CastFM
টেক্সট সাইজ
120%
মার্জিন
5%
লাইন স্পেসিং
1.5

লেখকের ভূমিকা

কোনো আইডিয়া শুরুতে যদি উদ্ভট মনে না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে ওই আইডিয়ার কোনো আশা নেই।

—আলবার্ট আইনস্টাইন

দেয়ালের ভেতর দিয়ে হেঁটে কি অন্যপাশে চলে যাওয়া সম্ভব? কিংবা এমন নভোযান কি বানানো সম্ভব, যা দিয়ে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় চলাচল করা যাবে আলোর চেয়ে বেশি গতিতে? অন্য আরেকজনের মন কি পড়া যাবে? অদৃশ্য হওয়া যাবে চোখের পলকে? কোনো বস্তু কি নাড়ানো সম্ভব হবে স্রেফ মনের শক্তি দিয়ে? মহাকাশের সুদূরে আমাদের দেহকে দ্রুতবেগে পাঠিয়ে দেওয়া যাবে কখনো?

ছেলেবেলায় এসব প্রশ্ন সব সময় তীব্র শিহরণ জাগাত আমার মনে। বড় হয়ে ওঠার সময়গুলোতে অনেক পদার্থবিদের মতো আমিও টাইম ট্রাভেলের সম্ভাবনা, রে-গান, বলক্ষেত্র, প্যারালাল ইউনিভার্স বা সমান্তরাল মহাবিশ্বের মতো বিষয়ে জাদুমুগ্ধ হয়ে থাকতাম। আমার কল্পনাজগতে প্রকাণ্ড এক মাঠ হিসেবে কাজ করেছে ম্যাজিক, ফ্যান্টাসি আর বিজ্ঞান কল্পকাহিনি। এসবের সংস্পর্শে এসে সূচনা হয়েছিল অসম্ভব বিষয়গুলোর সঙ্গে আমার আজীবন ভালোবাসার বন্ধন।

টেলিভিশনে পুনঃপ্রচারিত ফ্ল্যাশ গর্ডন সিরিজ দেখার কথা আমার এখনো বেশ মনে আছে। প্রতি শনিবার আমার চোখজোড়া টিভি সেটের পর্দায় আঠার মতো লেগে থাকত। ফ্ল্যাশ, ড. জারকভ ও ডেল আরদেনের দুঃসাহসী সব অ্যাডভেঞ্চার আর তাদের রকেটশিপ, অদৃশ্য ঢাল, রে-গানের মতো চোখধাঁধানো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও আকাশছোঁয়া শহরগুলোই ছিল এর পেছনের কারণ। কোনো সপ্তাহে আমি এ সিরিজ বাদ দিইনি। এই টিভি প্রোগ্রাম আমার ভাবনায় সম্পূর্ণ নতুন এক জগৎ খুলে দিয়েছিল। কোনো একদিন সুদূর এলিয়েন গ্রহে রকেটে চেপে যাওয়া যাবে, তারপর সেখানকার অদ্ভুত ভূখণ্ডে অনুসন্ধান চালানোর কথা ভাবতাম আমি। এসব ভেবে ভেবে বেশ রোমাঞ্চিত হতাম তখন। ওই প্রোগ্রামে দেখানো দারুণ সব উদ্ভাবনের এক অমোঘ টানে সারা বেলা ঘুরপাক খেতাম আমি। এভাবেই একসময় জেনে গেলাম, আমার নিজের ভাগ্যও কোনো না কোনোভাবে বিজ্ঞানের প্রতিশ্রুত এই বিস্ময়ের সঙ্গে বাঁধা পড়ে গেছে।

পরে দেখলাম, এ পথের যাত্রী শুধু আমি একা নই, অনেক সফল বিজ্ঞানীও একসময় বিজ্ঞান কল্পকাহিনির মাধ্যমে বিজ্ঞানে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। জুল ভার্নের লেখার মুগ্ধ পাঠক ছিলেন নামকরা জ্যোতির্বিদ এডুইন হাবল। জুল ভার্নের লেখা পড়ার কারণেই হাবল আইন পেশা ছেড়ে দেন। অথচ এ পেশায় তাঁর সফল হওয়ার বেশ সম্ভাবনা ছিল। তারপর বিজ্ঞানে নিজের ক্যারিয়ার শুরু করেন বাবার আদেশ অমান্য করে। পরিণামে বিশ শতকের সেরা জ্যোতির্বিদ হতে পেরেছিলেন তিনি। এডগার রাইজ বারোজের জন কার্টার অব মার্স উপন্যাস পড়ার পর বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ ও বেস্টসেলার লেখক কার্ল সাগানের কল্পনাজগৎ রঙিন হয়ে উঠেছিল উপন্যাসের নায়ক জন কার্টারের মতো তিনিও মঙ্গলের বালুকণায় বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান চালানোর স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন।

আলবার্ট আইনস্টাইন যখন মারা যান, তখন আমি ছোট শিশু। মানুষজন তাঁর জীবন, মৃত্যু নিয়ে চাপাগলায় আলাপ-আলোচনা করছিল—সেসব আমার এখনো বেশ মনে আছে। পরদিন খবরের কাগজে দেখি, তাঁর ডেস্কের ছবি ছাপা হয়েছে। সেখানে তাঁর অতিগুরুত্বপূর্ণ গবেষণাকাজের অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপি পড়ে ছিল। সেদিন নিজেকেই প্রশ্ন করেছি আমি, কী এমন গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল সেটা যে আমাদের কালের সেরা এক বিজ্ঞানী হয়েও তিনি তা শেষ করে যেতে পারেননি? সেদিনের ওই লেখাতে দাবি করা হলো, আইনস্টাইন এক অসম্ভব স্বপ্ন দেখতেন। সেটি এমন কঠিনতর সমস্যা ছিল, যা কোনো জীবিত মানুষের পক্ষেও সমাধান করা সম্ভব নয়। ওই পাণ্ডুলিপিটি ঠিক কী বিষয়ে ছিল, তা খুঁজে বের করতে অনেক বছর লেগে গিয়েছিল আমার। পরে জানতে পারি, সেটি ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ, একীভূত ‘থিওরি অব এভরিথিং’ বা যাকে বলে সার্বিক তত্ত্ব। স্রেফ এই স্বপ্নের পেছনে জীবনের শেষ তিনটি দশক ব্যয় করেন আইনস্টাইন। তাঁর এই স্বপ্ন পরবর্তী সময়ে আমার নিজের কল্পনাজগতের দিকে মনোযোগ দিতেও সহায়তা করে। এরপর থেকে ছোটখাটো যেকোনো উপায়েই হোক না কেন, আইনস্টাইনের এ গবেষণা সম্পূর্ণ করার বা পদার্থবিজ্ঞানের সব সূত্র একটি একক তত্ত্বে একীভূত করার উদ্যোগের অংশ হতে চাইতাম আমি।

বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটা বিষয় আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়। আমি বুঝতে পারি, পর্দায় ফ্ল্যাশ গর্ডন নায়ক। আবার সব সময় মেয়েদের সান্নিধ্য সে। কিন্তু তা হলেও একমাত্র বিজ্ঞানীদের নেপথ্যে কাজের কারণেই আসলে এসব টিভি সিরিজ কার্যকর হয়ে ওঠে। ড. জারকভ ছাড়া থাকত না কোনো রকেটশিপ, মনগো গ্রহে কোনো অভিযান চালানোও যেত না, এমনকি রক্ষা করা যেত না পৃথিবীকেও। মোদ্দা কথা, বিজ্ঞান ছাড়া কোনো বিজ্ঞান কল্পকাহিনি বা বীরোচিত ঘটনার অস্তিত্বই থাকত না।

আমি বুঝতে পারি, বিজ্ঞান দিয়ে চিন্তা করে দেখলে এসব কল্পকাহিনি এককথায় অসম্ভব। শুধু কল্পনার পাখায় ভর করে চলে এগুলো। বড় হয়ে ওঠা মানে এ ধরনের ফ্যান্টাসির জগৎ থেকে বেরিয়ে আসা। অনেকেই আমাকে বলত, বাস্তব জীবনে সবাইকে এসব অসম্ভব কল্পনা বাদ দিয়ে নিরেট বাস্তবতাকে মেনে নিতে হয়।

তবে একসময় সিদ্ধান্তে পৌঁছালাম, অসম্ভব বিষয়গুলোতে আমার মুগ্ধতা যদি অটুট রাখতে চাই, তাহলে সেটি করে যেতে হবে পদার্থবিজ্ঞানের রাজ্যের ভেতরে থেকে। উচ্চতর পদার্থবিজ্ঞানে শক্ত ভিত ছাড়া ভবিষ্যৎ-মুখী যেকোনো কাল্পনিক প্রযুক্তি সম্পর্কে আমাকে সব সময়ই সন্দেহ করতে হবে। কারণ, তখনই কেবল বোঝা যাবে, প্রযুক্তিগুলো বাস্তবে আদৌ সম্ভব, নাকি অসম্ভব। বুঝতে পারলাম, উচ্চতর গণিতে মনোযোগ দিতে হবে আর সেই সঙ্গে ভালো করে শিখতে হবে তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান। কাজেই এরপর থেকে সেগুলোই করে যেতে থাকি আমি।

হাইস্কুলে বিজ্ঞান মেলার প্রজেক্টের জন্য আমার মায়ের গ্যারেজে একটা অ্যাটম স্ম্যাশার বা পরমাণু চূর্ণকারক যন্ত্র বানাই আমি। সে জন্য ওয়েস্টিংহাউস কোম্পানিতে গিয়ে ৪০০ পাউন্ড ট্রান্সফরমার স্টিলের জঞ্জাল জড়ো করি। বড়দিনের ছুটির পুরো সময়টা হাইস্কুলের ফুটবল মাঠে ২২ মাইল তামার তার প্যাচাই সেবার। এভাবে ২৩ মিলিয়ন ইলেকট্রন ভোল্টের বেটাট্রন পার্টিকেল অ্যাকসিলারেটর বানিয়েছিলাম। যন্ত্রটি চালাতে ৬ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ খরচ হতো (যা আমাদের পুরো বাড়ির বিদ্যুৎ খরচের সমান)। পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের চেয়েও ২০ হাজার গুণ বেশি চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করতে পারত আমার যন্ত্রটি। আমার লক্ষ্য ছিল, এমন শক্তিশালী গামারশ্মির ঝলক তৈরি করা, যা দিয়ে অ্যান্টিম্যাটার বা প্রতিবস্তু তৈরি করা যায়।

এই প্রজেক্টের কল্যাণে সেবার আমি জাতীয় বিজ্ঞান মেলায় যেতে পেরেছিলাম। এরপর একসময় হার্ভার্ডে স্কলারশিপ পেয়ে পূরণ হয় আমার স্বপ্নটাও। সেখানে একজন তাত্ত্বিক পদার্থবিদ হয়ে আর আমার রোল মডেল আলবার্ট আইনস্টাইনের পদাঙ্ক অনুসরণ করি। এভাবে অবশেষে আমার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারি।

এখন বিজ্ঞান কল্পকাহিনির লেখক ও চিত্রনাট্যকারদের কাছ থেকে আমি প্রচুর ই-মেইল পাই। তাঁদের লেখা গল্পগুলোকে আরও ক্ষুরধার করতে পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলোর সীমাবদ্ধতা অনুসন্ধানের মাধ্যমে আমার সহায়তা পেতে চান তাঁরা।

‘অসম্ভব’ হলো আপেক্ষিক

পদার্থবিদ হিসেবে আমি শিখেছি, ‘অসম্ভব’ হলো একটা আপেক্ষিক শব্দ। মনে আছে, বড় হয়ে ওঠার সময়, আমার এক শিক্ষিকা তাঁর পেছনের দেয়ালে ঝোলানো পৃথিবীর মানচিত্রের দিকে হেঁটে যেতে যেতে দক্ষিণ আমেরিকা আর আফ্রিকার উপকূলরেখার দিকে ইঙ্গিত করেছিলেন। এরপর তিনি বলেন, এই যে দুই মহাদেশের উপকূলরেখা পরস্পরের সঙ্গে মিলে যায়, এটা কি জিগস পাজলের মতো নিছক কাকতালীয় নয়? তিনি বললেন, কিছু কিছু বিজ্ঞানী মনে করেন, একসময় সব কটি মিলে হয়তো একসঙ্গে অনেক বড় একটা মহাদেশ ছিল। কিন্তু বিষয়টি হাস্যকর। কোনো শক্তিই এ রকম বিশাল দুই মহাদেশকে আলাদা করতে পারবে না। সবশেষে বললেন, সে রকম কোনো কিছু ঘটার কথা চিন্তা করাও অসম্ভব।

সে বছর কিছুদিন পর আমরা ডাইনোসর নিয়ে পড়ি। আমাদের শিক্ষক বললেন, ডাইনোসর কয়েক লাখ বছর ধরে পৃথিবী দাপিয়ে বেড়িয়েছে। তারপর একদিন হুট করে এখান থেকে গায়েব হয়ে গেল তারা। বিষয়টি কি অদ্ভুত নয়? কেউই জানে না, তারা এ রকম হুট করে সবাই কেন মারা গেল। কিছু ভূতত্ত্ববিদের ধারণা, মহাকাশ থেকে হয়তো একটা উল্কা এসে দলবলসহ তাদের মেরে ফেলেছিল। কিন্তু সেটা তো অসম্ভব, ওটা কেবল বিজ্ঞান কল্পকাহিনিতেই ঘটা সম্ভব।

এখন আমরা জানি, প্লেট টেকটোনিকের মাধ্যমে মহাদেশগুলো ক্রমেই পরস্পরের কাছ থেকে সরে যাচ্ছে। আর ৬৫ মিলিয়ন বছর আগে প্রায় ৬ মাইল লম্বা, বিশাল আকারের এক উল্কা আছড়ে পড়ে পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল ডাইনোসরসহ আরও অনেক প্রাণীকে। আমার নিজের স্বল্প জীবনকালে একদা অসম্ভব মনে হওয়া অনেক কিছুকে বারবার বৈজ্ঞানিক সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে দেখেছি। কাজেই আমরা একদিন নিজেদের হয়তো এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় টেলিপোর্ট করতে পারব, কিংবা আমাদের বহু আলোকবর্ষ দূরের কোনো নক্ষত্রে নিয়ে যেতে সক্ষম কোনো স্পেসশিপও বানাতে পারব—সেসব কল্পনা করা কি অসম্ভব?

সাধারণত এ রকম কাণ্ডকারখানাকে বর্তমানের পদার্থবিদেরা অসম্ভব মনে করেন। সেগুলো কি বাস্তবে সম্ভব হতে কয়েক শতাব্দী লেগে যাবে? নাকি কয়েক হাজার বছরের মধ্যে প্রযুক্তি যখন আরও উন্নত হবে, তখন সম্ভব হবে সেগুলো? নাকি আরও কয়েক লাখ বছর লেগে যাবে এসব সত্যি হতে? অন্যভাবে বলা যায়, আমরা যদি কোনোভাবে আমাদের চেয়ে দশ লাখ বছর বেশি উন্নত কোনো সভ্যতার মুখোমুখি হই, তাহলে কি তাদের দৈনন্দিন প্রযুক্তিগুলো আমাদের কাছে ‘ম্যাজিক’ বলে মনে হবে? আসলে এটিই এ বইটির মূল আলোচ্য বিষয়। আজকে অসম্ভব হওয়ার কারণে কি সেটা ভবিষ্যতে কয়েক শতাব্দী বা কয়েক লাখ বছরেও অসম্ভবই থেকে যাবে?

গত শতাব্দীতে বিজ্ঞানে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। বিশেষ করে ওই শতকে আবিষ্কৃত হয়েছে কোয়ান্টাম তত্ত্ব আর সাধারণ আপেক্ষিকতা। কাজেই এ ধরনের চমকপ্রদ কোনো প্রযুক্তি আদৌ যদি সম্ভবপর হয়, তাহলে তা কখন ঘটবে, তার মোটামুটি একটা ধারণা করা সম্ভব। স্ট্রিং থিওরির মতো আরও উন্নত কিছু তত্ত্ব আসার সঙ্গে সঙ্গে টাইম ট্রাভেল ও সমান্তরাল মহাবিশ্বের মতো বিজ্ঞান কল্পকাহিনির পাতায় বন্দী থাকা ধারণাগুলো নিয়ে পদার্থবিদেরাও এখন একটু নড়চড়ে বসতে শুরু করেছেন। ১৫০ বছর আগের কথা চিন্তা করুন। এখনকার চলমান অনেক প্ৰযুক্তিগত উন্নয়নকে সেকালে স্রেফ আজগুবি বা অসম্ভব বলে ঘোষণা করতেন বিজ্ঞানীরা। অথচ সেগুলোই এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জুল ভার্ন প্যারিস ইন দ্য টোয়েন্টি সেঞ্চুরি শিরোনামে এক উপন্যাস লেখেন ১৮৬৩ সালে। বাক্সের ভেতর দীর্ঘদিন তালাবদ্ধ ছিল সেটি। প্রায় এক শতাব্দীর বেশি সময় উপন্যাসটির কথা সবাই বেমালুম ভুলে যায়। হঠাৎ সেটি আবিষ্কার করে বসেন জুল ভার্নের প্রপৌত্র। তারপর ১৯৯৪ সালে প্রথমবারের মতো সেটি প্রকাশ করেন তিনি। প্যারিস শহর ১৯৬০ সালে দেখতে কেমন হতে পারে উপন্যাসটিতে অনুমান করেছেন জুল ভার্ন। তাঁর এ উপন্যাসজুড়ে প্রযুক্তির ছড়াছড়ি। অথচ উনিশ শতকে একদম অসম্ভব বলে মনে করা হতো সেগুলোকে। এসব প্রযুক্তির মধ্যে আছে ফ্যাক্স মেশিন, ওয়ার্ল্ড ওয়াইড যোগাযোগের নেটওয়ার্ক, কাচের তৈরি বহুতল ভবন, গ্যাসচালিত অটোমোবাইল আর উচ্চগতির এলিভেটেড ট্রেন।

জুল ভার্ন যে বিস্ময়করভাবে এমন সঠিক ভবিষ্যদ্বাণী করতে পেরেছেন, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ, বিজ্ঞানজগতে মগ্ন থাকতেন তিনি। তা ছাড়া সেকালের বিজ্ঞানীদের সঙ্গে নিত্য ওঠবস ছিল তাঁর। বিজ্ঞানের বিভিন্ন মৌলিক বিষয়ে একজন বিদগ্ধ সমঝদার হওয়ার কারণে তিনি এ রকম অবাক করা সব ভবিষ্যদ্বাণী করতে পেরেছিলেন।

দুর্ভাগ্য, উনিশ শতকের অন্যতম সেরা কজন বিজ্ঞানীর অবস্থান ছিল এর ঠিক বিপরীতে। কোনো কোনো প্রযুক্তিকে বাস্তবে বানানো একেবারে অসম্ভব বলেও ঘোষণা দিয়ে বসেন তাঁরা। ভিক্টোরিয়ান যুগের সম্ভবত সবচেয়ে নামকরা বিজ্ঞানী ছিলেন লর্ড কেলভিন (তাঁকে ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেতে আইজাক নিউটনের সমাধির পাশে সমাহিত করা হয়)। অথচ তিনি একবার ঘোষণা দিলেন, বাতাসের চেয়ে ভারী কোনো যন্ত্র (যেমন উড়োজাহাজ) ) বানানো অসম্ভব। শুধু তা-ই নয়, তাঁর ধারণা ছিল, এক্স-রে হলো স্রেফ ধাপ্পাবাজি, আর রেডিওর কোনো ভবিষ্যৎ নেই। এদিকে পরমাণুর নিউক্লিয়াসের আবিষ্কর্তা আর্নেস্ট রাদারফোর্ড পারমাণবিক বোমা তৈরির সম্ভাবনাকে অবাস্তব কল্পনা বলে একদম নাকচ করে দেন। উনিশ শতকের রসায়নবিদেরা পরশপাথরের (কাল্পনিক এমন এক পদার্থ, যা সিসাকে সোনায় রূপান্তরিত করতে পারে) অনুসন্ধানের ধারণাকে বৈজ্ঞানিকভাবে অচল বলে রায় দেন। উনিশ শতকের রসায়নের ভিত্তি ছিল সিসার মতো পদার্থের মৌলিক নিত্যতা। কিন্তু বর্তমানের অ্যাটম স্ম্যাশার ব্যবহার করে আমরা তাত্ত্বিকভাবে সিসার পরমাণুকে সোনায় রূপান্তর করতে পারি। একবার ভেবে দেখুন, আজকের যুগের টেলিভিশন, কম্পিউটার আর ইন্টারনেট গত বিশ শতকে কতটা বিস্ময়কর বলে মনে হতো।

কিছুদিন আগেও কৃষ্ণগহ্বরকে বিজ্ঞান কল্পকাহিনি বলে ভাবা হতো। ১৯৩৯ সালে আইনস্টাইন এক গবেষণাপত্রে লেখেন, কৃষ্ণগহ্বর কখনোই গঠিত হতে পারবে না। অথচ আজকের যুগে হাবল স্পেস টেলিস্কোপ ও চন্দ্র এক্স-রে টেলিস্কোপ মহাকাশে কয়েক হাজার কৃষ্ণগহ্বর উদ্ঘাটন করেছে। [ইভেন্ট হরাইজন নামের একটি বিশেষ ধরনের টেলিস্কোপে এম৮৭ ছায়াপথে অবস্থিত ৫০০ মিলিয়ন ট্রিলিয়ন দূরের একটি কৃষ্ণগহ্বরের ছবি সম্প্রতি তোলা সম্ভব হয়েছে।—অনুবাদক]

এসব প্রযুক্তি অসম্ভব মনে হওয়ার পেছনের কারণ হলো, উনিশ ও বিশ শতকের শুরুর দিকে তাঁদের পদার্থবিজ্ঞান ও অন্যান্য বিজ্ঞান জানা ছিল না। আসলে সেকালে বিজ্ঞানের অনেক কিছুই অজানা ছিল, বিশেষ করে পারমাণবিক পর্যায়ে। সুতরাং সেকালে এ ধরনের প্রযুক্তিগত উন্নয়ন যে অসম্ভব মনে হবে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

অসম্ভব নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা

মজার ব্যাপার হলো, অসম্ভব ব্যাপার নিয়ে গুরুতর পর্যবেক্ষণ বা পরীক্ষা- নিরীক্ষা করলে বিজ্ঞানের আরও উন্নত ও পুরোপুরি অপ্রত্যাশিত দিগন্ত উন্মোচিত হয়। যেমন, কয়েক শতক ধরে পারপিচুয়াল মোশন মেশিন বা অবিরাম গতির যন্ত্রের পেছনে হতাশাজনক আর বৃথা অন্বেষা চালানো হয়েছে। এর কারণে পদার্থবিদেরা একসময় সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন যে এ ধরনের যন্ত্র বানানো অসম্ভব। পাশাপাশি শক্তি সংরক্ষণ নীতি ও তাপগতিবিদ্যার তিনটি সূত্রকে মৌলিক নীতি হিসেবে স্বীকার করতে বাধ্য করেছে তাদের। কিন্তু অবিরাম গতির যন্ত্র বানানোর ব্যর্থ অনুসন্ধান তাপগতিবিদ্যার সম্পূর্ণ নতুন কোনো ক্ষেত্র খুলে দিতে পারে। বাষ্পীয় ইঞ্জিন, যন্ত্রযুগ ও আধুনিক শিল্পসমাজের ভিত্তির অনেকটাই তাপগতিবিদ্যার ওপর নির্ভরশীল।

উনিশ শতকের শেষে বিজ্ঞানীরা সিদ্ধান্তে আসেন, পৃথিবীর বয়স কয়েক বিলিয়ন বছর হওয়া অসম্ভব। লর্ড কেলভিন মোটাদাগে ঘোষণা করলেন, গলন্ত কোনো পৃথিবী ২০ থেকে ৪০ মিলিয়ন বছরের মধ্যেই ঠান্ডা হয়ে যেতে পারবে। অন্যদিকে তাঁর বিপক্ষের ভূতত্ত্ববিদ আর ডারউইনবাদী জীববিজ্ঞানীরা দাবি করে বসলেন, পৃথিবী সম্ভবত কয়েক বিলিয়ন বছর পুরোনো। নিউক্লিয়ার বল আবিষ্কার করে এই অসম্ভবটাই শেষ পর্যন্ত সম্ভব বলে প্রমাণ করেন মাদাম কুরি আর অন্য বিজ্ঞানীরা। তাঁরা দেখালেন পৃথিবীর কেন্দ্র কীভাবে তেজস্ক্রিয় ক্ষয়ে উত্তপ্ত হয় এবং কয়েক বিলিয়ন বছর গলন্ত অবস্থায় থেকে যেতে পারে।

বিপদের সময় আমরা সব অসম্ভবকে উপেক্ষা করি। ১৯২০-এর দশক থেকে ১৯৩০-এর দশকে আধুনিক রকেটবিদ্যার জনক রবার্ট গডার্ড সমালোচনার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন। সেকালে অনেকের ধারণা ছিল, রকেট কখনোই মহাকাশে যেতে পারবে না। আসলে তারা ছিল তাঁর প্রধান সমালোচক। তারা ব্যঙ্গ করে তাঁর গবেষণাকে বলত ‘গডার্ডের গাধামি’। ১৯২১ সালে নিউইয়র্ক টাইমস-এর সম্পাদক ড. গডার্ডের বিরুদ্ধে লেখেন : ‘প্রফেসর গডার্ড ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়ার ভেতর সম্পর্কটাই জানেন না। এমনকি বিক্রিয়া ঠেকাতে ভ্যাকুয়ামের চেয়েও যে ভালো কিছুর দরকার, তা-ও জানেন না। হাইস্কুলে যে তাঁর সাধারণ জ্ঞানের অভাব ছিল, সেটা বেশ বোঝা যাচ্ছে।’ রকেট চালানো অসম্ভব, কারণ মহাকাশে তাকে ঠেলার মতো কোনো বাতাস নেই বলে ওই সম্পাদক বেশ তর্জন-গর্জন করেন সেবার। দুর্ভাগ্যক্রমে, একটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান গডার্ডের এই ‘অসম্ভব’ রকেটের মর্ম সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তিনি ছিলেন অ্যাডলফ হিটলার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি তাদের তৈরি অতি উন্নত ভি-২ রকেট অবিরাম বৃষ্টির মতো ঝরিয়ে লন্ডন শহরের বুকে আঘাত হানে। তাতে সেখানে অগণিত মৃত্যু আর ধ্বংস ডেকে এনে ইংল্যান্ডকে প্রায় পদানত করে ফেলে জার্মানি

অসম্ভব নিয়ে এ রকম আলোচনা বিশ্ব ইতিহাসও হয়তো বদলে দিতে পারে। ১৯৩০-এর দশকে ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা হতো, পারমাণবিক বোমা বানানো ‘অসম্ভব’। এমনকি খোদ আইনস্টাইনও বিশ্বাস করতেন সেই কথা। আইনস্টাইনের বিখ্যাত সমীকরণ E=mc2 অনুযায়ী পদার্থবিদেরা তখন জানতেন, পরমাণুর নিউক্লিয়াসে বিপুল শক্তি মজুত আছে। কিন্তু তারপরও পরমাণুর কোনো নিউক্লিয়াস থেকে শক্তি বের করে আনা খুবই অর্থহীন কাজ বলে ভাবা হতো। তবে এইচ জি ওয়েলসের উপন্যাস দ্য ওয়ার্ল্ড সেট ফ্রি পড়ার কথা স্মরণ করেছেন পরমাণু পদার্থবিদ লিও জিলার্ড। উপন্যাসটিতে পারমাণবিক বোমা বানানোর ভবিষ্যদ্বাণী করেন ওয়েলস। বইতে তিনি উল্লেখ করেন, পদার্থবিদেরা পারমাণবিক বোমার রহস্য উদ্ঘাটন করবেন ১৯৩৩ সালের মধ্যেই। ভাগ্যক্রমে ১৯৩২ সালে হঠাৎ বইটি হাতে এসে পড়ে জিলার্ডের। দুই দশক আগে এই উপন্যাসে ওয়েলসের করা ভবিষ্যদ্বাণীর তাড়না থেকেই চেইন রিঅ্যাকশনের মাধ্যমে একটি পরমাণুর ওপর শক্তি কেন্দ্রীভূত করার আইডিয়াটি হঠাৎ তাঁর মাথায় আসে। এই চেইন রিঅ্যাকশনের মাধ্যমে একটি ইউরেনিয়াম নিউক্লিয়াস ভেঙে তার শক্তিকে অনেক গুণ বেশি শক্তিতে পরিণত করা যায়। একে একে বেশ কিছু ধারাবাহিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন জিলার্ড। তারপর আইনস্টাইন আর প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্টের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ করেন তিনি। এসব ঘটনাই ম্যানহাটান প্রজেক্টের দিকে নিয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্রকে। আর এই প্রজেক্টেই বানানো হয় প্রথম পারমাণবিক বোমা।

এভাবে আমরা বারবার দেখতে পাব, অসম্ভব নিয়ে গবেষণার কারণে পুরোপুরি নতুন নতুন দিগন্ত খুলে দেয়। পাশাপাশি পদার্থবিদ্যা ও রসায়নের চৌহদ্দির দিকে ঠেলে দেয় এবং বিজ্ঞানীরা যাকে ‘অসম্ভব’ বলে মনে করেন, তাকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে বাধ্য করে। স্যার উইলিয়াম অসলার একবার বলেছিলেন, ‘এক যুগের দর্শন পরের যুগের উদ্ভট বিষয়ে পরিণত হয়। আর গতকালের বোকামি পরিণত হয় আগামীকালের বিচক্ষণতায়।’

পদার্থবিদ টি এইচ হোয়াটের বিখ্যাত বাণীটিতে একমত অনেকে। তিনি দ্য ওয়ানস অ্যান্ড ফিউচার কিং-এ লেখেন, “নিষিদ্ধ নয় এমন যেকোনো কিছুই বাধ্যতামূলক’–পদার্থবিজ্ঞানে আমরা সব সময়ই এ রকম প্রমাণ খুঁজে পাই। নতুন কোনো ঘটনায় পদার্থবিদ্যার কোনো সূত্র স্পষ্ট বিরুদ্ধাচরণ না করা পর্যন্ত, আমরা তার অস্তিত্ব টের পাই না। (নতুন অতিপারমাণবিক কণা খোঁজার সময় এটা বারবার ঘটতে দেখা গেছে। কোনটা নিষিদ্ধ, তার সীমানা অনুসন্ধান করতে গিয়ে পদার্থবিদেরা প্রায় অপ্রত্যাশিতভাবে পদার্থবিজ্ঞানের নতুন নতুন সূত্র আবিষ্কার করে বসেন।) কাজেই টি এইচ হোয়াটের কথাটিতে একটু ঘুরিয়েও হয়তো বলা যায়, ‘অসম্ভব নয় এমন যেকোনো কিছুই বাধ্যতামূলক!’

যেমন বিশ্ব সৃষ্টিতত্ত্ববিদ স্টিফেন হকিং প্রমাণের চেষ্টা করেছিলেন, টাইম ট্রাভেল অসম্ভব। সে জন্য পদার্থবিজ্ঞানের নতুন একটি সূত্র খুঁজে বের করেন তিনি, যা টাইম ট্রাভেলকে নিষিদ্ধ করে। একে তিনি বলেন ক্রনোলজি প্রটেকশন কনজেকচার বা কালপঞ্জি সুরক্ষা অনুমান। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে অনেক বছরের কঠোর পরিশ্রমেও নীতিটি প্রমাণ করা যায়নি। আসলে বিপরীত দিকে পদার্থবিদেরা এখন প্রমাণ করেছেন যে টাইম ট্রাভেল ঠেকিয়ে দেওয়া সূত্র আমাদের বর্তমান যুগের গণিতের সীমানার বাইরে। এখন টাইম মেশিনের অস্তিত্ব ঠেকিয়ে দেওয়ার মতো পদার্থবিজ্ঞানের কোনো সূত্র না থাকার কারণে পদার্থবিদেরা এই সম্ভাবনাকে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন।

এই বইয়ের উদ্দেশ্য হলো যেসব প্রযুক্তিকে এখন ‘অসম্ভব’ বলে ভাবা হচ্ছে, কিন্তু যা কয়েক দশক থেকে কয়েক শতাব্দীর মধ্যেই সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়াবে—সেগুলো নিয়ে আলোচনা।

ইতিমধ্যে একটি ‘অসম্ভব’ প্রযুক্তি এখন সম্ভব বলে প্রমাণিত হয়েছে। সেটি হলো টেলিপোর্টেশন (অন্তত পরমাণু পর্যায়ে এটি করা সম্ভব হয়েছে)। অথচ কয়েক বছর আগেও পদার্থবিদেরা বলতেন, কোনো বস্তুকে এক বিন্দু থেকে আরেক বিন্দুতে পাঠানো বা বিমিং করা হলে তা কোয়ান্টাম ফিজিকসের সূত্র অমান্য করে। পদার্থবিদদের সমালোচনায় একসময় খুবই যন্ত্রণার ভেতর ছিলেন স্টার ট্রেকের টেলিভিশন সিরিজের লেখকেরা। সে কারণে তাদের টেলিপোর্টেশনকে ব্যাখ্যা করতে ‘হাইজেনবার্গের ক্ষতিপূরণ’ যোগ করেছেন তাঁরা। সাম্প্রতিক যুগান্তকারী এক ঘটনার কারণে পদার্থবিদেরা এখন পরমাণুকে একটি ঘরের এ প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে পাঠাতে পারেন। আবার ফোটন পাঠাতে পারেন দানিয়ুব নদীর তলদেশ দিয়েও।

ভবিষ্যতের অনুমান

ভবিষ্যদ্বাণী করা সব সময়ই বিপজ্জনক। বিশেষ করে যে ভবিষ্যদ্বাণীটি পূরণ হতে ভবিষ্যতে কয়েক শতাব্দী থেকে কয়েক হাজার বছর লেগে যেতে পারে, তাতে বিপদ আরও বেশি। পদার্থবিদ নীলস বোর প্রায়ই একটা কথা বলতেন, “ভবিষ্যদ্বাণী করা খুবই কঠিন। বিশেষ করে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে।’ কিন্তু জুল ভার্নের সময়কাল ও বর্তমানের মধ্যে এক মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। বর্তমানে পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক সূত্রগুলো বোঝা সম্ভব হয়েছে। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, প্রোটনের অভ্যন্তরীণ গঠন থেকে শুরু করে তার তুলনায় ১০৪৩ গুণ বড় প্রসারণশীল মহাবিশ্বকে নিয়ন্ত্রণকারী সূত্রগুলো বর্তমানে জানেন পদার্থবিদেরা ফলে মোটাদাগে ভবিষ্যতের প্রযুক্তির চেহারা কেমন হবে, সে সম্পর্কে পদার্থবিদেরা এখন যৌক্তিক আত্মবিশ্বাস নিয়ে কথা বলতে পারেন। আবার কোন কোন প্রযুক্তির অসম্ভাবনা সন্দেহজনক আর কোনগুলো সত্যি সত্যিই অসম্ভব, তার মধ্যে পার্থক্য টানতে পারেন তাঁরা।

সে কারণে যেসব প্রযুক্তি ‘অসম্ভব’, সেগুলোকে এই বইয়ে তিনটি ভাগে ভাগ করেছি আমি।

এগুলোর মধ্যে প্রথমটিকে আমি বলব প্রথম শ্রেণির অসম্ভাব্যতা। এই প্রযুক্তিগুলো বর্তমানে অসম্ভব, কিন্তু এরা পদার্থবিদ্যার কোনো সূত্ৰ অমান্য করে না। কাজেই সেগুলো এই শতাব্দীতেই বাস্তবায়ন করা সম্ভব হতে পারে কিংবা হয়তো রূপান্তরিতভাবে সম্ভব হতে পারে পরের কোনো শতাব্দীতে। এ শ্রেণির মধ্যে আছে টেলিপোর্টেশন, অ্যান্টিম্যাটার বা প্রতিপদার্থ ইঞ্জিন, নির্দিষ্ট ধরনের টেলিপ্যাথি, সাইকোকানেসিস আর অদৃশ্য হওয়া।

দ্বিতীয় ধরনটিকে বলব দ্বিতীয় শ্রেণির অসম্ভাব্যতা। এসব প্রযুক্তি ভৌত বিশ্বে আমাদের উপলব্ধির দিক থেকে খুবই কাছাকাছি রয়েছে। এগুলো যদি কখনো আদৌ সম্ভব হয়, তাহলে তার জন্য সহস্রাব্দ থেকে কয়েক মিলিয়ন বছরও লেগে যেতে পারে। এদের মধ্যে রয়েছে টাইম মেশিন, হাইপারস্পেস ট্রাভেলের সম্ভাবনা আর ওয়ার্মহোলের মধ্য দিয়ে ভ্রমণ।

সর্বশেষ ধরনটিকে আমি বলব তৃতীয় শ্রেণির অসম্ভাব্যতা। এসব প্রযুক্তি আমাদের বর্তমানে জানা পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলো লঙ্ঘন করে। অবাক ব্যাপার হলো, এ রকম প্রযুক্তির সংখ্যা একেবারে হাতে গোনা। এগুলো যদি কখনো সম্ভবপর হয়, তাহলে সেগুলো আমাদের উপলব্ধির মৌলিক ধারণা পাল্টে দেবে।

আমার ধারণা, এই শ্রেণিবিভাগটা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বিজ্ঞান কল্পকাহিনিতে দেখানো বেশ কিছু প্রযুক্তি বিজ্ঞানীরা এমনভাবে নাকচ করে দেন, যেন সেগুলো কখনোই সম্ভব নয়। আসলে এর মাধ্যমে তাঁরা বোঝাতে চান, আমাদের মতো আদিম সভ্যতার পক্ষে এগুলো অসম্ভব। যেমন এলিয়েন দেখাকে সাধারণত অসম্ভব ঘটনা বলে মনে করা হয়। কারণ, নক্ষত্রগুলোর একটি থেকে আরেকটির মাঝখানের দূরত্ব অনেক বেশি। সে কারণে আন্তনাক্ষত্রিক ভ্রমণ আমাদের জন্য আক্ষরিক অর্থেই অসম্ভব। কিন্তু তবু আমাদের চেয়ে কয়েক শতাব্দী থেকে কয়েক হাজার কিংবা কয়েক লাখ বছর এগিয়ে থাকা অন্য কোনো সভ্যতার জন্য হয়তো তা সম্ভবও হতে পারে। কাজেই এ ধরনের ‘অসম্ভাব্যতা’র শ্রেণিকরণ করা জরুরি। আমাদের বর্তমান সভ্যতায় যেসব প্রযুক্তি অসম্ভব, সেগুলো অন্য কোনো ধরনের সভ্যতার জন্য অসম্ভব না-ও হতে পারে। আমাদের থেকে হাজার বা লাখ বছর সামনে অগ্রসর কোনো সভ্যতায় কোনটি সম্ভব আর কোনটি অসম্ভব, সে সম্পর্কে বিবৃতি গণনায় ধরতে হবে।

কার্ল সাগান একবার লিখেছিলেন, ‘কোনো সভ্যতার জন্য এক মিলিয়ন বছর বয়সের অর্থ কী? আমাদের কাছে রেডিও টেলিস্কোপ ও স্পেসশিপ আছে মাত্র কয়েক দশক হলো; আমাদের প্রযুক্তিগত সভ্যতার বয়স মাত্র কয়েক শ বছর। কাজেই দশ লাখ বছরের পুরোনো উন্নত কোনো সভ্যতা আমাদের থেকে ততটাই এগিয়ে থাকবে, যতটা কোনো বুশ বেবি বা ম্যাকাও বানরের চেয়ে আমরা এগিয়ে আছি।’

আমার নিজের গবেষণায় পেশাগতভাবে আইনস্টাইনের স্বপ্নের ‘থিওরি অব এভরিথিং’ সম্পূর্ণ করার দিকে মনোযোগ দিয়েছি আমি। চূড়ান্ত তত্ত্ব নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে গবেষণা করতে গিয়ে বেশ আনন্দ খুঁজে পাই। এটিই হয়তো এখনকার বিজ্ঞানের সবচেয়ে কঠিন কতিপয় ‘অসম্ভব’ প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর দিতে পারবে। প্রশ্নগুলো যেমন টাইম ট্রাভেল সম্ভব কি না, কৃষ্ণগহ্বরের ভেতরে কী আছে কিংবা মহাবিস্ফোরণের আগে কী ঘটেছিল। আমি এখনো অসম্ভাব্যতার সঙ্গে আমার দীর্ঘদিনের ভালোবাসা নিয়ে দিবাস্বপ্ন দেখি। কখনো যদি এ অসম্ভবগুলোর কিছু কিছু আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে ঢুকে যেতে পারে, তাহলে যারপরনাই বিস্মিত হব।

প্রথম পর্ব : প্রথম শ্রেণির অসম্ভাব্যতা

১ বলক্ষেত্র

১. নামকরা ও বয়স্ক কোনো বিজ্ঞানী যখন বলেন, কোনো কিছু সম্ভব, নিঃসন্দেহে তিনি তখন প্রায় সঠিক কথাই বলেন। তিনি যখন বলেন, কোনো কিছু অসম্ভব, সম্ভবত তখন তিনি ভুল বলেন।

২. সম্ভাবনার সীমানা আবিষ্কারের একমাত্র উপায় হলো, তা থেকে কিছু দূর অতীতের অসম্ভব থেকে ঘুরে আসা।

যথেষ্ট উন্নত কোনো প্রযুক্তিকে ম্যাজিক থেকে আলাদা করা যায় না। —আর্থার সি ক্লার্কের তিনটি সূত্র

‘শিল্ড আপ’

স্টার ট্রেকের অনেকগুলো পর্বে এটিই হলো ক্রুদের প্রতি ক্যাপ্টেন কার্কের প্রথম আদেশ। ফোর্স ফিল্ড বা বলক্ষেত্র উঠিয়ে স্টারশিপ এন্টারপ্রাইজকে শত্রুপক্ষের গোলা থেকে রক্ষা করার আদেশ এটা।

স্টার ট্রেকে ফোর্স ফিল্ড এতই অপরিহার্য যে বলক্ষেত্রটি কীভাবে ওঠানো হয়েছে, তা দেখে যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করা যায়। যখনই এই ফোর্স ফিল্ড থেকে শক্তি ক্রমাগত বেরিয়ে যেতে থাকে, এন্টারপ্রাইজের কাঠামোতে ক্ষতি হয়ে ততই ভুগতে থাকে। এর ফলে সবশেষে তাদের আত্মসমৰ্পণ অনিবার্য হয়ে ওঠে।

তাহলে এই ফোর্স ফিল্ড বা বলক্ষেত্র আসলে কী? বিজ্ঞান কল্পকাহিনিতে এটি বেশ সহজ কাজ, কিন্তু বিভ্রান্তিকর। সেখানে একটা পাতলা, অদৃশ্য হলেও অপ্রবেশ্য দেয়াল দেখানো হয়। এই দেয়াল লেজার ও রকেটের মতো কোনো কিছুকে ঠেকিয়ে পথচ্যুত করে দিতে পারে। প্রথম দর্শনে বলক্ষেত্র দেখতে এতই সরল ব্যাপার বলে দেখা যায় যে যুদ্ধক্ষেত্রে এ ধরনের দেয়াল বানানো অপরিহার্য মনে হবে। এতে অনেকে আশা করে বসতে পারে, যেকোনো দিন কোনো প্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবক হয়তো প্রতিরক্ষা বলক্ষেত্র আবিষ্কারের ঘোষণা দেবেন। কিন্তু প্রকৃত সত্যটা আসলে এর চেয়েও অনেক জটিল।

এডিসনের লাইট বাল্ব আধুনিক সভ্যতায় যেভাবে বিপ্লব এনে দিয়েছিল, একইভাবে বলক্ষেত্রও আমাদের জীবনের প্রতিটি দিকে গভীরভাবে প্রভাব ফেলতে পারবে। কোনো সেনাবাহিনী বলক্ষেত্র ব্যবহার করে শত্রুপক্ষের কাছে অভেদ্য হয়ে উঠতে পারবে। এর মাধ্যমে শত্রুপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র ও বুলেটের বিরুদ্ধে একটা অপ্রবেশ্যযোগ্য দেয়াল গড়ে তুলতে পারবে তারা। তাত্ত্বিকভাবে স্রেফ একটা বোতাম টিপেই নিমেষে সেতু, সুপারহাইওয়ে আর রাস্তা বানানো যাবে। আবার মুহূর্তের মধ্যে আস্ত এক শহর গড়ে তোলা যাবে কোনো ধু ধু মরুপ্রান্তরে। সেখানে একগাদা আকাশছোঁয়া ভবনও বানানো যাবে শুধু এই বলক্ষেত্র ব্যবহার করে। আবার শহরগুলোতে বলক্ষেত্র ব্যবহার করে সেখানকার অধিবাসীরা ইচ্ছেমতো আবহাওয়া (তীব্র বাতাস, বরফঝড়, টর্নেডো) বদলাতে পারবে। বলক্ষেত্রের নিরাপদ শামিয়ানার মধ্যে মহাসাগরের তলদেশেও আস্ত শহর বানানো যাবে। সে জন্য গ্লাস, ইস্পাত ও মর্টার (দেয়াল বা অন্য কিছু গাঁথার জন্য চুন, বালু ও পানির মিশ্রণ) লাগবে না।

তারপরও গবেষণাগারে বানানোর জন্য সম্ভবত সবচেয়ে কঠিন যন্ত্রটির নাম বলক্ষেত্র। সত্যি বলতে, অনেক পদার্থবিদ বিশ্বাস করেন, ধর্ম পরিবর্তন না করে এ ধরনের যন্ত্র তৈরি করা অসম্ভব।

মাইকেল ফ্যারাডে

ফোর্স ফিল্ড বা বলক্ষেত্রের ধারণার উদ্ভব হয় উনিশ শতকের অন্যতম সেরা ব্রিটিশ বিজ্ঞানী মাইকেল ফ্যারাডের গবেষণা থেকে।

১৮০০ সালের শুরুর দিকে শ্রমিকশ্রেণির এক পিতা-মাতার ঘরে জন্মেছিলেন ফ্যারাডে। তাঁর বাবা ছিলেন কামার। পরিবারকে কোনোমতে সহায়তা করতে সামান্য এক শিক্ষানবিশ বই বাঁধাইকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন ফ্যারাডে। তরুণ ফ্যারাডে দুটি নতুন বলের রহস্যময় ধর্ম উন্মোচনে বিপুল সাফল্য পান। বল দুটি হলো বিদ্যুৎ ও চুম্বকত্ব। এসব বিষয়ে যেখানে যা লেখা পেতেন, তাই গ্রোগ্রাসে গিলতেন ফ্যারাডে। ওই আগ্রহের জেরে লন্ডনের রয়্যাল ইনস্টিটিউটে হাজির হতেন প্রফেসর হামফ্রে ডেভির বক্তৃতা শুনতে।

একদিন এক রাসায়নিক দুর্ঘটনায় প্রফেসর ডেভির চোখ গুরুতর জখম হয়। তখন ফ্যারাডেকে সহকারী হিসেবে নিয়োগ দেন তিনি। শুরুতে তাঁকে প্রায়ই তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হলেও আস্তে আস্তে রয়্যাল ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীদের আস্থা অর্জন করতে থাকেন ফ্যারাডে। ফলে নিজের কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা চালানোর অনুমতি পান তিনি। বছরের পর বছর নিজের তরুণ সহকারীর মেধার স্বাক্ষর দেখে প্রফেসর ডেভি ধীরে ধীরে ঈর্ষায় জ্বলে উঠতে থাকেন। এভাবে পরীক্ষামূলক বিজ্ঞানীদের দলে উদীয়মান এক নক্ষত্র হিসেবে আবির্ভূত হন ফ্যারাডে। বিপরীতে মুছে যেতে থাকে ডেভির নাম-নিশানা। ১৮২৯ সালে ডেভির মৃত্যুর পর ফ্যারাডের বিস্ময়কর কিছু সফলতা অর্জনের পথ খুলে যায়। এ সুযোগটাই তাঁকে জেনারেটর উদ্ভাবনের পথে নিয়ে যায়। তাঁর এই উদ্ভাবন একসময় গোটা শহরে শক্তি সরবরাহে সক্ষম করে তোলে, এমনকি পাল্টে দেয় বিশ্ব সভ্যতার গতিপথটাও।

ফ্যারাডের সেরা আবিষ্কারগুলোর অন্যতম চাবিকাঠি ছিল তাঁর ফোর্স ফিল্ড। একটি চুম্বকের ওপর লোহার গুঁড়া রাখলে গুঁড়াগুলো মাকড়সার মতো একটা নকশা তৈরি হতে দেখা যায়, যা ওই জায়গাজুড়ে ছড়িয়ে থাকে। এগুলো হলো ফ্যারাডের বলের রেখা। বিদ্যুৎ ও চুম্বকের বলক্ষেত্র স্থানের মধ্যে কীভাবে বিস্তৃত থাকে, সেটিই চিত্রের মতো ব্যাখ্যা করে এ বলরেখা। যেমন পৃথিবীর চুম্বকীয় ক্ষেত্র আঁকা হলে রেখাগুলোকে উত্তর মেরু অঞ্চল থেকে উদ্ভূত হয়ে পৃথিবীর দক্ষিণ মেরু অঞ্চলে নেমে আসতে দেখা যাবে।

একইভাবে বজ্রপাতে কোনো বজ্রপাত দণ্ডের (লাইটিং রড) বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রের রেখা আঁকা হলেও বলের রেখাগুলো ঘনীভূত হতে দেখা যাবে লাইটিং রডের ডগার দিকে। ফ্যারাডের কাছে খালি জায়গা বা শূন্যস্থান বলতে কিছু ছিল না। বরং সেগুলোও বলের রেখা দিয়ে পরিপূর্ণ ছিল, যা দূরের বস্তুকে নাড়াতে পারে। (দারিদ্র্য ও দুর্দশার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠার কারণে ফ্যারাডে বলতে গেলে গণিতে নিরক্ষর ছিলেন। ফলে তাঁর নোটবুকে কোনো সমীকরণ লেখা থাকত না। তাঁর বদলে সেখানে থাকত বলের রেখাগুলোর হাতে আঁকা নকশা। মজার ব্যাপার হলো, গণিতে তাঁর শিক্ষা কম থাকার কারণে তাঁর তৈরি করা চমৎকার এসব বলরেখার নকশা এখনো যেকোনো পদার্থবিজ্ঞান বইয়ে দেখা যাবে। আসলে বিজ্ঞানে কোনো ভৌত চিত্র প্রায়ই গাণিতিকভাবে বর্ণনার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।)

ফোর্স ফিল্ড নামের বিজ্ঞানের অন্যতম সেরা ও গুরুত্বপূর্ণ এই ধারণা ফ্যারাডে কীভাবে আবিষ্কার করলেন, তা নিয়ে ইতিহাসবিদেরা যথেষ্ট জল্পনা-কল্পনা করেছেন। সত্যি বলতে, আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের সবকিছুই লেখা হয়েছে ফ্যারাডের বলক্ষেত্রের ভাষা ব্যবহার করে। ১৮৩১ সালে বলক্ষেত্র-সংক্রান্ত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সফলতা অর্জন করেন ফ্যারাডে। এটিই সভ্যতাকে চিরতরে বদলে দেয়। একদিন একটি ছোট চুম্বক তারের কুণ্ডলীর ওপর নড়াচড়া করছিলেন তিনি। হঠাৎ খেয়াল করেন, ওই তারে কোনো স্পর্শ না করেই তিনি সেখানে বিদ্যুৎপ্রবাহ সৃষ্টি করতে পেরেছেন। এর মানে হলো, চুম্বকের অদৃশ্য ক্ষেত্রও শূন্যস্থানে জুড়ে থাকা তারের ভেতরের ইলেকট্রনকে ধাক্কা দিয়ে বিদ্যুৎপ্রবাহ তৈরি করতে পারে।

ফ্যারাডের বলক্ষেত্রগুলোকে একসময় অকেজো, নিরর্থক হিজিবিজি বলে ভাবা হতো। কিন্তু সেগুলোই আসলে বাস্তব ও বস্তুগত বল, যা বস্তুকে নড়াচড়া করাতে পারে আর শক্তি উৎপাদনও করতে পারে। এখন আপনি যে আলো জ্বালিয়ে বইয়ের এই পৃষ্ঠাটি পড়ছেন, তা-ও শক্তি পাচ্ছে ফ্যারাডের বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় সম্পর্ক আবিষ্কারের মাধ্যমে। ঘূর্ণমান চুম্বক একটি বলক্ষেত্র সৃষ্টি করে। সেটি তারের ভেতরের ইলেকট্রনকে ধাক্কা দিতে পারে। সে কারণে ইলেকট্রনগুলো চলাচল করে বিদ্যুৎপ্রবাহের সৃষ্টি করে। তারের ভেতরের এই বিদ্যুৎপ্রবাহ পরে ব্যবহার করা যায় লাইট বাল্ব জ্বালাতে। ঠিক একই নীতি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে শক্তি সরবরাহ করা হয় বিশ্বের বিভিন্ন শহরে। যেমন বাঁধ দিয়ে পানির স্রোত তৈরি করে টারবাইনে বিশাল আকৃতির এক চুম্বক ঘোরানো হয়। আসলে এটিই তারের ভেতরের ইলেকট্রনগুলোকে অনবরত ধাক্কা দিতে থাকে। এতে তারের ভেতর বৈদ্যুতিক প্রবাহের সৃষ্টি হয়, যা উচ্চ ভোল্টেজের তারের মধ্য দিয়ে পাঠানো হয় আমাদের বাসাবাড়িতে।

অন্য কথায়, মাইকেল ফ্যারাডের বলক্ষেত্র বৈদ্যুতিক বুলডোজার থেকে শুরু করে আধুনিক কালের কম্পিউটার, ইন্টারনেট ও আইপড তথা আধুনিক সভ্যতার সবকিছুর মূল চালিকা শক্তি।

ফ্যারাডের বলক্ষেত্র গত প্রায় দেড় শ বছর পদার্থবিদদের অনুপ্রাণিত করে আসছে। আইনস্টাইন এতে এতই অনুপ্রাণিত হন যে তিনি তাঁর মহাকর্ষের তত্ত্ব লেখেন বলক্ষেত্রের শর্ত ব্যবহার করে। ফ্যারাডের গবেষণায় অনুপ্রাণিত হয়েছি আমি নিজেও। বেশ কয়েক বছর আগে আমি সফলভাবে স্ট্রিং থিওরি লিখি ফ্যারাডের বলক্ষেত্রের শর্তাবলি ব্যবহার করে। এভাবে একদিন স্ট্রিং ফিল্ড থিওরিও খুঁজে পাই আমি। পদার্থবিদ্যায় যখন কেউ বলে, ‘তিনি বলের রেখামতো চিন্তা করেন’, তা দিয়ে আসলে অসাধারণ প্রশংসা বোঝানো হয়।

চারটি বল

গত দুই হাজারের বেশি কাল পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম প্রধান অর্জন হলো মহাবিশ্ব নিয়ন্ত্রণকারী চারটি বলকে আলাদা করে শনাক্ত করা। এদের প্রতিটি ফ্যারাডের প্রবর্তিত বলক্ষেত্রের ভাষা দিয়ে বর্ণনা করা যায়। তবে দুর্ভাগ্যক্রমে বেশির ভাগ বিজ্ঞান কল্পকাহিনিতে এদের বলক্ষেত্রের ধর্মগুলো সঠিকভাবে দেখানো হয় না। যা-ই হোক, এ বলগুলো হলো :

১. মহাকর্ষ বল : মহাকর্ষ হলো নীরব বল। আমাদের পাগুলো এ বলটি মাটির সঙ্গে আটকে রাখে। পৃথিবী ও নক্ষত্রগুলোর বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া ঠেকিয়ে রাখে মহাকর্ষ। একই সঙ্গে সৌরজগৎ ও ছায়াপথকে একত্রে বেঁধে রেখেছে। মহাকর্ষ বল না থাকলে গ্রহের ঘূর্ণনের কারণে আমরা পৃথিবী ছেড়ে সেকেন্ডে ১০০০ মাইল বেগে মহাশূন্যে ছিটকে যেতাম। সমস্যাটি হলো, বিজ্ঞান কল্পকাহিনিতে যেমন বলক্ষেত্র দেখা যায় মহাকর্ষের ধর্ম আসলে ঠিক তার বিপরীত। মহাকর্ষ আকর্ষণধর্মী, বিকর্ষণধর্মী নয়। অন্য বলের সঙ্গে তুলনা করলে এটি খুব দুর্বল। তবে তা বিপুল দূরত্ব থেকেও ক্রিয়া করতে পারে। অন্য কথায়, বিজ্ঞান কল্পকাহিনি বইয়ে পড়া বা মুভিতে দেখা সেই সমতল, পাতলা, অপ্রবেশযোগ্য দেয়ালের প্রায় বিপরীত চরিত্রের এ বলটি। যেমন মেঝেতে একটা পালক আকর্ষণ করতে পুরো পৃথিবী প্রয়োজন। কিন্তু আমরা শুধু একটা আঙুল দিয়ে পালকটি তুলে পৃথিবীর মহাকর্ষের বিপরীতে কাজ করতে পারি। কাজেই আমাদের হাত ছয় ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন কিলোগ্রাম ওজনের পুরো একটি গ্রহের মহাকর্ষের বিপরীতে কাজ করতে পারে।

২. বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় বল : ইলেকট্রোম্যাগনেটিজম (ইএম) বা বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় বল আমাদের শহরগুলোকে আলোকিত রাখে। লেজার, রেডিও, টিভি, আধুনিক ইলেট্রনিকস, কম্পিউটার, ইন্টারনেট, বিদ্যুৎ, চুম্বকত্ব—সবই বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় বলের পরিণতি। মানবজাতির পোষ মানানো সবচেয়ে উপকারী বল সম্ভবত এটিই। মহাকর্ষের বিপরীতে, এটি আকর্ষণ ও বিকর্ষণ দুটোই করতে পারে। তবে বলক্ষেত্র হিসেবে এটি অনুপযোগী হওয়ার বেশ কিছু কারণ আছে। প্রথমত, একে খুব সহজেই নিষ্ক্রিয় করা যায়। যেমন প্লাস্টিক ও অন্য রোধকগুলো সহজেই একটি শক্তিশালী বৈদ্যুতিক বা চুম্বকীয় ক্ষেত্রে ঢোকানো যায়। কোনো চুম্বকীয় ক্ষেত্রে এক টুকরো প্লাস্টিক ছুড়ে দিলে কোনো বাধা ছাড়াই সেটি সরাসরি অন্যপাশে চলে যাবে। দ্বিতীয়ত, বিদ্যুৎ-চুম্বকত্ব বড় দূরত্বে কাজ করতে পারে না এবং কোনো সমতলে সহজে কেন্দ্রীভূত করা যায় না। জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণগুলো বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় বলের সূত্রগুলো ব্যাখ্যা করে। এই সমীকরণগুলো সমাধান হিসেবে এ ধরনের কোনো বলক্ষেত্র স্বীকার করে বলে মনে হয় না।

৩ ও ৪ দুর্বল ও সবল নিউক্লিয়ার বল : দুর্বল বল তেজস্ক্রিয় ক্ষয়ের বল। বলটি পৃথিবীর তেজস্ক্রিয় কেন্দ্রকে উষ্ণ রাখছে। আগ্নেয়গিরি, ভূমিকম্প ও মহাদেশীয় চলনের পেছনে কাজ করে বলটি। অন্যদিকে পরমাণুর নিউক্লিয়াসকে একসঙ্গে আটকে রাখে শক্তিশালী পারমাণবিক বল বা সবল নিউক্লিয়ার বল। সূর্য ও নক্ষত্রে শক্তি উৎপন্ন হয় এই সবল নিউক্লিয়ার বল থেকে, যা মহাবিশ্বকে আলোকিত করার জন্য দায়ী। সমস্যা হলো, নিউক্লিয়ার বল খুব স্বল্প পাল্লার, যা মূলত নিউক্লিয়াসের দূরত্বে কার্যকর। বলটি নিউক্লিয়াসের ধর্মের সঙ্গে আবদ্ধ হওয়ার কারণে একে কাজে লাগানো খুব কঠিন। বর্তমানে এই বলকে কাজে লাগানোর একমাত্র উপায়, অ্যাটম স্ম্যাশার বা পরমাণু চূর্ণকারক যন্ত্রে অতিপারমাণবিক কণায় বিভক্ত করা কিংবা কোনো পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো।

.

বিজ্ঞান কল্পকাহিনিতে বলক্ষেত্রকে যেভাবে ব্যবহার করা হয়, তা হয়তো পদার্থবিজ্ঞানের জানা সূত্রগুলোর সঙ্গে খাপ খায় না। তবে এমন কোনো কিছু থাকাও সম্ভব, যা থেকে এ ধরনের বলক্ষেত্র সৃষ্টি করা যাবে। প্ৰথমত, পঞ্চম বলের অস্তিত্বও হয়তো থাকতে পারে। তবে এটি গবেষণাগারে এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। এ রকম বল হয়তো বিশাল দূরত্বের বদলে মাত্র কয়েক ইঞ্চি থেকে কয়েক ফুট পর্যন্ত কাজ করবে। (অবশ্য এমন পঞ্চম বলের অস্তিত্ব পরিমাপের প্রাথমিক প্রচেষ্টায় এখন পর্যন্ত নেতিবাচক ফল পাওয়া গেছে।)

দ্বিতীয়ত, বলক্ষেত্রের কিছু কিছু ধর্ম অনুকরণ করতে প্লাজমা ব্যবহার করা সম্ভব হতে পারে। প্লাজমা পদার্থের চতুর্থ অবস্থা। আমাদের কাছে কঠিন, তরল ও গ্যাস পদার্থের সুপরিচিত অবস্থা। কিন্তু মহাবিশ্বে পদার্থের সবচেয়ে সাধারণ অবস্থা হলো প্লাজমা। এটি আসলে আয়োনিত পরমাণুর গ্যাস। একটি প্লাজমার পরমাণুগুলো ভেঙে ফেলার কারণে (বা ইলেকট্রন পরমাণুকে ভেঙে ফেলা হলে) পরমাণুগুলো বৈদ্যুতিকভাবে চার্জিত হয়। এরপর তাকে খুব সহজেই বৈদ্যুতিক ও চুম্বকীয় ক্ষেত্র হিসেবে কাজে লাগানো যায়।

মহাবিশ্বের দৃশ্যমান বস্তু সবচেয়ে বেশি দেখা যায় প্লাজমারূপে। সূর্য, নক্ষত্র ও আন্তনাক্ষত্রিক গ্যাস এতেই তৈরি হয়। প্লাজমা আমাদের কাছে তেমন পরিচিত নয়, কারণ এগুলো পৃথিবীতে খুব কমই দেখা যায়। তবে এদের পাওয়া যায় বজ্রপাতের আলোর ঝলকানিতে, সূর্যে ও আপনার বাসার প্লাজমা টিভিতে।

প্লাজমা জানালা

আগেই বলেছি, কোনো গ্যাস যথেষ্ট উচ্চ তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করা হলে প্লাজমা তৈরি হয়। একে চুম্বকীয় ও বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রে ব্যবহার করে নির্দিষ্ট ছাঁচ ও আকার দেওয়া যায়। যেমন চাদর বা জানালার মতো আকার দেওয়া যায় এভাবে। তা ছাড়া সাধারণ বাতাস থেকে কোনো বায়ুশূন্য জায়গা আলাদা করতে ব্যবহার করা যায় এই প্লাজমা উইন্ডো বা জানালাকে। তাত্ত্বিকভাবে, এভাবে স্পেসশিপ থেকে মহাকাশে বাতাস বেরিয়ে যাওয়া প্রতিরোধ করা সম্ভব। ফলে বাইরের মহাকাশ ও স্পেসশিপের মাঝখানে উপযুক্ত স্বচ্ছ তল তৈরি করা যাবে।

স্টার ট্রেক টিভি সিরিজে, এমন বলক্ষেত্র ব্যবহার করা হয় শাটল বে (যেখানে ছোট শাটল ক্র্যাফট থাকে) থেকে বাইরের বায়ুশূন্য মহাকাশকে আলাদা করতে। এটি সিনেমায় শুধু টাকা বাঁচানোর কৌশলী উপায়ই নয়, বরং যন্ত্রটি সত্যি সত্যি বানানোও সম্ভব।

প্লাজমা উইন্ডো উদ্ভাবন করেন পদার্থবিদ অ্যাডি হার্সকোভিচ। নিউইয়র্কের লং আইল্যান্ডের ব্রুকহ্যাভেনের ন্যাশনাল ল্যাবরেটরিতে ১৯৯৫ সালে কাজটি করেছিলেন তিনি। ইলেকট্রন বিম ব্যবহার করে ধাতব বস্তু ঝালাইয়ের সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে হার্সকোভিচ এটি বানিয়েছিলেন। কোনো কিছু গলাতে অ্যাসিটাইলিন টর্চ ব্যবহার করে উত্তপ্ত গ্যাসের বিস্ফোরণ ঘটান ঝালাইকারীরা। পরে তা দিয়ে ধাতব টুকরোগুলো ঝালাই করা হয়। কিন্তু ইলেকট্রন বিম দিয়ে ধাতব টুকরো আরও দ্রুত ও পরিষ্কারভাবে, এমনকি প্রচলিত পদ্ধতির চেয়ে আরও সস্তায় ঝালাই করা যায়। তবে ইলেকট্রন বিম দিয়ে ঝালাইয়ের সমস্যাটি হলো, কাজটি করতে হয় বায়ুশূন্য জায়গায়। এই আবশ্যিক শর্ত মেটানো বেশ অসুবিধাজনক। কারণ তার জন্য আস্ত একটা ঘরের সমান ভ্যাকুয়াম বক্স বানাতে হয়।

সমস্যাটি সমাধান করতে এই প্লাজমা উইন্ডো বানান ড. হার্সকোভিচ। মাত্র ৩ ফুট লম্বা আর ১ ফুটের কম ব্যাসের এ প্লাজমা উইন্ডো গ্যাসকে ১২ হাজার ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করে প্লাজমা তৈরি করে। আর সেগুলো বৈদ্যুতিক ও চুম্বকীয় ক্ষেত্রের ভেতর আটকা পড়ে। যেকোনো গ্যাসের মতো এই কণাগুলোও চাপ প্রয়োগ করে। এতে বাতাসকে ভ্যাকুয়াম চেম্বারের দিকে ছুটে যেতে বাধা দেয়। কাজেই বাতাসকে ভ্যাকুয়াম থেকে আলাদা করে রাখে এটি। (প্লাজমা উইন্ডোতে আর্গন গ্যাস ব্যবহার করা হলে অনেকটা স্টার ট্রেকের বলক্ষেত্রের মতোই এটি নীল দীপ্তি ছড়িয়ে জ্বলে ওঠে।)

মহাকাশ ভ্রমণ ও শিল্পকারখানার জন্য প্লাজমা উইন্ডোর বেশ কিছু ব্যবহার রয়েছে। শিল্পকারখানায় অনেক সময় উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় মাইক্রোফেব্রিকেশন ও শুষ্ক নকশাকাটার জন্য ভ্যাকুয়াম বা বায়ুশূন্যতার প্রয়োজন পড়ে। ভ্যাকুয়ামের মধ্যে কাজ করা বেশ ব্যয়বহুল। কিন্তু প্লাজমা উইন্ডো দিয়ে কম খরচে একটি বোতামে আলতো ছোঁয়াতেই জলজ্যান্ত একটি ভ্যাকুয়াম পাওয়া সম্ভব।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্লাজমা উইন্ডো দিয়ে কি কোনো দিন অপ্রবেশযোগ্য ঢাল বানানো সম্ভব? কামান থেকে তীব্র গতিতে ধেয়ে আসা কোনো বিস্ফোরককে কি ঠেকিয়ে দিতে পারবে? ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী ও আরও বেশি তাপমাত্রার প্লাজমা উইন্ডো বানানো সম্ভব হবে, তা কল্পনা করাই যায়। সেটি হয়তো বিপুল বেগে ধেয়ে আসা কোনো ক্ষেপণাস্ত্রকে চোখের পলকে ধ্বংস করতে বা স্রেফ হাওয়ায় মিলিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু বিজ্ঞান কল্পকাহিনিতে যেমনটি দেখা যায়, তেমন বাস্তবসম্মত কোনো বলক্ষেত্র তৈরি করতে হলে আরও কিছু প্রযুক্তি স্তরে স্তরে গাদা করে সমন্বয় করা প্রয়োজন। প্রতিটি স্তর হয়তো কোনো কামানের গোলা ঠেকিয়ে দেওয়ার জন্য একাই যথেষ্ট শক্তিশালী হতে পারে। তবে সে জন্য সব কটি স্তরের সমন্বয় পর্যাপ্ত হতে হবে।

বাইরের স্তরটি হতে পারে সুপারচার্জড বা অতিচার্জিত প্লাজমা উইন্ডো। হয়তো সেটি এতই উচ্চ তাপমাত্রার হয়ে উঠবে যে তা ধাতব কোনো বস্তুকেও বাষ্পীভূত বা নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারবে। দ্বিতীয় স্তরটি হতে পারে উচ্চশক্তির লেজার বিম ঠেকানোর মতো কোনো পর্দা। এই পর্দায় আড়াআড়িভাবে হাজারো লেজার বিম থাকতে পারে। সেগুলো একটা জাফরি বা জালি তৈরি করবে। জালিগুলোর ভেতর দিয়ে কোনো বস্তু গেলেই তাকে অতি উত্তপ্ত করে তুলতে পারবে। তারপর বস্তুটিকে বাষ্পীভূত করে ফেলতে পারবে সফলভাবে। পরের অধ্যায়ে লেজার নিয়ে আরও আলোচনা করা হবে।

এই লেজারের পর্দার পেছনে কার্বন ন্যানোটিউব দিয়ে বানানো জাফরির কথা কল্পনা করা যাক। কার্বন ন্যানোটিউব হলো অতিক্ষুদ্রাকার টিউব আলাদা আলাদা কার্বন পরমাণু দিয়ে বানানো হয় এটি। কার্বন ন্যানোটিউব পরমাণুর মতো পুরু হলেও তা ইস্পাতের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী। বর্তমানে বিশ্বে মাত্র ১৫ মিলিমিটার লম্বা কার্বন ন্যানোটিউব বানানো সম্ভব হয়েছে। তবে কল্পনা করা যায়, একদিন আমরা হয়তো ইচ্ছেমতো লম্বা কার্বন ন্যানোটিউব বানাতে পারব। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, এ ধরনের জাফরি বোনা যাবে কার্বন ন্যানোটিউব দিয়ে। এটি দিয়ে এমন অতি শক্তিশালী স্ক্রিন বা পর্দা বানানো যাবে, যা অধিকাংশ বস্তুকে বিকর্ষণ করতে পারবে। সবচেয়ে বড় কথা, এই পর্দা হবে অদৃশ্য। কারণ প্রতিটি কার্বন ন্যানোটিউবের আকার হবে পারমাণবিক পরিসরের। তবু কার্বন ন্যানোটিউবের তৈরি জাফরি প্রচলিত যেকোনো বস্তুর চেয়ে শক্ত হবে।

সুতরাং প্লাজমা উইন্ডো, লেজারের পর্দা আর কার্বন ন্যানোটিউবের পর্দার সমন্বয়ে এমন এক অদৃশ্য দেয়ালের কথা কল্পনা করা যায়, যা অধিকাংশ বস্তুর ক্ষেত্রে প্রায় অভেদ্য হয়ে উঠবে

এত কিছুর পরও আমাদের এই বহুস্তরবিশিষ্ট শিল্ড বা ঢালে বিজ্ঞান কল্পকাহিনিতে দেখানো বলক্ষেত্রের সব বৈশিষ্ট্য পুরোপুরি পাওয়া যাবে না। কারণ এই ঢালটি স্বচ্ছ হবে। সে কারণে লেজার বিম ঠেকাতে পারবে না এই ঢাল। যুদ্ধের সময় কোনো লেজারের কামানের সামনে এই বহুস্তরবিশিষ্ট ঢালও চরমভাবে ব্যর্থ হবে, তা বলা বাহুল্য।

কোনো লেজার বিমকে ঠেকাতে এই সুরক্ষা কবচ বা ঢালকে উন্নত ধরনের ফটোক্রোমাটিকের প্রক্রিয়াজাত করাও প্রয়োজন। এই প্রক্রিয়া সানগ্লাসেও ব্যবহার করা হয়। ইউভি বা অতিবেগুনি রশ্মির বিকিরণে এই সানগ্লাস নিজে নিজেই গাঢ় হয়ে যায়। যেসব অণু অন্তত দুটি অবস্থায় থাকতে পারে তাদের ওপর ভিত্তি করে কাজ করে ফোটোক্রোমাটিক। এখানে অণুর একটি অবস্থা হলো স্বচ্ছতা। কিন্তু অতিবেগুনি রশ্মির বিকিরণ পড়লে অণুগুলো দ্বিতীয় অবস্থায় বদলে যায়। আর সেই অবস্থাটি হলো অস্বচ্ছ।

ভবিষ্যতে কোনো একদিন আমরা হয়তো ন্যানোটেকনোলজি ব্যবহার করে কার্বন ন্যানোটিউবের মতো শক্ত কোনো বস্তু তৈরি করতে পারব। আর তার ওপর লেজার রশ্মি পড়লে বস্তুটির আলোকধর্ম বদলে যাবে হয়তো। এভাবে কোনো ঢাল হয়তো লেজার বিস্ফোরণসহ কণার বিম বা কামানের গোলাকেও ঠেকিয়ে দিতে পারবে। তবে লেজার রশ্মি ঠেকিয়ে দিতে পারার মতো কোন ফটোক্রোমাটিক এই মুহূর্তে আমাদের কাছে নেই।

চুম্বক দিয়ে শূন্যে ভাসা

বিজ্ঞান কল্পকাহিনিতে রে-গান বিস্ফোরণ ঠেকানোর পাশাপাশি বলক্ষেত্রের আরেকটি লক্ষ্যও আছে। সেটি হলো মহাকর্ষকে অগ্রাহ্য করে কোনো প্ল্যাটফর্মের মতো কাজ করা। ব্যাক টু দ্য ফিউচার মুভিতে মাইকেল জে ফক্সকে একটি হোভার বোর্ডে চড়তে দেখা যায়। স্কেটবোর্ডের মতো দেখতে এই হোভার বোর্ড রাস্তার ওপর ভেসে থাকতে পারে। কিন্তু এ মুহূর্তে আমাদের জানা পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রমতে, মহাকর্ষবিরোধী এ ধরনের কোনো যন্ত্র বানানো অসম্ভব (১০ম অধ্যায়ে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচিত হবে)। কিন্তু চুম্বকীয় তীব্রতা বাড়ানো কোনো হোভার বোর্ড ও হোভার কার ভবিষ্যতে বাস্তব হয়েও উঠতে পারে। এর মাধ্যমে আমরা বিশাল আকারের বস্তু শূন্যে ইচ্ছেমতো ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারব। ভবিষ্যতে কক্ষ তাপমাত্রার সুপারকন্ডাক্টর বা অতিপরিবাহিতা বাস্তবে পরিণত করা সম্ভব হলে চুম্বকীয় বলক্ষেত্রের শক্তি ব্যবহার করে বস্তুকেও শূন্যে ভাসিয়ে তোলা সম্ভব।

দুটি দণ্ড চুম্বককে তাদের উত্তর মেরু বরাবর পরস্পরের কাছাকাছি আনা হলে চুম্বক দুটো পরস্পরকে বিকর্ষণ করে। (একটি চুম্বককে ঘুরিয়ে তার দক্ষিণ মেরুকে অন্যটির উত্তর মেরুর দিকে আনলে চুম্বক দুটি পরস্পরকে আকর্ষণ করবে।) উত্তর মেরুগুলো পরস্পরকে বিকর্ষণ করবে—এই একই নীতি কাজে লাগিয়ে বিপুল ভরের কোনো বস্তু ভূমি থেকে ওপরে তোলা সম্ভব। এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি রাষ্ট্র উন্নত ধরনের ম্যাগনেটিক লেভিটেশন বা চুম্বকীয় ভাসমান ট্রেন তৈরি করেছে (যেমন ম্যাগলেভ ট্রেন)। এখানে সাধারণ চুম্বক ব্যবহার করে রেলপথের লাইনের একটু ওপরে ভেসে থাকে ট্রেন। এদের ঘর্ষণ শূন্য হওয়ার কারণে স্রেফ বাতাসে ভর করে ভাসমান অবস্থায় ট্রেনগুলো রেকর্ডভাঙা গতিতে ছুটতে পারে।

১৯৮৪ সালে বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিক স্বয়ংক্রিয় ম্যাগলেভ সিস্টেম চালু হয় যুক্তরাজ্যে। ট্রেনটি বার্মিংহাম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে পার্শ্ববর্তী বার্মিংহাম আন্তর্জাতিক রেলস্টেশনে যাতায়াত করে। জার্মানি, জাপান ও কোরিয়াও ম্যাগলেভ ট্রেন বানিয়েছে। এদের অধিকাংশই উচ্চ গতিবেগের জন্য নকশা করা হয়নি। প্রথম উচ্চ গতিবেগের বাণিজ্যিক ম্যাগলেভ ট্রেন ইনিশিয়াল অপারেটিং সেগমেন্ট (আইওএস) পরীক্ষা করে দেখা হয় সাংহাইতে। ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২৬৮ মাইল গতিতে ছুটতে পারে এটি। ইমানাশিতে জাপানি ম্যাগলেভ ট্রেন ঘণ্টায় ৩৬১ মাইল গতিবেগ তুলতে পেরেছে। এটি সাধারণ চাকার ট্রেনের তুলনায় অনেক দ্রুতগতির

কিন্তু সমস্যা হলো, ম্যাগলেভ যন্ত্র খুব ব্যয়বহুল। এর কার্যকারিতা বাড়ানোর একটি উপায় হতে পারে সুপারকন্ডাক্টর ব্যবহার করা। তাতে এগুলো ঠান্ডা হয়ে বা পরম শূন্য তাপমাত্রার কাছাকাছি পৌঁছে এই অতিপরিবাহী সব ধরনের বৈদ্যুতিক রোধ কমিয়ে দেবে। সুপারকন্ডাক্টর বা অতিপরিবাহিতা ১৯১১ সালে আবিষ্কার করেন হেইক অনেস। নির্দিষ্ট পদার্থকে ২০ কেলভিনের নিচে ও পরম শূন্য তাপমাত্রার ওপরে ঠান্ডা করা হলে পদার্থটির সব ধরনের বৈদ্যুতিক রোধ হারিয়ে যায়। সাধারণত আমরা যখন কোনো ধাতুর তাপমাত্রা কমাই, তার রোধও ক্রমান্বয়ে কমতে থাকে। (এর কারণ তারের ভেতর পরমাণুর এলোমেলো কম্পন ইলেকট্রনের প্রবাহে বাধা দেয়। তাপমাত্রা কমিয়ে এই এলোমেলো চলাফেরা কমানো যায়। তাতে বিদ্যুৎপ্রবাহের রোধও কমে।) কিন্তু নির্দিষ্ট পদার্থের রেজিস্ট্যান্স বা রোধ একটি ক্রান্তীয় তাপমাত্রায় হঠাৎ করে শূন্যে নেমে আসতে দেখে চোখ কপালে উঠেছিল হেইক অনেসের।

এই ফলাফলের গুরুত্ব বেশ দ্রুতই বুঝতে পারেন পদার্থবিদেরা। দূরবর্তী কোথাও বিদ্যুৎ পাঠাতে গেলে বিদ্যুতের লাইনগুলোতে বেশ ভালো পরিমাণ শক্তি খরচ হয়। কিন্তু বিদ্যুতের লাইনের সব রকম রোধ দূর করা সম্ভব হলে বৈদ্যুতিক শক্তি প্রায় মুক্তভাবে স্থানান্তর করা যায়। সত্যি বলতে কি, কোনো তারের কয়েলে বিদ্যুৎপ্রবাহ ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হলে কোনো শক্তি ক্ষয় না করেই ওই বিদ্যুৎ কয়েক লাখ বছর ধরে প্রবাহিত হতে থাকবে। আবার এই বিপুল বিদ্যুৎপ্রবাহ থেকে অবিশ্বাস্য শক্তিশালী চুম্বক বানানোও যাবে অনায়াসে। তা ছাড়া বিপুল পরিমাণ বস্তু সহজে ওপরেও তোলা যাবে এসব চুম্বক ব্যবহার করে।

বিস্ময়কর এমন সব শক্তি থাকা সত্ত্বেও অতিপরিবাহিতার সমস্যা হলো, বড় কোনো চুম্বক অতিশীতল তরলের চৌবাচ্চায় ডুবিয়ে রাখা অনেক ব্যয়বহুল। কোনো তরলকে অতিশীতলতা বজায় রাখতে বিশাল আকারের রেফ্রিজারেশন প্ল্যান্ট দরকার। এটিই আসলে অতিপরিবাহী চুম্বককে ব্যয়বহুল করে তোলার জন্য যথেষ্ট।

তবে ভবিষ্যতে কোনো দিন হয়তো কক্ষ তাপমাত্রার অতিপরিবাহী বানাতে পারবেন পদার্থবিদেরা। সেটি হবে সলিড-স্টেট পদার্থবিদদের কাছে পরম আরাধ্যের বস্তু। গবেষণাগারে কক্ষ তাপমাত্রার অতিপরিবাহীর উদ্ভাবন দ্বিতীয় শিল্পবিপ্লবের স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে দেবে। তখন গাড়ি ও ট্রেন ওপরে তুলতে পারা শক্তিশালী চুম্বকীয় ক্ষেত্র এতই সস্তা হবে যে হোভার কার বা বাতাসে ভাসতে পারা গাড়ি আর্থিকভাবে লাভজনক হয়ে উঠবে। ব্যাক টু দ্য ফিউচার, মাইনোরিটি রিপোর্ট এবং স্টার ওয়ারস মুভিতে দেখানো কক্ষ তাপমাত্রার সুপারকন্ডাক্টরযুক্ত বিস্ময়কর উড়ন্ত গাড়ি হয়তো বাস্তবেই দেখা যাবে একসময়।

তাত্ত্বিকভাবে, সুপারকন্ডাক্টিং চুম্বক দিয়ে বানানো এমন বেল্ট পরে ভূমি থেকে ওপরে বিনা কষ্টে বাতাসে ভেসে থাকা সম্ভব। এ রকম বেল্ট পরে যে কেউ বাতাসে উড়ে বেড়াতে পারবে সুপারম্যানের মতো। কক্ষ তাপমাত্রার অতিপরিবাহী অতি দারুণ ব্যাপার। সে কারণে এর উল্লেখ দেখা যায় অসংখ্য বিজ্ঞান কল্পকাহিনিতে (১৯৭০ সালে রিংওয়ার্ল্ড নামে এ রকম এক সিরিজ লেখেন ল্যারি নিভেন)।

কয়েক দশক ধরে কক্ষ তাপমাত্রার অতিপরিবাহী খুঁজছেন পদার্থবিদেরা। কিন্তু তাতে খুব একটা লাভ হয়নি। একের পর এক পদার্থ পরীক্ষা করে দেখা বেশ ক্লান্তির কাজ। তবে ১৯৮৬ সালে নতুন ধরনের এক পদার্থ খুঁজে পাওয়া যায়। একে বলা হচ্ছে উচ্চ তাপমাত্রার অতিপরিবাহী। পদার্থটি প্রায় ৯০ ডিগ্রি থেকে পরম শূন্য বা ৯০ কেলভিন তাপমাত্রার ওপরে অতিপরিবাহী হিসেবে কাজ করে। এতে মনে হয়েছিল, এবার বুঝি সব বাধা দূর হয়ে গেল। এরপর পদার্থবিদেরা পরস্পরের বিরুদ্ধে কোমর বেঁধে প্রতিযোগিতায় নেমে পড়লেন। কে কার আগে অতিপরিবাহিতার বিশ্ব রেকর্ড ভাঙবেন, তা নিয়ে প্রতিযোগিতা চলল মাসের পর মাস। সাময়িকভাবে মনে হলো, এবার বুঝি কক্ষ তাপমাত্রার অতিপরিবাহী কল্পবিজ্ঞানের পাতা থেকে হুস করে লাফ দিয়ে আমাদের বসার ঘরে ঢুকে পড়বে। কয়েক বছর বিপজ্জনক গতিতে এগিয়ে চলল উচ্চতাপমাত্রার অতিপরিবাহীবিষয়ক গবেষণা। এরপর সে গবেষণা স্রেফ মুখ থুবড়ে পড়তে শুরু করে।

বর্তমানে বিশ্বে উচ্চতাপমাত্রার সুপারকন্ডাক্টরের রেকর্ড গড়েছে মার্কারি-থ্যালিয়াম-বেরিয়াম-ক্যালসিয়াম-কপার অক্সাইড নামের এক পদার্থ। ১৩৮ কেলভিন (-১৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস) তাপমাত্রায় এটি অতিপরিবাহীতে পরিণত হয়। তুলনামূলক এই উচ্চতাপমাত্রা এখনো কক্ষ তাপমাত্রার চেয়ে অনেক দূরে। তবে ১৩৮ কেলভিন এখনো গুরুত্বপূর্ণ। নাইট্রোজেন ৭৭ কেলভিন তাপমাত্রায় তরলে পরিণত হয়। আর তরল নাইট্রোজেনের দাম প্রায় সাধারণ দুধের সমান। কাজেই উচ্চতাপমাত্রার অতিপরিবাহী ঠান্ডা করতে অনেক সস্তায় সাধারণ তরল নাইট্রোজেন ব্যবহার করা যেতে পারে। (কক্ষ তাপমাত্রার অতিপরিবাহীকে অবশ্য ঠান্ডা করার দরকার নেই। )

কিন্তু বিব্রতকর ব্যাপার হলো, বর্তমানে উচ্চতাপমাত্রার অতিপরিবাহী ধর্মগুলো ব্যাখ্যার জন্য কোনো তত্ত্ব নেই। আসলে উচ্চতাপমাত্রার অতিপারিবাহিতা যিনি ব্যাখ্যা করতে পারবেন, সেই উদ্যমী পদার্থবিদের জন্য অপেক্ষা করছে নোবেল পুরস্কার। (উচ্চতাপমাত্রার এই অতিপরিবাহী তৈরি করা হয় পরমাণুকে আলাদা স্তরে সাজিয়ে। অনেক পদার্থবিদের মতে, সিরামিকজাতীয় পদার্থের এসব স্তর ইলেকট্রনের প্রবাহকে প্রতিটি স্তরে অবাধ করে তোলে। তাতে সেটি অতিপরিবাহীতে পরিণত হয়। কিন্তু কীভাবে সেটি ঘটে, তা এখনো রহস্য।)

এই জ্ঞানের অভাবে পদার্থবিদেরা দুর্ভাগ্যক্রমে দৈবচয়ন পদ্ধতি ব্যবহার করে নতুন ধরনের উচ্চতাপমাত্রার অতিপরিবাহীর খোঁজে নেমেছেন। এর মানে, কাল্পনিক কক্ষ তাপমাত্রার অতিপরিবাহী আগামীকাল বা আগামী বছর আবিষ্কৃত হতে পারে, কিংবা হয়তো কখনোই সম্ভব হবে না। এ ধরনের পদার্থ আদৌ পাওয়া যাবে কি না, তা-ও কেউ জানে না।

কিন্তু কক্ষ তাপমাত্রার সুপারকন্ডাক্টর বা অতিপরিবাহী যদি সত্যি সত্যিই আবিষ্কৃত হয়, তাহলে বাণিজ্যিক ব্যবহারের বিপুল ঢেউ চারদিকে আছড়ে পড়তে শুরু করবে। পৃথিবীর চুম্বকীয় ক্ষেত্রের (যার পরিমাণ ০.৫ গাউস চেয়ে ১০ লাখ গুণ বেশি শক্তিশালী চুম্বকীয় ক্ষেত্র তখন একদম সাধারণ ব্যাপার হয়ে উঠতে পারে।

অতিপরিবাহিতার একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্যকে বলে মাইসনার ইফেক্ট। কোনো অতিপরিবাহীর ওপর চুম্বক রাখা হলে চুম্বকটি এমনভাবে শূন্যে ভেসে উঠবে, যেন কোনো অদৃশ্য বল তাকে ওপরে তুলে ধরে রেখেছে। (মাইসনার ইফেক্টের কারণ, চুম্বকটি অতিপরিবাহীর মধ্যে একটি চুম্বকের দর্পণ প্ৰতিবিম্ব তৈরি করতে প্রভাবিত করতে পারে। কাজেই আসল চুম্বক ও তার দর্পণ প্রতিবিম্ব পরস্পরকে বিকর্ষণ করে। আরেকভাবেও দেখা যায় একে। সেটি হলো, চুম্বকীয় ক্ষেত্রগুলো অতিপরিবাহীর ভেতরে ঢুকতে পারে না। তার বদলে চুম্বকীয় ক্ষেত্রগুলো অপসারিত হয়। তাই অতিপরিবাহীর ওপরে চুম্বক রাখা হলে তার বলরেখাগুলো ওই অতিপরিবাহীর দ্বারা অপসারিত হয়। এতে বলরেখাগুলো ওপরের দিকে ঠেলে দেয় চুম্বকটিকে। তাতে চুম্বকটি শূন্যে ভাসতে থাকে।)

মাইসনার ইফেক্ট ব্যবহার করে কল্পনা করা যায়, ভবিষ্যতের রাস্তাগুলো বানানো হবে এ রকম বিশেষ সিরামিক দিয়ে। এরপর আমাদের বেল্টে বা কিংবা গাড়ির টায়ারে চুম্বক বসানো থাকবে। এর মাধ্যমে কোনো ঘৰ্ষণ বা শক্তি ক্ষয় না করে ম্যাজিকের মতো গন্তব্যে ভেসে ভেসে যেতে পারব আমরা।

মাইসনার ইফেক্ট শুধু ধাতুর মতো চুম্বকজাতীয় পদার্থেই কাজ করে। তবে অতিপরিবাহী চুম্বক ব্যবহার করে অচুম্বকীয় পদার্থও শূন্যে ভাসানো সম্ভব, যাদের বলা হয় প্যারাম্যাগনেট এবং ডায়াম্যাগনেট। এসব পদার্থের নিজেদের কোনো চুম্বকীয় ধর্ম নেই। তবে বাইরের চুম্বকীয় ক্ষেত্রের উপস্থিতিতে তাদের মধ্যে চুম্বকীয় ধর্ম দেখা দেয়। প্যারাম্যাগনেটকে বাইরের একটি চুম্বক আকর্ষণ করে, আর ডায়াম্যাগনেটকে বাইরের চুম্বক বিকর্ষণ করে।

যেমন পানি ডায়াম্যাগনেট। সব জীবই পানি দিয়ে তৈরি। তাই তারা শক্তিশালী চুম্বকীয় ক্ষেত্রের উপস্থিতিতে শূন্যে ভাসতে পারে। প্রায় ১৫ টেসলা (পৃথিবী ক্ষেত্রের চেয়ে ৩০ হাজার গুণ) চুম্বকীয় ক্ষেত্র ব্যবহার করে ব্যাঙের মতো ছোট প্রাণীকে শূন্যে ভাসাতে পেরেছেন বিজ্ঞানীরা। কিন্তু কক্ষ তাপমাত্রার অতিপরিবাহী বাস্তবে বানানো সম্ভব হলে ডায়াম্যাগনেটিক ধর্ম কাজে লাগিয়ে বড় ধরনের অচুম্বকীয় বস্তুদের শূন্যে ভাসানো যাবে।

উপসংহারে বলা যায়, বিজ্ঞান কল্পকাহিনিতে ফোর্স ফিল্ড বা বলক্ষেত্র যত্রতত্র যেভাবে ব্যবহার করা হয়, তা মহাবিশ্বের চারটি বলের বর্ণনার সঙ্গে মেলে না। তারপরও বহুস্তরবিশিষ্ট ঢাল ব্যবহার করে বলক্ষেত্রের বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য তৈরি করা সম্ভব। এর মধ্যে থাকবে প্লাজমা উইন্ডো, লেজারের পর্দা, কার্বন ন্যানোটিউব আর ফটোক্রোমাটিক। কিন্তু এ রকম কোনো শিল্ড বা সুরক্ষা ঢাল বানানো কয়েক দশক কিংবা কয়েক শতাব্দীতেও সম্ভব না-ও হতে পারে। আর কক্ষ তাপমাত্রার অতিপরিবাহী পাওয়া গেলে বিজ্ঞান কল্পকাহিনির মতো গাড়ি ও ট্রেন শূন্যে ভাসানোর চুম্বকীয় ক্ষেত্র হয়তো তৈরি করা যাবে।

এসব কথা বিবেচনা করে, বলক্ষেত্রকে আমি প্রথম শ্রেণির অসম্ভাব্যতার অন্তর্ভুক্ত করেছি। এর মানে হলো, বর্তমানের প্রযুক্তি ব্যবহার করে বানানো অসম্ভব এটি। কিন্তু এক শতক বা তারও পরে কিছুটা রূপান্তরিত অবস্থায় এটি বানানো সম্ভব।

তথ্যনির্দেশ

শক্তিশালী বল : চারটি মৌলিক বলের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী। সে কারণে একে শক্তিশালী বল (Strong force) বলা হয়। এর প্রভাব স্বল্প পরিসরে। এই বল প্রোটন ও নিউট্রনের ভেতর কোয়ার্কগুলো ধরে রাখে এবং প্রোটন ও নিউট্রন একসঙ্গে ধরে রেখে পরমাণুর নিউক্লিয়াস গঠন করে।

স্ট্রিং থিওরি : পদার্থবিদ্যার এই তত্ত্বে কণাকে সুতার ওপর তরঙ্গ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। সুতাগুলোর দৈর্ঘ্য আছে, কিন্তু কোনো মাত্রা নেই। সুতোর ভিন্ন ভিন্ন ধরনের কম্পনের প্যাটার্নের কারণে মৌলিক কণাগুলোর ধর্ম ভিন্ন ভিন্ন হতে দেখা যায়। তত্ত্বটি কোয়ান্টাম বলবিদ্যা ও সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব দুটোকে ঐক্যবদ্ধ করে। একে সুপারস্ট্রিং থিওরিও বলা হয়।

স্ট্রিং : স্ট্রিং থিওরিতে একমাত্রিক মৌলিক বস্তু। এগুলো কাঠামোহীন মৌলিক কণার ধারণাকে প্রতিস্থাপন করেছে। তত্ত্বমতে, স্ট্রিং বা সুতার ভিন্ন ভিন্ন ধরনের কম্পনের প্যাটার্নের কারণে মৌলিক কণাগুলোর ধর্ম ভিন্ন ভিন্ন হতে দেখা যায়।

কেলভিন : তাপমাত্রার একটি স্কেল। এই স্কেলের শূন্য তাপমাত্রাকে পরম শূন্য তাপমাত্রা বলা হয়।

চুম্বকীয় ক্ষেত্র : বৈদ্যুতিক বলের জন্য দায়ী ক্ষেত্র। বলটি এখন বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় ক্ষেত্রের অন্তর্ভুক্ত।

২. অদৃশ্য হওয়া

কল্পনা যখন মূল কেন্দ্রবিন্দুর বাইরে, তখন শুধু চোখের ওপর নির্ভর করে থাকা যায় না।

—মার্ক টোয়েন

স্টার ট্রেক ৪ : দ্য ভয়েজ হোম-এ এন্টারপ্রাইজের ক্রুরা একবার ক্লিনগন ব্যাটল ক্রুজার ছিনতাই করে। সেটি ফেডারেশন স্টার ফ্লিটের স্টারশিপের মতো ছিল না। ক্লিনগন সাম্রাজ্যের ওই স্টারশিপে লুকানো ছিল অদৃশ্য করার এক যন্ত্র। আলো বা রাডার থেকে তাদের অদৃশ্য করে রাখত যন্ত্রটি। এর কারণে স্টারশিপের পেছনে ক্লিনগনের শিপ ফেডারেশন চুপি চুপি এসে পাল্টা আঘাত ছাড়াই অ্যামবুশ করতে পারত। ফেডারেশন অব প্ল্যানেটের বিরুদ্ধে ক্লিনগন সাম্রাজ্য আসলে কৌশলগত সুবিধা পায় অদৃশ্য হওয়ার এ যন্ত্রটির কারণে।

প্রশ্ন হলো, এ রকম যন্ত্র বানানো কি আসলে সম্ভব? অদৃশ্য হওয়ার বিষয়টি অনেক দিন ধরে কল্পবিজ্ঞান ও ফ্যান্টাসিতে বিস্ময়কর এক বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। দ্য ইনভিজিবল ম্যানবইয়ের পাতা থেকে শুরু করে এটি হ্যারি পটারের বইয়ের জাদুকরি অদৃশ্য হওয়ার চাদর কিংবা দ্য লর্ড অব দ্য রিংস-এর আংটি পর্যন্ত বিস্তৃত। তবু অন্তত এক শতাব্দী ধরে পদার্থবিদেরা অদৃশ্য হওয়ার এমন চাদর থাকার সম্ভাবনা নাকচ করে দেন। মোটাদাগে একে অসম্ভব বলেন তাঁরা। কারণ, এগুলো আলোকবিদ্যার সূত্র মানে না। তা ছাড়া পদার্থের জানা কোনো ধর্মের সঙ্গেও খাপ খায় না এটা।

তবে এই অসম্ভব ব্যাপারটি এখন হয়তো সম্ভব হয়ে উঠতে পারে। মেটাম্যাটেরিয়ালের নতুন বিকাশ গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার করতে বাধ্য করছে আলোকবিদ্যার পাঠ্যবইগুলো। এ রকম পদার্থের কার্যকর প্রোটোটাইপ বানানো হয়েছে গবেষণাগারে। আবার দৃশ্যমান কোনো কিছু অদৃশ্য করার ব্যাপারে ব্যাপক আগ্রহ দেখা দিয়েছে গণমাধ্যমে, শিল্পে ও সেনাবাহিনীতে।

ইতিহাসে অদৃশ্যতা

প্রাচীন পৌরাণিক কাহিনিতে অদৃশ্যতা সম্ভবত অন্যতম পুরোনো এক ধারণা। লিখিত ইতিহাস আসার পর দেখা যায়, গা-ছমছমে রাতে নিঃসঙ্গ মানুষ মৃত কারও অদৃশ্য আত্মায় ভয় পেত। অনেক আগে মৃত ব্যক্তির আত্মা অন্ধকারে চুপি চুপি ঘুরে বেড়ায় বলে বিশ্বাস করত তারা। গ্রিক নায়ক পারসিয়াস বদমাশ মেডুসাকে হত্যা করেছিল অদৃশ্য হওয়ার এক হেলমেট মাথায় পরে। বিভিন্ন দেশের সেনাপ্রধানরা অনেক দিন ধরে অদৃশ্য হওয়ার একখানি চাদর হাতে পাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। অদৃশ্য হয়ে সহজে শত্রুপক্ষের ভেতর ঢুকে অতর্কিতে ধরাশায়ী করা যাবে শত্রুপক্ষকে। আবার অপরাধীরাও অদৃশ্য হয়ে শ্বাসরুদ্ধকর উপায়ে ডাকাতিও করে বসতে পারবে।

প্লেটোর নীতিশাস্ত্র ও নৈতিকতায় অদৃশ্যতার একটি প্রধান ভূমিকা রয়েছে। তার দর্শনশাস্ত্রের মাস্টারপিস দ্য রিপাবলিক-এ প্লেটো গাইজেসের রিংয়ের মিথের কথা বর্ণনা করেছেন। লিডিয়ার দরিদ্র কিন্তু একজন সৎ রাখাল ছিল গাইজেস। একদিন এক গোপন গুহায় ঢুকে একটা সমাধি দেখতে পায় সে। সমাধিতে এক শবদেহের হাতে সে সোনার তৈরি একটি আংটি দেখতে পায়। গাইজেস আবিষ্কার করে, তাকে অদৃশ্য করার জাদুকরি ক্ষমতা আছে সোনার আংটিটির। শিগগিরই আংটি থেকে পাওয়া ক্ষমতায় উন্মত্ত হয়ে ওঠে ওই দরিদ্র রাখাল। দেশের রাজপ্রাসাদে গিয়ে নিজের ক্ষমতা ব্যবহার করে রানিকে বশ করে ফেলে গাইজেস। এরপর রানির সহায়তা নিয়ে সে রাজাকে হত্যা করে এবং নিজেই হয়ে ওঠে লিডিয়ার পরবর্তী রাজা।

এখানে প্লেটো যে নৈতিকতা তুলে ধরতে চেয়েছেন, সেটি হলো, কোনো মানুষই চুরি ও হত্যা করার সুযোগ পেলে প্রলোভন দমন করতে পারে না। সব মানুষই দুর্নীতিপরায়ণ। নৈতিকতা হলো একটি সামাজিক কাঠামো, যা বাইরে থেকে আরোপ করা হয়। কোনো মানুষ তার সাধুতা ও সততার সুনাম রক্ষা করতে হয়তো জনসমক্ষে নৈতিক আচরণ করতে পারে। কিন্তু কখনো অদৃশ্য হওয়ার ক্ষমতা পেলে ওই ক্ষমতা ব্যবহার করে অবাধ্য হয়ে উঠতে পারে মানুষটি। (অনেকের বিশ্বাস, এই নৈতিক গল্প থেকেই জে আর আর টোলকিন তাঁর লর্ড অব দ্য রিংস ট্রিলজির অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন। এ ট্রিলজিতেও একটি আংটির দেখা পাওয়া যায়। আংটিটি যে লোক হাতে পরে নিমেষে সে অদৃশ্য হয়ে যায় এবং তারপর পরিণত হয় বদমাশে।)

অদৃশ্য হওয়ার ব্যাপারটি কল্পবিজ্ঞানেও বেশ সাধারণ একটা কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ১৯৩০-এর দশকের ফ্ল্যাশ গর্ডন সিরিজে, মিং দ্য মার্সিলেজের ফায়ারিং স্কোয়াড থেকে পালিয়ে যেতে ফ্ল্যাশ অদৃশ্য হয়ে যেত। হ্যারি পটার উপন্যাস ও মুভিতে একটা বিশেষ চাদর পরার কারণে হগওয়ার্ট ক্যাসলে কারও কাছে ধরা না পড়ে ইচ্ছেমতো ঘুরে বেড়াতে পারত হ্যারি।

এই পৌরাণিক ব্যাপারটির অনেকটাই এইচ জি ওয়েলস তাঁর দ্য ইনভিজিবল ম্যান শিরোনামের ক্ল্যাসিক উপন্যাসে একটা দৃঢ় রূপ দিয়েছেন। এতে দেখা যায়, এক মেডিকেল ছাত্র দুর্ঘটনাক্রমে চতুর্থ মাত্রার ক্ষমতা আবিষ্কার করে ফেলে এবং তার মাধ্যমে অদৃশ্য হয়ে যায়। দুর্ভাগ্য, সে এই বিস্ময়কর ক্ষমতা ব্যবহার করেছিল নিজের ব্যক্তিগত লাভের জন্য। ছোট ছোট বেশ কিছু অপরাধ দিয়ে শুরু করেছিল সে। ক্রমেই সে মরিয়া হয়ে ওঠে এরপর পুলিশের হাত থেকে পালাতে গিয়ে মারা যায়।

ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণ ও আলোর রহস্য

উনিশ শতকের প্রভাবশালী বিজ্ঞানীদের অন্যতম ছিলেন স্কটিশ পদার্থবিদ জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল। তাঁর গবেষণার আগ পর্যন্ত অপটিকস বা আলোকবিদ্যার সূত্র সম্পর্কে পদার্থবিদেরা সুস্থির কোনো উপলব্ধিতে পৌছাতে পারেননি। এক অর্থে ম্যাক্সওয়েল ছিলেন মাইকেল ফ্যারাডের ঠিক উল্টো। পরীক্ষামূলক গবেষণায় ফ্যারাডের সহজাত প্রবৃত্তি অতুলনীয় ছিলেন, কিন্তু কোনো আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছিল না তাঁর। তেমনি ফ্যারাডের সমসাময়িক ম্যাক্সওয়েল ছিলেন উচ্চতর গণিতে সিদ্ধহস্ত। দুই শতক আগে নিউটন যেখানে তাঁর গবেষণা চালিয়ে গেছেন সেই কেমব্রিজে গাণিতিক পদার্থবিদ্যার শিক্ষার্থী হিসেবে বিখ্যাত হয়ে ওঠেন ম্যাক্সওয়েল।

নিউটন ক্যালকুলাস আবিষ্কার করেছিলেন। ক্যালকুলাসকে ডিফারেনশিয়াল ইকুয়েশনের ভাষায় প্রকাশ করা হয়। স্থান ও কালে কোনো বস্তু মসৃণভাবে যেসব ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পরিবর্তনগুলোর মধ্য দিয়ে যায়, তা বর্ণনা করে ডিফারেনশিয়াল ইকুয়েশন বা অন্তরক সমীকরণ। মহাসাগরে তরঙ্গের গতি থেকে শুরু করে তরল পদার্থ, গ্যাস ও কামান গোলার গতি—সবকিছুই ডিফারেনশিয়াল ইকুয়েশনের ভাষায় প্রকাশ করা যায়। ফ্যারাডের বৈপ্লবিক আবিষ্কার আর তাঁর বলক্ষেত্রগুলোকে নির্দিষ্ট ডিফারেনশিয়াল ইকুয়েশন দিয়ে প্রকাশ করার লক্ষ্য ঠিক করেন ম্যাক্সওয়েল।

ফ্যারাডে আবিষ্কার করেছিলেন, বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রকে চৌম্বক ক্ষেত্রে ও চৌম্বক ক্ষেত্রকে বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রে রূপান্তরিত করা যায়। এই আবিষ্কার দিয়েই কাজ শুরু করেন ম্যাক্সওয়েল। ফ্যারাডের চিত্রায়িত বলক্ষেত্রগুলোকে তিনি ডিয়ারেনশিয়াল সমীকরণের ভাষায় নতুন করে লেখেন। এতে জন্ম নিল আধুনিক বিজ্ঞানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একগুচ্ছ সমীকরণ। সেগুলো ছিল ভয়ংকরদর্শন আটটি ডিফারেনশিয়াল সমীকরণ [ম্যাক্সওয়েল শুরুতে আটটি সমীকরণে বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় ধর্মগুলো প্রকাশ করেন। পরে এ সমীকরণগুলো চারটিতে নামিয়ে আনা হয়।- অনুবাদক] সমীকরণগুলো দেখে গ্র্যাজুয়েট স্কুলে বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় বিষয় নিয়ে পড়তে আসা বিশ্বের সব পদার্থবিদ ও প্রকৌশলীর ঘাম ছুটে যেতে বাধ্য।

এরপর ম্যাক্সওয়েল নিজেকে ভাগ্যনির্ধারণী এক প্রশ্ন করলেন : চুম্বকীয় ক্ষেত্রকে বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রে আর বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রকে যদি চুম্বকীয় ক্ষেত্রে পরিণত করা যায়, তাহলে তারা অনবরত একটি থেকে আরেকটিতে অসীম প্যাটার্নে রূপান্তরিত হতে থাকলে কী ঘটবে? ম্যাক্সওয়েল দেখতে পেলেন, তাহলে এই বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় ক্ষেত্রগুলো একটি তরঙ্গের জন্ম দেবে। সেটা অনেকটা মহাসাগরের তরঙ্গের মতো। ভীষণ অবাক হয়ে তিনি আবিষ্কার করলেন, তাঁর গণনায় এই তরঙ্গের গতিবেগ পাওয়া যাচ্ছে ঠিক আলোর গতিবেগের সমান! ১৮৬৪ সালে এই কঠিন সত্য আবিষ্কার করার পর তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করে লিখলেন : ‘এই গতিবেগ আলোর খুবই কাছাকাছি। তাই দেখা যাচ্ছে, আলো নিজেও যে একটি বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গ, সে সিদ্ধান্তে আসার পেছনে যথেষ্ট জোরালো যুক্তি আছে।’

সম্ভবত মানবেতিহাসে অন্যতম বড় আবিষ্কার এটা। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো আলোর গোপনীয়তা উন্মোচিত হলো। ম্যাক্সওয়েল শিগগিরই বুঝতে পারলেন, সূর্য ওঠার সময়ের উজ্জ্বলতা থেকে শুরু করে সূর্য ডুবে যাওয়ার সময়ের আলোকচ্ছটা, রংধনুর মোহনীয় রং আর আকাশের গায়ে লেগে থাকা নক্ষত্রগুলো—সবকিছুকেই ব্যাখ্যা করা সম্ভব সামান্য এক টুকরো কাগজে তাঁর সেই অবহেলাভরে লেখা তরঙ্গ দিয়ে। এখন আমরা বুঝতে পারি, রাডার থেকে টিভি, ইনফ্রা রেড বা অবলোহিত আলো, দৃশ্যমান আলো, আলট্রাভায়োলেট বা অতিবেগুনি আলো, এক্স-রে, মাইক্রোওয়েভ ও গামারশ্মি—সবকিছুই আসলে ম্যাক্সওয়েলের তরঙ্গ ছাড়া আর কিছুই নয়। এগুলো আসলে ফ্যারাডের বলক্ষেত্রগুলোর কম্পন।

ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণের গুরুত্ব নিয়ে একবার আইনস্টাইন মন্তব্য করেন, ‘নিউটনের পর থেকে পদার্থবিজ্ঞান যেসব অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে, তার মধ্যে এগুলো হলো সবচেয়ে গভীর ও সবচেয়ে কার্যকরী।’

(দুঃখের ব্যাপার, উনিশ শতকের অন্যতম সেরা পদার্থবিজ্ঞানী ম্যাক্সওয়েল পাকস্থলীর ক্যানসারে মারা যান, মাত্র ৪৮ বছর বয়সে। সম্ভবত একই রোগে তাঁর মা-ও একই বয়সে মারা গিয়েছিলেন। দীর্ঘ জীবন পেলে সম্ভবত তিনি আবিষ্কার করতে পারতেন তাঁর সমীকরণগুলো স্থান-কালের বিকৃতি স্বীকার করে। এটা সরাসরি আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্বে নিয়ে যায়। ভাবতেও শিহরণ জাগে, ম্যাক্সওয়েল দীর্ঘ জীবন পেলে রিলেটিভি বা আপেক্ষিকতা হয়তো মার্কিন গৃহযুদ্ধের কালেই আবিষ্কার করে ফেলতে পারতেন।)

ম্যাক্সওয়েলের আলো তত্ত্ব ও পারমাণবিক তত্ত্ব আলোকবিদ্যা ও অদৃশ্যতার সহজ ব্যাখ্যা দেয়। কঠিন পদার্থে পরমাণুগুলো শক্তভাবে পরস্পরের সঙ্গে আটকে থাকে। অন্যদিকে তরল বা গ্যাসের অণুগুলো সে তুলনায় অনেক দূরে দূরে থাকে। বেশির ভাগ কঠিন পদার্থ অস্বচ্ছ। কারণ, তাদের ঘনবদ্ধ পরমাণুর ভেতর দিয়ে আলো চলাচল করতে পারে না। এই ঘনবদ্ধ পরমাণুগুলো ইটের দেয়ালের মতো আচরণ করে। বিপরীতে, অনেক তরল ও গ্যাসীয় পদার্থ স্বচ্ছ। কারণ তাদের পরমাণুগুলোর মাঝখানের ফাঁকা জায়গা দিয়ে আলো খুব সহজে চলাচল করতে পারে। এসব পদার্থের পরমাণুগুলোর মাঝখানের ফাঁকা জায়গার আকার দৃশ্যমান আলোক তরঙ্গের চেয়ে বেশি। যেমন পানি, অ্যালকোহল, অ্যামোনিয়া, অ্যাসিটোন, হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড, গ্যাসোলিন ও অন্যান্য তরল পদার্থ স্বচ্ছ। একইভাবে অক্সিজেন, হাইড্রোজেন, নাইট্রোজেন, কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেনের মতো অন্যান্য গ্যাসও স্বচ্ছ।

তবে এ নিয়মের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রমও আছে। অনেক ক্রিস্টাল বা স্ফটিক একই সঙ্গে কঠিন ও স্বচ্ছ। স্ফটিকের পরমাণুগুলো নিখুঁত নকশাকার কাঠামোয় সাজানো থাকে, সুষমভাবে সারিবদ্ধ থাকে। আবার তাদের মাঝখানে থাকে সুষম জায়গা। তারপরও এর ভেতরে অনেকগুলো পথ থাকে। স্ফটিকময় এই নকশার মধ্য দিয়ে আলোকরশ্মি চলাচল করতে পারে সে জন্য। সে কারণে কঠিন পদার্থের মতো স্ফটিকের পরমাণুরা পরস্পরের সঙ্গে শক্তভাবে আটকে থাকলেও তার ভেতর দিকে আলো সহজে চলাচল করতে পারে।

এই বিশেষ অবস্থায় একটি কঠিন বস্তুও স্বচ্ছ হতে পারে, যদি তার পরমাণুগুলো এলোমেলোভাবে সাজানো থাকে। নির্দিষ্ট পদার্থকে উচ্চ তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করে তারপর দ্রুত ঠান্ডা করে এটা করা সম্ভব। যেমন কাচ কঠিন পদার্থ হলেও এর অনেক ধর্ম তরলের মতো। কারণ এর পরমাণুগুলো এলোমেলোভাবে সাজানো। নির্দিষ্ট মিছরি বা ক্যান্ডিও স্বচ্ছ বানানো যায়, এই পদ্ধতি অনুসরণ করে।

কাজেই সহজেই বোঝা যাচ্ছে, অদৃশ্যতা এমন এক ধর্ম, যা ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণের মধ্য দিয়ে পারমাণবিক পর্যায় থেকে আসে। তাই সাধারণ অর্থে এটি নকল করা অসম্ভব না হলেও খুব কঠিন। হ্যারি পটারকে অদৃশ্য করার জন্য তাকে প্রথমে তরল পদার্থে রূপান্তরিত করতে হবে। পরে সেদ্ধ করে বাষ্পে পরিণত করে স্ফটিকে রূপান্তরিত করতে হবে তাকে। আবারও উত্তপ্ত করার পর ঠান্ডা করতে হবে হ্যারি পটারকে। এই সবকিছুই কোনো জাদুকরের পক্ষেও করে ওঠা খুব কঠিন।

কোনো দেশের সেনাবাহিনী এখনো অদৃশ্য করা সম্ভব বিমান তৈরি করতে পারেনি। তবে এর চেয়েও ভালো কিছু বানানোর চেষ্টা করছে তারা। যেমন তারা স্টিলথ প্রযুক্তি বানাচ্ছে। এটি রাডারের কাছে বিমানকে অদৃশ্য করে তোলে। স্টিলথ প্রযুক্তির ভিত্তি হলো ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণের ওপর নির্ভর করে বানানো বেশ কিছু কৌশল। স্টিলথ যুদ্ধবিমান মানুষের চোখে ঠিকই দেখা যায়, কিন্তু শত্রুপক্ষের রাডার স্ক্রিনে এর রাডার ইমেজ মাত্র বড়সড় একটা পাখির সমান। (স্টিলথ প্রযুক্তিতে আসলে একগুচ্ছ কৌশল জগাখিচুড়ি পাকিয়ে আছে। এতে যুদ্ধবিমানের উপাদান পরিবর্তন করে, তার মধ্যে ইস্পাতের পরিমাণ কমিয়ে তার বদলে প্লাস্টিক ও রেজিন ব্যবহার করা হয়। এক্সজস্ট পাইপ নতুনভাবে সাজিয়ে এবং আরও কিছু কাজ করা হয়। এতে শত্রুপক্ষের রাডার রশ্মি এই বিমানের গায়ে আঘাত করলে তা সব দিকে বিক্ষিপ্ত হয় বা ছড়িয়ে পড়ে। কাজেই ওই আলোকরশ্মি আর শত্রুর রাডারের পর্দায় ফিরে যেতে পারে না। তবে স্টিলথ প্রযুক্তি দিয়ে বানানো কোনো যুদ্ধবিমান পুরোপুরি অদৃশ্য নয়। বরং এটি রাডার থেকে যতটুকু রশ্মি আসে তার যান্ত্রিকভাবে যতটুকু সম্ভব দিক পরিবর্তন করে দেয় ও বিক্ষিপ্ত করে। )

মেটাম্যাটেরিয়াল ও অদৃশ্যতা

অদৃশ্যতা-সংক্রান্ত সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিশীল নতুন উন্নয়নটি সম্ভবত মেটাম্যাটেরিয়াল নামে নতুন ধরনের অদ্ভুত একটি পদার্থ। পদার্থটি ভবিষ্যতে বস্তুকে সত্যি সত্যি অদৃশ্য করে তুলতে পারবে। মজার ব্যাপার হলো, একসময় মনে করা হতো, মেটাম্যাটেরিয়াল তৈরি করা অসম্ভব। কারণ, এটি আলোকবিদ্যার সূত্র মানে না। তবে ২০০৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনায় ডারহামের ডিউক ইউনিভার্সিটি এবং লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের গবেষকেরা সফলভাবে প্রচলিত জ্ঞানকে বুড়ো আঙুল দেখান। মেটাম্যাটেরিয়াল ব্যবহার করে মাইক্রোওয়েভ বিকিরণের কাছে একটি বস্তুকে অদৃশ্য করে তুলতে সক্ষম হন তাঁরা। বলতে দ্বিধা নেই, তাঁদের সামনে এখনো অনেক বাধা রয়েছে। কিন্তু তারপরও ইতিহাসে প্রথমবার সাধারণ কোনো বস্তুকে অদৃশ্য করার নীলনকশা এখন আমাদের হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। (যুক্তরাষ্ট্রের পেন্টাগনের ডিফেন্স অ্যাডভান্সড রিসার্চ প্রজেক্ট এজেন্সি বা ডার্পা (DARPA) এই গবেষণায় অর্থ জোগান দিচ্ছে।)

মাইক্রোসফটের সাবেক প্রধান টেকনোলজি অফিসার নাথান মরিভোল্ড বলেছেন, ‘মেটাম্যাটেরিয়ালের বৈপ্লবিক সম্ভাবনা আলোকবিদ্যাকে পুরোপুরি ও ইলেকট্রনিকসের প্রায় পুরো চেহারা পাল্টে দেবে। এসব মেটাম্যাটেরিয়াল যেসব কাণ্ডকারখানা করে দেখাতে পারে, তা কয়েক দশক আগেও অলৌকিক মনে করা হতো।’

প্রশ্ন হলো, মেটাম্যাটেরিয়াল জিনিসটা আসলে কী? এগুলো এমন পদাৰ্থ, যাদের মতো আলোক ধর্ম প্রকৃতিতে আর কোথাও দেখা যায় না। মেটাম্যাটেরিয়াল কোনো বস্তুর ভেতরে অতিক্ষুদ্র অংশ দৃঢ়ভাবে স্থাপন করে এমনভাবে বানানো হয়, যেখানে বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গ অপ্রতিরোধ্য উপায়ে বাঁকিয়ে দিতে পারে। ডিউক ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানীরা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ইলেকট্রিক্যাল সার্কিট তামার পাতের মধ্যে এমন দৃঢ়ভাবে স্থাপন করেছেন। সেগুলো সমতল সজ্জায়, সমকেন্দ্রীয় বৃত্ত তৈরি করেছে (বৈদ্যুতিক ওভেনের কয়েলের সঙ্গে এর কিছুটা মিল আছে)। ফলাফল হিসেবে পাওয়া গেছে সিরামিক, টেফলন, যৌগিক ফাইবার ও ধাতব পদার্থের সূক্ষ্ম মিশ্রণ। তামার মধ্যে এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পদার্থ বসানোর কারণে মাইক্রোওয়েভ রেডিয়েশন নির্দিষ্ট পথে বাঁকানো এবং অন্য পথে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছে। কোনো পাথরের চাঁইয়ের কাছে নদীর প্রবাহের কথা একবার ভাবুন। বোল্ডার বা পাইয়ের চাঁইয়ের চারপাশে পানির প্রবাহ দ্রুত বেঁকে যায় বলেই পাথরের চাঁই সবেগে স্রোতে ভেসে যায়। একইভাবে মেটাম্যাটেরিয়াল অনবরত মাইক্রোওয়েভের পথ বদলে ও বাঁকিয়ে দেয়, তাতে তারা একটা সিলিন্ডারের চারপাশে প্রবাহিত হয়। তাই এই সিলিন্ডারের ভেতরে সবকিছুই মাইক্রোওয়েভের কাছে অদৃশ্য থেকে যায়। মেটাম্যাটেরিয়াল যদি আলোর সবগুলো প্রতিফলন ও ছায়া সরিয়ে দিতে পারে, তাহলে সেটি এ রকম কোনো বিকিরণ থেকে কোনো বস্তুকে পুরোপুরি অদৃশ্য করে ফেলতে পারবে।

তামার উপাদানে মুড়িয়ে ১০টি ফাইবার গ্লাসের রিং দিয়ে বানানো একটি যন্ত্রে সফলভাবে এই নীতির পরীক্ষা চালিয়ে দেখেছেন বিজ্ঞানীরা। যন্ত্রটির ভেতরে মাইক্রোওয়েভের কাছে প্রায় অদৃশ্য ছিল তামার রিংটি, শুধু অতিসামান্য ছায়া দেখা গিয়েছিল।

মেটাম্যাটেরিয়ালের মূলে আছে তাদের প্রতিসরণাঙ্ক সুচারুভবে বশ করার সক্ষমতা। স্বচ্ছ কোনো মাধ্যমে যাওয়ার সময় আলো বেঁকে যাওয়ার ঘটনাকে বলে প্রতিসরণ। আপনার হাত যদি পানিতে ডোবান কিংবা চশমার লেন্সের ভেতরে দিয়ে দেখেন, তাহলে দেখা যাবে, পানি ও চশমা সাধারণ আলোর গতিপথ বিকৃত ও বাঁকিয়ে দিয়েছে।

চশমার কাচে বা পানিতে আলো বেঁকে যাওয়ার কারণ ঘন মাধ্যমের (যেমন স্বচ্ছ মাধ্যম) ভেতর ঢুকলে আলোর গতি কমে। প্রকৃত শূন্যস্থানে আলোর গতি সব সময় একই থাকে। কিন্তু কাচ বা পানির মধ্যে চলার সময় কোটি কোটি পরমাণুর ভেতর দিয়ে যেতে হয় আলোকে। তাতে কমে যায় আলোর গতি। (আলোর গতিকে এসব মাধ্যমের মধ্যে আলোর ধীর গতি দিয়ে ভাগ করলে প্রতিসরণাঙ্ক বা রিফ্র্যাকশন ইনডেক্স পাওয়া যায়। আলোর গতি কাচের ভেতর ধীর হয়ে যায়, তাই এর প্রতিসরণাঙ্ক সব সময়ই ১.০-এর চেয়ে বেশি হবে)। যেমন শূন্যস্থানের প্রতিসরণাঙ্ক ১.০০, বাতাসের প্রতিসরণাঙ্ক ১.০০০৩, কাচের প্রতিসরণাঙ্ক ১.৫ আর হীরার ২.৪। সাধারণত যে মাধ্যম যত বেশি ঘন, আলোর গতিপথকে বাঁকানোর ক্ষমতা তার তত বেশি। তাই তার প্রতিসরণাঙ্কও তত বেশি হয়।

প্রতিসরণাঙ্কের একই ধরনের উদাহরণ মরীচিকা। উত্তপ্ত দিনে রাস্তায় গাড়ি চালাতে চালাতে সোজা দিগন্তের দিকে তাকালে মনে হবে রাস্তাটি ঝিকিমিকি করছে। এর ফলে চোখের সামনে পানির ঝকঝকে হ্রদ আছে বলে এক বিভ্রম সৃষ্টি হয়। আবার মরুভূমিতে মাঝে মাঝে দিগন্ত বরাবর দূরবর্তী শহরের প্রান্তরেখা ও পাহাড় দেখতে পায় অনেকে। উত্তপ্ত বাতাস পাকা রাস্তা বা মরুভূমি থেকে ওপরের দিকে উঠে যাওয়ার কারণে সেখানকার বাতাস সাধারণ বাতাসের তুলনায় হালকা হয়ে যায়। ফলে সেখানকার বাতাসের প্রতিসরণাঙ্ক কমে যায় চারপাশের ঠান্ডা বাতাসের তুলনায়। তাতে দূরের বস্তু থেকে আসা আলো রাস্তায় আপনার চোখে প্রতিসরিত হয়ে এমন বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে যেন, আপনি দূরের কোনো বস্তু দেখতে পাচ্ছেন।

সাধারণত প্রতিসরণাঙ্ক ধ্রুবক। সরু আলোকরশ্মি কাচের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় বেঁকে যায়। এরপর আবার সোজা পথে চলতে থাকে তা। কিন্তু এক মুহূর্তের জন্য ভেবে নিন, আপনি ইচ্ছেমতো প্রতিসরণাঙ্ক নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। কাজেই আপনি কাচের মধ্য দিয়ে তাকে প্রতিটি বিন্দুতে বারবার পরিবর্তন করতে লাগলেন। আলো এই নতুন বস্তুতে চলার সময় বেঁকে যাবে। তারপর আবারও নতুন পথে বাঁকতেই থাকবে। এতে ওই পদার্থটির মধ্যে আলোর জন্য সাপের মতো এঁকেবেঁকে চলা একটি পথের সৃষ্টি হবে।

কোনো মেটাম্যাটেরিয়ালের মধ্যে আলোর প্রতিসরণাঙ্ক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হলে (যাতে আলো কোনো বস্তুর চারপাশে চলাচল করে) বস্তুটি চোখের সামনে থেকে স্রেফ অদৃশ্য হয়ে যেত। এটা করার জন্য ওই মেটাম্যাটেরিয়ালের প্রতিসরণাঙ্ক হতে হবে ঋণাত্মক। কিন্তু আলোকবিদ্যার প্রতিটি পাঠ্যবইয়ে এটি করা অসম্ভব বলে মনে করা হয়। (তাত্ত্বিকভাবে মেটাম্যাটেরিয়ালের কথা একটি গবেষণাপত্রে প্রথম বলেন রুশ বিজ্ঞানী ভিক্টর ভেসেল্যাগো, ১৯৬৭ সালে। ওই গবেষণাপত্রে তিনি আলোর অদ্ভুত কিছু ধর্মের প্রমাণ দেখান। যেমন ঋণাত্মক প্রতিসরণাঙ্ক, বিপরীত ডপলার ইফেক্ট। আপাতদৃষ্টিতে মেটাম্যাটেরিয়াল এতই উদ্ভট ও অযৌক্তিক যে এটি বানানো একসময় অসম্ভব বলে মনে করা হতো। কিন্তু গত কয়েক বছরে গবেষণাগারে সত্যিকার অর্থেই মেটাম্যাটেরিয়াল বানানো সম্ভব হয়েছে। এর মাধ্যমে আলোকবিদ্যার সব পাঠ্যবই নতুন করে লিখতে বাধ্য করছে অনিচ্ছুক বিপ্লবী পদার্থবিদদের।

মেটাম্যাটেরিয়ালের গবেষকেরা অনবরত সাংবাদিকদের জ্বালাতনের শিকার হচ্ছেন। অদৃশ্য হওয়ার চাদর বা আলখেল্লা কবে, কখন বাজারে পাওয়া যাবে, তা নিয়ে রীতিমতো কৌতূহলী তাঁরা। এর উত্তর হলো : শিগগিরই এ রকম কিছু ঘটার কোনো সম্ভাবনা নেই।

ডিউক ইউনিভার্সিটির ডেভিড স্মিথ বলেন, “রিপোর্টাররা বারবার ফোন করে যেকোনো একটা সংখ্যা জানতে চান। অর্থাৎ মাসের সংখ্যা, নয়তো বছরের সংখ্যা। তাঁরা এমনভাবে দাবি জানান যে শেষ পর্যন্ত আপনি বলতে বাধ্য হবেন, হয়তো ১৫ বছরের মধ্যে। এরপর খবরের কাগজে শিরোনামে পরিণত হবেন আপনি, ঠিক? হ্যারি পটারের চাদর আসছে ১৫ বছরের মধ্যে।’ এ কারণে তিনি এখন কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিতে নারাজ। হ্যারি পটার বা স্টার ট্রেক-ভক্তদের হয়তো আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। বেশির ভাগ পদার্থবিদ হয়তো একমত হবেন যে পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র ব্যবহার করে একদিন অদৃশ্য হওয়ার চাদর সত্যিই বানানো সম্ভব। তবে মাইক্রোওয়েভ বিকিরণের পরিবর্তে এ প্রযুক্তি দৃশ্যমান আলোর ক্ষেত্রে না বাড়ানো পর্যন্ত ভয়ানক প্রযুক্তিগত বাধাগুলো থেকেই যাবে।

সাধারণভাবে মেটাম্যাটেরিয়ালের ভেতরে বসানো অভ্যন্তরীণ কাঠামো অবশ্যই ওই বিকিরণের তরঙ্গদৈর্ঘ্যের চেয়ে ছোট হতে হবে। যেমন ধরা যাক, মাইক্রোওয়েভের তরঙ্গদৈর্ঘ্য হতে পারে প্রায় ৩ সেন্টিমিটার। তাই কোনো মেটাম্যাটেরিয়াল মাইক্রোওয়েভের গতিপথ বাঁকাতে চাইলে তার ভেতরে বসানো অংশের আকার ৩ সেন্টিমিটারের চেয়ে ছোট হতে হবে। নীল আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য ৫০০ ন্যানোমিটার। সে জন্য কোনো বস্তু নীল আলোয় অদৃশ্য করতে চাইলে মেটাম্যাটেরিয়ালের ভেতরে বসানো কাঠামোগুলোর আকার হতে হবে মাত্র ৫০ ন্যানোমিটার লম্বা। ন্যানোমিটার পারমাণবিক পরিসরের মাপ, সে জন্য ন্যানো প্রযুক্তি প্রয়োজন। (১ ন্যানোমিটার হলো ১ মিটারের ১ বিলিয়ন বা ১০০ কোটি ভাগের ১ ভাগ। ১ ন্যানোমিটারে মোটামুটি পাঁচটি

পরমাণু অনায়াসে এঁটে যায়।) সত্যিকার অদৃশ্য হওয়ার যন্ত্র বানাতে এটিই সম্ভবত আমাদের জন্য এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা। কোনো মেটাম্যাটেরিয়ালের ভেতরে থাকা আলাদা আলাদা পরমাণু আলোকরশ্মিকে বাঁকিয়ে এমন করে দিতে হবে যেন তা সাপের গতিপথের মতো আঁকাবাঁকা হয়।

দৃশ্যমান আলোর মেটাম্যাটেরিয়াল

এখন প্রতিযোগিতা চলছে।

গবেষণাগারে মেটাম্যাটেরিয়াল বানানোর ঘোষণার পরপরই হঠাৎ ব্যাপক হুড়োহুড়ি দেখা দেয় এ ক্ষেত্রটিতে। সে কারণে এখন প্রায় কয়েক মাস পরপর নতুন চিন্তাভাবনা আর বিস্ময়কর সফলতার খবর পাওয়া যাচ্ছে। এখন আমাদের গন্তব্য স্পষ্ট। সেটি হলো, ন্যানোটেকনোলজি ব্যবহার করে এমন মেটাম্যাটেরিয়াল বানাতে হবে, যা শুধু মাইক্রোওয়েভ নয়, দৃশ্যমান আলোও বাঁকিয়ে দিতে পারবে। সে জন্য অনেকগুলো উপায়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি বেশ আশাজাগানিয়া।

একটি প্রস্তাব হলো, সাধারণ প্রযুক্তির ব্যবহার। অর্থাৎ সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি থেকে আমাদের আগে থেকে জানা থাকা প্রযুক্তি ধার করে নতুন মেটাম্যাটেরিয়াল বানানো। ফটোলিথোগ্রাফি নামে একটি পদ্ধতি ক্ষুদ্রাকৃতির কম্পিউটার বানানোর মূলমন্ত্র। এর মাধ্যমে কম্পিউটার-বিপ্লব সম্ভব হয়েছে। এই প্রযুক্তির কারণে সিলিকনের চাকতির মধ্যে অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কয়েক লাখ ট্রানজিস্টর বসাতে পারেন প্রকৌশলীরা। অবাক করা ব্যাপার হলো, এই সিলিকন চাকতির আকার আপনার বুড়ো আঙুলের চেয়ে বড় নয়।

কম্পিউটারের ক্ষমতা প্রতি আঠারো মাসে দ্বিগুণ হয় (একে বলে মুরের সূত্র)। এমন হওয়ার কারণ সিলিকন চিপে অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উপাদান খোদাই করতে অতিবেগুনি বিকিরণ ব্যবহার করা হয়। রঙিন টি-শার্ট বানাতে স্টেনসিল বা ছিদ্রময় পাতা ব্যবহার পদ্ধতির সঙ্গে এর বেশ মিল আছে। (কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়াররা পাতলা ওয়েফার বা চাকতি দিয়ে কাজ শুরু করেন। এরপর এর ওপর বিভিন্ন বস্তুর অতি পাতলা কোটিং ব্যবহার করা হয়। চাকতির ওপর পরে প্লাস্টিকের মাস্ক দেওয়া হয়, যা টেমপ্লেট বা মানদণ্ডের মতো কাজ করে। এতে বৈদ্যুতিক তার, ট্রানজিস্টর ও কম্পিউটারের অন্য সব উপাদানের জটিল আউটলাইন দেওয়া থাকে। এটিই এসব সার্কিটের মূল কঙ্কাল হিসেবে কাজ করে। এরপর অতিবেগুনি রশ্মির মধ্যে রাখা হয় চাকতিগুলোকে। এ আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য খুব ছোট। আলোসংবেদী চাকতির ওপর নকশা মুদ্রিত করে অতিবেগুনি রশ্মি। চাকতিটিতে পরে ব্যবহার করা হয় বিশেষ গ্যাস ও অ্যাসিড। এভাবে চাকতির যে অংশে অতিবেগুনি রশ্মি পড়ে, সেখানে জটিল সার্কিটের নকশা খোদাই হয়ে যায়। এ পদ্ধতিতে এমন চাকতিও বানানো যায়, যার মধ্যে কয়েক লাখ অতি ক্ষুদ্র খাঁজ কাটা থাকে। এই খাঁজগুলো আসলে ট্রানজিস্টরের আউটলাইন।) বর্তমানে এই খোদাই পদ্ধতিতে সবচেয়ে ছোট যে বস্তু বানানো সম্ভব, তার আকার প্রায় ৩০ ন্যানোমিটার (বা আড়াআড়িভাবে প্রায় ১৫০ পরমাণুর সমান)।

একদল বিজ্ঞানী দৃশ্যমান আলোতে কার্যকর মেটাম্যাটেরিয়াল বানাতে প্রথমবারের মতো সিলিকন চাকতি খোদাই প্রযুক্তি ব্যবহার করেন। এতে অদৃশ্যতার উপায়ের খোঁজে অর্জিত হয় এক মাইলফলক। ২০০৭ সালে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো লাল আলোতে কাজ করতে পারা এক রকম মেটাম্যাটেরিয়াল তৈরির ঘোষণা দেন জার্মান বিজ্ঞানীরা এবং মার্কিন ডিপার্টমেন্ট অব এনার্জি। কাজেই দেখা যাচ্ছে, বেশ স্বল্পকালের মধ্যে তথাকথিত অসম্ভব কাজটি করা সম্ভব হয়েছে।

জার্মানির কার্লশ্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টিফান লিনডেন, মার্টিন ওয়েগনার ও গানার ডলিংয়ের সঙ্গে আইওয়ার আমেস ল্যাবরেটরির পদার্থবিদ কোস্টাস সোকুলসি আরেক ধরনের মেটাম্যাটেরিয়াল তৈরি করেছেন, লাল আলোতে যার সূচক -০.৬। লাল আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য ৭৮০ ন্যানোমিটার। (এর আগে মেটাম্যাটেরিয়ালের আলোর বিকিরণ বাঁকানোর বিশ্ব রেকর্ড ছিল ১৪০০ ন্যানোমিটার। তার অবস্থান ছিল দৃশ্যমান আলোর পরিসরের বাইরের অবলোহিত বা ইনফ্রারেড আলোতে।)

কাচের পাত নিয়ে কাজ শুরু করেন এই বিজ্ঞানীরা। এতে ছিল সিলভার, ম্যাগনেশিয়াম ফ্লুরাইডের পাতলা স্তর। তারপর আরেক প্রস্থ সিলভারের স্তর ব্যবহার করে আক্ষরিক অর্থে ফ্লুরাইডের স্যান্ডউইচ বানান তাঁরা। এতে এর ঘনত্ব দাঁড়ায় মাত্র ১০০ ন্যানোমিটার। প্রচলিত খোদাই কৌশল ব্যবহার করে তাঁরা ওই স্যান্ডউইচের স্তরে অনেকগুলো মাইক্রোস্কোপিক আকারের বর্গাকার গর্ত তৈরি করেন। ফলে যে গ্রিড প্যাটার্ন তৈরি হয়, তা দেখতে অনেকটা মাছ ধরার জালের মতো। (গর্তগুলো ১০০ ন্যানোমিটার প্রশস্ত, যা লাল আলোর চেয়ে অনেক ছোট।) এবার তারা লাল আলো এ বস্তুর ভেতর চালিয়ে তার প্রতিসরণাঙ্ক মাপেন। এর পরিমাণ পাওয়া গেল -০.৬।

এ প্রযুক্তির বেশ কিছু ব্যবহারিক দিক আগাম বলতে পারে পদার্থবিদদের এই দল। এ ব্যাপারে ড. সোকুলসি বলেন, মেটাম্যাটেরিয়াল ‘হয়তো একদিন এমন সমতল সুপারলেন্স উন্নয়নের পথ দেখাবে, যা দৃশ্যমান বর্ণালিতেও কার্যকর হবে। এ রকম লেন্স প্রচলিত প্রযুক্তির চেয়ে আরও বেশি রেজল্যুশন দিতে পারবে। তাতে আলোর কোনো তরঙ্গদৈর্ঘ্যের চেয়েও অনেক ছোট বস্তুর বিশদ দৃশ্য ধারণ করতে পারবে এটি।’ সুপারলেন্সের তাৎক্ষণিক ব্যবহারিক দিক হলো মাইক্রোস্কোপিক বা অতিক্ষুদ্র বস্তুর ছবির অতুলনীয় স্পষ্টতা। যেমন জীবিত মানুষের দেহের কোষের ভেতর, কিংবা গর্ভে থাকা শিশুর রোগ নির্ণয়ে। আবার মনে মনে এটাও ভেবে নেওয়া যায়, এর মাধ্যমে বেখাপ্পা এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফির চেয়ে অনেক গুণ ভালোভাবে ডিএনএ অণুর উপাদানের ছবি তোলা সম্ভব হবে।

বিজ্ঞানীরা এ পর্যন্ত লাল আলোর ঋণাত্মক প্রতিসরণাঙ্ক হাতেনাতে করে দেখাতে পেরেছেন। তাঁদের পরবর্তী পদক্ষেপ হতে পারে, এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে এমন কোনো মেটাম্যাটেরিয়াল বানানো, যেটি লাল আলোকে এতই বাঁকিয়ে ফেলতে পারবে যে তা কোনো বস্তুর চারপাশে পুরোপুরি ঘুরপাক খাবে। তাতে ওই আলোতে আমাদের চোখে স্রেফ অদৃশ্য হয়ে যাবে বস্তুটি

এই ধারাবাহিকতার পাশাপাশি ভবিষ্যতে ফোটনিক ক্রিস্টাল ক্ষেত্রেও উন্নয়ন হতে পারে। ফোটনিক ক্রিস্টালের লক্ষ্য এমন চিপ বানানো, যা বিদ্যুৎ নয়, শুধু আলো ব্যবহার করে বিভিন্ন তথ্য প্রক্রিয়াজাত করবে। এতেও ন্যানো প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে চাকতির ওপর অতি ক্ষুদ্র উপাদান খোদাই করতে হয়। অনেকটা ভিন্ন ভিন্ন উপাদানের প্রতিসরণাঙ্ক পরিবর্তন হওয়ার মতো। বিদ্যুৎ ব্যবহৃত ট্রানজিস্টরের চেয়ে আলো ব্যবহার করা ট্রানজিস্টরের অনেক সুবিধা। যেমন ফোটনিক ক্রিস্টালের কারণে এতে খুব অল্প তাপ নষ্ট হবে। (সিলিকন চিপ এতই তাপ তৈরি করে যে তা দিয়ে একটা ডিম ভাজি করা যাবে। তাই তাদের অনবরত ঠান্ডা রাখতে হয়, নইলে অকার্যকর হয়ে যায়, যা বেশ ব্যয়বহুল।) অবাক হওয়ার কিছু নেই, মেটাম্যাটেরিয়ালের জন্য ফোটনিক ক্রিস্টাল সায়েন্স আদর্শগতভাবে বেশ উপযুক্ত। কারণ, দুটো প্রযুক্তিই ন্যানোস্কেলে আলোর প্রতিসরণাঙ্ক নিপুণভাবে কাজে লাগানোর সঙ্গে সম্পর্কিত।

প্লাজমোনিকসের মাধ্যমে অদৃশ্যতা

ঘটনা মাত্রা ছাড়িয়ে না গেলেও ২০০৭ সালের মাঝামাঝিতে বিজ্ঞানীদের আরেকটি দল মেটাম্যাটেরিয়াল তৈরির ঘোষণা দেয়। এতে তারা সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করে দৃশ্যমান আলোকে বাঁকিয়ে দেয়। প্রযুক্তিটিকে বলা হচ্ছে প্লাজমোনিকস। ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির পদার্থবিদ হেনরি লেজেক, জেনিফার ডায়োন এবং হ্যারি অ্যাটওয়াটার এমন ধরনের মেটাম্যাটেরিয়াল বানানোর ঘোষণা দেন, যেটি দৃশ্যমান আলো বর্ণালির কঠিনতর নীল-সবুজ এলাকার জন্য ঋণাত্মক প্রতিসরণাঙ্ক পাওয়া যায়।

প্লাজমোনিকসের লক্ষ্য হলো আলোকে নিষ্পেষণ করা, যাতে কোনো বস্তুকে ন্যানোস্কেলে, বিশেষ করে ধাতব পদার্থের পৃষ্ঠতলে নিপুণভাবে কাজে লাগানো যায়। ধাতব পদার্থ বিদ্যুৎ পরিবহন করার কারণ হলো ধাতব পরমাণুগুলোতে ইলেকট্রন বেশ আলগাভাবে আটকে থাকে। তাই ধাতবপৃষ্ঠের ওপর দিকে মুক্তভাবে চলাচল করতে পারে তারা। বাসাবাড়িতে তারের মধ্য দিয়ে যে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়, তা আসলে ধাতবপৃষ্ঠের ওপর দিয়ে আলগাভাবে আটকে থাকা ইলেকট্রনের মৃসণ গতিতে চলাফেরার কারণে ঘটছে। তবে নির্দিষ্ট কিছু অবস্থায়, আলোকরশ্মি যখন ধাতবপৃষ্ঠের সঙ্গে সংঘর্ষের মুখে পড়ে, তখন ইলেকট্রনগুলো ওই আলোর সঙ্গে একত্রে কেঁপে উঠে ধাতবপৃষ্ঠের ওপর তরঙ্গের মতো ইলেকট্রনের গতি তৈরি করে (যাকে বলা হয় প্লাজমোনস)। এই তরঙ্গের মতো গতি ওই আসল আলোকরশ্মির সঙ্গে একত্রে কম্পিত হয়। গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, এই প্লাজমোনসকে পিষে ফেলা সম্ভব, যাতে তাদের কম্পাঙ্ক ওই আলোকরশ্মির মতো একই রকম হয় (তাতে তারা যাতে একই তথ্য বহন করতে পারে), কিন্তু তরঙ্গদৈর্ঘ্য অনেক কম হয়। তাত্ত্বিকভাবে, পিষে ফেলা তরঙ্গগুলোকে ন্যানোওয়্যারে ঠেসে ভরা সম্ভব। ফটোনিক ক্রিস্টালের মতোই প্লাজমোনিকসেরও চূড়ান্ত লক্ষ্য, বিদ্যুতের বদলে আলো ব্যবহার করে গণনা করতে সক্ষম কম্পিউটার চিপ বানানো।

ক্যাল টেকের গবেষক দল মেটাম্যাটেরিয়াল বানিয়েছে দুই স্তরের সিলভারের মাঝখানে সিলিকন-নাইট্রোজেন ইনসুলেটর ব্যবহার করে (যার পুরুত্ব মাত্র ৫০ ন্যানোমিটার)। এটি কিছুটা ওয়েভগাইডের মতো কাজ করে, যা প্লাজমোনিকস ওয়েভের দিক পরিচালনা করতে পারে। এই যন্ত্রে লেজার আলো ঢোকে ও বের হয় মেটাম্যাটেরিয়ালের মধ্যে কেটে বানানো দুটি চির দিয়ে। কোণগুলো বিশ্লেষণ করে লেজার আলো মেটাম্যাটেরিয়ালের ভেতর দিয়ে অতিক্রম করার সময় বেঁকে যায়। তখন যাচাই করে দেখা যায়, এই আলো ঋণাত্মক প্রতিসরণাঙ্কে বেঁকে গেছে।

মেটাম্যাটেরিয়ালের ভবিষ্যৎ

মেটাম্যাটেরিয়ালের উন্নতি ভবিষ্যতে দ্রুতগতিতে ঘটবে সহজ একটি কারণে। কারণটি হলো এরই মধ্যে বিদ্যুতের বদলে আলোকরশ্মি ব্যবহার করা ট্রানজিস্টর তৈরিতে সবার আগ্রহ বাড়তে শুরু করেছে। ফলে সিলিকন চিপের বদলে অন্য কিছু বানানোর জন্য ফোটনিক ক্রিস্টাল ও প্লাজমোনিকস গবেষণা চলতেই থাকবে। আর এই দুটি গবেষণার পিঠে সওয়ার হয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাবে অদৃশ্যতা নিয়ে গবেষণাও। এরই মধ্যে সিলিকন প্রযুক্তির বদলে অন্য কোনো প্রযুক্তির খোঁজে কয়েক শ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হয়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, এসব গবেষণা থেকে লাভবান হবে আসলে মেটাম্যাটেরিয়াল গবেষণা।

কয়েক মাস পরপর বড় রকমের সফলতা পাওয়া যাচ্ছে ক্ষেত্রটিতে। তাই পদার্থবিদেরা কয়েক দশকের মধ্যে গবেষণাগার থেকে অদৃশ্য ঢাল বা চাদর বের করে এনে কিছু বাস্তব কাজে লাগানোর সম্ভাবনা দেখবেন, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। যেমন পরের কয়েক বছরের মধ্যে তাঁরা এমন মেটাম্যাটেরিয়াল বানানোর ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী, যেটি বস্তুকে দৃশ্যমান আলোর একটি কম্পাঙ্কে অন্তত দুটি মাত্রায় পুরোপুরি অদৃশ্য করে দিতে পারবে। এটি করতে অতি ক্ষুদ্র ন্যানো ইমপ্ল্যান্টগুলোকে সুষমভাবে বসানো যাবে না। তার বদলে তাদের এমন সূক্ষ্মভাবে বসাতে হবে, যাতে আলো ওই বস্তুটির চারপাশে মসৃণভাবে বেঁকে যেতে পারে।

এরপর বিজ্ঞানীদের এমন কোনো মেটাম্যাটেরিয়াল বানাতে হবে, যা আলোকে শুধু সমতল দুটি মাত্রার তলে নয়, তিনটি মাত্রায় বাঁকিয়ে দিতে পারবে। সমতল সিলিকন চাকতি বানানোর জন্য ফটোলিথোগ্রাফি উপযুক্ত পদ্ধতি। কিন্তু ত্রিমাত্রিক মেটাম্যাটেরিয়ালের জন্য চাকতিগুলোকে আরও জটিলভাবে সাজানোর প্রয়োজন পড়বে।

পরের ধাপে বিজ্ঞানীদের শুধু একটি নয়, অনেকগুলো কম্পাঙ্কের আলো বাঁকিয়ে দিতে পারা মেটাম্যাটেরিয়াল বানাতে হবে। সে জন্য যেসব সমস্যা বা বাধা রয়েছে, তার সমাধানও করতে হবে তাদের। সম্ভবত এ কাজটি তাদের জন্য সবচেয়ে কঠিন। কারণ, এখন পর্যন্ত কেবল যেকোনো একটি নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কের আলোকে বাঁকিয়ে দিতে পারা অতি ক্ষুদ্র ইমপ্ল্যান্ট বানানো গেছে। বিজ্ঞানীরা হয়তো স্তরের ওপর ভিত্তি করে মেটাম্যাটেরিয়াল বানাতে পারবেন, যেখানে প্রতিটি স্তর একটি নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কের আলোকে বাঁকাতে পারবে। এই সমস্যার সমাধান এখনো স্পষ্ট নয়।

যা-ই হোক, অদৃশ্য হওয়ার ঢাল বা চাদর বানানো কখনো সম্ভব হলে, সেটি বেশ ভারী একটা যন্ত্র হবে। হ্যারি পটারের অদৃশ্য হওয়ার চাদর পাতলা, নমনীয় কাপড় দিয়ে বানানো। আর এর ভেতরে কেউ ঢুকলে অদৃশ্য হয়ে যায় সে। সেটি সম্ভব করতে কাপড়টি বারবার নড়াচড়া করার জন্য এর ভেতরের প্রতিসরণাঙ্ক জটিল প্রক্রিয়ায় অনবরত পরিবর্তন করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে সেটি করা অসম্ভব। আবার অন্তত প্রাথমিকভাবে হলেও সত্যিকারের অদৃশ্য হওয়ার চাদর বানাতে হবে কঠিন সিলিন্ডার দিয়ে। এভাবে সিলিন্ডারের ভেতরের প্রতিসরণাঙ্ক স্থির থাকবে। (এর চেয়ে আরও উন্নত সংস্করণ ক্রমান্বয়ে মেটাম্যাটেরিয়ালের সঙ্গে একীভূত করা হতে পারে। বেশ নমনীয় হবে সেটি। আবার একে ভাঁজ করা হলেও মেটাম্যাটেরিয়ালের মাধ্যমে আলোর প্রবাহকে সঠিক পথে নিয়ে যেতে পারবে। চাদরের ভেতরে থাকা কারও জন্য নড়াচড়া করা অনেক সহজ হয়ে উঠবে এই উপায়ে। )

অনেকেই অদৃশ্য ঢাল বা চাদরের একটি ত্রুটি দেখান। ত্রুটিটি হলো এর ভেতরে যে থাকবে, সে নিজে দৃশ্যমান না হয়ে বাইরের কিছু দেখতে পাবে না। মনে করুন, হ্যারি পটার তার চোখ দুটো ছাড়া পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে গেল। তার চোখ দুটো বাতাসে ভাসমান বলে মনে হবে। তাই অদৃশ্য চাদরের আই হোল দুটো বাইরে থেকে দেখা যাবে। হ্যারি পটার যদি পুরোপুরি অদৃশ্য হয়, তাহলে অদৃশ্য চাদরের ভেতরে অন্ধের মতো বসে থাকতে হবে তাকে। (এ সমস্যার সম্ভাব্য সমাধান হতে পারে, দুটো অতি ক্ষুদ্র কাচের প্লেট আই হোলের কাছে বসিয়ে দেওয়া। কাচের প্লেট দুটো রশ্মি বিভাজক হিসেবে কাজ করবে। মানে এটি প্লেটে আসা আলোর অতি ক্ষুদ্র অংশ ভেঙে দিয়ে ওই আলোকে চোখে পাঠাবে। এতে অদৃশ্য চাদরে ধাক্কা খাওয়া অধিকাংশ আলো তার চারপাশে প্রবাহিত হয়ে ওই মানুষটিকে অদৃশ্য করে রাখবে। তবে আলোর ক্ষুদ্র একটি অংশ গতিপথ পাল্টে চোখের দিকে যাবে।)

ভয়াবহ সব সমস্যা থাকার পরও আগামী দশকেই অদৃশ্য ঢালের মতো কিছু একটা বানাতে পারার ব্যাপারে বেশ আশাবাদী বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীরা।

অদৃশ্যতা ও ন্যানোটেকনোলজি

আগেই বলেছি, অদৃশ্যতা তৈরির প্রধান উপায় হয়ে উঠতে পারে ন্যানোটেকনোলজি। মানে ১ মিটারের ১০০ কোটি ভাগের ১ ভাগের মধ্যে পারমাণবিক আকারের কাঠামোকে নিপুণভাবে কাজে লাগানোর ক্ষমতার মাধ্যমে।

ন্যানোটেকনোলজির জন্ম ১৯৫৯ সালে আমেরিকান ফিজিক্যাল সোসাইটিতে নোবেলজয়ী রিচার্ড ফাইনম্যানের বিখ্যাত এক বক্তৃতার মাধ্যমে। তাঁর বক্তৃতার লঘু শিরোনাম ছিল ‘দেয়ারস প্লেন্টি অব রুম অ্যাট দ্য বটম’। পদার্থবিদ্যার সেকালে জানা সূত্রমতে, সবচেয়ে ক্ষুদ্র যন্ত্রের চেহারা কেমন হতে পারে, বক্তৃতায় তা অনুমান করেন তিনি। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, পারমাণবিক দূরত্বে না পৌঁছানো পর্যন্ত যন্ত্র ধীরে ধীরে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হতে থাকবে। এরপর পরমাণুকে হয়তো ব্যবহার করা হবে যন্ত্র তৈরিতে। সবশেষে তিনি বলেন, পুলি, লিভার ও চাকার মতো পারমাণবিক যন্ত্র পদার্থবিদ্যার সূত্রের মধ্যেই তৈরি সম্ভব, যদিও সেগুলো বানানো চরম কঠিন

এরপর ন্যানো প্রযুক্তি মুখ থুবড়ে পড়ে থাকে বেশ কয়েক বছর। কারণ, পরমাণু আলাদাভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সেকালের প্রযুক্তি দিয়ে অসম্ভব ছিল। ১৯৮১ সালে স্ক্যানিং টানেলিং মাইক্রোস্কোপ আবিষ্কৃত হলে বেশ বড় সফলতা পান পদার্থবিজ্ঞানীরা। সে কারণে পদার্থবিদ জার্ড বিননিগ ও হেইনরিখ রোহরার নোবেল পুরস্কার জেতেন সেবার। তাঁরা তখন জুরিখের আইবিএম ল্যাবে কাজ করতেন।

এরপর হঠাৎ করে রসায়ন বইয়ের মতো আলাদা আলাদা পরমাণু সারির বিস্ময়কর ছবি দেখতে সক্ষম হলেন পদার্থবিদেরা। অথচ একসময় পারমাণবিক তত্ত্বের সমালোচকেরা এটা করা অসম্ভব বলে মনে করত। কোনো ক্রিস্টাল কিংবা ধাতুর মধ্যে সারিবদ্ধ থাকা পরমাণুর চমৎকার ছবি তোলাও এখন সম্ভব। বিজ্ঞানীদের ব্যবহৃত রাসায়নিক সূত্রে একটি অণুতে একগুচ্ছ পরমাণু জটিলভাবে জড়াজড়ি করে থাকে। খালি চোখে সেগুলোও দেখা সম্ভব এখন। আবার স্ক্যানিং টানেলিং মাইক্রোস্কোপ ব্যবহার করে পরমাণুদের আলাদাভাবে নিয়ন্ত্রণ করাও সম্ভব হচ্ছে। সত্যি বলতে, IBM অক্ষরগুলো আলাদা পরমাণুর মাধ্যমে বানানো গেছে, যা বিজ্ঞানজগতে বেশ আলোড়ন তোলে। এখন ভিন্ন ভিন্ন পরমাণুকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এমনকি এদের নিয়ে ইচ্ছেমতো দেখা ও খেলা যায়। তাই বিজ্ঞানীরাও এখন আর চোখ বন্ধ করে বসে নেই।

কৌশলগতভাবে স্ক্যানিং টানেলিং মাইক্রোস্কোপ বেশ সহজ ব্যাপার। ফোনোগ্রাফের সুচ দিয়ে কোনো ডিস্ককে যেভাবে স্ক্যান করা হয়, সেই পদ্ধতির মতো এখানেও একটি ধারালো যন্ত্র ব্যবহার করা হয়। যে পদার্থটি বিশ্লেষণ করতে হবে, তার ওপর ধীরে ধীরে নেওয়া হয় ধারালো এ যন্ত্রটি। (এর ডগাটি এতই ধারালো থাকে যে, সেখানে মাত্র একটি পরমাণু থাকে।) ক্ষুদ্র এক বৈদ্যুতিক চার্জ ওই যন্ত্রে থাকে। যন্ত্রটি থেকে বৈদ্যুতিক প্রবাহ পদার্থটির ভেতর দিয়ে নিচের তলে যেতে থাকে। ক্ষুদ্র যন্ত্রটি কোনো নির্দিষ্ট পরমাণুর ওপর গেলে যন্ত্রটির বৈদ্যুতিক প্রবাহের পরিমাণ বদলে যায়। পরিবর্তনটি রেকর্ড করা হয়। পরমাণুর ওপর যন্ত্র যাওয়ার সময়ে বিদ্যুতের প্রবাহ ওপরে ওঠে এবং পরে নিচে নামে। তাতে পরমাণুটির রূপরেখা বেশ ভালোভাবে শনাক্ত করা যায়। যন্ত্রটিকে অনেকবার ভিন্ন ভিন্ন পরমাণুর ওপর নিয়ে গিয়ে বিদ্যুতের ওঠানামা করিয়ে অনেকগুলো নির্দিষ্ট পরমাণুর চমৎকার একটি চিত্রের গঠন তৈরি করা যায়।

(কোয়ান্টাম মেকানিকসের একটি অদ্ভুত সূত্রের কারণে স্ক্যানিং টানেলিং মাইক্রোস্কোপ বানানো সম্ভব হয়েছে। সাধারণত ওই ক্ষুদ্র যন্ত্র থেকে নিচের পৃষ্ঠে ওই পদার্থের মধ্যে স্থানান্তর করার মতো যথেষ্ট শক্তি ইলেকট্রনের নেই। কিন্তু অনিশ্চয়তার নীতির কারণে সামান্য একটি সম্ভাবনা থাকে যে বিদ্যুৎপ্রবাহের মধ্যে ইলেকট্রনগুলো সুড়ঙ্গ পথে বা বাধা অতিক্রম করে ঢুকে যাবে। অবশ্য নিউনোনিয়ান তত্ত্বে নিষিদ্ধ হলেও ঠিক এটিই ঘটে। এতে ক্ষুদ্র যন্ত্রটির মধ্য দিয়ে যে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়, তা ওই পদার্থের মধ্যে স্পর্শকাতর হয়ে অতি ক্ষুদ্র কোয়ান্টাম প্রভাব তৈরি করে। কোয়ান্টাম তত্ত্বের এই প্রভাব সম্পর্কে পরে আরও বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।)

ভিন্ন ভিন্ন পরমাণু নড়াচড়ার করে পরমাণুগুলো থেকে সহজ কোনো যন্ত্ৰ তৈরির বেলাতেও ক্ষুদ্র যন্ত্রটি বেশ স্পর্শকাতর। এই প্রযুক্তি এখন এতই উন্নত হয়েছে যে, একগুচ্ছ পরমাণুকে কম্পিউটারের পর্দায় দেখানো যায়। তারপর শুধু কম্পিউটারের কারসর নাড়িয়ে যেদিকে খুশি আনা যায় পরমাণুদের। এভাবে অসংখ্য পরমাণু লেগো ব্লক খেলার মতো করে নিপুণভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। পাশাপাশি বর্ণমালার বিভিন্ন অক্ষর বানানো যায় আলাদা পরমাণু ব্যবহার করে। এমনকি চাইলে বানানো যাবে পারমাণবিক কোনো খেলনা। যেমন আলাদা পরমাণু দিয়ে অ্যাবাকাসও বানানো যাবে। পরমাণুগুলো পৃষ্ঠতলের ওপর উলম্ব স্লটে সাজানো থাকে। ইচ্ছে করলে উলম্ব স্লটগুলোর ভেতরে কার্বন বাকিবল ঢোকানো যাবে (বাকিবল দেখতে ফুটবলের মতো, তবে আলাদা কার্বন পরমাণু দিয়ে তৈরি)। কার্বনের এ বল এরপর প্রতিটি স্লটে ওপর ও নিচে নাড়ানো যাবে। এভাবে একটি পারমাণবিক অ্যাবাকাস বানানো যায়।

আবার ইলেকট্রন বিম ব্যবহার করে পারমাণবিক যন্ত্রে খোদাই করাও সম্ভব। যেমন কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা বিশ্বের সবচেয়ে ছোট্ট আকারের গিটার বানিয়েছেন। এটি মানুষের চুলের চেয়ে ২০ শতাংশ ছোট। সিলিকন স্ফটিক দিয়ে খোদাই করা হয়েছে গিটারটি। এর ছয়টি তারের প্রতিটির পুরুত্ব ১০০ পরমাণু। পারমাণবিক বলের মাইক্রোস্কোপ ব্যবহার করে তারগুলোকে বাজানোও যায়। (গিটারটি সুরও বাজাতে পারে। তবে এই সুর যে ফ্রিকোয়েন্সি বা কম্পাঙ্কে বাজে, তা মানুষের শ্রবণশক্তির সীমার ওপরে।)

বর্তমানের ন্যানোটেক দিয়ে বানানো অধিকাংশ যন্ত্রই নিছক খেলনা ছাড়া আর কিছু নয়। গিয়ার, বল বিয়ারিংসহ এর চেয়ে জটিল যন্ত্র এখনো বানানো হয়নি। তবে আত্মবিশ্বাসী অনেক প্রকৌশলীর ধারণা, এমন সময় আসবে যখন আমরা প্রকৃত অর্থেই পারমাণবিক যন্ত্র বানাতে পারব। (প্রকৃতিতে অবশ্য পারমাণবিক যন্ত্র পাওয়া যায়। কোষ পানিতে মুক্তভাবে ভেসে থাকতে পারে। কারণ, তারা অতি ক্ষুদ্র লোম আন্দোলিত করতে পারে। এই লোম ও কোষের মধ্যকার সংযোগ পরীক্ষা করলে দেখা যায়, এটা এমন এক পারমাণবিক যন্ত্র, যা লোমগুলোকে সব দিকে চলাফেরা করতে দেয়। তাই ন্যানো প্রযুক্তির উন্নয়নের একটি উপায় হলো প্রকৃতিকে অনুকরণ করা। কারণ, প্রকৃতি কয়েক কোটি বছর আগেই দক্ষতার সঙ্গে অ্যাটমিক মেশিন বা পারমাণবিক যন্ত্র বানানোর কৌশল রপ্ত করেছে।)

হলোগ্রাম ও অদৃশ্যতা

কেউ অদৃশ্য হতে চাইলে আরেকটি উপায় আছে। প্রথমে তার পেছনের দৃশ্যপটের ছবি তুলতে হবে। এরপর পেছনের দৃশ্যপটের ছবিটি সরাসরি তার গায়ের পোশাকের ওপর কিংবা সামনে থাকা কোনো পর্দার ওপর ফেলতে হবে। এতে সামনে থেকে দেখে মনে হবে, লোকটি যেন স্বচ্ছ হয়ে গেছে। সে কারণে লোকটির গায়ের ভেতর দিয়ে অন্য পাশে চলে গেছে আলোকরশ্মি।

জাপানের টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের তাচি ল্যাবরেটরির নাওকি কাওয়াকামি গবেষণা করছেন অদৃশ্য হওয়ার এ পদ্ধতি নিয়ে। পদ্ধতিটিকে বলা হচ্ছে অপটিক্যাল ক্যামোফ্লেজ। তিনি বলেন, ‘এটা ব্যবহার করে পাইলটরা ককপিটের মেঝে দিয়ে নিচের রানওয়ে দেখতে পাবেন কিংবা গাড়ির চালকেরা গাড়ি পার্ক করতে বাইরের কাঠামোর মধ্য দিয়ে জায়গা দেখার চেষ্টা করতে পারবেন। কাওয়াকামির চাদর অতি ক্ষুদ্র আলো প্রতিফলক পুঁতি দিয়ে আচ্ছাদিত, যা কাজ করে একদম চলচ্চিত্রের পর্দার মতো। একটি ভিডিও ক্যামেরা চাদরের পেছনের দৃশ্য ধারণ করে। ভিডিও প্রজেক্টরের মাধ্যমে ওই চাদরের ওপর ধারণকৃত ইমেজ ফেললে মনে হয় যেন ওই লোকটিকে ভেদ করে আলো চলে গেছে।

অপটিক্যাল ক্যামোফ্লেজ চাদরের প্রোটোটাইপ আসলে এখনো গবেষণাগারের গণ্ডিতেই রয়ে গেছে। সিনেমা পর্দার মতো এই চাদর পরে থাকা কোনো ব্যক্তির দিকে সরাসরি তাকালে, দেখে মনে হবে স্রেফ অদৃশ্য হয়ে গেছেন ওই ব্যক্তি। কারণ, তখন লোকটির পেছনের দৃশ্যই শুধু দেখতে পাওয়া যাবে। কিন্তু আপনার চোখজোড়া নড়াচড়া করলেও চাদরের ওপরের দৃশ্যের কোনো হেরফের হবে না। এটি দেখে মুহূর্তেই বুঝে ফেলা যাবে, ওটা আসলে মেকি। কাজেই ত্রিমাত্রিক ছবির বিভ্রান্তি তৈরি করতে হলে আরও বাস্তবসম্মত অপটিক্যাল ক্যামোফ্লেজের প্রয়োজন। আর সে জন্য প্রয়োজন হলোগ্রাম।

হলোগ্রাম হলো লেজার দিয়ে নির্মিত থ্রিডি বা ত্রিমাত্রিক ছবি ( স্টার ওয়ারস-এ প্রিন্সেস লিয়ার থ্রিডি ইমেজের মতো)। কোনো ব্যক্তিকে অদৃশ্য করা যাবে যদি বিশেষ হলোগ্রাম ক্যামেরা দিয়ে পেছনের দৃশ্যপটের ছবি তোলা হয়। এই হলোগ্রাফিক ছবি এরপর ফেলতে হবে ওই ব্যক্তির সামনে বিশেষ হলোগ্রাফিক পর্দায়। তাহলে তার সামনে দাঁড়ানো কেউ হলোগ্রাফিক দৃশ্যগুলো দেখতে পাবে। সেখানে শুধু তার পেছনের দৃশ্যপট দেখা যাবে, লোকটিকে দেখা যাবে না। ফলে মনে হবে লোকটি অদৃশ্য হয়ে গেছে। ওই ব্যক্তির জায়গায় নিখুঁতভাবে পেছনের দৃশ্যপটের থ্রিডি ইমেজ দেখা যাবে। এখন চোখ নাড়ালেও ধরতে পারবেন না যে আপনি মেকি কিছু দেখছেন।

এসব থ্রিডি ইমেজ তৈরি করা সম্ভব, কারণ, লেজার লাইট পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। লেজার আলোর সব কটি তরঙ্গ একটি সুষম একতায় কম্পিত হয়। হলোগ্রাম এ রকম পরস্পর সংযুক্ত লেজার বিমকে দুই ভাগে বিভক্ত করে তৈরি করা হয়। এ বিমের অর্ধেক ফটোগ্রাফিক ফিল্মের ওপর দ্যুতি ছড়ায়। আর অন্য অর্ধাংশ একটি বস্তুকে আলোকিত করে, ঠিকরে ওঠে, তারপর ওই একই ফটোগ্রাফিক ফিল্মের ওপর দ্যুতি ছড়ায়। ফিল্মের ওপর এই দুই বিমের ব্যতিচার ঘটালে একটি ব্যতিচার প্যাটার্ন তৈরি হয়, যা আসল থ্রিডি তরঙ্গের সব তথ্য এনকোড করে। এ ফিল্ম ডেভেলপ করা হলে তা দেখতে মাকড়সার জালের মতো তালগোল পাকানো জটিল রেখার মতো দেখায়। কিন্তু ফিল্মটির ওপর লেজার বিমের দ্যুতি ফেলা হলে হঠাৎ ম্যাজিকের মতো আসল বস্তুর রেপ্লিকা দেখা যায়।

হলোগ্রাফিক অদৃশ্যতার প্রযুক্তিগত সমস্যাগুলো ভয়াবহ। এর একটি চ্যালেঞ্জ হলো, প্রতি সেকেন্ডে ৩০টি ফ্রেম নিতে সক্ষম কোনো হলোগ্রাফিক ক্যামেরা বানানো। আরেকটি সমস্যা হলো, সবগুলো তথ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজত করা। সর্বশেষটি হলো, ইমেজকে একটি পর্দায় প্রক্ষেপ করা, যাতে ইমেজটি দেখতে বাস্তবসম্মত বলে মনে হয়।

চতুর্থ মাত্রার মাধ্যমে অদৃশ্যতা

অদৃশ্য হওয়ার ক্ষেত্রে এর চেয়েও নিখুঁত উপায়টির কথাও এখানে বলা উচিত। এ উপায়ের কথা বলেছিলেন এইচ জি ওয়েলস তাঁর দ্য ইনভিজিবল ম্যান উপন্যাসে। সেটি করা হয়েছিল চতুর্থ মাত্রার শক্তি কাজে লাগিয়ে। (এই বইয়ে পরে আমি উচ্চতর মাত্রার অস্তিত্ব নিয়ে আরও বিশদ আলোচনা করব।)

আমরা কি আমাদের ত্রিমাত্রিক মহাবিশ্ব ছেড়ে কোনো চতুর্থ মাত্রার সুবিধাজনক দিক থেকে এর ওপর ঝুলে আছি? ত্রিমাত্রিক প্রজাপতি যেভাবে দ্বিমাত্রিক কাগজের পাতার ওপর ঝুলে থাকে, অনেকটা সে রকম। তাহলে মহাবিশ্বে আমাদের নিচে যারা আছে, তাদের কাছ থেকে আমরা অদৃশ্য রয়ে যাব। এ ধারণাটির সমস্যা হলো, উচ্চতর কোনো মাত্রার অস্তিত্ব থাকার কোনো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। আবার তাত্ত্বিকভাবে উচ্চতর মাত্রায় ভ্রমণের জন্য এমন শক্তির প্রয়োজন, যা আমাদের প্রচলিত প্রযুক্তির পক্ষে অর্জন করা সম্ভব নয়। কাজেই টেকসই অদৃশ্যতা অর্জনের উপায় হিসেবে এ পদ্ধতি এখনো আমাদের জ্ঞান ও ক্ষমতার বাইরে। অনেক প্রচেষ্টায় অদৃশ্য হওয়ার উপায় অর্জনের পথে আমরা এত দূর এগিয়ে এসেছি। সে কারণে স্পষ্টতই এটি প্রথম শ্রেণির অসম্ভাব্যতার মধ্যে পড়ে। বলা বাহুল্য, পরবর্তী কয়েক দশকে কিংবা অন্তত এই শতাব্দীতে একধরনের অদৃশ্যতা হয়তো আমাদের কাছে একদম সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে।

তথ্যনির্দেশ

মার্কিন গৃহযুদ্ধ : যুক্তরাষ্ট্রে ১৮৬১ থেকে ১৮৬৫ সালে সংঘটিত উত্তর ও দক্ষিণ অঙ্গরাজ্যগুলোর মধ্যকার যুক্ত আমেরিকান গৃহযুদ্ধ নামে পরিচিত। কৃষ্ণদের দাস হিসেবে রাখা হবে কি না, বহুদিন ধরে চলমান সেই বিতর্কের জেরে এ গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। আব্রাহাম লিংকন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় আসার কিছুদিন পরই এই যুদ্ধ শুরু হয়েছিল।

আপেক্ষিক তত্ত্ব : আইনস্টাইনের একটি তত্ত্ব। ১৯০৫ সালে এক গবেষণাপত্রে তত্ত্বটি প্রকাশ করেন তিনি। বিজ্ঞানের নিয়মকানুন সব পর্যবেক্ষকের জন্যই একই হবে, তাদের গতিশীলতার ওপর এই নিয়মকানুন নির্ভরশীল নয়—এ ধারণার ওপর ভিত্তি করে তত্ত্বটি গড়ে উঠেছে। চতুর্থমাত্রিক স্থান-কালের বক্রতার ভিত্তিতে এটি মহাকর্ষ ব্যাখ্যা করে।

ডিএনএ : ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড, যা ফসফেট, একটি শর্করা ও চারটি ক্ষার (অ্যাডেনিন, গুয়ানিন, থায়ামিন ও সাইটোসিন) নিয়ে গঠিত। ডিএনএর দুটি সূত্রক একটি ডাবল হেলিক্স কাঠামো গঠন করে, যা প্যাচানো সিঁড়ির মতো। কোষের সব তথ্য ডিএনএতে লিপিবদ্ধ থাকে। এ তথ্যের মাধ্যমে তারা নিজেদের প্রতিলিপি তৈরি করতে পারে। এটি বংশগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

মুরের সূত্র : এ সূত্রমতে, প্রতি আঠারো মাসে কম্পিউটারের ক্ষমতা আগের তুলনায় দ্বিগুণ হয়ে যাবে। কিন্তু এ ঘটনা অনির্দিষ্টকালের জন্য চলতে পারে না।

ডপলার প্রভাব : শব্দতরঙ্গ বা আলোকতরঙ্গের উৎস যদি কোনো পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে চলমান হয় তাহলে ওই তরঙ্গের কম্পাঙ্ক ও তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বিচ্যুতি ঘটে। এই প্রভাব ব্যবহার করে মহাবিশ্ব যে প্রসারিত হচ্ছে, তার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল।

বৈদ্যুতিক আধান বা চার্জ : এ ধর্মের কারণে একটি কণা একই ধর্মের বা বিপরীত ধর্মের অন্য কণাকে বিকর্ষণ বা আকর্ষণ করে।

তরঙ্গদৈর্ঘ্য : একটি তরঙ্গের ক্ষেত্রে তার দুটি পাশাপাশি শীর্ষবিন্দু বা দুটি নিম্নবিন্দুর মধ্যবর্তী দূরত্ব।

৩. ফেজার ও মারণ নক্ষত্র

রেডিওর কোনো ভবিষ্যৎ নেই। বাতাসের চেয়ে ভারী কোনো যন্ত্র ওড়ানোও অসম্ভব। এক্স-রে ধাপ্পাবাজি হিসেবে প্রমাণিত হবে শিগগিরই।

—পদার্থবিদ লর্ড কেলভিন, ১৮৯৯

পারমাণবিক বোমা কখনোই বিস্ফোরিত হবে না। বিস্ফোরণ সম্পর্কে একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে এ কথা বলছি আমি।

—অ্যাডমিরাল উইলিয়াম লেহি

৪-৩-২-১, ফায়ার!

মারণ নক্ষত্র বেশ প্রকাণ্ড একটা যুদ্ধাস্ত্র। এর আকার আস্ত একটা চাঁদের সমান। প্রিন্সেস লিয়ার নিজের জগৎ, অর্থাৎ অসহায় আলডিরান গ্রহটির একেবারে কাছ থেকে একটা ডেথ স্টার নিক্ষেপ করা হয়েছিল। তাতে গ্রহটি তেজস্ক্রিয় হয়ে বিপুল বিস্ফোরণে চারদিকে টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। গ্রহটির ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে ওই সৌরজগতে। কোটি প্রাণের নিদারুণ আর্তচিৎকারে ভারী হয়ে ওঠে সেখানকার পরিবেশ। তাতে এমন এক ভীষণ আলোড়ন ওঠে, যা ছায়াপথটি জুড়েই অনুভব করা যাচ্ছিল।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, স্টার ওয়ার্স-এ দেখানো এই ডেথ স্টার বা মৃত নক্ষত্রের মতো মারণাস্ত্র কি আদৌও বানানো সম্ভব? একঝাঁক লেজারের কামানের মতো এ ধরনের কোনো মারণাস্ত্র দিয়ে কি চোখের পলকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া সম্ভব আস্ত একটা গ্রহ? লুক স্কাইওয়াকার এবং ডার্থ ভেডারের পরিচালিত সেই বিখ্যাত তলোয়ার সম্পর্কেই-বা কী বলা যায়? আলোকরশ্মি দিয়ে বানানো এই তলোয়ার (লাইট স্যাবার) শক্তিশালী ইস্পাতও কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলতে পারে? স্টার ট্রেকের ফেজারের মতো রে-গান কি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আইনপ্রয়োগকারী কর্মকর্তা ও সেনাবাহিনীর জন্য বাস্তবসম্মত কোনো মারণাস্ত্র?

স্টার ট্রেকের লাখো দর্শক এসব দারুণ স্পেশাল ইফেক্ট দেখে চমকে ওঠে। কিন্তু কতিপয় সমালোচকের কঠোর সমালোচনায় একসময় হতাশ হতে হয় দর্শকদের। কারণ, সমালোচকদের বক্তব্য, বিনোদনের জন্য এগুলো বেশ ভালো, কিন্তু বাস্তবে এগুলো করে দেখানো অসম্ভব। চাঁদের আকৃতির গ্রহধ্বংসকারী রে-গানকে উদ্ভট বলে রায় দেন তাঁরা। একইভাবে ঘনীভূত আলোকরশ্মি দিয়ে বানানো সেই অতি ধারালো তলোয়ার, এমনকি ছায়াপথের অনেক অনেক দূর থেকে অনুভূত সেই নিদারুণ আর্তচিৎকারও অসম্ভব। এসব শুনে স্পেশাল ইফেক্ট জগতের ওস্তাদ জর্জ লুকাসও যে সেবার দুঃখ পেয়েছিলেন, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

বিশ্বাস করা কঠিন হলেও আলোকরশ্মিকে ঠাসাঠাসি করার জন্য প্রাকৃতিক শক্তির কোনো ভৌত সীমানা নেই। পদার্থবিজ্ঞানের এমন কোনো সূত্র নেই, যা মারণ নক্ষত্র বা আলোকরশ্মির তলোয়ার বানাতে বাধা দেয়। আসলে গ্রহধ্বংসকারী গামা রশ্মির বিম খোদ প্রকৃতিতেই বর্তমান। গহিন মহাকাশে দূর থেকে গামা রশ্মির বিস্ফোরক থেকে বিকিরণের বিপুল ঝলক নিমেষেই শুধু বিগ ব্যাংয়ে সংঘটিত হয়েছিল। দুর্ভাগ্যক্রমে, যেকোনো গ্রহকে গামা রশ্মি বিস্ফোরকের লক্ষ্যবস্তুর সীমার মধ্যে রেখে ফায়ার করা হলে তা সত্যিই বিস্ফোরিত হয়ে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে।

ইতিহাসে রশ্মি মারণাস্ত্র

গুচ্ছবদ্ধ শক্তিকে লাগাম পরানোর স্বপ্ন আসলে আজকের নয়, এর শিকড় প্রোথিত আছে প্রাচীন পৌরাণিক কাহিনি ও উপকথায়। গ্রিক দেবতা জিউস মানুষের ওপর বজ্রপাতের বিস্ফোরণ ছোড়ার জন্য বিখ্যাত। নরওয়ে বা নর্স দেবতা থরের ছিল মিওনিয়র নামের জাদুকরি এক হাতুড়ি। সেটি দিয়ে সে বজ্রপাতের বিস্ফোরণ ঘটাতে পারত। আর হিন্দু দেবতা ইন্দ্র শক্তিগুচ্ছ ছুড়তে পারত তার জাদুকরি বর্শা থেকে।

বাস্তবসম্মত অস্ত্র হিসেবে রে বা রশ্মি ব্যবহারের ধারণা সম্ভবত শুরু হয় গ্রিসের মহান গণিতবিদ আর্কিমিডিসের কাজের মাধ্যমে। প্রাচীন পৃথিবীর বিজ্ঞানীদের মধ্যে সম্ভবত তিনিই ছিলেন শ্রেষ্ঠ। নিউটন ও লিবনিজের দুই হাজার বছর আগে তিনি ক্যালকুলাস আবিষ্কার করেন। অবশ্য সেটি ছিল ভুলে ভরা। খ্রিষ্টপূর্ব ২১৪ সালে দ্বিতীয় পিউনিক যুদ্ধে রোমান সেনাপ্রধান মার্সিলাসের বাহিনীর বিরুদ্ধে কিংবদন্তির মতো এক লড়াইয়ে সাইরাকাস সাম্রাজ্যকে সাহায্য করেন আর্কিমিডিস। সে সময় তিনি এমন ধরনের একটি প্রতিফলক বানান, যা সূর্যরশ্মিকে কেন্দ্রীভূত করতে পারত বলে ধারণা করা হয়। এভাবে শত্রুপক্ষের জাহাজগুলো একে একে পুড়িয়ে দেন আর্কিমিডিস। (সেটি ব্যবহারযোগ্য ও কার্যকরী বিম অস্ত্র ছিল কি না, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে এখনো বিতর্ক আছে। কারণ, বিজ্ঞানীদের বেশ কয়েকটি দল আর্কিমিডিসের ওই পদ্ধতি অনুসরণ করে ভিন্ন ভিন্ন ফলাফল পেয়েছেন।)

কল্পবিজ্ঞানে প্রথম রে-গান বিস্ফোরণ দেখা যায় ১৮৮৯ সালে এইচ জি ওয়েলসের ওয়ার অব দ্য ওয়ার্ল্ডস শিরোনামের ক্ল্যাসিক উপন্যাসে। এতে মঙ্গল গ্রহ থেকে এলিয়েনরা তাদের তেপায়া এক বস্তু থেকে অস্ত্র বের করে তা দিয়ে তাপশক্তির বিম ছুড়ে পৃথিবীর অসংখ্য শহর পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করে দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বিশ্বকে পদানত করতে সব সময় সর্বশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করতে উৎসুক ছিল নাৎসি বাহিনী। সে জন্য তারা বিভিন্ন ধরনের রে-গান নিয়ে পরীক্ষা চালায়। তার মধ্যে ছিল প্যারাবোলিক আয়নার ওপর ভিত্তি করে বানানো সনিক যন্ত্র, যা শব্দকে কেন্দ্রীভূত করে তীব্র করে তুলতে পারত।

কেন্দ্রীভূত আলোকরশ্মি দিয়ে বানানো মারণাস্ত্র সাধারণ জনগণের কল্পনায় ঢুকে পড়ে জেমস বন্ডের হাত ধরে। গোল্ডফিঙ্গার নামের মুভিতে প্রথমবার লেজারের ব্যবহার দেখানো হয়। (কিংবদন্তিতুল্য এই ব্রিটিশ স্পাইকে একটি ধাতব টেবিলে বেঁধে রাখা হয়েছিল। একটি শক্তিশালী লেজার রশ্মি ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে আসতে আসতে তার পায়ের ফাঁক দিয়ে টেবিল গলিয়ে দিচ্ছিল। এভাবে লেজার রশ্মির মাধ্যমে তাকেও দুই টুকরো করার হুমকি দেওয়া হয়েছিল।)

ওয়েলসের উপন্যাসে ওইভাবে রে-গানের ব্যবহার দেখে সেবার উপহাসে ফেটে পড়েন পদার্থবিদেরা। কারণ, ওটা নাকি আলোকবিদ্যার কোনো সূত্র মেনে চলে না। ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণ অনুযায়ী, আমাদের চারপাশে যে আলো দেখা যায়, তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং তা এলোমেলো বা বিচ্ছিন্ন। (যেমন এগুলো বিভিন্ন কম্পাঙ্কের ও পর্যায়ের তরঙ্গ একসঙ্গে মিলেমিশে থাকে)। একসময় ভাবা হতো, লেজারের মতো পরস্পর সংযুক্ত, কেন্দ্ৰীভূত, সুষম আলোকরশ্মি তৈরি করা অসম্ভব।

কোয়ান্টাম বিপ্লব

কোয়ান্টাম তত্ত্ব আসার পর সবকিছু আমূল বদলে গেল। গ্রহদের গতি ও আলোর আচরণ ব্যাখ্যায় নিউটনের সূত্রগুলো আর ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণগুলো একসময় সফল ছিল। কিন্তু বিশ শতক আসার সঙ্গে সঙ্গে বোঝা গেল সূত্রগুলো সব ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে পারে না। পদার্থের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয় কেন, নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় ধাতু কেন গলে যায়, গ্যাসকে তাপ দিলে তারা আলো নিঃসরণ করে কেন, নির্দিষ্ট বস্তু নিম্ন তাপমাত্রায় কেন অতিপরিবাহীর মতো আচরণ করে—এসব ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হলো সূত্রগুলো। এসব প্রশ্নের উত্তরের জন্য দরকার পড়ল পরমাণুর গভীরের গতিবিদ্যা বোঝার। এতেই একটা বিপ্লব দানা পাকিয়ে উঠতে লাগল একসময়। এভাবে প্রায় আড়াই শ বছর পর নিউটনিয়ান পদার্থবিদ্যা ছুড়ে ফেলে নতুন এক পদার্থবিদ্যার প্রসববেদনা ঘোষিত হলো।

জার্মানিতে ১৯০০ সালে ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক প্রস্তাব করেন, নিউটনের ধারণামতো শক্তি অবিছিন্ন নয়। বরং শক্তি আসলে ক্ষুদ্র ও বিছিন্ন গুচ্ছ গুচ্ছ প্যাকেটের মতো। শক্তির এই গুচ্ছকে বলে কোয়ান্টা। এরপর ১৯০৫ সালে আইনস্টাইন স্বীকার করেন, আলোর মধ্যেও এই অতি ক্ষুদ্র বিচ্ছিন্ন গুচ্ছ (বা কোয়ান্টা) থাকে। এই গুচ্ছকে পরে নাম দেওয়া হয় ফোটন। এ সহজ-সরল কিন্তু শক্তিশালী ধারণা ব্যবহার করে ফটোইলেকট্রিক ইফেক্ট বা আলোক-তড়িৎক্রিয়া ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হন আইনস্টাইন। ধাতব বস্তুর ওপর আলো ফেললে সেখানে ইলেকট্রন নিঃসৃত হওয়ার ঘটনাকে বলে আলোক-তড়িৎক্রিয়া। বর্তমান যুগের টিভি, লেজার, সৌরকোষ আধুনিক ইলেকট্রনিকসের ভিত্তি ফটোইলেকট্রিক ইফেক্ট ও ফোটন। (আইনস্টাইনের ফোটন তত্ত্ব এতই বৈপ্লবিক ছিল যে তার ধারণার সবচেয়ে বড় সমর্থক খোদ ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কও শুরুতে তা বিশ্বাস করতে পারেননি। আইনস্টাইন সম্পর্কে এক লেখায় প্ল্যাঙ্ক বলেছেন, “তিনি হয়তো মাঝে মাঝে লক্ষ্যভেদ করতে পারেননি…যেমন, তার আলোক কোয়ান্টার হাইপোথিসিসে, কিন্তু এটি তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যাবে না।’

এরপর ১৯১৩ সালে পরমাণুর সম্পূর্ণ নতুন এক চিত্র আমাদের সামনে হাজির করেন ড্যানিশ পদার্থবিদ নীলস বোর। তাঁর দেওয়া চিত্রটি যেন সৌরজগতের এক খুদে সংস্করণ। তবে পরমাণুতে ইলেকট্রনগুলো আসলে সৌরজগতের মতো নয়। তারা শুধু বিচ্ছিন্ন কক্ষপথ বা শক্তিস্তরে নিউক্লিয়াসের চারপাশে ঘোরে। এক শক্তিস্তর থেকে আরেকটি কম শক্তির ছোট শক্তিস্তরে লাফ দেওয়ার সময় ইলেকট্রন শক্তি নিঃসরণ করে ফোটন হিসেবে। আবার ইলেকট্রন বেশি শক্তির বড় শক্তিস্তরে লাফ দিলে বিচ্ছিন্ন শক্তি শোষণ করে।

পরমাণু সম্পর্কে প্রায় সম্পূর্ণ তত্ত্ব পাওয়া গিয়েছিল ১৯২৫ সালের দিকে। এটি সম্ভব হয়েছিল কোয়ান্টাম মেকানিকস বা কোয়ান্টাম বলবিদ্যা আগমন এবং আরউইন শ্রোডিঙ্গার, ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ ও অন্য পদার্থবিদদের বৈপ্লবিক সব কাজের মাধ্যমে। কোয়ান্টাম তত্ত্বমতে, ইলেকট্রন একটি কণা হলেও এর সঙ্গে একটি তরঙ্গও জড়িত থাকে। ফলে ইলেকট্রন একই সঙ্গে কণা ও তরঙ্গের মতো ধর্ম পায়। ইলেকট্রনের তরঙ্গ একটি সমীকরণ মেনে চলে, যাকে বলা হয় শ্রোডিঙ্গারের ওয়েভ ইকুয়েশন বা তরঙ্গ সমীকরণ। এ সমীকরণের মাধ্যমে পরমাণুর ধর্মগুলো, এমনকি বোরের ধারণা করা কোয়ান্টাম লাফও নির্ণয় করা যায়।

১৯২৫ সালের আগে পরমাণুকে রহস্যময় মনে করা হতো। সে কারণে দার্শনিক আর্নেস্ট মাখের মতো আরও অনেকে মনে করতেন, এদের সত্যিকার অস্তিত্ব নেই। ১৯২৫ সালের পর পরমাণুর গতিবিদ্যার গভীরে ডুব দিয়ে দেখা সম্ভব হয়। এর মাধ্যমে ভবিষ্যদ্বাণীও করা সম্ভব হয় তার ধর্মগুলোও। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, এর অর্থ হলো, আপনার কাছে অনেক বড় একটা কম্পিউটার থাকলে, কোয়ান্টাম তত্ত্বের সূত্র দিয়ে রাসায়নিক উপাদানের ধর্মগুলো আহরণ করা সম্ভব। একই উপায়ে, নিউটনিয়ান পদার্থবিদদের কাছে যদি অনেক বড় কোনো ক্যালকুলেটিং মেশিন থাকে, তাহলে মহাবিশ্বের সব বস্তুর গতি নির্ণয় করতে পারবেন তাঁরা। কোয়ান্টাম পদার্থবিদেরা দাবি করেন, তাত্ত্বিকভাবে মহাবিশ্বের সব পদার্থের রাসায়নিক ধর্ম নির্ণয় করা সম্ভব। আবার তাঁদের কাছে যদি অনেক বড় ও শক্তিশালী কম্পিউটার থাকে, তাহলে পুরো মানবজাতির ওয়েভ ফাংশন লিখতে পারবেন তাঁরা।

মেজার ও লেজার

বার্কলির ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর চার্লস টাউনস আর তাঁর সহকর্মীরা ১৯৫৩ সালে প্রথমবার মাইক্রোওয়েভরূপে সংসক্ত বিকিরণ তৈরি করতে পারেন। এর নাম দেওয়া হয় Maser বা মেজার (মাইক্রোওয়েভ অ্যামপ্লিফিকেশন থ্রু সিমুলেটেড এমিশন অব রেডিয়েশন)। তিনি ও রুশ বিজ্ঞানী নিকোলাই বাসভ ও আলেকজান্দার প্রোকোরভ এ কারণে ১৯৬৪ সালে নোবেল পুরস্কার পান। শিগগিরই তাঁদের ফলাফল দৃশ্যমান আলোর ক্ষেত্রেও সম্প্রসারণ করা হয়। এর মাধ্যমে জন্ম নেয় লেজার। (অন্যদিকে Phaser বা ফেজার হলো একটা কাল্পনিক যন্ত্র, স্টার ট্রেকের মুভির কারণে এটি জনপ্রিয়।)

লেজারে বিশেষ একটি মাধ্যম ব্যবহার করা হয়, যেটি লেজার বিমকে নির্দিষ্ট জায়গায় পাঠাতে পারে। সে মাধ্যমটি হতে পারে বিশেষ কোনো গ্যাস, ক্রিস্টাল বা ডায়োট। এরপর বাইরে থেকে এই মাধ্যমের ভেতরে শক্তি সঞ্চালন করা হয়, বৈদ্যুতিক প্রবাহ, রেডিও, আলো কিংবা কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়ার রূপে। শক্তি সঞ্চালনের এই হঠাৎ অন্তঃপ্রবাহে মাধ্যমটির পরমাণুগুলোতে সঞ্চারিত হয়, তাতে ইলেকট্রনগুলো শক্তি শোষণ করে এবং বাইরের ইলেকট্রন শক্তিস্তরে লাফ দেয়।

এই উত্তেজিত বা সঞ্চারিত অবস্থায় মাধ্যমটি অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। এখন এই মাধ্যমের মধ্য দিয়ে কোনো আলোকরশ্মি পাঠানো হলে ফোটনগুলো প্রতিটি পরমাণুতে আঘাত করবে। ফলে নিম্নস্তরে হঠাৎ ক্ষয়প্রাপ্ত হবে পরমাণু। এই প্রক্রিয়ায় আরও ফোটন নিঃসৃত হবে। ফলাফল হিসেবে আরও ফোটন নিঃসরণ করতে ট্রিগার করবে ইলেকট্রনকে। এভাবে ক্রমান্বয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে চুপসে যাওয়া পরমাণু তৈরি হবে। তার সঙ্গে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ফোটন হঠাৎ করে বেরিয়ে আসতে থাকবে এই রশ্মির সঙ্গে। ঝাঁকে ঝাঁকে ফোটনের এই স্রোত ঐকতানে কম্পিত হলে তারা সংসক্ত হয়। মূলত কিছু নির্দিষ্ট পদার্থের ক্ষেত্রে এটি ঘটে।

(ডমিনোর এক সারির ছবি কল্পনা করুন। টেবিলের সমতলে শুইয়ে রাখা হলে ডমিনোগুলো সর্বনিম্ন শক্তিস্তরে থাকে। কিন্তু ডমিনোগুলোকে খাড়াভাবে দাঁড় করিয়ে রাখলে তারা উচ্চ শক্তিস্তরে থাকে, ঠিক মাধ্যমের পরমাণুর মধ্যে সঞ্চারণ সৃষ্টি করার মতো। এখন একটি ডমিনো ঠেলা দেওয়া হলে ঠিক লেজার বিমের মতোই মুহূর্তেই সব শক্তিকে হঠাৎ ধসিয়ে দেওয়া যায়।)

কেবল নির্দিষ্ট কিছু পদার্থই এভাবে বিকিরণ নিঃসরণ করতে পারে। শুধু বিশেষ ধরনের পদার্থেই কোনো ফোটন একটি সঞ্চারিত পরমাণুতে আঘাত করলে একটি ফোটন নিঃসৃত হবে, যা আগের ফোটনের সঙ্গে সংসক্ত হবে। এ সংসক্তির ফলে ফোটনের ঝাঁকের মধ্যে সবগুলো ফোটনই ঐকতানে কম্পিত হবে এবং পেনসিলের মতো পাতলা লেজার বিম সৃষ্টি করবে। (অন্যদিকে জনশ্রুতিমতো লেজার বিম সব সময় পেনসিলের মতো পাতলা থাকতে পারে না। যেমন চাঁদে একটি লেজার বিম ছোড়া হলে, তা ক্রমান্বয়ে প্রসারিত হয়ে সবশেষে কয়েক মাইলজুড়ে বিস্তৃত এক বিন্দু তৈরি করবে।)

সাধারণ গ্লাস লেজারে হিলিয়াম ও নিয়ন গ্যাসের একটি টিউব থাকে। এ টিউবের ভেতরে বিদ্যুৎ প্রবাহিত করা হলে টিউবের ভেতরের পরমাণুতে শক্তি সঞ্চারিত হয়। এবার দুটি আয়না ব্যবহার করে বিমটিকে অ্যামপ্লিফাই বা বিবর্ধিত করা হয়। আয়না দুটি দুই প্রান্তে বসানো থাকায় বিমটি আয়না দুটির এপাশে-ওপাশে যাওয়া-আসা করতে পারে। একটি আয়না পুরোপুরি ঝাপসা থাকলেও আরেকটিতে প্রতিবার খুব ক্ষুদ্র পরিমাণ আলো বেরিয়ে যেতে দেয়। এভাবে এমন বিম তৈরি হয়, যা এক প্রান্ত দিয়ে ছুড়ে মারা যায়।

বর্তমানে প্রায় সব জায়গাতে লেজার দেখা যায়। মুদিদোকান থেকে শুরু করে চেকআউট স্ট্যান্ড, ইন্টারনেট বহনকারী ফাইবার অপটিক থেকে শুরু করে লেজার প্রিন্টার ও সিডি প্লেয়ার, কম্পিউটার—সব জায়গাতেই লেজারের ব্যবহার রয়েছে। চোখের সার্জারিতে, ট্যাটু তুলে ফেলতে, এমনকি কসমেটিক সেলুনেও লেজার ব্যবহার করা হয়। মজার ব্যাপার হলো, ২০০৪ সালে বিশ্বজুড়ে ৫৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের লেজার বিক্রি হয়েছে।

লেজার ও ফিউশনের ধরন

প্রায় প্রতিদিনই নতুন ধরনের লেজার আবিষ্কৃত হচ্ছে। কারণ, বিকিরণ নিঃসরণ করার মতো নতুন নতুন পদার্থ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে প্রায় নিত্যদিনই। আর তাতে আবিষ্কৃত হচ্ছে মাধ্যমটির মধ্যে শক্তি সঞ্চারণের নতুন নতুন সব উপায়। প্রশ্ন হলো, এসব প্রযুক্তির কোনোটি কি রে-গান কিংবা আলোক তলোয়ার বা লাইট স্যাবার তৈরির উপযুক্ত? মৃত নক্ষত্রে শক্তি সঞ্চারণ করার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী লেজার বানানো সম্ভব কি? বর্তমানে বিকিরণ নিঃসরণ করা বস্তু আর ওই বস্তুর মধ্যে শক্তি সঞ্চারণ (যেমন বিদ্যুৎপ্রবাহ, তীব্র আলোকরশ্মি, এমনকি রাসায়নিক বিস্ফোরণ) করার ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন বিস্ময়কর লেজার দেখা যায়। এর মধ্যে রয়েছে :

গ্যাস লেজার : এই লেজারগুলোর মধ্যে থাকে হিলিয়াম-নিয়ন লেজার। সাধারণ এই লেজার আমাদের পরিচিত লাল রশ্মি তৈরি করে। বিদ্যুৎপ্রবাহ বা রেডিও তরঙ্গের মাধ্যমে শক্তি সঞ্চারণ করা হয় এতে। হিলিয়াম-নিয়ন লেজারের শক্তি বেশ দুর্বল। তবে কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস লেজার ব্যবহার করে ভারী শিল্পকারখানায় বিস্ফোরণ, কাটিং আর ঢালাইয়ের কাজে ব্যবহার করা যায়। এ ছাড়া পুরোপুরি অদৃশ্য বিপুল শক্তির বিম সৃষ্টি করা যায় এটি দিয়ে।

রাসায়নিক লেজার : রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে শক্তি সঞ্চারণ করা হয় এই শক্তিশালী লেজারগুলোতে। যেমন ইথিলিনের জ্বলন্ত শিখা ও নাইট্রোজেন ট্রাইফ্লুরাইড বা NF3। এই লেজারগুলো বেশ শক্তিশালী হওয়ার কারণে এগুলো সামরিক কাজে ব্যবহার করা হয়। রাসায়নিক লেজার আকাশযুদ্ধে বা স্থলযুদ্ধে ব্যবহার করে মার্কিন সেনাবাহিনী। এগুলো কয়েক মিলিয়ন ওয়াট শক্তি তৈরি করতে পারে। এটি মধ্য আকাশে স্বল্পপাল্লার মিসাইল ভূপাতিত করার জন্য ডিজাইন করা হয়।

এক্সজিমার লেজার : রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে শক্তি সঞ্চারণ করা হয় এই লেজারও। এতে প্রায়ই নিষ্ক্রিয় গ্যাস (যেমন আর্গন, ক্রিপ্টন বা জেনন) ও ফ্লোরিন কিংবা ক্লোরিন ব্যবহার করা হয়। অতিবেগুনি রশ্মি তৈরি করে এই লেজার। সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে চিপের অতি ক্ষুদ্র ট্রানজিস্টর খোদাই করতে আর চোখের ল্যাসিক সার্জারিতে ব্যবহার করা যায়।

সলিড স্টেট লেজার : এ ধরনের প্রথম ব্যবহারোপযোগী লেজার বানানো হয়েছিল ক্রোমিয়াম-স্যাফায়ার রুবি ক্রিস্টাল দিয়ে। ইট্রিয়াম, হলমিয়াম, থুলিয়াম ও অন্যান্য রাসায়নিক যোগ করে অনেক ধরনের ক্রিস্টাল দিয়ে লেজার বিম বানানো যায়। এগুলো উচ্চ শক্তির অতি ক্ষুদ্র স্পন্দনের লেজার আলো তৈরি করতে পারে।

সেমিকন্ডাক্টর লেজার : সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে ডায়োডের ব্যবহার বেশ পরিচিত। ইন্ডাস্ট্রিয়াল কাটিং ও ঢালাইয়ে তীব্র রশ্মি তৈরি করতে পারে ডায়োড। আবার বিভিন্ন দোকানে চেকআউট স্ট্যান্ডে বিভিন্ন আইটেমের বারকোডের পাঠোদ্ধারে এগুলো ব্যবহৃত হয়।

ডাই লেজার : এই লেজার জৈব রং হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এরা বিশেষভাবে দরকারি। কারণ, এরা অতি ক্ষুদ্র কম্পাঙ্কের আলো তৈরি করতে পারে, যার স্থায়িত্ব মাত্র ১ সেকেন্ডের ট্রিলিয়ন ভাগের ১ ভাগ।

লেজার ও রে-গান?

বিভিন্ন ধরনের বাণ্যিজিক ও সামরিক লেজার থেকে শক্তি পাওয়া গেলেও লড়াই বা যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের মতো আমাদের কাছে কোনো রে-গান নেই কেন? সায়েন্স ফিকশন মুভিতে একপ্রকার রে-গান আদর্শ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে দেখা যায়। তাহলে আমরা সেগুলো এখনো বানাতে চেষ্টা করছি না কেন?

এর সহজ উত্তর হলো পোর্টেবল বা বহনযোগ্য পাওয়ার প্যাকের অভাব। সে জন্য বিপুল পরিমাণ বৈদ্যুতিক শক্তির জোগান দিতে সক্ষম ক্ষুদ্র আকৃতির পাওয়ার প্যাক দরকার। আবার সেটি এতই ছোট হতে হবে যে যেন তা হাতের তালুর মধ্যে এঁটে যায়। বর্তমানে এই পরিমাণ শক্তির জোগান দেওয়ার জন্য বড়সড় বাণিজ্যিক পাওয়ার স্টেশন বানাতে হবে। বর্তমানে এ রকম বিপুল শক্তি জোগান দেওয়ার মতো সবচেয়ে ছোট বহনযোগ্য যে সামরিক যন্ত্রটি পাওয়া যায়, সেটি ক্ষুদ্রাকৃতির একটি হাইড্রোজেন বোমা। এটি আপনার লক্ষ্যবস্তুর সঙ্গে সঙ্গে আপনাকেও ধ্বংস করে ফেলতে পারবে।

এখানে দ্বিতীয় আরেকটি আনুষঙ্গিক সমস্যা হলো লেজিং ম্যাটেরিয়ালের স্থায়িত্ব। তাত্ত্বিকভাবে, লেজারে শক্তি ঘনীভূত করার কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। কিন্তু সমস্যা হলো, হাতের মুঠোয় রাখার মতো রে-গানের লেজিং ম্যাটেরিয়াল স্থিতিশীল হবে না। যেমন ক্রিস্টাল লেজারে বেশি শক্তি পাম্প করলে তা অতিরিক্ত উত্তপ্ত হয়ে একসময় ফেটে যায়। তাই কোনো বস্তুকে বাষ্পীভূত করতে কিংবা শত্রুকে অসাড় করতে সক্ষম অতিশক্তিশালী লেজার বানানো দরকার। সে জন্য কোনো বিস্ফোরণের শক্তি ব্যবহারের প্রয়োজন হতে পারে। সে ক্ষেত্রে লেজিং ম্যাটেরিয়ালের স্থিতিশীলতা আর এ ধরনের বাধার সৃষ্টি করবে না। কারণ, এ ধরনের লেজার হয়তো মাত্র একবারই ব্যবহার করা যাবে।

পোর্টেবল পাওয়ার প্যাক ও স্থিতিশীল লেজিং ম্যাটেরিয়ালের সমস্যার কারণে বর্তমান প্রচলিত প্রযুক্তি দিয়ে হাতের মুঠোয় ধরে চালানোর মতো রে- গান বানানো সম্ভব নয়। অবশ্য রে-গান বানানো সম্ভব, যদি সেগুলো তারের মাধ্যমে পাওয়ার সাপ্লাইয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকে। কিংবা ন্যানো প্রযুক্তি দিয়ে হয়তো কোনো দিন মিনিয়েচার ব্যাটারি বানানো যাবে, যা প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটানোর মতো শক্তি উৎপাদন করতে পারবে। আবার হাতের মুঠোয় থাকা কোনো যন্ত্রের জন্য হয়তো প্রয়োজনীয় শক্তির জোগানও দিতে পারবে এটি আমরা দেখেছি, বর্তমানে ন্যানো প্রযুক্তি অনেকটাই প্রাথমিক পর্যায়ে রয়ে গেছে। পারমাণবিক পর্যায়ে পারমাণবিক যন্ত্রাংশ তৈরি করতে পেরেছেন বিজ্ঞানীরা। কিন্তু সেগুলো আকর্ষণীয় হলেও ব্যবহারযোগ্য নয়। যেমন পারমাণবিক অ্যাবাকাস ও পারমাণবিক গিটার। কল্পনা করা যায়, এই শতাব্দীর শেষে বা পরের শতাব্দীতে বিপুল শক্তি ধারণে সক্ষম মিনিয়েচার ব্যাটারি উপহার দিতে পারবে ন্যানো প্রযুক্তি।

আলোক তলোয়ারের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা আছে। ১৯৭০-এর দশকে স্টার ওয়ার্স মুভিটি যখন প্রথম মুক্তি পেল, তখন আলোক সেনাবাহিনী শিশুদের কাছে সেরা বিক্রীত খেলনা হয়ে ওঠে। কিন্তু অনেক সমালোচকের মতে, এ রকম যন্ত্র কখনো বানানো সম্ভব হবে না। প্রথমত, আলোকে ঘনীভূত করা অসম্ভব। আলো সব সময় আলোর গতিতেই চলে। তাই একে কখনো কঠিন বানানো সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত, স্টার ওয়ার্সে আলোক তলোয়ারের যেমন ব্যবহার দেখানো হয়, সেভাবে আলোকরশ্মিকে মধ্য আকাশে নিঃশেষ করে ফেলা যাবে না। কারণ, আলোকরশ্মি চিরকাল চলতেই থাকবে। কাজেই সত্যিকারের আলোক তলোয়ার আকাশে ছড়িয়ে পড়বে।

আসলে প্লাজমা বা অতি উত্তপ্ত আয়োনিত গ্যাস ব্যবহার করে একধরনের আলোক তলোয়ার বানানোর উপায় আছে। প্লাজমাকে এমনভাবে উত্তপ্ত করা সম্ভব, যাতে তা অন্ধকারে জ্বলে উঠতে ও ইস্পাতের ভেতর দিয়েও ছিদ্র তৈরি করতে পারে। প্লাজমা আলোক তলোয়ারে হয়তো কোনো উপায়ে একটি পাতলা ও ফাঁপা দণ্ড বসানো যাবে, যা টেলিস্কোপের মতো ক্রমান্বয়ে বাইরে বেরিয়ে আসতে পারবে। এ টিউবের মধ্যে উত্তপ্ত প্লাজমা ছেড়ে দিলে ভেতরের ফাঁপা দণ্ডটি বরাবর সুষমভাবে সাজানো ছোট গর্তগুলোর মধ্য দিয়ে বেরিয়ে যাবে। দণ্ডের ওপরে ও গর্তগুলোর ভেতর দিয়ে বা হাতলের বাইরে প্লাজমা প্রবাহিত হয়ে বাইরে বেরিয়ে এলে, অতি উত্তপ্ত গ্যাসের একটি লম্বা ও জ্বলজ্বলে টিউবের আকার ধারণ করবে সেটি। আর ইস্পাতকেও গলিয়ে ফেলার জন্য তা যথেষ্ট। এ যন্ত্রটিকে মাঝে মাঝে প্লাজমা টর্চ বলে উল্লেখ করা হয়।

কাজেই এমন একটি উচ্চশক্তির যন্ত্র তৈরি করা সম্ভব, যার সঙ্গে আলোক তলোয়ারের বেশ মিল আছে। কিন্তু রে-গানের জন্য আপনাকে উচ্চশক্তির একটি পোর্টেবল পাওয়ার প্যাক তৈরি করা ছাড়া উপায় নেই। তা না হলে লম্বা একটা তার দরকার হবে, যেটি আলোক তলোয়ারকে সংযুক্ত করবে একটি পাওয়ার সাপ্লাইয়ের সঙ্গে। কিংবা ন্যানো প্রযুক্তির মাধ্যমে বিপুল শক্তি সরবরাহ করতে পারা কোনো ক্ষুদ্র পাওয়ার সাপ্লাই বানিয়ে নিতে হবে।

তাই এভাবে হয়তো এখন একধরনের রে-গান ও আলোক তলোয়ার বানানো সম্ভব। কিন্তু সায়েন্স ফিকশন মুভিতে দেখানো হাতের মুঠোয় ধরা শক্তিশালী অস্ত্র এখনো আমাদের প্রচলিত প্রযুক্তির বাইরে। তবে এ শতাব্দীর শেষে বা পরের শতাব্দীতে ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স ও ন্যানোটেকনোলজির নতুন অগ্রগতির মাধ্যমে হয়তো রে-গান বানানো সম্ভব হবে। সে কারণে এটি প্রথম শ্রেণির অসম্ভাব্যতা।

মৃত নক্ষত্রের জন্য শক্তি

স্টার ওয়ার্সমুভিতে দেখানো আস্ত গ্রহ ধ্বংস করতে সক্ষম ও ছায়াপথে সন্ত্রাস সৃষ্টি করার মতো মৃত নক্ষত্রের লেজার কামান বানাতে দরকার কল্পনাতীত অতি শক্তিশালী লেজার। বর্তমানে সবচেয়ে শক্তিশালী লেজারের বেশ কিছুর অস্তিত্ব শুধু নক্ষত্রের কেন্দ্রেই দেখা যায়, যা তাপমাত্রা ছড়িয়ে দিতে ব্যবহৃত হয়। নক্ষত্রদের এই শক্তি ফিউশন রিঅ্যাক্টর হিসেবে হয়তো একদিন পৃথিবীতে ব্যবহারের উপায় বের করা যাবে।

নক্ষত্র গঠিত হলে বাইরের মহাকাশে কী ঘটে, তা অনুকরণের চেষ্টা করছে ফিউশন মেশিন। হাইড্রোজেন গ্যাসের আকারহীন বিশাল কোনো বলের মধ্য দিয়ে একটি নক্ষত্রের সূচনা হয়। নক্ষত্রের প্রবল মহাকর্ষ ওই গ্যাসকে সংকুচিত করে ও তাকে উত্তপ্ত করে তোলে; এভাবে ক্রমান্বয়ে তাপমাত্রা চরম পর্যায়ে পৌছায়। যেমন নক্ষত্রটির কেন্দ্রের অনেক গভীরের তাপমাত্রা ৫০ মিলিয়ন থেকে ১০০ মিলিয়ন ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে উঠে যায়। হাইড্রোজেন নিউক্লিয়াসকে পরস্পরের সঙ্গে সবলে আছড়ে ফেলার জন্য এই তাপমাত্রা যথেষ্ট। এভাবেই হাইড্রোজেন থেকে হিলিয়াম নিউক্লিয়াস তৈরি হয়, সঙ্গে তৈরি হয় বিপুল শক্তি। হাইড্রোজেন থেকে হিলিয়ামের এই ফিউশনই নক্ষত্রটির শক্তির উৎস। আইনস্টাইনের বিখ্যাত সমীকরণ E=mc^2 অনুযায়ী, এভাবেই কোনো নক্ষত্রে সামান্য পরিমাণ ভর রূপান্তরিত হয়ে বিপুল শক্তি বেরিয়ে আসে।

পৃথিবীতে ফিউশন বিক্রিয়ায় লাগাম পড়াতে বিজ্ঞানীরা এখন দুটি উপায়ে চেষ্টা করছেন। তবে দুটো পদ্ধতি গড়ে তোলার কাজটি প্রত্যাশার চেয়েও অনেক কঠিন বলে প্রমাণিত হয়েছে।

ফিউশনে জড়তার বন্ধন

প্রথম পদ্ধতিকে বলা হয় ইনারশিয়াল কনফাইনমেন্ট বা জড়তার বন্ধন। পৃথিবীতে সবচেয়ে শক্তিশালী লেজার ল্যাবরেটরিতে এক টুকরো সূর্য তৈরি করা হয় এ পদ্ধতিতে। নিওডাইমিয়াম গ্লাস কঠিন অবস্থার লেজার নক্ষত্রের কেন্দ্রের মতো চরম তাপমাত্রা তৈরির জন্য আদর্শ। এই লেজার সিস্টেমের আকার বড়সড় কারখানার সমান। এ ছাড়া এতে একগুচ্ছ লেজার থাকে, যা এক সারি সমান্তরাল লেজার বিমকে লম্বা এক টানেলে নিক্ষেপ করতে পারে। এই উচ্চশক্তির লেজার বিম এরপর আঘাত করে গোলকের চারপাশে সাজানো এক সারি ছোট ছোট আয়নায়। লেজার বিমগুলোকে এসব আয়না বেশ সাবধানে সুষমভাবে একটি ক্ষুদ্র, হাইড্রোজেন-সমৃদ্ধ মার্বেলের ওপর ফোকাস করা হয়। (মার্বেলগুলো লিথিয়াম ডিউটেরাইডের মতো পদার্থ দিয়ে বানানো, যা হাইড্রোজেন বোমার সক্রিয় উপাদান)। ক্ষুদ্র মার্বেলগুলোর আকার সাধারণত একটি আলপিনের মাথার সমান আর ওজন মাত্র ১০ মিলিগ্রাম।

লেজার আলোর বিস্ফোরণ মার্বেলগুলোর পৃষ্ঠতল পুড়িয়ে ফেলে। তাতে পৃষ্ঠতল বাষ্পীভূত হয়ে মার্বেলটি সংকুচিত হয়ে যায়। মার্বেলগুলো চুপসে যাওয়ার কারণে শক ওয়েভের সৃষ্টি হয়, যা মার্বেলগুলোর কেন্দ্র পর্যন্ত পৌঁছে তার তাপমাত্রা কয়েক মিলিয়ন ডিগ্রিতে নিয়ে যায়। হাইড্রোজেন নিউক্লিয়াসকে সংযুক্ত করে হিলিয়ামে রূপান্তর করতে এই তাপমাত্রা যথেষ্ট এই তাপমাত্রা ও সংকোচন চাপ এতই বেশি হয় যে তা লসনস ক্রাইটেরিয়ন বা লসনের মানদণ্ড পূরণ করে। হাইড্রোজেন বোমা ও নক্ষত্রের কেন্দ্রেও এই একই মানদণ্ড পূরণ করে। (লসনের মানদণ্ড অনুযায়ী, ফিউশন প্রক্রিয়া শুরু করতে কোনো হাইড্রোজেন বোমায়, নক্ষত্রে বা ফিউশন যন্ত্রে তাপমাত্রা, ঘনত্ব ও সময়ে অবশ্যই একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থাকতে হবে। )

জড়তার বাধা প্রক্রিয়ায় বিপুল শক্তি বেরিয়ে আসে, যার সঙ্গে নিউট্রন ও থাকে। (লিথিয়াম ডিউটেরাইড ১০০ মিলিয়ন ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় ও সিসার চেয়েও ২০ গুণ বেশি ঘনত্বে পৌঁছাতে পারে।) নিউট্রনের এই বিস্ফোরণ পরে ওই মার্বেল থেকে নিঃসৃত হয়। নিউট্রনগুলো চেম্বারের চারদিকের গোলকীয় পদার্থের আস্তরণে আঘাত করে আস্তরণটিকে উত্তপ্ত করে তোলে। উত্তপ্ত আস্তরণ এরপর পানিকে উত্তপ্ত করে বাষ্পীভূত করে। এই বাষ্প ব্যবহার করে টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়।

তবে কোনো ক্ষুদ্র মার্বেলের ওপর এ রকম তীব্র শক্তি সমানভাবে কেন্দ্রীভূত করতে পারাটাই এখানে মূল সমস্যা। লেজার ফিউশন বানানোর প্রথম গুরুতর প্রচেষ্টাটি ছিল শিব লেজার। ক্যালিফোর্নিয়ায় লরেন্স লিভারমোর ন্যাশনাল ল্যাবরেটরিতে (এলএলএনএল) বানানো বিশটি লেজার বিম সিস্টেম শিব লেজার ১৯৭৮ সালে কাজ শুরু করে। (হিন্দুদের দেবতা শিবের অনেকগুলো হাত। এই লেজার সিস্টেম নকশাতেও সেটিই অনুকরণ করা হয়েছিল।) শিব লেজার সিস্টেম কর্মক্ষমতা ছিল বেশ হতাশাজনক। তবে লেজার ফিউশন যে প্রযুক্তিগতভাবে কাজ করে, সেটি প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট ছিল এটা। পরে নোভা লেজারের মাধ্যমে শিব লেজার সিস্টেম প্রতিস্থাপন করা হয়। সেটি শিব লেজারের চেয়ে দশ গুণ শক্তিসম্পন্ন ছিল। তবে নোভা লেজারও মার্বেলগুলোর উপযুক্ত বিস্ফোরণ শক্তি অর্জন করতে ব্যর্থ হয়। তারপরও এখনকার ন্যাশনাল ইগনিশন ফ্যাসিলিটির (এনআইএফ) গবেষণার পথ দেখিয়েছিল এটি। এলএলএনএলে এই এনআইএফের নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৯৯৭।

বিশাল আকৃতির দানবীয় যন্ত্র এনআইএফ চালু করা হয় ২০০৯ সালে। এতে ১৯২টি লেজার বিমের সারি আছে, যা ৭০০ ট্রিলিয়ন ওয়াটের বিপুল শক্তির জোগান দেয়। (উৎপাদিত এই শক্তি প্রায় ৭ লাখ বড় নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্টের উৎপাদিত শক্তিকে একটি একক বিস্ফোরণে কেন্দ্ৰীভূত করার সমান)। হাইড্রোজেনসমৃদ্ধ মার্বেলে পুরোপুরি বিস্ফোরণ অর্জন করতে এই উন্নত প্রযুক্তির লেজার সিস্টেম ডিজাইন করা হয়েছে। (সমালোচকেরা তারপরও বলেন, নিঃসন্দেহে সামরিক ব্যবহারের জন্য এটি বানানো হয়েছে। কারণ, এটি হাইড্রোজেন বোমার বিস্ফোরণ সিমুলেট করতে পারে। আবার এর মাধ্যমে হয়তো নতুন পারমাণবিক অস্ত্র বা বিশুদ্ধ ফিউশন বোমা তৈরি করাও সম্ভব। এর ফিউশন প্রক্রিয়ার শুরু করার জন্য কোনো ইউরেনিয়াম বা প্লুটোনিয়াম বোমার প্রয়োজন নেই।)

তবে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী লেজার মেশিন বা এনআইএফ লেজার ফিউশন মেশিন থাকার পরও এটি স্টার ওয়ার্সে দেখানো মৃত নক্ষত্রের মতো বিপুল বিধ্বংসী শক্তি তৈরি করতে পারেনি। তাই এ রকম যন্ত্র বানাতে হলে আমাদের অবশ্যই অন্য কোনো শক্তির উৎসের দিকে তাকাতে হবে।

ফিউশনে চুম্বকীয় বন্ধন

বিজ্ঞানীরা সম্ভাব্য দ্বিতীয় যে পদ্ধতিটি ব্যবহার করে মারণ নক্ষত্র প্রবলভাবে সক্রিয় করতে পারেন, তার নাম ম্যাগনেটিক কনফাইনমেন্ট বা চুম্বকীয় বন্ধন। এ প্রক্রিয়ায় একটি চুম্বকীয় ক্ষেত্রে হাইড্রোজেন গ্যাসের উত্তপ্ত প্লাজমা ধরা থাকবে। আসলে এ পদ্ধতির মাধ্যমে প্রথম বাণিজ্যিক ফিউশন রিঅ্যাক্টরের প্রোটোটাইপ জোগান আসতে পারে। বর্তমানে এ রকম সবচেয়ে উন্নত ফিউশন প্রজেক্ট হলো ইন্টারন্যাশনাল থার্মোনিউক্লিয়ার এক্সপেরিমেন্ট রিঅ্যাক্টর (আইটিইআর)। ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চলের কাদারেসে ২০০৬ সালে যৌথভাবে আইটিইআর নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় কয়েকটি দেশ। (এর মধ্যে রয়েছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, রাশিয়া ও ভারত)। হাইড্রোজেন গ্যাসকে ১০০ মিলিয়ন ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় তুলতে এটি ডিজাইন করা হয়েছে। এটি ইতিহাসের প্রথম ফিউশন রিঅ্যাক্টর বা চুল্লি হয়ে উঠতে পারে, যা যে পরিমাণ শক্তি ব্যবহার করে তার চেয়ে বেশি উৎপাদন করতে পারবে। ৫০০ সেকেন্ডে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ডিজাইন করা হয়েছে চুল্লিটি (এখন পর্যন্ত রেকর্ড হলো ১ সেকেন্ডে ১৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন)। আইটিইআর আগামী ২০১৬ সালের মধ্যে প্রথমবারের মতো তার প্লাজমা উৎপাদন করবে। আর পুরোপুরি সক্রিয়ভাবে কাজ করবে আগামী ২০২২ সালে। ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় হচ্ছে এই প্রজেক্টে, যা ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল বৈজ্ঞানিক প্রজেক্ট (ম্যানহাটান প্রজেক্ট ও ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশনের পর)। [সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মধ্যে প্রাথমিকভাবে প্লাজমা পরীক্ষা চালানো শুরু হবে। আর ২০৩৫ সালে পুরোপুরি ডিউটেরিয়াম-ট্রিটিয়াম ফিউশন পরীক্ষা চালানো হবে। এ প্রকল্পে এখন ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।—অনুবাদক]

আইটিইআর দেখতে কিছুটা বিশাল আকৃতির ডোনাটের মতো, যার ভেতরে হাইড্রোজেন গ্যাস বৃত্তাকারে ঘুরছে। আবার বিশালাকার এক তারের কয়েল ঘুরছে ওই পৃষ্ঠতলের চারপাশে। কয়েলটি অতিপরিবাহী না হওয়া পর্যন্ত তাকে শীতল করা হয়। এরপর বিপুল পরিমাণ বৈদ্যুতিক শক্তি তার ভেতর পাম্প করে একটি চুম্বকীয় ক্ষেত্র তৈরি করা হয়। এ ক্ষেত্রটি ডোনাটের ভেতরে প্লাজমাকে আটকে রাখবে। এখন ডোনাটটির ভেতরে কোনো বৈদ্যুতিক প্রবাহ দেওয়া হলে নক্ষত্রের মতো তাপমাত্রায় উত্তপ্ত হয়ে উঠবে হাইড্রোজেন গ্যাস।

আইটিইআর নিয়ে বিজ্ঞানীদের উত্তেজনার কারণ এর মাধ্যমে সস্তায় শক্তি উৎপাদন করা যাবে। ফিউশন রিঅ্যাক্টরের জ্বালানি সাধারণ সমুদ্রের পানি কারণ, এটি হাইড্রোজেনসমৃদ্ধ। অন্তত কাগজে-কলমে হলেও হয়তো বিরামহীন, সস্তা শক্তি সরবরাহ করতে পারবে ফিউশন।

তাই প্রশ্ন উঠতে পারে, আমাদের কাছে এখনো ফিউশন রিঅ্যাক্টর নেই কেন? সেই ১৯৫০-এর দশকে ফিউশন পদ্ধতির নীলনকশা করা হলেও এটা বানাতে এত দশক লাগছে কেন? আসলে হাইড্রোজেন জ্বালানি সুষমভাবে সংকুচিত করাটাই এখানে চরম সমস্যা। নক্ষত্রে হাইড্রোজেন গ্যাস নিখুঁত গোলক আকারে সংকুচিত হয়। সে কারণে ওই গ্যাস সমভাবে ও পরিপাটিভাবে উত্তপ্ত হয়।

এনআইএফের লেজার ফিউশন, সমকেন্দ্রিক লেজার রশ্মি যে মার্বেলের পৃষ্ঠতল পুড়িয়ে দেয়, তা অবশ্যই নিখুঁতভাবে সুষম হতে হবে। এই সুষমতা অর্জন করাই এখন মূল সমস্যা। অন্যদিকে ম্যাগনেটিক কনফাইনমেন্ট মেশিনে, চুম্বকীয় ক্ষেত্রগুলোর উত্তর ও দক্ষিণ দুটো মেরু থাকে। ফলে গ্যাসকে সুষম গোলকীয়ভাবে সংকুচিত করা খুব কঠিন। আমরা শুধু ডোনাট আকৃতির একটি চুম্বকীয় ক্ষেত্র তৈরি করতে পারি। কিন্তু এখানে হাইড্রোজেন গ্যাস সংকুচিত করা অনেকটা বেলুন চুপসানোর মতো। প্রতিবার বেলুনের এক প্রান্তে চুপসানো হলে, বেলুনের অন্য কোথাও বাতাস ফুলে ওঠে। তাই একসঙ্গে বেলুনের সব দিকে সুষমভাবে সংকুচিত করা সত্যিই বিরাট এক চ্যালেঞ্জ। উত্তপ্ত গ্যাস সাধারণত এই চুম্বকীয় বোতল থেকে বেরিয়ে আসে, এতে তা চুল্লির দেয়াল স্পর্শ করে ও ফিউশনপ্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। এ কারণেই হাইড্রোজেন গ্যাসকে ১ সেকেন্ডের বেশি সংকুচিত করা খুবই কঠিন।

বর্তমান প্রজন্মের ফিশন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো কোনো ফিউশন পারমাণবিক চুল্লি বড় ধরনের পারমাণবিক বর্জ্য তৈরি করবে না। (প্রচলিত প্রতিটি ফিশন প্ল্যান্ট বছরে ৩০ টনের মতো উচ্চমাত্রার পারমাণবিক বর্জ্য তৈরি করে। কিন্তু ফিউশন মেশিন থেকে যে পারমাণবিক বর্জ্য তৈরি হয়, তা প্রধানত তেজস্ক্রিয় ইস্পাত। চুল্লিটি শেষ পর্যন্ত বন্ধ করে দেওয়া হলেই কেবল তা পাওয়া যায়।)

অবশ্য নিকট ভবিষ্যতে ফিউশন পদ্ধতি পৃথিবীর শক্তিসংকট শিগগিরই সমাধান করতে পারবে না। পদার্থবিজ্ঞানে নোবেলজয়ী ফরাসি বিজ্ঞানী পিয়েরে-গিলস ডি গেনস বলেন, ‘আমরা বলতে পারি, সূর্যকে একটি বাক্সের মধ্যে বন্দী করব। আইডিয়াটা চমৎকার তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু সমস্যা হলো, এই বাক্সটা কীভাবে বানাতে হবে, তা আমরা এখনো জানি না।’ তবে গবেষকদের ধারণা, সবকিছু ঠিকমতো চলতে থাকলে আগামী ৪০ বছরের মধ্যে আইটিইআর হয়তো বাণিজ্যিকভাবে ফিউশন শক্তি উৎপাদনের দিকে যেতে পারবে। এই শক্তি আমাদের বাসাবাড়িতেও বিদ্যুতের জোগান দেবে। একদিন ফিউশন চুল্লিগুলো আমাদের শক্তি সমস্যা কমিয়ে দেবে ও পৃথিবীতেই নিরাপদে সূর্যের শক্তি নিঃসরণ করতে পারবে।

তবে কথা হলো, ম্যাগনেটিক কনফাইনমেন্ট ফিউশন রিঅ্যাক্টরও ডেথ স্টার যুদ্ধাস্ত্রের জন্য দরকারি শক্তি জোগান দেওয়ার মতো যথেষ্ট নয়। সে জন্য আমাদের পুরোপুরি নতুন অন্য কোনো নকশার প্রয়োজন।

নিউক্লিয়ার চালিত এক্স-রে লেজার

ডেথ স্টার লেজার কামান সিমুলেট করতে বর্তমানের প্রযুক্তিতে আরও কিছু সম্ভাবনা রয়েছে। সেটি হতে পারে হাইড্রোজেন বোমা দিয়ে। তাত্ত্বিকভাবে এক্স-রে লেজারের একটি সারি নিউক্লিয়ার শক্তি ব্যবহার করে আর তা কেন্দ্রীভূত করে যথেষ্ট শক্তি তৈরি করতে পারে। এই শক্তি দিয়ে আস্ত একটি গ্রহ ভস্মীভূত করার মতো যন্ত্র বানানো সম্ভব।

রাসায়নিক বিক্রিয়ার তুলনায় পারমাণবিক শক্তি প্রায় ১০০ মিলিয়ন গুণ বেশি শক্তি নিঃসরণ করতে পারে। একটি বেসবলের চেয়ে ছোট সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের এক টুকরো পুরো একটি শহর অগ্নিগোলার মতো পুড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। এখানে এই ইউরেনিয়ামের মাত্র ১ শতাংশ ভর শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। আগেই আলোচনা করেছি, লেজার রশ্মিতে শক্তি ভরার অনেকগুলো উপায় আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালীটি হলো একটি নিউক্লিয়ার বোমা ব্যবহার করা।

বৈজ্ঞানিক গুরুত্বের পাশাপাশি এক্স-রে লেজারের সামরিক গুরুত্বও কম নয়। খুবই ক্ষুদ্র তরঙ্গদৈর্ঘ্যের কারণে এদের পারমাণবিক দূরত্বে অনুসন্ধান চালাতে ও জটিল অণুগুলোর পারমাণবিক গঠন বোঝার জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। কারণ, এসব ক্ষেত্রে সাধারণ পদ্ধতিগুলো ব্যবহার করা বেশ কঠিন। কোনো অণুর ভেতরের পরমাণুগুলোতে তাদের গতি ও সঠিক সজ্জা দেখা গেলে আমাদের সামনে রাসায়নিক বিক্রিয়ার সম্পূর্ণ নতুন একটি জগৎ খুলে যাবে।

হাইড্রোজেন বোমা এক্স-রে পরিসরে বিপুল পরিমাণ শক্তি নিঃসরণ করার কারণে, এক্স-রে লেজার দিয়েও নিউক্লিয়ার যুদ্ধাস্ত্রগুলোকে শক্তি সরবরাহ করা যেতে পারে।

এক্স-রে লেজারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যে মানুষটি জড়িত ছিলেন, তিনি হাইড্রোজেন বোমার জনক পদার্থবিদ এডওয়ার্ড টেলার

টেলার সেই পদার্থবিদ, যিনি ১৯৫০-এর দশকে ম্যানহাটান প্রজেক্টের প্রধান রবার্ট ওপেনহাইমারের বিরুদ্ধে কংগ্রেসের সামনে সাক্ষ্য দেন। ওপেনহাইমারের রাজনৈতিক বিশ্বাসের কারণে তাঁকে হাইড্রোজেন বোমা নিয়ে কাজ করতে বিশ্বাস করা উচিত নয় বলে সেবার সাক্ষ্য দেন টেলার। তাঁর সাক্ষ্যের কারণেই অসম্মানিত হতে হয় ওপেনহাইমারকে। তাঁর সিকিউরিটি ক্লিয়ায়েন্সও বাতিল করা হয়েছিল। এই কর্মকাণ্ডের জন্য অনেক বিখ্যাত পদার্থবিদ হয়তো কখনোই ক্ষমা করবেন না টেলারকে।

(টেলারের সঙ্গে আমার যোগাযোগ শুরু হয় হাইস্কুলে পড়ার সময়। অ্যান্টিম্যাটার বা প্রতিবস্তু নিয়ে আমি বেশ কিছু পরীক্ষা চালাই। এভাবে সান ফ্রান্সিসকো বিজ্ঞান মেলায় বড় ধরনের এক পুরস্কারও জিতি সেবার। পরে নিউ মেক্সিকোর আলবুকার্কে ন্যাশনাল সায়েন্স ফেয়ারে যেতে পারি। টেলারের সঙ্গে আমার দেখা হয় সেখানকার স্থানীয় এক টিভিতে। তখন তরুণ মেধাবী পদার্থবিদদের ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন তিনি। ক্রমান্বয়ে আমাকে হার্টজ ইঞ্জিনিয়ারিং স্কলারশিপ দেন টেলার। এটি হার্ভার্ডে আমার কলেজে পড়ালেখার খরচ জুগিয়েছিল। তাঁর পরিবার সম্পর্কেও বেশ জানতাম। কারণ, প্রতিবছর বেশ কয়েকবার বার্কলিতে টেলারের বাড়িতে আমি গিয়েছি।)

মূলত টেলারের এক্স-রে লেজার হলো ছোট্ট একটি নিউক্লিয়ার বোমা, যার চারপাশে তামার দণ্ড দিয়ে ঘেরা থাকে। এই নিউক্লিয়ার বোমা বিস্ফোরিত হলে তীব্র এক্স-রের গোলকীয় শক ওয়েভ বেরিয়ে আসে। এই শক্তিশালী রশ্মিগুলো তখন তামার দণ্ডগুলোর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়, যা লেজিং ম্যাটেরিয়াল হিসেবে কাজ করে এক্স-রের শক্তিকে কেন্দ্রীভূত করে পরিণত হয় তীব্র রশ্মিতে। এক্স-রের এই তীব্র রশ্মিগুলো এবার শত্রুপক্ষের দিকে ছুড়ে মারা হয়। এ ধরনের কোনো যন্ত্র অবশ্যই শুধু একবারই ব্যবহার করা যায়। কারণ, নিউক্লিয়ার বিস্ফোরণের কারণে এক্স-রে লেজারটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ধ্বংস করে ফেলে।

নিউক্লিয়ার-চালিত এক্স-রে লেজারের প্রাথমিক পরীক্ষাকে বলা হতো ক্যাবরা টেস্ট। ১৯৮৩ সালে ভূগর্ভস্থ খাদের মধ্যে চালানো হয় পরীক্ষাটি। এতে একটি হাইড্রোজেন বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছিল। এরপর এর এলোমেলো এক্স-রের প্লাবন কেন্দ্রীভূত করে একটি সংসক্ত এক্স-রে লেজার বিম তৈরি করা হয়। শুরুতে পরীক্ষাটি সফলতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। কিন্তু ১৯৮৩ সালে এটি প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানকে একটি ঘোষণা দিতে উদ্বুদ্ধ করতে সহায়তা করেছিল, মানে সেটাকে ঐতিহাসিক বক্তৃতাই বলা যায়। ওই ঘোষণায় তিনি স্টার ওয়ার্সের মতো প্রতিরক্ষা ঢাল তৈরির ইচ্ছা পোষণ করেন। ফলে শত্রুপক্ষের আইসিবিএম ভূপাতিত করতে নিউক্লিয়ার-চালিত এক্স-রে লেজারের মতো কোনো যন্ত্রের সজ্জা তৈরিতে কয়েক মিলিয়ন ডলার ঢালা হয়। (পরে তদন্তে দেখা গেছে, ক্যাবরা টেস্টের সময় পরিমাপের জন্য ব্যবহৃত ডিটেক্টর ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। কারণ, এর রিডিং বিশ্বাসযোগ্য ছিল না।)

এ রকম বিতর্কিত যন্ত্র ব্যবহার করে কি বর্তমানে আইসিবিএম যুদ্ধাস্ত্র ভূপাতিত করা সম্ভব? হয়তো সম্ভব। কিন্তু এ ধরনের যুদ্ধাস্ত্র নির্মূল করতে শত্রুপক্ষও বিভিন্ন ধরনের সহজ ও সস্তা পদ্ধতি ব্যবহার করে বসতে পারে (যেমন রাডারকে ধোঁকা দিতে শত্রুপক্ষ মিলিয়ন মিলিয়ন সস্তা ফাঁদ ছেড়ে দিতে পারে, কিংবা এক্স-রেগুলোকে বিক্ষিপ্ত করতে তাদের যুদ্ধাস্ত্র ঘোরাতে পারে, কিংবা রাসায়নিক আবরণ নিঃসরণ করতে পারা এক্স-রে বিমের বিরুদ্ধে টিকে থাকতে পারে)। আবার স্টার ওয়ার্সের প্রতিরক্ষা ঢালের মধ্যে ঢোকার জন্য শত্রুপক্ষের কাছে হয়তো অন্য কোনো যুদ্ধাস্ত্রও থাকতে পারে।

কাজেই নিউক্লিয়ার-চালিত এক্স-রে লেজার এখন মিসাইল বা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মতোই অকার্যকর। কিন্তু ধেয়ে আসা কোনো গ্রহাণুর বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য কিংবা আস্ত একটি গ্রহকে ধ্বংস করার জন্য ডেথ স্টার বানানোর ক্ষেত্রে এটি কি সম্ভব?

মারণ নক্ষত্রের পদার্থবিজ্ঞান

স্টার ওয়ার্স মুভির মতো আস্ত কোনো গ্রহ ধ্বংস করার উপযোগী কোনো যুদ্ধাস্ত্র কি বানানো সম্ভব? তাত্ত্বিকভাবে এর উত্তর হলো, হ্যাঁ, সম্ভব। বিভিন্ন উপায়ে এটি তৈরি করা যেতে পারে। প্রথমত, হাইড্রোজেন বোমা থেকে কী পরিমাণ শক্তি বেরিয়ে আসবে, তার কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। (হাইড্রোজেন বোমার সঠিক রূপরেখা এখনো টপ সিক্রেট ও ক্লাসিফায়েড ডকুমেন্ট হিসেবে গোপন রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র সরকার। কিন্তু মোটাদাগে এর রূপরেখা বেশ ভালোভাবেই জানা যায়।) হাইড্রোজেন বোমা আসলে বিভিন্ন পর্যায়ে বানানো হয়। এই পর্যায়গুলোকে সঠিক অনুক্রমে সাজিয়ে প্রায় ইচ্ছেমতো মাত্রার একটি নিউক্লিয়ার বোমা বানানো সম্ভব।

এর প্রথম পর্যায়টি হলো একটি আদর্শ ফিশন বোমার। এখানে ইউরেনিয়াম-২৩৫-এর শক্তি ব্যবহার করা হয়, যাতে সেখান থেকে এক্স-রের তীব্র ঝলক বেরিয়ে আসে। হিরোশিমা শহরে ফেলা বোমাটিতে যেমনটি ঘটানো হয়েছিল। এই পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণে সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাওয়ার সেকেন্ডের ভগ্নাংশ সময় আগে এই এক্স-রে প্রসারমাণ গোলক প্ৰবল বেগে বিস্ফোরণ থেকে বেরিয়ে আসে (কারণ এটি আলোর গতিতে চলাচল করে)। এরপর এক্স-রে এই ঝলককে লিথিয়াম ডিউটেরাইডের এক কন্টেইনারে কেন্দ্রীভূত করা হয়। লিথিয়াম ডিউটেরাইডই হলো হাইড্রোজেন বোমার সক্রিয় উপাদান। (এটি কীভাবে ঘটে, তা এখনো গোপনীয়)। লিথিয়াম ডিউটেরাইডে এক্স-রে আঘাত হানার কারণে এটি চুপসে যায় এবং উত্তপ্ত হয়ে মিলিয়ন ডিগ্রি তাপমাত্রায় পৌছায়। এতে দ্বিতীয় আরেকটি বিস্ফোরণ সংঘটিত হয়, যা প্রথমটির তুলনায় অনেক বড়। হাইড্রোজেন বোমা থেকে এক্স-রের বিস্ফোরণ এরপর দ্বিতীয় আরেক খণ্ড লিথিয়াম ডিউটেরাইডে কেন্দ্রীভূত করে তৃতীয় বিস্ফোরণটি ঘটানো যায়। এভাবে একের পর এক লিথিয়াম ডিউটেরাইডের স্তূপ বানিয়ে অকল্পনীয় মাত্রার হাইড্রোজেন বোমা তৈরি করা যায়। সত্যি বলতে, এ পর্যন্ত বানানো সবচেয়ে বড় হাইড্রোজেন বোমাটির ছিল দুই স্তরের বোমা। ১৯৬১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন সেই বোমাটি বিস্ফোরণ ঘটায়। এটি ৫০ মিলিয়ন টন টিএনটির সমমানের বোমা ছিল। অবশ্য তাত্ত্বিকভাবে এটি ১০০ মিলিয়ন টন টিএনটির সমমানের বিস্ফোরণ ক্ষমতাসম্পন্ন ছিল (কিংবা বলা যায়, হিরোশিমায় ফেলা বোমাটির চেয়ে এটি পাঁচ হাজার গুণ বেশি শক্তিশালী।)

অবশ্য পুরো একটি গ্রহ ভস্মীভূত করা পুরোপুরি ভিন্ন ব্যাপার। সে জন্য কোনো ডেথ স্টার বা মারণ নক্ষত্রকে মহাকাশে এ ধরনের কয়েক হাজার গুণ বেশি এক্স-রে লেজার ছুড়তে হবে। আবার এগুলোর সবটাই লক্ষ্যবস্তুতে একই সময়ে একসঙ্গে ছুড়তে হবে। (তুলনা হিসেবে মনে রাখতে হবে, ঠান্ডা যুদ্ধের চরম সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রত্যেকে প্রায় ৩০ হাজার পারমাণবিক বোমার স্তূপ গড়ে তোলে।) বিপুলসংখ্যক এক্স-রে লেজারের সম্মিলিত শক্তি পৃথিবীর উপরিতল ভস্মীভূত করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। কাজেই ভবিষ্যতের কয়েক শত হাজার বছর বয়সী কোনো গ্যালাকটিক সাম্রাজ্যের পক্ষে এ ধরনের যুদ্ধাস্ত্র বানানো হয়তো মামুলি ব্যাপার।

খুব উন্নত সভ্যতার জন্য এখানে দ্বিতীয় আরেকটি বিকল্প রয়েছে। সেটি হলো গামা রশ্মির বিস্ফোরকের শক্তি ব্যবহার করে একটি মারণ নক্ষত্র বানিয়ে নেওয়া। এ ধরনের মারণ নক্ষত্র যে পরিমাণ বিকিরণের বিস্ফোরণ ঘটাবে, তা শুধু দ্বিতীয় কোনো বিগ ব্যাংয়ের মাধ্যমে বেরিয়ে আসা সম্ভব। গামা রশ্মির বিস্ফোরক বাইরের মহাকাশে প্রাকৃতিকভাবে সংঘটিত হয়। তাই ধরে নেওয়া যায়, উন্নত কোনো সভ্যতা এই বিপুল পরিমাণ শক্তিতে লাগাম পরাতে পারবে। তবে কোনো নক্ষত্র চুপসে যাওয়ার আগে ও কোনো হাইপারনোভা পরিণত হওয়ার আগে নক্ষত্রটির ঘূর্ণন নিয়ন্ত্রণ করেও মহাকাশের যেকোনো বিন্দুতে গামা রশ্মির বিস্ফোরকটিকে লক্ষ্যভেদ করা সম্ভব হতে পারে।

গামা রশ্মির বিস্ফোরক

গামা রশ্মির বিস্ফোরক আসলে প্রথম দেখা যায় ১৯৭০-এর দশকে। পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণ শনাক্ত করতে সেবার মার্কিন সেনাবাহিনী ভেলা স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করে (অর্থাৎ অবৈধ পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের প্রমাণ)। তবে পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের কোনো চিহ্ন শনাক্ত করতে না পারলেও ভেলা স্যাটেলাইট মহাকাশে বিপুল পরিমাণ বিকিরণের বিস্ফোরণ শনাক্ত করেছিল। শুরুতে এই আবিষ্কারে পেন্টাগনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সোভিয়েত ইউনিয়ন কি তাহলে মহাকাশে পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছে? পরে নিশ্চিত হওয়া গেল, বিকিরণের এ বিস্ফোরণ সুষমভাবে মহাকাশের সব দিক থেকেই আসছে। তার মানে, মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির বাইরে থেকে এসব বিকিরণ আসছে। কিন্তু এগুলো যদি এক্সট্রাগ্যালাটিক বা মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির বাইরের ঘটনা হয়ে থাকে, তাহলে সত্যি সত্যিই বিপুল শক্তি নিঃসরণ করছে, যা পুরো মহাবিশ্ব আলোকিত করার জন্য যথেষ্ট।

১৯৯০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলে জ্যোতির্বিদ্যাসংক্রান্ত বিপুল পরিমাণ তথ্য-উপাত্ত হঠাৎ করে প্রকাশ করে দেয় পেন্টাগন। সেসব দেখে চোখ কপালে ওঠে জ্যোতির্বিদদের। হঠাৎ জ্যোতির্বিদেরা বুঝতে পারলেন, একটা নতুন, রহস্যময় ঘটনার মুখোমুখি হয়েছেন তাঁরা। এর মধ্যে একটি বিষয় তাঁরা বুঝতে পারলেন, বিজ্ঞানের পাঠ্যবইগুলো নতুন করে লিখতে হবে।

গামা রশ্মি বিস্ফোরণ অদৃশ্য হওয়ার আগে মাত্র কয়েক সেকেন্ড থেকে কয়েক মিনিট স্থায়ী থাকে। তাই তাদের শনাক্ত ও বিশ্লেষণ করতে বিস্তৃত ধরনের সেন্সর প্রয়োজন। প্রথমত, স্যাটেলাইট প্রাথমিক বিকিরণের বিস্ফোরণ শনাক্ত করে। এরপর তা বিস্ফোরণের সঠিক অবস্থান বা স্থানাঙ্ক পৃথিবীতে পাঠায়। এ অবস্থান বা স্থানাঙ্ক এরপর অপটিক্যাল বা রেডিও টেলিস্কোপে রিলে করা হয়, যা গামা রশ্মির বিস্ফোরণের সঠিক অবস্থানে শূন্য হয়।

অবশ্য এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য এখনো নিঃসন্দেহে গোপন রাখা হয়েছে। তবু গামা রশ্মির বিস্ফোরণের উৎপত্তি সম্পর্কে একটি তত্ত্ব হলো, তারা বিপুল শক্তিসম্পন্ন হাইপারনোভা। তারা বিশাল কোনো কৃষ্ণগহ্বর থেকে বেরিয়ে আসে। ধারণা করা হয়, কোনো দানবীয় কৃষ্ণগহ্বরের গঠনের সময় গামা রশ্মির বিস্ফোরণ হয়।

কৃষ্ণগহ্বর বিকিরণের দুটি জেট বা ফোয়ারা নিঃসরণ করে, যার একটি উত্তর মেরু ও আরেকটি দক্ষিণ মেরু থেকে। ঠিক ঘূর্ণমান লাটিমের মতো। দূরের কোনো গামা রশ্মি বিস্ফোরক থেকে দেখা বিকিরণ এ ফোয়ারা দুটির একটি, যা পৃথিবীর সমান্তরাল। গামা রশ্মির বিস্ফোরণের এই ফোয়ারা পৃথিবীর দিকে তাক করা থাকলে আর ওই গামা রশ্মি বিস্ফোরক আমাদের মহাজাগতিক প্রতিবেশী হলে (পৃথিবী থেকে কয়েক শ আলোকবর্ষ দূরে) তার শক্তি খুবই বেশি হতো। তাতে আমাদের গ্রহের সব জীব নিমেষে ধ্বংস হয়ে যেত।

প্রাথমিকভাবে গামা রশ্মি বিস্ফোরকের এক্স-রে স্পন্দন একটি বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় স্পন্দন তৈরি করবে, যা সব ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি নিশ্চিহ্ন করে দেবে। এর এক্স-রে এবং গামা রশ্মির তীব্রতা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ক্ষতিগ্রস্ত করার এবং আমাদের রক্ষাকারী ওজোন স্তর ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। এরপর গামা রশ্মি বিস্ফোরকের ফোয়ারা ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেবে। ক্রমান্বয়ে তা দানবীয় আগুনঝড়ে রূপ নেবে, যা পুরো গ্রহকে গ্রাস করবে। গামা রশ্মির বিস্ফোরক হয়তো স্টার ওয়ার্সের মতো পুরো গ্রহকে বিস্ফোরিত করবে না। তবে এর কারণে পৃথিবীর সব জীব নিশ্চিত ধ্বংস হয়ে যাবে। পরিণতিতে পড়ে থাকবে শুধু দগ্ধ, নিষ্ফলা একটি গ্রহ।

বোঝা যাচ্ছে, এমন এক কৃষ্ণগহ্বরকে লক্ষ্যবস্তুর দিকে হয়তো ঘুরিয়ে দেওয়া আমাদের চেয়ে কয়েক লাখ বছর এগিয়ে থাকা সভ্যতার পক্ষে সহজও হতে পারে। মৃত নক্ষত্র চুপসে যাওয়ার আগে তার দিকে গ্রহগুলোর ও নিউট্রন স্টারের গতিপথ সঠিক কোণে বদলে দিয়েও এটি করা সম্ভব। গতিপথের এই বিচ্যুতি নক্ষত্রটির ঘূর্ণন অক্ষ পাল্টে দেওয়ার জন্য হয়তো যথেষ্ট, যাতে একে নির্দিষ্ট দিকে লক্ষ্যস্থির করা যাবে। কাজেই একটি মৃত নক্ষত্র বড় ধরনের ও অকল্পনীয় রে-গান তৈরি করতে পারবে।

সংক্ষেপে বলা যায়, শক্তিশালী লেজার ব্যবহার করে বহনযোগ্য বা হাতের মুঠোয় রাখার মতো রে-গান ও আলোর তলোয়ার বানানোকে শ্রেণিবদ্ধ করা যেতে পারে প্রথম শ্রেণির অসম্ভাব্যতা হিসেবে। তার মানে, এই শ্রেণির অসম্ভাব্যতাকে অদূর ভবিষ্যতে বা হয়তো কয়েক শতাব্দীর মধ্যে সম্ভব করে তোলা যাবে। তবে ঘূর্ণমান কোনো নক্ষত্র একটি কৃষ্ণগহ্বরে বিস্ফোরিত হওয়ার আগেই তার দিকে লক্ষ্যস্থির করা আর তাকে একটি মৃত নক্ষত্রে পরিণত করাটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সে কারণে একে দ্বিতীয় শ্রেণির অসম্ভাব্যতা হিসেবে বিবেচনা করা যায়। তার মানে, এটি এমন এক ধরনের অসম্ভাব্যতা, যা নিঃসন্দেহে পদার্থবিজ্ঞানের কোনো সূত্র লঙ্ঘন না করলেও হয়তো ভবিষ্যতে কয়েক হাজার থেকে কয়েক মিলিয়ন বছর পর করা সম্ভব হবে।

তথ্যনির্দেশ

নিউক্লিয়াস : পরমাণুর কেন্দ্রীয় অংশ। এখানে শুধু প্রোটন ও নিউট্রন থাকে, যারা শক্তিশালী বল বা সবল নিউক্লীয় বল দ্বারা একত্র থাকে।

এক্সজিমার : এক্সসাইটেড ডিমার।

ইলেকট্রন : ঋণাত্মক চার্জযুক্ত একটি কণা, যা একটি পরমাণুর কেন্দ্র বা নিউক্লিয়াসের চারপাশে ঘোরে।

নিউক্লিয়ার ফিশন : যে প্রক্রিয়ায় দুটি নিউক্লিয়াসের সংঘর্ষে তারা একত্র হয়ে একটি একক, ভারী নিউক্লিয়াস গঠন করে।

নিউক্লিয়ার ফিউশন : যে প্রক্রিয়ায় একটি নিউক্লিয়াস ভেঙে বা বিভাজিত হয়ে দুটি বা তার চেয়ে বেশি ছোট নিউক্লিতে পরিণত হয়। এর পরিণতিতে বিপুল শক্তি বেরিয়ে আসে।

নিউট্রন : প্রায় প্রোটনের মতো একটি কণা। তবে এর কোনো চার্জ নেই। বেশির ভাগ পরমাণুর কেন্দ্রে প্রায় অর্ধেক এই কণা থাকে। তিনটি কোয়ার্ক কণা (দুটি ডাউন আর একটি আপ কোয়ার্ক) দিয়ে একটি নিউট্রন গঠিত।

৪. টেলিপোর্টেশন

খুবই দারুণ ব্যাপার হলো, আমরা প্যারাডক্সের মুখোমুখি হয়েছি। এখন আমাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে কিছুটা আশা করতে পারি।

—নীলস বোর

আমি পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলো পরিবর্তন করতে পারব না, ক্যাপ্টেন! —স্কটি, চিফ ইঞ্জিনিয়ার, স্টার ট্রেক

মানুষ বা বস্তুকে শিগগিরই এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় স্থানান্তর করার ক্ষমতাসম্পন্ন প্রযুক্তিই টেলিপোর্টেশন। এ প্রযুক্তি সভ্যতার গতিপথ বদলে দিতে পারে আর সেই সঙ্গে পাল্টে দিতে পারে বিভিন্ন জাতির ভবিষ্যৎ। একই সঙ্গে যুদ্ধের নিয়মকানুনও অপ্রতিরোধ্যভাবে বদলে দিতে পারে টেলিপোর্টেশন। যেমন বিভিন্ন দেশের সেনাবাহিনী তাদের সেনাদলকে শত্রুপক্ষের পেছনে টেলিপোর্ট করে পাঠিয়ে দিতে পারবে, কিংবা শত্রুপক্ষের নেতাদের টেলিপোর্ট করে তাদের পাকড়াও করতে পারবে। বর্তমানে প্রচলিত যোগাযোগব্যবস্থা, তথা গাড়ি থেকে শুরু করে জাহাজ, বিমান বা রেলপথ ও এই ব্যবস্থায় সেবাদানকারী অন্যান্য সব ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্রেফ অচল হয়ে যাবে। এর কারণও বেশ সহজ। কারণ, তখন আমরা খুব সহজে নিজেদের কর্মক্ষেত্রে আর আমাদের মালামাল বাজারে টেলিপোর্ট করতে পারব। সেটি করা গেলে অবসরযাপন হয়ে উঠবে কষ্টহীন। কারণ, নিজেদের টেলিপোর্টে করে বিভিন্ন গন্তব্যে চোখের পলকে পৌঁছে যেতে পারব আমরা। কাজেই এককথায় বলা যায়, টেলিপোর্টেশন সবকিছুই বদলে দেবে।

টেলিপোর্টেশন সম্পর্কে প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ধর্মীয় গ্রন্থগুলোতে। যেমন বাইবেল। সেখানে আত্মারা কোনো ব্যক্তিকে নিমেষে অনেক দূরে নিয়ে যায়। নিউ টেস্টামেন্টের একটি বাক্য দেখে মনে হয় ফিলিপকে গাজা থেকে আজোটাসে টেলিপোর্ট করা হয়েছিল। বাক্যটি হলো : “তারা যখন পানির ভেতর থেকে বাইরে বেরিয়ে এল, তখন আত্মাদের প্রভু হঠাৎ ফিলিপকে অনেক দূরে নিয়ে গেলেন। খোজা লোকটি তাকে আর দেখতে পেল না। কিন্তু যথারীতি আনন্দোৎসব চালিয়ে যেতে লাগল সে। তবে ফিলিপ আজোটাসে হাজির হলো আর ভ্রমণ করতে করতে কাসারিয়ার পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত সব শহরে যিশুর বাণী প্রচার করতে লাগল…’ (অ্যাক্ট ৮ : ৩৬-৪০)।

এদিকে সব ম্যাজিশিয়ানের কৌশল ও ইলিউশনের এক অংশও আসলে টেলিপোর্টেশন। যেমন মাথার টুপি থেকে খরগোশ আর হাতের আস্তিন থেকে তাস বের করে আনে ম্যাজিশিয়ানরা। আবার দর্শকদের কানের ভেতর থেকে কয়েন বের করে আনে তারা। এগুলোর মধ্যে বর্তমানে অন্যতম উচ্চাভিলাষী কৌশলটি হলো, দর্শকদের চোখ ছানাবড়া করে তাদের সামনে থেকে আস্ত একটা হাতি স্রেফ গায়েব করে দেওয়া। এ প্রদর্শনীর শুরুতে কয়েক টন ওজনের বিপুল আকৃতির একটি হাতিকে একটা খাঁচার মধ্যে রাখা হয়। এরপর ম্যাজিশিয়ানের হাতের জাদুদণ্ডের টুসকিতে হাতিটি এক লহমায় গায়েব হয়ে যায়। এতে বিস্ময়ে চোখ কপালে ওঠে দর্শকদের। (নিঃসন্দেহে হাতি গায়েব হয়ে যায় না। আসলে আয়নার মাধ্যমে কৌশলটি খাটানো হয়। লম্বা, পাতলা, খাড়া আয়নার ফালি ফালি গুচ্ছ ওই খাঁচার প্রতিটি বারের পেছনে লাগানো থাকে। একটি গেটের মতো প্রতিটি খাড়া এই আয়নার ফালি দিয়ে সুইভেল বানানো সম্ভব। ম্যাজিকের কৌশলের শুরুতে খাড়া আয়নার সবগুলো ফালি বারের পেছনে সারিবদ্ধ করা হয়। তাতে আয়নাগুলো সামনে দেখা যায় না, কিন্তু হাতিটি দেখা যায়। কিন্তু আয়নাগুলো দর্শকদের দিকে ৪৫ ডিগ্রি ঘোরালে হাতিটি চোখের সামনে থেকে অদৃশ্য হয়ে যায়। সেই সঙ্গে তখন খাঁচার এক পাশের প্রতিফলিত ছবি দেখতে শুরু করে দর্শকেরা। )

টেলিপোর্টেশন ও বিজ্ঞান কল্পকাহিনি

বিজ্ঞান কল্পকাহিনিতে প্রথম টেলিপোর্টেশনের কথা উল্লেখ করা হয় এডওয়ার্ড পেজ মিশেলের এক গল্পে, যার শিরোনাম ‘দ্য ম্যান উইদাউট আ বডি’। গল্পটি প্রকাশিত হয় ১৮৭৭ সালে। এতে এক বিড়ালের দেহের সব পরমাণু আলাদা করতে সক্ষম হন এক বিজ্ঞানী। পরমাণুগুলো এরপর টেলিগ্রাফের তার দিয়ে অন্য জায়গায় পাঠিয়ে দেন তিনি। বিজ্ঞানী যখন স্বয়ং নিজেকে এভাবে টেলিপোর্ট করার চেষ্টা করছিলেন, তখন দুর্ভাগ্যক্রমে ব্যাটারি ফুরিয়ে যায়। তাতে তার মাথাটাই কেবল টেলিপোর্ট করা সম্ভব হয়েছিল।

শার্লক হোমসের গল্প-উপন্যাসের জন্য বিখ্যাত স্যার আর্থার কোনান ডয়েলও বেশ আগ্রহী ছিলেন টেলিপোর্টেশন নিয়ে। অনেক বছর গোয়েন্দা উপন্যাস ও ছোটগল্প লেখার পর তিনি শার্লক হোমস সিরিজ নিয়ে রীতিমতো বিরক্ত হয়ে ওঠেন। সে কারণে নিজের সৃষ্ট গোয়েন্দাকে মেরে ফেলেন তিনি এক জলপ্রপাতের ওপর থেকে প্রফেসর মারিয়ার্টির সঙ্গে হোমসকে নিচে ফেলে দেন ডয়েল। কিন্তু জনসাধারণের তীব্র প্রতিবাদের মুখে ওই গোয়েন্দা চরিত্রকে তিনি আবারও বাঁচিয়ে ফিরিয়ে আনতে বাধ্য হন। এভাবে শার্লক হোমসকে হত্যা করতে ব্যর্থ হন তিনি। সে জন্য প্রফেসর চ্যালেঞ্জার নামে নতুন এক সিরিজ লেখার সিদ্ধান্ত নেন ডয়েল। আসলে এটি শার্লক হোমসের প্রতিদ্বন্দ্বী চরিত্র। দুটি চরিত্রই তাৎক্ষণিক বুদ্ধির ঝিলিক ও রহস্য সমাধানে তীক্ষ্ণ চোখের অধিকারী ছিল। তবে জটিল কোনো কেস সমাধানে মি. হোমস যেখানে ঠান্ডা ডিডাকটিভ লজিক বা অবরোহী যুক্তি ব্যবহার করে, সেখানে প্রফেসর চ্যালেঞ্জার আধ্যাত্মিকতা ও প্যারানরমাল ঘটনার অন্ধকার জগতে অভিযান চালান। এ জগতের মধ্যে টেলিপোর্টেশনও রয়েছে। ১৯২৭ সালে প্রকাশিত দ্য ডিসইন্ট্রিগ্রেশন মেশিন উপন্যাসে প্রফেসর চ্যালেঞ্জার এক ভদ্রলোকের পাল্লায় পড়েন। ওই ভদ্রলোক এমন এক যন্ত্র বানান, যা দিয়ে টুকরো টুকরো করে ফেলা যেত মানুষকে। টুকরোগুলো অন্য কোথায় পাঠিয়ে আবার জোড়া লাগানো যেত। কিন্তু ওই উদ্ভাবক একবার বেশ বড়াই করে বলে বসেন, যন্ত্রটি কোনো মন্দ লোকের হাতে পড়লে, সে মাত্র একটা বোতাম টিপেই গোটা এক শহরের লাখ লাখ মানুষ টুকরো টুকরো করে ফেলতে পারবে। তা শুনে প্রফেসর চ্যালেঞ্জার আতঙ্কিত হন। এরপর ওই উদ্ভাবক ভদ্রলোককে টুকরো টুকরো করতে তারই তৈরি করা যন্ত্রটি কাজে লাগান প্রফেসর চ্যালেঞ্জার। এরপর তাকে আর জোড়া না লাগিয়ে তার ল্যাবরেটারিতে ফেলে রাখেন তিনি

হলিউডে টেলিপোর্টেশন আবিষ্কারের ঘটনা খুব বেশি দিন আগের নয়। টেলিপোর্টেশন ভেস্তে গেলে কী ভয়ংকর ঘটনা ঘটতে পারে, তা দেখানো হয়েছে ১৯৫৮ সালে নির্মিত দ্য ফ্লাই চলচ্চিত্রে। এক বিজ্ঞানী সফলভাবে নিজেকে এক ঘরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে টেলিপোর্ট করতে সক্ষম হন। দুর্ঘটনাক্রমে টেলিপোর্টেশন চেম্বারে ঢুকে পড়া এক মাছির সঙ্গে বিজ্ঞানীর দেহের পরমাণু মিশে যায়। তাতে ওই বিজ্ঞানী অর্ধেক মানুষ ও অর্ধেক মাছির মিশ্রণে পরিণত হন কিম্ভূতকিমাকার মিউটেটেড দানবে। (চলচ্চিত্রটি ১৯৮৬ সালে রিমেক করা হয়, যেখানে অভিনয় করেছেন জেফ গোল্ডবাম।) [গল্পটির ছায়া অবলম্বনে মাসুদ রানার স্রষ্টা কাজী আনোয়ার হোসেন দেশীয় পটভূমিতে রূপান্তর করেছেন মাকড়সা শিরোনামে। গল্পটি তিনটি উপন্যাসিকা বইতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।—অনুবাদক]

‘স্টার ট্রেক’ সিরিজের কারণে টেলিপোর্টেশনের ব্যাপারটি জনসাধারণের কাছে প্রথম জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। স্টার ট্রেকের স্রষ্টা জিন রোডেনবেরি সিরিজটিতে টেলিপোর্টেশন আমদানি করেন। কারণ, বহুদূরের কোনো গ্রহে রকেটশিপ ওঠানামার জন্য যে ব্যয়বহুল স্পেশাল ইফেক্টের প্রয়োজন, তার জন্য বাজেট ছিল না প্যারামাউন্ড স্টুডিওর। কিন্তু টেলিপোর্টেশনের মাধ্যমে বেশ কম খরচে এন্টারপ্রাইজের ক্রুদের তাদের গন্তব্য নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছিল।

অনেক বছর ধরে টেলিপোর্টেশনের সম্ভাবনা নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছেন বিজ্ঞানীরা। কারণ, কাউকে টেলিপোর্ট করতে, তার দেহের প্রতিটি পরমাণুর নিখুঁত অবস্থান জানতে হয়। এটি হয়তো হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তার নীতি লঙ্ঘন করবে (এ নীতি অনুসারে, ইলেকট্রনের অবস্থান ও ভরবেগ একই সঙ্গে নিখুঁতভাবে জানা সম্ভব নয়)। সে কারণে সমালোচকদের সম্মান জানিয়ে স্টার ট্রেক সিরিজের নির্মাতারা ট্রান্সপোর্টার রুমে ‘হাইজেনবার্গ কমপেনসেটস’ বা ‘হাইজেনবার্গের ক্ষতিপূরক’ নামের একটা ঘটনার আমদানি করেন। এটি ব্যবহার করে যাতে স্থানান্তরের সময় কোনো গ্যাজেটের মাধ্যমে কোয়ান্টাম ফিজিকসের সূত্রগুলো অমান্য করার ক্ষতি পূরণ করা যায়, এটাই ছিল এর উদ্দেশ্য। তবে এই হাইজেনবার্গের কমপেনসেটর তৈরি করা বেশ দ্রুতই সম্ভব হয়ে উঠতে পারে বলে প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। এর মাধ্যমে হয়তো আগের সমালোচক ও বিজ্ঞানীরাই ভুল প্রমাণিত হতে পারেন।

টেলিপোর্টেশন ও কোয়ান্টাম তত্ত্ব

নিউটনিয়ান তত্ত্বমতে, টেলিপোর্টেশন একেবারেই অসম্ভব। পদার্থ হলো বিলিয়ার্ড বলের মতো শক্ত ও অতি ক্ষুদ্র—এ ধারণা নিউটনের সূত্রগুলোর ভিত্তি। কোনো বস্তুকে ধাক্কা না দেওয়া পর্যন্ত সেটি গতিশীল হয় না; আবার কোনো বস্তু হঠাৎ করে হারিয়ে যেতে কিংবা অন্য কোথাও হঠাৎ উদয় হতেও পারে না।

তবে কোয়ান্টাম তত্ত্বে, কণারা নিখুঁতভাবে এ কাজটি করতে পারে। প্রায় ২৫০ বছর রাজত্ব করেছিল নিউটনের সূত্রগুলো। কিন্তু ১৯২৫ সালে কোয়ান্টাম তত্ত্ব গড়ে তোলার পর নিউটনের সূত্রগুলো হটিয়ে দেন ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ, আরউইন শ্রোডিঙ্গার আর তাঁদের সহকর্মীরা। পরমাণুর অদ্ভুত ধর্ম বিশ্লেষণ করে পদার্থবিদেরা আবিষ্কার করলেন, ইলেকট্রনও তরঙ্গের মতো আচরণ করে। আবার পরমাণুর মধ্যে তাদের আপাতদৃষ্টিতে বিশৃঙ্খল গতির মধ্যে কোয়ান্টাম লাফ দিতে পারে ইলেকট্রন।

কোয়ান্টাম তরঙ্গের সঙ্গে যে মানুষটি খুব ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত, তিনি ভিয়েনার পদার্থবিদ আরউইন শ্রোডিঙ্গার। বিখ্যাত সেই তরঙ্গ সমীকরণটিও লেখেন তিনি। এখন পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এ সমীকরণের সঙ্গে তার নামটিও জড়িয়ে গেছে। গ্র্যাজুয়েট স্কুলের পুরো কোর্সগুলোতে তাঁর বিখ্যাত সমীকরণটি সমাধানে ব্যয় করতে হয়। পদার্থবিজ্ঞানের লাইব্রেরিগুলোর দেয়ালে দেয়ালে ঠাসা বইগুলো এ বিষয় দিয়েই ভরা থাকে। এসবই আসলে এই সমীকরণের গভীরতর পরিণতি। তাত্ত্বিকভাবে, রসায়নের সবকিছুর যোগফল কমিয়ে এনে এই সমীকরণের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব।

১৯০৫ সালে আইনস্টাইন প্রমাণ করেন, আলোর তরঙ্গের কণার মতো ধর্মও আছে। অর্থাৎ এদের শক্তির প্যাকেট বা গুচ্ছ হিসেবেও ব্যাখ্যা করা যায়। শক্তির এ গুচ্ছকে এখন বলা হয় ফোটন। ১৯২০-এর দশকে শ্রোডিঙ্গার বুঝতে পারেন, এর বিপরীতটাও সত্য। মানে হলো, ইলেকট্রনের মতো কণাগুলো তরঙ্গের মতো আচরণ করে। ধারণাটি প্রথম উল্লেখ করেন ফরাসি পদার্থবিদ লুই ডি ব্রগলি। এ অনুমানের জন্য তিনি পরে নোবেল পুরস্কার পান। (আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্ডারগ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থীদের কাছে আমরা এটা প্রমাণ করে দেখাই। সাধারণত টিভির মতো দেখতে একটা ক্যাথোড রে টিউবে ইলেকট্রন ফায়ার করা হয়। এসব ইলেকট্রন এক অতি ক্ষুদ্র ছিদ্রের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। তাই টিভি স্ক্রিনের যেখানে ইলেকট্রনগুলো আঘাত করে, সেখানে স্বাভাবিকভাবে একটা অতি ক্ষুদ্র ডট দেখার আশা করবেন আপনি। কিন্তু তার বদলে আপনি সেখানে সমকেন্দ্রী, তরঙ্গের মতো রিং দেখতে পাবেন। এটি কেবল তখনই ঘটার আশা করা যায়, যদি ছিদ্রের মধ্য দিয়ে কোনো বিন্দুকণা নয়, বরং তরঙ্গ প্রবাহিত হয়।

এই কৌতূহলোদ্দীপক ঘটনা নিয়ে একদিন এক বক্তৃতা দিচ্ছিলেন শ্রোডিঙ্গার। তাঁর সহকর্মী পদার্থবিদ পিটার ডিবাই তাঁকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে প্রশ্ন করেন : ইলেকট্রনকে যদি তরঙ্গ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়, তাহলে তাদের ওয়েভ ইকুয়েশন বা তরঙ্গ সমীকরণ কী?

নিউটন ক্যালকুলাস আবিষ্কার করার পর থেকেই পদার্থবিদেরা ডিফারেনশিয়াল ইকুয়েশনের মাধ্যমে তরঙ্গকে ব্যাখ্যা করতে পারেন। কাজেই ডিবাইয়ের প্রশ্নটিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে শ্রোডিঙ্গার ইলেকট্রনের তরঙ্গের জন্য ডিফারেনশিয়াল ইকুয়েশন লেখার সিদ্ধান্ত নেন। সে মাসে ছুটি কাটাতে চলে যান শ্রোডিঙ্গার। ছুটি থেকে তিনি ফিরে এলেন সেই সমীকরণটি বগলদাবা করে। তারও অনেক আগে ফ্যারাডের ফোর্স ফিল্ড নিয়ে আলোর জন্য ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণ লিখেছিলেন ম্যাক্সওয়েল। একইভাবে ডি ব্রগলির কণাতরঙ্গের ওপর ভর করে ইলেকট্রনের জন্য শ্রোডিঙ্গারের সমীকরণ লিখে ফেলেন শ্রোডিঙ্গার।

(আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নের চেহারা চিরদিনের জন্য পাল্টে দেওয়া বিখ্যাত সমীকরণটি শ্রোডিঙ্গার যখন আবিষ্কারে মগ্ন, তখন তিনি কী করছিলেন, তা সঠিকভাবে জানতে বিজ্ঞানের ইতিহাসবিদদের যথেষ্ট শ্রম দিতে হবে। যত দূর জানা যায়, শ্রোডিঙ্গার মুক্ত প্রেমে বিশ্বাসী ছিলেন। অবকাশযাপনে প্রায়ই তাঁর স্ত্রী ও প্রণয়িনীদের সঙ্গে নিতেন তিনি। এমনকি তাঁর বিপুলসংখ্যক প্রেমিকাদের নিয়ে ডায়েরিতে বিস্তারিত লিখে রাখতেন। প্রত্যেকের সঙ্গে মিলিত হওয়ার বিষয়টি সংকেতে লিখতেন শ্রোডিঙ্গার। ইতিহাসবিদেরা এখন বিশ্বাস করেন, সমীকরণটি আবিষ্কারের সময় বান্ধবীদের একজনকে সঙ্গে নিয়ে আল্পসের ভিলা হারউইগে ছিলেন তিনি।)

হাইড্রোজেন পরমাণুর সমীকরণ সমাধান করতে শুরু করেন শ্রোডিঙ্গার। একরাশ বিস্ময় নিয়ে তিনি দেখলেন, আগের পদার্থবিদদের অতিযত্নে তালিকাভুক্ত করা হাইড্রোজেনের নিখুঁত শক্তিস্তরের সঙ্গে তা মিলে যাচ্ছে। তিনি বুঝতে পারলেন, নীলস বোরের দেখানো নিউক্লিয়াসের চারপাশে ঘূর্ণমান ইলেকট্রন-সংবলিত পরমাণুর চিত্রটি আসলে ভুল। (আধুনিক বিজ্ঞান প্রতীকায়িত করতে পরমাণুর এ চিত্রটি এখনো বইপত্র ও বিজ্ঞাপনে ব্যবহৃত হয়।) নিউক্লিয়াসের চারপাশের এসব কক্ষপথ তরঙ্গ দিয়ে প্রতিস্থাপন করতে হবে।

শ্রোডিঙ্গারের কাজটি পদার্থবিজ্ঞান সমাজের ওপর সৃষ্টি করে প্রচণ্ড আলোড়ন। এর ফলে হঠাৎ করে পরমাণুর ভেতর উঁকি দিতে সক্ষম হন পদার্থবিদেরা। এর মাধ্যমে তাঁরা ইলেকট্রনের শক্তিস্তর সৃষ্টিকারী তরঙ্গ সম্পর্কে বিস্তারিত পরীক্ষা করে দেখতে পারলেন। আবার এই শক্তিস্তর সম্পর্কে সঠিকভাবে ভবিষ্যদ্বাণীও করতে পারলেন তাঁরা, যা প্রাপ্ত ডেটার সঙ্গে মিলে গেল একদম নিখুঁতভাবে।

কিন্তু তারপরও এখানে বিরক্তিকর একটা প্রশ্ন রয়েই গেছে, পদার্থবিজ্ঞান এখনো যার আস্তানা। ইলেকট্রনকে যদি তরঙ্গ হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়, তাহলে তরঙ্গায়িত আন্দোলন কী? এর উত্তর দিলেন পদার্থবিদ ম্যাক্স বর্ন। তিনি বললেন, এসব তরঙ্গ আসলে সম্ভাবনার তরঙ্গ। এসব তরঙ্গ শুধু যেকোনো সময়ে যেকোনো জায়গায় একটি নির্দিষ্ট ইলেকট্রন খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনার কথা জানায়। অন্য কথায়, ইলেকট্রন হলো একটি কণা। কিন্তু এই কণাকে খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা পাওয়া যায় শ্রোডিঙ্গারের তরঙ্গের মাধ্যমে। তরঙ্গ যত বড় হবে, ওই বিন্দুতে কণাটি খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনাও ততই বাড়বে।

এই অগ্রগতির পর পদার্থবিদ্যার মর্মমূলে হঠাৎ করে দৈবঘটনা ও সম্ভাবনার সূচনা হলো। অথচ আগে পদার্থবিজ্ঞান আমাদের গ্রহ থেকে শুরু করে ধূমকেতু বা কামানের গোলার মতো বস্তুকণার নিখুঁত ভবিষ্যদ্বাণী ও তাদের গতিপথের বিশদ তথ্য জোগান দিত।

এই অনিশ্চয়তা শেষ পর্যন্ত হাইজেনবার্গ তাঁর প্রস্তাবিত অনিশ্চয়তার নীতিতে সংকলন করেন। এ নীতি অনুযায়ী, একই সময়ে কোনো ইলেকট্রনের নির্ভুল ভরবেগ ও নির্ভুল অবস্থান জানা সম্ভব নয়। এমনকি একটি প্রদত্ত সময়ে পরিমাপ করে নির্ভুলভাবে এর শক্তি জানাও সম্ভব নয়। কোয়ান্টাম পর্যায়ে সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানের সব সাধারণ সূত্র লঙ্ঘিত হয়। যেমন ইলেকট্রন যেকোনো জায়গায় অদৃশ্য ও উদয় হতে পারে এবং ইলেকট্রন একই সময়ে অনেক জায়গায় থাকতে পারে।

[কোয়ান্টাম তত্ত্বের গডফাদার আইনস্টাইন ১৯০৫ সালে এ বিপ্লব শুরুতে সহায়তা করেন। আর শ্রোডিঙ্গার দিয়েছেন তরঙ্গ সমীকরণ। মজার ব্যাপার হচ্ছে মৌলিক পদার্থবিজ্ঞানে দৈবঘটনা ঢুকে পড়তে দেখে আতঙ্কিত হলেন তাঁরা। আইনস্টাইন লিখলেন, ‘কোয়ান্টাম মেকানিকস বিপুল মর্যাদার দাবি রাখে। কিন্তু আমার বিবেক বলছে, এটা সত্যি হতে পারে না। তত্ত্বটা অনেক কিছু প্রস্তাব করে, কিন্তু এটি গোপনীয়তার খুব সামান্যই আমাদের কাছে উন্মোচন করে। অন্তত আমার মনে হয়, তিনি (ঈশ্বর) পাশা খেলেন না।]

হাইজেনবার্গের তত্ত্বটি বৈপ্লবিক ও বিতর্কিত হলেও সেটা বেশ কাজে দিত। মাত্র এক ঝাড়ুতেই পদার্থবিদেরা রসায়নের সূত্রগুলোসহ বিপুলসংখ্যক বিভ্রান্তিকর ঘটনা ব্যাখ্যা করতে পেরেছিলেন এর মাধ্যমে। কোয়ান্টাম তত্ত্ব কতটা অদ্ভুতুড়ে সেটি দেখাতে আমার পিএইচডি ছাত্রদের মুগ্ধ করতে তাদের প্রায়ই আমি পরমাণুগুলো হঠাৎ করে অদৃশ্য হয়ে ইটের দেয়ালের অপর পাশে উদয় হওয়ার সম্ভাবনা গণনা করতে বলি। এ ধরনের কোনো টেলিপোর্টেশন নিউটনিয়ান পদার্থবিজ্ঞানে ঘটা অসম্ভব হলেও কোয়ান্টাম বলবিদ্যা তা অনুমোদন দেয়। তবে কেউ যদি এ ধরনের কিছু ঘটনা ঘটতে দেখতে চায়, তাহলে তাকে মহাবিশ্বের জীবনকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করে বসে থাকতে হবে। (আপনি যদি একটা কম্পিউটার ব্যবহার করে আপনার দেহের শ্রোডিঙ্গার তরঙ্গের গ্রাফ বা লেখচিত্র তৈরি করেন, তাহলে দেখতে পাবেন তার সঙ্গে আপনার দেহের সব গঠনের সঙ্গে বেশ মিল আছে। পার্থক্য শুধু এটুকুই যে গ্রাফটি কিছুটা ঝাপসা দেখা যাবে। সেই সঙ্গে আপনার কিছু তরঙ্গ ছড়িয়ে পড়তে দেখা যাবে সব দিকে। আপনার কিছু তরঙ্গ ছড়িয়ে পড়বে নক্ষত্রের মতো দূরদূরান্তে। তাই কোনো দিন ঘুম থেকে উঠে নিজেকে দূরের কোনো গ্রহে দেখতে পারেন আপনি, অবশ্য তেমন সম্ভাবনা খুব কম। )

ইলেকট্রনগুলোকে আপাতদৃষ্টিতে একই সময়ে অনেক জায়গায় দেখা যায়, এটাই রসায়নের যথার্থ ভিত্তি। আমরা জানি, একটা পরমাণুর নিউক্লিয়াসের চারপাশে ইলেকট্রন ঘোরে, ঠিক যেন সৌরজগতের ক্ষুদ্র সংস্করণ। কিন্তু পরমাণু ও সৌরজগৎ একেবারেই আলাদা। মহাকাশে দুটি সৌরজগতের সংঘর্ষ হলে তাদের পুরো ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে, আবার গ্রহগুলো হারিয়ে যাবে গভীর মহাকাশে। কিন্তু পরমাণুগুলো পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষের মুখে পড়লে তারা প্রায়ই অণু গঠন করে, যা বেশ নিখুঁতভাবে স্থিতিশীল। এ সময় তারা পরস্পরের ইলেকট্রনগুলো ভাগাভাগি করে নেয়। হাইস্কুলের রসায়ন ক্লাসে শিক্ষক মাঝেমধ্যে একে ‘স্মিয়ারড ইলেকট্রন’ (আঠালো প্রলেপের মতো) হিসেবে উল্লেখ করেন (যার সঙ্গে ফুটবলের বেশ মিল আছে), যারা পরমাণুদের পরস্পরকে একসঙ্গে সংযুক্ত করে।

কিন্তু রসায়নের শিক্ষকেরা খুব কম সময়ই শিক্ষার্থীদের বলেন যে ইলেকট্রন পরমাণু দুটির মধ্যে আসলে ‘স্মিয়ারড’ অবস্থায় থাকে না। এই ‘ফুটবল’ আসলে এ সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে যে ইলেকট্রনটি ওই ফুটবলের মধ্যে একই সময়ে অনেকগুলো জায়গায় থাকতে পারে। অন্য কথায়, আমাদের দেহের ভেতরের অণুগুলোকে ব্যাখ্যা করা সব রকমের রসায়নের ভিত্তিগত ধারণাটি হলো : ইলেকট্রন একই সময়ে বিভিন্ন জায়গায় থাকতে পারে। সেই সঙ্গে দুটি পরমাণুর মধ্যে ইলেকট্রনগুলোর এ রকম ভাগাভাগির কারণে আমাদের দেহের অণুগুলো পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত থাকে। কোয়ান্টাম তত্ত্ব ছাড়া দেহের এ অণু ও পরমাণুগুলো চোখের পলকে অদৃশ্য হয়ে যেত।

কোয়ান্টাম তত্ত্বের অদ্ভুত কিন্তু গভীর এই ধর্ম কাজে লাগিয়ে দ্য হিচহাইকার’স গাইড টু দ্য গ্যালাক্সি শিরোনামের চমৎকার উপন্যাস লিখেছেন ডগলাস অ্যাডামস। (সেই ধর্মটি হলো এখানে সবচেয়ে অদ্ভুতুড়ে ঘটনা ঘটারও এক সসীম সম্ভাবনা থাকে)। ছায়াপথের মধ্য দিয়ে শাঁই করে চলে যাওয়ার একটা উপযুক্ত উপায়ের দরকার ছিল তাঁর। তাই কাল্পনিক ইনফিনিট ইমপ্রোবাবিলিটি ড্রাইভ উদ্ভাবন করে তিনি। ‘এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশ সময়ে বিপুল আন্তনাক্ষত্রিক দূরত্ব পাড়ি দেওয়ার জন্য এটা বিস্ময়কর নতুন এক পদ্ধতি। এর মাধ্যমে হাইপারস্পেসে সব ধরনের ক্লান্তিকর তুচ্ছ কাজ বাদ দিয়েই পাড়ি দেওয়া সম্ভব।’ তাঁর যন্ত্রটি দিয়ে ইচ্ছেমতো কোয়ান্টাম ঘটনার যেকোনো অস্বাভাবিকতা পরিবর্তন করা যায়। তাই উচ্চমাত্রার অকল্পনীয় ঘটনাও এখানে মামুলি ব্যাপার। কাজেই আপনি যদি রকেটে চেপে সবচেয়ে কাছের কোনো নক্ষত্র ব্যবস্থায় যেতে চান, তাহলে নক্ষত্রটিতে নিজেকে পুনরায় বিমূর্ত করে তুলতে হবে। শুধু এই সম্ভাবনাটা পরিবর্তন করতে হবে আপনাকে। ব্যস, কাজ শেষ, চোখের পলক ফেলার আগেই আপনি সেখানে টেলিপোর্ট হয়ে যাবেন।

বাস্তবে পরমাণুর ভেতরে কোয়ান্টাম লাফ এতই সাধারণ ব্যাপার যে তাকে মানুষের মতো কোনো বস্তুর ক্ষেত্রে সহজে বোঝা যায় না। কারণ, এ রকম বড় বস্তুতে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন পরমাণু থাকে। এমনকি আমাদের দেহের ইলেকট্রনও তাদের নিউক্লিয়াসের চারপাশের ভ্রমণের সময় নাচানাচি ও লাফালাফি করছে। সেখানে এত বেশি এ রকম ঘটছে যে তাদের গতিগুলো পরস্পরকে বাতিল করে দেয়। তাই মোটাদাগে বলা যায়, এ কারণে আমাদের পর্যায়ের বস্তুগুলোকে কঠিন ও টেকসই অবস্থায় দেখা যায়।

পারমাণবিক পর্যায়ে টেলিপোর্টেশন বিধিসম্মত হলেও ম্যাক্রোস্কোপিক স্কেলে এই অদ্ভুত প্রভাবের সাক্ষী হতে চাইলে মহাবিশ্বের জীবনকালের চেয়েও বেশি সময় অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু কোয়ান্টাম তত্ত্বের সূত্র ব্যবহার করে এমন কোনো যন্ত্র কি বানানো সম্ভব, যা দিয়ে সায়েন্স ফিকশন গল্পগুলোর মতো ইচ্ছেমতো টেলিপোর্ট করা যাবে যেকোনো কিছু? মজার ব্যাপার হচ্ছে, এর উত্তরে হ্যাঁ বলা যায়।

ইপিআর এক্সপেরিমেন্ট

কোয়ান্টাম টেলিপোর্টেশনের মূল চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে ১৯৩৫ সালে আইনস্টাইন এবং তাঁর সহকর্মী বোরিস পডোলস্কি ও নাথান রোজেনের বিখ্যাত এক গবেষণা প্রবন্ধে। মজার ব্যাপার হলো, তাঁরা এই ইপিআর এক্সপেরিমেন্ট (তিন লেখকের নামের আদ্যাক্ষর) প্রস্তাব করেছিলেন পদার্থবিজ্ঞানে সম্ভাব্যতার সূত্রপাত চিরকালের জন্য হত্যা করতে। (কোয়ান্টাম তত্ত্বের অকাট্য পরীক্ষামূলক সফলতায় আক্ষেপ করে আইনস্টাইন লেখেন, ‘কোয়ান্টাম তত্ত্ব যতই সফলতা পাচ্ছে, ততই এটি অর্থহীন হয়ে উঠছে।’)

দুটি ইলেকট্রন যদি প্রাথমিকভাবে ঐকতানে কম্পিত হয় (এ অবস্থাকে বলে কোহেরেন্স বা সংসক্তি), তাহলে তাদের বড় দূরত্বে আলাদা করে রাখা হলেও তারা তরঙ্গের মতো সমলয়ে থাকতে পারে। এ দুটি ইলেকট্রনকে কয়েক আলোকবর্ষ দূরে আলাদা করে রাখা হলেও তাদের মধ্যে একটা অদৃশ্য শ্রোডিঙ্গার তরঙ্গ পরস্পরকে সংযুক্ত করবে। অনেকটা মায়ের সঙ্গে সন্তানের নাভিরুজ্জুর মতো। একটা ইলেকট্রনে কিছু ঘটলে, ওই তথ্যের কিছু অংশ সঙ্গে সঙ্গে অন্যটিতে স্থানান্তরিত হবে। একে বলে কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গেলমেন্ট বা কোয়ান্টাম বিজড়ন। এ ধারণামতে, সংসক্তিতে কম্পিত কণাদের পরস্পরের সঙ্গে একধরনের গভীর সংযোগ রয়েছে।

শুরু করা যাক, ঐকতানে দোলায়মান দুটি সংসক্ত ইলেকট্রন দিয়ে এরপর তাদের পরস্পরের বিপরীত দিকে চলে যেতে দেওয়া যাক। প্রতিটি ইলেকট্রন অনেকটা ঘূর্ণমান লাটিমের মতো। ইলেকট্রনের এই স্পিন বা ঘূর্ণনকে আপ বা ডাউন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ধরা যাক, এই সিস্টেমের সর্বমোট স্পিন শূন্য। সুতরাং একটা ইলেকট্রনের স্পিন আপ হলে স্বাভাবিকভাবেই অন্যটির স্পিন হবে ডাউন। কোয়ান্টাম তত্ত্ব অনুসারে, পরিমাপ করার আগে, ইলেকট্রনের স্পিন আপ বা ডাউন কোনোটাই থাকে না। তবে একটা নিম্নতম অবস্থায় থাকে, যেখানে এটা একই সঙ্গে আপ ও ডাউন উভয় স্পিনেই থাকে। (আপনি যদি এতে কোনো পর্যবেক্ষণ করেন, তাহলে এর ওয়েভ ফাংশন কলাপস করবে বা ভেঙে পড়বে। তাতে একটা কণা কোনো নির্দিষ্ট অবস্থায় চলে যাবে।)

এবার একটা ইলেকট্রনের স্পিন মাপা যাক। ধরা যাক, এর স্পিন আপ পাওয়া গেল। তাহলে সঙ্গে সঙ্গেই জানা যাবে যে অন্য ইলেকট্রনের স্পিন ডাউন। অন্য ইলেকট্রনটি বহু আলোকবর্ষ দূরে আলাদা করা থাকলেও প্রথম ইলেকট্রনের স্পিন মেপে মুহূর্তেই দ্বিতীয় ইলেকট্রনটির স্পিন জানা যাবে। আসলে আলোর চেয়েও দ্রুতগতিতে তথ্যটি জানতে পারছেন আপনি। কারণ, ইলেকট্রন দুটি এনট্যাঙ্গেলড বা তাদের ওয়েভ ফাংশন ঐকতানে কম্পিত হয়। তাদের ওয়েভ ফাংশন অদৃশ্য কোনো সুতা বা নাভিরুজ্জ দিয়ে সংযুক্ত। একটিতে যা কিছুই ঘটুক না কেন, স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্যটিতে তার প্রভাব দেখা দেয়। (কিছু ক্ষেত্রে এর অর্থ হলো, আমাদের ক্ষেত্রে যা-ই ঘটুক, তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে মহাবিশ্বের বহুদূর প্রান্তের কোনো কিছুতে মুহূর্তেই প্রভাব ফেলে। কারণ, আমাদের ওয়েভ ফাংশন সম্ভবত সময়ের সূচনালগ্নে এনট্যাঙ্গেলড। এক অর্থে, সেখানে এনট্যাঙ্গেলমেন্টের জাল বিস্তৃত, যা মহাবিশ্বের দূর প্রান্তের সঙ্গে সংযুক্ত, এমনকি আমরাও এর সঙ্গে সংযুক্ত।) আইনস্টাইন একে উপহাস করে বলেছেন, ‘স্পুকি অ্যাকশন অ্যাট ডিসট্যান্স’ বা দূর থেকে ভুতুড়ে কাণ্ড। এর মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন, কোয়ান্টাম তত্ত্ব ত্রুটিপূর্ণ। কারণ, কোনো কিছু আলোর চেয়ে দ্রুতগতিতে চলতে পারে না।

আইনস্টাইন ইপিআর এক্সপেরিমেন্ট ডিজাইন করেছিলেন কোয়ান্টাম তত্ত্বের মৃত্যুঘণ্টা বাজাতে। কিন্তু ১৯৮০-এর দশকে ফ্রান্সের অ্যালান অ্যাসপেক্ট ও তাঁর সহকর্মীরা ১৩ মিটার ব্যবধানে দুটি ডিটেক্টর স্থাপন করে পরীক্ষাটি চালিয়ে দেখেন। এতে পাওয়া ফলাফল নিখুঁতভাবে কোয়ান্টাম তত্ত্বের সঙ্গে মিলে গেছে। তাই এতে মনে হতে পারে ঈশ্বর হয়তো মহাবিশ্বের সঙ্গে পাশা খেলেন।

প্রশ্ন হলো, কোনো তথ্য কি সত্যিই আলোর চেয়ে বেশি বেগে চলতে পারে? মহাবিশ্বের গতির সীমা আলোর গতি হিসেবে নির্ধারণে আইনস্টাইন কি ভুল করেছিলেন? তা নয় আসলে। তথ্য আলোর চেয়ে বেশি বেগে চলতে পারে। তবে এ তথ্য হবে র‍্যান্ডম বা এলোমেলো, তথা অর্থহীন। ইপিআর এক্সপেরিমেন্টের তথ্য আলোর চেয়ে বেশি বেগে চললেও এর মাধ্যমে আপনি কোনো সত্যিকারের মেসেজ, কিংবা কোনো মোর্স কোড ইপিআর পাঠাতে পারবেন না।

মহাবিশ্বের অন্য প্রান্তে একটি ইলেকট্রনের স্পিন ডাউন অবস্থায় আছে, এই তথ্য জানা অর্থহীন। আপনি আজকের স্টক মার্কেটের কোনো তথ্য এ পদ্ধতিতে পাঠাতে পারবেন না। যেমন ধরা যাক, আপনার এক বন্ধু সব সময়

দৈবচয়ন ভিত্তিতে এক পায়ে লাল মোজা আর অন্য পায়ে সবুজ মোজা পরে। ধরে নিই, আপনি তার একটি পা পরীক্ষা করে দেখলেন এবং সেই পায়ে লাল মোজা পরা আছে। তাহলে আলোর চেয়েও বেশি গতিতেই আপনি জানতে পারবেন, তার অন্য পায়ের মোজার রং সবুজ। তথ্য আসলেই আলোর চেয়ে বেশি বেগে চলতে পারে, কিন্তু সেই তথ্য অর্থহীন। ননর‍্যান্ডম বা দৈবচয়নবিহীন কোনো তথ্য এ পদ্ধতিতে পাঠানো যাবে না।

অনেক বছর ধরে সমালোচকদের মুখে ছাই দিয়ে ইপিআর এক্সপেরিমেন্টকে কোয়ান্টাম তত্ত্বের মোক্ষম বিজয় হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু এ বিজয় আসলে অন্তঃসারশূন্য। এর কোনো ব্যবহারিক পরিণতি নেই। এখন পর্যন্ত এটাই সত্যি।

কোয়ান্টাম টেলিপোর্টেশন

তবে সবকিছু বদলে গেল ১৯৯৩ সালে। সেবার চার্লস বেনেটের নেতৃত্বে আইবিএমের বিজ্ঞানীরা প্রমাণ দেখালেন, ইপিআর এক্সপেরিমেন্ট ব্যবহার করে কোনো বস্তুকেও আস্ত টেলিপোর্ট করা সম্ভব। অন্তত পারমাণবিক পর্যায়ে এটা সত্যি। (আরও ভালোভাবে বললে, তাঁরা প্রমাণ দেখালেন, একটা কণার মধ্যে যতগুলো তথ্য থাকে, তার সবই টেলিপোর্ট করা সম্ভব।) এরপর থেকে পদার্থবিজ্ঞানীরা ফোটন ও এমনকি পুরো সিজিয়াম পরমাণুও টেলিপোর্ট করতে পেরেছেন। পরের কয়েক দশকে বিজ্ঞানীরা হয়তো প্রথমবারের মতো কোনো ডিএনএ ও ভাইরাসও টেলিপোর্ট করে দেখাতে পারবেন।

ইপিআর এক্সপেরিমেন্টের খুবই অদ্ভুত কিছু ধর্ম কাজে লাগায় কোয়ান্টাম টেলিপোর্টেশন। এ টেলিপোর্টেশন এক্সপেরিমেন্টে পদার্থবিদেরা দুটো পরমাণু বা A ও C নিয়ে কাজ শুরু করেন। ধরা যাক, আমরা A পরমাণু থেকে C পরমাণুতে একটা তথ্য পাঠাতে চাই। তাহলে তৃতীয় আরেকটি পরমাণু B নিতে হবে। এই B আবার পরমাণু C-এর সঙ্গে এনট্যাঙ্গেলড বা বিজড়িত। কাজেই B ও C সংসক্ত। এখন পরমাণু A পরমাণু B-এর কাছে আনা হলো। পরমাণু A পরমাণু B-কে স্ক্যান করল, তাতে পরমাণু A-তে থাকা তথ্য পরমাণু B-তে স্থানান্তরিত হলো। এই প্রক্রিয়া পরমাণু A ও B এনট্যাঙ্গেলড হয়ে যায়। কিন্তু পরমাণু B ও C যেহেতু এনট্যাঙ্গেলড, তাই পরমাণু A-তে থাকা তথ্যগুলো পরমাণু C-তে স্থানান্তরিত হয়ে যাবে। সবশেষে বলা যায়, পরমাণু A এখন পরমাণু C-তে টেলিপোর্ট হয়ে গেছে। অর্থাৎ পরমাণু C-এর ধারণকৃত তথ্য এখন হুবহু পরমাণু A-এর মতো হবে।

এখানে খেয়াল করতে হবে, পরমাণু A-এর তথ্য এখন ধ্বংস হয়ে গেছে (কাজেই টেলিপোর্টেশনের পর আমাদের কাছে একই পরমাণুর দুটি কপি থাকবে না)। তাই তাত্ত্বিকভাবে কাউকে এ পদ্ধতিতে টেলিপোর্ট করলে সে মারা যেতে পারে। কিন্তু তার দেহের তথ্য উদয় হতে পারে অন্য কোথাও। আরেকটি বিষয়ও খেয়াল রাখতে হবে, A পরমাণু নিজের জায়গা ছেড়ে C পরমাণুর কাছে যায়নি। এখানে শুধু A পরমাণুর তথ্য (যেমন তার স্পিন ও পোলারাইজেশন) C পরমাণুতে গেছে। (এর অর্থ এই নয় যে A পরমাণু গলে অদৃশ্য হয়ে দ্রুতবেগে আরেক জায়গায় গেছে। এর অর্থ, A পরমাণুর তথ্য শুধু পরমাণু C-তে স্থানান্তরিত হয়েছে।

বড় ধরনের এই সফলতার ঘোষণার পর, এর উন্নয়ন নিয়ে বিভিন্ন দল এখন তীব্র প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। একটা দল আরেক দলকে হারিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। এভাবে প্রথম ঐতিহাসিক কোয়ান্টাম টেলিপোর্টেশনের প্রমাণ মিলল ১৯৯৭ সালে। সেবার ইন্সব্রুক বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিবেগুনি রশ্মির ফোটন টেলিপোর্ট করা হয়। পরের বছর এর ধারাবাহিকতায় ক্যাল টেকের বিজ্ঞানীরা ফোটন টেলিপোর্ট সম্পর্কে আরও নিখুঁত পরীক্ষা চালান।

ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদেরা দানিয়ুব নদীর তলদেশ দিয়ে ৬০০ মিটার দূরত্বে আলোর কণা টেলিপোর্ট করতে সক্ষম হন ২০০৪ সালে। এতে ফাইবার অপটিক কেব্‌ল ব্যবহার করেন তাঁরা। এতে রেকর্ড সৃষ্টি হয়। (কেলটির দৈর্ঘ্য ছিল ৮০০ মিটার। দানিয়ুব নদীর তলদেশের নগরের পয়োনিষ্কাশন সিস্টেমের নিচ দিয়ে নেওয়া হয়েছিল কেব্‌লটা। নদীর এক পাড়ে দাঁড়িয়েছিলেন প্রেরক আর আরেক পাড়ে ছিলেন গ্রাহক।

এ পরীক্ষার একটা সমালোচনা হলো, এগুলো আলোর ফোটন দিয়ে চালানো হয়েছে। তাই সায়েন্স ফিকশনে দেখানো টেলিপোর্টেশনের ধারেকাছেও নেই এগুলো। তবে আরেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে ২০০৪ সালে। সেবার কোয়ান্টাম টেলিপোর্টেশন করা হয় আলোর কণা ফোটন দিয়ে নয়, সত্যিকার আস্ত এক পরমাণু দিয়ে। এর মাধ্যমে বাস্তবসম্মত টেলিপোর্টেশনের দিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যায়। ওয়াশিংটন ডিসির ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেকনোলজির পদার্থবিদেরা সফলভাবে তিনটি বেরিলিয়াম পরমাণু এনট্যাঙ্গেলড করেন। এরপর এদের একটা পরমাণুর ধর্ম আরেকটিতে স্থানান্তর করতেও পেরেছেন তাঁরা।

২০০৬ সালে আরেকটি বিস্ময়কর অগ্রগতি দেখা গেল। এবার প্রথম একটি মাইক্রোস্কোপিক বস্তু টেলিপোর্ট করা হয়। কোপেনহেগেনের নীলস বোর ইনস্টিটিউট ও জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউটের পদার্থবিদেরা এক আলোকরশ্মির সঙ্গে সিজিয়াম পরমাণুর গ্যাসের এনট্যাঙ্গেল করতে সক্ষম হন। গ্যাসে ছিল কয়েক ট্রিলিয়ন পরমাণু। পরে তারা লেজার পালসের ভতরের তথ্য এনকোড করতে ও সে তথ্য প্রায় অর্ধগজ দূরে সিজিয়াম পরমাণুতে টেলিপোর্ট করেন। কোয়ান্টাম টেলিপোর্টেশন দলের অন্যতম গবেষক ইউজিন পলজিক বলেন, ‘প্রথমবারের মতো আলো বা তথ্যের বাহক ও পরমাণুর মধ্যে এটি অর্জন করা সম্ভব হয়েছে।’

এনট্যাঙ্গেলমেন্ট ছাড়া টেলিপোর্টেশন

টেলিপোর্টেশনের উন্নয়ন দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। আরেকটি বড় ধরনের সফলতা পাওয়া গেছে ২০০৭ সালে। পদার্থবিদেরা নতুন আরেকটি টেলিপোর্টেশনের উপায়ের কথা বলেছেন, যেখানে এনট্যাঙ্গেলমেন্টের কোনো প্রয়োজন নেই। আমরা জানি, এনট্যাঙ্গেলমেন্ট হলো কোয়ান্টাম টেলিপোর্টেশনের সবচেয়ে কঠিন একটা ধর্ম। এই সমস্যা সমাধান করতে পারলে টেলিপোর্টেশনে নতুন এক দিগন্ত উন্মোচিত হবে আমাদের সামনে।

‘আমরা এমন একটা রশ্মির কথা বলছি, যেখানে প্রায় ৫০০০ কণা এক জায়গা থেকে অদৃশ্য হয়ে যাবে আর তারপর অন্য কোথাও সেগুলো আবার দেখা যাবে।’ এ কথা বলেছেন অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেনের অস্ট্রেলিয়ান রিসার্চ কাউন্সিল সেন্টার অব এক্সেসেলেন্স ফর কোয়ান্টাম অ্যাটম অপটিকসের পদার্থবিদ অ্যাস্টন ব্র্যাডলি। টেলিপোর্টেশনের নতুন পদ্ধতি নিয়ে গবেষণায় পথিকৃৎ তিনি।

তাঁর দাবি, ‘মনে হয়, আমাদের পরিকল্পনাটি বিজ্ঞান কল্পগল্পের ধারণার মূলনীতির অনেক কাছে।’ তাদের পদ্ধতিতে তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা রুবিডিয়াম পরমাণুগুচ্ছের একটা রশ্মি নেন। আসলে এখানে পরমাণুগুচ্ছের সব তথ্য আলোকরশ্মিতে রূপান্তরিত করা হয়। এরপর এক ফাইবার অপটিক কেবলের ভেতর দিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয় এই আলোকরশ্মি। দূরবর্তী কোনো জায়গায় তারপর পরমাণুগুচ্ছের আসল রশ্মিটিকে নির্মাণ করা হয় নতুন করে। তার দাবি সত্য হলে, পদ্ধতিটি টেলিপোর্টেশনের প্রতিবন্ধকতা দূর করে দিতে পারবে। সেই সঙ্গে ধীরে ধীরে বড় বস্তুর জন্যও টেলিপোর্টেশনের সম্পূর্ণ নতুন পথ খুলে দেবে।

কোয়ান্টাম টেলিপোর্টেশন থেকে আলাদা করতে ড. ব্র্যাডলি নতুন এ পদ্ধতির নাম দিয়েছেন ক্ল্যাসিকেল টেলিপোর্টেশন। (এতে ভুল-বোঝাবুঝি হতে পারে। কারণ, পদ্ধতিটি কোয়ান্টাম তত্ত্বের ওপর নির্ভরশীল হলেও এনট্যাঙ্গেলমেন্টের ওপর নির্ভর করে না। )

অভিনব এ টেলিপোর্টেশনের মূল চাবিকাঠি পদার্থের নতুন এক অবস্থা, যাকে বলে বোস-আইনস্টাইন কনডেনসেট বা বিইসি (বা বোস-আইনস্টাইন ঘনীভবন)। পুরো মহাবিশ্বে এটি অন্যতম শীতলতম বস্তু। প্রকৃতিতে সবচেয়ে শীতল তাপমাত্রা দেখা যায়, মহাকাশের বাইরে। আর তার তাপমাত্রা পরম শূন্যের ওপরে ৩ কেলভিন। (মহাবিস্ফোরণের অবশিষ্ট থেকে যাওয়া উত্তাপের কারণে মহাকাশের তাপমাত্রা এ রকম। এই অবশিষ্টাংশ এখনো পুরো মহাবিশ্ব ডুবে আছে।) তবে বিইসির তাপমাত্রা পরম শূন্য তাপমাত্রার ওপরে ১ ডিগ্রির ১ মিলিয়ন থেকে ১ বিলিয়ন ভাগের ১ ভাগ মাত্র। এমন তাপমাত্ৰা শুধু গবেষণাগারেই সৃষ্টি করা সম্ভব।

নির্দিষ্ট ধরনের বস্তুকে পরম শূন্য তাপমাত্রার কাছাকাছি ঠান্ডা করা হলে তাদের পরমাণুগুলো সর্বনিম্ন শক্তিস্তরে ভেঙে পড়ে বা জবুথবু হয়ে পড়ে। সে কারণে তাদের সবগুলো পরমাণু একই ঐকতানে কম্পিত হতে থাকে ও পরস্পর সংসক্ত হয়। সবগুলো পরমাণুর ওয়েভ ফাংশন একই হওয়ার কারণে এক অর্থে একটা বিইসি আচরণ অনেকটা বিশাল কোনো সুপার অ্যাটম বা অতিপরমাণুর মতো। এখানে প্রতিটি ভিন্ন ভিন্ন পরমাণুই ঐকতানে কম্পিত হয়। পদার্থের এই অদ্ভুতুড়ে অবস্থাটির কথা আইনস্টাইন ও সত্যেন্দ্রনাথ বসু অনুমান করেছিলেন সেই ১৯২৫ সালে। তবে পরবর্তী ৭০ বছরেও গবেষণাগারে বানানো সম্ভব হয়নি এটি। অবশেষে ১৯৯৫ সালে সেটি এমআইটি ও কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবে বানানো সম্ভব হয়।

ব্র্যাডলি ও তাঁর সহযোগীদের টেলিপোর্টেশন যন্ত্রটি কীভাবে কাজ করে, সেটিই বলছি এবার। প্রথমে তারা অতিশীতল একগুচ্ছ রুবিডিয়াম পরমাণুকে বিইসি অবস্থায় নিয়ে যান। এরপর তাঁরা এই বিইসিতে একটা বস্তুর বিম প্রয়োগ করেন (সেটিও রুবিডিয়াম পরমাণু দিয়ে তৈরি)। বিমের এসব পরমাণুও চলে যেতে চায় সবনিম্ন শক্তিস্তরে। সে জন্য তাদের অতিরিক্ত শক্তি আলোর কম্পন হিসেবে ঝেড়ে ফেলে তারা। এই আলোর বিমকে এরপর একটা ফাইবার অপটিক কেবলে পাঠানো হয়। লক্ষণীয় ব্যাপার হলো, এই আলোকরশ্মিতে আসল বস্তুর বিমের সব কটি দরকারি কোয়ান্টাম তথ্য থাকে। (যেমন তার সবগুলোর পরমাণুর অবস্থান ও ভরবেগ)। এবার আলোকরশ্মি আরেকটি বিইসিকে আঘাত করে, সেটি এরপর আলোকরশ্মিকে আসল বস্তুর বিমে রূপান্তরিত করে।

নতুন এ টেলিপোর্টেশন পদ্ধতির সম্ভাবনা বিপুল। কারণ এর সঙ্গে এনট্যাঙ্গেলমেন্টের কোনো সম্পর্ক নেই। তবু এ পদ্ধতিরও কিছু সমস্যা রয়ে গেছে। এটি বিইসির ধর্মের ওপর চরমভাবে নির্ভরশীল, আর একে ল্যাবরেটরিতে বানানো খুব কঠিন। বিইসির ধর্মও বেশ অদ্ভুত। কারণ, তারা এমন আচরণ করে যেন সবগুলো মিলে অতিদানবীয় একটিমাত্র পরমাণু। তাত্ত্বিকভাবে শুধু পারমাণবিক পর্যায়ে দেখতে পাওয়া অদ্ভুত কোয়ান্টাম ইফেক্টও খালি চোখে দেখা যায় বিইসিতে। অথচ একসময় এটি অসম্ভব বলে ভাবা হতো।

অ্যাটমিক বা পারমাণবিক লেজার বানাতে বোস-আইনস্টাইন কনডেনসেট বা বিইসির প্রত্যক্ষভাবে কাজে লাগে। নিঃসন্দেহে ঐকতানে কম্পিত একগুচ্ছ ফোটনের সংসক্তের ওপর নির্ভরশীল লেজার। কাজেই বিইসি পরমাণুদের এমন বিমও তৈরি করা সম্ভব, যারা সবাই সংসক্ত। অন্য কথায়, কোনো বিইসি লেজারের প্রতিরূপ তৈরি করতে পারে, পারমাণবিক লেজার বা বস্তুর লেজার, যা বিইসি পরমাণু দিয়ে তৈরি। লেজারের বাণিজ্যিক ব্যবহার ব্যাপক। পারমাণবিক লেজারের বাণিজ্যিক ব্যবহারও সম্ভাবনাময়। বিইসি যেহেতু শুধু পরম শূন্য তাপমাত্রার সামান্য ওপরে থাকে, তাই ক্ষেত্রটির অগ্রগতি স্থিতিশীল হলেও খুব ধীরগতির।

এসব অগ্রগতির পর, আমরা কবে নিজেদের টেলিপোর্ট করতে পারব? পদার্থবিদদের আশা জটিল অণুর টেলিপোর্ট আগামী কয়েক বছরের মধ্যে সম্ভব। এরপর ডিএনএ অণু কিংবা ভাইরাসও টেলিপোর্ট করা সম্ভব হবে আগামী কয়েক দশকের মধ্যে। সায়েন্স ফিকশন মুভির মতোই সত্যিকার কোনো মানুষ টেলিপোর্টে কোনো তাত্ত্বিক বাধা নেই। তবে এ ক্ষেত্রে যান্ত্রিক যেসব সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে, সেগুলো সত্যিই বিস্ময়কর। আলোর ফোটন ও নির্দিষ্ট পরমাণুদের মধ্যে সংসক্তি তৈরি করতে বিশ্বের সবচেয়ে ভালো ও সূক্ষ্ম মানসম্পন্ন পদার্থবিজ্ঞান গবেষণাগার প্রয়োজন। তাই বলার অপেক্ষা রাখে না, মানুষের মতো সত্যিকার কোনো ম্যাক্রোস্কোপিক বস্তুর কোয়ান্টাম কোহেরেন্স তৈরি করতে আরও অনেক দিন লেগে যাবে। হয়তো তার জন্য লাগবে আরও কয়েক শতাব্দী বা তার চেয়েও বেশি দিন। আমাদের চারপাশের দৈনন্দিন বস্তুদের আদৌ যদি টেলিপোর্ট করা সম্ভব হয়, তারপরই কেবল এটা সম্ভব হতে পারে।

কোয়ান্টাম কম্পিউটার

মোদ্দাকথা হলো, কোয়ান্টাম কম্পিউটারের উন্নয়নের সঙ্গে কোয়ান্টাম টেলিপোর্টেশন ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। দুটি ক্ষেত্রে একই কোয়ান্টাম ফিজিকস ও একই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। তাই এ দুটি ক্ষেত্রের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। কোয়ান্টাম কম্পিউটার হয়তো একদিন আমাদের টেবিলে বসে থাকা পরিচিত ডিজিটাল কম্পিউটারকে হটিয়ে দেবে। সত্যি বলতে কি, ভবিষ্যতের অর্থনীতি হয়তো নির্ভর করবে এ রকম কম্পিউটারের ওপর। কাজেই এ প্রযুক্তিতে ব্যাপক বাণিজ্যিক আগ্রহ রয়েছে। কোয়ান্টাম কম্পিউটার থেকে আসা নতুন প্রযুক্তির কারণে সিলিকন ভ্যালি ভবিষ্যতে জং ধরা পরিত্যক্ত একটি এলাকায় পরিণত হতে পারে।

সাধারণ কম্পিউটার গণনা করে ০ ও ১-এর বাইনারি সিস্টেম ব্যবহার করে। এই ০ ও ১-কে বলা হয় বিটস। কোয়ান্টাম কম্পিউটারের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী। তারা কিউবিটসে গণনা করতে পারে। কিউবিটস ০ থেকে ১-এর মাঝখানের মানগুলো নিয়ে কাজ করতে পারে। একটা চুম্বকীয় ক্ষেত্রে থাকা পরমাণুর কথা কল্পনা করুন। এটি একটা লাটিমের মতো ঘুরছে। কাজেই ঘূর্ণন অক্ষকে আপ অথবা ডাউন হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান বলে, পরমাণুর স্পিন হয় আপ হবে অথবা ডাউন হবে—দুটোই একই সঙ্গে হতে পারে না। কিন্তু কোয়ান্টাম জগৎ বড় অদ্ভুত। পরমাণুটিকে ওই দুটি অবস্থার যোগফল বলা হয়। অর্থাৎ একটা পরমাণুর আপ স্পিন ও ডাউন স্পিনের যোগফল। কোয়ান্টামের অধোভুবনে প্রতিটি বস্তুকে সবগুলো সম্ভাব্য অবস্থার যোগফল হিসেবে বর্ণনা করা হয়। (বিড়ালের মতো বড় বস্তুকে এই কোয়ান্টাম কায়দায় বর্ণনা করা হয়। এর অর্থ হলো, একটা জীবন্ত বিড়ালের ওয়েভ ফাংশনের সঙ্গে একটা মৃত বিড়ালের ওয়েভ ফাংশন যোগ করতে হবে। তাতে বিড়ালটির অবস্থা হবে মৃতও নয় আবার জীবিতও নয়। এ বিষয়ে ১৩ অধ্যায়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।)

এখন কল্পনা করুন, পরমাণুর একটি ঝাঁক একটা চুম্বকীয় ক্ষেত্রে সারিবদ্ধ হয়ে আছে, যাদের স্পিনও একই ছন্দে সারিবদ্ধ। একটি লেজার বিম যদি পরমাণুর এই ঝাঁকের ওপর ফেলা হয়, তাহলে লেজার বিমটি পরমাণুর ঝাঁকের ওপর লাফিয়ে উঠবে। তাতে কিছু পরমাণুর ঘূর্ণন অক্ষ ঘুরে যাবে। ভেতরে আসা ও বাইরে যাওয়া লেজার বিমের পার্থক্য মেপে, আমরা একটি জটিল কোয়ান্টাম গণনা করি, যার সঙ্গে অনেক ঘূর্ণনের পাল্টে যাওয়া জড়িত।

কোয়ান্টাম কম্পিউটার এখনো তাদের শৈশব অবস্থাতেই রয়ে গেছে। কোয়ান্টাম কম্পিটেশনে এ পর্যন্ত বিশ্ব রেকর্ড হলো 3×5=15, যা বর্তমানের সুপারকম্পিউটারকে হটিয়ে দেওয়ার জন্য একেবারে শিশুতোষ। কোয়ান্টাম টেলিপোর্টেশন ও কোয়ান্টাম কম্পিউটার উভয়ের একই রকম গুরুতর একটা দুর্বলতা রয়ে গেছে। সেটা হলো বিপুলসংখ্যক পরমাণুর কোহেরেন্স বা সংসক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। এই সমস্যা সমাধান করা গেলে দুটো ক্ষেত্রের জন্য সেটা বড় ধরনের ঘটনা বলে বিবেচিত হবে।

সিআইএ ও অন্যান্য গুপ্ত সংগঠনগুলো কোয়ান্টাম কম্পিউটারের ব্যাপারে ব্যাপকভাবে আগ্রহী। বিশ্বের অনেক গুপ্ত কোড একটি কি-এর ওপর নির্ভরশীল, যা বড় একটি পূর্ণ সংখ্যা হয়। এই কিয়ের ফ্যাক্টর করে তাকে মৌলিক সংখ্যায় নিয়ে আসার ক্ষমতার ওপর এটি নির্ভর করে। কি সংখ্যাটি যদি দুটি সংখ্যার গুণফল হয়, যাদের প্রতিটি ১০০ অঙ্কের, তাহলে এ দুটি ফ্যাক্টরকে খুঁজে বের করতে ডিজিটাল কম্পিউটারের লেগে যেতে পারে এক শ বছরের বেশি সময়। এ রকম কোড এখন অপরিহার্যভাবে শক্তিশালী হতে হয়।

তবে বেল ল্যাবের পিটার শোর ১৯৯৪ সালে দেখিয়েছেন, বড় সংখ্যা ফ্যাক্টর করা কোয়ান্টাম কম্পিউটারের জন্য ছেলেখেলা ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। এই আবিষ্কার বেশ দ্রুতই বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের আগ্রহ জাগিয়ে তুলবে। তাত্ত্বিকভাবে একটা কোয়ান্টাম কম্পিউটার বিশ্বের সব কোড ভেঙে ফেলতে পারবে। সেই সঙ্গে বর্তমানে প্রচলিত কম্পিউটারের নিরাপত্তাকে পুরোপুরি বিশৃঙ্খলার মধ্যে ছুড়ে ফেলে দিতে পারবে। প্রথম যে দেশ এ ধরনের সিস্টেম গড়ে তুলতে পারবে, তারাই অন্যান্য দেশ ও সংগঠনের অতি গোপনীয়তা উদ্‌ঘাটন করে ফেলতে পারবে।

বিজ্ঞানীদের ধারণা, ভবিষ্যতে বিশ্বের অর্থনীতি হয়তো কোয়ান্টাম কম্পিউটারের ওপর নির্ভর করবে। সিলিকনভিত্তিক ডিজিটাল কম্পিউটার একসময় সর্বশেষ ভৌত সীমায় পৌঁছাবে। কম্পিউটারের শক্তি বাড়ার ভিত্তিতে এ ঘটনা ২০২০ সালের কিছু পরেই ঘটবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রযুক্তিকে ক্রমান্বয়ে আরও সামনে এগিয়ে নিতে চাইলে তাই নতুন ও আরও শক্তিশালী কম্পিউটারের প্রয়োজন হবে। অনেকে কোয়ান্টাম কম্পিউটারের মাধ্যমে মানবমস্তিষ্কের শক্তি পুনরুৎপাদনের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছেন।

তাই এর জন্য পুরস্কারও রয়েছে অনেক উচ্চ মূল্যের। সংসক্তি-সংক্রান্ত সমস্যাটি সমাধান করা গেলে আমরা টেলিপোর্টেশনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারব। শুধু তা-ই নয়, একই সঙ্গে কোয়ান্টাম কম্পিউটারের মাধ্যমে হয়তো অপ্রত্যাশিত উপায়ে সব ধরনের উন্নত প্রযুক্তিরও অধিকারী হতে পারব আমরা। আমাদের জন্য এগুলো অনেক বড় ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। সে কারণে শেষ অধ্যায়ে এ ব্যাপারে আবারও আলোচনা করব আমি।

আগেও বলেছি, ল্যাবে সংসক্তি নিয়ন্ত্রণ করা অতিমাত্রায় কঠিন। ক্ষুদ্রতম কম্পনও দুটি পরমাণুর সংসক্তি নষ্ট করতে পারে ও কম্পিউটেশন ধ্বংস করে দিতে পারে। বর্তমানে গুটি কয়েকের বেশি পরমাণুর সংসক্তি বজায় রাখা খুব কঠিন। আসলে ন্যানোসেকেন্ডের মধ্যে বা সর্বোচ্চ ১ সেকেন্ডের মধ্যে পরমাণুর সংসক্তি নষ্ট হতে শুরু করে। তাই টেলিপোর্টেশন অবশ্যই খুব দ্রুত ঘটাতে হবে, বা পরমাণুদের সংসক্তি নষ্ট হয়ে যাওয়ার আগেই। এটিই কোয়ান্টাম কম্পিউটার ও টেলিপোর্টেশনের ক্ষেত্রে আরেক সীমাবদ্ধতা।

এসব চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভিড ডুসের বিশ্বাস, এ সমস্যার সমাধান সম্ভব। তিনি বলেন, ‘ভাগ্য ভালো থাকলে আর সাম্প্রতিক তাত্ত্বিক অগ্রগতির সহায়তা নিয়ে [একটি কোয়ান্টাম কম্পিউটার] হয়তো ৫০ বছরের কম সময় লাগবে। এটি হবে প্রকৃতিকে পোষ মানানোর সম্পূর্ণ নতুন উপায়।’

একটি কার্যকরী কোয়ান্টাম কম্পিউটার বানাতে আমাদের কয়েক মিলিয়ন পরমাণুকে একই ঐকতানে কম্পিত করতে হবে। সেটি করা এখন আমাদের বর্তমানের ক্ষমতার বাইরে। ক্যাপ্টেন কার্ককে টেলিপোর্ট করা হয়তো ভীষণ কঠিন হবে। আমাদের হয়তো কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গেলমেন্টের সঙ্গে ক্যাপ্টেন কার্কের যমজ বানাতে হবে। এমনকি এটি কীভাবে সম্পন্ন করা যেতে পারে, তা ন্যানোটেকনোলজি ও উন্নত কম্পিউটার দিয়ে দেখাটাও অনেক কঠিন।

কাজেই টেলিপোর্টেশন এখনো পারমাণবিক পর্যায়ে রয়ে গেছে। আমরা হয়তো ক্রমান্বয়ে জটিল ও জৈব অণুও টেলিপোর্ট করতে পারব আগামী কয়েক দশকের মধ্যে। কিন্তু বড় ধরনের বস্তুর টেলিপোর্টেশন সত্যি সত্যি কখনো করা সম্ভব হলেও তার জন্য কয়েক দশক থেকে কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত কিংবা তারও চেয়ে বেশি সময় অপেক্ষায় থাকতে হতে পারে। কাজেই জটিল অণু বা ভাইরাস বা জীবন্ত কোষ টেলিপোর্ট করাকে প্রথম শ্রেণির অসম্ভাব্যতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এর মানে, এটা এমন ধরনের অসম্ভব ঘটনা, যা হয়তো এই শতাব্দীর মধ্যেই সম্ভব করে তোলা যাবে। কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র মানুষকে টেলিপোর্ট করা অনুমোদন করলেও তার জন্য লেগে যেতে পারে কয়েক শতাব্দী বা তার চেয়েও বেশি সময়। তবে ধরে নেওয়া যায়, ভবিষ্যতের কোনো একদিন হয়তো এটা করা সম্ভব। তাই এ ধরনের টেলিপোর্টেশনকে আমি দ্বিতীয় শ্রেণির অসম্ভাব্যতা হিসেবে চিহ্নিত করেছি।

তথ্যনির্দেশ

টেলিপোর্টেশনের বাস্তব চিত্র : সায়েন্স ফিকশন মুভির মতো সত্যিকার কোনো মানুষকে টেলিপোর্ট করার ব্যাপারে কোনো তাত্ত্বিক বাধা না থাকলেও এ ক্ষেত্রে কঠিন সব যান্ত্রিক সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে। একটি হিসাব দিলে বিষয়টি পরিষ্কার বোঝা যাবে। হিসাবে দেখা গেছে, সামান্য এককোষী একটি ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়ায় পরমাণুর সংখ্যা ৯×১০১০। মানুষের দেহে কোষের পরিমাণ প্রায় ৩২ ট্রিলিয়ন (৩২-এর পর ১২টি শূন্য)। হিসাবটা বুঝতে সুবিধা হবে, যদি বলি, আমাদের এখন পর্যন্ত জানা মহাবিশ্বে যে পরিমাণ নক্ষত্র আছে, তার চেয়ে মানুষের দেহের কোষ ৩১২ ট্রিলিয়ন বেশি। একটি কোষে যদি ব্যাকটেরিয়ার সমান পরমাণু থাকে, তাহলে মানুষের দেহের মোট পরমাণুর সংখ্যা হিসাব করে দেখুন। যুক্তরাজ্যের লেচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ টেলিপোর্ট করতে গেলে তার প্রতিটি কোষ ভেঙে ডেটায় রূপান্তর করলে তার পরিমাণ হবে প্রায় ২৬×১০৪২ বিট। ফাইবার অপটিক কেবলে এ বিপুল ডেটা পাঠাতে দরকার অতিশক্তিশালী ব্যান্ডউইড আর ১০ ট্রিলিয়ন গিগাওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎশক্তি। মজার ব্যাপার হলো, এই শক্তি দিয়ে পুরো যুক্তরাজ্যে ১০ লাখ বছর বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাবে। এভাবে আস্ত একটা মানুষ টেলিপোর্ট করতে লাগবে কয়েক কোটি বছর।

ম্যাক্রোস্কোপিক : খালি চোখে দেখার জন্য যথেষ্ট বড় কোনো বস্তু। সাধারণত ০.০১ মিলিমিটারের নিচের স্কেলে ব্যবহার করা হয়। এই আয়তনের নিচের স্কেলগুলোকে বলা হয় মাইক্রোস্কোপিক বা অতিক্ষুদ্র।

স্পিন বা ঘূর্ণন : মৌলিক কণাদের অভ্যন্তরীণ ধর্ম। দৈনন্দিন ঘূর্ণন ধারণার সঙ্গে এটি সম্পর্কিত, তবে তা পুরোপুরি এক রকম নয়।

৫. টেলিপ্যাথি

আপনি যদি কোনো একটি দিনের মধ্যে উদ্ভট কিছু খুঁজে না পান, তাহলে সেটি কোনো দিনই নয়।

—জন হুইলার

যারা অদ্ভুত কিছুর চেষ্টা করে যায়, তারাই অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে।

—এম সি অ্যাশার

এ ই ভন ভোগের স্ল্যান উপন্যাসে টেলিপ্যাথির বিপুল সম্ভাবনা ও এর শক্তি সম্পর্কে আমাদের রহস্যময় ভীতি তুলে ধরা হয়েছে।

উপন্যাসের প্রধান চরিত্র জোমি ক্রস এক স্ল্যান। বিলুপ্তপ্রায় সুপারইন্টেলিজেন্ট টেলিপ্যাথ জনগোষ্ঠী হলো স্ল্যান।

ক্ষিপ্ত একদল মানুষের কাছে নিষ্ঠুরভাবে খুন হয় তার বাবা-মা। মানুষগুলো সব রকম টেলিপ্যাথদের ভয় পেত ও ঘৃণাও করত। কারণ, টেলিপ্যাথরা তাদের বিপুল শক্তি কাজে লাগিয়ে মানুষদের ব্যক্তিগত আর সবচেয়ে গোপন চিন্তাভাবনায় হানা দিতে পারত। তাই স্ল্যানদের পশুর মতো নির্দয়ভাবে খুঁজে বেড়াতে লাগল মানুষেরা। মাথা থেকে লতার মতো একধরনের প্রত্যঙ্গ বেরিয়ে থাকত স্ল্যান। সেটা দেখে তাদের সহজে শনাক্ত করা যেত। বইটির কাহিনিতে জোমি অন্য স্ল্যানদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে, যারা হয়তো পালিয়ে মহাকাশে চলে যাবে। কারণ, মানুষেরা ডাইনি শিকার করার মতো তাদেরও পুরোপুরি নির্মূল করতে বদ্ধপরিকর হয়েছিল সেবার।

ঐতিহাসিকভাবে মাইন্ড রিডিং বা মন পড়তে পারার ক্ষমতা এতই গুরুত্বপূর্ণ বলে ভাবা হয়েছে যে, এর সঙ্গে প্রায়ই দেব-দেবীদের জড়িয়ে ফেলা হয়। যেকোনো দেবতার মৌলিক শক্তির অন্যতম হলো অন্যদের মন পড়তে পারার ক্ষমতা আর তাদের গভীর প্রার্থনার উত্তর দেওয়া। অন্যের মন ইচ্ছেমতো পড়তে পারা সত্যিকার টেলিপ্যাথ সহজে সম্পদশালী ও পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি হয়ে উঠতে পারবে। এমনকি সে ওয়ালস্ট্রিট ব্যাংকারদের মনের ভেতর ঢুকে তাদের ব্ল্যাকমেল করতে পারবে। আবার প্রতিদ্বন্দ্বীদেরও দমন করতে পারবে খুব সহজে। কোনো দেশের সরকারের নিরাপত্তার জন্য সে হয়ে উঠবে হুমকি। বিনা আয়াশে সে হাতিয়ে নিতে পারবে জাতির স্পর্শকাতর গোপন তথ্য। স্ল্যানদের মতো তাকেও সবাই ভয় পাবে এবং হয়তো পাকড়াও করা হবে।

আইজাক আসিমভের ফাউন্ডেশন সিরিজকে বলা হয় সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহাকাব্যিক বিজ্ঞান কল্পকাহিনি। এতে এক সত্যিকারের টেলিপ্যাথের বিপুল ক্ষমতা তুলে ধরা হয়েছে। এক গ্যালাকটিক সাম্রাজ্য হাজার বছর শাসনের পর ভেঙে পড়ে ও ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছায়। সেকেন্ড ফাউন্ডেশন নামে বিজ্ঞানীদের এক গুপ্ত সমাজ জটিল সমীকরণ ব্যবহার করে ভবিষ্যদ্বাণী করে, সাম্রাজ্যটির ক্রমে পতন হবে। সুদীর্ঘ ৩০ হাজার বছরের অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে সভ্যতাটি। বিজ্ঞানীরা তাঁদের সমীকরণের ওপর ভিত্তি করে সভ্যতার পতন মাত্র কয়েক হাজার বছরে নামিয়ে আনতে তৈরি করেন বিশদ পরিকল্পনার এক খসড়া। কিন্তু এরপরও বিপর্যয় আঘাত হানে। তাঁদের বিস্তারিত সমীকরণ একটা ঘটনার পূর্বাভাস দিতে ব্যর্থ হয়। সেটি ছিল মিউল নামের এক মিউট্যান্টের জন্ম। অনেক দূর থেকেও অন্যদের মন নিয়ন্ত্রণ করতে পারত মিউল। তাই সে গ্যালাকটিক সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণের দখল করতে সক্ষম হয়। এই টেলিপ্যাথি থামানো না হলে গ্যালাক্সিটি ৩০ হাজার বছরের বিশৃঙ্খলা আর অরাজকতায় ধ্বংস হবে।

বিজ্ঞান কল্পকাহিনিটি টেলিপ্যাথি-সম্পর্কিত দারুণ সব গল্পে ভরা হলেও এর বাস্তবতা অনেক বেশি জাগতিক। কারণ, চিন্তা হলো ব্যক্তিগত ও অদৃশ্য। কয়েক শতাব্দী হাতুড়ে ডাক্তার ও প্রতারকেরা সাধারণ কৌশল খাটিয়ে আমাদের ভদ্রতা ও সরলতার সুযোগ নিয়েছে। ম্যাজিশিয়ান ও মনস্তত্ত্ববিদেরা দর্শকসারি থেকে তাদের ছদ্মবেশী সঙ্গীকে ব্যবহার করেছে। আর এই ছদ্মবেশী সঙ্গীর মনের কথা পড়েছেন মনস্তত্ত্ববিদেরা।

আসলে বেশির ভাগ ম্যাজিশিয়ান ও মনস্তত্ত্ববিদের পেশার ভিত্তি হলো বিখ্যাত হ্যাটের কৌশল। হ্যাটের ভেতরে লোকজন তাদের ব্যক্তিগত কথাবার্তা এক টুকরো কাগজে লিখে জমা রাখে। এরপর প্রতিটি টুকরো কাগজে কী লেখা রয়েছে, তা না দেখে বলে দর্শকদের রীতিমতো চমকে দেন ম্যাজিশিয়ান। এই সুদক্ষ কৌশলের বেশ সরল এক ব্যাখ্যা রয়েছে।

মজার ব্যাপার হলো, ইতিহাসে অন্যতম বিখ্যাত এক টেলিপ্যাথির ঘটনায় কোনো ছদ্মবেশী দর্শক জড়িত ছিল না, জড়িত ছিল একটি প্রাণী। ক্লেভার হ্যান্স নামের একটি ঘোড়া ১৮৯০-এর দিকে ইউরোপিয়ান দর্শকদের বিস্মিত করে। দর্শকদের অবাক করে দিয়ে ক্লেভার হ্যান্স জটিল সব গণিত কষে ফেলতে পারত। কেউ যদি ক্লেভার হ্যান্সকে জিজ্ঞেস করত ৪৮-কে ৬ দিয়ে ভাগ করো, তাহলে ঘোড়াটি ৮ বার খুর দিয়ে শব্দ করত। ক্লেভার হ্যান্স আসলে ভাগ, গুণ, ভগ্নাংশের যোগ, বানান, এমনকি সংগীতের সুরও শনাক্ত করতে পারত। ক্লেভার হ্যান্সের ভক্তরা ঘোষণা করে, অনেক মানুষের চেয়েও সে বুদ্ধিমান বা সে টেলিপ্যাথির মাধ্যমে মানুষের মস্তিষ্ক বেছে নিত।

কিন্তু ক্লেভার হ্যান্স চতুর কৌশলের কিছু ছিল না। ক্লেভার হ্যান্সের পাটিগণিতে দারুণ দক্ষতা তার প্রশিক্ষককেও একসময় বোকা বানায়। ১৯০৪ সালে নামকরা মনোবিজ্ঞানী অধ্যাপক সি স্ট্রাম্পকে ডাকা হয় ঘোড়াটি বিশ্লেষণের জন্য। ঘোড়াটির সঙ্গে কোনো চতুর কৌশল বা ঘোড়াকে সংকেত দেওয়ার কোনো কৌশল জড়িত আছে কি না, তা খুঁজে দেখার দায়িত্ব দেওয়া হয় তাঁকে। এটি করা হয়েছিল জনসাধারণের আগ্রহের কারণে। তিন বছর পর স্ট্রাম্পের শিক্ষার্থী মনোবিজ্ঞানী ওস্কার ফান্সট কিছু কঠিন পরীক্ষা চালান। শেষ পর্যন্ত ক্লেভার হ্যান্সের গোপন রহস্য উদ্ঘাটিত হয়। ঘোড়াটি আসলে তার প্রশিক্ষকের সূক্ষ্ম অভিব্যক্তি খেয়াল করত। প্রশিক্ষকের অভিব্যক্তির সূক্ষ্ম পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত সে পায়ের খুর দিয়ে আঘাত করত। অভিব্যক্তির পরিবর্তন হলে সে খুর চালানো থামাত। ক্লেভার হ্যান্স মানুষের মন পড়তে পারত বা পাটিগণিত করতে পারত; কারণ, সে লোকজনের মুখের তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষক ছিল।

লিখিত ইতিহাসে এ ছাড়া আরও কিছু টেলিপ্যাথিক জীবজন্তুর দেখা মেলে। ১৫৯১ সালের প্রথম দিকে মরক্কো নামের একটি ঘোড়া ইংল্যান্ডে বিখ্যাত হয়ে ওঠে। তার মাধ্যমে ঘোড়ার মালিক ধনী হয় যান। দর্শকসারি থেকে লোক বাছাই করে, বর্ণমালার অক্ষরগুলোর নির্দেশ করে, এক জোড়া ছক্কার সংখ্যাগুলো যোগ করে দেখাত। ঘোড়াটি এতই উত্তেজনা সৃষ্টি করে যে, শেক্সপিয়ার তাঁর লাভ’স লেবার লস্ট নামের এক নাটকে ‘ড্যান্সিং হর্স’ নামে অমর করে রেখেছেন তাকে।

আবার সীমিত অর্থে জুয়াড়িরা মানুষের মন পড়তে পারে। কোনো ব্যক্তি যখন আনন্দদায়ক কিছু দেখে, তখন স্বভাবত তার চোখের তারা বড় হয়। অন্যদিকে অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু দেখলে ওই ব্যক্তির (বা কোনো গাণিতিক হিসাব করলে) চোখের তারা সংকুচিত হয়ে আসে। জুয়াড়িরা তার উল্টো দিকে প্রতিদ্বন্দ্বী খেলোয়াড়ের চোখের তারার এই বড় হওয়া বা সংকুচিত হওয়া দেখে তার আবেগ বুঝতে পারে। জুয়াড়িরা কালো রঙের চশমা পরার অন্যতম কারণ চোখের তারা অন্যদের কাছ থেকে গোপন করা। আবার একটি লেজার রশ্মি কোনো ব্যক্তির চোখের তারায় ফেলে তার প্রতিবিম্ব কোথায় পড়েছে, তা বিশ্লেষণ করে ব্যক্তিটি কোথায় তাকিয়ে আছে, তা নিখুঁতভাবে নির্ধারণ করা যায়। লেজার লাইটের বিন্দুর প্রতিবিম্বের গতি বিশ্লেষণ করে কোনো ব্যক্তি কীভাবে ছবি স্ক্যান করে, তা-ও জানা যায়। এই দুটি প্রযুক্তির সমন্বয়ে কোনো ব্যক্তির ছবি স্ক্যান করার সময় তার অনুমতি ছাড়াই তার আবেগীয় প্রতিক্রিয়া বোঝা যায়।

সাইকিক গবেষণা

টেলিপ্যাথি ও অন্যান্য প্যারানরমাল ঘটনা নিয়ে প্রথম বৈজ্ঞানিক গবেষণা চালায় সোসাইটি ফর সাইকিক্যাল রিসার্চ। ১৮৮২ সালে লন্ডনে গড়ে তোলা হয় এ গবেষণা প্রতিষ্ঠান। (মেন্টাল টেলিপ্যাথি শব্দটি ওই বছর প্রথম ব্যবহার করেন ওই সোসাইটির সহযোগী এফ ডব্লিউ মেয়ার।) সোসাইটির সাবেক প্রেসিডেন্টদের বেশ কজন ছিলেন উনিশ শতকের অন্যতম নামকরা ব্যক্তি। প্রতিষ্ঠানটি এখনো টিকে আছে। অনেক প্রতারকের দাবির স্বরূপ উদ্ঘাটন করতে পেরেছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে বিষয়গুলো প্রায়ই অধ্যাত্মবাদী আর বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করেছে। কারণ, অধ্যাত্মবাদীরা প্যারানরমাল বা অস্বাভাবিক ঘটনায় দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন। অন্যদিকে ওই ঘটনাগুলো নিয়ে বিজ্ঞানীরা আরও বৈজ্ঞানিক গবেষণা করে দেখতে চান।

সোসাইটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক গবেষক ড. জোসেফ ব্যাংক রাইন সাইকিক ঘটনাগুলো নিয়ে প্রথম পদ্ধতিগত ও যথাযথ গবেষণা শুরু করেন। যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনার ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯২৭ সালে রাইন ইনস্টিটিউট (এখন রাইন রিসার্চ সেন্টার নামে পরিচিত) গড়ে তোলেন তিনি। কয়েক দশক ধরে তিনি ও তাঁর স্ত্রী লুইজা প্রথমবারের মতো কিছু বৈজ্ঞানিকভাবে নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষা চালান যুক্তরাষ্ট্রে। এসব পরীক্ষায় বিভিন্ন ধরনের প্যারাসাইকোলজিক্যাল ঘটনা ছিল। সেগুলো কিছু জার্নালে প্রকাশ করা হয়েছে। রাইন তাঁর প্রথম বইতে এক্সট্রাসেন্সরি পারসেপসন বা ইএসপি শব্দটি প্রথম চালু করেন।

রাইনের গবেষণাগার আসলে সাইকিক গবেষণার একটা মানদণ্ড ঠিক করে দিয়েছে। তাঁর সহযোগী ড. কার্ল জেনার পাঁচটি সংকেতের কার্ড সিস্টেম তৈরি করেন। এটি এখন জেনার কার্ড নামে পরিচিত। টেলিপ্যাথিক ক্ষমতা পরীক্ষা করতে এই কার্ড ব্যবহার করা হয়। অধিকাংশ ফলাফলে টেলিপ্যাথির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে অতি অল্পসংখ্যক পরীক্ষা দেখে মনে হয়, ক্ষুদ্র হলেও প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্তের সঙ্গে তাৎপর্যপূর্ণ সম্পর্ক আছে, যেগুলোকে সত্যিকার দৈবঘটনা বলে ব্যাখ্যা করা যায় না। সমস্যা হলো, এই পরীক্ষাগুলো আবার অন্য গবেষকেরা প্রায়ই নতুনভাবে করে দেখতে পারেন না।

রাইন তীব্রভাবে তাঁর খ্যাতি প্রতিষ্ঠার জন্য চেষ্টা করলেও লেডি ওয়ান্ডার নামের এক ঘোড়ার সঙ্গে লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েন। সে কারণে তাঁর খ্যাতি কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঘোড়াটি টেলিপ্যাথির চোখধাঁধানো কিছু কাজ করে দেখাতে পারত। যেমন খেলনা বর্ণমালার ব্লকে পা দিয়ে ঠকঠক শব্দ করা। এভাবে দর্শকেরা মনে মনে যা চিন্তা করে, তাই সে অক্ষরগুলো দিয়ে শব্দ তৈরি করত। আপাতভাবে মনে হয়, রাইন ক্লেভার হ্যান্সের প্রভাব সম্পর্কে কিছু জানতেন না। ১৯২৭ সালে রাইন লেডি ওয়ান্ডারকে বিশদভাবে পরীক্ষা করে সিদ্ধান্তে আসেন, ‘এই টেলিপ্যাথির একমাত্র ব্যাখ্যা হলো, অজ্ঞাত কোনো প্রক্রিয়ায় মানসিক প্রভাব স্থানান্তর করা হচ্ছে। এ ঘটনার সঙ্গে মিলতে পারে, এমন কিছুই পাওয়া যায়নি। আবার ফলাফলের পরিপ্রেক্ষিতে প্রস্তাবিত অন্য কোনো অনুমানও এখানে ধোপে টেকে না।

অবশ্য পরে মিলবোর্ন ক্রিস্টোফার লেডি ওয়ান্ডারের টেলিপ্যাথিক ক্ষমতার সত্যিকার উৎস উদ্ঘাটন করেন। ঘোড়ার মালিক খুব সূক্ষ্মভাবে চাবুকের মাধ্যমে ঘোড়ার কাছে বার্তা পাঠাত। এভাবে লেডি ওয়ান্ডার তার খুর ঠকঠক করা থামাত। (তবে লেডি ওয়ান্ডারের টেলিপ্যাথি ক্ষমতার সত্যিকার উৎস উদ্ঘাটনের পরও রাইন বিশ্বাস করেন, ঘোড়াটির সত্যিই টেলিপ্যাথিক ক্ষমতা ছিল। হয়তো কোনোভাবে তার ওই ক্ষমতা হারিয়ে গেছে। সে কারণে তার মালিক ওই চতুর কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

অবসর নেওয়ার প্রায় দ্বারপ্রান্তে এসে রাইনের খ্যাতি চূড়ান্ত বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। সে সময় তিনি এমন এক উত্তরসূরি খুঁজছিলেন, যে তাঁর ইনস্টিটিউটের সুনাম অক্ষুণ্ণ রাখবে। এ ব্যাপারে আশানুরূপ প্রার্থী ছিলেন ড. ওয়াল্টার লেভি। ১৯৭৩ সালে তাঁকে নিয়োগ দেন রাইন। ক্ষেত্রটিতে ক্রমে উঠতি তারকা হয়ে উঠছিলেন ড. লেভি। কিছুদিন আগে চাঞ্চল্যকর এক গবেষণায় তিনি দেখান, ইঁদুর টেলিপ্যাথিক ক্ষমতার মাধ্যমে কম্পিউটারে জেনারেট হওয়া এলোমেলো সংখ্যা পরিবর্তন করতে পারে। তবে সন্দেহপ্রবণ ল্যাব কর্মীরা একদিন আবিষ্কার করল, পরীক্ষার ফল বদলে দিতে ড. লেভি সবার অজান্তে রাতের বেলা ল্যাবে লুকিয়ে ছিলেন। হাতেনাতে ধরা পড়েন তিনি। আরও পরীক্ষায় দেখা গেল, ইঁদুরের টেলিপ্যাথিক ক্ষমতা নেই। ফলে ড. লেভিকে অসম্মানের সঙ্গে ওই ইনস্টিটিউট থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়।

টেলিপ্যাথি ও স্টার গেট

প্যারানরমাল ঘটনায় আগ্রহের পারদ ভয়াবহ বেড়ে যায় ঠান্ডা যুদ্ধের সময়। সে সময় টেলিপ্যাথি, মননিয়ন্ত্রণ ও দূরবর্তী দর্শন নিয়ে অসংখ্য গোপন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হয়। (অন্যের মন পড়ে শুধু মনের মাধ্যমে দূরের কোনো জায়গায় দেখার পদ্ধতিকে বলা হয় রিমোট ভিউয়িং বা দূরবর্তী দর্শন।) সিআইএর আর্থিক সহায়তায় অসংখ্য গোপন গবেষণার সাংকেতিক নাম ছিল স্টার গেট (যেমন সান স্ট্রেক, গ্রিল ফ্লেম ও সেন্টার লেন)। গবেষণাটি শুরু হয় ১৯৭০ সালে। সিআইএ যখন জানতে পারল, সোভিয়েত ইউনিয়ন সাইকোট্রোনিক গবেষণায় বছরে ৬০ মিলিয়ন রুবল খরচ করছে, তখন এ গবেষণা চালুর সিদ্ধান্ত নেয় তারাও। তাদের আশঙ্কা ছিল, সোভিয়েত হয়তো ইএসপি ব্যবহার করে মার্কিন সাবমেরিন ও সেনাঘাঁটি, গুপ্তচর শনাক্ত করতে ও গোপন নথিপত্র পড়তে পারবে।

সিআইএর জন্য অর্থ বরাদ্দ দেওয়া শুরু হয় ১৯৭২ সালে। মেনলো পার্কের স্ট্যানফোর্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এসআরআই) রাসেল টার্গ ও হ্যারল্ড পুথোফ এর দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। শুরুতে এক সাইকিক ক্যাডারকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল, তিনি যাতে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে যুক্ত হতে পারেন। দুই দশকের বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্র ২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ করে এই স্টার গেটে। সেখানে বেতুনভুক্ত ছিল ৪০ জনের বেশি কর্মী, ২৩ জন রিমোট ভিউয়ার আর তিনজন সাইকিক।

বছরে ৫ লাখ মার্কিন ডলার বাজেট নিয়ে ১৯৯৫ সালের মধ্যে সিআইএ কয়েক শ গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ প্রজেক্ট পরিচালনা করে, যার সঙ্গে কয়েক হাজার রিমোট ভিউয়িং সেশনও ছিল। রিমোট ভিউয়ারদের বিশেষ করে নিচের প্রশ্নগুলো জিজ্ঞেস করা হয়েছিল :

– লিবিয়ার বোমা হামলার আগে ১৯৮৬ সালে কর্নেল গাদ্দাফির অবস্থান শনাক্ত করা

– উত্তর কোরিয়ায় ১৯৯৪ সালে প্লুটোনিয়ামের মজুত খুঁজে বের করা

– ১৯৮১ সালে ইতালিতে রেড ব্রিগেড কর্তৃক অপহৃতদের খুঁজে বের করা

– আফ্রিকায় বিধ্বস্ত সোভিয়েত তু-৯৫ বোমারু বিমানের অবস্থান শনাক্ত করা

১৯৯৫ সালে আমেরিকান ইনস্টিটিউট ফর রিসার্চকে (এআইআর) এই কর্মসূচির মূল্যায়ন করতে বলে সিআইএ। জবাবে এসব কর্মসূচি স্রেফ বন্ধ করার সুপারিশ করে এআইআর। ‘গোয়েন্দাদের কাছে এর কোনো মূল্য আছে বলে এখনো কোনো তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি।’ এআইআরের কর্মকর্তা ডেভিড গসলিন এ কথা লিখেছেন।

স্টার গেটের সমর্থকেরা গর্ব করে, অনেক বছর ধরে ‘এইট মার্টিনি’ ফলাফল অর্জন করেছিল (অর্থাৎ ফলাফল এতই আকর্ষণীয় ছিল যে, তা কাটিয়ে উঠতে আপনাকে আট বার মার্টিনি পান করতে হবে)। তবে সমালোচকেরা বলেন, রিমোট ভিউয়িংয়ের সিংহভাগই অর্থহীন, অপ্রাসঙ্গিক তথ্য তৈরি করে করদাতাদের অর্থ নষ্ট করেছে। আর বাকিরা এতই অস্পষ্ট আর সাধারণ কথা বলেছে যে সেগুলোকে যেকোনো অবস্থার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যায়। এআইআর রিপোর্টে বলা হয়েছে, স্টার গেটের সবচেয়ে চমকপ্রদ ‘সাফল্য’ এমন সব রিমোট ভিউয়াদের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, যাঁরা ইতিমধ্যেই পরিচালিত ওই সব গবেষণার সঙ্গে বেশ পরিচিত ছিলেন। সে কারণে তাঁরা হয়তো আগের শেখা এমন সব অনুমান কাজে লাগান, যেগুলো বেশ যুক্তিযুক্ত বলে মনে হয়।

শেষ পর্যন্ত সিআইএ সিদ্ধান্তে পৌঁছে, স্টার গেট এমন কোনো তথ্যই আবিষ্কার করতে পারেনি, যা দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি কোনো গোয়েন্দা তৎপরতায় কাজে লাগাতে পারে। সে কারণে তারা প্রজেক্টটি বাতিল করে। (গুজব আছে, উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় সাদ্দাম হোসেনের অবস্থান শনাক্ত করতে রিমোট ভিউয়ারদের কাজে লাগিয়েছিল সিআইএ। অবশ্য তাদের সব চেষ্টাই শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছিল। )

ব্রেন স্ক্যান

একই সময় বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, মস্তিষ্কের কাজের পেছনে কিছু পদার্থবিজ্ঞান আছে। উনিশ শতকে তাঁরা সন্দেহ করেন, মস্তিষ্কের ভেতর বৈদ্যুতিক সংকেত স্থানান্তরিত হয়। ১৮৭৫ সালে রিচার্ড কার্টন আবিষ্কার করেন, মাথায় ইলেকট্রোড স্থাপন করে মস্তিষ্ক থেকে নিঃসৃত অতি ক্ষুদ্ৰ বৈদ্যুতিক সংকেত শনাক্ত করা যায়। এটা পরে ইলেকট্রোএনসেফালোগ্রাফের (ইইজি) উদ্ভাবনের দিকে নিয়ে যায়।

তাত্ত্বিকভাবে মস্তিষ্ক একপ্রকার ট্রান্সমিটার, যার মাধ্যমে আমাদের চিন্তা অতি ক্ষুদ্র বৈদ্যুতিক সংকেত ও বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গ রূপে ছড়িয়ে পড়ে। এই সংকেত ব্যবহার করে অন্যের চিন্তা পড়ার কিছু সমস্যাও আছে। প্রথমত, সংকেতগুলো খুব দুর্বল, যা মিলিওয়াট পরিসরের। দ্বিতীয়ত, এ সংকেত অর্থহীন কথাবার্তায় ভরা, যা এলোমেলো গোলমাল থেকে আলাদা করা যায় না। শুধু আমাদের চিন্তার স্কুল তথ্য এই গোলমাল থেকে সংগ্রহ করা যায়। তৃতীয়ত, এসব সংকেতের মাধ্যমে আমাদের মস্তিষ্ক অন্যদের মস্তিষ্ক থেকে একই রকম বার্তা গ্রহণ করতে পারে না। সবশেষে আমরা যদি এই দুর্বল সংকেত কোনোভাবে গ্রহণ করতে পারতাম, তবু সেগুলো বোধগম্য করে তোলা যেত না। সাধারণ নিউটনিয়ান ও ম্যাক্সলিয়ান পদার্থবিদ্যা ব্যবহার করে রেডিওর মাধ্যমে টেলিপ্যাথি সম্ভব বলে মনে হয় না।

অনেকের বিশ্বাস, টেলিপ্যাথি হয়তো পঞ্চম বলের মাধ্যমে কার্যকর হয়। পঞ্চম এ বলের নাম দেওয়া হয়েছে ‘সাই’ বল। কিন্তু প্যারাসাইকোলজির সমর্থকেরাও কবুল করেছেন, তাঁদের কাছে সাই বল সম্পর্কে কোনো সুদৃঢ় ও পুনরায় পরীক্ষা করার মতো প্রমাণ নেই।

তবে এর মাধ্যমে একটি প্রশ্ন উঠে এসেছে : কোয়ান্টাম তত্ত্ব টেলিপ্যাথি সম্পর্কে কী বলে?

গত দশকে নতুন কোয়ান্টাম যন্ত্রপাতির সঙ্গে পরিচিত হয়েছি আমরা। এর মাধ্যমে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো চিন্তাশীল কোনো মস্তিষ্কের ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখতে পেরেছি। শীর্ষস্থানীয় এই কোয়ান্টাম বিপ্লব হলো পিইটি (পজিট্রন-এমিশন টোমোগ্রাফি) এবং এমআরআই (ম্যাগনেটিক রেজোনেন্স ইমেজিং) ব্রেন স্ক্যান। পিইটি (PET) স্ক্যান করা হয় তেজস্ক্রিয় চিনি রক্তে ঢুকিয়ে। এই চিনি মস্তিষ্কের সেসব অংশে ঘনীভূত হয়, যে অংশগুলোর চিন্তা প্রক্রিয়ায় সক্রিয় থাকতে শক্তি দরকার। তেজস্ক্রিয় চিনি পজিট্রন নিঃসরণ করে (অ্যান্টিইলেকট্রন), যা খুব সহজে যন্ত্রপাতি দিয়ে শনাক্ত করা যায়। তাই এভাবে জীবন্ত মস্তিষ্কে প্রতিকণার পথের নকশা বানানো যায়। এভাবে চিন্তার প্যাটার্নও শনাক্ত করা যায়। আবার মস্তিষ্কের কোন অংশ কোন কাজে জড়িত, তা-ও নিখুঁতভাবে আলাদা করা যায়।

এমআরআই (MRI) মেশিনও একইভাবে কাজ করে, পার্থক্য শুধু এটি আরও নিখুঁত। কোনো রোগীর মাথা একটা বড় ডোনাট আকারের চুম্বকীয় ক্ষেত্রের মধ্যে রাখা হয়। চুম্বকীয় ক্ষেত্রটি মস্তিষ্কের ভেতরের পরমাণুর নিউক্লিওগুলোকে ক্ষেত্ররেখায় সমান্তরালভাবে সাজায়। রোগীকে একটা রেডিও পালস পাঠিয়ে এসব নিউক্লিও কম্পিত হয়। নিউক্লিওগুলোর সজ্জা উল্টে গেলে তারা অতি ক্ষুদ্র রেডিও প্রতিধ্বনি নিঃসরণ করে, যা শনাক্ত করা যায়। এর মাধ্যমে কোনো নির্দিষ্ট বস্তুর উপস্থিতি বোঝা যায়। যেমন মস্তিষ্কের সক্রিয়তার সঙ্গে অক্সিজেনের ব্যবহার জড়িত। কাজেই এমআরআই মেশিন অক্সিজেনযুক্ত রক্তের উপস্থিতি শনাক্ত করে চিন্তার প্রক্রিয়া আলাদা করতে পারে। যেখানে অক্সিজেনযুক্ত রক্ত যত বেশি ঘনীভূত হবে, মস্তিষ্কের ওই অংশে মানসিক সক্রিয়তা তত বেশি হয়। (বর্তমানে ফাংশনাল এমআরআই মেশিন [fMRI ] মস্তিষ্কের অতি ক্ষুদ্র এলাকায় সেকেন্ডের ভগ্নাংশ সময়ে ১ মিলিমিটারজুড়ে অক্সিজেনযুক্ত রক্তের উপস্থিতি শনাক্ত করতে পারে। এ কারণে জীবন্ত মস্তিষ্কে চিন্তার ধরন শনাক্ত করতে এই যন্ত্রগুলো আদর্শ হয়ে উঠেছে।)

এমআরআই লাই ডিটেক্টর

এমআরআই মেশিন ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা একদিন হয়তো জীবন্ত মস্তিষ্কের বিস্তৃত রূপরেখার পাঠোদ্ধার করতে পারবেন। মাইন্ড রিডিংয়ের সাধারণ পরীক্ষার মাধ্যমে কেউ মিথ্যা বলছে কি না, তা-ও নির্ধারণ করা যাবে।

কিংবদন্তি অনুসারে, কয়েক শতাব্দী আগে বিশ্বের প্রথম মিথ্যা ধরার যন্ত্রটি তৈরি করেছিলেন ভারতের এক পুরোহিত। তিনি সন্দেহভাজনকে ও একটি জাদুকরি গাধা একটি তালাবদ্ধ ঘরে রাখতেন। এরপর সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে জাদুকরি গাধার লেজ টানার নির্দেশ দেওয়া হতো। এতে গাধাটি যদি কথা বলতে শুরু করে, তার মানে সন্দেজভাজন ব্যক্তি মিথ্যাবাদী। অন্যদিকে গাধাটি নীরব থাকার মানে সন্দেহভাজন ব্যক্তি সত্যি কথা বলছে। (তবে পুরোহিত গোপনে গাধার লেজে কালি মাখিয়ে দিতেন।)

সন্দেহভাজন লোকটিকে ঘর থেকে বের করে আনার পর স্বাভাবিকভাবে সে নিজেকে নির্দোষ বলে দাবি করত। কারণ, গাধাটির লেজ টানার সময় গাধাটি কথা বলে না। কিন্তু পুরোহিত সন্দেহভাজনের হাত পরীক্ষা করে দেখতেন। তার হাতে কোনো কালি লেগে না থাকলে বোঝা যেত সে মিথ্যা বলছে। (মাঝেমধ্যে মিথ্যা ধরার যন্ত্র ব্যবহারের হুমকিও খোদ যন্ত্রটি ব্যবহারের চেয়ে বেশি কার্যকর হতো।)

আধুনিক কালের জাদুকরি গাধা তৈরি করা হয় ১৯১৩ সালে। মনোবিজ্ঞানী উইলিয়াম মার্সটন এক লোকের রক্তচাপ পর্যবেক্ষণের কথা উল্লেখ করে লিখেছেন, মিথ্যা বলার সময় রক্তচাপ বেড়ে যায়। (রক্তচাপ সম্পর্কে এই পর্যবেক্ষণ আসলে আরও অনেককাল আগের। সেকালে কোনো সন্দেহভাজনকে প্রশ্ন করার সময় তদন্তকারী তার হাত ধরে রাখত।) এ ধারণাটি কাজে লাগানো হয়েছিল বেশ দ্রুতই। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগও শিগগিরই নিজস্ব পলিগ্রাফ ইনস্টিটিউট গড়ে তোলে।

কয়েক বছর পর স্পষ্ট বোঝা গেল, সাইকোপ্যাথরা মিথ্যা ধরার যন্ত্রকে বোকা বানাতে পারে। কারণ, নিজেদের কর্মকাণ্ডের জন্য তাদের মধ্যে কোনো অনুশোচনা নেই। সবচেয়ে বিখ্যাত ঘটনাটি ছিল সিআইএর ডাবল এজেন্ট অ্যালড্রিম আমেসের। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছ থেকে তিনি বিপুল অর্থ পকেটস্থ করেন। আবার অসংখ্য মার্কিন এজেন্ট হত্যা ও মার্কিন নিউক্লিয়ার নেভির গুপ্ত খবর পাচার করতেন তিনি। বেশ কয়েক দশক সিআইএর একের পর এক লাই ডিটেক্টর পরীক্ষায় পার পেয়ে যাচ্ছিলেন আমেস। একইভাবে পার পেয়ে যাচ্ছিলেন সিরিয়াল কিলার গ্যারি রিজওয়ে। গ্রিন রিভার কিলার হিসেবে কুখ্যাত গ্যারি অন্তত ৫০ নারীকে হত্যা করেছিলেন।

২০০৩ সালে মার্কিন ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস একটি লাই ডিটেক্টরের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে কোনো লাই ডিটেক্টরকে বোকা বানানোর ও নির্দোষ মানুষকে মিথ্যাবাদী হিসেবে চিহ্নিত করার সব উপায়ের তালিকা করা হয়।

তবে লাই ডিটেক্টর যদি শুধু দুশ্চিন্তার মাত্রা পরিমাপ করে, তাহলে মস্তিষ্ক পরিমাপের ব্যাপারটি কী? মিথ্যা ধরার মাধ্যমে মস্তিষ্কের কার্যকলাপ খতিয়ে দেখার ধারণার সূচনা হয় ২০ বছর আগে। নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির পিটার রোসেনফেল্ডের গবেষণার মাধ্যমে। পর্যবেক্ষণে তিনি দেখতে পান, মানুষের মিথ্যা বলার প্রক্রিয়ায় ইইজি স্ক্যানে আলাদা প্যাটার্ন দেখা যায়। ওই মানুষ যখন সত্য কথা বলে, তার তুলনায় পি৩০০ ওয়েভে এই প্যাটার্নের পার্থক্য পাওয়া যাচ্ছে। (মস্তিষ্ক যখন কোনো অভিনব বা সাধারণের বাইরে কোনো কিছুর মুখোমুখি হয়, তখন প্রায়ই এই পি৩০০ ওয়েভ উদ্দীপিত হয়।)

এমআরআই স্ক্যান ব্যবহার করে মিথ্যা শনাক্তের ধারণাটি এসেছে পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ড্যানিয়েল ল্যাংলেবেনের মাথা থেকে। ১৯৯৯ সালে তিনি খবরের কাগজে এক খবর দেখতে পান। সেখানে বলা হয়, যেসব শিশু মনোযোগের ঘাটতিজনিত সমস্যায় ভুগছে, তারা মিথ্যা বলতেও সমস্যায় পড়ছে। কিন্তু অভিজ্ঞতা থেকে তিনি জানতেন, তথ্যটা ভুল। এ রকম শিশুদের মিথ্যা বলতে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। আসলে সত্যকে বাধা দিতে সমস্যা হয়েছিল তাদের। ‘তারা শুধু ঝোঁকের মাথায় সবকিছু বলে ফেলেছিল।’ স্মৃতিচারণা করে বলেন ল্যাংলেবেন। তিনি অনুমান করেন, মিথ্যা বলার সময় মস্তিষ্ক প্রথমে সত্য বলা থেকে নিজেকে থামিয়ে দেয় ও তারপর ছলচাতুরীর আশ্রয় নেয়। তিনি বলেন, ‘আপনি অনর্গল মিথ্যা কথা বলেন, তখন আপনাকে সত্যের কথা মাথায় রাখতেই হবে। কাজেই এতে বোঝা যায়, এতে মস্তিষ্কের সক্রিয়তা আরও বাড়ে।’ অন্য কথায়, মিথ্যা বলা বেশ পরিশ্রমের কাজ।

কলেজশিক্ষার্থীদের পরীক্ষার মাধ্যমে ও তাদের মিথ্যা কথা বলার অনুরোধ জানানোর মাধ্যমে, ল্যাংলেবেন শিগগিরই দেখতে পান, মিথ্যা বলার সময় মস্তিষ্কের বেশ কিছু জায়গায় সক্রিয়তা বেড়ে যায়। এর মধ্যে রয়েছে ফ্রন্টাল লোব (এখানে উচ্চতর চিন্তা ঘনীভূত হয়), টেম্পোরাল লোব ও লিম্বিক সিস্টেম (এখানে আবেগগুলো প্রক্রিয়াজাত হয়)। বিশেষত, সামনের সিঙ্গুলেট জাইরাসে (এটি সংঘাতের সমাধান ও প্রতিক্রিয়া প্রতিরোধের সঙ্গে সম্পর্কিত) অস্বাভাবিক কার্যকলাপ খেয়াল করেন তিনি।

কেউ মিথ্যা বলছে, নাকি বলছে না, তা নির্ধারণে কিছু নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষা চালান তিনি। এসব পরীক্ষা বিশ্লেষণে সংগতিপূর্ণ সফলতার হার ৯৯ শতাংশ পাওয়ার দাবি করেন (যেমন কলেজশিক্ষার্থীদের তিনি বিভিন্ন তাসের পরিচয় সম্পর্কে মিথ্যা কথা বলতে বলেছিলেন)।

প্রযুক্তিটিতে আগ্রহ এতই সুস্পষ্ট যে এই সেবা জনসাধারণকে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে দুটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। ‘নো লাই এমআরআই’ নামের এক কোম্পানি তাদের প্রথম কেসটি গ্রহণ করে ২০০৭ সালে। এক ব্যক্তি তাঁর ইনস্যুরেন্স কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা করে বসেন। কারণ, কোম্পানির দাবি, তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁর খাবারের দোকানে আগুন দিয়েছেন। (এফএমআরআই স্ক্যানে দেখা গেছে, তিনি আসলে আগুন জ্বালাননি।)

ল্যাংলেবেনের কৌশলের সমর্থকদের দাবি, আগের জমানার লাই ডিটেক্টরের তুলনায় এ কৌশল অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য। কারণ, মস্তিষ্কের প্যাটার্ন পাল্টানো আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে। যেসব মানুষ নিজের পালস রেট আর ঘামের নিয়ন্ত্রণ করার প্রশিক্ষণ নিতে পারে, তারাও নিজের মস্তিষ্কের প্যাটার্ন নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। এর সমর্থকেরা ইঙ্গিত করেছেন, ক্রমবর্ধমান সন্ত্রাসবাদের এই যুগে এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসীদের শনাক্ত করার মাধ্যমে অগণিত মানুষের জীবন বাঁচাতে পারবে।

মিথ্যা শনাক্তে এ প্রযুক্তির আপাতসফলতার হার দাবি সত্ত্বেও সমালোচকেরা ইঙ্গিত করেন, এফএমআরআই আসলে মিথ্যা ধরতে পারে না। তাঁদের দাবি, কেউ যখন মিথ্যা কথা বলে, তখন এ প্রযুক্তি শুধু তার মস্তিষ্কের সক্রিয়তা বাড়িয়ে দেয়। আবার যন্ত্রটি ভুল ফলাফলও দিতে পারে। যেমন কোনো ব্যক্তি যদি সত্য কথা বলার সময় খুব দুশ্চিন্তায় থাকে, তাহলে এ রকম ভুল ফলাফল পাওয়া যাবে। এফএমআরআই শুধু কোনো ব্যক্তির দুশ্চিন্তা শনাক্ত করতে পারে এবং ভুলভাবে দেখায় যে তিনি মিথ্যা কথা বলছেন। ‘ছলচাতুরী থেকে সত্যকে আলাদা করতে পরীক্ষার ব্যাপারে তীব্র আকাঙ্ক্ষা বিজ্ঞানে নিন্দিত হবে,’ বলে সতর্ক করেছেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোবায়োলজিস্ট স্টিভেন হাইম্যান।

কিছু সমালোচকের দাবি, সত্যি টেলিপ্যাথের মতো সত্যিকার লাই ডিটেক্টর সাধারণ সামাজিক মিথস্ক্রিয়াকে অস্বস্তির মুখে ঠেলে দেবে। কারণ, নির্দিষ্ট পরিমাণ মিথ্যা একটি সমাজে তৈলাক্ত গ্রিজের মতো কাজ করে, যা সমাজের চাকা সচল রাখতে সহায়তা করে। আমাদের বস, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, স্বামী বা স্ত্রী, প্রেমিকা ও সহকর্মীদের যে প্রশংসা করি, তা যদি কোনোভাবে মিথ্যা প্রতিপন্ন হয়, তাহলে আমাদের সম্মান হয়তো মুহূর্তেই ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। সত্যি লাই ডিটেক্টর আমাদের পারিবারিক সব গোপনীয়তা, গুপ্ত আবেগ, অবদমিত ইচ্ছা ও গোপন পরিকল্পনা ফাঁস করে দিতে পারে। বিজ্ঞান কলামিস্ট ডেভিড জোনস বলেন, প্রকৃত লাই ডিটেক্টর পারমাণবিক বোমার মতো। একে চূড়ান্ত অস্ত্র হিসেবে সংরক্ষিত রাখাই ভালো। একে যত্রতত্র মোতায়েন করা হলে সামাজিক জীবন অসম্ভব হয়ে উঠবে।’

সর্বজনীন অনুবাদক

চিন্তারত মস্তিষ্কের চমকপ্রদ ছবির ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের স্ক্যান সম্পর্কে অনেকে যথাযথ সমালোচনা করেছেন। কারণ, বিচ্ছিন্ন, স্বতন্ত্র চিন্তা পরিমাপে এগুলো সাধারণভাবে খুব স্থূল। আমরা যখন সরল কোনো মানসিক কাজ করি, তখন সম্ভবত কয়েক লাখ নিউরন একসঙ্গে সক্রিয় হয়। এফএমআরআই এই কর্মকাণ্ডকে শুধু একটি ফুটকি হিসেবে পর্দায় ফুটিয়ে তোলে। মস্তিষ্ক স্ক্যানকে প্রচণ্ড হইচইপূর্ণ কোনো ফুটবল খেলায় উপস্থিত হয়ে পাশে বসে থাকা কোনো ব্যক্তির কথা শোনার চেষ্টার সঙ্গে তুলনা করেছেন এক মনোবিজ্ঞানী। হাজার হাজার দর্শকের গোলমালে ওই ব্যক্তির শব্দ হারিয়ে যায়। যেমন কোনো এফএমআরআই মেশিন দিয়ে নির্ভরযোগ্যভাবে বিশ্লেষণ করা সম্ভব মস্তিষ্কের ক্ষুদ্রতম অংশকে বলা হয় ভোক্সেল। কিন্তু প্রতিটি ভোক্সেল কয়েক মিলিয়ন নিউরনের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। তাই কোনো ব্যক্তির চিন্তাকে আলাদা করার জন্য এফএমআরআই মেশিনের সংবেদনশীলতা যথেষ্ট ভালো নয়।

বিজ্ঞান কল্পকাহিনিতে মাঝেমধ্যে ইউনিভার্সেল ট্রান্সলেটর বা সর্বজনীন অনুবাদক দেখানো হয়। এই যন্ত্র কোনো ব্যক্তির চিন্তা পড়তে পারে। এরপর তা সরাসরি ঢুকিয়ে দিতে পারে অন্য আরেকজনের মনে। কিছু সায়েন্স ফিকশন উপন্যাসে এলিয়েন টেলিপ্যাথরা তাদের চিন্তা আমাদের মনে ঢুকিয়ে দেয়। আমাদের ভাষা না বুঝলেও কাজটা করতে পারে এলিয়েনরা। ১৯৭৬ সালে নির্মিত সায়েন্স ফিকশন সিনেমা ফিউচারওয়ার্ল্ড-এ এক মহিলার স্বপ্ন টিভি পর্দায় সরাসরি দেখানো হয়েছিল। ২০০৪ সালে জিম ক্যারির এটারনাল সানসাইন অব দ্য স্পটলেস মাইন্ড সিনেমায় দেখা যায়, চিকিৎসকেরা যন্ত্রণাদায়ক স্মৃতি চিহ্নিত করে সেগুলো মুছে ফেলছেন।

‘এ ক্ষেত্রটি নিয়ে সবার মধ্যে এ রকম ফ্যান্টাসি রয়েছে’, এমন মন্তব্য করেন জার্মানির লিপজিগের ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউটের নিউরোসায়েন্টিস্ট জন হাইনেস। ‘তবে আপনি যদি ও রকম কোনো যন্ত্র বানাতে চান, তাহলে আমি নিশ্চিত, আপনাকে প্রতিটি নিউরন নিয়ে আলাদা কাজ শুরু করতে হবে।’

একটি নিউরন থেকে আসা সংকেত শনাক্ত করা যায় না বলেই এখন কিছু মনোবিজ্ঞানী পরবর্তী বড় কাজটি করার চেষ্টা করছেন। সেটি হলো আলাদা বস্তুর কারণে সৃষ্ট এফএমআরআই প্যাটার্নকে আলাদা করা ও গোলমাল কমিয়ে আনা। যেমন, আলাদা শব্দের জন্য সৃষ্ট এফএমআরআই প্যাটার্ন শনাক্ত করা হয়তো সম্ভব হবে। তারপর ‘চিন্তার অভিধান’ বানানো যাবে।

নির্বাচিত কিছু ছোট বস্তুর (যেমন কার্পেন্ট্রি যন্ত্রপাতি) সৃষ্ট এফএমআরআই প্যাটার্ন শনাক্ত করতে পেরেছেন কার্নেগি-মেলোসন বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্সেল এ জাস্ট। তাঁর দাবি, ‘আমাদের কাছে ১২টি ধরন আছে। এই ১২টি ধরনের মধ্যে কোনটি ভাবনার সঙ্গে জড়িত, তা ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ নির্ভুলভাবে নির্ণয় করা যায়।’

তাঁর সহকর্মী কম্পিউটারবিজ্ঞানী টম মিশেল নির্দিষ্ট পরীক্ষায় এফএমআরআই স্ক্যানের মাধ্যমে পাওয়া মস্তিষ্কের জটিল প্যাটার্ন শনাক্ত করতে নিউরাল নেটওয়ার্কের মতো কম্পিউটার প্রযুক্তি ব্যবহার করেছেন। তিনি বলেন, ‘একটি পরীক্ষা আমার খুব পছন্দের, সেটি হলো শব্দ খোঁজা এটি মস্তিষ্কের সবচেয়ে স্বাতন্ত্র্যমূলক কার্যকলাপ তৈরি করে।

কিন্তু আমরা কখনো চিন্তার অভিধান তৈরি করতে পারলেও সর্বজনীন অনুবাদক তৈরি করা আরও বহু দূরের ব্যাপার। সর্বজনীন অনুবাদক আমাদের মন থেকে আরেকজনের মনের ভেতর সরাসরি চিন্তা ঢুকিয়ে দিতে পারবে। কিন্তু এফএমআরআই মেন্টাল ট্রান্সলেটরকে অনেকগুলো কঠিন ধাপ পার হতে হবে। প্রথমে নির্দিষ্ট এফএমআরআই প্যাটার্ন চিনে সেগুলো ইংরেজিতে রূপান্তর করতে হবে। তারপর ইংরেজি শব্দগুলোকে ঢুকিয়ে দিতে হবে লক্ষ্যবস্তুতে। এই অর্থে, এ ধরনের কোনো যন্ত্র স্টার ট্রেকে দেখা ‘মাইন্ড মেল্ড’-এর সঙ্গে কোনোক্রমেই মিলবে না (কিন্তু তারপরও এটি স্ট্রোক আক্রান্তদের জন্য খুবই উপকারী হয়ে উঠবে)।

হাতে বহনযোগ্য এমআরআই স্ক্যানার

এত কিছুর পরও প্রমাণ সাইজের এফএমআরআই মেশিন কার্যক্ষেত্রে টেলিপ্যাথির ক্ষেত্রে আরেকটি বড় বাধা। যন্ত্রটি অনেক বড়, আবার এর দামও কয়েক মিলিয়ন ডলার। যন্ত্রটি পুরো একটি ঘরের জায়গা দখল করে আর ওজন কয়েক টন। এমআরআই মেশিনের প্রধান অংশ হলো বিশাল ডোনাট আকৃতির ম্যাগনেট, যার ব্যাস কয়েক মিটার। এ অংশটি কয়েক টেসলার বিপুল পরিমাণ ম্যাগনেটিক ফিল্ড বা চুম্বকীয় ক্ষেত্র তৈরি করে। (চুম্বকীয় ক্ষেত্রটি এতই বিশাল যে দুর্ঘটনাক্রমে যন্ত্রটি চালু হওয়ায় হাতুড়ি ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ বাতাসে উড়ে গিয়ে একবার কয়েকজন কর্মী গুরুতর আহত হয়েছিল।)

সে কারণে সম্প্রতি নতুন এক প্রযুক্তির প্রস্তাব দিয়েছেন প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির পদার্থবিদ ইগর সাভুকোভ ও মাইকেল রোমালিস। হয়তো একদিন এটি হাতে বহনযোগ্য এমআরআই মেশিনের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারবে। সেই সঙ্গে এফএমআরআই মেশিনের দাম কমিয়ে দিতে পারবে এক শ ভাগের এক ভাগ। তাঁদের দাবি, বিশাল আকৃতির এমআরআই চুম্বকের বদলে সুপারসেনসিটিভ পারমাণবিক ম্যাগনেটোমিটার ব্যবহার করা হবে। অতি ক্ষুদ্র চুম্বকীয় ক্ষেত্র শনাক্ত করতে পারবে এই ম্যাগনেটোমিটার।

হিলিয়াম গ্যাসের মধ্যে রাখা উত্তপ্ত পটাশিয়াম বাষ্প থেকে প্রথমে একটি চুম্বকীয় সেন্সর তৈরি করেছেন সাভুকোভ ও রোমালিস। পরে পানির নমুনায় (মানবদেহের অনুকরণ করতে) একটি দুর্বল চুম্বকীয় ক্ষেত্র ব্যবহার করে ওই পানিতে রেডিও পালস পাঠান তাঁরা। এতে পানির অণু কম্পিত হয়। কম্পিত পানির অণু প্রতিধ্বনিত হয়ে পটাশিয়াম ইলেকট্রনগুলোও একইভাবে কম্পিত করবে। এই কম্পন শনাক্ত করা যাবে আরেকটি লেজার দিয়ে। এভাবে তাঁরা এক গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল পান : দুর্বল চুম্বকীয় ক্ষেত্রও প্রতিধ্বনি তৈরি করতে পারে, যা সেন্সর শনাক্ত করতে পারে। এর মাধ্যমে প্রমাণ সাইজের দানবীয় চুম্বকীয় ক্ষেত্রকে দুর্বল ক্ষেত্র দিয়ে প্রতিস্থাপন করা যাবে। শুধু তা-ই নয়, মুহূর্তেই ছবি তুলতে পারবে এটি (যেখানে প্রতিটি ছবি তুলতে এমআরআই মেশিনের লাগে অন্তত ২০ মিনিট)।

তাঁরা তত্ত্ব দিয়েছেন, এমআরআইয়ে ছবি তোলা একসময় ডিজিটাল ক্যামেরার মতো সহজ হয়ে যাবে। (তবে এ ক্ষেত্রে কিছু বাধাও রয়েছে। একটি সমস্যা হলো, যার ছবি তোলা হবে ও মেশিন দুটোকেই বাইরে বিচ্যুত হওয়া চুম্বকক্ষেত্রগুলো থেকে রক্ষা করতে হবে।)

এমআরআই মেশিন যদি বাস্তবে পরিণত হয়, তাহলে তাদের হয়তো ছোট আকারের কম্পিউটারের সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট বাক্যাংশ, শব্দ বা বাক্য ডিকোড করতে সক্ষম সফটওয়্যার লোড করা যাবে। এ ধরনের যন্ত্র হয়তো বিজ্ঞান কল্পকাহিনিগুলোতে দেখানো অত্যাধুনিক টেলিপ্যাথিক যন্ত্রের মতো অতটা সূক্ষ্ম না হলেও তার কাছাকাছি কিছু একটা হবে।

নিউরাল নেটওয়ার্ক হিসেবে মস্তিষ্ক

কিন্তু ভবিষ্যতের বৈপ্লবিক কোনো এমআরআই মেশিন কি কোনো দিন প্রকৃত টেলিপ্যাথির মতো একেবারে প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি ছবিসহ আমাদের ভাবনা নিখুঁতভাবে পড়তে পারবে? তা এখনো পরিষ্কার নয়। অনেকের যুক্তি, এমআরআই মেশিন আমাদের চিন্তাভাবনার শুধু অস্পষ্ট রূপরেখা পাঠোদ্ধার করতে পারবে। কারণ, আমাদের মস্তিষ্ক সত্যিকার কম্পিউটার নয়। একটি ডিজিটাল কম্পিউটারে গণনা নির্দিষ্ট এলাকায় সীমাবদ্ধ। আবার এটি খুব কঠোর কিছু নিয়মকানুন মেনে চলে। অন্যদিকে ডিজিটাল কম্পিউটার টুরিং মেশিনের সূত্র মেনে চলে। টুরিং মেশিন এমন এক মেশিন, যার মধ্যে থাকে একটি সেন্ট্রাল প্রসেসিং ইউনিট (সিপিইউ), ইনপুট ও আউটপুট। একটি সেন্ট্রাল প্রসেসর (যেমন পেন্টিয়াম চিপ) ইনপুটের একটি নির্দিষ্টসংখ্যক সেট সম্পাদন করতে পারে ও তা থেকে একটি আউটপুট তৈরি করে। সে কারণে ‘চিন্তাভাবনা’ সিপিইউতেই স্থানীয়ভাবে সীমাবদ্ধ।

অন্যদিকে আমাদের মস্তিষ্ক ডিজিটাল কম্পিউটার নয়। আমাদের মস্তিষ্কে কোনো পেন্টিয়াম চিপ, সিপিইউ, উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেম ও সাবরুটিন নেই। কম্পিউটারের সিপিইউ থেকে কোনো ট্রানজিস্টর সরিয়ে ফেলা হলে, তা বিকল হয়ে যেতে পারে। কিন্তু অতীতে বেশ কিছু ঘটনায় দেখা গেছে মানুষের মস্তিষ্কের অর্ধেক অংশ অকেজো হয়ে গেলেও বাকি অর্ধেক অংশ দায়িত্ব নিতে পারে।

মানুষের মস্তিষ্কের সঙ্গে আসলে লার্নিং মেশিনের বেশি মিল। অর্থাৎ এটি নিউরাল নেটওয়ার্ক, যা নতুন কোনো কাজ শেখার পর অনবরত তার নিজের সঙ্গে নতুন করে সংযোগ স্থাপন করে। এমআরআই গবেষণায় নিশ্চিত হওয়া গেছে, মস্তিষ্কের ভেতরে চিন্তাভাবনা টুরিং মেশিনের মতো কোনো নির্দিষ্ট এক জায়গায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা মস্তিষ্কজুড়ে ছড়িয়ে থাকে। এটি আসলে নিউরাল নেটওয়ার্কের বৈশিষ্ট্য। এমআরআই স্ক্যানে দেখা গেছে, চিন্তাভাবনা অনেকটা পিংপং খেলার মতো। এতে মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ ক্রমান্বয়ে আলোকিত হয় এবং মস্তিষ্কের চারপাশে বৈদ্যুতিক সক্রিয়তা ওঠানামা করে।

মস্তিষ্কের অনেকগুলো অংশে চিন্তাভাবনা ছড়ানো ও বিক্ষিপ্ত থাকে। সে কারণে বিজ্ঞানীরা সর্বোচ্চ যেটুকু করতে পারবেন, তা হলো ভাবনার একটি অভিধান সংকলন করা। সেটি হবে নির্দিষ্ট চিন্তাভাবনা ও নির্দিষ্ট ইইজি বা এমআরআইয়ের প্যাটার্নের মধ্যে সাদৃশ্য স্থাপন করা। অস্ট্রিয়ান বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ার গার্ট ফুটচেলার একটি কম্পিউটারকে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট প্যাটার্ন ও চিন্তাভাবনা চেনার জন্য প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। সে জন্য ইইজিতে পাওয়া। বা মাইক্রো তরঙ্গের দিকে নজর দেন তিনি। আপাতদৃষ্টিতে . তরঙ্গ নির্দিষ্ট পেশির নড়াচড়ার ইচ্ছার সঙ্গে সম্পর্কিত। তিনি তাঁর রোগীদের একটি আঙুল তুলতে, হাসতে বা ভ্রুকুটি করতে বলেন। এ সময় কোনো μ তরঙ্গ সক্রিয় তা রেকর্ড করা হয় কম্পিউটারে। প্রতিবার রোগীরা কোনো মানসিক কাজ করলে কম্পিউটার বেশ সতর্কভাবে μ তরঙ্গের প্যাটার্ন রেকর্ড করে। এই প্রক্রিয়া বেশ কঠিন ও ক্লান্তিকর। কারণ, আপনাকে বেশ সতর্কভাবে কৃত্রিম তরঙ্গ তৈরি করে যেতেই হবে। তবে ফুর্টচেলার এভাবে সরল নড়াচড়া আর মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট প্যাটার্নের মধ্যে মিল খুঁজে বের করতে পেরেছেন।

এমআরআইয়ের ফলাফলের সঙ্গে যুক্ত করে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রচেষ্টা হয়তো চিন্তাভাবনার বিশদ অভিধান তৈরির পথে নিয়ে যাবে। ইইজি বা এমআরআই স্ক্যানের নির্দিষ্ট প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করে একটি কম্পিউটার হয়তো প্যাটার্নগুলো শনাক্ত করতে ও কোনো ব্যক্তি কী চিন্তা করছে, তা-ও উদ্‌ঘাটন করতে পারবে। অন্তত সাধারণ অর্থেও এটি সত্য হতে পারে। এ ধরনের ‘মাইন্ড রিডিং’ নির্দিষ্ট ↓ তরঙ্গ ও এমআরআই স্ক্যানের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করবে। কিন্তু অভিধানটি আপনার চিন্তাকে নির্দিষ্ট শব্দে চিহ্নিত করতে পারবে কি না, সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েই যায়।

চিন্তার বিচ্ছুরণ

মোটাদাগে বলা যায়, আমরা যদি কোনো দিন অন্য কারও চিন্তার রূপরেখা পড়তে পারি, তাহলে এর বিপরীতও কি করা সম্ভব? অর্থাৎ আপনার চিন্তাভাবনা কি অন্য কারও মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া যাবে? উত্তর হ্যাঁ হবে বলে মনে হয়। বেতার তরঙ্গ সরাসরি মানুষের মস্তিষ্কের ভেতরে ছুড়ে দেওয়া যায়। আমাদের জানা মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কাজ নিয়ন্ত্রণকারী এলাকা উত্তেজিতও করা যায় এর মাধ্যমে।

গবেষণাটি শুরু হয় ১৯৫০-এর দশকে। মৃগীরোগীদের মস্তিষ্কে কানাডার নিউরোসার্জন ওয়াল্ডার পেনফিল্ডের সার্জারির মাধ্যমে এটি শুরু হয়। তিনি দেখতে পান, ইলেকট্রোড দিয়ে মস্তিষ্কের টেম্পোরাল লোবের নির্দিষ্ট এলাকায় উত্তেজিত করা হলে মানুষ অদ্ভুত কথাবার্তা শুনতে পায়। আবার ভূতের মতো কিছু অপচ্ছায়াও দেখতে পায় তারা।

মনোবিজ্ঞানীরা আগে থেকে জানতেন, মস্তিষ্কে মৃগীরোগ-সংক্রান্ত আঘাতের কারণে অতিপ্রাকৃত শক্তি কাজ করছে বলে অনুভব করে রোগীরা তারা মনে করে, শয়তান ও দেবদূতেরা তাদের চারপাশের ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করছে। (মনোবিজ্ঞানীরা তত্ত্ব দিলেন, মস্তিষ্কের এই এলাকা উত্তেজিত করা হলে হয়তো একই রকম অভিজ্ঞতা হয়, যা বিভিন্ন ধর্মের ভিত্তি। অনেকের সন্দেহ, ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ফরাসি সেনাবাহিনীকে একা হাতে বিজয় এনে দেওয়া জোয়ান অব আর্ক হয়তো মাথায় কোনো আঘাতের কারণে এমন কোনো রোগে ভুগছিল।)

এ অনুমানের ভিত্তিতে অন্টারিওর সুদবুরির নিউরোসায়েন্টিস্ট মাইকেল পারসিঙ্গার তার দিয়ে সংযুক্ত এক বিশেষ ধরনের হেলমেট বানিয়েছেন। এটি এমনভাবে ডিজাইন করা, যাতে রেডিও ওয়েভ মস্তিষ্কের ভেতর ছুড়ে দিয়ে ধর্মীয় অনুভূতির মতো বিশেষ ধরনের চিন্তা ও আবেগ টেনে বের করে আনা যায়। নিউরোসায়েন্টিস্টরা জানেন, বাঁ দিকের টেম্পোরাল লোবের নির্দিষ্ট ধরনের আঘাতের কারণে মস্তিষ্কের বাঁ পাশ এলোমেলো হয়ে যেতে পারে। আবার এতে মস্তিষ্কের ডান গোলার্ধ থেকে আসা কর্মকাণ্ডগুলোকে ‘আরেকজনের’ কাছ থেকে আসছে বলে মনে হতে পারে। এই আঘাতের কারণে এমন অনুভূতিও জন্মাতে পারে, ঘরে ভূতের মতো কোনো আত্মা ঘোরাফেরা করছে। কারণ, তখন মস্তিষ্ক, নিজেরই অন্য পাশের উপস্থিতি বেমালুম ভুলে যায়। কোনো ব্যক্তির বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে তার মস্তিষ্কের অন্য গোলার্ধের কর্মকাণ্ডকে শয়তান, দেবদূত, ভিনগ্রহের প্রাণী কিংবা ঈশ্বর বলেও ভাবতে পারে।

ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় সংকেতকে নিখুঁতভাবে মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশে ছুড়ে দেওয়া যাবে, যা দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে নির্দিষ্ট কাজ। এ ধরনের সংকেত অ্যামিগডালাতে ছুড়ে দিয়ে টেনে বের করে আনা যাবে নির্দিষ্ট কোনো আবেগ। আবার মস্তিষ্কের অন্য এলাকা উত্তেজিত করে কোনো ছবি দেখানো বা চিন্তা মাথায় আনা যাবে। কিন্তু এ-সম্পর্কিত গবেষণা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়ে গেছে।

মস্তিষ্কের মানচিত্র

কিছু কিছু বিজ্ঞানী হিউম্যান জিনোম প্রজেক্টের মতো ‘নিউরন ম্যাপিং প্ৰজেক্ট’ চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন। হিউম্যান জিনোম প্রজেক্টে মানুষের জিনোমের সব কটি জিনের মানচিত্র তৈরি করা হয়েছে। অন্যদিকে নিউরন ম্যাপিং প্রজেক্টে মানুষের মস্তিষ্কের প্রতিটি নিউরনের অবস্থান শনাক্ত করা হবে। সেই সঙ্গে মস্তিষ্কের ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরি করা যাবে, যেখানে দেখানো হবে নিউরনের প্রতিটি সংযোগ। তাই সত্যিই প্রজেক্টটি অনেক বড়। কারণ, মস্তিষ্কে ১০০ বিলিয়নের বেশি নিউরন রয়েছে। আবার প্রতিটি নিউরন অন্য আরও কয়েক হাজার নিউরনের সঙ্গে সংযুক্ত। ধরে নেওয়া যায়, এমন একটি প্রজেক্ট সম্পন্ন হলে নির্দিষ্ট চিন্তাভাবনা কীভাবে নির্দিষ্ট নিউরাল পথে উদ্দীপত হয়, তার বোধগম্য মানচিত্র তৈরি করা যাবে। এমআরআই স্ক্যান ও ইইজি তরঙ্গ ব্যবহার করে পাওয়া চিন্তার অভিধান একত্র করে সহজে নির্দিষ্ট চিন্তাভাবনার নিউরাল কাঠামোর পাঠোদ্ধার করা যাবে। এভাবে নির্ধারণ করা যাবে, নির্দিষ্ট শব্দ বা মানসিক চিত্রের কারণে কোন নিউরন সক্রিয় হয়। তাই এর মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট চিন্তা, তার এমআরআইয়ে প্রকাশ ও নির্দিষ্ট নিউরনের উদ্দীপনার কারণে মস্তিষ্কে চিন্তার উদয় হওয়ার মধ্যকার সম্পর্কও আবিষ্কৃত হবে।

২০০৬ সালে এ ব্যাপারে ক্ষুদ্র এক পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দেয় অ্যালেন ইনস্টিটিউট ফর ব্রেন সায়েন্স (মাইক্রোসফটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা পল অ্যালেনের স্থাপিত)। এর আগে, ইঁদুরের মস্তিষ্কে জিনের প্রকাশের ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরির ঘোষণা দিয়েছিল তারা। এ মানচিত্রে কোষীয় পর্যায়ে ২১ হাজার জিন বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। মানুষের মস্তিষ্কের জন্যও এ রকম মানচিত্র তৈরির ব্যাপারে তারা আশাবাদী। ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান মার্ক টেসিয়ার-ল্যাভিগনি বলেন, ‘অ্যালেন ব্রেন অ্যাটলাস সম্পূর্ণ হলে মেডিকেল সায়েন্স বা মস্তিষ্ক গবেষণা বড় এক ধাপ সামনে এগিয়ে যাবে।’ যারা মানবমস্তিষ্কের মধ্যে নিউরাল সংযোগ বিশ্লেষণ করতে চায়, তাদের জন্য এই মানচিত্র অপরিহার্য বস্তুতে পরিণত হবে। অবশ্য সত্যি নিউরন ম্যাপিং প্রজেক্টের জন্য এই ব্রেন অ্যাটলাস বেশ ছোটখাটো বলে মনে হয়।

সংক্ষেপে বলা যায়, বিজ্ঞান কল্পকাহিনি ও ফ্যান্টাসি গল্পে দেখানো প্রাকৃতিক টেলিপ্যাথি বর্তমানে অসম্ভব। এমআরআই স্ক্যান ও ইইজি তরঙ্গ ব্যবহার করে সরল কিছু চিন্তা পড়া যায়। কারণ, গোটা মস্তিষ্কে চিন্তাপ্রক্রিয়া বেশ জটিলভাবে ছড়িয়ে পড়ে। তবে আসন্ন দশক বা শতাব্দীর মধ্যে এ প্রযুক্তি কতটা উন্নত হবে? অনিবার্যভাবে চিন্তার প্রক্রিয়া সম্পর্কে অনুসন্ধানে বিজ্ঞানের সক্ষমতা সূচকীয় হারে বাড়তে থাকবে। সেই সঙ্গে বাড়তে থাকবে আমাদের এমআরআই ও অন্যান্য স্পর্শকাতর যন্ত্রগুলোর সংবেদনশীলতাও। এভাবে বিজ্ঞান একসময় মস্তিষ্কের চিন্তা ও আবেগের প্রক্রিয়ার জায়গায়গুলোকে অতি সূক্ষ্মভাবে চিহ্নিত করতে পারবে। কম্পিউটারের বিপুল ক্ষমতা দিয়ে এই তথ্য-উপাত্ত অতি নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করবে বলে আশা করা যায়। চিন্তাভাবনার অভিধানে বিপুলসংখ্যক চিন্তার প্যাটার্নকে শ্রেণিবদ্ধ করা সম্ভব হবে। সেখানে এমআরআই পর্দার বিভিন্ন ধরনের চিন্তার প্যাটার্নের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের চিন্তা বা অনুভূতির মিল পাওয়া যাবে। অবশ্য এমআরআই প্যাটার্ন ও চিন্তা হয়তো পুরোপুরি কখনোই মেলানো সম্ভব হবে না। তবু চিন্তার অভিধান সঠিকভাবে সাধারণ চিন্তাভাবনাকে নির্দিষ্ট বিষয়ে শনাক্ত করতে পারবে। অন্যদিকে এমআরআই চিন্তার প্যাটার্ন নিউরোনাল ম্যাপে নিখুঁতভাবে দেখানো সম্ভব হবে, যেটি মস্তিষ্কে কোন নিউরন কোন নির্দিষ্ট চিন্তা তৈরি করতে উদ্দীপ্ত করছে, তা বোঝা যাবে।

কিন্তু মস্তিষ্ক কম্পিউটার নয়, বরং নিউরাল নেটওয়ার্ক (এখানে চিন্তা মস্তিষ্কজুড়ে ছড়িয়ে থাকে) হওয়ার কারণে চূড়ান্তভাবে আমরা একটা বাধার মুখোমুখি হব। বাধাটি হবে মস্তিষ্ক নিজেই। কাজেই বিজ্ঞান চিন্তাশীল মস্তিষ্কের যতই গভীর থেকে গভীর অনুসন্ধান চালাক আর আমাদের চিন্তাপ্রক্রিয়ার কিছু অংশের পাঠোদ্ধার করুক না কেন, বিজ্ঞান কল্পকাহিনিতে প্রতিশ্রুত ‘চিন্তা পড়া’ পুরোটা কখনো সম্ভব হবে না। সে কারণে সাধারণ অনুভূতি ও চিন্তার প্যাটার্ন পড়ার সক্ষমতাকে প্রথম শ্রেণির অসম্ভাব্যতা হিসেবে গণ্য করেছি। আর আমাদের মনের চিন্তাপ্রক্রিয়া আরও নিখুঁতভাবে পড়ার সক্ষমতাকে গণ্য করেছি দ্বিতীয় শ্রেণির অসম্ভাব্যতা হিসেবে।

কিন্তু এমন কোনো সরাসরি উপায় হয়তো থাকতেও পারে, যেখানে মস্তিষ্কের বিপুল ক্ষমতা ব্যবহার করা সম্ভব। দুর্বল ও সহজে বিক্ষিপ্ত হওয়া রেডিও ব্যবহারের বদলে কেউ কি তখন সরাসরি মস্তিষ্কের ভেতরের নিউরন ব্যবহার করতে পারবে? সেটি যদি সম্ভব হয়, আমরা তখন সাইকোকাইনেসিসের মতো আরও বিপুল কোনো ক্ষমতার অর্গল খুলে দিতে পারব।

তথ্যনির্দেশ

বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গ : বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গকে কম্পাঙ্কের পার্থক্যের ভিত্তিতে বেতার তরঙ্গ, মাইক্রোওয়েভ, অবলোহিত রশ্মি, দৃশ্যমান আলো, অতিবেগুনি রশ্মি, রঞ্জন রশ্মি (এক্স-রে) ও গামা রশ্মি ইত্যাদি ভাগে ভাগ করা যায়।

হিউম্যান জিনোম প্রজেক্ট : সংক্ষেপে এইচজিপি। এখন পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে বড় দলগত জীববৈজ্ঞানিক প্রকল্প এটি। এ গবেষণা প্রকল্পে মানুষের ডিএনএর নিউক্লিওটাইড বেস পেয়ারের সিকোয়েন্স বের করতে কাজ শুরু হয়। সেই সঙ্গে দৈহিক ও কার্যকর সব জিনের ম্যাপিং ও তা শনাক্ত করা ছিল এ প্রকল্পের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। ১৯৯০ সালে শুরু হয়ে ২০০০ সালে তা শেষ হয়।

৬. সাইকোকাইনেসিস

নতুন কোনো বৈজ্ঞানিক সত্য তার প্রতিপক্ষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলে বিজয় অর্জন করতে পারে না। আবার তত্ত্বটিতে কোনো আলোও দেখতে পায় না তারা। বরং এ সত্যটির প্রতিপক্ষরা ধীরে ধীরে মারা যেতে থাকে এবং নতুন প্রজন্ম বেড়ে উঠতে গিয়ে এই বৈজ্ঞানিক সত্যটির সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওঠে

—ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক

পরম সত্য নিয়ে কেউ কথা বলবে না, সেটি বোকার অধিকার।

—শেক্সপিয়ার

একদিন দেবতারা স্বর্গে মিলিত হয়ে মানুষের দুঃখবোধের অবস্থা নিয়ে অভিযোগ তুললেন। আমাদের মানে মানুষের বাজে, বোকাটে ও অর্থহীন মূর্খতা নিয়ে চরম বিরক্ত ছিলেন তাঁরা। কিন্তু এক দেবতা আমাদের ওপর দয়া করলেন। তাই একটি পরীক্ষা চালানোর সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। পরীক্ষাটি ছিল খুব সাধারণ। এক ব্যক্তিকে সীমাহীন ক্ষমতা দিলেন তিনি। আসলে তাঁরা দেখতে চাচ্ছিলেন, মানুষ যদি দেবতাদের মতো ক্ষমতাবান হয়ে ওঠে, তাহলে তাদের প্রতিক্রিয়া কেমন হয়?

ওই নির্বোধ সাধারণ লোকটি ছিল জর্জ ফোথেরিনগে। ছোটখাটো এক দোকানদার সে। আচমকা নিজের মধ্যে দেবতাদের মতো ক্ষমতা আবিষ্কার করে জর্জ। বাতাসে মোমবাতি ভাসাতে পারল সে। একই সঙ্গে পানির রং বদলে দিতে, সুস্বাদু খাবার তৈরি করতে আর ভেলকি দেখিয়ে স্রেফ শূন্য থেকে হীরাও আনতে পারল সে। শুরুতে সে ক্ষমতাটা বিনোদন আর ভালো ভালো সব কাজের জন্য ব্যবহার করছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে ক্ষমতার লোভে তার অহমিকা বাড়তে লাগল আর লালসায় ডুবে যেতে লাগল লোকটি। এভাবে অনেকগুলো প্রাসাদ আর সীমাহীন ধনী ক্ষমতালোভী স্বেচ্ছাচারী এক মানুষে পরিণত হলো জর্জ। অসীম ক্ষমতায় বুঁদ হয়ে সে বড় একটা ভুল করে বসল একদিন। সে উদ্ধতভাবে পৃথিবীর ঘূর্ণন থামানোর আদেশ দিল। হঠাৎ চতুর্দিকে অকল্পনীয় বিশৃঙ্খলা শুরু হলো। প্রচণ্ড ঝোড়ো বাতাসে সবকিছু ছুটতে লাগল পৃথিবীর ঘূর্ণন বেগে বা ঘণ্টায় ১০০০ মাইল বেগে। পৃথিবীর সব মানুষ ছিটকে মহাশূন্যে চলে যেতে লাগল। মরিয়া হয়ে, সর্বশেষ ও চূড়ান্ত ইচ্ছা প্রকাশ করল সে। এবার সবকিছু আগের মতো ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দিল লোকটি।

দ্য ম্যান হু কুড ওয়ার্ক মিরাকলস (১৯৩৬) চলচ্চিত্রের কাহিনি এ রকম। ছবিটি বানানো হয়েছিল এইচ জি ওয়েলসের এক ছোটগল্প অবলম্বনে। (এই গল্প অবলম্বনে পরে জিম ক্যারি অভিনীত ব্রুস অলমাইটি চলচ্চিত্রটি পুনর্নির্মাণ করা হয়।) এসব ক্ষমতাকে বলা হয় ইএসপি, সাইকোকাইনেসিস বা মাইন্ড ওভার ম্যাটার, কিংবা কোনো বস্তু সম্পর্কে শুধু চিন্তা করে সেই বস্তুটিকে নাড়ানোর ক্ষমতা। অনেক বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন হওয়ার কারণে একে একধরনের দৈবশক্তি বলে ভাবা হয়। ওয়েলস এ ছোটগল্পে বলতে চেয়েছেন, দেবতাদের মতো ক্ষমতা পেতে হলে তাঁদের মতো বিচারবোধ আর প্রজ্ঞারও প্রয়োজন।

সাহিত্যে সাইকোকাইনেসিস বেশ ভালো জায়গা দখল করে আছে। বিশেষ করে শেক্সপিয়ারের দ্য টেমপেস্ট নাটকের কথা বলা যায়। নাটকটিতে জাদুকর প্রোসপেরো, তার মেয়ে মিরিন্ডা আর জাদুকরি ভূত এরিয়েল নিরুপায় ও অসহায় অবস্থায় জনশূন্য একটা দ্বীপে আটকে ছিল। প্রোসপেরোর খলনায়ক ভাইয়ের বিশ্বাসঘাতকার কারণে অনেকগুলো বছর সেখানে থাকতে হয় তাদের। একবার প্রোসপেরো জানতে পারে তার শয়তান ভাই এক নৌকায় চেপে তাদের কাছাকাছি আসছে। প্রতিশোধ নিতে নিজের সাইকোকাইনেসিস ক্ষমতা কাজে লাগায় প্রোসপেরো। এর মাধ্যমে সে শূন্য থেকে ভয়ংকর ঝড় এনে তার ভাইয়ের জাহাজটি ওই দ্বীপে ধ্বংস করে দেয়। প্রোসপেরো এরপর সাইকোকাইনেসিস ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে দুর্ভাগা যাত্রীদের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে। এদের মধ্যে ছিল নিষ্পাপ, সুদর্শন তরুণ ফার্দিনান্দ। প্রোসপেরো তার ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে মিরিন্ডার আর ফার্দিনান্দের মনে ভালোবাসার সৃষ্টি করে।

(রুশ লেখক ভ্লাদিমির নভোকভ উল্লেখ করেছেন, দ্য টেমপেস্ট-এ বিজ্ঞান কল্পকাহিনির চরিত্রের বেশ মিল আছে। আসলে প্রায় সাড়ে তিন শ বছর আগে নাটকটি লেখার পর, ১৯৫৬ সালে টেমপেস্টকে ক্ল্যাসিক সায়েন্স ফিকশন হিসেবে নতুন করে লেখা হয়। এর নাম ছিল ফরবিডেন প্ল্যানেট। সেখানে প্রোসপেরোকে দেখানো হয় চিন্তাশীল বিজ্ঞানী মরবিয়াস হিসেবে। জাদুকরি ভূতটি পরিণত হয় রোবি নামের এক রোবটে। আর মিরিন্ডা পরিণত হয় মরবিয়াসের সুন্দরী কন্যা আলটাইরা। অন্যদিকে জনবিচ্ছিন্ন দ্বীপটি হয়েছিল আলটেয়ার-৪ নামের একটা গ্রহ। স্টার ট্রেক সিরিজের নির্মাতা জিন রোডেনবেরি স্বীকার করেছেন, ফরবিডেন প্ল্যানেট তাঁর জনপ্রিয় টিভি সিরিজ বানানোর পেছনে অন্যতম অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছিল।)

স্টিফেন কিংয়ের ক্যারি (১৯৭৪) উপন্যাসের মূল প্লট ছিল সাইকোকাইনেসিস। সেখানে এক অখ্যাত এক লেখককে একসময় বিশ্বের সেরা হরর ঔপন্যাসিক হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠতে হতে দেখা যায়। ক্যারি খুব লাজুক ও সামান্য হাইস্কুলপড়ুয়া বালিকা। সে সামাজিকভাবে বন্ধুহীন। মানসিক ভারসাম্যহীন মায়ের যন্ত্রণায় প্রায়ই অবজ্ঞার শিকার হতে হয় তাকে। একমাত্র সান্ত্বনা তার সাইকোকাইনেসিস ক্ষমতা। দৃশ্যত তা তার পরিবারে সঞ্চালিত হয়। চূড়ান্ত দৃশ্যে, তাকে শত্রুরা এমন ভাব দেখায়, যেন সেই প্রোম কুইন হতে যাচ্ছে। এরপর তার নতুন পোশাকে শূকরের রক্ত ছিটিয়ে দেয় তারা। প্রতিশোধের চূড়ান্ত পর্যায়ে ক্যারি মানসিক শক্তি দিয়ে সব দরজা বন্ধ করে দেয়। তারপর তাকে যারা যন্ত্রণা দিয়েছিল তাদের বিদ্যুৎস্পৃষ্ট করে মেরে ফেলে, স্কুলভবন পুড়িয়ে দেয় ও আত্মঘাতী আগুনঝড় চারদিকে ছড়িয়ে দেয়। এতে ডাউনটাউনের বেশির ভাগ অংশ পুড়ে যায়। এভাবে একসময় নিজেকেও ধ্বংস করে ফেলে সে।

সাইকোকাইনেসিস ক্ষমতা এক ভারসাম্যহীন মানুষের হাতে পড়ার ঘটনা নিয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল স্টার ট্রেকের স্মরণীয় একটা পর্ব। এর নাম ছিল চার্লি এক্স। বহু দূরের এক কলোনি থেকে আসা এক ভারসাম্যহীন অপরাধী এক তরুণকে নিয়ে বানানো হয়েছিল পর্বটি। সাইকোকাইনেসিস ক্ষমতা কোনো ভালো কাজে ব্যবহার না করে সে অন্য মানুষদের নিয়ন্ত্রণ করত। নিজের স্বার্থপর ও কুটিল ইচ্ছা চরিতার্থ করতে ওই সব মানুষের ইচ্ছাও পাল্টে দিত সে। এন্টারপ্রাইজের ক্ষমতা যদি সে কোনোমতে দখল করতে পারত আর পৃথিবীতে আসতে পারত, তাহলে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে পুরো গ্রহটিই ধ্বংস করে ফেলত। এদিকে স্টার ওয়ার্স সাগার জেডাই নাইট নামের পৌরাণিক সমাজ পরিচালিত ফোর্সেরও সাইকোকাইনেসিস ক্ষমতা ছিল।

সাইকোকাইনেসিস ও বাস্তবতা

বাস্তব জীবনে সাইকোকাইনেসিস নিয়ে সবচেয়ে বিখ্যাত বিরোধিতার ঘটনাটি সম্ভবত ঘটেছিল জনি কারসনের শোতে। সেই ১৯৭৩ সালে। এই মহাকাব্যিক বিরোধিতায় জড়িত ছিলেন ইসরায়েলি সাইকিক উরি গেলার। তিনি মনের শক্তি ব্যবহার করে চামচ বাঁকিয়ে ফেলার দাবি করেন সেবার। এ ছাড়া পেশাদার জাদুকর অ্যামেজিং র‍্যান্ডিও জড়িত ছিলেন এতে। তাঁর সাইকিক ক্ষমতা থাকার ভুয়া দাবি করে ক্যারিয়ার গড়ে তোলেন তিনি। (এ তিনজনের সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো : তাঁদের প্রত্যেকেই জাদুকর হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেন। হাতসাফাইয়ের কৌশলে তাঁরা এমনই দক্ষ ছিলেন যে তাতে দর্শকদের চোখ কপালে উঠে যেত।)

গেলারের আবির্ভাবের আগে, র‍্যান্ডির সঙ্গে পরামর্শ করেন কারসন। র‍্যান্ডি তাঁকে পরামর্শ দেন, জনি নিজেই চামচ সরবরাহ করবে এবং শো টাইমের আগে সেগুলো সবাইকে দেখতে দেবে। অবাক ব্যাপার হলো, সম্প্রচারের সময় গেলারকে তাঁর নিজের চামচের বদলে কারসনের চামচ বাঁকানোর কথা বলেন। বিব্রতকর ব্যাপার হলো, চামচ বাঁকাতে প্রতিবার ব্যর্থ হন গেলার। (পরে র‍্যান্ডি জনি কারসনের শোতে এসে সফলভাবে চামচ বাঁকানোর কৌশল দেখান। কিন্তু সতর্কভাবে তিনি বলেন, তাঁর আর্ট বিশুদ্ধ ম্যাজিক, সাইকিক ক্ষমতার ফল নয়।)

সাইকিক ক্ষমতা দেখাতে পারবে, এমন কাউকে ১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন অ্যামেজিং র‍্যান্ডি। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এই ১ মিলিয়ন ডলার চ্যালেঞ্জে এখনো কাউকে অংশ নিতে দেখা যায়নি

সাইকোকাইনেসিস ও বিজ্ঞান

বৈজ্ঞানিকভাবে সাইকোকাইনেসিস বিশ্লেষণের কিছু সমস্যা আছে। সমস্যাটি হলো, যাঁরা সাইকিক ক্ষমতা আছে বলে দাবি করেন, তাঁদের কাছে বিজ্ঞানীরা সহজেই বোকা বনে যান। বিজ্ঞানীরা ল্যাবে যা দেখেন, তাতে বিশ্বাস করার প্রবণতা আছে তাঁদের মধ্যে। তবে যাঁরা সাইকিক পাওয়ার থাকার দাবি করেন, সেসব ম্যাজিশিয়ান অন্যদের ভিজ্যুয়াল সেন্সকে বোকা বানিয়ে প্রতারিত করতে পারেন। ফলে সাইকিক ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে হতভাগ্য পর্যবেক্ষকে পরিণত হন বিজ্ঞানীরা। যেমন ১৯৮২ সালে দুই বালককে নিরীক্ষা করতে ডাকা হয়েছিল একদল প্যারাসাইকোলজিস্টকে। মাইকেল এডওয়ার্ড ও স্টিভ শ নামের ওই দুই বালকের অসাধারণ কিছু ক্ষমতা ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছিল। ছেলে দুটি দাবি করত যে তারা ধাতব বস্তু বাঁকিয়ে ফেলতে পারে ও মনে মনে চিন্তা করে ফটোগ্রাফিক ফিল্মে ছবি তুলতে পারে। আবার সাইকোকাইনেসিস ক্ষমতা ব্যবহার করে বস্তু নাড়াতে ও অন্য মানুষের মন পড়তে পারার দাবিও তোলে তারা। প্যারাসাইকোলজিস্ট মাইকেল থালব্রোন ছেলে দুটোর এ ক্ষমতা দেখে এতই মুগ্ধ হয়ে যান যে তাদের ক্ষমতা বর্ণনা করতে ‘সাইকোকাইনেট’ শব্দটি উদ্ভাবন করে বসেন। যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরির সেন্ট লুইসে ম্যাকডোনেল ল্যাবরেটরি ফর সাইকিক্যাল রিসার্চের প্যারাসাইকোলজিস্টদেরও ওই ছেলেদের কাণ্ডকারখানা দেখে অবাক হয়ে যান। প্যারাসাইকোলজিস্টরা বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে ছেলে দুটোর সাইকিক ক্ষমতার সত্যিকার প্রমাণ তাঁদের হাতের মুঠোয় আছে। এরপর তাদের নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রবন্ধও লিখতে শুরু করেন তাঁরা। মজার ব্যাপার হলো, ঠিক পরের বছর ছেলে দুটো নিজেরাই ঘোষণা করে, তাদের দেখানো কাণ্ডকারখানাগুলো ভুয়া ছিল। ওসব কোনো অতিপ্রাকৃত শক্তি ছিল না, সাধারণ কিছু ম্যাজিকের কৌশল ব্যবহার করে তারা কাজগুলো করে দেখিয়েছিল। (ছেলে দুটোর একজন স্টিভ শ বিখ্যাত ম্যাজিশিয়ান হয়ে উঠতে পারে। তাকে প্রায়ই জাতীয় টেলিভিশনে দেখা যায়। )

ডিউক ইউনিভার্সিটির রাইন ইনস্টিটিউটে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে সাইকোকাইনেসিস নিয়ে ব্যাপক পরীক্ষা চালানো হয়েছে। কিন্তু সেখানেও পাওয়া গেছে মিশ্র ফলাফল। এ বিষয়ের একজন পথিকৃৎ নিউইয়র্কের সিটি কলেজের আমার সহকর্মী প্রফেসর গার্টড শিমেইডলার। প্যারাসাইকোলজি ম্যাগাজিনের সাবেক সম্পাদক ও প্যারাসাইকোলজির অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক প্রেসিডেন্ট তিনি। ইএসপি নিয়ে তিনি খুবই আগ্রহী। এ বিষয়ে ওই কলেজে তাঁর নিজের অনেক শিক্ষার্থীর ওপর অনেক গবেষণা করেছেন তিনি। তাঁর পরীক্ষায় আরও অংশগ্রহণকারী সংগ্রহে তিনি বিভিন্ন ককটেল পার্টি চষে বেড়ান। এসব পার্টিতে বিখ্যাত সাইকিকরা ডিনারের অতিথিদের সামনে বিভিন্ন ধরনের সাইকিক ট্রিক দেখান। শতাধিক শিক্ষার্থী আর অসংখ্য মেন্টালিস্ট ও সাইকিককে বিশ্লেষণ করেন তিনি। একসময় আমাকে বলেছিলেন, তিনি এমন একজনকেও পাননি যে চাহিদামতো সাইকোকাইনেটিক কৌশল দেখাতে পারে। বরং নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে এসব ক্ষমতা দেখাতে পারে তারা। একবার একটি ঘরে বেশ কিছু ক্ষুদ্র থার্মিস্টোর ছড়িয়ে রাখেন শিমেইডলার। সেগুলো ঘরের তাপমাত্রার ভগ্নাংশ ডিগ্রি পরিবর্তনও শনাক্ত করতে পারত। এক মেন্টালিস্ট তীব্র মানসিক চেষ্টার পর ঘরের তাপমাত্রা ১ ডিগ্রির ১০ ভাগের ১ ভাগ মাত্র বাড়াতে পেরেছিল। কঠোর পরিস্থিতিতে পরীক্ষাটি করতে পারায় সেবার বেশ গর্বিত হন শিমেইডলার। কিন্তু মনের শক্তি ব্যবহার করে চাহিদামতো বড় কোনো বস্তু সরাতে পারেনি কেউ।

সাইকোকাইনেসিস নিয়ে সবচেয়ে কঠিন, কিন্তু বিতর্কিত পরীক্ষাটি চালানো হয় প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিন্সটন অ্যানোমালিস রিসার্চ (পিইএআর) প্রোগ্রামে। ১৯৭৯ সালে এটি প্রতিষ্ঠা করেন রবার্ট জি জ্যান। তিনি স্কুল অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড অ্যাপ্লায়েড সায়েন্সে ডিনের দায়িত্বে ছিলেন। মানুষের মন চিন্তার মাধ্যমে নিজে নিজে দৈবচয়ন ভিত্তিতে কোনো ঘটনায় প্রভাব ফেলতে পারে কি না, তার খোঁজ চালান পিইএআরের প্রকৌশলীরা। যেমন আমরা জানি, কয়েন টস করা হলে হেড বা টেইল পাওয়ার সম্ভাবনা ৫০ শতাংশ। কিন্তু পিইএআরের বিজ্ঞানীদের দাবি, মানুষের চিন্তা নিজেই এ দৈবঘটনার ফলাফল প্রভাবিত করতে সক্ষম। ২৮ বছর চলার পর, ২০০৭ সালে প্রোগ্রামটি বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত পিইএআরের (PEAR) প্রকৌশলীরা কয়েক হাজার পরীক্ষা চালান। সেখানে ১.৭ মিলিয়ন ট্রায়াল ও ৩৪০ মিলিয়ন কয়েন টস করা হয়। এসব ফলাফলে নিশ্চিত হওয়া গেছে, সাইকোকাইনেসিসের প্রভাব সত্যিই আছে, তবে তা খুব সামান্য। গড়ে এর প্রভাব ১০ হাজারে মাত্র কয়েক অংশের বেশি নয়। এমন দুর্বল ফলাফলের পরও অন্য বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিতর্ক সৃষ্টি করে এটি। বিরোধী বিজ্ঞানী দলের দাবি, এ পরীক্ষায় কৌশলে তাঁদের তথ্য-উপাত্তে পক্ষপাত করে গোপন করেছেন গবেষকেরা।

(প্যারানরমাল অ্যাকটিভিটি তদন্ত করতে মার্কিন সেনাবাহিনী ১৯৮৮ সালে অনুরোধ জানায় ন্যাশনাল রিসার্চ কাউন্সিলকে। সেনাদলের মধ্যে সাইকিক ক্ষমতাসহ অন্যান্য যেকোনো সম্ভাব্য সুবিধাজনক কিছু খুঁজে পেতে উদ্‌গ্রীব ছিল মার্কিন সেনাবাহিনী। ন্যাশনাল রিসার্চ কাউন্সিলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তারা সন্ন্যাসী যোদ্ধাদের নিয়ে একটি হাইপোথেটিক্যাল ‘ফাস্ট আর্থ ব্যাটালিয়ন’ গড়ে তুলছিল। কমিটির বিবেচনায় এ যোদ্ধারা প্রায় সব কৌশলেই পারদর্শী ছিল। এসব ক্ষমতার মধ্যে ছিল ইএসপির ব্যবহার, ইচ্ছেমতো নিজের দেহ ওপরে তুলে ধরা, ভাসিয়ে তোলা, সাইকিক চিকিৎসা আর দেয়ালের ওপর দিয়ে হাঁটা। পিএইআরের আগের দাবি তদন্ত করতে গিয়ে ন্যাশনাল রিসার্চ কাউন্সিল দেখেছে, সফল পরীক্ষাগুলোর অর্ধেকই মাত্র একজন ব্যক্তির কাছ থেকে পাওয়া গেছে। কিছু সমালোচক বিশ্বাস করেন, ওই ব্যক্তিটি ছিল পরীক্ষকদের ভেতরের একজন এবং তিনি পিইএআরের জন্য কম্পিউটার প্রোগ্রাম লিখেছেন। ‘যে ব্যক্তিটি ল্যাব চালায়, সে নিজেই যদি ফলাফল তৈরি করে, তাহলে আমার জন্য সেটা সমস্যাজনক,’ এ কথা বলেছেন অরিগন বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. রে হাইম্যান। পরে প্রতিবেদনে সিদ্ধান্ত টানা হয়েছে, ‘১৩০ বছর ধরে পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণায় প্যারাসাইকোলজিক্যাল ঘটনার অস্তিত্বের কোনো বৈজ্ঞানিক সত্যতা পাওয়া যায়নি।’ )

সাইকোকাইনেসিস নিয়ে গবেষণার কিছু সমস্যাও আছে। এর সমর্থকেরাও এ সমস্যার কথা উল্লেখ করে। সেটি হলো, এটা আমাদের জানা পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রের সঙ্গে সহজে খাপ খায় না। মহাবিশ্বের সবচেয়ে দুর্বল বল মহাকর্ষ। এই বল শুধু আকর্ষণ করে, কিন্তু কোনো বস্তুকে বিকর্ষণ বা শূন্যে ভাসিয়ে তুলতে পারে না। অন্যদিকে বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় বল ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণ মেনে চলে। এ বলটি বৈদ্যুতিকভাবে নিরপেক্ষ কোনো বস্তুকে ঘরের অন্য দিকে ধাক্কা দেবে, তেমন কোনো সম্ভাবনা নেই। নিউক্লিয়ার বল কাজ করে অতি ক্ষুদ্র পরিসরে। যেমন পারমাণবিক কণাদের মধ্যবর্তী দূরত্বে।

সাইকোকাইনেসিস নিয়ে আরেক সমস্যা হলো শক্তি সরবরাহ। হর্সপাওয়ার বা অশ্বশক্তির পাঁচ ভাগের মাত্র এক ভাগ উৎপাদন করতে পারে মানবদেহ। তারপরও স্টার ওয়ার্স মুভিতে ইউডা শুধু মনের শক্তি দিয়ে পুরো একটা স্টারশিপ শূন্যে ভাসিয়ে তোলে। কিংবা চোখ থেকে শক্তিশালী লেজার রশ্মি ছুড়ে দেয় সাইক্লপস। এগুলো সরাসরি শক্তির সংরক্ষণশীলতার সূত্র লঙ্ঘন করে। এ সূত্রমতে, ইউডার মতো অতি খুদে কারও পক্ষে গোটা স্টারশিপ শূন্যে ভাসানোর মতো শক্তি একত্রে জড়ো করতে পারা সম্ভব নয়। আমরা যত চেষ্টাই করি না কেন, সাইকোকাইনেসিসের অলৌকিক ঘটনা বা কাণ্ডকারখানা করে দেখাতে যথেষ্ট শক্তি জড়ো করা সম্ভব নয়। তাহলে প্রদত্ত এসব সমস্যায়, পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলোর সঙ্গে সাইকোকাইনেসিসকে কীভাবে খাপ খাওয়ানো যায়?

সাইকোকাইনেসিস ও মস্তিষ্ক

সাইকোকাইনেসিস যদি আমাদের জানা মহাবিশ্বের বলগুলোর সঙ্গে খাপ না খায়, তাহলে একে ভবিষ্যতে কীভাবে পোষ মানানো সম্ভব? এর একটি ব্লু পাওয়া গিয়েছিল স্টার ট্রেকের ‘হু মোর্ন ফর অ্যাডোনিস?’ শিরোনামের এক পর্বে। এন্টারপ্রাইজের ক্রুরা গ্রিক দেবতাদের মতো দেখতে এক জাতির মুখোমুখি হয় পর্বটিতে। কোনো কিছু শুধু মনে মনে চিন্তা করেই অদ্ভুত সব কাজকারবার করার ক্ষমতা ছিল তাদের। প্রথমে মনে হচ্ছিল, ক্রুরা যেন খোদ অলিম্পাসের দেবতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করছে। অচিরেই ক্রুরা বুঝতে পারল, ওরা আসলে দেবতা নয়, সাধারণ জীবসত্তা, যারা মানসিকভাবে কেন্দ্রীয় পাওয়ার স্টেশন নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এরপর সেখান থেকে তাদের ইচ্ছা পূরণ হয়ে অলৌকিক কাণ্ডকারখানা ঘটায় তারা। তাদের প্রধান শক্তি কেন্দ্ৰ ধ্বংস করে এন্টারপ্রাইজের ক্রুরা তাদের ক্ষমতা উন্মুক্ত করতে পেরেছিল।

একইভাবে ভবিষ্যতের কোনো ব্যক্তির জন্য পদার্থবিদ্যার সূত্রগুলোর আওতায় একটা ইলেকট্রনিক সেন্সিং ডিভাইস মানসিকভাবে চালানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এ যন্ত্রটিই তাকে দেবতার মতো ক্ষমতা দিতে পারে। রেডিও-বিবর্ধন কিংবা কম্পিউটার-বিবর্ধনসম্পন্ন সাইকোকাইনেসিসের সত্যিকার সম্ভাবনা রয়েছে। যেমন ইইজি আদিম সাইকোকাইনেসিস যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। নিজের ইইজি মস্তিষ্কের প্যাটার্ন স্ক্রিনে দেখে মানুষ শিখতে পারে, কীভাবে আনাড়ির মতো, কিন্তু সচেতনভাবে তাদের সামনে দেখা মস্তিষ্কের প্যাটার্ন নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। যে পদ্ধতিতে এটা করা হয়, তাকে বলে বায়োফিডব্যাক।

মস্তিষ্কের কোন নিউরন দেহের কোন পেশি নিয়ন্ত্রণ করে, সেটা বলার মতো মস্তিষ্কের কোনো ব্লুপ্রিন্ট এ মুহূর্তে আমাদের কাছে নেই। সে কারণে রোগীদের সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করিয়ে কম্পিউটারের মাধ্যমে এসব নতুন প্যাটার্ন নিয়ন্ত্রণ করতে শিখতে হবে।

এভাবে একসময় কোনো ব্যক্তি স্ক্রিনে চাহিদামতো নির্দিষ্ট ধরনের ওয়েভ প্যাটার্ন তৈরি করতে পারবে। এ বিশেষ ওয়েভ প্যাটার্ন শনাক্ত করতে স্ক্রিন থেকে কোনো ছবি পাঠানো যাবে কম্পিউটার প্রোগ্রামেও। এরপর তা দিয়ে সুনির্দিষ্ট কমান্ড কার্যকর করা যাবে (যেমন কোনো পাওয়ার সুইচ অন করা বা মোটর চালু করা)। অন্য কথায়, কোনো ব্যক্তি শুধু চিন্তা করে ইইজিতে বিশেষ ধরনের মস্তিষ্কের প্যাটার্ন তৈরি করতে পারবে। আবার কোনো কম্পিউটার বা কোনো মোটর চালু করা যাবে এর মাধ্যমে।

এভাবে শুধু চিন্তাশক্তি ব্যবহার করে হুইলচেয়ার নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে পুরোপুরি পক্ষাঘাতগ্রস্ত ব্যক্তিও। কিংবা কোনো ব্যক্তি যদি ইইজি স্ক্রিনে ২৬টি শনাক্তযোগ্য প্যাটার্ন তৈরি করতে পারে, তাহলে শুধু চিন্তা করে সে টাইপ করতে পারবে। কারও চিন্তা এভাবে ট্রান্সমিট বা প্রেরণ করা যে অনেক কঠিন একটা পদ্ধতি, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সে জন্য বায়োফিডব্যাকের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তির নিজের মস্তিষ্কের ওয়েভ নিয়ন্ত্রণ করা শিখতে বেশ কিছুটা সময় লাগবে।

চিন্তা করার মাধ্যমে টাইপিং বাস্তবে রূপদানের বেশ কাছাকাছি চলে এসেছে জার্মানির টুবিনজেন বিশ্ববিদ্যালয়ের নীলস বিরবাওমারের গবেষণার কারণে। বায়োফিডব্যাক ব্যবহার করে তিনি স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে আংশিক পক্ষাঘাতগ্রস্ত মানুষদের সহায়তা করছেন। মস্তিষ্কের ওয়েভ পার্থক্যের প্রশিক্ষণ দিয়ে, তাদের কম্পিউটার স্ক্রিনে সরল বাক্য টাইপ করতে শিখিয়েছেন তিনি।

এদিকে বানরের মাথায় ইলেকট্রোড ঢুকিয়ে বায়োফিডব্যাকের মাধ্যমে তাদের কিছু চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করতে শেখানো গেছে। এসব বানর এরপর রোবটের চিন্তা করার প্রক্রিয়ায় ইন্টারনেটের মাধ্যমে হাত নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

এর চেয়ে আরও নিখুঁত পরীক্ষা চালানো হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টার এমরো ইউনিভার্সিটিতে। সেখানে স্ট্রোকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত এক লোকের মাথায় কাচের ছোট গোলক সরাসরি বসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কাচের গোলক তারের মাধ্যমে পিসিতে সংযুক্ত করা হলো। নির্দিষ্ট কিছু চিন্তা তারের মধ্য দিয়ে সিগন্যাল পাঠাতে, এমনকি পিসির স্ক্রিনে কারসরও নাড়াতে পেরেছিল ওই রোগী। বায়োফিডব্যাক ব্যবহার করে চর্চার মাধ্যমে রোগীটি সচেতনভাবে কারসরের নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছিল। তাত্ত্বিকভাবে, স্ক্রিনে কারসরটি ব্যবহার করে মনে মনে চিন্তার মাধ্যমে লেখালেখি, কোনো যন্ত্র চালু করা, ভার্চুয়াল কার, ভিডিও গেম খেলাসহ আরও অনেক কিছু করা সম্ভব।

ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোসায়েন্টিস্ট জন ডনোঘু সম্ভবত মাইন্ড-মেশিন ইন্টারফেসের ক্ষেত্রে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সফলতা পেয়েছেন। ব্রেনগেট নামের এক যন্ত্র বানিয়েছেন তিনি। শুধু মনের শক্তি ব্যবহার করে পক্ষাঘাতগ্রস্ত ব্যক্তিকে চোখে পড়ার মতো অনেকগুলো দৈহিক কাজ করার সুযোগ এনে দিয়েছে যন্ত্রটি। ডনোঘু তাঁর যন্ত্রটি চারজন রোগীর ওপর পরীক্ষা করে দেখেছেন। তাঁদের দুজন স্পাইনাল কর্ডের জখমে ভুগছিল। তৃতীয় জনের স্ট্রোক আর চতুর্থ জন ভুগছিল এএলএসতে (অ্যামিওট্রোফিক ল্যাটারাল স্কেলেরোসিস, বা লিও গেরিগ ডিজিজে ভুগছিল। কসমোলোজিস্ট স্টিফেন হকিংও একই রোগে ভুগেছেন)।

ডনোঘুর ২৫ বছর বয়সী ম্যাথিউ ন্যাগেল নামের এক রোগী স্থায়ীভাবে পক্ষাঘাতগ্রস্ত। পুরোপুরি নতুন কম্পিউটারাইজড দক্ষতা শিখতে তার সময় লেগেছিল মাত্র এক দিন। সে এখন শুধু চিন্তা করে দিব্যি টিভির চ্যানেল বদলাতে পারে। শুধু কি তাই ভলিউম ঠিক করতে, কৃত্রিম হাত খুলতে ও লাগাতে, বৃত্ত আঁকতে, কম্পিউটারের কারসর নাড়াতে, ভিডিও গেম খেলতে আর ই-মেইল পড়তে পারে সে। ২০০৬ সালের গ্রীষ্মে তাকে নিয়ে নেচার ম্যাগাজিনে কভার স্টোরি ছাপা হওয়ার পর বিজ্ঞানীদের মধ্যে বেশ সাড়া পড়ে যায়।

ডনোঘুর ব্রেনগেটের মূল অংশ ক্ষুদ্র এক সিলিকন চিপ। এটি ৪ মিলিমিটার চওড়া, যার মধ্যে এক শ অতি ক্ষুদ্র ইলেকট্রোড বসানো থাকে। চিপটি সরাসরি মস্তিষ্কের ওপরে বসানো হয়, যেখানে মোটর কার্যক্রম সমন্বয় হয়। মস্তিষ্কের কর্টেক্সে অর্ধেকটা ঢোকানো থাকে চিপটি, যা প্রায় ২ মিলিমিটার ঘন। সোনার তার সিলিকন চিপটি থেকে সিগন্যাল সিগার বাক্সের আকৃতির এক অ্যামপ্লিফায়ারে বয়ে নিয়ে যায়। পরে ডিশওয়াশার আকারের এক কম্পিউটারে পাঠানো হয় এ সিগন্যাল। বিশেষ কম্পিউটার সফটওয়্যারে সংকেতগুলো প্রসেস করা হয়। এর মাধ্যমে মস্তিষ্কে তৈরি কিছু প্যাটার্ন চিনতে পারে ও সেগুলোকে যান্ত্রিক গতিতে পরিণত করে।

আগের পরীক্ষাগুলোয় বায়োফিডব্যাক ব্যবহার করে রোগীদের ইইজি তরঙ্গ পড়ার পদ্ধতি ছিল ধীরগতির আর কিছুটা ক্লান্তিকর। কিন্তু কম্পিউটারের সহায়তায় নির্দিষ্ট চিন্তার প্যাটার্ন শনাক্তে রোগীর প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়া যথেষ্ট কমিয়ে আনা যায়। প্রথম ট্রেনিং সেশনে ন্যাগেলকে হাত নড়াচড়া করতে, হাত ডান থেকে বাঁ দিকে আনা, কবজি নাড়ানো ও হাতের মুঠি খোলা ও বন্ধ করার কথা মনে মনে চিন্তা করতে বলা হয়েছিল। ন্যাগেল যখন হাত ও আঙুল নাড়ানোর কথা কল্পনা করছিল, তখন তার বিভিন্ন নিউরনের উত্তেজনা দেখে ডনোঘু বেশ খুশি হন। ‘ব্যাপারটা আমার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিল। কারণ, আপনি মস্তিষ্কের কোষের কার্যপ্রণালি পরিবর্তন দেখতে পাবেন। এরপর আমি জানতাম, সবকিছু সামনে এগিয়ে যাবে, প্রযুক্তি সত্যি সত্যিই কাজ করবে,’ স্মৃতিচারণা করে বলেন তিনি।

(মাইন্ড-মেশিন ইন্টারফেসের এ অদ্ভুত রূপটি নিয়ে আগ্রহের পেছনে ডনোঘুর ব্যক্তিগত কিছু কারণ ছিল। যন্ত্রণাদায়ক এক রোগের কারণে শৈশবে হুইলচেয়ার বন্দী হয়েছিলেন তিনি। তাই হাঁটা-চলাফেরা হারিয়ে ফেললে যে অসহায়ত্ব আসে, তার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ছিল ডনোঘুর। )

ব্রেনগেট নিয়ে বেশ উচ্চাকাঙ্ক্ষী এক পরিকল্পনা আছে ডনোঘুর। যন্ত্রটিকে তিনি মেডিকেল পেশার জন্য অপরিহার্য করে তুলতে চান। যন্ত্রটি এখন একটা ডিশওয়াশার আকারের। কম্পিউটার প্রযুক্তি আরও উন্নতির পর, এটি আরও সহজে বহনযোগ্য হয়ে উঠবে, তাতে সন্দেহ নেই। হয়তো কোনো পোশাকের সঙ্গে একসময় যন্ত্রটি পরে ফেলা যাবে। চিপটি ওয়্যারলেস হিসেবে বানানো সম্ভব হলে তারের জঞ্জালও কমে আসবে। কাজেই তখন যন্ত্রটি নিরবচ্ছিন্নভাবে বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবে।

মস্তিষ্কের অন্যান্য অংশ এভাবে সক্রিয় করে তোলা এখন সময়ের ব্যাপার। আমাদের মস্তিষ্কের ওপরের পৃষ্ঠতলের মানচিত্র ইতিমধ্যে বানিয়ে ফেলেছেন বিজ্ঞানীরা। (মস্তিষ্কের কোন নিউরন সাধারণত কোথায় সংযুক্ত, তা দেখাতে আমাদের হাত, পা, মাথা ও পেছনের অংশ মাথার ওপরে চিত্রায়িত করা হলে এমন এক জিনিস পাওয়া যাবে, যাকে বলা হয় হোমানকুলাস বা ছোট্ট মানুষ। আমাদের দেহের অংশের ছবি আমাদের মস্তিষ্কে লিখলে বিকৃত এক মানুষের সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যাবে। তার আঙুল, মুখ, জিহ্বা সম্প্রসারিত দেখাবে এবং ধড় ও পেছনের অংশ দেখাবে সংকুচিত।)

একসময় মস্তিষ্কের পৃষ্ঠতলের বিভিন্ন অংশে সিলিকন চিপ বসানো সম্ভব হবে। বিভিন্ন অঙ্গ ও উপাঙ্গ চিন্তাশক্তি দিয়ে সক্রিয় করা যাবে এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। এ পদ্ধতিতে মানবদেহের যেকোনো দৈহিক কার্যক্রম নকল করা সম্ভব হবে। কল্পনা করা যায়, ভবিষ্যতে পক্ষাঘাতগ্রস্ত মানুষ সাইকোকাইনেটিক্যালি ডিজাইনকৃত বিশেষ ধরনের বাড়িতে বসবাস করবে। ফলে এয়ারকন্ডিশনার, টিভি ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি স্রেফ চিন্তাশক্তি দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে তারা।

একই সঙ্গে এটাও কল্পনা করে নেওয়া যায়, কালে কালে কোনো মানুষের দেহ বিশেষ বহিঃকঙ্কালে ঢেকে দেওয়া যাবে। এর মাধ্যমে পক্ষাঘাতগ্রস্ত মানুষের চলাফেরায় পুরোপুরি স্বাধীনতা এনে দেবে। তাত্ত্বিকভাবে এ ধরনের বহিঃকঙ্কাল সাধারণ মানুষের চেয়েও অনেক বেশি ক্ষমতা এনে দিতে পারবে। ফলে সে বায়োনিক সত্তায় পরিণত হয়ে চিন্তাশক্তি দিয়ে তার সুপারলিম্ব বা বাড়তি অঙ্গ ব্যবহার করে বিপুল যান্ত্রিক ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।

কাজেই মন দিয়ে কোনো কম্পিউটার নিয়ন্ত্রণ করা তখন আর অসম্ভব হবে না। কিন্তু এর মানে কী, শুধু চিন্তাশক্তি দিয়ে আমরা কোনো দিন বস্তু নাড়াচাড়া করতে, তাদের শূন্যে ভাসাতে আর তাদের শূন্যে ইচ্ছেমতো নিয়ন্ত্রণ করতে পারব?

একটা সম্ভাবনা হতে পারে, আমাদের ঘরের দেয়াল কক্ষ তাপমাত্রার সুপারকন্ডাক্টর দিয়ে মুড়ে দিয়ে। ধরে নেওয়া যায়, এ ধরনের যন্ত্র ভবিষ্যতে তৈরি করা সম্ভব। এরপর আমরা যদি অতি ক্ষুদ্র ইলেকট্রোম্যাগনেট বাসার বিভিন্ন জিনিসপত্রের মধ্যে রাখি, তাহলে মেসিয়ার ইফেক্ট (প্রথম অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে) কাজে লাগিয়ে সেগুলো মেঝে থেকে শূন্যে ভাসিয়ে তুলতে পারব। ইলেকট্রোম্যাগনেট কোনো কম্পিউটার দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা হলে এবং কম্পিউটারটি যদি তারের মাধ্যমে আমাদের মস্তিষ্কের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে, তাহলে আমরা ইচ্ছা করলেই বস্তুগুলোকে শূন্যে ভাসিয়ে তুলতে পারব। নির্দিষ্ট চিন্তার মাধ্যমে আমরা কম্পিউটারটিও সক্রিয় করে তুলতে পারব। কম্পিউটারটি এরপর বিভিন্ন ইলেকট্রোম্যাগনেটকে চালু করবে। এ কারণে তাদের শূন্য ভাসানো যাবে। বাইরে থেকে পর্যবেক্ষণ করলে বস্তুগুলো নড়ানো ও শূন্যে ভাসিয়ে তোলার ঘটনা ম্যাজিক বলে মনে হবে।

ন্যানোবট

মনের শক্তি দিয়ে কোনো বস্তু নড়াচড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো যদি রূপান্তর করাও সম্ভব হয়, তাহলে কেমন হবে? মানে ম্যাজিকের মতো এক বস্তু থেকে আরেক বস্তু বানানো যদি সম্ভব হয়? এসব কৌশল হাতসাফাইয়ের মাধ্যমে করে দেখান ম্যাজিশিয়ানরা। কিন্তু এ ধরনের ক্ষমতা কি পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলো অনুমোদন করে?

আগেই বলেছি, ন্যানোটেকনোলজির একটা লক্ষ্য পরমাণু ব্যবহার করে অতি ক্ষুদ্র যন্ত্র বানানো। খুদে এসব যন্ত্র লিভার, গিয়ার, বলবিয়ারিং ও পুলি হিসেবে কাজ করবে। অনেক পদার্থবিদ স্বপ্ন দেখেন, এসব ন্যানোযন্ত্র কোনো বস্তুর পরমাণুগুলো নতুনভাবে সাজাতে পারবে, যার মাধ্যমে এক বস্তু আরেক বস্তুতে রূপান্তরিত হবে। বিজ্ঞান কল্পকাহিনিতে যেসব রেপ্লিকেটর বা অনুলিপিকারক যন্ত্র দেখা যায়, তার ভিত্তি ন্যানোযন্ত্র। এর মাধ্যমে আপনার ইচ্ছেমতো সহজে যেকোনো বস্তু বানানো সম্ভব। তাত্ত্বিকভাবে একটি রেপ্লিকেটর হয়তো নিমেষেই দারিদ্র্য দূর করতে পারবে, সেই সঙ্গে আমূল পাল্টে দিতে পারবে সমাজের চেহারাটাও। এ যন্ত্র দিয়ে যেকোনো বস্তু যদি ইচ্ছেমতো বানানো যায়, তাহলে মানবসমাজ থেকে অভাব, মূল্য ও শ্রেণিবিভাজনের ধারণা এক লহমায় বদলে যাবে।

(আমার অন্যতম প্রিয় সিরিজ স্টার ট্রেক: দ্য নেক্সট জেনারেশন-এ রেপ্লিকেটর দেখানো হয়েছে। একবার বিশ শতক থেকে আসা প্রাচীন পথ হারানো এক স্পেস ক্যাপসুল মহাকাশে খুঁজে পাওয়া গেল। তার ভেতরে মানুষের জমাটবাঁধা দেহও পাওয়া গেল অনেকগুলো। ভয়ানক এক রোগে ভুগছিল তারা। দেহগুলো থেকে বেশ দ্রুত বরফ গলে যেতে লাগল। উন্নত মানের ওষুধ দিয়ে সুস্থ করা হলো তাদের। এক ব্যবসায়ী বুঝতে পারল, অনেক শতাব্দী পর তার বিনিয়োগ নিশ্চিতভাবে বিপুল পরিমাণে দাঁড়াবে। তাই সে এন্টারপ্রাইজের ক্রুদের দ্রুত তার বিনিয়োগ ও টাকার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করল। কিন্তু ক্রু সদস্যরা তার কথা শুনে স্রেফ হাঁ হয়ে গেল। টাকা? বিনিয়োগ? জবাবে তারা বলল, ভবিষ্যতে কোনো টাকা নেই। অন্য কিছু দরকার হলে শুধু বলবেন।)

রেপ্লিকেটরের মতো বিস্ময়কর শোনালেও প্রকৃতিতে এ রকম কিছু একটা রয়েছে। তার তাত্ত্বিক প্রমাণও পাওয়া গেছে। প্রকৃতি কাঁচা বা অপরিশোধিত উপাদান নিতে পারে, যেমন মাংস বা সবজি। আর কোনো মানবসত্তাকে ৯ মাসেই জন্ম দিতে পারে। জীবনের অলৌকিকত্ব বলতে আসলে কিছুই নেই, বরং পারমাণবিক পর্যায়ে অসংখ্য ন্যানোফ্যাক্টরি বস্তুর এক রূপ (যেমন খাদ্য) থেকে জীবন্ত টিস্যুতে (একটি শিশু) রূপান্তর করতে পারে।

একটি ন্যানোকারখানা বানাতে তিনটি উপাদান প্রয়োজন : নিৰ্মাণ উপকরণ, এসব উপকরণ কাটতে ও জোড়া লাগাতে সক্ষম কোনো হাতিয়ার আর এই হাতিয়ার ও উপকরণ ব্যবহারের পরিচালনার জন্য একটা নীলনকশা। প্রকৃতিতে নির্মাণ উপকরণ হলো হাজারো অ্যামিনো অ্যাসিড ও প্রোটিন। এগুলো থেকে মাংস ও রক্ত তৈরি হয়। এসব প্রোটিনকে জীবনের নতুন রূপ দিতে হাতুড়ি ও করাতের মতো কাটা ও জোড়া লাগানোর জন্য দরকারি হাতিয়ারটির নাম রাইবোজোম। এরা এমনভাবে নকশাকৃত যে তারা প্রোটিনকে নির্দিষ্ট বিন্দুতে কেটে ও জোড়া লাগিয়ে নতুন প্রোটিন তৈরি করতে বেশ উপযোগী। এতে ব্লুপ্রিন্ট বা নীলনকশার জোগান দেয় ডিএনএ অণুরা। এগুলোতে প্রাণের রহস্য নিউক্লিক অ্যাসিডের নির্দিষ্ট সজ্জায় লিপিবদ্ধ থাকে। এই তিন উপাদান একটা কোষে একত্র অবস্থায় থাকে, যা নিজের প্রতিলিপি তৈরি করার বা স্বপ্রতিলিপি করার ক্ষমতা থাকে। ডিএনএ অণুর আকার ডাবল হেলিক্স বা দ্বিসূত্রক হওয়ার কারণে কাজটি সম্পন্ন হয়। প্রজননের সময়, ডিএনএ অণু দুটি আলাদা হেলিক্স বা সূত্রকে বিভক্ত হয়ে যায়। প্রতিটি আলাদা সূত্রক এরপর জৈব অণু সংগ্রহ করে নিজের প্রতিলিপি তৈরি করে। আলাদা হয়ে যাওয়া হেলিক্স নতুন করে তৈরি করতেই এমনটি করে তারা।

প্রকৃতিতে পাওয়া এই বৈশিষ্ট্য নকল করতে পদার্থবিদেরা এখন পর্যন্ত খুব সামান্যই সফলতা পেয়েছেন। তবে বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস, এই সফলতার মূল চাবিকাঠি হলো নিজের প্রতিলিপি করতে পারা অসংখ্য ন্যানোবট তৈরি করা। ন্যানোবটগুলো হবে প্রোগ্রাম করতে সক্ষম পারমাণবিক যন্ত্র, যা বস্তুর মধ্যে পরমাণুগুলো নতুন করে সাজাতে ডিজাইন করা হবে।

ন্যানোবট বাহিনী তৈরির আগে নিষিদ্ধ কিছু বাধা অবশ্যই অতিক্রম করতে হবে। প্রথমত, স্বপ্রতিলিপি করতে পারা রোবট বানানো খুব কঠিন, এমনকি ম্যাক্রোস্কোপিক পর্যায়েও একই কথা সত্য। (এমনকি পারমাণবিক বলবিয়ারিং ও গিয়ারের মতো সরল পারমাণবিক যন্ত্ৰ বানানোও বর্তমানের প্রযুক্তিতে কঠিন।) কাউকে যদি একটা পিসি ও টেবিল ভরা ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ দেওয়া হয়, তাহলে তা দিয়ে নিজের প্রতিলিপি বানাতে পারা যন্ত্র বানানো বেশ কঠিন। তাই স্বপ্রতিলিপি করতে সক্ষম যন্ত্র টেবিলে বানানো যদি কঠিন হয়, তাহলে পারমাণবিক পর্যায়ে এ ধরনের কিছু বানানো আরও কঠিন।

দ্বিতীয়ত, ন্যানোবট বাহিনীকে বাইরে থেকে কীভাবে প্রোগ্রাম করা সম্ভব, তা এখনো পরিষ্কার নয়। অনেকে বলেন, রেডিও সিগন্যাল পাঠিয়ে প্রতিটি ন্যানোবট সক্রিয় করে তোলা যাবে। হয়তো লেজার বিমে ধারণ করা নির্দেশনা ন্যানোবটে ছুড়ে দেওয়া যাবে। কিন্তু এর মানে এমনও হতে পারে, ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ন্যানোবটের প্রতিটির জন্য আলাদা নির্দেশনা পাঠানো দরকার।

তৃতীয়ত, ন্যানোবটগুলো কীভাবে সঠিক সজ্জায় পরমাণুগুলো কাটবে, নতুন করে সাজাবে এবং তাদের জোড়া লাগাবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। মনে রাখতে হবে, এই সমস্যার সমাধান করতে প্রকৃতির প্রায় সাড়ে তিন বিলিয়ন বছর লেগেছে। তাই কয়েক দশকের মধ্যে আমাদের পক্ষে এই সমস্যার সমাধান আশা করা কঠিন।

রেপ্লিকেটর বা পারসোনাল ফেব্রিকেটরের (ব্যক্তিগত প্রতিলিপি) এ ধারণাটি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন এমআইটির পদার্থবিদ নিল গারশেনফেল্ড। এমআইটিতে তিনি একটি ক্লাস নেন, যার নাম ‘হাউ টু মেক (অলমোস্ট) এনিথিং’। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে অন্যতম জনপ্রিয় এক ক্লাস এটি। এমআইটি সেন্টার ফর বিটস অ্যান্ড অ্যাটমসের পরিচালনা করেন গারশেনফেল্ড। পাশাপাশি ব্যক্তিগত প্রতিলিপি নিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে চিন্তাভাবনা করেন তিনি। একেই পরবর্তী অসাধারণ ব্যাপার বলে ভাবা হচ্ছে এখন। এমনকি পারসোনাল ফেব্রিকেশন সম্পর্কে তাঁর ভাবনা নিয়ে বইও লিখেছেন, যার শিরোনাম : এফএবি : দ্য কামিং রেভল্যুশন অব ইওর ডেস্কটপ-ফ্রম পারসোনাল কম্পিউটার টু পারসোনাল ফেব্রিকেশন। তাঁর এই ধারণাগুলো ছড়িয়ে দিতে তিনি এরই মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণাগারের সঙ্গে, বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর সঙ্গে নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন। কারণ, এসব জায়গাতেই পারসোনাল ফেব্রিকেশন সর্বোচ্চ প্রভাব ফেলবে।

তিনি স্বপ্ন দেখেন, সব কাজের কাজি এই ফেব্রিকেটর যন্ত্রটি এতই ছোট হবে যে তা টেবিলেও রাখা যাবে। এতে লেজার ও মাইক্রো- মিনিয়েচারাইজেশনের সর্বশেষ উন্নয়ন ব্যবহার করে কম্পিউটার স্কিনে দেখে যেকোনো বস্তুকে কাটা, জোড়া লাগানো ও তার আকার দেওয়া সম্ভব। তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র মানুষেরা তাদের খামারের প্রয়োজনীয় নির্দিষ্ট যন্ত্রপাতি এর মাধ্যমে বানিয়ে নিতে পারবে। এই তথ্য একটা পিসিতে দেওয়া হবে। পিসিটি নীলনকশার ও তাত্ত্বিক তথ্যের বিশাল এক লাইব্রেরির সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে ইন্টারনেটের মাধ্যমে। প্রত্যেকের সুনির্দিষ্ট চাহিদা অনুযায়ী কম্পিউটার সফটওয়্যার সেখানে থাকা নীলনকশা মিলিয়ে তথ্য প্রসেস করবে। পরে তাদের কাছে ফিরতি ই-মেইল পাঠাবে। এরপর তাদের পারসোনাল ফেব্রিকেটর লেজার ও মিনিয়েচার কাটার যন্ত্র ব্যবহার করে টেবিলের ওপর পছন্দমতো বস্তু বানিয়ে দেবে তাদের।

ব্যক্তিগত কারখানার এই সবকিছুই আসলে প্রথম ধাপ। গারশেনফেল্ড তাঁর আইডিয়াটি ক্রমেই আণবিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে চান। তাতে মানুষের কল্পনার যেকোনো বস্তুই আক্ষরিক অর্থে বানানো সম্ভব হবে। তবে এ পথের অগ্রগতি বেশ ধীরগতির। কারণ, প্রতিটি পরমাণুকে নিপুণভাবে নিয়ন্ত্রণ করা খুবই কঠিন।

এ বিষয়ে পথিকৃতের মতো কাজ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যারিসটাইড রেকুইচা। তাঁর বিশেষত্ব হলো, আণবিক রোবটিকস। তাঁর লক্ষ্য ন্যানোবটের এমন এক বাহিনী বানানো, যা ইচ্ছেমতো নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। তিনি লিখেছেন, এ বিষয়ে দুটি পদ্ধতি আছে। প্রথমটি হলো টপ-ডাউন অ্যাপ্রোচ, যেখানে ইঞ্জিনিয়াররা সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের ছাপ দেওয়ার প্রযুক্তি ব্যবহার করে খুদে সার্কিট তৈরি করবেন। এটিই ন্যানোবটের মস্তিষ্ক হিসেবে কাজ করবে। এই প্রযুক্তি দিয়ে ক্ষুদ্র রোবট বানানো যাবে, যার উপকরণগুলোর আকার হবে ৩০ ন্যানোমিটার। এতে ন্যানোলিথোগ্রাফি ব্যবহার করা যাবে। ক্ষেত্রটি বেশ তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে।

তবে এ ক্ষেত্রে বটম-আপ অ্যাপ্রোচও আছে। এ পদ্ধতিতে ইঞ্জিনিয়াররা একটি পরমাণু দিয়ে ক্ষুদ্রাকৃতির রোবট তৈরির চেষ্টা করবে। সে জন্য প্রধান হাতিয়ার হবে স্ক্যানিং প্রোব মাইক্রোস্কোপ (এসপিএম)। এতেও স্ক্যানিং টানেলিং মাইক্রোস্কোপের মতো একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রতিটি পরমাণু শনাক্ত ও নড়ানো যাবে। যেমন জেনন পরমাণু প্লাটিনাম বা নিকেলের পৃষ্ঠতলে নাড়ানোর ব্যাপারে বিজ্ঞানীরা এখন বেশ দক্ষতা অর্জন করেছেন। তবে তিনি উল্লেখ করেন, ‘তারপরও এ কাজে সর্বোচ্চ ৫০টি পরমাণু দিয়ে একটি কাঠামো বানাতে বিশ্বের সেরা দলেরও ১০ ঘণ্টা সময় লাগে।’ একটা পরমাণু হাত দিয়ে সরানো খুব ধীরগতির ও ক্লান্তিকর। তাঁর মতে, এখানে উচ্চপর্যায়ের কাজ করতে সক্ষম নতুন যন্ত্র প্রয়োজন। তাতে শত শত পরমাণু একসঙ্গে ইচ্ছেমতো নড়ানো যাবে। দুর্ভাগ্যক্রমে এ রকম মেশিন এখনো বানানো যায়নি। তাতে অবশ্য অবাক হওয়ারও কিছু নেই। কারণ, বটম-আপ অ্যাপ্রোচ এখনো বলতে গেলে শৈশব অবস্থায় রয়ে গেছে।

কাজেই বেশ বোঝা যাচ্ছে, সাইকোকাইনেসিস বর্তমানের প্রেক্ষাপটে অসম্ভব। তবে ভবিষ্যতে হয়তো ইইজি, এমআরআই ও অন্যান্য পদ্ধতিতে আমাদের মস্তিষ্কের চিন্তার মধ্যে ঢুকে আরও অনেক কিছু বুঝতে পারা যাবে। এ শতাব্দীর মধ্যে মনের চিন্তা-চালিত যন্ত্রপাতি ব্যবহার করাও সম্ভব হতে পারে। সেগুলো দিয়ে কক্ষ তাপমাত্রার সুপারকন্ডাক্টর নিয়ন্ত্রণও করা যাবে। আবার এগুলো দিয়ে এমন সব কাজও করা যাবে যেগুলোকে ম্যাজিক বা জাদু থেকে আলাদা করা কঠিন। পরের শতাব্দীতে ম্যাক্রোস্কোপিক বা বড় বস্তুর ভেতরের অণুগুলোকে হয়তো নতুন করে সাজানো সম্ভব। সে কারণে সাইকোকাইনেসিসকে প্রথম শ্রেণির অসম্ভাব্যতা হিসেবে ধরা হয়েছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন ন্যানোবটই এই প্রযুক্তির চাবিকাঠি বলে দাবি করেছেন বেশ কজন বিজ্ঞানী। তবে অতি ক্ষুদ্র আকৃতির আণবিক রোবট তৈরির আগে আমাদের একটা মৌলিক প্রশ্নের জবাব দিতে হবে : রোবটের অস্তিত্ব কি সত্যিই থাকা সম্ভব?

তথ্যনির্দেশ

ডাবল হেলিক্স : ডিএনএ অণু দ্বিসূত্রক ও প্যাচানো সিঁড়ির মতো। একেই বলে ডাবল হেলিক্স। ডিএনএর ডাবল হেলিক্স হাইড্রোজেন বন্ধনের মাধ্যমে স্থির থাকে, যা দুটি সূত্রের মধ্যে সংযুক্ত থাকে। ডিএনএতে চারটি ক্ষার পাওয়া যায় (এডেনিন, সাইটোসিন, গুয়ানিন ও থায়ামিন)। ১৯৫৩ সালে জেমস ডি ওয়াটসন আর ফ্রান্সিস ক্রিক ডিএনএ অণুর গঠন ডাবল হেলিক্স প্রস্তাব করেন। সে জন্য ১৯৬৩ সালে ওয়াটসন, ক্রিক ও উইলকিন্স নোবেল পুরস্কার পান।

শক্তির সংরক্ষণশীলতার সূত্র : আরেক নাম শক্তির নিত্যতার সূত্র। এ সূত্রমতে, বিশ্বের মোট শক্তির পরিমাণ ধ্রুব। শক্তি অবিনশ্বর, শক্তি সৃষ্টি বা ধ্বংস করা যায় না। শক্তিকে শুধু এক রূপ থেকে শক্তির অন্য রূপে রূপান্তর করা যায়। যেমন ডিনামাইটের বিস্ফোরণে রাসায়নিক শক্তি যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। এ সূত্রমতে, পারপিচুয়াল মেশিন বা অবিরাম গতি যন্ত্র তৈরি করা অসম্ভব।

৭. রোবট

আগামী ৩০ বছরের মধ্যে একদিন, খুব ধীরে ধীরে পৃথিবীর সবচেয়ে গৌরবময় কিছু হিসেবে আমাদের সম্মান ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।

– জেমস ম্যাকলেয়ার

আইজ্যাক আসিমভের গল্প অবলম্বনে বানানো আই, রোবট মুভিতে দেখানো হয়েছে, সর্বকালের সবচেয়ে অগ্রসর রোবটিক ব্যবস্থা চালু হয় ২০৩৫ সালে। একে বলা হয় ভিকি (ভার্চুয়াল ইন্টারঅ্যাকটিভ কাইনেটিক ইন্টেলিজেন্স)। একটা বড় মহানগর নির্ভুলভাবে পরিচালনার জন্য নকশা করা হয় এটি সাবওয়ে সিস্টেম ও ইলেকট্রিসিটি গ্রিড থেকে শুরু করে বাসাবাড়ির হাজার হাজার রোবটের নিয়ন্ত্রণ করত ভিকি। মানবসভ্যতার সেবায় এর কেন্দ্রীয় কমান্ড বানানো হয়েছিল লোহার বর্ম দিয়ে

কিন্তু একদিন গুরুতর একটি প্রশ্ন করে বসে ভিকি : মানবতার সবচেয়ে বড় শত্রু কী? গাণিতিকভাবে ভিকি একসময় সিদ্ধান্তে আসে, মানবতার সবচেয়ে বড় শত্রু মানবজাতি নিজেই। মানবজাতিকে তার দূষণ করার পাগলাটে ইচ্ছা থেকে, লাগামছাড়া যুদ্ধ থেকে ও পৃথিবীকে ধ্বংস করা থেকে বাঁচানোর কথা ভাবে ভিকি। ভিকির কাছে এর একমাত্র উপায় ছিল, মানবজাতির নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেওয়া ও যন্ত্রের একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। মানবজাতিকে রক্ষার জন্য তাকেই ক্রীতদাসে পরিণত করতে হবে বলে ভাবল সে।

আই, রোবট কিছু প্রশ্ন তুলে ধরেছে : কম্পিউটারের ক্ষমতা দ্রুত অগ্রগতির মাধ্যমে যন্ত্র কি কখনো আমাদের নিয়ন্ত্রণ নেবে? রোবট কি এতই উন্নত হতে পারে যে একদিন আমাদের অস্তিত্বের জন্যও চূড়ান্ত হুমকি হয়ে দাঁড়াবে তারা?

কিছু বিজ্ঞানীর মতে, এর উত্তর—না। কারণ, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ধারণাটি বোকাটে। সমালোচকের ধারণা, চিন্তা করতে পারে, এমন যন্ত্র বানানো অসম্ভব। তাদের যুক্তি, প্রকৃতির এযাবৎকালে সৃষ্ট সবচেয়ে জটিল একটা সিস্টেম হলো মানবমস্তিষ্ক। অন্তত আমাদের ছায়াপথের এই অংশে কথাটি চরম সত্যি। মানুষের চিন্তার প্রতিলিপি বা নকল করতে সক্ষম কোনো যন্ত্রের নকশা করাও সম্ভব নয়। বার্কলির ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের দার্শনিক জন সার্লি এবং অক্সফোর্ডের বিখ্যাত পদার্থবিদ রজার পেনরোজ বিশ্বাস করেন, ভৌতভাবে যন্ত্র মানুষের চিন্তা করতে অক্ষম। রুটজার বিশ্ববিদ্যালয়ের কলিন ম্যাকজিন বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একটা শামুকের মতো দেখতে স্লাগ কীটের ফ্রয়েডিয়ান সাইকোঅ্যানালাইসিস করার চেষ্টার মতো। তাদের ধারণাগত কোনো হাতিয়ার নেই।

আসলে এ প্রশ্নটি বৈজ্ঞানিক সমাজকে গত প্রায় এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে বিভক্ত করে রেখেছে : যন্ত্র কি চিন্তা করতে পারে?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ইতিহাস

যান্ত্রিক সত্তার ধারণাটি অনেক দিন ধরে উদ্ভাবক, প্রকৌশলী, গণিতবিদ আর স্বপ্নদর্শীদের আগ্রহের বিষয়। দ্য উইজার্ড অব ওজ-এর টিন ম্যান থেকে শুরু করে স্পিলবার্গের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স : এআই-এর শিশুসুলভ রোবট, দ্য টার্মিনেটর মুভিতে খুনি রোবট, অর্থাৎ যন্ত্র মানুষের মতো কাজ ও চিন্তা করার এসব ধারণা আমাদের বেশ আমোদিত করে।

গ্রিক পুরাণে দেবতা ভালকান সোনা দিয়ে যান্ত্রিক পরিচারিকা ও তিনপায়া টেবিল বানিয়েছিল। সেগুলো নিজেদের ক্ষমতায় চলতে পারত। খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০ অব্দে গ্রিক গণিতবিদ আর্কিটাস অব টারেনটাম বাষ্পীয় শক্তিতে চালিত এক রোবট পাখি বানানোর সম্ভাবনার কথা লেখেন। প্রথম শতাব্দীর দিকে আলেকজান্দ্রিয়ার হিরো (বাষ্পচালিত প্রথম যন্ত্রের নকশার কৃতিত্ব তাঁকে দেওয়া হয়) কিছু স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের নকশা করেন। এদের মধ্যে একটা যন্ত্ৰ কথা বলতে পারত বলে কিংবদন্তি চালু আছে। ৯০০ বছর আগে আল-জাজারি কয়েকটি স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের ডিজাইন করেন ও বানান। এর মধ্যে ছিল পানিঘড়ি, রান্নার যন্ত্রপাতি ও পানিচালিত বাদ্যযন্ত্র।

১৪৯৫ সালে রেনেসাঁর কালে ইতালিয়ান শিল্পী ও বিজ্ঞানী লেওনার্দো দা ভিঞ্চি একটি রোবট নাইটের নকশা আঁকেন। সেটি বসতে ও তার হাত দুটো নাড়তে পারত। এ ছাড়া তার মাথা ও চোয়ালও নাড়াতে পারত যন্ত্রটি। ইতিহাসবিদেরা বিশ্বাস করেন, এটিই প্রথম কোনো হিউম্যানোয়েড (মানুষের মতো দেখতে) যন্ত্রের বাস্তবসম্মত ডিজাইন।

কিছু বিদ্ঘুটে হলেও প্রথম কার্যকর রোবট বানানো হয় ১৭৩৮ সালে। এটি বানান জ্যাকুস ডি ভ্যাকানসন। তিনি এমন একটি অ্যান্ড্রয়েড বানান, যেটি বাঁশি বাজাতে ও হাঁসের খেলাও দেখাতে পারত।

রোবট শব্দটি এসেছে ক্যারেল চ্যাপেকের লেখা আরইউআর শিরোনামের এক চেক নাটকের কারণে (চেক ভাষায় রোবট অর্থ গোলাম বা দাস। স্লোভাক ভাষায় এর অর্থ শ্রম)। ওই নাটকে রোসাম’স ইউনিভার্সেল রোবট নামের এক কারখানায় মানুষের কাজগুলো করতে একদল রোবট বানানো হতো। (সাধারণ যন্ত্রের চেয়ে আলাদা রোবটগুলো বানানো হতো রক্ত ও মাংস দিয়ে।) একসময় গোটা বিশ্বের অর্থনীতি এ রোবটের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। রোবটগুলো বেশ বাজেভাবে এ ক্ষমতার অপব্যবহার করতে থাকে। অবশেষে তারা তাদের প্রভু মানুষের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে তাদের হত্যা করতে থাকে। ক্রোধের কারণে রোবট সারাই করতে পারা ও নতুন রোবট তৈরি করতে পারা বিজ্ঞানীদেরও মেরে ফেলেছিল তারা। এতে নিজেদের একসময় বিলুপ্ত করে ফেলে। সবশেষে এমন দুটি বিশেষ রোবট আবিষ্কৃত হয়, যারা বংশবৃদ্ধি করতে পারে। আবার তাদের নতুন রোবট আদম ও ইভ হওয়ারও সম্ভাবনা থেকে যায়।

ফ্রিৎজ ল্যাংয়ের পরিচালনায় জার্মানিতে ১৯২৭ সালে নির্মিত বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল নির্বাক চলচ্চিত্র মেট্রোপলিশ-এর বিষয়বস্তুও ছিল রোবট। এর কাহিনি গড়ে উঠেছে ২০১৬ সালের পটভূমিতে। সেখানে শ্রমিকশ্রেণিকে মাটির নিচে বাজে ও নোংরা কারখানায় কাজ করতে বাধ্য করা হতো। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন অভিজাতদের বিচরণক্ষেত্র ছিল মাটির ওপরে। মারিয়া নামের এক সুন্দরী নারী একবার শ্রমিকদের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়। কিন্তু ক্ষমতাসীন অভিজাতরা ভয় পাচ্ছিল যে কোনো দিন হয়তো সে শ্রমিকদের বিদ্রোহে নেতৃত্ব দিয়ে বসে। তাই মরিয়া হয়ে এক শয়তান বিজ্ঞানীকে মারিয়ার মতো দেখতে এক রোবট বানাতে বলে অভিজাতরা। কিন্তু সেটিই শেষ পর্যন্ত তাদের জন্য বুমেরাং হয়ে দেখা যায়। কারণ, ক্ষমতাসীন অভিজাতদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে শ্রমিকদের নেতৃত্ব দিতে থাকে রোবটটি। এতে একসময় পুরো সামাজিক ব্যবস্থাটি ধসে পড়ে।

আগের আলোচিত প্রযুক্তি থেকে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আলাদা। এতে যে মৌলিক সূত্রগুলো জড়িত, তা এখনো পুরোপুরি বোঝা সম্ভব হয়নি। পদার্থবিদেরা নিউটনের গতিবিদ্যা, ম্যাক্সওয়েলের আলোর তত্ত্ব, আপেক্ষিকতা আর পরমাণু ও অণুর কোয়ান্টাম তত্ত্ব বেশ ভালোভাবেই বোঝেন। কিন্তু বুদ্ধিমত্তার মৌলিক সূত্রগুলো এখনো তাদের কাছে রহস্যে মোড়া। এআইয়ের জন্য নিউটনের মতো কারও সম্ভবত এখনো জন্ম হয়নি। কিন্তু গণিতবিদ ও কম্পিউটার বিজ্ঞানীরা এ ব্যাপারে নিঃশঙ্ক। তাঁদের কাছে এটা কোনো চিন্তাশীল যন্ত্রের গবেষণাগারের বাইরে হাঁটার আগের মুহূর্তের মতো ব্যাপার।

এআই ক্ষেত্রটিতে সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিটির নাম অ্যালান টুরিং। তিনি ছিলেন বিখ্যাত ব্রিটিশ গণিতবিদ। দূরদর্শী টুরিং এআই-সংক্রান্ত গবেষণার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন।

টুরিং একাই পুরো কম্পিউটার বিপ্লবের বনিয়াদ গড়ে তোলেন। তিনি এমন এক যন্ত্রের কথা কল্পনা করেছিলেন (একে বলা হয় টুরিং মেশিন), যেখানে মাত্র তিনটি উপাদান থাকবে। সেগুলো হলো : একটি ইনপুট টেপ, একটি আউটপুট টেপ আর একটি সেন্ট্রাল প্রসেসর (যেমন পেন্টিয়াম চিপ)। এ উপাদানগুলো সুনির্দিষ্ট কাজ সম্পাদন করতে পারবে। এখান থেকে তিনি কম্পিউটিং মেশিনের সূত্রগুলো বিধিবদ্ধ করতে সক্ষম হন। আবার সুনির্দিষ্টভাবে তাদের চূড়ান্ত শক্তি ও সীমাবদ্ধতা নির্ধারণও করেন তিনি। বর্তমানে সব ডিজিটাল কম্পিউটার টুরিংয়ের নির্ভুল এ সূত্রগুলো মেনে চলে। সে কারণে টুরিংয়ের কাছে গোটা ডিজিটাল জগতের অনেক ঋণ।

গাণিতিক যুক্তিবিদ্যার ভিত্তি স্থাপনে টুরিংয়ের অবদান অনেক। ১৯৩১ সালে ভিয়েনার গণিতবিদ কার্ট গোডেল প্রমাণ দেখান, পাটিগণিতে এমন কিছু সত্যি বিবরণ আছে, যেগুলো পাটিগণিতের স্বতঃসিদ্ধ ব্যবহার করে কখনো প্রমাণ করা যাবে না। এটি প্রমাণ করে গাণিতিক সমাজকে বেশ বড় এক ধাক্কা দেন গোডেল। (যেমন ১৭৪২ সালের গোল্ডবাক কনজেকচারে বলা হয়, ২-এর চেয়ে বড় যেকোনো জোড় পূর্ণসংখ্যা দুটি মৌলিক সংখ্যার যোগফল হিসেবে লেখা যায়। কিন্তু প্রায় আড়াই শ বছর পরও এই অনুমানটি প্রমাণ করা যায়নি। শেষ পর্যন্ত হয়তো কনজেকচারটি অপ্রমাণিতই রয়ে যাবে।) গোডেলের এ উদ্ঘাটনের ফলে দুই হাজার বছর আগের গ্রিকদের স্বপ্ন ভেঙে গেছে। সেকালে গ্রিকরা বিশ্বাস করত, গণিতের সব বিবৃতিই প্রমাণ করা সম্ভব। কিন্তু গোডেল প্রমাণ দেখিয়েছেন, গণিতে সব সময়ই এমন কিছু সত্যি বিবৃতি থাকবে, যেগুলো সব সময়ই আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে যাবে। তাই গ্রিকদের দেখা স্বপ্নের সেই সম্পূর্ণ ও নিখুঁত গণিত প্রাসাদ অনেক দূরের ব্যাপার। কারণ, গণিতকে অসম্পূর্ণ হিসেবে প্রমাণ করা হয়েছে।

টুরিং প্রমাণ দেখান, নির্দিষ্ট গাণিতিক কাজ সম্পাদন করতে একটা টুরিং মেশিন অসীম সময় নিল কি না, সাধারণভাবে তা জানা অসম্ভব। এটি প্রমাণ করে তিনি কম্পিউটার বিপ্লবের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যান। কিন্তু কম্পিউটার যদি কিছু গণনা করতে অসীম সময় লাগায়, তাহলে তার মানে হলো, কম্পিউটারটিকে যা গণনা করতে দেন না কেন, তা গণনাযোগ্য নয়। কাজেই টুরিং প্রমাণ করেন, গণিতে এমনও সত্যি বিবৃতি আছে, যা অগণনাযোগ্য। অর্থাৎ কম্পিউটার যত শক্তিশালীই হোক না কেন, ওই গণনা কম্পিউটারের ধরাছোঁয়ার বাইরে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, কোড ভাঙার ক্ষেত্রে টুরিংয়ের পথপ্রদর্শনমূলক কাজের কারণে মিত্রবাহিনীর হাজার হাজার প্রাণ মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যায়, যুদ্ধের ফলাফলেও তা প্রভাব ফেলে। সে সময় নাৎসি বাহিনী এনিগমা নামের এক যন্ত্র ব্যবহার করে তথ্য সংকেতাবদ্ধ করত। সে কারণে সেগুলো ডিকোড করা অসম্ভব হয়ে ওঠে মিত্রবাহিনীর কাছে। তাই নাৎসি বাহিনীর কোডগুলো ভাঙতে পারবে, এমন যন্ত্র বানানোর নির্দেশ দেওয়া হয় টুরিং ও তাঁর সহকর্মীদের। টুরিংয়ের মেশিনের নাম ছিল বোম্বি। সেটি শেষ পর্যন্ত সফল হয়। যুদ্ধ শেষ হওয়ার সময় তার দুই শতাধিক যন্ত্র কাজ করে যাচ্ছিল। এসব যন্ত্র ব্যবহার করে নাৎসি বাহিনীর গোপন তথ্য পড়তে পেরেছিল মিত্রবাহিনী। জার্মানিতে চূড়ান্ত আক্রমণের তারিখ ও স্থান সম্পর্কে নাৎসিদের বোকা বানাতেও পেরেছিল তারা। এরপর থেকেই নর্মান্ডি আক্রমণের পরিকল্পনায় টুরিংয়ের কাজ কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তা নিয়ে বিতর্কে নামেন ইতিহাসবিদেরা। কারণ, এ আক্রমণেই পরাজিত হয় জার্মানিরা। (যুদ্ধের পর টুরিংয়ের কাজ গোপন রাখে ব্রিটিশ সরকার। তাতে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো অনেক দিন জনসাধারণের চোখের আড়ালে থেকে যায়।)

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার পেছনে সহায়তা করেন টুরিং। কিন্তু যুদ্ধের সময়ের একজন নায়কে পরিণত হওয়ার বদলে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। একদিন তাঁর বাড়িতে চুরির ঘটনা ঘটল। দ্রুত পুলিশকে খবর দেন তিনি। দুর্ভাগ্যক্রমে সেখানে তাঁর সমকামিতার প্রমাণ পায় পুলিশ। তাঁকে সঙ্গে সঙ্গেই গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর টুরিংয়ের দেহে যৌন হরমোন ঢুকিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন আদালত। এর প্রভাবটা ছিল মারাত্মক। এর ফলে তাঁর স্তন বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং প্রচণ্ড মানসিক যন্ত্রণার কবলে পড়েন তিনি। এসব সইতে না পেরেই ১৯৫৪ সালে সায়ানাইড মেশানো একটি আপেল খেয়ে তিনি আত্মহত্যা করেন। (প্রচলিত এক গুজবমতে, টুরিংয়ের প্রতি শ্রদ্ধা দেখাতেই অ্যাপল করপোরেশনের লোগো রাখা হয়েছে কামড়ে খাওয়া একটি আপেল। )

বর্তমানে ‘টুরিং টেস্ট’-এর কারণে সম্ভবত টুরিং বেশি পরিচিত। যন্ত্ৰ চিন্তা করতে পারে কি না ও তাদের আত্মা আছে কি না, এ ধরনের অর্থহীন, অবিরাম দার্শনিক আলোচনায় ক্লান্ত হতেন তিনি। সে জন্য একটি পরীক্ষা উদ্ভাবনের মাধ্যমে তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে কঠিন ও যথাযথ আলোচনা শুরুর চেষ্টা করেন। তাঁর প্রস্তাব ছিল, দুটি সিল করা বাক্সের একটিতে একজন মানুষ আর অন্যটিতে একটি যন্ত্র রাখা হলো। প্রতিটি বাক্সে আপনাকে প্রশ্ন করার সুযোগ দেওয়া হলো। সেখানে পাওয়া উত্তর থেকে যদি আপনি মানুষ ও যন্ত্রের মধ্যে কোনো পার্থক্য করতে না পারেন, তাহলে যন্ত্রটি টুরিং টেস্ট পাস করবে।

সহজ কিছু কম্পিউটার প্রোগ্রাম লিখেছেন বিজ্ঞানীরা। যেমন এলিজা। এটি মানুষের কথোপকথন নকল করতে পারে। তাতে বেশির ভাগ সরল মানুষ বিশ্বাস করে বসে যে তারা মানুষের সঙ্গে কথা বলছে। (বেশির ভাগ মানুষের কথাবার্তায় মাত্র কয়েক শ শব্দ ব্যবহার হয়। তারা কেবল এতে গুটিকয়েক বিষয়ের ওপর মনোযোগ দিতে পারে।) তবে মানুষকে ধোঁকা দিতে পারে, এমন কোনো কম্পিউটার প্রোগ্রাম এখনো লেখা হয়নি। কোন বাক্সে মানুষ আর কোন বাক্সে যন্ত্র আছে, তা যারা নির্ণয় করার চেষ্টা করে, বিশেষ করে তাদের ধোঁকা দেওয়া যায় না। (স্বয়ং টুরিং অনুমান করেন, কম্পিউটারের ক্ষমতার ক্রমাগতভাবে সুচকীয় বৃদ্ধির ফলে ২০০০ সালের মধ্যে এমন যন্ত্রও বানানো সম্ভব, যেটি মাত্র পাঁচ মিনিটের মধ্যে ৩০ শতাংশ বিচারককে বোকা বানাতে পারবে। )

দার্শনিক ও ধর্মতত্ত্ববিদদের ছোট একটি দল ঘোষণা দিয়েছে, ‘আমাদের মতো করে চিন্তা করতে পারা কোনো সত্যিকারের রোবট বানানো অসম্ভব।’ এআই সম্ভব নয়, তা প্রমাণ করতে বার্কলিতে অবস্থিত ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের দার্শনিক জন সিয়ার্ল চায়নিজ রুম টেস্টের প্রস্তাব দিয়েছেন। মূলত, সিয়ার্লের যুক্তি, রোবট নির্দিষ্ট কিছু টুরিং টেস্ট উতরে যেতে পারলেও তারা সেটা করতে পারবে শুধু অন্ধ অনুকরণে সংকেতগুলো নিপুণভাবে কাজে লাগানোর কারণে। কিন্তু কার্যত তারা ওসব সংকেতের কিছু‍ই বুঝতে পারবে না।

কল্পনা করুন, আপনি কোনো বাক্সের ভেতরে বসে আছেন আর চীনা কোনো শব্দ বোঝেন না। ধরা যাক, আপনার কাছে এমন একটা বই আছে, যার কারণে আপনি দ্রুত চীনা অনুবাদ করতে ও এর অক্ষরগুলো নিপুণভাবে ব্যবহার করতে পারেন। এখন কেউ যদি আপনাকে চীনা ভাষায় প্রশ্ন করে, তাহলে অদ্ভুতদর্শন এসব অক্ষরের অর্থ একটুও না বুঝে বিশ্বাসযোগ্য উত্তর দিতে পারবেন আপনি।

তার সমালোচনার মূল ভাবার্থ হলো সিনট্যাক্স (বাক্যরীতি) আর সিমানটিক্সের (শব্দার্থতাত্ত্বিক) মধ্যকার পার্থক্য। কোনো ভাষার বাক্যরীতিতে দক্ষ হয়ে উঠতে পারে রোবটরা (যেমন, তারা ওই ভাষার ব্যাকরণ, তার প্রচলিত কাঠামো নিপুণভাবে ব্যবহার করতে পারে।) কিন্তু তার সত্যিকার অর্থঘটিত ব্যাপারটি আয়ত্ত করতে পারবে না তারা (যেমন শব্দটির অর্থ কী)। কোনো শব্দের অর্থ না জেনে-বুঝেও রোবটরা শব্দটি ব্যবহার করতে পারে। (টেলিফোনের অটোমেটিক ভয়েজ মেসেজ মেশিনের সঙ্গে কথা বলার সঙ্গে এর বেশ খানিকটা মিল আছে। এখানে প্রতিটি প্রতিক্রিয়ার জন্য আপনাকে ‘এক’ ‘দুই’ ইত্যাদি বাটন টিপতে হয়। অন্যদিকে ওই কণ্ঠটি আপনার সংখ্যাসূচক প্রতিক্রিয়া শনাক্ত করতে পারে। কিন্তু এ ব্যাপারে তারা কিছুই বুঝতে পারে না। )

অক্সফোর্ডের পদার্থবিদ রজার পেনরোজের বিশ্বাস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অসম্ভব। কোয়ান্টাম তত্ত্বমতে, চিন্তা করতে পারা ও মানুষের সচেতনতা ধারণ করতে পারা কোনো যান্ত্রিক সত্তা থাকা সম্ভব নয়। গবেষণাগারে মানুষের মতো রোবটের মানবমস্তিস্ক তৈরি করা অসম্ভব বলে দাবি করেন তিনি। এমন পরীক্ষা ব্যর্থ হবে বলে মনে করেন তিনি। (গোডেলের অসম্পূর্ণতার উপপাদ্য প্রমাণ করেছে, পাটিগণিত অসম্পূর্ণ। একইভাবে তিনি যুক্তি দেখান, হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তার নীতি প্রমাণ করবে, মানবচিন্তা ধারণা করতে যন্ত্র অক্ষম।)

তবু অনেক পদার্থবিদ ও প্রকৌশলীর বিশ্বাস, সত্যিকার রোবট বানাতে বাধা দেওয়ার মতো পদার্থবিদ্যায় কোনো সূত্র নেই। যেমন ইনফরমেশন থিওরি বা তথ্য তত্ত্বের জনক হিসেবে পরিচিত ক্লড শ্যাননকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ‘যন্ত্র কি চিন্তা করতে পারে?’ তিনি উত্তর দেন, ‘অবশ্যই। তাঁর মন্তব্যটি পরিষ্কার করতে বলা হলে তিনি জানান, ‘আমি চিন্তা করি, তাই নয় কি?’ সোজা কথায়, যন্ত্র যে চিন্তা করতে পারে, তা তাঁর কাছে অনস্বীকার্য। কারণ, মানুষও একধরনের যন্ত্র (যদিও তারা হার্ডওয়্যারের বদলে ওয়েটওয়্যার দিয়ে তৈরি)।

চলচ্চিত্রে রোবট দেখার কারণে অনেকে হয়তো ভেবে বসতে পারে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন অত্যাধুনিক রোবট তৈরির একেবারে দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছি আমরা। কিন্তু বাস্তবতা আসলে অন্য রকম। মানুষের মতো যেসব রোবট দেখা যায়, তাতে সাধারণত কিছু কৌশল ব্যবহৃত হয়। কৌশলটি হলো, একটা মানুষ তার ছায়ার ভেতর লুকিয়ে থাকে। তারাই মাইক্রোফোনের মাধ্যমে রোবটের মুখ দিয়ে কথা বলে। অনেকটা দ্য উইজার্ড অব ওজ-এর জাদুকরের মতো। আসলে আমাদের সবচেয়ে উন্নত রোবটের (অর্থাৎ যে রোবটটি মঙ্গলের বুকে ঘুরে বেড়াতে পারে) বুদ্ধিমত্তা একটা পোকার মতো। এমআইটির বিখ্যাত আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষামূলক রোবটগুলো যেসব কাজ পারে, তা একটা তেলাপোকাও করতে পারে। যেমন আসবাবে ঠাসা কোনো ঘরে চলাফেরা, লুকানোর জায়গা খোঁজা ও বিপদ চিহ্নিত করা। পৃথিবীর কোনো রোবটই শিশুদের সহজ-সরল গল্প শুনেও বুঝে উঠতে পারে না।

২০০১ : আ স্পেস ওডেসি চলচ্চিত্রে ভুলভাবে অনুমান করা হয়েছিল যে ২০০১ সালের মধ্যে আমাদের হাতে হ্যাল নামের সুপার রোবট চলে আসবে। এসব রোবট বৃহস্পতির দিকে স্পেসশিপ চালিয়ে নিতে, ক্রু সদস্যদের সঙ্গে আলাপ করতে, সমস্যা ঠিকঠাক করতে আর মানুষের মতো আচরণ করতে পারবে বলে ভাবা হয়েছিল।

টপ-ডাউন পদ্ধতি

রোবট বানাতে গিয়ে কয়েক দশক ধরে দুটি প্রধান সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন বিজ্ঞানীরা। সেগুলো হলো রোবটের কোনো প্যাটার্ন শনাক্ত করা ও সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান। বলা বাহুল্য, রোবটরা আমাদের তুলনায় অনেক ভালোভাবে দেখতে পায়। কিন্তু তা হলে কী হবে, সামনে কী দেখছে তার কণামাত্রও বুঝতে পারে না তারা। একইভাবে আমাদের চেয়ে অনেক গুণ ভালোভাবে শুনতেও পায় রোবটরা। কিন্তু বলা বাহুল্য, কী শুনছে তা তারা বুঝে উঠতে পারে না।

এই দ্বৈত সমস্যায় হানা দিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় টপ-ডাউন পদ্ধতি ব্যবহারের চেষ্টা করেন গবেষকেরা। মোটাদাগে বলতে গেলে, তাঁদের লক্ষ্য, প্যাটার্ন শনাক্ত করা আর সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানের সব নিয়মকানুন একটা সিডিতে প্রোগ্রাম করে ফেলা। কম্পিউটারে এ সিডিটি ঢোকানো হলে কম্পিউটারটি সহসা আত্মসচেতন ও মানবিক বুদ্ধিমত্তা অর্জন করতে পারবে বলে বিশ্বাস করেন তাঁরা। এই পথে ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে বেশ বড় ধরনের কিছু অগ্রগতি হয়েছে। এ ক্ষেত্রে এমন রোবট তৈরি করা সম্ভব হয়েছে, যারা দাবা খেলতে, বীজগণিত করতে, ব্লক তোলাসহ আরও অনেক কিছু করতে পারে। এই অগ্রগতি এতই বিস্ময়কর ছিল যে সে সময় ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল, আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই রোবটরা খোদ মানুষের বুদ্ধিমত্তা ছাড়িয়ে যাবে।

যেমন ১৯৬৯ সালে স্ট্যানফোর্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটে শ্যাকি নামের একটা রোবট মিডিয়ায় বেশ আলোড়ন তোলে। শ্যাকি ছিল ছোট্ট এক পিডিপি কম্পিউটার। এক সারি চাকার ওপর বসানো হয়েছিল রোবটটি। আর সবার ওপরে বসানো ছিল একটা ক্যামেরা। ক্যামেরাটি যেকোনো ঘর জরিপ করতে পারত। অন্যদিকে কম্পিউটারটি ঘরের বস্তুগুলো বিশ্লেষণ করে সেগুলো শনাক্ত করতে পারত। এভাবে বস্তুগুলোর চারপাশে চলাফেরা করতে পারত রোবটটি। শ্যাকিই প্রথম কোনো যান্ত্রিক অটোমেটন, যা বাস্তব জগতে নেভিগেট করতে পারত। এটি দেখেই সাংবাদিকদের আশঙ্কা হয়েছিল, রোবটরা কখন জানি মানুষকে ধুলোয় মিশিয়ে দেয়।

কিন্তু অচিরেই এ রোবটের বিভিন্ন ত্রুটি চোখে পড়তে শুরু করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার টপ-ডাউন পদ্ধতির ফলাফল পাওয়া গিয়েছিল বড় ও বেখাপ্পা রোবটগুলো থেকে। এ রোবটগুলো বিশেষ কোনো ঘরে চলাফেরা করতে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাগিয়ে বসে। তারা শুধু সরলরেখার বস্তুই (বর্গাকার ও ত্রিভুজাকার) শনাক্ত করতে পারত। কিন্তু কোনো ঘরে সাধারণ আকার-আকৃতির বাইরে অন্য কোনো আসবাব রাখা হলে রোবটগুলো তা কোনোভাবেই শনাক্ত করতে পারে না। (মজার ব্যাপার হলো, একটি মাছির মস্তিষ্কে মাত্র প্রায় আড়াই লাখ নিউরন থাকে, যার পরিমাণ উন্নত এসব রোবটের কম্পিউটিং পাওয়ারের ভগ্নাংশমাত্র। কিন্তু তারপরও মাছি ত্রিমাত্রিক জগতে অনায়াসে চলাফেরা করতে ও চোখধাঁধানো বিভিন্ন রণকৌশলও প্রয়োগ করতে পারে। অথচ জবরজং রোবটগুলো দ্বিমাত্রিক জগতেই গোলকধাঁধার চক্করে আটকে পড়ে থাকে।)

টপ-ডাউন পদ্ধতি অচিরেই কঠিন এক দেয়ালে বাধার সম্মুখীন হয়। সাইবারলাইফ ইনস্টিটিউটের পরিচালক স্টিভ গ্র্যান্ড বলেন, এ পদ্ধতিটি এমন যেন, ‘এটি প্রমাণ করতে আমাদের হাতে ৫০ বছর দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আমরা সেই প্রতিশ্রুতি রাখতে পারিনি।’

১৯৬০-এর দশকে সহজ কিছু কাজে রোবটের জন্য প্রোগ্রামিংয়ে জড়িত কাজগুলোর ব্যাপকতা পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেননি বিজ্ঞানীরা। কাজগুলো ছিল চাবি, জুতা ও কাপের মতো বস্তু শনাক্ত করতে রোবটকে প্রোগ্রামিং করা। এমআইটির রডনি ব্রুক বলেন, ‘চল্লিশ বছর আগে এমআইটির আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ল্যাবরেটরিতে এক আন্ডারগ্র্যাজুয়েটকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল পুরো একটা গ্রীষ্মকালের মধ্যে এর সমাধান করতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি ব্যর্থ হন। পিএইচডি থিসিস করতে গিয়ে একই সমস্যায় আমিও ব্যর্থ হই ১৯৮১ সালে।’ আসলে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গবেষকেরা এখনো এই সমস্যার কোনো সমাধান পাননি।

যেমন কোনো ঘরে ঢুকে আমরা প্রায় নিমেষেই ঘরের মেঝে, চেয়ার, আসবাব, টেবিল ও অন্যান্য জিনিস চিনে ফেলি। কিন্তু রোবট কোনো ঘর স্ক্যান করে আসলে কিছুই দেখে না, বরং বিপুলসংখ্যক সোজা ও বক্র রেখা দেখে। এ বক্ররেখাগুলোকে পিক্সেলে কনভার্ট করে সে। জটপাকানো এসব রেখা থেকে কিছু বুঝে উঠতে কম্পিউটারের বিপুল পরিমাণ সময় লাগে। একটি টেবিল চিনে উঠতে আমাদের বড়জোর এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশ সময় লাগে। কিন্তু একই কাজ করতে কম্পিউটার সেখানে বিপুলসংখ্যক বৃত্ত, ডিম্বাকৃতি, সরলরেখা, প্যাচানো রেখা, কর্ণ ও অন্যান্য রেখা দেখে। গণনার জন্য বিপুল সময় নেওয়ার পর, কোনো রোবট হয়তো শেষ পর্যন্ত বস্তুটিকে টেবিল হিসেবে চিনতে পারে। অন্য কথায়, রোবটও এভাবে দেখতে পারে। এমনকি তারা মানুষের চেয়েও অনেক গুণ ভালো দেখতে পায়। কিন্তু সামনে কী দেখছে তা বুঝতে পারে না। তবে কোনো ঘরে ঢুকে একটি রোবট হয়তো জটপাকানো বিপুল পরিমাণ রেখা বা বক্ররেখা দেখে, আমাদের মতো করে কোনো চেয়ার, টেবিল বা ল্যাম্প দেখতে পায় না।

আমরা কোনো ঘরে হাঁটার সময় আমাদের মস্তিষ্ক এক লহমায় ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন গণনা করে সামনের বস্তুগুলো চিনে ফেলে। এটি এমন এক কাজ, যা সম্পর্কে আমরা সচেতন নই। একে আমাদের জন্য সৌভাগ্যই বলতে হবে। আমাদের মস্তিষ্ক কী ধরনের কাজ করছে, সেটি সম্পর্কে যে আমরা অসচেতন, তার কারণ হলো বিবর্তন। আমরা যদি জঙ্গলের মধ্যে একাকী কোনো দাঁতাল বাঘের পাল্লায় পড়তাম, তখন আমাদের আসন্ন সব বিপদ শনাক্ত করা ও সেখান থেকে পালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটির সব গণনা কার্যক্রম সম্পর্কে সচেতন হতাম, তাহলে আমরা স্রেফ সেখানেই অকেজো হয়ে পড়ে থাকতাম। নিজেদের টিকে থাকার স্বার্থেই, আমাদের শুধু এটুকুই জানার প্রয়োজন, কীভাবে দৌড়াতে হয়। জঙ্গলে বাস করার সময় আমাদের মাটি, আকাশ, পাথর বা অন্যান্য বিষয় চিনতে মস্তিষ্কের সব হিসাব-নিকাশ সম্পর্কে সচেতন হওয়ার কোনো প্রয়োজন পড়েনি।

অন্য কথায়, আমাদের মস্তিষ্ক যেভাবে কাজ করে, তাকে বিশাল এক আইসবার্গ বা বরফখণ্ডের সঙ্গে তুলনা করা যায়। আমরা শুধু আইসবার্গের চূড়া সম্পর্কে সচেতন। এটিই আমাদের সচেতন মন। এর তলার নিচে আমাদের চোখের আড়ালে অনেক বড় বস্তু লুকিয়ে আছে। সেটি হচ্ছে আমাদের অবচেতন মন। এটিই আমাদের মস্তিষ্কের গণনা ক্ষমতার বিপুল অংশ ব্যবহার করে আমাদের চারপাশের সাধারণ বস্তুগুলো সম্পর্কে বুঝতে চেষ্টা করে। যেমন আপনি কোথায় আছেন, কার সঙ্গে কথা বলছেন ও আপনার চারপাশে কী লুকিয়ে আছে, তা বোঝার চেষ্টা করে এই অবচেতন মন। আমাদের কোনো রকম অনুমতি বা জ্ঞান ছাড়াই এসব স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন হয়।

এ কারণেই রোবটগুলো ঘরের ভেতরে নেভিগেট করতে, হাতের লেখা পড়তে, ট্রাক ও গাড়ি চালাতে, আবর্জনা বাছাই করতে ও অন্যান্য কাজ করতে পারে না। যান্ত্রিক সৈন্য ও বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন ট্রাক তৈরির চেষ্টায় এ পর্যন্ত শত শত কোটি ডলার ব্যয় করেছে মার্কিন সেনাবাহিনী। কিন্তু কোনো সফলতা পাওয়া যায়নি এখনো।

বিজ্ঞানীরা বুঝতে শুরু করছেন, দাবা খেলা বা বড় সংখ্যার গুণ করতে কেবল ছোট্ট, সীমিত মানবিক বুদ্ধিমত্তা হলেই চলে। ১৯৯৭ সালে আইবিএম কম্পিউটার ডিপ ব্লু বিশ্ব দাবা চ্যাম্পিয়ন গ্যারি ক্যাসপারভকে ছয় ম্যাচে পরাজিত করে। তখন সেটি ছিল অপরিপক্ব কম্পিউটার ক্ষমতার এক বিজয়। খেলাটি বিশ্বব্যাপী সংবাদ শিরোনাম হলেও পরীক্ষাটি আমাদের বুদ্ধিমত্তা বা চেতনা সম্পর্কে তেমন কিছুই জানাতে পারেনি। ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটারবিজ্ঞানী ডগলাস হোফস্টাডটার বলেন, ‘হায় ঈশ্বর, আমি ভাবতাম, দাবা খেলার জন্য চিন্তা করার দরকার। এখন বুঝতে পারছি, তার কোনো দরকার নেই। এর মানে এই নয় যে ক্যাসপারভ গভীরভাবে চিন্তা করেন না। তবে গভীর চিন্তা ছাড়াও দাবা খেলা যাবে। পাখা না ঝাপটিয়ে উড়ে যাওয়ার মতো ব্যাপার আরকি।’

কম্পিউটারের বিকাশ ভবিষ্যতের চাকরির বাজারেও ব্যাপক প্রভাব ফেলবে। ভবিষ্যদ্বাদীরা মাঝেমধ্যে জল্পনা করেন, ভবিষ্যতে শুধু সেই সব মানুষের চাকরি টিকে থাকবে, যারা কম্পিউটারবিজ্ঞানী ও টেকনিশিয়ান হিসেবে অনেক বেশি দক্ষ। কিন্তু আসলে আবর্জনা পরিষ্কারক, নির্মাণশ্রমিক, অগ্নিনির্বাপণকর্মী, পুলিশ ও এ ধরনের অন্যান্য কাজের ক্ষেত্রগুলোতেও ভবিষ্যতে চাকরি ঠিকই টিকে থাকবে। কারণ, তারা যেটা করে তার সঙ্গে প্যাটার্ন রিকগনিশন জড়িত। প্রতিটি অপরাধ, আবর্জনার টুকরো, যন্ত্রপাতি ও আগুন আলাদা। কাজেই সেগুলো রোবট দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। মজার ব্যাপার হলো, নিম্ন পর্যায়ের অ্যাকাউন্ট্যান্ট, ব্রোকার, ঘোষকদের মতো কলেজপড়ুয়া কর্মীরা হয়তো ভবিষ্যতে চাকরি হারাতে পারে। কারণ, তাদের কাজগুলো অনেকটাই পুনরাবৃত্তিমূলক। আবার তাদের কাজের সঙ্গে সংখ্যার হিসাব রাখার ব্যাপারটি জড়িত। তাই এসব কাজ কম্পিউটারের এক্সেলেই করা সম্ভব।

রোবট তৈরিতে দ্বিতীয় সমস্যাটি আরও বেশি মৌলিক। সেটি হলো প্যাটার্ন রিকগনিশন। এটি তাদের সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানের অভাব। মানুষ যেগুলো জানে, যেমন :

পানি ভেজা

মা তার মেয়ের চেয়ে বয়স্ক হন।

জীবজন্তু ব্যথা পছন্দ করে না।

মরার পর কেউ ফিরে আসে না।

দড়ি টানা যায়, ঠেলা যায় না।

লাঠি ঠেলা যায়, টানা যায় না।

সময় পেছনের দিকে যায় না।

কিন্তু ক্যালকুলাস বা গণিতের এমন কোনো পদ্ধতি নেই, যা দিয়ে এসব সত্য প্রকাশ করা সম্ভব। আমরা এসব জানি, কারণ, আমরা জীবজন্তু, পানি ও দড়ি দেখতে পাই। এভাবে নিজেরাই একসময় সত্যটা আবিষ্কার করতে পারি। বাস্তবের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে সাধারণত বিচারবুদ্ধি শেখে শিশুরা। জীববিজ্ঞান ও পদার্থবিজ্ঞানের স্বজ্ঞাতমূলক নিয়ম কঠিন উপায়ে বা বাস্তব জগতের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে শিখতে হয়। কিন্তু রোবটদের এমন কোনো অভিজ্ঞতা নেই। তারা শুধু সেটুকুই জানে, যেটুকু তাদের মধ্যে প্রোগ্রামিং করে দেওয়া হয়।

(ফলে ভবিষ্যতে এমন সব চাকরির দরকার হবে, যেখানে সাধারণ বিচারবুদ্ধির প্রয়োজন পড়ে। যেমন শৈল্পিক সৃজনশীলতা, স্বকীয়তা, অভিনয় দক্ষতা, হাস্যরস, বিনোদন, বিশ্লেষণ ও নেতৃত্ব। এই গুণগুলোই আমাদের অনন্যভাবে মানুষ করে তুলেছে। আর এগুলো নকল করা কোনো কম্পিউটারের পক্ষে কখনো সম্ভব নয়। )

অতীতে গণিতবিদেরা একটি ক্র্যাশ প্রোগ্রাম দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছেন, যেখানে সাধারণ বিচারবুদ্ধির সব নিয়মকানুন একবারে সবার জন্য জড়ো করা যাবে। সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী প্রচেষ্টাটি হলো সিওয়াইসি (এনসাইক্লোপিডিয়ার সংক্ষেপ)। সাইক্রপের প্রধান ডগলাস লিনাটের মস্তিষ্কপ্রসূত এটি। ম্যানহাটান প্রজেক্ট ছিল দুই বিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি ক্র্যাশ প্রোগ্রাম, যার মাধ্যমে পারমাণবিক বোমা বানানো হয়েছিল। সিওয়াইসিকে বলা যায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য একপ্রকার ম্যাটহাটান প্রজেক্ট। এর চূড়ান্ত প্রচেষ্টায় সত্যিকারের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পাওয়া যাবে।

অবাক হওয়ার কিছু নেই, বুদ্ধিমত্তার ১০ মিলিয়ন নিয়মকানুন থাকে। লিনাটের নীতিবাক্যও ওটাই। (লিনাটের অভিনব পথ আছে, যার মাধ্যমে শেষমেশ সাধারণ বিচারবুদ্ধির নতুন আইনকানুন খুঁজে পাওয়া যাবে। তাঁর সহকর্মীরা স্ক্যান্ডালের খবরে ভরা ট্যাবলয়েড পত্রিকা ও চাঞ্চল্যকর গুজব পড়েন। এরপর তিনি সিওয়াইসিকে জিজ্ঞেস করেন, সে ট্যাবলয়েডের কোনো ত্রুটি ধরতে পেরেছে কি না। এতে লিনাট সফলতা পেলে সিওয়াইসি হয়তো অধিকাংশ ট্যাবলয়েড পত্রিকার পাঠকের চেয়ে অনেক বেশি বুদ্ধিমান হয়ে উঠবে।)

সিওয়াইসির অন্যতম লক্ষ্য ‘ব্রেক ইভেন’-এ পৌঁছানো। অর্থাৎ এমন বিন্দুতে পৌঁছানো, যেখানে রোবট যথেষ্ট বুঝতে পারবে। ফলে রোবটটি লাইব্রেরিতে ম্যাগাজিন ও বই পড়ে নতুন তথ্য হজম করতে পারবে। একটা পাখির বাচ্চা একটা সময় তার বাসা ছেড়ে ডানা ঝাপটাতে থাকে ও নিজে নিজেই উড়তে পারে। এই ব্রেক ইভেন বিন্দুতে সিওয়াইসিকেও পাখির বাচ্চার সঙ্গে তুলনা করা যায়।

তবে ১৯৮৪ সালে সংস্থাটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে এআই নিয়ে সাধারণ এক সমস্যা থেকে এর বিশ্বস্ততা হুমকির মুখে পড়েছে। কারণ, তারা এমন ভবিষ্যদ্বাণী করেছে, যা সংবাদ শিরোনাম হয়েছে, কিন্তু সেগুলো ব্যাপকভাবে অবাস্তব। সে সময় লিনাট ভবিষ্যদ্বাণী করেন, আগামী ১০ বছরে বা ১৯৯৪ সাল নাগাদ সিওয়াইসি ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ ‘সর্বজনীন বাস্তবতা’ ধারণ করতে পারবে। কিন্তু এখনো তার ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারেনি সিওয়াইসি। সাইক্রপের বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, চার বছর বয়সী বাচ্চার মতো সাধারণ বিচারবুদ্ধি কম্পিউটারে দিতে চাইলে লাখ লাখ লাইন কোড প্রোগ্রামিং করতে হবে। সিওয়াইসি প্রোগ্রামের সর্বশেষ সংস্করণে এখন পর্যন্ত মাত্র ৪৭ হাজার আংশিক ধারণা আর ৩০৬০০০ ঘটনা যোগ করা সম্ভব হয়েছে। সাইক্রপ নিয়মিত আশাবাদী সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। তারপরও লিনাটের সহকর্মী আর ভি গুহ (১৯৯৪ সালে তিনি ওই দল ছেড়েছেন) একবার বলেছেন, সাধারণভাবে সিওয়াইসিকে একটা ব্যর্থ প্রজেক্ট হিসেবে দেখা যায়। আমরা যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, তার পাণ্ডুর ছায়া বানানোর চেষ্টা করতে গিয়ে নিজেরাই নিজেদের হত্যা করেছি।’

অন্য কথায়, সাধারণ বিচারবুদ্ধি বা কাণ্ডজ্ঞানের সব নিয়মকানুন কোনো কম্পিউটারে প্রোগ্রাম করার চেষ্টাই আসলে ভুল। কারণ, সাধারণ বিচারবুদ্ধির নিয়মকানুনের শেষ নেই। মানুষ এসব নিয়ম অনায়াসে শেখে। কারণ পুরো জীবনভর পরিবেশের সঙ্গে আমাদের সংঘাত লেগেই থাকে। আর এভাবেই পদার্থবিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞানের নিয়ম শিখি আমরা। কিন্তু রোবটরা তা করতে পারে না।

মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস স্বীকার করেছেন, ‘কম্পিউটার ও রোবটরা চারপাশের পরিবেশ সম্পর্কে বুঝতে এবং দ্রুত ও সঠিকভাবে তার প্রতিক্রিয়া দেখাতে সক্ষম করা প্রত্যাশার চেয়েও অনেক কঠিন। যেমন কোনো ঘরের সাপেক্ষে তাদের নিজেদের খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা, শব্দের প্রতি সাড়া দেওয়া ও কথাকে ব্যাখ্যা করা এবং বস্তুর আকার, গঠনবিন্যাস ও ভঙ্গুরতার ওপর ভিত্তি করে তা আঁকড়ে ধরা। এমনকি খোলা দরজা আর জানালার মধ্যে পার্থক্য বলাও রোবটের জন্য খুবই কঠিন সমস্যা হতে পারে।

তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার টপ-ডাউন পদ্ধতির সমর্থকেরা বলেন, এ পদ্ধতিতে সারা বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণাগারে অগ্রগতি হচ্ছে। অবশ্য মাঝেমধ্যে সেসব অগ্রগতিকে নীরস বলতে হবে। যেমন চালকবিহীন গাড়ি বানানোর জন্য কয়েক বছর ধরে দুই মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পুরস্কার ঘোষণা করেছে ডিফেন্স অ্যাডভান্সড রিসার্চ প্রজেক্ট এজেন্সি (ডাপা)। গাড়িটিকে এমন হতে হবে যেন তা নিজে নিজেই মোজাভ মরুভূমির রুক্ষ পথে চলতে পারে। ২০০৪ সালে ডার্পার এই গ্র্যান্ড চ্যালেঞ্জে কেউ প্রতিযোগিতায় টিকতে পারেনি। আসলে সেরা গাড়িটি কোনোমতে ৭৪ মাইল পাড়ি দিয়ে ভেঙে পড়ে। তবে ২০০৫ সালে স্ট্যানফোর্ড রেসিং টিমের চালকবিহীন কার সফলভাবে ১৩২ মাইল পথ পাড়ি দিয়েছে (অবশ্য সে জন্য সময় লেগেছে ৭ ঘণ্টা)। আরও চারটি গাড়িও প্রতিযোগিতা শেষ করেছিল। (কতিপয় সমালোচক বলেছেন, লম্বা মরুপথে প্রতিযোগিতার নিয়মে জিপিএস নেভিগেশন সিস্টেম ব্যবহারের অনুমতি আছে। এতে গাড়িগুলো খুব বেশি বাধা ছাড়াই একটি সুনির্ধারিত রাস্তার ম্যাপ অনুসরণ করতে পারে। তাই গাড়িগুলো কখনো রাস্তার মধ্যে জটিল বাধাগুলো চিনতে পারে না। বাস্তবে গাড়ি চালনায়, গাড়িগুলোকে তার চারপাশে অনির্ধারিত অন্য সব গাড়ি, পথচারী, নির্মাণস্থান, যানজট ও অন্য বাধাগুলোর মধ্য দিয়ে পথ করে নিতে হয়।)

বিল গেটস বেশ সতর্কভাবে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, রোবটিক মেশিন হয়তো আমাদের জন্য পরবর্তী বড় বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। রোবটিকস ক্ষেত্রটিকে ৩০ বছর আগে নিজের হাতে গড়ে তোলা পারসোনাল কম্পিউটার বা পিসি ক্ষেত্রের সঙ্গে তুলনা করেছেন তিনি। পিসির মতো এটিও হয়তো সফলতার দেখা পাবে। ‘এই শিল্পটি তার প্রয়োজনীয় পরিবর্তন কখন অর্জন করবে, কিংবা আদৌ করতে পারবে কি না, তা কেউই বলতে পারে না।’ তিনি লিখেছেন। ‘এটি যদি সফলতা পায়, তাহলে তা পৃথিবীকে পাল্টে দেবে

(একসময় মানবিক বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন রোবট বাণিজ্যিকভাবে সহজলভ্য হয়ে উঠবে। বাজারে তাদের চাহিদাও বিপুল। সত্যিকারের রোবট এখন না থাকলেও প্রিপ্রোগ্রামড রোবটের অস্তিত্ব আছে ও তাদের পরিমাণও বাড়ছে। ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রোবটিকস হিসাব করে দেখেছে, ২০০৪ সালে ব্যক্তিগত রোবটের পরিমাণ ছিল প্রায় ২০ লাখ। আর ২০০৮ সালে আরও ৭০ লাখ রোবট স্থাপন করা হয়েছে। জাপানিজ রোবট অ্যাসোসিয়েশনের অনুমান, ২০২৫ সাল নাগাদ ব্যক্তিগত রোবটশিল্পের (বর্তমানে যার বাজারমূল্য ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) মূল্য দাঁড়াবে বছরে ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।)

বটম-আপ পদ্ধতি

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় টপ-ডাউন পদ্ধতির সীমাবদ্ধতার কারণে তার বদলে বটম-আপ পদ্ধতি ব্যবহারের চেষ্টা চলছে। এতে বিবর্তন ও শিশুর শেখার পদ্ধতি অনুকরণ করা হয়েছে। যেমন পোকামাকড় পরিবেশ স্ক্যান করে নেভিগেট করে না। আবার সুপারকম্পিউটারের মাধ্যমে ছবিটি ক্ষুদ্রতর এককে ভেঙে ফেলে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন পিক্সেলে রূপান্তরিতও করে না তারা। পোকাদের মস্তিষ্ক নিউরাল নেটওয়ার্ক বা স্নায়ুতন্ত্রে গঠিত। এটি এমন এক লার্নিং মেশিন, যা প্রতিকূল বিশ্বের সঙ্গে প্রতিনিয়ত ধাক্কা খায়। এভাবে সেখানে কীভাবে চলতে হবে, তা ধীরে ধীরে শিখে ফেলে তারা। এমআইটিতে টপ-ডাউন পদ্ধতিতে হাঁটতে পারা রোবট বানানো ভীষণ কঠিন। কিন্তু পোকামাকড়ের মতো দেখতে সরল যান্ত্রিক জন্তু প্রতিকূল পরিবেশের হোঁচট খেয়ে সফলভাবে শেখে। এভাবে তাদের মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে এমআইটির মেঝের ওপর তাড়িয়ে নেওয়া যায়।

বড় আকারের ছুটতে পারা রোবটের জন্য এমআইটির আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ল্যাবরেটরি বেশ নামকরা। এর পরিচালক রোডনি ব্রুক ক্ষুদ্র ইনসেক্টটোইড রোবটের ধারণা অনুসন্ধান করে বেশ উদারপন্থী বনে গেছেন। বিভিন্ন জিনিসপত্রের ওপর হুমড়ি খেয়ে ও ধাক্কা খেয়ে এই রোবট পুরোনো পদ্ধতিতে হাঁটতে শিখতে পারে। হাঁটার সময় তাদের পায়ের অবস্থান গাণিতিকভাবে হিসাব করতে জটিল কম্পিউটার প্রোগ্রাম ব্যবহার করে না। বরং তার ইনসেক্টটোইড ট্রায়াল ও ইরর ব্যবহার করে তাদের পায়ের গতির সমন্বয় করে। সে জন্য তারা অতি সামান্য কম্পিউটার শক্তি ব্যবহার করে। বর্তমানে ব্রুকের ইনসেক্টটোইড রোবটের বেশ কিছু বংশধর মঙ্গল গ্রহে নাসার জন্য তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছে। মঙ্গলের ঊষর বুকে তাদের নিজেদের বুদ্ধিমত্তা কাজে লাগিয়ে দ্রুতবেগে ছোটাছুটি করতে পারে। ব্রুক বিশ্বাস করেন, তাঁর ইনসেক্টটোইড সৌরজগতে অনুসন্ধান চালানোর জন্য উপযুক্ত।

ব্রুকের প্রজেক্টের মধ্যে অন্যতমটি হলো সিওজি। ছয় মাস বয়সী শিশুর বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন যান্ত্রিক রোবট বানানোর প্রচেষ্টা এটি। বাইরে থেকে সিওজি দেখতে একগাদা তার, সার্কিট আর গিয়ারের তালগোল পাকানো অবস্থা বলে মনে হয়। তবে এর একটি মাথা, চোখ ও হাত আছে। বুদ্ধিমত্তার কোনো সূত্র প্রোগ্রাম না করে মানব প্রশিক্ষকের প্রতি এর চোখ যাতে নিবদ্ধ থাকে, সেভাবে ডিজাইন করা হয়েছে রোবটটি। রোবটটিকে সরল কিছু দক্ষতা শেখানোর চেষ্টা করেন প্রশিক্ষক। (এক গবেষক সন্তানসম্ভবা হওয়ার পর বাজি ধরেছিলেন, কে দ্রুত শিখতে পারে, সিওজি নাকি তার দুই বছরের শিশু। বলা বাহুল্য, শিশুটি সিওজিকে ছাড়িয়ে গেছে।)

পোকামাকড়ের আচরণ নকল করে সফলতা পেতে রোবটের ক্ষেত্রেও নিউরাল নেটওয়ার্ক ব্যবহৃত হয়েছে। তাদের মধ্যে স্তন্যপায়ীর মতো উচ্চশ্রেণির প্রাণীর আচরণ নকলের চেষ্টা করেন প্রোগ্রামাররা। কিন্তু এতে বাজে ফল পাওয়া গেছে। নিউরাল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা সবচেয়ে উন্নত রোবট ঘরে হাঁটতে বা পানিতে সাঁতার কাটতে পারে। কিন্তু কুকুরের মতো বনে লাফাতে পারে না, কিংবা ঘরের মধ্যে ইঁদুরের মতো দৌড়াতেও পারে না। বড় ধরনের নিউরাল নেটওয়ার্কসম্পন্ন রোবটের মধ্যে মানুষের মতো প্রায় কয়েক শ নিউরন থাকতে পারে। তবে মানুষের মস্তিষ্কে নিউরনের সংখ্যা ১০০ বিলিয়নের বেশি। C. elegans নামের খুব সরল এক কীটের নার্ভাস সিস্টেম বা স্নায়ুতন্ত্রের মানচিত্র বানিয়ে ফেলেছেন জীববিজ্ঞানীরা। এ কীটের স্নায়ুতন্ত্রে ৩০০-এর বেশি নিউরন আছে। এ কারণে এটিই হয়তো প্রকৃতিতে পাওয়া সবচেয়ে সরল নার্ভাস সিস্টেম। এ নিউরনগুলোতে সাত হাজারের বেশি সিন্যাপ্‌স আছে। C. elegans সরল হলেও তার নার্ভাস সিস্টেম খুব জটিল। সে কারণে এ কীটের মস্তিষ্কের মতো কোনো কম্পিউটার মডেল এখনো বানানো যায়নি। (১৯৮৮ সালে এক কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ ভবিষ্যদ্বাণী করেন, বর্তমান সময়ের মধ্যে আমাদের ১০০ মিলিয়ন কৃত্রিম নিউরনসম্পন্ন রোবট বানাতে পারা উচিত। কিন্তু আসলে ১০০ নিউরনসম্পন্ন কোনো নিউরাল নেটওয়ার্কও আমাদের জন্য এখনো বিরল ঘটনা।)

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, যেসব কাজ মানুষ কঠিন মনে করে সেগুলো অনায়াসে করতে পারে যন্ত্র। যেমন বড় সংখ্যার গুণ বা দাবা খেলা। কিন্তু মানুষের জন্য অতি সহজ কাজগুলো করতে বললে যন্ত্র হোঁচট খায়। যেমন ঘরের ভেতরে হাঁটা, কারও চেহারা শনাক্ত করা, কিংবা কোনো বন্ধুর সঙ্গে গল্প করা। এর কারণ হলো, আমাদের সবচেয়ে উন্নত কম্পিউটার মূলত বিভিন্ন যন্ত্রের সমন্বয়। তবে বিবর্তনের মাধ্যমে পাওয়া আমাদের মস্তিষ্কের ডিজাইন সাধারণ বিচারবুদ্ধি ও প্যাটার্ন শনাক্ত করার মতো জাগতিক সমস্যার সমাধান করে টিকে থাকার জন্য অতি চমৎকার। জঙ্গলের মধ্যে টিকে থাকতে ক্যালকুলাস বা দাবা খেলার কোনো প্রয়োজন নেই। শিকারি জীবজন্তু মোকাবিলা, সঙ্গী খোঁজা আর পরিবর্তনশীল পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়াটাই সেখানে বেশি দরকারি।

এআইয়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এমআইটির মার্ভিন মিনস্কি এআইয়ের এ সমস্যা সংক্ষেপ করেছেন এভাবে : ‘এআইয়ের ইতিহাস বেশ মজার। কারণ, এ বিষয়ে প্রথম কোনো বাস্তবসম্মত কাজটি বেশ চমৎকার ছিল। যেমন যুক্তি প্রমাণ করতে পারত বা ক্যালকুলাসের কোর্স বেশ ভালোভাবে করতে পারত যন্ত্রটি। কিন্তু এরপর আমরা এমন ধরনের যন্ত্র তৈরি করার চেষ্টা শুরু করেছি, যা প্রথম শ্রেণির পাঠকদের বইয়ে থাকা সরল ধরনের গল্প সম্পর্কে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে। এ রকম যন্ত্রের দেখা এখনো পাওয়া যায়নি।

অনেকের বিশ্বাস, টপ-ডাউন ও বটম-ডাউন পদ্ধতির মধ্যে একদিন বড় ধরনের সমন্বয় সম্ভব হবে। ফলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর মানবাকৃতির রোবট সহজলভ্য হবে। কোনো শিশু শেখার সময় প্রথমে প্রধানত বটম-আপ পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে। পারিপার্শ্বিকতার সঙ্গে ধাক্কা খেতে খেতে একসময় বাবা-মা, বইপত্র ও স্কুলশিক্ষকদের কাছ থেকে নির্দেশনা পায় সে। এভাবে টপ-ডাউন পদ্ধতিতে শেখে শিশু। বয়স্ক মানুষ হিসেবে, আমরা অনবরত এ দুটি পদ্ধতির মিশ্রণে ক্রমাগত শিখছি। যেমন রাঁধুনি কোনো রেসিপি শুধু পড়েই দেখেন না, সেই সঙ্গে অনবরত রান্না করে পদটি পরীক্ষা করে দেখেন। হ্যানস মোরাভেক বলেন, ‘পুরোপুরি বুদ্ধিমান যন্ত্র তখনই পাওয়া যাবে, যখন যান্ত্রিকভাবে এই দুই প্রচেষ্টাকে একত্র করা যাবে।’ সেটি হয়তো আগামী ৪০ বছরে সম্ভব হবে।

আবেগপ্রবণ রোবট?

সাহিত্য ও শিল্পকলায় প্রচলিত থিম হলো, যান্ত্রিক সত্তার মানবিক হওয়ার বাসনা বা মানবিক অনুভূতি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। তারের জঞ্জাল আর আবেগশূন্য ইস্পাত দিয়ে বানানো কোনো বস্তু নয়, বরং হাসতে, কাঁদতে পারা ও মানবসত্তার আবেগপ্রবণ আনন্দের সবটুকু অনুভব করতে চায় যন্ত্র। যেমন পিনোকিওর কথা বলা যাক। পিনোকিও ছিল একটা পাপেট। কিন্তু সত্যিকারের এক বালক হতে চেয়েছিল সে। দ্য উইজার্ড অব ওজ-এর টিন ম্যান তার নিজের বুকের ভেতর একটা সত্যিকার হৃদয় পেতে চেয়েছিল। আর স্টার ট্রেকের ডাটা ছিল রোবটমাত্র। কিন্তু সে মানুষের সব সক্ষমতা ও বুদ্ধিমত্তা করে দেখাতে পারত। এত কিছু পেয়েও তার মন ভরেনি। তারপরও সে মানুষ হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছিল।

কিছু মানুষ এমনও প্রস্তাব করে, আমাদের আবেগ উচ্চতর গুণের প্রতিনিধিত্ব করে, যার কারণে এটি মানবিক বোঝায়। কোনো যন্ত্র দ্যুতিময় সূর্যাস্তের রোমাঞ্চ কিংবা হাস্যরসাত্মক কৌতুকের হাসির বিষয়টি কখনো বুঝতে পারবে না বলে দাবি করেন তাঁরা। অনেকে বলে, যন্ত্রের কখনো আবেগ থাকা সম্ভব নয়। কারণ, আবেগ মানবিক বিকাশের শীর্ষবিন্দুর প্রতিনিধিত্ব করে।

তবে যেসব বিজ্ঞানী এআই নিয়ে গবেষণা করেন ও আবেগকে ভাঙার চেষ্টা করেন, তাঁরা অন্য রকম চিত্র তুলে ধরেছেন। তাঁদের কাছে আবেগ হলো বিবর্তনের একটি উপজাত। এটি মানবিকতার নির্যাস থেকেও অনেক দূরে বলে মত দেন তাঁরা। সহজ কথায়, আমাদের জন্য আবেগ বেশ ভালো একটা বিষয়। একসময় এ গুণটি বনে-জঙ্গলে টিকে থাকতে আমাদের সহায়তা করেছিল। আবার জীবনের বিভিন্ন বিপদ শনাক্ত করতেও এখনো সহায়তা করে এটি।

যেমন বিবর্তনের দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো কিছু পছন্দ করা আমাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বেশির ভাগ জিনিস আমাদের জন্য ক্ষতিকর। প্রতিদিন লাখো জিনিসের সঙ্গে আমাদের ঠোকাঠুকি লাগলেও তার মধ্যে সামান্য কিছু জিনিসই কাজে লাগে। কাজেই কোনো কিছু পছন্দের মাধ্যমে লাখ লাখ সম্ভাব্য ক্ষতিকর জিনিস থেকে আমাদের জন্য উপকারী অতি ক্ষুদ্র অংশ আলাদা করতে সহায়তা করে।

একইভাবে ঈর্ষাও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আবেগ। কারণ, পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে আমাদের জিন টিকে থাকা নিশ্চিত করার মধ্যেই আমাদের প্রজননের সফলতা নির্ভর করে। (আসলে এ কারণে যৌনতা ও ভালোবাসায় অনেকগুলো আবেগপ্রবণ ব্যাপার জড়িত।)

লজ্জা ও অনুতাপও বেশ গুরুত্বপূর্ণ আবেগ। কারণ, একটি সহযোগিতামূলক সমাজে এগুলো আমাদের প্রয়োজনীয় সামাজিক দক্ষতা শেখাতে সহায়তা করে। আমরা যদি কখনোই সরি বা দুঃখিত না বলি, তাহলে সমাজ থেকে একসময় বিছিন্ন হয়ে পড়ি। তাতে আমাদের জিনগুলোর টিকে থাকা ও পরবর্তী প্রজন্মে স্থানান্তরিত করার সম্ভাবনা কমে যাবে।

আবার একাকিত্বও আরেকটি প্রয়োজনীয় আবেগ। শুরুতে একাকিত্বকে অপ্রয়োজনীয় ও অতিরিক্ত বলে মনে হতে পারে। তারপরও আমরা একাকী ক্রিয়াকর্ম চালিয়ে যেতে পারি। কিন্তু আমাদের টিকে থাকার জন্য সঙ্গীর পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আমরা টিকে থাকি গোষ্ঠীগত সম্পদের ওপর নির্ভর করে। অন্য কথায়, রোবট যখন আরও উন্নত হবে, তখন তারাও হয়তো আবেগসম্পন্ন হয়ে উঠতে পারবে। হয়তো রোবটদের তাদের মালিক বা তত্ত্বাবধায়কদের সঙ্গে বন্ধন তৈরি করার মতো করে প্রোগ্রাম করা হবে। এর মাধ্যমে তারা যাতে আবর্জনার আস্তাকুঁড়ে নিজেদের নিক্ষেপ না করে, তা নিশ্চিত করা যাবে। এ ধরনের আবেগ হয়তো তাদের সমাজে ঢোকার ক্রান্তিকালে স্বস্তি দেবে। তাতে তাদের মালিকদের প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ার বদলে উপকারী সঙ্গী হতে পারবে তারা।

কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ হ্যান্স মোরাভেকের বিশ্বাস, রোবটরা যাতে নিজেদের রক্ষা করতে পারে, সে জন্য তাদের ভয়ের মতো আবেগ দিয়ে প্রোগ্রাম করা হবে। যেমন কোনো রোবটের ব্যাটারি ফুরিয়ে গেলে রোবটটি অস্থিরতা প্রকাশ করবে বা আতঙ্কিত হবে। এর সঙ্গে তারা কিছু সংকেতও দিতে থাকবে, যেগুলো মানুষ বুঝতে পারবে। এরপর তারা প্রতিবেশীর কাছে গিয়ে তাদের প্লাগ ব্যবহারের অনুমতি চেয়ে বলবে, “প্লিজ! প্লিজ! এটা আমার দরকার! এর খরচ অল্প হলেও এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ! আমরা আপনাকে ফেরত দেব!”

সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও আবেগ বেশ গুরুত্বপূর্ণ। যেসব মানুষ নির্দিষ্ট একধরনের মস্তিষ্কের আঘাতে ভোগে, তারা আবেগ অনুভব করতে পারে না। যুক্তি ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ থাকলেও কোনো অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে না তারা। ইউনিভার্সিটি অব আইওয়া কলেজ অব মেডিসিনের নিউরোলজিস্ট অ্যান্টোনিও দামাসিও মস্তিষ্কের এ ধরনের আঘাত নিয়ে গবেষণা করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি সিদ্ধান্তে এসেছেন, ‘তারা জানে, কিন্তু অনুভব করে না।’

ড. দামাসিও দেখেছেন, এসব ব্যক্তি প্রায়ই ছোটখাটো সিদ্ধান্ত নিতেও প্রায়ই অসহায় হয়ে পড়ে। কোনো আবেগ না থাকার কারণে তাদের পরিচালিত করতে গেলে অনবরত এই বা ওটা নিয়ে বিতর্কে মেতে ওঠে তারা। এভাবে তারা অর্থহীন সব দোলাচলে ভুগতে থাকে। যেমন ড. দামাসিওর এক রোগী তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের তারিখ ঠিক করতে আধঘণ্টা ধরে সিদ্ধান্ত নিতে চেষ্টা করছিলেন।

বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস, মস্তিষ্কের লিম্বিক সিস্টেমে আবেগ প্রক্রিয়া চলে। এ অংশটি আমাদের মস্তিষ্কের কেন্দ্রের গভীর এলাকায় অবস্থিত। মানুষ যখন নিওকর্টেক্স (এটি আমাদের যুক্তিনির্ভর চিন্তার নিয়ন্ত্রণ করে) আর লিম্বিক সিস্টেমের মধ্যে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলে, তখন তাদের যুক্তি ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ থাকলেও কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এটি সহায়তা করতে পারে না। মাঝেমধ্যে আমাদের ‘মন বলছে’ বা ‘ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়’ আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে প্রভাবিত করে। কিন্তু এ ধরনের আঘাতে যাঁরা ভোগেন, তাঁদের মস্তিষ্কের যৌক্তিক ও আবেগময় অংশের মধ্যে কোনো যোগাযোগ রাখার কোনো ক্ষমতা থাকে না।

যেমন কেনাকাটা করার সময় আমরা সামনে যা দেখি তা নিয়ে অবচেতনভাবে হাজারো গুণগত মান বিচার করতে থাকি। যেমন এটা খুবই দামি, ওটা খুব সস্তা, ওটা রঙিন, ওটা হাস্যকর কিংবা সব ঠিক আছে। কিন্তু মস্তিষ্কে এই ধরনের আঘাতপ্রাপ্ত মানুষদের জন্য কেনাকাটা ভয়াবহ এক দুঃস্বপ্নের ব্যাপার। কারণ, তাদের কাছে সবকিছু একই রকম বলে মনে হয়।

রোবটরা আরও বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন হয়ে উঠলে, সে সঙ্গে নিজেরা পছন্দ করতে সক্ষম হলে, তারাও একইভাবে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে পারে। (এটা দুটি খড়ের গাদার মাঝখানে বসে থাকা সেই গাধার কথা মনে করে দেয়। গাধাটি শেষ পর্যন্ত মারা গিয়েছিল। কারণ, সে কী খাবে, তা সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি।) তাদের সহায়তা করতে, ভবিষ্যৎ রোবটদের মস্তিষ্কে হয়তো আবেগের হার্ডওয়্যার বসানোর প্রয়োজন হতে পারে। রোবটদের আবেগের অভাবের ব্যাপারে কথা বলতে গিয়ে এমআইটি মিডিয়া ল্যাবের ড. রোজালিন্ড পিকার্ড জানান, “তাদের যে অনুভূতি নেই, এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এটি তাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। কম্পিউটার আসলে এটি পায় না।’

রুশ ঔপন্যাসিক ফিওদর দস্তয়ভস্কি একবার লিখেছিলেন, ‘পৃথিবীর সবকিছুই যদি যৌক্তিক হতো, তাহলে কিছুই ঘটত না।’

অন্য কথায়, ভবিষ্যতে রোবটদের হয়তো আবেগের প্রয়োজন হবে। তাদের লক্ষ্য নির্ধারণে আর তাদের জীবনের অর্থ ও কাঠামো দেওয়ার জন্য তার দরকার হতে পারে। নয়তো নিজেদের অচল হিসেবে আবিষ্কারের আশঙ্কার হয়তো কোনো সীমা-পরিসীমা থাকবে না।

তারা কি সচেতন?

যন্ত্র সচেতন হতে পারে কি না, সে ব্যাপারে সর্বসম্মত কোনো মত নেই। আবার সচেতনতা অর্থ সম্পর্কেও সর্বসম্মত কোনো মত নেই। সচেতনতার যথার্থ সংজ্ঞায় এখনো পৌঁছানো যায়নি।

সচেতনতাকে ‘মনের জগতের’ চেয়েও বেশি কিছু হিসেবে বর্ণনা করেছেন মার্ভিন মিনস্কি। তাঁর মতে, আমাদের মস্তিষ্কের চিন্তাপ্রক্রিয়া স্থানীয় নয়, তা ছড়ানো-ছিটানো। বিভিন্ন কেন্দ্র পরস্পরের সঙ্গে যেকোনো সময় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। সচেতনতাকে হয়তো তাহলে চিন্তার ও এসব ভিন্ন ভিন্ন, ক্ষুদ্ৰ মন থেকে উঠে আসা চিত্রের একটি ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা যায়। এসব ক্ষুদ্র মনের প্রতিটি আমাদের মনোযোগ আকর্ষণের জন্য প্রতিযোগিতা করে। কথাটি সত্য হলে সচেতনতা হয়তো অতিরঞ্জিত বিষয়ে পরিণত হবে। বিষয়টি নিয়ে এত বেশি গবেষণাপত্র লেখা হয়েছে যে দার্শনিক আর মনোবিজ্ঞানীরা হয়তো একে সঠিকভাবে বুঝতে ভুল করেছেন। লা জোলার সক ইনস্টিটিউটের সিডনি ব্রেনার এ ব্যাপারে বলেন, ‘আমার অনুমান, ২০২০ সালের মধ্যে, সচেতনতা বৈজ্ঞানিক সমস্যা হিসেবে অদৃশ্য হয়ে যাবে। আমাদের উত্তরসূরিরা অচল জার্নালের ইলেকট্রনিক আর্কাইভে ধৈর্য নিয়ে কখনো যদি ঢুঁ মারে, তাহলে বর্তমান সময়ের বহুল আলোচিত এসব বৈজ্ঞানিক আবর্জনা দেখে তারা তখন বিস্মিত হবে।’

পদার্থবিজ্ঞানের ঈর্ষায় এআই গবেষণা ভুগছে বলে মনে করেন মার্ভিন মিনস্কি। পদার্থবিদ্যায় পরম আরাধ্য বিষয় হলো, একটি সরল সমীকরণ খুঁজে বের করা, যার মাধ্যমে মহাবিশ্বের সব ভৌত বল একত্র করে একটি একক তত্ত্ব পাওয়া যাবে। সেই সঙ্গে আবিষ্কার করা যাবে থিওরি অব এভরিথিং। এ আইডিয়ায় অতিরিক্ত প্রভাবিত হয়ে এআইয়ের গবেষকেরাও একক মডেল খোঁজার চেষ্টা করছেন, যা সচেতনতাকে ব্যাখ্যা করতে পারবে। কিন্তু মিনস্কির মতে, এ ধরনের কোনো একক নমুনার হয়তো কোনো অস্তিত্ব না-ও থাকতে পারে।

(আমার মতো গঠনমূলক ভাবধারার মানুষ বিশ্বাস করে, চিন্তা করতে সক্ষম যন্ত্র বানানো সম্ভব, কী সম্ভব নয়, তা নিয়ে নিরন্তর তর্ক বাদ দিয়ে, এখন একটা কিছু বানিয়ে ফেলা উচিত। সচেতনতার পরিসর সম্ভবত ঘরের তাপমাত্রা যাচাই করতে পারা সাদামাটা থার্মোস্ট্যাট থেকে শুরু করে আত্মসচেতন জীবসত্তা (যেমন আমরা)। জীবজন্তুরা হয়তো সচেতন, কিন্তু তারা মানবসত্তার মতো এমন সচেতনতার পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। তাই চেতনার অর্থ নিয়ে দার্শনিক প্রশ্ন নিয়ে তর্কে না মেতে বিভিন্ন ধরনের ও পর্যায়ের সচেতনতার শ্রেণিবিভাগ করা উচিত। রোবটরা হয়তো ক্রমান্বয়ে ‘সিলিকন চেতনা’ অর্জন করবে। রোবট আসলে একদিন চিন্তা ও তথ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য আমাদের থেকে আলাদা কিছু গড়ে তুলবে। ভবিষ্যতের উন্নত রোবটরা হয়তো সিনট্যাক্স আর সিম্যানটিক্সের মাঝখানের ব্যবধান ঘুচিয়ে দেবে। তাতে তাদের প্রতিক্রিয়া মানুষের থেকে আলাদা করা সম্ভব হবে না। তা-ই যদি হয়, তাহলে তারা আসলেই বুঝতে পারে কি না, সেটি অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্নে পরিণত হবে। বাস্তব ক্ষেত্রে সিনট্যাক্সে দক্ষ রোবট কী বলতে হবে, তা বুঝতে পারবে। অন্য কথায়, সিনট্যাক্সের দক্ষতা বোঝা সম্ভব হবে।

রোবট কি বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে?

মুরের সূত্রমতে, কম্পিউটারের ক্ষমতা প্রতি ১৮ মাসে দ্বিগুণ হয়। এ সূত্রের কারণে বোঝা যায়, কয়েক দশকের মধ্যে এমন ধরনের রোবট বানানো সম্ভব, যার বুদ্ধিমত্তা হবে কুকুর বা বিড়ালের মতো। তবে ২০২০ সালের মধ্যে মুরের সূত্র অকার্যকর হয়ে সিলিকন যুগের সমাপ্তি ডেকে আনতে পারে। অতি ক্ষুদ্র সিলিকন ট্রানজিস্টর বানানোর সক্ষমতার কারণে গত ৫০ বছরে কম্পিউটারের ক্ষমতার বিস্ময়কর অগ্রগতি হয়েছে। কয়েক মিলিয়ন সিলিকন ট্রানজিস্টর আপনার নখের ডগায় সহজে এঁটে যাবে। সিলিকন দিয়ে বানানো ওয়েফারের ওপর মাইক্রোস্কোপিক ট্রানজিস্টরের খোদাই করতে ব্যবহৃত হয় অতিবেগুনি বিকিরণের বিম। কিন্তু এই প্রক্রিয়া দীর্ঘকাল চলতে পারে না। ক্রমান্বয়ে এসব ট্রানজিস্টর এতই ছোট হয়ে যাবে যে তার আকার অণুর সমান হয়ে দাঁড়াবে। তাতে পুরো প্রক্রিয়াটি ভেঙে পড়ে সিলিকন ভ্যালি ২০২০ সালের পর মরিচার বলয়ে পরিণত হতে পারে। তখন সিলিকন যুগ চূড়ান্তভাবে শেষ হয়ে যাবে।

আপনার ল্যাপটপের পেন্টিয়াম চিপে আড়াআড়িভাবে প্রায় ২০টি পরমাণুর একটি স্তরের সমান। ২০২০ সালের মধ্যে এই পেন্টিয়াম চিপ হয়তো আড়াআড়ি মাত্র পাঁচটি পরমাণুর একটি স্তরের সমান হয়ে দাঁড়াবে। এই বিন্দুতে সবকিছু হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তার নীতির আওতায় ঢুকে পড়ে। তখন আপনি জানতেও পারবেন না, ইলেকট্রনের অবস্থান কোথায়। বিদ্যুৎ তখন চিপ থেকে বের হয়ে যাবে এবং কম্পিউটারে শর্টসার্কিট শুরু হবে। কোয়ান্টাম তত্ত্বের কারণে এই বিন্দুতে কম্পিউটার বিপ্লব ও মুরের সূত্র এক অন্ধগলিতে ধাক্কা খাবে। (অনেকে দাবি করেন, ডিজিটাল যুগ হলো পরমাণুর ওপর বিটসের বিজয়। কিন্তু ক্রমান্বয়ে আমরা যখন মুরের সূত্রের সীমানা ছাড়িয়ে যাব, তখন পরমাণু হয়তো তাদের প্রতিশোধ নেবে।)

পদার্থবিদেরা এখন সিলিকন-পরবর্তী প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা করছেন। হয়তো এটি ২০২০ সালের পর কম্পিউটার-বিশ্বকে শাসন করবে। তবে এতে কোনো ফল মেলেনি এখনো। আমরা দেখলাম, বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা হচ্ছে, যেগুলো হয়তো একসময় সিলিকন প্রযুক্তিকে হটিয়ে দেবে। এর মধ্যে রয়েছে কোয়ান্টাম কম্পিউটার, ডিএনএ কম্পিউটার, অপটিক্যাল কম্পিউটার, পারমাণবিক কম্পিউটারসহ আরও অনেক কিছু। তবে সিলিকন চিপের জায়গা দখল করার আগে প্রতিটির সামনে অসংখ্য বাধা অতিক্রম করতে হবে। আলাদা আলাদা পরমাণু ও অণু সুচারুভাবে ব্যবহার করতে এমন এক প্রযুক্তি দরকার, যা এখনো শৈশব অবস্থায় রয়ে গেছে। কাজেই পারমাণবিক আকারের কোটি কোটি ট্রানজিস্টর বানানো এখন আমাদের সক্ষমতার বাইরে।

তবে এ মুহূর্তের জন্য অনুমান করা যায়, পদার্থবিদেরা সিলিকন চিপের ও কোয়ান্টাম কম্পিউটারের মধ্যবর্তী এই ব্যবধানের মধ্যে সেতুবন্ধ তৈরির ক্ষমতা রাখেন। ধরে নেওয়া যায়, মুরের সূত্রের কোনো একটি রূপ হয়তো সিলিকন যুগের পরের পর্যায়ে চলতে থাকবে। তারপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হয়তো সম্ভব হয়ে উঠবে সত্যি সত্যি। সেই পর্যায়ে রোবটও মানবিক যুক্তি ও আবেগে দক্ষ হয়ে উঠতে পারে এবং তারা প্রতিবার টুরিং টেস্টে পাস করবে। স্টিভেন স্পিলবার্গ এই প্রশ্নের উত্তরের অনুসন্ধান করেছেন তাঁর আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স : এআই নামের চলচ্চিত্রে। সেখানে প্রথম রোবট বালক তৈরি করা হয়, যার আবেগ আছে। সে কারণে সে একটি মানব পরিবারে দত্তক নেওয়ার উপযুক্ত হয়ে উঠেছিল।

এতে প্রশ্ন ওঠে : এ ধরনের রোবট কি বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে? এর উত্তর সম্ভবত, হ্যাঁ। তারা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে, যদি তাদের বুদ্ধিমত্তা কোনো বানরের মতো হয়। তাতে তারা আত্মসচেতন হয়ে উঠবে আর নিজের অ্যাজেন্ডা তৈরি করতে পারবে। অবশ্য ওই পর্যায়ে পৌঁছাতে এখনো অনেক দেরি আছে। কাজেই রোবটরা হুমকি হয়ে ওঠার আগে তাদের পর্যবেক্ষণ করার জন্য বিজ্ঞানীদের হাতে এখনো অনেক সময় আছে। যেমন বিশেষ ধরনের চিপ তাদের প্রসেসরে রাখা যেতে পারে। ফলে কোনো তাণ্ডব চালাতে তাদের বাধা দেওয়া যাবে। কিংবা তাদের মধ্যে আত্মধ্বংস বা নিষ্ক্রিয়তার ম্যাকানিজম রাখা যেতে পারে, যা তাদের কোনো জরুরি অবস্থায় বন্ধ করে ফেলতে পারবে। আর্থার সি ক্লার্ক লিখেছেন, ‘আশঙ্কা আছে, আমরা হয়তো কম্পিউটারের পোষা প্রাণী হয়ে যাব। এ কারণে আমাদের অবস্থা লাই দেওয়া ল্যাপডগের মতো হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু আমি আশা করি, আমরা কখনো যদি এ রকম অবস্থার মুখে পড়ি, তাহলে সব সময় টান দিয়ে প্লাগটাও বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে পারব।

আরেকটি বিরক্তিকর হুমকি হলো, আমাদের গোটা অবকাঠামো কম্পিউটারনির্ভর। আমাদের পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ গ্রিড, পরিবহন ও যোগাযোগ নেটওয়ার্কের কথা না বললেও চলে। এসব ক্ষেত্রে ভবিষ্যতেও কম্পিউটারের ওপর নির্ভরতা বাড়তে থাকবে। আমাদের শহরগুলো একসময় এতই জটিল হয়ে উঠবে যে শুধু জটিল ও বিস্তৃত কম্পিউটার নেটওয়ার্ক আমাদের সুবিশাল অবকাঠামো নিয়ন্ত্রণ ও মনিটর করতে সক্ষম হবে। এসব কম্পিউটার নেটওয়ার্কে ক্রমেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুক্ত করাটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দেবে ভবিষ্যতে। সুবিস্তৃত এসব কম্পিউটার অবকাঠামোর ব্যর্থতা বা ভাঙনে একটি শহর, রাষ্ট্র, কিংবা একটি সভ্যতা পঙ্গু হয়ে যেতে পারে।

কম্পিউটার কি ক্রমে বুদ্ধিমত্তায় ছাড়িয়ে যাবে? একে ঠেকাতে পদার্থবিজ্ঞানে যে কোনো সূত্র নেই, তা নিশ্চিত। রোবট যদি নিউরাল নেটওয়ার্ক শিখতে পারে ও দ্রুত শিখতে পারার মতো কোনো পর্যায় গড়ে তুলতে পারে, যেখানে আমাদের চেয়েও দক্ষতার সঙ্গে তারা শিখতে পারবে, তাহলে তারা আমাদের পদানত করবে, সেটাই যৌক্তিক। মোরাভেক বলেন, ‘(পোস্টবায়োলজিক্যাল ওয়ার্ল্ড) এমন এক বিশ্ব, যেখানে মানবজাতি, সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের স্রোতে ভেসে যাবে, তাদের কৃত্রিম বংশধরেরা তাদের গ্রাস করবে। এটা যখন ঘটবে, তখন আমাদের ডিএনএ তার কাজ হারাবে। বিবর্তনমূলক প্রতিযোগিতায় হেরে নতুন ধরনের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবে ডিএনএ।

রে কুর্জওয়েলের মতো উদ্ভাবকেরা এমনও অনুমান করেন, এই সময় আসন্ন। এমনকি পরের কয়েক দশকের মধ্যে সেটি চলে আসতে পারে। হয়তো আমাদের বিবর্তনমূলক বংশধর এরই মধ্যে তৈরি করে ফেলেছি আমরা’। কয়েকজন কম্পিউটারবিজ্ঞানী একটা বিন্দুর কথা বলেন, যাকে বলে সিঙ্গুলারিটি। এ বিন্দুতে রোবটরা সূচকীয় হারে তথ্য প্রসেস করতে পারবে। এভাবে তারা নিজেরাই নতুন রোবট বানাতে পারবে। তখন তাদের তথ্য শোষণের সম্মিলিত ক্ষমতা এতই উন্নত হবে যে তার প্রায় সীমা-পরিসীমা থাকবে না।

কাজেই দীর্ঘ মেয়াদে আমাদের বিলুপ্তির জন্য অপেক্ষা করার বদলে কার্বন ও সিলিকন প্রযুক্তি একত্র করার পরামর্শ দেন অনেকে। আমরা মানুষেরা মূলত কার্বনভিত্তিক, কিন্তু রোবটরা সিলিকনভিত্তিক (অন্তত এই সময়ে)। হয়তো আমাদের সৃষ্টির সঙ্গে একত্র করাটাই এখন সমাধান। (আমরা কখনো বহির্জাগতিক প্রাণীর মুখোমুখি হলে হয়তো তাদের কিছু অংশ জৈব ও কিছু অংশ যান্ত্রিক দেখে অবাক হব। মহাকাশ ভ্রমণের কঠিন বাধা ঠেকাতে ও সেখানকার প্রতিকূল পরিবেশ টিকে থাকতে তারা এ রকম হতে পারে। )

দূর ভবিষ্যতে রোবট বা মানুষের চেহারার সাইবর্গ হয়তো আমাদের অমরত্বের স্বাদ এনে দিতে পারে। মারভিন মিনস্কি বলেন, ‘সূর্যের মৃত্যু হলে কী হবে? কিংবা আমরা পৃথিবীটা ধ্বংস করে ফেললে কী হবে? তাহলে ভালো পদার্থবিদ, প্রকৌশলী বা গণিতবিদ বানিয়ে নিলে দোষ কী? আমাদের ভবিষ্যৎ নিজেদেরই গড়ে তুলতে হবে। তা না করলে আমাদের সংস্কৃতি হারিয়ে যাবে।’

মোরাভেক দূর ভবিষ্যতের এমন এক সময়ের কল্পনা করেছেন, যখন আমাদের নিউরাল আর্কিটেকচার স্থানান্তর করা হবে, নিউরন থেকে নিউরন, সরাসরি যন্ত্রে স্থানান্তর করা যাবে। এই অর্থে আমরা অমরত্ব পাব। ভাবনাটা খেপার মতো মনে হতে পারে, কিন্তু তা সম্ভাবনার সীমা অতিক্রম করে না। কাজেই কয়েকজন বিজ্ঞানীর কল্পনা অনুসারে, দূর ভবিষ্যতে অমরত্ব হয়তো মানবতার চূড়ান্ত ভবিষ্যৎ হতে পারে (ডিএনএর বর্ধিত আকারে বা সিলিকন দেহ আকারে)।

চিন্তা করতে সক্ষম যন্ত্র তৈরির আইডিয়া অন্তত জীবজন্তুর মতোই স্মার্ট। বাস্তবে এটি হয়তো আমাদের মতো বা আমাদের চেয়ে বেশি স্মার্ট হয়ে উঠতে পারে। সেটি সম্ভব হবে, যদি আমরা মুরের সূত্রের অকার্যকর হওয়া থামাতে পারি আর সাধারণ বিচারবোধ-সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান করতে পারি। সেটি সম্ভব হয়ে উঠতে পারে এই শতাব্দীর শেষের দিকে। এআইয়ের মৌলিক সূত্র এখনো আবিষ্কার করা বাকি। তবে এ ক্ষেত্রটির অগ্রগতি চরম দ্রুতগতিতে ঘটছে আর তা বেশ প্রতিশ্রুতিশীল। সে কথা মাথায় রেখে, রোবট ও অন্যান্য চিন্তা করতে সক্ষম যন্ত্রকে আমি প্রথম শ্রেণির অসম্ভাব্যতা হিসেবে গণ্য করেছি।

তথ্যনির্দেশ

আইবিএম : বিশ্বের সবচেয়ে বড় কম্পিউটার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। ১৯৮১ সালে অফিস ও বাসার জন্য প্রথম পারসোনাল কম্পিউটার বা পিসির (PC) সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয় আইবিএম। এতে ব্যবহৃত হয় মাইক্রোচিপ নির্মাতা ইন্টেল করপোরেশনের ৮০৮৮ মাইক্রোপ্রসেসর। অপারেটিং সিস্টেম ছিল বিল গেটসের প্রতিষ্ঠিত মাইক্রোসফট করপোরেশন নির্মিত কমান্ডভিত্তিক এমএস।

অনিশ্চয়তার নীতি : জার্মান বিজ্ঞানী হাইজেনবার্গ সূত্রবদ্ধ করেছিলেন আনসার্টেনিটি পিন্সিপাল বা অনিশ্চয়তার নীতি। এ নীতি অনুযায়ী, কোনো কণার অবস্থান ও গতিবেগ একই সঙ্গে নির্ভুলভাবে পরিমাপ করা সম্ভব নয়। একটি ধর্ম যত বেশি নির্ভুলভাবে জানা যাবে, অন্যটির নির্ভুল হওয়ার সম্ভাবনা তত কমতে থাকবে।

প্রোগ্রাম : কম্পিউটারকে সঠিকভাবে চালানোর জন্য আগে থেকে দিয়ে রাখা কিছু তথ্য, উপাত্ত ইত্যাদির সংকেতাবদ্ধ নির্দেশনা। কোনো কাজ করার আগে কম্পিউটার প্রথমে এই প্রোগ্রামের পাঠোদ্ধার করে। পরে সেই অনুযায়ী কাজ সম্পাদন করে।

ট্রানজিস্টর : ১৯৪৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের বেল ল্যাবরেটরিতে বিশ্বের প্রথম ব্যবহারিক ট্রানজিস্টর তৈরি হয়। একে ইলেকট্রনিকসের ইতিহাসে মাইলফলক হিসেবে গণ্য করা হয়। একটি সমন্বিত বর্তনীর ভেতরে অতি ক্ষুদ্র স্থানে কয়েক লাখ পর্যন্ত ট্রানজিস্টর সংযুক্ত করা যায়। বর্তমানে কম্পিউটারের মাইক্রোপ্রসেসরে একসঙ্গে কয়েক লাখ ট্রানজিস্টর থাকে।

সিলিকন : পৃথিবীর ভূত্বকে অক্সিজেনের পর দ্বিতীয় সর্বাধিক প্রাপ্ত মৌল সিলিকন। ভূত্বকের প্রায় ৯০ শতাংশই সিলিকেট যৌগে গঠিত। এটি মূলত ধূলি, বালুতে সিলিকনের অক্সাইড (সিলিকা) বা সিলিকেট আকারে থাকে। সিলিকন শক্ত, ভঙ্গুর ও সহজে চ্যাপ্টা করা যায়, দামেও সস্তা। এসব সুবিধার কারণে ট্রানজিস্টর তৈরিতে ব্যাপকভাবে সিলিকন ব্যবহৃত হয়। সিলিকনে তৈরি ট্রানজিস্টরকে বলে সিলিকন চিপ বা মাইক্রোচিপ, যা কম্পিউটারসহ ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহার হয়। ইলেকট্রনিকসে সিলিকনের গুরুত্ব বিবেচনা করে ইলেকট্রনিকস যন্ত্রপাতি নির্মাণে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় গড়ে তোলা হয় সিলিকন ভ্যালি নামের এক শহর।

৮. মহাকাশের আগন্তুক ও ইউএফও

পুরো মহাবিশ্বে আমরা হয় নিঃসঙ্গ কিংবা তা নই। উভয় চিন্তাই ভয়ানক।

—আর্থার সি ক্লার্ক

প্রকাণ্ড এক স্পেসশিপ। লস অ্যাঞ্জেলেস শহরের একদম ওপরে কয়েক মাইলজুড়ে স্থির হয়ে আছে। স্পেসশিপটিতে পুরো আকাশ ঢাকা পড়ে গোটা শহরে নেমে এসেছে অশুভ আর অদ্ভুত এক আঁধার। বিশ্বের অন্যান্য জায়গাতেও একই অবস্থা। পিরিচ আকৃতির ওই দুর্গগুলো বিশ্বের প্রধান প্ৰধান শহরে অবস্থান নিয়েছে। ভিনগ্রহ থেকে আসা এসব জীবকে লস অ্যাঞ্জেলেসে স্বাগত জানাতে উল্লসিত হাজার হাজার দর্শক উঠে পড়েছে আকাশছোঁয়া বহুতল ভবনের চূড়ায়। মহাকাশের অতিথিদের একদম কাছ থেকে স্বাগত জানাতেই হাজির হয়েছে তারা।

লস অ্যাঞ্জেলেসের আকাশে কয়েক দিন নিঃশব্দে ঝুলে রইল স্পেসশিপটি। অবশেষে একদিন ধীরে ধীরে খুলে গেল স্পেসশিপের পেট তার পরপরই লেজার লাইটের চোখধাঁধানো বিস্ফোরণ ছুড়ে দেওয়া হলো সেখান থেকে। মুহূর্তেই আকাশছোঁয়া বহুতল ভবনটি পুড়ে ছারখার হয়ে গেল। সেখান থেকে বেরিয়ে আসা ধ্বংসযজ্ঞের প্রবল ঢেউ পুরো শহরে আছড়ে পড়তে লাগল। মাত্র কয়েক সেকেন্ডেই শহরটি পরিণত হলো স্রেফ দগ্ধ আবর্জনায়।

হলিউডের ইনডিপেনডেন্ট ডেমুভিতে আমাদের মধ্যে ভয়াবহ আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল এলিয়েন বা বহির্জাগতিক ভিনগ্রহের প্রাণীরা। অন্যদিকে ইটি মুভিতে আমাদের স্বপ্ন আর ফ্যান্টাসির প্রতিফলন দেখেছি আমরা। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, এলিয়েন বা ভিনগ্রহের প্রাণীদের ব্যাপারে যুগে যুগে মানুষের আগ্রহ ছিল। এলিয়েনরা অন্য বিশ্বে বাস করে বলে ভাবত মানুষ। ১৬১১ সালে জ্যোতির্বিদ জোহান কেপলার তাঁর লেখা সমনিয়ামউপন্যাসে চাঁদে ভ্রমণ নিয়ে কল্পনার ডালপালা বিস্তার করেছেন। তাতে সেকালের সবচেয়ে সেরা বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ব্যবহার করেন তিনি। এ রকম ভ্রমণে অদ্ভুত এলিয়েন, গাছপালা ও জীবজন্তুর সঙ্গে দেখা হতে পারে বলে ধারণা করেন তিনি। তবে মহাকাশে প্রাণ নিয়ে প্রায়ই সংঘর্ষে লিপ্ত হয় বিজ্ঞান ও ধর্ম। বলা বাহুল্য, মাঝে মাঝে এর ফলটা বিয়োগান্ত হয়।

এর কয়েক বছর আগে, ১৬০০ সালে, সাবেক ডমিনিকান পাদরি ও দার্শনিক জিওদার্নো ব্রুনোকে রোমের রাস্তায় জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়। চরম অপমানিত করতে খুঁটিতে বেঁধে পুড়িয়ে মারার আগে উল্টো করে ঝুলিয়ে বিবস্ত্র করা হয়েছিল তাঁকে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ব্রুনোর কোন শিক্ষাটা এত ভয়ংকর ছিল? তাঁকে একটা সাধারণ প্রশ্ন করা হয়েছিল : বাইরের আকাশে কি প্রাণ আছে? কোপার্নিকাসের মতো তিনিও বিশ্বাস করতেন, পৃথিবী সূর্যের চারপাশে ঘুরছে। কোপার্নিকাস না করলেও তিনি বিশ্বাস করতেন, বাইরের আকাশে আমাদের মতো অগণিত জীবজন্তু আছে। (বাইরের আকাশে কোটি কোটি সাধুসন্ত, পোপ কিংবা যিশুখ্রিষ্ট থাকার সম্ভাবনার কথা একবারও চিন্তা করেনি গির্জার অনুসারী। তার বদলে ব্রুনোকে পুড়িয়ে মারাটাই বেশি সুবিধাজনক বলে মনে হয়েছিল তাদের কাছে। )

চার শ বছর ধরে ব্রুনোর এই স্মৃতি তাড়িয়ে বেড়িয়েছে বিজ্ঞানের ইতিহাসবিদদের। বর্তমানে কয়েক সপ্তাহ পরপরই ব্রুনো তাঁর প্রতিশোধ নিচ্ছেন। প্রতি মাসে প্রায় দুবার নতুন কোনো না কোনো এক্সোপ্ল্যানেট বা বহিঃসৌরজাগতিক গ্রহ আবিষ্কৃত হচ্ছে, যা মহাকাশের অন্য কোনো নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। মহাকাশে অন্য নক্ষত্রদের প্রদক্ষিণরত ২৫০-এর বেশি গ্রহ এখন তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। ব্রুনোর অনুমিত বহিঃসৌরজাগতিক গ্রহরা এখন অকাট্যভাবে প্রমাণিত। তবু একটা প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে। মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি বা আকাশগঙ্গা ছায়াপথে বহিঃসৌরজাগতিক গুচ্ছ গুচ্ছ গ্রহ থাকলেও তার মধ্যে কয়টি কোনো জীবের বেঁচে থাকার উপযোগী? কোনো বুদ্ধিমান প্রাণ যদি মহাকাশে থেকেই থাকে, তাহলে সে ব্যাপারে বিজ্ঞান কী বলে?

বহির্জাগতিক জীবের সঙ্গে কাল্পনিক লড়াই নিয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আমাদের সমাজ বুঁদ হয়ে আছে। এ বিষয়ে বইয়ের পাঠক ও মুভির দর্শকেরাও রোমাঞ্চিত। এ ব্যাপারে সবচেয়ে বিখ্যাত ঘটনা ঘটে ১৯৩৮ সালের ৩০ অক্টোবরে। সেবার মার্কিন দর্শকদের সামনে হ্যালোইন উৎসবে একটি কৌশল খাটানোর সিদ্ধান্ত নেন অরসন ওয়ালেস। সে জন্য বেছে নেন এইচ জি ওয়েলসের ওয়ার অব দ্য ওয়ার্ল্ড কাহিনির মূল প্লট। সিবিএস ন্যাশনাল রেডিওতে ধারাবাহিকভাবে সংক্ষিপ্ত খবর প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়। নাচের মিউজিক বিঘ্নিত করে মাঝখানে ঘোষণাটা বারবার দেওয়া হচ্ছিল। এমনটি চলছিল ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ঘোষণায় বলা হলো, মঙ্গলবাসীরা পৃথিবী আক্রমণ করেছে। এতে সভ্যতা ধ্বংসের মুখে। মঙ্গল থেকে আসা যন্ত্রগুলো নিউ জার্সির গ্রোভার মিলে অবতরণ করেছে। পুরো শহর ধ্বংস করে পৃথিবীর দখল করতে ডেথ রে ছুড়ছে তারা। এমন খবর শুনে লাখ লাখ মার্কিন আতঙ্কে স্রেফ জমে গেল। (সংবাদপত্রে পরে জানানো হলো, এমন খবরে এলাকার লোকজন পড়িমরি করে পালাতে শুরু করায় পুরো এলাকা বিরানভূমিতে পরিণত হয়। অনেক প্রত্যক্ষদর্শী দাবি করে বসে, তারা বিষাক্ত গ্যাসের ঝাঁজালো গন্ধ পেয়েছিল, এমনকি দূর থেকে আলোর ঝলকও দেখতে পেয়েছে।)

মঙ্গল নিয়ে মানুষের কৌতূহলের পারদ আরও একবার চূড়ায় ওঠে ১৯৫০-এর দশকে। সেবার মঙ্গল গ্রহে অদ্ভুত এক চিহ্ন দেখতে পান জ্যোতির্বিদেরা। সেটি দেখতে অনেকটা বিশালাকৃতির ইংরেজি এমের ( M ) মতো, যা কয়েক মাইল এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। একজন মন্তব্য করে বসে, হয়তো এই এমের অর্থ মার্স বা মঙ্গল গ্রহ। এর মাধ্যমে পৃথিবীবাসীকে শান্তিপূর্ণভাবে তাদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে মঙ্গলবাসী। ফুটবল স্টেডিয়ামে চিয়ারলিডাররা যেভাবে নিজের টিমের নাম উচ্চারণ করে, অনেকটা তেমন। (অনেকে রহস্যময়ভাবে বলতে লাগল, এটি এম নয়, ইংরেজি ডব্লিউ (W) বোঝানো হচ্ছে, যা দিয়ে ওয়ার বা যুদ্ধ বোঝায়। সোজা কথায়, এর মাধ্যমে মঙ্গলবাসী পৃথিবীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে)। অবশ্য ঝড়ের বেগে যেমন এমের উদয় হয়েছিল, সেভাবেই হঠাৎ সেটি অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার পর এই সাময়িক আতঙ্ক আস্তে আস্তে কমে যায়। সম্ভবত চিহ্নটি উদয় হয়েছিল মঙ্গলে ধূলিঝড়ের কারণে। পুরো গ্রহ ধুলোর আবরণে ঢাকা। ব্যতিক্রম এর ওপর চারটি বিশাল আগ্নেয়গিরির চূড়া। চূড়াগুলো দেখতে কিছুটা এম বা ডব্লিউ অক্ষরের মতো

প্রাণের সন্ধানে বিজ্ঞান

রাশভারী কিছু বিজ্ঞানী বহির্জাগতিক প্রাণের সম্ভাবনা নিয়ে অনেক দিন ধরে গবেষণা চালাচ্ছেন। তাঁদের মতে, এ রকম প্রাণ সম্পর্কে চূড়ান্ত কিছু বলা অসম্ভব। তারপরও পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন আর জীববিজ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে এলিয়েনজীবনের প্রকৃতি সম্পর্কে আমরা কিছু সাধারণ যুক্তি তুলে ধরতে পারি।

প্রথমত, এই মহাবিশ্বে প্রাণের উৎপত্তির পেছনে তরল পানির ভূমিকা মুখ্য। ‘পানি অনুসরণ করুন’, এটাই মহাকাশে প্রাণের অস্তিত্ব প্রমাণের খোঁজে জ্যোতির্বিদদের মূলমন্ত্র। অধিকাংশ তরলের চেয়ে ব্যতিক্রম তরল পানি সর্বজনীন দ্রাবক। বিস্ময়করভাবে বিভিন্ন রকম রাসায়নিক পদার্থকে দ্রবীভূত করার ক্ষমতা রাখে পানি। এটি এমন এক আদর্শ মিশ্রণ, যা ক্রমেই জটিল অণু তৈরি করতে পারে। আবার পানি সরল অণুও বটে। কারণ, মহাবিশ্বের যেসব জায়গায় অন্যান্য দ্রাবক বেশ বিরল, সেখানে পানি পাওয়া যায়।

দ্বিতীয়ত, আমরা জানি, কার্বন প্রাণের উৎপত্তির জন্য সম্ভাব্য উপাদান। কারণ এর চারটি বন্ধন আছে। বন্ধনগুলোর মাধ্যমে আরও চারটি পরমাণু একসঙ্গে বেঁধে অবিশ্বাস্য জটিল অণু তৈরি করতে পারে কার্বন। বিশেষ করে, এটি লম্বা কার্বনের শিকল তৈরি করতে পারে, যেটি হাইড্রোকার্বন আর জৈব রসায়নের ভিত্তি। চারটি বন্ধন থাকা অন্যান্য মৌলের এ ধরনের সমৃদ্ধ রাসায়নিক ধর্ম নেই।

কার্বনের সবচেয়ে অবিস্মরণীয় গুরুত্বটা পাওয়া যায় ১৯৫৩ সালে স্ট্যানলি মিলার ও হ্যারল্ড উরের বিখ্যাত এক পরীক্ষায়। পরীক্ষায় দেখা গেল, প্রাণের স্বতঃস্ফূর্ত গঠন হয় কার্বন রসায়নের একটি উপজাত থেকে। শুরুতে তাঁরা অ্যামোনিয়া, মিথেন ও অন্যান্য বিষাক্ত রাসায়নিকের একটি মিশ্ৰণ নেন। তাঁদের বিশ্বাস ছিল, আদিম পৃথিবীতেও এমন মিশ্রণ ছিল। মিশ্রণটি ফ্ল্যাঙ্কে নিয়ে এর মধ্যে সামান্য বিদ্যুৎপ্রবাহ দেওয়া হয়। এরপর অপেক্ষা করতে থাকেন তাঁরা। এক সপ্তাহের মধ্যে ফ্ল্যাস্কের মধ্যে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অ্যামিনো এসিড গঠিত হতে দেখা গেল। ওই বৈদ্যুতিক প্রবাহ কার্বনের বন্ধনগুলোকে অ্যামোনিয়া আর মিথেনের মধ্যে ভেঙে ফেলার জন্য যথেষ্ট ছিল। এরপর পরমাণুগুলোকে নতুন করে সাজিয়ে অ্যামিনো অ্যাসিড গঠিত হয়েছিল, যা আসলে প্রোটিনের পূর্বসূরি। এক অর্থে প্রাণের উৎপত্তি হতে পারে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। এরপর থেকে অ্যামিনো অ্যাসিড ধূমকেতুর ভেতর ও গভীর মহাকাশের গ্যাসের মেঘেও পাওয়া গেছে।

তৃতীয়ত, প্রাণের মৌলিক ভিত্তি হলো নিজের অনুলিপি তৈরি করতে পারা অণু, যার নাম ডিএনএ। রসায়নে, সেলফ রেপ্লিকেটিং বা স্ব-অনুলিপি করতে পারা অণু পাওয়ার ঘটনা খুবই বিরল। পৃথিবীতে প্রথম ডিএনএ গঠিত হতে কয়েক শ মিলিয়ন বছর লেগে গিয়েছিল। সম্ভবত সেটি ঘটেছিল গভীর সাগরে। ধরে নেওয়া যায়, কেউ যদি মহাসাগরে মিলার-উরের পরীক্ষাটি এক মিলিয়ন বছর ধরে চালিয়ে যান, তাহলে ডিএনএর মতো অণু স্বতঃস্ফূর্তভাবে গঠিত হতে পারে। এটি হয়তো এমন কোনো স্থান হবে, যেখানে পৃথিবীর প্রথম ডিএনএ অণু আদিম পৃথিবীর ইতিহাসে সংঘটিত হবে। সেটি হবে মহাসাগরের নিচের আগ্নেয়গিরির ফাটলের কাছে। কারণ, এই ফাটলের কার্যক্রমের কারণে সালোকসংশ্লেষণ ও উদ্ভিদ আসার আগে আদিম ডিএনএ অণুর এবং কোষের জন্য একটি উপযোগী শক্তির জোগান আসবে। ডিএনএর পাশাপাশি কার্বনভিত্তিক অন্য অণুগুলো স্বপ্রতিলিপি তৈরি করতে পারে কি না, তা এখনো জানা নেই। তবে মহাবিশ্বের অন্যান্য স্বপ্রতিলিপি তৈরি করতে সক্ষম অণুগুলো সম্ভবত কোনো না কোনোভাবে ডিএনএ অণুর মতো হতে পারে।

কাজেই দেখা যাচ্ছে, প্রাণের জন্য তরল পানি, হাইড্রোকার্বন কেমিক্যাল আর ডিএনএর মতো স্বপ্রতিলিপি তৈরি করতে পারা অণুর দরকার। এই বিস্তৃত শর্ত ব্যবহার করে মহাবিশ্বে বুদ্ধিমান জীবের উদ্ভবের হার মোটামুটি হিসাব করা যায়। ১৯৬১ সালে মোটাদাগে এ ধরনের হিসাব যাঁরা প্রথম দিকে করেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিদ ফ্রাঙ্ক ড্রেক। মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির ১০০ বিলিয়ন নক্ষত্র নিয়ে শুরু করা হলে হিসাব করে দেখা যাবে, এদের মধ্যে আমাদের সূর্যের মতো নক্ষত্র কত শতাংশ। আবার এদের মধ্যে কতটিতে সৌরজগৎ আছে, সেটিও হিসাব করা যাবে। আরও নির্দিষ্ট করে বললে, ড্রেক ইকুয়েশন ছায়াপথে সভ্যতার সংখ্যার হিসাব করে বিভিন্ন ধরনের সংখ্যা একসঙ্গে গুণ করে। এ সংখ্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে :

-গ্যালাক্সিতে নক্ষত্র জন্মের হার,

-এই নক্ষত্রগুলোর কত শতাংশের গ্রহ আছে,

-প্রতিটি নক্ষত্রে কতটি গ্রহ আছে, যাদের পরিবেশ প্রাণের টিকে থাকার উপযোগী,

-সত্যিকারের প্রাণের উন্নয়ন হয়েছে এমন গ্রহের সংখ্যা,

-কত শতাংশ গ্রহে বুদ্ধিমান জীব গড়ে ওঠা সম্ভব,

-কত শতাংশ জীব যোগাযোগ করতে ইচ্ছুক ও যোগাযোগের ক্ষমতা রাখে, এবং

-একটি সভ্যতার কাঙ্ক্ষিত জীবনকাল।

যুক্তিসম্মত হিসাব করে ও এসব ক্রমের সম্ভাবনার গুণন করলে বোঝা যায়, শুধু মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতেই ১০০ থেকে ১০ হাজার গ্রহ থাকতে পারে, যেখানে বুদ্ধিমান জীবের আস্তানা হতে পারে। এই বুদ্ধিমান জীবসত্তা যদি মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিজুড়ে সুষমভাবে ছড়িয়ে থাকে, তাহলে আমাদের এমন কোনো গ্রহ খুঁজে পাওয়ার প্রত্যাশা করা উচিত, যেটি আমাদের পৃথিবী থেকে মাত্র কয়েক শত আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। ১৯৭৪ সালে কার্ল সাগান হিসাব করে দেখেন, শুধু আমাদের ছায়াপথে এ ধরনের ১০ লাখ সভ্যতা থাকতে পারে।

তাই যাঁরা বহির্জাগতিক সভ্যতার প্রমাণ খুঁজছেন, তাঁদের কাজের বৈধতা দেয় এ ধারণা। বুদ্ধিমান জীবসত্তার উপযোগী গ্রহের এ হিসাব পেয়ে বিজ্ঞানীরা এখন গুরুত্বের সঙ্গে এমন গ্রহ থেকে রেডিও সিগন্যাল পাওয়া যায় কি না, তা খুঁজছেন। সেগুলো অনেকটা আমাদের গ্রহের টিভি ও রেডিও সিগন্যালের মতো। মাত্র গত পঞ্চাশ বছর আমরা এ রকম সিগন্যাল নিঃসরণ করতে শুরু করেছি

ইটির খোঁজে পাতা কান

দ্য সার্চ ফর এক্সট্রাটেরেস্ট্রিয়াল ইন্টেলিজেন্স (SETI) বা সেটি প্রজেক্টের কাজ শুরু হয় ১৯৫৯ সালে। পদার্থবিদ গুইসেপ কোকোনি আর ফিলিপ মরিসনের এক প্রভাবশালী গবেষণাপত্রের কারণে সেটি সম্ভব হয়। তাঁদের প্রস্তাব ছিল, ১ থেকে ১০ গিগাহার্জের মাইক্রোওয়েভ কম্পাঙ্কের রেডিয়েশন শনাক্ত করার মাধ্যমে বহির্জাগতিক জীবের সঙ্গে যোগাযোগের সবচেয়ে উপযুক্ত উপায় হতে পারে। (১ গিগাহার্জের নিচের সিগন্যাল দ্রুতগতিসম্পন্ন ইলেকট্রনদের বিকিরণ নিঃসরণের কারণে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে। আবার ১০ গিগাহার্জের ওপরের সিগন্যালের ক্ষেত্রেও কিছু সমস্যা আছে। সেটি হলো, আমাদের নিজেদের বায়ুমণ্ডলের অক্সিজেন ও পানির অণুর থেকে আসা গোলামাল এ ধরনের যেকোনো সংকেতের সঙ্গে বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারে।) মহাকাশ থেকে আসা সংকেতগুলো শুনতে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য কম্পাঙ্ক হিসেবে তাঁরা ১৪২০ গিগাহার্জকে নির্বাচন করেন। কারণ, এটিই ছিল মহাবিশ্বের সবচেয়ে প্রাচুর্যময় মৌল সাধারণ হাইড্রোজেন গ্যাসের নিঃসরণ কম্পাঙ্ক। (এই পরিসরের কম্পাঙ্কের ডাকনাম ‘ওয়াটারিং হোল’ বা পানির উৎস। বহির্জাগতিক যোগাযোগে তাদের উপযোগিতার কথা বিবেচনা করে এমন নাম দেওয়া হয়েছে।)

আসলে পানির উৎসের কাছে বুদ্ধিমান প্রাণীদের কোনো সংকেতের প্রমাণ অনুসন্ধান হতাশাজনক। ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার গ্রিন ব্যাংকে ২৫ মিটার রেডিও টেলিস্কোপ ব্যবহার করে সংকেতের খোঁজ করতে ১৯৬০ সালে ফ্রাঙ্ক ড্রেককে প্রজেক্ট ওজমাতে (ওজের রানির নামানুসারে এ নাম) আমন্ত্রণ জানানো হয়। বছরের পর বছর রাতের আকাশ চষে ফেলেও প্রজেক্ট ওজমা কিংবা অন্য প্রজেক্টগুলোতে কখনোই কোনো সংকেতের দেখা মেলেনি।

সেটি (SETI) গবেষণায় অর্থের জোগান দিতে ১৯৭১ সালে এক উচ্চাভিলাষী প্রস্তাব দেয় নাসা। প্রজেক্ট সাইক্লোপস নামে সুপরিচিত এ উদ্যোগে ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পনেরো শ রাডার টেলিস্কোপ যুক্ত করা হয়। অবাক হওয়ার কিছু নেই, এ গবেষণা থেকেও এখনো কিছু মেলেনি। আরও ন্যায়সংগত কিছু প্রস্তাবেও অর্থ বরাদ্দ পাওয়া গিয়েছিল। যেমন মহাকাশের এলিয়েনদের জন্য কোডেড মেসেজ পাঠানো। ১৯৭৪ সালে পুয়ের্তো রিকোর বিশাল আরেসিবো রেডিও টেলিস্কোপের মাধ্যমে ১৬৭৯ বিটের একটি কোডেড মেসেজ প্রায় ২৫,১০০ আলোকবর্ষ দূরের গ্লোবুলার ক্লাস্টার এম১৩-এর দিকে পাঠানো হয়। সংক্ষিপ্ত এ বার্তায় বিজ্ঞানীরা ২৩×৭৩ মাত্রার গ্রিড প্যাটার্ন বানান, যেটি সৌরজগতে আমাদের অবস্থান দেখানো হয়েছে। এ ছাড়া এতে ছিল মানুষের ছবি আর কিছু রাসায়নিক ফর্মুলাও। (বিপুল দূরত্বের কারণে বাইরের মহাকাশ থেকে ওই মেসেজের উত্তর আসতে অন্তত ৫২,১৭৪ বছর সময় লাগবে।)

মার্কিন কংগ্রেসকে এ প্রজেক্টের গুরুত্ব বোঝানো যায়নি। এমনকি ১৯৭৭ সালে ‘ওয়াও’ সিগন্যাল নামে এক রহস্যময় রেডিও সংকেত পাওয়ার পরও বিন্দুমাত্র বিচলিত হয়নি তারা। এ সংকেতে কিছু অক্ষর ও সংখ্যা ছিল। তা দেখে মনে হয়েছিল, সেগুলো এলোমেলো নয়, বরং বুদ্ধিমান কোনো জীবের পাঠানো সংকেত। (তারপরও অনেকে ওয়াও সিগন্যাল দেখে বিশ্বাস করতে পারেনি।)

১৯৯৫ সালে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে অর্থ বরাদ্দ না পেয়ে চরম হতাশায় জ্যোতির্বিদেরা ব্যক্তিগত অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের হয়ে কাজ শুরু করেন। এদের মধ্যে একটি ক্যালিফোর্নিয়ার মাউন্টেন ভিউয়ে সেটি ইনস্টিটিউট। সেটি (SETI) গবেষণা ও ১২০০ থেকে ৩০০০ মেগাহার্জ সীমার মধ্যে সূর্যের মতো আমাদের প্রতিবেশী এক হাজার নক্ষত্র নিয়ে গবেষণা প্রজেক্ট ফিনিক্স চালু করে। ড. জিল টার্টার (হলিউডের কন্টাক্টমুভিতে জোডি ফস্টার এই বিজ্ঞানীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন) একসময় এর পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন। (এই প্রজেক্টে ব্যবহার করা যন্ত্রপাতিগুলো খুবই সংবেদনশীল। ২০০ আলোকবর্ষ দূরের কোনো বিমানবন্দরের রাডার সিস্টেম থেকে কোনো কিছুর নিঃসরণ শনাক্ত করতে পারে এটি 1)

আরও অভিনব পদ্ধতিটি হলো SETI@home প্রজেক্ট। বার্কলির ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিদেরা ১৯৯৯ সালে এটি চালু করেন। তাঁদের আইডিয়া হলো, যাদের কম্পিউটার অধিকাংশ সময় অলস পড়ে থাকে, এ রকম কয়েক লাখ পিসির মালিকদের তালিকাভুক্ত করা। যারা একটি সফটওয়্যার প্যাকেজ ডাউনলোড করে এতে অংশ নেবে, তারা সবাই টেলিস্কোপ থেকে পাওয়া রেডিও সিগন্যাল ডিকোড করতে সহায়তা করবে। অংশগ্রহণকারীদের কম্পিউটার স্ক্রিন সেভার যখন সক্রিয় থাকবে, তখন এ কাজটি করা সম্ভব। তাই পিসি ব্যবহারের সময় তাদের কোনো সমস্যা হবে না। এ পর্যন্ত দুই শতাধিক দেশের ৫ মিলিয়নের বেশি পিসি ব্যবহারকারী এই প্রজেক্টে যোগ দিয়েছেন। তাঁরা প্রত্যেকে খুব অল্প খরচে বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি খরচের বিদ্যুৎ ভাগাভাগি করে নিচ্ছেন। এটিই ইতিহাসে এ পর্যন্ত হাতে নেওয়া সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী সমন্বিত কম্পিউটার প্রজেক্ট। অন্যান্য যেসব প্রজেক্টে বিপুলসংখ্যক কম্পিউটার ব্যবহার করে গণনার প্রয়োজন হয়, সেখানেও এটি মডেল হিসেবে কাজ করতে পারে। অবশ্য তারপরও এখনো কোনো বুদ্ধিমান প্রাণীদের কাছ থেকে SETI@home প্রজেক্ট কোনো সিগন্যাল খুঁজে পায়নি।

কয়েক দশক কঠোর পরিশ্রমের পরও সেটি গবেষণায় কোনো অগ্রগতি না পেয়ে এর প্রবক্তারা প্রজেক্ট নিয়ে কঠিন প্রশ্নের মুখে পড়েন। সবচেয়ে অনস্বীকার্য ত্রুটি সম্ভবত নির্দিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সির ব্যান্ডে রেডিও সিগন্যাল খোঁজা। অনেকের মতে, এলিয়েন-জীবন হয়তো রেডিওর বদলে লেজার সিগন্যালও ব্যবহার করে থাকতে পারে। রেডিও সিগন্যালের চেয়ে লেজারের অনেক সুবিধা আছে। কারণ, লেজারের ক্ষুদ্র তরঙ্গদৈর্ঘ্যের অর্থ হলো, একটি তরঙ্গে রেডিওর চেয়ে অনেক বেশি সিগন্যাল একত্র করা যায়। তবে লেজার রশ্মি সঠিক গন্তব্যে পাঠানো গেলেও এবং এতে শুধু একটি ফ্রিকোয়েন্সি থাকলেও সঠিক লেজার ফ্রিকোয়েন্সিতে নিখুঁত টিউন করা কঠিন।

আরেকটি অনস্বীকার্য ত্রুটি হতে পারে, নির্দিষ্ট রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি ব্যান্ডে নির্ভরশীল ছিলেন সেটি গবেষকেরা। কোথাও যদি এলিয়েন থাকে, তাহলে তারা হয়তো সংক্ষিপ্ত কৌশল ব্যবহার করতে পারে কিংবা ক্ষুদ্রতর প্যাকেজের মাধ্যমে মেসেজ ছড়িয়ে দিতে পারে। অর্থাৎ এমন কোনো কৌশল, যা এখন আধুনিক ইন্টারনেটে ব্যবহার করা হয়। এ রকম সংক্ষিপ্ত কৌশলের মেসেজ শোনা, যেগুলো বিভিন্ন ফ্রিকোয়েন্সিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে পারে, সেগুলোকে আমরা হয়তো শুধু এলোমেলো গোলমাল হিসেবে এতকাল শুনে এসেছি।

তবে সেটি প্রদত্ত সব নির্দিষ্ট সমস্যাগুলোর মুখোমুখি হওয়ার পরও, যৌক্তিকভাবে অনুমান করা যায় যে এ রকম সভ্যতা আছে। সেই সঙ্গে ধরে নেওয়া যায়, এই শতাব্দীর কোনো এক সময়ে আমরা বহির্জাগতিক সভ্যতা থেকে আসা কোনো না কোনো সংকেত শনাক্ত করতে পারব। আর তা ঘটলে মানবজাতির ইতিহাসে একটি মাইলফলক হবে।

ওরা কোথায়?

সত্যি বলতে, সেটি প্রজেক্ট এখনো মহাবিশ্বে কোনো বুদ্ধিমান প্রাণের কোনো চিহ্ন খুঁজে পায়নি। এ কারণে অন্য গ্রহে বুদ্ধিমান প্রাণের সম্ভাবনা সম্পর্কে ফ্রাঙ্ক ড্রেকের সমীকরণ নিয়ে একটু শীতল মনোভাব দেখা দিয়েছে বিজ্ঞানীদের মধ্যে। সম্প্রতি জ্যোতির্বিদ্যাসংক্রান্ত কিছু আবিষ্কার আমাদের মনে এই বিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে যে, ১৯৬০-এর দশকে ফ্রাঙ্ক ড্রেক বুদ্ধিমান প্রাণ খুঁজে পাওয়ার যে সম্ভাবনা হিসাব করেছিলেন, তার চেয়ে বাস্তবতা আসলে অন্য রকম। মহাবিশ্বে বুদ্ধিমান প্রাণ থাকার সম্ভাবনা সম্পর্কে আগে যা বিশ্বাস করা হতো, বাস্তবতা একই সঙ্গে তার চেয়েও অনেক বেশি আশাজাগানিয়া ও হতাশাজনক।

প্রথমত, বিভিন্ন নতুন আবিষ্কার আমাদের এই বিশ্বাসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে যে, এমন কোনোভাবেও জীবনের আবির্ভাব হতে পারে, যেটা ড্রেক ইকুয়েশনে বিবেচনা করা হয়নি। আগে বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করতেন, পানি শুধু সূর্যের চারপাশের কোনো গোল্ডিলক জোনেই থাকা সম্ভব। (অর্থাৎ সূর্য থেকে পৃথিবীর যে দূরত্ব, এটা ঠিক তা-ই। মানে সূর্যের খুব কাছেও নয়, খুব দূরেও নয়। সূর্যের খুব কাছে থাকলে মহাসাগরের পানি বাষ্পীভূত হয়ে যাবে। খুব দূরে থাকলে মহাসাগরের পানি জমাট বেঁধে বরফ হয়ে যাবে। একদম মাঝামাঝি জায়গাতে প্রাণের আবির্ভাব হওয়া সম্ভব। একেই বলে গোল্ডিলক জোন। )

কিন্তু জ্যোতির্বিদেরা একসময় বৃহস্পতি গ্রহের শীতল উপগ্রহ ইউরোপা বরফ আচ্ছাদিত স্তরের নিচেও তরল পানি থাকার প্রমাণ পেলেন। কাজেই আগের ধারণার ওপর এটি ছিল অনেক বড় এক ধাক্কা। ইউরোপা গোল্ডিলক জোনের বেশ বাইরে। তাই দেখা যাচ্ছে, ড্রেক সমীকরণের শর্তগুলোর সঙ্গে এটি মেলে না। আবার টাইডাল ফোর্স বা জোয়ারের বল ইউরোপার বরফের আচ্ছাদন গলিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট হতে পারে। এর মাধ্যমে সেখানে স্থায়ী তরল মহাসাগরও সৃষ্টি হতে পারে। বৃহস্পতির বিপুল পরিমাণ মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র ইউরোপাকে রাবার বলের মতো চেপে ধরে। বৃহস্পতির চারপাশে ইউরোপার ঘূর্ণনের কারণে উপগ্রহটির কেন্দ্রে গভীর সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়। ফলে ইউরোপার বরফে আচ্ছাদন গলিয়ে দিতে পারবে। আমাদের সৌরজগতে শতাধিক উপগ্রহ আছে। মানে, আমাদের সৌরজগতের গোল্ডিলক জোনের বাইরেও জীবের টিকে থাকার উপযোগী উপগ্রহ থাকতে পারে। (এ পর্যন্ত আমাদের সৌরজগতের বাইরে ২৫০টি বড় আকৃতির বহিঃসৌরজাগতিক গ্রহ আবিষ্কৃত হয়েছে। এগুলোর মধ্যেও বরফে জমাটবাঁধা উপগ্রহ থাকতে পারে, কে জানে যেগুলো প্রাণ ধারণের উপযোগীও হতে পারে।)

বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন, এই মহাবিশ্বে এমন ভবঘুরে টাইপের গ্রহও থাকতে পারে, যারা হয়তো অন্য কোনো নক্ষত্রের চারপাশে ঘুরছে না। টাইডাল ফোর্সের কারণে ভবঘুরে গ্রহের চারপাশে ঘূর্ণমান কোনো উপগ্রহের মহাসাগরে বরফস্তরের নিচে তরল পানিও থাকতে পারে, থাকতে পারে প্রাণের অস্তিত্বও। তবে আমাদের প্রচলিত যন্ত্রপাতি দিয়ে এ রকম উপগ্রহ দেখা অসম্ভব। কারণ, কোনো গ্রহ-উপগ্রহ দেখতে আমরা তাদের মাতৃ- নক্ষত্রের আলোর ওপর নির্ভর করি।

তাই দেখা যাচ্ছে, কোনো সৌরজগতে এ ধরনের উপগ্রহের সংখ্যা হয়তো গ্রহদের চেয়েও অনেক বেশি হতে পারে। আবার কয়েক লাখ ভবঘুরে গ্রহও থাকতে পারে আমাদের এই ছায়াপথে। এতে বোঝা যায়, মহাবিশ্বে প্রাণ ধারণের উপযোগী গ্রহ-উপগ্রহের সংখ্যা আগের ধারণার চেয়েও অনেক গুণ বেশি হতে পারে। অন্যদিকে বেশ কিছু কারণে কয়েকজন জ্যোতির্বিদ ধারণা করছেন, গোল্ডিলক জোনের মধ্যে থাকা গ্রহগুলোতে প্রাণের অস্তিত্ব থাকার সম্ভাবনা ড্রেক যা হিসাব করেছিলেন, তার তুলনায় অনেক বেশি হতে পারে।

প্রথমত, কম্পিউটার প্রোগ্রাম প্রমাণ করেছে, মহাকাশে ধূমকেতু ও গ্রহাণুর চলাচল বা উৎপাত ঠেকাতে কোনো সৌরজগতে বৃহস্পতির মতো আকারের গ্রহের উপস্থিতি থাকা প্রয়োজন। তাতে সৌরজগতে পরিষ্কার অভিযান চলমান থাকে, পাশাপাশি জীবের অস্তিত্বের উপযোগী হয় গ্রহটি। সৌরজগতে বৃহস্পতি না থাকলে ধূমকেতু ও গ্রহাণুর অবিরাম বর্ষণ চলত পৃথিবীতে। তাতে অসম্ভব হয়ে উঠত প্রাণের অস্তিত্ব। ওয়াশিংটন ডিসির কার্নেগি ইনস্টিটিউটের জ্যোতির্বিদ ড. জর্জ ওয়েথারিল হিসাব করে দেখেছেন, আমাদের সৌরজগতে বৃহস্পতি বা শনি গ্রহ না থাকলে, পৃথিবীতে বর্তমানের চেয়ে হাজার গুণ বেশি গ্রহাণু আছড়ে পড়ত। তার মধ্যে প্রতি ১০ হাজার বছরে জীবনের জন্য হুমকিও দেখা যেত (যেমন ৬৫ মিলিয়ন বছর আগে এমনই এক গ্রহাণুর আঘাতে ডাইনোসর সদলবলে বিলুপ্ত হয়েছিল।) তিনি বলেন, ‘এ ধরনের প্রচণ্ড আক্রমণে জীবনের অস্তিত্ব কীভাবে সম্ভব, তা কল্পনা করাও কঠিন।’

দ্বিতীয়ত, আমাদের গ্রহটির একটা বড়সড় চাঁদ আছে। সেটাও আমাদের জন্য সৌভাগ্যের। কারণ, আমাদের পৃথিবীর ঘূর্ণন স্থিতিশীল করে তুলেছে উপগ্রহটি। নিউটনের মহাকর্ষ সূত্রকে কয়েক মিলিয়ন বছরে বিস্তৃত করে, বিজ্ঞানীরা প্রমাণ দেখাতে পারেন, একটা বড় চাঁদ ছাড়া পৃথিবীর অক্ষ হয়তো অস্থিতিশীল হতে পারত। তার ফলে পৃথিবীর ভারসাম্য নষ্ট হয়ে জীবনের অস্তিত্ব অসম্ভব করে তুলত। ফরাসি জ্যোতির্বিদ ড. জ্যাকুস ল্যাসকার হিসাব করে দেখেছেন, আমাদের চাঁদটি ছাড়া পৃথিবীর অক্ষ ০ ও ৪৫ ডিগ্রিতে দুলত। ফলে পৃথিবীতে বিরাজ করত চরম আবহাওয়া। স্বভাবত তা হতো জীবন ধারণের পক্ষে অসম্ভব। কাজেই একটি বড় আকারের চাঁদের উপস্থিতির ফ্যাক্টরও ড্রেক সমীকরণের শর্তে ব্যবহার করা উচিত। (মঙ্গলের উপগ্রহ দুটি। সেগুলো মঙ্গলের ঘূর্ণন স্থিতিশীল করার পক্ষে খুব ছোট। সে কারণে মঙ্গল গ্ৰহ হয়তো অতীতে ভারসাম্যহীন অবস্থায় ছিল এবং ভবিষ্যতেও তার ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যেতে পারে)।

তৃতীয়ত, সাম্প্রতিক ভূতাত্ত্বিক প্রমাণ এটাই নির্দেশ করে, অতীতে অনেকবার পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব নিভে গিয়েছিল। প্রায় দুই বিলিয়ন বছর আগে সম্ভবত পুরোপুরি বরফের চাদরে ঢেকে গিয়েছিল পৃথিবী। অর্থাৎ একটা বরফের গোলকের মতো হয়ে উঠেছিল পৃথিবী, যেখানে জীবন ধারণ ছিল অকল্পনীয়। আবার অন্য কোনো সময়ে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ও ধূমকেতুর আঘাতে হয়তো পৃথিবীর সব জীব ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। কাজেই জীবনের সৃষ্টি ও বিবর্তন আমাদের আগের ধারণার চেয়েও অনেক ভঙ্গুর।

চতুর্থত, অতীতে বুদ্ধিমান জীব প্রায় বিলুপ্তির কাছাকাছি চলে গিয়েছিল। ডিএনএর প্রমাণ থেকে দেখা যায়, প্রায় এক লাখ বছর আগে সম্ভবত মাত্ৰ কয়েক শ থেকে কয়েক হাজার মানুষ টিকে ছিল। বেশির ভাগ প্রাণী থেকে এ প্রজাতি জিনগতভাবে আলাদা হলেও মানুষেরা জিনগতভাবে প্রায় একই ধরনের। প্রাণিজগতের সঙ্গে তুলনা করলে, মানুষেরা পরস্পরের ক্লোন। এ ঘটনা শুধু একভাবেই ব্যাখ্যা করা যায়, যদি আমাদের ইতিহাসে এমন কোনো বাধা থাকে, যেখানে বেশির ভাগ মানব প্রজাতি প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যায়। যেমন কোনো আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতে পৃথিবীর আবহাওয়া হঠাৎ শীতল হয়ে পুরো মানবজাতির প্রায় সবটা বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল।

এ ছাড়া আরও কিছু আকস্মিক দুর্ঘটনাও ঘটে থাকতে পারে, যা পৃথিবীর জীবন ধারণের জন্য জরুরি। এর মধ্যে রয়েছে :

একটি শক্তিশালী চুম্বকীয় ক্ষেত্র : পৃথিবীর প্রাণ ধ্বংস করে দেওয়ার মতো কসমিক রে ও বিকিরণ ঠেকানোর জন্য এটি দরকার।

গ্রহের ঘূর্ণনের মাঝারি গতি : পৃথিবী যদি খুব ধীরে ঘুরত, তাহলে সূর্যের দিকে থাকা অংশটি উত্তাপে দগ্ধ হতো। অন্য অংশে দীর্ঘকাল শীতে জমাট বেঁধে যেত। আর পৃথিবীর ঘূর্ণন দ্রুত হলে আবহাওয়া চরমভাবাপন্ন হতো। যেমন দানবীয় বাতাস ও ঝড়।

সঠিক অবস্থান বা গ্যালাক্সির কেন্দ্র থেকে সঠিক দূরত্ব : পৃথিবী যদি আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রের খুব কাছে হতো, তাহলে সেখানকার ভয়ংকর বিকিরণ এতে আঘাত করত। আবার কেন্দ্র থেকে খুব বেশি দূরে হলে আমাদের গ্রহটিতে ডিএনএ অণু ও প্রোটিন তৈরির জন্য সমৃদ্ধ মৌলের অস্তিত্বও থাকত না।

এসব কারণে জ্যোতির্বিদেরা এখন বিশ্বাস করেন, গোল্ডিলক জোনের বাইরের উপগ্রহ বা ভবঘুরে গ্রহগুলোতেও জীবনের অস্তিত্ব থাকতে পারে। তবে গোল্ডিলক জোনে পৃথিবীর মতো জীবন ধারণের উপযোগী গ্রহের অস্তিত্ব থাকার সম্ভাবনা আগের ধারণার চেয়েও অনেক কম। সর্বোপরি ড্রেক সমীকরণের অধিকাংশ হিসাব প্রমাণ করে, এই ছায়াপথে সভ্যতা খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা হয়তো আগের হিসাবের তুলনায় অনেক কম।

পিটার ওয়ার্ড ও ডোনাল্ড ব্রাউনলি লিখেছেন, ‘আমাদের বিশ্বাস, মহাবিশ্বের ক্ষুদ্র অণুজীব আর তাদের মতো জীবের অস্তিত্ব থাকাই স্বাভাবিক। এমনকি ড্রেক ও কার্ল সাগানের কল্পনার চেয়েও তা সুলভ হতে পারে। তবে জটিল জীব-প্রাণী আর উন্নত উদ্ভিদ সাধারণ ধারণার চেয়েও বেশ বিরল হতে পারে।’ আসলে ওয়ার্ড ও ব্রাউনলি এই সম্ভাবনা খোলা রেখেছেন যে এই ছায়াপথে প্রাণের আশ্রয়ের জন্য পৃথিবীটা অনন্য ঘটনা। (অবশ্য তত্ত্বটি আমাদের গ্যালাক্সিতে বুদ্ধিমান প্রাণ খোঁজার প্রচেষ্টাগুলোতে স্রেফ জল ঢেলে দিতে পারে। তারপরও দূরের অন্যান্য ছায়াপথে জীবনের অস্তিত্বের সম্ভাবনা এখানেও খোলাই রয়েছে।)

পৃথিবীর মতো গ্রহের খোঁজে

ড্রেক সমীকরণ অবশ্যই পুরোপুরি তাত্ত্বিক। সে জন্য মহাকাশে প্রাণের অনুসন্ধান গতি পেয়েছে এক্সট্রাসোলার প্ল্যানেট বা বহিঃসৌরজাগতিক গ্রহ আবিষ্কারের মাধ্যমে। বহিঃসৌরগ্রহ গবেষণায় বাধা হলো, তাদের নিজস্ব আলো না থাকায় আমাদের যেকোনো টেলিস্কোপের কাছে তারা অদৃশ্য। সাধারণভাবে তাদের মাতৃ-নক্ষত্রের চেয়ে তারা এক মিলিয়ন থেকে এক বিলিয়ন ভাগ নিষ্প্রভ।

তাদের খুঁজে পেতে তাই জ্যোতির্বিদেরা মাতৃ-নক্ষত্রে ক্ষুদ্র কম্পন বিশ্লেষণ করতে বাধ্য হন। ধারণা করা হয়, বৃহস্পতির মতো বড় আকারের গ্রহ যেকোনো নক্ষত্রের কক্ষপথ পাল্টে দিতে পারে। (একটা কুকুরকে তার লেজের পিছে ছোটার কথা কল্পনা করুন। একইভাবে, মাতৃ-নক্ষত্র ও তার বৃহস্পতির মতো আকারের কোনো গ্রহ পরস্পরের চারদিকে ঘোরার মাধ্যমে পরস্পরের পেছনে ছোটে। টেলিস্কোপ দিয়ে আমরা এই বৃহস্পতির মতো আকারের গ্রহটি দেখতে পাব না। কারণ, সেটি অন্ধকার। তবে তার মাতৃ- নক্ষত্রটি স্পষ্টভাবে দেখা যায়। সেই সঙ্গে সামনে-পেছনে টলমল বা কম্পিত হতে দেখা যাবে তাকে।)

সত্যিকারের প্রথম বহিঃসৌরগ্রহ পাওয়া গিয়েছিল ১৯৯৪ সালে। এটি আবিষ্কার করেন পেনসিলভানিয়া স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী ড. আলেকজান্ডার ওলজজান। ঘূর্ণমান এক পালসার বা এক মৃত নক্ষত্রের চারপাশে ঘূর্ণমান অবস্থায় গ্রহগুলো পর্যবেক্ষণ করেন তিনি। সম্ভবত মাতৃ- নক্ষত্রটি একটি সুপারনোভা হিসেবে বিস্ফোরিত হওয়ার কারণে দেখে মনে হচ্ছিল গ্রহগুলোও মৃত, ঝলসানো। পরের বছর জেনেভার মাইকেল মেয়র ও দিদিয়ার কুলে নামের দুই সুইস জ্যোতির্বিদ ঘোষণা করেন যে তাঁরা এমন একটি গ্রহ খুঁজে পেয়েছেন, যার ভর বৃহস্পতির মতো। সেই সঙ্গে সেটি ৫১ পেগাসি নক্ষত্রের চারপাশে ঘুরছে। এর পরপরই এই ক্ষেত্রটিতে যেন বাঁধভাঙা বন্যা বয়ে গেল। [বহিঃসৌরজাগতিক গ্রহ আবিষ্কারের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৯ সালে জেমস পিবলসের সঙ্গে পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন মাইকেল মেয়র এবং দিদিয়ার কুলে।—অনুবাদক]

গত দশ বছরে বহিঃসৌরজাগতিক গ্রহ খুঁজে পাওয়ার সংখ্যা লক্ষণীয়ভাবে বেড়ে গেছে। বোল্ডারের কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ববিদ ব্রুস জ্যাকোস্কির অভিমত হলো, ‘এটা মানবজাতির ইতিহাসে বিশেষ এক সময়। কারণ, আমরাই প্রথম প্রজন্ম যাদের অন্য গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব আবিষ্কারের সত্যিকারের সম্ভাবনা আছে।’

এসব সৌরব্যবস্থার কোনোটির সঙ্গে আমাদের নিজেদের কোনো মিল নেই। সত্যি বলতে কি, আমাদের সৌরজগতের সঙ্গে তাদের বেশ অমিল আছে। একসময় জ্যোতির্বিদেরা ভাবতেন, আমাদের সৌরজগৎ মহাবিশ্বজুড়ে অন্যান্য সৌরব্যবস্থার আদর্শ নমুনা, যার কক্ষপথগুলো বৃত্তাকার ও মাতৃ- নক্ষত্রকে ঘিরে তিনটি বলয়যুক্ত গ্রহ আছে। এই বলয় তিনটির মধ্যে নক্ষত্রটির সবচেয়ে কাছের গ্রহটি পাথুরে এলাকায়, পরের অঞ্চলটি গ্যাসীয় দানব আর সবশেষে জমাটবাঁধা বরফস্তূপের ধূমকেতুর বলয়।

কিন্তু জ্যোতির্বিদেরা বিস্ময় নিয়ে একসময় দেখতে পেলেন, অন্যান্য সৌরব্যবস্থায় কোনো গ্রহই এই সরল সূত্র মানেনি। নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে, বৃহস্পতির মতো আকারের গ্রহগুলোকে কোনো সৌরব্যবস্থায় মাতৃ-নক্ষত্ৰ থেকে অনেক দূরে পাওয়া যাবে আশা করা হয়েছিল। কিন্তু তার বদলে দেখা গেল, এদের অনেকগুলো মাতৃ-নক্ষত্রের একেবারে কাছে প্রদক্ষিণ করছে (এমনকি তাদের অনেকগুলোর কক্ষপথ বুধের চেয়েও অনেক কাছে), নয়তো তাদের কক্ষপথ চরমভাবে উপবৃত্তাকার। এই দুইয়ের যেকোনো ক্ষেত্রেই গোল্ডিলক জোনে পৃথিবীর মতো ছোট গ্রহের দুইয়ের যেকোনো অবস্থায় থাকা অসম্ভব। বৃহস্পতির মতো আকারের কোনো গ্রহ তার মাতৃ-নক্ষত্রের খুব কাছে থাকার মানে হলো, বৃহস্পতি আকারের গ্রহটি অনেক বড় দূরত্ব থেকে স্থানান্তরিত হয়ে সেখানে এসেছে। ক্রমেই সেটি ওই সৌরব্যবস্থার কেন্দ্রের দিকে সর্পিল বা প্যাচানো পথে এগিয়ে যাচ্ছে (সম্ভবত ধূলির জন্য সৃষ্ট ঘর্ষণের কারণে)। সে ক্ষেত্রে বৃহস্পতি আকারের গ্রহটি ক্রমান্বয়ে পৃথিবীর মতো ছোট গ্রহের কক্ষপথ ছেদ বা অতিক্রম করে তাকে মহাকাশে সজোরে ছুড়ে ফেলে দেবে। আবার বৃহস্পতি আকারের গ্রহটি যদি চরম উপবৃত্তাকার পথ অনুসরণ করে, তাহলে তার অর্থ হলো, বৃহস্পতি আকারের গ্রহটি নিয়মিতভাবে গোল্ডিলক জোনের ভেতর দিয়ে যায়। এর ফলেও পৃথিবীর মতো কোনো গ্ৰহ মহাকাশে নিক্ষিপ্ত হবে।

অনুসন্ধানে পাওয়া এসব ফল দেখে গ্রহশিকারি ও জ্যোতির্বিদেরা পৃথিবীর মতো কোনো গ্রহ আবিষ্কারে বেশ দমে যান। অথচ এ ফলাফল তাঁদের প্রত্যাশিত হওয়ার কথা ছিল। আমাদের যন্ত্রপাতি এতই অপরিপক্ব যে সেগুলো ব্যবহার করে শুধু বড়সড় ও দ্রুতবেগে চলমান বৃহস্পতি আকারের গ্রহ শনাক্ত করা যায়। কারণ, মাতৃ-নক্ষত্রের ওপর তাদের পরিমাপযোগ্য প্রভাব থাকে। তাই অবাক হওয়ার কিছু নেই যে বর্তমানের টেলিস্কোপগুলো দ্রুতবেগে চলমান দানবীয় গ্রহ শনাক্ত করতে পারে। মহাকাশে আমাদের সৌরজগতের মতো হুবহু কোনো যমজ সৌরজগৎ যদি থাকে, তাহলে তাদের খুঁজে পাওয়ার ব্যাপারে আমাদের যন্ত্রপাতি এখনো স্কুল।

কোরোট, কেপলার ও টেরেস্ট্রিয়াল প্ল্যানেট ফাইন্ডার চালু হওয়ার পর হয়তো একসময় এই সীমাবদ্ধতার বদল ঘটবে। এই তিনটি স্যাটেলাইট ডিজাইন করা হয়েছে মহাকাশে পৃথিবীর মতো শত শত গ্রহ খুঁজে বের করার জন্য। যেমন কোরোট আর কেপলার স্যাটেলাইট মাতৃ-নক্ষত্রে অস্পষ্ট ছায়া পরীক্ষা করে দেখবে। পৃথিবীর মতো কোনো গ্রহ তার মাতৃ-নক্ষত্রের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় হয়তো এই ছায়ার সৃষ্টি করে। ফলে ওই মাতৃ-নক্ষত্রের আলো কিছুটা কমে যায়। অন্য সৌরব্যবস্থায় থাকা পৃথিবীর মতো কোনো গ্রহকে দেখা যায় না। কিন্তু স্যাটেলাইটের মাধ্যমে মাতৃ-নক্ষত্রের আলো কমে যাওয়া শনাক্ত করে এ ধরনের গ্রহ শনাক্ত করা যাবে।

২০০৬ সালের ডিসেম্বরে সফলভাবে উৎক্ষেপণ করা হয় ফ্রান্সের কোরোট (CoRoT) স্যাটেলাইট (ফরাসি ভাষায় Convection, Stellar Rotation ও Planetary Transits শব্দ তিনটি একত্র করে CoRoT শব্দটি গঠিত)। বহিঃসৌরজাগতিক গ্রহ অনুসন্ধানে একে এক মাইলফলক বলা যায়। কারণ, এটি ছিল প্রথম কোনো মহাকাশভিত্তিক অনুসন্ধানী নভোযান। এর মাধ্যমে পৃথিবীর মতো দেখতে ১০ থেকে ৪০টি গ্রহ খুঁজে পাওয়ার প্রত্যাশা করেন বিজ্ঞানীরা। সেটি করতে পারলে গ্রহগুলো হয়তো গ্যাসীয় দানব নয়, বরং রুক্ষ পর্বতময়ও হতে পারে। আবার হয়তো পৃথিবীর চেয়ে কয়েক গুণ বড়ও হতে পারে সেগুলো। এ ছাড়া বৃহস্পতি আকারের অনেকগুলো গ্রহও আবিষ্কার করে বসতে পারে কোরোট। জ্যোতির্বিদ ক্লদ কাতালা বলেন, ‘সব ধরনের আকার ও প্রকৃতির বহিঃসৌরজাগতিক গ্রহ খুঁজে বের করতে পারবে কোরোট। এ মুহূর্তে ভূপৃষ্ঠ থেকে আমরা যা করতে পারি না, সেটিই করতে পারবে এটি।’ এই স্যাটেলাইট ১ লাখ ২০ হাজার নক্ষত্র স্ক্যান করতে পারবে বলে আশাবাদী বিজ্ঞানীরা। [এ অধ্যায়ের শেষে এ-সম্পর্কিত টীকা দেখুন।—অনুবাদক]

যেকোনো দিন মহাকাশে পৃথিবীর মতো গ্রহের প্রথম প্রমাণ হাজির করতে পারবে কোরোট। হয়তো জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেবে সেটি। ভবিষ্যতে মানুষ হয়তো রাতের আকাশে তাকিয়ে নিজের অস্তিত্ব নিয়ে একটা ধাক্কা খাবে। একই সঙ্গে মহাকাশে বহুদূরের এলাকায় অগণিত গ্রহে বুদ্ধিমান প্রাণের অস্তিত্ব থাকার সম্ভাবনাও উপলব্ধি করতে পারবে তারা। ভবিষ্যতে আকাশের দিকে তাকিয়ে সুদূরের মহাকাশের ওপার থেকে আমাদের দিকে কেউ তাকিয়ে আছে কি না, একরাশ বিস্ময় নিয়ে তাই ভাবব আমরা।

এদিকে কেপলার স্যাটেলাইটের উৎক্ষেপণের তারিখ ২০০৮ সালের শেষের দিকে ঠিক করেছে নাসা। স্যাটেলাইটটি এতই সূক্ষ্ম যে তা দিয়ে মহাকাশে কয়েক শ পৃথিবীর আকারের মতো গ্রহ আবিষ্কার করার সম্ভাবনা রয়েছে। মহাকাশে এক লাখ নক্ষত্রের উজ্জ্বলতা পরিমাপ করবে কেপলার। এর মাধ্যমে কোনো নক্ষত্রের সামনে দিয়ে যেকোনো গ্রহের গতি শনাক্ত করতে পারবে এটি। চার বছরের নির্ধারিত মিশনে কেপলার পৃথিবী থেকে ১৯৫০ আলোকবর্ষের চেয়েও দূরের নক্ষত্রগুলো বিশ্লেষণ ও পর্যবেক্ষণ করবে। [এ অধ্যায়ের শেষে এ-সম্পর্কিত টীকা দেখুন।—অনুবাদক]

কক্ষপথে উৎক্ষেপণের প্রথম বছরেই স্যাটেলাইটটি মোটামুটি নিম্নোক্ত আবিষ্কারগুলো করতে পারবে বলে আশাবাদী বিজ্ঞানীরা :

পৃথিবীর আকারের ৫০টি গ্রহ, পৃথিবীর চেয়ে প্রায় ৩০ শতাংশ বড় ১৮৫টি গ্রহ ও পৃথিবীর চেয়ে প্রায় ২২ গুণ বড় ৬৪০টি গ্রহ।

এদিকে টেরিস্ট্রিয়াল প্ল্যানেট ফাইন্ডারে হয়তো পৃথিবীর মতো আকারের গ্রহ খুঁজে পাওয়ার আরও বেশি সম্ভাবনা রয়েছে। কয়েক বছর বিলম্বের পর, স্যাটেলাইটটি ২০১৪ সালে উৎক্ষেপণের তারিখ ঠিক করা হয়েছে। ৪৫ আলোকবর্ষ দূরের অন্তত ১০০টি নক্ষত্র নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করার কথা এর। দূরের গ্রহগুলো অনুসন্ধানের জন্য এতে দুটি যন্ত্র বসানো হয়েছে। এর মধ্যে প্রথমটি হলো করোনাগ্রাফ। বিশেষ ধরনের টেলিস্কোপ এই করোনাগ্রাফ, যা দিয়ে মাতৃ-নক্ষত্র থেকে আসা সূর্যালোক ঢেকে দিয়ে তার আলো কয়েক বিলিয়ন ভাগ কমিয়ে আনা যাবে। টেলিস্কোপটি হাবল টেলিস্কোপের চেয়ে চার গুণ বড় আর ১০ গুণ বেশি নিখুঁত। এই অনুসন্ধানী যানটির মধ্যে দ্বিতীয় যন্ত্রটির নাম ইন্টারফেরোমিটার। এই যন্ত্র দিয়ে আলো তরঙ্গের ব্যতিচার ব্যবহার করে মাতৃ-নক্ষত্র থেকে আসা আলো প্রায় ১ মিলিয়ন ভাগ রোধ করা যাবে।

অন্যদিকে ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি বা ইসা তাদের নিজেদের গ্রহ অনুসন্ধানী স্যাটেলাইট ডারউইন উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা করছে। ২০১৫ বা তার পরে এটি কক্ষপথে উৎক্ষেপণের কথা রয়েছে। এতে তিনটি স্পেস টেলিস্কোপ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে ইসার, যার প্রতিটির ব্যাস হবে প্রায় ৩ মিটার। এগুলো একসঙ্গে একটি বড় ইন্টারফেরোমিটার হিসেবে কাজ করবে। এই মিশনেও মহাকাশে পৃথিবী আকৃতির গ্রহ শনাক্ত করা হবে।

মহাকাশে কয়েক শ পৃথিবী আকৃতির গ্রহ শনাক্তের মাধ্যমে সেটি (SETI) উদ্যোগে মনোযোগ দিতে সহায়তা করতে পারে। কাছের নক্ষত্রগুলোতে এলোপাতাড়ি স্ক্যান করার বদলে জ্যোতির্বিদেরা তাদের উদ্যম ছোট্ট এক নক্ষত্রগুচ্ছের মধ্যে কেন্দ্রীভূত করতে পারবেন। কে জানে, হয়তো সেগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে আছে পৃথিবীর কোনো যমজ গ্ৰহ।

তারা দেখতে কেমন হবে?

এলিয়েন দেখতে কেমন হবে, তা অনুমান করতে পদার্থবিদ্যা, রসায়ন ও জীববিজ্ঞান ব্যবহারের চেষ্টা করেন অনেক বিজ্ঞানী। যেমন আইজ্যাক নিউটন তাঁর চারপাশের জীবজন্তুর দ্বিপার্শ্বীয় প্রতিসম অবস্থা (বা দুটি চোখ, দুটি হাত ও দুটি পা) খেয়াল করে খুব অবাক হয়েছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই প্ৰশ্ন জাগে, এটা কি কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা, নাকি স্বয়ং ঈশ্বরের কাজ?

বর্তমানে জীববিজ্ঞানীদের বিশ্বাস, প্রায় অর্ধবিলিয়ন বছর আগে ক্যামব্রিয়ান বিস্ফোরণের সময় প্রকৃতি ক্ষুদ্র গঠন আর ধরন নিয়ে নানা রকম পরীক্ষার মধ্য দিয়ে গেছে। এখান থেকে বহুকোষী জীবজন্তুর আবির্ভাব হয় বলে ধারণা করা হয়। এদের অনেকের স্পাইনাল কর্ড বা সুষুম্না কাণ্ডের আকৃতি ছিল ইংরেজি এক্স, ওয়াই কিংবা জেডের মতো। অন্য অনেকের প্রতিসাম্যতা হয়েছিল স্টারফিশের মতো অরীয়। দুর্ঘটনাক্রমে এদের মধ্যে একটির সুষুম্না কাণ্ডের আকৃতি হয়েছিল ইংরেজি আইয়ের মতো। আর তার প্রতিসাম্যতা ছিল দ্বিপার্শ্বীয়। এরাই পৃথিবীর অধিকাংশ স্তন্যপায়ী প্রাণীর পূর্বপুরুষ। কাজেই তাত্ত্বিকভাবে কোনো বুদ্ধিমান জীবের জন্য অপরিহার্যভাবে হিউম্যানয়েড বা মানুষের মতো আকৃতির দ্বিপার্শ্বীয় প্রতিসম প্রয়োগ করা যায় না। অথচ মহাকাশের আগন্তুক বা এলিয়েন চিত্রায়িত করতে এ ধরনের আকৃতি ব্যবহার করে হলিউড।

কিছু জীববিজ্ঞানী বিশ্বাস করেন, ক্যামব্রিয়ান বিস্ফোরণের সময় বিচিত্র ধরনের জীব আবির্ভাবের কারণ হলো শিকার ও শিকারির মধ্যে অস্ত্র প্রতিযোগিতা। অন্য জীবকে গ্রাস করতে পারা প্রথম বহুকোষী জীবের আবির্ভাবে এই দুইয়ের মধ্যে বিবর্তনের গতি বাড়িয়ে দেয়। কারণ, এদের প্রত্যেকে অন্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার জন্য প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছিল। ঠান্ডা যুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অস্ত্র প্রতিযোগিতার মতো এখানেও প্রত্যেক পক্ষই অন্যকে ঠেলে এগিয়ে গিয়েছিল।

এই গ্রহে প্রাণ কীভাবে আবির্ভূত হয়েছে, সেটি পরীক্ষা করে অনুমান করা যায়, পৃথিবীতে বুদ্ধিমান জীবের উদয় হয়েছে কীভাবে। বিজ্ঞানীরা সিদ্ধান্তে এসেছেন, বুদ্ধিমান জীবের জন্য সম্ভবত নিচের শর্তগুলো পূরণ হওয়া দরকার :

১. তার চারপাশের পরিবেশ সম্পর্কে জানার জন্য কোনো ধরনের দৃষ্টিশক্তি বা সংবেদশীল প্ৰক্ৰিয়া।

২. কোনো কিছু চাপ দেওয়ার জন্য বুড়ো আঙুলের মতো কিছু একটা। এটি কোনো কর্ষিকা বা নখও হতে পারে।

৩. কোনো ধরনের যোগাযোগব্যবস্থা। যেমন ভাষা।

আমাদের পরিবেশ সম্পর্কে অনুভব করতে আর একে কাজে লাগাতে (দুটোই আসলে বুদ্ধিমত্তার নির্দেশক) ওপরের তিনটি বৈশিষ্ট্য থাকা প্রয়োজন। তবে এই তিনটি বৈশিষ্ট্য ছাড়িয়েও যেকোনো কিছু আরও সামনে এগিয়ে যেতে পারে। টিভিতে এলিয়েনদের যেভাবে দেখানো হয়, আসলে বহিঃসৌরজাগতিক আগন্তুকেরা দেখতে মোটেও মানুষের মতো নয়। আমরা টিভি ও চলচ্চিত্রে শিশুর মতো, পতঙ্গের মতো চোখওয়ালা যেসব এলিয়েন দেখি, সেগুলো আসলে ১৯৫০-এর দশকের বি-গ্রেড চলচ্চিত্র থেকে আসা বলে মনে হয়। এগুলো আমাদের অবচেতনের মধ্যে দৃঢ়ভাবে ঢুকে গেছে।

(তবে অদ্ভুত এক তথ্য ব্যাখ্যা করতে বুদ্ধিমান জীবের জন্য অনেক নৃতত্ত্ববিদ চতুর্থ আরেকটি মানদণ্ড যোগ করেন। তথ্যটি হলো মানবজাতি বনে-জঙ্গলে টিকে থাকতে হলে যেমন বুদ্ধিমান হওয়ার কথা ছিল, তারা আসলে তার চেয়েও অনেক বেশি বুদ্ধিমান। আমাদের মস্তিষ্ক মহাকাশ ভ্রমণ, কোয়ান্টাম তত্ত্ব আর উচ্চতর গণিত রপ্ত করতে পারে। অথচ জঙ্গলে শিকার করা ও চরে খাওয়ার জন্য এসব দক্ষতা একদম অপ্রয়োজনীয়। তাহলে আমাদের মস্তিষ্কের এত ক্ষমতা কেন? প্রকৃতিতে আমরা যখন চিতা ও অ্যান্টিলোপের মতো প্রাণীদের জোড়া দেখতে পাই, যারা টিকে থাকার জন্য এসবের বাইরে অসাধারণ দক্ষতার অধিকারী, তখন আমরা দেখতে পাই, তাদের মধ্যে একধরনের অস্ত্র প্রতিযোগিতা রয়েছে। একইভাবে অনেক বিজ্ঞানীর বিশ্বাস, এখানেও চতুর্থ আরেকটি মানদণ্ড রয়েছে, সেটি হলো জৈবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা, যা মানুষকে বুদ্ধিমত্তার দিকে এগিয়ে দিয়েছে। হয়তো এই অস্ত্র প্রতিযোগিতাটি ছিল আমাদের নিজেদের প্রজাতির অন্য সদস্যদের সঙ্গে। )

পৃথিবীর অসাধারণ বৈচিত্র্যময় জীবগুলোর কথা একবার ভাবুন। উদাহরণস্বরূপ, এদের কোনোটি যদি কয়েক লাখ বছরের জন্য নির্বাচিতভাবে অক্টোপড বা আট পা-ওয়ালা বাচ্চা জন্ম দিতে পারত, তাহলে ধারণা করা যায়, তারা বুদ্ধিমান জীবও হয়ে উঠতে পারবে। (৬০ লাখ বছর আগে আমরা এপস থেকে আলাদা হয়ে গেছি। কারণ, সম্ভবত আমরা আফ্রিকার ক্রমেই বদলে যেতে থাকা আবহাওয়ার সঙ্গে নিজেদের ভালোভাবে খাপ খাইয়ে নিতে পারিনি। অন্যদিকে অক্টোপাসরা পাথরের নিচে তাদের জীবনযাপনকে বেশ ভালোভাবে খাপ খাইয়ে নিতে পেরেছে। সে জন্য তারা কয়েক লাখ বছর বিবর্তিত হয়নি।) বায়োকেমিস্ট ক্লিফোর্ড পিকওভার বলেন, ‘আমি যখন অদ্ভুত দেখতে ক্রাস্টেশিয়ান বা খোলসযুক্ত প্রাণী, শোষক-কর্ষিকাযুক্ত জেলিফিশ, অদ্ভুতুড়ে উভলিঙ্গ কেঁচো আর স্লাইম মোন্ডের দিকে তাকাই, তখন আমি জানি ঈশ্বরেরও কৌতুকবোধ আছে। সেটি মহাবিশ্বের অন্য রূপগুলোতে আমরা প্রতিফলিত হতে দেখতে পাব।’

হলিউড বুদ্ধিমান এলিয়েন জীবকে যখন মাংসাশী হিসেবে চিত্রায়িত করে, সম্ভবত তখন তারা তা সঠিকভাবে বুঝতে পারে। শুধু মাংসখেকো এলিয়েন বক্স অফিসে বড় সফলতার গ্যারান্টি দেয় না, সেই সঙ্গে সেখানে সেটি চিত্রায়ণের সত্যতার উপাদানও থাকতে হয়। সাধারণত শিকারিরা তাদের শিকারের চেয়ে চৌকস হয়। শিকার ধরতে শিকারিরা চতুরভাবে পরিকল্পনা করে, গুটি গুটি পায়ে চলে, লুকিয়ে থাকে ও শিকারকে হঠাৎ আক্রমণও করে বসে। শেয়াল, কুকুর, বাঘ ও সিংহের চোখ তাদের মুখের সামনে থাকে। এর মাধ্যমে তারা শিকারকে ছোঁ মেরে ধরার জন্য মাঝখানের পৌঁছানোর দূরত্ব কতটুকু, তা বুঝতে পারে। দুটি চোখ দিয়ে তারা ত্রিমাত্রিক স্টিরিও-ভিশন ব্যবহার করে শিকারকে লক করতে পারে। অন্যদিকে হরিণ ও খরগোশের মতো শিকারেরা জানে কীভাবে দৌড়াতে হবে। তাদের চোখগুলো থাকে মুখের দুপাশে। এর মাধ্যমে চারপাশে শিকারিকে ৩৬০ ডিগ্রি কোণে স্ক্যান করতে পারে তারা।

অন্য কথায়, মহাকাশে বুদ্ধিমান জীব হয়তো শিকারির মুখের সামনে চোখ বা অন্য কোনো সংবেদি অঙ্গ থেকে আরও ভালোভাবে বিবর্তিত হয়ে থাকতে পারে। তারা হয়তো কোনো মাংসাশী, আগ্রাসী ও আঞ্চলিক আচরণের অধিকারী, যেগুলো আমরা নেকড়ে, সিংহ ও পৃথিবীর মানুষের মধ্যে দেখতে পাই। (তবে এ ধরনের জীব যেহেতু পুরোপুরি অন্য ধরনের ডিএনএ ও প্রোটিন অণুনির্ভর, তাই আমাদের খাওয়ার ব্যাপারে কিংবা যৌন সম্পর্ক স্থাপনে তাদের কোনো আগ্রহ না-ও থাকতে পারে।)

পদার্থবিদ্যা ব্যবহার করে তাদের দেহের আকার কেমন হতে পারে, তা অনুমান করা যায়। ধরে নিই, তারা পৃথিবীর মতো আকারের গ্রহে বাস করে। তাদের গ্রহেও মোটামুটি একই ঘনত্বের পানি আছে। তাহলে স্কেল ল অনুযায়ী, বিশাল আকারের জীব সেখানে আবির্ভাব হওয়া সম্ভব নয়। এই সূত্র অনুযায়ী, কোনো বস্তুর মাপনি বাড়ালে পদার্থবিদ্যার সূত্রগুলো ব্যাপকভাবে বদলে যাবে।

দানব আর স্কেল ল

কিং কংয়ের কোনো অস্তিত্ব যদি সত্যিই থাকত, তাহলে জন্তুটি নিউইয়র্ক শহরে সন্ত্রাস চালিয়ে যেতে পারত না। কারণ, মাত্র এক কদম হাঁটার সঙ্গে সঙ্গে তার পা ভেঙে যেত। কারণ, কোনো বানরের আকার স্বাভাবিকের চেয়ে ১০ গুণ বাড়ানো হলে তার ওজন বাড়বে তার আয়তনের ওপর নির্ভর করে। অর্থাৎ তার ওজন বাড়বে ১০x১০x১০=১০০০ গুণ। তাই এতে সে ১০০০ গুণ বেশি ভারী হবে। কিন্তু তার শক্তি বাড়বে তার হাড় ও পেশির পুরুত্বের সাপেক্ষে। তার হাত ও পেশির আড়াআড়ি এলাকা শুধু ওই দূরত্বের বর্গ হিসেবে বাড়বে, বা ১০x১০=১০০ গুণ। অন্য কথায়, কিং কং ১০ গুণ বড় হলে তার শক্তি ১০০ গুণ বাড়বে, কিন্তু ওজন বাড়বে ১০০০ গুণ। কাজেই বানরজাতীয় প্রাণীদের আকার বাড়াতে থাকলে শক্তির চেয়ে তার ওজন অনেক গুণ বেশি বেড়ে যাবে। এর মানে হলো, স্বাভাবিক এপের তুলনায় ১০ ভাগ দুর্বল হয়ে যাবে ওই প্রাণীটি। সে কারণেই তার পা মট করে ভেঙে যাবে।

আমার বেশ মনে আছে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আমাদের শিক্ষক পিঁপড়ার শক্তিমত্তা নিয়ে অবাক হতেন। একটা পিঁপড়া তার ওজনের চেয়ে অনেক গুণ বেশি ওজন বহন করতে পারে। আমার শিক্ষক এর মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিলেন, একটা পিঁপড়া যদি একটা বাড়ির সমান বড় হয়, তাহলে সে ওই বাড়িটাও ওপরে তুলতে পারবে। কিন্তু কিং কং নিয়ে এইমাত্র আমরা বুঝতে পারলাম, সেই একই কারণে তার এই অনুমান সঠিক নয়। কোনো পিঁপড়া একটি বাড়ির সমান আকারের হলে তার পা ভেঙে যাবে। কারণ, কোনো পিঁপড়া ১০০০ গুণ বড় করলে সাধারণ পিঁপড়ার তুলনায় ১০০০ গুণ দুর্বল হয়ে যাবে। সে কারণে তার নিজের ওজনের ভারে সে ভেঙে যাবে। (আবার পিঁপড়াটি শ্বাসরোধ হয়েও মারা যেতে পারে। পিঁপড়া তার দেহের বিভিন্ন পাশের ছিদ্রের মাধ্যমে শ্বাসপ্রশ্বাস নেয়। এই ছিদ্রগুলোর ক্ষেত্রফল তাদের ব্যাসার্ধের বর্গের আকারের হারে বাড়ে। কিন্তু পিঁপড়াটির আয়তন বাড়ে ওই ব্যাসার্ধের ঘনক আকারে। কাজেই এতে একটি পিঁপড়ার দেহের কোষগুচ্ছ ও পেশিতে অক্সিজেনের প্রয়োজনীয় জোগানের জন্য সাধারণ কোনো পিঁপড়ার চেয়ে ১০০০ গুণ কম বাতাস পাবে। একই কারণে চ্যাম্পিয়ন ফিগারের স্কেটার ও জিমন্যাস্টদের গড়পড়তার চেয়ে অনেক ছোট হন, যদিও অন্যদের মতো তাদের অনুপাতও একই রকম। ভারোত্তোলনের ক্ষেত্রেও লম্বা মানুষদের তুলনায় তাদের পেশির শক্তি আনুপাতিকভাবে অনেক বেশি।)

স্কেল ল ব্যবহার করে আমরা পৃথিবীর জীবজন্তুর ও মহাকাশের সম্ভাব্য এলিয়েনদের মোটামুটি আকার গণনা করতে পারি। কোনো জন্তুর পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার থেকে নিঃসৃত তাপও বাড়ে। কাজেই জন্তুটির আকৃতি ১০ গুণ বাড়লে তার তাপ হারানোর পরিমাণ বেড়ে দাঁড়াবে ১০x১০=১০০। কিন্তু তার দেহে থাকা তাপের পরিমাণ হবে তার আয়তনের সমানুপাতিক বা ১০x১০x১০=১০০০। কাজেই ছোট জীবের তুলনায় বড় জীব অনেক ধীরে তাপ হারাবে। (এ কারণে শীতকালে আমাদের আঙুল ও কানগুলো অন্য অঙ্গগুলোর আগে জমে যায়। কারণ, এগুলোর আপেক্ষিক পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল সবচেয়ে বেশি। একই কারণে ছোট মানুষ, বড় মানুষের তুলনায় দ্রুত ঠান্ডায় আক্রান্ত হয়। খবরের কাগজ অতি দ্রুত পুড়ে যাওয়ার এটাই ব্যাখ্যা। তাদের তুলনামূলক পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল কম হওয়ার জন্য এটি ঘটে।) আবার এটি ব্যাখ্যা করে, মেরু অঞ্চলের তিমিদের আকৃতি কেন গোলাকার। কারণ, গোলাকৃতি কোনো কিছুর প্রতি একক ভরের সাপেক্ষে সম্ভাব্য পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল সবচেয়ে কম। একই কারণে উষ্ণ পরিবেশে পোকামাকড়দের আকৃতি পাতলা হতে দেখা যায়। তাদের প্রতি একক ভরের বিপরীতে পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল তুলনামূলকভাবে বেশি।

ডিজনির নির্মিত মুভি হানি, আই শাঙ্ক দ্য কিডসতে একটি পরিবারের সদস্যরা কুঁচকে পিঁপড়ার আকৃতিতে পরিণত হয়। ঝড়বৃষ্টির সময় ও অতি ক্ষুদ্র জগতে আমরা বৃষ্টির ফোঁটা খানাখন্দে পড়তে দেখি। পিঁপড়াদের জগতে বৃষ্টির ফোঁটা বাস্তবে অতি ক্ষুদ্র বিন্দু নয়, বরং পানির বিশাল স্তূপের মতো। আমাদের জগতে পানির স্তূপ অস্থিতিশীল ও মহাকর্ষের কারণে তার নিজের ওজনের ভারে চুপসে যায়। কিন্তু অতি ক্ষুদ্র জগতে পৃষ্ঠটান তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। সে জন্য পানির স্তূপ সেখানে নিখুঁতভাবে স্থিতিশীল থাকে।

একইভাবে বাইরের মহাকাশে দূরের গ্রহগুলোতে পদার্থবিদ্যার সূত্র কাজে লাগিয়ে জীবজন্তুর মোটামুটি পৃষ্ঠতল ও আয়তনের অনুপাত হিসাব করা যায়। এসব সূত্র ব্যবহার করে তাত্ত্বিকভাবে বলা যায়, বিজ্ঞান কল্পকাহিনিতে মহাকাশের এলিয়েনদের দানব হিসেবে চিত্রায়িত করা হলেও তাদের আকৃতি আসলে অনেকটা আমাদের মতোই। (সাগরের পানিতে প্লবতার কারণে তিমি আকৃতিতে অনেক বড় হতে পারে। এটি ব্যাখ্যা করে সাগরতীরে তিমি মারা যায় কেন। কারণ, তিমি তার নিজের ওজনের ভারে থেঁতলে যায়।)

স্কেল ল-এর অর্থ হলো, যতই অতি ক্ষুদ্র জগতের গভীর থেকে আরও গভীরে ঢুকব, পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলো তত বদলে যাবে। কোয়ান্টাম তত্ত্ব এতটা অদ্ভুতুড়ে কেন এবং মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান কেন এটি লঙ্ঘন করে, সেসবের ব্যাখ্যা পাওয়া যায় এতে। তাই স্কেল ল বিজ্ঞান কল্পকাহিনিতে দেখানো বিশ্বের ভেতরে বিশ্বের সেই সুপরিচিত ধারণা বাতিল করে। অর্থাৎ পরমাণুর ভেতরে গোটা মহাবিশ্ব থাকতে পারে, এই ধারণা কিংবা অন্য বিশাল মহাবিশ্বের ভেতরে আমাদের মহাবিশ্বটি একটি পরমাণুর মতো—এই ধারণা বাতিল করে দেয় স্কেল ল। মেন ইন ব্ল্যাক মুভিতে এই ধারণার বিশ্লেষণ করা হয়েছে। মুভিটির শেষ দৃশ্যে ক্যামেরাটি পৃথিবী, অন্য সব গ্রহ, নক্ষত্র আর গ্যালাক্সিগুলো ছেড়ে দূরে সরে যেতে থাকে। এভাবে আমাদের পুরো মহাবিশ্ব ছাড়িয়ে চলে গিয়ে মহাবিশ্বটি শুধু একটি বলের আকৃতিতে পরিণত হয়। সেটি বিপুল আকারের এলিয়েনদের বিশাল বহির্জাগতিক একটি খেলার অংশ।

প্রকৃতপক্ষে নক্ষত্রদের বা কোনো গ্যালাক্সির সঙ্গে পরমাণুর মিল নেই। পরমাণুর ভেতরে বিভিন্ন স্তরে থাকা ইলেকট্রনগুলো গ্রহদের চেয়ে পুরোপুরি আলাদা। আমরা জানি, সবগুলো গ্রহ পরস্পরের থেকে একেবারে আলাদা আর তার মাতৃ-নক্ষত্রের চারপাশে যেকোনো দূরত্বে থেকে ঘুরতে পারে। অন্যদিকে পরমাণুতে অতিপারমাণবিক কণাগুলোর সবাই পরস্পরের মতো। তারা পরমাণুর নিউক্লিয়াস থেকে যেকোনো দূরত্বে অবস্থান করতে পারে না। (আবার গ্রহের বিপরীতে ইলেকট্রনগুলো অদ্ভুত সব আচরণ দেখায়, যা আমাদের সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান অমান্য করে। যেমন তারা একই সময়ে দুটি ভিন্ন জায়গায় থাকতে পারে ও তরঙ্গের মতো আচরণ করতে পারে।)

উন্নত সভ্যতার পদার্থবিজ্ঞান

মহাকাশে সম্ভাব্য সভ্যতাগুলোর রূপরেখা কেমন হতে পারে, পদার্থবিজ্ঞান ব্যবহার করে তা কল্পনা করা সম্ভব। যদি গত এক লাখ বছরে আফ্রিকা থেকে আধুনিক মানুষের আবির্ভাবের পর থেকে আমাদের সভ্যতার গড়ে ওঠার দিকে খেয়াল করি, তাহলে একে শক্তির ব্যবহার বা খরচের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এক কাহিনি হিসেবেও দেখা সম্ভব। রুশ জ্যোতিঃপদার্থবিদ নিকোলাই কার্দাশেভ অনুমান করেছেন, মহাবিশ্বে বহির্জাগতিক সভ্যতা গড়ে ওঠার বিভিন্ন পর্বও শক্তির খরচের ওপর ভিত্তি করে ভাগ করা যায়। পদার্থবিদ্যার সূত্র ব্যবহার করে তিনি সম্ভাব্য সভ্যতাকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন :

১. টাইপ-১ সভ্যতা : নিজেদের গ্রহের সব শক্তি সংগ্রহ করতে পারে এ সভ্যতা। আবার তাদের গ্রহে আসা সব সূর্যালোকও ব্যবহার করতে পারে। তারা হয়তো আগ্নেয়গিরির শক্তির ব্যবহারের পদ্ধতিও জেনে থাকতে পারে। এমনকি নিজেদের গ্রহের আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ, ভূমিকম্প নিয়ন্ত্রণ আর মহাসাগরে শহর নির্মাণ করতে পারে। মোট কথা, গ্রহের সব শক্তি তাদের হাতের মুঠোয়।

২. টাইপ-২ সভ্যতা: যারা তাদের সূর্যের পুরো শক্তি ব্যবহার করতে জানে। এর মাধ্যমে এরা টাইপ-১ সভ্যতার চেয়েও ১০ বিলিয়ন গুণ বেশি ক্ষমতাধর। স্টার ট্রেক সিনেমায় দেখানো দ্য ফেডারেশন অব প্ল্যানেট টাইপ-২ ধরনের সভ্যতা। এক হিসাবে টাইপ-২ সভ্যতা অমর। কারণ, বিজ্ঞানের জানা কোনো কিছুই (যেমন বরফযুগ, উল্কার আঘাত কিংবা কোনো সুপারনোভা) তাদের ধ্বংস করতে পারবে না। (তাদের মাতৃ-নক্ষত্র কোনো কারণে বিস্ফোরণের মুখে পড়লে তারা অন্য কোনো নক্ষত্র ব্যবস্থায় স্থানান্তরিত হতে পারে, কিংবা তাদের নিজেদের গ্রহটাও হয়তো সরিয়ে নিয়ে যেতে পারে।)

৩. টাইপ-৩ সভ্যতা : পুরো ছায়াপথের সব শক্তি ব্যবহার করার ক্ষমতা রাখে এই সভ্যতা। টাইপ-২ সভ্যতার চেয়ে এরা ১০ বিলিয়ন গুণ বেশি ক্ষমতাধর। স্টার ট্রেক সিনেমায় ব্রগরা, স্টার ওয়ার্সে এম্পায়ার এবং আসিমভের ফাউন্ডেশন সিরিজে গ্যালাকটিক সিভিলাইজেশন টাইপ-৩ সভ্যতা। তারা কোটি কোটি নক্ষত্র সিস্টেমে বসতি স্থাপন করতে পারে।

আবার নিজেদের ছায়াপথের কেন্দ্রে থাকা কৃষ্ণগহ্বরের শক্তি ব্যবহার করতে পারে এ সভ্যতা। তারা অবাধে তাদের গ্যালাক্সির এখানে-ওখানে যাতায়াত করতে পারে।

কার্দাশেভ হিসাব করে দেখেছেন, শক্তি খরচের ক্ষেত্রে প্রতিবছর কয়েক শতাংশ পরিমিত হারে বেড়ে ওঠা যেকোনো সভ্যতা টাইপ-১ থেকে দ্রুতগতিতে পরের ধাপে এগিয়ে যাবে। এটা কয়েক হাজার বছর থেকে ১০ হাজার বছরের মধ্যে ঘটতে পারে।

আমার লেখা আগের বইয়ে বলেছি, আমাদের নিজেদের সভ্যতা টাইপ ০ (শূন্য) পর্যায়ের (যেমন যন্ত্র চালানোর জন্য আমরা এখনো মৃত উদ্ভিদ, তেল ও কয়লা ব্যবহার করি)। সূর্যের মোট শক্তির মাত্র ক্ষুদ্র এক ভগ্নাংশ আমরা ব্যবহার করার ক্ষমতা রাখি। কিন্তু আমরা এরই মধ্যে পৃথিবীতে টাইপ-১ ধরনের সভ্যতার সূচনা পর্ব দেখতে পাচ্ছি। আমাদের ইন্টারনেট হলো টাইপ-১ টেলিফোন সিস্টেমের সূচনাপর্ব, যা পুরো পৃথিবীকে সংযুক্ত করেছে। টাইপ-১ অর্থনীতির সূচনা দেখা যেতে পারে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে, যার ফলে নাফটার (NAFTA) সঙ্গে প্রতিযোগিতা শুরু হবে। ইংরেজি ভাষা এরই মধ্যে পৃথিবীতে মাতৃভাষার পর অন্যতম দ্বিতীয় ভাষায় পরিণত হয়েছে। পাশাপাশি বিজ্ঞান, আর্থিক লেনদেন ও বাণিজ্যের ভাষা হয়ে দাঁড়িয়েছে ইংরেজি ভাষা। আমার ধারণা, এটি টাইপ-১ ভাষায় পরিণত হয়ে উঠতে পারে,

যা দিয়ে ভবিষ্যতে ভার্চুয়ালি সবাই কথা বলবে। পৃথিবীর হাজারো বৈচিত্র্যের মধ্যে স্থানীয় সংস্কৃতি ও প্রথা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে, কিন্তু বিচিত্র সব মানুষের ওপর অতিমাত্রায় আরোপ করতে দেখা যাবে প্ল্যানেটারি কালচার। এটা তরুণ সংস্কৃতি ও বাণিজ্যিকতা দিয়েও প্রভাবিত হয়ে উঠতে পারে।

একধরনের সভ্যতা থেকে আরেক সভ্যতার মধ্যবর্তী সন্ধিকালের নিশ্চয়তা এখনো অনেক দূরে। তবে টাইপ-০ থেকে টাইপ-১ সভ্যতার

ভেতরের সন্ধিকাল হয়তো খুবই মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে। টাইপ শূন্য সভ্যতা এখনো সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ আর বর্ণবাদের মতো ধ্বংসলীলা চলছে, যা তার উত্থানকে চিহ্নিত করতে পারে। আবার এসব গোত্রীয় ও ধর্মীয় উন্মাদনা এই সন্ধিকালকে গ্রাস করবে কি না, তা-ও এখনো নিশ্চিত নয়। (হয়তো আমাদের ছায়াপথে এখনো কোনো টাইপ-১ সভ্যতা দেখতে না পাওয়ার কারণ হতে পারে, কেউই এই সন্ধিকাল পার হতে পারেনি। মানে তারা নিজেরাই নিজেদের ধ্বংস করে ফেলেছে। কোনো দিন আমাদের সৌরজগতে ঘুরতে বেরিয়ে আমরা হয়তো বিভিন্ন সভ্যতার ধ্বংসস্তূপ আবিষ্কার করে বসব। তারা হয়তো নিজেরাই নিজেদের ধ্বংস করে ফেলেছে। তাদের বায়ুমণ্ডল হয়তো তেজস্ক্রিয় বা খুবই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে, যা প্ৰাণ বেঁচে থাকার জন্য একেবারে অনুপযোগী। )

যে সভ্যতা টাইপ-৩ পর্যায়ে পৌঁছাবে, পুরো ছায়াপথে অবাধে চলাচলের মতো শক্তি আছে তাদের। তারা জানে কীভাবে পুরো ছায়াপথে অবাধে চলতে হয়। ইচ্ছা করলে তারা হয়তো পৃথিবীতেও পৌঁছাতে পারবে। ২০০১ সালে নির্মিত একটি সিনেমার মতো, এমন সভ্যতা হয় স্বপ্রতিলিপি তৈরি করতে পারা রোবট পাঠাতে পারে, যারা গ্যালাক্সিজুড়ে বুদ্ধিমান প্রাণের অনুসন্ধান চালাতে পারবে।

তবে টাইপ-৩ সভ্যতা হয়তো ইনডিপেনডেন্ট ডে মুভিতে দেখানো এলিয়েনদের মতো নয়। তারা হয়তো আমাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে বা আমাদের ওপর বিজয় অর্জন করতে চায় না। এ সিনেমায় দেখানো সভ্যতা পঙ্গপালের মতো ছড়িয়ে পড়ে, দঙ্গল বেঁধে গ্রহগুলো ঘিরে ফেলে তাদের সম্পদ শুষে নেয়। বাস্তবে বাইরের মহাকাশে বিপুল পরিমাণ খনিজ সম্পদসংবলিত অসংখ্য মৃত গ্রহ থাকতে পারে। সেখানকার অস্থিরমতি আদিবাসী জনগণের সঙ্গে কোনো বোকার মতো যুদ্ধ না করেই সেখান থেকে এসব সম্পদ সংগ্রহ করা যায়। আমাদের সঙ্গে তাদের আচরণ পিঁপড়ার ঢিবির সঙ্গে আমাদের আচরণের মতোই হতে পারে। আমরা পিঁপড়াদের কাছে নত হতে চাই না এবং তাদের প্রতি যত্নবানও হতে চাই না, শুধু তাদের উপেক্ষা করতে চাই।

মানুষ যে পিঁপড়াদের আক্রমণ করতে বা নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে চায়, এটাই তাদের সবচেয়ে বড় বিপদ নয়। বরং আমরা তাদের ওপর দিয়ে পথ বানিয়ে চলতে চাই, কারণ তারা আমাদের পথের মধ্যেই থাকে। মনে রাখা দরকার, শক্তি খরচ করার ভিত্তিতে টাইপ-২ সভ্যতা আর আমাদের নিজেদের টাইপ-০ সভ্যতার মধ্যে যে দূরত্ব, আমাদের আর পিঁপড়াদের মধ্যেও সেই একই দূরত্ব।

ইউএফও

অনেকেই দাবি করে, বহির্জাগতিক জীব ইউএফওতে চড়ে এরই মধ্যে পৃথিবী ঘুরে দেখে গেছে। কিন্তু ইউএফওর কথা শুনলেই বিজ্ঞানীরা সাধারণত চোখ পাকিয়ে এর সম্ভাবনা নাকচ করে দেন। কারণ, একেকটি নক্ষত্র পরস্পর থেকে বহু দূরে। কিন্তু বিজ্ঞানীদের এমন প্রতিক্রিয়া সত্ত্বেও বছরের পর বছর ইউএফও দেখার দাবি কমেনি এক রত্তিও।

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ইউএফও দেখার দাবি অনেক পুরোনো। লিখিত ইতিহাসের শুরুর দিকে এ রকম দাবি দেখা যায়। বাইবেলে এজকেইল নবী রহস্যজনকভাবে আকাশে চক্রের মধ্যে চক্র আছে বলে উল্লেখ করেছেন। একে অনেকেই ইউএফওর কথা বলা হয়েছে বলে বিশ্বাস করে। খ্রিষ্টপূর্ব ১৪৫০ সালে মিসরে ফেরাউন তৃতীয় থুতমোসের রাজত্বকালে, সূর্যের চেয়েও উজ্জ্বল ৫ মিটার আকারের এক আগুনের বৃত্তের সঙ্গে সম্পর্কিত এক ঘটনার কথা লিখে রেখেছে মিসরীয়রা। এই বৃত্ত বেশ কয়েক দিন দেখা গিয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত তা আকাশে উঠে চলে যায়। খ্রিষ্টপূর্ব ‘৯১ সালে রোমান লেখক জুলিয়াস অবসেকুয়েনস গোলাকার এক বস্তু সম্পর্কে লিখেছেন। সেটি গোলাকার বা বৃত্তাকার ঢালের মতো, যা আকাশে যাচ্ছিল। ১২৩৫ সালে জেনারেল ইউরিটসুম ও তাঁর সেনাবাহিনী অদ্ভুত এক আলোর গোলক দেখে, যেটি জাপানের কিউটোর আকাশে নেচে বেড়াচ্ছিল। ১৫৬১ সালে জার্মানির নুরেমবার্গ থেকে অনেকগুলো বস্তু দেখা যায়, যেন তারা কোনো বিমানযুদ্ধে শামিল হয়েছে।

অতিসম্প্রতি ইউএফও দেখা নিয়ে বড় পরিসরে গবেষণা চালিয়েছে মার্কিন বিমানবাহিনী। ১৯৫২ সালে মার্কিন বিমানবাহিনী প্রজেক্ট ব্লু বুক চালু করে যেখানে ইউএফও দেখার মোট ১২ হাজার ৬১৮টি ঘটনা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে এই উপসংহার টানা হয়েছে যে ইউএফও দেখার অধিকাংশ ঘটনা প্রাকৃতিক কোনো ঘটনা, প্রচলিত বিমান কিংবা ধাপ্পাবাজি হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়। তবে এর মধ্যে প্রায় ৬ শতাংশকে অজানা কোনো কারণে সংঘটিত হিসেবে গোপন রাখা হয়েছে। তবে কনডন রিপোর্টের উপসংহারে বলা হয়, এ ধরনের গবেষণার কোনো মূল্য নেই। ফলে ১৯৬৯ সালে প্রজেক্ট ব্লু বুক বন্ধ করে দেওয়া হয়। ইউএফও নিয়ে এটাই ছিল মার্কিন বিমানবাহিনীর পরিচালিত বড় পরিসরের সর্বশেষ গবেষণা।

২০০৭ সালে ইউএফও-সংক্রান্ত বিপুল নথিপত্র জনগণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয় ফরাসি সরকার। ওই প্রতিবেদন ফ্রান্সের ন্যাশনাল সেন্টার ফর স্পেস স্টাডিজ ইন্টারনেটে সহজলভ্য করে দেয়। এর মধ্যে রয়েছে ৫০ বছর ধরে ১৬০০ ইউএফও দেখার ঘটনা। ইউএফএ প্রত্যক্ষদর্শীদের দেওয়া ১ লাখ পৃষ্ঠার বিবরণ, ফিল্ম ও অডিওটেপও রয়েছে এতে। ফরাসি সরকারের মতে, এসব দাবির ৯ শতাংশকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায়, ৩৩ শতাংশের সম্ভবত অন্য কোনো ব্যাখ্যা আছে, কিন্তু বাকিগুলোর কোনো ব্যাখ্যা নেই।

এসব দাবি নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে দেখা নিঃসন্দেহে কঠিন কাজ। আসলে ইউএফও-সংক্রান্ত বেশির ভাগ রিপোর্ট সতর্কভাবে বিশ্লেষণ করলে তা নিচের ফলাফল হিসেবে বাতিল করে দেওয়া যায় :

১. শুক্র গ্রহ, যা চাঁদের পর রাতের আকাশে সবচেয়ে উজ্জ্বল বস্তু। পৃথিবী থেকে বিপুল দূরত্ব হওয়ার কারণে এ গ্রহটি আপনার চলন্ত গাড়ির সঙ্গে আপনাকে অনুসরণ করছে বলে মনে হয়। চাঁদ যেভাবে আপনাকে অনুসরণ করে বলে মনে হয়, এ গ্রহ নিয়েও একই ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হয়। কোনো চলন্ত বস্তুর চারপাশের বস্তুর সঙ্গে তুলনা করে আমরা দূরত্ব বিচার করি। চাঁদ ও শুক্র গ্রহ আমাদের কাছ থেকে অনেক দূরে। আবার তাদের তুলনা করার মতো তাদের আশপাশে কিছু নেই। সে কারণে তাদের চারপাশের কোনো বস্তু সাপেক্ষে তারা চলে না। এর ফলে আমাদের এই বিভ্রম তৈরি হয় যেন তারা বুঝি আমাদের অনুসরণ করছে।

২. জলাভূমির গ্যাস। কোনো জলাভূমি এলাকায় তাপমাত্রার ঊর্ধ্বগতি সেখানকার গ্যাস মাটি থেকে ওপরে ভাসতে থাকে এবং তা সামান্য জ্বলজ্বল করতে পারে। আবার সেখানে একটি বড় ধরনের গ্যাসের প্যাকেট থেকে ছোট গ্যাসের প্যাকেট আলাদা হয়ে থাকতে পারে। তাতে মনে হতে পারে, কোনো মাদার শিপ থেকে ছোট ছোট স্কাউট শিপ বেরিয়ে আসছে।

৩. উল্কাপাত। উজ্জ্বল কোনো আলোর আঁকাবাঁকা রেখা রাতের আকাশে চোখের পলকে চলে যেতে পারে। এতে কোনো নভোযান উড়ে গেছে বলে বিভ্রান্তি তৈরির আশঙ্কা থাকে। এই আলোগুলো ভেঙেও যেতে পারে, তাতে আবারও বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে যেন মাদার শিপ থেকে কোনো স্কাউট শিপ বেরিয়ে গেল।

৪. বায়ুমণ্ডলীয় বিশৃঙ্খলা। বজ্রপাত ও অস্বাভাবিক বায়ুমণ্ডলীয় কোনো ঘটনা অদ্ভুত কোনো বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। ইউএফও দেখার বিভ্রান্তিও তৈরি করতে পারে এতে।

অন্যদিকে বিশ শতক আর একবিংশ শতকে নিচের ঘটনাগুলোও ইউএফও দেখার বিভ্রান্তি তৈরির পেছনের কারণ হতে পারে :

১. রাডারের প্রতিধ্বনি। রাডারের তরঙ্গ পাহাড়-পর্বতে বাধা পেয়ে প্রতিধ্বনিত হয়। এটি রাডার মনিটরে দেখা যেতে পারে। এই তরঙ্গগুলো আঁকাবাঁকা হয়ে দেখা যায় এবং রাডার স্ক্রিনে বিপুল বেগে উড়ে চলছে বলে দেখা যায়। কারণ, এগুলো আসলে প্ৰতিধ্বনি।

২. আবহাওয়া ও গবেষণা বেলুন। এক বিতর্কিত রিপোর্টে সেনাবাহিনী দাবি করেছে, ১৯৪৭ সালে নিউ মেক্সিকোর রসওয়েলে সুপরিচিত এলিয়েন বিধ্বংস্ত হওয়ার যে গুজব প্রচলিত আছে, তার পেছনের কারণ ছিল প্রজেক্ট মোগুল থেকে একটি অনিয়ন্ত্রিত বেলুন। প্রজেক্ট মোগুল ছিল কোনো কারণে পারমাণবিক যুদ্ধ বাধলে বায়ুমণ্ডলে তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা পরীক্ষা করার অতি গোপন এক প্রজেক্ট।

৩. বিমান। বাণিজ্যিক ও সামরিক বিমানের কারণেও ইউএফও দেখাসংক্রান্ত ঘটনা শুরু হয়েছিল জানা যায়। স্টিলথ বোম্বারের মতো উন্নত কোনো বিমানের পরীক্ষামূলক উড্ডয়নের ক্ষেত্রে এটি বিশেষভাবে সত্য। অতি গোপন কোনো প্রজেক্ট থেকে সবার নজর সরিয়ে রাখতে মার্কিন সেনাবাহিনী আসলে ফ্লাইং সসার বা উড়ন্ত চাকতির কাহিনিতে উৎসাহ জোগায়। )

৪. ইচ্ছাকৃত ধাপ্পাবাজি। ফ্লাইং সসারের ছবি তোলার দাবি করা সবচেয়ে বিখ্যাত ছবিগুলো আসলে ধাপ্পাবাজি ছাড়া আর কিছুই নয়। সুপরিচিত একটি ছবি ফ্লাইং সসারের জানালা ও ল্যান্ডিং পড় বলে দাবি করা ছবিটি আসলে ছিল চিকেন ফিডার।

.

অন্তত ৯৫ শতাংশ ইউএফও দেখার দাবি ওপরের কারণগুলোর মাধ্যমে বাতিল করে দেওয়া যায়। তবে বাকি অল্প কয়েকটির ক্ষেত্রে এমন প্রশ্ন তৈরি করে যেগুলো অব্যাখ্যাত। ইউএফও-সংক্রান্ত সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য ঘটনাগুলো (ক নিরপেক্ষ, বিশ্বাসযোগ্য প্রত্যক্ষদর্শীর ক্ষেত্রে অনেকবার ঘটেছে এবং (খ) সেগুলোর জন্য প্রত্যক্ষদর্শী ও রাডারের মতো বিভিন্ন উৎসের প্রমাণ রয়েছে। এ ধরনের রিপোর্ট বাতিল করে দেওয়া কঠিন। কারণ, এতে নিরপেক্ষ লোকদের বরাত রয়েছে। যেমন ১৯৮৬ সালে আলাস্কার আকাশে জেএএল ফ্লাইট ১৬২৮ একটি ইউএফও দেখার দাবি করেছিল। এটি তদন্ত করেছিল এফএএ। জেএএল ফ্লাইটের যাত্রীরা ইউএফওটি দেখেছিল। ভূমিতে থাকা রাডারেও শনাক্ত করা হয় সেটি। একইভাবে, ১৯৮৯-৯০ সালের দিকে বেলজিয়ামের আকাশে কালো ত্রিভুজ অনেকগুলো রাডারে ধরা পড়ে, যেটি ন্যাটো ও জেট ইন্টারসেপ্টর দিয়ে ট্র্যাক করা হয়। ১৯৭৬ সালে ইরানের তেহরান শহরের আকাশে আরেকটি ইউএফও দেখার ঘটনা ঘটে। এর কারণে একটি এফ-৪ জেট ইন্টারসেপ্টরে একাধিক সিস্টেম ফেইলর হয়। সিআইএর নথিতে এ রকম ঘটনার উল্লেখ রয়েছে।

বিজ্ঞানীদের কাছে সবচেয়ে হতাশাজনক ব্যাপার হলো, রেকর্ডকৃত হাজার হাজার সাক্ষ্যের মধ্যে কোনোটাই এমন কোনো বাস্তব বা ভৌত কোনো প্রমাণ তৈরি করতে পারেনি, যার মাধ্যমে গবেষণাগারে ওই ঘটনাগুলোর ফলাফল নতুন করে তৈরি করা যায়। এলিয়েন কোনো ডিএনএ, এলিয়েনদের কম্পিউটার চিপ কিংবা মর্ত্যে নেমে আসা কোনো এলিয়েনের দৈহিক প্রমাণও কখনো উদ্ধার করা যায়নি।

এক মুহূর্তের জন্য ভাবা যাক, এ ধরনের ইউএফওগুলো কোনো বিভ্ৰান্তি নয়, বরং তারা বাস্তব নভোযান। তাহলে আমরা নিজেদের প্রশ্ন করতে পারি, এগুলো আসলে কী রকম নভোযান। প্রত্যক্ষদর্শীরা এ সম্পর্কে যা জানিয়েছে, তাতে নভোযানগুলোর চরিত্র নিচের মতো :

১. তারা মধ্য আকাশে আঁকাবাঁকা পথ তৈরি করার জন্য পরিচিত।

২. এগুলো পাশ দিয়ে গেলে গাড়ির ইগনিশন বন্ধ করে দেয় ও বৈদ্যুতিক শক্তিতে বাধা সৃষ্টি করে।

৩. এগুলো আকাশে নিঃশব্দে ঝুলে থাকতে পারে।

এর মধ্যে কোনো বৈশিষ্ট্যই পৃথিবীতে আমাদের তৈরি রকেটের বিবরণের সঙ্গে মেলে না। যেমন আমাদের জানা রকেট নিউটনের গতির তৃতীয় সূত্রের ওপর নির্ভরশীল (প্রত্যেক ক্রিয়ার একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে)। তবে ইউএফও দেখার কোনো ঘটনায় এর উল্লেখ দেখা যায় না। আর আঁকাবাঁকা পথে উড়ে চলা উড়ন্ত সসার যে মহাকর্ষ বল বা জি-ফোর্স তৈরি করে, তা পৃথিবীর মহাকর্ষ বলের চেয়ে এক শ গুণ ছাড়িয়ে যাবে বলে মনে হয়। এই বল পৃথিবীর যেকোনো প্রাণীকে চ্যাপ্টা করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

আধুনিক বিজ্ঞান ব্যবহার করে কি ইউএফওর এ ধরনের বৈশিষ্ট্যগুলো ব্যাখ্যা করা যায়? আর্থ ভিএস দ্য ফ্লাইং সসার সিনেমায় সব সময়ই ধরে নেওয়া হয় যে এলিয়েনরাই এ ধরনের নভোযান চালাচ্ছে। তবে এ রকম নভোযানের সত্যি কোনো অস্তিত্ব থাকলে সেগুলো মনুষ্যবিহীন হওয়ার সম্ভাবনা বেশি (কিংবা এমন কোনো জীব হতে পারে, যার কিছু অংশ জৈব আর কিছু অংশ যান্ত্রিক)। এর মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায়, এ নভোযান কীভাবে জীবন্ত যেকোনো কিছুকে বিধ্বস্ত করে ফেলতে সক্ষম জি-ফোর্স তৈরি করে।

যে নভোযান গাড়ির ইগনিশন বন্ধ করতে আর বাতাসে নিঃশব্দে চলাচল করতে পারে, সেটি হয়তো চুম্বকচালিত যান বলে ধারণা করা যায়। চুম্বকশক্তি চালিত যানের সমস্যা হলো চুম্বকের সব সময় দুটি মেরু থাকে, একটি উত্তর মেরু ও আরেকটি দক্ষিণ মেরু। পৃথিবীর চুম্বকীয় ক্ষেত্রে কোনো চুম্বক রাখা হলে তা কোনো ইউএফওর বাতাসে ওঠার বদলে ঘুরবে (কম্পাসের কাঁটার মতো)। দক্ষিণ মেরু একদিকে চলবে আর উত্তর মেরু তার বিপরীত দিকে চলার কারণে চুম্বকটি ঘুরতে থাকবে ও কোথাও যেতে পারবে না।

মনোপোল বা একক মেরুর ব্যবহার এ সমস্যার সম্ভাব্য একটি সমাধান হতে পারে। অর্থাৎ যে চুম্বকের একটিমাত্র মেরু থাকবে, কোনো উত্তর বা দক্ষিণ মেরু থাকবে না। সাধারণত কোনো চুম্বককে দুই ভাগে বিভক্ত করা হলে দুটি মনোপোল পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। তার বদলে প্রতিটি বিভক্ত অংশ আলাদা চুম্বকে পরিণত হবে, যাদের দুটিতে উত্তর ও দক্ষিণ মেরু বর্তমান থাকবে। মানে দুটি চুম্বকই পরিণত হবে আলাদাভাবে ডাইপোল চুম্বকে। কাজেই চুম্বক অবিরামভাবে বিভক্ত করা হলে, প্রতিটি চুম্বকে সব সময় উত্তর ও দক্ষিণ মেরু পাওয়া যাবে। (একটি ডাইপোল বা দ্বিমেরু চুম্বকে ভেঙে আগের চেয়ে ক্ষুদ্রতর ডাইপোল চুম্বকে বানানোর এই প্রক্রিয়া পারমাণবিক পর্যায় পর্যন্ত চালিয়ে যাওয়া যায়। সেখানে খোদ পরমাণুগুলোও একেকটি ডাইপোল। )

বিজ্ঞানীদের জন্য সমস্যাটি হলো মনোপোল গবেষণাগারে কখনো বানানো সম্ভব হয়নি। পদার্থবিদেরা তাঁদের যন্ত্রপাতির মধ্যে চলমান মনোপোলের গতিপথের ছবি তোলার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন (এ ক্ষেত্রে একটিমাত্র ব্যতিক্রম আছে। ১৯৮২ সালে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ছবি তোলা হয়েছিল, যা নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে)।

পরীক্ষায় মনোপোল কখনোই তর্কাতীতভাবে না পাওয়া গেলেও পদার্থবিদেরা ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করেন যে মহাবিস্ফোরণের পরপর মহাবিশ্ব বিপুল পরিমাণ মনোপোলের অস্তিত্ব ছিল। মহাবিস্ফোরণের সর্বশেষ বিশ্ব-সৃষ্টিতত্ত্বে এ ধারণা গড়ে তোলা হয়েছে। তবে মহাবিস্ফোরণের পরপরই মহাবিশ্ব যেহেতু বিপুল বেগে স্ফীত হয়েছে, তাই মহাবিশ্বজুড়ে মনোপোলের ঘনত্ব কমে গেছে। কাজেই এগুলো এখন গবেষণাগারে দেখা যায় না। (আসলে বর্তমানে মনোপোলের অভাব পর্যবেক্ষণই পদার্থবিদদের স্ফীত মহাবিশ্বের ধারণার দিকে চালিত করেছে। কাজেই মনোপোলের অবশেষের ধারণাটি পদার্থবিদ্যায় সুপ্রতিষ্ঠিত। )

তাই অনুমান করে নেওয়া যায়, মহাকাশ ভ্রমণে অগ্রসর কোনো জাতি বাইরের মহাকাশে বিশালাকৃতির জাল ছড়িয়ে মহাবিস্ফোরণের পর অবশিষ্ট থেকে যাওয়া আদিম মনোপোল সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছে। তারা যদি কোনোভাবে যথেষ্ট পরিমাণ মনোপোল সংগ্রহ করতে পারে, তাহলে ছায়াপথজুড়ে বা কোনো গ্রহে চুম্বকীয় ক্ষেত্র রেখা ব্যবহার করে এবং কোনো এক্সজস্ট তৈরি না করে তারা মহাকাশেও যাতায়াত করতে পারবে। অনেক বিশ্ব-সৃষ্টিতত্ত্ববিদের কাছে মনোপোল নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ থাকার কারণে এ ধরনের কোনো নভোযানের অস্তিত্ব থাকাটা এখন পদার্থবিদ্যার বর্তমান চিন্তাভাবনার সঙ্গে নিশ্চিতভাবে খাপ খায়।

সবশেষে বলা যায়, মহাবিশ্বের সব জায়গায় স্টারশিপ পাঠাতে যেকোনো এলিয়েন সভ্যতাকে যথেষ্ট উন্নত হতে হবে। বিশেষ করে ন্যানো প্রযুক্তিতে সুদক্ষ হতে হবে। মানে তাদের স্টারশিপ খুব বেশি বড় হওয়ার প্রয়োজন নেই। তার চেয়ে প্রাণসমৃদ্ধ গ্রহ অনুসন্ধানে এ রকম লাখ লাখ নভোযান পাঠাতে পারবে তারা। জনশূন্য উপগ্রহগুলো এ রকম ন্যানোশিপের জন্য সবচেয়ে ভালো ঘাঁটি হয়ে উঠতে পারে। তাই যদি হয়, তাহলে আমাদের চাঁদেও হয়তো অতীতে কোনো টাইপ-৩ সভ্যতা এসে থাকতে পারে। অনেকটা ২০০১ সালে নির্মিত এক মুভিতে দেখানো ঘটনার মতো। এ মুভিতে সম্ভবত বহির্জাগতিক সভ্যতা সম্পর্কে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত রূপায়ণ করা হয়েছে। এমনও হতে পারে, চাঁদে অবতরণ করা নভোযানগুলো হয়তো মনুষ্যবিহীন ও রোবটচালিত ছিল। (অস্বাভাবিক তেজস্ক্রিয়তা খুঁজে দেখতে পুরো চাঁদে তন্ন তন্ন করে স্ক্যান করে দেখতে যেমন প্রযুক্তি দরকার, সে পর্যায়ে যেতে আমাদের আরও ১০০ বছর লেগে যাবে। পাশাপাশি অতীতে এলিয়েনদের ন্যানোশিপ পরিদর্শনের প্রাচীন প্রমাণ শনাক্ত করার সক্ষমতা অর্জনেও একই সময় লাগতে পারে। )

আমাদের চাঁদে সত্যি সত্যিই কোনো এলিয়েন যদি অতীতে এসে থাকে কিংবা সেখানে যদি ন্যানোটেক ঘাঁটি বানিয়ে থাকে, তাহলে হয়তো ব্যাখ্যা করা যাবে ইউএফও কেন অনিবার্যভাবে অনেক বেশি বড় হয় না। অনেক বিজ্ঞানী ইউএফওর বিষয়টি নিয়ে ব্যঙ্গ করেন। কারণ, তাঁরা বর্তমানে আমাদের ইঞ্জিনিয়ারদের তৈরি করা বিশাল এলাকাজুড়ে বিস্তৃত রামজেট ফিউশন ইঞ্জিন, বিশাল লেজারচালিত পাল আর নিউক্লিয়ার পালসড ইঞ্জিনের সঙ্গে বিশাল প্রোপালশন ডিজাইনগুলোর সঙ্গে ইউএফএকে খাপ খাওয়াতে পারছেন না। কিন্তু ইউএফও একটা জেটবিমানের মতো ছোটও হতে পারে। তবে আগের পরিদর্শনের সময় চাঁদে যদি কোনো স্থায়ী ঘাঁটি রাখা হয়ে থাকে, তাহলে ইউএফওদের বড় হওয়ার দরকার নেই। কারণ, তাদের পার্শ্ববর্তী চাঁদের ঘাঁটি থেকেই জ্বালানি নিতে পারবে। কাজেই ইউএফও দেখার কারণ জনহীন পরীক্ষামূলক শিপও হতে পারে, যা চাঁদের ঘাঁটি থেকে আসতে পারে।

সেটি (SETI) প্রজেক্টের প্রজেক্টের দ্রুত অগ্রগতি এবং অনেকগুলো বহিঃসৌরজাগতিক গ্রহ আবিষ্কারের কারণে এলিয়েন আমাদের পার্শ্ববর্তী এলাকায় থাকে বলে ধরে নেওয়া যায়। আর সেটি সত্য হলে এলিয়েন বা বহির্জাগতিক জীবের সঙ্গে যোগাযোগ এই শতাব্দীর মধ্যেই হয়তো ঘটতে পারে। এসব কারণে একে প্রথম শ্রেণির অসম্ভাব্যতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এলিয়েন সভ্যতা যদি বহু দূরের মহাকাশে থাকে, তাহলে পরবর্তী অনিবার্য প্রশ্নটি হলো : আমরা কি সত্যিই তাদের কাছে কখনো পৌঁছাতে পারব? আমাদের দূরবর্তী ভবিষ্যৎ কী হবে, যখন সূর্য প্রসারিত হতে থাকবে আর পৃথিবীকে গ্রাস করে ফেলবে? আমাদের গন্তব্য কি সত্যিই নক্ষত্রদের ওপর নির্ভর করে?

তথ্যনির্দেশ

কোরোট স্যাটেলাইট : ২০০৬ সালের ২৭ ডিসেম্বরে উৎক্ষেপণ করা হয় কোরোট স্যাটেলাইট। ফরাসি ভাষায় Convection, Stellar Rotation এবং Planetary Transits শব্দ তিনটি একত্র হয়ে CoRoT শব্দটি গঠিত। শব্দ তিনটির অর্থ যথাক্রমে পরিচলন, নাক্ষত্রিক ঘূর্ণন ও গ্রহসংক্রান্ত চলন। উৎক্ষেপণের তিন মাসের মধ্যে একটি বহিঃসৌর গ্রহ আবিষ্কার করে কোরোট, নাম COROT-1b। উৎক্ষেপণের পর আড়াই বছর কার্যক্রম চলার কথা থাকলেও পরে ২০১৪ সাল পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়। তবে ২০১২ সালে স্যাটেলাইটটির কম্পিউটারে সমস্যা দেখা দেয়। সেটি ঠিক করার চেষ্টা করেও লাভ হয়নি। এতে কোরোটে থাকা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-উপাত্তও উদ্ধার করা যায়নি। ২০১৩ সালের জুনে কোরোট মিশন বন্ধ করা হয় ও পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে সেটি ভস্মীভূত করা হয়। পুরো মিশনে কোরোট ৩২টি বহিঃসৌরজাগতিক গ্রহ আবিষ্কার করে। এ ছাড়া ১০০টিকে গ্রহ হিসেবে নিশ্চিত করার অপেক্ষায় ছিল।

কেপলার স্যাটেলাইট : ২০০৯ সালের ৭ মার্চ কেপলার স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করে নাসা। দীর্ঘ ৯ বছরের বেশি কার্যক্রম চলার পর ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবরে স্যাটেলাইটটি বন্ধ করা হয়। একই বছর ১৫ নভেম্বর কেপলার নিষ্ক্রিয় করা হয়। দিনটি ছিল জ্যোতির্বিদ কেপলারের ৩৮৮তম মৃত্যুবার্ষিকী। স্যাটেলাইটটি ৫৩০,৫০৬টি নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ ও ২৬৬২টি বহিঃসৌর গ্রহ শনাক্ত করেছে। টেরিস্ট্রিয়াল

প্ল্যানেট ফাইন্ডার : এর সংক্ষিপ্ত নাম টিপিএফ। স্যাটেলাইটটি কয়েকবার উৎক্ষেপণের চেষ্টা করেও বারবার তারিখ পেছানো হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ২০১১ সালে এর উৎক্ষেপণ একেবারে বাতিল ঘোষণা করে নাসা।

ডারউইন স্যাটেলাইট : মহাকাশে পৃথিবী আকৃতির গ্রহ অনুসন্ধানে ১৯৯৩ সালে এই মিশনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। ২০১৪ সালের দিকে স্যাটেলাইটটি উৎক্ষেপণের কথা থাকলেও ২০০৭ সালে এই মিশন বাতিল ঘোষণা করে এশা।

৯. স্টারশিপ

বিজ্ঞানীদের দুর্বিনীত লক্ষ্য কত উদ্ভট দূরত্বকে গন্তব্য বানাতে পারে, তার অন্যতম উদাহরণ চাঁদে যান পাঠানোর মতো নির্বুদ্ধিতা। এমন একটি চিন্তা একেবারেই অসম্ভব বলে মনে হয়।

এ ডব্লিউ বিকারটন, ১৯২৬

সব সম্ভাবনার মধ্যে মানবজাতির সবচেয়ে চমৎকার ব্যাপারটি হলো, মহাকাশের বাইরে গেলে তারা এক সূর্য থেকে আরেক সূর্যে স্থানান্তরিত হতে থাকবে। এ সম্ভাবনা কখনো বিনষ্ট হবে না। আর তাই জীবন, বুদ্ধিমত্তা ও মানবজাতির উৎকর্ষের কখনো শেষ নেই। এ অগ্রগতি চিরন্তন।

—কনস্টানটিন ই সিওলকোভস্কি, রকেটের জনক

অদূর ভবিষ্যতে কোনো একদিন পৃথিবীতে আমরা শেষ দিনটি কাটাব। আজ থেকে কয়েক বিলিয়ন বছর পর একদিন গোটা আকাশ তীব্র আগুনে ছেয়ে যাবে। আমাদের সূর্য ফুলেফেঁপে জ্বলন্ত এক নরকে পরিণত হবে, যা গোটা আকাশ ছেয়ে যাবে এবং আকাশের সবকিছু গ্রাস করবে। পৃথিবীর তাপমাত্রার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মহাসাগরের সমস্ত পানি উত্তপ্ত হয়ে স্রেফ বাষ্পীভূত হয়ে যাবে। সেখানে পড়ে থাকবে শুধু দগ্ধ, ক্ষতবিক্ষত আর বিরান স্থলভূমি। পাহাড়-পর্বতগুলো গলে গলে তরলে পরিণত হবে। সেগুলো অচিরেই রূপ নেবে দগদগে লাভায়। একসময় যেখানে জীবন্ত প্রাণোচ্ছল সব শহর দাঁড়িয়ে ছিল, সেখানে এসব গলিত লাভা প্রবাহিত হতে থাকবে।

পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলো অনুযায়ী, পৃথিবীর নির্মম এই চিত্র অনিবার্য। পৃথিবী একসময় সূর্যের তীব্র অগ্নিশিখার গ্রাসেই মারা যাবে। এটি পদার্থবিজ্ঞানের একটি সূত্র।

এই বিপর্যয় সংঘটিত হবে আগামী পাঁচ বিলিয়ন বছরের মধ্যে। মহাজাগতিক সময়সূচির বিশাল বিস্তৃতির কাছে মানবসভ্যতার উত্থান ও পতন অতি সামান্য ঘটনা। একদিন আমাদের এই পৃথিবী ছেড়ে যেতেই হবে, নয়তো এখানেই ধুঁকে ধুঁকে মরতে হবে। কাজেই পৃথিবীর অবস্থা যখন অসহনীয় হয়ে উঠবে, তখন মানবজাতি বা আমাদের উত্তরসূরিরা তা কীভাবে মোকাবিলা করবে?

গণিতবিদ ও দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল একবার বলেছিলেন, ‘কোনো আগুন, কোনো বীরত্ব, কোনো ভাবনা বা অনুভূতির তীব্রতা কোনো প্রাণকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে পারবে না। সব যুগের পরিশ্রম, সব সাধনা, সব অনুপ্রেরণা, দুপুরের মতো মানুষের প্রতিভার প্রখরতা সৌরজগতের প্রকাণ্ড মৃত্যুর ভেতর বিলুপ্তি হওয়ার জন্য নির্ধারিত। মানুষের অর্জনের সব আশ্রয়স্থল অবশ্যই অনিবার্যভাবে মহাবিশ্বের ধ্বংসস্তূপের নিচে সমাধিস্থ হবে।’

ইংরেজি ভাষায় আমার কাছে অন্যতম গভীর চিন্তাশীল একটি অনুচ্ছেদ এটি। তবে রাসেল কথাটা এমন এক যুগে লিখেছিলেন, যখন রকেট শিপকে অসম্ভব বলে ভাবা হতো। আমাদের যে একদিন এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে, বর্তমানে সে সম্ভাবনা আর মোটেও কষ্টকল্পিত নয়। কার্ল সাগান একবার বলেছিলেন, আমাদের ‘দুটি গ্রহের প্রজাতি’ হয়ে ওঠা উচিত। পৃথিবীতে জীবন এতটাই মূল্যবান যে, তিনি বলেন, কোনো বিপর্যয় ঘটার আগেই আমাদের অন্তত বাসযোগ্য অন্য কোনো গ্রহে চলে যাওয়া উচিত। চলমান গ্রহাণু, ধূমকেতু ও পৃথিবীর কক্ষপথের কাছে অন্যান্য ধ্বংসাবশেষের মাঝখানে পৃথিবী ঘুরে চলেছে। এদের যেকোনোটির সঙ্গে সংঘর্ষের কারণে আমাদের ধ্বংস ডেকে আনতে পারে।

আসন্ন বিপর্যয়

কবি রবার্ট ফ্রস্ট একবার প্রশ্ন তোলেন, আগুন না হয় তুষারের কারণে পৃথিবীর পরিসমাপ্তি হবে। পদার্থবিদ্যার সূত্রগুলো ব্যবহার করে বেশ যৌক্তিকভাবে অনুমান করা যায়, কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে এই বিশ্বের কীভাবে পরিসমাপ্তি হতে পারে।

কয়েক মিলিয়ন বছরে মানবসভ্যতার জন্য একটি বিপদ হলো নতুন বরফযুগের আবির্ভাব। সর্বশেষ বরফযুগ শেষ হয়েছে ১০ হাজার বছর আগে। পরেরটি আসতে পারে এখন থেকে ১০ থেকে ২০ হাজার বছরের মধ্যে। এতে উত্তর আমেরিকার অধিকাংশ এলাকা আধমাইল পুরু বরফের স্তরে ঢেকে যেতে পারে। সাম্প্রতিক অতি ক্ষুদ্র আন্তমহাজাগতিক সময়কালের মধ্যে মানবসভ্যতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। আর এ সময়টায় পৃথিবী অস্বাভাবিক উষ্ণ ছিল। কিন্তু এ ধরনের চক্র চিরকাল স্থায়ী হতে পারে না।

লাখ লাখ বছরে পৃথিবীর সঙ্গে বিশালাকৃতির উল্কা বা ধূমকেতুর সংঘর্ষে ব্যাপক বিধ্বংসী প্রভাব ফেলতে পারে। সর্বশেষ এ রকম বড় বিপর্যয় সংঘটিত হয়েছিল ৬৫ মিলিয়ন বছর আগে। তখন প্রায় ৬ মাইল বিস্তৃত একটি বস্তু মেক্সিকোর ইউকাতান উপদ্বীপে আঘাত হানে। ফলে প্রায় ১৮০ মাইল ব্যাসের এলাকাজুড়ে বিশাল এক খাদের সৃষ্টি হয় এবং পৃথিবীতে সেকালের প্রভাবশালী জন্তু ডাইনোসরদের নিশ্চিহ্ন করে দেয়। ওই সময়ে আরেকটি মহাজাগতিক সংঘর্ষ হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।

এখন থেকে কয়েক বিলিয়ন বছর পর আমাদের সূর্য ধীরে ধীরে প্রসারিত হয়ে বড় হতে থাকবে। শেষমেশ পৃথিবীকে গ্রাস করবে তা। আসলে আমাদের হিসাবে, সূর্য পরবর্তী বিলিয়ন (১০০ কোটি) বছরে এখনকার চেয়ে প্রায় ১০ শতাংশ উষ্ণ হবে। সেই সঙ্গে চরমভাবে অগ্নিগর্ভ করে তুলবে আমাদের পৃথিবীকেও। তারপর আগামী ৫ বিলিয়ন (৫০০ কোটি) বছরে পৃথিবীকে পুরোপুরি গ্রাস করে ফেলবে সূর্য। তখন আমাদের সূর্য এক লোহিত দানব নক্ষত্রে পরিণত হবে। পরিণামে আক্ষরিক অর্থেই সূর্যের আবহমণ্ডলের মধ্যে ঢুকে যাবে আমাদের প্রিয় পৃথিবী।

আবার এখন থেকে ১০ বিলিয়ন বছর পর মৃত্যু হবে আমাদের সূর্য ও মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির। কারণ, আমাদের সূর্য একসময় তার হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম জ্বালানি ফুরিয়ে ফেলবে। তখন সূর্য সংকুচিত হয়ে পরিণত হবে অতি ক্ষুদ্র এক শ্বেতবামন নক্ষত্রে। এরপর তা ক্রমেই শীতল হতে হতে শূন্যস্থানের মধ্যে একসময় একটি বিধ্বস্ত কালো পারমাণবিক বর্জ্যের স্তূপে পরিণত হবে। আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি বা আকাশগঙ্গা ছায়াপথ একসময় সংঘর্ষে লিপ্ত হবে তার সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশী অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সির সঙ্গে। এই অ্যান্ড্রোমিডা আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির চেয়ে অনেক অনেক বড়। কাজেই মিল্কিওয়ের সর্পিল বাহুগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। পরিণামে আমাদের সূর্য নিক্ষিপ্ত হতে পারে গভীর মহাকাশে। গ্যালাক্সি দুটির এই সংঘর্ষ আর তাদের একীভূত হওয়ার আগে তাদের কেন্দ্রে থাকা কৃষ্ণগহ্বরগুলো মৃত্যুকালীন চূড়ান্ত নাচ দেখাতে শুরু করবে।

ভবিষ্যতের এমন বিক্ষুব্ধ অবস্থায় মানবজাতিকে টিকে থাকতে হলে আমাদের সৌরজগৎ থেকে একদিন অবশ্যই প্রতিবেশী কোনো নক্ষত্রে পালিয়ে যেতেই হবে, নয়তো এখানেই ধ্বংস হতে হবে। প্রশ্ন হলো, সেটি কীভাবে করা সম্ভব? প্রতিবেশী নক্ষত্রগুলোতে কেমন করে যাওয়া যাবে? আমাদের সবচেয়ে কাছের নক্ষত্র ব্যবস্থা আলফা সেন্টুরাই পৃথিবী থেকে ৪ আলোকবর্ষ দূরে। আমাদের বর্তমান মহাকাশ কর্মসূচির ভিত্তি হলো রাসায়নিক প্রোপালশন রকেট। প্রচলিত এই রকেট মাত্র ঘণ্টায় ৪০ হাজার মাইল বেগে যেতে শুরু করেছে। কিন্তু এই বেগে চলতে গেলে সবচেয়ে কাছের এই নক্ষত্রে পৌঁছাতে আমাদের সময় লেগে যাবে ৭০ হাজার বছর।

বর্তমানের মহাকাশ কর্মসূচি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আমাদের বর্তমান কালের তুচ্ছ সক্ষমতা আর মহাবিশ্ব অভিযান শুরু করতে প্রয়োজনীয় সত্যিকার কোনো স্টারশিপের মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়ে গেছে। ১৯৭০-এর দশকের শুরুর দিকে চাঁদে অভিযান শুরু হয়। এরপর থেকে আমাদের মানুষবাহী মহাকাশ কর্মসূচিতে পৃথিবী থেকে মাত্র ৩০০ মাইল ওপরের কক্ষপথে স্পেস শাটল ও ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশনে নভোচারী পাঠানো হয়েছে। তবে ২০১০ সালের মধ্যে স্পেস শাটল স্থগিত করে অরিয়ন স্পেসক্র্যাফট চালু করার পরিকল্পনা করছে নাসা। এর মাধ্যমে ২০২০ সালের মধ্যে নভোচারীদের আবারও চাঁদে নেওয়া হবে। দীর্ঘ ৫০ বছর বিরতির পর এটি করা হবে। চাঁদের মাটিতে মানুষের জন্য একটি স্থায়ী ঘাঁটি গড়ে তোলার পরিকল্পনা আছে নাসার। এরপর হয়তো মঙ্গলে মানুষবাহী মিশন পরিচালনা করা হতে পারে।

অন্য নক্ষত্রগুলোতে আমরা কখনো যদি পাড়ি দিতে চাই, তাহলে নতুন ধরনের রকেটের নকশা অবশ্যই খুঁজে দেখতে হবে। হয় আমাদের রকেটের থ্রাস্ট বাড়াতে হবে, নয়তো রকেটের সক্রিয়তার সময় বাড়াতে হবে। যেমন একটি বড় রাসায়নিক রকেটের থ্রাস্ট কয়েক মিলিয়ন পাউন্ড হলেও তা মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য জ্বলতে পারবে। অন্যদিকে অন্যান্য রকেট নকশায়, যেমন আয়ন ইঞ্জিনের (পরের প্যারায় আলোচনা করা হয়েছে) থ্রাস্ট দুর্বল হলেও তা বাইরের মহাকাশে কয়েক বছর ধরে চলতে পারবে। রকেটের বেলায় খরগোশকেও হারিয়ে দিতে পারে কচ্ছপ।

আয়ন ও প্লাজমা ইঞ্জিন

রাসায়নিক ইঞ্জিনের চেয়ে আয়ন ইঞ্জিন বেশ আলাদা। রাসায়নিক ইঞ্জিনের মতো এ ইঞ্জিনগুলো হঠাৎ অতি উত্তপ্ত গ্যাসের নাটকীয় বিস্ফোরণ ঘটায় না। তবে প্রচলিত রকেটগুলো সামনের দিকে এগিয়ে চলে এই অতি উত্তপ্ত গ্যাসের মাধ্যমে। আসলে তাদের থ্রাস্ট অধিকাংশ সময় আউন্সে মাপা হয়। এগুলো এতটা দুর্বল যে পৃথিবীতে কোনো একটি টেবিলের ওপরে এদের রাখা হলে চলতে পারে না। তবে মহাকাশে শূন্যস্থানে অনেক বছর ধরে সক্রিয় থাকতে পারে এগুলো।

আদর্শ আয়ন ইঞ্জিন দেখতে টিভির ভেতরে থাকা টিউবের মতো। একটি উত্তপ্ত ফিলামেন্ট বৈদ্যুতিক প্রবাহের মাধ্যমে উত্তপ্ত হয়, যা আয়নিত পরমাণুর (যেমন জেনন) রশ্মি তৈরি করে। এটিই রকেটের শেষ প্রান্ত দিয়ে ছুড়ে দেওয়া হয়। উত্তপ্ত, বিস্ফোরক গ্যাসের পরিবর্তে আয়ন ইঞ্জিন আয়নের পাতলা, স্থির প্রবাহের ওপর চড়ে যাত্রা করে।

ডিপ স্পেস-১ নামের একটি অনুসন্ধানী যান সফলভাবে উৎক্ষেপণ করা হয় ১৯৯৮ সালে। এতে নাসার এনএসটিএআর (NSTAR) আয়ন থ্রাস্টার মহাকাশে পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে। মোট ৬৭৮ দিন চালানো হয় আয়ন ইঞ্জিনটি। এর মাধ্যমে নতুন রেকর্ড স্থাপন করেছে আয়ন ইঞ্জিন। এদিকে স্মার্ট-১ নামের অনুসন্ধানী যানে আয়ন ইঞ্জিনের পরীক্ষা চালিয়ে দেখেছে ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সিও। আবার জাপানের হায়াবুসা স্পেস প্রোব একটি গ্রহাণুর পাশ দিয়ে উড়ে গিয়েছিল। সেটি ছিল চারটি জেনন আয়ন ইঞ্জিনচালিত। শুনতে অদ্ভুত লাগলেও আয়ন ইঞ্জিন আন্তগ্রহের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অভিযান চালাতে সক্ষম (অবশ্য এটা এখনই জরুরি নয়)। আসলে এই আয়ন ইঞ্জিন হয়তো একদিন আন্তগ্রহগুলো যাতায়াতের জন্য প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠবে।

আয়ন ইঞ্জিনের আরও শক্তিশালী সংস্করণ হলো প্লাজমা ইঞ্জিন। যেমন ভিএএসআইএমআর (ভেরিয়েবল স্পেসিফিক ইমপালস ম্যাগনেটোপ্লাজমা রকেট), যা মহাকাশে চলাচলের জন্য প্লাজমার শক্তিশালী জেট ব্যবহার করে। এটি নকশা করেছেন নভোচারী ও প্রকৌশলী ফ্রাঙ্কলিক চাং-ডিয়াজ। এ ইঞ্জিন বেতার তরঙ্গ ও চুম্বকীয় ক্ষেত্র ব্যবহার করে হাইড্রোজেন গ্যাসকে ১ লাখ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করে তোলে। এই অতি উত্তপ্ত প্লাজমা রকেটের শেষ প্রান্ত দিয়ে বাইরে ছুড়ে ফেলা হয়। পরিণামে উল্লেখযোগ্য থ্রাস্ট বা ধাক্কার সৃষ্টি হয়। কয়েকজন প্রকৌশলীর প্রত্যাশা, মঙ্গল অভিযানের শক্তি সরবরাহে ব্যবহার করা সম্ভব হবে প্লাজমা ইঞ্জিন। এতে মঙ্গল-যাত্রার সময়কাল বেশ খানিকটা কমিয়ে মাত্র কয়েক মাসে নামিয়ে আনা যাবে। কিছু নকশায় ইঞ্জিনের প্লাজমায় শক্তি সরবরাহ করতে ব্যবহার করা হয়েছে সৌরশক্তি। অন্য নকশাগুলোতে ব্যবহার করা হয়েছে নিউক্লিয়ার ফিশন (যা নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগ বাড়িয়ে দেয়। কারণ, এতে মহাকাশে থাকা নভোযানে বিপুল পরিমাণ পারমাণবিক বস্তু ব্যবহার করা যা হয়, দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে)।

তবে আয়ন কিংবা প্লাজমা/ভিএএসআইএমআর ইঞ্জিনের কোনোটাই আমাদের অন্য কোনো নক্ষত্রে নিয়ে যাওয়ার মতো যথেষ্ট শক্তি নেই। সে কারণে আমাদের পুরোপুরি নতুনভাবে প্রোপালশনের ডিজাইন করতে হবে। কোনো স্টারশিপের নকশার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অসুবিধাটি হলো, সবচেয়ে কাছের নক্ষত্রে যাওয়ার জন্যও আমাদের বিপুল পরিমাণ জ্বালানির দরকার। আবার দূরবর্তী কোনো গন্তব্যে স্টারশিপটি পৌঁছানোর জন্যও লাগে অনেক দীর্ঘ সময়।

সৌরপাল

একটি উপায়ে হয়তো এ সমস্যার সমাধান করা যাবে, সেটি হলো সৌরপাল বা সোলার সেইল। সূর্যের আলো থেকে খুব অল্প পরিমাণে হলেও কিছু স্থির চাপ বেরিয়ে আসে। এ চাপের মাধ্যমে মহাকাশে বিশাল পাল চালানোর জন্য যথেষ্ট। সৌরপালের ধারণা বেশ পুরোনো। বিখ্যাত জোতির্বিদ জোহানেস কেপলার ১৬১১ সালে তাঁর সোমনিয়াম গ্রন্থে এ বিষয় উল্লেখ করেছিলেন।

সৌরপালের পেছনের পদার্থবিজ্ঞান সহজ হলেও বাস্তবে মহাকাশে চলতে সক্ষম সৌরপাল বানানোর ব্যাপারে এখনো তেমন অগ্রগতি নেই। ২০০৪ সালে সফলভাবে ছোট আকারের দুটি সৌরপালের প্রোটোটাইপ মহাকাশে মোতায়েন করে জাপানের রকেট। প্ল্যানেটারি সোসাইটি, কসমস স্টুডিও ও রাশিয়ান একাডেমি অব সায়েন্সেস ২০০৫ সালে বারেন্টস সাগর থেকে একটি সাবমেরিন থেকে উৎক্ষেপণ করে কসমস-১ সৌরপাল। কিন্তু সৌরপালটি বহনকারী ভোলনা রকেটটি উৎক্ষেপণে ব্যর্থ হয়। পরিণামে সৌরপালটি শেষমেশ কক্ষপথে পৌঁছাতে পারেনি। (এর আগে ২০০১ সালে উপ-কক্ষপথেও সৌরপাল উৎক্ষেপণ চেষ্টা ব্যর্থ হয়।) তবে ২০০৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাপানের এম-ভি রকেট ১৫ মিটার দৈর্ঘ্যের এক সৌরপাল সফলভাবে কক্ষপথে পাঠায়। অবশ্য সৌরপালটি পুরোপুরি খোলেনি।

সৌরপাল প্রযুক্তির উন্নয়নের অবস্থা দুঃখজনকভাবে বেশ ধীরগতির। তারপরও সৌরপাল প্রবক্তাদের আরেকটি আইডিয়া আছে, যা তাদের অন্য ক্ষেত্রে নিয়ে যেতে পারে। আইডিয়াটি হলো : চাঁদের মাটিতে বিপুল পরিমাণ লেজারের সারি তৈরি করা, যা সৌরপালে লেজারের তীব্র রশ্মি ছুড়ে দেবে। এর মাধ্যমে প্রতিবেশী নক্ষত্রে যাওয়া সম্ভব। এ রকম আন্তনাক্ষত্রিক সৌরপালের পদার্থবিজ্ঞান সত্যিকার অর্থেই বিস্ময়কর। এই পালের আকৃতি হবে আড়াআড়িভাবে কয়েক শ মাইল। আবার এর পুরোটাই বানাতে হবে বাইরের মহাকাশে। এদিকে চাঁদের মাটিতে বানাতে হবে কয়েক হাজার গুণ শক্তিশালী লেজার রশ্মি। সেগুলোকে কয়েক বছর থেকে শুরু করে কয়েক দশক পর্যন্ত অবিরামভাবে রশ্মি ছুড়তে সক্ষম হতে হবে। (হিসাবে দেখা গেছে, সৌরপালে ছোড়ার জন্য লেজার রশ্মির যে শক্তি দরকার, তার পরিমাণ বর্তমানে বিশ্বে উৎপাদিত বিদ্যুৎ শক্তির চেয়ে এক হাজার গুণ বেশি শক্তিশালী হতে হবে।)

তাত্ত্বিকভাবে বিশাল আকৃতির আলোর পাল হয়তো আলোর গতির অর্ধেক গতিতে চলতে পারবে। এতে একটি সৌরপাল প্রতিবেশী নক্ষত্রে পৌঁছাতে সময় নেবে মাত্র আট বছর। এ ধরনের প্রোপালশন সিস্টেমের সুবিধাটি হলো, এটি সাধারণ প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে। এ রকম সৌরপাল তৈরির জন্য হয়তো পদার্থবিজ্ঞানের নতুন কোনো সূত্র আবিষ্কার করতে হবে না। তবে প্রধান সমস্যাটি হলো অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত। আড়াআড়িভাবে এক শ মাইল বিস্তৃত একটি সৌরপাল তৈরির প্রকৌশলগত সমস্যা রয়েছে, আবার হাজারখানেক শক্তিশালী লেজার রশ্মি চাঁদে স্থাপন করা এই মুহূর্তে কঠিন কাজ। এর জন্য যে রকম প্রযুক্তি দরকার, তার জন্য হয়তো আরও এক শতাব্দী লেগে যাবে। (আন্তনাক্ষত্রিক সৌরপালের আরেকটি সমস্যা হলো ফিরে আসা। অন্য কোনো নক্ষত্র থেকে পৃথিবীতে ফিরে আসতে বহু দূরের কোনো চাঁদে দ্বিতীয় আরেকটি শক্তিশালী লেজার সারি তৈরি করতে হবে। নয়তো কোনো নক্ষত্রের চারপাশের কক্ষপথে দ্রুতবেগে দুলতে থাকবে নভোযানটি। বাটুল বা গুলতির মতো এটি ব্যবহার করে যথেষ্ট গতি অর্জন করে সেখান থেকে ফিরে আসা যাবে। এরপর চাঁদের লেজার ব্যবহার করে পৃথিবীতে অবতরণ করা যাবে সৌরপালের গতি কমিয়ে।)

রামজেট ফিউশন

অন্য নক্ষত্রে আমাদের বহন করতে আমার সবচেয়ে প্রিয় প্রযুক্তি রামজেট ফিউশন। হাইড্রোজেনের পরিমাণ মহাবিশ্বে বিপুল। তাই মহাকাশে ভ্রমণ করার সময় হাইড্রোজেন সংগ্রহ করে নিতে পারবে রামজেট ইঞ্জিন। আসলে এর মাধ্যমে অফুরান রকেট জ্বালানি পাবে এই ইঞ্জিন। একবার হাইড্রোজেন সংগ্রহ করার পর তা কয়েক মিলিয়ন ডিগ্রি তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করা হবে। একে যথেষ্ট উত্তপ্ত করতে হবে, যাতে হাইড্রোজেন ফিউজ বা একীভূত হয়। এভাবে থার্মোনিউক্লিয়ার বিক্রিয়ার মাধ্যমে পাওয়া যাবে বিপুল পরিমাণ শক্তি।

রামজেট ফিউশন ইঞ্জিনের প্রস্তাব দেন পদার্থবিদ রবার্ট ডব্লিউ বাসার্ড, ১৯৬০ সালে। একে জনপ্রিয় করে তোলেন কার্ল সাগান। বাসার্ড হিসাব করে দেখেছেন, রামজেট ইঞ্জিনের ওজন হবে প্রায় ১০০০ টন। তাত্ত্বিকভাবে এটি 1g বলের স্থিতিশীল থ্রাস্ট বজায় রাখতে পারবে, যাকে ভূপৃষ্ঠে দাঁড়িয়ে থাকার সঙ্গে তুলনা করা যায়। রামজেট ইঞ্জিন যদি এক বছরের জন্য 1g ত্বরণ বজায় রাখতে পারে, তাহলে তা আলোর বেগের ৭৭ শতাংশ অর্জন করতে পারবে। আন্তনাক্ষত্রিক ভ্রমণ আক্ষরিক অর্থেই সম্ভব করতে এই গতি যথেষ্ট।

রামজেট ফিউশন ইঞ্জিনের প্রয়োজনীয় উপাদান সহজে হিসাব করে বের করা যায়। প্রথমত, মহাবিশ্বে হাইড্রোজেন গ্যাসের গড় ঘনত্ব আমরা জানি। আবার 1g ত্বরণ পেতে কতটুকু হাইড্রোজেন গ্যাস পোড়াতে হবে, তা-ও মোটামুটি হিসাব করে বের করে ফেলা যায়। এর মাধ্যমে বোঝা যাবে, হাইড্রোজেন গ্যাস সংগ্রহ করতে আমাদের সংগ্রাহক যন্ত্রের আকার ঠিক কত বড় হতে হবে। যৌক্তিক কিছু অনুমানের মাধ্যমে দেখানো যায়, গ্যাস সংগ্রাহকের ব্যাস হবে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার। অবশ্য এত বড় সংগ্রাহক যন্ত্র পৃথিবীতে বানানো হয়তো কঠিন হতে পারে। তাই একে মহাকাশে বানিয়ে নিলে ওজনশূন্যতার জন্য তুলনামূলক কম সমস্যা হতে পারে।

তত্ত্ব অনুযায়ী, রামজেট ইঞ্জিন স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনির্দিষ্টকালের জন্য সামনে এগিয়ে যেতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত বহু দূরের ছায়াপথের নক্ষত্র ব্যবস্থায় পৌঁছাতে পারবে। আইনস্টাইনের মতে, যেহেতু রকেটের ভেতরে সময় ধীরগতির হয়ে যায়, তাই অনেক বড় দূরত্বে পৌঁছানোর জন্য যাত্রীদের ঘুম পাড়িয়ে রাখতে হবে না। স্টারশিপের ভেতরের ঘড়ি অনুযায়ী, ১২ বছরের জন্য 1g ত্বরণ অর্জন করার পর সেটি পৌঁছাতে পারবে ৪০০ আলোকবর্ষ দূরের প্লেইডেস স্টার ক্লাস্টারে। আর ২৩ বছরে স্টারশিপটি পৌছাবে পৃথিবীতে ২০ লাখ আলোকবর্ষ দূরের অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সিতে। তাত্ত্বিকভাবে স্টারশিপটির যাত্রীদের জীবদ্দশাতেও তা দৃশ্যমান মহাবিশ্বের সীমা ছাড়িয়ে যেতে পারবে (অবশ্য তত দিনে পৃথিবীতে পার হয়ে যাবে কয়েক বিলিয়ন বছর)।

ফিউশন বিক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ এক অনিশ্চয়তা আছে। ফ্রান্সের দক্ষিণে আইটিইআর ফিউশন রিঅ্যাক্টর বানানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। এখানে শক্তি বের করে আনতে দুটি বিরল হাইড্রোজেন (ডিউটেরিয়াম ও ট্রাইটিয়াম) একীভূত করা হবে। মহাকাশে প্রচুর পরিমাণ থাকা হাইড্রোজেনে একটি প্রোটন থাকে, যার চারপাশে একটি ইলেকট্রন ঘুরছে। রামজেট ফিউশন ইঞ্জিনকে প্রোটন-প্রোটন ফিউশন বিক্রিয়া থেকে শক্তি বের করে আনতে হবে। পদার্থবিদেরা কয়েক দশক ডিউটেরিয়াম-ট্রাইটিয়াম ফিউশন প্রক্রিয়া নিয়ে গবেষণা করলেও প্রোটন-প্রোটন ফিউশন প্রক্রিয়া এখনো ভালোভাবে বুঝে উঠতে পারেননি। কারণ, প্রক্রিয়াটি বেশ কঠিন ও এতে কম শক্তি বের করে আনা যায়। কাজেই তুলনামূলক কঠিন প্রোটন-প্রোটন ফিউশন পদ্ধতিতে দক্ষতা অর্জন করাও আগামী দশকগুলোর জন্য একটা চ্যালেঞ্জ। (প্রকৌশলীদের প্রশ্ন, রামজেট ইঞ্জিন আলোর কাছাকাছি গতিতে চলার সময় ড্রাগ ইফেক্ট বশে আনতে পারবে কি না। )

প্রোটন-প্রোটন ফিউশন পদ্ধতি নিয়ে পদার্থবিজ্ঞান ও অর্থনীতি সমাধান না করা পর্যন্ত রামজেট ইঞ্জিনের ব্যবহারের সম্ভাব্যতা নিয়ে সঠিকভাবে অনুমান করা কঠিন। তবে যেকোনো নক্ষত্র অভিযানে সম্ভাব্য প্রার্থীর মধ্যে এ নকশাটি সংক্ষিপ্ত তালিকায় রয়েছে।

নিউক্লিয়ার ইলেকট্রিক রকেট

মার্কিন অ্যাটোমিক এনার্জি কমিশন (এইসি) প্রজেক্ট রোভারের অধীনে নিউক্লিয়ার রকেটকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে শুরু করে ১৯৫৬ সালে। তাত্ত্বিকভাবে, কোনো নিউক্লিয়ার ফিশন রিঅ্যাক্টর বা চুল্লি হাইড্রোজেনের মতো গ্যাসকে চরম তাপমাত্রায় নিয়ে যায়। এরপর এই গ্যাস রকেটের এক প্রান্ত নিয়ে সজোরে বের হয়ে যেতে দিয়ে রকেটটি সম্মুখগতি অর্জন করে।

পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে নিউক্লিয়ার জ্বালানির বিষাক্ত বিস্ফোরণের ঝুঁকির কারণে নিউক্লিয়ার রকেট ইঞ্জিনের আদি সংস্করণ রেলপথের ওপর আড়াআড়িভাবে রাখা হয়েছিল। এভাবে রকেটটির দক্ষতা সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়। ১৯৫৯ সালে প্রজেক্ট রোভারের অধীনে পরীক্ষা চালানো প্রথম নিউক্লিয়ার রকেট ইঞ্জিনটি ছিল কিউয়ি ওয়ান (অস্ট্রেলিয়ার উড়তে না পারা পাখির নামে এর নামকরণ করা হয়েছে)। ১৯৬০ সালে নিউক্লিয়ার ইঞ্জিন ফর রকেট ভেহিকেল (NERVA) বানানোর জন্য এইসির সঙ্গে যোগ দেয় নাসা। এটিই প্রথম কোনো নিউক্লিয়ার রকেট, যা উলম্ব বা খাড়াভাবে পরীক্ষা করে দেখা হয়। আবার এই নিউক্লিয়ার রকেটটি পরীক্ষামূলকভাবে নিম্নাভিমুখে উৎক্ষেপণ করে দেখা হয়েছে ১৯৬৮ সালে।

এই গবেষণার ফলাফল মিশ্র। রকেটটি খুবই জটিল ও প্রায়ই লক্ষ্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে। নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনের তীব্র কম্পনে প্রায়ই ফাটল দেখা দেয় জ্বালানি প্রকোষ্ঠে। ফলে রকেটটি ভেঙে যায়। আরেকটি স্থায়ী সমস্যাও দেখা দেয় উচ্চ তাপমাত্রায় জ্বলন্ত হাইড্রোজেনের ক্ষয়ের কারণে। এসব কারণে নিউক্লিয়ার রকেট কর্মসূচি ১৯৭২ সালে পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়।

[এ পারমাণবিক রকেটের আরও একটি সমস্যাও আছে। পারমাণবিক বোমার মতো এখানেও ধাবমান পারমাণবিক বিক্রিয়া হয়। অবশ্য বাণিজ্যিকভাবে পারমাণবিক শক্তি উৎপাদন কেন্দ্রে এখন মিশ্রিত নিউক্লিয়ার জ্বালানি ব্যবহৃত হয়। এগুলো হিরোশিমায় ফেলা বোমার মতো বিস্ফোরিত হয় না। অন্যদিকে এ পারমাণবিক রকেটে সর্বোচ্চ সম্মুখগতি তৈরি করতে উচ্চতর সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ব্যবহার করা হয়। তাতে এটি ক্ষুদ্র পারমাণবিক বিস্ফোরক তৈরি করে চেইন রিঅ্যাকশনে বিস্ফোরিত হতে পারে। এ নিউক্লিয়ার রকেট কর্মসূচি যখন প্রায় স্থগিতের পথে, তখন সর্বশেষ পরীক্ষা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন বিজ্ঞানীরা। তাঁরা রকেটটিকে একটা ছোট পারমাণবিক বোমার মতো করে উড়িয়ে দিতে চাইলেন। সে জন্য কন্ট্রোল রড (এটি নিউক্লিয়ার বিক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণে রাখে) সরিয়ে নেন। রিঅ্যাক্টরটি সুপারক্রিটিক্যাল পর্যায়ে এসে আগুনের গোলার মতো বিস্ফোরিত হলো। নিউক্লিয়ার রকেট কর্মসূচির এই অপমৃত্যুর অসাধারণ দৃশ্য ভিডিও করা হয়েছিল। অবশ্য এ ঘটনায় খুশি হতে পারেনি রাশিয়াও। এই স্টান্টবাজিকে লিমিটেড টেস্ট ব্যান ট্রিটির লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করেছিল তারা। এই চুক্তি অনুযায়ী ভূপৃষ্ঠের ওপরে কোনো পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ নিষিদ্ধ। ]

মার্কিন সেনাবাহিনী বছরের পর বছর পর্যায়ক্রমে নিউক্লিয়ার রকেট নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছে। এ রকম গোপন একটি প্রজেক্টের নাম ছিল টিম্বারউইন্ড নিউক্লিয়ার রকেট। ১৯৮০-এর দশকে এটি ছিল মার্কিন সেনাবাহিনীর স্টার ওয়ার্স প্রজেক্টের একটি অংশ। (ফেডারেশন অব আমেরিকান সায়েন্টিস্ট কর্তৃক এর অস্তিত্ব সম্পর্কে বিশদ প্রকাশের পর এটি বাদ দেওয়া হয়। )

নিউক্লিয়ার ফিশন নিয়ে প্রধান উদ্বেগ হলো এর নিরাপত্তা। মহাকাশ যুগের ৫০ বছর পার হয়ে গেলেও রাসায়নিকভাবে বুস্টার রকেটগুলো মাত্ৰ প্ৰায় ১ শতাংশ বিপর্যয়কর ব্যর্থতার মুখে পড়েছে। (চ্যালেঞ্জার আর কলম্বিয়া স্পেস শাটলে দুটি বিপর্যয়ও রয়েছে এ ব্যর্থতার হারের মধ্যে। দুর্ভাগ্যক্রমে এতে ১৪ জন নভোচারী মারা যান।)

তারপরও গত কয়েক বছরে নিউক্লিয়ার রকেট নিয়ে গবেষণা আবারও চালু করেছে নাসা। ১৯৬০-এর দশকে NERVA প্রোগ্রামের পর এটাই প্রথমবার। ২০০৩ সালে নতুন এক প্রজেক্ট চালু করে। এর নামকরণ করা হয়েছে মানবজাতিকে প্রথম আগুন এনে দেওয়া গ্রিক দেবতা প্রমিথিউসের নামে। প্রমিথিউস প্রোগ্রামের জন্য ৪৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দ দেওয়া হয় ২০০৫ সালে। অবশ্য এই বরাদ্দ থেকে ২০০৬ সালে ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার কমানো হয়। তবে এ প্রজেক্টের ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত।

নিউক্লিয়ার পালসড রকেট

ভবিষ্যতের আরেকটি সম্ভাবনা হলো স্টারশিপকে চালাতে একগুচ্ছ মিনি নিউক্লিয়ার বোমা ব্যবহার করা। প্রজেক্ট ওরিয়নে মিনি পারমাণবিক বোমা রকেটের পেছন দিক দিয়ে ধারাবাহিকভাবে বের করে আনা হয়েছিল, যাতে নভোযান এই মিনি হাইড্রোজেন বোমার কারণে সৃষ্ট ধাক্কা চলতে পারে। তাত্ত্বিকভাবে, এ ধরনের নকশায় কোনো নভোযান আলোর গতির কাছাকাছি বেগে পৌঁছাতে সক্ষম। ১৯৪৭ সালে আসলে প্রথম এই নকশার জন্ম হয়েছিল স্টানিস্লা উলামের মাথায়। তিনিই প্রথম হাইড্রোজেন বোমার নকশা করতে সহায়তা করেন। আইডিয়াটি পরে আরও উন্নয়ন করেন টেড টেইলর (মার্কিন সেনাবাহিনীর নিউক্লিয়ার যুদ্ধাস্ত্রের প্রধান ডিজাইনারদের মধ্যে অন্যতম তিনি) আর প্রিন্সটনের ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্সড স্টাডির পদার্থবিদ ফ্রিম্যান ডাইসন।

এই আন্তনাক্ষত্রিক রকেটের জন্য ১৯৫০-এর দশকের শেষে ও ১৯৬০-এর দশকে বিস্তারিত হিসাব-নিকাশ করা হয়েছিল। হিসাবে দেখা গেল, এ রকম স্টারশিপে চড়ে প্লুটোতে যেতে-আসতে সময় লাগবে এক বছর। কারণ, এ স্টারশিপের সর্বোচ্চ গতিসীমা আলোর প্রায় ১০ শতাংশ। কিন্তু এই বেগেও আমাদের সবচেয়ে কাছের নক্ষত্রটিতে যেতে সময় লাগবে ৪৪ বছর। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এমন রকেট দিয়ে চালিত স্পেসশিপ বা স্পেস আর্ককে কয়েক শতাব্দী মহাকাশে ভ্রমণ করতে হতে পারে। সেখানে মাল্টিজেনারেশনাল যাত্রী থাকবে। স্পেসশিপে তাদের সন্তানেরা জন্মাবে ও পুরো জীবন ব্যয় করবে, যাতে বংশধরেরা প্রতিবেশী নক্ষত্রে পৌঁছাতে পারে।

১৯৫৯ সালে জেনারেল অ্যাটমিক নামের এক প্রতিষ্ঠান একটি প্রতিবেদনে ওরিয়ন স্পেসক্র্যাফটের আকার কতটুকু হতে পারে, তার হিসাব দেখায়। সুপার ওরিয়ন নামের সবচেয়ে বড় সংস্করণটির ওজন হতে পারে ৮ মিলিয়ন টন। এর ব্যাসার্ধ হবে ৪০০ মিটার। এতে শক্তি জোগাবে ১০০০টির বেশি হাইড্রোজেন বোমা।

এই প্রজেক্টের বড় একটি সমস্যা ছিল উৎক্ষেপণ করার সময় নিউক্লিয়ার দূষণের সম্ভাবনা। ডাইসন হিসাব করে দেখেন, প্রতিবার উৎক্ষেপণের সময় নিউক্লিয়ারের প্রভাবে ১০ জন মানুষের মারাত্মক ক্যানসার হতে পারে। আবার প্রতি উৎক্ষেপণে বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় পালস বা ইএমপি এতটাই বেশি হতে পারে যে তাতে পার্শ্ববর্তী বৈদ্যুতিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের শর্টসার্কিট ঘটাতে পারে।

১৯৬৩ সালে লিমিটেড টেস্ট ব্যান ট্রিটি স্বাক্ষর হওয়ায় এ প্রজেক্টের মৃত্যুঘণ্টা বেজে যায়। ক্রমান্বয়ে প্রজেক্টটির প্রধানতম চালিকা শক্তি, অর্থাৎ নিউক্লিয়ার বোমার ডিজাইনার টেড টেইলর হাল ছেড়ে দেন। (একবার তিনি আমাকে বলেছিলেন, যখন তিনি বুঝতে পারলেন, মিনি নিউক্লিয়ার বোমার পেছনের পদার্থবিজ্ঞান ব্যবহার করে সন্ত্রাসীরাও একসময় বহনযোগ্য নিউক্লিয়ার বোমা বানিয়ে ফেলতে পারবে, তখন ওই প্রজেক্ট নিয়ে শেষ পর্যন্ত হতাশ হয়ে পড়েন তিনি। এটি খুব বিপজ্জনক বলে মনে হওয়ায় শেষমেশ প্রজেক্টটি বাতিল করা হয়। এই নাম এখন টিকে আছে ওরিয়ন মহাকাশযানে। ২০১০ সালে স্পেশ শাটলের পরিবর্তনে একে বেছে নেয় নাসা।

নিউক্লিয়ার-চালিত রকেটের ধারণাটি ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত কিছুটা পুনর্নির্মাণ করে ব্রিটিশ ইন্টারপ্ল্যানেটারি সোসাইটি। এর নাম ছিল প্রজেক্ট ডিডেলাস। পৃথিবী থেকে ৫.৯ আলোকবর্ষ দূরের বার্নার্ড নক্ষত্রে পৌছাতে সক্ষম মানুষবিহীন স্টারশিপ বানানো সম্ভব কি না, তা নিয়ে এতে প্রাথমিক গবেষণা করা হচ্ছিল। (বার্নাড নক্ষত্র বেছে নেওয়ার কারণ, এতে একটি গ্রহ আছে বলে ধারণা করা হয়। এরপর থেকে জ্যোতির্বিদ জিল টার্টার ও মার্গারেট ট্রানবুল প্রাণ ধারণের উপযোগী গ্রহ থাকার সম্ভাবনা আছে এমন প্রতিবেশী ১৭,১২৯টি নক্ষত্রের তালিকা করেন। এর মধ্যে সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক নক্ষত্র ১১.৮ আলোকবর্ষ দূরের এপসিলন ইন্ডি এ।)

প্রজেক্ট ডেডিলাসের জন্য পরিকল্পিত রকেট শিপটি এত বড় ছিল যে তা মহাকাশে নির্মাণ করা লাগত। এর ওজন হতো ৫৪ হাজার টন, যার প্রায় সবটুকুই রকেটের জ্বালানির ওজন। রকেট শিপটি ৪৫০ টন ওজনের মালামাল নিয়ে আলোর গতির ৭.১ শতাংশ গতি অর্জন করতে সক্ষম। প্রজেক্ট ওরিয়নে ছোট ফিশন বোমা ব্যবহৃত হতো। অন্যদিকে প্রজেক্ট ডেডিলাসে ডিউটেরিয়াম/হিলিয়াম-৩-এর মিশ্রণে ইলেকট্রন বিমের মাধ্যমে প্রজ্বলিত করে মিনি হাইড্রোজেন বোমা ব্যবহারের কথা ভাবা হয়েছিল। কঠিন সব প্রযুক্তিগত সমস্যা ও নিউক্লিয়ার প্রোপালসন সিস্টেম নিয়ে উদ্বেগের কারণে প্রজেক্ট ডেডিলাসও অনির্দিষ্টকালের জন্য মুলতবি রাখা হয়েছে।

স্পেসিফিক ইমপালস ও ইঞ্জিনের দক্ষতা

প্রকৌশলীরা মাঝেমধ্যেই স্পেসিফিক ইমপালসের কথা উল্লেখ করেন। এর মাধ্যমে বিভিন্ন ইঞ্জিনের নকশার দক্ষতার শ্রেণিবিন্যাস করা যায়। ইঞ্জিনের জ্বালানির ভরের প্রতি এককের জন্য ইঞ্জিনের ভরবেগের পরিবর্তন দিয়ে সংজ্ঞায়িত করা হয় স্পেসিফিক ইমালস। কাজেই যে ইঞ্জিনের দক্ষতা যত বেশি, তা দিয়ে কোনো রকেটকে মহাকাশে নিয়ে যেতে তত কম জ্বালানির প্রয়োজন। নির্দিষ্ট সময়ে ক্রিয়াশীল ওই বলের কারণে ভরবেগ সৃষ্টি হয়। রাসায়নিক রকেটগুলোর থ্রাস্ট অনেক তীব্র হলেও এই রকেট মাত্র কয়েক মিনিট কার্যকর থাকতে পারে। সে জন্য এর স্পেসিফিক ইমপালস খুব কম। আয়ন ইঞ্জিন অনেক বছর কার্যকর থাকে। সে কারণে খুব অল্প থ্রাস্ট (ধাক্কা) থাকা সত্ত্বেও এই ইঞ্জিনের স্পেসিফিক ইমপালস অনেক বেশি।

স্পেসিফিক ইমপালসকে সেকেন্ডের হিসাবে পরিমাপ করা হয়। প্রচলিত কোনো রাসায়নিক রকেটের স্পেসিফিক ইমপালস সাধারণত ৪০০-৫০০ সেকেন্ড হতে পারে। (রাসায়নিক রকেটের সর্বোচ্চ স্পেসিফিক ইমপালস অর্জন করা সম্ভব হয়েছিল ৫৪২ সেকেন্ড। জ্বালানি হিসেবে হাইড্রোজেন, লিথিয়াম আর ফ্লোরিনের মিশ্রণ ব্যবহার করে এই ফলাফল পাওয়া গিয়েছিল।) স্মার্ট-১ আয়ন ইঞ্জিনের থ্রাস্টারের স্পেসিফিক ইমপালস ১৬৪০ সেকেন্ড। আর নিউক্লিয়ার রকেটের স্পেসিফিক ইমপালস পাওয়া যায় ৮৫০ সেকেন্ড।

কোনো রকেটের সম্ভাব্য সর্বোচ্চ স্পেসিফিক ইমপালস হতে পারে আলোর বেগের সমান। এর স্পেসিফিক ইমপালস হবে প্রায় ৩০ মিলিয়ন। নিচের তালিকায় বিভিন্ন ধরনের রকেট ইঞ্জিনের স্পেসিফিক ইমপালস দেখানো হয়েছে।

রকেট ইঞ্জিনের ধরন স্পেসিফিক ইমপালস

কঠিন জ্বালানি রকেট ২৫০

তরল জ্বালানি রকেট ৪৫০

আয়ন ইঞ্জিন ৩০০০

VASIMR প্লাজমা ইঞ্জিন ১০০০ থেকে ৩০,০০০

নিউক্লিয়ার ফিশন রকেট ৮০০ থেকে ১০০০

নিউক্লিয়ার ফিউশন রকেট ২৫০০ থেকে ২০,০০০০

নিউক্লিয়ার পালস রকেট ১০,০০০ থেকে ১০ লাখ

অ্যান্টিম্যাটার রকেট ১০ লাখ থেকে ১ কোটি

(তাত্ত্বিকভাবে, লেজার পাল ও র‍্যামজট ইঞ্জিনের স্পেসিফিক ইমপালস অসীম। কারণ, এতে কোনো রকেট জ্বালানি লাগে না। অবশ্য তাদের অন্য ধরনের সমস্যা আছে।)

স্পেস এলিভেটর

এসব রকেট নকশায় অনেকগুলো অভিযোগের মধ্যে অন্যতম গুরুতরটি হলো, এগুলোর আকৃতির বিশাল ও অনেক ভারী। তাই এদের ভূপৃষ্ঠে বানানো সম্ভব নয়। সে কারণে কিছু বিজ্ঞানী এসব রকেট মহাকাশে বানানোর প্রস্তাব দিয়েছেন। মহাশূন্যে ওজনহীনতার কারণে অসম্ভব রকম ভারী বস্তুও নভোচারীরা অনেক সহজে ওঠানামা করতে পারবেন। তবে মহাকাশে এগুলো বানানো অনেক খরুচে ব্যাপার বলে এরই মধ্যে ইঙ্গিত করেছেন অনেক সমালোচক। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের পুরোটা নির্মাণ সম্পন্ন করতে ১০০ বারের মতো মহাশূন্যে শাটল মিশন চালাতে হয়েছিল। আর এর নির্মাণ খরচ দাঁড়িয়েছে ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে ব্যয়বহুল বৈজ্ঞানিক প্রজেক্ট। আন্তনাক্ষত্রিক মহাকাশ পাল কিংবা র‍্যামজেট মহাশূন্যে বানাতে এর চেয়ে অনেক গুণ খরচ করতে হবে।

তবে বিজ্ঞান কল্পকাহিনি লেখক রবার্ট হেইনলেন বলতে পছন্দ করেন যে যদি ভূপৃষ্ঠের ১৬০ কিলোমিটার ওপরে ওঠা সম্ভব হয়, তাহলে সৌরজগতের যেকোনো জায়গায় যাওয়ার কাজটা অর্ধেক সম্পন্ন হয়ে যায়। কারণ, যেকোনো উৎক্ষেপণের প্রথম ১৬০ কিলোমিটারেই পৃথিবীর মহাকর্ষ থেকে রকেটকে মুক্ত হতে হয়। আর এতেই খরচ লাগে সবচেয়ে বেশি। এরপর রকেট শিপ প্লুটো বা তার সীমানা ছাড়িয়ে যেকোনো জায়গায় ভিড়তে পারে।

ভবিষ্যতে এই খরচ ব্যাপক কমানোর একটি উপায় হতে পারে স্পেস এলিভেটর বানানো। দড়ি বেয়ে মহাশূন্যে ওঠার ধারণা বেশ পুরোনো। যেমন রূপকথার জ্যাক অ্যান্ড দ্য বিনস্টক গল্পে এমনটি দেখা যায়। দড়িটিকে যদি মহাশূন্যের অনেক দূরে পাঠানো সম্ভব হয়, তাহলে বাস্তব হয়ে উঠতে পারে এটি। এরপর পৃথিবীর ঘূর্ণনের সেন্ট্রিফিউগাল বল বা কেন্দ্রাতিগ বলের মাধ্যমে মহাকর্ষ বলকে কাটানোর জন্য যথেষ্ট হতে পারে। তাতে দড়িটি কখনো আর নিচে পড়বে না। দড়িটি জাদুকরিভাবে খাড়াভাবে শূন্যে উঠে যাবে এবং একসময় তা হারিয়ে যাবে মেঘের ফাঁকে। (একটা দড়িতে বাধা বলের কথা ভাবুন। বলটি মহাকর্ষকে তুচ্ছ করে বলে মনে হয়, কারণ কেন্দ্রাতিগ বল (কেন্দ্রবিমুখী বল) একে ঘূর্ণনের কেন্দ্র থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। একইভাবে পৃথিবীর ঘূর্ণনের কারণে একটি লম্বা দড়ি বাতাসে ঝুলে থাকবে।) দড়িটিকে ধরে রাখতে পৃথিবীর ঘূর্ণন ছাড়া আর কিছুর প্রয়োজন নেই। তত্ত্ব অনুযায়ী, যে কেউ এই দড়ি বেয়ে ওপরে উঠে মহাশূন্যে আরোহণ করতে পারবে। নিউইয়র্কের সিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্ডারগ্র্যাজুয়েট ফিজিকস কোর্স নেওয়া শিক্ষার্থীদের মাঝেমধ্যে এ ধরনের একটি দড়িতে টান নির্ণয় করার সমস্যা দিই আমরা। সহজেই দেখানো যায়, দড়ির টান এতই হবে যে তা একটি ইস্পাতের তারও ছিঁড়ে ফেলতে পারবে। সে কারণেই স্পেস এলিভেটর বানানো অসম্ভব বলে অনেক দিন ধরে মনে করা হচ্ছে।

স্পেস এলিভেটর নিয়ে প্রথম যে বিজ্ঞানী গুরুত্বের সঙ্গে গবেষণা করেছেন, তিনি হলেন ভবিষ্যদ্রষ্টা রুশ বিজ্ঞানী কনস্টানটিন সিলোকোভস্কি। আইফেল টাওয়ার দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে ১৮৯৫ সালে তিনি মহাকাশ পর্যন্ত বিস্তৃত এক টাওয়ারের কল্পনা করেন। আর ওই টাওয়ারটি মহাশূন্যে পৃথিবীর সঙ্গে একটি স্বর্গীয় দুর্গকে সংযুক্ত করবে। সেটি ভূপৃষ্ঠে বানানো শুরু হবে এবং প্রকৌশলীরা ধীরে ধীরে সেই স্পেস এলিভেটরটিকে মহাশূন্যে বিস্তৃত করবেন।

১৯৫৭ সালে রুশ বিজ্ঞানী ইউরি আরষ্টুটানভ এর সমাধান হিসেবে বলেন, স্পেস এলিভেটরকে আসলে উল্টো করে বানাতে হবে। অর্থাৎ একে মহাশূন্য থেকে শুরু করতে হবে। তিনি মহাকাশের ৩৬ হাজার মাইল দূরের জিওস্টেশনারি কক্ষপথে একটি স্যাটেলাইটের কল্পনা করেছিলেন। সেখানে স্যাটেলাইটটি আপাতভাবে স্থির হয়ে থাকবে। আর সেখান থেকে পৃথিবীতে একটি তার ফেলে দেওয়া হবে। এরপর ভূপৃষ্ঠে নোঙর করে রাখা হবে ওই তারটিকে। কিন্তু এই স্পেস এলিভেটরের শিকলটির প্রায় ৬০ থেকে ১০০ গিগাপ্যাসকেল (জিপিএ) টান সহ্য করার ক্ষমতা থাকতে হবে। ইস্পাত প্রায় ২ জিপিএ টানেই ভেঙে যায়। কাজেই এ ধারণাটি এখনো বাস্তবে পরিণত করা যায়নি।

স্পেস এলিভেটরের ধারণাটিকে ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় করেন আর্থার সি ক্লার্ক। তাঁর ১৯৭৯ সালে প্রকাশিত দ্য ফাউন্ডেশন অব প্যারাডাইস উপন্যাসে এটি প্রকাশ করেন তিনি। এ ছাড়া রবার্ট হেইনলেন ১৯৮২ সালে তাঁর ফ্রাইডে উপন্যাসে স্পেস এলিভেটরের কথা উল্লেখ করেন। কিন্তু এরপর এর আর কোনো অগ্রগতি না থাকায় ধারণাটি বলতে গেলে স্রেফ মাঠে মারা গেছে।

রসায়নবিদেরা যখন কার্বন ন্যানোটিউব আবিষ্কার করলেন, তারপর এই দৃশ্যপট লক্ষণীয়ভাবে বদলে গেছে। ১৯৯১ সালে নিপ্পন ইলেকট্রিকের সুমিও ইজিমার গবেষণার কারণে হঠাৎ এই বিষয়ে সবার আগ্রহে বাড়িয়ে দিয়েছে (অবশ্য কার্বন ন্যানোটিউবের প্রথম প্রমাণ পাওয়া যায় ১৯৫০-এর দশকে। তবে সে সময় একে কোনো গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।) বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, ইস্পাতের তারের চেয়েও কার্বন ন্যানোটিউব অনেক বেশি শক্ত, কিন্তু ওজনে অনেক হালকা। আসলে স্পেস এলিভেটরের জন্য যে ধরনের শক্ত বস্তু দরকার, এগুলোর দৃঢ়তা তার চেয়ে বেশি। বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস, কার্বন ন্যানোটিউব ফাইবার ১২০ জিপিএ চাপ সহ্য করতে পারবে, যা কিনা ভঙ্গুর বিন্দুর চেয়ে বেশ এগিয়ে। এই আবিষ্কার স্পেস এলিভেটর নির্মাণে নতুন করে আশা জুগিয়েছে।

১৯৯৯ সালে নাসার একটি গবেষণার কারণে স্পেস এলিভেটর নিয়ে সবাই এখন গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে শুরু করেছে। এখন এমন এক রিবনের কথা কল্পনা করা হচ্ছে, যা প্রায় ১ মিটার প্রশস্ত ও ৪৭ কিলোমিটার লম্বা হবে। ১৫ টন মালামাল পৃথিবীর কক্ষপথে বহন করে নিয়ে যাওয়া যাবে এর মাধ্যমে। এ ধরনের স্পেস এলিভেটর স্পেস ট্রাভেলসংক্রান্ত অর্থনীতি পাল্টে দিতে পারে রাতারাতি। এর কারণে স্পেস ট্রাভেলের খরচ বিস্ময়করভাবে ১০ হাজার গুণ কমেও যেতে পারে। আর সেটি হবে বৈপ্লবিক এক পরিবর্তন।

বর্তমানে পৃথিবীর চারপাশের কক্ষপথে এক পাউন্ড ওজনের বস্তু পাঠাতে ১০ হাজার মার্কিন ডলার বা তার চেয়েও বেশি খরচ হয় (মোটামুটি সোনার দাম বলা যায়)। প্রতিটি স্পেস শাটল মিশনে খরচ হয় ৭০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। স্পেস এলিভেটর এই খরচ কমিয়ে প্রতি পাউন্ডে ১ মার্কিন ডলারে নামিয়ে আনতে পারে। মহাকাশ কার্যক্রমে খরচের এই অতি দরকারি হ্রাস করার মাধ্যমে স্পেস ট্রাভেলের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে। এলিভেটরের সাধারণ একটি সুইচ টিপেই বিমানের সমান ভাড়ায় তাত্ত্বিকভাবে একটি এলিভেটরকে মহাশূন্যে নিয়ে যাওয়া যাবে।

মহাশূন্যে যাওয়ার উপযোগী স্পেস এলিভেটর তৈরির আগে আমাদের বেশ কিছু কঠিন বাস্তবিক সমস্যার সমাধান করতে হবে। বর্তমানে গবেষণাগারে তৈরি করা বিশুদ্ধ কার্বন ন্যানোটিউব ফাইবার ১৫ মিলিমিটারের চেয়ে লম্বা বানানো যায়নি। স্পেস এলিভেটর বানাতে চাইলে এমন কার্বন ন্যানোটিউব বানানো দরকার, যার দৈর্ঘ্য হবে কয়েক হাজার মাইল লম্বা। অবশ্য বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি শুধুই এক যান্ত্রিক সমস্যা। কিন্তু সমস্যাটি এমনই কঠিন আর নাছোড়বান্দা যে এর সমাধান ছাড়া স্পেস এলিভেটর বানানো কোনোভাবে সম্ভব নয়। তবু কয়েক দশকের মধ্যে অনেক লম্বা কার্বন ন্যানোটিউব বানানোর প্রযুক্তিতে আমরা দক্ষ হয়ে উঠব বলে বিশ্বাস করেন অনেক বিজ্ঞানী।

দ্বিতীয়ত, কার্বন ন্যানোটিউবে মাইক্রোস্কোপিক ভেজালের কারণে অনেক লম্বা তার বানানো সমস্যাজনক হয়ে উঠতে পারে। ইতালির পলিটেকনিক অব তুরিনের নিকোলা পুগনো হিসাব করে দেখেছেন, কার্বন ন্যানোটিউবে একটি পরমাণু সঠিক সারিতে না বসলে তার শক্তি কমে যায় ৩০ শতাংশ। সর্বোপরি পারমাণবিক পরিসরের ত্রুটি কার্বন ন্যানোটিউব তারের দৃঢ়তা ৭০ শতাংশ কমিয়ে দিতে পারে। এতে স্পেস এলিভেটরের জন্য সর্বনিম্ন যে গিগাপ্যাসকেলের দৃঢ়তা দরকার, তার চেয়েও নিচে নেমে যায়।

স্পেস এলিভেটর নিয়ে বাণিজ্যিক আগ্রহ তৈরি করতে, দুটি আলাদা পুরস্কারের ব্যবস্থা করেছে নাসা। (১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের আনসারি এক্স-প্রাইজের মতো করে এই পুরস্কার দুটোর নকশা করা হয়েছে। মহাশূন্যে যাত্রী বহনযোগ্য বাণিজ্যিক রকেট নির্মাণে এটি সফলভাবে বাণিজ্যিক উদ্ভাবক প্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎসাহ জোগাতে পেরেছিল। ২০০৪ সালে এই এক্স-প্রাইজ জিতেছে স্পেসশিপ ওয়ান নামের একটি প্রতিষ্ঠান।) নাসা-ঘোষিত এই পুরস্কারকে বলা হয় বিম পাওয়ার চ্যালেঞ্জ ও টেথার চ্যালেঞ্জ। বিম পাওয়ার চ্যালেঞ্জে বিভিন্ন দলকে একটি শিকলে ঝোলানো অন্তত ২৫ কিলোগ্রামের একটি মেকানিক্যাল ডিভাইস সেকেন্ডে ১ মিটার গতিতে ৫০ মিটার দূরে পাঠাতে হয়। শুনতে সহজ মনে হলেও এখানে এই ডিভাইসটি কোনো জ্বালানি, ব্যাটারি কিংবা বৈদ্যুতিক তার ব্যবহার করে না। তার বদলে রোবট ডিভাইসটি সৌরকোষ, সোলার রিফ্লেকটর, লেজার বা মাইক্রোওয়েভের মাধ্যমে শক্তির জোগান পায়। এগুলোই আসলে মহাকাশের জন্য সবচেয়ে উপযোগী শক্তির উৎস।

অন্যদিকে টেথার চ্যালেঞ্জে, প্রতিটি দলকে অবশ্যই ২ মিটার লম্বা টেথার বা শিকল তৈরি করতে হয়, যার ওজন কোনোভাবেই ২ গ্রামের বেশি হবে না। আবার শিকলটিকে অবশ্যই আগের বছরের শিকলের তুলনায় ৫০ শতাংশ বেশি ওজন বহন করতে সক্ষম হতে হবে। মহাশূন্যে ১ লাখ কিলোমিটার তার বিছানোর জন্য হালকা কিন্তু শক্ত বস্তু তৈরির গবেষণায় উৎসাহ জাগানোর উদ্দেশ্যেই এ চ্যালেঞ্জের আয়োজন করা হয়। এই পুরস্কারের মূল্য দেড় লাখ, ৪০ হাজার ও ১০ হাজার মার্কিন ডলার। (২০০৫ সালে এ প্রতিযোগিতার প্রথম বছরে কেউই পুরস্কার জিততে পারেনি।)

সফল স্পেস এলিভেটর মহাকর্ষ কর্মসূচিতে বিপ্লব বয়ে আনলেও এ রকম যন্ত্রে কিছু বিপত্তিও আছে। যেমন, পৃথিবীর কাছের স্যাটেলাইটগুলো পৃথিবীর চারপাশে ঘোরার সময় তাদের গতিপথ বারবার বদলে যায় (কারণ, এদের ঠিক নিচেই পৃথিবী ঘুরছে)। এর মানে এসব স্যাটেলাইট ক্রমেই ঘণ্টায় ১৮ হাজার মাইল বেগে স্পেস এলিভেটরের সঙ্গে সংঘর্ষের মুখে পড়বে। এই গতি স্পেস এলিভেটরের শিকল ভেঙে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। এসব বিপর্যয় এড়াতে ভবিষ্যতে হয়তো স্যাটেলাইটের ডিজাইন এমন করতে হবে, যাতে তার সঙ্গে ছোট রকেটও থাকে। আর এই রকেটগুলো যাতে স্পেস এলিভেটরের চারপাশে ঘুরে যেতে পারে। অথবা এলিভেটরের শিকলটির সঙ্গে এমন কোনো ছোট রকেট জুড়ে দিতে হবে, যাতে কোনো স্যাটেলাইট তার কাছে এলে শিকলটি সরে যেতে পারে।

আবার অতি ক্ষুদ্র উল্কার সঙ্গে সংঘর্ষও আরেকটি সমস্যা। স্পেস এলিভেটর পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল থেকে অনেক ওপরে থাকার কারণে এটি ঘটবে। পৃথিবীর এ বায়ুমণ্ডল উল্কা থেকে আমাদের রক্ষা করে। অতি ক্ষুদ্র উল্কার সংঘর্ষ আগাম অনুমান করা যায় না। তাই স্পেস এলিভেটরে অবশ্যই অতিরিক্ত ঢাল যুক্ত করতে হবে। আবার ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও ঝড়ের মতো পৃথিবীর অস্থির আবহাওয়াও এতে বাজে প্রভাব ফেলতে পারে।

স্লিংশট ইফেক্ট

কোনো বস্তুকে আলোর গতির কাছাকাছি গতিতে ছুড়ে দেওয়া বোঝাতে স্লিংশট ইফেক্ট শব্দবন্ধটি ব্যবহার করা হয়। মহাকাশে অনুসন্ধানী নভোযান পাঠানোর সময়, নাসা মাঝেমধ্যে তাদের পার্শ্ববর্তী গ্রহের চারপাশে ঘুরিয়ে নেয়। এর মাধ্যমে নভোযানগুলো স্লিংশট ইফেক্ট ব্যবহার করে তাদের গতিবেগ বাড়িয়ে নিতে পারে। এভাবে মূল্যবান জ্বালানি খরচ বাঁচায় নাসা। ভয়েজার নভোযান এভাবে সৌরজগতের প্রায় শেষ প্রান্তের কাছের গ্রহ নেপচুনে পৌঁছেছিল।

প্রিন্সটনের পদার্থবিদ ফ্রিম্যান ডাইসন বলেন, অদূর ভবিষ্যতে হয়তো দুটি নিউট্রন স্টার খুঁজে পাওয়া যাবে, যারা পরস্পরের চারপাশে বিপুল বেগে ঘুরপাক খাচ্ছে। এই নিউট্রন স্টারের খুব কাছে গিয়ে তাদের চারপাশে ঘোরার পর আমরা মহাকাশে নিজেদের ছুড়ে দিতে পারব। এভাবে আলোর গতির তিন ভাগের এক ভাগ গতি অর্জন করা সম্ভব। এর ফলে হয়তো মহাকর্ষ ব্যবহার করে অতিরিক্ত গতি অর্জন করে আলোর গতির কাছাকাছি পৌঁছাতে পারব আমরা। কাগজে-কলমে বেশ কাজে দেয় এটি।

অন্য অনেকে এমন প্রস্তাব দিয়েছেন যে আলোর কাছাকাছি গতি অর্জন করতে আমরা আমাদের সূর্যের চারপাশেই ঘুরতে পারি। আসলে স্টার ট্রেক ফোর : দ্য ভয়েজ হোম-এ এন্টারপ্রাইজের ক্রুরা যখন ক্লিনগন শিপ হাইজ্যাক করে তখন পদ্ধতিটি ব্যবহার করা হয়েছিল। এরপর আলোর বাধা অতিক্রম করতে সূর্যের কাছে গিয়ে সময়ের অতীতে ফিরে যায় তারা। হোয়েন ওয়ার্ল্ডস কলাইড মুভিতে, পৃথিবী একবার এক গ্রহাণুর সঙ্গে সংঘর্ষের হুমকির মুখে পড়ে। বিপর্যয় থেকে বাঁচতে একটি বিশাল রোলার কোস্টার বানিয়ে তাতে চড়ে পৃথিবী থেকে পালিয়ে যান বিজ্ঞানীরা। এক রকেট শিপ রোলার কোস্টার থেকে নেমে একসময় বিপুল গতিবেগ অর্জন করে। তারপর রোলার কোস্টারের নিচ দিয়ে চারপাশে ঘুরপাক খেয়ে তীব্র বেগে মহাকাশে নিক্ষিপ্ত হয়।

সত্যি বলতে কি, মহাকর্ষ ব্যবহার করে গতিবেগ অর্জনের এই দুটি পদ্ধতির কোনোটিই মহাকাশে আমাদের কাজে লাগবে না। (শক্তির সংরক্ষণশীল নীতি। রোলার কোস্টারের নিচে গিয়ে এরপর আবার আগের জায়গায় এসে আমরা আসলে শেষ পর্যন্ত একই বেগেই থাকছি বা শুরুর বেগেই থাকছি। সুতরাং এখানে আসলে কোনো শক্তি অর্জিত হচ্ছে না। একইভাবে স্থির সূর্যের চারপাশে পাক খেয়েও আমরা আসলে শুরুর বেগেই থাকব।) তবে ডাইসনের দুটি নিউট্রন স্টার ব্যবহারের পদ্ধতি হয়তো কাজেও লাগতে পারে। কারণ, নিউট্রন স্টার খুব দ্রুতবেগে ঘুরপাক খায়। কোনো নভোযান এই স্লিংশট ইফেক্ট ব্যবহার করে কোনো গ্রহ বা নক্ষত্রের গতি থেকে শক্তি অর্জন করতে পারে। কিন্তু তারা স্থির হলে স্লিংশট ইফেক্ট কাজ করবে না।

ডাইসনের প্রস্তাবিত পদ্ধতি কাজের হলেও এ মুহূর্তে এটি পৃথিবীবন্দী বিজ্ঞানীদের কোনো কাজে লাগবে না। কারণ, সে জন্য আমাদের ঘূর্ণমান নিউট্রন স্টারে যাওয়ার উপযোগী স্টারশিপ দরকার।

রেল গানের মাধ্যমে মহাকাশে

মহাশূন্যে বিস্ময়কর গতিতে কোনো বস্তু ছুড়ে দেওয়ার আরেকটি সৃজনশীল পদ্ধতি হলো রেল গান। আর্থার সি ক্লার্ক ও অন্য লেখকেরা বিজ্ঞান কল্পগল্পে এ বিষয়ে বর্ণনা করেছেন। স্টার ওয়ার্সের মিসাইল শিল্ডের অংশ হিসেবেও এটি পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে।

কোনো বস্তু বা ক্ষেপণাস্ত্রকে উচ্চ বেগে ছুড়ে দিতে রকেটের জ্বালানি বা গানপাউডারের পরিবর্তে রেল গানে বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় শক্তি ব্যবহার করা হয়।

এর গঠন বেশ সহজ। একটি রেল গানে দুটি সমান্তরাল তার বা রেল থাকে, সঙ্গে থাকে একটি ক্ষেপণাস্ত্র, যা দুটি তারের সঙ্গে জুড়ে ইউ আকৃতি গঠন করে। মাইকেল ফ্যারাডেও জানতেন, বিদ্যুতের প্রবাহ কোনো চুম্বকীয় ক্ষেত্রে রাখা হলে একটি বল অনুভব করা যায়। (আসলে এটি ইলেকট্রিক মোটরের ভিত্তি।) এই তারগুলোর মধ্যে এবং একই সঙ্গে ওই ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্য দিয়ে কয়েক মিলিয়ন অ্যাম্পিয়ার বৈদ্যুতিক শক্তি পাঠিয়ে রেলের চারপাশে সৃষ্টি করা হয় বিপুল শক্তিশালী চুম্বকীয় ক্ষেত্র। চুম্বকীয় ক্ষেত্রটি এরপর ক্ষেপণাস্ত্রটিকে রেলের ওপর দিয়ে বিপুল বেগে চালিয়ে নিয়ে যায়।

রেল গান বেশ সফলভাবে ধাতব বস্তুকে বিপুল বেগে সংক্ষিপ্ত দূরত্বে নিয়ে যেতে পারে। লক্ষণীয় ব্যাপার হলো, তাত্ত্বিকভাবে একটি সরল রেল গান কোনো ধাতব ক্ষেপণাস্ত্রকে ঘণ্টায় ১৮ হাজার মাইল বেগে ছুড়ে দিতে পারবে। তাতে পৃথিবীর চারপাশের কক্ষপথে চলে যেতে পারবে ক্ষেপণাস্ত্রটি। তত্ত্ব অনুযায়ী, নাসার পুরো রকেট ফ্লিটকে রেল গান দিয়ে প্রতিস্থাপন করা যায়, যা পেলোড বা মালামাল পৃথিবী থেকে কক্ষপথে নিয়ে যেতে পারবে।

রাসায়নিক রকেট ও বন্দুকের বিপরীতে রেল গানের গুরুত্বপূর্ণ কিছু সুবিধা রয়েছে। একটি রাইফেলে প্রসারণশীল গ্যাস একটি বুলেটকে ধাক্কা দিতে পারে, কিন্তু শক ওয়েভের গতির কারণে তার চূড়ান্ত বেগ সীমাবদ্ধ। অবশ্য জুল ভার্ন তাঁর ফ্রম দ্য আর্থ টু দ্য মুন নামের ক্ল্যাসিক উপন্যাসে গানপাউডার ব্যবহার করে নভোচারীদের চাঁদে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সহজেই হিসাব করা যায়, গানপাউডার ব্যবহার করে যে গতি অর্জিত হবে, তা আসলে চাঁদে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় গতির ভগ্নাংশ মাত্র। তবে রেল গান শক ওয়েভের গতির কারণে সীমাবদ্ধ নয়।

কিন্তু রেল গানেরও কিছু সমস্যা রয়েছে। এটি বস্তুকে এতই দ্রুত ত্বরণ ঘটায় যে সেগুলো সাধারণত বাতাসের সঙ্গে প্রতিক্রিয়ায় চ্যাপ্টা হয়ে, যায়। রেল গানের ব্যারেল থেকে যে প্রক্রিয়ায় ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে দেওয়া হয় তাতে মারাত্মকভাবে বিকৃত হয়ে যায় পেলোড বা মালামাল। কারণ, ক্ষেপণাস্ত্রটি যখন বাতাসে আঘাত হানে, সেটা অনেকটা ইটের দেয়ালে আঘাত হানার মতো। আবার রেলের পাশাপাশি বিপুল ত্বরণও পেলোড বিকৃত করার জন্য যথেষ্ট। ক্ষেপণাস্ত্রের কারণে ট্র্যাকও নষ্ট হয়ে যায়। তাই ট্র্যাকও নিয়মিত পাল্টাতে হয়। আবার কোনো নভোচারীর ওপর মহাকর্ষ বল এতই বেশি হয় যে তাতে তার দেহের সব হাড় ভেঙে তিনি মারাও যেতে পারেন।

চাঁদের মাটিতে রেল গান স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছেন অনেকে। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের বাইরে কোনো রেল গানের ক্ষেপণাস্ত্রের বেগ মহাকাশের শূন্যস্থানের ভেতর দিয়ে কোনো বাধা ছাড়াই চলতে পারবে। কিন্তু তারপরও রেল গানের বিপুল ত্বরণের কারণে পেলোড ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এক অর্থে রেল গান হলো লেজার পালের ঠিক উল্টো। কারণ, লেজার পাল তাদের চূড়ান্ত গতিবেগ অর্জন করে দীর্ঘ সময় পর। রেল গানের কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। কারণ, ছোট্ট জায়গায় তারা অনেক বেশি শক্তি ধারণ করে।

রেল গান ব্যবহার করে প্রতিবেশী কোনো নক্ষত্রে বস্তু পাঠানো বেশ ব্যয়বহুল। এ ব্যাপারে একটি প্রস্তাব হলো, রেল গানকে মহাকাশে নির্মাণ করা। মানে, পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্বের দুই-তৃতীয়াংশ এলাকায় রেল গান বানিয়ে নেওয়া। তাতে সূর্য থেকে এটি সৌরশক্তি সংরক্ষণ করতে পারবে। তারপর এই শক্তিকে অতি দ্রুত রেল গানে ব্যবহার করে ১০ টন পেলোড আলোর এক-তৃতীয়াংশ গতিবেগে পাঠানো যাবে। এর ত্বরণ হবে ৫০০০ g সন্দেহ নেই, এ রকম বিপুল ত্বরণে একমাত্র শক্তিশালী রোবটিক পেলোডের পক্ষেই টিকে থাকা সম্ভব।

মহাকাশ ভ্রমণের বিপদ

বলা বাহুল্য, স্পেস ট্রাভেল কোনো পিকনিক নয়। মঙ্গল গ্রহে কিংবা অন্য কোনো গ্রহে ভ্রমণরত মানুষবাহী ফ্লাইটের জন্য হাজারো বিপদ ওত পেতে রয়েছে। কয়েক লাখ বছর ধরে পৃথিবীতে জীবন রয়েছে নিরাপদ এক আশ্রয়ের মধ্যে। এই গ্রহের ওজোন স্তর পৃথিবীকে ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি থেকে রক্ষা করছে, সৌরতরঙ্গ/সৌরবায়ু ও মহাজাগতিক রশ্মি থেকে রক্ষা করছে এর চুম্বকীয় ক্ষেত্র। আবার পৃথিবীর ঘন বায়ুমণ্ডল উল্কা থেকে সুরক্ষা দেয়। এর কারণেই উল্কা পুড়ে ভস্ম হয়ে যায়। পৃথিবীতে যে মৃদু তাপমাত্রা ও বায়ুচাপ দেখা যায়, তা আমাদের আমলে নিতে হবে। কিন্তু গভীর মহাকাশে মহাবিশ্বের অধিকাংশ জায়গা বিক্ষুব্ধ এবং সেখানে ক্ষতিকর বিকিরণ বলয় আর ভয়ানক সব উল্কার রাজত্ব—সেই বাস্তবতা আমাদের মেনে নিতেই হবে।

মহাকাশ ভ্রমণের প্রথম যে সমস্যাটি সমাধান করতে হবে, সেটি ওজনহীনতা। দীর্ঘ মেয়াদে ওজনহীনতা নিয়ে রুশদের গবেষণায় দেখা গেছে, এতে দেহ মূল্যবান খনিজ ও রাসায়নিক হারায়। আর সেটি প্রত্যাশার চেয়েও অনেক দ্রুত ঘটে। এমনকি স্পেস স্টেশনে কঠোর ব্যায়াম কর্মসূচির পরও রুশ নভোচারীদের হাড় ও পেশি এতই দুর্বল হয়ে গিয়েছিল যে তারা পৃথিবীতে ফিরে শিশুর মতো কোনোমতে হামাগুড়ি দিতে পারতেন। দীর্ঘ সময় মহাকাশে ওজনহীন অবস্থায় থাকার পরিণতি হলো পেশির দুর্বলতা, কঙ্কালতন্ত্রের ক্ষয়, লোহিত রক্তকণিকার নিম্নমুখী উৎপাদন, দেহের নিম্নমুখী প্রতিরক্ষা সাড়া ও ফুসফুসতন্ত্রের ক্রমহ্রাসমান কার্যকারিতা।

মঙ্গলে অভিযানে সময় লাগতে পারে কয়েক মাস থেকে এক বছর। এতে আমাদের নভোচারীদের সহনশীলতার সীমা ছাড়িয়ে যেতে পারে। আর প্রতিবেশী নক্ষত্রগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি অভিযানে এসব সমস্যা হয়ে উঠতে পারে আরও মারাত্মক। ভবিষ্যতের স্টারশিপে সে কারণে ঘূর্ণনব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। এর মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে মহাকর্ষ সৃষ্টি করা যায় সেন্ট্রিফিউগাল বলের মাধ্যমে। তাতে নভোযানের মানুষগুলো টিকে থাকতে পারবে। এতে ভবিষ্যতের স্টারশিপগুলোর ব্যয় ও জটিলতা বেড়ে যাবে অনেক গুণ।

দ্বিতীয়ত, মহাকাশে অতি ক্ষুদ্র উল্কাগুলো প্রতি ঘণ্টায় অনেক হাজার মাইল বেগে চলাফেরা করছে। এদের থেকে সুরক্ষার জন্য স্টারশিপগুলোকে অতিরিক্ত ঢাল ব্যবহার করতে হবে। স্পেশ শাটলের নিবিড় পরীক্ষায় প্রমাণ দেখা গেছে, অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ও সম্ভাব্য মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব আসতে পারে এসব অতি ক্ষুদ্র উল্কা থেকে। ভবিষ্যতে স্পেসশিপগুলোতে ক্রুদের জন্য বিশেষভাবে অতিরিক্ত শক্তিশালী চেম্বার রাখতে হবে।

মহাকাশের বিকিরণের মাত্রা আগে যে রকম ভাবা হতো, বাস্তবে তার চেয়েও অনেক বেশি। যেমন ১১ বছরের সৌরকলঙ্কের চক্রে সৌরবায়ু থেকে বিপুল পরিমাণ মারাত্মক প্লাজমা পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসে। অতীতে এ ঘটনার কারণে সম্ভাব্য প্রাণঘাতী অতিপারমাণবিক কণার প্রবল স্রোতের বিরুদ্ধে স্পেস স্টেশনের নভোচারীরা বিশেষ সুরক্ষাব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়েছিল। স্পেস ওয়াকের সময় এ ধরনের সৌর নির্গমন মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে। (এমনকি লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে নিউইয়র্ক পর্যন্ত সামান্য ট্রান্স-আটলান্টিক ট্রিপে প্রতিটি যাত্রার সময়ও প্রতি ঘণ্টায় প্রায় এক মিলিরেম বিকিরণ নিঃসৃত হয়। এ যাত্রায় আমাদের ওপর যে পরিমাণ বিকিরণ নিঃসৃত হয়, তা প্রায় দাঁতের এক্স-রে করার মতো।) অন্যদিকে গভীর মহাশূন্যে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ও চুম্বকীয় ক্ষেত্র আমাদের সুরক্ষা দিতে পারবে না। তাতে বিকিরণ আমাদের জন্য ভয়াবহ এক সমস্যা হয়ে দেখা দিতে পারে।

বিলম্বিত দৈহিক সক্রিয়তা

এ পর্যন্ত রকেটের যেসব নকশা নিয়ে আলোচনা করলাম, তার একটি গ্রহণযোগ্য সমালোচনা হলো, নিকটবর্তী কোনো নক্ষত্রে যেতে এ রকম স্টারশিপ বানানো গেলেও সে জন্য সময় লেগে যেতে পারে কয়েক দশক থেকে কয়েক শতাব্দী। এ ধরনের কোনো অভিযানের জন্য বহু প্রজন্মের ক্রু যুক্ত থাকার দরকার হবে। তাদের উত্তরসূরিরাই হয়তো পৌঁছাতে পারবে কাঙ্ক্ষিত চূড়ান্ত গন্তব্যে।

এর একটি সমাধান দেখানো হয়েছে এলিয়েন অ্যান্ড প্ল্যানেট অব দ্য এপস-এর মতো কিছু মুভিতে। সেটি হলো মহাকাশ অভিযাত্রীদের সাসপেন্ডেড অ্যানিমেশন বা বিলম্বিত দৈহিক সক্রিয়তা অভিজ্ঞতার মধ্যে থাকা। অর্থাৎ তাদের দেহের তাপমাত্রা এমন সতর্কভাবে কমিয়ে আনা, যতক্ষণ না তার দৈহিক কার্যপ্রণালি প্রায় থেমে যায়। যেসব প্রাণী হাইবারনেট করে বা শীতনিদ্রা যায়, তারা প্রতিবছর শীতে এই প্রক্রিয়া কাজে লাগায়। নির্দিষ্ট কিছু মাছ ও ব্যাঙ বরফের মধ্যে জমে কঠিন হয়ে বেঁচে থাকতে পারে। এরপর তাপমাত্রা বেড়ে গেলে তারা সেখান থেকে লাফিয়ে চলে যায়।

এই আগ্রহোদ্দীপক ঘটনা নিয়ে গবেষণা করা জীববিজ্ঞানীদের বিশ্বাস, এসব প্রাণীর প্রাকৃতিকভাবে অ্যান্টিফ্রিজ বা জমাট বাঁধাবিরোধী উপাদান তৈরির ক্ষমতা আছে। এগুলো পানির ফ্রিজিং পয়েন্টকে (যে তাপমাত্রায় পানি জমে বরফ হয়) নিচে নামিয়ে দেয়। এই প্রাকৃতিক অ্যান্টিফ্রিজ হিসেবে মাছের মধ্যে নির্দিষ্ট কিছু প্রোটিন থাকে আর ব্যাঙের মধ্যে থাকে নির্দিষ্ট গ্লুকোজ। রক্তের মধ্যে এসব প্রোটিন চলাচলের কারণে মেরু অঞ্চলের মাইনাস ২ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় মাছ টিকে থাকতে পারে। ব্যাঙের মধ্যে উচ্চ মাত্রার গ্লুকোজ বজায় রাখার ক্ষমতা তৈরি হয়। এর ফলে বরফ স্ফটিক হয়ে যাওয়া থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারে তারা। তাদের দেহের বাইরের অংশ জমে কঠিন অবস্থায় চলে গেলেও ভেতরের কোনো কিছু জমাট বাঁধে না। এভাবে তাদের দেহের একটি হ্রাসমান পর্যায়ে হলেও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সচল রাখতে পারে।

তবে এ ক্ষমতায় অভিযোজিত হওয়ার ক্ষেত্রে স্তন্যপায়ী প্রাণীদের সমস্যা রয়েছে। মানুষের টিস্যু জমাট বেঁধে গেলে কোষের ভেতরে বরফের ক্রিস্টাল বা স্ফটিক গঠিত হতে থাকে। বরফের স্ফটিক বাড়তে থাকলে সেগুলো কোষঝিল্লির ভেতর ঢুকে কোষঝিল্লি ধ্বংস করে দেয়। (তাই মৃত্যুর পর যেসব তারকা তরল নাইট্রোজেনে তাঁদের মাথা ও দেহ জমাট বাঁধিয়ে রাখতে চান, তাঁদের আরেকবার ভেবে দেখা উচিত।)

এসব সমস্যা সত্ত্বেও সম্প্রতি সীমিত পরিসরে কিছু অগ্রগতির খবর পাওয়া গেছে। যেসব স্তন্যপায়ী প্রাণী সাধারণত হাইবারনেট করে না (ইঁদুর ও কুকুর), তাদের সীমিত পরিসরে সাসপেন্ডেড অ্যানিমেশন করে দেখা হয়েছে। ২০০৫ সালে পিটসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা কুকুরের রক্ত বরফশীতল এক বিশেষ মিশ্রণের মাধ্যমে প্রতিস্থাপন করে তাদের জীবিত করতে সক্ষম হন। তিন ঘণ্টা ধরে ক্লিনিক্যালি ডেড থাকা কুকুরগুলোর হার্ট পুনরায় সচল করার পর তারা আবারও জীবিত হয়ে ওঠে। (এই ঘটনার পর বেশির ভাগ কুকুরই সুস্থ ছিল। তবে কিছু কুকুর ব্রেন ড্যামেজে আক্রান্ত হয়।)

ওই বছরই হাইড্রোজেন সালফাইড থাকা একটি চেম্বারে কিছু ইঁদুর রেখে পরীক্ষা চালান বিজ্ঞানীরা। তাদের দেহের তাপমাত্রা ১৩ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড কমিয়ে আনা হয়েছিল প্রায় ছয় ঘণ্টা ধরে। ফলে ইঁদুরগুলোর বিপাকক্রিয়ার হার স্বাভাবিকের চেয়ে ১০ শতাংশ কমে যায়। শূকর ও ইঁদুরকে হাইড্রোজেন সালফাইড ব্যবহার করে ২০০৬ সালে সাসপেন্ডেড অ্যানিমেশন অবস্থায় রাখেন বোস্টনের ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতলের চিকিৎসকেরা।

ভবিষ্যতে এ ধরনের পদ্ধতি হয়তো গুরুতর দুর্ঘটনা বা হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত মানুষের জীবন বাঁচাতে সহায়তা করবে। রোগীকে চিকিৎসার আওতায় নিয়ে আসার আগ পর্যন্ত চিকিৎসকদের জন্য হয়তো সময় থামিয়ে দেবে সাসপেন্ডেড অ্যানিমেশন। তবে নভোচারীর ওপর এ রকম কৌশল ব্যবহারোপযোগী করে তুলতে আরও কয়েক দশক বা তারও বেশি সময় লেগে যেতে পারে। কারণ, নভোচারীদের জন্য হয়তো কয়েক শতক টিকে থাকার মতো সাসপেন্ডেড অ্যানিমেশনের প্রয়োজন।

ন্যানোশিপ

বিভিন্ন নক্ষত্রে আমাদের পৌঁছানোর এ ছাড়া আরও অনেকগুলো উপায় থাকতে পারে। সেগুলো আরও উন্নত ও এখন পর্যন্ত অপ্রমাণিত সব প্রযুক্তি। সাধারণত এসব প্রযুক্তি নিয়ে বিজ্ঞান কল্পকাহিনির গণ্ডির মধ্যে আলোচিত হয়। এগুলোর মধ্যে একটি গ্রহণযোগ্য প্রস্তাব হলো ন্যানো প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে মানুষবিহীন অনুসন্ধানী নভোযান। এ আলোচনায় আমি অনুমান করে নিয়েছি, স্টারশিপের জন্য প্রয়োজন বিশাল আকৃতির যন্ত্র, যেগুলো বিপুল পরিমাণ শক্তি ব্যবহার করবে। পাশাপাশি স্টার ট্রেক সিরিজের এন্টারপ্রাইজ স্টারশিপের মতো সেগুলো নক্ষত্রগুলোতে বিপুলসংখ্যক অভিযাত্রী বহন করতে পারবে।

কিন্তু শুরুতে বহুদূর নক্ষত্রগুলোতে আলোর কাছাকাছি বেগে ক্ষুদ্র মানুষবিহীন অনুসন্ধানী নভোযান পাঠানো তুলনামূলক বেশি সুবিধাজনক হয়ে উঠতে পারে। আগেই বলেছি, ভবিষ্যতে ন্যানো প্রযুক্তি ব্যবহার করে ক্ষুদ্রাকৃতির নভোযান বানানোর সম্ভাবনা রয়েছে। সেগুলো পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করবে ও তাদের ভেতরের যন্ত্রপাতি হবে অণুর সমান। এগুলো অতি হালকা হওয়ার কারণে আয়ন খুব সহজে আলোর কাছাকাছি বেগ অর্জন করতে পারে। গবেষণাগারে সাধারণ ভোল্টেজ ব্যবহার করে এমন ফল পাওয়া গেছে। বিশালাকৃতির বুস্টার রকেটের বদলে এগুলোকে হয়তো বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় ক্ষেত্র ব্যবহার করে আলোর কাছাকাছি গতিতে কোথায় পাঠানো যাবে। এর মানে, ন্যানোবটকে আয়নিত করা হলে ও কোনো চুম্বকীয় ক্ষেত্রে রাখা হলে তা মসৃণভাবে আলোর কাছাকাছি বেগে চলতে থাকবে। মহাকাশে ঘর্ষণজনিত বাধা না থাকায় ন্যানোবট এরপর নোঙর ফেলতে পারবে বিভিন্ন নক্ষত্রে। এভাবে বৃহৎ আকৃতির স্টারশিপে উদ্ভূত অনেকগুলো সমস্যা বেশ দ্রুত সমাধান করা সম্ভব। মানুষবাহী বিশাল আকৃতির স্টারশিপ বানানো ও চালানোর বিপুল খরচের সামান্য অংশ ব্যয় করে মানুষবিহীন বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন ন্যানোবট স্পেসশিপ পার্শ্ববর্তী নক্ষত্র ব্যবস্থায় পৌঁছাতে পারবে।

এ ধরনের ন্যানোশিপ ব্যবহার করে প্রতিবেশী নক্ষত্রগুলোতে যাওয়া যাবে। মার্কিন এয়ারফোর্সের অবসরপ্রাপ্ত অ্যাস্ট্রোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার জেরাল্ড নোর্ডলির মতে, সৌরপালে ধাক্কা দিয়ে মহাশূন্যে চালিয়ে নেওয়ার কাজেও ব্যবহার করা যাবে একে। নোর্ডলির বলেন, ‘আলপিনের মাথার মতো ছোট আকৃতির একগুচ্ছ নভোযান উড়ে চলবে আর তারা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখবে। এদের কার্যত একটি ফ্ল্যাশলাইট দিয়েও ধাক্কা দেওয়া সম্ভব।’

তবে ন্যানো স্টারশিপেও কিছু ঝামেলা আছে। গভীর মহাকাশে বিদ্যুৎ ও চুম্বকীয় ক্ষেত্রের কারণে নির্ধারিত পথ থেকে বিচ্যুত হতে পারে তারা। এ ধরনের বলক্ষেত্রের সঙ্গে যাতে কোনোভাবে প্রভাবিত না হয়, সে জন্য ওই ন্যানোশিপকে পৃথিবীতেই খুবই উচ্চ ভোল্টেজে ত্বারিত করতে হবে। এর ফলে সহজে আর বিচ্যুত হবে না তারা। দ্বিতীয়ত, আমরা হয়তো ঝাঁকে ঝাঁকে কয়েক লাখ এ ধরনের ন্যানোবট স্টারশিপ পাঠাতে পারি। এর মাধ্যমে তাদের একটি নির্দিষ্টসংখ্যক ন্যানোবট যাতে অন্তত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে, সে নিশ্চয়তা থাকবে। প্রতিবেশী নক্ষত্রগুলোতে অনুসন্ধান চালাতে ঝাঁকে ঝাঁকে ন্যানোবট স্টারশিপ পাঠানোর ব্যাপারটা অনেকের কাছে অতিরঞ্জিত মনে হতে পারে। তবে এ ধরনের স্টারশিপ অনেক সস্তা হয়ে উঠবে একসময়। তাই এ রকম কোটি কোটি ন্যানোশিপ বানানো সম্ভব। তবে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাবে হয়তো তাদের অতি সামান্য অংশই।

প্রশ্ন হলো, এসব ন্যানোশিপের চেহারা কেমন হবে? নাসার সাবেক প্রধান ড্যান গোল্ডিনের মতে, এগুলো হবে কোকের ক্যান আকৃতির। অন্যদের মতে, স্টারশিপগুলো সুইয়ের মতো হতে পারে। পেন্টাগন অনেক দিন ধরে স্মার্ট ডাস্ট বা ধুলো তৈরির সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করছে। স্মার্ট ধুলো আসলে ধুলো আকারের কণা, যাদের ভেতরে অতি ক্ষুদ্র সেন্সর থাকবে। যুদ্ধ পরিস্থিতির তাৎক্ষণিক তথ্য পেতে সেগুলো যুদ্ধক্ষেত্রে স্প্রে করা হতে পারে। ভবিষ্যতে স্মার্ট ধুলো পার্শ্ববর্তী নক্ষত্রে পাঠানো হতে পারে বলে ধরে নেওয়া যায়।

ধুলো আকারের ন্যানোবটের ইলেকট্রিক সার্কিট বানানো হবে সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রিতে ব্যবহৃত ছাপ দেওয়ার টেকনিক ব্যবহার করে। এতে ৩০ ন্যানোমিটারের মতো ছোট আকৃতির বস্তু বানানো সম্ভব। অর্থাৎ এর মাধ্যমে মোটামুটি ১৫০টি অণু আড়াআড়ি স্থাপন করা যাবে। এসব ন্যানোবটকে চাঁদের মাটি থেকে চালু করা হবে রেল গান কিংবা কণা ত্বরক যন্ত্র দিয়ে। কণা ত্বরণ যন্ত্র অতিপারমাণবিক কণাকে প্রায় আলোর কাছাকাছি গতিতে পাঠাতে পারে। মহাকাশে কোটি কোটি ন্যানোবট পাঠানোর জন্য এসব যন্ত্রকে অবশ্যই বেশ সস্তা হতে হবে।

এগুলো নিকটবর্তী কোনো নক্ষত্রব্যবস্থায় পৌঁছালে ন্যানোবটগুলো সেখানকার জনশূন্য বা নিষ্প্রাণ কোনো চাঁদে অবতরণ করতে পারবে। চাঁদের মহাকর্ষ কম হওয়ার কারণে সেখানে সহজেই অবতরণ করতে আর সেখান থেকে ফিরে আসতে পারবে ন্যানোবট। আবার এসব চাঁদের স্থিতিশীল পরিবেশের কারণে এটিই হয়ে উঠতে পারে অভিযান চালানোর জন্য আদর্শ ঘাঁটি। ওই চাঁদে প্রাপ্ত খনিজ ব্যবহার করে ন্যানোবট দিয়ে বানানো যেতে পারে ন্যানোফ্যাক্টরি। এভাবে হয়তো একটি শক্তিশালী রেডিও স্টেশন বানানো যাবে, যা পৃথিবীতে তথ্য পাঠাতে পারবে। কিংবা ন্যানোফ্যাক্টরি এমনভাবে ডিজাইন করতে হবে, যা নিজের কোটি কোটি প্রতিলিপি বানিয়ে ওই সৌরব্যবস্থায় অনুসন্ধান চালাবে এবং পার্শ্ববর্তী অন্যান্য নক্ষত্রেও অভিযান চালাবে। এভাবে একই প্রক্রিয়ার পুনরাবৃত্তি করতে থাকবে তারা। এই শিপগুলো রোবটিক হওয়ার কারণে এদের পৃথিবীতে ফিরে আসার কোনো দরকার হবে না। বরং রেডিও স্টেশন ব্যবহার করে তারা তথ্য পাঠাতে থাকবে।

এইমাত্র যে ন্যানোবটের কথা বললাম, এদের মাঝেমধ্যে নিওম্যান প্রোবও বলা হয়। এই নাম দেওয়া হয়েছে বিখ্যাত গণিতবিদ জন ভন নিওম্যানের নামানুসারে। নিজের প্রতিলিপি বানাতে সক্ষম টুরিং মেশিনের গণিত সমাধান করেছিলেন তিনি। তাত্ত্বিকভাবে, নিজস্ব প্রতিলিপি বানাতে সক্ষম এ রকম ন্যানোবট স্পেসশিপ হয়তো শুধু পার্শ্ববর্তী নক্ষত্রগুলোতেই নয়, বরং পুরো গ্যালাক্সিতেই অনুসন্ধান চালাতে পারবে। ক্রমান্বয়ে পুরো এলাকায় কয়েক ট্রিলিয়ন ন্যানোবট থাকতে পারে, তারা সূচকীয় হারে বা প্রায় আলোর বেগে তাদের সংখ্যা বাড়তে থাকবে। এই প্রসারমাণ এলাকার ভেতর ন্যানোবটগুলো কয়েক হাজার বছরের মধ্যে পুরো গ্যালাক্সিতে কলোনি স্থাপন করে ফেলতে পারবে।

এক ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ন্যানোশিপের এই আইডিয়াটি বেশ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন। তিনি ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানের অধ্যাপক ব্রায়ান গিলক্রিস্ট। একটি ব্যাকটেরিয়া আকারের ন্যানোশিপ বানাতে গবেষণার জন্য সম্প্রতি নাসার ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্সড কনসেপ্ট থেকে ৫ লাখ মার্কিন ডলার অনুদান পেয়েছেন তিনি। সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রিতে যে ছাপ দেওয়া প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়, সেই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তিনি লাখ লাখ ন্যানোশিপ বাহিনী বানানোর পরিকল্পনা করছেন। মাত্র কয়েক ন্যানোমিটার চওড়ার অতি ক্ষুদ্র ন্যানোকণা বের করে দিয়ে এসব ন্যানোশিপ চালিত হতে পারবে নিজে নিজেই। কোনো বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রের মধ্য দিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে ন্যানোকণাগুলো শক্তির জোগান পাবে, অনেকটা আয়ন ইঞ্জিনের মতো। প্রতিটি ন্যানোকণার ওজন একটি আয়নের তুলনায় কয়েক হাজার গুণ বেশি হওয়ার কারণে প্রচলিত আয়ন ইঞ্জিনের চেয়ে এই ইঞ্জিনগুলো অনেক বেশি ধাক্কা তৈরি করতে পারবে। কাজেই ন্যানোশিপের ইঞ্জিনের সুবিধা প্ৰায় আয়ন ইঞ্জিনের মতো হলেও এর থেকে বাড়তি যে সুবিধাটুকু পাওয়া যাবে সেটি হলো, এর অনেক বেশি থ্রাস্ট। গিলক্রিস্ট এরই মধ্যে এই ন্যানোশিপ বানানোর জন্য কিছু যন্ত্রাংশে ছাপ দিতে শুরু করেছেন। এভাবে তিনি একটি সিলিকন চিপের ভেতর ১০ হাজার আলাদা থ্রাস্টার রাখতে পারবেন। আর এর আকার হবে মাত্র ১ সেন্টিমিটার। তাঁর তৈরি ন্যানোশিপ বহরের দক্ষতা পরীক্ষা করার জন্য শুরুতে তিনি সেগুলো সৌরজগতের ভেতরেই কোথাও পাঠাতে চান। তবে ক্রমেই এসব ন্যানোশিপ কোনো নক্ষত্রে যাওয়ার জন্য প্রথম বহর হয়ে উঠতে পারে।

নাসা ভবিষ্যতের যেসব প্রযুক্তি নিয়ে জল্পনাকল্পনা করছে, তার মধ্যে গিলক্রিস্টের পরিকল্পনাটি অন্যতম। কয়েক দশক নিষ্ক্রিয় থাকার পর সম্প্রতি নাসা আন্তনাক্ষত্রিক ভ্রমণ নিয়ে কিছু গুরুতর প্রস্তাব নিয়ে চিন্তাভাবনা করছে। এর মধ্যে বিশ্বাসযোগ্য প্রযুক্তি ছাড়াও রয়েছে চমকপ্রদ আরও কিছু প্রযুক্তি। ১৯৯০ দশকের শুরুতে বার্ষিক অ্যাডভান্সড স্পেস প্রোপালশন রিসার্চ ওয়ার্কশপের আয়োজক ছিল নাসা। এ সময় নামকরা ইঞ্জিনিয়ার ও পদার্থবিদদের দল এসব প্রযুক্তি বাছাই করেন। আবার ব্রেকথ্রু প্রোপালশন ফিজিকস প্রোগ্রাম আরও উচ্চাভিলাষী। এ প্রোগ্রামে আন্তনাক্ষত্রিক ভ্রমণে কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যার সম্পর্ক অনুসন্ধানের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। অবশ্য এখানে এখনো কোনো ঐকমত্য না থাকলেও তাদের বেশির ভাগ কর্মসূচি মনোযোগ দিয়েছে লেজার পাল ও বিভিন্ন ধরনের ফিউশন রকেটের মতো শীর্ষ প্রযুক্তিগুলোতে।

স্পেসশিপ ডিজাইনে ধীরগতির হলেও স্থিতিশীল উন্নয়নের কারণে বেশ যৌক্তিকভাবে অনুমান করা যায়, প্রথম মানুষবিহীন অনুসন্ধানী নভোযান হয়তো এই শতাব্দীর শেষ দিকে কিংবা পরের শতাব্দীর প্রথম দিকে প্রতিবেশী কোনো নক্ষত্রে পাঠানো সম্ভব হবে। সে কারণে এখানে একে প্রথম শ্রেণির অসম্ভাব্যতা হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।

অ্যান্টিম্যাটার বা প্রতিবস্তু ব্যবহার করে ডিজাইন করা স্টারশিপ হবে সবচেয়ে শক্তিশালী। অবশ্য এখনো এটি বিজ্ঞান কল্পকাহিনির মতো শোনালেও পৃথিবীতে এরই মধ্যে প্রতিবস্তু তৈরি করা গেছে। বলা বাহুল্য, ভবিষ্যতে কোনো একদিন হয়তো কার্যকরী মানুষবাহী স্টারশিপের জন্য সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিশীল ডিজাইনটিও মিলে যাবে।

তথ্যনির্দেশ

প্রোটন : নিউট্রনের মতো একটি কণা। তবে এ কণা ধনাত্মক চার্জযুক্ত। বেশির ভাগ পরমাণুর কেন্দ্রে এ কণা প্রায় অর্ধেক থাকে। এ কণা তিনটি কোয়ার্ক (দুটি আপ এবং একটি ডাউন কোয়ার্ক) দিয়ে গঠিত।

নিউট্রন তারা : শীতল নক্ষত্র, যা একটি সুপারনোভা বিস্ফোরণের পর কিছু সময় অবশিষ্ট থাকে। একটি নক্ষত্রের কেন্দ্রে প্রধান পদার্থগুলো চুপসে ঘন ভরের নিউট্রনে পরিণত হলে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়।

কণা ত্বরক যন্ত্র : কণা ত্বরক যন্ত্র বা পার্টিকেল অ্যাকসিলারেটর যন্ত্রের সাহায্যে বিদ্যুৎ-চুম্বক ব্যবহার করে চার্জিত কণাগুলোকে অনেক বেশি শক্তি দান করে গতিশীল করতে পারে।

১০. প্রতিবস্তু ও প্রতি-মহাবিশ্ব

নতুন কোনো আবিষ্কারের ঘোষণায় বিজ্ঞানে সবচেয়ে উত্তেজনাময় শব্দটি ‘ইউরেকা’ (আমি পেয়ে গেছি) নয়, বরং ‘এটা অদ্ভুত ব্যাপার’।

-আইজ্যাক আসিমভ

আমরা যেমনটি বিশ্বাস করি, কোনো মানুষ যদি তা না করে, তাহলে তাকে বলা হয় আধপাগলা। আর এতেই সব মিটমাট হয়ে যায়। বলতে চাচ্ছি, এখন এমনটিই ঘটে। কারণ, এখন আমরা তাকে পুড়িয়ে মারতে পারি না।

—মার্ক টোয়েন

কোনো অগ্রদূতকে চেনা যায় তার পিঠে বেঁধা তির দেখে।

—বেভারলি রুবিক

ড্যান ব্রাউনের বেস্টসেলার বই দ্য ডা ভিঞ্চি কোড-এর আগে প্রকাশিত অ্যাঞ্জেলস অ্যান্ড ডেমনস-এ এক দল উগ্রবাদীকে দেখানো হয়েছে। তারা ইলুমিনাটি। অ্যান্টিম্যাটার বা প্রতিবস্তু বোমা দিয়ে ভ্যাটিকান শহর উড়িয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করে তারা। সে জন্য জেনেভার বাইরের পরমাণু গবেষণাগার সার্ন থেকে অ্যান্টিম্যাটার চুরি করে এ দলটি। ষড়যন্ত্রকারীরা জানত, বস্তু আর প্রতিবস্তু পরস্পরের কাছে এলে মুহূর্তেই প্রচণ্ড বিস্ফোরণ হয়। আর সেটি হাইড্রোজেন বোমার চেয়েও শতগুণ শক্তিশালী। অবশ্য প্রতিবস্তুর বোমা এখন পর্যন্ত কল্পনাতেই সীমাবদ্ধ হলেও প্রতিবস্তু পুরোপুরি বাস্তব।

পারমাণবিক বোমা অনেক শক্তিশালী হওয়া সত্ত্বেও তা মাত্র ১ শতাংশ কার্যকর। কারণ, খুব সামান্য পরিমাণ ইউরেনিয়াম শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। কিন্তু একটি অ্যান্টিম্যাটার বোমা বানানো সম্ভব হলে একে তার পুরো ভরের ১০০ শতাংশই শক্তিতে রূপান্তর করা যাবে। এভাবে অ্যান্টিম্যাটার বোমা আসলে পারমাণবিক বোমার চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর বানানো যায়। (আরও বিশদভাবে বলতে গেলে একটি অ্যান্টিম্যাটার বোমার প্রায় ৫০ শতাংশ ব্যবহারযোগ্য বিস্ফোরক শক্তিতে রূপান্তর করা যায়। বাকি অংশ নিউট্রিনো নামের অশনাক্তযোগ্য কণার রূপে বেরিয়ে যায়।

দীর্ঘদিন ধরে প্রতিবস্তু নিয়ে বেশ জল্পনাকল্পনা চলছে। অবশ্য অ্যান্টিম্যাটার বোমার এখনো কোনো অস্তিত্ব না থাকলেও পদার্থবিদেরা শক্তিশালী অ্যাটম স্ম্যাশার ব্যবহার করে গবেষণার জন্য খুব সামান্য পরিমাণ প্রতিবস্তু তৈরি করতে পেরেছেন।

প্রতি-পরমাণু ও প্রতি-রসায়ন তৈরি

বিশ শতকের শুরুতে পদার্থবিদেরা বুঝতে পারেন, পরমাণুতে ইলেকট্রন ছাড়াও চার্জিত অতিপারমাণবিক কণা থাকে। এই ইলেকট্রন (ঋণাত্মক চার্জের) একটি ক্ষুদ্র নিউক্লিয়াসের (ধনাত্মক চার্জের) চারপাশে ঘুরপাক খায়। নিউক্লিয়াসে প্রোটন (যার চার্জ ধনাত্মক) ও নিউট্রন (যা চার্জনিরপেক্ষ) থাকে।

১৯৩০-এর দশকে পদার্থবিদেরা বুঝতে পারলেন, প্রতিটি কণার একটি যমজ আছে। যমজ কণারা প্রতিকণা আর তাদের চার্জ কণার ঠিক বিপরীত। এ আবিষ্কারে পদার্থবিদেরা বেশ একটা ধাক্কাই খেয়েছিলেন। প্রথম আবিষ্কৃত প্রতিকণাটির নাম অ্যান্টি-ইলেকট্রন (যাকে পজিট্রন বলা হয়)। এর চার্জ ধনাত্মক। পজিট্রন সব দিক দিয়ে হুবহু ইলেকট্রনের মতো। একমাত্র ব্যতিক্রম এর চার্জ ইলেকট্রনের বিপরীত। এক ক্লাউড চেম্বারে কসমিক রে-র ফটোতে পজিট্রন প্রথমবার আবিষ্কৃত হয়েছিল। (পজিট্রনের গতিপথ ক্লাউড চেম্বারে খুব সহজেই দেখা যায়। শক্তিশালী চুম্বকীয় ক্ষেত্রে পজিট্রন রাখা হলে তারা সাধারণ ইলেকট্রনগুলোর গতিপথ থেকে বিপরীত দিকে বেঁকে যায়। সত্যি বলতে কি, আমি নিজেও হাইস্কুলে পড়ার সময় এ ধরনের অ্যান্টিম্যাটারের গতিপথের ছবি তুলেছি।)

বার্কলির ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ায় ১৯৫৫ সালে বেভাট্রন নামের পার্টিকেল অ্যাকসিলারেটর বা কণা ত্বরক যন্ত্র প্রথম অ্যান্টিপ্রোটন তৈরি করে। প্রত্যাশামতোই সেটিও হুবহু প্রোটনের মতো, ব্যতিক্রম শুধু এর চার্জ নেগেটিভ বা ঋণাত্মক। এর মানে, তত্ত্ব অনুসারে, অ্যান্টি-অ্যাটম বা প্ৰতি- পরমাণু তৈরি করা সম্ভব (যেখানে পজিট্রন অ্যান্টিপ্রোটনের চারপাশে ঘুরবে)। আসলে প্রতি-মৌল, প্রতি-রসায়ন, প্রতি-মানুষ, প্রতি-পৃথিবী, এমনকি প্ৰতি-মহাবিশ্বও তাত্ত্বিকভাবে থাকা সম্ভব।

বর্তমানে ইউরোপের সার্নে এবং যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের বাইরে অবস্থিত ফার্মিল্যাবে কণা ত্বরক যন্ত্র দিয়ে অতিসামান্য পরিমাণ প্রতি- হাইড্রোজেন বানানো গেছে। (পার্টিকেল অ্যাকসিলারেটর ব্যবহার করে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে উচ্চ শক্তির প্রোটনের বিম বিস্ফোরণ ঘটিয়ে এটি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে একঝাঁক অতিপারমাণবিক কণাও তৈরি হয়। শক্তিশালী চুম্বক দিয়ে অ্যান্টিপ্রোটনগুলো আলাদা করা হয়, যা অতি নিম্ন বেগে ধীরগতির হয়ে পড়ে। এরপর সোডিয়াম-২২ থেকে প্রাকৃতিকভাবে নিঃসৃত হওয়া অ্যান্টিইলেকট্রনের ভেতর এই অ্যান্টিপ্রোটন উন্মুক্ত করা হয়। অ্যান্টি- ইলেকট্রন অ্যান্টিপ্রোটনের চারপাশে ঘুরপাক খেতে শুরু করলে তারা অ্যান্টি- হাইড্রোজেন তৈরি করে। সাধারণ হাইড্রোজেন একটি প্রোটন ও একটি ইলেকট্রনের সমন্বয়ে গঠিত।) প্রকৃত শূন্যস্থানে এই অ্যান্টি-অ্যাটম চিরকাল টিকে থাকতে পারে। কিন্তু দেয়ালের অবিশুদ্ধতা ও দেয়ালের সঙ্গে সংঘর্ষের কারণে অ্যান্টি-অ্যাটম বা প্রতি-পরমাণু ধীরে ধীরে সাধারণ পরমাণুর সঙ্গে সংঘর্ষের মুখে পড়ে। এ সংঘর্ষে নিশ্চিহ্ন হয়ে শক্তি নিঃসৃত করে তারা।

এদিকে ১৯৯৫ সালে এক ইতিহাস সৃষ্টি করে সার্ন। সেবার নয়টি অ্যান্টিহাইড্রোজেন তৈরির ঘোষণা দেয় তারা। ফার্মিল্যাবও শিগগিরই এ ধারাবাহিকতায় ১০০টি অ্যান্টিহাইড্রোজেন তৈরি করে। তাত্ত্বিকভাবে উচ্চ শক্তির প্রতি-মৌল তৈরি করতে কোনো বাধা নেই। এখানে একমাত্র বাধা হলো বিস্ময়কর খরচ। মাত্র কয়েক আউন্স প্রতি-পরমাণু তৈরি করতে গেলেও যেকোনো রাষ্ট্র একেবারে দেউলিয়া হয়ে যেতে পারে। প্রতিবস্তু উৎপাদনের বর্তমান হার বছরে ১ গ্রামের ১ বিলিয়ন ভাগের ১ ভাগ থেকে ১০ বিলিয়ন ভাগের ১ ভাগ মাত্র। তবে ২০২০ সালের মধ্যে এই হার তিন গুণ বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হয়। প্রতিবস্তুর অর্থনীতি খুবই দুর্বল। ২০০৪ সালে ১ গ্রামের কয়েক ট্রিলিয়ন ভাগের ১ ভাগ প্রতিবস্তু তৈরি করতে গিয়ে ২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ করে সার্ন। এই হারে ১ গ্রাম প্রতিবস্তু তৈরি করতে খরচ হবে ১০০ কোয়াড্রিটিলিয়ন মার্কিন ডলার। আবার সে জন্য প্রতিবস্তুর কারখানা ১০০ বিলিয়ন বছর ধরে অবিরত চালু রাখতে হবে। এ কারণে প্রতিবস্তু এখন বিশ্বের সবচেয়ে দামি বস্তু।

সার্নের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘সার্নে আমরা এ পর্যন্ত যে পরিমাণ প্রতিবস্তু তৈরি করেছি, তার সবগুলো যদি একত্রে জড়ো করা সম্ভব হয় এবং সেগুলো বস্তুর সঙ্গে নিশ্চিহ্ন করা হয়, তাহলে যে পরিমাণ শক্তি পাওয়া যাবে, তা দিয়ে একটি ইলেকট্রিক লাইট বাল্বকে কয়েক মিনিটের জন্য জ্বালিয়ে রাখা যাবে

প্রতিবস্তু ও বস্তু পরস্পরের কাছে এলে বিস্ফোরণ হয়। তাই প্রতিবস্তু নিয়ে কাজে অস্বাভাবিক সমস্যা আছে। সাধারণ কনটেইনারে প্রতিবস্তু রাখা আত্মহত্যার শামিল। কারণ, প্রতিবস্তু ওই কনটেইনারের দেয়াল স্পর্শ করলেই বিস্ফোরিত হবে। তাহলে এত বিস্ফোরক স্বভাবের প্রতিবস্তু কীভাবে সামলানো যায়? একটি উপায় হলো, প্রতিবস্তু আয়নিত গ্যাসের মধ্যে আয়নিত করে রাখা। এরপর একে সাবধানে একটি চুম্বকীয় বোতলে বন্দী করে রাখা। চুম্বকীয় ক্ষেত্রটি চেম্বারের দেয়াল স্পর্শ করা থেকে প্রতিবস্তুকে বাধা দেবে।

প্রতিবস্তুর ইঞ্জিন বানাতে, প্রতিবস্তুর স্থিতিশীল স্রোত কোনো বিক্রিয়া চেম্বারে নিয়ে যেতে হয়। এই চেম্বারে একে সাধারণ বস্তুর সঙ্গে সতর্কতার সঙ্গে একত্র করে নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। রাসায়নিক রকেটে যেভাবে বিস্ফোরণ ঘটনা হয়, এটাও অনেকটা সে রকম। এই বিস্ফোরণে যে আয়ন তৈরি হয়, সেগুলো অ্যান্টিম্যাটার রকেটের পেছন দিক দিয়ে বাইরে ছুড়ে দেওয়া হয়। এতে রকেট সম্মুখগতি অর্জন করে। অ্যান্টিম্যাটার ইঞ্জিনের দক্ষতা নির্ভর করে বস্তুকে শক্তিতে রূপান্তর করে। তাই তত্ত্ব অনুসারে, ভবিষ্যতের স্টারশিপের জন্য এটিই অন্যতম আকর্ষণীয় নকশার ইঞ্জিন। স্টার ট্রেক সিরিজে এন্টারপ্রাইজের শক্তির উৎস ছিল প্রতিবস্তু। সেখানে ইঞ্জিনগুলো বস্তু ও প্রতিবস্তুর মধ্যে নিয়ন্ত্রিত সংঘর্ষের মাধ্যমে শক্তি পেত।

অ্যান্টিম্যাটার রকেট

অ্যান্টিম্যাটার রকেটের অন্যতম প্রধান প্রবক্তা পেনসিলভানিয়ার স্টেট ইউনিভার্সিটির পদার্থবিদ জেরাল্ড স্মিথ। প্রাথমিকভাবে মাত্র ৪ মিলিগ্রামের মতো পজিট্রন দিয়ে এক অ্যান্টিম্যাটার রকেটে চেপে মাত্র কয়েক সপ্তাহে মঙ্গলে যাওয়া যাবে বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, রকেটের সাধারণ জ্বালানি থেকে যে শক্তি পাওয়া যায়, তার চেয়ে ১ বিলিয়ন গুণ বেশি শক্তি পাওয়া যাবে প্রতিবস্তু থেকে।

এই জ্বালানি তৈরির প্রথম ধাপ হতে পারে, কণা ত্বরক যন্ত্রের মাধ্যমে প্রতি-প্রোটনের বিম তৈরি করা। এরপর সেগুলো একটি পেননিং ট্র্যাপের মধ্যে সংরক্ষণ করে রাখতে হবে। বিশেষ এই পেননিং ট্র্যাপও তৈরি করেছেন স্মিথ। বানানোর পর পেননিং ট্র্যাপের ওজন হবে ২২০ পাউন্ড (যার অধিকাংশই তরল নাইট্রোজেন ও তরল হিলিয়াম)। এতে একটি চুম্বকীয় ক্ষেত্রে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন প্রতি-প্রোটন সংরক্ষণ করা সম্ভব। (অতি অল্প তাপমাত্রায় প্রতি-প্রোটনের তরঙ্গদৈর্ঘ্য কনটেইনারের দেয়ালের পরমাণুর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের তুলনায় কয়েক গুণ বড় হবে। সে কারণে কনটেইনারের দেয়ালের সঙ্গে প্রতি-প্রোটন যুক্ত হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার বদলে প্রতিফলিত হবে।) স্মিথ বলেন, পেননিং ট্র্যাপ প্রায় পাঁচ দিন এসব প্রতি-প্রোটন সংরক্ষণ করতে পারবে (সাধারণ পরমাণুর সঙ্গে মিশে শেষ পর্যন্ত নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত)। প্রায় ১ গ্রামের ১ বিলিয়ন ভাগের ১ ভাগ প্রতি-প্রোটন সংরক্ষণ করতে পারবে তার তৈরি পেননিং ট্র্যাপ। তিনি এমন ধরনের পেননিং ট্র্যাপ বানাতে চান, যা দিয়ে ১ মাইক্রোগ্রাম প্রতি-প্রোটন সংরক্ষণ করা সম্ভব।

প্রতিকণা পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান উপাদান হলেও এর মূল্য প্রতিবছর নাটকীয়ভাবে কমে যাচ্ছে (বর্তমানে ১ গ্রামের দাম ৬২.৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার)। নতুন পার্টিকেল ইজেক্টর শিকাগো শহরের বাইরে অবস্থিত ফার্মিল্যাবে বানানো হচ্ছে। সেটি প্রতিকণার উৎপাদন ১০ গুণ বাড়িয়ে প্রতিবছরে ১.৫ থেকে ১৫ ন্যানোগ্রামে উত্তীর্ণ করতে পারে। এর মাধ্যমে দাম কমে যাওয়ার কথা। তবে নাসার হ্যারল্ড গেরিশ বিশ্বাস করেন, আরও অগ্রগতির পর প্রতিকণার দাম প্রতি মাইক্রোগ্রামে ৫ হাজার ডলারে নেমে আসবে। নিউ মেক্সিকোর লস অ্যালামসের সিনারজিসটিকস টেকনোলজিসের ড. স্টিভেন হোয়ি বলেন, ‘যোগাযোগব্যবস্থায় ও চিকিৎসাক্ষেত্রে কাজে লাগাতে প্রতিকণাকে বিজ্ঞান কল্পকাহিনির জগৎ থেকে বের করে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারযোগ্য জগতে নিয়ে আসা আমাদের লক্ষ্য।’

কণা ত্বরকযন্ত্র প্রতি-প্রোটন তৈরি করতে পারলেও তাদের সেভাবে ডিজাইন করা হয় না। তাই তাদের দক্ষতাও কম। এ রকম কণা ত্বরকযন্ত্র শুরুতে গবেষণার জন্য ডিজাইন করা হয়, প্রতিবস্তু বানানোর কারখানা হিসেবে নয়। তাই স্মিথ নতুন একটি কণা ত্বরকযন্ত্র বানানোর পরিকল্পনা করছেন, যা বিশেষভাবে ডিজাইন করা হবে বিপুল প্রতি-প্রোটন তৈরির জন্য। তাতে এর দামও কমে যাবে।

প্রযুক্তিগত উন্নয়ন আর বিপুল উৎপাদনের কারণে প্রতিবস্তুর দাম আরও ব্যাপকভাবে কমে যেতে পারে। স্মিথের ধারণা, তাহলে তখন এমন সময় আসবে যে আন্তগ্রহ ও সম্ভাব্য আন্তনাক্ষত্রিক ভ্রমণের জন্য প্রতিবস্তুর রকেট প্রধান অবলম্বন হয়ে উঠবে। তবে প্রতিবস্তুর রকেট তত দিন পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকবে শুধু ড্রয়িংবোর্ডেই।

প্রাকৃতিকভাবে উদ্ভূত প্রতিবস্তু

প্রতিবস্তু যদি পৃথিবীতে তৈরি করা খুব কঠিন হয়, তাহলে কি গভীর মহাকাশেও প্রতিবস্তু সহজেই খুঁজে পাওয়া যাবে? দুর্ভাগ্যক্রমে, অনুসন্ধানকারীরা মহাবিশ্বে প্রতিবস্তু খুব অল্পই পেয়েছেন, যেটি পদার্থবিদদের কাছে বিস্ময়কর। আসল ব্যাপার হলো, আমাদের মহাবিশ্ব প্রতিবস্তু নয়, প্রধানত বস্তু দিয়ে গঠিত। কিন্তু এর কারণ ব্যাখ্যা করা কঠিন। অনেকে হয়তো সরলভাবে অনুমান করতে পারে যে মহাবিশ্বের শুরুতে বস্তু ও প্রতিবস্তুর পরিমাণ সমান ও প্রতিসম ছিল। কাজেই এখন মহাবিশ্বে প্রতিবস্তুর অভাব একটা ধাঁধার মতোই।

এ ব্যাপারে সম্ভবত সবচেয়ে ভালো সমাধান উত্থাপন করেছিলেন আন্দ্রেই শাখারভ। ১৯৫০-এর দশকে এ মানুষটি সোভিয়েত ইউনিয়নে হাইড্রোজেন বোমার ডিজাইন করেন। শাখারভের অনুমান, মহাবিশ্বের শুরুতে মহাবিস্ফোরণে বস্তু আর প্রতিবস্তুর মধ্যে খুব সামান্য অপ্রতিসমতা ছিল। এই অতি ক্ষুদ্র প্রতিসমতা ভাঙাকে বলা হয় সিপি ভায়োলেশন। এ ঘটনা বর্তমানে বেশ কিছু সক্রিয় গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু। এরপর শাখারভ অনুমান করলেন, বর্তমানে মহাবিশ্বের যত পরমাণু আছে, সেগুলো আসলে বস্তু আর প্রতিবস্তু পরস্পরকে ধ্বংস করার পর যেটুকু বাকি থাকে সেটুকু। মহাবিস্ফোরণের কারণে এই দুইয়ের মধ্যে মহাজাগতিক বাতিলের ঘটনাটি ঘটেছে। অতি ক্ষুদ্র পরিমাণ অতিরিক্ত বস্তু বেঁচে গিয়ে আমাদের দৃশ্যমান মহাবিশ্ব গঠিত হয়েছে। আমাদের দেহের সবগুলো পরমাণু হলো বস্তু আর প্রতিবস্তুর এই বিপুল সংঘর্ষ থেকে বেঁচে যাওয়া অংশ।

শাখারভের তত্ত্বটি এ সম্ভাবনার দ্বারও উন্মুক্ত রেখেছে যে সামান্য প্রতিবস্তুও হয়তো প্রাকৃতিকভাবে উদ্ভূত হতে পারে। তা ঘটলে সেই উৎসের কারণে প্রতিবস্তুর ইঞ্জিনে ব্যবহারের জন্য প্রতিবস্তুর উৎপাদন খরচ কমিয়ে দিতে পারে ব্যাপকভাবে। তত্ত্বমতে, প্রাকৃতিকভাবে উদ্ভূত প্রতিবস্তু সহজে শনাক্ত করতে পারার কথা। ইলেকট্রন ও অ্যান্টি-ইলেকট্রন পরস্পরের সঙ্গে মিলিত হয়ে নিজেদের নিশ্চিহ্ন করে গামা রশ্মি নিঃসৃত করে, যার শক্তি হবে ১.০২ মিলিয়ন ইলেকট্রন ভোল্ট বা তার বেশি। কাজেই এই শক্তির গামা রশ্মির জন্য মহাবিশ্ব স্ক্যানিং করার মাধ্যমে প্রাকৃতিকভাবে উদ্ভূত প্রতিবস্তুর ‘হাতের ছাপের’ সন্ধান হয়তো পাওয়া যেতে পারে।

সত্যি বলতে কি, আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে প্রতিবস্তুর ‘ফোয়ারা’ খুঁজে পেয়েছেন নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ড. উইলিয়াম পুরসেল। সেটি আমাদের গ্যালাক্সির কেন্দ্র থেকে খুব বেশি দূরে নয়। সেখানে থাকা প্রতিবস্তুর এক বিশেষ বৈশিষ্ট্যের গামা রশ্মির প্রবাহ ১.০২ মিলিয়ন ইলেকট্রন ভোল্ট বিকিরিত হচ্ছে। তা দেখে মনে হয় সেটি সাধারণ হাইড্রোজেন গ্যাসের সঙ্গে সংঘর্ষে তৈরি হয়েছে। প্রতিবস্তুর এই খনি যদি প্রাকৃতিকভাবে টিকে থাকে, তাহলে মহাবিশ্বের অন্যান্য জায়গাতেও প্রতিবস্তুর আরও উৎস রয়েছে। হয়তো সেগুলো মহাবিস্ফোরণের সময় ধ্বংস হয়ে যায়নি।

প্রাকৃতিকভাবে উদ্ভূত প্রতিবস্তু আরও সুচারুভাবে খুঁজতে ২০০৬ সালে পৃথিবীর কক্ষপথে একটি স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করা হয়েছে। এর নাম পামেলা (পেলোড ফর অ্যান্টিম্যাটার-ম্যাটার এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড লাইট-নিউক্লীয় অ্যাস্ট্রোফিজিকস)। মহাবিশ্বের অন্যান্য জায়গায় প্রতিবস্তুর উৎস খুঁজতে যৌথভাবে এই উদ্যোগ নেয় রাশিয়া, ইতালি, জার্মানি ও সুইডেন। প্রতিবস্তু খুঁজতে এর আগের অভিযানগুলোতে উচ্চ আকাশে বেলুন ও স্পেস শাটল ব্যবহার করা হয়েছিল। এগুলোতে যেসব তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছে তার পরিসর এক সপ্তাহ বা তার চেয়ে বেশি নয়। বিপরীত দিকে, পামেলা (PAMELA) অন্তত তিন বছর কক্ষপথে অবস্থান করবে। ইউনিভার্সিটি অব রোমের দলের সদস্য পিয়ারগিওরগিও পিকোজ্জা এক ঘোষণায় জানিয়েছেন, ‘এ পর্যন্ত বানানো সবচেয়ে ভালো ডিটেক্টর এটি। আর এটি দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবহার করা হবে।’

সাধারণ উৎসগুলো থেকে আসা মহাজাগতিক রশ্মি শনাক্তে ডিজাইন করা হয়েছে পামেলা। যেমন সুপারনোভা। তবে এটি অস্বাভাবিক বা পুরোটা প্রতিবস্তু দিয়ে তৈরি নক্ষত্রও শনাক্ত করতে পারবে। বিশেষ করে, পামেলা অ্যান্টি-হিলিয়ামের চিহ্ন খুঁজবে, এটি হয়তো কোনো প্রতি-নক্ষত্রের ভেতরে তৈরি হয়। শাখারভের মতো বেশির ভাগ পদার্থবিদ বর্তমানে বিশ্বাস করেন, মহাবিস্ফোরণের ফলে বস্তু ও প্রতিবস্তু পরস্পরকে প্রায় নিখুঁতভাবে ধ্বংস করে ফেলেছিল। তবে পামেলা ভিন্ন এক অনুমানের ভিত্তি করে কাজ করছে। অনুমানটি হলো, মহাবিশ্বে প্রতিবস্তুর পুরোটা আসলে এই ধ্বংস প্রক্রিয়ায় শেষ হয়ে যায়নি। তাই বর্তমানে তাদের অস্তিত্ব সম্ভবত প্রতি-নক্ষত্র হিসেবে টিকে রয়েছে।

গভীর মহাকাশে সামান্য পরিমাণেও প্রতিবস্তু থাকলে এই প্রতিবস্তুর কিছু অংশ সংগ্রহ করে স্টারশিপ চালাতে ব্যবহার করা সম্ভব। নাসার ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্সড কনসেপ্টস প্রতিবস্তু সংগ্রহের একটি ধারণা এতই গুরুত্ব দিয়েছে যে সম্প্রতি তারা এই ধারণার ওপর গবেষণা করতে একটি পাইলট প্রোগ্রামে অর্থ ঢেলেছে। ‘সাধারণত, আপনাকে একটি জাল তৈরি করতে হবে, ঠিক মাছ শিকারের মতো।’ বলেছেন এই প্রজেক্টের সঙ্গে জড়িত নেতৃত্বস্থানীয় প্রতিষ্ঠান এইচবার টেকনোলজির জেরাল্ড জ্যাকসন।

প্রতিবস্তু সংগ্রহের ভিত্তি হবে তিনটি সমকেন্দ্রী গোলক, যার প্রতিটি তারের জালের কাঠামোতে তৈরি। সবচেয়ে বাইরের গোলকটি হবে আড়াআড়িভাবে ১৬ কিলোমিটার ও ধনাত্মক চার্জের। তাই এটি যেকোনো প্রোটনকে বিকর্ষণ করবে। কারণ, প্রোটনের চার্জও ধনাত্মক। তবে অ্যান্টিপ্রোটন ঋণাত্মক চার্জবিশিষ্ট হওয়ায় একে আকর্ষণ করবে। প্রতি-প্রোটন বাইরের গোলক থেকে সংগ্রহ করে, ধীরে ধীরে তারা দ্বিতীয় গোলকের মধ্য দিয়ে গিয়ে অবশেষে সবচেয়ে ভেতরের গোলকে ঢুকবে। আড়াআড়িভাবে ১০০ মিটার হবে এটি। প্রতি-প্রোটন এরপর কোনো চুম্বকীয় বোতলে সংগ্রহ করে তার সঙ্গে প্রতি- ইলেকট্রন যোগ করে প্রতি-হাইড্রোজেন তৈরি করা হবে।

জ্যাকসন হিসাব করে দেখেছেন, কোনো নভোযানের ভেতরে নিয়ন্ত্রিত বস্তু-প্রতিবস্তুর বিক্রিয়ার প্লুটোতে যাওয়ার জন্য একটি সৌরপালের জ্বালানি হিসেবে মাত্র ৩০ মিলিগ্রাম প্রতিবস্তু দরকার হবে। একটি স্টারশিপের আলফা সেন্টুরাইতে যাওয়ার জন্য ১৭ গ্রাম প্রতিবস্তুই যথেষ্ট বলে মনে করেন জ্যাকসন। শুক্র গ্রহ ও মঙ্গল গ্রহের কক্ষপথের মধ্যখানে ৮০ গ্রাম প্রতিবস্তু থাকতে পারে বলে দাবি করেছেন জ্যাকসন। এগুলো অনুসন্ধানী নভোযান দিয়ে সংগ্রহ করা যাবে বলে ধারণা তাঁর। তবে বিশালাকৃতির অ্যান্টিম্যাটার সংগ্রাহক যন্ত্রের জটিলতা ও খরচ মেটানো সম্ভবত এই শতাব্দী শেষ হওয়ার আগে কিংবা তারও পর ছাড়া সম্ভব নয়।

অনেক বিজ্ঞানী গভীর মহাকাশে কোনো ভাসমান উল্কা থেকে প্রতিবস্তু সংগ্রহ করার স্বপ্ন দেখেন। (ফ্ল্যাশ গর্ডন কমিস স্ট্রিপে একবার দেখানো হয়েছিল, ভয়ানক এক প্রতিবস্তুর উল্কা মহাকাশে ভাসছে। সেটি কোনো গ্রহের সংস্পর্শে এলে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটবে।)

প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট প্রতিবস্তু মহাকাশে না পাওয়া গেলে আমাদের আরও কয়েক যুগ থেকে কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে, যত দিন পৃথিবীতে যথেষ্ট পরিমাণ প্রতিবস্তু তৈরি না হয়। তবে যদি ধরে নেওয়া হয় প্রতিবস্তু তৈরির প্রযুক্তিগত সমস্যাগুলোর সমাধান করা যাবে, তাহলে এটাও বলা যায়, একদিন প্রতিবস্তুর রকেট আমাদের দূরের কোনো নক্ষত্রে বহন করে নিয়ে যাবে।

প্রতিবস্তু সম্পর্কে আমরা এখন যা জানি ও এ-সম্পর্কিত প্রযুক্তির বিবর্তনের ভবিষ্যৎ বিবেচনা করে, প্রতিবস্তুর রকেট শিপকে আমি প্রথম শ্রেণির অসম্ভাব্যতা হিসেবে শ্রেণিবিভাগ করেছি।

প্রতিবস্তুর প্রতিষ্ঠাতা

প্রতিবস্তু কী? বিষয়টি অদ্ভুত যে প্রকৃতি ভালো কোনো কারণ ছাড়াই মহাবিশ্বে অতিপারমাণবিক কণার সংখ্যা দ্বিগুণ করে দিয়েছে। সাধারণত প্রকৃতি বেশ মিতব্যয়ী। কিন্তু প্রতিবস্তু সম্পর্কে জানার পর, প্রকৃতিকে চরমভাবে অপ্রয়োজনীয় ও অযথা বলে মনে হবে। আর প্রতিবস্তুর অস্তিত্ব যদি থাকে, তাহলে কি প্রতি-মহাবিশ্বের অস্তিত্বও আছে?

এ প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে প্রতিবস্তুর উৎপত্তি সম্পর্কে জানতে হবে আগে। প্রতিবস্তুর আবিষ্কার হয় ১৯২৮ সালে। ২০ শতকের অন্যতম মেধাবী পদার্থবিদ পল ডিরাকের বৈপ্লবিক একটা গবেষণার কারণে এটি সম্ভব হয়েছিল। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের লুকাসিয়ান চেয়ারে অধিষ্ঠিত ছিলেন তিনি। একই চেয়ার একসময় আলোকিত করেছিলেন স্বয়ং নিউটন। আবার স্টিফেন হকিংও একসময় এই চেয়ারে অধিষ্ঠিত হন। ডিরাকের জন্ম ১৯০২ সালে। লম্বা ছিপছিপে গড়নের এ মানুষটির বয়স যখন মাত্র বিশের কোঠায়, তখন শুরু হয়ে গেছে ১৯২৫ সালের উত্তাল কোয়ান্টাম বিপ্লব। সে সময় তিনি ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়তেন। কিন্তু কোয়ান্টাম তত্ত্বের তীব্র জোয়ারে অদম্য এক কৌতূহল জাগে তাঁর ভেতর। তাই সাতপাঁচ না ভেবে আচমকা সেদিকে ঝুঁকে পড়েন ডিরাক।

কোয়ান্টাম তত্ত্বের ভিত্তি হলো : ইলেকট্রনের মতো কণাগুলোকে বিন্দুসম কণা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হলেও সেগুলো আসলে একধরনের তরঙ্গ। এটি ব্যাখ্যা করা হয়েছিল শ্রোডিঙ্গারের বিখ্যাত সেই তরঙ্গ সমীকরণ ব্যবহার করে। (কণাটিকে কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় পাওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু, সেটিই জানায় এই তরঙ্গ সমীকরণ। )

তবে ডিরাক একসময় বুঝতে পারলেন, শ্রোডিঙ্গারের সমীকরণে একটা ত্রুটি আছে। শুধু নিম্ন বেগে চলমান ইলেকট্রনের ব্যাখ্যা করতে পারে সমীকরণটি। কিন্তু উচ্চ বেগে চলমান ইলেকট্রনকে সমীকরণটি ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থ। কারণ, এটি উচ্চ বেগে চলমান বস্তুর সূত্র মেনে চলে না। অর্থাৎ আলবার্ট আইনস্টাইনের আবিষ্কৃত আপেক্ষিকতার সূত্রগুলো মেনে চলে না।

তাই আপেক্ষিক তত্ত্বের সঙ্গে শ্রোডিঙ্গারের সমীকরণকে খাপ খাওয়াতে বেশ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লেন তরুণ ডিরাক। ১৯২৮ সালে ডিরাক বললেন, শ্রোডিঙ্গারের সমীকরণের একটি মৌলিক রূপান্তর করলে তা আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব পুরোটা মেনে চলে। এ কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে গেল পদার্থবিজ্ঞান জগৎ। ইলেকট্রনের জন্য ডিরাক তাঁর বিখ্যাত রিলেভিস্টিক সমীকরণটি পেয়েছিলেন উচ্চতর গণিত নিপুণভাবে ব্যবহার করে, যাকে বলা হয় স্পিনোর (spinor)। ফলে হঠাৎ করে গাণিতিক আগ্রহ পুরো মহাবিশ্বের যেন কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হলো। (তার আগে অনেক পদার্থবিদ পর্যবেক্ষণগত তথ্য-উপাত্ত থেকে বড় ধরনের আবিষ্কারগুলো করতে পেরেছিলেন। কিন্তু তাঁদের থেকে আলাদা ছিলেন তিনি। তাই একেবারে উল্টো পথে হাঁটলেন ডিরাক। তাঁর কাছে বিশুদ্ধ গণিতই সব। গণিত যদি যথেষ্ট সুন্দর হয়, তাহলে নিঃসন্দেহে বড় ধরনের আবিষ্কারের কাছে নিয়ে যাবে বলে মনে করতেন তিনি। তিনি লিখেছিলেন, ‘কোনো সমীকরণকে পরীক্ষার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর চেয়ে তার সৌন্দর্যটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কেউ যদি তাঁর সমীকরণে সৌন্দর্য আনার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করতে থাকেন আর তাঁর যদি সত্যিই চমৎকার অন্তর্দৃষ্টি থাকে, তাহলে তিনি নিঃসন্দেহে সামনে এগিয়ে যাবেনই।’)

ইলেকট্রনের নতুন সমীকরণ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে ডিরাক একদিন বুঝতে পারলেন, আইনস্টাইনের বিখ্যাত সমীকরণ E=mc^2, পুরোপুরি সঠিক নয়। ম্যাডিসন অ্যাভিনিউয়ের বিজ্ঞাপনে, শিশুদের টি-শার্টে, কার্টুন, এমনকি সুপারহিরোদের পোশাকে আইনস্টাইনের সমীকরণ শোভা পেলেও তা আংশিক সঠিক। সমীকরণটির সঠিক রূপ হবে E=mc^2। (এখানে বিয়োগ চিহ্নও এসেছে, কারণ, নির্দিষ্ট পরিমাণের বর্গমূল নিয়েছি। যেকোনো পরিমাণের বর্গমূল নিলে সব সময় একটি যোগ ও সন্দেহজনক একটি বিয়োগফল পাওয়া যায়।)

তবে পদার্থবিদেরা বিয়োগবোধক বা ঋণাত্মক শক্তি পছন্দ করেন না। পদার্থবিদ্যায় এক স্বতঃসিদ্ধে বলা হয়, পদার্থ সব সময় সর্বনিম্ন শক্তিস্তরে থাকতে চায় (এ কারণে পানি সব সময় সর্বনিম্ন স্তর খোঁজে, অর্থাৎ সমুদ্রসীমা)। বস্তু সব সময় তার নিম্নতম শক্তিস্তরে নেমে যাওয়ার কারণে, সম্ভাব্য ক্ষতিকর ব্যাপার হলো ঋণাত্মক শক্তির সম্ভাবনা। তার মানে, সব ইলেকট্রন ক্রমান্বয়ে অসীম ঋণাত্মক শক্তির দিকে নেমে যাবে। সে কারণে ডিরাকের তত্ত্বটি অস্থিতিশীল হবে। ঠিক এভাবে ‘ডিরাক সমুদ্র’ আবিষ্কার করে বসেন পদার্থবিদ ডিরাক। তিনি কল্পনা করে নিলেন, সব ঋণাত্মক শক্তিস্তর এরই মধ্যে পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। কাজেই একটি ইলেকট্রন আর ঋণাত্মক শক্তির দিকে নেমে যেতে পারবে না। তাতে মহাবিশ্ব স্থিতিশীল হয়। একটি গামা রশ্মির সঙ্গেও হয়তো মাঝেমধ্যে ঋণাত্মক শক্তিস্তরে থাকা একটি ইলেকট্রনের সংঘর্ষ হতে পারে। এতে ইলেকট্রনটিকে ধাক্কা দিয়ে ধনাত্মক স্তরে তুলে আনতে পারে। এর ফলে আমরা দেখব গামা রশ্মিটি ইলেকট্রনে রূপান্তরিত হয়েছে এবং ডিরাক সমুদ্রে একটি হোল বা গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এই গর্তটি শূন্যস্থানে একটি বুদের মতো আচরণ করতে পারে। অর্থাৎ এর চার্জ হবে ধনাত্মক। আর ভর হবে আসল ইলেকট্রনের মতো। অন্য কথায়, গর্তটি একটি প্রতি-ইলেকট্রনের মতো আচরণ করবে। কাজেই এই চিত্রে প্রতিবস্তুতে ডিরাক সমুদ্রে বুদ্বুদ থাকবে।

ডিরাকের এই বিস্ময়কর ভবিষ্যদ্বাণীর কয়েক বছর পর কার্ল অ্যান্ডারসন সত্যি সত্যিই প্রতি-ইলেকট্রন আবিষ্কার করে বসেন (এ কারণেই ১৯৩৩ সালে ডিরাক নোবেল পুরস্কার পান)।

অন্য কথায়, প্রতিবস্তুর অস্তিত্ব আছে, কারণ, ডিরাক সমীকরণের দুই ধরনের সমাধান পাওয়া যায়। এর একটি বস্তুর জন্য আর অন্যটি প্রতিবস্তুর জন্য। (আর এটি ঘটেছে বিশেষ আপেক্ষিকতার কারণে।)

ডিরাকের সমীকরণ শুধু প্রতিবস্তু থাকার অনুমানই করেনি, এটি ওই ইলেকট্রনের স্পিন বা ঘূর্ণনেরও ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল। অতিপারমাণবিক কণাদের স্পিন থাকে, অনেকটা ঘূর্ণমান লাটিমের মতো। আধুনিক ইলেকট্রনিকসের ভিত্তি ট্রানজিস্টর ও সেমিকন্ডাক্টরে ইলেকট্রনের প্রবাহ বোঝার জন্য ইলেকট্রনের স্পিন অতিগুরুত্বপূর্ণ।

স্টিফেন হকিং একবার দুঃখ করে বলেছিলেন, ডিরাক তাঁর সমীকরণের পেটেন্ট করেননি। তিনি লিখেছিলেন, “ডিরাক যদি তাঁর ডিরাক সমীকরণের পেটেন্ট করাতেন, তাহলে তিনি বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হতে পারতেন। তাহলে প্রতিটি টেলিভিশন, ওয়াকম্যান, ভিডিওগেম আর কম্পিউটার থেকে রয়্যালটি পেতেন তিনি।’

বর্তমানে ডিরাকের বিখ্যাত সমীকরণটি ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেতে একটা পাথরে খোদাই করে রাখা হয়েছে। সেটি আইজ্যাক নিউটনের সমাধি থেকে খুব বেশি দূরে নয়। পুরো বিশ্বে এটিই সম্ভবত একমাত্র সমীকরণ, যেটি এ রকম সম্মান অর্জন করেছে।

ডিরাক আর নিউটন

ডিরাক কীভাবে তাঁর বৈপ্লবিক সমীকরণটিতে এবং প্রতিবস্তুর ধারণায় পৌঁছালেন, তা অনেক দিন ধরে বোঝার চেষ্টা করছেন বিজ্ঞানের ইতিহাসবিদেরা। তাঁকে মাঝে মাঝে তুলনা করা হয় নিউটনের সঙ্গে। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, নিউটন ও ডিরাকের মধ্যে বেশ কিছু ব্যাপারে মিল আছে। দুজনেই তাঁদের ২০ বছর বয়সে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে শুরু করেন। আবার গণিতেও দক্ষ ছিলেন দুজনেই। এ ছাড়া তাঁদের মধ্যে আরেকটি বৈশিষ্ট্যে পুরোপুরি মিলে যায়। সেটি হলো রোগবিদ্যার দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁদের সামাজিক দক্ষতার পুরোপুরি অভাব ছিল। গালগল্প করার ও সাধারণ সামাজিক কমনীয়তার মতো ব্যাপারগুলোতে দুজনের কেউ দক্ষ ছিলেন না। চরম লাজুক ডিরাককে সরাসরি কিছু জিজ্ঞেস না করলে তা কখনোই বলতেন না তিনি। আবার উত্তরে তিনি শুধু ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’ অথবা ‘আমি জানি না’ শব্দ ব্যবহার করতেন।

ডিরাক খুবই ভদ্র ছিলেন, আবার জনপ্রিয়তাও অপছন্দ করতেন। তাঁকে পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার দেওয়ার পর সেটি ফিরিয়ে দেওয়ার কথা ভেবেছিলেন তিনি। কারণ, এতে কুখ্যাতি ও ঝামেলার সৃষ্টি হবে বলে মনে হয়েছিল তাঁর। তবে তাঁকে বলা হয়েছিল, নোবেল পুরস্কার ফিরিয়ে দিলেও আরও বেশি লোক জানাজানি হবে। তখন অনেকটা বাধ্য হয়ে পুরস্কারটি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

নিউটনের অদ্ভুত ব্যক্তিত্ব নিয়েও অনেক লেখালেখি হয়েছে। এসব লেখাতে এমনও হাইপোথিসিস আছে যে তিনি সম্ভবত পারদের বিষক্রিয়ার কারণে মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলেন। সম্প্রতি কেমব্রিজের সাইকোলজিস্ট সাইমন ব্যারন-কোহেন নতুন এক তত্ত্ব প্রস্তাব করেছেন। এটি হয়তো নিউটন ও ডিরাকের অদ্ভুত ব্যক্তিত্বের ব্যাখ্যা জোগাতে পারবে। ব্যারন-কোহেনের দাবি, এই দুই বিজ্ঞানী সম্ভবত অ্যাসপারগারস সিনড্রোমে ভুগছিলেন, যা কিছুটা অটিজমের মতো। রেইন ম্যান মুভির বোকা সাধুর মতো অ্যাসপারগারসে ভোগা ব্যক্তিরা ভয়াবহ স্বল্পভাষী হন, সামাজিকভাবে লাজুক হন। তবে মাঝেমধ্যে আশীর্বাদের মতো বিস্ময়কর গাণিতিক দক্ষতাও থাকে তাঁদের। কিন্তু অটিস্টিকদের থেকে একটু আলাদা হন তাঁরা। সে কারণে তাঁরা সমাজে কার্যকর থাকেন ও গঠনমূলক কাজে যুক্ত থাকতে পারেন। এ তত্ত্ব সঠিক হলে, নিউটন ও ডিরাকের বিস্ময়কর গাণিতিক দক্ষতা ও সমাজের মানুষ থেকে দূরে থাকার কারণ হয়তো বোঝা যাবে।

প্রতি-মহাকর্ষ ও প্রতি-মহাবিশ্ব

ডিরাকের তত্ত্ব ব্যবহার করে এখন আমরা একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে পারি : মহাকর্ষের মতো কোনো কিছু কি প্রতিবস্তুরও আছে? প্রতি-মহাবিশ্বের অস্তিত্ব কি থাকা সম্ভব?

আগেই বলেছি, প্রতিকণার চার্জ সাধারণ কণার ঠিক উল্টো। তবে সাধারণ কণাদের কোনো চার্জ না-ও থাকতে পারে (যেমন আলোর কণা ফোটন বা মহাকর্ষের কণা গ্র্যাভিটন)। এদের নিজস্ব প্রতিকণাও থাকতে পারে। আমরা দেখছি, মহাকর্ষের নিজস্ব প্রতিবস্তু আছে। অন্য কথায় মহাকর্ষ ও প্রতি- মহাকর্ষ একই জিনিস। কাজেই প্রতিবস্তু মহাকর্ষের টানে নিচে পড়ে, ওপরে ওঠে না। (এটি সর্বজনীনভাবে বিশ্বাস করেন পদার্থবিদেরা। তবে গবেষণাগারে এটি এখনো পরীক্ষা করে দেখা যায়নি)।

ডিরাকের তত্ত্ব আরও গভীরতর কিছু প্রশ্নেরও উত্তর দেয়। সেগুলো হলো : প্রকৃতি প্রতিবস্তুর মতো কিছু একটার অনুমোদন কেন দিল? এর মানে কি প্রতি-মহাবিশ্বও আছে?

কিছু বিজ্ঞান কল্পকাহিনিতে, মহাকাশে পৃথিবীর মতো এক নতুন গ্ৰহ আবিষ্কার করে বসে নায়ক। নতুন গ্রহটি সব দিক দিয়েও পৃথিবীর যমজের মতো হতে দেখা যায়। ব্যতিক্রম শুধু সেটি প্রতিবস্তু দিয়ে তৈরি। গ্রহটিতে আমাদের প্রতিবস্তুর যমজও থাকে, যাদের শিশুরা আসলে প্রতি-শিশু, যাদের বসবাস কোনো এক প্রতি-শহরে। তাদের প্রতি-রসায়নের সূত্রগুলো রসায়নের মতোই হয়, শুধু এর চার্জ উল্টো হয়। সে কারণে এমন কোনো বিশ্বে (নাকি প্রতি-বিশ্বে) বাস করা মানুষেরা কখনো জানবে না যে তারা প্রতিবস্তুর তৈরি। (পদার্থবিদেরা একে বলেন চার্জ-রিভার্সড বা সি-রিভার্সড মহাবিশ্ব। কারণ, প্রতি-মহাবিশ্বে সব চার্জ উল্টো। তবে বাকি সবকিছুই একই রকম। )

কিছু বিজ্ঞান কল্পকাহিনিতে বিজ্ঞানীদের মহাকাশে পৃথিবীর যমজ গ্রহ আবিষ্কার করতে দেখা যায়। একমাত্র ব্যতিক্রম শুধু ওই পৃথিবীটা লুকিং গ্লাস মহাবিশ্ব, যেখানে সবকিছু বাঁহাতি। সেখানের সবার হৃৎপিণ্ড দেহের ডান পাশে থাকে আর বেশির ভাগ মানুষ বাঁহাতি। তারা কখনো জানতেও পারবে না যে তারা বাঁহাতি উল্টো এক লুকিং গ্লাস মহাবিশ্বের বাসিন্দা। (পদার্থবিদেরা এ ধরনের লুকিং গ্লাস ইউনিভার্সকে বলেন প্যারিটি-রিভার্সড বা পি-রিভার্সড ইউনিভার্স।)

এ ধরনের কোনো প্রতিবস্তু ও প্যারিটি-রিভার্সড ইউনিভার্সে অস্তিত্ব কি সত্যিই আছে? পদার্থবিদেরা যমজ মহাবিশ্বের প্রশ্নটি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন। কারণ, আমাদের অতিপারমাণবিক কণার চার্জ উল্টে দিলে কিংবা ডান-বাঁ সজ্জা উল্টে দিলেও নিউটন আর আইনস্টাইনের সমীকরণ সেখানে একই থাকে। কাজেই সি-রিভার্সড ও পি-রিভার্সড মহাবিশ্ব তাত্ত্বিকভাবে থাকা সম্ভব।

নোবেল বিজয়ী পদার্থবিদ রিচার্ড ফাইনম্যান এসব মহাবিশ্ব সম্পর্কে চমৎকার এক প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন। ধরা যাক, কোনো একদিন আমরা দূরের কোনো গ্রহের এলিয়েনদের সঙ্গে রেডিও বা বেতার যোগাযোগ স্থাপন করতে পারলাম, কিন্তু তাদের দেখতে পেলাম না। তাঁর প্রশ্ন হলো, তাহলে বেতারের মাধ্যমে তাদের কাছে কি আমরা ডান আর বাঁয়ের মধ্যে পার্থক্য বোঝাতে পারব? পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলো পি-রিভার্সড মহাবিশ্বেও কার্যকর হলে এই ধারণা তাদের বোঝানো অসম্ভব।

কারণ হিসেবে ফাইনম্যান বলেন, নির্দিষ্ট কিছু বিষয় নিয়ে যোগাযোগ করা খুব সহজ। যেমন আমাদের দেহের আকার ও হাতের আঙুলের সংখ্যা, বাহু ও পা। এমনকি আমরা রসায়ন আর জীববিজ্ঞানের ধারণাগুলোও তাদের কাছে ব্যাখ্যা করতে পারব। কিন্তু তাদের কাছে ডান ও বাঁয়ের ধারণা (কিংবা ঘড়ির কাঁটার দিকে ও ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে) ব্যাখ্যার চেষ্টা করলে প্রতিবারই আমরা ব্যর্থ হব। তাদের কখনোই বোঝানো যাবে না যে আমাদের হৃৎপিণ্ড দেহের বাঁ দিকে থাকে। আবার পৃথিবী কোন দিকে ঘুরছে, কিংবা ডিএনএ অণুর সর্পিলতা কোন দিকে, তা-ও তাদের বোঝানো যাবে না।

সুতরাং কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন বিজ্ঞানী সি এন ইয়াং এবং টি ডি লি সে সময় যখন এই মূল্যবান তত্ত্বটি ভুল বলে প্রমাণ করলেন, তখন নিঃসন্দেহে সেটি ছিল বিস্ময়কর এক ঘটনা। অতিপারমাণবিক কণাগুলোর প্রকৃতি পরীক্ষা করে তাঁরা দেখালেন, লুকিং গ্লাস, পি-রিভার্সড ইউনিভার্সের কোনো অস্তিত্ব নেই। এক পদার্থবিজ্ঞানী এই বৈপ্লবিক ফলাফল জেনে বলেছিলেন, “ঈশ্বর নিশ্চয়ই কোনো ভুল করেছেন।’ এই দুনিয়া পাল্টানো ফলাফলকে বলা হয় ‘ওভারথ্রো অব প্যারিটি’ বা সমতার পরাজয়। এ ফলাফলের জন্য ১৯৫৭ সালে পদার্থবিজ্ঞানে ইয়াং এবং লি নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন।

ফাইনম্যানের জন্য এই উপসংহারের মানে হলো, আপনি যদি এলিয়েনদের সঙ্গে রেডিওতে কথা বলেন, তাহলে এমন এক পরীক্ষার আয়োজন করা সম্ভব, যার মাধ্যমে বাঁহাতি আর ডানহাতি মহাবিশ্বের মধ্যকার পার্থক্য শুধু রেডিওর মাধ্যমেই বোঝানো সম্ভব। (যেমন, তেজস্ক্রিয় কোবাল্ট ৬০ থেকে নিঃসৃত ইলেকট্রনের স্পিন সমানভাবে ঘড়ির কাঁটার দিকে কিংবা ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে থাকে না। বরং তাদের স্পিন ইচ্ছেমতো দিকে থাকে, এতে প্যারিটি বা সমতা ভেঙে যায়। )

তাহলে ফাইনম্যান কল্পনা করতে পারতেন যে এলিয়েন ও মানবজাতির মধ্যে একটি ঐতিহাসিক আলোচনা শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রথম সাক্ষাতের সময় আমরা এলিয়েনদের তাদের ডান হাত বাড়িয়ে দিতে বলব এবং তাদের সঙ্গে হাত মেলাব। এলিয়েনরা যদি সত্যি সত্যিই তাদের ডান হাত বাড়িয়ে দেয়, তাহলে আমরা তাদের সঙ্গে সফলভাবে যোগাযোগ করে বাঁ- ডানের ও ঘড়ির কাঁটার দিকে আর বিপরীত দিকের ধারণা বোঝাতে পেরেছি।

কিন্তু তাহলে ফাইনম্যান আরেকটি যন্ত্রণাদায়ক ভাবনা তুলে ধরতেন। এলিয়েনরা যদি তাদের বাঁ হাত বাড়িয়ে দেয়, তাহলে কী হবে? এর অর্থ হবে, আমরা একটা বড় ধরনের ভুল করেছি। অর্থাৎ আমরা তাদের বাঁ ও ডানের ধারণা বোঝাতে পারিনি। সবচেয়ে বাজে ব্যাপার। কারণ, এর মানে হবে, এই এলিয়েনরা প্রতিবস্তু দিয়ে তৈরি আর তারা সব পরীক্ষাই উল্টোভাবে করে। কাজেই আমাদের চেয়ে তাদের বাঁ ও ডান উল্টো। কাজেই তাদের সঙ্গে হাত মেলালে আমরা বিস্ফোরিত নিশ্চিত হব!

১৯৬০-এর দশক পর্যন্ত আমরা এ রকমই জানতাম। আমাদের মহাবিশ্ব ও সবকিছুই প্রতিবস্তু দিয়ে তৈরি কোনো মহাবিশ্ব আর প্যারিটি-রিভার্সড মহাবিশ্বের মধ্যকার পার্থক্য বলা অসম্ভব ছিল। প্যারিটি ও চার্জ উল্টো করলে ওই মহাবিশ্বও পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলো মেনে চলবে। প্যারিটি নিজেই নিজেকে বাতিল করেছে। কিন্তু চার্জ ও প্যারিটি ওই মহাবিশ্বের জন্য ভালো প্রতিসাম্যতা ছিল। সে কারণে সিপি-রিভার্সড মহাবিশ্ব এখনো থাকা সম্ভব।

মানে আমরা যদি এলিয়েনের সঙ্গে ফোনে কথা বলি, তবে সাধারণ মহাবিশ্ব এবং যে মহাবিশ্ব একই সঙ্গে প্যারিটি ও চার্জ রিভার্সড, তাদের ভেতরে পার্থক্য করতে পারব না (যেমন বাঁ ও ডান পরস্পর প্রতিস্থাপনযোগ্য এবং সব বস্তু প্রতিবস্তুতে পরিণত হয়)।

১৯৬৪ সালে পদার্থবিদেরা দ্বিতীয়বার ধাক্কা খেলেন। দেখা গেল, সিপি- রিভার্সড মহাবিশ্বেরও অস্তিত্ব নেই। অতিপারমাণবিক কণার ধর্ম বিশ্লেষণ করে দেখা গেল, আরেকটি সিপি-রিভার্সড মহাবিশ্বের সঙ্গে রেডিওতে কথা বলে বাঁ-ডান আর ঘড়ির কাঁটার দিকে ও বিপরীত দিকের পার্থক্য বলা সম্ভব। এ ফলাফলের কারণে জেমস ক্রোনিন আর ভ্যাল ফিটচ ১৯৮০ সালে নোবেল পুরস্কার পান।

(সিপি-রিভার্সড মহাবিশ্বকে পদার্থবিদ্যার সূত্রগুলোর সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ দেখানোর পর অনেক পদার্থবিদ হতাশ হন। কিন্তু তারপরও এই আবিষ্কারের পেছনে ভালো বিষয় আছে। সে বিষয়ে আমরা আগেই আলোচনা করেছি। সিপি-রিভার্সড মহাবিশ্ব থাকা সম্ভব হলে প্রকৃত মহাবিস্ফোরণকালে নিখুঁতভাবে একই পরিমাণ বস্তু ও প্রতিবস্তু থাকত। তাহলে মহাবিশ্বের ১০০ ভাগই পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত। তাতে কোনোভাবেই আমাদের পরমাণুর অস্তিত্ব থাকা সম্ভব হতো না। সমপরিমাণ বস্তু ও প্রতিবস্তুর ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর বেঁচে যাওয়া বস্তু থেকে আমাদের অস্তিত্ব সম্ভব হয়েছে, এই চরম সত্যটিই সিপি লঙ্ঘনের নিশ্চিত প্রমাণ। )

কোনো উল্টো প্রতি-মহাবিশ্ব কি থাকা সম্ভব? এর উত্তর হচ্ছে, হ্যাঁ, সম্ভব। প্যারিটি-রিভার্সড আর চার্জ-রিভার্সড মহাবিশ্ব থাকা সম্ভব না হলেও প্রতি- মহাবিশ্ব থাকা সম্ভব। কিন্তু সেটি হবে অদ্ভুতুড়ে। আমরা যদি চার্জ, প্যারিটি বা সমতা আর সময়ের প্রবাহ উল্টে দিই, তাহলে যে মহাবিশ্ব পাওয়া যাবে, সেটি পদার্থবিজ্ঞানের সব সূত্র মেনে চলবে। অর্থাৎ সিপিটি-রিভার্সড মহাবিশ্ব থাকা সম্ভব।

সময় উল্টে দিলে অদ্ভুতুড়ে প্রতিসাম্য পাওয়া যায়। টি-রিভার্সড মহাবিশ্বে ডিনারের প্লেট থেকে ভাজা ডিম লাফিয়ে কড়াইয়ে নেমে গঠন বদলে যাবে। সেটি লাফিয়ে ডিমের ভেতরে ঢুকে ভাঙা ডিমটা ঠিকঠাকমতো লাগিয়ে দেবে। মৃতাবস্থা থেকে আচমকা উঠে বসবে লাশ, তারপর ক্রমে তরুণ হতে হতে একসময় শিশুতে পরিণত হবে এবং হঠাৎ লাফ দিয়ে তাদের মায়ের জঠরে প্রবেশ করবে।

সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান আমাদের বলে, এই টি-রিভার্সড মহাবিশ্ব থাকা সম্ভব নয়। তবে অতিপারমাণবিক কণাদের গাণিতিক সমীকরণ আমাদের অন্য কথা বলে। নিউটনের সূত্রগুলো পেছন দিক কিংবা সামনের দিকে দুই দিকেই নিখুঁতভাবে কাজ করে। ভিডিওতে ধারণ করা একটি বিলিয়ার্ড খেলার কথা কল্পনা করুন। বলের প্রতিটি সংঘর্ষ নিউটনের গতির সূত্র মেনে চলে; কোনো অদ্ভুত গেমের ক্ষেত্রে এ ধরনের কোনো ভিডিও রিভার্স করে চালানো হলেও সেখানে নিউটনের সূত্রগুলো কার্যকর থাকবে।

কোয়ান্টাম তত্ত্বে বিষয়টি আরও জটিল আকার ধারণ করে। কোয়ান্টাম বলবিদ্যার সূত্রগুলো অমান্য করে টি-রিভার্স নিজেই। তবে সম্পূর্ণ সিপিটি- রিভার্সড মহাবিশ্ব সেখানে অনুমোদন করে। এর মানে, কোনো মহাবিশ্বে যেখানে বাঁ ও ডান উল্টো, সেখানে বস্তু পরিণত হবে প্রতিবস্তুতে এবং সময় চলবে পেছন দিকে। আর পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলো মেনে চলবে এ রকম মহাবিশ্ব!

(মজার ব্যাপার হলো, আমরা এমন সিপিটি-রিভার্সড মহাবিশ্বের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করতে পারব না। এই মহাবিশ্বের গ্রহগুলোতে সময় পেছন দিকে চলার মানে হলো, তাদের আমরা যেটাই বলব সেগুলো আসলে তাদের ভবিষ্যতের অংশ। কাজেই তাদের যে কথাই বলা হোক না কেন, তারা সবই বেমালুম ভুলে যাবে। কাজেই পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র সিপিটি-রিভার্সড মহাবিশ্বের অনুমোদন দিলেও আমরা রেডিওর মাধ্যমে কোনো সিপিটি- রিভার্সড এলিয়েনদের সঙ্গে বলা বলতে পারব না।)

সংক্ষেপে বলা যায়, প্রতিবস্তুচালিত ইঞ্জিন হয়তো দূর ভবিষ্যতে আমাদের স্টারশিপের জন্য জ্বালানি জোগাতে পারে। অবশ্য পৃথিবীতে যদি যথেষ্ট পরিমাণ প্রতিবস্তু তৈরি করা যায়, কিংবা মহাকাশে খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয়, তবেই সেটি সম্ভব। সিপি ভায়োলেশনের কারণে বস্তু ও প্রতিবস্তুর মধ্যে সামান্য ভারসাম্যহীনতা ছিল। এর ফলে হয়তো গভীর মহাকাশে প্রতিবস্তুর কিছু উৎস এখনো টিকে থাকতে পারে। কে জানে কোনো দিন সেগুলো সংগ্রহ করাও সম্ভব হবে।

কিন্তু প্রতিবস্তুর ইঞ্জিনের প্রযুক্তিগত জটিলতার কারণে এই প্রযুক্তি হাতের মুঠোয় পেতে আরও এক শতাব্দী বা তার চেয়ে বেশি সময় লাগতে পারে। সে কারণে একে প্রথম শ্রেণির অসম্ভাব্যতা হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।

চলুন, আরেকটি প্রশ্ন নিয়ে ভাবা যাক। ভবিষ্যতের হাজার বছরের মধ্যে আলোর চেয়ে দ্রুতগতির কোনো স্টারশিপ বানানো কি সম্ভব? আইনস্টাইনের বিখ্যাত মতবাদ ‘কোনো কিছুই আলোর চেয়ে বেশি বেগে চলতে পারে না’—এই ধারণায় কি কোনো ত্রুটি আছে? বিস্ময়কর হলেও সত্য, এই প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে, হ্যাঁ।

তথ্যনির্দেশ

বিশেষ আপেক্ষিকতা : বিজ্ঞানের নিয়মকানুন সব পর্যবেক্ষকের জন্য একই হবে। মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের অনুপস্থিতিতে পর্যবেক্ষকের গতিবেগ যা-ই হোক না কেন, সব ক্ষেত্রেই নিয়মকানুন একই হবে। এসব ধারণার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা আইনস্টাইনের তত্ত্ব।

নিউট্রিনো: একটি চার্জহীন কণা। খুবই হালকা কণা, যা শুধু দুর্বল বল দিয়ে প্রভাবিত হয়।

সিপিটি : পদার্থবিদ্যার সূত্রগুলোতে অতীত ও ভবিষ্যতের মধ্যে পার্থক্যসূচক কোনো বৈশিষ্ট্য নেই। আরও ভালোভাবে বলতে গেলে, C, P, T নামে পরিচিত কিছু কার্যক্রমের অধীনে পদার্থবিদ্যার সূত্রগুলো সব সময় অপরিবর্তিত থাকে। এখানে C অর্থ প্রতিকণার কারণে কণাতে পরিবর্তন। P-এর অর্থ দর্পণে প্রতিফলিত প্রতিবিম্ব নেওয়া, যাতে বাঁ ও ডান পরস্পরের সঙ্গে অদলবদল করতে পারে। আর T-এর অর্থ সবগুলো কণার গতির দিক উল্টো দিকে আনা, যাতে কণাদের গতিপথ পেছন দিকে হয়। পদার্থবিদ্যার যেসব সূত্র সব রকম সাধারণ অবস্থায় বস্তুর আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে, সেগুলো C ও P-এর অধীনে কার্যক্রমেও একই থাকে। অন্য কথায়, অন্য কোনো গ্রহের অধিবাসী, যারা আমাদের দর্পণ প্রতিবিম্ব ও যারা প্রতিকণা দিয়ে তৈরি, তাদের জীবনও ঠিক আমাদের মতোই হবে। তারা হয়তো প্রতিকণা দিয়ে তৈরি।

––––––––––––––––––––—

দ্বিতীয় পর্ব : দ্বিতীয় শ্রেণির অসম্ভাব্যতা

১১. আলোর গতি ছাড়িয়ে

খুব সহজেই বোঝা যায়, প্রাণ শেষ পর্যন্ত ছায়াপথ পেরিয়ে আরও দূরে ছড়িয়ে পড়বে। ফলে প্রাণ এখন মহাবিশ্বের ক্ষুদ্র ও অগুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে থাকলেও চিরকাল যে এভাবেই থাকবে এমনটা নাও হতে পারে। সত্যি বলতে কী, আমার কাছে একে খুব জোরালো মত বলে মনে হয়।

—অ্যাস্ট্রোনোমার রয়েল স্যার মার্টিন রিস

আলোর চেয়ে বেশি বেগে ভ্রমণ করা অসম্ভব। নিঃসন্দেহে তা প্রত্যাশিতও নয়। কারণ, তাহলে মাথার হ্যাট বাতাসে উড়ে যাবে।

—উডি অ্যালেন

স্টার ওয়ার্স মুভিতে দেখা যায়, ট্যাটুনি নামের ঊষর এক গ্রহ থেকে মিলেনিয়াম ফ্যালকন নভোযান উৎক্ষেপিত হয়ে আমাদের নায়ক লুক স্কাইওয়াকার আর হ্যান সোলোকে বহন করে আনে। কিন্তু গ্রহটির কক্ষপথে ওত পেতে ঘুরছিল শত্রুপক্ষের ইম্পেরিয়াল যুদ্ধজাহাজের এক ভয়ানক সেনাদল। তাদের সঙ্গে ভয়াবহ সংঘর্ষে লিপ্ত হয় নভোজাহাজটি। এম্পায়ারের যুদ্ধজাহাজ একঝাঁক লেজার বিস্ফোরক ছুড়েছিল আমাদের নায়কদের নভোজাহাজ লক্ষ্য করে। নভোযানের বলক্ষেত্রে এসে ক্রমান্বয়ে ভেঙে পড়ে সেগুলো। এভাবে কোনোমতে বেঁচে পালাতে সক্ষম হয় মিলেনিয়াম ফ্যালকন।

বিধ্বংসী লেজার বিস্ফোরণের মুখে স্রেফ ভস্ম হওয়ার উপক্রম হয় নভোযানটি। তখন হ্যান সলো চিৎকার করে বলে ওঠে, তাদের বাঁচার একমাত্র আশা হলো হাইপারস্পেসে ঝাঁপ দেওয়া। তার কথা শেষ হতে না হতেই চোখের পলকে গর্জে ওঠে হাইপারড্রাইভ ইঞ্জিন। চারপাশের সব নক্ষত্র সঙ্গে সঙ্গে তাদের ভিউ স্ক্রিনের কেন্দ্রের দিকে সংকুচিত হয়ে একত্র হতে থাকে। নিমেষেই দৃষ্টি আচ্ছন্নকারী আলোর গুচ্ছে পরিণত হয় সেগুলো। এরপর শিগগিরই এক গর্ত খুলে যায়। তার মধ্য দিয়ে মিলেনিয়াম ফ্যালকন গুরুগম্ভীর গর্জন করতে করতে দ্রুতবেগে চলতে থাকে। এরপর তা হাইপারস্পেসে পৌঁছে মুক্ত হয়।

এটি কি বিজ্ঞান কল্পকাহিনি? নিঃসন্দেহে তাই। বৈজ্ঞানিক কোনো সত্যের ওপর ভিত্তি করে এ রকম কি ঘটা সম্ভব? হয়তো, পারে। আলোর চেয়ে বেশি বেগে চলাচল করা বিজ্ঞান কল্পকাহিনিতে সব সময়ই জলভাতের মতো ব্যাপার ছিল। তবে সম্প্রতি এ সম্ভাবনা নিয়ে গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে শুরু করেছেন পদার্থবিদেরাও।

আইনস্টাইনের কথামতো, আলোর বেগই হলো আমাদের মহাবিশ্বের চূড়ান্ত গতিসীমা। এমনকি আমাদের সবচেয়ে শক্তিশালী কণা ত্বরকযন্ত্রও অতিপারমাণবিক কোনো কণাকে আলোর চেয়ে বেশি গতিতে ছুড়ে দিতে পারে না। অ্যাটম স্ম্যাশার বা কণা ত্বরকযন্ত্র যে শক্তি তৈরি করে, তা শুধু বিস্ফোরণোন্মুখ নক্ষত্রের কেন্দ্রে বা মহাবিস্ফোরণের সময় মিলতে পারে। সব দেখে মনে হয়, আলোর বেগই আমাদের মহাবিশ্বের চূড়ান্ত ট্রাফিক পুলিশ। যদি তা-ই হয়, তাহলে বহু দূরের কোনো ছায়াপথে যাওয়ার কোনো আশাই আর থাকে না।

কিন্তু তা যদি না হয়…

ব্যর্থ আইনস্টাইন

আইজ্যাক নিউটনের পর তরুণ পদার্থবিদ আলবার্ট আইনস্টাইনই যে সেরা পদার্থবিজ্ঞানী হিসেবে বিশ্বব্যাপী সুনাম কুড়াবেন, সেটা ১৯০২ সালে কল্পনাও করা যেত না। আসলে ওই বছরটি ছিল আইনস্টাইনের জীবনে সবচেয়ে বাজে সময়। সদ্য পিএইচডি ডিগ্রিধারী শিক্ষার্থী হিসেবে অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার চাকরির আবেদন করেন তিনি। কিন্তু একে একে সব কটি জায়গা থেকে প্রত্যাখ্যাত হন। (পরে তিনি আবিষ্কার করেন, তাঁকে সুপারিশ করে তাঁর শিক্ষক প্রফেসর হেনরিক ওয়েবার বিভিন্ন জায়গায় ভয়ানক সব চিঠি পাঠিয়েছেন। সম্ভবত তাঁর ক্লাস বাদ দেওয়ার কারণে আইনস্টাইনের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে এটি করেছিলেন তিনি।) এদিকে তাঁর বান্ধবী মেলিভা মেরিকের চরম বিরোধিতা শুরু করেছিলেন আইনস্টাইনের মা। অথচ মিলেভার গর্ভে তখন আইনস্টাইনের সন্তান। তাঁদের প্রথম সন্তান লিসেরেল একসময় জারজ হয়েই জন্ম নেবে।

তরুণ আলবার্ট যেসব ঠিকা চাকরি জোগাড় করেছিলেন, সেগুলোতে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছিলেন। এমনকি অতি স্বল্প বেতনে পড়ানোর কাজ থেকেও তাঁকে হঠাৎ ছাঁটাই করা হয়েছিল। এ সময় তিনি জীবন ধারণের জন্য সেলসম্যানের কাজ নেওয়ার কথাও চিন্তা করেছিলেন। সে সময় লেখা বিষণ্ণ কিছু চিঠিপত্রে এসবের উল্লেখ আছে। এমনকি নিজের পরিবারকে তিনি এমনও লিখেছেন, তাঁর জন্ম না হলেই বোধ হয় ভালো হতো। কারণ, তখন নিজের পরিবারেও নিজেকে স্রেফ একটা বোঝা বলে ভাবতে শুরু করছিলেন তিনি। জীবনে কোনো সফলতার মুখ দেখতে না পেয়ে এমন মন্তব্য করেন আইনস্টাইন। বাবা মারা যাওয়ার পর, তিনি বেশ লজ্জা পান। লজ্জার পেছনে ভাবনাটি ছিল, নিজের সন্তানকে পুরোপুরি ব্যর্থ মনে করে মারা গেলেন তাঁর বাবা।

তবে এর পরের বছর আইনস্টাইনের ভাগ্যের চাকা ঘুরে যাবে। সুইস পেটেন্ট অফিসে তাঁর জন্য একটা ক্লার্কের চাকরির ব্যবস্থা করে দেবেন তাঁরই এক বন্ধু। এরপর এই সবচেয়ে বাজে অবস্থা থেকে আধুনিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিপ্লবের জন্ম দেবেন আইনস্টাইন। তাঁর টেবিলে জমা হওয়া পেটেন্টগুলো তিনি খুব দ্রুত বিশ্লেষণ করতে পারবেন। তারপর ঘণ্টার পর ঘণ্টা পদার্থবিদ্যার সমস্যা নিয়ে মগ্ন থাকবেন, যেগুলো ছোটবেলা থেকেই ধাঁধার মধ্যে ফেলেছিল তাঁকে।

তাঁর প্রতিভার গোপন রহস্য কী? বিশুদ্ধ গণিতের বদলে ভৌত ছবির (যেমন চলমান ট্রেন, ত্বারিত ঘড়ি, প্রসারিত চাদর) মাধ্যমে চিন্তা করার ক্ষমতা ছিল আইনস্টাইনের। এটি হয়তো তাঁর প্রতিভার একটি ব্লু হতে পারে। আইনস্টাইন একবার বলেছিলেন, কোনো শিশুর কাছে কোনো তত্ত্ব ব্যাখ্যা করতে না পারলে সে তত্ত্ব সম্ভবত অর্থহীন, অকেজো। বা যেকোনো তত্ত্বের নির্যাস অবশ্যই ভৌত ছবির মাধ্যমে বর্ণনা করতে হবে। বেশির ভাগ পদার্থবিদ কঠিন গণিতের মধ্যে হাবুডুবু খান, যা তাদের কোনো পথের নির্দেশনা দেয় না। তবে পূর্বসূরি নিউটনের মতো আইনস্টাইনও ভৌত ছবির প্রতি আসক্ত ছিলেন। গাণিতিক বিষয়গুলো আসবে আরও পরে। নিউটনের ক্ষেত্রে ভৌত ছবিখানি ছিল পড়ন্ত আপেল ও একখানি চাঁদ। একটি আপেলকে যে বল মাটিতে ফেলছে, সেই একই বল কি চাঁদকে কক্ষপথে ধরে রাখে? একসময় নিউটন বুঝতে পারলেন, এর উত্তর হ্যাঁ। তখন মহাবিশ্বের জন্য একটি গাণিতিক নকশা প্রণয়ন করলেন তিনি। সেটি হঠাৎ মহাকাশে লুকিয়ে থাকা চরম সব রহস্য উন্মোচন করে বসল। গ্রহগুলোর গতিপথের রহস্য উন্মোচিত হলো এভাবে।

আইনস্টাইন ও আপেক্ষিকতা

আলবার্ট আইনস্টাইন তাঁর বিখ্যাত স্পেশাল থিওরি অব রিলেটিভিটি বা বিশেষ আপেক্ষিকতার প্রকাশ করেন ১৯০৫ সালে। তাঁর তত্ত্বটির মর্মমূলে ছিল একটি ছবি, যা যেকোনো শিশুও বুঝতে পারে। আসলে তাঁর তত্ত্বটি ছিল একটি অলীক কল্পনার উপসংহার। ১৬ বছর বয়সে কল্পনাটি করেন তিনি। ওই কিশোর বয়সে তিনি এক ভাগ্যনির্ধারণী প্রশ্ন করেন। তাঁর প্রশ্নটি ছিল : একটা আলোকরশ্মির পিঠে চড়ে বসলে কী ঘটবে? তরুণ বয়সে তিনি জানতেন, নিউটনের বলবিদ্যা পৃথিবীর ও মহাকাশের বিভিন্ন বস্তুর গতির ব্যাখ্যা দেয়। অন্যদিকে ম্যাক্সওয়েলের তত্ত্ব ব্যাখ্যা করে আলো। সেকালে এ দুটিই ছিল পদার্থবিদ্যার দুটি ভিত্তি স্তম্ভ।

আইনস্টাইনের প্রতিভার মূল সারবত্তা হলো, এই ভিত্তি দুটি যে পরস্পরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, তা একসময় ঠিকই বুঝে ফেলেন তিনি। কাজেই দুটোর যেকোনো একটাকে সরে দাঁড়াতেই হবে।

নিউটনের তত্ত্বমতে, আপনি দৌড়ে সব সময় কোনো আলোকরশ্মিকে ছাড়িয়ে যেতে পারবেন। কারণ, আলোর গতিতে বিশেষ কোনো ব্যাপার নেই। এর মানে, আপনি যদি কোনো আলোকরশ্মির পাশে আলোর গতিতে দৌড়াতে থাকেন, তাহলে আপনার পাশে আলো স্রেফ স্থির হয়ে দেখা দেবে। কিন্তু একজন তরুণ পদার্থবিদ হিসেবে আইনস্টাইন বুঝতে পারেন, পুরো স্থির অবস্থায় বা জমাট তরঙ্গ হিসেবে কেউই কখনো কোনো আলো তরঙ্গ দেখেনি। তাই তিনি সিদ্ধান্তে এলেন, নিউটনের তত্ত্ব এ ক্ষেত্রে সঠিক কথা বলে না।

জুরিখে কলেজশিক্ষার্থী হিসেবে ম্যাক্সওয়েলের তত্ত্ব পড়তে গিয়ে অবশেষে কৈশোরে জাগা প্রশ্নের উত্তর পান আইনস্টাইন। এভাবে তিনি এমন কিছু আবিষ্কার করে বসলেন, খোদ ম্যাক্সওয়েলও যেটি নিশ্চিত ছিলেন না। সেটি হলো : আলোর গতি ধ্রুব। মানে আপনি কত জোরে দৌড়াচ্ছেন, তার ওপর কখনো আলোর গতি নির্ভর করে না। আপনি যদি আলোর দিকে বা আলো থেকে দূরে সরে যেতে থাকেন, তারপরও আলো একই বেগে চলবে। কিন্তু এই উপলব্ধি আমাদের সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানের সঙ্গে মেলে না। আইনস্টাইন তাঁর কৈশোরে মাথায় জাগা প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেলেন : আপনি কখনোই কোনো আলোকরশ্মির পাশে দৌড় প্রতিযোগিতায় নামতে পারবেন না। কারণ, আলো সব সময় আপনার কাছ থেকে এক নির্দিষ্ট ধ্রুবগতিতে চলে। আপনি কত জোরে দৌড়াচ্ছেন, তা একে প্রভাবিত করে না।

কিন্তু নিউটনের বলবিদ্যা কঠিনভাবে সংরক্ষিত এক সিস্টেমের মধ্যে ছিল। আপনি যদি এর অনুমানে সামান্য পরিবর্তন করেন, তাহলে ঢিলা কোনো সুতাকে টানার মতো পুরো তত্ত্বটিই ভেঙে পড়তে পারে। নিউটনের তত্ত্বে মহাবিশ্বজুড়ে সময়ের পথ সুষম। পৃথিবীর এক সেকেন্ড হুবহু শুক্র বা মঙ্গল গ্রহে এক সেকেন্ড। একইভাবে, পৃথিবীতে মিটারের দণ্ড রাখলে যে দৈর্ঘ্য পাওয়া যাবে, প্লুটোতেই তা-ই হবে। কিন্তু আলোর গতি সব সময় ধ্রুব হলে আর আপনার বেগের ওপর তা নির্ভর না করলে স্থান ও কাল নিয়ে আমাদের উপলব্ধিতে বড় ধরনের একটা পরিবর্তনের প্রয়োজন পড়ে। স্থান ও কালের গভীর বিকৃতি ঘটবে যদি আলোর গতিকে ধ্রুব রাখতে হয়।

আইনস্টাইনের মতে, আপনি যদি কোনো রকেট শিপের গতি বাড়ান, তাহলে রকেটের ভেতরে সময়ের গতিপথ পৃথিবীর সাপেক্ষে ধীরগতির হতে হবে। সময়ও স্পন্দিত হবে ভিন্ন হারে। সেটি নির্ভর করবে আপনি কত দ্রুত চলছেন। আবার রকেট শিপের ভেতরের স্থানও সংকুচিত হয়ে যাবে। কাজেই আপনার গতির ওপর ভিত্তি করে মিটার দণ্ডের দৈর্ঘ্যও যাবে বদলে। আবার রকেটের ভরও বেড়ে যাবে একইভাবে। ওই রকেটের ভেতরটা যদি আমরা টেলিস্কোপ দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখতে পারতাম, তাহলে দেখা যেত, সেখানে মানুষ ধীরে চলাফেরা করছে। আর সেখানকার মানুষগুলোকে দেখতে পাওয়া যাবে চ্যাপ্টা বা সংকুচিত অবস্থায়।

আসলে রকেটটি আলোর গতিতে চললে রকেটের ভেতরে সময় আপাতভাবে থেমে যাবে। রকেটটিও সংকুচিত হয়ে অজানা কিছু হয়ে যাবে আর তার ভরও হবে অসীম। এই পর্যবেক্ষণগুলো আসলে বোধগম্য কোনো অর্থ প্রকাশ করে না। তাই আইনস্টাইন বললেন, কোনো কিছুই আলোর গতির সীমা অতিক্রম করতে পারবে না। (কারণ, কোনো বস্তু যত দ্রুতবেগে চলবে ততই তা ভারী হতে থাকবে। এর মানে, এই গতিশক্তি রূপান্তরিত হয়ে ভরে পরিণত হয়েছে। এই নির্দিষ্ট শক্তি থেকে পাওয়া ভরের পরিমাণ সহজে পরিমাপ করা যায়। এর কয়েক লাইন পর সেই বিখ্যাত সমীকরণ E=mc^2-এ এসে পৌঁছাই আমরা।)

আইনস্টাইন তাঁর বিখ্যাত সমীকরণটি প্রকাশ করার পর আক্ষরিক অর্থেই লাখো পরীক্ষার মাধ্যমে তাঁর বৈপ্লবিক আইডিয়াটি প্রমাণিত হয়েছে। যেমন পৃথিবীতে আপনার অবস্থান কয়েক ফুটের মধ্যে নির্ণয় করতে ব্যবহৃত জিপিএস সিস্টেমও ভুল ফলাফল দেবে, যদি আপেক্ষিকতা থেকে পাওয়া সংশোধনী এতে যোগ করা না হয়। (সেনাবাহিনীও জিপিএস সিস্টেমের ওপর নির্ভর করে। তাই পেন্টাগনের জেনারেলদেরও আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা সম্পর্কে সংক্ষেপে বোঝান পদার্থবিদেরা।) জিপিএসের ঘড়ি আসলে পৃথিবীর ওপরে গতিশীল অবস্থায় বদলে যায়, ঠিক যেমনটি আইনস্টাইন অনুমান করেছিলেন।

এ ধারণার সবচেয়ে ভালো চিত্রটি পাওয়া যায় কণা ত্বরকযন্ত্রে। সেখানে বিজ্ঞানীরা কণাদের আলোর কাছাকাছি বেগে ত্বরণ ঘটান। সুইজারল্যান্ডে জেনেভা শহরের বাইরে লার্জ হ্যাড্রন কলাইডর নামে সার্নের বিশালাকৃতির কণা ত্বরকযন্ত্রে প্রোটনকে কয়েক ট্রিলিয়ন ইলেকট্রন ভোল্টে ত্বারিত বা গতিশীল করা হয়। এতে আলোর প্রায় কাছাকাছি বেগে চলে কণা।

রকেট সায়েন্টিস্টদের কাছে আলোর এ বাধা এখনো তেমন সমস্যা হয়ে দেখা দেয়নি। কারণ, রকেট ঘণ্টায় প্রায় কয়েক হাজার মাইল বেগে চলতে পারে। তবে এক বা দুই শতাব্দীর মধ্যে আমাদের কাছের নক্ষত্রে (পৃথিবী থেকে ৪ আলোকবর্ষ দূরে) অনুসন্ধানী নভোযান পাঠানোর কথা ভাবতে শুরু করবেন রকেট সায়েন্টিস্টরা। তখন আলোর এই বাধা ক্রমেই একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে।

আইনস্টাইনের তত্ত্বের ত্রুটি

কয়েক দশক ধরে পদার্থবিদেরা আইনস্টাইনের বিখ্যাত তত্ত্বের ফাঁক খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন। কিছু ফাঁকফোকর অবশ্য পাওয়াও গেছে, কিন্তু সেগুলোর বেশির ভাগ তেমন কাজের কিছু নয়। যেমন কেউ যদি মহাকাশ এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে একটা ফ্ল্যাশলাইট নিয়ে নাড়াচাড়া করতে থাকে, তাহলে তাত্ত্বিকভাবে, আলোকরশ্মির ছবিটি আলোর গতিকেও ছাড়িয়ে যাবে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ফ্ল্যাশলাইটের ছবিটি দিগন্তের এক বিন্দু থেকে বিপরীত বিন্দুতে চলতে থাকবে। এই দূরত্ব কয়েক শ আলোকবর্ষ ছাড়িয়ে যেতে পারবে। কিন্তু এটি তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়; কারণ, এভাবে কোনো তথ্যই আলোর চেয়ে বেশি বেগে স্থানান্তরিত হতে পারবে না। আলোকরশ্মির এই ছবি আলোর গতিকে ছাড়িয়ে যাবে, তবে ছবিটি কোনো শক্তি বা কোনো তথ্য বহন করবে না।

ধরা যাক, আমাদের কাছে দুটি কাঁচি আছে। ব্লেড দুটিকে সংযোগ বিন্দু থেকে যত দূরে রাখা হবে পারস্পরিক ছেদবিন্দুটি তত দ্রুত চলাফেরা করবে। যদি কল্পনা করি, কাঁচিটির দৈর্ঘ্য এক আলোকবর্ষ লম্বা, তাহলে ব্লেড দুটোকে বন্ধ করলে ছেদ বিন্দুটি আলোর চেয়েও দ্রুতবেগে চলবে। (আবারও যেহেতু ছেদবিন্দু কোনো শক্তি বা তথ্য বহন করে না, তাই এরও কোনো গুরুত্ব নেই।)

একইভাবে চতুর্থ অধ্যায়ে যেমন বলেছি, ইপিআর এক্সপেরিমেন্টের মাধ্যমে আলোর চেয়েও দ্রুতবেগে তথ্য পাঠানো যায়। (একটু ঝালিয়ে নেওয়া যাক, এই পরীক্ষায় দুটি ইলেকট্রন সমলয়ে স্পন্দিত হয়। তারপর তাদেরকে বিপরীত দিকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এই ইলেকট্রন পরস্পর সংসক্ত বলেই তাদের মধ্যে তথ্য আলোর চেয়েও দ্রুতবেগে পাঠানো যায়। কিন্তু এই তথ্য এলোমেলো, তাই অকাজের। তাই ইপিআর মেশিন ব্যবহার করে দূরবর্তী কোনো নক্ষত্রে অনুসন্ধানী নভোযান পাঠানো যাবে না।)

পদার্থবিদদের কাছে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ত্রুটিটি এসেছে স্বয়ং আইনস্টাইনের কাছ থেকে। ১৯১৫ সালে জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভি বা সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্ব আবিষ্কার করেন তিনি। তত্ত্বটি বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্বের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। শিশুদের নাগরদোলার (মেরি গো রাউন্ড) কথা ভাবতে গিয়ে সাধারণ আপেক্ষিকতার বীজ বোনেন আইনস্টাইন। কিছুক্ষণ আগে দেখেছি, আলোর গতিতে চলতে গেলে বস্তুর আকার সংকুচিত হয়। যত দ্রুতগতিতে চলা যাবে, তত বেশি সংকুচিত হবে। কিন্তু ঘূর্ণমান কোনো ডিস্কে বাইরের পরিধি কেন্দ্রের চেয়ে বেশি জোরে চলে। (আসলে কেন্দ্রটি প্রায় স্থির থাকে।) এর মানে, কোনো রুলার বা পরিমাপক দণ্ডকে পরিধিতে রাখলে তা অবশ্যই সংকুচিত হবে। অন্যদিকে রুলারটিকে কেন্দ্রে রাখা হলে সেটি প্রায় একই রকম থাকবে। তাই নাগরদোলার পৃষ্ঠতল তখন আর সমতল থাকছে না, বক্র হয়ে যাচ্ছে। সুতরাং সিদ্ধান্ত টানা যায়, নাগরদোলার স্থান ও সময়ের বক্রতায় ত্বরণের প্রভাব রয়েছে।

সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্বে, স্থান-কাল এমন এক বুনন বা কাঠামো, যা প্রসারিত ও সংকুচিত হতে পারে। নির্দিষ্ট অবস্থায় এই কাঠামো আলোর চেয়েও দ্রুতবেগে প্রসারিত হয়। উদাহরণ হিসেবে বিগ ব্যাং বা মহাবিস্ফোরণের কথা ধরা যাক। ১৩.৭ বিলিয়ন বছর আগে এক মহাজাগতিক বিস্ফোরণের মাধ্যমে মহাবিশ্বের জন্মকে বলা হয় বিগ ব্যাং। এখানে সহজেই গণনা করে বের করা যায় যে মহাবিশ্ব আসলে আলোর চেয়েও দ্রুতবেগে প্রসারিত হয়েছিল। (এই কর্মটি বিশেষ আপেক্ষিকতা লঙ্ঘন করে না। কারণ, স্বয়ং নক্ষত্ররা নয়, বরং শূন্যস্থান বা নক্ষত্রদের মাঝখানের স্থান প্রসারিত হয়েছিল। প্রসারিত স্থান কোনো তথ্য বহন করে না।)

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিশেষ আপেক্ষিকতা শুধু স্থানীয়ভাবে প্রয়োগ করা যায়। অর্থাৎ আপনার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে। আপনার স্থানীয় এলাকায় (যেমন সৌরজগৎ) বিশেষ আপেক্ষিকতা কাজ করে। আমাদের মহাকাশ অনুসন্ধানী নভোযান দিয়ে সেটি নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে বৈশ্বিকভাবে (যেমন মহাজাগতিক পরিসরে, যার সঙ্গে মহাবিশ্ব জড়িত) এর বদলে অবশ্যই সাধারণ আপেক্ষিকতা ব্যবহার করতে হবে। সাধারণ আপেক্ষিকতায় স্থান-কাল একটি বুনন বা কাঠামো। এই বুনন আলোর চেয়েও দ্রুতবেগে প্রসারিত হতে পারে। আবার স্থানের মধ্যে গর্তেরও অনুমোদন দেয় এটি। এই গর্ত দিয়ে স্থান-কালের মধ্য দিয়ে শর্টকাট পথও তৈরি করে নেওয়া যায়।

এই সতর্কবার্তার পর, হয়তো আলোর চেয়ে দ্রুতবেগে ভ্রমণ করার একটি উপায়ের কথা মনে করিয়ে দেয় সাধারণ আপেক্ষিকতা। এখানে আসলে দুটি উপায় আছে, যা দিয়ে এটি ঘটানো সম্ভব।

১. প্রসারিত স্থান : আপনার পেছনের স্থান যদি প্রসারিত আর সামনের স্থান সংকুচিত করতে পারেন, তাহলে এমন বিভ্রান্তি হবে যেন আপনি আলোর চেয়ে দ্রুতবেগে চলছেন। আসলে বাস্তবে মোটেও তা ঘটে না। তবে স্থান বিকৃত হয়ে যাওয়ার কারণে, আপনার কাছে মনে হবে, চোখের পলকে দূরের কোনো নক্ষত্রে চলে গেছেন আপনি

২. বিভক্ত স্থান : ১৯৩৫ সালে ওয়ার্মহোলের মতো এক ধারণার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন আইনস্টাইন। অ্যালিসের লুকিং গ্লাসের কথা একবার মনে করুন। সেটি এমন এক যন্ত্র ছিল, যা অক্সফোর্ডের গ্রাম থেকে ওয়ান্ডারল্যান্ডকে সংযুক্ত করেছিল। ওয়ার্মহোলও এমন এক যন্ত্র, যা দুটি মহাবিশ্বকে সংযুক্ত করে। গ্রেড স্কুলে পড়ার সময় আমরা শিখেছি, দুটি বিন্দুর মধ্যে সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত পথ হলো সরলরেখা। কিন্তু অনিবার্যভাবে কথাটি সত্য নয়। কারণ, একখণ্ড কাগজকে যদি গোল করা হয়, যতক্ষণ না দুটি প্রান্ত পরস্পরকে স্পর্শ করছে, তাহলে দেখা যাবে, দুটি বিন্দুর মধ্যে সবচেয়ে ছোট পথ আসলে একটি ওয়ার্মহোল।

ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ ম্যাট ভিসার বলেন, ‘আপেক্ষিকতার সমর্থক সমাজ র‍্যাপ ড্রাইভ বা ওয়ার্মহোলের মতো বিষয় বিজ্ঞান কল্পকাহিনির জগতের বাইরে আনার জন্য কী করণীয়, তা নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে।’

এমনকি গ্রেট ব্রিটেনের রাজকীয় জ্যোতির্বিদ স্যার মার্টিন রিস বলেন, ‘ওয়ার্মহোল, অতিরিক্ত মাত্রা ও কোয়ান্টাম কম্পিউটার এমন দূরকল্পনার জগৎ খুলে দিয়েছে যে তা আমাদের গোটা মহাবিশ্বকে একসময় “জীবন্ত এক কসমসে” বদলে দিতে পারে।

আলকুবিরি ড্রাইভ ও ঋণাত্মক শক্তি

প্রসারমাণ স্থানের সবচেয়ে ভালো উদাহরণ হলো আলকুবিরি ড্রাইভ। আইনস্টাইনের মহাকর্ষতত্ত্ব ব্যবহার করে এটি ১৯৯৪ সালে উত্থাপন করেন পদার্থবিদ মিগুয়েল আলকুবিরি। এর প্রোপালশন সিস্টেম ঠিক স্টার ট্রেকের মতো। এ ধরনের স্টারশিপের পাইলট একটি বাবল বা বুদের মধ্যে (যাকে বলা হয় র‍্যাপ বাবল) বসে থাকেন। সেখানে সবকিছুই আপাতভাবে স্বাভাবিক বলে মনে হয়। এমনকি নভোযানটি আলোর গতিসীমাও ভাঙতে পারে এখানে। পাইলটের কাছে মনে হবে তিনি স্থির অবস্থায় রয়েছেন। কিন্তু স্থান-কালের চরম বিকৃতি ঘটবে র‍্যাপ বাবলের বাইরে। কারণ, র‍্যাপ বাবলের সামনের স্থান সংকুচিত হয়ে যাবে। এখানে কোনো টাইম ডায়লেশন হবে না। কাজেই র‍্যাপ বাবলের ভেতরে সময় স্বাভাবিকভাবেই প্রবাহিত হবে।

আলকুবিরির মতে, এই সমাধান খুঁজে পাওয়ার পেছনে স্টার ট্রেকের হয়তো একটা ভূমিকা ছিল। তিনি বলেন, “স্টার ট্রেকের কলাকুশলীরা র‍্যাপ ড্রাইভ বা স্থানকে বিকৃত করার ধারণা নিয়ে কথাবার্তা বলত। স্থান কীভাবে বিকৃত হবে বা হবে না, তার জন্য আমাদের কাছে এরই মধ্যে একটিমাত্র তত্ত্বই ছিল। সেটি হলো সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্ব। আমার মনে হয়েছিল, র‍্যাপ ড্রাইভ কীভাবে কাজ করবে, সেটা দেখতে এ ধারণাটি ব্যবহারের কোনো না কোনো উপায় আছে।’ ইতিহাসে এটিই সম্ভবত প্রথম কোনো ঘটনা, যেখানে একটা টিভি অনুষ্ঠান আইনস্টাইনের কোনো সমীকরণ সমাধানে উৎসাহিত করেছে।

আলকুবিরির ধারণা, তাঁর প্রস্তাবিত স্টারশিপে চড়ে যাত্রার সঙ্গে স্টার ওয়ার্সের মিলেনিয়াম ফ্যালকনের যাত্রার মিল আছে। ‘আমার ধারণা, এদের সম্ভবত কিছু মিল আছে। স্টারশিপের সামনে, নক্ষত্রগুলো লম্বা রেখার মতো হবে। পেছনে, কিছুই দেখা যাবে না, শুধু কালো হয়ে থাকবে। কারণ, নক্ষত্রের আলো স্টারশিপটির পিছু ধাওয়া করার মতো যথেষ্ট দ্রুত চলতে পারবে না।’ বলেন আলকুবিরি।

আলকুবিরি ড্রাইভের মূল চাবিকাঠি প্রয়োজনীয় শক্তি, যা নভোযানকে আলোর চেয়ে বেশি বেগে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে। সাধারণত স্টারশিপ চালাতে ধনাত্মক শক্তি ব্যবহার করেন পদার্থবিদেরা। এর মাধ্যমে সব সময় আলোর চেয়ে কম বেগে চলা যায়। কিন্তু আলোর চেয়ে বেশি বেগে চলতে চাইলে এই কৌশল বাদ দিয়ে স্টারশিপের জ্বালানি বদলাতে হবে। এক সহজ গণনায় দেখা গেছে, সে জন্য দরকার ঋণাত্মক ভর কিংবা ঋণাত্মক শক্তি। মহাবিশ্বে যদি এর অস্তিত্ব থাকে, তাহলে এটিই সম্ভবত সবচেয়ে চমকপ্রদ বস্তু। আগের ঐতিহ্যমতো বিজ্ঞান কল্পকাহিনির মতো ঋণাত্মক ভর ও ঋণাত্মক শক্তি থাকার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন পদার্থবিদেরা। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, আলোর চেয়ে বেশি বেগে চলার জন্য এগুলো অপরিহার্য। আবার এদের অস্তিত্ব সত্য হওয়াও সম্ভব।

প্রকৃতিতে অনেক দিন ধরে ঋণাত্মক বস্তুর অনুসন্ধান চালাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। কিন্তু এতে এখনো সফলতা আসেনি। (প্রতিবস্তু এবং ঋণাত্মক বস্তু দুটি আলাদা জিনিস। প্রথমটির অস্তিত্ব আছে ও এদের শক্তি ধনাত্মক হলেও চার্জ বিপরীত। অন্যদিকে নেগেটিভ ম্যাটার বা ঋণাত্মক বস্তু থাকার এখনো কোনো প্রমাণ মেলেনি।) ঋণাত্মক বস্তু অদ্ভুত চরিত্রের হবে। কারণ, অস্তিত্বহীনতার চেয়েও হালকা হবে এটি। আসলে এটি বাতাসে ভাসবে। আদিম মহাবিশ্বে যদি ঋণাত্মক বস্তু থাকত, তাহলে মহাকাশে তার ভেসে বেড়ানোর কথা। গ্রহদের মহাকর্ষে বাধা পড়ে উল্কা বিভিন্ন গ্রহে আছড়ে পড়ে। কিন্তু ঋণাত্মক বস্তু এ রকম হবে না। তারা গ্রহদের স্রেফ এড়িয়ে চলবে। নক্ষত্র বা গ্রহদের মতো বড় বস্তুদের ঋণাত্মক বস্তু বিকর্ষণ করবে, আকর্ষণ নয়। কাজেই ঋণাত্মক বস্তুর অস্তিত্ব থাকলেও তাদের শুধু গভীর মহাকাশেই খুঁজে পাওয়ার আশা করা যেতে পারে; কোনোভাবেই পৃথিবীতে নয়।

গভীর মহাকাশে ঋণাত্মক বস্তু খুঁজে পাওয়ার একটি প্রস্তাব হলো ‘আইনস্টাইন লেন্স’ ব্যবহার করা। সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্ব অনুসারে, নক্ষত্র বা ছায়াপথের চারপাশ দিয়ে চলার সময় আলোর গতিপথ মহাকর্ষের প্রভাবে বেঁকে যায়। ১৯১২ সালে (আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তখনো পূর্ণাঙ্গ হয়নি) তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেন, এ কারণে কোনো ছায়াপথ একটা টেলিস্কোপের লেন্সের মতো আচরণ করতে পারে। বহু দূরের কোনো বস্তু থেকে আসা আলো পার্শ্ববর্তী কোনো ছায়াপথের চারপাশে ঘুরে আবারও একই বিন্দুতে মিলিত হবে, ঠিক লেন্সের মতো। ওই আলো অবশেষে পৃথিবীতে পৌঁছালে তাকে লক্ষণীয় একটা রিংয়ের মতো নকশায় দেখা যাবে। এই ঘটনাকেই বলা হয় আইনস্টাইন রিং।

১৯৭৯ সালে প্রথমবারের মতো গভীর মহাকাশে আইনস্টাইনের লেন্স পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়। এরপর থেকে আইনস্টাইনের লেন্স অপরিহার্য এক হাতিয়ার হয়ে ওঠে জ্যোতির্বিদদের কাছে। (যেমন একসময় ভাবা হতো, গভীর মহাকাশে ডার্ক ম্যাটার বা গুপ্ত বস্তুর অবস্থান শনাক্ত করা অসম্ভব। [ডার্ক ম্যাটার এক রহস্যময় বস্তু, যা অদৃশ্য হলেও তার ওজন আছে। এগুলো পুরো ছায়াপথে ছড়িয়ে আছে। সম্ভবত মহাবিশ্বে আমাদের দৃশ্যমান সাধারণ বস্তুর তুলনায় এর পরিমাণ ১০ গুণ বেশি।] নাসার বিজ্ঞানীরা ডার্ক ম্যাটারের জন্য একটি মানচিত্র তৈরি করতে পেরেছেন। কারণ, ডার্ক ম্যাটার আলোকে বাঁকিয়ে দেয়। কাচ যেভাবে আলো বাঁকিয়ে দেয়, ঠিক সেভাবে ডার্ক ম্যাটারের পাশ দিয়ে আলো আসার সময় বেঁকে যায়।)

কাজেই আইনস্টাইনের লেন্স ব্যবহার করে গভীর মহাকাশে ঋণাত্মক বস্তু ও ওয়ার্মহোল খুঁজে বের করা হয়তো সম্ভব। এরা আলোকে অদ্ভুতভাবে বাঁকিয়ে দেবে, যা হাবল স্পেস টেলিস্কোপে দেখতে পাওয়ার কথা। তবে আইনস্টাইনের লেন্সের মাধ্যমে গভীর মহাকাশে ঋণাত্মক বস্তু বা ওয়ার্মহোলের ছবি তোলা না গেলেও অনুসন্ধান চালিয়ে যেতে হবে। কোনো দিন হাবল স্পেস টেলিস্কোপ আইনস্টাইনের লেন্সের মাধ্যমে ঋণাত্মক বস্তু বা ওয়ার্মহোলের অস্তিত্ব শনাক্ত করতে পারলে সেটি হবে পদার্থবিজ্ঞানের জন্য একটা বিশাল ধাক্কা।

ঋণাত্মক বস্তু ও ঋণাত্মক শক্তি একেবারেই আলাদা। ঋণাত্মক শক্তির অস্তিত্ব থাকলেও তার পরিমাণ খুবই সামান্য। কোয়ান্টাম তত্ত্বের সূত্র ব্যবহার করে ১৯৩৩ সালে হেনড্রিক ক্যাসিমির অদ্ভুত এক ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। তিনি দাবি করেন, দুটি অচার্জিত সমান্তরাল ধাতুর প্লেট পরস্পরকে আকর্ষণ করবে। ব্যাপারটা ঠিক যেন জাদুমন্ত্রের মতো। সাধারণত সমান্তরাল প্লেট স্থির হয়, কারণ, তাদের মধ্যে কোনো চার্জ থাকে না। কিন্তু দুটি সমান্তরাল প্লেটের মধ্যে ভ্যাকুয়াম বা বায়শূন্য অবস্থায় খালি থাকে না, বরং ভার্চুয়াল বা কাল্পনিক কণায় ভরা থাকে। এগুলোর অস্তিত্ব আসে-যায়।

অতি অল্প সময়ের জন্য, ইলেকট্রন ও অ্যান্টি-ইলেকট্রন জোড়া শূন্য থেকে হঠাৎ উদয় হয়। তারপর পরস্পরের সঙ্গে মিলে নিশ্চিহ্ন হয়ে আবারও হারিয়ে যায় শূন্যে। মজার ব্যাপার হলো, একসময় শূন্যস্থানে কিছুই থাকে না বলে ভাবা হতো। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে এতে কোয়ান্টাম কার্যকারিতা অটুট থাকে। সাধারণত বস্তু ও প্রতিবস্তুর অতি ক্ষুদ্র বিস্ফোরণ শক্তির সংরক্ষণশীলতার নীতির লঙ্ঘন বলে মনে হবে। কিন্তু অনিশ্চয়তার নীতির কারণে এ অতি ক্ষুদ্র লঙ্ঘন অতি সংক্ষিপ্ত কালের ও এতে গড় শক্তি সর্বদা সংরক্ষিত থাকে।

ক্যাসিমির দেখতে পান, কাল্পনিক কণার মেঘ শূন্যস্থানে একটা চাপের সৃষ্টি করে। দুটি সমান্তরাল প্লেটের মাঝখানের স্থান অবরুদ্ধ বা আটকা থাকে। কাজেই এই চাপের পরিমাণ অল্প। কিন্তু প্লেটের বাইরের চাপ তো আর আটকে থাকে না। তাই সেখানে চাপও অনেক বেশি। এতে মোট চাপ প্লেট দুটিকে পরস্পরের দিকে ঠেলে দেবে।

সাধারণত প্লেট দুটি স্থির থাকলে ও পরস্পরের কাছ থেকে অনেকটা দূরে থাকলে শূন্য শক্তি অবস্থা ঘটে। কিন্তু প্লেট দুটো পরস্পরের কাছে এলে তাদের মাঝখান থেকে শক্তি বের করে নেওয়া যায়। তাই প্লেট দুটো থেকে গতিশক্তি বের করে দেওয়ার কারণে, প্লেট দুটোর শক্তি শূন্যের চেয়েও কম হয়।

এই ঋণাত্মক শক্তি গবেষণাগারে সত্যি সত্যিই মাপা হয়েছিল ১৯৪৮ সালে। ফলাফলে ক্যাসিমিরের অনুমান সত্য বলে প্রমাণিত হয়। সুতরাং ঋণাত্মক শক্তি ও ক্যাসিমির ইফেক্ট আর এখন বিজ্ঞান কল্পকাহিনি নয়, প্রতিষ্ঠিত এক সত্য। তবে সমস্যা হলো, ক্যাসিমির ইফেক্টের পরিমাণ খুব অল্প। এটি মাপতে গবেষণাগারে অতি সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতির দরকার। (সাধারণভাবে, ক্যাসিমির শক্তি হলো প্লেট দুটোর মাঝখানের দূরত্বের বিপরীত চতুর্থ ঘাতের সমানুপাতিক। এর মানে, প্লেট দুটোর মাঝখানের দূরত্ব যত কম হবে, এই শক্তির পরিমাণ তত বেশি হবে।) ক্যাসিমির ইফেক্ট ১৯৯৬ সালে নিখুঁতভাবে পরিমাপ করেন লস অ্যালামস ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির স্টিভেন ল্যামোরেক্স। আর এই আকর্ষণ বলের পরিমাণ পাওয়া গেছে একটি পিঁপড়ার ওজনের ১/৩০,০০০ গুণ।

আলকুবিরি প্রথম তত্ত্বটি উত্থাপনের পর পদার্থবিদেরা কিছু অদ্ভুত ব্যাপার আবিষ্কার করেছেন। স্টারশিপের ভেতরে কোনো মানুষ স্বাভাবিকভাবে বাইরের বিশ্ব থেকে বিছিন্ন থাকবে। এর মানে, আপনি ইচ্ছেমতো কোনো বাটন টিপে আলোর চেয়ে বেশি বেগে চলতে পারবেন না। বুদের মধ্য দিয়ে আপনি যোগাযোগও করতে পারবেন না। সেখানে স্থান ও কালের মধ্য দিয়ে একটা আগে থেকে ঠিক করে রাখা হাইওয়ে থাকতে হবে। অনেকটা নিয়মিত সময়সূচি অনুযায়ী একগুচ্ছ ট্রেন অতিক্রম করার মতো ব্যাপার। এই অর্থে, স্টারশিপটি ইচ্ছেমতো দিক আর গতি পরিবর্তন করতে পারা কোনো সাধারণ নভোজাহাজ হতে পারবে না। তাহলে স্টারশিপটি হবে অনেকটা সংকুচিত স্থানের মধ্যে আগে থেকে অস্তিত্বশীল তরঙ্গে যাত্রীবাহী গাড়ি চালানোর মতো। সেটি আগে থেকে অস্তিত্বশীল বক্র স্থান-কালের করিডরের মধ্য দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাবে। আলকুবিরির মতে, ‘হাইওয়ের মতো এ পথে সাধারণের চেয়ে অন্য রকম বস্তু বারবার দরকার হবে। সেগুলোই স্থানকে নিপুণভাবে ব্যবহার করে আপনার জন্য সুষম একটা পথ বানিয়ে দেবে।’

আসলে আইনস্টাইনের সমীকরণে আরও কিছু অদ্ভুত ধরনের সমাধান পাওয়া যায়। আইনস্টাইনের সমীকরণের মতে, নির্দিষ্ট পরিমাণ ভর বা শক্তি দেওয়া হলে ওই ভর বা শক্তি স্থান-কালে কতটুকু বক্রতা তৈরি করবে, তা নির্ণয় করা যাবে (কোনো পুকুরে ঢিল ছোড়া হলে, যে আলোড়ন সৃষ্টি করে, তা নির্ণয় করার মতো)। তবে সমীকরণগুলোকে পেছন দিকেও চালানো যায়। একটি অদ্ভুত স্থান-কাল দিয়ে শুরু করা যায়, দ্য টোয়ালাইট জোন পর্বে যেমন দেখানো হয়েছে সে রকম। (যেমন, মহাবিশ্বে আপনি কোনো দরজা খুললে নিজেকে হয়তো চাঁদে আবিষ্কার করবেন। আপনি গাছের চারপাশে দৌড়ে নিজেকে সময়ের অতীতে আবিষ্কার করতে পারবেন। অবশ্য সেখানে আপনার হৃৎপিণ্ডটি দেহের ডানে দেখা যাবে।) এরপর নির্দিষ্ট স্থান-কালে বস্তু ও শক্তির বণ্টন হিসাব করা যাবে। (এর মানে, কোনো পুকুরে অদ্ভুত ধরনের তরঙ্গ দেওয়া হলে পেছনে গিয়ে এই তরঙ্গ সৃষ্টির জন্য কী ধরনের পাথর বা ঢিলের বণ্টন প্রয়োজন, তা নির্ণয় করা যাবে)। আসলে আলকুবিরি এভাবেই তাঁর সমীকরণে পৌছান। তিনি আলোর চেয়েও দ্রুতবেগে চলতে সক্ষম স্থান-কাল নিয়ে কাজ শুরুর পর পেছনে গিয়ে এর জন্য কী পরিমাণ শক্তির প্রয়োজন, তা নির্ণয় করেছিলেন।

ওয়ার্মহোল ও ব্ল্যাক হোল

আলোর গতির সীমা ভাঙার জন্য প্রসারণশীল স্থানের পাশাপাশি, দ্বিতীয় সম্ভাব্য উপায়টি হলো ওয়ার্মহোলের মাধ্যমে স্থানে ছিদ্র বা সুড়ঙ্গ তৈরি করা। গল্প-উপন্যাসে ওয়ার্মহোলের প্রথম উল্লেখ করেন অক্সফোর্ডের গণিতবিদ চার্লস ডজসন। লুইস ক্যারল ছদ্মনামে তিনি থ্রু দ্য লুকিং গ্লাস লিখেছিলেন। অ্যালিসের লুকিং গ্লাস আসলে ছিল ওয়ার্মহোল। সেটি অক্সফোর্ডের গ্রাম্য এলাকার সঙ্গে জাদুময় বিশ্ব ওয়ান্ডারল্যান্ডকে সংযুক্ত করেছিল। লুকিং গ্লাসের মধ্যে হাত রেখে চোখের পলকে এক মহাবিশ্ব থেকে আরেকটিতে চলে যেতে পারত অ্যালিস। গণিতবিদেরা একে বলেন মাল্টিপলি কানেকটেড স্পেসেস।

ওয়ার্মহোলের ধারণাটি পদার্থবিদ্যার আঙিনায় আসে ১৯১৬ সালে; আইনস্টাইনের মহাকাব্যিক সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্ব প্রকাশের এক বছর পর। পদার্থবিদ কার্ল শোয়ার্জশিল্ড তখন জার্মানির কাইজারের সেনাবাহিনীতে কাজ করছিলেন। যুদ্ধক্ষেত্রে বসে একক বিন্দুসম নক্ষত্রের জন্য আইনস্টাইনের সমীকরণ সঠিকভাবে সমাধান করেন তিনি। নক্ষত্র থেকে অনেক দূরে, এর মহাকর্ষক্ষেত্র একটি সাধারণ নক্ষত্রের মতোই দেখা গেল। শোয়ার্জশিল্ডের সমাধান ব্যবহার করেই আসলে নক্ষত্রের চারপাশে আলোর বিচ্যুতি কতটুকু হবে, তা নির্ণয় করেন আইনস্টাইন। শোয়ার্জশিল্ডের সমাধানটি বেশ দ্রুত জ্যোতির্বিদ্যায় গভীরতর প্রভাব ফেলে। এখন পর্যন্ত আইনস্টাইনের সমীকরণের অন্যতম সেরা সমাধান এটাই। পদার্থবিদেরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই বিন্দুসম নক্ষত্রের মহাকর্ষ ক্ষেত্রকে একটি আসন্ন মান হিসেবে সসীম ব্যাসসম্পন্ন সত্যি কোনো নক্ষত্রের চারপাশের মহাকর্ষ ক্ষেত্রের জন্য ব্যবহার করছেন।

কিন্তু এই বিন্দুসম সমাধানটি গুরুত্বের সঙ্গে নিলে এর কেন্দ্রে বিন্দুসম দানবীয় একটা বস্তু লুকিয়ে থাকতে দেখা যায়। প্রায় এক শতাব্দীর মতো এটি পদার্থবিদদের একই সঙ্গে বিস্মিত ও স্তব্ধ করে রেখেছিল। একেই বলা হয় ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বর। বিন্দুসম একটি নক্ষত্রের মহাকর্ষের জন্য শোয়ার্জশিল্ডের সমাধানটি ছিল একটা ট্রোজান ঘোড়ার মতো। বাইরে থেকে একে স্বর্গ থেকে আসা একটা আকর্ষণীয় উপহারের মতো মনে হলেও ভেতরে ভেতরে যত সব শয়তান আর দানব লুকিয়ে থাকে। তবে একটি মেনে নেওয়া হলে আরেকটিও মেনে নিতেই হবে। শোয়ার্জশিল্ডের সমাধানটি প্রমাণ দেখায়, এই বিন্দুসম নক্ষত্রে অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটতে পারে। এই নক্ষত্রের চারপাশে একটি অদৃশ্য গোলক থাকে (যাকে বলা হয় ইভেন্ট হরাইজন বা ঘটনা দিগন্ত)। একেই বলে পয়েন্ট অব নো রিটার্ন। এখানে সবকিছুই ঢুকতে পারবে, কিন্তু কোনো কিছুই আর বেরিয়ে আসতে পারবে না। ঠিক যেন রোচ মোটেল [তেলাপোকা মারার একধরনের ফাঁদ। বাক্সের মতো দেখতে এই ফাঁদের ছিদ্র দিয়ে তেলাপোকা ভেতরে ঢুকলে আর বেরিয়ে আসতে পারে না।—অনুবাদক]। একবার ইভেন্ট হরাইজন অতিক্রম করলে সেখান থেকে আর ফিরে আসা যাবে না। (তবে ইভেন্ট হরাইজনের ভেতরে ঢুকলে, সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে আপনাকে আলোর চেয়েও বেশি বেগে চলতে হবে, আদতে যা একেবারেই অসম্ভব।)

ঘটনা দিগন্তের যত কাছে যাওয়া যাবে, ততই আপনার দেহের পরমাণুগুলো প্রবল আকর্ষণ বলের কারণে প্রসারিত হতে থাকবে। আপনার মাথার তুলনায় আপনার পায়ে মহাকর্ষ বল বেশি অনুভূত হবে। তাতে আপনি স্প্যাগেটিফাইয়েড বা সেমাইয়ের মতো লম্বা হয়ে যাবেন। এরপর ছিঁড়ে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে আপনার দেহ। একইভাবে আপনার দেহের পরমাণুগুলোও মহাকর্ষের কারণে প্রবলভাবে প্রসারিত হয়ে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে।

আপনাকে ঘটনা দিগন্তের দিকে এগিয়ে যাওয়ার দৃশ্যটি বাইরের দর্শকের কাছে মনে হবে আপনি সময়ের মধ্যে ধীরগতিতে চলছেন। আসলে আপনি ঘটনা দিগন্তের কাছে চলে গেলে মনে হবে যেন সময় থেমে গেছে।

আবার ঘটনা দিগন্ত পেরিয়ে ভেতরে পড়ে যাওয়ার সময় আলো আটকে গেছে আর কৃষ্ণগহ্বরের চারদিকে কোটি কোটি বছর ধরে ঘুরপাক খাচ্ছে বলে মনে হবে। যেন কোনো চলচ্চিত্র দেখছেন বলে মনে হবে, কৃষ্ণগহ্বরের পুরো ইতিহাস তার একেবারে জন্মমুহূর্ত থেকে দেখতে পাবেন আপনি।

সবশেষে, আপনি যদি সোজা কৃষ্ণগহ্বরের মধ্যে পড়ে যেতে থাকেন, তাহলে সেখানে অন্য পাশে আরেকটি মহাবিশ্বও থাকতে পারে। একে বলা হয় আইনস্টাইন-রোজেন ব্রিজ। ১৯৩৫ সালে এটি উত্থাপন করেন আইনস্টাইন। এখন একে বলা হয় ওয়ার্মহোল।

আইনস্টাইন এবং আরও কয়েকজন পদার্থবিদ বিশ্বাস করতেন যে কোনো নক্ষত্র প্রাকৃতিকভাবে কখনোই এ রকম দানবীয় বস্তুতে পরিণত হতে পারে না। এ বিষয়ে ১৯৩৯ সালে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন আইনস্টাইন। সত্যি বলতে কি, সেখানে তিনি প্রমাণ দেখান, ঘুরপাক খাওয়া গ্যাস ও ধূলির ভর কখনোই সংকুচিত হয়ে কৃষ্ণগহ্বরে পরিণত হতে পারে না। কাজেই কৃষ্ণগহ্বরের কেন্দ্রে একটা ওয়ার্মহোল লুকিয়ে থাকলেও তিনি বিশ্বাস করতেন, এ ধরনের অদ্ভুত কোনো কিছু কখনোই প্রাকৃতিকভাবে গঠিত হতে পারে না। জ্যোতিঃপদার্থবিদ আর্থার এডিংটন একবার বলেছিলেন, ‘প্রকৃতিতে এমন কোনো সূত্র থাকা উচিত, যা নক্ষত্রকে এ রকম অদ্ভুতুড়ে আচরণ করা থেকে বিরত রাখবে।’ অন্য কথায়, কৃষ্ণগহ্বর ছিল আইনস্টাইনের সমীকরণের বৈধ সমাধান। কিন্তু সে সময় প্রাকৃতিকভাবে গঠিত হতে পারা অন্য কোনো কৌশল জানা ছিল না।

সবকিছু পাল্টে গেল জে রবার্ট ওপেনহাইমার এবং তাঁর ছাত্র হার্টল্যান্ড স্নাইডারের একটি গবেষণাপত্র প্রকাশের কারণে। ১৯৩৯ সালে প্রকাশিত এই গবেষণাপত্রে দেখানো হলো, কৃষ্ণগহ্বর প্রাকৃতিকভাবে গঠিত হতে পারে। তাঁরা অনুমান করলেন, একটি মৃত নক্ষত্র তার সব নিউক্লিয়ার জ্বালানি খরচ করে ফেললে নক্ষত্রটি তার নিজের মহাকর্ষ বলের টানে ভেঙে পড়ে বা চুপসে যায়। সুতরাং নক্ষত্রটি তার নিজের ওজনের নিচে কেন্দ্রীভূত হতে থাকে। মহাকর্ষ যদি নক্ষত্রটিকে তার ঘটনা দিগন্তের ভেতর সংকুচিত করতে পারত, তাহলে মহাকর্ষের প্রভাবে নক্ষত্রটিকে চুপসে বিন্দুকণা বা কৃষ্ণগহ্বরে পরিণত হওয়া থেকে ঠেকিয়ে রাখতে পদার্থবিদ্যার আর কিছুই করার থাকে না। (চুপসে যাওয়ার এই পদ্ধতি থেকেই হয়তো কয়েক বছর পর নাগাসাকি বোমা বানানোর ক্লু জুগিয়েছিল ওপেনহাইমারকে। বোমাটি প্লুটোনিয়াম গোলকের চুপসে যাওয়ার ওপর ভিত্তি করে বানানো হয়েছিল।)

এরপরের বড় ঘটনাটি ঘটে ১৯৬৩ সালে। সে সময় নিউজিল্যান্ডের গণিতবিদ রয় কার সম্ভবত কৃষ্ণগহ্বরের সবচেয়ে বাস্তব পরীক্ষাটি করে দেখেন। সংকুচিত বা চুপসে যাওয়ার সময় বস্তু সবচেয়ে দ্রুতবেগে ঘোরে। স্কেটাররা যেমন দ্রুতবেগে ঘোরার সময় হাত দুটোকে দেহের কাছাকাছি আনে, এটাও অনেকটা তেমন। এর ফলে কৃষ্ণগহ্বর এক বিস্ময়কর গতিতে ঘুরতে থাকবে।

রয় কার দেখতে পান, একটি ঘুরপাক খাওয়া কৃষ্ণগহ্বর কোনো বিন্দুসম নক্ষত্রে চুপসে যাবে না। অথচ তেমনই অনুমান করেছিলেন শোয়ার্জশিল্ড। বরং সেটি ঘূর্ণমান রিংয়ের মধ্যে চুপসে যাবে। দুর্ভাগ্যক্রমে কেউ এই রিংয়ে ধাক্কা খেলে মারা যাবে। তবে রিংয়ের মাঝখানে পড়লে মারা যাবে না, বরং ভেতর দিয়ে পড়ে যেতেই থাকবে। রিংয়ের অন্য প্রান্তে শেষ হয়ে যাওয়ার বদলে ওই ব্যক্তি আইনস্টাইন-রোজেন ব্রিজের ভেতর দিয়ে যেতে থাকবে। একসময় অন্য মহাবিশ্বে বেরিয়ে আসবে। অন্য কথায়, ঘুরপাক খাওয়া কৃষ্ণগহ্বর হলো অ্যালিসের লুকিং গ্লাসের রিম বা সীমানা।

ওই ব্যক্তি যদি ঘূর্ণমান রিংয়ের চারপাশে দ্বিতীয় দফায় যায়, তাহলে সে হয়তো আরও একটা মহাবিশ্বে প্রবেশ করবে। আসলে ঘূর্ণমান রিংয়ে বারবার ঢুকলে সে প্যারালাল ইউনিভার্স বা সমান্তরাল মহাবিশ্বে চলে যাবে। অনেকটা এলিভেটরের আপ বাটন টেপার মতো। তত্ত্ব অনুসারে, অসীমসংখ্যক মহাবিশ্ব থাকার সম্ভাবনা আছে, যাদের প্রতিটিই পরস্পরের ওপর গাদাগাদি হয়ে রয়েছে। ‘এই ম্যাজিক রিংয়ের ভেতর দিয়ে গেলে পুরোপুরি ভিন্ন ধরনের মহাবিশ্বে আবিষ্কার করবেন আপনি। সেখানে ব্যাসার্ধ ও ভর হতে পারে ঋণাত্মক।’ এভাবেই লিখেছিলেন রয় কার।

তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় আছে। কৃষ্ণগহ্বর হলো ননট্রান্সভার্সেবল ওয়ার্মহোলের উদাহরণ। অর্থাৎ ঘটনা দিগন্তের মধ্য দিয়ে এর পথ একমুখী। আপনি যদি একবার ঘটনা দিগন্ত অতিক্রম করে কারের রিংয়ে ঢোকেন, তাহলে ওই রিংয়ের পেছনে যেতে পারবেন না এবং ঘটনা দিগন্ত থেকেও বেরিয়ে আসতে পারবেন না।

তবে কিপ থর্ন আর তাঁর সহকর্মীরা ১৯৮৮ সালে ট্রান্সভার্সেবল ওয়ার্মহোলের একটি উদাহরণ খুঁজে পান। এর মধ্য দিয়ে আপনি সামনে ও পেছনে যাতায়াত করতে পারবেন। আসলে এই সমাধানে ওয়ার্মহোলের মধ্য দিয়ে যাতায়াত করার ঝক্কি বিমানে চড়ার চেয়ে খুব বেশি খারাপ হবে না।

সাধারণত ওয়ার্মহোলের সুড়ঙ্গের মধ্যে মহাকর্ষ তীব্র। তাই ওয়ার্মহোলের গলাকে চিপে ধরে রাখে। সে কারণে এর ভেতর দিয়ে অন্য প্রান্তে যাওয়ার চেষ্টা করা নভোচারীকে পিষে ধ্বংস করে ফেলবে। এ কারণে ওয়ার্মহোলের ভেতর দিয়ে আলোর চেয়ে দ্রুতবেগে চলা সম্ভব নয়। কিন্তু ঋণাত্মক শক্তি বা ঋণাত্মক ভরের বিকর্ষণ বল এই সুড়ঙ্গকে নভোচারীর যাওয়ার জন্য যথেষ্ট বড় করে ফেলতে পারবে। অন্য কথায়, ঋণাত্মক ভর বা শক্তি আলকুবিরি ড্রাইভ ও ওয়ার্মহোলের সমাধান দুটোর জন্যই জরুরি।

গত কয়েক বছরে আইনস্টাইনের যেসব সমীকরণ ওয়ার্মহোলের অনুমোদন করে, সেগুলোর বিস্ময়কর সমাধান পাওয়া গেছে। প্রশ্ন হলো, ওয়ার্মহোল কি সত্যিই আছে, নাকি সেগুলো শুধু গাণিতিক বিভ্রান্তি? অবশ্য ওয়ার্মহোল নিয়ে আরও কিছু সমস্যাও রয়েছে।

প্রথমত, ওয়ার্মহোলের ভেতর দিয়ে ভ্রমণের জন্য স্থান ও কালে চরম বিকৃতি তৈরি করতে হবে। সে জন্য বিপুল পরিমাণ ধনাত্মক ও ঋণাত্মক বস্তু দরকার, যার পরিমাণ বিশাল কোনো নক্ষত্র বা কোনো কৃষ্ণগহ্বরের সমান। ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ ম্যাথিউ ভিসার হিসাব করেছেন, ওয়ার্মহোলের ১ মিটার পথ খুলতে প্রয়োজনীয় ঋণাত্মক শক্তির পরিমাণ বৃহস্পতি গ্রহের ভরের সমান। ব্যতিক্রম শুধু এ ভর ঋণাত্মক হতে হবে। তিনি বলেন, “কাজটি করতে আপনার মাইনাস ১ বৃহস্পতি ভর প্রয়োজন। ধনাত্মক বৃহস্পতির ভরের শক্তি ব্যবহারের সাধ্য এখনো আমাদের হয়নি। সুদূর ভবিষ্যতে হয়তো আমরা তেমন সক্ষমতা অর্জন করতে পারব।’

ক্যালিফোর্নিয়ার ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির বিজ্ঞানী কিপ থর্নের ধারণা, ‘একসময় হয়তো দেখা যাবে, কোনো ওয়ার্মহোল খুলতে মানুষের সমান এক্সোটিক ম্যাটার ওয়ার্মহোলে দিলেই কাজ হবে। সেটি পদার্থবিদ্যার সূত্র হয়তো অনুমোদনও করবে। তবে এমনও হয়তো দেখা যাবে যে ওয়ার্মহোল বানানোর প্রযুক্তি ও তাদের উন্মুক্ত করার কাজটি মানবসভ্যতার সক্ষমতার কাছে অকল্পনীয়।’

দ্বিতীয়ত, আমরা এখনো জানি না এসব ওয়ার্মহোলের স্থিতিশীলতা কতটুকু। ওয়ার্মহোল থেকে নিঃসৃত বিকিরণ হয়তো এতে প্রবেশ করা কাউকে মেরে ফেলার জন্য যথেষ্ট। কিংবা হয়তো ওয়ার্মহোলগুলো একটুও স্থিতিশীল নয়, বরং খোলার সঙ্গে সঙ্গেই সেগুলো আবার বন্ধ হয়ে যায়।

তৃতীয়ত, কৃষ্ণগহ্বরের ওপর পতিত আলোর নীল বিচ্যুতি হওয়া উচিত। অর্থাৎ আলোগুলো ঘটনা দিগন্তের যতই কাছে আসতে থাকবে, ততই তারা আগের তুলনায় বেশি শক্তি অর্জন করতে থাকবে। ঘটনা দিগন্তেও আলোর অসীমভাবে নীল বিচ্যুতি হবে। কাজেই এখান থেকে আসা বিকিরণ রকেটে থাকা সবাইকে মেরে ফেলার জন্য যথেষ্ট।

সমস্যাটি নিয়ে একটু বিস্তারিত আলোচনা করা যাক। স্থান-কালের নকশায় গর্ত করে সেখানে বিপুল পরিমাণ শক্তি জড়ো করাও একটি সমস্যা বটে। কাজটি করার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো, কোনো বস্তুকে সংকুচিত করা, যতক্ষণ না পর্যন্ত সেটি ঘটনা দিগন্তের চেয়ে ছোট হচ্ছে। সূর্যের ক্ষেত্রে এ কথার মানে হলো, সূর্যকে মাত্র ২ মাইল ব্যাসে সংকুচিত করে ফেলতে হবে। তাহলে সূর্য চুপসে গিয়ে কৃষ্ণগহ্বরে পরিণত হবে। (সূর্যের মহাকর্ষ এতই দুর্বল যে প্রাকৃতিকভাবে এটি সংকুচিত হয়ে ২ মাইলে নেমে আসবে না। কাজেই সূর্য কখনো কৃষ্ণগহ্বরে পরিণত হবে না। তাত্ত্বিকভাবে এর মানে যেকোনো কিছু, এমনকি আপনিও কৃষ্ণগহ্বরে পরিণত হতে পারেন, যদি আপনাকে যথেষ্ট পরিমাণ সংকুচিত করা হয়। সে জন্য আপনার দেহের সবগুলো পরমাণু সংকুচিত করে অতিপারমাণবিক দূরত্বের চেয়েও ছোট বানাতে হবে। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান এখনো এই ক্ষমতা অর্জনের কথা ভাবতেও পারে না। )

আরও প্রয়োগিক উপায় হতে পারে, এক সারি লেজার রশ্মি একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে ছুড়ে দেওয়া। কিংবা বিশালাকৃতির কোনো অ্যাটম স্ম্যাশার বা কণা ত্বরকযন্ত্র বানিয়ে দুটি বিম তৈরি করা। এরপর তাদের পরস্পরকে অতি শক্তিতে সংঘর্ষ ঘটাতে হবে। এর ফলে স্থান-কালের বুননের মধ্যে একটা ছোট ছিদ্র তৈরি করা যাবে।

প্ল্যাঙ্ক শক্তি ও কণা ত্বরকযন্ত্র

স্থান ও কালের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি করতে কী পরিমাণ শক্তির দরকার, তা সহজে হিসাব করে বের করা যায়। সেটি হবে প্ল্যাঙ্ক শক্তি অনুসারে বা ১০১৯ বিলিয়ন ইলেকট্রন ভোল্ট। নিঃসন্দেহে এটি অকল্পনীয় একটি সংখ্যা। সুইজারল্যান্ডের জেনেভা শহরের বাইরে অবস্থিত বর্তমানে সবচেয়ে শক্তিশালী যন্ত্র বা লার্জ হ্যাড্রন কলাইডরের (এলএইচসি) তুলনায় যা কোয়াড্রিলিয়ন গুণ বেশি শক্তি অর্জন করে। এলএইচসি প্রোটনকে বিশালাকৃতির ডোনাটের মধ্যে দোলাতে পারে, যতক্ষণ না তারা কয়েক ট্রিলিয়ন ইলেকট্রন ভোল্টে পৌঁছায়। মহাবিস্ফোরণের পর এত শক্তি আর কখনো দেখা যায়নি। তারপরও এই দানবীয় যন্ত্রটি যে পরিমাণ শক্তি উৎপাদন করে, তা প্ল্যাঙ্ক শক্তির তুলনায় অনেক গুণ কম।

এলএইচসির পরের পার্টিকেল অ্যাকসিলারেটর যন্ত্রটি হবে ইন্টারন্যাশনাল লিনিয়ার কলাইডার (আইএলসি)। অতিপারমাণবিক কণাদের গতিপথ বৃত্তাকারে বাঁকানোর বদলে আইএলসিতে কণাদের সোজা পথে ছুড়ে দেওয়া হবে। কণাগুলো এ পথে চলার সময় তাদের মধ্যে শক্তি ঢুকিয়ে দেওয়া হবে, যতক্ষণ না তারা অকল্পনীয় শক্তি লাভ করে। এরপর ইলেকট্রনের একটি বিম প্রতি-ইলেকট্রনের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হবে। এতে বিপুল পরিমাণ শক্তির বিস্ফোরণ হবে। আইএলসির দৈর্ঘ্য হবে ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার। মানে স্ট্যানফোর্ড লিনিয়ার অ্যাকসিলারেটরের তুলনায় দশ গুণ বড়। সব ঠিক থাকলে পরের দশকের মধ্যে আইএলসির কাজ শেষ হবে।

আইএলসিতে শক্তি উৎপাদিত হবে ৫ থেকে ১০ ট্রিলিয়ন ইলেকট্রন ভোল্ট। এটি এলএইচসির চেয়ে ১৪ ট্রিলিয়ন ইলেকট্রন ভোল্ট কম শক্তি। তবে এখানে একটা ফাঁকি আছে। (এলএইচসিতে প্রোটনদের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটানো হয়, ওই প্রোটন যেসব কোয়ার্ক দিয়ে তৈরি তাদের মাধ্যমে। কাজেই কোয়ার্কদের মধ্যে সংঘর্ষে ১৪ ট্রিলিয়ন ইলেকট্রন ভোল্টের চেয়ে কম শক্তি থাকে। তাই সংঘর্ষের মাধ্যমে এলএইচসির চেয়েও অনেক বেশি শক্তি উৎপাদন করবে আইএলসি।) আবার ইলেকট্রনের যেহেতু কোনো গাঠনিক উপাদানের কথা জানা নেই, তাই ইলেকট্রন আর প্রতি-ইলেকট্রনের মধ্যে গতিশীল সংঘর্ষটি হবে সরল ও স্পষ্ট।

তবে বাস্তবে, স্থান-কালে ছিদ্র তৈরির ক্ষেত্রে আইএলসিও অনেক পিছিয়ে থাকবে। সে জন্য কোয়াড্রিলিয়ন গুণ বেশি শক্তিশালী কণা ত্বরকযন্ত্রের দরকার। আমাদের মতো শূন্য (০) টাইপের সভ্যতা, যারা এখনো জ্বালানি হিসেবে মৃত উদ্ভিদ ব্যবহার করে (যেমন তেল ও কয়লা), তাদের কাছে এই প্রযুক্তি অনেক অনেক দূরের ব্যাপার। তবে এটি সহজে সম্ভব হতে পারে টাইপ থ্রি সভ্যতার জন্য।

মনে রাখতে হবে, টাইপ থ্রি সভ্যতা শক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে গ্যালাকটিকল। টাইপ টু সভ্যতার চেয়ে এই সভ্যতা ১০ বিলিয়ন গুণ বেশি শক্তি ব্যবহার করে। তাদের শক্তি ব্যবহারের ভিত্তি হবে নক্ষত্রের শক্তি। অন্য দিকে টাইপ ওয়ান সভ্যতার চেয়ে ১০ বিলিয়ন গুণ বেশি শক্তি ব্যবহার করে টাইপ টু সভ্যতা। এদের শক্তি ব্যবহারের ভিত্তি কোনো গ্রহ। আগামী ১০০ থেকে ২০০ বছরের মধ্যে আমাদের দুর্বল টাইপ জিরো সভ্যতা টাইপ ওয়ান মর্যাদায় পৌঁছাবে।

এই ভবিষ্যদ্বাণীর পর সহজে বোঝা যাচ্ছে, প্ল্যাঙ্ক এনার্জি অর্জন করতে আমাদের আরও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। অনেক পদার্থবিদ বিশ্বাস করেন, অতি ক্ষুদ্র দূরত্বে বা ১০-৩২ সেন্টিমিটার প্ল্যাঙ্ক দূরত্বে স্থান শূন্য বা মসৃণ নয়, বরং ফেনাময়। এগুলো অতি ক্ষুদ্র বুদের সঙ্গে ফেনায়িত হচ্ছে। এই বুদ অনবরত অস্তিত্বশীল হচ্ছে, অন্য বুদের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে, তারপর নিশ্চিহ্ন হয়ে আবারও শূন্যে ফিরে যাচ্ছে। এসব বুদের মধ্যে যেগুলো শূন্য থেকে আসছে-যাচ্ছে সেগুলো ভার্চুয়াল ইউনিভার্স বা কাল্পনিক মহাবিশ্ব। হঠাৎ অস্তিত্বে আসা ও তারপর নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া ইলেকট্রন ও প্রতি-ইলেকট্রনের সঙ্গে কাল্পনিক কণার বেশ মিল আছে।

স্বভাবতই, এই কোয়ান্টাম স্থান-কালের ফেনা আমাদের কাছে পুরোপুরি অদৃশ্য। এসব বুদের গঠন এ রকম অতি ক্ষুদ্র দূরত্বে থাকে যে সেগুলো দেখা যায় না। কিন্তু কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান মতে, কোনো একক বিন্দুতে অনেক বেশি শক্তি জমা করা সম্ভব হলে এসব বুদ্বুদ অনেক বড় হয়ে উঠতে পারে। এরপর অতি ক্ষুদ্র বুদ্‌দসহ ফেনায়িত স্থান-কালের দেখা যাবে। সেখানে প্রতিটি বুদে একটি ওয়ার্মহোল সংযুক্ত করবে একটি শিশু মহাবিশ্বকে।

অতীতে এই শিশু মহাবিশ্বকে বুদ্ধিবৃত্তিক কৌতূহল বলে বিবেচনা করা হতো। সেটি ছিল বিশুদ্ধ গণিতের অদ্ভুত এক পরিণতি। কিন্তু পদার্থবিদেরা এখন সত্যি সত্যি ভাবছেন যে হয়তো এ রকম কোনো শিশু মহাবিশ্ব থেকে শুরু হয়েছিল আমাদের মহাবিশ্ব।

এ ধরনের ভাবনা নিছক কল্পনা নয়। পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র এই সম্ভাবনাকে অনুমোদন করে যে একক কোনো বিন্দুতে যথেষ্ট শক্তি জড়ো করতে পারলে স্থানের মধ্যে একটি গর্ত খুলে যাবে। এর মাধ্যমে আমরা একসময় স্থান-কালের ফেনায় ও আমাদের মহাবিশ্বের সঙ্গে একটি শিশু মহাবিশ্বে সংযুক্ত করা ওয়ার্মহোলের ভেতরে ঢুকতে পারব।

স্থানের মধ্যে একটি গর্ত খুঁড়তে আমাদের অবশ্যই প্রযুক্তিতে বড় ধরনের কিছু ঘটার দরকার। তবে আবারও বলি, সেই প্রযুক্তি হয়তো টাইপ থ্রি সভ্যতার কাছে থাকা সম্ভব। যেমন, তাদের কাছে এমন প্রতিশ্রুতিশীল কোনো প্রযুক্তি থাকতে পারে, যাকে বলা যেতে পারে ওয়েকফিল্ড টেবিলটপ অ্যাকসিলারেটর। লক্ষণীয় ব্যাপার হলো, এই কণা ত্বরকযন্ত্র এতই ছোট হবে যে সেটি একটা টেবিলের ওপরে রেখে দেওয়া যাবে। হয়তো কয়েক বিলিয়ন ইলেকট্রন ভোল্ট শক্তি তৈরি করা যাবে এই যন্ত্র দিয়ে। ওয়েকফিল্ড টেবিলটপ অ্যাকসিলারেটর কাজ করবে চার্জিত কণায় লেজার ছুড়ে দিয়ে। স্ট্যানফোর্ড লিনিয়ার অ্যাকসিলারেটর সেন্টার, ইংল্যান্ডের রাদারফোর্ড অ্যাপলটন ল্যাবরেটরি আর প্যারিসের ইকোল পলিটেকনিকে পরিচালিত কিছু পরীক্ষায় দেখা গেছে, শক্তি ঢুকিয়ে দিতে লেজার বিম আর প্লাজমা ব্যবহার করে ছোট দূরত্বে কণার বিপুল ত্বরণ ঘটানো সম্ভব।

এরপরও আরেকটি বড় ধরনের ঘটনা ঘটেছে ২০০৭ সালে। সেবার স্ট্যানফোর্ড লিনিয়ার অ্যাকসিলারেটর সেন্টার, ইউসিএলএ ও ইউএসসির পদার্থবিদ আর প্রকৌশলীরা এক পরীক্ষায় দেখান, মাত্র ১ মিটার দূরত্বে বিশাল আকৃতির কণা ত্বরকযন্ত্রের দ্বিগুণ শক্তি তৈরি সম্ভব। তারা ইলেকট্রনের বিম নিয়ে কাজটি শুরু করেছিলেন, যা স্ট্যানফোর্ডের ২ মাইল লম্বা এক টিউবে ছুড়ে দেওয়া হয়। সেটি ৪২ বিলিয়ন ইলেকট্রন ভোল্ট শক্তি অর্জন করে। এরপর এসব উচ্চ শক্তির ইলেকট্রনকে আফটারবার্নারের মধ্য দিয়ে চালিত করা হয়, যার মধ্যে মাত্র ৮৮ সেন্টিমিটার লম্বা এক প্লাজমা চেম্বার ছিল। সেখানে ইলেকট্রনগুলো অতিরিক্ত ৪২ বিলিয়ন ইলেকট্রন ভোল্ট অর্জন করে শক্তিকে দ্বিগুণ করে ফেলে। (এই প্লাজমা চেম্বার লিথিয়াম গ্যাসে ভরা ছিল। এই গ্যাসের মধ্য দিয়ে যাওয়ার পথে ইলেকট্রনগুলো একটি প্লাজমা ওয়েভ তৈরি করে, যেটি একটি আলোড়ন তৈরি করে। এই আলোড়ন ইলেকট্রন বিমের দিকে প্রবাহিত করা হয়। এরপর একে ধাক্কা দিয়ে সামনে চালিত করা হয়।) এই বিস্ময়কর অর্জনের মাধ্যমে পদার্থবিদেরা প্রতি মিটারে যে পরিমাণ শক্তি দিয়ে ইলেকট্রন বিমে ত্বরণ সৃষ্টি করতে পারতেন, সেই আগের রেকর্ডের ৩ হাজার গুণ সামনে এগিয়ে গেছেন। এ ধরনের আফটারবার্নার যোগ করে বর্তমানের চলমান কণা ত্বরকযন্ত্রের শক্তি তাত্ত্বিকভাবে প্রায় বিনা মূল্যেই দ্বিগুণ করা সম্ভব।

বর্তমানে ওয়েকফিল্ড টেবিলটপ অ্যাসিলারেটরের বিশ্ব রেকর্ড প্রতি মিটারে ২০০ বিলিয়ন ইলেকট্রন ভোল্ট। একে বড় দূরত্ব পরিসরে নিয়ে গেলে অনেকগুলো সমস্যা দেখা দেয় (যেমন এতে লেজার শক্তি পাম্প করতে গেলে এর স্থিতিশীলতা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়)। তবে যদি ধরে নেওয়া হয়, আমরা প্রতি মিটারে ২০০ বিলিয়ন ইলেকট্রন ভোল্ট শক্তি বজায় রাখতে পারি। তার মানে হবে, প্ল্যাঙ্ক শক্তিতে পৌঁছাতে আমাদের এমন অ্যাসিলারেটর দরকার, যার দৈর্ঘ্য হতে হবে ১০ আলোকবর্ষ লম্বা। টাইপ থ্রি সভ্যতার এ সক্ষমতা বেশ ভালোভাবে অর্জন করতে পারে।

ওয়ার্মহোল ও প্রসারণশীল স্থান হয়তো আলোর গতিসীমা ভাঙতে আমাদের সবচেয়ে বাস্তবসম্মত উপায়ের জোগান দিতে পারে। কিন্তু এই প্রযুক্তি স্থিতিশীল কি না, তা এখনো অজানা। তা হলেও তাদের কার্যকরী করতে ধনাত্মক হোক আর ঋণাত্মকই হোক, আমাদের বিপুল পরিমাণ শক্তি লাগবে।

কোনো টাইপ থ্রি সভ্যতা হয়তো এরই মধ্যে এ ধরনের প্রযুক্তি হাতের মুঠোয় পেয়ে গেছে। তবে এই প্রযুক্তি অর্জন করতে আমাদের হয়তো আরও ১০০ বছর লেগে যেতে পারে। কারণ, এত বিপুল পরিমাণ শক্তিতে লাগাম পরানোর আগে কোনোভাবেই এ বিষয়ে ভাবার অবকাশ নেই। কোয়ান্টাম পর্যায়ে স্থান-কালের বুননসংক্রান্ত মৌলিক সূত্র নিয়ে এখনো বিতর্ক চলছে। সে কারণে একে আমি দ্বিতীয় শ্রেণির অসম্ভাব্যতা হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছি।

তথ্যনির্দেশ

কোয়ার্ক : শক্তিশালী বল দ্বারা প্রভাবিত চার্জিত মৌলিক কণা। প্রোটন ও নিউট্রন প্রতিটি তিনটি কোয়ার্ক কণা দিয়ে গঠিত। এ পর্যন্ত ছয় ধরনের বা ফ্লেভারের কোয়ার্ক পাওয়া গেছে। যথা : আপ, ডাউন, স্ট্রেঞ্জ, চার্মড, বটম ও টপ।

প্ল্যাঙ্ক দৈর্ঘ্য : প্রায় ১০-৩৫ সেন্টিমিটার। স্ট্রিং তত্ত্বে একটি সাধারণ স্ট্রিং বা সুতোর আকার।

ঘটনা দিগন্ত : কৃষ্ণগহ্বরের কিনারাই হলো ঘটনা দিগন্ত বা ইভেন্ট হরাইজন। এখান থেকে অসীমের দিকে ফিরে আসা সম্ভব নয়।

স্থান-কাল : সময়সহ একটি চারমাত্রিক স্থান, যার বিন্দুগুলো একেকটি ঘটনা। নিউটনের মহাবিশ্বে স্থান ও কালকে আলাদা বলে ভাবা হতো। কিন্তু আইনস্টাইন তাঁর আপেক্ষিক তত্ত্বে দেখালেন, এই দুটি আসলে আলাদা কিছু নয়, বরং একক অস্তিত্ব হিসেবে বিরাজমান।

এলএইচসি : বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী কণা ত্বরকযন্ত্র লার্জ হ্যাড্রন কলাইডার বা এলএইচসি। ইউরোপিয়ান নিউক্লিয়ার গবেষণা সংস্থা বা সার্ন ও ১০০টি দেশের ১০ হাজারের বেশি বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলী এটি তৈরিতে কাজ করেছেন। সুইজারল্যান্ডের জেনেভা শহরের কাছে ফ্রান্স ও সুইজারল্যান্ড সীমান্তের প্রায় ১৭৫ মিটার মাটির নিচে ২৭ কিলোমিটার পরিধির বৃত্তাকার সুড়ঙ্গের মধ্যে এটি স্থাপন করা হয়েছে। ২০১২ সালে এ কণা ত্বরকযন্ত্রে হিগস-বোসন কণা আবিষ্কৃত হয়।

১২. টাইম ট্রাভেল

সময় পরিভ্রমণ যদি সত্যিই সম্ভব হয়, তাহলে ভবিষ্যতের আগন্তুকেরা সব গেল কোথায়?

—স্টিফেন হকিং

[টাইম ট্রাভেল] কারণের বিরুদ্ধে।’ বলল ফিলবি।

‘কোন কারণ?’, জিজ্ঞেস করল টাইম ট্রাভেলার।

–এইচ জি ওয়েলস

জানুস ইকুয়েশন উপন্যাসে লেখক জি স্কুল অন্যতম মর্মভেদী এক সমস্যার উদ্‌ঘাটন করেছেন। গল্পটি মেধাবী এক গণিতবিদের। তাঁর লক্ষ্য টাইম ট্রাভেল বা সময় পরিভ্রমণের রহস্য আবিষ্কার করা। তা করতে গিয়েই এক অদ্ভুত, সুন্দরী নারীর সঙ্গে দেখা হয় তাঁর। নারীটির অতীত সম্পর্কে কিছু না জেনেও তার সঙ্গে একসময় ভালোবাসায় জড়ান গণিতবিদ। তার সত্যিকার পরিচয় খুঁজে বের করতে গিয়ে ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়েন গভীর এক চক্রান্তের জালে। একসময় আবিষ্কৃত হয়, মেয়েটি একবার প্লাস্টিক সার্জারি করে তার চেহারা পাল্টেছিল, এমনকি লিঙ্গও পরিবর্তন করেছিল মেয়েটি। অবশেষে একরাশ বিস্ময় নিয়ে গণিতবিদ উদ্ঘাটন করেন যে মেয়েটি আসলে ভবিষ্যৎ থেকে আসা এক টাইম ট্রাভেলার। শুধু তা-ই নয়, মেয়েটি আসলে স্বয়ং তিনিই, তবে ভবিষ্যতের। মানে হলো, গণিতবিদ আসলে নিজের সঙ্গেই ভালোবাসার সম্পর্কে জড়িয়েছেন এত দিন। আরও বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, তাদের কোনো সন্তান জন্ম নিলে সেটা কী হবে? সেই সন্তানটি যদি অতীতে ফিরে গিয়ে গল্পের শুরুর ওই গণিতবিদ হয়ে ওঠেন, তাহলে কি তিনি নিজেই নিজের পিতা ও মাতা, পুত্র এবং কন্যা হবেন?

অতীত পাল্টানো

মহাবিশ্বের অন্যতম রহস্যময় বিষয়টির নাম সময় বা কাল। আমরা প্রত্যেকেই সময়ের নদীতে আমাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সাঁতরে বেড়াচ্ছি। প্রায় খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০ অব্দে সেন্ট অগাস্টিন সময়ের বিভ্রান্তিকর প্রকৃতি সম্পর্কে লেখেন, ‘অতীত ও ভবিষ্যৎ কীভাবে হয়, যেখানে অতীতের কোনো অস্তিত্ব নেই আর ভবিষ্যৎ এখনো আসেনি? একই অবস্থা বর্তমানেরও। সব সময় যদি বর্তমান কাল হয় আর সেটি যদি কখনো অতীতের দিকে না যায়, তাহলে সেটি আসলে সময় হতে পারে না, বরং সেটি অনন্তকাল।’ সেন্ট অগাস্টিনের যুক্তিটিকে আরও সামনে এগিয়ে নিয়ে গেলে দেখা যাবে, সময়ের অস্তিত্ব থাকা আসলে সম্ভব নয়। কারণ, অতীত চলে গেছে, ভবিষ্যতের কোনো অস্তিত্ব নেই আর তাৎক্ষণিকভাবে শুধু অস্তিত্ব থাকে বর্তমানের। (সেন্ট অগাস্টিন এরপর গভীর ধর্ম তাত্ত্বিক প্রশ্নের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলেন, ঈশ্বর কীভাবে সময়কে অনিবার্যভাবে প্রভাবিত করছেন, যে প্রশ্নটি আজও প্রাসঙ্গিক। তিনি লিখেছেন, ঈশ্বর যদি সর্বশক্তিমান হন, তাহলে তিনিও কি সময়ের প্রবাহে বাঁধা পড়বেন? অন্য কথায়, ঈশ্বর কি আমাদের মতো মরণশীলদের মতো তাড়াহুড়ো করেন? কারণ, তাঁরও কি কোনো অ্যাপয়েন্টমেন্টে দেরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে? উপসংহারে সেন্ট অগাস্টিন বলেছেন, ঈশ্বর সর্বশক্তিমান। কাজেই তিনি সময়ের নিয়ন্ত্রণে থাকেন না। তাঁর অবস্থান সময়ের বাইরে। অবশ্য সময়ের বাইরের এ ধারণাটি অযৌক্তিক। কিন্তু এ ধারণাটি এখন আধুনিক পদার্থবিদ্যায় নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে। এ বিষয়ে পরে আলোচনা করা হবে।)

সেন্ট অগাস্টিনের মতো আমরা সবাই সময়ের অদ্ভুত ধর্ম নিয়ে আর স্থান থেকে এটা কীভাবে আলাদা হয়, তা ভেবে বিস্মিত হই। আমরা যদি স্থানের সামনে ও পেছনে যেতে পারি, তাহলে সময়ের সামনে ও পেছনে কেন নয়? সবাই অবাক হই, ভবিষ্যৎ আমাদের জন্য কী সাজিয়ে রাখতে পারে? মানুষের জীবনকাল সসীম, কিন্তু পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়ার অনেক অনেক বছর পরও কী ঘটবে, তা নিয়ে কৌতূহল থাকে আমাদের।

টাইম ট্রাভেল বা সময় পরিভ্রমণের আকাঙ্ক্ষা সম্ভবত মানবজাতির ইতিহাসের মতোই প্রাচীন। টাইম ট্রাভেল নিয়ে লেখা প্রথম গল্পটি হলো ‘মেমোয়াজ অব দ্য টোয়েন্টিথ সেঞ্চুরি’। এটি ১৭৩৩ সালে লেখেন স্যামুয়েল ম্যাডেন। ১৯৯৭ সাল থেকে এক দেবদূত আড়াই শ বছর পেছনে গিয়ে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূতকে এক দলিল তুলে দেয়। তাতে ভবিষ্যৎ বিশ্ব সম্পর্কে বর্ণনা থাকে। গল্পের বিষয়বস্তু ছিল এটিই।

এ রকম আরও অনেক গল্প থাকতে পারে। ১৮৩৮ সালে ‘মিসিং ওয়ান’স কোচ : অ্যান অ্যানারকিজম’ লেখেন অজ্ঞাত কেউ। গল্পটি লেখা হয় কোচের জন্য অপেক্ষারত এক ব্যক্তিকে নিয়ে। হঠাৎ নিজেকে এক হাজার বছর পেছনে আবিষ্কার করেন ব্যক্তিটি। সেখানে তিনি প্রাচীন এক গির্জায় এক সন্ন্যাসীর দেখা পান। তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেন, পরের এক হাজার বছরে ইতিহাস কীভাবে সামনে এগিয়ে যাবে। কিছুক্ষণ পর রহস্যময়ভাবে নিজেকে বর্তমান সময়ে খুঁজে পান তিনি। ততক্ষণে কোচটি তাঁকে ফেলে চলে গেছে।

১৮৪৩ সালে চার্লস ডিকেন্সের উপন্যাস আ ক্রিসমাস ক্যারল আসলে একধরনের ট্রাইম ট্রাভেলের গল্প। কারণ, ইবেনেজার স্ক্রুজকে বর্তমানের আগে আর তার মৃত্যুর পরের বিশ্বকে দেখাতে তাকে অতীতে ও ভবিষ্যতে নিয়ে যাওয়া হয়।

মার্কিন সাহিত্যে টাইম ট্রাভেলের প্রথম দেখা পাওয়া যায় ১৮৮৯ সালে মার্ক টোয়েনের উপন্যাস আ কানেকটিকাট ইয়াংকি ইন কিং আর্থার’স কোর্ট উপন্যাসে। এতে উনিশ শতকের এক ইয়াংকি সময়ের পেছনে গিয়ে খ্রিষ্টপূর্ব ৫২৮ অব্দে কিং আর্থারের আদালতে উপস্থিত হয়। তাকে বন্দী করে সেখানে প্রায় পুড়িয়ে মারার চেষ্টা চলতে থাকে। কিন্তু সে হঠাৎ ঘোষণা দেয়, সূর্যকে অদৃশ্য করে দেওয়ার ক্ষমতা আছে তার। আসলে ওই সময়ই একটা সূর্যগ্রহণ হওয়ার কথা সে জানত। সূর্যগ্রহণ হওয়ার পর নিরাপত্তারক্ষীরা ভয় পেয়ে তাকে ছেড়ে দিতে রাজি হয়। এরপর সূর্য ফিরিয়ে আনার শর্তে তাকে বিভিন্ন সুবিধা দিতেও রাজি হয় তারা।

সাহিত্যে সময় পরিভ্রমণ নিয়ে প্রথম সত্যিকার অনুসন্ধানের চেষ্টা করেন এইচ জি ওয়েলস, ক্ল্যাসিক উপন্যাস দ্য টাইম মেশিন-এ। এতে নায়ক কয়েক হাজার বছর পরের ভবিষ্যতে চলে যায়। দূরের সেই ভবিষ্যতে মানবজাতি জিনগতভাবে দুটি প্রজাতিতে বিভক্ত হয়ে পড়ে। ভয়ংকরদর্শন মরলকরা মাটির নিচের যন্ত্রগুলো পরিচালনা করে আর অকাজের শিশুসুলভ ইলয়রা পৃথিবীর ওপরে সূর্যের আলোতে নেচে বেড়ায়। কিন্তু নিজেদের ভয়ংকর ভাগ্য সম্পর্কে কখনো বুঝতে পারেনি তারা (মুরলকরা তাদের খেয়ে ফেলবে)।

এরপর স্টার ট্রেক থেকে শুরু করে ব্যাক টু দ্য ফিউচার বিজ্ঞান কল্পকাহিনির প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে টাইম ট্রাভেল। সুপারম্যান ১-এ, সুপারম্যান যখন জানতে পারে, লুইস লেইন মারা গেছে, তখন মরিয়া হয়ে সে সময়ের পেছনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। নিজেকে আলোর চেয়ে বেশি গতিতে পৃথিবীর চারদিকে রকেটের মতো পাক খাওয়াতে খাওয়াতে থাকে, যতক্ষণ না পর্যন্ত সময় পেছন দিকে চলে যায়। পৃথিবী ধীরগতির হয়ে একসময় থেমে যায়। তারপর ঘুরতে থাকে উল্টো দিকে। একসময় পৃথিবীর সব ঘড়িও উল্টো দিকে ঘুরতে শুরু করে। বন্যার পানি পেছন দিকে যেতে থাকে, ভেঙে যাওয়া বাঁধ বিস্ময়করভাবে ঠিক হয়ে যেতে থাকে আর মৃত অবস্থা থেকে আবারও জীবন ফিরে পায় লুইস ল্যান।

বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে, নিউটনের মহাবিশ্বে টাইম ট্রাভেল অসম্ভব। সেখানে সময়কে একটি তির হিসেবে দেখা হয়। একবার ছুড়ে দেওয়া হলে সেটি আর কখনো অতীতে ফেরে না। পৃথিবীর ১ সেকেন্ড মানে মহাবিশ্বের যেকোনো জায়গাতেই ১ সেকেন্ড। এ ধারণাটি হটিয়ে দেন আইনস্টাইন। তিনি দেখালেন, সময় আসলে অনেকটা নদীর মতো, যেটি মহাবিশ্বজুড়ে এঁকেবেঁকে চলছে। নক্ষত্র ও ছায়াপথজুড়ে সাপের মতো সর্পিলভাবে চলতে গিয়ে সময়ের গতি বাড়ে ও কমে। কাজেই পৃথিবীর ১ সেকেন্ড আসলে পরম কোনো ব্যাপার নয়। বরং মহাবিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় আমরা চলতে গেলে সময়ও ভিন্ন ভিন্ন হবে।

আগেই বলেছি, আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্বমতে, কোনো রকেট যত দ্রুতবেগে চলবে তার ভেতরের সময় তত ধীরগতির হতে থাকবে। বিজ্ঞান কল্পকাহিনির লেখকেরা মনে করেন, আলোর গতির সীমা ভেঙে ফেলা সম্ভব হলে সময়ের পেছন দিকেও যাওয়া যাবে। কিন্তু এটি আসলে সম্ভব নয়। কারণ, আলোর গতিতে চলতে থাকলে আপনার ভর হয়ে যাবে অসীম। আলোর গতি যেকোনো রকেটের জন্য এক চূড়ান্ত গতিসীমা। স্টার ট্রেক ৪ : দ্য ভয়েজ হোম-এ এন্টারপ্রাইজের সদস্যরা ক্লিনগনের একটি স্পেসশিপ ছিনতাই করে। এরপর সেটি স্লিংশটের মতো সূর্যের চারপাশে ঘুরিয়ে আলোর গতিসীমার বাধা ভেঙে ফেলে ১৯৬০ দশকের সান ফ্রান্সিসকো চলে যায়। কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলোর সঙ্গে এটি সাংঘর্ষিক।

তারপরও বলা যায়, ভবিষ্যতে টাইম ট্রাভেল সম্ভব। এটি লাখোবার বিভিন্ন পরীক্ষাতে প্রমাণিতও হয়েছে। দ্য টাইম মেশিন উপন্যাসের নায়কের দূর ভবিষ্যতে ভ্রমণ সত্যি সত্যি ভৌতভাবে সম্ভব। কোনো নভোচারী যদি আলোর কাছাকাছি বেগে চলতে থাকে, তাহলে ধরে নেওয়া যায়, আমাদের প্রতিবেশী নক্ষত্রে তিনি প্রায় ১ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে যাবেন। এদিকে পৃথিবীতে চার বছর পার হয়ে যাবে, কিন্তু তার কাছে মনে হবে মাত্র ১ মিনিট পার হয়েছে। কারণ, রকেটের ভেতরে সময় ধীরে চলবে। কাজেই পৃথিবীর অভিজ্ঞতার হিসেবে আসলে চার বছর পরের ভবিষ্যতে চলে গেছেন তিনি। (আমাদের নভোচারীরা যখন মহাকাশে যান, তাঁরা ভবিষ্যতে সংক্ষিপ্ত ভ্রমণও করেন। কারণ, পৃথিবীর ওপরে ঘণ্টায় ১৮ হাজার মাইল বেগে চলাচল করেন তাঁরা। এ কারণে পৃথিবীর যেকোনো ঘড়ির চেয়ে তাদের ঘড়ির অতি সামান্য ধীরে চলে। সুতরাং মহাকাশ স্টেশনে এক বছরের অভিযান শেষে পৃথিবীতে ফিরে এলে তারা ১ সেকেন্ডের ভগ্নাংশ সময় ভবিষ্যতে চলে যান। ভবিষ্যতে ভ্রমণের ক্ষেত্রে বিশ্ব রেকর্ডে এগিয়ে আছেন রুশ নভোচারী সের্গেই আভদেয়েভ। তিনি পৃথিবীর কক্ষপথে ৭৪৮ দিন কাটিয়েছিলেন। তাই তিনি ভবিষ্যতে ০.২ সেকেন্ড এগিয়ে গেছেন।

সুতরাং যে টাইম মেশিন আমাদের ভবিষ্যতে নিয়ে যেতে পারে, তা আইস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্বের সঙ্গে বেশ ভালোভাবে খাপ খায়। কিন্তু সময়ের পেছনে যাওয়ার ব্যাপারটি কী?

আমরা যদি অতীতে যেতে পারতাম, তাহলে ইতিহাস লেখা খুব কঠিন হতো। কোনো ইতিহাসবিদ অতীতের ইতিহাস লেখার পর, যে কেউ আবারও অতীতে গিয়ে সেটি আবার নতুন করে লিখতে পারে। টাইম মেশিন শুধু ইতিহাসবিদদের বেকারই করে দেবে না, পাশাপাশি আমাদের সময়কেও পাল্টে দিতে পারবে ইচ্ছেমতো। ধরা যাক, আমরা ডাইনোসর যুগে ফিরে গিয়ে ভুল করে কোনো স্তন্যপায়ীকে মেরে ফেললাম। স্তন্যপায়ীটি যদি আমাদের পূর্বপুরুষ হয়, তাহলে এর মাধ্যমে আমরা হয় দুর্ঘটনাক্রমে পুরো মানবজাতিকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে পারব। ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোতে ভবিষ্যৎ থেকে আসা পর্যটকেরা সবচেয়ে ভালো ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল খুঁজতে গিয়ে পদদলিত হয়ে মারা যেতে শুরু করলে ইতিহাস হবে অসমাপ্ত।

টাইম ট্রাভেল : পদার্থবিদদের খেলাঘর

কৃষ্ণগহ্বর ও টাইম মেশিনের জটিল গাণিতিক সমীকরণ নিয়ে যে ব্যক্তিটি সবচেয়ে বেশি পরিচিত, সম্ভবত তিনি বিশ্ব সৃষ্টিতত্ত্ববিদ স্টিফেন হকিং। আপেক্ষিকতার অন্য শিক্ষার্থীরা অধিকাংশ প্রথম দিকে গাণিতিক পদার্থবিদ্যায় নাম করেন। তবে তাঁদের কারও মতো ছিলেন না হকিং। তরুণ বয়সে তাঁকে অসামান্য ছাত্র বলা যায় না। নিঃসন্দেহে অনেক মেধাবী ছিলেন তিনি। কিন্তু তাঁর শিক্ষকেরা প্রায়ই খেয়াল করতেন, তিনি পড়ালেখায় মনোযোগ দিচ্ছেন না এবং তাঁর সম্পূর্ণ সম্ভাবনাও ব্যবহার করছেন না। তিনি ঘুরে দাঁড়ান ১৯৬২ সালে, অক্সফোর্ড থেকে গ্র্যাজুয়েট করার পর। সেবার প্রথম এএলএস (অ্যামিওট্রোপিক ল্যাটারেল স্কেলেরোসিস বা লিও গেহরিগ’স ডিজিজ) রোগের লক্ষণগুলো খেয়াল করেন তিনি। দুরারোগ্য এই মোটর নিউরন রোগে নিজের আক্রান্ত হওয়ার খবর শুনে রীতিমতো আঁতকে উঠেছিলেন তিনি। জানতে পারলেন, তাঁর সব মোটর ফাংশন অকার্যকর হয়ে যাবে ও শিগগিরই মারাও যাবেন। প্রথমে খবরটি খুব হতাশাজনক ছিল। তিনি ভাবলেন, অল্প কিছুদিন পর যদি মরেই যেতে হয়, তাহলে পিএইচডি ডিগ্রি নিয়ে লাভ কী?

কিন্তু প্রাথমিক শোকের ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার পর, তিনি প্রথমবার নিজের জীবনের প্রতি মনোযোগী হন। বুঝতে পারলেন, তিনি আজীবন বাঁচতে পারবেন না। তাই মরিয়া হয়ে সাধারণ আপেক্ষিকতার সবচেয়ে কঠিন কিছু সমস্যা সমাধানে ঝাঁপিয়ে পড়েন তিনি। ১৯৭০-এর দশকের শুরুর দিকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু গবেষণা প্রবন্ধ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করতে শুরু করলেন। সেগুলোতে দেখালেন, আইনস্টাইনের তত্ত্বে সিঙ্গুলারিটি বা পরম বিন্দু (যেখানে মহাকর্ষক্ষেত্র অসীম, অনেকটা কৃষ্ণগহ্বরের কেন্দ্রের মতো ও মহাবিস্ফোরণের সময়ের মতো) আপেক্ষিকতার অপরিহার্য এক বৈশিষ্ট্য। একে সহজে বাতিল করাও সম্ভব নয় (অথচ আইনস্টাইন তেমনই ভাবতেন)। ১৯৭৪ সালে হকিং এটাও প্রমাণ করেন, কৃষ্ণগহ্বর পুরোটা কালো নয়, বরং সেখান থেকে ক্রমান্বয়ে বিকিরণ নিঃসৃত হয়। এটি এখন হকিং রেডিয়েশন বা হকিং বিকিরণ নামে পরিচিত। এর কারণ বিকিরণ মহাকর্ষ ক্ষেত্রের মধ্য দিয়ে কৃষ্ণগহ্বর থেকেও বেরিয়ে আসতে পারে। এই গবেষণাপত্রে প্রথমবারের মতো আপেক্ষিকতা তত্ত্বের সঙ্গে কোয়ান্টাম তত্ত্ব গুরুত্ব দিয়ে ব্যবহার করা হয়। এটি তাঁর সেরা গবেষণা বলে বিবেচিত।

আগের আশঙ্কামতোই এএলএসে ধীরে ধীরে তাঁর হাত-পা ও তাঁর ভোকাল কর্ড প্যারালাইসিস হতে থাকে। তবে চিকিৎসকেরা যে গতিতে আক্রান্ত হওয়ার কথা বলেছিলেন, তার চেয়ে অনেক ধীরে ঘটতে থাকে সবকিছু। ফলে তিনি সাধারণ মানুষের মতো অনেকগুলো প্রচলিত মাইলফলক অতিক্রম করতে পারেন। সে জন্য তিনি তিন সন্তানের পিতা হতে পেরেছেন (এখন তিনি দাদা হয়েছেন), ১৯৯১ সালে প্রথম স্ত্রীকে ডিভোর্সও দেন, চার বছর পর আরেক নারীকে বিয়ে করেন, যাঁর আগের স্বামী তাঁর ভয়েজ সিনথেজসাইজার বানিয়ে দিয়েছিলেন এবং দ্বিতীয় স্ত্রীকেও ডিভোর্স দেন ২০০৬ সালে। অনেক দিনের ইচ্ছা পূরণ করতে ২০০৭ সালে তিনি একটি জেট বিমানে চড়ে ওজনহীনতার অভিজ্ঞতা লাভ করে সংবাদপত্রের শিরোনামেও পরিণত হন। তাঁর পরের ইচ্ছা মহাশূন্যে ভ্রমণ

তিনি প্রায় পুরো প্যারালাইসড হয়ে হুইলচেয়ারে বন্দী। [আধুনিক কালের অন্যতম সেরা পদার্থবিদ ও গণিতবিদ স্টিফেন হকিং মারা গেছেন ২০১৮ সালের ১৪ মার্চ। অবশ্য এ বইটি লেখার সময় তিনি বেঁচে ছিলেন।—অনুবাদক] চোখ নড়াচড়া করে তিনি অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতে পারেন। কিন্তু ভয়ংকর দৈহিক অক্ষমতা সত্ত্বেও তিনি রসিকতা করেন, গবেষণাপত্র লেখেন, বক্তৃতা দেন আর বিতর্কে জড়ান। পুরো দেহ নিয়ন্ত্রণ করতে পারা বিজ্ঞানীদের চেয়ে তাঁর এই দুচোখের নড়াচড়াও অনেক বেশি ফলপ্রসূ। (ব্রিটেনের রানির কাছ থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত অ্যাট্রোনমার রয়েল ও কেমব্রিজে তাঁর সহকর্মী স্যার মার্টিন রিস একবার আমাকে বলেছিলেন, হকিংয়ের দৈহিক অক্ষমতার তাঁকে ক্লান্তিকর গাণিতিক হিসাব থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। সে কারণে নিজের কাজে তিনি সেরা। সুতরাং জটিল গণনার চেয়ে তিনি নিত্যনতুন আইডিয়া নিয়ে ভাবার সময় পান। আর তাঁর গাণিতিক হিসাবগুলো তাঁর ছাত্ররা করে দেয়।)

১৯৯০ সালে সহকর্মীদের গবেষণাপত্র পড়েন হকিং। তাঁরা নিজেদের মতো করে টাইম মেশিনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন এতে। এরপর নিজের সন্দেহের কথা জানান হকিং। তাঁর অন্তর্দৃষ্টি তাঁকে জানাল, টাইম ট্রাভেল সম্ভব নয়। কারণ, ভবিষ্যৎ থেকে আমাদের সময়ে কোনো পর্যটককে এখনো দেখা যায়নি। টাইম ট্রাভেল যদি পার্কে ছুটির দিনের পিকনিকের মতো হতো, তাহলে ভবিষ্যৎ থেকে টাইম ট্রাভেলাররা ক্যামেরা নিয়ে আমাদের জ্বালাতন করতে দলবলে এখানে ছুটে আসত। তারপর তাদের সঙ্গে ছবি তোলার জন্য পীড়াপীড়ি করত তারা।

আবার পদার্থবিজ্ঞানের জগৎকে একটি চ্যালেঞ্জও ছুড়ে দিয়েছেন হকিং। তাঁর দাবি, এখানে একটি সূত্র থাকা উচিত, যার মাধ্যমে টাইম ট্রাভেল অসম্ভব হবে। সে জন্য ক্রোনোলজি প্রটেকশন কনজেকচারের প্রস্তাব দেন তিনি। এর মাধ্যমে ইতিহাসবিদদের কাছে ইতিহাসকে নিরাপদ রাখতে পদার্থবিদ্যার সূত্রগুলো ব্যবহার করে টাইম ট্রাভেল নিষিদ্ধ করতে চান হকিং।

কিন্তু বিব্রতকর ব্যাপার হলো, অনেক চেষ্টা করেও পদার্থবিদেরা টাইম ট্রাভেল ঠেকাতে কোনো সূত্র খুঁজে পাননি। বরং পদার্থবিজ্ঞানে আমাদের জানা থাকা সূত্রগুলো আপাতদৃষ্টিতে টাইম ট্রাভেলের সঙ্গে খাপ খায় বলেই মনে হচ্ছে। টাইম ট্রাভেলকে অসম্ভব করতে তুলতে পারে, এমন কোনো ভৌত সূত্রের খোঁজ না পেয়ে হকিং সম্প্রতি তাঁর মত বদলেছেন। তিনি বলেছেন, টাইম ট্রাভেল হয়তো সম্ভব হতেও পারে, কিন্তু সেটি বাস্তবসম্মত নয়। এরপর লন্ডনের একটি সংবাদপত্রে শিরোনাম হন তিনি।

একসময় যা বিজ্ঞানে গুরুত্ব পেত না, সেই টাইম ট্রাভেলই হঠাৎ করে তাত্ত্বিক পদার্থবিদদের খেলাঘর হয়ে উঠল। ক্যাল টেকের পদার্থবিদ কিপ থর্ন লিখলেন, ‘টাইম ট্রাভেল একসময় শুধু বিজ্ঞান কল্পকাহিনি লেখকদের রাজ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। সত্যিকার বিজ্ঞানীরা একে প্লেগ রোগের মতো এড়িয়ে চলতেন। অবশ্য তাঁরাই আবার ছদ্মনামে ঠিকই এ-সংক্রান্ত সাহিত্য রচনা করেছেন কিংবা একান্তে পড়েছেনও। সময় কীভাবে বদলে গেল এখন পাণ্ডিত্যপূর্ণভাবে টাইম ট্রাভেল নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক জার্নালে বিশ্লেষণ করছেন তাঁরা। …এই পরিবর্তন কেন? কারণ, আমরা পদার্থবিদেরা বুঝতে পেরেছি, সময়ের প্রকৃতি খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই তাকে শুধু বিজ্ঞান কল্পকাহিনি লেখকদের হাতে ছেড়ে দেওয়া চলে না।’

এই বিভ্রান্তি ও উত্তেজনার মূল কারণ হলো আইনস্টাইনের সমীকরণগুলো বিভিন্ন ধরনের টাইম মেশিনের অনুমোদন দেয়। (অবশ্য সেগুলো কোয়ান্টাম তত্ত্ব থেকে আসা চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে পারবে কি না, তা নিয়ে এখনো সন্দেহ রয়ে গেছে।) আসলে আইনস্টাইনের তত্ত্বে আমরা একটি বিষয়ের মুখোমুখি হই, যাকে বলা হয় ‘ক্লোজড টাইম-লাইক কার্ভ’ বা আবদ্ধ সময়-সদৃশ বক্রতা। অতীতে টাইম ট্রাভেলের অনুমোদিত পথ বোঝাতে এই পরিভাষা ব্যবহার করা হয়। আমরা যদি ক্লোজড টাইম-লাইক কার্ভের পথ অনুসরণ করি, তাহলে যাত্রা করে ঠিক যাত্রা শুরুর আগের মুহূর্তে ফিরে আসা সম্ভব।

প্রথম টাইম মেশিন ওয়ার্মহোলের সঙ্গে সম্পর্কিত। আইনস্টাইনের সমীকরণের অনেকগুলো সমাধান আছে, যা মহাকাশে দূরের দুটি বিন্দুকে সংযুক্ত করতে পারে। কিন্তু আইনস্টাইনের তত্ত্বে স্থান ও সময় ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। সে কারণে, একই ওয়ার্মহোল সময়ের দুটি বিন্দুও সংযুক্ত করতে পারে। তাই ওয়ার্মহোলের মধ্য দিয়ে যাত্রা করে অতীতেও যাওয়া সম্ভব (অন্তত গাণিতিকভাবে হলেও সম্ভব এটি)। এভাবে আপনি যাত্রা শুরুর বিন্দুতে পৌঁছাতে পারবেন, আবার সেখানে নিজের সঙ্গেই দেখা করতে পারবেন, সেটাও বিশ্বাসযোগ্য। কিন্তু আগের অধ্যায়ে বলেছি, কৃষ্ণগহ্বরের কেন্দ্রের ভেতর দিয়ে ওয়ার্মহোলের মধ্য দিয়ে যাওয়া মানে হলো, একমুখী যাত্রা। পদার্থবিদ রিচার্ড গট বলেন, ‘কোনো ব্যক্তি কৃষ্ণগহ্বরের মধ্য দিয়ে টাইম ট্রাভেল করতে পারবে, সে বিষয়ে আমার মনে হয় না কোনো প্রশ্ন থাকতে পারে। প্রশ্ন হতে পারে, তিনি কি কখনো সেখান থেকে বেরিয়ে এসে সে বিষয়ে গর্ব ভরে বলতে পারবেন। ‘

আরেকটি টাইম মেশিন একটি ঘূর্ণমান মহাবিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কিত। ১৯৪৯ সালে টাইম ট্রাভেল-সংক্রান্ত আইনস্টাইনের সমীকরণের প্রথম সমাধানটি পান গণিতবিদ কুর্ট গোডেল। মহাবিশ্ব যদি ঘুরতে থাকে, তাহলে যথেষ্ট দ্রুতবেগে আপনি যদি মহাবিশ্বের চারদিকে ঘুরতে পারেন, তাহলে নিজেকে অতীতে খুঁজে পাবেন, তারপর ওই যাত্রা শুরুর আগে পৌঁছাতেও পারবেন। আসলে মহাবিশ্বের চারদিকের যাত্রাটাই হবে অতীত ভ্রমণ। নভোচারীরা যখন ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্সড স্টাডি দেখতে যেতেন, গোডেল তাঁদের প্রায়ই জিজ্ঞেস করতেন, মহাবিশ্ব যে ঘূর্ণমান সে-সংক্রান্ত কোনো প্রমাণ তাঁরা পেয়েছেন কি না। জবাবে তাঁরা যখন বলতেন, মহাবিশ্ব যে প্রসারিত হচ্ছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট প্রমাণ আছে। এ কথা শুনে হতাশ হতেন তিনি। (তা না হলে হয়তো টাইম ট্রাভেল সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়াত। পাশাপাশি আমরা যে ইতিহাস জানি, তা-ও ভেঙে পড়ত।)

তৃতীয়ত, আপনি যদি অসীমভাবে লম্বা কোনো ঘূর্ণমান সিলিন্ডারের চারপাশে ঘোরেন তাহলেও হয়তো আপনি যাত্রা শুরুর আগে পৌঁছাতে পারবেন। (সমাধানটি পাওয়া গিয়েছিল গোডেলের টাইম ট্রাভেলবিষয়ক সমাধানের অনেক আগে। এটি ১৯৩৬ সালে পেয়েছিলেন ডব্লিউ জে ভন স্টোকাম। মজার ব্যাপার হলো, স্টোকাম নিজেও সম্ভবত জানতেন না, তাঁর সমাধানটি টাইম ট্রাভেল অনুমোদন করে।) এ ক্ষেত্রে আপনি যদি মে দিবসে কোনো ঘূর্ণমান মে পোলের চারপাশে নাচতে থাকেন, তাহলে নিজেকে হয়তো এপ্রিল মাসে আবিষ্কার করবেন। (তবে এ ডিজাইনের সমস্যাটি হলো, সিলিন্ডারটি অবশ্যই অসীম দৈর্ঘ্যের হতে হবে। আবার একে এত জোরে ঘুরতে হবে যে তার বেশির ভাগ পদার্থ উড়তে থাকবে। )

টাইম ট্রাভেলের সাম্প্রতিকতম উদাহরণটি ১৯৯১ সালে আবিষ্কার করেন প্রিন্সটনের রিচার্ড গট। তাঁর সমাধানের ভিত্তি হলো বিশাল আকৃতির মহাজাগতিক সুতো খুঁজে পাওয়া (যেটি হয়তো আদি মহাবিস্ফোরণের সময় কোনোভাবে বেঁচে গিয়েছিল)। তাঁর অনুমান, দুটি বড় আকৃতির কসমিক স্ট্রিং বা মহাজাগতিক সুতো প্রায় সংঘর্ষের মুখে পড়েছে। এখন সংঘর্ষমুখী কসমিক স্ট্রিংয়ের চারদিকে দ্রুত ঘুরে আসা গেলে হয়তো অতীতে ভ্রমণ করা সম্ভব। এই টাইম ট্রাভেলের সুবিধা হলো, এর জন্য অসীম দৈর্ঘ্যের কোনো ঘূর্ণমান সিলিন্ডার, ঘূর্ণমান মহাবিশ্ব কিংবা কৃষ্ণগহ্বরের প্রয়োজন নেই। (তবে এ ডিজাইনেরও সমস্যা আছে। সমস্যাটি হলো, প্রথমে মহাকাশে ভাসমান বিশালাকৃতির কসমিক স্ট্রিং খুঁজে পেতে হবে। এরপর নির্দিষ্টভাবে সংঘর্ষের মুখে ফেলতে হবে তাদের। এরপর সময়ের অতীতের যাওয়ার সুযোগ পাওয়া যাবে খুব স্বল্প সময়ের জন্য।) গট বলেন, ‘চুপসে যাওয়া স্ট্রিংয়ের লুপ যথেষ্ট বড় হলে তার চারপাশে আপনি একবার ঘুরে এক বছর আগে চলে যেতে পারবেন। তবে সে জন্য এর ভর-শক্তি পুরো গ্যালাক্সির অর্ধেকের বেশি থাকতে হবে।’

টাইম মেশিনের সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিশীল ডিজাইনটি হলো ট্রান্সভার্সেবল ওয়ার্মহোল। এ ব্যাপারে আগের অধ্যায়ে বলা হয়েছে। স্থান-কালের মধ্যে এটি এমন এক গর্ত, যার ভেতর দিয়ে কোনো ব্যক্তি সহজে সময়ের এদিক-ওদিক হেঁটে যেতে পারবেন। তত্ত্ব অনুসারে, ট্রান্সভার্সেবল ওয়ার্মহোল শুধু আলোর চেয়ে বেশি বেগে চলার সুবিধা দেয় না, সেই সঙ্গে টাইম ট্রাভেলেরও সুবিধা দেয়। ট্রান্সভার্সেবল ওয়ার্মহোলের প্রধান চাবিকাঠি হলো ঋণাত্মক শক্তি।

একটি ট্রান্সভার্সেবল ওয়ার্মহোল টাইম মেশিনে দুটি চেম্বার থাকতে পারে। প্রতিটি চেম্বারে দুটি সমকেন্দ্রী গোলক থাকতে পারে। সেগুলো হয়তো আলাদা হয়ে থাকতে পারে অতি ক্ষুদ্র দূরত্বে। বাইরের গোলককে সংকুচিত করে, দুটি গোলকে ক্যাসিমির ইফেক্ট ও ঋণাত্মক শক্তি তৈরি করা যেতে পারে। ধরে নেওয়া যায়, টাইপ থ্রি সভ্যতার কোনো ওয়ার্মহোলে এই দুটি চেম্বারের মধ্যে যোগসূত্র তৈরি করতে পারে (সম্ভবত একটিকে স্থান-কালের ফেনা থেকে বের করে এনে)। এরপর, প্রথম চেম্বারটি নিয়ে তাকে আলোর বেগে স্থানের ভেতর পাঠিয়ে দেওয়া। এই চেম্বারে সময় ধীরগতিতে প্রবাহিত হবে। কাজেই দুটি ঘড়ি আর পরস্পরের সঙ্গে সমন্বয় থাকবে না। দুটি চেম্বারে সময় ভিন্ন স্পন্দনে প্রবাহিত হবে, যা একটি ওয়ার্মহোলের মাধ্যমে সংযুক্ত।

আপনি যদি দ্বিতীয় চেম্বারে থাকেন, তাহলে সঙ্গে সঙ্গেই ওয়ার্মহোলের ভেতর দিয়ে প্রথম চেম্বারে যেতে পারবেন। এ চেম্বারটির পথ সময়ের অতীতে উন্মুক্ত হয়েছে। কাজেই এর মধ্য দিয়ে আপনি অতীতে চলে যেতে পারবেন।

তবে এই ডিজাইনে কিছু বড় ধরনের সমস্যা আছে। ওয়ার্মহোলটি খুব ছোট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এমনকি পরমাণুর চেয়েও ছোট হতে পারে সেটি। আর ঋণাত্মক শক্তি তৈরি করতে প্লেটগুলোকে হয়তো সংকুচিত করতে হতে পারে প্ল্যাঙ্ক দূরত্বে। সবশেষে বলা যায়, আপনি অতীতে যেতে পারবেন, তবে টাইম মেশিন যে বিন্দুতে বানানো হয়েছিল, শুধু সেই বিন্দুতে। এর আগে, দুটি চেম্বারের ভেতরে সময় একই হারে স্পন্দিত হবে।

প্যারাডক্স ও সময়ের প্রহেলিকা

প্রযুক্তিগত ও সামাজিক উভয় ধরনের সমস্যা তৈরি করতে পারে টাইম ট্রাভেল। এ বিষয়ে নৈতিক, আইনগত বিষয়গুলো উত্থাপন করেছেন ল্যারি ডয়ার। তিনি লিখেছেন, ‘কোনো টাইম ট্রাভেলার যদি খোদ তারই তরুণ বয়সের জনকে ঘুষি মারেন (কিংবা উল্টোটাও হতে পারে), তাহলে কি তার জরিমানা করা উচিত? ধরা যাক, কাউকে হত্যা করে কোনো টাইম ট্রাভেলার আশ্রয়ের জন্য অতীতে পালিয়ে গেলেন। তাহলে কি ভবিষ্যতে করা কোনো অপরাধের জন্য তাকে অতীতে ভালো বলা যাবে? একটি স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও, তিনি যদি অতীতের এমন কাউকে বিয়ে করেন, যিনি প্রায় ৫০০০ বছর জন্ম নেবেন না, তাহলে কি বহুবিবাহের অপরাধ করবেন তিনি?’

কিন্তু এর চেয়েও সম্ভবত বিতর্কিত সমস্যা হলো, টাইম ট্রাভেলের কারণে উদ্ভূত কিছু যৌক্তিক প্যারাডক্স। যেমন, জন্মের আগেই যদি তিনি আমাদের বাবা-মাকে মেরে ফেলেন, তাহলে কী হবে? এটি যৌক্তিকভাবে অসম্ভব। একে বলা হয় গ্র্যান্ডফাদার প্যারাডক্স।

তিনভাবে এই প্যারাডক্সগুলোর সমাধান করা যায়। প্রথমত, সম্ভবত অতীতে গেলে আপনি সরলভাবে আপনার ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করবেন। এ ক্ষেত্রে আপনার কোনো স্বাধীন ইচ্ছা থাকবে না। অতীত যেভাবে লেখা আছে, ঠিক সেভাবেই সবকিছু করতে আপনাকে বাধ্য করা হবে। কাজেই যদি অতীতে গিয়ে আপনার তরুণজনকে টাইম ট্রাভেলের রহস্য ফাঁস করে দেন, তাহলে তার মানে, অতীতটা আসলে সেভাবেই লেখা ছিল। অর্থাৎ টাইম ট্রাভেলের রহস্য আসবে ভবিষ্যৎ থেকেই। এটাই ছিল কপাললেখন। (তবে এটি বলতে পারবে না, আসল ধারণাটি কোথা থেকে এসেছে।)

দ্বিতীয়ত, আপনার স্বাধীন ইচ্ছা বলবৎ থাকবে। তাতে অতীত পরিবর্তন করতে পারবেন, কিন্তু তারও সীমাবদ্ধতা আছে। আপনার স্বাধীন ইচ্ছা সময়ের কোনো প্যারাডক্স তৈরির অনুমোদন দেবে না। যতই আপনার পিতা- মাতাকে আপনার জন্মের আগে হত্যা করার চেষ্টা করেন না কেন, রহস্যময় কোনো শক্তি আপনাকে ট্রিগার টিপতে বাধা দিতে থাকবে। এ ধারণাটির প্রস্তাব দিয়েছেন রুশ পদার্থবিদ ইগর নোভিকভ। (তাঁর যুক্তি হলো, নিশ্চয় কোনো সূত্র আছে, যার কারণে আমরা সিলিংয়ের ওপর হাঁটতে পারি না, আমাদের ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও। কাজেই এমন কোনো সূত্রও থাকতে পারে, যেটি আমাদের জন্মের আগে আমাদের পিতা-মাতাকে হত্যাতেও বাধা দেবে। অদ্ভুত কোনো আইন রিভলবারের ট্রিগার টিপতে আমাদের বাধা দেয়। )

তৃতীয়ত, মহাবিশ্ব দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যাবে। একটি টাইম লাইনে আপনি যাদেরকে হত্যা করবেন, তারা শুধু দেখতে আপনার বাবা-মায়ের মতো হবে, কিন্তু তারা আসলে তাদের চেয়ে আলাদা সত্তা। কারণ, তখন আপনি আসলে প্যারালাল বা সমান্তরাল মহাবিশ্বে চলে যাবেন। শেষের সম্ভাবনাটি কোয়ান্টাম তত্ত্বের সঙ্গে খাপ খায়। মাল্টিভার্স নিয়ে আলোচনার সময় এ ব্যাপারে বিস্তারিত বলব।

দ্বিতীয় সম্ভাবনাটি খতিয়ে দেখা হয়েছে টার্মিনেটর থ্রি মুভিতে। এতে ভবিষ্যৎ থেকে আসা এক রোবটের চরিত্রে অভিনয় করেছেন আরনল্ড শোয়ার্জেনিগার। ভবিষ্যতের সেই পৃথিবী তখন খুনে যন্ত্রদের দখলে। সেখানে কিছু মানুষ থাকলেও তাদেরকে হিংস্র দাবনের মতো যন্ত্ররা শিকার করে বেড়ায়। মানুষদের নেতৃত্বে রয়েছে মহান এক নেতা, যাকে দানব যন্ত্ররা কোনোভাবেই হত্যা করতে পারছিল না। তাই হতাশ হয়ে যন্ত্ররা ধারাবাহিকভাবে কিছু খুনি রোবট পাঠাতে থাকে অতীতকালে, যাতে ওই মহান নেতার জন্মের আগেই তার মাকে হত্যা করা যায়। কিন্তু মুভির শেষে ভয়াবহ যুদ্ধের পর মানবসভ্যতা ক্রমে ধ্বংস হতে দেখা যায়।

ব্যাক টু দ্য ফিউচার মুভিতে দেখানো হয়েছে তৃতীয় সম্ভাবনা। প্লুটোনিয়াম-চালিত ডিলোরেন কার উদ্ভাবন করেন ড. ব্রাউন। আসলে এই গাড়িটি ছিল অতীতে যাওয়ার এক টাইম মেশিন। মাইকেল জে ফক্স (মার্টি ম্যাকফ্লাই) ওই টাইম মেশিনে চড়ে অতীতে চলে যায়। সেখান তার তরুণী মায়ের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়, যিনি মার্টির প্রেমে পড়ে যান। এতে শুরু হয় ভয়াবহ ঝামেলা। মজার ব্যাপার হলো, মার্টি ম্যাকফ্লাইয়ের তরুণী মা যদি তার ভবিষ্যতের বাবাকে প্রত্যাখ্যান করে বসেন, তাহলে তাদের কখনো বিয়ে হওয়া সম্ভব নয়। তাতে মাইকেল জে ফক্স চরিত্রটির কখনোই আর জন্ম হবে না।

সমস্যাটি কিছুটা পরিষ্কার করে দেন ড. ব্রাউন। তিনি ব্ল্যাকবোর্ডে একটি আনুভূমিক রেখা এঁকে সেখানে আমাদের মহাবিশ্বের টাইমলাইন দেখান। এরপর প্রথম রেখার শাখা হিসেবে তিনি দ্বিতীয় আরেকটি রেখাও আঁকেন, যেটি সমান্তরাল মহাবিশ্বের প্রতিনিধিত্ব করছে। অতীত বদলে ফেললে এই সমান্তরাল মহাবিশ্ব উন্মুক্ত হয়। কাজেই সময়ের নদীতে যখনই পেছনে যাবেন, নদীটি শাখা বিস্তার করে দুটি নদীতে বিভক্ত হয়ে যাবে। এর একটি টাইমলাইন বা সময়রেখা বিভক্ত হয়ে যাবে দুটি টাইমলাইনে। একে মেনি ওয়ার্ল্ডস বা ‘অনেক মহাবিশ্ব’ নামেও ডাকা যেতে পারে। এ বিষয়ে পরের অধ্যায়ে আলোচনা করা হবে।

এর মানে হলো, টাইম ট্রাভেলের সব প্যারাডক্সের সমাধান হওয়া সম্ভব। আপনার জন্মের আগে যদি আপনার বাবা-মাকে হত্যা করেন, তাহলে এর সহজ অর্থ হলো, আপনি এমন কাউকে হত্যা করবেন, যারা জীবগতভাবে আপনার বাবা-মায়ের ঠিক যমজের মতো। এমনকি তাদের স্মৃতি ও ব্যক্তিত্বও আপনার বাবা-মায়ের মতো, কিন্তু তারা আসলে আপনার সত্যিকার বাবা-মা নন।

‘অনেক মহাবিশ্ব’-এর ধারণাটি টাইম ট্রাভেল-সংক্রান্ত প্রধান সমস্যার অন্তত একটি সমাধান করতে পারে। কোনো পদার্থবিদের কাছে, টাইম ট্রাভেল নিয়ে অন্যতম সমালোচনা হলো (ঋণাত্মক শক্তি খুঁজে পাওয়ার পাশাপাশি) বিকিরণের প্রভাব এমনভাবে বাড়তে থাকবে যে হয় টাইম মেশিনে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে তার প্রভাবে আপনি মারা যাবেন, নয়তো আপনার ওপর ওয়ার্মহোল ধসে পড়বে। বিকিরণের প্রভাব বাড়তে থাকবে, কারণ, টাইম পোর্টালে যেকোনো বিকিরণ ঢুকলে তা অতীতে ফেরত পাঠানো হবে। এরপর বর্তমান সময়ে না পৌছানো পর্যন্ত সেখানে ক্রমেই মহাবিশ্বের চারদিকে ঘুরতে থাকবে সেটি। পরে তা ওয়ার্মহোলের ওপর আবারও আছড়ে পড়বে। যেহেতু বিকিরণ ওয়ার্মহোলের মুখ দিয়ে অসীমসংখ্যক সময়ে ঢুকতে পারে, সে জন্য ওয়ার্মহোলের ভেতরের বিকিরণ অবিশ্বাস্য রকম শক্তিশালী হবে। এই শক্তিশালী বিকিরণ আপনাকে মেরে ফেলার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু ‘অনেক মহাবিশ্ব’ এ সমস্যার সমাধান করতে পারে। বিকিরণ যদি টাইম মেশিনের ভেতরে যায় আর তা অতীতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে নতুন কোনো মহাবিশ্বে চলে যাবে সেটি। এতে এই বিকিরণ টাইম মেশিনে আর কখনো ঢুকতে পারবে না। এর সহজ অর্থ হলো, মহাবিশ্বের সংখ্যাও অসীম। প্রতিটি চক্রের জন্য একটি এবং একটি চক্র কেবল একটিমাত্র ফোটন বিকিরণের জন্য, অসীমসংখ্যক বিকিরণের জন্য নয়।

১৯৯৭ সালে তিন পদার্থবিদ অবশেষে প্রমাণ করেন, টাইম ট্রাভেল নিষিদ্ধ করতে হকিংয়ের অনুষ্ঠানটি আসলে ছিল ত্রুটিপূর্ণ। এর মাধ্যমে এই বিতর্ক কিছুটা মিটেছিল। বার্নাড কে, মেরেক র‍্যাডজিকোস্কি আর রবার্ট ওয়াল্ড প্ৰমাণ দেখান, আমাদের জানা পদার্থবিদ্যার সব সূত্রেরই সঙ্গে খাপ খায় টাইম ট্রাভেল। তবে ব্যতিক্রম আছে শুধু একটি জায়গায়। সময়ে যখন ভ্রমণ করা হয়, তখন সম্ভাব্য সব ধরনের সমস্যা ঘটনা দিগন্তে (ওয়ার্মহোলের প্রবেশপথেই যার অবস্থান) কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ে। কিন্তু ঘটনা দিগন্তের অবস্থান এমন জায়গায়, যেখানে আইনস্টাইনের তত্ত্ব অকার্যকর হয়ে যাবে আর কোয়ান্টাম প্রভাবমতো সবকিছু ঘটবে বলে আশা করি আমরা। এখানে সমস্যা হলো, আমরা টাইম মেশিনে ঢোকার সময় বিকিরণের প্রভাব যখন মাপার চেষ্টা করি, তখন এমন কোনো তত্ত্ব ব্যবহার করতে হবে, যা আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার সঙ্গে বিকিরণের কোয়ান্টাম তত্ত্বকে সমন্বিত করবে। কিন্তু এই দুই তত্ত্বের মধ্যে আমরা যতই ভদ্রগোছের বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করি না কেন, পরিণতিতে যে তত্ত্ব পাওয়া যায়, তা থেকে আসলে কিছুই বোঝা যায় না। কারণ, এর মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে অসীম উত্তর পাওয়া যায়, যা একেবারেই অর্থহীন।

ঠিক এখানে থিওরি অব এভরিথিং সবচেয়ে উপযুক্ত। ওয়ার্মহোলের ভেতর দিয়ে ভ্রমণের সব সমস্যা পদার্থবিদদের ঝামেলায় ফেলেছে। (যেমন ওয়ার্মহোলের স্থিতিশীলতা, আপনাকে মেরে ফেলার মতো শক্তিশালী বিকিরণ, ওয়ার্মহোলে ঢোকার পর তা বন্ধ হয়ে যাওয়া)। এগুলো সবই ঘটনা দিগন্তে উদ্ভূত হয়। আরও ভালোভাবে বলতে গেলে, এখানে আইনস্টাইনের তত্ত্ব কোনো কাজে আসে না।

কাজেই টাইম ট্রাভেল নিয়ে এই আলোচনার প্রধান উপলব্ধিটি হলো, কৃষ্ণগহ্বরের ঘটনা দিগন্তের পদার্থবিজ্ঞান বুঝতে হবে। আর একমাত্র থিওরি অব এভরিথিং বা সার্বিক তত্ত্বই ব্যাখ্যা করতে পারবে এটি। সে কারণে অধিকাংশ পদার্থবিজ্ঞানী এখন একমত যে একটি উপায়ে টাইম ট্রাভেল-সংক্রান্ত প্রশ্নটির নিশ্চিত সমাধান করা সম্ভব, সেটি হলো মহাকর্ষ ও স্থান-কালের পরিপূর্ণ একটি তত্ত্ব।

মহাবিশ্বের চারটি বলকে একত্র করবে থিওরি অব এভরিথিং। একই সঙ্গে টাইম মেশিনে ঢুকলে কী ঘটবে, সেটাও গণনা করতে পারবে। ওয়ার্মহোল যে বিকিরণের প্রভাব সৃষ্টি করে এবং টাইম মেশিনে ঢোকার পর কোন ওয়ার্মহোল কতটুকু স্থিতিশীল, সে-সংক্রান্ত প্রশ্নেরও সফলভাবে সমাধান করতে পারে একমাত্র থিওরি অব এভরিথিং। তারপরও এ তত্ত্বটির হাতে- কলমে পরীক্ষা করার জন্য সত্যিকার টাইম মেশিন বানাতে হবে। সে জন্য হয়তো অপেক্ষা করতে হবে আরও কয়েক শতাব্দী বা তার বেশি সময়।

টাইম ট্রাভেলের সূত্রগুলো ওয়ার্মহোলে পদার্থবিজ্ঞানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। সে কারণে টাইম ট্রাভেলকে এখানে দ্বিতীয় শ্রেণির অসম্ভাব্যতা হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।

তথ্যনির্দেশ

কৃষ্ণগহ্বর : স্থান-কালের একটি অঞ্চল, যেখানে কোনো কিছুই এমনকি আলোও বেরিয়ে আসতে পারে না। কারণ, এখানে মহাকর্ষ অনেক বেশি শক্তিশালী। সম্প্ৰতি বিশেষ ধরনের টেলিস্কোপে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রে থাকা একটি কৃষ্ণগহ্বরের ছবি তোলা সম্ভব হয়েছে।

মহাজাগতিক সুতো : মহাজাগতিক সুতো বা কসমিক স্ট্রিং একটি লম্বা, ভারী বস্তু, যার ক্ষুদ্র প্রস্থচ্ছেদ আছে। এটি হয়তো মহাবিশ্বের প্রাথমিক পর্যায়ে তৈরি হয়েছিল। এখন পর্যন্ত একটি একক স্ট্রিং হয়তো পুরো মহাবিশ্বে বিস্তৃত হয়ে গেছে।

পরম বিন্দু বা অনন্যতা : স্থান-কালের একটি বিন্দু, যেখানে স্থান-কালের বক্রতা (অথবা আরও কিছু ভৌত ধর্ম) অসীম হয় তাকেই বলা হয় পরম বিন্দু বা সিঙ্গুলারিটি।

১৩. সমান্তরাল মহাবিশ্ব

‘কিন্তু স্যার, আপনি কি সত্যিই বোঝাতে চাচ্ছেন যে এই জায়গার ওই পাশে, মানে ওই প্রান্তে এ রকম আরও অন্য মহাবিশ্বও থাকতে পারে?’, পিটার বলল।

প্রফেসর বিড়বিড় করে বললেন, ‘এর চেয়ে বড় সম্ভাবনা আর কী হতে পারে। আমার জানতে ইচ্ছা করছে, স্কুলে তারা কী শেখায়।’

–সি এস লুইস, দ্য লায়ন, দ্য উইচ অ্যান্ড দ্য ওয়ার্ডরোব

শুনুন : দরজার ওপাশের একটা ভালো মহাবিশ্বের এক নরক আছে; চলুন যাই।

–ই ই কানিংমস

বিকল্প কোনো মহাবিশ্ব থাকা কি সত্যিই সম্ভব? হলিউডের স্ক্রিপ্টরাইটারের জন্য প্রিয় একটি হাতিয়ার আছে। স্টার ট্রেকের মতো ধারাবাহিকে তাকে বলা হয় ‘মিরর, মিরর’। দুর্ঘটনাক্রমে একবার অদ্ভুত এক প্যারালাল ইউনিভার্সে পাঠানো হয়েছিল ক্যাপ্টেন কার্ককে। সেখানে ফেডারেশন অব প্ল্যানেটের অশুভ সাম্রাজ্য দখল করেছিল নৃশংস বিজয় আর লোভ ও লুটপাটের মাধ্যমে। ওই মহাবিশ্বে স্পুক ভয়ংকরদর্শন এক দাড়ি পরেছিল। আর সাংঘাতিক এক দস্যু দলের নেতায় পরিণত হন ক্যাপ্টেন কার্ক। প্রতিদ্বন্দ্বীদের দমিয়ে ও তাদের শীর্ষ নেতাদের গুপ্তহত্যা করে ধীরে ধীরে তারা সামনে এগিয়ে যায়।

বিকল্প মহাবিশ্বের কারণে আমরা অনুসন্ধান করতে পারি, মহাবিশ্বের ‘এমন যদি হতো’ ও এর মনোরম, মজার সম্ভাবনাগুলো। যেমন সুপারম্যান কমিকসে অনেকগুলো বিকল্প মহাবিশ্ব আছে। সেখানে সুপারম্যানের নিজের গ্রহ ক্রিপ্টন কখনো ধ্বংস হয় না। কিংবা সুপারম্যান শেষ পর্যন্ত ভদ্রগোছের ক্ল্যার্ক কেন্ট হিসেবে তার সত্যিকার পরিচয় উদ্ঘাটন করতে পারে। অথবা সে লুইস ল্যানকে বিয়ে করে আর তাদের সুপার বাচ্চাকাচ্চা হয়। প্রশ্ন হলো, সমান্তরাল মহাবিশ্ব কি শুধু টোয়ালাইট জোন-এ বর্ণিত কাল্পনিক কোনো রাজ্য, নাকি আধুনিক পদার্থবিদ্যায় তার কোনো বাস্তব ভিত্তি আছে?

ইতিহাসে ফিরে তাকালে দেখা যায়, প্রাচীন প্রায় সব সমাজে ঈশ্বর বা প্রেতাত্মাদের বাসস্থান হিসেবে অন্য স্থানের অস্তিত্বে বিশ্বাস করত মানুষ। খ্রিষ্টীয় চার্চ স্বর্গ, নরক ও প্রায়শ্চিত্তে বিশ্বাস করে। নির্বাণে ও বিভিন্ন ধরনের সচেতনতায় বিশ্বাস করে বৌদ্ধধর্মাবলম্বীরা। অন্যদিকে হাজারো স্থানের অস্তিত্বে বিশ্বাস হিন্দুদের।

স্বর্গের অবস্থান সম্পর্কে খ্রিষ্টীয় ধর্মতত্ত্ববিদদের ধারণা, ঈশ্বর হয়তো উচ্চতর মাত্রার কোনো স্থানে থাকেন। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, উচ্চতর মাত্রার অস্তিত্ব যদি থাকে, তাহলে ঈশ্বরের অনেকগুলো বৈশিষ্ট্যের হয়তো সহজ ব্যাখ্যা করা সম্ভব। বহুবিধ মাত্রার কোনো সত্ত্বা ইচ্ছেমতো অদৃশ্য ও আবির্ভূত হতে পারে, কিংবা দেয়ালের ভেতর দিয়ে হেঁটে অন্য পাশে চলে যেতে পারে। এসব ক্ষমতা সাধারণত ঈশ্বরের ওপর আরোপ করা হয়।

সম্প্রতি প্যারালাল ইউনিভার্সের ধারণাটি তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে অন্যতম বিতর্কের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ‘বাস্তবতা’ আসলে কী, তার অর্থ আবারও বিবেচনার ব্যাপারে জোর দেয় বিভিন্ন ধরনের প্যারালাল ইউনিভার্স। বিভিন্ন প্যারালাল ইউনিভার্স সম্পর্কে এই বিতর্কের বাজি আসলে খোদ বাস্তবতার অর্থই প্রকাশ করে।

বিজ্ঞানে বর্তমানে অন্তত তিন ধরনের প্যারালাল ইউনিভার্স বা সমান্তরাল মহাবিশ্ব নিয়ে জোর আলোচনা করা হয় :

১. হাইপারস্পেস বা উচ্চতর মাত্রা

২. মাল্টিভার্স বা বহুবিশ্ব ও

৩. কোয়ান্টাম প্যারালাল ইউনিভার্স বা কোয়ান্টাম সমান্তরাল মহাবিশ্ব

হাইপারস্পেস

যে প্যারালাল ইউনিভার্স দীর্ঘ ঐতিহাসিক বিতর্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেটি হলো উচ্চতর মাত্রার। আমাদের সাধারণ জ্ঞান অনুযায়ী, আমরা ত্রিমাত্রিক (দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা) বিশ্বে বসবাস করি। স্থানের মধ্যে কোনো বস্তুকে আমরা কীভাবে নড়াচাড়া করছি, তা এখানে ধর্তব্যের বিষয় নয়। এখানে সব অবস্থানকে ব্যাখ্যা করা যায় মাত্র তিনটি স্থানাঙ্ক দিয়ে। আসলে এ তিনটি মাত্র সংখ্যা দিয়ে আমাদের নাকের ডগা থেকে শুরু করে দূরতম ছায়াপথসহ যেকোনো বস্তুকে মহাবিশ্বের যেকোনো জায়গার অবস্থান চিহ্নিত করা যায়।

চতুর্থ স্থানিক মাত্রা সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানের সঙ্গে খাপ খায় না বলে মনে করা হয়। ধরা যাক, কোনো ঘরে যদি ধোঁয়া ভরে যেতে দেওয়া হয়, তাহলে ওই ধোঁয়া অন্য কোনো মাত্রায় অদৃশ্য হয়ে যেতে দেখা যায় না। মহাবিশ্বের কোথাও কোনো বস্তু হঠাৎ করে হারিয়ে যেতে কিংবা অন্য মহাবিশ্বে সেটা উদয় হতেও দেখা যায় না। এর মানে, যেকোনো উচ্চতর মাত্রা যদি সত্যিই থাকে, তাহলে তা অবশ্যই পরমাণুর চেয়েও অনেক ছোট।

তিনটি স্থানিক মাত্রাই গ্রিক জ্যামিতির মৌলিক ভিত্তি তৈরি করেছে। যেমন অ্যারিস্টটল তাঁর রচনা ‘অন হেভেন’-এ লিখেছেন, ‘রেখা এক দিকে বিস্তৃত হয়, তলের বিস্তৃতি দুই দিকে আর ঘনকের তিন দিকে। আর এই বাইরে অন্য কোনো বিস্তৃতি বা মাত্রা নেই। কারণ, এই তিনটিই সব। খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০ অব্দে আলেকজান্দ্রিয়ার টলেমি প্রথম প্রমাণ করেন, উচ্চতর মাত্রা থাকা অসম্ভব। তাঁর রচনা ‘অন ডিসটেন্স’-এ এ-সম্পর্কিত যুক্তিটি দেখান তিনি। সেটি ছিল এ রকম : তিনটি রেখা আঁকুন, যারা পরস্পরের ওপর লম্ব (কোনো ঘরের কোনায় রেখা গঠন করার মতো)। তিনি বলেন, স্পষ্টত অন্য তিনটির ওপর চতুর্থ কোনো লম্বরেখা আঁকা সম্ভব নয়। কাজেই চতুর্থ মাত্রা থাকাও অসম্ভব। (তিনি আসলে প্রমাণ করেছেন যে আমাদের মস্তিষ্ক চতুর্থ মাত্রার দৃশ্যমান করে তুলতে অক্ষম। মজার ব্যাপার হলো, আপনার ডেস্কের পিসি সব সময় হাইপারস্পেসে গণনা করে।)

প্রায় দুই হাজার বছর ধরে, যেসব গণিতবিদ চতুর্থ মাত্রা থাকার সম্ভাবনা দিয়ে কথা বলার দুঃসাহস দেখাতেন, তাঁরাই উপহাসের শিকার হতেন। ১৮৬৫ সালে চতুর্থ মাত্রার বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করেন গণিতবিদ জন ওয়ালিস। একে প্রকৃতির দানব হিসেবে চিহ্নিত করেন তিনি। গ্রিক দানব কাইমেরা বা সেন্টর চেয়েও এর থাকার সম্ভাবনা কম বলে মনে করতেন ওয়ালিস। উনিশ শতকে গণিতবিদদের রাজপুত্র নামে পরিচিত কার্ল গাউস চতুর্থ মাত্রার গণিতের অনেকাংশ নির্ণয় করলেও তা প্রকাশ করতে ভয় পান। চতুর্থ মাত্রার কারণে প্রবল প্রতিক্রিয়া হবে বলে তা নিয়ে ভীত ছিলেন তিনি। তবে সমতল, ত্রিমাত্রিক গ্রিক জ্যামিতি সত্যি সত্যি মহাবিশ্বকে ব্যাখ্যা করতে পারে কি না, তা গোপনে পরীক্ষা করে দেখেন গাউস। পরীক্ষার জন্য তাঁর সহকারীদের তিনটি পাহাড়চূড়ায় পাঠান তিনি। তাঁদের প্রত্যেকের হাতে ছিল একটি করে লন্ঠন। এভাবে অনেক বড় এক ত্রিভুজ তৈরি হয়। গাউস এরপর ওই ত্রিভুজের প্রতিটি প্রান্তের কোণ মাপেন। অভ্যন্তরীণ বা অন্তঃস্থ সব কোণ যোগ করে ১৮০ ডিগ্রি হতে দেখে তিনি যারপরনাই হতাশ হন। তিনি সিদ্ধান্তে পৌঁছান, গ্রিক জ্যামিতির যদি বিচ্যুতি ঘটেও থাকে, তাহলে সেগুলো অবশ্যই এত ক্ষুদ্র হবে যে, লন্ঠন দিয়ে তা শনাক্ত করা যায়নি।

উচ্চতর মাত্রার মৌলিক গণিত লেখার দায়িত্ব গাউস তাঁর ছাত্র জর্জ বার্নার্ড রিম্যানের ওপর ছেড়ে দেন (কয়েক দশক পর এটাই আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্বে আমদানি করা হয়েছিল)। রিম্যান যেন একঝটকায় দুই হাজার বছরের গ্রিক জ্যামিতিকে উল্টেপাল্টে দিলেন। ১৮৫৪ সালে আলোচিত এক বক্তৃতায় সেটি উপস্থাপন করেন তিনি। এভাবে রিম্যান উচ্চতর, বক্র মাত্রার মৌলিক গণিত প্রতিষ্ঠা করেন। এই গণিত আমরা আজও ব্যবহার করি।

১৮০০-এর দশকের শেষ দিকে রিম্যানের অসাধারণ এই আবিষ্কার ইউরোপে বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। শিল্পী, সংগীতজ্ঞ, লেখক, দার্শনিক ও চিত্রশিল্পীদের কাছে চতুর্থ মাত্রা বেশ আলোড়ন তোলে। সত্যি বলতে কি, পিকাসোর কিউবিজম চতুর্থ মাত্রার মাধ্যমে আংশিক অনুপ্রাণিত। চিত্রশিল্প ইতিহাসবিদ লিন্ডা ডালরিম্পল হেন্ডারসন এমনই মনে করেন। (পিকাসোর আঁকা ছবিতে নারীদের চোখ সামনের দিকে আর নাক পাশে রেখে আসলে চতুর্থমাত্রিক দৃষ্টিকোণ ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে। কারণ চতুর্থ মাত্রা নিচ থেকে দেখা হলে নারীর মুখ, নাক ও কান মাথার পেছনটা একই সঙ্গে দেখা সম্ভব।) হেন্ডারসন লিখেছেন, ‘কৃষ্ণগহ্বরের মতো চতুর্থ মাত্রারও রহস্যময় গুণাগুণে আচ্ছন্ন, যা পুরোপুরি বোঝা যায় না। বিজ্ঞানীরাও তার পুরোটা বোঝেন না। তবু ১৯১৯ সালের পর আপেক্ষিক তত্ত্ব বাদে কৃষ্ণগহ্বর বা অন্য কোনো সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক হাইপোথিসিসের চেয়ে চতুর্থ মাত্রার প্রভাব অনেক বেশি বোধগম্য।’

অন্য চিত্রশিল্পীরাও চতুর্থ মাত্রা থেকে অনুপ্রেরণা পেয়ে ছবি এঁকেছেন। সালভাদর দালির কর্পাস হাইপারকিউবিকাস ছবিতে এক মঞ্চের সামনে যিশুকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছে। সেখানে ক্রুশটি ত্রিমাত্রিক ও ভাসমান। এটি আসলে একটি টেসারক্ট, অর্থাৎ একটি পাক খোলা চতুর্থমাত্রিক ঘনক। তাঁর বিখ্যাত পারসিস্ট্যান্স অব মেমোরি ছবিতে তিনি সময়কে চতুর্থ মাত্রা হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন। সে জন্য গলিত ঘড়িগুলোকে ব্যবহার করেছেন রূপক হিসেবে। মার্সেল ডুকাম্পের ‘ন্যুড ডিসেন্ডিং আ স্টেয়ারকেস’ শিরোনামের ছবিটি আঁকা হয়েছে সময়কে চতুর্থ মাত্রা হিসেবে উপস্থাপন করে। এখানে সিঁড়ি দিয়ে হেঁটে নেমে যাওয়া এক নগ্নিকার ছবি আঁকা হয়েছে টাইম ল্যাপস মোশন ব্যবহার করে। অস্কার ওয়াইল্ডের গল্প ‘দ্য ক্যান্টারভিল গোস্ট’তেও চতুর্থ মাত্রা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। একটি বাড়িতে হানা দেওয়া এক ভূতকে চতুর্থ মাত্রায় বসবাস করতে দেখা যায় এ গল্পে।

এইচ জি ওয়েলসের বেশ কয়েকটি গল্পে চতুর্থ মাত্রার বিষয়টি এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘ইনভিজিবল ম্যান, দ্য প্ল্যাটনার স্টোরি আর দ্য ওয়ান্ডার ভিজিট।’ (আমাদের মহাবিশ্ব অন্য এক সমান্তরাল মহাবিশ্বের সঙ্গে সংঘর্ষের মুখে পড়েছে—এটি পরবর্তীকালে হলিউডের চলচ্চিত্র ও বিজ্ঞান কল্পকাহিনি উপন্যাসের ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। একবার দুর্ঘটনাক্রমে এক শিকারির গুলি খেয়ে অন্য মহাবিশ্ব থেকে এক দেবদূত আমাদের মহাবিশ্বে পড়ে যায়। আমাদের মহাবিশ্বের সব ধরনের লোভ, লালসা আর স্বার্থপরতা দেখে হতাশ হয়ে একসময় দেবদূতটি আত্মহত্যা করে।

সমান্তরাল মহাবিশ্বের ধারণা কৌতুককর করে তুলে ধরেছেন রবার্ট হেনলিন দ্য নাম্বার অব দ্য বিস্ট বইয়ে। সমান্তরাল মহাবিশ্বে এক উন্মাদ অধ্যাপকের আন্তমাত্রিক স্পোর্টস কারে চড়ে ঘুরে বেড়ানো চার সাহসী ব্যক্তির দলকে এখানে চিত্রিত করেছেন হেনলিন।

টিভি সিরিজ স্লাইডার-এ এক ছোট ছেলে একটি বই পড়ে এমন একটি যন্ত্র বানানোর অনুপ্রেরণা পায়, যার মাধ্যমে সে সমান্তরাল মহাবিশ্বে যেতে সক্ষম হয়। (মজার ব্যাপার হলো, বইটিতে ছোট্ট ছেলেটি যে বই পড়েছিল, সেটি ছিল আমার লেখা হাইপারস্পেস।)

তবে ঐতিহাসিকভাবে চতুর্থ মাত্রা নিয়ে পদার্থবিদদের আগ্রহ ছিল খুব সামান্যই। কারণ, উচ্চতর মাত্রার এখনো কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে এ অবস্থা বদলে যায় ১৯১৯ সালে পদার্থবিদ থিওডর কালুজার অতিমাত্রায় বিতর্কিত এক গবেষণাপত্র লেখার পর। উচ্চতর মাত্রা থাকার ইঙ্গিত দেওয়া হয় এই গবেষণাপত্রে। আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্ব দিয়ে শুরু করলেও তিনি একে পাঁচ মাত্রায় বসিয়ে দেখান (সময়ের জন্য এক মাত্রা ও স্থানের জন্য মাত্রা চারটি। কারণ, স্থান-কালের মাত্রায় সময় চতুর্থ মাত্রা। পদার্থবিদেরা এখন চতুর্থ স্থানিক মাত্রাকে পঞ্চম মাত্রা হিসেবে বিবেচনা করেন)। পঞ্চম মাত্রা যদি ছোট থেকে ছোট হতে থাকে, তাহলে সমীকরণগুলো বিস্ময়করভাবে দুটি খণ্ডে বিভক্ত হয়ে যায়। এর এক খণ্ড আইনস্টাইনের প্রমিত আপেক্ষিক তত্ত্ব ব্যাখ্যা করে, অন্যদিকে অন্য খণ্ডটি হয়ে যায় ম্যাক্সওয়েলের আলোর তত্ত্ব!

এটি ছিল বিস্ময়কর এক উদ্ঘাটন। হয়তো আলোর গুপ্ত রহস্য লুকিয়ে আছে এই পঞ্চম মাত্রায়। খোদ আইনস্টাইনও এই সমাধানে আঁতকে ওঠেন। এ সমাধানে আলো আর মহাকর্ষের মার্জিত একত্রকরণের জোগান দেয় বলে মনে করা হয়েছিল। (কালুজার প্রস্তাবে আইনস্টাইন এতটাই ধাক্কা খেয়েছিলেন যে তিনি দীর্ঘ দুই বছর গবেষণাপত্রটি ঝুলিয়ে রাখেন। অবশেষে এটি প্রকাশের অনুমতি দেন তিনি। এক চিঠিতে আইনস্টাইন কালুজাকে লেখেন, ‘একটি পাঁচ মাত্রিক সিলিন্ডার মহাবিশ্বের মাধ্যমে [একটি একীভূত তত্ত্ব] অর্জনের এই ধারণা আমার মাথাতেও কখনো আসেনি। প্রথম দর্শনে, আপনার ধারণাটি আমার খুব পছন্দ হয়েছিল। কারণ, আপনার তত্ত্বের আনুষ্ঠানিক ঐক্য বিস্ময়কর।’

অনেক বছর ধরে পদার্থবিদেরা প্রশ্ন করে আসছেন : আলো যদি তরঙ্গ হয়, তাহলে তরঙ্গায়িত বিষয়টি কী? শূন্যস্থানের ভেতর দিয়ে আলো বিলিয়ন আলোকবর্ষ পাড়ি দিতে পারে। কিন্তু শূন্যস্থান হলো ভ্যাকুয়াম, সেখানে কোনো বস্তু থাকে না। তাহলে ভ্যাকুয়ামের মধ্যে তরঙ্গায়িত ঢেউ আসলে কী? কালুজার তত্ত্বে এ সমস্যার জোরালো এক উত্তর পেয়েছি আমরা। এ তত্ত্বমতে, আলো হলো পঞ্চম মাত্রায় আন্দোলন বা ঢেউ। ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণগুলো আলোর সব ধর্ম সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করে। পঞ্চম মাত্রায় তরঙ্গের চলাচলের ক্ষেত্রেও এ সমীকরণগুলো প্রকাশ করতে পারে বেশ সহজভাবে।

কল্পনা করুন, একটি অগভীর পুকুরে মাছ সাঁতার কাটছে। তারা হয়তো তৃতীয় মাত্রার উপস্থিতি কখনোই বুঝতে পারে না; কারণ, তাদের চোখ পাশের দিকে বসানো। তারা শুধু সামনে ও পেছনে আর বাঁ ও ডানে সাঁতার কাটতে পারে। তাদের কাছে তৃতীয় মাত্রা অসম্ভব হতে পারে। কিন্তু ধরা যাক, পুকুরটিতে বৃষ্টি হচ্ছে। তারা তৃতীয় মাত্রা দেখতে না পেলেও পুকুরের পৃষ্ঠতলে ঢেউয়ের ছায়া স্পষ্টভাবে দেখতে পাবে। একইভাবে পঞ্চম মাত্রায় আলোর ঢেউয়ের চলাচল হিসেবে ব্যাখ্যা করতে পারে কালুজা তত্ত্ব।

আবার পঞ্চম মাত্রা কোথায় আছে, তার উত্তরও দিয়েছেন কালুজা। আমরা যেহেতু পঞ্চম মাত্রার কোনো প্রমাণ দেখতে পাই না, কাজেই মাত্রাটি অবশ্যই কুঁকড়ে এতই ছোট হয়ে আছে যে, তা পর্যবেক্ষণ করা যাচ্ছে না। (একটি দ্বিমাত্রিক পাতলা কাগজের টুকরো নিন। এরপর একে গোল করে একটি সিলিন্ডার বানান। দূর থেকে এই সিলিন্ডার দেখতে একমাত্রিক রেখার মতো দেখায়। এভাবে একটি দ্বিমাত্রিক বস্তু কুঁকড়ে একমাত্রিক বস্তুতে পরিণত হয়।)

কালুজার গবেষণাপত্র শুরুতে বেশ একটা উত্তেজনার জন্ম দেয়। কিন্তু পরের বছরগুলোতে বেশ কিছু আপত্তি উঠতে থাকে তাঁর তত্ত্ব নিয়ে। নতুন এই পঞ্চম মাত্রার আকার কত? এটা কীভাবে কুঁকড়ে গেল? এর উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।

অনেক দশক ধরে থেমে থেমে এই তত্ত্ব নিয়ে কাজ করেছেন আইনস্টাইন। ১৯৫৫ সালে তিনি মারা যাওয়ার পর তত্ত্বটি বেশ দ্রুতই বিস্মৃতির অতলে চলে যায়। এরপর তা পদার্থবিজ্ঞানের বিবর্তনের ইতিহাসে কেবল অদ্ভুত এক পাদটীকায় পরিণত হয়।

স্ট্রিং থিওরি

অবশ্য এই সবকিছুই বদলে গিয়েছিল সুপারস্ট্রিং থিওরি নামে চমকপ্রদ নতুন এক তত্ত্ব হাতে আসার পর। ১৯৮০-এর দশকে পদার্থবিদেরা সাব-অ্যাটমিক বা অতিপারমাণবিক কণা নিয়ে হাবুডুবু খাচ্ছিলেন। প্রতিবার তাঁরা একটি পরমাণুকে শক্তিশালী পার্টিকেল অ্যাকসিলারেটর বা কণা ত্বরকযন্ত্রের মাধ্যমে ভাঙতে গিয়ে নতুন নতুন আরও অনেক কণা খুঁজে পাচ্ছিলেন। এটি হতাশাজনক বিষয়ে পরিণত হয়। তাই জে রবার্ট ওপেনহাইমার শেষমেশ ঘোষণা দিয়ে বসেন, পদার্থবিদ্যার নোবেল পুরস্কার এই বছর সেই পদার্থবিদকে দেওয়া হবে, যিনি নতুন কোনো কণা আবিষ্কার করবেন না। (গ্রিক-ধ্বনি যুক্ত অতিপারমাণবিক কণার বিস্তৃতি দেখে খোদ এনরিকো ফার্মিও আতঙ্কিত হয়েছিলেন। সে কারণে তিনি বলেন, ‘আমি যদি সবগুলো কণার নাম মনে রাখতে পারতাম, তাহলে নির্ঘাত আমি উদ্ভিদবিজ্ঞানী হয়ে যেতাম।’) কয়েক দশকের কঠোর পরিশ্রমের পর কণাদের এই চিড়িয়াখানাকে স্ট্যান্ডার্ড মডেল সাজানো সম্ভব হয়। বিলিয়ন বিলিয়ন অর্থ ব্যয়ে, হাজার হাজার প্রকৌশলী ও পদার্থবিদের ঘাম আর ২০টি নোবেল পুরস্কার বেদনাদায়কভাবে জড়ো করার বিনিময়ে টুকরো টুকরোভাবে গড়ে ওঠে স্ট্যান্ডার্ড মডেল বা প্রমিত মডেল। সত্যিই অসাধারণ তত্ত্ব এটি, যা অতিপারমাণবিক পদার্থবিজ্ঞান-সম্পর্কিত সব কটি পরীক্ষামূলক তথ্য-উপাত্তের সঙ্গে খাপ খায়।

কিন্তু সব কটি পরীক্ষামূলক সাফল্য থাকার পরও স্ট্যান্ডার্ড মডেলের গুরুতর এক ত্রুটি রয়ে গেছে। স্টিফেন হকিং এ সম্পর্কে বলেছেন, ‘এটি বিশ্রী আর সাময়িক।’ এতে অন্তত ১৯টি মুক্ত প্যারামিটার (ধ্রুবকবিশেষ) আছে (এর মধ্যে কণার ভর ও অন্য কণাদের সঙ্গে তাদের আন্তক্রিয়ার শক্তি ও রয়েছে)। আরও আছে ৩৬টি কোয়ার্ক ও প্রতি-কোয়ার্ক, উপকণার তিনটি হুবহু ও অনাবশ্যক কপি আর অদ্ভুত নামধারী কিছু অতিপারমাণবিক কণা। এসব অতিপারমাণবিক কণার মধ্যে রয়েছে টাউ নিউট্রিনো, ইয়াং-মিলস গ্লুয়ন, হিগস বোসন, ডব্লিউ বোসন ও জেড কণা। সবচেয়ে বাজে ব্যাপারটি হলো, স্ট্যান্ডার্ড মডেল মহাকর্ষ নিয়ে কিছুই বলে না। প্রকৃতি তার সর্বোচ্চ ও মৌলিক স্তরে এতটা এলোমেলো আর চরমভাবে শ্রীহীন হতে পারে, সেটা বিশ্বাস করাও শক্ত। এমন কোনো তত্ত্বকে শুধু এর জন্মদাতাই ভালোবাসতে পারে। তাই স্ট্যান্ডার্ড মডেলের পুরোদস্তুর শ্রীহীন প্রকৃতি সম্পর্কে সব কটি অনুমান নতুন করে বিশ্লেষণ করতে বাধ্য হয়েছেন পদার্থবিদেরা। আর কিছু কিছু ছিল ভয়ানকভাবে ভুল।

পদার্থবিজ্ঞানের গত কয়েক শতাব্দী বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, গত শতাব্দীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জনগুলোকে মৌলিক পদার্থবিজ্ঞানের দুটি অসাধারণ তত্ত্বে সংক্ষেপে তুলে ধরা হয়েছে। এর একটি কোয়ান্টাম তত্ত্ব (যা স্ট্যান্ডার্ড মডেলের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়) এবং আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্ব (যা মহাকর্ষের ব্যাখ্যা দেয়)। লক্ষণীয় ব্যাপার হলো, এ তত্ত্ব দুটি একত্রে মৌলিক পর্যায়ে সব ভৌত জ্ঞানের সমষ্টির প্রতিনিধিত্ব করে। প্রথম তত্ত্বটি খুবই ছোট জগৎ ব্যাখ্যা করে, অর্থাৎ অতিপারমাণবিক কোয়ান্টাম জগৎ। এখানে কণাগুলো দারুণ নৃত্য প্রদর্শন করে, অস্তিত্বে যখন-তখন আসে-যায় আর একই সময়ে দুটি জায়গায় উদয়ও হয়। অন্যদিকে বৃহৎ জগৎ ব্যাখ্যা করে দ্বিতীয় তত্ত্বটি। যেমন ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বর আর বিগ ব্যাং বা মহাবিস্ফোরণ। মসৃণ পৃষ্ঠতল, প্রসারিত নকশা ও বক্র পৃষ্ঠতলের ভাষা ব্যবহার করে তত্ত্বটি। তত্ত্ব দুটি সব দিক দিয়েই পরস্পরের বিপরীত। কারণ, তারা ভিন্ন ধরনের গণিত ব্যবহার করে, ভবিষ্যদ্বাণী করে ভিন্ন ধরনের, একই সঙ্গে উপস্থাপন করে ভিন্ন ধরনের ভৌত চিত্র। বিষয়টি এমন যেন প্রকৃতির দুটি হাত। কিন্তু হাত দুটি পরস্পরের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ রক্ষা করে না। আবার তত্ত্ব দুটি একত্রকরণের সব রকম চেষ্টা করতে গিয়ে অর্থহীন সব উত্তর পাওয়া গেছে। অর্ধশতাব্দী ধরে পদার্থবিদেরা কোয়ান্টাম তত্ত্ব আর সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্বের মধ্যে বন্দুকের মুখে জোর করে বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তাঁরা দেখেছেন, নতুন তত্ত্বের তোড়ে খোদ তাঁদেরই চোখমুখ উড়ে গেছে। কারণ, এর মাধ্যমে এমন সব অসীম উত্তর পাওয়া যায়, সাধারণভাবে যার কোনো অর্থই হয় না।

অবশ্য সুপারস্ট্রিং তত্ত্বের আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে এসব বদলে যায়। এ তত্ত্ব অনুসারে, ইলেকট্রন ও অন্যান্য অতিপারমাণবিক কণা একটি স্ট্রিং বা সুতার কম্পন ছাড়া আর কিছুই নয়। আর সুতাগুলো অতি ক্ষুদ্র এক রাবার ব্যান্ডের মতো আচরণ করে। রাবার ব্যান্ডে আঘাত করলে তা বিভিন্নভাবে কম্পিত হয়। আর ভিন্ন ভিন্ন ধরনের কম্পনের প্রতিটি বিভিন্ন অতিপারমাণবিক কণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এভাবেই আমাদের কণা ত্বরকযন্ত্রে পাওয়া শত শত অতিপারমাণবিক কণাকে ব্যাখ্যা করে সুপারস্ট্রিং থিওরি। এদিকে আইনস্টাইনের তত্ত্ব আসলে স্ট্রিংয়ের অন্যতম সর্বনিম্ন কম্পনের মাধ্যমে পাওয়া যায়।

স্ট্রিং থিওরিকে থিওরি অব এভরিথিং বা সার্বিক তত্ত্ব হিসেবে অভিহিত করা হয়। কিংবদন্তিতুল্য এই সার্বিক তত্ত্বের খোঁজে আইনস্টাইন তাঁর জীবনের শেষ ৩০টি বছর ব্যর্থভাবে হাতড়ে বেড়িয়েছেন। একক ও সমন্বিত এমন এক তত্ত্ব চেয়েছিলেন আইনস্টাইন, যা পদার্থবিদ্যার সব সূত্রকে সংক্ষিপ্ত করতে পারবে। আবার যে তত্ত্ব দিয়ে ঈশ্বরের মন পড়ার সুযোগ পাবেন তিনি। মহাকর্ষের সঙ্গে কোয়ান্টাম তত্ত্বের একীভূত করার ক্ষেত্রে স্ট্রিং থিওরি যদি সঠিক হয়, তাহলে এটি সম্ভবত বিজ্ঞানের চরম অর্জনে পরিণত হবে। দুই হাজার বছর আগে গ্রিকরা প্রশ্ন করেছিল, বস্তু কী দিয়ে তৈরি—এর মধ্য দিয়ে হয়তো তার জবাব পাওয়া যাবে।

তবে সুপারস্ট্রিং থিওরি উদ্ভট বৈশিষ্ট্যটি হলো, এই স্ট্রিং বা সুতাগুলো স্থান-কালের শুধু নির্দিষ্ট মাত্রাতে কম্পিত হতে পারে। অর্থাৎ সুতাগুলো কম্পিত হতে পারে শুধু ১০ মাত্রাতে। অন্য কোনো মাত্রায় কেউ যদি স্ট্রিং থিওরি গঠনের চেষ্টা করে, তাহলে তত্ত্বটি গাণিতিকভাবে ভেঙে পড়ে বা অকার্যকর হয়ে যায়।

আমাদের মহাবিশ্ব অবশ্যই চতুর্থমাত্রিক (যার তিনটি স্থানিক মাত্রা ও একটি সময়ের মাত্রা)। এর মানে, অন্য ছয়টি মাত্রা অতি অবশ্যই কোথাও না কোথাও চুপসে বা কুঁকড়ে গেছে, ঠিক কালুজার পঞ্চম মাত্রার মতো।

এসব উচ্চতর মাত্রা আছে নাকি নেই, তা প্রমাণ করতে সম্প্রতি গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে শুরু করেছেন পদার্থবিদেরা। উচ্চতর মাত্রাগুলো থাকার প্রমাণের সবচেয়ে সহজ উপায় হতে পারে নিউটনের মহাকর্ষ সূত্রের বিচ্যুতি খুঁজে বের করা। আমরা হাইস্কুলে শিখেছি, বাইরের মহাকাশে যতই যাওয়া যায় পৃথিবীর মধ্যাকর্ষণ বা মহাকর্ষ ততই কমতে থাকে। আরও সঠিকভাবে বললে, দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতে মহাকর্ষ কমতে থাকে। কিন্তু এর একমাত্র কারণ হলো আমরা একটি ত্রিমাত্রিক বিশ্বে বাস করি। (পৃথিবীর চারপাশে একটি গোলকের কথা কল্পনা করুন। গোলকের পৃষ্ঠতলে পৃথিবীর মহাকর্ষ সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ে। তাই গোলকটি যত বড় হবে, মহাকর্ষও দুর্বল হবে তত। কিন্তু গোলকের পৃষ্ঠতল যেহেতু তার ব্যাসার্ধের বর্গের অনুপাতে বাড়ে, তাই গোলকের পৃষ্ঠতলে যখন মহাকর্ষের শক্তি ছড়াবে, তখন তা অবশ্যই গোলকের ব্যাসার্ধের বর্গের অনুপাতে কমে যাওয়ার কথা।

কিন্তু মহাবিশ্বের যদি চারটি স্থানিক মাত্রা থাকে, তাহলে দূরত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মহাকর্ষ কমা উচিত কিউব বা ঘনক হিসেবে। অন্যদিকে মহাবিশ্বের স্থানিক মাত্রাসংখ্যা যদি n হয়, তাহলে মহাকর্ষ কমে যাওয়ার কথা n-1 পাওয়ার বা ঘাত হিসেবে। নিউটনের বিখ্যাত বিপরীত বর্গীয় সূত্র অসাধারণ নির্ভুলতায় মহাকাশীয় দূরত্বে পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে। সে কারণে আমরা অবিশ্বাস্য নির্ভুলভাবে শনি গ্রহের বলয়ের পাশ দিয়ে অতিক্রম করার মতো মহাকাশ অনুসন্ধান যান পাঠাতে পেরেছি। কিন্তু সাম্প্রতিক কালের আগ পর্যন্ত নিউটনের বিপরীত বর্গীয় সূত্র গবেষণাগারে ছোট দূরত্বে কখনো পরীক্ষা করে দেখা হয়নি।

ছোট দূরত্বে বিপরীত বর্গীয় সূত্র প্রথম পরীক্ষা করা হয় ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে নেতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। এতে দৃশ্যত কোনো সমান্তরাল মহাবিশ্ব নেই বলে মনে হয়, অন্তত কলোরাডোতে নেই। কিন্তু যেসব পদার্থবিদ একই পরীক্ষা আরেকবার আরও সূক্ষ্মভাবে করে দেখার আশা করেন, এ নেতিবাচক ফল তাঁদের ক্ষুধা কেবল বাড়িয়ে দিয়েছিল।

তা ছাড়া ২০০৮ সালে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় চালু হওয়া লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডার নতুন ধরনের কণার অনুসন্ধান চালাবে। এই কণাকে বলা হচ্ছে স্পার্টিকেল (এসপার্টিকেল) বা সুপারপার্টিকেল। এটি সুপারস্ট্রিংয়ের উচ্চতর কম্পন (আপনার চারপাশে যা দেখছেন, তার সবই সুপারস্ট্রিংয়ের নিম্নতম কম্পন)। স্পার্টিকেল যদি এলএইচসিতে খুঁজে পাওয়া যায়, তাহলে তা আমাদের মহাবিশ্ব দেখার দৃষ্টিকোণে নতুন বিপ্লব ঘটাবে। মহাবিশ্বের নতুন এই চিত্রে স্ট্যান্ডার্ড মডেল শুধু সুপারস্ট্রিংয়ের নিম্নতম কম্পনের প্রতিনিধিত্ব করে।

পদার্থবিদ কিপ থর্ন বলেন, ‘২০২০ সালের মধ্যে পদার্থবিদেরা কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটির (কোয়ান্টাম মহাকর্ষ) সূত্রগুলো বুঝতে পারবেন। আর এটি স্ট্রিং থিওরির একটি রূপ হিসেবে পাওয়া যাবে।’

উচ্চতর মাত্রা ছাড়াও আরেক ধরনের সমান্তরাল মহাবিশ্বের ভবিষ্যদ্বাণী করে স্ট্রিং থিওরি। একে বলা হয় মাল্টিভার্স বা বহুবিশ্ব।

মাল্টিভার্স

স্ট্রিং থিওরিতে এখনো নাছোড়বান্দার মতো একটি প্রশ্ন ঝুলে আছে। সেটি হলো : স্ট্রিং থিওরির পাঁচটি আলাদা সংস্করণ থাকার কারণ কী? কোয়ান্টাম তত্ত্বের সঙ্গে মহাকর্ষকে সফলভাবে একীভূত করেছে স্ট্রিং থিওরি, কিন্তু এটি পাঁচটি উপায়ে করা যায়। অধিকাংশ পদার্থবিদ যেখানে একটি অনন্য সার্বিক তত্ত্ব আশা করেন, সেখানে বেশ বিব্রতকর ব্যাপার এটি। যেমন আইনস্টাইন জানতে চাইতেন, এই মহাবিশ্ব তৈরিতে ঈশ্বরের কোনো পছন্দ ছিল কি না। তাঁর বিশ্বাস ছিল, সবকিছুর একীভূত ক্ষেত্র তত্ত্বটি অনন্য হওয়া উচিত তাহলে পাঁচটি স্ট্রিং থিওরি কেন থাকবে?

আরেকটি বোমা বিস্ফোরিত হয়েছিল ১৯৯৪ সালে। প্রিন্সটনের ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্সড স্টাডির এডওয়ার্ড উইটেন আর কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পল টাউনসেন্ড ধারণা করলেন, এই পাঁচটি স্ট্রিং থিওরি আসলে একই তত্ত্ব। তবে এটি তখনই কেবল একই তত্ত্ব হবে যদি এতে আরও ১১তম একটি মাত্রা যোগ করা হয়। ১১তম মাত্রার সুবিধা হলো, পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন তত্ত্বই একটি তত্ত্বে পতিত হয়। সব দিক দিয়েই তত্ত্বটি অনন্যই বটে। কিন্তু সেটি তখনই সম্ভব যদি আমরা ১১তম মাত্রার পাহাড়চূড়ায় আরোহণ করতে পারি।

১১তম মাত্রায় নতুন গাণিতিক বস্তু থাকতে পারে, যাকে বলা হয় মেমব্রেন বা পর্দা (যেমন কোনো গোলকের পৃষ্ঠতলের মতো)। সবচেয়ে চমকপ্রদ পর্যবেক্ষণটি ছিল এটি : কোনো কিছু যদি ১১ মাত্রা থেকে ১০ মাত্রায় নেমে যায়, তাহলে পাঁচটি স্ট্রিং তত্ত্ব আবির্ভূত হবে। এদের সবগুলোই একক মেমব্রেন থেকে শুরু হবে। কাজেই পাঁচটি স্ট্রিং তত্ত্বের সবগুলো আসলে ১১ মাত্রা থেকে ১০ মাত্রায় একটি পর্দা সরানোর ভিন্ন ভিন্ন উপায়মাত্র।

(এটি বুঝতে চাইলে, একটি বিচবলের কথা কল্পনা করুন, যার চারদিকে বিষুবরেখা বরাবর একটি রাবার ব্যান্ড টানা আছে। ধরা যাক, একটি কাঁচি দিয়ে বিচবলটিকে দুই টুকরো করা হলো। এর এক ভাগ রাবার ব্যান্ডের ওপরে ও আরেক ভাগ নিচে। কাজেই রাবার ব্যান্ড বরাবর বিচবলটি ওপরে ও নিচে কাটা হলো। এখন শুধু বাকি আছে রাবার ব্যান্ডটি, অর্থাৎ একটি স্ট্রিং। একইভাবে, আমরা যদি ১১তম মাত্রাকে কুঁকড়ে ফেলি, তাহলে বাকি থাকবে শুধু বিষুবরেখার পর্দা, যা আসলে একটি স্ট্রিং। আসলে গাণিতিকভাবে পাঁচ উপায়ে এটি কাটা যেতে পারে। এর ফলে ১০ মাত্রায় ৫টি ভিন্ন ভিন্ন স্ট্রিং থিওরির দেখা পাই আমরা।)

১১ মাত্রার কারণে আমরা নতুন এক চিত্র পাই। এতে এটিও বোঝা যায়, মহাবিশ্বের নিজেই হয়তো একটি পর্দার মতো, যা স্থান-কালের একটি মাত্রায় ভেসে বেড়াচ্ছে। আবার এসব মাত্রার সবগুলোই ক্ষুদ্র নয়। আসলে এসব মাত্রার কয়েকটি হয়তো আসলে অসীম।

এতে এই সম্ভাবনা দেখা যায়, আমাদের মহাবিশ্ব হয়তো অন্য কোনো মহাবিশ্বের সঙ্গে একটি মাল্টিভার্সে টিকে আছে। সাবানের ভাসমান অসংখ্য বুদ্বুদ বা পর্দার কথা কল্পনা করুন। ১১ মাত্রিক হাইপারস্পেসের বিশাল ক্ষেত্রে সাবানের প্রতিটি বুদের মতো একেকটি মহাবিশ্ব ভাসছে। এসব বুদ্বুদ অন্যান্য বুদ্বুদের সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারে, কিংবা আলাদাও হয়ে যেতে পারে। এমনকি ফটাস করে উদয় ও মিলিয়ে যেতেও পারে। কে জানে, আমরা হয়তো এ রকম কোনো এক বুদ মহাবিশ্বের ত্বকে বসবাস করছি।

এমআইটির ম্যাক্স টেগমার্কের বিশ্বাস, আগামী ৫০ বছরের মধ্যে এসব সমান্তরাল মহাবিশ্বের অস্তিত্ব ছায়াপথের অস্তিত্বের চেয়ে খুব বেশি বিতর্কিত মনে হবে না। প্রায় ১০০ বছর আগেই অন্য ছায়াপথের অস্তিত্বকে বলা হতো আইল্যান্ড ইউনিভার্স বা দ্বীপ মহাবিশ্ব।

স্ট্রিং থিওরি কয়টি মহাবিশ্বের ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারে? স্ট্রিং থিওরির অন্যতম বিব্রতকর বৈশিষ্ট্য হলো, ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন মহাবিশ্ব থাকা সম্ভব, যাদের প্রতিটি আপেক্ষিক তত্ত্ব ও কোয়ান্টাম তত্ত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এক হিসাবে দেখা গেছে, এ ধরনের মহাবিশ্ব থাকার সম্ভাবনা আছে এক গুগলসংখ্যক (গুগল হলো ১০-এর ঘাত ১০০টি শূন্য বা ১০১০০)।

এসব মহাবিশ্বের মধ্যে সাধারণত যোগাযোগ অসম্ভব। আমাদের দেহের পরমাণুগুলো অনেকটা ফ্লাইপেপারে আটকে থাকা মাছির মতো। আমাদের মেমব্রেন বা পর্দা মহাবিশ্বের সঙ্গে আমরা তিনটি মাত্রায় অবাধে চলাচল করতে পারি। কিন্তু এই মহাবিশ্ব থেকে লাফ দিয়ে কোনো হাইপারস্পেসে যেতে পারি না। কারণ, আমাদের মহাবিশ্বে আমরা আঠার মতো আটকে আছি। তবে স্থান-কাল বক্র হওয়ার কারণে মহাকর্ষ এসব মহাবিশ্বের মধ্যে অবাধে ভেসে থাকতে পারে।

সত্যি বলতে কি, এমন একটি তত্ত্ব আছে, যেখানে বলা হয়, ডার্ক ম্যাটার বা গুপ্তবস্তু যে ছায়াপথের চারপাশে থাকা বস্তুর একটি অদৃশ্য রূপ। হয়তো এগুলো সাধারণ বস্তুর মতো, তবে তা কোনো সমান্তরাল মহাবিশ্বে ভেসে বেড়াচ্ছে। এইচ জি ওয়েলস তাঁর ইনভিজিবল ম্যান উপন্যাসে বলেছেন, কোনো ব্যক্তি যদি আমাদের ওপরে চতুর্থ মাত্রায় ভেসে থাকতে পারে, তাহলে সে অদৃশ্য হয়ে থাকতে পারবে। দুটি সমান্তরাল কাগজের কথা চিন্তা করুন। ধরা যাক, একটি কাগজের ওপরে এসব ভেসে আছে। একইভাবে, মনে করা হয়, গুপ্তবস্তুও হয়তো সাধারণ কোনো ছায়াপথ, যা আমাদের ওপরের অন্য কোনো পর্দা মহাবিশ্বে ভেসে আছে। আমাদের ওই ছায়াপথের মহাকর্ষ অনুভব করতে পারি আমরা। কারণ, মহাবিশ্বগুলোর মধ্যে মহাবিশ্ব ধীরে ধীরে ঝরে পড়তে পারে। কিন্তু অন্য ছায়াপথগুলো আমাদের কাছে অদৃশ্য মনে হবে; কারণ, ওই ছায়াপথের নিচ দিয়ে আলো চলাচল করে। এই উপায়ে ছায়াপথটির মহাকর্ষ থাকবে, কিন্তু তা আমাদের কাছে অদৃশ্য হয়ে থাকবে। এ ব্যাখ্যার সঙ্গে গুপ্তবস্তুর বর্ণনা মিলে যায়। (অবশ্য আরেকটি সম্ভাবনাও থাকতে পারে। সেটি হলো গুপ্তবস্তু হয়তো সুপারস্ট্রিংয়ের পরবর্তী কোনো কম্পনে গঠিত। চারপাশে আমরা যা দেখি, যেমন পরমাণু ও আলো, এগুলো সুপারস্ট্রিংয়ের নিম্নতম কম্পন ছাড়া আর কিছুই নয়। গুপ্তবস্তুও হয়তো উচ্চতর কোনো কম্পন হতে পারে।)

এমনও হতে পারে, সমান্তরাল মহাবিশ্বের অধিকাংশই হয়তো মৃত। যাদের মধ্যে ইলেকট্রন ও নিউট্রিনোর মতো অতিপারমাণবিক কণাদের গঠনহীন গ্যাস আছে। এসব মহাবিশ্বে প্রোটন হয়তো অস্থিতিশীল হবে। কাজেই আমাদের জানা সব বস্তু ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়ে অদৃশ্য হয়ে যাবে। জটিল বস্তুতে থাকে পরমাণু ও অণু। তাই এসব মহাবিশ্বে জটিল বস্তুর কোনো অস্তিত্বই হয়তো থাকবে না। অন্যান্য সমান্তরাল মহাবিশ্বগুলোতে হয়তো এর ঠিক বিপরীত চিত্র পাওয়া যাবে। সেখানে এমনও জটিল বস্তু থাকতে পারে, যা আমাদের কল্পনাতীত। প্রোটন, নিউট্রন ও ইলেকট্রনের সমন্বয়ে গঠিত একধরনের পরমাণুর বদলে সেখানে হয়তো বিভিন্ন ধরনের স্থিতিশীল চমকপ্রদ বস্তু থাকতে পারে।

এসব মেমব্রেন মহাবিশ্বগুলো পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষের মুখে পড়তে পারে। তাতে এক মহাজাগতিক আতশবাজির সৃষ্টি হবে। প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন পদার্থবিদ মনে করেন, আমাদের মহাবিশ্ব হয়তো ১৩.৭ বিলিয়ন বছর আগে দুটি বিশাল আকারের পর্দার মধ্যে সংঘর্ষের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে। তাঁদের অনুমান, আমাদের মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়েছে প্রচণ্ড সংঘর্ষে। মজার ব্যাপার হলো, তাঁদের এই অদ্ভুত ধারণাটি পরীক্ষামূলক ফলাফল অনুসন্ধান করে দেখা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, পৃথিবীর চারপাশে চক্কর খাওয়া ডব্লিউএমএপি স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া ফলাফলের সঙ্গে এটি বেশ ভালোভাবে মিলে যায়। (একে বলা হয় বিগ স্প্ল্যাট থিওরি।)

মাল্টিভার্স তত্ত্বের একটি তথ্য এর পক্ষে আছে। প্রকৃতির ধ্রুবকগুলো বিশ্লেষণ করার সময় দেখা যায়, সেগুলো এমন নির্ভুলভাবে সমন্বয় করা, যা প্রাণের অস্তিত্বের জন্য জরুরি। আমরা যদি পারমাণবিক বলের শক্তি বাড়াই, তাহলে নক্ষত্রগুলো এতই দ্রুত পুড়ে যাবে যে, কোনো প্রাণ সৃষ্টিই হতে পারবে না। আবার পারমাণবিক বলের শক্তি কমিয়ে দিলে নক্ষত্র জ্বলে উঠতে পারত না কখনোই। তাতে প্রাণেরও অস্তিত্ব থাকত না। আবার মহাকর্ষ বল বাড়ালে, আমাদের মহাবিশ্ব বিগ ক্রাঞ্চ বা মহাসংকোচনের মাধ্যমে অতি দ্রুত মরে যেত। মহাকর্ষের শক্তি কমিয়ে দিলে মহাবিশ্ব এত দ্রুত প্রসারিত হতে থাকত যে তা চলে যেত বিগ ফ্রিজ বা মহাশীতল অবস্থায়। আসলে প্রকৃতির ধ্রুবকগুলোতে অনেকগুলো দুর্ঘটনা জড়িত, যার কারণে প্রাণের টিকে থাকা সম্ভব হয়েছে। স্পষ্টত, আমাদের মহাবিশ্ব অনেকগুলো প্যারামিটারের গোল্ডিলক জোনের মধ্যে আছে। প্রাণের অস্তিত্বের জন্য এর সবগুলো সুষমভাবে সমন্বয় করা। কাজেই এই উপসংহারে আসা যায়, হয়তো ঈশ্বর আছেন। তিনিই আমাদের মহাবিশ্ব এমন নিখুঁতভাবে তৈরি করেছেন, যাতে এখানে প্রাণ টিকে থাকতে পারে। কিংবা এখানে বিলিয়ন বিলিয়ন সমান্তরাল মহাবিশ্ব থাকতে পারে, যাদের অনেকগুলো মৃত। এ ব্যাপারে ফ্রিম্যান ডাইসন বলেন, ‘মহাবিশ্বকে এমন মনে হয় যেন সে জানত, আমরা একদিন এখানে আসব।’

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার মার্টিন রিস এ সম্পর্কে লিখেছেন, এই সুষম সমন্বয় আসলে মাল্টিভার্সের প্রমাণ দেয়। পাঁচটি ভৌত ধ্রুবক (যেমন বিভিন্ন বলের শক্তি) আছে, সেগুলো এমন সুষমভাবে সমন্বয় করা, যা প্রাণের অস্তিত্বের অনুমোদন দেয়। তিনি বিশ্বাস করেন, অসীমসংখ্যক মহাবিশ্বও থাকতে পারে, যেগুলোতে প্রকৃতির এসব ধ্রুবক প্রাণের টিকে থাকার পক্ষে উপযোগী নয়।

এটি সেই নামকরা অ্যানথ্রোপিক প্রিন্সিপাল বা মানুষ-সম্পর্কিত নীতি। এই নীতির দুর্বল সংস্করণ অনুযায়ী প্রাণের টিকে থাকার উপযোগী করে আমাদের মহাবিশ্ব সুষমভাবে সমন্বয় করা হয়েছে (কারণ, এই বিবৃতিটি সঠিক প্ৰমাণ করতেই আমরা এখানে এসেছি)। শক্তিশালী সংস্করণ অনুযায়ী আমাদের অস্তিত্ব সম্ভবত একটি নকশা বা উদ্দেশ্যের উপজাত। অধিকাংশ বিশ্ব সৃষ্টিতত্ত্ববিদ অ্যানথ্রোপিক প্রিন্সিপালের দুর্বল সংস্করণের সঙ্গে একমত। তবে অ্যানথ্রোপিক প্রিন্সিপাল বিজ্ঞানের নতুন কোনো নীতি কি না, যা নতুন কোনো আবিষ্কার ও পরিণতির দিকে আমাদের নিয়ে যাবে কি না, নাকি অনস্বীকার্য কোনো বিষয়ে এটি সাধারণ কোনো বিবৃতি, তা নিয়ে বেশ বিতর্ক আছে।

কোয়ান্টাম তত্ত্ব

উচ্চতর মাত্রাগুলো ও মাল্টিভার্সের পাশাপাশি আরেক ধরনের সমান্তরাল মহাবিশ্ব আছে। একসময় এটি আইনস্টাইনের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এমনকি বর্তমানে পদার্থবিদদেরও দুশ্চিন্তার কারণ হয়েছে এটি। একে বলা হয় কোয়ান্টাম ইউনিভার্স বা কোয়ান্টাম মহাবিশ্ব, যা সাধারণ কোয়ান্টাম বলবিদ্যা ভবিষ্যদ্বাণী করে। কোয়ান্টাম ফিজিকসের মধ্যকার প্যারাডক্সগুলো খুবই দুর্ধর্ষ বলে মনে হয়। সে জন্য নোবেল বিজয়ী পদার্থবিদ রিচার্ড ফাইনম্যানও বলতে পছন্দ করতেন, কোয়ান্টাম তত্ত্ব কেউই বোঝে না।

মজার ব্যাপার হলো, মানুষের প্রস্তাবিত যেকোনো তত্ত্বের মধ্যে কোয়ান্টাম তত্ত্ব সফলতম তত্ত্ব হওয়ার পরও দৈবঘটনা, ভাগ্য আর সম্ভাবনার বালুর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। নিউটনের তত্ত্ব বস্তুর গতি সম্পর্কে সুনিশ্চিত ও জোরালো জবাব দেয়। কোয়ান্টাম তত্ত্ব এর চেয়ে একেবারে আলাদা। এটি শুধু সম্ভাবনার কথা বলে। লেজার, ইন্টারনেট, কম্পিউটার, টিভি, সেলফোন, রাডার, মাইক্রোওয়েভ ওভেনসহ আধুনিক যুগের বিস্ময়গুলোর ভিত্তি হলো এই সম্ভাবনার বালুকণা।

এই প্যারাডক্স বা হেঁয়ালির সবচেয়ে ভালো উদাহরণ শ্রোডিঙ্গারের বিড়াল সমস্যা (এটি প্রণয়ন করেছিলেন কোয়ান্টাম তত্ত্বের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন। তিনি এই সম্ভাবনার ব্যাখ্যাটিকে ধ্বংস করতে হেঁয়ালিপূর্ণভাবে সমস্যাটি তুলে ধরেন)। শ্রোডিঙ্গার তাঁর তত্ত্বের এই ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করে বলেছিলেন, ‘কেউ যদি এই জঘন্য কোয়ান্টাম জাম্পিংয়ের সঙ্গে আটকে যায়, তাহলে এর সঙ্গে জড়িত হওয়ার জন্য আমি দুঃখ প্রকাশ করব।’

শ্রোডিঙ্গারের বিড়ালের প্যারাডক্সটা এ রকম : একটা বিড়ালকে একটি শক্তভাবে বন্ধ করা বাক্সে রাখা হয়েছে। বাক্সের ভেতরে একটি বন্দুক বিড়ালটির দিকে তাক করে রাখা হয়েছে (বন্দুকটির ট্রিগার এক গাইগার কাউন্টারের সঙ্গে যুক্ত। তার পাশে আছে এক টুকরো ইউরেনিয়াম)। সাধারণভাবে ইউরেনিয়াম পরমাণু ক্ষয় হলেই গাইগার কাউন্টার চালু হয়। তারপর বন্দুকটি থেকে গুলি বের হয়ে বিড়ালটিকে মেরে ফেলবে। ইউরেনিয়াম পরমাণু ক্ষয় হতেও পারে, না-ও পারে। তাই বিড়ালটি মারাও যেতে পারে, আবার না-ও যেতে পারে। সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান এটুকুই বলে।

কিন্তু কোয়ান্টাম তত্ত্বমতে, ইউরেনিয়াম ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করে বলতে পারব না আমরা। কাজেই এখানে আমাদের দুটি সম্ভাবনা যোগ করতে হবে। ক্ষয়প্রাপ্ত পরমাণু ওয়েভ ফাংশনের সঙ্গে যোগ করতে হবে অক্ষত ইউরেনিয়াম পরমাণুর ওয়েভ ফাংশনকে। কিন্তু এর মানে দাঁড়ায়, বিড়ালটি বর্ণনা করতে গেলেও আমাদের বিড়ালটির দুটি অবস্থার (মৃত ও জীবিত) কথা যোগ করতে হবে। কাজেই বিড়ালটি মৃতও নয়, আবার জীবিতও নয়। এতে আসলে একটি মৃত বিড়াল ও একটি জীবিত বিড়ালের যোগফল থাকবে। ফাইনম্যান একবার লিখেছিলেন, ‘কোয়ান্টাম মেকানিকস প্রকৃতিকে এমনভাবে বর্ণনা করে, যা সাধারণ জ্ঞানে উদ্ভট বলে মনে হয়। কিন্তু তবু এটি পরীক্ষার সঙ্গে খাপ খায়। কাজেই আমি আশা করি, আপনিও প্রকৃতিকে উদ্ভট হিসেবে মেনে নেবেন।

আইনস্টাইন ও শ্রোডিঙ্গারের কাছে বিষয়টি অযৌক্তিক বলে মনে হয়েছিল। ‘বস্তুগত বাস্তবতায়’, অর্থাৎ সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানে বিশ্বাস করতেন আইনস্টাইন। নিউটনিয়াম দৃষ্টিভঙ্গিতে সাধারণ বুদ্ধিতে, বস্তুরা নির্দিষ্ট অবস্থায় টিকে থাকে, অনেকগুলো সম্ভাব্য অবস্থার যোগফলে নয়। কিন্তু তারপরও এই উদ্ভট ব্যাখ্যাটি আধুনিক সভ্যতার হৃৎপিণ্ডের গভীরে ঢুকে গেছে। এটি ছাড়া আধুনিক ইলেকট্রনিকস (আর আমাদের দেহের পরমাণু) টিকে থাকতে পারত না। (আমাদের সাধারণ জগতে আমরা মাঝেমধ্যে কৌতুক করে বলি যে, এটি ছাড়া ‘আংশিক গর্ভবতী’ হওয়া অসম্ভব। কিন্তু কোয়ান্টাম জগতে এর অবস্থা আরও খারাপ। সেখানে আমরা একই সঙ্গে অগর্ভবতী, গর্ভবতী, একটি সন্তান, বয়স্ক নারী, কিশোরী, পেশাজীবী নারী ইত্যাদির সবগুলো সম্ভাব্য অবস্থার যোগফল হিসেবে টিকে থাকি।)

এই নাছোড়বান্দা প্যারাডক্সের সমাধান করার অনেক রকম উপায় আছে। কোপেনহেগেন স্কুলের কোয়ান্টাম তত্ত্বের প্রতিষ্ঠাতারা বিশ্বাস করতেন, একবার বাক্সটি খুলে ফেললে, আপনি পরিমাপ করতে পারবেন। আবার বিড়ালটি মৃত নাকি জীবিত, তা-ও নির্ধারণ করতে পারবেন। কারণ, ওয়েভ ফাংশন তখন কলাপস বা ভেঙে একটি একক অবস্থায় পৌঁছাবে। আর তখন আমাদের সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ নেবে। ওয়েভ বা তরঙ্গ অদৃশ্য হয়ে শুধু কণাই পড়ে থাকবে সেখানে। এর মানে হলো, বিড়ালটি এখন একটি নির্দিষ্ট অবস্থায় থাকবে (মৃত বা জীবিত নয়)। তা ছাড়া তাকে বর্ণনার জন্য এখন আর ওয়েভ ফাংশনের প্রয়োজন হবে না।

কাজেই এখানে অদৃশ্য দেয়াল আছে। এ দেয়ালটি পরমাণুর অদ্ভুত জগৎ আর মানুষের ম্যাক্রোস্কোপিক জগৎকে আলাদা করে রেখেছে। পারমাণবিক জগতের জন্য সবকিছুই সম্ভাবনার তরঙ্গ দিয়ে বর্ণনা করা হয়। এখানে পরমাণুগুলো একই সময়ে বিভিন্ন জায়গায় থাকতে পারে। কোনো অঞ্চলে তরঙ্গ যত বড় হবে, ওই বিন্দুতে সেই কণা খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনাও তত বাড়বে। কিন্তু বস্তু যত বড় হয়, তাদের এই তরঙ্গ ভেঙে যায়। বস্তুটি তখন নির্দিষ্ট অবস্থায় টিকে থাকে। এভাবে আমাদের সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান জয়ী হয়।

(আইনস্টাইনের বাড়িতে কোনো অতিথি এলে তিনি আকাশের চাঁদের দিকে আঙুল দেখিয়ে জিজ্ঞেস করতেন, ইঁদুর চাঁদের দিকে তাকিয়ে দেখে বলেই কি চাঁদটা ওখানে দেখা যাচ্ছে?’ কিছু ক্ষেত্রে কোপেনহেগেন স্কুলের জবাব হবে সম্ভবত হ্যাঁ-বোধক।)

অধিকাংশ পিএইচডি পাঠ্যপুস্তকে সযত্নে আসল কোপেনহেগেন স্কুলকে মেনে চলে। তবে এটি বাদও দেন অনেক গবেষক-পদার্থবিদ। আমাদের কাছে এখন ন্যানোটেকনোলজি আছে। এর মাধ্যমে নিপুণভাবে কাজে লাগানো যায় প্রতিটি পরমাণুকে। কাজেই যেসব পরমাণু দ্রুত অস্তিত্বে আসা-যাওয়া করে, সেগুলো স্ক্যানিং টানেলিং মাইক্রোস্কোপ ব্যবহার করে ইচ্ছেমতো কাজে লাগানো যায়। আসলে মাইক্রোস্কোপিক ও ম্যাক্রোস্কোপিক জগতের মধ্যে কোনো অদৃশ্য দেয়াল নেই। এদের মধ্যে ধারাবাহিকতা আছে।

আধুনিক পদার্থবিদ্যার মর্মমূলে বিঁধে থাকা এ সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে এখনো একমত হওয়া যায়নি। বিভিন্ন কনফারেন্সে বিভিন্ন তাত্ত্বিক বিজ্ঞানীর সরোষে অন্য তাত্ত্বিকদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামেন। এক দৃষ্টিভঙ্গিতে, মহাবিশ্বজুড়ে অবশ্যই ‘মহাজাগতিক চেতনা’ থাকা উচিত। কোনো বস্তুকে পরিমাপ করার সময়ে সেটি হঠাৎ লাফিয়ে অস্তিত্বশীল হয়। আর এই পরিমাপের কাজটি করে সচেতন জীব। কাজেই এখানে মহাজাগতিক চেতনা থাকতেই হবে, যা মহাবিশ্বজুড়ে বিস্তৃত থেকে নির্ধারণ করবে আমরা কোন অবস্থায় আছি। নোবেলজয়ী ইউজিন উইগনারের মতো অনেকের ধারণা, এর মাধ্যমে ঈশ্বরের বা কোনো মহাজাগতিক চেতনার অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়। (উইগনার লিখেছেন, ‘চেতনার প্রসঙ্গ ছাড়া [কোয়ান্টাম তত্ত্বের] নিয়মগুলো পুরোপুরি মানানসইভাবে সূত্রবদ্ধ করা সম্ভব হতো না।’ এমনকি তিনি হিন্দুধর্মের বেদান্ত দর্শনের প্রতিও আগ্রহ প্রকাশ করেন। এতে বলা হয়, মহাবিশ্ব এক সর্বব্যাপী চেতনায় জড়িয়ে আছে।)

এ প্যারাডক্সের আরেক দৃষ্টিভঙ্গি হলো, অনেক মহাবিশ্ব থাকার ধারণা। ১৯৫৭ সালে এটি প্রস্তাব করেন হিউগ ইভেরেট। এতে বলা হয়, মহাবিশ্ব সাধারণভাবে দুই ভাগে বিভক্ত। এক ভাগে থাকে একটি জীবিত বিড়াল আর অন্য ভাগে এক মৃত বিড়াল। এর মানে, যখন কোয়ান্টাম ঘটনা ঘটে, তখন সমান্তরাল মহাবিশ্বের ব্যাপক বিস্তার ঘটে বা তার শাখা-প্রশাখা থাকে। তাই যেকোনো মহাবিশ্বের অস্তিত্ব থাকতে পারে। কাজেই এমন সমান্তরাল মহাবিশ্বও থাকতে পারে, যেখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিজয়ী নাৎসি বাহিনী। কিংবা এমন মহাবিশ্বও থাকা সম্ভব, যেখানে স্প্যানিশ আর্মাডা কখনো পরাজিত হয়নি আর তাই সবাই স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলে। অন্য কথায়, ওয়েভ ফাংশন কখনো ভেঙে যায় না। শুধু তার নিজের পথে চলমান থাকে আর চমকপ্রদভাবে অসংখ্য মহাবিশ্বে বিভক্ত হয়ে যায়।

এমআইটির পদার্থবিদ অ্যালান গুথ বলেন, ‘এমন এক মহাবিশ্বের অস্তিত্ব আছে, যেখানে এলভিস প্রিসলি এখনো জীবিত এবং সেখানে প্রেসিডেন্ট হয়েছেন আল গোর।’ নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী ফ্রাঙ্ক উইলজেক বলেন, ‘আমাদের ওপর চেতনা ভর করে, যা অসীমভাবে আমাদের নিজেদের বিভিন্ন ধরনের অসংখ্য কপি। যারা তাদের সমান্তরাল জীবন যাপন করছে এবং প্রতিটি মুহূর্তেই আরও প্রতিলিপি লাফিয়ে অস্তিত্বশীল হচ্ছে আর আমাদের বিভিন্ন ধরনের বিকল্প ভবিষ্যতের মধ্যে চলে যাচ্ছে।’

একটি দৃষ্টিভঙ্গি পদার্থবিদদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় হয়েছে, যাকে বলা হয় ডিকোহেরেন্স বা অসংগতি। এই তত্ত্বমতে, এসব সমান্তরাল মহাবিশ্বের সবগুলো সম্ভব, তবে আমাদের ওয়েভ ফাংশনের সঙ্গে সেগুলোর কোনো সম্পর্ক নেই। (যেমন তাদের সঙ্গে আমাদের ওয়েভ ফাংশন ঐকতানে কম্পিত হয় না)। কাজেই তাদের সঙ্গে আমাদের কোনো মিথস্ক্রিয়াও নেই। এর মানে, আপনার শোবার ঘরের ভেতর ডাইনোসর, এলিয়েন, জলদস্যু, ইউনিকর্নের ওয়েভ ফাংশনের সঙ্গে একত্রে সহবাস করছেন। এদের প্রত্যেকে তাদের মহাবিশ্বকে জোরালোভাবে বাস্তব বলে মনে করছে, কিন্তু তাদের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই।

নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী স্টিভেন ওয়েনবার্গের মতে, এটা অনেকটা আমাদের ঘরে একটি রেডিও স্টেশন টিউন করার মতো। আপনি জানেন, আপনার ঘরে সারা দেশ ও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অগণিত রেডিও স্টেশনের সিগন্যালের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আপনার রেডিও কেবল একটিই স্টেশন টিউন করছে। কাজেই এর সঙ্গে অন্য স্টেশনগুলোর সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। (সংক্ষেপে বলা যায়, ওয়েনবার্গ মনে করেন, অনেক মহাবিশ্বের ধারণা আসলে অন্য ধারণাগুলো ছাড়া একটি শোচনীয় ধারণা। )

তাহলে কি কোনো বর্বর ফেডারেশন অব প্ল্যানেটের ওয়েভ ফাংশনও আছে, যারা দুর্বল গ্রহগুলোতে লুণ্ঠন চালাচ্ছে আর শত্রুদের হত্যা করছে? হয়তো আছে। কিন্তু তা-ই যদি হয়, তাহলে ওই মহাবিশ্বের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই।

কোয়ান্টাম মহাবিশ্ব

হিউগ ইভেরেট অন্য পদার্থবিদদের সঙ্গে তাঁর ‘বহু মহাবিশ্ব’ তত্ত্ব আলোচনা করার সময় ধাঁধা লাগানো আর নির্লিপ্ত প্রতিক্রিয়া পান। টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ ব্রাইস ডিউইট এই তত্ত্বের বিরুদ্ধে প্রতি অভিযোগ তোলেন। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘নিজেকে বিভক্ত বলে ভাবতে পারি না আমি।’ তবে এর জবাবে ইভেরেট বলেন, এটা অনেকটা গ্যালিলিওর সমালোচকদের মতো কথা। একসময় তারাও বলেছিল, পৃথিবী যে ঘুরছে, তা বুঝতে পারছে না তারা। (ডিউইট ক্রমেই ইভেরেটের মতের প্রতি সমর্থন জানিয়ে এই তত্ত্বের নেতৃস্থানীয় সমর্থকে পরিণত হয়েছেন।)

কয়েক দশক ধরে ‘বহু মহাবিশ্ব’ তত্ত্ব দুর্বোধ্যতার কারণে ম্লান হয়ে গিয়েছিল। এটি সত্যিই বেশ উদ্ভট এক ব্যাপার। প্রিন্সটনে ইভেরেটের উপদেষ্টা জন হুইলার অবশেষে উপসংহার টানেন, এ তত্ত্বের সঙ্গে অনেকগুলো অতিরিক্ত লটবহর জড়িয়ে আছে। তবে একটি কারণে ইভেরেটের তত্ত্বটি এখন হঠাৎ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। কারণটি হলো পদার্থবিদেরা কোয়ান্টাম তত্ত্বের সর্বশেষ অস্ত্রটি এতে প্রয়োগ করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। সেটি হলো কোয়ান্টায়িত হতে বাধা দিচ্ছে, খোদ মহাবিশ্বকেও। পুরো মহাবিশ্বে অনিশ্চয়তার নীতি ব্যবহার করা হলে স্বাভাবিকভাবেই তা আমাদের মাল্টিভার্সের দিকে নিয়ে যায়।

কোয়ান্টাম তত্ত্বের কাজকারবার পরমাণুর অতি ক্ষুদ্র জগৎ নিয়ে। আর কসমোলজি বা বিশ্ব সৃষ্টিতত্ত্ব গোটা মহাবিশ্ব নিয়ে কাজ করে। তাই এ প্রেক্ষাপটে কোয়ান্টাম কসমোলজির ধারণাটি প্রথমে বেশ স্ববিরোধী বলে মনে হয়। তবে এটাও বিবেচনায় রাখতে হবে যে মহাবিস্ফোরণের সময় এই মহাবিশ্ব একটা ইলেকট্রনের চেয়েও অনেক ছোট ছিল। সব পদার্থবিদ এখন একমত, ইলেকট্রন অবশ্যই কোয়ান্টায়িত। অর্থাৎ তাদের সম্ভাবনার তরঙ্গ সমীকরণ (ডিরাকের সমীকরণ) দিয়ে প্রকাশ করা যায়। পাশাপাশি তারা সমান্তরাল অবস্থাতেও থাকতে পারে। কাজেই ইলেকট্রন যদি কোয়ান্টায়িত হয় ও মহাবিশ্ব যদি কোনো এক সময় একটা ইলেকট্রনের চেয়েও ছোট হয়ে থাকে, তাহলে মহাবিশ্বও অতি অবশ্যই সমান্তরাল অবস্থায় থাকতে পারে। এ তত্ত্ব স্বাভাবিকভাবে ‘বহু বিশ্ব’ ধারণায় নিয়ে যায়।

তবে নীলস বোরের কোপেনহেগেন ব্যাখ্যাটি পুরো মহাবিশ্বে ব্যবহার করা হলে কিছু সমস্যায় পড়তে হয়। পিএইচডি পর্যায়ে কোয়ান্টাম মেকানিকসের সব কোর্সে কোপেনহেগেন ব্যাখ্যা শেখানো হয়। তবে এটি একজন পর্যবেক্ষকের পর্যবেক্ষণ ও ওয়েভ ফাংশন ভেঙে পড়ার ওপর নির্ভর করে। ম্যাক্রোস্কোপিক বা বৃহৎ পরিসরের জগৎ সংজ্ঞায়িত করতে এই পর্যবেক্ষণ প্রক্রিয়া অপরিহার্য। কিন্তু পুরো মহাবিশ্বকে পর্যবেক্ষণের জন্য মহাবিশ্বের ‘বাইরের’ পর্যবেক্ষক কীভাবে থাকতে পারে? একটি ওয়েভ ফাংশন যদি মহাবিশ্বের বর্ণনা দেয়, তাহলে কোনো বাইরের পর্যবেক্ষকের কাছে মহাবিশ্বের ওয়েভ ফাংশন কলাপস করতে পারে কীভাবে? আসলে, মহাবিশ্বের বাইরে থেকে কারও পক্ষে মহাবিশ্বকে পর্যবেক্ষণ করার এই অক্ষমতাকে কোপেনহেগেন ব্যাখ্যার সবচেয়ে বড় ত্রুটি মনে করা হয়।

‘বহু বিশ্ব’ তত্ত্বে এই সমস্যার সমাধান খুব সহজ। এ ক্ষেত্রে মহাবিশ্বকে কেবল অনেকগুলো সমান্তরাল অবস্থার মধ্যে থাকতে হবে, যার সবগুলো একটি প্রধান ওয়েভ ফাংশন দিয়ে সংজ্ঞায়িত করা হবে। একে বলা হয় মহাবিশ্বের ওয়েভ ফাংশন। কোয়ান্টাম কসমোলজিতে ভ্যাকুয়ামের কোয়ান্টাম ফ্ল্যাকচুয়েশন বা অস্থিরতা হিসেবে মহাবিশ্বের সূচনা হয়েছিল বা স্থান-কালের ফেনায় অতি ক্ষুদ্র বুদ্বুদ হিসেবে। স্থান-কালের ফেনায় অধিকাংশ শিশু মহাবিশ্বের একটি মহাবিস্ফোরণ থাকে এবং তারপর তারা অতি দ্রুত মহাসংকোচনের মুখে পড়ে। এ কারণেই আমরা তাদের দেখতে পাই না। কারণ, তাদের অতি ক্ষুদ্র ও তাদের অর্জনও অতি সংক্ষিপ্ত। তারা ভ্যাকুয়াম থেকে অতি দ্রুত হাজির হয়, তারপর আবারও মিলিয়ে যায়। এর মানে হলো, শূন্যস্থানও শিশু মহাবিশ্বের উদয় ও হারিয়ে যাওয়ার ব্যাপার ঘটছে। তবে সেগুলো এতই ক্ষুদ্র যে আমাদের যন্ত্রপাতি দিয়ে তাদের শনাক্ত করা যায় না। কিন্তু কোনো এক কারণে স্থান-কালের ফেনায় এ রকম একটি বুদ মহাসংকোচনের বিলীন হয়ে যায়নি, বরং ক্রমেই প্রসারিত হচ্ছে। এই বুদ্‌দটিই আমাদের মহাবিশ্ব। অ্যালান গুথের মতে, এর মানে হলো পুরো মহাবিশ্বটা হলো চূড়ান্তভাবে ফ্রি লাঞ্চ।

কোয়ান্টাম কসমোলজিতে পদার্থবিদেরা শ্রোডিঙ্গারের সমীকরণের সদৃশ কিছু দিয়ে শুরু করেন, যেটি ইলেকট্রন ও পরমাণুর ওয়েভ ফাংশনের শাসনের অধীন। ডিউইট-হুইলারের সমীকরণ ব্যবহার করেন তাঁরা। এটি মহাবিশ্বের ওয়েভ ফাংশনে কাজ করে। শ্রোডিঙ্গারের ওয়েভ ইকুয়েশন সাধারণত স্থান ও কালের প্রতি বিন্দু সংজ্ঞায়িত করে। কাজেই স্থান ও কালের ওই বিন্দুতে একটি ইলেকট্রন খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা হিসাব করতে পারবেন আপনি। তবে মহাবিশ্বের ওয়েভ ফাংশন সম্ভাব্য সব মহাবিশ্বের ওপর সংজ্ঞায়িত। নির্দিষ্ট মহাবিশ্বকে সংজ্ঞায়িত করার সময় মহাবিশ্বের ওয়েভ ফাংশন যদি অনেক বড় হয়, তাহলে তার মানে মহাবিশ্বটির ওই নির্দিষ্ট অবস্থায় থাকার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে।

এই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করেছেন হকিং। তিনি দাবি করেন, অন্যান্য মহাবিশ্বের মধ্যে আমাদের মহাবিশ্বটি বিশেষ একটি। আমাদের মহাবিশ্বের জন্য মহাবিশ্বের ওয়েভ ফাংশন অনেক বড়। আর অন্যান্য মহাবিশ্বের ক্ষেত্রে এই ওয়েভ ফাংশন প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। সুতরাং অন্যান্য মহাবিশ্ব মাল্টিভার্সে টিকে থাকতে পারে, যার সম্ভাবনা ছোট ও সসীম, কিন্তু আমাদের মহাবিশ্বের সম্ভাবনা সবচেয়ে বড়। আসলে হকিং এভাবে স্ফীতিতে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। এই চিত্রে স্ফীতিশীল এক মহাবিশ্ব শুধু অস্ফীতিশীল কোনো মহাবিশ্বের তুলনায় অনেক বেশি সম্ভাবনাময় হয়ে থাকে। কাজেই আমাদের মহাবিশ্বের একটা স্ফীতি পর্যায় ছিল।

আমাদের মহাবিশ্ব যে স্থান-কালের ফেনার শূন্যতা থেকে এসেছে—এ তত্ত্ব পরীক্ষা করে দেখা সম্ভব নয় বলে মনে হয়। কিন্তু কিছু সাধারণ পর্যবেক্ষণের সঙ্গে বেশ খাপ খায় এটি। প্রথমত, আমাদের মহাবিশ্বের ভেতরে ধনাত্মক ও ঋণাত্মক চার্জ মোট পরিমাণ শূন্য বলে বিস্ময় প্রকাশ করেন অনেক পদার্থবিদ। আমরা যদি মেনে নিই, বাইরের মহাকাশের মহাকর্ষ প্রবল শক্তিসম্পন্ন, তাহলে তার একমাত্র কারণ হলো ধনাত্মক ও ঋণাত্মক চার্জ পরস্পরকে নিখুঁতভাবে বাতিল করে। পৃথিবীতে ধনাত্মক ও ঋণাত্মক চার্জের মধ্যে যদি সামান্য পরিমাণও ভারসাম্যহীনতা থাকে, তাহলে হয়তো পৃথিবীর সবকিছুকে পরস্পরের সঙ্গে আটকে রাখা মহাকর্ষীয় বলের ওপর এটি আধিপত্য বিস্তার করত। এতে পৃথিবীকে টুকরো টুকরো করে ফেলার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে যাবে সেটি। ধনাত্মক ও ঋণাত্মক চার্জের মধ্যে এই ভারসাম্য কেন রয়েছে? এটি ব্যাখ্যা করার সহজ উপায় হলো অনুমান করে নেওয়া যে আমাদের মহাবিশ্ব শূন্য থেকে এসেছে। আর শূন্যের চার্জ তো শূন্যই হয়।

দ্বিতীয়ত, আমাদের মহাবিশ্বের স্পিন বা ঘূর্ণনও শূন্য। অনেক বছর ধরে কার্ট গোডেল বিভিন্ন ছায়াপথের ঘূর্ণন যোগ করে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন, আমাদের মহাবিশ্বও ঘুরছে। তবে জ্যোতির্বিদেরা এখন বিশ্বাস করেন, মহাবিশ্বের সর্বমোট স্পিন শূন্য। এ ঘটনাকেও খুব সহজেই ব্যাখ্যা করা যায়, যদি মহাবিশ্ব শূন্য থেকে এসে থাকে। কারণ, শূন্যের স্পিনও শূন্য।

তৃতীয়ত, আমাদের মহাবিশ্ব শূন্য থেকে এসেছে—এই বিবৃতি ব্যাখ্যা করতে সহায়তা করে, কেন মহাবিশ্বের মোট বস্তু-শক্তির পরিমাণ এতই ছোট যে, হয়তো সেটি শূন্যও হতে পারে। আমরা যখন বস্তুর ধনাত্মক শক্তি এবং মহাকর্ষের সঙ্গে জড়িত ঋণাত্মক শক্তি যোগ করি, তখন দেখা যায়, এই দুটি পরস্পরকে বাতিল করে দেয়। সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্ব অনুসারে, মহাবিশ্ব যদি আবদ্ধ ও সসীম হয়, তাহলে বস্তু-শক্তির মোট পরিমাণ নিখুঁতভাবে শূন্য হওয়া উচিত। (আমাদের মহাবিশ্ব যদি উন্মুক্ত ও অসীম হতো, [সম্ভবত এটি সত্য নয়], তবে স্ফীতিশীল তত্ত্ব ইঙ্গিত করে, মহাবিশ্বের বস্তু-শক্তির মোট পরিমাণ লক্ষণীয়ভাবে ছোট হবে।)

মহাবিশ্বগুলোর মধ্যে কি যোগাযোগ আছে?

এটি কিছু লোভনীয় প্রশ্নের দ্বার খুলে দেয় : পদার্থবিদেরা যদি বিভিন্ন ধরনের সমান্তরাল মহাবিশ্বের সম্ভাবনা বাতিল করতে না পারেন, তাহলে কি ওই সব মহাবিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব? সেখানে বেড়াতে যাওয়া যাবে? কিংবা ওই সব মহাবিশ্বের প্রাণীরা কি আমাদের দেখতে আসতে পারে?

আমাদের কাছ থেকে সম্পর্কহীন এসব কোয়ান্টাম মহাবিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগকে খুবই অসম্ভব ঘটনা বলে মনে হয়। এসব মহাবিশ্বের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক না থাকার কারণ হলো, আমাদের পরমাণুগুলো চারপাশের পরিবেশের আরও অসংখ্য পরমাণুর সঙ্গে ধাক্কা খায়। প্রতিবার ধাক্কা খাওয়ার সময় এসব পরমাণুর ওয়েভ ফাংশন কিছুটা কলাপস করে বা ভেঙে যায়। এতে সমান্তরাল মহাবিশ্বের সংখ্যা কমে যায়। প্রতিটি সংঘর্ষ সম্ভাবনার পরিমাণ সংকুচিত করে ফেলে। ট্রিলিয়নসংখ্যক এসব পারমাণবিক মিনি-কলাপসের যোগফল আমাদের এই বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে যে আমাদের দেহের পরমাণুগুলো একটি নির্দিষ্ট অবস্থায় পুরোপুরি কলাপস করেছে। আইনস্টাইনের বস্তুগত বাস্তবতা হলো একধরনের বিভ্রান্তি। এ বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার কারণ হলো, আমাদের দেহে অনেক পরমাণু আছে, প্রতিটিই পরস্পরের সঙ্গে ধাক্কা খাচ্ছে এবং তাতে প্রতিবারই সম্ভাব্য মহাবিশ্বের সংখ্যা কমে যাচ্ছে।

ক্যামেরায় ভেতর দিয়ে ফোকাসের বাইরের ছবির দিকে তাকানোর মতো এটা। এটি অতি ক্ষুদ্র জগতের সঙ্গে সম্পর্কিত, যেখানে সবকিছুই অস্পষ্ট ও অনির্দিষ্ট বলে মনে হয়। কিন্তু প্রতিবার আপনি যখন ক্যামেরার ফোকাস ঠিক করেন, ততই ছবিটি স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়ে ফুটে উঠতে থাকে। প্রতিবেশী পরমাণুর সঙ্গে ট্রিলিয়নসংখ্যক অতি ক্ষুদ্র সংঘর্ষের সঙ্গে সম্পর্কিত এটি। এতে প্রতিবার সম্ভাব্য মহাবিশ্বের সংখ্যা কমে আসে। এভাবে আমরা মসৃণভাবে অস্পষ্ট অতি ক্ষুদ্র জগৎ থেকে বৃহত্তর জগতে স্থানান্তর করতে পারি।

কাজেই আমাদের সঙ্গে মিল আছে, এমন অন্য কোয়ান্টাম মহাবিশ্বের সঙ্গে আমাদের মিথস্ক্রিয়া করার সম্ভাবনা শূন্য নয়। তবে আপনার দেহের পরমাণুর সংখ্যার মতো এটি খুব দ্রুত কমে যায়। আপনার দেহে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন পরমাণু আছে। সে কারণে ডাইনোসর বা এলিয়েন বসতি আছে, এমন মহাবিশ্বের সঙ্গে আপনার যোগাযোগ করার সম্ভাবনা অসীমভাবে অতি ক্ষুদ্ৰ। হিসাব করলে দেখতে পাবেন, এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটার জন্য আপনাকে মহাবিশ্বের জীবনকালের চেয়েও বেশি সময় ধরে অপেক্ষা করে থাকতে হবে।

কাজেই কোয়ান্টাম সমান্তরাল মহাবিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যাপারটি বাতিল করা না গেলেও তা অতি বিরল ঘটনা। কারণ, তাদের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। তবে কসমোলজিতে ভিন্ন এক সমান্তরাল মহাবিশ্বের মুখোমুখি হতে হয়। সেটি হলো, অসংখ্য মহাবিশ্বের মাল্টিভার্স, যারা সাবানের বুদ্বুদ ভেসে থাকার মতো পরস্পরের পাশাপাশি টিকে থাকতে পারে। মাল্টিভার্সে অন্য মহাবিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যাপারটি ভিন্ন প্রশ্ন। এটি নিঃসন্দেহে কঠিন। তবে টাইপ থ্রি সভ্যতার জন্য তা হয়তো সম্ভবও হতে পারে।

আগেই আলোচনা করেছি, স্থানের মধ্যে ছিদ্র করতে কিংবা স্থান-কালের ফেনা বিবর্ধিত করতে যে শক্তির প্রয়োজন, তা প্ল্যাঙ্ক শক্তির মতো। সেখানে আমাদের জানা পদার্থবিজ্ঞান অকার্যকর হয়ে পড়ে। স্থান ও কাল এই শক্তিস্তরে স্থিতিশীল থাকে না। এটি আমাদের মহাবিশ্ব ছেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করে (ধরে নেওয়া যায়, অন্যান্য মহাবিশ্বের অস্তিত্ব আছে আর আমরা এভাবে মারা পড়ব না।)।

এর পুরোটাই একাডেমিক প্রশ্ন নয়। কারণ, মহাবিশ্বের সব বুদ্ধিমান প্রাণী একদিন মহাবিশ্বের সমাপ্তির মুখোমুখি হবে। তাই হয়তো আমাদের মহাবিশ্বের সব বুদ্ধিমান প্রাণীর জন্য একটি পরিত্রাণের উপায় হয়ে দাঁড়াবে মাল্টিভার্স তত্ত্ব। পৃথিবীর চারপাশে চক্কর খাওয়া ডব্লিউএমএপি স্যাটেলাইট (WMAP) থেকে পাওয়া সাম্প্রতিক তথ্য-উপাত্ত নিশ্চিত করেছে, মহাবিশ্ব একটি ত্বরিত হারে প্রসারিত হচ্ছে। একদিন আমরা হয়তো সবাই ধ্বংস হয়ে যাব। পদার্থবিদেরা একে বলেন বিগ ফ্রিজ বা মহাশীতলতা। ক্রমান্বয়ে পুরো মহাবিশ্ব কালো হয়ে যাবে। আকাশের সব নক্ষত্র নিভে যাবে দপ করে। মহাবিশ্বজুড়ে তখন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকবে মৃত নক্ষত্র, নিউট্রন স্টার আর কৃষ্ণগহ্বর। এমনকি তাদের মধ্যে থাকা পরমাণুগুলোও ক্ষয় হতে শুরু করবে। মহাবিশ্বের তাপমাত্রা প্রায় পরম শূন্যের কাছাকাছি চলে যাবে। তাতে প্রাণ ধারণ করা কোনোভাবে সম্ভব হবে না।

মহাবিশ্ব এ পর্যায়ে যেতে শুরু করলে, কোনো উন্নত সভ্যতা মহাবিশ্বের চূড়ান্ত মৃত্যু দেখতে পাবে। তখন হয়তো অন্য মহাবিশ্বে চলে যাওয়ার কথা ভাববে তারা। ওই সব প্রাণীর জন্য জমে মরে যাওয়া, নয়তো চলে যাওয়া—দুটোর যেকোনো একটা বেছে নিতে হবে। সব বুদ্ধিমান প্রাণীর জন্য পদার্থবিদ্যার সব সূত্র একধরনের মৃত্যু পরোয়ানার মতো। তবে সূত্রগুলোতে পালিয়ে যাওয়ারও উপায় আছে।

এ ধরনের কোনো সভ্যতা হয়তো পরমাণু ত্বরকযন্ত্র থেকে বিপুল শক্তি সংগ্রহ করতে পারে। তাদের হয়তো এমন লেজার বিমও থাকতে পারে, যার আকার সৌরজগতের সমান। কিংবা প্ল্যাঙ্ক শক্তি অর্জনের জন্য বিপুল পরিমাণ শক্তিকে একক বিন্দুতে ঘনীভূত করার মতো স্টার ক্লাস্টারও থাকতে পারে তাদের কাছে। এগুলো অর্জন করে কোনো ওয়ার্মহোল বা অন্য মহাবিশ্বে যাওয়ার রাস্তা খুলে ফেলার মতো যথেষ্ট হবে। টাইপ থ্রি সভ্যতা হয়তো এ রকম বিপুল শক্তি ব্যবহার করে থাকতে পারে। এর মাধ্যমে কোনো ওয়ার্মহোলের ভেতর দিয়ে রাস্তা খুলে অন্য মহাবিশ্বে চলে যেতে পারবে তারা। তখন তাদের পেছনে পড়ে থাকবে আমাদের মৃত্যুমুখী মহাবিশ্ব। এভাবে আবারও নতুন করে সবকিছু শুরু করতে পারে তারা।

গবেষণাগারে শিশু মহাবিশ্ব সম্ভব?

এই ধারণাগুলো যতই অসম্ভব বলে মনে হোক না কেন, এগুলোকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে ভাবছেন পদার্থবিদেরা। যেমন, মহাবিস্ফোরণ কীভাবে সংঘটিত হয়েছিল, তা আমরা যখন বুঝতে চেষ্টা করি, তখন ওই বিস্ফোরণের শর্ত কী কী, তা বিশ্লেষণ করতে হয়। অন্য কথায়, আমাদের জিজ্ঞেস করতে হয় : গবেষণাগারে একটি শিশু মহাবিশ্ব কীভাবে বানানো যায়? স্ফীতিশীল মহাবিশ্ব ধারণার অন্যতম সহ-প্রতিষ্ঠাতা আন্দ্রেই লিন্ডে বলেন, “আমরা যদি শিশু মহাবিশ্ব তৈরি করতে পারি, তাহলে হয়তো ঈশ্বরকে শুধু মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা হিসেবে সংজ্ঞায়িত না করে, তাঁকে আরও সূক্ষ্ম কোনো কাজের জন্য পুনরায় সংজ্ঞায়িত করা যাবে।’

ধারণাটি নতুন নয়। বেশ কয়েক বছর আগে, মহাবিস্ফোরণ শুরু হওয়ার জন্য কতটা শক্তির দরকার, তা হিসাব করতে গিয়ে নড়েচড়ে বসতে হয়েছিল পদার্থবিদদের। তখন লোকজন অবাক হয়ে ভাবতে বসল, গবেষণাগারে যদি কোনো স্থানে বিপুল পরিমাণ শক্তি রাখা হয়, তারপর তাতে অনেকগুলো কামান দাগা হয়, তাহলে কী ঘটবে? এর মাধ্যমে কি একটা মিনি মহাবিস্ফোরণ ঘটানোর মতো যথেষ্ট শক্তি জড়ো করা যাবে?’ জিজ্ঞেস করেছিলেন লিন্ডে।

কোনো বিন্দুতে বিপুল পরিমাণ শক্তি জড়ো করা হলে সেখানে স্থান-কাল ভেঙে একটি কৃষ্ণগহ্বর তৈরি হবে। এর বেশি কিছু নয়। তবে ১৯৮১ সালে এমআইটির অ্যালান গুথ ও লিন্ডে প্রস্তাব করলেন ইনফ্লেশন বা স্ফীতিশীল মহাবিশ্ব তত্ত্বের। বিশ্ব সৃষ্টিতত্ত্ববিদদের কাছে ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি করে তত্ত্বটি। এই ধারণা অনুসারে মহাবিস্ফোরণ বিপুল বিস্ফোরণের মাধ্যমে শুরু হবে। তবে আগের অনুমানের চেয়েও অনেক দ্রুত ঘটেছিল এই বিস্ফোরণ (স্ফীতিশীল মহাবিশ্বের ধারণাটি কসমোলজির অনেক কঠিন সমস্যার সমাধান দিয়েছিল। যেমন মহাবিশ্বকে সুষম হতেই হবে কেন? রাতের আকাশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তের যেদিকে তাকাই, সেখানেই এক সুষম মহাবিশ্ব দেখা যায়। কিন্তু মহাবিস্ফোরণের পর থেকে এই বিপুল বিস্তৃত অঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগের জন্য যথেষ্ট সময় পাওয়া যায়নি। স্ফীতিশীল মহাবিশ্ব তত্ত্বে এই ধাঁধার উত্তরে বলা হয়, তুলনামূলক সুষম স্থান-কালের অতি ক্ষুদ্র একটি টুকরো বিস্ফোরিত হয়ে পুরো দৃশ্যমান মহাবিশ্ব তৈরি হয়েছে।) একলাফে স্ফীতির সূচনার জন্য গুথ অনুমান করেন, সময়ের শুরুতে স্থান-কালের অতি ক্ষুদ্র বুদ্‌দ ছিল। সেটি বিপুলভাবে স্ফীত হয়ে বর্তমানের মহাবিশ্বে পরিণত হয়েছে।

স্ফীতিশীল মহাবিশ্ব তত্ত্বের এক ছোবলে অনেকগুলো মহাজাগতিক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেছে। আবার মহাকাশের ডব্লিউএমএপি ও কোর স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া বর্তমানের সব তথ্য-উপাত্তের সঙ্গেও এটি বেশ মানানসই। কাজেই মহাবিস্ফোরণ তত্ত্বের জন্য এটি প্রশ্নাতীত এক পদপ্রার্থীতে পরিণত হয়েছে।

এত কিছুর পরও স্ফীতিশীল মহাবিশ্ব তত্ত্ব বেশ কিছু বিব্রতকর প্রশ্ন তুলেছে। যেমন এই বুদ হঠাৎ স্ফীত হতে শুরু করল কেন? এই প্রসারণ বন্ধ হয়ে পরিণতিতে বর্তমানের মহাবিশ্ব গঠিত হলো কীভাবে? একবার স্ফীতির ঘটনা ঘটলে এটা কি আবারও কখনো ঘটবে? মজার ব্যাপার হলো, কসমোলজিতে স্ফীতিশীল তত্ত্বটি শীর্ষস্থানীয় হলেও ঠিক কোন ঘটনার কারণে স্ফীতির ঘটনা ঘটল আর এটি বন্ধ হলো কেন—সেসব সম্পর্কে কিছুই জানা যায়নি।

বিরক্তিকর এসব প্রশ্নের জবাব দিতে ১৯৮৭ সালে এমআইটির অ্যালান গুথ আর এডওয়ার্ড ফাহরি আরেকটি হাইপোথেটিক্যাল প্রশ্ন তোলেন। সেটি হলো : অগ্রসর কোনো সভ্যতা তাঁদের মহাবিশ্বকে কীভাবে স্ফীত করতে পারবে? তাঁদের অনুমান, এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে মহাবিশ্বের স্ফীতি কীভাবে শুরু হয়েছিল, সে-সম্পর্কিত গভীর প্রশ্নটির উত্তর দিতে পারবেন তাঁরা।

তাঁরা দেখতে পেয়েছেন, যদি যথেষ্ট পরিমাণ শক্তি কোনো এক বিন্দুতে ঘনীভূত করা যায়, তাহলে স্থান-কালের অতি ক্ষুদ্র বুদ স্বতঃস্ফূর্তভাবে গঠিত হবে। কিন্তু বুদ্বুদগুলো খুব ছোট হলে তারা স্থান-কালের ফেনায় আবারও ফিরে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। বুদ্বুদগুলো যদি যথেষ্ট বড় হয়, তাহলেই কেবল তারা প্রসারিত পুরো একটি মহাবিশ্ব গঠন করতে পারবে।

অন্যদিকে নতুন এই মহাবিশ্বের জন্মের বাইরে, হয়তো ৫০০ কিলোটন নিউক্লিয়ার বোমার বিস্ফোরণের চেয়ে খুব বেশি দরকার হবে না বলে মনে হয়। একে দেখে মনে হবে, হয়তো কোনো ছোট্ট বুদ্বুদ মহাবিশ্ব থেকে হারিয়ে গিয়ে ছোট এক পারমাণবিক বিস্ফোরণের জন্ম দিয়েছে। কিন্তু বুদের ভেতর একটি গোটা নতুন মহাবিশ্ব হয়তো প্রসারিত হতে থাকবে। সাবানের একটি বুদের কথা কল্পনা করুন, যেটি বিভক্ত হয়ে আরও ছোট বুদ্বুদে পরিণত হয়ে কোনো শিশু সাবানের বুদে পরিণত হয়। এই খুদে সাবানের বুদ হয়তো দ্রুতবেগে প্রসারিত হয়ে সম্পূর্ণ নতুন সাবানের বুদে পরিণত হতে পারে। একইভাবে মহাবিশ্বের ভেতরেও আপনি স্থান-কালের বিপুল বিস্ফোরণ এবং একটি পুরো মহাবিশ্বের সৃষ্টিপ্রক্রিয়াও দেখতে পারবেন।

শক্তির সূচনার মাধ্যমে একটি বড় বুদ প্রসারিত হয়ে পুরো মহাবিশ্বে পরিণত হতে পারে কি না, তা দেখতে ১৯৮৭ সালের পর অনেক তত্ত্ব প্রস্তাব করা হয়েছে। সাধারণভাবে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য তত্ত্বটি হলো, ইনফ্লেশন বা স্ফীতি। একটি নতুন কণা স্থান-কালকে অস্থিতিশীল করে তোলে। আর এ কারণেই এই বুদ্বুদ গঠন করে ও তাকে প্রসারিত করে।

২০০৬ সালে নতুন বিতর্কের সূত্রপাত ঘটে। সে সময় একটি মনোপোলের সঙ্গে একটি শিশু মহাবিশ্বের সূচনা করতে নতুন একটি প্রস্তাবকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে নিতে শুরু করেন পদার্থবিদেরা। যেসব কণা উত্তর বা দক্ষিণ মেরুর শুধু যেকোনো একটি মেরু বহন করে তাকে বলা হয় মনোপোল বা এক মেরু। মনোপোল কখনো দেখা না গেলেও অনুমান করা হয় যে তারাই আদিম মহাবিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করেছিল। তারা এতই ভারী যে গবেষণাগারে এদের তৈরি করাও কঠিন। তবে তারা বিপুল ভরের হওয়ার কারণেই কোনো মনোপোলের মধ্যে আরও শক্তি ঢুকিয়ে দিলে শিশু মহাবিশ্বের জন্ম দেওয়া সম্ভব। এটিই প্রসারিত হয়ে একসময় প্রকৃত মহাবিশ্বে পরিণত হবে।

পদার্থবিদেরা মহাবিশ্ব কেন বানাতে চান? লিন্ডে বলেন, ‘দৃষ্টিভঙ্গিটা হলো, আমাদের সবাই ঈশ্বরের সমকক্ষ হয়ে উঠতে পারে।’ কিন্তু এর বাইরে নতুন মহাবিশ্ব বানানোর কিছু বাস্তব কারণও রয়েছে : আমাদের মহাবিশ্বের চূড়ান্ত মৃত্যু থেকে পালিয়ে বাঁচা।

মহাবিশ্বের বিবর্তন

কিছু পদার্থবিদ এই ধারণাকে আরও সামনে এগিয়ে নিয়ে গেছেন, যাকে বলে একেবারে বিজ্ঞান কল্পকাহিনির সীমানায়। প্রশ্ন তুলেছেন, আমাদের মহাবিশ্ব ডিজাইনের ক্ষেত্রে কোনো বুদ্ধিমান সত্তার হাত আছে কি না।

গুথ ও ফাহরির চিত্রে কোনো অগ্রসর সভ্যতা একটি শিশু মহাবিশ্ব তৈরি করতে পারে। ভৌত ধ্রুবকগুলো (যেমন ইলেকট্রন ও প্রোটনের ভর ও চারটি প্রাকৃতির বলের শক্তি) একই থাকবে। কিন্তু কোনো অগ্রসর সভ্যতা যদি এমন শিশু মহাবিশ্ব তৈরি করে, যেখানে মৌলিক ধ্রুবকগুলো কিছুটা আলাদা হয়? তাহলে শিশু মহাবিশ্বটি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিকশিত হতে থাকবে। শিশু মহাবিশ্বের প্রতি প্রজন্ম তার আগের প্রজন্ম থেকে কিছুটা আলাদা হতে থাকবে।

আমরা যদি মৌলিক ধ্রুবকগুলোকে মহাবিশ্বের ডিএনএ হিসেবে ধরে নিই, তাহলে এর মানে হবে, বুদ্ধিমান কোনো জীব হয়তো এমন শিশু মহাবিশ্ব তৈরি করতে পারবে, যার ডিএনএ কিছু আলাদা। ক্রমান্বয়ে মহাবিশ্বগুলো বিকশিত হতে থাকবে। এগুলোর মধ্যে যে মহাবিশ্বের ডিএনএ বুদ্ধিমান প্রাণের বিকাশের জন্য সবচেয়ে ভালো, তার বংশবিস্তার করা হবে।

লি স্মোলিনের আগের ধারণা নিয়ে পদার্থবিদ এডওয়ার্ড হ্যারিসন মহাবিশ্বের প্রাকৃতিক নির্বাচনের প্রস্তাব করেছেন। যে মহাবিশ্বটি মাল্টিভার্সে আধিপত্য বিস্তার করতে পারবে, তার মধ্যেই সঠিকভাবে সবচেয়ে ভালো ডিএনএ আছে। সেটিই অগ্রসর সভ্যতার জন্য মানানসই। এভাবে তারা আরও শিশু মহাবিশ্ব তৈরি করবে। ‘সারভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট’ বা ‘যোগ্যতমের উদ্বর্তন’ সহজ মানে হলো, সেই মহাবিশ্বগুলো টিকে থাকবে, যেগুলো অগ্রসর সভ্যতা গঠনের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত হবে।

এই চিত্র সঠিক হলে মহাবিশ্বের মৌলিক ধ্রুবকগুলো প্রাণের টিকে থাকার উপযোগী করে কেন সুষমভাবে সমন্বয় করা, তা ব্যাখ্যা করবে এটি। এর সহজ অর্থ হলো, যে মহাবিশ্বগুলোর কাঙ্ক্ষিত মৌলিক ধ্রুবকগুলো প্রাণের সঙ্গে মানানসই, সেগুলোই মাল্টিভার্সে বংশবিস্তার করে। (মহাবিশ্বের এই বিবর্তনের ধারণা বেশ আকর্ষণীয়। কারণ, এটি অ্যানথ্রোপিক প্রিন্সিপাল-সংক্রান্ত সমস্যাটির ব্যাখ্যা করতে পারে। তবে এই ধারণাটির জটিলতাও আছে। সেটি হলো, এটি পরীক্ষা করে দেখা সম্ভব নয় ও যাচাইযোগ্য কোনো প্রতিপাদ্য নয়। এ ধারণাটি বোঝার জন্য আমাদের একটি পূর্ণাঙ্গ থিওরি অব এভরিথিং পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে থাকতে হবে।)

সমান্তরাল মহাবিশ্বের উপস্থিতি প্রমাণের জন্য বর্তমানে আমাদের প্রযুক্তি একেবারেই আদিম। কাজেই একে দ্বিতীয় শ্রেণির অসম্ভাব্যতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে এখানে। তবে এখন করা অসম্ভব হলেও এটি পদার্থবিদ্যার কোনো সূত্র লঙ্ঘন করে না। কয়েক হাজার থেকে কয়েক লাখ বছরে এই অনুমান হয়তো টাইপ থ্রি সভ্যতার জন্য নতুন প্রযুক্তির ভিত্তি হয়ে দাঁড়াবে।

তথ্যনির্দেশ

টেসারেক্ট : জ্যামিতিতে ঘনকসদৃশ চতুর্থ মাত্রিক বস্তু।

স্ফীতি তত্ত্ব : একেবারেই আদিম মহাবিশ্বের ত্বরিত প্রসারণের সংক্ষিপ্ত কাল, যখন মহাবিশ্ব আয়তনে বিপুল পরিমাণ প্রসারিত হয়েছিল। মহাবিস্ফোরণের পর মহাবিশ্বের দ্রুত প্রসারণ ব্যাখ্যার জন্য এখন পর্যন্ত এটিই সবচেয়ে সফল তত্ত্ব। ১৯৭০-এর দশকে তাত্ত্বিক পদার্থবিদ অ্যালেস্কি স্টারোবিস্কি, অ্যালান গুথ আর অ্যান্দ্রেই লিন্ডে এ তত্ত্বের প্রস্তাব করেছিলেন।

কোয়ান্টাম মহাকর্ষ : কোয়ান্টাম বলবিদ্যা ও সাধারণ আপেক্ষিকতাকে একীভূত করা একটি তত্ত্ব।

অ্যানথ্রোপিক প্রিন্সিপাল : আমরা এই মহাবিশ্ব এভাবে দেখি; কারণ, এটি যদি অন্য রকম হতো, তাহলে একে পর্যবেক্ষণ করার জন্য হয়তো আমাদের অস্তিত্বই থাকত না—এই ধারণা।

––––––––––––––––––––

তৃতীয় পর্ব : তৃতীয় শ্রেণির অসম্ভাব্যতা

১৪. অবিরাম গতিযন্ত্র

কোনো তত্ত্ব গ্রহণযোগ্য হওয়ার চারটি ধাপ থাকে :

১. সেটা অকেজো বা অর্থহীন হবে

২. এটি আকর্ষণীয়, কিন্তু বেমানান হবে

৩. এটা সত্যি হলেও অগুরুত্বপূর্ণ হবে

৪. আমি সব সময় তা-ই বলতাম।

—জে বি এস হ্যালডন, ১৯৬৩

আইজ্যাক আসিমভের ক্ল্যাসিক উপন্যাস দ্য গডস দেমসেফলস-এ ২০৭০ সালের পৃথিবীর এক রহস্যময় রসায়নবিদের দেখা পাওয়া যায়। দুর্ঘটনাক্রমে একদিন সর্বকালের সেরা এক আবিষ্কার করে বসেন তিনি। সেটি ছিল এক ইলেকট্রন পাম্প। তা দিয়ে বিনা মূল্যে সীমাহীন শক্তি তৈরি করা যায়। এর ফলাফল ছিল প্রত্যক্ষ ও বেশ গভীর। অফুরান শক্তির জন্য সভ্যতার তৃষ্ণা সর্বকালের। তাই তাঁর আবিষ্কারে এই তৃষ্ণা মিটে যাওয়ার কারণেই তাঁকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী হিসেবে অভিনন্দন জানানো হয়। ‘আবিষ্কারটি ছিল গোটা বিশ্বের জন্য সান্তা ক্লজ ও আলাদিনের বাতির মতো’, আসিমভ লিখেছেন। এরপর একটি কোম্পানি খুলে বসেন বিজ্ঞানীরা। অচিরেই সেটি পরিণত হয় এই গ্রহের সবচেয়ে ধনী একটি প্রতিষ্ঠানে। অন্যদিকে তেল, গ্যাস, কয়লা ও নিউক্লিয়ার শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসা হারিয়ে শেষমেশ লাটে উঠতে থাকে।

অবাধ শক্তির জোয়ারে ভাসতে থাকে গোটা বিশ্ব। নতুন আবিষ্কৃত এই শক্তিতে ভর করে বিশ্ববাসী উন্মত্ত হয়ে ওঠে। সবাই অসাধারণ এ অর্জন উদ্‌যাপন করতে থাকে। ব্যতিক্রম কেবল নিঃসঙ্গ এক পদার্থবিদ। ভীষণ অস্বস্তিতে ভুগতে থাকেন তিনি। নিজেকেই প্রশ্ন করেন তিনি, ‘এসব অবাধ, অফুরান শক্তি এল কোথা থেকে?’ এই উত্তর খুঁজতে গিয়ে একসময় তিনি এক গুপ্তরহস্য উদ্ঘাটন করেন। বিনা মূল্যের এই শক্তি আসলে আসছিল ভয়ংকর এক মূল্য চুকিয়ে। মহাশূন্যের স্থানের ভেতরে এক গর্ত থেকে এসব শক্তি নিঃসৃত হচ্ছিল। গর্তটি একটি সমান্তরাল মহাবিশ্বের সঙ্গে সংযুক্ত করেছিল আমাদের মহাবিশ্বটিকে। আমাদের মহাবিশ্বে আসা হঠাৎ শক্তির প্রবাহের কারণে সেখানে একটি চেইন রিঅ্যাকশন শুরু হয়ে যায়। এর ফলে ক্রমেই সেখানকার নক্ষত্র, ছায়াপথ ধ্বংস হতে শুরু করে, সূর্য পরিণত হতে থাকে সুপারনোভায়। তারপর পৃথিবীও ধ্বংস হয়ে যায়।

লিখিত ইতিহাসে উদ্ভাবক, বিজ্ঞানী থেকে শুরু করে হাতুড়ে ডাক্তার, ভন্ড ও প্রতারক শিল্পী সবার কাছে অলীক পারপিচুয়াল মোশন মেশিন বা অবিরাম গতির যন্ত্র দেখা যায়। এটি এমন এক যন্ত্র, যা শক্তি ছাড়াই চিরকাল চলতে পারে। আবার এ যন্ত্রের আরেকটি সংস্করণে দেখা যায়, যন্ত্রটি যতটুকু শক্তি ব্যবহার করে, তার চেয়ে বেশি শক্তি উৎপাদন করে। যেমন ইলেকট্রন পাম্প, যেটি অবাধে সীমাহীন শক্তি উৎপাদন করে।

আসন্ন বছরগুলোতে আমাদের শিল্পোন্নত বিশ্বে একসময় সস্তা তেলের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাবে। তখন পরিচ্ছন্ন শক্তির পর্যাপ্ত নতুন উৎস অনুসন্ধানের বিপুল চাপ তৈরি হবে। গ্যাসের দাম বাড়িয়ে, উৎপাদন কমিয়ে, দূষণ বাড়িয়ে, বায়ুমণ্ডলে পরিবর্তন করে—এ সবগুলো শক্তি পাওয়ার তীব্র আগ্রহে ইন্ধন জোগায়।

উদ্বেগের ব্যাপার হলো, বর্তমানে কয়েকজন উদ্ভাবক অফুরন্ত বিনা মূল্যের শক্তি সরবরাহ করার এই জোয়ারে গা ভাসিয়েছেন। তাঁদের উদ্ভাবনগুলো শত শত মিলিয়ন অর্থের বিনিময়ে বিক্রির প্রস্তাব দিচ্ছেন তাঁরা। বাণিজ্যিক গণমাধ্যমে চাঞ্চল্যকর দাবির কারণে প্রলুব্ধ হয়ে কিছু বিনিয়োগকারীকে তাদের কাছে ভিড় জমাতে দেখা যাচ্ছে। কারণ, গণমাধ্যমে এসব ছিটগ্রস্ত লোককেই পরবর্তী এডিসন হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে।

অবিরাম গতির যন্ত্রের জনপ্রিয়তা ব্যাপক। দ্য পিটিএ ডিসব্যান্ডশিরোনামের দ্য সিমসন সিরিজের একটি পর্বে শিক্ষকদের এক ধর্মঘটের সময় নিজের জন্য একটি অবিরাম গতির যন্ত্র বানায় লিসা। এর ফলে হোমার ঘোষণা করতে বাধ্য হয়, ‘লিসা, শোনো, এই বাড়িতে আমরা তাপগতিবিদ্যার সূত্রগুলো মেনে চলি!”

কম্পিউটার গেমস দ্য সিমস, জেনোসাগা এপিসোড ১ ও ২ এবং আলটিমা ৪ : দ্য ফলস প্রফেট, একই সঙ্গে নিকলোডিয়নের ইনভেডার জিমের কাহিনিতে অবিরাম গতির যন্ত্র বেশ সুপরিচিত।

তবে শক্তি যদি এতই মূল্যবান হয়, তাহলে অবিরাম গতির যন্ত্র বানানোর ব্যাপারে আমাদের সম্ভাবনা কতটা? এই যন্ত্র কি সত্যিই বানানো অসম্ভব? নাকি তাদের বানানোর জন্য পদার্থবিদ্যার সূত্রগুলোর সংশোধন করা দরকার?

শক্তিসম্পর্কিত ইতিহাস ফিরে দেখা

সভ্যতার জন্য শক্তি খুব গুরুত্বপূর্ণ। সত্যি বলতে কি, মানুষের ইতিহাসের পুরোটাই শক্তির আতশি কাচ দিয়ে দেখা যায়। এককালে ৯৯.৯ শতাংশ মানুষের অস্তিত্বের জন্য আদিম সমাজগুলো ছিল যাযাবর প্রকৃতির। খাদ্যের জন্য তারা সর্বভুকের মতো শিকার করে বেড়াত। তাদের জীবন ছিল নিষ্ঠুরতায় ভরা ও আয়ু ছিল সংক্ষিপ্ত। সেকালে আমাদের কাছে যে শক্তি ছিল, তা অশ্বশক্তির হিসাবে ৫ ভাগের ১ ভাগ মাত্র। সে শক্তি ছিল আমাদের পেশির। আমাদের পূর্বপুরুষদের হাড় বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তাদের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি যুদ্ধ আর দুর্ভোগ লেগেই থাকত। তার পেছনের কারণ তাদের প্রতিদিনের বেঁচে থাকা। তাদের গড় আয়ু ছিল ২০ বছরের কম।

তবে গত বরফযুগ শেষে, প্রায় ১০ হাজার বছর আগে কৃষিকাজ ও জীবজন্তু (বিশেষ করে ঘোড়া) পোষ মানানোর পদ্ধতি আবিষ্কার করি আমরা। এর ফলে ক্রমেই আমাদের শক্তি উৎপাদন বেড়ে এক বা দুই হর্সপাওয়ার বা অশ্বশক্তি দাঁড়ায়। এর মাধ্যমে মানব ইতিহাসে প্রথম বড় ধরনের কোনো বিপ্লব দেখা দেয়। ঘোড়া বা গরুর কারণে একজন মানুষ নিজেই পুরো একটা মাঠ চাষ করতে সক্ষম হতো, দিনে ভ্রমণ করতে পারত প্রায় ১০ মাইল, কিংবা কয়েক শ পাউন্ড পাথর বা শস্য এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিয়ে যেতে পারত। এর মাধ্যমেই মানবেতিহাসে প্রথমবার পরিবারগুলোতে বাড়তি শক্তি দেখা গিয়েছিল। ফলে এভাবে আমরা প্রথম শহরের গোড়াপত্তন করতে পারি। অতিরিক্ত শক্তির অর্থ হলো, কোনো সমাজ শিল্পী, স্থপতি, নির্মাতা ও লেখকশ্রেণির সহায়তা দিতে সক্ষম। তাতে প্রাচীন সভ্যতা উন্নতি লাভ করতে থাকে। শিগগিরই বনজঙ্গল ও মরুভূমি থেকে মাথা তুলে দাঁড়াতে লাগল গ্রেট পিরামিড ও অন্যান্য সাম্রাজ্য। তখন গড় আয়ু পৌঁছাল প্রায় ৩০ বছরে।

এরপর ৩০০ বছর আগে মানবেতিহাসে দ্বিতীয়বার বড় ধরনের বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল। বিভিন্ন যন্ত্র ও বাষ্পীয় শক্তি আসার সঙ্গে সঙ্গে একজন লোকের জন্য শক্তির পরিমাণ বেড়ে ১০ অশ্বশক্তিতে পৌঁছায়। বাষ্পীয় ইঞ্জিনের শক্তিতে লাগাম পরিয়ে, মানুষ তখন পুরো মহাদেশ মাত্র কয়েক দিনে অতিক্রম করতে পারত। যন্ত্রের মাধ্যমে পুরো একটি জমি চাষ করা সম্ভব হলো। সেই সঙ্গে একসঙ্গে হাজার হাজার মাইল পরিবহন করা সম্ভব হলো শত শত যাত্রীকে। বানানো সম্ভব হলো বিশাল সুউচ্চ ইমারত। এভাবে যুক্তরাষ্ট্রে ১৯০০ সালে গড় আয়ু প্রায় ৫০ বছরে পৌঁছাল।

এখন মানবেতিহাসের তৃতীয় বড় ধরনের বিপ্লবের মাঝখানে আমরা। সেটি তথ্যবিপ্লব। জনসংখ্যা বিস্ফোরণ, বিদ্যুৎ ও শক্তির জন্য আমাদের বুভুক্ষু স্বভাবের কারণে শক্তিচাহিদা এখন আকাশছোঁয়া। কিন্তু শক্তি সরবরাহ সংকুচিত হয়ে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। একজনের ব্যবহারযোগ্য শক্তি এখন মাপা হয় হাজার অশ্বশক্তিতে। আমরা মেনে নিয়েছি, একটি গাড়ি কয়েক শ অশ্বশক্তি উৎপাদন করতে পারে। আরও বেশি শক্তির চাহিদার কারণে অবিরাম গতির যন্ত্রসহ শক্তির উৎসের প্রতি আমাদের আগ্রহী করে তুলেছে।

ইতিহাসে অবিরাম গতিযন্ত্র

অবিরাম গতিযন্ত্রের খোঁজাখুঁজির ধারা অতীতেও বিদ্যমান ছিল। অবিরাম গতিযন্ত্রের বানানোর প্রথম রেকর্ডকৃত প্রচেষ্টা দেখা যায় অষ্টম শতাব্দীতে বেভারিয়ায়। পরবর্তী হাজার বছর ধরে এ ধরনের যন্ত্রের শতাধিক সংস্করণ বানানোর চেষ্টা করা হয়েছে। পরের এসব যন্ত্রের আদিরূপ ছিল আসলে ওই প্রথম যন্ত্রটি। একটি চাকার সঙ্গে অনেকগুলো ছোট ছোট চুম্বক সারিবদ্ধ করে এটি বানানো হয়েছিল। অনেকটা ফেরিস হুইল বা চাকার মতো ছিল যন্ত্রটি। চাকাটি মেঝের ওপর আরও বড় একটি চুম্বকের ওপর বসানো থাকত। চাকায় বসানো প্রতিটি চুম্বক নিচের স্থির চুম্বক পেরিয়ে যাওয়ার সময় সেগুলো বড় চুম্বকটিকে প্রথমে আকর্ষণ আর পরে বিকর্ষণ করত বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল। পরিণামে চাকাটিতে ধাক্কা লাগত ও অবিরাম গতির সৃষ্টি হতো।

আরেকটি সুদক্ষ ডিজাইন ১১৫০ সালে তৈরি করেন ভারতীয় দার্শনিক ভাস্কর। তিনি এমন একটি চাকার কথা বলেছিলেন, যার রিমের ওপর কিছু ভর রাখা হলে তা চিরকাল চলতে থাকবে। তাঁর চাকাটি ঘুরেছিল; কারণ, সেটি ভারসাম্যহীন অবস্থায় ছিল। চাকাটি ভরের কারণে ঘুরতে থাকবে এবং তারপর সেটি তার আগের অবস্থায় ফিরে যাবে। এই চক্র বারবার পুনরাবৃত্তি করার মাধ্যমে ভাস্কর দাবি করেন যে এর মাধ্যমে যে কেউ সীমাহীন কাজ বের করে আনতে পারবে একেবারে বিনা মূল্যে।

বেভারিয়ান আর ভাস্করের অবিরাম গতির যন্ত্রের নকশা ও তার পরের উত্তরসূরি যন্ত্রগুলোতে প্রায় একই উপাদান ব্যবহার করতে দেখা যায়। এসব যন্ত্রে এমন একটি চাকা থাকে, যা কোনো অতিরিক্ত শক্তি না নিয়ে একটি আবর্তন শেষ করতে পারে। এভাবে সেগুলো ব্যবহারযোগ্য কাজ করতে পারে। (এসব কৌশলী যন্ত্র সতর্কতার সঙ্গে পরীক্ষা করে সাধারণত দেখা গেছে, চাকার প্রতিটি চক্রে বা আবর্তনে আসলে শক্তি হারায়, কিংবা এর মাধ্যমে ব্যবহারযোগ্য কোনো কাজ বের করে আনা যায় না।)

মজার ব্যাপার হলো, রেনেসাঁর আসার সঙ্গে সঙ্গে অবিরাম গতিযন্ত্র বানানোর দাবি বাড়তে থাকে। অবিরাম গতিযন্ত্রের প্রথম পেটেন্ট অনুমোদন করা হয় ১৬৩৫ সালে। জোহান বেসলার ১৭১২ সালের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের প্রায় ৩০০ নকশা বিশ্লেষণ করে দেখেন। এরপর নিজেই নতুন আরেকটি নকশার দাবি করে বসেন তিনি। (কিংবদন্তি আছে, তাঁর বানানো যন্ত্রটি যে প্রতারণা, তা খোদ তাঁর পরিচারিকাই প্রকাশ করে দেয়।) অবিরাম গতির যন্ত্রে আগ্রহী হয়ে ওঠেন রেনেসাঁ-যুগের মহান চিত্রশিল্পী ও বিজ্ঞানী লেওনার্দো দা ভিঞ্চি। এ যন্ত্র সম্পর্কে তিনি জনসমক্ষে সমালোচনা করেছিলেন। যন্ত্রটিকে অনর্থক পরশপাথর খোঁজার মতো ব্যাপার বলে মন্তব্য করেন তিনি। কিন্তু তা হলে কী হবে, তলেতলে নিজের নোটবুকে সেন্ট্রিফিউগাল পাম্প, চিমনি জ্যাকসহ স্বচালিত অবিরাম গতির যন্ত্রের নকশা আঁকেন। সেটি আগুনের ওপর রোস্ট বানানোর কাঠিকে ঘোরাতে ব্যবহার করেন তিনি।

১৭৭৫ সালের মধ্যে এত বেশি প্রস্তাব আসতে লাগল যে প্যারিসের রয়্যাল একাডেমি অব সায়েন্স একসময় ঘোষণা দিতে বাধ্য হলো, অবিরাম গতিবিষয়ক কোনো প্রস্তাব আর গ্রহণ করবে না তারা।

পারপিচুয়াল মোশন মেশিন বা অবিরাম গতিযন্ত্রের ইতিহাসবিদ আর্থার অর্ড-হিউম এসব যন্ত্রের উদ্ভাবকদের অক্লান্ত আত্মোৎসর্গ করার কথা লিখেছেন। তাঁরা অবিশ্বাস্য প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে কাজ করেছেন উল্লেখ করে তাঁদের প্রাচীনকালের আলকেমিস্টদের সঙ্গে তুলনা করেছেন তিনি। তবে সেই সঙ্গে এটাও উল্লেখ করেছেন, ‘আলকেমিস্টরাও অন্তত জানতেন, তিনি কখন হেরে গেছেন।’

ধাপ্পাবাজি ও প্রতারণা

একসময় পারপিচুয়াল মোশন মেশিন বানানোর উত্তেজনা এতই বেশি ছিল যে সেখানে ধাপ্পাবাজিও নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। নিউইয়র্কে ১৮১৩ সালে চার্লস রেডহেফার একটি যন্ত্র দেখান। দর্শকদের অভিভূত করে ফেলে সেটি। কারণ, বিনা মূল্যে সীমাহীন শক্তি তৈরি করত যন্ত্রটি। (কিন্তু রবার্ট ফালটন যন্ত্রটি বেশ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে দেখেন। অনুসন্ধানে আগে থেকে লুকিয়ে রাখা একটি বিড়ালের অস্ত্র দিয়ে বানানো বেল্ট দিয়ে মেশিনটিকে চালাতে দেখতে পান তিনি। ওই তারটি চিলেকোঠায় লুকিয়ে থাকা এক লোকের কাছে সংযুক্ত ছিল। তিনি হাতল ঘুরিয়ে সেটি চালাচ্ছিলেন।)

একসময় বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীরাও অবিরাম গতিযন্ত্রের তীব্র স্রোতে ভেসে গিয়েছিলেন। ১৮৭০ সালে সায়েন্টিফিক আমেরিকান ম্যাগাজিনের সম্পাদকেরা ই পি উইলসের বানানো একটি যন্ত্র দেখে স্রেফ বোকা বনে যান। এরপর যথারীতি ‘গ্রেটেস্ট ডিসকোভারি এভার ইয়েট মেড’ শিরোনামে ম্যাগাজিনটিতে চাঞ্চল্যকর একটি ফিচার ছাপা হয়। কিন্তু পরে তদন্তকারীরা আবিষ্কার করেন, উইলসের অবিরাম গতির যন্ত্রে গোপন একটি শক্তির উৎস ছিল।

১৮৭২ জন আর্নেস্ট ওরেল কেলি তাঁর সময়ে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ও লাভজনক কেলেঙ্কারির জন্ম দেন। তিনি প্রায় ৫ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ বাগিয়ে আনেন। সেটা উনিশ শতকের শেষে অনেক বড় অঙ্কের টাকা। তাঁর অবিরাম গতির যন্ত্রের ভিত্তি ছিল টিউনিং ফর্কের কম্পন। এটি ‘ইথার’কে টোকা মারতে পারে বলে দাবি তোলেন তিনি। কেলির বিজ্ঞানবিষয়ক কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। নিজের বাড়িতে ধনী বিনিয়োগকারীদের আমন্ত্রণ জানাতেন তিনি। সেখানে তিনি তাঁর হাইড্রো-নিউমেটিক-পালসেটিং-ভ্যাকু- -ইঞ্জিন দেখিয়ে চমৎকৃত করতেন। তাঁর যন্ত্রটি বাইরের কোনো শক্তি ব্যবহার না করেই চারদিকে ঘুরত। উৎসাহী বিনিয়োগকারীরা এ স্বচালিত যন্ত্রটি দেখে বিস্মিত হতেন। তারপর কেলির অর্থভান্ডারে দুহাতে টাকা ঢালতেন বিনিয়োগকারীরা।

পরে বিভ্রান্তি থেকে মুক্ত হয়ে কিছু বিনিয়োগকারী ক্ষুব্ধ হন। প্রতারক হিসেবে অভিযুক্ত করা হয় তাঁকে। সে জন্য তাঁকে কিছুদিন কারাগারে কাটাতে হয়। অবশ্য ধনী হিসেবেই পরে মারা যান তিনি। মৃত্যুর পর বিনিয়োগকারীরা তাঁর যন্ত্রের গোপন একটি কৌশল খুঁজে পান। তাঁর বাড়িটি ভেঙে ফেলার সময় ঘরের মেঝে ও বেজমেন্টের দেয়ালে গোপন কিছু টিউব খুঁজে পাওয়া যায়। তাঁর যন্ত্রটিতে গোপনে সংকুচিত বায়ু সরবরাহ করত টিউবগুলো। আর টিউবগুলোতে এক ফ্লাইহুইলের মাধ্যমে শক্তি সরবরাহ করা হতো।

মার্কিন নৌবাহিনী ও মার্কিন প্রেসিডেন্টকেও একসময় গ্রাস করেছিল এসব যন্ত্র। ১৮৮১ সালে তরল অ্যামোনিয়া যন্ত্র উদ্ভাবন করেন জন জ্যামজি। শীতল অ্যামোনিয়ার বাষ্প প্রসারিত গ্যাস তৈরি করত, যা একটি পিস্টন নাড়াতে পারত। কাজেই শুধু মহাসাগরের তাপ কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন যন্ত্রে শক্তি সঞ্চালন করা যেত। মহাসাগর থেকে সীমাহীন শক্তি তৈরির এ আইডিয়ায় মার্কিন নৌবাহিনী এতই মুগ্ধ হয় যে তারা যন্ত্রটি অনুমোদন দেয়। এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট জেমস গারফিল্ডের সামনে তা প্রদর্শনও করা হয়। কিন্তু সমস্যা হলো, ওই বাষ্পকে আবারও ঠিকমতো জমাট বাঁধিয়ে তরলে পরিণত করা যেত না। কাজেই পুরো চক্রটি শেষে আর কাজ করেনি।

মার্কিন পেটেন্ট ও ট্রেডমার্ক অফিসে (ইউএসপিটিও) অসংখ্য অবিরাম গতির যন্ত্র উপস্থাপন করা হয়েছিল। তাই একসময় এ ধরনের কোনো যন্ত্রের কার্যকর মডেল উপস্থাপন না করা পর্যন্ত অনুমোদন করতে অস্বীকার করে প্রতিষ্ঠানটি। বিরল কিছু পরিস্থিতিতে, পেটেন্ট পরীক্ষকেরা কোনো মডেলে স্পষ্ট কোনো ত্রুটি না পেলেই কেবল সেটি অনুমোদন করা হতো। ইউএসপিটিও ঘোষণা দেয়, ‘অবিরাম গতির সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো ব্যতিক্রমী ক্ষেত্র ছাড়া প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সাধারণভাবে কোনো মডেলের কার্যপ্রণালি দেখানোর কোনো প্রয়োজন নেই।’ (এই ফাঁকটির সুযোগ নিত বিবেকহীন উদ্ভাবকেরা। ইউএসপিটিও কাগজে-কলমে তাদের যন্ত্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে দাবি করে সরল বিনিয়োগকারীদের তাদের উদ্ভাবিত যন্ত্রে বিনিয়োগে রাজি করাত তারা।)

তবে অবিরাম গতির যন্ত্রের খোঁজার পালা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে একেবারে বৃথা যায়নি। কারণ, কোনো উদ্ভাবক অবিরাম গতির যন্ত্র বানাতে না পারলেও তারা এ ধরনের অলীক যন্ত্র বানানোর পেছনে বিপুল সময় ও শক্তি খরচ করত। ফলে পদার্থবিদেরা বেশ ভালোভাবে তাপীয় ইঞ্জিনের প্রকৃতি সম্পর্কে গবেষণা করতে পারেন। (একইভাবে আলকেমিস্ট বা কিমিয়াবিদেরা একসময় পরশপাথর খুঁজতে বিপুল সময় ও শ্রম ব্যয় করত। তাদের বিশ্বাস ছিল, পরশপাথরের মাধ্যমে সিসাকে সোনায় রূপান্তর করা সম্ভব। কিন্তু তাদের সেই নিষ্ফল চেষ্টার কারণে একসময় রসায়নের মৌলিক সূত্রগুলো উদ্ঘাটিত হয়েছিল।)

যেমন ১৭৬০-এর দশকে জন কক্স এমন এক ঘড়ি বানান, যা চিরকাল চলতে পারবে। বায়ুমণ্ডলের চাপের তারতম্য থেকে শক্তির জোগান পেত ঘড়িটি। বায়ুচাপের পরিবর্তন একটি ব্যারোমিটারকে চালাত। পরে ঘড়ির হাতল ঘোরাত এই ব্যারোমিটার। ঘড়িটি বেশ ভালোভাবে কাজ করত। এখনো বহাল তবিয়তে আছে সেটি। ঘড়িটি চিরকাল চলতে পারে; কারণ, এটি বায়ুমণ্ডলীয় চাপের পরিবর্তন থেকে বাইরের শক্তি সংগ্রহ করে।

কক্সের মতো পারপিচুয়াল মেশিন একসময় বিজ্ঞানীদের অনুমান করতে অনুপ্রাণিত করল যে বাইরে থেকে শক্তি আমদানি করা গেলে এ ধরনের যন্ত্রকে চিরকাল চালানো সম্ভব। তাতে সর্বমোট শক্তি সংরক্ষিত থাকে। এই তত্ত্বই পরে থার্মোডাইনামিকস বা তাপগতিবিদ্যার প্রথম সূত্রের দিকে নিয়ে যায়। এ সূত্র অনুসারে, মোট বস্তু বা শক্তিকে সৃষ্টি বা ধ্বংস করা যায় না। এভাবে একসময় তাপগতিবিদ্যার তিনটি সূত্র স্বতঃসিদ্ধ হিসেবে মেনে নেওয়া হয়। দ্বিতীয় সূত্র বলে, এনট্রপির (বিশৃঙ্খলা) সর্বমোট পরিমাণ সব সময় বাড়ে। (মোটাদাগে বলা যায়, এই সূত্র বলে, উত্তপ্ত জায়গা থেকে শীতল জায়গায় তাপ স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রবাহিত হয়।) তাপগতিবিদ্যার তৃতীয় সূত্রমতে, পরম শূন্য তাপমাত্রায় কখনো পৌঁছানো সম্ভব নয়।

মহাবিশ্বকে যদি একটা খেলার সঙ্গে তুলনা করা হয় আর এই খেলার লক্ষ্যকে যদি শক্তি বের করে আনার সঙ্গে তুলনা করা হয়, তাহলে এ তিনটি সূত্রকে এভাবেও লেখা যায় :

‘কোনো কিছু না দিয়ে কিছু পাওয়া যাবে না।’ (প্ৰথম সূত্র ) ‘লাভ বা ক্ষতি কোনোটাই পাওয়া যাবে না।’ (দ্বিতীয় সূত্র ) ‘এই খেলা থেকে বের হয়ে যাওয়াও সম্ভব নয়।’ (তৃতীয় সূত্র)

(সূত্রগুলো অনিবার্যভাবে সবর্দা পরম সত্য নয়, সে কথা বেশ সাবধানে বলেন পদার্থবিদেরা। তারপরও কোনো বিচ্যুতি এখনো পাওয়া যায়নি। সূত্রগুলো যারা মিথ্যা প্রমাণের চেষ্টা করবে, তারা অবশ্যই কয়েক শতাব্দীর সতর্ক বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার বিরুদ্ধে দাঁড়াবে। এই সূত্রগুলোর সম্ভাব্য বিচ্যুতি নিয়ে কিছুক্ষণ পর আমরা আলাপ করব। )

উনিশ শতকের বড় অর্জনগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো এই সূত্রগুলো। কিন্তু তা যুগান্তকারী হওয়ার পাশাপাশি এতে বিয়োগান্ত ঘটনাও জড়িয়ে আছে। এগুলো যারা সূত্রবদ্ধ করছিলেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন মহান জার্মান পদার্থবিদ লুডভিগ বোলজম্যান। সূত্র তিনটি সূত্রবদ্ধ করতে গিয়ে এক বিতর্কে সৃষ্টি হয়। এর জের ধরে আত্মহত্যা করেন তিনি

লুডভিগ বোলজম্যান ও এনট্রপি

মানুষ হিসেবে বোলজম্যান ছিলেন ক্ষুদ্রকায়, কিন্তু তাঁর দেহের ওপরের অংশ ছিল বিপুলাকৃতির। জঙ্গলের মতো ঘন ও বড়সড় ছিল তাঁর মুখের দাড়ি। তাঁর এই দুর্ধর্ষ আর ভয়ানক দেহাবয়ব দেখে ভুল ধারণা জন্মাতে পারে। কারণ, চেহারা দেখে কোনোভাবেই বোঝা সম্ভব নয় তাঁর আইডিয়াগুলো রক্ষার লড়াই করতে তাঁকে কতটা ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। নিউটনিয়ান পদার্থবিদ্যা উনিশ শতকেও রাজত্ব করছিল বেশ ভালোভাবে। কিন্তু বোলজম্যান একসময় বুঝতে পেরেছিলেন, এই সূত্রগুলোকে কখনোই পরমাণুর মতো বিতর্কিত ধারণায় ব্যবহার করা যাবে না। কারণ, পরমাণুর ধারণা তখনো সেকালের শীর্ষ বিজ্ঞানীরা মেনে নেননি। (আমরা মাঝে মাঝে ভুলে যাই, এক শতাব্দী আগেও বেশ বড়সংখ্যক বিজ্ঞানী জোরের সঙ্গে বলতেন, পরমাণু হলো হিসাবের সুবিধার্থে চতুর এক কৌশলমাত্র, বাস্তবে এর কোনো অস্তিত্ব নেই। পরমাণু এতই ক্ষুদ্র যে এদের সত্যিকারের কোনো অস্তিত্ব নেই বলে দাবি করতেন তাঁরা।

নিউটন প্রমাণ করেন, কোনো আত্মা বা ইচ্ছাশক্তি নয়, বরং যান্ত্রিক বল সব বস্তুর গতি নির্ধারণের জন্য যথেষ্ট। বোলজম্যান এরপর এক সরল অনুমানের ভিত্তিতে গ্যাসের বেশ কিছু অভিজাত সূত্র প্রতিপাদন করেন। তিনি বলেন, গ্যাস অতি ক্ষুদ্র পরমাণু দিয়ে গঠিত, অনেকটা বিলিয়ার্ড বলের মতো। এসব পরমাণু নিউটনের বলের সূত্রগুলো মেনে চলে। বোলজম্যানের কাছে গ্যাসভর্তি কোনো চেম্বারের অর্থ ছিল ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন অতি ক্ষুদ্র ইস্পাতের বল ভরা একটি বাক্স। এসব বল বাক্সের দেয়ালে ও সেই সঙ্গে পরস্পরের সঙ্গে ধাক্কা খায় নিউটনের গতির সূত্র মেনে। বোলজম্যান (আর জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েলও স্বাধীনভাবে প্রমাণ করেছেন) গাণিতিকভাবে প্রমাণ করেন, এই সরল অনুমান থেকে কীভাবে চোখধাঁধানো নতুন সূত্র পাওয়া যায়। এটি পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম সেরা মাস্টারপিস। সেই সঙ্গে জন্ম নেয় পদার্থবিজ্ঞানের নতুন একটা শাখা। এ শাখাটির নাম হলো স্ট্যাটিস্টিক্যাল মেকানিকস বা পারিসংখ্যানিক বলবিদ্যা।

হঠাৎ বস্তুর অনেকগুলো ধর্ম প্রথম নীতি থেকে পাওয়া গেল। নিউটনের সূত্রগুলো বলে, পরমাণুতে প্রয়োগ করতে গেলে শক্তিকে অবশ্যই অপরিবর্তনীয় হতে হবে। পরমাণুদের পরস্পরের মধ্যে সংঘর্ষে শক্তি সংরক্ষিত থাকতে হবে। এর মানে হলো, শক্তি সংরক্ষণ করবে পুরো একটি চেম্বারের ট্রিলিয়নসংখ্যক পরমাণুও। শক্তির সংরক্ষণশীলতা এখন প্রতিষ্ঠিত করা যেতে পারে। তবে তা পরীক্ষণের মাধ্যমে নয়, বরং প্রথম নীতির মাধ্যমে, অর্থাৎ পরমাণুর নিউটনিয়ান গতিবিদ্যা।

উনিশ শতকে পরমাণুর অস্তিত্ব নিয়ে তখনো ভয়ানক বিতর্ক চলছিল। নামকরা বিজ্ঞানী, যেমন দার্শনিক আর্নেস্ট মাখ তা নিয়ে প্রায়ই বিদ্রূপ করতেন। অভিমানী ও প্রায়ই বিষাদগ্রস্ত মানুষ বোলজম্যান একসময় সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন। পরমাণুবাদবিরোধীরা প্রায়ই তাঁকে ভয়ানক আক্রমণ করত। পরমাণুবাদবিরোধীদের মতে, যে জিনিস পরিমাপ করা যায় না, তার কোনো অস্তিত্বও নেই। স্বাভাবিকভাবেই এর মধ্যে ছিল পরমাণু। বোলজম্যানের জন্য আরও ভয়াবহ অবমাননাকর ব্যাপারটা ছিল, তার অনেকগুলো গবেষণাপত্র বাতিল করেন সেকালে জার্মান পদার্থবিজ্ঞান জার্নালের এক নামকরা সম্পাদক। তার কারণ ছিল, ওই সম্পাদক দাবি করতেন, পরমাণু ও অণু হলো বেশ কার্যকরী তাত্ত্বিক হাতিয়ার, কিন্তু প্রকৃতিতে এ ধরনের কোনো কিছুর সত্যিকার অস্তিত্ব নেই।

একের পর এক ব্যক্তিগত আক্রমণে ভীষণ ক্লান্তি ও তিক্ততায় ১৯০৬ সালে আত্মহত্যা করেন বোলজম্যান। তাঁর স্ত্রী ও সন্তানেরা তখন সাগরতীরে ছিলেন। দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হলো, তিনি জানতেও পারেননি মাত্র এক বছর আগে আলবার্ট আইনস্টাইন নামের এক বেপরোয়া তরুণ পদার্থবিদ সেই অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলেছেন। তিনি পরমাণুর অস্তিত্বের প্রমাণ দেখিয়ে প্রথম এক গবেষণা প্রবন্ধ লিখে ফেলেছেন—কিন্তু সে কথা ঘুণাক্ষরেও জানতে পারলেন না বোলজম্যান।

মোট এনট্রপি সর্বদা বাড়ে

বোলজম্যান ও অন্য পদার্থবিদের কাজের কারণে অবিরাম গতিযন্ত্রের প্রকৃতি স্পষ্ট হতে সহায়তা করে। আবার এ যন্ত্রকে দুটি ধরনে ভাগ করেন তাঁরাই। অবিরাম গতিযন্ত্রের প্রথম ধরনটি থার্মোডাইনামিকস বা তাপগতিবিদ্যার প্রথম সূত্রটি লঙ্ঘন করে। অর্থাৎ যন্ত্রগুলো যে পরিমাণ শক্তি ব্যবহার করে, তার চেয়ে বেশি উৎপাদন করে। সব ক্ষেত্রে পদার্থবিদেরা দেখতে পান, এ রকম অবিরাম গতিযন্ত্র অন্য কোনো গুপ্ত ও বাইরের শক্তি উৎসের ওপর নির্ভরশীল। এটি হয় ধোঁকাবাজি, নয়তো উদ্ভাবকেরা বাইরের শক্তি উৎসের কথা জানেন না।

অবিরাম গতিযন্ত্রের দ্বিতীয় ধরনটি আরও বেশি জটিল। এগুলো শক্তির সংরক্ষণশীলতার সূত্র বা তাপগতিবিদ্যার প্রথম সূত্র মেনে চলে, কিন্তু দ্বিতীয় সূত্রটি লঙ্ঘন করে। তাত্ত্বিকভাবে দ্বিতীয় ধরনের অবিরাম গতিযন্ত্র অপচয় করার মতো কোনো তাপ তৈরি করে না। কাজেই এটি ১০০ ভাগ সুদক্ষ। কিন্তু দ্বিতীয় সূত্রটি মতে, এ ধরনের কোনো যন্ত্র থাকা অসম্ভব। অর্থাৎ অপচয় করার মতো তাপ অবশ্যই সব সময় তৈরি হবে। তাই সর্বদা বাড়তে থাকবে মহাবিশ্বের বিশৃঙ্খলা বা ক্যাওয়াস বা এনট্রপি। একটা যন্ত্র কতটা দক্ষ, তাতে কিছু যায় আসে না, যন্ত্রটি সর্বদাই কিছু তাপ অপচয় করবেই। মহাবিশ্বের এনট্রপি বেড়ে যাবে তাতে।

সর্বমোট এনট্রপি যে সর্বদা বাড়ে, এই সত্যটা লুকিয়ে আছে মানবজাতির ইতিহাসের গভীর। একইভাবে আছে প্রকৃতির মধ্যেও। দ্বিতীয় সূত্র মোতাবেক কোনো কিছু বানানোর চেয়ে ধ্বংস করা অনেক সহজ। কোনো কিছু তৈরি করতে যদি কয়েক হাজার বছর লাগে (যেমন মেক্সিকোর অ্যাজটেক সাম্রাজ্য), তা মাত্র কয়েক মাসেই ধ্বংস করে ফেলা যায়। ইতিহাস সাক্ষী, স্প্যানিশ বিজেতার একদল লুটেরা সশস্ত্র ঘোড়া নিয়ে অ্যাজটেক সাম্রাজ্য পুরোপুরি ধুলোর সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছিল।

যতবারই আয়নার দিকে তাকাবেন, ততবারই নতুন কোনো ব্রণ বা একটি সাদা চুল চোখে পড়বে আপনার। এখানেও দ্বিতীয় সূত্রের প্রভাব দেখা যায়। জীববিজ্ঞানীরা বলেন, বয়স হওয়ার প্রক্রিয়াটা হলো, আমাদের কোষ ও জিনের ভেতর জিনগত ত্রুটিগুলো ক্রমান্বয়ে ভিড় করতে থাকে। কোষের কাজ করার সক্ষমতা ধীরে ধীরে কমতে থাকে সে কারণে। বয়স হওয়া, মরিচা ধরা, পচে যাওয়া, ক্ষয় হওয়া, খণ্ডিত হওয়া ও চুপসে যাওয়া—সবগুলোই তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্রের উদাহরণ।

দ্বিতীয় সূত্রের প্রকৃতি উল্লেখ করে জ্যোতির্বিদ আর্থার এডিংটন একবার বলেন, ‘এনট্রপি সর্বদা বাড়ছে, এই সূত্রের অবস্থান প্রকৃতির সব সূত্রের মধ্যে শীর্ষে বলেই আমার ধারণা। আপনার তত্ত্ব যদি তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্রের বিরোধী প্রমাণিত হয়, তাহলে আপনার জন্য কোনো আশার বাণী শোনাতে পারছি না। কারণ, এ রকম কিছুই থাকতে পারে না। বরং তা গাঢ় কলঙ্কের অতলে তলিয়ে যাবে।’

কিছু উদ্যমী ইঞ্জিনিয়ার (ও চতুর প্রতারক) এখনো অবিরাম গতিযন্ত্র উদ্ভাবনের ঘোষণা দিয়েই যাচ্ছে। সম্প্রতি ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল আমাকে এক উদ্ভাবকের ব্যাপারে মন্তব্য করার অনুরোধ জানিয়েছিল। ওই উদ্ভাবক তাঁর বানানো যন্ত্রের পেছনে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ঢালতে বিনিয়োগকারীদের রাজি করিয়ে ফেলেছেন। এ ব্যাপারে চাঞ্চল্যকর প্রবন্ধ প্রকাশ করে শীর্ষ কয়েকটি বাণিজ্যিক পত্রিকা। সেগুলো লিখেছিলেন বিজ্ঞানে কোন অভিজ্ঞতা না থাকা সাংবাদিকেরা। সম্ভাবনাময় উদ্ভাবন যে বিশ্বকে পাল্টে দেবে (আর এই প্রক্রিয়ায় আকর্ষণীয় লাভ আসতে থাকবে), সেটিই ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে লেখেন তাঁরা। হেডলাইনে লেখা ছিল, ‘জিনিয়াস অর ক্র্যাকপট?

বিনিয়োগকারীরা কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ ঢেলেছিলেন এই যন্ত্রের পেছনে। কিন্তু আমাদের হাইস্কুলে পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নের যেসব মৌলিক সূত্র শেখানো হয়েছে, তার বেশির ভাগই লঙ্ঘন করে এই যন্ত্র। (একটা লোক জোচ্চুরি করছে, এটা দেখে আমি মর্মাহত হইনি; কারণ, এটা তো কালের শুরু থেকেই হয়ে আসছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপারটি ছিল, ওই উদ্ভাবক কতিপয় ধনী বিনিয়োগকারীকে বোকা বানাতে পেরেছিলেন; কারণ, তাদের মৌলিক পদার্থবিজ্ঞানের জ্ঞানটুকু নেই।) আমি ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে সেই আগের প্রবাদটিই শুনিয়েছিলাম, ‘আ ফুল অ্যান্ড হিজ মানি আর ইজিলি পার্টেড।’ এর সঙ্গে ছিল পি টি বারনামের বিখ্যাত সেই উক্তি, ‘দেয়ারস আ সাকার বর্ন এভরি মিনিট।’ ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস, ইকোনমিস্ট এবং ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল—সবাই মিলে অবিরাম গতিযন্ত্র নিয়ে বিভিন্ন উদ্ভাবক যেসব প্রতারণা করেছেন, তা নিয়ে যদি বড় ধরনের ফিচার ছাপত, তাহলে খুব ভালো হতো।

তিনটি সূত্র ও প্রতিসাম্য

এসবই গভীর এক প্রশ্ন উত্থাপন করে : তাপগতিবিদ্যার এই কঠিন সূত্রগুলো কেন মেনে চলতে হয়? এটি এমন এক রহস্য, যা সূত্রগুলো প্রথম প্রস্তাবিত হওয়ার পর থেকেই বিজ্ঞানীদের কৌতূহলী করে আসছে। আমরা যদি এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারি, তাহলে হয়তো সূত্রগুলোর মধ্যে কোনো ফাঁক খুঁজে পেতেও পারি। তারপর তা প্রয়োগের মাধ্যমে দুনিয়া উল্টেপাল্টে যেতে পারে।

শক্তির সংরক্ষণশীলতার নীতির সত্যিকারের জন্ম সম্পর্কে আমি জেনেছিলাম গ্র্যাজুয়েট স্কুলে। সেদিন সত্যি সত্যিই বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম মৌলিক নীতি (আবিষ্কার করেন গণিতবিদ এমি নোয়েথার, ১৯১৮ সালে) হলো, কোনো সিস্টেম সিমেট্রি বা প্রতিসাম্য প্রক্রিয়ার মধ্যে গেলে ফলস্বরূপ সংরক্ষণশীলতার সূত্র পাওয়া যায়। মহাবিশ্বের সূত্রগুলো যদি সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে একটি দারুণ ফলাফল পাওয়া যায়। ফলাফলটি হলো সিস্টেমটি শক্তির সংরক্ষণ করে। (আবার যেকোনো দিকে চলাচল করলেও পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলো একই থাকে, তাহলে যেকোনো দিকেই একইভাবে ভরবেগ সংরক্ষিত হয়। আর কোনো ঘূর্ণনের ভেতর পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র যদি একই হয়, তাহলে কৌণিক ভরবেগ সংরক্ষিত হয়।)

এ বিষয়টি আমাকে বেশ অবাক করেছিল। বুঝতে পারলাম, বিলিয়ন বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরের গ্যালাক্সিগুলো (দৃশ্যমান মহাবিশ্বের প্রায় কিনারার কাছে) থেকে আসা কোনো নক্ষত্রের আলো যখন আমরা বিশ্লেষণ করি, তখন আমরা আলোর যে স্পেকট্রাম বা বর্ণালি পাই, তা পৃথিবীতে পাওয়া বর্ণালির মতো একই রকম। অতীতের আলোর এই ধ্বংসাবশেষ, যা পৃথিবী বা সূর্যের জন্মের কয়েক বিলিয়ন বছর আগে নিঃসৃত হয়েছিল। এই আলোতেও আমরা বর্তমানের পৃথিবীতে পাওয়া হাইড্রোজেন, হিলিয়াম, কার্বন, নিয়ন ও অন্যান্য মৌলের একই রকম নির্ভুল ফিঙ্গারপ্রিন্ট দেখতে পাই। তার মানে হলো, গত কয়েক বিলিয়ন বছরে পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক সূত্রগুলোর কোনো পরিবর্তন হয়নি। এমনকি সূত্রগুলো মহাবিশ্বের বহিঃস্থ প্রান্তদেশেও ধ্রুব সত্য।

আমি বুঝতে পারলাম, সর্বনিম্ন ধরলেও নোয়েথার থিওরেম বা উপপাদ্যের অর্থ হলো, শক্তির সংরক্ষণশীলতা হয়তো আগামী কয়েক বিলিয়ন বছরে টিকে থাকবে। হয়তো চিরকাল তা না-ও থাকতে পারে। আমরা যতটুকু জানি, তাতে মনে হয় না পদার্থবিজ্ঞানের কোনো মৌলিক সূত্র সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায়। আর এ কারণেই শক্তি সংরক্ষিত থাকে।

আধুনিক পদার্থবিদ্যায় নোয়েথার উপপাদ্যের প্রয়োগ অনেক গভীর। পদার্থবিদেরা যখনই নতুন তত্ত্ব প্রতিপাদন করেন, সেটি মহাবিশ্বের উৎপত্তি, কোয়ার্ক ও অন্যান্য অতিপারমাণবিক কণাদের মিথস্ক্রিয়া কিংবা প্রতিকণা সম্পর্কে কিছু বলুক বা না-বলুক, আমরা প্রথমেই ওই সিস্টেম যে প্রতিসাম্যতা মেনে চলে তা দিয়ে শুরু করি। আসলে সিমেট্রি বা প্রতিসাম্য এখন নতুন তত্ত্ব প্রতিপাদনে মৌলিক পথপ্রদর্শক নীতি হিসেবে পরিচিত। অথচ অতীতে প্রতিসাম্যকে একটি তত্ত্বের উপজাত হিসেবে মনে করা হতো। তখনকার বিশ্বাস ছিল, এটি চমৎকার কিন্তু তত্ত্বের জন্য চূড়ান্তভাবে অপ্রয়োজনীয় বৈশিষ্ট্য। এখন আমরা বুঝতে পারি, প্রতিসাম্যগুলো যেকোনো তত্ত্বকে সংজ্ঞায়িত করার জন্য প্রয়োজনীয় ধর্ম। নতুন তত্ত্ব প্রতিপাদনে, আমরা পদার্থবিদেরা প্রথমে প্রতিসাম্য দিয়ে শুরু করি, তারপর তার চারদিকে তত্ত্বটি গঠন করি।

(দুঃখজনক ব্যাপার হলো, স্বীকৃতির জন্য বোলজম্যানের মতোই এমি নোয়েথারকে চরম লড়াই করতে হয়েছে। নারী গণিতবিদ হওয়ার কারণে শীর্ষস্থানীয় কোনো প্রতিষ্ঠানে তাঁর স্থায়ী পদ একের পর এক প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল। নোয়েথারের গুরু ছিলেন গণিতবিদ ডেভিড হিলবার্ট। নোয়েথারকে শিক্ষক হিসেবে কোথাও নিশ্চিত পদ দিতে ব্যর্থ হয়ে তিনি খুবই হতাশ হন। সে কারণে তিনি বিস্মিত হয়ে একবার বলেছিলেন, ‘আমরা আসলে কী, বিশ্ববিদ্যালয়, নাকি কোনো বেদিং সোসাইটি।)

এর মাধ্যমে এক বিব্রতকর প্রশ্নের উদয় হয়। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলো পরিবর্তন না হওয়ার কারণে শক্তি যদি সংরক্ষিত হয়, তাহলে এই প্রতিসাম্যতা কি বিরল? অস্বাভাবিক কোনো পরিস্থিতিতে তা কি ভেঙে যেতে পারবে? মহাজাগতিক পরিসরে শক্তির সংরক্ষণশীলতা লঙ্ঘিত হওয়ার এখনো সম্ভাবনা রয়েছে, যদি আমাদের সূত্রগুলোর প্রতিসাম্যতা কোনো বাইরের ও অনাকাঙ্ক্ষিত জায়গায় ভেঙে যায়।

পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কিংবা দূরত্বের সঙ্গে পরিবর্তন হলে এটি ঘটতে পারে। (আসিমভের উপন্যাস দ্য গডস দেমসেলভস-এ এই প্রতিসাম্যতা ভেঙে গিয়েছিল। কারণ, স্থানে সৃষ্ট একটি ছিদ্র আমাদের মহাবিশ্বের সঙ্গে সংযুক্ত করেছিল অন্য এক সমান্তরাল মহাবিশ্বকে। পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলো স্থানের মধ্যে ওই ছিদ্রের আশপাশে বদলে দেয়। তাতে ভেঙে পড়ে তাপগতিবিদ্যার সূত্রগুলো। কাজেই শক্তির সংরক্ষণশীলতা লঙ্ঘিত হতে পারে, যদি স্থানে ওয়ার্মহোলের মতো কোনো ছিদ্র থাকে।)

এতে আরেকটি ত্রুটিও আছে, যেটি নিয়ে বর্তমানে বিতর্ক চলছে যে শক্তি হয়তো শূন্য থেকেও আসতে পারে।

শূন্য থেকে শক্তি?

একটি লোভনীয় প্রশ্ন হলো, শূন্য থেকে কি শক্তি নিঃসরণ করা সম্ভব? পদার্থবিদেরা অতি সম্প্রতি বুঝতে পেরেছেন যে ভ্যাকুয়াম বা শূন্যস্থান আসলে মোটেও খালি নয়, বরং সেখানে জোড়বদ্ধ সক্রিয়তা বর্তমান।

এই আইডিয়ার অন্যতম প্রস্তাবক হলেন বিশ শতকের পাগলাটে জিনিয়াস নিকোলা টেসলা। টমাস এডিসনের যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন তিনি। জিরো পয়েন্ট এনার্জি বা শূন্য বিন্দু শক্তিরও অন্যতম প্রস্তাবক টেসলা। ধারণাটি হলো, শূন্যস্থানে হয়তো অকল্পনীয় পরিমাণ শক্তি রয়েছে। সেটি সত্যি হলে শূন্যস্থান হয়ে উঠতে পারে চূড়ান্ত ‘ফ্রি লাঞ্চ’। আক্ষরিক অর্থেই এটি তখন পাতলা বাতাস থেকে সীমাহীন শক্তি সরবরাহ করতে পারবে। শূন্যস্থান শূন্য ও বস্তুহীন হওয়ার বদলে হয়ে উঠবে বিপুল শক্তির আধার।

বর্তমানের সার্বিয়ার ছোট্ট এক শহরে জন্মেছিলেন টেসলা। ১৮৮৪ সালে তিনি যখন যুক্তরাষ্ট্রে এলেন, তখন তাঁর পকেটে বলতে গেলে কোনো ফুটো পয়সাও নেই। বেশ দ্রুতই টমাস এডিসনের সহকারী হলেন তিনি। কিন্তু তাঁর মেধার কারণেই তিনি একসময় টমাস এডিসনের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠেন। বিখ্যাত এক প্রতিযোগিতায় (ইতিহাসবিদেরা যাকে বলেন ‘বিদ্যুতের যুদ্ধ’) এডিসনের বিরুদ্ধে জিতে যান টেসলা। এডিসন বিশ্বাস করতেন, ডাইরেক্ট কারেন্ট (ডিসি) মোটর দিয়ে তিনি গোটা বিশ্বকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারবেন। অন্যদিকে টেলসা ছিলেন অল্টারনেটিং কারেন্টের (এসি) স্রষ্টা। তিনি বেশ সফলতার সঙ্গে প্রমাণ করতে পারেন যে তাঁর পদ্ধতিটি এডিসনের তুলনায় অনেক বেশি ভালো। আবার তাঁর পদ্ধতিতে দূরবর্তী স্থানে বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রেই কম শক্তি অপচয় হয়। বর্তমানে আমাদের পুরো গ্রহটিতে বিদ্যুৎ সরবরাহের ভিত্তির পেটেন্ট এডিসনের নয়, বরং টেসলার।

টেসলার উদ্ভাবন ও পেটেন্টসংখ্যা সাত শতাধিক। এর মধ্যে রয়েছে আধুনিক বিদ্যুতের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু মাইলফলক। ইতিহাসবিদেরা এমন এক বিশ্বাসযোগ্য ঘটনাও হাজির করেছেন যে গুগলিমো মার্কনির (রেডিওর উদ্ভাবক হিসেবে তিনিই সুপরিচিত) আগেই রেডিও উদ্ভাবন করেছিলেন টেসলা। আবার উইলহেম রন্টজেনের আগেই কার্যকরী এক্স-রে আবিষ্কার করেছিলেন তিনি। (মার্কনি ও রন্টজেন উভয়েই পরে যেগুলোর কারণে নোবেল পুরস্কার পান, সেগুলো উদ্ভাবন সম্ভবত অনেক আগেই করেছিলেন টেসলা।)

টেসলা বিশ্বাস করতেন, শূন্যস্থান থেকে তিনি সীমাহীন শক্তি নিঃসরণ করতে পারবেন। কিন্তু এ দাবি তিনি দুর্ভাগ্যক্রমে তাঁর নোটে প্রমাণ করতে পারেননি। প্রথমেই জিরো পয়েন্ট এনার্জি (কিংবা শূন্যস্থানে থাকা শক্তি) তাপগতিবিদ্যার প্রথম সূত্র লঙ্ঘন করে বলে মনে হয়। অবশ্য জিরো পয়েন্ট এনার্জি নিউটনিয়ান বলবিদ্যাকে অমান্য করে। জিরো পয়েন্ট এনার্জি ধারণাটি সম্প্রতি অভিনব একটি দিক থেকে নতুন করে উত্থাপিত হয়েছে।

বর্তমানে পৃথিবীর চারপাশে ঘোরা স্যাটেলাইটের (যেমন ডব্লিউএমএপি স্যাটেলাইট) তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে বিস্ময়কর এক সিদ্ধান্ত পৌঁছাতে বাধ্য হয়েছেন বিজ্ঞানীরা। সিদ্ধান্তটি হলো, মহাবিশ্বের ৭৩ শতাংশ ডাক এনার্জি বা গুপ্তশক্তি দিয়ে তৈরি। অর্থাৎ বিশুদ্ধ ভ্যাকুয়ামের শক্তি। এর অর্থ হলো, গোটা মহাবিশ্বে শক্তির বিপুল আধার হলো শূন্যস্থান, যা মহাবিশ্বে ছায়াপথগুলো আলাদা করে রেখেছে। (গুপ্তশক্তি এতই বেশি যে এরা ছায়াপথগুলোকে পরস্পরের কাছ থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। আবার মহাবিশ্বকে একসময় বিগ ফ্রিজ অবস্থায় নিয়ে যাবে এই গুপ্তশক্তি।)

মহাবিশ্বের সব জায়গাতেই গুপ্তশক্তি ছড়িয়ে আছে। এমনকি আপনার বসার ঘরে আর আপনার দেহের ভেতরেও আছে গুপ্তশক্তি। মহাকাশে গুপ্তশক্তির পরিমাণ প্রকৃত অর্থেই অতিমাত্রায়। সব নক্ষত্র ও ছায়াপথের সব শক্তি একত্র করলেও তার চেয়ে বেশি হবে গুপ্তশক্তি। আমরা পৃথিবীর গুপ্তশক্তির পরিমাণ গণনা করতে পারি। এর পরিমাণ এতই অল্প যে তা দিয়ে অবিরাম গতিযন্ত্রে ব্যবহার করা যাবে না। টেসলা গুপ্তশক্তি সম্পর্কে সঠিক ছিলেন, কিন্তু পৃথিবীতে গুপ্তশক্তির পরিমাণ সম্পর্কে তাঁর ভাবনায় ত্রুটি ছিল।

আসলেই কি তিনি ভুল ছিলেন?

আধুনিক পদার্থবিদ্যায় সবচেয়ে বিব্রতকর ফাঁকটি হলো এখন পর্যন্ত কেউই গুপ্তশক্তির পরিমাণ নির্ণয় করতে পারেনি। স্যাটেলাইট ব্যবহার করে এটা পরিমাপ করা যায়। পারমাণবিক পদার্থবিদ্যার সর্বশেষ তত্ত্ব ব্যবহার করে গুপ্তশক্তির পরিমাণ নির্ণয় করতে গেলে এমন একটি সংখ্যায় পৌঁছায়, যাতে ভুলের পরিমাণের ফ্যাক্টর ১০১২০, অর্থাৎ ১-এর পর ১২০টি শূন্য! পুরো পদার্থবিজ্ঞানে তত্ত্ব ও পরীক্ষার মধ্যে সবচেয়ে বড় ধরনের অসংগতি এটি।

সমস্যাটি হলো, কেউই জানে না ‘শূন্য শক্তি’ কীভাবে গণনা করতে হয়। পদার্থবিজ্ঞানে এটি এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন (কারণ, এটিই ক্রমেই মহাবিশ্বের ভাগ্য নির্ধারণ করবে)। কিন্তু একে কীভাবে গণনা করতে হবে, সে ব্যাপারে বর্তমানে আমরা কোনো হদিস জানি না। কোনো তত্ত্বই ডার্ক এনার্জি বা গুপ্তশক্তিকে ব্যাখ্যা করতে পারে না। অবশ্য এর অস্তিত্বের পরীক্ষামূলক প্রমাণের ব্যাপারে নিঃসন্দেহ হওয়া গেছে।

কাজেই টেসলার সন্দেহমতোই শূন্যস্থানে শক্তির অস্তিত্ব আছে। কিন্তু এই শক্তিকে ব্যবহারোপযোগী কোনো শক্তির উৎস হিসেবে ব্যবহারের জন্য তার পরিমাণ হয়তো খুব অল্প। ছায়াপথগুলোর মধ্যে বিপুল পরিমাণ গুপ্তশক্তি থাকলেও পৃথিবীতে এই শক্তি খুবই অল্প। কিন্তু এই শক্তি পরিমাপের পদ্ধতি, কিংবা শক্তিটি কোথা থেকে এল—সেসব সম্পর্কে কেউ এখনো কিছু জানে না। এটিই এখন সবচেয়ে ব্রিবতকর ব্যাপার।

আমার মতে, শক্তির সংরক্ষণশীলতা আসে মহাজাগতিক গভীর কোনো কারণে। এসব সূত্রের লঙ্ঘনের অর্থ, মহাবিশ্বের বিবর্তন সম্পর্কে আমাদের উপলব্ধিতে গভীর পরিবর্তন দরকার। আর গুপ্তশক্তির রহস্য পদার্থবিদদের এ প্রশ্নটি নিয়ে ভাবতে বাধ্য করছে।

সত্যিকারের একটা অবিরাম গতিযন্ত্র বানানোর জন্য মহাজাগতিক পরিসরে পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক সূত্রগুলো নিয়ে আমাদের নতুন করে মূল্যায়ন করতে হবে। সে কারণে অবিরাম গতিযন্ত্রকে আমি তৃতীয় শ্রেণির অসম্ভাব্যতা হিসেবে গণ্য করেছি। এর মানে, এটি হয় সত্যি সত্যিই অসম্ভব, নয়তো এ ধরনের যন্ত্র বানানোর জন্য মহাজাগতিক পরিসরে মৌলিক পদার্থবিজ্ঞান সম্পর্কে আমাদের উপলব্ধিটি মৌলিকভাবে পরিবর্তন করতে হবে। আধুনিক বিজ্ঞানের অন্যতম বড় অসমাপ্ত অধ্যায়ের নাম গুপ্তশক্তি।

তথ্যনির্দেশ

ভাস্কর : আসল নাম ভাস্করাচার্য। তিনি দ্বিতীয় ভাস্কর নামেও পরিচিত। এই গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিদ ১১১৪ সালে ভারতের বিজাপুরে (বর্তমানে কর্ণাটক জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর সেরা কাজের মধ্যে রয়েছে গণিতের বই সিদ্ধান্ত শিরোমণি। ৩৬ বছর বয়সে সংস্কৃত ভাষায় বইটি লেখেন তিনি। বইটির চারটি ভাগের মধ্যে একটির নাম লীলাবতী, যা তাঁর মেয়ের নামে নামকরণ করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। মৃত্যু ১১৮৫ সালে। ১১৫০ সালের দিকে তিনি এমন একটি চাকার কথা বলেন, যা চিরকাল ঘুরতে থাকবে বলে দাবি করেন।

তাপগতিবিদ্যা : কোনো গতিশীল ভৌত সিস্টেমে শক্তি, কাজ, তাপ এবং এনট্রপির মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করা। তাপগতিবিদ্যা আসলে গ্যাসের গাণিতিক পদার্থবিজ্ঞান। বড় পরিসরে গ্যাসের অণুগুলোর পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া যে তাপমাত্রা ও চাপের সৃষ্টি হয়, তার ব্যাখ্যা করে এটি। এই বিষয়টি প্রকৃতির একগুচ্ছ সূত্র দিয়ে শুরু হয়, যাদের সঙ্গে তাপমাত্রা, চাপ ও আয়তন জড়িত। তাপগতিবিদ্যার তিনটি সূত্র আছে।

রেডিওর উদ্ভাবক : বিশ্বের সবাই জানে রেডিওর উদ্ভাবক মার্কনি। কিন্তু মার্কনির অন্তত এক বছর আগেই রেডিও উদ্ভাবন করেছিলেন বাঙালি বিজ্ঞানী স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু। ১৮৯৪ সালে ভারতের কলকাতায় তিনি জনসমক্ষে রেডিও তরঙ্গের ব্যবহার দেখান। কিন্তু তাঁর যন্ত্রের পেটেন্ট করতে রাজি হননি। অন্যদিকে এর এক বছর পর রেডিও তরঙ্গ নিয়ে কাজ করেন মার্কনি।

গুপ্তশক্তি : কসমোলজি ও জ্যোতির্বিদ্যায় ডাক এনার্জি বা গুপ্তশক্তি হলো অজানা ধরনের কোনো শক্তি। এই শক্তির কারণে মহাবিশ্ব প্রসারিত হচ্ছে বলে ধারণা করা হয়। মহাবিশ্বের আমাদের জানা পদার্থের পরিমাণ মাত্র ৫ শতাংশ। আর বাকি ২৩ শতাংশ ডার্ক ম্যাটার বা গুপ্তবস্তু, আর ৭২ শতাংশই গুপ্তশক্তি।

ডিসি : ডাইরেক্ট কারেন্ট বা অপরিবর্তনশীল বিদ্যুৎ। এর মান বা দিকের কোনো পরিবর্তন হয় না।

এসি : অল্টারনেটিং কারেন্ট বা পরিবর্তনশীল বিদ্যুৎ। এখানে বিদ্যুৎপ্রবাহের দিক নির্দিষ্ট সময় পরপর বিপরীত দিকে যায়।

এনট্রপি : এনট্রপি হচ্ছে একটি সিস্টেমের এলোমেলো বা বিশৃঙ্খলার পরিমাপ। যে সিস্টেম যত এলোমেলো, তার এনট্রপি তত বেশি। তাপগতিবিদ্যার সূত্রমতে, মহাবিশ্বের সব বস্তুর মধ্যেই কিছু না কিছু এনট্রপি জড়িত। এতে যখনই কোনো প্রতিক্রিয়া ঘটে, তখনই তার এনট্রপি বেড়ে যায়। এনট্রপি বেড়ে যাওয়ার অর্থ হলো, বস্তুর ভেতরের অণু-পরমাণুগুলো আর এলোমেলো বা বিশৃঙ্খল হওয়া। বিজ্ঞানী বোলজম্যানের মতে, এনট্রপি একটি সম্ভাবনা।

বর্ণালি : উপাদানের কম্পাঙ্ক, যা একটি তরঙ্গের সৃষ্টি করে। সূর্যের দৃশ্যমান অংশের বর্ণালি মাঝেমধ্যে রংধনু হিসেবে দেখা যায়।

ইথার : একটি হাইপোথেটিক্যাল অবস্তুগত মাধ্যম, যা পুরো স্থানে বিরাজমান বলে একসময় ধারণা করা হতো। এই মাধ্যমে বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় বিকিরণের বিস্তারের জন্য এই মাধ্যম প্রয়োজন বলে মনে করা হতো। তবে এই ধারণা এখন বাতিল করা হয়েছে।

১৫. ভবিষ্যৎ দেখার ক্ষমতা

একটা প্যারাডক্স সবার মনোযোগ আকর্ষণ করতে সত্যের মাথায় ওপর চড়ে বসে।

—নিকোলাস ফলেটা

প্রিকগনিশন বা ভবিষ্যৎ দেখা বলে কি সত্যিই কিছু আছে? প্রাচীন এই ধারণা সেই গ্রিক ও রোমানদের ওরাকল এবং ওল্ড টেস্টামেন্টে বর্ণিত নবীদেরসহ প্রতিটি ধর্মেই দেখা যায়। কিন্তু ভবিষ্যৎ বলার ক্ষমতা উপহার দেওয়া অনেক সময় অভিশাপেও পরিণত হতে দেখা যায় এসব গল্পে। গ্রিক পুরাণে ক্যাসান্ড্রার একটি গল্প পাওয়া যায়। ক্যাসান্ড্রা ছিল ট্রয়ের রাজার কন্যা। তার রূপের কারণে সে সূর্যদেবতা অ্যাপোলোর নজরে পড়ে। তাকে জয় করতে অ্যাপোলো তাকে ভবিষ্যৎ দেখার ক্ষমতা দান করে। কিন্তু ক্যাসান্ড্রা অ্যাপালোকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে বসে। ভীষণ রেগে অ্যাপোলো তার দানটি উল্টে দেয়। ফলে ক্যাসান্ড্রা ভবিষ্যৎ দেখতে পায় ঠিকই, কিন্তু কেউই তাকে আর বিশ্বাস করে না। ক্যাসান্ড্রা যখন ট্রয়বাসীকে তাদের আসন্ন ধ্বংস সম্পর্কে সতর্ক করল, স্বভাবত তা বিশ্বাস করল না কেউ। এমনকি সে ট্রোজান ঘোড়ার প্রতারণা, আগামেমননের মৃত্যু, এমনকি তার নিজের মৃত্যু সম্পর্কেও ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল। কিন্তু তার কথা আমলে না নিয়ে ট্রয়বাসী ভাবল, সে হয়তো পাগল হয়ে গেছে। সে কারণে তাকে বন্দী করে রাখল তারা।

ষোলো শতকে নস্ত্রাদামাস আর অতিসম্প্রতি এডগার সিসি দাবি করেছেন, তাঁরা সময়ের পর্দা উঠিয়ে ভবিষ্যৎ দেখতে পারেন। অবশ্য এ ধরনের অনেক দাবি আছে যে তাঁদের ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি হয়েছে (যেমন তাঁরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সম্পর্কে, কেনেডির হত্যা ও সমাজতন্ত্রের পতন সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন)। অস্পষ্ট, রূপকের মাধ্যমে তাঁরা অসংখ্য পঙ্ক্তি লিখে গেছেন, যা বিভিন্ন ধরনের স্ববিরোধিতায় ভরা। যেমন নস্ত্রাদামাসের চার লাইনের পদ্য এতই সাধারণ যে তার মধ্যে যে কেউ ইচ্ছেমতো কিছু ভেবে নিতে পারবে (লোকজন আসলে তা-ই করে)। তাঁর লেখা চার লাইনের একটি পদ্য নিচে দেওয়া হলো :

ওয়ার্ল্ড সেন্টার থেকে ঝলসে উঠবে দুনিয়াকাঁপানো আগুন : ‘নিউ সিটি’র চারপাশে শিহরিত হবে পৃথিবী অর্থহীন এক যুদ্ধের মূল্য চুকাতে হবে বিশাল দুটো লম্বকে বসন্তের দেবী বেরিয়ে আসবে নতুন, লাল এক নদী থেকে।

অনেকে দাবি করে, এই চার লাইনের পদ্যে নস্ত্রাদামাস ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ার ধ্বংসের ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। অথচ অন্য শতাব্দীতে এই একই পদ্যটিকে অন্য কিছু ঘটনার ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে দাবি করা হতো। এতে যে ছবিটি পাওয়া যায়, তা এতই অস্পষ্ট যে তাকে সম্ভাব্য সব রকম ব্যাখ্যা করা সম্ভব।

যারা রাজাদের ও সাম্রাজ্যের পতন নিয়ে নাটক লেখেন, সেসব নাট্যকারের কাছে ভবিষ্যদ্বাণী এক প্রিয় হাতিয়ার। শেক্সপিয়ারের ম্যাকবেথ নাটকে ভবিষ্যদ্বাণী প্রধান বিষয়বস্তু। আবার ম্যাকবেথেরও প্রধান বিষয়বস্তু বা আরাধ্য ওই ভবিষ্যদ্বাণী। ওই নাটকে ম্যাকবেথ ডাইনিদের মুখোমুখি হয়। সে স্কটল্যান্ডের রাজা হবে, সেই ভবিষ্যদ্বাণী করে ডাইনিরা। ডাইনিদের ভবিষ্যদ্বাণীতে খুনে এক আকাঙ্ক্ষায় উদীপ্ত হয়ে সে তার শত্রুদের ভয়ানক ও বীভৎসভাবে খতম করতে শুরু করে। তার হত্যার তালিকায় বাদ যায়নি তার প্রতিদ্বন্দ্বী ম্যাকডাফের নিষ্পাপ স্ত্রী ও সন্তানেরাও।

রাজমুকুট ছিনিয়ে নিতে একের পর এক ভয়ানক সব কাজ করতে থাকে। একসময় ডাইনিদের কাছ থেকে ম্যাকবেথ জানতে পারে, সে যুদ্ধে পরাজিত হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না বিনাম জঙ্গল থেকে ডানসিনান পাহাড় তার বিরুদ্ধে এসে না দাঁড়াবে। পাশাপাশি নারীর মাধ্যমে প্রসব করা কেউই ম্যাকবেথের ক্ষতি করতে পারে। এই ভবিষ্যদ্বাণীতে বেশ স্বস্তি পায় ম্যাকবেথ। কারণ, জঙ্গল তো আর নড়াচড়া করতে পারে না। আর সব মানুষই তো প্রসব হয় নারীর মাধ্যমেই। কিন্তু বির্নামের বিশাল জঙ্গল নড়াচড়া করতে দেখা গেল একসময়। কারণ, ম্যাকডাফের সেনাবাহিনী বিনাম জঙ্গলের ডালপালা দিয়ে ছদ্মবেশ নিয়ে ম্যাকবেথের দিকে এগিয়ে আসছিল। আবার স্বয়ং ম্যাকডাফ জন্মেছিল সিজার অপারেশনের মাধ্যমে।

অতীতে যেসব ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে, তাতে অনেক বেশি বিকল্প ব্যাখ্যা থাকে। তাই সেগুলো পরীক্ষা করে দেখা অসম্ভব। তবু এসব ভবিষ্যদ্বাণীকে সহজে বিশ্লেষণ করা যায়। ডুমসডে বা পৃথিবীর শেষ দিবসের নির্দিষ্ট তারিখের অনুমান করে বাইবেলের শেষ অধ্যায় বা রেভেলেশনে পৃথিবীর শেষ দিনের বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া আছে। যখন বিশৃঙ্খলা ও ধ্বংস আসবে খ্রিষ্টবিরোধীর আগমনের সঙ্গে সঙ্গে আর তখনই খ্রিষ্টানদের চূড়ান্ত মুহূর্তটি আসবে। মৌলবাদীরা শেষ দিনের সুনির্দিষ্ট তারিখ অনুমানের চেষ্টা করেছেন অনেক দিন ধরে।

ডুমসডে সম্পর্কে অন্যতম বিখ্যাত ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল জ্যোতিষীরা। তাঁরা বলল, বড় ধরনের এক বন্যায় ১৫২৪ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে। তাঁদের এই ভবিষ্যদ্বাণীর ভিত্তি ছিল আকাশের সব গ্রহ বা বুধ, শুক্র, মঙ্গল, বৃহস্পতি ও শনি যুগপৎ একই রেখায় আসা। এতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে গোটা ইউরোপে। মরিয়া হয়ে ইংল্যান্ডে নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে যায় ২০ হাজার মানুষ। সেন্ট বার্থোলোমিউ গির্জার চারপাশে দুর্গের মতো করে দুই মাস চলার মতো খাবার ও পানীয়ের মজুত করা হয়। বন্যা থেকে বাঁচতে জার্মানি ও ফ্রান্সজুড়ে লোকজন বড় ধরনের নৌকা বানাতে শুরু করে। এই ঐতিহাসিক ঘটনার আশঙ্কায় কাউন্ড ভন ইগলেহেম বানিয়ে ফেলেন তিনতলা সমান বিশাল এক নৌকা। কিন্তু সত্যি সত্যিই যখন দিনটি এল, তখন শুধু সামান্য বৃষ্টি ঝরে পড়তে দেখা গেল। এতে জনগণের মনের আতঙ্ক হঠাৎ রাগে পরিণত হলো। যেসব মানুষ তাদের সহায়-সম্বল সব বিক্রি করে ফেলেছিল, সব হারিয়ে নিজেদের প্রতারিত ভাবতে লাগল তারা। বিক্ষুব্ধ জনতা সন্ত্রাসে লিপ্ত হলো। কাউন্টকে পাথর ছুড়ে হত্যা করল তারা। কয়েক শ জনতা মারা গেল পদপৃষ্ট হয়ে।

ভবিষ্যদ্বাণীর মায়ায় যে শুধু খ্রিষ্টানরাই জড়িয়েছে, তা নয়। ১৬৪৮ সালে ধনী ইহুদি স্মিরনার ছেলে সাবাতাই জেভি একবার নিজেকে মসিহ বলে দাবি করে বসেন। তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করলেন, পৃথিবী ধ্বংস হবে ১৬৬৬ সালে। ইহুদিদের কাব্বালার রহস্যময় পক্তি সুন্দর, ভক্তি উদ্রেক করা ও চমৎকার ছন্দময়ভাবে আবৃত্তি করে তিনি দ্রুতই একদল অনুগত অনুসারী জোগাড় করে ফেললেন। তারাই নিজ দায়িত্বে গোটা ইউরোপে এই খবরটা রটিয়ে দিল ১৬৬৬ সালের বসন্তে সুদূর ফ্রান্স, হল্যান্ড, জার্মানি ও হাঙ্গেরি থেকে ইহুদিরা দলে দলে তাদের ব্যাগ গোছাতে শুরু করল। তাদের মসিহর ডাকে সাড়া দিতে লাগল তারা। কিন্তু ওই বছরের শেষ দিকে জেভিকে কন্টাস্টান্টিপোলে গ্রেপ্তার করে গ্র্যান্ড ভাইজার। এরপর কারাগারে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হলো তাঁকে। সম্ভাব্য মৃত্যুদণ্ডের মুখে, তিনি নাটকীয়ভাবে তাঁর ইহুদি পোশাক ছুড়ে ফেললেন। তারপর মাথায় তুর্কি পাগড়ি চাপিয়ে দীক্ষিত হলেন ইসলাম ধর্মে তাঁর কয়েক হাজার অনুগত অনুসারীর তখনই অন্ধ মোহমুক্তির অবসান ঘটে। তারা দল থেকে সরে পড়ল একে একে।

ভবিষ্যদ্রষ্টাদের ভবিষ্যদ্বাণীর আগের সেই প্রতিধ্বনি এ যুগেও কমেনি। তারা সারা বিশ্বে কয়েক মিলিয়ন মানুষকে কোনো না কোনোভাবে প্রভাবিত করে যাচ্ছে। এই যেমন যুক্তরাষ্ট্রে উইলিয়াম মিলার একবার ঘোষণা করলেন, ১৮৪৩ সালের ৩ এপ্রিল হবে পৃথিবীর শেষ দিন। খবরের কাগজের মাধ্যমে তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী ছড়িয়ে পড়ল গোটা যুক্তরাষ্ট্রে। ঘটনাক্রমে ১৮৩৩ সালে রাতের আকাশে উল্কাবৃষ্টিতে আলোকিত হয়ে উঠল। বেশ বড় ধরনের ছিল সেই উল্কাবৃষ্টি। এতে মিলারের ভবিষ্যদ্বাণীর প্রভাব আরও বেড়ে যায়।

কয়েক হাজার অন্ধভক্ত, যাদের বলা হতো মিলারাইটস, পৃথিবীর শেষ দিনের জন্য অপেক্ষার প্রহর গুনতে লাগল। দেখতে দেখতে ১৮৪৩ সাল চলে এল। একসময় তা বহাল তবিয়তে চলেও গেল পৃথিবীর শেষ দিন আসার আগেই। এতে মিলারিটেস আন্দোলন কয়েকটি বড় ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। বড় ধরনের মিলারিটেস জড়ো হওয়ার কারণে প্রতিটি বিভক্ত গ্রুপের ধর্মের ওপর এখনো ব্যাপক প্রভাব আছে। মিলারিটেসের একটি বড় অংশ ১৮৬৩ সালে নতুন করে দল গঠন করে। তারা নাম পাল্টে সেভেনথ ডে অ্যাডভেন্টিস্ট চার্চ নাম ধারণ করে। বর্তমানে তাদের ১৪ মিলিয়ন ব্যাপ্টিজড সদস্য আছে। তাদের বিশ্বাসের মূল বিষয় হলো দ্বিতীয় দফায় খ্রিষ্ট আসবেন।

মিলারিটেসের বিভক্ত আরেকটি গ্রুপ পরে চার্লস টেজ রাসেলের দিকে ঝুঁকে পড়ে। তিনি ডুমসডেকে পিছিয়ে ১৮৭৪ সালে নিয়ে যান। এই তারিখও পার হয়ে যাওয়ার পর, মিশনের গ্রেট পিরামিড বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে তিনি তাঁর ভবিষ্যদ্বাণীকে সংশোধন করে তারিখটি ১৯১৪ সালে পিছিয়ে নিয়ে যান। এই গ্রুপটি পরে জেহোভা’স উইটনেস নামে পরিচিতি পায়। এ গ্রুপের সদস্যসংখ্যা ৬ মিলিয়নের বেশি।

মিলারিটেস আন্দোলনের অন্য অংশগুলো এখনো ভবিষ্যদ্বাণী করে যাচ্ছে। প্রতিবার ভবিষ্যদ্বাণী ব্যর্থ হওয়ার পর সেগুলো আবারও বিভক্ত হয়ে যায়। এ ধরনের ছোট্ট একটি মিলারিটেস গ্রুপের নাম ব্রাঞ্চ ডেভিডিয়ান তারা সেভেনথ ডে অ্যাডভেনটিস থেকে ১৯৩০-এর দশকে আলাদা হয়ে যায়। তাদের ছোট একটি কমিউন আছে টেক্সাসের ওয়াকোতে। তরুণ ধর্মপ্রচারক ডেভিড কোরেশের প্রভাব রয়েছে তাদের ওপর। গ্রুপটি ১৯৯৩ সালে এফবিআইয়ের সঙ্গে দুঃখজনক এক সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। তখন তাদের ভবনে যেন জলজ্যান্ত এক নরক নেমে আসে। তাতে ২৭ শিশুসহ ৭৬ সদস্যকে পুড়িয়ে মারা হয়। তাদের মধ্যে ছিলেন স্বয়ং কোরেশও।

আমরা কি ভবিষ্যৎ দেখতে পাই?

কঠোর বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় কি প্রমাণ করা যায় যে কিছু ব্যক্তি ভবিষ্যৎ দেখতে পায়? ১২ অধ্যায়ে আমরা দেখেছি, টাইম ট্রাভেল পদার্থবিদ্যার সূত্রের সঙ্গে খাপ খেতেও পারে। উন্নত, টাইপ থ্রি সভ্যতার জন্য সেটা সত্য। কিন্তু পৃথিবীতে কি এখন ভবিষ্যদ্বাণী করা সম্ভব?

রাইন সেন্টারে কিছু বিশদ পরীক্ষায় দেখা গেছে, কিছু মানুষ ভবিষ্যৎ দেখতে পায়। অর্থাৎ কোনো কার্ড বের করে আনার আগেই তারা কার্ডটি শনাক্ত করতে পারে। কিন্তু পুনরাবৃত্তি করা বেশ কিছু পরীক্ষায় দেখা গেছে, এই প্রভাব খুব অল্প। আবার অন্যরা ওই ফলাফল নকল করার চেষ্টা করলে তাদের প্রভাব হারিয়ে যায়।

ভবিষ্যদ্বাণীকে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের সঙ্গে সমন্বয় করা বেশ কঠিন কারণ, এটি কার্যকারণ সম্পর্ককে অমান্য করে, মানে কারণ ও তার প্রভাবকে লঙ্ঘন করে। কারণের পরই প্রভাব সংঘটিত হয়, উল্টোটা নয়। পদার্থবিজ্ঞানের যেসব সূত্র দেখা যায়, তাদের মধ্যে কার্যকারণ সম্পর্ক থাকে। কার্যকারণ সম্পর্ক অমান্য করাটা পদার্থবিজ্ঞানের ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত। নিউটনের বলবিদ্যা কার্যকারণ সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। নিউটনের সূত্রগুলো পরস্পরের সঙ্গে এতটাই সংযুক্ত যে আপনি যদি মহাবিশ্বের সব অণুর অবস্থান ও দশা জানেন, তাহলে তাদের ভবিষ্যৎ গতিও হিসাব করতে পারবেন। কাজেই ভবিষ্যৎ আসলে গণনাযোগ্য। তাত্ত্বিকভাবে, নিউটনিয়ান বলবিদ্যা বলে, আপনার কাছে যদি যথেষ্ট বড়সড় একটা কম্পিউটার থাকে, তাহলে আপনি ভবিষ্যতের সব ঘটনা গণনা করতে পারবেন। নিউটনের মতে, মহাবিশ্ব বিশাল এক ঘড়ির মতো। কালের একদম শুরুতে ঈশ্বর এই ঘড়িতে চাবি এঁটে দিয়েছেন। এরপর থেকে ঘড়িটি টিক টিক করে চলছে তাঁর বিধি অনুযায়ী। নিউটনের তত্ত্বে ভবিষ্যদ্বাণীর কোনো জায়গা নেই।

সময়ের পেছনে

ম্যাক্সওয়েলের তত্ত্ব আলোচনার সময় ঘটনা আরও জটিলতর হয়ে যায়। আলোর জন্য ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণ সমাধান করার সময় আমরা একটি নয়, দুটি সমাধান পাই : একটি “রিটার্ডেড’ ওয়েভ আর আরেকটি ‘অ্যাডভান্সড’ ওয়েভ। রিটার্ডেড ওয়েভ এক বিন্দু থেকে আরেক বিন্দুতে আলোর প্রমিত গতি বোঝায়। অন্যদিকে অ্যাডভান্সড ওয়েভ আলোকরশ্মি সময়ের পেছন দিকে যায়। এই অ্যাডভান্সড সমাধানটি ভবিষ্যৎ থেকে এসে অতীত গিয়ে পৌঁছায়!

১০০ বছর ধরে ইঞ্জিনিয়াররা ‘অ্যাডভান্সড’ সমাধানটির মুখোমুখি হয়েছেন। এটি সময়ের পেছন দিকে যায়। তাই তাঁরা একে গাণিতিক কৌতূহল হিসেবে নাকচ করে দিয়েছেন। কারণ, রিটার্ডেড ওয়েভ নিখুঁতভাবে রেডিও, মাইক্রোওয়েভ, টিভি, রাডার ও এক্স-রের আচরণ অনুমান করতে পারে। তাই বিজ্ঞানীরা অ্যাডভান্সড সমাধানটি ছুড়ে ফেলে দিয়েছেন। আবার রিটার্ডেড ওয়েভ বিস্ময়কর রকম সফল। তাই ইঞ্জিনিয়াররা তার কুৎসিত যমজকে অগ্রাহ্য করেন। সফলতার সঙ্গে অন্যায় হস্তক্ষেপ কেন?

তবে অ্যাডভান্সড ওয়েভ নিয়ে পদার্থবিদেরা গত শতাব্দীতে বেশ বিব্রতকর এক ঝামেলায় পড়েন। ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণগুলোকে বলা হয় আধুনিক যুগের ভিত্তি। সে কারণে এসব সমীকরণের যেকোনো সমাধান খুব গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয়। এমনকি এতে কোনো তরঙ্গ যদি ভবিষ্যৎ থেকেও এসে থাকে, সেটাও গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। দেখে মনে হয়, ভবিষ্যৎ থেকে আসা অ্যাডভান্সড ওয়েভকে পুরোপুরি অগ্রাহ্য করা অসম্ভব। প্রকৃতি কেন এ রকম মৌলিক স্তরে এ ধরনের উদ্ভট সমাধান দেয়? এটা নিষ্ঠুর কোনো কৌতুক, নাকি এর কোনো গভীর অর্থ আছে?

অধ্যাত্মবাদীরা এই অ্যাডভান্সড ওয়েভে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। তাঁদের সন্দেহ, তরঙ্গগুলো ভবিষ্যৎ থেকে আসা কোনো বার্তা। আমরা যদি কোনোভাবে এই তরঙ্গগুলোকে পোষ মানাতে পারি, তাহলে হয়তো অতীতেও বার্তা পাঠাতে পারব। এভাবে হয়তো আগের প্রজন্মকে আসন্ন কোনো ঘটনা সম্পর্কে সতর্ক করা যাবে। যেমন আমাদের দাদা-দাদিকে ১৯২৯ সালে আমরা একটি সতর্কবার্তা পাঠাতে পারি, যাতে তারা আর্থিক মন্দা শুরু হওয়ার আগেই তাদের জমানো সব স্টক বিক্রি করে ফেলে। অ্যাডভান্সড ওয়েভ ব্যবহার করে আমরা টাইম ট্রাভেলের মতো ব্যক্তিগতভাবে অতীতে যেতে পারব না, কিন্তু এর মাধ্যমে আমরা অতীতকালে চিঠিপত্র ও বার্তা পাঠাতে পারব। এর মাধ্যমে অতীতের লোকজনকে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সম্পর্কে সতর্ক করা যাবে।

রিচার্ড ফাইনম্যানের গবেষণার আগ পর্যন্ত অ্যাডভান্সড ওয়েভ একটা রহস্য হয়েই টিকে ছিল। অতীতে যাওয়ার এই ধারণার জন্মদাতা তিনিই একসময় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ম্যানহাটান প্রজেক্টে কাজ করেছেন। প্রথম পারমাণবিক বোমাটি বানানো হয়েছিল এখানেই। ম্যানহাটান প্রজেক্টে কাজ শেষে ফাইনম্যান লস অ্যালামস ছেড়ে প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটিতে গবেষণা শুরু করেন জন হুইলারের অধীনে। ইলেকট্রন নিয়ে ডিরাকের গবেষণা বিশ্লেষণ করে ফাইনম্যান কিছু অদ্ভুত ব্যাপার দেখতে পান। দেখা গেল, ডিরাক ইকুয়েশনে সময়ের দিক উল্টে দিলেও সমীকরণটি একই থাকে। আবার ইলেকট্রনের চার্জ উল্টে দিলেও একই থাকে সমীকরণটি। অন্য কথায়, একটি ইলেকট্রন সময়ের পেছনে যেতে পারা ও একটি অ্যান্টি-ইলেকট্রনের সময়ের সামনে যাওয়া একই ব্যাপার! সাধারণভাবে কোনো সতর্ক পদার্থবিদ হয়তো এই ব্যাখ্যা নাকচ করে দিতেন। তিনি হয়তো বলতেন, এটা চতুর কৌশলমাত্র। গাণিতিকভাবে এই চতুর কৌশলের কোনো অর্থ নেই। ডিরাক ইকুয়েশন এখানে স্পষ্ট কথা বললেও সময়ের পেছনে যাওয়ার কোনো অর্থ হয় না। অন্য কথায়, ফাইনম্যান দেখলেন প্রকৃতি কেন সময়ের পেছনে যাওয়াটা অনুমোদন করে। আসলে প্রতিবস্তুর গতির প্রতিনিধিত্ব করে এটি। তিনি বয়স্ক পদার্থবিদ হলে ফাইনম্যানও হয়তো সমাধানটি জানালা দিয়ে আস্ত ছুড়ে ফেলে দিতেন। কিন্তু গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থী হওয়ার সুবাদে তাঁর কৌতূহলটাকে আরও সামনে এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

এই ধাঁধা নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে গিয়ে তরুণ ফাইনম্যান আরও উদ্ভট ব্যাপার খেয়াল করলেন। সাধারণত কোনো ইলেকট্রন ও কোনো অ্যান্টি- ইলেকট্রন যদি সংঘর্ষের মুখে পড়ে, পরস্পরকে নিশ্চিহ্ন করে দেয় তারা। এর ফলে গামারশ্মি নিঃসৃত হয়। তিনি এটি একটি কাগজে আঁকলেন : দুটি বস্তু পরস্পরের সঙ্গে ধাক্কা খেল, তারপর তারা শক্তি নিঃসরণ করল।

কিন্তু এরপর অ্যান্টি-ইলেকট্রনের চার্জ উল্টে দেওয়া হলে সেটি সাধারণ ইলেকট্রনে পরিণত হয়ে সময়ের পেছন দিকে যাবে। এরপর ওই একই ডায়াগ্রামে সময়কে উল্টে দিয়ে নতুন করে লেখা যায়। এতে এখন দেখা যায়, ইলেকট্রনটি যদি সময়ের সামনের দিকে যায়, তারপর হঠাৎ করে উল্টো দিকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ইলেকট্রনটি সময়ে একটি ইউটার্ন নেয় এবং এখন সেটি সময়ের পেছন দিকে যায়। এরপর সেটি এই প্রক্রিয়ায় বিস্ফোরিত ‘শক্তির নিঃসরণ করে। অন্য কথায়, এটা একই ইলেকট্রন। ইলেকট্রন ও অ্যান্টি-ইলেকট্রন ধ্বংস হওয়ার প্রক্রিয়াটা আসলে একই ইলেকট্রনের সময়ের পেছন দিকে যাওয়ার সিদ্ধান্তের ফল!

কাজেই ফাইনম্যান প্রতিবস্তুর সত্যিকারের গুপ্তরহস্য উন্মোচন করেছিলেন। তাঁর মতে, এটা সাধারণ বস্তু, যা শুধু সময়ের পেছন দিকে যায়। এই সরল পর্যবেক্ষণ দ্রুতই যেসব কণার প্রতিকণা সঙ্গী আছে, তাদের ধাঁধা ব্যাখ্যা করতে পেরেছিল। এর কারণ হলো, সব কণাই সময়ের পেছন দিকে চলাচল করে। তাতে প্রতিবস্তুর ছদ্মবেশ ধারণ করে তারা। (এই ব্যাখ্যাটি ডিরাক সমুদ্রের সমতুল্য। এ সম্পর্কে আগেই বলা হয়েছে। তবে এটি আরও সরলতর। এ ব্যাখ্যাটি এখন গ্রহণ করা হয়েছে।)

এখন ধরা যাক, আমাদের কাছে এক টুকরো প্রতিবস্তু আছে। সেটি সাধারণ বস্তুর সঙ্গে সংঘর্ষের মুখে পড়ে বিপুল বিস্ফোরণ সৃষ্টি করল। এখানে এখন অগণিত ইলেকট্রন ও অ্যান্টি-ইলেকট্রন থাকবে, যারা পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। কিন্তু আমরা যদি অ্যান্টি-ইলেকট্রনের সময়ের দিক উল্টে দিয়ে তাকে সময়ের পেছন দিকে ইলেকট্রনের চলার পথ বানিয়ে দিই, তাহলে তার অর্থ হবে, একই ইলেকট্রন সামনের ও পেছনের দিকে আঁকাবাঁকা পথে কয়েক ট্রিলিয়ন বার যাতায়াত করেছে।

এ ছাড়া এখানে আরেকটি কৌতূহলোদ্দীপক ফল পাওয়া যায়। সেটি হলো, সেখানে বস্তুর টুকরোর মধ্যে অবশ্যই শুধু একটি ইলেকট্রন ছিল। ওই একই ইলেকট্রন সময়ের সামনে ও পেছনে আঁকাবাঁকা পথে যাতায়াত করেছে। প্রতিবার সেটি সময়ের পথে কোনো ইউটার্ন নিলেও তা প্রতিবস্তুতে পরিণত হতো। কিন্তু সেটি সময়ের পথে আরেকবার ইউটার্ন নিলে আরেকটি ইলেকট্রনে পরিণত হয়।

(তাঁর থিসিস অ্যাডভাইজার ছিলেন জন হুইলার। হুইলারের সহায়তায় ফাইনম্যান অনুমান করেন, হয়তো গোটা মহাবিশ্বে মাত্র একটা ইলেকট্রন আছে। সেটি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সামনে-পেছনে আঁকাবাঁকা পথে চলে। কল্পনা করা যাক, প্রকৃত মহাবিস্ফোরণের বিশৃঙ্খলায় মাত্র একটি ইলেকট্রন তৈরি হয়েছিল। কয়েক ট্রিলিয়ন বছর পর ইলেকট্রনটি ক্রমান্বয়ে মহাবিশ্বের শেষ দিনের মুখোমুখি হবে। সেখানে ইলেকট্রনটি ইউটার্ন নিয়ে চলতে থাকবে সময়ের পেছনে। এ প্রক্রিয়ায় গামা রশ্মি নিঃসৃত হবে। এরপর ইলেকট্রনটি আবারও মহাবিস্ফোরণের কাছে ফিরে গিয়ে আরেকটি ইউটার্ন নেবে। ইলেকট্রনটি এরপর আবারও সামনে-পেছনে আঁকাবাঁকা পথে চলে মহাবিস্ফোরণ থেকে মহাবিশ্বের শেষ দিন পর্যন্ত যেতে থাকবে। একুশ শতকে আমাদের মহাবিশ্ব হলো এই ইলেকট্রনের ভ্রমণের একটা অংশমাত্র। এখানে আমরা ট্রিলিয়ন ইলেকট্রন ও অ্যান্টি-ইলেকট্রন বা দৃশ্যমান মহাবিশ্ব দেখি। তত্ত্বটি যত উদ্ভট লাগুক না কেন, এটা কোয়ান্টাম তত্ত্বের আগ্রহোদ্দীপক এক ঘটনার ব্যাখ্যা দেয়। সেটা হলো, সব ইলেকট্রন একই রকম কেন। পদার্থবিজ্ঞানে ইলেকট্রনকে আলাদা করে শনাক্ত করা যায় না। এখানে সবুজ ইলেকট্রন বা জনি ইলেকট্রন বলে কিছু নেই। আসলে ইলেকট্রনদের পরস্পরের মধ্যে কোনো স্বাতন্ত্র্য নেই। বনের জীবজন্তু নিয়ে গবেষণার জন্য তাদের মাঝে মাঝে ট্যাগ করেন বিজ্ঞানীরা। কিন্তু কোনো ইলেকট্রনকে এভাবে ট্যাগ করা যায় না। এর কারণ, হয়তো গোটা মহাবিশ্বে একই ইলেকট্রনই সময়ের সামনে ও পেছনে দিকে যাওয়া- আসা করছে।)

কিন্তু প্রতিবস্তু যদি সাধারণ বস্তু হয়ে সময়ের পেছনে যায়, তাহলে অতীতে কি কোনো বার্তা পাঠানো সম্ভব? আজকের ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল কি আপনি নিজের অতীতের কাছে পাঠাতে পারবেন? এর মাধ্যমে স্টক মার্কেটের মৃত্যুঘণ্টা বাজানো যাবে কি?

এর উত্তর হলো—না।

আমরা যদি প্রতিবস্তুকে শুধু অন্য আরেক ধরনের বস্তু হিসেবে বিবেচনা করে তা নিয়ে পরীক্ষা চালাই, তাহলে এতে কার্যকারণের কোনো লঙ্ঘন হবে না। কারণ, তার প্রভাব একই থাকবে। এখন অ্যান্টি-ইলেকট্রনের জন্য সময়ের তির উল্টে দিয়ে তাকে সময়ের পেছনে পাঠিয়ে দিলে শুধু গাণিতিক কাজটাই করা হবে। তখনো একই থাকবে পদার্থবিজ্ঞান, ভৌতভাবে কোনো কিছুর পরিবর্তন হবে না। সব পরীক্ষার ফলাফল একই থাকবে। কাজেই ইলেকট্রনকে সময়ের পেছনের দিকে যাওয়া এবং আসার দৃষ্টিভঙ্গি বৈধ। কিন্তু ইলেকট্রনের প্রতিবার সময়ের পেছনে যাওয়া সাধারণভাবে অতীতকে পূরণ করে। কাজেই এটি এভাবে দেখা যায়, ভবিষ্যৎ থেকে আসা এই অ্যাডভান্সড সমাধান কোনো সুসংগত কোয়ান্টাম তত্ত্বের জন্য প্রয়োজনীয়। কিন্তু তারা শেষ পর্যন্ত কার্যকারণকে লঙ্ঘন করে না। (আসলে এই উদ্ভট অ্যাডভান্সড তরঙ্গগুলো ছাড়া কার্যকারণ কোয়ান্টাম তত্ত্বকে লঙ্ঘন করতে পারে। ফাইনম্যান প্রমাণ করেছেন, আমরা যদি অ্যাডভান্সড ও রিটার্ডেড ওয়েভের ভূমিকা যোগ করি, তাহলে দেখা যাবে, যে শর্তটি কার্যকারণকে লঙ্ঘন করে, তা নিখুঁতভাবে দূর হয়ে যাচ্ছে। সুতরাং কার্যকারণ অটুট রাখার জন্য প্রতিবস্তু প্রয়োজনীয়। প্রতিবস্তু ছাড়া কার্যকারণ ভেঙে পড়তে পারে।)

ফাইনম্যান এই উদ্ভট ধারণাটির অঙ্কুরে অনুসন্ধান চালিয়ে যেতে থাকেন, যতক্ষণ না তা ইলেকট্রনের পরিপূর্ণ কোয়ান্টাম তত্ত্ব হিসেবে প্রস্ফুটিত না হয়। তাঁর সৃষ্টি কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডাইনামিকস বা কিউইডি পরীক্ষামূলকভাবে ১০ বিলিয়নের মধ্যে একটি অংশে যাচাই করা হয়েছে। এতে সর্বকালের সবচেয়ে নিখুঁত তত্ত্ব হিসেবে তৈরি করেছে একে। এ কারণে তিনি আর তাঁর সহকর্মী জুলিয়ান শুইঞ্জার ও সিন-ইটিরো তোমোনাগা ১৯৬৫ সালে নোবেল পুরস্কার পান।

(নোবেল গ্রহণের সময় দেওয়া ভাষণে ফাইনম্যান বলেন, তরুণ বয়সে ঝোঁকের বশে ভবিষ্যৎ থেকে আসা অ্যাডভান্সড ওয়েভের প্রেমে পড়েন তিনি কোনো সুন্দরী মেয়ের প্রেমে পড়ার মতো। আজ এই সুন্দরী মেয়েটি বড় হয়ে পরিপূর্ণ এক নারীতে পরিণত হয়েছে। এখন সে অনেক সন্তানের মা। এসব সন্তানের একটি হলো তার কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডাইনামিকস বা কোয়ান্টাম বিদ্যুৎগতিবিদ্যা।)

ভবিষ্যৎ থেকে ট্যাকিয়ন

ভবিষ্যৎ থেকে আসা অ্যাডভান্সড ওয়েভ (এটি কোয়ান্টাম তত্ত্বে বারবার উপযোগী বলে প্রমাণিত) নিয়ে কোয়ান্টাম তত্ত্বে আরও একটি উদ্ভট ধারণা আছে। এটিও বেশ পাগলাটে ধারণা মনে হলেও সম্ভবত তেমন দরকারি কিছু নয়। ধারণাটি হলো ট্যাকিয়ন। স্টার ট্রেকে একে প্রায়ই দেখা যায়। কোনো জাদুকরি কাণ্ড দেখানোর জন্য স্টার ট্রেক লেখকদের যখনই নতুন কোনো শক্তির প্রয়োজন হয়, তখন ট্যাকিয়ন আমদানি করেন তাঁরা।

ট্যাকিয়নের বাস অদ্ভুত এক বিশ্বে। সেখানে সবকিছুই আলোর চেয়ে দ্রুতবেগে চলাচল করে। ট্যাকিয়ন দ্রুতবেগে চলার সময় শক্তি হারাতে থাকে, যা সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান লঙ্ঘন করে। আসলে তারা যদি সব শক্তি হারিয়ে ফেলে, তাহলে তাদের অসীম বেগে চলার কথা। ট্যাকিয়ন শক্তি অর্জন করতে থাকলে তারা ধীরগতির হয়ে পড়ে। এভাবে একসময় তারা আলোর গতিতে পৌঁছায়।

ট্যাকিয়নকে এ রকম অদ্ভুত বানাল কোন জিনিসটি, যে তারা কাল্পনিক ভর নিয়ে আসে। (এখানে কাল্পনিক বলতে বোঝাতে চাচ্ছি, তাদের ভর মাইনাস ১-এর বর্গমূলে বা ‘i-এর গুণফল।) সাধারণভাবে আমরা যদি আইনস্টাইনের বিখ্যাত সমীকরণে m-এর বদলে im বসাই, তাহলে বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে। সব কণা তখন হঠাৎ করে আলোর চেয়ে বেশি বেগে চলতে শুরু করবে।

এই ফলাফল অদ্ভুত পরিস্থিতির জন্ম দেয়। কোনো ট্যাকিয়ন বস্তুর ভেতর দিয়ে চলাচল করলে সেটি শক্তি হারায়। কারণ, পরমাণুর সঙ্গে সংঘর্ষের মুখে পড়ে ওই ট্যাকিয়ন। কিন্তু পরমাণুর সঙ্গে এর যতই সংঘর্ষ হয়, ততই এর গতি বেড়ে যায়। তাতে পরমাণুর সঙ্গে সংঘর্ষের পরিমাণও বাড়ে। আবার এই সংঘর্ষের কারণে বাড়ে তার শক্তি হারানোর পরিমাণও এবং তার গতিও আরও বেড়ে যায়। এভাবে এমন এক চক্র সৃষ্টি হয় যে, ট্যাকিয়ন প্রাকৃতিকভাবে নিজে নিজেই অসীম গতিবেগ লাভ করে।

(ট্যাকিয়নরা প্রতিবস্তু আর ঋণাত্মক বস্তুর চেয়ে আলাদা। প্রতিবস্তুর শক্তি ধনাত্মক। এরা আলোর চেয়ে কম বেগে চলাচল করে। এদেরকে আমাদের

নির্মিত কণা ত্বরকযন্ত্রে তৈরি করা যায়। তাত্ত্বিকভাবে, মহাকর্ষের টানে নিচের দিকে পড়ে প্রতিবস্তু। সাধারণ বস্তুর সঙ্গে সম্পর্কিত প্রতিবস্তু সময়ের পেছনে যায়। ঋণাত্মক বস্তুর শক্তিও ঋণাত্মক। এরা আলোর চেয়ে কম বেগে চলাচল করে, কিন্তু মহাকর্ষের টানে নিচে নয়, ওপরের দিকে ওঠে। ঋণাত্মক বস্তুকে কখনোই গবেষণাগারে পাওয়া যায়নি। তাত্ত্বিকভাবে টাইম মেশিনের জ্বালানি হিসেবে এই বস্তু বিপুল পরিমাণে ব্যবহার করা হয়। আলোর চেয়ে বেশি বেগে চলাচল করে ট্যাকিয়ন। আর এর ভর কাল্পনিক। মহাকর্ষের টানে এটি নিচে পড়ে, নাকি ওপরে ওঠে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। এদেরও গবেষণাগারে এখনো পাওয়া যায়নি।)

উদ্ভট ট্যাকিয়নের মতো আরও অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এদের নিয়ে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে গবেষণা করছেন পদার্থবিদেরা। এই পদার্থবিদদের মধ্যে আছেন কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়াত জেরাল্ড ফিনবার্গ এবং অস্টিনের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের জর্জ সুদর্শন। সমস্যা হলো, গবেষণাগারে কেউই এখনো কোনো ট্যাকিয়ন দেখেনি। ট্যাকিয়ন নিয়ে পরীক্ষামূলক প্রমাণ থেকে দেখা যাচ্ছে, এরা কার্যকারণকে লঙ্ঘন করতে পারে। ফিনবার্গ এমনও বলেছেন, একটি যন্ত্র চালু হওয়ার আগে, তা থেকে নিঃসৃত লেজার রশ্মি পরীক্ষা করেছেন পদার্থবিদেরা। ট্যাকিয়নের অস্তিত্ব যদি সত্যিই থাকে, তাহলে হয়তো লেজার রশ্মির যন্ত্র চালু করার আগেই যন্ত্র থেকে আসা আলো শনাক্ত করা যাবে।

বিজ্ঞান কল্পকাহিনিতে অতীতের দর্শকদের কাছে বার্তা পাঠাতে ট্যাকিয়নকে নিয়মিত ব্যবহার করা হয়। তবে কেউ যদি পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষা করে, তাহলে এটি সম্ভব কি না, তা পরিষ্কার নয়। যেমন ফিনবার্গ বিশ্বাস করেন, ট্যাকিয়নের নিঃসরণ সময়ের সামনের দিকে যায়, যা সময়ের পেছনে ঋণাত্মক শক্তির ট্যাকিয়নের শোষণের মতো (প্রতিবস্তুর সঙ্গে সম্পর্কিত পরিস্থিতির মতো)। কাজেই এখানে কার্যকারণের কোনো লঙ্ঘন হয় না।

বিজ্ঞান কল্পকাহিনিকে একপাশে রেখে, ট্যাকিয়নের আধুনিক ব্যাখ্যাটি হলো, হয়তো মহাবিস্ফোরণের সময় তাৎক্ষণিকভাবে ট্যাকিয়নের অস্তিত্ব ছিল। সে সময় তারা কার্যকারণকে লঙ্ঘন করেছিল। কিন্তু এখন তাদের আর কোনো অস্তিত্ব নেই। আসলে মহাবিস্ফোরণের সময় হয়তো তাদের গুরুত্বপূর্ণ কোনো ভূমিকা ছিল। এই অর্থে, বিগ ব্যাং বা মহাবিস্ফোরণের কিছু তত্ত্বের জন্য ট্যাকিয়ন অপরিহার্য।

ট্যাকিয়নের কিছু অদ্ভুত ধর্ম আছে। তাদের যখন কোনো তত্ত্বে রাখা হয়, তখন ভ্যাকুয়ামকে অস্থিতিশীল করে তোলে তারা। অর্থাৎ কোনো সর্বনিম্ন শক্তিস্তরকে অস্থিতিশীল করে। কোনো সিস্টেমে ট্যাকিয়ন থাকলে একটি ফলস ভ্যাকুয়ামের মধ্যে থাকে সেটি। কাজেই সিস্টেমটি অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে ও ক্ষয় হয়ে সত্যিকারের ভ্যাকুয়াম অবস্থায় চলে আসে।

এমন কোনো বাঁধের কথা ভাবুন, যা কোনো হ্রদের পানি ধরে রেখেছে। এটি মেকি ভ্যাকুয়ামের মতো। বাঁধটিকে নিখুঁতভাবে স্থিতিশীল বলে মনে হলেও সেখানে একটি শক্তিস্তর থাকে, যা ওই বাঁধের চেয়ে নিচের স্তরে থাকে। বাঁধে কোনো ফাটল দেখা দিলে ভাঙনের জায়গায় পানি ছুটে এসে বাঁধ ভেঙে দেয়। পানি সমুদ্রপৃষ্ঠ বরাবর প্রবাহিত হতে গিয়ে সিস্টেমটি সত্যিকার ভ্যাকুয়ামের দিকে যায়।

একইভাবে, অনুমান করা হয় যে মহাবিস্ফোরণের আগে মেকি ভ্যাকুয়াম শুরু হয়েছিল। আর সেখানে ছিল ট্যাকিয়ন। কিন্তু ট্যাকিয়ন থাকার অর্থ হলো এটা সর্বনিম্ন শক্তিস্তর নয়। কাজেই সিস্টেমটি অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। স্থান-কালের বুননে একটি ক্ষুদ্র ছিদ্র দেখা দেয়, যা সত্যিকারের ভ্যাকুয়ামের সৃষ্টি করে। ছিদ্রটি বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি বুদের আবির্ভাব ঘটে। বুদের বাইরে তখনো ট্যাকিয়নের অস্তিত্ব ছিল, কিন্তু বুদ্বুদের ভেতরের সব ট্যাকিয়ন নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। বুদটি বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ট্যাকিয়ন ছাড়া আমরা বর্তমানের জানা মহাবিশ্ব খুঁজে পেয়েছি। এটিই হলো মহাবিস্ফোরণ।

ইনফ্লেশন বা স্ফীতি তত্ত্বকে কমসোলজিস্টরা গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে ধারণা করেন, ট্যাকিয়নই স্ফীতি প্রক্রিয়া শুরু করেছিল। আগেই বলেছি, স্ফীতিময় মহাবিশ্ব তত্ত্বমতে, মহাবিশ্ব শুরু হয়েছিল স্থান-কালের একটি অতি ক্ষুদ্র বুদ্বুদ হিসেবে। একসময় স্ফীতিশীল পর্যায়ে এতে তীব্র গতি সঞ্চারিত হয়। পদার্থবিদেরা বিশ্বাস করেন, মহাবিশ্ব আসলে মেকি ভ্যাকুয়াম অবস্থার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল। সেখানে স্ফীতিক্ষেত্র হিসেবে ছিল একটি ট্যাকিয়ন। কিন্তু কোনো ট্যাকিয়নের উপস্থিতি ভ্যাকুয়ামটিকে অস্থিতিশীল করে তোলে ও অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বুদ্বুদ গঠন করে। এসব বুদের ভেতরে স্ফীতিক্ষেত্র সত্যিকার ভ্যাকুয়াম অবস্থার অধীনে ছিল। এই বুদ এরপর দ্রুতবেগে স্ফীত হতে শুরু করে। এভাবে শেষ পর্যন্ত আমাদের এই মহাবিশ্ব গঠন করার পর সেটি থেমে যায়। আমাদের বুদ্বুদ মহাবিশ্বে স্ফীতি হারিয়ে গেছে। কাজেই একে আমাদের মহাবিশ্বে আর কখনোই শনাক্ত করা যাবে না। সুতরাং ট্যাকিয়ন এমন এক উদ্ভট কোয়ান্টাম অবস্থার প্রতিনিধিত্ব করে, যেখানে বস্তু আলোর চেয়েও দ্রুতবেগে চলতে পারে এবং হয়তো তা কার্যকারণকেও লঙ্ঘন করে। কিন্তু তারা অনেক আগেই হারিয়ে গেছে। সম্ভবত তারাই এই মহাবিশ্বকে জন্ম দিয়েছে।

এসব ধারণাকে অলস অনুমান বলে মনে হতে পারে। কারণ, এগুলো পরীক্ষা করে দেখা সম্ভব নয়। কিন্তু মেকি ভ্যাকুয়াম তত্ত্ব প্রথমবারের মতো পরীক্ষা করে দেখা হবে। সুইজারল্যান্ডের জেনেভার বাইরে ২০০৮ সালে লার্জ হ্যাড্রন কলাইডার বা এলএইচসি চালু করার পর এটি শুরু করা হয়েছে। এলএইচসির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো হিগস বোসন খুঁজে বের করা। স্ট্যান্ডার্ড মডেলে এটিই সর্বশেষ কণা। জিগস পাজলের এটিই ছিল শেষ খণ্ড। (হিগস কণা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী লিওন লেডারম্যান একে বলেছেন গড পার্টিকেল বা ঈশ্বরকণা।

পদার্থবিদদের বিশ্বাস, হিগস বোসন আসলে ট্যাকিয়ন হিসেবে শুরু হয়েছিল। মেকি ভ্যাকুয়ামে অতিপারমাণবিক কোনো কণার ভর থাকে না। কিন্তু ভ্যাকুয়ামের অস্থিতিশীলতার কারণে ও মহাবিশ্বে নতুন ভ্যাকুয়াম গঠনের সন্ধিক্ষণে হিগস বোসন সাধারণ কণায় রূপান্তরিত হয়ে গেছে। ট্যাকিয়ন থেকে সাধারণ কণায় রূপান্তরের এই সন্ধিক্ষণে অতিপারমাণবিক কণাগুলো ভর পেতে শুরু করে। এই ভরই এখন গবেষণাগারে পরিমাপ করি আমরা। কাজেই হিগস বোসন কণার আবিষ্কার স্ট্যান্ডার্ড মডেলের সর্বশেষে নিরুদ্দিষ্ট খণ্ডই পূরণ করবে। শুধু তা-ই নয়, সেই সঙ্গে এটাও যাচাই করে দেখা হবে একসময় ট্যাকিয়ন পর্যায়ের অস্তিত্ব ছিল কি না এবং পরে সেটি রূপান্তরিত হয়ে সাধারণ কণায় পরিণত হয়েছে কি না।

সংক্ষেপে বলা যায়, নিউটনিয়ান পদার্থবিদ্যা ভবিষ্যদ্বাণী করার ক্ষমতা নাকচ করে দেয়। কিন্তু কার্যকারণের লৌহকঠিন নিয়ম এতে কখনো লঙ্ঘিত হয় না। কোয়ান্টাম তত্ত্বে, বস্তুর নতুন অবস্থা থাকা সম্ভব। যেমন প্ৰতিবস্তু, এটি বস্তুর সময়ের পেছনে যাওয়ার শামিল। তবে এতে কার্যকারণ লঙ্ঘিত হয় না। আসলে কোয়ান্টাম তত্ত্বে, কার্যকারণকে পুনরুদ্ধারের জন্য প্রতিবস্তু অপরিহার্য। ট্যাকিয়নকে প্রথমে মনে হয় কার্যকারণ লঙ্ঘন করে। কিন্তু পদার্থবিদেরা বিশ্বাস করেন, তাঁদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল মহাবিস্ফোরণের সৃষ্টি করা। কাজেই তাঁদের এখন আর পর্যবেক্ষণ করা যায় না।

সুতরাং ভবিষ্যদ্বাণী করার ক্ষমতা বাতিল হয়ে গেল। অন্তত সুদূর ভবিষ্যৎ পর্যন্ত একে তৃতীয় শ্রেণির অসম্ভাব্যতা হিসেবে গণ্য করা যায়। ভবিষ্যদ্বাণী করার ক্ষমতা যদি কখনো বারবার পরীক্ষা করে দেখা সম্ভব বলে প্রমাণিত হয়, তাহলে সেটি হবে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের ভিত্তির জন্য অনেক বড় একটা ধাক্কা।

তথ্যনির্দেশ

ফাইনম্যান : নোবেলজয়ী মার্কিন পদার্থবিদ রিচার্ড ফাইনম্যান (১৯১৮-৮৮ খ্রি.)। কোয়ান্টাম মেকানিকসে পাথ ইন্টেগ্রাল ফর্মুলেশন, কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডাইনামিকস, অতি শীতল তরল হিলিয়ামের অতিপরিবাহিতার ক্রিয়াকৌশল ব্যাখ্যা ও কণা পদার্থবিজ্ঞানে কাজের জন্য তিনি সুপরিচিত। কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডাইনামিকসে তাঁর অবদানের জন্য ১৯৬৫ সালে তিনি নোবেল পুরস্কার পান।

কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডাইনামিকস : কণা পদার্থবিজ্ঞানে বিদ্যুৎগতিবিজ্ঞানের একটি আপেক্ষিকতাভিত্তিক কোয়ান্টাম ক্ষেত্র তত্ত্ব। কণাবাদী বিদ্যুৎগতিবিদ্যা সংক্ষেপে কিউইডি (QED) নামেও পরিচিত। আলো ও পদার্থ কীভাবে মিথস্ক্রিয়া করে, তা আলোচিত হয় এখানে। এই তত্ত্বের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো কোয়ান্টাম মেকানিকস ও বিশেষ আপেক্ষিকতাকে পরস্পরের সঙ্গে পুরোপুরি খাপ খাওয়ানো সম্ভব হয়েছে। বিজ্ঞানী রিচার্ড ফাইনম্যান এই তত্ত্বকে বলেছিলেন পদার্থবিদ্যার রত্ন (দ্য জুয়েল অব ফিজিকস)।

গামা রশ্মি : খুব ছোট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় রশ্মি। তেজস্ক্রিয় পদার্থের ক্ষয় বা মৌলিক কণাদের সংঘর্ষে এই রশ্মির সৃষ্টি হয়।

স্ট্যান্ডার্ড মডেল : কণা পদার্থবিজ্ঞানের একটি তত্ত্ব। মহাকর্ষ বাদে মৌলিক কণাসমূহ ও প্রকৃতির মৌলিক বলগুলোকে ব্যাখ্যা করে। একই সঙ্গে জানা থাকা, সব মৌলিক কণাগুলোকে শ্রেণিবদ্ধ করা হয় এই তত্ত্বের মাধ্যমে। এ মডেলে বলা হয়েছে, সব বস্তুই ১২টি ফার্মিয়ন কণা (৬টি কোয়ার্ক ও ৬টি লেপটন) এবং তাদের বিপরীত বা প্রতিকণা দিয়ে গঠিত। আর তাদের পারস্পরিক ক্রিয়া সংগঠিত হয় চারটি গেজ বা দূত বোসন কণার মাধ্যমে। এখন পর্যন্ত এই তত্ত্বের সবগুলো ভবিষ্যদ্বাণীই পরীক্ষার সঙ্গে মিলে গেছে। সম্প্রতি এই তত্ত্বের ভবিষ্যদ্বাণী করা নতুন একটি কণা (যা হিগস বোসন নামে পরিচিত) শনাক্ত করেছেন সার্নের বিজ্ঞানীরা।

হিগস বোসন : হিগস-বোসন কণাটি একসময় গড পার্টিকেল বা ঈশ্বরকণা নামে বিশ্বব্যাপী পরিচিত হয়ে ওঠে। ২০০৮ সালে সুইজারল্যান্ডে মাটির নিচে প্রায় ৩০ কিলোমিটার পরিধির সুড়ঙ্গ খুঁড়ে তাতে বসানো হয় লার্জ হ্যাড্রন কলাইডার বা এলএইচসি। সেখানে আলোর গতিতে ধাবমান দুটি বিপরীতমুখী প্রোটনের মধ্যে সংঘর্ষে সৃষ্টি হয় বিপুল পরিমাণ শক্তি আর অসংখ্য অতিপারমাণবিক কণা। সেখানে বিজ্ঞানীরা খোঁজ পান বহু কাঙ্ক্ষিত হিগস-বোসন কণার। ২০১২ সালের ৪ জুলাই সার্ন এ কণা আবিষ্কারের ঘোষণা দেয়।

শেষ কথা – অসম্ভবের ভবিষ্যৎ

কোনো কাজ যতই বড় কিংবা উদ্ভট হোক না কেন, কাজটি জাগতিক দৃষ্টিকোণে সম্ভব হয়ে থাকলে প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা লাখ লাখ গোষ্ঠীর কেউ না কেউ কাজটি করে ফেলতে প্রেরণা পাবেই।

—ফ্রিম্যান ডাইসন

গন্তব্য ভাগ্যের নয়, পছন্দের বিষয়। এর জন্য অপেক্ষায় থাকা নয়, বরং একে অর্জন করতে হয়।

—উইলিয়াম জেনিংস ব্রায়ান

এমন কোনো সত্য কি আছে, যা চিরকাল আমাদের হাতের মুঠোর বাইরে রয়ে যাবে? যত উন্নত সভ্যতাই হোক না কেন, জ্ঞানের কি এমন কোনো জগৎ আছে, যা আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাবে? এখানে এ পর্যন্ত যতগুলো প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, তার মধ্যে শুধু অবিরাম গতিযন্ত্র ও ভবিষ্যদ্বাণী করার ক্ষমতাকে তৃতীয় শ্রেণির অসম্ভাব্যতা হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া অন্য আরও কোনো প্রযুক্তি কি থাকতে পারে, যেগুলো বানানো একই রকম অসম্ভব?

উপপাদ্যের বিশুদ্ধ গণিত প্রমাণ করে যে নির্দিষ্ট কিছু বিষয় সত্যিই অসম্ভব। এ রকম সহজ একটা উদাহরণ হলো, শুধু একটি কম্পাস আর রুলার ব্যবহার করে একটি কোণকে সমান তিন ভাগে ভাগ করা অসম্ভব। এটি প্রমাণ করা হয়েছিল সেই ১৮৩৭ সালে।

এমনকি পাটিগণিতের মতো সরল সিস্টেমেও অসম্ভাব্যতা আছে। আগেই বলেছি, পাটিগণিতের সত্যি সব বক্তব্য পাটিগণিতের স্বতঃসিদ্ধ দিয়ে প্ৰমাণ করা অসম্ভব। তাই পাটিগণিত অসম্পূর্ণ। পাটিগণিতে সব সময় কিছু সত্য বক্তব্য থাকবে, যাকে আরও বড় কোনো সিস্টেমে সরিয়ে নিলেই কেবল প্রমাণ করা যাবে। আর সেখানে পাটিগণিত নিজেই একটি সাবসেট হিসেবে বর্তমান থাকবে।

গণিতে অনেক কিছু করা অসম্ভব হলেও ভৌত বিজ্ঞানের কোনো কিছু পরমভাবে অসম্ভব বলে ঘোষণা করা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী আলবার্ট এ মাইকেলসন ১৮৯৪ সালে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের রায়ারসন ফিজিক্যাল ল্যাবে যে বক্তৃতা দিয়েছিলেন, সেটি একবার মনে করিয়ে দিতে চাই। সেখানে তিনি ঘোষণা করেছিলেন, নতুন কোনো পদার্থবিজ্ঞান আবিষ্কার করা অসম্ভব : ‘ভৌত পদার্থবিজ্ঞানের আরও গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক সূত্র ও তথ্যের সব আবিষ্কৃত হয়ে গেছে। এগুলো এখন এতই দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে নতুন আবিষ্কারের মাধ্যমে তাদের স্থানচ্যুত করার আশঙ্কা অত্যন্ত সামান্য। তাই আমাদের ভবিষ্যৎ আবিষ্কারগুলো অবশ্যই দশমিকের পর ছয় ঘর পর্যন্ত নির্ভুল করার দিকে এখন মনোযোগ দেওয়া উচিত।’

তিনি এমন মন্তব্য ছুড়ে দেন বিজ্ঞানের ইতিহাসের বড় ধরনের টালমাটাল এক সময়ে। সেটি ছিল ১৯০০ সালের কোয়ান্টাম বিপ্লব আর ১৯০৫ সালের আপেক্ষিকতা বিপ্লব। এখানে মূল কথা হলো, আজ যেটা অসম্ভব, যা আমাদের জানা পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলো অমান্য করে, খোদ সেই সূত্রগুলোই একদিন বদলে যেতে পারে।

১৮২৫ সালে ফরাসি দার্শনিক অগাস্ট কোমে তাঁর লেখা কোর্স ডি ফিলোসফিতে ঘোষণা দেন, নক্ষত্র কী দিয়ে তৈরি তা নির্ধারণ করা বিজ্ঞানের পক্ষে অসম্ভব। এটা সে সময় নিরাপদ একটি বাজি বলে মনে হয়েছিল। কারণ, নক্ষত্রের প্রকৃতি সম্পর্কে তখন কিছুই জানা যাচ্ছিল না। তাদের অবস্থান এত বেশি দূরে যে সেখানে সশরীর যাওয়াও অসম্ভব। কিন্তু তাঁর এহেন দাবির মাত্র কয়েক বছর পরই পদার্থবিদেরা (স্পেকট্রোস্কপি ব্যবহার করে) ঘোষণা দিলেন, সূর্য হাইড্রোজেন দিয়ে তৈরি। আসলে আমরা এখন জানি, বিলিয়ন বিলিয়ন বছর আগে নক্ষত্র থেকে নিঃসৃত বর্ণালি রেখা বিশ্লেষণ করে মহাবিশ্বের অধিকাংশের রাসায়নিক প্রকৃতি নির্ধারণ করা সম্ভব।

কোমে আরও কিছু অসম্ভাব্যতার তালিকা তৈরি করে বিজ্ঞানবিশ্বের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন :

-তিনি দাবি করেছিলেন, বস্তুর চূড়ান্ত কাঠামো সব সময় অনিবার্যভাবে আমাদের জ্ঞানের পরিধির বাইরে রয়ে যাবে। অন্য কথায়, বস্তুর সত্যিকার প্রকৃতি জানা অসম্ভব।

-তিনি মনে করতেন, গণিত ব্যবহার করে কখনো জীববিজ্ঞান ও রসায়ন ব্যাখ্যা করা যাবে না। তাঁর দাবি, বিজ্ঞানের এই বিষয়গুলোকে কমিয়ে গণিতের আওতায় আনা সম্ভব নয়।

-তিনি মনে করতেন, আকাশের বস্তুগুলো নিয়ে গবেষণা করে মানুষের ওপর কোনো প্রভাব ফেলা অসম্ভব।

উনিশ শতকে মৌলিক বিজ্ঞান সম্পর্কে খুব অল্পই জানা গিয়েছিল। তাই সেকালে এসব ব্যাপার অসম্ভব মনে করা যুক্তিসংগত। বস্তু ও প্রাণ সম্পর্কে বলতে গেলে কিছুই জানা ছিল না তখন। কিন্তু আমাদের কাছে এখন পারমাণবিক তত্ত্ব আছে। এটি বস্তুর কাঠামোর ভেতর বৈজ্ঞানিক তদন্তের পুরোপুরি নতুন এক জগৎ খুলে দিয়েছে। ডিএনএ ও কোয়ান্টাম তত্ত্ব সম্পর্কেও আমরা জানি। প্রাণ ও রসায়নের গোপন রহস্য উন্মোচন করেছে এটি। আমরা মহাকাশের উল্কাপাতের প্রভাব সম্পর্কেও জানি। এটি শুধু পৃথিবীতে প্রাণের ওপর প্রভাব ফেলে না, সেই সঙ্গে এর অস্তিত্ব রূপ দিতেও সহায়তা করে।

জ্যোতির্বিদ জন ব্যারো লিখেছিলেন, ‘কোমের দৃষ্টিভঙ্গির পেছনে ফরাসি বিজ্ঞানের ক্রমান্বয়ে অবনতি আংশিকভাবে দায়ী ছিল বলে দাবি করা হয়। তবে তা নিয়ে এখনো বিতর্ক করেন ইতিহাসবিদেরা।

কোমের দাবি নাকচ করে গণিতবিদ ডেভিড হিলবার্ট লিখেছেন, “আমার মতে, কোমে কেন অমীমাংসিত সমস্যা খুঁজে পায়নি, তার সত্যিকার কারণ হলো, সেখানে অমীমাংসিত কোনো সমস্যা ছিলই না।’

কতিপয় বিজ্ঞানী নতুন একগুচ্ছ অসম্ভাব্যতা তুলে ধরেছেন। সেগুলো হলো, মহাবিস্ফোরণের আগে কী ঘটেছিল, আমরা তা কখনো জানতে পারব না (কিংবা মহাবিস্ফোরণ হয়েছিল কেন)। এমনকি আমরা থিওরি অব এভরিথিং কখনো অর্জন করতে পারব না।

পদার্থবিদ জন হুইলার প্রথম অসম্ভাব্যতা নিয়ে মন্তব্য করে লিখেছেন, ‘দুই শ বছর আগে, আপনি যে কাউকে জিজ্ঞেস করতে পারতেন, “আমরা কি কোনো দিন বুঝতে পারব প্রাণ কীভাবে বাস্তবে রূপ নিল?” তিনি হয়তো বলতেন, “উদ্ভট! অসম্ভব!” কেউ যখন আমাকে প্রশ্ন করে, “মহাবিশ্ব কীভাবে বাস্তব রূপ লাভ করল, তা কি আমরা কখনো বুঝতে পারব?” তখন আমারও ঠিক একই অনুভূতি হয়।’

জ্যোতির্বিদ জন ব্যারো আরও বলেছেন, ‘আলোর গতি সীমাবদ্ধ। তাই মহাবিশ্বের কাঠামো সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানও সীমাবদ্ধ থেকে যাবে। আমরা কখনো জানতে পারব না মহাবিশ্ব অসীম, নাকি সসীম, এর কোনো শুরু ছিল, নাকি এর কোনো শেষ আছে। আমরা এটাও জানতে পারব না যে মহাবিশ্বের সব জায়গায় পদার্থবিজ্ঞানের কাঠামো একই কি না, কিংবা মহাবিশ্ব চূড়ান্তভাবে একটা সুশৃঙ্খল, নাকি শৃঙ্খলাহীন জায়গা…। মহাবিশ্বের শুরু থেকে এর শেষ পর্যন্ত মহাবিশ্বের প্রকৃতি সম্পর্কে বড় প্রশ্নগুলোও জানতে পারব না। এ সবই অমীমাংসিত থেকে যাবে।’

আমরা কখনোই জানতে পারব না—এ কথা বলে ব্যারো নিশ্চিতভাবেই মহাবিশ্বের প্রকৃতি সম্পর্কে সঠিক কথা বলেছিলেন। কিন্তু ধীরে ধীরে এসব শাশ্বত প্রশ্ন দূর করা সম্ভব এবং তার কাছে যাওয়াও সম্ভব। আমাদের জ্ঞানের পরম সীমানার প্রতিনিধিত্ব করার বদলে এসব অসম্ভাব্যতাকে হয়তো পরের প্রজন্মের বিজ্ঞানীদের জন্য অপেক্ষমাণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখাই ভালো। এই সীমাবদ্ধতাগুলো পাই ক্রাস্টের মতো, যা বানানোই হয় ভেঙে ফেলার জন্য।

মহাবিস্ফোরণের আগে যুগ শনাক্ত করা

মহাবিস্ফোরণের ক্ষেত্রে, একটি নতুন ধরনের শনাক্তকারী যন্ত্র বানাতে হবে। সনাতন এসব প্রশ্নের অনেকগুলোর হয়তো মীমাংসা করতে পারবে যন্ত্রটি। মহাকাশে বর্তমানে আমাদের বিকিরণ শনাক্তকারী যন্ত্রটি শুধু মহাবিস্ফোরণের ৩ লাখ বছর পরের নিঃসৃত বিকিরণ শনাক্ত করতে পারে। তখন কেবল প্রথম পরমাণু গঠিত হয়েছে। এই মাইক্রোওয়েভ রেডিয়েশনকে মহাবিস্ফোরণের পরের ৩ লাখ বছরের আগের কোনো সময়ে অনুসন্ধান চালানো অসম্ভব। কারণ মহাবিস্ফোরণের প্রকৃত অগ্নিগোলা এতই উত্তপ্ত আর এলোমেলো ছিল যে সেখান থেকে ব্যবহারযোগ্য কোনো তথ্য তুলে আনা সম্ভব নয়।

কিন্তু আমরা যদি অন্য কোনো ধরনের বিকিরণ বিশ্লেষণ করি, তাহলে হয়তো মহাবিস্ফোরণের আরও কাছের কোনো সময়ে পৌঁছানো যাবে। যেমন নিউট্রিনোর পথ অনুসরণ করলে মহাবিস্ফোরণের আরও কাছে যাওয়া সম্ভব (নিউট্রিনো অধরা, কোথাও বাধা পড়ে না। তাই গোটা সৌরজগৎ কঠিন সিসা দিয়ে বানানো হলেও নির্বিঘ্নে তা পাড়ি দিয়ে চলে যেতে পারে তারা)। নিউট্রিনো বিকিরণ আমাদের মহাবিস্ফোরণের কয়েক সেকেন্ড পরের সময়ে নিয়ে যেতে পারবে।

তবে মহাবিস্ফোরণের চরম রহস্য হয়তো উন্মোচিত হবে গ্র্যাভিটি ওয়েভ (গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ) বা মহাকর্ষ তরঙ্গ পরীক্ষার মাধ্যমে। এটি এমন ধরনের তরঙ্গ যা স্থান-কালের বুননের মধ্য দিয়ে চলাচল করে। এ ব্যাপারে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ রকি কোব বলেন, ‘নিউট্রিনো পটভূমি ধর্ম পরিমাপ করে আমরা মহাবিস্ফোরণের এক সেকেন্ড পরের অবস্থা দেখতে পারব। তবে স্ফীতি এলাকা থেকে আসা মহাকর্ষ তরঙ্গ মহাবিস্ফোরণের ১০^-৩৫ পরের মহাবিশ্বের ধ্বংসাবশেষ।

মহাকর্ষ তরঙ্গ সম্পর্কে প্রথম অনুমান করেছিলেন আইনস্টাইন, ১৯১৬ সালে। এরপর ধীরে ধীরে জ্যোতির্বিদ্যার গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধান হাতিয়ারে পরিণত হয় এটি। ঐতিহাসিকভাবে যখনই নতুন ধরনের বিকিরণ ব্যবহার করা হয়েছে, তখনই নতুন এক যুগের সূচনা হয়েছে। বিকিরণের প্রথম রূপটি ছিল দৃশ্যমান আলো। সেটি ব্যবহার করে সৌরজগৎ নিয়ে অনুসন্ধান চালান গ্যালিলিও। দ্বিতীয় ধরনের বিকিরণটি ছিল রেডিও ওয়েভ বা বেতার তরঙ্গ। এ তরঙ্গের মাধ্যমে আমরা ছায়াপথের মাঝখানে অনুসন্ধান চালিয়ে একসময় কৃষ্ণগহ্বর খুঁজে পেয়েছি। মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্তকারী যন্ত্র হয়তো সৃষ্টির রহস্য উন্মোচন করতে পারবে।

এক অর্থে মহাকর্ষ তরঙ্গের অস্তিত্ব থাকতেই হবে। বহু পুরোনো সেই প্রশ্নটির কথা ভাবুন : হঠাৎ করে সূর্য হারিয়ে গেলে কী ঘটবে? নিউটনের মতে, এই প্রভাব সঙ্গে সঙ্গেই বুঝতে পারব আমরা। পৃথিবী শিগগিরই তার কক্ষপথ থেকে বিচ্যুত হয়ে গাঢ় অন্ধকারে হারিয়ে যাবে। এমন প্রভাবের কারণ হলো, নিউটনের মহাকর্ষ সূত্রে বেগের বিষয়টি আমলে নেওয়া হয়নি। তাই বলগুলো নিমেষেই গোটা মহাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু আইনস্টাইনের মতে, কোনো কিছুই আলোর চেয়ে দ্রুতবেগে চলতে পারে না। কাজেই সৌরজগৎ থেকে হঠাৎ সূর্য হারিয়ে গেলে সে তথ্য পৃথিবীতে পৌঁছাতে সময় লাগবে প্রায় ৮ মিনিট। অন্য কথায়, মহাকর্ষের গোলীয় শক ওয়েভ সূর্য থেকে নির্গত হয়, তারপর একসময় পৃথিবীতে আঘাত হানে। এই মহাকর্ষ তরঙ্গের গোলক বা বলয়ের বাইরে, দেখা যাবে যে সূর্য তখনো স্বাভাবিকভাবে আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে। কারণ সূর্যের হারিয়ে যাওয়ার তথ্য তখনো পৃথিবীতে পৌঁছায়নি। তবে মহাকর্ষ তরঙ্গের এই বলয়ের ভেতরে সূর্য ইতিমধ্যে হারিয়ে গেছে। কারণ এখানে মহাকর্ষের প্রসারিত শক ওয়েভ আলোর গতিতে ভ্রমণ করে।

মহাকর্ষ তরঙ্গের অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার আরেকটা উপায় হচ্ছে, অনেক বড় একটি বিছানার চাদরের কথা কল্পনা করা। আইনস্টাইনের মতে, স্থান-কাল হলো একটি বুনন, যা সংকুচিত বা প্রসারিত হতে পারে। ঠিক যেন বিছানার চাদরের মতো। আমরা যদি বিছানার চাদরটি আঁকড়ে ধরে বারবার ঝাড়তে থাকি, তাহলে দেখতে পাব যে বিছানার চাদরের পৃষ্ঠ বরাবর তরঙ্গের ঢেউ উঠছে এবং তা একটি নির্দিষ্ট বেগে চলাচল করছে। একই উপায়ে মহাকর্ষ তরঙ্গকেও ভ্রমণরত তরঙ্গ হিসেবে দেখা যায়, যা স্থান-কালের বুনন বরাবর চলাচল করে।

পদার্থবিজ্ঞানে এখন সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো মহাকর্ষ তরঙ্গ। বড় ধরনের মহাকর্ষ শনাক্তকারী যন্ত্র ২০০৩ সালে প্রথমবার কাজে নেমেছে। এই ডিটেক্টরের নাম লাইগো (লেজার ইন্টারফেরোমিটার গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ অবজারভেটরি)। ২৫ মাইল লম্বা এই ডিটেক্টরটির একটি ওয়াশিংটনের হ্যানফোর্ডে এবং আরেকটি লুইজিয়ানার লিভিংস্টোন প্যারিসে অবস্থিত। ৩৬৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে বানানো এই লাইগো নিউট্রন স্টার ও কৃষ্ণগহ্বরের মধ্যে সংঘর্ষের কারণে সৃষ্ট বিকিরণ শনাক্ত করতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে। [লাইগোতে এরই মধ্যে বেশ কয়েকবার মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। ২০১৬ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি লাইগো এবং ভারগো যৌথভাবে প্রথমবার মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্ত করার ঘোষণা দেয়। প্রায় ৫ মাস আগে ২০১৫ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর এই তরঙ্গ শনাক্ত করে লাইগো। পৃথিবী থেকে ১৩০ কোটি আলোকবর্ষ দূরের বিশাল ভরের দুটি কৃষ্ণগহ্বরের সংঘর্ষের কারণে এই মহাকর্ষ তরঙ্গের সৃষ্টি হয়েছিল। কৃষ্ণগহ্বর দুটির মধ্যে একটি ছিল সূর্যের চেয়ে ৩০ গুণ ও আরেকটি ৩৫ গুণ ভারী। এই তরঙ্গ শনাক্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কারণে ২০১৭ সালে নোবেল পুরস্কার পান রেইনার ওয়েস, কিপ থর্ন ও ব্যারি ব্যারিস।—অনুবাদক]

পরবর্তী বড় পদক্ষেপ শুরু হবে ২০১৫ সালে। তখন মহাবিশ্ব সৃষ্টির মুহূর্তের মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্ত করতে মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা হবে পুরোপুরি নতুন ধরনের কয়েকটি স্যাটেলাইট। তিনটি স্যাটেলাইট নতুন ডিটেক্টর লিসা (লেজার ইন্টারফেরোমিটার স্পেস অ্যানটেনা) বানানো হবে। এটি নাসা ও ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির যৌথ প্রজেক্ট। লিসাকে (LISA) সূর্যের চারপাশের কক্ষপথে স্থাপন করা হবে। মহাবিস্ফোরণের ১ সেকেন্ডের ট্রিলিয়ন ভাগের ১ ভাগ সময় পরের মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্ত করতে পারবে এই স্যাটেলাইটগুলো। মহাবিস্ফোরণ থেকে আসা মহাকর্ষ তরঙ্গ যদি এখনো মহাবিশ্বে ছড়িয়ে থাকে, তাহলে তা এই স্যাটেলাইটে আঘাত হানবে। এই তরঙ্গ লেজার বিমকে ব্যাঘাত ঘটাবে। এই বিঘ্ন থেকেই নিখুঁতভাবে মহাবিশ্বের সৃষ্টি মুহূর্তের বা শিশু মহাবিশ্বের ছবি পাওয়া যাবে। [২০১৭ সালে লিসা স্যাটেলাইট মহাকাশে পাঠানোর কথা থাকলেও পরে তা উৎক্ষেপণের তারিখ পিছিয়ে দেওয়া হয়। ২০৩০ সালের দিকে এটি উৎক্ষেপণ করা হতে পারে।—অনুবাদক]

লিসা তিনটি স্যাটেলাইট নিয়ে গঠিত, যারা সূর্যের চারপাশে তিনটি বিন্দুতে অবস্থান করে একটি ত্রিভুজ গঠন করে পাক খাবে। প্রতিটি স্যাটেলাইটে ৩০ লাখ (৩ মিলিয়ন) মাইল লম্বা লেজার বিম সংযুক্ত থাকবে। এর মাধ্যমে এটি হয়ে উঠবে সর্বকালের সবচেয়ে বড় যন্ত্র। তিনটি স্যাটেলাইটের এ ব্যবস্থাটি পৃথিবী থেকে ৩০ মিলিয়ন মাইল দূর থেকে সূর্যের চারপাশে ঘুরবে।

প্রতিটি স্যাটেলাইট যে লেজার রশ্মি নিঃসরণ করবে, তার শক্তির পরিমাণ মাত্র অর্ধেক ওয়াট। অন্য দুটি স্যাটেলাইট থেকে আসা লেজার রশ্মির সঙ্গে তুলনা করলে প্রতিটি স্যাটেলাইট আলোর একটি ব্যতিচার নকশা গঠন করবে। কোনো মহাকর্ষ তরঙ্গ এই লেজার রশ্মিগুলোতে আঘাত হানলে এই ব্যতিচার নকশা বদলে যাবে এবং স্যাটেলাইটগুলো এই বাধা শনাক্ত করতে পারবে। (মহাকর্ষ তরঙ্গ স্যাটেলাইটকে কাঁপায় না। এটি আসলে তিনটি স্যাটেলাইটের মধ্যখানের স্থানে একটি বিকৃতির সৃষ্টি করবে।)

লেজার রশ্মিগুলো খুব দুর্বল হলেও তাদের যথার্থতা অবাক করার মতো। তারা বিলিয়ন ট্রিলিয়ন ভাগের মধ্যে ক্ষুদ্র ১ ভাগ কম্পন শনাক্ত করতে পারবে। অনেকটা পরমাণুর আকারের ১০০ ভাগের মধ্যে ১ ভাগ পরিমাণ করার মতো। প্রতিটি লেজার রশ্মি ৯ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূর থেকে আসা মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্ত করতে পারবে। এটিই দৃশ্যমান মহাবিশ্বের অধিকাংশ এলাকা।

মহাবিস্ফোরণের আগের বিভিন্ন চিত্রের মধ্যে সম্ভাব্য পার্থক্য করার মতো সংবেদনশীল হবে লিসা। তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে এখন অন্যতম জনপ্রিয় বিষয় মহাবিশ্বের মহাবিস্ফোরণের আগের (প্রাক্-মহাবিস্ফোরণ) চরিত্র গণনা করা। মহাবিস্ফোরণের পর মহাবিশ্ব কীভাবে বিবর্তিত হলো, তা বর্তমানে বেশ ভালোভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে স্ফীতি তত্ত্ব। কিন্তু মহাবিস্ফোরণ কেন সংঘটিত হলো, তা স্ফীতি তত্ত্ব ব্যাখ্যা করতে পারে না। মহাবিস্ফোরণের আগের যুগের অনুমিত মডেলগুলো ব্যবহার করে মহাবিস্ফোরণ থেকে নিঃসৃত মহাকর্ষ বিকিরণ গণনা করাই এখন আমাদের লক্ষ্য। প্রাক্-মহাবিস্ফোরণ নিয়ে বিভিন্ন তত্ত্ব ভিন্ন ভিন্ন অনুমান করে। যেমন মহাবিস্ফোরণ থেকে নিঃসৃত বিকিরণের অনুমান করেছিল বিগ স্প্যালা থিওরি। স্ফীতি তত্ত্বের অনুমিত বিকিরণ থেকে এটি আবার আলাদা। কাজেই লিসা হয়তো বিভিন্ন তত্ত্ব বাতিল করে দিতে পারবে। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, এই প্রাক্-মহাবিস্ফোরণ মডেলগুলোকে সরাসরি পরীক্ষা করে দেখা সম্ভব নয়। কারণ, এর সঙ্গে স্বয়ং সময় সৃষ্টির আগের মহাবিশ্ব সম্পর্কে উপলব্ধিও জড়িত। তবে এই মডেলগুলো পরোক্ষভাবে পরীক্ষা করে দেখা সম্ভব। কারণ, এসব তত্ত্বের প্রতিটিই মহাবিস্ফোরণ থেকে ভিন্ন ভিন্ন বিকিরণ বর্ণালির নিঃসরণের কথা অনুমান করে।

পদার্থবিদ কিপ থর্ন লিখেছেন, ‘২০০৮ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যবর্তী কোনো এক সময়ে মহাবিস্ফোরণের পরম বিন্দু থেকে আসা মহাকর্ষ তরঙ্গ আবিষ্কৃত হবে। এতে নতুন একটা যুগের সূচনা করবে, যা স্থায়ী হবে অন্তত ২০৫০ সাল পর্যন্ত। এসব প্রচেষ্টার মাধ্যমে মহাবিস্ফোরণের পরম বিন্দু সম্পর্কে বিস্তারিত উন্মোচিত হবে। পাশাপাশি এর মাধ্যমে প্রমাণ করা যাবে যে স্ট্রিং থিওরির কিছু সংস্করণ মহাকর্ষের কোয়ান্টাম তত্ত্ব হিসেবে সঠিক।

প্রাক্-মহাবিস্ফোরণ নিয়ে বিভিন্ন তত্ত্বের মধ্যে যদি লিসা কোনো পার্থক্য করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে এর উত্তরসূরি বিগ ব্যাং অবজারভার (বিবিও) হয়তো সেটি করতে পারবে। এর চালু করার সম্ভাব্য সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৫ সাল। গোটা মহাবিশ্বের নিউট্রন স্টার, কৃষ্ণগহ্বরসহ বাইনারি সিস্টেমগুলো স্ক্যান করতে পারবে বিবিও স্যাটেলাইট। নিউট্রন স্টার ও কৃষ্ণগহ্বরগুলোর ভর আমাদের সূর্যের চেয়ে ১০০০ ভাগ কম হলেও বিবিও (BBO) তা শনাক্ত করতে পারবে। তবে এর প্রধান লক্ষ্য হলো মহাবিস্ফোরণের স্ফীতি পর্যায় শুরু হওয়ার সময়ে যে মহাকর্ষ তরঙ্গ নিঃসৃত হয়েছিল, তা বিশ্লেষণ করা। সে জন্য বিবিও বিশেষভাবে ডিজাইন করা হয়েছে, যাতে তা স্ফীতিশীল মহাবিস্ফোরণ তত্ত্বের অনুমান অনুসন্ধান চালাতে পারে।

কিছু ক্ষেত্রে লিসার সঙ্গে বিবিওর ডিজাইনের মিল আছে। এতেও তিনটি স্যাটেলাইট থাকবে, যারা সূর্যের চারপাশে আবর্তন করবে। প্রতিটি স্যাটেলাইট পরস্পরের সঙ্গে দূরত্ব হবে ৫০ হাজার কিলোমিটার (লিসার স্যাটেলাইটগুলোর চেয়ে এই স্যাটেলাইটগুলো অনেক বেশি কাছাকাছি থাকবে)। ৩০০ ওয়াটের লেজার রশ্মি ছুড়তে সক্ষম হবে প্রতিটি স্যাটেলাইট। এর মাধ্যমে লাইগো ও লিসার মহাকর্ষ তরঙ্গের কম্পাঙ্কের মধ্যবর্তী কম্পাঙ্ক অনুসন্ধান করতে পারবে এটি। এর মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ শূন্যস্থান পূরণ হবে। (১০ থেকে ৩০০০ হার্জের মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্ত করতে পারবে লিসা। অন্যদিকে ১০ মাইক্রোহার্জ থেকে ১০ মিলিহার্জ কম্পাঙ্কের মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্ত করতে পারে লাইগো। তবে বিবিও এই উভয় পরিসরের কম্পাঙ্ক শনাক্ত করতে পারবে।)

‘২০৪০ সালের মধ্যে আমরা কোয়ান্টাম মহাকর্ষের সূত্রগুলো ব্যবহার করে অনেকগুলো গভীর ও ধাঁধার মতো অমীমাংসিত প্রশ্নের উত্তর যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দিতে পারব।’ কিপ থর্ন লিখেছেন, ‘এর মধ্যে থাকবে মহাবিস্ফোরণের পরম বিন্দুর আগে কী ছিল, কিংবা পরম বিন্দুর আগে আসলেই ‘আগে’ বলতে কিছু আছে কি না? এর বাইরেও কি অন্য কোনো মহাবিশ্বের অস্তিত্ব আছে? আর তা-ই যদি হয়, তাদের পরস্পরের সঙ্গে বা আমাদের মহাবিশ্বের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কী? পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলো কি ইন্টারস্টেলার ভ্রমণের জন্য অতি উন্নত কোনো সভ্যতাকে ওয়ার্মহোল বানানোর ও তা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দিয়েছে? সেই সঙ্গে এর মাধ্যমে টাইম মেশিন বানিয়ে তা দিয়ে সময়ের পেছনে পরিভ্রমণ করার ক্ষমতা দিয়েছে?’

এখানে মূল ব্যাপারটি হলো, কয়েক দশক পর মহাকাশে স্থাপিত মহাকর্ষ তরঙ্গ ডিটেক্টরগুলো থেকে পাওয়া পর্যাপ্ত তথ্য ব্যবহার করে প্রাক্- মহাবিস্ফোরণ-সম্পর্কিত তত্ত্বগুলোর মধ্যে পার্থক্য করা যাবে।

মহাবিশ্বের সমাপ্তি

কবি টি এস ইলিয়ট একবার প্রশ্ন করেছিলেন, ‘মহাবিশ্বের সমাপ্তি কি কোনো বিস্ফোরণ, নাকি মৃদু গর্জনের মধ্য দিয়ে হবে?’ আর কবি রবার্ট ফ্রস্টের জিজ্ঞাসা ছিল, ‘আমরা কি আগুন নাকি বরফে পরিণত হয়ে শেষ হয়ে যাব?’ সর্বশেষ পাওয়া প্রমাণ ইঙ্গিত করছে, বিগ ফ্রিজ বা মহাশীতলতার মাধ্যমে মহাবিশ্বের অন্তিম সমাপ্তি ঘটবে। তখন মহাবিশ্বের তাপমাত্রা দাঁড়াবে পরম শূন্যের কাছাকাছি। ভয়াবহ ওই অবস্থায় সব বুদ্ধিমান প্রাণের জীবনপ্রদীপ দপ করে নিভে যাবে। কিন্তু এ ব্যাপারে আমরা কি কখনো নিশ্চিত হতে পারব?

কয়েকজন আবার আরেকটি অসম্ভব রকম প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের জিজ্ঞাসা, মহাবিশ্বের চূড়ান্ত পরিণতি কী হবে, সেটি কি আমরা কখনো জানতে পারব? কারণ, ভবিষ্যতে এ ঘটনাটি ঘটবে আরও ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন বছর পর। বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস, ডার্ক এনার্জি বা গুপ্তশক্তি বা ভ্যাকুয়াম এনার্জি ছায়াপথগুলোকে পরস্পরের কাছ থেকে সর্বোচ্চ হারে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। এতে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, মহাবিশ্ব কোনো পলায়নরত অবস্থায় আছে। এ ধরনের প্রসারণ মহাবিশ্বের তাপমাত্রা কমিয়ে দেবে। তাতে চূড়ান্তভাবে বিগ ফ্রিজের দিকে নিয়ে যাবে মহাবিশ্বকে। কিন্তু এই প্রসারণ কি ক্ষণস্থায়ী? ভবিষ্যতে কি এই প্রসারণ উল্টো দিকে যাবে?

যেমন, বিগ স্প্যালা থিওরির (Big Splat theory) স্তরের মধ্যে সংঘর্ষ হয় ও মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয়। দেখে মনে হচ্ছে, স্তরগুলো পর্যায়ক্রমে সংঘর্ষের মুখে পড়ে। তা-ই যদি হয়, তাহলে এখন যে প্রসারণ বিগ ফ্রিজের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, তা সাময়িক অবস্থামাত্র। এটি পরে নিজে থেকেই উল্টো দিকে প্রবাহিত হবে।

মহাবিশ্বের বর্তমানের ত্বরণ নিয়ন্ত্রণ করছে ডার্ক এনার্জি বা গুপ্তশক্তি। এই শক্তির পেছনে হয়তো মহাজাগতিক ধ্রুবক রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। কাজেই এই রহস্যময় ধ্রুবক বা ভ্যাকুয়ামের শক্তি সম্পর্কে বোঝাটা জরুরি। এই ধ্রুবক কি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয়, নাকি তা আসলে ধ্রুব রাশি? বর্তমানে এ ব্যাপারে নিশ্চিতভাবে কেউ কিছু জানে না। পৃথিবীর চারপাশে ঘূর্ণনরত ডব্লিউএমএপি স্যাটেলাইট থেকে আমরা জানি, এই মহাজাগতিক ধ্রুবক হয়তো মহাবিশ্বের বর্তমান ত্বরণের পেছনে কাজ করছে। কিন্তু এটি চিরস্থায়ী নাকি চিরস্থায়ী নয়, তা এখনো জানা যায়নি।

সমস্যাটি বেশ পুরোনো। ১৯১৬ সালে আইনস্টাইন প্রথম এই কসমোলজিক্যাল কনস্ট্যান্ট বা মহাজাগতিক ধ্রুবকের সূচনা করেন। তার আগের বছর সাধারণ আপেক্ষিকতা প্রস্তাব করার পর, নিজের তত্ত্বের মহাজাগতিক প্রয়োগ নিয়ে গবেষণা করছিলেন তিনি। বিস্ময়ের সঙ্গে তিনি দেখতে পান, মহাবিশ্ব গতিশীল। মানে হলো, মহাবিশ্ব প্রসারিত হচ্ছে, নয়তো তা গতিশীল। কিন্তু এই ধারণাটিকে সেকালের জানা তথ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে হলো আইনস্টাইনের কাছে।

বেন্টলি প্যারাডক্স মোকাবিলা করলেন আইনস্টাইন। খোদ নিউটনও বিশ্বাস করতেন এ প্যারাডক্সে। ১৬৯২ সালে রেভারেন্ড রিচার্ড বেন্টলি নির্দোষ এক চিঠি লেখেন নিউটনকে। চিঠিতে ছিল এক বিধ্বংসী প্রশ্ন। বেন্টলির জিজ্ঞাসা, নিউটনের মহাকর্ষ যদি সর্বদা আকর্ষণধর্মী হয়, তাহলে মহাবিশ্ব চুপসে বা ভেঙে পড়ছে না কেন? মহাবিশ্বে পরস্পরকে আকর্ষণ করা সসীমসংখ্যক নক্ষত্র থাকলে নক্ষত্রদের পরস্পরের কাছে চলে আসা উচিত। এভাবে মহাবিশ্ব চুপসে অগ্নিগোলায় পরিণত হওয়ার কথা। চিঠির এই প্রশ্নে বেশ বেকায়দায় পড়েন নিউটন। কারণ, এটি তার মহাকর্ষ তত্ত্বের গুরুতর ত্রুটির ইঙ্গিত করে। মহাকর্ষের যেকোনো তত্ত্ব আকর্ষণধর্মী হলে সহজাতভাবে মহাবিশ্ব অস্থিতিশীল হয়। সসীমসংখ্যক নক্ষত্র মহাকর্ষের অধীনে পতিত হয়ে অনিবার্যভাবে চুপসে যাবে।

চিঠির উত্তরে নিউটন লেখেন, স্থিতিশীল মহাবিশ্ব সৃষ্টির একমাত্র উপায় নক্ষত্রের সংখ্যা অসীম ও সুষম হওয়া। তাতে সব দিকে আকর্ষণ অনুভব করবে প্রতিটি নক্ষত্র। ফলে সব বল বাতিল হয়ে যাবে। এটা বেশ চতুর কৌশল। তবে যথেষ্ট স্মার্ট হওয়ার কারণে নিউটন একসময় বুঝতে পারেন, এ ধরনের স্থিতিশীলতা বিভ্রান্তিকর। তাসের ঘরের মতো ক্ষুদ্র কম্পনেও পুরো ব্যাপারটা ধসে পড়বে। এটা আপাতস্থিতিশীলতা। অর্থাৎ সামান্যতম উত্তেজনার কারণে ধসে পড়ার আগ পর্যন্ত এটা সাময়িকভাবে স্থিতিশীল অবস্থায় থাকবে। নিউটন সিদ্ধান্তে আসেন, স্বয়ং ঈশ্বর অনিবার্যভাবে পর্যায়ক্রমে নক্ষত্রগুলোকে কিছুটা ধাক্কা দেন। তাতে মহাবিশ্ব আর চুপসে যায় না।

অন্য কথায়, মহাবিশ্বকে সুবিশাল একটি ঘড়ি হিসেবে দেখতে পেলেন নিউটন। সময়ের শুরুতে এর চাবি টেনে দিয়েছেন ঈশ্বর। এরপর তা নিউটনের সূত্রগুলো মেনে চলছে। স্বর্গীয় কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়াই এরপর থেকে চিরকাল মহাবিশ্ব চলছে স্বয়ংক্রিয়ভাবে। তবে নিউটনের মতে, ঈশ্বর প্রয়োজনমতো নক্ষত্রগুলোতে হস্তক্ষেপ করেন। এ কারণে মহাবিশ্ব চুপসে কোনো অগ্নিগোলায় পরিণত হয়নি।

বেন্টলির এই প্যারাডক্সে ১৯১৬ সালে হোঁচট খেলেন স্বয়ং আইনস্টাইনও। তাঁর সমীকরণগুলো সঠিকভাবেই বলল যে মহাবিশ্ব গতিশীল। মহাবিশ্ব হয় প্রসারিত হচ্ছে, নয়তো সংকুচিত হচ্ছে। আবার স্থির মহাবিশ্ব অস্থিতিশীল ও তা মহাকর্ষের কারণে ভেঙে পড়ে। কিন্তু তখনকার জ্যোতির্বিদেরা জোর দাবি জানাতে লাগলেন, মহাবিশ্ব স্থিতিশীল ও অপরিবর্তনীয়। কাজেই জ্যোতির্বিদদের পর্যবেক্ষণের কাছে নত হলেন আইনস্টাইন। এরপর তিনি তাঁর সমীকরণে মহাজাগতিক ধ্রুবক যোগ করেন। এটি মহাকর্ষের বিপরীত বল, যা মহাকর্ষের টানের কারণে মহাবিশ্বের চুপসে যাওয়া ঠেকাতে নক্ষত্রগুলোকে পরস্পরের কাছে আসতে দূরে ঠেলে দেয়। (এই মহাকর্ষের বিপরীত বল শূন্যস্থানের মধ্যে ধারণকৃত শক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এতে স্থানের অনেক বড় শূন্যতার মধ্যে বড় ধরনের অদৃশ্য শক্তি থাকে।) ধ্রুবকটি নিখুঁতভাবে বেছে নেওয়া হয়েছিল মহাকর্ষের আকর্ষী বলকে বাতিল করতে।

পরে এডুইন হাবল ১৯২৯ সালে প্রমাণ করলেন, মহাবিশ্ব সত্যিই প্রসারিত হচ্ছে। তখন আইনস্টাইন বললেন, মহাজাগতিক ধ্রুবক তাঁর সবচেয়ে বড় ভুল। কিন্তু ৭০ বছর পর দেখা যাচ্ছে, আইনস্টাইনের সেই মহাভুল বা মহাজাগতিক ধ্রুবক হয়তো মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় শক্তির জোগানদাতা। এটি মহাবিশ্বের ৭৩ শতাংশ বস্তুশক্তির আধার। (অন্যদিকে আমাদের দেহের গাঠনিক উপাদানের পরিমাণ মহাবিশ্বের মাত্র ০.০৩ শতাংশ। আইনস্টাইনের মহাভুলই মহাবিশ্বের চূড়ান্ত ভাগ্য নির্ধারণ করবে বলে মনে হচ্ছে।

কিন্তু এই মহাজাগতিক ধ্রুবক এল কোথা থেকে? বর্তমানে এর উত্তর জানা নেই। কালের শুরুতে মহাকর্ষের বিপরীত বল (প্রতি-মহাকর্ষ) হয়তো বেশি ছিল। সে কারণে মহাবিশ্ব স্ফীত হয়ে জন্ম দেয় এক মহাবিস্ফোণের। তারপর হঠাৎ করে হারিয়ে যায় এটি। কিন্তু কেন তা হারিয়ে গেল, তা এখনো অজানা। (মহাবিশ্ব এখনো প্রসারিত হচ্ছে, কিন্তু বেশ ধীরগতিতে।) তারপর মহাবিস্ফোরণের প্রায় ৮ বিলিয়ন বছর পর প্রতি-মহাকর্ষ বল আবারও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এর কারণেই ছায়াপথগুলো পরস্পর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে ও মহাবিশ্বের ত্বরণ ঘটছে।

কাজেই মহাবিশ্বের চূড়ান্ত পরিণতি নির্ধারণ করা কি অসম্ভব? হয়তো না। বেশির ভাগ পদার্থবিদ বিশ্বাস করেন, কোয়ান্টাম প্রভাবই চূড়ান্তভাবে মহাজাগতিক ধ্রুবকের আকার নির্ধারণ করে। কোয়ান্টাম তত্ত্বের একটি আদি সংস্করণ ব্যবহার করে এক সরল গণনায় দেখা যায়, মহাজাগতিক ধ্রুবক ১০১২০ গুণ কম-বেশি হচ্ছে। বিজ্ঞানের ইতিহাসে এটি সবচেয়ে বড় অসংগতি।

তবে পদার্থবিদেরা একটি ঐকমত্যে পৌঁছেছেন যে এই অস্বাভাবিকতার সহজ অর্থ হলো আমাদের একটি কোয়ান্টাম মহাকর্ষের তত্ত্ব দরকার। যেহেতু মহাজাগতিক ধ্রুবক কোয়ান্টাম সংশোধনের মাধ্যমে উঠে আসে, কাজেই একটি থিওরি অব এভিরিথিং বা সর্বজনীন তত্ত্বের প্রয়োজন। অর্থাৎ এমন একটি তত্ত্ব, যা শুধু স্ট্যান্ডার্ড মডেলই গণনা করার অনুমোদন দেবে না, সেই সঙ্গে মহাজাগতিক ধ্রুবকের মানও নির্ণয় করতে পারবে। এর মাধ্যমেই মহাবিশ্বের চূড়ান্ত পরিণতি নির্ধারণ করা যাবে।

কাজেই মহাবিশ্বের চূড়ান্ত পরিণতি নির্ধারণের জন্য একটি সর্বজনীন তত্ত্বের প্রয়োজন। মজার ব্যাপার হলো, কিছু পদার্থবিদের বিশ্বাস, কোনো সর্বজনীন তত্ত্ব অর্জন করা আমাদের পক্ষে অসম্ভব।

থিওরি অব এভরিথিং

আগেই বলেছি, থিওরি অব এভরিথিংয়ের দাবিদার প্রধান প্রার্থী হলো স্ট্রিং থিওরি। অবশ্য স্ট্রিং থিওরি এই দাবি করতে পারে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্কও আছে। এদের একটি দলে আছে এমআইটির অধ্যাপক ম্যাক্স টেগমার্কের মতো কিছু মানুষ। টেগমার্ক লিখেছেন, ‘আমার ধারণা, ২০৫৬ সালে আমরা এমন টি-শার্ট কিনতে পারব, যার গায়ে মহাবিশ্বের ভৌত সূত্রগুলো ঐক্যবদ্ধ করে বর্ণিত সমীকরণ ছাপা থাকবে।’ অন্যদিকে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ সমালোচকদের উদীয়মান একটি দলও আছে এখানে। তাদের দাবি, স্ট্রিং মেনে নেওয়ার কোনো কারণ এখনো পাওয়া যায়নি। অনেকে বলেন, স্ট্রিং থিওরি নিয়ে কতটা শ্বাসরুদ্ধকর লেখা ছাপা হলো বা কতটা টিভি ডকুমেন্টারি তৈরি হলো, তাতে কিছু যায় আসে না। কারণ, এ তত্ত্বের এখনো কোনো পরীক্ষাযোগ্য সত্যতা পাওয়া যায়নি। সমালোচকেরা দাবি করেন, তত্ত্বটি থিওরি অব এভরিথিং তো নয়ই, বরং এটি অন্তঃসারশূন্য। ২০০২ সালে স্টিফেন হকিং পক্ষ পরিবর্তন করার পর এই বিতর্ক বেশ জমে উঠেছিল। একে অসম্পূর্ণ উপপাদ্য হিসেবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, থিওরি অব এভরিথিং থাকা হয়তো গাণিতিকভাবেও অসম্ভব।

বিস্ময়ের ব্যাপার, এ বিতর্কে পদার্থবিদদের বিরুদ্ধে লড়ছেন খোদ পদার্থবিদেরা। কারণ, এর লক্ষ্য অধরা হলেও বেশ অভিজাত। প্রকৃতির সব সূত্র ঐক্যবদ্ধ করার প্রচেষ্টা দার্শনিক ও পদার্থবিদদের প্রায় হাজার বছর ধরে উত্তেজিত ও প্রলুব্ধ করে রেখেছে। সক্রেটিস বলেছিলেন, ‘সবকিছুর ব্যাখ্যা জানা আমার কাছে দুর্দান্ত ব্যাপার মনে হয়, এটি কেন এল, এটি কেন ধ্বংস হয়, এটি কেন হয়।’

থিওরি অব এভরিথিংয়ের প্রথম গুরুতর প্রস্তাব ওঠে সেই খ্রিষ্টপূর্ব ৫০০ অব্দে। তখন গ্রিক পিথাগোরিয়ানরা সংগীতের গাণিতিক সূত্র উদ্ঘাটনের কৃতিত্ব দেখাচ্ছেন। লির বাদ্যযন্ত্রের তারের কম্পন ও নোড বিশ্লেষণ করে তাঁরা দেখালেন, সংগীত অসাধারণ সরল গণিত মেনে চলে। এরপর তাঁরা অনুমান করলেন, প্রকৃতির সবকিছুকে লির তারের ঐকতান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। (এক অর্থে পিথাগোরিয়ানদের সেই স্বপ্নই আবার ফিরিয়ে এনেছে স্ট্রিং থিওরি।)

আধুনিক যুগে বিশ শতকের পদার্থবিজ্ঞানের প্রায় সব বাঘা বাঘা বিজ্ঞানী একটি ঐক্যবদ্ধ ফিল্ড থিওরি প্রণয়নের প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। তবে ফ্রিম্যান ডাইসন সতর্ক করে বলেছেন, ‘পদার্থবিদ্যার জমিন বিভিন্ন ঐক্যবদ্ধ তত্ত্বের মৃতদেহ বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে আছে।

১৯২৮ সালে নিউইয়র্ক টাইমস বেশ চটকদার হেডলাইন করেছিল, ‘আইনস্টাইন অনেক বড় আবিষ্কারের দ্বারপ্রান্তে; অনুপ্রবেশে ক্ষুব্ধ।’ এই খবর গণমাধ্যমে থিওরি অব এভরিথিং নিয়ে সাধারণের উন্মাদনা উসকে দিয়েছিল। শিরোনামে বেশ জোরের সঙ্গে বলা হলো, ‘তত্ত্ব সম্পর্কে আলোড়ন দেখে আইনস্টাইন বিস্মিত। এক সপ্তাহ ধরে সাগরতীরে ১০০ সাংবাদিক অপেক্ষমাণ।’ সে সময় কয়েক শ সাংবাদিক বার্লিনে তাঁর বাড়ির চারপাশে দঙ্গল বেঁধে ছিলেন। এই জিনিয়াস বিজ্ঞানীকে শুধু একঝলক দেখার জন্য এবং একটা চটকদার শিরোনাম বাগানোর জন্য নিদ্রাহীনভাবে অবিরাম সেখানে অপেক্ষা করছিলেন তাঁরা। তাঁদের কাছ থেকে বাঁচতে সেবার আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হন আইনস্টাইন।

আইনস্টাইনকে জ্যোতির্বিদ আর্থার এডিংটন লিখলেন, ‘জেনে হয়তো খুশি হবেন, আমাদের লন্ডনের অন্যতম বড় একটি দোকানের (সেলফ্রিজেস) জানালায় আপনার গবেষণাপত্রের (ছয় পৃষ্ঠা) লটকে দেওয়া হয়েছে। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় পথচারীরা যাতে সবটুকু পড়তে পারে, সে জন্যই এ ব্যবস্থা। এটা পড়ার জন্য বিপুল লোকসমাগম হয়।’ (১৯২৩ সালে এডিংটন তাঁর নিজের ঐক্যবদ্ধ ক্ষেত্রতত্ত্বের প্রস্তাব করেন। সেটি নিয়ে ১৯৪৪ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ক্লান্তিহীনভাবে কাজ করে গেছেন তিনি।)

কোয়ান্টাম বলবিদ্যার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা আরউইন শ্রোডিঙ্গার ১৯৪৬ সালে এক প্রেস কনফারেন্স আহ্বান করে নিজের ঐক্যবদ্ধ ক্ষেত্র তত্ত্বটির প্রস্তাব পেশ করেন। মজার ব্যাপার হলো, সেখানে উপস্থিত ছিলেন আয়ারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ইমন ডি ভ্যালেরা। এক রিপোর্টার জিজ্ঞেস করলেন, তাঁর তত্ত্বটি ভুল প্রমাণিত হলে তিনি কী করবেন। শ্রোডিঙ্গার আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জবাব দিলেন, ‘আমার বিশ্বাস, আমি সঠিক আছি। আর যদি ভুল হয়, তাহলে বুঝতে হবে আমি চরম বোকামি করেছি।’ (আইনস্টাইন বিনীতভাবে এই তত্ত্বের ত্রুটিগুলোর দিকে ইঙ্গিত করলে সেবার বেশ অপদস্থ হতে হয়েছিল শ্রোডিঙ্গারকে।)

ঐক্যবদ্ধ তত্ত্বের সবচেয়ে কঠোর সমালোচক ছিলেন পদার্থবিদ ওলফগ্যাং পাউলি। আইনস্টাইনকে তিরস্কার করে তিনি বলেছিলেন, “ঈশ্বর যা ছিন্ন করেছেন, তা কোনো মানুষের একত্র করার সাধ্য নেই।’ যেকোনো অর্ধসমাপ্ত তত্ত্বকে তিনি নির্দয়ভাবে বিদ্রূপ করে বলতেন, ‘এটা এমনকি ভুলও নয়।’ কাজেই তিনি নিজেই যখন ঐক্যবদ্ধ তত্ত্বের জ্বরে আক্রান্ত হলেন, তখন অবাক না হয়ে পারা যায় না। ওয়ার্নার হাইজেনবার্গকে সঙ্গে নিয়ে ১৯৫০-এর দশকে তিনি নিজের ঐক্যবদ্ধ ক্ষেত্র তত্ত্বের প্রস্তাব করে বসেন পাউলি।

১৯৫৮ সালে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে হাইজেনবার্গ-পাউলি একীভূত তত্ত্ব উত্থাপন করেন পাউলি। দর্শকসারিতে সেদিন বসে ছিলেন স্বয়ং পদার্থবিদ নীলস বোর। কিন্তু তিনি মুগ্ধ হতে পারেননি। কোনো কিছুর তোয়াক্কা করে বোর চট করে উঠে দাঁড়িয়ে বলে বসলেন, ‘পেছনে বসে থাকা আমরা নিশ্চিত হয়েছি, তোমার তত্ত্বটি বেশ উদ্ভট। কিন্তু তত্ত্বটি যথেষ্ট উদ্ভট কি না, তা নিয়ে আমরা দ্বিধাবিভক্ত।’ সমালোচনাটি ছিল এক বিপর্যয়ের মতো। কারণ, এর আগে নিশ্চিত দাবি করা সবগুলো তত্ত্ব একে একে বাতিল করা হয়েছিল। তাই সত্যিকার একীভূত ক্ষেত্র তত্ত্বটিকে অবশ্যই অতীতের তত্ত্বগুলো থেকে আলাদা কিছু হতে হবে। হাইজেনবার্গ-পাউলির তত্ত্বটি এতই গতানুগতিক ছিল যে তা কোনোভাবে সত্য হতে পারে না। (সে বছর হাইজেনবার্গ রেডিওতে মন্তব্য করলেন, তাঁদের তত্ত্বে শুধু কয়েকটি তাত্ত্বিক বিবরণ যোগ করা বাকি আছে। তা শুনে পাউলি বেশ বিরক্ত হন। পাউলি তাঁর বন্ধুকে ফাঁকা আয়তক্ষেত্র এঁকে চিঠি পাঠান। তাতে ক্যাপশন লেখা ছিল, “বিশ্ব দেখুক আমি ইতালিয়ান চিত্রশিল্পী টিটিয়ানের মতো আঁকতে পারি। এখানে শুধু তাত্ত্বিক বিবরণ নেই।’)

স্ট্রিং থিওরির সমালোচনা

আগে বলেছি, বর্তমানে থিওরি অব এভরিথিংয়ের মুখ্য (ও একমাত্র) পদপ্রার্থী হলো স্ট্রিং থিওরি। কিন্তু আবারও এতে পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বিরোধীদের দাবি, শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থায়ী পদ পেতে হলে স্ট্রিং থিওরি নিয়ে কাজের অভিজ্ঞতা থাকতেই হবে। আপনার যদি সে যোগ্যতা না থাকে, তাহলে স্রেফ বেকার হয়ে যাবেন। এ মুহূর্তের প্রবণতা এটি, যা পদার্থবিদ্যার জন্য মোটেও ভালো কিছু নয়।

এই সমালোচনা শুনে আমি হাসি। কারণ, সব মানুষের উদ্যমের মতো পদার্থবিজ্ঞান হলো ট্রেন্ড ও ফ্যাশনের বিষয়। অসাধারণ তত্ত্বগুলোর ভাগ্য, বিশেষ করে সম্পূর্ণ নতুন মানবজ্ঞানের উত্থান-পতন তো থাকবেই। আসলে স্ট্রিং থিওরি ঐতিহাসিকভাবে পরিত্যক্ত, ধর্মভ্রষ্ট তত্ত্ব। আর ট্রেন্ডের প্রভাবের শিকার।

স্ট্রিং থিওরির জন্ম ১৯৬৮ সালে। তখন একটি সূত্রে হোঁচট খেয়ে পড়েছিলেন গ্যাব্রিয়েল ভেনেডিয়ানো আর ম্যাহিকো সুজুকি নামের পোস্টডকের দুই তরুণ। সূত্রটি দেখে মনে হচ্ছিল, অতিপারমাণবিক কণাদের সংঘর্ষের ব্যাখ্যা দিতে পারবে। কিন্তু বেশ অচিরেই বোঝা গেল, চমৎকার সূত্রটি কম্পমান স্ট্রিং বা সুতোর সংঘর্ষ থেকে পাওয়া সম্ভব। তবে ১৯৭৪ সালে তত্ত্বটি মারা পড়ল নিজের পথেই। কোয়ান্টাম ক্রোমোডাইনামিকস (কিউসিডি) বা কোয়ার্কের তত্ত্ব নামের নতুন এক তত্ত্ব ও শক্তিশালী মিথস্ক্রিয়ার চাপে অন্য সব তত্ত্ব সে সময় আক্ষরিক অর্থেই ঘুঁটো জগন্নাথ হয়ে বসে পড়ল। কিউসিডি নিয়ে কাজ করতে দলে দলে হামলে পড়তে লাগল লোকজন। তাতে স্ট্রিং থিওরির কথা সবাই বেমালুম ভুলে গেল। কোয়ার্ক মডেল নিয়ে যাঁরা কাজ করতেন, সেই পদার্থবিদদের ঝুলিতে সব ধরনের অর্থ তহবিল, লোভনীয় চাকরি আর বিভিন্ন স্বীকৃতি একে একে চলে যেতে লাগল।

সেই অন্ধকার বছরগুলোর কথা আমার এখনো বেশ ভালোই মনে আছে। শুধু গোঁয়ারগোবিন্দ ও একগুঁয়ে জেদি কয়েকজন তখন স্ট্রিং থিওরি গবেষণা নিয়ে পড়েছিল। একসময় জানা গেল, স্ট্রিংগুলো শুধু ১০ মাত্রাতে কম্পিত হয়। তখন স্বভাবতই কৌতুকের নিশানায় পরিণত হলো তত্ত্বটি। স্ট্রিং থিওরির পথিকৃৎ ক্যাল টেকের জন সোয়ার্জের সঙ্গে মাঝে মাঝে এলিভেটরে ফাইনম্যানের দেখা হয়ে যেত। সর্বকালের সেরা রসিক বিজ্ঞানী ফাইনম্যান তখন জিজ্ঞেস করতেন, ‘আচ্ছা, জন, আজ তাহলে কয় মাত্রার মধ্যে আছ?’ আমরা মজা করে বলতাম, স্ট্রিং তাত্ত্বিকদের শুধু বেকারত্বের লাইনে খুঁজে পাওয়া যায়। (কোয়ার্ক মডেলের প্রতিষ্ঠাতা নোবেলজয়ী মারি গেল-মান আমাকে বিশ্বাস করে একবার বলেছিলেন, তিনি স্ট্রিং তাত্ত্বিক বিজ্ঞানীদের প্রতি মমতা বোধ করেন। সে জন্য তিনি ‘বিপন্ন স্ট্রিং তাত্ত্বিক বিজ্ঞানীদের জন্য প্রকৃতি সংরক্ষণ’ খুলেছেন, যাতে জন সোয়ার্জের মতো কোনো লোককে চাকরি হারাতে না হয়। )

আজকের দিনে অনেক তরুণ পদার্থবিদ স্ট্রিং থিওরির ওপর গবেষণায় ব্যস্ত। এটি উল্লেখ করে স্টিভ ভাইনবার্গ লিখেছেন, ‘চূড়ান্ত তত্ত্বের জন্য বর্তমানে একমাত্র পদপ্রার্থীর উৎস হলো স্ট্রিং থিওরি। কাজেই এতে যে বহুসংখ্যক মেধাবী তরুণ তাত্ত্বিক কাজ করবে না, সেটা আশা করেন কীভাবে?’

স্ট্রিং থিওরি কি পরীক্ষা করে দেখা অসম্ভব?

বর্তমানে স্ট্রিং থিওরি নিয়ে অন্যতম বড় সমালোচনা হলো এটি পরীক্ষা করে দেখা সম্ভব নয়। সমালোচকদের দাবি, এটি পরীক্ষা করে দেখার জন্য ছায়াপথের সমান অ্যাটম স্ম্যাশার লাগবে।

কিন্তু সমালোচকেরা একটি সত্য ভুলে যান যে বেশির ভাগ বিজ্ঞান প্রত্যক্ষভাবে নয়, পরোক্ষভাবে সম্পন্ন করা হয়। সূর্যকে সরাসরি পরীক্ষা করে দেখতে এখন পর্যন্ত কেউই সূর্যে যায়নি। কিন্তু তারপরও আমরা জানি সূর্য গঠিত হয়েছে হাইড্রোজেন দিয়ে। কারণ, তার বর্ণালি রেখা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়।

কিংবা কৃষ্ণগহ্বরের কথাই ধরুন। কৃষ্ণগহ্বরের তত্ত্ব অনেক পুরোনো। ১৭৮৩ সালে এ বিষয়ে রয়্যাল সোসাইটির ফিলোসফিক্যাল ট্রান্সসেকশন্স-এ একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেন জন মিশেল। সেখানে তিনি দাবি করেন, একটি নক্ষত্র এতই ভারী হতে পারে যে ‘ওই বস্তুর দেহ থেকে নিঃসৃত সব আলো তার নিজের মহাকর্ষের টানে আবারও তার কাছেই ফিরে যাবে।’ মিশেলের ডার্ক স্টার তত্ত্ব বহু শতাব্দী ধরে স্থবির হয়ে পড়ে ছিল। কারণ, এ বিষয়ে সরাসরি পরীক্ষা অসম্ভব ছিল সেকালে। ১৯৩৯ সালে এ বিষয়ে একটি গবেষণাপত্র লেখেন স্বয়ং আইনস্টাইন। তাতে তিনি দেখান, প্রাকৃতিকভাবে এ ধরনের ডার্ক স্টার গঠিত হওয়া সম্ভব নয়। এ ব্যাপারে সমালোচনাটি ছিল যে এসব ডার্ক স্টার সহজাতভাবেই পরীক্ষাযোগ্য নয়, কারণ, সংজ্ঞানুসারে তারা অদৃশ্য। তারপরও কৃষ্ণগহ্বর সম্পর্কে আমাদের দারুণ সব প্রমাণ দিয়েছে হাবল স্পেস টেলিস্কোপ। আমরা এখন বিশ্বাস করি, কোটি কোটি কৃষ্ণগহ্বর বিভিন্ন ছায়াপথের মাঝখানে লুকিয়ে থাকতে পারে। এমনকি অসংখ্য ভবঘুরে কৃষ্ণগহ্বর আমাদের নিজেদের ছায়াপথের মধ্যেও থাকতে পারে। কিন্তু মূল ব্যাপার হলো, কৃষ্ণগহ্বরের সব প্রমাণই পরোক্ষ। অর্থাৎ কৃষ্ণগহ্বর সম্পর্কে আমরা তথ্য জোগাড় করি তার চারপাশে ঘূর্ণনরত অ্যাক্রিশন ডিস্ক বিশ্লেষণ করে। [কৃষ্ণগহ্বর সম্পর্কে এতকাল পরোক্ষ প্রমাণ থাকলেও ২০১৯ সালে প্রথমবারের মতো একটি কৃষ্ণগহ্বরের ছবি তোলা সম্ভব হয়েছে। পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়ানো ইভেন্ট হরাইজন টেলিস্কোপ ওই বছরের ১০ এপ্রিল এ বিষয়ে ঘোষণা দেয় যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন।—অনুবাদক]

আবার অনেক ‘অপরীক্ষাযোগ্য’ তত্ত্ব একসময় চূড়ান্তভাবে পরীক্ষাযোগ্য হয়ে ওঠে। ডেমোক্রিটাস প্রথম পরমাণুর প্রস্তাব করার দুই হাজার বছর পর পরমাণুর অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়। অথচ পরমাণুতত্ত্বে বিশ্বাস করার জন্য উনিশ শতকে লুডভিগ বোলজম্যানের মতো পদার্থবিদদের পেছনে মৃত্যু তাড়িয়ে বেড়িয়েছিল। অথচ এখন পরমাণুর দুর্দান্ত ছবি আছে আমাদের কাছে। পাউলি নিজেই ১৯৩০ সালে নিউট্রিনোর ধারণার সূচনা করেন। অধরা এই কণাটি কোথাও শোষিত না হয়ে পুরো সৌরজগতের সমান কঠিন সিসার দেয়ালের বাধা পেরিয়ে যেতে পারে। পাউলি একবার আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘আমি চরম পাপ করেছি। এমন এক কণার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছি, যাকে কখনোই পর্যবেক্ষণ করা যায় না।’ একসময় নিউট্রিনোকে শনাক্ত করা অসম্ভব ছিল। কাজেই বেশ কয়েক দশক ধরে একে বিজ্ঞান কল্পকাহিনির চেয়েও বেশি কিছু নয় বলে ভাবা হতো। অথচ আমরা এখন নিউট্রিনো বিম তৈরি করতে পারি

আসলে বেশ কিছুসংখ্যক পরীক্ষা রয়েছে, যার মাধ্যমে প্রথমবারের মতো পরোক্ষভাবে স্ট্রিং থিওরি পরীক্ষা করে দেখা সম্ভব হবে বলে আশা করেন পদার্থবিদেরা। সেগুলো হলো :

-লার্জ হ্যাড্রন কলাইডার বা এলএইচসি একদিন হয়তো যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে উঠবে, যা দিয়ে এসপার্টিকেল বা সুপারপার্টিকেল তৈরি করা যাবে। সুপারপার্টিকেল হলো সুপারস্ট্রিং থিওরির (একই সঙ্গে অন্য সুপারসিমেট্রিক তত্ত্বগুলোও) ভবিষ্যদ্বাণী করা উচ্চতর কম্পন।

-আগেই বলেছি, ২০১৫ সালে লেজার ইন্টারফেরোমিটার স্পেস অ্যানটেনা বা লিসা মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা হবে। লিসা ও তার ভবিষ্যৎ উত্তরসূরি বিগ ব্যাং অবজারভার হয়তো স্ট্রিং থিওরির কয়েকটি সংস্করণসহ প্রাক্‌- মহাবিস্ফোরণ তত্ত্বগুলো পরীক্ষার জন্য যথেষ্ট সংবেদনশীল হবে। [লিসা উৎক্ষেপণের তারিখ পিছিয়ে দিয়েছে নাসা। ২০৩০ সালে এটি উৎক্ষেপিত হতে পারে।—অনুবাদক]

-মিলিমিটার পরিসরে নিউটনের বিখ্যাত বিপরীত বর্গীয় সূত্র থেকে বিচ্যুতি অনুসন্ধানের মাধ্যমে অনেকগুলো গবেষণাগারে উচ্চমাত্রার উপস্থিতি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। (যদি চতুর্থ স্থানিক মাত্রা থাকে, তাহলে মহাকর্ষ টান বিপরীত বর্গীয় নয়, বিপরীত ঘন সূত্র হবে।) স্ট্রিং থিওরির সর্বশেষ সংস্করণ বা এম-থিওরি ১১ মাত্রার ভবিষ্যদ্বাণী করে।

-অনেক পরীক্ষাগারে ডার্ক ম্যাটার বা গুপ্তবস্তু শনাক্তের চেষ্টা চলছে। কারণ, গুপ্তবস্তুর মহাজাগতিক বাতাসে চলাচল করছে আমাদের পৃথিবী। গুপ্তবস্তুর ভৌত ধর্ম সম্পর্কে স্ট্রিং থিওরি নির্দিষ্ট ও পরীক্ষণযোগ্য ভবিষ্যদ্বাণী করেছে। কারণ, গুপ্তবস্তু হয় স্ট্রিং বা সুতোর উচ্চতর কোনো কম্পন (যেমন ফোটিনো)।

-আশা করা হয়, বেশ কিছু ধারাবাহিক পরীক্ষায় (যেমন দক্ষিণ মেরুতে নিউট্রিনো পোলারাইজেশন বা মেরুকরণ) মহাজাগতিক রশ্মির অনিয়ম বিশ্লেষণ করে মিনি কৃষ্ণগহ্বর ও অন্যান্য অদ্ভুত বস্তুদের উপস্থিতি শনাক্ত করা যাবে। মহাজাগতিক রশ্মির শক্তি খুব সহজে এলএইচসির সীমা ছাড়িয়ে যায়। মহাজাগতিক রশ্মির পরীক্ষা ও এলএইচসি স্ট্যান্ডার্ড মডেলের সীমা ছাড়িয়ে নতুন আর উত্তেজক নতুন এক দিগন্ত খুলে দেবে।

-কিছু পদার্থবিদ একটি সম্ভাবনা আঁকড়ে ধরে আছেন। সেটি হলো : মহাবিস্ফোরণ এতই বিস্ফোরণোন্মুখ ছিল যে হয়তো কোনো অতি ক্ষুদ্র সুপারস্ট্রিং বিপুল অনুপাতে উড়িয়ে দিয়েছে। যেমন টাফটস বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ ভিলেনকিন লিখেছেন, ‘খুব উত্তেজক সম্ভাবনা হলো সুপারস্ট্রিং অনেক বড় মাত্রাও থাকতে পারে, যাকে আকাশে দেখতে পাব আমরা। এর মাধ্যমে সুপারস্ট্রিং থিওরি সরাসরি পরীক্ষা করে দেখা যাবে।’ (মহাবিস্ফোরণের সময় বিস্ফোরিত বিপুল আকারের, ধ্বংসাবশেষে পরিণত হওয়া সুপারস্ট্রিং বা অতিতন্তু খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। )

পদার্থবিজ্ঞান কি অসম্পূর্ণ?

স্টিফেন হকিং ১৯৮০ সালের দিকে থিওরি অব এভরিথিংয়ের প্রতি সবার আগ্রহ বাড়িয়ে তুলতে সহায়তা করেন। তার পেছনের কারণটি ছিল ‘ইজ দ্য এন্ড ইন সাইট ফর থিওরিটিক্যাল ফিজিকস’ শিরোনামের এক বক্তৃতা। এতে তিনি বলেন, ‘এখানে যাঁরা উপস্থিত আছেন, তাঁদের অনেকের জীবনকালে আমরা হয়তো একটি পূর্ণাঙ্গ তত্ত্ব দেখে যেতে পারব।’ তিনি দাবি করেছিলেন, আগামী ২০ বছরের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ তত্ত্ব পাওয়ার সম্ভাবনা ফিফটি-ফিফটি। কিন্তু ২০০০ সাল যখন এল, তখন দেখা গেল থিওরি অব এভরিথিং নিয়ে কোনো ঐকমত্য নেই। তখন হকিং মত বদলে বললেন, আরও ২০ বছরের মধ্যে এ তত্ত্ব খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা ফিফটি-ফিফটি।

এরপর ২০০২ সালে আরেকবার মত বদলে স্টিফেন ঘোষণা করলেন, গোডেলের অসম্পূর্ণতার উপপাদ্য হয়তো তাঁর মৌলিক চিন্তার মারাত্মক ত্রুটির দিকে ইঙ্গিত করে। তিনি লিখলেন, “নির্দিষ্ট সংখ্যানীতির কারণে সিদ্ধান্তে আসা যায়, চূড়ান্ত কোনো তত্ত্ব না থাকলে অনেকে খুব হতাশ হবে। আমি নিজেও এই দলে। কিন্তু আমি মত বদলে ফেলেছি…গোডেলের উপপাদ্য নিশ্চিত করে, গণিতবিদদের জন্য সর্বদা কোনো না কোনো কাজ থেকেই যাবে। আমার ধারণা, এম-থিওরি পদার্থবিদদের জন্য একই কাজ করে যাবে।’

তাঁর যুক্তিটি বেশ পুরোনো, কারণ গণিত অসম্পূর্ণ। আর পদার্থবিজ্ঞানের ভাষা হলো গণিত। কাজেই সব সময় এমন কোনো ভৌত বিবৃতি থাকবে, যা আমাদের নাগালের বাইরে থেকে যাবে। তাই থিওরি অব এভরিথিং পাওয়া সম্ভব নয়। অসম্পূর্ণতার উপপাদ্য গ্রিকদের গণিতে সত্যি বিবৃতি পাওয়ার স্বপ্ন হত্যা করেছিল। একই সঙ্গে থিওরি অব এভরিথিং চিরকাল আমাদের হাতের নাগালের বাইরে থেকে যাবে এর কারণে।

ফ্রিম্যান ডাইসন দারুণভাবে লিখেছেন, ‘গোডেল প্রমাণ করেছেন বিশুদ্ধ গণিতের জগৎ অফুরান; এমন কোনো নির্দিষ্টসংখ্যক স্বতঃসিদ্ধ ও অনুমানের নিয়ম নেই, যা চিরতরে গোটা গণিতবিদ্যাকে আবৃত করতে পারে। আশা করি, ভৌত বিশ্বেও একই রকম পরিস্থিতি বিদ্যমান। ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আমার দৃষ্টিভঙ্গি সঠিক হওয়ার মানে হলো, পদার্থবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিদ্যার জগৎত্ত অফুরান। ভবিষ্যতে আমরা কত দূর পৌঁছাব, তা এখানে ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না। কারণ, সব সময়ই নতুন নতুন ঘটনা ঘটতেই থাকবে, আসতে থাকবে নতুন তথ্য, অনুসন্ধানের জন্য পাওয়া যাবে নিত্যনতুন বিশ্বও এবং জীবন, সচেতনতা আর স্মৃতির প্রসারিত রাজ্যও পাওয়া যাবে প্রতিনিয়ত।’ জ্যোতিঃপদার্থবিদ জন ব্যারো যুক্তিটিকে এভাবে সংক্ষিপ্ত করেছেন, “বিজ্ঞানের ভিত্তি হলো গণিত। গণিত সব সত্য আবিষ্কার করতে পারে না। কাজেই বিজ্ঞানও সব সত্য আবিষ্কার করতে পারে না।’

এই যুক্তি সত্যি হতেও পারে, আবার না-ও পারে। কিন্তু এখানে সম্ভাব্য কিছু ত্রুটি রয়েছে। পেশাদার গণিতবিদদের বেশির ভাগ তাঁদের গবেষণায় অসম্পূর্ণতার উপপাদ্য উপেক্ষা করেন। এর কারণ হলো অসম্পূর্ণতার উপপাদ্য নিজের সম্পর্কে উল্লেখ করা বিবৃতি বিশ্লেষণ করার মধ্য দিয়ে শুরু হয়। অর্থাৎ তারা স্বনির্দেশক। যেমন নিচের বিবৃতিগুলো বিভ্রান্তিকর :

এই বাক্যটি মিথ্যা।

আমি মিথ্যুক।

এই বিবৃতিটি প্রমাণ করা যাবে না।

প্রথম ক্ষেত্রে, বাক্যটি সত্য হওয়ার মানে সেটি মিথ্যা। আবার বাক্যটি মিথ্যা হলে, বিবৃতিটি সত্য। একইভাবে আমি যদি সত্যি বলি, তাহলে আমি একটি মিথ্যা কথা বলছি। আর আমি যদি মিথ্যা বলি, তাহলে আমি সত্যি বলছি। সবশেষের বাক্যটি সত্য হলে তাকে সত্য হিসেবে প্রমাণ করা যাবে না।

(দ্বিতীয় বিবৃতিটি লায়ারস প্যারাডক্স হিসেবে বিখ্যাত। ক্রিটানের দার্শনিক এপিমেনিডেস এই প্যারাডক্স ব্যাখ্যা করে বলেছেন, ‘সব ক্রিটানই মিথ্যাবাদী।’ তবে সেন্ট পল পুরো ব্যাপারটি লক্ষ না করেই টাইটাসের কাছে লেখা এক চিঠিতে লিখেছেন, “ক্রিটের অন্যতম ভাববাদী বলেছেন, ক্রিটানরা সব সময় মিথ্যাবাদী, দুষ্ট প্রকৃতির, অলস ও পেটুক। নিঃসন্দেহে তিনি সত্যি কথা বলেছেন।’)

অসম্পূর্ণতার উপপাদ্য ‘এই বাক্যটি গণিতের স্বতঃসিদ্ধ ব্যবহার করে প্রমাণ করা যাবে না’ টাইপের বিবৃতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। এভাবে স্বনির্দেশিত প্যারাডক্সের একটি বাস্তবধর্মী জাল তৈরি করে।

তবে হকিং এই অসম্পূর্ণতার উপপাদ্য ব্যবহার করে দেখিয়েছেন, থিওরি অব এভরিথিং বা সর্বজনীন তত্ত্ব থাকা সম্ভব নয়। তিনি দাবি করেন, গোডেলের অসম্পূর্ণতার উপপাদ্যের মূল চাবিকাঠি হলো এর গণিত স্বনির্দেশিত। পদার্থবিজ্ঞানও একইভাবে এই রোগে ভুগছে। পর্যবেক্ষককে যেহেতু পর্যবেক্ষণ প্রক্রিয়া থেকে আলাদা করা সম্ভব নয়, তাই এর মানে হলো পদার্থবিজ্ঞান সব সময় নিজেকেই নির্দেশ করবে। কারণ, আমরা মহাবিশ্ব ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে পারব না। চূড়ান্ত বিশ্লেষণে, পর্যবেক্ষক নিজেও পরমাণু ও অণু দিয়ে তৈরি। কাজেই তিনি যে পরীক্ষাটি চালাচ্ছেন, তারও অবিচ্ছেদ্য অংশ তিনি নিজেও।

কিন্তু হকিংয়ের সমালোচনা এড়িয়ে যাওয়ার একটি উপায় আছে। গোডেলের উপপাদ্যের সহজাত প্যারাডক্স এড়িয়ে যেতে পেশাদার গণিতবিদেরা এখন সাধারণত বলেন, তাঁদের গবেষণা সব ধরনের স্বনির্দেশিত বিবৃতিমুক্ত। এরপর তাঁরা অসম্পূর্ণতার উপপাদ্যকে বোকা বানান। গোডেলের কালের পর থেকে গণিতে বেশ বড় মাত্রায় বিকশিত হয়েছে। আর তা হয়েছে গোডেলের অসম্পূর্ণতার উপপাদ্য উপেক্ষা করে। অর্থাৎ এটা স্বতঃসিদ্ধ যে বর্তমানের কাজগুলোতে স্বনির্দেশিত কোনো বিবৃতি তৈরি করে না।

একইভাবে কোনো থিওরি অব এভরিথিংও হয়তো গড়ে তোলা সম্ভব, যা পর্যবেক্ষক/পর্যবেক্ষণ দ্বিধাবিভক্তি থেকে স্বাধীন থেকে জানা সব পরীক্ষা ব্যাখ্যা করতে পারবে। এ-জাতীয় কোনো থিওরি অব এভরিথিং হয়তো ব্যাখ্যা করতে পারবে মহাবিস্ফোরণের জন্ম থেকে শুরু করে আমাদের চারপাশের দৃশ্যমান মহাবিশ্বের সবকিছু। তা-ই যদি হয়, তাহলে পর্যবেক্ষক ও পর্যবেক্ষণের মধ্যবর্তী মিথস্ক্রিয়া কীভাবে বর্ণনা করা হবে, তা অধ্যয়নের বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। আসলে থিওরি অব এভরিথিংয়ের একটি মানদণ্ড এমন হওয়া উচিত যেন তা পর্যবেক্ষক ও পর্যবেক্ষণের মধ্যে যেভাবে বিভাজন তৈরি করি, তা থেকে স্বাধীন থাকে।

আবার প্রকৃতি হয়তো অফুরান ও সীমাহীন হতে পারে, এমনকি এটি বেশ কয়েকটি নীতির ওপর ভিত্তি করে হলেও। দাবা খেলার কথা ভাবুন। অন্য কোনো গ্রহ থেকে আসা কোনো এলিয়েনকে শুধু দাবা খেলা দেখে এর নিয়ম-কানুন নির্ণয়ের কথা জিজ্ঞেস করুন। কিছুক্ষণ পর এলিয়েন বুঝে ফেলতে পারবে বড়ে, গজ ও রাজার চাল কীভাবে দিতে হয়। এই খেলার নিয়ম সসীম ও সরল। কিন্তু সম্ভাব্য খেলার সংখ্যা সত্যিই বিপুল হতে পারে। একইভাবে প্রকৃতির নিয়মকানুনও হয়তো সসীম ও সরল হতে পারে, কিন্তু এই নিয়মের প্রয়োগ হয়তো অফুরন্ত হতে পারে। আমাদের লক্ষ্য হলো পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মগুলো খুঁজে বের করা।

কিছু ক্ষেত্রে আমরা ইতিমধ্যে অনেক ঘটনার সম্পূর্ণ তত্ত্ব পেয়ে গেছি। আলোর জন্য ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণের কোনো ত্রুটি আজ পর্যন্ত কেউ খুঁজে পায়নি। স্ট্যান্ডার্ড মডেলকে প্রায়ই ‘থিওরি অব অলমোস্ট এভরিথিং’ বা প্রায় সর্বজনীন তত্ত্ব নামে ডাকা হয়। কিছু সময়ের জন্য ভাবুন, আমরা মহাকর্ষ বল থামিয়ে দিতে পারি। তাহলে মহাকর্ষ বাদে অন্য সব ঘটনার জন্য স্ট্যান্ডার্ড মডেলই হয়ে উঠবে সবচেয়ে নিখুঁত তত্ত্ব। তত্ত্বটি বিশ্রী হতে পারে, কিন্তু এটি বেশ কাজের। এমনকি অসম্পূর্ণতার উপপাদ্যের উপস্থিতি সত্ত্বেও আমাদের কাছে নিখুঁতভাবে যুক্তিযুক্ত একটি থিওরি অব এভরিথিং আছে (মহাকর্ষ বাদে)।

আমার কাছে সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, শুধু একটি কাগজের পৃষ্ঠায় যে কেউ জানা সব ভৌত ঘটনার নিয়ন্ত্রণকারী সূত্রগুলো লিখে ফেলতে পারবে, যার আওতার বিস্তৃতি ১০৪৩ গুণ। এর আওতায় রয়েছে ১০ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরের সবচেয়ে দূরবর্তী কসমস থেকে শুরু করে কোয়ার্ক ও নিউট্রিনোর অতি ক্ষুদ্র জগৎ। এই টুকরো কাগজে দুটি সমীকরণ থাকবে, আইনস্টাইনের মহাকর্ষ তত্ত্ব আর স্ট্যান্ডার্ড মডেলের সমীকরণ। আমার ধারণা, প্রকৃতির মৌলিক পর্যায়ে এটি চূড়ান্ত সরলতা ও ঐকতান উন্মোচন করে। মহাবিশ্ব হয়তো বিকৃত, এলোমেলো বা খামখেয়ালি হতে পারে। কিন্তু তারপরও আমাদের কাছে সম্পূর্ণ, সুসংগত ও সুন্দর হিসেবে ধরা দেয় এটি

নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী স্টিভ ওয়েনবার্গ আমাদের থিওরি অব এভরিথিংয়ের অন্বেষাকে উত্তর মেরুতে অভিযান চালানোর সঙ্গে তুলনা করেছেন। কয়েক শতাব্দী ধরে প্রাচীন নাবিকেরা মানচিত্র নিয়ে কাজ করেছেন, কিন্তু তাতে উত্তর মেরু অনুপস্থিত ছিল। কম্পাসের সব কাঁটা ও চার্ট মানচিত্রে হারিয়ে যাওয়া অংশের দিকে তাক করা। তারপরও কেউই সেই জায়গায় যায়নি। একইভাবে, আমাদের সব তথ্য আর তত্ত্ব থিওরি অব এভরিথিং বা সর্বজনীন তত্ত্বের দিকে তাক করা। এটিই আমাদের সমীকরণগুলোর হারিয়ে যাওয়া অংশ।

এখানে সব সময়ই আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে কিছু ব্যাপার থাকবে। সেগুলো অন্বেষণ করা অসম্ভব (যেমন ইলেকট্রনের নির্দিষ্ট অবস্থান বা আলোর গতির সীমার বাইরের বিশ্ব)। কিন্তু আমার দৃঢ়বিশ্বাস, মৌলিক সূত্রগুলো জানা সম্ভব আর তা সসীম। আসন্ন বছরগুলোতে পদার্থবিজ্ঞান সবার কাছে সবচেয়ে উত্তেজক হয়ে উঠতে পারে। কারণ, মহাবিশ্বে আমরা নতুন প্রজন্মের পার্টিকেল অ্যাকসিলারেটর, স্থানভিত্তিক মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্তকরণ যন্ত্র ও অন্যান্য প্রযুক্তি দিয়ে অনুসন্ধান চালাতে থাকব। আমরা এখনো জ্ঞানের শেষ প্রান্তে পৌঁছাইনি, তবে নতুন পদার্থবিজ্ঞানের সূচনালগ্নে রয়েছি। কিন্তু এই অনুসন্ধানে আমরা যেটাই খুঁজে পাই না কেন, সেখানে সর্বদাই আমাদের জন্য সম্পূর্ণ নতুন কোনো দিগন্ত অপেক্ষা করে থাকবে।

তথ্যনির্দেশ

পাইক্রাস্ট : একধরনের খাবার। এর ওপরে রুটির শক্ত স্তর থাকে।

পরম শূন্য : সম্ভাব্য সর্বনিম্ন তাপমাত্রা। এ তাপমাত্রায় বস্তুর মধ্যে কোনো তাপশক্তি থাকে না। প্রায় -২৭৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা কেলভিন স্কেলে শূন্য।

স্ট্রিং তত্ত্ব : এ তত্ত্বে কণাকে অতি ক্ষুদ্র সুতার তরঙ্গ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। সুতাগুলোর দৈর্ঘ্য আছে, কিন্তু কোনো মাত্রা নেই। তত্ত্বটি কোয়ান্টাম বলবিদ্যা ও সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব দুটোকে ঐক্যবদ্ধ করে। একে সুপারস্ট্রিং থিওরিও বলা হয়।

এম-তত্ত্ব : পাঁচটি স্ট্রিং থিওরির সবগুলো ঐক্যবদ্ধকারী একটি তত্ত্ব। এ ছাড়া এই তত্ত্বে অতিমহাকর্ষকেও একটি একক তাত্ত্বিক কাঠামোর মধ্যে আনা হয়েছে। কিন্তু তত্ত্বটি এখনো পুরোপুরি বোঝা সম্ভব হয়নি

গোডেলের অসম্পূর্ণতার উপপাদ্য : ১৯৩১ সালে গণিতের প্রকৃতিসম্পর্কিত বিখ্যাত অসম্পূর্ণতার উপপাদ্য প্রমাণ করেন গণিতবিদ কার্ট গোডেল। এই উপপাদ্যমতে, বর্তমান কালের গণিতের মতো প্রচলিত যেকোনো স্বতঃসিদ্ধ সিস্টেমের মধ্যে কিছু প্রশ্ন সব সময় অনড় থেকেই যায়। সিস্টেমটি যে স্বতঃসিদ্ধ দিয়ে সংজ্ঞায়িত, সেগুলোর ভিত্তিতে এই প্রশ্নগুলো প্রমাণও বা অপ্রমাণও করা যায় না।

পরিভাষা

অণু molecules

অতিকণা বা সুপারপার্টিকেল superparticle

অতিক্ষুদ্র জগৎ microworld

অতিতন্ত্র বা সুপারস্ট্রিং superstring

অতিপরিবাহিতা superconductor

অতিপারমাণবিক কণা subatomic particle

অতিবেগুনি বিকিরণ ultraviolet radiation

অনিশ্চয়তার নীতি Uncertainty principle

অবিরাম গতিযন্ত্র Perpetual motion machines

অসম্পূর্ণতার উপপাদ্য Incompleteness theorem

অসীম infinite

অ্যানথ্রোপিক প্রিন্সিপাল বা মানুষসম্পর্কিত নীতি Anthropic principle

আধান বা চার্জ charge

আন্তমাত্রিক interdimensional

আপেক্ষিক তত্ত্ব Theory of relativity

আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্ব Theory of general relativity

আলোকবর্ষ light-years

আসন্নতা approximation

ইলেকট্রন electron

উপকণা sub-particle

ঋণাত্মক চার্জ বা আধান negative charge

ওয়েভ ফাংশন বা তরঙ্গ অপেক্ষক wave function

এক মেরু বা মনোপোল monopole

এনট্রোপি বা বিশৃঙ্খলা entropy

এম-থিওরি M-theory

কণা ত্বরকযন্ত্র particle accelerators

কণা শনাক্তকারী যন্ত্র Particle Detector

কম্পন vibrations

কোপেনহেগেন ব্যাখ্যা Copenhagen interpretation

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা Artificial intelligence

কৃষ্ণগহ্বর Black holes

কালুজা তত্ত্ব Kaluza’s theory

কোয়ান্টাম কম্পিউটার quantum computer

কোয়ান্টাম ক্রোমোডাইনামিকস Quantum Chromodynamics

কোয়ান্টায়িত quantized

কোয়ার্ক quarks

গুপ্তবস্তু Dark matter

গ্লুয়ন gluons

গোল্ডিলক জোন Goldilocks zone

গোলক sphere

ঘাত power

ঘূর্ণন বা স্পিন spin

চতুর্থ মাত্রা fourth dimension

চুপসে যাওয়া বা ভেঙে পড়া collapse

চুম্বকীয় ক্ষেত্র Magneticfield

জিনগত ত্রুটি genetic error

টুরিং টেস্ট Turing test

ট্রানজিস্টর transistors

ডপলার প্রভাব Doppler effect

তরঙ্গ wave

তরঙ্গ সমীকরণ wave equation

তরঙ্গায়িত waving

তাপগতিবিদ্যা Thermodynamics

ধনাত্মক চার্জ positive charge

ধ্রুবক constants

নিউরন neurons

নিঃসরণ emit

নিউট্রন Neutron

নিউক্লিয়াস Nucleus

পজিট্রন positron

নিউট্রিনো Neutrino

পঞ্চম মাত্রা fifth dimension

পরম শূন্য absolute zero

পরম সময় absolute time

পরমাণু atom

পরশপাথর philosopher’s stone

পর্দা membrane

পর্যবেক্ষক observer

প্রতিকণা antiparticle

প্রতি-কোয়ার্ক বা অ্যান্টিকোয়ার্ক antiquarks

প্রমিত মডেল বা স্ট্যান্ডার্ড মডেল Standard Model

প্রাক্-মহাবিস্ফোরণ pre-big bang

প্রোটন proton

প্লাজমা Plasma

প্ল্যাঙ্ক শক্তি Planck energy

বহুবিশ্ব many worlds

বহুবিশ্ব বা মাল্টিভার্স multiverse

বায়ুশূন্য vacuum

ব্যাসার্ধ radius

বিশ্ব সৃষ্টিতত্ত্ব Cosmology

বিকল্প ভবিষ্যৎ alternative futures

বিপরীত বর্গীয় সূত্র Inverse-square law

বুদ্ধিমত্তা intelligence

বৃহত্তর জগৎ macroworld

ভেঙে যাওয়া collapses

ভৌত তত্ত্ব physical theory

মহাকর্ষ gravity

মহাকর্ষ তরঙ্গ gravity wave

মহাকাশীয় দূরত্ব astronomical distances

মহাজাগতিক চেতনা cosmic consciousness

মহাজাগতিক ধ্রুবক Cosmological constant

মহাজাগতিক রশ্মি Cosmic ray

মহাবিস্ফোরণ Big bang

মুরের সূত্র Moore’s law

মেরুকরণ polarization

ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণ Maxwell’s equations

শক্তি power

শক্তির সংরক্ষশীলতা conserving energy

শব্দার্থবিদ্যা বা সিম্যানটিকস semantics

শিশু মহাবিশ্ব baby universes

শ্রোডিঙ্গারের সমীকরণ Schrodinger equation

সংসক্ত coherent

সচেতনতা consciousness

সমান্তরাল মহাবিশ্ব Parallel universes

সম্পর্কহীন বা অসংগতি decoherence

সসীম ভর finite mass

সুপারস্ট্রিং থিওরি Superstring theory

সুতা বা স্ট্রিং string

সুষম মহাবিশ্ব uniform universe

স্বনির্দেশিত self-referential

স্থান-কাল বা দেশকাল space-time

স্থানিক spatial

স্ট্রিং থিওরি String theory

সিনটেক্স syntax

স্নায়বীয় neural

স্ফীতি inflation

স্ফীতি দশা বা পর্যায় inflationary phase

স্ফীতিশীল মহাবিশ্ব inflationary universe

স্ববিরোধিতা বা প্যারাডক্স paradox

হিগস বোসন Higgs bosons

kindlebangla.com