রকাশ্যভাবে তোমাদের সভার মধ্যে কেন তাকে গ্রহণ করবে না? আমি তোমাদের কৌমার্য্য সভার কেন সভ্য না হব?

নিষ্কলুষচিত্ত চন্দ্রমাধবের কাছে ইহার কোন উত্তর ছিল না। তবু দ্বিধাকুন্ঠিতভাবে বলিতে লাগিলেন—অন্য যাঁরা সভ্য আছেন―

নির্ম্মল কথা শেষ না হইতেই বলিয়া উঠিল—যাঁরা সভ্য আছেন, যাঁরা ভারতবর্ষের হিতব্রত নেবেন, যাঁরা সন্ন্যাসী হতে যাচ্ছেন—তাঁরা কি একজন ব্রতধারিণী স্ত্রীলোককে অসঙ্কোচে নিজের দলে গ্রহণ করতে পারবেন না? তা যদি হয় তাহলে তাঁরা গৃহী হয়ে ঘরে রুদ্ধ থাকুন্ তাঁদের দ্বারা কোন কাজ হবে না!

চন্দ্রমাধববাবু চুলগুলোর মধ্যে ঘন ঘন পাঁচ আঙুল চালাইয়া অত্যন্ত উস্কোখুস্কো করিয়া তুলিলেন। এমন সময় হঠাৎ তাঁহার আস্তিনের ভিতর হইতে হারা বোতামটা মাটিতে পড়িয়া গেল। নির্ম্মলা হাসিতে হাসিতে কুড়াইয়া লইয়া চন্দ্রমাধব বাবুর কামিজের গলায় লাগাইয়া দিল— চন্দ্রমাধববাবু তাহার কোন খবরই লইলেন না―চুলের মধ্যে অঙ্গুলি চালনা করিতে করিতে মস্তিষ্ক কুলায়ের চিন্তাগুলিকে বিব্রত করিতে লাগিলেন।

চাকর আসিয়া খবর দিল, পূর্ণবাবু আসিয়াছেন। নির্ম্মলা ঘর হইতে চলিয়া গেলে তিনি প্রবেশ করিলেন। কহিলেন—চন্দ্রবাবু, সে কথাটা কি ভেবে দেখ লেন? আমাদের সভাটিকে স্থানান্তর করা আমার বিবেচনায় ভাল হচ্চে না!

চন্দ্রবাবু। আজ আর একটি কথা উঠছে, সেটা পূর্ণবাবু তোমার সঙ্গে ভাল করে আলোচনা করতে ইচ্ছা করি। আমার একটি ভাগ্নী আছেন বোধ হয় জান?

পূর্ণ। (নিরীহভাবে) আপনার ভাগ্নী?

চন্দ্র। হাঁ, তার নাম নির্ম্মলা। আমাদের চিরকুমার সভার সঙ্গে তার হৃদয়ের খুব যোগ আছে!

পূর্ণ। (বিস্মিতভাবে) বলেন কি?

চন্দ্র। আমার বিশ্বাস, তাঁর অনুরাগ এবং উৎসাহ আমাদের কারো চেয়ে কম নয়।

পূর্ণ। (উত্তেজিতভাবে) এ কথা শুন্‌লে আমাদের উৎসাহ বেড়ে ওঠে। স্ত্রীলোক হয়ে তিনি―

চন্দ্রবাবু। আমিও সেই কথা ভাবচি, স্ত্রীলোকের সরল উৎসাহ পুরুযের উৎসাহে যেন নূতন প্রাণ সঞ্চার করতে পারে—আমি নিজেই সেটা আজ অনুভব করেছি।

পূর্ণ। (আবেগপূর্ণভাবে) আমিও সেটা বেশ অনুমান করতে পারি।

চন্দ্রবাবু। পূর্ণবাবু, তোমারও কি ঐ মত?

পূর্ণ। কি মত বল্‌চেন?

চন্দ্র। অর্থাৎ যথার্থ অনুরাগী স্ত্রীলোক আমাদের কঠিন কর্ত্তব্যের বাধা না হয়ে যথার্থ সহায় হতে পারেন?

পূর্ণ। (নেপথ্যের প্রতি লক্ষ্য করিয়া উচ্চকণ্ঠে) সে বিষয়ে আমার লেশমাত্র সন্দেহ নেই। স্ত্রীজাতির অনুরাগ পুরুষের অনুরাগের একমাত্র সজীব নির্ভর―পুরুষের উৎসাহকে নবজাত শিশুটির মত মানুষ করে তুলতে পারে কেবল স্ত্রীলোকের উৎসাহ।

শ্রীশ ও বিপিনের প্রবেশ।

শ্রীশ। তাত পারে পূর্ণবাবু―কিন্তু সেই উৎসাহের অভাবেই কি আজ সভায় যেতে বিলম্ব হচ্চে?

পূর্ণ এত উচ্চস্বরে বলিয়া উঠিয়াছিলেন যে নবাগত দুইজনে সিঁড়ি হইতে সকল কথা শুনিতে পাইয়াছিলেন।

চন্দ্রবাবু কহিলেন, না, না, দেরি হবার কারণ, আমার গলার বোরাটা কিছুতেই খুঁজে পাচ্চিনে।

শ্রীশ। গলায় ত একটা বোতাম লাগান রয়েছে দেখতে পাচ্ছি― আরো কি প্রয়োজন আছে? যদি বা থাকে, আর ছিদ্র পাবেন কোথা?

চন্দ্রবাবু গলায় হাত দিয়া বলিলেন, তাইত। বলিয়া ঈষৎ লজ্জিত হইয়া হাসিতে লাগিলেন।

চন্দ্র। আমরা সকলেই ত উপস্থিত আছি এখন সেই কথাটার আলোচনা হয়ে যাওয়া ভাল, কি বল পূর্ণবাবু?

হঠাৎ পূর্ণবাবুর উৎসাহ অনেকটা নামিয়া গেল। নির্ম্মলার নাম করিয়া সকলের কাছে আলোচনা উত্থাপন তাহার কাছে রুচিকর বোধ হইল না। সে কিছু কুন্ঠিতস্বরে কহিল, সে বেশ কথা কিন্তু এদিকে দেরি হয়ে যাচ্চে না?

চন্দ্র। না, এখনো সময় আছে। শ্রীশবাবু তোমরা একটু বস না কথাটা একটু স্থির হয়ে ভেবে দেখবার যোগ্য। আমার একটা ভাগ্নী আছেন, তাঁর নাম নির্ম্মলা,―

পূর্ণ হঠাৎ কাশিয়া লাল হইয়া উঠিল। ভাবিল চন্দ্রবাবুর কাণ্ডজ্ঞান মাত্রই নাই—পৃথিবীর লোকের কাছে নিজের ভাগ্নীর পরিচয় দিবার কি দরকার―অনায়াসে নির্ম্মলাকে বাদ দিয়া কথাটা আলোচনা করা যাইতে পারে। কিন্তু কোন কথার কোন অংশ বাদ দিয়া বলা চন্দ্রবাবুর স্বভাব নহে।

চন্দ্র। আমাদের কুমার সভার সমস্ত উদ্দেশ্যের সঙ্গে তাঁর একান্ত মনের মিল।

এত বড় একটা খরব শ্রীশ এবং বিপিন অবিচলিত নিরুৎসুক ভাবে শুনিয়া যাইতে লাগিল। পূর্ণ কেবলি ভাবিতে লাগিল নির্ম্মলার প্রসঙ্গ সম্বন্ধে যাহারা জড় পাষাণের মত উদাসীন, নির্ম্মলাকে যাহারা পৃথিবীর সাধারণ স্ত্রীলোকের সহিত পৃথক করিয়া দেখে না, তাহাদের কাছে সে নামের উল্লেখ করা কেন?

চন্দ্র। এ কথা আমি নিশ্চয় বল্‌তে পারি তাঁর উৎসাহ আমাদের কারো চেয়ে কম নয়।

শ্রীশ ও বিপিনের কাছ হইতে কিছুমাত্র সাড়া না পাইয়া চন্দ্রবাবুও বোধ করি মনে মনে একটু উত্তেজিত হইতেছিলেন।

চন্দ্র। একথা আমি ভালরূপ বিবেচনা করে দেখে স্থির করেছি স্ত্রীলোকের উৎসাহ পুরুষের সমস্ত বৃহৎ কার্য্যের মহৎ অবলম্বন। কি বল পূর্ণবাবু।

পূর্ণবাবুর কোন কথা বলিবার ইচ্ছাই ছিল না—কিন্তু নিস্তেজভাবে বলিল, তা ত বটেই।

চন্দ্রবাবুর পালে কোন দিক হইতে কোন হাওয়া লাগিল না দেখিয়া হঠাৎ সবেগে ঝিঁকা মারিয়া উঠিলেন—নির্ম্মলা যদি কুমারসভার সভ্য হবার জন্য প্রার্থী থাকে তাহলে তাকে আমরা সভ্য না করব কেন?

পূর্ণ ত’একেবারে বজ্রাহতবৎ! বলিয়া উঠিল—বলেন কি চন্দ্রবাবু?

শ্রীশ পূর্ণর মত অত্যুগ্র বিস্ময় প্রকাশ না করিয়া কহিল—আমরা কখনো কল্পনা করিনি যে, কোন স্ত্রীলোক আমাদের সভার সভ্য হতে ইচ্ছা প্রকাশ করবেন, সুতরাং এ সম্বন্ধে আমাদের কোন নিয়ম নেই—

ন্যায়পরায়ণ বিপিন গম্ভীর কণ্ঠে কহিল, নিষেধও নেই।

অসহিষ্ণু শ্রীশ কহিল, স্পষ্ট নিষেধ না থাক্‌তে পারে কিন্তু আমাদের সভার যে সকল উদ্দেশ্য তা স্ত্রীলোকের দ্বারা সাধিত হবার নয়।

কুমারসভায় স্ত্রীলোক সভ্য লইবার জন্য বিপিনের যে বিশেষ উৎসাহ ছিল তাহা নয়, কিন্তু তাহার মানসপ্রকৃতির মধ্যে একটা স্বাভাবিক সংযম থাকায় কোন শ্রেণীবিশেষের বিরুদ্ধে একদিকঘেঁষে কথা সে সহিতে পারিত না। তাই সে বলিয়া উঠিল—আমাদের সভার উদ্দেশ্য সঙ্কীর্ণ নয়; এবং বৃহৎ উদ্দেশ্য সাধন করতে গেলে বিচিত্র শ্রেণীর ও বিচিত্র শক্তির লোকের বিচিত্র চেষ্টায় প্রবৃত্ত হওয়া চাই। স্বদেশের হিতসাধন একজন স্ত্রীলোক যে রকম পারবেন তুমি সে রকম পার্‌বে না এবং তুমি যে রকম পার্‌বে একজন স্ত্রীলোক সে রকম পার্‌বেন না—অতএব সভার উদ্দেশ্যকে সর্ব্বাঙ্গ সম্পূর্ণভাবে সাধন কর্‌তে গেলে তোমারও যেমন দরকার স্ত্রীসভ্যরও তেমনি দরকার।

লেশমাত্র উত্তেজনা প্রকাশ না করিয়া বিপিন শান্তগম্ভীরস্বরে বলিয়া গেল—কিন্তু শ্রীশ কিছু উত্তপ্ত হইয়া বলিল, যারা কাজ কর্‌তে চায় না, তারাই উদ্দেশ্যকে ফলাও করে তোলে। যথার্থ কাজ করতে গেলেই লক্ষ্যকে সীমাবদ্ধ কর্‌তে হয়। আমাদের সভার উদ্দেশ্যকে যত বৃহৎ মনে করে তুমি বেশ নিশ্চিন্ত আছ, আমি তত বৃহৎ মনে করিনে।

বিপিন শান্তমুখে কহিল, আমাদের সভার কার্য্যক্ষেত্র অন্ততঃ এতটা বৃহৎ যে তোমাকে গ্রহণ করেছে বলে আমাকে পরিত্যাগ কর্‌তে হয় নি এবং আমাকে গ্রহণ করেছে বলে তোমাকে পরিত্যাগ করতে হয় নি। তোমার আমার উভয়েরই যদি এখানে স্থান হয়ে থাকে, আমাদের দুজনেরই যদি এখানে উপযোগিতা ও আবশ্যকতা থাকে তাহলে আরও একজন ভিন্ন প্রকৃতির লোকের এখানে স্থান হওয়া এমন কি কঠিন?

শ্রীশ চটিয়া কহিল—উদারতা অতি উত্তম জিনিষ, সে আমি নীতিশাস্ত্রে পড়েছি। আমি তোমার সেই উদারতাকে নষ্ট কর্‌তে চাইনে, বিভক্ত কর্‌তে চাই মাত্র। স্ত্রীলোকেরা যে কাজ কর্‌তে পারেন তার জন্যে তাঁরা স্বতন্ত্র সভা করুন, আমরা তার সভ্য হবার প্রার্থী হব না এবং আমাদের সভাও আমাদেরই থাক্‌! নইলে আমরা পরস্পরের কাজের বাধা হব মাত্র। মাথাটা চিন্তা করে করুক্‌; উদরটা পরিপাক করতে থাক্‌—পাকযন্ত্রটি মাথার মধ্যে এবং মস্তিষ্কটি পেটের মধ্যে প্রবেশ চেষ্টা না কর্‌লেই বস্!

বিপিন। কিন্তু তাই বলে মাথাটা ছিন্ন করে এক জায়গায় এবং পাকযন্ত্রটাকে আর এক জায়গায় রাখলেও কাজের সুবিধা হয় না!

শ্রীশ। অত্যন্ত বিরক্ত হইয়া কহিল―উপমা ত আর যুক্তি নয় যে সেটাকে খণ্ডন কর্‌লেই আমার কথাটাকে খণ্ডন করা হল! উপমা কেবল খানিক দূর পর্য্যন্ত খাটে―

বিপিন। অর্থাৎ যতটুকু কেবল তোমার যুক্তির পক্ষে খাটে।

এই দুই পরম বন্ধুর মধ্যে এমন বিবাদ সর্ব্বদাই ঘটিয়া থাকে। পূর্ণ অত্যন্ত বিমনা হইয়া বসিয়াছিল—সে কহিল, বিপিনবাবু আমার মত এই যে, আমাদের এই সকল কাজে মেয়েরা অগ্রসর হয়ে এলে তাতে তাঁদের মাধুর্য্য নষ্ট হয়।

চন্দ্রবাবু একখানা বই চক্ষের অত্যন্ত কাছে ধরিয়া কহিলেন মহৎ কার্য্যে যে মাধুর্য্য নষ্ট হয় সে মাধুর্য্য সযত্নে রক্ষা কর্‌বার যোগ্য নয়!

শ্রীশ বলিয়া উঠিল—না চন্দ্রবাবু আমি ওসব সৌন্দর্য্য মাধুর্য্যের কথা আন্‌চিইনে। সৈন্যদের মত এক চালে আমাদের চল্‌তে হবে, অনভ্যাস বা স্বাভাবিক দুর্ব্বলতা বশত যাঁদের পিছিয়ে পড়বার সম্ভাবনা আছে তাঁদের নিয়ে ভারগ্রস্ত হলে আমাদের সমস্তই ব্যর্থ হবে!

এমন সময় নির্ম্মলা অকুণ্ঠিত মর্য্যাদার সহিত গৃহের মধ্যে প্রবেশ করিয়া নমস্কার করিয়া দাঁড়াইল। হঠাৎ সকলেই স্তম্ভিত হইয়া গেল। যদিচ একটা অপূর্ণ ক্ষোভে তাহার কণ্ঠস্বর আর্দ্র ছিল তথাপি সে দৃঢ়স্বরে কহিল—আপনাদের কি উদ্দেশ্য এবং আপনারা দেশের কাজে কতদূর পর্য্যন্ত যেতে প্রস্তুত আছেন তা আমি কিছুই জানিনে,—কিন্তু আমি আমার মামাকে জানি, তিনি যে পথে যাত্রা করে চলেছেন আপনারা কেন আমাকে সে পথে তাঁর অনুসরণ কর্‌তে বাধা দিচ্ছেন?

শ্রীশ নিরুত্তর, পূর্ণ কুন্ঠিত অনুতপ্ত, বিপিন প্রশান্ত গম্ভীর, চন্দ্রবাবু সুগভীর চিন্তামগ্ন।

পূর্ণ এবং ঐশের প্রতি বর্ষায় ব্রৌদ্ররশ্মির ন্যায় অশ্রুজলস্নাত কটাক্ষপাত করিয়া নির্ম্মলা কহিল—আমি যদি কাজ কর্‌তে চাই, যিনি আমার আশৈশবের গুরু, মৃত্যু পর্য্যন্ত যদি সকল শুভ চেষ্টায় তাঁর অনুবর্ত্তিনী হতে ইচ্ছা করি, আপনারা কেবল তর্ক করে আমার অযোগ্যতা প্রমাণ কর্‌তে চেষ্টা করেন কেন? আপনারা আমাকে কি জানেন?

শ্রীশ স্তব্ধ। পূর্ণ ঘর্ম্মাক্ত।

নির্ম্মলা। আমি আপনাদের কুমারসভা বা অন্য কোন সভা জানিনে। কিন্তু যাঁর শিক্ষায় আমি মানুষ হয়েছি তিনি যখন কুমারসভাকে অবলম্বন করেই তাঁর জীবনের সমস্ত উদ্দেশ্য সাধনে প্রবৃত্ত হয়েছেন, তখন এই কুমারসভা থেকে আপনারা আমাকে দুরে রাখ্‌তে পারবেন না! (চন্দ্রবাবুর দিকে ফিরিয়া) তুমি যদি বল আমি তোমার কাজের যোগ্য নই, তাহলে আমি বিদায় হব, কিন্তু এঁরা আমাকে কি জানেন? এঁরা কেন আমাকে তোমার অনুষ্ঠান থেকে বিচ্ছিন্ন করবার জন্যে সকলে মিলে তর্ক কর্‌চেন?

শ্রীশ তখন বিনীত মৃদুস্বরে কহিল—মাপ কর্‌বেন, আমি আপনার সম্বন্ধে কোন তর্ক করিনি, আমি সাধারণতঃ স্ত্রীজাতি সম্বন্ধেই বলছিলুম―

নির্ম্মলা। আমি স্ত্রীজাতি পুরুষ জাতির প্রভেদ নিয়ে কোন বিচার কর্‌তে চাইনে—আমি নিজের অন্তঃকরণ জানি এবং যাঁর উন্নত দৃষ্টান্তকে আশ্রয় করে রয়েছি তাঁর অন্তঃকরণ জানি, কাজে প্রবৃত্ত হতে এর বেশী আমার আর কিছু জান্‌বার দরকার নেই।

চন্দ্রবাবু নিজের দক্ষিণ করতল চোখের অত্যন্ত কাছে লইয়া নিরীক্ষণ করিয়া দেখিতে লাগিলেন। পূর্ণ খুব চমৎকার করিয়া একটা কিছু বলিবার ইচ্ছা করিল, কিন্তু তাহার মুখ দিয়া কোন কথাই বাহির হইল না। নির্ম্মলা দ্বারের অন্তরালে থাকিলে পূর্ণর বাক্‌শক্তি যেরূপ সতেজ থাকে আজ তাহার তেমন পরিচয় পাওয়া গেল না।

তবু সে মনে মনে অনেক আপত্তি করিয়া বলিল, দেবী, এই পঙ্কিল পৃথিবীর কাজে কেন আপনার পবিত্র দুইখানি হস্ত প্রয়োগ করতে চাচ্চেন?

কথাটা মনে যেমন লাগিতেছিল মুখে তেমন শোনাইল না—পূর্ণ বলিয়াই বুঝিতে পারিল কথাটা গদ্যের মধ্যে হঠাৎ পদ্যের মত কিছু যেন বাড়াবাড়ি হইয়া পড়িল। লজ্জায় তাহার কান লাল হইয়া উঠিল। বিপিন স্বাভাবিক সুগম্ভীর শান্তস্বরে কহিল—পৃথিবী যত বেশী পঙ্কিল পৃথিবীর সংশোধন কার্য্য তত বেশী পবিত্র।

এই কথাটায় কৃতজ্ঞ নির্ম্মলার মুখের ভাব লক্ষ্য করিয়া পূর্ণ ভাবিল আহা, কথাটা আমারি বলা উচিত ছিল।—বিপিন বলিয়াছে বলিয়া তাহার উপর অত্যন্ত রাগ হইল।

শ্রীশ। সভার অধিবেশনে স্ত্রীসভ্য হওয়া সম্বন্ধে নিয়মমত প্রস্তাব উত্থাপন করে যা স্থির হয় আপনাকে জানাব।

নির্ম্মলা এক মুহূর্ত্ত অপেক্ষা না করিয়া পালের নৌকার মত নিঃশব্দে চলিয়া যাইবার উপক্রম করিল। হঠাৎ অধ্যাপক সচেতন হইয়া ডাকিলেন―ফেনি, আমার সেই গলার বোতামটা?

নির্ম্মলা সলজ্জ হাসিয়া মৃদুকণ্ঠে ইসারা করিয়া কহিল, গলাতেই আছে।

চন্দ্রবাবু গলায় হাত দিয়া “হাঁ হাঁ আছে বটে” বলিয়া তিন ছাত্রের দিকে চাহিয়া হাসিলেন।

(৮)

নৃপ। আজকাল তুই মাঝে মাঝে কেন অমন গম্ভীর হচ্চিল বল্‌ত নীরু।

নীরু। আমাদের বাড়ির যত কিছু গাম্ভীর্য্য সব বুঝি তোর একলার? আমার খুসি আমি গম্ভীর হব!

নৃপ। তুই কি ভাবছিস্ আমি বেশ জানি।

নীরু। তোর অত আন্দাজ করবার দরকার কি ভাই? এখন তোর নিজের ভাবনা ভাববার সময় হয়েছে।

নৃপ। নীরুর গলা জড়াইয়া ধরিয়া কহিল―তুই ভাবচিস্, মাগো মা, আমরা কি জঞ্জাল! আমাদের বিদায় করে দিতেও এত ভাবনা, এত ঝঞ্ঝাট!

নীরু। তা আমরা ত ভাই ফেলে দেবার জিনিষ নয় যে অম্‌নি ছেড়ে দিলেই হল! আমাদের জন্যে যে এতটা হাঙ্গাম হচ্ছে সে ত গৌরবের কথা! কুমারসম্ভবেত পড়েছিস্‌ গৌরীর বিয়ের জন্য একটি আস্ত দেবতা পুড়ে ছাই হয়ে গেল! যদি কোন কবির কানে উঠে তাহলে আমাদের বিবাহেরও একটা বর্ণনা বেরিয়ে যাবে।

নৃপ। না ভাই আমার ভারি লজ্জা করচে!

নীরু। আর আমার বুঝি লজ্জা করচে না? আমি বুঝি বেহায়া! কিন্তু কি করবি বল? ইস্কুলে যেদিন প্রাইজ নিতে গিয়েছিলুম লজ্জা করেছিল, আবার তার পর বছরেও প্রাইজ নেবার জন্যে রাত জেগে পড়া মুখস্থ করেছিলেম। লজ্জাও করে প্রাইজও ছাড়িনে, আমার এই স্বভাব।

নৃপ। আচ্ছা নীরু এবারে যে প্রাইজটার কথা চল্‌চে সেটার জন্যে তুই কি খুব ব্যস্ত হয়েছিস্?

নীরু। কোন্‌টা বল দেখি? চিরকুমার সভার দুটো সভ্য?

নৃপ। যেই হোক্‌ না কেন, তুইত বুঝতে পারচিস্।

নীরু। তা ভাই সত্যি কথা বল্‌ব? (নৃপর গলা জড়াইয়া কানে কানে) শুনেছি কুমার সভার দুটি সভ্যের মধ্যে খুব ভাব, আমরা যদি দুজনে দুই বন্ধুর হাতে পড়ি তা হলে বিয়ে হয়েও আমাদের ছাড়াছাড়ি হবে না―নইলে আমরা কে কোথায় চলে যাব তার ঠিক নেই। তাইত সেই যুগল দেবতার জন্যে এত পূজোর আয়োজন করেছি ভাই! জোড়হস্তে মনে মনে বল্‌চি, হে কুমারসভার অশ্বিনীকুমারযুগল, আমাদের দুটি বোনকে, এক বোঁটার দুই ফুলের মত তোমরা একসঙ্গে গ্রহণ কর!

বিরহ সম্ভাবনার উল্লেখমাত্রে দুই ভগিনী পরস্পরকে জড়াইয়া ধরিল এবং নৃপ কোনমতে চোখের জল সাম্‌লাইতে পারিল না।

নৃপ। আচ্ছা নীরু মেজদিদিকে কেমন করে ছেড়ে যাবি বল্ দেখি? আমরা দুজনে গেলে ওঁর আর কে থাক্‌বে?

নীরু। সে কথা অনেক ভেবেছি। থাক্‌তে যদি দেন তাহলে কি ছেড়ে যাই? ভাই ওঁরত স্বামী নেই, আমাদেরও না হয় স্বামী না রইল। মেজদিদির চেয়ে বেশী সুখে আমাদের দরকার কি?

পুরুষবেশধারিণী শৈলবালার প্রবেশ। নীরু টেবিলের উপরিস্থিত থালা হইতে একটি ফুলের মালা তুলিয়া লইয়া শৈলবালার গলায় পরাইয়া কহিল—আমরা দুই স্বয়ম্বরা তোমাকে আমাদের পতিরূপে বরণ করলুম। ―এই বলিয়া শৈলবালাকে প্রণাম করিল।

শৈল। ও আবার কি?

নীরু। ভয় নেই ভাই, আমরা দুই সতীনে তোমাকে নিয়ে ঝগড়া করব না। যদি করি, সেজদিদি আমার সঙ্গে পারবে না—আমি একলাই মিটিয়ে নিতে পারব, তোমাকে কষ্ট পেতে হবে না। না, সত্যি বল্‌চি মেজদিদি, তোমার কাছে আমরা যেমন আদরে আছি এমন আদর কি আর কোথাও পাব? কেন তবে আমাদের পরের গলায় দিতে চাস্‌?

পুনর্ব্বার নৃপর দুই চক্ষু বাহিয়া ঝর্ ঝর্ করিয়া জল পড়িতে লাগিল। “ও কি ও নৃপ, ছি” বলিয়া শৈল তাহার চোখ মুছিয়া দিল—কহিল―তোদের কিসে সুখ তা কি তোরা জানিস্? আমাকে নিয়ে যদি তোদের জীবন সার্থক হত তা হলে কি আমি আর কারো হাতে তোদের দিতে পারতুম?

তিনজনে মিলিয়া একটা অশ্রুবর্ষণকাণ্ড ঘটিবার উপক্রম করিতেছিল এমন সময়ে রসিকদাদা প্রবেশ করিয়া কাতরস্বরে কহিলেন—ভাই আমার মত অসভ্যটাকে তোরা সভ্য করলি—আজ ত স এখানে বস্‌বে, কি রকম ভাবে চল্‌ব শিখিয়ে দে?

নীরু কহিল―ফের, পুরোণো ঠাট্টা? তোমার ঐ সভ্য অসভ্যর কথাটা এই পর্শু‌ থেকে বল্‌চ।

রসিক। যাকে জন্ম দেওয়া যায় তার প্রতি মমতা হয় না? ঠাট্টা একবার মুখ থেকে বের হলেই কি রাজপুতের কন্যার মত তাকে গলা টিপে মেরে ফেল্‌তে হবে। হয়েছে কি―যতদিন চিরকুমার সভা টিঁকে থাকবে এই ঠাট্টা তোদের দুবেলা শুন্‌তে হবে।

নীরু। তবে ওটাকে ত একটু সকাল সকাল সেরে ফেল্‌তে হচ্চে। মেজদিদি ভাই, আর দয়ামায়া নয়—রসিকদাদার রসিকতাকে পুরোন হতে দেব না, চিরকুমার সভার চিরত্ব আমরা অচিরে ঘুচিয়ে দেব তবেই ত আমাদের বিশ্ববিজয়িনী নারী নাম সার্থক হবে! কি রকম করে আক্রমণ করতে হবে একটা কিছু প্ল্যান ঠাউরেছিস্?

শৈল। কিছুই না। ক্ষেত্রে উপস্থিত হয়ে যখন যে রকম মাথায় আসে।

নীরু। আমাকে যখন দরকার হবে রণভেরীধ্বনিত করলেই আমি হাজির হব। আমি কি ডরাই সখি কুমারসভারে? নাহি কি বল এ ভুজ মৃণালে?

অক্ষয় ঘরে প্রবেশ করিয়া কহিলেন, অদ্যকার সভায় বিদুষীমণ্ডলীকে একটি ঐতিহাসিক প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে ইচ্ছা করি।

শৈল। প্রস্তুত আছি।

অক্ষয়। বল দেখি যে দুটি ডালে দাঁড়িয়েছিলেন সেই দুটি ডাল কাটতে চেয়েছিলেন কে?

নৃপ তাড়াতাড়ি উত্তর করিল, আমি জানি মুখুজ্জে মশায়, কালিদাস।

অক্ষয়। না আরো একজন বড় লোক। শ্রীঅক্ষয়কুমার মুখোপাধ্যায়।

নীরু। ডাল দুটি কে?

অক্ষয় বামে নীরুকে টানিয়া বলিলেন “এই একটি,” এবং দক্ষিণে নৃপকে টানিয়া আনিয়া কহিলেন “এই আর একটি!”

নীরু। আর, কুড়ুল বুঝি আজ আস্‌চে?

অক্ষয়। আসচে কেন, এসেচে বল্লেও অত্যুক্তি হয় না। ঐ যে সিঁড়িতে পায়ের শব্দ শোনা যাচ্চে।

শুনিয়া দৌড়, দৌড়! শৈল পালাইবার সময় রসিকদাদাকে টানিয়া লইয়া গেল। চুড়ি বালার ঝঙ্কার এবং ত্রস্ত পদপল্লব কয়েকটির দ্রুত পতন শব্দ সম্পূর্ণ না মিলাইতেই শ্রীশ ও বিপিনের প্রবেশ। ঝম্ ঝম্ ঝম্ ঝম্ দূর হইতে দূরে বাজিতে লাগিল। এবং ঘরের আলোড়িত বাতাসে এসেন্স ও গন্ধতৈলের মিশ্রিত মৃদু পরিমল যেন পরিত্যক্ত আস্‌বাবগুলির মধ্যে আপনার পুরাতন আশ্রয়গুলিকে খুঁজিয়া নিঃশ্বাস ফেলিয়া বেড়াইতে লাগিল।

বিজ্ঞান শাস্ত্রে বলে শক্তির অপচয় নাই, রূপান্তর আছে। ঘর হইতে হঠাৎ তিন ভগিনীর পলায়নে বাতাসে যে একটি সুগন্ধ আন্দোলন উঠিয়াছিল সেটা কি প্রথমে কুমারযুগলের বিচিত্র স্নায়ুমণ্ডলীর মধ্যে একটি নিগূঢ় স্পন্দনে ও অব্যবহিত পরেই তাঁহাদের অন্তঃকরণের দিক্‌প্রান্তে ক্ষণকালের জন্য একটি অনির্ব্বচনীয় পুলকে পরিণত হয় নাই? কিন্তু সংসারে যেখান হইতে ইতিহাস শুরু হয় তাহার অনেক পরের অধ্যায় হইতে লিখিত হইয়া থাকে;—প্রথম স্পর্শ স্পন্দন আন্দোলন ও বিদ্যুৎচমকগুলি প্রকাশের অতীত।

পরস্পর নমস্কারের পর অক্ষয় জিজ্ঞাসা করিলেন, পূর্ণবাবু এলেন না যে?

শ্রীশ। চন্দ্রবাবুর বাসায় তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছিল, কিন্তু হঠাৎ তাঁর শরীরটা খারাপ হয়েছে বলে আজ আর আস্‌তে পারলেন না।

অক্ষয়। (পথের দিকে চাহিয়া) একটু বসুন্,―আমি চন্দ্রবাবুর অপেক্ষায় দ্বারের কাছে গিয়ে দাঁড়াই। তিনি অন্ধমানুষ কোথায় যেতে কোথায় গিয়ে পড়বেন তার ঠিক নেই―কাছাকাছি এমন স্থানও আছে যেখানে কুমারসভার অধিবেশন কোন মতেই প্রার্থনীয় নয়। বলিয়া অক্ষয় নামিয়া গেলেন।

আজ চন্দ্রবাবুর বাসায় হঠাৎ নির্ম্মলা আবির্ভূত হইয়া চিরকুমারদলের শান্তমনের মধ্যে যে একটা মন্থন উৎপন্ন করিয়া দিয়াছিল তাহার অভিঘাত বোধ করি এখনো শ্রীশের মাথায় চলিতেছিল। দৃশ্যটি অপূর্ব্ব, ব্যাপারটি অভাবনীয়, এবং নির্ম্মলার কমনীয় মুখে যে একটি দীপ্তি ও তাহার কথা গুলির মধ্যে যে একটি আন্তরিক আবেগ ছিল তাহাতে তাঁহাকে বিস্মিত ও তাঁহার চিন্তার স্বাভাবিক গতিকে বিক্ষিপ্ত করিয়া দিয়াছে। তিনি লেশমাত্র প্রস্তুত ছিলেন না বলিয়া এই আকস্মিক আঘাতেই বিপর্য্যস্ত হইয়া পড়িয়াছেন! তর্কের মাঝখানে হঠাৎ এমন জায়গা হইতে এমন করিয়া এমন একটা উত্তর আসিয়া উপস্থিত হইবে স্বপ্নেও মনে করেন নাই বলিয়াই উত্তরটা তাঁহার কাছে এমন প্রবল হইয়া উঠিল। উত্তরের প্রত্যুত্তর থাকিতে পারে, কিন্তু সেই আবেগকম্পিত ললিতকণ্ঠ, সেই গূঢ় অশ্রুকরুণ বিশাল কৃষ্ণচক্ষুর দীপ্তিচ্ছটার প্রত্যুত্তর কোথায়? পুরুষের মাথায় ভাল ভাল যুক্তি থাকিতে পারে, কিন্তু যে আরক্ত অধর কথা বলিতে গিয়া স্ফুরিত হইতে থাকে, যে কোমল কপোল দুটি দেখিতে দেখিতে ভাবের আভাসে করুণাভ হইয়া উঠে তাহার বিরুদ্ধে দাঁড় করাইতে পারে পুরুষের হাতে এমন কি আছে?

পথে আসিতে আসিতে দুই বন্ধুর মধ্যে কোন কথাই হয় নাই। এখানে আসিয়া ঘরে প্রবেশ না করিতেই যে শব্দগুলি শোনা গেল, অন্য কোন দিন হইলে শ্রীশ তাহা লক্ষ্য করিত কি না সন্দেহ—আজ তাহার কাছে কিছুই এড়াইল না। অনতিপূর্ব্বেই ঘরের মধ্যে রমণীদল যে ছিল, ঘরে প্রবেশ করিয়াই সে তাহা বুঝিতে পারিল।

অক্ষয় চলিয়া গেলে ঘরটি শ্রীশ ভাল করিয়া দেখিয়া লইল। টেবিলের মাঝখানে ফুলদানিতে ফুল সাজানো। সেটা চকিতে তাহাকে একটু যেন বিচলিত করিল। তাহার একটা কারণ শ্রীশ অত্যন্ত ফুল ভাল বাসে, তাহার আর একটা কারণ, শ্রীশ কল্পনাচক্ষে দেখিতে পাইল, অনতিকাল পূর্ব্বেই যাহাদের সুনিপুণ দক্ষিণ হস্ত এই ফুলগুলি সাজাইয়াছে তাহারাই এখনি ত্রস্তপদে ঘর হইতে পালাইয়া গেল।

বিপিন ঈষৎ হাসিয়া বলিল, যা বল ভাই, এ ঘরটি চিরকুমার সভার উপযুক্ত নয়।

হঠাৎ মৌনভঙ্গে শ্রীশ চকিত হইয়া উঠিয়া কহিল, কেন নয়?

বিপিন কহিল, ঘরের সজ্জাগুলি তোমার নবীন সন্ন্যাসীদের পক্ষেও যেন বেশী বোধ হচ্চে।

শ্রীশ। আমার সন্ন্যাসধর্ম্মের পক্ষে বেশী কিছু হতে পারে না।

বিপিন। কেবল নারী ছাড়া!

শ্রীশ কহিল, হাঁ ঐ একটি মাত্র!―লেখকের অনুমান মাত্র হইতে পারে কিন্তু অন্য দিনের মত কথাটায় তেমন জোর পৌঁছিল না।

বিপিন কহিল, দেয়ালের ছবি এবং অন্যান্য পাঁচ রকমে এ ঘরটিতে সেই নারী জাতির অনেকগুলি পরিচয় পাওয়া যায় যেন।

শ্রীশ। সংসারে নারীজাতির পরিচয় ত সর্ব্বত্রই আছে।

বিপিন। তা ত বটেই। কবিদের কথা যদি বিশ্বাস করা যায় তাহলে চাঁদে ফুলে লতায় পাতায় কোন খানেই নারীজাতির পরিচয় থেকে হতভাগ্য পুরুষমানুষের নিষ্কৃতি পাবার জো নেই।

শ্রীশ হাসিয়া কহিল, কেবল ভেবেছিলুম, চন্দ্রবাবুর বাসায় সেই একতলার ঘরটিতে রমণীর কোন সংস্রব ছিল না। আজ সে ভ্রমটা হঠাৎ ভেঙে গেল। নাঃ, ওরা পৃথিবীময় ছড়িয়ে পড়েছে।

বিপিন। বেচারা চিরকুমার ক’টির জন্যে একটা কোনও ফাঁক রাখেনি। সভা করবার জায়গা পাওয়াই দায়।

শ্রীশ। এই দেখ না!―বলিয়া কোণের একটা টিপাই হইতে গোটাদুয়েক চুলের কাঁটা তুলিয়া দেখাইল।

বিপিন কাঁটা দুটি লইয়া পর্য্যবেক্ষণ করিয়া কহিল, ওহে ভাই এস্থানটাত কুমারদের পক্ষে নিষ্কণ্টক নয়।

শ্রীশ। ফুলও আছে কাঁটাও আছে।

বিপিন। সেইটেই ত বিপদ। কেবল কাঁটা থাক্‌লে এড়িয়ে চলা যায়!

শ্রীশ অপর কোণের ছোট বইয়ের শেল্‌ফ হইতে বইগুলি তুলিয়া দেখিতে লাগিল। কতকগুলি নভেল, কতকগুলি ইংরাজি কাব্যসংগ্রহ। প্যাল্‌গ্রেভের গীতিকাব্যের স্বর্ণভাণ্ডার খুলিয়া দেখিল, মার্জ্জিনে মেয়েলি অক্ষরে নোট লেখা—তখন গোড়ার পাতাটা উল্টাইয়া দেখিল। দেখিয়া একটু নাড়িয়া চাড়িয়া বিপিনের সম্মুখে ধরিল।

বিপিন পড়িয়া কহিল, নৃপবালা! আমার বিশ্বাস নামটি পুরুষ মানুষের নয়। কি বোধ কর।

শ্রীশ। আমারও সেই বিশ্বাস। এ নামটিও অন্ত জাতীয়ের বলে ঠেকচে হে!―বলিয়া আর একটা বই দেখাইল

বিপিন কহিল―নীরবালা! এ নামটি কাব্যগ্রন্থে চলে কিন্তু কুমার সভায়―

শ্রীশ। কুমার সভাতেও এই নামধারিণীরা যদি চলে আসেন তা হলে দ্বাররোধ করতে পারি এত বড় বলবান ত আমাদের মধ্যে কাউকে দেখিনে।

বিপিন। পূর্ণ ত একটি আঘাতেই আহত হয়ে পড়ল—রক্ষা পায় কি না সন্দেহ!

শ্রীশ। কি রকম?

বিপিন। লক্ষ্য করে দেখনি বুঝি?

প্রশান্তভার বিপিনকে দেখিলে মনে হয় না যে সে কিছু দেখে; কিন্তু তাহার চোখে কিছুই এড়ায় না। পরম দুর্ব্বল অবস্থায় পূর্ণকে সে দেখিয়া লইয়াছে।

শ্রীশ। না না ও তোমার অনুমান!

বিপিন। হৃদয়টা ত অনুমানেরই জিনিষ, না যায় দেখা না যায় ধরা।

শ্রীশ থমকিয়া দাঁড়াইয়া ভাবিতে লাগিল,―কহিল, পূর্ণর অসুখটাও তা হলে বৈদ্যশাস্ত্রের অন্তর্গত নয়?

বিপিন। না, এ সকল ব্যাধি সম্বন্ধে মেডিকাল কলেজে কোন লেক্‌চার চলে না।

শ্রীশ উচ্চস্বরে হাসিতে লাগিল, গম্ভীর বিপিন স্মিতমুখে চুপ করিয়া রহিল।

চন্দ্রবাবু প্রবেশ করিয়া কহিলেন—আজকের তর্কবিতর্কের উত্তেজনায় পূর্ণবাবুর হঠাৎ শরীর খারাপ হল দেখে আমি তাঁকে তাঁর বাড়ী পৌঁছে দেওয়া উচিত বোধ করলুম।

শ্রীশ বিপিনের মুখের দিকে, চাহিয়া ঈষৎ একটু হাসিল, বিপিন গম্ভীরমুখে কহিল, পূর্ণবাবুর যে রকম দুর্ব্বল অবস্থা দেখচি পূর্ব্ব হতেই তার বিশেষ সাবধান হওয়া উচিত ছিল।

চন্দ্রমাধব সরলভাবে উত্তর করিলেন, পূর্ণবাবুকে ত বিশেষ অসাবধান বলে বোধ হয় না!

চন্দ্রমাধব বাবু সভাপতির আসন গ্রহণ করিবার পূর্ব্বেই অক্ষয় রসিক দাদাকে সঙ্গে লইয়া ঘরে প্রবেশ করিলেন। কহিলেন—মাপ করবেন, এই নবীন সভ্যটিকে আপনাদের হাতে সমর্পণ করে দিয়েই আমি চলে যাচ্চি।

রসিক হাসিয়া কহিলেন—আমার নবীনতা বাইরে থেকে বিশেষ প্রত্যক্ষগোচর নয়―

অক্ষয়। অত্যন্ত বিনয়বশতঃ সেটা বাহ্য প্রাচীনতা দিয়ে ঢেকে রেখেচেন―ক্রমশঃ পরিচয় পাবেন। ইনিই হচ্চেন সার্থকনামা শ্রীরসিকচক্রবর্ত্তী।

শুনিয়া শ্রীশ ও বিপিন সহাস্যে রসিকের মুখের দিকে চাহিল,― রসিকদাদা কহিলেন, পিতা আমার রসবোধ সম্বন্ধে পরিচয় পাবার পূর্ব্বেই রসিক নাম রেখেছিলেন, এখন পিতৃসত্য পালনের জন্য আমাকে রসিকতার চেষ্টা করতে হয়, তার পরে “যত্নে কৃতে যদি ন সিধ্যতি কোহত্র দোষঃ।”

অক্ষয় প্রস্থান করিলেন। ঘরে দুটি কেরোসিনের দীপ জ্বলিতেছে। সেই দুটিকে বেষ্টন করিয়া ফিরোজরঙের রেশমের অবগুণ্ঠন। সেই আবরণ ভেদ করিয়া ঘরের আলোটি মৃদু এবং রঙীন হইয়া উঠিয়াছে।

পুরুষবেশী শৈল আসিয়া সকলকে নমস্কার করিল। ক্ষীণদৃষ্টি চন্দ্রমাধব বাবু ঝাপ্‌সাভাবে তাহাকে দেখিলেন—বিপিন ও শ্রীশ তাহার দিকে চাহিয়া রহিল।

শৈলের পশ্চাতে দুই জন ভৃত্য কয়েকটি ভোজনপত্র হাতে করিয়া উপস্থিত হইল। শৈল ছোট ছোট রূপার থালাগুলি লইয়া শাদা পাথরের টেবিলের উপর সাজাইতে লাগিল। প্রথম পরিচয়ের দুর্নিবার লজ্জাটুকু সে এইরূপ আতিথ্যব্যাপারের মধ্যে ঢাকিয়া লইবার চেষ্টা করিল।

রসিক কহিলেন, ইনি আপনাদের সভায় আর একটি নবীন সভ্য। এঁর নবীনতা সম্বন্ধে কোন তর্ক নেই। ঠিক আমার বিপরীত। ইনি বুদ্ধির প্রবীণতা বাহ্য নবীনতা দিয়ে গোপন করে রেখেছেন। আপনারা কিছু বিস্মিত হয়েছেন দেখচি; হবার কথা! এঁকে দেখে মনে হয় বালক, কিন্তু আমি আপনাদের কাছে জামিন রইলুম―ইনি বালক নন্।

চন্দ্র। এঁর নাম?

রসিক। শ্রীঅবলাকান্ত চট্টোপাধ্যায়।

শ্রীশ বলিয়া উঠিল, অবলাকান্ত?

রসিক। নামটি আমাদের সভার উপযোগী নয় স্বীকার করি। নামটির প্রতি আমারও বিশেষ মমত্ব নেই—যদি পরিবর্ত্তন করে বিক্রম সিংহ বা ভীমসেন বা অন্য কোন উপযুক্ত নাম রাখেন তাতে উনি আপত্তি করবেন না। যদিচ শাস্ত্রে আছে বটে স্বনামা পুরুষো ধন্যঃ—কিন্তু উনি অবলাকান্ত নামটির দ্বারাই জগতে পৌরুষ অর্জ্জন করতে ব্যাকুল নন।

শ্রীশ কহিল—বলেন কি মশায়! নাম ত আর গায়ের বস্ত্র নয়, যে বদল করলেই হ’ল।

রসিক। ওটা আপনাদের একেলে সংস্কার শ্রীশ বাবু। নামটাকে প্রাচীনেরা পোষকের মধ্যেই গণ্য করতেন। দেখুন না কেন, অর্জ্জুনের পিতৃদত্ত নাম কি, ঠিক করে বলা শক্ত,—পার্থ, ধনঞ্জয়, সব্যসাচী, লোকের যখন যা মুখে আস্‌ত তাই বলেই ডাক্‌ত। দেখুন, নামটাকে আপনার বেশী সত্য মনে করবেন না;—ওঁকে যদি ভুলে আপনি অবলাকান্ত নাও বলেন ইনি লাইবেলের মোকদ্দমা আনবেন না।

শ্রীশ হাসিয়া কহিল—আপনি যখন এতটা অভয় দিচ্চেন তখন অত্যন্ত নিশ্চিন্ত হলুম—কিন্তু ওঁর ক্ষমাগুণের পরিচয় নেবার দরকার হবে না—নাম ভুল করব না মশায়।

রসিক। আপনি না করতে পারেন কিন্তু আমি করি মশায়। উনি আমার সম্পর্কে নাতি হন—সেই জন্যে ওঁর সম্বন্ধে আমার রসনা কিছু শিথিল, যদি কখনো এক বল্‌তে আর বলি সেটা মাপ করবেন।

শ্রীশ উঠিয়া কহিল—অবলাকান্ত বাবু, আপনি এ সমস্ত কি আয়োজন করেচেন? আমাদের সভার কার্য্যাবলীর মধ্যে মিষ্টান্নটা ছিল না!

রসিক। (উঠিয়া) সেই ত্রুটি যিনি সংশোধন করচেন তাঁকে সভার হয়ে ধন্যবাদ দিই।

শ্রীশের মুখের দিকে না চাহিয়া থালা সাজাইতে সাজাইতে শৈল কহিল, শ্রীশ বাবু আহারটাও কি আপনাদের নিয়মবিরুদ্ধ?

শ্রীশ দেখিল কণ্ঠস্বরটিও অবলা নামের উপযুক্ত, কহিল এই সভ্যটির আকৃতি নিরীক্ষণ করে দেখলেই ও সম্বন্ধে কোন সংশয় থাক্‌বে না।― বলিয়া বিপুলায়তন বিপিনকে টানিয়া আনিল।

বিপিন কহিল, নিয়মের কথা যদি বলেন অবলাকান্ত বাবু, সংসারের শ্রেষ্ঠ জিনিষমাত্রই নিজের নিয়ম নিজে সৃষ্টি করে; ক্ষমতাশালী লেখক নিজের নিয়মে চলে, শ্রেষ্ঠ কাব্য সমালোচকের নিয়ম মানে না। মিষ্টান্নগুলি সংগ্রহ করেচেন এর সম্বন্ধেও কোন সভার নিয়ম খাট্‌তে পারে না—এর একমাত্র নিয়ম, বসে যাওয়া এবং নিঃশেষ করা! ইনি যতক্ষণ আছেন ততক্ষণ জগতের অন্য সমস্ত নিয়মকে দ্বারের কাছে অপেক্ষা করতে হবে।

শ্রীশ কহিল―তোমার হল কি বিপিন? তোমাকে খেতে দেখেছি বটে কিন্তু এক নিঃশ্বাসে এত কথা কইতে শুনিনি ত!

বিপিন। রসনা উত্তেজিত হয়েছে, এখন সবল বাক্য বলা আমার পক্ষে অত্যন্ত সহজ হয়েছে। যিনি আমার জীবনবৃত্তান্ত লিখ্‌বেন, হায়, এ সময়ে তিনি কোথায়?

রসিক টাকে হাত বুলাইতে বুলাইতে কহিলেন, আমার দ্বারা সে কাজটা প্রত্যাশা করবেন না, আমি অত দীর্ঘকাল অপেক্ষা করতে পারব না।

নূতন ঘরের বিলাস সজ্জার মধ্যে আসিয়া চন্দ্রমাধব বাবুর মনটা বিক্ষিপ্ত হইয়া গিয়াছিল। তাঁহার উৎসাহস্রোত যথাপথে প্রবাহিত হইতেছিল না। তিনি ক্ষণে ক্ষণে কার্য্য বিবরণের খাতা, ক্ষণে ক্ষণে নিজের করকোষ্ঠি অকারণে নিরীক্ষণ করিয়া দেখিতেছিলেন। শৈল তাঁহার সম্মুখে গিয়া সবিনয়ে নিবেদন করিল, সভার কার্য্যের যদি কিছু ব্যাঘাত করে থাকি ত মাপ করবেন, চন্দ্রবাবু, কিন্তু কিছু জলযোগ―

চন্দ্রবাবু শৈলকে নিকটে পাইয়া তাহার মুখ নিরীক্ষণ করিয়া কহিলেন― এ সমস্ত সামাজিকতায় সভার কার্য্যের ব্যাঘাত করে, তাতে সন্দেহ নাই।

রসিক কহিলেন—আচ্ছা পরীক্ষা করে দেখুন মিষ্টান্নে যদি সভার কার্য্য রোধ হয় তা হলে―

বিপিন মৃদুস্বরে কহিল―তা হলে ভবিষ্যতে না হয় সভাটা বন্ধ রেখে মিষ্টান্নটা চালালেই হবে।

চন্দ্রবাবু নিরীক্ষণ করিয়া দেখিতে দেখিতে শৈলের সুন্দর সুকুমার চেহারাটি কিয়ৎপরিমাণে আয়ত্ত করিয়া লইলেন। তখন শৈলকে ক্ষুণ্ণ করিতে তাঁহার আর প্রবৃত্তি হইল না।

বলা আবশ্যক, অচিরকাল পূর্ব্বেই বিপিন জলযোগ করিয়াই বাড়ি হইতে বাহির হইয়া আসিয়াছিল। তাহার ভোজনের ইচ্ছামাত্র ছিল না কিন্তু এই প্রিয়দর্শন কুমারটিকে দেখিয়া বিশেষতঃ তাহার মুখের অত্যন্ত কোমল একটি স্মিতহাস্যে বিপুলবলশালী বিপিনের চিত্ত হঠাৎ এমনি স্নেহাকৃষ্ট হইয়া পড়িল যে, অস্বাভাবিক মুখরতার সহিত মিষ্টান্নের প্রতি সে অতিরিক্ত লোলুপতা প্রকাশ করিল। রোগভীরু শ্রীশের অসময়ে খাইবার সাহস ছিল না, তাহারও মনে হইল, না খাইতে বসিলে এই তরুণ কুমারটির প্রতি কঠোর রূঢ়তা করা হইবে।

শ্রীশ কহিল—আসুন রসিক বাবু! আপনি উঠ্‌চেন না যে!

রসিক। রোজ রোজ যেচে এবং মাঝে মাঝে কেড়ে খেয়ে থাকি, আজ চিরকুমার সভার সভ্যরূপে আপনাদের সংসর্গগৌরবে কিঞ্চিৎ উপরোধের প্রত্যাশায় ছিলুম, কিন্তু―

শৈল। কিন্তু আবার কি রসিক দাদা? তুমি যে রবিবার করে থাক, আজ তুমি কিছু খাবে নাকি?

রসিক। দেখেচেন মশায়! নিয়ম আর কারো বেলায় নয়, কেবল রসিক দাদার বেলায়! নাঃ―বলং বলং বাহুবলম্! উপরোধ অনুরোধের অপেক্ষা করা নয়!

বিপিন। (চারটিমাত্র ভোজন পাত্র দেখিয়া) আপনি আমাদের সঙ্গে বসবেন না!

শৈল। না আমি আপনাদের পরিবেশন করব!

শ্রীশ উঠিয়া কহিল―সে কি হয়!

শৈল কহিল—আমার জন্যে আপনারা অনেক অনিয়ম সহ্য করেছেন, এখন আমার আর একটি মাত্র ইচ্ছা পূর্ণ করুন। আমাকে পরিবেষন কর্‌তে দিন, খাওয়ার চেয়ে তাতে আমি ঢের বেশী খুশী হব।

শ্রীশ। রসিক বাবু, এটা কি ঠিক হচ্ছে?

রসিক। ভিন্ন রুচির্হি‌-লোকঃ; উনি পরিবেষন কর্‌তে ভালবাসেন আমরা আহার কর্‌তে ভাল বাসি এ রকম রুচিভেদে বোধ হয় পরস্পরের কিছু সুবিধা আছে।

আহার আরম্ভ হইল।

শৈল। চন্দ্রবাবু, ওটা মিষ্টি, ওটা আগে খাবেন না, এই দিকে তরকারী আছে। জলের গ্লাস্ খুঁজচেন? এই যে গ্লাস্‌—বলিয়া গ্লাস অগ্রসর করিয়া দিল।

চন্দ্রবাবুর নির্ম্মলাকে মনে পড়িল। মনে হইল এই বালকটি যেন নির্ম্মলার ভাই। আত্মসেবায় অনিপুণ চন্দ্রবাবুর প্রতি শৈলের একটু বিশেষ স্নেহোদ্রেক হইল। চন্দ্রবাবুর পাতে আম ছিল তিনি সেটাকে ভালরূপ আয়ত্ত করিতে পারিতেছিলেন না—অনুতপ্ত শৈল তাড়াতাড়ি তাহা কাটিয়া সহজসাধ্য করিয়া দিল। যে সময়ে যেটি আবশ্যক সেটি আস্তে আস্তে হাতের কাছে জোগাইয়া দিয়া তাঁহার ভোজন ব্যাপারটি নির্ব্বিঘ্ন করিতে লাগিল।

চন্দ্র। শ্রীশ বাবু, স্ত্রী সভ্য নেওয়া সম্বন্ধে আপনি কিছু বিবেচনা করেছেন?

শ্রীশ। ভেবে দেখতে গেলে ওতে আপত্তির কারণ বিশেষ নেই, কেবল সমাজের আপত্তির কথাটা আমি ভাবি।

বিপিনের তর্কপ্রবৃত্তি চড়িয়া উঠিল। কহিল―সমাজকে অনেক সময় শিশুর মত গণ্য করা উচিত। শিশুর সমস্ত আপত্তি মেনে চল্‌লে শিশুর উন্নতি হয় না, সমাজ সম্বন্ধেও ঠিক সেই কথা খাটে।

আজ শ্রীশ উপস্থিত প্রস্তাবটা সম্বন্ধে অনেকটা নরমভাবে ছিল, নতুবা উত্তাপ হইতে বাষ্প ও বাষ্প হইতে বৃষ্টির মত এই তর্ক হইতে কলহ ও কলহ হইতে পুনর্ব্বার সদ্ভাবের সৃষ্টি হইত।

এমন কি, শ্রীশ কথঞ্চিৎ উৎসাহের সহিত বলিলেন, আমার বোধ হয় আমাদের দেশে যে এত সভাসমিতি আয়োজন অনুষ্ঠান অকালে ব্যর্থ হয় তার প্রধান কারণ, সে সকল কার্য্যে স্ত্রীলোকদের যোগ নেই। রসিক বাবু কি বলেন?

রসিক। অবস্থা গতিকে যদিও স্ত্রীজাতির সঙ্গে আমার বিশেষ সম্বন্ধ নেই, তবু এটুকু জেনেছি স্ত্রীজাতি হয় যোগ দেন নয় বাধা দেন, হয় সৃষ্টি নয় প্রলয়। অতএব ওঁদের দলে টেনে অন্য সুবিধা যদি বা নাও হয় তবু বাধার হাত এড়ান যায়। বিবেচনা করে দেখুন চিরকুমার সভার মধ্যে যদি স্ত্রীজাতিকে আপনারা গ্রহণ করতেন তাহলে গোপনে এই সভাটিকে নষ্ট করবার জন্যে ওঁদের উৎসাহ থাক্‌ত না-কিন্তু বর্ত্তমান অবস্থায়―

শৈল। কুমারসভার উপর স্ত্রীজাতির আক্রোশের খবর রসিক দাদা কোথায় পেলে?

রসিক। বিপদের খবর না পেলে কি আর সাবধান করতে নেই? এক চক্ষু হরিণ যে দিকে কাণা ছিল সেই দিক থেকেই ত তীর খেয়েছিল― কুমারসভা যদি স্ত্রীজাতির প্রতিই কাণা হন তাহলে সেই দিক থেকেই হঠাৎ ঘা খাবেন।

শ্রীশ। (বিপিনের প্রতি মৃদু স্বরে) এক চক্ষু হরিণ ত আজ একটা তীর খেয়েছেন, একটি সত্য ধুলিশায়ী।

চন্দ্র। কেবল পুরুষ নিয়ে যারা সমাজের ভাল করতে চায় তারা এক পায়ে চল্‌তে চায়! সেই জন্যই খানিক দূর গিয়েই তাদের বসে পড়তে হয়। সমস্ত মহৎ চেষ্টা থেকে মেয়েদের দুরে রেখেছি বলেই আমাদের দেশের কাজে প্রাণসঞ্চার হচ্ছে না। আমাদের হৃদয়, আমাদের কাজ, আমাদের আশা বাইরে ও অন্তঃপুরে খণ্ডিত। সেই জন্যে আমরা বাইরে গিয়ে বক্তৃতা দিই ঘরে এসে ভুলি! দেখ অবলাকান্ত বাবু এখনো তোমার বয়স অল্প আছে, এই কথাটি ভাল করে মনে রেখো―স্ত্রীজাতিকে অবহেলা কোরো না। স্ত্রীজাতিকে যদি আমরা নীচু করে রাখি তাহলে তাঁরাও আমাদের নীচের দিকেই আকর্ষণ করেন; তা হলে তাঁদের ভারে আমাদের উন্নতির পথে চলা অসাধ্য হয়―দুপা চলেই আবার ঘরের কোণে এসেই আবদ্ধ হয়ে পড়ি। তাঁদের যদি আমরা উচ্চে রাখি, তাহলে ঘরের মধ্যে এসে নিজের আদর্শকে খর্ব্ব করতে লজ্জাবোধ হয়। আমাদের দেশে বাইরে লজ্জা আছে কিন্তু ঘরের মধ্যে সেই লজ্জাটি নেই, সেই জন্যেই আমাদের সমস্তউন্নতি কেবল বাহ্যাড়ম্বরে পরিণত হয়।

শৈল চন্দ্রবাবুর এই কথাগুলি আনত মস্তকে শুনিল―কহিল, আশীর্ব্বাদ করুন্ আপনার উপদেশ যেন ব্যর্থ না হয়, নিজেকে যেন আপনার আদর্শের উপযুক্ত করতে পারি।

একান্ত নিষ্ঠার সহিত উচ্চারিত এই কথাগুলি শুনিয়া চন্দ্রবাবু কিছু বিস্মিত হইলেন। তাঁহার সকল উপদেশের প্রতি নির্ম্মলার তর্কবিহীন বিনম্র শ্রদ্ধার কথা মনে পড়িল! স্নেহার্দ্র মনে আবার ভাবিলেন, এ যেন নির্ম্মলারই ভাই।

চন্দ্র। আমার ভাগ্নী নির্ম্মলাকে কুমারসভার সভ্যশ্রেণীতে ভুক্ত করতে আপনাদের কোন আপত্তি নেই?

রসিক। আর কোন আপত্তি নেই, কেবল একটু ব্যাকরণের আপত্তি। কুমার সভায় কেউ যদি কুমারীবেশে আসেন তাহলে বোপদেবের অভিশাপ।

শৈল। বোপদেবের অভিশাপ একালে খাটে না!

রসিক। আচ্ছা, অন্ততঃ লোহারামকে ত বাঁচিয়ে চল্‌তে হবে। আমি ত বোধ করি, স্ত্রীসভ্যরা যদি পুরুষ সভ্যদের অজ্ঞাতসারে বেশ ও নাম পরিবর্ত্তন করে আসেন তাহলে সহজে নিষ্পত্তি হয়।

শ্রীশ। তাহলে একটা কৌতুক এই হয় যে কে স্ত্রী কে পুরুষ নিজেদের সেই সন্দেহটা থেকে যায়―

বিপিন। আমি বোধ হয় সন্দেহ থেকে নিষ্কৃতি পেতে পারি।

রসিক। আমাকেও বোধ হয় আমার নাৎনী বলে কারো হঠাৎ আশঙ্কা না হতে পারে!

শ্রীশ। কিন্তু অবলাকান্ত বাবু সম্বন্ধে একটা সন্দেহ থেকে যায়। তখন শৈল অদূরবর্ত্তী টিপাই হইতে মিষ্টান্নের থালা আনিতে প্রস্থান করিল।

দেখুন রসিক বাবু, ভাষাতত্বে দেখা যায়, ব্যবহার করতে করতে একটা শব্দের মূল অর্থ লোপ পেয়ে বিপরীত অর্থ ঘটে থাকে। স্ত্রীসভ্য গ্রহণ করলে চিরকুমার সভার অর্থের যদি পরিবর্ত্তন ঘটে তাতে ক্ষতি কি?

রসিক। কিছু না। আমি পরিবর্ত্তনের বিরোধী নই—তা নাম পরিবর্ত্তন বা বেশ পরিবর্ত্তন বা অর্থ পরিবর্ত্তন যাই হোক না কেন, যখন যা ঘটে আমি বিনা বিরোধে গ্রহণ করি বলেই আমার প্রাণটা নবীন আছে।

মিষ্টান্ন শেষ হইল এবং স্ত্রীসভ্য লওয়া সম্বন্ধে কাহারো আপত্তি হইল না।

আহার অবসানে রসিক কহিল, আশা করি সভার কাজের কোন ব্যাঘাত হয় নি।

শ্রীশ কহিল―কিছু না—অন্যদিন কেবল মুখেরই কাজ চল্ত আজ দক্ষিণ হস্তও যোগ দিয়েছে।

বিপিন। তাতে আভ্যন্তরিক তৃপ্তিটা কিছু বেশী হয়েছে।

শুনিয়া শৈল খুসি হইয়া তাহার স্বাভাবিক স্নিগ্ধকোমল হাস্যে সকলকে পুরস্কৃত করিল।


(৯)

অক্ষয়। হল কি বল দেখি! আমার যে ঘরটি এতকাল কেবল ঝড়ু বেহারার ঝাড়নের তাড়নে নির্ম্মল ছিল, সেই ঘরের হাওয়া দুবেলা তোমাদের দুই বোনের অঞ্চল বীজনে চঞ্চল হয়ে উঠ্‌ছে যে!

নীর। দিদি নেই, তুমি একলা পড়ে আছ বলে দয়া করে মাঝে মাঝে দেখা দিয়ে যাই, তার উপরে আবার জবাবদিহি?

অক্ষয়—(গান করিয়া) ভৈরবী।

ওগো দয়াময়ী চোর! এত দয়া মনে তোর!
বড় দয়া করে কণ্ঠে আমার জড়াও মায়ার ডোর!
বড় দয়া করে চুরি করি লও শূন্য হৃদয় মোর!

নীর। মশায়, এখন সিঁধ কাটার পরিশ্রম মিথ্যে; আমাদের এমন বোকা চোর পাওনি! এখন হৃদয় আছে কোথায় যে, চুরি কর্‌তে আসব?

অক্ষয়। ঠিক করে বল দেখি হতভাগা হৃদয়টা গেছে কতদূরে?

নৃপ। আমি জানি মুখুজ্জে মশায়। বল্‌ব? ৪৭৫ মাইল!

নীর। সেজ্‌দিদি অবাক করলে! তুই কি মুখুজ্জে মশায়ের হৃদয়ের পিছনে পিছনে মাইল গুন্‌তে গুন্‌তে ছুটেছিলি নাকি?

নৃপ। না ভাই, দিদি কাশী যাবার সময় টাইম্ টেবিলে মাইলটা দেখেছিলুম।

অক্ষয়। (গান) বাহার।

চলেছে ছুটিয়া পলাতকা হিয়া
বেগে বহে শিরা ধমনী,
হায় হায় হায় ধরিবারে তায়
পিছে পিছে ধায় রমণী!
বায়ু বেগভরে উড়ে অঞ্চল,―
লটপট বেণী দুলে চঞ্চল,
একিরে রঙ্গ, আকুল অঙ্গ
ছুটে কুরঙ্গ-গমনী!

নীর। কবিবর, সাধু সাধু। কিন্তু তোমার রচনায় কোন কোন আধুনিক কবির ছায়া দেখ্‌তে পাই যেন!

অক্ষয়। তার কারণ আমিও অত্যন্ত আধুনিক! তোরা কি ভাবিস তোদের মুখুজ্জে মশায় কৃত্তিবাস ওঝার যমজ ভাই। ভূগোলের মাইল গুণে দিচ্চিস্, আর ইতিহাসের তারিখ ভুল? তাহলে আর বিদুষীশ্যালী থেকে ফল হল কি? এত বড় আধুনিকটাকে তোদের প্রাচীন বলে ভ্রম হয়?

নীর। মুখুজ্জেমশায়, শিব যখন বিবাহ সভায় গিয়েছিলেন, তখন তাঁর শ্যালীরাও ঐ রকম ভুল করেছিলেন, কিন্তু উমার চোখে ত অন্য রকম ঠেকেছিল! তোমার ভাবনা কিসের, দিদি তোমাকে আধুনিক বলেই জানেন!

অক্ষয়। মূঢ়ে, শিবের যদি শ্যালী থাক্‌ত তাহলে কি তাঁর ধ্যানভঙ্গ করবার জন্যে অনঙ্গদেবের দরকার হত; আমার সঙ্গে তাঁর তুলনা?

নৃপ। আচ্ছা মুখুজ্জেমশায়, এতক্ষণ তুমি এখানে বসে বসে কি করছিলে?

অক্ষয়। তোদের গয়লা বাড়ীর দুধের হিসেব লিখ্‌ছিলুম!

নীর। (ডেস্কের উপর হইতে অসমাপ্ত চিঠি তুলিয়া লইয়া) এই তোমার গয়লা বাড়ীর হিসেব? হিসেবের মধ্যে ক্ষীর নবনীর অংশটাই বেশী!

অক্ষয়। (ব্যস্তসমস্ত) না, না, ওটা নিয়ে গোল করিস্‌নে আহা, দিয়ে যা—

নৃপ। নীরু ভাই জ্বালাস্‌নে—চিঠিখানা ওঁকে ফিরিয়ে দে, ওখানে শ্যালীর উপদ্রব সয় না! কিন্তু মুখুজ্জেমশায় তুমি দিদিকে চিঠিতে কি বলে সম্বোধন কর বল না!

অক্ষয়। রোজ নূতন সম্বোধন করে থাকি―

নৃপ। আজ কি করেছ বল দেখি?

অক্ষয়। শুন্‌বে? তবে সখি শোন! চঞ্চলচকিতচিত্তচকোরচৌর চঞ্চুচুম্বিতচারুচন্দ্রিকরুচিরুচির চিরচন্দ্রমা।

নীরু। চমৎকার চাটু-চাতুর্য্য!

অক্ষয়। এর মধ্যে চৌর্য্যবৃত্তি নেই, চর্ব্বিত চর্ব্বণ শূন্য।

নৃপ। (সবিস্ময়ে) আচ্ছা মুখুজ্জেমশায় রোজ রোজ তুমি এই রকম লম্বা লম্বা সম্বোধন রচনা কর? তাই বুঝি দিদিকে চিঠি লিখতে এত দেরী হয়?

অক্ষয়। ঐ জন্যেই ত নৃপর কাছে আমার মিথ্যে কথা চলে না। ভগবান যে আমাকে সদ্য সদ্য বানিয়ে বলবার এমন অসাধারণ ক্ষমতা দিয়েছেন সেটা দেখছি খাটাতে দিলে না! ভগ্নীপতির কথা বেদবাক্য বলে বিশ্বাস করতে কোন্ মনুসংহিতায় লিখেছে বল্ দেখি?

নীর। রাগ কোরো না, শান্ত হও মুখুজ্জেমশায়, শান্ত হও! সেজ দিদির কথা ছেড়ে দাও, কিন্তু ভেবে দেখ, আমি তোমার আধখানা কথা সিকি পয়সাও বিশ্বাস করিনে, এতেও তুমি সান্ত্বনা পাও না?

নৃপ। আচ্ছা মুখুজ্জেমশায়, সত্যি করে বল, দিদির নামে তুমি কখনো কবিতা রচনা করেছ?

অক্ষয়। এবার তিনি যখন অত্যন্ত রাগ করেছিলেন তখন তাঁর স্তব রচনা করে গান করেছিলুম―

নৃপ। তার পরে?

অক্ষয়। তার পরে দেখলুম, তাতে উল্টো ফল হল, বাতাস পেয়ে যেমন আগুন বেড়ে ওঠে তেমনি হল―সেই অবধি স্তব রচনা ছেড়েই দিয়েছি।

নৃপ। ছেড়ে দিয়ে কেবল গয়লা বাড়ীর হিসেব লিখ্‌চ। কি স্তব লিখেছিলে মুখুজ্জেমশায় আমাদের শোনাও না।

অক্ষয়। সাহস হয় না, শেষকালে আমার উপরওয়ালার কাছে রিপোর্ট করবি!

নৃপ। না আমরা দিদিকে বলে দেব না।

অক্ষয়। তবে অবধান কর! (সিন্ধুকাফি)

মনোমন্দির সুন্দরী!
স্খলদঞ্চলাচল চঞ্চলা
অয়ি মঞ্জুলা মঞ্জরী।
রোষরুণরাগরঞ্জিতা!
গোপনহাস্য- কুটিল আস্য
কপট কলহ গঞ্জিতা!
সঙ্কোচনত-অঙ্গিনী!
চকিতচপল নবকুরঙ্গ
যৌবনবনসঙ্গিনী!
অয়ি খল, ছলগুন্ঠিতা!
লুব্ধ-পবন ক্ষুব্ধ লোভন
মল্লিকা অবলুণ্ঠিতা!
চুম্বনধনবঞ্চিনী!
রুদ্ধ-কোরক-সঞ্চিত-মধু
কঠিন কনক কঞ্জিনী!

কিন্তু আর নয়। এবারে মশায়রা বিদায় হন।

নীর। কেন এত অপমান কেন? দিদির কাছে তাড়া খেয়ে আমাদের উপরে বুঝি তার ঝাল ঝাড়তে হবে?

অক্ষয়। এরা দেখ্‌ছি পবিত্র জেনানা আর রাখ্‌তে দিলে না। আরে দুর্ব্বত্তে! এখনি লোক আস বে!

নৃপ। তার চেয়ে বলনা দিদির চিঠিখানা শেষ করতে হবে।

নীর। তা আমরা থাক্‌লেই বা, তুমি চিঠি লেখ না, আমরা কি তোমার কলমের মুখ থেকে কথা কেড়ে নেব না কি?

অক্ষয়। তোমরা কাছাকাছি থাক্‌লে মনটা এইখানেই মারা যায়, দূরে যিনি আছেন সে পর্য্যন্ত আর পৌঁছায় না! না ঠাট্টা নয়, পালাও। এখনি লোক আস্‌বে—ঐ একটী বই দরজা খোলা নেই, তখন পালাবার পথ পাবে না।

নৃপ। এই সন্ধে বেলায় কে তোমার কাছে আস্‌বে?

অক্ষয়। যাদের ধ্যান কর তারা নয় গো তারা নয়!

নীর। যার ধ্যান করা যায় সে সকল সময় আসে না, তুমি আজকাল সেটা বেশ বুঝ্‌তে পারছ কি বল মুখুজ্জেমশায়! দেবতার ধ্যান কর আর উপদেবতার উপদ্রব হয়।

“অবলাকান্ত বাবু আছেন?” বলিয়া ঘরের মধ্যে সহসা শ্রীশের প্রবেশ। “মাপ করবেন” বলিয়া পলায়নোদ্যম। নৃপ ও নীরর সবেগে প্রস্থান।

অক্ষয়। এস এস শ্রীশ বাবু!

শ্রীশ। (সলজ্জভাবে) মাপ করবেন।

অক্ষয়। রাজি আছি কিন্তু অপরাধটা কি, আগে বল!

শ্রীশ। খবর না দিয়েই―

অক্ষয়। তোমার অভ্যর্থনার জন্য ম্যুনিসিপালিটির কাছ থেকে যখন বাজেট স্যাংশন করে নিতে হয় না তখন না হয় খবর না দিয়েই এলে শ্রীশ বাবু!

শ্রীশ। আপনি যদি বলেন, এখানে আমার অসময়ে অনধিকার প্রবেশ হয় নি তা হলেই হল!

অক্ষয়। তাই বল্লেম! তুমি যখনি আসবে তখনি সুসময়, এবং যেখানে পদার্পণ করবে সেই খানেই তোমার অধিকার, শ্রীশবাবু স্বয়ং বিধাতা সর্ব্বত্র তোমাকে পাস্‌পোর্ট দিয়ে রেখেছেন। একটু বোস অবলাকান্ত বাবুকে খবর পাঠিয়ে দিই! (স্বগত) না পলায়ন করলে চিঠি শেষ করতে পারব না!

(প্রস্থান)

শ্রীশ। চক্ষের সম্মুখ দিয়ে এক জোড়া মায়া স্বর্ণমৃগী ছুটে পালাল, ওরে নিরস্ত্র ব্যাধ তোর ছোটবার ক্ষমতা নেই! নিকষের উপর সোনার রেখার মত চকিত চোকের চাহনি দৃষ্টিপথের উপরে যেন আঁকা রয়ে গেল!

রসিকের প্রবেশ।

শ্রীশ। সন্ধ্যাবেলায় এসে আপনাদের ত বিরক্ত করিনি রসিকবাবু?

রসিক। ভিক্ষু-কক্ষে বিনিক্ষিপ্তঃ কিমিক্ষু নীরসো ভবেৎ? শ্রীশ বাবু আপনাকে দেখে বিরক্ত হব আমি কি এত বড় হতভাগ্য!

শ্রীশ। অবলাকান্ত বাবু বাড়ি আছেন ত?

রসিক। আছেন বৈ কি, এলেন বলে!

শ্রীশ। না, না, যদি কাজে থাকেন তাহলে তাঁকে ব্যস্ত করে কাজ নেই—আমি কুঁড়ে লোক, বেকার মানুষের সন্ধানে ঘুরে বেড়াই।

রসিক। সংসারে সেরা লোকেরাই কুঁড়ে এবং বেকার লোকেরাই ধন্য। উভয়ে সম্মিলন হলেই মণিকাঞ্চন যোগ! এই কুঁড়ে বেকারের মিলনের জন্যেই ত সন্ধ্যে বেলাটার সৃষ্টি হয়েছে। যোগীদের জন্যে সকাল বেলা, রোগীদের জন্যে রাত্রি, কাজের লোকের জন্যে দশটা চারটে, আর সন্ধ্যে বেলাটা, সত্যি কথা বলচি, চিরকুমার সভার অধিবেশনের জন্যে চতুর্ম্মুখ সৃজন করেন নি! কি বলেন শ্রীশ বাবু?

শ্রীশ। সে কথা মানতে হবে বৈ কি, সন্ধ্যা চিরকুমার সভার অনেক পূর্ব্বেই সৃজন হয়েছে, সে আমাদের সভাপতি চন্দ্র বাবুর নিয়ম মানে না―

রসিক। সে যে চন্দ্রের নিয়ম মানে তার নিয়মই আলাদা। আপনার কাছে খুলে বলি হাসবেন না শ্রীশবাবু, আমার এক তলার ঘরে কায়ক্লেশে একটি জানালা দিয়ে অল্প একটু জ্যোত্মা আসে—শুক্ল সন্ধ্যায় সেই জ্যোৎস্নার শুভ্র রেখাটি যখন আমার বক্ষের উপর এসে পড়ে তখন মনে হয় কে আমার কাছে কি খবর পাঠালে গো! শুভ্র একটি হংসদূত কোন বিরহিনীর হয়ে এই চিরবিরহীর কানে কানে বলচে―

অলিন্দে কালিন্দীকমল সুরভৌ কুঞ্জবসতের্
বসন্তীং বাসন্তীনবপরিমলোদ্গার চিকুরাং।
ত্বদুৎসঙ্গে লীনাং মদমুকুলিতাক্ষীং পুনরিমাং
কদাহং সেবিষ্যে কিসলয় কলাপব্যজনিনী!

শ্রীশ। বেশ বেশ রসিক বাবু, চমৎকার। কিন্তু ওর মানেটা বলে দিতে হবে। ছন্দের ভিতর দিয়ে ওর রসের গন্ধটা পাওয়া যাচ্ছে কিন্তু অনুস্বার বিসর্গ দিয়ে একেবারে এঁটে বন্ধ করে রেখেছে।

রসিক। বাঙ্‌লায় একটা তর্জ্জমাও করেছি—পাছে সম্পাদকরা খবর পেয়ে হুড়াহুড়ি লাগিয়ে দেয়, তাই লুকিয়ে রেখেছি—শুন্‌বেন শ্রীশ বাবু?

কুঞ্জ কুটীরের স্নিগ্ধ অলিন্দের পর
কালিন্দীকমলগন্ধ ছুটীবে সুন্দর;
লীনা রবে মদিরাক্ষী তব অঙ্কতলে,
বহিবে বাসন্তীবাস ব্যাকুল কুন্তলে।
তাহারে করিব সেবা, কবে হবে হায়,
কিসলয় পাখা খানি দোলাইব গায়?

শ্রীশ। বা, বা, রসিক বাবু আপনার মধ্যে এত আছে তা ত জানতুম না।

রসিক। কি করে জান্‌বেন বলুন। কাব্যলক্ষ্মী যে তাঁর পদ্মবন থেকে মাঝে মাঝে এই টাকের উপরে খোলা হাওয়া খেতে আসেন এ কেউ সন্দেহ করে না। (হাত বুলাইয়া) কিন্তু এমন ফাঁকা জায়গা আর নেই!

শ্রীশ। আহাহা রসিক বাবু, যমুনাতীরে সেই স্নিগ্ধ অলিন্দওয়ালা কুঞ্জ কুটীরটি আমার ভারি মনে লেগে গেছে। যদি পায়েনিয়রে বিজ্ঞাপন দেখি সেটা দেনার দায়ে নিলেমে বিক্রী হচ্ছে তা হলে কিনে ফেলি!

রসিক। বলেন কি শ্রীশ বাবু! শুধু অলিন্দ নিয়ে করবেন কি? সেই মদমুকুলিতাক্ষীর কথাটা ভেবে দেখবেন। সে নিলেমে পাওয়া শক্ত।

শ্রীশ। কার রুমাল এখানে পড়ে রয়েছে!

রসিক। দেখি দেখি! তাইত! দুর্লভ জিনিষ আপনার হাতে ঠেকে দেখচি! বাঃ দিব্যি গন্ধ! শ্লোকের লাইনটা বদ্‌লাতে হবে মশায়, ছন্দ ভঙ্গ হয় হোক্ গে—বাসন্তীনবপরিমলোদ্গাররুমালং”! শ্রীশবাবু, এ রুমালটাতে ত আমাদের কুমারসভার পতাকা নির্ম্মাণ চল্‌বে না। দেখেছেন, কোণে একটি ছোট্ট ন অক্ষর লেখা রয়েছে?

শ্রীশ। কি নাম হতে পারে বলুন্ দেখি? নলিনী? না, বড্ড চলিত নাম। নীলাম্বুজা? ভয়ঙ্কর মোটা। নীহারিকা? বড় বাড়াবাড়ি। বলুন না রসিক বাবু, আপনার কি মনে হয়?

রসিক। নাম মনে হয় না মশায়, আমার ভাব মনে আসে, অভিধানে যত ন আছে সমস্ত মাথার মধ্যে রাশীকৃত হয়ে উঠ্‌তে চাচ্চে, নয়ের মালা গেঁথে একটি নীলোৎপলনয়নার গলায় পরিয়ে দিতে ইচ্ছে করচে―নির্ম্মলনবনীনিন্দিত নবীন―বলুন্ না শ্রীশবাবু―শেষ করে দিন না―

শ্রীশ। নবমল্লিকা।

রসিক। বেশ বেশ—নির্ম্মলনবনী নিন্দিত নবীন নবমল্লিকা! গীত গোবিন্দ মাটি হল! আরো অনেকগুলো ভাল ভাল ন মাথার মধ্যে হাহাকার করে বেড়াচ্চে, মিলিয়ে দিতে পাচ্চি নে―নিভৃত নিকুঞ্জনিলয়, নিপুণনূপুরনিক্কণ, নিবিড় নীরদনির্ম্মুক্ত-অক্ষয় দাদা থাক্‌লে ভাবতে হত না! মাষ্টার মশায়কে দেখবামাত্র ছেলেগুলো যেমন বেঞ্চে নিজ নিজ স্থানে সার বেঁধে বসে—তেমনি অক্ষয় দাদার সাড়া পাবামাত্র কথাগুলো দৌড়ে এসে জুড়ে দাঁড়ায়। শ্রীশবাবু, বুড়ো মানুষকে বঞ্চনা করে রুমালখান চুপি চুপি পকেটে পুরবেন না―

শ্রীশ। আবিষ্কার কর্ত্তার অধিকার সকলের উপর―

রসিক। আমার ঐ রুমালখানিতে একটু প্রয়োজন আছে শ্রীশ বাবু! আপনাকে ত বলেছি আমার নির্জ্জন ঘরের একটি মাত্র জালনা দিয়ে একটু মাত্র চাদের আলো আসে—আমার একটি কবিতা মনে পড়ে―

বীথীষু বীথীষু বিলাসিনীনাং
মুখানি সংবীক্ষ্য শুচিস্মিতানি,
জালেষু জালেষু করং প্রসার্য্য
লাবণ্যভিক্ষামটতীব চন্দ্রঃ।
কুঞ্জ পথে পথে চাঁদ উঁকি দেয় আসি,
দেখে বিলাসিনীদের মুখভরা হাসি।
কর প্রসারণ করি ফিরে সে জাগিয়া
বাতায়নে বাতায়নে লাবণ্য মাগিয়া।

হতভাগা ভিক্ষুক আমার বাতায়নটায় যখন আসে তখন তাকে কি দিয়ে ভোলাই বলুনত? কাব্য শাস্ত্রের রসালো জায়গা যা কিছু মনে আসে সমস্ত আউড়ে যাই, কিন্তু কথায় চিঁড়ে ভেজে না। সেই দুর্ভিক্ষের সময় ঐ রুমালখানি বড় কাজে লাগ্‌বে। ওতে অনেকটা লাবণ্যের সংস্রব আছে।

সে লাবণ্য কি দৈবাৎ কখনো দেখেছেন রসিক বাবু?

রসিক। দেখেছি বৈ কি, নইলে কি ঐ রুমালখানার জন্যে এত লড়াই করি? আর ঐ যে ন অক্ষরের কথাগুলো আমার মাথার মধ্যে এখনো এক ঝাঁক ভ্রমরের মত গুঞ্জন করে বেড়াচ্চে তাদের সাম্‌নে কি একটি কমলবনবিহারিণী মানসীমুর্ত্তি নেই?

শ্রীশ। রসিক বাবু, আপনার ঐ মগজটি একটি মৌচাক বিশেষ, ওর ফুকরে ফুকরে কবিত্বের মধু―আমাকে সুদ্ধ মাতাল করে দেবেন দেখচি! (দীর্ঘ নিঃশ্বাস পতন)

পুরুষবেশী শৈলবালার প্রবেশ।

শৈল। আমার আসতে অনেক দেরী হয়ে গেল, মাপ করবেন শ্রীশ বাবু।

শ্রীশ। আমি এই সন্ধে বেলায় উৎপাত করতে এলুম, আমাকেও মাপ করবেন অবলাকান্ত বাবু!

শৈল। রোজ সন্ধ্যা বেলায় যদি এই রকম উৎপাত করেন তাহলে মাপ করব, নইলে নয়।

শ্রীশ। আচ্ছা রাজি, কিন্তু এর পরে যখন অনুতাপ উপস্থিত হবে তখন প্রতিজ্ঞা স্মরণ করবেন।

শৈল। আমার জন্যে ভাববেন না, কিন্তু আপনার যদি অনুতাপ উপস্থিত হয় তা হলে আপনাকে নিষ্কৃতি দেব।

শ্রীশ। সেই ভরসায় যদি থাকেন তাহলে অনন্তকাল অপেক্ষা করতে হবে।

শৈল। রসিক দাদা তুমি শ্রীশ বাবুর পকেটের দিকে হাত বাড়াচ্চ কেন? বুড়ো বয়সে গাঁটকাটা ব্যবসা ধরবে না কি?

রসিক। না ভাই, সে ব্যবসা তোদের বয়সেই শোভা পায়। একখানা রুমাল নিয়ে শ্রীশবাবুতে আমাতে তকরার চল্‌ছে, তোকে তার মীমাংসা করে দিতে হবে।

শৈল। কি রকম?

রসিক। প্রেমের বাজারে বড় মহাজনী করবার মূলধন আমার নেই— আমি খুচরো মালের কারবারী―রুমালটা, চুলের দড়িটা, ছেঁড়া কাগজে দুচারটে হাতের অক্ষর এই সমস্ত কুড়িয়ে বাড়িয়েই আমাকে সন্তুষ্ট থাক্‌তে হয়। শ্রীশবাবুর যে রকম মূলধন আছে তাতে উনি বাজার সুদ্ধ পাইকেরি দরে কিনে নিতে পারেন―রুমাল কেন সমস্ত নীলাঞ্চলে অর্দ্ধেক ভাগ বসাতে পারেন; আমরা যেখানে চুলের দড়ি গলায় জড়িয়ে মরতে ইচ্ছে করি উনি যে সেখানে আগুল্‌ফবিলম্বিত চিকুররাশির সুগন্ধ ঘনান্ধকারের মধ্যে সম্পূর্ণ অস্ত যেতে পারেন। উনি উঞ্ছবৃত্তি করতে আসেন কেন?

শ্রীশ। অবলাকান্ত বাবু, আপনি ত নিরপেক্ষ ব্যক্তি, রুমালখানা এখন আপনার হাতেই থাক্‌, উভয় পক্ষের বক্ত্তৃতা শেষ হয়ে গেলে বিচারে যার প্রাপ্য হয় তাকেই দেবেন।

শৈল। (রুমালখানি পকেটে পুরিয়া) আমাকে আপনি নিরপেক্ষ লোক মনে করচেন বুঝি? এই কোণে যেমন একটি ন অক্ষর লাল সুতোয় সেলাই করা আছে আমার হৃদয়ের একটি কোণে খুঁজলে দেখতে পাবেন ঐ অক্ষরটি রক্তের বর্ণে লেখা আছে। এ রুমাল আমি আপনাদের কাউকেই দেব না।

শ্রীশ। রসিক বাবু এ কি রকম জবর্‌দস্তি? আর, ন অক্ষরটিও ত বড় ভয়ানক অক্ষর!

রসিক। শুনেছি বিলিতী শাস্ত্রে ন্যায়ধর্ম্মও অন্ধ, ভালবাসাও অন্ধ, এখন দুই অন্ধে লড়াই হোক্, যার বল বেশী তারই জিত হবে।

শৈল। শ্রীশ বাবু, যার রুমাল আপনি ত তাকে দেখেন নি, তবে কেন কেবলমাত্র কল্পনার উপর নির্ভর করে ঝগড়া করচেন।

ঐশ। দেখিনি কে বল্লে?

শৈল। দেখেছেন? কাকে দেখলেন। ন ত দুটি আছে―

শ্রীশ। দুটিই দেখেছি― তা এ রুমাল দুজনের যাঁরই হোক্, দাবী আমি পরিত্যাগ করতে পারব না।

রসিক। শ্রীশ বাবু বৃদ্ধের পরামর্শ শুনুন, হৃদয়গগনে দুই চন্দ্রের আয়োজন করবেন না, একশ্চন্দ্রস্তমোহন্তি।

ভৃত্যের প্রবেশ।

ভৃত্য। (শ্রীশের প্রতি) চন্দ্র বাবুর চিঠি নিয়ে একটি লোক আপনার বাড়ি খুঁজে শেষকালে এখানে এসেছে।

শ্রীশ। (চিঠি পড়িয়া) একটু অপেক্ষা করবেন? চন্দ্র বাবুর বাড়ি কাছেই—আমি একবার চট্ করে দেখা করে আসব।

শৈল। পালাবেন না ত?

শ্রীশ। না, আমার রুমাল বন্ধক রইল, ওখানা খালাস না করে যাচ্চিনে।

(প্রস্থান)

রসিক। ভাই শৈল, কুমারসভার সভ্যগুলিকে যে রকম ভয়ঙ্কর কুমার ঠাউরেছিলুম তার কিছুই নয়। এদের তপস্যা ভঙ্গ করতে মেনকা রম্ভা মদন বসন্ত কারো দরকার হয় না, এই বুড়ো রসিকই পারে।

শৈল। তাই ত দেখছি।

রসিক। আসল কথাটা কি জান? যিনি দার্জ্জিলেঙে থাকেন তিনি ম্যালেরিয়ার দেশে পা বাড়াবামাত্রই রোগে চেপে ধরে। এঁরা এতকাল চন্দ্র বাবুর বাসায় বড্ড নীরোগ জায়গায় ছিলেন, এই বাড়িটি যে রোগের বীজেভরা; এখানকার রুমালে, বইয়ে, চৌকিতে, টেবিলে যেখানে স্পর্শ করচেন সেইখান থেকেই একেবারে নাকে মুখে রোগ ঢুক্‌চে―আহা, শ্রীশ বাবুটি গেল।

শৈল। রসিক দাদা, তোমার বুঝি রোগের বীজ অভ্যেস হয়ে গেছে?

রসিক। আমার কথা ছেড়ে দাও! আমার পিলে যকৃত যা কিছু হবার তা হয়ে গেছে।

নীরবালার প্রবেশ।

নীরবালা। দিদি আমরা পাশের ঘরেই ছিলুম।

রসিক। জেলেরা জাল টানাটানি করে মরচে, আর চিল বসে আছে ছোঁ মারবার জন্যে?

নীর। সেজদিদির রুমালখানা নিয়ে শ্রীশ বাবু কি কাণ্ডটাই করলে? সেজ দিদি ত লজ্জায় লাল হয়ে পালিয়ে গেছে। আমি এম্‌নি বোকা, ভুলেও কিছু ফেলে যাইনি। বারোখানা রুমাল এনেছি ভাব্‌ছি এবার ঘরের মধ্যে রুমালের হরির লুঠ দিয়ে যাব!

শৈল। তোর হাতে ও কিসের খাতা নীর?

নীর। যে গানগুলো আমার পছন্দ হয় ওতে লিখে রাখি দিদি।

রসিক। ছোটদিদি, আজকাল তোর কি রকম পারমার্থিক গান পছন্দ হচ্ছে তার এক আধটা নমুনা দেখতে পারি কি?

নীর।

—দিন গেলরে, ডাক দিয়েনে পারের খেয়া,
চুকিয়ে হিসেব মিটিয়ে দে তোর দেয়া নেয়া।

রসিক। দিদি ভারি ব্যস্ত যে! পার করবার নেয়ে ডেকে দিচ্ছি, ভাই! যা দেবে যা নেবে সেটা মোকাবিলায় ঠিক করে নিয়ো।

“অবলাকান্ত বাবু আছেন?” বলিয়া বিপিন ঘরে প্রবিষ্ট ও সচকিত হইয়া স্তম্ভিতভাবে দণ্ডায়মান―নীরবালা মুহূর্ত্ত হতবুদ্ধি হইয়া দ্রুতবেগে বহিষ্ক্রান্ত।

শৈল। আসুন বিপিনবাবু।

বিপিন। ঠিক করে বলুন আস্‌ব কি? আমি আসার দরুণ আপনাদের কোন রকম লোকসান নেই?

রসিক। ঘর থেকে কিছু লোকসান না করলে লাভ হয় না বিপিনবাবু―ব্যবসার এই রকম নিয়ম। যা গেল তা আবার দুনো হয়ে ফিরে আস্‌তে পারে, কি বল অবলাকান্ত?

শৈল। রসিক দাদার রসিকতা আজকাল একটু শক্ত হয়ে আসছে।

রসিক। গুড় জমে যে রকম শক্ত হয়ে আসে। কিন্তু বিপিন বাবু কি ভাব্‌চেন বলুন দেখি?

বিপিন। ভাব্‌চি কি ছুতো করে বিদায় নিলে আমাকে বিদায় দিতে আপনাদের ভদ্রতায় বাধবে না।

শৈল। বন্ধুত্বে যদি বাধে?

বিপিন। তা হলে ছুতো খোঁজবার কোন দরকারই হয় না।

শৈল। তবে সেই খোঁজটা পরিত্যাগ করুন, ভাল হয়ে বসুন।

রসিক। মুখখানা প্রসন্ন করুন বিপিন বাবু! আমাদের প্রতি ঈর্ষা করবেন না। আমি ত বুদ্ধ, যুবকের ঈর্ষার যোগ্যই নই। আর আমাদের সুকুমারমুর্ত্তি অবলাকান্ত বাবুকে কোন স্ত্রীলোক পুরুষ বলে জ্ঞানই করে না। আপনাকে দেখে যদি কোন সুন্দরী কিশোরী ত্রস্ত হরিণীর মত পলায়ন করে থাকেন তাহলে মনকে এই বলে সান্ত্বনা দেবেন যে, তিনি আপনাকে পুরুষ বলেই মস্ত খাতিরটা করেছেন। হায়রে হতভাগ্য রসিক, তোকে দেখে কোন তরুণী লজ্জাতে পলায়নও করে না!

বিপিন। রসিকবাবু আপনাকেও যে, দলে টান্‌চেন অবলাকান্তবাবু! এ কি রকম হল?

শৈল। কি জানি বিপিনবাবু―আমার এই অবলাকান্ত নামটাই মিথ্যে—কোন অবলা ত এ পর্য্যন্ত আমাকে কান্ত বলে বরণ করে নি।

বিপিন। হতাশ হবেন না, এখনো সময় আছে।

শৈল। সে আশা এবং সে সময় যদি থাক্‌ত তাহলে চিরকুমারসভায় নাম লেখাতে যেতুম না!

বিপিন। (স্বগত) এঁর মনের মধ্যে একটা কি বেদনা রয়েছে নইলে এত অল্প বয়সে এই কাঁচামুখে এমন স্নিগ্ধ কোমল করুণভাব থাক্‌ত না। এটা কিসের খাতা? গান লেখা দেখচি। নীরবালা দেবী! (পাঠ)

শৈল। কি পড়চেন বিপিনবাবু?

বিপিন। কোন একটি অপরিচিতার কাছে অপরাধ করচি, হয় ত তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবার সুযোগ পাব না এবং হয়ত তাঁর কাছে শাস্তি পাবারও সৌভাগ্য হবে না কিন্তু এই গানগুলি মাণিক এবং হাতের অক্ষরগুলি মুক্তো! যদি লোভে পড়ে চুরি করি তবে দণ্ডদাতা বিধাতা ক্ষমা করবেন!

শৈল। বিধাতা মাপ করতে পারেন কিন্তু আমি করব না। ও খাতাটির পরে আমার লোভ আছে বিপিনবাবু।

রসিক। আর আমি বুঝি লোভ মোহ সমস্ত জয় করে বসে আছি? আহা, হাতের অক্ষরের মত জিনিষ আর আছে? মনের ভাব মূর্ত্তি ধরে আঙুলের আগা দিয়ে বেরিয়ে আসে―অক্ষরগুলির উপর চোখ বুলিয়ে গেলে, হৃদয়টি যেন চোখে এসে লাগে। অবলাকান্ত, এ খাতাখানি ছেড়োনা ভাই! তোমাদের চঞ্চলা নীরবালা দেবী কৌতুকের ঝরনার মত দিনরাত ঝরে পড়ছে, তাকে ত ধরে রাখ্‌তে পার না, এই খাতাখানির পত্রপুটে তারি একটি গণ্ডুষ ভরে উঠেছে―এ জিনিষের দাম আছে! বিপিনবাবু, আপনি ত নীরবালাকে জানেন না, আপনি এ খাতাখানা নিয়ে কি করবেন?

বিপিন। আপনারা ত বয়ং তাঁকেই জানেন―খাতাখানিতে আপনাদের প্রয়োজন কি? এই খাত থেকে আমি যেটুকু পরিচয় প্রত্যাশা করি তার প্রতি আপনারা দৃষ্টি দেন কেন?

শ্রীশের প্রবেশ।

শ্রীশ। মনে পড়েছে মশায়—সে দিন এখানে একটা বইয়েতে নাম দেখেছিলেম, নৃপবালা, নীরবালা—একি, বিপিন যে! তুমি এখানে হঠাৎ?

বিপিন। তোমার সম্বন্ধেও ঠিক ঐ প্রশ্নটা প্রয়োগ করা যেতে পারে।

শ্রীশ। আমি এসেছিলুম আমার সেই সন্যাস সম্প্রদায়ের কথাটা অবলাকান্তবাবুর সঙ্গে আলোচনা করতে। ওঁর যে রকম চেহারা, কণ্ঠস্বর, মুখের ভাব, উনি ঠিক আমার সন্ন্যাসীর আদর্শ হতে পারেন। উনি যদি ওঁর ঐ চন্দ্রকলার মত কপালটিতে চন্দন দিয়ে, গলায় মালা পরে, হাতে একটি বীণা নিয়ে সকাল বেলায় একটি পল্লীর মধ্যে প্রবেশ করেন তা হলে কোন্ গৃহস্থের হৃদয় না গলাতে পারেন?

রসিক। বুঝতে পারচিনে মশায়, হৃদয় গলাবার কি খুব জরুর দরকার হয়েছে?

শ্রীশ। চিরকুমারসভা হৃদয় গলাবার সভা।

রসিক। বলেন কি? তবে আমার দ্বারা কি কাজ পাবেন?

শ্রীশ। আপনার মধ্যে যে রকম উত্তাপ আছে আপনি উত্তর মেরুতে গেলে সেখানকার বরফ গলিয়ে বন্যা করে দিয়ে আস্‌তে পারেন। বিপিন উঠ্‌চ না কি?

বিপিন। যাই, আমাকে রাত্রে একটু পড়তে হবে।

রসিক। (জনান্তিকে) অবলাকান্ত জিজ্ঞাসা করচেন পড়া হয়ে গেলে বইখানা কি ফেরৎ পাওয়া যাবে?

বিপিন। (জনান্তিকে) পড়া হয়ে গেলে সে আলোচনা পরে হবে, আজ থাক্‌।

শৈল। (মৃদুস্বরে) শ্রীশ বাবু ইতস্ততঃ করচেন কেন, আপনার কিছু হারিয়েছে না কি?

শ্রীশ। (মৃদুস্বরে) আজ থাক, আর এক দিন খুঁজে দেখব।

উভয়ের প্রস্থান।

নীরবালা। (দ্রুত প্রবেশ করিয়া) এ কি রকমের ডাকাতী দিদি। আমার গানের খাতাখানা নিয়ে গেল? আমার ভয়ানক রাগ হচ্চে।

রসিক। রাগ শব্দে নানা অর্থ অভিধানে কয়।

নীর। আচ্ছা পণ্ডিত মশায়, তোমার অভিধান জাহির করতে হবে না—আমার খাতা ফিরিয়ে আন।

রসিক। পুলিশে খবর দে ভাই, চোর ধরা আমার ব্যবসা নয়।

নীর। কেন দিদি তুমি আমার খাতা নিয়ে যেতে দিলে?

শৈল। এমন অমূল্য ধন তুই ফেলে রেখে যাস্ কেন?

নীর। আমি বুঝি ইচ্ছে করে ফেলে রেখে গেছি?

রসিক। লোকে সেই রকম সন্দেহ করছে!

নীর। না রসিকদাদা, তোমার ও ঠাট্টা আমার ভাল লাগে না!

রসিক। তা হলে ভয়ানক খারাপ অবস্থা!

(সক্রোধে প্রস্থান)

সলজ্জ নৃপবালার প্রবেশ।

রসিক। কি নৃপ, হারাধন খুঁজে বেড়াচ্ছিস্?

নৃপ। না আমার কিছু হারায় নি!

রসিক। সে ত অতি সুখের সংবাদ। শৈলদিদি, তা হলে আর কেন, রুমালখানার মালিক যখন পাওয়া যাচ্ছে না, তখন যে লোক কুড়িয়ে পেয়েছে তাকেই ফিরিয়ে দিস্। (শৈলের হাত হইতে রুমাল লইয়া) এ জিনিসটা কার ভাই?

নৃপ। ও আমার নয়! (পলায়নোদ্যত)।

রসিক। (নৃপকে ধরিয়া) যে জিনিসটা খোওয়া গেছে নৃপ তার উপরে কোন দাবীও রাখ্‌তে চায় না।

নৃপ। রসিকদাদা, ছাড় আমার কাজ আছে!

(১০)

পথে বাহির হইয়াই শ্রীশ কহিল-ওহে বিপিন, আজ মাঘের শেষে প্রথম বসন্তের বাতাস দিয়েছে, জ্যোৎস্নাও দিব্যি, আজ যদি এখনি ঘুমতে কিম্বা পড়া মুখস্থ করতে যাওয়া যায় তাহলে দেবতারা ধিক্কার দেবেন।

বিপিন। তাঁদের ধিক্কার খুব সহজে সহ্য হয় কিন্তু ব্যামোর ধাক্কা কিম্বা―

শ্রীশ। দেখ, ঐ জন্যে তোমার সঙ্গে আমার ঝগড়া হয়। আমি বেশ জানি দক্ষিণে হাওয়ায় তোমারও প্রাণটা চঞ্চল হয়, কিন্তু পাছে কেউ তোমাকে কবিত্বের অপবাদ দেয় বলে মলয় সমীরণটাকে একেবারেই আমল দিতে চাও না। এতে তোমার বাহাদুরীটা কি জিজ্ঞাসা করি? আমি তোমার কাছে আজ মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করছি, আমার ফুল ভাল লাগে, জ্যোৎস্না ভাল লাগে, দক্ষিণে হাওয়া ভাল লাগে―

বিপিন। এবং―

শ্রীশ। এবং যাহা কিছু ভাল লাগ্‌বার মত জিনিষ সবই ভাল লাগে।

বিপিন। বিধাতা ত তোমাকে ভারি আশ্চর্য্য রকম ছাঁচে গড়েছেন দেখচি।

শ্রীশ। তোমার ছাঁচ আরও আশ্চর্য্য। তোমার লাগে ভাল কিন্তু বল অন্য রকম—আমার সেই শোবার ঘরের ঘড়িটার মত—সে চলে ঠিক কিন্তু বাজে ভুল।

বিপিন। কিন্তু শ্রীশ, তোমার যদি সব মনোরম জিনিষই মনোহর লাগতে লাগ্‌ল তাহলে ত আসন্ন বিপদ।

শ্রীশ। আমি ত কিছুই বিপদ বোধ করিনে।

বিপিন। সেই লক্ষণটাই ত সব চেয়ে খারাপ। রোগের যখন বেদনা বোধ চলে যায় তখন আর চিকিৎসার রাস্তা থাকে না। আমি ভাই স্পষ্টই কবুল করচি, স্ত্রীজাতির একটা আকর্ষণ আছে―চিরকুমার সভা যদি সেই আকর্ষণ এড়াতে চান তাহলে তাঁকে খুব তফাৎ দিয়ে যেতে হবে।

শ্রীশ। ভুল, ভুল, ভয়ানক ভুল! তুমি তফাতে থাক্‌লে কি হবে, তাঁরা ত তফাতে থাকেন না। সংসার রক্ষার জন্যে বিধাতাকে এত নারী সৃষ্টি করতে হয়েছে যে, তাঁদের এড়িয়ে চলা অসম্ভব। অতএব কৌমার্য্য যদি রক্ষা করতে চাও তাহলে নারীজাতিকে অল্পে অল্পে সইয়ে নিতে হবে। ঐযে স্ত্রীসভ্য নেবার নিয়ম হয়েছে এতদিন পরে কুমারসভা চিরস্থায়ী হবার উপায় অবলম্বন করেছে। কিন্তু কেবল একটিমাত্র মহিলা হলে চলবে না বিপিন, অনেকগুলি স্ত্রীসভ্য চাই। বদ্ধ ঘরের একটি জানলা খুলে ঠাণ্ডা লাগালে সর্দ্দি ধরে, খোলা হাওয়ায় থাক্‌লে সে বিপদ নেই।

বিপিন। আমি তোমার ঐ খোলা হাওয়া বদ্ধ হাওয়া বুঝিনে ভাই! যার সর্দ্দির ধাত তাকে সর্দ্দি থেকে রক্ষা কর্‌তে দেবতা মনুষ্য কেউ পারে না।

শ্রীশ। তোমার ধাত কি বল্‌চে হে?

বিপিন। সে কথা খোলসা করে বল্লেই বুঝতে পারবে তোমার ধাতের সঙ্গে তার চমৎকার মিল আছে। নাড়ীটা যে সব সময়ে ঠিক চিরকুমারের নাড়ীর মত চলে তা জাঁক করে বল্‌তে পারব না।

শ্রীশ। ঐটে তোমার আর একটা, ভুল! চিরকুমারের নাড়ীর উপরে উনপঞ্চাশ পবনের নৃত্য হতে দাও—কোন ভয় নেই—বাঁধাবাঁধি চাপাচাপি কোরো না। আমাদের মত ব্রত যাদের, তারা কি হৃদয়টিকে তুলো দিয়ে মুড়ে রাখতে পারে? তাকে অশ্বমেধ যজ্ঞের ঘোড়ার মত ছেড়ে দাও, যে তাকে বাঁধবে তার সঙ্গে লড়াই কর!

বিপিন। ও কেহে! পূর্ণ দেখ্‌চি। ও বেচারার এ গলি থেকে আর বেরবার জো নেই! ঐ বীরপুরুষের অশ্বমেধের ঘোড়াটি বেজায় খোঁড়াচ্চে। ওকে একবার ডাক দেব?

শ্রীশ। ডাক। ও কিন্তু আমাদেরই দুজনকে অন্বেষণ করে গলিতে গলিতে ঘুরচে বলে বোধ হচ্ছে না।

বিপিন। পূর্ণবাবু, খবর কি?

পূর্ণ। অত্যন্ত পুরোনো। কাল পর্শু যে খবর চল্‌ছিল আজও তাই চল্‌চে।

শ্রীশ। কাল পর্শু শীতের হাওয়া বচ্ছিল, আজ বসন্তের হাওয়া দিয়েছে―এতে দুটো একটা নতুন খবরের আশা করা যেতে পারে।

পূর্ণ। দক্ষিণের হাওয়ায় যে সব খবরের সৃষ্টি হয়, কুমার সভার খবরের কাগজে তার স্থান নেই। তপোবনে এক দিন অকাল বসন্তের হাওয়া দিয়েছিল তাই নিয়ে কালিদাসের কুমার সম্ভব কাব্য রচনা হয়েছে—আমাদের কপালগুণে বসন্তের হাওয়ায় কুমার-অসম্ভব কাব্য হয়ে দাঁড়ায়।

বিপিন। হয় ত হোক্ না পূর্ণ বাবু—সে কাব্যে যে দেবতা দগ্ধ হয়েছিলেন এ কাব্যে তাঁকে পুনর্জীবন দেওয়া যাক্।

পূর্ণ। এ কাব্যে চিরকুমার সভা দগ্ধ হোক্! যে দেবতা জ্বলেছিলেন তিনি জ্বালান্! না, আমি ঠাট্টা করচিনে শ্রীশ বাবু আমাদের চিরকুমার সভাটি একটি আস্ত জতুগৃহ বিশেষ। আগুণ লাগ্‌লে রক্ষে নেই। তার চেয়ে বিবাহিত সভা স্থাপন কর স্ত্রীজাতি সম্বন্ধে নিরাপদ থাক্‌বে। যে ইঁট পাঁজায় পুড়েছে তা’ দিয়ে ঘর তৈরি করলে আর পোড়বার ভয় থাকে না হে!

শ্রীশ। যে সে লোক বিবাহ করে করে বিবাহ জিনিষটা মাটি হয়ে গেছে পূর্ণ বাবু। সেই জন্যেইত কুমার সভা। আমার যত দিন প্রাণ আছে ততদিন এ সভায় প্রজাপতির প্রবেশ নিষেধ।

বিপিন। পঞ্চশর?

শ্রীশ। আসুন্ তিনি। একবার তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয়ে গেলে, বাস্, আর ভয় নেই।

পূর্ণ। দেখো শ্রীশবাবু।

শ্রীশ। দেখব আর কি। তাঁকে খুঁজে বেড়াচ্ছি! এক চোট দীর্ঘ নিশ্বাস ফেল্‌ব, কবিতা আওড়াব, কনকবলয়ভ্রংশরিক্তপ্রকোষ্ঠ হয়ে যাব, তবে রীতিমত সন্ন্যাসী হতে পারব। আমাদের কবি লিখেছেন―

নিশি না পোহাতে জীবন প্রদীপ
জ্বালাইয়া যাও প্রিয়া
তোমার অনল দিয়া!
কবে যাবে তুমি সমুখের পথে
দীপ্ত শিখাটি বাহি
আছি তাই পথ চাহি!
পুড়িবে বলিয়া রয়েছে আশায়
আমার নীরব হিয়া
আপন আঁধার নিয়া!
নিশি না পোহাতে জীবন প্রদীপ
জ্বালাইয়া যাও প্রিয়া!

পূর্ণ। ওহে শ্রীশ বাবু, তোমার কবিটি ত মন্দ লেখেনি!―

নিশি না পোহাতে জীবন প্রদীপ
জ্বালাইয়া যাও প্রিয়া!

ঘরটি সাজান রয়েছে- থালায় মালা, পালঙ্কে পুষ্পশয্যা, কেবল জীবন প্রদীপটি জ্বলচে না, সন্ধ্যা ক্রমে রাত্রি হতে চল্‌ল। বাঃ দিব্যি লিখেছে! কোন্ বইটাতে আছে বল দেখি?

শ্রীশ। বইটার নাম আবাহন।

পূর্ণ। নামটাও বেছে বেছে দিয়েছে ভাল! (আপন মনে)―

নিশি না পোহাতে জীবন প্রদীপ
জ্বালাইয়া যাও প্রিয়া

(দীর্ঘনিশ্বাস)

তোমরা কি বাড়ির দিকে চলেচ?

শ্রীশ। বাড়ি কোন্ দিকে ভুলে গেছি ভাই!

পূর্ণ। আজ পথ ভোলবার মতই রাতটা হয়েছে বটে! কি বল বিপিন বাবু!

শ্রীশ। বিপিন বাবু এ সকল বিষয়ে কোন কথাই কন না, পাছে ওঁর ভিতরকার কবিত্ব ধরা পড়ে। কৃপণ যে জিনিষটার বেশি আদর করে সেইটেকেই মাটির নীচে পুঁতে রাখে।

বিপিন। অস্থানে বাজে খরচ করতে চাইনে ভাই, স্থান খুঁজে বেড়াচ্চি। মরতে হলে একেবারে গঙ্গার ঘাটে গিয়া মরাই ভাল!

পূর্ণ। এ ত উত্তম কথা, শাস্ত্রসঙ্গত কথা! বিপিনবাবু একেবারে অন্তিমকালের জন্যে কবিত্ব সঞ্চয় করে রাখ্‌চেন, যখন অন্যে বাক্য কবেন কিন্তু উনি রবেন নিরুত্তর! আশীর্ব্বাদ করি আগের সেই বাক্যগুলি যেন মধুমাখা হয়―

শ্রীশ। এবং তার সঙ্গে যেন কিঞ্চিৎ ঝালের সম্পর্কও থাকে―

বিপিন। এবং বাক্যবর্ষণ করেই যেন মুখের সমস্ত কর্ত্তব্য নিঃশেষ না হয়,―

পূর্ণ। বাক্যের বিরামস্থলগুলি যেন বাক্যের চেয়ে মধুমত্তর হয়ে ওঠে!

শ্রীশ। সে দিন নিদ্রা যেন না আসে―

পূর্ণ। রাত্রি যেন না যায়―

বিপিন। চন্দ্র যেন পূর্ণচন্দ্র হয়—

পূর্ণ। বিপিন যেন বসন্তের ফুলে প্রফুল্ল হয়ে উঠে―

শ্রীশ। এবং হতভাগ্য শ্রীশ যেন কুঞ্জদ্বারের কাছে এসে উঁকি ঝুঁকি না মারে।

পূর্ণ। দুর হোক্ গে শ্রীশ বাবু, তোমার সেই আবাহন থেকে আর একটা কিছু কবিতা আওড়াও। চমৎকার লিখেছে হে।

নিশি না পোহাতে জীবন প্রদীপ
জ্বালাইয়া যাও প্রিয়া!

আহা! একটি জীবন প্রদীপের শিখাটুকু আরেকটি জীবন প্রদীপের মুখের কাছে কেবল একটু ঠেকিয়ে গেলেই হয়, বাস্, আর কিছুই নয়— দুটি কোমল অঙ্গুলি দিয়ে প্রদীপখানি একটু হেলিয়ে একটু ছুঁইয়ে যাওয়া তার পরেই চকিতের মধ্যে সমস্ত আলোকিত! (আপন মনে) নিশি না পোহাতে (ইত্যাদি)।

শ্রীশ। পূর্ণ বাবু, যাও কোথায়?

পূর্ণ। চন্দ্রবাবুর বাসায় একখানা বই ফেলে এসেছি সেইটে খুঁজ্‌তে যাচ্চি।

বিপিন। খুঁজ্‌লে পাবে ত? চন্দ্রবাবুর বাসা বড় এলোমেলো জায়গা―সেখানে যা হারায় সে আর পাওয়া যায় না।

(পূর্ণের প্রস্থান)

শ্রীশ। (দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলিয়া) পূর্ণ বেশ আছে ভাই বিপিন!

বিপিন। ভিতরকার বাষ্পের চাপে ওর মাথাটা সোডাওয়াটারের ছিপির মত একেবারে টপ্‌করে উড়ে না যায়।

শ্রীশ। যায় ত যাক্ না! কোনমতে লোহার তার এঁটে মাথাটাকে ঠিক জায়গায় ধরে রাখাই কি জীবনের চরম পুরুষার্থ? মাঝে মাঝে মাথার বেঠিক না হলে রাতদিন মুটের বোঝার মত মাথাটাকে বয়ে বেড়াচ্চি কেন? দাও ভাই তার কেটে, একবার উড়ুক!―সেদিন তোমাকে শোনাচ্ছিলুম―

ওরে সাবধানী পথিক, বারেক
পথ ভুলে মর্ ফিরে!
খোলা-আঁখি দুটো অন্ধ করে’দে
আকুল আঁখির নীরে!
সে ভোলা-পথের প্রান্তে রয়েছে
হারান’-হিয়ার কুঞ্জ;
ঝরে’ পড়ে’ আছে কাঁটাতরুতলে
রক্ত কুসুম পুঞ্জ;
সেথা দুই বেলা ভাঙা-গড়া খেলা
অকূল সিন্ধুতীরে!
ওরে সাবধানী পথিক, বারেক
পথ ভুলে’ মর ফিরে!

বিপিন। আজ কাল তুমি খুব কবিতা পড়তে আরম্ভ করেছ, শীঘ্রই একটা মুষ্কিলে পড়বে দেখচি!

শ্রীশ। যে লোক ইচ্ছে করে মুষ্কিলের রাস্তা খুঁজে বেড়াচ্চে তার জন্যে কেউ ভেবোনা। মুষ্কিলকে এড়িয়ে চল্‌তে গিয়ে হঠাৎ মুষ্কিলের মধ্যে পা ফেলেই বিপদ। আসুন্, আসুন্ রসিকবাবু রাত্রে পথে বেরিয়েছেন যে?

(রসিকের প্রবেশ)।

রসিক। আমার রাতই বা কি, আর দিনই বা কি!

বরমসৌ দিবসো ন পুনর্নিশা,
ননু নিশৈব বরং ন পুনর্দিনম্।
উভয় মেত দুপৈত্বথবা ক্ষয়ং
প্রিয়জনেন ন যত্র সমাগমঃ!

শ্রীশ। অস্যার্থঃ?

রসিক। অস্যার্থ হচ্ছে—

আসে ত আসুক্ রাতি, আসুক্ বা দিবা,
যায় যদি যাক্ নিরবধি!
তাহাদের যাতায়াতে আসে যায় কিবা
প্রিয় মোর নাহি আসে যদি!

অনেক গুলো দিন রাত এ পর্য্যন্ত এসেছে এবং গেছে কিন্তু তিনি আজ পর্য্যন্ত এসে পৌঁছলেন না—তাই, দিনই বলুন্ আর রাতই বলুন ও দুটোর পরে আমার আর কিছুমাত্র শ্রদ্ধা নেই!

শ্রীশ। আচ্ছা রসিক বাবু, প্রিয়জন এখনি যদি হঠাৎ এসে পড়েন?

রসিক। তাহলে আমার দিকে তাকাবেন না, তোমাদের দুজনের মধ্যে একজনের ভাগেই পড়বেন।

শ্রীশ। তা’হলে তদ্দণ্ডেই তিনি অরসিক বলে প্রমাণ হয়ে যাবেন।

রসিক। এবং পরদণ্ডেই পরমানন্দে কালযাপন করতে থাক্‌বেন। তা আমি ঈর্ষ্যা করতে চাইনে শ্রীশবাবু! আমার ভাগ্যে যিনি আস্‌তে বহ বিলম্ব করলেন, আমি তাঁকে তোমাদের উদ্দেশেই উৎসর্গ করলুম। দেবি, তোমার বরমাল্য গেঁথে আন! আজ বসন্তের শুক্ল রজনী, আজ অভিসারে এস!—

মন্দং নিধেহি চরণৌ, পরিধেহি নীলং
বাসঃ, পিধেহি বলয়াবলিমঞ্চলেন!
মা জল্প সাহসিনি, শারদচন্দ্রকান্ত
দস্তাংশবস্তব তমাংসি সমাপয়ন্তি।
ধীরে ধীরে চল তন্বি, পর নীলাম্বর,
অঞ্চলে বাঁধিয়া রাখ কঙ্কণ মুখর;
কথাটি কোয়ো না, তব দন্ত অংশুরুচি
পথের তিমির রাশি পাছে ফেলে মুছি!

শ্রীশ। রসিকবাবু আপনার ঝুলি যে একেবারে ভরা। এমন কত তর্জ্জমা করে রেখেছেন?

রসিক। বিস্তর। লক্ষ্মীত এলেন না, কেবল বাণীকে নিয়েই দিন যাপন করছি।

শ্রীশ। ওহে বিপিন, অভিসার ব্যাপারটা কল্পনা করতে বেশ লাগে।

বিপিন। ওটা পুনর্ব্বার চালাবার জন্যে চিরকুমার সভায় একটা প্রস্তাব এনে দেখ না!

শ্রীশ। কতকগুলো জিনিষ আছে যার আইডিয়াটা এত সুন্দর যে, সংসারে সেটা চালাতে সাহস হয় না। যে রাস্তায় অভিসার হতে পারে, যেখানে কামিনীদের হার থেকে মুক্তো ছিঁড়ে ছড়িয়ে পড়ে সে রাস্তা কি তোমার পটলডাঙ্গা ষ্ট্রীট? সে রাস্তা জগতে কোথাও নেই। বিরহিনীর হৃদয় নীলাম্বরী পরে’ মনোরাজ্যের পথে ঐ রকম করে বেরিয়ে থাকে— বক্ষের উপর থেকে মুক্তো ছিঁড়ে পড়ে চেয়েও দেখে না—সত্যিকার মুক্তো হলে কুড়িয়ে নিত! কি বলেন রসিকবাবু।

রসিক। সে কথা মান্‌তেই হয়—অভিসারটা মনে মনেই ভাল, গাড়ি-ঘোড়ার রাস্তায় অত্যন্ত বেমানান্। আশীর্ব্বাদ করি শ্রীশবাবু, এই রকম বসন্তের জ্যোৎস্নারাত্রে কোন একটি জাল্‌না থেকে কোন এক রমণীর ব্যাকুল হৃদয় তোমার বাসার দিকে যেন অভিসারে যাত্রা করে।

শ্রীশ। তা করবে রসিকবাবু আপনার আশীর্ব্বাদ ফলবে। আজকের হাওয়াতে সেই খবরটা আমি মনে মনে পাচ্চি। বিশে ডাকাত যেমন খবর দিয়ে ডাকাতী করত, আমার অজানা অভিসারিকা তেম্‌নি পূর্ব্বে হতেই আমাকে অভিসারের খবর পাঠিয়েছে।

বিপিন। তোমার সেই ছাতের বারান্দাটা সাজিয়ে প্রস্তুত হয়ে থেকো।

শ্রীশ। তা আমার সেই দক্ষিণের বারান্দায় একটি চৌকিতে আমি বসি, আর একটি চৌকি সাজান থাকে।

বিপিন। সেটাতে আমি এসে বসি।

শ্রীশ। মধ্বভাবে গুড়ং দদ্যাৎ, অভাবপক্ষে তোমাকে নিয়ে চলে।

বিপিন। মধুময়ী যখন আস্‌বেন তখন হতভাগার ভাগ্যে লগুড়ং দদ্যাৎ।

রসিক। (জনান্তিকে) শ্রীশবাবু, আপনার সেই দক্ষিণের ছাতটিকে চিহ্ণিত করে রাখবার জন্যে যে পতাকা ওড়ান আবশ্যক সেটা যে ফেলে এলেন!

শ্রীশ। রুমালটা কি এখন চেষ্টা করলে পাওয়া যেতে পারবে?

রসিক। চেষ্টা করতে দোষ কি?

শ্রীশ। বিপিন, তুমি ভাই রসিকবাবুর সঙ্গে একটু কথাবার্ত্তা কও, আমি চট্ করে আচি।

(প্রস্থান)।

বিপিন। আচ্ছা রসিক বাবু রাগ করবেন না,―

রসিক। যদি বা করি আপনার ভয় করবার কোন কারণ নেই―আমি ভারি দুর্ব্বল।

বিপিন। দুই একটা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করব আপনি বিরক্ত হবেন না।

রসিক। আমার বয়স সম্বন্ধে কোন প্রশ্ন নয় ত?

বিপিন। না।

রসিক। তবে জিজ্ঞাসা করুন ঠিক উত্তর পাবেন।

বিপিন। সে দিন যে মহিলাটিকে দেখলাম, তিনি―

রসিক। তিনি আলোচনার যোগ্য, আপনি সঙ্কোচ করবেন না বিপিনবাবু―তাঁর সম্বন্ধে আপনি যদি মাঝে মাঝে চিন্তা ও চর্চ্চা করে থাকেন তবে তাতে আপনার অসাধারণত্ব প্রমাণ হয় না—আমরাও ঠিক ঐ কাজ করে থাকি।

বিপিন। অবলাকান্তবাবু বুঝি―

রসিক। তাঁর কথা বল্‌বেন না—তাঁর মুখে অন্য কথা নেই।

বিপিন। তিনি কি―

রসিক। হাঁ তাই বটে! তবে হয়েছে কি, তিনি নৃপবালা নীরবালা দুজনের কাকে যে বেশি ভালবাসেন স্থির করে উঠতে পারেন না― তিনি দুজনের মধ্যে সর্ব্বদাই দোলায়মান।

বিপিন। কিন্তু তাঁদের কেউ কি ওঁর প্রতি―

রসিক। না, এমন ভাব নয় যে, ওঁকে বিবাহ করতে পারেন। সে হলে ত কোন গোলই ছিল না!

বিপিন। তাই বুঝি অবলাকান্তবাবু কিছু―

রসিক। কিছু যেন চিন্তান্বিত।

বিপিন। শ্রীমতী নীরবালা বুঝি গান ভালবাসেন?

রসিক। বাসেন বটে,—আপনার পকেটের মধ্যেই তার সাক্ষী আছে।

বিপিন। (পকেট হইতে গানের খাতা বাহির করিয়া) এখানা নিয়ে আসা আমার অত্যন্ত অভদ্রতা হয়েছে― রসিক। সে অভদ্রতা আপনি না করলে আমরা কেউ না কেউ কর্ত্তেম।

বিপিন। আপনারা করলে তিনি মার্জ্জনা করতেন, কিন্তু আমি― বাস্তবিক অন্যায় হয়েছে, কিন্তু এখন ফিরিয়ে দিলেও ত—

রসিক। মূল অন্যায়টা অন্যায়ই থেকে যায়।

বিপিন। অতএব―

রসিক। যাঁহাতক বাহান্ন তাঁহাতক তিপ্পান্ন। হরণে যে দোষটুকু হয়েছে রক্ষণে না হয় তাতে আরেকটু যোগ হল।

বিপিন। খাতাটা সম্বন্ধে তিনি কি আপনাদের কাছে কিছু বলেছেন?

রসিক। বলেছেন অল্পই, কিন্তু না বলেছেন অনেকটা।

বিপিন। কি রকম?

রসিক। লজ্জায় অনেকখানি লাল হয়ে উঠলেন।

বিপিন। ছি ছি, সে লজ্জা আমারি।

রসিক। আপনার লজ্জা তিনি ভাগ করে নিলেন, যেমন অরুণের লজ্জায় উষা রক্তিম।

বিপিন। আমাকে আর পাগল করবেন না রসিক বাবু!

রসিক। দলে টান্‌চি মশায়!

বিপিন। (খাতা পুনর্ব্বার পকেটে পূরিয়া) ইংরিজিতে বলে দোষ করা মানবের ধর্ম্ম, ক্ষমা করা দেবতার।

রসিক। আপনি তা হলে মানব ধর্ম্ম পালনটাই সাব্যস্ত করলেন!

বিপিন। দেবীর ধর্ম্মে যা বলে তিনি তাই করবেন!

শ্রীশের প্রবেশ।

শ্রীশ। অবলাকান্ত বাবুর সঙ্গে দেখা হল না।

বিপিন। তুমি রাতারাতিই তাঁকে সন্ন্যাসী করতে চাও না কি?

শ্রীশ। যা হোক্ অক্ষয়বাবুর কাছে বিদায় নিয়ে এলুম।

বিপিন। বটে বটে, তাঁকে বলে আস্‌তে ভুলে গিয়েছিলেম—একবার তাঁর সঙ্গে দেখা করে আসিগে।

রসিক। (জনান্তিকে) পুনর্ব্বার কিছু সংগ্রহের চেষ্টায় আছেন বুঝি? মানব ধর্ম্মটা ক্রমেই আপনাকে চেপে ধরচে!

বিপিনের প্রস্থান।

শ্রীশ। রসিক বাবু, আপনার কাছে আমার একটা পরামর্শ আছে॥

রসিক। পরামর্শ দেবার উপযুক্ত বয়স হয়েছে, বুদ্ধি না হতেও পারে।

শ্রীশ। আপনাদের ওখানে সে দিন যে দুটি মহিলাকে দেখেছিলেম, তাঁদের দুজনকেই আমার সুন্দরী বলে বোধ হল।

রসিক। আপনার বোধশক্তির দোষ দেওয়া যায় না। সকলেই ত ঐ এক কথাই বলে।

শ্রীশ। তাঁদের সম্বন্ধে যদি মাঝে মাঝে আপনার সঙ্গে আলাপ আলোচনা করি তাহলে কি―

রসিক। তাহলে আমি খুসি হব, আপনারও সেটা ভাল লাগ্‌তে পারে এবং তাঁদেরও বিশেষ ক্ষতি হবে না।

শ্রীশ। কিছুমাত্র না। ঝিল্লি যদি নক্ষত্র সম্বন্ধে জল্পনা করে—

রসিক। তাতে নক্ষত্রের নিদ্রার ব্যাঘাত হয় না।

শ্রীশ। ঝিল্লিরই অনিদ্রা রোগ জন্মাতে পারে, কিন্তু তাতে আমার আপত্তি নেই।

রসিক। আজ ত তাই বোধ হচ্চে।

শ্রীশ। যাঁর রুমাল কুড়িয়ে পেয়েছিলুম তাঁর নামটি বল্‌তে হবে।

রসিক। তাঁর নাম নৃপবালা।

শ্রীশ। তিনি কোন্‌টি?

রসিক। আপনিই আন্দাজ করে বলুন দেখি।

শ্রীশ। যাঁর সেই লালরঙের রেশমের সাড়ি পরা ছিল?

রসিক। বলে যান।

শ্রীশ। যিনি লজ্জায় পালাতে চাচ্ছিলেন অথচ পালাতেও লজ্জা বোধ করছিলেন—তাই মুহূর্ত্তকালের মত হঠাৎ ত্রস্ত হরিণীর মত থম্‌কে দাঁড়িয়েছিলেন, সাম্‌নের দুই এক গুচ্ছ চুল প্রায় চোখের উপরে এসে পড়েছিল―চাবির-গোচ্ছা-বাঁধা চ্যুত অঞ্চলটি বাঁ হাতে তুলে ধরে যখন দ্রুতবেগে চলে গেলেন তখন তাঁর পিঠভরা কালোচুল আমার দৃষ্টিপথের উপর দিয়ে একটি কালো জ্যোতিষ্কের মত ছুটে নৃত্য করে চলে গেল।

রসিক। এ ত নৃপবালাই বটে! পা দুখানি লজ্জিত, হাতখানি কুন্ঠিত, চোখ দুটি ত্রস্ত, চুলগুলি কুঞ্চিত,―দুঃখের বিষয় হৃদয়টি দেখ্‌তে পান নি—সে যেন ফুলের ভিতরকার লুকোনো মধুটুকুর মত মধুর, শিশিরটুকুর মত করুণ।

শ্রীশ। রসিকবাবু, আপনার মধ্যে এত যে কবিত্বরস সঞ্চিত হয়ে রয়েছে তার উৎস কোথায় এবার টের পেয়েছি।

রসিক। ধরা পড়েছি শ্রীশবাবু―

কবীন্দ্রাণাং চেতঃ কমলবনমালাতপরুচিং
ভজন্তে যে সন্তঃ কতিচিদরুণামেব ভবতীং
বিরিঞ্চিপ্রেয়স্যাস্তরুণতর শৃঙ্গারলহরীং
গভীরাভির্বাগ্‌ভির্বিদধতি সভারঞ্জনময়ীং।

কবীন্দ্রদের চিত্তকমলবনমালার কিরণ লেখা যে তুমি, তোমাকে যারা লেশমাত্র ভজনা করে তারাই গভীর বাক্যদ্বারা সরস্বতীর সভারঞ্জনময়ী তরুণলীলালহরী প্রকাশ করতে পারে। আমি সেই কবিচিত্ত কমলবনের কিরণ লেখাটির পরিচয় পেয়েছি।

শ্রীশ। আমিও অল্পদিন হল একটু পরিচয় পেয়েছি তার পর থেকে কবিত্ব আমার পক্ষে সহজ হয়ে এসেছে।

অক্ষয়ের প্রবেশ।

অক্ষয়। (স্বগত) নাঃ, দুটি নবযুবকে মিলে আমাকে আর ঘরে তিষ্ঠতে দিলে না দেখচি। একটি ত গিয়ে চোরের মত আমার ঘরের মধ্যে হাত্‌ড়ে বেড়াচ্ছিলেন—ধরা পড়ে ভাল রকম জবাবদিহি কর্‌তে পার্‌লে না—শেষকালে আমাকে নিয়ে পড়ল। তার খানিক বাদেই দেখি দ্বিতীয় ব্যক্তিটি গিয়ে ঘরের বইগুলি নিয়ে উল্টেপাল্টে নিরীক্ষণ কর্‌চে। তফাৎ থেকে দেখেই পালিয়ে এসেছি। বেশ মনের মত করে চিঠিখানি যে লিখব এরা তা আর দিলে না। আহা চমৎকার জ্যোৎস্না হয়েছে!

শ্রীশ। এই যে অক্ষয়বাবু!

অক্ষয়। ঐরে! একটা ডাকাত ঘরের মধ্যে, আর একটা ডাকাত গলির মোড়ে? হা প্রিয়ে, তোমার ধ্যান থেকে যারা আমার মনকে বিক্ষিপ্ত করছে তারা মেনকা উর্ব্বশী রম্ভা হলে আমার কোন খেদ ছিল না—মনের মত ধ্যানভঙ্গও অক্ষয়ের অদৃষ্টে নেই—কলিকালে ইন্দ্রদেবের বয়স বেশি হয়ে বেরসিক হয়ে উঠেছে!

বিপিনের প্রবেশ।

বিপিন। এই যে অক্ষয়বাবু, আপনাকেই খুঁজছিলুম।

অক্ষয়। হায় হতভাগ্য, এমন রাত্রি কি আমাকে খোঁজ করে বেড়াবার জন্যই হয়েছিল?

In such a night as this,
When the sweet wind did gently kiss the trees
And they did make no noise, in such a night
Troilus methinks mounted the Troyan walls,
And sighed his soul toward the Grecian tents,
Where Cressid lay that night.

শ্রীশ। In such a night আপনি কি করতে বেরিয়েছেন অক্ষয় বাবু?

রসিক।

অপসরতি ন চক্ষুষো মৃগাক্ষী
রজনিরিয়িং চ ন যাতি নৈতি নিদ্রা!

চক্ষু পরে মৃগাক্ষীর চিত্র পানি ভাসে;
রজনীও নাহি যায়, নিদ্রাও না আসে!

অক্ষয়বাবুর অবস্থা আমি জানি মশায়!

অক্ষয়। তুমি কে হে?

রসিক। আমি রসিকচন্দ্র—দুই দিকে দুই যুবককে আশ্রয় করে যৌবন সাগরে ভাসমান।

এ বয়সে যৌবন সহ্য হবে না রসিক দাদা।

রসিক। যৌবনটা কোন্ বয়সে যে সহ্য হয় তা ত জানিনে, ওটা অসহ্য ব্যাপার। শ্রীশবাবু আপনার কি রকম বোধ হচ্চে।

শ্রীশ। এখনো সম্পূর্ণ বোধ কর্‌তে পারি নি।

রসিক। আমার মত পরিণত বয়সের জন্যে অপেক্ষা করচেন বুঝি? অক্ষয় দা, আজ তোমাকে বড় অন্যমনস্ক দেখাচ্ছে।

অক্ষয়। তুমি ত অন্যমনস্ক দেখ্‌বেই, মনটা ঠিক তোমার দিকে নেই।—বিপিনবাবু তুমি আমাকে খুঁজছিলে বল্লে বটে, কিন্তু খুব যে জরুর দরকার আছে বলে বোধ হচ্চে না অতএব আমি এখন বিদায় হই, একটু বিশেষ কাজ আছে।

(প্রস্থান)

রসিক। বিরহী চিঠি লিখ্‌তে চল্ল।

শ্রীশ। অক্ষয়বাবু আছেন বেশ। রসিকবাবু, ওঁর স্ত্রীই বুঝি বড় বোন? তাঁর নাম?

রসিক। পুরবালা।

বিপিন। (নিকটে আসিয়া) কি নাম বল্লেন?

রসিক। পুরবালা।

বিপিন। তিনিই বুঝি সব চেয়ে বড়?

রসিক। হাঁ

বিপিন। সব ছোটটির নাম?

রসিক। নীরবালা।

শ্রীশ। আর নৃপবালা কোনটি?

রসিক। তিনি নীরবালার বড়।

শ্রীশ। তাহলে নৃপবালাই হলেন মেজ।

বিপিন। আর নীরবালা ছোট।

শ্রীশ। পুরবালার ছোট নৃপবালা।

বিপিন। তাঁর ছোট হচ্চেন নীরবালা।

রসিক (স্বগত) এরা ত নাম জপ কর্‌তে সুরু করলে। আমার মুষ্কিল। আর ত হিম সহ্য হবে না, পালাবার উপায় করা যাক্।

বনমালীর প্রবেশ।

বন। এই যে আপনারা এখানে! আমি আপনাদের বাড়িতে গিয়েছিলুম।

শ্রীশ। এইবার আপনি এখানে থাকুন আমরা বাড়ি যাই!

বন। আপনারা সর্ব্বদাই ব্যস্ত দেখ্‌তে পাই।

বিপিন। তা, আপনি আমাদের কখনো সুস্থ দেখেন নি—একটু বিশেষ ব্যস্ত হয়েই পড়ি।

বন। পাঁচ মিনিট যদি দাঁড়ান।

শ্রীশ। রসিকবাবু, একটু ঠাণ্ডা বোধ হচ্ছে না?

রসিক। আপনাদের এতক্ষণে বোধ হল, আমার অনেকক্ষণ থেকেই বোধ হচ্ছে!

বন। চলুন না, ঘরেই চলুন না!

শ্রীশ। মশায় এত রাত্রে যদি আমাদের ঘরে ঢোকেন তাহলে কিন্তু―

বন। যে আজ্ঞে, আপনারা কিছু ব্যস্ত আছেন দেখ্‌চি, তাহলে আর এক সময় হবে।

(১১)

রসিক। ভাই শৈল!

শৈল। কি রসিক দাদা!

রসিক। এ কি আমার কাজ? মহাদেবের তপোভঙ্গের জন্যে স্বয়ং কন্দর্পদেব ছিলেন—আর আমি বৃদ্ধ―

শৈল। তুমি ত বৃদ্ধ, তেমনি যুবক দুটিও ত যুগল মহাদেব নন্!

রসিক। তা নন্, আমি বেশ ঠাহর করেই দেখেছি। সেই জন্যেই ত নির্ভয়ে এসেছিলুম। কিন্তু তাঁদের সঙ্গে রাস্তার মধ্যে হিমে দাঁড়িয়ে অর্দ্ধেক রাত পর্য্যন্ত রসালাপ করবার মত উত্তাপ আমার শরীরে ত নেই!

শৈল। তাঁদের সংসর্গে উত্তাপ সঞ্চয় করে নেবে।

রসিক। সজীব গাছ যে সূর্য্যের তাপে প্রফুল্ল হয়ে ওঠে মরাকাঠ তাতেই ফেটে যায়, যৌবনের উত্তাপ বুড়োমানুষের পক্ষে ঠিক উপযোগী বোধ হয় না।

শৈল। কই তোমাকে দেখে ফেটে যাবে বলে ত বোধ হচ্চে না।

রসিক। হৃদয়টা দেখলে বুঝতে পারতিস্ ভাই।

শৈল। কি বল রসিক দা। তোমারি ত এখন সব চেয়ে নিরাপদ বয়েস। যৌবনের দাহে তোমার কি করবে?

রসিক। শুষ্কেন্ধনে বহ্নিরুপৈতি বৃদ্ধিম্। যৌবনের দাহ বৃদ্ধকে পেলেই হু হুঃ শব্দে জ্বলে ওঠে—সেই জন্যেই ত বৃদ্ধস্য তরুণীভার্য্যা বিপত্তির কারণ! কি আর বল্‌ব ভাই।

নীরবালার প্রবেশ।

রসিক। আগচ্ছ বরদে দেবি! কিন্তু বর তুমি আমাকে দেবে কি না জানিনে আমি তোমাকে একটি বর দেবার জন্যে প্রাণপাত করে মর্‌চি। শিব ত কিছুই কর্‌চেন না তবু তোমাদের পূজো পাচ্চেন, আর এই যে বুড়ো খেটে মরচে একি কিছুই পাবে না?

নীরবালা। শিব পান ফুল, তুমি পাবে তার ফল―তোমাকেই বরমাল্য দেব রসিকদাদা!

রসিক। মাটির দেবতাকে নৈবেদ্য দেবার সুবিধা এই যে সেটি সম্পূর্ণ ফিরে পাওয়া যায়—আমাকে ও নির্ভয়ে বরমাল্য দিতে পারিস্, যখনি দরকার হবে তখনি ফিরে পাবি―তার চেয়ে ভাই আমাকে একটা গলাবন্ধ বুনে দিস্, বরমাল্যের চেয়ে সেটা বুড়োমানুষের কাজে লাগ্‌বে।

নীর। তা দেব—এক জোড়া পশমের জুতো বুনে রেখেছি সেও শ্রীচরণেষু হবে।

রসিক। আহা, কৃতজ্ঞতা একেই বলে? কিন্তু নীরু, আমার পক্ষে গলাবন্ধই যথেষ্ট—আপাদমস্তক নাই হোল, সে জন্যে উপযুক্ত লোক পাওয়া যাবে, জুতোটা তাঁরি জন্যে রেখে দে।

নীর। আচ্ছা, তোমার বক্ত্তৃতাও তুমি রেখে দাও?

রসিক। দেখেছিস, ভাই শৈল, আজকাল নীরুরও লজ্জা দেখা দিয়েছে―লক্ষণ খারাপ।

শৈল। নীরু তুই করচিস্ কি? আবার এ ঘরে এসেছিস্। আজ যে এখানে আমাদের সভা বস্‌বে―এখনি কে এসে পড়বে, বিপদে পড়বি।

রসিক। সেই বিপদের স্বাদ ও একবার পেয়েছে, এখন বারবার বিপদে পড়বার জন্যে ছট্‌ফট করে বেড়াচ্ছে।

নীর। দেখ রসিকদাদা তুমি যদি আমাকে বিরক্ত কর তা’হলে গলাবন্ধ পাবে না বল্‌চি। দেখ দেখি দিদি, তুমিও যদি রসিকদার কথায় ঐ রকম করে হাস তা’হলে ওঁর আস্পর্দ্ধা আরও বেড়ে যায়।

রসিক। দেখেছিস্ ভাই শৈল, নীরু আজ কাল ঠাট্টাও সইতে পারছে না, মন এত দুর্ব্বল হয়ে পড়েছে! নীরু দিদি, কোন কোন সময় কোকিলের ডাক শ্রুতিকটু বলে ঠেকে এই রকম শাস্ত্রে আছে, তোর রসিকদাদার ঠাট্টাকেও কি তোর আজকাল কুহুতান বলে ভ্রম হতে লাগ্‌ল?

নীর। সেই জন্যেইত তোমার গলায় গলাবন্ধ জড়িয়ে দিতে চাচ্চি তানটা যদি একটু কমে।

শৈল। নীরু আর ঝগড়া করিস্‌নে—আয়, এখনি সবাই এসে পড়বে। (উভয়ের প্রস্থান)

পূর্ণর প্রবেশ।

রসিক। আসুন পূর্ণবাবু!

পূর্ণ। এখনো আর কেউ আসেন নি?

রসিক। আপনি বুঝি কেবল এই বৃদ্ধটিকে দেখে হতাশ হয়ে পড়েচেন। আরো সকলে আস্‌বেন পূর্ণবাবু।

পূর্ণ। হতাশ কেন হব রসিক বাবু?

রসিক। তা কেমন করে বলব বলুন? কিন্তু ঘরে যেই ঢুক্‌লেন আপনার দুটি চক্ষু দেখে বোধ হল তারা যাঁকে ভিক্ষা করে বেড়াচ্চে সে ব্যক্তি আমি নই।

পূর্ণ। চক্ষুতত্বে আপনার এতদূর অধিকার হল কি করে?

রসিক। আমার পানে কেউ কোন দিন তাকায় নি পূর্ণবাবু তাই এই প্রাচীন বয়স পর্য্যন্ত পরের চক্ষু পর্য্যবেক্ষণের যথেষ্ট অবসর পেয়েছি। আপনাদের মত শুভাদৃষ্ট হলে দৃষ্টিতত্ত্ব লাভ না করে অনেক দৃষ্টিলাভ করতে পারতুম। কিন্তু যাই বলুন পূর্ণবাবু, চোখ দুটির মত এমন আশ্চর্য্য সৃষ্টি আর কিছু হয় নি—শরীরের মধ্যে মন যদি কোথাও প্রত্যক্ষ বাস করে সে ঐ চোখের উপরে।

পূর্ণ। (সোৎসাহে) ঠিক বলেছেন রসিকবাবু! ক্ষুদ্র শরীরের মধ্যে যদি কোথাও অনন্ত আকাশ কিংবা অনন্ত সমুদ্রের তুলনা থাকে সে ঐ দুটি চোখে!

রসিক।

নিঃসীমশোভাসৌভাগ্যং নতাঙ্গ্যা নয়নদ্বয়ং
অন্যোহন্যালোকনানন্দবিরহাদিব চঞ্চলং―

বুঝেছেন পূর্ণবাবু?

পূর্ণ। না, কিন্তু বোঝবার ইচ্ছা আছে।

রসিক।

আনতাঙ্গী বালিকার শোভাসৌভাগ্যের সার নয়ন যুগল,
না দেখিয়া পরস্পরে তাই কি বিরহভরে হয়েছে চঞ্চল?

পূর্ণ। না রসিকবাবু, ও ঠিক হ’ল না! ও কেবল বাক্‌চাতুরী! দুটো চোখ পরস্পরকে দেখ্‌তে চায় না।

রসিক। অন্য দুটো চোখকে দেখতে চায় ত? সেই রকম অর্থ করেই নিন্ না! শেষ দুটো ছত্র বদ্‌লে দেওয়া যাক—

প্রিয়চক্ষু দেখাদেখি যে আনন্দ, তাই সে কি খুঁজিছে চঞ্চল?

পূর্ণ। চমৎকার হয়েছে রসিক বাবু!

প্রিয়চক্ষু-দেখাদেখি যে আনন্দ, তাই সে কি খুঁজিছে চঞ্চল?

অথচ সে বেচারা বন্দী—খাঁচার পাখীর মত কেবল এপাশে ওপাশে ছট্‌ফট্‌ করে—প্রিয়চক্ষু যেখানে, সেখানে পাখা মেলে উড়ে যেতে পারে না।

রসিক। আবার দেখাদেখির ব্যাপারখানাও যে কি রকম নিদারুণ, তাও শাস্ত্রে লিখেছে—

হত্বা লোচনবিশিখৈর্গত্বা কতিচিৎপদানি পদ্মাক্ষী
জীবতিযুবা ন বা কিং ভূয়ো ভূয়ো বিলোকয়তি।

বিঁধিয়া দিয়া আঁখিবাণে
যায় সে চলি গৃহপানে,―
জনমে অনুশোচনা;―
বাঁচিল কি না দেখিবারে
চায় সে ফিরে বারে বারে
কমলবরলোচনা!

পূর্ণ। রসিকবাবু বারে বারে ফিরে চায় কেবল কাব্যে।

রসিক। তার কারণ, কাব্যে ফিরে চাবার কোন অসুবিধে নেই। সংসারটা যদি ঐ রকম ছন্দে তৈরি হত তা হলে এখানেও ফিরে ফিরে চাইত পূর্ণবাবু―এখানে মন ফিরে চায়, চক্ষু ফেরে না!

পূর্ণ। (সনিঃশ্বাসে) বড় বিশ্রী জায়গা রসিক বাবু! কিন্তু ওটা আপনি বেশ বলেচেন― প্রিয়চক্ষু দেখাদেখি যে আনন্দ, তাই সে কি খুঁজিছে চঞ্চল?

রসিক। আহা পূর্ণবাবু; নয়নের কথা, যদি উঠল ও আর শেষ করতে ইচ্ছা করে না―

লোচনে হরিণগর্ব্বমোচনে
মা বিদূষয় নতাঙ্গি কজ্জলৈঃ!
সায়কঃ সপদি জীবহারকঃ
কিং পুনর্হি গরলেন লেপিতঃ?
হরিণগর্ব্বমোচন লোচনে
কাজল দিয়ো না, সরলে!
এমনিতে বাণ নাশ করে প্রাণ
কি কাজ লেপিয়া গরলে?

পূর্ণ। থামুন রসিকবাবু থামুন? ঐ বুঝি কারা আস্‌চেন?

চন্দ্রবাবু ও নির্ম্মলার প্রবেশ।

চন্দ্র। এই যে অক্ষয় বাবু!

রসিক। আমার সঙ্গে অক্ষয় বাবুর সাদৃশ্য আছে শুনলে তিনি এবং তাঁর আত্মীয়গণ বিমর্ষ হবেন। আমি রসিক।

চন্দ্র। মাপ করবেন—রসিক বাবু—হঠাৎ ভ্রম হয়েছিল।

রসিক। মাপ করবার কি কারণ ঘটেছে মশায়! আমাকে অক্ষয়বাবু ভ্রম করে কিছুমাত্র অসম্মান করেন নি। মাপ তাঁর কাছে চাইবেন। পূর্ণবাবুতে আমাতে এতক্ষণে বিজ্ঞানচর্চ্চা করছিলুম চন্দ্রবাবু।

চন্দ্র। আমাদের কুমারসভায় আমরা মাসে একদিন করে বিজ্ঞান আলোচনার জন্যে স্থির করব মনে কর্‌ছিলুম। আজ কি বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছিল পূর্ণবাবু?

পূর্ণ। না, সে কিছুই না চন্দ্রবাবু!

রসিক। চোখের দৃষ্টি সম্বন্ধে দুচার কথা বলাবলি করা যাচ্ছিল।

চন্দ্র। দৃষ্টির রহস্য ভারি শক্ত রসিক বাবু।

রসিক। শক্ত বৈকি! পূর্ণবাবুরও সেই মত।

চন্দ্র। সমস্ত জিনিষের ছায়াই আমাদের দৃষ্টিপটে উল্টো হয়ে পড়ে, সেইটেকে যে কেমন করে আমরা সোজাভাবে দেখি সে সম্বন্ধে কোন মতই আমার সন্তোষজনক বলে বোধ হয় না।

রসিক। সন্তোষজনক হবে কেমন করে? সোজা দেখা বাঁকা দেখা এই সমস্ত নিয়ে মানুষের মাথা ঘুরে যায়। বিষয়টা বড় সঙ্কটময়।

চন্দ্র। নির্ম্মলার সঙ্গে রসিকবাবুর পরিচয় হয় নি? ইনিই আমাদের কুমার সভার প্রথম স্ত্রীসভ্য।

রসিক। (নমস্কার করিয়া) ইনি আমাদের সভার সভালক্ষ্মী। আপনাদের কল্যাণে আমাদের সভায় বুদ্ধি বিদ্যার অভাব ছিল না, ইনি আমাদের শ্রী দান করতে এসেছেন।

চন্দ্র। কেবল শ্রী নয়, শক্তি।

রসিক। একই কথা চন্দ্রবাবু। শক্তি যখন শ্রীরূপে আবির্ভূতা হন তখনই তাঁর শক্তির সীমা থাকে না! কি বলেন পূর্ণবাবু?

পুরুষবেশী শৈলের প্রবেশ।

শৈল। মাপ করবেন চন্দ্রবাবু, আমার কি আস্‌তে দেরি হয়েছে?

চন্দ্র। (ঘড়ি দেখিয়া) না এখনও সময় হয় নি। অবলাকান্ত বাবু আমার ভাগ্নী নির্ম্মলা আজ আমাদের সভার সভ্য হয়েছেন।

শৈল। (নির্ম্মলার নিকট বসিয়া) দেখুন পুরুষরা স্বার্থপর, মেয়েদের কেবল নিজেদের সেবার জন্যই বিশেষ করে বন্ধ করে রাখ্‌তে চায়—চন্দ্রবাবু যে আপনাকে আমাদের সভার হিতের জন্যে দান করেছেন তাতে তাঁর মহত্ত্ব প্রকাশ পায়।

নির্ম্মলা। আমার মামার কাছে দেশের কাজ এবং নিজের কাজ একই! আমি যদি আপনাদের সভার কোন উপকার করতে পারি তাতে তাঁরই সেবা হবে।

শৈল। আপনি যে সৌভাগ্যক্রমে চন্দ্র বাবুকে ভাল করে জান্‌বার যোগ্যতা লাভ করেছেন এতে আপনি ধন্য।

নির্মলা। আমি ওঁকে জান্‌ব না ত কে জান্‌বে?

শৈল। আত্মীয় সব সময় আত্মীয়কে জানে না। আত্মীয়তায় ছোটকে বড় করে তোলে বটে, তেমনি বড়কেও ছোট করে আনে। চন্দ্রবাবুকে যে আপনি যথার্থভাবে জেনেছেন তাতে আপনার ক্ষমতা প্রকাশ পায়।

নির্ম্মলা। কিন্তু আমার মামাকে যথার্থভাবে জানা খুব সহজ, ওঁর মধ্যে এমন একটি স্বচ্ছতা আছে।

শৈল। দেখুন সে ত ওঁকে ঠিক মত জানা শক্ত। দুর্য্যোধন স্ফটিকের দেয়ালকে দেয়াল বলে দেখতেই পান নি। সরল স্বচ্ছতার মহত্ত্ব কি সকলে বুঝতে পারে? তাকে অবহেলা করে। আড়ম্বরেই লোকের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়।

নির্ম্মলা। আপনি ঠিক কথা বলেছেন। বাইরের লোকে আমার মামাকে কেউ চেনেই না। বাইরের লোকের মধ্যে এতদিন পরে আপনার কাছে মামার কথা শুনে আমার যে কি আনন্দ হচ্চে সে কি বল্‌ব!

শৈল। আপনার ভক্তিও আমাকে ঠিক সেই রকম আনন্দ দিচ্ছে।

চন্দ্র। { উভয়ের নিকটে আসিয়া) অবলাকান্ত বাবু, তোমাকে যে বইটি দিয়েছিলেম সেটা পড়েছ?

শৈল। পড়েছি, এবং তার থেকে সমস্ত নোট্ করে আপনার ব্যবহারের জন্যে প্রস্তুত করে রেখেছি।

চন্দ্র। আমার ভারি উপকার হবে,—আমি বড় খুসি হলুম অবলাকান্ত বাবু। পূর্ণ নিজে আমার কাছে ঐ বইটি চেয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু ওঁর শরীর ভাল ছিল না বলে কিছুই করে উঠতে পারেন নি। খাতাটি তোমার কাছে আছে?

শৈল। এনে দিচ্চি। (প্রস্থান)

রসিক। পূর্ণ বাবু আপনাকে কেমন ম্লান দেখছি অসুখ করচে কি?

পূর্ণ। না; কিছুই না! রসিক বাবু, যিনি গেলেন এঁরই নাম অবলাকান্ত?

রসিক। হাঁ।

পূর্ণ। আমার কাছে ওঁর ব্যবহারটা তেমন ভাল ঠেক্‌ছে না।

রসিক। অল্প বয়স কি না সেই জন্যে―

পূর্ণ। মহিলাদের সঙ্গে কি রকম আচরণ করা উচিত সে শিক্ষা ওঁর বিশেষ দরকার।

রসিক। আমিও সেটা লক্ষ্য করে দেখেছি মেয়েদের সঙ্গে উনি ঠিক পুরুষোচিত ব্যবহার করতে জানেন না—কেমন যেন গায়ে-পড়া ভাব! ওটা হয়ত অল্প বয়সের ধর্ম্ম।

পূর্ণ। আমাদেরও ত বয়স খুব প্রাচীন হয় নি, কিন্তু আমরা ত—

রসিক। তা ত দেখচি, আপনি খুব দূরে দূরেই থাকেন, কিন্তু উনি হয়ত সেটাকে ঠিক ভদ্রতা বলেই গ্রহণ করেন না। ওঁর হয়ত ভ্রম হচ্চে আপনি ওঁকে অগ্রাহ করেন।

পূর্ণ। বলেন কি রসিক বাবু? কি করব বলুন ত? আমি ত ভেবেই পাইনে কি কথা বলবার জন্যে আমি ওঁর কাছে অগ্রসর হতে পারি।

রসিক। ভাবতে গেলে ভেবে পাবেন না। না ভেবে অগ্রসর হবেন তার পরে কথা আপনি বেরিয়ে যাবে।

পূর্ণ। না রসিক বাবু, আমার একটা কথাও বেরয় না। কি বল্‌ব আপনিই বলুন না।

রসিক। এমন কোন কথাই বল্‌বেন না যাতে জগতে যুগান্তর উপস্থিত হবে। গিয়ে বলুন, আজকাল হঠাৎ কি রকম গরম পড়েছে।

পূর্ণ। তিনি যদি বলেন হাঁ গরম পড়েছে তার পরে কি বলব?

বিপিন ও শ্রীশের প্রবেশ।

শ্রীশ। (চন্দ্রবাবু ও নির্ম্মলাকে নমস্কার করিয়া নির্ম্মলার প্রতি) আপনাদের উৎসাহ ঘড়ির চেয়ে এগিয়ে চল্‌চে―এই দেখুন্‌ এখনো সাড়ে ছটা বাজে নি!

নির্ম্মলা। আজ আপনাদের সভায় আমার প্রথম দিন সেই জন্যে সভা বসবার পূর্ব্বেই এসেছি—প্রথম সভ্য হবার সঙ্কোচ ভাঙতে একটু সময় দরকার।

বিপিন। কিন্তু আপনার কাছে নিবেদন এই যে আমাদের কিছুমাত্র সঙ্কোচ করে চল্‌বেন না। আজ থেকে আপনি আমাদের ভার নিলেন ―লক্ষ্মীছাড়া পুরুষ সভ্যগুলিকে অনুগ্রহ করে দেখবেন শুন্‌বেন এবং হুকুম করে চালাবেন।

রসিক। যান্ পূর্ণবাবু, আপনিও একটা কথা বলুন গে।

পূর্ণ। কি বল্‌ব?

নির্ম্মলা। চালাবার ক্ষমতা আমার নেই।

শ্রীশ। আপনি কি আমাদের এতই অচল বলে মনে করেন?

বিপিন। লোহার চেয়ে অচল আর কি আছে কিন্তু আগুন ত লোহাকে চালাচ্চে― আমাদের মত ভারী জিনিষ গুলোকে চলনসই করে তুল্‌তে আপনাদের মত দীপ্তির দরকার।

রসিক। শুন্‌চেন ত পূর্ণবাবু?

পূর্ণ। আমি কি বল্‌ব বলুন না!

রসিক। বলুন লোহাকে চালাতে চাইলেও আগুন চাই, গলাতে চাইলেও আগুন চাই!

বিপিন। কি পূর্ণবাবু, রসিক বাবুর সঙ্গে পরিচয় হয়েছে?

পূর্ণ। হাঁ।

বিপিন। আপনার শরীর আজ ভাল আছে ত?

পূর্ণ। হাঁ।

বিপিন। অনেকক্ষণ এসেছেন না কি?

পূর্ণ। না।

বিপিন। দেখেছেন এবারে শীতটা ঘোড়দৌড়ের ঘোড়ার মত সজোরে দৌড়ে মাঘের মাঝামাঝি একেবারে খপকরে থেমে গেল।

পূর্ণ। হাঁ।

শ্রীশ। এই যে পূর্ণবাবু, গেলবারে আপনার শরীর খারাপ ছিল―এবারে বেশ ভাল বোধ হচ্চে ত?

পূর্ণ। হাঁ।

শ্রীশ। এতদিন কুমার সভার যে কি একটা মহৎ অভাব ছিল আজ ঘরের মধ্যে ঢুকেই তা বুঝতে পেরেছি;―সোনার মুকুটের মাঝখানটিতে কেবল একটি হীরে বসাবার অপেক্ষা ছিল—আজ সেইটি বসান হয়েছে কি বলেন পূর্ণবাবু!

পূর্ণ। আপনাদের মত এমন রচনাশক্তি আমার নেই—আমি এত বানিয়ে বানিয়ে কথা বাঁটতে পারিনে—বিশেষত মহিলাদের সম্বন্ধে।

শ্রীশ। আপনার অক্ষমতার কথা শুনে দুঃখিত হলেম পূর্ণবাবু― আশা করি ক্রমে উন্নতিলাভ কর্‌তে পারবেন।

বিপিন। (রসিককে জনান্তিকে টানিয়া) দুই বীর পুরুষে যুদ্ধ চলুক এখন আসুন্ রসিকবাবু আপনার সঙ্গে দুই একটা কথা আছে!―দেখুন―সেই খাতা সম্বন্ধে আর কোন কথা উঠেছিল?

রসিক। অপরাধ করা মানবের ধর্ম্ম আর ক্ষমা করা দেবীর―সে কথাটা আমি প্রসঙ্গক্রমে তুলেছিলেম―

বিপিন। তাতে কি বল্লেন?

রসিক। কিছু না বলে বিদ্যুতের মত চলে গেলেন।

বিপিন। চলে গেলেন?

রসিক। কিন্তু সে বিদ্যুতে বজ্র ছিল না।

বিপিন। গর্জ্জন?

রসিক। তাও ছিল না।

বিপিন। তবে?

রসিক। এক প্রান্তে কিংবা অন্যপ্রান্তে একটু হয়ত বর্ষণের আভাস ছিল।

বিপিন। সেটুকুর অর্থ?

রসিক। কি জানি মহাশয়! অর্থও থাক্‌তে পারে অনর্থও থাক্‌তে পারে!

বিপিন। রসিকবাবু আপনি কি বলেন আমি কিছু বুঝতে পারিনে!

রসিক। কি করে বুঝবেন―ভারি শক্ত কথা!

শ্রীশ। (নিকটে আসিয়া) কি কথা শক্ত মশায়?

রসিক। এই বৃষ্টি বজ্রবিদ্যুতের কথা!

শ্রীশ। ওহে বিপিন, তার চেয়ে শক্ত কথা যদি শুনতে চাও তা হলে পূর্ণর কাছে যাও!

বিপিন। শক্ত কথা সম্বন্ধে আমার খুব বেশী সখ নেই ভাই।

শ্রীশ। যুদ্ধ করার চেয়ে সন্ধি করার বিদ্যেটা ঢের বেশী দুরূহ―সেটা তোমার আসে। দোহাই তোমার, পূর্ণকে একটু ঠাণ্ডা করে এসগে। আমি বরঞ্চ ততক্ষণ রসিকবাবুর সঙ্গে বৃষ্টিবজ্রবিদ্যুতের আলোচনা করে নিই। (বিপিনের প্রস্থান) রসিকবাবু, ঐ যে সেদিন আপনি যাঁর নাম নৃপবালা বল্লেন, তিনি― তিনি—তাঁর সম্বন্ধে বিস্তারিত করে কিছু বলুন। সেদিন চকিতের মধ্যে তাঁর মুখে এমন একটি স্নিগ্ধভাব দেখেছি, তাঁর সম্বন্ধে কৌতুহল কিছুতেই থামাতে পারচিনে।

রসিক। বিস্তারিত করে বল্লে কৌতূহল আরো বেড়ে যাবে। এ রকম কৌতূহল “হবিষা কৃষ্ণবর্ত্মেব ভূয় এবাভিবর্দ্ধতে”। আমি ত তাঁকে এতকাল ধরে জেনে আস্‌চি, কিন্তু সেই কোমল হৃদয়ের দ্বিগ্ন মধুর ভাবটি আমার কাছে “ক্ষণে ক্ষণে তন্নবতামুপৈতি”।

শ্রীশ। আচ্ছা তিনি—আমি সেই নৃপবালার কথা জিজ্ঞাসা করছি—

রসিক। সে আমি বেশ বুঝতেই পারচি।

শ্রীশ। তা তিনি— কি আর প্রশ্ন করব? তাঁর সম্বন্ধে যা হয় কিছু বলুন না—কাল কি বল্লেন, আজ সকালে কি করলেন যত সামান্য হোক্ আপনি বলুন আমি শুনি।

রসিক। (শ্রীশের হাত ধরিয়া) বড় খুসি হলুম শ্রীশ বাবু আপনি যথার্থ ভাবুক বটেন—আপনি তাঁকে কেবল চকিতের মধ্যে দেখে’ এটুকু কি করে ধরতে পারলেন যে তাঁর সম্বন্ধে তুচ্ছ কিছুই নেই। তিনি যদি বলেন, রসিক দা, ঐ কেরোসিনের বাতিটা একটুখানি উস্কে দাও, আমার মনে হয় যেন একটা নতুন কথা শুন্‌লেম—আদি কবির প্রথম অনুষ্টুপ ছন্দের মত। কি বল ব শ্রীশ বাবু, আপনি শুনলে হয় ত হাস্‌বেন, সে দিন ঘরে ঢুকে দেখি নৃপবালা ছুঁচের মুখে সূতো পরাচ্ছেন কোলের উপর বালিশের ওয়াড় পড়ে রয়েছে, আমার মনে হল এক আশ্চর্য্য দৃশ্য। কতবার কত দরজির দোকানের সামনে দিয়ে গেছি, কখনো মুখ তুলে দেখিনি কিন্তু―

শ্রীশ। আচ্ছা রসিকবাবু, তিনি নিজের হাতে ঘরের সমস্ত কাজ করেন?

শৈলের প্রবেশ।

শৈল। রসিকদার সঙ্গে কি পরামর্শ করচেন?

রসিক। কিছুই না, নিতান্ত সামান্য কথা নিয়ে আমাদের আলোচনা চল্‌চে, যত দূর তুচ্ছ হতে পারে।

চন্দ্র। সভা অধিবেশনের সময় হয়েছে আর বিলম্ব করা উচিত হয় না। পূর্ণবাবু, কৃষিবিদ্যালয় সম্বন্ধে আজ তুমি যে প্রস্তাব উত্থাপন করবে বলেছিলে সেটা আরম্ভ কর।

পূর্ণ। (দণ্ডায়মান হইয়া ঘড়ির চেন নাড়িতে নাড়িতে) আজ― আজ― (কাশি)

রসিক। (পার্শ্বে বসিয়া মৃদুস্বরে) আজ এই সভা―

পূর্ণ। আজ এই সভা―

রসিক। যে নূতন সৌন্দর্য্য এবং গৌরব লাভ করিয়াছে―

পূর্ণ। যে নুতন সৌন্দর্য্য এবং গৌরব লাভ করিয়াছে—

রসিক। প্রথমে তাহারই জন্য অভিনন্দন প্রকাশ না করিয়া থাকিতে পারিতেছি না।

পূর্ণ। প্রথমে তাহারই জন্য অভিনন্দন প্রকাশ না করিয়া থাকিতে পারিতেছি না।

রসিক। (মৃদু স্বরে) বলে যান পূর্ণবাবু!

পূর্ণ। তাহারই জন্য অভিনন্দন প্রকাশ না করিয়া থাকিতে পারিতেছি না।

রসিক। ভয় কি পূর্ণবাবু বলে যান্।

পূর্ণ। যে নূতন সৌন্দর্য এবং গৌরব—(কাশি) যে নূতন সৌন্দর্য্য (পুনরায় কাশি) অভিনন্দন―

রসিক। (উঠিয়া)―সভাপতিমশায়, আমার একটা নিবেদন আছে। আজ পূর্ণবাবু সকল সভ্যের পূর্ব্বেই সভায় উপস্থিত হয়েছেন। উনি অত্যন্ত অসুস্থ, তথাপি উৎসাহ সম্বরণ করতে পারেন নি। আজ আমাদের সভায় প্রথম অরুণোদয়, তাই দেখবার জন্যে পাখী প্রত্যুষেই নীড় পরিত্যাগ করে বেরিয়েছেন—কিন্তু দেহ রুগ্ন তাই পূর্ণহৃদয়ের আবেগ কণ্ঠে ব্যক্ত কর্‌বার শক্তি নেই—অতএব ওঁকে আজ আমাদের নিষ্কৃতি দান করতে হবে। এবং আজ নব প্রভাতের যে অরুণচ্ছটার স্তবগান করতে উনি উঠেছিলেন তাঁর কাছেও এই অবরুদ্ধকন্ঠ ভক্তের হয়ে আমি মার্জ্জনা প্রার্থনা করি। পূর্ণবাবু, আজ বরঞ্চ আমাদের সভার কার্য্য বন্ধ থাকে সেও ভাল তথাপি বর্ত্তমান অবস্থায় আজ আপনাকে কোন প্রস্তাব উত্থাপন করতে দিতে পারিনে। সভাপতিমশায় ক্ষমা করবেন এবং আমাদের সভাকে যিনি আপন প্রভা দ্বারা অন্য সার্থকতা দান করতে এসেছেন ক্ষমা করা তাঁদের স্বজাতিসুলভ করুণ হৃদয়ের সহজ ধর্ম্ম।

চন্দ্র। আমি জানি, কিছুকাল থেকে পূর্ণবাবু ভাল নেই, এ অবস্থায় আমরা ওঁকে ক্লেশ দিতে পারি না। বিশেষতঃ অবলাকান্তবাবু ঘরে বসেই আমাদের সভার কাজ অনেকদূর অগ্রসর করে দিয়েছেন। এপর্য্যন্ত ভারতবর্ষীয় কৃষি সম্বন্ধে গবর্মেন্ট থেকে যতগুলি রিপোর্ট বাহির হয়েছে সবগুলি আমি ওঁর কাছে দিয়েছিলেম—তার থেকে উনি, জমিতে সার দেওয়া সম্বন্ধীয় অংশটুকু সংক্ষেপে সঙ্কলন করে রেখেছেন—সেইটি অবলম্বন করে উনি সর্ব্বসাধারণের সুবোধ্য বাংলা ভাষায় একটি পুস্তিকা প্রণয়ন করতেও প্রতিশ্রুত হয়েছেন! ইনি যেরূপ উৎসাহ ও দক্ষতার সঙ্গে সভার কার্য্যে যোগদান করেছেন সে জন্য ওঁকে প্রচুর ধন্যবাদ দিয়ে অদ্যকার সভা আগামী রবিবার পর্য্যন্ত স্থগিত রাখা গেল। বিপিন বাবু য়ুরোপীয় ছাত্রাগার সকলের নিয়ম ও কার্য্যপ্রণালী সঙ্কলনের ভার নিয়েছিলেন এবং শ্রীশবাবু স্বেচ্ছাকৃত দানের দ্বারা লণ্ডন নগরে যত বিচিত্র লোক-হিতকর অনুষ্ঠান প্রবর্ত্তিত হয়েছে তার তালিকা সংগ্রহ ও তৎসম্বন্ধে একটি প্রবন্ধ রচনায় প্রতিশ্রুত হয়েছিলেন, বোধ হয় এখনো তা সমাধা করতে পারেন নি। আমি একটি পরীক্ষায় প্রবৃত্ত আছি―সকলেই জানেন, আমাদের দেশের গরুর গাড়ি এমন ভাবে নির্ম্মিত যে তার পিছনে ভার পড়লেই গাড়ি উঠেপড়ে এবং গরুর গলায় ফাঁস লেগে যায় আবার কোন কারণে গরু যদি পড়ে যায় তবে বোঝাই শুদ্ধ গাড়ি তার ঘাড়ের উপর গিয়ে পড়ে—এরই প্রতিকার করবার জন্যে আমি উপায় উদ্ভাবনে ব্যস্ত আছি—কৃতকার্য্য হব বলে আশা করি। আমরা মুখে গোজাতি সম্বন্ধে দয়া প্রকাশ করি অথচ প্রত্যহ সেই গরুর সহস্র অনাবশ্যক কষ্ট নিতান্ত উদাসীন ভাবে নিরীক্ষণ করে থাকি―আমার কাছে এইরূপ মিথ্যা ও শূন্য ভাবুকতার অপেক্ষা লজ্জাকর ব্যাপার জগতে আর কিছুই নেই—আমাদের সভা থেকে যদি এর কোন প্রতিকার করতে পারি তবে আমাদের সভা ধন্য হবে। আমি রাত্রে গাড়োয়ান পল্লীতে গিয়ে গোরুর অবস্থা সম্বন্ধে আলোচনা করেছি―গোরুর প্রতি অনর্থক অত্যাচার যে স্বার্থ ও ধর্ম্ম উভয়ের বিরোধী হিন্দু গাড়োয়ানদের তা বোঝান নিতান্ত কঠিন বলে বোধ হয় না। এসম্বন্ধে আমি গাড়োয়ানদের মধ্যে একটা পঞ্চায়েৎ করবার চেষ্টায় প্রবৃত্ত আছি। ঐমতা নির্ম্মলা আকস্মিক অপঘাতের আশু চিকিৎসা এবং রোগীচর্য্যা সম্বন্ধে রামরতন ডাক্তার মহাশয়ের কাছ থেকে নিয়মিত উপদেশ লাভ করছেন ―ভদ্র লোকদের মধ্যে সেই শিক্ষা ব্যাপ্ত করবার জন্যে তিনি দুই একটি অন্তঃপুরে গিয়ে শিক্ষাদানে নিযুক্ত হয়েছেন। এইরূপে প্রত্যেক সভ্যের স্বতন্ত্র ও বিশেষ চেষ্টায় আমাদের এই ক্ষুদ্র কুমার সভা সাধারণের অজ্ঞাতসারে ক্রমশই বিচিত্র সফলতা লাভ করতে থাক্‌বে এ বিষয়ে আমার কোন সন্দেহ নাই।

শ্রীশ। ওহে বিপিন, আমার কাজ ত আমি আরম্ভও করি নি।

বিপিন। আমারও ঠিক সেই অবস্থা।

শ্রীশ। কিন্তু করতে হবে।

বিপিন। আমাকেও করতে হবে।

শ্রীশ। কিছুদিন অন্য সমস্ত আলোচনা ত্যাগ না করলে চল্‌চে না।

বিপিন। আমিও তাই ভাবছি।

শ্রীশ। কিন্তু অবলাকান্ত বাবুকে ধন্য বলতে হবে—উনি যে কখন্ আপনার কাজটি করে যাচ্ছেন কিছু বোঝবার জো নেই।

বিপিন। তাই ত বড় আশ্চর্য্য! অথচ মনে হয় যেন ওঁর অন্যমনস্ক হবার বিশেষ কারণ আছে।

শ্রীশ। যাই ওঁর সঙ্গে একবার আলোচনা করে আসিগে।

(শৈলের নিকট গমন)

পূর্ণ। রসিকবাবু আপনাকে কি বলে ধন্যবাদ জানাব?

রসিক। কিছু বলবেন না, আমি এমনি বুঝে নেব। কিন্তু সকলে আমার মত নয় পূর্ণবাবু―আন্দাজে বুঝবে না, বলা কওয়ার দরকার।

পূর্ণ। আপনি আমার অন্তরের কথা বুঝে নিয়েছেন রসিকবাবু― আপনাকে পেয়ে আমি বেঁচে গেছি। আমার যা কথা তা মুখে উচ্চারণ করতেও সঙ্কোচ বোধ হয়। আপনি আমাকে পরামর্শ দিন কি করতে হবে।

রসিক। প্রথমে আপনি ওঁর কাছে গিয়ে যা-হয় একটা কিছু কথা আরম্ভ করে দিন।

পূর্ণ। ঐ দেখুন না, অবলাকান্তবাবু আবার ওঁর কাছে গিয়ে বসেচেন―

রসিক। তা হোক না, তিনি ত ওঁকে চারিদিকে ঘিরে দাঁড়ান নি। অবলাকান্তকে ত ব্যূহের মত ভেদ করে যেতে হবে না! আপনিও এক পাশে গিয়ে দাঁড়ান না!

পূর্ণ। আচ্ছা আমি দেখি!

শৈল। (নির্ম্মলার প্রতি) আমাকে এত করে বল্‌বেন না— আপনি আমার চেয়ে ঢের বেশী কাজ করচেন।―কিন্তু বেচারা পূর্ণবাবুর জন্যে আমার বড় দুঃখ হয়। আপনি আস্‌বেন বলেই উনি আজ বিশেষ উৎসাহ করে এসেছিলেন—অথচ সেটা ব্যক্ত করতে না পেরে উনি বোধ হয় অত্যন্ত বিমর্ষ হয়ে পড়েছেন। আপনি যদি ওঁকে―

নির্ম্মলা। আপনাদের অন্যান্য সভ্যদের থেকে আমাকে একটু বিশেষভাবে পৃথক্ করে দেখছেন বলে আমি বড় সঙ্কোচ বোধ করছি,― আমাকে সভ্য বলে আপনাদের মধ্যে গণ্য করবেন, মহিলা বলে স্বতন্ত্র করবেন না।

শৈল। আপনি যে মহিলা হয়ে জন্মেছেন সে সুবিধাটুকু আমাদের সভা ছাড়তে পারেন না। আপনি আমাদের সঙ্গে এক হয়ে গেলে যত কাজ হবে, আমাদের থেকে স্বতন্ত্র হলে তার চেয়ে বেশী কাজ হবে। যে লোক গুণের দ্বারা নৌকাকে অগ্রসর করে দেবে তাকে নৌকো থেকে কতকটা দুরে থাক্‌তে হবে। চন্দ্রবাবু আমাদের নৌকোর হাল ধরে আছেন তিনিও আমাদের থেকে কিছু দূরে এবং উচ্চে আছেন, আপনাকে গুণের দ্বারা আকর্ষণ কর্‌তে হবে সুতরাং আপনাকে পৃথক থাক্‌তে হবে। আমরা সব দাঁড়ির দলে বসে গেছি।

নির্ম্মলা। আপনাকেও কর্ম্মে এবং ভাবে এঁদের সকলের থেকে পৃথক্ বোধ হয়। এক দিন মাত্র দেখেই আমার দৃঢ় বিশ্বাস হচ্চে এ সভার মধ্যে আপনিই আমার প্রধান সহায় হবেন।

শৈল। সেত আমার সৌভাগ্য! এই যে আসুন পূর্ণবাবু! আমরা আপনার কথাই বল্‌ছিলাম। বসুন।

শ্রীশ। অবলাকান্তবাবু আসুন, আপনার সঙ্গে অনেক কথা বল্‌বার আছে। (জনান্তিকে লইয়া) আজ সভার পুরাতন সভ্য তিনটিকে আপনারা দুজনে লজ্জা দিয়েছেন। তা ঠিক হয়েছে—পুরাতনের মধ্যে প্রাণসঞ্চার করবার জন্যই নূতনের প্রয়োজন।

শৈল। আবার নূতন চালা কাঠে আগুন জ্বালাবার জন্যে পুরাতন ধরা কাঠের দরকার।

শ্রীশ। আচ্ছা সে বিচার পরে হবে। কিন্তু আমার সেই রুমালটি? সেটি হরণ করে আমার পরকাল খুইয়েছি আবার রুমালটিও খোয়াতে পারিনে! (পকেট হইতে বাহির করিয়া) এই আমি এক ডজন রেসমের রুমাল এনেছি, এই বদল করে নিতে হবে! এ যে তার উচিত মূল্য তা বল্‌তে পারিনে—তার উপযুক্ত মূল্য দিতে গেলে চীন জাপান উজাড় করে দিতে হয়।

শৈল। মশায়, এছলনাটুকু বোঝ্‌বার মত বুদ্ধি বিধাতা আমাকে দিয়াছেন। এ উপহার আমার জন্যে আসেও নি—যাঁর রুমাল হরণ করেছেন আমাকে উপলক্ষ করে এগুলি―

শ্রীশ। অবলাকান্তবাবু, ভগবান্ বুদ্ধি আপনাকে যথেষ্ট দিয়াছেন দেখ্‌তে পাচ্ছি কিন্তু দয়ার ভাগটা কিছু যেন কম বোধ হচ্চে― হতভাগ্যকে রুমালটি ফিরিয়ে দিলেই সেই কলঙ্কটুকু একেবারে দূর হয়।

শৈল। আচ্ছা আমি দয়ার পরিচয় দিচ্ছি—কিন্তু আপনি সভার জন্য যে প্রবন্ধ লিখ্‌তে প্রতিশ্রুত সেটা লিখে দেওয়া চাই।

শ্রীশ। নিশ্চয় দেব―রুমালটা ফিরে পেলেই কাজে মন দিতে পার্‌ব —তখন অন্য সন্ধান ছেড়ে কেবল সত্যানুসন্ধান কর্‌তে থাক্‌ব।

(ঘরের অন্যত্র) বিপিন। বুঝেছেন রসিকবাবু আমি তাঁর গানের নির্ব্বাচন চাতুরী দেখে আশ্চর্য্য হয়ে গেছি। গান যে তৈরি করেছে তার কবিত্ব থাক্‌তে পারে কিন্তু এই গানের নির্ব্বাচনে যে কবিত্ব প্রকাশ পেয়েছে তার মধ্যে ভারি একটি সৌকুমার্য্য আছে।

রসিক। ঠিক বলেছেন—নির্ব্বাচনের ক্ষমতাইত ক্ষমতা! লতায় ফুলত আপনি ফোটে, কিন্তু যে লোক মালা গাঁথে নৈপুণ্য এবং সুরুচিত তারি!

বিপিন। আপনার ও গানটা মনে আছে?

তরী আমার হঠাৎ ডুবে যায়
কোন্ পাথারে কোন্ পাষাণের দায়!
নবীন তরী নতুন চলে,
দিইনি পাড়ি অগাধ জলে,
বাহি তারে খেলার ছলে কিনার কিনারায়!
তরী আমার হঠাৎ ডুবে যায়!
ভেসে ছিল স্রোতের ভরে
একা ছিলেম কর্ণ ধরে
লেগে ছিল পালের পরে মধুর মৃদু বায়।

সুখে ছিলেম আপন মনে,
মেঘ ছিল না গগন কোণে;
লাগ্‌বে তরী কুসুম বনে ছিলাম সে আশায়।
তরী আমার হঠাৎ ডুবে যায়!

রসিক। যাক্ ডুবে, কি বলেন বিপিনবাবু!

বিপিন। যাক্‌গে! কিন্তু কোথায় ডুব্‌ল তার একটু ঠিকানা রাখা চাই। আচ্ছা রসিকবাবু এ গানটা তিনি কেন খাতায় লিখে রাখ্‌লেন?

রসিক। স্ত্রী-হৃদয়ের রহস্য বিধাতা বোঝেন না এই রকম একটা প্রবাদ আছে, রসিক বাবুত তুচ্ছ।

শ্রীশ। (নিকটে আসিয়া) বিপিন, তুমি চন্দ্র বাবুর কাছে একবার যাও! বাস্তবিক, আমাদের কর্ত্তব্যে আমরা ঢিলে দিয়েছি—ওঁর সঙ্গে একটু আলোচনা করলে উনি খুসি হবেন।

বিপিন। আচ্ছা। (প্রস্থান)

শ্রীশ। হাঁ, আপনি সেই যে শেলাইয়ের কথা বল্‌ছিলেন―উনি বুঝি নিজের হাতে সমস্ত গৃহ কর্ম্ম করেন?

রসিক। সমস্তই।

শ্রীশ। আপনি বুঝি সে দিন গিয়ে দেখ্‌লেন তাঁর কোলে বালিশের ওয়াড়গুলো পড়ে রয়েছে আর তিনি―

রসিক। মাথা নীচু করে ছুঁচে সূতো পরাচ্ছিলেন।

শ্রীশ। ছুঁচে সূতো পরাচ্ছিলেন। তখন স্নান করে এসেছেন বুঝি?

রসিক। বেলা তখন তিনটে হবে।

শ্রীশ। বেলা তিনটে। তিনি বুঝি তাঁর খাটের উপর বসে―

রসিক। না খাটে নয়—বারান্দার উপর মাদুর বিছিয়ে―

শ্রীশ। বারান্দায় মাদুর বিছিয়ে বসে ছুঁচে সূতো পরাচ্ছিলেন-

রসিক। হাঁ ছুঁচে সুতো পরাচ্ছিলেন। (স্বগত) আর ত পারা যায় না।

শ্রীশ। আমি যেন ছবির মত স্পষ্ট দেখতে পাচ্চি―পা দুটি ছড়ানো, মাথা নীচু, খোলা চুল মুখের উপর এসে পড়েছে—বিকেল বেলার আলো―

বিপিন। (নিকটে আসিয়া) চন্দ্রবাবু তোমার সঙ্গে তোমার সেই প্রবন্ধটা সম্বন্ধে কথা কইতে চান। (শ্রীশের প্রস্থান) রসিক বাবু।

রসিক। (স্বগত) আর কত বক্‌ব?

(অন্য প্রান্তে) নির্ম্মলা। (পূর্ণর প্রতি) আপনার শরীর আজ বুঝি তেমন ভাল নেই।

পূর্ণ। না, বেশ আছে—হাঁ, একটু ইয়ে হয়েছে বটে—বিশেষ কিছু নয়—তবু একটু ইয়ে বই কি―তেমন বেশ—(কাশি) আপনার শরীর বেশ ভাল আছে?

নির্ম্মলা। হাঁ।

পূর্ণ। আপনি—জিজ্ঞাসা করছিলুম যে আপনি― আপনি আপনার ইয়ে কি রকম বোধ হয় ঐ যে—মিল্‌টনের আরিয়োপ্যাজিটিকা—ওটা কিনা আমাদের এম, এ, কোর্সে আছে ওটা আপনার বেশ ইয়ে বোধ হয় না?

নির্ম্মলা। আমি ওটা পড়িনি।

পূর্ণ। পড়েন নি? (নিস্তব্ধ) ইয়ে হয়েছে—আপনি—এবারে কি রকম গরম পড়েছে—আমি একবার রসিকবাবু—রসিকবাবুর সঙ্গে আমার একটু দরকার আছে। (নির্ম্মলার নিকট হইতে প্রস্থান)

(ঘরের অন্যত্র) বিপিন। রসিকবাবু, আচ্ছা, আপনার কি মনে হয় ওগানটা তিনি বিশেষ কিছু মনে করে লিখেছেন।

রসিক। হতেও পারে! আপনি আমাকে সুদ্ধ ধোঁকা লাগিয়ে দিলেন যে! পূর্ব্বে ওটা ভাবিনি।

বিপিন। “তরী আমার হঠাৎ ডুবে যায় কোন্ পাথারে কোন্ পাষাণের ঘায়!”

আচ্ছা রসিক বাবু এখানে তরী বল্‌তে ঠিক কি বোঝাচ্চে?

রসিক। হৃদয় বোঝাচ্চে তার আর সন্দেহ নেই। তবে ঐ পাথারটা কোথায় আর পাষাণটা কে সেইটেই ভাববার বিষয়!

পূর্ণ। (নিকটে আসিয়া) বিপিনবাবু, মাপ করবেন―রসিকবাবুর সঙ্গে আমার একটি কথা আছে—যদি―

বিপিন। বেশ, বলুন, আমি যাচ্চি।

(প্রস্থান)

পূর্ণ। আমার মত নির্ব্বোধ জগতে নেই রসিকবাবু!

রসিক। আপনার চেয়ে ঢের নির্ব্বোধ আছে যারা নিজেকে বুদ্ধিমান বলে জানে—যথা আমি।

পূর্ণ। একটু নিরালা পাই যদি আপনার সঙ্গে অনেক কথা আছে, সভা ভেঙে গেলে আজ রাত্রে একটু অবসর করতে পারেন?

রসিক। বেশ কথা।

পূর্ণ। আজ দিব্য জ্যোৎস্না আছে গোলদিঘির ধারে—কি বলেন?

রসিক। (স্বগত) কি সর্ব্বনাশ!

শ্রীশ। (নিকটে আসিয়া) ওঃ পূর্ণবাবু কথা কচ্চেন বুঝি। আচ্ছা এখন থাক্। রাত্রে আপনার অবসর হবে রসিকবাবু?

রসিক। তা হতে পারে।

শ্রীশ। তা হলে কালকের মত ―কি বলেন? কাল দেখ্‌লেন ত ঘরের চেয়ে পথে জমে ভাল।

রসিক। জমে বৈ কি! (স্বগত) সর্দ্দি জমে, কাশি জমে, গলার স্বর দইয়ের মত জমে যায় (শ্রীশের প্রস্থান)

পূর্ণ। আচ্ছা রসিকবাবু আপনি হলে কি বলে কথা আরম্ভ করতেন?

রসিক। হয় ত বলতুম—সেদিন বেলুন উড়ে ছিল আপনাদের বাড়ির ছাত থেকে দেখতে পেয়েছিলেন কি?

পূর্ণ। তিনি যদি বল্‌তেন হাঁ―

রসিক। আমি বলতুম, মনকে ওড়বার অধিকার দিয়াছেন বলেই ঈশ্বর মানুষের শরীরে পাখা দেন নি—শরীরকে বদ্ধ রেখে বিধাতা মনের আগ্রহ কেবল বাড়িয়ে দিয়েছেন―

পূর্ণ। বুঝেছি রসিকবাবু—চমৎকার—এর থেকে অনেক কথার সৃষ্টি হতে পারে।

বিপিন। (নিকটে আসিয়া) পূর্ণবাবুর সঙ্গে কথা হচ্চে। থাক্ তবে আমাদের সেই যে একটা কথা ছিল সেটা আজ রাত্রে হবে, কি বলেন?

রসিক। সেই ভাল।

বিপিন। জ্যোৎস্নায় রাস্তায় বেড়াতে বেড়াতে দিব্যি আরামে কি বলেন?

রসিক। খুব আরাম। (স্বগত) কিন্তু বেয়ারামটা তার পরে।

শৈল। (নির্ম্মলার প্রতি) তা বেশ, আপনি যদি ইচ্ছা করেন আমিও ঐ বিষয়টার আলোচনা করে দেখব। ডাক্তারী আমি অল্প অল্প চর্চ্চা করেছি―বেশী নয়—কিন্তু আমি যোগদান করলে আপনার যদি উৎসাহ হয় আমি প্রস্তুত আছি।

(অন্যত্র) পূর্ণ। (নিকটে আসিয়া) সে দিন বেলুন উড়েছিল আপনি কি ছাদের উপর থেকে দেখতে পেয়েছিলেন?

নির্মলা। বেলুন?

পূর্ণ। হাঁ ঐ বেলুন (সকলে নিরুত্তর) রসিকবাবু বলছিলেন আপনি বোধ হয় দেখে থাক্‌বেন—আমাকে মাপ করবেন আপনাদের আলোচনায় আমি ভঙ্গ দিলুম―আমি অত্যন্ত হতভাগ্য।

(১২)

পূর্ব্বদিনে পুরবালা তাহার মাতার সহিত কাশী হইতে ফিরিয়া আসিয়াছে।

অক্ষয় কহিলেন, দেবি, যদি অভয় দাও ত একটি প্রশ্ন আছে।

পুরবালা। কি শুনি।

অক্ষয়। শ্রীঅঙ্গে কৃশতার ত কোন লক্ষণ দেখচিনে।

পুরবালা। শ্রীঅঙ্গ ত কৃশ হবার জন্যে পশ্চিমে বেড়াতে যায় নি।

অক্ষয়। তবে কি বিরহবেদনা বলে জিনিষটা মহাকবি কালিদাসের সঙ্গে সহমরণে মরেচে?

পুরবালা। তার প্রমাণ তুমি। তোমারও ত স্বাস্থ্যের বিশেষ ব্যাঘাত হয় নি দেখচি!

অক্ষয়। হতে দিল কই? তোমার তিন ভগ্নী মিলে অহরহ আমার কৃশতা নিবারণ করে রেখেছিল—বিরহ যে কাকে বলে সেটা আর কোন মতেই বুঝতে দিলে না।

(পিলু)

বিরহে মরিব বলে ছিল মনে পণ।
কে তোরা বাহুতে বাঁধি করিলি বারণ?
ভেবেছিনু অশ্রুজলে, ডুবিব অকূল তলে
কাহার সোনার তরী করিল তারণ?

প্রিয়ে, কাশীধামে বুঝি পঞ্চশর ত্রিলোচনের ভয়ে এগোতে পারেন না?

পুরবালা। তা হতে পারে—কিন্তু কলকাতায় তাঁর ত যাতায়াত আছে।

অক্ষয়। তা আছে—কোম্পানির শাসন তিনি মানেন না, আমি তার প্রমাণ পেয়েছি।

নৃপ ও নীরর প্রবেশ।

নীর। দিদি!

অক্ষয়। এখন দিদি বই আর কথা নেই, অকৃতজ্ঞ! দিদি যখন বিচ্ছেদ দহনে উত্তরোত্তর তপ্ত কাঞ্চনের মত শ্রী ধারণ করছিলেন তখন তোমদের ক’টিকে সুশীতল করে রেখেছিল কে?

নীর। শুন্‌চ দিদি! এমন মিথ্যে কথা! তুমি যতদিন ছিলে না আমাদের একবার ডেকেও জিজ্ঞাসা করেন নি—কেবল চিঠি লিখেছেন আর টেবিলের উপর দুই পা তুলে দিয়ে বই হাতে করে পড়েচেন। তুমি এসেছ এখন আমাদের নিয়ে গান হবে, ঠাট্টা হবে, দেখাবেন যেন―

নৃপ। দিদি, তুমিও ত ভাই এতদিন আমাদের একখানিও চিঠি লেখনি?

পুরবালা। আমার কি সময় ছিল ভাই? মাকে নিয়ে দিনরাত ব্যস্ত থাক্‌তে হয়েছিল।

অক্ষয়। যদি বল্‌তে, তোদের ভগ্নীপতির ধ্যানে নিমগ্ন ছিলুম তা হলে কি লোকে নিন্দে করত?

নীর। তা হলে ভগ্নীপতির আস্পর্দ্ধা আরো বেড়ে যেত। মুখুজ্জেমশায়, তুমি তোমার বাইরের ঘরে যাও না! দিদি এতদিন পরে এসেছেন আমরা কি ওঁকে নিয়ে একটু গল্প করতে পাব না?

অক্ষয়। নৃশংসে, বিরহদাবদগ্ধ তোর দিদিকে আবার বিরহে জ্বালাতে চাস্? তোদের ভগ্নীপতিরূপ ঘনকৃষ্ণ মেঘ মিলনরূপ মুষল ধারাবর্ষণ দ্বারা প্রিয়ার চিত্তরূপ লতানিকুঞ্জে আনন্দরূপ কিসলয়োদ্‌গম করে প্রেমরূপ বর্ষায় কটাক্ষরূপ বিদ্যুৎ―

নীর। এবং বকুনিরূপ ভেকের কলরব―

শৈলর প্রবেশ।

অক্ষয়। এস এস—উত্তমাধ্যমমধ্যমা এই তিন শালী না হলে আমার―

নীর। উত্তম মধ্যম হয় না।

শৈল। (নৃপ ও নীরর প্রতি) তোরা ভাই একটু যা ত, আমাদের কথা আছে।

অক্ষয়। কথাটা কি বুঝতে পারচিস্ ত নীরু? হরিনাম কথা নয়।

নীর। আচ্ছা, তোমার আর বক্‌তে হবে না! (নৃপ ও নীরর প্রস্থান)

শৈল। দিদি, নৃপ নীরর জন্যে মা দুটি পাত্র তা হলে স্থির করেচেন?

পুর। হাঁ, কথা একরকম ঠিক হয়ে গেছে। শুনেছি ছেলে দুটি মন্দ নয়—তারা মেয়ে দেখে পছন্দ করলেই পাকাপাকি হয়ে যাবে।

শৈল। যদি পছন্দ না করে?

পুর। তা হলে তাদের অদৃষ্ট মন্দ।

অক্ষয়। এবং আমার শ্যালী দুটির অদৃষ্ট ভাল।

শৈল। নৃপ নীরু যদি পছন্দ না করে?

অক্ষয়। তা হলে ওদের রুচির প্রশংসা করব।

পুর। পছন্দ আবার না করবে কি? তোদের সব বাড়াবাড়ি, স্বয়ম্বরার, দিন গেছে। মেয়েদের পছন্দ করবার দরকার হয় না—স্বামী হলেই তাকে ভালবাস্‌তে পারে।

অক্ষয়। নইলে তোমার বর্ত্তমান ভগ্নীপতির কি দুর্দ্দশাই হত শৈল?

জগত্তারিণীর প্রবেশ।

জগৎ। বাবা অক্ষয়, ছেলে দুটিকে তা হলে খবর দিতে হয়। তারা ত আমাদের বাড়ির ঠিকানা জানে না।

অক্ষয়। বেশ ত মা, রসিক দাদাকে পাঠিয়ে দেওয়া যাক্।

জগৎ। পোড়া কপাল! তোমার রসিক দাদার যে রকম বুদ্ধি! তিনি কাকে আন্‌তে কাকে আন্‌বেন ঠিক নেই!

পুর। তা মা, তুমি কিছু ভেবো না। ছেলে দুটিকে আনাবার ব্যবস্থা করে দেব।

জগৎ। মা পুরী, তুই একটু মনোযোগ না করলে হবে না। আজকালকার ছেলে, তাদের সঙ্গে কি রকম ব্যাভার করতে হয় না হয় আমি কিছুই বুঝিনে।

অক্ষয়। (জনান্তিকে) পুরীর হাতযশ আছে! পুরী তার মার জন্যে যে জামাইটি জুটিয়েছেন, পসার খুব বেড়ে গেছে! আজকালকার ছেলে কি করে বশ করতে হয় সে বিদ্যে―

পুর। (জনান্তিকে) মশায় বুঝি আজকালকার ছেলে?

জগৎ। মা, তোমরা পরামর্শ কর, কায়েত দিদি এসে বসে আছেন, আমি তাঁকে বিদায় করে আসি।

শৈল। মা, তুমি একটু বিবেচনা করে দেখ—ছেলে দুটিকে এখনো তোমরা কেউ দেখনি, হঠাৎ―

জগৎ। বিবেচনা করতে করতে আমার জন্ম শেষ হয়ে এল―আর বিবেচনা করতে পারিনে―

অক্ষয়। বিবেচনা সময় মত এর পরে করলেই হবে, এখন কাজটা আগে হয়ে যাক্।

জগৎ। বল্ত বাবা, শৈলকে বুঝিয়ে বলত! (প্রস্থান)

পুর। মিথ্যে তুই ভাবছিস্ শৈল,―মা যখন মনস্থির করেচেন ওঁকে আর কেউ টলাতে পারবে না। প্রজাপতির নির্ব্বন্ধ আমি মানি ভাই―যার সঙ্গে যার হবার, হাজার বিবেচনা করে মলেও, সে হবেই।

অক্ষয়। সেত ঠিক কথা―নইলে যার সঙ্গে যার হয়ে থাকে তার সঙ্গে না হয়ে আর একজনের সঙ্গে হত।

পুর। কি যে তর্ক কর তোমার অর্দ্ধেক কথা বোঝাই যায় না।

অক্ষয়। তার কারণ আমি নির্ব্বোধ।

পুর। যাও এখন স্নান করতে যাও, মাথা ঠাণ্ডা করে এস গে!

(প্রস্থান)

রসিকের প্রবেশ।

শৈল। রসিক দাদা, শুনেছ ত সব? মুস্কিলে পড়া গেছে।

রসিক। মুস্কিল কিসের? কুমার সভারও কৌমার্য্য রয়ে গেল নৃপ নীরুও পার পেলে, সব দিক রক্ষা হল।

শৈল। কোন দিক রক্ষা হয় নি।

রসিক। অন্ততঃ এই বুড়োর দিকটা রক্ষা হয়েছে—দুটো অর্ব্বাচীনের সঙ্গে মিশে আমাকে রাত্রে রাস্তায় দাঁড়িয়ে শ্লোক আওড়াতে হবে না।

শৈল। মুখুজ্জে মশায়, তুমি না হলে রসিক দাদাকে কেউ শাসন করতে পারে না―উনি আমাদের কথা মানেন না।

অক্ষয়। যে বয়সে তোমাদের কথা বেদবাক্য বলে মান্‌তেন সে বয়স পেরিয়েছে কি না তাই লোকটা বিদ্রোহ করতে সাহস করচে। আচ্ছা আমি ঠিক করে দিচ্চি। চল ত রসিক দা, আমার বাইরের ঘরটাতে বসে তামাক নিয়ে পড়া যাক্।

(১৩)

ওস্তাদ্ আসীন। তানপূরা হস্তে বিপিন অত্যন্ত বেসুরা গলায় সা রে গা মা সাধিতেছেন। ভৃত্য আসিয়া খবর দিল—একটি বাবু এসেছেন।

বিপিন। বাবু? কি রকম বাবু রে?

ভৃত্য। বুড়ো লোকটি।

বিপিন। মাথায় টাক আছে?

ভৃত্য। আছে।

বিপিন। (তানপূরা রাখিয়া) নিয়ে আয় এখনি নিয়ে আয়! ওরে তামাক দিয়ে যা! বেহারাটা কোথায় গেল, পাখা টান্‌তে বলে দে। আর দেখ্‌ চট্‌ করে গোটাকতক মিঠে পানের দোনা কিনে আন্‌ত রে! দেরি করিসনে, আর, আধসের বরফ নিয়ে আসিস্‌, বুঝেচিস্‌, (পদশব্দ শুনিয়া) রসিক বাবু আসুন্!

বনমালীর প্ররেশ।

বিপিন। রসিক বাবু—এ যে সেই বনমালী!

বৃদ্ধ। আজ্ঞে, হাঁ আমার নাম বনমালী ভট্টাচার্য্য।

বিপিন। সে পরিচয় অনাবশ্যক। আমি একটু বিশেষ কাজে আছি!

বনমালী। মেয়ে দুটিকে আর রাখা যায় না―পাত্রও অনেক আস্‌চে―

বিপিন। শুনে খুসি হলেম—দিয়ে ফেলুন্ দিয়ে ফেলুন্―

বনমালী। কিন্তু আপনাদেরি ঠিক উপযুক্ত হত―

বিপিন। দেখুন বনমালী বাবু এখনো আপনি আমার সম্পূর্ণ পরিচয় পাননি—যদি একবার পান তা হলে আমার উপযুক্ততা সম্বন্ধে আপনার ভয়ানক সন্দেহ হবে!

বন। তাহলে আমি উঠি, আপনি ব্যস্ত আছেন, আরেক সময় আস্‌ব।

বিপিন। (তানপূরা তুলিয়া লইয়া) সারে গা, রেগামা, গামাপা,―

শ্রীশের প্রবেশ।

শ্রীশ। কিহে বিপিন―একি? কুস্তি ছেড়ে দিয়ে গান ধরেছ?

বিপিন। (শিক্ষকের প্রতি) ওস্তাদ্‌জি আজ ছুটি। কাল বিকেলে

এস! (ওস্তাদের প্রস্থান) কি করব বল, গান না শিখ্‌লে ত আর তোমার সন্ন্যাসীদলে আমল পাওয়া যাবে না।

শ্রীশ। আচ্ছা, তুমি যে সারেগামা সাধ্‌তে বসেছ, কুমার সভার সেই লেখাটায় হাত দিতে পেরেছ?

বিপিন। ভাই সেটাতে এখনো হাত দিতে পারিনি। তোমার লেখাটি হয়ে গেছে নাকি?

শ্রীশ। না আমিও হাত দিইনি! (কিয়ৎক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া) ভাই ভারি অন্যায় হচ্চে। ক্রমেই আমরা আমাদের সঙ্কল্প থেকে যেন দুরে চলে যাচ্চি।

বিপিন। অনেক সঙ্কল্প ব্যাঙাচির ল্যাজের মত, পরিণতির সঙ্গে সঙ্গে আপনি অন্তর্দ্ধান করে। কিন্তু যদি ল্যাজ টুকুই থেকে যেত, আর ব্যাংটা যেত শুকিয়ে, সে কি রকম হত? এক সময়ে একটা সংকল্প করেছিলেম বলেই যে সেই সংকল্পের খাতিরে নিজেকে শুকিয়ে মারতে হবে আমি ত তার মানে বুঝিনে।

শ্রীশ। আমি বুঝি! অনেক সংকল্প আছে যার কাছে নিজেকে শুকিয়ে মারাও শ্রেয়! অফলা গাছের মত আমাদের ডালে পালায় প্রতি দিন যেন অতিরিক্ত পরিমাণ রস সঞ্চার হচ্ছে এবং সফলতার আশা প্রতি দিন যেন দূর হয়ে যাচ্চে। আমি ভুল করেছিলুম ভাই বিপিন―সব বড় কাজেই তপস্যা চাই, নিজেকে নানা ভোগ থেকে বঞ্চিত না করলে, নানা দিক থেকে প্রত্যাহার করে না আন্‌তে পারলে চিত্তকে কোন মহৎ কাজে সম্পূর্ণভাবে নিযুক্ত করা যায় না—এবার থেকে রসচর্চ্চা একেবারে পরিত্যাগ করে কঠিন কাজে হাত দেব―এই রকম প্রতিজ্ঞা করেছি।

বিপিন। তোমার কথা মানি। কিন্তু সব তৃণেইত ধান ফলে না— শুকতে গেলে কেবল নাহক্ শুকিয়ে মরাই হবে ফল ফলবে না। কিছু দিন থেকে আমার মনে হচ্চে আমরা যে সংকল্প গ্রহণ করেছি সে সংকর আমাদের দ্বারা সফল হবে না—অতএব আমাদের স্বভাবসাধ্য অন্য কোন রকম পথ অবলম্বন করাই শ্রেয়।

শ্রীশ। এ কোন কাজের কথা নয়। বিপিন তোমার তম্বুরা ফেল—

বিপিন। আচ্ছা ফেল্লুম, তাতে পৃথিবীর কোন ক্ষতি হবে না।

শ্রীশ। চন্দ্র বাবুর বাসায় আমাদের সভা তুলে নিয়ে যাওয়া যাক্―

বিপিন। উত্তম কথা।

শ্রীশ। আমরা দুজনে মিলে রসিক বাবুকে একটু সংযত করে রাখ্‌ব।

বিপিন। তিনি একলা আমাদের দুজনকে অসংযত করে না তোলেন।

দ্বিতীয় ভৃত্যের প্রবেশ।

ভৃত্য। একটি বুড়ো বাবু এসেছেন।

বিপিন। বুড়ো বাবু? জ্বালালে দেখ্‌চি! বনমালী আবার এসেছে!

শ্রীশ। বনমালী?সে যে এই খানিকক্ষণ হল আমার কাছেও এসেছিল!

বিপিন। ওরে, বুড়োকে বিদায় করে দে।

শ্রীশ। তুমি বিদায় করলে আবার আমার ঘাড়ের উপর গিয়ে পড়বে। তার চেয়ে ডেকে আনুক্ আমরা দুজনে মিলে বিদায় করে দিই। (ভৃত্যের প্রতি) বুড়োকে নিয়ে আয়!

রসিকের প্রবেশ।

বিপিন। একি! এত বনমালী নয়, এযে রসিক বাবু!

রসিক। আজ্ঞে হাঁ,—আপনাদের আশ্চর্য্য চেনবার শক্তি—আমি বনমালী নই। ধীর সমীরে যমুনা তীরে বসতি বনে বনমালী―

শ্রীশ। না রসিক বাবু, ও সব নয়, রসালাপ আমরা বন্ধ করে দিয়েছি!

রসিক। আঃ বাঁচিয়েছেন!

শ্রীশ। অন্য সকল প্রকার অলোেচনা পরিত্যাগ করে এখন থেকে আমরা একান্ত মনে কুমার সভার কাজে লাগ্‌ব।

রসিক। আমারও সেই ইচ্ছে।

শ্রীশ। বনমালী বলে এক জন বুড়ো কুমোরটুলির নীলমাধব চৌধুরীর দুই কন্যার সঙ্গে আমাদের বিবাহের প্রস্তাব নিয়ে উপস্থিত হয়েছিল আমরা তাকে সংক্ষেপে বিদায় করে দিয়েছি—এ সকল প্রসঙ্গও আমাদের কাছে অসঙ্গত বোধ হয়।

রসিক। আমার কাছেও ঠিক তাই। বনমালী যদি দুই বা ততোধিক কন্যার বিবাহের প্রস্তাব নিয়ে আমার কাছে উপস্থিত হতেন তবে বোধ হয় তাঁকে নিষ্ফল হয়ে ফির্‌তে হত!

বিপিন। রসিক বাবু কিছু জলযোগ করে যেতে হবে!

রসিক। না মশায়, আজ থাক্। আপনাদের সঙ্গে দুটো একটা বিশেষ কথা ছিল কিন্তু কঠিন প্রতিজ্ঞার কথা শুনে সাহস হচ্চে না।

বিপিন। (সাগ্রহে) না, না, তাই বলে কথা থাক্‌লে বল্‌বেন না কেন?

শ্রীশ। আমাদের যতটা ঠাওরাচ্চেন ততটা ভয়ঙ্কর নই। কথাটা কি বিশেষ করে আমার সঙ্গে?

বিপিন। না, সে দিন যে রসিক বাবু বলছিলেন আমারি সঙ্গে ওঁর দুটো একটা আলোচনার বিষয় আছে।

রসিক। কাজ নেই থাক্!

শ্রীশ। বলেন ত আজ রাত্রে গোলদিঘির ধারে—

রসিক। না শ্রীশ বাবু মাপ করবেন।

শ্রীশ। বিপিন ভাই, তুমি একটু ও ঘরে যাও না, বোধ হয় তোমার সাক্ষাতে রসিক বাবু―

রসিক। না না দরকার কি―

বিপিন। তার চেয়ে রসিক বাবু, তেতালার ঘরে চলুন―শ্রীশ এখানে একটু অপেক্ষা করবেন এখন!

রসিক। না আপনারা দুজনেই বসুন—আমি উঠি।

বিপিন। সে কি হয়! কিছু খেয়ে যেতে হবে।

শ্রীশ। না আপনাকে কিছুতেই ছাড়চিনে! সে হবে না।

রসিক। তবে কথাটা বলি। নৃপবালা নীরবালার কথা ত পূর্ব্বেই আপনারা শুনছেন

শ্রীশ। শুনেছি বই কি-তা নৃপবালার সম্বন্ধে যদি কিছু―

বিপিন। নীরবালার কোন বিশেষ সংবাদ―

রসিক। তাঁদের দুজনের সম্বন্ধেই বিশেষ চিন্তার কারণ হয়ে পড়েছে।

উভয়ে। অসুখ নয় ত?

রসিক। তার চেয়ে বেশি। তাঁদের বিবাহের সম্বন্ধ―

শ্রীশ। বলেন কি রসিক বাবু? বিবাহের ত কোন কথা শোনা যায় নি―

রসিক। কিচ্ছু না―হঠাৎ মা কাশী থেকে এসে দুটো অকাল কুম্মাণ্ডের সঙ্গে মেয়ে দুটির বিবাহ স্থির করেছেন―

বিপিন। এ ত কিছুতেই হতে পারে না রসিক বাবু!

রসিক। মশায়, পৃথিবীতে যেটা অপ্রিয় সেইটেরই সম্ভাবনা বেশি! ফুল গাছের চেয়ে আগাছাই বেশি সম্ভবপর।

বিপিন। কিন্তু মশায়, আগাছা উৎপাটন করতে হবে―

শ্রীশ। ফুলগাছ রোপণ কর্‌তে হবে―

রসিক। তা ত বটেই—কিন্তু করে কে মশায়?

শ্রীশ। আমরা কর্‌ব। কি বল বিপিন?

বিপিন। নিশ্চয়ই।

রসিক। কিন্তু কি করবেন?

বিপিন। যদি বলেন ত সেই ছেলে দুটোকে পথের মধ্যে―

রসিক। বুঝেছি। সেটা মনে করলেও শরীর পুলকিত হয়। কিন্তু বিধাতার বরে অপাত্র জিনিষটা অমর―দুটো গেলে আবার দশটা আস্‌বে।

বিপিন। এদের দুটোকে যদি ছলে বলে কিছুদিন ঠেকিয়ে রাখতে পারি তাহলে ভাব্‌বার সময় পাওয়া যাবে।

রসিক। ভাববার সময় সঙ্কীর্ণ হয়ে এসেছে। এই শুক্রবারে তারা মেয়ে দেখ্‌তে আস্‌বে।

বিপিন। এই শুক্রবারে?

শ্রীশ। সে ত পর্শু।

রসিক। আজ্ঞে পর্শুই ত বটে—শুক্রবারকে ত পথের মধ্যে ঠেকিয়ে রাখা যায় না।

শ্রীশ। আচ্ছা আমার একটা প্ল্যান্ মাথায় এসেছে।

রসিক। কি রকম, শুনি!

শ্রীশ। সেই ছেলে দুটোকে বাড়ির কেউ চেনে?

রসিক। কেউ না।

শ্রীশ। তারা বাড়ি চেনে?

রসিক। তাও না।

শ্রীশ। তাহলে বিপিন যদি সেদিন তাদের কোন রকম করে আট্‌কে রাখতে পারেন আমি তাদের নাম নিয়ে নৃপবালাকে―

বিপিন। জানই ত ভাই, আমার কোন রকম কৌশল মাথায় আসে না—তুমি ইচ্ছে করলে কৌশলে ছেলে দুটোকে ভুলিয়ে রাখতে পারবে― আমি বরঞ্চ নিজেকে তাদের নামে চালিয়ে দিয়ে নীরবালাকে―

রসিক। কিন্তু মশায়, এ স্থলে ত গৌরবে বহুবচন খাট্‌বে না― দুটি ছেলে আসবার কথা আছে, আপনাদের একজনকে দুজন বলে চালানো আমার পক্ষে কঠিন হবে―

শ্রীশ। ও, তা বটে!

বিপিন। হাঁ সে কথা ভুলেছিলেম।

শ্রীশ। তা হলে ত আমাদের দুজনকেই যেতে হয়। কিন্তু―

রসিক। সে দুটোকে ভুল রাস্তায় চালান করে দিতে আমিই পারব। কিন্তু আপনারা―

বিপিন। আমাদের জন্যে ভাববেন না রসিক বাবু।

শ্রীশ। আমরা সব তাতেই প্রস্তুত আছি।

রসিক। আপনারা মহৎ লোক—এ রকম ত্যাগ স্বীকার―

শ্রীশ। বিলক্ষণ! এর মধ্যে ত্যাগ স্বীকার কিছুই নেই!

বিপিন। এ ত আনন্দের কথা!

রসিক। না না তবু ত মনে আশঙ্কা হতে পারে যে, কি জানি নিজের ফাঁদে যদি নিজেই পড়তে হয়!

শ্রীশ। কিছু না মশায়, কোন আশঙ্কায় ডরাই নে।

বিপিন। আমাদের যাই ঘটুক্ তাতেই আমরা সুখী হব।

রসিক। এ ত আপনাদের মহত্ত্বের কথা, কিন্তু আমার কর্ত্তব্য আপনাদের রক্ষা করা। তা আমি আপনাদের কথা দিচ্চি এই শুক্রবারের দিনটা আপনারা কোনমতে উদ্ধার করে দিন―তার পরে আপনাদের আর কোন বিরক্ত করব না—আপনার সম্পূর্ণ স্বাধীন হবেন—আমরাও সন্ধান করে ইতিমধ্যে আর দুটি সৎপাত্র জোগাড় করব!

শ্রীশ। আমাদের বিরক্ত করবেন না এ কথা শুনে দুঃখিত হলেম রসিক বাবু!

রসিক। আচ্ছা, করব।

বিপিন। আমরা কি নিজের স্বাধীনতার জন্যেই কেবল ব্যস্ত? আমাদের এতই স্বার্থপর মনে করেন?

রসিক। মাপ করবেন—আমার ভুল ধারণা ছিল।

শ্রীশ। আপনি যাই বলুন, ফস্ করে ভাল পাত্র পাওয়া বড় শক্ত!

রসিক। সেই জন্যেই ত এতদিন অপেক্ষা করে শেষে এই বিপদ! বিবাহের প্রসঙ্গমাত্রই আপনাদের কাছে অপ্রিয় তবু দেখুন্ আপনাদের সুদ্ধ―

বিপিন। সে জন্যে কিছু সঙ্কোচ করবেন না―

শ্রীশ। আপনি যে আর কারো কাছে না গিয়ে আমাদের কাছে এসেচেন, সেজন্যে অন্তরের সঙ্গে ধন্যবাদ দিচ্চি!

রসিক। আমি আর আপনাদের ধন্যবাদ দেব না! সেই কন্যা দুটির চিরজীবনের ধন্যবাদ আপনাদের পুরষ্কৃত করবে।

বিপিন। ওরে পাখাটা টান্।

শ্রীশ। রসিক বাবুর জন্যে যে জলখাবার আনাবে বলেছিলে―

বিপিন। সে এল বলে! ততক্ষণ এক গ্লাস বরফ দেওয়া জল খান―

শ্রীশ। জল কেন লেমনেড আনিয়ে দাও না। (পকেট্ হইতে টিনের বাক্স বাহির করিয়া) এই নিন্ রসিক বাবু পান খান্!

বিপিন। ওদিকে কি হাওয়া পাচ্ছেন? এই তাকিয়াটা নিন্ না।

শ্রীশ। আচ্ছা, রসিকবাবু, নৃপবালা, বুঝি খুব বিষন্ন হয়ে পড়েছেন―

বিপিন। নীরবালাও অবশ্য খুব―

রসিক। সে আর বল্‌তে।

শ্রীশ। নৃপবালা বুঝি কান্নাকাটি করচেন?

বিপিন। আচ্ছা নীরবালা তাঁর মাকে কেন একটু ভাল করে বুঝিয়ে বলেন না―

রসিক। (স্বগত) ঐরে শুরু হ’ল? আমার লেমনেডে কাজ নাই! (প্রকাশ্যে) মাপ করবেন, আমায় কিন্তু এখনি উঠতে হচ্ছে!

শ্রীশ। বলেন কি?

বিপিন। সে কি হয়?

রসিক। সেই ছেলে দুটোকে ভুল ঠিকানা দিয়ে আস্‌তে হবে নইলে—

শ্রীশ। বুঝেছি, তা হলে এখনি যান্!

বিপিন। তা হলে আর দেরি করবেন না!


(১৪)

নির্ম্মল বাতায়নতলে আসীন। চন্দ্রের প্রবেশ।

চন্দ্র। (স্বগত) বেচারা নির্ম্মল বড় কঠিন ব্রত গ্রহণ করেছে। আমি দেখচি ক’দিন ধরে ও চিন্তায় নিমগ্ন হয়ে রয়েছে; স্ত্রীলোক, মনের উপর এতটা ভার কি সহ্য কর্‌তে পারবে? (প্রকাশ্যে) নির্ম্মল!

নির্ম্মলা। (চমকিয়া) কি মামা!

চন্দ্র। সেই লেখাটা নিয়ে বুঝি ভাবচ? আমার বোধহয় অধিক না ভেবে মনকে দুই একদিন বিশ্রাম দিলে লেখার পক্ষে সুবিধা হতে পারে।

নির্ম্মলা। (লজ্জিত হইয়া) আমি ঠিক ভাবছিলুম না মামা। আমার এতক্ষণ সেই লেখায় হাত দেওয়া উচিত ছিল, কিন্তু এই ক’দিন থেকে গরম পড়ে দক্ষিণে হাওয়া দিতে আরম্ভ করেছে, কিছুতেই যেন মন বসাতে পারচিনে—ভারি অন্যায় হচ্চে আজ আমি যেমন করে হোক্—

চন্দ্র। না, না, জোর করে চেষ্টা কোরো না। আমার বোধ হয় নির্ম্মল, বাড়িতে কেউ সঙ্গিনী নেই, নিতান্ত একলা কাজ করতে তোমার শ্রান্তি বোধ হয়। কাজে দুই একজনের সঙ্গ এবং সহায়তা না হলে—

নির্ম্মলা। অবলাকান্ত বাবু আমাকে কতকটা সাহায্য করবেন বলেচেন—আমি তাঁকে রোগীশুশ্রূষা সম্বন্ধে সেই ইংরাজী বইটা দিয়েছি, তিনি একটা অধ্যায় আজ লিখে পাঠাবেন বলেছেন—বোধ হয় এখনি পাওয়া যাবে, তাই আমি অপেক্ষা করে বসে আছি।

চন্দ্র। ঐ ছেলেটি বড় ভাল―

নির্ম্মলা। খুব ভাল―চমৎকার―

চন্দ্র। এমন অধ্যবসায়, এমন কার্য্যতৎপরতা—

নির্ম্মলা। আর এমন সুন্দর নম্রস্বভাব!

চন্দ্র। ভাল প্রস্তাবমাত্রেই তাঁর উৎসাহ দেখে আমি আশ্চর্য্য হয়েছি।

নির্মলা। তা ছাড়া, তাঁকে দেখ্‌বামাত্র তাঁর মনের মাধুর্য্য মুখে এবং চেহারায় কেমন স্পষ্ট বোঝা যায়।

চন্দ্র। এত অল্পকালের মধ্যেই যে কারো প্রতি এত গভীর স্নেহ জন্মাতে পারে তা আমি কখনো মনে করিনি—আমার ইচ্ছা করে ঐ ছেলেটিকে নিজের কাছে রেখে ওর সকল প্রকার লেখাপড়ায় এবং কাজে সহায়তা করি!

নির্ম্মলা। তা হলে আমারও ভারি উপকার হয়, অনেক কাজ করতে পারি! আচ্ছা এ রকম প্রস্তাব করে একবার দেখই না!—ঐ যে বেহারা আস্‌চে। বোধ হয় তিনি লেখাটা পাঠিয়ে দিয়েছেন। রামদীন, চিঠি আছে? এইদিকে নিয়ে আয়। (বেহারার প্রবেশ ও চন্দ্রবাবুর হাতে চিঠি প্রদান) মামা, সেই প্রবন্ধটা নিশ্চয় তিনি আমাকে পাঠিয়েছেন, ওটা আমাকে দাও!

চন্দ্র। না ফেনি, এটা আমার চিঠি।

নির্ম্মল। তোমার চিঠি! অবলাকান্ত বাবু বুঝি তোমাকেই লিখেচেন? কি লিখেছেন?

চন্দ্র। না, এটা পূর্ণর লেখা।

নির্ম্মলা। পূর্ণবাবুর লেখা? ওঃ।

চন্দ্র। পূর্ণ লিখছেন—“গুরুদেব আপনার চরিত্র মহৎ, মনের বল অসামান্য; আপনার মত বলিষ্ঠ প্রকৃতি লোকেই মানুষের দুর্ব্বলতা ক্ষমার চক্ষে দেখিতে পারেন ইহাই মনে করিয়া অদ্য এই চিঠিখানি আপনাকে লিখিতে সাহসী হইতেছি।”

নির্ম্মলা। হয়েছে কি? বোধ হয় পূর্ণ বাবু চিরকুমার সভা ছেড়ে দেবেন তাই এত ভূমিকা করছেন। লক্ষ্য করে দেখেছ বোধ হয় পূর্ণ বাবু আজ কাল কুমার সভার কোন কাজই করে উঠতে পারেন না।

চন্দ্র। “দেব, আপনি যে আদর্শ আমাদের সম্মুখে ধরিয়াছেন তাহা অত্যুচ্চ, যে উদ্দেশ্য আমাদের মস্তকে স্থাপন করিয়াছেন তাহা গুরুভার― সে আদর্শ এবং সেই উদ্দেশ্যের প্রতি এক মুহূর্ত্তের জন্য ভক্তির অভাব হয় নাই কিন্তু মাঝে মাঝে শক্তির দৈন্য় অনুভব করিয়া থাকি তাহা শ্রীচরণ সমীপে সবিনয়ে স্বীকার করিতেছি।”

নির্ম্মলা। আমার বোধ হয়, সকল বড় কাজেই মানুষ মাঝে মাঝে আপনার অক্ষমতা অনুভব করে হতাশ হয়ে পড়ে―শ্রান্ত মন এক একবার বিক্ষিপ্ত হয়ে যায়, কিন্তু সে কি বরাবর থাকে?

চন্দ্র। “সভা হইতে গৃহে ফিরিয়া আসিয়া যখন কার্য্যে হাত দিতে যাই, তখন সহসা নিজেকে একক মনে হয়, উৎসাহ যেন আশ্রয়হীন লতার মত লুন্ঠিত হইয়া পড়িতে চাহে।” নির্ম্মল আমরা ত ঠিক এই কথাই বল্‌ছিলেম।

নির্ম্মলা। পূর্ণবাবু যা লিখেছেন সেটা সত্য―মানুষের সঙ্গ না হলে কেবলমাত্র সঙ্কল্প নিয়ে উৎসাহ জাগিয়ে রাখা শক্ত।

চন্দ্র। “আমার ধৃষ্টতা মার্জ্জনা করিবেন, কিন্তু অনেক চিন্তা করিয়া একথা স্থির বুঝিয়াছি, কুমারব্রত সাধারণ লোকের জন্য নহে,―তাহাতে বল দান করেনা, বল হরণ করে। স্ত্রী পুরুষ পরস্পরের দক্ষিণ হস্ত―তাহারা মিলিত থাকিলে তবেই সম্পূর্ণরূপে সংসারের সকল কাজের উপযোগী হইতে পারে!” তোমার কি মনে হয় নির্ম্মল? (নির্ম্মলা নিরুত্তর) অক্ষয়বাবুও এই কথা নিয়ে সে দিন আমার সঙ্গে তর্ক কর্‌ছিলেন, তাঁর অনেক কথার উত্তর দিতে পারিনি।

নির্ম্মলা। তা হতে পারে। বোধ হয় কথাটার মধ্যে অনেকটা সত্য আছে।

চন্দ্র। “গৃহস্থসন্তানকে সন্ন্যাসধর্মে দীক্ষিত না করিয়া গৃহাশ্রমকে উন্নত আদর্শে গঠিত করাই আমার মতে শ্রেষ্ঠ কর্ত্তব্য।”

নির্ম্মল। এ কথাটা কিন্তু পূর্ণবাবু বেশ বলেচেন।

চন্দ্র। আমিও কিছুদিন থেকে মনে করছিলেম কুমারব্রত গ্রহণের নিয়ম উঠিয়ে দেব।

নির্ম্মলা। আমারও বোধ হয় উঠিয়ে দিলে মন্দ হয় না, কি বল মামা? অন্য কেউ কি আপত্তি করবেন? অবলাকান্তবাবু, শ্রীশবাবু—

চন্দ্র। আপত্তির কোন কারণ নেই।

নির্ম্মলা। তবু একবার অবলাকান্ত বাবুদের মত নিয়ে দেখা উচিত।

চন্দ্র। মত ত নিতেই হবে।—(পত্রপাঠ) “এ পর্য্যন্ত যাহা লিখিলাম সহজে লিখিয়াছি, এখন যাহা বলিতে চাহি তাহা লিখিতে কলম সরিতেছে না।”

নির্ম্মলা। মামা, পূর্ণবাবু হয়ত কোন গোপনীয় কথা লিখ্‌চেন, তুমি চেঁচিয়ে পড়ছ কেন?

চন্দ্র। ঠিক বলেছ ফেনি। (আপন মনে পাঠ) কি আশ্চর্য্য। আমি কি সকল বিষয়েই অন্ধ! এত দিন ত আমি কিছুই বুঝতে পারি নি! নির্ম্মল, পূর্ণ বাবুর কোন ব্যবহার কি কখনো তোমার কাছে—

নির্ম্মলা। হাঁ, পূর্ণ বাবুর ব্যবহার আমার কাছে মাঝে মাঝে অত্যন্ত নির্ব্বোধের মত ঠেকেছিল।

চন্দ্র। অথচ পূর্ণবাবু খুব বুদ্ধিমান্। তাহলে তোমাকে খুলে বলি―পূর্ণবাবু বিবাহের প্রস্তাব করে পাঠিয়েছেন―

নির্ম্মলা। তুমি ত তাঁর অভিভাবক নও―তোমার কাছে প্রস্তাব―

চন্দ্র। আমি যে তোমার অভিভাবক—এই পড়ে দেখ।

নির্ম্মলা। (পত্র পড়িয়া রক্তিম মুখে) এ হতেই পারে না।

চন্দ্র। আমি তাঁকে কি বল্‌ব?

নির্ম্মলা। বোলো, কোন মতে হতেই পারে না।

চন্দ্র। কেন নির্ম্মল, তুমি ত বল্‌ছিলে কুমারব্রত পালনের নিয়ম, সভা হতে উঠিয়ে দিতে তোমার আপত্তি নেই।

নির্ম্মলা। তাই বলেই কি যে প্রস্তাব কর্‌বে তাকেই―

চন্দ্র। পূর্ণ বাবু ত যে সে নয়, অমন ভাল ছেলে―

নির্ম্মলা। মামা, তুমি এসব বিষয়ে কিছুই বোঝ না, তোমাকে বোঝাতে পারবও না―আমার কাজ আছে। (প্রস্থানোদ্যম) মামা, তোমার পকেটে ওটা কি উচু হয়ে আছে?

চন্দ্র। (চমকিয়া উঠিয়া) হাঁ হাঁ ভুলে গিয়েছিলেম—বেহারা আজ সকালে তোমার নাম লেখা একটা কাগজ আমাকে দিয়ে গেছে―

নির্ম্মলা। (তাড়াতাড়ি কাগজ লইয়া) দেখ দেখি মামা, কি অন্যায়, অবলাকান্ত বাবুর লেখাটা সকালেই এসেছে আমাকে দাওনি? আমি ভাবছিলেম তিনি হয়ত ভুলেই গেছেন—ভারি অন্যায়!

চন্দ্র। অন্যায় হয়েছে বটে। কিন্তু এর চেয়ে ঢের বেশী অন্যায় ভুল আমি প্রতিদিনই করে থাকি ফেনি—তুমিই ত আমাকে প্রত্যেকবার সহাস্যে মাপ করে করে প্রশ্রয় দিয়েছ।

নির্ম্মলা। না, ঠিক অন্যায় নয়—আমিই অবলাকান্ত বাবুর প্রতি মনে মনে অন্যায় কর্‌ছিলেম, ভাব্‌ছিলেম—এই যে রসিক বাবু আস্‌চেন। আসুন রসিক বাবু, মামা এইখানেই আছেন।

রসিকের প্রবেশ।

চন্দ্র। এই যে রসিকবাবু এসেছেন ভালই হয়েছে।

রসিক। আমার আসাতেই যদি ভাল হয় চন্দ্রবাবু তাহলে আপনাদের পক্ষে ভাল অত্যন্ত সুলভ। যখনি বলবেন তখনি আসব, নাবল্লেও আস্‌তে রাজি আছি।

চন্দ্র। আমরা মনে করছি আমাদের সভা থেকে চিরকুমার ব্রতের নিয়মটা উঠিয়ে দেব—আপনি কি পরামর্শ দেন?

রসিক। আমি খুব নিঃস্বার্থভাবেই পরামর্শ দিতে পারব, কারণ, এ ব্রত রাখুন বা উঠিয়ে দিন আমার পক্ষে দুই সমান। আমার পরামর্শ এই যে উঠিয়ে দিন, নইলে সে কোন দিন আপনিই উঠে যাবে। আমাদের পাড়ার রামহরি মাতাল রাস্তার মাঝখানে এসে সকলকে ডেকে বলেছিল, বাবাসকল, আমি স্থির করেছি এইখানটাতেই আমি পড়ব! স্থির না করলেও সে পড়ত, অতএব স্থির করাটাই তার পক্ষে ভাল হয়েছিল।

চন্দ্র। ঠিক বলেচেন রসিকবাবু, যে জিনিষ বলপূর্ব্বক আস্‌বেই তাকে বল প্রকাশ করতে না দিয়ে আসতে দেওয়াই ভাল। আসচে রবিবারের পূর্ব্বেই এই প্রস্তাবটা সকলের কাছে একবার তুলতে চাই।

রসিক। আচ্ছা শুক্রবারের সন্ধ্যাবেলায় আপনারা আমাদের ওখানে যাবেন আমি সকলকে সংবাদ দিয়ে আনাব।

চন্দ্র। রসিকবাবু, আপনার যদি সময় থাকে তা হলে আমাদের দেশে গোজাতির উন্নতি সম্বন্ধে একটা প্রস্তাব আপনাকে―

রসিক। বিষয়টা শুনে খুব ঔৎসুক্য জন্মাচ্চে, কিন্তু সময় খুব যে বেশী―

নির্ম্মলা। না রসিকবাবু, আপনি ও ঘরে চলুন, আপনার সঙ্গে অনেক কথা কবার আছে। মামা, তোমার লেখাটা শেষ কর, আমরা থাক্‌লে ব্যাঘাত হবে।

রসিক। তা হলে চলুন।

নির্ম্মলা। (চলিতে চলিতে) অবলাকান্ত বাবু আমাকে তাঁর সেই লেখাটা পাঠিয়ে দিয়েছেন―আমার অনুরোধ যে তিনি মনে করে রেখেছিলেন সে জন্যে আপনি তাঁকে আমার ধন্যবাদ জানাবেন!

রসিক। ধন্যবাদ না পেলেও আপনার অনুরোধ রক্ষা করেই তিনি কৃতার্থ।

(১৫)

জগত্তারিণী। বাবা অক্ষয়! দেখত, মেয়েদের নিয়ে আমি কি নেপ বসে বসে কাঁদচে, নীর রেগে অস্থির, সে বলে সে কোন মতেই বেরবে না। ভদ্রলোকের ছেলেরা আজ এখনি আসবে, তাদের এখন কি বলে ফেরাবে! তুমিই বাপু ওদের শিখিয়ে পড়িয়ে বিবি করে তুলেছ এখন তুমিই ওদের সামলাও!

পুরবালা। সত্যি, আমিও ওদের রকম দেখে অবাক্ হয়ে গেছি ওরা কি মনে করেছে ওরা―

অক্ষয়। বোধ হয় আমাকে ছাড়া আর কাউকে ওরা পছন্দ করচে না; তোমারই সহোদরা কিনা, রুচিটা তোমারি মত!

পুরবালা। ঠাট্টা রাখ, এখন ঠাটার সময় নয়—তুমি ওদের একটু বুঝিয়ে বলবে কি না বল! তুমি না বল্লে ওরা শুনবে না!

অক্ষয়। এত অনুগত! একেই বলে ভগ্নীপতিব্রতা শ্যালী! আচ্ছা আমার কাছে একবার পাঠিয়ে দাও,―দেখি! (জগত্তারিণী ও পুরবালার প্রস্থান)

নৃপ ও নীরর প্রবেশ।

নীর। না, মুখুজ্জেমশায়, সে কোনমতেই হবে না!

নৃপ। মুখুজ্জেমশায় তোমার দুটি পায়ে পড়ি আমাদের যার তার সাম্‌নে ও রকম করে বের কোরো না!

অক্ষয়। ফাঁসির হুকুম হলে একজন বলেছিল, আমাকে বেশী উঁচুতে চড়িয়ো না আমার মাথাঘোরা ব্যামো আছে! তোদের যে তাই হল! বিয়ে করতে যাচ্চিস এখন দেখা দিতে লজ্জা করলে চলবে কেন?

নীর। কে বল্লে আমরা বিয়ে করতে যাচ্চি?

অক্ষয়। অহো, শরীরে পুলক সঞ্চার হচ্চে!―কিন্তু হৃদয় দুর্ব্বল এবং দৈব বলবান, যদি দৈবাৎ প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করতে হয়―

নীর। না ভঙ্গ হবে না!

অক্ষয়। হবে না ত? তবে নির্ভয়ে এস; যুবক দুটোকে দেখা দিয়ে আধপোড়া করে ছেড়ে দাও―হতভাগারা বাসায় ফিরে গিয়ে মরে থাকুক!

নীর। অকারণে প্রাণীহত্যা করবার জন্যে আমাদের এত উৎসাহ নেই।

অক্ষয়। জীবের প্রতি কি দয়া! কিন্তু সামান্য ব্যাপার নিয়ে গৃহবিচ্ছেদ করবার দরকার কি? তোদের মা দিদি যখন ধরে পড়েছেন এবং ভদ্রলোক দুটি যখন গাড়িভাড়া করে আসচে তখন একবার মিনিট পাঁচেকের মত দেখা দিস্, তারপরে আমি আছি—তোদের অনিচ্ছায় কোনমতেই বিবাহ দিতে দেব না।

নীর। কোনমতেই না?

অক্ষয়। কোনমতেই না!

পুরবালার প্রবেশ।

আয়, তোদের সাজিয়ে দিইগে!

নীর। আমরা সাজব না!

পুর। ভদ্রলোকের সামনে এই রকম বেশেই বেরোবি? লজ্জা করবে না?

নীর। লজ্জা করবে বৈ কি দিদি―কিন্তু সেজে বেরতে আরো বেশী লজ্জা করবে।

অক্ষয়। উমা তপস্বিনী বেশে মহাদেবের মনোহরণ করেছিলেন; শকুন্তলা যখন দুষ্যন্তের হৃদয় জয় করেছিল তখন তার গায়ে একখানি বাকল ছিল, কালিদাস বলেন সেও কিছু আঁট হয়ে পড়েছিল, তোমার বোনেরা সেই সব পড়ে সেয়ানা হয়ে উঠেছে, সাজতে চায় না!

পুর। সে সব হল সত্যযুগের কথা। কলিকালের দুষ্যন্ত মহারাজারা সাজসজ্জাতেই ভোলেন।

অক্ষয়। যথা―

পুর। যথা তুমি। যেদিন তুমি দেখতে এলে মা বুঝি আমাকে সাজিয়ে দেন নি?

অক্ষয়। আমি মনে মনে ভাবলেম, সাজেও যখন একে সেজেছে তখন সৌন্দর্য্যে না জানি কত শোভা হবে!

পুর। আচ্ছা তুমি থাম, নীরু আয়!

নীরু। না ভাই দিদি―

পুর। আচ্ছা সাজ নাই করলি চুল ত বাঁধতে হবে।

অক্ষয়।

(গান)

অলকে কুসুম না দিয়ো,
শুধু, শিথিল কবরী বাঁধিয়ো!

কাজলবিহীন সজল নয়নে
হৃদয়দুয়ারে ঘা দিয়ো।
আকুল আঁচলে পথিকচরণে
মরণের ফাঁদ ফাঁদিয়ো!
না করিয়া বাদ মনে যাহা সাধ
নিদয়া নীরবে সাধিয়ো!

পুর। তুমি আবার গান ধরলে? আমি এখন কি করি বল দেখি? তাদের আসবার সময় হল—এখনো আমার খাবার তৈরি করা বাকি আছে। (নৃপ নীরুকে লইয়া প্রস্থান)

রসিকের প্রবেশ।

অক্ষয়। পিতামহ ভীষ্ম, যুদ্ধের সমস্তই প্রস্তুত?

রসিক। সমস্তই। বীর পুরুষ দুটিও সমাগত।

অক্ষয়। এখন কেবল দিব্যাস্ত্র দুটি সাজতে গেছেন। তুমি তাহলে সেনাপতির ভার গ্রহণ কর, আমি একটু অন্তরালে থাকতে ইচ্ছা করি।

রসিক। আমিও প্রথমটা একটু আড়াল হই! (উভয়ের প্রস্থান)

শ্রীশ ও বিপিনের প্রবেশ।

শ্রীশ। বিপিন, তুমি ত আজকাল সঙ্গীত বিদ্যার উপর চীৎকার শব্দে ডাকাতী আরম্ভ করেছ―কিছু আদায় কর্‌তে পারলে?

বিপিন। কিছু না! সঙ্গীতবিদ্যার দ্বারে সপ্তসুর অনবরত পাহারা দিচ্ছে, সেখানে কি আমার ঢোকবার জো আছে? কিন্তু এ প্রশ্ন কেন তোমার মনে উদয় হল?

শ্রীশ। আজকাল মাঝে মাঝে কবিতায় সুর বসাতে ইচ্ছে করে! সে দিন বইয়ে পড়ছিলুম―

কেন সারাদিন ধীরে ধীরে
বালু নিয়ে শুধু খেল তীরে!

চলে যায় বেলা, রেখে মিছে খেলা
ঝাঁপ দিয়ে পড় কালো নীরে।
অকূল ছানিয়ে যা’ পাস্ তা’ নিয়ে
হেসে কেঁদে চল ঘরে ফিরে!

মনে হচ্ছিল এর সুরটা যেন জানি গাবার যো নেই!

বিপিন। জিনিষটা মন্দ নয় হে—তোমার কবি লেখে ভাল! ওহে ওর পরে আর কিছু নেই? যদি সুরু করলে ত শেষ কর!

শ্রীশ।

নাহি জানি মনে কি বাসিয়া
পথে বসে আছে কে আসিয়া!
যে ফুলের বাসে অলস বাতাসে
হৃদয় দিতেছে উদাসিয়া,
যেতে হয় যদি চল নিরবধি
সেই ফুলবন তলাসিয়া!

বিপিন। বাঃ বেশ! কিন্তু শ্রীশ, শেল্পের কাছে তুমি কি খুঁজে বেড়াচ্চ?

শ্রীশ। সেই যে সে দিন যে বইটাতে দুটি নাম লেখা দেখেছিলাম, সেইটে—

বিপিন। না ভাই, আজ ওসব নয়!

শ্রীশ। কি সব নয়?

বিপিন। তাঁদের কথা নিয়ে কোন রকম—

শ্রীশ। কি আশ্চর্য্য বিপিন। তাঁদের কথা নিয়ে আমি কি এমন কোন আলোচনা করতে পারি যাতে—

বিপিন। রাগ কোরো না ভাই—আমি নিজের সম্বন্ধেই বলছি, এই ঘরেই আমি অনেক সময় রসিক বাবুর সঙ্গে তাঁদের বিষয়ে যে ভাবে আলাপ করেচি,আজ সে ভাবে কোন কথা উচ্চারণ করতেও সঙ্কোচ বোধ হচ্চে―বুঝচনা―

শ্রীশ। কেন বুঝবনা? আমি কেবল একখানি বই খুলে দেখবার ইচ্ছে করেছিলুম মাত্র―একটি কথাও উচ্চারণ করতুম না!

বিপিন। না আজ তাও না। আজ তাঁরা আমাদের সম্মুখে বেরবেন আজ আমরা যেন তার যোগ্য থাকতে পারি!

শ্রীশ। বিপিন তোমার সঙ্গে―

বিপিন। না ভাই আমার সঙ্গে তর্ক কোরোনা, আমি হারলুম―কিন্তু বইটা রাখ!

রসিকের প্রবেশ।

রসিক। এই যে, আপনারা এসে একলা বসে আছেন—কিছু মনে করবেন না―

শ্রীশ। কিছু না। এই ঘরটি আমাদের সাদর সম্ভাষণ করে নিয়েছিল!

রসিক। আপনাদের কত কষ্টই দেওয়া গেল।

শ্রীশ। কষ্ট আর দিতে পারলেন কই? একটা কষ্টের মত কষ্ট স্বীকার করবার সুযোগ পেলে কৃতার্থ হতুম।

রসিক। যা হোক্, অল্পক্ষণের মধ্যেই চুকে যাবে এই এক সুবিধে তার পরেই আপনারা স্বাধীন। ভেবে দেখুন দেখি যদি এটা সত্যকার ব্যাপার হত তাহলেই পরিণামে বন্ধনভয়ং! বিবাহ জিনিষটা মিষ্টান্ন দিয়েই শুরু হয় কিন্তু সকল সময় মধুরেণ সমাপ্ত হয় না। আচ্ছা আজ আপনারা দুঃখিত ভাবে এ রকম চুপচাপ করে বসে আছেন কেন বলুন দেখি। আমি বল্‌চি আপনাদের কোন ভয় নেই! আপনারা বনের বিহঙ্গ, দুটি খানি সন্দেশ খেয়েই আবার বনে উড়ে যাবেন, কেউ আপনাদের বাঁধবে না! নাত্র ব্যাধশরাঃ পতন্তি পরিতো, নৈবাত্র দাবানলঃ―দাবানলের পরিবর্ত্তে ডাবের জল পাবেন!

শ্রীশ। আমাদের সে দুঃখ নয় রসিকবাবু, আমরা ভাবচি, আমাদের দ্বারা কতটুকু উপকারই বা হচ্চে! ভবিষ্যতের সমস্ত আশঙ্কা ত দূর করতে পার্‌চিনে!

রসিক। বিলক্ষণ। যা কর্‌চেন তাতে আপনারা দুটি অবলাকে চিরকৃতজ্ঞতাপাশে বদ্ধ কর্‌চেন—অথচ নিজেরা কোন প্রকার পাশেই বদ্ধ হচ্চেন না!

(নেপথ্যে মৃদুস্বরে জগত্তারিণী) আঃ নেপ, কি ছেলে মানুষী কর্‌চিস্। শীগ্‌গির চকের জল মুচে ঘরের মধ্যে যা! লক্ষ্মী মা আমার―কেঁদে চোক লাল কল্লে কি রকম ছিরি হবে ভেবে দেখো দেখি!― নীরো যা’না! তোদের সঙ্গে আর পারিনে বাপু! ভদ্রলোকদের কতক্ষণ বসিয়ে রাখ্‌বি? কি মনে কর্‌বেন?

শ্রীশ। ঐ শুন্‌চেন, রসিকবাবু, এ অসহ্য! এর্ চেয়ে রাজপুতদের কন্যাহত্যা ভাল।

বিপিন। রসিকবাবু এঁদের এই সংকট থেকে সম্পূর্ণ রক্ষা করবার জন্যে আপনি আমাদিগকে যা বল্‌বেন আমরা তাতেই প্রস্তুত আছি।

রসিক। কিছু না, আপনাদের আর অধিক কষ্ট দেব না! কেবল আজকার দিনটা উত্তীর্ণ করে দিয়ে যান্—তারপরে আপনাদের আর কিছুই ভাব্‌তে হবে না!

শ্রীশ। ভাবতে হবে না? কি বলেন রসিক বাবু! আমরা কি পাষাণ? আজ থেকেই আমরা বিশেষরূপে এঁদের জন্যে ভাববার অধিকার পাব।

বিপিন। এমন ঘটনার পর আমরা যদি এঁদের সম্বন্ধে উদাসীন হই তবে আমরা কাপুরুষ।

শ্রীশ। এখন থেকে এদের জন্যে ভাবা আমাদের পক্ষে গর্ব্বের বিষয় গৌরবের বিষয়!

রসিক। তা বেশ, ভাববেন, কিন্তু বোধ হয় ভাবা ছাড়া আর কোন কষ্ট করতে হবে না।

শ্রীশ। আচ্ছা রসিক বাবু, আমাদের কষ্ট স্বীকার করতে দিতে আপনার এত আপত্তি হচ্ছে কেন?

বিপিন। এঁদের জন্যে যদিই আমাদের কোন কষ্ট করতে হয় সেটা যে আমরা সম্মান বলে জ্ঞান করব।

শ্রীশ। দু’দিন ধরে রসিকবাবু, বেশী কষ্ট পেতে হবে না বলে আপনি ক্রমাগতই আমাদের আশ্বাস দিচ্চেন—এতে আমরা বাস্তবিক দুঃখিত হয়েছি।

রসিক। আমাকে মাপ করবেন—আমি আর কখন এমন অবিবেচনার কাজ করব না, আপনারা কষ্ট স্বীকার করবেন!

শ্রীশ। আপনি কি এখনো আমাদের চিন্‌লেন না?

রসিক। চিনেছি বই কি, সেজন্যে আপনারা কিন্তু মাত্র চিন্তিত হবেন না।

কুণ্ঠিত নৃপ ও নীরবালার প্রবেশ।

শ্রীশ। (নমস্কার করিয়া) রসিক বাবু, আপনি এঁদের বলুন আমাদের যেন মার্জ্জনা করেন।

বিপিন। আমরা যদি ভ্রমেও ওঁদের লজ্জা বা ভয়ের কারণ হই তবে তার চেয়ে দুঃখের বিষয় আমাদের পক্ষে আর কিছু হতে পারে না, সে জন্যে যদি ক্ষমা না করেন তবে—

রসিক। বিলক্ষণ! ক্ষমা চেয়ে অপরাধিনীদের অপরাধ আরো বাড়াবেন না। এঁদের অল্প বয়স, মান্য অতিথিদের কি রকম সম্ভাষণ করা উচিত তা যদি এঁরা হঠাৎ ভুলে গিয়ে নতমুখে দাঁড়িয়ে থাকেন তাহলে আপনাদের প্রতি অসদ্ভাব কল্পনা করে এঁদের আরো লজ্জিত করবেন না। নৃপ দিদি, নীর দিদি―কি বল ভাই! যদিও এখনো তোমাদের চোখের পাতা শুকোয় নি—তবু এঁদের প্রতি তোমাদের মন যে বিমুখ নয় সে কথা কি জানাতে পারি? (নৃপ ও নীরু লজ্জিত নিরুত্তর) না একটু আড়ালে জিজ্ঞাসা করা দরকার। (জনান্তিকে) ভদ্রলোকদের এখন কি বলি বলত ভাই? বলব কি, তোমরা যত শীঘ্র পার বিদায় হও।

নীর। (মৃদুস্বরে) রসিকদাদা কি বক তার ঠিক নেই, আমরা কি তাই বলেছি, আমরা কি জানতুম এঁরা এসেছেন?

রসিক। (শ্রীশ ও বিপিনের প্রতি) এঁরা বলচেন—

সখা, কি মোর করমে লেখি—
তাপন বলিয়া তপনে ডরিনু,
চাঁদের কিরণ দেখি!

এর উপরে আপনাদের আর কিছু বল্‌বার আছে?

নীর। (জনান্তিকে) আঃ রসিক দাদা, কি বল্‌চ তার ঠিক নেই! ওকথা আমরা কখন্‌ বল্লুম!

রসিক। (শ্রীশ ও বিপিনের প্রতি) এঁদের মনের ভাবটা আমি সম্পূর্ণ ব্যক্ত করতে পারিনি বলে এঁরা আমাকে ভর্ৎসনা কর্‌ছেন! এঁরা বল্‌তে চান, চাঁদের কিরণ বল্লেও যথেষ্ট বলা হয় না― তার চেয়ে আরো যদি―

নীর। (জনান্তিকে) তুমি অমন কর যদি তা হলে আমরা চলে যাব।

রসিক। সখি, ন যুক্তম্ অকৃতসৎকারম্ অতিথিবিশেষম্ উজ্‌ঝিত্বা স্বচ্ছন্দতো গমনম্! (শ্রীশ বিপিনের প্রতি) এঁরা বল্‌চেন এঁদের যথার্থ মনের ভাবটি যদি আপনাদের কাছে ব্যক্ত করে বলি, তা হলে এঁরা লজ্জায় এঘর থেকে চলে যাবেন। (নীর নৃপ প্রস্থানোদ্যম)

শ্রীশ। রসিকবাবুর অপরাধে আপনারা নির্দ্দোষদের সাজা দেবেন কেন? আমরা ত কোন প্রকার প্রগল্‌ভতা করিনি। (উভয়ের ন যযৌ ন তস্থৌ ভাব)

বিপিন। (নীরকে লক্ষ্য করিয়া) পূর্ব্বকৃত কোন অপরাধ যদি থাকে ত ক্ষমা প্রার্থনার অবকাশ কি দেবেন না?

রসিক। (জনান্তিকে) এই ক্ষমাটুকুর জন্যে বেচারা অনেক দিন থেকে সুযোগ প্রত্যাশা করচে―

নীর। (জনান্তিকে) অপরাধ কি হয়েছে, যে ক্ষমা কর্‌তে যাব?

রসিক। (বিপিনের প্রতি) ইনি বল্‌ছেন, আপনার অপরাধ এমন মনোহর যে, তাকে ইনি অপরাধ বলে লক্ষ্যই করেন নি।―কিন্তু আমি যদি সেই খাতাটি হরণ করতে সাহসী হতেম তবে সেটা অপরাধ হত—আইনের বিশেষ ধারায় এই রকম লিখচে।

বিপিন। ঈর্ষা করবেন না রসিকবাবু! আপনারা সর্ব্বদাই অপরাধ কর্‌বার সুযোগ পান এবং সেজন্য দণ্ডভোগ করে কৃতার্থ হন, আমি দৈবক্রমে একটি অপরাধ কর্‌বার সুবিধা পেয়েছিলুম―কিন্তু এতই অধম যে দণ্ডনীয় বলেও গণ্য হলেম না, ক্ষমা পাবার যোগ্যতাও লাভ করলেম না।

রসিক। বিপিন বাবু, একেবারে হতাশ হবেন না! শাস্তি অনেক সময় বিলম্বে আসে কিন্তু নিশ্চিত আসে। ফস্ করে মুক্তি না পেতেও পারেন!

ভৃত্যের প্রবেশ।

ভৃত্য। জল খাবার তৈরি। (নৃপ ও নীরর প্রস্থান)

শ্রীশ। আমরা কি দুর্ভিক্ষের দেশ থেকে আসছি রসিক বাবু? জল খাবারের জন্যে এত তাড়া কেন?

রসিক। মধুরেণ সমাপয়েৎ!

শ্রীশ। (নিশ্বাস ফেলিয়া) কিন্তু সমাপনটাত মধুর নয়!(জনান্তিকে বিপিনের প্রতি) কিন্তু বিপিন, এঁদের ত প্রতারণা করে যেতে পারব না!

বিপিন। (জনান্তিকে) তা যদি করি তবে আমরা পাষণ্ড!

শ্রীশ। (জনান্তিকে) এখন আমাদের কর্ত্তব্য কি।

বিপিন। (জনান্তিকে) সে কি আর জিজ্ঞাসা করতে হবে?

রসিক। আপনারা দেখছি ভয় পেয়ে গেছেন! কোন আশঙ্কা নেই শেষকালে যেমন করেই হোক্ আমি আপনাদের উদ্ধার করবই।

(সকলের প্রস্থান)

অক্ষয় ও জগত্তারিণীর প্রবেশ।

জগৎ। দেখলে ত বাবা, কেমন ছেলে দুটি?

অক্ষয়। মা, তোমার পছন্দ ভাল, এ কথা আমি ত অস্বীকার করতে পারি নে!

জগৎ। মেয়েদের কম দেখলে ত বাবা! এখন কান্নাকাটি কোথায় গেছে তার ঠিক নেই!

অক্ষয়। ঐ ত ওদের দোষ! কিন্তু মা, তোমাকে নিজে গিয়ে আশীর্ব্বাদ দিয়ে ছেলে দুটিকে দেখতে হচ্ছে।

জগৎ। সে কি ভাল হবে অক্ষয়? ওরা কি পছন্দ জানিয়েছে?

অক্ষয়। খুব জানিয়েছে। এখন তুমি নিজে এসে আশীর্ব্বাদ করে গেলেই চট্‌পট্‌ স্থির হয়ে যায়!

জগৎ। তা বেশ, তোমরা যদি বল, ত যাব, আমি ওদের মার বয়সী, আমার লজ্জা কিসের!

পুরবালার প্রবেশ।

পুর। খাবার গুছিয়ে দিয়ে এসেছি। ওদের কোন্ ঘরে বসিয়েছে আমি আর দেখ্‌তেই পেলুম না।

জগৎ। কি আর বল্‌ব পুরো, এমন সোনার চাঁদ ছেলে!

পুর। তা জান্‌তুম,! নীর নৃপর অদৃষ্টে কি খারাপ ছেলে হতে পারে!

অক্ষয়। তাদের বড়দিদির অদৃষ্টের আঁচ লেগেছে আর কি।

পুর। আচ্ছা থাম; যাও দেখি, তাদের সঙ্গে একটু আলাপ করগে; কিন্তু শৈল গেল কোথায়?

অক্ষয়। সে খুসী হয়ে দরজা বন্ধ করে পূজোয় বসেছে।

(১৬)

অক্ষয়। বাপারটা কি? রসিক দা, আজকাল ত খুব খাওয়াচ্চ দেখচি। প্রত্যহ যাকে দুবেলা দেখচ তাকে যে হঠাৎ ভুলে গেলে?

রসিক। এঁদের নতুন আদর, পাতে যা পড়ছে তাতেই খুসী হচ্চেন তোমার আদর পুরোণো হয়ে এল, তোমাকে নতুন করে খুসী করি এমন সাধ্য নেই ভাই।

অক্ষয়। কিন্তু শুনেছিলেম, আজকের সমস্ত মিষ্টান্ন এবং এ পরিবারের সমস্ত অনাস্বাদিত মধু উজাড় করে নেবার জন্যে দুটি অখ্যাতনামা যুবকের অভ্যুদয় হবে—এঁরা তাঁদেরই অংশে ভাগ বসাচ্ছেন না কি? ওহে রসিক দা ভুল করনি ত?

রসিক। ভুলের জন্যেইত আমি বিখ্যাত। বড় মা জানেন তাঁর বুড়ো রসিককাকা যাতে হাত দেবেন তাতেই গলদ হবে।

অক্ষয়। বল কি রসিক দাদা? করেছ কি? সে দুটি ছেলেকে কোথায় পাঠালে?

রসিক। ভ্রমক্রমে তাদের ভুল ঠিকানা দিয়েছি!

অক্ষয়। সে বেচারাদের কি গতি হবে?

রসিক। বিশেষ অনিষ্ট হবে না। তাঁরা কুমারটুলিতে নীলমাধব চৌধুরীর বাড়িতে এতক্ষণে জলযোগ সমাধা করেছেন। বনমালী ভট্টাচার্য্য তাঁদের তত্ত্বাবধানের ভার নিয়েছেন।

অক্ষয়। তা যেন বুঝ্‌লুম, মিষ্টান্ন সকলেরই পাতে পড়ল, কিন্তু তোমারই জলযোগটি কিছু কটু রকমের হবে! এইবেলা ভ্রমসংশোধন করে নাও! শ্রীশ বাবু, বিপিন বাবু কিছু মনে কোরো না, এর মধ্যে একটু পারিবারিক রহস্য আছে।

শ্রীশ। সরল প্রকৃতি রসিক বাবু সে রহস্য আমাদের নিকট ভেদ করেই দিয়েছেন! আমাদের ফাঁকি দিয়ে আনেন নি!

বিপিন। মিষ্টান্নের থালায় আমরা অনধিকার আক্রমণ করি নি, শেষ পর্য্যন্ত তার প্রমাণ দিতে প্রস্তুত আছি।

অক্ষয়। বল কি বিপিন বাবু? তা হলে চিরকুমার সভাকে চিরজন্মের মত কাঁদিয়ে এসেছ? জেনেশুনে, ইচ্ছা পূর্ব্বক?

রসিক। না, না, তুমি ভুল করচ অক্ষয়।

অক্ষয়। আবার ভুল? আজ কি সকলেরই ভুল করবার দিন হল না কি? বিপিন দা।

(গান)

ভুলে ভুলে আজ ভুলময়!
ভুলের লতায় বাতাসের ভুলে,
ফুলে ফুলে হোক্ ফুলময়!
আনন্দ ঢেউ ভুলের সাগরে
উছলিয়া হোক্ কুলময়।

রসিক। একি বড় মা আস্‌ছেন যে।

অক্ষয়। আস্‌বারইত ত কথা! উনি ত আর কুমারটুলির ঠিকানায় যাবেন না!

জগত্তারিণীর প্রবেশ। শ্রীশ ও বিপিনের ভূমিষ্ঠ হইয়া প্রণাম। দুই জনকে দুই মোহর দিয়া জগত্তারিণীর আশীর্ব্বাদ। জনান্তিকে অক্ষয়ের সহিত জগত্তারিণীর আলাপ।

অক্ষয়। মা বল্‌চেন, তোমাদের আজ ভাল করে খাওয়া হল না সমস্তই পাতে পড়ে রইল।

শ্রীশ। আমরা দুবার চেয়ে নিয়ে খেয়েছি।

বিপিন। যেটা পাতে পড়ে আছে, ওটা তৃতীয় কিস্তী।

শ্রীশ। ওটা না পড়ে থাক্‌লে আমাদেরই পড়ে থাক্‌তে হত।

জগত্তারিণী। (জনান্তিকে) তা হলে তোমরা ওঁদের বসিয়ে কথাবার্তা কও বাছা আমি আসি। (প্রস্থান)

রসিক। না এ ভারি অন্যায় হল।

অক্ষয়। অন্যায়টা কি হল?

রসিক। আমি ওঁদের বারবার করে বলে এসেছি যে, ওঁরা কেবল আজ আহারটি করেই ছুটি পাবেন কোন রকম বধ বন্ধনের আশঙ্কা নেই!―কিন্তু―

শ্রীশ। ওর মধ্যে কিন্তুটা কোথায় রসিক বাবু, আপনি অত চিন্তিত হচ্ছেন কেন?

রসিক। বলেন কি শ্রীশবাবু, আপনাদের আমি কথা দিয়েছি যখন―

বিপিন। তা বেশ ত, এমনিই কি মহাবিপদে ফেলেচেন!

শ্রীশ। মা আমাদের যে আশীর্ব্বাদ করে গেলেন আমরা যেন তার যোগ্য হই!

রসিক। না, না, শ্রীশবাবু, সে কোন কাজের কথা নয়। আপনারা যে দায়ে পড়ে ভদ্রতার খাতিরে―

বিপিন। রসিকবাবু আপনি আমাদের প্রতি অবিচার করবেন না― দায়ে পড়ে

রসিক। দায় নয় ত কি মশায়। সে কিছুতেই হবে না! আমি বরঞ্চ সেই ছেলে দুটোকে বনমালীর হাতছাড়িয়ে কুমারটুলি থেকে এখনও ফিরিয়ে আনব তবু―

শ্রীশ। আপনার কাছে কি অপরাধ করেছি রসিক বাবু?―

রসিক। না, না, এ ত অপরাধের কথা হচ্ছে না। আপনারা ভদ্রলোক, কৌমার্য্য ব্রত অবলম্বন করেছেন—আমার অনুরোধে পড়ে পরের উপকার করতে এসে শেষকালে―

বিপিন। শেষকালে নিজের উপকার করে ফেলব এটুকু আপনি সহ করতে পারবেন না―এমনি হিতৈষী বন্ধু!

শ্রীশ। আমরা যেটাকে সৌভাগ্য বলে স্বীকার করচি―আপনি তার থেকে আমাদের বঞ্চিত করতে চেষ্টা করচেন কেন?

রসিক। শেষকালে আমাকে দোষ দেবেন না?

বিপিন। নিশ্চয় দেব যদি না আপনি স্থির হয়ে শুভকর্ম্মে সহায়তা করেন।

রসিক। আমি এখনো সাবধান করচি—গতং তদ্‌গাম্ভীর্যং তটমপি চিতং জালিকশতৈঃ সখে হংসোত্তিষ্ঠ, ত্বরিতমমুতো গচ্ছ সরসীং!

সে গাম্ভীর্য্য গেল কোথা, নদীতট হের হোথা
জালিকেরা জালে ফেলে ঘিরে―
সখে হংস ওঠ ওঠ, সময় থাকিতে ছোট
হেথা হতে মানসের তীরে!

শ্রীশ। কিছুতেই না! তা, আপনার সংস্কৃত শ্লোক ছুড়ে মারলেও সখা হংসরা কিছুতেই এখান থেকে নড়চেন না!

রসিক। স্থান খারাপ বটে নড়বার জো নেই! আমি ত অচল হয়ে বসে আছি―হায়, হায়―

অয়ি কুরঙ্গ তপোবন বিভ্রমাৎ
উপগতাসি কিরাতপুরীমিমাম্!

ভৃত্যের প্রবেশ।

ভৃত্য। চন্দ্রবাবু এসেচেন।

অক্ষয়। এইখানে ডেকে নিয়ে আয়।

(ভৃত্যের প্রস্থান)

রসিক। একেবারে দারোগার হাতে চোর দুটিকে সমর্পণ করে দেওয়া হক্।

চন্দ্রবাবুর প্রবেশ।

চন্দ্র। এই যে আপনারা এসেছেন। পূর্ণ বাবুকেও দেখচি!

অক্ষয়। আজ্ঞে না, আমি পূর্ণ নই, তবু অক্ষয় বটে!

চন্দ্র। অক্ষয় বাবু! তা বেশ হয়েছে, আপনাকেও দরকার ছিল!

অক্ষয়। আমার মত অদরকারী লোককে যে দরকারে লাগাবেন তাতেই লাগতে পারি―বলুন কি কর্‌তে হবে?

চন্দ্র। আমি ভেবে দেখেছি, আমাদের সভা থেকে কুমার ব্রতের নিয়ম না ওঠালে সভাকে অত্যন্ত সঙ্কীর্ণ করে রাখা হচ্ছে! শ্রীশ বাবু বিপিন বাবুকে এই কথাটা একটু ভাল করে বোঝাতে হবে।

অক্ষয়। ভারি কঠিন কাজ, আমার দ্বারা হবে কি না সন্দেহ!

চন্দ্র। একবার একটা মতকে ভাল বলে গ্রহণ করেছি বলেই সেটাকে পরিত্যাগ করবার ক্ষমতা দূর করা উচিত নয়। মতের চেয়ে বিবেচনাশক্তি বড়। শ্রীশবাবু, বিপিন বাবু―

শ্রীশ। আমাদের অধিক বলা বাহুল্য―

চন্দ্র। কেন বাহুল্য? আপনারা যুক্তিতেও কর্ণপাত করবেন না?

বিপিন। আমরা আপনারই মতে―

চন্দ্র। আমার মত এক সময় ভ্রান্ত ছিল সে কথা স্বীকার করছি, আপনারা এখনো সেই মতেই―

রসিক। এই যে পূর্ণবাবু আস্‌চেন! আসুন্ আসুন্!

পূর্ণর প্রবেশ।

চন্দ্র। পূর্ণবাবু, তোমার প্রস্তাবমতে আমাদের সভা থেকে কুমার ব্রত তুলে দেবার জন্যেই আজ আমরা এখানে মিলিত হয়েছি। কিন্তু শ্রীশবাবু এবং বিপিনবাবু অত্যন্ত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, এখন ওদের বোঝাতে পারলেই—

রসিক। ওঁদের বোঝাতে আমি ত্রুটি করিনি চন্দ্রবাবু―

চন্দ্র। আপনার মত বাগ্মী যদি ফল না পেয়ে থাকেন তা হলে―

রসিক। ফল যে পেয়েছি তা ফলেন পরিচীয়তে।

চন্দ্র। কি বলচেন ভাল বুঝতে পারচিনে।

ওহে রসিক দা, চন্দ্রবাবুকে খুব স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দেওয়া দরকার। আমি দুটি প্রত্যক্ষ প্রমাণ এখনি এনে উপস্থিত কর্‌চি!

শ্রীশ। পূর্ণবাবু, ভাল আছেন ত?

পূর্ণ। হাঁ।

বিপিন। আপনাকে একটু শুক্‌নো দেখাচ্ছে।

পূর্ণ। না, কিছু না।

শ্রীশ। আপনাদের পরীক্ষার আর ত দেরী নেই।

পূর্ণ। না।

(নৃপ ও নীরকে লইয়া অক্ষয়ের প্রবেশ।)

অক্ষয়। (নৃপ ও নীরর প্রতি) ইনি চন্দ্রবাবু ইনি তোমাদের গুরুজন, এঁকে প্রণাম কর। (নৃপ নীরর প্রণাম) চন্দ্রবাবু, নূতন নিয়মে আপনাদের সভায় এই দুটি সভ্য বাড়ল!

চন্দ্র। বড় খুসি হলেম। এঁরা কে?

অক্ষয়। আমার সঙ্গে এঁদের সম্বন্ধ খুব ঘনিষ্ঠ। এঁরা আমার দুটি শ্যালী। শ্রীশবাবু এবং বিপিনবাবুর সঙ্গে এঁদের সম্বন্ধ শুভলগ্নে আরো ঘনিষ্ঠতর হবে। এঁদের প্রতি দৃষ্টি করলেই বুঝ্‌বেন, রসিক বাবু এই যুবক দুটির যে মতের পরিবর্ত্তন করিয়েছেন সে কেবল মাত্র বাগ্মিতার দ্বারা নয়।

চন্দ্র। বড় আনন্দের কথা।

পূর্ণ। শ্রীশ বাবু, বড় খুসি হলুম! বিপিন বাবু আপনাদের বড় সৌভাগ্য! আশা করি, অবলাকান্ত বাবুও বঞ্চিত হন নি,তাঁরো একটি―

নির্ম্মলার প্রবেশ।

চন্দ্র। নির্ম্মলা শুনে খুসি হবে, শ্রীশবাবু এবং বিপিন বাবুর সঙ্গে এঁদের বিবাহের সম্বন্ধ স্থির হয়ে গেছে। তা হলে কুমারব্রত উঠিয়ে দেওয়া সম্বন্ধে প্রস্তাব উত্থাপন করাই বাহুল্য।

নির্ম্মলা। কিন্তু অবলাকান্তবাবুর মত ত নেওয়া হয় নি―তাঁকে এখানে দেখচিনে―

চন্দ্র। ঠিক কথা, আমি সেটা ভুলেই গিয়েছিলুম, তিনি আজ এখনো এলেন না কেন?

রসিক। কিছু চিন্তা করবেন না, তাঁর পরিবর্ত্তন দেখলে আপনারা আরো আশ্চর্য্য হবেন।

অক্ষয়। চন্দ্রবাবু, এবারে আমাকেও দলে নেবেন। সভাটি যে রকম লোভনীয় হয়ে উঠলো, এখন আমাকে ঠেকিয়ে রাখতে পারবেন না!

চন্দ্র। আপনাকে পাওয়া আমাদের সৌভাগ্য।

অক্ষয়। আমার সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি সভ্যও পাবেন। আজকের সভায় তাঁকে কিছুতেই উপস্থিত করতে পারলেম না। এখন তিনি নিজেকে সুলভ করবেন না,―বাসরঘরে ভূতপূর্ব্ব কুমারসভাটিকে সাধ্যমত পিণ্ডদান করে তার পরে যদি দেখা দেন! এইবার অবশিষ্ট সভ্যটি এলেই আমাদের চিরকুমারসভা সম্পূর্ণ সমাপ্ত হয়!

শৈলের প্রবেশ।

শৈল। (চন্দ্রকে প্রণাম করিয়া) আমাকে ক্ষমা করবেন!

শ্রীশ। একি, অবলাকান্ত বাবু―

অক্ষয়। আপনারা মত পরিবর্ত্তন করেছেন, ইনি বেশ পরিবর্ত্তন করেছেন মাত্র।

রসিক। শৈলজা ভবানী এতদিন কিরাত বেশ ধারণ করেছিলেন, আজ ইনি আবার তপস্বিনী বেশ গ্রহণ করলেন।

চন্দ্র। নির্ম্মলা আমি কিছুই বুঝতে পারচিনে।

নির্ম্মলা। অন্যায়! ভারি অন্যায়! অবলাকান্তবাবু―

অক্ষয়। নির্ম্মলা দেবী ঠিক বলেছেন—অন্যায়! কিন্তু সে বিধাতার অন্যায়! এঁর অবলাকান্ত হওয়াই উচিত ছিল, কিন্তু ভগবান্ এঁকে বিধবা শৈলবালা করে কি মঙ্গল সাধন করচেন সে-রহস্য আমাদের অগোচর!

শৈল। (নির্ম্মলার প্রতি) আমি অন্যায় করেছি, সে অন্যায়ের প্রতিকার আমার দ্বারা কি হবে? আশা করি কালে সমস্ত সংশোধন হয়ে যাবে।

পূর্ণ। (নির্ম্মলার নিকটে আসিয়া) এই অবকাশে আমি আপনার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি, চন্দ্রবাবুর পত্রে আমি যে স্পর্ধা প্রকাশ করেছিলুম সে আমার পক্ষে অন্যায় হয়েছিল—আমার মত অযোগ্য—

চন্দ্র। কিছু অন্যায় হয় নি পূর্ণবাবু আপনার যোগ্যতা যদি নির্ম্মল না বুঝতে পারেন ত সে নির্ম্মলারই বিবেচনার অভাব! (নির্ম্মলার নতমুখে নিরুত্তরে প্রস্থান)

রসিক। (পূর্ণের প্রতি জনান্তিকে) ভয় নেই পূর্ণবাবু আপনার দরখাস্ত মঞ্জুর―প্রজাপতির আদালতে ডিক্রি পেয়েছেন―কাল প্রত্যুষেই জারি করতে বেরবেন।

শ্রীশ। (শৈলবালার প্রতি) বড় ফাঁকি দিয়েছেন।

বিপিন। সম্বন্ধের পূর্ব্বেই পরিহাসটা করে নিয়েছেন।

শৈল। পরে তাই বলে নিষ্কৃতি পাবেন না!

বিপিন। নিষ্কৃতি চাইনে!

রসিক। এইবারে নাটক শেষ হল—এইখানে ভরতবাক্য উচ্চারণ করে দেওয়া যাক্।

সর্ব্বস্তরতু দুর্গাণি সর্ব্বো ভদ্রাণি পশ্যতু।
সর্ব্ব কামানবাপ্নোতু সর্ব্বঃ সর্ব্বত্র নন্দতু॥

১৩০৭