→♦←
বাঘ ও বক
একদা এক বাঘের গলার হাড় ফুটিয়াছিল। বাঘ বিস্তর চেষ্টা পাইল, কিছুতেই হাড় বাহির করিতে পারিল না; যন্ত্রণায় অস্থির হইয়া, চারি দিকে দৌড়িয়া বেড়াইতে লাগিল। সে যে জন্তুকে সম্মুখে দেখে, তাহাকেই কহে, ভাই হে! যদি তুমি, আমার গলা হইতে, হাড় বাহির করিয়া দিতে পার, তাহা হইলে, আমি তোমায় বিলক্ষণ পুরস্কার দি, এবং, চির কালের জন্যে, তোমার কেনা হইয়া থাকি। কোনও জন্তুই সম্মত হইল না।
অবশেষে, এক বক, পুরস্কারের লোভে, সম্মত হইল, এবং বাঘের মুখের ভিতর, আপন লম্বা ঠোঁট প্রবেশ করাইয়া দিয়া, অনেক যত্নে ঐ হাড় বাহির করিয়া আনিল। বাঘ সুস্থ হইল। পরে, বক পুরস্কারের কথা উত্থাপন করিবামাত্র, সে দাঁত কড়মড় ও চক্ষু রক্তবর্ণ করিয়া কহিল, অরে নির্ব্বোধ! তুই বাঘের মুখে ঠোঁট প্রবেশ করাইয়া দিয়াছিলি। তুই যে নির্বিঘ্নে ঠোঁট বাহির করিয়া লইয়াছিস, তাহাই ভাগ্য করিয়া না মানিয়া, আবার পুরস্কার চাহিতেছিস। যদি বাঁচিবার সাধ থাকে, আমার সম্মুখ হইতে যা, নতুবা এখনই তোর ঘাড় ভাঙ্গিব। বক শুনিয়া, হতবুদ্ধি হইয়া, তৎক্ষণাৎ তথা হইতে পলায়ন করিল।
অসতের সহিত ব্যবহার করা ভাল নয়।
দাঁড়কাক ও ময়ূরপুচ্ছ
এক স্থানে কতকগুলি ময়ূরপুচ্ছ পড়িয়া ছিল। এক দাঁড়কাক, দেখিয়া, মনে মনে বিবেচনা করিল, যদি আমি এই ময়ূরপুচ্ছগুলি আপন পাখায় বসাইয়া দি, তাহা হইলেই আমিও ময়ূরের মত সুশ্রী হইব। এই ভাবিয়া, দাঁড়কাক ময়ূরপুচ্ছগুলি আপন পাখায় বসাইয়া দিল, এবং দাঁড়কাকদের নিকটে গিয়া, তোরা অতি নীচ ও অতি বিশ্রী, আর আমি তোদের সঙ্গে থাকিব না, এই বলিয়া, গালাগালি দিয়া, ময়ূরের দলে মিশিতে গেল।
ময়ূরগণ, দেখিবা মাত্র, তাহাকে দাঁড়কাক বলিয়া চিনিতে পারিল, সকলে মিলিয়া, তাহার পাখা হইতে, এক একটি করিয়া, ময়ূরপুচ্ছগুলি তুলিয়া লইল, এবং তাহাকে নিতান্ত অপদার্থ জ্ঞান করিয়া, এত ঠোকরাইতে আরম্ভ করিল যে, দাঁড়কাক, জ্বালায় অস্থির হইয়া, পলায়ন করিল। অনন্তর, সে পুনরায় আপন দলে মিলিতে গেল। তখন, দাঁড়কাকেরা উপহাস করিয়া কহিল, অরে নির্ব্বোধ! তুই ময়ূরপুচ্ছ পাইয়া, অহঙ্কারে মত্ত হইয়া, আমাদিগকে ঘৃণা করিয়া ও গালাগালি দিয়া, ময়ূরের দলে মিলিতে গিয়াছিলি; সেখানে অপদস্থ হইয়া, আবার আমাদের দলে মিলিতে আসিয়াছিস। তুই অতি নির্লজ্জ। এই রূপে যথোচিত তিরস্কার করিয়া, তাহারা সেই নির্ব্বোধ দাঁড়কাককে তাড়াইয়া দিল।
যাহার যে অবস্থা, সে যদি তাহাতেই সন্তুষ্ট থাকে, তাহা হইলে, তাহাকে কাহারও নিকট অপদস্থ ও অবমানিত হইতে হয় না।
শিকারী কুকুর
এক ব্যক্তির একটি অতি উত্তম শিকারী কুকুর ছিল। সে যখন শিকার করিতে যাইত, কুকুরটি সঙ্গে থাকিত। ঐ কুকুরের বিলক্ষণ বল ছিল, শিকারের সময়, কোনও জন্তুকে দেখাইয়া দিলে, সে সেই জন্তুর ঘাড়ে এমন কামড়াইয়া ধরিত যে, উহা আর পলাইতে পারিত না। এই রূপে, যত দিন তাহার শরীরে বল ছিল, আপন প্রভুর যথেষ্ট উপকার করিয়াছিল।
কালক্রমে, ঐ কুকুর বৃদ্ধ হইয়া অত্যন্ত দুর্ব্বল হইয়া পড়িল। এই সময়ে, তাহার প্রভু এক দিন, তাহাকে সঙ্গে লইয়া, শিকার করিতে গেলেন। এক শূকর তাঁহার সন্মুখ হইতে দৌড়িয়া পলাইতে লাগিল। শিকারী ব্যক্তি ইঙ্গিত করিবা মাত্র, কুকুর, প্রাণপণে দৌড়িয়া গিয়া, শূকরের ঘাড়ে কামড়াইয়া ধরিল, কিন্তু পূর্ব্বের মত বল ছিল না, এজন্য ধরিয়া রাখিতে পারিল না, শূকর অনয়াসে ছাড়াইয়া চলিয়া গেল।
শিকারী ব্যক্তি, ক্রোধে অন্ধ হইয়া, কুকুরকে তিরস্কার ও প্রহার করিতে আরম্ভ করিল। তখন কুকুর কহিল, মহাশয়! বিনা অপরাধে, আমারে তিরস্কার ও প্রহার করেন কেন। মনে করিয়া দেখুন, যত দিন আমার বল ছিল, প্রাণপণে আপনকার কত উপকার করিয়াছি; এক্ষণে বৃদ্ধ হইয়া, নিতান্ত দুর্বল ও অক্ষম হইয়া পড়িয়াছি বলিয়া, তিরস্কার ও প্রহার করা উচিত নহে।
সর্প ও কৃষক
শীতকালে, এক কৃষক, অতি প্রত্যুষে, ক্ষেত্রে কর্ম্ম করিতে যাইতেছিল; দেখিতে পাইল, এক সর্প, হিমে আচ্ছন্ন ও মৃতপ্রায় হইয়া, পথের ধারে পড়িয়া আছে। দেখিয়া, তাহার অন্তঃকরণে দয়ার উদয় হইল। তখন সে ঐ সর্পকে উঠাইয়া লইল, এবং বাটীতে আনিয়া, আগুনে সেকিয়া, কিছু আহার দিয়া, তাহাকে সজীব করিল। সাপ, এই রূপে সজীব হইয়া উঠিয়া, পুনরায় আপন স্বভাব প্রাপ্ত হইল, এবং কৃষকের শিশু সন্তানকে সম্মুখে পাইয়া, দংশন করিতে উদ্যত হইল।
কৃষক দেখিয়া, অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হইয়া, সর্পকে সম্বোধন করিয়া কহিল, অরে ক্রূর! তুই অতি কৃতঘ্ন। তোর প্রাণ নষ্ট হইতেছিল দেখিয়া, দয়া করিয়া, গৃহে আনিয়া, আমি তোরে প্রাণদান দিলাম; তুই, সে সকল ভুলিয়া গিয়া, আমার পুত্রকে দংশন করিতে উদ্যত হইলি। বুঝিলাম, যার যে স্বভাব, কিছুতেই তাহার অন্যথা হয় না। যাহা হউক, তোর যেমন কর্ম্ম, তার উপযুক্ত ফল পা। এই বলিয়া, কুপিত কৃষক, হস্তস্থিত কুঠার দ্বারা, সর্পের মস্তকে এমন প্রহার করিল যে, এক আঘাতেই তাহার প্রাণত্যাগ হইল।
কুকুর ও প্রতিবিম্ব
একটা কুকুর, একখণ্ড মাংস মুখে করিয়া, নদী পার হইতেছিল। নদীর নির্মল জলে, তাহার যে প্রতিবিম্ব পড়িয়াছিল, সেই প্রতিবিম্বকে অন্য কুকুর স্থির করিয়া, মনে মনে বিবেচনা করিল, এই কুকুরের মুখে যে মাংসখণ্ড আছে কাড়িয়া লই। তাহা হইলে, আমার দুই খণ্ড মাংস হইবেক।
এই রূপ লোভে পড়িয়া, মুখ বিস্তার করিয়া, কুকুর যেমন অলীক মাংসখণ্ড ধরিতে গেল, অমনি উহার মুখস্থিত মাংসখণ্ড, জলে পড়িয়া, স্রোতে ভাসিয়া গেল। তখন সে, হতবুদ্ধি হইয়া, কিয়ৎ ক্ষণ স্তব্ধ হইয়া রহিল; অনন্তর, এই ভাবিতে ভাবিতে, নদী পার হইয়া চলিয়া গেল, যাহারা, লোভের বশীভূত হইয়া, কল্পিত লাভের প্রত্যাশায়, ধাবমান হয়, তাহাদের এই দশাই ঘটে।
ব্যাঘ্র ও মেষশাবক
এক ব্যাঘ্র, পর্ব্বতের ঝরনায় জল পান করিতে করিতে, দেখিতে পাইল, কিছু দূরে, নীচের দিকে, এক মেষশাবক জল পান করিতেছে। সে দেখিয়া মনে মনে কহিতে লাগিল, এই মেষের প্রাণ সংহার করিয়া, আজকার আহার সম্পন্ন করি; কিন্তু বিনা দোষে এক জনের প্রাণবধ করা ভাল দেখায় না; অতএব, একটা দোষ দেখাইয়া, অপরাধী করিয়া, উহার প্রাণবধ করিব।
এই স্থির করিয়া, ব্যাঘ্র সত্বর গমনে মেষশাবকের নিকট উপস্থিত হইয়া কহিল, অরে দুরা- ত্মন! তোর এত বড় আস্পর্দ্ধা যে, আমি জল পান করিতেছি দেখিয়াও, তুই জল ঘোলা করিতেছিস। মেষ শাবক শুনিয়া ভয়ে কাঁপিতে কাঁপিতে কহিল, সে কি মহাশয়! আমি কেমন করিয়া আপনকার পান করিবার জল ঘোলা করিলাম। আমি নীচে জল পান করিতেছি, আপনি উপরে জল পান করিতেছেন। নীচের জল ঘোলা করিলেও, উপরের জল ঘোলা হইতে পারে না।
বাঘ কহিল, সে যাহা হউক, তুই, এক বৎসর পূর্ব্বে, আমার বিস্তর নিন্দা করিয়াছিলি; আজ তোরে তাহার সমুচিত প্রতিফল দিব। মেষশাবক কাঁপিতে কাঁপিতে কহিল, আপনি অন্যায় আজ্ঞা করিতেছেন; এক বৎসর পূর্ব্বে আমার জন্মই হয় নাই; সুতরাং তৎকালে আমি আপনকার নিন্দা করিয়াছি, ইহা কিরূপে সম্ভবিতে পারে। বাঘ কহিল, হাঁ সত্য বটে, সে তুই নহিস, তোর বাপ আমার নিন্দা করিয়াছিল। তুই কর, আর তোর বাপ করুক, একই কথা; আর আমি তোর কোনও ওজর শুনিতে চাহি না। এই বলিয়া, বাঘ ঐ অসহায় দুর্বল মেষশাবকের প্রাণসংহার করিল।
দুরাত্মার ছলের অসদ্ভাব নাই। আমি অপরাধী নহি, বা এরূপ করা অন্যায়, ইহা কহিয়া প্রবল ব্যক্তির অত্যাচার হইতে পরিত্রাণ পাওয়া যায় না।
মাছি ও মধুর কলসী
এক দোকানে মধুর কলসী উলটিয়া পড়িয়াছিল। তাহাতে চারি দিকে মধু ছড়াইয়া যায়। মধুর গন্ধ পাইয়া, ঝাঁকে ঝাঁকে মাছি আসিয়া সেই মধু খাইতে লাগিল। যত ক্ষণ এক ফোঁটা মধু পড়িয়া রহিল, তাহারা ঐ স্থান হইতে নড়িল না। অধিক ক্ষণ তথায় থাকাতে, ক্রমে ক্রমে সমুদয় মাছির পা মধুতে জড়াইয়া গেল, মাছি সকল আর কোনও মতে উড়িতে পারিল না; এবং আর যে উড়িয়া যাইতে পারিবেক, তাহারও প্রত্যাশা রহিল না। তখন তাহারা, আপনাদিগকে ধিক্কার দিয়া, আক্ষেপ করিয়া কহিতে লাগিল, আমরা কি নির্বোধ, ক্ষণিক সুখের জন্যে প্রাণ হারাইলাম।
সিংহ ও ইঁদুর
এক সিংহ পর্ব্বতের গুহায় নিদ্রা যাইতেছিল। দৈবাৎ একটা ইঁদুর, সেই দিকে যাইতে যাইতে, সিংহের নাসারন্ধ্রে প্রবিষ্ট হইয়া গেল। প্রবিষ্ট হইবা মাত্র, সিংহের নিদ্রাভঙ্গ হইল। পরে, ইঁদুর নির্গত হইলে, সিংহ ঈষৎ কুপিত হইয়া, নখর প্রহার করিয়া, তাহার প্রাণ সংহারে উদ্যত হইল। ইঁদুর, প্রাণভয়ে কাতর হইয়া, বিনয় করিয়া কহিল, মহারাজ! আমি না জানিয়া অপরাধ করিয়াছি, ক্ষমা করিয়া আমায় প্রাণ দান করুন। আপনি সমস্ত পশুর রাজা, আমার মত ক্ষুদ্র পশুর প্রাণ বধ করিলে, আপনকার কলঙ্ক আছে। সিংহ শুনিয়া ঈষৎ হাস্য করিল, এবং দয়া করিয়া, ইঁদুরকে ছাড়িয়া দিল।
এই ঘটনার কিছু দিন পরে, সিংহ, ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিতে করিতে, এক শিকারীর জালে পড়িল; বিস্তর চেষ্টা পাইল, কিছুতেই জাল ছাড়াইতে পারিল না। পরিশেষে, প্রাণরক্ষা বিষয়ে নিতান্ত নিরাশ হইয়া, সে এমন ভয়ঙ্কর গর্জ্জন করিতে লাগিল যে, সমস্ত অরণ্য কম্পিত হইয়া উঠিল।
সিংহ, ইতিপূর্ব্বে, যে ইঁদুরকে প্রাণ দান করিয়াছিল, সে ঐ অরণ্যের অনতিদূরে বাস করিত। এক্ষণে সে, পূর্ব্ব প্রাণদাতার স্বর চিনিতে পারিয়া, সত্বর সেই স্থানে উপস্থিত হইল, এবং তাহার এই বিপদ দেখিয়া, ক্ষণমাত্র বিলম্ব না করিয়া, জাল কাটিতে আরম্ভ করিল, এবং অল্প ক্ষণের মধ্যেই, সিংহকে বন্ধন হইতে মুক্ত করিয়া দিল।
কাহারও উপর দয়া প্রকাশ করিলে, তাহা প্রায় নিষ্ফল হয় না। যে যেমন ক্ষুদ্র প্রাণী হউক না কেন, উপকৃত হইলে, সে, কখনও না কখনও, প্রত্যুপকার করিতে পারে।
কুকুর, কুক্কুট ও শৃগাল
এক কুকুর ও এক কুক্কুট উভয়ের অত্যন্ত প্রণয় ছিল। এক দিন উভয়ে মিলিয়া বেড়াইতে গেল। এক অরণ্যের মধ্যে রাত্রি উপস্থিত হইল। রাত্রি যাপন করিবার নিমিত্ত, কুক্কুট এক বৃক্ষের শাখায় আরোহণ করিল, কুকুর সেই বৃক্ষের তলে শয়ন করিয়া রহিল।
রাত্রি প্রভাত হইল। কুক্কুটদের স্বভাব এই প্রভাতকালে উচ্চ স্বরে ডাকিয়া থাকে। কুক্কুট শব্দ করিবামাত্র, এক শৃগাল, শুনিতে পাইয়া, মনে মনে স্থির করিল, কোনও সুযোগে, আজ এই কুক্কুটের প্রাণ নষ্ট করিয়া, মাংস আহার করিব। এই স্থির করিয়া, সেই বৃক্ষের নিকটে আসিয়া, ধূর্ত্ত শৃগাল কুক্কুটকে সম্বোধন করিয়া কহিল, ভাই! তুমি কি সৎ পক্ষী, সকলের কেমন উপকারক। আমি, তোমার স্বর শুনিতে পাইয়া, প্রফুল্ল হইয়া আসিয়াছি। এক্ষণে, বৃক্ষের শাখা হইতে নামিয়া আইস। দুজনে মিলিয়া খানিক আমোদ আহ্লাদ করি।
কুক্কুট, শৃগালের ধূর্ত্ততা বুঝিতে পারিয়া, তাহাকে ঐ ধূর্ত্ততার প্রতিফল দিবার নিমিত্ত, কহিল, ভাই শৃগাল! তুমি বৃক্ষের তলায় আসিয়া খানিক অপেক্ষা কর, আমি নামিয়া যাইতেছি। শৃগাল শুনিয়া, হৃষ্ট চিত্তে, যেমন বৃক্ষের তলায় আসিল, অমনি কুকুর তাহাকে আক্রমণ করিল, এবং দন্তাঘাতে ও নখর প্রহারে তাহার সর্ব্ব শরীর বিদীর্ণ করিয়া প্রাণ সংহার করিল।
পরের মন্দচেষ্টায় ফাঁদ পাতিলে, আপনাকেই সেই ফাঁদে পড়িতে হয়।
ব্যাঘ্র ও পালিত কুকুর
এক স্থূলকায় পালিত কুকুরের সহিত এক ক্ষুধার্ত্ত শীর্ণকায় ব্যাঘ্রের সাক্ষাৎ হইল। প্রথম আলাপের পর, ব্যাঘ্র কুকুরকে কহিল, ভাল ভাই, জিজ্ঞাসা করি, বল দেখি, তুমি কেমন করিয়া এমন সবল ও স্থূলকায় হইলে; প্রতিদিন কিরূপ আহার কর, এবং কি রূপেই বা প্রতিদিনের আহার সংগ্রহ কর। আমি, অহোরাত্র আহারের চেষ্টায় ফিরিয়াও, উদর পূরিয়া আহার করিতে পাই না; কোনও কোনও দিন উপবাসীও থাকিতে হয়। এই রূপ আহারের কষ্টে এমন শীর্ণকায় ও দুর্বল হইয়া পড়িয়াছি।
কুকুর কহিল, আমি যা করি, তুমি যদি তাই করিতে পার, আমার মত আহার পাও। ব্যাঘ্র কহিল, সত্য না কি; আচ্ছা ভাই, তোমায় কি করিতে হয়, বল। কুকুর কহিল, আর কিছু নয়, রাত্রিতে প্রভুর বাটীর রক্ষণাবেক্ষণ করিতে হয়, এই মাত্র। ব্যাঘ্র কহিল, আমিও করিতে সম্মত আছি। আমি, আহারের চেষ্টায়, বনে বনে ভ্রমণ করিয়া, রৌদ্রে ও বৃষ্টিতে অত্যন্ত কষ্ট পাই। আর এ ক্লেশ সহ্য হয় না। যদি, রৌদ্র ও বৃষ্টির সময়, গৃহের মধ্যে থাকিতে পাই, এবং ক্ষুধার সময় পেট ভরিয়া খাইতে পাই, তাহা হইলে বাঁচিয়া যাই। ব্যাঘ্রের দুঃখের কথা শুনিয়া, কুকুর কহিল, তবে আমার সঙ্গে এস। আমি, প্রভুকে বলিয়া, তোমার বন্দোবস্ত করিয়া দিব।
ব্যাঘ্র কুকুরের সঙ্গে চলিল। খানিক গিয়া, সে কুকুরের ঘাড়ে একটা দাগ দেখিতে পাইল, এবং কিসের দাগ জানিবার নিমিত্ত, অত্যন্ত ব্যগ্র হইয়া, কুকুরকে জিজ্ঞাসা করিল, ভাই! তোমার ঘাড়ে ও কিসের দাগ। কুকুর কহিল, ও কিছু নয়। ব্যাঘ্র কহিল, না ভাই! বল বল, আমার জানিতে বড় ইচ্ছা হইয়াছে। কুকুর কহিল, আমি বলিতেছি, ও কিছু নয়; বোধ হয়, গলাবন্ধের দাগ। বাঘ কহিল, গলাবন্ধ কেন? কুকুর কহিল, ঐ গলাবন্ধে শিকলী দিয়া, দিনের বেলায়, আমায় বাঁধিয়া রাখে।
বাঘ শুনিয়া চমকিয়া উঠিল এবং কহিল, শিকলীতে বাঁধিয়া রাখে। তবে তুমি, যখন যেখানে ইচ্ছা, যাইতে পার না। কুকুর কহিল, তা কেন দিনের বেলায় বাঁধা থাকি বটে; কিন্তু রাত্রিতে যখন ছাড়িয়া দেয়, তখন আমি যেখানে ইচ্ছা যাইতে পারি। তদ্ভিন্ন, প্রভুর ভৃত্যেরা আমাকে কত আদর ও কত যত্ন করে, ভাল আহার দেয়, স্নান করাইয়া দেয়। প্রভুও, কখনও কখনও, আদর করিয়া, আমার গায় হাত বুলাইয়া দেন। দেখ দেখি, কেমন সুখে থাকি। বাঘ কহিল, ভাই হে! তোমার সুখ তোমারই থাকুক, আমার অমন সুখে কাজ নাই। নিতান্ত পরাধীন হইয়া, রাজভোগে থাকা অপেক্ষা, স্বাধীন থাকিয়া, আহারের ক্লেশ পাওয়া সহস্র গুণে ভাল। আর আমি তোমার সঙ্গে যাইব না। এই বলিয়া বাঘ চলিয়া গেল।
খরগস ও কচ্ছপ
কচ্ছপ স্বভাবতঃ অতি আস্তে চলে, এজন্য, এক খরগস কোনও কচ্ছপকে উপহাস করিতে লাগিল। কিন্তু, কচ্ছপ ঈষৎ হাসিয়া কহিল, ভাল ভাই! কথায় কাজ নাই, দিন স্থির কর, ঐ দিনে দুজনে এক সঙ্গে চলিতে আরম্ভ করিব; দেখা যাবে, কে আগে নিরূপিত স্থানে পঁহুছিতে পারে। খরগস কহিল, অন্য দিনের আবশ্যক কি; এস আজই দেখা যাউক; এখনই বুঝা যাইবেক, কে কত চলিতে পারে।
এই প্রতিজ্ঞা করিয়া, উভয়ে এক কালে, এক স্থান হইতে, চলিতে আরম্ভ করিল। কচ্ছপ আস্তে আস্তে চলিত বটে, কিন্তু চলিতে আরম্ভ করিয়া, এক বারও না থামিয়া, অবাধে চলিতে লাগিল। খরগস অতি দ্রুত চলিতে পারিত, এজন্য মনে করিল, কচ্ছপ যত চলুক না কেন, আমি আগে পঁহুছিতে পারিব। এই স্থির করিয়া, খানিক দূর গিয়া, শ্রম বোধ হওয়াতে, সে নিদ্রা গেল; নিদ্রাভঙ্গের পর, নির্দিষ্ট স্থানে গিয়া দেখিল, কচ্ছপ তাহার অনেক পূর্ব্বে পঁহুছিয়াছে।
কচ্ছপ ও ঈগল পক্ষী
পক্ষীরা অনায়াসে আকাশে উড়িয়া বেড়ায়, কিন্তু আমি পারি না, ইহা ভাবিয়া, এক কচ্ছপ অত্যন্ত দুঃখিত হইল, এবং মনে মনে অনেক আন্দোলন করিয়া, স্থির করিল, যদি কেহ আমায় এক বার আকাশে উঠাইয়া দেয়, তাহা হইলে, আমি, পক্ষীদের মত, সচ্ছন্দে উড়িয়া বেড়াইতে পারি। অনন্তর, সে এক ঈগল পক্ষীর নিকটে গিয়া কহিল, ভাই! যদি তুমি, অনুগ্রহ করিয়া, আমায় একটি বার আকাশে উঠাইয়া দাও, তাহা হইলে, সমুদ্রের গর্ভে যত রত্ন আছে, সমুদয় উদ্ধৃত করিয়া তোমায় দি। আমার, আকাশে উড়িয়া বেড়াইতে, বড় ইচ্ছা হইয়াছে।
ঈগল, কচ্ছপের অভিলাষ ও প্রার্থনা শুনিয়া, কহিল, শুন কচ্ছপ! তুমি যে মানস করিয়াছ, তাহা সিদ্ধ হওয়া অসম্ভব। ভূচর জন্তু কখনও, খেচরের ন্যায়, আকাশে উড়িতে পারে না। তুমি এ বাসনা পরিত্যাগ কর। আমি যদি তোমায় আকাশে উঠাইয়া দি, তুমি তৎক্ষণাৎ পড়িয়া যাইবে এবং হয় ত ঐ পড়াতেই তোমার প্রাণত্যাগ হইবে। কচ্ছপ ক্ষান্ত হইল না, অত্যন্ত পীড়াপীড়ি করিতে লাগিল। তখন ঈগল, ঈষৎ হাস্য করিয়া, কচ্ছপকে লইয়া, অনেক ঊর্দ্ধে উঠিল, এবং, তবে তুমি উড়িতে আরম্ভ কর, এই বলিয়া উহাকে ছাড়িয়া দিল। ছাড়িয়া দিবা মাত্র, কচ্ছপ এক পাহাড়ের উপর পড়িল এবং তাহার সর্ব্ব শরীর চূর্ণ হইয়া গেল।
অহঙ্কার করিলেই পড়িতে হয়।
নাহঙ্কারাৎ পরো রিপুঃ।
রাখাল ও ব্যাঘ্র
এক রাখাল মাঠে গোরু চরাইত। ঐ মাঠের নিকটবর্ত্তী বনে বাঘ থাকিত। রাখাল, তামাসা দেখিবার নিমিত্ত, মধ্যে মধ্যে, বাঘ আসিয়াছে বলিয়া, উচ্চৈঃ স্বরে চীৎকার করিত। নিকটস্থ লোক, বাঘ আসিয়াছে শুনিয়া, অত্যন্ত ব্যস্ত হইয়া, তাহার সাহায্যের নিমিত্ত, তথায় উপস্থিত হইত। রাখাল দাঁড়াইয়া খিল খিল করিয়া হাসিত। আগত লোকেরা অপ্রস্তুত হইয়া চলিয়া যাইত।
অবশেষে এক দিন, সত্য সত্যই, বাঘ আসিয়া তাহার পালের গোরু আক্রমণ করিল। তখন রাখাল, নিতান্ত ব্যাকুল হইয়া, বাঘ আসিয়াছে বলিয়া, উচ্চৈঃ স্বরে মুহুর্মুহুঃ চীৎকার করিতে লাগিল। কিন্তু সে দিবস, এক প্রাণীও তাহার সাহায্যার্থে উপস্থিত হইল না। সকলেই মনে করিল, ধূর্ত্ত রাখাল, পূর্ব্ব পূর্ব্ব বারের মত, বাঘ আসিয়াছে বলিয়া, আমাদের সঙ্গে তামাসা করিতেছে। বাঘ ইচ্ছামত পালের গোরু বধ করিল, এবং অবশেষে, রাখালের প্রাণ সংহার করিয়া, চলিয়া গেল। নির্ব্বোধ রাখাল, সকলকে এই উপদেশ দিয়া, প্রাণত্যাগ করিল যে, মিথ্যাবাদীরা সত্য কহিলেও, কেহ বিশ্বাস করে না।
শৃগাল ও কৃষক
ব্যাধগণে ও তাহাদের কুকুরে তাড়াতাড়ি করাতে, এক শৃগাল, অতি দ্রুত দৌড়িয়া গিয়া, কোনও কৃষকের নিকট উপস্থিত হইল, এবং কহিল, ভাই! যদি তুমি কৃপা করিয়া আশ্রয় দাও, তবে এ যাত্রা আমার পরিত্রাণ হয়। কৃষক আপন কুটীর দেখাইয়া দিল। শৃগাল, কুটীরে প্রবেশ করিয়া, এক কোণে লুকাইয়া রহিল। ব্যাধেরাও, অবিলম্বে তথায় উপস্থিত হইয়া, কৃষককে জিজ্ঞাসা করিল, অহে ভাই! এ দিকে একটা শিয়াল এসেছিল, কোন দিকে গেল, বলিতে পার। সে কহিল, না; কিন্তু কুটীরের দিকে অঙ্গুলিপ্রয়োগ করিল। তাহারা, কৃষকের সঙ্কেত বুঝিতে না পারিয়া, তৎক্ষণাৎ তথা হইতে চলিয়া গেল।
ব্যাধেরা প্রস্থান করিলে, শৃগাল, কুটীর হইতে নির্গত হইয়া, চুপে চুপে চলিয়া যাইতে লাগিল। ইহা দেখিয়া, কৃষক ভর্ৎসনা করিয়া শৃগালকে কহিল, যা হউক ভাই! তুমি বড় ভদ্র; আমি বিপদের সময়, আশ্রয় দিয়া, তোমার প্রাণ রক্ষা করিলাম। কিন্তু তুমি, যাইবার সময়, আমারে একটা কথার সম্ভাষণও করিলে না। শৃগাল কহিল, ভাই হে! তুমি কথায় যেমন ভদ্রতা করিয়াছিলে, যদি অঙ্গুলিতেও সেইরূপ ভদ্রতা করিতে, তাহা হইলে, আমি, তোমার নিকট বিদায় না লইয়া, কদাচ কুটীর হইতে চলিয়া যাইতাম না।
এক কথায় যত মন্দ হয়, এক ইঙ্গিতেও তত মন্দ হইতে পারে।
কাক ও জলের কলসী
এক তৃষ্ণার্ত্ত কাক, দূর হইতে জলের কলসী দেখিতে পাইয়া, আহ্লাদিত হইয়া, ঐ কলসীর নিকটে উপস্থিত হইল, এবং জল পান করিবার নিমিত্ত, নিতান্ত ব্যগ্র হইয়া, কলসীর মধ্যে ঠোঁট প্রবেশ করাইয়া দিল; কিন্তু কলসীতে জল অনেক নীচে ছিল, এজন্য কোনও মতে পান করিতে পরিল না। তখন, সে প্রথমে কলসী ভাঙ্গিয়া ফেলিবার চেষ্টা পাইল; পরে, কলসী উল্টাইয়া দিয়া, জল পান করিবার চেষ্টা করিল; কিন্তু বলের অল্পতা প্রযুক্ত, তাহার কোনও চেষ্টাই সফল হইল না। অবশেষে, কতকগুলি লুড়ি সেই খানে পড়িয়া আছে দেখিয়া, এক একটি করিয়া, সমুদয় লুড়িগুলি কলসীর ভিতরে ফেলিল। তলায় লুড়ি পড়াতে, জল কলসীর মুখের গোড়ায় উঠিল, তখন কাক, ইচ্ছামত জল পান করিয়া, তৃষ্ণা নিবারণ করিল।
বলে যাহা সম্পন্ন না হয়, কৌশলে তাহা সম্পন্ন হইতে পারে।
কাজ আটকাইলে বুদ্ধি যোগায়।
একচক্ষু হরিণ
এক একচক্ষু হরিণ সতত নদীর তীরে চরিয়া বেড়াইত। নদীর দিকে ব্যাধ আসিবার আশঙ্কা নাই, এই স্থির করিয়া, নিশ্চিন্ত হইয়া, স্থলের দিকে ব্যাধ আসিবার ভয়ে, সতত সেই দিকে দৃষ্টি রাখিত। দৈবযোগে, এক দিবস, কোনও ব্যাধ নৌকায় চড়িয়া যাইতেছিল। সে দূর হইতে ঐ হরিণকে চরিতে দেখিয়া শর নিক্ষেপ করিল। হরিণ মনে মনে এই ভাবিয়া প্রাণ ত্যাগ করিল, আমি যে দিকে বিপদের আশঙ্কা করিয়া সতর্ক থাকিতাম, সে দিকে কোনও ভয় হইল না; কিন্তু যে দিকে বিপদের আশঙ্কা নাই ভাবিয়া নিশ্চিন্ত ছিলাম, সেই দিক হইতেই শত্রু আসিয়া আমার প্রাণ সংহার করিল।
উদর ও অন্য অন্য অবয়ব
কোনও সময়ে, হস্ত পদ প্রভৃতি অবয়ব সকল মিলিয়া পরামর্শ করিতে লাগিল, দেখ ভাই সকল! আমরা নিয়ত পরিশ্রম করি; কিন্তু, উদর কখনও পরিশ্রম করেনা। সে সর্ব্ব ক্ষণ নিশ্চিন্ত রহিয়াছে; আমরা, প্রাণপণে পরিশ্রম করিয়া তাহার ভরণ পোষণ করিতেছি। যে নিয়ত আলস্যে কালহরণ করিবেক, আমরা কেন তাহার ভরণ পোষণ করিব। অতএব, আইস, সকলে প্রতিজ্ঞা করি, আজ অবধি, আমরা আর উদরের সাহায্য করিব না।
এই চক্রান্ত করিয়া, তাহারা পরিশ্রম ত্যাগ করিল। পা আর আহার স্থানে যায় না, হস্ত আর মুখে আহার তুলিয়া দেয় না, মুখ আর আহার গ্রহণ করে না, দন্ত আর ভক্ষ্য বস্তু চর্ব্বণ করে না। উদরকে জব্দ করিবার চেষ্টায়, দুই এক দিন এইরূপ করিলে, শরীর শুষ্ক হইয়া আসিল, অবয়ব সকল অত্যন্ত দুর্ব্বল হইয়া গেল, কোনও অবয়ব আর নড়িতে পারে না।
তখন তাহারা বুঝিতে পারিল, যদিও উদর পরিশ্রম করে না বটে, কিন্তু উদর প্রধান অবয়ব; উদরের ভরণ পোষণের জন্যে, পরিশ্রম না করিলে, সকলকেই দুর্ব্বল ও নিস্তেজ হইতে হইবেক। আমরা পরিশ্রম করিয়া কেবল উদরের সাহায্য করি, এমন নহে। উদরের পক্ষে, যেমন অন্য অন্য অবয়বের সহায়তা আবশ্যক, অন্য অন্য অবয়বের পক্ষেও, সেইরূপ উদরের সহায়তা আবশ্যক। যদি সুস্থ থাকা আবশ্যক হয়, সকল অবয়বকেই স্ব স্ব নিয়মিত কর্ম্ম করিতে হইবেক, নতুবা কাহারও ভদ্রস্থতা নাই।
দুই পথিক ও ভালুক
দুই বন্ধুতে মিলিয়া এক পথে ভ্রমণ করিতেছিল। দৈবযোগে, সেই সময়ে, তথায় এক ভালুক উপস্থিত হইল। বন্ধুদিগের মধ্যে এক ব্যক্তি, ভালুক দেখিয়া, অত্যন্ত ভয় পাইয়া, নিকটবর্ত্তী বৃক্ষে আরোহণ করিল, কিন্তু বন্ধুর কি দশা ঘটিল, তাহা এক বারও ভাবিল না। দ্বিতীয় ব্যক্তি, আর কোনও উপায় না দেখিয়া, এবং একাকী ভালুকের সঙ্গে যুদ্ধ করা দুঃসাধ্য ভাবিয়া, মৃতবৎ ভূতলে পড়িয়া রহিল। কারণ, সে পূর্ব্বে শুনিয়া ছিল, ভালুক মরা মানুষ ছোঁয় না।
ভালুক আসিয়া তাহার নাক, কান, মুখ, চোক, বুক পরীক্ষা করিল এবং তাহাকে মৃত নিশ্চয় করিয়া চলিয়া গেল। ভালুক চলিয়া গেলে পর, প্রথম ব্যক্তি, বৃক্ষ হইতে নামিয়া, বন্ধুর নিকটে আসিয়া, জিজ্ঞাসিল, ভাই! ভালুক তোমায় কি বলিয়া গেল; আমি দেখিলাম, সে তোমার কানের কাছে, অনেক ক্ষণ, মুখ রাখিয়াছিল। দ্বিতীয় ব্যক্তি কহিল, ভালুক আমায় এই কথা বলিয়া গেল, যে বন্ধু বিপদের সময় ফেলিয়া পলায়, আর কখনও তাহাকে বিশ্বাস করিও না।
সিংহ, গর্দ্দভ ও শৃগালের শিকার
এক সিংহ, এক গর্দ্দভ, এক শৃগাল, এই তিনে মিলিয়া শিকার করিতে গিয়াছিল। শিকার করা সমাপ্ত হইলে পর, তাহারা, যথাযোগ্য ভাগ করিয়া লইয়া, ইচ্ছামত আহার করিবার মানস করিল। তখন, সিংহ গর্দ্দভকে ভাগ করিতে আজ্ঞা দিল। তদনুসারে গর্দ্দভ, তিন ভাগ সমান করিয়া, স্বীয় সহচরদিগকে এক এক ভাগ গ্রহণ করিতে কহিল। সিংহ, অত্যন্ত কুপিত হইয়া, গর্দ্দভকে আক্রমণ করিল, এবং তৎক্ষণাৎ খণ্ড খণ্ড করিয়া ফেলিল।
পরে, সিংহ শৃগালকে ভাগ করিতে বলিল। শৃগাল অতি ধূর্ত্ত, গর্দ্দভের ন্যায় নির্বোধ নহে। সে, সিংহের অভিপ্রায় বুঝিতে পারিয়া, সিংহের ভাগে সমুদয় রাখিয়া, আপন ভাগে কিঞ্চিৎ মাত্র রাখিল। তখন, সিংহ সন্তুষ্ট হইয়া কহিল, সখে! কে তোমায় এরূপ ন্যায্য ভাগ করিতে শিখাইল? শৃগাল কহিল, যখন গর্দ্দভের দশা স্বচক্ষে দেখিলাম, তখন আর অপর শিক্ষার প্রয়োজন কি।
খরগস ও শিকারী কুকুর
কোনও জঙ্গলে, এক শিকারী কুকুর, এক খরগসকে শিকার করিবার নিমিত্ত, তাহার পশ্চাৎ ধাবমান হইল। খরগস, প্রাণভয়ে, এত দ্রুত দৌড়িতে আরম্ভ করিল যে, কুকুর, অতি বেগে দৌড়িয়াও, তাহাকে ধরিতে পারিল না; খরগস এক বারে দৃষ্টির বাহির হইয়া গেল। এক রাখাল এই তামাসা দেখিতেছিল, সে উপহাস করিয়া কহিল, কি আশ্চর্য্য! খরগস, অতি ক্ষীণ জন্তু হইয়াও, বেগে কুকুরকে পরাভব করিল। ইহা শুনিয়া কুকুর কহিল, ভাই হে! প্রাণভয়ে দৌড়ন, আর আহারের চেষ্টায় দৌড়ন, এ উভয়ের কত অন্তর, তা তুমি জান না।
কৃষক ও কৃষকের পুত্রগণ
এক কৃষক কৃষিকর্ম্মের কৌশল বিলক্ষণ অবগত ছিল। সে, আপন মৃত্যুর পূর্ব্ব ক্ষণে, ঐ সমস্ত কৌশল শিখাইবার নিমিত্ত, পুত্রদিগকে আহ্বান করিয়া কহিল, হে পুত্রগণ! আমি এক্ষণে ইহলোক হইতে প্রস্থান করিতেছি। আমার যা কিছু সং স্থান আছে, অমুক অমুক ভূমিতে অনুসন্ধান করিলে পাইবে। পুত্রেরা মনে করিল, ঐ সকল ভূমিতে পিতার গুপ্ত ধন আছে।
কৃষকের মৃত্যুর পর, তাহারা, গুপ্ত ধনের লোভে, সেই সকল ভূমি অত্যন্ত খনন করিল। এই রূপে, যার পর নাই পরিশ্রম করিয়া, তাহারা গুপ্ত ধন কিছুই পাইল না বটে, কিন্তু ঐ সকল ভুমি অত্যন্ত খনন করাতে, সে বৎসর এত শস্য জন্মিল যে, গুপ্ত ধন না পাইয়াও, তাহাদের পরিশ্রমের সম্পূর্ণ ফল লাভ হইল।
নেকড়ে বাঘ ও মেষের পাল
কোনও স্থানে কতকগুলি মেষ চরিত এবং কতিপয় বলবান কুকুর তাহাদের রক্ষণাবেক্ষণ করিত। কুকুরের ভয়ে, নেকড়ে বাঘে মেষদিগকে আক্রমণ করিতে পারিত না। একদা, বাঘেরা পরামর্শ করিল, এই সমস্ত কুকুর থাকিতে, আমরা কিছুই করিতে পারিব না। কোনও কৌশল করিয়া, ইহাদিগকে দূর করতে না পারিলে, আমাদের সুবিধা নাই। অতএব, যাহাতে ইহারা মেষগণের নিকট হইতে যায়, এমন কোনও উপায় করা আবশ্যক।
এই স্থির করিয়া, তাহারা মেষগণের নিকট বলিয়া পাঠাইল, এস আমরা অতঃপর সন্ধি করি। কেন চির কাল পরস্পর বিবাদ করিয়া মরি। যে সকল কুকুর তোমাদের রক্ষণাবেক্ষণ করে, তাহারাই এই সমস্ত বিবাদের মূল। তাহারা অনবরত চীৎকার করে, তাহাতেই আমাদের বিষম কোপ জন্মে। তাহাদিগকে বিদায় করিয়া দাও, তাহা হইলেই, চির কাল আমাদের পরস্পর বন্ধুতা থাকিবেক। নির্বোধ মেষগণ, এই কুমন্ত্রণা শুনিয়া কুকুরদিগকে বিদায় করিয়া দিল। এই রূপে, তাহারা রক্ষকশূন্য হওয়াতে, বাঘেরা, নিরুদ্বেগে তাহাদের প্রাণ সংহার করিয়া, ইচ্ছামত উদরপূর্ত্তি করিল।
শত্রুর কথায় ভুলিয়া, হিতৈষী বন্ধুকে দূর করিয়া দিলে, নিশ্চিত বিপদ ঘটে।
লাঙ্গূলহীন শৃগাল
কোনও সময়ে, এক শৃগাল ফাঁদে পড়িয়াছিল। যাহারা ফাঁদ পাতিয়াছিল, তাহারা তাহার প্রাণবধের উদ্যম করিল; কিন্তু, তাহার কাতরতা দেখিয়া, প্রাণে না মারিয়া, লাঙ্গূল কাটিয়া ছাড়িয়া দিল। শৃগাল এই রূপে লাঙ্গূল দিয়া প্রাণ বাঁচাইল বটে, কিন্তু লাঙ্গূল না থাকাতে, স্বজাতির নিকট যে অপমান বোধ হইবেক, তাহা ভাবিয়া, মনে মনে কহিতে লাগিল, লাঙ্গূল যাওয়া অপেক্ষা আমার প্রাণ যাওয়া ভাল ছিল।
পরিশেষে, এই অপমান শুধরিয়া লইবার জন্য, সকল শৃগালকে একত্র করিয়া, সে কহিতে লাগিল, দেখ ভাই সকল! আমার ইচ্ছা যে, তোমরা সকলে আমার মত লাঙ্গূল কাটিয়া ফেল; লাঙ্গূল না থাকাতে, আমি যে এক্ষণে কেমন সচ্ছন্দ শরীরে বেড়িয়া বেড়াই, তোমরা কেহই তাহা অনুভব করিতেছ না। যদি পরীক্ষা করিয়া না দেখিতাম, বোধ করি, আমিও কখনও বিশ্বাস করিতাম না। বিবেচনা করিয়া দেখিলে, লাঙ্গূল থাকিলে অতি কদর্য্য দেখায়, অত্যন্ত অসুবিধা, এবং অনর্থক ভার বহিয়া বেড়ান মাত্র লাভ। আমার আশ্চর্য্য বোধ হইতেছে যে, আমরা এত দিন লাঙ্গূল রাখিয়াছি কেন। হে বন্ধুগণ! আমি স্বয়ং যার পর নাই উপকার বোধ করিয়াছি, এজন্য তোমাদিগকে পরামর্শ দিতেছি যে, তোমরাও, আমার মত, আপন আপন লাঙ্গূল কাটিয়া ফেল। লাঙ্গূল না থাকায় কত আরাম, এখনই বুঝিতে পারিবে।
এই প্রস্তাব শুনিয়া, এক বৃদ্ধ শৃগাল, অগ্রসর হইয়া, লাঙ্গূলহীন শৃগালকে সম্বোধন করিয়া কহিল, ভাই হে! যদি তোমার লাঙ্গূল ফিরিয়া পাইবার সম্ভাবনা থাকিত, তাহা হইলে, তুমি কদাচ আমাদিগকে আপন আপন লাঙ্গূল কাটিয়া ফেলিতে পরামর্শ দিতে না।
শশকগণ ও ভেকগণ
এক স্থানে কতকগুলি শশক বাস করিত। ক্ষীণজীবী শশকগণ শত্রুগণের উৎপীড়নে এত জ্বালাতন হইয়াছিল যে, এক দিন, তাহারা একত্র হইয়া, পরামর্শ করিয়া, স্থির করিল, আমাদের প্রাণ রক্ষার কোনও উপায় নাই; অতএব প্রাণ ত্যাগ করাই শ্রেয়ঃ। এই প্রতিজ্ঞা করিয়া, নিকটবর্ত্তী হ্রদে ঝাঁপ দিয়া, প্রাণ ত্যাগ করিবার মানসে, সকলে মিলিয়া তথায় উপস্থিত হইল। কতকগুলি ভেক সেই হ্রদের তীরে বসিয়া ছিল; তাহারা, শশকগণ নিকটবর্ত্তী হইবা মাত্র, ভয়ে নিতান্ত ব্যাকুল হইয়া, জলে লাফাইয়া পড়িল। তাহা দেখিয়া, সকলের অগ্রসর শশক সহচরদিগকে কহিল, হে বন্ধুগণ! আমরা যত ভীত হইয়াছি ও যত নিরুপায় ভাবিয়াছি, তত করা উচিত নয়। তোমরা, এখানে আসিয়া, আরও কতকগুলি ক্ষীণজীবী প্রাণী দেখিলে; দেখ, ইহারা আমাদের অপেক্ষাও ভীরুস্বভাব।
তোমার অবস্থা যত মন্দ হউক না কেন, অন্যের অবস্থা এত মন্দ আছে যে, তাহার সহিত তুলনা করিলে, তোমার অবস্থা অনেক ভাল বোধ হইবেক।
কৃষক ও সারস
কতকগুলি বক প্রতিদিন ক্ষেত্রের নূতন শস্য নষ্ট করিয়া যাইত। তাহা দেখিয়া, কৃষক, বক ধরিবার নিমিত্ত, ক্ষেত্রে জাল পাতিয়া রাখিল। পরে, সে জাল তদারক করিতে আসিয়া দেখিল, কতকগুলি বক জালে পড়িয়া আছে, এবং একটি সারসও, সেই সঙ্গে, জালে পড়িয়াছে। তখন সারস কৃষককে কহিল, ভাই কৃষক! আমি বক নহি, আমি তোমার শস্য নষ্ট করি নাই, আমাকে ছাড়িয়া দাও। তুমি বিবেচনা করিয়া দেখ, আমার কোনও অপরাধ নাই। যত পক্ষী আছে, আমি সে সকল অপেক্ষা অধিক ধর্ম্মপরায়ণ। আমি, কখনও কাহারও কোনও অনিষ্ট করি না। আমি বৃদ্ধ পিতা মাতাকে অত্যন্ত সম্মান করি, এবং নানা স্থানে ভ্রমণ করিয়া, প্রাণপণে তাঁহাদের ভরণ পোষণ করি। তখন কৃষক কহিল, শুন সারস, তুমি যে সকল কথা বলিলে, সে সকলই যথার্থ, তাহাতে আমার সন্দেহ নাই। কিন্তু, যাহারা আমার শস্য নষ্ট করে, তুমি তাহাদের সঙ্গে ধরা পড়িয়াছ। এজন্য, তোমায় তাহাদের সঙ্গে শাস্তি ভোগ করিতে হইবেক।
অসৎসঙ্গের অশেষ দোষ। যথার্থ সাধুদিগকেও, সঙ্গদোষে, বিপদে পড়িতে হয়।
গৃহস্থ ও তাহার পুত্রগণ
এক গৃহস্থ ব্যক্তির চারি পাঁচ পুত্র ছিল। ঐ পুত্রদিগের পরস্পর সদ্ভাব ছিল না। তাহারা সতত বিবাদ করিত। গৃহস্থ সর্ব্বদাই তাহাদিগকে বুঝাইতেন, কিন্তু তাহারা তাঁহার কথা শুনিত না। তখন তিনি এই স্থির করিলেন, কেবল কথায় না বলিয়া, দৃষ্টান্ত দেখাইয়া বুঝাইলে, ইহারা বিবাদে ক্ষান্ত হইতে পারে। অনন্তর, তিনি পুত্রদিগকে আপন নিকটে ডাকাইয়া আনিলেন, এবং কতকগুলি কঞ্চী আনিয়া আটি বাঁধিতে বলিলেন। তাহারা তৎক্ষণাৎ সেইরূপ করিলে, তিনি জ্যেষ্ঠ পুত্রকে কহিলেন, বাপু! এই কঞ্চীর আটিটি ভাঙ্গিয়া ফেল। সে, দুই হাতে দুই পাশ ধরিয়া, মাঝখানে পা দিয়া, ভাঙ্গিবার বিস্তর চেষ্টা পাইল, কিন্তু কিছুই করিতে পারিল না।
এই রূপে, গৃহস্থ একে একে সকল পুত্রকেই কহিলেন; সকলেই চেষ্টা পাইল, কেহই ভাঙ্গিতে পারিল না। তখন তিনি এক পুত্রকে, কঞ্চীর আটি খুলিয়া, এক গাছা হস্তে লইয়া, ভাঙ্গিয়া ফেলিতে বলিলেন। সে তৎক্ষণাৎ ভাঙ্গিয়া ফেলিল। তখন গৃহস্থ পুত্রদিগকে কহিলেন, দেখ বৎসগণ, এই রূপ, যত দিন তোমরা পরস্পর সদ্ভাবে এক সঙ্গে থাকিবে, তত দিন শত্রুপক্ষ তোমাদের কিছুই করিতে পারিবেক না। কিন্তু, পরস্পর বিবাদ করিয়া পৃথক হইলেই, তোমরা উচ্ছিন্ন হইবে।
অশ্ব ও অশ্বারোহী
এক অশ্ব একাকী এক মাঠে চরিয়া বেড়াইত। কিছু দিন পরে, এক হরিণ সেই মাঠে আসিয়া চরিতে আরম্ভ করিল, এবং ইচ্ছামত ঘাস খাইয়া, অবশিষ্ট ঘাস নষ্ট করিয়া ফেলিতে লাগিল। তাহাতে, অশ্বের আহার বিষয়ে অতিশয় অসুবিধা ঘটিল। অশ্ব হরিণকে জব্দ করিবার চেষ্টা পাইতে লাগিল, কিন্তু কিছুতেই কিছু করিতে পারিল না। অবশেষে, সে এক মনুষ্যকে নিকটে দেখিয়া কহিল, ভাই! এই হরিণ আমার বড় অপকার করিতেছে, ইহাকে সমুচিত শাস্তি দিতে হইবেক। যদি এ বিষয়ে সাহায্য কর, তাহা হইলে, আমার যথেষ্ট উপকার হয়। তখন মনুষ্য কহিল, ইহার ভাবনা কি। তুমি আমাকে, তোমার মুখে লাগাম দিয়া, পিঠে উঠিতে দাও, তাহা হইলেই, আমি অস্ত্র লইয়া তোমার শত্রু দমন করি। অশ্ব সম্মত হইল। মনুষ্য তৎক্ষণাৎ তাহার পৃষ্ঠে আরোহণ করিল; কিন্তু, হরিণকে দমন করিতে না গিয়া, অশ্বকে আপন আলয়ে লইয়া গেল। তদবধি অশ্বগণ মনুষ্যজাতির বাহন হইল।
নেকড়ে বাঘ ও মেষ
কোনও সময়ে এক নেকড়ে বাঘকে কুকুরে কামড়াইয়াছিল। ঐ কামড়ের ঘা ক্রমে ক্রমে এত বাড়িয়া উঠিল যে, বাঘ আর নড়িতে পারে না। সুতরাং তাহার আহার বন্ধ হইল। এক দিন, সে ক্ষুধায় কাতর হইয়া পড়িয়া আছে, এমন সময়ে এক মেষ তাহার সম্মুখ দিয়া চলিয়া যায়। তাহাকে দেখিয়া, নেকড়ে অতি কাতর বাক্যে কহিল, ভাই হে! কয়েক দিন অবধি, আমি চলৎশক্তি রহিত হইয়া পড়িয়া আছি, ক্ষুধায় অস্থির হইয়াছি, তৃষ্ণায় ছাতি ফাটিয়া যাইতেছে। তুমি কৃপা করিয়া এই খাল হইতে জল আনিয়া দাও, আমি আহারের সংস্থান করিয়া লইব। মেষ কহিল, আমি তোমার অভিপ্রায় বুঝিয়াছি, আমি জল দিবার নিমিত্ত নিকটে গেলেই, তুমি আমার ঘাড় ভাঙ্গিয়া আহারের সংস্থান করিয়া লইবে।
সিংহ ও অন্য অন্য জন্তুর শিকার
সিংহ ও আর কয়েক জন্তু মিলিয়া শিকার করিতে গিয়াছিল। তাহারা, নানা বনে ভ্রমণ করিয়া, অবশেষে এক বৃহৎ হরিণ শিকার করিল। ভাগের সময় উপস্থিত হইলে, সিংহ কহিল, তোমাদিগকে ব্যস্ত হইতে হইবেক না; আমি যথাযোগ্য ভাগ করিতেছি। এই বলিয়া, সেই হরিণকে সমান তিন অংশে বিভক্ত করিয়া, সিংহ কহিল, দেখ, প্রথম ভাগ আমি লইব, কারণ আমি সকল পশুর রাজা, আর আমি শিকারে যে পরিশ্রম করিয়াছি, সেই পরিশ্রমের পুরস্কারস্বরূপ দ্বিতীয় ভাগ লইব; আর তৃতীয় ভাগের বিষয়ে আমার বক্তব্য এই, যাহার সাধ্য থাকে সে লউক। অন্য অন্য পশুরা, সিংহের অভিপ্রায় বুঝিতে পারিয়া, এই ভাবিতে ভাবিতে চলিয়া গেল যে, প্রবল লোকেরা স্বার্থপর ও ন্যায় অন্যায় বিবেচনা শূন্য হইলে, দুর্বলের পক্ষে এইরূপ বিচারই হইয়া থাকে।
কুকুর ও অশ্বগণ
এক কুকুর অশ্বগণের আহার স্থানে শয়ন করিয়া থাকিত। অশ্বগণ আহার করিতে গেলে, সে ভয়ানক চীৎকার করিত, ও দংশন করিতে উদ্যত হইয়া, তাহাদিগকে তাড়াইয়া দিত। এক দিন এক অশ্ব কহিল, দেখ, এই হতভাগা কুকুর কেমন দুর্বৃত্ত! আহারের দ্রব্যের উপর শয়ন করিয়া থাকিবেক, আপনিও আহার করিবেক না, এবং যাহারা ঐ আহার করিয়া প্রাণ ধারণ করিবেক, তাহাদিগকেও আহার করিতে দিবেক না।
বৃষ ও মশক
এক মশক, কোনও বৃষের মস্তকের উপর কিয়ৎক্ষণ উড়িয়া, অবশেষে তাহার শৃঙ্গের উপর বসিল, এবং মনে ভাবিল, হয় ত বৃষ আমার ভারে কাতর হইয়াছে। তখন তাহাকে কহিল, ভাই হে! যদি আমার ভার তোমার অসহ্য হইয়া থাকে, বল, আমি এখনই উড়িয়া যাইতেছি; আমি তোমায় ক্লেশ দিতে চাহি না। ইহা শুনিয়া বৃষ কহিল, তুমি সে জন্য উদ্বিগ্ন হইও না। তুমি থাক বা যাও, আমার দুই সমান। তুমি এত ক্ষুদ্র যে, তুমি আমার শৃঙ্গে বসিয়াছ, ইহা এ পর্য্যন্ত আমার অনুভবই হয় নাই।
মন যত ক্ষুদ্র, আত্মশ্লাঘা তত অধিক হয়।
মৃণ্ময় ও কাংস্যময় পাত্র
এক মাটির ও এক কাঁসার পাত্র নদীর স্রোতে ভাসিয়া যাইতেছিল। কাংস্যপাত্র মৃত্তিকাপাত্রকে কহিল, অহে মৃণ্ময় পাত্র! তুমি আমার নিকটে থাক, তাহা হইলে, আমি তোমাকে রক্ষা করিতে পারিব। তখন মৃন্ময় পাত্র কহিল, তুমি যে প্রস্তাব করিলে, তাহাতে আমি অতিশয় উপকৃত হইলাম। কিন্তু, আমি যে আশঙ্কায় তোমার অন্তরে থাকিতেছি, তোমার নিকটে গেলে, আমার তাহাই ঘটিবেক। তুমি, অনুগ্রহ করিয়া, অন্তরে থাকিলেই, আমার মঙ্গল। কারণ, আমরা উভয়ে একত্র হইলে, আমারই সর্ব্বনাশ। তোমার আঘাত লাগিলে, আমিই ভাঙ্গিয়া যাইব।
প্রবল প্রতিবেশীর নিকটে থাকা পরামর্শ নহে; বিবাদ উপস্থিত হইলে, দুর্ব্বলের সর্ব্বনাশ।
রোগী ও চিকিৎসক
কোনও চিকিৎসক কিছু দিন এক রোগীর চিকিৎসা করিয়াছিলেন। ঐ চিকিৎসকের হস্তেই, সেই রোগীর মৃত্যু হয়। তাহার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময়, চিকিৎসক, তাহার অত্মীয়গণের নিকট উপস্থিত হইয়া, আক্ষেপ করিয়া কহিলেন, আহা! যদি এই ব্যক্তি আহারাদির নিয়ম করিয়া চলিতেন, সর্ব্বদা সকল বিষয়ে অত্যাচার না করিতেন, তাহা হইলে, ইঁহার অকালে মৃত্যু হইত না। তখন মৃত ব্যক্তির এক আত্মীয় কহিলেন, কবিরাজ মহাশয়! আপনি যাহা আজ্ঞা করিতেছেন, তাহা যথার্থ বটে। কিন্তু এক্ষণে আপনার এ উপদেশের কোনও ফল দেখিতেছি না। যখন সে ব্যক্তি জীবিত ছিল, এবং আপনকার উপদেশ অনুসারে চলিতে পারিত, তখন তাহাকে এই উপদেশ দেওয়া উচিত ছিল।
সময় বহিয়া গেলে, উপদেশ দেওয়া বৃথা।
ইঁদুরের পরামর্শ
ইঁদুরেরা, বিড়ালের উপদ্রবে নিতান্ত বিব্রত হইয়া, সকলে একত্র হইয়া, কিসে পরিত্রাণ হয়, এই পরামর্শ করিতে বসিল। যাহার মনে যাহা উপস্থিত হইল, সে তাহাই কহিতে লাগিল; কিন্তু, কোনও প্রস্তাবই পরামর্শসিদ্ধ বোধ হইল। না। পরিশেষে, এক বুদ্ধিমান ইঁদুর কহিল, বিড়ালের গলায় একটা ঘণ্টা বাঁধিয়া দেওয়া যাউক। ঘণ্টার শব্দ হইলে, আমরা বুঝিতে পারিব, বিড়াল আমাদিগকে খাইতে আসিতেছে। তাহা হইলেই, আমরা সাবধান হইতে পারিব।
এই প্রস্তাব শুনিয়া, সকলে ধন্য ধন্য করিতে লাগিল, এবং ইহাই কর্ত্তব্য বলিয়া, সকলের মত হইল। এক বৃদ্ধ ইঁদুর, এ পর্য্যন্ত চুপ করিয়া বসিয়া ছিল। সে কহিল, অমুক যাহা কহিলেন, তাহা বিলক্ষণ বুদ্ধির কথা বটে, এবং সেরূপ করিতে পারিলে, আমাদের ইষ্টসিদ্ধিও হইতে পারে। কিন্তু, আমি এক কথা জিজ্ঞাসা করি, আমাদের মধ্যে কোন ব্যক্তি, সাহস করিয়া, বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধিতে যাইবে। ইহা শুনিয়া, পরস্পর মুখ চাহিয়া, সকলে হতবুদ্ধি ও স্তব্ধ হইয়া রহিল।
কোনও বিষয় প্রস্তাব করা সহজ, কিন্তু নির্ব্বাহ করিয়া উঠা কঠিন।
সিংহ ও মহিষ
একদা, এক সিংহ ও এক মহিষ, পিপাসায় কাতর হইয়া, দৈবযোগে, এক সময়ে, এক খালে জল পান করিতে গিয়াছিল। উভয়ে সাক্ষাৎ হওয়াতে, কে আগে জল পান করিবেক, এই বিষয় লইয়া, পরস্পর বিবাদ উপস্থিত হইল। উভয়েই প্রতিজ্ঞা করিল, প্রাণ যায় তাহাও স্বীকার, তথাপি বিপক্ষকে অগ্রে জল পান করিতে দিব না; সুতরাং উভয়ের যুদ্ধ ঘটিবার উপক্রম হইয়া উঠিল।
এই সময়ে তাহারা, ঊর্দ্ধ্বে দৃষ্টিপাত করিয়া, দেখিতে পাইল, একপাল শকুনি তাহাদের মস্তকের উপর উড়িতেছে। দেখিয়া বুঝিতে পারিল, যুদ্ধে যাহার প্রাণত্যাগ হইবেক, তাহার মাংস খাইবেক বলিয়া, উহারা উড়িয়া বেড়াইতেছে। তখন তাহাদের বুদ্ধির উদয় হইল; এবং পরস্পর কহিতে লাগিল, এস ভাই! ক্ষান্ত হই, আর বিবাদে কাজ নাই। অনর্থক বিবাদ করিয়া, কাক ও শকুনির আহার হওয়া অপেক্ষা, পরস্পর সুহৃদ্ভাবে জল পান করিয়া চলিয়া যাওয়া ভাল।
চোর ও কুকুর
এক চোর কোনও গৃহস্থের বাটীতে চুরি করিতে গিয়াছিল। এক কুকুর সমস্ত রাত্রি, ঐ গৃহস্থের বাটীর রক্ষণাবেক্ষণ করিত। চোর, ঐ কুকুরকে দেখিয়া, মনে ভাবিল, ইহার মুখ বন্ধ না করিলে, চীৎকার করিয়া, গৃহস্থকে জাগাইয়া দিবে; তাহা হইলে, আর আমার অভীষ্ট সিদ্ধ হইবেক না। অতএব, অগ্রে ইহার মুখ বন্ধ করা আবশ্যক। এই বলিয়া, সে মাংসের টুকরা কুকুরের সম্মুখে ফেলিয়া দিতে লাগিল। তাহা দেখিয়া, কুকুর কহিল, তুমি এখান হইতে চলিয়া যাও। প্রথমে, তোমায় দেখিয়া, আমার মনে সন্দেহ জন্মিয়াছিল; এক্ষণে আমার নিশ্চিত বোধ হইল, তুমি অবশ্য মন্দ লোক হইবে।
যাহারা উৎকোচ দিতে উদ্যত হয়, তাহারা কদাচ ভদ্র নহে; তাহাদের মনে অবশ্যই মন্দ অভিপ্রায় থাকে।
সারস ও তাহার শিশু সন্তান
এক সারসী, শিশু সন্তানগুলি লইয়া, কোনও ক্ষেত্রে বাস করিত। ঐ ক্ষেত্রের শস্য সকল পাকিয়া উঠিলে, সারসী বিবেচনা করিল, অতঃপর কৃষকেরা শস্য কাটিতে আরম্ভ করিবেক। এই নিমিত্ত, প্রতিদিন, আহারের অন্বেষণে বাহিরে যাইবার সময়, সে শিশু সন্তানদিগকে কহিয়া যাইত, তোমরা, আমার আসিবার পূর্ব্বে, যাহা কিছু শুনিবে, আমি আসিব মাত্র, সে সমুদয় অবিকল কহিবে।
এক দিন, সারসী বাসা হইতে বহির্গত হইয়াছে, এমন সময়ে ক্ষেত্রস্বামী, শস্য কাটিবার সময় হইয়াছে কি না, বিবেচনা করিয়া দেখিবার নিমিত্ত, তথায় উপস্থিত হইল, এবং চারি দিক নিরীক্ষণ করিয়া কহিল, শস্য সকল পাকিয়া উঠিয়াছে, আর কাটিতে বিলম্ব করা উচিত নয়। অমুক অমুক প্রতিবেশীকে ভার দি, তাহারা কাটিয়া দিবে। এই বলিয়া সে চলিয়া গেল।
সারসী বাসায় আসিলে, তাহার সন্তানেরা ঐ সমস্ত কথা জানাইল, এবং কহিল, মা! তুমি আমাদিগকে শীঘ্র স্থানান্তরে লইয়া যাও। আর তুমি, আমাদিগকে এখানে রাখিয়া, বাহিরে যাইও না। যাহারা শস্য কাটিতে আসিবেক, তাহারা, দেখিলেই, আমাদের প্রাণ বধ করিবেক। সারসী কহিল, বাছা সকল! তোমরা এখনই ভয় পাইতেছ কেন। ক্ষেত্রস্বামী যদি, প্রতিবেশীদিগের উপর ভার দিয়া, নিশ্চিন্ত থাকে, তাহা হইলে, শস্য কাটিতে আসিবার অনেক বিলম্ব আছে।
পর দিবস, ক্ষেত্রস্বামী পুনরায় তথায় উপস্থিত হইল; দেখিল, যাহাদিগকে ভার দিয়াছিল, তাহারা শস্য কাটিতে আইসে নাই। কিন্তু, শস্য সকল সম্পূর্ণ পাকিয়া উঠিয়াছিল; অতঃপর না কাটিলে হানি হইতে পারে, এই নিমিত্ত, সে কহিল, আর সময় নষ্ট করা হয় না; প্রতিবেশীদের উপর ভার দিয়া নিশ্চিন্ত থাকিলে, বিস্তর ক্ষতি হইবেক। আর তাহাদের ভরসায় না থাকিয়া, আপন ভাই বন্ধু দিগকে বলি, তাহারা সত্বর কাটিয়া দিবেক। এই বলিয়া, সে আপন পুত্রের দিকে মুখ ফিরাইয়া কহিল, তুমি তোমার খুড়াদিগকে আমার নাম করিয়া বলিবে, যেন তাহারা, সকল কর্ম্ম রাখিয়া, কাল সকালে আসিয়া, শস্য কাটিতে আরম্ভ করে। এই বলিয়া তাহারা পিতা পুত্রে চলিয়া গেল।
সারসশিশুগণ শুনিয়া অতিশয় ভীত হইল, এবং সারসী আসিবা মাত্র, কাতর বাক্যে কহিতে লাগিল, মা! আজ ক্ষেত্রস্বামী আসিয়া এই এই কথা বলিয়া গিয়াছে। তুমি আমাদের একটা উপায় কর। কাল তুমি, আমাদিগকে এখানে ফেলিয়া, যাইতে পারিবে না। যদি যাও, আসিয়া আর আমাদিগকে দেখিতে পাইবে না। সারসী, শুনিয়া, ঈষৎ হাস্য করিয়া, কহিল, যদি এই কথা মাত্র শুনিয়া থাক, তাহা হইলে, ভয়ের বিষয় নাই। যদি ক্ষেত্রস্বামী, ভাই বন্ধু দিগের উপর ভার দিয়া, নিশ্চিন্ত থাকে, তাহা হইলে, শস্য কাটিতে আসিবার, এখনও, অনেক বিলম্ব আছে। তাহাদেরও শস্য পাকিয়া উঠিয়াছে; তাহারা, আগে আপনাদের শস্য না কাটিয়া, কখনও, ইহার শস্য কাটিতে আসিবেক না। কিন্তু ক্ষেত্রস্বামী, কাল সকালে আসিয়া, যাহা কহিবেক, তাহা মন দিয়া শুনিও, এবং আমি আসিলে, বলিতে ভুলিও না।
পর দিন প্রত্যূষে, সারসী আহারের অন্বেষণে বহির্গত হইলে, ক্ষেত্রস্বামী তথায় উপস্থিত হইল; দেখিল, কেহই শস্য কাটিতে আইসে নাই; আর শস্য সকল অধিক পাকিয়াছিল, এজন্য ঝরিয়া ভূমিতে পড়িতেছে। তখন সে, বিরক্ত হইয়া আপন পুত্রকে কহিল, দেখ, আর প্রতিবেশীর, অথবা ভাই বন্ধুর, মুখ চাহিয়া থাকা উচিত নহে। আজ রাত্রিতে তুমি, যত জন পাও, ঠিকা লোক স্থির করিয়া রাখ। কাল সকালে, তাহাদিগকে লইয়া, আপনারাই কাটিতে আরম্ভ করিব; নতুবা বিস্তর ক্ষতি হইবেক।
সারসী, বাসায় আসিয়া, এই সমস্ত কথা শুনিয়া কহিল, অতঃপর, এখানে আর থাকা হয় না। এখন, অন্যত্র যাওয়া কর্ত্তব্য। যখন কেহ, অন্যের উপর ভার দিয়া নিশ্চিন্ত না থাকিয়া, স্বয়ং আপন কর্ম্মে মন দেয়, তখন ইহা স্থির বটে যে, সে যথার্থই সে কর্ম্ম সম্পন্ন করা মনস্থ করিয়াছে।
পথিক ও কুঠার
দুই পথিক এক পথ দিয়া চলিয়া যাইতেছিল। তাহাদের মধ্যে এক জন সম্মুখে একখানি কুঠার দেখিতে পাইল; দেখিয়া তৎক্ষণাৎ তাহা ভূমি হইতে উঠাইয়া লইল, এবং আপন সহচরকে কহিল, দেখ ভাই! আমি কেমন সুন্দর একখানি কুঠার পাইয়াছি। তখন সে কহিল, এ কি ভাই! ও কেমন কথা; আমি পাইলাম বলিতেছ কেন, আমরা দুজনে পাইলাম, বল। এক সঙ্গে যাই- তেছি, যাহা পাওয়া গেল, দুজনেরই হওয়া উচিত। অপর ব্যক্তি কহিল, না ভাই, তাহা হইলে অন্যায় হয়। তুমি কি জান না, যে যা পায়, সে তারই হয়। এই কুঠার আমি পাইয়াছি, আমারই হওয়া উচিত; আমি তোমাকে ইহার অংশ দিব কেন? সে শুনিয়া নিরস্ত হইল।
এই সময়ে, যাহাদের কুঠার হারাইয়াছিল, তাহারা খুজিতে খুজিতে সেই স্থানে উপস্থিত হইল, এবং পথিকের হস্তে কুঠার দেখিয়া, তাহাকে চোর বলিয়া ধরিল। তখন সে স্বীয় সহচরকে কহিল, হায়! আমরা মারা পড়িলাম। তাহার সহচর কহিল, ও কেমন কথা; এখন আমরা মারা পড়িলাম বল কেন, আমি মারা পড়িলাম বল। যাহাকে লাভের অংশ দিতে চাহ নাই, তাহাকে বিপদের অংশভাগী করিতে যাওয়া অন্যায়।
ঈগল ও দাঁড়কাক
এক পাহাড়ের নিম্নদেশে কতকগুলি মেষ চরিতে ছিল। এক ঈগল পক্ষী, পাহাড়ের উপর হইতে নামিয়া, ছোঁ মারিয়া, এক মেষশাবক লইয়া, পুনরায় পাহাড়ের উপর উঠিল। ইহা দেখিয়া, এক দাঁড়কাক ভাবিল, আমিও কেন, এইরূপ ছোঁ মারিয়া, একটা মেষ অথবা মেষশাবক লই না। ঈগল যদি পারিল, আমি না পারিব কেন। এই স্থির করিয়া, সে যেমন এক মেষের উপর ছোঁ মারিল, অমনি সেই মেষের লোমে তাহার পায়ের নখর জড়াইয়া গেল।
দাঁড়কাক, এইরূপে বদ্ধ হইয়া, ছট্পট্ ও প্রাণভয়ে কা কা করিতে লাগিল। মেষপালক, আদি অবধি অন্ত পর্য্যন্ত, এই ব্যাপার অবলোকন করিয়া, হাসিতে হাসিতে তথায় উপস্থিত হইল, এবং সেই নির্বোধ দাঁড়কাককে ধরিয়া, তাহার পাখা কাটিয়া দিল। পরে সে সায়ংকালে সেই কাককে গৃহে লইয়া গেলে, মেষপালকের শিশু সন্তানেরা আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, বাবা! তুমি আমাদের জন্যে ও কি পাখী এনেছ? মেষপালক কহিল, যদি তোমরা উহাকে জিজ্ঞাসা কর, ও বলিবেক, আমি ঈগল পক্ষী; কিন্তু আমি উহাকে দাঁড়কাক বলিয়া আনিয়াছি।
পক্ষী ও শাকুনিক
এক শাকুনিক, ফাঁদ পাতিয়া, এক পক্ষী ধরিয়া ছিল। পক্ষী, প্রাণবিনাশ উপস্থিত দেখিয়া, কাতর হইয়া, বিনয়বাক্যে শাকুনিককে কহিতে লাগিল, ভাই! তুমি অনুগ্রহ করিয়া আমায় ছাড়িয়া দাও। আমি তোমার নিকট স্বীকার করিতেছি, আমাকে ছাড়িয়া দিলে, আমি, অন্য অন্য পক্ষীদিগকে ভুলাইয়া আনিয়া, তোমার ফাঁদে ফেলিয়া দিব। বিবেচনা করিয়া দেখ, তুমি এক পক্ষীর পরিবর্ত্তে কত পক্ষী পাইবে। শাকুনিক কহিল, না, আমি তোমায় ছাড়িয়া দিব না। যে, আপন মঙ্গলের নিমিত্ত, স্বজাতীয় ও আত্মীয় দিগের সর্ব্বনাশ করিতে উদ্যত, তাহার মৃত্যু হওয়াই মঙ্গল।
সিংহ, শৃগাল ও গর্দ্দভ
এক গর্দ্দভ ও এক শৃগাল, উভয়ে মিলিয়া শিকার করিতে গিয়াছিল। যাইতে যাইতে, পথিমধ্যে, তাহারা এক সিংহের সম্মুখে পড়িল। শৃগাল, এই বিষম বিপদ উপস্থিত দেখিয়া, সহসা সিংহের নিকটে উপস্থিত হইল, এবং আস্তে আস্তে কহিতে লাগিল, মহাশয়! যদি আপনি কৃপা করিয়া আমায় প্রাণদান দেন, তাহা হইলে, আমি গর্দ্দভকে আপনকার হস্তগত করিয়া দি। সিংহ সম্মত হইল। শৃগাল, কৌশল করিয়া, গর্দ্দভকে সিংহের হস্তগত করিয়া দিল। সিংহ, এই রূপে গর্দ্দভকে হস্তগত করিয়া লইয়া, শৃগালের প্রাণবধ করিয়া, সে দিনের আহার নির্বাহ করিল, গর্দ্দভকে পর দিনের আহারের জন্যে রাখিয়া দিল।
পরের মন্দ করিতে গেলে, আপনার মন্দ আগে হয়।
হরিণ ও দ্রাক্ষালতা
ব্যাধগণে তাড়াতাড়ি করাতে, এক হরিণ, প্রাণভয়ে পলাইয়া, দ্রাক্ষালতার মধ্যে লুকাইয়া রহিল। ব্যাধেরা, তাহার সন্ধান না পাইয়া, দ্রাক্ষাবনের ধার দিয়া, চলিয়া যাইতে লাগিল। হরিণ মনে ভাবিল, ব্যাধগণ চলিয়া গিয়াছে, আর আমার কোনও ভয় নাই। এইরূপ স্থির করিয়া, সে স্বচ্ছন্দ মনে দ্রাক্ষালতা ভক্ষণ করিতে আরম্ভ করিল। ব্যাধেরা লতা ভক্ষণের শব্দ শুনিতে পাইয়া, বনের দিকে মুখ ফিরাইল, এবং সেই স্থানে হরিণ আছে বুঝিতে পারিয়া তাহাকে লক্ষ্য করিয়া, এক শর ক্ষেপণ করিল। সেই শরের আঘাতে হরিণের মৃত্যু হইল। হরিণ, এই কয়টি কথা বলিয়া, প্রাণ ত্যাগ করিল যে, যাহারা বিপদের সময়, আমায় আশ্রয় দিয়াছিল, আমি তাহাদের যে অপকার করিতে আরম্ভ করিয়াছিলাম, তাহার সমুচিত প্রতিফল পাইলাম।
কৃপণ
এক কৃপণের কিছু সম্পত্তি ছিল। সে সর্ব্বদা এই ভাবনা করিত, পাছে চোরে ও দস্যুতে সন্ধান পাইয়া অপহরণ করে। অবশেষে, অনেক ভাবিয়া চিন্তিয়া, সে সর্ব্বস্ব বিক্রয় করিল, এবং এক তাল সোনা কিনিয়া, মাটিতে পুতিয়া রাখিল। তদবধি প্রতিদিন অবাধে, সে, এক এক বার, সেই স্থানে গিয়া দেখিয়া আইসে, কেহ সন্ধান পাইয়া লইয়া গিয়াছে কি না।
কৃপণ প্রত্যহ এইরূপ করাতে, তাহার ভৃত্যের মনে এই সন্দেহ জন্মিল, হয় ত ঐ স্থানে প্রভুর গুপ্ত ধন আছে; নতুবা, উঁনি প্রতিদিন, এক এক বার, ওখানে যান কেন। পরে, এক দিন সুযোগ পাইয়া, সেই স্থান খুঁড়িয়া, সে সোনার তাল লইয়া পলায়ন করিল। পর দিন, যথাকালে, কৃপণ ঐ স্থানে গিয়া দেখিল, কে সেই স্বর্ণ লইয়া পলায়ন করিয়াছে। তখন সে, মাথা কুড়িয়া, চুল ছিঁড়িয়া, হাহাকার করিয়া, আমার সর্ব্বনাশ হইয়াছে বলিয়া, উচ্চৈঃ স্বরে রোদন করিতে লাগিল।
এক প্রতিবেশী, তাহাকে শোকে অভিভূত ও নিতান্ত কাতর দেখিয়া, কারণ জিজ্ঞাসা করিল, এবং সমস্ত অবগত হইয়া কহিল, ভাই! তুমি অকারণে শোক করিতেছ কেন? একখণ্ড প্রস্তর লইয়া ঐ স্থানে রাখিয়া দাও; মনে কর, তোমার সোনার তাল পূর্ব্বের মত পোতা আছে; কারণ যখন স্থির করিয়াছিলে, অর্থ ভোগ করিবে না, তখন এক তাল সোনা মাটিতে পোতা থাকিলেও যে ফল, আর এক খান পাথর পোতা থাকিলেও সেই ফল। অর্থের ভোগ না করিলে, অর্থ থাকা না থাকা দুই সমান।
সিংহ, ভালুক ও শৃগাল
কোনও স্থানে মৃত হরিণশিশু পতিত দেখিয়া, এক সিংহ ও এক ভালুক, উভয়েই কহিতে লাগিল, এ হরিণ আমার। ক্রমে বিবাদ উপস্থিত হইয়া, উভয়ের যুদ্ধ আরম্ভ হইল। অনেক ক্ষণ যুদ্ধ হওয়াতে, উভয়েই অত্যন্ত ক্লান্ত ও নিতান্ত নির্জীব হইয়া পড়িল; উভয়েরই আর নড়িবার ক্ষমতা রহিল না। এই সুযোগ পাইয়া, এক শৃগাল আসিয়া, মৃত হরিণশিশু মুখে করিয়া, নির্বিঘ্নে চলিয়া গেল। তখন তাহারা উভয়ে, আক্ষেপ করিয়া, কহিতে লাগিল, আমরা অতি নির্বোধ, সর্ব্ব শরীর ক্ষতবিক্ষত করিয়া, এবং নিতান্ত নির্জীব হইয়া, এক ধূর্ত্তের আহারের সংস্থান করিয়া দিলাম।
পীড়িত সিংহ
এক সিংহ, অত্যন্ত বৃদ্ধ ও দুর্ব্বল হইয়া, আর শিকার করিতে পারিত না। সুতরাং, তাহার আহার বন্ধ হইয়া আসিল। তখন সে, পর্ব্বতের গুহার মধ্যে থাকিয়া, এই কথা রটাইয়া দিল, সিংহ অতিশয় পীড়িত হইয়াছে; আর চলিতে পারে না, উঠিতে পারে না, কথা কহিতে পারে না। এই সংবাদ নিকটস্থ পশুদের মধ্যে প্রচার হইলে, তাহারা একে একে সিংহকে দেখিতে যাইতে লাগিল। সিংহ নিতান্ত দুর্বল হইয়াছে ভাবিয়া, যেমন কোনও পশু নিকটে যায়, অমনি সিংহ, তাহার ঘাড় ভাঙ্গিয়া, সচ্ছন্দে আহার করে।
এই রূপে কয়েক দিন গত হইলে, এক শৃগাল, সিংহকে দেখিবার নিমিত্ত, গুহার দ্বারে উপস্থিত হইল। সিংহ যথার্থই পীড়িত হইয়াছে, অথবা ছল করিয়া, নিকটে পাইয়া, পশুদিগের প্রাণ বধ করিতেছে, শৃগালের মনে এরূপ সন্দেহ ছিল। এজন্য, সে, গুহায় প্রবেশ করিয়া, সিংহের নিতান্ত নিকটে না গিয়া, কিঞ্চিৎ দূর হইতে জিজ্ঞাসিল, মহারাজ! আপনি কেমন আছেন? সিংহ, শৃগালকে দেখিয়া, অতিশয় আহ্লাদ প্রকাশ করিয়া, কহিল, কে ও, আমার পরম বন্ধু। শৃগাল! এস ভাই এস; আমি ভাবিতেছিলাম, ক্রমে ক্রমে, সকল বন্ধুই আমায় দেখিতে আসিল, পরম বন্ধু শৃগাল আসিল না কেন। যাহা হউক ভাই! তুমি যে আসিয়াছ, ইহাতে অত্যন্ত আহ্লাদিত হইলাম। যদি ভাই! আসিয়াছ, দূরে দাঁড়াইয়া রহিলে কেন? নিকটে এস, দুটা মিষ্ট কথা বল, আমার কর্ণ শীতল হউক। দেখ ভাই! আমার শেষ দশা উপস্থিত; আর অধিক দিন বাঁচিব না।
শুনিয়া শৃগাল কহিল, মহারাজ! প্রার্থনা করি, শীঘ্র সুস্থ হউন। কিন্তু, আমায় ক্ষমা করিবেন, আমি আর অধিক নিকটে যাইতে, অথবা অধিক ক্ষণ এখানে থাকিতে, পারিব না। বলিতে কি মহারাজ! পদচিহ্ন দেখিয়া স্পষ্ট বোধ হইতেছে, এই গুহার মধ্যে অনেক পশু প্রবেশ করিয়াছে, কিন্তু প্রবেশ করিয়া, কেহ পুনরায় বহির্গত হইয়াছে, তাহা কোনও ক্রমে বোধ হইতেছে না। ইহাতে আমার অন্তঃকরণে অত্যন্ত আশঙ্কা উপস্থিত হইয়াছে। আর আমার এখানে থাকিতে সাহস হইতেছে না, আমি চলিলাম! এই বলিয়া, শৃগাল পলায়ন করিল।
সিংহ ও তিন বৃষ
তিন বৃষের পরস্পর অতিশয় সম্প্রীত ছিল। তাহারা নিয়ত, এক মাঠে, এক সঙ্গে, চরিয়া বেড়াইত। এক সিংহ সর্ব্বদাই এই ইচ্ছা করিত, ঐ তিন বৃষের প্রাণ বধ করিয়া, মাংস আহার করিব। কিন্তু, উহারা এমন বলবান যে, তিন একত্র থাকিলে, সিংহ, আক্রমণ করিয়া, কিছু করিতে পারে না। এজন্য, সে মনে মনে বিবেচনা করিল, যাহাতে ইহারা পৃথক পৃথক চরে, এমন কোনও উপায় করি। পরে, কৌশল করিয়া, সে উহাদের মধ্যে এমন বিরোধ জন্মাইয়া দিল যে, তিনের আর পরস্পর মুখ দেখাদেখি পর্য্যন্ত রহিল না। তখন তাহারা, পরস্পর দূরে, পৃথক পৃথক স্থানে, চরিতে আরম্ভ করিল। সিংহও, সুযোগ পাইয়া, একে একে, তিনের প্রাণ সংহার করিয়া, ইচ্ছামত মাংস আহার করিল।
বন্ধুদিগের পরস্পর বিরোধ শক্রর আনন্দের নিমিত্ত।
শৃগাল ও সারস
এক দিবস, শৃগাল সারসকে আহারের নিমন্ত্রণ করিল। সারসকে উপহাস করিয়া, আমোদ করিবার নিমিত্ত, সে অন্য কোনও আয়োজন না করিয়া, থালায় কিঞ্চিৎ ঝোল ঢালিয়া, সারসকে আহার করিতে বলিল, এবং আপনিও আহার করিতে বসিল। শৃগাল, জিহ্বা দ্বারা, অনায়াসেই, থালার ঝোল চাটিয়া খাইতে লাগিল। কিন্তু সারসের ঠোঁট সরু ও লম্বা, সুতরাং সে কিছুই আহার করিতে পারিল না; চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। আহারে বসিবার সময়, সারসের যেরূপ ক্ষুধা ছিল, সেইরূপই রহিল, কিছুমাত্র নিবৃত্ত হইল না।
সারসকে অল্প আহার করিতে দেখিয়া, শৃগাল ক্ষোভ প্রকাশ করিয়া কহিল, ভাই! তুমি ভাল করিয়া আহার করিলে না; ইহাতে আমি অত্যন্ত দুঃখিত হইয়াছি। বোধ করি, আহারের দ্রব্য সুস্বাদ হয় নাই, তাই ভাল করিয়া আহার করিলে না। সারস শুনিয়া, উপহাস বুঝিতে পারিয়া, তখন কোনও উক্তি করিল না; কিন্তু শৃগালকে জব্দ করিবার নিমিত্ত, যাইবার সময় কহিল, ভাই! কাল তোমায়, আমার ওখানে গিয়া, আহার করিতে হইবেক। শৃগাল সম্মত হইল।
পর দিন যথাকালে, শৃগাল সারসের আলয়ে উপস্থিত হইলে, সারস, এক গলাসরু পাত্রে আহারসামগ্রী রাখিয়া, শৃগালের সম্মুখে ধরিল, এবং এস ভাই! ভোজন করি, এই বলিয়া আহার করিতে বসিল। সারস, আপন সরু লম্বা ঠোঁট অনায়াসে পাত্রের মধ্যে প্রবেশ করাইয়া, আহার করিতে লাগিল। কিন্তু, শৃগাল কোনও মতে পাত্রের মধ্যে মুখ প্রবেশ করাইতে পারিল না; কেবল, ক্ষুধায় ব্যাকুল হইয়া, সেই পাত্রের গাত্র চাটিতে লাগিল। পরে, আহার সমাপ্ত হইলে, বিরক্তি প্রকাশ না করিয়া, সে এই বলিতে বলিতে চলিয়া গেল, আমি কোনও মতে সারসকে দোষ দিতে পারি না; আমি যে পথে চলিয়াছিলাম, সারসও সেই পথে চলিয়াছে।
সিংহচর্ম্মাবৃত গর্দ্দভ
এক গর্দ্দভ, সিংহের চর্ম্মে সর্ব্ব শরীর আবৃত করিয়া, মনে ভাবিল, অতঃপর আমায় সকলেই সিংহ মনে করিবেক, কেহই গর্দ্দভ বলিয়া বুঝিতে পারিবেক না; অতএব, আজ অবধি, আমি এই বনের সিংহের ন্যায়, আধিপত্য করিব। এই স্থির করিয়া, কোনও জন্তুকে সম্মুখে দেখিলেই, সে চীৎকার ও লম্ফ ঝম্প করিরা ভয় দেখায়। নির্বোধ জন্তুরা, তাহাকে সিংহ মনে করিয়া, ভয়ে পলায়ন করে। এক দিবস, এক শৃগালকে ঐ রূপে ভয় দেখাইবাতে, সে কহিল, অরে গর্দ্দভ! আমার কাছে তোর ধূর্ত্ততা খাটিবেক না। আমি যদি তোর স্বর না চিনিতাম, তাহা হইলে, সিংহ ভাবিয়া ভয় পাইতাম।
টাক ও পরচুলা
এক ব্যক্তির মস্তকে টাক পড়িয়া, সমুদয় চুল উঠিয়া গিয়াছিল। সকলকার কাছে, সেরূপ মাথা দেখাইতে, অত্যন্ত লজ্জা হইত, এজন্য, সে সর্ব্বদা পরচুলা পরিয়া থাকিত। এক দিন সে, তিন চারি জন বন্ধুর সহিত, ঘোড়ায় চড়িয়া বেড়াইতে গিয়াছিল। ঘোড়া বেগে দৌড়িতে আরম্ভ করিলে ঐ ব্যক্তির পরচুলা, বাতাসে উড়িয়া, ভূমিতে পড়িয়া গেল; সুতরাং তাহার টাক বাহির হইয়া পড়িল। তাহার সহচরেরা, এই ব্যাপার দেখিয়া, হাস্য সংবরণ করিতে পারিল না। সে ব্যক্তিও, তাহাদের সঙ্গে সঙ্গে, হাস্য করিতে লাগিল, এবং কহিল, যখন আমার আপনার চুল মাথায় রহিল না, তখন পরের চুল অটিকাইয়া রাখিতে পারিব, এমন প্রত্যাশা করা অন্যায়।
ঘোটকের ছায়া
এক ব্যক্তির একটি ঘোটক ছিল। সে, ঐ ঘোটক ভাড়া দিয়া, জীবিকা নির্বাহ করিত। গ্রীষ্ম কালে, এক দিবস, কোনও ব্যক্তি, চলিয়া যাইতে যাইতে, অতিশয় ক্লান্ত হইয়া, ঐ ঘোড়া ভাড়া করিল। কিয়ৎ দূর গিয়া, মধ্যাহ্ন কাল উপস্থিত হওয়াতে, সে ঘোড়া হইতে নামিয়া, খানিক বিশ্রাম করিবার নিমিত্ত, ঘোড়ার ছায়ায় বসিল। সে ব্যক্তিকে ছায়ায় বসিতে দেখিয়া, যাহার ঘোড়া, সে কহিল, ভাল, তুমি ঘোড়ার ছায়ায় বসিবে কেন? ঘোড়া তোমার নয়, ও আমার ঘোড়া; আমি উহার ছায়ায় বসিব, তোমায় কখনও বসিতে দিব না। তখন সে ব্যক্তি কহিল, সে কেমন, আমি সমস্ত দিনের জন্য, এই ঘোড়া ভাড়া করিয়াছি কি না? অপর ব্যক্তি কহিল, তোমাকে ঘোড়াই ভাড়া দিয়াছি, ঘোড়ার ছায়া ত ভাড়া দি নাই। এই রূপে, ক্রমে ক্রমে বিবাদ উপস্থিত হওয়াতে, উভয়ে ঘোড়া ছাড়িয়া দিয়া, মারামারি আরম্ভ করিল। এই সুযোগে, ঘোড়া বেগে দৌড়িয়া পলায়ন করিল, আর উহার সন্ধান পাওয়া গেল না।
অশ্ব ও গর্দ্দভ
এক ব্যক্তির একটি অশ্ব ও একটি গর্দ্দভ ছিল। সে, কোনও স্থানে যাইবার সময় হইলে, সমুদয় দ্রব্য সামগ্রী গর্দ্দভের পৃষ্ঠে চাপাইয়া দিত, অশ্ব বহু মূল্যের বস্তু বলিয়া, তাহার উপর কোনও ভার চাপাইত না। এক দিবস, সমুদয় ভার বহিয়া পথে যাইতে যাইতে, গর্দ্দভের পীড়া উপস্থিত হইল। পীড়ার যাতনা ও ভারের আধিক্য প্রযুক্ত, গর্দ্দভ অতিশয় কাতর হইয়া, অশ্বকে কহিল, দেখ, ভাই! আমি আর এত ভার বহিতে পারি না; যদি তুমি, দয়া করিয়া, কিয়ৎ অংশ গ্রহণ কর, তাহা হইলে, আমার অনেক পরিত্রাণ হয়; নতুবা আমি মরিয়া যাই। অশ্ব কহিল, তুমি ভার বহিতে পার, না পার, আমার কি; আমায় তুমি বিরক্ত করিও না; আমি কখনও তোমার ভারের অংশ লইব না।
গর্দ্দভ আর কিছুই বলিল না; কিন্তু, খানিক দূর গিয়া, যেমন মুখ থুবড়িয়া পড়িল, অমনি তাহার প্রাণত্যাগ হইল। তখন ঐ ব্যক্তি সেই সমুদায় ভার অশ্বের পৃষ্ঠে চাপাইল, এবং, সেই ভারের সঙ্গে, মরা গর্দ্দভটিও চাপাইয়া দিল। তখন অশ্ব, সমুদায় ভার ও মরা গর্দ্দভ উভয়ই বহিতে হইল দেখিয়া, আক্ষেপ করিয়া, মনে মনে কহিতে লাগিল, আমার যেমন দুষ্ট স্বভাব, তাহার উপযুক্ত ফল পাইলাম। তখন যদি আমি এই ভারের অংশ লইতাম, তাহা হইলে, এখন আমায় সমুদায় ভার ও মরা গর্দ্দভ বহিতে হইত না।
লবণবাহী বলদ
এক ব্যক্তি লবণের ব্যবসায় করিত। কোনও স্থানে লবণ সস্তা বিক্রয় হইতেছে শুনিয়া, সে তথায় উপস্থিত হইল, এবং কিছু লবণ ক্রয় করিয়া, বলদের পৃষ্ঠে বোঝাই করিয়া, বাটী আসিতে লাগিল। পূর্ব্ব পূর্ব্ব বারে যত বোঝাই করিত, এ বারে তাহা অপেক্ষা, অনেক অধিক বোঝাই করিয়াছিল, এজন্য বলদ অত্যন্ত কাতর হইয়াছিল। পথের মধ্যে এক নালা ছিল। ঐ নালায় অনেক জল থাকিত। নালার উপর এক সাঁক ছিল। সেই সাঁকর উপর দিয়া সকলে যাতায়াত করিত। বলদ ইচ্ছা করিয়া, সেই সাঁকর উপর হইতে, নালায় পড়িয়া গেল। নালায় পড়িবা মাত্র, অধিকাংশ লবণ জল লাগিয়া গলিয়া গেল। তখন বলদের ভার অনেক লঘু হইল; এবং সে অকাতরে চলিয়া যাইতে লাগিল।
ঐ ব্যক্তি, আর এক দিবস, সেই বলদ লইয়া, লবণ কিনিতে গিয়াছিল। সে দিবসও ঐ বলদের পৃষ্ঠে অধিক ভার চাপাইল; বলদও পুনরায়, ছল করিয়া, ঐ নালায় পড়িয়া গেল। এই রূপে, দুই দিন অত্যন্ত ক্ষতি হইলে, ব্যবসায়ী ব্যক্তি বুঝিতে পারিল, বলদ, কেবল দুষ্টতা করিয়া, আমার ক্ষতি করিতেছে, অতএব ইহাকে ইহার প্রতিফল দিতে হইল। এই স্থির করিয়া, সে ব্যক্তি, ঐ বলদ লইয়া, তূল কিনিতে গেল, এবং তূল কিনিয়া, বলদের পৃষ্ঠে চাপাইয়া, বাটী আসিতে লাগিল। বলদ পূর্ব্বের মত, ভার কমাইবার নিমিত্ত, ঐ নালায় পড়িয়া গেল।
ব্যবসায়ী ব্যক্তি, পূর্ব্ব পূর্ব্ব বারে, লবণ গলিয়া যাইবার ভয়ে, তাড়াতাড়ি করিয়া, বলদকে উঠাইত, এ বারে সে অনেক বিলম্ব করিয়া উঠাইল। অনেক বিলম্ব হওয়াতে, তূল ভিজিয়া অত্যন্ত ভারী হইল। ঐ ব্যক্তি সেই সমুদয় ভিজা তূল, বলদের পৃষ্ঠে চাপাইয়া, লইয়া চলিল। সুতরাং সে দিবস, নালায় পড়িবার পূর্ব্বে, বলদকে যত ভার বহিতে হইয়াছিল, নালায় পড়িয়া, তাহার দ্বিগুণ অপেক্ষা, অধিক ভার বহিতে হইল।
সকল সময়ে এক ফিকির খাটে না।
হরিণ
এক হরিণ খালে জল পান করিতে গিয়াছিল। জল পান করিবার সময়ে, ঐ জলে তাহার শরীরের প্রতিবিম্ব পড়িয়াছিল। সেই প্রতিবিম্ব দর্শন করিয়া, হরিণ কহিল, আমার শৃঙ্গ যেমন দৃঢ়, তেমনই সুন্দর; কিন্তু, আমার পা দেখিতে অতি কদর্য্য ও অকর্ম্মণ্য। হরিণ, এই রূপে, আপন অবয়বের দোষ গুণ বিবেচনা করিতেছে, এমন সময়ে, ব্যাধেরা আসিয়া তাড়াতাড়ি করিল। সে প্রাণভয়ে এত বেগে পলাইতে লাগিল যে, ব্যাধেরা অনেক পশ্চাৎ পড়িল। কিন্তু, জঙ্গলে প্রবেশ করিবা মাত্র, তাহার শৃঙ্গ লতায় এমন জড়াইয়া গেল যে, আর সে পলায়ন করিতে পারিল না। তখন ব্যাধের আসিয়া তাহার প্রাণ বধ করিল। হরিণ এই বলিয়া, প্রাণত্যাগ করিল যে, আমি, যে অবয়বকে কদর্য্য ও অকর্ম্মণ্য জ্ঞান করিয়া, অসন্তুষ্ট হইয়াছিলাম, উহা আমায় শত্রুহস্ত হইতে রক্ষা করিয়াছিল; কিন্তু, যে অবয়বকে দৃঢ় ও সুন্দর জ্ঞান করিয়া, সন্তুষ্ট হইয়াছিলাম, তাহাই আমার প্রাণবধের হেতু হইল।
জ্যোতির্বেত্তা
এক জ্যোতির্বেত্তা প্রতিদিন রাত্রিতে নক্ষত্র দর্শন করিতেন। এক দিন তিনি, আকাশে দৃষ্টিপাত করিয়া, নিবিষ্ট মনে নক্ষত্র দেখিতে দেখিতে, পথে চলিয়া যাইতেছিলেন; সম্মুখে এক কূপ ছিল, দেখিতে না পাইয়া, তাহাতে পড়িয়া গেলেন। তিনি কূপে পতিত হইয়া, অত্যন্ত চীৎকার করিয়া, লোকদিগকে ডাকিতে লাগিলেন, ভাই রে! কে কোথায় আছ, আসিয়া আমার প্রাণ রক্ষা কর। এক ব্যক্তি নিকট দিয়া চলিয়া যাইতেছিল, সে তাঁহার কাতর শব্দ শুনিয়া, কূপের নিকটে উপস্থিত হইল, এবং পড়িয়া যাইবার কারণ জিজ্ঞাসিয়া, সমস্ত অবগত হইয়া কহিল, কি আশ্চর্য্য! তুমি যে পথে চলিয়া যাও, সেই পথের কোথায় কি আছে, তাহা জানিতে পার না; কিন্তু, আকাশের কোথায় কি আছে, তাহা জানিবার নিমিত্ত ব্যস্ত হইয়াছিলে।
বালকগণ ও ভেকসমূহ
কতকগুলি বালক এক পুষ্করিণীর ধারে খেলা করিতেছিল। খেলা করিতে করিতে, দেখিতে পাইল, জলে কতকগুলি ভেক ভাসিয়া রহিয়াছে। তাহারা ভেকদিগকে ডেলা মারিতে আরম্ভ করিল। ডেলা লাগিয়া কয়েকটি ভেক মরিয়া গেল। তখন, তাহাদের মধ্যে এক ভেক বালকদিগকে সম্বোধন করিয়া কহিল, অহে বালকগণ! তোমরা এ নিষ্ঠুর খেলা পরিত্যাগ কর। ডেলা মারা তোমাদের পক্ষে খেলা বটে, কিন্তু আমাদের প্রাণবধের কারণ হইয়া উঠিয়াছে।
বাঘ ও ছাগল
এক বাঘ, পাহাড়ের উপর বেড়াইতে বেড়াইতে, দেখিতে পাইল, একটা ছাগল, ঐ পাহাড়ের অতি উচ্চ স্থানে চরিতেছে। ঐ স্থানে উঠিয়া গিয়া, ছাগলের প্রাণ বধ করিয়া, রক্ত মাংস খাওয়া বাঘের পক্ষে সহজ নহে, এজন্য সে, কৌশল করিয়া নীচে নামাইবার নিমিত্ত, কহিল, ভাই ছাগল! তুমি ওরূপ উচ্চ স্থানে বেড়াইতেছ কেন। যদি দৈবাৎ পড়িয়া যাও, মরিয়া যাইবে। বিশেষতঃ, নীচের ঘাস যত মিষ্ট ও যত কোমল, উপরের ঘাস তত মিষ্ট ও তত কোমল নয়। অতএব, নামিয়া আইস। ছাগল কহিল, ভাই বাঘ! তুমি আমায় মাপ কর, আমি নীচে যাইতে পারিব না। আমি বুঝিতে পারিয়াছি, তুমি, আপন আহারের নিমিত্তে, আমায় নীচে যাইতে বলিতেছ, আমার আহারের নিমিত্তে নহে।
গর্দ্দভ, কুক্কুট ও সিংহ
এক গর্দ্দভ ও এক কুক্কুট, উভয়ে এক স্থানে বাস করিত। এক দিবস, সেই স্থানের নিকট দিয়া, এক সিংহ যাইতেছিল। সিংহ, গর্দ্দভকে পুষ্টকায় দেখিয়া, তাহার প্রাণ বধ করিয়া, মাংস ভক্ষণের মানস করিল। গর্দ্দভ, সিংহের অভিপ্রায় বুঝিতে পারিয়া, অতিশয় ভীত হইল।
এরূপ প্রবাদ আছে, সিংহ, কুক্কুটের শব্দ শুনিলে, অতিশয় বিরক্ত হয়, এবং তৎক্ষণাৎ সে স্থান হইতে চলিয়া যায়। দৈবযোগে, ঐ সময়ে কুক্কুট শব্দ করাতে, সিংহ তৎক্ষণাৎ তথা হইতে চলিয়া গেল। গর্দ্দভ, কি কারণে সিংহ চলিয়া গেল, বুঝিতে না পারিয়া, মনে করিল, সিংহ আমার ভয়ে পলায়ন করিতেছে। এই স্থির করিয়া, সিংহকে আক্রমণ করিবার নিমিত্ত, গর্দ্দভ তাহার পশ্চাৎ ধাবমান হইল। এই রূপে খানিক দূর গেলে পর, সিংহ ফিরিয়া, এক চপেটাঘাতে, গর্দ্দভের প্রাণ সংহার করিল।
নির্বোধেরা আপনাকে বড় জ্ঞান করিয়া মারা পড়ে।।
সিংহ ও নেকড়ে বাঘ
এক দিন, এক নেকড়ে বাঘ, খোঁয়াড় হইতে একটি মেষশাবক লইয়া, আপন বাসস্থানে যাইতেছিল। পথিমধ্যে এক সিংহের সহিত সাক্ষাৎ হওয়াতে, সিংহ বল পূর্ব্বক, ঐ মেষশাবক কাড়িয়া লইল। নেকড়ে কিয়ৎ ক্ষণ স্তব্ধ হইয়া রহিল, পরে কহিল, এ অতি অবিচার! তুমি অন্যায় করিয়া, আমার নিকট হইতে আমার বস্তু কাড়িয়া লইলে। সিংহ শুনিয়া ঈষৎ হাস্য করিয়া কহিল, তুমি যেরূপ কথা কহিতেছ, তাহাতে আমার বোধ হইতেছে, তুমি এই মেষশাবক অন্যায় করিয়া আন নাই; মেষপালক তোমায় উপহার দিয়াছে।
বৃদ্ধ সিংহ
এক সিংহ, অত্যন্ত বৃদ্ধ হইয়া, নিতান্ত দুর্ব্বল ও অসমর্থ হইয়াছিল। সে, এক দিন, ভূমিতে পড়িয়া ঘন ঘন নিশ্বাস টানিতেছে, এমন সময়ে, এক বন-বরাহ তথায় উপস্থিত হইল। সিংহের সহিত ঐ বরাহের বিরােধ ছিল, কিন্তু সিংহ অত্যন্ত বলবান বলিয়া, সে কিছুই করিতে পারিত না। এক্ষণে, সিংহের এই অবস্থা দেখিয়া, সে বারংবার দন্তাঘাত করিয়া চলিয়া গেল। সিংহের নড়িবার সামর্থ্য ছিল না, সুতরাং বরাহের দন্তাঘাত সহ্য করিয়া রহিল। কিয়ৎ ক্ষণ পরে, এক বৃষ তথায় উপস্থিত হইল। এই বৃষেরও সিংহের সহিত বিরােধ ছিল। এক্ষণে সে, সিংহকে মৃতপ্রায় পতিত দেখিয়া, শৃঙ্গ দ্বারা প্রহার করিয়া, চলিয়া গেল। সিংহ এ অপমানও সহ করিয়া রহিল।
দেখাদেখি, এক গর্দ্দভ ভাবিল, সিংহের যখন বল বিক্রম ছিল, তখন আমাদের সকলের উপরেই অত্যাচার করিয়াছে। এক্ষণে, সময় পাইয়া, সকলেই সিংহের উপর বৈরসাধন করিতেছে। বরাহ ও বৃষ, সিংহের অপমান করিয়া, চলিয়া গেল, সিংহ কিছুই করিতে পারিল না। আমিও সময় পাইয়াছি, ছাড়ি কেন? এই বলিয়া, সিংহের নিকটে গিয়া, সে তাহার মুখে পদাঘাত করিল। তখন সিংহ, আক্ষেপ করিয়া কহিল, হায়! সময়গুণে আমার কি দুর্দ্দশা ঘটিল। যে সকল পশু, আমায় দেখিলে, ভয়ে কাঁপিত, তাহারা আসিয়া অনয়াসে আমার অপমান করিতেছে। যাহা হউক, বরাহ ও বৃষ বলবান জন্তু, তাহারা যে অপমান করিয়াছিল, তাহা আমার কথঞ্চিৎ সহ্য হইয়াছিল। কিন্তু, সকল পশুর অধম গর্দ্দভ যে আমায় পদাঘাত করিল, ইহা অপেক্ষা আমার শত বার মৃত্যু হওয়া ভাল ছিল।
মেষপালক ও নেকড়ে বাঘ
এক মেষপালক কয়েক জন আত্মীয়কে নিমন্ত্রণ করিয়াছিল। সে একটি মেষ কাটিয়া, পাক করিয়া, আত্মীয়দিগের সহিত বসিয়া, আহার ও আমোদ আহ্লাদ করিতেছে, এমন সময়ে, এক নেকড়ে বাঘ নিকট দিয়া চলিয়া যাইতেছিল। সে মেষপালককে মেষের মাংসভক্ষণে আমোদ করিতে দেখিয়া তাহাকে সম্বোধন করিয়া কহিল, ভাই হে! যদি আমাকে ঐ মেষের মাংস ভক্ষণ করিতে দেখিতে, তাহা হইলে, তুমি কত হঙ্গাম করিতে।
মানুষের স্বভাব এই, অন্যকে যে কর্ম্ম করিতে দেখিলে গালাগালি দিয়া থাকে, আপনারা সেই কর্ম্ম করিয়া দোষ বোধ করে না।
পিপীলিকা ও পারাবত
এক পিপীলিকা, তৃষ্ণায় কাতর হইয়া, নদীতে জল পান করিতে গিয়াছিল। সে, হঠাৎ জলে পড়িয়া গিয়া, ভাসিয়া যাইতে লাগিল। এক পারাবত বৃক্ষের শাখায় বসিয়া ছিল। সে, পিপীলিকার এই বিপদ দেখিয়া, গাছের একটি পাতা ভাঙ্গিয়া, জলে ফেলিয়া দিল; সেই পাতা পিপীলিকার সম্মুখে পড়াতে, সে তাহার উপর উঠিয়া বসিল, এবং পাতা কিনারায় লাগিবা মাত্র, তীরে উঠিল।
এই রূপে, পায়রার সাহায্যে, প্রাণদান পাইয়া, পিপিড়া মনে মনে তাহাকে ধন্যবাদ দিতেছে, এমন সময়ে হঠাৎ দেখিতে পাইল, এক ব্যাধ, জাল চাপা দিয়া, পায়রাকে ধরিবার উপক্রম করিতেছে; কিন্তু পায়রা কিছুই জানিতে পারে নাই, সুতরাং সে নিশ্চিন্ত বসিয়া আছে। পিপিড়া, প্রাণদাতার এই বিপদ উপস্থিত দেখিয়া, সত্বর গিয়া, ব্যাধের পায়ে এমন কামড়াইল যে, সে জ্বালায় অস্থির হইয়া, জাল ফেলিয়া দিল, এবং মাটিতে বসিয়া পড়িয়া, সেই স্থানে হাত বুলাইতে লাগিল। এই অবকাশে পায়রাও, আপনার বিপদ বুঝিতে পারিয়া, তথা হইতে উড়িয়া গেল।
কাক ও শৃগাল
এক কাক, কোনও স্থান হইতে, এক খণ্ড মাংস আনিয়া, মুখে করিয়া, বৃক্ষের শাখায় বসিল। সে ঐ মাংস ভক্ষণ করিবার উপক্রম করিতেছে, এমন সময়ে, এক শৃগাল, সেই স্থানে উপস্থিত হইয়া, কাকের মুখে মাংসখণ্ড দেখিয়া, মনে মনে স্থির করিল, কোনও উপায়ে, কাকের মুখ হইতে, ঐ মাংস লইয়া আহার করিতে হইবেক। অনন্তর, সে কাককে সম্বোধন করিয়া কহিল, ভাই কাক! আমি তোমার মত সর্বাঙ্গসুন্দর পক্ষী কখনও দেখি নাই। কেমন পাখা! কেমন চক্ষু! কেমন গ্রীবা! কেমন বক্ষঃস্থল! কেমন নখর! দেখ, তোমার সকলই সুন্দর; দুঃখের বিষয় এই, তুমি বোবা।
কাক, শৃগালের মুখে, এইরূপ প্রশংসা শুনিয়া, অতিশয় আহ্লাদিত হইল, এবং মনে করিল, শৃগাল ভাবিয়াছে, আমি বোবা। এই সময়ে, যদি আমি শব্দ করি, তাহা হইলে, শৃগাল এক বারে চমৎকৃত হইবেক। এই বলিয়া, মুখ বিস্তার করিয়া, কাক যেমন শব্দ করিতে গেল, অমনি তাহার মুখস্থিত মাংসখণ্ড ভূমিতে পড়িয়া গেল। শৃগাল তাহা উঠাইয়া লইল, এবং মনের সুখে খাইতে খাইতে, তথা হইতে চলিয়া গেল। কাক হতবুদ্ধি হইয়া বসিয়া রহিল।
আপন ইষ্ট সিদ্ধ করা অভিপ্রেত না হইলে, প্রায় কেহ খোসামোদী করে না। আর, যাহারা খোসামোদীর বশীভূত হয়, তাহাদিগকে তাহার ফলভোগ করিতে হয়।
সিংহ ও কৃষক
একদা এক সিংহ কোনও কৃষকের গোয়াল বাড়িতে প্রবেশ করিয়াছিল। কৃষক, ঐ সিংহ ধরিবার নিমিত্ত, গোয়াল বাড়ির দরজা বন্ধ করিয়া দিয়া, উহাকে তাড়াতাড়ি করিতে আরম্ভ করিল। সিংহ, প্রথমতঃ, পলাইবার চেষ্টা পাইল, কিন্তু দরজা বন্ধ দেখিয়া, বিবেচনা করিল, আর আমার পলাইবার উপায় নাই। তখন সে, ভয়ঙ্কর গর্জ্জন করিয়া, গোয়ালের গরু সংহার করিতে আরম্ভ করিল। কৃষক, সিংহকে ধরা অসাধ্য ভাবিয়া এবং গোয়ালের গরু নষ্ট হইতেছে দেখিয়া, তাড়াতাড়ি দরজা খুলিয়া দিল, এবং সিংহও, তৎক্ষণাৎ, তথা হইতে পলায়ন করিল। সিংহের গর্জন ও গোলযোগ শুনিয়া, কৃষকের স্ত্রী সেই স্থানে উপস্থিত হইল। সে, স্বামীকে নিতান্ত ব্যাকুল দেখিয়া, কারণ জিজ্ঞাসা করিল, এবং সবিশেষ সমস্ত অবগত হইয়া, ভর্ৎসনা করিয়া কহিল, তোমার যেমন বুদ্ধি, তাহার উপযুক্ত ফল পাইয়াছ। আমি তোমার মত পাগল কখনও দেখি নাই। যে জন্তুকে দূরে দেখিলে, লোক ভয়ে পলায়ন করে, তুমি সেই দুরন্ত জন্তুকে ধরিবার বাসনা করিয়াছিলে।
চোরকে ধরিবার চেষ্টা করা অপেক্ষা তাড়াতাড়ি করা ভাল।
জলমগ্ন বালক
এক বালক পুষ্করিণীতে স্নান করিতেছিল; হঠাৎ অধিক জলে পড়িয়া, তাহার মরিবার উপক্রম হইল। দৈবযোগে, সেই স্থান দিয়া, এক পথিক যাইতেছিল। বালক, তাহাকে দেখিতে পাইয়া, কাতর বাক্যে কহিল, ওগো মহাশয়! আপনি কৃপা করিয়া আমায় তুলুন, নতুবা আমি ডুবিয়া মরি। পথিক, অগ্রে তাহাকে না উঠাইয়া, ভর্ৎসনা করিতে লাগিল। তখন ঐ বালক কহিল, আগে আমায় উঠাইয়া, পরে ভর্ৎসনা করিলে ভাল হয়। আপনকার ভর্ৎসনা করিতে করিতে, আমার প্রাণত্যাগ হয়।
শিকারী ও কাঠুরিয়া
এক ব্যক্তি অরণ্যে সিংহ শিকার করিতে গিয়াছিল। ইতস্ততঃ অনেক ভ্রমণ করিয়া, সে, সম্মুখে এক জন কাঠুরিয়াকে দেখিয়া, জিজ্ঞাসিল, ওহে! সিংহ কোন স্থানে থাকে, বলিতে পার। কাঠুরিয়া কহিল, হাঁ বলিতে পারি; তুমি আমার সঙ্গে এস, আমি এক বারে তোমাকে সিংহই দেখাইয়া দিতেছি। শিকারী ব্যক্তি, সিংহের নাম শুনিয়া, ভয়ে কাঁপিয়া উঠিল, এবং তাহার মুখ শুকাইয়া গেল। সে কহিল, না ভাই, আমার সিংহের প্রয়োজন নাই; আমি কেবল সিংহের স্থান অন্বেষণ করিতেছি। কাঠুরিয়া, তাহাকে কাপুরুষ নিশ্চয় করিয়া, ঈষৎ হাসিয়া, আপন কর্ম্ম করিতে লাগিল।
কাপুরুষেরা দূরে বীরত্ব প্রকাশ করে, কিন্তু বীরত্বপ্রকাশের সময় উপস্থিত হইলে, তাহাদের বুদ্ধিলোপ হইয়া যায়।
বানর ও মৎস্যজীবী
এক নদীতে জেলেরা, জাল ফেলিয়া, মাছ ধরিতেছিল। এক বানর, নিকটবর্ত্তী বৃক্ষে বসিয়া, তাহাদের মাছ ধরা দেখিতেছিল। কোনও প্রয়োজন বশতঃ, জেলেরা, সেই খানে জাল রাখিয়া, কিঞ্চিৎ দূরে গমন করিল। অনেক ক্ষণ দেখিয়া দেখিয়া, বানরের, জেলেদের মত, মাছ ধরিবার ইচ্ছা হইল। তখন সে গাছ হইতে নামিয়া আসিল, এবং জাল লইয়া যেমন নাড়িতে লাগিল, অমনি তাহার হাত পা জালে জড়াইয়া গেল; আর যে জাল ছাড়াইয়া পলায়ন করিতে পারিবেক, সে সম্ভাবনা রহিল না। জেলেরা, দূর হইতে দেখিতে পাইয়া, এবং দুষ্ট বানর আমাদের জাল ছিঁড়িয়া ফেলিল, এই মনে করিয়া, তৎক্ষণাৎ সেই স্থানে উপস্থিত হইল, এবং সকলে মিলিয়া, যষ্টি প্রহার করিয়া তাহাকে বিলক্ষণ শিক্ষা দিল। বানর, মনে মনে আপনাকে ধিক্কার দিয়া, আক্ষেপ করিয়া কহিতে লাগিল, আমার যেমন কর্ম্ম তেমন ফল পাইলাম। আমি মাছ ধরিবার কিছুই জানি না, কেন, দৌড়াদৌড়ি আসিয়া, জালে হাত দিলাম।
অশ্ব ও গর্দ্দভ
এক গর্দ্দভ, ভারি বোঝাই লইয়া, অতি কষ্টে চলিয়া যাইতেছে। এমন সময়ে, এক যুদ্ধের অশ্ব, অতি বেগে খট খট করিয়া, সেই খান দিয়া চলিয়া যায়। অশ্ব, গর্দ্দভের নিকটবর্ত্তী হইয়া, কহিল, অরে গাদা! পথ ছাড়িয়া দে; নতুবা, এক পদাঘাতে, তোর প্রাণ নাশ করিব। গর্দ্দভ, ভয় পাইয়া, তাড়াতাড়ি পথ ছাড়িয়া দিল; কিন্তু আপনার দুর্ভাগ্য ও অশ্বের সৌভাগ্য ভাবিয়া, মনে মনে অত্যন্ত দুঃখ করিতে লাগিল।
কিছু দিন পরে, ঐ অশ্ব যুদ্ধে গেল। তথায় এমন বিষম আঘাত লাগিল যে, সে একবারে অকর্ম্মণ্য হইয়া গেল; সুতরাং আর যুদ্ধে যাইবার উপযুক্ত রহিল না। তাহা দেখিয়া, অশ্বস্বামী তাহাকে কৃষিকর্ম্মে নিযুক্ত করিয়া দিল।
এক দিন, বেলা দুই প্রহরের রৌদ্রে, অশ্ব লাঙ্গল বহিতেছে, এমন সময়ে, সেই গর্দ্দভ ঐ স্থানে উপস্থিত হইল, এবং অশ্বের ক্লেশ দেখিয়া, মনে মনে কহিতে লাগিল, আমি অতি মূঢ়, এজন্যে তখন, ইহার সৌভাগ্য দেখিয়া, দুঃখ ও ঈর্ষ্যা করিয়াছিলাম। এক্ষণে ইহার দুর্দশা দেখিয়া, চক্ষে জল আইসে। আর, এও অতি মূঢ়, সৌভাগ্যের সময় গর্ব্বিত হইয়া, অকারণে আমার অপমান করিয়াছিল। তখন জানিত না যে, সৌভাগ্য চিরস্থায়ী নহে। এখন, আমার অপেক্ষাও, ইহার দুর্ভাগ্য অধিক।
অশ্ব ও বৃদ্ধ কৃষক
এক কৃষকের একটি টাটু ঘোড়া ছিল। সে এক দিবস, আপন পুত্রকে সঙ্গে লইয়া, ঐ ঘোড়া বাজারে বিক্রয় করিতে যাইতেছে, এই সময়ে, সেই পথ দিয়া, কতকগুলি বালক, হাস্য ও কৌতুক করিতে করিতে, চলিয়া যাইতেছিল। তাহাদের মধ্যে এক জন, কৃষক ও তাহার পুত্রকে উদ্দেশ করিয়া, আপন সহচরদিগকে কহিল, তোমরা ইহাদের মত নির্বোধ কখনও দেখেছ। অনায়াসে ঘোড়ায় চড়িয়া যাইতে পারে; না হইয়া, আপনারা অনর্থক, ঘোড়ার সঙ্গে সঙ্গে, হাঁটিয়া যাইতেছে।
বৃদ্ধ শুনিয়া, আপন পুত্রকে ঘোড়ায় চড়াইয়া দিল, আর আপনি সঙ্গে সঙ্গে চলিল। কিঞ্চিৎ পরেই, পথের ধারে কয়েক জন বৃদ্ধ, দাঁড়াইয়া, কোনও বিষয়ে বাদানুবাদ করিতেছিল। তাহাদের মধ্যে এক জন, কৃষকের পুত্রকে অশ্বে আরোহণ করিয়া, আর কৃষককে অশ্বের সঙ্গে হাটিয়া, যাইতে দেখিয়া কহিল, দেখ! আমি যাহা বলিতেছিলাম, তাহা যথার্থ কি না। এ কালে বৃদ্ধের আদর নাই। ঐ দেখ, বেটা ঘোড়ায় চড়িয়া যাইতেছে, আর বুড়া বাপ সঙ্গে সঙ্গে হাঁটিয়া, যাইতেছে। এই বলিয়া, সে কৃষকের পুত্রকে ধমকাইয়া কহিল, অরে পাপিষ্ঠ! বৃদ্ধ পিতা চলিয়া যাইতেছে, আর তুই ঘোড়ায় চড়িয়া যাইতেছিস; তোর কিছুই বিবেচনা নাই।
কৃষকের পুত্র শুনিয়া লজ্জিত হইল, এবং আপনি ঘোড়া হইতে নামিয়া, পিতাকে চড়াইয়া লইয়া চলিল। খানিক দূর গেলে পর, কতকগুলি স্ত্রীলোক উপস্থিত হইল। তাহারা কহিল, কে জানে, এ মিন্সের কেমন আক্কেল, আপনি ঘোড়ায় চড়ে যাচ্চে, আর ছোট ছেলেটিকে হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্চে। বৃদ্ধ শুনিয়া, লজ্জিত হইয়া, পুত্রকেও ঘোড়ায় চড়াইয়া লইল।
এইরূপে খানিক দূর গেলে পর, এক ব্যক্তি বৃদ্ধকে জিজ্ঞাসিল, ওহে ভাই! তোমায় জিজ্ঞাসা করি, এ ঘোড়াটি কার। বৃদ্ধ কহিল, এ আমার ঘোড়া। তখন সে ব্যক্তি কহিল, তোমার আচরণ দেখিয়া, তোমার বলিয়া বোধ হইতেছে না। তোমার হইলে, তুমি উহার উপর এত নির্দয় হইতে না। কোন বিবেচনায়, এমন ছোট ঘোড়ার উপর, বাপ বেটা দুজনে চড়িয়া বসিয়াছ। ঘোড়াটিকে এত ক্ষণ যেমন কষ্ট দিয়াছ, অতঃপর উহাকে কাঁধে করিয়া লইয়া যাওয়া উচিত।
এই ভর্ৎসনা শুনিয়া, তাহারা পিতা পুত্রে ঘোড়া হইতে নামিল, দড়ি দিয়া ঘোড়র পা বাঁধিল, এবং পায়ের ভিতরে বাঁশ দিয়া, কাঁধে করিয়া লইয়া চলিল। বাজারের নিকটে একটি ছোট খাল ছিল। তাহারা ঐ খালের পুলের উপর উঠিলে, বাজারের লোক এই তামাসা দেখিতে উপস্থিত হইল, এবং মানুষে জিয়ন্ত ঘোড়া কাঁধে করিয়া লইয়া যাইতেছে দেখিয়া, সকল লোকে এত হাসি তামাসা করিতে ও হাততালি দিতে লাগিল যে, ঘোড়া ভয় পাইয়া, জোর করিয়া, পায়ের দড়ি ছিঁড়িয়া ফেলিল, এবং দড়ি ছিঁড়িবা মাত্র, এক বারে খালের জলে পড়িয়া পঞ্চত্ব পাইল।
বৃদ্ধ, লোকের ঠাট্টা তামাসায়, যৎপরোনাস্তি বিরক্ত ও লজ্জিত হইল, এবং হতবুদ্ধি হইয়া, কিয়ৎ ক্ষণ সেই স্থানে দাঁড়াইয়া রহিল; পরে, এই ভাবিতে ভাবিতে চলিয়া গেল, আমি, সকলকে সন্তুষ্ট করিতে চেষ্টা পাইয়া, কাহাকেও সন্তুষ্ট করিতে পারিলাম না, লাভের মধ্যে ঘোড়াটি গেল।
সম্পূর্ণ
PRINTED BY PI′TA′MBARA VANDYOPA′DHYA′YA,
AT THE SANSKRIT PRESS.
62, AMHERST STREET. 1877.