ময়ূরাক্ষী

ইবুক এডিটরের কথা

অনলাইনে গণদেবতার প্রচুর ইবুক ভার্সন থাকা সত্ত্বেও সবগুলোতেই বেশ কিছু সমস্যা দেখতে পারি। এর মধ্যে সবচেয়ে সমস্যাজনক মনে হয় একাধিক লাইন মার্জ হয়ে যাওয়া, ডায়লগ আলাদা লাইনে না গিয়ে আগের লাইনের সাথে মিশে যাওয়া। একই সাথে প্রচুর বানান ভুল। কোথাও কোথাও দেখেছি কোন চ্যাপটারে মূল বইতে আছে ৩০০ লাইন, অথচ অনলাইনের ইপাবগুলোতে আছে মোটে ১২০-১৩০ লাইন। লেখা মিসিং, ব্যাপারটা তেমন নয়, বরং ফরম্যাটিং এররের কারণে আলাদা লাইন বা ডায়লগ সব এক হয়ে বড়ো একটা লাইন হয়ে গেছে। এই রকম টেক্সট পাঠ-অভিজ্ঞতার জন্যে খুবই দুর্বিষহ। তাই বাধ্য হয়ে নিজেই হাত দিয়েছি বইটা ঠিক করতে।

ইবুক বানানোর কাজটা খুবই কষ্টসাধ্য, সুতরাং যারা ফরম্যাটিং এর কাজটা তেমন গা না লাগিয়ে করেছেন, তাঁদের খুব একটা দোষ দিতে পারছিনে। যদি কেউ ক্ষোভ পুষে রাখে, সব কর্পূরের মত উবে যাবে নিজে ফরম্যাট করতে গিয়ে।

গোঁড়া থেকে আবার গণদেবতার ইবুক OCR করে, ন্যানো ব্যানানা প্রো দিয়ে ফরম্যাট করার পর ম্যানুয়ালি চোখ বুলিয়ে বানানো এই ভার্সনে অনেক সমস্যাই নিরূপণ হয়েছে আমি মনে করি। তবু যদি কোথাও বানান ভুল দেখতে পান, তবে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আফটার অল, নিজে পড়বো বলে এবং তারাবাবুর প্রতি দায়বদ্ধতা আছে বলেই কাজটা ধরেছিলুম। লোকের স্তুতিগ্রহণ আমার লক্ষ্য নয়।

আমর আসাদ

আরো বই সংগ্রহ করুন

বইয়ের গ্রুপ ॥ বইয়ের চ্যানেল ॥ বাংলা লাইব্রেরী

বাংলা ইবুক লাইব্রেরী একটি টেলিগ্রাম ভিত্তিক ইন্টারনেটে সহজলভ্য বইয়ের সংগ্রহশালা। এখানে দেয়া সকল বই ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহীত। আমরা নতুন করে কোন ধরনের বইয়ের ডিজিটাল ভার্শন বানাই না। কারো কপিরাইট লঙ্গনের কোনরুপ অভিপ্রায় আমাদের নেই। আমরা নতুন বই কিনে পড়ার সুপারিশ করি।

সূচী

এক দুই তিন চার পাঁচ ছয় সাত আট নয় দশ এগারো বারো তেরো চৌদ্দ পনেরো ষোলো সতেরো আঠারো উনিশ কুড়ি একুশ বাইশ তেইশ চব্বিশ পঁচিশ ছাব্বিশ সাতাশ আঠাশ

Landmarks

সূচীপত্র

এক

কারণ সামান্যই। সামান্য কারণেই গ্রামে একটা বিপর্যয় ঘটিয়া গেল। এখানকার কামার অনিরুদ্ধ কর্মকার ও ছুতার গিরিশ সূত্রধর নদীর ওপারে বাজারে-শহরটায় গিয়া একটা করিয়া দোকান ফাঁদিয়াছে। খুব ভোরে উঠিয়া যায়, ফেরে রাত্রি দশটায়; ফলে গ্রামের লোকের অসুবিধার আর শেষ নাই। এবার চাষের সময় কি নাকালটাই যে তাদের হইতে হইয়াছে, সে তাহারাই জানে। লাঙলের ফাল পাজানো, গাড়ির হাল বাঁধার জন্য চাষীদের অসুবিধার আর অন্ত ছিল না। গিরিশ ছুতারের বাড়িতে গ্রামের লোকের বাবলা কাঠের গুঁড়ি আজও স্তূপীকৃত হইয়া পড়িয়া আছে সেই গত বৎসরের ফাল্গুন-চৈত্র হইতে; কিন্তু আজও তাহারা নূতন লাঙল পাইল না।

এ ব্যাপার লইয়া অনিরুদ্ধ এবং গিরিশের বিরুদ্ধে অসন্তোষের সীমা ছিল না। কিন্তু চাষের সময় ইহা লইয়া একটা জটলা করিবার সময় কাহারও হয় নাই, প্রয়োজনের তাগিদে তাহাদিগকে মিষ্ট কথায় তুষ্ট করিয়া কার্যোদ্ধার করা হইয়াছে; রাত্রি থাকিতে উঠিয়া অনিরুদ্ধর বাড়ির দরজায় বসিয়া থাকিয়া, তাহাকে আটক করিয়া লোকে আপন আপন কাজ সারিয়া লইয়াছে; জরুরি দরকার থাকিলে, ফাল লইয়া, গাড়ির চাকা ও হাল গড়াইয়া গড়াইয়া সেই শহরের বাজার পর্যন্তও লোকে ছুটিয়াছে। দূরত্ব প্রায় চার মাইল—কিন্তু ময়ূরাক্ষী নদীটাই একা বিশ ক্রোশের সমান। বর্ষার সময় ভরানদীর খেয়াঘাটে পারাপারে দেড় ঘণ্টা কাটিয়া যায়। শুকনার সময়ে যাওয়া-আসায় আট মাইল বালি ঠেলিয়া গাড়ির চাকা গড়াইয়া লইয়া যাওয়া সোজা কথা নয়। একটু ঘুরপথে নদীর উপর রেলওয়ে ব্রিজ আছে; কিন্তু লাইনের পাশের রাস্তাটা এমন উঁচু ও অল্পপরিসর যে গাড়ির চাকা গড়াইয়া লইয়া যাওয়া প্রায় অসম্ভব।

এখন চাষ শেষ হইয়া আসিল। মাঠে ফসল পাকিয়া উঠিয়াছে—এখন কাস্তে চাই। কামার চিরকাল লোহা-ইস্পাত লইয়া কাস্তে গড়িয়া দেয়—পুরনো কাস্তেতে শান লাগাইয়া পুরি কাটিয়া দেয়; ছুতার বাট লাগাইয়া দেয়। কিন্তু কামার-ছুতার সেই একই চালে চলিয়াছে; যে অনিরুদ্ধের হাত পার হইয়াছে, সে গিরিশের হাতে দুঃখ ভোগ করিতেছে। শেষ পর্যন্ত গ্রামের লোক এক হইয়া পঞ্চায়েত-মজলিস ডাকিয়া বসিল। কেবল একখানা গ্রাম নয়, পাশাপাশি দুখানা গ্রামের লোক একত্র হইয়া গিরিশ ও অনিরুদ্ধকে একটি নির্দিষ্ট দিন জানাইয়া ডাকিয়া পাঠাইল। গ্রামের শিবতলায় বারোয়ারী চণ্ডীমণ্ডপের মধ্যে মজলিস বসিল। মন্দিরে ময়ূরেশ্বর শিব, পাশেই ভাঙা চণ্ডীমণ্ডপে গ্রামদেবী মা ভাঙা-কালীর বেদি। কালীঘর যতবার তৈয়ারি হইয়াছে, ততবারই ভাঙিয়াছে—সেই হেতু কালীর নাম ভাঙা-কালী। চণ্ডীমণ্ডপটিও বহুকালের এবং এক কোণ ভাঙা হইয়া আছে; মধ্যে নাটমন্দির। তার চাল কাঠামো হাতিশুঁড়-ষড়দল-তীরসাঙা প্রভৃতি হরেক রকমের কাঠ দিয়া যেন অক্ষয় অমর করিবার উদ্দেশ্যে গড়া হইয়াছিল। নিচের মেঝেও সনাতন পদ্ধতিতে মাটির। এই চণ্ডীমণ্ডপের এই নাটমন্দিরে বা আটচালায় শতরঞ্জি, চাটাই, চট প্রভৃতি বিছাইয়া মজলিস বসিল।

গিরিশ, অনিরুদ্ধ এ ডাকে না আসিয়া পারিল না। যথাসময়ে তাহারা দুজনেই আসিয়া উপস্থিত হইল। মজলিসে দুইখানা গ্রামের মাতব্বর লোক একত্র হইয়াছিল; হরিশ মণ্ডল, ভবেশ পাল, মুকুন্দ ঘোষ, কীর্তিবাস মণ্ডল, নটবর পাল—ইহারা সব ভারিক্কি লোক, গ্রামের মাতব্বর সদ্গোপ চাষী। পাশের গ্রামের দ্বারকা চৌধুরীও উপস্থিত হইয়াছে। চৌধুরী বিশিষ্ট প্রবীণ ব্যক্তি, এ অঞ্চলে বিশেষ মাননীয় জন। আচার-ব্যবহার বিচার-বুদ্ধির জন্য সকলের শ্রদ্ধার পাত্র। লোকে এখনও বলে—কেমন বংশ দেখতে হবে। এই চৌধুরীর পূর্বপুরুষেরাই এককালে এই দুইখানি গ্রামের জমিদার ছিলেন; এখন ইনি অবশ্য সম্পন্ন চাষীরূপেই গণ্য, কারণ জমিদারি অন্য লোকের হাতে গিয়াছে। আর ছিল দোকানি বৃন্দাবন দত্ত—সেও মাতব্বর লোক। মধ্যবিত্ত অবস্থার অল্পবয়স্ক চাষী গোপেন পাল, রাখাল মণ্ডল, রামনারায়ণ ঘোষ প্রভৃতিও উপস্থিত ছিল। এ-গ্রামের একমাত্র ব্রাহ্মণ বাসিন্দা হরেন্দ্র ঘোষাল—ও-গ্রামের নিশি মুখুজ্জে, পিয়ারী বাঁড়ুজ্জে—ইহারাও একদিকে বসিয়াছিল।

আসরের প্রায় মাঝখানে জাঁকিয়া বসিয়াছিল ছিরু পাল; সে নিজেই আসিয়া জাঁকিয়া আসন লইয়াছিল। ছিরু বা শ্রীহরি পালই এই দুইখানা গ্রামের নূতন সম্পদশালী ব্যক্তি। এ অঞ্চলের মধ্যে বিশিষ্ট ধনী যাহারা, ছিরু ধন-সম্পদে তাহাদের কাহারও চেয়ে কম নয়—এই কথাই লোকে অনুমান করে। লোকটার চেহারা প্রকাণ্ড; প্রকৃতিতে ইতর এবং দুর্ধর্ষ ব্যক্তি। সম্পদের জন্য যে প্রতিষ্ঠা সমাজ মানুষকে দেয়, সে প্রতিষ্ঠা ঠিক ঐ কারণেই ছিরুর নাই। অভদ্র, ক্রোধী, গোঁয়ার, চরিত্রহীন, ধনী ছিরু পালকে লোকে বাহিরে সহ্য করিলেও মনে মনে ঘৃণা করে, ভয় করিলেও সম্পদোচিত সম্মান কেহ দেয় না। এ জন্য ছিরুর ক্ষোভ আছে, লোকে তাহাকে সম্মান করে না বলিয়া সেও সকলের উপর মনে মনে রুষ্ট। প্রাপ্য প্ৰতিষ্ঠা জোর করিয়া আদায় করিতে সে বদ্ধপরিকর। তাই সাধারণের সামাজিক মজলিস হইলেই ঠিক মাঝখানে আসিয়া সে জাঁকিয়া বসে।

আর একটি সবলদেহ দীর্ঘকায় শ্যামবর্ণ যুবা নিতান্ত নিস্পৃহের মত এক পাশের থামে ঠেস দিয়া দাঁড়াইয়া ছিল। সে দেবনাথ ঘোষ—এই গ্রামেরই সদ্গোপ চাষীর ছেলে। দেবনাথ নিজ হাতে চাষ করে না, স্থানীয় ইউনিয়ন বোর্ডের ফ্রি প্রাইমারি স্কুলের পণ্ডিত সে। এ মজলিসে আসিবার বিশেষ ইচ্ছা না থাকিলেও সে আসিয়াছে; অনিরুদ্ধের যে অন্যায় সে অন্যায়ের মূল কোথায় সে জানে। ছিরু পালের মত ব্যক্তি যে মজলিসে মধ্যমণির মত জঁকাইয়া বসে, সে মজলিসে তাহার আস্থা নাই বলিয়া এই নিস্পৃহতা, নীরব অবজ্ঞার সহিত সে একপাশে থামে ঠেস দিয়া দাঁড়াইয়াছিল। আসে নাই কেবল ও-গ্রামের কৃপণ মহাজন মৃত রাখহরি চক্রবর্তীর পোষ্যপুত্র হেলারাম চাটুজ্জে ও গ্রাম্য ডাক্তার জগন্নাথ ঘোষ। গ্রামের চৌকিদার ভূপাল লোহারও উপস্থিত ছিল। আশপাশে ছেলেদের দল গোলমাল করিতেছিল, একেবারে একপ্রান্তে গ্রামের হরিজন চাষীরাও দাঁড়াইয়া দর্শক হিসাবে। ইহারাই গ্রামের শ্রমিক চাষী—অসুবিধার প্রায় বারআনা ভোগ করিতে হয় ইহাদিগকেই।

অনিরুদ্ধ এবং গিরিশ আসিয়া মজলিসে বসিল। বেশভূষা অনেকটা পরিচ্ছন্ন এবং ফিটফাট—তাহার মধ্যে শহুরে ফ্যাশনের ছাপ সুস্পষ্ট; দুজনেই সিগারেট টানিতে টানিতে আসিতেছিল—মজলিসের অনতিদূরেই ফেলিয়া দিয়া মজলিসের মধ্যে আসিয়া বসিল।

অনিরুদ্ধ কথা আরম্ভ করিল; বসিয়াই হাত দিয়া একবার মুখটা বেশ করিয়া মুছিয়া লইয়া বলিল—কই গো, কি বলছেন বলুন। আমরা খাঁটি-খুটি খাই; আমাদের আজ এ বেলাটাই মাটি।

কথার ভঙ্গিমায় ও সুরে সকলেই একটু চকিত হইয়া উঠিল, যেন ঝগড়া করিবার মতলবেই কোমর বাঁধিয়া আসিয়াছে : প্রবীণের দলের মধ্যে সকলেই একবার সশব্দে গলা ঝাড়িয়া লইল। অল্পবয়সীদের ভিতর হইতে যেন একটা আগুন দপ করিয়া উঠিল; ছিরু ওরফে শ্রীহরি বলিয়া উঠিল—মাটিই যদি মনে কর, তবে আসবারই বা কি দরকার ছিল?

হরেন্দ্র ঘোষাল কথা বলিবার জন্য হাঁকপাক করিতেছিল; সে বলিল—তেমন মনে হলে এখনও উঠে যেতে পার তোমরা। কেউ ধরে নিয়েও আসে নাই, বেঁধেও রাখে নাই তোমাদিগে।

হরিশ মণ্ডল এবার বলিল—চুপ কর তোমরা। এখানে যখন ডাকা হয়েছে, তখন আসতেই হবে। তা তোমরা এসেছ, বেশ কথা—ভাল কথা, উত্তম কথা। তারপর এখন দুপক্ষে কথাবার্তা হবে, আমাদের বলবার যা বলব—তোমাদের জবাব যা তোমরা দেবে; তারপর তার বিচার হবে। এত তাড়াতাড়ি করলে হবে কেন? ঘোড়া দুটো বাঁধো।

গিরিশ বলিল—তা হলে, কথা আপনাদের আমাদিগে নিয়েই?

অনিরুদ্ধ বলিল—তা আমরা অ্যাঁচ করেছিলাম। তা বেশ, কি কথা আপনাদের বলুন? আমাদের জবাব আমরা দোব। কিন্তু কথা হচ্ছে কি জানেন আপনারা সবাই যখন একজোট হয়েছেন, তখন এ-কথার বিচার করবে কে? নালিশ যখন আপনাদের, তখন আপনারা বিচার কি করে করবেন—এ তো আমরা বুঝতে পারছি না।

দ্বারকা চৌধুরী অকস্মাৎ গলা ঝাড়িয়া শব্দ করিয়া উঠিল; চৌধুরীর কথা বলিবার এটি পূর্বাভাস। উচ্চ গলা-ঝাড়ার শব্দে সকলে চৌধুরীর দিকে ফিরিয়া চাহিল। চৌধুরীর চেহারায় এবং ভঙ্গিমাতে একটা স্বাতন্ত্র্য আছে। গৌরবর্ণ রং সাদা ধবধবে গোঁফ, আকৃতিতে দীর্ঘ। মানুষটি আসরের মধ্যে আপনাআপনি বিশিষ্ট হইয়া বসিয়াছিল। সে এবার মুখ খুলিল—দেখ কর্মকার, কিছু মনে কোরো না বাপু, আমি একটা কথা বলব। গোড়া থেকেই তোমাদের কথাবার্তার সুর শুনে মনে হচ্ছে যেন তোমরা বিবাদ করবার জন্যে তৈরি হয়ে এসেছ! এটা তো ভাল নয় বাবা। বস, স্থির হয়ে বস।

অনিরুদ্ধ এবার সবিনয়ে ঘাড় হেঁট করিয়া বলিল—বেশ, বলুন কি বলছেন।

হরিশ মণ্ডলই আরম্ভ করিল—দেখ বাপু, খুলে বলতে গেলে মহাভারত বলতে হয়। সংক্ষেপেই বলছি—তোমরা দুজনে শহরে গিয়ে আপন আপন ব্যবসা করতে বসেছ। বেশ করেছ। যেখানে মানুষ দুটো পয়সা পাবে সেখানেই যাবে। তা যাও। কিন্তু এখানকার পাট যে একেবারে তুলে দেবে, আর আমরা যে এই দু কোশ রাস্তা জিনিসপত্র ঘাড়ে করে নিয়ে ছুটব ওই নদী পার হয়ে, তা তো হবে না বাপু। এবার যে তোমরা আমাদের কি নাকাল করেছ সে কথাটা ভেবে দেখ দেখি মনে মনে।

অনিরুদ্ধ বলিল—আজ্ঞে, তা অসুবিধে একটুকুন হয়েছে আপনাদের।

ছিরু বা শ্রীহরি গর্জিয়া উঠিল—একটুকুন! একটুকুন কি হে? জান, জমিতে জল থাকতে ফাল পাজানোর অভাবে চাষ বন্ধ রাখতে হয়েছে? তোমারও তো জমি আছে, জমির মাথায়। একবার ঘুরে দেখে এস দেখি পটপটি ঘাসের ধুমটা। ভাল ফালের অভাবে চাষের সময় একটা পটপটিরও শেকড় ভাল ওঠে নাই। বছর সাল তোমরা ধানের সময় ধানের জন্যে বস্তা হাতে করে এসে দাঁড়াবে, আর কাজের সময় তখন শহরে গিয়ে বসে থাকবে, তা করতে হবে কেন?

হরেন্দ্র সঙ্গে সঙ্গে সায় দিয়া উঠিল—এই কথা! এবং সঙ্গে সঙ্গে হাতে একটা তালি বাজাইয়া দিয়া বসিল।

মজলিসসুদ্ধ সকলেই প্রায় সমস্বরে বলিল—এই।

প্রবীণরাও ঘাড় নাড়িয়া সায় দিল। অর্থাৎ এই।

অনিরুদ্ধ এবার খুব সপ্রতিভ ভঙ্গিতে নড়িয়াচড়িয়া জাঁকিয়া বসিয়া বলিল—এই তো আপনাদের কথা? আচ্ছা, এইবার আমাদের জবাব শুনুন। আপনাদের ফাল পাজিয়ে দিই, হাল লাগিয়ে দিই চাকায়, কাস্তে গড়ে দিই, আপনারা আমাকে ধান দেন হালপিছু পাঁচ শলি। আমাদের গিরিশ সূত্রধর—

বাধা দিয়া ছিরু পাল বলিল—গিরিশের কথায় তোমার কাজ কি হে বাপু?

কিন্তু ছিরু কথা শেষ করিতে পারিল না; দ্বারকা চৌধুরী বলিল—বাবা শ্রীহরি, অনিরুদ্ধ তো অন্যায় কিছু বলে নাই। ওদের দুজনের একই কথা। একজন বললেও তো ক্ষতি নাই কিছু।

ছিরু চুপ করিয়া গেল। অনিরুদ্ধ ভরসা পাইয়া বলিল—চৌধুরী মশায় না থাকলে কি মজলিসের শোভা হয়, উচিত কথা বলে কে?

—বল অনিরুদ্ধ কি বলছিলে, বল!

—আজ্ঞে, হ্যাঁ। আমার, মানে কর্মকারের হালপিছু পাঁচ শলি, আর সূত্রধরের হালপিছু চার শলি করে ধান বরাদ্দ আছে। আমরা এতদিন কাজ করে আসছি, কিন্তু চৌধুরী মশাই, ধান আমরা ঠিক হিসেবমত প্রায়ই পাই না।

—পাও না?

—আজ্ঞে না।

গিরিশ সঙ্গে সঙ্গে সায় দিল—আজ্ঞে না। প্রায় ঘরেই দু-চার আড়ি করে বাকি রাখে, বলে, দু-দিন পরে দোব, কি আসছে বছর দোব। তারপর সে ধান আমরা পাই না।

ছিরু সাপের মত গর্জিয়া উঠিল—পাও না? কে দেয় নি শুনি? মুখে পাই না বললে তো হবে না। বল, কার কাছে পাবে তোমরা?

অনিরুদ্ধ দুরন্ত ক্ৰোধে বিদ্যুৎগতিতে ঘাড় ফিরাইয়া শ্ৰীহরির দিকে চাহিয়া বলিল—কার কাছে পাব? নাম করতে হবে? বেশ, বলছি। তোমার কাছেই পাব।

—আমার কাছে?

—হ্যাঁ তোমার কাছে। দিয়েছ ধান তুমি দু বছর? বল?

—আর আমি যে তোমার কাছে হ্যান্ডনোটে টাকা পাব। তাতে কটাকা উসুল দিয়েছ শুনি? ধান দিই নাই…মজলিসের মধ্যে তুমি যে এত বড় কথাটা বলছ!

—কিন্তু তার তো একটা হিসেব নিকেশ আছে? ধানের দামটা তোমার হ্যান্ডনোটের পিঠে উসুল দিতে তো হবে না কি? বলুন চৌধুরী মশায়, মণ্ডল মশাইরাও তো রয়েছেন, বলুন না।

চৌধুরী বলিল—শোন, চুপ কর একটু। শ্ৰীহরি, তুমি বাবা হ্যান্ডনোটের পিঠে টাকাটা উসুল দিয়ে নিয়ো। আর অনিরুদ্ধ, তোমরা একটা বাকির ফর্দ তুলে হরিশ মণ্ডল মশায়কে দাও। এ নিয়ে মজলিসে গোল করাটা তো ভাল নয়। এঁরাই সব আদায়-পত্র করে দেবেন। আর তোমরাও গাঁয়ে একটা করে পাট রাখ। যেমন কাজকর্ম করছিলে তেমনি কর।

মজলিসসুদ্ধ সকলেই এ কথায় সায় দিল। কিন্তু অনিরুদ্ধ এবং গিরিশ চুপ করিয়া রহিল, ভাবে-ভঙ্গিতেও সম্মতি বা অসম্মতি কোনো লক্ষণ প্রকাশ করিল না।

এতক্ষণে দেবনাথ মুখ খুলিল; প্রবীণ চৌধুরীর এ মীমাংসা তাহার ভাল লাগিয়াছে। অনিরুদ্ধ-গিরিশের পাওনা অনাদায়ের কথা সে জানিত বলিয়াই তাহার প্রথমে মনে হইয়াছিল—অনিরুদ্ধ এবং গিরিশের উপর মজলিস অবিচার করিতে বসিয়াছে। নতুবা গ্রামের সমাজ-শৃঙ্খলা বজায় রাখিবারই সে পক্ষপাতী; তাহার নিজের একটি নিয়ম-শৃঙ্খলার ধারণা আছে। সেই ধারণা অনুযায়ী আজ দেবু খুশি হইল; অনিরুদ্ধ ও গিরিশের এবার নত হওয়া উচিত বলিয়া তাহার মনে হইল। সে বলিল—অনি ভাই, আর তো তোমাদের আপত্তি করা উচিত নয়।

চৌধুরী প্ৰশ্ন করিল—অনিরুদ্ধ?

—আজ্ঞে।

—কি বলছ বল।

এবার হাত জোড় করিয়া অনিরুদ্ধ বলিল—আজ্ঞে, আমাদিগে মাপ করুন আপনারা। আমরা আর এভাবে কাজ চালাতে পারছি না।

মজলিসে এবার অসন্তোষের কলরব উঠিয়া গেল।

—কেন?

—না পারবার কারণ?

—পারব না বললে হবে কেন?

—চালাকি নাকি?

—গাঁয়ে বাস কর না তুমি?

ইহার মধে চৌধুরী নিজের দীর্ঘ হাতখানি তুলিয়া ইঙ্গিত প্রকাশ করিল—চুপ কর, থাম। হরিশ বিরক্তিভরে বলিল—থাম্‌রে বাপু ছোঁড়ারা; আমরা এখনও মরি নাই।

হরেন্দ্র ঘোষাল অল্পবয়সী ছোকরা এবং ম্যাট্রিক পাস এবং ব্রাহ্মণ। সেই অধিকারে সে প্রচণ্ড একটা চিৎকার করিয়া উঠিল—এইও! সাইলেন্স-সাইলেন্স!

অবশেষে দ্বারকা চৌধুরী উঠিয়া দাঁড়াইল। এবার ফল হইল। চৌধুরী বলিল চিৎকার করে গোলমাল বাধিয়ে তো ফল হবে না! বেশ তো, কর্মকার কেন পারবে না—বলুক। বলতে দাও ওকে।

সকলে এবার নীরব হইল। চৌধুরী আবার বসিয়া বলিল—কর্মকার, পারবে না বললে তো হবে না বাবা। কেন পারবে না, বল! তোমরা পুরুষানুক্ৰমে করে আসছ। আজ পারব না বললে গ্রামের ব্যবস্থাটা কি হবে?

দেবনাথ বলিল—অন্যায়। অনিরুদ্ধ ও গিরিশের এ মহা অন্যায়।

হরিশ বলিল—তোমার পূর্বপুরুষের বাস হল গিয়ে মহাগ্রামে; এ গ্রামে কামার ছিল না। বলেই তোমার পিতামহকে এনে বাস করানো হয়েছিল। সে তো তুমিও শুনেছ হে বাপু। এখন না বললে চলবে কেন?

অনিরুদ্ধ বলিল—আজ্ঞে, মোড়ল জ্যাঠা, তা হলে শুনুন। চৌধুরী মশায় আপনি বিচার করুন। এ গাঁয়ে আগে কত হাল ছিল ভেবে দেখুন। কত ঘরে হাল উঠে গিয়েছে তাও দেখুন। এই ধরুন গদাই, শ্রীনিবাস, মহেন্দ্র আমি হিসেব করে দেখেছি, আমার চোখের ওপর এগারটি ঘরের হাল উঠে গিয়েছে। জমি গিয়ে ঢুকেছে কঙ্কণার ভদ্রলোকদের ঘরে। কঙ্কণায় কামার আলাদা। আমাদের এগারখানা হালের ধান কমে গিয়েছে। তারপরে ধরুন আমরা চাষের সময় কাজ করতাম লাঙ্গলের গাড়ির, অন্য সময়ে গাঁয়ের ঘরদের হত। আমরা পেরেক গজাল হাতা খুন্তি গড়ে দিতাম—বঁটি কোদাল কুড়ুল গড়তাম, গাঁয়ের লোকে কিনত। এখন গাঁয়ের লোকে সেসব কিনছেন বাজার থেকে। সস্তা পাচ্ছেন—তাই কিনছেন। আমাদের গিরিশ গাড়ি গড়ত, দরজা তৈরি করত; ঘরের চালকাঠামো করতে গিরিশকেই লোকে ডাকত। এখন অন্য জায়গা থেকে সস্তায় মিস্ত্রি এনে কাজ হচ্ছে। তারপর ধরুন ধানের দর পাঁচ সিকে—দেড় টাকা, আর অন্য জিনিসপত্র আক্ৰা। এতে আমাদের এই নিয়ে চুপচাপ পড়ে থাকলে কি করে চলে, বলুন? ঘর-সংসার যখন করছি—তখন ঘরের লোকের মুখে তো দুটো দিতে হবে। তার ওপর ধরুন, আজকালকার হাল-চাল সে রকম নেই

ছিরু এতক্ষণ ধরিয়া মনে মনে ফুলিতেছিল, সে সুযোগ পাইয়া বাধা দিয়া কথার মাঝখানেই বলিয়া উঠিল—তা বটে, আজকাল বার্নিশ-করা জুতো চাই, লম্বা লম্বা জামা চাই, সিগারেট চাই পরিবারের শেমিজ চাই, বডি চাই।

—এই দেখ ছিরু মোড়ল, তুমি একটু হিসেব করে কথা বলবে। অনিরুদ্ধ এবার কঠিন স্বরে প্রতিবাদ করিয়া উঠিল।

ছিরু বারকতক হেলিয়া-দুলিয়া বলিয়া উঠিল—হিসেব আমার করাই আছে রে বাপু। পঁচিশ টাকা ন আনা তিন পয়সা। আসল দশ টাকা, সুদ পনের টাকা ন আনা তিন পয়সা। তুই বরং কষে দেখতে পারিস। শুভঙ্করী জানিস তো?

হিসাবটা অনিরুদ্ধের নিকট পাওনা হ্যান্ডনেটের হিসাব। অনিরুদ্ধ কয়েক মুহূর্ত স্তব্ধ হইয়া রহিল সমস্ত মজলিসের দিকে একবার সে চাহিয়া দেখিল। সমস্ত মজলিসটাও এই আকস্মিক অপ্রত্যাশিত রূঢ়তায় স্তব্ধ হইয়া গিয়াছে। অনিরুদ্ধ মজলিস হইতে উঠিয়া পড়িল।

ছিরু ধমক দিয়া উঠিল—যাবে কোথা তুমি?

অনিরুদ্ধ গ্রাহ্য করিল না, সে চলিয়া গেল।

চৌধুরী এতক্ষণে বলিল—শ্ৰীহরি!

ছিরু বলিল—আমাকে চোখ রাঙাবেন না চৌধুরী মশায়, দু-তিনবার আপনি আমাকে থামিয়ে দিয়েছেন, আমি সহ্য করেছি। আর কিন্তু আমি সহ্য করব না।

চৌধুরী এবার চাদরখানি ঘাড়ে ফেলিয়া বাঁশের লাঠিটা লইয়া উঠিল; বলিল—চললাম গো তা হলে। ব্রাহ্মণগণকে প্রণাম—আপনাদিগে নমস্কার।

এই সময়ে গ্রামের পাতুলাল মুচি জোড়হাত করিয়া আগাইয়া আসিয়া বলিল চৌধুরী মহাশয়, আমার একটুকুন বিচার করে দিতে হবে।

চৌধুরী সন্তৰ্পণে মজলিস হইতে বাহির হইবার উদ্যোগ করিয়া বলিল—বল বাবা, এরা সব। রহিয়াছেন, বল!

—চৌধুরী মশায়!

চৌধুরী এবার চাহিয়া দেখিল—অনিরুদ্ধ আবার ফিরিয়া আসিয়াছে।

—একবার বসতে হবে চৌধুরী মশায়! ছিরু পালের টাকাটা আমি এনেছি—আপনারা থেকে কিন্তু আমার হ্যান্ডনোটটা ফেরতের ব্যবস্থা করে দিন।

মজলিসসুদ্ধ লোক এতক্ষণে সচেতন হইয়া চৌধুরীকে ধরিয়া বসিল। কিন্তু চৌধুরী কিছুতেই নিরস্ত হইল না, সবিনয়ে নিজেকে মুক্ত করিয়া লইয়া ধীরে ধীরে বাহির হইয়া গেল।

অনিরুদ্ধ পঁচিশ টাকা দশ আনা মজলিসের সম্মুখে রাখিয়া বলিল—এখনই হ্যান্ডনোটখানা। নিয়ে এস ছিরু পাল!

পরে হ্যান্ডনোটখানি ফেরত লইয়া বলিল—ও একটা পয়সা আমাকে আর ফেরত দিতে হবে না। পান কিনে খেয়ো। এস হে গিরিশ, এস।

হরিশ বলিল—ওই, তোমরা চললে যে হে? যার জন্যে মজলিস বসল—

অনিরুদ্ধ বলিল—আজ্ঞে হ্যাঁ। আমরা আর ও কাজ করব না মশায়, জবাব দিলাম। যে মজলিস ছিরু মোড়লকে শাসন করতে পারে না, তাকে আমরা মানি না।

তাহারা হনহন করিয়া চলিয়া গেল। মজলিস ভাঙিয়া গেল।

পরদিন প্রাতেই শোনা গেল, অনিরুদ্ধের দুই বিঘা বাকুড়ির আধ-পাকা ধান কে বা কাহারা নিঃশেষে কাটিয়া তুলিয়া লইয়াছে।

দুই

অনিরুদ্ধ ফসলশূন্য ক্ষেতখানার আইলের উপর স্থিরদৃষ্টিতে দাঁড়াইয়া কিছুক্ষণ দেখিল। নিষ্ফল আক্রোশে তাহার লোহা-পেটা হাত দুখানা মুঠা বাঁধিয়া ভাইস-যন্ত্রের মত কঠোর করিয়া তুলিল। তাহার পর সে অত্যন্ত দ্রুতপদে বাড়ি ফিরিয়া হাতকাটা জামাটা টানিয়া সেটার মধ্যে মাথা গলাইতে গলাইতে বাহির দরজার দিকে অগ্রসর হইল।

অনিরুদ্ধের স্ত্রীর নাম পদ্মমণি—দীর্ঘাঙ্গী পরিপূর্ণ-যৌবনা কালো মেয়েটি। টিকালো নাক, টানা-টানা ভাসা-ভাসা ডাগর দুটি চোখ। পদ্মের রূপ না থাক, শ্রী আছে। পদ্মের দেহে অদ্ভুত শক্তি, পরিশ্রম করে সে উদয়াস্ত। তেমনি তীক্ষ্ণ তাহার সাংসারিক বুদ্ধি। অনিরুদ্ধকে এইভাবে বাহির হইতে দেখিয়া সে স্বামী অপেক্ষাও দ্রুতপদে আসিয়া সম্মুখে দাঁড়াইয়া বলিল—চললে কোথায়?

রূঢ়দৃষ্টিতে চাহিয়া অনিরুদ্ধ বলিল—ফিঙের মত পেছনে লাগলি কেন? যেখানে যাই না, তোর সে খোঁজে কাজ কি?

হাসিয়া পদ্ম বলিল—পেছনে লাগি নাই। তার জন্য সামনে এসে দাঁড়িয়েছি। আর, খোঁজে আমার দরকার আছে বৈকি। মারামারি করতে যেতে পাবে না তুমি।

অনিরুদ্ধ বলিল—মারামারি করতে যাই নাই, থানা যাচ্ছি, পথ ছাড়।

—থানা? পদ্মর কণ্ঠস্বরের মধ্যে উদ্বেগ পরিস্ফুট হইয়া উঠিল।

—হ্যাঁ, থানা। শালা ছিরে চাষার নামে আমি ডাইরি করে আসব—রাগে অনিরুদ্ধের কণ্ঠস্বর রণ-রণ করিতেছিল।

পদ্ম স্থিরভাবে ঘাড় নাড়িয়া বলিল—না। সত্যি হলেও ছিরু মোড়ল তোমার ধান চুরি করেছে—এ চাকলায় কে এ কথা বিশ্বাস করবে?

অনিরুদ্ধের কিন্তু তখন এ পরামর্শ শুনিবার মত অবস্থা নয়, সে ঠেলিয়া পদ্মকে সরাইয়া দিয়া বাহির হইবার উদ্যোগ করিল। অনিরুদ্ধের অনুমান অভ্রান্ত, ধান শ্রীহরি পালই কাটিয়া লইয়াছে।

কিন্তু পদ্ম যাহা বলিয়াছে সে-ও নিষ্ঠুরভাবে সত্য, ধনীকে চোর প্রতিপন্ন করা বড় সহজ নয়। শ্রীহরি ধনী। এ চাকলায় কাছাকাছি তিনখানা গ্রাম—কালীপুর, শিবপুর ও কঙ্কণা—এ তিনখানা গ্রামে ছিরু পাল বা শ্রীহরি পালের ধনের খ্যাতি যথেষ্ট। কালীপুর ও শিবপুর সরকারি সেরেস্তায় দুখানা ভিন্ন গ্রাম হিসাবে জমিদারের অধীন স্বতন্ত্র মৌজা হইলেও কার্যত একখানাই গ্রাম। একটা দিঘির এপার-ওপার মাত্র। শ্রীহরির বাস এই কালীপুরে। এ দুখানা গ্রামের মধ্যে শ্রীহরির সমকক্ষ ব্যক্তি আর কেহ নাই। শিবপুরের হেলা চাটুজ্জেরও টাকা ও ধান যথেষ্ট; তবে লোকে বলে—শ্রীহরির ঘরে সোনার ইট আছে, টাকা ধানও প্রচুর, তা হইলেও দুইজনের তুলনা হয় না। ক্রোশখানেক দূরবর্তী কঙ্কণা অবশ্য সমৃদ্ধ গ্রাম। বহু সম্ভ্রান্ত ব্রাহ্মণ পরিবারের বাস। সেখানকার মুখুজ্জেবাবুরা লক্ষ লক্ষ টাকার অধিকারী, এ অঞ্চলের প্রায় গ্রামই এখন তাহাদের কুক্ষিগত। মহাজন হইতে তাহারা প্রবল প্রতাপান্বিত জমিদার হইয়া উঠিয়াছে; শিবপুর কালীপুর গ্রাম দুখানাও ধীরে ধীরে তাহাদের গ্রামের আকর্ষণে সর্পিল জিহ্বার দিকে আগাইয়া চলিয়াছে। কিন্তু সেখানেও শ্রীহরি পালের নামডাক আছে। ময়ূরাক্ষীর ওপারে আধা শহর রেলওয়ে জংশন, সেখানে ধনী মাড়োয়ারীর গদি আছে—দশ-বারটা চালের কল, গোটা দুয়েক তেল-কল, একটা আটার কল আছে—সেখানেও শ্রীহরি পালকে ‘ঘোষ মশায়’ বলিয়াই সম্বর্ধিত করা হয়। ওই জংশন-শহরেই এ অঞ্চলের থানা অবস্থিত।

সুতরাং পদ্মের অনুমানের ভিত্তি আছে। কঙ্কণায় অথবা জংশন-শহরে কেহ এ কথা বিশ্বাস করিবে না; কিন্তু শিবকালীপুরের কেহ এ কথা অবিশ্বাস করে না। ছিরু ভয়ঙ্কর ব্যক্তি—এ সংসারে তাহার অসাধ্য কিছু নাই! এ ধান কাটিয়া লওয়া তাহার অনিরুদ্ধের উপর প্রতিশোধ লইবার জন্যই নয়—চুরিও তাহার অন্যতম উদ্দেশ্য। এ কথাও শিবকালীপুরের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা বিশ্বাস করে। কিন্তু সে কথা মুখ ফুটিয়া বলিবার সাহস কাহারও নাই।

শ্রীহরির বিশাল দেহ—কিন্তু স্থূল নয়, একবিন্দু মেদশৈথিল্য নাই। বাঁশের মত মোটা হাত-পায়ের হাড়—তাহাতে জড়ানো কঠিন মাংসপেশী। প্রকাণ্ড চওড়া দুখানা হাতের পাঞ্জা, প্রকাণ্ড বড় মাথা, বড় বড় উগ্র চোখ, থ্যাবড়া নাক, আকর্ণ-বিস্তার মুখগহ্বর, তাহার উপর একমাথা কোঁকড়া-ঝাঁকড়া চুল। এত বড় দেহ লইয়া সে কিন্তু নিঃশব্দ পদসঞ্চারে দ্রুত চলিতে পারে। পরের ঝাড়ের বাঁশ কাটিয়া সে রাতারাতি আনিয়া আপনার পুকুরে ফেলিয়া রাখে, শব্দ নিবারণের জন্য সে হাত-করাত দিয়া বাঁশ কাটে। খেপলা জাল ফেলিয়া রাত্রে সে পরের পুকুরের পোনামাছ আনিয়া নিজের পুকুর বোঝাই করে; প্রতি বৎসর তাহার বাড়ির পাঁচিল সে নিজেই বর্ষার সময় কোদাল চালাইয়া ফেলিয়া দেয়, নতুন পাঁচিল দিবার সময় অপরের সীমানা অথবা রাস্তা খানিকটা চাপাইয়া লয়। কেহ বড় প্রতিবাদ করে না, কিন্তু ব্যক্তিগত সীমানা আত্মসাৎ করিলে প্রতিবাদ না করিয়া উপায় থাকে না। তখন ছিরু কোদাল হাতেই উঠিয়া দাঁড়ায়; দন্তহীন মুখে কি বলে বোঝা যায় না। মনে হয় একটা পশু গর্জন করিতেছে। এই চুয়াল্লিশ বৎসর বয়সেই সে দন্তহীন, যৌনব্যাধির আক্রমণে তাহার দাঁতগুলো প্রায় সবই পড়িয়া গিয়াছে। হরিজন-পল্লীতে সন্ধ্যার পর যখন পুরুষেরা মদে বিভোর হইয়া থাকে, তখন ছিরু নিঃশব্দ পদসঞ্চারে শিকার ধরিতে প্রবেশ করে। কতবার তাহারা উহাকে তাড়া করিয়া ধরিবার চেষ্টা করিয়াছে—কিন্তু ছিরু ছুটিয়া চলে অন্ধকারচারী হিংস্র চিতাবাঘের মত।

এই শ্রীহরি ঘোষ, ওরফে ছিরু পাল বা ছিরে মোড়ল।

শ্রীহরিকে ভাল করিয়া চিনিয়াও অনিরুদ্ধ স্ত্রীর কথা বিবেচনা করা দূরে থাক, তাহাকে ঠেলিয়া সরাইয়া দিয়া, বাড়ি হইতে রাস্তায় নামিয়া পড়িল। পদ্ম বুদ্ধিমতী মেয়ে, সে রাগ অভিমান করিল না, আবার ডাকিল—ওগো, শোন শোন, ফেরো। অনিরুদ্ধ ফিরিল না।

এবার একটু ক্ষীণ হাসিয়া পদ্ম ডাকিল—পেছন ডাকছি, যেও না, শোন!

সঙ্গে সঙ্গে অনিরুদ্ধ লাঙ্গুল-স্পৃষ্ট কেউটের মত সক্রোধে ফিরিয়া দাঁড়াইল।

পদ্ম হাসিয়া বলিল—একটু জল খেয়ে যাও।

অনিরুদ্ধ ফিরিয়া আসিয়া পদ্মের গালে সজোরে এক চড় বসাইয়া দিয়া বলিল—ডাকবি আর পিছন থেকে?

পদ্মের মাথাটা ঝিনঝিন করিয়া উঠিল, অনিরুদ্ধের লোহাপেটা হাতের চড়—নিদারুণ আঘাত। পদ্ম ‘বাবা রে’ বলিয়া হাতে মুখ ঢাকিয়া বসিয়া পড়িল।

অনিরুদ্ধ এবার অপ্রস্তুত হইয়া পড়িল। সঙ্গে সঙ্গে একটু ভয়ও হইল। যেখানে-সেখানে চড় মারিলে নাকি মানুষ মরিয়া যায়; সে ত্রস্ত হইয়া ডাকিল—পদ্ম! পদ্ম! বউ!

পদ্মের শরীর থরথর করিয়া কাঁপিতেছে—সে ফুলিয়া ফুলিয়া কাঁদিতেছে। অনিরুদ্ধ বলিল—এই নে বাপু, এই নে জামা খুললাম, থানায় যাব না। ওঠ। কাঁদিস না, ও পদ্ম।…সে পদ্মের মুখ-ঢাকা হাতখানি ধরিয়া টানিল—ও পদ্ম!

পদ্ম এবার মুখ হইতে হাত ছাড়িয়া দিয়া খিলখিল করিয়া হাসিয়া উঠিল; মুখ ঢাকা দিয়া পদ্ম কাঁদে নাই, নিঃশব্দে হাসিতেছিল। অদ্ভুত শক্তি পদ্মের; আর অনিরুদ্ধের অনেক কিল চড় খাওয়া তাহার অভ্যাস আছে—এক চড়ে তাহার কি হইবে।

কিন্তু অনিরুদ্ধের পৌরুষে বোধহয় ঘা লাগিল—সে গুম হইয়া বসিয়া রহিল। পদ্ম খানিকটা গুড় আর প্রকাণ্ড একটা বাটিতে একবাটি মুড়ি ও টুকনি-ঘটির এক ঘটি জল আনিয়া নামাইয়া দিয়া বলিল—তুমি ছিরু মোড়লকে সুবে করে এজাহার করবে, গাঁয়ের লোক কে তোমার হয়ে সাক্ষী দেবে বল তো? কাল থেকে তো গাঁয়ের লোক সবাই তোমার ওপর বিরূপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কাল সন্ধ্যার পর আবার মজলিস বসিয়াছিল, অনিরুদ্ধের ওই ‘মজলিসকে মানি না’ কথাটা সকলকে বড় আঘাত দিয়াছে। সন্ধ্যার মজলিসে অনিরুদ্ধ এবং গিরিশের বিরুদ্ধে জমিদারের কাছে নালিশ জানানো স্থির হইয়া গিয়াছে।

কথাটা অনিরুদ্ধের মনে পড়িল, কিন্তু তবু তাহার মন মানিল না।


তিন



বেশ পরিপাটি করিয়া এক ছিলিম তামাক সাজিয়া হুঁকায় জল ফিরাইয়া পদ্ম স্বামীর আহার-শেষের প্রতীক্ষা করিতেছিল। অনিরুদ্ধের খাওয়া শেষ হইতেই হাতে জল তুলিয়া দিয়া হুঁকাটি তাহার হাতে দিয়া বলিল—খাও।

অনিরুদ্ধ টানিয়া বেশ গল গল্ করিয়া নাক-মুখ দিয়া ধোঁয়া বাহির করিয়াছে, তখন পদ্ম বলিল—আমার কথাটা ভেবে দেখ। রাগ একটু পড়েছে তো?

—রাগ! অনিরুদ্ধ মুখ তুলিয়া চাহিল—ঠোঁট দুইটা তাহার থর থর্ করিয়া কাঁপিতেছে।—এ রাগ আমার তুষের আগুন, জনমে নিভবে না। আমার দু’বিঘে বাকুড়ির ধান—

কথাটা শেষ করিতে পারিল না। কারণ তাহার চোখের জলের ছোঁয়াচে পদ্মের ডাগর চোখ দুটিও অশ্রুজলে উচ্ছ্বসিত হইয়া উঠিয়াছে। এবং অনিরুদ্ধের আগেই তাহার ফোঁটা কয়েক জল টপ টপ করিয়া ঝরিয়া পড়িল।

অনিরুদ্ধ চোখ মুছিয়া বলিল—কাঁদছিস কেন তুই? দু’বিঘে জমির ধান গিয়েছে, যাগে, আমি তো আছিরে বাপু! আর দেখ না—কি করি আমি!

চোখ মুছিতে মুছিতে পদ্ম বলিল—কিন্তু থানা-পুলিশ কর না বাপু! তোমার দুটি পায়ে পড়ি আমি। ওরা সাপ হয়ে দংশায়, রোজা হয়ে ঝাড়ে।

আমার বাপের ঘরে ডাকাতি হল—বাবা চিনলে একজনকে কিন্তু পুলিশ তার গায়ে হাত দিল না। অথচ মুঠো মুঠো টাকা খরচ হয়ে গেল বাবার। ছেলেমেয়ে গুষ্টি সমেত নিয়ে টানাটানি; একবার দারোগা আসে, একবার নেসপেকটার আসে, একবার সায়েব আসে—আর দাও এজাহার। তার পরে, ক’জনকে কোথা হতে ধরলে, তাদিগে সনাক্ত করতে জেলখানা পর্যন্ত মেয়েছেলে নিয়ে টানাটানি। তাছাড়া গালমন্দ আর ধমক ত আছেই।

—হুঁ। চিন্তিতভাবে হুঁকায় গোটা কয়েক টান দিয়া অনিরুদ্ধ বলিল—কিন্তু এর একটা বিহিত করতে তো হবে। আজ না হয় দু-বিঘে জমির ধান গেল। কাল আবার পুকুরের মাছ ধরে নেবে—পরশু ঘরে—

বাধা পড়িল—অনি ভাই ঘরে রয়েছে নাকি? অনিরুদ্ধের কথা শেষ হইবার পূর্বেই বাহির হইতে গিরীশ ডাকিয়া সাড়া দিয়া বাড়ীর মধ্যে আসিয়া প্রবেশ করিল। পদ্ম আধ ঘোমটা টানিয়া, এঁটো বাসন কয়খানি তুলিয়া ঘাটের দিকে চলিয়া গেল।

অনিরুদ্ধ একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলিয়া বলিল—দু-বিঘে বাকুড়িয়া ধান একেবারে শেষ করে কেটে নিয়েছে, একটি শীষও পড়ে নাই। গিরীশও একটা নিঃশ্বাস ফেলিয়া বলিল—শুনলাম।

—থানায় ডায়রি করব ঠিক করেছিলাম, কিন্তু বউ বারণ করছে। বলছে, ছিরু পাল চুরি করেছে—এ কথা বিশ্বাস করবে কেন! আর গায়ের লোকও আমার হয়ে কেউ সাক্ষী দেবে না।

—হ্যাঁ, কাল সন্ধ্যেতে আবার নাকি চণ্ডীমণ্ডপে জটলা হয়েছিল। আমরা নাকি অপমান করেছি গায়ের লোকদের। জমিদারের কাছে নালিশ করবে শুনছি।

ঠোঁটের দিক বাঁকাইয়া অনিরুদ্ধ এবার উঠিল—যা যা, জমিদার, জমিদার আমার কচু করবে।

কথাটা গিরীশের খুব মনঃপূত হইল না, সে বলিল—তাই বলারই বা আমাদের দরকার কি? জমিদারেরও তো বিচার আছে, তিনি বিচার করুন না কেন!

অনিরুদ্ধ বারবার ঘাড় নাড়িয়া অস্বীকার করিয়া বলিল—উহু, ছাই বিচার করবে জমিদার। নিজেই আজ তিন বছর ধান দেয় নাই। জমিদার ঠিক ওদের রায়ে রায় দেবে; তুমি জান না।

বিষণ্ণভাবে গিরীশ বলিল—আমিও পাই নাই চার বছর।

অনিরুদ্ধ বলিল—এই দেখ ভাই, যখন মুখ ফুটে বলেছি করব না তা তখন আমার মরা বাবা এলেও আমাকে করাতে পারবে না; তাতে আমার ভাগ্যে যাই থাক! তুমি ভাই এখনও বুঝে দেখ।

গিরীশ হাতের ছাঁদের মধ্যে কঙ্কেটি পুরিয়া বলিল—সে তুমি নিশ্চিন্দি থাক। তুমি না মিটোলে আমি মিটোব না! অনিরুদ্ধ প্রীত হইয়া কঙ্কেটি তাহার হাতে দিল।

গিরীশ কয়েক টান দিয়া বলিল—এদিকে গোলমালও তোমার চরম লেগে গিয়েছে। শুধু আমরা দু’জনা নই। জমিদার ক’জনার বিচার করবে, করুক না! নাপিত, বায়েন, দাই, চৌকিদার, নদীর ঘাটের মাঝি, মাঠ-আগলদার সবাই আমাদের ধুয়ো নিয়ে ধুয়ো ধরেছে—ওই অল্প ধান নিয়ে আমরা কাজ করতে পারব না। তারা নাপিত তো আজই বাড়ীর দোরে অর্জুনতলায় খান কয়েক ইট পেতে বসেছে—বলে পয়সা আন, এনে কামিয়ে যাও।

অনিরুদ্ধ কঙ্কেটি ঝাড়িয়া নূতন করিয়া তামাক সাজিতে সাজিতে বলিল—তাই বৈকি! পয়সা ফেল, মোওয়া খাও; আমি কি তোমার পর?

গিরীশের কথাবার্তার মধ্যে বেশ একটি বিজ্ঞতা প্রচারের ভঙ্গি থাকে, ইহা তাহার অভ্যাস হইয়া গিয়াছে; সে বলিল—এই কথা! আগেকার কাল তোমার এক আলাদা কথা ছিল। সস্তাগণ্ডার বাজার ছিল—তখন ধান নিয়ে কাজ করে আমাদের পুষিয়েছে—আমরা করেছি; এখন যদি না পোষায়?

বাহিরে রাস্তায় ঠুন-ঠুন করিয়া বাইসাইকেলের ঘণ্টা বাজিয়া উঠিল; সঙ্গে সঙ্গে ডাক আসিল—অনিরুদ্ধ! ডাক্তার জগন্নাথ ঘোষ। অনিরুদ্ধ ও গিরীশ দুজনেই বাহির হইয়া আসিল। মোটাসোটা খাটো লোকটি, মাথায় বাবরী চুল—জগন্নাথ ঘোষ বাইসাইকেল ধরিয়া দাড়াইয়া ছিল।

ডাক্তার কোথাও পড়িয়া-শুনিয়া পাস করে নাই, চিকিৎসাবিদ্যা তাহাদের তিনপুরুষের বংশগত বিদ্যা, পিতামহ ছিলেন কবিরাজ, বাপ জ্যেঠা ছিলেন কবিরাজ এবং ডাক্তার—একাধারে দুই। জগন্নাথ কেবল ডাক্তার, তবে সঙ্গে দু-চারটি মুষ্টিযোগের ব্যবস্থাও দেয়—তাহাতে চট্ করিয়া ফলও হয় ভাল। গ্রামের সকল লোকই তাহাকে দেখায়, কিন্তু পয়সা বড় কেহ দেয় না।

ডাক্তার তাহাতে খুব গররাজী নয়, ডাকিলেই যায়, বাকীর উপরে বাকীও দেয়। ভিন্ন গ্রামেও তাহাদের পুরুষানুক্রমিক পসার আছে—সেখানকার রোজগারেই তাহার দিন চলে। কোনদিন শাক-ভাত, আর কোনদিন যাহাকে বলে এক-অন্ন পঞ্চাশ-ব্যঞ্জন, যেদিন যেমন রোজগার।

এককালে ঘোষেরা সম্পত্তিশালী প্রতিষ্ঠাবান লোক ছিল। ধনীর গ্রাম কঙ্কণায় পর্যন্ত যথেষ্ট সম্মান-মর্যাদা পাইত, ওই কঙ্কণার লক্ষপতি মুখুজ্জেদের একহাজার টাকা ঋণ ক্রমে চারি হাজারে পরিণত হইয়া ঘোষেদের সমস্ত সম্পত্তি গ্রাস করিয়া ফেলিয়াছে। এই সম্পত্তি এবং সকলের সম্মানিত প্রবীণগণের তিরোধানের সঙ্গে সঙ্গে তাহাদের সেই সম্মান-মর্যাদাও চলিয়া গিয়াছে।

জগন্নাথ অকাতরে চিকিৎসা এবং ঔষধ সাহায্য করিয়াও সে সম্মান আর ফিরিয়া পায় নাই। তাহার জন্য তাহার ক্ষোভের অন্ত নাই। সেই ক্ষোভে কাহাকেও রেয়াত করে না, রূঢ়তম ভাষায় সে উচ্চকণ্ঠে বলে—“চোরের দল সব, জানোয়ার।” গোপনে নয়, সাক্ষাতেই বলে। ধনী দরিদ্র যেই হোক প্রত্যেকের ক্ষুদ্রতম অন্যায়েরও অতি কঠিন প্রতিবাদ সে করিয়া থাকে। তবে স্বাভাবিক ভাবে ধনীদের ওপর ক্রোধ তাহার বেশী।

অনিরুদ্ধ ও গিরীশ বাহির হইয়া আসিতেই ডাক্তার বিনা ভূমিকায় বলিল—থানায় ডায়রি করলি?

অনিরুদ্ধ বলিল—আজ্ঞে তাই—

—তাই আবার কিসের রে বাপু? যা, ডায়রি করে আয়।

—আজ্ঞে বারণ করছে সব, বলছে—ছিরু পাল চুরি করেছে কে একথা বিশ্বাস করবে?

—কেন? ও বেটার টাকা আছে বলে?

—তাই তো সাত-পাঁচ ভাবছি ডাক্তারবাবু।

বিদ্রূপতীক্ষ্ণ হাসি হাসিয়া জগন্নাথ বলিল—তা হলে এ সংসারে যাদের টাকা আছে তারাই সাধু—আর গরীব মাত্রেই অসাধু, কেমন? কে বলেছে এ কথা?

অনিরুদ্ধ এবার চুপ করিয়া রহিল। বাড়ীর ভিতরে বাসনের টুংটাং শব্দ উঠিতেছে। পদ্ম ফিরিয়াছে, সব শুনিতেছে, তাহারই ইশারা দিতেছে। উত্তর দিল গিরীশ, বলিল—আজ্ঞে, ডায়রি করেই বা কি হবে ডাক্তারবাবু, ও এখুনি টাকা দিয়ে দারোগার মুখ বন্ধ করবে। তা ছাড়া থানার জমাদারের সঙ্গে ছিরুর বেশ ভাবের কথা তো জানেন। একসঙ্গে মদ-ভাং খায় তারপর—

ডাক্তার বলিল—জানি। কিন্তু দারোগা টাকা খেলে—তারও উপায় আছে। তার উপরে কমিশনার আছে। তার ওপরে ছোট লাট, ছোট লাটের ওপর বড় লাট আছে।

অনিরুদ্ধ বলিল—তা বুঝলাম ডাক্তারবাবু, কিন্তু মেয়েছেলেকে এজাহার-ফেজাহার দিতে হবে, সেই কথা আমি ভাবছি।

—মেয়েছেলের এজাহার? ডাক্তার আশ্চর্য হইয়া গেল। মাঠে ধান চুরি হয়েছে, তাতে মেয়েছেলেকে এজাহার দিতে হবে কেন? কে বলল? এ কি মগের মূলুক নাকি?

সঙ্গে সঙ্গে অনিরুদ্ধ উঠিয়া পড়িল।—তা হলে আমি আজ এই এখুনি চললাম।

ডাক্তার বাইসাইকেলে উঠিয়া বলিল—যা, তুই নির্ভাবনায় চলে যা। আমি ও-বেলা যাব। চুরি করার জন্যে ধান কেটে নিয়েছে—এ কথা বলবি না, বলবি, আক্রোশবশে আমার ক্ষতি করবার জন্যে করেছে।

অনিরুদ্ধ আর বাড়ীর মধ্যে ঢুকিল না পর্যন্ত, রওনা হইয়া গেল, পাছে পদ্ম আবার বাধা দেয়। সে ডাক্তারের গাড়ীর সঙ্গে সঙ্গেই চলিতে আরম্ভ করিল; গিরীশকে বলিল—গিরীশ, কামার-শালের চাবিটা নিয়ে এসো তো ভাই চেয়ে। ওপারের জংশনের কামারশালার চাবি।

গিরীশকে ভিতরে ঢুকিয়া চাহিতে হইল না, পদ্ম দরজার আড়াল হইতে ঝনাৎ করিয়া চাবিটা ফেলিয়া দিয়া আসিয়া তাহার সম্মুখে পড়িল। গিরীশ হেঁট হইয়া চাবিটা তুলিতেছিল—পদ্ম দরজার পাশ হইতে উকি মারিয়া দেখিল—ডাক্তার ও অনিরুদ্ধ অনেকখানি চলিয়া গিয়াছে। সে এবার আধঘোমটা টানিয়া সামনে আসিয়া বলিল—একবার ডাক ওকে।

মুখ তুলিয়া একবার পদ্মের দিকে একবার অনিরুদ্ধের দিকে চাহিয়া গিরীশ বলিল—পেছনে ডাকলে ক্ষেপে যাবে।

—তা তো যাবে। কিন্তু ভাত? ভাত নিয়ে যাবে কে? আজ কি খেতেদেতে হবে না?

গিরীশ ও অনিরুদ্ধ সকালে উঠিয়া ও-পারে যায়, তাহার পূর্বেই তাহাদের ভাত হইয়া থাকে—যাইবার সময় সেই ভাত তাহারা একটা বড় কৌটায় করিয়া লইয়া যায়। সেই খাইয়াই তাহাদের দিন কাটে। রাত্রে খাওয়াটা বাড়ীতে ফিরিয়া আরাম করিয়া খায়।

গিরীশ বলিল—ভাতের কৌটা আমাকে দাও, আমিই নিয়ে যাই।

পদ্ম সংসারে একা মানুষ। বছর দুয়েক পূর্বে শাশুড়ী মারা যাওয়ার পর হইতেই সমস্ত দিনটা তাহাকে একলাই কাটাইতে হয়। সে নিজে বন্ধ্যা, ছেলে-পুলে নাই। পাড়াগাঁয়ে এমন অবস্থায় একটি মনোহর কর্মান্তর আছে—সে হইল পাড়া বেড়ানো।

কিন্তু পদ্মের স্বভাব যেন ঊর্ণনাভ-গৃহিণীর মত। সমস্ত দিনই সে আপনার গৃহস্থালীর জাল ক্রমাগত বুনিয়া চলিয়াছে। ধান-কলাই রৌদ্রে দিতেছে, তুলিতেছে, সেগুলি মাটি ও কুড়ানো ইট মাটি দিয়া গাঁথিয়া ঘবে বেদী বাঁধিতেছে; ছাই দিয়া মাজিয়া-তোলা বাসনেরও ময়লা তুলিতেছে—গীতের লেপ-কাঁথাগুলি পাড়িয়া নতুন পাট করিতেছে। ইহা ছাড়া নিয়মিত কাজ—গোয়াল পরিষ্কার করা, জাব কাটা, খুঁটে দেওয়া, তিন-চারবার বাড়ী ঝাঁট দেওয়া এসব তো আছেই।

আজ কিন্তু তাহার কোন কাজ করিতে ইচ্ছা হইল না। সে খিড়কির ঘাটে পা ছড়াইয়া বসিল। অনিরুদ্ধকে থানায় যাইতে বারণ করিয়াছে, হাসিমুখে রহস্য করিয়া তাহাকে শান্ত করিবার জন্য চেষ্টা করিয়াছে—সে কেবল ভবিষ্যৎ অশান্তি নিবারণের জন্য। ঐ দু বিঘা বাকুড়ির ধানের জন্য তাহারও দুঃখের সীমা ছিল না। আপন মনেই সে মৃদুস্বরে ছিরু পালকে অভিসম্পাত দিতে লাগিল।

—কানা হবেন—কানা হবেন—অন্ধ হবেন; হাতে কুষ্ঠ হবে, সর্বস্ব যাবে—ভিক্ষে করে খাবেন।

সহসা যেন কোথাও প্রচণ্ড কলরব উঠিতেছে বলিয়া মনে হইল। পদ্ম কান পাতিয়া শুনিল। গোলমালটা বায়েনপাড়ায় মনে হইতেছে। প্রচণ্ড রূঢ়কণ্ঠে অশ্লীল ভাষায় কেউ তর্জন-গর্জন করিতেছে। ওই ছোঁয়াচটা যেন পদ্মকেও লাগিয়া গেল। সেও কণ্ঠ উচ্চে চড়াইয়া শাপ-শাপান্ত আরম্ভ করিল—

—জোড়া বেটা ধড়ফড় করে মরবে; এক বিছানায় একসঙ্গে। আমার জমির ধানের চালে কলেরা হবে। নিবংশ হবেন—নিবংশ হবেন; নিজে মরবেন না, কানা হবেন—দুটি চোখ যাবে, হাতে কুষ্ঠ হবে। যথা-সর্বস্ব উড়ে যাবে—পুড়ে যাবে। পথে পথে ভিক্ষে করে বেড়াবেন।

বেশ হিসাব করিয়া—ছিরু পালের সহিত মিলাইয়া সে শাপ-শাপান্ত করিতেছিল। সহসা তাহার নজরে পড়িল, খিড়কির পুকুরের ওপারে রাস্তার উপর দাঁড়াইয়া ছিরু পাল তাহার গালিগালাজগুলি বেশ উপভোগ করিয়া হাসিতেছে। এইমাত্র ছিরু পাতু বায়েনকে মারপিট করিয়া ফিরিতেছিল, বায়েনপাড়ার কলরবটা তাহারই সেই বিক্রমোদ্ভূত।

ফিরিবার পথে অনিরুদ্ধের স্ত্রীর শাপ-শাপান্ত শুনিয়া দাড়াইয়া হাসিতেছিল। সে হাসির মধ্যে বন্য একটা ক্রুর প্রবৃত্তির প্রেরণা অথবা তাড়নাও ছিল। দেখিয়া পদ্ম উঠিয়া বাড়ীর মধ্যে ঢুকিয়া পড়িল। ছিরু ভাবিতেছিল, লাফ দিয়া বাড়ীর মধ্যে ঢুকিয়া পড়িবে কি না? কিন্তু দিবালোককে তাহার বড় ভয়, সে স্পন্দিতবক্ষে দ্বিধা করিতেছিল। সহসা পদ্মের কণ্ঠস্বর শুনিয়া আবার সে ফিরিয়া চাহিল। কিন্তু কিসের একটা প্রতিবিম্বিত আলোকচ্ছটা তাহার চোখে আসিয়া পড়িতেই সে চোখ ফিরাইয়া লইল।

—ধার পরীক্ষে করতে এক কোপে দুটো পাটা কেটে আমার কাজ বাড়িয়ে গেলেন বীরপুরুষ। রক্তের দাগ ধোয়া নাই ঘরে ভরে রেখে দিয়েছেন। আমি ঘাটে বসে ঝামা ঘষি আর কি।

পদ্মের হাতে একখানা বগি দা, রোদ পড়িয়া দাখানা ঝক্‌ঝক্ করিতেছে। তাহারই ছটা আসিয়া চোখে পড়িতেই ছিরু পাল চোখ ফিরাইয়া লইল। পরক্ষণেই ছম-ছম্ শব্দে পা ফেলিয়া আপনার বাড়ীর পথ ধরিল। সঙ্গে সঙ্গে পদ্মের মুখেও নিষ্ঠুর কৌতুকের হাসি ফুটিয়া উঠিল।


চার



গ্রাম হইতে বাহির হইলেই বিস্তীর্ণ পঞ্চগ্রামের মাঠ। দৈর্ঘ্যে প্রায় ছয় মাইল প্রস্থে চার মাইল; কঙ্কণা, কুসুমপুর, মহাগ্রাম, শিবকালীপুর ও দেখুড়িয়া এই পাঁচখানা গ্রামের অবস্থিতি; এবং পাঁচখানা গ্রামের সীমানার মাঠ ময়ূরাক্ষী নদীর ধার পর্যন্ত ছড়াইয়া আছে। মাঠখানার দক্ষিণ ও পূর্ব-পশ্চিমে অর্থাৎ তিন দিকে ময়ূরাক্ষী নদী। ময়ূরাক্ষী নদীর তীরভূমি জুড়িয়া এই মাঠখানার উর্বরতা অদ্ভুত। অংশের নামই হইল ‘অমরকুণ্ডার মাঠ’ অর্থাৎ মাঠে ফসলের মৃত্যু নাই। শিবপুরের ইহার মধ্যে আবার শিবকালীপুরের সীমানার জমিই নাকি উৎকৃষ্ট। এইটুকু জমির পরিমাণ এদিকে অতি অল্প; শিবপুরের সমস্ত জমি উত্তর দিকে। কালীপুরের চাষের মাঠ অধিকাংশই গ্রামের দক্ষিণ ও পূর্বদিকে অর্থাৎ এই দিকে। শিবকালীপুর নামেমাত্র দুইখানা গ্রাম; শিবপুর ও কালীপুর, দুই গ্রামে বসতির মধ্যে কেবল একটা দীঘির ব্যবধান। কালীপুর গ্রামখানাই বড়, ওই গ্রামেই লোকসংখ্যা বেশী, শ্রীহরি, দেবু প্রভৃতি সকলেরই বাস এখানে।

শিবপুর গ্রামখানি বহু পূর্বে ছিল ছোট একটি পাড়াবিশেষ, তখন অর্থাৎ বর্তমান কাল হইতে প্রায় আশি-নব্বই বৎসর পূর্বে সেখানে একশ্রেণীর বিচিত্র সম্প্রদায় বাস করিত; তাহারা নিজেদের বলিত, ‘দেবল-চাষী’। তাহারা নিজ হাতে চাষ করিত না, শিবপুরের বুড়া শিবের সেবাপূজার ভার লইয়া তাহারা মাতিয়া থাকিত। এখন এই দেবল সম্প্রদায়ের আর কেহই নাই। অধিকাংশই মরিয়া হাজিয়া গিয়াছে, অবশিষ্ট কয়েক ঘর এখান হইতে অন্যত্র চলিয়া গিয়াছে। ক্রোশ পাঁচেক দূরবর্তী রক্ষেশ্বর গ্রাম এবং ক্রোশ আষ্টেক দূরবর্তী জলেশ্বর গ্রাম—বাবা রক্ষেশ্বর ও বাবা জলেশ্বর এই নামীয় দুই শিবের আশ্রয় লইয়া পাণ্ডা হিসেবে তাহাদের জ্ঞাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে বাস করিতেছে। শিবভক্ত দেবলদের বাস ছিল বলিয়াই পল্লীটার নাম ছিল শিবপুর। দেবলেরা চলিয়া যাইবার পর কালীপুরের চৌধুরীরা গ্রামের জমিদারী স্বত্ত্ব কিনিয়া শিবপুরে আসিয়া বাস করিয়াছিল। জ্ঞাতি সদগোপ চাষীদের প্রত্যক্ষ সংস্রব এড়াইবার জন্যই তাহারা এই ব্যবস্থা করিয়াছিল। চৌধুরীরাই শিবপুরকে একটি স্বতন্ত্র মৌজায় পরিণত করিয়াছিল। তাহাদের পতনের সঙ্গে সঙ্গে আবার শিবপুর স্তিমিত হইয়া আসিয়াছে।

উত্তর-পশ্চিমে যে গ্রামের মাঠ, সে গ্রামে নাকি লক্ষ্মী বসতি করেন না, গ্রামের দক্ষিণ ও পূর্বদিকে যে গ্রামের চাষের সীমানা—সেখানে নাকি লক্ষ্মীর অপার করুণা। অন্ততঃ প্রবীণেরা তাই বলে। মাঠ উত্তর ও পশ্চিমদিকে হইলে দেখা যায় গ্রাম অপেক্ষা মাঠ উঁচু। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দক্ষিণ ও পূর্বদিকে ক্রমনিম্নতার একটা একটানা প্রবাহ চলিয়া গিয়াছে। বোধহয় গোটা পৃথিবী জুড়িয়া এইটাই এই ক্রমনিম্নতার জন্যই, দক্ষিণ ও পূর্বদিকে কৃষিক্ষেত্র হইলে—গ্রামের সমস্ত জলই গিয়া মাঠে পড়ে; গ্রাম ধোয়া জলের উর্বরতা প্রচুর।

ইহা ছাড়াও গ্রামের পুকুরগুলির জলের সুবিধা ষোল আনা পাওয়া যায়। এই কারণে শিবপুর এবং কালীপুর পাশাপাশি গ্রাম হইলেও দুই গ্রামের জমির গুণ ও মূল্যে অনেক প্রভেদ। এজন্য কালীপুরের লোকের অনেক অহঙ্কার শিবপুরের লোককে সহ্য করিতে হয়। শিবপুরের চৌধুরীরা এককালে তাহাদের জমিদার ছিল, তখন কালীপুরকে শিবপুরের আধিপত্য সহ্য করিতে হইয়াছে; কালীপুরের বর্তমান অহঙ্কারের ঔদ্ধত্য তাহারও একটা প্রতিক্রিয়া বটে।

দ্বারকা চৌধুরী সেই বংশোদ্ভূত। চৌধুরীদের সমৃদ্ধি অনেক দিনের কথা। দ্বারকা চৌধুরীর একপুরুষ পূর্বে তাহাদের বংশের সম্মান সমৃদ্ধির ভাণ্ডার নিঃশেষিত হইয়াছে। চৌধুরীরও আভিজাত্যের কোন ভান নাই; পূর্বকালের কথা সে সম্পূর্ণ ভুলিয়া গিয়াছে। এ অঞ্চলের চাষীদের সঙ্গে সে সমানভাবেই মেলামেশা করে; এক মজলিসে বসিয়া তামাক খায়—সুখ-দুঃখের গল্প করে। তবু চৌধুরীর কথাবার্তার ধরন ও সুরের মধ্যে একটু স্বাতন্ত্র্য আছে। চৌধুরী কথা বলে খুব কম, যেটুকু বলে—তাহাও অতি ধীর এবং মৃদুস্বরে। কথার প্রতিবাদ করিলে চৌধুরী তাহার আর প্রতিবাদ করে না। কোন ক্ষেত্রে প্রতিবাদকারীর কথা সংক্ষেপে স্বীকার করিয়া লয়, কোন ক্ষেত্রে চুপ করিয়া যায়, কোন ক্ষেত্রে সেদিনকার মত মজলিস হইতে উঠিয়া পড়ে। মোট কথা, চৌধুরী শান্তভাবেই অবস্থান্তরকে মানিয়া লইয়া জীবন অতিবাহিত করিয়া চলিয়াছে।

বৃদ্ধ দ্বারকা চৌধুরী সকালেই ছাতাটা মাথায় বাঁশের লাঠিটি হাতে লইয়া কালীপুরের দক্ষিণ মাঠে নদীর ধারে রবি ফসলের চাষের তদ্বিরে চলিয়াছিল। কালীপুরের জমিদারীর স্বত্ব চলিয়া গেলেও—সেখানে তাহাদের মোটা জোত এখনও আছে। কালীপুরের দক্ষিণেই ‘অমরকুণ্ডার মাঠ’, পূর্বেই বলিয়াছি এখানকার ফসল কখনও মরে না, এ মাঠে হাজা-সুখা নাই। মাঠটির মাথায় বেশ বিস্তৃত দুইটি ঝর্নার জলা আছে; প্রশস্ত একটি অগভীর জলা হইতে নালা বাহিয়া অবিরাম জল বহিয়া চলিয়াছে; জলাটি কানায় কানায় অহরহই পরিপূর্ণ, জল কখনও শুকায় না। এই যুগ্ম-ধারাই অমরকুণ্ডার মাঠের উপর যেন ধরিত্রী মাতার বক্ষ-ক্ষরিত ক্ষীরধারা। নালা বাহিয়া জলাভাবের সময় নালায় বাঁধ দিয়া, যাহার যে দিকে প্রয়োজন জলস্রোতকে ঘুরাইয়া লইয়া যায়।

অগ্রহায়ণ পড়িতেই হৈমন্তী ধান পাকিতে শুরু করিয়াছে, সবুজ রঙ হলুদ হইতে আরম্ভ করিয়াছে। অমরকুণ্ডার মাঠের এক প্রান্ত হইতে অপর প্রান্ত নদীর বাঁধের কোল পর্যন্ত সুপ্রচুর ধানের সবুজ ও হলুদ রঙের সমন্বয়ে রচিত অপূর্ব এক বর্ণ-শোভা ঝলমল করিতেছে। ধানের প্রাচুর্যে মাঠের আল পর্যন্ত কোথাও দেখা যায় না। কেবল ঝর্নার দুই পাশের বিসর্পিল বাধের উপরের তালগাছগুলি আঁকাবাকা সারিতে ঊর্ধ্বলোকে মাথা তুলিয়া দাড়াইয়া আছে। হেমন্তের পীতাভ রৌদ্রে মাঠখানা ঝলমল করিতেছে। আকাশে আজও শরতের নীলের আমেজ রহিয়াছে; এখনও ধুলা উড়িতে আরম্ভ করে নাই। দূরে আবাদী মাঠের শেষপ্রান্তে নদীর বন্যারোধী বাধের উপর ঘন সবুজ শরবন একটা সবুজ রঙের দীর্ঘ প্রাচীরের মত দাঁড়াইয়া আছে। মাথায় চুনকাম করা আলিসার মত চাপ বাধিয়া সাদা ফুলের সমৃদ্ধ সমারোহ বাতাসে অল্প অল্প দুলিতেছে।

কালীপুরের পশ্চিম দিকে সম্ভ্রান্ত ধনীদের গ্রাম কঙ্কণা, গ্রামের চারিপাশে গাছপালার উপর সাদা-লাল-হলুদ রঙের দালানগুলির মাথা দেখা যাইতেছে। একেবারে ফাঁকা প্রান্তরে স্কুল—হাসপাতাল—বাবুদের থিয়েটারের ঘর আগাগোড়া পরিষ্কার দেখা যায়। বাবুরা হালে টাকায় এক পয়সা ঈশ্বরবৃত্তির প্রচলন করিয়াছেন; টাকা দিতে গেলেও দিতে হইবে—টাকা লইতে গেলেও দিতে হইবে। ঐ টাকায় পার্বণ-উপলক্ষে ধুমধাম যাত্রা-থিয়েটার হয়। চৌধুরী নিঃশ্বাস ফেলিল—দীর্ঘনিঃশ্বাস। বৎসরে দেড় টাকা দুই টাকা করিয়া তাহাকে ঐ ঈশ্বরবৃত্তি দিতে হয়!

অমরকুণ্ডার ক্ষেতে এখনও জল রহিয়াছে, জলের মধ্যে প্রচুর মাছ জন্মায়, আল কাটিয়া দিয়া মুখে ঝুড়ি পাতিয়া হাড়ি বাউরি ডোম ও বায়েনদের মেয়েরা মাছ ধরিতেছে। ক্ষেতের মধ্যেও অনেকে ঘুরিয়া বেড়াইতেছে, তাহাদের দেখা যায় না—কেবল ধানগাছগুলি চিরিয়া একটা চলন্ত রেখা দেখা যায়, যেমন অগভীর জলের ভিতর মাছ চলিয়া গেলে জলের উপর একটা রেখা জাগিয়া ওঠে ঠিক তেমনি। অনেকে ঘাস কাটিতেছে; কাহারও গরু আছে—কেহ ঘাস বেচিয়া দুই-চার পয়সা রোজগার করে। এই এখানকার জীবন।

অমরকুণ্ডার মাঠের ঠিক মাঝামাঝি একটি প্রশস্ত আলের উপর দিয়া যাওয়া-আসার পথ। প্রশস্ত অর্থে একজন বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে চলিতে পারে, দুইজন হইলে গা ঘেঁষাঘেঁষি হয়। এই পথ ধরিয়া গ্রামের গরু বাছুর নদীর ধারে চরিতে যায়। ধান খাইবে বলিয়া তখন তাহাদের মুখে একটি করিয়া দড়ির জাল বাঁধিয়া দেওয়া হয়। প্রৌঢ় চৌধুরী একটু হতাশার হাসি হাসিল—গরুগুলির মুখের জাল খুলিবার মত গো-চরও আর রহিল না।

বন্যারোধী বাঁধের ওপারে নদীর চর ভাঙিয়া রবি ফসলের চাষের একটা ধুম পড়িয়া গিয়াছে। চাষীদের অবশ্য আর উপায়ও ছিল না। অমরকুণ্ডার মাঠের অর্ধেকের উপর জমি কঙ্কণার বিভিন্ন ভদ্রলোকের মালিকানিতে চলিয়া গিয়াছে। অনেক চাষীর আর জমি বলিতে কিছুই নাই। এই তাহারাই প্রথম নদীর ধারে গো-চর ভাঙিয়া রবি ফসলের চাষ আরম্ভ করিয়াছিল। এখন দেখাদেখি সবাই আরম্ভ করিয়াছে। কারণ চরের জমি খুবই উর্বর। সারা বর্ষাটাই নদীর জলে ডুবিয়া থাকিয়া পলিতে পলিতে মাটি যেন সোনা হইয়া থাকে। সেই সোনা, ফসলের কাণ্ড বাহিয়া শীষ ভরিয়া দানা হইয়া ফলিয়া উঠে। গম যব সরিষা প্রচুর হয়; সকলের চেয়ে ভাল হয় ছোলা। ওই চরটার নামই ‘ছোলাকুড়ি’ বা ছোলাকুণ্ড। এখন অবশ্য আলুর চাষেরই রেওয়াজ বেশী। আলু প্রচুর হয় এবং খুব মোটাও হয়। নদীর ওপারের জংশনে আলুর বাজারও ভাল। কলিকাতা হইতে মহাজনেরা এখানে আলু কিনিতে আসে। এ কয় মাসের জন্য তাহাদের এক একজন লোক আড়ত খুলিয়া বসিয়াই আছে—আলু লইয়া গেলেই নগদ টাকা! বড় চাষী যাহারা তাহারা বিশ-পঞ্চাশ টাকা দাদনও পায়।

সকলের টানে চৌধুরীকেও গো-চর ভাঙিয়া আলু গম ছোলার চাষ করিতে হইতেছে। চারিপাশে ফসলের মধ্যে তাহার গো-চরে গরু চরানো চলে না; অবুঝ অবোলা পশু কখন যে ছুটিয়া গিয়া অন্য লোকের ফসলের উপর পড়িবে—সে কি বলা যায়! তাহার উপর অমর-কুণ্ডার মাঠে উৎকৃষ্ট দোয়েম জমিতে রবি ফসলের চাষও অসম্ভব হইয়া উঠিয়াছে। কঙ্কণার ভদ্রলোকের জমি সব পড়িয়া থাকে, তাহারা রবি ফসলের হাঙ্গামা পোহাইতে চায় না, আর খইল-সারেও টাকা খরচ তাহারা করিবে না। কাজেই তাহাদের জমি ধান কাটার পর পড়িয়াই থাকে। অধিকাংশ জমি চাষ হইলে—সেখানে কতকটা জমি পতিত রাখিয়া গরু চরানো যেমন অসম্ভব, আবার অধিকাংশ জমি পতিত থাকিলে সেখানে কতকটা জমি চাষ করাও তেমনি অসম্ভব। তবু ত গরু-ছাগলকে আগলাইয়া পারা যায়, কিন্তু মানুষ ও বানরকে পারা যায় না। তাহারা খাইয়াই শেষ করিয়া দিবে। কালীপুরের দোয়েম—সোনার দোয়েম! ...

এদিকে যুদ্ধ বাধিয়া সব যেন উল্টাইয়া গেল। (প্রথম মহাযুদ্ধ) কি কাল যুদ্ধই না ইংরেজরা করিল জার্মানদের সঙ্গে? সমস্ত একেবারে লণ্ডভণ্ড করিয়া দিল। দুঃখ দুর্দশা সব কালেই আছে, কিন্তু যুদ্ধের পর এই কালটির মত দুর্দশা আর কখনও হয় নাই। কাপড়ের জোড়া ছ-টাকা সাত-টাকা, ওষুধ অগ্নিমূল্য—মায় পেরেক ও সূচের দাম চার গুণ হইয়া গিয়াছে। ধানচালের দরও প্রায় দ্বিগুণ বাড়িয়াছে; কিন্তু কাপড়-চোপড়ের দর বাড়িয়াছে তিনগুণ। জমির দামও ডবল হইয়া গিয়াছে। দর পাইয়া হতভাগা মূর্খের দল জমিগুলা কঙ্কণার বাবুদের পেটে ভরিয়া দিল। ফলে এই অবস্থা, আজ আপসোস করিলে কি হইবে!

মরুক, হতভাগারা মরুক! আঃ—সেই তেরোশো একুশ সালে যুদ্ধ আরম্ভ হইয়াছিল, যুদ্ধ শেষ হইয়া গিয়াছে পঁচিশ সালে, আজ তেরোশো ঊনত্রিশ সাল—আজও বাজারের আগুন নিবিল না। কঙ্কণার বাবুরা ধুলামুঠা সোনার দরে বেচিয়া কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা আনিতেছে, আর কালীপুরের জমি কিনিতেছে মোটা দামে। ধুলা বৈকি! মাটি কাটিয়া কয়লা ওঠে—সেই কয়লা বেচিয়া তো তাহাদের পয়সা! যে-কয়লায় মণ ছিল তিন আনা, চৌদ্দ পয়সা, আজ সেই কয়লার দর কিনা চোদ্দ আনা। গোদের ওপর বিষফোড়ার মত এই বাজারে আবার প্রেসিডেন্ট পঞ্চায়েতি ঘুচাইয়া ট্যাক্স বাড়াইয়া বসাইল ইউনিয়ন বোর্ড! বাবুরা সব বোর্ডের মেম্বর সাজিয়া দণ্ডমুণ্ডের মালিক হইয়া বসিল—আর, দাও তোমরা এখন ট্যাক্স! ট্যাক্স আদায়ের ধুম কি! চৌকিদার দফাদার সঙ্গে লইয়া বাধানো খাতা বগলে বোর্ডের কেরানী দুর্গই মিশ্র যেন একটা লাটসাহেব।

সহসা চৌধুরী চকিত হইয়া থমকাইয়া দাড়াইল। কে কোথায় তারস্বরে চীৎকার করিয়া কাঁদিতেছে না? লাঠিটি বগলে পুরিয়া রৌদ্রনিবারণের ভঙ্গিতে ভ্রূর উপরে হাতের আড়াল দিয়া এপাশ ওপাশ দেখিয়া চৌধুরী পিছন ফিরিয়া দাঁড়াইল। হ্যাঁ, পিছনেই বটে। ওই—গ্রাম হইতে কয়জন লোক আসিতেছে, উহাদের ভিতরেই কেহ কাঁদিতেছে সে স্ত্রীলোক, তাহাকে দেখা যাইতেছে না, সামনের পুরুষটির আড়ালে সে ঢাকা পড়িয়াছে। আ-হা-হা! পুরুষটা! পুরুষটা কেউটে সাপের মত ফিরিয়া মেয়েটার চুলের মুঠি ধরিয়া দুম-দাম করিয়া প্রহার আরম্ভ করিয়া দিল। চৌধুরী এখান হইতেই চীৎকার করিয়া উঠে—এই, এই; আ-হা-হা! ওই!

তাহারা শুনিতে পাইল কি না কে জানে, কিন্তু স্ত্রীলোকটি চীৎকার বন্ধ করিল; পুরুষটিও তাহাকে ছাড়িয়া দিল। চৌধুরী কিছুক্ষণ সেইদিকে চাহিয়া দাড়াইয়া থাকিয়া—আবার রওনা হইল। ছোটলোক কি সাধে বলে! লজ্জা-সরম, রীত-করণ উহাদের কখনও হইবে না। জানে না—স্ত্রীলোকের চুলে হাত দিলে শক্তি ক্ষয় হয়। রাবণ যে রাবণ যাহার দশটা মুণ্ড, কুড়িটা হাত, এক লক্ষ ছেলে, একশ লক্ষ নাতি, সে যে সে, সীতার চুলের মুঠি ধরিয়া সে একেবারে নির্বংশ হইয়া গেল।

বাধের কাছাকাছি চৌধুরী পৌছিয়াছে—এমন সময় পিছনে পদ-শব্দ শুনিয়া চৌধুরী ফিরিয়া চাহিল। দেখিল, পাতু বায়েন হন্ হন্ করিয়া বুনো শূকরের মত গোভরে চলিয়া আসিতেছে। পিছনে কিছু দূরে ধুপ, ধুপ, করিয়া ছুটিতে ছুটিতে আসিতেছে একটি স্ত্রীলোক। বোধ হয় পাতুর স্ত্রী। সে এখনও গুন্ গুন্ করিয়া কাঁদিতেছে—আর মধ্যে মধ্যে চোখ মুছিতেছে। চৌধুরী একটু সন্ত্রস্ত হইয়া উঠিল। পাতু যে-গতিতে আসিতেছে, তাহাতে তাহাকে পথ ছাড়িয়া না দিলে উপায় কি। উহার আগে আগে চলিবার শক্তি চৌধুরীর নাই। পাতু কিন্তু নিজেই পথ করিয়া লইল, সে পাশের জমিতে নামিয়া পড়িয়া ধানের মধ্য দিয়া যাইবার জন্য উদ্যত হইল। সহসা সে থমকিয়া দাড়াইয়া চৌধুরীকে একটা প্রণাম করিয়া বলিল—দ্যাখেন চৌধুরী মশায় দ্যাখেন।

চৌধুরী পাতুর মুখের দিকে চাহিয়া শিহরিয়া উঠিল। কপালে একটা সদ্য আঘাতচিহ্ন হইতে রক্ত ঝরিয়া মুখখানাকে রক্তাক্ত করিয়া দিয়াছে। সঙ্গে সঙ্গে পাতুর স্ত্রী ডাক ছাড়িয়া কাদিয়া উঠিল।

—ওগো, বাবুমশায় গো! খুন করলে গো!

—এ্যা-ও! পাতু গর্জন করিয়া উঠিল। ... আবার চেঁচাতে লাগিলি মাগী? সঙ্গে সঙ্গে পাতুর স্ত্রীর কণ্ঠস্বর নামিয়া গেল; সে গুন্ গুন্ করিয়া কাঁদিতে আরম্ভ করিল—গরীবের কি দশা করেছে দেখেন গো; আপনারা বিচার করেন গো।

পাতু পিছন ফিরিয়া দাড়াইয়া পিঠ দেখাইয়া বলিল—দেখেন পিঠ, দেখেন।

এবার চৌধুরী দেখিল পাতুর পিঠে লম্বা দড়ির মত নির্মম প্রহার চিহ্ন রক্তমুখী হইয়া ফুটিয়া উঠিয়াছে। দাগ একটা দুইটা নয়—দাগে দাগে পিঠটা একেবারে ক্ষতবিক্ষত। চৌধুরী অকপট মমতা ও সহানুভূতিতে বিচলিত হইয়া উঠিল, আবেগ-বিগলিত স্বরেই বলিল—আ-হা-হা কে এমন কল্লে রে পাতু?

—আজ্ঞে, ওই ছিরু পাল। রাগে গন্ গন্ করিতে করিতে প্রশ্ন শেষ হইবার পূর্বেই পাতু উত্তর দিল—কথা নাই, বার্তা নাই, এসেই একগাছা দড়ির বাড়িতে দেখেন কি করে দিলে দেখেন! আবার সে পিছন ফিরিয়া ক্ষতবিক্ষত পিঠখানা চৌধুরীর চোখের সামনে ধরিল। তারপর আবার ঘুরিয়া দাড়াইয়া বলিল—দড়িখানা চেপে ধরলাম তো একগাছা বাখারীর ঘায়ে কপালটাকে একেবারে দিল ফাটিয়ে।

ছিরু পাল—শ্রীহরি ঘোষ? অবিশ্বাস করিবার কিছু নাই, উঃ! নির্মমভাবে প্রহার করিয়াছে। চৌধুরীর চোখে অকস্মাৎ জল আসিয়া গেল। এক এক সময় অপরের দুঃখ-দুর্দশায় মানুষ এমন বিচলিত হয় যে, তখন নিজের সকল সুখ-দুঃখকে অতিক্রম করিয়া নির্যাতিতের দুঃখ যেন আপন দেহমন দিয়া প্রত্যক্ষভাবে অনুভব করে। চৌধুরী এমনই একটি অবস্থায় উপনীত হইয়া সজলচক্ষে পাতুর দিকে চাহিয়া রহিল, তাহার দন্তহীন মুখের শিথিল ঠোঁট অত্যন্ত বিশ্রী ভঙ্গিতে থর থর করিয়া কাঁপিতে লাগিল।

পাতু বলিল—মোড়লদের ফি-জনার কাছে গেলাম। তা কেউ রা কাড়লে না মশায়। শক্তর সব দুয়োর মুক্ত।

পাতুর বউ অনুচ্চ কান্নার ফাঁকে ফাঁকে বলিতেছিল—সর্বনাশী কালামুখীর লেগে গো—পাতু একটা ধমক করিয়া বলিল—অ্যাই—অ্যাই, আবার ঘ্যান ঘ্যান করে!

চৌধুরী একটু আত্মসম্বরণ করিয়া বলিল—কেন অমন করে মারলে? কি এমন দোষ করেছ তুমি যে—

অভিযোগ করিয়া পাতু কহিল—সেদিন চণ্ডীমণ্ডপের মজলিসে বলতে গেলাম—তা তো আপনি শুনলেন না, চলে গেলেন। গোটা গেরামের লোকের ‘আঙোটজুতি’ আমাকে সারা বছর যোগাতে হয়; অথচ আমি কিছুই পাই না। তা কর্মকার যখন রব তুললে, তখন আমিও বলেছিলাম যে, আমি আর ‘আঙোটজুতি’ যোগাতে পারব। কাল সানঝেতে পালের মুনিষ আঙোটজুতি চাইতে এসেছিল—আমি বলেছিলাম—পয়সা আন গিয়ে। তা আমার বলা বটে! আজ সকালে উঠে এসেই কথা নাই বার্তা নাই—আথালি-পাথালি দড়ি দিয়ে মার!

চৌধুরী চুপ করিয়া রহিল। পাতুর বউ বার বার ঘাড় নাড়িয়া মৃদু বিলাপের সুরে সেই বলিয়াই চলিল—না গো বাবুমশায়—

পাতু তাহার কথা ঢাকিয়া দিয়া বলিল—আমার পেট চলে কি ক’রে—সেটা আপনারা বিচার করবেন না, আর এমনি করে মারবেন?

চৌধুরী কাশিয়া গলা পরিষ্কার করিয়া লইয়া বলিল—শ্রীহরি তোমাকে এমন করে মেরেছে মহা অন্যায় করেছে, অপরাধ করেছে, হাজারবার, লক্ষবার, সে কথা সত্যি। কিন্তু ‘আঙোটজুতি’র কথাটা তুমি জান না বাবা পাতু! গায়ের ভাগাড় তোমরা যে দখল কর—তার জন্যেই তোমাদিগে গাঁয়ের ‘আঙোটজুতি’ যোগাতে হয়। এই নিয়ম। ভাগাড়ে মড়ি পড়লে তোমরা চামড়া নাও, হাড় বিক্রি কর—তারই দরুণ তোমরা ওই ‘আঙোটজুতি, মাংস কাটিয়া লইয়া যাওয়ার কথাটা আর চৌধুরী ঘুণাবশে উচ্চারণ করিতে পারিল না।

পাতু অবাক হইয়া গেল; সে বলিল—ভাগাড়ের দরুণ!

—হ্যাঁ! তোমাদের প্রবীণেরা তো কেউ নাই, তারা সব জানত।

—শুধু তাই লয়, মশায়, ওই পোড়ামুখী কলঙ্কিনী গো। এই ফাঁকে পাতুর বউ আবার সুর তুলিল।

পাতু এবার সঙ্গে সঙ্গে বলিল—আজ্ঞে হ্যাঁ। শুধু তো ‘আঙোটজুতি’ও লয়; আপনারা ভদ্দরনোকরা যদি আমাদের ঘরের মেয়েদের পানে তাকান তবে আমরা যাই কোথায় বলুন?

প্রৌঢ় প্রবীণ ধর্মপরায়ণ চৌধুরী বলিয়া উঠিল—রাম! রাম! রাম! রাধাকৃষ্ণ! রাধাকৃষ্ণ! পাতু বলিল—আজ্ঞে, রাম রাম লয়, চৌধুরী মশায়। আমার ভগ্নী দূর্গা একটু বজ্জাত বটে; বিয়ে দেলাম তো পালিয়ে এল শ্বশুরঘর থেকে। সেই তারই সঙ্গে মশায় ছিরু পাল ফষ্টিনষ্টি করবে। যখন তখন পাড়ায় এসে ছুঁতোনাতা নিয়ে বাড়ীতে ঢুকে বসবে। আমার মা হারামজাদীকে তো জানেন? চিরকাল একভাবে গেল। ছিরু পালকে বসতে মোড়া দেবে—তার সঙ্গে ফুস-ফাস করবে। ঘরে মশায়, আমার বউ রয়েছে। তাকে, মাকে আর দূর্গাকে আমি ঘা কতক করে দিয়েছিলাম। মোড়লকেও বলেছিলাম, ভাল করেই বলেছিলাম চৌধুরী মশাই,—আমাদের জাত-জ্ঞেতে নিন্দে করে—আর আপনি আসবেন না, মশায়। এ আক্লোশটাও আছে মশাই।

লাঠি ও ছাতায় চৌধুরীর দুই হাত ছিল আবদ্ধ, কানে আঙুল দিবার উপায় ছিল না; সে ঘৃণাভরে থুতু ফেলিয়া মুখ ফিরাইয়া বলিল—রাধাকৃষ্ণ হে! থাক পাতু, থাক বাবা—সকালবেলা ওসব কথা আমাকে আর শুনিও না। এতে আর আমার কি হাত আছে বল! রাধাকৃষ্ণ!

পাতু কিন্তু ইহাতে তুষ্ট হইল না। সে কোন কথা না বলিয়া চৌধুরীকে পাশ কাটাইয়া হন্ হন্ করিয়া অগ্রসর হইল। তাহার পিছন পিছন তাঁহার স্ত্রী আবার ছুটিতে আরম্ভ করিল। স্বামীর নীরবতার সুযোগ পাইয়া সে আবার কান্নার সুরে সুর করিল—হারামজাদী আবার ঢং ক’রে ভাইয়ের দুঃখে ঘটা ক’রে কানতে বসেছে গো! ওগো আমি কি করব গো!

পাতু বিদ্যুৎ-গতিতে ফিরিল; সঙ্গে সঙ্গে বউটি আতঙ্কে অস্ফুট চীৎকার করিয়া উঠিল—অ্যা।

পাতু মুখ খিঁচাইয়া বলিল—চেল্লাস না বাপু। তোকে কিছু বলি নাই...তু থাম। ধাক্কা দিয়া স্ত্রীকে সরাইয়া দিয়া সে ফিরিয়া পশ্চাদগামী চৌধুরীর সম্মুখে আসিয়া বলিল—আচ্ছা চৌধুরীমশায়, আলিপুরের রহমৎ শাঁখ যে কঙ্কণার রমন্দ চাটুজ্জের সঙ্গে ভাগাড় দখল করেছে, তার কি করছেন?

আশ্চর্য হইয়া চৌধুরী বলিলেন—সে কি?

—আজ্ঞে হ্যাঁ মশায়। ভাগাড়ের চামড়া তাদিগে ছাড়া আর কাউকে বেচতে পাব না আমরা। তারা বলে, ভাগাড় জমিদার আমাদিগে বন্দোবস্ত দিয়েছে। ছাল ছাড়ানোর মজুরী আর নুনের দাম—তার ওপর দু-চার আনা ছাড়া আর কিছু দেয় না। অথচ চামড়ার দাম এখন আগুন! তাহলে?

চৌধুরী পাতুর মুখের দিকে চাহিয়া প্রশ্ন করিল—সত্যি কথা পাতু?

—আজ্ঞে হ্যাঁ। মিছে যদি হয় পঞ্চাশ জুতো খাব, নাকে খত দোব।

তা হলে, চৌধুরী ঘাড় নাড়িয়া বলিল—তা হলে হাজার বার তুমি বলতে পার ও কথা, গাঁয়ের লোক পয়সা দিতে বাধ্য। কিন্তু জমিদারের গোমস্তা নন্দীকে কথাটা জিজ্ঞাসা করেছ?

পাতু বলিল—গোমস্তা নন্দী কেন, জমিদারের কাছেই যাব আমি। ডাক্তার ঘোষ মশায় বললে, থানায় যা। তা থানা কেন—আগে জমিদারের কাছেই যাই, দুটো বিচারই হয়ে যাক! দেখি, জমিদার কি বলে!

সে আবার ফিরিল এবং সোজা আল-পথটা ছাড়িয়া দক্ষিণ দিকের একটা আল ধরিয়া কঙ্কণার দিকে মুখ করিল। বৃদ্ধ চৌধুরী ঠুক ঠুক্ করিয়া নদীর চরের দিকে অগ্রসর হইল। নদীর ওপারের জংশনের কলগুলার চিমনি এইবার স্পষ্ট হইয়া উঠিয়াছে, আর চৌধুরী চরের উপর আসিয়া পড়িয়াছে। কিন্তু হতভম্ব হইয়া গিয়াছে বৃদ্ধ চৌধুরী; সব করিয়া সব হইল—শেষে চামড়া বেচিয়া রামেন্দ্র চাটুজ্জে বড়লোক হইবে! ছিঃ ছিঃ, ব্রাহ্মণের ছেলে!


পাঁচ



গল্পে শোনা যায়, যমজ ভাইয়ের ক্ষেত্রে যমদূতেরা রামের বদলে শ্যামকে লইয়া যায়, শ্যামের বদলে আসিয়া ধরে রামকে। তাদের অনুকরণে হইলেও ক্ষেত্র বিস্তৃততর করিয়া লইয়া রাম অপরাধ করিলে মানুষ অতিবুদ্ধিবশতঃ প্রায়ই শ্যামকে লইয়া টানাটানি করে। পুলিশও মানুষ, সুতরাং এক্ষেত্রেও তাহার ব্যতিক্রম হইল না। পরদিনই একটা পুলিশ তদন্ত হইয়া গেল। অনিরুদ্ধ আক্রোশের কারণ দেখাইয়া ছিরু পালকে সন্দেহ করিলেও পুলিশ আসিয়া মাঠ-আগলদার সতীশ বাউড়ীর বাড়ী খানা-তল্লাস করিয়া সব তছনছ করিয়া তাহাকে টানিয়া আনিল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোকটাকে জেরায় নাজেহাল করিয়া অবশেষে ছাড়িয়া দিল। অবশ্য, অনিরুদ্ধের সন্দেহ অনুযায়ী একবার ছিরু পালের খামার বাড়ীটাও ঘুরিয়া দেখিল, কিন্তু সেখানে দুই বিঘা জমির আধ-পাকা ধানের একগাছি খড়ও কোথাও মিলিল না।

পুলিশ আসিয়া গ্রামের চণ্ডীমণ্ডপেই বসিয়াছিল। গ্রামের মণ্ডল মাতব্বরেরাও আসিয়া চন্দ্রমণ্ডলের নক্ষত্র সভাসদের মত চারিপাশে জমকাইয়া বসিয়া উত্তেজিতভাবে ফিস ফিস করিয়া পরস্পরের মধ্যে কথা বলিতেছিল। ছিরু পাল বসিয়াছিল—পুলিশের অতি নিকটেই এবং অত্যন্ত গম্ভীরভাবে। তাহার আকর্ণবিস্তৃত মুখগহ্বরের পাশে চোয়ালের হাড় দুইটা কঠিন ভঙ্গিতে উঁচু হইয়া উঠিয়াছিল। অনিরুদ্ধ সম্মুখেই উবু হইয়া বসিয়া মাটির দিকে চাহিয়া কত কি ভাবিতেছিল। তদন্ত শেষে পুলিশ উঠিল। সঙ্গে সঙ্গে অনিরুদ্ধও উঠিল। সে চাহিয়া না দেখিয়াও স্পষ্ট অনুভব করিতেছিল যে, সমস্ত গ্রামের লোক কঠিন প্রতিহিংসা-তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাহার দিকে চাহিয়া আছে। প্রত্যক্ষ যন্ত্রণা সহ্য করা যায়—নিরুপায় হইয়া মানুষকে সহ্যও করিতে হয়—কিন্তু যন্ত্রণারও ভাবী ইঙ্গিত বা নিষ্ঠুর কল্পনা মানুষের পক্ষে অসহ্য। সে পুলিশেরই পিছন পিছন উঠিয়া আসিল।

পুলিশ চলিয়া যাইতেই চণ্ডীমণ্ডপে প্রচণ্ড কলরব উঠিল। সমবেত জনতার প্রত্যেকে আপন আপন মন্তব্য ঘোষণা আরম্ভ করিল; কেউ কাহারও কথা শোনে না দেখিয়া প্রত্যেকেই আপন আপন কণ্ঠস্বরকে যথাসম্ভব উচ্চগ্রামে লইয়া গেল। সদ্‌গোপ সম্প্রদায়ের কেহই অবশ্য শ্রীহরি ঘোষকে সুনজরে দেখে না; কিন্তু অনিরুদ্ধ কর্মকার যখন পুলিশে খবর দিয়া তাহার বাড়ী খানা-তল্লাস করাইল, বাড়ীতে পুলিশ ঢুকাইয়া দিল, তখন অপমানটাকে তাহারা সম্প্রদায়গত করিয়া লইয়া বেশ উত্তেজিত হইয়া উঠিয়াছে। বিশেষ করিয়া সেদিন অনিরুদ্ধের সমাজকে উপেক্ষা করার ঔদ্ধত্যজনিত অপরাধের ভিত্তির উপর আজিকার ঘটনাটা ঘটিবার ফলে বিষয়টা গুরুত্বে রীতিমত বড় হইয়া উঠিয়াছে।

দেবনাথ ঘোষের গলাটা যেমন তীক্ষ্ণ তেমনি উচ্চ, এ গ্রামে সকল কলরবের ঊর্ধ্বে তাহার কণ্ঠস্বর শোনা যায়। সে দুই অর্থেই। চাষীর ঘরে দেবনাথ যেন ব্যতিক্রম! তীক্ষ্ণধী বুদ্ধিমান যুবক দেবনাথ! তাহার ছাত্র-জীবনে সে কৃতী ছাত্র ছিল। কিন্তু আর্থিক অসাচ্ছল্য এবং সাংসারিক বিপর্যয় হেতু ম্যাট্রিক ক্লাস হইতে তাহাকে পড়া ছাড়িতে হইয়াছে। সে এখন এই গ্রামেরই পাঠশালার পণ্ডিত। গ্রাম্যজীবনের ব্যবস্থা শৃঙ্খলার বহু তথ্য সে ব্যগ্র কৌতূহলে অনুসন্ধান করিয়া জানিয়াছে। সে বলিতেছিল—কামার, ছুতোর, নাপিত কাজ করব না বললেই চলবে না। কাজ করতে তারা বাধ্য।

শ্রীহরি কেবল তেমনি গম্ভীরভাবে দাঁতে দাঁত চাপিয়া বসিয়াছিল, এতখানি যে হইবে—সে তাহা ভাবিতে পারে নাই। ওদিকে শ্রীহরির খামারবাড়ীতে শুকাইতে দেওয়া ধান পায়ে পায়ে ওলোট-পালোট করিয়া দিতে দিতে ছিরুর মা অশ্লীল ভাষায় গালাগালি ও নিষ্ঠুরতম আক্রোশে নির্মম অভিসম্পাত দিতেছিল অনিরুদ্ধকে।

অন্যদিকে অনিরুদ্ধের বাড়ীতে পদ্ম উৎকণ্ঠিত দৃষ্টিতে পথের দিকে চাহিয়া বাহির দরজাটিতে দাড়াইয়া ছিল। থানা-পুলিশকে তাহার বড় ভয়। ছিরুর মায়ের অশ্লীল গালিগালাজ এবং নিষ্ঠুর অভিসম্পাতগুলি এখান হইতে স্পষ্ট শোনা যাইতেছিল। ছিরু পালের বাড়ী এবং তাহাদের বাড়ীর মধ্যে ব্যবধান মাত্র একটা পুকুরের এপার ওপার। শব্দ তেরছা ভাসিয়া আসে। পথটা তিনপাড় বেড় দিয়া খানিকটা ঘুর পথ। গালাগালি শুনিয়া পদ্মের মুখখানা থমথমে হইয়া উঠিয়াছিল। পদ্ম দুরন্ত মুখরা মেয়ে, গালিগালাজ অভিসম্পাত সে-ও অনেক জানে। সে কাহারও স্পষ্ট নামোল্লেখ না করিয়া তাহাদের অবস্থার সহিত মিলাইয়া এমনভাবে অভিসম্পাত দিতে পারে যে শব্দভেদী বাণের মত উদ্দিষ্ট ব্যক্তিটির একেবারে বুকে গিয়া আমূল বিধিয়া যায়। কিন্তু আজ দারুণ উৎকণ্ঠায় কে যেন গলা চাপিয়া ধরিয়াছে। এই সময় অনিরুদ্ধ আসিয়া বাড়ী ঢুকিল। অনিরুদ্ধকে দেখিয়া গভীর আশ্বাসে সে স্বস্তির একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিল। পরমুহূর্তেই চোখমুখ দীপ্ত করিয়া বলিল—শুন্‌ছ তো? আমিও এইবার গাল দোব কিন্তু!

অনিরুদ্ধের অবস্থাটা তখন ঠিক শীতের বরফের মত অনুতপ্ত, স্থির ও কঠিন। সে রুক্ষস্বরে বলিল—না, গাল দিতে হবে না—ঘরে চল।

পদ্ম ঘরের দিকে আসিতে আসিতে বলিল—না। শুধু শুধু ঘরে যাব? কানের মাথা খেয়েছ? গালাগালগুলো শুনতে পাচ্ছ না?

—তবে যা, গাল দিগে; গলা ফাটিয়ে চীৎকার কর গিয়ে! মর গিয়ে।

পদ্ম গজ গজ করিতে করিতে গিয়া ভাঁড়ার ঘর হইতে তেল বাহির করিয়া আনিয়া বলিল—কি খোয়ারটা আমার করছে শুনতে পাচ্ছ না তুমি?

পদ্ম ও অনিরুদ্ধ নিঃসন্তান—তাই ছিরুর মা অনিরুদ্ধের নিষ্ঠুরতম মৃত্যু কামনা করিয়া পদ্মের জন্য কদর্যতম অশ্লীলতম ভবিষ্যৎ উপজীবিকার নির্দেশ দিয়া অভিসম্পাত দিতেছে। তেলের বাটি পাশে রাখিয়া সে স্বামীর একখানা হাত টানিয়া লইয়া তাহাকে তেল মাখাইতে বসিল। কর্কশ ও কঠিন হাত; আগুনের আঁচে রোমগুলি পুড়িয়া কামানো দাড়ির মত করকরে হইয়া আছে। শুধু হাত নয়, হাত-পা-বুক—মোট কথা সম্মুখভাগের প্রায় অনাবৃত অংশটাই এমনি দগ্ধরোম। তেল দিতে দিতে পদ্ম বলিল—বাবা, বাবা, হাত-পা নয় যেন উখো!

অনিরুদ্ধ সে কথায় কান না দিয়া বলিল—আমার গুপ্তিটা বার করে বেশ করে মেজে রাখবি তো।

পদ্ম স্বামীর মুখের দিকে চাহিয়া বলিল—আমারও দা আছে, কাল মেজে ঘষে শান দিয়ে রেখেছি। নিজের গলায় মেরে একদিন দু-খানা হয়ে পড়ে থাকব কিন্তু।

—কেন?

—তুমি খুনখারাপী করে ফাঁসি যাবে—আর আমি হাড়ির ললাট ডোমের দুর্গতি ভোগ করে বেঁচে থাকব?

অনিরুদ্ধ কথার কোন উত্তর দিল না, কেবল বলিল—হু-উ! —অর্থাৎ পদ্মের হাড়ির ললাট ডোমের দুর্গতির সম্ভাবনার কথাটা সে ভাবিয়া দেখে নাই, নতুবা ছিরুকে জখম করিয়া জেল খাটিতে বা হত্যা করিয়া ফাঁসি যাইতে বর্তমানে তাহার বিশেষ আপত্তি ছিল না।

পদ্ম বলিল—বারণ করলাম থানা পুলিশ কর না। কথা কানেই তুললে না। কিন্তু হল কি? পুলিশ কি করলে? গাঁয়ের সঙ্গে কেবল ঝগড়া-বিবাদ বেড়ে গেল। আর আমি গাল দোব বললেই একেবারে বাঘের মত হাঁকিয়ে উঠছ—‘না, দিতে পাবি না।’

রুদ্ধক্রোধ অনিরুদ্ধ বিরক্তিতে অসহিষ্ণু হইয়া উঠিল; কিন্তু কোন কঠিন কথা বলিতে তাহার সাহসও হইল না, প্রবৃত্তিও হইল না। বন্ধ্যা পদ্মকে লইয়া তাহাকে বড় সন্তর্পণে চলিতে হয়; সামান্য কারণে নিতান্ত বালিকার মত সে অভিমান করিয়া মাথা খুঁড়িয়া, কাঁদিয়া কাটিয়া অনর্থ বাধাইয়া তোলে; আবার কখনও প্রবীণা প্রৌঢ়া যেমন দুরন্ত ছেলের আবদার-অত্যাচার সহ্য করে তেমনি করিয়া হাসিমুখে অনিরুদ্ধের অত্যাচার সহ্য করে—অনিরুদ্ধের হাতে মার খাইয়াও তখন সে খিল্‌ খিল্‌ করিয়া হাসে। কখন কোন্ মুখে পদ্ম চলে অনিরুদ্ধ অনেকটা বুঝিতে পারে। আজিকার কথার মধ্যে তাহার আবদারের সুর ফুটিতে আরম্ভ করিয়াছে; সেইটুকু বুঝিয়াই সে দারুণ বিরক্তি সত্ত্বেও আত্মসংবরণ করিয়া রহিল। কোন কথা না বলিয়াই পদ্মর হাত হইতে সে আপনার পা-খানা টানিয়া লইয়া বলিল—কই, গামছা কই?

পদ্ম কিন্তু এইটুকুতেই অভিমানে ফোঁস করিয়া উঠিল, অনিরুদ্ধ ভুল করে নাই। পদ্ম আজ ছোট মেয়ের মতই আবদেরে হইয়া উঠিয়াছে। মুখে সে কিছু বলিল না বটে, কিন্তু বিদ্যুতের মত চমকাইয়া মুখ তুলিয়া জ্বলন্ত দৃষ্টিতে স্বামীর দিকে চাহিল,—পরমুহূর্তেই তেলের বাটিটা তুলিয়া লইয়া উঠিয়া চলিয়া গেল।

বিরক্তিতে ভ্রূকুটি করিয়া অনিরুদ্ধ বলিল—বেলার পানে তাকিয়ে দেখেছিস? ছায়া কোথা গিয়েছে দেখ। এদিকে তিনটে বাজে।

গম্ভীর মুখে চকিত দৃষ্টিতে চাহিয়া বাড়ীর উঠানের ছায়া লক্ষ্য করিয়া পদ্ম গামছাখানা আনিয়া অনিরুদ্ধের হাতে দিয়া বলিল—বস, আমি জল এনে দিই, বাড়ীতেই চান করে নাও। গামছাখানা কাঁধে ফেলিয়া অনিরুদ্ধ বলিল—তাতে দেরি হবে, পদ্ম। আমি এই যাব আর আসব। পানকৌড়ির মত ভুক করে ডুবব আর উঠব। ভাত তুই বেড়ে রাখ। বলিতে বলিতেই সে দ্রুতপদে বাহির হইয়া গেল।

পদ্ম ভাত বাড়িতে গিয়া রান্নাঘরের শিকলে হাত দিয়া থমকাইয়া দাঁড়াইল। তরকারি সব ঠাণ্ডা হিম হইয়া গিয়াছে! সেসব বাবুর মুখে রুচিবে কি? যত আয় তত ব্যয়। কামার, কুমোর, নাপিত, স্বর্ণকার—ইহাদের অবশ্য চিরকাল বদনাম, কিন্তু উহার মত খরচে পদ্ম আর কাহাকেও দেখে না। কামারশালা করিয়া খরচের বাতিক তাহার আরো বাড়িয়া গিয়াছে। ওপারে শহরে এক টাকা সেরের ইলিশমাছ এ গ্রামে কে খাইয়াছে? এখন গরম একটা কিছু না করিয়া দিলে নবাব কেবল ভাতে-হাত করিয়াই উঠিয়া পড়িবে! খিড়কির ডোবাটার পাড়ে পদ্ম প্রথম আশ্বিনেই কয়েক ঝাড় পেঁয়াজ লাগাইয়াছিল, সেগুলো বেশ ঝাড়ে-গোছে বড় হইয়া উঠিয়াছে। পেঁয়াজের শাক আনিয়া ভাজিয়া দিলে কেমন হয়? পদ্ম খিড়কির দিকে অগ্রসর হইয়াই লক্ষ্য করিল—দুয়ারের পাশে কে যেন দাঁড়াইয়া আছে। সাদা কাপড়ের খানিকটা মধ্যে মধ্যে দেখা যাইতেছে। সে শিহরিয়া উঠিল। তাহার মনে পড়িয়া গেল—গত কালের ছিরু পালের সেই বীভৎস হাসি! কয়েক পা পিছাইয়া আসিয়া সে প্রশ্ন করিল—কে? কে দাঁড়িয়ে গো?

সাড়া পাইয়া মানুষটি চকিত গতিতে ঘরে প্রবেশ করিল। পদ্ম আশ্বস্ত হইল—পুরুষ নয়, স্ত্রীলোক। পরমুহূর্তেই সে স্তম্ভিত হইয়া গেল—এ যে ছিরু পালের বউ! বয়স ত্রিশ-বত্রিশের বেশী হইবে না, এককালে সুন্দরী ছিল সে, কিন্তু এখন অকালবার্ধক্যে জীর্ণ এবং শীর্ণ। চোখে তাহার যত ক্লান্তি তত সকরুণ মিনতি। ছিরু পালের বউ বিনা ভূমিকায় দু’টি হাত জোড় করিয়া সামনে দাঁড়াইয়া বলিল—ভাই, কামার বউ!

পদ্ম কোন কথা বলিতে পারিল না, ছিরু পালের বউকে সে ভাল করিয়াই জানে, এমন ভাল মেয়ে আর হয় না। কত বড় ভাল ঘরের মেয়ে সে তাও পদ্ম জানে। তাহার কতখানি দুঃখ তাও সে চোখে দেখিয়াছে—কানে শুনিয়াছে, ছিরু পালের প্রহার সে দূর হইতে স্বচক্ষে দেখিয়াছে; তদুপরি ছিরুর মায়ের গালিগালাজ সে নিত্যই শুনিতেছে।

ছিরুর বউ তাহার সম্মুখে আসিয়া ঈষৎ নত হইয়া বলিল—তোমার পায়ে ধরতে এসেছি ভাই!

দুই পা পিছাইয়া গিয়া পদ্ম বলিল—না না না! সে কি!

—আমার ছেলে দুটিকে তোমরা গাল দিও না, ভাই; যে করেছে তাকে গাল দিও—কি বলব আমি তাতে!

ছিরু পালের সাতটি ছেলের মধ্যে দুইটি মাত্র অবশিষ্ট; তাও পৈতৃক গুপ্তব্যাধির বিষে জর্জরিত—একটি রুগ্ন, অপরটি প্রায় পঙ্গু। সন্তানবতী নারীদের উপর বন্ধ্যা পদ্মের একটা অবচেতনগত হিংসা আছে। এই মুহূর্তে কিন্তু সে হিংসাও তাহার স্তব্ধ হইয়া গেল। সে আপনা-আপনি কেবলি একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিল।

ছিরু পালের স্ত্রী বলিল—তোমাদের অনেক ক্ষতি করেছে। চাষীর মেয়ে—আমি জানি। তুমি ভাই এই টাকা কটা রাখ—বলিয়া সে স্তম্ভিত পদ্মের হাতে দুখানি দশ টাকার নোট গুজিয়া দিয়া আবার বলিল—লুকিয়ে এসেছি, ভাই, জানতে পারলে আমার আর মাথা থাকবে না—বলিয়াই সে দ্রুতপদে ফিরিল। দরজার মুখে গিয়া আবার একবার ফিরিয়া দাঁড়াইয়া হাত দু’টি জোড় করিয়া বলিল—আমার ছেলে দুটির কোন দোষ নাই ভাই। আমি হাত জোড় করে যাচ্ছি।

পরমুহূর্তে সে খিড়কির দরজার ও-পাশে অদৃশ্য হইয়া গেল। পদ্ম যেন অসাড় নিস্পন্দ হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল—

কিছুক্ষণ পরে তাহার এই স্তম্ভিত ভাব কাটিয়া গেল অদূরবর্তী একটা কোলাহলের আঘাতে। আবার একটা কোথায় গোলমাল বাধিয়া উঠিয়াছে। সকল কোলাহলের ঊর্ধ্বে একজনের গলা শোনা যাইতেছে। পদ্ম উৎকণ্ঠিত হইয়া উঠিল;—অনিরুদ্ধ কি? না, সে নয়। তবে? ছিরু পাল? কান পাতিয়া শুনিয়া পদ্ম বুঝিল না, এ ছিরু পালের কণ্ঠস্বরও নয়! তবে? সে দ্রুতপদে আসিয়া বাহির-দরজার সম্মুখে পথের উপর নামিয়া দাঁড়াইল। এবার সে স্পষ্ট চিনিতে পারিল এ কণ্ঠস্বর এ গ্রামের একমাত্র ব্রাহ্মণ বাসিন্দা হরেন্দ্র ঘোষালের। পদ্ম এবার নিশ্চিত ও নিশ্চিন্ত দুইই হইল। মুখে খানিকটা ব্যঙ্গহাসিও দেখা দিল। হরেন্দ্র ঘোষালের মাথায় বেশ খানিকটা ছিট আছে, তাহাতে সন্দেহ নাই। গ্রামের সকলকে টেক্কা দিয়া তাহার চলা চাই। ছিরু পাল সাইকেল কিনিলে, সে সাইকেল এবং কলের গান দুইই কিনিয়া ফেলিল, টাকা যোগাড় করিল জমি বন্ধক দিয়া। ছিরু পাল নাকি রহস্য করিয়া একবার রটনা করিয়াছিল—সে এবার ঘোড়া কিনিবে। হরেন্দ্র মান রক্ষার জন্য চিন্তিত হইয়া মায়ের সঙ্গে পরামর্শ করিয়াছিল—ছিরু পাল ঘোড়া কিনিলে সে একটা হাতী কিনিবে! আজ আবার বামুনের কি রোখ মাথায় চাপিয়াছে কে জানে? পথে কোন একটা ছোট ছেলেও নাই যে জিজ্ঞাসা করে!

ঠিক এই সময়েই পদ্ম দেখিল অনিরুদ্ধ আসিতেছে। কাছে আসিয়া পদ্মের মুখের দিকে চাহিয়া সে হো হো করিয়া হাসিয়া উঠিল।

পদ্ম বলিল—মরণ—হাসছ কেন?

অনিরুদ্ধ হাসিয়া প্রায় গড়াইয়া পড়িল।—যা গেল! ব্যাপারটা ব’লে তবে তো মানুষে হাসে! এত চেঁচামেচি কিসের; হ’ল কি? হরু ঠাকুর এমন চেঁচাচ্ছে কেন?

—ঠাকুরকে ভারী জব্দ করেছে। আধখানা কামিয়ে দিয়ে। আবার হাসিতে সে ভাঙ্গিয়া পড়িল।

বহুকষ্টে হাসি সংবরণ করিয়া অনিরুদ্ধ বলিল—তারা নাপিত মহা ধূর্ত!

কাপড় ছাড়িয়া খাইতে বসিয়া এতক্ষণে অনিরুদ্ধ কোনমতে কথাটা শেষ করিল। সেটা এই—তারা নাপিতও তাহাদের দেখাদেখি বলিয়াছে, ধান লইয়া গোটা বৎসর সমস্ত গ্রামের লোকের ক্ষৌরির কাজ সে করিতে পারিবে না। যাহাদের জমি নাই—হাল নাই—তাহাদের ধান পাওয়া যায় না। যাহাদের আছে তাহারাও সকলে দেয় না। সুতরাং ধান লইয়া ক্ষৌরির কারবার ছাড়িয়া সে নগদ কারবার শুরু করিয়াছে। হরুঠাকুর কামাইতে গিয়াছিল—তারা নাপিত পয়সা চাহিয়াছিল! খানিকটা বকাইয়া অবশেষে ‘পয়সা দিব’ বলিয়াই হরুঠাকুর কামাইতে বসে।

অনিরুদ্ধ বলিল—তারা নাপিত—একে নাপিত ধূর্ত, তার তারা। আধখানা কামিয়ে বলে—কই, পয়সা দাও ঠাকুর। হরু বলে—কাল দোব। তারাও অমনি ক্ষুর ভাঁড় গুটিয়ে ঘরে ঢুকে বলে দিয়েছে—তা হলে আজ থাক, কাল বাকীটা কামিয়ে দেব। এই চেঁচামেচি গালাগালি—হিন্দী ফার্সী ইংরেজী। গাঁয়ের লোকেরা সব আবার জটলা পাকাচ্ছে!

অনিরুদ্ধ আবার প্রবল কৌতুকে হাসিয়া উঠিল এবং সে হাসির তোড়ে তাহার মুখের ভাত ছিটাইয়া উঠানময় হইয়া গেল। পদ্মের খানিকটা শুচি-বাতিক আছে; তাহার হাঁ-হাঁ করিয়া উঠিবার কথা, কারণ সব উচ্ছিষ্ট হইয়া যাইতেছে। কিন্তু আজ সে কিছুই বলিল না। অনিরুদ্ধের এত হাসিতেও সে এতক্ষণের মধ্যে একবার হাসে নাই। কথাটা অনিরুদ্ধের অকস্মাৎ মনে হইল। সে গভীর বিস্ময়ে পদ্মের মুখের দিকে চাহিয়া প্রশ্ন করিল—তোর আজ কি হল বল দেখি?

দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া পদ্ম বলিল—ছিরু পালের বউ লুকিয়ে এসেছিল।

—কে? বিস্ময়ে অনিরুদ্ধ সচকিত হইয়া উঠিল।

—ছিরু পালের বউ গো। তারপর ধীরে ধীরে সমস্ত কথাগুলি বলিয়া পদ্ম কাপড়ের খুঁটে-বাঁধা নোট দুইখানি দেখাইল।

অনিরুদ্ধ নীরব হইয়া রহিল। পদ্ম আবার দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া বলিল—আহা, মায়ের প্রাণ।

অনিরুদ্ধ আরও কিছুক্ষণ স্তব্ধ হইয়া থাকিয়া অকস্মাৎ গা-ঝাড়া দিয়া উঠিয়া পড়িল, যেন ঝাঁকি দিয়াই নিজেকে টানিয়া তুলিল; বলিল—বাবাঃ! রাজ্যের কাজ বাকী পড়ে গিয়েছে। এইবার খেয়ে-দেয়ে দেড় ক্রোশ পথ ছুটতে হবে।

পদ্ম কোন কথা বলিল না। অনিরুদ্ধ হাতমুখ ধুইয়া মশলা মুখে দিয়া একটা বিড়ি ধরাইল। এবং একমুখ হাসিয়া বলিল—একখানা নোট আমাকে দে দেখি!

পদ্ম ভ্রূকুঞ্চিত করিয়া অনিরুদ্ধের মুখের দিকে চাহিল। অনিরুদ্ধ আরও খানিকটা হাসিয়া বলিল—লোহা আর ইস্পাত কিনতে হবে পাঁচ টাকার। ছিরে শালাকে টাকা দিতে খদ্দেরের পাঁচ টাকা ভেঙেছি। আর—

পদ্ম কোন কথা না বলিয়া একখানা নোট অনিরুদ্ধের সম্মুখে ফেলিয়া দিল। অনিরুদ্ধ কুড়াইয়া লইয়া হাসিয়া বলিল—আমি নিজে একটি—। মাইরি বলছি—একটি টাকার এক পয়সা বেশী পয়সা খরচ করব না। কতদিন খাই নাই তুই বল? অর্থাৎ মদ।

তবু পদ্ম কোন কথা বলিল না। অকস্মাৎ যেন অনিরুদ্ধের উপর তাহার মন বিরূপ হইয়া উঠিয়াছে।


ছয়



ঘোষালের আধখানা দাড়ি কামাইয়া বাকীটা রাখিয়া দেওয়ায় তারা নাপিতের যতই পরিহাস রসিকতা প্রকাশ পাইয়া থাকুক এবং গ্রামের লোকে প্রথমটা হরু ঘোষালের সেই অর্ধনারীশ্বরবৎ রূপ দেখিয়া হাসিয়া ব্যাপারটা যতই হাস্যকর করিয়া তুলুক, প্রতিক্রিয়ার পালাটা কিন্তু সহজ ও আদৌ হাস্যকর হইল না; অত্যন্ত ঘোরালো এবং গম্ভীর হইয়া উঠিল।

হরিশ মন্ডল প্রবীণ মাতব্বর ব্যক্তি—লোকটির সূক্ষ্ম বোধশক্তিও আছে। সে-ই প্রথম বলিল—হাসিস না তোরা, হাসির ব্যাপার এটা নয়। গাঁয়ের অবস্থাটা কি হ’ল একবার ভেবে দেখেছিস?

সকলেই হাসির বেগের প্রবণতা খানিকটা সংবরণ করিয়া হরিশের মুখের দিকে চাহিল। হরিশ গম্ভীরভাবে বলিল—ঘোর অরাজক।

ভবেশ পাল—ছিরুর কাকা—স্থূল ব্যক্তি, তবুও বুদ্ধিমত্তার ভান তাহার আছে, সে-ও গম্ভীর হইয়া বলিল—তা বটে!

দেবনাথ হাসি-তামাসায় যোগ দিবার মত লোক নয়; সে ব্যাপারটা অনুমান করিয়া লইয়া বলিল—এ আপনারা আটকাবেন কি করে? গাঁয়ের জোটান আছে আপনাদের? ওই কামার-ছুতোরের পঞ্চাইতি আসরে ছিরু দ্বারিক চৌধুরীর অপমান করলে, চৌধুরী উঠে চলে গেল। জগন ডাক্তার তো এলই না—উল্টে অনিরুদ্ধকে উস্কে দিলে।

ভবেশ একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া বলিল—হরিনাম সত্য হে! ‘কলিশেষে একবর্ণ হইবে যবন’—একি আর মিথ্যা কথা বাবা? এমনি করেই ধম্ম-কর্ম্ম জাত-জরম সব যাবে।

হরিশ বলিল—ওদিকে লুটনী দাই কি বলছে জান? আমার বউমায়ের ন’মাস চলছে তো! তাই বলে পাঠিয়েছিলাম যে, রাত-বিরেতে কোথাও যদি যাস তবে আগে খবর দিয়ে যা যেন! তা বলেছে—আমাকে কিন্তু নগদ বিদেয় করতে হবে।

গভীর চিন্তায় বিভোর হইয়া ভবেশ বলিল—হুঁ। হরিশ বলিল—রাজা বিনে রাজ্যনাশ যে বলে—কথাটা মিথ্যে নয়। আমাদের জমিদার যে হয়েছে সে থেকেও না থাকা।

দেবনাথ সঙ্গে সঙ্গে বলিল—জমিদারের কথা বাদ দেন। জমিদার আমাদের খারাপ কিসের? এ কাজ তো জমিদারের নয়—আপনাদের। আপনারা কই শক্ত হয়ে বসে ডাকুন দেখি মজলিস। ঘাড় হেঁট করে সবাইকে আসতে হবে। আসবে না—চালাকি নাকি? বিপদ-আপদ কি নাই তাদের? লোহাতে মুড় বাঁধিয়ে ঘর করে সব? চৌধুরীকে ডাকুন—জগন ডাক্তারকে ডাকুন—ডেকে আগে ঘর বুঝুন। তারপর কামার, ছুতোর, বায়েন, দাই, ধোপা, নাপিত এদের ডাকুন, আর ন্যায্য বিচার করুন। তাদের পাওনাটা কড়ায়গণ্ডায় পাবার ব্যবস্থা করতে হবে।

হরিশ মাতব্বরদের মুখের দিকে চাহিয়া বলিল—এ দেবনাথ কিন্তু বলেছেন ভাল। কি বলেন গো সব?

ভবেশ বলিল—উত্তম কথা।

নটবর বলিল—হ্যাঁ, তাই করুন তা হলে।

দেবনাথের উৎসাহের সীমা ছিল না, সে বলিল—আজই বসুন সব সন্ধ্যের সময়। আমি আসর ক’রে দিচ্ছি, স্কুলের চল্লিশ বাতির আলো দিচ্ছি, খবরও দিচ্ছি সকলকে। কি বলছেন সব?

হরিশ আবার সকলের দিকে চাহিয়া জিজ্ঞাসা করিল—কি গো?

জবাব আসিল—তা বেশ। খানিকটা তামাক আর আগুনের যোগাড় রেখো বাপু।

বহুকাল পর চণ্ডীমণ্ডপের আটচালাটা আবার আলোকোজ্জ্বল হইয়া গ্রাম্য-মজলিসে জমিয়া উঠিল। ত্রিশ বৎসর পূর্বেও এই আটচালা ও চণ্ডীমণ্ডপ এমনি ভাবে নিত্য সন্ধ্যায় জমজমাট হইয়া উঠিত। গ্রাম্য-বিচার হইত, সংকীর্ত্তন হইত, পাশা-দাবাও চলিত, গ্রামখানির সলাপরামর্শের কেন্দ্রস্থল ছিল এই চণ্ডীমণ্ডপ ও আটচালা। গ্রামে কাহারও কোন কুটুম্ব সজ্জন আসিলে এই চণ্ডীমণ্ডপেই বসানো হইত। ক্রিয়া কর্ম—অন্নপ্রাশন, বিবাহ, শ্রাদ্ধ—সবই এইখানে অনুষ্ঠিত হইত। কালগতিকে ধূলার অবলেপনে অবলুপ্তপ্রায় বহু বসুধারার চিহ্ন এখনও শিবমন্দিরের দেওয়ালে এবং চণ্ডীমণ্ডপের থামের গায়ে অঙ্কিত দেখা যায়।

তখন গ্রামে ব্যক্তিগত বৈঠকখানা বা বাহিরের ঘর কাহারও ছিল না। জগন ডাক্তারের পূর্বপুরুষ—জগনের পিতামহই কবিরাজ হইয়া বাহিরের ঘর বা বৈঠকখানার পত্তন করিয়াছিল। প্রথমে সে অবশ্য এই চণ্ডীমণ্ডপে বসিয়াই রোগী দেখিত। তারপর অবস্থার পরিবর্তনের জন্যও বটে এবং জমিদারের গোমস্তার সঙ্গে কি কয়েকটা কথান্তরের জন্যও বটে—কবিরাজ ঔষধালয় ও বৈঠকখানা তৈয়ারী করিয়া ঔষধালয় খুলিল এবং সেখানে পান ও তামাকের সাচ্ছল্যে মজলিস জমাইয়া চণ্ডীমণ্ডপের মজলিসে ভাঙন ধরাইয়া দিল। তারপর ক্রমে ক্রমে অনেকের বাড়ীতেই একটি করিয়া বাহিরের ঘরের পত্তন হইয়াছে। সেইগুলিকে কেন্দ্র করিয়াই সমগ্র গ্রাম জুড়িয়া এখন অনেকগুলি ছোট ছোট মজলিস বসে। কেহ কেহ বা একাই একটি আলো জ্বালিয়া সম্মুখের অন্ধকারের দিকে চাহিয়া চুপ করিয়া বসিয়া থাকে।

তবে এখনও জগন ডাক্তারের ওখানেই মজলিসটি বড় হয়। জগনের রূঢ় দাম্ভিকতা সত্ত্বেও রোগীর বাড়ীর লোকজন সেখানে যায়, আরও কয়েকজন যায়—ডাক্তারের অর্ধসাপ্তাহিক খবরের কাগজের সংবাদের প্রত্যাশায়। দেবনাথ ঘোষ এত বিরূপতা সত্ত্বেও যায়। সে-ই চীৎকার করিয়া কাগজ পড়ে, অন্য সকলে শোনে। অসহযোগ আন্দোলন তখন শেষ হইয়াছে, স্বরাজ-পার্টির উগ্র বক্তৃতায় এবং সমালোচনায় কাগজের স্তম্ভগুলি পরিপূর্ণ। শ্রোতাদের মনে চমক লাগে—স্তিমিতগতি পল্লীবাসীর রক্তে যেন একটা উষ্ণ শিহরণ অনুভূত হয়।

আজ চণ্ডীমণ্ডপের মজলিসে দেবনাথই সকলকে সম্ভাষণ জানাইতেছিল, সে-ই উদ্যোক্তা। মজলিস আরম্ভ হইবার পূর্ব হইতেই আসর সে বেশ জমাইয়া তুলিয়াছে। চণ্ডীমণ্ডপের বাহিরের দেবস্থলের আঙিনায় পুরানো বকুলগাছটি গ্রামের ষষ্ঠীতলা, একটি বাসুদেব-মূর্তি সেখানে গাছের শিকড়ের বন্ধনে একেবারে আঁটিয়া বসিয়া আছে; সেইটিই ষষ্ঠীদেবী বলিয়া পূজিত হয়। সেখানে একটা মোটা শুকনা ডাল জ্বালিয়া আগুন করা হইয়াছে। আগুনের চারিপাশে গ্রামের জনকতক হরিজন আসিয়া বসিয়া গিয়াছে। ভদ্র সজ্জনেরা প্রায় সকলেই আসিয়াছে। কেবল দ্বারকা চৌধুরী, জগন ডাক্তার, ছিরু পাল এবং আরও দু-একজন এখনও আসে নাই।

চল্লিশ বাতির আলোয় আলোকিত চণ্ডীমণ্ডপটির উপরের দিকে চাহিয়া ভবেশ বলিল—দেখতে বেশ লাগছে বাপু! হরিশও একবার চারিদিক দেখিয়া লইয়া বলিল—এইবার কিন্তু একবার মেরামত করতে হবে চণ্ডীমণ্ডপটিকে। বলিয়া সে সপ্রশংস কণ্ঠে বলিল—কি কাঠামো দেখ দেখি! ওঃ কি কাঠ। দেবনাথ বলিল—ষড়দলে কি লেখা আছে জানেন—যাবচ্চন্দ্রার্কমেদিনী। মানে চন্দ্র-সূর্য-পৃথিবী যতদিন থাকবে, এও ততদিন থাকবে।

—তা থাকবে বাপু! বলিহারি বলিহারি! ভবেশ পাল অকারণে উচ্ছ্বসিত এবং পুলকিত হইয়া উঠিল।

ঠিক এই সময়েই দ্বারকা চৌধুরী লাঠি হাতে ঠুক ঠুক করিয়া আসিয়া বলিলেন—ওঃ তলব যে বড় জোর গো!

দেবনাথ ব্যস্ত হইয়া উঠিয়া গেল, জগন ডাক্তার ও ছিরুর জন্য আবার সে দু’টি ছেলেকে দু’জনের কাছে পাঠাইয়া দিল। কিন্তু জগন ডাক্তার আসিল না, সে স্পষ্ট বলিয়া দিয়াছে—তাহার সময় নাই। চোখে চশমা লাগাইয়া সে নাকি খবরের কাগজ পড়িতেছে। ছিরুও আসে নাই; তাহার জ্বর হইয়াছে, তবে সে বলিয়াছে—‘পাঁচ জনে যা করবেন তাই আমার মত’। ছিরুর এই অযাচিত বিনয়ে দেবনাথ অত্যন্ত আশ্চর্য হইয়া গেল।

ছিরুর কথাটা অস্বাভাবিকতা দোষে দুষ্ট; বিনয়ের ধার ছিরু পাল ধারে না। জ্বর তাহার হয়ই নাই। সে নির্মম আক্রোশে গর্তের ভিতরকার আহত অজগরের মত মনে মনে পাক খাইয়া ঘুরিতেছিল। বাড়ীর ভিতরে দাওয়ার উপর উবু হইয়া বসিয়া সে প্রকাণ্ড বড় হুঁকাটায় ক্রমাগত একঘেয়ে টান টানিয়া যাইতেছিল ও প্রখর নির্নিমেষ দৃষ্টিতে উঠানের একটা বিন্দুর উপর দৃষ্টি নিবন্ধ করিয়া বসিয়া ছিল। নানা চিন্তা তাহার মাথার মধ্যে ঘুরিতেছে।

—‘ঘরে আগুন লাগাইয়া দিলে কি হয়!’ মনটা আনন্দে চঞ্চল হইয়া উঠে। পরক্ষণেই মনে হয়, না। আক্রোশের বশে একটা-কিছু করিয়া বসিলে আবার হয়ত ফ্যাসাদে পড়িতে হইবে। আজই পঞ্চাশ টাকা জমাদার বন্ধুকে দিতে হইয়াছে। তাই লইয়া তাহার মা এখনও গজ গজ করিয়া তাহাকে গালি পাড়িতেছে।

—মর্, তুই মর্ রে। এমন রাগ তোর! একটু সবুর নাই! হাঁদা-গাডোল গোঁয়ার কোথাকার, পঞ্চাশ টাকা আমার খস্ খস্ করে বেরিয়ে গেল! আমার বুকে বাঁশ চাপিয়ে দে তুই—আমার হাড় জুড়োক।

শ্রীহরি সে দিকে কানই দিতেছে না। অন্য সময় হইলে এতক্ষণে সে বুড়ীর চুলের মুঠো ধরিয়া উঠানে আছাড় মারিয়া ফেলিয়া নির্মম প্রহার আরম্ভ করিত। কিন্তু আজ সে নিষ্ঠুর প্রতিহিংসার চিন্তায় একেবারে মগ্ন হইয়া গিয়াছে। অনিরুদ্ধ ওপার হইতে রাত্রি ন’টা-দশটার সময় ফেরে। অন্ধকারে অতর্কিত আক্রমণে—না—সঙ্গে গিরীশ ছুতোর থাকে! থাকিলেই বা, দুজনকে ঘায়েল করিয়া দেওয়াই বা এমন কি কঠিন? শ্রীহরিরও মিতে আছে। মিতে গড়াঞী সানন্দে তাহাকে সাহায্য করিবে।

পরক্ষণেই সে চমকিয়া উঠিল। ধরা পড়িলে ফাঁসি হইয়া যাইবে। তাহার সে চমক এত স্পষ্টভাবে পরিস্ফুট যে তাহার ক্ষীণদৃষ্টি বুড়ী মা পর্যন্ত দেখিয়া ফেলিল। অত্যন্ত রূঢ় ভাষায় সে বলিল—মর্ মুখপোড়া! ছোট ছেলের মত চমকে উঠে যেন দেয়ালা করছে!

শ্রীহরি অত্যন্ত কঠিন দৃষ্টিতে মায়ের দিকে একবার ফিরিয়া চাইল, পরক্ষণেই দৃষ্টি ফিরাইয়া হুঁকা হইতে কল্কেটা নামাইয়া দিয়া বলিল—এই! শুনচিস্? কঙ্কেটা পাল্টে দিয়ে যা। কথাটা বলা হইল তাহার স্ত্রীকে। ছিরুর স্ত্রী রন্ধনশালে ভাতের হাঁড়ির দিকে চাহিয়া বসিয়া ছিল। পাশেই ল্যাম্পের আলোয় ছিরুর বড় ছেলেটা বই খুলিয়া একদৃষ্টে বাপের দিকে চাহিয়া বসিয়া আছে। শীর্ণ, রুগ্ন, বছর দশেকের ছেলেটা—গলায় এক বোঝা মাদুলী—বড় বড় চোখে অদ্ভুত স্থির মূঢ় দৃষ্টি। চিন্তাগ্রস্ত বাপের প্রতিটি ভঙ্গিমা সে লক্ষ্য করিতেছে।

শ্রীহরির ছোট ছেলেটা প্রায় পঙ্গু এবং বোবা, সেটাও একপাশে বসিয়া আছে—মুখের লালায় সমস্ত বুকটা অনবরত ভিজিতেছে। বড় ছেলেটি উঠিয়া আসিয়া কল্কেটা লইয়া গেল। শ্রীহরি ছেলেটার দিকে একবার চাহিল। ছেলেটা অদ্ভুত, শ্রীহরির মার খাইয়াও কাঁদে না, স্থিরদৃষ্টিতে চাহিয়া থাকে। ছেলেটার জন্য এখন তাহার মাকে প্রহার করা কঠিন হইয়া উঠিয়াছে। মাকে যেন আগলাইয়া রাখে! মারিলে পশুর মত হিংস্র হইয়া উঠে। সেদিন সে প্রহাররত শ্রীহরির পিঠে একটা সূচ বিঁধাইয়া দিয়াছিল। ছেলেটার দিক হইতে দৃষ্টি ফিরাইয়া শ্রীহরি স্ত্রীর দিকে চাহিল—বিশীর্ণ গৌরবর্ণ মুখখানা উনানের আগুনের আভায় লাল হইয়া উঠিয়াছে—চামড়ায় ঢাকা কঙ্কালসার মুখ! শ্রীহরি দৃষ্টি ফিরাইয়া লইল।

—হ্যাঁ, আর এক উপায় আছে! অনিরুদ্ধের অনুপস্থিতিতে পাঁচিল ডিঙাইয়া পদ্ম কামারনীকে বাঘের মত মুখে করিয়া—। শ্রীহরির বুকখানা ধ্বক ধ্বক করিয়া লাফাইতে লাগিল। দীর্ঘাঙ্গী সবলদেহা কামারনীর সেই দা-খানা কিন্তু বড় শানিত! চোখ তাহার শীতল এবং ক্রূর। সেদিন, দা-খানার রৌদ্র প্রতিফলিত ছটায় ছিরুর চোখ ধাঁধিয়া গিয়াছিল।

বায়েনদের দূর্গা।—কামারনী চেয়ে দেখিতে অনেক শ্রী। যৌবন তাহার উচ্ছ্বসিত, দেহবর্ণে সে গৌরী; রঙ্গরসে, লীলা-লাস্যে সে অপরূপা। কিন্তু সে বহুভোগ্যা, সেই কারণেই তাহার আকর্ষণ শ্রীহরিকে আর তেমন বিচলিত করে না। দূর্গার দাদা পাতু আবার তাহার নামে জমিদারের কাছে নালিশ করিয়াছে। স্পর্ধা দেখ বায়েনের! শ্রীহরির মুখে তাচ্ছিল্যের ব্যঙ্গ হাস্য ফুটিয়া উঠিল। জমিদারের ছেলের সোনার নিমফলের গোঠ তাহার কাছে বন্ধক আছে। অকস্মাৎ শ্রীহরি উঠিয়া দাঁড়াইল।

শ্রীহরির স্ত্রী কঙ্কেতে নতুন তামাক সাজিয়া আনিয়া নামাইয়া দিল। কিন্তু তামাক শ্রীহরিকে আর আকর্ষণ করিল না। দেওয়ালে-পোতা পেরেকে ঝুলানো জামাটা হইতে বিড়ি-দেশলাই বাহির করিয়া লইয়া সে চলিয়া গেল। অন্ধকার গলি পথে পথে ঘুরিয়া সে হরিজন পল্লীর প্রান্তে আসিয়া উপস্থিত হইল।

প্রচণ্ড কলরব উঠিতেছে। পল্লীর প্রান্তে বহুকালের বৃদ্ধ বকুলগাছ, গ্রামের ধর্মরাজতলা—সেখানে প্রতি সন্ধ্যায় উহাদের মজলিস বসে। গান-বাজনা হয়, ভাসান, বোলান, ঘেঁটুগানের মহলা চলে—আবার এক-একদিনে দুর্নিবার কলহও বাধিয়া উঠে। আজ কলহ বাধিয়াছে। শ্রীহরি একটা গাছের অন্ধকারের মধ্যে আত্মগোপন করিয়া কান পাতিয়া শুনিতে আরম্ভ করিল।

পাতু বাইনই আস্ফালন করিয়া চীৎকার করিতেছে।

দূর্গারও তীক্ষ্ণ কণ্ঠের আওয়াজ উঠিতেছে—ভাত দেবার ভাতার লয়, কিল মারার গোঁসাই। দাদা সাজছে, দা-দা! মারবি ক্যানে তু! আমার যা খুশি আমি তাই করব। হাজার নোক আসবে আমার ঘরে, তোর কি? তোর ভাত আমি খাই? সঙ্গে সঙ্গে দূর্গার মা-ও চীৎকার করিতেছে। শ্রীহরি হাসিল। এ যে তাহাকে লইয়াই আন্দোলন চলিতেছে।

সহসা একটা মতলব তাহার মাথায় খেলিয়া গেল। গাছের আড়াল হইতে বাহির হইয়া সে নিঃশব্দে অগ্রসর হইল দূর্গাদের বাড়ির দিকে। বকুল গাছটার ওপাশে পল্লীটা খাঁ খাঁ করিতেছে। মেয়ে পুরুষ সব গিয়া জুটিয়াছে ওই গাছতলায়। শ্রীহরি সন্তর্পণে ঢুকিয়া পড়িল দূর্গাদের বাড়ীতে। বাড়ী অর্থে প্রাচীর বেষ্টনহীন এক টুকরো উঠানের দুই দিকে দু’খানা ঘর; একখানা দূর্গা ও দূর্গার মায়ের, অপরখানা পাতুর। শ্রীহরির তীক্ষ্ণদৃষ্টি পাতুর ঘরখানার দিকে। শ্রীহরি হতাশ হইল। দরজাটা বন্ধ—দাওয়াটাও শূন্য।

একটা কুকুর অকস্মাৎ গোঁ গোঁ শব্দ করিয়া ছুটিয়া পলাইয়া গেল। বোধ হয় চুরি করিয়া কাঁচা চামড়ার টুকরা খাইতে আসিয়াছিল। শ্রীহরি হাসিয়া একটা বিড়ি ধরাইল, সুকৌশলে হাতের মধ্যে সেটাকে সম্পূর্ণভাবে লুকাইয়া টানিয়া টানিয়া বাহির হইল। দূর্গার জন্য কতক্ষণ অপেক্ষা করিতে হইবে কে জানে? আবার সে গাছের আড়ালে আসিয়া দাঁড়াইল।

ওদিকে কিন্তু ঝগড়াটা ক্রমশই প্রবলতর হইয়া উঠিতেছে। শ্রীহরি আবার একটা বিড়ি ধরাইল। কিছুক্ষণ পরে সে গাছতলা হইতে বাহির হইয়া জ্বলন্ত বিড়িটা পাতুর চালের মধ্যে গুঁজিয়া দিয়া দ্রুত লঘুপদে আপন বাড়ীর দিকে চলিয়া গেল। ওদিকে চণ্ডীমণ্ডপেও ভদ্র সজ্জনদের প্রবল আলোচনা চলিতেছে। শ্রীহরি হাসিল।

কিছুক্ষণ পরেই গ্রামের উর্ধ্বলোকে অন্ধকার আকাশ রক্তাভ আলোয় ভয়াল হইয়া উঠিল। আকাশের নক্ষত্র মিলাইয়া গিয়াছে। উৎক্ষিপ্ত খড়ের জ্বলন্ত অঙ্গার আকাশে উঠিয়া ফুলঝুরির মত নিভিয়া যাইতেছে। মাঝে মাঝে হাউই-এর মত প্রজ্বলিত-বাখারিগুলি সশব্দে বাগানের মাথায় ঠিকরাইয়া পড়িতে লাগিল। আগুন! আগুন! ভয়ার্ত চীৎকার—শিশু ও নারীর উচ্চ কান্নার রোলে শূন্যলোকের বায়ুতরঙ্গ মুখর, ভারাক্রান্ত হইয়া উঠিল। নিমেষে বকুলতলার জটলা এবং তাহার পরই চণ্ডীমণ্ডপের মজলিশ ভাঙ্গিয়া গেল।


সাত



একা পাতুর ঘর নয়, পাতুর ঘরের আগুন ক্রমশ বিস্তৃত হইয়া সমস্ত হরিজন পল্লীটাকেই পোড়াইয়া দিল! বড় বড় গাছের আড়াল পাইয়া খান দুই-তিন ঘর কোন রকমে বাঁচিয়াছে। বাকি ঘরগুলি অতি অল্প সময়ের মধ্যেই পুড়িয়া গিয়াছে।

সামান্য কুটীরের মত নিচু-নিচু ছোট-ছোট ঘর—বাঁশের হালকা কাঠামোর উপর অল্প খড়ের পাতলা ছাউনি, কার্তিকের প্রথম হইতে বৃষ্টি না হওয়ায় রোদে শুকাইয়া বারুদের মত দাহ্য বস্তু হইয়াই ছিল; আগুন তাহাতে স্পর্শ করিবামাত্র বিস্ফোরণের মতই অগ্নিকাণ্ড ঘটিয়া গেল।

গ্রামের লোক অনেকেই ছুটিয়া আসিয়াছিল—বিশেষ করিয়া অল্পবয়সী ছেলের দল। তাহারা চেষ্টাও অনেক করিয়াছিল, কিন্তু জল তুলিবার পাত্রের অভাব এবং বহ্নিমান সঙ্কীর্ণ চালাগুলিতে দাঁড়াইবার স্থানের অভাবে তাহারা কিছু করিতে পারে নাই। তাহাদের মুখপাত্র ছিল জগন ডাক্তার। অগ্নিদাহের সমস্ত সময়টা চীৎকার করিয়া সেনাপতির মত আদেশ দিয়া ও উপদেশ বাৎলাইয়া এমন গলা ফাটাইয়া ফেলিল যে, আগুন নিভিতে নিভিতে তাহার গলার আওয়াজও বসিয়া গেল।

রাত্রে উহাদের সকলকে চণ্ডীমণ্ডপে আসিয়া শুইতে অনুমতি দেওয়া হইল; কিন্তু আশ্চর্য মানুষ উহারা—কিছুতেই ওই পোড়া ভিটার মায়া ছাড়িয়া আসিল না। সমস্ত রাত্রি পোড়া ঘরের আশেপাশে কোনরূপে স্থান করিয়া লইয়া হেমন্তের এই শীতজর্জর রাত্রিটা কাটাইয়া দিল। ছেলেগুলা অবশ্য ঘুমাইল, মেয়েগুলা গানের মত সুর করিয়া বিনাইয়া বিনাইয়া কাঁদিল, আর পুরুষেরা পরস্পরকে দোষ দিয়া নিজের কৃতিত্বের আস্ফালন করিল এবং দগ্ধগৃহের আগুন তুলিয়া ক্রমাগত তামাক খাইল।

প্রায় ঘরেই দু-একটা গরু দুই-চারিটা ছাগল আছে; আগুনের সময় সেগুলোকে তাহারা ছাড়িয়া দিয়াছিল। হাঁস-মুরগীও প্রত্যেকের ছিল; তাহার কতকগুলা পুড়িয়াছে, চোখে দেখা না গেলেও গন্ধে তাহা অনুমান করা যায়। যেগুলা পলাইয়া বাঁচিয়াছে—সেগুলা ইতিমধ্যেই আসিয়া আপন আপন গৃহস্থের জটলার পাশে পালক ফুলাইয়া যথাসম্ভব দেহ সঙ্কুচিত করিয়া বসিয়া গেল!

সকাল হইতেই জাগিয়া উঠিয়া মেয়েরা আর একদফা কাঁদিয়া শোকোচ্ছ্বাস প্রকাশ করিতে বসিল। একটু রোদ উঠিতেই কোমর বাঁধিয়া মেয়ে-পুরুষে পোড়া খড়ের ছাইগুলা ঝুড়িতে করিয়া আপন আপন সারগাদায় ফেলিয়া ঘর দুয়ার পরিষ্কার করিতে লাগিয়া গেল। পাকা-কাঠগুলি একদিকে গাদা করিয়া রাখা হইল; পরে জ্বালানির কাজে লাগিবে।

সমস্ত কাজ ইহাদের মুখস্থ। গৃহের উপর দিয়া এমন বিপর্যয় ইহাদের প্রায়ই ঘটিয়া থাকে। ঘর-দুয়ার পরিষ্কারের পর আহার্যের ব্যবস্থা করিতে হইবে। গত সন্ধ্যার বাসি ভাতই ইহাদের সকালের খাদ্য; কিন্তু ভাত বা মুড়ি সবই নষ্ট হইয়া গিয়াছে। ছোট বাচ্চাগুলা ইহারই মধ্যে চীৎকার আরম্ভ করিয়া দিয়াছে—কিন্তু তাহার আর উপায় নাই। দুই-একজন মা ছোট ছোট ছেলেমেয়েগুলার পিঠে দুম-দাম করিয়া কিল-চড় বসাইয়া দিল।

—রাক্ষসদের প্যাটে যেন আগুন লেগেছে। মর মর তোরা, মর!

মনিবেরা এসব ক্ষেত্রে চিরকালই তাহাদিগকে সাহায্য করিয়া থাকেন। এ পাড়ার প্রায় সকলেই চাষীদের অধীনে খাটে—বাধা বাৎসরিক বেতন বা উৎপন্ন ভাগের চুক্তিতে শ্রমিকের কাজ করে। মনিব সমস্ত চাষের সময়টা ধান দিয়া ইহাদের সংসারের সংস্থান করিয়া দেয়—ফসল উঠিলে ভাগের সময় সুদ-সমেত ধান কাটিয়া লয়। সুদের হার প্রায় শতকরা পঁচিশ হইতে ত্রিশ পর্যন্ত। এই প্রথার মধ্যে অন্যায় কিছু ইহারা বোধ করে না—বরং সকৃতজ্ঞ আনুগত্যের ভাবই অন্তরে ইহার জন্য পোষণ করে।

পাতুর কিন্তু এসব ভরসা নাই। সে জাতিতে বায়েন বা বাদ্যকর। তাহার কিছু চাকরান জমি আছে। গ্রামের সরকারী শিবতলা, কালীতলা এবং পাশের গ্রামে চণ্ডীতলায় নিত্য ঢাক বাজায়। নিজের দুইটা হেলে বলদ আছে—তাই দিয়া সে নিজের জমির সঙ্গে কঙ্কণার ভদ্রলোকের কিছু জমিও ভাগে চাষ করিয়া থাকে। এ ছাড়া ভাগাড়ের মরা গরু-মহিষের চামড়া ছাড়াইয়া পূর্বে সে চামড়া ব্যবসায়ী শেখদের বিক্রয় করিত। কিন্তু সম্প্রতি জমিদার ভাগাড় বন্দোবস্ত করায় এ দিকের আয় তাহার অনেক কমিয়া গিয়াছে।

আপন মনে ভাবিতে ভাবিতে পাতু দ্রুত গতিতে ছাই জড় করিয়া চলিয়াছিল। ছিরু পালের কাছে সেদিন মার খাইয়া তাহার মনে যে উত্তেজনা জাগিয়া উঠিয়াছিল—সে উত্তেজনা দিন দিন বাড়িয়াই চলিয়াছে। সেই উত্তেজনাবশেই সে দূর্গার কলঙ্কের কথা প্রকাশ করিয়া নালিশ করিয়াছিল। স্বজাতিরা কথাটা লইয়া ঘোঁট পাকাইয়া তাহাকে প্রশ্ন করিয়াছিল—

—তুমি তো আপন মুখেই এই কেলেঙ্কারির কথা চৌধুরী মহাশয়ের কাছে বলেছ, জমিদারের কাছারীতে বলেছ। বলেছ কি না?

—হ্যাঁ, বলেছি!

—তবে? তুমি পতিত হবে না কেন, তা বল?

পাতু চমকিয়া উঠিয়াছিল। সে হন হন করিয়া বাড়ী চলিয়া গিয়া দূর্গার চুলের মুঠি ধরিয়া হিড় হিড় করিয়া টানিয়া তাহাকে মজলিশের সম্মুখে হাজির করিয়াছিল। ধাক্কা দিয়া দূর্গাকে মাটির উপরে ফেলিয়া দিয়া বলিয়াছিল—

—সে কথা এই হারামজাদী ছেনালকে শুধাও। ভিন্ন ভাতে বাপ পড়শী; আমি ওর সঙ্গে পৃথকান্ন।

দূর্গা উচ্চকণ্ঠে পাড়ার প্রত্যেকটি মেয়ের কুকীর্তির গুপ্ত ইতিহাস প্রকাশ করিয়া পাতুর মুখের ওপর সদম্ভে ঘোষণা করিয়া বলিয়াছিল—

—ঘর আমার, আমি নিজের রোজগারে করেছি, আমার খুশী যার ওপর হবে—সে-ই আমার বাড়ী আসবে। তোর কি? তোর ভাত আমি খাই? তুই আমাকে খেতে দিস, না দিবি? আপন পরিবারকে সামলাস তুই।

পাতু আরও ঘা-কতক লাগাইয়া দিয়াছিল। পাতুর বউটি ঘোমটার ভিতর হইতে তীক্ষ্ণকণ্ঠে ননদকে গাল দিতে শুরু করিয়াছিল। মজলিশের উত্তাপের মধ্যে উত্তেজিত কলরব হাতাহাতির সীমানায় বোধ করি গিয়া পৌঁছিয়াছিল—ঠিক এই সময়েই আগুন জ্বলিয়া ওঠে।

এই দুই দিনের উত্তেজনা, তাহার উপর এই অগ্নিদাহের ফলে গৃহহীনতার অপরিমেয় দুঃখ তাহাকে রুদ্ধমুখ আগ্নেয়গিরির মত করিয়া তুলিয়াছিল। সে নীরবেই কাজ করিয়া চলিতেছিল, এমন সময় তার বউয়ের ছিঁচকান্না তাহার কানে গেল। সে এতক্ষণে ছাগল-গরুগুলিকে অদূরবর্তী খেজুরগাছগুলার গোড়ায় খুঁটা পুঁতিয়া দিল। তাহার পর হাঁসগুলিকে নিকটবর্তী পুকুরের জলে নামাইয়া দিয়া, স্বামীর কাজে সাহায্য করতে আসিল। সঙ্গে সঙ্গে সেই গুনগুনানির কান্নার রেশও টানিয়া চলিল। পাতু হিংস্র জানোয়ারের মত দাঁত বাহির করিয়া গর্জন করিয়া উঠিল—

—এ্যাঁই দেখ, মিহি গলায় আর ঢং করে কাঁদিস না বলছি। মেরে হাড় ভেঙে দোব—হ্যাঁ।

ঘর পুড়িয়া যাওয়ার দুঃখে এবং সমস্ত রাত্রি কষ্টভোগের ফলে পাতুর বউয়ের মেজাজও খুব ভাল ছিল না, সে বন্যবিড়ালীর মত হিংস্র ভঙ্গিতে ফাঁস করিয়া উঠিল—

—ক্যানে, ক্যানে আমার হাড় ভেঙে দিবি শুনি? বলে দরবারে হেরে, মাগকে মারে ধরে—সেই বিত্তান্ত। নিজের ছেনাল বোনকে কিছু বলবার ক্ষোমতা নাই—

পাতু বাঘের মত লাফ দিয়া বউকে মাটিতে ফেলিয়া তাহার বুকে বসিয়া গলা টিপিয়া ধরিল। দূর্গা নির্যাতন দেখিয়া ভাইকে বলিল—

—হ্যাঁ, বউকে একটুকুন শাসন কর, মাথায় তুলিস না!

সেই মুহূর্তেই জগন ডাক্তারের ধরা গলা শোনা গেল, সে হাঁ হাঁ করিয়া বলিল—

—ছাড়, ছাড় হারামজাদা বায়েন, মরে যাবে যে!

বউটা অচেতন হইয়া অসাড়ের মত পড়িয়া আছে। পাতু এবার শঙ্কিত হইয়া ঝুঁকিয়া বউয়ের মুখের দিকে চাহিয়া অকস্মাৎ এক মুহূর্তে হাউ হাউ করিয়া কাঁদিয়া উঠিল—

—ওগো, আমি বউকে মেরে ফেললাম গো।

—ওরে বাবা, কি করলি রে? (পাতুর মা চীৎকার করিয়া উঠিল)

—ওরে জল, শীগগির জল আন। (ডাক্তার ব্যস্ত হইয়া বলিল)

বউ চোখ মেলিয়া চাহিল এবং প্রাণপণে চীৎকার আরম্ভ করিল—

—আমাকে আর কারুর মেমতা করতে হবে না রে, সংসারে আমার কেউ নাই রে।

জগন ডাক্তার কতগুলি ঘর পুড়িয়াছে এবং মানুষ বিপন্ন তাহা নোটবুকে লিখিয়া লইল। এ পাড়ার সকলকে ডাকিয়া ডাক্তার বলিল—

—সব আপন আপন মনিবের কাছে যা, গিয়ে বল—দুটো করে বাঁশ, দশ গণ্ডা করে খড়, পাঁচ-সাত দিনের মত খোরাকি আমাদের দিতে হবে। ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের কাছে একটা দরখাস্ত দিতে হবে—আমি লিখে রাখছি, ও বেলায় গিয়ে সব টিপসই দিয়ে আসবি।

সতীশ বাউড়ি বলিল—

—আজ্ঞে সায়েবের কাছে—

—হ্যাঁ, সায়েবের কাছে—

—শেষে, আবার কি-না কি ফ্যাসাদ হবে মশায়!

—ফ্যাসাদ কিসের রে? জেলার কর্তা, প্রজার সুখ-দুঃখের ভার তাঁর ওপর।

—আজ্ঞে, কনেস্টবল-দারোগা-থানা-পুলিস টানাহ্যাঁচড়া-কৈফেত—সে মশায় হাজার হাঙ্গামা!

ডাক্তার এবার ভীষণ চটিয়া গেল। এই হিতৈষণা উপলক্ষ করিয়া ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের সহিত পরিচিত হওয়ার একটা প্রবল বাসনা তাহার ছিল। সাহেব-সুবোরা কঙ্কণার বাবুদেরই চেনে, তাই সে চটিয়া বলিল—

—তবে মর্ গে তোরা, পচে মর্ গে। হারামজাদা মুখ্যুর দল সব।

ঠিক এই মুহূর্তে বৃদ্ধ দ্বারকা চৌধুরী সম্মুখে আসিয়া উপস্থিত হইল। ডাক্তার বলিল—

—দেখুন না, বেটাদের মুখ্যুমি। বলছি, ম্যাজিস্ট্রেট সায়েবের কাছে একটা দরখাস্ত কর্। তা, বলছে কি জানেন? বলছে—থানা-পুলিস-ফাঁসাদ সায়েব সুবো! বেজায় হাঙ্গামা।

চৌধুরী বলিল—

—তা, মিছে বলে নাই—এর জন্যে আর সায়েব-সুবো কেন ভাই? গাঁয়ের পাঁচজনের কাছ থেকেই তো ওদের কাজ হয়ে যাবে! ধর, আমি ওদের প্রত্যেককে দু’গণ্ডা ক’রে খড় দোব, পাঁচটা বাঁশ দোব।

অপরাহ্ণে সকলে দল বাঁধিয়া ডাক্তারের কাছে হাজির হইল। ডাক্তার জিজ্ঞাসা করিল—

—পাতু কই, পাতু?

—পাতু আজ্ঞে আসবে না। সে মশাই গাঁয়েই থাকবে না বলছে। উপার জংশনে গিয়ে থাকবে। (সতীশ বলিল)

দলের পিছনে ছিল দূর্গা, সে ফোড়ন কাটিয়া উঠিল—

—সে যদি উঠেই যায় গাঁ থেকে, তাতে নোকের কি শুনি? সে যদি চলেই যায়—তাতে তো ভাল হবে তোদেরই। ভিক্ষেয় ভাগ তোদের মোটা হবে।

—থাম, থাম দূর্গা। (জগন ডাক্তার ধমক দিল)

—ওই! এই দূর্গা, টিপ-সই দিয়ে যা! তা হলে কিন্তু সরকারী টাকার কিছুই পাবি না তুই।

—আমি টিপ সই দিতে আসি নাই গো। গতর থাকতে ভিখ মাঙব ক্যানে? গলায় দড়ি। (দূর্গা মুখ মুচকাইয়া বলিল)

পথে দূর্গা দেখিল বাশবনের আড়ালে শ্রীহরি পাল দাড়াইয়া আছে। দূর্গা হাসিয়া বলিল—

—টাকা চাই! এই এতগুলি! ঘর করব। বুঝেছ?

—কিসের দরখাস্ত হচ্ছে রে? (শ্রীহরি প্রশ্ন করিল)

—ম্যাজিস্ট্রেট সায়েবের কাছে। ঘর পুড়ে গিয়েছে—তাই।

শ্রীহরি শুনিবামাত্র অকারণে চমকিয়া উঠিল, পরক্ষণেই মুখখানা ভয়ঙ্কর করিয়া চাপা গলায় বলিল—

—তাই আমাকে সুবু করে দরখাস্ত করছে বুঝি শালা ডাক্তার? শালাকে—

দূর্গা অপরাধীকে চিনিয়া ফেলিল এবং বলিল—

—হ্যাঁ গো, তুমিই যে দিয়েছ আগুন!

—কে বললে দিয়েছি? তুই দেখেছিস? (শ্রীহরি হাসিয়া বলিল)

—ঠাকুর ঘরে কে রে? না, আমি তো কলা খাই নাই। সেই বৃত্তান্ত। হ্যাঁ দেখেছি বৈকি আমি।

—চুপ কর, এতগুলো টাকাই দোব আমি।

দূর্গা আর উত্তর করিল না। ঠোঁট বাকাইয়া বিচিত্র দৃষ্টিতে মুহূর্তের জন্য চাহিয়া দেখিয়া আপন পথে চলিয়া গেল।


আট



দূর্গা বেশ সুশ্রী সুগঠন মেয়ে। তাহার দেহবর্ণ পর্যন্ত গৌর, যাহা তাহাদের স্বজাতির পক্ষে যেমন দুর্লভ তেমনি আকস্মিক। ইহার উপর দূর্গার রূপের মধ্যেও এমন একটা বিস্ময়কর মাদকতা আছে, যাহা সাধারণ মানুষের মনকে মুগ্ধ করে মত্ত করে—দুর্নিবারভাবে কাছে টানে।

পাতু নিজেই দ্বারকা চৌধুরীকে বলিয়াছিল—আমার মা-হারামজাদীকে তো জানেন? হারামজাদীর স্বভাব আর গেল না।

দূর্গার রূপের আকস্মিকতা পাতুর মায়ের সেই স্বভাবের জীবন্ত প্রমাণ।

এই স্বভাব দমনের জন্য কোন কঠোর শাস্তি বা পরিবর্তনের জন্য কোন আদর্শের সংস্কার ইহাদের সমাজে নাই। অল্পস্বল্প উচ্ছৃঙ্খলতা, স্বামীরা পর্যন্ত দেখিয়াও দেখে না। বিশেষ করিয়া উচ্ছৃঙ্খলতার সহিত যদি উচ্চবর্ণের সচ্ছল অবস্থার পুরুষ জড়িত থাকে তাহা হইলে তো তাহারা বোবা হইয়া যায়। কিন্তু দূর্গার উচ্ছৃঙ্খলতা সে-সীমাকেও অতিক্রম করিয়া গিয়াছে! সে দুরন্ত স্বেচ্ছাচারিণী; ঊর্ধ্ব বা অধঃলোকের কোন সীমাকেই অতিক্রম করিতে তাহার দ্বিধা নাই। নিশীথ রাত্রে সে কঙ্কণার জমিদারের প্রমোদভবনে যায়, ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্টকে সে জানে; লোকে বলে দারোগা, হাকিম পর্যন্ত তাহার অপরিচিত নয়। সেদিন ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের ভাইস-চেয়ারম্যান মুখার্জী সাহেবের সহিত সে গভীর রাত্রে পরিচয় করিয়া আসিয়াছে, দফাদার শরীররক্ষীর মত সঙ্গে সঙ্গে গিয়াছিল। দূর্গা ইহাতে অহঙ্কার বোধ করে, নিজেকে স্বজাতীয়দের অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ মনে করে; নিজের কলঙ্ক সে গোপন করে না। এ স্বভাবের জন্য লোকে দায়ী করে তাহার মা নাকি কন্যাকে স্বামী পরিত্যাগ করাইয়া এই পথ দেখাইয়া দিয়াছে। কিন্তু দায়ী তাহার মা নয়। তাহার বিবাহ হইয়াছিল কঙ্কণায়। দূর্গার শাশুড়ী কঙ্কণার এক বাবুর বাড়ীতে ঝাড়ুদারণীর কাজ করিত। একদিন শাশুড়ীর অসুখ করিয়াছিল—দূর্গা গিয়াছিল শাশুড়ীর কাজে। বাবুর বাড়ীর চাকরটা সকল কাজের শেষে তাহাকে ধমক দিয়া বাবুর বাগানবাড়ী ঝাঁট দিবার জন্য একটা নির্জন ঘরে ঢুকাইয়া দিয়াছিল। ঘরটা কিন্তু নির্জন ছিল না। ঘরের মধ্যে ছিলেন স্বয়ং গৃহস্বামী বাবু। সন্ত্রস্ত হইয়া দূর্গা ঘোমটা টানিয়া দরজার দিকে ফিরিল, কিন্তু একি? এ যে বাহির হইতে দরজা কে বন্ধ করিয়া দিয়াছে।

ঘণ্টাখানেক পরে সে কাপড়ের খুঁটে-বাধা পাঁচ টাকার একখানি নোট লইয়া বাড়ী ফিরিল। আতঙ্কে, অশান্তিতে ও গ্লানিতে এবং সেই সঙ্গে বাবুর দুর্লভ অনুগ্রহ ও এই অর্থপ্রাপ্তির আনন্দে পথ ভুল করিয়া, সেই পথে পথেই সে পলাইয়া আসিয়াছিল আপন মায়ের কাছে। কারণ সে বাবুর কাছে শুনিয়াছিল এই যোগসাজশটি তাহার শাশুড়ীর। সব শুনিয়া মায়ের চোখেই বিচিত্র দৃষ্টি ফুটিয়া উঠিয়াছিল; একটা উজ্জ্বল আলোকিত পথ সহসা যেন তাহার চোখের সম্মুখে উদ্ভাসিত হইয়া উঠিল—সেই পথই সে কন্যাকে দেখাইয়া দিয়া বলিল, যাক আর শ্বশুরবাড়ী যেতে হবে না। তাহার পর হইতে দূর্গা সেই পথ ধরিয়া চলিয়াছে। সেই পথেই আলাপ হইয়াছে ছিরু পালের সঙ্গে।

ছিরু পালের সহিত দূর্গার আলাপ অনেক দিনের; কিন্তু সম্বন্ধটা একান্তভাবে দেওয়া-নেওয়ার সীমার মধ্যেই গণ্ডীবদ্ধ। তাহার প্রতি এতটুকু কোমলতা কোনদিন্ তাহার ছিল না। আজ এই নূতন আবিষ্কারে তাহার প্রতি দূর্গার দারুণ ঘৃণা ও আক্রোশ জন্মিয়া গেল। পাতুর সহিত তাহার যতই বিরোধ থাক, জাতি-জ্ঞাতিদের যতই সে হীন ভাবুক—আজ তাহাদের জন্য সে মমতাই অনুভব করিল। সারাপথ সে কেবলি ভাবিতে লাগিল—ছিরু পালের মদের সঙ্গে গরুমারা-বিষ মিশাইয়া দিলে কেমন হয়?

—ডাক্তার কি বললে, গাছ বেচবে? —প্রশ্নটা করিল দূর্গার মা। চিন্তা করিতে করিতে দূর্গা কখন যে আসিয়া বাড়ী পৌছিয়াছে—খেয়াল ছিল না।

সচকিত হইয়া দূর্গা উত্তর দিল—না।

—বেচবে না?

—জিজ্ঞাসা করি নাই।

—মরণ! গেলি ক্যানে তবে ঢং করে?

দূর্গা একবার কেবল তির্ধক তীব্র দৃষ্টিতে মায়ের দিকে চাহিল, কথার কোন জবাব দিল না। হয়তো কোন প্রয়োজন বোধ করিল না।

কন্যার দেহবিক্রয়ের অর্থে যে মা বাঁচিয়া থাকে তাহার কাছে এ তীব্র দৃষ্টির শাসন অলঙ্ঘনীয়। দূর্গার চোখের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দেখিয়া মা সঙ্কুচিত হইয়া চুপ করিয়া গেল; কিছুক্ষণ পর আবার বলিল—

—হাম্‌দু শেখ পাইকার এসেছিল।

দূর্গা এবারও কথার উত্তর দিল না।

মা আবার বলিল—আবার আসবে, ধর্মরাজতলায় পাড়ার নোকের সঙ্গে কথা কইছে।

দূর্গা এবার বলিল—ক্যানে? কি দরকার তার? আমি বেচব না গরু ছাগল। দূর্গার একপাল ছাগল আছে, কয়েকটা গাই এবং একটা বলদ-বাছুরও আছে।

হাম্‌দু শেখ পাইকার গরু-বাছুর কেনা-বেচা করিয়া থাকে। সুতরাং অগ্নিকাণ্ডের খবর পাইয়া শেখ নিজেই ছুটিয়া এ-পাড়ায় আসিয়াছে। এখন এই পাড়ার অনেকে ছাগল-গরু বেচিবে। এ পাড়ায় সে ছাগল-গরু কেনে, প্রয়োজন হইলে চার আনা আট আনা হইতে দু’চার টাকা পর্যন্ত অগ্রিমও দেয়। পরে ছাগল-গরু লইয়া টাকাটা সুদ সমেত শোধ লইয়া থাকে। আজও সে আসিয়াছে ছাগল-গরু কিনিতে, দু’একজনকে অগ্রিমও দিবে, এত বড় বিপদে এই দারুণ প্রয়োজনের সময় ইহাদের জন্য হাম্‌দু কর্জ করিয়া টাকা লইয়া আসিয়াছে। দূর্গার পালিত বলদ-বাছুরটার জন্য হাম্‌দু অনেকদিন হইতে তোষামোদ করিতেছে কিন্তু দূর্গা বেচে নাই। আজ সে আবার আসিয়াছে এবং দূর্গার মাকে গোপনে চার আনা পয়সাও দিয়াছে। সওদা হইলে, পশ্চিম মুখে দাঁড়াইয়া আরও চার আনা দিবার প্রতিশ্রুতিও হাম্‌দু দিয়াছে। মেয়ের কথাটা মায়ের মোটেই ভাল লাগিল না—খানিকটা ঝাঁজ দিয়া বলিল—বেচবি না তো, ঘর কিসে হবে শুনি?

—তোর বাবা টাকা দেবে বুঝলি হারামজাদী। আমি আমার শাঁখাবাঁধা বেচব। দূর্গা দুই চারিখানা সোনার গহনাও গড়াইয়াছে; অত্যন্ত সামান্য অবশ্য কিন্তু তাহাই ইহাদের পক্ষে স্বপ্ন-সাফল্যের কথা।

দূর্গার মা এবার বিস্ফোরক বস্তুর মত ফাটিয়া পড়িবার উপক্রম করিল। কিন্তু দূর্গা তাহাতে দমিবার মেয়ে নয়, সে জিজ্ঞাসা করিল—ক’আনা নিয়েছিস হাম্‌দুর কাছে? আমি কিছু বুঝি না মনে করেছিস! ধান-চালের ভাত আমি খাই না, লয়?

বিস্ফোরণের মুখেই দূর্গার মা প্রচণ্ড বর্ষণে যেন ভিজিয়া নিষ্ক্রিয় হইয়া পড়িল। সে অকস্মাৎ কাঁদিতে আরম্ভ করিল, প্যাটের মেয়ে হয়ে তু এত বড় কথাটা আমাকে বললি!

দূর্গা গ্রাহ্য করিল না, বলিল—থাক, ঢের হয়েছে। এখন দাদা কোথায় গেল বলতে পারিস? বউটাই বা গেল কোথায়?

মা আপন মনেই বিলাপ করিয়া কাঁদিতে আরম্ভ করিল, দূর্গার প্রশ্নের উত্তর তাহার মধ্যেই ছিল—গত্যে আমার আগুন ধরে দিতে হয় রে! নেকনে আমার পাথর মারতে হয় রে! জ্যান্তে আমায় দগ্ধে দগ্ধে মারলে রে! যেমন বেটা তেমনি বিটী রে! বিটী বলছে চোর। আর বেটা হল দ্যাশের বার! দ্যাশের লোক তালপাতা কেটে আপন আপন ঘর ঢাকলে, আর আমার বেটা গাঁ ছেড়ে চললো। মরুক, মরুক ড্যাকরা—এই অঘ্রাণের শীতে সান্নিপাতিকে মরুক!

এবার অত্যন্ত রূঢ়স্বরে দূর্গা বলিল—বলি, রান্না-বান্না করবি, না, প্যান প্যান করে কাঁদবি? পিণ্ডি গিলতে হবে না?

—না, মা রে; আর পিণ্ডি গিলব না, মা রে; তার চেয়ে আমি গলায় দড়ি দোব যে। দূর্গার মা বিনাইয়া বিনাইয়া জবাব দিল।

দূর্গা মুখে কিছু বলিল না, উঠিয়া ঘরের ভিতর হইতে একগাছা গরুবান্ধা দড়ি লইয়া মায়ের কোলের কাছে ফেলিয়া দিয়া বলিল, লে, তাই দেগা গলায়, যা! তারপর সে পাড়ার মধ্যে চলিয়া গেল আগুনের সন্ধানে।

হরিজন পল্লীর মজলিশের স্থান—এই ধর্মরাজ ঠাকুরের বকুলগাছতলা। বহুদিনের প্রাচীন বকুলগাছটি পত্রপল্লবে পরিধিতে বিশাল; কাণ্ডটার অনেকাংশ শূন্যগর্ভ এবং বহুকাল পূর্বে কোন প্রচণ্ড ঝড়ে অর্ধোৎপাটিত ও প্রায় ভূমিশায়ী হইয়া পড়িয়া আছে, কিন্তু বিস্ময়ের কথা, সেই গাছ আজও বাঁচিয়া আছে। ইহা নাকি ধর্মরাজের আশ্চর্য মহিমা! এমন শায়িত অবস্থায় কোথায় কোন্ গাছকে কে জীবিত দেখিয়াছে? গাছের গোড়ায় স্তূপীকৃত মাটির ঘোড়া; মানত করিয়া লোকে ধর্মরাজকে ঘোড়া দিয়া যায়, বাবা বাত ভাল করিয়া থাকেন। আশপাশের ছায়াবৃত স্থানটি বারোমাস পরিচ্ছন্নতায় তকতক করে। পল্লীর প্রত্যেকে প্রতি প্রভাতে একটি করিয়া মাড়ুলী দিয়া যায়, সেই মাড়ুলীগুলি পরস্পরের সহিত যুক্ত হইয়া—গোটা স্থানটাই নিকানো হয়। হাম্‌দু শেখ সেইখানে বসিয়া পল্লীর লোকজনের সঙ্গে গরু-ছাগল সওদার দরদস্তুর করিতেছিল। পাঁচ-সাতটা ছাগল, দুইটা গরু অদূরে বাঁধিয়া রাখিয়াছে; সেগুলি কেনা হইয়া গিয়াছে।

পুরুষেরা সকলেই গিয়াছে জগন ডাক্তারের ওখানে। হাম্‌দুর কারবার চলিতেছে মেয়েদের সঙ্গে। মেয়েরা কেহ মাসী, কেহ পিসী, কেহ দিদি, কেহ চাচী, কেহ বা ভাবী! হাম্‌দু একটা খাসী লইয়া এক বাউড়ী ভাবীর সঙ্গে দর করিতেছিল—ইহার গায়ে কি আছে, তুই বল ভাবী, সেরেফ খালটা আর হাড় ক’খানা। পাঁচ সের গোস্তও হবে না ইয়াতে। জোর সের তিনেক হবে। ইয়ার দাম পাঁচ সিকা বলেছি—কি অন্যায় বলেছি বল? পাঁচজনা তো রয়েছে—বলুক পাঁচজনায়। আর এই অসময়ে লিবেই বা কে বল? গরজ এখন তুর, না, গরজ পরের, তু বুঝ কেনে—বলিতে বলিতেই সে চীৎকার করিয়া ডাকিল—ও দুগ্‌গা দিদি, শুন গো শুন। তোর বাড়ী পাঁচবার গেলাম। শুন্‌—শুন্‌!

দূর্গা আগুনের সন্ধানেই পাড়ায় বাহির হইয়াছিল, সে দূর হইতেই বলিল—বেচব না আমি।

—আরে না বেচিস, শুন শুন। তুকে বেচতে আমি বলি নাই।

—কি বলছ বল? —দূর্গা আগাইয়া আসিয়া দাঁড়াইল।

—আরে বাপ রে! দিদি যে একেবারে ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে আলি গো।

—তাই বটে। ফিরে গিয়ে আমাকে রাঁধতে হবে। কি বলছ বল?

—ভাল কথাই বলছি ভাই; বলছি ঘরে টিন দিবি? সন্ধানে আমার সস্তায় টিন আছে।

—টিন?

—হ্যাঁ গো! একেবারে নতুন! কলওয়ালারা বেচবে, কিনবি? একেবারে নিশ্চিন্তি। দেখ। গোটা চল্লিশ-পঞ্চাশ টাকা।

দূর্গা কয়েক মুহূর্ত ভাবিল। মনশ্চক্ষে দেখিল তাহার ঘরের উপর টিনের আচ্ছাদন—রোদের ছটায় রূপার পাতের মত ঝকমক করিতেছে। কিন্তু পরমুহূর্তেই সে আত্মসংবরণ করিয়া বলিল—উহু! না।

—তুর টাকা না থাকে আমাকে ইয়ার পরে দিস। ছ’মাস, এক বছর পরে দিস।

দূর্গা হাসিয়া ঘাড় নাড়িয়া বলিল—উহু! ও বলদের নামে তুমি হাত ধোও, হাম্‌দু ভাই। ও আমি এখন দু’বছর বেচব না।—বলিয়া দেহের একটা দোলা দিয়া চলিয়া গেল।

আগুন লইয়া বাড়ী ফিরিয়া দূর্গা দেখিল—দড়িগাছটা সেইখানেই পড়িয়া আছে, মা সেটা স্পর্শ করে নাই। উনানে আগুন দিয়া এখন সে পাতুর সঙ্গে বচসায় নিযুক্ত। বড় বড় দুই বোঝা তালপাতা উঠানে ফেলিয়া পাতু হাঁপাইতেছে এবং মায়ের দিকে ক্রুদ্ধ বাঘের মত চাহিয়া আছে। পাতুর বউ কাঠকুটা কুড়াইয়া জড় করিতেছে, রান্না চড়াইবে।

দূর্গা বিনা ভূমিকায় বলিল, বউ, রান্না আর করতে হবে না। আমিই রাঁধছি, একসঙ্গেই খাব সব।

পাতু দূর্গার দিকে চাহিয়া বলিল—দেখ দুগ্‌গা দেখ! মায়ের মুখ দেখ! যা মন চায় তাই বলছে! ভাল হবে না কিন্তুক!

—তা আমিই বা কি করব বল? এতক্ষণ তো আমার সঙ্গেই লেগেছিল। মা যে! পেটে ধরেছে মাথা কিনেছে! তাড়িয়ে দিতেও নাই, খুন করতেও নাই—মারধোর করলেও পাপ।

—একশো বার। তোর কথার কাটান নাই কিন্তুক, ই গাঁয়ে থাকব কি সুখে বল দেখি?

—সত্যিই তু উঠে যাবি নাকি? হ্যাঁ দাদা? ভিটে ছেড়ে উঠে যাবি?

পাতু কিছুক্ষণ চুপ করিয়া রহিল। তারপর বলিল—তাতেই তো আবার এই অবেলাতে তালপাতা কেটে আনলাম দুগ্‌গা! নইলে—জংশনে কলে কাম-কাজ, থাকবার ঘর সব ঠিক করে এসেছিলাম দুপুরবেলাতে।

দু’হাত ছাঁদাছাঁদি করিয়া তাহারই মধ্যে মাথা গুঁজিয়া পাতু মাটির দিকে চাহিয়া বসিয়া রহিল।

দূর্গা বলিল, ওঠ। ওই দেখ, ক’খানা লম্বা বাঁশ রয়েছে আমার, ওই ক’খানা চাপিয়ে তালপাতা দিয়ে ঘরখানা ঢাক। পিতি-পুরুষের ভিটে ছেড়ে কেউ কখনও যায় নাকি? তুই চালে উঠ, আমি আর বউ দু’জনাতে তুলে দিচ্ছি সব।

একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া পাতু উঠিল। দূর্গা কাপড়ের আঁচল কোমরে আঁট-সাঁট করিয়া বাঁধিয়া বলিল, এই গাদা সতীশ। সতীশ বাউড়ী রে! মিনসে জগন ডাক্তারকে বলছে—পাতু বায়েন বড় নোক, ব্যালেস্টার, উকীল! তা আমি বললাম—আহা, তোমার মুখে ফুলচন্দন পড়ুক! বলে—বড়-নোক; গাঁ ছেড়ে উঠে চলে যাবে। ওরা যায় তো, তোদিগে ভিটে দানপত্তর লিখে দিয়ে যাবে! তোরা ভোগ করবি!

বিড়ালীর মত হৃষ্টপুষ্ট পাতুর বউটা খুব খাটিতে পারে, খাটো পায়ে দ্রুতগতিতে লাটিমের মত পাক দিয়ে ফেরে। সে ইহারই মধ্যে বাঁশগুলাকে টানিয়া আনিয়া উঠানে ফেলিয়াছে।


নয়



গোটা পাড়াটা পোড়াইয়া দিবার অভিপ্রায় শ্রীহরির ছিল না। কিন্তু যখন পুড়িয়া গেলই, তখন তাহাতেও বিশেষ আফসোস তাহার হইল না। পুড়িয়াছে, বেশ হইয়াছে, মধ্যে মধ্যে এমন ধারায় বিপর্যয় ঘটিলে তবে ছোটলোকের দল সায়েস্তা থাকে। ক্রমশঃ বেটাদের আস্পর্ধা বাড়িয়া চলিতেছিল। তাহার উপর দেবু ঘোষ ও জগন ডাক্তারের উস্কানিতে তাহারা লাই পাইতেছিল। হাতের মারে কিছু হয় না, ভাতের মার—অর্থাৎ ভাতে বঞ্চিত করিতে পারিলেই মানুষ জব্দ হয়। বাঘ যে বাঘ, তাহাকে খাঁচায় পুরিয়া অনাহারে রাখিয়া মানুষ তাহাকে পোষ মানায়।

এ সব বিষয়ে তাহার গুরু ছিল দূর্গাপুরের স্বনামধন্য ত্রিপুরা সিং। দূর্গাপুর এখান হইতে ক্রোশ দশেক দূর। শ্রীহরির মাতামহের বাড়ী ওই দূর্গাপুরে। তাহার মাতামহ ত্রিপুরা সিংয়ের চাষবাসের তদ্বিরকারক ছিল। বাল্যকালে শ্রীহরি মাতামহের ওখানে যখন যাইত, তখন সে ত্রিপুরা সিংকে দেখিয়াছে। লম্বাচওড়া দশাশয়ী চেহারা। জাতিতে রাজপুত। প্রথম বয়সে ত্রিপুরা সিং সামান্য ব্যক্তি ছিল। সম্পত্তি ছিল, মাত্র কয়েক বিঘা জমি। সেই জমিতে সে পরিশ্রম করিত অসুরের মত। আর স্থানীয় জমিদারের বাড়ীতে লক্ষ্মীর কাজ করিত। আরও করিত তামাকের ব্যবসা। হাতে লাঠি ও মাথায় তামাকের বোঝা লইয়া গ্রাম-গ্রামান্তরে ফেরি করিয়া বেড়াইত; ক্রমে শুরু করে মহাজনী। সেই মহাজনী হইতে প্রথমত বিশিষ্ট জোতদার, অবশেষে তাহার মনিব জমিদারের জমিদারির খানিকটা কিনিয়া ছোটখাটো জমিদার পর্যন্ত হইয়াছিল। ত্রিপুরা সিংয়ের দাড়ি ছিল, বড় শখের দাড়ি, সেই দাড়িতে গালপাট্টা বাঁধিয়া গোঁফে পাক দিতে দিতে সে বলিত, শ্রীহরি নিজের কানে শুনিয়াছে, সে ছেলেবেলায়—‘এহি গাঁও হমি তিন-তিনবার পুড়াইয়েসি তব না ই-বেটালোক হমাকে আমল দিল!’

হা-হা করিয়া হাসিয়া সিং বলিত ‘এক এক দফে ঘর পুড়ল আর বেটা লোক টাকা ধার নিল। যে বেটা প্রথম দফে কায়দা হইল নাই—সে দু’ দফে হইল, দু’ দফেও যারা আইল না তারা আইল তিন দফের দফে। পাওয়ের পর গড়িয়ে পড়ল।’ এই সব কথা বলিতে তাহার এতটুকু দ্বিধা হইত না। বলিত—বড় বড় জমিদারের কুষ্ঠী-ঠিকুজী নিয়ে এস, দেখবে সবাই ওই করেছে। আমার ঠাকুরদা ছিল রত্নগড়ের জমিদার বাড়ীর পোষা ডাকাত। বাবুদের ডাকাতি ছিল ব্যবসা। সীতানগরের চাটুজ্জে বাবুরা সেদিন পর্যন্ত ডাকাতির বামাল সামাল দিয়েছে।

সিং নিজে যে কথাগুলি বলে নাই অথবা সিংয়ের মুখ হইতে ইতিহাসের যে অংশ শুনিবার শ্রীহরির সুযোগ-সৌভাগ্য ঘটে নাই, সে অংশ শ্রীহরিকে শুনাইয়াছে তাহার মাতামহ। রাত্রিতে খাওয়া-দাওয়ার পর তামাক খাইতে খাইতে বৃদ্ধ নিজের নাতিকে সে সব অতীতের কথা বলিত। ত্রিপুরা সিংয়ের শক্তির কাহিনী, সে একেবারে রূপকথার মত; ত্রিপুরা সিংয়ের জমির পাশেই ছিল সে গ্রামের বহুবল্লভ পালের একখানা আউয়ল জমি—মাত্র কাঠাদশেক তাহার পরিমাণ। সিং ওই জমিটুকুর জন্য, একশো টাকা পর্যন্ত দাম দিতে চাহিয়াছিল। কিন্তু বহুবল্লভের দুর্মতি ও অতিরিক্ত মায়া। সে কিছুতেই নেয় নাই! শেষ বর্ষার সময় একদিন রাত্রে সিং নিজে একা কোদাল চালাইয়া দুইখানা জমিকে কাটিয়া আকারে-প্রকারে এমন এক অখণ্ড বস্তু করিয়া তুলিল যে, পরদিন বহুবল্লভ নিজেই ধরিতে পারিল না, দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে কোথায় কোন্খানে ছিল তাহার জমির সীমানার চারিটি কোণ। বহুবল্লভ মামলা করিয়াছিল। কিন্তু মামলাতে বহুবল্লভ তো পরাজিত হইলই উপরন্তু কয়েকদিন পর বহুবল্লভের তরুণী-পত্নী ঘাটে জল আনিতে গিয়া আর ফিরিল না। ঘাটের পথে সন্ধ্যার অন্ধকারে কে বা কাহারা তাহাকে মুখে কাপড় বাঁধিয়া কাঁধে তুলিয়া লইয়া গেল।

বৃদ্ধ চুপি চুপি বলিত—মেয়েটা এখন বুড়ো হয়েছে, সিংজীর বাড়ীতে ঝিয়ের কাজ করে। একটা নয়, এমন মেয়ে সিংজীর বাড়ীতে পাঁচ-সাতটা।

ত্রিপুরা সিংয়ের বিষয়বুদ্ধি, দূরদৃষ্টির বিষয়েও শ্রীহরির মাতামহের শ্রদ্ধার অন্ত ছিল না। বলিত—সিংজী লক্ষ্মীমন্ত পুরুষ, কি বিষয়বুদ্ধি! জমিদারের বাড়ীতে লক্ষ্মীগিরি করতে করতেই বুঝেছিল—এ বাড়ীর আর প্রতুল নাই। লাটের খাজনা মহল থেকে আসে কিন্তু খাজনা দাখিলের সময় আর টাকা থাকে না। সিংজী তখন নিজে টাকা ধার দিতে লাগল। যখন যা দরকার হয়েছে, ‘না’ বলে নাই, দিয়েছে। তারপর সুদে-আসলে ধার হ্যান্ডনোট পালটে পালটে শেষ মেশ যখন নিজের কাছে না থাকলে আট আনা সুদে কর্জ করে এনে এক টাকা সুদে বাবুদিগে চেপে ধরলে টাকার লেগে, তখন বাবুদের জমিদারিই ঘরে ঢুকল। ক্ষ্যাণজন্মা লক্ষ্মীমন্ত পুরুষ! বলিয়া সে তাহার মনিবের উদ্দেশে প্রণাম করিত।

শ্রীহরির বাপ ছিল কৃতী চাষী। দৈহিক পরিশ্রমে মাথার ঘাম পায়ে ফেলিয়া পতিত জমি ভাঙিয়া উৎকৃষ্ট জমি তৈয়ারী করিয়াছিল। শ্রম ও সঞ্চয় করিয়া বাড়ির উঠানটি ধানের মরাইয়ে মরাইয়ে একটি মনোরম শ্রীভবনে পরিণত করিয়া তুলিয়াছিল। বাপের মৃত্যুর পর শ্রীহরি যখন এই সম্পদ হাতে পাইল তখন তাহার মনে পড়িল মাতামহের স্বনামধন্য মনিব ত্রিপুরা সিংকে। মনে মনে তাহাকেই আদর্শ করিয়া সে জীবন-পথে যাত্রা সুরু করিল।

পরিশ্রমে তাহার এতটুকু কার্পণ্য নাই; তাহার বিনিময়ে ফসলও হয় প্রচুর। সেই ফসল সে বাপের মত কেবল বাঁধিয়াই রাখে না, সুদে ধার দেয়। শতকরা পঁচিশ হইতে পঞ্চাশ পর্যন্ত সুদে ধানের কারবার। একমণ ধান ধার দিলে বৎসরান্তে একমণ দশ সের বা দেড়মণ হইয়া সে ধান ফিরিয়া আসে। অবশ্য এটা শ্রীহরির জুলুম নয়। সুদের এই হারই দেশে প্রচলিত। প্রচলনের অভ্যাসে খাতকও এ সুদকে অতিরিক্ত মনে করে না বরং অসময়ে অন্ন দেয় বলিয়া মহাজন তাহার কাছে শ্রদ্ধার পাত্র।

শ্রীহরিকেও লোকে খাতির করে না এমন নয়; কিন্তু শ্রীহরি তাহা পর্যাপ্ত বলিয়া মনে করে না। সে অনুভব করে, লোকে ওই মৌখিক শ্রদ্ধার অন্তরালে তাহাকে ঈর্ষা করে, তাহার ধ্বংস কামনা করে। তাই এক এক সময়ে তাহার মনে হয়, সমস্ত গ্রামখানাতেই সে আগুন লাগাইয়া লোকগুলাকে সর্বহারা করিয়া দেয়।

পথ চলিতে চলিতে জগন ডাক্তারের মত এবং অনিরুদ্ধের মত শত্রুর ঘর নজরে পড়িলে বিদ্যুচ্চমকের মত তাহার ওই দুরন্ত অবাধ্য ইচ্ছাটা অন্তরে জাগিয়া উঠে। কিন্তু ত্রিপুরা সিংয়ের মত দুর্দান্ত সাহস তাহার নাই। সে আমলও যে আর নাই! ত্রিপুরা সিং যে ইচ্ছা পরিপূর্ণ করিতে পারিত, আমলের চাপে শ্রীহরিকে সে ইচ্ছা দমন করিতে হয়। তাছাড়া শ্রীহরির অন্যায়-বোধ কালের পার্থক্যে ত্রিপুরা সিংয়ের চেয়ে কিছু বেশী।

এই অন্যায় বোধ ত্রিপুরা সিংয়ের চেয়ে তাহার বেশী বলিয়াই সে বারবার আপনার মনেই গত রাত্রের কাণ্ডটার জন্য নানা সাফাই গাহিতেছিল। বহুক্ষণ বসিয়া থাকিয়া সে অকস্মাৎ উঠিল। এই ভস্মীভূত পাড়াটার দিকেই সে চলিল। যাইতে যাইতেও বার কয়েক সে ফিরিল। কেমন যেন সঙ্কোচ বোধ হইতেছিল। অবশেষে সে নিজের রাখালটার বাড়ীটাকেই একমাত্র গন্তব্যস্থল স্থির করিয়া অগ্রসর হইল। তাহার বাড়ীর রাখাল, সে তাহার চাকর, এ বিপদে তাহার তল্লাস করা যে অবশ্য কর্তব্য। কার সাধ্য তাহাকে কিছু বলে, আপনার মনেই সে প্রকাশ্যভাবে চীৎকার করিয়া উঠিল—এ্যাঁও!

বোধ করি যে তাহাকে কিছু বলিবে—তাহাকে সে পূর্ব হইতেই ধমকটা দিয়া রাখিল। আসলে সে তাহার মনেই ওই অবাধ্য বৃত্তি উদ্ভূত সঙ্কোচকে একটা ধমক দিল।

রাখালটা মনিবকে যমের মত ভয় করে। ছিরু আসিয়া দাঁড়াইতেই সে ভাবিল আজিকার গরহাজিরের জন্যই পাল তাহার ঘাড় ধরিয়া লইয়া যাইতে আসিয়াছে। ছেলেটা ডুকরিয়া কাঁদিয়া উঠিল—ঘর পুরে গেইছে মশাই—তাতেই—

পুড়িয়া যাওয়ার পর এই গরীব পাড়াটার অবস্থা স্বচক্ষে দেখিয়া শ্রীহরি মনে মনে খানিকটা লজ্জাবোধ না করিয়া পারিল না। সে সস্নেহে ছেলেটাকে বলিল—কাঁদিস কেনে? দৈবের ওপর তো হাত নাই। কি করবি বল? কেউ তো আর আগুন লাগিয়ে দেয় নাই।

রাখালটার বাপ বলিল,—তা কে আর দেবে মশাই—কেনেই বা দেবে? আমরা কার কি করেছি বলেন যে ঘরে আগুন দেবে!

শ্রীহরি চুপ করিয়াই পোড়া ঘরগুলার দিকেই চাহিয়া রহিল। তাহার পায়ের তলার মাটি যেন সরিয়া যাইতেছে।

রাখালটার বাপ আবার বলিল,—ছোটনোকদের কাণ্ড, শুকনো পাতাতে আগুন ধরে গেইছে আর কি! আর তা ছাড়া মশাই, বিধাতাই আমাদের কপালে আগুন লাগিয়ে রেখেছে।

শুষ্ক কণ্ঠে শ্রীহরি বলিল, এক কাজ কর। যা খড় লাগে আমার বাড়ী থেকে নিয়ে আয়। বাঁশ কাঠ যা লাগে নিবি আমার কাছে। ঘর তুলে ফেল। তারপর রাখালটার দিকে চাহিয়া বলিল—বাড়ীতে গিয়ে চাল নিয়ে আয় দশ সের। কাল বরং ধান নিবি, বুঝলি!

রাখালটার বাপ এবার শ্রীহরির পায়ে একরকম গড়াইয়া পড়িল।

ইহারই মধ্যে আরও জন দুয়েক আসিয়া দাঁড়াইয়াছিল; একজন হাত জোড় করিয়া বলিল—আমাদিগে যদি কিছু করে ধান দিতেন ঘোষ মশায়।

—ধান?

—আজ্ঞে, তা না হলে তো উপোস করে মরতে হবে মশায়।

—আচ্ছা, পাঁচ সের ক’রে চাল আজ ঘর-পিছু আমি দেব। সে আর শোধ দিতে হবে না। আর ধানও অল্প অল্প দোব কাল। কাল বার আছে ধানের। আর—

—আজ্ঞে—

—দশগণ্ডা করে খড়ও আমি দোব প্রত্যেককে। বলে দিস পাড়াতে।

—জয় হবে মশায়, আপনার জয়-জয়কার হবে। ধনে পুতে লক্ষ্মীলাভ হবে আপনার।

শ্রীহরির দাক্ষিণ্যে অভিভূত হইয়া লোকটা ছুটিয়া চলিয়া গেল পাড়ার ভিতর। সংবাদটা সে প্রত্যেকের ঘরে প্রচার করিবার জন্য অস্থির হইয়া উঠিয়াছে।

দরিদ্র অশিক্ষিত মানুষগুলি যেমন শ্রীহরির দাক্ষিণ্যে অভিভূত হইয়া গেল শ্রীহরিও তেমনি অভিভূত হইয়া গেল ইহাদের কৃতজ্ঞতার সরল অকপট গদগদ প্রকাশে। এক মুহূর্তে ও সামান্য দানের ভারে মানুষগুলি পায়ের তলায় লুটাইয়া পড়িয়াছে। বিশেষ করিয়া শ্রীহরির মনে হইল—যে-অপরাধ সে গত রাত্রে করিয়াছে, সে অপরাধ যেন উহাদেরই ওই কৃতজ্ঞতার সজল চোখের অশ্রু প্রবাহে উহারা ধুইয়া মুছিয়া দিতে চাহিতেছে। ভাবাবেগে শ্রীহরিরও কণ্ঠস্বর রুদ্ধ হইয়া আসিয়াছিল, সে বলিল, যা সব, যা। চাল-খড়-ধান নিয়ে আসবি।

অনেকখানি লঘু পবিত্র চিত্ত লইয়া সে বাড়ী ফিরিয়া আসিল।

বাড়ী ফিরিবার পথে সে অনেক কল্পনা করিল।

গ্রীষ্মকালে জলের অভাবে লোকের কষ্টের আর অবধি থাকে না। পানীয় জলের জন্য মেয়েদের ওই নদীর ঘাট পর্যন্ত যাইতে হয়। যাহারা ইজ্জতের জন্য যায় না তাহারা খায় পচা পুকুরের দুর্গন্ধময় কাদা-ঘোলা জল। এবার একটা কুয়া সে কাটাইয়া দিবে। গ্রামের পাঠশালার আসবাবের জন্য সেবার লোকের দুয়ারে দুয়ারে ভিক্ষাতে পাঁচটা টাকাও সংগৃহীত হয় নাই; সে পঞ্চাশ টাকা পাঠশালার আসবাবের জন্য দান করিবে।

আরও অনেক কিছু। গ্রামের পথটা কাঁকর ঢালিয়া পাকা করিয়া দিবে। চণ্ডীমণ্ডপটার মাটির মেঝেটা বাঁধাইয়া দিবে; সিমেন্ট-করা মেঝের উপর খুদিয়া লিখিয়া দিবে—শ্রীচরণাশ্রিত শ্রীহরি ঘোষ। যেমন কঙ্কণার চণ্ডীতলায় মার্বেল বাঁধানো বারান্দার মেঝের উপর সাদা মার্বেলের মধ্যে কালো হরফে লেখা আছে কঙ্কণার বাবুদের নাম।

সে কল্পনা করে, অতঃপর গ্রামের লোক সসম্ভ্রমে সকৃতজ্ঞ চিত্তে মহাশয় ব্যক্তি বলিয়া নমস্কার করিয়া তাহাকে পথ ছাড়িয়া দিতেছে।

আজ নূতন একটা অভিজ্ঞতা লাভের ফলে শ্রীহরির অন্তরে এক নূতন মন কোন অজ্ঞাত-নিক্ষিপ্ত বীজের অঙ্কুর-শীর্ষের মত মাথা ঠেলিয়া জাগিয়া উঠিল। কল্পনা করিতে করিতে সে গ্রামের মাঠে কিছুক্ষণ ঘুরিয়া বেড়াইল। যখন বাড়ী ফিরিল তখন বেলা প্রায় শেষ হইয়া আসিয়াছে। আসিয়াই দেখিল, বাড়ীর দুয়ারে দাঁড়াইয়া আছে ওই দরিদ্রের দলটি নিতান্ত অপরাধীর মত। আর তাহার মা নির্মম কটু ভাষায় গালিগালাজ করিতেছে। শুধু ওই হতভাগ্যদিগকেই নয়—শ্রীহরির উপরেও গালিগালাজ বর্ষণ করিতে মায়ের কার্পণ্য ছিল না। ক্রুদ্ধচিত্তেই সে বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করিল। মা তাহাকে দেখিয়া দ্বিগুণবেগে জ্বলিয়া উঠিয়া গালিগালাজ আরম্ভ করিল—‘ওরে ও হতচ্ছাড়া বাঁশবুকো, বলি দাতাকর্ণ-সেন হলি কবে থেকে? ওই যে পঙ্গপাল এসে দাঁড়িয়েছে, বলছে তুই ডেকে এনেছিস—’

শ্রীহরির নগ্ন-প্রকৃতির একটা অতি নিষ্ঠুর ভঙ্গি আছে; তখন সে চীৎকার করে না, নীরবে ভয়াবহ মুখভঙ্গি লইয়া অতি স্থিরভাবে মানুষকে বা পশুকে নির্যাতন করে—যেমন শীতের স্বচ্ছ জল মানুষের হাত-পা হিম করিয়া জমাইয়া দিয়া শ্বাসরুদ্ধ করিয়া হত্যা করে! সেই ভঙ্গীতে সে অগ্রসর হইয়া আসিতেই তাহার মা দ্রুতপদে খিড়কির দরজা দিয়া পলাইয়া গেল।

শ্রীহরি নিজেই নীরবে প্রত্যেককে চাল দিয়া বলিল—খড় আর ধান কাল নিবি সব। সর্বশেষে বলিল—মায়ের কথায় তোরা কিছু মনে করিস না যেন, বুঝলি?

তাহার পায়ের ধুলা লইয়া একজন বলিল,—আজ্ঞে দেখেন দেখি, তাই কি পারি? —তারপর রহস্য করিয়া ব্যাপারটা লঘু করিয়া দিবার অভিপ্রায়েই সাধ্যমত বুদ্ধি খরচ করিয়া সে বলিল,—মা আমাদের ক্ষ্যাপা মা গো! রাগলে আর রক্ষে নাই।

শ্রীহরি উত্তর দিল না। সে আপন মনেই চিন্তা করিতেছিল ওই মা হারামজাদীই কিছু করিতে দিবে না। তাহার আজিকার পরিকল্পনা কার্যে পরিণত করিতে এত টাকা খরচ করিলে এই হারামজাদী নিশ্চয়ই একটা বীভৎস কাণ্ড করিয়া তুলিবে। আজ পর্যন্ত বড় কাঠের সিন্দুকটায় চাবী ওই বেটী বুকে আঁকড়াইয়া ধরিয়া আছে। টাকা বাহির করিতে গেলেই বিপদ বাঁধিবে। টাকার জন্য অবশ্য কোন ভাবনা নাই। কয়েকটা বড় খাতকের কাছে সুদ আদায় করিলেই এই কাজ কয়টা হইয়া যাইবে।

হ্যাঁ, তাই সে করিবে।

আজিকার এই ক্ষুদ্র ঘটনাটি যেন বটবৃক্ষের অতিক্ষুদ্র একটি বীজকণার সঙ্গে তুলনীয়। কিন্তু সেই এক কণার মধ্যেই লুকাইয়া আছে এক বিরাট মহীরুহের সম্ভাবনা। সেই সম্ভাবনার প্রারম্ভেই শ্রীহরি যেন তাহার এতকালের বদ্ধ-অন্ধকার দুর্গন্ধময় জীবন-সৌধের প্রতিটি কক্ষে—দেহের প্রতিটি গ্রন্থিতে—প্রতিটি সন্ধিতে এক বিচিত্র স্পন্দন অনুভব করিতেছে। সৌধখানি বোধ হয় ফাটিয়া চৌচির হইয়া যাইবে।


দশ



ভূপাল চৌকীদার ইউনিয়ন বোর্ডের মোহর-দেওয়া একখানা নোটিশ হাতে করিয়া চলিয়াছিল, আগে আগে ডুগ-ডুগ শব্দে ঢোল বাজাইয়া চলিতেছিল পাতু।

‘একসপ্তাহের মধ্যে আষাঢ় আশ্বিন—দুই কিস্তির বাকী ট্যাক্স আদায় না দিলে জরিমানা সমেত দেড়গুণ ট্যাক্স অস্থাবর ক্রোক করিয়া আদায় করা হইবেক।’

জগন ডাক্তার একেবারে আগুনের মত জ্বলিয়া উঠিল।

—কি? কি? ‘কি করা হইবেক’?

ভূপাল সভয়ে হাতের নোটিশখানি আগাইয়া দিয়া বলিল—আজ্ঞে, এই দেখেন কেনে।

জগন কঠিন দৃষ্টিতে ভূপালের দিকে চাহিয়া বলিল—সরকারী উর্দি গায়ে দিয়ে মাথা নোয়াতেও ভুলে গেলি যে! সরকারী নুন খেতেও ভুলে গেলি যে।

অপ্রস্তুত হইয়া ভূপাল তাড়াতাড়ি ডাক্তারের পায়ের ধুলা কপালে মুখে লইয়া বলিল—আজ্ঞে দেখেন দেখি, তাই ভোলে! আপনকারাই আমাদের মা বাপ!

পাতু বলিল—নিশ্চয়!

জগন নোটিশখানা দেখিয়া একেবারে গর্জন করিয়া উঠিল—এয়ার্কি নাকি? এ সব কি পৈতৃক জমিদারী পেয়েছে সব!

—লোকের মাঠের ধান মাঠে রইল, বাবুরা একেবারে অস্থাবরের নোটিশ বার করে দিলেন! মানুষকে উৎখাত করে ট্যাক্স আদায় করতে বলেছে গবর্ণমেন্ট? আজই দরখাস্ত করব আমি।

ভূপাল হাত জোড় করিয়া বলিল—আজ্ঞে, আমরা চাকর, আমাদিগে যেমন বলেছে তেমনি—

—তোদের দোষ কি? তোরা কি করবি? তোরা ঢোল দিয়ে যা।

পাতু ঢোলটায় গোটাকয়েক কাঠির আঘাত করিয়া বলিল—আজ্ঞে ডাক্তারবাবু, ‘নবান্ন’ হবে বাইশে তারিখ।

—আর সব লোককে বল গিয়ে। গাঁয়ের লোকের সঙ্গে আমার কোন সম্বন্ধ নাই। আমি নবান্ন করব—আমার যে দিন খুশি।

পাতু আর কোন উত্তর না দিয়া পথে অগ্রসর হইল। ডাক্তার ক্রুদ্ধ গাম্ভীর্যে থমথমে মুখে তাহার দিকে চাহিয়া বলিল—এই পেতো শোন!

—আজ্ঞে!

পাতু ঘুরিয়া দাঁড়াইল।

জগন বলিল—চলে যাচ্ছিস যে?

পাতু আবার বলিল—আজ্ঞে?

ডাক্তার এবার কথা খুঁজিয়া না পাইয়া বলিল—সেদিন দরখাস্তে টিপসই দিতে এলি না যে বড়? খুব বড়লোক হয়েছিস, না? শহরে গিয়ে বাড়ী করবি, এ গাঁয়েই আর থাকবি না শুনছি!

বিরক্তিতে পাতুর ভ্রূ কুঁচকাইয়া উঠিল। কিন্তু কোন উত্তর দিল না। ডাক্তার ঘরে ঢুকিয়া দরখাস্তখানা বাহির করিয়া আনিয়া সস্নেহে শাসনের সুরে বলিল—দে, টিপছাপ দে! তোর জন্যেই আমি ছাড়ি নাই দরখাস্ত।

পাতু এবার বিনা আপত্তিতেই টিপছাপ দিল। সেদিন যে সে আসে নাই, সমস্ত দিনটাই গ্রামত্যাগের সংকল্প লইয়া জংশন শহর পর্যন্ত ঘুরিয়া আসিয়াছে—সে সমস্তই সাময়িক এতটা উত্তেজনার বশে। আজও যে সে মুহূর্ত পূর্বে ডাক্তারের কথায় ভ্রূ কুঞ্চিত করিয়াছে—সেও ডাক্তারের কথার কটুত্বের জন্য। নতুবা সাহায্য বা ভিক্ষা লইতে তাহার আপত্তি নাই। গভীর কৃতজ্ঞতার সহিতই সে টিপছাপ দিল। টিপছাপ দিয়া বুড়া আঙুলের কালি মাথায় মুছিতে মুছিতে কৃতজ্ঞভাবে আবার হাসিয়া বলিল—ডাক্তারবাবুর মত গরীবগুর্বোর উপকার কেউ করে না।

ডাক্তারের জুতার ধূলা আঙুলের ডগায় লইয়া তাহা ঠোঁটে ও মাথায় বুলাইয়া লইল। ভূপাল চৌকিদারও তাহার অনুসরণ করিল।

ডাক্তার ইহার মধ্যে কিছু চিন্তা করিতেছিল, চিন্তা-শেষে বার দুই ঘাড় নাড়িয়া বলিল—দাঁড়া! আরও একটা টিপছাপ দিয়ে যা।

—আজ্ঞে? —পাতু সভয়ে প্রশ্ন করিল। অর্থাৎ, আবার কেন? টিপছাপকে ইহাদের বড় ভয়।

—এই ট্যাক্স আদায়ের বিরুদ্ধে একটা দরখাস্ত দোব! তোদের ঘর পুড়ে গিয়েছে, চাষীদের ধান এখনও মাঠে, এই অসময় অস্থাবরের নোটিশ, এ কি মগের মুলক নাকি?

এবার ভয়ে পাতুর মুখ শুকাইয়া গেল। ইউনিয়ন বোর্ডের হাকিমের বিরুদ্ধে দরখাস্ত! সে ভূপাল চৌকিদারের দিকে চাহিল—ভূপালও বিব্রত হইয়া উঠিয়াছে। ডাক্তার তাগিদ দিয়া বলিল—দে, টিপছাপ দে!

—আজ্ঞে না মশায়। উ আমি দিতে পারব না! —পাতু এবার হন্ হন্ করিয়া পথ চলিতে আরম্ভ করিল। পিছনে পিছনে ভূপাল পলাইয়া হাঁফ ছাড়িয়া বাঁচিল। ভূপাল ভাবিতেছিল—খবরটা আবার ‘প্রেসিডেন বাবু’কে দিয়া দিতে হইবে। নহিলে হয়ত সন্দেহ আসিবে তাহারও ইহার সহিত যোগসাজশ আছে।

ডাক্তার ভীষণ ক্রুদ্ধ হইয়া পলায়নপর পাতু ও ভূপালের দিকে চাহিয়া দাঁড়াইয়া রহিল। কয়েক মুহূর্ত পরেই সে ফাটিয়া পড়িল—হারামজাদার জাত, তোদের উপকার যে করে সে গাধা! —বলিয়াই সে দরখাস্তখানা ছিঁড়িয়া ফেলিবার উপক্রম করিল।

—ছিঁড়ো না, ডাক্তার ছিঁড়ো না। —বাধা দিল পাঠশালার পণ্ডিত দেবু ঘোষ। সে কিছু দূরে দাঁড়াইয়া সবই দেখিয়াছিল। এ-সব ব্যাপারে তাহারও আন্তরিক সহানুভূতি আছে।

দেবু ঘোষ একটু বিচিত্র ধরনের মানুষ। এ গ্রামের পাঁচজনের একজন হইয়াও সে যেন সকল হইতে একটু পৃথক। তাহার মতামতগুলিও সাধারণ মানুষ হইতে পৃথক। আপনাদের দুর্দশার প্রতিকারের জন্য কাহারও সাহায্যভিক্ষা করিতে চায় না। অনিরুদ্ধকে, ছিরুকে শাসন করিতে জমিদারের দ্বারস্থ হইতে সে নারাজ। কিন্তু পঞ্চায়েত মজলিসের আয়োজনে সে-ই প্রধান উদ্যোক্তা! তবু আজ সে জগন ডাক্তারকে দরখাস্ত ছিঁড়িতে বাধা দিল।

ডাক্তার দেবনাথের মুখের দিকে চাহিয়া বলিল—ছিঁড়তে বারণ করছ? ওই বেটাদের উপকার করতে বলছ? দেখলে তো সব!

দেবু হাসিয়া বলিল—তা দেখলাম! ওদের ওপর রাগ করে কি করবে বল! দাও, তোমার ট্যাক্সের দরখাস্ত, আমি সই করছি, আর দশজনার সইও যোগাড় করে দিচ্ছি।

ডাক্তার একটা বিড়ি ও দেশলাই পণ্ডিতকে দিয়া বলিল—বস। —তারপর বাড়ীর দিকে মুখ ফিরাইয়া চীৎকার করিয়া বলিল—মিনু, দু’কাপ চা।

মিনু ডাক্তারের মেয়ে।

ডাক্তার আবার আরম্ভ করিল—লোকে ভাবে কি জান, পণ্ডিত? ভাবে এ সবের মধ্যে আমার বুঝি কোন স্বার্থ আছে। অন্যায় অত্যাচারের প্রতিকার হলে বাঁচবে সবাই, কিন্তু রাজা হয়ে যাব আমি!

দেবু বিড়ি ধরাইয়া দেশলাইটা ডাক্তারের হাতে দিয়া একটু হাসিয়া বলিল—তা স্বার্থ আছে বৈ কি ডাক্তার।

—স্বার্থ? —ডাক্তার রুক্ষ অথচ বিস্মিত দৃষ্টিতে পণ্ডিতের দিকে চাহিল।

পণ্ডিত হাতের বিড়িটার আগুনের দিকে চাহিয়া হাসিতে হাসিতেই সহজভাবেই বলিল—স্বার্থ আছে বৈ কি! দশজনের কাছে গণ্যমান্য হবে তুমি, দু’দিন বাদে ইউনিয়ন বোর্ডের মেম্বারও হতে পার। স্বার্থ নেই? আমার মনে হয় সংসারে স্বার্থ-চিন্তা ছাড়া মানুষ টিকতেই পারে না।

ডাক্তারের কপাল কুঞ্চিত হইয়া উঠিল, বলিল—ওটাও যদি স্বার্থ হয়, তবে তো সাধু-সন্ন্যাসীদের ভগবানের উপাসনা করার মধ্যেও স্বার্থ আছে হে! তাহ’লে বশিষ্ঠ-বুদ্ধদেবও স্বার্থপর!

—স্বার্থ-কথাকে ছোট করে না দেখলে ও কথা নিশ্চয় সত্য। পরমার্থও তো অর্থ ছাড়া নয়।—দেবু তেমনি হাসিয়াই বলিল।

ডাক্তার বলিল—ইউনিয়ন বোর্ডের মেম্বার আমি হতে চাই, আলবৎ হতে চাই। সে হতে চাই দশজনের সেবা করবার জন্যে। পরলোক-টরলোক জপতপ ওসবে আমার বিশ্বাস নাই। ওই ছিরু পাল—চুরি করবে ব্যভিচার করবে, আর ঘরে বসে জপতপ করবে—ঘটা করে কালীপূজো, অন্নপূর্ণা পূজো করবে, ও-রকম ধর্মের মাথায় মারি আমি পাঁচঝাড়ু।

অতঃপর ডাক্তার আরম্ভ করিল এক সুদীর্ঘ বক্তৃতা। মনুষ্য-জীবন ধন্য করিতে কে না চায় এ সংসারে? কে মানুষের সেবা করিয়া ধন্য হইতে চায়, ইত্যাদি ইত্যাদি।

বক্তৃতার উত্তরে দেবু ঘোষও বক্তৃতা দিতে পারিত, কিন্তু সে তাহা দিল না, কেবল বলিল—দশজনের ভাল করতে চাও, খুব ভাল কথা, ডাক্তার। কিন্তু গাঁয়ের লোককে কেন ছোট ভাব তুমি? আজ বললে—গাঁয়ের লোকের সঙ্গে নবান্ন করবে না তুমি! কদিন আগে দু-দুটো মজলিস হল গাঁয়ে তুমি তো গেলেই না, উলটে কামারকে তুমি উস্কে দিলে।

—কখনও না। গাঁয়ের লোকের বিরুদ্ধে আমি কাউকে উস্কে দিই নাই। অনিরুদ্ধের জমির ধান কেটে নিলে আমি তাকে ছিরের নামে ডাইরি করতে বলেছি এই পর্যন্ত!

—বেশ কথা! মজলিসে গেলে না কেন?

—মজলিস? যে মজলিসে ছিরু পাল টাকার জোরে মাতব্বর—সেখানে আমি যাই না।

—তার মাতব্বরি ভেঙে দাও তুমি। মজলিসে গিয়ে আপনার জোরে দাঁড়াও। ঘরে বসে থাকলে তার মাতব্বরি আরও বেড়ে যাবে!

জগন এবার চুপ করিয়া রহিল।

—ভাল। গাঁয়ের লোকের সঙ্গে নবান্ন করবে না কেন তুমি?

এবার ডাক্তার কাবু হইয়া পড়িল। কিছুক্ষণ পরে বলিল—করব না, এমন প্রতিজ্ঞা আমি করি নাই।

দেবু ঘোষ এবার খুশী হইয়া বলিল—হাঁ! ‘দশে মিলে করি কাজ হারিজিতি নাহি লাজ।’ যা করবে, দশজনে এক হয়ে কর। দেখ না, তিনদিনে সব চিট হয়ে যাবে। অনিরুদ্ধ কামার, গিরীশ ছুতোর, তারা নাপিত, পেতো মুচি—এমন কি তোমার ছিরেকেও নাকে কানে খৎ দিয়েই ছাড়ব। তা না ক’রে হাজারখানা দরখাস্ত ক’রেও কিছু হবে না ডাক্তার। সংসারে একলা থাকে বাঘ সিংহ। মানুষে নয়।

ডাক্তার বলিল—বেশ। কোনও আপত্তি নাই আমার। তবে এক হতে হলে সব কাজেই এক হতে হবে। গাঁয়ের গরজের সময় জগন ডাক্তার আর দেবু পণ্ডিত; আর ইউনিয়ন বোর্ডের ভোটের সময় কঙ্কণার বাবুরা, ছিরে পাল—

বাধা দিয়া দেবু ঘোষ বলিল—এবার তিন নম্বর ওয়ার্ড থেকে তুমি আর আমি দাঁড়াব। তা হলে হবে তো?

দেবনাথ ঘোষ—দেবু পণ্ডিত একটু স্বতন্ত্র মানুষ। আপনার বুদ্ধি-বিদ্যার উপর তাহার প্রগাঢ় বিশ্বাস। তাহার এই বুদ্ধি সম্বন্ধে চেতনার সহিত খানিকটা কল্পনা—খানিকটা স্বার্থপরতা আছে। তাহা অবশ্য বেশী নয়, কিন্তু দেবু সেইটুকুকেই লইয়া অহরহ চর্চা করে। খুঁজিয়া পাতিয়া বই যোগাড় করিয়া পড়ে; খবরের কাগজের খবরগুলো রাখে; এ ছাড়াও মহাগ্রামের ন্যায়রত্ন মহাশয়ের পৌত্র বিশ্বনাথ এম-এ ক্লাসের ছাত্র, সে তাহার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তাহাকে সে অনেক বই আনিয়া দেয়। এবং মুখেমুখেও অনেক কিছু সে তাহার কাছে শিখিয়াছে। এই সব কারণে সে বেশ একটু অহঙ্কৃতও বটে। এ গ্রামে তাহার সমকক্ষ বিদ্বান ব্যক্তি কাহাকেও দেখিতে পায় না। জগন ডাক্তার পর্যন্ত তাহার তুলনায় কম শিক্ষিত।

জগন তো কঙ্কণার হাইস্কুলে ফোর্থক্লাস পর্যন্ত পড়িয়া পড়া ছাড়িয়াছে; বাপের কাছে ডাক্তারি শিখিয়াছে। দেবু পড়িয়াছে ফার্স্ট ক্লাস পর্যন্ত। পড়াশুনাতে সে ভালই ছিল, পড়িলে সে যে ম্যাট্রিক পাস করিত, ভালভাবেই পাস করিত এ-কথা আজও কঙ্কণার মাস্টারেরা স্বীকার করে। দেবু নিজে জানে—পড়িতে পাইলেই সে বৃত্তি লইয়া পাস করিত। তাহার পর আই-এ, বি-এ—দেবনাথের সে কল্পনা ছিল সুদূরপ্রসারী। ম্যাজিস্ট্রেট হইতে পারিত সে। অন্তত তাই মনে করে। সঙ্গে সঙ্গে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে আপনার দুর্ভাগ্যের জন্য।

হঠাৎ তাহার বাপ মারা গেল! চাষবাস, সংসার দেখিবার দ্বিতীয় পুরুষ বাড়ীতে ছিল না। তাহার মা অন্য গ্রাম্য মেয়েদের মত মাঠে মাঠে ঘুরিয়া পাঁচজনের সঙ্গে পুরুষের মত ঝগড়া করিয়া ফিরিবে এও দেবুর কল্পনায় অসহ্য মনে হইয়াছিল। এবং বাবা যখন মারা গেল তখন সংসার একেবারে ভরাডুবির মুখে। এক পয়সার সঞ্চয় নাই, ধান নাই। ধারও কিছু হইয়াছে। অগত্যা সে পড়াশুনা ছাড়িয়া চাষ ও সংসারের কাজে আত্মনিয়োগ করিয়াছিল। কিন্তু সন্তুষ্টচিত্তে নয়। একটা অসন্তোষ অহরহই তাহার জাগিয়া থাকিত, তাহা আজও আছে। কয়েক বৎসর পূর্বে, স্বায়ত্বশাসন আইনে গ্রাম্য পাঠশালার ভার ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড ও ইউনিয়ন বোর্ড গ্রহণ করিবার পর হইতে চাষবাস ছাড়িয়া ওই স্কুলে পণ্ডিত হইয়া বসিয়াছে। বেতন মাসে বারো টাকা, চাষবাস ভাগেঠিকায় বন্দোবস্ত করিয়া দিয়াছে। লোকে এইবার তাহাকে বলিল—পণ্ডিত; খানিকটা সম্মানও করিল। কিন্তু তাহাতেও তাহার পরিতৃপ্তি হইল না।

তাহার ধারণা, গ্রামের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি হইল সে। শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্বের সম্মানই তাহার প্রাপ্য! অরণ্যানীর শিশু-শাল যেমন বহুল লতার দুর্ভেদ্য জাল ভেদ করিয়া সকলের উপরে মাথা তুলিতে চায়, তেমনি উদ্ধত বিক্রমে সে এতদিন গ্রামের সকলের সঙ্গে যুদ্ধ করিয়া আসিয়াছে। তবে সে একা নভোমণ্ডলের ভোগের জন্যেই ঊর্ধ্বলোকে উঠিতে চায় না, নিচের লতাগুলি তাহাকেই অবলম্বন করিয়া তাহারই সঙ্গে আলোক-রাজ্যের অভিযানে আকাশলোকে চলুক—এই আকাঙ্ক্ষা! ছিরু পালের অর্থসম্পদ এবং বর্বর পশুত্বকে সে অন্তরের সঙ্গে ঘৃণা করে।

জগনের নকল দেশপ্রীতি ও আভিজাত্যের আস্ফালন তাহার নিকট যেন ছার তেমনি, পাকিলে দাড়িতে হরিশ মণ্ডলের গ্রামের মণ্ডল-গিরিকেও সে স্বীকার করতে চায় না। ভবেশ ও মুকুন্দ বয়সের প্রাচীনত্ব লইয়া বিজ্ঞতার ভানে কথা কয়,—তাহাও সে সহ্য করিতে পারে না।

দেবুর উপেক্ষা অবশ্য অহেতুক নয় অথবা একমাত্র আত্মপ্রাধান্যের আকাঙ্ক্ষা হইতে উদ্ভূত নয়। আপনার গ্রামখানিকে সে প্রাণের সহিত ভালবাসে। সে যে চোখের উপর গ্রামখানিকে দিন দিন অবনতির পথে গড়াইয়া যাইতে দেখিতেছে! অর্থবলে এবং দৈহিক শক্তিতে ছিরু যথেচ্ছাচার করিতেছে। শুধু ছিরু কেন—গ্রামের কেহই কাহাকেও মানে না, সামাজিক আচার-ব্যবহার সব লোপ পাইতে বসিয়াছে। মানুষ মরিলে সহজে মড়া বাহির হয় না, সামাজিক ভোজনে—একই পঙক্তিতে ধনী-দরিদ্রের ভেদ দেখা দিয়াছে। সম্প্রতি কামার ছুতার বায়েন কাজ ছাড়িল, দাই, নাপিত চিরকেলে বিধান লঙ্ঘনে উদ্যত হইল। যাহার মাসে পাঁচ টাকা আয় সে দশ টাকা খরচ করিয়া বাবু সাজিয়া বসিয়াছে। ঋণের দায়ে জমি বিকাইয়া যাইতেছে, ঘটি-বাটি বেচিতেছে, তবু জামা চাই, শৌখিন-পাড় কাপড় চাই, ঘরে ঘরে হ্যারিকেন লণ্ঠন চাই। ছোকরাদের পকেটে বিড়ি-দেশলাই ঢুকিয়াছে, জংশন-শহরে গেলেই সবাই দু-এক পয়সার সিগারেট না কিনিয়া ছাড়ে না,—তামাক চকমকি একেবারে বাতিল হইয়া গেল। এ-সবের প্রতিকার করিবার সাধ্য যাহাদের নাই, তাহারা প্রধান হইতে চায় কেন? কিসের জোরে? এ প্রশ্ন যাহাদের অকারণে মাথা ধরাইয়া তোলে দেবু পণ্ডিত সেই তাহাদেরই একজন।

দেবু পণ্ডিত পাঠশালার ছেলেদের পড়াইতে পড়াইতে এই সব ভাবনার অনেক কিছু ভাবে। গ্রামের সকল জন হইতে নিজেকে কতকটা পৃথক রাখিয়া—আপনার চিন্তাকে বিকীর্ণ করে এবং সঙ্গে সঙ্গে আপন ব্যক্তিত্বকেও প্রতিষ্ঠিত করিবার চেষ্টা করিয়া যায়—অক্লান্তভাবে সামান্য সুযোগও সে কখনও ছাড়িয়া দেয় না।

তাই জগন ডাক্তার যখন ইউনিয়ন বোর্ডের কর্তৃপক্ষের অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা তুলিয়া দাঁড়াইল—তখন ডাক্তারের আভিজাত্যের আস্ফালনের প্রতি ঘৃণা সত্ত্বেও তাহার সহিত মিলিত হইতে সে দ্বিধাবোধ করিল না।

দেবনাথ ও জগন ডাক্তার দুইজনে মিলিত উৎসাহে কাজ আরম্ভ করিয়া দিল। দরখাস্ত পাঠানো হইয়া গিয়াছে। নবান্নের দিনে দুইজনে পরামর্শ করিয়া একটা উৎসবেরও ব্যবস্থা করিল। সন্ধ্যায় চণ্ডীমণ্ডপে মনসার ভাসান গান হইবে। ভাসান গানের দলকে এখানে ‘বেহুলার দল’ বলিয়া থাকে। বাউড়ীদের একটি বেহুলার দল আছে; সেই দলের গান হইবে। চাঁদা করিয়া চাল তুলিয়া উহাদের মদের ব্যবস্থা করা হইয়াছে—তাহাতেই দলের লোকের মহা আনন্দ। এই ভাসান গানের ব্যবস্থার মধ্যে আরও একটি উদ্দেশ্য আছে। নবান্নের দিন ছিরু পালের বাড়ীতে অন্নপূর্ণা পূজা হইয়া থাকে; সেই উপলক্ষে সন্ধ্যায় গ্রামের সমস্ত লোকই গিয়া জমায়েত হয় ছিরুর বাড়ীতে। তামাক খায়, গালগল্প করে, খোল বাজাইয়া অল্পস্বল্প কীর্তন গানও হয়। এবার আবার ছিরু নাকি বিশেষ সমারোহের আয়োজন করিয়াছে। রাত্রে লোকজন খাওয়াইবে এবং একদল রুযাত্রাও নাকি বায়না করিয়াছে। শ্রীহরির মায়ের নিত্যকার গালিগালাজ ও আস্ফালনের মধ্যে হইতে অন্তত ওই দুইটি সংবাদ পাওয়া গিয়াছে। গ্রামের লোক যাহাতে ছিরুর বাড়ী না যায়—জগন ডাক্তার এবং দেবনাথ তাহার জন্য ব্যবস্থাগুলি করিয়াছে। গ্রামকে সঙ্ঘবদ্ধ করিবার প্রচেষ্টায় জগন ও দেবনাথের এইটি প্রথম আয়োজন বা ভূমিকা।

চাষীর গ্রামে নবান্নের সমারোহ কিছু বেশী, এইটিই সত্যকারের সার্বজনীন উৎসব। চাষের প্রধান শস্য হৈমন্তী ধান মাঠে পাকিয়া উঠিয়াছে; এইবার সেই ধান কাটিয়া ঘরে তোলা হইবে। কার্তিক সংক্রান্তির দিনে কল্যাণ করিয়া আড়াই মুঠা ধান কাটিয়া আনিয়া লক্ষ্মী পূজা হইয়া গিয়াছে। এইবার আজ লঘু ধানের চাল হইতে নানা উপকরণ তৈয়ারী করিয়া পিতৃলোক এবং দেবলোকের ভোগ দেওয়া হইবে। তাহার সঙ্গে ঘরে ঘরে হইবে ধান্যলক্ষ্মীর পূজা। ছেলেমেয়েরা সকালবেলাতেই সব স্নান সারিয়া ফেলিয়াছে। অগ্রহায়ণের তৃতীয় সপ্তাহে শীতও পড়িয়াছে, তবুও নবান্নের উৎসাহে ছেলেরা পুকুরে জল ঘোলা করিয়া তবে উঠিয়াছে। তাহারা সব এখনও চণ্ডীমণ্ডপের আঙিনায় রোদে দাঁড়াইয়া খোঁড়া পুরোহিতের কঙ্কালসার ঘোড়াটাকে লইয়া কলরব করিতেছে। বুড়ো শিব এবং ভাঙা কালীর মন্দিরে ভোগ না হইলে নবান্ন আরম্ভ হইবে না। কুমারী কিশোরী মেয়েরা ভিজা চুল পিঠে এলাইয়া দিয়া নতুন বাটিতে নতুন ধানের আতপ চাল, চিনি, মণ্ডা, দুধ, কলা, আখের টিকলি, আদাকুচি, মূলাকুচি সাজাইয়া দক্ষিণা সহ মন্দিরের বারান্দায় নামাইয়া দিতেছে। অধিকাংশই চার পয়সা, কেহ দু পয়সা, কেহ এক পয়সা, দু-চার জনে দিয়াছে দু আনা। যাহাদের বাড়ীতে কুমারী মেয়ে নাই, তাহাদের ভোগসামগ্রী প্রবীণারা লইয়া আসিতেছে। গ্রামের পুরোহিত-খোঁড়া চক্রবর্তী বসিয়া সামগ্রীগুলি লইয়া দেবতার সম্মুখে রাখিয়া দক্ষিণাগুলি ট্যাকে পুরিতেছে এবং মধ্যে মধ্যে ধমক দিতেছে ওই ছেলেগুলিকে—এ্যাই এ্যাই! এ্যাই ছেলেগুলো, এত ভারী বদ! যাস না কাছে, চাঁট ছোড়ে তো পিলে ফাটিয়ে দেবে।

অর্থাৎ ওই ঘোড়াটা। ঘোড়াটা পিছনের পা ছুঁড়িলে প্লীহা ফাটিয়া যাইবে। খোঁড়া চক্রবর্তী গ্রাম-গ্রামান্তরে ওই ঘোড়ার সওয়ার হইয়া যজমান সাধিয়া ফেরে। ফিরিবার সময় ঘোড়ার উপর থাকে সে—তাহার মাথায় থাকে চাল-কলা ইত্যাদির বোঝা। ঘোড়া খুব শিক্ষিত, চক্রবর্তী প্রায়ই লাগাম না ধরিয়া দুই হাতে বোঝা ধরিয়া অনায়াসে চলে, অবশ্য ইচ্ছা করিলে চক্রবর্তী মাটিতে পা নামাইয়া দিতে পারে। মাটি হইতে বড় জোর ফুটখানেক উপরে তাহার পা দুইটা ঝুলিতে ঝুলিতে যায়।

ছেলেদের কতকগুলো দূর হইতে ঢেলা ছুড়িয়া ঘোড়াটাকে ক্রমাগত মারিতেছিল। কতকগুলো অতিসাহসী গাছের ডাল লইয়া পিছন দিক হইতে পিটিতেছিল। পুরোহিত ভয়ানক চটিয়া উঠিয়াছিল। কিন্তু কোন উপায় সে খুঁজিয়া পাইতেছিল না। ছেলেগুলো যেন তাহার কথা কানেই তুলিবে না বলিয়াই একজোট হইয়াছে। একটি প্রৌঢ়া বিধবা ভোগের সামগ্রী লইয়া আসিয়াছিল—সে-ই পুরোহিতের উপায় করিয়া দিল; সে বলিল—এ্যাঁ তোরা ওই ঘোড়াটাকে ছুঁলি? বলি—ওরে ও ম্লেচ্ছর দল! যা, আবার সব চান করগে যা।

পুরোহিত বলিল—দেখ বাছা দেখ, বজ্জাত ছেলেদের কাণ্ড দেখ। চাঁট ছোড়ে তো পিলে ফাটিয়ে দেবে। তখন নাম-দোষ হবে আমার!

বিধবা কিন্তু এ কথাটা মানিল না, সে বলিল—ও-কথা আর বোলোনা ঠাকুর। ওই ছাগলের মত ঘোড়াও নাকি পিলে ফাটিয়ে দেবে? তুমিও যেমন। ছেলেদের বলছি কেন, তোমারও তো বাপু আচার-বিচার কিছু নাই। সামনের দুটো পায়ে বেঁধে ছেড়ে দাও, রাজ্যের আঁস্তাকুড়, পাতা, ময়লা মাড়িয়ে চলে বেড়ায়। সেদিন আমাদের গাঁয়ে এসে নতুন পুকুরের পাড়ে—মা-গোঃ, মনে করলেও বমি আসে—চান করতে হয়—সেইখানে দেখি ঘাস খাচ্ছে। আর তুমি ওই ঘোড়াতে চেপে এসে দেবতার পূজো কর?

পুরোহিত বলিল—গঙ্গাজল দি মোড়ল পিসি, রোজ সন্ধ্যাবেলা বাড়ী ফিরলে গঙ্গাজল দিয়ে তবে ওরে ঘরে বাঁধি। আমি তো গঙ্গাজল-স্পর্শ করিই।

—ও সব মিছে কথা।

—ঈশ্বরের দিব্যি। পৈতে ছুঁয়ে বলছি আমি। গঙ্গাজল না দিলে ও বাড়ী ঢোকে না। বাইরে দাঁড়িয়ে মাটিতে পা ঠুকবে আর চি হি চি হি করে চেঁচাবে।

মোড়ল পিসি কি বলিতে গিয়া শশব্যস্ত হইয়া সম্মুখের দিকে খানিকটা সরিয়া গিয়া ফিরিয়া দাঁড়াইল—কে লা? হন হন করে আসছে দেখ। —পিছন দিক হইতে কোন আগন্তুকের দীর্ঘচ্ছায়া মাথাটা তাহার পায়ের উপর পড়িতেই মোড়ল পিসি সংস্পর্শের ভয়ে সরিয়া গিয়া প্রশ্ন করিল—কে?

একটি বধূ দীর্ঘাঙ্গী—অবগুণ্ঠনাবৃত মুখ; সে উত্তর করিল না, নীরবে ভোগসামগ্রীর পাত্রখানি পুরোহিতের হাতের সম্মুখে নামাইয়া দিল।

—অ! কামার বউ! আমি বলি কে-না-কে!

এই মুহূর্তেই ডাক্তার ও পণ্ডিত আসিয়া চণ্ডীমণ্ডপে প্রবেশ করিল। দেবনাথ বিনা ভূমিকায় বলিল—ঠাকুর, কামারের পূজো গাঁয়ের সামিলে আপনি করবেন না, সে হতে আমরা দেব না।

জগন ও দেবু এই সুযোগটিরই প্রতীক্ষা করিয়া নিকটেই কোথাও দাঁড়াইয়া ছিল, পদ্মকে চণ্ডীমণ্ডপে প্রবেশ করিতে দেখিয়া সঙ্গে সঙ্গে তাহারাও আসিয়া হাজির হইয়াছে।

ঠাকুর কিছুক্ষণ পণ্ডিতের মুখের দিকে চাহিয়া থাকিয়া প্রশ্ন করিল—সে আবার কি রকম? গাঁ-সামিলে পুজো না হলে কি করে পূজো হবে?

—সে আমরা জানি না, কর্মকার বুঝে করবে। সে যখন গাঁয়ের নিয়ম লঙ্ঘন করেছে, তখন আমরাই বা গাঁয়ের সামিলে ক্রিয়াকর্মে নোব কেন?

পদ্ম তেমনি অবগুণ্ঠনে মুখ ঢাকিয়া স্থির হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল, এতটুকু চাঞ্চল্য দেখা গেল না। ঠাকুর তাহার দিকে চাহিয়া নিতান্ত নিরুপায়ভাবে বলিল—তাহলে আর আমি কি করব মা!

দেবনাথ পদ্মকে লক্ষ্য করিয়া বলিল—পুজো তুমি ফিরিয়ে নিয়ে যাও, বল গে কর্মকারকে, পূজো দিতে দিলে না গাঁয়ের লোক।

পদ্ম এবার ধীরে ধীরে চলিয়া গেল, কিন্তু পুজোর পাত্র তুলিয়া লইয়া গেল না, সেটা এবং দক্ষিণার পয়সা সেখানেই পড়িয়া রহিল।

পুরোহিত বিব্রত হইয়া বলিল—ওগো ও বাছা, পূজোর ঠাঁইটা নিয়ে যাও! ও বাছা, ও কামার বউ!

দেবু আবার বলিল—থাক না। কামার এখুনি তো আসবেই। যা হোক একটা মীমাংসা আজ হবেই। —দেবু ঘোষের গোপনতম অন্তরে কর্মকারের উপর একটু সহানুভূতি এখনও আছে; অনিরুদ্ধ তাহার সহপাঠী, তা ছাড়া, অন্যায় অনিরুদ্ধেরই একার নয় এবং অনিরুদ্ধই প্রথমে অন্যায় করে নাই। গ্রামের লোকই অন্যায় করিয়াছে প্রথম। সে কথাটাও তাহার মনে কাঁটার মত বিঁধিতেছিল।

পুরোহিত ব্যাপারটা ভাল বুঝিতে পারে নাই, বুঝিবার ব্যগ্রতাও তাহার ছিল না। উপস্থিত একবাড়ীর আতপতণ্ডুল দুধ-মণ্ডা প্রভৃতি পূজোর সামগ্রী বাদ পড়িয়া যাইতেছে—সেই চিন্তাটাই তাহার বড়। ভ্রূ কুঞ্চিত হইয়া উঠিল। বলিল—বলি ওহে ডাক্তার, ও পণ্ডিত—

জগন বাধা দিয়া দৃঢ় আদেশের ভঙ্গীতে তাহাকে বলিল—গিরিশ ছুতোর তারা নাপিত এদের পূজোও হবে না ঠাকুর, বলে রাখছি আপনাকে। আমরা অবিশ্যি একজন-না-একজন শেষ পর্যন্ত থাকব, তবে যদি না থাকি—সেজন্যে আগে থেকে বলে রাখছি আপনাকে।

ঠিক এই সময়ে ছিরু পাল আসিয়া ডাকিল—ঠাকুর! ছিরুর পরনে আজ গরদের কাপড়, গায়ে একখানি রেশমী চাদর; ভাবে-ভঙ্গিতে ছিরু পাল আজ একটি স্বতন্ত্র মানুষ।

পুরোহিত চক্রবর্তী ব্যস্ত হইয়া বলিল—এই যাই বাবা। আর বড় জোর আধ ঘণ্টা। ও পণ্ডিত, ও ডাক্তার, কই হে সব আসছে না কেন?

গম্ভীরভাবে জগন ডাক্তার বলিল—এত তাড়াতাড়ি করলে তো হবে না ঠাকুর। আসছে সব, একে একে আসছে। একঘর যজমানের জন্য দশজনকে ব্যতিব্যস্ত করতে গেলে তো চলবে না।

ছিরু বলিল—বেশ বেশ! দশের কাজ সেরেই আসুন। ঠাকুর! আমি একবার তাগাদা দিয়ে গেলাম। —তারপর ছিরু তাহার প্রকাণ্ড বিশ্রী মুখখানাকে যথাসাধ্য কোমল এবং বিনীত করিয়া বলিল—ডাক্তার, একবার যাবেন গো দয়া করে। দেবু খুড়ো দেখেশুনে দিয়ে এস বাবা—

কথাটা তাহার শেষ হইল না, অনিরুদ্ধের প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ চীৎকারে চণ্ডীমণ্ডপটা যেন অতর্কিতে চমকিয়া উঠিল।

—কে? কে? কার ঘাড়ে দশটা মাথা? কোন্ নবাব-বাদশা আমার পূজো বন্ধ করেছে শুনি?

অনিরুদ্ধের সে মূর্তি যেন রুদ্র-মূর্তি!

চক্রবর্তী হতভম্ব হইয়া গেল, দেবনাথ সোজা হইয়া দাঁড়াইল, জগন ডাক্তার বিজ্ঞ সান্ত্বনাদাতার মত একটু আগাইয়া আসিল; ছিরু পাল যথাস্থানে অচঞ্চল স্থিরভাবেই দাঁড়াইয়া রহিল।

ডাক্তার বলিল—থাম, থাম, চীৎকার করিস না অনিরুদ্ধ!

ব্যঙ্গভরা ঘৃণিত দৃষ্টিতে চকিতে একবার ছিরু পাল হইতে ডাক্তার পর্যন্ত সকলের দিকে চাহিয়া অনিরুদ্ধ মন্দিরের দাওয়া হইতে পদ্মের পরিত্যক্ত পূজার পাত্রটা তুলিয়া লইল। পাত্রটা দুই হাতে খানিকটা উপরে তুলিয়া যেন দেবতাকে দেখাইয়া বলিল—হে বাবা শিব, হে মা কালী—খাও বাবা, খাও মা খাও। আর বিচার কর, তোমরা বিচার কর, তোমরা বিচার কর। —বলিয়াই সে ফিরিল।

ডাক্তারের চোখ দিয়া যেন আগুন বাহির হইতেছিল, কিন্তু অনিরুদ্ধকে ধরিয়া নির্যাতন করিবার কোন উপায় ছিল না।

অনিরুদ্ধ খানিকটা গিয়াই কিন্তু ফিরিল, এবং দক্ষিণার পয়সা কয়টা ট্যাকে খুঁজিয়া দেখিল দেবু ঘোষ ও জগন ডাক্তারের অল্প দূরে তখনও দাঁড়াইয়া আছে ছিরু পাল। তাহার ক্রোধ মুহূর্তে যেন উন্মত্ততায় পরিণত হইয়া গেল। সে চীৎকার করিয়া উঠিল, বড়লোকের মাথায় আমি ঝাড়ু মারি, আমি কোন শালাকে মানি না, গ্রাহ্য করি না। দেখি—কোন্ শালা আমার কি করতে পারে।

মুহূর্তের জন্যে সে ছিরুর দিকে ফিরিয়া যেন তাহাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান করিয়া বুক ফুলাইয়া দাঁড়াইল।

খোঁড়া পুরোহিত ও মোড়ল পিসী একটা বিপর্যয় আশঙ্কা করিয়া শিহরিয়া উঠিল। ইহার পরই অনিরুদ্ধের উপর ছিরু পালের বাঘের মত লাফাইয়া পড়ার কথা; কিন্তু আশ্চর্য, ছিরু পাল আজ হাসিয়া অনিরুদ্ধকে বলিল—আমাকে মিছিমিছি জড়াচ্ছ, কর্মকার, আমি এ-সবের মধ্যে নাই। আমি এসেছিলাম পুরুত ডাকতে।

অনিরুদ্ধ আর দাঁড়াইল না, যেমন হনহন করিয়া আসিয়াছিল, তেমনি হনহন করিয়া চলিয়া গেল। যাইতে যাইতেও সে বলিতেছিল—সব শালাকে আমি জানি। ধার্মিক—রাতারাতি সব ধার্মিক হয়ে উঠেছে।

ছিরু অবিচলিত ধৈর্যে স্থির প্রশান্তভাবেই চণ্ডীমণ্ডপ হইতে নামিয়া বাড়ীর পথ ধরিল। ছিরুর চরিত্রের এই একটি বৈশিষ্ট্য। যখন সে ইষ্ট স্মরণ করে, কোন ধর্ম-কর্ম বা পূজা-পার্বণে রত থাকে—সে তখন স্বতন্ত্র মানুষ হইয়া যায়। সেদিন সে কাহারও সহিত বিরোধ করে না, কাহারও অনিষ্ট করে না, পৃথিবী ও বস্তু-বিষয়ক সমস্ত কিছুর সহিত সংস্রবহীন হইয়া এক ভিন্ন জগতের মানুষ হইয়া উঠে। অবশ্য সমগ্র হিন্দুসমাজের জীবনই আজ এমনই দুই ভাবে বিভক্ত হইয়া গিয়াছে; কর্মজীবন এবং ধর্মজীবন একেবারে স্বতন্ত্র—দুইটার মধ্যে যেন কোন সম্বন্ধ নাই। ইষ্ট স্মরণ করিতে করিতে যাহার চোখে অকপট অশ্রু উদ্গত হয়, সেই মানুষই ইষ্ট স্মরণ-শেষে চোখের জল মুছিতে মুছিতে বিষয়ের আসনে বসিয়া জাল-জালিয়াতি শুরু করে। শুধু হিন্দু সমাজই বা কেন? পৃথিবীর সকল দেশে—সকল সমাজেই জীবনধারা অল্পবিস্তর এমনই দুই ভাগে বিভক্ত হইয়া গিয়াছে। পৃথিবীর কথা থাকুক, ছিরুর জীবনে এই বিভাগটা বড় প্রকট—অতি মাত্রায় পরিস্ফুট। আজিকার ছিরু স্বতন্ত্র, এই ছিরু যে কেমন করিয়া ব্যভিচারী পাষণ্ড ছিরুর প্রচণ্ড ভার ঠেলিয়া দেবপূজাকে উপলক্ষ করিয়া বাহির হইয়া আসে—সে অতি বিচিত্র সংঘটন। পাষণ্ড ছিরুর অন্যায় বা পাপে কোন ভয় নাই, দেবসেবক ছিরুরও সে পাপ খণ্ডনের জন্য কোন ব্যগ্রতা নাই। আছে কেবল পরমলোক প্রাপ্তির জন্য একটি নিষ্ঠাভরা তপস্যা এবং অকপট বিশ্বাস। দিন ও রাত্রির মত পরস্পরের সঙ্গে এই দুই বিরোধী ছিরুর কখনও মুখোমুখি দেখা হয় না, কিন্তু কোন বিরোধও নাই। তবে ছিরুর দিবাভাগগুলি অর্থাৎ জীবনের আলোকিত অংশটুকু শীতমণ্ডলের শীতের দিনের মত অতি সংক্ষিপ্ত তাহার আয়ু।

আজ কিন্তু আরও একটু নূতনত্ব ছিল ছিরুর ব্যবহারে। আজিকার কথাগুলি শুধু মিষ্টই নয়—খানিকটা অভিজাতজনোচিত, ভদ্র এবং সাধু। বিগত কালের দেবসেবক ছিরু হইতেও আজিকার দেবসেবক ছিরু আরো স্বতন্ত্র, আরো নূতন। উত্তেজনার মুখে সেটা কেহ লক্ষ্য করিল না।

কিছুক্ষণ পরই চণ্ডীমণ্ডপের সামনের রাস্তা দিয়া বাউড়ী, ডোম, মুচীদের একপাল ছেলেমেয়েরা সারি বাঁধিয়া কোথাও যাইতেছিল। কাহারও হাতে থালা, কাহারও হাতে গেলাস, কাহারও হাতে কোন রকমের একটা পাত্র। জগন ডাক্তার প্রশ্ন করিল—কোথায় যাবি হে সব দল বেঁধে?

—আজ্ঞে, ঘোষ মহাশয়ের বাড়ী গো, অন্নপূর্ণার পেসাদ নিতে ডেকেছেন।

—কে? ঘোষটা আবার কে? ছিরু? ছিরে পাল—সে আবার ঘোষ হল কবে থেকে?

অশালীন ভাষায়—ছিরুকে কয়টা গাল দিয়া ডাক্তার বলিল—ওঃ, বেজায় সাধু মাতব্বর হয়ে উঠল দেখছি!

দেবু স্তব্ধ হইয়া ভাবিতেছিল।


এগারো



দেবু স্তব্ধ হইয়া ভাবিতেছিল অনেক কথা। ওই নবান্নের ঘটনার বেশ কয়েকদিন পর।

চণ্ডীমণ্ডপেই গ্রাম্য পাঠশালা বসে। পাঠশালার প্রতিষ্ঠার প্রথম দিন হইতেই চণ্ডীমণ্ডপই পাঠশালার নির্দিষ্ট স্থান। সে বহুকাল আগের কথা। তখন ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড ছিল না, ইউনিয়ন বোর্ড ছিল না। পাঠশালা ছিল গ্রামের লোকের। লোকেরা পণ্ডিতকে মাসে একটা করিয়া সিধা দিত এবং ছেলে পড়াইত। চণ্ডীমণ্ডপে সেকালে কালী ও শিবের নিত্য-পূজার ব্যবস্থা ছিল এবং ওই পূজক ব্রাহ্মণই তখন ছিল পাঠশালার পণ্ডিত। পরবর্তীকালে পূজকের দেবোত্তর জমি কেমন করিয়া কোথায় উবিয়া গেল কে জানে। লোকে বলে—জমিদারের পূর্ববর্তী এক গোমস্তা দেবোত্তর জমিকে নামমাত্র খাজনায় বন্দোবস্ত করিয়া নিজের জোতের অন্তর্গত করিয়া লইয়াছে। এমন কৌশলে লইয়াছে যে, সে আর উদ্ধারের কোন উপায় নাই। এমন কি চিহ্নিত জমিগুলোকে কাটিয়া এমনি রূপান্তরিত করিয়াছে যে, সে জমি পর্যন্ত খুঁজিয়া বাহির করা দুঃসাধ্য। তাহার পরও গ্রাম্য-পৌরোহিত্য, দেব-সেবা এবং পাঠশালাকে অবলম্বন করিয়া এক ব্রাহ্মণ অনেকদিন এখানে ছিল; আজ বৎসর কয়েক আগে সে-ও চলিয়া যাইতে বাধ্য হইয়াছে। শিক্ষা-বিভাগের নূতন নিয়মানুযায়ী অযোগ্যতা হেতু তাহাকে বরখাস্ত করিয়া নূতন বন্দোবস্ত হইয়াছে। সম্প্রতি বছর তিনেক পাঠশালার ভার পড়িয়াছে দেবুর হাতে।

এককালে দেবুও এই পাঠশালায় সেই পুরোহিত-পণ্ডিতমশায়ের কাছে পড়িয়াছে। পণ্ডিত একদিকে পূজা করিত 'জয়ন্তী মঙ্গলা কালী'—অকস্মাৎ মন্ত্র বন্ধ করিয়া চীৎকার করিয়া উঠিত—এ্যাই—এ্যাই চণ্ডে, পাঁচ তেরম পঁচাত্তর নয়, পাঁচ তেরম পয়ষট্টি। ছয় তেরম আটাত্তর। হ্যাঁ—

ওই অনিরুদ্ধও তখন তাহার সঙ্গে পড়িত। পণ্ডিত তাহাকে বলিত—এ দেশের লোহাতে চেকন কাজ হয় না বাবা, কর্মকার, তুমি 'বিলাত' যাও। বিলাতে কল-কারখানার কারবার, আলপিন সূচ তৈরী হয় লোহা থেকে। বিলাতী পণ্ডিত না হলে তোমাকে পড়ানো আমার কর্ম নয়।

ছিরু দেবুর জ্ঞাতি, সম্বন্ধে ভাইপো, কিন্তু বয়সে অনেক বড়। সে প্রথমে তাহার কয়েক ক্লাস উপরে পড়িত; শেষে এক এক ক্লাসে দুই-তিন বৎসর করিয়া বিশ্রাম লইতে লইতে যেদিন দেবুকে সহপাঠীরূপে দেখিতে পাইল, সেইদিনই সে পাঠশালার মোহ জন্মের মত বিসর্জন দিল। তারপরই সে বিবাহ করিয়া সংসারী হইয়াছে—ক্রমে বিষয়-বুদ্ধিতে পাঁচখানা গ্রামের লোককে বিস্মিত করিয়া দিয়াছে। সে আজ গণ্যমান্য ব্যক্তি, গ্রামের মাতব্বর।

অনিরুদ্ধ এবং এই ছিরু পাল—এই দুইজনেই গ্রামখানার সমস্ত শৃঙ্খলা ভাঙিয়া দিল। ওই সঙ্গে গিরিশ ছুতার, তারা নাপিতও আছে। দেবু আশ্চর্য হইয়া ভাবিতেছিল—অনিরুদ্ধ ওই যে দম্ভভরে সামাজিক নিয়ম উপেক্ষা করিয়া চণ্ডীমণ্ডপ হইতে ভোগ উঠাইয়া লইয়া গেল, অথচ সমাজের কেহ তাহাকে প্রতিরোধ করিতে পারিল না, ইহার কি কোন প্রতিকার নাই? এ কয়েকদিন সে নিজেই লোকের দুয়ারে দুয়ারে ফিরিয়াছে, গ্রামের লোক তাহাকে ভালবাসে, অনেকে শ্রদ্ধা করে; কিন্তু এক্ষেত্রে সকলেই বলিয়াছে এক কথা—এর আর করবে কি দেবু? উপায় কি বল? যদি থাকে তাহলে তুমি কর! তবে বুঝচ কি না—উ হবে না! কি সমাজ সমাজ করছ? সমাজ কই?

নাই! দেবু নিজেই বুঝিয়াছে, নাই! সেকালে যে-সব মানুষ এই সমাজ গড়িয়াছিল, এই সমাজ শাসন করিত, এ সমাজকে ভাল করিয়া জানিত, বুঝিত—সে-সব মানুষই আর নাই। সে শিক্ষাও নাই, সে দীক্ষাও নাই, সে দৃষ্টি নাই। এ-সব মানুষ আর এক জাতের মানুষ। আর এক ধাঁতের মানুষ। মানুষের নামে অমানুষ।

জগন ডাক্তার সেদিন বলিয়াছিল—ধ'রে এনে বেটাচ্ছেলে কামারকে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে লাগাও ঘা-কতক।

জগনের ও প্রস্তাবে দেবু সায় দিতে পারে নাই। ছি! মানুষকে শিক্ষা দিবার অধিকার আছে, ক্ষেত্রবিশেষে মনুষ্যোচিত শাসন করিবার অধিকারও সে স্বীকার করে কিন্তু অত্যাচারই একমাত্র শাসন নয়। জীবনে তাহার আকাঙ্ক্ষা আছে, কিন্তু সে আকাঙ্ক্ষা পরিপূরণের জন্য হীন কৌশল, অত্যাচার ও অন্যায়কে অবলম্বন করিতে সে চায় না। জীবনে তাহার একটি আদর্শবোধও আছে। পাঠ্যাবস্থায় আপনার ভাবী জীবনে আত্মপ্রতিষ্ঠার কামনায় সেই বোধটিকে দেবু গড়িয়া তুলিয়াছিল। মহাপুরুষদের দৃষ্টান্তের সঙ্গে খাপ খাওয়াইয়া নিজের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চিন্তা ও অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে গঠিত সেই আদর্শবোধ। বাল্যজীবনের কতকগুলি ঘটনা হইতে কয়েকটি ধারণা তাহার বদ্ধমূল হইয়া আছে। বারংবার নিরপেক্ষ বিচার-বুদ্ধি-শাণিত যুক্তির আঘাত দিয়াও সে-ধারণাগুলি আজও তাহার খণ্ডিত হয় নাই।

জমিদারকে, ধনী মহাজনকে সে ঘৃণা করে। তাহাদের প্রতিটি কর্মের মধ্যে অন্যায়ের সন্ধান করা যেন তাহার স্বভাবের মধ্যে দাঁড়াইয়া গিয়াছে। তাহাদের অতি-উদার দান-ধ্যান-ধর্ম-কর্মকেও সে মনে করে কোন গুপ্ত গো-বধের স্বেচ্ছাবৃত চান্দ্রায়ণ প্রায়শ্চিত্ত বলিয়া। তাহার অবশ্য কারণ আছে।

তাহার বাল্যকালে একবার জমিদার বাবুরা বাকী খাজনা আদায়ের জন্য তাহার বাবাকে সমস্ত দিন কাছারিতে আটক রাখিয়াছিল। আতঙ্কিত দেবু তিনবার বাবুদের কাছারিতে গিয়া দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া শুধু কাঁদিয়াছিল; দুইবার চাপরাসীর ধমক খাইয়া পলাইয়া আসিয়াছিল। শেষবার বাবু তাহাকে দেখিয়া বলিয়াছিল—এবার যদি আসবি ছোঁড়া, তবে কয়েদখানায় বন্ধ করে রেখে দেব। চাপরাসীটা তাহাকে টানিয়া আনিয়া একটা অন্ধকার ঘরও দেখাইয়া দিয়াছিল। বাবুদের অবশ্য কয়েদখানার জন্য স্বর্গধাম কি বৈকুণ্ঠজাতীয় কোন মহল বা ঘর কোনদিনই ছিল না। নিতান্তই ছোট জমিদার তাহারা, দেবুকে নিছক ভয় দেখাইবার জন্য ও-কথাটা বলা হইয়াছিল—সেটা দেবু আজ বোঝে। কিন্তু জমিদার অত্যাচারী—এ ধারণা তাহাতে একবিন্দু ক্ষুণ্ণ হয় নাই।

জমিদারের ওই বাকী খাজনা শোধের জন্য তাহার বাপ কঙ্কণার মুখুজ্জে বাবুদের কাছে ঋণ করিয়াছিল। তাহারা তিন বৎসর অন্তে হ্যাণ্ডনোটের নালিশ করিয়া অস্থাবর ক্রোকী পরোয়ানা আনিয়া, গাই-বাছুর-থালা-গেলাস ও অন্যান্য জিনিসপত্র টানিয়া রাস্তায় যেদিন বাহির করিয়াছিল সেদিনের সেই লাঞ্ছনা-বিভীষিকা দেবু কিছুতেই ভুলিতে পারে না। তাহার পর অবশ্য ডিক্রীর টাকা আসল করিয়া তমসুক লিখিয়া দিবার প্রতিশ্রুতি দিলে বাবুরা অস্থাবর ছাড়িয়া দিয়াছিল। সে-টাকা তাহার বাবার মৃত্যুর পর সে শোধ করিয়াছে। এই বাবুরা অবশ্য বে-আইনী কখনও কিছু করে না, হিসাবের বাহিরে একটি পয়সা অতিরিক্ত লয় না। লোকে বলে—মুখুজ্জে বাবুদের মত মহাজন বিরল। টাকা আদায়ের জন্য জোর-জুলুম নাই, অপমান নাই, সুদ শোধ করিয়া গেলে নালিশ কখনও করিবে না; লোকের সম্পত্তির উপর তাহাদের প্রলোভন নাই। নীলাম করিয়া লওয়ার পরও টাকা দিলেই বাবুরা সম্পত্তি ফেরত দেয়। ইহার একবিন্দু অতিরঞ্জন নয়। তবু দেবু মহাজনকে ক্ষমা করিতে পারে না।

এ-সবের উপর আরও একটা তিক্ত অভিজ্ঞতা তাহার মনে অক্ষয় হইয়া আছে। স্কুলে সে ছিল সর্বাপেক্ষা ভাল দুইটি ছেলের একটি। তাহার নিচের ক্লাসে পড়িত মহাগ্রামের মহামহোপাধ্যায় ন্যায়রত্নের পৌত্র বিশ্বনাথ, সে ছিল দ্বিতীয় জন। শিক্ষকেরা প্রত্যাশা করিতেন—এই ছেলে দুইটি স্কুলের মুখোজ্জ্বল করিবে। কিন্তু দেবু আজও ভুলিতে পারে না যে, সে ছিল শিক্ষকদের সস্নেহ করুণার পাত্র; ন্যায়রত্নের পৌত্র বিশ্বনাথ পাইত স্নেহের সহিত শ্রদ্ধা আর কঙ্কণার বাবুদের মধ্যম মেধার কয়েকটি ছাত্র পাইত স্নেহের সহিত সম্মান। এমন কি, এই ছিরুকেও স্কুলের হেডপণ্ডিত তোষামোদ করিতেন, কারণ প্রয়োজনমত ছিরুর বাপের কাছে তিনি কখনও তালগাছ, কখনও জামগাছ, ক্রিয়াকর্মে দশ-পনেরো সের মাছ চাহিয়া লইতেন। ইহা ছাড়া ঘি, চাল, ডাল, গুড় প্রভৃতি তো নিয়মিত উপহার পাইতেন।

ওই পণ্ডিতটির নির্লজ্জ লোভের কথা মনে করিলে দেবুর সর্বাঙ্গ রি-রি করিয়া উঠে। বিশ বৎসর বয়সে ছিরু স্কুলের ফিফথ ক্লাস হইতে বিদায় লইলে, পণ্ডিত ছিরুর বাপকে বলিয়াছিল—ছেলেকে সংস্কৃত পড়াও মোড়ল।

ছিরুর বাপ ব্রজবল্লভ ছিল শক্তিশালী চাষী—নিজের পরিশ্রমের সাধনায় সে ঘরে লক্ষ্মীর কৃপা আয়ত্ত করিয়াছিল, কিন্তু নিজে ছিল মূর্খ। তাই বড় সাধ ছিল ছেলেটি তাহার পণ্ডিত হয়। ছিরু বিশ বৎসর বয়সে পশু-স্বভাব-সম্পন্ন হইয়া উঠায় বেচারার মনস্তাপের সীমা ছিল না। পণ্ডিতের কথায় সে ছেলেকে পণ্ডিতের ছাত্র করিয়া দিল। ছিরু প্রথমটা আপত্তি করে নাই। পণ্ডিত পড়াইতে আসিয়া গল্প করিতেন। বিশেষ করিয়া বয়স্ক বিবাহিত ছাত্রের কাছে তিনি আদিরসাশ্রিত সংস্কৃত শ্লোকের ব্যাখ্যা করিয়া এবং ঐ ধরনের গল্প বলিয়া বৎসর চারেক নিয়মিতভাবেই বেশ প্রসন্ন গৌরবের সঙ্গে গ্লানিহীন চিত্তে বেতন লইয়াছিলেন। অবশ্য বেতন বেশী নয় মাসিক দুই টাকা। চারি বৎসর পর ছিরু আবার বিদ্রোহ করিল। ছিরুর বাপ কিন্তু নাছোড়বান্দা। ছিরু তখন পণ্ডিতের হাত হইতে নিষ্কৃতি পাইবার জন্য বুলি ধরিল—সংস্কৃত পড়িয়া কি হইবে? পড়িতে হইলে সে ইংরাজীই পড়িবে।

ইংরাজী পড়াইবার গৃহশিক্ষক কিন্তু পণ্ডিতের ডবল বেতন দাবী করিল। ছিরু তখন ধরিল—সে স্কুলেই পড়িবে। চব্বিশ বৎসর বয়সে সে আবার আসিয়া ফিফথ ক্লাসে বসিল। দেবুও তখন ফিফথ ক্লাসে উঠিয়াছে। হঠাৎ ছিরুর নজর পড়িল দেবুর উপর। দেবুর পাশে অনি কামার। স্কুলে পড়িবার কথা যখন বলিয়াছিল—তখন এই কথাটা ছিরুর মনে হয় নাই। তাহার কল্পনা ছিল অন্যরকম। স্কুলে পড়িবার নাম করিয়া সে কঙ্কণার অথবা স্বগ্রামের নীচ জাতীয়দের পল্লীতে দিনটা কাটাইয়া আসিবে। কিন্তু দেবুকে এবং অনিরুদ্ধকে ক্লাসে দেখিয়া সে আর মাথা ঠিক রাখিতে পারিল না। সঙ্গে সঙ্গেই সে বই-খাতা লইয়া উঠিয়া চলিয়া আসিল। বাড়ী চলিয়া আসিল না। সেই পথে-পথেই সে গিয়া উঠিল তাহার মাতামহের বাড়ী। সেখানে গিয়াই সে তাহার জীবনের আদর্শ গুরু ত্রিপুরা সিংকে পাইয়াছিল। তাহার জীবনে পথ দেখায় যে সে-ই মানুষের গুরু, মাতামহের মনিব ত্রিপুরা সিংকে দেখিয়া ছিরু তাহাকেই মনে মনে গুরুপদে বরণ করিয়া নিজের কর্ম-জীবন-যাত্রা শুরু করিল। কিন্তু চব্বিশ বৎসর বয়সে ছিরু যেদিন ক্লাসে আসিয়া বসিয়াছিল—সেদিনও পণ্ডিত আসিয়া বলিয়াছিলেন—খবরদার, ছিরুকে দেখে কেউ হেসো না। তাহার মধ্যে ব্যঙ্গ ছিল না—ছিল খাতির।—সে কথা দেবুর আজও মনে আছে।

স্কুলের মধ্যে সকলের চেয়ে সম্মানের পাত্র ছিল কঙ্কণার মুখুজ্জেদের মূর্খ ছেলেটা। তিন-তিন জন গৃহশিক্ষক সত্ত্বেও কোন বিষয়ে তাহার পরীক্ষার নম্বর চল্লিশের কোঠায় পৌঁছিত না। একবার সে সঙ্গীদের মধ্যে রহস্য করিয়া বলিয়াছিল—গাধা পিটে কখনও ঘোড়া হয় না।

কথাটা ছেলেটার কানে উঠিতেই সে শোরগোল তুলিয়া ফেলিল। সেই শোরগোলে একেবারে শিক্ষকমণ্ডলী পর্যন্ত কাঁপিয়া উঠিলেন। আপিসে ডাকাইয়া আনিয়া হেডমাস্টার তাহাকে ক্ষমা চাহিতে বাধ্য করিয়াছিলেন। একজন শিক্ষক বলিয়াছিলেন—গাধা রে, গাধা নয়, হাতী—হাতীর বাচ্চা। গজেন্দ্রগমন একটু একটু ধীরই বটে। আজ বুঝবি না বড় হ'লে বুঝবি।...

সে-কথাটা এখন সে মর্মে মর্মে বুঝিতেছে। বাবুদের সেই ছেলেটি বার-দু'য়েক ফেল করার পর শেষে তৃতীয় বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করিয়া আজ লোকাল বোর্ড, ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের মেম্বর, ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট, অনারারী ম্যাজিস্ট্রেট। প্রতি মাসে দেবুকে ইউনিয়ন বোর্ডে গিয়া পাঠশালার সাহায্যের জন্য তাহার সম্মুখে হাত পাতিয়া দাঁড়াইয়া থাকিতে হয়। ছিরু পালও সম্প্রতি ইউনিয়ন বোর্ডের মেম্বর হইয়াছে। মধ্যে মধ্যে সে-ও আসিয়া জিজ্ঞাসা করে—কি গো, পাঠশালা চলছে কেমন?

দেবুর মাথার মধ্যে আগুন জ্বলিয়া উঠে।—সেদিন একখানা ছেলেদের বইয়ে একটা ছড়া দেখিল—'লেখাপড়া করে যেই গাড়ী ঘোড়া চড়ে সেই।' দেবু সে লাইনটি বার বার কলম চালাইয়া কাটিয়া দিল। তারপর বোর্ডের উপর খড়ি দিয়া লিখিয়া দিল—লেখাপড়া করে যেই—মহামানী হয় সেই।

তারপর আরম্ভ করিল—ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের গল্প।

মধ্যে মধ্যে, তাহার মনে হয়, সে যদি ইউনিয়ন বোর্ডের ওই প্রেসিডেন্টের আসনে বসিতে পারিত, তবে সে দেখাইয়া দিত ওই আসনের মর্যাদা কত! কত—কত—কত কাজ সে করিত!

সে কল্পনা করিত—অসংখ্য পাকা রাস্তা! প্রতি গ্রাম হইতে লাল কাঁকড়ের সোজা রাস্তা বাহির হইয়া মিলিত হইয়াছে এই ইউনিয়নের প্রধান গ্রামের একটি কেন্দ্রে—সেখান হইতে একটি প্রশস্ত রাজপথ চলিয়া গিয়াছে জংশন শহরে। ওই রাস্তা দিয়া চলিয়াছে সারি সারি ধান-চালে বোঝাই গাড়ী, লোকে ফিরিতেছে পণ্য-বিক্রয়ের টাকা লইয়া, ছেলেরা স্কুলে চলিয়াছে ওই পথ ধরিয়া। সমস্ত গ্রামের জঙ্গল সাফ হইয়া—ডোবা বন্ধ হইয়া একটি পরিচ্ছন্নতায় চারিদিক ভরিয়া উঠিয়াছে। সমস্ত স্থানগুলিতে ছড়াইয়া দিয়াছে দোপাটি ফুলের বীজ; দোপাটি শেষ হইলে গাঁদার বীজ। ফুলে ফুলে গ্রামগুলি আলোকিত হইয়া উঠিয়াছে। প্রতি গ্রামের প্রতি পল্লীতে একটি করিয়া পাকা ইদারা খোঁড়া হইয়াছে। কোনো পুকুরে এক কণা আবর্জনা নাই, কালো জল টলটল করিতেছে—পাশে পাশে ফুটিয়া আছে শালুক ও পানাড়ীর ফুল। কোর্ট বেঞ্চের সুবিচারে সমস্ত অন্যায়, অত্যাচারের প্রতিবিধান হইয়াছে—কঠিন হস্তে সে মুছিয়া দিতেছে উৎপীড়ন ও অবিচার।—এই সমস্তই সে সম্ভব করিয়া তুলিতে পারে; সুযোগ পাইলে সে প্রমাণ করিয়া দিতে পারে যে, স্থূলকায় মন্থরগতি চতুষ্পদ হইলেই সে হাতী নয়, সোনার খুর-বাঁধানো হৃষ্টপুষ্ট হইলেও গর্দভ চিরদিনই গর্দভই।

ঈর্ষার উত্তেজনায়, কর্মের প্রেরণায় সে অধীর হইয়া উঠিয়া দাঁড়ায়, দ্রুতপদে ঘুরিয়া বেড়ায়, মধ্যে মধ্যে হাতখানা ভাঁজিয়া অতি দৃঢ় মুঠা বাঁধিয়া পেশী ফুলাইয়া কঠিন কঠোর করিয়া তোলে। সকল দেহমন ভরিয়া সে যেন শক্তির আলোড়ন অনুভব করে।

তাহার স্ত্রীটি বড় ভাল মেয়ে। ধবধবে রঙ, খ্যাঁদা নাক, মুখখানি কোমল—অতি মিষ্টি তাহার চোখের দৃষ্টি। আকারে ছোটখাটো, মাথায় একপিঠ চুল—সরল সুন্দর তাহার মন। তাহার উপরে দেবুর মত ব্যক্তিত্বসম্পন্ন স্বামীর সংস্পর্শে আসিয়া আপনাকে সে একেবারে হারাইয়া ফেলিয়াছে। মধ্যে মধ্যে দেবুর এই মূর্তি দেখিয়া সে সবিস্ময়ে প্রশ্ন করে—ও কি হচ্ছে গো? আপনার মনে—

দেবু হাসিয়া বলে—ভাবছি আমি যদি রাজা হতাম।

—রাজা হতে! সে কি গো?

—হ্যাঁ। তা হ'লে তুমি হতে রানী।

—হ্যাঁ—

তাহার বিস্ময়ের আর অবধি রহিল না। কিন্তু কথাগুলি ভারী মজার কথা। তাই তো—পণ্ডিত রাজা হইলে সে রানী হইত ইহা তো খাঁটি সত্য কথা।

দেবু আরও খানিকটা গোল পাকাইয়া বলিল—কিন্তু রানী হলেও তোমার গয়না থাকত না।

অভিভূতা হইয়া গেল দেবুর বউ—সে স্তব্ধ হইয়া গেল।

দেবু হাসিয়া বলে—এ রাজার রাজ্য আছে, কিন্তু রাজা তো প্রজার কাছে খাজনা পায় না। ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট বুঝেছ? লোকের কাছে ট্যাক্স নিয়ে গ্রামের কাজ করতে হয়। ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে হয়।

অন্তরে শুভ আকাঙ্ক্ষা এবং উচ্চ কল্পনা থাকিলেই সংসারে তাহা পূর্ণ হয় না। পারিপার্শ্বিক অবস্থাটাই পৃথিবীতে বড় শক্তি। বার বার চেষ্টা করিয়া দেবু সেটা উপলব্ধি করিয়াছে। শীতকালে বর্ষা নামিলেও ধানের চাষ অসম্ভব। বর্ষার সময় খুব উঁচু জমি দেখিয়া দেবু একবার আলুর চাষ করিয়াছিল; কিন্তু আলুর বীজ অঙ্কুরিত হইয়াই জলের স্যাঁতস্যাঁতানিতে মরিয়া গিয়াছিল। যে দুই চারটি গাছ বাঁচিয়াছিল—তাহাতে যে আলু ধরিয়াছিল, তাহার আকার মটর কলাইয়ের মত বলিলে বাড়াইয়া বলা হইবে না। সমস্ত আশা-আকাঙ্ক্ষা হৃদয়ে বন্ধ রাখিয়া সে নীরবে পাঠশালার কাজ করিয়া যায়। এবং নিজের গ্রামখানির একটি ভবিষ্যৎ রূপকে মাতৃগর্ভের ভ্রূণের মত বিধাতার কল্পনায় লালন করিয়াও যায় মনে মনে। গ্রামের ছোটখাটো সকল আন্দোলন হইতে সে নিজে যথাসাধ্য পৃথকই থাকিতে চায়। সে জানে ইহাতে তাহার মত অবস্থার লোকের ক্ষতিই হয়। পাঠশালার বাঞ্ছিত দলাদলিতে তাহার না থাকাই উচিত—তবু সকল চেষ্টা ব্যর্থ করিয়া তাহার আকাঙ্ক্ষা কল্পনা এমনি ধারায় আন্দোলন উত্তেজনার স্পর্শ পাইবামাত্র নাচিয়া বাহির হইয়া আসে।

গ্রামখানির যাবতীয় অভাব-অভিযোগ, ত্রুটি-বিশৃঙ্খলা তাহার নখদর্পণে। গ্রামের সামাজিক ইতিহাস সে আবিষ্কারকের মত খুঁজিয়া খুঁজিয়া সংগ্রহ করিয়াছে। গ্রামের কামার, ছুতার, নাপিত, পুরোহিত, দাই, চৌকিদার, ধোপা প্রভৃতির কাহার কি কাজ, কি বৃত্তি, কোথায় ছিল তাহাদের চাকরান জমি, সমস্তই সে যেমন জানিয়াছে এমনটি আর কেহ জানে না। বিগত পাঁচপুরুষের কালের মধ্যে গ্রামের পঞ্চায়েতমণ্ডলীর কীর্তি-অপকীর্তির ইতিহাসও আমূল তাহার কণ্ঠস্থ।

চণ্ডীমণ্ডপের আটচালায় বসিয়া পাঠশালায় পড়াইতে পড়াইতে দেবু ঘোষ চণ্ডীমণ্ডপটির কথা ভাবে। এই চণ্ডীমণ্ডপটি একদিন ছিল গ্রামের হৃৎপিণ্ড, সমস্ত জীবনীশক্তির কেন্দ্রস্থল। পূজাপার্বণ, আনন্দ, উৎসব, অন্নপ্রাশন, বিবাহ, শ্রাদ্ধ—সব অনুষ্ঠিত হইত এইখানে। অন্যায়-অবিচার-উৎপীড়ন, বিশৃঙ্খলা-ব্যভিচার পাপ গ্রামের মধ্যে দেখা দিলে, এই চণ্ডীমণ্ডপেই বসিত পঞ্চায়েত। এই আসরে বসিয়া বিচার চলিত, শাসন করিয়া সে সমস্ত দূর করা হইত। গ্রামের ঠিক মধ্যস্থলে স্থাপিত এই চণ্ডীমণ্ডপ হইতে হাঁক দিলে গ্রামের সমস্ত ঘর হইতে সে ডাক শোনা যায়, সে ডাক উপেক্ষা করিবার কাহারো সামর্থ্য ছিল না। আরও তাহার মনে আছে, চণ্ডীমণ্ডপের পাশ দিয়া সেকালে যে যতবার যাইত প্রণাম করিয়া যাইত। আজকাল আর মানুষ প্রণামও করে না। মধ্যে মধ্যে তাহার মনে হয়, দেবতাকে—ঈশ্বরকে উপেক্ষা করিয়াই তাহারা এই পরিণতির পথে চলিয়াছে! দেবু নিত্য নিয়মিত তিন সন্ধ্যা এখানে প্রণাম করে। 'আপনি আচরি ধর্ম' নীরবে সে পরকে শিখাইতে চায়।

নাস্তিকতার পরিণাম সম্পর্কে এক ঘটনার কাহিনী তাহার অন্তরে অদ্ভুত প্রভাব বিস্তার করিয়া রহিয়াছে। তাহার অবশ্য শোনা কথা, তাহার জীবনকালে ঘটিলেও সে তখন ছিল নিতান্তই শিশু। তাহার বাল্যবন্ধু বিশ্বনাথ মহাগ্রামের মহামহোপাধ্যায় ন্যায়রত্নের পৌত্র। বিশ্বনাথের পিতা পণ্ডিত শশিশেখরের কাহিনী সেটি। পণ্ডিত শশিশেখর তাঁহার পিতা ওই ঋষিতুল্য ন্যায়রত্নের অমতে ইংরেজী শিখিয়া নাস্তিক হইয়া উঠিয়াছিলেন। এ দেশে ব্রাহ্মণসভা ডাকিয়া পুরাতন কালের কুসংস্কার বর্জনের একটা চেষ্টা করিয়াছিলেন। অধিবেশনটার তিনিই ছিলেন উদ্যোক্তা। সেই অধিবেশনে তিনি সর্বাগ্রে নারায়ণশিলা স্থাপন করিয়া অর্চনা না করার জন্য ন্যায়রত্ন শিহরিয়া উঠিয়া প্রতিবাদ করেন। নাস্তিক শশিশেখর নাস্তিকতাবাদের যুক্তিতে পিতার সহিত তর্ক করেন। ফলে সভা পণ্ড হয়। শুধু তাই নয়, উদভ্রান্ত শশিশেখরের মৃত্যু হয় অপঘাতে, রেল এঞ্জিনের তলায় তিনি স্বেচ্ছায় কাটা পড়েন। ঘটনার সংঘটন তাই বটে, কিন্তু দেবু ঘোষ তাহার মধ্যে দেখিতে পায় কর্মফলের অলঙ্ঘ্য বিধান। দেবুর সব চেয়ে বড় দুঃখ—এই পরিণতি জানিয়াও ন্যায়রত্নের পৌত্র বিশ্বনাথও নাস্তিক হইয়া উঠিয়াছে। সে এখন কলিকাতায় এম-এ পড়ে। যখন আসে তখন দেবুর সঙ্গে দেখা করে। এম-এ ক্লাসের ছাত্র হইয়াও কিন্তু বিশ্বনাথ এখনও তাহার বন্ধুই আছে। বয়সে সে দেবুর পাঁচ-ছয় বৎসরের ছোট হইলেও দেবুর বন্ধু সে; স্কুলে ভাল ছেলে বলিয়া তাহাদের পরস্পরের ঘনিষ্ঠতা ছিল। তখন বিশ্বনাথ তাহাকে দেবু-দা বলিত। বয়সের সঙ্গে দেবু আপনার ও বিশ্বনাথের সামাজিক পার্থক্য বুঝিয়া বলিয়াছিল—তুমি আমাকে দাদা বলো না কিন্তু ভাই; আমার ওতে অপরাধ হয়। বিশু তখন হইতে দেবুকে বলে দেবু ভাই। এখন তাহার বন্ধু—সত্যকারের বন্ধু। কখনও শ্রেষ্ঠত্বের এতটুকু তীক্ষ্ণাগ্র কণ্টক-স্পর্শ সে তাহার সান্নিধ্যে অনুভব করে না। এই বিশ্বনাথও সন্ধ্যাহ্নিক করে না, এই চণ্ডীমণ্ডপে আসিয়াও কখনও দেবতাকে প্রণাম করে না।

দেবু কিছুদিন আগে এই চণ্ডীমণ্ডপ সম্বন্ধে তাহার চিন্তার কথা বিশ্বনাথকে বলিয়াছিল কি করিয়া এই চণ্ডীমণ্ডপটির হৃতগৌরব পুনরুদ্ধার করা যায়, সে সম্বন্ধে প্রশ্ন করিয়াছিল। বিশ্বনাথ হাসিয়াছিল—সে আর হবে না, দেবু ভাই। চণ্ডীমণ্ডপটা বুড়ো হয়েছে, ও মরবে এইবার।

—বুড়ো হয়েছে? মরবে মানে?

—মানে, বয়স হলেই মানুষ যেমন বুড়ো হয়, তেমনি চণ্ডীমণ্ডপটা কতকালের বল তো? বুড়ো হয় নি?

চাল-কাঠামোর দিকে চাহিয়া দেবু বলিয়াছিল—ভেঙে নতুন করে করতে বলছ?

বিশ্বনাথ হাসিয়াছিল; বলিয়াছিল—রঙিন পেনিফ্রক পরলেই বুড়ো খোকা হয় না, দেবু-ভাই! এ যুগে ও চণ্ডীমণ্ডপ আর চলবে না। কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্ক করতে পার? কর না ওই ঘরটাতে কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্ক, দেখবে দিনরাত লোক আসবে এইখানে। ধর্ণা দিয়ে পড়ে থাকবে।

তারপর সে অনেক যুক্তিতর্ক দিয়া দেবুকে বুঝাইতে চাহিয়াছিল টাকাই সব। সেকালের ধর্মমত সামাজিক ব্যবস্থার ভিতরেও অতি সূক্ষ্ম কৌশলে নাকি ওই টাকাটাই ছিল ধর্ম, কর্ম, স্বর্গ, মর্ত্য, নরক সমস্ত কিছুর ভিত্তি। ভিত্তির সেই টাকার মশলাটা আজ শূন্য হইয়া যাওয়াতেই এই অবস্থা।

দেবু বার বার প্রতিবাদ করিয়া বলিয়াছিল—না—না—না।

বিশ্বনাথ হাসিয়াছিল।

দেবু প্রতিবাদ করিয়া তীক্ষ্ণ-কণ্ঠে বলিয়া উঠিয়াছিল—ছি—ছি—ছি, বিশু-ভাই। তুমি ঠাকুর মশায়ের নাতি, তোমার মুখে এ কথা শোভা পায় না। তোমার প্রায়শ্চিত্ত করা উচিত!

বিশ্বনাথ আরও কিছুক্ষণ হাসিয়া অবশেষে বলিয়াছিল—আমি কতকগুলো বই পাঠিয়ে দেব, দেবু-ভাই, তুমি পড়ে দেখ।

—না। ওই সব বই ছুঁলে পাপ হয়। ও-সব বই তুমি পাঠিয়ো না।

সে প্রাণপণে আপন সংস্কারকে আঁকড়াইয়া ধরিয়া আছে। তাহাকে সে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করিতে চায়। তাই নবান্নের দিনে অনিরুদ্ধকে এই চণ্ডীমণ্ডপে পূজার অধিকার হইতে বঞ্চিত করিয়া তাহাকে সামাজিক শাস্তি দিবার জন্য জগনের সহিত মিলিত হইয়া দাঁড়াইয়াছিল। কিন্তু আশ্চর্যের কথা, সারা গ্রামটার আর একজনও কেহ তাহাদের পাশে আসিয়া দাঁড়াইল না। অনিরুদ্ধও বিনা দ্বিধায় অবলীলাক্রমে ভোগপূজার থালা তুলিয়া লইয়া চলিয়া গেল। অনিরুদ্ধের পিতৃপিতামহের কিন্তু এ সাধ্য ছিল না।

দেবু দিশাহারা হইয়া কয়েকদিন ধরিয়া এইসব ভাবিতেছে। মধ্যে মধ্যে মনে হয়, হয়তো দেবতা একদিন আপন মহিমায় জাগ্রত হইবেন—অন্যায়ের ধ্বংস করিবেন, ন্যায়ের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করিবেন। শাস্ত্রের বাণীগুলি সে স্মরণ করে। কিন্তু আশ্চর্যের কথা, কিছুক্ষণ পরেই সে হতাশায় অবসন্ন হইয়া পড়ে।

পাতু মুচী সেই একটি দিনের দিকে চাহিয়াই বাঁচিয়া আছে। সেই ভরসায় সে সমস্ত দুঃখ-কষ্টের বোঝা মাথায় লইয়া চলিয়াছে। কিন্তু দেবু যে তাহাদের মত কোনমতেই ওই ভরসায় এমনি করিয়া বাঁচিয়া থাকিতে পারে না।

পাঠশালায় ছুটি দিয়াও দেবু একা চণ্ডীমণ্ডপে বসিয়া ওই সব কথাই ভাবিতেছিল। পথ হইতে কে ডাকিল—পণ্ডিতমশায় গো!

—কে?

—ওরে বাস্ রে! বসে বসে কি এত ভাবছ গো? —মুচীদের দূর্গা দুধ বেচিতে যাইতেছিল, পথ হইতে দেবুকে ডাকিয়া সে-ই কথা বলিল।

ভ্রূ কুঞ্চিত করিয়া দেবু বলিল—সে খবরে তোর দরকার কি রে?

মেয়েটাকে সে দু’চক্ষে দেখিতে পারে না, সে স্বৈরিণী—সে ভ্রষ্টা—সে পাপিনী; বিশেষ করিয়া সে ওই ছিরুর সহিত ঘনিষ্ঠভাবে সংশ্লিষ্ট। তাহাকে সে ঘৃণা করে।

দূর্গা হাসিয়া বলিল—খবরে আমার দরকার নাই, দরকার তোমার বউয়ের। পথের পানে চোখ চেয়ে বিলু দিদি বাড়ীর দুয়োরে দাঁড়িয়ে আছে।

তাই তো! দেবুর এতক্ষণে চমক ভাঙিল, সে তাড়াতাড়ি উঠিয়া দাঁড়াইল। ওঃ, এ যে অনেক বেলা হইয়া গিয়াছে! চণ্ডীমণ্ডপ হইতে নামিয়া সে হন্ হন্ করিয়া আসিয়া বাড়ী ঢুকিল। ভালমানুষ বউটি সত্যই পথ চাহিয়া বসিয়াছিল। সে বলিল—রান্না হয়ে গিয়েছে, চান কর!

দেবুর জীবনে এই এক পরম সম্পদ। ঘরে তাহার কোন দ্বন্দ্ব নাই, অশান্তি নাই। তাই বোধ হয় বাহিরে বাহিরে সমগ্র গ্রামখানি জুড়িয়া দ্বন্দ্ব অশান্তি সন্ধান করিয়া ফিরিয়াও তাহার ক্লান্তি আসে না।

দেবু চলিয়া গেলেও দূর্গা অনেকক্ষণ দাঁড়াইয়া রহিল, দেবু যে পথে গেল, সেই পথ-পানে চাহিয়াই দাঁড়াইয়া রহিল। পণ্ডিতকে তাহার ভাল লাগে—খুব ভাল লাগে। ছিরুকে সে এখন ঘৃণা করে; সেই আগুন লাগানোর সংবাদ সে কাহাকেও বলে নাই; ঘৃণায় তাহার সহিত সংস্রব ত্যাগ করিয়াছে। কিন্তু ছিরুর সহিত যখন তাহার ঘনিষ্ঠতা ছিল—তখনও তাহার পণ্ডিতকে ভাল লাগিত, ছিরু অপেক্ষা অনেক বেশী ভাল লাগিত। কিন্তু আশ্চর্যের কথা এই যে, এই দুই ভাল লাগার মধ্যে কোন দ্বন্দ্ব ছিল না। আজ পণ্ডিতকে পূর্বাপেক্ষা যেন আরও বেশী ভাল লাগিল।

পণ্ডিতের সহিত তাহার একটা সম্বন্ধও আছে। রক্তের সম্বন্ধ নয়, পাতানো সম্বন্ধ। দেবুর বউ বিলুকে তাহার মা এককালে কোলেপিঠে করিত। সেই কারণে সে বিলুকে দিদি বলে। দেবু পণ্ডিত তাহার বিলু দিদির বর।

বারো

অগ্রহায়ণ সংক্রান্তিতে ‘ইতুলক্ষ্মী’ পর্ব আসিয়া গেল।

অন্যান্য প্রদেশে—বাংলাদেশে বিশেষ অঞ্চলে কার্তিক-সংক্রান্তি হইতেই ইতু বা মিত্র-ব্রত আরম্ভ হয়, শেষ হয় অগ্রহায়ণ সংক্রান্তিতে। রবিশস্যের কল্যাণ কামনা করিয়া সূর্য-দেবতার উপাসনা হইতেই নাকি ইহার উদ্ভব। দেবুদের দেশে কিন্তু সমগ্র মাস ধরিয়া সূর্য-দেবতার আরাধনার প্রচলন নাই। এদেশে রবিশস্যের চাষেরও বিশেষ প্রসার নাই, ধান-চাষ এখানকার প্রধান কৃষিকর্ম। ইতু-পর্বকে এখানে ইতুলক্ষ্মী বা ইতু-সংক্রান্তি পর্ব বলা হয়। হৈমন্তী-ধান মাড়াই ও ঝাড়াই করিবার শুভ প্রারম্ভের পর্ব এটি এবং রবিশস্যের আবাহনও বটে। চাষীদের আপন খামারে ইহার অনুষ্ঠান হয়। খামারের ঠিক মধ্যস্থলে শক্ত একটি বাঁশের খুঁটি পুঁতিয়া সেই খুঁটির তলায় আল্পনা দিয়া সেইখানে লক্ষ্মীর পূজা ভোগ হয়। ধান মাড়াইয়ের সময়ে ওই খুঁটিটির চারদিকেই ধানসুদ্ধ পোয়াল বিছাইয়া দেওয়া হইবে এবং গরু মহিষগুলি ওই খুঁটিতে আবদ্ধ থাকিয়া বৃত্তাকারে পোয়ালের উপর পাক দিয়া ফিরিবে। তাহাদের পায়ের খুরের মাড়াইয়ে খড় হইতে ধান ঝাড়াই হইয়া যাইবে।

এ পর্বের সঙ্গে চণ্ডীমণ্ডপের সম্বন্ধ বিশেষ নাই। তবে মেয়েরা প্রাতঃকালে স্নান করিয়া চণ্ডীমণ্ডপে প্রণাম না করিয়া লক্ষ্মী পাতিবে না। পূর্বকালে আরও খানিকটা ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ ছিল। দেবুর মনে আছে, পনেরো বৎসর পূর্বেও লক্ষ্মীপূজার শেষে সমস্ত গ্রামের মেয়েরা আসিয়া এইখানে সমবেত হইয়া সুপারি হাতে ব্রত-কথা শুনিতে বসিত। গ্রামের প্রবীণা কেহ ব্রত-কথা বলিতেন। অপর সকলে শুনিত। আজকাল সে রেওয়াজ উঠিয়া গিয়াছে। এখন দুই-তিন বাড়ির মেয়েরা কোনো এক বাড়িতে একত্রিত হইয়া ব্রত-কথা শুনিয়া লয়। দেবুর বাড়িতেও এই ব্রত-কথার আসর বসে। আজ দেবু পাঠশালায় পড়াইতে পড়াইতে ওইসব কথাই ভাবিতেছিল। তাহার মনে সেদিন হইতে সমস্ত প্রেরণা ও শক্তি ক্ষুব্ধ ও আহত হইয়া অহরহ তাহাকে পীড়িত করিতেছে। যে কোনো সুযোগ পাইলেই তাহা অবলম্বন করিয়া আবার সে খাড়া হইয়া দাঁড়াইতে চায়। জগন ডাক্তারের সহিত যোগাযোগ আবার স্বাভাবিক নিয়মের বশে শিথিল হইয়া আসিয়াছে। জগন ডাক্তারের ওই দরখাস্ত করার পন্থাটাকে সে অন্তরের সহিত গ্রহণ করিতে পারে না। দরখাস্তের কথায় তাহার হাসি আসে। অন্তর জ্বলিয়া ওঠে।

সে সাহিত্য পড়াইতেছিল—

অট্টালিকা নাহি মোর নাহি দাস-দাসী
ক্ষতি নাই, নহি আমি সে সুখ-প্রয়াসী।
আমি চাই ছোট ঘরে বড় মন লয়ে,
নিজের দুঃখের অন্ন খাই সুখী হয়ে!
পরের সঞ্চিত ধনে হয়ে ধনবান,
আমি কি থাকিতে পারি পশুর সমান?

সহসা তাহার নজরে পড়িল—একটি দীর্ঘাঙ্গী অবগুণ্ঠনবতী মেয়ে পথের ধার হইতেই চণ্ডীমণ্ডপের দেবতার উদ্দেশে প্রণাম করিল। চণ্ডীমণ্ডপে সে বোধহয় ইচ্ছা করিয়াই উঠিল না; কারণ তাহার পদক্ষেপে কোনো ব্যস্ততার লক্ষণ দেখা গেল না। দেবু তাহাকে চিনিল—অনিরুদ্ধের স্ত্রী। বুঝিল নবান্নের দিনের সেই ঘটনার জন্য অনিরুদ্ধের স্ত্রী চণ্ডীমণ্ডপের উপরে উঠিল না। মুহূর্তে দেবুর মন খারাপ হইয়া গেল। অনিরুদ্ধের স্ত্রী ওই যে নীরবে পথের উপর হইতে প্রণাম করিয়া চলিয়া গেল, তাহার প্রতিটি ভঙ্গি যেন রুদ্ধ-বেদনায় ব্যথিত বিষণ্ণ বলিয়া তাহার মনে হইল। একা আসিয়া একা চলিয়া গেল, যেন বলিয়া গেল—একা আমিই কি দোষী? দেবু অনিরুদ্ধের স্ত্রীর গমনপথের দিকেই চাহিয়া রহিল, মেয়েটির ধীরপদক্ষেপ যেন ক্লান্ত বলিয়া তাহার মনে হইল। সে একটা দীর্ঘনিশ্বাস না ফেলিয়া পারিল না। কাজটা সত্যই অন্যায় হইয়া গিয়াছে। এই মুহূর্তটিতে তাহার বিচারবুদ্ধির ত্রুটি স্বীকার না করিয়া পারিল না। অনিরুদ্ধের অন্যায়ের চেয়ে গ্রামের লোক যে অনিরুদ্ধের প্রতি অন্যায় করিয়াছে বেশি! ধান না দেওয়ার জন্যই অনিরুদ্ধ কাজ বন্ধ করিয়াছে। মজলিসে ছিরু আগে অপমান করিয়াছে, তবে অনিরুদ্ধ উঠিয়াছিল। অনিরুদ্ধের দুই বিঘা বাকুড়ির ধান কাটিয়া লওয়ার প্রতিকার যখন কেহ করিতে পারে নাই, তখন অনিরুদ্ধকে শাস্তি দিবার অধিকারই বা কাহার আছে? অকস্মাৎ সে বিস্ময়ে চকিত হইয়া উঠিল, মনের চিন্তাধারায় একটা ছেদ পড়িয়া গেল—একি! অনিরুদ্ধের স্ত্রী তাহার বাড়ির দিকে যাইতেছে কেন?

পাঠশালার ছেলেগুলো পণ্ডিতের স্তব্ধতার অবকাশ পাইয়া উসখুস করিতে শুরু করিয়াছিল। একটি ছেলে বলিল—আজ ইতুলক্ষ্মী, মাস্টার মশায় আজ আমাদের হাপ-ইস্কুল হয়। নটা বেজে গিয়েছে ঘড়িতে।

দেবুর সম্মুখেই থাকে একটা টাইমপিস্। দেবু ঘড়িটার দিকে চাহিয়া আবার পড়াইতে শুরু করিল—

শৈশব না যেতে ক্ষেতে শিখিয়াছি কাজ,
সেই তো গৌরব মোর তাতে কিবা লাজ?

ধীরে ধীরে সমস্ত কবিতাটি শেষ করিয়া দেবু বলিল—কালকে এই পদ্যটির মানে লিখে আনবে সবাই। মানে বলতে কথার মানে নয়, কে কি বুঝেছ লিখে আনবে।

পাঠশালার ছুটি দিয়া সে আজ সঙ্গে সঙ্গেই আসিয়া বাড়ি ঢুকিল। বাড়ির উঠানে তখন তাহার স্ত্রীর সম্মুখে বসিয়া আছে পদ্ম, অদূরে বসিয়া আছে দূর্গা; তাহার স্ত্রী ইতুলক্ষ্মীর ব্রতকথা বলিতেছে। দেবুর স্ত্রী বড় ভাল উপকথা বলিতে পারে, এ পাড়ায় ব্রত-কথার আসর তাহার ঘরেই বসে। সে আসর শেষ হইয়া গিয়াছে। এ বোধহয় দ্বিতীয় দফা। দেবুর শিশু-পুত্রটিকে কোলে লইয়া পদ্ম বসিয়াছিল, দেবুকে দেখিয়া সে অবগুণ্ঠন টানিয়া দিল। দেবুর স্ত্রীও ঘোমটা অল্প একটু টানিয়া হাসিল। দূর্গা কাপড়চোপড় সামলাইয়া গুছাইয়া বেশ একটু বিন্যাস করিয়া বসিল। তাহারও মুখে ফুটিয়া উঠিল মৃদু হাসি। কিন্তু সেদিকে লক্ষ্য করিবার মত মনের অবস্থা দেবুর ছিল না। ব্রত-কথা তাহার স্ত্রী ভাল বলে—চমৎকার বলে, তাহাদের পাড়ার সকলেই প্রায় ব্রত-কথা শুনিতে তাহার বাড়িতে আসে। কিন্তু আজ কামার-বউয়ের তাহার বাড়িতে আসাটা যেমন অস্বাভাবিক তেমনি বিস্ময়কর।

নবান্নের দিন দেবু এই বধূটিকে কঠোরভাবে ভোগ ফিরাইয়া লইয়া যাইতে বলিয়াছিল। আজও কিছুক্ষণ আগেই পদ্ম পথ হইতে চণ্ডীমণ্ডপে দেবতার উদ্দেশে প্রণাম করিয়াছে, চণ্ডীমণ্ডপে ওঠে নাই, অথচ তাহারই বাড়িতে ব্রত-কথা শুনিতে আসিয়াছে—এ ব্যাপারটা সত্যই তাহার কাছে বিস্ময়কর মনে হইল। দেবু থমকিয়া দাঁড়াইল, পদ্মকে কোনো কথা বলিতে না পারিয়া প্রশ্ন করিল দূর্গাকে—কি রে দূর্গা?

দূর্গার মুখে মৃদু হাসি বিকশিত হইয়া উঠিল, হাসিয়া সে বলিল—কথা শুনতে এসেছি দিদির কাছে। এমন কথা কেউ বলতে পারে না, বাপু। হাজার হোক পণ্ডিত-গিন্নি তো!

ভ্রূ কুঞ্চিত করিয়া দেবু বলিল—দিদি? কথাটা তাহাকে পীড়া দিয়াছিল।

—হ্যাঁ গো। দিদি! তোমার গিন্নি যে আমার বিলু দিদি, তুমি যে আমার জামাইবাবু!

দেবুর সর্বাঙ্গ জ্বলিয়া গেল; কঠোর স্বরেই বলিল—মানে? ও দিদি কি করে হল তোর?

চোখ দুইটা বড় বড় করিয়া বলিল—হেই মা! আমার মামার বাড়ি যে তোমার শ্বশুরদের গায়ে গো! আমার মামারা যে দিদিদের বাপের বাড়ির খেয়ে মানুষ—পুরনো চাকর! দিদি যে আমার মামাকে কাকা বলে; তা হলে আমার দিদি নয়?

ভাল না লাগিলেও প্রসঙ্গটা সম্পর্কে তাহাকে নীরব হইতে হইল। শুধু বলিল—হুঁ। তারপর স্ত্রীকে বলিল—উটি আমাদের কর্মকারের, মানে অনিরুদ্ধের স্ত্রী নয়?

দীর্ঘ অবগুণ্ঠন পদ্ম আরও একটু বাড়াইয়া দিল। দেবুর স্ত্রী চাপাগলায় বলিল—হ্যাঁ।

দূর্গা সঙ্গে সঙ্গে আরম্ভ করিল—কামার-বউয়ের কথা শোনা হয় নাই। ওদের বাড়ি গেলাম তো দেখলাম—ভাম হয়ে বসে ভাবছে। উ পাড়ায় কথা হয় ওই পালের বাড়িতে—ছিরু পালের বাড়িতে। ওদের বাড়ি যায় না কামার-বউ, তাতেই বললাম—এসো, আমার দিদির বাড়িতে এসো।

দেবু চুপ করিয়া রহিল।

দূর্গা বলিল—কামার-বউ ভয় করছিল, পণ্ডিতমশায় যদি কিছু বলে। সেদিন চণ্ডীমণ্ডপে তুমি নাকি বলেছিলে—

মধ্যপথেই বাধা দিয়া দেবু বলিল—অনিরুদ্ধ যে মহা অন্যায় করেছে।

অকুণ্ঠিত স্বরে অভিযোগ করিয়া দূর্গা বলিল—তোমার মত লোকের যুগ্যি কথা হল না, পণ্ডিতমশায়। অন্যায় কি একা কর্মকারের? বল তুমি?

দেবু কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া বলিল, তা বটে। বুঝতে আমার ভুল খানিকটা হয়েছিল।

সুযোগ পাইয়া বিনা দ্বিধায় সে ওই দূর্গার মারফতে কামার-বউয়ের কাছে কথাটা স্বীকার করিয়া ভারমুক্ত হইতে চাহিল।

দেবুর স্ত্রী চাপা গলাতেই ব্যস্ত হইয়া বলিল—কেঁদো না কামার-বউ, কেঁদো না! পদ্ম ঘোমটার আঁচল দিয়া বার বার চোখ মুছিতেছিল; সেটা সে লক্ষ্য করিয়াছিল।

দেবু ব্যস্ত হইয়া বলিল—না, তুমি কেঁদো না। অনিরুদ্ধ আমার ছেলেবেলার বন্ধু; একসঙ্গে পাঠশালায় পড়েছি। তাকে বোলো, আমি যাব—আমি নিজেই যাব তার কাছে।

দূর্গা পদ্মকে লক্ষ্য করিয়া বলিয়া উঠিল—আমি তোমাকে বলেছিলাম তো কামার-বউ, ওই জগন ডাক্তারের মোড়লির পাল্লায় পড়ে জামাই আমাদের এ কাজ করেছে।

—না, না, মিছে পরকে দোষ দিসনে দূর্গা। আমারই বুঝবার ভুল।

এমন আন্তরিকতা-মাখা কণ্ঠে অকপট স্বীকারোক্তি সে করিল যে দূর্গা পর্যন্ত স্তব্ধ হইয়া গেল।

দেবুই আবার বলিল—ওগো, অনিরুদ্ধের বউকে জল খাইয়ে তবে ছেড়ে দিও।

—আর আমি? দূর্গা ঝঙ্কার দিয়া উঠিল। —ওঃ, আমি বুঝি বাদ যাব? বেশ জামাইদাদা যা হোক।

স্বৈরিণী মেয়েটার কথা বলার ভঙ্গি, আত্মীয়তার সুর এমন মিষ্ট এবং মনকাড়া যে কিছুতেই রাগ করা যায় না তাহার উপর। তাহার কথায় দেবুর বউ হাসিল, পদ্ম হাসিল; দেবুও না হাসিয়া পারিল না। হাসিয়া দেবু বলিল—তোর জন্য ভাবনা তো আমার নয়, সে ভাবনা ভাববে তোর দিদি। আপনার জন থাকতে কি পরের আদর ভাল লাগে রে?

—লাগে গো লাগে। টাকার চেয়ে সুদ মিষ্টি; দিদির চেয়ে দিদির বর ইস্টি, আদর আরও মিষ্টি। আমার কপালে মেলে না।

দেবু হাসিয়াই বলিল—নে আর ফাজলামি করতে হবে না, এখন কথা শোন। বলিয়া সে যেন ভারমুক্ত হইয়া লঘুহৃদয়ে ঘরে ঢুকিল।

“দরিদ্র ব্রাহ্মণের পিঠে খাবার সাধ হয়েছে।”

দেবুর স্ত্রী ব্রত-কথা বলিতেছিল। ব্রাহ্মণ মনে মনে ভাবেন—চালের পিঠে, সরুচাকলি, মুগের পিঠে, নারকেল পুরের পিঠে, রাঙা আলুর পিঠে, ভাবেন আর তার জিভে জল আসে।

ঘরের ভিতর বসিয়া দেবু আপন মনেই হাসিল। জল তাহার জিভে আসিতেছে; বোধ করি ব্রত-কথার কথক ঠাকরুন—মায় শ্রোতাদের জিহ্বা পর্যন্তও সজল হইয়া উঠিয়াছে।

“কিন্তু সাধ হলেই তো হয় না, সাধ্যি থাকা চাই। দরিদ্র ব্রাহ্মণ, জমি নাই, জেরাত নাই, চাকরি-বাকরি নাই, ব্যবসা নাই, বাণিজ্য নাই, যজ্ঞি নাই, যজমান নাই—আজ খেতে কাল নাই আর কোথায় চাল কোথায় কলাই কোথায় গুড়, রাঙা আলুই বা আসে কোথা থেকে? আর ব্রাহ্মণ হয়েও চুরি করতে তো পারেন না! কি করেন?”

দেবু ব্রাহ্মণের সততার তারিফ না করিয়া পারিল না।

“কিন্তু ব্রাহ্মণের বুদ্ধি তো! তিনি এক ফন্দি বার করলেন। তখন অগ্রহায়ণ মাসের শেষ। মাঠ থেকে গেরস্তের গাড়ি গাড়ি ধান আসছে, কলাই আসছে, আলু আসছে, গাড়ির চাকায় পথের মাটি গুঁড়ো হয়ে এক হাঁটু করে ধুলো হয়েছে। ব্রাহ্মণ বুদ্ধি করে সন্ধ্যার পর বাড়ির সামনেই পথের ধুলোর ওপর আরও খানিকটা কেটে বেশ একটি গর্ত করলেন—তারপর ঢাললেন ঘড়া ঘড়া জল। পরের দিন যত গাড়ি আসে, সব পড়ে ওই গর্তের কাদায়। চাকা আটকে যায়। ব্রাহ্মণ সেই গাড়ি তুলতে সাহায্য করেন আর চাষীদের কাছে আদায় করেন—ধানের গাড়ির থেকে ধান, কলাইয়ের গাড়ি থেকে কলাই, গুড়ের নাগরি থেকে গুড়। এমনি করে ধান, কলাই, গুড়, আলু যোগাড় করে ঘরে তুললেন, তারপর ব্রাহ্মণীকে বললেন, নে বামনি, এবার পিঠে তৈরি কর।”

দেবু এবার হো-হো করিয়া হাসিয়া উঠিল। ব্রাহ্মণের বুদ্ধিতে সে একেবারে মুগ্ধ হইয়া গিয়াছে। তাহার হাসিতে ব্রত-কথা বন্ধ হইয়া গেল। বাহির হইতে দূর্গা প্রশ্ন করিল—পণ্ডিতমশায়, হাসছ ক্যানে গো তুমি?

দেবু বাহির হইয়া আসিয়া বলিল, —বামুনের বুদ্ধির কথা শুনে। আচ্ছা বামুন!

দেবুর স্ত্রী মৃদু হাসিয়া ঘোমটা আরও একটু বাড়াইয়া দিল। বলিল—কথাটা শেষ করতে দাও, বাপু।

—আচ্ছা—আচ্ছা! বলিতে বলিতে দেবু বাহির হইয়া গেল।

পরিতুষ্ট লঘু মন লইয়া দেবু বাহিরে আসিয়া পথের ধারে বাহিরের ঘরের দাওয়ায় দাঁড়াইল। পল্লীগ্রামে জলখাবার বেলা হইয়াছে। মাঠ হইতে চাষীরা বাড়ি ফিরিতেছে। চাষী-শ্রমিকেরা মাঠেই জল খায়, তাহাদের জলখাবার লইয়া মেয়েরা চলিয়াছে মাঠে; মাথায় তাহাদের গামছায় জলখাবারের পাত্র—কাঁকালে ঝুড়ি, হাতে জলের ঘটি। পুরুষদের জলখাবার খাওয়াইয়া, এই ধান কাটার সময় তাহারা ধানের শীষ সংগ্রহ করিবে, বনজঙ্গল হইতে শুকনা কাঠ ভাঙিয়া জ্বালানি সংগ্রহ করিবে।

দুই-চারিখানা ধান বোঝাই গাড়িও মাঠ হইতে ফিরিতেছে। অগ্রহায়ণের সংক্রান্তি ইহারই মধ্যে গ্রাম্য কাঁচা রাস্তা ময়দার মত ধুলায় ভরিয়া উঠিয়াছে; হেমন্তের শেষ দিন—রৌদ্রের রঙের মধ্যে যেন বৃদ্ধের পাংশু দেহবর্ণের মত শীতের পীতাভ আমেজ ফুটিয়া উঠিয়াছে। গাড়ির চাকায় উৎক্ষিপ্ত ধূলিকণায় সে রৌদ্রও ধূলি-ধূসর। চণ্ডীমণ্ডপের এক প্রান্তে ষষ্ঠীতলার বুড়া বকুলগাছটার গাঢ় সবুজ পাতাগুলার উপর ইহারই মধ্যে একটা ধুলার প্রলেপ পড়িয়া গিয়াছে। দেবু অন্যমনস্কভাবে আবার চণ্ডীমণ্ডপের উপর উঠিল। চণ্ডীমণ্ডপটারও সৰ্বাঙ্গ ধুলার আস্তরণ। ঘুরিয়া ফিরিয়া সে এইখানেই আসিয়া দাঁড়ায়। এই স্থানটির সঙ্গে তাহার একটা নিবিড় যোগাযোগ আছে যেন।

—হ্যাঁ হে নাতি, বলি, পাঠশালা ভাঙল তোমার? সাড়া-শব্দ কিছু নাই যেন লাগছে? এত সকালে?

জরাজীর্ণ কোনো নারীকণ্ঠের সাড়া আসিল পথ হইতে।

—এস এস, রাঙাদিদি, এস। আজ ইতুলক্ষ্মী, হাফ-স্কুল! দেবু সাগ্রহে তাহাকে একটু অস্বাভাবিক উচ্চকণ্ঠে আহ্বান করিল।

এক বৃদ্ধা—এ গ্রামের রাঙাদিদি, প্রবীণের রাঙাপিসি। তেল মাখিয়া একগাছি ঝাঁটা হাতে আসিয়া চণ্ডীমণ্ডপে উঠিল। বৃদ্ধা এই গ্রামেরই মেয়ে, সন্তানহীনা; শুধু সন্তানহীনাই নয়, সর্বস্বজনহীনা—আপনার জন তাহার আর কেহ নাই। চোখে এখন ভাল দেখিতে পায় না, কানেও খাটো হইয়াছে; কিন্তু দেহ এখনও বেশ সমর্থ আছে। এই সত্তরের উপর বয়সেও সে সোজা খাড়া মানুষ এবং রাঙাদিদি নামটিও নিরর্থক নয়; এখনও তাহার দেহবৰ্ণ গৌর এবং তাহাতে বেশ একটা চিক্কণতা আছে। লোকে বলে—বুড়ি তেলহলুদে তাহার দেহটাকে পাকাইয়া তুলিয়াছে; দুই বেলায় পোয়াটাক তেল সে সর্বাঙ্গে মাখে, মধ্যে মধ্যে আবার হলুদও মাখে। সে বলে—তোরা সাবান মাখিস—আমি হলুদ মাখব না? রোজ স্নানের পূর্বে বুড়ি চণ্ডীমণ্ডপে ঝাঁটা বুলাইয়া পরিষ্কার করিয়া যায়। এটি তাহার নিত্যকৰ্ম।

—ইতুলক্ষ্মীতে হাপ-স্কুল বুঝি? তা বেশ করেছিল। বুড়ি অবিলম্বে ঝাড়ু দিতে আরম্ভ করিয়া দিল। —কত গান শুনেছি এখানে ভাই নাতি—নীলকণ্ঠ, নটবর, যোগীন্দ্র; মতিরায়ও একবার এসেছিল। বড় যাত্রার দল। কেত্তন, পাঁচালী কত হত ভাই! তোরা আর কি দেখলি বল? সে রামও নাই—সে অয্যেও নাই। চণ্ডীমণ্ডপ নিকুবার জন্যে তখন মাইনে করা লোক ছিল, দিনরাত তক্ তক্ ঝক্ ঝক্ করত। সিঁদুর পড়লে তোলা যেত।

বুড়ি আপন মনেই বকিয়া যায়। জীবনের যত সমারোহের সুখস্মৃতি সে সমস্তই সে আহরণ করিয়াছে এই স্থানটি হইতে। এখানে আসিয়া তাহার সব কথা মনে পড়িয়া যায়। রোজ সে এই কথাগুলি বলে। কত বড় বড় মজলিস ভাই, গায়ের মাতব্বরেরা এসে বসত, বিচার হত; ভাল-মন্দতে পরামর্শ হত। তখন কিন্তুক মেয়েদের পা বাড়াবার যো থাকত না। ওরে বাস রে, মোড়লদের সে হাঁকাড়ি কি?

দেবু একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া বলিল—তুমি মলেই দিদি চণ্ডীমণ্ডপে আর ঝাঁট পড়বে না।

বুড়ির ঝাঁট মুহূর্তে থামিয়া গেল, উদাস কণ্ঠে বলিল—মা কালী বুড়ো বাবা আপনার কাজের ব্যবস্থা করে নেবে রে ভাই।

আবার কিছুক্ষণ স্তব্ধ থাকিয়া বুড়ি বলিল—মরবার সময় যেন তোরা ধরাধরি করে এইখানে এনে বুড়িকে শুইয়ে দিস, ভাই!

দেবু বলিল—তা দোব। তুমি কিন্তু তোমার কিছু পোঁতা টাকা আমাদের দিয়ে যেও চণ্ডীমণ্ডপটা মেরামত করাব।

অন্য কেহ এ কথা বলিলে বুড়ি আর বাকি রাখিত না, তাহাকে গালিগালাজ দিতে আরম্ভ করিয়া পরিশেষে কাঁদিতে বসিত। কিন্তু দেবু যেন এ গ্রামের অন্য সকল হইতে পৃথক মানুষ। বুড়ি তাহাকে গালিগালাজ না দিয়া বলিল, —নাতি, তুইও শেষে এই কথা বললি ভাই? গোবর কুড়িয়ে ঘুঁটে বেচে, দুধ বেচে, এক পেট খেয়ে টাকা জমানো যায়? তুই-ই বল ক্যানে!

বুড়ি এবার খসখস করিয়া যথাসাধ্য দ্রুতগতিতে ঝাঁটা চালাইতে আরম্ভ করিল। টাকার কথাটা সে আর বাড়াইতে চায় না। টাকার কথা হইলেই বুড়ির ভয় হয় হয়ত কেহ কোনোদিন রাত্রে তাহাকে মারিয়া ফেলিয়া সর্বস্ব লইয়া পলাইবে। বুড়ির কিছু টাকা আছে সত্য, দুই-তিন জায়গায় মাটির নিচে পুঁতিয়া রাখিয়াছে। বেশি নয়, সর্বসমেত দশ কুড়ি পাঁচ টাকা।

মন্থরগতি উত্তেজনাহীন পল্লীজীবন। ইহারই মধ্যে রাস্তায় মানুষ চলাচল বিরল হইয়া আসিতেছে। মধ্যে মধ্যে কেবল দুই-একখানা গরুর গাড়িতে মাঠ হইতে ধান আসিতেছে। ক্যাঁচ-কোঁচ-ক্যোঁ—একঘেয়ে করুণ শব্দ উঠিতেছে। কর্মহীন দেবুও অলসভাবে চণ্ডীমণ্ডপে বসিয়া ছিল। পৌষ মাস গেল মাঠের ধান ঘরে আসিলে, এ গাড়ি কয়খানাও আর যাওয়া-আসা করিবে না। সেবার বিশু-ভাই একটা কথা বলিয়াছিল—আমাদের গ্রামের সেই গরুর গাড়ি চড়ে জীবন যাত্ৰা আর বদলাল না। গ্রামগুলো গরুর গাড়ি চড়ে বলেই এমন পিছিয়ে আছে, জীবনটাই হয়ে গেছে ঢিমে-তেতালা। অন্য দেশে চাষের কাজে এখন চলছে কলের লাঙল, মোটর ট্র্যাক্টর। তাদের গ্রাম চলে লরিতে-ট্রাকে।

দেবু অবশ্য বিশ্বনাথের কথা স্বীকার করে না। কিন্তু গরুর গাড়ি চড়িয়া এখানে যে জীবন চলিয়াছে সে কথা মিথ্যা নয়। ঢিমা-ঢিলা চালে কোনোমতে গড়াইয়া গড়াইয়া চলিয়াছে ওই চাকার ক্যাঁ-ক্যোঁ শব্দের মত কাতরাইতে কাতরাইতে।

ভূপাল বাগদী চৌকিদার আসিয়া প্ৰণাম করিয়া দাঁড়াইল—পেনাম পণ্ডিতমশায়। ভূপালের পিছনে একটি অবগুণ্ঠনবতী মেয়ে, হাতে একটি হাঁড়ি।

দেবু অন্যমনস্কভাবেই হাসিয়া বলিল—ভূপাল?

—আজ্ঞে হ্যাঁ। একবার নিকিয়ে-চুকিয়ে দিয়ে যাই চণ্ডীমণ্ডপটি। লে গোলে, সেই উ-পাশ থেকে আরম্ভ কর।

মেয়েটার হাতের হাড়িতে ছিল গোবর-মাটির গোলা, সে নিকাইতে আরম্ভ করিয়া দিল। ভূপাল—সরকারি চৌকিদার আবার জমিদারের নগদীও বটে; আশ্বিন, পৌষ ও চৈত্র—এই তিন কিস্তির প্রারম্ভে তিনবার চণ্ডীমণ্ডপ তাহাকে গোলা দিয়া নিকাইতে হয়। লক্ষ্মীর পাঁচালীর কর্তব্যের মধ্যে এটাও একটা।

দেবু এবার সচেতন হইয়া হাসিয়া বলিল—এ যে হরিঠাকুরের পুজো করা হচ্ছে ভূপাল। চক্রবর্তী ঠাকুরের পুজো করার মত কাণ্ড হচ্ছে ভূপাল। পাঁচখানা গাঁয়ে চক্রবর্তী ঠাকুর পুজো করে। একদিন এক গাঁয়ে গিয়ে একেবারে পাঁচ দিনের পুজো করে আসে। আবার পাঁচ দিন পরে যায়। পৌষ-কিস্তির যে এখনও অনেক দেরি হে!

পণ্ডিতের কথায় ভূপাল না হাসিয়া পারিল না, বলিল—আজ্ঞে আমাদের যুধিষ্ঠির থানাদারও (চৌকিদার) তাই করে; সন্‌ঝে-বেলায় বার হয়, রাত্রে তিনবার হাঁক দেবার কথা—একবারেই তিনবার হাঁক দিয়ে ঘরে এসে শোয়।

দেবু সশব্দে হাসিয়া উঠিল। ভূপাল বলিল আমি সেটা করি না—পণ্ডিতমশায়। গোমস্তামশায় এসে গিয়েছেন আজ।

—এসে গিয়েছেন? এত সকালে?

—আজ্ঞে হ্যাঁ, এবার সকাল-সকালই বটে। সেটেলমেন্টার এসেছে কিনা।

—সেটেলমেন্ট ক্যাম্প?

—আজ্ঞে হ্যাঁ। ধুমধাম কত, তাঁবুটাবু নিয়ে সে বিশ-পঁচিশখানা গাড়ি। শুনেছি খানাপুরী আরম্ভ হবে ৭ই পৌষ হতে। আজই সন্‌ঝেতে বোধহয় ঢোল-শোহরত হবে। খেয়েই আমাকে কঙ্কণা যেতে হবে।

সেটেলমেন্টের খানাপুরী? সমস্ত মাঠ জুড়িয়া পাকা ধান—সেই ধানের উপর শেকল টানিয়া—বুটজুতায় ধান মাড়াইয়া–খানাপুরী?

ভূপাল বলিল—খানাপুরী এবার মাঠেই ঝাড়াই হবে পণ্ডিতমশায়।

দেবু ভ্রূ কুঞ্চিত করিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল। এ যে অন্যায়! এ যে অবিচার!


তেরো



“যিনি করেন ‘ইতুলক্ষ্মী’ তাঁর ভাগ্যি হয় ব্রতকথার ‘ঈশনে’—মানে ‘ঈশানী’র মত ধান, কলাই, ছোলা, মুগ, যব, সরষে, তিসি নানান ফসলে থৈ থৈ করে ক্ষেত, গাড়িতে গাড়িতে তুলে ফুরোয় না। খামার জুড়ে মরাই বেঁধে কুলোয় না। একমুঠো তুলতে দু-মুঠো হয়। তার ক্ষেত-খামার ভাড়ার ভরে মা লক্ষ্মী অচল হয়ে বাস করেন। ঘর ভরে যায় সন্তান-সন্ততিতে, গোয়াল ভরে ওঠে গরুতে বাছুরে; গাছ-ভরা ফল, পুকুর ভরা মাছ, লক্ষ্মীর হাঁড়িতে কড়ি, আট অঙ্গ সোনারূপোয় ঝল্-ঝল্ করে। বউ বেটা আসে, নাতি-নাতনী পাশে শুয়ে স্বামীর কোলে মরণ হয় তার একগলা গঙ্গাজলে।”

ব্রতকথা শেষ করিয়া ‘উলু’ ‘উলু’ হুলুধ্বনি দিয়া দেবুর স্ত্রী প্রণাম করিল।

সঙ্গে সঙ্গে দূর্গা এবং পদ্মও হুলুধ্বনি দিয়া প্রণাম করিল। দূর্গার কণ্ঠস্বর যেমন তীক্ষ্ণ, তাহার জিভখানিও তেমনি লঘু চাপল্যে চঞ্চল, তাহার হুলুধ্বনিতে সমস্ত বাড়ীটা মুখরিত। প্রণাম করিয়া সুপারীটি দেবুর স্ত্রীর সম্মুখে রাখিয়া সে সরবে হাসিয়া উঠিয়া বলিল—বিলু দিদি, ভাই কামার-বউ, মরণকালে তোমরা কেউ আমাকে স্বামী ধার দিয়ো ভাই কিন্তুক!

দেবুর স্ত্রীর নাম বিশ্ববাসিনী—ডাকনাম বিলু। বিলু হাসিল। তাহার স্বামীকে সে জানে, সে রাগ করিল না। অন্য কেহ হইলে এই কথা লইয়া একটা ঝগড়া বাধাইয়া দিত। এই সুরূপা স্বৈরিণী মেয়েটা যখন মৃদু বাঁকা হাসি হাসিতে হাসিতে পথে বাহির হয়, তখন এই অঞ্চলের প্রতিটি বধূই সন্ত্রস্ত হইয়া উঠে। লজ্জা নাই—ভয় নাই—পুরুষ দেখিলেই তাহার সহিত দুই-চারিটা রসিকতা করিয়া সর্বাঙ্গ দোলাইয়া চলিয়া যায়।

পদ্মও রাগ করিল না। কয়েকদিন হইতেই দূর্গা তাহার বাড়ী আসা-যাওয়া শুরু করিয়াছে। অনিরুদ্ধকে সে একখানা দা গড়িতে দিয়াছে, সেই তাগাদায় সে এখন দুইবেলা যায় আসে—অনিরুদ্ধের সঙ্গে রঙ্গ-রহস্য করে—হাসিয়া ঢলিয়া পড়ে। মধ্যে মধ্যে পদ্মের সর্বাঙ্গ জ্বলিয়া উঠে, কিন্তু খরিদ্দারকে কিছু বলা চলে না। তাহা ছাড়াও, ইদানীং পদ্ম যেন অকস্মাৎ পাল্টাইয়া অন্য মানুষ হইয়া গিয়াছে। হঠাৎ যেন তাহার জীবনে একটা সকরুণ উদাসীনতা আসিয়া তাহাকে আচ্ছন্ন করিয়া সারা জীবনটাকে জুড়িয়া বসিয়াছে এই শীতকালের ভোরবেলায় কুয়াশার মত। ঘর ভাল লাগে না, অনিরুদ্ধ সম্পর্কেও তাহার সেই সর্বগ্রাসী আসক্তিও যেন হতচেতন মানুষের বাহুবন্ধনের মত ক্রমশ এলাইয়া পড়িয়াছে। অনিরুদ্ধ-দূর্গার রহস্য-লীলা সে চোখে দেখিয়াও কিছু বলে না, দেবুর শিশুপুত্রকে আপনার কোল হইতে বিলুর কোলে তুলিয়া দিয়া বলিল—আমার তো ভাই ওইটুকুই পুঁজি! বাদবাকী গরু-বাছুর-বউ-বেটা—বলে ‘শির নেই তার শিরঃপীড়া!’—নাতি-নাতনী! বলিয়া সে একটু হাসিল, হাসিয়া বলিল—চলি ভাই, পণ্ডিতগিন্নী।

বিলু তাহার হাত ধরিয়া বলিল—জল খাবার নেমন্তন্ন দিয়ে গিয়েছে—তোমার বরের বন্ধু। দাঁড়াও একটু মিষ্টি মুখে দিয়ে যাও।

বিলুর কোলের শিশুটির উপর ঝুঁকিয়া পড়িয়া বার বার চুমা খাইয়া পদ্ম বলিল—খোকামণির ‘হামি’ খেয়ে পেট ভরে গিয়েছে। এর চেয়ে মিষ্টি আর কিছু হয় নাকি?

—না, তা হবে না।

—তবে দাও ভাই খুঁটে বেঁধে নিয়ে যাই। ইতুর পেসাদ মুখে দিয়ে খাই কি করে বল? পণ্ডিত না হয় এসব জানে না, পণ্ডিতগিন্নীকে তো আর বলে দিতে হবে না!

পথে বাহির হইয়া দূর্গা বলিল—বিলুদিদি আমার ভারী ভাল মানুষ। যেমন পণ্ডিত তেমনি বিলুদিদি! তবে পণ্ডিত একটুকুন কাঠ-কাঠ, রস কম।

পদ্ম কিন্তু দূর্গার কথা যেন শুনিলই না—আমাকে ভাই ছিরু পালের বাড়ীর সামনেটা পার করে দাও।

—মরণ! এত ভয় কিসের? দিনের বেলায় ধরে খেয়ে নেবে নাকি? —দূর্গা মুখ বাঁকাইয়া হাসিল। কথাটা বলিয়াও দূর্গা কিন্তু পদ্মের সঙ্গে সঙ্গে চলিল।

পদ্ম বলিল, ওকেই বলি ভাগ্যিমানী। বড়লোক না হোক ‘ছচল-বচল’ সংসার, তেমনি স্বামী আর ছেলেটি! আহা, যেন পদ্মফুল! যেমন নরম তেমনি কি গা ঠাণ্ডা। কোলে নিলাম তা শরীর আমার যেন জুড়িয়ে গেল।

—মা সোন্দার, তার ওপর বাপ কেমন সোন্দার, ছেলে সোন্দার হবে না!

পদ্ম একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিল—কোন কথা সে বলিল না। পথে একটা বছর ছয়-সাতের ছোট ছেলে আদিম কালের বর্বর আনন্দে পথের ধুলোর উপর বসিয়া মুঠা-মুঠা ময়দার মত ধুলা আপন মাথায় চাপাইয়া পরমানন্দে হাসিতেছিল। দূর্গা বলিল—এই দেখ, যেমন কপাল—তেমনি গোপাল। যেমন লক্ষ্মীছাড়া বাপ-মা—তেমনি ছেলের রীতিকরণ।

ছেলেটি সদ্গোপবংশীয় তারিণীচরণের। তারিণীচরণ একজন সর্বস্বান্ত চাষী, যথাসর্বস্ব তাহার বাকী খাজনার দায়ে নীলাম হইয়া গিয়াছে। সে এখন বাউড়ী, ডোম প্রভৃতি শ্রমিকদের মত দিনমজুর খাটিয়া খায়। তারিণীর স্ত্রীও উপযুক্ত সহধর্মিণী, প্রায় সমস্ত দিনটাই ওর বাউড়ী-ডোমের মেয়েদের মত ঝুড়ি লইয়া বনে-বাদাড়ে কাঠ সংগ্রহ করে, শাক খুঁটিয়া আনে, ডোবার পাঁক ঘাঁটিয়া মাছ ধরে। ওগুলো কিন্তু তারিণীর স্ত্রীর বাহ্যাড়ম্বর, ওই অজুহাতে সে চুরি করিবার বেশ একটি সুযোগ করিয়া লয়। আম-কাঁঠাল শসা-কলা-লাউ-কুমড়া কোথায় কাহার ঘরে আছে—সে সব নখদর্পণে। শাক-কাঠ সংগ্রহের অছিলায় সে আশেপাশেই ঘুরিয়া বেড়ায়। আর সুযোগ পাইলেই পটাপট ছিঁড়িয়া ঝুড়ির তলায় ভরিয়া লইয়া পলাইয়া আসে। আর ওই শিশুটা এমনি করিয়া পথে বসিয়া ধুলা মাখে—কাঁদে। কাঁদিতে কাঁদিতে ক্লান্ত হইয়া আপনিই ঘুমাইয়া পড়ে হয়তো আপনাদের ঘরের অনাচ্ছাদিত দাওয়ায় অথবা কোন গাছের তলায়, ঠাঁই বাছাবাছি নাই। কোন কোন দিন দূর-দূরান্তেও গিয়া পড়ে; বাপ-মায়ে খোঁজে না, চিন্তিত হয় না। ছেলেটা আপনি আবার ফিরিয়া আসে।

—সর রে, ছেলেটা সর। ধুলো দিস না বাপু, কাল ধোয়া কাপড় পরেছি। —দূর্গা রূঢ় তিরস্কারে সাবধান করিয়া দিল।

—ইঃ! —বলিয়া দুষ্ট হাসি হাসিয়া ছেলেটা একমুঠো ধুলা লইয়া উঠিয়া দাঁড়াইল।

—দোব ছেলের কষা নিঙড়ে। —দূর্গা কঠোর স্বরে শাসাইয়া দিল। ধোয়া কাপড়ে ধুলোর ছিটা তাহার কোনমতেই সহ্য হইবে না।

—মিষ্টি দোব, বাবা? মিষ্টি খাবে? —পদ্ম ছেলেটিকে তাহার বঞ্চিত জীবনের সকল আকুতি জড়াইয়া সাদরে সম্ভাষণ করিল।

ধুলোর মুঠাটা নামাইয়াও ছেলেটা বলিল—মিছে কথা। উঃ, ভারী চালাক তুই!

আপনার খুঁট খুলিয়া পদ্ম বিলুর দেওয়া মিষ্টিটি বাহির করিয়া বলিল—এইবার ধুলো ফেলে দাও। লক্ষ্মীটি।

—উ-হুঁ। তু আগে ওইখানে ফেলে দে!

—ছি, ধুলো লাগবে। হাতে হাতে নাও।

—হিঃ! তাহ’লে তু ধরে মারবি।

—না, তু ফেলে দে ক্যানে।

—দাও হে, তাই ফেলে দাও। ধুলো! বলে—আস্তাকুড়ের পাতা কুড়িয়ে খায়। ধুলো! —দূর্গা ঝঙ্কার দিয়া উঠিল। তাহার রাগ হইতেছিল। সেও বন্ধ্যা কিন্তু তাহার ছেলে-ছেলে করিয়া আকুতি নাই।

পদ্ম কিন্তু মিষ্টিটি ফেলিয়া দিতে পারিল না, একটি পরিচ্ছন্ন স্থানে সন্তর্পণে নামাইয়া দিয়া ছেলের মুখের দিকে চাহিয়া একটু হাসিল। তারপরেই নীরবেই পথে অগ্রসর হইল।

—কামার-বউ! —সকৌতুকে দূর্গা তাহাকে ডাকিল।

দীর্ঘ অবগুণ্ঠনে মুখ ঢাকিয়া মাটির উপর চোখ রাখিয়া পদ্মর পথে চলা অভ্যাস; সে তেমনি ভাবেই চলিতেছিল। মুখ না তুলিয়াই সে উত্তর দিল—কি?

—ওই দেখ!

—কি? কোথা? কে?

—ওই যে ছামুতে হে!

দূর্গা খুক খুক করিয়া হাসিয়া উঠিল।

মাথার ঘোমটা খানিকটা সরাইয়া মাথা তুলিয়া চারিদিক চাহিয়াই সে আবার তাড়াতাড়ি ঘোমটা টানিয়া দিল। সম্মুখেই ছিরু পাল খামারবাড়ীর দরজার মুখে মোড়া পাতিয়া বসিয়া আছে। একা নয়, পাশেই বসিয়া আছে আরও একটা লোক; লোকটার চোখ দুইটা ভাটার মত গোল-গোল এবং লালচে। নাকটা থ্যাবড়া এবং নাকের পাশে প্রকাণ্ড একজোড়া বাহারের গোঁফ লোকটাকে বেশ একটা চেহারা দিয়াছে। যে চেহারা দেখিয়া মেয়েরা অস্বস্তি বোধ করে। তাহারা দু’জনেই তাহাদের দিকে চাহিয়া আছে। ও-লোকটাকেও পদ্ম চেনে—লোকটা জমিদারের গোমস্তা। দ্রুতপদে পদ্ম স্থান অতিক্রম করিয়া চলিয়া গেল। দূর্গার কিন্তু সেই মন্থর গতি-ভঙ্গিমা।

গোমস্তা একবার দূর্গার দিকে চাহিল—তারপর ফিরিয়া তাকাইল শ্রীহরির দিকে। তারপর প্রশ্ন করিল—দূর্গার সঙ্গে কে হে পাল?

—অনিরুদ্ধের পরিবার!

—হুঁ! দূর্গার সঙ্গে সঙ্গে জোট বেঁধে বেড়াচ্ছে ক্যানে হে?

—পরচিত্ত অন্ধকার, কি করে জানব বলুন!

—দূর্গা কি বলে? খায়?

শ্রীহরি গম্ভীরভাবে বলিল—আমি ওসব ছেড়ে দিয়েছি, দাশ মশায়; দূর্গার সঙ্গে কথা পর্যন্ত বলি না।

সবিস্ময়ে চক্ষু বিস্ফারিত করিয়া দাশ বলিল—বল কি হে? —সঙ্গে সঙ্গে তাহার শিকারী গোঁফজোড়াটা নাচিয়া উঠিল। ওইটা দাশের মুদ্রাদোষ।

—আজ্ঞে হ্যাঁ।

—হঠাৎ? ব্যাপার কি?

—নাঃ। ও নীচ-সংসর্গ ভাল নয় দাশজী। সমাজে ঘেন্না করে, ছোটলোকে হাসে। নিজের মান-মর্যাদাও থাকে না।

ঘরে আগুন দিবার ব্যাপারটা লইয়া দূর্গার সঙ্গে শুধু তাহার কলহই হয় নাই, মনে মনে সে একটা প্রবল অস্বস্তি বোধ করিতেছে। মনে হইতেছে শুইবার ঘরে সে সাপ লইয়া বাস করিতেছে। সাপ নয়, সাপিনী। সে দূর্গা!

হাসিয়া দাশ বলিল—বেশ তো, কামারনী তো আর নীচ-সংসর্গ নয়? বেটাকে যখন জব্দই করবে—তখন ঘরের হাঁড়িসুদ্ধ এঁটো করে দাও না!

শ্রীহরি চুপ করিয়া রহিল। এ কামনাটা তাহার বুকে আগ্নেয়গিরির অগ্নিপ্রবাহের মতোই রুদ্ধমুখ চাপা হইয়া আছে। নাড়া খাইয়া সেই প্রচ্ছন্ন অগ্নিশিখা ভিতরে ভিতরে প্রবল হইয়া উঠে। ওদিকে দাশ ফ্যা ফ্যা করিয়া হাসিতে আরম্ভ করিল।

শ্রীহরির উগ্র চোখ দুইটি সঙ্গে সঙ্গে যেন জ্বলিয়া উঠিল। ওই উজ্জ্বল শ্যামবর্ণা দীর্ঘাঙ্গী বধূটির প্রতি তাহার অন্তরের নগ্ন কামনার একটি প্রগাঢ় আসক্তি আছে। তাহার মনে পড়ে, ডোবার ঘাটে দণ্ডায়মানা পদ্মের অবগুণ্ঠিত মুখ;—বড় বড় চোখ, ছোট কপাল ঘিরিয়া ঘন কালো একরাশি চুল, ঈষৎ বাঁকা নাক, গালে পাশে বড় একটি তিল,—তাহার হাতে শাণিত দা, নিষ্ঠুর কৌতুকের মৃদু হাসিতে বিকশিত ছোট ছোট সুন্দর দাঁতের সারিটি পর্যন্ত তাহার মনোমধ্যে ঝলমল করিয়া উঠে।

দাশ হাসি থামাইয়া বলিল—তোমার টাকা আছে, ভাগ্যিমান লোক তুমি, তুমি যদি ভোগ না কর তো করবে কি রামা-শ্যামা?

বহুক্ষণ পরে অজগরের মত একটা নিঃশ্বাস ফেলিয়া শ্রীহরি বলিল—ছাড়ান দেন, দাশজী, ওসব কথা। এখন আমি যা বললাম তার কি করছেন বলুন।

—তার আর কি, ‘পাল’ কেটে ‘ঘোষ’ করতে আর কতক্ষণ? তবে—জমিদারী সেরেস্তার নিয়ম জান তো—‘ফেল কড়ি মাখ তেল’, জমিদারকে কিছু নগদ ছাড়, দস্তুরী দাও! আর তা ছাড়া একটা খাওয়াও। —শ্রীহরির মুখের দিকে চাহিয়া দাশ বলিল—হ্যাঁ হে, মদও ছেড়েছ নাকি? যে রকম গতিক তোমার। —দাশ একটু বাঁকা হাসি হাসিল।

শ্রীহরি হাসিয়া বলিল—না, না, সে হবে বৈকি। তবে কথা হচ্ছে—ওসব আর ঢাক পিটিয়ে হৈ-হৈ করে কিছু করব না। গোপনে আপনার ঘরে বসে বসে যা হয় একটু—মাঝে মাঝে—

—নিশ্চয়! ভদ্রলোকের মত! —দাশজী বার বার ঘাড় নাড়িয়া শ্রীহরির যুক্তি স্বীকার করিয়া বলিল—একশোবার, আমি আগে কতবার তোমাকে বারণ করিচি, মনে আছে? বলেছি ‘পাল, ঐ রকম ধারা-ধরন তোমাকে শোভা পায় না’; যাক, শেষ পর্যন্ত তুমি যে বুঝে সামলেছ—এ বড় ভাল।

দাশজীর কথা শ্রীহরিও স্বীকার করিয়া বলিল—হ্যাঁ, সে আমি বুঝে দেখলাম দাশজী, মান-সম্মান আপনার ও-রকম করে হয় না, সে-কাল এখন আর নাই।

জমিদারী সেরেস্তার বহুদর্শী বিচক্ষণ কর্মচারী দাশজী, সে হাসিয়া বলিল—কোনকালেই হয় না বাবা, কোনকালেই হয় না। ত্রিপুরা সিংয়ের কথা বল তুমি—তাকে লোকে আজও বলে ডাকাত। সেইটা কি মান-সম্মান নাকি? এই দেখ, এই কঙ্কণার মুখুজ্জেবাবুদের কথা দেখ। বড়লোক হ’ল—তাতেও লোকে বাবু বলত না। তারপর ইস্কুল দিলে, হাসপাতাল দিলে, ঠাকুর পিতিষ্ঠে করলে—আমনি লোকে ধন্যি ধন্যি করলে, বাবু তো বাবু একেবারে বড়বাবু বড়-বাড়ীর বড়বাবু খেতাব হয়ে গেল।

—এবার চণ্ডীমণ্ডপটা আমিও বাঁধিয়ে পাকা করে দেব, দাশজী। আর চণ্ডীমণ্ডপের পাশে একটা কুয়ো।

—ব্যস্, ব্যস্, পাকা করে খুদে লিখে দাও কুয়োর গায়ে, চণ্ডীমণ্ডপের মেঝেতে—সেবক শ্রীহরি ঘোষেণ প্রতিষ্ঠিতং, তারপর তোমার ঘোষ খেতাব মারে কে? একেবারে পাকা হয়ে যাবে।

—আপনি কিন্তু ওটা করে দেন, সেটলমেন্টের পরচাতেও ঘোষ লেখাব আমি।

—কাল—কালই করে নাও না তুমি।

শ্রীহরিদের বংশ-প্রচলিত উপাধি পাল। শ্রীহরি পাল উপাধিটা পাল্টাইতে চায়। অনেকদিন হইতেই সে নিজেকে লেখে ঘোষ; কিন্তু আদালতে ঘোষ চলে না। তাই জমিদারী সেরেস্তায় তাহার নামের জমাগুলিতে পাল কাটাইয়া ঘোষ করিতে চায়। ওদিকে গভর্নমেন্ট হইতে নূতন সার্ভে হইতেছে; রেকর্ড অব রাইটসের দপ্তরেও ঘোষ উপাধি তাহার পাকা হইয়া যাইবে। পাল উপাধিটা অসম্মানজনক; যাহার নিজের হাতে চাষ করে, তাহাদের—অর্থাৎ চাষীদের ঐ উপাধি।

দাশজী আবার বলিল—আর সে-কথাটার কি করছ?

—কোন্ কথা, কামার-বউয়ের কথা?

হো হো করিয়া দাশজী হাসিয়া উঠিল। বলিল—সে তো হবেই হে। সে কথা আবার শুধোয় নাকি? আমি বলছিলাম গোমস্তাগিরির কথাটা।

শ্রীহরি লজ্জিত হইয়া পড়িল। অতর্কিতে সে ধরা পড়িয়া গিয়াছে। অপ্রস্তুতের মতই বলিল—আচ্ছা ভেবে দেখি।

ঠিক এই মুহূর্তেই ক্ষুর-ভাঁড় বগলে করিয়া আসিয়া হাজির হইল তারাচরণ পরামাণিক। গভীর ভক্তির সহিত একটি নমস্কার করিয়া মোলায়েম হাসি হাসিয়া সম্ভাষণ জানাইল—পেনাম আজ্ঞে।

কপালের উপরে দৃষ্টি টানিয়া তুলিয়া তারাচরণের মুখের দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া দাশজী বলিল—এস বাপধন এস। কি সংবাদ?

মাথা চুলকাইয়া তারাচরণ বলিল—গিয়েছিলাম কঙ্কণায়। বাড়ী এসেই শুনলাম, মা বললে—গোমস্তামশাই এসেছেন, শুনেই জোর-পায়ে আজ্ঞে আসছি—সে অকারণে হাসিতে লাগিল।

তারাচরণের এই হাসিটি তাহার ব্যবসায়ের অভিজ্ঞতা এবং বুদ্ধি হইতে উদ্ভূত। যাহার ডাকে সে সর্বাগ্রে না যায়—সেই-ই চটিয়া উঠে। তাই তারাচরণ মনঃতুষ্টির জন্য এই মিষ্টি হাসিটি হাসে, শ্লেষে-তিরস্কারেও সে এমনি করিয়া হাসে। আরও একটি সত্য সে আবিষ্কার করিয়াছে—সেটিকেও সে কাজে লাগায়। প্রতিবেশীর গোপন তথ্য জানিবার জন্য মানুষের অতি ব্যগ্র কৌতূহল। সকাল হইতে দ্বিপ্রহর পর্যন্ত সে গ্রামে-গ্রামান্তরে নানাজনের বাড়ীতে যায়। রামের বাড়ীর খবর সে শ্যামকে বলে, শ্যামের সংবাদ যদুকে দেয়; আবার যদুর কথা মধুকে নিবেদন করিতে করিতে তাহার বিরক্তি অপনোদন করিয়া তাহাকে খুসী করিয়া তোলে। সেই অবসরে আবার তাহাদের বাড়ীরও দুই-চারিটি গোপন সংবাদ জানিয়া লয়।

গাড়ু হইতে বাটিতে জল ঢালিয়া লইয়া সে আরম্ভ করিল—কঙ্কণাতে হৈ-হৈ কাণ্ড। আজ্ঞে বুঝলেন কিনা! তাঁবু পড়েছে আট-দশটা, —গাড়ী গাড়ী কাগজ জড়ো হয়েছে।

—হুঁ—সেটলমেন্ট ক্যাম্প বসেছে।

কৌশলী তারাচরণ বুঝিল—এ সংবাদে গোমস্তার চিত্ত সরস হইবে না। চকিতদৃষ্টিতে শ্রীহরির মুখের দিকে চাহিয়া দেখিল—শ্রীহরির মুখও গম্ভীর। মুহূর্তে সে প্রসঙ্গান্তরে আসিয়া বলিল—এবার পোয়া বারো হ’ল দূর্গা-টুর্গার। দু’হাতে টাকা লুটবে। টেরিকাটা আমিনের দল যা দেখলাম! বুঝলে ভাই পাল?

গোমস্তা ধমক দিল—পাল কি রে, ভাই কি রে? ভাই পাল বলিস কেন? ওকে তুই ‘ভাই পাল’ বলবার যুগ্যি? ‘বুঝলেন’ বলতে পারিস না, না?

—আজ্ঞে?

—ঘোষমশায় বলবি। পাল হ’ল যারা নিজের হাতে চাষ করে। এ গাঁয়ের মাথার ব্যক্তি হলেন শ্রীহরি।

তারাচরণ নীরবে সব শুনিতে আরম্ভ করিল। অনেক কথাই শুনিল—মায় এ গ্রামের গোমস্তাগিরিও যে শ্রীহরি ঘোষ মহাশয় লইতেছেন, সে কথাটা আভাসে সে অনুমান করিয়া লইল। তৎক্ষণাৎ বলিল—একশোবার হাজারবার, ঘোষ মহাশয়ের তুল্য ব্যক্তি এ ক’খানা গাঁয়ে কে আছে বলুন? গোমস্তার গালের উপর ক্ষুরের একটা টান দিয়া সে চাপা গলায় বলিল—উনি ইচ্ছে করলে দূর্গার মত বিশটা বাঁদী রাখতে পারেন।

হাত তুলিয়া ইঙ্গিতে ক্ষুর চালাইতে নিষেধ করিয়া দাশজী মৃদুস্বরে প্রশ্ন করিল—অনিরুদ্ধ কামারের বউটা দূর্গার সঙ্গে জোট বেঁধে বেঁধে বেড়ায় কেন রে? ব্যাপার কি বল তো?

—তাই নাকি? আজই খোঁজ নিচ্ছি দাঁড়ান! তবে কর্মকারের সঙ্গে দূর্গার আজকাল একটুকু—তারাচরণ হাসিল।

—নাকি?

—হ্যাঁ!

শ্রীহরি চুপ করিয়া বসিয়াছিল। পদ্মকে লইয়া এমনভাবে আলোচনা তাহার ভাল লাগিতেছিল না। ওই দীর্ঘাঙ্গী মেয়েটির প্রতি তাহার আসক্তি প্রচণ্ড কামনা প্রগাঢ়, যে আসক্তি ও যে কামনাতে মানুষ মানুষকে, পুরুষ নারীকে একান্তভাবে একক ও নিতান্তভাবে নিজস্ব করিয়া পাইতে চায়, এক জনশূন্য লোকে—সে তাহাকে চায় চোরের সম্পদের মতো; অন্ধকার গুহার নিস্তব্ধতম আবেষ্টনীর মধ্যে সর্পের সর্পিণীর মতো—শতপাকের নাগপাশের বন্ধনের মধ্যে!

***

পদ্মের বাড়ী আসিয়া দূর্গা দেখিল—পদ্ম আবার স্নানে যাইবার উদ্যোগ করিতেছে। পদ্ম দ্রুতপদে চলিয়া আসিবার কিছুক্ষণ পর দূর্গা কিছুক্ষণ একটা গলির আড়ালে লুকাইয়া দাঁড়াইয়াছিল। গোমস্তাটিকে সে ভাল করিয়াই জানে। শ্রীহরির তো নখ হইতে মাথার চুল পর্যন্ত তাহার নখদর্পণে। ...তাহাদের কথাবার্তা শুনিবার জন্যই সে লুকাইয়া দাঁড়াইয়াছিল। গোমস্তার কথা শুনিয়া সে হাসিল; শ্রীহরির কথাবার্তার ধরনে সে অনুভব করিল বিস্ময়। তারাচরণ আসিতেই সে চলিয়া আসিয়াছে। গামছা কাঁধে ফেলিয়া পদ্ম তখন বাড়ী হইতে বাহির হইতেছিল। দূর্গা প্রশ্ন করিল—এ কি? আবার চান?

—হ্যাঁ।

—ছোঁয়াচ পড়লো বুঝি? যে পাঁচহাত ‘সান’ তোমার! কিছু ছোঁয়াটা আর আশ্চয্যি কি!

অপ্রস্তুতের মত হাসিয়া পদ্ম বলিল—না—মাড়াই নাই কিছু।

—তবে?

—ছেলেতে ময়লা করে দিলে কাপড়।

—তোমার ওই এক বাতিক, ছেলে দেখলেই কোলে নেবে। নিজের নাই পরের নিয়ে এত ঝঞ্ঝাট বাড়াও ক্যানে বল তো? এর মধ্যে আবার কার ছেলে নিতে গেলে!

পদ্ম এবার অত্যন্ত অপ্রস্তুত হইয়া একটু হাসিল, ছিরু পালের ছেলে।

দূর্গা অবাক হইয়া গেল।

পদ্ম বলিল—গলির মুখে বউটি দাঁড়িয়ে কাঁদছিল, কোলে ছোটটা ঘ্যান-ঘ্যান্ করছে, পায়ের কাছে বড়টা কোলে চাপবার জন্যে মায়ের কাপড় ধরে টেনে ছিঁড়ে একাকার করছে আর চেঁচাচ্ছে; বাড়ীর ভেতরে শাশুড়ী গাল পাড়ছে—বিয়েনখাগী, সব খেয়েছিস, আর ও দু’টো ক্যানে? ও দু’টোকেও খা, খেয়ে তুইও যা, আমি বাঁচি। তাই ছোটটাকে একবার নিলাম—মা তখন বড়টাকে নিয়ে চুপ করালো। কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া সে আবার বলিল—পালের বউটি কিন্তুক বড় ভাল মেয়ে, বড় ভাল! তাহার মনে পড়িয়া গেল সেই সেদিনের কথা।

শ্রীহরির স্ত্রীর বিরুদ্ধে দূর্গার কোন অভিযোগ নাই, বরং তাহার কাছে তাহার নিজেরই একটি গোপন অপরাধ-বোধ আছে। এ গ্রামের বধূদের সকলেই তাহাকে অভিসম্পাত দেয়, কটু কথা বলে—সে-কথা সে জানে। কেবল দুটি বউয়ের বিরুদ্ধে সে এ অভিযোগ করিতে পারে না; একজন বিলু দিদি—পণ্ডিতের স্ত্রী, অপর জন শ্রীহরির স্ত্রী। পণ্ডিতের স্ত্রী না করিবারই কথা—পণ্ডিত সম্বন্ধে তো তাহার আশঙ্কার কিছু নাই, সে সাধু লোক, কিন্তু ছিরুর সহিত তার প্রকাশ্য ঘনিষ্ঠতা সত্ত্বেও শ্রীহরির স্ত্রী কোনদিন তাহাকে কটু কথা বলে নাই—অভিসম্পাত দেয় নাই। পালের স্ত্রীর সঙ্গে চোখে চোখ রাখিতে তাহার সত্যই লজ্জাবোধ হয়। কিছুক্ষণ নীরবে পথ চলিয়া, অকস্মাৎ বোধ হয় শ্রীহরির স্ত্রীর প্রসঙ্গ হইতে নিষ্কৃতি পাইবার জন্যই সে প্রসঙ্গান্তরের অবতারণা করিল; বলিল—কে জানে ভাই, কচি-কাঁচা দেখলে আমার তো গা ঘিন-ঘিন করে! মা গো?

পদ্ম অত্যন্ত রূঢ়দৃষ্টিতে তাহার দিকে চাহিল।

দূর্গা তাহা লক্ষ্যই করিল না, অবশ্য লক্ষ্য করিলেও সে গ্রাহ্য করিত না। তাচ্ছিল্যের একটা বাঁকা হাসির শাণিত ছুরিতে উহাকে টুকরা টুকরা করিয়া ধুলায় লুটাইয়া দিত। তেমনি উপেক্ষার ভঙ্গিতে সে বলিয়া গেল—আমাদের বউটার আবার এই বুড়ো বয়সে ছেলেপিলে হবে। আমি ভাই এখন থেকে ভাবছি—সেই ট্যা-ট্যা করে কাঁদবে, পাখীর বাচ্চার মতো ক্ষণে ক্ষণে কাঁথা কাপড় ময়লা করবে, মা গোঃ।

মুহূর্তে পদ্মের বিচিত্র রূপান্তর হইয়া গেল। সে প্রশ্ন করিল—কোন্ দেবতার দোর ধরেছিল তোমাদের বউ?

—দেবতা? দেবতা তো অনেককেই দয়া করেছে। —তারপর ফিক্ করিয়া হাসিয়া বলিল—শেষ ওই ঘোষালের—

—ঘোষালেরা কবচ দেয় নাকি?

—মরণ তোমার! ওই হরেন ঘোষালের সঙ্গে বউ-এর এতকালে আশনাই হয়েছে। বউ তো আর বাজা নয়, তাই সন্তান হবে।

পদ্ম স্থিরদৃষ্টিতে দূর্গার দিকে চাহিয়া রহিল।

দূর্গা বলিল—শুধু তো মেয়েই বাজা হয় না, পুরুষেরও দোষ থাকে। তা জান না বুঝি?

সে দৃষ্টান্ত দিতে আরম্ভ করিল, আশ-পাশ গ্রামের বহু দৃষ্টান্তই সে জানে। এই জীবনের—এই পথের পথিকদের প্রতিটি সংবাদ সে জানে, প্রতিটি জনকে চেনে। তাহারা হয়তো আড়াল দিয়া অন্ধকারে আত্মগোপন করিয়া চলিতে চায়—কিন্তু সে যে অহরহ পথের উপর অনবগুণ্ঠিত মুখে অকুণ্ঠিত দৃষ্টিতে চাহিয়া বসিয়া আছে পথের যাযাবরীর মত—ওই পথেই যে সে বাসা বাঁধিয়াছে।

শীতের দিন—জলের হিম মানুষের দেহে যেন সূচ ফুটাইয়া দেয়। সকাল বেলাতেই দুইবার স্নান করিয়া পদ্মের শরীর যেন অসুস্থ হইয়া পড়িল। সমস্ত দিনেও বেচারী সে অসুস্থতা কাটাইয়া উঠিতে পারিল না। রান্নাশালায় আগুনের আঁচেও সে আরাম পাইল না। রান্নাবান্না শেষ করিয়াও সে কিছু খাইল না, সমস্ত অনিরুদ্ধের জন্য ঢাকা দিয়া রাখিয়া দিল। কর্মকার সকালেই খাবার বাঁধিয়া লইয়া ময়ূরাক্ষীর ওপারে জংশনে তাহার নূতন কামারশালায় গিয়াছে।

অপরাহ্ণে সে ফিরিল। পদ্ম চুপ করিয়া দেওয়ালে ঠেস দিয়া বসিয়াছিল, অসুস্থ উদাসীনতা তাহার সর্বাঙ্গে পরিস্ফুট। অনিরুদ্ধ একে ক্লান্ত, তাহার উপর পথে দূর্গার বাড়ীতে খানিকটা মদ খাইয়া আসিয়াছে। পদ্মের ভাবভঙ্গি দেখিয়া তাহার সর্বাঙ্গ জ্বলিয়া গেল। অত্যন্ত ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ নির্বাক পদ্মের দিকে চাহিয়া থাকিয়া অকস্মাৎ প্রচণ্ড চীৎকার করিয়া উঠিল—বলি, তোর হ’ল কি?

পদ্ম এতক্ষণে অনিরুদ্ধের দিকে চাহিল।

অনিরুদ্ধ আবার চীৎকার করিয়া উঠিল—হ’ল কি তোর?

শান্তস্বরে পদ্ম জবাব দিল—কি হবে? কিছুই হয় নাই।...শরীরের অসুস্থতার কথা অনিরুদ্ধকে বলিতেও তাহার ইচ্ছা হইল না, ভালও লাগিল না। পাথরকে দুঃখের কথা বলিয়া কি হইবে? অরণ্য-রোদনে ফল কি? কথার শেষে একটি বিষণ্ণ মৃদু হাসি তাহার মুখে ফুটিয়া উঠিল।

দাঁতে দাঁত ঘষিয়া অনিরুদ্ধ বলিল—তবে? তবে উদাসিনী রাই-এর মত বসে রয়েছিস—চালকাঠের দিকে চেয়ে?

মুহূর্তে পদ্ম যেন দপ, করিয়া জ্বলিয়া উঠিল—তাহার অলস শিথিল দেহের সর্বাঙ্গে চকিতের জন্য একটি অধীর চাঞ্চল্য যেন খেলিয়া গেল, ডাগর চোখ দু’টি ক্রোধে রক্তাভ, উগ্রভঙ্গিতে বিস্ফারিত হইয়া উঠিল। অনিরুদ্ধের মনে হইল—দুই টুকরা লোহা যেন কামারশালার জ্বলন্ত অঙ্গারের মধ্যে আগুনের চেয়েও দীপ্তিময় এবং উত্তপ্ত হইয়া গলিবার উপক্রম করিতেছে। পদ্মের দেহখানা পর্যন্ত জ্বলন্ত অঙ্গারের মত দুঃসহ উত্তাপ ছড়াইতেছে। এ মূর্তি পদ্মের নূতন। অনিরুদ্ধ ভয় পাইয়া গেল। এইবার পদ্ম কি বলিবে, কি করিবে—সেই আশঙ্কায় সে অধীর অস্থির হইয়া উঠিল। পদ্ম কিন্তু মুখে কিছু বলিল না। তাহার ক্রোধ পাত্রে আবদ্ধ জ্বলন্ত ধাতুর মতোই তাহার দৃষ্টি ও দেহভঙ্গির মধ্যেই গণ্ডীবদ্ধ হইয়া রহিল; কেবল একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া সে উঠিয়া দাঁড়াইল। অনিরুদ্ধ দেখিল—পদ্ম যেন কাঁপিতেছে; সে শঙ্কিত হইয়া ছুটিয়া গিয়া তাহার হাত ধরিল—কি হ’ল পদ্ম? পদ্ম!

সর্বদেহ সঙ্কুচিত করিয়া পদ্ম বোধ হয় অনিরুদ্ধের নিকট হইতে সরিয়া যাইতে চাহিল, কিন্তু পারিল না—কাঁপিতে কাঁপিতেই সে দেওয়ালে ঠেস দিয়া ধীরে ধীরে বসিয়া পড়িয়া মাটিতে লুটাইয়া পড়িল।

***

অনিরুদ্ধ ছুটিয়া জগন ডাক্তারের কাছে চলিয়াছিল।

পথে চণ্ডীমণ্ডপের উপরে ডাক্তারের আস্ফালন শুনিয়া সে চণ্ডীমণ্ডপেই উঠিয়া আসিল। চণ্ডীমণ্ডপে তখন গ্রামের প্রায় সমস্ত লোকই আসিয়া সমবেত হইয়াছে। ডাক্তার কেবল আস্ফালন করিতেছে—দরখাস্ত করব। কমিশনারের কাছে টেলিগ্রাম করব।

উর্দি-পরা একজন সরকারী পিওন চণ্ডীমণ্ডপের দেওয়ালের গায়ে একটা নোটিশ লটকাইয়া দিতেছে। “আগামী ৭ই পৌষ হইতে এই গ্রামে সার্ভে-সেটেলমেন্টের খানাপুরী আরম্ভ হইবেক। অতএব প্রত্যেক ব্যক্তিকে আপন আপন জমির নিকট উপস্থিত থাকিয়া সীমানা সরহদ্দ দেখাইয়া দিতে আদেশ দেওয়া যাইতেছে। অন্যথায় আইন অনুযায়ী কার্য করা যাইবেক।”

গ্রামের লোকগুলি চিন্তিতমুখে গুঞ্জন করিতেছে।

শ্রীহরি ও গোমস্তা কথা বলিতেছে সেটেলমেন্ট হাকিমের পেশকারের সঙ্গে। —মাছ—একটা বড় মাছ!

দেবু নীরবে একপাশে দাঁড়াইয়া ছিল। অনিরুদ্ধ তাহারই কাছে ছুটিয়া গেল। জংশন হইতে ফিরিবার পথে দূর্গার বাড়ীতে সকালবেলার কথা সব শুনিয়াছে। দেবুকে সে বরাবরই ভালবাসে, শ্রদ্ধা করে; সেদিন সে তাহার উপর রাগ ঠিক করে নাই—অভিমানই করিয়াছিল। আজও দূর্গার কাছে সব শুনিয়া, দেবুর উপর তাহার অভিমান দূর হইয়া প্রগাঢ় অনুরাগে হৃদয় ভরিয়া উঠিয়াছে।

আবেগ-কম্পিত-কণ্ঠে সে বলিল—দেবু ভাই!

—কি, অনি ভাই কি হ’ল?

অনিরুদ্ধ কাঁদিয়া ফেলিল।

***

দেবুই জগন ডাক্তারকে ডাকিল—শিগগির চল, অনিরুদ্ধের স্ত্রীর মূৰ্ছা হয়েছে।

জগন ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে অনিরুদ্ধের দিকে একবার চাহিল, তারপর নিজেই অগ্রসর হইয়া ডাকিল—এস তা হলে।

সেটেলমেন্ট সংক্রান্ত বক্তৃতা আপাততঃ মুলতবী থাকিল, চলিতে চলিতে জগন শুরু করিল গ্রাম্য লোকের অকৃতজ্ঞতার উপর এক বক্তৃতা। —তবু আমার কর্তব্য করে যাব আমি। চিকিৎসক যখন হয়েছি তখন ডাকামাত্র যেতে হবে আমাকে, যাব আমি! তিন পুরুষ ধরে গাঁয়ে ফি দেয়নি, আমিও নেব না ফি! ফি? ডাক্তার হাসিল—ওষুধের দামই কেউ দেয় না তো ফি।

দেবু পকেট হইতে বিড়ি বাহির করিয়া বলিল—বিড়ি খাও ডাক্তার।

—দাও। —বিড়িটা দাঁতে চাপিয়া ধরিয়া ডাক্তার বলিল—তোমার খাতা দেখাব পণ্ডিত—দশ হাজার টাকা! আমাদের দশ হাজার টাকা ডুবিয়ে দিলে লোকে, খাতিরের লোক মহাজন—যারা সুদ নেয়; কঙ্কণার বাবুরা ছিরে পাল—এরাই।

জগনের ডাক্তারখানার সম্মুখেই সকলে আসিয়া পড়িয়াছিল। ডাক্তারখানা হইতে একটা শিশি লইয়া ডাক্তার বলিল—চল। এক মিনিট—এক মিনিটেই চেতন হয়ে যাবে; ভয় নেই।


চৌদ্দ



আকাশের ভোরের আলো ভাল করিয়া তখনও ফোটে নাই—দেবু বিছানা ছাড়িয়া উঠে। শৈশব হইতেই তাহার এই অভ্যাস। একা দেবুর নয়—পল্লীর অধিকাংশ লোকই দিন শুরু হইবার পূর্ব হইতেই দৈনন্দিন জীবন-যাত্রা আরম্ভ করে। মেয়েরা উঠিয়া দুয়ারে জল দেয়, ঘর-দুয়ার পরিষ্কার করে, নিকায়, পুরুষেরা গরু-বাছুরকে খাইতে দেয়। ইহা ছাড়াও যাহার বাড়ীতে যখন ধান ভানার কাজ থাকে তখন তাহার বাড়ীতে জীবনের সাড়া জাগিয়া উঠে রাত্রির শেষ-প্রহর হইতে। রাত্রির নিস্তব্ধ শেষ-প্রহরে ঢেঁকির শব্দ উঠে দুম-দুম-দুম করিয়া একটি নির্দিষ্ট তালে; মৃদু কথাবার্তার সাড়া পাওয়া যায়, কেরোসিনের ডিবের আলোর আভাস লাগে। পল্লীর এই সময় ওই নূতন ধানের সময় অনেক বাড়ী হইতে ঢেঁকির সাড়া উঠেই। আজ কোন বাড়ীতেই সাড়া উঠে নাই। ‘ইতুলক্ষ্মী’র পর্ব, শস্যের উপর ঢেঁকির আঘাত দিতে নাই; আজ সঞ্চয়ের দিন।

বিলুকে দেবু বলিল—দেখ, আজ বাইরের উঠানটাও নিকুতে হবে। গোমস্তা এসেছে—এখন কিছুদিন বাড়ীতেই পাঠশালা বসবে।

গোমস্তা আসিয়াছে, চণ্ডীমণ্ডপে এখন গোমস্তার কাছারি বসিবে। গ্রাম্য দেবোত্তর সম্পত্তির সেবাইত হিসাবে চণ্ডীমণ্ডপের মালিক জমিদার; তবে সাধারণের ব্যবহার্য স্থান—সাধারণের ব্যবহারের অধিকার আছে। সেই অধিকারেই গ্রামের লোক ব্যবহার করে—সেই দায়িত্বে চণ্ডীমণ্ডপটির রক্ষণাবেক্ষণও তাহারাই করে। চাঁদা করিয়া খড় তুলিয়া তাহারাই ছায়, প্রয়োজন হইলে ভাঙা-ফুটো তাহারাই মেরামত করায়, এমন কি চণ্ডীমণ্ডপটি তাহারাই একদা নিজেরা চাঁদা তুলিয়া সৃষ্টি করিয়াছিল। সে অনেক পূর্বের কথা, তখনকার জমিদার মালিক হিসাবে তাহাতে সম্মতি দিয়াছিলেন মাত্র! তাহার অধিক দিয়াছিলেন গোটা দুই তাল গাছ চালকাঠের জন্য।

চণ্ডীমণ্ডপে প্রণাম করিয়া দেবু মাঠের দিকে বাহির হইয়া গেল; গ্রামের প্রবীণারা তখন বাবা-শিব ও মা-কালীর দ্বারে জল ছিটাইয়া প্রণাম করিতেছে। জলে-জলে দেবতার ঘরের চৌকাঠের নিচের কাঠ একেবারে পচিয়া খসিয়া গিয়াছে, কপাটের নিচের খানিকটাও ক্ষয়িষ্ণু হইয়াছে। এবার মেরামত না করাইলে পূজার সময় ভোগের সামগ্রীর গন্ধে বিড়াল তো ঢুকিবেই—কুকুর প্রবেশ করিলেও আশ্চর্য হইবার কিছু থাকিবে না!

খোঁড়া পুরোহিত বলে—এত করে জল দিও না, মা-সকল, জল একটুকুন কম করেই দিও; তোমাদেরই পরলোকের পথে কাদা হবে, পেছল হবে—তাতেই বলছি। শেষে রথের চাকা গেড়ে গিয়ে আর উঠবে না।

মোড়লপিসি মূর্খের মত জবাব দেয়, বলে—রথের ঘোড়া তো আর তোমার ওই তে-ঠেঙে বেতো ঘোড়া নয়, ঠাকুর; তার লেগে আর তোমাকে ভাবতে হবে না।

পুরোহিত হাসিয়া বলে—আমার ঘোড়া সেই রথের ঘোড়ারই বাচ্চা মোড়লপিসি। আমার ঘোড়ার তো তিনটে ঠ্যাঙ, ওর মা-বাবার মাত্তর দুটো, শোন নাই, ‘ডান ঠ্যাঙটা লটর-পটর, বাঁ ঠ্যাঙটা খোঁড়া, বাবা বক্রনাথের ঘোড়া।’

জগন ডাক্তার বলে আরো কর্কশ কঠোর কথা, বলে—কেউ চোর, কেউ ছ্যাঁচড়, কেউ ছেনাল; হিংসুটে-বদমাস-কুঁদুনী তো সবাই; সকালে আসেন সব পুণ্যি করতে! নিয়ম করে দাও, দেবতার দোরে জল দিতে হলে সবাইকে রোজ একটি করে পয়সা দিতে হবে। দেখবে একজন আর আসবে না। দেখ না, পুকুরের জল সব ঘড়া-ঘড়া আনছে আর ঢালছে।

দেবু কোন কথাই বলে না। জগনের কথা অবশ্য মিথ্যা নয়, যে অপবাদ সে দেয়, তাহা অনেকাংশেই সত্য। কিন্তু নিত্য-নিয়মিত প্রথম প্রভাতে দেবু যখন ইহাদের দেখে, তখন এই পরিচয়গুলির কোন চিহ্নই তাহাদের চোখেমুখে ভাবেভঙ্গিতে সে দেখিতে পায় না। সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র একদল মানুষকে সে দেখে। তখন ইহারা প্রত্যেকেই যেন এক এক কল্পলোকের যাত্রী। ইহারা যদি সদাসর্বদা এমনই মানুষ থাকিত! কিন্তু এই চণ্ডীমণ্ডপ হইতে বাহির হইয়া বাড়ীতে পা দিতে-না-দিতেই প্রতিটি জনই আবার নিজমূর্তি ধারণ করে। কেহ আপনার দুঃখকষ্টের জন্য ভগবানকে শতমুখে গালি পাড়ে; কেহ হয়তো ঘাট হইতে অন্যের বাসন তুলিয়া লয়, কেহ হয়তো রাস্তার প্রতীক্ষা করে ‘পাইকারের’ অর্থাৎ গরু-বাছুরের দালালের—বুড়ো গাইটাকে বেচিয়া দিবে। দালালেরা বুড়ো গাই লইয়া কি করিবে সে সকলেই জানে। কিন্তু কয়েকটা টাকার লোভও সংবরণ করা তখন ইহাদের সাধ্যের অতীত। মানুষেরা আশ্চর্য, মানুষেরা বিচিত্র—একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া দেবু চণ্ডীমণ্ডপ হইতে নামিয়া গেল।

কৃষাণেরা মাঠে চলিয়াছে, বাউড়ী, ডোম, মুচী প্রভৃতি শ্রমিক চাষীর দল। পরনে খাটো কাপড়, মাথার গামছাখানা পাগড়ী করিয়া বাঁধা। তাহার সঙ্গে একখানা পরনের কাপড়ই—গায়ে র‍্যাপারের মত জড়াইয়া হুঁকো টানিতে টানিতে চলিয়াছে, অন্য হাতে কাস্তে। ধান-কাটার পালা এখন। গ্রামের চাষী গৃহস্থেরাও অধিকাংশই নিজ হাতে কৃষাণদের সঙ্গেই চাষ করে, তাহারাও কাস্তে হাতে চলিয়াছে। ‘খাটে খাটায় দুনো পায়’—অর্থাৎ চাষে যাহারা নিজেরাও সঙ্গে খাটিয়া চাষী মজুরদের খাটায়, তাহাদের চাষে দ্বিগুণ ফসল উৎপন্ন হয়—এই প্রবাদ-বাক্যটা ইহারা আজও মানিয়া চলে। এ গ্রামে কেবল দুই-চারিজন নিজেরা চাষে খাটে না। হরেন্দ্র ঘোষাল ব্রাহ্মণ, জগন ঘোষ একে কায়স্থ তায় আবার ডাক্তার, দেবু ঘোষ পাঠশালার পণ্ডিত, শ্রীহরি সম্প্রতি কুলীন সদ্গোপ এবং বহু ধন-সম্পত্তির মালিক, এই কয়জনই চাষে খাটে না।

সতীশ বাউড়ী তাহাদের সম্প্রদায়ের মধ্যে মাতব্বর গোছের লোক। লোকটির নিজের হাল-গরু আছে। জমি অবশ্য তাহার নিজের নয়—পরের জমি ভাগে চাষ করে। বেশ বিজ্ঞ-ধরনের কথা কয়। দেবুকে দেখিয়া হেঁট হইয়া সে প্রণাম করিল, বলিল—পেনাম হই, পণ্ডিত মশায়! —সঙ্গে সঙ্গে দলের সকলেই প্রণাম করিল।

দেবু প্রতিনমস্কার করিয়া বলিল—মাঠে যাচ্ছ?

—আজ্ঞে হ্যাঁ। সতীশ নিজের সঙ্গীদের বলিল—পণ্ডিতমশায়ের মতো মানুষটি আর দেখলাম না। পেনাম করলে অনেক মণ্ডল মশাইরা তো রা পর্যন্ত কাড়ে না। পণ্ডিতমশায় কিন্তুক কপালে হাতটি ঠেকাবেই। কখনও তুই-তুকারি শুনলাম না উনার মুখে।

দেবু কথা বলিল না, দ্রুতপদে আগাইয়া যাইবার চেষ্টা করিল। কিন্তু সতীশ বলিল—হ্যাঁ গো, পণ্ডিতমশায়—এ কি হবে বলেন দেখি?

—কিসের? কি হ’ল তোদের?

—আজ্ঞে, একা আমাদের লয়, গোটা গাঁয়ের নোকেরই বটে। এই সেটেলমেন্টোরের কথা বলছি। সাতদিন পরেই বলছে আরম্ভ হবে। দিনরাত হাজির থাকতে হবে, নোয়ার শেকল টেনে মাপ হবে; তা হলে ধানকাটাই বা কি করে হয়, আর পাকা ধানের ওপর শেকল টানলে ধানই বা থাকে কি করে?

—গোমস্তা কি বললেন? পালই বা কি বলল?

—আজ্ঞে ঘোষমশাই বলুন।

—ঘোষ মশায়?

—আজ্ঞে, উনি এখন ছিহরি ঘোষ মশাই গো! ঘোষ বলতে হুকুম হয়েছে। জমিদারের কাগজ-পত্তরে, মায় আদালতে পর্যন্ত ঘোষ করে লিয়েছেন পাল কাটিয়ে।

—তাই নাকি? ওঁরা কি বললেন? কাল তো তোমরা গিয়েছিলে সব!

—আজ্ঞে ডাক হয়েছিল, গিয়েছিলাম। তা ওঁরা বললেন—দিনরাত খেটে ধান কেটে ফেল সব সাতদিনের মধ্যে! তাই কি হয় গো? আপনিই বলেন ক্যানে পণ্ডিতমশায়?

দেবু চুপ করিয়া রহিল, কোন উত্তর দিল না। কাল সমস্ত রাত্রি সে এই কথাটাই ভাবিয়াছে। কিন্তু কোন উপায়ই স্থির করিতে পারে নাই।

সতীশ বলিল—হোথা থেকে এলাম তো দেখি, ডাক্তোর বাবু পাড়ায় এসেছেন, বলছেন—টিপছাপ দিতে হবে, দরখাস্ত পাঠাবেন। তা হ্যাঁ মশায়, দরখাস্তে কি হবে গো? এই তো ঘর-পোড়ার লেগে দরখাস্ত করলাম—কি হ’ল? তা ছাড়া দরখাস্ত করলে সেটেলমেন্টোরের হাকিম যদি রেগে যায়।

***

বাংলাদেশে ইংরাজী ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময় কোন জরিপবন্দী হয় নাই। তখনকার দিনে সীমানা-সরহদ লইয়া দাঙ্গা, হাঙ্গামা, মামলা-মকদ্দমার আর অন্ত ছিল না। ১৮৪০ খৃষ্টাব্দে গবর্ণমেন্ট হইতে পঁয়ত্রিশ বৎসর ধরিয়া জরিপ করিয়া মাত্র গ্রামগুলির সীমানা নির্ধারিত হইয়াছিল। ১৮৭৫ খৃষ্টাব্দে জরীপ আইন পাস হইবার পর বাংলা দেশে নূতন জরীপের এক পরিকল্পনা হয়। প্রতিটি টুকরা জমি, তাহার বিবরণ এবং তাহার স্বত্ব-স্বামিত্ব নির্ধারণ করিবার জন্যই এ জরিপের আয়োজন। ১৯২৬ খৃষ্টাব্দে তাহার জের এই গ্রামাঞ্চলে আসিয়া পড়িয়াছে। গ্রাম্য লোকগুলি বিভীষিকায় একেবারে ত্রস্ত হইয়া উঠিয়াছে।

জরিপের সময়ে এতটুকু ত্রুটিতে হাকিম নাকি বেত লাগায়, হাতকড়ি দিয়া জেলে পাঠাইয়া দেয়। এই ধরনের নানা গুজবে অঞ্চলটা উত্তপ্ত হইয়া উঠিয়াছে।

আরও আছে, জরিপের পর প্রজাদের জরিপের খরচের অংশ দিতে হইবে। না দিলে অস্থাবর ক্রোক হইবে, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হইবে। তাহার পর জমিদার দাবী করিবে খাজনা-বৃদ্ধি; প্রতি টাকায় চার আনা, আট আনা, এমন কি টাকায় টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধিও হইতে পারে, হাইকোর্টের নাকি নজির আছে। লাখরাজ বাজেয়াপ্ত হইয়া যাইবে। বজায় থাকিলে সেস লাগিবে, সে সেসের পরিমাণ নাকি খাজনারই সমান—কম নয়; এমনি আরও অনেক কিছু হইবে।

ফিরিবার পথে দেবু দেখিল—জনকয়েক মাতব্বর ইতিমধ্যেই চণ্ডীমণ্ডপে সমবেত হইয়াছে, সকলে তাহারই প্রতীক্ষা করিতেছিল। দেবু চণ্ডীমণ্ডপেই উঠিয়া আসিল। হরিশ প্রশ্ন করিল—হয়েছে?

রাত্রে তাহার একখানা দরখাস্ত লিখিয়া রাখিবার কথা ছিল। কিন্তু দেবুর দরখাস্ত লেখা হইয়া উঠে নাই। দরখাস্তে তাহার আস্থা নাই। দরখাস্তের প্রসঙ্গে মনে পড়িয়া গিয়াছিল কয়েকটি তিক্ত ঘটনার স্মৃতি। নিজে সে এককালে কয়েকবার দরখাস্ত করিয়াছিল, সেই দরখাস্তের ফলের কথা মনে পড়িয়া গিয়াছিল।

তখন বাপের মৃত্যুর পর সদ্য সে স্কুল ছাড়িয়া নিজের হাতেই চাষ করিত। সেদিন মাঠে সে হাল চালাইতেছিল। খাকী পোশাক পরা টুপী মাথায় পুলিশের এ্যাসিস্ট্যান্ট সাব-ইন্সপেক্টর মাঠের পথে যাইতে যাইতে তাহাকে ডাকিয়া বলিয়াছিল—এই শোন্।

দেবু এই অভদ্রজনোচিত সম্ভাষণে অসন্তুষ্ট হইয়াই উত্তর দেয় নাই।

—এই উল্লুক!

দেবু এবারও উত্তর দেয় নাই। দেবুর সেই প্রথম দরখাস্ত। দরখাস্ত করিয়াছিল পুলিশ সাহেবের কাছে। তদন্ত হইল মাস কয়েক পর। তদন্তে আসিলেন ইন্সপেক্টর।

দেবুর অভিযোগ শুনিয়া তিনি মিষ্ট কথায় ব্যাপারটা মিটাইয়া দিলেন, বলিলেন—দেখ বাপু, জমাদার বাবু তোমার বাপের বয়সী। ‘তুই’ বললেও তোমার রাগ করা উচিত নয়। ‘উল্লুক’ বলাটা অন্যায় হয়েছে, যদি উনি বলে থাকেন।

দেবু বলিল—উনি বলেছেন।

—বুঝলাম কিন্তু সাক্ষী কে বল?

সাক্ষী ছিল না। ইন্সপেক্টর বলিলেন—থাক, তুমি বাড়ী যাও। কিছু মনে করো না।

দেবুর ক্ষোভ কিন্তু মেটে না।

দ্বিতীয় দরখাস্তের অভিজ্ঞতা বিচিত্র। জমিদার বৈশাখ মাসে খাসপুকুর হইতে মাছ ধরিবার ব্যবস্থা করিয়াছিল। সেইটিই একমাত্র পানীয় জলের পুকুর। জল অল্পই ছিল, সেই জল আরও খানিকটা বাহির করিয়া দিয়া মাছ ধরিবার কথা হইল। গ্রামের লোকে শিহরিয়া উঠিল। বলিল—ওটুকু জল, কেটে বের করে দিলে থাকবে কতটুকু? তার উপর মাছ ধরলে যে কাদা ছাড়া কিছু থাকবে না। আমরা খাব কি?

গোমস্তা বলিল—জমিদারের বাড়ীতে কাজ, তিনিই বা মাছ কোথায় পাবেন বল?

প্রজারা খোদ জমিদারের কাছে গেল। জমিদার বলিলেন—তোমরা মাছ দাও, নয় মাছের দাম দাও।

তরুণ দেবু এক দরখাস্ত করিল ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের কাছে। কিন্তু কিছুই হইল না। জমিদারের চাপরাসীরা শোভাযাত্রা করিয়া আসিয়া মাছ ধরাইয়া পুকুরটাকে পঙ্ক-পৰ্ব্বলে পরিণত করিয়া দিয়া গেল। দেবুর ক্ষোভের আর সীমা রহিল না। হঠাৎ সাতদিন পর, অকস্মাৎ দারোগা-কনস্টেবল-চৌকিদারের আগমনে গ্রামখানা ত্রস্ত হইয়া উঠিল। তাহাদের সঙ্গে একজন সাহেবী পোশাকপরা অল্পবয়সী ভদ্রলোক। দারোগা আসিয়া দেবুকে ডাকিল। বলিল—ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব বাহাদুর ডাকছেন তোমাকে।

দেবু অবাক হইয়া গেল। সাহেব নিজে আসিয়াছেন। কিন্তু এখন আসিয়া ফল কি? সাহেবকে সে নমস্কার করিয়া দাঁড়াইল। সাহেব প্রতিনমস্কার করিলেন। সে আরও আশ্চর্য হইয়া গেল সাহেবের কথায়।

—আপনি দেবনাথ ঘোষ?

—আজ্ঞে হ্যাঁ।

দারোগা বলিল—আজ্ঞে হ্যাঁ হুজুর বলতে হয়।

সাহেব বলিলেন—থাক। তারপর সমস্ত শুনিলেন—পুকুর নিজে দেখিলেন। পুকুরের পাড়ে দাঁড়াইয়া জলের অবস্থা দেখিয়া তিনি স্তম্ভিত হইয়া গেলেন। দেবুর আজও মনে আছে ভদ্রলোকের চোখ হইতে ফোঁটা কয়েক জল ঝরিয়া পড়িয়াছিল। রুমালে চোখ মুছিয়া সাহেব বলিলেন—তাই তো দেবুবাবু, এসে তো কিছু করতে পারলাম না আমি।

দেবু বলিল—আমি দরখাস্ত করেছিলাম পাঁচ দিন আগে হুজুর!

—ডাকে যেতে একদিন লেগেছে। দরখাস্ত যথানিয়মে পেশ হতেও কোন কারণে দেরি হয়েছে। সে কারণ আমি এনকোয়ারী করব। তারপর সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া বলিলেন—দেবনাথবাবু, এসব ক্ষেত্রে দরখাস্ত করবেন না। নিজে যাবেন, একেবারে আমাদের কাছে গিয়ে সরাসরি জানাবেন। দরখাস্ত? —শব্দটা উচ্চারণ করিতে করিতে তিনি হাসিয়াছিলেন।

সাহেব গ্রামের জন্য একটা ইদারা মঞ্জুর করিয়া দিয়াছিলেন। কিন্তু তাহাও শেষ পর্যন্ত হয় নাই। কারণ সাহেব এ জেলা হইতে চলিয়া যাওয়ার সুযোগে ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট কঙ্কণার বাবু সেটা অন্য গ্রামে মঞ্জুর করিয়া দিয়াছে। এ গ্রামের মেম্বার হিসাবে শ্রীহরিও তাহাতে সম্মতি-ভোট দিয়াছে। দেবনাথ জমিদারের মাছ ধরার জন্য দরখাস্ত করিয়াছিল। সাজাটা তাহারই জন্য গোটা গ্রামের লোক ভোগ করিল।

দরখাস্ত! একটা গল্প তাহার মনে পড়ে। কোন রাজার বাড়ীতে আগুন লাগিয়াছিল; রাজা ছিলেন দার্জিলিঙে। আগুন নিভাইবার হাড়ি বালতি কিনিবার জন্য বরাদ্দ না থাকায় রাজার নিকট টেলিগ্রাম করা হইল। হুকুম টেলিগ্রামে আসিলেও চব্বিশ ঘণ্টার পর। ততক্ষণে সব কিছুকে ভস্মসাৎ করিয়া আগুন আপনা আপনি নিভিয়া গিয়াছে। দরখাস্তের কথায় ওই গল্প তাহার মনে পড়ে, মুখে তিক্ত হাসি ফুটিয়া উঠে, সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে সেই সাহেবকে। মিঃ এস. কে. হাজরা, আই-সি-এস। দেবু তাঁহাকে শ্রদ্ধা করে।

দেবু উত্তর দিল—না হরিশ-কাকা, লেখা হয় নাই।

লেখা হয় নাই শুনিয়া, হরিশ, ভবেশ প্রভৃতি প্রবীণগণ সকলেই অসন্তুষ্ট হইল। হরিশ বলিল—তুমি বললে লিখে রাখবে, ভার নিলে! জলখাওয়ার পর গাঁয়ের লোক সব আসবে, দস্তখত করবে। এখন বলছ হয় নাই! এ কি রকম কথা হে? পারবে না বললে ডাক্তারই লিখে রাখত।

ভবেশ বলিল—এ্যাই কথা। স্পষ্ট কথার কষ্ট নাই। বললেই তো অন্য ব্যবস্থা হ’ত।

দেবু হাসিল, বলিল—দরখাস্ত না হয় আমি এখনি লিখে দিচ্ছি ভবেশদাদা, কিন্তু দরখাস্ত করে হবে কি বলতে পার?

সকলেই চুপ করিয়া রহিল। কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া হরিশ বলিল—তা হ’লে কি করব বল? কিছু করতে তো হবে; এমন করে—ধর—আপনাকেই বা প্রবোধ দিই কি বলে?

—এক কাজ করবেন?

—কি, বল?

—পাঁচখানা গাঁয়ের লোক ডাকুন, তারপর চলুন সকলে মিলে সদরে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে।

—তাতে ফল হবে বলছ?

—দরখাস্তের চেয়ে বেশী হবে নিশ্চয়।

সকলে আপনাদের মধ্যেই আবার গুঞ্জন শুরু করিল।

পাঠশালার ছেলেরা ইতিমধ্যে চণ্ডীমণ্ডপেই আসিয়া উপস্থিত হইয়াছিল; দেবু তাহাদের বলিল—এইখানেই এসেছ সব? আচ্ছা আজ এইখানেই ওই পাশে বসে সব পড়তে আরম্ভ কর। কালকে যে পদ্যের মানে লিখতে দিয়েছিলাম সবাই লিখেছো তো? খাতা আন সব—রাখ এইখানে।

হরিশ ডাকিল—দেবু!

—বলুন!

—তবে না হয় তাই চল। না, কি গো? তোমাদের মত কি? হরিশ জিজ্ঞাসু নেত্রে সকলের দিকে চাহিল।

ভবেশ উৎসাহিত হইয়া উঠিয়া বলিল—হরির নাম নিয়ে তাই চল সব। ধরে তো আর খেয়ে ফেলবে না সায়েব! আমি রাজি। বল হে সব বল, আপন আপন কথা বল সব!

মনে মনে সকলেই একটা উত্তেজনার উচ্ছ্বাস অনুভব করিল। হরেন ঘোষাল সর্বাপেক্ষা বেশী উত্তেজিত হইয়াছিল, সে সঙ্গে সঙ্গে উঠিয়া দাঁড়াইয়া বুকে হাত রাখিয়া বলিল—আই এ্যাম রেডি! এস্পার কি ওস্পার, যা হয় হয়ে যাক।

—ব্যস, তাই চল, কাল সকালেই!

—হ্যাঁ! হ্যাঁ! হ্যাঁ!

এবার একটা সমবেত সম্মতি প্রায় ঐকতানের মত ধ্বনিত হইল।

—কিন্তু! —ভবেশের একটা কথা মনে পড়িয়া গেল।

—কিন্তু কি? হরিশ বলিল—আবার কিন্তু করছ কেনে?

—পাঁজিটা একবার দেখবে না? দিন-ক্ষণ কেমন?

—তা বটে। ঠিক কথা।

সকলে মুহূর্তে সায় দিয়া উঠিল।

দেবু তিক্ত স্বরে বলিল—আপনারা মানেন কিন্তু রাজার কাজে তো পাঁজি মানে না। দশ দিন যদি ভাল দিন-ক্ষণ না থাকে?

ঘোষাল উত্তেজিত স্বরে বলিল—ড্যাম ইওর পাঁজি! বোগাস ওসব।

দেবু বলিল—মামলার দিন থাকলে যে মঘাতেও যেতে হয়।

হরিশ একটু ভাবিয়া বলিল—তা ঠিক। রাজদ্বারে পাঁজি-পুঁথি নাই।

দেবু বলিল—ভোর ভোর বেরিয়ে পড়লে দশটা নাগাদ ঠিক কোর্টের সময়েই গিয়ে পৌঁছানো যাবে। আপন আপন খাবার সকলে সঙ্গে নেবেন; চিঁড়ে গুড় যে যা পারেন। একটা দিন বৈ তো নয়।

ঠিক এই সময় চণ্ডীমণ্ডপে আসিয়া উপস্থিত হইল—গোমস্তা দাশজী, শ্রীহরি ঘোষ, ভূপাল নন্দী এবং আরও কয়েকজন; তাহার মধ্যে একজন খোকন বৈরাগী—লোকটি এ অঞ্চলে রাজমিস্ত্রির কাজ করিয়া থাকে।

দাশজী হাসিয়া বলিল—কি গো, দেবু মাস্টারের পাঠশালায় সব আবার নূতন করে নাম লেখালেন নাকি? ব্যাপার কি সব?

কে কি উত্তর দিত কে জানে, কিন্তু সে দায় হইতে সকলকে নিষ্কৃতি দিয়া হরেন ঘোষাল সঙ্গে সঙ্গে বলিয়া উঠিল—উই আর গোয়িং টু দি ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট—কাল ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের কাছে যাচ্ছি সব। ধানকাটা না হওয়া পর্যন্ত খানাপুরী স্টপড্—বন্ধ রাখতে হবে।

ভ্রূ নাচাইয়া দাশজী প্রশ্ন করিল—ঘোষাল মহাশয়ের হাত ক’টা? দুটো না চারটে?

এমন ভঙ্গিতে সে কথাগুলি বলিল যে, ঘোষাল কিছুক্ষণের জন্য হতভম্ব হইয়া চুপ করিয়া গেল। তারপর সে-ই চীৎকার করিয়া উঠিল—ব্রাহ্মণকে তুমি এত বড় কথা বল?

দাশজী সে কথার উত্তর দিল না, শ্রীহরির হাতে একখানা কাগজ ছিল, সেখানা টানিয়া লইয়া বলিল—এই দেখো। বেশী লাফিয়ো না। ‘জিতেন্দ্রলাল বন্দ্যোপাধ্যায় গ্রেপ্তার। সেটেলমেন্টের কার্যে বাধা দেওয়ার অপরাধে জিতেন্দ্রলাল বন্দ্যোপাধ্যায় গ্রেপ্তার হইয়াছেন।’ এই নাও, পড়ে দেখ। সে কাগজখানা মজলিসের মধ্যে ছুঁড়িয়া ফেলিয়া দিল।

ঘোষালই কাগজখানা কুড়াইয়া লইয়া হেড লাইনে চোখ বুলাইয়া বলিয়া উঠিল—মাই গড়! পাংশু বিবর্ণ মুখে কাগজখানা দেবুর দিকে বাড়াইয়া দিল। দেবু কাগজখানা পড়িতে আরম্ভ করিল।

শ্রীহরি বলিল—আমাকে তো আপনারা বাদ দিয়েই সব করছেন, তা করুন। আমি কিন্তু আপনাদের কথা না ভেবে পারি না। ওসব করতে যাবেন না। পাথরের চেয়ে মাথা শক্ত নয়। তার চেয়ে চলুন বিকাল-বেলা সেটেলমেন্ট হাকিমের সঙ্গে দেখা করে আসি। দাশজী যাবেন, আমি যাব, মাতব্বর জন-কয়েক আপনারাও চলুন। ভাল রকমের ডালিও একটা নিয়ে যাই। মাছ একটা ভালই পড়েছে, বুঝলেন হরিশখুড়ো, পাকি বারো সের।

বলিতে বলিতেই বোধ করি তাহার একটা কথা মনে পড়িয়া গেল। দাশজীকে বলিল—হ্যাঁ গো, সেই ইয়ে, মানে মুরগীর জন্য লোক পাঠানো হয়েছে তো? সবাই মিলে ধরে পেড়ে যা হোক একটা ব্যবস্থা করতেই হবে। আর, ওই না-রাজী দরখাস্ত করা, কি একেবারে ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের কাছে দরবার করতে যাওয়া—ও একরকম সরকারের হুকুমের বিরোধিতা করা। তাতে আমাদের বিপদ বাড়বে বৈ কমবে না। না কি গো? শ্রীহরি জিজ্ঞাসা করিল গোমস্তা দাশজীকে।

দেবু কাগজখানা দাশজীর হাতেই ফেরত দিল, তারপর মজলিসের দিকে পিছন ফিরিয়া অখণ্ড মনোযোগের সহিত সে ছেলেদের পড়াইতে আরম্ভ করিল। সে ইহাদের জানে। ইহারই মধ্যে সব সঙ্কল্প তাসের ঘরের মত ভাঙিয়া পড়িয়াছে। সে উঠিয়া গিয়া ব্ল্যাকবোর্ডের উপর খড়ি দিয়া লিখিল, মুখে বলিতে লাগিল, এক মণ দুধের দাম যদি পাঁচ টাকা দশ আনা হয়।

ওদিকে মজলিসে আবার পরামর্শের গুঞ্জনধ্বনি উঠিল। হরেন ঘোষালেরই চাপা-গলা বেশ স্পষ্ট শোনা যাইতেছিল—ভেরি নাইস হবে! ভেরি গুড পরামর্শ!

দাশজী এবার খোকন মিস্ত্রীকে বলিল—ধর দড়ি ধর। ভূপাল তুই ধর একদিকে।

খোকন বৈরাগী খানিকটা বাবুই ঘাসের দড়ি হাতে অগ্রসর হইয়া আসিল, সর্বাগ্রে ভূমিষ্ঠ হইয়া দেবদেবীকে প্রণাম করিল—তারপর জোড়হাতে বলিল—আরম্ভ করি তাহলে?

দাশজী বলিল—দুগ্গা বলে, তার আর কথা কি? শুনছেন গো—হরিশ মণ্ডল মশায়, ভবেশ পাল! চণ্ডীমণ্ডপ পাকা করে বাঁধানো হচ্ছে। আপনারাও একটা অনুমতি দেন।

—বাঁধানো হচ্ছে? পাকা করে?

সমস্ত মজলিস-সুদ্ধ লোক অবাক হইয়া গেল।

—হ্যাঁ। একটা কুয়োও হচ্ছে—ওই ষষ্ঠীতলায়। ঘোষ মশায়, মানে, আমাদের শ্রীহরি ঘোষ গ্রামের উপকারের জন্য এই সব করে দিচ্ছেন।

শ্রীহরি নিজে হাত জোড় করিয়া সবিনয়ে বলিল—অনুমতি দেন আপনারা সবাই।

হরিশ বলিল—দীর্ঘজীবী হও বাবা। এই তো চাই। তা মা-ষষ্ঠীকে আর ধুলোয় মাটিতে রাখছ ক্যানে? ষষ্ঠীতলাটিও বাঁধিয়ে দাও।

শ্রীহরি বলিল—বেশ তো, তাও হোক। ষষ্ঠীতলা বলে খেয়ালই হয় নাই আমার।

হরিশ মজলিসের দিকে চাহিয়া বলিল—তা হ’লে সেটেলমেন্টারের সম্বন্ধে দাশজী যা বলেছেন তাই ঠিক হ’ল, বুঝলেন গো সব? দরখাস্ত-টরখাস্ত লয়।

শ্রীহরির খুড়া ভবেশ অকস্মাৎ ভ্রাতুষ্পুত্রের গৌরবে ভাবাবেগে প্রায় কাঁদিয়া ফেলিল, উঠিয়া আসিয়া শ্রীহরির মাথায় হাত দিয়া আশীর্বাদ করিয়া বলিল—মঙ্গল হবে, তোমার মঙ্গল হবে বাবা।

শ্রীহরি খুড়াকে প্রণাম করিল।

ঘোষাল চুপি চুপি বলিল, হি উইল ডাই—ছিরু এইবার নিশ্চয় মরবে। হঠাৎ এত বড় সাধু? এ তো ভাল লক্ষণ নয়! মতিভ্রম—দিস ইজ মতিভ্রম!

মজলিস ভাঙিয়া গিয়াছে। সকলে বাড়ী চলিয়া গিয়াছে। ওদিকে জলখাবারের বেলা হইয়াছে। রোদ মন্দিরের চূড়া হইতে গা বাহিয়া আটচালার ফাঁকে ফাঁকে ঢুকিয়াছে। দেবু ছেলেদের ছুটি দিয়া বলিল—কাল থেকে আমার বাড়ীতে পাঠশালা বসবে, বুঝেছ? সেইখানে যাবে সবাই।

—বাঁধানো হয়ে গেলে আবার এইখানেই বসবে তো পণ্ডিত মশায়?

—পাকা হোলে বসবে বৈকি! যাও আজ ছুটি।

সে উঠিল, উঠিতে গিয়া তাহার নজরে পড়িল বৃদ্ধ দ্বারকা চৌধুরী এতক্ষণে ঠুকটুক করিয়া চণ্ডীমণ্ডপের উপরে উঠিতেছে। দেবু সম্ভাষণ করিয়া বলিল—চৌধুরী মশায় এত বেলায়?

—হ্যাঁ একটু বেলা হয়ে গেল। সকালে আসতে পারলাম না। দরখাস্তে সই করবার ডাক ছিল।

দেবু হাসিয়া বলিল—কষ্টই সার হল আপনার, দরখাস্ত করা হল না।

চৌধুরী হাসিয়া বলিল—পথে আসতে তা সব শুনলাম। সদরে যাবার পরামর্শ হয়েছিল তা-ও শুনলাম। আবার নতুন হুকুম শুনলাম, বিকেলে আসতে হবে। তাই চলুন, বিকেলে দেখা যাক কি হয়।

—আমি যাব না চৌধুরী মশাই।

বৃদ্ধ দেবুর মুখের দিকে চাহিয়া বলিল—যা পাঁচজনে ভাল বোঝে করুক, পণ্ডিত, আপনি মন খারাপ করবেন না।

দেবু জোর করিয়া একটু হাসিল।

—চলুন পণ্ডিত, আপনার ওখানে একটু জল খাব।

—আসুন, আসুন। দেবু ব্যস্ত হইয়া অগ্রসর হইল।

চলিতে চলিতে বৃদ্ধ বলিল—ও কিছু হবে না, পণ্ডিত! একদিন আমারও ভাল দিন ছিল—আর তখন ডালি দেওয়া তো হরির লুটের শামিল ছিল গো। আজকাল বরং একটু কম হয়েছে। তা দেখেছি—বিশেষ কিছু হয় না। তার চেয়ে বরং সবাই মিলে গিয়ে পড়লে... কিছু হইত—এ কথাও ভরসা করিয়া বলিতে পারিল না।

দেবু একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া বলিল—এতটুকু সাহস নাই, মতিস্থির নাই; এরা মানুষ নয়, চৌধুরী মশায়! সে আর আত্মসংবরণ করিতে পারিল না, চোখ ফাটিয়া জল আসিল। চোখ মুছিয়া হাসিয়া সে আবার বলিল—জানেন, পাঁচখানা গাঁয়ের লোক যদি সদরে যেত, আমি বলতে পারি চৌধুরী মশায়, কাজ নিশ্চয় হ’ত। সায়েব নিশ্চয় কথা শুনত। প্রজার দুঃখ শুনবে না কেন? হাজরা সাহেব ম্যাজিস্ট্রেট আমাকে সেবার বলেছিলেন। আমার মনে আছে।

বৃদ্ধ হাসিল—আপনি মিছে দুঃখু করছেন পণ্ডিত।

—দুঃখ একটু হয় বৈকি।

—একটা গল্প বলব চলুন।

জল খাইয়া কলার পেটোয় তামাক খাইতে খাইতে চৌধুরী বলিল—অনেক দিন আগে মহাগ্রামের ঠাকুরমশায়ের সঙ্গে গিয়েছিলাম প্রয়াগে কুম্ভস্নান করতে। হরেক রকমের সন্ন্যাসী দেখে অবাক হয়ে গেলাম। নাগা সন্ন্যাসী দেখলাম—উলঙ্গ বসে রয়েছে সব। কেউ বুক পর্যন্ত বালিতে পুঁতে রয়েছে, কেউ ঊর্দ্ধবাহু, কেউ বসে আছে লোহার কাঁটার আসনে, কেউ চারিদিকে অগ্নিকুণ্ড জ্বেলে বসে রয়েছে। দেখে অবাক হয়ে গেলাম। বললাম—স্বর্গ এদের হাতের মুঠোয়। আঃ! শুনে ঠাকুরমশায় বললেন—চৌধুরী, একটা গল্প বলি শোন।

তখন সত্যযুগের আরম্ভ। সবে মানুষের সৃষ্টি হয়েছে। সবাই তখন সাধু; সত্যযুগ তো! বনে কুটির বেঁধে সব থাকেন—ফলমূলে জীবন ধারণ চলে, ভগবানের নাম করেন, আর পরমানন্দে দিন কাটে। মা-লক্ষ্মী তখন বৈকুণ্ঠে, অন্নপূর্ণা কৈলাসে, মানে সোনা-রুপো, এমনকি অন্নেরও পর্যন্ত প্রচলন হয় নাই সংসারে। যাক্‌, এইভাবে এক পুরুষ কেটে গেল। তখন অকালমৃত্যু ছিল না, কাজেই হাজার বছর পরে একসঙ্গে একপুরুষের মৃত্যুর সময় হয়ে এল। মানুষেরা ঠিক করলেন—চল, আমরা সশরীরে স্বর্গে যাব। যেমন সঙ্কল্প তেমনি কাজ। বেরিয়ে পড়ল সব।

বদরিকাশ্রম পার হয়ে হিমালয়ের পথে পিঁপড়ের সারির মত মানুষ চলতে লাগল। ওদিকে স্বর্গদ্বারে দ্বারী ছিল, সে দেখতে পেলে, কোটী কোটী মানুষ কলরব করতে করতে সেই দিকেই চলে আসছে। সে ভয়ে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে গেল দেবরাজ ইন্দ্রের কাছে—দেবরাজ, মহা বিপদ উপস্থিত!

—কিসের বিপদ হে?

—কোটী কোটী কারা স্বর্গের দিকে চলে আসছে পিঁপড়ের সারির মত। বোধহয় দৈত্য-সৈন্য!

—দৈত্য-সৈন্য? বল কি?

সঙ্গে সঙ্গে সাজ সাজ রব পড়ে গেল। এমন সময় এলেন দেবর্ষি নারদ। বললেন—দৈত্য নয় দেবরাজ, মানুষ।

—মানুষ?

—হ্যাঁ, মানুষ। তোমাদের অস্ত্রে তাদের কিছুই হবে না; কারণ পাপ তো তাদের দেহে নাই, সুতরাং দেব-অস্ত্র অচল। দিব্যাস্ত্র ফুলের মালা হয়ে যাবে তাদের গায়ে ঠেকে।

—তবে উপায়? এত মানুষ যদি সশরীরে এখানে আসে তবে—ইন্দ্র আর কথা বলতে পারলেন না। সবাই হয়তো দাবি করবে এই সিংহাসন!

শেষে বললেন—চল নারায়ণের কাছে চল সব।

নারায়ণ শুনে হাসলেন। বললেন—আচ্ছা, চল দেখি। বলে প্রথমেই তিনি পাঠালেন মা অন্নপূর্ণাকে।

অন্নপূর্ণা এসে পথে পুরী নির্মাণ করে ফেললেন—ভাণ্ডার পরিপূর্ণ করে রাখলেন একশ-পঞ্চাশ-ব্যঞ্জনে। তারপর মানুষের সেই দল সেখানে আসবামাত্র তাদের বললেন—পথশ্রমে বড়ই ক্লান্ত তোমরা, আজকের মত তোমরা আমার আতিথ্য গ্রহণ কর।

মানুষেরা পরস্পরের মুখের দিকে চাইল, রান্নার সুগন্ধে সকলেই মোহিত হয়ে গেল। দলের কতক লোক কিন্তু মোহ কাটিয়ে বললে—স্বর্গের পথে বিশ্রাম করতে নাই! তারা চলে গেল। যারা থাকল তারা অন্ন-ব্যঞ্জন খেয়ে পেট ফুলিয়ে সেইখানেই শুয়ে পড়ল। বললে—মা, আমরা এইখানেই যদি থাকি, রোজ এমনি খেতে দেবে তো?

মা বললেন—নিশ্চয়।

থেকে গেল তারা সেইখানেই।

যারা থামে নি, তারা চলল এগিয়ে। নারায়ণ তখন পাঠিয়ে দিলেন লক্ষ্মীকে। লক্ষ্মীর পুরী—সোনার পুরী! সোনার পথ, সোনার ঘাট; সোনার ধুলো পুরীতে। দেখে মানুষের চোখ ধাঁধিয়ে গেল।

মা বললেন—এসব তোমাদের জন্যে বাবা। এস-এস; পুরীতে প্রবেশ কর।

একদল প্রবেশ করলে।

পথে আরও এক পুরী তখন নির্মাণ হয়ে আছে। ফুলের বাগান চারিদিকে, কোকিল ডাকছে, ভুবন-ভুলানো গান শোনা যাচ্ছে—আর এক অপূর্ব সুগন্ধ ভেসে আসছে। দরজায় দাঁড়িয়ে আছে অপ্সরার দল, এক হাতে তাদের অপরূপ ফুলের মালা আর এক হাতে সোনার পানপাত্র। তারা ডাকছে—আসুন, বিশ্রাম করুন; আমরা আপনাদের দাসী, সেবা করবার জন্যে দাঁড়িয়ে আছি। আপনারা তৃষ্ণার্ত এই পানীয় পান করুন।

সে পানীয় হচ্ছে স্বর্গীয় সুরা। দলে দলে লোকে সেখানে ঢুকে পড়ল।

নারায়ণ বললেন, দেখ তো ইন্দ্র, আর কেউ আসছে কি না?

ইন্দ্র স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বললেন—না।

—ভাল করে দেখ।

একটা কি নড়ছে, বোধহয় একজন মানুষ!

নারায়ণ বললেন—স্বর্গদ্বার খুলে রাখ, তুমি নিজে পারিজাতের মালা হাতে দাঁড়িয়ে থাক। আমার মত সম্মান করে স্বর্গে নিয়ে এস। ওর পায়ের ধুলোয় স্বর্গ পবিত্র হোক।

হাসিয়া চৌধুরী বলিল—জানেন পণ্ডিত, গল্পটি শেষ করে ঠাকুরমশায় বলেছিলেন—চৌধুরী, এরপর কেউ গুরু হয়ে ভক্তের রসাল খাদ্যদ্রব্যে ভুলবে, কেউ মোহন্ত হয়ে সোনা-রুপো সম্পত্তি নিয়ে ভুলবে, কেউ সেবাদাসীর দল নিয়ে স্ত্রীলোকে আসক্ত হবে। স্বর্গে যাবে কোটী কোটির মধ্যে একজন। দুঃখ করবেন না পণ্ডিত। মানুষের ভুল-ভ্রান্তি-মতিভ্রম পদে পদে। এরা মানুষ নয় বলে দুঃখ করছেন? মানুষ হওয়া কি সোজা কথা? আচ্ছা আমি উঠি তা হলে। ওই ডাক্তার আসছেন—উনি এসে পড়লে আবার খানিকক্ষণ দেরি হয়ে যাবে। আমি চলি।

বৃদ্ধ তাড়াতাড়ি নামিয়া পড়িল।

গল্পটি দেবুর বড় ভাল লাগিল। বিলুকে আজ গল্পটি বলিতে হইবে। আশ্চর্য বিলুর ক্ষমতা, একবার শুনিলেই সে গল্পটি শিখিয়া লয়।

ডাক্তার আসিয়া বিনা ভূমিকায় বলিল—শুনলাম সব।

দেবু হাসিল, বলিল—তুমি সকাল থেকে কোথায় ছিলে হে?

—অনিরুদ্ধের বাড়ী। কামার-বউয়ের আজ আবার ফিট্ হয়েছিল।

—আবার?

—হ্যাঁ। সে সাংঘাতিক ফিট্, ঘরে মেয়ে নাই, ছেলে নাই, সে এক বিপদ। তবু দূর্গা মুচিনী ছিল, তাই খানিক সাহায্য হ’ল। বউটার বোধহয় মৃগীরোগে দাঁড়িয়ে গেল। অনিরুদ্ধ তো বলছে অন্য রকম। মানুষে নাকি তুক্ করেছে।

—মানুষে তুক্ করেছে?

—হ্যাঁ, ছিরে পালের নাম করছে। যাক গে! এ দিকের এ যা হয়েছে ভাল হয়েছে দেবু। পরে সব ঝুঁকি পড়ত তোমার আর আমার ঘাড়ে। জে. এল. ব্যানার্জীর এ্যারেস্টের খবর জান তো? হয়তো আমাদেরও এ্যারেস্ট করত। আর সব শালা সুড়সুড় করে ঘরে ঢুকত। আচ্ছা, আমি চলি। সকাল থেকে রোগী বসে আছে, ওষুধ দিতে হবে।

ডাক্তার ব্যস্ত হইয়াই চলিয়া গেল। দেবু একটু হাসিল। ডাক্তারের এই ব্যস্ততার অর্ধেকটা সত্য বাকিটা কৃত্রিম। রোগীদের জন্য জগনের দরদ অকৃত্রিম; চিকিৎসকের কর্তব্য সম্বন্ধে সে সত্যই সজাগ। শত্রু হোক মিত্র হোক—সময় অসময় যখনই হোক ডাকিলে সে বাহির হইয়া আসিবে, যত্ন করিয়া নিজে ঔষধ তৈয়ারি করিয়া দিবে। কিন্তু আজিকার ব্যস্ততাটা কিছু বেশী, একটু অস্বাভাবিক। জে. এল. ব্যানার্জীর গ্রেপ্তারের সংবাদে ডাক্তার বেশ একটু ভয় পাইয়া গিয়াছে, আসলে সে আলোচনাটা এড়াইতে চাহিল।

—পণ্ডিতমশাই গো! —বাড়ীর ভিতর থেকে কে ডাকিল।

পণ্ডিত পিছন ফিরিয়া দেখিল—বিলু দাঁড়াইয়া হাসিতেছে; সে-ই ডাকিয়াছে।

রাগের ভান করিয়া দেবু বলিল—দুষ্ট বালিকা, হাসিছে কেন? পড়া করিয়াছ?

বিলু খিলখিল করিয়া হাসিয়া উঠিল; দেবু উঠিয়া আসিয়া বলিল—আজ ভারি সুন্দর একটা গল্প শুনেছি, তোমাকে বলব, একবার শুনেই শিখতে হবে।

বিলু বলিল—খোকার কাছে একবার বস তুমি। কামার-বউকে একবার আমি দেখে আসি।


পনেরো



পদ্মের মূর্ছা রীতিমত মূর্ছা-রোগে দাঁড়াইল। এবং মাসখানেক ধরিয়া নিত্যই সে মূর্ছিত হইয়া পড়িতে লাগিল।

ফলে মাসখানেকের মধ্যে বন্ধ্যা মেয়েটির সবল পরিপুষ্ট দেহখানি হইয়া গেল দুর্বল এবং শীর্ণ। একটি দীর্ঘাঙ্গী মেয়ে সে; এই শীর্ণতায় এখন তাহাকে অধিকতর দীর্ঘাঙ্গী বলিয়া মনে হয়; দুর্বলতাও বড় বেশী চোখে পড়ে। চলিতে ফিরিতে দুর্বলতাবশত সে যখন কোন কিছুকে আশ্রয় করিয়া দাঁড়াইয়া আত্মসম্বরণ করে, তখন মনে হয় দীর্ঘাঙ্গী পদ্ম যেন থর থর করিয়া কাঁপিতেছে। সেই বলিষ্ঠ ক্ষিপ্রচারিণী পদ্মের প্রতি পদক্ষেপে এখন ক্লান্তি ফুটিয়া ওঠে।

ধীরে মন্দগতিতে চলিতেও তাহার পা যেন টলে। কেবল তাহার চোখের দৃষ্টি হইয়া উঠিয়াছে অস্বাভাবিক প্রখর। দুর্বল পাণ্ডুর মুখের মধ্যে পদ্মের ডাগর চোখ দুইটা অনিরুদ্ধের শখের শাণিত বগি-দা খানায় আঁকা পিতলের চোখ দুইটার মতই ঝকঝক করে। স্ত্রীর চোখের দিকে চাহিয়া অনিরুদ্ধ শিহরিয়া উঠে।

অনটনের দুঃখের উপর এই দারুণ দুশ্চিন্তায় অনিরুদ্ধ বোধ করি পাগল হইয়া যাইবে। জগন ডাক্তারের পরামর্শে সেদিন সে কঙ্কণার হাসপাতালের ডাক্তারকে ডাকিয়া আনিল।

জগন বলিয়াছিল—মৃগী রোগ।

হাসপাতালের ডাক্তার বলিল—এ একরকম মূর্ছা-রোগ। বন্ধ্যা মেয়েদেরই, মানে—যাদের ছেলেপুলে হয় না তাদেরই এ রোগ বেশী হয়। হিষ্টিরিয়া।

পাড়া-পড়শীরা কিন্তু প্রায় সকলেই বলিল—দেবরোগ! কারণও খুঁজিয়া পাইতে দেরি হইল না। বাবা বুড়োশিব ভাঙাকালীকে উপেক্ষা করিয়া কেহ কোন কালে পার পায় নাই! নবান্নের ভোগ দেবস্থলে আনিয়া সে বস্তু তুলিয়া লওয়ার অপরাধ তো সামান্য নয়! অনিরুদ্ধের পাপে তাহার স্ত্রীর এই রোগ হইয়াছে। কিন্তু অনিরুদ্ধ ও-কথা গ্রাহ্য করিল না। তাহার মত কাহারও সহিত মেলে না। তাহার ধারণা, দুষ্ট লোকে তুক করিয়া এমন করিয়াছে। ডাইনী-ডাকিনী বিদ্যার অভাব দেশে এখনও হয় নাই। ছিরুর বন্ধু চন্দ গড়াই তুকতাক বিদ্যায় ওস্তাদ। সে বাণ মারিয়া মানুষকে পাথরের মত পঙ্গু করিয়া দিতে পারে। আর একটা কথা যে তাহার মনে অহরহ জাগিতেছে!

প্রথম দিন পদ্মের মূর্ছা জগন ডাক্তার ভাঙাইয়া দেওয়ার পর সেই রাত্রের ভোরের দিকে সে ঘুমের ঘোরে একটা বিকট চীৎকার করিয়া আবার মূর্ছিত হইয়া পড়িয়াছিল। সেই নিষুতি রাত্রে অনিরুদ্ধ আর জগনকে ডাকিতে পারে নাই এবং সেই রাত্রে মূর্ছিতা পদ্মকে ফেলিয়া যাওয়ারও উপায় তাহার ছিল না। বহু কষ্টে পদ্মের চেতনা সঞ্চার হইলে নিতান্ত অসহায়ের মত পদ্ম তাহাকে জড়াইয়া ধরিয়া বলিয়াছিল—আমার বড় ভয় লাগছে গো!

—কি? কিসের ভয়?

—আমি স্বপ্ন দেখলাম—

—কি? কি স্বপ্ন দেখলি? অমন করে চেঁচিয়ে উঠলি ক্যানে?

—স্বপ্ন দেখলাম—মস্ত বড় একটা কালো কেউটে আমাকে জড়িয়ে ধরেছে।

—সাপ?

—হ্যাঁ, সাপ। আর—

—আর?

—সাপটা ছেড়ে দিয়েছে এই মুখপোড়া—

—কে? কোন মুখপোড়া?

—এই শত্রুর—ছিরে মোড়ল! সাপ ছেড়ে দিয়ে আমাদের সদর দুয়োরের চালাতে দাঁড়িয়ে হাসছে।

বলিতে বলিতেই পদ্ম আবার থর থর করিয়া কাঁপিয়া উঠিয়া তাহাকে জড়াইয়া ধরিয়াছিল।

কথাটা অনিরুদ্ধের মনে আছে। পদ্মের অসুখের কথা মনে হইলেই ওই কথাটাই তাহার মনে পড়িয়া যায়। ডাক্তারেরা যখন চিকিৎসা করিতেছিল, তখন মনে হইলেও কথাটাকে সে আমল দেয় নাই কিন্তু দিন দিন ধারণাটা তাহার মনে বদ্ধমূল হইয়া উঠিতেছে। এখন সে রোজার কথা ভাবিতেছে, অথবা কোন দেবস্থল বা ভূতস্থল!

তাহার এই ধারণার কথা কেহ জানে না, পদ্মকেও সে বলে নাই। বলিয়াছে—কেবল মিতা গিরীশ ছুতারকে। জংশনের দোকানে যখন দু’জন যায়, তখন পথে অনেক সুখদুঃখের কথা হয়। দু’জনে ভালমন্দ অনেক মন্ত্রণা করিয়া থাকে। সমস্ত গ্রামই প্রায় একদিকে, তাহাদিগকে জব্দ করিবার একটা সঙ্ঘবদ্ধ ধারাবাহিক প্রচেষ্টা চলিতেছে। অনিরুদ্ধ ও গিরীশের সঙ্গে আর একজন আছে, পাতু মুচি। ছিরু পালকে এখন শ্রীহরি ঘোষ নামে গ্রামের প্রধানরূপে খাড়া করিয়া গোমস্তা দাশজী বসিয়া বসিয়া কল টিপিতেছে; গ্রামের দলের মধ্যে নাই কেবল দেবু পণ্ডিত, জগন ঘোষ এবং তারা নাপিত। দেবু নিরপেক্ষ, তাহার প্রীতি স্নেহের উপর অনিরুদ্ধের অনেক ভরসা; কিন্তু এ সকল কথা লইয়া অহরহ তাহাকে বিরক্ত করিতেও অনিরুদ্ধের সঙ্কোচ হয়। জগন ডাক্তার দিবারাত্র ছিরুকে গালাগালি করে, ওই পর্যন্ত—তাহার কাছে তাহার অতিরিক্ত কিছু প্রত্যাশা করা ভুল। তারাচরণকে বিশ্বাস করা যায় না। তারাচরণ নাপিতের সঙ্গে গ্রামের লোকের হাঙ্গামাটা মিটিয়া গিয়াছে। গ্রামের লোকই মিটাইতে বাধ্য হইয়াছে, কারণ সামাজিক ক্রিয়াকলাপে নাপিতের প্রয়োজন বড় বেশী। জাতকর্ম হইতে শ্রাদ্ধ পর্যন্ত প্রত্যেকটি ক্রিয়াতেই নাপিতকে চাই। তারাচরণ এখন নগদ পয়সা লইয়াই কাজ করিতেছে, রেট অবশ্য বাজারের রেটের অর্ধেক;—দাড়ি-গোঁফ কামাইতে এক পয়সা, চুল কাটিতে দু-পয়সা, চুলকাটা এবং কামানো একসঙ্গে তিন পয়সা।

অন্যদিকে সামাজিক ক্রিয়া-কলাপে নাপিতের প্রাপ্যও কমিয়া গিয়াছে। নগদ বিদায় ছাড়া—চাল, কাপড় ইত্যাদি যে-সব পাওনা নাপিতের ছিল তাহার দাবি নাপিত পরিত্যাগ করিয়াছে। তারাচরণ নাপিত ঠিক কোনো পক্ষভুক্ত নয়, অনেকটা নিরপেক্ষ ব্যক্তি। অনিরুদ্ধ বা গিরীশ জিজ্ঞাসা করিলে চুপি চুপি সে গ্রামের লোকের অনেক পরামর্শের কথাই বলিয়া যায়। আবার অনিরুদ্ধ ও গিরীশের সংবাদ গ্রামের লোক জিজ্ঞাসা করিলে তা-ও হ্যাঁ না করিয়া দুই চারিটা বলে। তবে তারাচরণের আকর্ষণ অনিরুদ্ধ গিরীশের দিকেই বেশী! পাতুর সহিত তাহার কোন সম্বন্ধ নাই। ইহাদেরই সে দুই-চারিটি বেশী খবর দেয়, কিন্তু অযাচিতভাবে সকল খবর দিয়া যায় দেবুকে। দেবুকে সে ভালবাসে। আর কিছু কিছু খবর বলে জগন ডাক্তারকে। বাছিয়া বাছিয়া উত্তেজিত করিবার মতো সংবাদ সে ডাক্তারকে বলে। ডাক্তার চীৎকার করিয়া গালিগালাজ দেয়; তারাচরণ তাহাতে খুশী হয়, দাঁত বাহির করিয়া হাসে। কৌশলী তারাচরণ কিন্তু কোনদিন প্রকাশে অনিরুদ্ধ-গিরীশের সঙ্গে সখ্যতা দেখায় না। কথাবার্তা যাহা-কিছু হয় সে-সব ওপারের জংশন শহরে বটতলায়। সেও আজকাল গিয়া ক্ষুর ভাঁড়ে লইয়া হাটের পাশেই একটা গাছতলায় বসিতে আরম্ভ করিয়াছে। শিবকালী, দেখুড়িয়া, কুসুমপুর, মহাগ্রাম, কঙ্কণা—এই পাঁচখানা গ্রামে তাহার যজমান আছে, তাহার দুইখানার কাজ সে একেবারে ছাড়িয়া দিয়াছে। বাকি তিনখানার একখানি নিজ গ্রাম—অপর দুইখানি মহাগ্রাম ও কঙ্কণা। মহাগ্রামের ঠাকুরমশায় বলেন মহাগ্রাম। এই ঠাকুরমশায় শিবশেখর ন্যায়রত্ন জীবিত থাকিতে ও-গ্রামের কাজ ছাড়া অসম্ভব। ন্যায়রত্ন সাক্ষাৎ দেবতা। এই দুইখানা গ্রামে দুদিন বাদে—সপ্তাহের পাঁচদিন সে অনিরুদ্ধ-গিরীশের মত সকালে উঠিয়া জংশনে যায়! হাটতলায় অনিরুদ্ধের কামারশালার পাশেই বটগাছের ছায়ায় কয়েকখানা ইট পাতিয়া সে বসে। সেই তাহার হেয়ার কাটিং সেলুন। দস্তরমত সেলুনের কল্পনাও তাহার আছে। অনিরুদ্ধের সঙ্গে কথাবার্তা হয় সেইখানে। কঙ্কণা তাহাকে বড়ো একটা যাইতে হয় না। বাবুরা সবাই ক্ষুর কিনিয়াছে। যাইতে হয় ক্রিয়াকর্মে পূজাপার্বণে। সেগুলা লাভের ব্যাপার।

পদ্মের অসুস্থ সম্বন্ধে নিজের ধারণার কথা অনিরুদ্ধ গিরীশকে বলিলেও তারাকে বলে নাই—তারাচরণকে তাহারা ঠিক বিশ্বাস করে না।

কিন্তু তারাচরণ অনেক সন্ধান রাখে, ভাল রোজা, জাগ্রত দেবতার অথবা প্রেতাত্মার স্থান; যেখানে ভর হয়—এ সবের সন্ধান তারা নাপিত দিতে পারে। অনিরুদ্ধ ভাবিয়াছিল—তারা নাপিতকে কথাটা বলিবে কি না।

সেদিন মনের আবেগে অনিরুদ্ধ কথাটা তারাচরণের পরিবর্তে বলিয়া ফেলিল জগন ডাক্তারকে। দ্বিপ্রহরে জংশনের কামারশালা হইতে ফিরিয়া অনিরুদ্ধ দেখিল, পদ্ম মূর্ছিত হইয়া পড়িয়া আছে। ইদানীং পদ্মর মূর্ছা-রোগের পর সে দুপুরে বাড়ী ফিরিয়া আসে। সেদিন ফিরিয়া পদ্মকে মূর্ছিত দেখিয়া বারকয়েক নাড়া দিয়া ডাকিল, কিন্তু সাড়া পাইল না। কখন যে মূর্ছা হইয়াছে—কে জানে! মুখে-চোখে জল দিয়াও চেতনা হইল না। কামারশালায় তাতিয়া পুড়িয়া এতটা আসিয়া অনিরুদ্ধের মেজাজ ভাল ছিল না। বিরক্তিতে ক্রোধে সে কাণ্ডজ্ঞান হারাইয়া ফেলিল। জলের ঘটিটা ফেলিয়া দিয়া, পদ্মের চুলের মুঠি ধরিয়া সে নিষ্ঠুরভাবে আকর্ষণ করিল। কিন্তু পদ্ম অসাড়! চুল ছাড়িয়া দিয়া তাহার মুখের দিকে চাহিয়া থাকিতে থাকিতে অনিরুদ্ধের বুকের ভিতরটা কান্নার আবেগে থরথর করিয়া কাঁপিয়া উঠিল। সে পাগলের মতো ছুটিয়া আসিল। জগনের তেজী ওষুধের ঝাঁঝে পদ্ম অচেতন অবস্থাতেই বারকয়েক মুখ সরাইয়া শেষে গভীর একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া চোখ মেলিয়া চাহিল।

ডাক্তার বলিল—এই তো চেতন হয়েছে! কাঁদছিস কেন তুই?

অনিরুদ্ধের চোখ দিয়া দর দর ধারে জল পড়িতেছিল। সে ক্রন্দন-জড়িত কণ্ঠেই বলিল—আমার অদেষ্ট দেখুন দেখি, ডাক্তার! আগুন-তাতে পুড়ে এই এক ক্রোশ দেড় ক্রোশ রাস্তা এসে আমার ভোগান্তি দেখুন দেখি একবার!

ডাক্তার বলিল—কি করবি বল? রোগের উপর তো হাত নাই! এ তো আর মানুষে করে দেয় নাই!

অনিরুদ্ধ আজ আর আত্মসম্বরণ করিতে পারিল না, সে বলিয়া উঠিল—মানুষ, মানুষেই করে দিয়েছে ডাক্তার, তাতে আমার এতটুকুন সন্দেহ নাই। রোগ হলে এত ওষুধ-পত্র পড়ছে তাতেও একটুকু বারণ শুনছে না রোগ! এ রোগ নয়—এ মানুষের কীর্তি।

জগন, ডাক্তার হইলেও, প্রাচীন সংস্কার একেবারে ভুলিতে পারে না। রোগীকে মকরধ্বজ এবং ইনজেকশন দিয়াও সে দেবতার পাদোদকের উপর ভরসা রাখে। অনিরুদ্ধের মুখের দিকে চাহিয়া সে বলিল—তা-যে না হতে পারে তা নয়। ডাইনী-ডাকিনী দেশ থেকে একেবারে যায় নাই। আমাদের ডাক্তারি শাস্ত্রে তো বিশ্বাস করে না! ওরা বলছে—

বাধা দিয়া অনিরুদ্ধ বলিল—বলুক, এ কীর্তি ওই হারামজাদা ছিরের।

ক্রোধে ফুলিয়া সে এতখানি হইয়া উঠিল।

সবিস্ময়ে জগন প্রশ্ন করিল—ছিরের?

—হ্যাঁ, ছিরের। ক্রুদ্ধ আবেগে অনিরুদ্ধ পদ্মের সেই স্বপ্নর কথাটা আনুপূর্বিক ডাক্তারকে বলিয়া সে বলিল—ওই যে চন্দর গড়াই, ছিরে শালার প্রাণের বন্ধু—ও শালা ডাকিনী-বিদ্যে জানে। যোগী গড়ায়ের বিধবা মেয়েটাকে কেমন বশীকরণ করে বের করে নিলে দেখলেন তো! ওকে দিয়েই এই কীর্তি করেছে। এ একেবারে নিশ্চয় করে বলতে পারি আমি।

জগন গভীর চিন্তায় নিমগ্ন হইয়া গেল, কিছুক্ষণ পর বার-দুই ঘাড় নাড়িয়া বলিল—হুঁ।

ক্রোধে অনিরুদ্ধের ঠোঁট থর-থর করিয়া কাঁপিতেছিল। পদ্ম এই কথাবার্তার মধ্যে উঠিয়া বসিয়াছিল; দেওয়ালে ঠেস দিয়া বসিয়া সে হাঁপাইতেছিল। অনিরুদ্ধের ধারণার কথাটা শুনিয়া সে অবাক হইয়া গেল।

জগন বলিল—তাই তুই দেখ, অনিরুদ্ধ, একটা মাদুলি কি তাবিজ হলেই ভাল হয়! তারপর বলিল—দেখ, একটা কথা কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, দেখিস তুই—এ ঠিক ফলে যাবে; নিজের বাণে বেটা নিজেই মরবে।

অনিরুদ্ধ সবিস্ময়ে জগনের মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। জগন বলিল—সাপের স্বপ্ন দেখলে কি হয় জানিস তো?

—কি হয়?

—বংশবৃদ্ধি হয়, ছেলে হয়, তোদের কপালে ছেলে নাই, কিন্তু ছিরে নিজে যখন সাপ ছেড়েছে, তখন ওই বেটার ছেলে ম’রে—তোর ঘরে এসে জন্মাবে! তোর হয়তো নাই, কিন্তু ও নিজে থেকে দিয়েছে!

জগনের এই বিচিত্র ব্যাখ্যা শুনিয়া অনিরুদ্ধ বিস্ময়ে স্তম্ভিত হইয়া গেল; তাহার চোখ দুইটা বিস্ফারিত হইয়া উঠিয়াছিল, সে জগনের মুখের দিকে স্থিরদৃষ্টিতে চাহিয়া রহিল।

পদ্মের মাথার ঘোমটা অল্প সরিয়া গিয়াছে, সে-ও স্থির বিচিত্র দৃষ্টিতে চাহিয়া ছিল সম্মুখের দিকে। তাহার মনে পড়িয়া গেল—ছিরুর শীর্ণ গৌরবর্ণা স্ত্রীর কথা। তাহার চোখ-মুখের মিনতি, তাহার সেই কথা—‘আমার ছেলে দু’টিকে যেন গাল দিয়ো না ভাই! তোমার পায়ে ধরতে এসেছি আমি!’

জগন ও অনি কথা বলিতে বলিতে বাহিরে চলিয়া গেল। জগন বলিল—চিকিৎসা এর তেমন কিছু নাই। তবে মাথাটা যাতে একটু ঠাণ্ডা থাকে, এমনি কিছু চলুক। আর তুই বরং, একবার লাওগ্রামের শিবনাথ-তলাটাই না হয় ঘুরে আয়! শিবনাথ তলার নাম-ডাক তো খুব আছে!

শিবতলার ব্যাপারটা ভৌতিক ব্যাপার। কোন পুত্রহারা শোকার্ত মায়ের অবিরাম কান্নার বিচলিত হইয়া নাকি তাহার মৃত পুত্রের প্রেতাত্মা নিত্য সন্ধ্যায় মায়ের কাছে আসিয়া থাকে। অন্ধকার ঘরের মধ্যে তাহার মা খাবার রাখিয়া দেয়, আসন পাতিয়া রাখে; প্রেতাত্মা আসিয়া সেই ঘরে বসিয়া মায়ের সঙ্গে কথাবার্তা বলে। সেই অবসরে নানা স্থান হইতে লোকজন আসিয়া আপন আপন রোগ-দুঃখ অভাব-অভিযোগ প্রেতাত্মার কাছে নিবেদন করে, প্রেতাত্মা যে-সবের প্রতিকারের উপায় করিয়া দেয়। কাহাকেও দেয় মাদুলি, কাহাকেও তাবিজ, কাহাকেও জড়ি, কাহাকেও বুটি, কাহাকেও আর কিছু!

অনিরুদ্ধ বলিল—তাই দেখি।

—দেখি নয়, শিবনাথ-তলাতেই যা তুই। দেখ না, কি বলে!

একটা গভীর দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া অনিরুদ্ধ একটু হাসিল—অত্যন্ত ম্লান হাসি। বলিল—এদিকে যে দেওয়ালে পিঠ ঠেকেছে, এগিয়ে যাই কি করে?

ডাক্তার অনিরুদ্ধের দিকে চাহিল, অনিরুদ্ধ বলিল—পুঁজি ফাঁক হয়ে গেল ডাক্তারবাবু, বর্ষাতে হয়তো ভাতই জুটবে না। বাকুড়ির ধান মূলে-চুলে গিয়েছে, গাঁয়ের লোকে ধান দেয় নাই, আমিও চাইতে যাই নাই। তার ওপর মাগীর এই রোগে কি খরচটা হচ্ছে, তা তো আপনি সবই জানেন গো! শিবনাথের শুনেছি বেজায় খাই।

প্রেত-দেবতা শিবনাথ রোগ-দুঃখের প্রতিকার করিয়া দেয়, কিন্তু বিনিময়ে তাহার যৎকিঞ্চিৎ মূল্য দিতে হয়। সেটা লাগে প্রথমেই।

জগন বলিল—পাঁচ-সাত টাকা হলে আমি না-হয় কোন রকমে দেখতাম অনিরুদ্ধ কিন্তু বেশী হলে তো—

অনিরুদ্ধ উচ্ছ্বসিত হইয়া উঠিল—ডাক্তারের অসমাপ্ত কথার উত্তরে সে বলিয়া উঠিল, তাতেই হবে ডাক্তারবাবু, তাতেই হবে, আরও কিছু আমি ধার-ধোর করে চালিয়ে নোব। দেবুর কাছে কিছু আপনার আর দূর্গার কাছে যদি—

ডাক্তার ভ্রূ কুঞ্চিত করিয়া প্রশ্ন করিল—দুগগা?

অনিরুদ্ধ ফিক্ করিয়া হাসিয়া ফেলিল, তারপর মাথা চুলকাইয়া একটু লজ্জিত ভাবেই বলিল—পেতো মুচির বোন দুগগা গো—

চোখ দুইটা বড় করিয়া ডাক্তারও একটু হাসিল—ও! তারপর আবার প্রশ্ন করিল—ছুঁড়ির হাতে টাকাকড়ি আছে?

—তা আছে বৈকি। শালা ছিরের অনেক টাকা ও বাগিয়ে নিয়েছে। তা ছাড়া কঙ্কণার বাবুদের কাছেও বেশ পায়। পাঁচ টাকার কমে হাটেই না।

—ছিরের সঙ্গে নাকি এখন একবারেই ছাড়াছাড়ি শুনলাম?

চোখ দুইটা বড় বড় করিয়া অনিরুদ্ধ বলিল—আমার কাছে একখানা বগি-দা করিয়ে নিয়েছে, বলে খ্যাপা কুকুরকে বিশ্বাস নাই। রাত্রে সেখানা হাতের কাছে নিয়ে ঘুমোয়।

—বলিস কি?

—আজ্ঞে হ্যাঁ!

—কিন্তু তোর সঙ্গে এত মাখামাখি কিসের? আশনাই নাকি?

মাথা চুলকাইয়া অনিরুদ্ধ বলিল—না—তা নয়, দুগগা লোক ভাল, যাই-আসি গল্প-গুজব করি।

—মদ-টদ চলে তো?

—তা—এক-আধ দিন মধ্যে মাঝে—

অনিরুদ্ধ লজ্জিত হইয়া হাসিল।

***

পথের উপর দাঁড়াইয়া ডাক্তারকে অকপটে সে সব কথাই খুলিয়া বলিল।

দূর্গার সঙ্গে সত্যিই অনিরুদ্ধের ঘনিষ্ঠতা হৃদ্য হইয়া গড়িয়া উঠিতেছে। দূর্গা শ্রীহরির সহিত সকল সংশ্রব ছাড়িয়া নূতনভাবে জীবনের ছক কাটিবার চেষ্টা করিতেছে।

আজকাল দূর্গা জংশনে যায় নিত্যই, দুধের যোগান দিতে। ফিরিবার পথে অনিরুদ্ধের কামারশালায় একটি বিড়ি বা সিগারেট খাইয়া, সরস হাস্য-পরিহাসে খানিকটা সময় কাটাইয়া তবে বাড়ী ফেরে। অনিরুদ্ধও সকালে দুপুরে বিকালে জংশনে যাওয়া-আসার পথে দূর্গার বাড়ীর সম্মুখ দিয়াই যায়; দূর্গাও একটি করিয়া বিড়ি দেয়, বিড়ি টানিতে টানিতে দাঁড়াইয়াই দুই-চারিটা কথাবার্তা হয়। দা’খানাকে উপলক্ষ করিয়া হৃদ্যতাটুকু স্বল্পদিনের মধ্যেই বেশ ঘন হইয়া উঠিয়াছে; মধ্যে একদিন লোহা কিনিবার একটা গুরুতর প্রয়োজনে টাকার অভাবে বিব্রত হইয়া অনিরুদ্ধ চিন্তিতমুখেই কামারশালায় বসিয়াছিল, সেদিন দূর্গা আসিয়া প্রশ্ন করিয়াছিল—এমন করে গুম মেরে বসে কেন হে?

দূর্গাকে বিড়ি দিয়া নিজেও বিড়ি ধরাইয়া অনিরুদ্ধ কথায় কথায় অভাবের কথাটা খুলিয়া বলিয়াছিল। দূর্গা তৎক্ষণাৎ আঁচলের খুঁট খুলিয়া দুইটা টাকা বাহির করিয়া তাহাকে দিয়া বলিয়াছিল—চারদিন পরেই কিন্তুক শোধ দিতে হবে ভাই।—

অনিরুদ্ধ সে টাকাটা ঠিক চারদিন পরেই দিয়াছিল। দূর্গা সেদিন হাসিয়া বলিয়াছিল—সোনার চাঁদ খাতক আমার!—

অনিরুদ্ধকে দূর্গার বড় ভাল লাগে। ভারী তেজী লোক, কাহারও সে তোয়াক্কা রাখে না। অথচ কি মিষ্ট স্বভাব! সব চেয়ে ভাল লাগে কামারের চেহারাখানি। লম্বা মানুষটি দেহখানিও যেন পাথর কাটিয়া গড়া! প্রকাণ্ড লোহার হাতুড়িটা লইয়া সে যখন অবলীলাক্রমে লোহার উপর আঘাতের পর আঘাত করিতে থাকে তখন ভয়ে তাহার সর্বাঙ্গ শিহরিয়া উঠে; কিন্তু তবুও ভাল লাগে, একটি আঘাতও বেঠিক পড়ে না!

***

ডাক্তারকে বিদায় করিয়া অনিরুদ্ধ বাড়ীর মধ্যে ফিরিয়া দেখিল পদ্ম চুপ করিয়া বসিয়া আছে, রান্নাবান্নার নাম-গন্ধ নাই। পদ্মকে সে আর কিছু বলিল না, কতকগুলো কাঠ-কুটা উনানের মুখে আনিয়া উনান ধরাইতে বসিল। রান্না করিতে হইবে; তাহার পর আবার ছুটিতে হইবে জংশনে। রাজ্যের কাজ বাকী পড়িয়া গিয়াছে।

পদ্ম কাহাকে ধমক দিল—যা!

অনিরুদ্ধ ফিরিয়া চাহিল, কিন্তু কেহ কোথাও নাই। কাক কি কুকুর, কি বিড়াল, তাও কোথাও নাই। সে ভ্রূ কুঞ্চিত করিয়া প্রশ্ন করিল—কি?

পদ্ম উত্তরে প্রশ্ন করিল—কি?

অনিরুদ্ধ একেবারে ক্ষেপিয়া গেল, বলিল—খেপেছিস নাকি তুই? কিছু কোথাও নাই, ধমক দিচ্ছিস কাকে?

পদ্ম এইবার লজ্জিত হইয়া পড়িল, শুধু লজ্জিতই নয়, একটু অধিক মাত্রায় সচেতন হইয়া ধীরে ধীরে উঠিয়া উনানশালে আসিয়া বলিল—সর। আমি পারব। তুমি যাও।

অনিরুদ্ধ কিছুক্ষণ তাহার মুখের দিকে চাহিয়া থাকিয়া উঠিয়া গেল। আর সে পারিতেছে না। কিন্তু তাহার অনুপস্থিতিতে যদি পদ্মের রোগ উঠিয়া পড়ে! সে দ্বিধাগ্রস্ত হইয়া দাঁড়াইল। পড়ে পড়ুক, সে আর পারে না। সে বাহির হইয়া গেল।

পদ্ম রান্না চাপাইল। ভাতের সঙ্গে কতকগুলো আলু, একটা ন্যাকড়ায় বাঁধিয়া কতকগুলি মসুরির ডাল ফেলিয়া দিয়া চুপ করিয়া বসিয়া রহিল।

অনিরুদ্ধ বাহিরে গিয়াছে। বাড়ীতে কেহ কোথাও নাই। নির্জন নিঃসহ অবস্থায় আজ অহরহ মনে হইতেছে তাহার সেই স্বপ্নের কথাগুলি, জগন ডাক্তারের কথাগুলি। ছিরু পালের বড় ছেলেটা তাহার মাকে কি ভালই না বাসে!

ওই—ওই কি আসিবে?

ধ্বক্ ধ্বক্ করিয়া তাহার হৃৎপিণ্ড স্পন্দিত হইয়া উঠিল।

সঙ্গে সঙ্গে মনে হইল ছেলেটির শীর্ণ গৌরাঙ্গী মা ওই খিড়কীয় দরজার মুখেই আধকালো আধ-অন্ধকারের মধ্যে পদ্মের দিকে মিনতিভরা চোখে চাহিয়া দাঁড়াইয়া আছে। সে একটা সকাতর দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিল। বার বার আপন মনেই বলিল—না না না, তোমার বুকের ধন কেড়ে নিতে আমি চাই না। আমি চাই না। আমি চাই না।

উনানের মধ্যে কাঠগুলা জ্বলিয়া উঠিয়াছে, হাঁড়ি-কড়া সম্মুখেই—এইবার রান্না চড়াইয়া দেওয়া উচিত। কিন্তু সে তাহার কিছুই করিল না। চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। অন্তরের মধ্যে থাকিয়া থাকিয়া অকস্মাৎ চকিতের মত অধীর অতৃপ্ত কেহ অতি নিষ্ঠুর ভঙ্গিতে বলিয়া উঠিতেছে—মরুক, মরুক, মরুক! মনশ্চক্ষে ভাসিয়া উঠিতেছে পাল-বধূর সন্তান। সভয়ে চাঞ্চল্যে শিহরিয়া উঠিয়া নীরবেই পদ্ম বলিতেছিল—না না না।

পাল-বধূর আটটি সন্তান হইয়াছিল, তাহার মধ্যে মাত্র দুইটি অবশিষ্ট আছে; আবারও নাকি সে সন্তানসম্ভবা। তাহার গেলে সে আবার পায়। যাক, তাহার আর একটা যাক। ক্ষতি কি!

উনানের আগুন বেশ প্রখরভাবেই জ্বলিয়া উঠিয়াছিল, তবুও সে কাঠগুলাকে অকারণে ভিতরে ঠেলিয়া দিল, অকারণেই স্ফুটস্বরে বলিয়া উঠিল—আঃ ছি ছি ছি। ছি-ছিকার করিল সে আপন মনের ভাবনাকে।

তারপরই সে ডাকিল পোষা বিড়ালটাকে—মেনী মেনী, আয় আয়, পুষি আয়!

ছেলে না হইলে কিসের জন্য মেয়েমানুষের জীবন! শিশু না থাকিলে ঘরসংসার! শিশু রাজ্যের জঞ্জাল আনিয়া ছড়াইবে,—পাতা, কাগজ, কাঠি, ধুলা, মাটি, ঢেলা, পাথর, কত কি! কি তিরস্কার করিবে, আবার পরিষ্কার করিবে, রূঢ় তিরস্কারে শিশু কাঁদিবে, পদ্ম তখন তাহাকে বুকে লইয়া আদর করিবে! তাহার আবদারে নিজের ধূলার মুঠা মুখের কাছে লইয়া খাওয়ার অভিনয় করিবে—হাম-হাম-হাম! শিশু কাঁদিবে হাসিবে, বক্‌ বক্‌ করিয়া বকিবে, কত বায়না ধরিবে, সঙ্গে সঙ্গে পদ্মও আবোল-তাবোল বকিয়া ক্লান্ত হইয়া শেষে তাহাকে একটা চড় কষাইয়া দিবে। কাঁদিতে কাঁদিতে সে কোলে আসিয়া ঘুমাইয়া পড়িবে। তাহার গায়ে মাথায় হাত বুলাইয়া, দুটি গালে দুটি চুমা খাইয়া তাহাকে লইয়া উঠানময় ঘুরিয়া বেড়াইবে আর চাঁদকে ডাকিবে—আয় চাঁদ, আয় আয়, চাঁদের কপালে চাঁদ দিয়ে যা!

এই সব কল্পনা করিতে করিতে ঝর্ ঝর্ করিয়া তাহার চোখ দিয়া জল ঝরিয়া পড়িতে আরম্ভ করিল।

তাহার নিজের নাই, কেহ যদি তাহাকে একটি শিশু পালন করিতেও দেয়! একটি মাতৃহীন শিশু! শিশুসন্তানের জননী কেহ মরে না! ওই পালবধূ মরে না! পণ্ডিতের বউ মরে না! না হয় তো তাহার নিজের মরণ হয় না কেন! সে মরিলে তো সকল জ্বালা জুড়ায়!

বাহিরে অনিরুদ্ধের কণ্ঠস্বর শোনা গেল, চণ্ডীমণ্ডপের সঙ্গে আমার সম্বন্ধ নাই। ওখানে আর যাচ্ছি না। আমার পৌষ-আগলানো আমার নিজের বাড়ীর দরজায় হবে।

পদ্মের মনের মধ্যে অকস্মাৎ জাগিয়া উঠিল একটা দুরন্ত ক্রোধ। ইচ্ছা হইল—উনানের জ্বলন্ত আগুন লইয়া এই ঘরের চারিদিকে লাগাইয়া দেয়। যাক, সব পুড়িয়া ছাই হইয়া যাক। অনিরুদ্ধ পর্যন্ত পুড়িয়া মরুক। পরমুহূর্তেই সে জ্বলন্ত উনানের উপর হাঁড়িটা চাপাইয়া দিল, তাহাতে জল ঢালিয়া, চাল ধুইতে আরম্ভ করিল।

কাল আবার লক্ষ্মীপূজা, পৌষ-সংক্রান্তিতে পৌষ-লক্ষ্মী। লক্ষ্মী! তাহার আবার লক্ষ্মী! কার জন্য লক্ষ্মী? কিসের লক্ষ্মী?


ষোল



পৌষ-সংক্রান্তির দিন পৌষ-লক্ষ্মী অর্থাৎ পৌষ-পার্বণ। নবান্নের দিন হইতে মাস দেড়েক পর পল্লীবাসীর জীবনে আর একটি সর্বজনীন উৎসব আসিল। যে জীবনে উদয়কাল হইতে অস্তকাল পর্যন্ত বারো ঘণ্টা সময়ের অর্ধেকটা চলে হল-আকর্ষণকারী কুঁজপৃষ্ঠ বলদের অতি-মন্থর পদক্ষেপের পিছনে পিছনে অথবা ঘরের সমান উঁচু ধান ও খড়-বোঝাই গরুর গাড়ীর চাকা ঠেলিয়া অথবা শ্বাসরোগীর মত দুঃসহ কষ্টে হাঁপাইতে হাঁপাইতে ধানের বোঝা মাথায় করিয়া আনিতে আনিতে কাটিয়া যায় টানিয়া টানিয়া শ্বাস-প্রশ্বাস ফেলিয়া, সেখানে দেড়মাস সময় পরিমাণে নগর-জীবনের তুলনায় নিশ্চয়ই দীর্ঘ। একটানা একঘেয়ে জীবন।

মধ্যে ইতুলক্ষ্মী গিয়াছে; কিন্তু ইতুলক্ষ্মীতে নিয়ম আছে, পালন আছে, পার্বণের সমারোহ নাই। পৌষ-পার্বণে ঘরে ঘরে সমারোহ, পিঠা-পরব। অগ্রহায়ণ-সংক্রান্তিতে খামারে লক্ষ্মী পাতিয়া চিঁড়া, মুড়কি, মুড়ি, মুড়ির নাড়ু, কলাই-ভাজা ইত্যাদিতে পূজা হইয়াছিল। পৌষ-সংক্রান্তিতে ঘরের মধ্যে লক্ষ্মীর আসন পাতিয়া ধান-কড়ি সাজাইয়া সিংহাসনের দুইপাশে দুইটি কাঠের পেঁচা রাখিয়া লক্ষ্মীপূজা হইবে। এক অন্ন পঞ্চাশ ব্যঞ্জনে লক্ষ্মীর সঙ্গে নানা দেবতার ভোগ দেওয়া হইবে। রাশীকৃত চাল ঢেঁকিতে কুটিয়া গুঁড়া প্রস্তুত হইয়াছে—পিঠা তৈয়ারী হইবে হরেক রকমের। রস প্রস্তুত হইয়াছে, রসে সিদ্ধ পিঠা হইবে। তাহা ছাড়া গুড়ে-নারিকেলে, গুড়ে-তিলে মিষ্টান্ন প্রস্তুত হইয়াছে, পাতলা ক্ষীর হইয়াছে, চাচি বা খোয়া ক্ষীর হইয়াছে—লোকে আকণ্ঠ পুরিয়া প্রসাদ পাইবে।

অনিরুদ্ধের এসবের আয়োজন কিছুই হয় নাই। একে পদ্মের দেহ অসুস্থ, তার ওপর একটি পয়সাও তাহার হাতে নাই। গোটা পৌষটাই অনিরুদ্ধের কামারশালা একরকম বন্ধ গিয়াছে বলিলেই হয়। লোহার কাজ এসময়ে বেশী না হইলেও কিছু হয়; ধান কাটার কাস্তে পাজানো এবং গরুর গাড়ীর চাকার খুলিয়া-পড়া লোহার বেড় লাগানো কাজ না করাইয়া চাষীদের উপায় নাই। কিন্তু অবসরের অভাবে অনিরুদ্ধ তাহাও করিতে পারে নাই। অবসর পাইবে কোথায়? পদ্মের অসুখ লইয়াই মাথা খারাপ করিয়া তাহার দিন কাটিয়াছে। আজ এখানে গিয়াছে, কাল ওখানে গিয়াছে। শিবনাথতলা, কোন এক মুসলমান ওস্তাদের বাড়ী যাইতে সে বাকী রাখে নাই। সব করিয়াছে ধার করিয়া। খরিদ্দারের টাকা ভাঙিয়া। এদিকে পাঁচবিঘা বাকুড়ির ধান তাহার গিয়াছে। বাকি জমির ধান ভাগ জোতদারের সঙ্গে নিজে লাগিয়া কাটিতেছে ও ঘাড়ে করিয়া আনিয়া ঘরে তুলিতেছে।

আবার সরকারের সেটেলমেন্ট আসিয়াছে, নোটিশ হইয়াছে—'আপন আপন জমিতে স্বত্ব-স্বামিত্বের প্রমাণাদি সহ উপস্থিত থাকিতে হইবে। অন্যথায় সেটেলমেন্ট কার্যবিধি অনুযায়ী দণ্ডনীয় হইবেক।'

এক টুকরা জমির জন্য কানুনগো ও আমিন বাবুদের সঙ্গে সেই ভোর হইতে বেলা তিন প্রহর কাটিয়া যায়, পাকা ধানের উপর দিয়া শিকল টানিতে টানিতে সেই জমিটুকুতে আসিতে চার পাঁচ দিন সময় লাগে। সে টুকরাটা হইয়া গেলে দুই-তিন দিন কি চার-পাঁচ দিন নিশ্চিত, তাহার পর হয়তো আবার এক টুকরা। শুধু অনিরুদ্ধ নয়, সমস্ত গ্রামের লোকেরই এইভাবে লাঞ্ছনা-দুর্বিপাকের আর শেষ নাই! পৌষ-সংক্রান্তিতে ঘরের মধ্যে লক্ষ্মীর সিংহাসন স্থাপনের উদ্যোগ হইতেছে; কিন্তু এবার লক্ষ্মী এখনও মাঠে। গোটা গাঁয়ের মধ্যে একটি গৃহস্থেরও ‘দাওন’ আসে নাই। ওই আবার একটা হাঙ্গামা রহিয়া গেল। ধান তোলার শেষ দিনে ‘দাওন’ আসিবে—অনিরুদ্ধের নিজেকেই শেষ ধানগুচ্ছটি কাটিতে হইবে—কাটা ধানের গোড়ায় জল দিয়া ধানগুচ্ছটি লইয়া আসিতে হইবে মাথায় করিয়া। অনিরুদ্ধের কৃষাণ নাই, ভাগ-জোতদারকে পায়েস রাঁধিয়া খাওয়াইতে হইবে। অন্যান্য বার এই লক্ষ্মীর সঙ্গেই ও পর্বটি সারা হইয়া যায়—এবার সেটেলমেন্টের দায়ে বাকী পড়িয়া রহিল।

ভাতের হাঁড়িটা নামাইয়া পদ্ম ফেন গালিয়া ফেলিল। খুঁজিয়া বাছিয়া ভাতের ভিতর হইতে একটা ছোট পুঁটলি টানিয়া বাহির করিল, পুঁটলিটার মধ্যে আছে খানিকটা মসুর কলাই, গোটাচারেক বড় আলু, এবং একটুকরা কুমড়ার ফালি। এগুলা মাখিয়া ফেলিয়া আবার মাছ দেখিতে হইবে; মাছ নহিলে অনিরুদ্ধের ভাত উঠিবে না। এইজন্য খিড়কীর ডোবার জলের কিনারায় কতকগুলা 'আপা' অর্থাৎ গর্ত করা আছে—পাকাল মাছগুলা তাহার মধ্যে ঢুকিয়া থাকে; সতর্ক ও ক্ষিপ্রভাবে হাত চালাইয়া দিলেই ধরা যায়। পদ্ম অত্যন্ত বিরক্ত হইয়া বাহিরের দরজার দিকে চাহিল। এ কাজটুকুও তো সে করিলে পারিত! কোথায় গেলেন নবাব? সেই একবার বাহির-দরজায় সাড়া শোনা গিয়াছিল—চণ্ডীমণ্ডপ না ছাঁটিবার সঙ্কল্পের আস্ফালন হইতেছিল, তারপর আর সাড়া নাই। ‘চণ্ডীমণ্ডপ ছাঁটিব না’। তবে তো মা কালী ও বাবা শিবের বেগুন ক্ষেত প্লাবিত হইয়া গাছগুলা পচিয়া নিদারুণ ক্ষতি হইয়া গেল! ওইরূপ মতি না হইলে এই দুর্গতি হইবে কেন?

—কর্মকার রইছ নাকি হে? কর্মকার। অ কর্মকার। কর্মকার হে!

কে লোকটা? উত্তর না পাইয়াও একনাগাড়ে ডাকিয়াই চলিয়াছে।

—অ কর্মকার! এই তোমার দুগগা বললে—বাড়ী গেল কর্মকার, আর সাড়া দিচ্ছ না। ওহে ও কর্মকার।

অনিরুদ্ধ তাহা হইলে দূর্গার বাড়ী গিয়াছিল। রূপ আছে বলিয়াই ওই মুচিনীর বাড়ী? ছি-ছি-ছি।...লক্ষ্মী? এই লোকের বাড়ীতে লক্ষ্মী থাকে? না এই লোকের বংশ থাকে? পদ্ম যেন পাগল হইয়া উঠিল—সে উনান হইতে জ্বলন্ত কাঠ একখানা টানিয়া বাহির করিল। আগুন ধরাইয়া দিবে—ঘর-সংসারে সে আগুন ধরাইয়া দিবে। কিন্তু সেই মুহূর্তেই বাড়ীর ভিতর আসিয়া প্রবেশ করিল ভূপাল চৌকিদার।

—বলি, কর্মকার, তুমি কি রকম মানুষ হে? ডেকে ডেকে গলা আমার ফেটে গেল!

বাড়ীর মধ্যে অনিরুদ্ধকে না পাইয়া ভূপাল খানিকটা অপ্রতিভ হইয়া গেল, অবশেষে পদ্মকেই উদ্দেশ করিয়া বলিল—তুমি বাপু কর্মকারকে ব'ল—আমি এসেছিলাম। আমার হয়েছে এক জ্বালা। ডাকলে লোকে যাবে না, আর গোমস্তা বলবে—শালা, বসে বসে ভাত খাবার জন্য তোকে মাইনে দিই!

—কে রে? কে কি বলবে কর্মকারকে? কর্মকার কার কি ধার ধারে?

বাহির দরজা হইতেই কথা বলিতে বলিতে অনিরুদ্ধ ঘরে ঢুকিল।

—এই যে কর্মকার। —ভূপাল হাঁফ ছাড়িয়া বাঁচিল। —তুমি বাপু একবার চল, গোমস্তা তো আমার মুণ্ডুপাত করছে।

অনিরুদ্ধ খপ করিয়া তাহার হাতখানা ধরিয়া ফেলিয়া বলিল—এই। বাড়ীর ভেতর ঢুকলি ক্যানে তুই?

তাহার মুখের দিকে চাহিয়া ভূপাল এবার রূঢ় কণ্ঠস্বরে বলিল—হাত ছাড় কর্মকার।

—বাড়ী ঢুকলি ক্যানে তুই? খাজনাব তাগাদা আছে, বাড়ীর বাইরে থেকে করবি। জমিদারের নগদী—বেটা ছুঁচোর গোলাম চামচিকে।

হাতটা মোচড় দিয়া ছাড়াইয়া লইয়া ভূপাল এবার হুঙ্কার দিয়া উঠিল—এ্যাও। মুখ সামলে, কর্মকার, মুখ সামলে বল। দুবছর খাজনা বাকী, খাজনা দাও নাই ক্যানে? আলবৎ বাড়ী ঢুকব। ইউনিয়ান বোর্ডের ট্যাক্স—তাও আজ পর্যন্তও দাও নাই।... ভূপালও বান্দীর ছেলে; সেও এবার বুক ফুলাইয়া দাঁড়াইল।

খাজনা, ইউনিয়ন বোর্ডের ট্যাক্স। অনিরুদ্ধ অস্থির হইয়া উঠিল। কিন্তু সে আর অধিক অগ্রসর হইতে সাহস করিল না। ও-সব কথা আমলে না আনিয়া সে তাহার নিজের অভিযোগটাই আবার জাহির করিল—আমি যদি বাড়ীতে থাকতাম, তা হলে নয় ঢুকতিস—ঢুকতিস। বাড়ীতে বেটাছেলে নাই—আমার বাড়ী ঢুকবি ক্যানে তুই?

ভূপাল বলিল—চল তুমি, গোমস্তা ডাকছে।

—যা যা বল গে, কারুর ডাকে আমি যাই না!

—খাজনার কি বলছ বল?

—যা, বল গে, খাজনা আমি দোব না।

—বেশ।

ভূপাল বাহির হইয়া চলিয়া গেল। অনিরুদ্ধ ও সাফ জবাব দিয়া নিশ্চিন্ত হইয়া আস্ফালন আরম্ভ করিয়া দিল—আদালত আছে, উকিল আছে, আইন আছে, নালিশ কর গিয়ে। বাড়ীর ভেতর ঢুকবে, বাড়ীর ভেতর! ওঃ আস্পর্ধা দেখ!

অকস্মাৎ সে কাঁদো-কাঁদো সুরে আবার বলিল—গরীব বলে আমাদের যেন মান-ইজ্জৎ নাই। আমরা মানুষ নই!

পদ্ম একটি কথাও বলে নাই, নীরবেই সিদ্ধ সামগ্রীগুলি নুন-তেল দিয়া মাখিতেছিল। এতক্ষণে বলিল—হ্যাঁগা, মাছের কি হবে?

—মাছ! মাছ চাই না। কিছু খাব না, যা। পিণ্ডিতে আমার অরুচি ধরেছে।

পদ্ম আর কোন কথা না বলিয়া ভাত বাড়িতে আরম্ভ করিল।

অনিরুদ্ধ অকস্মাৎ চীৎকার করিয়া উঠিল—তুই আমার লক্ষ্মী ছাড়ালি!

—আমি?

—হাঁ, তুই! রোগ হয়ে দিনরাত পড়ে আছিস, ঘরে সন্ধ্যে নাই, ধূপ নাই! এ ঘরে লক্ষ্মী থাকে? বলি, কাল যে লক্ষ্মীপুজো—তার কি কুটোগাছটা ভেঙে আয়োজন করেছিস? অনিরুদ্ধ রাগে ক্ষোভে অধীর হইয়া উঠিয়া চলিয়া গেল।

পদ্ম চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। তাহার অন্তরের ক্ষোভের উন্মত্ততা ইতিমধ্যে অদ্ভুতভাবে প্রশান্ত উদাসীনতায় পরিণত হইয়া আসিয়াছে। অনিরুদ্ধের এই অপমানে ক্ষোভে তাহার তৃপ্তি হইয়াছিল কিনা কে জানে, কিন্তু তাহার নিজের ক্ষোভের উন্মত্ততা—যে উন্মত্ততাবশে কিছুক্ষণ পূর্বে সে ঘরে আগুন ধরাইয়া দিতে চাহিয়াছিল—সে উন্মত্ততা বিচিত্রভাবে শান্ত হইয়া গিয়াছে। আঁচল বিছাইয়া সেইখানেই সে শুইয়া পড়িল। তাহার বুকের ভিতর যেন একরাশ কান্না উথলাইয়া পড়িতেছে।

***

পদ্ম নীরবে কাঁদিতেছিল; দরদর ধারে তাহার চোখ হইতে জল গড়াইয়া গাল ভিজাইয়া মাটির উপর ঝরিয়া পড়িতেছিল। কাঁদিলে তাহার বুকের ভিতরে গভীর যন্ত্রণাদায়ক আবেগটা কমিয়া যায়। কাঁদিতে কাঁদিতে সে কিছুক্ষণ পর তৃপ্তি অনুভব করে, তাহার পর একটা আনন্দ পায়।

—কই হে? কামার-বউ কই হে?

কে ডাকিতেছে? পদ্ম নিঃশব্দে চোখের জল আঁচলে মুছিয়া ফেলিল। মুছিয়া ফেলিয়াও কিন্তু সাড়া দিল না, সাড়া দিতে ইচ্ছা হইল না।

—কামার-বউ! ওমা!, এই বিকেলবেলা উনোনের মুখে শুয়ে ক্যানে হে?

তাহাকে দেখিয়া পদ্মের সর্বশরীর জ্বলিয়া উঠিল। যে ডাকিতেছিল সে ঘরে আসিয়া ঢুকিয়াছে। সে দূর্গা।

কি আস্পর্ধা মুচিনীর। ডাকিবার ধরন দেখ না। অত্যন্ত অপ্রসন্ন কণ্ঠেই সে বলিল—ক্যানে? কি দরকার?

হাসিয়া দূর্গা বলিল—একটা কথা আছে ভাই তোমার সঙ্গে।

—আমার সঙ্গে? কি কথা—? কিসের কথা, শুনি?

—বলব, তা উঠেই বস।

—আমার শরীরটা ভাল নাই।

দূর্গা শঙ্কিত কণ্ঠে বলিল—অসুখ করেছে? দাওয়ার ওপর উঠব?

তড়িৎ-স্পৃষ্টের মত পদ্ম উঠিয়া বসিল, বলিল—না।

দূর্গা তাহার মুখের দিকে চাহিয়া হাসিয়া বলিল—ওমা, কাঁদছিলে বুঝি? কি হ'ল? কর্মকারের সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে বুঝি? —সে হি-হি করিয়া হাসিতে আরম্ভ করিল।

—সে খবরে তোমার দরকার কি? কি বলছ বল না? খোঁজ দেখ না! যেন আমার কত আপনার জন!

—আপনার জন তো বটে, ভাই। 'লই' কি না—তুমিই বল।

—তুই আমার আপনার জন? —পদ্ম ক্রোধে এবার 'তুই' বলিয়া সম্বোধন করিল।

দূর্গা কিন্তু তাহাতেও রাগ করিল না, হাসিল। সে বলিল—হ্যাঁ হে হ্যাঁ। যদি বলি আমি তোমার সতীন! তোমার কর্তা তো আমাকে ভালবাসে হে!

পদ্ম এবার ক্ষিপ্ত হইয়া উঠিল। দুরন্ত ক্রোধে রান্নাশালার ঝাঁটা গাছটা কুড়াইয়া লইল। দূর্গা হাসিয়া খানিকটা সরিয়া গিয়া বলিল—ছোঁয়া পড়লে অবেলায় চান করতে হবে! আমার কথাটাই আগে শোন ভাই, তারপর না হয় ঝাঁটাটা ছুঁড়েই মেরো।

পদ্ম অবাক হইয়া গেল।

দূর্গা বলিল—দাঁড়াও ভাই, বার দরজাটা আগে বন্ধ করে দি। কে কখন এসে পড়বে।

পদ্ম তখনও শান্ত হয় নাই, সে ঝাঁঝালো সুরে বলিল—দরজা দিয়ে কি হবে? গণ্ডায় গণ্ডায় আমার তো নাগর নাই।

দূর্গা আবার হাসিয়া উঠিল, বলিল—আমার তো আছে ভাই। তারা যদি গন্ধে গন্ধে এসে পড়ে!

—আমার বাড়ী এলে ঝেঁটিয়ে বিষ ঝেড়ে দেব না?

দূর্গা ততক্ষণে দরজা বন্ধ করিয়া দিয়াছে। ফিরিয়া সে সংস্পর্শ বাঁচাইয়া খানিকটা দূর হইতে বলিল—পরকে না হয় পার। কিন্তু তোমার আপন জনাটিকে? সেও যে আমার তুমি যা বললে—তাই! যাক, শোন ভাই ঠাট্টা লয়, এইগুলো ঘরে তুলে রাখ দেখি। —সে ততক্ষণে কাঁখাল হইতে কাপড়-ঢাকা একটা চুপড়ি নামাইল। তাহার মধ্য হইতে নামাইয়া দিল—এক ঘটি দুধ, এক ভাঁড় গুড়, গোটাদুয়েক ছাড়ানো নারিকেল, সেরখানেক তিল, একটা পাত্রে আধসেরটা তেল—আরও কতকগুলি মসলাপত্র। বলিল—যাও, লক্ষ্মীপূজোর উদ্যোগ করে ফেল। আতপ চাল তো আমার নাই, আর আমাদের চালগুঁড়োতে তো হবে না! আমি শুনলাম তোমার কর্তার কাছে।

পদ্মর সর্বাঙ্গ জ্বলিয়া উঠিল; ইচ্ছা হইল লাথি মারিয়া জিনিসগুলোকে ছড়াইয়া ফেলিয়া দেয়। তাহাই সে দিত। কিন্তু ঠিক তখনই বাহির দরজায় ধাক্কা দিল। হয়তো অনিরুদ্ধ। ভাল, সে-ই আসুক—তারপর সামনেই সে লাথি মারিয়া ফেলিয়া দিবে।

দ্রুতপদে সে নিজেই গিয়া খুলিয়া দিল। কিন্তু সে অনিরুদ্ধ নয়—বুড়ী রাঙাদিদি।

পদ্ম শান্ত ভাবে সম্ভাষণ করিল—কে, রাঙাদিদি?

—হ্যাঁ। তা হ্যালো নাতবউ। বলিতে বলিতে বৃদ্ধার দৃষ্টি পড়িল দূর্গার উপর।—ওমা, ও কে বসে? ওটা কে?

—আমি। —কণ্ঠস্বর উচ্চ করিয়া দূর্গা বলিল—রাঙাদিদি, আমি দুগগা, বায়েনদের দুগগা।

—দুগগা। তোর কি না-হাঁটা 'মিত্তিকে' নাই না? এই হেথা, এই হোথা, একেবারে ওই মুলুকে। কঙ্কণা, জংশন, কোথায় বা না যাস। তা হেথা কি করছিস লা? ওগুলো কি বটে?

—এই, কামার-বউ টাকা দিয়েছিল জংশন থেকে জিনিস কিনতে; তাই এনে দিলাম, রাঙাদিদি।

—তা আমাকে বলতে নাই? গাঁয়ে বসে চার আনার বাজার করলাম আজ, চাল বেচলাম এক টাকার। জংশনে চার আনার বাজারেও একটা পয়সা বাঁচত, চালের দরেও দুটো পয়সা বেশী পেতাম। আমার তো শক্তসোমথ সোয়ামী নাই, আভাগী আমি—আমার 'উগার' করবি ক্যানে বল?

হাসিয়া দূর্গা বলিল—এইবার একদিন দিও দিদি, এনে দোব।

—তা দিস। তুই মানুষ তো ভাল, তবে বড় নচ্ছার। তা তুই যা করবি করগে, আমার কি?

দূর্গা সশব্দে হাসিয়া উঠিল—তা বই কি, দিদির তো আর বুড়ো নাই। ভয়-ভাবনা কিসের? তা বাজার তোমার করে দোব দিদি!

বৃদ্ধা বলিল—মরণ। তার আবার হাসি কিসের লা?

—বেশ, আর হাসব না। এখন কি বলছ বল?

—মর! তোকে কে বলছে? বলছি নাতবউকে। হ্যাঁ লা নাতবউ, এবার যে বড় আমার বাড়ীতে চাল কুটতে গেলি না?

রাঙাদিদির বাড়ীতে ঢেঁকি আছে, পদ্ম বরাবরই রাঙাদিদির ঢেঁকিতে পিঠার চাল কুটিয়া আনে। এবার যায় নাই; তাই বৃদ্ধা আসিয়াছে।

—বলি হ্যাঁ লা, তোকে আমি কখনও কিছু বলেছি নাকি? বল কিছু বলেছি কিনা? মনে তো পড়ছে না ভাই!

কাহাকে কখন যে বুড়ী কি বলে সে আর পরে তাহার মনে থাকে না।

ম্লান হাসি হাসিয়া পদ্ম বলিল—তার জন্য নয়, এবার চাল কোটাই হয় নাই রাঙাদিদি।

—চাল কোটাই হয় নাই? বলিস কি?

—না।

—আ-মরণ! তা আর কবে চাল কুটবি? রাত পোহালেই তো লক্ষ্মী—

পদ্ম চুপ করিয়া রহিল। দূর্গা মাঝখান হইতে বলিল—নাতবউয়ের অসুখ তো জান রাঙাদিদি। অসুস্থ শরীরে কি করবে বল?

—তবে? লক্ষ্মী হবে কি করে? তোর সেই 'হাদামুষল' মিন্সে কোথা? সেই অনিরুদ্ধ? সে পারে না?

দূর্গাই বলিল—হবে কোন রকম করে। কর্মকার আনুক, দোকান থেকে কিনে আনবে।

—কিনে আনবে? না না। কলে কোটা গুঁড়োয় কি লক্ষ্মী হয়? ও নাতবউ, এক কাজ কর, আমার ঘর থেকে নিয়ে আয় চাটি গুঁড়ো। তা দু'সের আড়াই সের দিতে পারব। আচ্ছা, আমিই না হয় দিয়ে যাব! ওমা! তা বলতে হয়। আমি এক্ষুনি দিয়ে যাচ্ছি।

যাইতে যাইতে দরজার গোড়ায় দাঁড়াইয়া বৃদ্ধা বলিল—হামদু শেখ পাইকারের করণটা দেখ দেখি দুগগা, বুড়ো গাইটার দাম বলছে চার টাকা। শেষমেষ বলে, পাঁচ টাকা। তোদের পাড়ায় আর কেউ পাইকার এলে পাঠিয়ে দিস্ তো বুন।

দূর্গাও ঝুড়িটা লইয়া উঠিল, বলিল—বাটি-ঘটি কাল এসে নিয়ে যাব ভাই। আজ চললাম।

—এইখানে কাল খাবে।

—বেশ।

দূর্গা হাসিতে হাসিতে চলিয়া গেল।

অকস্মাৎ কোথা দিয়া কি হইয়া গেল। রাঙাদিদির সঙ্গে কথা বলিতে বলিতে কেমন করিয়া তাহার অন্তরের ক্ষোভ যেন জুড়াইয়া গেল। আবার সব ভাল লাগিতেছে। দূর্গার জিনিসগুলা সে প্রত্যাখ্যান করিল না; লাথি মারিয়া ফেলিয়া দিল না। দূর্গার ওই মিথ্যা কথাটা তার বড় ভাল লাগিয়াছে; রাঙাদিদিকে সে বলিল—কামার-বউ তাহাকে জংশন শহর হইতে বাজার করিয়া আনিতে টাকা দিয়াছিল—এ সেই জিনিস!

সে রাঙাদিদির চালগুঁড়োর প্রতীক্ষা করিয়া রহিল। বাড়ীতে আতপ চাল নাই। চাল গুঁড়াইয়া একবার বাটিয়া লইয়া আপনার গোলা তৈয়ারি করিতে হইবে। আল্পনা আঁকিতে হইবে—বাহির-দরজা হইতে ঘরের ভিতর পর্যন্ত খামারে, মরাইয়ের নিচে গোয়াল ঘর পর্যন্ত। চণ্ডীমণ্ডপে আবার পৌষ আগলানোর আলপনা আছে। মনে পড়িল, 'আউরী-বাউরী' চাই। কার্তিক-সংক্রান্তি ‘মুঠলক্ষ্মীর’ ধানের খড় পাকাইয়া সেই দড়িতে বাঁধিতে হইবে বাড়ীর প্রতিটি জিনিস। ঘরের বাক্স-পেটরা তৈজস-পত্র সবেতেই পড়িবে মা-লক্ষ্মীর বন্ধন। ঘরের চালে পর্যন্ত আউরী-বাউরীর বন্ধন পড়িবে। তাহা হইলেই বৈশাখের ঝড়ে আর চাল উড়িবে না।

***

সেই পুরাকালে ছিল এক রাখাল ছেলে। বনের ধারে বিস্তীর্ণ প্রান্তরে সে আপনার গরু-গুলিকে লইয়া চরাইয়া ফিরিত। গ্রীষ্মের রৌদ্র, বর্ষার বৃষ্টি, শীতের বাতাস তাহার মাথার উপর দিয়া বহিয়া যাইত। মধ্যে মধ্যে দুঃখ-কষ্ট হইলে সে চোখের জল ফেলিত, আর ঊর্দ্ধমুখে দেবতাকে ডাকিত—ভগবান, আর পারি না, এ কষ্ট তুমি দূর কর, আমাকে বাঁচাও।

একদিন লক্ষ্মী-নারায়ণ চলিয়াছিলেন আকাশ-পথে। রাখালের কাতর কান্না আসিয়া পৌছিল তাহাদের কানে। মা-লক্ষ্মীর কোমল হৃদয় ব্যথিত হইয়া উঠিল। দূর কর ঠাকুর, রাখালের দুঃখ দূর কর!

নারায়ণ হাসিলেন। বলিলেন—এ দুঃখ দূর করিবার শক্তি তো আমার নাই লক্ষ্মী, সে শক্তি তোমার!

লক্ষ্মী বলিলেন—তুমি অনুমতি দাও!

নারায়ণের অনুমতি পাইয়া লক্ষ্মী আসিলেন মর্ত্যে। চারিদিক হাসিয়া উঠিল—সোনার বর্ণচ্ছটায়, বাতাস ভরিয়া উঠিল দেবীর দিব্যাঙ্গের অপরূপ সৌরভে। রাখাল অবাক হইয়া গেল। দেবী রাখালের কাছে আসিয়া বলিলেন—দুঃখ তোমার দূর হইবে, তুমি আমার কথামত কাজ কর। এই লও ধানের বীজ; বর্ষার সময় মাঠে এইগুলি ছড়াইয়া দাও, বীজ হইতে গাছ হইবে। সেই গাছের বর্ণ যখন হইবে আমার দেহবর্ণের মতো, আমার গাত্র-গন্ধের মতো, গন্ধে যখন ভরিয়া উঠিবে তাহার সর্বাঙ্গ, তখন সেগুলি কাটিয়া ঘরে তুলিবে।

রাখাল লক্ষ্মীকে প্রণাম করিল। বর্ষার প্রান্তরের বুকে ছড়াইয়া দিল ধানের বীজ। দেখিতে দেখিতে সমস্ত মাঠ ভরিয়া গেল সবুজ ধানের গাছে। ক্রমে ক্রমে বর্ষা গেল—ধানের ডগায় দেখা দিল শীষ। রাখাল নাড়িয়া-চাড়িয়া দেখিল, কিন্তু এখনও সেই ঠাকরুনের মতো বর্ণ হয় না, সে গন্ধও উঠিতেছে না। রাখাল অপেক্ষা করিয়া রহিল। হেমন্তের শেষ অগ্রহায়ণে একদিন রাত্রে ঘরে শুইয়াই রাখাল পাইল সে গন্ধ। সকালে উঠিয়াই সে ছুটিয়া গেল মাঠে। অবাক হইয়া গেল। সোনার বর্ণে গোটা মাঠটা আলো হইয়া উঠিয়াছে, দিব্য-গন্ধে আকাশ বাতাস আমোদিত। সোনার বর্ণে, দিব্য গন্ধে আকৃষ্ট হইয়া আকাশে নানাবিধ কীট-পতঙ্গ-পাখী উড়িতেছে—পশুরা আসিয়া জুটিয়াছে চারিপাশে, সেই ঠাকরুন যেন তাহার দুঃখে বিগলিত হইয়া মাঠ জুড়িয়া অঙ্গ এলাইয়া বসিয়া আছেন। রাখাল ধান কাটিয়া ভারে ভারে ঘরে তুলিল।

দেশের রাজা সংবাদ পাইয়া আসিয়া সোনা দিয়া কিনিতে চাহিলেন সমস্ত ধান। রাজার ভাণ্ডারের সোনা ফুরাইয়া গেল—কিন্তু রাখালের ধান অফুরন্ত। রাজার বিস্ময়ের আর অবধি রহিল না। তখন রাজা আপনার কন্যাকে আনিয়া দান করিলেন রাখালের হাতে। সম্মুখেই পৌষ-সংক্রান্তিতে রাখাল লক্ষ্মীদেবীকে পূজা করিল। ওই ধানকেই স্থাপিত করিল সিংহাসনে, সিন্দুর-কজ্জলে বসনে-ভূষণে তাহাকে বিচিত্র শোভায় সাজাইল, সম্মুখে স্থাপন করিল জলপূর্ণ ঘট, ঘটের মাথায় দিল ডাব-আমের পল্লব। রাজকন্যা ঐ ধান ভানিয়া চাল করিলেন, চাল হইতে প্রস্তুত হইল সেই নানাবিধ সুস্বাদু, ঘৃতে অন্নে সুতয়, দুধে-অন্নে মিষ্টান্ন-পায়সান্ন-পরমান্ন, হরেক রকমের পিঠা সরুচাকুলি, তাহার সঙ্গে পঞ্চপুষ্পে ধূপে-দীপে চন্দনে গন্ধে দেবীর পূজা করিয়া রাখাল ও রাজকন্যা দেবীর ভোগ দিয়া সর্বাগ্রে দিলেন কৃষাণকে, রাখালকে—নিজের স্বামীকে, ঘরের জনকে—তাহার পর বিলাইলেন পাড়া প্রতিবেশীকে, হেলে বলদ, গাই গরু ছাগল-ভেড়া—এমন কি বাড়ীর উচ্ছিষ্টভোজী কুকুরটা পর্যন্ত প্রসাদ পাইল।

লক্ষ্মীদেবী মূর্তিমতী হইয়া দেখা দিলেন, আপন পরিচয় দিলেন, বর দিলেন, তোমার মতো এই পৌষ-সংক্রান্তিতে যে আমার পূজার্চনা করিবে—তাহার ঘরে আমি অচলা হইয়া বাস করিব। পৃথিবীতে তাহার কোন অভাব বা কোন দুঃখ থাকিবে না। পরলোকে সে করিবে বৈকুণ্ঠে বাস।

ব্রত-কথাটি মনে মনে স্মরণ করিতে করিতে আশা-আকাঙ্ক্ষার বুক বাঁধিয়া পরিতুষ্ট মনেই পদ্ম লক্ষ্মীর আয়োজন আরম্ভ করিল। ঘর-দুয়ার, খামার হইতে গোয়াল পর্যন্ত আলপনা আঁকিয়া এবার সে যেন একটু বেশী বিচিত্রিত করিয়া তুলিল, দুয়ার হইতে আঙিনার মধ্যস্থল পর্যন্ত আলপনায় আঁকিল চরণ-চিহ্ন। ওই চরণ-চিহ্ন। ওই চরণ-চিহ্নে পা ফেলিয়া লক্ষ্মী ঘরে আসিবেন। ঘরের মধ্যস্থলে সিংহাসনের সম্মুখে আঁকিল প্রকাণ্ড এক পদ্ম। অপরূপ তাহার কারুকার্য। মা আসিয়া বিশ্রাম করিবেন। শাঁক ধুইল, ধূপ বাহির করিল, প্রদীপ মার্জনা করিল, সিন্দুর রাখিল, কাজল পাড়িল। এদিকের আয়োজন শেষ করিয়া গুড়ে-নারিকেলে, গুড়ে-তিলে মিষ্টান্ন প্রস্তুত করিবে, দুধ জাল দিয়া ক্ষীর হইবে। কত কাজ, কত কাজ। কাজের কি অন্ত আছে? আজ যদি তাহার একটা ছোট মেয়ে থাকিত, তবে সে-ই জিনিসপত্রগুলি হাতে হাতে আগাইয়া দিতে পারিত। সহসা তাহার মনে পড়িয়া গেল—আলপনার কাজে তাহার একটা ভুল হইয়া গিয়াছে। চণ্ডীমণ্ডপে পৌষ-আগলানোর আলপনা চাই—সেটা দেওয়া হয় নাই।

একমুহূর্তে সে দাঁড়াইয়া ভাবিয়া লইল। মনে পড়িল, অনিরুদ্ধ তখন বলিতেছিল, চণ্ডীমণ্ডপে তাহার কেহ যাইবে না, তাহার পৌষ-আগলানো পর্ব হইবে তাহার বাড়ীর দুয়ারে!

না, সে হইবে না। পদ্ম তাহা করিবে না, করিতে দিবে না। 'মা কালী, বাবা বুড়োশিবের চরণতল ওই চণ্ডীমণ্ডপ ছাড়িয়া, না, সে হইবে না।' পদ্ম আলপনা গোলার বাটী হাতে চণ্ডীমণ্ডপ অভিমুখেই বাহির হইয়া গেল।

চণ্ডীমণ্ডপের সামনে দাঁড়াইয়া পদ্মের বিস্ময়ের আর অবধি রহিল না। এ কি সেই চণ্ডীমণ্ডপ? কোন্ যাদুকরের মায়াদণ্ডের স্পর্শে তাহার আমূল পরিবর্তিত হইয়া গিয়া এমন অপরূপ শোভায় হাসিতেছে! এ যে সব পাকা হইয়া গিয়াছে। পথ হইতে চণ্ডীমণ্ডপে উঠিবার পাকা সিঁড়ির দুই পাশে দুইটি হাতীর শুঁড় সিঁড়িগুলিকে বেষ্টন করিয়া যেন ধরিয়া রাখিয়াছে। ষষ্ঠীতলার বকুল গাছটির চারিপাশ পাকা গোল বেদী করিয়া বাঁধানো। চণ্ডীমণ্ডপের মেঝে পাকা হইয়াছে, মসৃণ সিমেন্টের পালিশ ঝমক্‌ করিতেছে। থামগুলিতে পলেস্তারা করা হইয়াছে। তাহাতে দুধবরণ কলি-চুন দেওয়া হইয়াছে। ওপাশে নূতন একটা কুয়া। পদ্মর মনে পড়িয়া গেল—এসব শ্রীহরি ঘোষের কীর্তি! সে একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া আলপনা আঁকিতে বসিল। 'পৌষ পৌষ পৌষ, বড় ঘরের মেঝের এসে বস'—একটা ঘর আঁকিতে হইবে। মরাই আঁকিতে হইবে। 'এস পৌষ বস তুমি, না যেও ছাড়িয়া।' পৌষ মাস তো শ্রীহরির, তাহাদের আবার পৌষ মাস কিসের।

—কে গা, কে তুমি? একরাশ আলপনা যেন দিও না, বাছা। মুঠো মুঠো খরচ করে একজনা বাঁধিয়ে দিলে—আর তোমরা তো আপনার কল্যাণ করে চাল-গোলা ঢালছ। এর পর ধোবে মুছবে কে?

পদ্ম মুখ ফিরাইয়া দেখিল, শ্রীহরির মা পথের উপর হইতে চীৎকার করিতেছে। পদ্ম প্রতিবাদ করিতে পারিল না। শ্রীহরির মায়ের এ-কথা বলিবার অধিকার আছে বইকি! সে কোনমতে আলপনা শেষ করিয়া চলিয়া আসিল।

বাড়ী ঢুকিতে গিয়াই দেখিল, দেবু তাহাদেরই বাড়ী হইতে বাহির হইয়া আসিতেছে। ঘোমটা টানিয়া সে একপাশে সরিয়া দাঁড়াইল। দেবুর পিছনে বাড়ীর দরজায় দাঁড়াইয়া ছিল অনিরুদ্ধ। দেবু হাসিয়া পদ্মকেই বলিল—কাল তাহলে পণ্ডিতগিন্নীর কাছে লক্ষ্মীর কথা শুনতে যেয়ো মিতেনী। সে বলে দিয়েছে।

পদ্ম অবগুণ্ঠিত মস্তকে সায় দিয়া ইঙ্গিতে জানাইল, সে যাইবে। দেবু চলিয়া গেল।

অনিরুদ্ধ বলিল—পণ্ডিত এসেছিল; কার কাছে শুনেছে, লক্ষ্মীর উদ্যোগ হয় নাই আমার, তাই দুটো টাকা দিয়ে গেল। এমন মানুষ আর হয় না! কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া সে আবার বলিল, কিন্তু সংসারে বাড়-বাড়ন্ত তো ওর হবে না, হবে ছিরের।

পদ্ম চুপ করিয়া রহিল। সে-ও একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিল। অনিরুদ্ধ আবার প্রশ্ন করিল, আর কিছু আনতে হয় তো বল?

—না।

—তবে নে, কাজগুলো সেরে নে। আগে একবার তামুক সেজে দে দেখি।

অনিরুদ্ধকে তামাক সাজিয়া দিয়া সে উনানে কড়া চড়াইয়া আরম্ভ করিল গুড়-নারিকেলের পাক। তাহার অন্তর আবার দুঃখের আক্ষেপের আবেগে ভরিয়া উঠিয়াছে। দেবু পণ্ডিতের কথা ছাড়িয়াই দিতে হইবে—পণ্ডিত সত্যই দেবতার মত মানুষ! কিন্তু ওই দূর্গা, তাহারও দয়াধর্ম আছে, ভালবাসা আছে, রাঙাদিদির মত কৃপণ, সেও পুণ্যকর্ম করে। শ্রীহরি ঘোষের কীর্তি—তাহার মহত্ব দেখিয়া সে তো অবাক হইয়া গিয়াছে। কিন্তু তাহাদের জীবনে কি হইল!

দুঃখ তাহার নিজের জন্য, কিন্তু আজ সে হিংসা কাহাকেও করিল না। বরং সকলকেই সে শ্রদ্ধা নিবেদন করিল। আর বার বার কামনা করিল, মাগো! দুঃখ আমার দূর কর। ধানে-সম্পদে আমার ঘর ভরিয়া দাও, আমি ষোড়শোপচারে তোমার পূজা দিব, আঙুল কাটিয়া প্রদীপের সলিতা করিব, চুল কাটিয়া চামর বাঁধিয়া সে চামরে তোমায় বাতাস করিব, বুক চিরিয়া রক্ত দিয়া সেই রক্তে তোমায় পায়ে আলতা পরাইব। তোমার পূজায় পঞ্চ-শব্দের বাজনা করিব, পট্টবস্ত্রের চাঁদোয়া টানাইব। রূপার সিংহাসনে সোনার ছাতার তলায় তোমাকে বসাইব, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-পড়শী, দীন-দুঃখী, পশু-পক্ষীকে বিতরণ করিব তোমার প্রসাদ—এক-অন্ন, পঞ্চাশ-ব্যঞ্জন!

অনিরুদ্ধ বাড়ীর বাহির হইতেই ব্যস্তসমস্ত হইয়া ব্যগ্র কণ্ঠে ডাকিল—পদ্ম! ও পদ্ম!

পদ্ম চমকিয়া উঠিল। কি হইল আবার?

অনিরুদ্ধ ঘরের ভিতর ঢুকিয়া বলিল—কড়াইটা নামিয়ে রেখে আমার সঙ্গে আয় দেখি।

—কেন?

—পণ্ডিতকে ধরে নিয়ে গেল। পণ্ডিতের বাড়ী যাব।

—ধরে নিয়ে গেল? কে?

—সেটেলমেন্টের হাকিম পরোয়ানা বার করেছিল; থানা থেকে লোক এসে ধরে নিয়ে গেল।

—সেটেলমেন্ট! সেটেলমেন্ট! উঃ—কোথা হইতে ইহারা আসিয়া গ্রামখানার ঝুঁটি ধরিয়া ঝাঁকি দিয়া সর্ব অঙ্গ-স্নায়ু-তন্ত্রী-মন এমন করিয়া অস্থির অবশ করিয়া দিল। নিত্য নূতন নোটিশ, নূতন হুকুম! তকমা আঁটা পিয়নগুলোর যাওয়া-আসার বিরাম নাই। পথে-ঘাটে সাইকেলের পর সাইকেল চলিয়াছে। কিন্তু হায় হায় একি কাণ্ড! দেবু পণ্ডিতের মত লোককে তাহারা ধরিয়া লইয়া গেল!


সতেরো



দেবু ঘোষের বিরুদ্ধে অভিযোগ একটি নয়। সরকারি জরিপের কাজে বাধা দেওয়া ও সার্ভে ডিপার্টমেন্টের কর্মচারী আমিনকে প্রহার করার অপরাধে সে অভিযুক্ত হইয়াছে। স্থানীয় সেটেলমেন্ট অফিসারের নির্দেশমত এখানকার থানার অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব-ইন্সপেক্টর একজন কনস্টেবল লইয়া আসিয়াছে। গ্রাম্য চৌকিদার ভূপালও তাহাদের সঙ্গে আছে। তাহারা চণ্ডীমণ্ডপে অপেক্ষা করিতেছিল। দেবু অনিরুদ্ধের বাড়ি হইতে আসিবামাত্র তাহাকে গ্রেপ্তার করিয়াছে। এখন হাতে হাতকড়ি দিয়া লইয়া যাওয়া হইবে। আজ রাত্রিতে থাকিবে হাজতে, কাল সকালে সেটেলমেন্ট অফিসারের নিকট হাজির করা হইবে। তিনি ইচ্ছা করিলে জামিন দিবেন কিংবা বিচারাধীন আসামি হিসাবে তাহাকে সদর জেলে পাঠাইবেন। আবার ইচ্ছা করলে সঙ্গে সঙ্গে বিচারের দিন ধাৰ্য করিয়া নিজে বিচার করিবেন। দেবুকে লইয়া তাহারা চণ্ডীমণ্ডপেই বসিয়া আছে।

দেবুও চুপ করিয়া মাথা হেঁট করিয়া বসিয়া ছিল। মাথার ভিতরটাই কেমন যেন শূন্য হইয়া গিয়াছে; কিসে কি হইয়া গেল তাহা চিন্তা করিবার শক্তি পর্যন্ত নাই। শুধুই সে ভাবিতে পারিল যে, যাহা সে করিয়াছে—ভালই করিয়াছে; এখন যাহা হইবার হইয়া যাক!

দেখিতে দেখিতে গ্রামের প্রায় সকল লোকই জমিয়া গেল। শ্ৰীহরি ও দাশজী গোমস্তা, ছোট দারোগা সাহেবের পাশেই বসিয়া আছে। মধ্যে মধ্যে মৃদুস্বরে তিন জনে কথাও হইতেছে। হরিশ আসিয়াছে, ভবেশ আসিয়াছে, হরেন ঘোষাল, মুকুন্দ ঘোষ, কীৰ্তিবাস মণ্ডল, নটবর পাল ও গ্রামের দোকানি বৃন্দাবন, রামনারায়ণ ঘোষ, এমনকি এই শীতের সন্ধ্যায় বৃদ্ধ দ্বারকা চৌধুরীও আসিয়া উপস্থিত হইয়াছে। জগন ডাক্তার দেবুর পাশে বসিয়া আছে। প্ৰগল্‌ভ জগনও আজ স্তব্ধ, বিষণ্ণ—এমন আকস্মিক অভাবনীয় পরিণতিতে সে-ও হতভম্ব হইয়া গিয়াছে। একপাশে গ্রামের হরিজনেরা দাঁড়াইয়া আছে। সতীশ, পাতু সকলেই আসিয়াছে। দূর্গা বসিয়া আছে ষষ্ঠীতলার একপাশে একা, নীরবে, মাটির পুতুলের মত।

চিৎকার করিতেছে কেবল বুড়ি রাঙাদিদি। চণ্ডীমণ্ডপের ওপাশে গ্রামের প্রবীণারা পর্যন্ত আসিয়া দাঁড়াইয়াছে। তাহাদের সম্মুখে দাঁড়াইয়া রাঙাদিদি বলিতেছিল—এ একেবারে হাতে করে মাথা কাটা! দারোগা! দারোগা হয়েছে তো সাপের পাঁচ পা দেখেছে। বলি হা গো দারোগা, চুরি না জোচ্চুরি না ডাকাতি, কি করেছে বাছা যে, এই দিন সন্ধেবেলা রাত পোয়ালে লক্ষ্মী তুমি বাছার হাতে দড়ি দিতে এলে?

হরিশ বলিল—ওগো রাঙা পিসি, তুমি থাম।

—ক্যানে? থামব ক্যানে? দেখব একবার কত বড় ওই দারোগা মিনসে!

একবার ধমক দিয়া শ্ৰীহরি বলিল—রাঙাদিদি, তুমি থাম। যা হয় আমরা করছি, তুমি একটু চুপ কর। তোমরা মেয়েলোক—

—মেয়েলোক? আমার সাড়ে তিন কুড়ি বয়স হল—আমি আবার মেয়েলোক কি রে? একশো বার বলব, হাজার বার বলব; আমাকে কি করবে? বাঁধবি তো বাঁধ ক্যানে, দেখি। পণ্ডিতের মতন লোককে দড়ি দিয়ে বাঁধছিল—আমাকেও বাঁধ। লে বাঁধ! আহা, পণ্ডিতের মতন মানুষ, দেবুর মত ছেলে! বুড়ি অকস্মাৎ কাঁদিয়া ফেলিল।

দেবু এবার নিজে উঠিয়া আসিয়া বলিল—একটু চুপ কর, রাঙাদিদি, আমি তোমার কাছে হাতজোড় করছি।

বৃদ্ধা সস্নেহে তাহার মাথায় হাত বুলাইয়া বলিল—আমি তোকে আশীর্বাদ করছি ভাই, সায়েব তোকে দেখবামাত্তর ছেড়ে দেবে, চেয়ারে বসিয়ে বলবে পণ্ডিত লোক, তোমাকে কি জেহেল দিতে পারি বাপ!

দেবু হাসিল।

ওদিকে ব্যাপারটাকে চাপা দিয়া কৌশলে মুক্তিলাভ করাইবার কথাবার্তা হইতেছিল। শ্ৰীহরি ঘোষ তাহার অগ্রণী, সঙ্গে জমিদারের গোমস্তা দাশজী আছে। ছোট দারোগা শ্ৰীহরি ঘোষের বন্ধু লোক, শ্ৰীহরি তাহাকেই ধরিয়াছে। প্রত্যক্ষভাবে না হইলেও পরোক্ষভাবে দেবু শ্রীহরির বিরোধীপক্ষ; অন্তরে অন্তরে দেবু তাহাকে ঘৃণা করে—তাহা শ্ৰীহরি জানে। কিন্তু গ্রামের প্রধান ব্যক্তি হিসাবে শ্রীহরি আজ দেবুর পক্ষ অবলম্বন না করিয়া পারে না। সে থাকিতে তাহার গ্রামবাসী বিশেষ করিয়া তাহার জ্ঞাতি একজনকে হাতে দড়ি দিয়া লইয়া গেলে লোকে কি বলিবে? সে ছোট দারোগাকে খুশি করিয়া একটা উপায় উদ্ভাবনের চেষ্টা করিতেছে।

ছোট দারোগা বলিল—পেশকারের কাছে যাও, ধরে-পেড়ে হয়ে যাবে একরকম করে। যে আমিন-কানুনগোর সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে—তাদেরই খুশি কর, বিনয় করে মাফ চেয়ে নিক দেবু ঘোষ, ব্যস—মিটে যাবে। এ তো আকছার হচ্ছে।

শ্ৰীহরি বলিল—খুড়োর যে আমার বেজায় মাথাগরম গো—আমি প্রথম দিন শুনেই বলে পাঠিয়েছিলাম, খুড়া, একবার কানুনগো বাবুর সঙ্গে দেখা করে ব্যাপারটা মিটিয়ে এসো। রাজকর্মচারী তুই-তুকারি করলে তো হল কি?

ভবেশ অমনি বলিয়া উঠিল—এ্যাই, গায়ে তো আর ফোস্কা পড়ে নাই।

শ্ৰীহরি বলিল—যখন ঘটনা ঘটল, তখুনি তখুনি জানতে পারলে তো সে ঢেউ আমিই তখুনি মেরে দিতাম ব্যাপারটা মিটিয়ে দিতাম। আমি যে অনেক পরে শুনলাম।

ব্যাপারটা এইভাবে ঘটিয়া গিয়াছিল। এও সেই তুই-তুকারি লইয়া ঘটনা।

দেবু আপনার দাওয়ায় বসিয়া ছিল—তখন বেলা প্রায় বারটা। সাইকেলে চড়িয়া সম্মুখের পথ দিয়া যাইতেছিল একজন কানুনগো। বোধহয় বহুদূর হইতে আসিতেছিল শীতের দিনে এক গা ঘামিয়া ধুলায় ও ঘামে আচ্ছন্ন এবং ক্লান্ত হইয়া পড়িয়াছিল ভদ্রলোক; দেবুকে দেখিয়া সাইকেল হইতে নামিয়াই সম্ভাষণ করিল—এই! ওরে! এই শোন্!

এই সম্ভাষণ শুনিলেই দেবু ক্ষিপ্তপ্রায় হইয়া ওঠে; তাহার তিক্ত কটু অতীতের স্মৃতি জাগিয়া ওঠে। তবু লোকটির মাথায় টুপি, সাদা শার্ট, খাকি হাফপ্যান্ট ও সাইকেল দেখিয়া সরকারি কর্মচারী অনুমান করিয়া সে চুপ করিয়াই রহিল।

—এই ইডিয়েট, শুনতে পাচ্ছিস?

এবার দেবু ভ্রূ কুঞ্চিত করিয়া লোকটির দিকে চাহিল—ইচ্ছা ছিল কোনো উত্তর না দিয়াই সে উঠিয়া গিয়া বাড়ির ভিতরে ঢুকিবে, উত্তর দিবে না, ওই লোকটার কোনো কথাই শুনিবে না। কিন্তু উঠিতে-উঠিতেও একবার সে লোকটির দিকে না চাহিয়া পারিল না।

চোখাচোখি হইতেই কানুনগো বলিল—যা, এক গ্রাস জল আন দেখি। বেশ ঠাণ্ডা জল। পরিষ্কার গ্লাসে, বুঝলি?

দেবু বিপদে পড়িয়া গেল। তৃষ্ণার জলের জন্য এই আবেদন অভদ্র হইলেও সে না বলিতে পারি না। তবুও সে মুখে কোনো কথা বলিল না, ঘরের ভিতর হইতে একটা মোড়া আনিয়া দাওয়ায় রাখিল; পিচবোর্ডে তৈয়ারি একখানা পাখা আনিয়া দিল। ওইগুলির মারফতেই নীরব আমন্ত্রণ জানাইয়া সে বাড়ির ভিতর চলিয়া গেল। কিছুক্ষণ পরই এক হাতে ঝকঝকে মাজা একখানি থালায় একটি বড় কদমা ও এক গ্লাস জল এবং অন্য হাতে একটি বড় ঘটির এক ঘটি জল ও পরিষ্কার একখানি গামছা আনিয়া হাজির করিল।

লোকটি হাত-মুখ ধুইল, গামছা আগাইয়া দিলে বা হাত দিয়া কানুনগো গামছাখানা সরাইয়া দিল। হাত-মুখ মুছিয়া ফেলিল সে আপনার রুমালে; তারপর কদমাটার খানিকটা ভাঙিয়া মুখে দিয়া বোধহয় চাখিয়া দেখিল। কদমাটা টাটকা কদমা, বেশ ভালই লাগিবার কথা। লাগিলও বোধহয় ভাল; কারণ গোটা কদমাটাই নিঃশেষ করিয়া জল খাইয়া কানুনগো পরিতৃপ্তির একটা নিশ্বাস ফেলিল–আঃ!

দেবু ইতিমধ্যে ভিতরে গিয়াছিল। পান বা মসলা আনিতে ভুল হইয়া গিয়াছিল। বিলুকে বলিল—সুপারি লবঙ্গ আর দুটো পান দাও দেখি! শিগগির।

পান সাজাই ছিল। এক টুকরা পরিষ্কার কলাপাতার উপর দুইটি পান ও সুপারি, লবঙ্গ সাজাইয়া সে স্বামীর হাতে তুলিয়া দিল।

ঠিক এই সময়েই বাহির হইতে ডাক আসিল—ওরে! এই ছোকরা!

দেবু আর সহ্য করিতে পারিল না। পানের পাতাটা সেইখানেই ফেলিয়া দিয়া বাহিরে আসিয়া সে বলিল কিরে, কি বলছিল?

এমন অতর্কিত রূঢ় প্রত্যুত্তরের জন্য কানুনগো প্রস্তুত ছিল না। বিস্ময়ে ক্রোধে প্রথমে সে কয়েক মুহূর্ত হতবাক হইয়া রহিল, তারপর বলিল—হোয়াট! আমায় তুই-তুকারি করিস?

নিৰ্ভয়ে দেবু উত্তর দিল—সে তো তুই-ই আগে করলি।

—কি নাম তোর শুনি? তারপর দেখছি তোকে!

দেবু তাহার মুখের দিকে চাহিল, তারপর নির্ভয়ে বলিল—আমার নাম শ্রীদেবনাথ ঘোষ। তাহার দিকে আগাইয়া গিয়া বলিল—কি করবি কর!

কানুনগো বিনা বাক্যব্যয়ে চলিয়া গিয়াছিল।

ওদিকে জরিপ স্থগিত রাখিবার জন্য শ্ৰীহরিদের দরবারে বিশেষ ফল হয় নাই; ধান কাটিবার জন্য মাত্র আর সাত দিন সময় মঞ্জুর হইয়াছিল। কিন্তু পৌষের চৌদ্দ দিনের মধ্যে বিস্তীর্ণ মাঠের ধান কটা ও তোলা অসম্ভব ব্যাপার। অসম্ভব কোনোমতেই সম্ভব হয় নাই। হইয়াছে কেবল শ্ৰীহরির এবং আর জন দুই-তিনের—হরিশ দোকানি, বৃন্দাবন দত্ত এবং কৃপণ হেলারাম চাটুয্যের। তাহাদের পয়সা আছে, বহু নগদ মজুর নিযুক্ত করিয়া তাহারা কাজ শেষ করিয়াছে। বাকি লোকের পাকাধানের উপর দিয়াই জরিপ চলিতে আরম্ভ করিল। সরকার হইতে অবশ্য যথাসম্ভব সাবধানতা অবলম্বন করিয়া ধান বাঁচাইয়া আইলের উপর দিয়া কাজ করিতে নির্দেশ রহিল।

দেবু প্রথম দিন মাঠে গিয়া দেখিল—সার্ভে টেবিলের ধারে দাঁড়াইয়া আছে সেই কানুনগো লোকটি। কানুনগোও দেবুকে দেখিল। দুজনের চিত্তই তিক্ত হইয়া উঠিল। কানুনগো লোকটি ডিস্পেপটিক, অত্যন্ত রুক্ষ মেজাজের লোক, লোকজনের সঙ্গে রূঢ় ব্যবহার করা তাহার স্বভাব। দেবু সাবধানে তাহাকে এড়াইয়া চলিতে আরম্ভ করিল। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই কয়েকটা ক্ষুদ্র ব্যাপার উপলক্ষ করিয়া কানুনগো তাহাকে ক্যাম্পে হাজির হইতে নোটিশ দিল।

তিক্তচিত্তে দেবু অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হইয়া উঠিল। সে স্থির করিল–যাহা হয় হউক, সে কিছুতেই ওই কানুনগোর সম্মুখে হাজির হইয়া হাত জোড় করিয়া দাঁড়াইবে না।

কানুনগো সুযোগ পাইয়া এই অনুপস্থিতির কথা সেটেলমেন্ট-ডেপুটিকে রিপোর্ট করিল। ডেপুটি সাহেব নোটিশগুলি দেখিয়া একটু বিস্মিত হইলেন। এই তুচ্ছ কারণে নোটিশ করা হইয়াছে? তাহার ওপর তিনি এই কানুন্‌গোটির স্বভাবও জানিতেন। তবুও আইনানুযায়ী দেবুকে নোটিশ করিলেন। দেবু এ নোটিশও অমান্য করিল। তারপরই ওয়ারেন্ট হওয়ার নিয়ম। এদিকে ঠিক এই সময়েই এক চরম ব্যাপার ঘটিয়া গেল।

দেবুরই একটা জমি পরিমাপের সময় কানুনগোর সঙ্গে তাহার বচসা আরম্ভ হইল। দেবু জমির রসিদ আনে নাই। বচসার উপলক্ষ তাই। কথার উত্তর দিতে দিতেই দেবুর নজর পড়িল, তাহার জমির ঠিক মাঝখানে পাকা ধানের উপর জরিপের শিকল টানা হইতেছে। সে ভাবিল—এটাও কানুনগোর ইচ্ছাকৃত ব্যাপার। কিন্তু সত্য বলিতে কি এটা কানুনগোর ইচ্ছাকৃত ছিল না, দেবুর জমিটার আকারই এমন অসমান যে, মাঝখানে প্রস্থের একটা মাপ না লইয়া উপায় ছিল না। রাগের মাথায় ভুল বুঝিয়া দেবু চরম কাণ্ড করিয়া বসিল। জরিপের চেন টানিয়া তুলিয়া ফেলিয়া দিল। কানুনগো সঙ্গে সঙ্গে টেবিল শিকল লইয়া মাঠ হইতে উঠিয়া একেবারে ডেপুটির ক্যাম্পে হাজির হইয়া রিপোর্ট করিল।

ডেপুটিবাবু সত্যকারের ভদ্রলোক, তিনি বাংলার চাষীর নিরীহ প্রকৃতির কথা জানেন, তিনিও এই দেশেরই মানুষ; তিনি অবাক হইয়া গেলেন। কিন্তু কানুনগোর বন্ধু পেশকারটি ধুরন্ধর লোক, সে তাহাকে পরিষ্কার বুঝাইয়া দিল–লোকটা ওই জে. এল. ব্যানার্জীর শিষ্য।

ডেপুটি আর উপেক্ষা করিতে পারিলেন না।

তারপরই এই পরিণতি। একেবারে ওয়ারেন্ট অব অ্যারেস্ট।

শ্ৰীহরি সত্যই বলিয়াছে—সে কয়েকবারই অনুরোধ করিয়াছে খুড়ো, চল তুমি, আমি তোমার সঙ্গে যাচ্ছি, কানুন্‌গোকে আমি নরম করে এনেছি, তুমি একবারটি গেলেই সব মিটে যাবে।

দেবু বলিয়াছে–না।

জগন বলিয়াছে—পণ্ডিত, তুমিও একটা দরখাস্ত কর, সমস্ত ব্যাপার জানিয়ে দাও সি. ও.-কে.; ডি. এল. আর.-কেও একটা দরখাস্ত কর।

দেবু বলিয়াছে–না, থাক।

বিলু শঙ্কিত, উদ্বিগ্ন মুখে প্রশ্ন করিয়াছো—হ্যাঁ গো, কি হবে?

দেবু হাসিয়াছে—যা হয় হবে।

যাহা হইবার হইয়া গেল।

***

শ্ৰীহরি দেবুর কাছে আসিয়া বলিল—ছোট দারোগাকে রাজি করিয়েছি, খুড়ো। প্রথমে কানুনগোর ক্যাম্পে যাবে, সেখানে ব্যাপারটা মিটিয়ে নিয়ে, কানুনগোর চিঠি নিয়ে যাবে সার্কেল ডেপুটির কাছে। কেস খারিজ হয়ে যাবে, আমরা বাড়ি চলে আসব।

দেবু বলিল–না।

—না কি গো?

–না, সে আমি যাব না, ছিরু।

–ফল কি হবে, ভাবছ তা!

–যা হয় হবে। দেবু এবারও হাসিল।

শ্ৰীহরি গভীর দুঃখের সঙ্গে একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়াও বিরক্তি সংবরণ করিতে পারি না, বলিল—কাজটা কিন্তু ভাল করছ না, খুড়ো।

দাশজী বলিল—তা হলে আমরা আর কি করব বল?

মজলিসসুদ্ধ লোকই সমস্বরে বলিল—আমরা আর কি করব বল?

কেবল মজলিসের সঙ্গে সায় দিল না তিন জন জগন ডাক্তার, অনিরুদ্ধ আর হরেন ঘোষাল। হরেন ঘোষালের অভ্যাস সকলের আগে কথা বলা, কিন্তু সে আজ কিছু না বলিয়াই দ্রুতপদে উঠিয়া চলিয়া গেল।

জগন বলিল—ভেবো না দেবু ভাই! কাল যদি কেস না করে হাজতী আসামি করে জেলে পাঠায়, তবে সদরে গিয়ে মোক্তার এনে মামলা লড়ব। আর যদি কালই বিচার করে জেল দেয়, তবে সদরে আপিল করব। জামিন সঙ্গে সঙ্গে হবে।

দেবু বলিল—শতখানেক টাকা আমার পোস্ট আপিসে আছে, বিলুর কাছে ফরম সই করে দিয়েছি। দরকারমত টাকা বার করে নিয়ো। মামলা করে কিছু হবে না জানি, কিন্তু জেরা করে আমি সব একবার ফাঁস করে দিতে চাই।

অনিরুদ্ধ অত্যন্ত কাতরস্বরে বলিল দেবু ভাই, তার চেয়ে মামলা মিটিয়ে ফেল।

হাসিয়া দেবু বলিল—তুমি একটু সাবধানে থেকো, অনি-ভাই। ডাক্তার, ওকে তুমি একটু দেখো।

ছোট দারোগা বলিল–সন্ধে হয়ে গেল। কি ঠিক হল আপনাদের?

দেবু উঠিয়া দাঁড়াইল—চলুন, আমি তৈরি।

ছোট দারোগা ডাকিল—ভূপাল! রামকিষণ।

–একটুকুন দাঁড়ান, দারোগাবাবু! কোথা হইতে আসিয়া হাতজোড় করিয়া দাঁড়াইল দূর্গা। দেবুকে বলিল—আর একবার বিলুদিদির সঙ্গে দেখা করে যাও পণ্ডিত।

দারোগা বলিল—যান, দেখা করে আসুন।

মুখরা দূর্গা আজ নীরব হইয়া দেবুর আগে আগে পথ চলিতেছিল।

দেবু বলিল—দূর্গা, তুই কিন্তু ওদের একটু দেখিস, একটু খোঁজখবর নিস্।

অগ্ৰগামিনী শুধু নীরবে ঘাড় নাড়িয়া সায় দিল।

বিলু কাঁদতেছিল। দেবু চোখ মুছাইয়া দিল। তারপর শুধু কয়টা কাজের কথাই বলিল–পোস্ট আপিসের টাকাগুলো তুলে এনে নিজের কাছে রেখো, ডাক্তার যা চাইবে দিয়ো মামলার জন্যে। সাবধানে থেকো। ধান-পান হিসেব করে নিয়ে নিজেই তুমি হিসেব করে নিয়ো। তুমি তো হিসেব জান। মন-খারাপ কোরো না। খোকার ভার তোমার ওপর রইল—ঘরদোর সব। তুমি আমার ঘরের লক্ষ্মী, তুমি চঞ্চল হলে তো চলবে না; তোমায় থাকতে হবে অচলা হয়ে।

বিলু একটি কথাও বলিতে পারিল না।

দেবু হাসিয়া সবশেষে তাহাকে বুকে টানিয়া লইয়া প্রগাঢ় আবেগে একটি চুম্বন দিয়া ঘর থেকে বাহির হইয়া আসিল।

বাহিরে ছিল পদ্ম ও দূর্গা। দেবু বলিল—মিতেনী, তুমি রইলে, দূর্গা রইল; বিলুকে তোমরা একটু দেখো।

সে চণ্ডীমণ্ডপে আসিয়া বলিল—চলুন।

–ওয়েট! চণ্ডীমণ্ডপে নাটকীয়ভাবে প্রবেশ করিল হরেন ঘোষাল। তাহার হাতে একটি অতি সুন্দর গাঁদা ফুলের মালা। মালাখানি সে দেবুর গলায় পরাইয়া দিয়া উত্তেজিত আবেগে চিৎকার করিয়া উঠিল—জয়, দেবু ঘোষের জয়!

মুহূর্তে ব্যাপারটার চেহারা পাল্টাইয়া গেল।

দারোগা যাইবার জন্য ব্যস্ত হইয়া উঠিল। ফুলের মালা ও জয়ধ্বনিতে দেবুর পা হইতে মাথা পর্যন্ত একটা অদ্ভুত শিহরন বহিয়া গেল। বুকের মধ্যে যে ক্ষীণতম দুর্বলতার আবেগটুকু স্পন্দিত হইতেছিল—সেটুকুও আর রহিল না, তাহার পরিবর্তে ভাটার নদীর বুকে জোয়ারের মত একটা বিপরীতমুখী উচ্ছ্বসিত আবেগ আসিয়া তাহাকে স্ফীত প্রশস্ত করিয়া তুলিল। সঙ্গে সঙ্গে সমবেত জনতা দারোগা কনস্টেবলের উপস্থিতি সম্পর্কে সচেতন থাকিয়াও প্ৰতিধ্বনি তুলিল জয়, দেবু ঘোষের জয়। দৃঢ় দীর্ঘ পদক্ষেপে দেবু সম্মুখে অগ্রসর হইল।

লক্ষ্মীপূজার আয়োজন করিতে বিলুর হাত উঠিতেছিল না। এক-অন্ন পঞ্চাশ-ব্যঞ্জনে লক্ষ্মীর পূজা। এই বেদনা বুকে লইয়া সে-আয়োজন কেমন করিয়া কি করিবে সে; কাহার জন্য লক্ষ্মী পাতিবে। পুরুষকে আশ্ৰয় করিয়াই নারীর বাস, নারায়ণের পাশে লক্ষ্মীর আসন। দেবুই যখন আজ এই আয়োজনের মধ্যস্থলে উপস্থিত নাই, তখন—! বারবার তাহার চোখ ফাটিয়া জল আসিতেছিল।

কিন্তু রাঙাদিদি আসিয়া বলিল—ভাবিস না ভাই, পণ্ডিত ভাই আজই ফিরে আসবে। আর আমার পানে তাকিয়ে দেখ, তিনকুলে কেউ নাই, তবু তো পুজো করছি। তোর কোলে সোনার চাদ, দেবু আমার ফিরে আসছে—তোর পূজা না করলে চলে? দে, আমি বরং তোর লক্ষ্মী পেতে দিয়ে যাই। ওই চারদিকে শাঁখ বাজছে—লক্ষ্মী পাতা হয়ে গেল সব।

রাঙাদিদি কত বাহার করিয়া নিপুণ হাতে সাজাইয়া লক্ষ্মী পাতিয়া দিয়াছে। লাল রেশমি কাপড়ে এমন করিয়া ধান ও কড়িগুলি ঢাকিয়া দিয়াছে যে মনে হয় যেন ছোট্ট একটি বন্ধু সিংহাসনের উপর বসিয়া আছে।

পদ্ম দুই-তিনবার আসিয়াছিল। দূর্গা তো সকাল হইতে বসিয়াই আছে, নড়ে নাই। শ্ৰীহরির মা-বউও আসিয়াছিল।

মা মৌখিক তত্ত্ব করিয়া গিয়াছে; বউটি আনিয়াছিল একছড়া মর্তমান কলা, একটা থোড়, একটা মোচা-শ্ৰীহরির নূতন কাটানো পুকুরের পাড়ের ফসল। আর কতকগুলি মটরশুটি, একটা কপি, বাড়িতে লক্ষ্মীপূজা উপলক্ষে শ্ৰীহরি শহর হইতে আনাইয়াছে। বউটি বলিয়া গিয়াছে তুমি ভেবো না, শাশুড়ি! তোমার ভাসুর-পো সকালেই গিয়েছে হাকিমের সঙ্গে দেখা করতে। খুড়শ্বশুরকে সঙ্গে নিয়ে সে আজই ফিরে আসবে।

প্রায় প্রতি ঘরের মেয়েরা আসিয়া বিলুর তত্ত্ব লইয়া গিয়াছে। জগন ডাক্তারের স্ত্রী পাবার আসিয়াছে। হরিজনেরা জনে জনে আসিয়াছে। খেজুরগুড়ের মহলাদারটি খেজুরগুড় দিয়া গিয়াছে। সতীশ হইতে প্রত্যেকেই ছোট ছোট ঘটিতে কাঁচা দুধ আনিয়া দিয়া গিয়াছে। আর প্রয়োজন নাই বলিলে শোনে নাই, বোঝে নাই; উত্তরে বিষণ্ণ মুখে বলিয়াছে অপরাধ করলাম, মা?

দূর্গা বলিল—বিলু-দিদি, ক্ষীর করে রাখ।

বিলু বলিল—কি হবে বল দেখি? পচে যাবে তো।

—পচবে কেন? দেখ না, জামাই ঠিক ঘুরে আসছে।

কয়েকটি বাড়ির গুটিকয়েক কুমারী মেয়ে আসিয়া দাঁড়াইল। ঘড়া দাও, বউদিদি, জল এনে দি।

বিলুর ইহারা সম্পর্কে ননদ। বিলু মিষ্ট-হাসি হাসিয়া বলিল জল আমি এনেছি ভাই।

বিলু বলিল—বস, জল খাও।

–না। আমরা কাজ করতে এসেছি।

ইহাদের এই অকপট আত্মীয়তা বিলুর বড় ভাল লাগিল। এত আপনার জন তাহার আছে! মানুষ এত ভাল!

চণ্ডীমণ্ডপে তিলকুটো ভোগের ঢাক বাজিলে তবে মেয়ে কয়টি গেল। চণ্ডীমণ্ডপে আজও তিলকুটো সন্দেশে বাবা-শিব ও মা-কালীর ভোগ হইবে। ওখানে ভোগ হইলে, তবে বাড়িতে লক্ষ্মীর ভোগ হইবে। বাউরি-ডাম-মুচিদের ছেলেরা চণ্ডীমণ্ডপে ভিড় জমাইয়া বসিয়া আছে। একটুকরা তিলকুটোর জন্য। ইহার পর আবার বাড়ি বাড়ি পিঠা সাধিতে যাইবে।

বয়স্কেরা অনেকেই দেবুর জন্য সেটেলমেন্ট ক্যাম্পে গিয়াছিল। ফিরিল প্রায় একটার সময়। সকলেই গম্ভীর, চিন্তান্বিত। বিচার এখনও হয় নাই। তবে সবই বুঝা গিয়াছে। কিন্তু কি করিবে তাহারা? সকলের চেয়ে গম্ভীর শ্ৰীহরি। আমিন শ্ৰীহরিকে ডাকিয়া স্পষ্টই বলিয়াছে—দেবুর পক্ষ লইয়া যে সাক্ষী দিবে, তাহার সহিত বুঝাপড়া হইবে পরে। কারণ দেবু কিছুতেই ক্ষমা চাহিতে রাজি হয় নাই।

মুরব্বিরা পরামর্শ করিয়া ঠিক করিয়াছে—তাহার চেয়ে কোনো পক্ষেই সাক্ষ্য তাহারা দিবে না।

বাড়ি আসে নাই কেবল জনকয়েক, জগন ডাক্তার, অনিরুদ্ধ, হরেন ঘোষাল, দ্বারকা চৌধুরী, তারা নাপিত। তাহারা বাড়ি ফিরিল প্রায় সন্ধ্যার সময়—বিষণ্ন মুখে, মন্থর পদে। দূর্গা পথে দাঁড়াইয়া ছিল, সে প্রশ্ন করিল—কি হল ডাক্তারবাবু, চৌধুরীমশায়?

জগন বলিল—সমস্ত দিন বসিয়ে রেখে, সন্ধেবেলায় দিন ফেলে সদরে চালান দিলে! বদমায়েশি আর কি!

–চালান দিলে?

–হ্যাঁ। কালই যাব আমি সদরে, জামিনে পণ্ডিতকে খালাস করে আন।

কথাটা মিথ্যা। দেবুর এক বৎসর তিন মাস পনের মাসের মেয়াদে জেল হইয়াছে। কাল জগন সদরে যাইবে আপিল করিবার জন্য। দেবু কিন্তু আপিল করিতে বারণ করিয়াছে। সাক্ষীর অবস্থা দেখিয়া সে আপিলের ফলও আন্দাজ করিয়া লইয়াছে।

জগন গালিগালাজ করিয়াছিল গ্রামের লোককে। দ্বারকা চৌধুরী পর্যন্ত আত্মসংবরণ করিতে পারে নাই। বৃদ্ধ দন্তহীন মুখে কম্পিত অধরে বলিয়াছিল-ভগবান এর বিচার করবেন।

দেবু হাসিয়া বলিয়াছে—আপনি সেদিন যে গল্পটা বললেন—সেটা ভুলে গেলেন চৌধুরীমশাই? মানুষের ভুল-চুক পদে পদে, আর একটা কথা চৌধুরীমশায়, এরা আমার পক্ষে সাক্ষি না দিক, বিপক্ষেও তো দেয় নাই!

অনিরুদ্ধ চিৎকার করিয়া উঠিয়াছিল—দিলে মাথায় বজ্রাঘাত হত না?

জেলের কথাটা তাহারা চাপিয়া গেল; দেবুর স্ত্রীর কথা বিবেচনা করিয়াই প্ৰকাশ করিল না।

দূর্গা আসিয়া বিলুকে সংবাদ দিয়া বুলিল—তোমার কাছে আমার মা শোবে, বিলু-দিদি।

বিলু বলিল—তুই থাক্‌ না দুগ্‌গা, বেশ দুজনে গল্প করব। আমি ঘরে শোব, তুই বারান্দার দোরটিতে শুবি।

দূর্গা বলিল—না, বিলু-দিদি!

–কেন দূর্গা?

–আমার ভাই, নিজের বিছানা নইলে ঘুম হয় না।

বিলু আর অনুরোধ করিল না। ব্যাপারটা সে বুঝিল; একটু কেবল হাসিল, কিন্তু রাগ করিল না। মরিলেও নাকি মানুষের স্বভাব যায় না।

সমস্ত দিনটা কাটিল, কিন্তু সন্ধ্যা হইতে সময় আর কাটিতে চায় না। বিলু চুপ করিয়া বসিয়া ছিল। সে জেলে। সন্ধ্যায় গোটা গ্রামটায় শাঁখ বাজিয়া উঠিতে তাহার চমক ভাঙিল–ঘরে মা-লক্ষ্মী রহিয়াছেন, ধূপ-দীপ দিতে হইবে। মায়ের শীতল-ভোগের আয়োজন এখনও করা হয় নাই। দূর্গা যাইবার সময় বাড়ির রাখালটাকে ডাকিয়া গিয়াছিল, ঘোড়াটা প্রচুর পরিমাণে পিঠা খাইয়া কাপড় মুড়ি দিয়া একপাশে অঘোরে ঘুমাইতেছিল। বেচারির পেটটা ফুলিয়া বুকের চেয়েও উঁচু হইয়া উঠিয়াছে হসফাস করিতেছে। ছোঁড়াটাও আশপাশের বাড়ির শাঁখের শব্দে উঠিয়া বসিল, বলিল—সঁজ লেগে গেইচে লাগছে! মনিব্যান, সঁজ জ্বাল গো, শাঁখ বাজাও, ধূপপিদিম দাও।

দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া বিলু উঠিল। ছোঁড়াটা বসিয়া বসিয়া আপন মনেই কথা বলিতেছিল সবই মনিবের অর্থাৎ দেবুর কথা।

—মনিব এতক্ষণ বসে বসে আমাদের কথাই ভাবছে, লয় মনিব্যা?

বিলু চোখ মুছিল।

–আচ্ছা, মনিব্যান্‌! জেহেলে কি লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে রেখে দেয়? মনিব তা হলে কি করে শোবে?

আৰ্তস্বরে বিলু বলিল ওরে তুই আর বকিস্ না, থাম্।

ছোঁড়াটা অপ্রস্তুত হইয়া চুপ করিয়া গেল।

সন্ধ্যা-প্রদীপ, ধূপ, শীতল-ভোগ সাজাইয়া বিলু বলিল-আমার সঙ্গে আয় বাবা, খামারে গোয়ালে যাব-বলিতে বলিতেই মনে পড়িলঘুমন্ত শিশুর কথা; তাহার কাছে কে থাকিবে? অন্যদিন এই সময়টিতে থাকিত সে। বিলু একাই খামারে গোয়ালে, মরাইয়ের তলে জল দিয়া সন্ধ্যা দেখাইয়া আসিত। আজ সে নাই বলিয়া অকারণে তাহার ভয় করিতেছে, তাহার আকস্মিক সকরুণ অসহায় অবস্থা ক্ষণে ক্ষণে তাহাকে অভিভূত করিয়া ফেলিতেছে।

ছোঁড়াটা উঠিয়া বলিল—চল।

–কিন্তু খোকার কাছে থাকবে কে?

—আমি থাকছি। বলিয়া সে শুইয়া পড়িয়া বলিল—এত ভয় কিসের গো, মনিব্যান? যাও ক্যানে, কিরষেণ রইছে সব খামারে।

–কিষানরা রয়েছে?

–নাই? আমি যে হেথা রইছি, তারাই তো গরু ঢোকালে গোয়ালে। রেতে একজন থাকবে বাড়িতে শুয়ে। পালা করে রোজ একজন করে থাকবে। মনিব নাই, থাকবে না? আমিও থাকব মনিব্যান, একটি করে কাহিনী কিন্তুক বলতে হবে।

বিলু সন্ধ্যা দেখাইয়া ফিরিয়া আসিল—সঙ্গে সঙ্গে কৃষাণ দুই জন।

লক্ষ্মীর সিংহাসনের সম্মুখে ধূপ-দীপ, শীতল-ভোগ রাখিয়া প্ৰণাম করিয়া বিলু কামনা করিলওঁকে মানে মানে খালাস করে দাও, মা। ওঁর মঙ্গল কর। ঘরে আমার অচলা হয়ে বাস কর।

ছোঁড়াটা বলিল–মনিব্যান, সেই ক্ষীরের পিঠে আর আছে নাকি?

বিলু মৃদু হাসিয়া বলিল আছে।

–তবে তাই গণ্ডা দুয়েক দাও, আর কিছু খাব না রেতে।

–হ্যাঁ বাবা, তোমরা? বিলু প্রশ্ন করিল কৃষাণ দুই জনকে।

–দেন অল্প করে চারডি।

দুপুরবেলায় এক-একজন ভীমের আহার করিয়াছে। ইহাদের খাওয়াইতে বিলুর এত ভাল লাগে! দেবু নিজে ইহাদের খাওয়াইত। বিলু যোগাইয়া দিত, পরিবেশন করিত সে নিজে।

আবার অ্যাঁউরি-বাউরি দিয়া সব বাঁধিতে হইবে। মুঠ-লক্ষ্মীর ধানের খড়ের দড়িতে সমস্ত সামগ্রীতে বন্ধন দিতে হইবে। আজিকার ধন থাক, কালিকার ধন আসুক, পুরানে-নূতনে সঞ্চয় বাড়ুক। লক্ষ্মীর প্রসাদে পুরাতন অন্নে নূতন বস্ত্রে জীবন কাটিয়া যাক নিশ্চিন্তে নিৰ্ভাবনায়। অচলা হইয়া থাক মা, অচল হইয়া থাক।

শেষরাত্রে আর এক পর্ব। পৌষ-আগলানো পর্ব-এই পৌষ সংক্রান্তির রাত্রির শেষ প্রহর। পৌষ মাস যখন বিদায় লইয়া অন্ধকারের আবরণে পশ্চিম দিগন্তের মুখে পা বাড়ায়, পূর্ব দিগন্তে আলোক আভাসের পশ্চাতে মকর রাশিস্থ সূর্যের রথের সঙ্গে উদয় হয় মাঘের প্রথম দিন তখন কৃষক-বনিতারা পৌষকে বন্দনা করিয়া সনির্বন্ধ অনুরোধ করে—পৌষ তুমি যাইও না। চিরদিন তুমি থাক।

চণ্ডীমণ্ডপের আটচালায় পৌষ-আগলানো হইয়া থাকে।

ভোররাত্রে ঘরে ঘরে লোক জাগিয়া উঠিয়াছে, গ্রামময় মানুষের সাড়া। শাখও বাজিতেছে।

বিলুও উঠিল। ছেলেটিও জাগিয়াছিল—তাহাকে কাপড় জড়াইয়া রাখাল-ছেলেটার কোলে দিয়া বিলু পূজার আয়োজন করিতে বসিল।

–ও ভাই, পণ্ডিত-বউ! সব হল তোমার? এস!

ডাকিতেছিল পদ্ম।

বিলু দুয়ার খুলিয়া দিল।এই হয়েছে। ধূপের আগুন হলেই হয়, চল যাই।

উনানের কাঠ জ্বলিতেছিল; পদ্ম দাঁড়াইয়া রহিল, ধূপদানিতে আগুন তুলিয়া লইয়া বিলু বলিল—চল।

রাখাল-ছেলেটা লইল হারিকেন। বাড়িতে কৃষাণেরা রহিল। দূর্গার মা শুইয়াই রহিল–সে ওঠে নাই। বাড়ি হইতে বাহির হইয়াই রাখালটা চমকিয়া উঠিল, জিজ্ঞাসা করিল—কে?

—কে রে? পদ্ম জিজ্ঞাসা করিল।

ছোঁড়াটা আলোটা তুলিয়া ধরিয়া বলিল–দুগ্‌গা দিদি বটে।

লণ্ঠনের আলোটা দূর্গার উপর পড়িল পরিপূর্ণভাবে, পরনে পাটভাঙা খয়ের রঙের তাঁতের শাড়ি, চুলের পারিপাট্যও চমৎকার, কপালে টিপ; কিন্তু সমস্তই বিশৃঙ্খল—বিপর্যস্ত। সে যেন হাঁপাইতেছিল—চোখের দৃষ্টি যেন উদভ্ৰান্ত।

আলোর দিকে পরিপূর্ণভাবে ফিরিয়া দাঁড়াইল। এতটুকু লজ্জা করিল না, সে বলিল—মিছে। কথা বিলু-দিদি, মিছে কথা। পণ্ডিত জামাইয়ের পনের মাসের মেয়াদ হয়ে গিয়েছে! বলিতে বলিতে সে ফুঁপাইয়া কাঁদিয়া উঠিল।

বিলু হতবাক হইয়া পাথরের মত দাঁড়াইয়া রহিল।

দূর্গা গিয়াছিল নৈশ অভিসারে। কঙ্কণায় সেটেলমেন্ট ক্যাম্পে। আমিন, পিয়ন, এমনকি কানুনগোদের মধ্যেও দুই-এক জন, স্থানীয় দুৰ্গা-শ্রেণীর নারীদের ওপর গোপনে অনুগ্রহ করিয়া থাকে। পেশকারটি আবার এ বিষয়ে সকলের সেরা, দূর্গার কাছে কয়েকদিনই সে অনুগ্রহের আহ্বান পাঠাইয়াছিল, কিন্তু দূর্গা যায় নাই। আজ সে গিয়াছিল নিজে। বলিয়াছিল, পণ্ডিতকে কিন্তু হাকিমকে বলে-কয়ে ছাড়িয়ে দিতে হবে।

পেশকার বলিয়াছিল—আচ্ছা; কাল সকালে।

ভোরবেলায় আসিবার সময় দূর্গার ভুল ভাঙিয়া দিয়াছে—তাহার অনুগ্রহপ্রার্থী পেশকারের প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ একজন পিয়ন।

দূর্গা আর দাঁড়াইল না, চলিয়া গেল। সে মনে মনে বাছিতেছিল—আপনার সগোত্ৰাদের মধ্যে একটি বাহ্যশ্রীময়ী অথচ ব্যাধিযুক্তা সখী।

ওদিকে তখন চণ্ডীমণ্ডপে মেয়েদের সমস্বরে ধ্বনি উঠিতেছিল—পৌষ-বন্দনার, পৌষবন্ধনের।

পৌষ—পৌষ–সোনার পৌষ।
এস পৌষ যেয়ো না—জন্ম জন্ম ছেড়ে না।
না যেয়ো ছাড়িয়ে পৌষ–না যেয়ো ছাড়িয়ে,
স্বামী-পুত্ৰ ভাত খাবে কটোরা ভরিয়ে।


পৌষ–পৌষ—সোনার পৌষ,
বড় ঘরের মেঝেয় বোস,
বড় ঘরের মেঝে ভরে–বাহান্ন হোস!
সোনার পৌষ।…

পদ্ম তাহার কধে হাত দিয়া ডাকিল—এস ভাই!

বিলু স্বপ্নোত্থিতের মত বলিল—চল।

কি করিবে? উপায় কি? যাইবার সময় সে বলিয়া গিয়াছে—খোকার ভার তোমার ওপর রহিল, আরও রহিল ঘর-দুয়ার-মরাইগরু-বাছুর-ধান-জমি—সবের ভার। তুমি আমার ঘরের লক্ষ্মী, তুমি চঞ্চল হইলে চলিবে না। সর্ব-অবস্থায় অচলা হইয়া থাকিতে হইবে তোমাকে।

তাই থাকিবে সে, তাই থাকিবে। তাহার ঘরের সোনার পৌষ চলিয়া যাইতেছে, তাহাকে পূজা করিয়া বাঁধিতে হইবে। না যেয়ো ছাড়িয়ে পৌষনা যেয়ো ছাড়িয়ে! পনের মাস পরে তো সে ফিরিয়া আসিবে। তখন তাহাকে যে পঞ্চাশ ব্যঞ্জন দিয়া কটোরা ভরিয়া অন্ন সাজাইয়া দিতে হইবে!


আঠারো



দেখতে দেখতে এক বৎসরেরও বেশী সময় চলিয়া গেল। এক পৌষ-সংক্রান্তি হইতে আর এক পৌষ-সংক্রান্তিতে এক বৎসর পূর্ণ হইয়া মাঘ-ফাল্গুন আরও দুটি মাস কাটিয়া গেল। সেদিন চৈত্র মাসের পাঁচ তারিখ। দেবু ঘোষ জংশন স্টেশনে নামিল। শীর্ণ ময়ূরাক্ষী পার হইয়া শিবকালীপুরের ঘাটে উঠিয়া সে একবার দাঁড়াইল। দীর্ঘ এক বৎসর তিন মাস কারাদণ্ড ভোগ শেষ করিয়া সে আজ বাড়ী ফিরিতেছে। পনেরো মাসের মধ্যে কয়েকদিন সে মকুব পাইয়াছে। এতক্ষণে আপনার গ্রামখানির সীমানায় পদার্পণ করিয়া যেন পরিপূর্ণ মুক্তির আস্বাদ সে অনুভব করিল।

ওই তাহার গ্রাম শিবকালীপুর, তাহার পরই মহাগ্রাম। পশ্চিমে শেখপাড়া কুসুমপুর, তাহার পশ্চিমে ওই দালান-কোঠায় ভরা কঙ্কণা, একেবারে পূর্বে ওই দেখুড়িয়া। আর দক্ষিণে ময়ূরাক্ষীর ওপারে জংশন। শেখপাড়া কুসুমপুরের মসজিদের উঁচু সাদা থামগুলি সবুজ গাছপালার ফাঁক দিয়া দেখা যাইতেছে। শিবকালীপুরের পূর্বে—ওই মহাগ্রামে—ন্যায়রত্ন মহাশয়ের বাড়ী। মহাগ্রামের পূর্বে ওই দেখুড়িয়া। দেখুড়িয়ার খানিকটা পূর্বে ময়ূরাক্ষী একটা বাঁক ফিরিয়াছে। ওই বাঁকের উপর ঘন সবুজ গাছপালার মধ্যে বন্যায় নিশ্চিহ্ন ঘোষপাড়া মহিষডহর।

ঘাট হইতে সে ময়ূরাক্ষীর বন্যারোধী বাঁধের উপর উঠিল। চৈত্র মাসের বেলা দশটা পার হইয়া গিয়াছে, ইহারই মধ্যে বেশ ‘খরা’ উঠিয়াছে। বিস্তীর্ণ শস্যক্ষেত্র এখন প্রায় রিক্ত। গম, কলাই, যব, সরিষা, রবিশস্য প্রায়ই ঘরে উঠিয়াছে। মাঠে এখন কেবল কিছু তিল, কিছু আলু এবং কিছু কিছু রবি-ফসলও রহিয়াছে। তিলই এ সময়ের মোটা ফসল; গাঢ় সবুজ সতেজ গাছগুলি পরিপূর্ণরূপে বাড়িয়া উঠিয়াছে। এইবার ফুল ধরিবে।

চৈত্রলক্ষ্মীর কথা দেবুর মনে পড়িল।—এই তিলফুল তুলিয়া মা-লক্ষ্মী, তাই চাষী ব্রাহ্মণের ঘরে কর্ণাভরণ করিয়া পরিয়াছিলেন। তাঁহাকে আসিতে হইয়াছিল তিলফুলের ঋণ শোধ দিতে। বেগুনি রঙের তিলফুলগুলির অপূর্ব গঠন! মনে পড়িল 'তিলফুল জিনি নাসা'।

আজ এক বৎসরেরও অধিক কাল সে জেলখানায় ছিল, সেখানে ভাগ্যক্রমে জনকয়েক রাজবন্দীর সাহচর্য সে কিছুদিনের জন্য লাভ করিয়াছিল। ওই লাভের সম্পদ-কল্যাণেই তাহার বন্দীজীবন পরম সুখে না হোক প্রচুর আনন্দের মধ্যে কাটিয়া গিয়াছে। দেহ তাহার ক্ষীণ হইয়াছে, ওজনে সে প্রায় সাত সের কমিয়া গিয়াছে কিন্তু মন ভাঙে নাই। মুক্তি পাইয়া আপনার গ্রামের সম্মুখে আসিয়াও সাধারণ মানুষের মত অধীর-আনন্দে ছুটিয়া বা দ্রুতপদে চলিতেছিল না। সে একবার দাঁড়াইল। চারিদিকে ভাল করিয়া দেখিয়া লইল। শিবকালীপুর স্পষ্ট দেখা যাইতেছে। আম, কাঁঠাল, জাম, তেঁতুল গাছগুলির উঁচু মাথা নীল আকাশ-পটে আঁকা ছবির মত মনে হইতেছে। দুলিতেছে কেবল বাঁশের ডগাগুলি। ওই মৃদু দোল খাওয়া বাঁশগুলির পিছনে তাদের ঘর। গাছের ফাঁকে ফাঁকে কতকগুলি ঘর দেখা যাইতেছে।

এদিক বাউড়ী-পাড়া বায়েন-পাড়া; ওই বড়গাছটি ধর্মরাজতলার বকুলগাছ। ছোট ছোট কুঁড়েঘরগুলির মধ্যে ওই বড় ঘরখানা দূর্গার কোঠা-ঘর। দূর্গা! আহা দূর্গা বড় ভাল মেয়ে। পূর্বে সে মেয়েটাকে ঘৃণা করিত, মেয়েটার গায়েপড়া ভাব দেখিয়া বিরক্তি ভাব প্রকাশ করিত। অনেকবার রূঢ় কথাও বলিয়াছে সে দূর্গাকে। কিন্তু তাহার অসময়ে, বিপদের দিনে দূর্গা দেখা দিল এক নূতন রূপে। জেলে আসিবার দিন সে তাহার আভাসমাত্র পাইয়াছিল। তারপর বিলুর পত্রে জানিয়াছে অনেক কথা। অহরহ—উদয়াস্ত দূর্গা বিলুর কাছে থাকে, দাসীর মত সেবা করে, সাধ্যমত সে বিলুকে কাজ করিতে দেয় না, ছেলেটাকে বুকে করিয়া রাখে। স্বৈরিণী বিলাসিনীর মধ্যে এ রূপ কোথায় ছিল—কেমন করিয়া লুকাইয়া ছিল?

ওই যে বড় ঘরের মাথাটা দেখা যাইতেছে—ওটা হরিশ-খুড়ার ঘর; তারপরেই ভবেশ দাদার বাড়ী, সেটা দেখা যায় না। ওই যে ওধারের টিনের ঘরের মাথা রৌদ্রে ঝকমক করিতেছে—ওটা শ্রীহরির ঘর। শ্রীহরির ঘরের পরেই সর্বস্বান্ত তারিণীর ভাঙা ঘর। তারপর পথের একপাশে গ্রামের মধ্যস্থলে চণ্ডীমণ্ডপ। তারপর হরেন ঘোষালের বাড়ী; ঠিক বাড়ী নয়, হরেন ঘোষাল বলে—'ঘোষাল হাউস'। ঘোষাল বিচিত্রচরিত্র। তাহার বাহিরের ঘরের দরজায় লেখা আছে 'পার্লার', একটা ঘরে লেখা আছে 'স্টাডি'। দেবু ঘোষালের সেই গাঁদা মালার কথা জীবনে কোনদিন ভুলিতে পারিবে না। ঘোষালের সম্পূর্ণ পরিচয় সে জানে। ম্যাট্রিক পাস করিলেও মূর্খ ছাড়া সে কিছু নয়; ভীরু, কাপুরুষ সে, ব্রাহ্মণ হইয়াও সে পাতু বায়েনের স্ত্রীর প্রতি আসক্ত। কিন্তু সেদিন ঘোষালকে তাহার মনে হইয়াছিল যেন সত্যকালের ব্রাহ্মণ। তাহার মালাকে সে পবিত্র আশীর্বাদ বলিয়া গ্রহণ করিয়াছিল, ওই আশীর্বাদই তাহাকে সেই যাত্রার মুহূর্তে অদ্ভুত বল দিয়াছিল। জেলের মধ্যেও বোধ হয় ওই আশীর্বাদের বলেই রাজবন্দী বন্ধুদিগকে পাইয়াছিল।

বন্ধু কে নয়? বিলুর পত্রে সে পরিচয় পাইয়াছে, তাহাদের গ্রামের মানুষগুলির প্রতিটি জনই যেন দেবতা। তাহার মনে পড়িল একটি প্রবাদ—গাঁয়ে মায়ে সমান কথা। হ্যাঁ—মা! এই পল্লীই তাহার মা! সে নত হইয়া পথের ধূলা মাথায় তুলিয়া লইল।

আরও খানিকটা অগ্রসর হইয়া নজরে পড়িল—পলাশ গাছে ফুল ধরিয়াছে, লাল টকটকে ফুল। একটি বাড়ীর চালের মাথায় অজস্র সজিনার ডাঁটা ঝুলিয়া আছে। গ্রামের উত্তর প্রান্তে দীঘির পাড়ের রিক্তপত্র শিমুল গাছটিতেও লাল রঙের সমারোহ। তাহারই পাশে একটা উঁচু তালগাছের মাথায় বসিয়া আছে একটা শকুন। এখন স্পষ্ট দেখা যাইতেছে—জগন ডাক্তারের খিড়কির বাঁশঝাড়ের একটা নুইয়া-পড়া বাঁশের উপর সারবন্দী একদল হরিয়াল বসিয়া আছে; সবুজ ও হলুদের সংমিশ্রণে পাখীগুলির রংও যেন অপূর্ব, ডাকও তেমনি মধুর;—জলতরঙ্গ বাজনার ধ্বনির মত। বাতাসে এইবার গ্রামের নাবি আম গাছগুলির মুকুলের গন্ধ ভাসিয়া আসিতেছে। চৈত্র মাসে সকল আম গাছেই আম ধরিয়া গিয়াছে; শুধু চৌধুরীদের পুরানো খাস আমবাগানের গাছে চৈত্র মাসে মুকুল ধরে; এ গন্ধ চৌধুরীর বাগানের মুকুলের গন্ধ।

—পণ্ডিত মশায়!

কিশোর কণ্ঠের সবিস্ময় আনন্দ-ধ্বনি শুনিয়া ফিরিয়া চাহিয়া দেবু দেখিল—অদূরবর্তী পাশের আলপথ ধরিয়া আসিতেছে কালীপুরের সুধীর, দ্বারকা চৌধুরীর নাতি, বড় ছেলের ছেলে। পাঠশালায় তাহার ছাত্র ছিল।

দেবু হাসিয়া সস্নেহে বলিল—সুধীর? ভাল আছিস?

সুধীর ছুটিয়া কাছে আসিয়া তাহাকে প্রণাম করিল।—আপনি ভাল ছিলেন স্যার? এই আসছেন বুঝি?

—হ্যাঁ। এই আসছি। তুমি স্কুলে যাচ্ছ বুঝি কঙ্কণায়?

—হ্যাঁ। আপনার বাড়ীর সকলে ভাল আছে, পণ্ডিতমশায়। খোকা খুব কথা বলে এখন। আমরা যাই কিনা প্রায়ই বিকেলে, খোকাকে নিয়ে খেলা করি।

দেবু গভীর আনন্দে যেন অভিভূত হইয়া গেল। ছেলেরা তাহাকে এত ভালবাসে!

—পাঠশালার নুতন বাড়ী হয়েছে স্যার।

—তাই নাকি?

—হ্যাঁ, বেশ ঘর, তিনখানা কুঠরী! নতুন পালিশ-করা চেয়ার-টেবিল হয়েছে স্যার। —ইহার পর সে ঈষৎ কুণ্ঠিতভাবেই প্রশ্ন করিল—আর তো আপনি স্কুলে পড়াবেন না স্যার?

দেবু একটা গভীর দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিল—না সুধীর, আমি আর পড়াব না। নতুন মাস্টার এখন কে হয়েছে?

—কঙ্কণার বাবুদের নায়েবের ছেলে। ম্যাট্রিক পাস, গুরু-ট্রেনিংও পাস করেছেন। কিন্তু আপনি কেন?

সুধীরের কথা শেষ হবার পূর্বেই ওদিক হইতে আগন্তুক একজন খুব অল্পবয়সী ভদ্রলোক সুধীরকে ডাকিয়া বলিল—খোকা বুঝি ইস্কুলে যাচ্ছ? দেখি, তোমার খাতা আর পেন্সিলটা একবার দেখি।

সুধীর খাতা-পেন্সিল বাহির করিয়া দিল। এ ছেলেটি—হ্যাঁ—ভদ্রলোক অপেক্ষা ইহাকে ছেলে বলিলেই বেশী মানায়। কে এ ছেলেটি? বয়স বোধ হয় আঠার-উনিশ বৎসর। চোখে চশমা গায়ে একটা ফর্সা পাঞ্জাবি; এখানকার লোক নিশ্চয়ই নয়। সুন্দর ধারাল চেহারা। সুধীর অবশ্য ভদ্রলোকটিকে চেনে। কিন্তু ভদ্রলোকের সামনে দেবু তাহার পরিচয় জিজ্ঞাসা করিতে পারিল না। অন্য প্রসঙ্গই উত্থাপন করিল—চৌধুরী মশায়—তোমার ঠাকুরদা ভাল আছেন?

—হ্যাঁ। তিনি আপনার কত নাম করেন!

দেবু হাসিল। চৌধুরীকে সে বরাবরই শ্রদ্ধা করে, চমৎকার মানুষ। তিনি তাহার নাম করেন? দেবুর আনন্দ হইল। সে আবার প্রশ্ন করিল—বাড়ীর আর সকলে?

—সবাই ভাল আছেন। কেবল আমার একটি ছোট বোন মারা গিয়েছে।

—মারা গিয়েছে?

—হ্যাঁ। বেশী বড় নয়, এই এক মাসের হয়ে মারা গিয়েছে।

ভদ্রলোকটি এইবার খাতা ও পেন্সিল সুধীরকে ফেরত দিল, হাসিয়া বলিল—বল তো সংখ্যা কত?

সুধীর সংখ্যাটার দিকে চাহিয়া বিব্রত হইয়া পড়িল। দেবুও দেখিল—বিরাট একটা সংখ্যা। কয়েক লক্ষ বা হাজার কোটি।

ভদ্রলোকটি হাসিয়া সুধীরকে বলিল—পারলে না? বাইশ হাজার আট শো ছিয়ানব্বই কোটি, চৌষট্টি লক্ষ, ঊননব্বই হাজার।

সবিস্ময়ে সুধীর প্রশ্ন করিল—কি?

—টাকা।

—টাকা!

—হ্যাঁ। ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকার খনি থেকে আর কলকারখানা থেকে এক বছরের উৎপন্ন জিনিসের দাম।

সুধীর হতবাক হইয়া গেল। বিমূঢ় হইয়া তাহার মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। দেবুও বিস্মিত হইয়া গিয়াছিল, কে এই অদ্ভুত ছেলেটি!

ভদ্রলোকটি সুধীরের পিঠের উপর সস্নেহে কয়েক চাপড় মারিয়া বলিল—আচ্ছা যাও, স্কুলের দেরি হয়ে যাচ্ছে! তারপর দেবুর দিকে চাহিয়া বলিল—আপনি বুঝি এদের বাড়ী যাবেন? চৌধুরী মশায়ের বাড়ী?

দেবু আরও বিস্মিত হইয়া গেল—ভদ্রলোক চৌধুরীকেও চেনেন দেখিতেছি! বলিল—না। আমি যাব শিবপুর।

—কার বাড়ী যাবেন বলুন তো?

—আপনি কি সকলকে চেনেন? দেবু ঘোষকে জানেন?

বেশ সম্ভ্রমের সহিত যুবকটি বলিল—তাঁর বাড়ী চিনি, তাঁর ছোট খোকাটিকেও চিনি, কিন্তু তাঁকে এখনও দেখি নি! আমি আসবার আগেই তিনি জেলে গিয়েছেন। শীগগির তিনি আসবেন বেরিয়ে।

সুধীর বলিল—উনিই আমাদের পণ্ডিতস্যার।

—আপনি! —ছেলেটির চোখদুটি আনন্দের উত্তেজনায় প্রদীপ্ত হইয়া উঠিল; দুই হাত মেলিয়া সাগ্রহে দেবুকে জড়াইয়া ধরিয়া সে বলিল—উঃ, আপনি দেবুবাবু! আসুন আসুন—বাড়ী আসুন।

দেবু প্রশ্ন করিল—আপনি? আপনার পরিচয় তো—

চোখ বড় করিয়া সম্ভ্রমের সহিত সুধীর বলিল—উনি এখানে নজরবন্দী হয়ে আছেন স্যার।

—এখানে রেখেছে আমাকে। অনিরুদ্ধ কর্মকার মশায়ের বাড়ীর বাইরের ঘরটায় থাকি। সুধীর, তুমি দৌড়ে যাও, ওঁর বাড়ীতে খবর দাও, গ্রামে খবর দাও। ওয়ান-টু-থ্রি। পু—ভস্-ভস্—ঝিক-ঝিক—! ধর মেল ট্রেন—তুফান মেলে চলেছ তুমি!

মুহূর্তে সুধীর তীরের মত ছুটিল।

হাসিয়া ভদ্রলোকটি বলিল—বুঝতে পারছেন বোধ হয়, এখানে ডেটিনিউ হয়ে আছি আমি।

গ্রামে ঢুকিবার মুখেই ক্ষুদ্র একটি জনতার সঙ্গে দেখা হইল। জগন, হরেন, অনিরুদ্ধ, তারিণী, গণেশ আরও কয়েকজন। চণ্ডীমণ্ডপে ছিল অনেকেই—শ্রীহরি, ভবেশ প্রমুখ প্রবীণগণ। সকলেই তাহাকে সাদরে সস্নেহে আহ্বান করিল—এস, এস বাবা এস বস'!

দেবু চণ্ডীমণ্ডপে প্রণাম করিল, সমস্ত গুরুজনদিগকে প্রণাম করিল; শ্রীহরি পর্যন্ত আজ তাহাকে খাতির করিল। দেবু সম্বন্ধে খুড়া হইলেও শ্রীহরি বয়সে অনেক বড়। তাহার উপর অবস্থাপন্ন ব্যক্তি হিসাবে শ্রীহরি প্রণামের খাতির বড়-একটা কাহাকেও দেয় না। সেই শ্রীহরিও আজ তাহাকে প্রণাম করিল।

চণ্ডীমণ্ডপের খানিকটা দূরে ওই যে তাহার বাড়ী। দাওয়ার সম্মুখেই ওই যে শিউলি ফুলের গাছটি। ওই যে সব ভিড় করিয়া কাহারা দুয়ারে দাঁড়াইয়া আছে।

তাহার বাড়ীর দুয়ারে দাঁড়াইয়া ছিল গ্রামের মেয়েরা। দুইটি কুমারী মেয়ের কাঁধে দুটি পূর্ণ-ঘট। দেবু অভিভূত হইয়া গেল। তাহাকে বরণ করিয়া লইবার জন্য গ্রামবাসীর এ কি গভীর আগ্রহ—এ কি পরমাদরের আয়োজন! সহসা শঙ্খধ্বনিতে আকৃষ্ট হইয়া দেখিল, একটি দীর্ঘাঙ্গী মেয়ে শাঁখ বাজাইতেছে। দেবু তাহাকে চিনিল, সে পদ্ম।

বাড়ীতে ঢুকিতেই তাহার পায়ের কাছে খোকাকে নামাইয়া ঢিপ করিয়া প্রণাম করিল দূর্গা!

আবক্ষ ঘোমটা দুয়ারের বাজুতে ঠেস দিয়া দাঁড়াইয়া ছিল বিলু। খোকাকে কোলে লইয়া দেবু বিলুর দিকে চাহিল। বুড়ী রাঙাদিদি তাহার হাত ধরিয়া টানিয়া বলিল—ই ঘোড়ার কোন আক্কেল নাই। পণ্ডিত না মুণ্ডু! আগে ই দিকে আয়। বদ-রসিক কোথাকার!

—ছাড়, রাঙাদিদি, পেণাম করি।

—পেণাম করতে হবে না রে ছোঁড়া। —বৃদ্ধা তাহাকে হিড় হিড় করিয়া টানিয়া ঘরের ভিতর লইয়া গেল। তারপর বিলুকে টানিয়া আনিয়া বলিল—এই নে।

তারপর সমবেত মেয়েদের দিকে চাহিয়া বলিল—চল গো সব, এখন বাড়ী চল। চল চল। নইলে গাল দোব কিন্তু।

সকলে হাসিতে হাসিতেই চলিয়া গেল। বিলুর হাত ধরিয়া সস্নেহে সে ডাকিল—বিলু-রাণী!

বিলুর মুখে-চোখে জলের দাগ, চোখ দুটি ভারী। চোখ মুছিয়া সে হাসিয়া বলিল—দাঁড়াও, পেণাম করি।

—মনিবমশায়! —আকৰ্ণ বিস্তার হাসি হাসিয়া সেই মুহূর্তে রাখাল ছোঁড়াটা আসিয়া দাঁড়াইল। ছোঁড়াটা হাঁপাইতে হাঁপাইতে বলিল, মাঠে শোনলাম—এক দৌড়ে চলে আইচি। —সে ঢিপ করিয়া একটা প্রণাম করিল।

—পণ্ডিতমশায় কই গো! —এবারে আসিল সতীশ বাউড়ী, তাহার সঙ্গে তাহার পাড়ার লোকেরা সবাই।

আবার ডাক আসিল,—কোথা গো পণ্ডিতমশায়।

এ ডাক শুনিয়া দেবু ব্যস্ত হইয়া উঠিল,—বৃদ্ধ দ্বারকা চৌধুরীর গলা।

দেবুর জীবনে এ দিনটি অভূতপূর্ব। এই দুঃখ-দারিদ্র্য-জীর্ণ নীচতায়-দীনতায় ভরা গ্রামখানির কোন্ অস্থিপঞ্জরের আবরণের অন্তরালে লুকানো ছিল এত মধুর, এত উদার স্নেহ-মমতা! বিলুকে সে বলিল—আসি বাইরে থেকে। চৌধুরী মশায় এসেছেন। সুখের মধ্যে মানুষকে চিনতে পারা যায় না, বিলু। দুঃখের দিনেই মানুষকে ঠিক বোঝা যায়। আগে মনে হ’ত এমন স্বার্থপর নীচ গ্রাম আর নাই!

বিলু হাসিয়া বলিল—কত বড়লোক তুমি, ভালবাসবে না লোকে? জান, তুমি জেলে যাওয়ার পর জরিপের আমিন, কানুনগো, হাকিম কেউ আর লোককে কড়া কথা বলে নাই, 'আপনি' ছাড়া কথা ছিল না। পাঁচখানা গাঁয়ের লোক তোমার নাম করেছে। দুহাত তুলে আশীর্বাদ করেছে।

এক বৎসরের মধ্যে অনেক কিছু ঘটিয়া গিয়াছে। গ্রামের প্রতি জনে আসিয়া একে একে একবেলার মধ্যেই সব জানাইয়া দিল। জগন খবর দিল, সঙ্গে সঙ্গে হরেন ঘোষাল সায় দিল—কিছু কিছু সংশোধনও করিয়া দিল।

গ্রামে প্রজা-সমিতি হইয়াছে, ঐ সঙ্গে একটি কংগ্রেস-কমিটিও স্থাপিত হইয়াছে। জগন প্রেসিডেন্ট, হরেন সেক্রেটারী।

হরেন বলিল—কথা আছে, তুমি এলেই তুমি হবে একটার প্রেসিডেন্ট, যেটার খুসী। আমি বলি, তুমি হও কংগ্রেস-কমিটির প্রেসিডেন্ট। ডেটিনিউ যতীনবাবু বলেন—না, দেবুবাবু হবেন প্রজা-সমিতির প্রেসিডেন্ট।

—ছিরে পাল এখন গণ্যমান্য লোক। একটা গুড়গুড়ি কিনেছে, চণ্ডীমণ্ডপে শতরঞ্জি পেতে একটা তাকিয়া নিয়ে বসে। বেটা আবার গোমস্তা হয়েছে, গাঁয়ের গোমস্তাগিরি নিয়েছে। একে মহাজন, তার পর হ'ল গোমস্তা, সর্বনাশ করে দিলে গাঁয়ের!

জমিদারের এখন অবস্থা খারাপ, শ্রীহরির টাকা আছে, আদায় হোক না হোক, সমস্ত টাকা শ্রীহরি দিবে—এই শর্তে জমিদার শ্রীহরিকে গোমস্তাগিরি দিয়াছে। শ্রীহরি এখন এক ঢিলে দুই পাখী মারিতেছে। বাকী-খাজনার নালিশের সুযোগে লোকের জমি নীলামে তুলিয়া আপন প্রাপ্য আদায় করিয়া লইতেছে সুদে-আসলে। সুদ-আসল আদায় হইয়াও আরও একটা মোটা লাভ থাকে।

গণেশ পালের জোত নীলাম হইয়া গিয়াছে, কিনিয়াছে শ্রীহরি, এখন গণেশের অবশিষ্ট শুধু কয়েক বিঘা কোফা জমি।

সর্বস্বান্ত তারিণীর ভিটাটুকুও শ্রীহরি কিনিয়াছে, এখন সেটা উহার গোয়ালবাড়ীর অন্তর্ভুক্ত। তারিণীর স্ত্রীটা সেটেলমেন্টের একজন পিয়নের সঙ্গে পলাইয়া গিয়াছে। তারিণী মজুর খাটে, ছেলেটা থাকে জংশনে, স্টেশনে ভিক্ষা করে।

পাতু মুচীর দেবোত্তর চাকরান জমি উচ্ছেদ হইয়া গিয়াছে। তাহার জন্য নালিশ-দরবার করিতে হয় নাই, সেটেলমেন্টেই সে-জমি জমিদারের খাস খতিয়ানে উঠিয়া গিয়াছে। পাতু নিজেই স্বীকার করিয়াছিল, সে এখন আর বাজায় না, বাজাইতেও চায় না।

অনিরুদ্ধের জমি নীলামে চড়িয়াছে। অনিরুদ্ধ এখন মদ খাওয়া ভবঘুরের মত বেড়ায় দূর্গার ঘরেও মধ্যে মধ্যে যায়। তাহার স্ত্রীও পাগলের মত হইয়া গিয়াছিল। এখন অনেকটা সুস্থ। দূর্গার যোগাযোগেই দারোগা ডেটিনিউ রাখিবার জন্য অনিরুদ্ধের ঘরখানা ভাড়া লইয়াছে। ওই ভাড়ার টাকা হইতেই এখন তাহাদের সংসার চলে।

দেবু বলিল—কামার-বউকে আজ দেখলাম শাঁখ বাজাচ্ছিল।

জগন বলিল—হ্যাঁ, এখন একটু ভাল আছে। একটু কেন, যতীনবাবু আসার পর থেকেই বেশ একটু ভাল আছে। —ঠোঁট বাঁকাইয়া সে একটু হাসিল।

হরেন চাপা গলায় বলিল—মেনি মেন সে—বুঝলে কিনা—যতীনবাবু এ্যান্ড কামার-বউ—

দেবু বিশ্বাস করিতে পারিল না, সে তিরস্কার করিয়া উঠিল—ছিঃ হরেন। কি যা-তা বলছ!

—ইয়েস, আমিও তাই বলি, এ হতে পারে না। যতীনবাবু কামার-বউকে 'মা' বলে। —তারপর আবার সে বলিল—যতীনবাবু কিন্তু বড্ড চাপা লোক। বোমার ফরমুলা কিছুতেই আদায় করতে পারলাম না।

হরিশ এবং ভবেশ আসায় তাদের আলোচনা বন্ধ হইল, কিছুক্ষণ পরে সে উঠিয়া গেল।

হরিশ বলিল—বাবা দেবু, সন্ধ্যেবেলায় একবার চণ্ডীমণ্ডপে যেয়ো। ওখানেই এখন আমরা আসি তো। শ্রীহরি বসে পাঁচজনকে নিয়ে। আলো, পান, তামাক সব ব্যবস্থাই আছে। শ্রীহরি এখন নতুন মানুষ। বুঝলে কিনা!

ভবেশ বলিল—হ্যাঁ। দুবেলা চায়ের ব্যবস্থা পর্যন্ত করেছে আমাদের শ্রীহরি। বুঝেছ কিনা?

দেবু তাদের নিকট হইতে আরো অনেক খবর শুনিল।

গ্রামের পাঁচজনকে লইয়া উঠিবার বসিবার সুবিধার জন্যই শ্রীহরি পৃথক পাঠশালা ঘরের ব্যবস্থা করিয়া দিয়াছে। জমিদার তরফ হইতে জায়গার ব্যবস্থা করিয়া দিয়াছে সে-ই। ইউনিয়ন বোর্ডের মেম্বার সে, সে-ই দেওয়ালের খরচ মঞ্জুর করাইয়াছে। নিজে দিয়াছে নগদ পঁচিশ টাকা। তা ছাড়া চালের কাঠ, খড়, দরজা-জানলার কাঠও সে দিয়াছে শ্রীহরি।

দুই বেলা এখন চণ্ডীমণ্ডপে মজলিস বসে দেখিয়া শ্রীহরির বিপক্ষ দলের লক্ষ্মীছাড়ারা হিংসায় পাটু-পাটু হইয়া গেল। তাহারা নানা নিন্দা রটনা করে। কিন্তু তাহাতে শ্রীহরির কিছু আসে যায় না। তাহার গোমস্তাগিরির অসুবিধা করিবার জন্যই তাহারা প্রজা-সমিতি গড়িয়াছে, কংগ্রেস-কমিটি খাড়া করিয়াছে। দেবু যেন ও-সবের মধ্যে না যায়।

তারা নাপিত আরও গূঢ় সংবাদ দিল। জমিদার এ গ্রামখানা পত্তনি বিলি করিবে কিনা ভাবিতেছে। শ্রীহরি গিলিবার জন্য হাঁ করিয়া আছে। পত্তনি কায়েম হইলে, শ্রীহরি বাবা বুড়োশিবের অর্ধসমাপ্ত মন্দিরটা পাকা করিয়া দিবে, চণ্ডীমণ্ডপের আটচালার উপর তুলিবে পাকা নাটমন্দির। শ্রীহরির বাড়ীতে এখন একজন রাঁধুনী, একজন ছেলে পালন করিবার লোক।

তারাচরণ পরিশেষে বলিল—এই যে হরিহরের দুই কন্যে—যারা কলকাতায় ঝি-গিরি করতে গিয়েছিল—তারাই। বুঝলেন তার মানে—রীতিমত বড়লোকের ব্যাপার, দুজনকেই এখন ছিরু রেখেছে। বুঝলেন, একেবারে আমীরী মেজাজ। হরিহরের ছোট মেয়েটা যখন যায়—রোগা, শণফুলের মত রঙ। ক্রমে শোনা গেল—কলকাতায়—বুঝলেন?

অর্থাৎ মাতৃত্ব-সম্ভাবনাকে বিনষ্ট করিয়াছিল মেয়েটি। তাই গ্রাম্য-সমাজ তাহাদিগকে পতিত করিল। কিন্তু শ্রীহরি দয়া করিয়া আশ্রয় দিয়াছে, তাহারই অনুরোধে সমাজ তাহাদের ত্রুটি মার্জনা করিয়াছে, তারা বলিল—দু’দুটো মেয়ের ভাত-কাপড়, শখ-সামগ্রী তো সোজা কথা নয়, দেবু-ভাই।

বৃদ্ধ চৌধুরী শুধু আপন সংসারের সংবাদ দিলেন, দেবুর জেলের সুখ-দুঃখের সংবাদ লইলেন। পরিশেষে আশীর্বাদ করিলেন—পণ্ডিত, তুমি দীর্ঘজীবী হও। দেখ, যদি পার বাবা—তবে শ্রীহরির সঙ্গে ডাক্তারের, আর বিশেষ করে কর্মকারের মিটমাট করিয়ে দাও। অনিরুদ্ধ লোকটা নষ্ট হয়ে গেল। এরপর সর্বনাশ হয়ে যাবে।

রামনারায়ণ আসিয়া বলিল—ভাল আছ দেবু-ভাই? আমার মা-টি মারা গিয়েছেন!

বৃন্দাবন দোকানী বলিল—চালের ব্যবসায় অনেক টাকা লোকসান দিলাম দেবু-ভাই। যারা চালের ব্যবসা করেছিল তারা সবাই দিয়েছে। জংশনের রামলাল ভকত তো লালবাতি জ্বেলে দিল।

বৃদ্ধ মুকুন্দ একটি খোকাকে কোলে করিয়া দেখাইতে আসিয়াছিল,—আমাদের সুরেন্দ্রের ছেলে, দেখ বাবা দেবু।

মুকুন্দের পুত্র গোবিন্দ, গোবিন্দের পুত্র সুরেন্দ্র সুতরাং সুরেন্দ্রের ছেলে তাহার প্রপৌত্র।

সন্ধ্যার মুখে নিজে আসিল শ্রীহরি। শ্রীহরি এখন সম্ভ্রান্ত লোক। লম্বা-চওড়া পেশী সবল যে জোয়ান চাষী নগ্নদেহে কোদাল হাতে ঘুরিয়া বেড়াইত, দুর্দান্ত বিক্রমে দৈহিক শক্তির আস্ফালন করিয়া ফিরিত, সামান্য কথায় শক্তিপ্রয়োগ করিত, জোর করিয়া পরের সীমানা খানিকটা আত্মসাৎ করিয়া লইত, কর্কশ উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করিত—সে-ই গ্রামের প্রধান ব্যক্তি, তাহার অপেক্ষা বড় কেহ নাই, সেই ছিরু পালের সঙ্গে এই শ্রীহরির কোন সাদৃশ্য নাই। শ্রীহরি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র মানুষ! তাহার পায়ে ভাল চটি, গায়ে ফতুয়ার উপর চাদর, গম্ভীর সংযত মূর্তি, সে এখন গ্রামের অধিপতি। গোমস্তা—মহাজন।

—দেবু-খুড়ো রয়েছ নাকি হে? —হাসিমুখে শ্রীহরি আসিয়া দাঁড়াইল।

—এসো ভাইপো এস। —দেবুও তাহাকে সম্ভ্রম করিয়া স্বাগত সম্ভাষণ জানাইল। দেবু বাহির হইবার উদ্যোগ করিতেছিল। অনিরুদ্ধের ওখানে যাইবার ইচ্ছা ছিল। ডেটিনিউ যতীনবাবু সেই তাহাকে চণ্ডীমণ্ডপে পৌঁছাইয়া দিয়া চলিয়া গিয়াছে, তাহার সঙ্গে একবার দেখা করিবার জন্য সে ব্যস্ত হইয়া উঠিয়াছিল। অনিরুদ্ধও সেই চলিয়া গিয়াছে। সে নাকি এখন মাতাল, দূর্গার ঘরে রাত্রিযাপন করে, তাহার অন্নগ্রহণেও অরুচি নাই তাহার, জমি-জমা নীলামে উঠিয়াছে।

অনি-ভাইয়ের জন্য দুঃখ হয়। কি হইয়া গেল সে। তাহার একটা কথা মনে পড়িয়া গেল, চৌধুরীই বলিয়াছেন—পণ্ডিত! মা-লক্ষ্মীর নাম শ্রী। শ্রী যার আছে—তারই শ্রী আছে; সে মনে বল, চেহারায় বল, প্রকৃতিতে বল। শ্রীহরির পরিবর্তন হবে বৈকি! আবার অভাবেই ওই দেখ, অনি-ভাইয়ের এমন দশা। তার ওপর কামার-বউএর অসুখ করে আরও এমনটি হয়ে গেল।

শ্রীহরি তাহাকে ডাকিয়া বলিল—তোমাকে ডাকতে এসেছি।—চল খুড়ো, চণ্ডীমণ্ডপে চল। ওখানেই এখন বসছি। চা হয়ে গিয়েছে, চল।

দেবু 'না' বলিতে পারিল না। চণ্ডীমণ্ডপে বসিয়া শ্রীহরি বলিয়া গেল অনেক কথা।

গ্রামে স্কুল-ঘর করা হইয়াছে। স্কুল-ঘরের মেঝে-বারান্দা সব পাকা করিয়া দিবার ইচ্ছা আছে। একজন ডাক্তারের সঙ্গেও তাহার কথা হইয়াছে। তাহাকে আনিয়া সে গ্রামে বসাইতে চায়। শ্রীহরিই তাহাকে থাকিবার ঘর দিবে, খাইতেও দিবে। জগনকে দিয়া আর চলে না। উহার ওষুধ নাই, সব জল, সব ফাঁকি। এই চণ্ডীমণ্ডপে বসিবার জন্যই দেবু চুপ করিয়া রহিল।

সেটেলমেন্টের ‘খানাপুরী’ ‘বুঝারত’ দুইটা শেষ হইয়া গিয়াছে। আর কোন গণ্ডগোল হয় না। এই সমস্তই দেবুর জন্য, তাহা শ্রীহরি অস্বীকার করিল না। বলিল—বুঝলে খুড়ো, শেষটা আমিন, কানুনগো—'আপনি' ছাড়া কথা বলত না। আমরা তোমার নাম করতাম। এইবার হবে তিনধারা, তারপর পাঁচধারা।

শ্রীহরি আরো জানাইল দেবুর জমি-জমা সমস্তই সে নির্ভুল করিয়া সেটেলমেন্টে রেকর্ড করাইয়াছে। এমন কি, কঙ্কণার বাবুদের কর্মচারী যে জমির টুকরাটি আত্মসাৎ করিয়াছিল—সেটি পর্যন্ত উদ্ধার করিয়াছে।

—তাও উদ্ধার হইয়াছে? —দেবু বিস্মিত হইয়া গেল।

—হবে না। জমিদারীর সেরেস্তার তামাম কাগজপত্র আমাদের হাতে, তার ওপর দাশজীর পাকা মাথা! আমি দাশজীকে বললাম—দেবু খুড়ো উপকার করলে দেশের লোকের, বাঘের দাঁত ভেঙে দিয়ে গেল; আর তার জমি কুকুরে খাবে তা হবে না। আমাদের এ উপকারটি না করলে চলবে না; আর তা ছাড়া—

—তা ছাড়া; শ্রীহরি আকাশের দিকে চাহিয়া জোড় হাতে প্রণাম করিল—ভগবান যখন জন্ম দিয়েছেন, তখন উপকার ছাড়া অপকার কারুর করব না, খুড়ো। এই দেখ না হরিহরের কন্যে দু'টিকে নিয়ে কি কেলেঙ্কারি কাণ্ড! কলকাতায় তো খাতায় নাম লিখেছিল। শেষে বিশ্রী কাণ্ড করে দেশে এল। গাঁয়ের লোক পতিত করলে। আমি বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ক্ষান্ত করে আমার বাড়ীতেই রেখেছি। লোকে বলে নানা কথা। তা আমি মিথ্যে বলব না খুড়ো, তুমি তো শুধু খুড়ো নও, বন্ধুলোক, একসঙ্গে পড়েছি! বাজারে-খাতাতেই যারা নাম লিখিয়েছিল, তাদের যদি আমি ঐজন্যে ঘরের একপাশে রেখে থাকি তো কি এমন দোষ করেছি, বল?

গড়গড়ার নলটা দেবুর হাতে দিয়া শ্রীহরি বলিল—খাও খুড়ো।

—না। জেলখানায় গিয়ে বিড়ি তামাক ছেড়ে দিয়েছি।

—বেশ করেছ।

শ্রীহরির কথা ফুরাইতেই চায় না; কাহার বিপদের সময় তাহার উপকারের জন্য কত টাকা সে ধার দিয়াছে, আর সে এখন দিবার নাম করিতেছে না—সেই ইতিহাস আরম্ভ করিল।

শ্রীহরিকে দোষ দেওয়া যায় না। টাকা থাকা পাপ নয়, বে-আইনী নয়। কাহারও বিপদে টাকা ধার দিলে, খাতক সে সময়ে উপকৃতই হয়। কিন্তু সুদে-আসলে আদায়ের সময় তাহার যে কদর্য রূপটা বাহির হইয়া পড়ে, তাহা দেখিয়া খাতক আতঙ্কিত হয়, মহাজন ক্ষেত্রবিশেষে সঙ্কুচিত হইলেও সর্বক্ষেত্রে হয় না। কিন্তু ইহার জন্য দায়ী কে তাহা বলা শক্ত। সুদের জন্য মহাজনকে ইনকাম ট্যাক্স দিতে হয়; হক্ পাওনা আদায়ের জন্য আদালতে কোর্ট-ফি লাগে; ইউনিয়নকে দিতে হয় চৌকিদারী ট্যাক্স। সুদ শ্রীহরি ছাড়ে কি করিয়া।

দেবু একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিল; শ্রীহরির দিকটা ভাবিতে ভাবিতে তাহার মনে পড়িয়া গেল—বাল্যকালের স্মৃতি। ঋণের দায়ে কঙ্কণার বাবুদের দ্বারা তাহাদের অস্থাবর-ক্রোকের কথা। সে শিহরিয়া উঠিল। খাতকের দিকটা দেবুর চোখের উপর ভাসিতে লাগিল। জমি-জমা যায়, পুকুর-বাগান যায়, ক্ষেত-খামার যায়, তাহার পর গরু-বাছুর যায়, তাহার পর থালা-কাসা যায়, তাহার পর যায় বাস্তুভিটা। মানুষ পথের উপর গিয়া দাঁড়ায়। তিন বছর অন্তর অন্তর হ্যাণ্ডনোট পাল্টাইয়া একশো টাকা কয়েক বছরে অনায়াসে হাজার টাকায় গিয়া দাঁড়ায়—ইহাও আইনসম্মত। যখন আইনসম্মত তখন ইহাই ন্যায়। ইহাই যদি ন্যায় তবে সংসারে অন্যায়টা কি?

তাহার চিন্তাকে বিঘ্নিত করিয়া শ্রীহরি বলিল—এই দেখ, সেটেলমেন্টের তিনধারা আসছে, পাঁচধারার কোর্ট আসছে! এদিকে প্রজা-সমিতি করে ডাক্তার ধুয়ো তুলেছে—এ গাঁয়ের সব জমি মোকররী জমা। এ মৌজায় নাকি কখনও বৃদ্ধি হয় না! তোমাকে আমি কাগজ দেখাব, বারো শো সত্তর সালের কাগজ; তামাম জমায় বৃদ্ধি করা আছে; একটি জমাও মোকররী দাঁড়াবে না। জমিদার বৃদ্ধি দাবি করবে। হয়তো হাঙ্গামা বাধাবে ওরা। মামলা হবে। আইনে জমিদারের প্রাপ্য—সে পাবেই। আর যখন আইনসম্মত তখন আর তার অপরাধটা কোথায় বল? পঞ্চাশ বছরে ফসলের দাম অন্তত তিনগুণ বেড়েছে। জমিদার পাবে না?

দেবু এ কথারও কোনও উত্তর দিতে পারিল না। ফসলের দাম সত্যই বাড়িয়াছে। কিন্তু তাহাতে প্রজাদের আয় বাড়িয়াও বাড়ে নাই, বাজার দরে সব খাইয়া গেল। মানুষের অভাব বাড়িয়াছে, ইহার উপরে খাজনা-বৃদ্ধি!

শ্রীহরি বলিল—শোন খুড়ো, দৈবের বিপাকে অনেক কষ্ট পেলে। আর বাবা, আর ওসব পথে যেও না তুমি; খাও-দাও, কাজকর্ম কর, লোকের উপকার কর।—তোমার উপরে লোকেও আশা করে—আমরাও করি। সেই কথাই আজ দারোগা বললেন, পণ্ডিতকে বারণ করে দিও, ঘোষ, ওসব যেন না করে। তা একটা কথা লিখে দাও তুমি—ওরা তোমাকে নির্ঝঞ্ঝাট করে দেবে। স্কুলের চাকরি—ও তোমারই আছে, একটা বণ্ড লিখে দিলেই তুমি পাবে। আর—ওই নজরবন্দী ছোকরার সঙ্গে তুমি যেন মিশো-টিশো না বাপু। বুঝলে?

এবার দেবু হাসিয়া বলিল—বুঝলাম সব।

—তা হলে কালই চল আমার সঙ্গে।

—না, তা পারবো না, ছিরু। আমি তো অন্যায় কিছু করিনি।

—কাজ ভালো করছো না খুড়ো। আচ্ছা, দু'দিন ভেবে দেখ তুমি।

—আচ্ছা।

হাসিয়া দেবু উঠিয়া চলিয়া আসিল। চণ্ডীমণ্ডপ হইতে পথের উপর নামিতে নামিতেই কাহারা জন দু'য়েক তাহাকে হেঁট হইয়া নমস্কার করিয়া সম্মুখে দাঁড়াইল।

—কে, সতীশ?

—আজ্ঞে হ্যাঁ।

—কি ব্যাপার!

—আজ্ঞে, আমাদের পাড়ায় একবার পদার্পণ করতে হবে আপনাকে।

—কেন? কি হ'ল? ও ঘেঁটু-গান? আজ থাক সতীশ—অন্য একদিন হবে।

—আজ্ঞে, আপনাকে শোনাবার জন্যে আসর পেতেছি আমরা। —তারপর ফিস ফিস করিয়া বলিল—নজরবন্দী বাবুও আইচেন। তিনি বসে রইচেন, ডাক্তারবাবু রইছেন।

—নজরবন্দী বাবুটি আছেন? আচ্ছা, চল তবে।

চৈত্র মাসে ঘণ্টাকর্ণের পূজা। ঘেঁটু পূজা, পঞ্জিকার 'ঘণ্টাকর্ণ' নয়। পঞ্জিকার 'ঘণ্টাকর্ণ'—বসন্ত রোগ-নিবারক মহাবল ঘণ্টাকর্ণের পূজা। এই ‘ঘণ্টাকর্ণ’—ঘেঁটু গাজনের অঙ্গ। বিষ্ণু-বিরোধী শিবভক্ত ঘণ্টাকর্ণ ছিল পিশাচ। সে সাধনায় সিদ্ধিলাভ করিয়া রুদ্র দেবতার এবং বিষ্ণু দেবতার উভয়েরই প্রসাদ লাভ করিয়াছিল। এই একাধারে ভক্ত ও পিশাচ ঘণ্টাকর্ণের পূজা করে বাংলার নিম্ন জাতীয়েরা। সমস্ত মাস ধরিয়া ঘেঁটুর গান গাহিয়া বাড়ী বাড়ী ঘুরিয়া বেড়ায়। চাল-ডাল সিধা মাগিয়া মাসান্তে গাজনের সময় উৎসব করে।

চৈত্র মাসের সন্ধ্যা। ধর্মরাজের স্থানে বকুলগাছ তলায় আসন পড়িয়াছে। বকুলের গন্ধে সমস্ত জায়গাটা ভুরভুর করিতেছে। আকাশে চাঁদ ছিল—শুক্লপক্ষের দ্বাদশীর রাত্রি। একদিকে মেয়েরা অন্যদিকে পুরুষদের আসর। দুই আসরের মাঝখানে বসিল—নজরবন্দী বাবুটি, পণ্ডিতমশায়, ডাক্তারবাবু ও হরেন ঘোষাল। চারিটি মোড়াও তাহারা যোগাড় করিয়াছে। বাসন্তী সন্ধ্যার জ্যোৎস্না—আকাশ হইতে মাটির বুক পর্যন্ত যেন এক স্বপ্নকুহেলিকাময় আলোর জাল বিছাইয়া দিয়াছিল।

দেবুর মনে পড়িয়া গেল—বাল্যকালে তাহারা ঘেঁটু-গান শুনিতে এখানে আসিত। এমনই জ্যোৎস্নার আলোতে আসর বসিত। যাইবার সময় আঁচল ভরিয়া কুড়াইয়া লইয়া যাইত বকুল ফুল। তখন সতীশেরা সদ্য জোয়ান, উহারাই গাহিত গান—আর তাহাদের বয়সীরা ধুয়া গাহিত, নাচিত। তখন কিন্তু ঘেঁটুর আসর ছিল জমজমাট। সে কত লোক! সে তুলনায় এ আসর অনেক ছোট। বিশেষ করিয়া পুরুষের দলই যেন অল্প। দেবু বলিল—সে আমলের মত কিন্তু আসর নাই তোমাদের, সতীশ।

সতীশ বলিল—পাড়ার সিকি মরদই এখনো আসে নাই, পণ্ডিতমশাই।

—কেন? কোথায় গিয়েছে?

—আজ্ঞে, প্যাটের দায়ে। গাঁয়ে চাকরি মেলে না; গেরস্তরা ফেরার হয়ে গেল, মুনিষ-জন রাখতে পারে না। আমাদেরও ছেলে-পিলে বেড়েছে। এখন ভিনগাঁয়ে চাকরি করতে হয়। চাকরি সেরে ফিরতে একপহর রাত হয়ে যায়। তা ঘেঁটু-গান করবে কখন—শুনবে কখন, বলেন?

জগন বলিল—পেটেই তোদের আগুন লেগেছে রে, পেট আর কিছুতেই ভরছে না!

সতীশ হাত-জোড় করিয়া বলিল—তা আজ্ঞে আপনি ঠিক বলেছেন ডাক্তোর বাবু; প্যাটে আগুনই নেগেছে বটে। মেয়েরা পর্যন্ত ‘রোজ’ খাটতে যাচ্ছে। কি করব বলুন? পঞ্চায়েত করে বারণ করলাম। তা কে শুনছে? সব ছুটছে তো ছুটছে। আর অভাবও যা হয়েছে বুঝলেন!

বাধা দিয়া যতীন বলিল—নাও, গান আরম্ভ কর।

গায়ক ও বাদকের দল অপেক্ষা করিয়াই ছিল, তাহারা আরম্ভ করিয়া দিল। ঢোলকের বাজনার সঙ্গে মন্দিরার ধ্বনি; গায়কের দল আরম্ভ করিল—

শিব-শিব-রাম-রাম।

ছোট ছেলের দল নাচিতে নাচিতে হাতে তালি দিয়া ধুয়া ধরিল—

শিব-শিব-রাম-রাম।

গায়কেরা গান গাহিল—

‘এক ঘেঁটু তার সাত বেটা।
সাত বেটা তার সাতান্ত
এক বেটা তার মহান্ত।
মহান্ত ভাই রে,
ফুল তুলতে যাই রে,
যত ফুল পাই রে,
আমার ঘেঁটুকে সাজাই রে!

সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যেক লাইনের পর ছেলেরা তালি দিয়া গান গাহিয়া গেল—শিব-শিব-রাম-রাম। এই গান শেষ হইবার পর আরম্ভ হইল অন্য গান। স্থানীয় বিশেষ ঘটনাকে অবলম্বন করিয়া ইহাদের গান আছে—

হায় এ জল কোথায় ছিল।
জলে জলে বাংলা মুলুক ভে-সে গেল!

বহুদিন আগে যখন রেলওয়ে লাইন পড়িয়াছিল, সে গান আজও ইহারা গায়—

সাহেব রাস্তা বাঁধালে।
ছ'মাসের পথ কলের গাড়ী দণ্ডে চালালে।

—অজন্মার বৎসরের গান—

ঈশাণ কোণে ম্যাঘ লেগেছে দেবতা করলে শুকো।
এক ছিলম তামুক দাও গো সঙ্গে আছে হুঁকো।

আজ তাহারা আরম্ভ করিল—

দেশে আসিল জরীপ!
রাজা-পেজা ছেলে-বুড়োর বুক ঢিপ ঢিপ।

ছেলেরা ধুয়া ধরিল—

হায় বাবা, কি করি উপায়?
প্রাণ যায় তাকে পারিমান রাখা দায়।

গায়কেরা গাহিয়া চলিল—

পিওন এল, আমিন এল, এল কানুনগো,
বুড়োশিবের দরবারে মানত মানুন গো।
বুঝি আর মান থাকে না।

ছেলেরা গাহিল,

হায় বাবা, কি করি উপায়?
হাকিম এল ঘোড়ায় চড়ে, সঙ্গেতে পেশকার,
আত্মারাম খাঁচা ছাড়া হল দেশটায়।
বুঝি আর মান থাকে না।

তাঁবু এল, চেয়ার এল, কাগজ গাড়ী গাড়ী,
নোয়ারই ছেকল এল চল্লিশ মণ ভারী।
ক্ষেতে বুঝি ধান থাকে না।

তে-ঠেঙে টেবিল পেতে লাগিয়ে দুরবীন,
এখানে ওখানে পোতে চিনে মাটির পিন।
কুলীদের প্রাণ থাকে না।

কুঁচবরণ রাঙা চোখ তারার মতন ঘোরে,
দন্তকড়মড়ি হাঁকে—এই উল্লুক ওরে।
হায় কলিতে মাটি ফাটে না।

পণ্ডিতমশায় দেবু ঘোষ তেজিয়ান বিদ্বান,
জানের চেয়ে তার কাছে বেশী হল মান।
ও সে আর সইতে পারে না।

কানুনগো কহিল 'তুই', সে করে ‘তুকারি’
আমার কাছে খাটবে না তোর কোন জুরি জারি
দেবু কারুর ধার ধারে না।

দেবু ঘোষের পাকা ধানে ছেকল চল্লিশ মণ,
টেনে নিয়ে চলে আমিন ঝন্ ঝন্ ঝন্।
ও সে কারুর মানা মানে না।

দেবু হাসিল। বলিল—এ সব করেছ কি সতীশ?

যতীন মুগ্ধ হইয়া শুনিতেছিল।

গায়কেরা তাহার পরের ঘটনাও নিখুঁতভাবে বর্ণনা করিল। শেষে গাহিল—

দেবু ঘোষে বাঁধল এসে পুলিশ দারোগা,
বলে, কানুনগোর কাছে হাত জোড় করগা।
দেবু ঘোষ হেসে বলে 'না'॥
থাকিল পিছনে পড়ে সোনার বরণ নারী,
ননীর পুতলী শিশু ধুলায় গড়াগড়ি।
তবু ঘোষের মন টলে না।

চোখ মুছিতে মুছিতে দূর্গা বলিল—তা তুমি পাষাণই বটে জামাই। মাগো, সে কি দিন!

শুধু দূর্গা নয়, সমবেত মেয়েগুলি সকলেই আঁচল দিয়া চোখ মুছিতেছিল। সেদিনের কথা তাহাদের মনে আছে।

গায়কেরা গাহিল—

'ফুলের মালা গলায় দিয়ে ঘোষ চলেন জেলে,
অধম সতীশ লুটায় এসে তাঁরই চরণ তলে
দেবতা নইলে হায় এ কাজ কেউ পারে না।

সতীশ আসিয়া দেবু ঘোষকে প্রণাম করিল।

গান শেষ হইল।

দেবুর বুকেও একটা আবেগ উচ্ছ্বসিত হইয়া উঠিয়াছিল; সে মুখে কিছু বলিতে পারিল না, সতীশকে সস্নেহে ধরিয়া তুলিল।

জগন বলিল—তোকে আমি একটা মেডেল দেব সতীশ!

হরেন বলিল—আচ্ছা সতীশ, মালাটা যে আমিই দিয়েছিলাম সে কথাটা বাদ গিয়েছে কেন? মালা আছে, গলা আছে, আমি নাই। বাঃ!

যতীন স্বপ্নাচ্ছন্নের মত উঠিয়া দাঁড়াইল। সমস্ত অনুষ্ঠানটাই তাহার কাছে অদ্ভুত ভাল লাগিয়াছে। সতীশকে মনে মনে নমস্কার করিল। বলিল—তোমাদের গানগুলো আমাদের লিখে দেবে সতীশ?

—আজ্ঞে! —সতীশ অপ্রস্তুতের মত হাসিতে লাগিল। —আপনি লিখে নেবেন?

—হ্যাঁ।

—সত্যি বলছেন, বাবু!

—হ্যাঁ হে।

নিঃশব্দে আকর্ণবিস্তার হাসিতে সতীশের মুখ ভরিয়া গেল। সে কৃতার্থ হইয়া গিয়াছে।

দেবু বলিল, আজ তো আপনার সঙ্গে আলাপ হল না, কাল—

যতীন বলিল—আলাপ তো হয়ে গেছে। আলোচনা বাকি আছে। কাল আমিই আপনার বাড়ী যাব।


উনিশ



এই একটি দিন। শুধু একটি দিনের জন্যই দেবু, কেবল দেবুই দেখিল—শিবকালীপুরের অদ্ভুত এক রূপ। শুধু রূপ নয়, তাহার স্পর্শ তাহার স্বাদ—সবই একটি দিনের জন্য দেবুর কাছে মধুময় হইয়া দেখা দিল। পরের দিন হইতে কিন্তু আবার সেই পুরানো শিবকালীপুর। সেই দীনতা-হীনতা, হিংসায় জর্জর মানুষ, দারিদ্র্য-দুঃখ-রোগপ্রপীড়িত গ্রাম। কালও গ্রামখানির গাছপালা-পাতা-ফল-ফুলের মধ্যে যে অভিনব মাধুর্য দেবুর চোখে পড়িয়াছিল, নাবি আমের মুকুলের গন্ধে সে যে তৃপ্তি অনুভব করিয়াছিল, আজ তাহার কিছুই সে অনুভব করিল না।

আপনার দাওয়ায় বসিয়া সে ভাবিতেছিল অনেক কথা—এলোমেলো বিচ্ছিন্ন ধারায়।

প্রথমেই মনে হইল গ্রামখানার সর্বাঙ্গে যেন ধুলা লাগিয়াছে! পথ কয়টায় এক-পা গভীর হইয়া ধূলা জমিয়াছে। ডোবার পুকুরের জল মরিয়া আসিয়াছে, অল্প জলে পানাগুলা পচিতে আরম্ভ করিয়াছে। গ্রামে জলের অভাব দেখা দিল। গরু বাছুর গাছপালা লইয়া জলের জন্য বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠে আর কষ্টের সীমাপরিসীমা থাকিবে না। বাড়ীতে অনেকগুলি গাছ হইয়াছে, দৈনিক জলের প্রয়োজন হইবে।

আর গাছ লাগাইয়াই বা ফল কি? তাহার বাড়ীর যে কুমড়ার লতাটি প্রাচীর ভরিয়া উঠিয়াছে, সেই গাছটায় কয়টা কুমড়া ধরিয়াছিল, তাহার মধ্যে তিনটা কুমড়া কাল রাত্রে কে ছিঁড়িয়া লইয়া গিয়াছে। তাহার বাড়ীর রাখাল ছোঁড়াটা গাছটা পুঁতিয়াছিল—সে তারস্বরে চীৎকার করিয়া গালি দিতেছে অজ্ঞাতনামা চোরকে।

ছোঁড়া আবার মাহিনা-কাপড়ের জন্য ব্যস্ত হইয়া উঠিয়াছে। বিলুরও কাপড় ছিঁড়িয়াছে। নিজেরও চাই। ‘যেমন করে পর কাপড় চৈতে হবে কানি'—কথাটা মিথ্যে নয়। কিন্তু কি করিবে? পোস্ট আপিসে সঞ্চয়ের টাকাগুলির আর কিছু অবশিষ্ট নাই।

চিন্তাটা ছিন্ন হইয়া গেল। কোথায় যেন একঘেয়ে চীৎকার উঠিতেছে। কোথায় কাহারা উচ্চ-কর্কশকণ্ঠে যেন গালিগালাজ করিতেছে, কাহাদের ঝগড়া বাধিয়াছে; সম্ভবতঃ একটা কণ্ঠস্বর রাঙাদিদির! বুড়ীর আবার কাহার সঙ্গে কি হইল? বিলুকেই সে প্রশ্ন করিল—রাঙাদিদি কার সঙ্গে লাগল বল তো?

বিলু হাসিয়া বলিল—লাগেনি কারু সঙ্গে। বুড়ী গাল দিচ্ছে নিজের বাপকে আর দেবতাকে। আজকাল রোজ সকালে উঠে দেয়। বুড়ো হয়েছে, একা কাজ-কর্ম করতে কষ্ট হয়, সকালে উঠে তাই রোজ ওই গাল দেবে। বাপকে গাল দেয়—বাঁশ-বুকো রাক্ষস, জমি-জেরাত-গুলো সব নিজে পেটে পুরে গিয়েছে, আর দেবতাকে গাল দেয়—চোখ-খেগো, কানা হও তুমি।

দেবু হাসিল; তারপর বলিল—কিন্তু আরও একজন যে গাল দিচ্ছে। কাঁসার আওয়াজের মত অল্পবয়সী গলা!

—ও পদ্ম, কামার বউ!

—অনিরুদ্ধের বউ?

—হ্যাঁ। বোধ হয় আমাদের ভাসুরপো—মানে শ্রীহরিকে গাল দিচ্ছে। মধ্যে মধ্যে অমন দেয়। আজও দিচ্ছে বোধ হয়। মাঝখানে তো পাগলের মত হয়ে গিয়েছিল। এখন একটুকু ভাল। ওদিকে কর্মকার তো একরকম কাজের বার হয়ে গেল। এক-একদিন মদ খেয়ে যা করে! একটা লোহার ডাণ্ডা হাতে করে বেড়ায়, আর চেঁচায়—খুন করেঙ্গা। যার-তার বাড়ীতে খায়।

—মানে দূর্গার বাড়ীতে তো?

—হ্যাঁ।

—ছি! ছি! ছি! দূর্গার ওই দোষটা গেল না। ওই এক দোষেই ওর সব গুণ নষ্ট হয়েছে।

বিলু বলিল—মদ খেয়ে মাতাল হয়ে ‘খেতে দে খেতে দে' করে হাঙ্গামা করলে দূর্গা আর কি করবে বল? অবিশ্যি কিছুদিন দূর্গার ঘরে রাত কাটাত কর্মকার। কিন্তু আজকাল দূর্গা তো রাত্রে ঘরে ঢুকতে দেয় না। কামার তবু পড়ে থাকে ওদের উঠানে, কোনদিন বাগানে; কোনদিন রাস্তায়। কোনদিন অন্য কোথাও।

—হ্যাঁ, আজকাল অনিরুদ্ধের তো পয়সা-কড়ি নাই। দূর্গা আর—

—না—না—না, তা বলো না। দূর্গা কোনদিনই পয়সা নেয় নাই কর্মকারের কাছে। ও-ই বরং দু-টাকা চার-টাকা করে দিয়েছে মধ্যে মধ্যে। আমার হাতে দিয়ে বলেছে—বিলু-দিদি, তুমি কামার-বউকে দিয়ো, আমি দিলে তো নেবে না!

—ছিঃ! তুমি ওই সব জঘন্য ব্যাপারের মধ্যে গিয়েছিলে?

বিলু কিছুক্ষণ নতমুখে থাকিয়া বলিল—কি করব বল, কামার-বউ তখন ক্ষ্যাপার মত—হাঁড়ি চড়ে না। খেতে পায় না। পদ্মও না, কর্মকারও না। আমার হাতেও কিছুই ছিল না যে দোব। একদিন দূর্গা এসে অনেক কাকুতি-মিনতি করে বললে। কি করব বল!

—হুঁ। —দেবুর একটা কথা মনে পড়িল। নজরবন্দীর জন্য অনিরুদ্ধের ঘর দূর্গাই তো দারোগাকে বলে ভাড়া করিয়ে দিয়েছে শুনলাম।

—তা সে অনেক পরের কথা। —একটু চুপ করিয়া থাকিয়া বলিল—হ্যাঁ। নজরবন্দী ছেলেটি বড় ভাল, বাপু। কামার-বউকে মা বলে। গাঁয়ের ছেলেরাও এর কাছে ভিড় জমিয়ে বসে থাকে।

—বস তুমি। আমি আসি একবার যতীনবাবুর সঙ্গেই দেখা করে।

পথে চণ্ডীমণ্ডপ হইতে ডাকিল শ্রীহরি। সেখানেও চারপাশে একটি ছোটখাটো ভিড় জমিয়া রহিয়াছে। দেবু অনুমানে বুঝিল, খাজনা আদায়ের পর্ব চলিতেছে। চৈত্র মাসের বারোই-তেরোই, ইংরাজী আটাশে মার্চ সরকার-দপ্তরে রাজস্ব দাখিলের শেষদিন। তা ছাড়া চৈত্র-কিস্তি, আখেরী।

দেবু বলিল—ওবেলা আসব ভাইপো।

শ্রীহরি বলিল—পাঁচ মিনিট। গ্রামের ব্যাপারটা দেখে যাও। যেন অরাজক হয়েছে।

দেবু উঠিয়া আসিল। দেখিল বৈরাগীদের 'নেলো’—অর্থাৎ নলিন হাত জোড় করিয়া দাঁড়াইয়া আছে; ও-পাশে তাহার মা কাঁদিতেছে।

শ্রীহরি বলিল—ওই দেখ, ছোঁড়ার কাণ্ড দেখ। —আঙ্গুল দিয়া সে দেখাইয়া দিল চণ্ডীমণ্ডপের চুনকাম করা একটি থাম। সেই চুনকাম করা থামের সাদা জমির উপর কয়লা দিয়া আঁকা এক বিচিত্র ছবি। মা-কালীর এক মূর্তি।

দেবু নেলোকে জিজ্ঞাসা করিল—হ্যাঁ রে, তুই একেছিস?

নেলো ঘাড় নাড়িয়া সায় দিয়া উত্তর দিল—হ্যাঁ।

—চুনকাম করা চণ্ডীমণ্ডপের ওপর কি করেছে একবার দেখ দেখি? —পুট এঁকেছেন।

ইহার পর নেলোকেই সে বলিল—চুনকামের খরচা দে, দিয়ে উঠে যা!

দেবু তখনও ছবিখানি দেখিতেছিল—বেশ আঁকিয়াছিল নেলো। তাহাকে জিজ্ঞাসা করিল—কার কাছে আঁকতে শিখলি তুই?

নেলো রুদ্ধস্বরে কোনমতে উত্তর দিলে—আপুনি আপুনি, আজ্ঞে।

—নিজে নিজে শিখেছিস?

শ্রীহরি এই প্রশ্নের উত্তর দিল,—হ্যাঁ, হ্যাঁ। ছোঁড়ার ওই কাজ হয়েছে, বুঝলে কি না! লোকের দেওয়ালে সিমেন্টের উঠানে, এমন কি বড় বড় গাছের গায়ে পর্যন্ত কয়লা দিয়ে ছবি আঁকবে। তারপর ওই নজরবন্দী ছোকরা ওর মাথা খেল! অনিরুদ্ধের বাইরের ঘরে ছোকরা থাকে, দেখো না একবার তার দেওয়ালটা—একেবারে চিত্রি-বিচিত্রে ভর্তি। এখন চণ্ডীমণ্ডপের ওপর লেগেছে। কাল দুপুরবেলায় কাজটি করেছে।

দেবু হাসিয়া বলিল—নেলো অন্যায় করেছে বটে, কিন্তু এঁকেছে ভাল, কালী-মূর্তিটি খাসা হয়েছে।

—নমস্কার, ঘোষ মশায়! —ওদিকের সিঁড়ি দিয়া পথ হইতে উঠিয়া আসিল ডেটিনিউ যতীন। দেবুকে দেখিয়া সে বলিল—এই যে আপনিও রয়েছেন দেখছি! আপনার ওখানেই যাচ্ছিলাম!

—আমিও যাচ্ছিলাম আপনার কাছেই।

—দাঁড়ান, কাজটা সেরে নি। ঘোষ মশায়, ওই মাথাটায় কলি ফেরাতে কত খরচ হবে?

শ্রীহরি বলিল—খরচ সামান্য কিছু হবে বৈকি। কিন্তু কথা তো তা নয়, কথা হচ্ছে নেলোকে শাসন করা।

হাসিয়া যতীন বলিল—আমি দুজনকে জিজ্ঞেস করলাম, তারা বললেন—চুন চার আনা, একটা রাজমিস্ত্রীর আধ রোজের মজুরি চার আনা, একটা মজুরের আধ রোজ দুআনা। মোট এই দশ আনা, কেমন?

—হ্যাঁ। তবে পাটও কিছু লাগবে পৌঁচড়ার জন্যে।

—বেশ, সেও ধরুন দুআনা। এই বারো আনা। —একটি টাকা বাহির করিয়া যতীন শ্রীহরির সম্মুখে নামাইয়া দিয়া বলিল—বাকীটা আমায় পাঠিয়ে দেবেন।

সে উঠিয়া পড়িল। দেবুও সঙ্গে সঙ্গে উঠিল। যতীন হাসিয়া বলিল—আমার ওখানেই আসুন, দেবুবাবু। নলিনের আঁকা অনেক ছবি আছে, দেখবেন। এস নলিন—এস।

শ্রীহরি ডাকিল—খুড়ো, একটা কথা!

দেবু ফিরিয়া দাঁড়াইয়া বলিল—বল।

—একটু এধারে এস বাবা। সব কথা কি সবার সামনে বলা চলে!

শ্রীহরি হাসিল। ষষ্ঠীতলার কাছে নির্জনে আসিয়া শ্রীহরি বলিল—গতবার চোত কিস্তি থেকেই তোমার খাজনা বাকী হয়েছে, খুড়ো। এবার সম্বৎসর। কিস্তির আগেই একটা ব্যবস্থা করো বাবা।

দেবুর মুখ মুহূর্তে অপ্রসন্ন হইয়া উঠিল! গতকালের কথা তাহার মনে পড়িল! বোধ হইল, শ্রীহরি তাহাকে শাসাইতেছে। সে সংযত স্বরে বলিল—আচ্ছা দেবো। কিস্তির মধ্যেই দোব।

উনিশ-শো চব্বিশ খ্রীষ্টাব্দে বিশেষ ক্ষমতাবলে ইংরেজ সরকারের প্রণয়ন করা আইন—আটক-আইন। নানা গণ্ডীবন্ধনে আবদ্ধ করিয়া বিশেষ থানার নিকটবর্তী পল্লীতে রাজনৈতিক অপরাধ-সন্দেহে বাঙালী তরুণদের আটক রাখার ব্যবস্থা হইয়াছিল। বাংলা সরকারের সেই আটক-আইনের বন্দী যতীন। যতীনের বয়স বেশী নয়, সতেরো আঠারো বৎসরের কিশোর, যৌবনে সবে পদার্পণ করিয়াছে। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ রঙ, রুক্ষ বড় বড় চুল, ছিপছিপে লম্বা, সর্বাঙ্গে একটি কমনীয় লাবণ্য; চোখ দুটি ঝকঝকে, চশমার আবরণের মধ্যে সে দুটিকে আরও আশ্চর্য দেখায়।

অনিরুদ্ধের বাহিরের ঘরের বারান্দায় একখানা তক্তপোষ পাতিয়া, সেইখানে যতীন আসর করিয়া বসে। গ্রামের ছেলের দল তো সেইখানেই পড়িয়া থাকে। বয়স্কেরাও সকলেই আসে—তারা নাপিত, গিরিশ ছুতার, গাঁজাখোর গদাই পাল, বৃদ্ধ দ্বারকা চৌধুরীও আসেন। সন্ধ্যার পর দোকান বন্ধ করিয়া বৃন্দাবন দত্তও আসে; মজুর খাটিয়া কোনরূপে বাঁচিয়া আছে তারিণী পাল—সেও আসিয়া চুপ করিয়া বসিয়া থাকে। কোন-কোনদিন শ্রীহরিও পথে যাইতে আসিতে এক-আধবার বসে। বাউড়ী-পাড়া, বায়েন-পাড়ার লোকেরাও আসে। গ্রাম্য বধূ ও ঝিউড়ি মেয়েগুলি দূর হইতে তাহাকে দেখে। বুড়ী রাঙাদিদি মধ্যে মধ্যে যতীনের সঙ্গে কথা বলে, কোনদিন নাড়ু, কোনদিন কলা, কোনদিন অন্য কিছু দিয়া, সে যতীনকে দেখিয়া আপন মনেই পাঁচালীর একটি কলি আবৃত্তি করে—

“অক্রুর পাষাণ হিয়া, সোনার গোপালে নিয়া
শূন্য কৈল যশোদার কোল।”

যতীনও মধ্যে মধ্যে আপনার মনে গুন-গুন করিয়া আবৃত্তি করে—রবীন্দ্রনাথের কবিতা। দুইটা লাইন এই পল্লীর মধ্যে তাহার অন্তরীণ জীবনে অহরহ গুঞ্জন করিয়া ফেরে—

'সব ঠাঁই মোর ঘর আছে...
ঘরে ঘরে আছে পরমাত্মীয়...'

সমগ্র বাংলা দেশ যেন এই পল্লীটির ক্ষুদ্র আয়তনের মধ্যে রূপায়িত হইয়া ধরা দিয়াছে তাহার কাছে। এখানে পদার্পণমাত্র গ্রামখানি এক মুহূর্তে তাহার আপন ঘরে পরিণত হইয়া উঠিয়াছে। এখানকার প্রতিটি মানুষ তাহার ঘনিষ্ঠতম প্রিয়জন, পরমাত্মীয়। কেমন করিয়া যে এমন হইল—এ সত্য তাহার কাছে এক পরমাশ্চর্য। শহরের ছেলে সে, কলিকাতায় তাহার বাড়ী। জীবনে পল্লীগ্রাম এমন করিয়া কখনও দেখে নাই। আটক-আইনে গ্রেপ্তার হইয়া প্রথমে কিছুদিন ছিল জেলে। তারপর কিছুদিন ছিল বিভিন্ন জেলার সদরে মহকুমা শহরে। এই মহকুমা শহরগুলি অদ্ভুত। সেখানে পল্লীর আভাস কিছু আছে, কিছু কিছু মাঠ-ঘাট আছে, কৃষি এখনও সেখানকার জীবিকার একটা মুখ্য বা গৌণ অংশ, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সমাজও আছে। ঠিক সমাজ নয়—দল। সমাজ ভাঙিয়া শিক্ষা, সম্মান ও অর্থবলের পার্থক্য লইয়া ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে পরিণত হইয়াছে। সঙ্কীর্ণ, আত্মকেন্দ্রিক, পরস্পরের প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ। সেখানে পল্লীর আভাস তৈলচিত্রের রঙের প্রলেপ অবলুপ্ত কাপড়ের আভাসের মতই—অস্পষ্ট ইঙ্গিতে আছে। স্পষ্ট প্রভাব নাই—প্রকাশ নাই।

তাই একেবারে খাঁটি পল্লীগ্রামে অন্তরীণ হইবার আদেশে সে অজানা আশঙ্কায় বিচলিত হইয়াছিল। কিন্তু প্রত্যক্ষ পরিচয় লাভে সে আশ্বস্ত হইয়াছে। সর্বত্র একটি পরমাশ্চর্য স্নেহস্পর্শ অনুভব করিয়াছে। অবশ্য এখানকার দীনতা, হীনতা, কদর্যতাও তাহার চোখ এড়ায় নাই। অশিক্ষা তো প্রত্যক্ষভাবে প্রকটিত। কিন্তু তবু ভাল লাগিয়াছে। এখানে মানুষ অশিক্ষিত, অথচ শিক্ষার প্রভাবশূন্য অমানুষ নয়। অশিক্ষার দৈন্যে ইহারা সঙ্কুচিত, কুশিক্ষা বা অশিক্ষার ব্যর্থতার দম্ভে দাম্ভিক নয়। শিক্ষা এখানকার লোকের না থাক, একটা প্রাচীন জীর্ণ সংস্কৃতি আজও আছে—অবশ্য মুমূর্ষুর মতই কোন মতে টিকিয়া আছে। কিন্তু তাহারও একটা আন্তরিকতা আছে।

শহরকে সে ভালবাসে, শ্রদ্ধা করে। ওইখানেই তো চলিয়াছে মানুষের জয়যাত্রা। কিন্তু সে-মফস্বলের ওই উকিল-মোক্তার-আমলাসর্বস্ব, কতকগুলা পান-বিড়ি-মণিহারী দোকানদার, ক্ষুদ্র চালের কলওয়ালা, তামাকের আড়তওয়ালা ও কাপড়ওয়ালাদের দলপ্রধান ছোট শহর নয়। সে শহরের ঊর্ধ্বলোকে শত শত কলকারখানার চিমনি উদ্যত হইয়া আছে তপস্বীর ঊর্ধ্ব বাহুর মত। অবিশ্বাস্য অপরিমেয় তাহাদের শক্তি। বন্দী দানবের মত যন্ত্রশক্তির মধ্য দিয়া সে শক্তির ক্রিয়া চলিতেছে। উৎপাদন করিতেছে বিপুল সম্পদ-সম্ভার। কিন্তু তবু মরণোন্মুখ পল্লীকে তাহার ভাল লাগিয়াছে। বিগত যুগের মুমূর্ষু প্রাচীন, যাহার সঙ্গে নব যুগের পার্থক্য অনেক,—সেই মুমূর্ষু প্রাচীনের সকরুণ বিদায় সম্ভাষণ যেমন নবীনকে অভিভূত করে, তেমনি এই মরণোন্মুখ প্রাচীন সংস্কৃতির আপ্যায়নও তাহার কাছে বড় সকরুণ ও মধুর বলিয়া মনে হইতেছে।

অনিরুদ্ধের বারান্দায় পাতা তক্তপোষের উপর যতীন দেবুকে বসাইল—বসুন। আপনার সঙ্গে আলাপ করার জন্য উদ্‌গ্রীব হয়ে আছি।

দেবু হাসিয়া বলিল—কাল তো বললেন—আলাপ হয়ে গিয়েছে।

—তা সত্যি। এইবার আলোচনা হবে। দাঁড়ান, তার আগে একটু চা হোক। —বলিয়া সে অনিরুদ্ধের বাড়ীর ভিতরের দরজায় দাঁড়াইয়া ডাকিল—মা-মণি!

মা-মণি তাহার পদ্ম। মা-মণিটি তাহার জীবনে বিষামৃতের সংমিশ্রণে গড়া এক অপূর্ব সম্পদ। তাহার বিষের জ্বালা—অমৃতের মাধুর্য এত তীব্র যে, তাহা সহ করিতে যতীন হাঁপাইয়া উঠে। তাহার সঙ্গে পদ্মের বয়সের পার্থক্যও বেশী নয়, বোধ হয় পাঁচ-সাত বৎসরের—তবু সে তার মা-মণি। এক এক সময়ে যতীনের মনে পড়ে তাহার ছেলেবেলার খেলাঘরে তাহার দিদি সাজিত মা, সে সাজিত ছেলে। প্রাপ্তবয়সে সেই খেলার যেন পুনরাবৃত্তি ঘটিতেছে। সে যখন এখানে আসে তখন পদ্ম প্রায় অর্ধোন্মাদ। মধ্যে মধ্যে মূর্ছারোগে চেতনা হারাইয়া উঠানে, ধূলামাটিতে অসংবৃত অবস্থায় পড়িয়া থাকিত। অনিরুদ্ধ তাহার পূর্ব হইতেই বাউণ্ডুলে, ভবঘুরে, বাড়ীতে থাকিত না। যতীনকেই অধিকাংশ সময় চোখে-মুখে জল দিতে হইত। তখন হইতেই যতীন ডাকে মা বলিয়া। মা ছাড়া আর কোন সম্বোধন সে খুঁজিয়া পায় নাই। সেই মা সম্বোধনের উত্তরেই পদ্ম একদিন প্রকৃতিস্থ হইয়া তাহাকে ডাকিল ছেলে বলিয়া। সেই হইতেই এই খেলাঘর পাতা হইয়াছে। পদ্ম এখন অনেকটা সুস্থ, অহরহ ছেলেকে লইয়াই ব্যস্ত। অনিরুদ্ধের ভাবনা সে যেন ভাবেই না। ক্বচিৎ কখনও আসিলে তাহাকে যত্নও বিশেষ করে না।

বাড়ির ভিতর তখন কলরব চলিতেছে। একপাল ছেলে হুটোপাটি ছুটোছুটি করিয়া বেড়াইতেছিল। পদ্ম একজনের চোখ গামছায় বাঁধিয়া বলিতেছিল—ভাত করে কি?

—টগবগ। —ছেলেটি উত্তর দিল।

—মাছ করে কি?

—ছ্যাঁক-ছোঁক।

—হাটে বিকোয় কি?

—আদা।

—তবে ধরে আন তোর রাঙা রাঙা দাদা।

কানামাছি খেলা চলিতেছে। যতীনের কাছে ছেলের দল আসে। যতীন না থাকিলে তাহারা পদ্মকে লইয়া পড়ে। পদ্মও যতীনের অনুপস্থিতিতে ছেলেদের খেলার মধ্যে বুড়ী সাজিয়া বসে।

যতীন আবার ডাকিল—মা-মণি!

পদ্ম উঠিয়া পড়িল,—কি? চাঁদ-চাওয়া ছেলের আমার আবার কি হুকুম শুনি?

—চায়ের জল গরম আর একবার—

—হবে না। মানুষ কতবার চা খায়?

—দেবু ঘোষ মশায় এসেছেন। চা খাওয়াতে হবে না?

—পণ্ডিত?

—হ্যাঁ।

পদ্ম একহাতে ঘোমটা টানিয়া দিল—চাপা গলায় বলিল—দি।

যতীন হাসিয়া বলিল—পণ্ডিত বাইরে! ঘোমটা দিচ্ছ কাকে দেখে? ওই দেখ, তাই তো!

ঘোমটা সরাইয়া দিয়া পদ্ম অপ্রস্তুতের মত একটু হাসিল।

বাহিরে আসিয়া যতীন দেবুকে বলিল—আপনার নামে একটা ভি-পি আনছি আমি।

দেবু একটু বিব্রত বোধ করিল। —বেনামীতে ভি-পি, কিসের ভি-পি?

—হ্যাঁ। খানকয়েক ছবির বই, একটা রঙ-তুলির বাক্স। আমাদের নলিনের জন্য। পুলিশের মারফত আনানোর অনেক হাঙ্গামা। নলিন ছবি আঁকতে শিখুক। ওর হাত ভাল।

—তা বেশ। কিন্তু তার চেয়ে, নলিন, তুই পটুয়াদের কাছে শেখ না কেন? প্রতিমা গড়তে শেখ, রং করতে শেখ।

নলিন ছেলেটা অদ্ভুত লাজুক, দুই চারিটি অতি সংক্ষিপ্ত কথায় কথা শেষ করে সে। মাটির দিকে চাহিয়া বলিল—পটুয়ারা শেখায় না। বলে পয়সা লাগবে!

যতীন বলিল—পয়সা আমি দেব, তুমি শেখো।

—দু টাকা ফি-মাসে লাগবে।

দেবু বলিল—আচ্ছা, সে আমি বলে দেব দ্বিজপদ পটুয়াকে। পরশু যাব আমি মহাগ্রামে। আমার সঙ্গে যাবি।

নলিন ঘাড় নাড়িয়া সায় দিল—বেশ। কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া বলিল—পয়সা দেবেন বলেছিলেন!

যতীন একটি সিকি তাহার হাতে দিয়া বলিল—তা হলে পণ্ডিত মশায়ের সঙ্গে যাবে তুমি, বুঝলে?

নলিন আবার ঘাড় নাড়িয়া সায় দিয়া নীরবেই উঠিয়া চলিয়া গেল।

যতীন বলিল—এইবার আপনার সঙ্গে আলোচনা আরম্ভ করব। অনেককে জিজ্ঞেস করছি, কেউ উত্তর দিতে পারে নি। অন্ততঃ সন্তোষজনক মনে হয় নি আমার।

—কি বলুন?

—আপনাদের ওই চণ্ডীমণ্ডপটি। এটি কার?

—সাধারণের।

—তবে যে বলে জমিদার মালিক?

—মালিক নয়। জমিদার দেবোত্তরের সেবাইত বলে তিনিই চণ্ডীমণ্ডপের রক্ষণাবেক্ষণ করেন।

—রক্ষণাবেক্ষণও তো, আমি যতদূর শুনেছি, গ্রামের লোকেই করে।

—হ্যাঁ, তা করে। কিন্তু তবু ওই রকম হয়ে আসছে আর কি! ওটা জমিদারের সম্মান। তা ছাড়া শূদ্রের গ্রাম, জমিদার ব্রাহ্মণ, তিনিই সেবায়েত হয়ে আছেন। আর ধরুন, গ্রামের মধ্যে ঝগড়া-ঝাঁটি হয়, দলাদলি হয়। এই কারণেই জমিদারকেই দেবোত্তরের মালিক স্বীকার করে আসা হয়েছে। কিন্তু অধিকার গ্রামের লোকেরই।

—তবে প্রজা-সমিতির মিটিং করতে বাধা দিলে কেন জমিদার-পক্ষ?

—বাধা দিয়েছে!

—হ্যাঁ, মিটিং করতে দেয় নি।

দেবু কিছুক্ষণ ভাবিয়া বলিল—বোধ হয় 'প্রজা-সমিতি' জমিদারের বিরোধী বলে দেয় নাই। তা ছাড়া ওটা তো আর ধর্মকর্ম নয়!

—প্রজা-সমিতি—প্রজার মঙ্গলের জন্য। প্রজার মঙ্গল মানে জমিদারের সঙ্গে বিরোধ নয়। কোন কোন বিষয়ে বিরোধ আসে বটে, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে নয়। আর চণ্ডীমণ্ডপ তো প্রজারাই করেছে, জমিদার করে দেয় নি। জায়গাটা শুধু জমিদারের। সে তো পথের জায়গা জমিদারের। তা বলে প্রজা-সমিতির শোভাযাত্রা চলতে পারে না সে পথে? আর ধর্মকর্ম ছাড়া যদি অধিকার না থাকে, তবে জমিদারের খাজনা আদায়ই বা হয় কি করে ওখানে? দারোগা হাকিম এলেই বা মজলিশ হয় কেন?

দেবু আশ্চর্য হইয়া গেল। ইহার মধ্যে ছেলেটি এত সংবাদ লইয়াছে! সঙ্গে সঙ্গে তাহার মনে একটা সংশয় জাগিয়া উঠিল। চণ্ডীমণ্ডপের স্বত্বাধিকার সত্যই সমস্যার বিষয়। কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া সে বলিল—আজ কথাটার উত্তর দিতে পারলাম না আপনাকে।

ভিতরে খুট খুট করিয়া কড়া নাড়ার শব্দ হইল। যতীন বুঝিল—মা-মণি ডাকিতেছে। বলিল—আমি আর উঠতে পারছি না; তুমিই দিয়ে যাও মা-মণি।

পদ্মের বিরক্তির আর সীমা রহিল না। ছেলেটা যেন কি! দেবু হাসিয়া কহিল—আমাকে লজ্জা করছে নাকি, মিতেনী?

ইহার পর আর বাহির না হইয়া উপায় রহিল না। দীর্ঘ অবগুণ্ঠনে আপনাকে আবৃত করিয়া পদ্ম দুই কাপ চা নামাইয়া দিয়া চলিয়া গেল।

যতীন বলিল—তা ছাড়া লোকজন যারাই ওখানে যান, গোমস্তা শ্রীহরিবাবু তাঁদেরই সাবধান করেন—এ করবে না, ও করবে না! লোকে মেনে নেয়। দুর্বল নিরীহ মানুষ তারা বোঝে না। টাকা দিয়ে শ্রীহরি ঘোষ মেঝে বাঁধিয়ে দিয়েছেন বলে সাধারণের অধিকার নিশ্চয়ই বিক্রি হয়ে যায় নি!

দেবু অনেকক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া বলিল—উপায় কি বলুন? শ্রীহরি ধনী। সে এখন সমস্ত গ্রামেরই শাসনকর্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জমিদার পর্যন্ত তার হাতে গোমস্তাগিরি ছেড়ে দিয়েছেন—পত্তন-বিলির মত শর্ত! করবেন কি বলুন?

যতীন হাসিয়া বলিল—আমি তো কিছু করব না, আমার করবার কথাও নয়। করতে হবে আপনাকে, দেবুবাবু। নইলে উদ্‌গ্রীব হয়ে আপনার জন্য অপেক্ষা করছিলাম কেন?

দেবু স্থিরদৃষ্টিতে যতীনের মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। যতীনও চুপ করিয়া বসিয়া রহিল, সম্মুখের দিকে চাহিয়া।

সহসা কে ডাকিল—বাবু!

—কে?

যতীন ও দেবু দু'জনেই ফিরিয়া দেখিল—ভিতরের দরজায় দাঁড়াইয়া ডাকিতেছে দূর্গা।

দেবু হাসিয়া বলিল—দূর্গা!

—হ্যাঁ।

—কি খবর?

—কামার-বউ জিজ্ঞেস করছে, উনান ধরিয়ে দেবে কিনা? রান্নাবান্না—

যতীন বলিল—হ্যাঁ। তা উনান ধরাতে বল না কেন!

—কি রান্না করবেন?

—যা হয় করতে বল।

সবিস্ময়ে দূর্গা বলিল—করতে বলব কাকে?

—মা-মণিকে বল। না হয়—তুমিই দুটো চড়িয়ে দাও।

দূর্গা মুখে কাপড় চাপা দিয়া হাসিয়া বলিল, আপনি একটুকুন ক্ষ্যাপা বটেন বাবু!

—কেন, দোষ কি? যে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়, সে যে জাতই হোক তার হাতে খেতে দোষ নাই। জিজ্ঞেস কর পণ্ডিতমশাইকে।

—হ্যাঁ, পণ্ডিতমশায়?

দেবু হাসিয়া বলিল—জেলখানায় আমাদের যে রান্না করত সে ছিল হাড়ী। —যতীনের মুখের দিকে চাহিয়া বলিল—নামটি ছিল বিচিত্র—গান্ধারী হাড়ী।

যতীন বলিল—দ্রৌপদী হলেই ভাল হত। চলুন, চান করতে যাব নদীতে। —সে জামাটা খুলিয়া ফেলিয়া গামছা টানিয়া লইল।

দেবু মনে মনে স্থির করিয়াছিল—আর সে পাঁচের হাঙ্গামায় যাইবে না। জেল হইতেই সেই সঙ্কল্প করিয়াই আসিয়াছিল। কিন্তু যতীন ছেলেটি তার সব সঙ্কল্প ওলোট-পালোট করিয়া দিতে বসিয়াছে।

বাড়ী হইতে তেল মাখিয়া গামছা লইয়া, যতীনের সহিত নীরবে সে পথ চলিতেছিল। চণ্ডীমণ্ডপের নিকটে আসিয়াই দেখা হইল বৃদ্ধ দ্বারকা চৌধুরীর সঙ্গে। লাঠি হাতে ঠুক ঠুক করিয়া বৃদ্ধ চণ্ডীমণ্ডপ হইতেই নামিয়া আসিলেন। বৃদ্ধ যতীনের দিকে চাহিয়া বলিলেন—চানে চলেছেন বুঝি?

যতীন হাসিয়া উত্তর দিল—হ্যাঁ।

—আপনি তো তেল মাখেন না শুনি?

—আজ্ঞে না।

—তবে পেনাম। —ঈষৎ হেঁট হইয়া বৃদ্ধ নমস্কার করিলেন।

যতীন একেবারে শশব্যস্ত হইয়া বলিল—না না। ওকি? আপনাকে কতবার বারণ করেছি আমি। বয়সে আমি আপনার চেয়ে—

কথার মাঝখানেই চৌধুরী মিষ্টি হাসিয়া বলিলেন—শালগ্রামের ছোট বড় নাই বাবা। আপনি ব্রাহ্মণ। ওসব আপনাদের সেকালে চলত, সেকাল চলে গেছে।

হাসিটি চৌধুরীর ঠোঁটের ডগায় লাগিয়াই থাকে। হাসিয়া তিনি বলিলেন—এখনকার কাল নতুন বটে বাবা। সেকালের কিছু আর রইল না। কিন্তু আমরা জনকতক যে সেকালের মানুষ, অকালের মতন পড়ে রয়েছি একালে; বিপদ যে সেইখানে!

বৃদ্ধের কথা কয়টি যতীনের বড় ভাল লাগিল, বলিল—সেকালের গল্প বলুন আপনাদের!

—গল্প? হ্যাঁ, তা সেকালের কথা একালে গল্প বৈকি। আবার ওপারে গিয়ে যখন কর্তাদের সঙ্গে দেখা হবে, তখন একালে যা দেখে যাচ্ছি বললে, সেও তাদের কাছে গল্পের মত মনে হবে। সেকালে আমরা গাই বিয়োলে দুধ বিলোতাম, মাছ ধরালে মাছ বিলোতাম, ফল পাড়লে ফল বিলোতাম, ক্রিয়াকর্মে বাসন বিলোতাম, পথের ধারে আম-কাঁঠালের বাগান করতাম, সরোবর দীঘি কাটাতাম, গরু-ব্রাহ্মণকে প্রণাম করতাম, দেবতা প্রতিষ্ঠে করতাম, মহাপুরুষেরা ঈশ্বর দর্শন করতেন—সে আজ আপনাদের কাছে গল্প গো। আর আজকে আকাশে উড়োজাহাজ, জলের তলায় ডুবোজাহাজ, বেতারের খবর আসা, টাকায় আট সের চাল, হরেক রকম নতুন ব্যামো, দেবকীর্তি লোপ,—এও সেকালের লোকের কাছে গল্প।

—আপনি দীঘি কাটিয়েছেন চৌধুরীমশায়?

—আমার কপাল, ভাঙা-ভাগ্যি বাবা। তবে আমার আমলে বাবা কাটিয়েছেন—তখন আমি ছোট, মনে আছে। এক এক ঝুড়ি মাটি—দশ গণ্ডা কড়ি। একজন লোক কড়ি নিয়ে বসে থাকত—ঝুড়ি গুনে গুনে কড়ি দিত; বিকেলে সেই কড়ি নিয়ে পয়সা দিত।

—আধ পয়সা ঝুড়ি বলুন।

—হ্যাঁ।... হাসিয়া চৌধুরী বলিলেন—আমাদের কথা তো আপনারা তবু বুঝতে পারেন গো, আমরা যে আপনাদের কথা বুঝতেই পারি না! আচ্ছা বাবা, এতো যে সব স্বদেশী হাঙ্গামা, বোমা-পিস্তল করছেন—এসব কেন করছেন? ইংরেজ রাজত্বকে তো আমরা চিরকাল রাম-রাজত্ব বলে এসেছি।

একমুহূর্তে যতীনের চোখ দুইটা টর্চের আলোকের মত জ্বলিয়া উঠিল এক প্রদীপ্ত দীপ্তিতে। পরমুহূর্তেই কিন্তু সে দীপ্তি নিভিয়া গেল। হাসিয়া বলিল—বোমা-পিস্তল আমি দেখি নি। তবে হাঙ্গামা হচ্ছে কেন জানেন? হাঙ্গামা হচ্ছে ওই দীঘি সরোবর কাটানো আপনাদের কালকে ওরা নষ্ট করেছে বলে।

বৃদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া বলিলেন—বুঝতে ঠিক পারলাম না। হ্যাঁ গো, পণ্ডিত, আপনি এমন চুপচাপ যে?

চিন্তাকুলভাবেই হাসিয়া দেবু বলিল—এমনি।

আবার কিছুক্ষণ নীরব থাকিয়া বৃদ্ধ দেবুকে বলিল—আপনার কাছে আসব একবার ওবেলায়?

—আমার কাছে?

—হ্যাঁ। কথা আছে। আপনি ছাড়া আর বলবই বা কাকে?

—অসুবিধে না হয় তো এখুনি বলুন না! আবার আসবেন কষ্ট করে। —দেবু উৎকণ্ঠিত হইয়াই প্রশ্ন করিল।

যতীন বলিল—আমি বরং একটু এগিয়ে চলি।

—না না না। বৃদ্ধ বলিলেন—বেলা হয়েছে বলেই বলছিলাম। বুড়ো বয়সে আমার আবার লুকোবার কথা আছে নাকি? চৌধুরী হাসিয়া উঠিলেন—আপনি বোধ হয় শুনেছেন, পণ্ডিত?

—কি বলুন তো?

—এই গাজনের কথা!

—না, কিছু শুনি নি তো!

—গাজনের ভক্তরা বলছে এবার তারা শিব তুলবে না।

—শিব তুলবে না কেন?

—ও, আপনি তো গতবার ছিলেন না! গতবার থেকেই সূত্রপাত। গেলবারে ঠিক গাজনের সময়েই সেটেলমেন্টের খানাপুরীতে শিবের জমি হারিয়ে গেল।

—হারিয়ে গেল!

—জমিদারের নায়েব-গোমস্তা বের করতে পারলে না। নিজেরাই বন্দোবস্ত করেছে মাল বলে। বের করবে কি, পুরোহিতের জমি তা ছাড়া শিবের পুজোর খরচা জিম্মা ছিল মুকুন্দ মণ্ডলের কাছে। শিবোত্তর জমি ভোগ করত ওরা। এখন মুকুন্দের বাবা সে জমি কখন বেচে দিয়ে গিয়েছে মাল বলে। জমিদারও খাজনাখারিজ ফি শুনে নিয়ে দেবোত্তর মাল স্বীকার করেছে। মুকুন্দ এত সব জানত না, সে বরাবর শিবের খরচ যুগিয়েই আসছিল। এখন গতবার জরীপের সময় যখন দেখলে শিবোত্তর জমিই নাই, তখন সে বললে—জমিই যখন নাই, তখন খরচও আমি দেব না। গতবার কোনও রকমে চাঁদা করে পুজো হয়েছে। এবার ভক্তরা বলছে, ও-রকম যেচেমেগে পুজোতে আমরা নাই। তাই একবার শ্রীহরির কাছে এসেছিলাম—পুজোর কি হবে তাই জানতে। এখনও বেঁচে আছি—বেঁচে থাকতেই গাজন বন্ধ হবে বাবা।

—শ্রীহরি কি বললে?

—জমিদারের পত্র দেখালেন, তিনি খরচ দেবেন না। পুজো বন্ধ হয় হোক।

চৌধুরী বলিলেন—গতবার থেকে পাতু ঢাক বাজায় নাই, পাতু জমি ছেড়ে দিয়েছে। বায়েন অবশ্য হবে। অনিরুদ্ধ বলি করে নাই। বলে, একটা পাঁঠার ঠ্যাং নিয়ে ও আমি করতে পারব না। শেষে ও-ই খোঁড়াঠাকুর বলি করলে। এবার সে বলেছে—বলি করতে হলে দক্ষিণা চাই। নানান রকমের গোল লেগেছে পণ্ডিত। এসবের মীমাংসা তো পথে হয় না। তাই বলছিলাম—ও-বেলায় আসব।

দেবু হাঁপাইয়া উঠিতেছিল, সে বলিল—এর আর আমি কি করব চৌধুরীমশায়?

—এ কথা আপনার উপযুক্ত হল না, পণ্ডিত। আপনার মত লোক যদি না করে, তবে কে করবে?

দেবু স্তব্ধ হইয়া গেল।

চৌধুরী কালীপুরের পথে বিদায় লইল। দেবু ও যতীন মাঠ অতিক্রম করিয়া গিয়া নামিল ময়ূরাক্ষীর গর্ভে। দেবু নীরবেই স্নান করিল, নীরবেই গ্রাম পর্যন্ত ফিরিল। যতীন দুই-চারটা কথা বলিয়া উত্তর না পাইয়া গুন-গুন করিয়া কবিতা আবৃত্তি করিল:

তৃণে পুলকিত যে মাটির ধরা লুটায় আমার সামনে
সে আমার ডাকে এমন করিয়া কেন যে কব তা কেমনে।
মনে হয় যেন সে ধূলির তলে
যুগে যুগে আমি ছিনু তৃণে জলে......

বাসায় ফিরিয়া যতীনের সে এক বিপদ। পদ্ম মূর্ছিত হইয়া জলে-কাদায় উঠানের উপর পড়িয়া আছে। মাথার কাছে বসিয়া কেবল দূর্গা বাতাস করিতেছে। তাহারও সর্বাঙ্গে জল-কাদা লাগিয়াছে। ও-ঘরের দাওয়ায় বসিয়া আছে মাতাল অনিরুদ্ধ। মাথাটা বুকের উপর ঝুঁকিয়া পড়িয়াছে, আপন মনেই বিড় বিড় করিয়া সে বকিতেছে। রান্নাবান্নার কোন চিহ্নই নাই।

দূর্গা বলিল,—আপনারা চলে গেলেন, কামার-বউ একেবারে খ্যাপার মতন হয়ে আমাকে বললে—বেরো, বেরো তুই আমার বাড়ী থেকে, বেরো। আমার সঙ্গে দু-চারটে কথা কাটাকাটি হয়ে গেল। আমি মশায়, বাড়ী যাব বলে যেই এখান থেকে বেরিয়েছি, আর শব্দ হ'ল দড়াম করে। পিছন ফিরে দেখি এই অবস্থা। ছুটে এসে জল দিয়ে বাতাস করে কিছুই হ'ল না। খানিক পরে হঠাৎ কর্মকার এল। এসে, ওই দেখুন না, খানিকটা চেঁচামেচি করে ওই বসেছে—এইবার মুখ থুবড়ে পড়বে।

দেবু অনিরুদ্ধকে ঠেলা দিয়া ডাকিল—অনিরুদ্ধ!

একটা গর্জন করিয়া অনিরুদ্ধ চোখ মেলিয়া চাহিল—এ্যাও!

কিন্তু দেবুকে চিনিয়া সে সবিস্ময়ে বলিল—ও, পণ্ডিত!

—হ্যাঁ, শুনছ?

—আলবৎ, একশবার শুনব, হাজারবার শুনব।

পরক্ষণেই সে হু-হু করিয়া কাঁদিয়া উঠিল—আমার অদেষ্ট দেখ পণ্ডিত! তুমি বন্ধুনোক, ভাল নোক; গাঁয়ের সেরা নোক, প্রাতঃস্মরণীয় নোক তুমি—দেখ আমার শাস্তি। পথের ফকির আমি। আর ওই দেখ পদ্মের অবস্থা।

—জগনকে ডেকে আন অনিরুদ্ধ। ডাক্তার ডাক।

অতি কাতর স্বরে অনিরুদ্ধ বলিল—ডাক্তার কি করবে, তাই বল? এ ওই ছিরে শালার কাজ। আমার গুপ্তি কই? আমার গুপ্তি! খুন করব শালাকে। আর ওই দুগগাকে। ওই পশুকে। দুগগা আমাকে বাড়ী ঢুকতে দেয় না পণ্ডিত। আমার সঙ্গে ভাল করে কথা বলে না।

তারপর সে আরম্ভ করিল অশ্লীল গালিগালাজ। দূর্গা নতশির হইয়া নীরবে বসিয়া রহিল।

দেবু বলিল—যতীনবাবু আসুন, আমার ওখানেই দু'টো খাবেন। আমরা গিয়ে বরং জগনকে ডেকে দেব'খন।

দেবু ও যতীন চলিয়া যাইতেই অনিরুদ্ধ আবার আরম্ভ করিল—আর ওই নজরবন্দী ছোঁড়াকে কাটব। ওকেই আগে কাটব। ও ব্যাটাই আমার ঘরের—

দূর্গা এবার ফোঁস করিয়া উঠিল—দেখ কর্মকার, ভাল হবে না বলছি।

অনিরুদ্ধ চৌকাঠের উপর নিষ্ঠুরভাবে মাথা ঠুকিতে আরম্ভ করিল—ওই নে, ওই নে!

দূর্গা বারণ পর্যন্ত করিল না।


কুড়ি



"ফাল্গুনের আট চৈত্রের আট

সেই তিল দায়ে কাট।"

ফাল্গুনের দ্বিতীয় সপ্তাহ হইতে চৈত্রের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে তিল ফসল পাকিলে সেবার চূড়ান্ত ফসল হয়। সে তিল ফসল দা' ভিন্ন কাস্তেতে কাটা যায় না। এবার তিল নাবি, সবে এই ফুল ধরিতেছে, পাকিতে বৈশাখের প্রথম সপ্তাহ। কাজেই ফসল ভাল হইবে না।

ভোরবেলায় মাঠ ঘুরিয়া চাষের জমির তদারক করিয়া দেবু ফিরিতেছিল। এ বৎসর মাঘ মাস হইতে আর বৃষ্টি হয় নাই। বৃষ্টির অভাবে এখনও কেহ আখ লাগাইতে পারে নাই। ময়ূরাক্ষীর জল একেবারে শীর্ণধারায় ওপারে জংশন শহরের কোল ঘেঁষিয়া বহিতেছে; বাঁধ দিয়া জল এপারে আনিতে পারিলে সিচ করিয়া চাষের কাজ চলিত। কিন্তু এ বাঁধ বাঁধা বড় কষ্টসাধ্য। এপার হইতে ওপার পর্যন্ত ময়ূরাক্ষীর গর্ভে বাঁধ দিতে হইবে; অন্তত চার-পাঁচ হাত উঁচু না করিলে চলিবে না। সে করিবে কে? চার-পাঁচখানা গ্রামের লোক একজোট হইয়া না লাগিলে তাহা সম্ভবপর নয়। এখন আখ লাগাইলে সে আখের বিনাশ থাকিত না; বর্ষা পড়িবার পূর্বেই হাত দুয়েক না হোক অন্তত দেড় হাত উঁচু হইয়া উঠিত। পটোল লাগানোও হইল না। 'পটোল ফলিলে ফাল্গুনে ফল বাড়ে দ্বিগুণে'। শ্রীহরি কিন্তু সব লাগাইয়া ফেলিয়াছে। আপনার জমিতে দুই-তিনটা কাঁচা কুয়া কাটাইয়া, 'ঢেড়া'র জল তুলিয়া সিচনের ব্যবস্থা করিয়াছে। শ্রীহরির কুয়া হইতে জল লইয়া ভবেশ-হরিশও কাজ করিয়া লইয়াছে।

দেবু ভাবিতেছিল একটা কুয়া কাটাইবার কথা। পটোল থাক, কিন্তু আখ না লাগাইলে কি করিয়া চলিবে? বাড়ীতে গুড় না থাকিলে চলে? ময়ূরাক্ষীর চরভূমিতে অল্প খুঁড়িলেই জল অতি সহজেই পাওয়া যাইবে, আট-দশহাত গর্ত করিলেই চলিবে। টাকা-পনেরো খরচ। কিন্তু এদিকে যে বিলুর হাতে মজুত টাকা সব শেষ হইয়া আছে। শ্রীহরির স্ত্রী গোপনে ধার দিয়াছে। দূর্গার মারফতে দোকানেও কিছু ধার হইয়া আছে। ধান এবার ভাল হয় নাই। মজুত যাহা আছে—বিক্রি করিতে ভরসা হয় না। সম্মুখে বর্ষা আছে, চাষের খরচ—সংসার খরচ—অনেক দায়িত্ব। গম, যব—তাও ভাল হয় নাই। গম দেড় মণ, যব মাত্র তিরিশ সের। কলাই যাহা হইয়াছে সে সংসারেই লাগিবে। আর স্কুলের চাকরি নাই, মাস মাস নগদ আয়ের সংস্থান গিয়াছে। এখন সে কি করিবে? অথচ এই অবস্থায় গোটা গ্রামটাই যেন তাহাকে টানিতেছে সহস্র সমস্যা হইয়া। যতীনের কথা মনে হইল, দ্বারকা চৌধুরীর কথা মনে হইল।

গ্রামে ঢুকিতেই দেখা হইল ভূপালের সঙ্গে। চৌকিদারী পেটিটা কাঁধে ফেলিয়া সে সকালেই বাহির হইয়াছে। ভূপাল প্রণাম করিল—পেণাম।

প্রতি-নমস্কার করিয়া দেবু চলিয়া যাইতেছিল, ভূপাল সবিনয়ে বলিল—পণ্ডিতমশায়।

—আমাকে কিছু বলছ?

—আজ্ঞে হ্যাঁ, গিয়েছিলাম বাড়ীতে, ফিরে আসছি।

—কি? বল?

—আজ্ঞে, খাজনা আর ইউনিয়ান বোর্ডের ট্যাক্স।

—আচ্ছা, পাবে।

ভূপাল খুশী হইয়া বলিল—এই তো মশায় মানুষের মতন কথা। তা না ডাক্তারবাবু তো মারতে এলেন। ঘোষালমশাই বলে দিলে নেহি দেঙ্গা। আর সবাই তো ঘরে শুকিয়ে বসে থাকছে। মেয়ে-ছেলেতে বলেছে—বাড়ীতে নাই। এদিকে আমি গাল খাচ্ছি।

হাসিয়া দেবু বলিল—না থাকলেই মানুষকে চোর সাজতে হয় ভূপাল।

—ই আপনি ঠিক বলেছেন।

ভূপাল দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া বলিল—কার ঘরে কি আছে বলুন? গোটা মাঠটার ধানই তো ঘোষমশাইয়ের ঘরে এসে উঠল গো। বর্ষার ধান শোধ দিতেই তো সব ফাক হয়। সত্যি, লোকে দেয় কি করে? কিন্তু আমিই বা করি কি বলুন? আমারই এ হইছে মরণের চাকরি!

বাড়ীতে আসিয়া দেবু দেখিল—বিলু তাহার জন্য চা করিয়া বসিয়া আছে। সে আশ্চর্য হইয়া গেল। এ কি!

বিলু লজ্জিত ভাবেই বলিল—দেখ দেখি হয়েছে কিনা! কামার-বউকে শুধিয়ে এলাম। নজরবন্দীর চা কামার-বউ করে কিনা!

—তা না হয় হল। কিন্তু করতে বললে কে?

—তুমি যে বললে—জেলে রোজ নজরবন্দীদের কাছে চা খেতে!

—হ্যাঁ, তা খেতাম। কিন্তু তাই বলে এখনও খেতে হবে তার মানে কি? না; আর খরচ বাড়িয়ো না, বিলু।

—বেশ। এক কৌটো চা আনিয়েছি, সেটা ফুরিয়ে যাক, তারপর আর খেয়ো না।

—এক কৌটো চা আনিয়েছ?

—দূর্গা এনে দিয়েছে কাল সন্ধ্যেবেলা।

দেবুর ইচ্ছা হইল চায়ের বাটিটা উপুড় করিয়া ফেলিয়া দেয়। কিন্তু বিলু ব্যথা পাইবে বলিয়া সে তাহা করিল না। বলিল—আজ করেছ কিন্তু কাল থেকে আর করো না। চায়ের কৌটোটা থাক, ভাল করে রেখে দাও। ভদ্রলোক-জন এলে, কি বর্ষায়-বাদলায় সর্দি-টর্দি করলে খাওয়া যাবে।

—না।

দেবু বিস্মিত হইয়া প্রশ্ন করিল—মানে?

—তোমার কষ্ট হবে।

—হবে না।

—হবে, আমি জানি।

—কি আশ্চর্য!

বিরক্তিতে বিস্ময়ে দেবু বলিল—আমার কষ্ট হবে কিনা আমি জানব না, তুমি জানবে?

—বেশ। করব না চা।

মুহূর্তে বিলুর চোখ দুটি জলে ভরিয়া উঠিল। সঙ্গে সঙ্গে মুখ ফিরাইয়া সে চলিয়া গেল। দেবু একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিল। এই বোধ হয় তাহাদের জীবনে প্রথম দ্বন্দ্ব। বিলুকে আঘাত দেওয়ার দুঃখ বড় মর্মান্তিক হইয়া দেবুর অন্তরে বাজিল।

—মুনিবমশায়! —দেবুর কৃষাণ আসিয়া দাঁড়াইল।

—কি রে?

—আজ্ঞে, এবার তো একখানা কোদাল না হলে চলবে না।

—নতুন চাই? লোহা চাপিয়ে হবে না?

—না, আজ্ঞে। গেলবারই লাগত, আপুনি ছিলেন না। লোহা দিয়ে কোন রকমে চালিয়েছি, ক্ষয়ে এই এতটুকুন হয়ে গিয়েছে। সার কেটে পালটানোই যাচ্ছে না।

—সার কাটছ নাকি? জল দিচ্ছ তো? চল দেখি।

চৈত্র মাসে ‘সার’ প্রস্তুতের গর্তে সঞ্চিত আবর্জনাগুলিকে কোদাল দিয়া উপরের নূতন না-পচা আবর্জনা নিচে ফেলিয়া, নিচের পচা আবর্জনা যাহা 'সারে' পরিণত হইয়াছে—সেগুলিকে উপরে দেওয়ার বিধি। সঙ্গে সঙ্গে ভারে ভারে জল। দেবুর বাড়ীর সার কোনমতে কাটিয়া পালটানো হইয়াছে। কৃষাণটি কোদালটা দেখাইল। সত্যই সেটা ক্ষয় পাইয়া ছোট হইয়া গিয়াছে, উহাতে চাষের কাজ চলিবে না। চাষের কাজে ভারী কোদাল চাই। সেকালে শক্তিমান চাষীরা যে কোদাল চালাইত, তাহার ওজন পাঁচ সেরের কম হইত না, সাত-আট সের ওজনের কোদাল চালাইবার মত সক্ষম চাষীও অনেক ছিল।

দেবু বলিল—বেশ কোদাল একখানা—কি করবে, বরাত দিয়ে করাবে, না কিনবে? কেনা জিনিস ভাল হয় না, তবে সস্তা বটে।

—কিন্তু কামার কোথা?

—অনিরুদ্ধ তো কাজের বার হয়েছে। অন্য কামার যাকেই দেবে কাল দোব বলে ছ-মাসের আগে দেবে না। তবে তাই কিনেই দেন। আর শন্ চাই। হালের 'জুতি' চাই। রাখালটা বলছিল—গরুর দড়িও ছিঁড়েছে।

দেবু একটা কাজ পাইয়া খুশী হইল। শন্ পাকাইয়া দড়ি করার কাজ—পল্লীগ্রামে নিষ্কর্মার কর্ম—বুড়োর কাজ। সে তখনই ঢেঁড়া-শন্ লইয়া আসিল। দড়ি পাকাইতে পাকাইতে সে ভাবিতেছিল—কি করিবে সে?

কৃষাণ কিছুক্ষণ পরে আবার আসিয়া দাঁড়াইল।

—আর একটা কথা বলছিলাম যে মুনিবমশায়!

—কি, বল?

—পাড়ার লোকে সবাই আসবে আপনার কাছে। তা আমাকে বলেছে, তু বলে রাখি পণ্ডিতমশায়কে।

—কি, ব্যাপার কি?

—আজ্ঞে চণ্ডীমণ্ডপে আটচালা ছাওয়াতে আমরা বেগার দি। তা এবার ডাক্তোরবাবু, ঘোষাল—সব কমিটি করেছেন, ওঁরা বলছেন—পয়সা নিবি তোরা। বেগার ক্যানে দিবি? চণ্ডীমণ্ডপ জমিদারের, জমিদারকে খরচ দিতে হবে।

দেবু চুপ করিয়া রহিল। আপনার গৃহকর্মে মন দিয়া দড়ি পাকাইতে বসিয়া সে ভবিষ্যতের কথা ভাবিতেছিল—ভাবিতেছিল একটা দোকান করিবে সে; এবং তাহার সঙ্গে ভাল করিয়া চাষ। প্রয়োজন মত সে নিজে লাঙল ধরিবে। এখন কিছু না করিলে সংসার চলিবে কিসে?

কৃষাণটা আবার বলিল—আমরা তাই ভাবছি। ডাক্তারবাবু কথাটি মন্দ বলেন নাই। চণ্ডীমণ্ডপে জমিদারের কাছারি হয়, ভদ্দোনোকের মজলিস হয়, তোদের সঙ্গে চণ্ডীমণ্ডপের 'লেপচ' (সংস্রব) কি? বিনি পয়সায় ক্যানে খাটবি? আবার ওদিকে ঘোষমশায় লোক পাঠাচ্ছেন—কবে ব্যাগার দিবি? ঘোষমশায় গাঁয়ের মাথার নোক; আবার গোমস্তা হয়েছেন। ওঁর কথাই বা ঠেলি কি করে? তার ওপর গ্রাম-দেবতাও বটে। তাই সব বলছে পণ্ডিতমশায়ের কাছে যাব। উনি যেমনটি বলবেন, তেমনটি শিরোধার্য আমাদের!

দেবুর মন-প্রাণ ঠিক গত কল্যকার মত হাঁপাইয়া উঠিল।

কিছুক্ষণ অপেক্ষা করিয়া কৃষাণটি ডাকিল—মুনিবমশায়?

—আমি এখন কিছু বলতে পারলাম না, নোটন!

—আপনি যা বলবেন আমরা তাই করব। সে আমাদের ঠিক হয়ে রইচে।

সে উঠিয়া গেল। দেবুর হাতের শন্-ঢেঁড়া নিশ্চল হইয়া গিয়াছিল—সে সম্মুখের দিকে চাহিয়া বসিয়া রহিল।

চণ্ডীমণ্ডপে লোকজনের সাড়া উঠিতেছে। সেখানে খাজনা আদায় চলিতেছে। সঙ্গে সঙ্গে খাতকদের কাছে শ্রীহরির পাওনার হিসাবও চলিতেছে। আখেরি কিস্তি, বৎসরের শেষ। তামাদি যাহাদের, তাহাদের উপর নালিশ হইবে। শ্রীহরির ধানের পাওনা হিসাব করিয়া উসুল বাদে যাহা থাকিবে, আগামী বৎসরে তাহার জের চলিবে; যাহার উসুল নাই, তাহার আসল-সুদ এক হইয়া আগামী বৎসরের জন্যে আসল হইবে।

শ্রীহরির গোয়ালঘরগুলি ছাওয়ানো হইতেছে। চালের উপর ঘরামীরা কাজ করিতেছে, চাষীদের ঘর-ছাওয়ানোর কাজ প্রায় শেষ হইয়া গিয়াছে। সকলে নিজেরাই বাড়ীর কৃষাণ-রাখাল লইয়া ঘর ছাওয়াইয়া লয়। দেবুরও অবশ্য ছাওয়ানোর কাজ না-জানা নয়। কিন্তু পণ্ডিতি গ্রহণ করিয়া আর সে এ কাজ করে না, এবার করিতে হইবে। তাহার ঘর এখনো ছাওয়ানো হয় নাই। সে একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিল।

—সালাম পণ্ডিতজী!

ইছু সেখ পাইকার আরও দুই-তিন জনের সঙ্গে পথ দিয়া যাইতেছিল; দেবুকে দেখিয়া সে সম্ভাষণ করিয়া দাঁড়াইল। সঙ্গে তাহার সঙ্গীরাও সম্ভাষণ করিল—সালাম।

—সেলাম। ভাল আছ ইছু-ভাই? তোমরা ভাল আছ সব?

—হ্যাঁ। আপনি শরীফ ছিলেন?

—হ্যাঁ।

—তা আপনাকে আমরা হাজারবার সালাম করেছি। হ্যাঁ—মরদের বাচ্ছা মরদ বটে। মছলেদে আমাদের হামেশাই কথা হয় আপনকার। মহু মিঞা, খালেক সায়েব, গোলাম মির্জা আসবে একদিন আপনকার সাথে মোলাকাৎ করতে।

দেবু প্রসঙ্গটা পাল্টাইয়া দিল—কোথায় এসেছিলে?

—এই গাঁয়েই বটে। কিস্তির সময়—ছাগল, গরু দু'চারটে বেচবে তো। তা ধরেন—হ'ল আমার কেনাবেচার গাঁও তাই টাকাকড়ি নিয়ে এসেছিলাম। আর কেনা তো উঠেই গিয়েছে। কিন্‌নেওয়ালা হয়ে গেল। আপনার তো একটা বলদ বুড়ো হয়েছে পণ্ডিতমশায় আপনি ল্যান ক্যানে একটা বলদ!

—এবার আর হয় না, ইছু-ভাই।

—আপনি ল্যান, বুড়ো বলদটা দ্যান আমাকে, বাকী যা থাকবে—দিবেন আমাকে ইহার পরে। না-হয় কিছু ধান ছেড়ে দ্যান, ধানের পাইকার আমার সাথে।

দেবু হাসিল।—না ভাই, থাক।

—আচ্ছা, তবে থাক।

ইছুর দল সেলাম করিয়া চলিয়া গেল। পাকা ব্যবসাদার ইছু, মানুষের টাকার প্রয়োজনের সময় সে টাকা লইয়া উপস্থিত হইবেই। কাহার বাড়ীতে কোন্ জন্তুটি মূল্যবান সে তাহার নখাগ্রে। কিন্তু মহু মিঞা, খালেক সাহেব, গোলাম মির্জা তাহার সহিত দেখা করিতে আসিবে কেন? সে মনে মনে অস্বস্তি অনুভব করিল। ইহারা সম্ভ্রান্ত লোক, বড় চাষী, ব্যবসায়ী।

রাখাল-ছোঁড়া আসিয়া দেবুর শিশুটিকে নামাইয়া দিয়া বলিল—আপনি একবার ল্যান, মুনিবমশায়। আমাকে কিছুতেই ছাড়ছে না। গরু চরাইতে যাবে আমার সাথে।

ছোঁড়াটা হি-হি করিয়া হাসিতে হাসিতে খোকাকে বলিল—নেকা-পড়া কর বাবার কাছে। গরু চরাতে যেতে নাই। ছি!

দেবু সাগ্রহে খোকাকে বুকে তুলিয়া লইল। ছেলেটাও তেমনি, বিলু তাহাকে বেশ তালিম দিয়াছে, সে গম্ভীরমুখে আরম্ভ করিল—কল কলো, ক ল কলো!

—কি হচ্ছে পণ্ডিত?

বলিয়া এই সময় অনিরুদ্ধ আসিয়া বসিল। এখন সে প্রকৃতিস্থ। মুখে মদের সামান্য গন্ধ উঠিতেছে, কিন্তু মাতাল নয়। হাতে একটা লোহার টাঙ্গি।

হাসিয়া দেবু বলিল—চেতন হয়েছে, অনি ভাই?

কোন লজ্জা বোধ না করিয়া অনিরুদ্ধ হাসিয়া বলিল—কাল একটুকু বেশী হয়েছিল বটে।

দেবু বলিল—ছি, অনি-ভাই! ছি।

অনিরুদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ করিয়া রহিল, তারপর অকস্মাৎ খানিকটা হাসিয়া বলিল—ও তুমি জান না, দেবু-ভাই। রস তুমি পাও নাই—তুমি বুঝবে না।

তিরস্কার করিয়া দেবু বলিল—তোমার জমি নীলামে উঠেছে, কি নীলাম হয়েছে, ঘরে পরিবারের অসুখ, আর তুমি মদ খেয়ে বেড়াও—পয়সা নষ্ট কর।

—পয়সা আর বেশী খরচ আমি করি না, এখন পচাই মদ খাই। এখন জমি নীলামের কথাই তোমাকে বলতে এসেছি। আর পরিবারের অসুখ তো, আমি কত ভুগবো বল?

—তুমি তো এমন ছিলে না অনি-ভাই!

—কে জানে? মদ তো আমি বরাবরই একটু-আধটু খাই। আমি তো অন্যায় কিছু বুঝতে পারি না।

—বুঝতে পার না! পৈতৃক ব্যবসা তুলে দিলে! ছোটলোকের মত পচাই ধরেছ। যেখানে সেখানে খাও-শোও!

—কি করব? অনি কামারের দা, ক্ষুর, গুপ্তি—কিনবে কে? কোদাল-কুড়ুল-ফাল—তাও এখন বাজারে মেলে—সস্তা। গাঁয়ে কাজ করলে শালারা ধান দেয় না। কি করব? তাই পচাই! পয়সায় কুলোয় না—কি করব?

—কি করবে! তোমার বোধশক্তিও লোপ পেয়েছে, অনি-ভাই?

—কে জানে?

—দূর্গার ঘরে খাও অনি ভাই? তার ঘরে তুমি রাত কাটাও?

—দূর্গার নাম করো না পণ্ডিত। নেমকহারাম, পাপী, শয়তানের একশেষ। আমাকে আর ঘরে ঢুকতে দেয় না।

অনিরুদ্ধের এই নির্লজ্জ স্বীকারোক্তিতে দেবু চুপ করিয়া রহিল।

...অনিরুদ্ধ বলিয়া গেল—জানো পণ্ডিত, দূর্গার জন্যে আমি জান দিতে পারতাম—পারি। দূর্গাই আমাকে নিজে থেকে ডেকেছিল। তখন আমার পরিবার পাগল। মিছে কথা বলব না, সে-সময় দূর্গা আমার পরিবারের সেবা পর্যন্ত করেছে, টাকাও দিয়েছে। দারোগা ওর এককালের আশনাইয়ের লোক—দারোগাকে বলে নজরবন্দীর জন্যে আমার ঘরখানি ভাড়া করিয়ে দিয়েছে। মাসে দশ টাকা ভাড়া, কিন্তু ওর সব চোখের নেশা! যাকে যখন ভালবাসে। এখন ওই নজরবন্দীর উপর নজর পড়েছে—

—ছি, অনিরুদ্ধ! ছি!

—যতীনবাবুর দোষ আমি দিই না। ভাল লোক, উঁচুঘরের ছেলে। পদ্মকে 'মা' বলে। আমি পরখ করে দেখেছি। যাক গে ও-কথা। মরুক গে দূর্গা। এখন যা বলতে এসেছি, শোন। বাকী খাজনার ডিক্রি জারি হয়ে গিয়েছে, জমি এইবার নীলামে চড়বে। ও ঝঞ্ঝাট আমি রাখব না। এখন বিক্রি করে দিয়ে যা পাই! তোমাকে ভাই দেখেশুনে আমার জোতটি বেচে দিতে হবে।

—বেচে দেবে? —দেবুর বিস্ময়ের আর অবধি রহিল না।

—হ্যাঁ।

—তারপর?

—সে যা হয় করব। ছিরে গোমস্তাকে আমি খাজনা দেব না।

—পাগলামি করো না, অনি-ভাই।

—পাগলামি? তবে যাক, এমনি ন’কড়া-ছ’কড়ায় নিলেম হয়ে যাক। আমার দ্বারা কিছু হবে না।

—বাকী খাজনার টাকাটা যোগাড় কর। হয় খাজনার পরিমাণ দামের মত জমি বেচে দাও, নয় ধার পাও তো দেখ।

অনেকক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া অনিরুদ্ধ বলিল—দেবু-ভাই, বাপুতি সম্পত্তি ছেড়ে দোব মনে করলে বুক ফেটে যায়। জানো পণ্ডিত, ওই চার বিঘে বাকুড়ি, আগে ঠাকুরদাদার আমলে সাতখানা টুকরো টুকরো জমি ছিল। কেটে-কুটে সাতখানাকে ঠাকুরদাদা করেছিল তিনখানা। বাবা তিনখানাকে কেটে করেছিল দুখানা। সাড়ে-তিন বিঘে বাকুড়ি—আর দশ কাঠা ফালি। দুখানাকে কেটে আমি করেছি একখানা চারবিঘে বাকুড়ি।

টপ, টপ, করিয়া বড় বড় কয় ফোঁটা জল তাহার চোখ হইতে ঝরিয়া পড়িল।

দেবু তাহার পিঠে হাত বুলাইয়া বলিল—কেঁদো না, অনি-ভাই। তুমি সক্ষম বেটা-ছেলে, তুমি মন দিয়ে কাজ করলে তোমার কিছুর অভাব হতে পারে না।

বিচিত্র হাসিয়া অনিরুদ্ধ বলিল—হাজার মন পাতিয়ে কাজ করলেও কামারের কাজ করে আর অভাব ঘুচবে না, পণ্ডিত। উপায় এক—কলে কাজ। তাই দেখব এবার। দূর্গা আমাকে বলেছিল একবার—আমি গা করি নাই। কেশব কামারের ছেলে, হিতু কামারের নাতি—আমি কলের কুলি হব? ওই সব কি-না-কি জাতের মিস্ত্রীদের তাঁবেদার হয়ে থাকব? জানো দেবু, এমন দা আমি গড়তে পারি যে এক কোপে শেলেদা বাঘের গলা নেমে যাবে!

অনিরুদ্ধকে শান্ত করিবার জন্যই রহস্য করিয়া দেবু বলিল—সেই তো তোমার ভুল, অনি-ভাই, ও দা নিয়ে লোকে করবে কি বল? বাঘ কাটতে যাবে কে?

অনিরুদ্ধ এবার হাসিয়া ফেলিল।

দেবু বলিল—টাকা যদি ধার পাও তো দেখ, অনি-ভাই। জমি রাখতেই হবে। তারপর মন দিয়ে কাজ-কর্ম কর। ক্ষতি কি? কলে—কলেই কাজ কর আপাতত।

অনেকক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া অনিরুদ্ধ বলিল—তুমি বলছ। —আবার একটু চুপ করিয়া থাকিয়া বলিল—তাই দেখি।

পথে বাহির হইয়া অনিরুদ্ধ বাড়ী গেল না। বাড়ী তাহার ভাল লাগে না। পদ্ম তাহাকে চায় না, সেও পদ্মকে চায় না। নিক্তির ওজনে চরিত্রবান্ সে কোনদিনই নয়; কিন্তু পদ্মের প্রতি ভালবাসার অভাব তাহার কোনদিন ছিল না। চরিত্রহীনতার ব্যভিচার ছিল তাহার খেয়াল পরিতৃপ্তির গোপন পন্থা, উন্মত্ত দেহলালসার দাহ নিবৃত্তির জন্য পঙ্কস্থান।

অকস্মাৎ কোথা হইতে জীবনে একটা দুর্যোগ আসিয়া সব বিপর্যস্ত করিয়া দিল। সেই দুর্ভোগের মধ্যে দূর্গা আসিয়া দাঁড়াইল মোহিনীর বেশে, শুধু মোহিনীর রূপ লইয়াই নয়—অফুরন্ত ভালবাসাও দিয়াছিল দূর্গা। সেবা যত্ন—এমন কি নিজের পার্থিব সম্পদও সে তখন অনিরুদ্ধের জন্য ঢালিয়া দিতে চাহিয়াছিল, কিছু দিয়াছেও।

তা ছাড়া দূর্গার সঙ্গ তাহাকে যে তৃপ্তি দিয়াছে, পদ্ম তাহার সুস্থ সবল যৌবন-পরিপূর্ণ দেহ লইয়াও সেরূপ তৃপ্তি দিতে পারে নাই। তাহার বুকে আছে এক বোঝা মাদুলি; চিরদিন সে তাহাতে বেদনা অনুভব করিয়াছে। আচার-বিচার-ব্রত-বার পালনের আগ্রহে, শুচিতা-বোধের উগ্রতায় পদ্ম তাহাকে অস্পৃশ্যের মত দূরে ঠেলিয়া রাখিয়াছে। তাহার ভালবাসায় যত্নের আধিক্য, মমতার আতিশয্য অনিরুদ্ধকে পীড়া দিয়াছে। সঙ্কোচশূন্য অধীরতায় দূর্গার মত বুকে ঝাঁপ দিয়া পড়িতে সে কোনদিনই পারে নাই। সমস্ত দিন আগুনের কুণ্ড জ্বালিয়া তাহারই সম্মুখে বসিয়া সর্বাঙ্গ ঝলসাইয়া, সে বাড়ী ফিরিয়া একটু করিয়া মদ খাইত। কিন্তু ওই দেহ-মন লইয়া পদ্মের সম্মুখে দাঁড়াইলেই তাহার নেশার আগ্রহ সব যেন হিম হইয়া যাইত।

দূর্গার মধ্যে আগুন ও জল—দুই-ই আছে, একাধারে জ্বলিবার ও জুড়াইবার উপাদান। তাহার যৌবনে আছে আবেগময়ী মানবীর ঈষদুষ্ণ স্বাদ; তাহা অনিরুদ্ধকে উন্মত্ত করিয়া তুলিয়াছে। তাহার ভালবাসায় আছে সর্বস্ব ঢালিয়া দিবার আকৃতি। কামারশালা অচল হইলে, কর্মহীন অনিরুদ্ধ বিশ্বগ্রাসী অবসাদ হইতে বাঁচিবার জন্য সস্তা মদ ধরিবার সময়টিতেই দূর্গা আক্রোশবশে ছিরুকে ছাড়িয়া তাহাকে সাগ্রহে জড়াইয়া ধরিয়াছিল।

সেই চরম আত্মসমর্পণের মধ্যে দূর্গার নিকট সেও আপনাকে বিলাইয়া দিয়াছিল। কিন্তু দূর্গা সহসা একদিন তাহাকে পরিত্যাগ করিয়া সরিয়া দাঁড়াইয়াছে—নূতনের মোহে। দূর্গা তুষানল ও মরীচিকা—দুই-ই। সে পাষাণী, বিশ্বাসঘাতিনী, মায়াবিনী!

হঠাৎ সে চমকিয়া উঠিল। এ কি! এ যে অন্যমনস্ক ভাবে চলিতে চলিতে একেবারে বায়েন-পাড়াতেই দূর্গার ঘরের সামনে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছে। দূর্গা উঠানে দুধ মাপিতেছে, রোজের দুধ দিতে যাইবে।

সে ফিরিল তাড়াতাড়ি। পাড়াটা পার হইয়া সে মাঠের ধারে আসিয়া দাঁড়াইল। দূর্গা তাহাকে পরিত্যাগ করিয়াছে, সেই-বা দূর্গার পিছনে ঘুরিবে কেন? সে-ও পরিত্যাগ করিবে। দেবু তাহাকে ঠিক কথাই বলিয়াছে। এখন সে বুঝিতে পারিতেছে—তাহার কত পরিবর্তন হইয়াছে! ছি ছি! কেশব কর্মকারের ছেলে—হিতু কর্মকারের নাতি—সে মুচির মেয়ের ঘেঁষে পড়িয়া থাকে তাহার উচ্ছিষ্ট দেহখানার লোভে—তাহার দুই-চারিটি টাকা-পয়সার প্রত্যাশায়, ছি! সে না সক্ষম বেটাছেলে—একজন নামকরা লোহার কারিগর।

পরক্ষণেই সে হাসিল। লোহার কারিগরের আর মান নাই—নাম নাই। চার আনার বিলাতি চাকু-ছুরিতেই নামের গলা দু-ফাঁক হইয়া গিয়াছে। সে এক দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিল। থাক—নাম যাক—মানও যাক, জানটাই থাকুক, চাল-কলে তেল-কলে নাটবল্টু কষিয়া, হাতুড়ি ঠুকিয়া মিস্ত্রী হইয়াই বাঁচিয়া থাকিবে সে। জোতটাকেও বাঁচাইতে হইবে। ঠাকুরদাদার মাথায় ঘাম পায়ে ফেলিয়া নিজের হাতে কাটা জমি, বাবার কাটা জমি, তাহার নিজের হাতে কাটা ওই বাকুড়ি—তাহার সোনার বাকুড়ি—'লক্ষ্মী-জোল', তাহার মা অন্নপূর্ণা!

আপনা হইতেই তাহার দৃষ্টি সম্মুখের শস্যশূন্য মাঠের উপর দিয়া প্রসারিত হইয়া নিবদ্ধ হইল চার বিঘার বাকুড়ির উপর। সে চলিতে আরম্ভ করিল; আসিয়া বাকুড়ির আইলের উপর বসিল। আইলের মাথায় একটা কয়েৎবেলের গাছ। গাছটা লাগাইয়াছিল তাহার পিতামহ। বাল্যকালে তাহার বাপ চাষ করিত, সে আসিত বাপের ও কৃষাণের খাবার লইয়া, আসিয়া ওই গাছতলায় বসিত। জ্বর-জ্বালার পর কতদিন এখানে আসিয়া নুন দিয়া কয়েৎবেল খাইয়াছে। লক্ষ্মী পুজোতে, পর্বে-পার্বণে এই ধানের চালে হইয়াছে অন্ন, ওই কয়েৎবেল গুড়-নুন দিয়া মাখিয়া হইয়াছে চাটনি।

অনেকক্ষণ বসিয়া থাকিয়া অনিরুদ্ধ সঙ্কল্প লইয়া উঠিল—এ জোত তাহাকে রাখিতেই হইবে!

সে চলিল 'আকুলিয়া গ্রামের কাবুলী চৌধুরীর কাছে। ফ্যালারাম চৌধুরী, কঙ্কণা ইস্কুলের মাস্টার, তাহার সুদি কারবার আছে। খুব চড়া সুদ ও ভয়ঙ্কর তাগাদার জন্যে অনেক লোকে বলে 'কাবুলী'। অনেকে বলে 'অজগর'—তাহার গ্রাসে পড়িলে নাকি আর বাহির হওয়া যায় না। অনেকে বলে 'খুনে'। একবার একটা চোর ধরিয়া চৌধুরী চোরটাকে খুন করিয়া ফেলিয়াছিল।

চৌধুরীর জমির ক্ষুধা বড় প্রবল। ভাল সম্পত্তি হইলে চৌধুরী টাকা দিবেই। সে পাকুলিয়া গ্রামের পথই ধরিল।

চৌধুরী লেখাপড়া-জানা লোক, বি-এ পাস, এদিকে আবার সংস্কৃতেও কি একটা পরীক্ষা দিয়াছে, ইস্কুলে সে হেডপণ্ডিত। কিন্তু আসলে সে একজন প্রথম শ্রেণীর আঙ্কিক। সুদ কষিতে তাহার কাগজ-কলম দরকার হয় না। চক্রবৃদ্ধিহারে দশ-বিশ বৎসরের সুদ মুখে মুখে হিসাব করিয়া দেয়। তবে সুদকে আসলে পরিণত করিয়া সেটা উসুলের হিসাব আলোচনার সময় দুই-চারিটা সংস্কৃত শ্লোক আওড়াইয়া অঙ্কগুলাকে রসায়িত অথবা পারমার্থিক তত্ত্বমণ্ডিত করিয়া দেয়।

অনিরুদ্ধ বলিল—আমি ঠিক সময়ের মধ্যে টাকা শোধ করব, চৌধুরীমশাই—আমি ফাঁকিবাজ নই। আর পালিয়ে বেড়িয়ে দেখা করব না, সে স্বভাবও আমার নয়।

চৌধুরী হাসিল—ফাঁকি দেবার উপায় নাই, বাবা। আর পালিয়েই বা যাবি কোথায়? বলিয়া সে একটা শ্লোক আওড়াইয়া দিল—'গিরৌ কলাপী গগনে চ মেঘো, লক্ষান্তরেঽর্ক সলিলে চ পদ্মম্'। বুঝলি অনিরুদ্ধ, মেঘ থাকে আকাশে আর ময়ূর থাকে পাহাড়ে, দূর অনেক। কিন্তু মেঘ উঠলেই ময়ূরকে বেরিয়ে এসে পেখম মেলতেই হবে। আর সূর্য থাকে আকাশে, জলে পদ্মের কুঁড়ি। কিন্তু সূর্য উঠিলেই পদ্মকে বাপ বাপ বলে পাপড়ি খুলতেই হবে। খাতক-মহাজন সম্বন্ধ হলে যেখানে থাকিস না কেন, হাজির তোকে হতেই হবে—পালাবি কোথা।

অনিরুদ্ধ কথাগুলো ভাল করিয়া বুঝিল না, দাঁত মেলিয়া শুধু নিঃশব্দে হাসিল। কথাগুলোয় রসের গন্ধ আছে।

চৌধুরী মুখে মুখেই হিসাব করিল—বিঘেতে চল্লিশ টাকা দিলে, তিন বছরে চল্লিশ তো ষাটে গিয়ে দাঁড়াবে। এতে নালিশের খরচা চাপলে মহাজনের থাকবে কি বল? তার ওপর খাতক আবার যদি বাকী খাজনা ফেলে যায়, তবে তো আমাকে রঘু রাজার মত ভাঁড়ে জল খেতে হবে!

অনিরুদ্ধ তাহার পায়ে ধরিয়া বলিল—আজ্ঞে, আমি আপনার পা ছুঁয়ে বলছি, এক বছরের মধ্যেই সব টাকা শোধ করব আমি।

পা টানিয়া লইয়া চৌধুরী বলিল—পায়ে ধরিস না অনিরুদ্ধ, পায়ের ফাটে হাত-মুখ ছিঁড়ে যাবে তোর। ছাড়।

মিথ্যা বলে নাই, চৌধুরীর কালো কর্কশ চামড়ায়, কোন ব্যাধির জন্যই হউক বা শরীরে কোন উপাদানের অভাব হেতুই হউক, বারোমাস ফাট ধরিয়া থাকে। শীতকালে সাদা ফাটগুলো রক্তাভ হইয়া উঠে। সব চেয়ে ভয়ঙ্কর, চৌধুরীর পায়ের তলাকার ফাট, শুষ্ক কঠিন চামড়া, ছুরির মত ধারালো।

পা'টা ছাড়াইয়া লইয়া চৌধুরী তারপর সান্ত্বনা দিয়া বলিল—এক বছরেই যখন শোধ করবি, তখন ছ'বিঘে কেন দশবিঘে বন্ধক দিতেই বা আপত্তি কিসের তোর? কাগজে লেখা থাকবে বই তো নয়?

অনিরুদ্ধ চুপ করিয়া রহিল; সে ভাবিতেছিল দেহের গতিকের কথা, দেবতার গতিকের অর্থাৎ বৃষ্টি-অনাবৃষ্টির কথা।

চৌধুরী তার মনের ভাব ধরিয়া ফেলিয়া বলিল—এক বছরেই শোধ করিস আর পাঁচ বছরে করিস—তোকে মরতে আমি দোব না। সুদ আমি বাকী রাখি না, রাখবও না। বাকী থাকলে আসলই থাকবে, তাতে বেইমানি করিস, তাহলে ব্রাহ্মণের গণ্ডুষ। কিছু ভয় করিস না। চৌধুরী হাসিতে লাগিল।

অনিরুদ্ধ বলিল—সুদ আপনি মাসে মাসে পাবেন।

—ঠিক তো?

—তিন সত্য করছি আপনার চরণ ছুঁয়ে।

—তবে দিনতিনেক পরে আসিস্। আমি সব খোঁজখবর করে দেখি।

—খোঁজ করবেন। কি খোঁজ করবেন?

—আর কোথাও বন্ধক-টন্ধক দিয়েছিস কিনা।

—আপনার চরণ ছুঁয়ে বলছি—

চৌধুরী বলিল—এইবার চরণ দু'টিকে আমাকে শিকেয় তুলতে হবে বাবা। তাতে তোরই খারাপ হবে। রেজেস্ত্রী অফিসে যাওয়া হবে না, তুইও টাকা পাবি না। খোঁজ না করে আমি টাকা কাউকে দিই না, দোবও না।

অনিরুদ্ধ তবু উঠিল না। ভ্রান্ত ক্লান্ত দেশান্তরী উদাসীনের অকস্মাৎ প্রিয়জনকে মনে পড়িয়া যেমন বাড়ী ফিরিবার জন্য ব্যাকুল আগ্রহ জাগে, অনিরুদ্ধের আজ তেমনি ব্যাকুল আগ্রহ জাগিয়া উঠিয়াছে আবার সেই পূর্বের সংযত সচ্ছল জীবনে ফিরিবার জন্য। সেই ফিরিবার পথের পাথেয় চাই তাহার। চার বছরের বাকী খাজনা সালিযানা পঁচিশ টাকা দশ আনা হিসাবে একশত আড়াই টাকা; সিকি সুদ পঁচিশ টাকা দশ আনা একুনে একশো আটাশ টাকা দু'আনা, খরচা লইয়া একশো চল্লিশ কি পঁয়তাল্লিশ, দেড়শো টাকাই ধরিয়া রাখা ভাল। আরও একশো চাই। সে বলদ এক জোড়া কিনিবে। জমি ভাগে না দিয়া, একটি কৃষাণ রাখিয়া সে বাপ-ঠাকুরদার মতই ঘরে চাষ করিবে। তাহার নিজের জমি তের বিঘা। তাহার সঙ্গে অন্য কাহারও বিঘাপাঁচেক জমি সে ভাগে লইতেও পারিবে। সঙ্গে সঙ্গে জংশন শহরের ধান-কলে বা তেল-কলে একটা চাকরিও লইবে। রাত্রি থাকিতে সে উঠিবে, গরু দুটাকে আপন হাতে খাইতে দিবে। কৃষাণ হাল লইয়া যাইবে, সেই সঙ্গে সে-ও বাহির হইবে—একেবারে সারাদিনের মত সাজিয়া গুছাইয়া। জমিগুলি দেখিয়া শুনিয়া ওই পথেই চলিয়া যাইবে সে জংশনে কলের কাজে। ফিরিবার পথে আবার একবার মাঠ ঘুরিয়া বাড়ী আসিবে। মদ খাইতে হয়—একটু না খাইলে সে বাঁচিবে না—বোতল কিনিয়া আনিয়া বাড়ীতে রাখিবে, পদ্ম মাপিয়া ঢালিয়া দিবে—ব্যাস! কলের মাইনে দৈনিক আট আনা হিসাবে চারিটা রবিবার বাদ দিয়া তের টাকা—বৎসরে একশো ছাপ্পান্ন টাকা নগদ আয়। ধান, কলাই, গুড়, গম, যব, তিসি, সরিষা হইবে চাষে। নজরবন্দীর বাড়ী ভাড়া আছে মাসিক দশ টাকা। অভাব আর তাহার থাকিবে না। এ ছাড়াও সে বাড়ীতে আবার কামারশালা খুলিবে। রাত্রে যাহা পারে, যতটুকু পারে করিবে; দৈনিক দু'গণ্ডা পয়সা রোজগার হইলেও তাহাতেই তাহার দৈনিক নুন-তেলের খরচা তো চলিয়া যাইবে। ঋণ শোধ দিতে তাহার কয় দিন! ঋণ শোধ দিয়া সে জমা করিবে সঞ্চয়; সঞ্চয় হইতে সুদি কারবার। খৎ-তমসুকে নয়, জিনিস-বন্ধকী কারবার। ঘাটতি নাই পড়তি নাই, বৎসরে একটি টাকা দু'টাকায় পরিণত হইবে। ইহার উপর তাহার বাকুড়ির আরো আধ হাত মাটি তুলিয়া সে যদি গর্ত করিতে পারে—তবে বাকুড়িতে হাজাশুকা থাকিবে না। মাটি তুলিয়া গাড়ি-গাড়ি সার এবং মরা পুকুরের পাঁক ঢালিয়া দিবে। উনো ফসল দুনো হইবে।

চৌধুরী বলিল—বসে থাকলে তো টাকা মিলবে না, অনিরুদ্ধ! আমি খোঁজখবর করি, তারপর—এদিকে বেলাও যে দশটা হ'ল। আমার আবার ইস্কুল আছে।

অনিরুদ্ধ বলিল, আজই চলুন কঙ্কণা, রেজেস্টারী আপিসে খোঁজ করুন।

হাসিয়া চৌধুরী বলিল—আজই? থামতে চায় না! বেশ, বোস তুই। টিফিনের সময় খোঁজ করব। তোর অশ্বতর যে পক্ষীরাজের চেয়েও জিন্দে দেখছি! আমি চান করে দুটো খেয়ে নি। চল আমার সঙ্গে।

টিফিনেও খোঁজ শেষ হইল না। চৌধুরী বলিল—আবার সেই শেষ ঘণ্টা, তিনটে-দশের পর আবার অবসর। তুই তা হলে বোস্।

শেষ ঘণ্টায় হেডপণ্ডিত চৌধুরীর ধর্ম-সম্বন্ধীয় বক্তৃতার ক্লাস। এ ক্লাসটার সময় চৌধুরী প্রায়ই ছেলেদের স্বাধীনভাবে ধর্মচর্চার অবকাশ দিয়া রেজেস্ত্রী অফিসের কাজগুলি সারিয়া থাকে। দলিল-দস্তাবেজ বাহির করে, কে কোথায় কি নিল—কি বেচিল, কে কি বন্ধক দিল ইত্যাদি সংবাদগুলি সংগ্রহ করিয়া রাখে।

অনিরুদ্ধ সেই অপেক্ষা করিয়া রহিল। সমস্ত দিন খাওয়া হয় নাই। সে খানকয়েক বাতাসা কি দুই টুকরা পাটালির প্রত্যাশায় পরাণ ময়রার দোকানে বসিয়া পরাণের তোষামোদ করিতে আরম্ভ করিল। পাটালি বাতাসা মিলিল না, কিন্তু ক্ষুধা-তৃষ্ণা সে ভুলিয়া গেল; পরাণের বিধবা ভাগ্নী দোকান করে, তাহার সঙ্গে বেশ আলাপ জমাইয়া ফেলিল। একটা হইতে তিনটা—দুই ঘন্টা সময় যেন মেয়েটার হাসির ফুঁয়ে উড়িয়া গেল!

চৌধুরী আসিয়া বলিল—দেখা আমার হয়ে গেল, অনিরুদ্ধ, বুঝলি?

—হয়ে গেল আজ্ঞে!

—হ্যাঁ। তোকে আর ডাকি নাই। দেখলাম গল্পেতে খুব জমে গিয়েছিস, রসভঙ্গ করা পাপ, শাস্ত্র নিষিদ্ধ। —বলিয়া চৌধুরী হাসিল।

অনিরুদ্ধ একটু লজ্জিত হইল।

—টাকা আমি দোব।

—দেবেন! —উৎসাহে অনিরুদ্ধ উঠিয়া দাঁড়াইল।

—হ্যাঁ। কিন্তু তোর তো আজ সারাদিন খাওয়া হ'ল না রে!

—তা এই বাড়ী গিয়ে—এই তো কোশখানেক পথ আছে।

আনন্দের আবেগে অনিরুদ্ধ কোন কথাই শেষ করিতে পারিল না।

—আচ্ছা পরশু আসিস্। তাহলে শীগগির বাড়ী চল। মেঘ উঠেছে। ঝড়-জল হবে মনে হচ্ছে। —চৌধুরী চলিয়া গেল।

মেয়েটি বলিল—তুমি খাও নাই এখনো?

—তা হোক। এই কতক্ষণ! বোঁ বোঁ করে চলে যাব।

—এই বাতাসা কখানা ভিজিয়ে জল খাও। খাও নাই—বলতে হয়!

বাতাসা ভিজাইয়া জল খাইয়া অনিরুদ্ধ যেন বাঁচিল। টাঙিটা হাতে করিয়া সে পথে নামিয়া হন হন করিয়া বাড়ী চলিল। কিন্তু কঙ্কণার প্রান্তে আসিয়া পৌঁছিতে-না-পৌঁছিতে ঝড় উঠিয়া পড়িল। পৌষের পর হইতে বৃষ্টি হয় নাই। চারিদিক রুক্ষ হইয়া উঠিয়াছিল। চৈত্রমাসের মাঝামাঝিতেই যেন বৈশাখের চেহারা দেখা দিয়াছে। অকালেই উঠিয়া পড়িয়াছে কাল-বৈশাখীর ঝড়। দেখিতে দেখিতে চারিদিক অন্ধকার হইয়া গেল, দুর্দান্ত ঝড়ের তাড়নায় পৃথিবী হইতে আকাশ পর্যন্ত পিঙ্গল ধুলায় ধূসর হইয়া উঠিল, তাহার উপর ঘনাইয়া আসিল—দ্রুত আবর্তনে আবর্তিত পুঞ্জ পুঞ্জ মেঘের ঘন ছায়া—দুইয়ে মিলিয়া সে এক বিচিত্র পিঙ্গলাভ অন্ধকার। গোঁ গোঁ শব্দ করিয়া ঝড়ের সে কি দুর্দান্তপনা!

অনিরুদ্ধ আশ্রয় লইল একটা গাছতলায়। শিলাবৃষ্টি বজ্রপাতও হইতে পারে? কিন্তু উপায় কি? আবার কে এখন এই দুর্যোগে গ্রামের মধ্যে ছুটিয়া যায়? আর মরণ তো একবার!

সোঁ-সোঁ শব্দে প্রবল ঝড়। ঝড়ে চালের খড় উড়িতেছে, গাছের ডাল ভাঙিতেছে। বিকট শব্দে ওই কার টিনের ঘরের চাল উড়িয়া গেল। কিছুক্ষণ পরেই নামিল ঝম্ ঝম্ করিয়া বৃষ্টি, দেখিতে দেখিতে চারিদিক আচ্ছন্ন করিয়া মুষলধারে বর্ষণ। আঃ, পৃথিবী যেন বাঁচিল! ঠাণ্ডা ঝড়ো হাওয়ায় ভিজা মাটির সোঁদা সোঁদা গন্ধ উঠিতে লাগিল।

বৈশাখের আগে এ অকাল-বৈশাখী ভাল নয়। 'চৈতে মথর মথর, বৈশাখে ঝড় পাথর, জ্যৈষ্ঠে মাটি ফাটে, তবে জেনো বর্ষা বটে!' তবে একটা ভাগ্য ভাল, শিল পড়িল না। উপকার হইল, জমিতে চাষ চাইবে। এ সময়ে একটা চাষ পাঁচ গাড়ি সারের সমান। কাটা ধানের গোড়াগুলি উল্টাইয়া দিবে, সেগুলি মাটির ভিতর পচিতে পাইবে। মাটি ফোপরা নরম হইবে। হাতে তুলিয়া ধরিলেই এলাইয়া পড়িবে আদরিণী মেয়ের মত! রোদে বাতাসে মাটি ‘তা’ খাইবে!

ঝড়-জল থামিতে সন্ধ্যা ঘুরিয়া গেল। অন্ধকার রাত্রি, ক্রোশখানেক দীর্ঘ মেঠো পথ, মাঠে কাদা হইয়া উঠিয়াছে, গর্তে জল জমিয়াছে। জায়গায় জায়গায় জলের স্রোতে ভাসিয়া আসিয়া স্তূপীকৃত হইয়া উঠিয়া জমিয়াছে খড়কুটা-পাতা—নানা আবর্জনা। চারিদিকে ব্যাঙগুলা জলের সাড়ায় ও স্বাদে মুখর হইয়া উঠিয়াছে। মধ্যে মধ্যে বিষধর সরীসৃপের সাড়া পাওয়া যাইতেছে—সুদীর্ঘ দেহ লইয়া সর সর শব্দে চলিয়া যাইতেছে। কিন্তু অনিরুদ্ধের কোন দিকে ভ্রূক্ষেপ নাই। টাঙিটা হাতে করিয়া সে নির্ভয়ে চলিতে চলিতে গান ধরিল। সাপ! সাপের প্রাণের ভয় নাই? উচ্চকণ্ঠে গান শুধু তাহার আনন্দের অভিব্যক্তি নয়, সরীসৃপদের প্রতি সরিয়া যাইবার নোটিশ! সে নোটিশ সত্ত্বেও যদি কাহারও দুর্মতি হয়—মাথা তুলিয়া গর্জন করে, তবে তাহার হাতে আছে এই টাঙি। সাপ—সে হাসিল।

যেবার সে দুইখানা জমি কাটিয়া একখানা বাকুড়িতে পরিণত করে, সেবারে একটা পুরানো পগার কাটিবার সময় কালকেউটে মারিয়াছিল বারোটা। পাঁচটা ছিল চার হাত করিয়া লম্বা। সাপ কি অপর জানোয়ারকে সে ভয় করে না। ভয় তাহার মানুষকে। ছিরুকে আগে গ্রাহ্য করিত না, কিন্তু শ্রীহরি এখন আসল কালকেউটে! চৌধুরীও ভীষণ জীব!

ঝড়ে গ্রামটা তছনছ করিয়া দিয়াছে। গাছের ডাল ভাঙিয়াছে, পাতায় খড়ে পথেঘাটে আর চলা যায় না। চণ্ডীমণ্ডপের ষষ্ঠীতলার বকুলগাছটার বড় ডালটাই ভাঙিয়া পড়িয়াছে। চালের খড় সকলেরই কিছু-না-কিছু উড়িয়াছে। হরেন্দ্র ঘোষাল একখানা ঘর করিয়াছিল গম্বুজের মত, উঁচুতে প্রায় মাঝারি তালগাছের সমান। সেইখানার চালটাকে একেবারে উপড়াইয়া হরিশ মোড়লের পুকুরের জলে ফেলিয়া দিয়াছে। বায়েনপাড়া, বাউড়ীপাড়ার দুর্দশার একশেষ হইয়াছে। তালপাতা এবং খড়ে ছাওয়ানো ঘরগুলির আচ্ছাদন বলিতে কিছু রাখে নাই। তাহার উপর বর্ষণে দেওয়াল গলিয়া মেঝে ভিজিয়া কাদা সপ-সপ করিতেছে।

যাক, দেবু-ভায়ের কিছু যায় নাই। আহা, বড় ভাল লোক দেবু-ভাই। জগনের ডাক্তারখানার কেবল বারান্দার চালটা মাঝখানা উল্টাইয়া গিয়াছে। আশ্চর্য, শ্রীহরি বেটার কোন ক্ষতি হয় নাই। টিনের ঘরে, বেটা লোহার দড়ির টানা দিয়াছে। এই রাত্রেই রাঙাদিদি ঘরের খড়কুটা পরিষ্কার করিতে করিতে দেবতাকে গাল পাড়িতেছে।

আপনার বাড়ীর সম্মুখে আসিয়া অনিরুদ্ধ দাঁড়াইল।

দাওয়ায় বসিয়া ছিল যতীন! সে বই পড়িতেছিল, প্রশ্ন করিল—কে?

—আজ্ঞে, আমি। অনিরুদ্ধ।

—কোথায় ছিলেন সমস্ত দিন?

—কাজে গিয়েছিলাম বাবু।

কথাটা বলিয়া অনিরুদ্ধ অন্ধকারের মধ্যেও তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চালের দিকে চাহিয়া দেখিল।

যতীন একটু আশ্চর্য হইয়া গেল—অনিরুদ্ধ আজ সুস্থ কথাবার্তা বলিতেছে। এ অবস্থাটা যেন অনিরুদ্ধের পক্ষে অস্বাভাবিক। সে আবার প্রশ্ন করিল—শরীর ভাল আছে তো? কি দেখছেন?

—দেখছি চালের অবস্থা। নাঃ, উড়ে নাই কিছু। কেবল কোঠা ঘরের পশ্চিম দিকের চালের খড়গুলা আতঙ্কিত সজারুর কাঁটার মত উপরের দিকে ঠেলিয়া উঠিয়াছে। আসছি বাবু। অনেক কথা আছে।

সে বাড়ীর ভিতরে চলিয়া গেল। কিছু খাইতে হইবে। পেট হু-হু করিয়া জ্বলিতেছে।

পদ্ম বাড়ীর উঠান হইতে পথ-ঘাট পর্যন্ত সব ইহারই মধ্যে পরিষ্কার করিয়া ফেলিয়াছে। ওপাশের দাওয়ায় যে বসিয়া রহিয়াছে, ওটা কে? একটা ছেলে! কে? ও বাউণ্ডুলে তারিণীর সেই ছেলেটা! জংশনে ভিক্ষা করিতে করিতে এখানে আসিয়া জুটিল কি করিয়া? পদ্মের কাছে আসিয়া বলিল—ওটা কোথা থেকে এল?

অনিরুদ্ধকে সুস্থ দেখিয়া পদ্মও অবাক হইয়া গেল। অনিরুদ্ধ এবারে ছেলেটাকে বলিল—এখানে কোথা থেকে এসে জুটলি?

হাসিয়া পদ্ম বলিল—নজরবন্দী নিয়ে এসেছে আজ জংশন থেকে, বাবুর চাকর হবে।

—হুঁ, যত মড়া গাঙের ঘাটের জড়ো! দে, এখন খেতে দে দেখি। ঘরে কি আছে?

শুনিবামাত্র পদ্ম সঙ্গে সঙ্গেই উঠিল। যাইতে যাইতে বলিল—জংশন-ইষ্টিশানে কার কি চুরি করেছিল, লোকে ধরে মারছিল—নজরবন্দী ছেলে ছাড়িয়ে নিয়ে এসেছে।

অনিরুদ্ধ বিরক্ত হইয়া উঠিল। কোন দিন আবার তাহার বাড়ীর কিছু কিংবা ওই নজরবন্দীর কিছু চুরি করিয়া না পালায় ছেলেটা! সে রূঢ়স্বরে বলিল—এই ছোঁড়া, কোথায় চুরি করেছিলি? কি চুরি করেছিলি?

ছোঁড়া ভীত অথচ ক্রুদ্ধ জানোয়ারের মত মাথা হেঁট করিয়া আড়চোখে তাহার দিকে চাহিয়া রহিল, কোন উত্তর দিল না।

পদ্ম বলিল—কি ধারার মানুষ গো তুমি! নিয়ে এসেছে অন্য একজনা, তোমার বাড়ীতে তো আসে নাই ও! তুমি বকছ কেনে বল তো? তা ছাড়া ছেলেমানুষ, অনাথ, ওর দোষ কি? যা রে বাবা, তুই উঠে তোর মুনিবের ওই দিকে যা।

ছোঁড়াটা কিন্তু তেমনি ভঙ্গিতে সেইখানে বসিয়াই রহিল, নড়িল না।


একুশ



‘চাষ আর বাস' পল্লীর জীবনে দুইটা ভাগ। মাঠ আর ঘর—এই দুইটি ক্ষেত্রেই এখানে জীবনের সকল আয়োজন সকল সাধনা। আষাঢ় হইতে ভাদ্র—এই তিনমাস পল্লীবাসীর দিন কাটে মাঠে—কৃষির লালন-পালনে। আশ্বিন হইতে পৌষ সেই ফসল কাটিয়া ঘরে তোলে—সঙ্গে সঙ্গে করে রবি ফসলের চাষ। এ সময়টাও পল্লীজীবনের বারো আনা অতিবাহিত হয় মাঠে। মাঘ হইতে চৈত্র পর্যন্ত তাহার ঘরের জীবন। ফসল ঝাড়িয়া, দেনা-পাওনা মিটাইয়া সঞ্চয় করে, আগামী চাষের আয়োজন করে, ঘরের ভিতর-বাহির গুছাইয়া লয়। প্রয়োজন থাকিলে নূতন ঘর তৈয়ারী করে, পুরানো ঘর ছাওয়ায়, মেরামত করে; সার কাটিয়া জল দেয়, শন পাকাইয়া দড়ি করে। গল্প-গান-মজলিস করে, চোখ বুজিয়া হরদম তামাক পোড়ায়, বর্ষার জন্য তামাক কাটিয়া গুড় মাখাইয়া হাঁড়ির মধ্যে পুরিয়া জলের ভিতর পুঁতিয়া পচাইতে দেয়। চাষীর পরিবারের যত বিবাহ সব এই সময়ে—মাঘ ও ফাল্গুনে। জের বড় জোর বৈশাখ পর্যন্ত যায়। হরিজনদের চৈত্রমাসেও বাধা নাই, পৌষ হইতে চৈত্রের মধ্যেই বিবাহ তাহারা শেষ করিয়া ফেলে।

অকালে—চৈত্রমাসের মাঝামাঝি এই অকাল—কালবৈশাখীর ঝড়জলে সেই বাঁধাধরা জীবনে একটা ধাক্কা দিয়া গেল। ভোরবেলায় শনের দড়ি পাকানো ছাড়িয়া সবাই মাঠে গিয়া পড়িল। প্রবীণদের সকলের হাতেই হুঁকা। অল্পবয়সীদের কোঁচড়ে অথবা পকেটে বিড়ি-দেশলাই, কানে আধপোড়া বিড়ি। সকলে আপন আপন জমির চারিপাশের আইলে ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। উঁচু ডাঙা জমিতে দুই-চারিজন আজই লাঙলের চাষ দিতে আরম্ভ করিয়াছে। নিম্নভূমি—জোলান জমিগুলিতে এখনও জল জমিয়া আছে, দুই-চারিদিন গিয়া খানিকটা না শুকাইলে এসব জমিতে চাষ চলিবে না। ময়ূরাক্ষীর চরভূমিতে তরি-তরকারির চারাগুলি মাতৃস্তন্য-বঞ্চিত শীর্ণকায় শিশুর মত এতদিন কোনমতে বাঁচিয়া ছিল। এইবার মহীরাবণের পুত্র অহিরাবণের মত দশ-দিনে দশ-মূর্তি হইয়া উঠিবে। তিলের ফুল সবে ধরিতেছে, জলটায় তিলের খানিকটা উপকার হইবে। তবে অপকারও কিছু হইয়া গেল, যে ফুলগুলি সদ্য ফুটিয়াছিল, এই বর্ষণে তাহার মধু ধুইয়া যাওয়ায় তাহাতে আর ফল ধরিবে না। এইবার আখ লাগানো চলিবে। জলটায় উপকার হইয়াছে অনেক। তবে গ্রামে ঘর-বাড়ীর ক্ষতি হইয়াছে প্রচুর। তাহার আর কি করা যাইবে!

গ্রামের মেয়েরা ঝড়ে বিপর্যস্ত বাড়ী-ঘর পরিষ্কার করিতে ব্যস্ত। কোমরে কাপড় বাঁধিয়া খড়-কুটা জড়ো করিতেছে,—সমস্ত সারে ফেলিতে হইবে। ছেলের দল আমবাগানে ছুটিয়া আমের গুটি কুড়াইতেছে। হরিজনদের মেয়েরা ঝুড়ি কাঁখে সেই ভোরবেলায়, কোঁচড় ভরিয়া পথে-ঘাটে-বাগানে—পাতা-খড়-কাঠি শুকনা ডাল-পাতা সংগ্রহ করিয়া প্রচণ্ড বোঝা বাঁধিয়া ঘরে আনিয়া ফেলিতেছে; জ্বালানি হইবে। তাহাদের নিজেদের ঘর-দুয়ার এখনও সাফ হয় নাই। পুরুষেরা যে-যার কাজে গিয়াছে। কেহ চাষী-গৃহস্থবাড়ীর বাঁধা কাজে, কেহ জংশনে কলের কাজে, কেহ ভিন গাঁয়ে দিনমজুরিতে।

দূর্গা আপনার ঘরে বসিয়াছিল। তাহার কাজ বাঁধা-ধরা। তাহার বাহিরে সে যায় না। সে এই সব পাতা-কুটা কুড়াইয়া কখনও জ্বালানি করে না। জ্বালানি সে কেনে। ভোরবেলায় একদফা দুধ দোহাইয়া সে নজরবন্দীবাবুকে দিয়া আসিয়াছে; পথে বিলুদিদিকেও খানিকটা দিয়া, সেইখানেই চা খাইয়া, বাড়ী আসিয়া বসিয়াছে। আগে আগে কিছুদিন সে চা খাইত কামার বউয়ের বাড়ীতে, কামার-বউ নজরবন্দীবাবুর চা করিত, নজরবন্দীকে চা দিয়া বাকিটা পদ্ম এবং দূর্গা খাইত। কিন্তু সেদিন পদ্মের সেই রূঢ় কথার পর আর সে কামার বউয়ের বাড়ীর ভিতর যায় না। বাহিরে-বাহিরেই নজরবন্দীবাবুর দুধের যোগান দিয়া, দুই-চারটা কাজ-কর্ম করিয়া দিয়া চলিয়া আসে। নজরবন্দীও আজ কয়েক দিন তাহাকে কোন কথা বলে নাই। সে বসিয়া বসিয়া ভাবিতেছিল, কাল হইতে সে আর নিজে দুধ দিতে যাইবে না। মাকে দিয়া পাঠাইয়া দিবে। যে মানুষ কথা কয় না, তাহাকে যাচিয়া কথা বলা তাহার অভ্যাস নাই।

দূর্গার মা উঠান সাফ করিতেছিল; বউটা ডাল-পালা খড়-কুটা কুড়াইতে গিয়াছে।

পাতু আপনার ছেলেটাকে লইয়া বসিয়া আছে দাওয়ার উপর। লোকে বলে ছেলেটা নাকি দেখিতে অনেকটা হরেন ঘোষালের মত হইয়াছে, কিন্তু তবু পাতু ছেলেটাকে বড় ভালবাসে। বছর খানেকের মধ্যে পাতুর অদ্ভুত পরিবর্তন ঘটিয়াছে। অবস্থা এবং প্রকৃতি দুয়েরই। পূর্বে পাতু বায়েন বেশ মাতব্বর লোক ছিল। আচারে-ব্যবহারে বেশ একটু ভারিক্কী চাল দেখাইয়া চলিত। তখন পাতুর চালচল্তি দেখিয়া লোকে হিংসা করিত। ভাগাড়ের চামড়া হইতে তাহাদের ছিল মোটা আয়। চামড়া বেচিত, কতক চামড়া নিজে পরিষ্কার করিয়া ঢোল, তবলা, বাঁয়া, খোল প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্র ছাইয়া দিত। পাতুর ছাওয়া খোল তবলার শব্দের মধ্যে কাঁসার আওয়াজের মিঠা রেশ বাজিত। এই ভাগাড় হইতেই আসিত তাহার আয়ের বারো আনা। বাকী সিকি আয় ছিল চাকরান জমির চাষ এবং এখানে-ওখানে ঢাকের বাজনা হইতে। ভাগাড়টা এখন হাতছাড়া হইয়া গিয়াছে। জমিদার টাকা লইয়া বন্দোবস্ত করিয়াছে। বন্দোবস্ত লইয়াছে আলেপুরের রহমৎ শেখ এবং কঙ্কণার রমেন্দ্র চাটুজ্জে।

চাকরান-জমিও পাতুর গিয়াছে, সে-জমি এখন জমিদারের খাস খতিয়ানের অন্তর্ভুক্ত। জমিটা পাতু নিজেই ছাড়িয়া দিয়াছে। না দিয়াই বা উপায় কি ছিল? তিন বিঘা জমি লইয়া বারোমাস পালে-পার্বণে ঢাক বাজাইয়া কি হইবে? যেদিন বাজাইতে হইবে সেই দিনটাই মাটি। তার চেয়ে সে বরং নগদ মজুরিতে এখানে-ওখানে বাজনা বাজাইয়া আসে—সে ভাল। বায়না থাকিলে পরিষ্কার কাপড়ের উপর চাদর বাঁধিয়া ঢাক কাঁধে লইয়া পাতু বাহির হয়, ফিরিয়া আসে দুই-একটি টাকা লইয়া; উপরন্তু দুই-একটা পুরানো জামা-কাপড়ও লাভ হয়। প্রায় বারোটা মাসই সে এখন বেকার। জন-মজুর খাটিতেও পারে না! বাদ্যকর-বায়েন বলিয়া তাহার একটি সম্ভ্রম আছে, সে জন-মজুর খাটিবে কেমন করিয়া? বসিয়া বসিয়া সে ভাগাড় বন্দোবস্ত লওয়ার কথাটাই ভাবে। তাহার চেয়েও ভাল হয় যদি চামড়ার ব্যবসা করিতে পারে। তাহাদেরই স্বজাতি নীলু বায়েন—এখন অবস্থা নীলু দাস, চামড়ার ব্যবসা করিয়া লক্ষপতি ধনী হইয়াছে। এখন সে কলিকাতায় থাকে, মস্ত বড় চামড়ার ব্যবসা। মস্ত বাড়ী করিয়াছে, বাড়ীতে ঠাকুর প্রতিষ্ঠা করিয়াছে। সে-সব দেখিবার জন্য এম-এ, বি-এল পাস করা একজন সরকারী হাকিম সরকারী চাকরি ছাড়িয়া তাহার ম্যানেজারি করিতেছে। প্রকাণ্ড বসত বাড়ী, হাওয়া-গাড়ী, ঠাকুর-বাড়ী আছে। দেশে আপনার গ্রামে কঙ্কণার বাবুদের মত ইস্কুল ও হাসপাতাল করিয়া দিয়াছে। তাহার ছেলে নাকি লাটসাহেবের মেম্বার। পাতু চামড়া ব্যবসায় ও ভাগাড় বন্দোবস্ত লইবার কল্পনা করে, সঙ্গে সঙ্গে এমনি ঐশ্বর্যের স্বপ্ন দেখে।

বারোমাস জীবনধারণের ব্যবস্থা করে তাহার স্ত্রী এবং দূর্গা। যে পাতু একদা দূর্গাকে কঠিন ক্রোধে লাঞ্ছিত করিয়া ছিল—ছিরু পালের প্রতি প্রীতির জন্য, সেই পাতু হরেন ঘোষালের সঙ্গে সাদৃশ্য থাকা সত্ত্বেও ছেলেটাকে ভালবাসে—দিনরাত আদর করে। মধ্যে মধ্যে ঘোষালের কাছে যায়, আবদার করিয়া বলে—আজ চার আনা পয়সা কিন্তু দিতে হবে, ঘোষালমশায়!

দূর্গা নৈশ-অভিসারে যায় কঙ্কণায়, জংশনে। প্রতীক্ষমান ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করে—সঙ্গে কে?

অন্ধকারের অস্পষ্ট মূর্তিটি সরিয়া যায়, দূর্গা বলে—ও আমার সঙ্গে এসেছে।

—কে?

—আমার দাদা।

অস্পষ্ট মূর্তি হেঁট হইয়া নীরবে নমস্কার করে।

দূর্গা বলে—একটা সিগারেট দেন, ও ততক্ষণে বসে বসে খাক।

বাবুদের বাগান বাড়ীর কোন গাছতলায় অথবা বারান্দায় সিগারেটের আগুনের আভায় পাতুকে তখন চেনা যায়। আসিবার সময় সে একটা মজুরি পায়—চার আনা হইতে আট আনা; দূর্গা আদায় করিয়া দেয়।

সেদিন পাতু মনস্থির করিয়া বার বার দূর্গাকে বলিল—পঁচিশ টাকা বই তো লয়! দে না দুগ্‌গা, ভাগাড়টা জমা নিয়ে লি।

দূর্গা বলিল—সে হবে। আজ এখুনই দুটো গাছের তালপাতা কেটে আন্ গা দিকি, ঘরটা তো ঢাকতে হবে!

এই তাহাদের চিরকালের ব্যবস্থা। উড়িলে কি পুড়িলে ঘরের জন্য ইহারা ভাবে না। পুড়িলে কাঠ-বাঁশের জন্য তবু ভাবনা আছে, উড়িলে সেটা ইহারা গ্রাহ্য করে না। খামারের মাঠে তালগাছ কাটিয়া আনিবে, পুকুরের পাড়ের অথবা নদীর বাঁধের উপরে তালগাছ কাটিয়া আনিয়া ঘর ছাইয়া ফেলিবে। শুধু পুরুষদের ফিরিবার অপেক্ষা,—কাজ হইতে ফিরিয়া তাহারা গাছে উঠিয়া পাতা কাটিবে, মেয়েরা মাথায় তুলিয়া ঘরে আনিবে। দু-চারিজন মেয়েও গাছে চড়িয়া পাতা কাটে। দূর্গাও এককালে তালগাছে চড়িতে পারিত, কিন্তু এখন আর গাছে চড়ে না। কোঠাঘর চালে বেশ পুরু খড়ের ছাউনি—মজবুত বাঁধনে বাঁধা। প্রয়োজনও নাই, তাহার চালের খড় কিছু বিপর্যস্ত হইয়াছে, বিশৃঙ্খল হইয়াছে এইমাত্র, উড়িয়া যায় নাই। ওগুলাকে আবার সমান করিয়া বসাইতে অবশ্য গোটা দুয়েক মজুর লাগিবে। এ কাজ পাতুকে দিয়াই হইবে, তাহাকেই বরং দুই দিনের মজুরি দিবে।

দূর্গার কথার উত্তরে পাতু বলিল—হুঁ।

—হুঁ তো ওঠ! গা যা।

—বউটো আসুক আগে।

—বউ এলে পাঠিয়ে দোব, বউকে মাকে; তুই এখন যা দিকি। পাতা কেটে ফেল।

দূর্গার মা উঠান পরিষ্কার করিতে করিতে বলিল—মা লারবে বাছা। তুমি খেতে দিচ্ছ—তোমার 'তিলশুনো' খাটছি, উপায় নাই, আবার বেটার খাটুনি খাটতে পারব না আমি। ক্যানে, কিসের লেগে? কখনো মা বলে দু-গণ্ডা পয়সা দেয় না—একটুকরা ট্যানা দেয় না, যে ওর লেগে আমি খাটব?

পাতু হুঙ্কার দিয়া উঠিল—আমরা দিই না তোর কোন্ বাবা দেয় শুনি?

—শুনলি দুগ্‌গা, বচন শুনলি খাল্‌ভরার?

দূর্গা বাধা দিয়া বলিল—থাম্ বাপু তোরা। তোর গিয়েও কাজ নাই, চেঁচিয়েও কাজ নাই। বউ আসুক—আমরা দুজনায় যাব। দাদা তু এগিয়ে চল।

কোমরে কাটারি গুঁজিয়া পাতু আসিয়া উঠিল নদীর ধারে। ময়ূরাক্ষীর ব্যারোধী বাঁধটা নদীর সঙ্গে সমান্তরাল হইয়া পূর্ব-পশ্চিমে চলিয়া গিয়াছে। বাঁধের গায়ে সারিবন্দী অসংখ্য তালগাছ এবং শরগাছ। পাতু বাছিয়া বাছিয়া ঢলকো পাতা দেখিয়া একটা গাছে চড়িয়া বসিল।

ওই খানিক দূরে গাছের উপর 'আখনা' অর্থাৎ রাখহরি বাউড়ি পাতা কাটিতেছে। তার ওধারের গাছটায়ও কে? পুরুষ নয়, মেয়ে! আপনার বউ পরী! এপাশে এই গাছটায় ওটা কে? পাতু ঠাহর করিতে না পারিয়া ডাকিল—কে রে ওইখানে?

—আমি গণা। অর্থাৎ গণপতি।

—আর কে বটে?

—আমার পাশে বাঁকা, হুই রয়েছে ছিদাম। হুই মতিলাল।

গাছে চড়িয়াই সবার আলাপ-আলোচনা চলিতেছিল। সহসা এদিকে আখনা চীৎকার করিয়া উঠিল—হুই! হুস হুই ধা! উঃ! হুম ধা, উঃ! বাবা রে, মেরে ফেলালে লাঠিয়ে! ঠোঁটের চাড় কি রে বাবা!

আপনার জিহ্বার একটু জড়তা আছে, স্পষ্ট কথা বাহির হয় না।

আখনাকে দুইটা কাক আক্রমণ করিয়াছে। মাথার উপর কা-কা করিয়া উড়িতেছে, আর ঠোঁট দিয়া ঠোকুর মারিতেছে। গাছটায় কাকের বাসা আছে। ওপাশে পরী, স্বামীকে গাল পাড়িতেছে—ড্যাকরা বাঁশবুকোকে দশবার যে মানা করলাম, কাগের বাসা আছে, উঠিস না! কেমন হইছে—বলিতে বলিতে আখনার বিব্রত অবস্থা দেখিয়া সে খিলখিল করিয়া হাসিয়া সারা হইল।

দূরে ছম্-করিয়া একটা শব্দ উঠিল। সর্বনাশ! কে পড়িয়া গেল? উঃ, ভাদ্র মাসের পাকা তালের মত পড়িয়াছে! ফাটিয়া গেল না তো? না, মরে নাই, নড়িতেছে। যাক—উঠিয়া বসিয়াছে। বাপ রে! আচ্ছা শক্ত জান! নদীর ধারের ভিজা মাটি—তাই রক্ষা! কিন্তু লোকটা কে?

—কে বটিস রে?

লোকটা উঠিয়া দাঁড়াইয়া জবাব দিল—সাপ!

—সাপ?

—খরিশ।

—খরিশ। যেমন ইদিকের পাতায় উঠতে যাব—অমনি শালা ফোস্ করে ফণা নিয়ে উঠছে উদিকের পাতায়। কি করব, লাফিয়ে পড়লাম।

ফড়িং বাউড়ী! ছোঁড়া খুব শক্ত! খুব বাঁচিয়াছে আজ! সাপটা পাখীর ডিমের সন্ধানে খেঙো বাহিয়া গাছে উঠিয়াছে।

ও রে বাবা! পাতুরও জ্বালা কম নয়; একটা পাতা কাটিতেই অসংখ্য পিঁপড়ে বাহির হইয়া তাহার সর্বাঙ্গে ছাঁকিয়া ধরিয়াছে। পাতু গামছাটা খুলিয়া গামছার আছাড়ে সেগুলিকে ঝাড়িয়া ফেলিতে আরম্ভ করিল। দূর শালা, দূর! ধ্যেৎ! ধ্যেৎ! ধ্যেৎ!

দূর্গা আয়না দেখিয়া নরুণ দিয়া দাঁত চাঁচিতেছিল। পরিষ্কার-পরিষ্কার দূর্গার একটা বাতিক। তাহার দাঁতগুলি শাঁখের মত ঝক ঝক করা চাই, মধ্যে মধ্যে দাঁতে একটু আধটু পানের ছোপ পড়ে, খুব ভাল করিয়া দাঁত মাজিলেও যায় না। তখন সে নরুণ দিয়া সেই ছোপের দাগ চাঁচিয়া তুলিয়া ফেলে। বউ ফিরিলেই সে বউকে লইয়া পাতা বহিয়া আনিতে যাইবে। হাঙ্গামা অনেক; মাথায় চুলে ময়লা লাগিবে, সর্বাঙ্গ ধূলায় ভরিয়া যাইবে, কাপড়খানা আর পরা চলিবে না। কিন্তু তবু উপায় কি? মায়ের পেটের ভাই।

মা বলিল—বউ রোজগার করছে, কখনো একটা পয়সা দেয় আমাকে—শাশুড়ী বলে ছেদ্দা করে?

দূর্গা হাসিয়া বলিল—থাক মা, আর বলিস না, ওই পয়সা ছুঁতে হয়?

মা এবার ঝঙ্কার দিয়া উঠিল—ওলো সীতের বেটি সাবিতিরি আমার! —তারপর সে আরম্ভ করিল তিন কালের কথা, তাহার নিজের মা শাশুড়ীর আমলের শ্রুতিকথা, নিজেদের কালের স্মৃতি-কথা, বর্তমান যুগের প্রত্যক্ষ বধূ-কন্যার বিবরণ কাহিনী। অবশেষে বলিল—বউ হারামজাদী সাবিত্তির তখন ঘৃণা কত? কত বলেছিলাম, তা নাক ঘুরিয়ে তখন বলত—ছি! এখন তো সেই ‘ছি’ তপ্তভাতে ঘি হইছে। সেই রোজগারে প্যাট চলছে, পরন চলছে!

পাড়ার ভিতর হইতে কে গালি দিতে দিতে আসিতেছিল। দূর্গা বলিল—থাম মা, থাম, আর কেলেঙ্কারি করিস না। নোক আসছে।

চীৎকার করিয়া গালি দিতেছিল রাঙাদিদি। —হবে না, দুগ্‌গতি হবে না, আরও হবে। এর পর বিনি ঝড়ে উড়ে যাবে, বিনি আগুনে পুড়ে যাবে। ধানের ভেতর চাল থাকবে না, শুধু ‘আগরা’ হবে।

দূর্গা হাসিয়া প্রশ্ন করিল—কি হ'ল রাঙাদিদি?

রাঙাদিদি সেই সুরের ঝঙ্কার দিয়া উঠিল—ধম্মকে সব পুড়িয়ে খেলে মা। পিরখিমিতে ধম্ম বলে আর রইল না কিছু।

চীৎকার করিয়া দূর্গা বলিল—কি হ'ল কি? কে কি করলে?

—ওই গাঁদা মিনসে গোবিন্দে! এতকাল দিয়ে এসে আজ বলছে—না।

—কি?

—কি? ক্যানে, তুই আবার বেলাত থেকে এলি নাকি? পাড়ার নোক জানে, গাঁয়ের নোক জানে, তুই জানিস না? বলি তুই কে লা ছুঁড়ি? একে তো চোখে দেখতে পাই না, তার ওপর মুখপোড়া সুয্যির রোদের ছটা দেখ ক্যানে? চিনতে লারছি তুই কে?

—আমি—দুগ্‌গা গো!

—দুগ্‌গা? মরণ! আপন ঠেকারেই আছিস। পরের কথা মনে থাকে না—ক্যানে? গোবিন্দের বাবা আমার কাছে দু-টাকা ধার নিয়েছিল—জানিস না? বুড়ো ফি মাসে ছ-আনা সুদ আমাকে দিয়ে আসতো। তা ছাড়া—যখন ডেকেছি, তখনি এসেছে। ধরে গোঁজা দিয়েছে, বর্ষায় নালা ছাড়িয়ে দিয়েছে। সে ম'ল, তারপর গোবিন্দ দশ-বারো বছর মাসে মাসে সুদ দিয়েছে, ডাকলে এসেছে! আজ ডাকতে এলাম, তা বলে কিনা মোলাম, অনেক দিয়েছি, আর সুদও দোব না, আসলও দোব না, বেগারও দোব না।—আমি চললাম দেবুর কাছে! চার পো কলি, মা! এখন যদি সবাই এই বলে তো আমার কি দুগ্‌গতি হবে!

এমন খাতক বৃদ্ধার অনেকগুলি আছে, অন্তত: দশ-বারো জন, দুই কুড়ির উপর টাকা পড়িয়া আছে। পুরুষানুক্রমে তাহারা সুদ গনিয়া যাইতেছে, বৃদ্ধা মরিলে আর আসল লাগিবে না। তবে এমন মহাজন গ্রামে আরও কয়েকজন আছে। সকলেই প্রায় স্ত্রীলোক এবং তাহাদের ওয়ারিশ আছে। আসলে ইহাদের ঋণ আইনের ধারাই এমনি।

বৃদ্ধা যাইতে যাইতে আবার দাঁড়াইল—বলি দুগ্‌গা শোন!

—কি বল?

—এক জোড়া ‘মাকুড়ি’ আছে, লিবি? সোনার মাকুড়ি!

—মাকুড়ি? কার মাকুড়ি? কার জিনিস বটে?

—আয় আমার সঙ্গে। খুব ভাল জিনিস। জিনিস একজনার বটে, কিন্তু সে লেবে না। তুই লিস তো দেখ!

—তা মাকুড়ি কি করব আমি?

—না দিদি, আজ হবে না। আজ এখন তালপাতা আনতে যাব।

—মরণ! তুই আবার তালপাতা নিয়ে কি করবি?

—আমার নয়, দাদার লেগে।

—ও-রে দাদা-সোহাগী আমার! দাদার লেগে ভেবে ভেবে তো মরে গেলি!

বুড়ী আপন মনেই বক বক করিতে করিতে পথ ধরিল। কিছু দূর গিয়া একটা গর্তের কাদায় পড়িয়া বৃদ্ধা মেথকে গাল দিল, ইউনিয়ন বোর্ডের ট্যাক্স আদায়কারীকে গাল দিল, কয়েকটা ছেলে কাদা লইয়া খেলিতেছিল—তাহাদের চতুর্দশ পিতৃপুরুষে গাল দিল। তারপর জগন ডাক্তারের ডাক্তারখানার সম্মুখে ওষুধের গন্ধে নাকে কাপড় দিয়া ওষুধকে গাল দিল, ডাক্তারকে গাল দিল, রোগকে গাল দিল, রোগীকে গাল দিল। টাকা মারা যাইবার আশঙ্কায় বৃদ্ধা আজ ক্ষিপ্ত হইয়া উঠিয়াছে। দেবুর বাড়ীর কাছে আসিয়া ডাকিল—দেবু পণ্ডিত!

কেহ সাড়া দিল না। বিরক্ত হইয়া বৃদ্ধা বাড়ী ঢুকিল—বলি কানের মাথা খেয়েছিস নাকি তোরা! অ দেবু—

বিলু বাহির হইয়া আসিল—কে, রাঙাদিদি!

—আমার মতন কানের মাথা খেয়েছিস; চোখের মাথা খেয়েছিস? শুনতে পাস না? দেখতে পাস না?

বিলু ঠোঁটের কোণে ঈষৎ হাসিল; এ কথার কোন উত্তর দিল না। বুঝিল রাঙাদিদি বেজায় চটিয়াছে।

—সেই ছোঁড়া কই? দেবা?

—বাড়ীতে নেই, রাঙাদিদি।

—কি বললি চেঁচিয়ে বল। গাড়ী কোথা গেল আবার?

—গাড়ীতে নয়। বাড়ীতে নেই। চণ্ডীমণ্ডপে গেল।

—চণ্ডীমণ্ডপে?

—আচ্ছা। সেখানে যাচ্ছি আমি। বিচার হয় কিনা দেখি। ভালই হ'ল, দেবুও আছে হিরুও আছে। কান ধরে নিয়ে আসুক হারামজাদাকে। এত বড় বাড় হয়েছে! ধৰ্ম্ম নাই, বিচার নাই?

বুড়ী বকিতে বকিতে চলিল চণ্ডীমণ্ডপের দিকে।

চণ্ডীমণ্ডপে তখন জমজমাট মজলিস। ভূপাল বাগ্দী লাঠি হাতে দাঁড়াইয়া আছে। ষষ্ঠীতলায় মাথায় হাত দিয়া বসিয়া আছে—পাতু, রাখহরি, পরী, বাঁকা, ছিদাম, ফড়িং আরও জনকয়েক। পাশে পড়িয়া আছে কয়েক আঁটি তালপাতার বোঝা। ময়ূরাক্ষীর ব্যারোধী বাঁধ জমিদারের সম্পত্তি—সেখানকার তালগাছও জমিদারের। সেই গাছ হইতে পাতা কাটার অপরাধে ভূপাল সকলকে ধরিয়া আনিয়াছে। শ্রীহরি গম্ভীর মুখে গড়গড়া টানিতেছে। দেবু একধারে চুপ করিয়া বসিয়া আছে, তাহাকে ডাকিয়া আনিয়াছে পাতুদের দল। হরেন ঘোষাল নিজেই আসিয়াছে; সে প্রজা-সমিতির সেক্রেটারি। চীৎকার করিতেছে সে-ই।

—ওরা চিরকাল পাতা কেটে আসছে, বাপ-পিতামহের আমল থেকে। ওদের স্বত্ব জন্মিয়ে গেছে।

ঘোষালের কথায় শ্রীহরি জবাবই দিল না। পাতু—সে বহুদিন হইতেই শ্রীহরির সঙ্গে মনে মনে একটি বিরোধ পোষণ করিয়া আসিতেছে—সে একটু উষ্ণভাবেই বলিল—পাতা তো চিরকাল কেটে আসা যায়, মশায়। এ তো আজ লতুন নয়!

—চিরকাল অন্যায় করে আসছিলি বলে, আজও অন্যায় করবি গায়ের জোরে? কাটিস, সেটা চুরি করে কাটিস!

দেবু এতক্ষণে বলিল—চুরি একে বলা চলে না শ্রীহরি! আগে জমিদার আপত্তি করত না, ওরা কাটত। এখন তুমি গোমস্তা হিসাবে আপত্তি করছ—বেশ আর কাটবে না। এর পর যদি না বলে কাটে, তখন চুরি বলতে পারবে।

ঘোষাল বলিল—নো, নেভার! ও তুমি ভুল বলছ দেবু। গাছের পাতা কাটাবার স্বত্ত্ব ওদের আছে। তিন পুরুষ ধরে কেটে আসছে। তিন বছর ঘাট পরলে, পারে কেউ সে ঘাট বন্ধ করতে—না পথ বন্ধ করতে?

হাসিয়া শ্রীহরি বলিল—গাছ ওটা, পুকুর নয় ঘোষাল, পথও নয়।

—ইয়েস, গাছ ইজ গাছ এন্ড পথ ইজ পথ; বাট ম্যান ইজ ম্যান আফটার অল্।

—কাল যদি জমিদার গাছগুলি বেচে দেয় ঘোষাল, কি কেটে নেয়, তখন পাতার অধিকার থাকবে কোথা? বাজে বকো না, শুধু খাসখামারের গাছ নয়, মাল জমির ওপর গাছ পর্যন্ত জমিদারের; প্রজা ফল ভোগ করতে পারে, কিন্তু কাটতে পারে না।

দেবু একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিল, তাহার বুকের মধ্যে মুহূর্তে জাগিয়া উঠিল একটা বিস্মৃত ক্ষোভ। তাহাদের খিড়কির ঘাটে একটা কাঁঠাল গাছ ছিল, কাঁঠাল অবশ্য পাকিত না, কিন্তু ইঁচড় হইত প্রচুর। তাহার আবছা মনে পড়ে। আসবাব তৈয়ারী করবার জন্য জমিদার গাছটি কাটিয়াছিল। কিছু দাম নাকি দিয়াছিল, কিন্তু প্রথমে তাহার বাপ আপত্তি করায় ওই আইন-বলে জোর করিয়া কাটিয়াছিল। কতদিন তাহার বাবা আক্ষেপ করিত—আঃ, ইঁচড় হ'ল গাছ পাঁঠা! আর স্বাদ কি ইঁচড়ের!

দেবু বলিল—তা হলে তাই কর, শ্রীহরি, গাছগুলো সব কেটে নাও! প্রজারা ফল খাবে না।

শ্রীহরি হাসিল—তুমি মিছে রাগ করছ, দেবু খুড়ো। ওটা আমি, আইনের কথা, কথায় বললাম। জমিদার তা করবেন কেন? তবে প্রজা যদি রাজার সঙ্গে বিরোধ করে, তখন আইনমত চলতে রাজারই বা দোষ কি? বে-আইনী বা অন্যায় তো হবে না!

—কিন্তু এ গরীব প্রজারা কি বিরোধ করলে শুনি? হঠাৎ এদের এরকম ধরে আনার মানে?

—ওদের জিজ্ঞেস কর। ওই প্রজা-সমিতির সেক্রেটারি বাবুকে জিজ্ঞেস কর। —তারপর হরিজনদের দিকে চাহিয়া শ্রীহরি বলিল—কি রে? চণ্ডীমণ্ডপ ছাওয়াতে পয়সা নিবি না তোরা?

কথাটা এতক্ষণে স্পষ্ট হইল। সকলে স্তব্ধ হইয়া গেল। কিন্তু সকলেই অন্তরে অন্তরে একটা জ্বালা অনুভব করিল। সর্বাপেক্ষা সেটা বেশী অনুভব করিল দেবু। তালপাতার মূল্য এবং চণ্ডীমণ্ডপ ছাওয়ানোর মজুরির অসঙ্গতি তাহার হেতু নয়; তাহার হেতু সমগ্র ব্যাপারটার মধ্যে শ্রীহরির ভঙ্গি।

রাঙাদিদি খানিকক্ষণ আগে এখানে আসিয়া ব্যাপার দেখিয়া শুনিয়া অবাক হইয়া দাঁড়াইয়াছিল; কানে ভাল শুনিতে পায় না, কিছুক্ষণ দাঁড়াইয়া ব্যাপারটা সে বুঝিল। তারপর বলিল—হ্যাঁ ড্যাকরারা, তোরা চণ্ডীমণ্ডপ ছাওয়াবি না! আস্পর্ধা দেখ, মাগো কোথা যা!

হরেন ঘোষাল সুযোগ পাইয়া রাঙাদিদিকে ধমক দিল—যা বুঝ না তা নিয়ে কথা বলো না রাঙাদিদি। চণ্ডীমণ্ডপ এখন কার? চণ্ডীমণ্ডপ থাকল না থাকল তা ওদের কি? ওদের তো ওদের—গাঁয়ের লোকেরই বা কি অধিকার আছে? চণ্ডীমণ্ডপ জমিদারের। চণ্ডীমণ্ডপ নয়, এটা এখন জমিদারের কাছারি।

—তা রাজারও যা পেজারও তাই। রাজার হলেই পেজার।

দেবু হাসিয়া বেশ জোর গলাতেই বলিল—সে তো ওই তালপাতাতেই দেখছ, রাঙাদিদি!

—কে? দেবু?

—হ্যাঁ।

—তা বটে ভাই। তা হ্যাঁ ছিহরি, তালপাতা বই তো লয়—তা যদি ওরা রাজার না লেবে তো পাবে কোথা?

শ্রীহরি অত্যন্ত রূঢ়ভাবে ধমক দিল—যাও, যাও, তুমি বাড়ী যাও। এসব কথায় তোমায় কথা বলতে কেউ ডাকে নাই। বাড়ী যাও।

রাঙাদিদি আর সাহস করিল না। গ্রামের কাহাকেও সে ভয় করে না, কিন্তু শ্রীহরিকে সে সম্প্রতি ভয় করিতে আরম্ভ করিয়াছে। বৃদ্ধা ঠুকঠুক করিয়া চলিয়া গেল। যাইতে যাইতে ডাকিল—দেবু, বাড়ী আয়। ছেলেটা কাঁদছে তোর।

মিথ্যা বলিয়া সে দেবুকে ডাকিল। যে মানুষ দেবু। আবার কোথায় শ্রীহরির সঙ্গে কি হাঙ্গামা করিয়া বসিবে। আর ছেলেটা যত হাঙ্গামা করিতেছে তত সে যেন তাহাকে দিন দিন বেশী করিয়া ভালবাসিতেছে।

দেবু কিন্তু রাঙাদিদির ডাক শুনিল না। সে শ্রীহরিকে বলিল—ভাল শ্রীহরি, তুমি এখন কি করতে চাও শুনি?

—মানে?

—মানে, এদের যদি চুরি করেছে বলে চালান দিতে চাও, দাও। আর যদি তালপাতার দাম নিতে চাও নাও। দশখানা তালপাতায় ডোমেরা একখানা তালপাতার চ্যাটাই দেয়। দাম তার দু-পয়সা। সেই এক আনা কুড়ি হিসাবে দাম দেবে ওরা!

—তা হলে ঝগড়াই করতে চাস তোরা? কি রে? —শ্রীহরি প্রশ্ন করিল হরিজনদের।

—আজ্ঞে?

—দেবু বলিল, গুনে লে, কার কত তালপাতা আছে, গুনে ফেল।

সকলে তালপাতা গুনিতে আরম্ভ করিল।

মুহূর্তে শ্রীহরি ভীষণ হইয়া উঠিল। হিংস্র ক্রুদ্ধ গর্জনে সে এক হাঁক মারিয়া উঠিল—বোস্! রাখ্, তালপাতা!

তাহার আকস্মিক দুর্দান্ত ক্রোধের এই সশব্দ প্রকাশের প্রচণ্ডতায় সকলে চমকিয়া উঠিল। হরিজনেরা তালপাতা ছাড়িয়া সরিয়া দাঁড়াইল, কেবল পাতু তালপাতা ছাড়িয়াও সেইখানেই দাঁড়াইয়া রহিল। ভবেশ, হরিশ শ্রীহরির পাশেই বসিয়াছিল তাহারা চমকিয়া উঠিল। হরেন ঘোষাল প্রায় আঁতকাইয়া উঠিয়াছিল। সে কয়েক পা সরিয়া গিয়া বিস্ফারিত চোখে শ্রীহরির দিকে চাহিয়া রহিল। দেবু চমকিয়া উঠিয়াছিল, কিন্তু পরমুহূর্তেই আত্মসংবরণ করিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল। বাউড়ী ও বায়েনদের কাছে আগাইয়া আসিয়া সে দৃঢ়কণ্ঠে বলিল—থাক্ তালপাতা পড়ে, উঠে আয় তোরা ওখান থেকে। আমি বলছি, ওঠ!

সকলে একবার তাহার মুখের দিকে চাহিল—তাহার শীর্ণ মুখখানির সে এক অদ্ভুত তেজোদ্দীপ্ত রূপ। সে দীপ্তির মধ্যে বোধ করি তাহারা অভয় খুঁজিয়া পাইল। তাহারা সঙ্গে সঙ্গে চণ্ডীমণ্ডপ হইতে বাহির হইবার জন্য পা বাড়াইল।

শ্রীহরি ডাকিল—ভূপাল! আটক কর বেটাদের।

দেবু তাহার দিকে চাহিয়া একটু মৃদু হাসিল, তারপর পাতুদের বলিল—যে যার এখান থেকে চলে যা। আমার গায়ে হাত না দিয়ে কেউ তোদের ছুঁতে পারবে না।

হরেন ঘোষাল দ্রুতপদে সকলের অগ্রগামী হইয়া পথ ধরিয়া বলিল—চলে আয়।

সকলের শেষে চণ্ডীমণ্ডপ হইতে নামিয়া আসিল দেবু।

শ্রীহরির পিঙ্গল চোখ দুইটি ক্রুর শনিগ্রহের মত হিংস্র হইয়া উঠিল।

ঠিক ওই মুহূর্তেই রাস্তার উপর হইতে কে উচ্চকণ্ঠে তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গে বলিয়া উঠিল—হরি হরি বল ভাই, হরি হরি বল! —বলিয়াই হো হো করিয়া এক প্রচণ্ড উচ্চহাস্যে সব যেন ভাসাইয়া দিল।

সে অনিরুদ্ধ। অনিরুদ্ধ হাততালি দিয়া উচ্চহাসি হাসিয়া যেন নাচিতে লাগিল। শ্রীহরির এই অপমানে তাহার আনন্দের সীমা ছিল না।

শ্রীহরি কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া একটা ক্রুদ্ধ দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিল। ভবেশ, হরিশ প্রভৃতি প্রবীণ মাতব্বর—যাহারা তাহার অনুগত তাহারাও এ ব্যাপারে স্তম্ভিত হইয়া গেল। কিছুক্ষণ পর ভবেশই প্রথম কথা বলিল—ঘোর কলি, বুঝলে হরিশখুড়ো!

শ্রীহরি এবার বলিল—আমাকে কিন্তু আর আপনারা দোষ দেবেন না।

হরিশ বলিল—দোষ আর কি করে দিই ভাই; স্বচক্ষে তো সব দেখলাম।

—ভূপাল! —শ্রীহরি ভূপালকে ডাকিল।

—আজ্ঞে?

—তোমার দ্বারা কাজ চলবে না, বাবা।

—আজ্ঞে! —ভূপাল মাথা চুলকাইতে আরম্ভ করিল।

ভবেশ বলিল—এতগুলো লোকের কাছে ভূপাল কি করত, বাবা ছিরু! ও বেচারার দোষ কি?

—আজ্ঞে তার ওপর আমি চৌকিদার, ফৌজদারি আমি কি করে করি? আপনি ইউনিয়ন বোর্ডের মেম্বর। আপনিই বলুন হুজুর।

শ্রীহরি বলিল—তুই একবার কঙ্কণায় যা। বাঁড়ুষ্যে বাবুদের বুড়ো চাপরাসী নাদের শেখের কাছে যাবি। তাকে বলবি তোমার ছেলে কালু শেখকে ঘোষমশায়ের কাছে পাঠিয়ে দাও, ঘোষ মহাশয় রাখবেন।

—কালু শেখ? —সভয়ে সবিস্ময়ে প্রশ্ন করিল ভবেশ।

—হ্যাঁ, কালু শেখ!

নাদের শেখ এককালের বিখ্যাত লাঠিয়াল, কালু তাহার উপযুক্ত পুত্র। তরুণ জোয়ান, শক্তিশালী, দুর্দান্ত সাহসী। দাঙ্গা করিয়া সে একবার কিছুকাল জেল খাটিয়াছে, তারপর ডাকাতি অপরাধের সন্দেহে চালান গিয়াছিল, কিন্তু প্রমাণ অভাবে খালাস পাইয়াছে। কালু শেখ ভয়ঙ্কর জীব।

শ্রীহরি বলিল—অন্যায় আমি করব না, হরিশ-দাদা। কারু অনিষ্টও আমি করতে চাই না। কিন্তু আমার মাথায় যে পা দেবে, তাকে আমি শেষ করব—সে অন্যায়ই হোক আর অধর্মই হোক!

আবার কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া বলিল—এই ছোটলোকের দল—বর্ষায় আমি ধান দিই তবে খায়—আজ আমাকে অমান্য করে উঠে গেল! ওই দেবু ঘোষ, সেটেলমেন্টের সময় আমি এর জমি-জমা সমস্ত নির্ভুল করে লিখিয়েছি। দু-বেলা খোঁজ করেছি ওর ছেলের, পরিবারের। জান, হরিশ-দাদা—ফের যাতে ওর ইস্কুলের কাজটি হয়—তার জন্যেও চেষ্টা করেছিলাম। প্রেসিডেন্টকেও বলেছি।

ভবেশ বলিল—কলিতে কারু ভাল করতে নাই বাবা!

—কাল হয়েছে ওই নজরবন্দী ছোঁড়া। ও-ই এই সব করছে। কামার-বউটাকে নিয়ে ঢলাঢলি করছে। আর ওই শালা কর্মকার—! কথা বলিতে বলিতে শ্রীহরি নিষ্ঠুর হইয়া উঠিল। —নেমকহারামের গ্রাম! এক এক সময় মনে হয়—এ গাঁয়ের সর্বনাশ করে দিই!

হরিশ বলিল—তা বললে চলবে ক্যানে ভাই! ভগবান তোমাকে বড় করেছেন, ভাণ্ডার দিয়েছেন, তোমাকে সইতে হবে বৈকি! একথা তোমাকে সাজে না।

কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া শ্রীহরি সহজ স্বরেই বলিল—হরিশ-দাদা, ষষ্ঠীকাকাকে বলুন এইবার কাজ আরম্ভ করে দিক। ইট তো তোমার পড়ে রয়েছে। ইস্কুলের মেজে না হয় দশদিন পরে হবে, জল পড়ুক ভাল করে—নইলে ফেটে যাবে মেঝে। কিন্তু সাঁকোটা এখন না করালে কখন করবে? তার ওপর ওটা আমার কাজ নয়, আমি অবিশ্যি দশ টাকা দিয়েছি। কিন্তু সে ইউনিয়ন বোর্ডকে দিয়েছি সাঁকো করবার জন্যে। ইউনিয়ন বোর্ডকে আমি বলব কি?

হরিশের ছেলে ষষ্ঠী শ্রীহরির পৃষ্ঠপোষকতায় আজকাল ঠিকাদারির কাজ করিতেছে। ইউনিয়ন বোর্ড হইতে শিবকালীপুরের রাস্তায় একটা সাঁকো হইবে, শ্রীহরি নিজে ইস্কুলের মেঝে বাঁধাইয়া দিবে। এসবেরই ঠিকাদার ষষ্ঠীচরণ।

হরিশ বলিল—তোমার কাজেই সে এখন ব্যস্ত, ভাই। খাতাপত্র নিয়ে সকালে বসে, ওঠে সেই রাত্রে। তামাদির হিসেব, হিসেব তো কম নয়!

ষষ্ঠীচরণ শ্রীহরির গোমস্তাগিরির কাগজপত্র সারিয়া দেয়। চৈত্র মাসে বাকি বকেয়ার হিসাব হইতেছে; যাহাদের চার বৎসরের বাকি, তাহাদের নামে নালিশ হইবে। শ্রীহরির নিজের ধানের টাকার হিসাব আছে, তাহার তামাদি তিন বৎসরে। সে-সবের হিসাবও হইতেছে।

ভূপাল চলিয়া গিয়াছিল; বরাত খাটিবার উপযুক্ত অন্য কেহ ছিল না। নিরুপায়ে ভবেশ নিজেই তামাক সাজিতে বসিয়াছিল। ষষ্ঠীতলার ধারে কাঠের ধুনি জ্বলে, সেখান হইতে কল্কেতে আগুন তুলিতে তুলিতে ভবেশ কাহাকে ডাকিল—কে রে? ও ছেলে—!

একটি ছেলে একগুচ্ছ লালফুল হাতে করিয়া যাইতেছিল, ডাকিতে সে দাঁড়াইল।

—কে রে? কি ফুল হাতে? অশোক নাকি?

ছেলেটি বৈরাগীদের নলিন, সে গিয়াছিল মহাগ্রামে পটুয়াদের বাড়ী। ঠাকুরদের বাগানে অশোক ফুল ফুটিয়াছিল, সেখান হইতে অশোক ফুলের একটি তোড়া বাঁধিয়া আনিয়াছে—নজরবন্দীকে দিবে। আরও কতকগুলি কলি সে আনিয়াছে, পণ্ডিতের বাড়ীতে প্রতিবেশীদের বাড়িতে বিলাইবে। দুই দিন পরেই অশোকষষ্ঠী। অশোকের কলি চাই। নলিন অভ্যাসমত কথা না বলিয়া ঘাড় নাড়িয়া জানাইল—হ্যাঁ, অশোকের কলি।

—দিয়ে যা তো, বাবা। একটা ডাল দিয়ে যা তো!

নলিন অশোকের কয়েকটি ফুল নামাইয়া দিয়া চলিয়া গেল।

শ্রীহরি বলিল—আমার পুকুরপাড়ের বাগানেও অশোকের চারা লাগিয়েছি।

সে একটা পুকুর কাটাইয়াছে। তাহার পাড়ে শখ করিয়া নানাজাতীয় গাছ লাগাইয়াছে। সবই প্রায় ভাল ভাল কলমের চারা।


বাইশ



অশোক ষষ্ঠীর দিন। এই ষষ্ঠী যাহারা করে, তাহাদের সংসারে নাকি কখনও শোক প্রবেশ করে না। “হারালে পায়, মলে জীয়োয়”। অর্থাৎ কোন কিছু হারাইয়াও হারায় না, হারাইলে ফিরিয়া পায়—মরিলেও মরে না, পুনরায় জীবিত হয়, অশোক ষষ্ঠীর কল্যাণে। মেয়েরা সকাল হইতে উপবাস করিয়া আছে। ষষ্ঠীদেবীর পূজা করিয়া ব্রতকথা শুনিবে, অশোক ফুলের আটটি কলি খাইবে। প্রসাদী দই-হলুদ মিশাইয়া—তাহারই ফোঁটা দিবে ছেলেদের কপালে। তারপর খাওয়া-নাওয়া: সে সামান্যই। অন্নগ্রহণ নিষেধ।

বারো মাসে তেরো ষষ্ঠী। মাসে মাসে স্বর্গ হইতে আসে ষষ্ঠীদেবীর নৌকা, বারো মাসে তেরো রূপে তিনি মর্ত্যলোকে আসেন—পৃথিবীর সন্তানদের কল্যাণের জন্য। সিঁথিতে ডগমগ করে সিঁদুর, হাতে শাঁখা, সর্বাঙ্গে হলুদের প্রসাধন, ডাগর চোখে কাজল। পরের সাত পুতকে কোলে রাখেন, নিজের সাত পুত থাকে পিঠে। বৈশাখ মাসে চন্দন-ষষ্ঠী, জ্যৈষ্ঠে অরণ্য-ষষ্ঠী, আষাঢ়ে বাঁশ-ষষ্ঠী, শ্রাবণে লুণ্ঠন বা লোটন-ষষ্ঠী, ভাদ্রে চপটা বা চাপড়-ষষ্ঠী, আশ্বিনে দূর্গা-ষষ্ঠী, কার্তিকে কালী-ষষ্ঠী, অগ্রহায়ণে অখণ্ড-ষষ্ঠী—সংসারকে অখণ্ড পরিপূর্ণ করিয়া দিয়া যান। পৌষে মূলা-ষষ্ঠী, মাঘে শীতলা-ষষ্ঠী, ফাল্গুনে গোবিন্দ-ষষ্ঠী, চৈত্রে অশোক তরু যখন ফুলভারে ভরিয়া উঠে, তখন শোক দুঃখ মুছিতে আসেন মা অশোক-ষষ্ঠী। তাঁরই কল্যাণ-স্পর্শে আনন্দে সুখে ওই ফুলভরা অশোক গাছের মতই সংসার হাসিয়া উঠে। অশোকের পর আছে নীল-ষষ্ঠী। গাজন-সংক্রান্তির পূর্বদিন। তিথিতে ষষ্ঠী না হইলেও—ওই দিন হয় নীল-ষষ্ঠী!

পদ্ম সকালবেলা হইতে গৃহকর্ম সারিয়া ফেলিবার জন্য ব্যস্ত। কাজ সারিয়া স্নান করিবে, ষষ্ঠীর পূজা আছে—ব্রতকথা শুনিতে যাইবে বিলুর বাড়ী। তারপর অশোকের কলি খাইতে হইবে। তাহার আবার মন্ত্র আছে। এহেন দিনে আবার অনিরুদ্ধ কাজের ঝঞ্ঝাট বাড়াইয়া দিয়াছে।

কামারশালা মেরামতে লাগিয়াছে। হাপর, নেয়াই, হাতুড়ি, সাঁড়াশি ইত্যাদি লইয়া টানাটানি শুরু করিয়াছে। কামারশালার বহুকালের পুরানো ঝুল-কালি-কয়লা সাফ করা একদণ্ডের কাজ নয়। ইহার উপর কয়লার সঙ্গে মিশিয়া আছে লোহার টুকরা—ছুতারের ব্রেদায় চাঁচিয়াতোলা কাঠের আঁশের মত পাতলা কোঁকড়ানো লোহাগুলি সাংঘাতিক জিনিস, বিঁধিলে বঁড়শির মত বিঁধিয়া যাইবে। ঝাঁটা দিয়া পরিষ্কার করিয়া আবার গোবর-মাটি প্রলেপে নিকাইতে হইবে।

পদ্মের সঙ্গে তারিণীর সেই ছেলেটাও কাজ করিতেছিল। ছেলেটিকে যতীন খাইতে দেয়। দুই-একটা কাজ-কর্ম অবশ্য ছেলেটা করে, কিন্তু অহরহই পদ্মের কাছে থাকে। অনিরুদ্ধ দুই-একটা ধমক দিলেও ছেলেটা আর বিশেষ কিছু বলে না। বিপদ হয় ছোঁড়াটা বাহিরে গেলেই। বাহিরে গেলে আর সহজে ফেরে না। যতীন উহাকে দিয়া দেবুকে কোন খবর পাঠাইলে, দেবু আসে, কথাবার্তা কহিয়া চলিয়া যায়—কিন্তু ছেলেটার পাত্তা আর পাওয়া যায় না। অবশেষে একবেলা পার করিয়া খাইবার সময় ফেরে। কোন-কোনদিন হরিজন-পাড়া, কি কোন বনজঙ্গল খোঁজ করিয়া ধরিয়া আনিতে হয়। সে পদ্মই আনে।

অনিরুদ্ধ নূতন করিয়া কাজকর্ম আরম্ভ করিতে চায়। কাবুলী চৌধুরীর কাছে টাকা সে পাইয়াছে। আড়াইশো টাকার জন্য চৌধুরী গোটা জোতটাই বন্ধক না লইয়া ছাড়ে নাই। অনিরুদ্ধ তাহাই দিয়াছে। তাহার মন খানিকটা খুঁতখুঁত্ করিয়াছিল, কিন্তু টাকা পাইয়া সে সব আফসোস ছাড়িয়া, মহা উৎসাহের সঙ্গে কাজ আরম্ভ করিয়া দিয়াছে। বাকি খাজনার টাকাটা আদালতে দাখিল করিতে হইবে, আপোসে দিয়া বিশ্বাস নাই। আর আপোসেই বা সে দিবে কেন? পাচুন্দীর গরু-মহিষের হাট হইতে একজোড়া গরু কিনিবে। ইহার মধ্যে সে কৃষাণ বাহাল করিয়া ফেলিয়াছে। দূর্গার ভাই পাতুকেই তাহার পছন্দ। তাহাকে সে কামারশালে চাকরও রাখিয়াছে। পাতুকে সে ভালও বাসে। দূর্গার কাছে পাতু অনেক ওকালতি করিয়াছিল অনিরুদ্ধের জন্য।

সেদিন অনিরুদ্ধের সঙ্গে কামারশালায় পাতুও কাজ করিতেছিল। মোটা মোটা লোহার জিনিসগুলি তাহারা দু'জনে বহিয়া বাহির করিয়া আনিয়া রাখিতেছিল। কাজের ফাঁকে চাষের সম্বন্ধে কথাবার্তা চলিতেছিল। কেমন গরু কেনা হইবে—তাই লইয়া আলোচনা। আলোচনা হইতেছিল গরুর কথা।

পাতুর মতে দূর্গার নিকট হইতে বলদ-বাছুরটা কেনা হউক এবং হাট হইতে দেখিয়া শুনিয়া তাহার একটা জোড়া কিনিয়া আনিলে—বড় চমৎকার হাল হইবে!

অনিরুদ্ধ হাসিয়া বলিল—দূর্গার বাছুরটার দাম যে বেজায়।

—পাইকেররা একশো টাকা পর্যন্ত বলেছে। দূর্গা ধরে রয়েছে, আরও পঁচিশ টাকা। তা তোমাকে সস্তা করে দেবে। আমি সুদ্ধ যখন আছি।

হাসিয়া অনিরুদ্ধ বলিল—মোটে একশো টাকা আমার পুঁজি। ও হবে না পাতু। ছোটখাটো গিঁঠ-গিঁঠ বাছুর কিনিব। জমিও বেশী নয়—বেশ চলে যাবে।

—কিন্তু দধি-মুখো গরু কিনো বাপু। দধি-মুখো গরু ভারী ভাল—লক্ষণ-মান।

—চল না, হাটে তো দু'জনেই যাব।

পদ্ম বলিল তারিণীর ছেলেটাকে—হ্যাঁ রে, আবার লোহার টুকরো কুড়োতে লাগলি? এই বুঝি তোর কাজ করা হচ্ছে?

ছোঁড়াটা উত্তর দিল না।

পাতু বলিল—এ্যাই এ্যাই, ই তো আচ্ছা ছেলে রে বাপু! এই ছেলে!

ছেলেটা দাঁত বাহির করিয়া পাতুকে একটা ভেঙচি কাটিয়া দিল।

—ও বাবা, ই যে ভেঙচি কাটে লাগছে। বলিহারির ছেলে রে বাবা!

অনিরুদ্ধ বলিল—ধরে আন। কান ধরে নিয়ে আয় তো, পাতু।

পদ্ম হাঁ-হাঁ করিয়া উঠিল,—ধোরো না, কামড়ে দেবে কামড়ে দেবে!

ছোঁড়াটার ওই এক বদ অভ্যাস। কেহ ধরিলেই সঙ্গে সঙ্গে কামড় বসাইয়া দেয়। আর দাঁতগুলিতেও যেন ক্ষুরের ধার। অতর্কিত কামড়ে আক্রমণকারীকে বিব্রত করিয়া মুহূর্তে সে আপনাকে মুক্ত করিয়া লইয়া পলাইয়া যায়। ওই তাহার রণ-কৌশল। আজ কিন্তু পাতু ধরিবার আগেই ছোঁড়াটা উঠিয়া ভোঁ-দৌড় দিল।

পদ্ম ব্যস্ত হইয়া উঠিল, উচ্চিঙ্গে, উচ্চিঙ্গে, ওরে অ উচ্চিঙ্গে! যাস্ না কোথাও যেন, শুনছিস?

ছেলেটার ডাকনাম 'উচ্চিংড়ে', ভাল নাম মা-বাপে শখ করিয়া একটা রাখিয়াছিল। কিন্তু সে তার বাপ-মাই জানে, ছেলেটা নিজেও জানে না। উচ্চিংড়ে কিন্তু পদ্মের ডাক কানেই তুলিল না। তবে বাড়ীর দিকেই গেল—এই ভরসা। পদ্মও বাড়ীর দিকে চলিল।

অনিরুদ্ধ বলিল—চললি কোথায়?

—দেখি, কোথায় গেল?

—যাক্‌ গে, মরুক গে। তোর কি? আপনার কাজ কর তুই!

—খাট! আজ ষষ্ঠীর দিন। তোমার মুখের আগল নাই? —বড় বড় চোখে প্রদীপ-দৃষ্টিতে চাহিয়া পদ্ম অনিরুদ্ধকে নীরবে তিরস্কার করিয়া চলিয়া গেল।

দাঁতে দাঁত টিপিয়া অনিরুদ্ধও ক্রুদ্ধদৃষ্টিতে পদ্মের দিকে চাহিয়া রহিল। পদ্ম পিছু ফিরিয়াও চাহিল না; বাড়ীর মধ্যে চলিয়া গেল। অনিরুদ্ধ একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া কাজ করিতে আরম্ভ করিল। কথায় আছে 'না বিয়াইয়া কানুর মা', এ দেখিতেছি তাই! অনিরুদ্ধেরই মরণ।

থাক, উচ্চিংড়ে অন্য কোথাও পালায় নাই। যতীনের মজলিসে গিয়া বসিয়াছে। যতীনের কথার সাড়া হইতেই দূর হইতে পদ্ম উচ্চিংড়ের অস্তিত্ব অনুমান করিল।

যতীন জিজ্ঞাসা করিতেছিল—মা-মণি কোথায় রে?

—হুই কামারশালায়!

—মা-মণির খোঁজ কেন?

এই যে তাহারই খোঁজ হইতেছে। পদ্ম হাসিল। —কেন? ওই এক চাঁদ-চাওয়া ছেলে! এখন কি হুকুম হইবে কে জানে? সে ভিতরের দরজার ওপাশে যতীনের ঘরের শেকল নাড়িয়া সঙ্কেত জানাইল—মা-মণি মরে নাই, বাঁচিয়া আছে। বাহিরের বারান্দায় ভরপুর মজলিস চলিতেছে। দেবু, জগন, হরেন, গিরিশ, গদাই অনেকে আসিয়া জমিয়াছে। শিকল নাড়ার শব্দ পাইয়া, হাসিয়া যতীন বারান্দা হইতে ঘরে আসিয়া বাড়ীর ভিতরের দিকের দরজায় দাঁড়াইল। কালি-ঝুলি-মাথা আপনার সর্বাঙ্গ এবং কালো ছেঁড়া কাপড়খানার দিকে চাহিয়া পদ্ম ব্যস্ত হইয়া উঠিল, বলিল—না না, ভেতরে এস না।

—আসব না?

—না, আমি ভূত সেজে দাঁড়িয়ে আছি।

হাসিয়া যতীন বলিল—ভূত সেজে!

—হ্যাঁ। এই দেখ। —দরজার ফাঁক দিয়া সে আপনার কালি-মাথা হাত দুখানা বাড়াইয়া দেখাইল। —এস না, জুজুবুড়ী! ভয় খাবে! —সে একটি নূতন পুলকে অধীর হইয়া খিলখিল করিয়া হাসিতে আরম্ভ করিল।

যতীনও হাসিয়া বলিল—কিন্তু জুজু-মা, এখুনি যে চায়ের জল চাই! হাতটা কিন্তু ধুয়ে ফেলো!

পদ্ম এবার গজগজ করিতে আরম্ভ করিল। চা দিনের মধ্যে লোকে কতবার খায়? তাহার যেমন কপাল! অনিরুদ্ধ মাতাল—যতীন চাতাল, ওই উচ্চিংড়েটা জুটিল তো সেটা হইল দাঁতাল।

যতীন ফিরিয়া গিয়া মজলিসে বসিল। চা তাহার মজলিসের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। হরেন ইহারই মধ্যে বারদুয়েক তাগাদা দিয়েছে।

—চা কই মশাই? এ যে জমছে না!

মজলিসে আজ জগন বাংলা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বক্তৃতা দিতেছে। উপস্থিত আলোচনা চলিতেছে প্রজাস্বত্ব আইনের সংশোধন সম্ভাবনা সম্বন্ধে। বাংলা প্রদেশের আইন সভায় প্রজাস্বত্ব আইন লইয়া জোর আলোচনা চলিতেছে। কথাটা উঠিয়াছে শ্রীহরি পালের সেদিনের সেই শাসন-বাক্যের আলোচনা-প্রসঙ্গে। মাল জমি অর্থাৎ প্রজাস্বত্ববিশিষ্ট জমির উপর মূল্যবান বৃক্ষে প্রজার শুধু ফল ভোগের অধিকার ছাড়া আর কোন স্বত্ব নাই। গাছ জমিদারের।

জগন বলিতেছে—প্রজাস্বত্ব আইনের সংশোধনে সে স্বত্ব হবে প্রজার। জমিদারের বিষ-দাঁত এইবার ভাঙিল। সেদিন কাগজে সব বেরিয়েছিল—কি রকম সংশোধন হবে! আমি কেটে যত্ন করে রেখে দিয়েছি। ও আইন পাস হবেই। ওঃ, স্বরাজ্য পার্টির কি সব বক্তৃতা! একেবারে আগুন ছুটিয়ে দিয়েছে!

গদাই জিজ্ঞাসা করিল—কি রকম কি সব হবে, ডাক্তার?

হরেন খবরের কাগজের কেবল হেডলাইনগুলি পড়ে আর পড়ে আইন-আদালতের কথা। বিস্তৃত বিবরণ পড়িবার মত ধৈর্য তাহার নাই। তবুও সে বলিল—অনেক। সে অনেক ব্যাপার। এই এত বড় একখানা বই হবে। —বলিয়া দুই হাত দিয়া বইয়ের আকারটা দেখাইল। তারপর বলিল,—বোকার মত মুখে মুখেই জিজ্ঞাসা করছি, কি রকম হবে ডাক্তার!

জগনেরও সব মনে নাই—সব সে বুঝিতেও পারে নাই, তবুও সে কিছু কিছু বলিল। প্রথমেই বলিল—গাছের উপর প্রজার স্বত্ব কায়েম হইবে। হস্তান্তর আইনে জমিদারের উচ্ছেদ ক্ষমতা উঠিয়া যাইবে। খারিজ-ফিস নির্দিষ্ট হইবে, এবং সে ফিস প্রজা রেজিস্ত্রী আপিসে দাখিল করিবে। মাল জমির উপরেও পাকা ঘর করিতে পাইবে। মোট কথা, জমি প্রজার।

গদাই বলিল—কোর্ফার নাকি স্বত্ব হবে? ঠিকে ভাগেরও নাকি?

জগন বলিল—হ্যাঁ হ্যাঁ। কোর্ফার স্বত্ব সাব্যস্ত হলে মানুষের আর থাকবে কি? নাকে তেল দিয়ে ঘুমো গিয়ে। ভাগে ঠিকের জমি সব তোর হয়ে যাবে।

দেবু আপন প্রকৃতি অনুযায়ী চুপ করিয়া বসিয়াছিল। কয়েক দিন হইতেই তাহার মনে অশান্তির শেষ নাই। সে ভাবিতেছে, সেদিনের সেই পাতু প্রমুখ বাউড়ী-বায়েনগুলির কথা। তাহার কথা শুনিয়া তাহারা শ্রীহরিকে অমান্য করিয়া উঠিয়া আসিয়াছে। অচিরে শ্রীহরির শাসনদণ্ড কোন-না-কোন একটা দিক হইতে আকস্মিক ভাবে আঘাতে তাহাদের মাথার উপর আসিয়া পড়িবেই। তাহাদিগকে বাঁচাইতে হইবে; এবং তাহাকেই বাঁচাইতে হইবে। বাঁচাইতে সে ন্যায়ধর্ম অনুসারে বাধ্য। কিন্তু—সে একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিল। বিলু, খোকা, সংসার, জমাজমি সম্বন্ধে তাহার চিন্তা করিবার অবসর নাই। মধ্যে মধ্যে এমনি ভাবে ক্ষণিক বৃষ্টিস্নানের মত সাময়িকভাবে তাহাদিগকে মনে পড়িয়া যায়।

জগন বক্তৃতা দিয়াই চলিয়াছিল—দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন যদি আজ বেঁচে থাকতেন তা হলে আর দেখতে হ'ত না।

ওই নামটিতে আসরের সমস্ত লোকগুলির শরীর রোমাঞ্চিত হইয়া উঠিল। দেশবন্ধুর নাম, তাঁহার পরিচয় সকলেই জানে, তাঁহার ছবিও তাহারা দেখিয়াছে।

দেবুর চোখের উপর ভাসিয়া উঠিল তাঁহার মূর্তি। দেশবন্ধুর শেষ শয্যার একখানা ছবি বাঁধাইয়া ঘরে টাঙাইয়া রাখিয়াছে। মহাকবি রবীন্দ্রনাথ ছবির তলায় লিখিয়া দিয়াছেন—

“এনেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ
মরণে তাহাই তুমি করে গেলে দান।”

যতীন বাড়ীর ভিতর হইতে ডাকিল—উচ্চিংড়ে!

সে চায়ের খোঁজে বাড়ীর ভিতরে গিয়াছিল।

মজলিসের মধ্যে বসিয়া উচ্চিংড়ের খেয়াল-খুশীমত চাঞ্চল্য প্রকাশের সুবিধা হইতেছিল না। কিছুক্ষণ ধরিয়া পথের ওপাশে জঙ্গলের মধ্যে একটা গিরগিটির শিকার দেখিতেছিল; দেখিতে দেখিতে যেই একটু সুস্থির-শান্ত হইয়াছে, অমনি সেইখানেই শুইয়া ঘুমাইয়া পড়িয়াছে। বেচারা!

হরেন তাহাকে ধমক দিয়া ডাকিল—এই ছোঁড়া, এই?

দেবু বলিল—ডেকো না। ছেলেমানুষ ঘুমিয়ে পড়েছে। —বলিয়াই সে নিজেই ভিতরে উঠিয়া গিয়া যতীনকে বলিল—কি করতে হবে বলুন!

যতীন বলিল—চায়ের বাটিগুলো নিয়ে সকলকে দিয়ে দিন।

দেবুই সকলকে চা পরিবেশন করিয়া দিল। চা খাইতে খাইতে জগন আরম্ভ করিল—মহাত্মা গান্ধী, পণ্ডিত মতিলাল নেহরু, জহরলাল নেহরু, যতীন্দ্রমোহন, সুভাষচন্দ্রের কথা।

চা খাইয়া সকলে চলিয়া গেল। সকলের শেষে গেল দেবু। যাইবার জন্য উঠিয়াছিল সর্বাগ্রে সে-ই। কিন্তু যতীন বলিল—গোটাকয়েক কথা ছিল যে দেবুবাবু!

দেবু বসিল। সকলে চলিয়া গেলে যতীন বলিল—আর দেরি করবেন না দেবুবাবু। সমিতির কাজটা নিয়ে ফেলুন।

সমিতি—প্রজা-সমিতি। যতীন বলিতেছে, দেবুকে সমিতির ভার লইতে হইবে। দেবু চুপ করিয়া রহিল।

—আপনি না হলে হবে না, চলবে না। সকলেই আপনাকে চায়। হয়তো ডাক্তার মনে মনে একটু ক্ষুণ্ণ হবে। তা হোক সে ক্ষুণ্ণ, কিন্তু একটা জিনিস গড়ে উঠেছে—সেটাকে ভাঙতে দেওয়া উচিত হবে না।

দেবু বলিল—আচ্ছা কাল বলব আপনাকে।

যতীন হাসিল, বলিল—বলবার কিছু নাই। ভার আপনাকে নিতেই হবে।

দেবু চলিয়া গেল; যতীন স্তব্ধ হইয়া বসিয়া রহিল।

বাংলার পল্লীর দুর্দশার কথা সে ছাত্র-জীবনে অনেক পড়িয়াছে, অনেক শুনিয়াছে। অনেক সরকারী স্ট্যাটিস্টিক্স এবং নানা পত্র-পত্রিকায় এর বর্ণনাও পড়িয়াছে, কিন্তু এমন বাস্তবরূপে সে কল্পনা করিতে পারে নাই। সবে এই তো চৈত্র মাস, কৃষিজাত শস্যসম্পদ এখনও সম্পূর্ণ শেষ হইয়া মাঠ হইতে ঘরে আসে নাই, ইহারই মধ্যে মানুষের ভাণ্ডার রিক্ত হইয়া গিয়াছে। ধান শ্রীহরির ঘরে গিয়াছে, জংশনের কলে গিয়াছে। গম, যব, কলাই, আলু—তাহাও লোকে বেচিয়াছে। তিল এখনও মাঠে; কিন্তু তাহার উপরেও পাইকার দাদন দিয়া গিয়াছে। ইহারই মধ্যে একদিন শ্রীহরির খামারে একটি জনতা জমিয়াছিল, শ্রীহরি ধান-ঋণ দিতে আরম্ভ করিয়াছে। এই গ্রামের মাঠে বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডের প্রায় সব জমিই নাকি মহাজনের কাছে আবদ্ধ। মহাজনদের মধ্যে সব চেয়ে বড় মহাজন শ্রীহরি।

পল্লীর প্রতিটি ঘর জীর্ণ, শ্রীহীন; মানুষগুলি দুর্বল। চারিপাশে কেবল জঙ্গল, খানায় খন্দে পল্লীপথ দুর্গম। সেদিনের বৃষ্টিতে সমস্ত পথটাই কাদায় ভরিয়া উঠিয়াছে। স্নানের ও পানের জলের পুকুর দেখিয়া শিহরিয়া উঠিতে হয়। প্রকাণ্ড বড় দীঘি, কিন্তু জল আছে সামান্য খানিকটা স্থানে, গভীরতা মাত্র হাত-খানেক কি হাত-দেড়েক। সেদিন একটা লোককে সে পলুই চাপিয়া ও-দীঘিতে মাছ ধরিতে দেখিয়াছিল। পাঁকে জলে ভাল করিয়া লোকটার কোমরও ডোবে নাই।

আশ্চর্য! ইহার মধ্যেই মানুষ বাঁচিয়া আছে!

বিশেষজ্ঞরা বলেন—বাঁচা প্রেতের বাঁচা। অথবা ক্ষয়রোগাক্রান্ত রোগীর দিন গণনা করিয়া বাঁচা। তিল তিল করিয়া ইহারা চলিয়াছে মৃত্যুর দিকে—একান্ত নিশ্চেষ্টভাবে মৃত্যুর কাছে আত্মসমর্পণ করিয়াছে।

এখানে প্রজা-সমিতি কি বাঁচিবে? সঞ্চয়-সম্বলহীন চাষী গৃহস্থের সম্মুখে চাষের সময় কঠিন গ্রীষ্ম, দুর্যোগ-ভরা বর্ষা। চোখের উপর শ্রীহরির খামারে রাশি রাশি ধান্য-সম্পদ। সেখানে প্রজা-সমিতি কি বাঁচিবে না কাহাকেও বাঁচাইতে পারিবে? সমিতির প্রত্যক্ষ এবং প্রথম সংঘর্ষ হইবে যে শ্রীহরির সঙ্গে! হইবে কেন, আরম্ভ তো হইয়াই গিয়াছে।

সম্মুখের দাওয়ার উপর পড়িয়া ঘুমাইতেছে উচ্চিংড়ে। ওই পল্লীর ভাবী পুরুষ। নিঃস্ব, রিক্ত, গৃহহীন, স্বজনহীন, আত্মসর্বস্ব। যে নীড়ের মমতায় মানুষ শ্রী অর্থাৎ লক্ষ্মীর তপস্যা করিয়া তাহাকে আয়ত্ত করিতে চায়—সে নীড় তাহার ভাঙিয়া গিয়াছে!

অকস্মাৎ পদ্মের উচ্চকণ্ঠ তাহার কানে আসিয়া প্রবেশ করিল। পদ্ম তাহাকে শাসন করিতেছে। সেই শাসন-বাক্যের ঝঙ্কারে তাহার চিন্তার একাগ্রতা ভাঙিয়া গেল। ষষ্ঠী পূজার থালা হাতে পদ্ম ঝঙ্কার দিতে দিতে আসিয়া সম্মুখে দাঁড়াইল; তাহার স্নান হইয়া গিয়াছে; পরনে পুরানো একখানি শুদ্ধ কাপড়। সে বলিল—কি ছেলে বাবা তুমি! পঞ্চাশবার শেকল নেড়ে ডাকছি, তা শুনতে পাও না? যাক, ভাগ্যি আমার, সাঙ্গপাঙ্গের দল সব গিয়াছে! নাও—ফোঁটা নাও। উঠে দাঁড়াও।

যতীন হাসিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল। শুচিস্মিতা পদ্ম কপালে তাহার দই-হলুদের ফোঁটা দিয়া বলিল—তোমার মা আজ দরজার বাজুতে তোমাকে ফোঁটা দেবে।

যতীনকে ফোঁটা দিয়া এবার সে ডাকিল—উচ্চিঙ্গে! অ উচ্চিঙ্গে! ওরে দেখ তো—ছেলের ঘুম দেখ তো অসময়ে! এই উচ্চিঙ্গে—!

ইতিমধ্যেই উচ্চিংড়ের বেশ একদফা ঘুম হইয়াছিল, ক্ষুধার বেলাও হইয়াছিল, সুতরাং তিনবার ডাকিতেই সে উঠিয়া বসিল।

—ওঠ, উঠে দাঁড়া, ফোঁটা দি! ওঠ বাবা ওঠ!

উচ্চিংড়ে দাঁড়াইয়া প্রথমেই হাত পাতিল—পেসাদ।

পদ্ম হাসিয়া ফেলিল,—দাঁড়া আগে ফোঁটা দি!

—পেসাদ দাও!

উচ্চিংড়ে খুব ভাল ছেলেটির মত কপাল পাতিয়া দাঁড়াইল, পদ্ম ফোঁটা পরাইয়া দিল। যতীন বলিল—প্রণাম কর, উচ্চিংড়ে, প্রণাম করতে হয়। দাঁড়াও মা-মণি, আমিও একটা।

—বাবা রে বাবা রে! আমাকে তুমি নরকে না পাঠিয়ে ছাড়বে না!

পদ্ম মুহূর্তে উচ্চিংড়েকে কোলে তুলিয়া লইয়া একপ্রকার ছুটিয়াই ভিতরে চলিয়া গেল।

চৈত্রের দ্বিপ্রহর। অলস বিশ্রামে যতীন দাওয়ার তক্তপোশখানির উপর শুইয়াছিল। চারিদিক বেশ রৌদ্রদীপ্ত হইয়া উঠিয়াছে। উত্তপ্ত বাতাস এলোমেলো গতিতে বেশ জোরেই বহিতেছে। বড় বড় বট, অশ্বত্থ, শিরীষ গাছগুলি কচি পাতায় ভরা; উত্তাপে কচি পাতাগুলি ম্লান হইয়া পড়িয়াছে। সেদিনের বৃষ্টির পর মাঠে এখনও হাল চলিতেছে, চাষীরা এতক্ষণে হাল-গরু লইয়া বাড়ী ফিরিতেছে। সর্বাঙ্গ ঘামে ভিজিয়া গিয়াছে, ঘর্মসিক্ত কালো চামড়া রৌদ্রের আভায় চক্‌-চক্‌ করিতেছে তৈলাক্ত লোহার পাতের মত; বাউড়ী-বায়েনদের মেয়েরা গোবর, কাঠ-কুটা সংগ্রহ করিয়া ফিরিতেছে। সম্মুখেই রাস্তার ওপাশেই একটা শিরীষ গাছের সর্বাঙ্গ ভরিয়া কি একটা লতা—লতাটির সর্বাঙ্গ ভরিয়া ফুল। চারিধারে মৌমাছি ও ভ্রমরের গুনগুনানিতে যেন এক মৃদুতম ঐকতান-সঙ্গীতের একটা সূক্ষ্ম জাল বিছাইয়া দিয়াছে। গোটা কয়েক বুলবুলি পাখী নাচিয়া নাচিয়া এ-ডাল ও ডাল করিয়া ফিরিতেছে। দূরে কোথায় পাল্লা দিয়া ডাকিতেছে দুইটা কোকিল। 'চোখ গেল' পাখীটার আজ সাড়া নাই। কোথায় গিয়া পড়িয়াছে—কে জানে! আকাশে উড়িতেছে কয়েকটা ছোট ঝাঁকে একদল বন-টিয়া; মাঠের তিল-ফসলে তাহাদের প্রত্যাশা। অসংখ্য বিচিত্র রঙিন প্রজাপতি ফড়িং, ভাসিয়া ভাসিয়া ফিরিতেছে দেবলোকের বায়ুতাড়িত পুষ্পের মত।

গন্ধে, গানে, বর্ণচ্ছটায় পল্লীর এই এক অনিন্দ্য রূপ। কবির কাব্যের মতই এই গন্ধে গানে বর্ণচ্ছটার যেন একটা মাদকতা আছে, কেমন একটা হাতছানির ইশারা আছে।

হঠাৎ উঠিয়া বসিয়া সেই ইশারার ডাকেই যেন মোহগ্রস্তের মত যতীন বাহির হইয়া পড়িল। কাছেই কোন গাছের মধ্যে ডাকিতেছে একটা পাখী। অতি সুন্দর ডাক। শুধু স্বরই সুন্দর নয়, ডাকের মধ্যে সঙ্গীতের একটা সমগ্রতা আছে। পাখীটি যেন কোন গানের গোটা একটি কলি গাহিতেছে। ওই পাখীটার খোঁজেই যতীন সন্তর্পণে জঙ্গলের ভিতর ঢুকিয়া পড়িল। খানিকটা ভিতরে গিয়া পাইল সে গাঢ় মদির গন্ধ। ধ্বনি এবং গন্ধের উৎসমূল আবিষ্কার করিবার জন্য সে অগ্রসর হইয়া চলিল। তাহার সঙ্গে কি লুকোচুরি খেলিতেছে? শব্দ এবং গন্ধ আসিতেছে—তাহারাও যেন তত সরিয়া চলিতেছে। সেখানে আসিলেই পাখী চুপ করে—ফুল লুকাইয়া পড়ে।

আশ্চর্য! পাখীটা এবং ফুলগুলি অনুসরণ করিয়া যত সে আগাইয়া যায়, মনে হয় ঠিক ওই গাছটা। কিন্তু আবার আরও দূরে পাখী ডাকিয়া উঠে। গন্ধ মনে হয় ক্ষীণ; উৎসস্থান মনে হয় আরও দূরে। মোহগ্রস্তের মত যতীন আবার চলিল।

—বাবু!

কে ডাকিল? নারী-কণ্ঠ যেন!

যতীন পাশে দৃষ্টি ফিরাইয়া দেখিল—একটা গাছের শিকড়ের উপর বসিয়া রহিয়াছে দূর্গা। সে কি করিতেছে।

—দূর্গা?

—আজ্ঞে হ্যাঁ।

আঁট-সাঁট করিয়া গাছকোমর বাঁধিয়া কাপড় পরিয়া দূর্গা বসিয়া কি যেন কুড়াইতেছে।

—ওগুলো কি? কি কুড়োচ্ছ?

এক অঞ্জলি ভরিয়া দূর্গা বাড়াইয়া তাহার সামনে ধরিল। টোপা-টোপা স্ফটিকের মত সাদা এগুলি কি? এই তো সে মদির গন্ধ! ইহারই একছড়া মালা গাঁথিয়া দূর্গা গলায় পরিয়াছে। বিলাসিনী মেয়েটির দিকে যতীন অবাক হইয়া চাহিয়া রহিল। গঠন-ভঙ্গিতে, চোখ-মুখের লাবণ্যে, রুক্ষ চুলে মেয়েটার সর্বাঙ্গ-ভরা একটা অদ্ভুত রূপ—নূতন করিয়া আজ তাহার চোখে পড়িল।

দূর্গা মৃদু হাসিয়া বলিল—মউফুল!

—মউ-ফুল?

—মহুয়া ফুল, বাবু; আমরা বলি মউ-ফুল।

যতীন ফুলগুলি তুলিয়া নাকের কাছে ধরিল। সে এক উগ্র মদির গন্ধ—মাথার ভিতরটা যেন কেমন হইয়া যায়; সর্বাঙ্গ শিহরিয়া উঠে।

—কুড়িয়ে রাখছি বাবু গরুতে খাবে,—দুধ বাড়বে। —আবার দূর্গা হাসিল।

—আর কি করবে?

—আর সে—আপনাকে শুনতে হবে না!

—কেন, আপত্তি কি?

—আর আমরা মদ তৈরী করি।

—মদ?

—হ্যাঁ। —পিছন ফিরিয়া দূর্গা হাসিতে লাগিল, তারপর বলিল—কাঁচাও খায়, ভারী মিষ্টি।

যতীনও টপ করিয়া একটা মুখে ফেলিয়া দিল। সত্যই চমৎকার মিষ্টি, কিন্তু সে মিষ্টির মধ্যেও ওই মাদকতা। আবার একটা সে খাইল। আবার একটা। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাহার কানের ভিতরটা যেন গরম হইয়া উঠিল; নাকের ভিতর নিঃশ্বাস—উগ্র উত্তপ্ত! কিন্তু অপূর্ব এই মধু-রস।

দূর্গা সহসা চকিত হইয়া বলিল—পাড়ার ভেতরে গোল উঠেছে লাগছে!

—হ্যাঁ, তাই তো!

সে তাড়াতাড়ি ঝুড়িটা কাঁধে তুলিয়া লইয়া বলিল—আমি চললাম, বাবু। পাড়াতে কি হ'ল দেখি গিয়ে।

যাইতে যাইতে সে ফিরিয়া দাঁড়াইল, হাসিয়া বলিল—মউ আর খাবেন না বাবু, মাদকে যাবেন।

—কি হবে?

—মাদকে! নেশা নেশা! —দূর্গা চলিয়া গেল।

নেশা! তাই তো, তাহার মাথার ভিতরটা যেন ঝিম্ ঝিম্ করিতেছে। সর্বশরীরে একটা দাহ, দেহের উত্তাপও যেন বাড়িয়া গিয়াছে বলিয়া মনে হইতেছে।

—বাবু! বাবু!

আবার কে ডাকিতেছে?—কে?

জঙ্গলের ভিতর আসিয়া ঢুকিল উচ্চিংড়ে।

—গাঁয়ে খুব গোল লেগে যেয়েছে বাবু। কালু শ্যাখ বাউড়ী-মুচিদের গরু সব ধরে নিয়ে গ্যালো।

—গরু ধরে নিয়ে গেল! কালু শেখ কে? নিল কেন?

—কালু শ্যাখ ছিরু ঘোষের প্যায়দা! দেখ না এসে—তোমাকে সব ডাকছে!

যতীন দ্রুতপদে ফিরিল। উচ্চিংড়ে চড়িয়া বসিল মহুয়া গাছে। একেবারে মগডালে উঠিয়া পাকা ফুল পাড়িয়া খাইতে আরম্ভ করিল।

শ্রীহরি অপমানের কথা ভুলিয়া যায় নাই, অপমান ভুলিবার তাহার কথাও নয়। গ্রামের শাসন-শৃঙ্খলার জন্য লোকত ধর্মত সে-ই দায়ী। প্রতিটি মুহূর্তে সে দায়িত্ব শ্রীহরি অনুভব করে, উপলব্ধি করে; বিপদে-বিপর্যয়ে সে তাহাদের রক্ষা করিবে, আর শৃঙ্খলা ভাঙিলে সে তাহাদের শাস্তি দিবে—বিদ্রোহকে কঠিন হস্তে দমন করিবে। এ তাহার অধিকার। এ তাহার দায়িত্ব। যখন সে অত্যাচারী ছিল, তখন তাহার অধিকার ছিল না—একথা সে স্বীকার করে। কিন্তু আজ সে কোন অন্যায় করে না। আজ সমস্ত গ্রামখানাতেই তাহার কর্তব্যপরায়ণতার, ধর্মপরায়ণতার পরিচয় শ্রীহরির মহিমায় উজ্জ্বল হইয়াছে। চণ্ডীমণ্ডপ, ষষ্ঠীতলা, কুয়া, স্কুল-ঘর—সর্বত্র তাহার নাম ঝলমল করিতেছে। রাস্তার ঐ নালাটা আবহমানকাল হইতে একটা দুর্লক্ষ্য বিঘ্ন; সে নিজে হইতেই সে বিঘ্ন দূর করিবার আয়োজন করিতেছে। শিবকালীপুরের সকল ব্যবস্থাকে সে-ই পরম যত্নে সুষ্ঠু করিয়া তুলিয়াছে। সেই সুব্যবস্থাকে অব্যবস্থায় পরিণত করিতে যে বিদ্রোহ, সে বিদ্রোহ দমন করা কেবল তাহার অধিকার নয় কর্তব্য। তবে প্রথমেই সে কঠিন শাস্তি দিতে চায় না। চণ্ডীমণ্ডপ ছাওয়ানোর জন্য যাহারা মজুরি চায়, বলে—জমিদারের চণ্ডীমণ্ডপ—তাহারা বিনা মজুরিতে খাটিবে কেন, তাহাদের সে বুঝাইয়া দিতে চায়—বিনা বিনিময়ে জমিদারের কতখানি তাহারা ভোগ করে। মাত্র ওই কয়খানা তালপাতাই লয় না। জমিদারের খাস-পতিত ভূমি তাহাদের গরু-বাছুরের একমাত্র চারণভূমি। জমিদারের খাস পতিত পুকুরের ঘাটে তাহারা নামে, স্নান করে, জল খায়; জমিদারের খাস-পতিত জমির উপর দিয়াই তাহাদের যাতায়াতের পথ। চণ্ডীমণ্ডপ সেই জমিদারের অধিকার বলিয়া বিনা পয়সায় ছাওয়াইবে না!

তাই সে নবনিযুক্ত কালু শেখ চাপরাসীকে হুকুম দিয়াছে—জমিদার-সরকারের বাঁধে কিংবা পতিত-জমিতে বাউড়ী-বায়েনদের গরু অনধিকার প্রবেশ করিলেই গরুগুলিকে আগল করিয়া কঙ্কণার ইউনিয়ন বোর্ডের খোঁয়াড়ে দিয়া আসিবে। নবনিযুক্ত কালু মনিবকে কাজ দেখাইতে উদ্‌গ্রীব, তাহার উপর এ কাজটা লাভের কাজ। খোঁয়াড়ওয়ালা এক্ষেত্রে গরু-পিছু কিছু কিছু প্রকাশ্য চলিত ঘুষ দিয়া থাকে। সে আভূমি এক সেলাম ঠুকিয়া তৎক্ষণাৎ মনিবের হুকুম প্রতিপালন করিতে চলিল। ভূপাল তাহাকে দেখাইয়া দিল,—কোন্গুলি শ্রীহরির অনুগত লোকের গরু। সেগুলি বাদ দিয়া বাকি গরুগুলি সে ধরিয়া লইয়া গেল খোঁয়াড়ে।

শ্রীহরির গ্রাম-শাসনের এই দ্বিতীয় পর্যায়। ইহাতেও যদি লোকে না বুঝে, তবে আরও আছে। একেবারেই সে কঠিনতম দণ্ড দিবে না। অধর্ম সে করিবে না। লক্ষ্মী তাহাকে কৃপা করিয়াছেন, সে তাহার পূর্বজন্মের সুকৃতির ফল, সে উহার অপব্যবহার করিবে না। দানের তুল্য পুণ্য নাই—দয়ার তুল্য ধর্ম নাই—শাস্তিবিধানের সময়েও সেকথা সে বিস্মৃত হইবে না। তাহার ইচ্ছা ছিল, গরুগুলোকে আটক করিয়া তাহার বাড়ীতেই রাখিবে, বাউড়ী-বায়েনদের দল আসিয়া কান্নাকাটি করিলে তাহাদের অন্যায়টা বেশ করিয়া বুঝাইয়া দিবে। তাহা হইলে গরীবদের আর খোঁয়াড়ের মাশুলটা লাগিত না। মাসুল বড় কম নয়, গরু-পিছু চারি আনা হিসাবে চল্লিশ-পঞ্চাশটা গরুতে দশ-বারো টাকা লাগিবে। আবার সামান্য বিলম্ব হইলেই খোঁয়াড় ভেণ্ডার এক আনা হিসাবে খোরাকি দাবী করিবে। অথচ খোরাকি এক কুটা খড়ও দেয় না—গরুগুলোকে অনাহারেই রাখে। খোরাকি হিসাবেও টাকা আড়াই-তিন লাগিবে। কিন্তু সে কি করিবে? আইন তাই। বেআইনী করিতে গেলেই—দেবু জগন হয়তো তাহাকে বিপদাপন্ন করিবার জন্য মামলা বা দরখাস্ত করিয়া বসিবে।

চণ্ডীমণ্ডপে অর্ধশায়িত অবস্থায় গুড়গুড়ি টানিতে টানিতে সে অলস দৃষ্টিতে গ্রামহিতৈষীদের ব্যর্থ বিক্রম লক্ষ্য করিতেছিল। কিন্তু এত শীঘ্র খবরটা আনিল কে?

খবরটা জানিয়াছিল তারাচরণ নাপিত। কালু শেখ গরুগুলোকে আটক করিলে, রাখাল ছেলেরা মিনতি করিয়া কাঁদিয়া কালু শেখের পায়ে গড়াইয়া পড়িল। —সেখ জী গো! তোমার পায়ে পড়ি, মশাই ছেড়ে দ্যান আজকের মতন ছেড়ে দ্যান!

শেখের ক্রোধ হয় নাই, ক্রোধ হইবার হেতুও ছিল না, তবু ছোঁড়াগুলার ওই হাতে-পায়ে ধরা হইতে অব্যাহতি পাইবার জন্য কৃত্রিম ক্রোধে একটা ভয়ঙ্কর রকমের হাঁক মারিয়া উঠিল—ভাগো হিয়াসে!

ঠিক সেই সময়ই ময়ূরাক্ষীর ব্যারোধী বাঁধের উপর দিয়া আসিতেছিল তারাচরণ ভাণ্ডারী। সে থমকাইয়া দাঁড়াইল। ছেলেগুলা শেখজীর হাঁকে ভয় পাইয়া খানিকটা পিছাইয়া গেলেও গরুগুলির সঙ্গ ছাড়িতে পারিতেছিল না। জনদুয়েক রাখাল উচ্চৈঃস্বরে কাঁদিতে আরম্ভ করিয়া দিল,—ভাষাহীন হাউ হাউ করিয়া কান্না।

কালু বলিল—ওরে উল্লুক, বেকুব, ছুঁচোরা সব, বাড়ীতে ভাগ্‌ গা যা। হাউমাউ করে চিল্লাস না।

ছেলেগুলা সে কথা বুঝিল না, তাহারা ওই গরুগুলির মমতার আকর্ষণেই গরুর পালের পিছনে পিছনে চলিল। কান্নার বিরাম নাই। —ওগো, কি করব গো? কি হবে গো?

শেখ আবার পিছনে তাড়া করিল—ভাগ, বুলছি!

ছেলেগুলা খানিকটা পিছাইয়া আসিল; কিন্তু শেখ ফিরিবার সঙ্গে সঙ্গেই তাহারাও আবার ফিরিল।

তারাচরণ ব্যাপারটা বুঝিয়া লইল। কাল সে শ্রীহরির পায়ের নখের কোণ তুলিতে তুলিতে ইহার খানিকটা আভাসও পাইয়াছিল। তারাচরণ দ্রুতপদে গ্রামে ফিরিয়া দেবুর খিড়কির দরজায় দাঁড়াইয়া তাহাকে সন্তর্পণে ডাকিয়া সংবাদটা দিয়া চলিয়া গেল। বলিল—শীগ্‌গির ব্যবস্থা কর ভাই, নইলে এক আনা করে ফাজিল লেগে যাবে। সে-ও আড়াই টাকা, তিন টাকা। ছ'টা বাজলে আজ আর গরু দেবেই না। কাল দু-আনা করে বেশী লাগবে গরুতে।

খিড়কির দরজা দিয়াই সে বাহির হইয়া চলিয়া গেল। শ্রীহরি ঘোষ যে চণ্ডীমণ্ডপে বসিয়া আছে, সে-বিষয়ে সে নিঃসন্দেহ। পণ্ডিতের বাড়ী হইতে বাহির হইতে দেখিলেই ঘোষ ঠিক তাহাকে সন্দেহ করিয়া বসিবে। জঙ্গলের আড়াল হইতে তারাচরণ এক ফাঁক দিয়া চণ্ডীমণ্ডপের দিকে চাহিয়া দেখিল, তাহার অনুমান অভ্রান্ত। এক ঝিলিক সকৌতুক হাসি তারাচরণের মুখে খেলিয়া গেল।

দেবু কিছুক্ষণ মাটির দিকে চাহিয়া চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া রহিল। আজ কয়েক দিন হইতেই যে আঘাত সে আশঙ্কা করিয়া আসিতেছিল সে আঘাতটা আজ আসিয়াছে। ইহার দায়িত্ব সমস্তটাই তো প্রায় তাহার। এ কথা সে কোনো দিন মুহূর্তের জন্য আপনার কাছে অস্বীকার করে নাই। আঘাতটা আসিবার সঙ্গে সঙ্গে আপন মাথা পাতিয়া দিয়া নির্দোষ গরীবদের রক্ষা করিবার জন্য অহরহ সচেতন হইয়াই সে প্রতীক্ষা করিতেছে।

গরীবের পয়সাই বা পাইবে কোথা? তারাচরণ বলিয়া গেল, এক আনা হিসাবে বেশী লাগিয়ে আড়াই টাকা, তিনটাকা বেশী লাগিবে। তাহা হইলে গরু অন্তত চল্লিশ-পঞ্চাশটি। মনে মনে সে হিসাব করিয়া দেখিল—দশ টাকা হইতে পনের টাকা দণ্ড লাগিবে। উহারা কোথা হইতে দিবে? জমি নাই, জেরাত নাই, সম্বলের মধ্যে ভাঙা বাড়ী আর ওই গরু-ছাগল। গাই-গরুর দুধ বিক্রি করে, গোবর হইতে খুঁটে বিক্রি করে, গরু-বাছুর-ছাগল বিক্রি করে, ওই পশুগুলিই তাহাদের একমাত্র সম্পদ। ইছু শেখ এ সময়ে টাকা দিতে পারে, কিন্তু তাহার এক টাকার মূল্য হিসাবে অন্তত সে দুই টাকা আদায় করিয়া লইবে। তা'ছাড়া উহাদের এই বিপদের জন্য দায়ী একমাত্র সে-ই। সে বেশ জানে, সেদিন ওই তালপাতা উপলক্ষ করিয়াই একটা মিটমাট হইয়া যাইত, উহারা শ্রীহরির বশ্যতা স্বীকার করিয়া লইয়া বাঁচিত। কিন্তু সে-ই তাহাদিগকে উঠিয়া আসিতে বলিয়াছিল। অন্যায়কে অস্বীকার করিতে সে-ই প্রেরণা দিয়াছিল। আজ নিজের বেলায় ন্যায়কে ধর্মকে মাথায় তুলিয়া না লইলে চলিবে কেন?

আরও কয়েক মুহূর্তে চিন্তা করিয়া মাথা উঁচু করিয়া দাঁড়াইল। ডাকিল—বিলু!

তারাচরণ ডাকিতেই বিলুও আসিয়া আড়ালে দাঁড়াইয়া ছিল। সংবাদটা দিয়া তারাচরণ চলিয়া গেলেও বিলু দেবুর সম্মুখে না আসিয়া নীরবে সেই আড়ালেই দাঁড়াইয়াছিল। ওই গরীবদের কথাই ভাবিতেছিল, আহা, গরীব! উহাদের উপর নাকি এই অত্যাচার করে! এই স্তব্ধ দুপুরে বাউড়ী-বায়েন পাড়ায় মেয়েদের সকরুণ কান্না শোনা যাইতেছে। শুনিয়া বিলুরও কান্না পাইল, সে কাঁদিতেছিল। দেবুর ডাক শুনিয়া, তাড়াতাড়ি চোখ মুছিয়া আসিয়া কাছে দাঁড়াইল।

দেবু বিলুর সর্বাঙ্গে অনুসন্ধান করিয়া দেখিল। কোথাও একটুকরা সোনা নাই। চাষীর ঘরে সোনার অলঙ্কারের বড় প্রচলন নাই। খুব জোর নাকে নাকছবি, কানে ফুল, গলায় বিছেহার, হাতে শাঁখাবাঁধা, বিলুর সে-সব গিয়াছে।

বিলু বলিল—কি বলছ?

—কিছুই নাই আর?

—কি?

—বাঁধা দিয়ে গোটা-পনেরো টাকা পাওয়া যায়—এমন কিছু?

বিলু কয়েক মুহূর্ত চিন্তা করিয়া বোধ করি তাহার সকল ভাণ্ডার মনে মনে অনুসন্ধান করিয়া দেখিল। তারপর সে ঘরের ভিতর গিয়া দুই গাছি ছোট বালা হাতে করিয়া ফিরিয়া এল।

দেবু দুই-পা পিছাইয়া গেল—খোকার বালা?

—হ্যাঁ।

এই বালা দুইগাছি দিয়াছিল বিলুর বাপ। দেবুর অনুপস্থিতিতে শত দুঃখ-কষ্টের মধ্যেও বিলু এ দু'টিকে হস্তান্তর করিতে পারে নাই।

বিলু বলিল—নাও।

—খোকার বালা নেব?

—হ্যাঁ নেবে। আবার যখন হবে তোমার, তুমি গড়িয়ে দেবে।

—যদি খালাস না হয়, আর গড়াতে না পারি!

—পরবে না খোকা।

দেবু আর দ্বিধা করিল না। বালা দুইগাছা লইয়া জামাটা গায়ে দিয়া দ্রুতপদে বাহির হইয়া গেল।

গরুগুলিকে খালাস করিয়া ফিরিল সে সন্ধ্যার সময়। অর্ধেক দিন রৌদ্রে ঘুরিয়া জামাকাপড় ঘামে ভিজিয়া গিয়াছে। তাহার উপর একপাল গরুর পায়ের ধুলায় সর্বাঙ্গ কাদায় আচ্ছন্ন। যতীনের দুয়ারে তখন বেশ একটি মজলিস বসিয়া গিয়াছে।

তাহাকে দেখিয়া সকলে প্রায় একসঙ্গে প্রশ্ন করিয়া উঠিল—কি হ'ল দেবু?

—ছাড়ানো হয়েছে গরু। —দেবু তৃপ্তির হাসি হাসিল।

—কত লাগল?

সে কথার উত্তর না দিয়া দেবু বলিল—যতীনবাবু!

—বলুন?

—একটা কথা বলব আপনাকে।

—দাঁড়ান; আপনাকে বড় ক্লান্ত দেখাচ্ছে। আগে একটু চা করি আপনার জন্য।

—না। এখনি বাড়ী যাব আমি। কথাটা বলে যাই।

যতীন দেবুকে লইয়া ঘরের ভিতর প্রবেশ করিল।

দেবু মৃদু অথচ দৃঢ় স্বরে বলিল—প্রজা সমিতির ভার আমিই নেব।

—দাঁড়ান, চা খেয়ে তবে যেতে পাবেন। —সে বাড়ীর ভিতরে গিয়া ডাকিল—মা-মণি! মা-মণি!

কেহ সাড়া দিল না।

পদ্ম বাড়ীতে নাই, সে গিয়াছে উচিংড়ের সন্ধানে। উচ্চিংড়ে এখনও ফিরে নাই, তাহাকে খুঁজিতে বাহির হইয়াছে।

যতীন নিজেই চায়ের জল চড়াইয়া দিল।


তেইশ



হরেন ঘোষালের উত্তেজনা—সে এক ভীষণ ব্যাপার! সে গোটা গ্রামটার পথে পথে ঘোষণা করিয়া দিল—প্রজা সমিতির মিটিং! প্রজা সমিতির মিটিং! স্থানটার উল্লেখ করিতে সে ভুলিয়াই গেল। ঠিক ছিল মিটিং হইবে ওই বাউড়ীপাড়ায় ধর্মরাজতলায়। কিন্তু ঘোষাল সেকথা উল্লেখ করিতে ভুলিয়া যাওয়ায় লোকজন আসিয়া জমিল—নজরবন্দী বাবুর বাসার সম্মুখে। কারণ প্রজা সমিতির সকল উৎসই যে ওখানেই।

হরেন বলিল—তবে এইখানেই হোক। আবার এখান থেকে ওখানে! তা ছাড়া এখানে চা করা যাবে দরকার হলে। চেয়ার-টেবিল রয়েছে এখানে। এখানেই হোক।

সঙ্গে সঙ্গে সে যতীনের টেবিল-চেয়ার টানিয়া বাহিরে আনিয়া রীতিমত সভার আসর সাজাইয়া ফেলিল। ইতিমধ্যে দুই গাছা মালাও সে গাঁথিয়া ফেলিয়াছে। ওটাতে তাহার ভুল হয় না।

লোকজন অনেক জমিয়াছে। বাউড়ী-বায়েনরা প্রায় সকলেই আসিয়াছে। গ্রামের চাষীরাও আসিয়াছে। বিশেষ করিয়া আজিকার গরু খোঁয়াড়ে দেওয়ার জন্য সকলেই বেশ একটু উত্তেজিতও হইয়াছে। ময়ূরাক্ষীর ব্যারোধী বাঁধ জমিদারের খাস খতিয়ানের অন্তর্ভুক্ত হইলেও ওই বাঁধ তৈয়ারী করিয়াছে তো প্রজারাই। সেখানে চিরকাল লোক গরু চরাইয়া থাকে। গ্রামের পতিত জমিও আবহমানকাল গোচারণ ভূমি হিসাবে লোক ব্যবহার করিয়া আসিতেছে। সেখানে গোচারণ করিবার অধিকার নাই—এই কথায় সকলকেই উত্তেজিত করিয়াছে। আজ ওই অন্যায় আইন বাউড়ী-বায়েনদের পক্ষে প্রযুক্ত হইল কাল যে সকলের পক্ষেই তাহা প্রযোজ্য হইবে না তাহা কে বলিল? বাউড়ীরা অবশ্য এত বুঝে নাই। তাহারা শুনিয়াছে—পণ্ডিত মশায় কমিটির কর্তা হইবেন। তাই শুনিয়াই তাহারা সকৃতজ্ঞ চিত্তে আসিয়াছে। নির্ভয়ে আসিয়াছে।

তাহাদের পাড়ায় আজ ঘরে ঘরে পণ্ডিতের কথা। দূর্গার মা পর্যন্ত মুক্তকণ্ঠে আশীর্বাদ করিতেছে। মাথার চুলের মত পেরমাই হবে, সোনার দোতকলম হবে, বেটার কোলে বেটা হবে, লক্ষ্মী উথলে উঠবে। সোনার মানুষ, পণ্ডিত-জামাই আমার সোনার মানুষ!—

সন্ধ্যার সময় আপনার ঘরে বালিশে বুক রাখিয়া জানালার বাহিরের দিকে চাহিয়া দূর্গাও এই কথা ভাবিতেছিল—সোনার মানুষ, পণ্ডিত সোনার মানুষ, বিলু-দিদি তাহার ভাগ্যবতী! আজ ওই সুকুমার নজরবন্দী বাবুটিও পণ্ডিতের তুলনায় হীনপ্রভ হইয়া গিয়াছে। তাহার ইচ্ছা—একবার মজলিসে যায়, দশের মধ্যে পণ্ডিত উঁচু হইয়া বসিয়া আছে, সেই দৃশ্যটি আড়ালে দাঁড়াইয়া থাকিয়া একবার দেখিয়া আসে। আবার ভাবিল—না, মজলিস ভাঙুক, সে বিলু-দিদির বাড়ী যাইবে, গিয়া পণ্ডিত-জামাইয়ের সঙ্গে দুইটা রসিকতা করিয়া উত্তরে কয়েকটা ধমক খাইয়া আসিবে। সে ভাবিতেছিল—কি বলিয়া কথা আরম্ভ করিবে!

আবার ওদিকে নজরবন্দীকে বলিবার মত অনেক কথা তাহার মনে ঘুরিতেছে।

—মউ ফুলের মধু কেমন লাগল বাবু?

আপন মনে দূর্গা হাসিল। বাবুর চোখের কোণে লালচে আমেজ যে স্পষ্ট দেখিয়াছে। —কিন্তু পণ্ডিতকে সে কি বলিবে?

দূর্গার কোঠার সম্মুখে অমরকুণ্ডার মাঠ, তারপর নদীর বাঁধ। বাঁধের উপর দিয়া একটা আলো আসিতেছে। আলোটা মাঠে নামল।

পণ্ডিত বড় গম্ভীর লোক। সে একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিল। তারপর সহসা সে আনন্দে চঞ্চল হইয়া উঠিল। কথা সে খুঁজিয়া পাইয়াছে।

—জামাই-পণ্ডিত, তুমি ভাই আবার পাঠশালা খোল।

—কে পড়বে?

—কেউ না পড়ে আমি পড়ব। নেকাপড়া শিখব আমি—

ওঃ, আলোটা তাহাদের গ্রামেই আসিতেছে। হাতে ঝুলানো লণ্ঠনের আলোয় চলন্ত মানুষের গতিশীল পা-দুখানা বেশ দেখা যাইতেছে। কে? কাহারা? একজন লণ্ঠন-হাতে আসিতেছে, পিছনে একজন—একজন নয়, দুইজন, বায়েনপাড়ার প্রান্ত দিয়াই ঢুকিবার সোজা পথ। সেই পথে আগন্তুকেরা কাছে আসিয়া পড়িল।

দূর্গা চমকিয়া উঠিল। এ কি। এ যে আলো হাতে ভূপাল থানাদার, তাহার পিছনে ও যে জমাদারবাবু! জমাদারের পিছনে সেই হিন্দুস্থানী সিপাহীটা! ছিরু পালের বাড়ীতে চলিয়াছে নিশ্চয়।

ছিরু পালের নিমন্ত্রণে রাত্রে জমাদারের আগমন এমন কিছু নূতন কথা নয়। পূর্বে এমন আসরে দূর্গারও নিয়মিত নিমন্ত্রণ হইত। কিন্তু পালের নিমন্ত্রণে জমাদারের সঙ্গে তো সিপাহী থাকার কথা নয়। জমাদারবাবুর আজ এমন পোশাকই বা কেন? সে যে একেবারে খাঁটি জমাদারের পোশাক আঁটিয়া আসিতেছে। সিপাহীর মাথায় পাগড়ী, তা ছাড়া শ্রীহরির নিমন্ত্রণের আসর তো প্রথম রাত্রে বসে না! সে আসর বসে মধ্যরাত্রে বারোটা নাগাত।

দূর্গা হঠাৎ একটু চকিত হইয়া উঠিল। তাহার মনে পড়িয়া গেল নজরবন্দীকে, জামাই-পণ্ডিতকে। কেন সে তাহা জানে না! কিন্তু তাহাদের দুজনকেই মনে হইল। সে তাড়াতাড়ি নামিয়া আসিয়া পথে বাহির হইয়া পড়িল। শুক্ল-ষষ্ঠীর চাঁদ তখন অস্ত গিয়াছে। অন্ধকারে আত্মগোপন করিয়া পথের পাশের জঙ্গলের মধ্য দিয়া সে তাহাদের অনুসরণ করিল।

চণ্ডীমণ্ডপ আজ অন্ধকার। ছিরু পাল আজ চণ্ডীমণ্ডপে বসে নাই। পালের পাল নয়, আজকাল ঘোষ মশায়! ঘোষ মশায়ের খামার বাড়ীর বৈঠকখানা ঘরে আলো জ্বলিতেছে। ভূপালের আলো গিয়া ওইখানেই প্রবেশ করিল। নিমন্ত্রণই বটে। চণ্ডীমণ্ডপ দেবস্থল, সেখানে এ আসর চলে না। কিন্তু শ্রীহরি আজকাল নাকি—। কথাটা মনে পড়িতেই দূর্গা না হাসিয়া পারিল না।

এক-একটা গরু রাত্রে দড়ি ছিঁড়িয়া মাঠে যাইয়া ফসল খাইয়া ফিরে। যে গরু এ আস্বাদ একবার পাইয়াছে সে আর ভুলিতে পারে না। শিকল দিয়া বাঁধিলেও সে খুটা উপড়াইয়া রাত্রে মাঠে যায়। ছিরু পাল নাকি সাধু হইয়াছে। তাই সে হাসিল। কিন্তু নূতন নারীটি কে? একজন কেহ আছেই। কিন্তু সে কে? দূর্গা কৌতুক সম্বরণ করিতে পারিল না, শ্রীহরির বাড়ীর গোপনতম পথের সন্ধান পর্যন্ত তাহার সুবিদিত, কত রাত্রে সে আসিয়াছে। চুড়িগুলি হাতের উপরে তুলিয়া নিঃশব্দে আসিয়া সে শ্রীহরির ঘরের পিছনে দাঁড়াইল। ঘরের কথা শোনা যাইতেছিল। সে কান পাতিল।

জমাদার বলিতেছিল—নির্ঘাত দু-বছর ঠুকে দোব।

শ্রীহরি বলিল—চলুন তা হলে—জোর কমিটি বসেছে। জগন ডাক্তার, শালা হরেন ঘোষাল, গিরিশ ছুতোর—অনি কামার তো আছেই। দেবু আর নজরবন্দীকে সব ঘিরে বসেছে। উঠুন তা হলে।

জমাদার বলিল—চা-টা নিয়ে এস জলদি! চা খাওয়া হয় নি আমার।

শ্রীহরি খবর পাঠাইয়া ছিল। নজরবন্দীর বাড়ীতে প্রজা সমিতির কমিটি বসিয়াছে। জমাদার সাহেবের কাছে সেলাম পাঠানো হইয়াছিল, সেলামীর ইঙ্গিতও ছিল। জমাদারের নিজেরও একটা প্রত্যাশা আছে। ডেটিনিউটিকে হাতে-নাতে ধরিয়া ষড়যন্ত্র বা আইনভঙ্গ—যে কোন মামলায় ফেলিতে পারিলে চাকরিতে পদোন্নতি বা পুরস্কার—নিদেনপক্ষে বিভাগীয় একটা সদয়-মন্তব্য লাভ অনিবার্য। সেলামীটা ফাউ। সেলামীটা ধর্তব্যের মধ্যে নয়।

দূর্গা শিহরিয়া উঠিল।

নিঃশব্দে দ্রুতপদে সে ঘরের পিছন হইতে চলিয়া আসিয়া পথের উপর দাঁড়াইয়া কয়েক মুহূর্ত ভাবিয়া লইল। তাহার পর বেশ করিয়া চুড়ি বাজাইয়া ঝঙ্কার তুলিয়া চলিতে আরম্ভ করিল। ঠিক পরমুহূর্তে প্রশ্ন ভাসিয়া আসিল—কে? কে যায়?

—আমি।

—কে আমি?

—আমি বায়েনদের দূর্গা গো।

—দূর্গা! আরে আরে—শোন্ শোন্।

—না।

ভূপাল আসিয়া এবার বলিল—জমাদারবাবু ডাকছে!

'একমুখ' হাসি লইয়া দূর্গা ভিতরে আসিয়া বলিল—আ মরণ আমার! তাই বলি চেনা চেনা গলা মনে হচ্ছে—তবু চিনতে পারছি না। জমাদারবাবু! কি ভাগ্যি আমার? কার মুখ দেখে উঠেছিলাম আমি?

জমাদার হাসিয়া বলিল—ব্যাপার কি বল দেখি? আজকাল নাকি পিরীতে পড়েছিলি? প্রথম অনি কামার, তারপর শুনছি নজরবন্দীবাবু!

দূর্গা হাসিয়া বলিল—বলছে তো আপনার মিতে, পাল মশাই!

পরক্ষণেই সে বলিল—আজকাল আবার গোমস্তা মশাই বলতে হবে বুঝি? ও গোমস্তা মশাই মিছে বলেছে, মনের রাগে বলেছে।

শ্রীহরি গম্ভীরভাবেই বলিল—মনের রাগে? তো রাগ তো হতেই পারে! পুরানো বন্ধু-লোককে ছাড়লি কেন তুই?

দূর্গা বলিল—মুচিপাড়াকে-পাড়া পান লাগিয়ে পুড়িয়ে ছিলে আপনার জিদে! পরে টিন দেবার জন্য টাকা চাইলাম, তা আমাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ছিলে আপনার বন্ধুনোক। সত্যি-মিথ্যে শুধোন আপনি! বলুক ও ঘরে আগুন দিয়েছে কিনা?

শ্রীহরির মুখ বিবর্ণ হইয়া গেল। জমাদার তার মুখের দিকে চাহিয়া বলিল—দূর্গা কি বলছে, পাল মশাই! জমাদারের কণ্ঠস্বর মুহূর্তে পাল্টাইয়া গিয়াছে।

দূর্গা লক্ষ্য করিয়া বুঝিল—একটা বুঝাপড়ার সময় আসিয়াছে। সে বলিল—ঘাট থেকে আসি জমাদারবাবু!

জমাদার দূর্গার কথার কোন জবাব দিল না। সে স্থিরদৃষ্টিতে চাহিয়াছিল শ্রীহরির দিকে। সে দৃষ্টির অর্থ দূর্গা খুব ভাল করিয়া জানে। জরিমানা আদায়ের পূর্বরাগ। এ পর্বটা শেষ হইতে বেশ কিছুক্ষণ লাগিবে। ঘাটে যাইবার জন্য বাহির হইয়া, তখনি ফিরিয়া দূর্গা লীলায়িত ভঙ্গিতে দেহে হিল্লোল তুলিয়া বলিল—আজ কিন্তু মাল খাওয়াতে হবে দারোগাবাবু! পাক্কা মাল! —বলিয়াই সে বাহির হইয়া গেল ঘাটের দিকে।

শ্রীহরির খিড়কীর পুকুরের পাড় ঘন-জঙ্গলে ভরা। বাঁশের ঝাড়, তেঁতুল, শিরীষ প্রভৃতি গাছ এমন ভাবে জন্মিয়াছে যে, দিনেও কখনো রৌদ্র প্রবেশ করে না। নিচেটায় জন্মিয়াছে ঘন কাঁটা-বন। চারিদিকে উই-ঢিবি। ওই উইগুলির ভিতর নাকি বড় বড় সাপ বাসা বাঁধিয়াছে। শ্রীহরির খিড়কীর পুকুর সাপের জন্য বিখ্যাত। বিশেষ চন্দ্রবোড়া সাপের জন্য। সন্ধ্যার পর হইতেই চন্দ্রবোড়ার শিস শোনা যায়। পুকুরঘাটে আসিয়া দূর্গা জলে নামিল না, সে প্রবেশ করিল ওই জঙ্গলে। নিশাচরীর মত নিঃশব্দে নির্ভয় পদক্ষেপে দ্রুতগতিতে সে জঙ্গলটা অতিক্রম করিয়া আসিল—নামিল এপাশের পথে। এখান হইতে অনিরুদ্ধের বাড়ী কাছেই। ওই মজলিসের আলো দেখা যাইতেছে। ছুটিয়া আসিয়া দূর্গা চকিতে ছায়াছবির মত অনিরুদ্ধের খিড়কীর দরজা দিয়া বাড়ীর ভিতর ঢুকিয়া গেল।

প্রজা সমিতির সভাপতি পরিবর্তনের কাজ তখন শেষ হইয়াছে। অনিরুদ্ধ চা পরিবেশন করিতেছিল, জগন ডাক্তার ভাবিতেছিল—বিদায়ী সভাপতি হিসাবে সে একটি জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিবে। দেবু ভাবিতেছিল—নূতন কর্মভারের কথা। সহসা একটি মূর্তি অন্ধকারের মধ্যে চকিতে অনিরুদ্ধের খিড়কীর দরজার দিকে চলিয়া যাইতে সকলে চমকিয়া উঠিল—আপাদমস্তক সাদা কাপড়ে ঢাকা, দ্রুত পদধ্বনির সঙ্গে আভরণের ঠুংঠান শব্দ। কে? কে? —কে গেল?

অনিরুদ্ধ দ্রুত বাড়ীর মধ্যে প্রবেশ করিল। পদ্ম! এমন করিয়া সে কোথা হইতে ছুটিয়া আসিল? কোথায় গিয়াছিল সে?

—কর্মকার!

—দূর্গা!

দূর্গার কণ্ঠস্বর। ক্রোধে বিরক্তিতে অধীর হইয়া অনিরুদ্ধ দূর্গার সম্মুখীন হইল—কি?

দূর্গা সংক্ষেপে শ্রীহরির বাড়ীতে জমাদারের আগমন সংবাদটা দিয়া যেমন আসিয়াছিল তেমনি দ্রুতপদে আভরণের মৃদু সাড়া তুলিয়া বিলীয়মান রহস্যের মত চকিতে মিলাইয়া গেল। ছুটিয়া সে আবার সেই পুকুরপাড়ের জঙ্গলের মধ্যে প্রবেশ করিল।

ঘাটে হাত-পা ধুইয়া যখন শ্রীহরির ঘরে প্রবেশ করিল—তখন বোধ হয় ঘরে-আগুন-দেওয়ার মামলা মিটিয়া গিয়াছে। জমাদারের চোখে প্রসন্ন দৃষ্টি। জমাদার দূর্গার দিকে চাহিয়া বলিল—হাঁপাচ্ছিস কেন?

আতঙ্কে চোখ বিস্ফারিত করিয়া দূর্গা বলিল—সাপ!

—সাপ! কোথায়?

—খিড়কির ঘাটে। এই প্রকাণ্ড বড়। চন্দ্রবোড়া। এই দেখুন জমাদারবাবু! —বলিয়া সে ডান পাখানি আলোর সম্মুখে ধরিল। একটা ক্ষতস্থান হইতে কাঁচা রক্তের ধারা গড়াইয়া পড়িতেছিল।

জমাদার এবং শ্রীহরি উভয়েই আতঙ্কিত হইয়া উঠিল। কি সর্বনাশ! জমাদার বলিল—বাঁধ বাঁধ। দড়ি, দড়ি! পাল, দড়ি নিয়ে এস!

শ্রীহরি দড়ির জন্য ভিতরে যাইতে যাইতে বিরক্তভরে বলিল—কি বিপদ! কোথা থেকে বাধা এসে জুটল দেখ দেখি? দড়ি আনিয়া ভূপালের হাতে দিয়া শ্রীহরি বলিল—বাঁধ। জমাদারবাবু, আসুন চট করে ওদিকের কাজটা সেরে আসি।

দূর্গা বিবর্ণমুখে করুণদৃষ্টিতে জমাদারের দিকে চাহিয়া বলিল—কি হবে জমাদারবাবু! চোখ তাহার জলে ছল ছল করিয়া উঠিল।

জমাদার আশ্বাস দিয়া বলিল—কোন ভয় নাই। ভূপালের হাত হইতে দড়ি লইয়া সে নিজেই বাঁধিতে বসিল, ভূপালকে বলিল—একদৌড়ে থানায় গিয়ে লেক্সিন নিয়ে আয়। আর ওঝা কে আছে ডাক—এনি।

দূর্গা বলিল—আমাকে বাড়ী পাঠিয়ে দাও, জমাদারবাবু। ওগো আমি মায়ের কোলে মরবো।

শ্রীহরি বলিল—সেই ভাল। ভূপাল ওকে বাড়ীতে দিয়ে আসুক। দীমু ওঝা আর মিতে গড়াইকে ডাক। ছুটে যাবি আর আসবি। চলুন জমাদারবাবু।

দাওয়ার তক্তপোশের উপর যতীন একা বসিয়াছিল। আগন্তুককে অভ্যর্থনা করিয়া বলিল—ছোট দারোগাবাবু! এত রাত্রে?

দারোগা কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া বলিল—গিয়েছিলাম অন্য গ্রামে। পথে ভাবলাম আপনার মজলিসটা দেখে যাই। কিন্তু কেউ কোথাও নেই যে!

যতীন হাসিয়া বলিল—আপনি এসেছেন—ঘোষ মশায় এসেছেন, আবার বসুক মজলিস! ওরে উচ্চিংড়ে, চায়ের জল চড়িয়ে দে তো!

ভূপাল দূর্গাকে বাড়ীতে পৌঁছাইয়া দিয়া ঔষধ ও ওঝার মত চলিয়া গেল। দূর্গার মা হাউ-মাউ আরম্ভ করিয়া দিল। তাহার চিৎকারে পাড়ার লোক আসিয়া জুটিয়া গেল। পাতুর বৌ সকরুণ মমতায় বার বার প্রশ্ন করিল—কি সাপ ঠাকুরঝি? সাপ দেখেছ?

দূর্গা অত্যন্ত কাতর স্বরে বলিল—ওগো তোমরা ভিড় ছাড় গো। সে ছটফট করিতে আরম্ভ করিল। এ-পাড়ার মাতব্বর সতীশ, সে সত্যই মাতব্বর লোক। সে অনেক ঔষুধ-পত্তরের খবর রাখে। সাপের ঔষধও সে দুই-চারিটা জানে। সতীশ একরূপ ছুটিয়াই বাহির হইয়া গেল—ঔষধের সন্ধানে। কিছুকাল পর ফিরিয়া আসিয়া একটা শিকড় দিয়া বলিল—চিবিয়ে দেখ দেখি তেতো লাগছে না মিষ্টি লাগছে?

দূর্গা সেটাকে মুখে দিয়া পরক্ষণেই ফেলিয়া দিল—থু-থু—।

সতীশ আশ্বস্ত হইয়া বলিল—তেতো যখন লেগেছে তখন ভয় নাই!

দূর্গা ধুলায় গড়াগড়ি দিয়া বলিল—মিষ্টিতে গা বমি-বমি করছে গো! বাবা গো—ওই কে আসছে—ওরা নাকি গো!

ওরা নয়। জগন ডাক্তার, হরেন ঘোষাল, অনিরুদ্ধ এবং আর কয়েকজন।

হরেন ঘোষাল চীৎকার উঠিল—হঠ যাও, হঠ যাও। সব হঠ যাও।

জগন তাড়াতাড়ি বসিয়া দূর্গার পা-খানা টানিয়া লইল। হুঁ! স্পষ্ট দাঁতের দাগ!

পাতুর চোখ দিয়া জল পড়িতেছিল; সে বলিল—কি হবে, ডাক্তারবাবু?

পকেট হইতে ছুরি বাহির করিয়া ডাক্তার বলিল—ওষুধ দিচ্ছি, দাঁড়া। অনিরুদ্ধ, এই পারমাঙ্গানেটের দানাগুলো ধর দেখি। আমি চিরে দি—তুই দিয়ে দে।

দূর্গা পা-খানা টানিয়া লইল—না, না গো।

—কি!

—না না না। মড়ার উপর আর খাঁড়ার ঘা দিয়ো না, বাপু।

—ঘোষাল, ধর তো পা-খানা।

ঘোষাল চমকিয়া উঠিল। সে এই অবসরে পাতুর বউয়ের সঙ্গে কটাক্ষ বিনিময় করিয়া মৃদু মৃদু হাসিতেছিল।

দূর্গা আবার দৃঢ়স্বরে বলিল—না।

জগন বিরক্ত হইয়া উঠিয়া পড়িল—তবে মর!

দূর্গা উল্টাইয়া উপুড় হইয়া শুইয়া বোধ করি নীরব কান্নার আবেগে থরথর করিয়া কাঁপিতেছিল। অনিরুদ্ধ ডাকিল—দূর্গা! ডাক্তার যা বলছে শোন। ও!

দূর্গার কম্পমান দেহখানি অস্বীকারের ভঙ্গিতে নড়িয়া উঠিল। জগন এবার রাগ করিয়া চলিয়া গেল। অনিরুদ্ধ বলিল—একজন ভাল মুসলমান ওঝা আছে। হরেন একটা বিড়ি ধরাইল।

অনতিদূরে একটা আলো আসিয়া দাঁড়াইল। আলোর পিছনে জমাদার ও শ্রীহরি। ঘোষালও এইবার সরিয়া পড়িল।

দারোগা সতীশকে প্রশ্ন করিল—কেমন আছে?

—আজ্ঞে ভালো নয়। একেবারে ছটফট করছে।

—গড়াই আসে নাই?

—আজ্ঞে না।

—ঘোষ, আপনি আর একটা লোক পাঠিয়ে দিন। আমি থানা থেকে লেক্সিন পাঠিয়ে দিচ্ছি। আসুন।

দারোগা ও শ্রীহরি চলিয়া গেল।

দূর্গা আরও কিছুক্ষণ ছটফট করিয়া খানিকটা সুস্থ হইল, বলিল—সতীশ-দাদা, তোমার ওষুধ ভাল। ভাল লাগছে আমার। —আরও কিছুক্ষণ পর সে উঠিয়া বসিল।

সতীশ বলিল—ওষুধ আমার অব্যর্থ।

দূর্গা বলিল—আমাকে নিয়ে ওপরে চল, বউ।

উপরে বিছানায় বসিয়া দূর্গা মাথার খোঁপার একটা বেলকুঁড়ির কাঁটা খুলিয়া আলোর সম্মুখে তাহার অগ্রভাগটা ঘুরাইয়া ফিরাইয়া দেখিল।

পাতুর বউ বলিল—সাপ তুমি দেখেছ, ঠাকুরঝি? কি সাপ?

দূর্গা বলিল—কালসাপ!

অতি প্রচ্ছন্ন একটি হাসির রেখা তাহার ঠোঁটের কোণে কোণে খেলিয়া গেল। সাপে তাহাকে কামড়ায় নাই। কর্মকারের বাড়ী হইতে ফিরিবার পথেই সে মনে মনে স্থির করিয়া ঘাটে আসিয়া বেলকুঁড়ির কাঁটাটা পায়ে ফুটাইয়া রক্তমুখী দংশনচিহ্নের সৃষ্টি করিয়াছিল। নহিলে কি সকলে পালাইবার অবকাশ পাইত, না জমাদার তাহাকে নিষ্কৃতি দিত? মদ খাইয়া জমাদারের যে মূর্তি হয় মনে করিয়া সে শিহরিয়া উঠিল। একটা ভয় ছিল, লোকে তাহার অনিরুদ্ধের বাড়ী যাওয়ার কথাটা প্রকাশ করিয়া ফেলিবে। ভাগ্যক্রমে সে কথাটা কাহারও মনেই হয় নাই।

কিন্তু নজরবন্দী, জামাই-পণ্ডিত তাহার এ অবস্থার কথা শুনিয়া একবার তাহাকে দেখিতেও আসিল না? কেহই তো সত্য কথা জানে না, তবু আসিল না? নজরবন্দী না হয় নজরবন্দী, তাহার চোখে পাহারা হাজির ছিল গ্রামে, ছিরু পাল রহিয়াছে। তাই না আসিবার কারণ আছে। কিন্তু জামাই পণ্ডিত। জামাই পণ্ডিত একবার আসিল না!

পাতুর বউ প্রশ্ন করিল—ঠাকুরঝি, আবার এলছে?

—যা বউ, যা তুই! আবার একটুকুন শুই।

—না। ঘুমুতে তুমি পাবে না আজ।

দূর্গা এবার রাগে অধীর হইয়া বলিল—ঘুমোবো না, ঘুমোবো না। আমার মরণ হবে না, আমি মরব না। তুই যা, তুই যা এখান থেকে।

পাতুর বউ এবার রাগ করিয়া উঠিয়া গেল।

কে? নিচে কে ডাকিতেছে?

—পাতু, দূর্গা কেমন আছে রে?

দূর্গা বালিশে মুখ গুজিয়া পড়িয়া রহিল। —হ্যাঁ, জামাই-পণ্ডিতের গলা! ওই যে সিড়িতে পায়ের শব্দ!

—কেমন আছিস দূর্গা? —পাতুর সঙ্গে দেবু ঘরে ঢুকিল। দূর্গা উত্তর দিল না।

—দূর্গা!

দূর্গা এবার মুখ তুলিল, বলিল—যদি এতক্ষণে মরে যেতাম জামাই পণ্ডিত!

দেবু বলিল—আমি খবর নিয়েছি, তুই ভাল আছিস। রাখাল-ছোঁড়া দেখে গিয়ে আমাকে বলেছে।

দূর্গা আবার বালিশে মুখ লুকাইল; রাখাল-ছোঁড়া খবর করিয়া গিয়াছে! মরণ তাহার!

দেবু বলিল—বাড়ী গিয়ে বসেছি আর মহাগ্রামের ঠাকুর মশায় হঠাৎ এলেন। কি করি? এই তাঁকে এগিয়ে দিয়ে আসছি।

—মহাগ্রামের ঠাকুর মশায়?

দূর্গার বিস্ময়ের আর অবধি রহিল না। মহাগ্রামের ঠাকুর মশায়! মহামহোপাধ্যায় শিবশেখর ন্যায়রত্ন! সাক্ষাৎ দেবতার মত মানুষ! রাজার বাড়ীতেও যিনি পদার্পণ করেন না, তিনি?

ন্যায়রত্ন দেবুর বাড়ীতে আসিয়াছিলেন। ইহাতে দেবুর নিজেরও বিস্ময়ের সীমা ছিল না। নিতান্ত অতর্কিত ভাবে যেন তিনি আসিয়া উপস্থিত হইয়াছিলেন। ব্যাপারটা ঘটিয়াছিল এইভাবে।

যতীনের ওখান হইতে আসিয়া সে ঘরে বসিয়া দূর্গার কথাই ভাবিতেছিল। ভাবিতেছিল, দূর্গা বিচিত্র, দূর্গা মহৎ, দূর্গা অতুলনীয়! বিলু সমস্ত শুনিয়া দূর্গার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হইয়া দূর্গার কথাই বলিতেছিল। বলিতেছিল—গল্পের সেই লক্ষহীরে বেতীর মত দেখো তুমি, সাত জন্ম পরে এর শাপমোচন হবে, যাকে কামনা করে মরবে সে-ই এর স্বামী হবে।

ঠিক সেই সময়েই বাহির দরজায় কে ডাকিল—মণ্ডল মশায় বাড়ী আছেন?

কণ্ঠস্বর শুনিয়া দেবু ঠাহর করিতে পারিল না—কে? কিন্তু সে কণ্ঠস্বর সম্ভ্রমপূর্ণ। সে সবিস্ময়ে প্রশ্ন করিল—কে? —বলিয়া সঙ্গে সঙ্গেই বাহির হইয়া আসিল।

—আমি। আলো হাতে একটি লোকের পিছন হইতে বক্তা উত্তর দিলেন—আমি বিশ্বনাথের পিতামহ।

দেবু সবিস্ময়ে সম্ভ্রমে হতবাক হইয়া গেল। তাহার সর্বাঙ্গে কাঁটা দিয়া উঠিল। বিশ্বনাথের পিতামহ পণ্ডিত মহামহোপাধ্যায় শিবশেখর ন্যায়রত্ন! তাহার শরীর থরথর করিয়া কাঁপিয়া উঠিল। পরক্ষণেই আপনাকে সংযত করিয়া সেই পথের ধূলোর উপরেই সে ন্যায়রত্নের পায়ে প্রণত হইল।

—তোমাকে আশীর্বাদ করতেই এসেছি। কল্যাণ হোক, ধর্ম যেন তোমাকে কোনকালে পরিত্যাগ না করেন। জয়ত্ব। তোমার জয় হোক!

বসিয়া তাহার মাথার উপর হাত রাখিলেন। বলিলেন—ঘরটা খোল তোমার, একটু বসব।

দেবুর এতক্ষণে খেয়াল হইল। সে তাড়াতাড়ি ঘর খুলিয়া দিল; দরজার আড়ালে দাঁড়াইয়া বিলু সব দেখিয়াছিল, শুনিয়াছিল। সে ভিতরের দিক হইতে বাহিরের ঘরে আসিয়া পাতিয়া দিল তাহার ঘরের সর্বোত্তম আসনখানি। তারপর একটি ঘটি হাতে আসিয়া দাঁড়াইল।

ন্যায়রত্ন বলিলেন—পা ধুইয়ে দেবে মা? প্রয়োজন ছিল না।

বিলু দাঁড়াইয়া রহিল। ন্যায়রত্ন এবার পা বাড়াইয়া দিয়া বলিলেন—দাও।

বিলু পা ধুইয়া দিয়া সযত্নে একখানি পুরাতন রেশমী কাপড় দিয়া পা মুছিয়া দিল।

আসন গ্রহণ করিয়া ন্যায়রত্ন বলিলেন—তোমার ছেলেকে আন মণ্ডল। তাকে আমি আশীর্বাদ করব।

বিস্ময়ে যেন দেবুর চারিপাশে এক মোহজাল বিস্তার করিয়াছিল; কোন্ অজ্ঞাত পরমভাগ্যে তাহার কুটিরে এই রাত্রির অন্ধকারে অকস্মাৎ নামিয়া আসিয়াছেন স্বর্গের দেবতা, পরম কল্যাণের আশীর্বাদ-সম্ভার লইয়া আসিয়াছেন তাহার ঘর ভরিয়া দিতে!

বিলু ঘুমন্ত শিশুকে আনিয়া ন্যায়রত্নের পায়ের তলায় নামাইয়া দিল।

ন্যায়রত্ন শিশুটির দিকে চাহিয়া দেখিয়া সস্নেহে বলিলেন—বিশ্বনাথের খোকা এর চেয়ে ছোট। এই তো সবে অন্নপ্রাশন হ'ল, তার বয়স আট মাস।

তারপর ঘুমন্ত শিশুর মাথায় হাত দিয়া বলিলেন—দীর্ঘায়ু হোক, ভাগ্য প্রসন্ন হোক।

কথা শেষ করিয়া গায়ের চাদরের ভিতরের খুঁট খুলিয়া বাহির করিলেন—দুইগাছি বালা। হস্ত প্রসারিত করিয়া বলিলেন—ধর।

দেবু ও বিলু অবাক হইয়া গেল—এ বালা যে খোকারই বালা! আজই বন্ধক দেওয়া হইয়াছে!

—ধর। আমার কথা অমান্য করতে নেই। ধর মা, তুমি ধর।

বিলু হাত বাড়াইয়া গ্রহণ করিল—হাত তাহার কাঁপিতেছিল।

—ছেলেকে পরিয়ে দাও মা। আজ অশোক-ষষ্ঠীর দিন, অশোক আনন্দে সংসার তোমাদের পরিপূর্ণ হোক।

তারপর হাসিয়া বলিলেন—বিশ্বনাথের স্ত্রী, আমার নাত-বৌ শৈলজা। তিনি এসে আমায় সংবাদটা দিলেন। বাউড়ী-বায়েনদের গরু খোঁয়াড়ে দেওয়ার সংবাদ আমি পেয়েছিলাম। ভাবছিলাম—কাউকে পাঠিয়ে দি—গরুগুলি ছাড়িয়ে নিয়ে আসুক। গো-মাতা ভগবতী অনাহারে থাকবেন! আর ওই গরীবদের হয়তো যথাসর্বস্ব যাবে গরুর মাশুল দিতে। এমন সময় সংবাদ পেলাম—দেবু মণ্ডল গরুগুলি ছাড়িয়ে নিয়ে এসেছে। আশ্বস্ত হলাম। মনে মনে তোমাকে আশীর্বাদ করলাম। মনে হ'ল—বাঁচব, আমরা বাঁচব। মনে হ'ল সেই গল্পের কথা। সঙ্কল্প করলাম—একদিন তোমাকে ডাকব, আশীর্বাদ করব। সন্ধ্যার পর বিশ্বনাথের স্ত্রী এসে বললে—দাদু, শিবকালীপুরের পণ্ডিতের কাজ দেখুন তো! ষষ্ঠীর দিন—আজ সে ছেলের হাতের বালা বন্ধক দিয়েছে আমাদের চাটুজ্যেদের গিন্নীর কাছে। গিন্নী আমায় দেখিয়ে বললে—দেখ তো নাত-বৌ, পনের টাকায় ভাল হয় নাই? আমার মনটা আবার ভরে উঠল, মণ্ডল মশায়, অপার আনন্দে। মনে মনে বার বার তোমাকে আশীর্বাদ করলাম। তবু মন খুঁতখুঁত্ করতে লাগল। ষষ্ঠীর দিন, শিশুর অলঙ্কার, অলঙ্কারের জন্য শিশু হয়তো কেঁদেছে। আমি তৎক্ষণাৎ নিয়ে এলাম ছাড়িয়ে। কারও হাত দিয়ে পাঠিয়ে দিতে প্রবৃত্তি হ'ল না। নিজেই এলাম। তোমাকে আশীর্বাদ করতে এলাম। তোমার কল্যাণ হোক। ধর্মকে তুমি বন্দী করে রাখ কর্মের বন্ধনে। তুমি দীর্ঘজীবী হও; তোমার জয় হোক। দাও মা, বালা পরিয়ে দাও ছেলেকে। মণ্ডল, টাকা যখন তোমার হবে, আমায় দিয়ে এস; তোমার পুণ্য, তোমার ধর্মকে আমি ক্ষুণ্ন করতে চাই না।

টপ টপ করিয়া দেবুর চোখ হইতে জল ঝরিয়া পড়িল। বিলুর চোখ হইতে ধারা বহিতেছিল। সে বালা দুইগাছি ছেলেকে পরাইয়া দিল।

ন্যায়রত্ন বলিলেন—কেঁদো না, একটা গল্প বলি, শোন।

এমন সময় যতীন আসিয়া ডাকিল—দেবুবাবু।

—যতীনবাবু আসুন—আসুন!

ন্যায়রত্ন হাসিয়া প্রশ্ন করিলেন—ইনি?

দেবু যতীনের সঙ্গে পরিচয় করাইয়া দিল। যতীন কয়েক মুহূর্ত ন্যায়রত্নকে দেখিল। তারপর তাঁহাকে প্রণাম করিয়া বলিল—আপনার নাতি বিশ্বনাথবাবুকে আমি চিনি।

ন্যায়রত্ন প্রথমে নমস্কার করিয়া, পরে যতীনকে আশীর্বাদ করিলেন। তারপর প্রশ্ন করিলেন—চেনেন তাকে? আপনাদের সঙ্গে সে বুঝি সমগোত্রীয়?

ঐ প্রশ্নে যতীন প্রথমে একটু বিস্মিত হইল। তারপর অর্থটা বুঝিয়া হাসিয়া বলিল—গোত্র এক, গোষ্ঠী ভিন্ন।

ন্যায়রত্ন চুপ করিয়া রহিলেন, কোন উত্তর দিলেন না।

যতীন বলিল—তারা নাপিত আমার সংবাদ দিলে, আমি ছুটে এলাম। আপনাকে দেখব বলে।

—দেখবার বস্তু আর কিছু নাই—দেশেও নাই—মানুষেও নাই। প্রকাণ্ড সৌধ, বটবৃক্ষ বজ্রে ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। চোখেই তো দেখছেন। —তারপর হাসিয়া বলিলেন—তাই মধ্যে মধ্যে যখন দুর্যোগে বজ্রাঘাতের আঘাতকে প্রতিহত করতে দেখি সেই সৌধের কোন অংশকে, তখন আনন্দ হয়। আজ মণ্ডল আমাকে সেই আনন্দ দিয়েছে।

দেবু কথাটা পরিবর্তন করিবার জন্য বলিল—আপনি একটা গল্প বলবেন বলছিলেন।

—গল্প। হ্যাঁ বলি শোন—

“এক ব্রাহ্মণ ছিলেন, মহাকর্মি, মহাপুণ্যবান। জ্যোতির্ময় ললাট, সৌভাগ্য-লক্ষ্মী স্বয়ং ললাট মধ্যে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাঁর প্রতিটি কর্ম ছিল মহৎ এবং প্রতি কর্মেই ছিল সাফল্য; কারণ যশোলক্ষ্মী আশ্রয় নিয়েছিলেন তাঁর কর্মশক্তিতে। তাঁর কুল ছিল অকলঙ্ক, পত্নী-পুত্র কন্যা-বধূর গৌরবে অকলঙ্ক কুল উজ্জ্বলতর হয়ে উঠেছিল—কারণ, কুললক্ষ্মী তাঁর কুলকে আশ্রয় করেছিলেন। পাপ অহোরহ ঈর্ষাতুর অন্তরে ব্রাহ্মণের বাসভূমির চারিদিকে অস্থির হয়ে ঘুরে বেড়ায়। তার সহ্য হয় না। বহু চিন্তা করে সে একদিন সঙ্গে করে আনল অলক্ষ্মীকে। বাড়ীর বাইরে থেকে ব্রাহ্মণকে ডাকলে।

ব্রাহ্মণ বললেন—কি চাও বল?

পাপ বলিল—আমি বড় দুর্ভাগা। দুঃখ-কষ্টের সীমা নাই। আমার সঙ্গিনীটিকে আপনি কিছুদিনের জন্য আশ্রয় দিন—এই আমার প্রার্থনা।

ব্রাহ্মণ বললেন—আমি গৃহস্থ; আশ্রয়প্রার্থী দুঃস্থকে আশ্রয় দেওয়া আমার ধর্ম! বেশ, থাকুন উনি। বধু-কন্যার মতই যত্ন করব। ইচ্ছা হলে যতদিন দুর্ভাগ্যের শেষ না হয়, ততদিন তুমিও থাকতে পার। এস, তুমি এস।

আহ্বান সত্ত্বেও পাপ কিছু পুরপ্রবেশ করতে সাহস করল না। কারণ ব্রাহ্মণকে আশ্রয় করে রয়েছেন ধর্ম।

যাক অলক্ষ্মীকে আশ্রয় দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিপর্যয় ঘটল। ফলবান বৃক্ষগুলির ফল যেন নীরস হয়ে গেল, ফুল ম্লান হল।

রাত্রে ব্রাহ্মণ জপ করছেন—এমন সময় শুনতে পেলেন এক করুণ কান্না। কেউ যেন করুণ সুরে কাঁদছে। বিস্মিত হয়ে জপ শেষ করে উঠতেই তিনি দেখলেন—তাঁরই ললাট থেকে বেরিয়ে এল এক জ্যোতি, সেই জ্যোতি ক্রমে এক নারীমূর্তি ধারণ করলে। তিনিই এতক্ষণ কাঁদছিলেন।

ব্রাহ্মণ প্রশ্ন করলেন—কে মা তুমি?

রমণী-মূর্তি বললে—আমি তোমার সৌভাগ্য-লক্ষ্মী। এতদিন তোমার ললাটে আশ্রয় ছিলাম, তোমায় ছেড়ে যেতে হচ্ছে, তাই কাঁদছি।

ব্রাহ্মণ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন—একটা প্রশ্ন করব, মা? আমার অপরাধ কি হল?

—তুমি আজ অলক্ষ্মীকে আশ্রয় দিয়েছ। ওই মেয়েটি অলক্ষ্মী। অলক্ষ্মী এবং আমি তো একসঙ্গে বাস করতে পারি না।

ব্রাহ্মণ একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন। সৌভাগ্য-লক্ষ্মীকে প্রণাম করলেন, কিন্তু কোন কথা বললেন না। তিনি চলে গেলেন।

পরদিন সকালে দেখলেন বৃক্ষের ফল খসে গেছে, ফুল শুকিয়ে গেছে। সরোবর হয়েছে ছিদ্রময়ী, জল ছিদ্রপথে অদৃশ্য হয়েছে। ভূমি হয়েছে শস্যহীনা, গাভী হয়েছে দুগ্ধহীনা। গৃহ হয়েছে শ্রীহীন।

রাত্রে আবার সেই রকম কান্না। আবার দেহ থেকে বেরিয়ে এলেন এক দিব্যাঙ্গনা। তিনি বললেন—আমি তোমার যশোলক্ষ্মী। অলক্ষ্মীকে তুমি আশ্রয় দিয়েছ, ভাগ্যলক্ষ্মী তোমাকে পরিত্যাগ করেছেন, সুতরাং আমিও তোমাকে পরিত্যাগ করে যাচ্ছি।

ব্রাহ্মণ নীরবে তাঁকে প্রণাম করলেন। তিনিও চলে গেলেন।

পরদিন তিনি শুনলেন—লোকে তাঁর অপযশ ঘোষণা করছে—ব্রাহ্মণ লম্পট, ওই যে মেয়েটিকে আশ্রয় দিয়েছে—তার দিকে তার কু-দৃষ্টি পড়েছে। তিনি প্রতিবাদ করলেন না।

সেদিন রাত্রে আর এক নারী-মূর্তি তাঁর দেহ থেকে বেরিয়ে এলেন। তিনি তাঁর কুল-লক্ষ্মী। বললেন—অলক্ষ্মী এসেছে, ভাগ্যলক্ষ্মী চলে গেছেন, যশোলক্ষ্মী চলে গেছেন, লোকে তোমার কলঙ্ক রটনা করছে; আমি কুললক্ষ্মী, আর কেমন করে থাকি তোমাকে আশ্রয় করে? তিনিও চলে গেলেন।

পরদিন ব্রাহ্মণের দেহ থেকে বেরিয়ে এলেন আর এক মূর্তি। নারী নয়—পুরুষ-মূর্তি। দিব্য ভীমকান্তি, জ্যোতির্ময় পুরুষ।

ব্রাহ্মণ জিজ্ঞাসা করলেন—আপনি কে?

দিব্যকান্তি পুরুষ বললেন—আমি ধর্ম!

—ধর্ম? আপনি আমাকে পরিত্যাগ করছেন কোন্ অপরাধে?

—অলক্ষ্মীকে আশ্রয় দিয়েছ তুমি।

—সে কি আমি অধর্ম করেছি?

ধর্ম চিন্তা করে বললেন—না!

—ভাগ্যলক্ষ্মী তোমায় ত্যাগ করেছেন।

—আশ্রয়প্রার্থী বিপদগ্রস্তকে আশ্রয় দেওয়া যখন অধর্ম নয়, তখন আমার অধর্মের জন্য তিনি আমায় পরিত্যাগ করেন নি। পরিত্যাগ করেছেন অলক্ষ্মীর সংস্পর্শ সইতে না পেরে।

—ভাগ্যলক্ষ্মীকে অনুসরণ করেছেন যশোলক্ষ্মী, তাঁর পেছনে গেছেন কুললক্ষ্মী, আমি প্রতিবাদ করি নি। কারণ ওই তাঁদের পন্থা। একের পিছনে এক আসেন, যাবার সময় একের পিছনে পরে যান। কিন্তু আপনি আমাকে পরিত্যাগ করবেন কোন্ অপরাধে?

ধর্ম স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।

ব্রাহ্মণ বললেন—আপনাকে আমি যেতে দিতে পারি না; কারণ আপনাকে অবলম্বন করেই আমি বেঁচে রয়েছি। আপনাকে আমি যেতে না বললে—আপনার যাবার অধিকার নাই। আমিই আপনার অস্তিত্ব।

ধর্ম স্তম্ভিত হয়ে গেলেন, নিজের ভ্রম বুঝলেন। তারপর ব্রাহ্মণকে বললেন—তথাস্তু, তোমার জয় হোক। —বলে তিনি আবার ব্রাহ্মণের দেহে প্রবিষ্ট হলেন।”

ন্যায়রত্নের গল্প বলার ভঙ্গি অতি চমৎকার। প্রথম জীবনে তিনি নিয়মিত ভাগবত কথকতা করিতেন। তাঁহার বর্ণনায়, স্বর-মাধুর্যে, ভঙ্গিতে একটি মোহজালের সৃষ্টি করিয়াছিল। তিনি স্তব্ধ হইলেন।

কিছুক্ষণ পর যতীন বলিল—তারপর?

—তারপর? —ন্যায়রত্ন হাসিলেন, বলিলেন—

—তারপর সংক্ষিপ্ত কথা। ধর্মের প্রভাবে সেইদিন রাত্রে উঠিল আবার এক ক্রন্দনধ্বনি। ব্রাহ্মণ দেখলেন সেই অলক্ষ্মী মেয়েটি এসে বলছে—আমি যাচ্ছি। আমি চললাম।

ব্রাহ্মণ বললেন—তুমি স্বেচ্ছায় বিদায় চাও?

—স্বেচ্ছায়। স্বেচ্ছায় যাচ্ছি। সে মিলিয়ে গেল।

সেইদিন রাত্রেই ফিরলেন—ভাগ্যলক্ষ্মী ফিরলেন। তারপর যশোলক্ষ্মী, তারপর কুললক্ষ্মী।

যতীন বলিল—চমৎকার কথা। লক্ষ্মীই দেয় যশ—সেই পবিত্র করে কুল। তাই তাকে নিয়ে এত কাড়াকাড়ি। লক্ষ্মীই সব।

—না, ন্যায়রত্ন বলিলেন—না, ধর্ম। মণ্ডল, সেই ধর্মকে তুমি অবলম্বন করেছ বলেই আজ আশা হচ্ছে। সেই আনন্দেই আমি ছুটে এসেছি। আচ্ছা, আমি চলি আজ, মঙ্গল হোক।

ঠিক এই সময়ে সংবাদ আসিল—দূর্গাকে সাপে কামড়াইয়াছে। রাখাল-ছোঁড়াটা বলিল—ভাল আছে। উঠে বসেছে।

দেবু ন্যায়রত্নকে আগাইয়া দিতে বাহির হইল। পথে যতীন বিদায় লইয়া আপন দাওয়ায় উঠিয়া তক্তপোশের উপর স্তব্ধ হইয়া বসিল।

যতীনের মনের অবস্থা বিচিত্র। পল্লীগ্রামের কোন্ নিভৃত কোণে বাস করে ওই বৃদ্ধ—তার চারিপাশে এই ধ্বংসোন্মুখ পারিপার্শ্বিক অজ্ঞান-অশিক্ষা-দারিদ্র্য, হীনতায় জীর্ণ। কঠিন জীবন-সংগ্রাম এখানে নিপুণ সরীসৃপের সুকঠিন বেষ্টনীর মত শ্বাসরোধ করিয়া ক্রমশঃ চাপিয়া ধরিতেছে। ইহারই মধ্যে কেমন করিয়া প্রশান্ত অবিচলিতচিত্ত সৌম্যদর্শন বৃদ্ধ স্বচ্ছ ঊর্ধ্বগ দৃষ্টি মেলিয়া পরমানন্দে বসিয়া আছেন। অসীম জ্ঞানভাণ্ডার লইয়া বসিয়া আছেন লবণাক্ত সমুদ্রতলে মুক্তাগর্ভ শুক্তির মত।

এই মুহূর্তে ইহা এক পরমাশ্চর্যের মত মনে হইল।

দণ্ডে দণ্ডে প্রহরের পর প্রহর অতিক্রম করিয়া রাত্রি ঘন গাঢ় হইয়া আসিতেছিল। দ্বিতীয় প্রহরের শেয়াল, পেঁচা ডাকিয়া গিয়াছে। কোন একটা গাছে বসিয়া একটা পেঁচা এখনও মধ্যে মধ্যে ডাকিতেছে। এ ডাক অন্য রকমের ডাক—প্রহর ঘোষণার ডাকের সহিত কোন মিল নাই। প্রহরের ডাকের মধ্যে স্পষ্ট একটি ঘোষণার সুর আছে। গাছের কোটরের মধ্যে থাকিয়া অপরিণত কণ্ঠে চাপা শিসের শব্দের মত করিয়া অবিরাম একঘেয়ে ডাকিয়া চলিয়াছে উহাদের শাবকের দল। বনেজঙ্গলে পথেঘাটে ঘরে, চারিদিকে, আশেপাশে অবিরাম ধ্বনি উঠিতেছে—অসংখ্য কোটি পতঙ্গের সকরুণ ঝঙ্কার। অন্ধকার শূন্যপথে কালো ডানা সশব্দে আস্ফালন করিয়া উড়িয়া চলিয়াছে বাদুড়ের দল—একটার পর একটা, তারপর একসঙ্গে তিনটা, আবার একটা।

সেদিন বৃষ্টির পর আকাশ এখনও স্বচ্ছ, উজ্জল নীল। তারাগুলি পূর্ণদীপ্তিতে দীপ্যমান। চৈত্র মাসের বাতাস ঝির ঝির করিয়া বহিতেছে। সে বাতাসের সর্বাঙ্গ ভরিয়া ফুলের গন্ধের অদৃশ্য অরূপ সম্ভার। শেষ প্রহরে বাতাস হিমের আমেজে ক্রমশঃ ঘন হইতে ঘনতর হইয়া উঠিতেছে।

বৃদ্ধকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করিতে ভুল হইয়া গিয়াছে। গল্পটি তাহার বড় ভাল লাগিয়াছে। ঐ বৃদ্ধ এবং ঐ গল্পের মধ্যে সে আজ পল্লীর জীবন মন্ত্রের আভাস পাইয়াছে। যুগ যুগ ধরিয়া ওই বৃদ্ধেরাই তাহাদের ঐ গল্প শুনাইয়া আসিতেছে। গল্পটি সত্যই ভাল—ভাল শুধু নয়—সত্য বলিয়াই তাহার মনে হইয়াছে। শুধু এক জায়গায় খটকা লাগিয়াছে। অলক্ষ্মীর আগমনে সৌভাগ্য-লক্ষ্মীর অন্তর্ধান—কথাটি মৌলিক সত্য কথা। ভাগ্যলক্ষ্মীর অভাবে কর্মশক্তি পঙ্গু হয়, যশোলক্ষ্মী চলিয়া যান। লক্ষ্মীহীন হৃতকর্মশক্তি মানুষের কুলগৌরব ক্ষুণ্ণ করে। উচ্চিংড়ের মা চলিয়া গিয়াছে সেটেলমেন্ট ক্যাম্পের পিওনের সঙ্গে! কিন্তু ধর্ম বলিতে বৃদ্ধ কি বুঝাইতেছেন, ঐ প্রশ্নটা তাঁহাকে করা হয় নাই। অনেক চিন্তা করিয়াও সে এমন কোন উত্তর খুঁজিয়া বাহির করিতে পারিল না—যাহার সহিত পৃথিবীর নব-উপলব্ধ সত্যের একটি সমন্বয় হয়। সে ক্লান্ত হইয়া শূন্য-মস্তিষ্কে রাত্রির পল্লীর দিকে চাহিয়া রহিল।

প্রগাঢ় দুর্নিরীক্ষ্য অন্ধকারের মধ্যে পল্লীটা যেন হারাইয়া গিয়াছে। অনুমানে নির্দেশ করা যায় সামনেই পথের ওপারে সেই ডোবাটা। সমস্ত রাত্রির মধ্যে সন্ধ্যের সময় ঘাটটিতে একবার কেরোসিন ডিবি দেখা যায়, দু’টি মেয়ে ডিবি হাতে বাসন ধুইয়া লইয়া যায়। ডিবির আলোয় তাহাদের মুখ বেশ স্পষ্ট দেখিতে পায় যতীন। ঘাট হইতে উঠিয়াই তাহারা বাড়ীতে ঢুকিয়া কপাট দেয়। পল্লীটার অধিকাংশ ঘরেই সেই সন্ধ্যাতেই খিল পড়ে। শ্রীহরি ঘোষ এবং জগন ডাক্তার বা তাহার নিজের এখানে ছোটখাটো একটা করিয়া দুটি বিরোধী দল আসর জমানোর পরেও জাগিয়া থাকে। কিন্তু সেই বা কতক্ষণ? দশটা বাজিতে না বাজিতে পল্লীটা নিস্তব্ধ হইয়া যায়।

যতীন একবার ভাল করিয়া গ্রামখানার দিকে চাহিয়া দেখিল। প্রগাঢ় অন্ধকারে সুষুপ্ত নিথর পল্লীটার ভঙ্গির মধ্যে নিতান্ত অসহায় শিশুর আত্মসমর্পণের ভঙ্গি যেন সুপরিস্ফুট হইয়া উঠিয়াছে।

সহসা তাহার মনে পড়িয়া গেল—তাহার জন্মস্থান—মহানগরী কলিকাতাকে। মহানগরী কলিকাতা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নগরী সমূহের অন্যতম। কলিকাতাকে সে বড় ভালবাসে। দিনের আলো, রাত্রির অন্ধকারের প্রভাব সেখানে কতটুকু? দিনেও সেখানে আলো জ্বলে। রাত্রে পথের পাশে-পাশে আলোয় আলোয় আলোময়। মানুষের সভ্যতার দীপ্তচক্ষুর সম্মুখে রাত্রির অন্ধকার, মহানগরীর দ্বারদেশে অবশ তনুর মত অসহায় দৃষ্টিতে চাহিয়া দাড়াইয়া থাকে। মোড়ে মোড়ে বিটের প্রহরী জাগ্রত চক্ষে দাড়াইয়া ঘোষণা করে—সে জাগিয়া আছে। গবেষণাগারে বৈজ্ঞানিক তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চাহিয়া আছে তাহার গবেষণার বস্তুর দিকে। গতিশীল দণ্ড স্পর্শ করিয়া দাঁড়াইয়া আছে যন্ত্রী; যন্ত্র চলিতেছে—উৎপাদন চলিতেছে অবিরাম। জল আলোড়িত করিয়া জাহাজ চলিয়াছে, পোর্ট কমিশনারের লাইনের উপর ট্রেন চলিয়াছে; সাইডিংয়ে শান্টিং হইতেছে। পথে গর্জন করিয়া মোটর চলিয়াছে। মধ্যে মধ্যে রোমাঞ্চক আবেশ জাগাইয়া ধ্বনিত হইয়া উঠিতেছে অশ্বক্ষুরধ্বনি। মহানগরী চলিয়াছেই—চলিয়াছেই—দিনে রাতে, গতির তাহার বিরাম নাই। আসা-যাওয়ায়, ভাঙা-গড়ায়, হাসি-কান্নায় নিত্য তাহার নব নব রূপের অভিনব অভিব্যক্তি। তারও একটা অন্ধকার দিক আছে। কিন্তু সে থাক।

পল্লীর কিন্তু সেই একই রূপ। অদ্ভুত পল্লীগ্রাম। বিশেষ এদেশের পল্লীগ্রাম। সমাজগঠনের আদিকাল হইতে ঠিক একই স্থানে অনন্ত-পরমায়ু পুরুষের মত বসিয়া আছে। ইণ্ডিয়ান ইকনমিক্স-এর একটা কথা তাহার মনে পড়িয়া গেল, Sir Charles Metcalfe বলিয়া গিয়াছেন—

"They seem to last where nothing else lasts... অদ্ভুত! Dynasty after dynasty tumbles down, revolution succeeds revolution! Hindu, Pathan, Mogul, Mahratta, Sikh, English are masters in turn, but the village community remains the same."

সে কি কোনদিন নড়িবে না? বিংশ শতাব্দীর পৃথিবীতে বিরাট পরিবর্তন শুরু হইয়াছে। সর্বত্র নববিধানের সাড়া উঠিয়াছে। এ দেশের পল্লীতে কি জীর্ণ স্থবির পুরাতনের পরিবর্তন হইবে না!

বিপ্লবী তরুণ, তাহার কল্পনার চোখে অনাগত কালের নূতনত্বের স্বপ্ন। সে একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিল। বৃদ্ধ বলিয়া গেলেন—প্রকাণ্ড সৌধ বটবৃক্ষের শিকড়ের চাপে ফাটিয়া গিয়াছে!

সে সেই ভাঙনের মুখে আঘাত করিতে বদ্ধপরিকর। সেই ধর্মে সে যেখানে ক্ষুত দেখে, সেইখানেই সে দ্বন্দ্বকে উৎসাহিত করিয়া তোলে!

বাড়ীর ভিতর হইতে দরজার আঘাতের শব্দ হইল।

যতীন জিজ্ঞাসা করিল—মা-মণি?

পদ্ম তিরস্কার করিয়া বলিল—তুমি কি আজ শোবে না? অসুখ-বিসুখ একটা না করে ছাড়বে না দেখ!

—যাচ্ছি।—যতীন হাসিল।

—যাচ্ছি নয়, এখুনি শোবে এস। আমি বরং বাতাস করে ঘুম পাড়িয়ে দি। এস! এস বলছি।

—তুমি গিয়ে শোও। আমি এক্ষনি শোব।

—আঃ! তুমি এখুনি এস। এস। মাথা খুঁড়ব বলে দিচ্ছি।

যতীন ঘরের ভিতর না গিয়া পারিল না। কিন্তু তাহাতেও নিষ্কৃতি নাই, পদ্ম বলিল—এদিকের দরজা খুলে দাও। বাতাস করি।

—দরকার নেই।

—না, দরকার আছে।

যতীন দরজা খুলিয়া দিল। পদ্ম যতীনের শিয়রে পাখা লইয়া বসিল। বলিল—একজন বেরিয়েছে দুগ্‌গাকে সাপে কামড়েছে বলে—এখনও ফিরল না। তুমি—

—অনিরুদ্ধবাবু এখনও ফেরেন নাই?

—না! দাঁড়াও। দুগ্‌গা মরুক আগে—তারপর ফিরবে চোখের জলে ভাসতে ভাসতে। দুনিয়ায় এত লোকে মরে—ওই হারামজাদী মরে না!

যতীন শিহরিয়া উঠিল। পদ্মের কণ্ঠস্বরে ভাষায় সে কী কঠিন আক্রোশ! দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া সে চোখ বন্ধ করিল। কিছুক্ষণ পরই তাহার কানে একটা দূরাগত বিপুল শব্দ যেন জাগিয়া উঠিল। দ্রুততম গতিতে শব্দটা আগাইয়া আসিতেছে। ঘরে-দুয়ারে একটা কম্পন জাগিয়া উঠিতেছে। সে উঠিয়া বসিয়া বলিল—ভূমিকম্প!

হাসিয়া পদ্ম বলিল—কি ছেলে মা! যেন দেয়ালা করছে! ও ভূমিকম্প নয়, ডাকগাড়ী যাচ্ছে। শোও দেখি এখন।

—ডাকগাড়ী? মেল ট্রেন?

—ঘুমোও।

সেই মুহূর্তেই তীব্র হুইসিলের শব্দ করিয়া ট্রেন উঠিল ময়ূরাক্ষীর পুলে,—ঝমঝম শব্দে চারি দিক পরিপূর্ণ হইয়া গেল। ঘর-দুয়ার থর-থর করিয়া কাঁপিতেছে। জংশন-স্টেশনে আলো জ্বলিতেছে। সেখানকার কলে রাত্রেও কাজ চলে। ময়ূরাক্ষীর ওপারেই জংশন! যতীন অকস্মাৎ যেন আশার আলো দেখিতে পাইল। পল্লী কাঁপিতেছে।

কিছুক্ষণ পরে পাখা রাখিয়া পদ্ম সন্তর্পণে ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল।

যাক, ঘুমাইয়াছে। উপরে মশারী ভাল করিয়া গুজিয়া দিয়া আসা হয় নাই, উচ্চিংড়েটাকে হয়তো মশায় ছিড়িয়া ফেলিল!

যতীনের ঘর হইতে বাহির হইয়া সে আশ্চর্য হইয়া গেল। উপর হইতে কখন নামিয়া আসিয়াছে উচ্চিংড়ে। আপন মনেই এই তিন প্রহর রাত্রে উঠানে বসিয়া একা-একাই কড়ি খেলিতেছে।

শেষরাত্রে ঘুমাইয়া যতীনের ঘুম ভাঙিতে দেরি হইয়াছিল। তাহাকে তুলিল পদ্ম।—ওঠ ছেলে! ওঠ!

উঠিয়া বসিয়া যতীন বলিল—অনেক বেলা হয়ে গেছে, না?

—ওদিকে যে সর্বনাশ হয়ে গেল।

—সর্বনাশ হয়ে গেল?

—ছিরু পাল লেঠেল নিয়ে এসে গাছ কাটছে। সব ছুটে গেল, দাঙ্গা হবে হয়তো।

—কে ছুটে গেল, অনিরুদ্ধবাবু?

—সব—সব। পণ্ডিত, জগন ডাক্তার, ঘোষাল—বিস্তর লোক।

যতীন খুশী হইয়া উঠিল। বলিল—বেশ কড়া করে চা কর দেখি মা-মণি।

—তুমি কিন্তু নাচতে নাচতে যেয়ো না যেন।

—তবে আমায় ডাকলে কেন?

পদ্ম কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া বলিল—জানি না—

সত্যই সে খুঁজিয়া পাইল না কেন সে যতীনকে ডাকিল!

—মুখ হাত ধোও। আমি চা করছি।

—উচ্চিংড়ে কই?

—সে ‘বানের আগে কুটো’—সে ছুটে গিয়েছে দেখতে।

গত কল্যকার অপমানের শোধ লইয়াছে শ্রীহরি। বাউড়ী-বায়েনের কাছে মাথা হেঁট হইয়াছে। শুধু অপমান নয়—তাহার মতে, এটা গ্রামের শৃঙ্খলা ভাঙিবার একটা অপচেষ্টা। তাহার উপর দুর্গা তাহাদিগকে যেভাবে ঠকাইল সে-সত্যটা ঘন্টা দুয়েক পরেই মনে মনে বুঝিয়া ও জানিতে পারিয়া সে ক্ষিপ্ত হইয়া উঠিয়াছিল। এবং যাহারা ইহার সঙ্গে জড়াইয়া আছে তাহাদের শাস্তি দিবার ব্যবস্থা সে কাল সেই গভীর রাত্রেই করিয়া রাখিয়াছে।

কালু শেখ মারফৎ লাঠিয়ালের ব্যবস্থা করিয়া আজ সকালে সে জমিদারের গোমস্তা হিসাবে দেবু, জগন, হরেন ও অনিরুদ্ধের গাছ কাটিবার ব্যবস্থা করিয়াছে। গাছগুলি জমিদারের পতিত ভূমির উপর আছে। পূর্বকালে চাষী প্রজারা এমনই ভাবে গাছ লাগাইত, ভোগ-দখল করিত, জমিদার আপত্তি করিত না। প্রয়োজন হইলে, প্রজাকে দুইটা মিষ্ট কথা বলিয়া জমিদার ফলও পাড়িত, ডালও কাটিত। কিন্তু এমনভাবে সমূলে উচ্ছেদ কখনও করিত না। করিলে বহু পূর্বকালে—একশো বছর পূর্বে জমিদার-প্রজার দাঙ্গা বাধিত। পঞ্চাশ বৎসর পরে সে-যুগ পাল্টাইয়াছিল। তখন প্রজা জমিদারের হাতে-পায়ে ধরিত, ঘরে বসিয়া গাছের মমতায় কাঁদিত। অকস্মাৎ আজ দেখা গেল, আবার তাহারা ছুটিয়া বাহির হইতেছে।

যতীন ব্যগ্র হইয়া উঠিতেছিল—সংবাদের জন্য। শেষ পর্যন্ত খুনখারাপি হইয়া গেলে যে একটা অত্যন্ত শোচনীয় ব্যাপার হইবে। উদ্বিগ্নভাবে সে ভাবিতেছিল—তাহার যাওয়া কি উচিত হইবে? তাহাকে এই ব্যাপারে কোনমতে জড়াইতে পারিলে সমগ্র ঘটনার রূপ পাল্টাইয়া যাইবে।

পদ্ম ইহারই মধ্যে তিনবার উঁকি মারিয়া দেখিয়া গিয়াছে—সে ঘরে আছে কিনা। যতীন শেষবারে বলিল—আমি যাই নি মা-মণি। আছি।

—তোমাকে বিশ্বাস নাই। সাংঘাতিক ছেলে তুমি।

যতীন হাসিল।

—হেসো না তুমি, হ্যাঁ।—কথা বলিতে বলিতে পদ্ম পথের দিকে চাহিয়া বলিল—ওই! ওই নেলো আসছে। দাও পয়সা দাও।

সেই চিত্রকর ছেলেটি—বৈরাগীদের নেলো আসিতেছে। পয়সার প্রয়োজন হইলেই নেলো আসে। অন্যথায় সে আসে না। নিঃশব্দে আসে—চুপ করিয়া বসিয়া থাকে, প্রশ্ন না থাকিলে প্রয়োজন ব্যক্ত করিতে পারে না; কিন্তু উঠিয়া যায় না; বসিয়াই থাকে। প্রশ্ন করিলে সংক্ষেপে বলে পয়সা। দাবিও বেশী নয়, চার পয়সা হইতে চার আনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আজ কিন্তু নেলো একটু উত্তেজিত, মুখের গৌরবর্ণ রং রক্তাভ হইয়া উঠিয়াছে, চোখের তারা দুটি অস্থির। সে আসিয়া আজ বসিল না, দাড়াইয়া রহিল।

—কি নলিন? পয়সা চাই?

—পণ্ডিতের মাথা ফেটে গিয়েছে।

—কার? দেবুবাবুর?

—হ্যাঁ। আর কালীপুরের চৌধুরী মশায়ের।

—দ্বারকা চৌধুরী মশায়ের?

—হ্যাঁ। পণ্ডিতের আমগাছ কাটছিল, পণ্ডিত একেবারে কুডুলের সামনে গিয়ে দাড়াল।

—তারপর?

—লেঠেলদের সঙ্গে পণ্ডিতের ঠেলাঠেলি লেগে গেল। চৌধুরী মশায় গেল ছাড়াতে। তা লেঠেলরা দু-জনকেই ঠেলে ফেলে দিল।

—ফেলে দিলে?

—হ্যাঁ। গাছ কাটছিল, সেই কাটা শেকড়ে লেগে দু-জনকারই মাথা কেটে গেল।

—তারপর?

—খুব রক্ত পড়ছে। ধরাধরি করে ধরে নিয়ে আসছে।

—অন্য লোকেরা কি করছিল?

—সব দাড়িয়েছিল, কেউ এগোয় নাই। কর্মকার কেবল একজন লেঠেলকে এক লাঠি কষে পালিয়েছে।

—জগন ডাক্তার কোথায়?

—সে জংশনে গিয়েছে—পুলিসের কাছে।

যতীন ঘরে ঢুকিয়া লিখিতে বসিল; টেলিগ্রাম। একখানা ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে—একখানা এস-ডি-ওর কাছে। আর একখানা চিঠি—এ জেলার জেলা কংগ্রেস কমিটির কাছে। চিঠিখানা গোপনে পাঠাইতে হইবে।

টেলিগ্রাম করিতে ডাক্তারকে পাঠাইতে হইবে। কিন্তু এ পত্রখানা জগনের হাতে দেওয়া হইবে না। দেবু ভাল থাকিলেই তাহাকে সদরে পাঠানো সব চেয়ে যুক্তিযুক্ত হইত। সে একটু ভাবিয়া নেলোকে ডাকিয়া বলিল—একটা কাজ করতে পারবে?

নলিন ঘাড় নাড়িয়া সায় দিল—হ্যাঁ।

—একখানা চিঠি জংশনের ডাকঘরে ফেলতে হবে। একটা চার পয়সার টিকিট কিনে বসিয়ে দেবে। কেমন?

নলিন আবার সেই ঘাড় নাড়িয়া সায় দিল।

—কাউকে দেখিয়ো না যেন।

নলিনের আবার সেই নীরব স্বীকৃতি।

—এই চার পয়সার টিকিট কিনবে। আর এই চার পয়সায় তুমি জল খাবে।

নলিন চিঠিখানি কোমরে রাখিয়া তাহার উপর সযত্নে ভাঁজ করিয়া কাপড় বাঁধিয়া ফেলিল। আনি দুইটি বাঁধিল খুঁটে। তারপর ঘাড় হেঁট করিয়া যথাসাধ্য দ্রুতগতিতে চলিয়া গেল।

সমস্ত গ্রামখানা চঞ্চল হইয়া উঠিল।

জগন ডাক্তারের ডাক্তারখানায় দেবু ও চৌধুরীকে আনা হইয়াছিল; দেবু নিজে হাঁটিয়াই আসিয়াছে। তাহার আঘাত তেমন বেশী নহে, তাছাড়া তাহার জোয়ান বয়স—উত্তেজনাও যথেষ্ট হইয়াছিল, রক্তপাত বেশ খানিকটা হইলেও সে ভীত বা অবসন্ন হয় নাই। কিন্তু বৃদ্ধ চৌধুরী কাতর হইয়া পড়িয়াছে, আঘাতও তাহারই বেশী। প্রথমে চৌধুরী সংজ্ঞাহীন হইয়া পড়িয়াছিল, চেতনা হইলেও ধরাধরি করিয়া বহিয়া আনিতে হইয়াছে। চৌধুরী চোখ বুজিয়া শুইয়াই আছে। দেবু নীরবে বসিয়া আছে দেওয়ালে ঠেস দিয়া। ধুইয়া দেওয়ার পর রক্তাভ জলের ধারা কপাল বাহিয়া এখনও ঝরিতেছে। প্রায় সমস্ত গ্রামের লোকই জগনের ডাক্তারখানার সম্মুখে ভিড় করিয়া দাড়াইয়াছে।

টিঞ্চার আয়োডিন, তুলা, গরম জল—ব্যাণ্ডেজ লইয়া জগন ব্যস্ত। হরেন তাহাকে সাহায্য করিতেছে। মাঝে মাঝে হাঁকিতেছে—হট যাও! ভিড় ছাড়ো।

রাঙাদিদি একটা গাছতলায় বসিয়া কাঁদিতেছে। দুর্গা দাঁতে দাঁত টিপিয়া নিষ্পলক নেত্রে দাঁড়াইয়া আছে। এমন সময় ডাক্তারখানায় যতীন আসিয়া উঠিল।

জগন বলিল—গাছ সব আটকে দিয়েছি—পুলিস এসে নোটিশ জারি করে দিয়েছে। কোন পক্ষই গাছের কাছে যেতে পাবে না। আমি বারণ করে গেলাম, আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত কিছু করো না। কাটুক গাছ। ফিরে এসে দেখি—দেবু এই কাণ্ড করে বসে আছে। অনিরুদ্ধ একজনের পিঠে এক লাঠি কষে পালিয়েছে।

ভিড়ের ভিতর হইতে অনিরুদ্ধ আগাইয়া আসিয়া বলিল—অনিরুদ্ধ ঠিক আছে! সে মেয়ে নয়—মরদ। অনিরুদ্ধের হাতে তাহার টাঙি। সে বলিল—টাঙিটা তখন যে হাতের কাছে পেলাম না! নইলে হয়েই যেত এক কাণ্ড!

যতীন বলিল—সে-সব পরে যা হয় করবেন—এখন এঁদের তাড়াতাড়ি ব্যাণ্ডেজ করে ফেলুন।

বৃদ্ধ দ্বারকা চৌধুরী এতক্ষণে চোখ মেলিয়া মৃদু হাস্যের সহিত হাত জোড় করিয়া বলিল—প্রণাম।

যতীন প্রতি-নমস্কার করিল—নমস্কার। কেমন বোধ করছেন?

—ভাল।—মৃদু হাসিয়া বৃদ্ধ আবার বলিল—মনে করলাম মাঝে পড়ে মিটিয়ে দোব। দেবু গিয়ে কুডুলের সামনে দাঁড়াল। থাকতে পারলাম না চুপ করে।

সকলে চুপ করিয়া রহিল। এ-কথার কোন উত্তর দিবার ছিল না।

বৃদ্ধ বলিল—পণ্ডিত নমস্য ব্যক্তি। শুধু পণ্ডিতই নয়, বীরপুরুষ। বয়স হলেও চশমা আমার এখনও লাগে না, দেবতা। কুড়ুলের সামনে পণ্ডিত যখন গিয়ে দাঁড়াল—তখনকার সে মূর্তি পণ্ডিত নিজেও বোধ হয় কখনও আয়নায় দেখে নাই। বীরপুরুষ!

জগন বলিল—ওগুলো হল গোঁয়ার্তুমি। কি ফল হল? রাগ করো না ভাই দেবু।

হাসিয়া বৃদ্ধ বলিল—সবার গাছই কেটেছে। গাছ এখনও দেবুরই দাড়িয়ে আছে, ডাক্তার!

জগন হরেন ঘোষালকে একটা প্রচণ্ড ধমক দিয়ে উঠিল—কোন্ দিকে চেয়ে কাজ করছ ঘোষাল!

হরেন চমকিয়া উঠিল।

দেবু হাসিল। ডাক্তার বৃদ্ধের উপর চটিয়াছে। ঝালটা পড়িল হরেনের উপর।

পুলিসের একটা তদন্ত হইল।

শ্রীহরি কোন কথাই অস্বীকার করিল না। শ্রীহরির পক্ষে কথাবার্তা যাহা বলিবার বলিল—দাশজী। দাশজী এখন জমিদারের সদর-কর্মচারী, এখানকার ভূতপূর্ব গোমস্তা। অভিজ্ঞ, সুচতুর, বিষয়বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তি। প্রজাস্বত্ব আইনে, ফৌজদারি আইনে—সে সাধারণ উকীল-মোক্তার অপেক্ষাও বিজ্ঞ। শ্রীহরি সংবাদ পাইয়া তাহাকে আনিয়াছে। ব্যাপারটা এখন আর গ্রামের লোক এবং ব্যক্তিগতভাবে শ্রীহরির মধ্যে আবদ্ধ নয়। জমিদারের গোমস্তা হিসাবে সে ব্যাপারটা করিয়াছে, সুতরাং দায়িত্ব জমিদারের উপরও পড়িয়াছে।

জমিদার বয়সে নবীন। একালের বাংলাদেশের জমিদারের ছেলে। ইংরাজী লেখা-পড়া জানে, জমিদারি খুব পছন্দ করে না। বারকয়েক ব্যবসা করিবার চেষ্টা করিয়া লোকসান দিয়া অগত্যা জমিদারিকেই আঁকড়াইয়া ধরিয়া বসিয়া আছে। জমিদারির মধ্যে আইন অনুযায়ী চলিবার প্রথা প্রবর্তনের চেষ্টা তাহার আছে, সেকালের জমিদারের মত জোর-জবরদস্তির ধারা সে মোটেই পছন্দ করে না। সেকালের জমিদারের মত ব্যক্তিত্বও তাহার নাই। কাজেই তাহার সাধু চেষ্টা ফলবতীও হয় নাই। ঘটিলেই নায়েব-গোমস্তার মতে মত দিতে বাধ্য হয়। কলিকাতা যাইবার টাকার অভাব ঘটিলেই জমিদারি শাসন কড়া হয়। কলিকাতার সিনেমা দেখে, থিয়েটার দেখে, একটু-আধটু মদও খায়, রাজনৈতিক সভা-সমিতিতে দর্শক হিসাবে যায়। ইউনিয়ন বোর্ডের মেম্বার; লোকাল বোর্ডে দাড়াইয়া এবার পরাজিত হইয়াছে। আগামী বারে কংগ্রেস-নমিনেশন পাইবার জন্য এখন হইতেই চেষ্টা করিতেছে। এবার অর্থাৎ উনিশশো আটাশ সালে কলিকাতায় যে কংগ্রেস অধিবেশন হইবে—তাহার ডেলিগেট হইবার চেষ্টাও সে এখন হইতেই করিতেছে।

জমিদার কিন্তু এই সংবাদটা শুনিয়া পছন্দ করে নাই; বলিয়াছিল—এমন হুকুম যখন আমরা দিই নি, তখন আমাদের দায়িত্ব অস্বীকার করবেন! শ্রীহরি নিজে বুঝুক।

দাশজী হাসিয়া বলিয়াছিল—শ্রীহরির মত গোমস্তা পাচ্ছেন কোথায়? সেটা ভাবুন! গ্রামের লোকের সঙ্গে তার ঝগড়া হয়েছে। সে গোমস্তা হিসেবে কাজটা অন্যায়ই করেছে। কিন্তু সে-লোকটা আদায় হোক-না-হোক মহলের প্রাপ্য পাই-পয়সা চুকিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া, এই এক বছর হাওনোটেও সে টাকা দিয়েছে—হাজার দুয়েক। তারপর সেটেলমেন্টের খরচা আদায়ের সময় আসছে। এক শিবকালীপুরেই আপনার লাগবে হাজার টাকার ওপর। তাছাড়া অন্য মহলেরও মোটা টাকা আছে। এসময় ওকে যদি ছাড়িয়ে দেন—তবে কি সেটা ভাল হবে?

জমিদারটি মিটিংয়ে দু’দশ কথা বলিতে পারে, সমকক্ষ স্বজনবন্ধুর মধ্যে বেশ স্পষ্টবক্তা বলিয়া খ্যাতি আছে; কিন্তু এই দাশজীটি যখন এমনই ধারায় চিবাইয়া চিবাইয়া কথা কয়, তখন জলমগ্ন ব্যক্তির মত ছাপাইয়া উঠিয়া অসহায় ভাবে দুই হাত বাড়াইয়া সে আত্মসমর্পণ করে।

দাশজী বলিল—আচ্ছা, এক কাজ করুন না কেন? শিবকালীপুর শ্রীহরিকে পত্তনি দিয়ে দেন না?

—পত্তনি!

—হ্যাঁ, ধরুন শ্রীহরি পাবে দু-হাজারের উপর। তা ছাড়া আবার এই সেটেলমেন্টের খরচা লাগবে। আর শ্রীহরিকে গোমস্তা রাখতে গেলে—এমনি বিরোধ হবেই। শ্রীহরি নেবেও গরজ করে।

—ও পত্তনি-টত্তনি নয়। যদি কিনে নিতে চায় তো দেখুন।

সম্পত্তি হস্তান্তরে জমিদারের আপত্তি নাই। সে নিজেই বলে—জমিদারি নয়, ও হল গাধার খাটুনি। বাড়ী—আগে কর জমিদারি!

তদন্তে দাশজী সবিনয়ে সব স্বীকার করিল। আজ্ঞে হ্যাঁ, গাছ কাটতে আমরা জমিদার তরফ থেকে হুকুম দিয়েছি। শ্রীহরি ঘোষ আমাদের গোমস্তা হিসাবেই গাছ কাটাতে লোক নিযুক্ত করেছিলেন। বৈশাখ মাসে গাছ আমরা হিন্দুরা কাটি না, কাজেই চৈত্র মাসে কাটবার ব্যবস্থা। এই সময়েই আমাদের সমস্ত বছরের কাঠ কেটে রাখা হয়।

জগন বলিল—কাটুন না! নিজের গাছ কাটুন, জমিদার কেন—

বাধা দিয়া দাশজী বলিল—নিজের গাছই তো। ওসব গাছই তো জমিদারের।

—জমিদারের?

—আপনারাই বলুন জমিদারের কি না?

—না। আমাদের গাছ।

—আপনাদের? ভাল, কখনও আপনারা গাছের ডাল কেটেছেন?

—ডাল কাটিনি। কিন্তু আমরাই চিরকাল দখল করে আসছি।

—হ্যাঁ, আপনারাই ফল ভোগ করেন। কিন্তু সে তো জমিদারের তালগাছের তাল কাটেন—পাতা কাটেন আপনারা, শিমুল গাছের ‘পাবড়া’ পাড়েন আপনারা। সরকারী পুকুরে লোকে পলুই চেপে মাছ ধরে। পুকুর পর্যন্ত গ্রামের লোকে একটা ভাগ করে রেখেছে, এ পুকুরের মাছ ধরবে—রাম, শ্যাম, যদু, ও পুকুরে ধরবে ঝালি, কানাই, হরি, অন্য পুকুরে ধরবে—ভবেশ, দেবেশ, যোগেশ! এখন, এই তালগাছ—এই পুকুর, এসবেই কি আপনাদের মালিকানি?

দেবু এতক্ষণে বলিল—ভাল কথা, দাশ মশায়। কিন্তু এসব গাছ যদি আপনাদের, তবে আপনারা এত লাঠিয়াল পাঠিয়েছিলেন কেন? জবর দখল দরকার হয় কোথায়? যেখানে দখল নাই সেইখানে—কিম্বা যেখানে বে-দখলের সম্ভাবনা আছে সেইখানে। মানে সেখানেও দখল সন্দেহজনক।

দাশ হাসিয়া বলিল—না। না। লাঠিয়াল আমরা পাঠাই নি। আমরা পাঠিয়েছিলাম পাইক। লাঠি তাদের হাতে থাকে। ওদের দু’ঠোটের সামিল ওটা। এখন ধরুন, যার যেমন বিয়ে, তার তেমন বাদ্যি। আপনার আমার বাড়ীতে বিয়ে হয়, একটা ঢোল বাজে একটা কাসী বাজে। তার সঙ্গে বড় জোর সানাই। জমিদার বাড়ীর বিয়েতে বাজনা হরেক রকমের। জমিদার-তরফ থেকে গাছ কাটতে এসেছে—পাঁচ-সাতটা গাছ কাটবে, মজুর আছে ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ জন—তার সঙ্গে আট-দশটা পাইক এসেছে—কি এমন বেশী এসেছে? আপনারা এমন বে-আইনী দাঙ্গা করবেন জানলে—আমরা অন্তত পঞ্চাশ জন লাঠিয়াল পাঠাতাম। তার আগে অবশ্য শান্তিভঙ্গের আশঙ্কা জানিয়ে খবর দিয়ে রাখতাম। তা ছাড়া আইন তো আপনি বেশ জানেন গো দেবুবাবু; গাছ কার বলুন না আপনি!

আজ এ তদন্তের ভার পাইয়াছিল এখানকার থানার দারোগাবাবু। দারোগাবাবু লোকটি ভাল। ক্ষমতার অপব্যবহার করে না, ব্যবহারও ভদ্র। দারোগা বলিল—যাই বলুন, দাশজী, কাজটি ভাল হয় নি। মানুষের মনে আঘাত দিতে নেই। যাক আমাদের এতে করবার কিছু নাই। স্বত্বের মামলার বিষয়। আমরা নোটিশ দিয়েছি—মুখেও উভয় পক্ষকে বারণ করছি—আদালতে মীমাংসা না হওয়া পর্যন্ত কেউ গাছের কাছ দিয়ে যাবেন না। গেলে ফৌজদারী হবে—আমরা তখন চালান দেব। পুলিস বাদী হয়ে মামলা করবে।

তারপর উঠিবার সময় দারোগা আবার বলিল—প্রজাস্বত্ব আইনের সংশোধন হচ্ছে জানেন তো, দাশজী?

—আজ্ঞে জানি বৈকি।—দাশজী হাসিল। তারপর বলিল—হলে আমরা বাঁচি, দারোগা-বাবু, আমরা বাঁচি।

দারোগাবাবুকে বিদায় করিয়া শ্রীহরি দাশজীকে লইয়া আপনার বৈঠকখানায় উঠিল। ইতিমধ্যে শ্রীহরি একটা নূতন বৈঠকখানা করিয়াছে। খড়ের ঘর হইলেও পাকা সিঁড়ি পাকা বারান্দা পাকা মেঝে।

দাশ তারিফ করিয়া বলিল—বা-বা-বা! কিন্তু আমাদের নীলকণ্ঠের গান জানো তো?—যদি করবে পাকা বাড়ী—আগে কর পাকা জমিদারি! যদি—বা! এ যে পাকা আসর করে ফেললে, ঘোষ।

শ্রীহরি তক্তপোশের উপরের সতরঞ্চিটা ঝারিয়া দিয়া বলিল—বলুন।

বসিয়া দাশজী বলিল—জমিদারি কিনবে ঘোষ?

—জমিদারি? শ্রীহরি চমকিয়া উঠিল। জমিদারির কল্পনা সে স্পষ্টভাবে কখনও করে নাই। সে প্রশ্ন করিল—কোন্ মৌজা? কাছে-পিঠে বটে তো?

—খোদ শিবকালীপুর। কিনবে?

শ্রীহরি বিচিত্র সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে দাশজীর দিকে চাহিয়া রহিল। শিবকালীপুরের জমিদারি? গ্রামের প্রতিটি লোক তাহার প্রজা হইবে? ঘোষ হইবে সকলের মনিব, বাবু মহাশয়, হুজুর! চকিতে তাহার অধীর মন নানা কল্পনায় চঞ্চল হইয়া উঠিল। গ্রামে সে হাট বসাইবে। স্নানের মরা দীঘিটা কাটাইয়া দিবে। চণ্ডীমণ্ডপে পাকা দেউল তুলিবে, আটচালা ভাঙিয়া নাটমন্দির গড়িবে। এল-পি পাঠশালার বদলে এম-ই স্কুল করিবে; নাম হইবে ‘শ্রীহরি এম-ই স্কুল’। ইউনিয়ন বোর্ড হইতে লোকাল বোর্ডে দাড়াইবে।

দাশজী বলিল—কিনে ফেল ঘোষ। তোমার পয়সা আছে। জমিদারি হল অক্ষয় সম্পত্তি। তা ছাড়া—এই গাঁয়ের যারা তোমার শত্রু—একদিন তোমার পায়ে গড়িয়ে পড়বে। সেটেলমেন্ট ফাইনাল পাবলিকেশনের আগেই কেনো। দরখাস্ত করে নাম সংশোধন করিয়ে নাও। ফাইনাল পাবলিকেশনের পর পাঁচধারার কোর্ট পাবে। টাকায় চার আনা বৃদ্ধি তো হবেই। আট আনার নজীর হাইকোর্ট থেকে নিয়ে রেখেছি। শোন, আমি সুবিধা করে দেব। হ্যাঁ, দরজাটা বন্ধ করে দাও দেখি।

শ্রীহরি দরজা বন্ধ করিয়া দিল।

দীর্ঘকাল পরামর্শ করিয়া হাসিতে হাসিতেই দুজনে বাহির হইল। দাশজী বলিল—ও নোটিশ তোমার বাজে, একদম বাজে নোটিশ দিয়েছে। তুমি যদি যাও—তার ফলে শান্তিভঙ্গ ঘটে—তবে হেনো হবে তেনো হবে, এই তো?

তারপর মুখের কাছে মুখ আনিয়া ভঙ্গি করিয়া নাড়িতে নাড়িতে বলিল—কিন্তু শান্তিভঙ্গ যদি না হয় তা হলে?—দাশজী ঠোঁট টিপিয়া হাসিতে আরম্ভ করিল।

শ্রীহরি বলিল—তবে আমি নিশ্চিন্দি হয়ে করতে পারি?

—নিশ্চয়; তবে সাবধান, কেউ যেন জানতে না পারে। কোন হাঙ্গামা যেন না হয়।

—আর গাজনের কি করব?

—যা হয় কর।

—চণ্ডীমণ্ডপ তাহলে যেমন আছে তেমনি থাক।

—ওই কাজটি করো না ঘোষ। আমি বারণ করছি। চণ্ডীমণ্ডপের সেবাইত জমিদার বটে, কিন্তু অধিকার গাঁয়ের লোকের। পাকা নাটমন্দির, দেবমন্দির নিজের বাড়ীতে কর। সম্পত্তি থাকতেও আছে—যেতেও আছে। যদি কোনদিন সম্পত্তি চলেও যায়—তখন আর কোন অধিকার থাকবে না তোমার।

দাশজী শ্রীহরিকে চণ্ডীমণ্ডপের উপর টাকা খরচ করিতে নিষেধ করিতেছে। যে দিনকাল পড়িয়াছে! সাধারণের জিনিসে নিজের টাকা খরচ করা মূর্খতা মাত্র।

পরদিন প্রাতঃকালেই গ্রামে আর একটা হৈ-চৈ উঠিল।

দেবু ঘোষের আধ-কাটা আমগাছটা গতরাত্রেই কাটিয়া কেহ তুলিয়া লইয়াছে। কেহ আর কে? শ্রীহরি লইয়াছে। শান্তিভঙ্গ হয় নাই, সুতরাং আইনভঙ্গও সে করে নাই! সদ্যকাটা গাছটার শিকড়ের উপর আঙ্গুল চারেক কাণ্ডটা কেবল জাগিয়া আছে। কাটা গাছটার অবশিষ্ট কোথাও বিশেষ পড়িয়া নাই। কেবল কতকগুলো ঝরা কাঁচা পাতা, কতকগুলো কাঁচা আম, আঙ্গুলের মত সরু দুই-চারটা ডাল, শিকড়-কাটা কতক কুচা পড়িয়া আছে। জমিটার জলসিক্ত নরম মাটিতে গাড়ীর চাকার দাগে, গরুর ক্ষুরের চিহ্নে, সাঙ্কেতিক ভাষায় লিখিত রহিয়াছে গত রাত্রের কাহিনী।

ঘোষাল আস্ফালন করিয়া বেড়াইতেছিল—রেগুলার থেফট কেস! হি ইজ এ থীফ! হি ইজ এ থীফ! হ্যাণ্ডকাফ দিয়ে চালান দেবো।

দেবু বারণ করিল—না। ওসব বল না, ঘোষাল।

জগন বলিল—দুপুরের ট্রেনেই চল মামলা রুজু করে আসি।

তাহাতেও দেবু বলিল—না।...

ধীর পদক্ষেপে দেবু আসিয়া বসিল যতীনের কাছে।

যতীন বলিল—শুনলাম গাছটা রাতারাতি কেটে নিয়েছে।

দেবু একটু ম্লানহাসি হাসিল। জগন বলিল—মামলা করতে বলছি, দেবু রাজী হচ্ছে না।

—কি হবে মামলা করে? গাছ আইন অনুসারে জমিদারের। মিছে টাকা খরচ করে কি লাভ?

—এরই মধ্যে যে অবসন্ন হয়ে পড়লেন দেবুবাবু?

—হ্যাঁ। অবসন্ন হয়েছি যতীনবাবু। আর পারছি না।

—দাড়ান, একটু চা করি—উচ্চিংড়ে? উচ্চিংড়ে?

একা উচ্চিংড়ে নয়, সঙ্গে আরও একটা বাচ্চা আসিয়া হাজির হইল।

—চা করতে বল মা-মণিকে।

হরেন বলিল—এটা আবার কোত্থেকে এসে জুটল? একা রামে রক্ষা নাই সুগ্রীব দোসর!

হাসিয়া যতীন বলিল—উচ্চিংড়ের জংশনের বন্ধু। কাল পিছনে পিছনে এসেছিল গাছ কাটার হাঙ্গামা দেখতে। সেখানে বনের পাখী আর খাঁচার পাখীতে মিলন হয়েছে। উচ্চিংড়ে ওকে নিয়ে এসেছে।

—বেশ আছেন মশায়, নন্দী-ভৃঙ্গী নিয়ে! আপনার কাছেই এসে জোটে সব।

—আমার কাছে নয়। উচ্চিংড়ে ওকে নিয়ে এসেছে—মা-মণির কাছে।

—মানে কামার-বউয়ের কাছে?

হাসিয়া যতীন বলিল—হ্যাঁ।

—অনিরুদ্ধ ওকে মেরে তাড়াবে।

—কাল সে বোঝাপড়া হয়ে গেছে। অনিরুদ্ধবাবু তাড়াতে চেয়েছিলেন। মা-মণি বলেছেন ও গরু চরাবে খাবে থাকবে। অনিরুদ্ধবাবু গরু কিনেছেন কিনা। আর কামারশালার হাপর টানবে।

উচ্চিংড়ে আসিয়া দাড়াইল—চা লাও গো বাবু।

ওদিক ঢাক বাজিয়া উঠিল। উচ্চিংড়ে তাড়াতাড়িতে অর্ধেক চা উপচাইয়া ফেলিয়া, চায়ের বাটিগুলি নামাইয়া দিয়াই—দাওয়া হইতে এক লাফ দিয়া পড়িল, ড্যাং-ড্যাং-ড্যাং—ন্যাটাং ড্যাটাং ড্যাং-ড্যাং-ড্যাং—ন্যাটাং ড্যাটাং! আয় রে গোবরা, শিব উঠছে দেখতে যাই।

গাজনের ঢাক বাজিতেছে। পূর্ণ এক বৎসর পরে গাজনের বুড়াশিব পুকুরের জল হইতে উঠিবেন। ভক্তেরা দোলায় করিয়া লইয়া আসিবে।

জগন বলিল—ভক্ত কে কে হল জান, ঘোষাল?

হরেন বলিল—ওনলি ফাইভ। একটা হাতের আঙ্গুলি প্রসারিত করিয়া সে দেখাইয়া দিল।

—চল, ব্যাপারটা দেখে আসি।

—চল!

জগন, হরেন চলিয়া গেল।

যতীন বলিল—দেবুবাবু!

—বলুন?

—কি ভাবছেন?

—ভাবছি—দেবু হাসিল। তারপর বলিল—দেখবেন?

—কি?

—আসুন আমার সঙ্গে।

অল্প খানিকটা আসিয়াই শ্রীহরির বাড়ী, বাড়ীর পর খামার। পথ হইতেই খামারটা দেখা যায়। প্রকাণ্ড একটা জনতা সেখানে জমিয়া আছে। খামারের উঠানের মাঝখানে সোনার বর্ণ ধানের একটি স্তূপ। পাশেই তিনটি বাশের তেপায়াতে বড় বড় ওজনের কাঁটা-পাল্লা টাঙানো হইয়াছে। একটা গাছের তলায় চেয়ার পাতিয়া বসিয়া আছে শ্রীহরি। জনকয়েক লোক দেবু ও যতীনকে দেখিয়া আড়ালে লুকাইয়া দাড়াইল। ওদিকে ওজনের পাল্লায় অবিরাম ধান ওজন চলিতেছে—দশ দশ—দশ রামে—ইগার ইগার। ইগার ইগার—ইগার রামে—বারো বারো।

দেবু বলিল—দেখলেন!

যতীন হাসিয়া বলিল—‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চল রে’!

—কি ভাবছি আমি বুঝলেন? আমি একা পড়ে গিয়েছি।

কিছুক্ষণ পর যতীন বলিল—আপনি তা হলে বিবাদ মিটিয়ে ফেলুন দেবুবাবু। সত্যই বড় কষ্টে পড়বেন আপনি।

দেবু হাসিল, বলিল—নাঃ, ও ভাবনা আর ভাবি নে। ভাবছি—এতদিনের গাজন, আমাদের গ্রামে গাজনে কত ধুম ছিল, সমস্ত গ্রামের লোক প্রাণ দিয়ে খাটত। অন্য গাঁয়ের সঙ্গে আমাদের গাজনের ধুমের পাল্লা চলত। সে-সব উঠে যাবে। নয়তো শ্রীহরির একলার হাতে গিয়ে পড়বে। দেবতাতে সুদ্ধ আমাদের অধিকার থাকবে না। ভগবানে আমাদের অধিকার থাকবে না। আমাদের ভগবান পর্যন্ত কেড়ে নেবে!

নেলো আসিয়া দাড়াইল।

যতীন বলিল—কি সংবাদ নলিন?

—আট আনা পয়সা। গাজনে এবার মেলা বসাবে ঘোষ মশায়। পুতুল তৈরী করে বিক্রী করব। রং কিনব।

—মেলা বসাবে শ্রীহরি? দেবু উঠিয়া বসিল।

নলিনকে বিদায় করিয়া যতীন বলিল—নলিনের হাতটি চমৎকার।

দেবু বলিল—ওর মাতামহ যে ছিল নামকরা কুমোর।

—কুমোর! নলিন তো বৈরাগী!

—হ্যাঁ, কাঁচের পুতুলের চল হল, শেষ বয়সে অভাবে পড়ে বুড়ো ভিক্ষে ধরে বোষ্টম হয়েছিল। তা ছাড়া বিধবা মেয়েটার বিয়ের জন্যও বোষ্টম হওয়া বটে।

কিছুক্ষণ স্তব্ধ হইয়া থাকিয়া দেবু আবার বলিল—শ্রীহরি এবার তা হলে ধুম করে গাজন করবে দেখছি!

ঢাকের বাজনার শব্দে ভোরবেলাতেই—ভোরবেলা কেন—তখনও খানিকটা রাত্রি ছিল, যতীনের ঘুম ভাঙিয়া গেল। গাজনের ঢাক। পূর্বে চৈত্রের প্রথম দিন হইতেই গাজনের ঢাক বাজিত। গতবার হইতে পাতু দেবোত্তর চাকরান জমি ছাড়িয়া দেওয়ার পর, চৈত্রের বিশ তারিখ হইতে ঢাক বাজিতেছে। ভিন্ন গ্রামের একজন বায়েনের সঙ্গে নগদ বেতনে নূতন বন্দোবস্ত হইয়াছে। শেষরাত্রিতে ঢাকের বাজনা—যতীনের বেশ লাগিল। ঢাকের বাজনার মধ্যে আছে একটা গুরুগম্ভীর প্রচণ্ডতা। রাত্রির নিস্তব্ধ শেষ প্রহরে প্রচণ্ড গম্ভীর শব্দের মধ্যেও একটি পবিত্রতার রেশ সে অনুভব করিল। দরজা খুলিয়া সে বাহিরে আসিয়া বসিল।

সে আশ্চর্য হইয়া গেল;—গ্রামখানায় এই শেষরাত্রেই জাগরণের সাড়া উঠিয়াছে। ঢেঁকিতে পাড় পড়িতেছে; মেয়েরা ইহারই মধ্যে পথে বাহির হইয়াছে। হাতে জলের ঘটি। চণ্ডীমণ্ডপে জল দিতে চলিয়াছে। রাঙাদিদি বড় বড় করিয়া তেত্রিশ কোটি দেবতার নাম করিতেছে—এখান হইতে শোনা যাইতেছে। জনকয়েক গাজনের ভক্ত স্নান শেষ করিয়া ফিরিতেছে—তাহারা ধ্বনি দিতেছে—বলো শি-বো—শি-বো—শিবো-হে! হর-হর বোম্—হর-হর বোম্!

যতীন সকালেই ওঠে, কিন্তু এই শেষরাত্রে সে কোনোদিন ওঠে নাই। পল্লীর এ ছবি তাহার কাছে নূতন। সে যখন ওঠে, তখন রাঙাদিদি ভগবানকে এবং পিতৃপুরুষকে গালিগালাজ আরম্ভ করে। মেয়েদের ঘরের পাট-কাম দেবার্চনা শেষ হইয়া গৃহকর্ম আরম্ভ হইয়া যায়।

অনিরুদ্ধের বাড়ির খিড়কির দরজা খুলিয়া গেল। আবছা অন্ধকারের মধ্যে ছায়ামূর্তির মত উচ্চিংড়ে ও গোবরা বাহির হইয়া গেল। তাহাদের পিছনে বাহির হইয়া আসিল পদ্ম, তাহার হাতেও জলের ঘটি।

একটানা ক্যাঁ-কোঁ শব্দে একখানা সারবোঝাই গরুর গাড়ি চলিয়া গেল। শেষরাত্রি হইতেই মাঠের কাজ শুরু হইয়া গিয়াছে। সার ফেলার কাজ চলিতেছে। সারের গাড়িতেই আছে জোয়াল লাঙল। সার ফেলিয়া জমিতে লাঙল চষিবে। সেদিনের জলের রস এখনও জমিতে আছে। মাটির বতর এখন চমৎকার, অর্থাৎ রোদ পাইয়া কাদার আঠা মরিয়া মাটি চমৎকার চাষের যোগ্য হইয়াছে। লাঙলের ফাল কোমল মাটির মধ্যে আকণ্ঠ ডুবিয়া চিরিয়া চলিবে নিঃশব্দে, নির্বিঘ্নে, স্বচ্ছন্দ গতিতে—ছানার তালের মধ্যে ধারালো ছুরির মতন। বড় বড় চাই দুইপাশে উলটাইয়া পড়িবে; অথচ লাঙলের ফালে এতটুকু মাটি লাগিবে না, সামান্য আঘাতেই চাইগুলা গুঁড়া হইয়া যাইবে। গরু মহিষগুলি চলিবে অবহেলায় ধীর অনায়াস গতিতে। এই কর্ষণের মধ্যে চাষীর বড় আনন্দ। অন্তরে অন্তরে যেন আনন্দের রস ক্ষরণ হয়।

একসঙ্গে সারিবন্দি শোভাযাত্রার মত হাল গেল ছয়খানা; পিছনে চারখানা সারবোঝাই গাড়ি। বড় বড় হৃষ্টপুষ্ট সবলকায় হেলে-বলদগুলি দেখিলে চোখ জুড়াইয়া যায়। এগুলি সবই শ্ৰীহরি ঘোষের। ঘোষের ঘরে দশখানা হাল, কুড়ি জন কৃষাণ। ঘোষের সুপ্ৰসন্ন ভাগ্যচ্ছটার প্রতিফলন তাহার সর্বসম্পদে সুপরিস্ফুট।

যতীন জামা গায়ে দিয়া বাড়ি হইতে বাহির হইয়া পড়িল। অতিক্ৰম করিয়া আসিয়া পড়িল মাঠে। দিগন্তবিস্তীর্ণ মাঠে। মাঠের প্রান্তে ময়ূরাক্ষীর বাঁধ, বাঁধের গায়ে কচি সবুজ শরবনের চাপ। তাহারই ভিতর হইতে উঠিয়াছে—তালগাছের সারি। মধ্যে মধ্যে পলাশ-পালতে-শিমুল-শিরীষ-তেঁতুলের গাছ। গাছগুলির মাথার উপরে অস্পষ্ট আলোয় উদ্ভাসিত আকাশের গায়ে জংশন-শহরের কলের চিমনী। কলে ভোঁ বাজিতেছে—একসঙ্গে চার-পাঁচটা কলে বাজিতেছে। বোধহয় চারিটা বাজিল।

মাঠ পার হইয়া সে বাঁধে উঠিল। বাঁধ হইতে নামিল ময়ূরাক্ষীর চর-ভূমিতে। জল পাইয়া চরে বেনাঘাসগুলি সবুজ হইয়া উঠিয়াছে। তাহারই মধ্যে সযত্নকর্ষিত তার ফসলের জমিগুলির গিরিরঙের মাটি বড় চমৎকার দেখাইতেছে। জমির মধ্যে তরকারির চারাগুলি সাপের ফণার মত ডগা বাড়াইয়া লতাইতে শুরু করিয়াছে। ভোরবেলায় তিতির পাখির দল বাহির হইয়াছে খাদ্যান্বেষণে। উইয়ের ঢিবি, পিঁপড়ের গর্ত ঠোকরাইয়া উই ও পিঁপড়ে খাইয়া ফিরিতেছে। যতীনের সাড়ায় কয়টা তিতির ফরফর শব্দে উড়িয়া দূরে গিয়া জঙ্গলের মধ্যে লুকাইল।

আকাশ লাল হইয়া উঠিতেছে। যতীন নদীর বালির উপর গিয়া দাঁড়াইল। পূর্বদিগন্তে চৈত্রের বালুকাগর্ভময়ী ময়ূরাক্ষী ও আকাশের মিলন-রেখায় সূর্য উঠিতেছে। কয়েকদিন পরেই মহাবিষুবসংক্রান্তি। ময়ূরাক্ষী এখানে ঠিক পূর্ববাহিনী।

ময়ূরাক্ষী পার হইয়া সে জংশনের ঘাটে উঠিল। সপ্তাহে দুই দিন তাহাকে থানায় গিয়া হাজিরা দিতে হয়। অন্যান্য দিন সে চা খাইয়া থানায় যায়। আজ ভোরবেলার নেশায় সে বাহির হইয়া এতটা যখন আসিয়াছে; তখন জংশনে হাজিরার কাজটা সারিয়া যাওয়াই স্থির করিল।

গ্রামের পথে পা দিয়াই যতীন আবার এক হাঙ্গামার সংবাদ পাইল। হাঙ্গামায় হাঙ্গামায় কয়েকদিন হইতেই গ্রামখানার মন্থর জীবনযাত্রা অকস্মাৎ যেন তালভঙ্গ হইয়া গিয়াছে। আজ শ্ৰীহরির বাগানে কে বা কাহারা গাছ কাটিয়া তছনছ করিয়া দিয়াছে। গুজবে, জটলায়, উত্তেজনায় গ্রামখানা চঞ্চল হইয়া উঠিয়াছে। চণ্ডীমণ্ডপে আটচালায় শ্রীহরি ঘোষ রাগে-দুঃখে অধীর হইয়া প্রায় মাথার চুল ছিড়িয়া বেড়াইতেছে। অকস্মাৎ তাহার মধ্য হইতে আজ বাহির হইয়া আসিয়াছে পূর্বের সেই বর্বর ছিরু পাল।

গ্রাম হইতে অল্প দূরে—উত্তর মাঠে অর্থাৎ যেদিকে ময়ূরাক্ষী নদী—তাহার বিপরীত দিকে, বন্যাভয়-নিরাপদ মাঠের মধ্যে একটা মজা পুকুরে পঙ্কোদ্ধার করিয়া সেই পুকুরের চারিপাশে শ্ৰীহরি শখ করিয়া বাগান তৈয়ারি করিয়াছিল। অতীত দিনের চাষী ছিরুর সৃষ্টির নেশার সঙ্গে বর্তমানের আভিজাত্যকামী শ্ৰীহরির কল্পনা মিশাইয়া বাগানখানি রচিত হইয়াছিল। বহু দামি কলমের বহু চারা আনিয়া পুঁতিয়াছিল শ্ৰীহরি; মালদহ মুর্শিদাবাদ হইতে আমের কলম, কলিকাতা হইতে লিচু-জামরুলের কলম ও নানা স্থান হইতে কানাইবাঁশি, অমৃতসাগর, কাবুলি প্রভৃতি কলার চারা সংগ্রহ করিয়া আনাইয়াছিল। শুধু ফলের কামনাই নয়, ফুলের নেশাও তার ছিল—অশোক, চাঁপা, গোলাপ, গন্ধরাজ, বকুলের গাছও অনেকগুলি লাগাইয়াছিল।

শ্ৰীহরির কল্পনা ছিল আরও অনেক। বাগানের মধ্যে শৌখিন দুই-কামরা একখানি ঘর, ঘরের সামনে পুকুরের দিকে খানিকটা বাঁধানো চত্বর হইতে নামিয়া যাইবে একটি বাঁধানো ঘাটের সিঁড়ি। সেই কল্পনায় কাঁচা ঘাটের দুই পাশে দুইটি কনকচাঁপার গাছ পুঁতিয়াছিল। অশোক ফুলের চারা বসাইয়াছিল—বাগানে ঢুকিবার পথের পাশেই। গাছগুলি বেশ একটু বড় হইলেই গোড়া বাঁধাইয়া বসিবার স্থান তৈয়ারি করিবার ইচ্ছা ছিল। সন্ধ্যায় সে বন্ধু-বান্ধব লইয়া বাগানে আসিয়া বসিবে, ইচ্ছা হইলে রাত্রে আনন্দ করিবে। গান-বাজনা-পান-ভোজন—কঙ্কণার বাবুদের মত।

গতরাত্রে কে বা কাহারা শ্ৰীহরি ঘোষের সেই বাগানটিকে কাটিয়া তছনছ করিয়া দিয়াছে। শ্ৰীহরি বলিতেছে—চিৎকার করিয়া বলিতেছে—তাদেরও মাথায় কোপ মারব আমি!

তাহার ধারণা—যাহাদের গাছ সে কাটিয়াছে, এ কাজ তাহাদেরই। পঞ্চপাণ্ডবের প্রতি আক্ৰোশে অশ্বথামা যেমন নিষ্ঠুর আক্রমণে অন্ধকারের আবরণে পাণ্ডব শিশুগুলিকে হত্যা করিয়াছিল তেমনি আক্ৰোশেই কাপুরুষ শত্ৰু তাহার শখের চারা গাছগুলিকে নষ্ট করিয়াছে। শ্ৰীহরি ছাড়িবে না, অশ্বথামার শিরোমণি কাটিয়া সে প্রতিশোধ লইবে। থানায় খবর পাঠানো হইয়াছে। পথে ভূপালের সঙ্গে যতীনের দেখা হইয়াছে।

হরেন ঘোষাল দস্তুরমত ভড়কাইয়া গিয়াছে। শ্ৰীহরির এই মূর্তিকে তাহার দারুণ ভয়। সে আমলে ছিরু পাল তাহাকে একদিন জলে ডুবাইয়া ধরিয়াছিল—ঘাড়ে ধরিয়া মুখ মাটিতে রগড়াইয়া দিয়াছিল। সে ব্রাহ্মণ বলিয়া ভয় করে না, ভদ্রলোক বলিয়া খাতির করে না। যতীন ফিরিতেই সে শুষ্কমুখে আসিয়া কাছে বসিল, বলিল—যতীনবাবু, কেস ইজ সিরিয়াস! ভেরি সিরিয়াস! ছিরু পাল ইজ ফিউরিয়াস্! হি ইজ এ ডেঞ্জারাস ম্যান!

জগন ঘোষ খুব খুশি হইয়াছে। সে ইহাকে সর্বোত্তম সূক্ষ্ম বিচারক বিধাতার দণ্ডবিচারের সঙ্গে তুলনা করিয়াছে। থার্ড ক্লাস পর্যন্ত পড়া বিদ্যায় সে আজ দেবভাষায় ইহার ব্যাখ্যা করিয়া দিল—ষণ্ডস্য শত্ৰু ব্যাঘ্রেণ নিপাতিতঃ। অর্থাৎ ষাঁড়ের শত্ৰু বাঘে মারিয়াছে।

দেবু বলিল—না ডাক্তার, কাজটা অত্যন্ত অন্যায় হয়েছে। ছিঃ!

—তোমার কথা বাদ দাও ভাই, তুমি হলে ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির।

দেবু কোনো উত্তর দিল না; রাগও করিল না। সে সত্য সত্যই দুঃখিত হইয়াছে। ওই গাছগুলি শ্ৰীহরি যত্নে পুঁতিয়াছিল—ফলও সে ভোগ করিত। শ্ৰীহরি তাহার গাছ কাটিয়াছে, তবু দুঃখ সে পাইয়াছিল। কাজটা অন্যায়। গাছপালার উপর তাহার বড় মমতা। ওইসব গাছ বড় হইত, ফুলেফলে ভরিয়া উঠিত প্রতিটি বৎসর; পুরুষানুক্রমে তাহারা বাড়িয়া চলিত। মানুষের চেয়ে গাছের পরমায়ু বেশি। শ্ৰীহরি, শ্ৰীহরির সন্তানসন্ততি তাহার উত্তরাধিকারী। তাহারও পরের পুরুষ ওই গাছের ফলে-ফুলে পরিতৃপ্ত হইত। দেবতার ভোগ দিত, গ্রামে বিলাইত, লোক তৃপ্ত হইত। সে গাছ কি এমনভাবে নষ্ট করিতে আছে?

ভোঁ শব্দে দৌড়াইয়া আসিয়া উচ্চিংড়ে বলিল—দারোগা এসেছে।

হরেন চমকাইয়া উঠিল—কোথায়?

উচ্চিংড়ে তখন বাড়ির মধ্যে গিয়া ঢুকিয়াছে। জবাব দিল গোবরা, সে উচ্চিংড়ের পিছনে ছিল, বলিল—সেই পুকুর দেখে গাঁয়ে আসছে।

এবার জগনও শঙ্কিত হইয়া উঠিল, বলিল—যতীনবাবু, বেটা নিশ্চয় আমাদের সবাইকেই সন্দেহ করে এজাহার দেবে। পুলিশও বোধহয় আমাদেরই চালান দেবে। জামিনটামিনের ব্যবস্থা কিন্তু আপনাকেই করতে হবে। আপনি কংগ্রেসের সেক্রেটারিকে চিঠি লিখে রাখুন।

দূর্গা আসিয়া দাঁড়াইল।—জামাই-পণ্ডিত!

—দূর্গা? দেবু যতীনের তক্তপোশে শুইয়া ছিল, উঠিয়া বসিল।

—হ্যাঁ। বাড়ি এস।

—কেন রে?

—পুলিশ এসেছে, ঘর দেখবে। ডাক্তার, আপনার ঘরের সামনেও সিপাই দাঁড়িয়েছে।

হরেন সর্বাগ্রে উঠিয়া বলিল—মাই গড! মায়ের গীতাটা নিয়ে হয়েছে আমার মরণ।

একজন পুলিশের কনস্টেবল জনতিনেক চৌকিদার লইয়া আসিয়া অনিরুদ্ধের তিন দরজায় পাহারা দিয়া বসিল।

পথে যাইতে যাইতে দূর্গা বলিল—জামাই-পণ্ডিত।

—কি রে?

—ঘরে কিছু থাকে তো আমাকে দেবে। আমি ঠিক পেট-অ্যাঁচলে নিয়ে বাইরে চলে যাব।

—কি থাকবে আমার ঘরে? কিছু নাই!

বাড়ির দুয়ারে সাব-ইন্সপেকটার নিজে ছিল; সে বলিল—পণ্ডিত, আপনার ঘর আমরা সার্চ করব। দুগ্‌গা, তুই ভেতরে যাস নে!

দূর্গা বলিল—ওরে বাবা, দুধের ঘটি রয়েছে যে দারোগাবাবু! আবার আমাকে নিয়ে পড়লেন ক্যানে?

হাসিয়া দারোগা বলিল—তুই ভারি বজ্জাত। কোথায় ঘটি আছে বল—চৌকিদার এনে দেবে।

দেবু বলিল—আসুন দারোগাবাবু। দূর্গা তুই বোস, ঘটি আমি পাঠিয়ে দিচ্ছি।

দারোগা বলিল—ঝরঝরে জায়গায় বোস, দূর্গা দেখিস—সাপে কি বিছেয় কামড়ায় না যেন!

দেবু একটা জিনিসের কথা ভাবে নাই।

পুলিশ বাড়ি-ঘর অনুসন্ধান করিয়া, দা-কুড়ুল-কাটারি বেশ তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে পরীক্ষা করিয়া দেখিল, তাহার মধ্যে গতরাত্রের কচি গাছ কাটার কোনো চিহ্ন আছে কি না। কিন্তু সেসব কিছু পাওয়া গেল না। কাঁচা কাপড়গুলি পরীক্ষা করিয়া দেখিল—তাহাতে কলাগাছের কষের চিহ্ন আছে কি না। কিন্তু তাও ছিল না। পুলিশ লইল নূতন প্রজা-সমিতির খাতাপত্রগুলি। এই খাতাপত্রগুলির কথাই দেবুর মনে ছিল না। অন্য সকলের বাড়ি হইতে পুলিশ শুধু-হাতেই ফিরিয়া আসিয়াছিল।

শ্ৰীহরি যতীনের নামেও এজাহার দিয়াছিল—তাহাকেও তাহার সন্দেহ হয়। শ্রীহরির বন্ধু জমাদার সাহেব হইলে কি হইত বলা যায় না, কিন্তু সাব-ইন্সপেকটার শ্ৰীহরির এ কথা গ্ৰাহ্যই করিল না। বলিল—ঘোষমশায়, সবেরই মাত্ৰা আছে, মাত্রা ছাড়িয়ে যাবেন না।

এ সংসারে যাহারা আপন সত্যের বিধান লঙ্ন করিতে চায়—বিধাতাকে সবচেয়ে বেশি মানে তাহারাই। বিধাতার তুষ্টিলাভ করিলে সর্বপ্রকার বিধান-লঙ্ন-জনিত অপরাধের দণ্ড লঘু হইয়া যায়—এই বিশ্বাসই তাহাদের জীবনে পরম আশ্বাস। শ্ৰীহরি তাড়াতাড়ি বলিল—না-না-না। ওটা আমারই ভুল। ও আপনি ঠিক বলেছেন।

যাহা হউক, দেবুর ঘর তল্লাশ করার পর দারোগা বলিল—পণ্ডিত, আপনাকে আমরা অ্যারেস্ট করছি। আপনি প্রজা-সমিতির প্রেসিডেন্ট, এ কাজটা প্রজা-সমিতির দ্বারাই হয়েছে বলেই সন্দেহ হচ্ছে আমাদের। অবশ্য এনকোয়ারি আমাদের এখনও শেষ হয় নি; উপস্থিত আপনাকে অ্যারেস্ট করলাম। চার্জটা অবিশ্যি থেফট!

দেবু বলিল—থেফট চার্জ—চুরি? আমার বিরুদ্ধে?

হাসিয়া দারোগা বলিল—গাছ কাটা তো আছেই, সেটার সমন করবেন এস-ডি-ও। ঘোষের দুটো লোহার তারের জাফরি চুরি গেছে।

—আমাকে চুরির চার্জে চালান দেবেন দারোগাবাবু? দেবু মর্মান্তিক আক্ষেপের সহিত প্রশ্ন করিল।

—অর্জুনের মত বীরকে সময়-দোষে নপুংসক সাজতে হয়েছিল, জানেন তো পণ্ডিত! ও নিয়ে দুঃখু করবেন না। বেলা তো অনেক হয়ে গেল, খাওয়াদাওয়াই সেরেই নিন।

দারোগার কথায় দেবু আশ্চর্য রকমের সান্ত্বনা পাইল। সে হাসিয়া বলিল—আপনি একটু জল-টল খাবেন?

—চাকরি পেটের দায়ে পণ্ডিত। খাব নিশ্চয়। তবে আপনার ঘরেও না, ঘোষের ঘরেও নয়। আমাদের যতীনবাবু আছেন। ওখানেই যা হয় হবে।

দারোগা আসিয়া যতীনের ওখানে বসিল।

গ্রামের লোকেরা অবনত মস্তকে চারিপাশে বসিয়া ছিল। সকলেই সবিস্ময়ে ভাবিতেছিল—কে এ কাজ করিল।

মেয়েরা আসিয়া জড়ো হইয়াছে—দেবুর বাড়ি। অনেকে উঠানের উপর ভিড় করিয়া দাঁড়াইয়াছে, কেহ কেহ দাওয়ার উপর বসিয়া পড়িয়াছে। বিলু যেন পাথর হইয়া গিয়াছে। দূর্গার চোখ দিয়া জল গড়াইয়া পড়িতেছে অনর্গল ধারায়। রাঙাদিদির আর বিলাপের শেষ নাই। পদ্ম বসিয়া আছে বিলুর পাশে। বিলুর দুঃখে সেও অপরিসীম দুঃখ অনুভব করিতেছে। মনে হইতেছে—আহা, এ দুঃখের ভার যদি সে নিজে লইয়া বিলুর দুঃখ মুছিয়া দিতে পারিত! অবগুণ্ঠনের মধ্যে তাহার চোখ হইতেও টপ টপ করিয়া জল মাটির উপর ঝরিয়া পড়িতেছে।

অকস্মাৎ ছুটিয়া আসিল উচ্চিংড়ে। লোকজনের ভিড়ের মধ্যে সুকৌশলে মাথা গলাইয়া একেবারে পদ্মের কাছে আসিয়া হাঁপাইতে হাঁপাইতে বলিল—শিগগির বাড়ি এস মা-মণি!

যতীনের দেখাদেখি সে-ও পদ্মকে মা-মণি বলে।

পদ্ম বিরক্ত হইয়া ঘাড় নাড়িয়া ইঙ্গিতে প্ৰশ্ন করিল—কেন?—সে অবশ্য বুঝিয়াছে, যতীনের তলব পড়িয়াছে, চা করিতে হইবে।

—কম্মকারকে যে দারোগাবাবু ধরে নিয়ে যাচ্ছে গো!

পদ্মের বুকটা ধড়াস করিয়া উঠিল। তাহার সর্বাঙ্গ থরথর করিয়া কাঁপিতে আরম্ভ করিল। অনিরুদ্ধকে ধরিয়া লইয়া যাইতেছে! সে আবার কি কথা! একা পদ্ম নয়, কথাটায় সকলেই সচকিত হইয়া উঠিল।

দেবু প্রশ্ন করিল—তার আবার কি হল?

—কম্মকার যে সাউখুড়ি করে বললে—আমাকে ধর হে। আমি গাছ কেটেছি। দারোগা অমনি ধরলে। বলতে বলতেই উচ্চিংড়ে যেমন ভিড়ের ভিতর দিয়া সুকৌশলে মাথা গলাইয়া প্রবেশ করিয়াছিল, তেমনি সুকৌশলেই বাহির হইয়া গেল।

কোনোরূপে আত্মসংবরণ করিয়া পদ্মও মেয়েদের ভিড় ঠেলিয়া বাহির হইয়া আসিল।

—কামার-বউ!

পদ্ম পিছন ফিরিয়া দেখিল, ডাকিতেছে দূর্গা।

—দাঁড়াও, আমিও যাব।

উচ্চিংড়ে কথাটা গুছাইয়া বলিতে পারে নাই, কিন্তু মিথ্যা বলে নাই। সত্যই বলিয়াছে। স্তব্ধ জনতার মধ্য হইতে নিতান্ত অকস্মাৎ অনিরুদ্ধ চোখ-মুখ দৃপ্ত করিয়া দারোগার সম্মুখে বুক ফুলাইয়া আসিয়া বলিয়াছিল—দেবু পণ্ডিতের বদলে আমাকে ধর। ও গাছ কাটে নাই, গাছ কেটেছি আমি।

ডেটিনিউ যতীনের ঘরের দাওয়ায় বসিয়া ছিল দারোগা। তাহার সম্মুখে জমিয়া দাঁড়াইয়া ছিল একটি জনতা। সেই দারোগা হইতে সমবেত জনতা আকস্মিক বিস্ময়ে তাহার মুখের দিকে চাহিল।

অনিরুদ্ধ বলিয়াছিল—কাল রেতে টাঙি দিয়ে আমি বেবাক গাছ কেটেছি; জাফরি দুটো তুলে ফেলে দিয়েছি ‘চরখাই’ পুকুরের জলে।

মিথ্যা কথা নয়। ধারালো টাঙি দিয়া অনিরুদ্ধ তাহাদের গাছ কাটার প্রতিশোধ তুলিয়াছে ছিরু পালের উপর। উন্মত্ত প্রতিশোধের আনন্দে গাছ কাটিতে কাটিতে সে সেই অন্ধকার রাত্রে নাচিয়া নাচিয়া ছুটিয়া বেড়াইয়াছে, আর ছোট ছেলেদের মত মুখে বলিদানের বাজনার বোল আওড়াইয়াছে—খা-জ্জিং-জ্জিং-জিনাক-জিং-জিং না-জিং-জিং-জিনাক। এ কথা কেহ জানে না, সে কাহাকেও বলে নাই, এমনকি পদ্মকে পর্যন্ত না। ওই ছেলে দুটাকে লইয়া পদ্ম আজকাল পৃথক শুইয়া থাকে; রাত্রে নিঃশব্দে অনিরুদ্ধ উঠিয়া গিয়াছিল, ফিরিয়াছেও নিঃশব্দে। সকালবেলা হইতে সে ছিরুর আস্ফালন শুনিয়া মনে মনে কৌতুক বোধ করিয়াছে, পুলিশ আসিলেও সে একবিন্দু ভয় পায় নাই। ভোরবেলাতেই টাঙ্গিখানাকে সে আগুনে পোড়াইয়া সকল অপরাধের চিহ্নকে নিশ্চিহ্ন করিয়াছে। কাপড়খানাতে অবশ্য কলার কষ লাগিয়াছে—সেখানাকে অনিরুদ্ধ খিড়কির ঘাটে জলের তলায় পুঁতিয়া রাখিয়াছে। কিন্তু যখন দেবু পণ্ডিতকে দারোগা গ্রেপ্তার করিল—তখন সে চমকিয়া উঠিল।

তাহার মনে একটা প্রবল ধাক্কা আসিয়া লাগিল। এ কি হইল? পণ্ডিতকে গ্রেপ্তার করিল? দেবুকে? এই মাত্র কিছুদিন হইল সে জেল হইতে ফিরিয়াছে। বিনাদোষে আবার তাহাকে ধরিল? এ গ্রামের সকলের চেয়ে ভালমানুষ, দশের উপকারী, তাহার পাঠশালার বন্ধু বিপদের মিত্র দেবুকে ধরিল? জগনকে ধরিল না, হরেনকে ধরিল না, তাহাকে ধরিল না? ধরিল পণ্ডিতকে? জনতার মধ্যে চুপ করিয়া মাটির দিকে সে ক্ষুব্ধ বিষণ্ন মুখে ভাবিতেছিল। তাহার অপরাধের দণ্ড ভোগ করিতে দেবু-ভাই জেলে যাইবে? সমস্ত লোকগুলিই নীরবে হায়-হায় করিতেছে। আক্ষেপে সে অধীর হইয়া উঠিল। ভাবিতে ভাবিতে সে আর আত্মসংবরণ করিতে পারিল না। একটা অদ্ভুত ধরনের আবেগের প্রাবল্যে দৃপ্ত ভঙ্গিতে সে দারোগার নিকট আসিয়া নিজের হাত বাড়াইয়া বলিল—দেবু পণ্ডিতের বদলে আমাকে ধর। ও গাছ কাটে নাই, গাছ কেটেছি আমি।

মুহূর্তে সমস্ত জনতা বিস্ময়ে হতবাক হইয়া গেল। একটা স্তব্ধতা থমথম করিতে লাগিল। দারোগা পর্যন্ত অনিরুদ্ধের দিকে বিস্ময়ে বিস্ফারিত দৃষ্টিতে চাহিয়া রহিল। সেই স্তব্ধ এবং বিস্মিত পরিমণ্ডলের মধ্যে অনিরুদ্ধ সোচ্চারে নিজের সমস্ত দোষ কবুল করিয়া ফেলিল।

এ স্তব্ধতা প্রথম ভঙ্গ করিল দেবু। উচ্চিংড়ের কাছ হইতে খবর পাইয়া বাড়ি হইতে ছুটিয়া আসিয়া তাহাকে জড়াইয়া ধরিয়া থরথর কম্পিত কণ্ঠে বলিল—অনি-ভাই, অনি-ভাই, কিছু ভেবো না অনি-ভাই! আমি প্রাণ দিয়ে তোমাকে ছাড়াতে চেষ্টা করব।

অনিরুদ্ধ উত্তর দিতে পারিল না—গভীর আনন্দে বোকার মত আকৰ্ণবিস্তার হাসিয়া দেবুর মুখের দিকে চাহিয়া দাঁড়াইয়া রহিল। অকস্মাৎ তাহার চোখ হইতে দরদর ধারে জল গড়াইতে লাগিল। সঙ্গে সঙ্গে দেবুও কাঁদিয়া ফেলিল। তাহার সঙ্গে আরও অনেকে, এমনকি যতীন এবং দারোগা পর্যন্ত চোখ মুছিতে লাগিল।

সঙ্গে সঙ্গে গ্রামের প্রত্যেকেই অনিরুদ্ধকে সাধুবাদ দিল।—মানুষের মত কাজ করলে অনিরুদ্ধ এবার! এ একশোবার! শাবাশ, অনিরুদ্ধ, শাবাশ!

ইহারই মধ্যে একটি উচ্চকণ্ঠ জনতার পিছন হইতে ধ্বনিত হইয়া উঠিল—শাবাশ ভাই শাবাশ! একশোবার শাবাশ!

বিচিত্র ব্যাপার, এ কণ্ঠস্বর সর্বস্বান্ত ভিক্ষুক তারিণী পালের। উচ্চিংড়ের বাবার। লোকটা কালো, লম্বা, দাঁত উঁচু, খানিকটা ক্ষ্যাপাক্ষ্যাপা। অনিরুদ্ধের এই কাজটির মধ্যে সে কি করিয়া এক মহোল্লাসের সন্ধান পাইয়াছে।

বাড়ির ভিতরে পদ্ম নির্বাক হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল, চোখ দিয়া তাহার শুধু জলই ঝরিতেছিল। তাহার বাক্য হারাইয়া গিয়াছে, চোখের জল গলিয়া গলিয়া পড়িতেছে। দূর্গা দাঁড়াইয়া ছিল অল্প দূরে। উচ্চিংড়ে ও গোবরা কাছেই ছিল; অনিরুদ্ধ ভিতরে আসিতেই তাহারা সরিয়া গেল। অনিরুদ্ধ এতক্ষণে সপ্রতিভভাবে হাসিয়া সকলের দিকে চাহিয়া বলিল—চললাম তা হলে!

পদ্মের তখনও ভাত হয় নাই, যতীনেরও অল্প দেরি আছে। দেবু বলিল—আমার জন্য ভাতে-ভাত হয়েছে অনি-ভাই, তাই দুটো খেয়ে নেবে, চল।

দেবুর ঘরেই খাইয়া অনিরুদ্ধ থানায় চলিয়া গেল।

যাইবার সময় দারোগা দূর্গাকে একটা তলব দিয়া গেল—থানাতে যাবি একবার। তোর নামেও একটা রিপোর্ট হয়েছে।

আজ যতীন নিজে রান্না করিল। উদ্যোগ করিয়া দিল উচ্চিংড়ে এবং গোবরা। দূরে দাঁড়াইয়া সমস্ত বলিয়া দিল দূর্গা।

পদ্ম কিছুক্ষণ ঘরে বসিয়া ছিল, তাহার পর গিয়া বসিল খিড়কির ঘাটে। সেখানে বসিয়া তীক্ষ্ণস্বরে নামহীন কোনো ব্যক্তিকে উদ্দেশ করিয়া তীব্র নিষ্ঠুরতম অভিসম্পাত দিতে আরম্ভ করিল।

—শরীরে ঘুণ ধরবে, আকাট রোগ হবে। শরীর যদি পাথর হয় তো ফেটে যাবে, লোহার হয় তো গলে যাবে। অলক্ষ্মী ঘরে ঢুকবে লক্ষ্মী বনবাস যাবে। ঘরে আগুন লাগবে, ধানের মরাই ছাইয়ের গাদা হবে।

মনের ভিতর রূঢ়তর অভিসম্পাতের আরও চোখা-চোখা বাণী ঘুরিতেছিল—বউবেটা মরবে, পিণ্ডি লোপ হবে, জোড়া বেটা এক বিছানায় শুয়ে ধড়ফড় করে যাবে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে মনের কোণে উঁকি মারিতেছিল—বিশীর্ণ গৌরবর্ণা এক সীমন্তিনী নারীর অতি কাতর করুণা-ভিক্ষু মুখ। অল্পে অল্পে সে চুপ করিয়া গেল।

দূর্গা আসিয়া ডাকিল—কামার-বউ, এস ভাই, নজরবন্দিবাবু রান্না নিয়ে বসে আছেন। পদ্ম উত্তর দিল না।

—খালভরি, উঠে আয় কেনে? পিণ্ডি খাবি না? তোর লেগে আমরাও খাব না নাকি?

এবার আসিয়া এমন মধুর সম্ভাষণে ডাকিল উচ্চিংড়ে।

পদ্ম উত্তর দিল—তোরা খা না গিয়ে হতভাগারা, আমি খাব না, যা।

—খেতে দিছে না যি লজরবন্দিবাবু। তুমি না খেলে আমাদিকে দেবে না। নিজেও খায় নাই। কৰ্ম্মকার তো মরে নাই—তবে তার লেগে এত কাঁদছিস ক্যানে?

—তবে রে মুখপোড়া!—পদ্ম ক্রোধভরে তাহাকে তাড়া করিয়া আসিয়া সেই টানে একেবারে বাড়ি ঢুকিয়া পড়িল।

ঊনত্ৰিশে চৈত্র অনিরুদ্ধের মামলার দিন পড়িয়াছে। বিচার করিবার কিছু নাই; সে নিজেই স্বীকারোক্তি করিয়াছে। পুলিশের কাছে করিয়াছিল। হাকিমের কাছেও করিয়াছে। উকিল-মোক্তার কাহারও পরামর্শেই সে তাহা প্রত্যাহার করে নাই। সে যেন অকস্মাৎ বেপরোয়া হইয়া উঠিয়াছে। সেই দিনের সর্বজনের বাহবা তাহাকে যেন একটা নেশা ধরাইয়া দিয়াছে। সাজা তাহার হইবেই। দেবু কয়েক দিনই সদর শহরে গিয়াছিল, উকিল-মোক্তারও দেওয়া হইয়াছে। কিন্তু সকল উকিল-মোক্তারে এক কথাই বলিয়াছে। সাজা দুই মাস হইতে ছয় মাস পর্যন্ত হইতে পারে। কিন্তু সাজা হইবে।

ইহার মধ্যে ইন্সপেকটার আসিয়া একবার তদন্ত করিয়া গিয়াছে। প্রজা-সমিতির সহিত কোনো সংস্রব আছে কি না ইহাই ছিল তদন্তের বিষয়। ইন্সপেকটার তাহার ধারণা স্পষ্টই গ্রামের লোকের কাছে বলিয়া গিয়াছে—প্রজা-সমিতি এ কাজ করতে বলে নাই এটা ঠিক, কিন্তু প্রজা-সমিতি যদি না থাকত গ্রামে, তবে এ কাণ্ড হত না। এতে আমি নিঃসন্দেহ।

দূর্গাকে ডাকা হইয়াছিল—তাহার বিরুদ্ধে নাকি রিপোর্ট হইয়াছে। কে রিপোর্ট করিয়াছে না বলিলেও দূর্গা বুঝিয়াছে। ইন্সপেকটার তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তাহার দিকে চাহিয়া প্রশ্ন করিয়াছিল—শুনছি তোর যত দাগী বদমায়েশ লোকের সঙ্গে আলাপ, তাদের সঙ্গে তুই—ব্যাপার কি বল তো?

দূর্গা হাত জোড় করিয়া বলিল—আজ্ঞে হুজুর, আমি নষ্ট-দুষ্ট—এ কথা সত্যি। তবে মশায়, আমাদের গাঁয়ের ছিরু পাল। জিভ কাটিয়া সে বলিল—না, মানে ঘোষ মহাশয়, শ্রীহরি ঘোষ, থানার জমাদারবাবু, ইউনিয়ন বোর্ডের পেসিডেনবাবু—এঁরা সব যে দাগী বদমাশ নোক—এ কি করে জানব বলুন! মেলামেশা আলাপ তো আমার এঁদের সঙ্গে।

ইন্সপেকটার ধমক দিল। দূর্গা কিন্তু অকুতোভয়। বলিল—আপনি ডাকুন সবাইকে আমি মুখে মুখে বলছি। এই সেদিন রেতে জমাদার ঘোষমশায়ের বৈঠকখানায় এসে আমোদ করতে আমাকে ডেকেছিলেন—আমি গেছিলাম। সেদিন ঘোষমশায়ের খিড়কির পুকুরে আমাকে সাপে কামড়েছিল—পেরমাই ছিল তাই বেঁচেছি। রামকিষণ সিপাইজি ছিল, ভূপাল থানাদার ছিল। শুধান সকলকে। আমার কথা তো কারু কাছে ছাপি নাই।

ইন্সপেকটার আর কোনো কথা না বাড়াইয়া কঠিন দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া বলিয়াছিল—আচ্ছা আচ্ছা, যাও তুমি, সাবধানে থাকবে।

পরম ভক্তিসহকারে একটি প্রণাম করিয়া দূর্গা চলিয়া আসিয়াছিল।


ছাব্বিশ



ইহার পর বিপদ হইল পদ্মকে লইয়া। তাহার মেজাজের অন্ত পাওয়া ভার। এই এখনই সে একরকম, আবার মুহূর্ত পরেই সে আর এক রকমের মানুষ। উচ্চিংড়ে গোবরা পর্যন্ত প্রায় হতভম্ব হইয়া পড়িয়াছে। তবে তাহারা বাড়ীতে বড় একটা থাকে না। বিশ তারিখ হইতে গাজনের ঢাক বাজিয়াছে, মাঠের চেঁচুড়ে দীঘি হইতে বুড়াশিব চণ্ডীমণ্ডপ জাঁকাইয়া বসিয়াছেন, তাহারা দুইজনে নন্দী-ভৃঙ্গীর মত অহরহ চণ্ডীমণ্ডপে হাজির আছে। গাজনের ভক্তের দল বাণ-গোঁসাই লইয়া গ্রামে গ্রামে ভিক্ষা সাধিতে যায়—ছোঁড়া দুইটাও সঙ্গে সঙ্গে ফেরে।

গ্রামে গাজনে এবার প্রচুর সমারোহ। শ্রীহরি চণ্ডীমণ্ডপে দেউল ও নাটমন্দির তৈয়ারীর সঙ্কল্প মুলতুবী রাখিলেও হঠাৎ এই কাণ্ডের পর গাজনের আয়োজনে সে উঠিয়া পড়িয়া লাগিয়াছে। লোকে ভক্ত হইতে চাহিতেছে না কেন তাহার কারণ সে বোঝে। দেবু ঘোষ, জগন ডাক্তার আর দুগ্ধপোষ্য একটা আগন্তুক বালক ষড়যন্ত্র করিয়া তাহাকে অপমান করিবার জন্যই গাজন ব্যর্থ করিবার ব্যবস্থা করিয়াছে, তাহা শ্রীহরি বুঝে। তাই হঠাৎ সে এবার গাজনে কোমর বাঁধিয়া লাগিয়া গেল। ছোট ধরনের একটি মেলার আয়োজনও করিয়া ফেলিল। দুই দল ভাল ‘বোলান’ গান—এক দল ঝুমুর, এক দল কবি-গানের পাল্লার ব্যবস্থা করিয়া সে গ্যাট হইয়া বসিল। যাহারা বলিয়াছে চণ্ডীমণ্ডপ ছাইব না, তাহারাই যেন চব্বিশ ঘণ্টা আনন্দ আয়োজনের দ্বারপ্রান্তে পথের কুকুরের মত দাঁড়াইয়া থাকে—তাহারই জন্য এত আয়োজন। ভাত ছড়াইলে কাক ও কুকুর আপনি আসিয়া জুটে। সেই যেদিন ধান দাদন করে, সেদিন গ্রামের লোক তাহার বাড়ীর আশেপাশে ঘুরিয়া ঘুরিয়া তাহার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করিয়াছে। ইহারই মধ্যে ভবেশ খুড়া বহুজনের দরবার লইয়া আসিয়াছে। কথাবার্তা চলিতেছে, তাহারা ঘাট মানিয়া ক্ষমা প্রার্থনা করিতে প্রস্তুত; প্রজা সমিতিও তাহারা ছাড়িয়া দিবে বলিয়া কথা দিয়াছে।

গড়গড়া টানিতে টানিতে শ্রীহরি আপন মনেই হাসিল। তবে ওই হরিজনের দলকে সে ক্ষমা করিবে না। কুকুর হইয়া উহারা ঠাকুরের মাথার উপর উঠিতে চায়!

কাল আবার অনিরুদ্ধের মামলার দিন। সদরে যাইতে হইবে। শ্রীহরি চঞ্চল হইয়া উঠিল। অনিরুদ্ধ জেলে গেলে পদ্ম একা থাকিবে। অন্নের অভাব হইবে—বস্ত্রের অভাব হইবে। দীর্ঘতনু, আয়ত নয়না, উদ্ধতা, মুখরা কামারণী। এবার সে কি করে দেখিতে হইবে। তারপর অনিরুদ্ধের চার বিঘা বাকুড়ি। কামারের গোটা জোতটাই নীলামে উঠিয়াছে। হয়তো নীলাম এতদিন হইয়া গেল। যাক!

কালু শেখ আসিয়া সেলাম করিয়া বলিল—হুজুরের মা ডাকিতেছে।

—মা? ও, আজ যে আবার নীল-ষষ্ঠী!—শ্রীহরি উঠিয়া বাড়ীর ভিতরে গেল।

চৈত্র-সংক্রান্তির পূর্বদিন নীল-ষষ্ঠী। তিথিতে ষষ্ঠী না হইলেও মেয়েদের যাহাদের নীলের মানত আছে, তাহারা ষষ্ঠীর উপবাস করিবে, পূজা করিবে, সন্তানের কপালে ফোঁটা দিবে। নীল অর্থাৎ নীলকণ্ঠ এই দিনে নাকি লীলাবতীকে বিবাহ করিয়াছিলেন। লীলাবতীর কোল আলো করিয়া নীলমণির শোভা। নীল-ষষ্ঠী করিলে নীলমণির মত সন্তান হয়।

পদ্ম সকল ষষ্ঠীই পালন করে; সে-ও উপবাস করিয়া আছে। কিন্তু বিপদ হইয়াছে উচ্চিংড়ে ও গোবরাকে লইয়া। আজ সকালবেলা হইতেই তাহাদের দেখা নাই। চড়ক-পাটা বাহির হইয়াছে। ঢাক বাজাইয়া ভক্তরা গ্রামে গ্রামে ফিরিতেছে। একটা লোহার কাঁটায় কণ্টকিত তক্তার উপর একজন ভক্ত শুইয়া থাকিবে। সে কি সোজা কথা! সেই বিস্ময়কর ব্যাপারের পিছনে পিছনে তাহারা ফিরিতেছে। আগে এখানে বাণ ফোঁড়া হইত, এখন আর হয় না।

পদ্ম অপেক্ষা করিয়া অবশেষে নিজেই চণ্ডীমণ্ডপের প্রান্তে আসিয়া দাঁড়াইল। চণ্ডীমণ্ডপে ঢাক বাজিতেছে। বোধ হয় এ বেলার মত চড়ক ফিরিয়া আসিল।

চণ্ডীমণ্ডপ ঘিরিয়া মেলা বসিয়াছে। খানবিশেক দোকান। তেলেভাজা মিষ্টির দোকানই বেশী। বেগুনি, ফুলুরী, পাপড়-ভাজা হইতেছে। ছেলেরা দলে দলে আসিয়া কিনিয়া খাইতেছে। খানচারেক মণিহারী দোকান। সেখানে তরুণী মেয়েদেরই ভিড় বেশী—ফিতা, টিপ, আলতা, গন্ধ কিনিতেছে। গাছতলায় ছোট আসর পাতিয়া বসিয়াছে তিনজন চুড়ি-ওয়ালী। একটা গাছতলায় বৈরাগীদের নেলোও বসিয়াছে কতকগুলা মাটির পুতুল লইয়া। ওমা! বুড়ো পুতুলগুলো তো বেশ গড়িয়াছে! হুঁকা হাতে তামাক খাইতেছে—আবার ঘাড় নাড়িতেছে! বয়স্কেরা ঘুরিয়া বেড়াইতেছে—অলস পদক্ষেপে। আজকাল দুইদিন কোন চাষের কাজ নাই। হাল চষিতে নাই, গরু জুতিতে নাই। এই দুই দিন সর্বকর্মের বিশ্রাম।

উচ্চিংড়ে ও গোবরার সন্ধান মিলিল না। তাহা হইলে চড়ক হইতে এখনও ফেরে নাই। ও ঢাক শ্রীহরি ঘোষের ষষ্ঠী পূজার ঢাক। পদ্ম বোধ হয় জানে না—ঘোষ এবার দশখানা ঢাকের বন্দোবস্ত করিয়াছে। পাতু নিজের গ্রাম ছাড়িয়া অন্য গ্রামে বাজাইতে গিয়াছে। সর্বত্রই এক অবস্থা। বাদ্যকরের চাকরান জমি প্রায় সর্বত্রই উচ্ছেদ হইয়া গিয়াছে। এ গ্রামের ঢাকী ও গ্রামে যায়, সে গ্রামের ঢাকী আসিয়াছে এ গ্রামে। সতীশ বাউড়ীও তাহার বোলানের দল লইয়া অন্য গ্রামে গিয়াছে।

অগত্যা পদ্ম বাড়ী ফিরিয়া আসিয়া মাটিতে আঁচল বিছাইয়া শুইয়া পড়িল। পরের সন্তান লইয়া এ কি বিড়ম্বনা তাহার! কিছুক্ষণ পর আবার সে বাহির হইল। এবার শুষ্ক মুখ, ধূলি-ধূসর দেহ ছেলে দুইটাকে দেখিতে পাইয়া তাহাদিগকে ধরিয়া যতীনের সম্মুখে আনিয়া বলিল—এই দেখ, একবার ছেলে দুটোর দশা দেখ। তুমি শাসন কর।

যতীন কিছু বলিল না, মৃদু হাসিল।

পদ্ম বলিল—হেসো না তুমি। আমার সর্বাঙ্গ জ্বলে যায় তোমার হাসি দেখলে। ভেতরে এস একবার, ফোঁটা দেব!

ফোঁটা দিয়া পদ্ম বলিল—হাসি নয়, উচ্চিংড়েকে তুমি বল, এমনি করে বাইরে বাইরে ফিরলে তুমি ওকে রাখবেই না এখানে, জবাব দেবে। খেতে দেবে না। গোবরাটা ভাল ওকে নিয়ে যায় উচ্চিংড়েই। কাল ওরা যেন না বেরোয় ঘর থেকে।

যতীন এবার মুখে কৃত্রিম গাম্ভীর্য টানিয়া আনিয়া বলিল—তথাস্তু মা-মণি। তারপর সে উচ্চিংড়েকে কড়া রকমের ও গোবরাকে মৃদু রকমের শাসন করিয়া দিল। অর্থাৎ দুইজনকে দুই রকমের কান মলিয়া দিল।

কিন্তু তাহাই কি হয়? উচ্চিংড়ে আর গোবরা হোম-সংক্রান্তি, অর্থাৎ গাজনের দিন কি ঘরে থাকিবে? সেই ভোররাত্রেই ঢাক বাজিবার সঙ্গে সঙ্গেই উচ্চিংড়ে গোবরাকে লইয়া বাহির হইল, আর বাড়ীমুখো হইল না, পাছে পদ্ম তাহাদের আটক করে।

আজ বুড়ো-শিবের পূজা। পূজা হইবে, বলিদান হইবে, হোম হইবে। আজ ভক্ত শুইয়া থাকিবে সমস্ত দিন। লোহার কাঁটাওয়ালা তক্তাখানা এমনভাবে বসানো আছে যে ঘুরাইলে বন-বন্ করিয়া ঘোরে।

উচ্চিংড়ে গোবরাকে বলিল—আজ ভাই আমরা শিবের উপোস করব।

—উপোস? গোবরার ক্ষুধাটা কিছু বেশী।

—হ্যাঁ। বাবা বুড়ো শিবের উপোস। সবাই করে, না করলে পাপ হয়। উপোস করলে মেলা টাকা হয়।

সবাই গাজনের উপবাস করে, এ কথাটা গোবরা অস্বীকার করিতে পারিল না। গাজনের উপবাস প্রায় সর্বজনীন। বাউড়ী-বায়েন হইতে উচ্চতম বর্ণ ব্রাহ্মণ আজ প্রায় সকলেরই উপবাস। অনিরুদ্ধের মামলার তদ্বিরে দেবু উপবাস করিয়াই সদরে গিয়াছে। শ্রীহরিরও উপবাস। কিন্তু উপবাস করিলেই টাকা হয়—এ কথাটা গোবরা স্বীকার করিতে পারিল না। তাহা হইলে পণ্ডিত গরীব কেন?

গোবরার অন্তরের একান্ত অনিচ্ছা উচ্চিংড়ে বুঝিল; বলিল—বেশী ক্ষিদে লাগে তো, হুই চৌধুরীদের বাগানে গিয়ে আম পেড়ে খাব! বেশ বড় বড় হয়েছে—বুঝলি? আম পাড়লে চৌধুরীরা কিছু বলবে না, আর ওতে পাপও হবে না।

এবার গোবরার তেমন আপত্তি রহিল না।

—শেষকালে না-হয় কারু বাড়ীতে মেগে খাব দুটো।

—মা-মণি তা হলে মারবে। বলবে—ভিখিরি কোথাকার, বেরো হতভাগারা!

—তবে চল, আমরা মহাগেরাম যাই। সেখানে এখানকার চেয়ে বেশী ধুম। আর সেখানে মেগে খেলে, মা-মণি কি করে জানবে? তাই চল।

গোবরা এ প্রস্তাবে উৎসাহিত হইয়া উঠিল।

গ্রামের প্রান্তে একটা জলশূন্য পুকুরের পাড়ে খোঁড়া পুরোহিতের তেঠেঙে ঘোড়াটা ঘাস খাইতেছিল। উচ্চিংড়ে দাঁড়াইল। বলিল—এই ঘোড়াটা ধর দিকি!

—চাট ছুঁড়বে।

—তোর মাথা! পেছনকার একটা ঠ্যাং খোঁড়া। চাট ছুঁড়তে গেলে নিজেই ধপাস করে পড়ে যাবে। ধর ওইটার ওপর চেপে দুজনা চলে যাব। তোর কাপড়টা খোল, লাগাম করব।

সত্যই ঘোড়াটা চাঁট ছুঁড়িতে পারে না; কিন্তু কামড়ায়, খেঁকি কুকুরের মত দাঁত বাহির করিয়া মাথা উঁচাইয়া কামড়াইতে আসে। এটা উচ্চিংড়ে জানিত না। সম্ভবত এটা ঘোড়াটার আত্মরক্ষার আধুনিকতম অস্ত্র আবিষ্কার। অশ্বারোহণের সঙ্কল্প ত্যাগ করিতে হইল।


****


সন্ধ্যায় গাজনের পূজা শেষ। চড়ক শেষ হইয়াছে। ভক্তদের আগুন লইয়া ফুল-খেলাও হইয়া গিয়াছে। বলি-হোমও হইয়া গিয়াছে। কপালে তিলক পরিয়া ভবেশ ও হরিশ চণ্ডীমণ্ডপে বসিয়া আছে। শ্রীহরি এখনও সদর হইতে ফেরে নাই। ঢাকীর দল প্রচণ্ড উৎসাহে ঢাকের বাজনার কেরামতি দেখাইতেছে। বড় বড় ঢাক, ঢাকের মাথায় দেড় হাত লম্বা পালকের ফুল। এ ঢাকের আওয়াজ প্রচণ্ড, ভদ্রলোকেরা বলে, ঢাকের বাদ্য থামিলেই মিষ্ট লাগে। কিন্তু ঢাকের গুরুগম্ভীর আওয়াজ নিপুণ বাদ্যকরের হাতে রাগিণীর উপযুক্ত বোলে যখন বাজে, তখন আকাশ বাতাস পরিপূর্ণ হইয়া যায়—গুরুগম্ভীর ধ্বনির আঘাতে মানুষের বুকের ভিতরেও গুরুগম্ভীর ঝঙ্কার উঠে। নাচিয়া নাচিয়া নানা ভঙ্গি করিয়া মুখে বোল আওড়াইয়া—এক-একজন ঢাকী পর্যায়ক্রমে ঢাক বাজাইতেছে, তাহাদের নাচের সঙ্গে নাচিতেছে—কাকের পাখার কালো পালকের তৈয়ারী ফুল; একেবারে মাথার কাছে বকের সাদা পালকের গুচ্ছ।

হরিশ আক্ষেপ করিতেছিল—এবার চৌধুরী আসতে পারলেন না! ঠাঁইটি একেবারে খাঁ-খাঁ করছে।

চৌধুরী প্রতি বৎসর উপস্থিত থাকে। ঢাকের বাজনার সে একজন সমঝদার শ্রোতা। বসিয়া বসিয়া তালে তালে ঘাড় নাড়ে। পাশে থাকে একটি পোটলা। বাজনার শেষে চৌধুরী পোটলা খুলিয়া পুরস্কার দেয়—কাহাকেও পুরানো জামা, কাহাকেও পুরানো চাদর, কাহাকেও বা পুরানো কাপড়। এবার চৌধুরী শয্যাশায়ী হইয়া আছে। সেই মাথায় আঘাত পাইয়া বিছানায় শুইয়াছে, আর উঠে নাই। ঘা শুকাইতেছে না, সঙ্গে সঙ্গে অল্প অল্প জ্বর হইতেছে।

চণ্ডীমণ্ডপের চারিপাশে মেলার মধ্যে পথে ভিড় এখন প্রচুর। মেয়ে, ছেলে, স্ত্রী, পুরুষ দলে দলে ঘুরিতেছে। সন্ধ্যার পর কবিগান হইবে। কলরবের অন্ত নাই। অকস্মাৎ সেই কলরব ছাপাইয়া কালু শেখের গলা শোনা গেল—হঠ হঠ, হঠ সব!

ভিড় ঠেলিয়া পথ করিয়া কালু শেখ বাহির হইয়া আসিল—তাহার পিছনে শ্রীহরি। ঘোষ ফিরিয়াছে। ভবেশ ও হরিশ অগ্রসর হইয়া গেল।

শ্রীহরি ফোকলা দাঁতে একগাল হাসিয়া বলিল—সুখবর। দুই মাস সশ্রম কারাদণ্ড।


***


পথের ভিড় ঠেলিয়া দেবু ঘোষও যাইতেছিল। বিমর্ষমুখে সে গেল যতীনের ওখানে। যতীন, দেবু, জগন ও হরেন—আজ সান্ধ্য মজলিসে লোক কেবল চারজন। সকলেই চুপ করিয়া বসিয়া আছে। আজিকার সমস্যা—পদ্মকে এ সংবাদটা কে দিবে, কেমন করিয়া দিবে?

ভিতরের দরজায় শিকল নড়িয়া উঠিল। পদ্ম ডাকিতেছে। যতীন উঠিয়া গেল। অনিরুদ্ধের দণ্ডের কথা শুনিয়া যতীন খুব বিষণ্ণ হয় নাই। দুই মাস জেল—যতীনের মতে লঘুদণ্ডই হইয়াছে। যে মন লইয়া অনিরুদ্ধ দেবুকে মিথ্যা দণ্ড হইতে বাঁচাইতে গিয়া সত্য স্বীকারোক্তি করিয়াছে, সে মন যদি তাহার টিকে—তবে সে নূতন মানুষ হইয়া ফিরিবে। আর যদি সে মন বুদ্বুদের মত ক্ষণস্থায়ীই হয়—তবুও বা দুঃখ কিসের! দারিদ্র্য-ব্যাধিতে জীর্ণ মনুষ্যত্বের মৃত্যু তো ধ্রুবই ছিল। কিন্তু বিপদ হইয়াছে পদ্মকে লইয়া। কি মায়ায় যে এই অশিক্ষিতা আবেগসর্বস্বা পল্লী-বধূটি তাহাকে জড়াইয়া ধরিয়াছে তাহা সে বুঝিতে পারে না। বুদ্ধি দিয়া বিশ্লেষণ করিয়াও সে তাহাকে উপেক্ষা করিতে পারে না। বৃহত্তর জীবন, মহত্তর স্বার্থের মানদণ্ডে ওজন করিয়াও সে কিছুতেই তাহার মূল্যকে অকিঞ্চিৎকর করিয়া তুলিতে পারে না। মাটির মূর্তির মধ্যে সে দেবীরূপ কল্পনা করিতে পারে না। জলে বিসর্জন দিলে সে মূর্তি গলিয়া কাদা হইয়া যায়, জলতলে সে রূপ পঙ্ক-সমাধিলাভ করে, এ সত্য মনে করিয়া সে হাসে। কিন্তু ঐ ভঙ্গুর মাটির মূর্তি অক্ষয় দেবীরূপ লাভ করিল কেমন করিয়া? কালের নদী-জলে তাহাকে বিসর্জন দিলেও যে সে গলিবে না বলিয়া মনে হইতেছে। শিক্ষা নাই সংস্কৃতি নাই—অভিমান ও কুসংস্কার-সর্বস্ব পদ্ম মাটির মূর্তি ছাড়া আর কি? সে এমন সজীব দেবীমূর্তি হইয়া উঠিল কি করিয়া? কোন্ মন্ত্রে?

ইতিমধ্যে কাঁদিয়া কাঁদিয়া পদ্মের চোখ দুইটা ফুলিয়া উঠিয়াছে। চোখের জল মুছিতে মুছিতে ম্লান হাসিয়া সে বলিল—দু’ মাস জেল হয়েছে?

যতীন আশ্চর্য হইয়া গেল। ইহার মধ্যে কথাটা তাহাকে কে বলিল? মাথা নিচু করিয়া সে বলিল—হ্যাঁ।

একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিল পদ্ম, বলিল—তা হোক। ভালোয় ভালোয় ফিরে আসুক সে। কিন্তু পণ্ডিতকে যে তার পাপের দণ্ডভোগ করতে হয় নাই, সে যে সত্যি কথা বলেছে সেই আমার ভাগ্যি। তা না হলে তার অনন্ত নরক হ’ত, সাত পুরুষ নরকস্থ হ’ত।

যতীন অবাক হইয়া গেল।

পদ্ম বলিল—জল গরম হয়েছে। চা তুমি করে নাও। আমি একবার দেখি সেই মুখপোড়া ছেলে দুটোকে। এখনও ফেরে নাই। সারাদিন খায় নাই।

—তুমিও তো খাওনি মা-মণি? খেয়ে নাও!—যতীনের মনে পড়িল—কাল পদ্মের নীল-ষষ্ঠীর উপবাস গিয়াছে। আজ আবার সে সারাদিন গাজনের উপবাস করিয়াছে।

—খাব। সে দুটোকে আগে ধরে আনি!

যতীন আর কিছু বলিবার পূর্বেই পদ্ম বাহির হইয়া গেল।

শ্রীহরির খিড়কীর ঘাটে শ্রীহরির মা উচ্চকণ্ঠে সবিস্তারে অনিরুদ্ধের শাস্তির কথা দম্ভ সহকারে ঘোষণা করিতেছে। এ সে বহুক্ষণ পূর্বেই আরম্ভ করিয়াছে; এখনও শেষ হয় নাই। পুত্রগর্বিতা বৃদ্ধা শুধু অপেক্ষা করিতেছে—অদূরে উচ্চকণ্ঠের একটি সবিলাপ রোদন-ধ্বনির।

কথাবার্তা কহিবার অবসর আজ খুব কমই হইতেছিল। চা খাওয়া শেষ করিয়া যতীন বলিল—চৌধুরী কেমন আছেন ডাক্তারবাবু?

দেবু চমকাইয়া উঠিল, অনিরুদ্ধের হাঙ্গামায় আজ দু-দিন চৌধুরীর সংবাদ লওয়াই হয় নাই।

জগন বলিল—একটু ভাল আছেন। তবে এই একটুকু ঘা আর কিছুতেই সারছে না। ঘায়ের মুখ থেকে অল্প অল্প পূঁজ পড়ছে, আর প্রায়ই সামান্য সামান্য জ্বর হচ্ছে।

যতীন বলিল—যাব একদিন দেখতে।

দেবু বলিল—কালই চলুন না সকালে। আমি যাব।

—আমাকে ডেকো দেবু। তোমাদেরই সঙ্গে যাব। আমাকে তো যেতেই হবে। একসঙ্গেই যাব। হরেন যাবে নাকি?

—টু-মরো তো হবে না ব্রাদার! পয়লা বোশেখ, খাতা ফেরার হাঙ্গামা আছে। আমাকে ছুটতে হবে আলেপুর, ইছু শেখের কাছে—গোটা চারেক টাকা আনতে হবে। নইলে বেটা বৃন্দাবনকে তো জান? একটি পয়সা আর ধার দেবে না।

পয়লা বৈশাখ হালখাতা। কথাটা যেন ঝনাৎ করিয়া পড়িল। কথাটা দেবুরও মনে হইল। ধার সে বড় করে না। তবে এবার তাহার অনুপস্থিতিতে দূর্গার মারফৎ জংশনের একটা দোকানে বাকী পড়িয়াছে—এগারো টাকা দশ আনা। অনিরুদ্ধের হাঙ্গামায় কথাটা তাহার মনেই হয় নাই। দূর্গাও কোন তাগাদা দেয় নাই। টাকাটা বা কোথা হইতে আসিবে? আসিয়া অবধি নিজের ভাবনা যে ভাবাই হয় নাই! কি হইবে?

কিন্তু না ভাবিলে ভবিষ্যৎ? সে যদি হঠাৎ মারা যায়, তবে কি বিলু এই পদ্মের মত কিংবা অবশেষে তারিণীর স্ত্রীর মত—ভাবিতেই সে শিহরিয়া উঠিল। বার বার সে নিজেকে ধিক্কার দিয়া উঠিল—ছি, ছি ছি! তবুও চিন্তা গেল না। বিলুর বদলে মনে হইল খোকার কথা। তাহার খোকাও কি ওই উচ্চিংড়ের মত—না না না। সে মনে মনেই বলিল—কিছুতেই না। কাল নববর্ষের প্রথম দিন হইতে সে নিজের ভাবনা ভাবিবে, আর নয়—আর নয়। স্ত্রী-পুত্র লইয়া—দারিদ্র্য লইয়া দশের ভাবনা ভাবিবার অধিকার তাহার নাই, সে অধিকার ভগবান তাহাকে দেন নাই। সে ভার—সে অধিকার শ্রীহরির। গোটা গাজনের খরচটা সে-ই দিয়াছে। গোটা দেশের লোককে ধান দাদন সে-ই দিয়াছে। সে ভার তাহার।

সে অত্যন্ত আকস্মিক ভাবে উঠিয়া পড়িল।

জগন জিজ্ঞাসা করিল—কি ব্যাপার হে? হঠাৎ উঠলে?

—একটা জরুরী কাজ ভুলেছি।

সে চলিয়া আসিল। পথে চণ্ডীমণ্ডপে উঠিয়া শিবকে প্রণাম করিল—হে দেবাদিদেব মহাদেব, ভালয় ভালয় এ বৎসর পার করে দিলে। আশীর্বাদ কর—আগামী বৎসরটি যেন ভালয় ভালয় যায়।

খোঁড়া পুরোহিত তাহাকে আশীর্বাদী নির্মাল্য দিল।

পথে নামিয়া সে বাড়ী গেল না। সে গেল দূর্গার বাড়ী। দূর্গাই দোকান হইতে ধার আনিয়া দিয়াছিল। তাহারই মারফতে একটা টাকা কাল সে পাঠাইয়া দিবে এবং মাসখানেক সময় চাহিয়া লইবে। সময় একটু বেশী লওয়াই ভাল। বৈশাখের প্রথমেই সে তিসি, মসিনা, গম, যব—যে কয়টা ঘরে আছে বিক্রি করিয়া দিবে। সর্বাগ্রে সে ঋণ পরিশোধ করিবে।

বাড়ীতে দূর্গার মা বসিয়াছিল, একা অন্ধকারে দাওয়ার উপর বসিয়া কাহাকে গালি দিতেছিল—রাক্ষস, প্যাটে আগুন নাগুক—আগুন লাগুক আগুন নাগুক! মরুক, মরুক, মরুক! আর হারামজাদী নচ্ছারী, বানের আগে কুটো—সব্বাগ্যে তোর যাওয়ার কি দরকার শুনি?

দেবু জিজ্ঞাসা করিল—ও পিসেস, দূর্গা কই!

বিলু দূর্গার মাকে বাপের বাড়ীর গ্রামবাসিনী হিসাবে পিসী বলে, তাই দেবু বলে—পিসেস্ অর্থাৎ পিস্-শাশুড়ী।

দূর্গার মা মাথায় একটু ঘোমটা টানিয়া দিল। জামাইয়ের সামনে মাথায় কাপড় না থাকিলে এবং জামাই মাথার চুল দেখিলে, চিতায় নাকি মাথার চুল পোড়ে না। ঘোমটা দিয়া দূর্গার মা বলিল—সে নচ্ছারীর কথা আর বলো না বাবা! বানের আগে কুটো... ‘রূপেন’ বায়েনের কিনা কি ব্যামো হয়েছে, তাই সব্বাগ্যে গিয়েছেন তিনি।

‘রূপেন’ অর্থাৎ উপেন। আত্মীয়জনহীন বৃদ্ধ উপেন, আহা-হা বেচারী! কেউ নাই সংসারে। কিন্তু সে তো এখানে থাকে না। সে তো কঙ্কণায় ভিক্ষা করিত!

দেবু প্রশ্ন করিল—উপেন আজকাল গাঁয়ে ফিরেছে নাকি?

—মরতে ফিরেছে বাবা। গাঁয়ে আগুন লাগাতে ফিরেছে। কাল থেকে গাঁয়ে গাজনের মেলা দেখতে এসেছে। আজ সকালে ফুলুরীর দোকানদার কতকগুলো তে-বাসী ফুলুরী ফেলে দিয়েছিল—সেনেটারী বাবু আসবে শুনে। রূপেন তাই কুড়িয়ে গবাগব খেয়েছে। খেয়ে সন্ধ্যে থেকে ‘নামুনে’ হয়েছে। আমাদের দুগ্‌গা বিবি তাই শুনে দেখতে ছুটেছেন। আহা-হা, দরদ কত! কি বলব বাবা বল?

‘নামুনে’ অর্থাৎ কলেরা! সর্বনাশ! সম্মুখে এই বৈশাখ মাস—কোথাও এক ফোটা পানীয় জল নাই! এই সময় কলেরা।

সে দ্রুতপদে আসিয়া উঠিল উপেনের বাড়ী। এক মুহূর্তে তাহার সব ভুল হইয়া গেল।

উঠানে মাটির উপর পড়িয়া জরা-জীর্ণ বৃদ্ধ ছটফট করিতেছিল—জ-ল—জ-ল—জ-ল! স্বর অনুনাসিক হইয়া উঠিয়াছে। অন্য কেহ নাই, কেবল দূর্গা দাঁড়াইয়া আছে, সে যথাসাধ্য সংস্পর্শ বাঁচাইয়া একটা ভাড়ে করিয়া তাহাকে জল ঢালিয়া দিয়াছে। বৃদ্ধ কিন্তু আপনার জল খাইবার ভাঁড়ের নিকট হইতে অনেকটা দুরে আসিয়া নিস্তেজ হইয়া পড়িয়াছে। কম্পিত বাহু বিস্তার করিয়া বিস্ফারিত দৃষ্টিতে তীব্র ব্যগ্রতায় সে চীৎকার করিতেছে—জল—একটু জল!

দেবু অগ্রসর হইল, ভাঁড়টি লইয়া উপেনের মুখের কাছে বসিয়া একটু একটু করিয়া জল ঢালিয়া দিতে আরম্ভ করিল। দূর্গাকে বলিল—দূর্গা, শীগগির গিয়ে একবার জগনকে খবর দে। বলবি আমি বসে রয়েছি।

যতীনের কথাও একবার মনে হইল। কিন্তু পরক্ষণেই ভাবিল—বিদেশী ভদ্রলোক! তাহাকে এসব বিপজ্জনক ব্যাপারে টানিয়া আনা উচিত হইবে না। এ তাহাদের গ্রাম, এখানকার সকল দুঃখকষ্ট একান্ত করিয়া তাহাদের। অতিথি আগন্তুককে দিতে হয় সুখের ভাগ। দুঃখের ভাগ কি বলিয়া কোন্ মুখে সে তাহাকে লইতে আহ্বান করিবে!


সাতাশ



শুভ নববর্ষ। বৃদ্ধেরা শিহরিয়া উঠিল। নিতান্ত অশুভ প্রারম্ভ। রুদ্ররূপে মৃত্যু প্রবেশ করিয়াছে—সঙ্গিনী মহামারীকে লইয়া। চণ্ডীমণ্ডপে বর্ষগণনা পাঠ ও পঞ্জিকা-বিচার চলিতেছে। করিতেছে খোঁড়া পুরোহিত, শুনিতেছে শ্রীহরি ঘোষ এবং প্রবীণ মণ্ডলেরা।

গতরাত্রির শেষভাগ হইতে বায়েনপাড়ার তিন জন আক্রান্ত হইয়াছে; বাউড়ীপাড়ায় দুই জন। উপেন মরিয়াছে। শ্রীহরি গম্ভীরভাবে বসিয়া ভাবিতেছিল। এ যে প্রকাণ্ড দায়িত্ব সম্মুখে। গ্রামকে রক্ষা করিতে হইবে। হতভাগ্যের দল, তাহার সহিত বিরোধিতা করিয়াছে বলিয়া সে এ সময় বিমুখ হইলে, সে যে ধর্মে পতিত হইবে। অবশ্য কাজ সে আরম্ভ করিয়া দিয়াছে। ভূপাল চৌকিদারকে ইউনিয়ন বোর্ডে পাঠাইয়াছে। স্যানিটারি ইন্সপেক্টারের কাছে সংবাদ দিতে ইউ-বির সেক্রেটারিকে পত্র দিয়াছে। লোকটি কাল সকালেই আসিয়াছিল। বাউড়ীপাড়ায়, বায়েনপাড়ায় কিছু চাল সাহায্য দিবার কথাও সে ভাবিয়া রাখিয়াছে। চণ্ডীমণ্ডপের ইদারাটিকে কলেরার সংস্পর্শ হইতে বাঁচাইয়া রাখিবার জন্য কঠোর ব্যবস্থা করিয়াছে। কালু শেখ পাহারায় মোতায়েন আছে।

বুড়ী রাঙাদিদি আজ সকালে ভগবানকে গাল দেয় নাই; সে জোড়হাতে তারস্বরে বার বার বলিতেছে—ভগবান, রক্ষে কর, হে ভগবান! দোহাই তোমার বাবা! তুমি ছাড়া গরীবের আর কে আছে দয়াময়! গেরাম রক্ষা কর বাবা বুড়োশিব! হে বাবা! হে ভোলানাথ! হে মা কালী।

পদ্ম আকুল হইয়া উঠিয়াছে উচ্চিংড়ে ও গোবরার জন্য। আসাপা ছেলে—সাপ দেখিলে ধরিবার মত দুঃসাহস উহাদের; কি করিয়া উহাদের সে বাঁচাইবে? তাহার সর্বাঙ্গ থরথর করিয়া কাঁপিতেছে।

যতীনও চিন্তান্বিত হইয়া উঠিয়াছে; বাংলাদেশে কত লোক কলেরায় মরে, কত লোক ম্যালেরিয়ায় মরে, কত লোক অনাহারে মরে, কত লোক অর্ধাশনে থাকে—এ সব তথ্য সে জানে। নিয়তিকে সে স্বীকার করে না। সে জানে এ মনুষ্যকৃত ত্রুটি, আপনাদের অজ্ঞানতার অক্ষমতার অপরাধের প্রতিফল। অপরাধ একমাত্র এই দেশটিতেই আবদ্ধ নয়—মানুষের ভ্রম হইতে, ভেদবুদ্ধি হইতে, অক্ষমতা হইতে উদ্ভূত এ অপরাধ পৃথিবীর সর্বত্র ব্যাপ্ত। ব্যাধি এক দেশ হইতে অন্য দেশে সংক্রামিত হয় নাই, সেই দেশ হইতেই উদ্ভূত হইয়াছে—অর্থগৃধ্নুর ধন উপার্জন-শক্তির প্রতিক্রিয়ায় চৌর্যের মত, দানধর্মের প্রতিক্রিয়ায় ভিক্ষাব্যবসায়ের মত। পুলিশ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন-রিপোর্ট সে পড়িয়াছে—ভিক্ষুকের দল এক-একটা শিশুকে হাঁড়ির ভিতর দিবারাত্র বসাইয়া রাখে—বৎসরের পর বৎসর বসাইয়া রাখে, যাহাতে তাহাদের অর্ধাঙ্গ বৃদ্ধি না পায়, পুষ্ট না হয়। পরে ইহাদের বিকলাঙ্গের দোহাই দিয়া দিব্য ভিক্ষার ব্যবসার পুতুল করিয়া তোলে। হয়তো এ দেশের ত্রুটি বেশি, এ দেশে লোক বেশি মরে, কুকুর-বিড়ালের মত মরে। তাহার প্রতিকারের চেষ্টাও চলিতেছে। হয়তো একদিন—তাহার চোখ জ্বলজ্বল করিয়া জ্বলিয়া উঠিল—আরতির যুগল কপূর-প্রদীপের শিখার মত মুহূর্তের জন্য, পরমুহূর্তেই সে একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিল। কালের দ্বারে বলি ভাবিয়া দৃঢ়চিত্তে আজ কিন্তু এ সমস্ত সে দেখিতে পারিতেছে না। পদ্মের মত সমস্ত গ্রামখানাই কবে কখন তাহার সমস্ত অন্তরকে মমতায় আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিয়াছে—সে বুঝিতে পারে নাই। গ্রামের এই বিপর্যয়ে—বিয়োগে-শোকে সে নিতান্ত আপনজনের মতই একান্ত বিষণ্ণ ও ব্যথিত হইয়া উঠিল।


****


বৈশাখের প্রথম দিন। সেই মধ্যরাত্রে কিছু বৃষ্টি হইয়াছে, তারপর আর হয় নাই। হু-হু করিয়া গরম ধূলিকণাপূর্ণ বাতাস বহিতেছে ঝড়ের মত। সেই বাতাসে শরীরের রক্ত যেন শুকাইয়া যাইতেছে। মাটি তাতিয়া আগুন হইয়া উঠিয়াছে। চারিদিকে যেন একটা তৃষাতুর হা-হা-ধ্বনি উঠিয়াছে। কোথাও মানুষ দেখা যায় না। এক দিনেই এক বেলাতেই একটা মানুষের মৃত্যুতেই মানুষ ভয়ে ত্রস্ত হইয়া ঘরে ঢুকিয়াছে, একটা মানুষও আর পথের উপরে নাই।

শুধু বাহির হইয়াছে দেবু ও জগন। তাহারা এখনও ফেরে নাই। যতীনও একবার বাহির হইয়াছিল, অল্পক্ষণ পূর্বে ফিরিয়াছে। সে ফিরিতেই পদ্ম অঝোর-ঝরে কাঁদিয়া বলিল—আমাকে খুন কোরো না তুমি—তোমার পায়ে পড়ি। দোহাই একটু সাবধানে থাক তুমি।

যতীন ভাবিয়া পায় না—এই অবোধ মা-মণিকে সে কি বলিবে?

দেবু গিয়াছে উপেনের সৎকারে। সকাল হইতে দেবু যেন একাই একশো হইয়া উঠিয়াছে। এই অর্ধ-শিক্ষিত পল্লী-যুবকটির কর্মক্ষমতা ও পরার্থপরতা দেখিয়া যতীন বিস্মিত হইয়া গিয়াছে। আরও একটা নূতন জিনিস সে দেখিয়াছে। ডাক্তারের অভিনব রূপ। চিকিৎসকের কর্তব্যে তাহার এতটুকু ত্রুটি নাই। শৈথিল্য নাই। এই মহামারী ক্ষেত্রে নির্ভীক জগন—পরম যত্নের সহিত প্রতিটি জনকে আপনার বিদ্যাবুদ্ধি মত অকাতরে চিকিৎসা করিয়া চলিয়াছে। গ্রামে সে কখনও ফি লয় না; কিন্তু এমন ক্ষেত্রে, কলেরার মত ভয়াবহ মহামারীর সময় ডাক্তারদের উপার্জনের বিশেষ একটা সুযোগ পাইয়াও জগন আপনার প্রথা-রীতি ভাঙে নাই, এটা জগনের লুকাইয়া রাখা একটা আশ্চর্য মহত্ত্বের পরিচয়। মুখে আজ তাহার কর্কশ কথা পর্যন্ত নাই, মিষ্ট ভাষায় সকলকে অভয় দিয়া চলিয়াছে।

দেবু ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডে টেলিগ্রাম পাঠাইয়াছে। টেলিগ্রাম লইয়া জংশনে গিয়াছে দূর্গা। ইউনিয়ন বোর্ডেও দেবু সংবাদ পাঠাইয়াছে, পাতু সেখানে গিয়াছে। নিজে সে রোগাক্রান্তদের বাড়ী বাড়ী ঘুরিয়াছে। যাহারা গ্রাম হইতে সরিয়া যাইতে চাহিয়াছে—তাহাদিগকে সাহায্য করিয়াছে। তারপর উপেন বায়েনের সৎকারের ব্যবস্থা করিতে বসিয়াছে। বায়েনদের মধ্যে এখানে সক্ষম পুরুষ মাত্র তিন জন। তাহাদের এক জন পলাইয়াছে। বাকি দুই জন রাজি থাকিলেও দুই জনে একটা শব লইয়া যাওয়া অসম্ভব কথা। পাশেই বাউড়ীপাড়ায় অনেক লোক আছে বটে, কিন্তু বাউড়ীরা মুচীর শব স্পর্শ করিবে না। তবে বাউড়ীদের মাতব্বর সতীশ তাহার সঙ্গে আছে।

শ্মশানের পথও কম নয়, ময়ূরাক্ষীর গর্ভের উপর শ্মশান দূরত্ব দেড় মাইলের উপর। অনেক চিন্তা করিয়া শেষে বেলা এগারটার সময় আপনার গাড়ী গরু আনিয়া, দেবু গাড়ীতে করিয়া উপেনের সৎকারের ব্যবস্থা করিল।

সৎকারের ব্যবস্থা করিয়াই তাহার কর্তব্য শেষ হইল না; বাউড়ী-বায়েনদের দায়িত্বজ্ঞান কম হয়তো গ্রামের কাছেই কোথাও ফেলিয়া দিবে আশঙ্কা করিয়া সে শবের সঙ্গে শ্মশান পর্যন্ত যাইতে প্রস্তুত হইল। তা ছাড়া পাতুও তাহার সঙ্গী—মাত্র দুই জনে এই কলেরারোগীর মৃতদেহ লইয়া শ্মশানে যাইতে তাহারা যেন ভয় পাইতেছিল। দেবু তাহা অনুভব করিল। এবং বলিল—ভয় করছে পাতু?

শুকমুখে পাতু বলিল—আজ্ঞে?

—ভয় করছে নিয়ে যেতে?

—করছে একটুকু। ভয়ার্ত শিশুর মতই অকপটে সে স্বীকার করিল।

—তবে চল, আমি তোমাদের সঙ্গে যাই।

—আপুনি?

—হ্যাঁ, আমি। চল যাই।

পাতু ও তাহার সঙ্গীর মুখ উজ্জ্বল হইয়া উঠিল। পাতু বলিল—আপুনি বাঁধের ওপরটিতে শুধু দাঁড়াবেন তা হলেই হবে।

—চল, আমি শ্মশান পর্যন্তই যাব।

প্রচণ্ড উত্তাপে উত্তপ্ত বৈশাখী দ্বিপ্রহরে তাহারা গাড়ীর উপর শবদেহ চাপাইয়া বাহির হইয়া পড়িল। মাঠ আজ জনশূন্য। রাখালেরা সকলেই প্রায় এই বাউড়ী-বায়েনের ছেলে—তাহারা এমন আতঙ্কিত হইয়া উঠিয়াছে যে, মাঠে গরু লইয়া আসে নাই। গ্রামের আশপাশেই গরু লইয়া চুপচাপ বসিয়া আছে। বৈশাখী দ্বিপ্রহরে এই ধু-ধু করা প্রান্তরে আসিয়া যদি অকস্মাৎ তাহারা রোগাক্রান্ত হইয়া পড়ে, তাহা হইলে কি হইবে? মাঠে আগুনের মত ধুলায় পড়িয়া তৃষ্ণায় ছটফট করিয়া মরিবে যে! এই আতঙ্কে তাহারা আতঙ্কিত। চারিদিকে যতদূর দৃষ্টি যায় মাঠখানা খাঁ-খাঁ করিতেছে। মধ্যে যে বৃষ্টি হইয়া গিয়াছে, তাহার আর এক বিন্দুও কোথাও জমিয়া নাই। মাটির রস পর্যন্ত শুকাইয়া গিয়াছে। প্রাচীন কালের বড় বড় সেঁচের পুকুরগুলি এমনভাবে মজিয়া গিয়াছে, মোহনার বাঁধ এমনভাবে ভাঙিয়া গিয়াছে যে, বিন্দু বিন্দু করিয়া যে জল ভিতরে জমে, তাহাও নিঃশেষে বাহির হইয়া আসে। গ্রামের প্রান্ত হইতে ময়ূরাক্ষী পর্যন্ত কোথাও এক ফোঁটা জল নাই। ঝড়ের মত প্রবল বৈশাখী দ্বিপ্রহরের বাতাসে মাঠের ধুলা উড়িতেছে; তাহাতে যেন আগুনের স্পর্শ। ইহারই মধ্যে গাড়ীটা ধীর গতিতে চলিয়াছিল। ক্যাঁ-ক্যাঁ-ক্যাঁ—চাকার দীর্ঘ একটানা একঘেয়ে শব্দ উঠিতেছে। ক্যাঁ-ক্যাঁ—

পাতু বলিল—এবার আর আমাদের রক্ষে নাই; কেউ বাঁচবে না পণ্ডিত মশায়।

দেবু স্নেহসিক্ত স্বরে অভয় দিয়া বলিল—তুই পাগল পাতু! ভয় কি?

—ভয়? পাতু হাসিল, বলিল—একেবারে পয়লা বোশেখ নামুনে ঢুকল গাঁয়ে। তা ছাড়া লোকে বলছে—এবার আমরা চণ্ডীমণ্ডপ ছাইয়ে দিলাম না—বাবা বুড়োশিবের রাগেই হয়তো—

দেবুও একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিল। সে দেবধর্মে বিশ্বাসী। কিন্তু বাবা কি এমনই অবিচার করিবেন? নিরপরাধের অপরাধটাই বড় হইবে তাঁহার কাছে? দেবোত্তর সম্পত্তি যাহারা আত্মসাৎ করিয়া লইয়াছে, তাহাদের তো কিছু হয় নাই? সে দৃঢ়স্বরে বলিল—না পাতু, বাবার কাছে কোনো অপরাধ তোমাদের হয় নাই। আমি বলছি।

পাতু বলিল—তবে ইরকমটা ক্যানে হল পণ্ডিত মশাই?

দেবু কলেরার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আরম্ভ করিল।

উঃ! এই ঠিক দুপুরে স্ত্রীলোক কে এদিকে আসিতেছে? বোধ হয় জংশন হইতে ফিরিতেছে। হ্যাঁ, তাই তো। এ যে দূর্গা! দূর্গা টেলিগ্রাম পাঠাইয়া ফিরিতেছে।

উপেনের শবের সঙ্গে দেবুকে দেখিয়া থমকিয়া দাঁড়াইল—নিকটে আসিয়া তিরস্কার-ভরা কণ্ঠ করিয়া বলিল—এ কি করেছ জামাই! তুমি কেন এলে? তুমি যাচ্ছ কেন? ফের!

দেবু কথাটা একেবারে ঘুরাইয়া দিল—এতক্ষণে ফিরলে দূর্গা! টেলিগ্রাম হল?

—হল। কিন্তু তুমি কিসের লেগে যাচ্ছ জামাই? ফিরে চল!

—ফিরছি, তুই যেতে লাগ।

—না, তুমি ফের আগে!

—পাগলামি করিস না দূর্গা। তুই যা, আমি শিগগির ফিরব।

তাহারা চলিয়া গেল; দূর্গার চোখ দিয়া অকারণে জল পড়িতে আরম্ভ করিল।


 


শীঘ্র ফিরিব বলিলেও শীঘ্র ফেরা হইল না। ফিরিতে অপরাহ্ণ গড়াইয়া গেল। ময়ূরাক্ষীর কাদা-বালি-গোলা, হাঁটুডোবা জলে কোনোমতে স্নান সারিয়া বাড়ী আসিয়া দেবু ডাকিল—বিলু!

ছুটিয়া বাহির হইয়া আসিল খোকা, তাহার খোকনমণি। দুটি হাত বাড়াইয়া সে ডাকিল—বা-বা!

দেবু দুই পা পিছনে সরিয়া আসিয়া বলিল—না, না, ছুঁয়ো না আমাকে। না।

খোকন আমোদ পাইয়া গেল। মুহূর্তে তাহার মনে পড়িয়া গেল লুকোচুরি খেলার আমোদ, সে খিলখিল করিয়া হাত বাড়াইয়া আরও ছুটিয়া আসিল। খোকনের আমোদের ছোঁয়াচ দেবুকেও লাগিল—সে আরও খানিকটা সরিয়া আসিয়া বলিল—না খোকন, দাঁড়াও ওখানে। তারপর সে ডাকিল বিলুকে।—বিলু—বিলু!

বিলু বাহির হইয়া আসিল—অভিমান-স্ফুরিতাধরা। সে কোনো কথা বলিল না। চুপ করিয়া স্বামীর আদেশের প্রতীক্ষায় দরজার কাছে দাঁড়াইয়া রহিল। দেবু কি তাহার সর্বনাশ করিতে চায়? এই প্রখর গ্রীষ্ম, তাহার উপর এই ভয়ঙ্করী মহামারী, দেবু সেই মহামারী লইয়া মাতিয়া উঠিল—তাহার সর্বনাশ করিবার জন্য? সে সমস্ত দুপুর কাঁদিয়াছে।

দূর্গা আসিয়াছিল। সে বিলুকে তিরস্কার করিয়া গিয়াছে। বলিয়া গিয়াছে, একটুকুন শক্ত হও বিলু-দিদি, জামাই-এর একটু রাস টেনে ধর। নইলে এই রোগের পিছুতে ও আহার নিদ্রে ভুলবে, হয়তো তোমাদের সর্বনাশ—নিজের সর্বনাশ করে ফেলবে।

দেবু তাহার মুখের দিকে চাহিয়া তাহার অভিমান অনুভব করিল। হাসিয়া বলিল—আমার বিলুমণির রাগ হয়েছে? শিগগির একটু খোকাকে ধর বিলু!

বিলুর চোখের জল আর বাঁধ মানিল না। ঝরঝর করিয়া সে কাঁদিয়া ফেলিল।

দেবু বলিল—কেঁদো না, ছি! কথা শোন, শিগগির ধর খোকাকে। আর আমাকে একটু খড় জ্বেলে আগুন করে দাও, তারপর তাড়াতাড়ি এককড়া জল গরম চাপাও। গরম জলে হাত-পা ধুয়ে ফেলব; কাপড়-জামাও গরম জলে ফুটিয়ে নিতে হবে।

বিলু কোনো কথা বলিল না, ছেলেটিকে টানিয়া কোলে তুলিয়া লইল। ছেলেটি দেবুকে সকাল হইতে দেখিতে পায় নাই, সে চিৎকার আরম্ভ করিয়া দিল—বাবা দাব! বাবা দাব!

বিলু তাহার পিঠে একটা চাপড় বসাইয়া দিয়া বলিল—চুপ কর বলছি, চু-উ-প। তবুও তাহার জিদ দেখিয়া তাহাকে দুম করিয়া নামাইয়া দিল।

দেবু আর সহ্য করতে পারিল না। বিলুকে তিরস্কার করিয়া বলিল—আঃ বিলু! ও কি হচ্ছে? শিগগির ওকে কোলে নাও বলছি।

বিলু আজ ক্ষেপিয়া গিয়াছে, সে বলিল—কেন, তুমি মারবে নাকি? ছেলের আদর কত করছ—তা জানি।

দেবু স্তম্ভিত হইয়া গেল।

বিলু হু-হু করিয়া কাঁদিয়া উঠিল; বলিল—এমন দগ্ধে মারার চেয়ে আমাকে তুমি খুন করে ফেল। আমাকে তুমি বিষ এনে দাও।

দেবু উত্তর দিতে গেল—সান্ত্বনা-মধুর উত্তরই সে দিতেছিল। কিন্তু দেওয়া হইল না। সর্পদৃষ্টের মত সে চমকিয়া উঠিল, শিহরিয়া উঠিল—পিছন হইতে খোকা তাহাকে দুই হাত দিয়া জড়াইয়া ধরিয়া খিল খল করিয়া হাসিতেছে। ধরিয়াছে, সে ধরিয়াছে—পলাতককে সে ধরিয়াছে। দেবু পিছন ফিরিয়া খোকার দুই হাত শক্ত করিয়া ধরিয়া ফেলিল, আর্তস্বরে বিলুকে বলিল—শিগগির জল গরম কর বিলু, শিগগির। খোকার হাত ধুয়ে দিতে হবে। এখুনি হয়তো ওই হাত মুখে দেবে।

খোকা দুরন্ত অভিমানে চিৎকার করিয়া হাত পা ছুঁড়িয়া কাঁদিয়া অস্থির হইয়া উঠিল। তাহার ধারণা হইল—তাহার বাবা তাহাকে দূরে ঠেলিয়া দিতেছে। শুধু সে কাঁদিলই না—ঝুঁকিয়া পড়িয়া রোষে ক্ষোভে দেবুর হাতের এক জায়গায় কামড়াইয়া প্রায় ক্ষতবিক্ষত করিয়া দিল। শেষে তাহার ভিজা কাপড়ের খানিকটাও দাঁত দিয়া ছিঁড়িয়া দিল।

দেবু ইহাতে রীতিমত আতঙ্কিত হইয়া উঠিল। বিলুকে একপ্রকার হাত ধরিয়া বাড়ীর মধ্যে টানিয়া আনিয়া বলিল—বিলু, লক্ষ্মীটি, সব বুঝিয়ে বলছি তোমায়। চট করে এখনই গরম জল চড়াও। খোকার মুখখানা তাড়াতাড়ি ধুইয়ে দাও।—

 

বিলুর রাগ কিন্তু একটু পরেই নিভিয়া গিয়াছে। দেবুর কোলে খোকনকে দেখিয়া সে মহাখুশি হইয়া উঠিয়াছে। বলিল—তুমি কি নিষ্ঠুর বল দেখি! ছেলেটা আমার চেয়েও তোমাকে ভালবাসে—আর তুমি কিনা ওকে ফেলে বাইরে বাইরে থাক! তোমার বোধহয় বাড়ীর বাইরে পা দিলে সংসার বলে কিছুই মনে থাকে না! ছিঃ, খোকাকে ভুলে যাও তুমি?

দেবু বলিল—না। আর যাব না বিলু, আমি প্রতিজ্ঞা করছি আর যাব না।

গরম জলে মুখ হাত পা ধোওয়াইয়া, নিজে ধুইয়া দেবু খোকাকে এতক্ষণে ভাল করিয়া কোলে লইল। বাপের কোলে থাকিয়াই সে মাকে কাছে আসিতে দেখিয়া বাপের বুকে মুখ লুকাইল। বিলু দেখিয়া হাসিয়া বলিল—ওই দেখ দেখি।

খোকন বলিয়া উঠিল—না, দাব না। না, দাব না।

বিলু খিলখিল করিয়া হাসিয়া বলিল—ওরে দুষ্ট ছেলে! না, দাবে না তুমি? বাপ পেয়ে আমায় ভুললে বুঝি? আচ্ছা, আমিও তোমাকে মেনু দেব না!

খোকন এবার মায়ের মন রাখিতে দেবুকে বলিল—বাবা, মা দাই!

বিলু বলিল—উঁহুঁ! বাবাকে ধরে রাখ, বাবা পালাবে।

দেবুর বুকখানা রুদ্ধ আবেগে তোলপাড় করিয়া উঠিল।

সেটা বিলুর চোখে পড়িল। সে শঙ্কিত হইয়া প্রশ্ন করিল—হ্যাঁগা, তোমার শরীরটা ভাল আছে তো?

হাসিবার চেষ্টা করিয়া দেবু বলিল—শরীরটা খুব ক্লান্ত হয়েছে।

—একটু চা করব, খাবে?

—কর।

চা খাইয়াও সে তেমনি নীরব বিষণ্ণতার মধ্যে উদ্বেগ-উদ্বেলিত অন্তরে একটা ভীষণ কিছু অপেক্ষা করিয়া রহিল। সন্ধ্যার সময় বাউড়ী-বায়েনপাড়ায় একটা কান্নার রোল উঠিল। কেহ নিশ্চয় মরিয়াছে। দেবু খোকাকে ঘুম পাড়াইতে পাড়াইতে অধীর হইয়া উঠিল।

বিলু বলিল—কেউ ম’ল বোধহয়!

তিক্তস্বরে দেবু বলিল—মরুক গে, আমি আর খোঁজ নিচ্ছি না।

অবাক হইয়া বিলু তাহার মুখের দিকে চাহিয়া রহিল; তারপর বলিল—আমি কি তোমাকে বলেছি যে, কেউ মলে তুমি খোঁজ করবে না, না তাদের বিপদে তুমি দেখবে না! উপেন বায়েন—মুচী, তার সৎকারের জন্যে গাড়ী দিলে, আমি কিছু বলেছি? কিন্তু তুমি শ্মশান পর্যন্ত সঙ্গে গেলে কেন বল দেখি? খাওয়া নাই—এই বোশেখ মাসের রোদ! তাই বলেছি আমি।

খোকা দেবুর কোলে ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল। বিলু খোকাকে দেবুর কোল হইতে লইয়া বলিল—যাও, একবার দেখে এখুনি ফিরে এস। তোমার উপর কত ভরসা করে ওরা তো জানি।

দেবু যন্ত্রচালিত পুতুলের মতই বিলুর কথায় বাড়ী হইতে বাহির হইয়া পড়িল। চণ্ডীমণ্ডপে খোল-করতাল লইয়া হরিনাম-সংকীর্তনের দল বাহির করিবার উদ্যোগ হইতেছে। মৃদঙ্গের ধ্বনিতে নাকি অমঙ্গল দূরীভূত হয়।

ও-পাড়ার ধর্মদেবের পূজার আয়োজন চলিতেছে। সে সতীশকে ডাকিল। সতীশ আসিয়া তাহাকে প্রণাম করিয়া বলিল—অবস্থা যে ভয়ানক হয়ে উঠল পণ্ডিতমশায়! বিকেলে আবার দুজনার হয়েছে। গণার পরিবার একটুকু আগে মারা গেলেন।

—তাড়াতাড়ি সৎকারের ব্যবস্থা কর।

—আজ্ঞে হ্যাঁ। সেসব করছি। কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া অপরাধীর মত সে বলিল—উ বেলায় রূপেনের মড়া নিয়ে আপনাকে—কি করব বলেন! আমাদের জাত তো লয়। আমাদের লেগে আপনাকে এত ভাবতে হবে না।

কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া দেবু বলিল—ডাক্তার বিকেলে এসেছিল?

—আজ্ঞে হ্যাঁ। বিকেলে আবার ঘোষমশায় নোক পাঠিয়েছিলেন—চাল দেবেন বলে। তা ডাক্তারবাবু বললেন—কিছুতেই লিবি না।—আমরা যাই মশায়।

দেবু অন্যমনস্কভাবে চুপ করিয়া রহিল। তাহার মনের মধ্যে ধীরে ধীরে একটা গভীর উদাসীনতা যেন নিবিড় কুয়াশার মত জাগিয়া উঠিতেছে—তাহার সুখ দুঃখ সব যেন সংবেদন-শূন্যতায় আচ্ছন্ন হইয়া যাইতেছে। যে গভীর উদ্বেগ সে সহ্য করিতেছিল—সেই উদ্বেগ যেন পুরাণের নীলকণ্ঠের হলাহল। নীলকণ্ঠের হলাহলের মতই তাহাকে যেন মোহাচ্ছন্ন করিয়া ফেলিয়াছে।

সতীশ আবার ডাকিল—পণ্ডিতমশায়!

—আমাকে কিছু বলছ?

সতীশ অবাক হইয়া গেল, বলিল—আজ্ঞে হ্যাঁ।

পণ্ডিতমশায় আর কে আছে এখানে, ও-নামে আর কাহাকে ডাকিবে সে?

—কি বল?

—বলছি। রাগ করবেন না তো?

—না না, রাগ করব কেন?

—বলছিলাম কি, ঘোষমশায় চাল দিতে চাইছেন, তা লিতে দোষ কি? অভাবী নোক সব এই মহা বেপদের সময়—

দেবু প্রসন্ন সহানুভূতির সঙ্গেই বলিল—না না, কোনো দোষ নাই সতীশ। ঘোষমশায় তো শত্রু নন তোমাদের, আমাদেরও নন। তিনি যখন নিজে যেচে দিতে চাচ্ছেন—তখন নেবে বৈকি।

সতীশ দেবুর পায়ের ধূলা লইয়া বলিল—আপনকার মত যদি সবাই হত পণ্ডিতমশায়! আপনি একটুকুন বলে দেবেন ডাক্তারবাবুকে। উনি আবার রাগ করবেন।

—আচ্ছা, আচ্ছা। আমি বলে দোব ডাক্তারকে।

—ডাক্তারবাবু বসে আছেন নজরবন্দিবাবুর কাছে।

দেবু ফিরিল। কিন্তু আজ আর যতীনের ওখানে যাইতে ইচ্ছা হইল না। সে বাড়ীর পথ ধরিল। বাড়ীতে দূর্গা আসিয়া বসিয়া আছে। দূর্গা বলিল—আমাদের পাড়া গিয়েছিলে জামাই পণ্ডিত? গণার বউটা মারা গেল, নয়?

—হ্যাঁ। সে বিলুকে বলিল—খোকন কই?

—সে সেই ঘুমিয়েছে, এখনও ওঠে নি।

ঘুমিয়েছে! দেবু একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলিল। প্রায় ঘণ্টাচারেক কাটিয়া গেল, খোকা নিশ্চিন্ত হইয়া ঘুমাইতেছে। ঘুম সুস্থতার একটা লক্ষণ। তারপর সে দূর্গাকে প্রশ্ন করিল—তুই এতক্ষণ ছিলি কোথায়?

—জংশন গেছলাম।

বিলু বলিল—একটু জল খাও। দূর্গা খাতা ফিরিয়ে মিষ্টি এনেছে।

—তাই তো। হারে দূর্গা, জংশনে দোকানদারদের কাছে ভারি কথার খেলাপ হয়ে গেল রে!

—সেসব ঠিক হয়েছে গো, তোমাকে অত ভাবতে হবে না।

দূর্গা হাসিল—বিলু-দিদির মত লক্ষ্মী তোমার ঘরে, ভাবনা কি? বিলু-দিদি আমাকে দু টাকা দিয়েছিল, আমি দিয়ে এসেছি। আবার সেই আষাঢ়ে কিছু দিয়ো রথের দিনে, আর কিছু আশ্বিনে,—দোকানি তাতেই রাজি হয়েছে।

পরম আরামের একটা নিশ্বাস ফেলিয়া এতক্ষণে সত্যকার হাসি হাসিয়া দেবু বলিল—বিলু, আমি যতীনবাবুর কাছ থেকে একটু ঘুরে আসি, বুঝলে?

—এই রাত্তিরে আবার বেরুচ্ছ? তা একটুকুন জল খেয়ে যাও।

—আমি যাব আর আসব। জল এখন আর খাব না।

—আচ্ছা উপোস করতে পার তুমি! বিলু হাসিল। দেবু বাহির হইয়া গেল।

যতীনের আসরে আজ কেবল যতীন, জগন, আর চা-প্রত্যাশী গাঁজাখোর গদাই। চিত্রকর নলিনও আসিয়া একটি কোণে অভ্যাসমত চুপ করিয়া বসিয়া আছে। সে আজ একটি টাকা চাহিতে আসিয়াছে। গ্রাম ছাড়িয়া কয়েক দিনের জন্য সে অন্যত্র যাইবে।

জগন অনর্গল বকিতেছে। দেবুকে দেখিয়া ডাক্তার বলিল—কি ব্যাপার হে, এ বেলা পাত্তাই নাই! আমি ভাবলাম, তুমি বুঝি ভয় পেয়েছ।

দেবু হাসিল।

যতীন বলিল—শরীর কেমন দেবুবাবু? শুনলাম শ্মশানে গিয়েছিলেন, ফিরেছেন চারটের পর।

—শরীর খুব ক্লান্ত। নইলে ভালই আছি।

—তুমি মুচী মড়ার সঙ্গে গিয়েছ, চণ্ডীমণ্ডপে গিয়ে দেখে এসো একবার ব্যাপারটা! আর তোমার রক্ষে নাই।

দেবু ও-কথা আমলেই আনিল না, বলিল—আচ্ছা ডাক্তার, কলেরার বিষ যদি শরীরে ঢোকে, তবে কতক্ষণ পরে রোগ প্রকাশ পায়?

জগন হো-হো করিয়া হাসিয়া উঠিল—তুমি ভয় পেয়ে গিয়েছ দেবু-ভাই!

গদাই ওপাশ হইতে সসঙ্কোচে বুলিল—কিসের ভয়? ওর ওষুধ হল এক ছিলিম গাঁজা।

দেবু আর কোনো প্রশ্ন করিল না, প্রশ্ন করিতেও তাহার ভয় হইতেছে। বিজ্ঞানের সত্য যদি তাহার উৎকণ্ঠা বাড়াইয়া দেয়? সে বারবার মনে করিল—বিজ্ঞানই একমাত্র সত্য নয়, এ সংসারে আর একটা পরম তত্ত্ব আছে—সে পুণ্য, সে ধর্ম। তাহার ধর্ম, তাহার পুণ্য তাহাকে রক্ষা করিবে। সেই অমৃতের আবরণ থোকাকে মহামারীর বিষ হইতে অবশ্যই রক্ষা করিবে।

যতীন বলিল—কি ব্যাপার বলুন তো দেবুবাবু? হঠাৎ এ প্রশ্ন করলেন কেন আপনি?

দেবু বলিল—আজ যখন বাড়ী ফিরলাম, শ্মশানে উপেনের শব আমাকে ধরতে হয়েছিল; তারপর অবিশ্যি ময়ূরাক্ষীতে স্নান করেছি। তারপর বাড়ী ফিরে——কে? দূর্গা নাকি?

হ্যাঁ, দূর্গাই। অন্ধকার পথের উপর আলো হাতে আসিয়া দূর্গাই দাঁড়াইল।

বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে দূর্গা বলিল—হ্যাঁ, বাড়ী এস শিগগির। খোকার অসুখ করেছে, একবারে জলের মতন—

দেবু বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মত উঠিয়া একলাফে পথে নামিয়া ডাকিল—ডাক্তার।

বৈজ্ঞানিক সত্য ধর্মবিশ্বাসের কণ্ঠরোধ করিয়া শেষে কি তাহার গৃহেই রুদ্রমূর্তিতে আত্মপ্রকাশ করিল?


***


সর্বনাশী মহামারী মানবদেহের সকল রস দ্রুত শোষণ করিয়া জীবনীশক্তিকে নিঃশেষিত করিয়া দেয়। সেই মহামারী দেবুর সকল রস, সকল কোমলতা নিষ্ঠুর পেষণে পিষ্ট করিয়া পাথর করিয়া দিয়া তাহার ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল। একা খোকা নয়, খোকা ও বিলু—দুজনেই কলেরায় মারা গেল। প্রথম দিন খোকা, দ্বিতীয় দিন বিলু। শুশ্রুষা ও চিকিৎসার কোনো ত্রুটি হয় নাই। জংশন শহর হইতে রেলের ডাক্তার, কঙ্কণার হাসপাতালের ডাক্তার দুই জন বড় ডাক্তার আনা হইয়াছিল। কঙ্কণার হাসপাতালের ডাক্তারটি সংবাদ পাইয়া আপন হইতেই আসিয়াছিল। লোকটি গুণগ্রাহী, দেবুর প্রতি শ্রদ্ধাবশতই আসিয়াছিল। জগন নিজে জংশনে গিয়া রেলের ডাক্তারকে আনিয়াছিল। অনাহারে অনিদ্রায় দেবু অকাতরে তাহাদের সেবা করিয়াছে আর ঈশ্বরের নিকট মাথা খুঁড়িয়াছে—দেবতার নিকট মানত করিয়াছে। দূর্গাও কয়দিন প্রাণপণে তাহার সাহায্য করিয়াছে। জগন ডাক্তারের তো কথাই নাই; যতীন, সতীশ, গদাই, পাতু দুই বেলা আসিয়া তত্ত্ব লইয়া গিয়াছে, কিন্তু কিছুতেই কিছু হয় নাই। দেবু পাথরের মত অশ্রুহীন নেত্রে নীরব নির্বাক হইয়া সব দেখিল—বুক পাতিয়া নিদারুণ আঘাত গ্রহণ করিল।

 

বিলুর সৎকার যখন শেষ হইল তখন সূর্যোদয় হইতেছে। দেবু ঘরে প্রবেশ করিল—নিঃস্ব, রিক্ত, তিক্ত জীবন লইয়া। সুখ-দুঃখের অনুভূতি মরিয়া গিয়াছে, হাসি ফুরাইয়াছে, অশ্রু শুকাইয়াছে, কথা হারাইয়াছে; মন অসাড়, দৃষ্টি শূন্য; ঠোঁট হইতে বুক পর্যন্ত নীরস শুষ্ক—সাহারার মত সব খাঁ-খাঁ করিতেছে। দেওয়ালে ঠেস দিয়া সে উদাস শূন্য দৃষ্টিতে সম্মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। সব আছে—সেই পথ, সেই ঘাট, সেই বাড়ীঘর, সেই গাছপালা, কিন্তু দেবুর দৃষ্টির সম্মুখে সব অর্থহীন, সব অস্তিত্বশূন্য ঝাপসা, এক রিক্ত অসীম তৃষাতুর ধূসর প্রান্তর আর বেদনাবিধুর পাণ্ডুর আকাশ। ওই বিবর্ণ ধূসরতার মধ্যে ভবিষ্যৎ বিলুপ্ত নিশ্চিহ্ন।

সমস্ত গ্রামের লোকই ভিড় করিয়া আসিয়াছিল তাহাদের অকৃত্রিম সহানুভূতি জানাইতে। কিন্তু দেবুর এই মূর্তির সম্মুখে তাহারা কে কিছু বলতে পারিল না। যতীনও তাহাকে সান্ত্বনা দিতে আসিয়া নির্বাক হইয়া বসিয়া ছিল। আত্মগ্লানিতে সে কষ্ট পাইতেছে—তাহার মনে হইতেছে দেবুকে সে-ই বোধহয় এই পরিণামের মুখে ঠেলিয়া দিয়াছে। জগনও স্তব্ধ হইয়া গিয়াছে। শ্রীহরি, হরিশ, ভবেশও আসিয়াছিল। তাহারাও নীরব। দেবুর সম্মুখে কথা বলিতে শ্রীহরিরও যেন কেমন সঙ্কোচ হইল।

ভবেশ শুধু বলিল হরি-হরি-হরি।

নির্বাক জনমণ্ডলীর প্রান্তদেশে দাঁড়াইয়া কে ডাকিল—ডাক্তারবাবু!

বিরক্ত হইয়া জগন বলিল—কে? কি?

—আজ্ঞে, আমি গোপেশ। একবার আসেন দয়া করে।

—কেন, হল কি?

দেবু একদিকের ঠোঁট বাঁকাইয়া বিষণ্ণ হাসিয়া বলিল—আর কি? বুঝতে পাচ্ছ না? যাও দেখে এস।

জগন দ্বিরুক্তি করিল না, উঠিয়া গেল। যতীন বলিল—দাঁড়ান, আমিও যাচ্ছি।

একে একে জনমণ্ডলী নীরবে উঠিয়া চলিয়া গেল, দেবু একা ঘরে বসিয়া রহিল। এইবার তাহার ইচ্ছা হইল সে একবার বুক ফাটাইয়া কাঁদিবে। চেষ্টাও করিল, কিন্তু কান্না তাহার আসিল না। তারপর সে শুইবার চেষ্টা করিল। এতক্ষণে চারিদিক চাহিয়া চোখে পড়িল চারিদিকে শত সহস্র স্মৃতি—দেওয়ালে খোকার হাতের কালির দাগ, বিলুর হাতের সিঁদুরের চিহ্ন, পানের পিচ, খোকার রং-চটা কাঠের ঘোড়া, ভাঙা বাঁশী, ছেঁড়া ছবি। পাশ ফিরিয়া শুইতে গিয়া শয্যাতলে যেন কিসের চাপে সে একটু বেদনা বোধ করিল। হাত দিয়া সেটা বাহির করিল—খোকার বালা! সেই বালা দুই গাছি, বিলুর নাকচাবি, কানের ফুল, হাতের নোয়া। একটা পাজর-ফাটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া সে অকস্মাৎ ডাকিয়া উঠিল—খোকা! বিলু!

ঠিক এই সময়ে বাড়ীর ভিতরের দিকের দরজার মুখে কে মুখ বাড়াইয়া বলিল, দেবু!

—কে? দেবু উঠিয়া আসিল—রাঙাদিদি?

বুড়ী হাউহাউ করিয়া কাঁদিয়া উঠিল। তাহার সঙ্গে আরও কেউ।

একা রাঙাদিদি নয়, দূর্গাও একপাশে বসিয়া নীরবে কাঁদিতেছিল।

 

দেবুর ইচ্ছা ছিল, গভীর রাত্রে—সকলে ঘুমাইলে—বিশ্বপ্রকৃতি নিস্তব্ধ হইলে সে একবার প্রাণ ভরিয়া কাঁদিবে।

একা নয়। সন্ধ্যা হইতে বহুজনেই আসিয়াছিল, সকলে চলিয়া গিয়াছে। তাহার নিকট শুইতে আসিয়াছে কেবল—জগন ডাক্তার, হরেন ঘোষাল ও গাঁজাখোর গদাই, উচ্চিংড়ের বাবা তারিণী। শ্রীহরি ভূপাল চৌকিদারকেও পাঠাইয়াছে। সে রাত্রিতে দেবুর দাওয়ায় শুইয়া থাকিবে।

সকলে ঘুমাইয়া পড়িলে দেবু উঠিল। উঠানে আসিয়া ঊর্ধ্বমুখে আকাশের দিকে চাহিয়া সে দাঁড়াইয়া রহিল। খোকা নাই—বিলু নাই—বিশ্বসংসারে কোথাও নাই। স্বর্গ মিথ্যা, নরক মিথ্যা, পাপ মিথ্যা, পুণ্য মিথ্যা। কোন্ পাপ সে করিয়াছিল? পূর্বজন্মের? কে জানে? একবার যতীনের কাছে গেলে হয় না? একা বসিয়া সে খোকা ও বিলুকে চিন্তা করিবার অবসর খুঁজিয়াছিল, কিন্তু তাহাও যেন ভাল লাগিতেছে না। আত্মগ্লানিতেই তাহার অন্তর পরিপূর্ণ হইয়া উঠিয়াছে। সেই তো মৃত্যুর বিষ বহন করিয়া আনিয়াছিল। সে-ই তো তাহাদের হত্যা করিয়াছে। কোন্ লজ্জায় সে কাঁদিবে? সে বাহির হইয়া দাওয়ায় আসিয়া দাঁড়াইল। দূরে রাস্তায় একটা আলো আসিতেছে।

এত রাত্রে আলো হাতে কে আসিতেছে? এক জন নয়, জনকয়েক লোকই আসিতেছে।


***


কাহার কণ্ঠধ্বনি বাজিয়া উঠিল।—পণ্ডিত!

দেবুর সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইলেন ন্যায়রত্ন; তাহার সঙ্গে যতীন, পিছনে লণ্ঠন হাতে আর একটি লোক।

—আপনি? কিন্তু আমাকে তো—

—চল, বাড়ীর ভেতর চল।

—আমাকে তো প্রণাম করতে নাই—আমার অশৌচ।

সস্নেহে তাহার মাথায় হাত দিয়া ন্যায়রত্ন বলিলেন—অশৌচ! তিনি মৃদু হাসিলেন। একটা কিছু আন পণ্ডিত, এইখানে এই উঠোনেই বসা যাক। ঘরের ভেতর থেকে ঘুমন্ত লোকের শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে যেন। থাক, যারা ঘুমোচ্ছে ঘুমোক। তোমার সঙ্গে নিরালায় একটু আলাপ করব বলে এত রাত্রে আমার আসা। লোকজনের ভিড়ের মধ্যে আসতে ইচ্ছা হল না, পথে যতীন ভায়া সঙ্গ নিলেন। এঁদের দৃষ্টি জাগ্রত তপস্বীর মত। ফাঁকি দিতে পারলাম না। দেখলাম আকাশের দিকে চেয়ে উনিও বসে আছেন তোমার মত। আমাকে বললেন—তোমার এই নিষ্ঠুর বিপর্যয়ের জন্য উনিই দায়ী। ওঁর চোখে জল ছলছল করে উঠল। তাই ওঁকে সঙ্গে নিয়ে এলাম। আমাদের সুখ-দুঃখের কথায় উনিও অংশীদার হবেন।

ন্যায়রত্ন হাসিলেন। এ হাসি সুখের নয়—দুঃখেরও নয়—এক বিচিত্র দিব্য হাসি।

দেবুও হাসিল। ন্যায়রত্নের হাসির প্রতিবিম্বটিই যেন ফুটিয়া উঠিল। ঘর হইতে একটি মোড়া আনিয়া পাতিয়া দিয়া সে বলিল—বসুন।

ন্যায়রত্ন বসিয়া বলিলেন—বস, আমার কাছে বস। বস যতীন ভায়া, বস।

তাহারা মাটির উপরেই বসিয়া পড়িল। দেবু বলিল—এই সেদিন পরমশ্রদ্ধায় বিলু আপনার পা ধুইয়ে দিয়েছিল কিন্তু আজ আজ সে কোথায়!

ন্যায়রত্ন তাহার মাথার উপর হাত রাখিয়া বলিলেন—দেবু-ভাই, আমি সেইদিনই বুঝে গিয়েছিলাম এই পরিণামের দিকেই তুমি এগিয়ে চলেছ। তোমাকে দেখেই বুঝেছিলাম, তোমার স্ত্রীকে দেখেও বুঝেছিলাম।

দেবু ও যতীন উভয়ে বিস্মিত হইয়া তাহার মুখের দিকে চাহিয়া রহিল।

ন্যায়রত্ন যতীনের দিকে চাহিয়া বলিলেন—সেদিনের গল্পটা মনে আছে বাবা! সবটা সেদিন বলি নি। বলি শোন। গল্প এখন ভাল লাগবে তো?

দেবু সাগ্রহে তাহার মুখের দিকে চাহিয়া বলিল—বলুন।

ন্যায়রত্ন আরম্ভ করিলেন—সেই ব্রাহ্মণ ধনবলে আবার আপন সৌভাগ্যে প্রতিষ্ঠিত হলেন। পুত্র-কন্যা-জামাতায়, পৌত্র-পৌত্রী-দৌহিত্র-দৌহিত্রীতে সংসার হয়ে উঠল—দেববৃক্ষের সঙ্গে তুলনীয়। ফলে অমৃতের স্বাদ ফুলে অগুরু-চন্দনকে লজ্জা দেয় এমন গন্ধ। কোনো ফল অকালে চ্যুত হয় না, কোনো ফুল অকালে শুষ্ক হয় না।

পরিপূর্ণ সংসার তার, আনন্দে শান্তিতে সুখে স্নিগ্ধ সমুজ্জ্বল। ছেলেরাও প্রত্যেকে বড় বড় পণ্ডিত, জামাতারাও তাই। প্রত্যেকেই দেশান্তরে স্বকর্মে প্রতিষ্ঠিত। কেউ কোনো রাজার কুলপণ্ডিত, কেউ সভাপণ্ডিত, কেউ বড় টোলের অধ্যাপক। ব্রাহ্মণ আপন গ্রামেই থাকেন আপন কর্ম করেন।

একদিন তিনি হাঁটে গিয়ে এক মেছুনীর ডালার দিকে চেয়ে চমকে উঠলেন। মেছুনীর ডালায় একটি কালো রঙের সুডৌল পাথর, গায়ে কতকগুলি চিহ্ন। তিনি চিনলেন, নারায়ণ-শিলা শালগ্রাম। মেছুনীর এই অপবিত্র ডালায় আমিষ গন্ধের মধ্যে পূত নারায়ণ-শিলা! তিনি চমকে উঠলেন এবং তৎক্ষণাৎ সেই মেছুনীকে বললেন—মা, ওটি তুমি কোথায় পেলে?

মেছুনী একগাল হেসে প্রণাম করে বলল—বাবা, ওটি নদীর ঘাটে কুড়িয়ে পেয়েছি, ঠিক একপো ওজন; বাটখারা করেছি ওটিকে। ভারি পয় আমার বাটখারাটির। যেদিন থেকে এটি পেয়েছি—সেদিন থেকে আমার বাড়বাড়ন্তর আর সীমা নেই।

সত্য কথা। মেছুনীর এক-গা সোনার গহনা।

ব্রাহ্মণ বললেন—দেখ মা, এটি হল শালগ্রাম-শিলা। ঐ আমিষের মধ্যে এঁকে রেখে দিয়েছ—ওতে তোমার মহা-অপরাধ হবে।

মেছুনী হেসেই সারা।

ব্রাহ্মণ বললেন—ওটি তুমি আমাকে দাও। আমি তোমায় কিছু টাকা দিচ্ছি। পাঁচ টাকা দিচ্ছি তোমাকে।

মেছুনী বললে—না বাবা। এটি আমি বেচব না।

—বেশ, দশ টাকা নাও!

—না, বাবা-ঠাকুর। ও আমাকে অনেক দশ টাকা পাইয়ে দেবে।

—বেশ, কুড়ি টাকা।

—না বাবা। তোমাকে জোড়হাত করছি।

—আচ্ছা, পঞ্চাশ টাকা!

—হবে না।

—একশো!

—না গো, না।

—এক হাজার!

মেছুনী এবার ব্রাহ্মণের মুখের দিকে অবাক হয়ে চেয়ে রইল। কোনো উত্তর দিল না; দিতে পারল না।

—পাঁচ হাজার টাকা দিচ্ছি তোমায়!

এবার মেছুনী আর লোভ সংবরণ করতে পারল না। ব্রাহ্মণ তাকে পাঁচটি হাজার টাকা গুনে দিয়ে নারায়ণকে এনে গৃহে প্রতিষ্ঠা করলেন। কিন্তু আশ্চর্যের কথা, প্রথম দিনেই ব্রাহ্মণ স্বপ্ন দেখলেন—একটি জ্যোতির্ময় দুরন্ত কিশোর তার মাথার শিয়রে দাঁড়িয়ে তাকে বলছে—আমাকে কেন তুমি মেছুনীর ডালা থেকে নিয়ে এলে? আমি সেখানে বেশ ছিলাম। যাও, এখুনি ফিরিয়ে দিয়ে এস আমাকে।

ব্রাহ্মণ বিস্মিত হলেন।

দ্বিতীয় দিনেও আবার সেই স্বপ্ন। তৃতীয় দিনের দিনে স্বপ্নে দেখলেন কিশোরের ভীষণ উগ্রমূর্তি। বললেন—ফিরিয়ে দিয়ে এস, নইলে কিন্তু তোমার সর্বনাশ হবে।

সকালে উঠে সেদিন তিনি গৃহিণীকে সব বললেন। এতদিন স্বপ্নের কথাটা প্রকাশ করেন নি, বলেন নি। আজ আর না বলে পারলেন না।

গৃহিণী উত্তর দিলেন—তাই বলে নারায়ণকে পরিত্যাগ করবে নাকি? যা হয় হবে। ও চিন্তা তুমি কোরো না।

রাত্রে আবার সেই স্বপ্ন, আবার–আবার। তখন তিনি পুত্র-জামাতাদের এই স্বপ্ন-বিবরণ লিখে জানতে চাইলেন তাদের মতামত। মতামত এল, সকলেরই এক জবাব—গৃহিণী যা বলেছিলেন তাই।

সেদিন রাত্রে স্বপ্নে তিনি নিজে উত্তর দিলেন, ঠাকুর, কেন তুমি রোজ এসে আমার নিদ্রার ব্যাঘাত কর, বল তো? কাজে-কর্মে-বাক্যে-চিন্তায় আমার জবাব কি তুমি আজও পাও নি? আমিষের ডালায় তোমাকে আমি রেখে দিতে পারব না।

পরের দিন ব্রাহ্মণ পূজা শেষ করে উঠে নাতি-নাতনীদের ডাকলেন প্রসাদ নেবার জন্যে। সকলের যেটি ছোট, সেটি ছুটে আসছিল সকলের পিছনে। সে অকস্মাৎ হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল। ব্রাহ্মণ তাড়াতাড়ি তাকে তুললেন কিন্তু তখন শিশুর দেহে আর প্রাণ নাই। মেয়েরা ডাক ছেড়ে কেঁদে উঠল। ব্রাহ্মণ স্তম্ভিত হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।

রাত্রে স্বপ্নে দেখলেন—সেই কিশোর নিষ্ঠুর হাসি হেসে বলছে—এখনও বুঝে দেখ। জান তো, ‘সর্বনাশের হেতু যার, আগে মরে নাতি তার’।

ব্রাহ্মণ নীরবে হাসলেন।

তারপর অকস্মাৎ সংসারে আরম্ভ হয়ে গেল মহামারী। একটির পর একটি—একে একে নিভিল দেউটি। আর রোজ রাত্রে একই স্বপ্ন। রোজই ব্রাহ্মণ নীরবে হাসেন।

একে একে সংসারে সব শেষ হয়ে গেল। অবশিষ্ট রইলেন ব্রাহ্মণ আর ব্রাহ্মণী।

আবার স্বপ্ন দেখলেন—এখনও বুঝে দেখ ব্রাহ্মণী থাকতে!

ব্রাহ্মণ বললেন—তুমি বড়ই প্রগলভ হে ছোকরা, তুমি বড়ই বিরক্ত করছ আমাকে।

পরদিন ব্রাহ্মণীও গেলেন।

আশ্চর্য, সেদিন আর রাত্রে কোনো স্বপ্ন দেখলেন না!

অতঃপর ব্রাহ্মণ শ্রাদ্ধাদি শেষ করে, একটি ঝোলায় সেই শালগ্রাম শিলাটিকে রেখে ঝোলাটি গলায় ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। তীর্থ থেকে তীর্থান্তরে, দেশ থেকে দেশান্তরে, নদ-নদী-জঙ্গল-পাহাড়-পর্বত অতিক্রম করে চললেন। পূজার সময় হলে একটি স্থান পরিষ্কার করে বসেন—ফুল তুলে পূজা করেন, ফল আহরণ করে ভোগ দেন প্রসাদ পান।

অবশেষে একদা তিনি মানসসরোবরে এসে উপস্থিত হলেন। স্নান করলেন—তারপর পূজায় বসলেন। চোখ বন্ধ করে ধ্যান করছেন এমন সময় অপূর্ব দিব্যগন্ধে স্থানটি পরিপূর্ণ হয়ে গেল, আকাশমণ্ডল পরিপূর্ণ করে বাজতে লাগল দেব-দুন্দুভি। কে যেন তার প্রাণের ভিতর ডেকে বলল—ব্রাহ্মণ, আমি এসেছি।

চোখ বন্ধ করেই ব্রাহ্মণ বললেন—কে তুমি?

—আমি নারায়ণ।

—তোমার রূপটা কেমন বল তো?

—কেন, চতুর্ভুজ। শঙ্খ চক্র—

—উঁহুঁ, যাও যাও, তুমি যাও।

—কেন?

—আমি তোমায় ডাকি নি।

—তবে কাকে ডাকছ?

—সে এক প্রগলভ কিশোর। প্রায়ই সে স্বপ্নে এসে আমাকে শাসাত, আমি তাকে চাই।

এবার সেই স্বপ্নের কিশোরের কণ্ঠস্বর তিনি শুনতে পেলেন, ব্রাহ্মণ, আমি এসেছি!

চোখ খুলে ব্রাহ্মণ এবার দেখলেন হ্যাঁ, সেই তো বটে।

হেসে কিশোর বললেন—এস আমার সঙ্গে।

ব্রাহ্মণ আপত্তি করলেন না, বললেন—চল। তোমার দৌড়টাই দেখি।

কিশোর দিব্যরথে চড়িয়ে তাঁকে এক অপূর্ব পুরীতে এনে বললেন—এই তোমার পুরী। তোমার জন্যে আমি নির্মাণ করে রেখেছি। পুরীর দ্বার খুলে গেল; সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে এল—সেই সকলের ছোট নাতিটি যে সর্বাগ্রে মারা গিয়েছিল। তার পিছনে পিছনে আর সব।

গল্প শেষ করিয়া ন্যায়রত্ন চুপ করিলেন।

দেবু একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া মুখ তুলিয়া একটু হাসিল।

যতীন ভাবিতেছিল এই অদ্ভুত ব্রাহ্মণটির কথা।

ন্যায়রত্ন আবার বলিলেন—সেদিন তোমাকে দেখে—বিলুকে দেখে এই কথাই আমার মনে হয়েছিল। তারপর যখন শুনলাম—উপেন রুইদাসের মৃতদেহের সৎকার করতে গেছ তুমি তাদের সেবা করছ, তখন আর সন্দেহ রইল না। আমি প্রত্যক্ষ দেখতে পেলাম—মেছুনীর ডালার শালগ্রাম উদ্ধার করতে হাত বাড়িয়েছ তুমি। আত্মা নারায়ণ, কিন্তু ওই বায়েন-বাউড়ীদের পতিত অবস্থাকে মেছুনীর ডালার সঙ্গে তুলনা করি, তবে আধুনিক তোমরা রাগ কোরো না যেন।

এতক্ষণে দেবুর চোখ দিয়া কয়েক ফোঁটা জল ঝরিয়া পড়িল।

ন্যায়রত্ন চাদরের খুঁট দিয়া সস্নেহে সে জল মুছাইয়া দিলেন। দেবুর মাথায় হাত দিয়া বহুক্ষণ বসিয়া রহিলেন। তারপর বলিলেন—এখন উঠি ভাই। তোমার সান্ত্বনা তোমার নিজের কাছে, প্রাণের ভেতরেই তার উৎস রয়েছে। ভাগবত আমার ভাল লাগে। আমার শশী যেদিন মারা যায় সেদিন ভাগবত থেকেই সান্ত্বনা পেয়েছিলাম। তাই তোমাকে আজ বলতে এসেছিলাম। ভাগবতী লীলার একটি গল্প।

যতীনও ন্যায়রত্নের সঙ্গে উঠিল।

পথে যতীন বলিল—এই গল্পগুলি যদি এ যুগের উপযোগী করে দিয়ে যেতেন আপনি!

হাসিয়া ন্যায়রত্ন বলিলেন—অনুপযোগী কোন জায়গা মনে হল ভাই?

—রাগ করবেন না তো?

—না, না, না। সত্যের যুক্তির কাছে নতশির হতে বাধ্য আমি। রাগ করব! ন্যায়রত্ন শিশুর মত অকুণ্ঠায় হাসিয়া উঠিলেন।

—ওই আপনার মাছের চুবড়ি চতুর্ভুজ শঙ্খ চক্র ইত্যাদি।

—ভগবানের অনন্ত রূপ। যে রূপ খুশি তুমি বসিয়ে নিয়ো। তা ছাড়া ব্রাহ্মণ তো চতুর্ভুজ মূর্তি চোখেই দেখেন নি। তিনি দেখলেন—তাঁর স্বপ্নের মূর্তিকে সেই উগ্র কিশোরকে।

যতীন বাড়ীর দুয়ারে আসিয়া পড়িয়াছিল, রাত্রিও অনেক হইয়াছে। কথা বাড়াইবার আর অবকাশ রহিল না, ন্যায়রত্ন চলিয়া গেলেন।

 

বসিয়া থাকিতে থাকিতে যতীনের মনে অকস্মাৎ রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতার কয়েকটি ছত্র গুঞ্জন করিয়া উঠিল।

ভগবান, তুমি যুগে যুগে দূত পাঠায়েছ বারে বারে
দয়াহীন সংসারে,
তারা বলে গেল ‘ক্ষমা করো সবে’ বলে গেল ‘ভালবাসা—
অন্তর হতে বিদ্বেষ বিষ নাশো’।—
বরণীয় তারা স্মরণীয় তারা, তবুও বাহির-দ্বারে
আজি দুর্দিনে ফিরানু তাদের ব্যর্থ নমস্কারে।…

নাঃ, ন্যায়রত্নের কথা সে মানিতে পারিল না।


আটাশ



মাস দুয়েক পর। গ্রামের কলেরা থামিয়া গিয়াছে।

আষাঢ় মাসের প্রথম সপ্তাহ। সাত তারিখে অম্বুবাচী পড়িল। ধরিত্রী নাকি এই দিনটিতে ঋতুমতী হইয়া থাকেন। আকাশ ঘন-ঘোর মেঘাচ্ছন্ন। বর্ষা প্রত্যাসন্ন বলিয়া মনে হইতেছে। ‘মিগের বাতে’ এবার যেরূপ প্রচণ্ড গুমোট গিয়াছে, তাহাতে এবার বর্ষা সত্বর নামিবে বলিয়া চাষী অনুমান করিয়াছিল। জ্যৈষ্ঠের শেষের দিকে মৃগশিরা নক্ষত্রে যেবার এমন গুমোট হয়, সেবার বর্ষা প্রথম আষাঢ়েই নামিয়া থাকে। অম্বুবাচীতে বর্ষণ হইয়া যদি কাড়ান লাগে, তবে সে অতি সুলক্ষণ—ঋতুমতী ধরিত্রীর মৃত্তিকা জলে ভিজিয়া অপরূপ উর্বরা হইয়া ওঠে। অম্বুবাচীর তিন দিন হল-কর্ষণ নিষিদ্ধ।

গ্রামে গ্রামে ঢোল বাজিতেছে, লড়াইয়ের ঢোল।

অম্বুবাচীতে চাষীদের মধ্যে কুস্তি প্রতিযোগিতা হইয়া থাকে। চলতি ভাষায় ইহাকে বলে ‘আমুতির লড়াই’; এখানকার মধ্যে কুসুমপুর ও আলেপুরেই সমারোহ সর্বাপেক্ষা বেশী। এই দুইখানি মুসলমানের গ্রাম। আমুতির লড়াই হিন্দু মুসলমান দুই সম্প্রদায়েরই সমারোহের বস্তু। চাষের পূর্বে চাষীরা বোধহয় শক্তি পরীক্ষা করে। এ অঞ্চলের মধ্যে ভরতপুরে হয় সর্বাপেক্ষা বড় লড়াইয়ের আখড়া। বিভিন্ন স্থান হইতে নামকরা শক্তিমান চাষীরা যাহারা এখানে কুস্তিগীর বলিয়া খ্যাত, তাহারা যোগ দেয়। ভরতপুরে যে বিজয়ী হয়, সে-ই এ অঞ্চলে শ্রেষ্ঠ বীর বলিয়া সম্মানিত হইয়া থাকে। তবে শক্তিচর্চায় শক্তি প্রতিযোগিতায় মুসলমানদের আগ্রহ অপেক্ষাকৃত বেশী।

যতীনের বাড়ীর সম্মুখে একটা জায়গা খুঁড়িয়া উচ্চিংড়ে ও গোবরা আখড়া খুলিয়াছে। দুইটাতে সারাদিন যুধ্যমান হইয়া পড়িয়াই আছে।

আজ নিষ্ঠাবান চাষীর বাড়ীতে অরন্ধন। ঋতুমতী ধরিত্রীর বুকে আগুন জ্বালিতে নাই। ব্রাহ্মণ, বৈষ্ণব এবং বিধবারা এই তিন দিনই অগ্নিসিদ্ধ বা অগ্নিদগ্ধ কোনো জিনিসই খাইবে না। দেবু আজ অরন্ধন-ব্রত প্রতিপালন করিতেছে। একা বসিয়া শান্ত উদাস দৃষ্টিতে চাহিয়া আছে মেঘমেদুর আকাশের দিকে। বর্ষার সজল ঘন মেঘ পুঞ্জিত হইতেছে, আবর্তিত হইতেছে, ভাসিয়া চলিতেছে ওই দূর দিগন্তের অন্তরালে। আবার এ দিগন্ত হইতে উদয় হইয়াছে নূতন মেঘের পুঞ্জ। অচিরে বর্ষা নামিবে। অজস্র বর্ষণে পৃথিবী সুজলা হইয়া উঠিবে, শস্যসম্ভারে শ্যামলা হইয়া উঠিবে। মানুষের দুঃখ-কষ্ট ঘুচিবে।

সবুজ হইয়া উঠিবে মাঠ, জলে ভরিয়া উঠিবে ঘাট। ময়ূরাক্ষী বহিয়া গৈরিক জলস্রোত বহিয়া যাইবে। শূন্য মাঠ ফসলে ভরিয়া উঠিবে। নীল আকাশ মেঘে ভরিয়া গিয়াছে। মেঘ কাটিয়া গেলে সূর্য, রাত্রে চন্দ্র তারায় ভরিয়া থাকিবে। তাহারই জীবন শুধু শূন্য হইয়া গিয়াছে। এ আর ভরিয়া উঠিবে না।

একা বসিয়া এমনি করিয়া কত কথাই ভাবে। অকস্মাৎ জীবনে যে প্রচণ্ড বিপর্যয় ঘটিয়া গেল—তাহার ফলে তাহার প্রকৃতিচরিত্রেও একটা পরিবর্তন ঘটিয়া গিয়াছে। প্রশান্ত, উদাসীন, একান্ত একাকী একটি মানুষ; গ্রামের সকলে তাহাকে ভালবাসে, শ্রদ্ধা করে, কিন্তু তবু তাহারা তাহার পাশে বেশিক্ষণ বসিয়া থাকিতে পারে না। দেবুর নিশ্চেষ্ট নির্বাক উদাসীনতার মধ্যে তাহারা যেন হাঁপাইয়া ওঠে।

রাত্রে—গভীর রাত্রে দেবু গিয়া বসে যতীনের কাছে। ওই সময় তার সাথী মেলে। যতীন তাহাকে অনেকগুলি বই দিয়াছে। বঙ্কিমচন্দ্রের গ্রন্থাবলী দেবুর ছিল। যতীন তাহাকে দিয়াছে রবীন্দ্রনাথের কয়েকখানা বই, শরৎচন্দ্রের গ্রন্থাবলী, কয়েকজন আধুনিক লেখকের লেখা কয়েকখানা বইও তাহার মধ্যে আছে। নিঃসঙ্গ অবসরে উহারই মধ্যে তাহার সময় অনেকটা নিরুদ্বেগ প্রশান্তির মধ্যে কাটে। কখনও কখনও সে দাওয়ার উপর একা বসিয়া চাহিয়া থাকে। ঠিক দাওয়ার সম্মুখে রাস্তার উপরের শিউলী গাছটির দিকে। ওই শিউলী গাছটির সঙ্গে বিলুর সহস্র স্মৃতি বিজড়িত। বিলু শিউলী ফুল বড় ভালবাসিত। কতদিন দেবুও বিলুর সঙ্গে শরৎকালের ভোরে উঠিয়া শিউলী ফুল কুড়াইয়াছে।

আজ আবার বৈকালে তাহাকে আলেপুর যাইতে হইবে। আলেপুরের শেখ চাষীরা তাহার নিকট আসিয়াছিল; তাহাকে তাহাদের কুস্তির প্রতিযোগিতায় পাঁচ জন বিচারকের মধ্যে এক জন হইতে হইবে। সে হাসিয়া বলিয়াছিল—আমাকে কেন ইছু-ভাই, আর কাউকে—

ইছু বলিয়াছিল—উরে বাস রে! তাই কি হয়! আপনি যে বাত বুলবেন—পাঁচখানা গাঁয়ের নোক সিটি মানবে।

দেবু সেই কথাই ভাবিতেছে। পাঁচখানা গ্রামের লোক তাহাকে মানিবে—একদিন এমনি আকাঙ্ক্ষাই তাহার অন্তরে ছিল। কিন্তু কোন্ মূল্যে সে ইহা পাইল।

যতীন যদি তাহার সঙ্গে আলেপুর যাইত, বড় ভাল হইত; এই রাজবন্দী তরুণটিকে তাহার বড় ভাল লাগে, সে তাহাকে অসীম শ্রদ্ধাও করে। যতীন মধ্যে মধ্যে বলে—আমাদের দেশের লোক শক্তির চর্চাটা একেবারে করে না। তাহাকে সে আমুতির লড়াই দেখাইত। সকলেই শক্তির চর্চা একদিন করিত, প্রথাটা এখনও বাঁচিয়া আছে—এই চণ্ডীমণ্ডপটার মত। চণ্ডীমণ্ডপটা এবার ছাওয়ানো হয় নাই, বর্ষায় এবার ওটা পড়িয়া যাইবে। গ্রামের লোক ছাওয়ায় নাই, শ্রীহরিও হাত দেয় নাই। শ্রীহরি ওটা ভাঙিতে চায়। এবার দূর্গাপূজার পর সর্বশুদ্ধা ত্রয়োদশীর দিন সে ওখানে দেউল তুলিবে, পাকা নাটমন্দির গড়িবে। চণ্ডীমণ্ডপ এখন সত্য সত্যই শ্রীহরির। শ্রীহরিই এখন এ গ্রামের জমিদার। শিবকালীপুরের জমিদারী সে-ই কিনিয়াছে। চণ্ডীমণ্ডপ তাহার নিজস্ব। ইহার মধ্যে অনাচ্ছাদিত চণ্ডীমণ্ডপের দেওয়ালগুলি বৈশাখের ঝড়ে, কাদায় ভরিয়া গিয়াছে। কত পুরাতন দিনের বসুধারার চিহ্নগুলির একটিও আর দেখা যায় না।

শ্রীহরিও এখন তাহাকে প্রায়ই ডাকে—এসো খুড়ো, আমার ওখানে পায়ের ধুলো দিয়ে। ব্যঙ্গ করিয়া বলে না, সত্যই সে অন্তরের সঙ্গে শ্রদ্ধা করিয়া বলে।

কিন্তু বলিলে কি হইবে? ওদিকে আবার যে শ্রীহরির সঙ্গে গ্রামের দ্বন্দ্বের সম্ভাবনা ধীরে ধীরে বীজ হইতে অঙ্কুরের মত উদ্গত হইতেছে। সেটেলমেন্টের পাঁচ ধারার ক্যাম্প আসিতেছে। শস্যের মূল্যবৃদ্ধির দাবিতে শ্রীহরি খাজনা বৃদ্ধি দাবি করিবে। শ্রীহরি সেদিন তার কাছে কথাটা তুলিয়াছিল। দেবু বলিয়াছে—আশেপাশের গ্রামে কি হয় দেখ। সব গ্রামে কি হয় দেখ। সব গ্রামের লোক যদি জমিদারকে বৃদ্ধি দেয়—তুমিও পাবে।

গভর্নমেন্ট সার্ভে হওয়ার ফলে এ দেশে জমিদারদের একটা সর্বজনীন পর্বের মত খাজনা বৃদ্ধির একটা সাধারণ উপলক্ষ উপস্থিত হইয়াছে। প্রজারা চিন্তিত হইয়া উঠিয়াছে। গ্রামের মাতব্বরেরা তার কাছে ইহারই মধ্যে গোপনে গোপনে আসিতেছে। সে বরাবর বলিয়াছে, মনেও করিয়াছে—এসব ব্যাপারে সে থাকিবে না। তবু লোকে শুনিতেছে না। কিন্তু খাজনা বৃদ্ধি! ইহার উপর খাজনা বৃদ্ধি? সে শিহরিয়া ওঠে। গ্রামের দিকে চাহিয়া দেখে—জীর্ণ গ্রাম, মাত্র দুইখানা কাপড় দুই মুঠা ভাত মানুষের জুটিতেছে না, ইহার উপর খাজনা বৃদ্ধি হইলে প্রজারা মরিয়া যাইবে। চাষীর ছেলে জমিদার হইয়া শ্রীহরি এসব কথা প্রায় ভুলিয়াছে; কিন্তু খোকাকে বিলুকে হারাইয়া সে আজ প্রায় সন্ন্যাসী হইয়াও এ কথা কিছুতেই ভুলিতে পারিতেছে না। গত কয়েকদিন ধরিয়া যতীনের সঙ্গে তাঁহার এই আলোচনাই চলিতেছে।

কি করিবে? যদি প্রয়োজন হয়—তবে আবার সে উঠিয়া-পড়িয়া লাগিবে। মধ্যে মধ্যে মনে হয়—না, কাজ কি এসব পরের ঝঞ্ঝাটে গিয়া? তাহার মনে পড়ে ন্যায়রত্নের গল্প। ধর্মজীবন যাপন করিবার ইচ্ছা হয়। কিন্তু কিছুতেই তাহা হইয়া ওঠে না। যতীন তাহাকে এ গল্পের অন্যরূপ অর্থ বুঝাইবার চেষ্টা করিয়াছে, তাহাতেও তাহার ভাল লাগে নাই। কিন্তু একান্তভাবে ধর্মকর্ম লইয়াও সে থাকিতে পারিল না—এটাই তাহার নিজের কাছে সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার বলিয়া মনে হইতেছে। তাহার ভিতরে একজন কে যেন আছে যে তাহাকে এই পথে এই ভাবে লইয়া চলিতেছে। সে-ই হয়তো আসল দেবু ঘোষ।

জগন ও হরেন তো ইহারই মধ্যে ভাবী খাজনাবৃদ্ধিকে উপলক্ষ করিয়া যুদ্ধ ঘোষণার পায়তারা করিতেছে। হরেন পথে-ঘাটে পাড়ায়-পাড়ায় বেড়ায়, অকারণে অকস্মাৎ চিৎকার করিয়া ওঠে—লাগাও ধর্মঘট। আমরা আছি।

বাংলার প্রজা-সমাজে ধর্মঘট একটি অতি পরিচিত কথা ও একটি অতি পুরাতন প্রথা। ধর্মঘট নামেই ইহার প্রাচীনত্বের পরিচয় বিদ্যমান। ধর্ম সাক্ষ্য করিয়া—ঘট পাতিয়া যে কোনো সর্বসাধারণের কর্মসাধনের জন্য পূর্ব হইতে শপথ গ্রহণ করা হইত। পরে উহা জমিদার ও প্রজার—পুঁজিপতি ও শ্রমজীবীর মধ্যে দ্বন্দ্বের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ হইয়াছে।

ইহার মধ্যে তাহারা বিপুল উত্তেজনা অনুভব করে, সঙ্ঘশক্তির প্রেরণায় অসম্ভবকে সম্ভব করিয়া তুলিতে চায়, আত্মস্বার্থ অদ্ভুতভাবে হাস্যমুখে বলি দেয়। প্রতি গ্রামের ইতিহাস অনুসন্ধান করিলে দেখা যাইবে—দরিদ্র চাষীদের মধ্যে এক-আধজনের পূর্বপুরুষ সেকালের প্রজা-ধর্মঘটের মুখ্য ব্যক্তি হইয়া সর্বস্ব খোয়াইয়া ভাবী পুরুষকে দরিদ্র করিয়া গিয়াছে। কোনো কোনো গ্রামে পোড়ো ভিটা পড়িয়া আছে; যেখানে পূর্বে ছিল কোনো সমৃদ্ধিশালী চাষীর ঘর সে ঘর ওই ধর্মঘটের ফলে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হইয়াছে। ঘরের মানুষেরা উদরান্নের তাড়নায় গ্রাম ত্যাগ করিয়া চলিয়া গিয়াছে, অথবা রোগ অনশন আসিয়া বংশটাকে শেষ করিয়াছে।

কিন্তু ধর্মঘট সচরাচর হয় না। ধর্মঘট করিবার মত সর্বজনীন উপলক্ষ সাধারণত বড় আসে না। আসিলেও অভাব হয় প্রেরণা দিবার লোকের। এবার এমনই একটি উপলক্ষ আসিয়াছে। এ অঞ্চলেও প্রতি গ্রামেই গভর্নমেন্ট সার্ভের পর শস্যের মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে খাজনাবৃদ্ধির আয়োজন করিতেছে জমিদারেরা। প্রজারা খাজনাবৃদ্ধি দিতে চায় না। এটাকে তাহারা অন্যায় বলিয়া মনে করে। কোনো যুক্তিই তাহাদের মন মানিতে চায় না। তাহারা পুরুষানুক্রমে প্রাণপাত পরিশ্রম করিয়া জমিকে উর্বরা করিতেছে—সে জমির শস্য তাহাদের। অবুঝ মন কিছুতেই বুঝিতে চায় না। গ্রামে গ্রামে প্রজাদের জল্পনা-কল্পনা চলিতেছে। আশ্চর্য, তাহার প্রতিটি তরঙ্গ আসিয়া আঘাত করিতেছে দেবুকে!

আলেপুরের মুসলমান অধিবাসীরা তাহাকে আজ যে আমুতির লড়াই দেখিবার নিমন্ত্রণ করিয়াছে, সে-ও এই তরঙ্গ। লড়াইয়ের পর ওই কথাই আলোচিত হইবে।

মহাগ্রামের তরঙ্গও তাহার কাছে আসিয়া পৌঁছিয়াছে। গ্রামের লোকেরা ন্যায়রত্ন মহাশয়ের সমীপস্থ হইয়াছিল। ঠাকুর মহাশয় তাহাদের পাঠাইয়া দিয়াছেন দেবুর কাছে। একটা চিঠিতে লিখিয়া দিয়াছেন—পণ্ডিত, আমার শাস্ত্রে ইহার বিধান নাই। ভাবিয়া দেখিলাম তুমি পার; বিবেচনা করিয়া বিধান দিয়ো।

ন্যায়রত্নকে সে মনে মনে প্রণাম করিয়াছে। তুমি আমার ঘাড়ে এই বোঝা চাপাইতেছ ঠাকুর? বেশ, বোঝা ঘাড়ে লইব। মুখে তাহার বিচিত্র হাসি ফুটিয়া উঠিয়াছে। সে তাই ভাবিতেছে—অন্যায় সঙ্ঘর্ষ সে বাঁধাইবে না। আগামী রথের দিন—ন্যায়রত্নের বাড়ীতে গৃহদেবতার রথযাত্রাকে উপলক্ষ করিয়া যে মেলা বসিবে, সেই মেলায় সমবেত হইবে পাঁচসাতখানা গ্রামের লোক। প্রতি গ্রামের মাতব্বরেরা ন্যায়রত্নের আশীর্বাদ লইতে আসে। ন্যায়রত্ন দেবুকে নিমন্ত্রণ করিয়াছেন। দেবু ঠিক করিয়াছে, সেইখানেই সকল গ্রামের মাতব্বরদের সঙ্গে পরামর্শ করিয়া যাহা হয় স্থির করিবে।

—পোঁ—ভস-ভস-ভস।

রেলগাড়ী ছুটাইয়া আসিয়া হাজির হইল উচ্চিংড়ে। মুহূর্তের জন্য দাঁড়াইয়া সে বলিল—লজরবন্দীবাবু ডাকছে। তারপর মুখে বাঁশী বাজাইয়া দিয়া ছুটিল—পোঁ—ভস-ভস-ভস

দেবু উচ্চিংড়ের ভাব দেখিয়া হাসিতে লাগিল।

দেবু আসিতেই যতীন বলিল অনিরুদ্ধের কথা।

—দু মাস তো পেরিয়ে গেল দেবুবাবু। তার তো এতদিনে ফেরা উচিত ছিল। আমি হিসেব করে দেখেছি—দশ দিন আগে বেরিয়েছেন তিনি। হিসেবে তাই হয়, থানাতেও তাই বলে।

—তাই তো! অনি-ভাইয়ের তো এতদিনে ফেরা উচিত ছিল।

—আমি ভাবছি—জেলে আবার কোনো হাঙ্গামা করে নতুন করে মেয়াদ হল না তো?

বিচিত্র নয়। অনি-ভাইকে বিশ্বাস নাই। গায়ে প্রচণ্ড শক্তি, দুর্দান্ত ক্রোধী। অনিরুদ্ধ সব পারে। দেবু বলিল—কামার-বউ বোধহয় খুব ব্যস্ত হয়ে পড়েছে?

যতীন হাসিল—মা-মণি? দেবুবাবু, ও এক বিচিত্র মানুষ। দেখছেন না—বাউণ্ডুলে ছেলে দুটো আর কোথাও যায় না। বাড়ীর আশপাশেই ঘুরছে দিনরাত। মা-মণি ওই ওদের নিয়েই দিনরাত ব্যস্ত। একদিন মাত্র অনিরুদ্ধের কথা জিজ্ঞাসা করেছিল। ব্যস। আবার যেদিন মনে পড়বে জিজ্ঞাসা করবে।

দেবুর চোখে এই তুচ্ছ কারণে জল আসিল। খোকাকে কোলে করিয়া বিলুর হাসিভরা মুখ, ব্যস্তসমস্ত দিনের কথা তাহার মনে পড়িয়া গেল। যতীন বলিল—বরং দূর্গা আমাকে দু-তিন দিন জিজ্ঞাসা করেছে।

চোখ মুছিয়া দেবু হাসিল, বলিল—দূর্গা আমার ওদিক দিয়ে আজকাল বড় যায় না। একদিন জিজ্ঞাসা করলাম তো বললে—গাঁয়ের লোককে তো জান জামাই! এখন আমি বেশি গেলে-এলেই—তোমাকে জড়িয়ে নানান কুকথা রটাবে।

সত্য কথা। দূর্গা দেবুর বাড়ী বড় একটা যায় না। কিন্তু তাহার মাকে পাঠায় দুধ দিতে, পাতুকে পাঠায় দুবেলা। রাত্রে পাতুই দেবুর বাড়ীতে শুইয়া থাকে, সে-ও দূর্গার বন্দোবস্ত। তা ছাড়া সে-ও যেন কেমন হইয়া গিয়াছে। সে আর লীলাচঞ্চলা তরঙ্গময়ী নাই। আশ্চর্য রকমের শান্ত হইয়া গিয়াছে। বোধহয় দেবুর ছোঁয়া লাগিয়াছে তাহাকে। যতীনের কিশোর তরুণ রূপ তাহাকে আর বিচলিত করে না। সে মাঝে মাঝে দূর হইতে দেবুকে দেখে—তাহারই মত উদাস দৃষ্টিতে পৃথিবীর দিকে নিরর্থক চাহিয়া থাকে।

যতীন কিছুক্ষণ পরে বলিল—শুনেছি শ্রীহরি ঘোষ সদরে দরখাস্ত করেছে গ্রামে প্রজা-ধর্মঘটের আয়োজন হচ্ছে, তার মূলে আমি আছি। আমাকে সরাবার চেষ্টা করছেন। সরতেও আমাকে হবে বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু এই স্নেহপাগলিনী মেয়েটির জন্য যে ভেবে আকুল হচ্ছি। এক ভরসা আপনি আছেন। কিন্তু সে-ও তো এক ঝঞ্ঝাট। তা ছাড়া এ এক অদ্ভুত মেয়ে, দেবুবাবু; ওই দুটো ছেলেকে আবার জুটিয়েছে। খাবে কি, দিন চলবে কি করে? আমি গেলেই ঘর ভাড়া দশ টাকা তো বন্ধ হয়ে যাবে। আজকাল মা-মণি ধান ভানে, কঙ্কণায় ভদ্রলোকদের বাড়ীতে গিয়ে মুড়ি ভাজে। কিন্তু ওতে কি ওই ছেলে দুটোসমেত সংসার চলবে?

কিছুক্ষণ চিন্তা করিয়া দেবু বলিল—জেল-অফিস ভিন্ন তো অনিরুদ্ধের সঠিক খবর পাওয়া যাবে না। আমি বরং একবার সদরে গিয়ে খোঁজ করে আসি।

সদরে গিয়া দেবু দুই দিন ফিরিল না।

যতীন আরও চিন্তিত হইয়া উঠিল। অপর কেহ এ সংবাদ জানে না। পদ্মও জানে না। তৃতীয় দিনের দিন দেবু ফিরিল। অনিরুদ্ধের সংবাদ পাওয়া যায় নাই। জেল হইতে সে বাহির হইয়াছে দশ দিন আগে। দেবু অনেক সন্ধান করিয়াছে, সেই জন্য দুই দিন দেরি হইয়াছে। জেল হইতে বাহির হইয়া একটা দিন সে শহরেই ছিল দ্বিতীয় দিন জংশন পর্যন্ত আসিয়াছিল। সেখানে হইতে নাকি একটি স্ত্রীলোককে লইয়া সে চলিয়া গিয়াছে। এই পর্যন্ত সংবাদ মিলিয়াছে যে কলে কাজ করিবার জন্য সে কলিকাতা বা বোম্বাই বা দিল্লি বা লাহোরে গিয়াছে। অন্তত সেই কথাই সে বলিয়া গিয়াছে—কলে কাজ করব তো এখানে কেন করব? বড় কলে কাজ করব। কলকাতা, বোম্বাই, দিল্লি, লাহোর যেখানে বেশি মাইনে পাব, যাব।

বাড়ীর ভিতর শিকল নড়িয়া উঠিল।

যতীন ও দেবু উভয়েই চমকিয়া পরস্পরের মুখের দিকে চাহিল। আবার শিকল নড়িল। যতীন এবার উঠিয়া গিয়া নতশিরে অপরাধীর মত পদ্মের সম্মুখে দাঁড়াইল।

পদ্ম জিজ্ঞাসা করিল—সে জেল থেকে বেরিয়ে কি কোথাও চলে গেছে?

—হ্যাঁ।

—কলকাতা, বোম্বাই?

—হ্যাঁ।

পদ্ম আর কোনো প্রশ্ন করিল না। ফিরিয়া চুপ করিয়া দেওয়ালে ঠেস দিয়া বসিল। সে চলিয়া গিয়াছে। যাক। তার ধর্ম তার কাছে!

তাহার এ মূর্তি দেখিয়া যতীন আজ আর বিস্মিত হইল না। পদ্ম বিষণ্ণ মূর্তিতে বসিতেই গোবরা ও উচ্চিংড়ে আসিয়া চুপ করিয়া পাশে বসিল। যতীন অনেকটা আশ্বস্ত হইয়া দেবুর নিকট ফিরিয়া আসিল।


***


দিন চারেক পর। সেদিন রথের দিন।

গত রাত্রি হইতে নববর্ষার বর্ষণ শুরু হইয়াছে। আকাশভাঙা বর্ষণে চারিদিক জলে থইথই করিতেছে। কাড়ান লাগিয়াছে। প্রচণ্ড বর্ষণের মধ্যে মাথালি মাথায় দিয়া চাষীরা মাঠে কাজ আরম্ভ করিয়া দিয়াছে। জমির আইলের কাটা মুখ বন্ধ করিতেছে, ইঁদুরের গর্ত বন্ধ করিতেছে, জল আটক করিতে হইবে। পায়ের নিচে মাটি মাখনের মত নরম, সেই মাটি হইতে সোঁদা গন্ধ বাহির হইতেছে। সাদা জলপরিপূর্ণ মাঠ চকচক করিতেছে মেঘলা দিনের আলোর প্রতিফলনে। মধ্যে মধ্যে বীজধানের জমিতে সবুজ সতেজ ধানের চারা চাপ বাঁধিয়া এক-একখানি সবুজ গালিচার আসনের মত জাগিয়া আছে। বাতাসে ধানের চারাগুলি দুলিতেছে—যেন অদৃশ্য লক্ষ্মীদেবী মেঘলোক হইতে নামিয়া কোমল চরণপাতে পৃথিবীর বুকে আসিয়া আসন গ্রহণ করিবেন বলিয়া চাষীরা আসনখানি পাতিয়া রাখিয়াছে।

সেই বর্ষণের মধ্যে যতীন বাসা ছাড়িয়া পথে নামিল। তাহার সঙ্গে দারোগাবাবু। দুই জন চৌকিদারের মাথায় তাহার জিনিসপত্র। দেবু, জগন, হরেন—গ্রামের প্রায় যাবতীয় লোক সেই বর্ষণের মধ্যে দাঁড়াইয়া আছে।

যতীনের অনুমান সত্য হইয়াছে। তাহার এখান হইতে চলিয়া যাইবার আদেশ আসিয়াছে। সদর শহরে—একেবারে কর্তৃপক্ষের প্রত্যক্ষ দৃষ্টির সম্মুখে রাখার ব্যবস্থা হইয়াছে এবার। দুয়ার ধরিয়া দাঁড়াইয়া আছে ম্লানমুখী পদ্ম; আজ তাহার মাথায় অবগুণ্ঠন নাই। দুই চোখ দিয়া তাহার জলের ধারা গড়াইতেছে। তাহার পাশে উচ্চিংড়ে ও গোবরা স্তব্ধ, বিষণ্ণ।

প্রথমটা যতীন শঙ্কিত হইয়াছিল, ভাবিয়াছিল—পদ্ম হয়তো একটা কাণ্ড বাঁধাইয়া বসিবে। মূর্ছাব্যাধিগ্রস্ত পদ্ম হয়তো মূর্ছিত হইয়া পড়িবে—এইটাই তাহার বড় আশঙ্কা হইয়াছিল। কিন্তু পদ্ম তাহাকে নিশ্চিন্ত করিয়া কেবল কাঁদিল। তাহার পাশে উচ্চিংড়ে-গোবরা বেশ শান্ত হইয়া বসিয়া ছিল। পদ্ম তাহাকে কোনো কথা বলিল না।

উচ্চিংড়ে জিজ্ঞাসা করিল—তুমি চলে যাবা বাবু?

—হ্যাঁ। মা-মণির কাছে খুব ভাল হয়ে থাকবি, উচ্চিংড়ে। কেমন? আমি চিঠি দিয়ে খোঁজ নেব তোদের।

ঘাড় নাড়িয়া স্বীকার করিয়া উচ্চিংড়ে বলিল—আর তুমি ফিরে আসবা না বাবু?

যতীন ঘাড় নাড়িয়া হাসিতে গিয়া একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিল—তারপর পদ্মকে বলিল—মা-মণি, যেদিন ছাড়া পাব, একদিন তো ছেড়ে দেবেই, তোমার কাছে আসব।

পদ্ম চুপ করিয়াই রহিল।

এতক্ষণে পদ্ম নীরব রোদনের মধ্যেও মৃদু হাসিয়া হাতটি উপরের দিকে বাড়াইয়া দিয়া আকাশের দিকে চাহিল।

যতীনের চোখে জল আসিল। আত্মসংবরণ করিয়া সে বলিল—যখন যা হবে, পণ্ডিতকে বলবে তার পরামর্শ নেবে।

পদ্মের মুখ এবার উজ্জ্বল হইয়া উঠিল, হ্যাঁ, পণ্ডিত আছে। চোখ মুছিয়া এবার সে বলিল—সাবধানে থেকো তুমি।

নলিন, সেই চিত্রকর ছেলেটিও ভিড়ের মধ্যে চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া ছিল। সে নীরবে অগ্রসর হইয়া আসিয়া চুপ করিয়া একটি প্রণাম করিয়া, অভ্যাসমত নীরবেই চলিয়া গেল।

যতীন তাহার দিকে চাহিয়া হাসিল।

হরেন হাত ধরিয়া বলিল—গুডবাই ব্রাদার।

জগন বলিল—রিলিজড হলে যেন খবর পাই।

সতীশ বাউড়ী আসিয়া প্রণাম করিয়া একখানি ভাঁজ করা ময়লা কাগজ তাহার দিকে বাড়াইয়া একমুখ বোকার হাসি হাসিয়া বলিল—আমাদের গান। নিকে নিতে চেয়েছিলেন আপুনি। অনেকদিন নিকিয়ে রেখেছি, দেয়া হয় নাই।

যতীন কাগজখানি লইয়া সযত্নে পকেটে রাখিল।

আশ্চর্য! দূর্গা আসে নাই!

দারোগাবাবু বলিল—এইবার চলুন যতীনবাবু।

যতীন অগ্রসর হইল—চলুন।

দেবু তাহার পাশে পাশে চলিল। পিছনে জগন, হরেন, আরও অনেকে চলিল। পথে চণ্ডীমণ্ডপের ধারে শ্রীহরি ঘোষ দাঁড়াইয়া ছিল। মজুরেরা চণ্ডীমণ্ডপের খড়ের চাল খুলিয়া দিতেছে, বর্ষার জলে ওটা ভাঙিয়া পড়িবে। তারপর সে আরম্ভ করিবে—ঠাকুরবাড়ী। শ্রীহরি ঘোষও মৃদু হাসিয়া তাহাকে ক্ষুদ্র একটি নমস্কার করিল।

গ্রাম পার হইয়া তাহারা মাঠে আসিয়া পড়িল। যতীন বলিল—ফিরুন এবার আপনারা।

সকলেই ফিরিল। কেবল দেবু বলিল—চলুন, আমি বাঁধ পর্যন্ত যাব। ওখান থেকে মহাগ্রামে যাব ঠাকুর মশায়ের বাড়ী। তাঁর ওখানে রথযাত্রা।

পথে নির্জন একটি মাঠের পুকুরপাড়ে গাছতলায় দাঁড়াইয়া ছিল দূর্গা। তাহাকে কেহ দেখিল না। কিন্তু সে তাহাদের দিকে চাহিয়া যেমন দাঁড়াইয়া ছিল—তেমনি দাঁড়াইয়া রহিল।

সকলেই চলিতেছিল নীরবে। একটি বিষণ্ণতায় সকলেই যেন কথা হারাইয়া ফেলিয়াছে। দারোগাবাবুটিও নীরব। এতগুলি মানুষের মিলিত বিষণ্ণতা তাঁহার মনকে তাঁহার অজ্ঞাতসারেই স্পর্শ করিয়াছে।

যতীনের মনে পড়িতেছিল—অনেক কিছু কথা, ছোটখাটো স্মৃতি। সহসা মাঠের দিকে চাহিয়া তাহার ভাবান্তর উপস্থিত হইল। এই বিস্তীর্ণ মাঠ একদিন সবুজ ধানে ভরিয়া উঠিবে, ধীরে ধীরে হেমন্তে স্বর্ণবর্ণে উদ্ভাসিত হইয়া উঠিবে। চাষীর ঘর ভরিবে রাশি রাশি সোনার ফসলে।

পরমুহূর্তেই মনে হইল—তারপর? সে ধান কোথায় যাইবে?

তাহার মনে পড়িল অনিরুদ্ধের সংসারের ছবি। আরও অনেকের ঘরের কথা। জীর্ণ ঘর, রিক্ত অঙ্গন, অভাবক্লিষ্ট মানুষের মুখ, মহামারী, ম্যালেরিয়া, ঋণভার; শীর্ণকায় অর্ধ-উলঙ্গ অজ্ঞ শিশুর দল। উচ্চিংড়ে ও গোবরা বাংলার ভাবী-পুরুষের নমুনা।

পরক্ষণেই মনে পড়িল—পদ্ম তাহাদের কপালে অশোক-ষষ্ঠীর ফোঁটা দিতেছে।

হঠাৎ তাহার পড়া স্ট্যাটিস্টিক্সের কথা তুচ্ছ মনে হইল। অর্ধসত্য—সে শুধু কঠিন বস্তুগত হিসাব। কিন্তু সংসারটা শুধু হিসাব নয়। কথাটা তাহাকে একদিন ন্যায়রত্ন বলিয়াছিলেন। তাঁহাকে মনে পড়িয়া গেল। সে অবনত মস্তকে বারবার তাঁহাকে প্রণাম জানাইয়া স্বীকার করিল—সংসার ও সংসারের কোনো কোনো মানুষ হিসাবের গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়। ন্যায়রত্ন হিসাবের ঊর্ধ্বে—পরিমাপের অতিরিক্ত। আরও তাহার পাশের এই মানুষটি পণ্ডিত দেবু ঘোষ, অর্ধশিক্ষিত চাষীর ছেলে, হৃদয়ের প্রসারতায় তাহার নির্ধারিত মূল্যাঙ্ককে ছাড়াইয়া গিয়াছে। কতখানি—কতদূর যতীন তাহা নির্ধারিত করিতে পারে নাই, কেমন করিয়া গেল—সেও অঙ্কশাস্ত্রের অতিরিক্ত এক রহস্য।

এই হিসাব-ভুলের ফেরেই তো সৃষ্টি বাঁচিয়া আছে। এক ধূমকেতুর সঙ্গে সংঘর্ষে পৃথিবীর একবার চুরমার হইয়া যাইবার কথা ছিল। বিরাট বিরাট হিসাব করিয়া ও অঙ্ক কষিয়াই সেটা অঙ্কফল হিসাবেই ঘোষিত হইয়াছিল। অঙ্ক ভুল হয় নাই, কিন্তু পৃথিবী কোন্ রহস্যময়ের ইঙ্গিতে ভুল করিয়া ধূমকেতুটার পাশ কাটাইয়া বাঁচিয়া গিয়াছে।

নহিলে সেই সমাজ-শৃঙ্খলার সবই তো ভাঙিয়া গিয়াছে। গ্রামের সনাতন ব্যবস্থা নাপিত, কামার, কুমোর, তাঁতি—আজ স্বকর্মত্যাগী, স্বকর্মহীন। এক গ্রাম হইতে পঞ্চগ্রামের বন্ধন, পঞ্চগ্রাম হইতে সপ্তগ্রাম, নবগ্রাম, দশগ্রাম, বিংশতি গ্রাম, শতগ্রাম, সহস্রগ্রামের বন্ধন-রজ্জু গ্রন্থিতে গ্রন্থিতে এলাইয়া গিয়াছে।

মহাগ্রামের মহা বিশেষণ বিকৃত হইয়া মহুতে পরিণত হইয়াছে, শুধু শব্দার্থেই নয়–বাস্তব পরিণতিতেও তাহার মহা-মহিমত্ব বিলুপ্ত হইয়া গিয়াছে। আঠারো পাড়া গ্রাম আজ মাত্র অল্প কয়েক ঘর লোকের বসতিতে পরিণত। ন্যায়রত্ন জীর্ণ বৃদ্ধ একান্তে মহাপ্রয়াণের দিন গণনা করিয়া চলিয়াছেন।

নদীর ওপারে নূতন মহাগ্রাম রচনা করিতেছে—নূতন কাল। নূতন কালের সে রচনার মধ্যে যে রূপ ফুটিয়া উঠিবে—সে যতীন বইয়ের মধ্যে পড়িয়াছে—তার জন্মস্থান কলিকাতায় প্রত্যক্ষ দেখিয়াছে। সে মনে হইলে শিহরিয়া উঠিতে হয়, মনে হয় গোটা পৃথিবীর আলো নিভিয়া যাইবে, বায়ুপ্রবাহ স্তব্ধ হইবে, গোটা সৃষ্টিটা দুর্বৃত্ত-ধর্ষিতা নারীর মত অন্তঃসারশূন্য কাঙালিনীতে পরিণত হইবে। জীর্ণ অন্তর, বুকে হাহাকার, বাহিরে চাকচিক্য, মুখে কৃত্রিম হাসি। দুর্ভাগিনী সৃষ্টি! আঙ্কিক নিয়মে তার পরিণতি—ক্ষয়রোগীর মত তিলে তিলে মৃত্যু। তবু কিন্তু সে হতাশ নয় আজ। মানুষ সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে অঙ্কশাস্ত্রের অতিরিক্ত রহস্য। পৃথিবীর সমুদ্রতটের বালুকারাশির মধ্যে একটি বালুকণার মতই ব্রহ্মাণ্ড-ব্যাপ্তির অভ্যন্তরে এই পৃথিবী, তাহার মধ্যে যে জীবনরহস্য, সে রহস্য ব্রহ্মাণ্ডের গ্রহ-উপগ্রহের রহস্যের ব্যতিক্রম—এক কণা পরিমাণ জীবন, প্রকৃতির প্রতিকূলতা মৃত্যুর অমোঘ শক্তি—সমস্তকে অতিক্রম করিয়া শত ধারায়, সহস্র ধারায়, লক্ষ ধারায়, কোটি কোটি ধারায় কালে কালে তালে তালে উচ্ছ্বসিত হইয়া মহাপ্রবাহে পরিণত হইয়া বহিয়া চলিয়াছে। সে সকল বাধাকেই অতিক্রম করিবে। আনন্দময়ী প্রাণবতী সৃষ্টি, অফুরন্ত তাহার শক্তি—সে তাহার জীবন-বিকাশের সকল প্রতিকূল শক্তিকে ধ্বংস করিবে, তাহাতে তাহার সংশয় নাই আজ। ভারতের জীবনপ্রবাহ বাধাবিঘ্ন ঠেলিয়া আবার ছুটিবে।

ন্যায়রত্ন জীর্ণ। তাঁহার কাল অতীত হইতে চলিয়াছে। তিনি থাকিবেন না। কিন্তু তাঁহার স্মৃতি আদর্শ নূতন জন্মলাভ করিবে।

যতীন হাসিল। মনে পড়িল ন্যায়রত্নের পৌত্র বিশ্বনাথকে। সে আসিবে। দেবু ঘোষ। নবরূপে পল্লীর এই শৃঙ্খলাহীন যুগে, ভাঙাগড়ার আসরের মধ্যে শ্রীহরি পাল, কঙ্কণার বাবু, থানার জমাদার, দারোগার রক্তচক্ষুকে তুচ্ছ করিয়া উঠিয়া দাঁড়াইয়াছে, মহামারীর আক্রমণকে সে রোধ করিয়াছে। দেবুর বুকে বুক রাখিয়া আলিঙ্গনের সময় সে স্পষ্ট অনুভব করিয়াছে, অভয়ের বাণী তাহার বুকের মধ্যে আলোড়িত হইতে। সকল বাধা দূর করিয়া জীবনের সার্থকতা লাভের অদম্য আগ্রহের বাণী।

উত্তেজনায় বিপ্লববাদী শরীরে থরথর করিয়া কম্পন বহিয়া গেল। এ চিন্তা তাহার বিপ্লববাদের চিন্তা। আনন্দে তাহার চোখে ফুটিয়া উঠিল অদ্ভুত এক দীপ্তি। তাহার আনন্দ, তাহার সান্ত্বনা এই যে, সে তাহার কর্তব্য করিয়াছে। বন্দিজীবনে এই পল্লীর মধ্যে দেবুর জাগরণে সে সাহায্য করিয়াছে। বন্দিত্ব তাহার নিজের জীবনে জাগরণের ভাবপ্লাবনের গতিরোধ করিতে পারে নাই। এমনি করিয়াই নূতন কালের ধর্ষণ-প্রচেষ্টা ব্যর্থ হইবে মানুষ বাঁচিবে। ভয় নাই, ভয় নাই।

বাঁধের উপর দেবু দাঁড়াইয়া বলিল—যতীনবাবু, আসি তা হলে। নমস্কার।

যতীন বলিল—নমস্কার দেবুবাবু, বিদায়। দেবুর হাত দুইখানি নিজের হাতের মধ্যে গ্রহণ করিয়া দেবুর মুখের দিকে চাহিয়া রহিল; হঠাৎ থামিয়া আবৃত্তি করিল—

উদয়ের পথে শুনি কার বাণী—ভয় নাই ওরে ভয় নাই।
নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান, ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।।

তারপর সে নিতান্ত অকস্মাৎ মুখ ফিরাইয়া দ্রুতবেগে চলিতে আরম্ভ করিল। দেবু যতীনের গতিপথের দিকে একদৃষ্টে চাহিয়া দাঁড়াইয়া রহিল। চোখ দিয়া তাহার দরদরধারে জল পড়িতে আরম্ভ করিল। এই একান্ত একক জীবন বিলু, খোকা চলিয়া গিয়াছে, জগন, হরেন আসিয়া আর তেমন কলরব করে না। সমস্ত গ্রাম হইতে সে বিচ্ছিন্ন হইয়া পড়িতেছে। আজ যতীনবাবুও চলিয়া গেল। কেমন করিয়া দিন কাটিবে তাহার? কাহাকে লইয়া বাঁচিয়া থাকিবে? সহসা মনে পড়িল ন্যায়রত্নের গল্প। কই, তাহার সে শালগ্রাম কই? সে ঊর্ধ্বলোকে আকাশের দিকে চাহিয়া আত্মহারার মত হাত বাড়াইল, সমস্ত অন্তর পরিপূর্ণ করিয়া অকপট-কাতর স্বরে ডাকিল ভগবান!

ময়ূরাক্ষীর গর্ভে নামিয়া যতীন আবার ফিরিয়া দাঁড়াইল। সুউচ্চ বাঁধের উপর দণ্ডায়মান ঊর্ধ্ববাহু দেবুকে দেখিয়া সে আনন্দে তৃপ্তিতে মোহগ্রস্তের মত নিশ্চল হইয়া দেবুর দিকে চাহিয়া রহিল।

দারোগা ডাকিল যতীনবাবু, আসুন!

যতীন মাটিতে হাত ঠেকাইয়া, সেই হাত কপালে ঠেকাইয়া প্রণাম করিল। তারপর বলিল—চলুন।

অকস্মাৎ দূরে কোথাও ঢাক বাজিয়া উঠিল।

সেই দূরাগত ঢাকের শব্দে সচেতন হইয়া দেবু একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিল। ঢাক বাজিতেছে। মহাগ্রামে ঢাকের শব্দ। ন্যায়রত্নের বাড়ীতে রথযাত্রা। রথ কোথায় গিয়া থামিবে কে জানে?

বাঁধের পথ ধরিয়া সে দ্রুতপদে অগ্রসর হইল।