CastFM
টেক্সট সাইজ
120%
মার্জিন
5%
লাইন স্পেসিং
1.5

প্রথম পিরামিড

‘আচ্ছা, বলো দেখি মিশরের রাজধানী কী ছিল?’

‘ছিল মানে কী? আছে তো, কায়রো।’

‘সে তো এখন, কায়রো শহরের বয়স মাত্র ১০০০ বছর।’

‘মাত্র বলছেন? আমাদের কলকাতার বয়স ৪০০ বছর, এটাকে মাত্র বলা যায়।’

‘তাহলে শুনে রাখো, ইজিপ্ট দেশটার জন্ম আজ থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার বছর আগে, সেই সময় ভারতের নাম কেউ শোনেনি। তাই কায়রো ওর কাছে শিশু। যাই হোক, এবারে বলো, কায়রোর আগে কী ছিল?’

এবারে আমাদের মাথা চুলকোনোর পালা, কায়রোরও আগের রাজধানী?

ভবেশ সামন্ত এবারে বিড়িতে একটা টান মেরে বললেন,

‘মেমফিস।’

* *

আমার নাম স্পন্দন বসু। বয়স একুশ, বাড়ি বর্ধমানে। একদম শহরের মধ্যেই। তবে এখন থাকি কলকাতায়। জয়েন্টে ৪২ র‌্যাঙ্ক করে মেডিক্যাল কলেজে ভরতি হয়েছিলাম। এখন সেকেন্ড ইয়ার। থাকি কলেজের হোস্টেলেই।

গেল সপ্তাহে বাড়ি ফিরেই দেখলাম মামা এসেছে। মামারা দশদিন ধরে ইজিপ্ট ঘুরে এল। মোবাইলে তার ছবি দেখাচ্ছিল। পিরামিড, মমি, তুতানখামেন, নীল নদ এসব দেখে মাথা ঘুরে গেল। ইস, আমিও যদি যেতে পারতাম! কী দারুণ দারুণ গল্প বলছিল মামা। সেইসব শুনে আমার মনে হল আরিব্বাস, এগুলো নিয়ে তো আরও জানতে হবে!

মেডিক্যাল কলেজের হোস্টেলে থাকার একটা মস্ত বড়ো সুবিধা হল দু-পা হাঁটলেই কলেজ স্ট্রিট! এমন কোনো বই আছে নাকি যেটা ওখানে পাওয়া যায় না! গুডরিডসের ওয়েবসাইট থেকে ইজিপ্ট নিয়ে লেখা কয়েকটা বইয়ের নাম দেখে নিয়েছিলাম। সোমবার ক্লাস শেষ হতেই রুমমেট পিজি-কে নিয়ে হাজির হয়ে গেলাম কলেজ স্ট্রিটে। পিজির ভাল নাম প্রদীপ্ত ঘোষ, ওইটাই ছোটো হয়ে পিজি হয়ে গেছে। কলেজ স্ট্রিটে নেমে কিন্তু বেশ হতাশ হতে হল। যে বইটা খুঁজছি সেটা পাচ্ছিই না। কিন্তু সবাই একটাই কথা বলল, প্রেসিডেন্সির গেটের বাইরেই বারো নম্বর দোকান। ভবেশদার। ওখানে না পেলে নাকি আর কোথাও পাওয়ার চান্স নেই।

দোকান না বলে গুমটি বলাই ভালো। তিন চারটে পিলারের মতো করে বইয়ের স্তূপ দাঁড়িয়ে আছে, একটু ঠেলা দিলেই হুড়মুড় করে পড়বে সবকটা। কাঠের তাকগুলোতেও গিজগিজ করছে বই। কলেজ স্ট্রিটের আর পাঁচটা গুমটির সঙ্গে কোনো তফাত নেই। দোকানের একটা টুলে বসে এক ভদ্রলোক মন দিয়ে বই পড়ছেন।

‘দাদা, একটা বই খুঁজছিলাম।’

কথাটা যেন ওঁর কান অবদি পৌঁছোলই না। আবার ডাকলাম,

‘দাদা, শুনতে পাচ্ছেন?’

মাথা তুলে চাইলেন।

‘চিল্লাও কেন খামোখা, উইলবার স্মিথ-এর রিভার গড চাই তো?’

‘আপনি জানলেন কী করে?!’

এবারে ভদ্রলোক নড়েচড়ে বসলেন। ছোটোখাটো ছাপোষা চেহারা। গায়ে নীল স্ট্রাইপের পুরোনো সুতির জামা, সঙ্গে বাদামি রঙের সুতির প্যান্ট, উঠে আছে গোড়ালির একটু ওপরে। পায়ে একটা হাওয়াই চটি। মুখটাও মনে রাখার মতো নয়। রোগাটে, লম্বা, গালে কয়েকদিনের না কামানো দাড়ি। চোখে একটা হাই পাওয়ারের চশমা। বয়স মনে হয় পঞ্চাশের আশেপাশে। জিজ্ঞাসা করলেন,

‘এই চত্বরে কি নয়া?’

‘না না, তবে ঘন ঘন আসা হয় না। কিন্তু, কেন বলুন তো?

‘সেই থেকে দেখছি চষে বেড়াচ্ছ। আমি ওইদিকে চা আনতে গেছিলাম, কানে গেল কথাটা। তখনই জানতুম, তোমাদেরকে এই ভবেশ সামন্তর কাছেই আসতে হবে।’

আমাদের ভ্যাবাচ্যাকা মুখ দুটো দেখতে দেখতেই ভবেশদা বলতে লাগলেন,

‘রিভার গড ছাড়াও উইলবারবাবুর সেভেন্থ স্ক্রোল, ওয়ারলক, হালের ডেজার্ট গড, ফারাও সব পাবে। ইজিপ্ট নিয়ে আগ্রহ আছে বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু ফিকশন পড়ার শখ কেন?’

অলংকরণ : রাজকুমার

‘মানে, ফিকশনই তো ইন্টারেস্টিং লাগে বেশি, ফ্যাক্ট বেসড লেখা অতটা ভালো লাগবে না তো।’

‘হুঁ, ইজিপ্ট নিয়ে আগে কতটা পড়েছ?’

‘ওই স্কুলের বইতে যতটুকু থাকে, তারপরে বিশ্বকোষ, কাকাবাবু, শেয়াল দেবতা রহস্য, ফারাওয়ের চুরুট, অ্যাস্টেরিক্স আর ক্লিওপেট্রা...’

‘ঠিক ঠিক, ক্লিওপেট্রা! লিজ টেলর! আমি দেখেছি।’

পিজি মাড়ি বের করে হাসতে হাসতে বলল।

লোকটা মনে হল চোখ দিয়েই পিজিকে পুড়িয়ে মারবে। তারপরে আমার দিকে তাকিয়ে বলল,

‘বাহ, কাকাবাবু, টিনটিন পড়ে ইজিপ্ট চিনছ! এর চাইতে দুর্ভাগ্যের আর কী হতে পারে? ইজিপ্টের ইতিহাস যেকোনো থ্রিলারকে হার মানাবে, এটা কি জানো?’

‘তাই নাকি! কিন্তু বাংলায় তো তেমন কিছু নেই।’

‘হ্যাঁ, বাংলায় নেই সত্যি, দু-একটা বই ছাড়া। তবে ব্রিটিশদের লেখা গুচ্ছের বই আছে। তার এক একটা গল্প বললে তোমাদের নেশা চড়ে যাবে বলে রাখলুম।’

এবারে আমার চোখ চকচক করে উঠল,

‘আপনি মনে হচ্ছে অনেক জানেন ইজিপ্ট নিয়ে!’

‘বইয়ের দোকান দিয়েছি কি শুধু বেচবার জন্য নাকি! খনির মধ্যে বসে থাকি হে সারাদিন, না জানাটাই আশ্চর্যের নয় কি?’

বইয়ের দোকান দিলেই যে বই পড়তে হবে তার কোনো মানে নেই, তবে এই লোকটাকে দেখে বাজে বকছে বলে মনে হল না।

‘আমার নাম স্পন্দন, আর এ আমার বন্ধু প্রদীপ্ত। আমরা মেডিক্যাল কলেজে পড়ি, এই উলটোদিকের হোস্টেলেই থাকি। আপনার কাছে দারুণ দারুণ গল্প শুনতে ইচ্ছে করছে যে!’

‘বিড়ি হবে?’

‘না, মানে, আমরা তো বিড়ি খাই না।’

‘ধুস! যাকগে, সাড়ে সাতটা নাগাদ দোকান বন্ধ করব। একটা বিড়ির প্যাকেট নিয়ে চলে এসো। গল্প কাকে বলে আজ বুঝবে।’

এই বলে আবার বইয়ের পাতায় মুখ গুঁজলেন ভবেশ সামন্ত। গুমটিতে একটাও লোক নেই। তাও কীসের ব্যস্ততা বুঝলাম না। বই পড়াটা লোকটার কাছে এখন বেশি জরুরি। আর কথা না বাড়িয়ে তখনকার মতো ফিরে এলাম হোস্টেলে।

পিজির একদম ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু ও বেশ ছোটোখাটো মানুষ, তাই ওকে একরকম বগলদাবা করেই পাক্কা সাড়ে সাতটায় হাজির হয়ে গেলাম বারো নম্বর গুমটির সামনে। লোকটা তখন কাঠের পাল্লায় তালা লাগাচ্ছে।

‘ভবেশবাবু।’

‘খবরদার, এসব বাবু-টাবু বলবে না, নিজেকে বেশ বুড়ো লাগে, ভবেশদা চলবে।’

‘ওহ, ওকে, ভবেশদা।’

লোকটার হেবি ঘ্যাম। নির্বিকার চিত্তে বাকি কাজ করে নিয়ে বলল,

‘বেনুর দোকানে চলো, আদা দিয়ে হেব্বি চা বানায়, খেতে খেতে গল্প জমবে। আমার প্যাকেট কই?’

পিজি বাড়িয়ে দিল জীবনে প্রথম কেনা বিড়ির প্যাকেট।

বেনুদার গুমটি সবাই চেনে, পুঁটিরামের দোকানটাকে ডান দিকে রেখে কয়েক পা হাঁটলেই ডান দিকে বেনুদার চা পাঁউরুটির দোকান। যেদিন মেসের খাবার আর মুখে তোলা যায় না সেদিন আমরা এখানে এসে ম্যাগি, ডিম পাঁউরুটি খাই। বেনুদাকে তিনটে চা বানাতে বলে আমরা গুমটির সামনে পেতে রাখা বেঞ্চে বসলাম। ভবেশদা এবারে একটা বিড়ি ধরিয়ে বললেন,

‘শুরুটা তাহলে গোড়া থেকেই করা যাক। তোমাদের বিদ্যে তো ওই লিজ টেলর লেভেলের দেখলাম।’ ভবেশদা পিজির দিকে তাকালেন বাঁকা চোখে।

মুখে কিছু না বললেও মনে মনে বেশ রাগ হল, মেডিক্যাল কলেজের স্টুডেন্টকে বই পড়া দেখাচ্ছে। একটা অ্যানাটমির বই দিয়ে বসিয়ে দিতে হয় একে। বুঝত পড়া কাকে বলে। কিন্তু এমন একটা ইন্টারেস্টিং সাবজেক্ট। লোকটাকে এক্ষুনি চটানো ঠিক হবে না। তাই চুপ করেই রইলাম।

‘আগে দেখি তোমরা কতদূর কী জানো। আচ্ছা, বলো দেখি মিশরের রাজধানী কী ছিল?’

‘মেমফিসের নামটাও শোননি? মানে কাকাবাবুটাও দেখছি ভালো করে পড়া হয়নি। শুধু পড়ার বই গিলেছ বসে বসে।’

‘না, মানে, অনেকদিন আগে তো...’

একদম ভুলেই গেছিলাম সত্যি মেমফিসের কথা, নিজের মনেই একবার জিভ কাটলাম।

‘যাই হোক। মেমফিসে কী আছে জানো তো?’

‘হ্যাঁ এটা মনে আছে, স্টেপ পিরামিড।’

‘ঠিক। এই স্টেপ পিরামিডকেই বাকি সব পিরামিডের বাবা বা দাদু বলা যায়। পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম আগাগোড়া পাথর দিয়ে বানানো সৌধ। কে বানিয়েছিল জানো?’

না, এইটা তো মনে হয় কাকাবাবুতে ছিল না। দু-জনেই এবারে মাথা নাড়লাম।

‘চলো, তাহলে আজকে সেই লোকটার গল্পটাই হয়ে যাক। এই গল্প সাড়ে চার হাজার বছর পুরোনো।’

‘ইজিপশিয়ানদের প্রধান দেবতা ‘‘রা’’। সূর্যদেব। পৃথিবী যে গোল সেটা ওরা জানত না। তাই সূর্য পশ্চিম দিকে অস্ত গেলে ওরা ভাবত ওদের দেবতা এবারে মাটির নীচের জগতে যাত্রা শুরু করলেন, যেখানে মৃত্যুর পরে আত্মারা যায়। সেই কারণেই মেমফিস শহরের পশ্চিম প্রান্তে তৈরি হয়েছিল একটা নেক্রোপলিস। জায়গাটার নাম সাকারা। সেখানে মৃতদের কবর দেওয়া হত। প্রায় সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার জুড়ে ছিল এই কবরখানা।

‘কবরে মৃতদেহ ছাড়াও রাখা থাকত জীবদ্দশায় ভোগ করে যাওয়া সব রকমের জিনিস। খাবারদাবার, পোশাক, অস্ত্র, আসবাবপত্র এমনকী বাজনা পর্যন্ত, যাতে অতিপ্রাকৃত জীবনে মানুষটার কোনো কষ্ট না হয়। কিন্তু প্রথমদিকের কবরগুলো চ্যাপটা ছিল বুঝলে, একতলা বাড়ির মতো। নীল নদের তীরের কাদামাটি পুড়িয়ে তৈরি করা ইট দিয়ে বানানো। ইজিপশিয়ানরা এখন ওকে বলে মাস্তাবা, আরবি ভাষায় যার মানে বেঞ্চ। তবে একজন ফারাও প্রথমবার অন্যরকম কিছু ভাবেন। তাঁরর নাম ছিল জোসার।’

পিজি নিজের মনে মোবাইল নিয়ে খুট খুট করছিল। টক করে আমার কাছে হোয়াটস-অ্যাপে একটা মেসেজ এল। খুলে দেখলাম পিজি লিখেছে,

‘জোসার? কেমন জুসার জুসার শুনতে লাগছে।’

ভবেশদা বেশ বিরক্ত হলেন এতে,

‘নাহ, আমি উঠি, তোমাদের মন নেই দেখছি। ফালতু সময় নষ্ট করছি।’

‘না না দাদা, খুব সরি। এই, এই মোবাইল সাইলেন্ট করে দিলাম। আপনি বলুন।’

পিজির দিকে কটমট করে তাকাতে সেও মুখটা ব্যাজার করে মোবাইলটা পকেটে পুরল এবারে।

‘তা, কোথায় যেন ছিলাম?’

‘ওই ফারাও জুস... মানে জোসার।’

‘হুম, তা জোসারের মনে হল ওর সমাধিটা বাকিদের থেকে একদম আলাদা হতে হবে। ওঁরটা ইট দিয়ে নয়, পাথর দিয়ে বানানো হবে। কিন্তু অত ভারী পাথর দিয়ে একটা বাড়ি বানানো যাবে নাকি! আগে তো কেউ কখনো এমনটা ভাবেনি। জোসার তাঁরর সভায় সবচেয়ে বুদ্ধিমান লোকটাকে কাজটার দায়িত্ব দিলেন। নাম ইমহোটেপ।’

‘আরে, ইমহোটেপকে তো চিনি ! ‘‘মামি’’ সিনেমার ভিলেন। টাক মাথা ছিল, আনেকসুনেমুকে ভালোবাসত। হাঁ করে মুখ দিয়ে অ্যাত্তো পোকা বের করেছিল...’

পিজি এবারে মুখ হাঁ করে পোকা বের করা দেখাচ্ছিল।

‘তোমার এই বন্ধুটি তো দেখছি হলিউডেই থাকে সারাদিন। সিনেমাটা একটা দারুণ মানুষের নামটাই খারাপ করে দিয়েছে। ইমহোটেপ কীরকম ট্যালেন্টেড লোক ছিল জানো? একইসঙ্গে রাজার অ্যাডভাইসার, কবি, আর্কিটেকচার, অ্যাস্ট্রোলজার...’

‘বুঝেছি বুঝেছি, লিওনার্দো দা ভিঞ্চির মতো।’

ভবেশদা চায়ের কাপে সুড়ুৎ করে চুমুক দিয়ে বললেন,

‘ধুস, লিওনার্দো তো কালকের ছেলে। ইমহোটেপ ওকে বলে বলে দশটা গোল দিত। তা যাই হোক, রাজা তো ইমহোটেপকে ওর কবরখানা বানাতে বলে খালাস। কিন্তু সেই জিনিস বানানো যায় কী করে! পাথরের ওপরে পাথর বসিয়ে উঁচু কিছু বানাতে গেলেই যে ব্যালান্স নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এইভাবেই ছ-বার সমাধি বানাতে গিয়ে সেটা ভেঙে গেল। তখন ইমহোটেপ একটা বুদ্ধি বের করল। আচ্ছা, যদি এমনটা করা যায়, যে, মাস্তাবার ওপরে আরেকটা মাস্তাবা, তার ওপরে আরেকটা, তারও ওপরে আরেকটা। প্রতিটা ধাপই তার নীচেরটার থেকে ছোটো হবে। সেইভাবে বানিয়েও ফেলা হল কবরখানা। আর এভাবেই তৈরি হল ইজিপ্টের প্রথম পিরামিড। ধাপে ধাপে উঠেছে তাই একে স্টেপ পিরামিড বলে।’

‘তাহলে এই পিরামিডের মধ্যেই জোসারের মমি ছিল?’

ইমহোটেপ

‘না, সেটা ভুল ধারণা, সাকারার স্টেপ পিরামিড কিন্তু একদম নিরেট। পিরামিডের নীচে মাটির তলায় ইমহোটেপ কবরখানা বানিয়েছিল। সেখানে মমি ছাড়াও ছিল অনেকগুলো ঘর, রাজার আসবাবপত্র রাখার জন্য। সেই ঘরগুলো আবার জোড়া ছিল সরু সরু প্যাসেজ দিয়ে। পিরামিডের চারিদিকে বিশাল বড়ো পাথরের দেওয়ালও বানিয়েছিল ইমহোটেপ। সেই দেওয়ালের গায়ে চোদ্দোখানা দরজা ছিল, যার মাত্র একটা দিয়েই পিরামিডের কাছে পৌঁছোনো যেত। বাকি সবকটা অন্ধগলিতে গিয়ে শেষ হত।’

‘ভুলভুলাইয়া!’

‘হ্যাঁ, ভুলভুলাইয়াই বটে। তবে এখন সব মাটিতে মিশে গেছে। পিরামিডটাই শুধু বেঁচে আছে, এই যা।’

‘যাই হোক, ভদ্রলোকের এলেম ছিল বলতে হবে। পাঁচ হাজার বছর আগে আর্কিটেকচারের এরকম নলেজ তো জাস্ট ভাবা যায় না!’

‘তবে ইমহোটেপের আরও বড়ো কাজ ছিল কিন্তু ডাক্তার হিসেবে।’

‘বলেন কী ! ডাক্তারও!’

‘হ্যাঁ, ইমহোটেপ দু-শোর ওপরে রোগ সারিয়েছিল। তার মধ্যে আছে গাউট, আর্থ্রাইটিস, টিবি। কিছু ছোটোখাটো অপারেশনও করত। মানুষের অ্যানাটমির ব্যাপারে ওর দারুণ জ্ঞান ছিল। ও-ই প্রথম বলে রোগ ভোগ দেবতার অভিশাপ নয়, মানুষের শরীরেরই ফল্ট। তাই চিকিৎসা করলেই সারবে। আর এই সব কিছু ঘটছিল আমাদের সুশ্রুতেরও দেড় হাজার বছর আগে।

পিজি মনে হল এতক্ষণে বেশ আগ্রহ পেয়েছে, এবারে বলল,

‘একটাই লোক ডাক্তারও আবার আর্কিটেক্টও! অবশ্য হতেই পারে, লোকটা আমার মতন, আমারও জয়েন্টে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে...’

ভবেশদা কিন্তু বলে যেতে লাগলেন, যেন পিজির কথাটা কানেই যায়নি,

‘ভাবো তাহলে, কী মারাত্মকরকম ট্যালেন্টেড ছিল ইমহোটেপ। ইজিপ্টের মানুষেরা ওকে ভগবানের মতো পুজো করত। কিন্তু লোকটা একদিন রহস্যজনকভাবে হারিয়ে গেল।’

‘বলেন কী? হারিয়ে গেল? এত বিখ্যাত একটা মানুষ?’

‘হ্যাঁ, কেউ আজ পর্যন্ত ইমহোটেপের কবর খুঁজে পায়নি। ওইরকম জনপ্রিয় একজন মানুষের কী হল সেটা কোত্থাও লেখা নেই। ইতিহাসের পাতা থেকেই লোকটা ভ্যানিশ হয়ে গেল। অনেকে আজও বিশ্বাস করে সাকারার মাটির নীচেই কোথাও ইমহোটেপের কবর লুকিয়ে আছে।’

‘এটাও তো বেশ মিস্ট্রির মতো। তবে ভবেশদা, এই গল্পটা শুনতে শুনতে একটা কথা মাথায় এল।’

‘বলে ফেলো।’

‘আচ্ছা, এই যে এতগুলো পিরামিড, মাস্তাবা, মমি এইসব তো ইজিপশিয়ানরা বানাত, কারণ ওরা পরলোকে বিশ্বাস করত।’

‘ঠিক পরলোক নয়, মৃত্যুর পরের আরেকটা জীবন। সেই জীবনটা যাতে নির্ঝঞ্ঝাট হয় সেইজন্যই বানানো ওগুলো। বুক অফ ডেড-এর নাম শুনেছ?’

‘শুনব না আবার!’ পিজি এবারে লাফিয়ে উঠল,

‘মামি রিটার্নসে ছিল তো, বুক অফ দ্য ডেড। দামড়া একটা বই, সোনায় মোড়া। সেইটা পড়লেই দুমদাম মরে যাওয়া মানুষ বেঁচে যায়। ওই করেই তো আনেকসুনেমুকে বাঁচাল। উফফ, আনেকসুনেমু, ভাবলেই না গায়ে কেমন কাঁটা দিয়ে...’

ভবেশদা এতক্ষণ মনে হয় নিজেকে অনেক কষ্টে সামলে রেখেছিলেন। কিন্তু পিজির এই মুহুর্মুহু গোলা বর্ষণ আর নিতে পারলেন না। দুম করে উঠে দাঁড়ালেন।

‘বাঁদর ছেলের দল সব। ভালো কিছু শেখার ইচ্ছা নেই। তোমাদের জন্য টিনটিনই ভালো।’

বলেই হনহন করে হাঁটা লাগালেন বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিটের দিকে। আমরা অনেকবার করে ডাকলেও ফিরে তাকালেন না।

হোস্টেলে ফিরেই পিজির নোটের খাতাটা জ্বালিয়ে দেব বলে ঠিক করলাম আমি।

মৃতের বই

না, আগের সোমবার পিজির নোটের খাতাটা আর পোড়াইনি। বেচারা কাঁচুমাচু মুখ করে ফিরছিল আমার সঙ্গে। রুমে ঢোকার পরে মুখ খুলল,

‘ইস, আমার জন্যই জমাটি আড্ডাটা নষ্ট হল ভাই। আসলে আমার না আনেকসুনেমুর ওপরে একটা ইয়ে...’

মনে হচ্ছিল পায়ের হাওয়াই চটিটা খুলে ওকে পেটাই। কিন্তু অনেক কষ্টে নিজেকে আটকে বললাম,

‘যা হওয়ার তো হয়েই গেছে। এখন আর কাঁদুনি গেয়ে কী হবে?’

‘না ভাই, লোকটা অনেক জানে, বুঝলি। আমার নিজেরও হেব্বি লাগছিল শুনতে। এমন একটা মানুষকে হাতছাড়া করাটা ঠিক হবে না।’

‘কী করবি তাহলে?’

‘একবার গিয়ে সরি বলে আসব?’

‘এখন আর কোথায় পাবি ওঁকে, পরে একদিন ওঁর দোকানে যাওয়া যায়। কিন্তু তোর মার খাওয়ার একটা হাই চান্স আছে।’

সেকেন্ড ইয়ারে ক্লাসের খুব একটা চাপ থাকে না। আর ওই বোরিং ফার্মাকোলজি, প্যাথোলজি, মাইক্রোবায়োলজি কাঁহাতক পড়া যায়? তাই আজকে সন্ধেবেলায় পিজিকে নিয়ে আবার এসেছিলাম ভবেশদার দোকানে। আমাদের দেখেই না চেনার ভান করে আবার বই পড়তে লেগেছিলেন, কিন্তু পিজি হাতে বিড়ির প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে অনেক সরি-টরি বলে ম্যানেজ করেছে। প্রমিস করেছে আর ভবেশদার গল্প বলার মাঝে ফুট কাটবে না। তবে তাতে আমার বিশ্বাস হয়নি।

বুক অফ দ্য ডেড-এর একটা পাতা

আমরা তিনজনে এসে বসলাম বেনুদার দোকানে, আজকে ভবেশদার মুড ভালো করতে বেনুদাকে কফি বানাতে বললাম। আমি এবারে মোবাইলটাকে সাইলেন্ট করে পকেটে ঢোকাতে ঢোকাতে বললাম,

‘ভবেশদা, আজকে ওই বুক অফ দ্য ডেড-টা নিয়ে কিছু বলুন না।’

‘বাহ, তোমার তো নামটা মনে আছে বেশ দেখছি। তবে ওই বই দিয়ে কিন্তু কাউকে বাঁচিয়ে তোলা যায় না। হলিউডি গাঁজাখুরি সব। বলতে পারো বুক অফ দ্য ডেড হল মৃত্যুর পরের রাজ্যে ঢোকার চাবি।’

‘মৃত্যুর পরের রাজ্য? মানে আমাদের স্বর্গ আর নরকের মতো?’

‘কিছুটা সেরকমই। কিন্তু আবার অনেকটা আলাদাও। সেই রাজ্যে পৌঁছোনোর রাস্তাটাই ভয়ংকর! ইজিপশিয়ানরা বিশ্বাস করত মানুষ মারা যাওয়ার পরে মাটির নীচে আরেকটা জীবন শুরু হয়। তাই অত যত্ন করে মমি বানানো। অতশত জিনিস মমির সঙ্গে কবর দেওয়া।’

‘আচ্ছা, কবর দিয়ে দেওয়ার পরে তাহলে মৃতদেহ আবার বেঁচে উঠবে?’

‘না ঠিক তা নয়, দাঁড়াও, বুঝিয়ে বলি।’

বলে ভবেশদা পিজির দিকে তাকিয়ে বললেন,

‘আমরা ধরে নিই প্রদীপ্ত একজন ফারাও। আর আজকেই সকালে বাহ্যবমি করতে করতে ও মারা গেছে।’

পিজির এই ব্যাপারটা একদমই ভালো লাগল না,

‘আমিই কেন? আমার ঠাকুমা আমার কুষ্ঠি বিচার করেছিল। নব্বই বছর অবদি বাঁচব, জানেন? তা নয়, এখনই আমাকে মারার তাল করছেন। বুঝেছি, আগের দিন আপনার পেছনে লেগেছিলাম বলে এখন তার শোধ নিচ্ছেন, তাই না?’

আমি বললাম, ‘আরে বাবা, ভবেশদা তো কথার কথা বলছেন, এত চটছিস কেন? একটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা বুঝতে একটু সুবিধা হয় না কি?’

আমার কথাটা পিজির খুব একটা মনপসন্দ না হওয়ায় গোমড়া মুখে চুপ করে বসে থাকল। ভবেশদা ফিচ করে একটা ছোটো হাসি দিয়ে আবার বলা শুরু করলেন।

‘ফারাও প্রদীপ্ত মারা যাওয়ার পরে সত্তর দিন ধরে ওর শরীরটাকে মমি বানানো হল।’

‘মমি কী করে বানাত?’

ওপেনিং অফ দ্য মাউথ

‘একদিনে সব হজম করতে পারবে না, আজকে যেটা বলছি সেটা শুনে যাও চুপ করে।’

‘তা, যেটা বলছিলাম, ওর মমিটা বানানো হয়ে গেলে সেটা দিয়ে দেওয়া হল বাড়ির লোকজনের হাতে। তারা এবারে সেটাকে কবর দেওয়ার ব্যবস্থা করল। সেই কবরে এবারে মমিকে ঢুকিয়ে তার ওপরে মন্ত্র পড়া শুরু করল পুরোহিত। তার মধ্যে একটার নাম হল ওপেনিং অফ দ্য মাউথ। এতে মৃতের শরীরে প্রাণ আসবে। এর নাম আখ। আখ এবারে তৈরি হয়ে যাবে মাটির নীচের জার্নির জন্য।’

‘গতবার বলেছিলেন বটে যে ইজিপশিয়ানরা বিশ্বাস করত সূর্য পশ্চিমে ডুবে যাওয়ার পরে মাটির নীচে যাত্রা করে।’

‘ঠিক, প্রদীপ্ত এবারে সূর্যদেবতা রা-এর পথে চলতে থাকবে। রা সারারাত ধরে মাটির নীচে পশ্চিম থেকে পূর্বে যায়, যাতে পরের দিন ভোরে আবার আকাশে উঠতে পারে। প্রতি রাতেই এই জার্নির সময় রা-এর নৌকোকে আক্রমণ করে আপেপ নামের একটা বিশাল সাপ। প্রতি রাতেই রা তাকে হত্যা করে। যে রাতে আপেপ জিতে যাবে তার পরের দিন সকালে আর সূর্য উঠবে না।’

আপেপ

‘তাহলে ফারাও পিজি-ও পূর্বে পৌঁছে যাবে?’

‘না না, তার আগেই ওর সামনে আসবে একটা গোলকধাঁধা। ওসাইরিসের নাম শুনেছ?’

‘শুনেছি,’ গোমড়া মুখে বলল পিজি, ‘ইজিপ্টের মৃত্যুর পরের দেবতা।’

‘বাহ এই তো, ইন্টারেস্ট এসছে একটু দেখছি। ঠিক বলেছ। ইজিপশিয়ানদের মৃত্যুর পরের জগৎটা পুরোটাই মাটির নীচে। সেই জগতের দেবতার নাম ওসাইরিস। অনেকটা আমাদের যম বা গ্রিক দেবতা হেইডিসের মতো। তোমার এই মরে যাওয়ার পরের যে জার্নিটা হবে সেটাতে তোমার নামের আগে ওসাইরিস বসে যাবে। মানে তুমি তখন ওসাইরিস প্রদীপ্ত।’

বার বার মরে যাওয়ার কথাটা শুনতে পিজির একদম যে ভালো লাগছে না সেটা বুঝতেই পারছিলাম। কিন্তু এমন একটা ইন্টারেস্টিং জায়গায় এসে ও রাগও দেখাতে পারছিল না। চুপ করে রইল। ভবেশদা বিড়িতে টান দিতে দিতে বলে চললেন,

‘প্রদীপ্ত এবারে এসে পড়বে একটা গোলকধাঁধার সামনে। তার সাতটা দরজা আছে। প্রতিটা দরজা আগলে দাঁড়িয়ে আছে একজন দারোয়ান। সেখানে গিয়ে একটা স্পেসিফিক মন্ত্র বলতে হবে প্রদীপ্তকে। ঠিকঠাক মন্ত্র বললে তবেই গেট খুলবে।’

‘বাপ রে! এ তো হেবি চাপের জিনিস!’

‘চাপ তো এখনও কিছুই দেখনি ভাই, স্পন্দন। এখনও অনেক খেলা বাকি। এইখান থেকেই প্রদীপ্তর দরকার লাগবে বুক অফ দ্য ডেড-কে, যেটা হয়তো প্যাপিরাসে লিখে ওর কফিনে ওর মমির সঙ্গে রাখা আছে। অথবা কফিনের দেওয়ালে বা মমির গায়ের ব্যান্ডেজে সাঁটা আছে। এই বইয়ের জন্ম কবে হয়েছিল সেটা কেউ জানে না। ইজিপ্টের ইতিহাসের একদম প্রথমদিকে এগুলো পিরামিডের ভেতরের দেওয়ালে লেখা থাকত। সেগুলোকে এখন পিরামিড টেক্সট বলে। পরে ওদের একটু-আধটু অদলবদল করে প্যাপিরাসে লিখে বই বানিয়ে মমির দেহর সঙ্গে রাখা হতে থাকল। ১৮৪২ সালে জার্মান ইজিপ্টোলজিস্ট কার্ল লেপলিয়াস এই বইয়ের মানে উদ্ধার করেন। ওঁরই দেওয়া নাম বুক অফ দ্য ডেড, যে বই মৃতকে ঠিকঠাক করে ওসাইরিসের সামনে পরীক্ষায় পাশ করিয়ে দেবে।’

‘ওসাইরিসও আবার পরীক্ষা নেবে?’ পিজি একটু অবাক হয়েছে মনে হল।

‘নেবে না আবার? পাপ পুণ্যের বিচার করেই তো ঠিক হবে যে তুমি কোনদিকে যাবে, স্বর্গে না নরকে। বুক অফ দ্য ডেড থেকে ঠিকঠাক মন্ত্র আউড়ে তুমি তো কোনোরকমে গোলকধাঁধা পেরোলে। কিন্তু তখনই তুমি এসে পড়বে স্বয়ং ওসাইরিসের সামনে। আরও বিয়াল্লিশ জন দেবদেবী মিলে তোমার বিচার করবে। এই জায়গাটার নাম হল ‘কোর্ট অফ দ্য টু ট্রুথস’। এখানে তুমি ওই বুক অফ দ্য ডেড থেকেই আওড়াতে থাকবে। নেগেটিভ কনফেশন করবে। মানে যে যে পাপগুলো জীবদ্দশায় করনি তাদের কথা বলবে। মানুষ পৃথিবীতে কোনো-না-কোনো পাপ করবেই। তাই এই বিচারে ঠিক হবে সে কোন কোন পাপ করেনি। যদি ঠিকঠাক স্বীকার করতে পারো তাহলে তোমার শেষ পরীক্ষা নেবে ওসাইরিস।’

‘সেটা কীরকম?’

‘তোমার হৃৎপিণ্ডটার ওজন করা হবে।’

‘হৃৎপিণ্ডের?!’

‘হ্যাঁ, মিশরীয়রা বিশ্বাস করত যে হৃৎপিণ্ডই সব। একটা মানুষের শরীরের মধ্যে সবচেয়ে প্রয়োজনীয়, সবচেয়ে পবিত্র জিনিস। তাই মমি বানানোর সময় শরীরের ভেতরের সব কিছু বের করে নিলেও হৃৎপিণ্ডটাকে যথাস্থানে রেখে দেওয়া হত। ওইটা ছাড়া তো মৃত মানুষটা ওসাইরিসের সামনে দাঁড়াতেই পারবে না।’

‘আর মমি বানানোর সময় ভুল করে যদি ওটাকে কেউ উপড়ে ফেলে, তাহলে?’

‘এমনটা হয়েছিল তো। দ্বিতীয় রামেসিসের মমি বানানোর সময়েই ভুল করে হৃৎপিণ্ডটাকে কেটে ফেলেছিল শরীর থেকে। তারপরে সেটা আবার সোনার সুতো দিয়ে জুড়ে দেওয়া হয়। যদিও সেখানেও একটা ভুল করে ওরা। রামেসিসের মমিতে হৃৎপিণ্ডটা ছিল বুকের ডান দিকে লাগানো।’

‘এ বাবা। বাজে কেস তো। যাই হোক, ওই ওজন করার ব্যাপারটা বলুন।’

‘হ্যাঁ, প্রদীপ্তর হৃৎপিণ্ডটার ওজন হবে এবারে। আনুবিসের নাম শুনেছ তো?’

‘শুনব না আবার! শেয়ালদেবতা!’

‘ঠিক, আনুবিস হলেন মামিফিকেশনের দেবতা। সেই আনুবিস একটা দাঁড়িপাল্লার একদিকে চড়াবেন হৃৎপিণ্ডটাকে, আরেকদিকে রাখবেন একটা অস্ট্রিচ পাখির পালক, যেটা দেবী মাতের মাথার মুকুট থেকে নেওয়া।’

‘মাত?’

‘হ্যাঁ, মাত হল সত্য আর ন্যায়ের দেবী। সেও দাঁড়িয়ে দেখবে দাঁড়িপাল্লার কোন দিকটা ভারী হল। যদি হৃৎপিণ্ড পালকের থেকে হালকা হয় তাহলে প্রদীপ্ত শেষ পরীক্ষাতেও পাশ করে গেল।’

হৃৎপিণ্ডের ওজন করছেন দেবতা আনুবিস, দাঁড়িপাল্লার পােশ বসে রাক্ষস আমিত

‘আমি খুব ভালোমানুষ, আমার হৃৎপিণ্ডটা ওই পালকের থেকে হালকা হবেই। আমি শিয়োর। কিন্তু তার পরে কী? স্বর্গ?!’

পিজির মুখটা বেশ খুশি খুশি এবারে। কিন্তু ভবেশদা ওর দিকে তাকিয়ে একটু বাঁকা হাসলেন।

‘স্বর্গ মানে তুমি কী বোঝো?’

‘মানে, দারুণ সুন্দর একটা জায়গা। হেবি খাওয়া-দাওয়া, চারিদিকে অপ্সরারা ঘুরে বেড়াচ্ছে। কোনো কাজকর্ম নেই, সারাদিন শুধু গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়াও।’

‘তাহলে কিন্তু তুমি বেশ হতাশ হতে। ওসাইরিস পরীক্ষায় খুশি হলে তোমার যে আত্মাটা অন্য জগতে যাবে তার নাম হল দুয়াত। চারিদিকে লোহার পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। সেখানে নদী আছে, পাহাড় আছে, আর আছে বড়ো বড়ো খেত, সেখানে বার্লি চাষ হয়। তুমি সেখানে সুখেই থাকবে, ভালো ভালো খাওয়া-দাওয়াও হবে। কিন্তু তোমাকে কাজও করতে হবে ভগবানের জন্য। খেতে চাষ করতে হবে। নদী থেকে জল তুলতে হবে। গোরু চরাতে হবে।’

‘যাব্বাবা, এত খেটেখুটে শেষে চাষবাস করব?’

‘তুমি যদি সমাজের নীচের দিকের মানুষ হও তাহলে তো করতেই হবে। কিন্তু তুমি ফারাও বলে তোমার হয়ে সেই কাজগুলো তোমার অনুগতরা করে দেবে। ফারাওদের সমাধিতেই তাদের কফিনের সঙ্গে রাখা হত মাটি আর কাঠ দিয়ে তৈরি করা পুতুল, এরা হল উশাবতি। মৃত ফারাও মাটির নীচের জগতে জীবন ফিরে পেলে এরাও বেঁচে ওঠে। তখন এরাই ফারাওয়ের কাজগুলো করে।’

‘যাক, তাহলে বাঁচোয়া। কিন্তু আপনি একটা কথা বললেন না তো?’

‘কী?’

‘যদি শেষ পরীক্ষায় হার্টটা পালকের থেকে ভারী হয়ে যায় তাহলে কী হবে?’

‘তার ফল কিন্তু মারাত্মক খারাপ হবে।’ এবারে গলার স্বরটা বেশ গাঢ় করে রহস্যময়ভাবে বললেন ভবেশদা। আমি আর পিজি নিজেদের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম।

‘মারাত্মক খারাপ মানে? কী হবে?’

‘আনুবিস যখন ওজন করছেন তখন আনুবিসের পিছনেই বসে থাকে একটা রাক্ষস, নাম আমিত, যার মুখটা কুমিরের, শরীরটা সিংহর আর পিছনের পা দুটো জলহস্তীর। এই পরীক্ষায় ফেল করলেই আমিত গপ করে হৃৎপিণ্ডটাকে খেয়ে ফেলবে। ব্যস, ওটা ছাড়া তো আত্মা এক পা-ও চলতে পারবে না। ওইখানেই আটকে রয়ে যেতে হবে অনন্তকালের জন্য।’

‘তারপর কী হবে?’

‘তারপর আর কী? সেই অশরীরী আত্মা পৃথিবীর মাটিতে হানা দেবে মাঝে মাঝে। ভয় দেখাতে থাকবে তার উত্তরসূরিদের। তার আর কোনো মুক্তি নেই।’

ঘড়িতে দেখলাম সাড়ে দশটা বাজে। চারপাশটা খালি খালি হয়ে গেছে। বেনুদাও কখন দোকান বন্ধ করে চলে গেছে। বেশ একটা কাঁপুনি লাগছে এবারে। সেটা শীতের উত্তুরে হাওয়ার জন্য? নাকি ভয়ে? চারপাশটা আগের দিনে শোনা জোসারের কবরখানার গোলকধাঁধার মতো লাগছে কেন?

ভবেশদাকে ‘বাই’ বলে আমরা চুপচাপ হোস্টেলে ফিরলাম। রাতের খাওয়া শেষ করে যখন ঘরে ঢুকছি তখন পিজি বলল,

‘ভাই, আজ রাতে দু-জনে একটা খাটেই শুয়ে পড়ি, নাকি?’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ, সেটাই ভালো।’

আজকে একা শোয়ার সাহসটা নিতে পারব না। স্বপ্নে আসবে ওসাইরিস, শিয়ালদেবতা আনুবিস আর কুমিরের মাথাওয়ালা আমিত।

ঘুমটা ঠিকঠাক এলে হয়।

অলংকরণ : সৌমক পাল

মমির গল্প (প্রথম পর্ব)

ডাক্তারির প্রথম বছরে অ্যানাটমিটা খুব ভয়ের জিনিস। ভয়টা যত না জীবনে প্রথমবার মৃতদেহ নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করার জন্য, তার চেয়ে বেশি শরীরের প্রতিটা পেশি, শিরা, ধমনী, তাদের উৎস, গতিপথ মুখস্থ রাখাকে। আমার কিন্তু অ্যানাটমি দিব্যি লাগত। গোল্ড মেডেলও পেয়েছিলাম। তাই এখনও মাঝে মাঝে বিকেলে কলেজ ছুটির পরে অ্যানাটমির বিল্ডিংয়ে ঢুকি। ফার্স্ট ইয়ারের ছেলেমেয়েগুলোকে পড়াই কয়েক ঘণ্টা।

আজকেও সেরকমই একটা দিন ছিল। ছুটির পরে এক ঘণ্টা মতন পড়ালাম, তারপরে হোস্টেলমুখো। ঘরে ঢুকে দেখি পিজি খাটে আধশোয়া হয়ে ভুঁড়িতে হাত বোলাচ্ছে। খাটের পাশে টুলে একটা বড়ো বাটিতে মুড়ি মাখা। আর তার পাশের চেয়ারটায় বসে আছেন, নান আদার দ্যান...

‘আরে ভবেশদা যে! এখানে? কী...’

আমার কথাটা শেষ করতে দিল না পিজি। নাক সিটকে খাট থেকে উঠে বসে বলল, ‘তুই আবার বাচ্চাগুলোকে পড়াতে গেছিলি? ইস, গায়ে সেই ফর্মালিনের গন্ধ। একদম ঘরে ঢুকবি না এখন, যা আগে চান করে আয়।’

বলে ঘরে ঝুলিয়ে রাখা দড়ি থেকে গামছা টেনে নিয়ে আমার দিকে ছুড়ে দিল।

অগত্যা!

চান করে যখন ঘরে ঢুকছি ততক্ষণে দেখি তিন কাপ চা-ও এসে গেছে। এবারে পিজি নিজেই আমার আগের প্রশ্নের জবাব দিল,

‘আরে, আজকে ক্লাসের পরে বাইরে বেরিয়ে দেখি হাসপাতালের মধ্যে ভবেশদা ঘোরাঘুরি করছেন। জিজ্ঞাসা করতে বললেন কোন এক ভাইঝিকে দেখতে এসেছিলেন। আমিও দুম করে ধরে নিয়ে চলে এলুম।’

বুঝতেই পারলাম পিজি এখন গল্প শোনার মুডে আছে।

‘কিন্তু পিজি, কালকে ফার্মার ক্লাস টেস্ট, ভুলে গেলি?’

‘আরে ধুর, নিকুচি করেছে তোর ক্লাস টেস্টের, অমন অনেক আসবে যাবে। তুই চুপ করে বোস তো। নে, চা খা।’

সত্যি বলতে কী, মাসে তিনটে করে ক্লাস টেস্ট দিতে আমারও ভালো লাগে না। তবে একটু বেশি রাত অবদি পড়লেই ম্যানেজ করে নেওয়া যাবে। এই ভেবে আমিও এবারে বারমুডার ওপরে একটা গেঞ্জি গলিয়ে পিজির খাটেতেই হাঁটু মুড়ে বেশ জমিয়ে বসলাম।

‘তা ভবেশদা, আজকে হাতে সময় আছে তো?’

‘আমার হাতে তো সময়ই সময়, আগে একটা কথা বলো তো, তোমার গা থেকে ফর্মালিনের গন্ধ ছাড়ছিল কেন?’

‘ওহ, জুনিয়রদের একটু অ্যানাটমি পড়াচ্ছিলাম, ওখানে ডেডবডিগুলোতে ফৰ্মালিন দেওয়া থাকে তো...’

‘জানি, যাতে না পচে যায়। একে কী বলে বলো তো?’

‘এমবামিং।’

বুঝতেই পারছি ভবেশদা কোনদিকে যেতে চাইছেন।

‘আজকে কি মমি নিয়ে কিছু হবে নাকি?’

ভবেশদা এবারে একটু হেসে বললেন,

‘হতেই পারে, মমির রহস্য নিয়ে তো সবার মনেই প্রশ্ন, কী করে একটা মানুষকে হাজার হাজার বছর ধরে প্রায় অবিকৃত রেখে দিত ওরা? তার চেয়েও বড়ো প্রশ্ন এত খাটনি খাটার কী দরকার ছিল?’

‘ঠিক, শরীরটাকে প্রিজার্ভ করে লাভ কী হত?’

‘হুঁ হুঁ বাবা, কারণ তো আছেই, মিশরের প্রথম মমি কার হয়েছিল জানো?’

‘নাহ, সেটা ঠিক জানা নেই।’

‘শুনলে অবাক হয়ে যাবে। প্রথম মমি একজন দেবতা নিজেই, স্বয়ং ওসাইরিস!’

‘বলেন কী!’

ভবেশদা এবারে একমুঠো মুড়ি গালে ফেলে চিবোতে চিবোতে বললেন,

‘আগে সেই গল্পটা শুনে নাও তাহলে। ওসাইরিস, সেথ আর আইসিস তিন ভাইবোন। আবার আইসিস ওসাইরিসের স্ত্রীও।’

‘অ্যাঁ! বোনই স্ত্রী?’

‘হ্যাঁ, মিশরের পুরাণে এরকম উদাহরণ অনেক আছে। অনেক ফারাওরাও তাঁরদের বোনকে বিয়ে করতেন। তো যেটা বলছিলাম, ওসাইরিস তখন মিশরের রাজা। সিংহাসনে বসে আছেন। কিন্তু ওসাইরিসের ভাই সেথের খুব রাগ ওঁর ওপরে। সেই সেথই একদিন ওসাইরিসকে বুদ্ধি করে খুন করলেন। তারপরে ওসাইরিসের দেহটাকে বিয়াল্লিশটা টুকরো করে ছড়িয়ে দিলেন মিশরের দিকে দিকে। ওসাইরিসের স্ত্রী আইসিস এবারে একটা চিলের রূপ নিয়ে খুঁজতে বেরোলেন স্বামীর শরীরের অংশগুলো। লিঙ্গ বাদে সবকটা টুকরোই পাওয়া গেল। মৃত ওসাইরিসের এক একটা টুকরোকে জোড়া লাগালেন আইসিস। লিঙ্গটা তৈরি হল সোনা দিয়ে। তারপরে সেই ওসাইরিসের দেহের সংরক্ষণ করল আনুবিস।’

‘আনুবিস?!’

‘হ্যাঁ, আনুবিস মানে শেয়ালদেবতাই ওসাইরিসের মমি বানালেন। সেই প্রথম মমি বানানো। তারপরে ওসাইরিসের শরীরে প্রাণ এল। পুনর্জন্মের পরে ওসাইরিস আর আইসিসের একটা সন্তান হল, তার নাম হোরাস। সে-ই পরে সেথকে যুদ্ধে হারিয়ে বাবার হত্যার বদলা নেবে।’

ফেলুদার ‘শেয়াল দেবতা রহস্য’-তে আনুবিস। সৌজন্যে : সন্দীপ রায়

‘আচ্ছা, সেইজন্যই গতবারে বলেছিলেন আনুবিস মামিফিকেশনের দেবতা।’

‘একদম ঠিক। অন্যদিকে ওসাইরিস তাঁরর পুনর্জন্মের পরে পাতালে চলে যান। সেই থেকে তিনি মৃত্যুর পরের জগতের দেবতা, এই জগতের নামই দুয়াত।’

‘হ্যাঁ, বলেছিলেন তো।’

ওসাইরিসের মমি বানাচ্ছেন আনুবিস

‘হ্যাঁ, তাই দেখবে ওসাইরিসের যেকোনো ছবি মমিরই মতো। হাত দুটো ভাঁজ করে বুকের কাছে রাখা, সোজা মাথা। পা দুটোও জোড়া। যেন গোটা শরীরটাই কিছু দিয়ে মোড়ানো আছে।’

এতক্ষণে পিজি মুখ খুলল, ‘হুম, ওসাইরিসকে কপি করেই তাহলে মমি বানানোর শুরু।’

‘না, ঠিক কপি করে নয়। মিথোলজি তো মানুষেরই তৈরি। মানুষের জীবনের গল্পই তাতে থাকে। এই গল্প ছাড়াও মমি বানানোর পিছনে আরেকটা ফিলোজফিকাল কারণ আছে, বুঝলে।’

‘আরেকটা কারণ!’

‘হ্যাঁ, আর এটাই মুখ্য কারণ। ইজিপশিয়ানরা বিশ্বাস করত একজন মানুষের তিন রকমের আত্মা আছে, তাদের মধ্যে একজন হল ‘‘আখ’’।’

‘হ্যাঁ, যেটা সেই ওসাইরিসের সামনে পরীক্ষায় পাশ করলে স্বর্গের দিকে যেতে পারে।’

‘ঠিক, আরেক রকমের আত্মা হল ‘‘বা’’, যে আত্মার ডানা আছে, পাখির রূপ ধরে সে দিনের বেলায় কবর থেকে বেরিয়ে পৃথিবীতে ঘুরতে পারে। রাতের বেলায় আবার কবরে ফিরে আসে।’

‘আর তিন নম্বর আত্মা?’

‘তার কথাই এখানে আসল, সেই আত্মার নাম হল ‘‘কা’’, কা-ই হল শরীরের মূল জীবনীশক্তি। অন্য দুটো আত্মা মৃত্যুর পরে তৈরি হলেও কা মানুষ জন্মাবার সময়তেই সৃষ্টি হয়। তাই কা-কে বাঁচিয়ে রাখার একমাত্র উপায় হল শরীরটাকে টিকিয়ে রাখা।’

আমি বললাম, ‘এবারে বুঝলাম, এই কা-কে বাঁচিয়ে রাখার জন্যই মৃতদেহের সংরক্ষণ করার দরকার পড়ে। তাই থেকেই মমি বানানোর শুরু।’

মিশরীয় চিহ্ন

‘ঠিক ধরেছ, এই কা-কে বাঁচিয়ে রাখার জন্যই মমির সঙ্গে কবরে রাখা হত খাবারদাবার, জল, সাজগোজের জিনিস, এমনকী টয়লেট পর্যন্ত। ইজিপ্ট এমনিতেই খুব শুকনো দেশ। প্রথম দিকে মৃতদেহদের কবর দেওয়া হত বালিতে গর্ত খুঁড়ে। খুব কম আর্দ্রতা থাকার জন্য গরম বালির নীচে সেই দেহগুলো শুকিয়ে গেলেও পচত না একেবারেই। কিন্তু ফারাওরাই প্রথম ভাবতে লাগলেন যে, আমাদের কবর বাকিদের সঙ্গে হবে কেন? আমরা রাজা, আমাদের সমাধি হবে অন্যদের থেকে আলাদা, চোখ ধাঁধানো। কিন্তু তাহলে তো কফিনের মধ্যেই একটা মাইক্রো ক্লাইমেট তৈরি করতে হবে, যেটা হবে বালির কবরের মতোই। শুকনো, আবার ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ হলেও চলবে না। এই চিন্তা থেকেই শুরু হল মমি বানানোর প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়াকে উন্নত করতে সময় লেগেছিল কয়েক হাজার বছর। শুধুমাত্র হাতে-গোনা কয়েকজন এই কাজটা জানত। তাই এদের মূল্য ছিল অপরিসীম। প্রথমদিকে শুধু ফারাওদের মমি তৈরি হলেও পরে ব্যাপারটা সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে যায়। তখন পকেট গরম থাকলেই নিজের মমি বানিয়ে নেওয়াটা কোনো ব্যাপার নয়। তাই এখন ফারাওদের মমি ছাড়াও অনেক ধনী পরিবারের লোক কিংবা তাদের স্ত্রী, কন্যাদেরও মমি পাওয়া যায়। আদরের পোষ্যদেরও মমি বানিয়ে রাখার চল ছিল।’

পিজি অনেকক্ষণ ধরে উশখুশ করছিল, এবারে বলল, ‘সবই তো বুঝলাম, কিন্তু মমিটা ওরা বানাত কী করে?’

ভবেশদার চা-টা হাতের কাপেই ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল কথা বলতে বলতে, একটা লম্বা চুমুক দিয়ে সেটাকে শেষ করে বললেন,

‘মমি তৈরির রেসিপিটা বুঝলে অনেকটা সুক্তো রান্না করার মতো, মোটামুটি উপকরণগুলো সবার চেনা। কিন্তু ভালো রাঁধতে খুব কম লোক পারত।’

‘কিছু তো একটা রহস্য ছিলই।’

‘হ্যাঁ, সে তো থাকবেই। কীভাবে মমি বানাতে হবে সেটা তো শুধু কিছু সংখ্যক লোক জানত। তারা সেই সিক্রেট কারোর কাছে বলত না। হেরোডটাসের নাম শুনেছ তো?’

‘শুনব না আবার? স্কুলের ইতিহাস বইতে পড়েছিলাম তো।’

‘ঠিক, গ্রিক ইতিহাসবিদ, ফাদার অফ হিস্ট্রি বলা হয় এঁকে, যিশুর জন্মের দেড় হাজার বছর আগে হেরোডটাস ইজিপ্ট ঘুরে গেছিলেন। ওঁর লেখাতেই মমি কীভাবে বানানো হত তার একটা আন্দাজ পাওয়া যায়। মমি বানানোর ওয়ার্কশপগুলো ছিল শহর থেকে বেশ কিছুটা দূরে, মরুভূমির কাছাকাছি। সেখানে মৃতদেহ নিয়ে যাওয়ার পরে বাড়ির লোকেদের প্রথমে কাঠ দিয়ে বানানো মমির ছোটো ছোটো রেপ্লিকা দেখানো হত। এক একরকম মমির এক একরকম দাম। দাম ঠিক হওয়ার পরে মৃতদেহকে নিয়ে আসা হত একটা ঘরে, তার নাম ইব। সেখানে তাকে তিনদিন ধরে ভালো করে জল দিয়ে ধোয়া হত। ইবের পরে মৃতদেহের গন্তব্য ছিল আরেকটা ঘর, নাম ওয়াবেত। ওয়াবেত মানে পবিত্র স্থান। এখানেই তারপরে শুরু হত মমি বানানো। প্রথমেই একটা তামার তৈরি সরু আঁকশি মৃতের নাকের মধ্যে দিয়ে ঢুকিয়ে দেওয়া হত খুলিতে। তাই দিয়ে কুরে কুরে মস্তিষ্কটাকে বের করে নেওয়া হত।

তামার আঁকশি দিয়ে মাথার ঘিলু বের করে নেওয়া হত

যেটুকু বেরোত না সেটুকু জল স্প্রে করে বের করা হত। এরপরের কাজ হল শরীরের ভেতরের অঙ্গগুলো বের করা। ধারালো ইথিয়োপিয়ান ব্লেড দিয়ে পেটের বাঁ-দিকে লম্বালম্বিভাবে চিরে বের করে নেওয়া হত নাড়িভুঁড়ি, লিভার, কিডনি, স্প্লিন আর ফুসফুস। আগেই বলেছি হৃৎপিণ্ড ওদের কাছে খুব প্রয়োজনীয় জিনিস ছিল, তাই ওটিকে ছোঁয়া হত না। এই বের করে নেওয়া অঙ্গগুলোও আবার শুকিয়ে রাখা হত অ্যালবাস্টার পাথরের জারে। সেগুলো মমির সঙ্গেই কফিনে যেত। ভিসেরাগুলো বের করে নেওয়ার পরের কাজ হল শরীরটা থেকে জল একদম টেনে বের করে নেওয়া। কারণ জল থাকলেই শরীর পচতে শুরু করবে। এইজন্য ব্যবহার করা হত ন্যাট্রন। এই ন্যাট্রনের গুঁড়ো ঢুকিয়ে দেওয়া হত ফাঁপা পেটের মধ্যে। তারপর গোটা শরীরটাকে চুবিয়ে রাখা হত ন্যাট্রন ভরতি চৌবাচ্চায়, চল্লিশ দিনের জন্য! একটা শরীরকে একদম শুকিয়ে খটখটে করার জন্য লাগত প্রায় আড়াইশো কিলো ন্যাট্রন।’

‘এই ন্যাট্রন জিনিসটা কী?’

ন্যাট্রন

‘এটা হল বুঝলে, একরকমের পাথরের গুঁড়ো, হাইড্রেটেড সোডিয়াম কার্বোনেট। রং হত সাদা বা স্বচ্ছ। পাওয়া যেত নুনের লেকগুলোতে। যেটা বলছিলাম, চল্লিশ দিন পরে সেই দেহকে তুলে নিয়ে আসা হত। তারপরে তার চামড়ায় লাগানো হত সিডার অয়েল আর তরল রেজিন, তাতে মেশানো থাকত নানান রকমের মশলা, সেই মশলাগুলোর একটা ছিল দারচিনি, যেটা নিয়ে আসা হত ভারতবর্ষ থেকেই!’

‘বাপ রে! মমি বানানোর জন্য তাহলে আমাদের দেশের একটু হলেও অবদান আছে, কিন্তু মড়ার শরীরে এরকম করে তেল ঘষার কারণটা কী?’

অ্যালাবাস্টারের জার

‘কারণটা দুটো, প্রথমত পোকামাকড়ের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য, আর দ্বিতীয়ত এর জন্য শরীর থেকে একটা সুগন্ধও বেরোত। এই তেল লাগানোর পরে মৃতের পেটের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হত খড়, কাঠের গুঁড়ো, বালির মিশ্রণ। মুখ, নাকের ফুটো বুজিয়ে দেওয়া হত মোম দিয়ে। চোখ দুটোও সরিয়ে নেওয়া হত, তার জায়গায় আসত সাদা পাথরের ওপরে আঁকা চোখ। এইসব কাজ কিন্তু করত মূল পুরোহিত, সে পরে থাকত আনুবিসের মুখোশ। একে বলা হত ‘‘হেরি সেশেতা’’, ইংরেজিতে যার মানে দাঁড়ায় ‘‘লর্ড অফ দ্য সিক্রেটস’’।’

‘কিন্তু মমির ছবিগুলো যে দেখি কাপড় দিয়ে মোড়ানো।’

‘হ্যাঁ, এখানেই আসছিলাম, এটাই লাস্ট স্টেপ। কিন্তু এই জায়গাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এখানেই বিজ্ঞানের সঙ্গে মিশে যায় বিশ্বাস। হেরি সেশেতা বেশ কয়েকদিন ধরে মৃতের শরীরটাকে কাপড় দিয়ে মুড়ে ফেলত। মাথা থেকে শুরু করে পায়ের পাতা অবধি। এটা করার সময় পাশে দাঁড়িয়ে জাদুমন্ত্র পড়ত আরেকজন পুরোহিত, যাকে বলা হত ‘‘হেরি হেব’’। কাপড়ের ভাঁজে ভাঁজেও রেখে দেওয়া হত মন্ত্রপূত অ্যামুলেট বা প্যাপিরাসের পাতা। এই কাপড় দিয়ে মোড়ানোর কাজটা হলেই মমি তৈরি শেষ।’

পিজি এবারে মাথা চুলকোতে চুলকোতে বলল,

‘বাপ রে! এ তো হেবি ফ্যাচাংয়ের ব্যাপার!’

‘এখানেই শেষ, ভাই প্রদীপ্ত? মমি বানানো হয়ে গেলে তাকে দিয়ে দেওয়া হত বাড়ির লোকের হাতে। তারা তাকে ঢোকাত কাঠের কফিনে। সেই কফিনের গায়ে বা ভেতরের দেওয়ালে লেখা থাকত বুক অফ দ্য ডেড-এর মন্ত্রগুলো, আগের দিন যেটা বললাম। তারপরে সেই কাঠের কফিনের জায়গা হত পাথরের কফিনের মধ্যে।

‘হ্যাঁ জানি, ওগুলোকেই সারকোফেগাস বলা হত তো?’

‘একদম তাই। কিন্তু সারকোফেগাস নামটার মানে জানো?’

‘তা তো জানি না।’

‘ইজিপশিয়ানরা কিন্তু এই শব্দ ব্যবহার করত না। এই যে আমরা এত রকমের ইজিপশিয়ান দেবদেবীর নাম বলছি সেগুলোর অনেকটাই কিন্তু গ্রিক আর রোমান উচ্চারণ। ওরা প্রায় সাতশো বছর দেশটাকে শাসন করেছিল। তেমনই সারকোফেগাস শব্দটাও গ্রিক। সারকো মানে মাংস, আর ফেগাই মানে খাওয়া। সারকোফেগাস মানে তাহলে মাংস খাওয়া।’

‘এরকম অদ্ভুত নাম কেন!’

সারকোফেগাস

‘কফিনগুলো তৈরি হত লাইমস্টোন দিয়ে। এই কফিনের ভেতরে যে আবহাওয়ার সৃষ্টি হত তাতে মৃতদেহের মাংসপেশিগুলো শুকিয়ে প্রায় ভ্যানিশ হয়ে যেত। কিন্তু পচন ধরত না। তাই নাম সারকোফেগাস।’

আমি এই সময় ভাবছিলাম বাপ রে, সত্যিই কত কিছু জানি না। শব্দটা সেই মমি সিনেমা দেখার সময় থেকে শুনে আসছি, কিন্তু কখনো মনে হয়নি যে নামটার এরকম অদ্ভুত একটা মানে আছে। তবে একটা জায়গায় খটকা থেকেই যাচ্ছিল। তাই ভবেশদার কাছেই জানতে চাইলাম,

‘তাহলে আমাদের কলকাতা মিউজিয়ামের মমিটার এমন খারাপ অবস্থা কেন?’

‘ভালো কথা বলেছ, কলকাতায় মমিটা কবে এসেছিল জানো?’

‘না তো।’

কলকাতার মমি

‘ঠিক কবে এসেছিল সেটা জানা যায় না, তবে ৫ জুলাই, ১৮৩৪-এর তারিখে কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটির প্রসিডিংসের একটা নোট পাওয়া গেছে। ওইদিন সোসাইটি একটা চিঠি পায় বেঙ্গল লাইট ক্যাভালরির জনৈক লেফটেন্যান্ট আর্চিবল্ডের কাছ থেকে। তিনি নাকি সোসাইটিকে একটি মমি গিফট করতে চান, যেটা পাওয়া গিয়েছিল ইজিপ্টের গৌরভা নামের একটা জায়গায় ফারাওদের সমাধি থেকে। আর্চবল্ডের জাহাজের লোকজন ভয় পেয়ে ওই মমিকে নিতে চায়নি। তাই তাকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রণতরীতে করে আনা হয় মুম্বইতে, সেখান থেকে কলকাতায়। এটা সত্যি যে সেই মমির হালত এখন খুব খারাপ, মাথার খুলি বেরিয়ে গেছে। ভালোভাবে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে। তবে খোদ ইজিপ্টেই মমিদের যা হাল হয়েছিল শুনলে চমকে যাবে।’

‘ওরা মমির ক্ষতি করবে কেন? ওরা তো এই কাল্টে বিশ্বাস করত।’

‘সে তো মাত্র কয়েক হাজার বছরের জন্য, ভায়া। মানুষের মন থেকে একসময় সেই বিশ্বাস কর্পূরের মতো হাওয়া হয়ে যেতে থাকে। ফারাওদের সমাধিগুলোতে বার বার ডাকাতি হত, শক্ত পাথরের দেওয়ালে গর্ত খুঁড়ে ডাকাতরা ঢুকে পড়ত। লক্ষ্য ছিল মমির সঙ্গে সাজিয়ে রাখা সোনার গয়না আর আসবাবপত্র। সেসব কিছু লুঠ করে নেওয়ার পরে মমির শরীরটাকেও ছাড়েনি ওরা। ফারাও তৃতীয় তুতমোসিসের মমি যখন পাওয়া যায় তখন তার বুকে একটা বড়ো ফুটো। ডাকাতেরা কাপড় কেটে বুকের কাছে বসানো সোনার অ্যামুলেট খুলে নিয়েছিল। কত মমি পাওয়া গেছে হাত, পা, গর্দান ছাড়া। সমাধি লুঠ করার সময় ডাকাতরা ছোটো ছোটো বাচ্চাদের মমিগুলোকে জ্বালিয়ে মশালের মতো ব্যবহার করত। এমনকী কাঠের কফিনেও আগুন লাগিয়ে দিত, যাতে তাতে লেগে থাকা সোনা গলিয়ে বের করে নেওয়া যায়।’

‘তাহলে ভাগ্যিস ইউরোপের লোকজন গিয়ে পড়েছিল মিশরে! তাই যতটুকু রিস্টোরেশন...’

‘কীসের রিস্টোরেশন? ইউরোপের লোকজন মিশরের খবর পায় কার জন্য জানো?’

‘না তো।’

‘নেপোলিয়ন বোনাপার্টের জন্য। সে আরেক গল্প, অন্য আরেকদিন বলা যাবে ’খন। কিন্তু আমার এখানে বক্তব্য হল যে ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, জার্মানির লোকেরাও মমিদের নিয়ে খুব একটা ভালো ব্যবহার করেনি।’

‘মানে? ওরাও লুঠ করত?’

‘লুঠ আর করবে কী? ততদিনে প্রায় সব সমাধি লুঠ হয়েই গেছে। ওরা মমিগুলোকে জাহাজে বোঝাই করে দেশে আনত। ফ্রান্সে আর লন্ডনে বিত্তশালীদের বাড়িতে লোকজন ডেকে তামাশা চলত। কখনো সেটা দেখানোর জন্য টিকিটও বিলি করা হত।’

‘কীসের তামাশা?’

‘মমি খোলার। টেবিলে মমিটাকে শুইয়ে দামড়া দামড়া যন্ত্রপাতি দিয়ে তার কাপড়ের আচ্ছাদন খোলা হত। তাতে কোনোরকম বৈজ্ঞানিক ভাবনা ছিল না। শুধুমাত্র সস্তার থ্রিল আর কৌতূহলের জন্য কত শত মমি যে নষ্ট হয়ে গেছে তার ঠিক-ঠিকানা নেই।’

মমির কাপড়ের আচ্ছাদন খোলা

‘ছি ছি। একটা এমন দারুণ শিল্প এভাবে নষ্ট করেছে!’

‘এ তো কিছুই নয়, মমি খাওয়ার কথা কখনো ভাবতে পারো?’

কথাটা শুনেই আমার গা গুলিয়ে উঠল। পিজিও দেখলাম একবার ওয়াক করল। মমি আবার খাবে? ভবেশদা আমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে একবার হাসলেন এবারে, তারপরে বললেন,

‘ঠিকই শুনেছ। পারসিয়ান পাহাড়গুলোতে একরকমের বিটুমেন পাওয়া যেত, তার নাম মামিয়া। গ্রিক ফিজিশিয়ান ডায়োস্কোরিডেস তাঁরর বইতে এই মামিয়াকে মমি বলে ভুল করেন। সেই বইটাকেই ফলো করে ষোড়শ শতাব্দীর শেষের দিকে এই অদ্ভুত ওষুধ ব্যবহারের ধুম পড়ে যায়। ১৫৮৬ সালে ব্রিটিশ মার্চেন্ট জন স্যানডারসন জাহাজে করে ৫০০ কিলো মমি নিয়ে আসেন লন্ডনে। সেগুলোকে গুঁড়ো করে সেই পাউডারের সঙ্গে আরও কিছু মশলা আর হার্বস মিশিয়ে আজগুবি ওষুধ তৈরি হত। সেই ওষুধ নাকি ফোঁড়া থেকে শুরু করে প্যারালিসিস পর্যন্ত সারিয়ে দেয়। কে এই ওষুধের বিজ্ঞাপন করেছিল জানো? নামটা শুনলে চমকে উঠবে, ফ্রান্সিস বেকন, সেই সময়কার বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক।’

‘বলেন কী!’

‘হুম, মানুষ চড়া দামে পাগলের মতো ওই ওষুধ কিনত। একসময় চাহিদা এত বেড়ে গিয়েছিল যে শেষের দিকে বেওয়ারিশ মৃতদেহ তুলে এনে ব্যান্ডেজ করে আবার মাটিতে পুঁতে কিংবা রোদে শুকিয়ে গুঁড়িয়ে বিক্রি করত। এইসব চলতে থাকে আরও দু-শো বছর ধরে। শেষ হয় এইটিন্থ সেঞ্চুরির শেষের দিকে, যখন ইজিপ্টের ওটোমান সম্রাটরা বে-আইনি মমি পাচার নিষিদ্ধ করে দেয়। তারপরে প্রথম যে মমিটা গোটা দেহে লন্ডনে ঢোকে সেটাকে রাজা দ্বিতীয় চার্লস আনিয়েছিলেন নিজের রক্ষিতার মন জয় করার জন্য। সেটা এখন ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রাখা আছে।’

‘তাহলে মমির ঠিকঠাক অ্যানাটমিকাল ডিসেকশন কখনো হয়ইনি?’

‘কে বলেছে হয়নি? হয়েছে তো। কিন্তু আজকে আর সে-গল্প নয়। একদিনে আর কত হজম করবে?’

বলেই হাতের ঘড়ি দেখল ভবেশদা।

‘ইস, সাড়ে দশটা বেজে গেল। আমার ট্রেনটা না মিস হয়ে যায়। উঠি আজকে। কাল সন্ধেবেলায় দোকানে এসো। তখন না হয় বাকিটা বলে দেব। খুব কৌতূহল হলে গুগল করেও দেখতে পারো। তবে বেশি কিছু পাবে বলে মনে হয় না। এই ভবেশ সামন্তর কাছেই আসতে হবে, জানি।’

বলেই ভবেশদা উঠে ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে গেলেন। অদ্ভুত মানুষ বটে একটা!

ন্যাট্রনের চৌবাচ্চায় মৃতের শরীর। ছবি : সৌমক পাল

মমির গল্প (দ্বিতীয় পর্ব)

পরের দিন সন্ধেবেলায় ভবেশদার দোকানে গিয়ে দেখি যথারীতি বই মুখে নিয়ে বসে আছেন। দোকানে খদ্দের তো দেখি না বিশেষ কখনো, কী করে সংসার চলে কে জানে। আমাদের দেখে মাথা তুলে বললেন,

‘বাহ মানিকজোড়, এসে গেছ? খুব ভালো, ঝট করে বাকিটা বলে দিই। আজকে একটু জলদি বাড়ি ফিরতে হবে। তা কোথায় যেন ছিলাম?’

‘ওই যে মমির শরীরের ঠিকঠাক ডিসেকশনের ব্যাপারে কথা হচ্ছিল।’

‘ও হ্যাঁ হ্যাঁ, মমির প্রথম মেডিক্যাল অটোপসি। যিনি করেছিলেন সেই মানুষটার জীবনটাও ছিল অদ্ভুত, বুঝলে।’

‘কীরকম?’

‘অগাস্টাস গ্রেনভিল, জন্ম ১৭৮৩ সালে মিলান শহরে। অগাস্টাস যখন বড়ো হচ্ছেন তখন ইতালির ওই অংশটা নেপোলিয়নের দখলে। ডাক্তারি পাশ করতে-না-করতেই অগাস্টাস খবর পেলেন যে তাঁরকে নেপোলিয়নের সেনাবাহিনীতে ঢুকতেই হবে। এদিকে যুদ্ধ তো ওঁর বিন্দুমাত্র ভালো লাগে না। তাই তিনি মিলান থেকে পালিয়ে চলে এলেন ভেনিসে। তার পরের বছরগুলোতে অগাস্টাস ইউরোপের একটার পর একটা দেশে ঘুরে ঘুরে ডাক্তারি করেছেন আর নানান রোগে ভুগেছেন। প্রথমে গ্রিস, যেখানে ম্যালেরিয়ার কবলে পড়লেন। সেটা যদি-বা সারল, তো তুরস্কতে গিয়ে হল প্লেগ। তুরস্ক থেকে স্পেন, সেখান থেকে পর্তুগাল। সেখান থেকে ব্রিটিশ নেভির জাহাজে করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। এত দেশ ঘুরে অগাস্টাস সাহেব অবশেষে এক ব্রিটিশ মেমকে বিয়ে করে লন্ডনে থিতু হলেন। লন্ডনে ওঁর পসার ফুলেফেঁপে বেড়ে উঠতে লাগল। উনি তখন শহরের নামজাদা সার্জন আর গাইনেকোলজিস্ট। সমাজের সবরকম উঁচুতলার লোকেদের সঙ্গে ওঠাবসা।’

তা এই অগাস্টাসের একজন রুগি ছিলেন আর্চিবল্ড এডমন্সটন, যিনি কিনা সদ্য ইজিপ্ট থেকে ফিরেছেন। তিনি সার্জন সাহেবকে একটা অদ্ভুত খবর দিলেন। আর্চিবল্ড নাকি ইজিপ্টের থিবস এলাকা থেকে একটা গোটা মমি তুলে নিয়ে এসেছেন, একদম কফিনে সিল করা। অগাস্টাসের তো চোখ দুটো চকচক করে উঠল। তোমাদের আগেই বলেছি সেই সময় লন্ডনের যেখানে সেখানে লোক জড়ো করে মমি খোলার ধুম পড়ে গেছে। কিন্তু অগাস্টাস ভাবলেন যে যদি একদম যত্ন নিয়ে মমিটা খোলা যায় তাহলে মামিফিকেশনের রহস্যটা বোঝা যাবে! সেকথা বললেনও আর্চিবল্ডকে। ব্যস, পরের দিনই অগাস্টাসের বাড়ির দরজায় হাজির হয়ে গেল থিবসের সেই মমি। সালটা ১৮২৫।

ছয় সপ্তাহ ধরে গ্রেনভিল একটু একটু করে মমির গায়ের কাপড়ের প্যাঁচ খুললেন। কাপড়ের ভাঁজের মধ্যে পাওয়া গেল কয়েকটা নীলচে কাচের ছোটো ছোটো গুলি আর গমের দানা। পুরোটা খুলে ফেলার পরে বোঝা গেল সেটি একজন নারীর। শরীরটা শুকিয়ে এলেও পেটের চামড়া থেকে বোঝা যায় জীবদ্দশায় ইনি বেশ মোটাসোটা ছিলেন। মমির গোটা শরীরে লাগানো ছিল মোম আর বিটুমেনের মিশ্রণ। গ্রেনভিল ভেবেছিলেন এই দিয়েই সংরক্ষণ করা হয়েছিল এই মহিলাকে।

কালকেই তোমাদের বলেছিলাম যে মমি তৈরির সময়ে মৃতদেহের পেটের বাঁ-দিকে লম্বালম্বি চিরে পেটের মধ্যের অংশগুলো বের করে নেওয়া হত। তবে একটু গরিব ক্লায়েন্টদের ক্ষেত্রে পদ্ধতিটা ছিল অন্যরকম। তাদের পায়ুদ্বার দিয়ে অ্যাসিড জাতীয় কিছু একটা ঢুকিয়ে দেওয়া হত। তাতে পেটের নাড়িভুঁড়িগুলো গলে গিয়ে পায়ুদ্বার দিয়েই বেরিয়ে আসত। ড গ্রেনভিলের এই মমিও ছিল অনেকটা সেরকম। এঁর পেটের ওপরে কোনো কাটা দাগ ছিল না। কিন্তু গ্রেনভিল মমির দেহের ডিসেকশন আরম্ভ করার পরে পেটের মধ্যেকার নাড়ি, লিভার, কিডনি প্রায় অক্ষত অবস্থাতেই পেয়েছিলেন। হয়তো এঁর ক্ষেত্রে দ্বিতীয় পদ্ধতিটা ব্যবহার করা হলেও সেটা ভালো কাজ করেনি।

যাই হোক, কোমরের হাড় দেখে গ্রেনভিল মৃতের বয়সটা আন্দাজ করেছিলেন ৫০-৫৫র কাছাকাছি। আর সবাইকে অবাক করে দিয়ে এই মহিলার মৃত্যুর কারণটাও বলে দিয়েছিলেন।’

পিজি এবারে টুল থেকে প্রায় লাফিয়ে উঠল,

‘কীভাবে! অত হাজার বছরের পুরোনো মমি থেকে মৃত্যুর কারণ বলে দেওয়া গেল! তখন কি মেডিক্যাল সায়েন্স থোড়াই এত অ্যাডভান্স ছিল নাকি?’

‘না, তা ছিল না, তবে মমির ওভারিতে একটা টিউমার পাওয়া যায়। তাই গ্রেনভিল এই সিদ্ধান্তে পৌঁছোন যে ওই টিউমারই এর মৃত্যুর কারণ। অটোপসির রেজাল্ট বেশ যত্ন করে পাবলিশ করেছিলেন। তাতে ওঁর নিজের হাতে করা মমিটির কিছু স্কেচও ছিল। এই ঘটনার পরেই গ্রেনভিল বিখ্যাত হয়ে যান।

এতটাই যে একসময় রয়াল ইনস্টিটিউশনে এই মমিটিকে নিয়ে গিয়ে লেকচার দেন। সেদিন সেই লেকচার থিয়েটারের আলো জ্বালানো হয়েছিল মমির শরীর আর কাঠের কফিন থেকে পাওয়া মোমগুলো পুড়িয়েই।’

গ্রেনভিলের মমি

‘বাবা রে, এ তো একদম সিনেমার মতো গল্প!

‘ইতিহাস জিনিসটাই তো সিনেমার মতো প্রদীপ্ত ভাই, রোমাঞ্চে ভরা। তোমাকে শুধু তাকে খুঁজে নিতে হবে।’

এবারে আমি বললাম, ‘তাহলে গ্রেনভিলের সেই মমি এখন কোথায় আছে?’

‘ব্রিটিশ মিউজিয়ামে। তবে গ্রেনভিল সাহেব কিন্তু ভুল ছিলেন। ওই মহিলার মৃত্যু আসলে ওভারিয়ান ক্যান্সারে হয়নি। হয়েছিল অন্য একটা রোগে।’

‘কীসে?’

‘আমাদের দেশে খুব কমন, কী বলো তো?’

‘লাং ক্যান্সার?’

‘না না, ক্যান্সার-ট্যান্সার নয়। ওকে, একটা হিন্ট দিচ্ছি, দাদা, আমি বাঁচতে চাই!’

পিজি টপ করে প্রশ্নটা লুফে নিল,

‘‘‘মেঘে ঢাকা তারা’’র নীতা!’

‘একদম ঠিক, তা নীতার কী রোগ হয়েছিল জানা আছে?’

‘টিউবারকিউলোসিস!’

‘বাহ, সিনেমার ব্যাপারে কিন্তু তোমার জবাব নেই পিজি ভাই। এই টিবি রোগেই অক্কা পেয়েছিলেন আমাদের এই মামিফায়েড মহিলাটি।’

‘তাই নাকি! কিন্তু সেটা কীভাবে জানা গেল?’

‘সে আরেক গল্প, গ্রেনভিলের আবিষ্কারের ১৩০ বছর পরে ব্রিটিশ মিউজিয়ামের স্টোররুমে একটা বড়ো কাঠের বাক্স পান ইজিপ্টোলজিস্ট জন টেলর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে মিউজিয়ামের অনেক কালেকশনই স্টোররুমে সরিয়ে রাখা হয়েছিল নিরাপত্তার জন্য। কিন্তু যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলেও তার মধ্যের বেশ কিছু ওই স্টোররুমেই রয়ে যায়। ওই বাক্সটাও তার মধ্যে একটা। বাক্সটা খুলে তার মধ্যে দুটো ট্রে পাওয়া যায়। সেগুলো আবার ছোটো ছোটো খুপরিতে ভাগ করা, তাতে গুছিয়ে রাখা আছে একটা মমির শরীরের বিভিন্ন অংশগুলো। আর বাক্সর নাম্বারের সঙ্গে ক্যাটালগ মিলিয়ে দেখা গেল অগাস্টাস গ্রেনভিলই ওই বাক্স মিউজিয়ামকে দান করেন।’

‘গ্রেনভিলের ডিসেক্ট করা মমি আবার সামনে এল তাহলে?!’

‘হ্যাঁ, কিন্তু সেটাও বাক্সবন্দি হয়ে পড়ে ছিল আরও তিরিশ বছর। ২০০৯ সালের মাঝামাঝি ইউনিভার্সিটি অফ লন্ডন সেই মমির টুকরোগুলোকে নিয়ে আবার রিসার্চ শুরু করে। গ্রেনভিল সাহেবের সময় থেকে বিজ্ঞান তো অনেক এগিয়ে এসেছে, তাই ওরা মমির ফুসফুস, গল ব্লাডার আর হাড় থেকে টিউবারকিউলোসিসের জীবাণুর অংশ পায়। আড়াই হাজার বছর আগে তো টিবির কোনো ওষুধ ছিল না। তাই ইনি টিবিতেই মারা যান।’

‘আপনি বললেন কী করে আড়াই হাজার বছর আগে এই মমি তৈরি হয়েছিল? মমির গায়ে তো আর লেখা ছিল না।’

‘না, তা ছিল না, তবে মমির শরীরের রেডিয়োকার্বন ডেটিং থেকে বোঝা গেছে যে এটা যিশুর জন্মের ছ-শো বছর আগের।’

পিজি এবারে আমার মাথায় একটা চাঁটি মেরে বলল,

‘কী বোকার মতো একটা প্রশ্ন করলি, কার্বন ডেটিং তো এখন আকছার হয়। আমি জানতামই ওই করেই মমি কত পুরোনো সেটা বের করেছে। কিন্তু ভবেশদা একটা কথা বলুন। ওভারির টিউমারেই যে সেই মহিলা মারা যাননি সেটা কী করে প্রমাণ হল?’

ভবেশদা এবারে একটু হেসে বললেন,

‘নাহ, তোমাকে যতটা ছ্যাবলা ভেবেছিলাম ততটা নও তুমি। ভালো প্রশ্ন করলে, ইউনিভার্সিটি কলেজ অফ লন্ডনের প্যাথলজিস্ট এডি ট্যাপ ওই ওভারি, ইউটেরাস আর ফ্যালোপিয়ান টিউব পরীক্ষা করেছেন। তাতেই প্রমাণিত হয়েছে যে টিউমারে ক্যান্সার নেই।’

‘বিনাইন টিউমার?’

‘ঠিক, বিনাইন টিউমার। তোমরা ডাক্তারির ছাত্র, তোমরাই জানবে এর মানে কী।’

আমি এবারে বললাম,

‘সে জানি, মানে ওই টিউমার সাধারণ মানের, ও থেকে কখনো ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা খুব খুব কম।’

‘হ্যাঁ, সুতরাং ইরতেরসেনুকে মেরেছিল টিউবারকিউলোসিস, হাজার হাজার বছরের পুরোনো যে ব্যাকটেরিয়া আজও আমাদের চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে।’

‘ইরতেরসেনু? সে আবার কে?’

‘ওহ, এটা তো বলা হয়নি। ওটাই ভদ্রমহিলার নাম, মমির কফিনের গায়ে লেখা ছিল। গ্রেনভিলের সময় তো হায়রোগ্লিফসের মানে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি, তাই কী লেখা আছে কেউ বুঝতে পারেনি। এখন বোঝা গেছে নামটা। এই নামের গোদা ইংরেজি মানে করলে দাঁড়ায় ‘লেডি অফ দ্য হাউস’। মানে কারো বাড়ির সর্বময়ী কর্ত্রী বলতে পার।’

পিজি চোখ বড়ো বড়ো করে এবারে বলল,

‘বেশ ডিটেকটিভ গল্পের মতো কিন্তু ব্যাপারটা, তাই না!’

‘সে তো বটেই, মৃতের মৃত্যুর কারণ বের করা, তোমাদের ফরেনসিক মেডিসিনের মতোই তো। মমি থেকে আরও যা সব তথ্য পাওয়া গেছে তা জানলে চোখ কপালে উঠে যাবে!’

‘তাই নাকি! সব ওই অটোপসি করে?’

‘না না, এখন আর অটোপসির দরকারই পড়ে না। এই তো বছর চারেক আগে ব্রিটিশ মিউজিয়ামেই দারুণ একটা কাজ করা হল।’

‘কীরকম?’

‘কায়রোর মিউজিয়ামের পরেই পৃথিবীতে মিশরের মমির সবচেয়ে বড়ো কালেকশন আছে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে, প্রায় ১২০ খানা মমি আছে ওদের কাছে। তার মধ্যে থেকেই আটখানা মমি বেছে নেওয়া হয়, তারপরে তাদের সিটি স্ক্যান করে সেই ইমেজগুলোকে নিয়ে থ্রিডি বা ত্রিমাত্রিক একটা আকার দেওয়া হয়। তাতেই ভেতরে থাকা মমিদের অবয়ব একদম স্পষ্ট বোঝা গেছে। এতটাই স্পষ্ট যে চামড়া, মাথার চুল, নখ সব চেনা যাচ্ছিল। সেই ছবিগুলো পরীক্ষা করেই মানুষগুলোর জীবনযাত্রা, রোগভোগ নিয়ে অনেক কিছু আন্দাজ করা গেছে। তার কয়েকটা তোমাদের বলি, শোনো। প্রায় প্রতিটা মমিরই দাঁতের অবস্থা খুব খারাপ ছিল, অনেকের মাড়িতে ঘা বা অ্যাবসেসের দাগও পাওয়া গেছে। খুব কম বয়সেই দাঁত ক্ষয়ে যাওয়া বা দাঁতের রোগ হওয়ার পেছনে ছিল হাইজিনের অভাব আর ওদের খাদ্যাভ্যাস। রুটি প্রধান খাদ্য ছিল। সেই রুটি যা তৈরি হত গম বা ভুট্টার আটা দিয়ে। আটার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই মিশে থাকত মরুভূমির বালি। আর সেই বালির দানার ঘষা লেগে লেগেই দাঁত ক্ষয়ে যেত। সেই সময়ের লোকেরা আবার হার্টের সমস্যাতেও ভুগত। খাবারের সঙ্গে প্রচুর পরিমাণে রেড মিট খাওয়ার জন্য শরীরে যথারীতি কোলেস্টেরল জমত। কয়েকটা মমির আর্টারিতে তাই জমে থাকা কোলেস্টেরল পাওয়া গেছে।’

ব্রিটিশ মিউজিয়ােম প্রথম মমি রুম

মমির সিটি স্ক্যানিং

আমি এবারে বললাম,

‘অ্যাদেরোসক্লেরোসিস?’

‘একদম তাই, তোমাদের ডাক্তারি ভাষায় তো এইটাই রোগটার নাম, এই থেকেই হার্টে রক্ত চলাচলও কমে যায়, যার ফল হার্ট অ্যাটাক। তবে একটা মজার কথা বলি, এরই মধ্যে একটা মমির মাথার খুলির মধ্যে একটুকরো তামাও পাওয়া গেছে, কী করে সেটা ওখানে গেল বলো তো?’

‘খুলির মধ্যে তামার টুকরো? ইজিপশিয়ানরা কি ব্রেনের অপারেশন করতেও জানত নাকি!’

‘ধুস, সেরকম কিছু নয়। মনে করে দেখো, মমি বানাবার সময়ের একটা স্টেপ বলেছিলাম।’

এবারে আমার কাছে ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে গেল,

‘বুঝেছি বুঝেছি, মৃতের নাকের মধ্যে দিয়ে তামার শিক ঢুকিয়ে ঘিলু বের করে নেওয়া হত তো! তখনই নির্ঘাত একটা টুকরো ভেঙে ভেতরে রয়ে গেছিল।’

ভবেশদা এবারে আমার পিঠ চাপড়ে বললেন,

‘ওয়েল ডান, স্পন্দন ভাই! এই তো, তুমিও এখন ডিটেকটিভ হয়ে গেছ! একদম ঠিকই বলেছ। বেচারা লোকটা ওই তামার টুকরো নিয়েই কাটাচ্ছে এখনও। আরেকটা দারুণ খবর বলি, ২০১৫তে ব্রিটিশ মিউজিয়ামই একটা আস্ত কুমিরের মমির সিটিস্ক্যান করেছিল।’

‘বলেন কী! কুমিরের মমি!!’

‘হ্যাঁ, অস্বাভাবিক কিছু নয় তো, কুমিরকে মিশরীয়রা দেবতার মতো পুজো করত। এই দেবতার নাম সোবেক। ইজিপ্টের আসওয়ান শহর থেকে পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে কোম ওম্বো নামের একটা মন্দির আছে। সেই মন্দির কুমিরদেবতা সোবেকের নামেই। সেখানে ৩০০ খানা মমি বানানো কুমির আছে! সেখান থেকেই একটা মমি আসে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে। সেটাকেই ওরা স্ক্যান করে।’

সোবেক

পিজি এবারে মুখ বেঁকিয়ে বলল,

‘এরা দেখছি যা পাচ্ছে তাকেই স্ক্যানারে ঢুকিয়ে দিচ্ছে। কোনোদিন শুনব বেড়াল কুকুরের মমিও স্ক্যান করেছে।’

‘সেটাও করেছে, ভায়া। তবে তুমি শুধু কুমিরেরটা শোনো, এই চার মিটার লম্বা কুমিরের মমিটা স্ক্যান করে এত ভালো ইমেজ পাওয়া গেছে যে কুমিরটার শেষ খাদ্য হিসেবে একটা গোরুর হাড়ও পাওয়া গেছে পাকস্থলীতে! আর ওটার পিঠের সঙ্গে লাগানো ছিল পঁচিশ খানা ছোটো ছোটো কুমিরের বাচ্চা!’

‘আরিব্বাস! যত শুনছি তত অবাক হচ্ছি, সত্যি।’

‘ইজিপ্টের ইতিহাস অবাক করার মতোই, এ তো কিছুই নয়, আরও কত কত গল্প আছে...’

এবারে ভবেশদার কথার মাঝেই পিজি বলল,

‘একটা কথা আমি আগের দিন থেকে ভেবে যাচ্ছি, ভবেশদা। সেটা বলি এবারে, নাহলে আজকেও জিজ্ঞাসা করতে ভুলে যাব।’

‘বলে ফেলো, ভাইটু।’

‘মমি বলতেই মাথায় এসেছিল, কাকাবাবুর ‘‘মিশর রহস্যতে’’ পড়েছিলাম গিজার পিরামিডের কাছে থাকা রানি হেতেফেরিসের সমাধির কথা, যেখানে কিনা হেতেফেরিসের মমি গায়েব হয়ে গিয়ে আবার ফিরে এসেছিল। এটা কি সত্যি?’

কোম ওম্বোর মন্দিেরর কুমিরের মমি

ভবেশদা এবারে স্বভাবসুলভ ‘সব জানি’ টাইপের হাসিটা দিয়ে বললেন,

‘না, আংশিক সত্যি। বইটাতে এক জায়গায় হেতেফেরিসের নামের বানানও ভুল আছে। গিজার পিরামিড নিয়েও তো তোমাদের কিছু বলা হয়নি। শুনবে নাকি সে-গল্প?’

‘শুনব না মানে! আলবাত শুনব!’

‘ওকে, তাহলে সামনের শুক্রবার সন্ধেবেলায় দিলখুশা কেবিনে দেখা হচ্ছে। ফিশ কবিরাজি খেতে খেতে কথা হবে ’খন।’

কুমিরের মমি

বলা বাহুল্য, কবিরাজিটা আমাদেরকেই খাওয়াতে হবে। তবে এই নৈবেদ্য-তে যে প্রসাদ পাওয়া যাবে তার স্বাদ যে কী সে আমরা বুঝে গেছি এতদিনে!

গ্রেট পিরামিড

‘সালটা ১৮৬৭, গা-পুড়ে-যাওয়া গরমের মধ্যেই বছর বত্রিশের এক আমেরিকান নিউজ রিপোর্টার কায়রোর পাঁচ মাইল পশ্চিমে মরুভূমির দিকে চলেছেন। একটা ছোটো ডিঙিতে করে নীল নদ পার হতে হল, বাকিটা পথ বালির মধ্যেই পায়ে হেঁটে। দিগন্তে যে তিনটে দানবকে দেখা যাচ্ছিল তাদের সবচেয়ে বড়োটার কাছাকাছি আসতেই তিনি দেখলেন দিগন্তটা কেমন হঠাৎ হারিয়ে গেল। ওঁর সামনে দাঁড়ানো পাথরের তৈরি আশ্চর্যটার মাথা যেন আকাশ ফুঁড়ে উঠে গেছে। সাংবাদিক এবারে সেই পাথর বেয়ে ওপরে উঠতে লাগলেন। সাড়ে চারশো ফিটের চুড়োটায় যখন পা রাখলেন তখন চারপাশটা দেখে যেন তাক লেগে গেল। পৃথিবীটা এত ওপর থেকে কখনো দেখা হয়নি আগে! একদিকে হলুদ বালির সমুদ্র বিছিয়ে রয়েছে। তার যেন কোনো শেষ নেই। অন্যদিকটা আবার সবুজ, মাঝখান দিয়ে সরু সুতোর মতো নীল নদ বয়ে গেছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ছোটো ছোটো গ্রামগুলোও দেখা যাচ্ছে। আর সবচেয়ে দূরে পাঁচিলের মতো পাম গাছের সারি।

সাংবাদিকের ছোটোবেলাকার একটা স্বপ্ন সত্যি হল। খুফুর পিরামিডে চড়ার স্বপ্ন।

আমরা দু-জন এতক্ষণ হাঁ করে ভবেশদার কথা শুনছিলাম। দিলখুশাতে আজকে ভিড় কম ছিল, সপ্তাহের মাঝখানে তো। আমরা ভেতরের দিকের একটা টেবিলে বসেছিলাম, তাই এম জি রোডের বাস ট্যাক্সির আওয়াজও একটু কম আসছিল। গল্প শোনার একদম আদর্শ পরিবেশ যাকে বলে। তবে রেস্টুরেন্টটার দেওয়ালে বিশ্রী গোলাপি রং করেছে, সেটা বড্ড চোখে লাগছিল প্রথমে। কিন্তু ভবেশদা মুখ খোলার পরেই সেসব কোথায় হাওয়া হয়ে গিয়ে চারপাশে ইজিপ্টের মরুভূমি চলে এল। খাবার দিতে মনে হয় এখনও একটু দেরি আছে। ভবেশদা গ্লাসের জলে একটু চুমুক দিয়ে এবারে বললেন,

‘বলো তো দেখি এই লোকটার নাম কী, যে কিনা তরতর করে খুফুর পিরামিডে উঠে গেল?’

‘আমেরিকান সাংবাদিক, ১৮৬৭... এভাবে হয় নাকি? আপনি আরও কিছু হিন্ট দিন।’

পাশের পিরামিডের চুড়ো থেকে দেখা খুফুর পিরামিডের মাথার তুরা পাথরের আস্তরণ

‘ওকে, ইনি ১৮৯৬ কলকাতায় এসেছেন, ময়দানে হেঁটেছেন। যে হোটেলে ছিলেন তাকে বলেছিলেন জুয়েল অফ দি ইস্ট ! এখন সেটার নাম ললিত গ্রেট ইস্টার্ন।’

আমাদের বোকার মতো মুখ দেখে ভবেশদা একটু বিরক্তই হলেন এবারে,

‘নিজের শহরটাই ভালো করে চেনো না। এদিকে এসেছ ইজিপ্টের গল্প শুনতে। যাক গে, টম সয়ার, হাকলবেরি ফিনের নাম শুনেছ নিশ্চয়?’

এবারের শব্দগুলো কমন পড়েছিল। পিজি বিজয়ীর মতো হাসতে হাসতে বলল,

‘বুঝেছি কার কথা বলছেন, মার্ক টোয়েন যে কলকাতাতে এসেছিলেন সেটাই জানতাম না। টোয়েনেরও তাহলে ইজিপ্টের নেশা ছিল?!’

‘শুধু টোয়েন নয়, ভায়া। গত কয়েক শতাব্দী ধরে বিশ্বের তাবড় তাবড় লোককে এই দেশটা টেনে এনেছে। তার অনেকটাই ওই পিরামিডের জন্য।’

‘দ্য গ্রেট পিরামিড!’

‘শুধু সেটা নয়। দেশটা জুড়ে নব্বইয়ের ওপরে পিরামিড ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। তবে তাদের মধ্যে সেরা হল গিজার তিনটে পিরামিড। যেগুলোকে আমরা ছোটোবেলায় হিস্ট্রির বইতে দেখেছি। ইজিপ্টের প্রথম পিরামিডের কথা তো আগেই বলেছি তোমাদের।’

‘হ্যাঁ, সাকারার স্টেপ পিরামিড।’

‘ঠিক, তবে গিজার পিরামিডগুলো সেটার থেকে অনেক বড়ো। প্রাচীন পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের একটা। এই পিরামিড বানানোর গল্পটাও কিন্তু দারুণ, বুঝলে।’

ব্যস, আবার এক মুহূর্তের মধ্যে আমরা চলে এলাম ধু-ধু মরুভূমির মাঝখানে। ভবেশদা বলতে লাগলেন,

‘আজ থেকে সাড়ে চার হাজার বছর আগের কথা, গিজার মরুভূমির মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন এক বাইশ বছরের যুবক। ওর নজর চারপাশের চুনাপাথরের পাহাড়গুলোতে। ফারাও খুফু এখন মিশরের অধিপতি। এত কম বয়সেই তার অধীনে উত্তর আর দক্ষিণ মিশর এক হয়েছে। যে কাজটা ওর বাবা নেফ্রু শুরু করেছিলেন সেটা খুফু শেষ করতে পেরেছেন। দেশ জুড়ে শান্তি এখন।

‘খুফু অমর হতে চান, হওয়াটাই স্বাভাবিক। ফারাওরা ঈশ্বর ‘‘রা’’-এর প্রতিনিধি। মারা যাওয়ার পরে তাঁরদের অমর হয়ে থাকাই দস্তুর। সেইজন্যই মমি বানানো হয়, পিরামিড বানানো হয়। ওঁর বাবা নেফ্রুও তো দুটো পিরামিড বানিয়েছিলেন নিজের জন্য। একটা মেইদাম নামের এক জায়গায়। কিন্তু সেটাকে ঠিক পিরামিড বলা যায় না। অঙ্কের হিসেবের গণ্ডগোলের জন্য সেই পিরামিডের পেটের কাছ থেকে অনেকটা বেঁকে আসতে হয়েছিল। পরে অবশ্য দাশুর নামের আরেকটা জায়গাতে নেফ্রু আরেকটা পিরামিড বানান। সেটা নিখুঁত। সূর্য ডোবার সময় সেই পিরামিডের গায়ের পাথরগুলো লাল লাগে। এমনটা আর একটাও নেই ইজিপ্টে। তবে খুফুর স্বপ্ন আরও বেশি কিছুর।

‘খুফুর নিজের একটা পিরামিড হবে। সেটা হবে আগের বানানো যেকোনো পিরামিডের থেকে অনেক অনেক বড়ো। এমন কিছু একটা যেটা আগে এই দেশের কেউ দেখেনি। পরেও কেউ বানাতে পারবে না। সেই পিরামিড বানানোর জন্যই খুফু গিজার এই জায়গাটা বেছে নিয়েছেন। কারণ দুটো। এক, হাতের কাছেই থাকা চুনাপাথরের খনি, যেখান থেকে পিরামিড বানানোর জন্য পাথর খুব সহজেই পাওয়া যাবে। আর দ্বিতীয়ত এই জায়গাটা বেশ উঁচুও, তাই অনেক দূর থেকে দেখতেও পাওয়া যাবে পিরামিডটা। কিন্তু মুশকিল একটাই, রাজধানী মেমফিস থেকে প্রায় পনেরো মাইল দূরে এই গিজা। রাজার সমাধি রাজধানী থেকে এত দূরে হলে চলে নাকি? কী করা যায়? দুটোকে কাছাকাছি আনা তো অসম্ভব। তবে ওদের দূরত্বটা একভাবে কমিয়ে ফেলাই যায়। মেমফিস শহর নীল নদের গায়েই। সেই নীল নদ থেকেই একেবারে গিজা অবধি লম্বা খাল তৈরি করে ফেললেন খুফু। দুটো জায়গার মধ্যে যাতায়াত করার খুব সুবিধা হয়ে গেল এতে। প্রতি বছর নীল নদের বন্যার জন্য সেই খালে জলের অভাবও হল না। খুফু গিজার মরুভূমিতেই নিজের আরেকটা রাজপ্রাসাদও বানিয়ে ফেললেন। পিরামিড তৈরি তো আর একদিনের কাজ নয়। তিরিশ বছর ধরে একটু একটু করে তৈরি হয়েছিল গ্রেট পিরামিড! খুফু এই পিরামিড বানানোর কাজটা দিয়েছিলেন...’

‘দুটো ফিশ কবিরাজি, একটা চিকেন কাটলেট। চা আসছে।’

টেবিলের ওপরে ঠকাস ঠকাস করে প্লেটগুলো রাখতে রাখতে বলল ওয়েটার। এমনভাবে রসভঙ্গের জন্য একেবারে দুর্বাসা মুনির মতো তাকালাম ওর দিকে। কিন্তু তাকানোই সার। প্লেটগুলো নামিয়ে রেখেই লোকটা অন্য টেবিলে চলে গেল। পিজি ফিশ কবিরাজি খায় না। ওর নাকি সব মাছেই আঁশটে গন্ধ লাগে। তাই ওর জন্য কাটলেটটা নেওয়া। ভবেশদার মুখটা কিন্তু উজ্জ্বল হয়ে উঠল দেখলাম। কবিরাজির গায়ে লেগে থাকা ঝুরিগুলো তুলে একটু কাসুন্দি আর একটু টমেটো সসে চুবিয়ে মুখে পুরে দিলেন। দিয়েই গাইতে আরম্ভ করলেন,

‘হোঁটো সে ছুঁলো তুম...’

রেলগাড়ি লাইনচ্যুত হচ্ছে দেখে আমাকে মুখ খুলতেই হল এবারে,

‘ভবেশদা।’

‘উমম...’

‘বলছি, খুফু পিরামিডটা বানাতে দিলেন...’

‘ও, হ্যাঁ হ্যাঁ। ভালো খাবার মুখে পড়লেই না আমার কেমন গজল এসে যায়। সরি, সরি। তা যেটা বলছিলাম, খুফু কাজটা দিলেন নিজেরই এক আত্মীয় হেমিউনুকে। তার দায়িত্বেই তৈরি হল গ্রেট পিরামিড। তেরো একর জায়গা নিয়ে। এক একটা দিক ২৩০ মিটার লম্বা। উচ্চতায় প্রায় দেড়শো মিটার। স্ট্যাচু অফ লিবার্টির থেকেও উঁচু। ভলিউমের দিক থেকে বলতে গেলে কুড়িখানা ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল ঢুকে যাবে ওর মধ্যে।’

‘বলেন কী! এত বড়ো যে সেটা ছবি দেখে বুঝিনি।’

‘হ্যাঁ, বললাম না, প্রাচীন পৃথিবীর সাতটা আশ্চর্যের একটা হল গ্রেট পিরামিড। এত পুরোনো একটা জিনিস আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। আরবিতে একটা প্রবাদ আছে জানো? মানুষ সময়কে ভয় পায়, আর সময় ভয় পায় পিরামিডকে। এখন একে যে অবস্থায় দেখ তার চেয়ে অনেক সুন্দর ছিল কয়েক হাজার বছর আগেও। গোটা পিরামিডটার গা মোড়ানো ছিল ঝকঝকে সাদা পাথর দিয়ে। সেই পাথর এসেছিল গিজার দক্ষিণ পূর্বের তুরা নামের একটা জায়গার খনি থেকে। নীল নদ দিয়ে নৌকায় করে আনা হয়েছিল সেই পাথর। সূর্যের আলো পড়লে ঝিকমিকিয়ে উঠত পিরামিডটা সেই সময়। কিন্তু পরের দু-হাজার বছর ধরে মানুষ ওই সাদা পাথর খুলে নিয়ে গেছে নিজেদের ঘরবাড়ি বানানোর জন্য। গোটা ইজিপ্ট জুড়ে অনেক পুরোনো বাড়ি আর প্রাসাদে আজও সেই সাদা পাথর পাওয়া যায়।

পিজি এতক্ষণ চুপচাপ কাটলেট খাচ্ছিল। এবারে মুখ খুলল ও,

‘পিরামিডের ভিতরে কী ছিল ভবেশদা! অনেক ঐশ্বর্য থাকার কথা তো!’

‘তা হয়তো ছিল, পিজি ভায়া। কিন্তু সেসবের কিছুই পাওয়া যায়নি। পিরামিড বানানোর হাজার বছরের মধ্যেই ডাকাতরা ওর মধ্যে ঢুকে সব লুঠ করে নেয়। কিন্তু বুদ্ধি করে পিরামিডে ঢোকার রাস্তাটাও এমনভাবে বন্ধ করে দেয় যাতে বাইরে থেকে কিছুই বোঝা না যায়। তারপরে মানুষ পিরামিডে ঢোকে আরও দু-হাজার বছর পরে। সেই লোকটার নাম আল মামুন।’

‘আরে! কাকাবাবুর ‘‘মিশর রহস্য’’তে একজন মিশরীয় বিজনেসম্যানের নাম ছিল তো আল মামুন!’

খুফুর পিরািমডে আল মামুনের তৈরি প্রবেশপথ (নীচের গর্ত)

‘হ্যাঁ, কিন্তু এই আল মামুন যে সে লোক নয়। বাগদাদের রাজা, যদিও ওদেরকে ঠিক রাজা বলা হত না। রুলারদের বলত কালিফ। তো, এই আল মামুন ঠিক করে পিরামিডের ভেতরে ঢুকবে। কিন্তু চারিদিকে ঘুরেও কোনো রাস্তা খুঁজে পাওয়া গেল না। তখন গরম ভিনিগার ঢেলে পিরামিডের পাথরে ফাটল ধরানোর চেষ্টা চলল। তাতে কাজ না হওয়ায় শেষে হাতুড়ির দ্বারস্থই হতে হয় মামুনকে। পিরামিডের গায়ে পাথর ভেঙে গর্ত করে সেইখান থেকে ভেতরের দিকে টানেল বানানো হতে থাকে। তবে মামুন ভাগ্যবান ছিলেন। কিছুদূর অবধি টানেল কাটার পরেই শ্রমিকরা একটা গুপ্ত সুড়ঙ্গে এসে পড়ে, যেটা ওপরদিকে উঠে গেছে। সেই পথ একটু ওপরে গিয়েই অনেকটা চওড়া হয়ে যায়। এখন সেই পথকে বলে গ্র্যান্ড গ্যালারি। এই পথ শেষ হয় একটা খুব নীচু ছাদের ছোটো ঘরে, এখন যাকে বলা হয় কুইন’স চেম্বার। এই ঘরের একটা দেওয়াল দিয়ে আবার সুড়ঙ্গ কেটে মামুন এসে পড়েন একটা বিশাল বড়ো ঘরে, যার সিলিং অনেক উঁচুতে। ঘরের দেওয়ালগুলোও বাকি পিরামিডের পাথরের থেকে আলাদা, লাল রঙের। পরে জানা গেছে এই পাথর এসেছিল কায়রো থেকে সাড়ে আটশো কিলোমিটার দূরে থাকা আসওয়ান শহরের খনি থেকে! নীল নদের পথে।

খুফুর পিরামিডের গুপ্ত সুড়ঙ্গ

‘মামুন একটু হতাশই হন এই ঘরে ঢুকে। একদম ফাঁকা। শুধু পশ্চিমদিকে একটা পাথরের সারকোফেগাস রয়েছে। মামুন সেই সারকোফেগাস খোলেন। পিরামিড থেকে বাইরে বেরিয়ে এসে মামুন ঘোষণা করে দেন যে তিনি সারকোফেগাসের মধ্যে একটা মমি পেয়েছেন যার সারা শরীর সোনা দিয়ে মোড়ানো, হাতে তলোয়ার আর বুকের ওপরে একটা বড়ো রুবি পাথর বসানো। খুব সম্ভবত নিজের নাম ছোটো হয়ে যাওয়ার ভয়ে আল মামুন ডাহা মিথ্যে কথা বলেছিলেন। ওইখানে কিছু পাওয়ার কথাই নয়। কারণ পিরামিড তো তার আগেই ডাকাতরা ফাঁকা করে দিয়েছে। তবে ওই সারকোফেগাসটা খুব সম্ভবত খুফুরই ছিল। আর ওই ঘরকে এখন বলে কিং’স চেম্বার।’

খুফুর পিরামিডের ভেতরের নকশা

আমি এবারে বললাম,

‘ও আচ্ছা, বুঝেছি। তাহলে আগে যে কুইন’স চেম্বারের কথা বললেন ওখানে খুফুর স্ত্রী-র মমি ছিল এক সময়ে?’

‘একদমই ভুল ধারণা। খুফুর পিরামিডে ওর স্ত্রী-র কোনো মমিই ছিল না। ওই ঘরটা কিং’স চেম্বারের থেকে একটু ছোটো হওয়ায় নাম কুইন’স চেম্বার। হয়তো একসময় ওই ঘরে কোনো ঐশ্বর্য সত্যিই ছিল। ওই ঘরে এখন আর যাওয়া যায় না। কিং’স চেম্বারে কিন্তু এখন টুরিস্টরাও ঢুকতে পারে। আল মামুনের বানানো পথটাই এখনও ব্যবহৃত হয় কিং’স চেম্বারে পৌঁছোনোর জন্য।’

‘আরিব্বাস! তাহলে খুফুর সারকোফেগাসটা এখনও আছে!’

‘আছে তো। একরকমভাবে আছে ফাঁকা সারকোফেগাসটা।’

‘আচ্ছা, তাহলে দুটো ঘর পিরামিডের মধ্যে।’

‘না, দুটো নয়, সব মিলিয়ে আটটা। সতেরোশো শতাব্দীতে ব্রিটিশ আর্কিয়োলজিস্টরা বাকিগুলো আবিষ্কার করে। কিং’স আর কুইন’স চেম্বার ছাড়াও কিং’স চেম্বারের গায়ে রয়েছে একটা ছোটো অ্যান্টিচেম্বার। আর কিং’স চেম্বারের সিলিংয়ের ওপরে রয়েছে চারটে ফাঁকা ঘর। খুব সম্ভবত যাতে পাথরের ভারে কিং’স চেম্বারের সিলিং না ভেঙে পড়ে তাই এই ঘরগুলো বানানো হয়েছিল। কিং আর কুইন’স চেম্বারটাকে জুড়েছে গ্র্যান্ড গ্যালারি। সেখান থেকে আরেকটা সুড়ঙ্গ চলে গেছে পিরামিডের গা অবদি। সেটার একটা অংশ আল মামুন খুঁজে পেয়েছিলেন। কুইন’স চেম্বার থেকে আবার একটা সুড়ঙ্গ চলে গেছে মাটির নীচের আরেকটা ঘরে। দুঃখের কথা সেটাও একদম ফাঁকা অবস্থাতে পাওয়া যায়। অবাক করার ব্যাপার হল এই যে, কিং’স আর কুইন’স চেম্বার থেকে আরও চারটে সুড়ঙ্গ চলে গেছে বাইরের দিকে। কিন্তু তার সবকটাই অদ্ভুতভাবে পিরামিডের গা অবদি পৌঁছোনোর আগেই শেষ হয়ে গেছে। কেন এগুলো বানানো হয়েছিল সেটা কেউ জানে না। আবার খুফুর পিরামিডের সঙ্গে কিন্তু ক্রিকেট খেলার একটা ক্ষীণ লিঙ্ক আছে।’

‘তাই নাকি! সেটা কীভাবে?’

‘কিং’স চেম্বারের ওপরে যে চারটে ফাঁকা ঘর ছিল সেগুলো আবিষ্কার করেছিলেন হাওয়ার্ড ভ্যাস নামের এক আর্কিয়োলজিস্ট। তিনি এই ঘরগুলোর নাম বিখ্যাত ব্রিটিশদের নামে রাখেন। তাদের মধ্যে একটা ঘরের নাম রাখা হয় অ্যাডমিরাল নেলসনের নামে। এঁকে নিশ্চয়ই চেনো?’

‘চিনি মানে, নাম শুনেছি, ক্রিকেটে ১১১-কে তো নেলসন’স নাম্বার বলে।’

‘ঠিক, হোরাশিও নেলসন ছিলেন ব্রিটিশ নেভির ফ্ল্যাগ অফিসার। ১৮০৫ সালে ট্রাফালগারের বিখ্যাত যুদ্ধে মারা যান। এই অ্যাডমিরাল নেলসনের নাম থেকেই নেলসন’স নাম্বার এসেছে। কারণ নাকি নেলসনের একটা চোখ, একটা হাত আর একটা পা ছিল না। তবে এই তথ্য ভুল যদিও, নেলসনের একটা করে চোখ আর হাত না থাকলেও পা দুটোই ছিল। তাই ক্রিকেটে ১১১-কে নেলসন’স নাম্বার বলার কোনো যৌক্তিকতাই নেই... এই দেখ, আবার অন্য কথায় চলে যাচ্ছি। কাজের কথায় ফিরে আসি।

খুফুর পিরামিডের ভেতরে

গ্র্যান্ড গ্যালারিতে যাওয়ার গুপ্ত সুড়ঙ্গ

গুপ্ত সুড়ঙ্গ (উপরে) ও গ্র্যান্ড গ্যালারি (নীচে)

কিংস চেম্বারে ঢোকার রাস্তা (উপরে) ও কিংস চেম্বারে রাখা সারকোফেগাস (নীচে )

‘এই পিরামিডকে নিউক্লিয়াস করেই গিজার মরুভূমিতে গড়ে ওঠে একটা বিশাল কবরখানা। খুফুর পিরামিডের পাশেই আরও দুটো বিশাল পিরামিড বানায় ওঁর ছেলে খাফরে আর নাতি মেনকুরে। পিরামিডের গায়ে তুরার সাদা পাথরের একটা আস্তরণের কথা বললাম না? ওইটা এখন একমাত্র খাফরের পিরামিডের মাথার কাছটাতেই পাওয়া যায়। এই তিনটে পিরামিড ছাড়াও গিজার প্লেটুতে এখন আছে আরও আটখানা ছোটো পিরামিড আর ১০০০-এর ওপরে কবর। আর আছে বিখ্যাত স্ফিংস!’

‘স্ফিংস নিয়ে কিছু বলুন না, ভবেশদা!’

‘উফফ, বলেছি না একদিনে একটাই জিনিস হজম করতে। এবারে আমি বরং তোমাদেরকে একটা প্রশ্ন করি।’

ভবেশদার একটা প্রশ্ন মানেই আরেকটা দারুণ কিছুর খোঁজ পাওয়া। তাই আমি পিজি দু-জনেই এবারে প্রায় একসঙ্গে বলে উঠলাম,

‘কী?’

‘এতক্ষণ তো খুফুর পিরামিডের কথা শুনলে। এবারে বলো তো এই দুর্দান্ত জিনিসটা বানানো সম্ভব হল কী করে?’

পিজি বলল,

‘এটা তো শুনেছি একটা রহস্য, বাংলায় অনুবাদ করা দানিকেনের একটা বই পড়েছিলাম। তাতে লেখা ছিল যে গ্রহান্তরের এলিয়েনরা নাকি পিরামিড বানাতে মিশরীয়দের হেল্প করেছিল।’

‘ধুস, ওসব গাঁজাখুরি। মিশরীয়রা নিজেরাই বানিয়েছিল। বিজ্ঞান আর অঙ্কতে অনেক এগিয়ে ছিল ওরা। তবে হেরোডটাস খুফুকে ভিলেন বানিয়ে দিয়েছিলেন।’

‘কীভাবে?!’

‘হেরোডটাস ইজিপ্টে এসেছিলেন খুফুর দু-হাজার বছর পরে। তাই পিরামিড বানানোর ব্যাপারে যেটুকু জেনেছিলেন তার পুরোটাই ছিল জনশ্রুতি। তার ওপরে ভিত্তি করেই ইতিহাস লিখে ফেলেন। হেরোডটাসের মতে খুফু ছিলেন খুব নিষ্ঠুর একজন ফারাও। জোর করে মিশরীয়দের পিরামিড বানানোর কাজে লাগিয়েছিলেন। এক লাখ ক্রীতদাস অমানুষিক পরিশ্রম করে পিরামিড বানিয়েছিল। বাইবেলের এক্সোডাসেও তো ইহুদি ক্রীতদাসদের কথা বলা আছে, যাদের ফারাওরা পশুর মতো খাটায়। এর কতটা সত্যি তাই নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। যাই হোক, খুফুর বদনাম ঘুচতে অপেক্ষা করতে হয় প্রায় আড়াই হাজার বছর। হেরোডটাসকে ভুল প্রমাণ করেন একজন ইজিপশিয়ান আর্কিয়োলজিস্ট। তাঁরর নাম জাহি হাওয়াস।

‘১৯৯০ সালে জাহি’র দল পিরামিড চত্বরের কাছেই একটা বিশাল কবরখানা আবিষ্কার করে, যেটা খুব সাধারণ মানের। কিন্তু কবরখানার মানুষগুলোর পরিচয় থেকেই বোঝা যায় ওদের কাজ। ওরাই পিরামিড বানানোর কাজ করত। ১৯৯৯-তে এই শ্রমিকদের ছোটো একটা গ্রামও খুঁজে পাওয়া যায় গিজাতেই। এক লাখ নয়, ১০,০০০ মানুষ কাজ করেছিল খুফুর পিরামিড বানানোর জন্য। এবং তাদের প্রত্যেককেই পারিশ্রমিক দেওয়া হত। থাকার জায়গাও ছিল বেশ। শুধু তাই নয়, কায়িক পরিশ্রমের ধকল নিতে পারার জন্য ওদের ডায়েটও ছিল বেশ ভালো। দেশ জুড়ে পশুর মাংস খুব মূল্যবান হলেও ওদের রেশনে সেটা রোজ থাকত। এমনকী স্বাস্থ্যের খেয়ালও খুব ভালোভাবে রাখা হত। অত ভারী ভারী পাথর বইবার সময় অ্যাক্সিডেন্ট হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তাই কাছেই ছিল একটা ছোটো হাসপাতাল, যেখানে হাড় ভাঙার জন্য প্লাস্টার করা বা ছোটোখাটো অ্যাম্পুটেশনের কাজ চলত। আবার অনেক হতভাগ্য শ্রমিকেরই কবর পাওয়া গেছে ঘাড় বা মাথা ভাঙা অবস্থায়। তবে তাদের খুব যত্ন করে কবর দেওয়া হয়।’

জাহি হাওয়াস

‘হুমম, এটা তাহলে বুঝলাম যে নিজেদের ইচ্ছাতেই সবাই কাজ করেছিল। কিন্তু পিরামিডটা বানাল কী করে ওরা?’

পিরামিডের ঢালে যেভাবে পাথর টেনে নিয়ে যাওয়া হত

‘আগেই বললাম, ওরা আর্কিটেকচারে তুখোড় ছিল। পিরামিডের নকশাটা আগেই বানিয়ে নিয়ে তারপরে সেইটা ধরে কাজ এগোয়। ভারী পাথরগুলোকে টেনে আনার জন্য রাস্তার বালিকে জলে ভিজিয়ে দিত ওরা। এতে পাথর টানা অনেক সহজ হয়ে যেত। অর্ধেক মানুষ লাগত একটা বড়ো পাথরকে টানতে। তারপরে কাঠের র‌্যাম্পের ওপর দিয়ে এনে পাথরগুলোকে একের পর এক বসাত। তবে এই কাজটা তিরিশ বছর ধরে করে যাওয়ার মতো প্ল্যানিং আর ম্যানেজমেন্ট চমকে দেওয়ার মতো। ওহ, এই দেখো, এতক্ষণ ধরে এত খুফু খুফু করে যাচ্ছি, একটা মজার কথা তো বলাই হয়নি। যে লোকটার জন্য এরকম আকাশচুম্বী একটা জিনিস বানানো হল সেই লোকটার মমি যে আগেই নষ্ট হয়ে গেছে ডাকাতদের হাতে সেটা আগেই বলেছি। কিন্তু গোটা ইজিপ্টে খুঁজেও খুফুর একটার বেশি স্ট্যাচু পাওয়া যায়নি। আর সেটা মাত্র তিন ইঞ্চি লম্বা। জ্যামিতি বক্সের স্কেলও ওর দ্বিগুণ হয়।’

আমি এবারে বললাম,

‘আচ্ছা খুফুর কথা তো শুনলাম, কিন্তু ওঁর মায়ের গল্প তো বললেন না?’

‘হেতেফেরিস?’

‘হ্যাঁ, আগের দিন জানতে চাইলাম না? সেই হেতেফেরিসের টুম্বে কোনো মমি ছিল না! আবার ফিরেও এল! যেমনটা মিশর রহস্যে বলেছিল।’

খুফুর মূির্ত

ভবেশদা এবারে একটু ভ্রূ কুঁচকে বললেন,

‘ও হ্যাঁ, বলেছিলে বটে। সে-গল্প বলাই যায়। কিন্তু কবিরাজিটা তো শেষ হয়ে গেল। আজকাল এরা সাইজও ছোটো করে দিয়েছে কেমন। কিন্তু টেস্টটা বুঝলে এক…’

‘এই যে দাদা! এদিকে আরেকটা ফিশ কবিরাজি দিতে হবে!’

পিজি বুঝে গেছে কী করতে হবে এখন। ভবেশদাকে এই অবস্থায় কিছুতেই ছাড়া যাবে না।

হেতেফেরিসের রহস্যটা আজকে জানতেই হবে।

হেতেফেরিসের রহস্য

‘আজ থেকে ৪৭০০ বছর আগের একটা দিন, মিশরের ফারাও হুনি নিজের প্রাসাদে মাথা নীচু করে বসে আছেন। দেশের মানুষ তাঁরকে ভগবানের মতো পুজো করে। হেন কোনো পার্থিব সম্পদ নেই যা তাঁরর আয়ত্তের বাইরে। তবুও হুনি আজকে নিঃস্ব। যেকোনো পিতার সবচেয়ে কষ্টের কাজটা এইমাত্র তাঁরকে করে আসতে হল। কবর দিয়ে এলেন নিজের একমাত্র পুত্রসন্তানকে। হঠাৎ একদম কম বয়সেই ছেলেটা চলে গেল। হুনির সামনে এখন একটা বড়ো প্রশ্ন, পরের ফারাও কে হবে? কোনো পুরুষকেই তো বসতে হবে মেমফিসের মসনদে। কিন্ত হুনির বাকি সন্তানেরা তো সবাই কন্যা। এদিকে তাঁরর চারিদিকে শত্রুরও তো অভাব নেই। শকুনের মতো তাঁরকে তারা ঘিরে রাখবে। ফারাও মারা গেলেই ঝাঁপিয়ে পড়বে সিংহাসনের জন্য। হুনির বয়স হয়েছে। এই বয়সে নতুন করে আর সন্তানের বাবা হওয়া সম্ভব নয়। তাহলে উপায়?’

এই বলে ভবেশদা একটা ভ্রূ ওপরে তুলে আমাদের দিকে চাইলেন। দু-নম্বর কবিরাজিটা এই একটু আগেই দিয়ে গেছে। আমরা আর কিছু অর্ডার করিনি। এমনিতেই বাড়ি থেকে বেশি টাকা পাওয়া যায় না মাসের হাতখরচার জন্য। একদিনে দুটো করে ফিশ কবিরাজি সাঁটালে পরের উইকএন্ডে হোস্টেলের ক্যান্টিনের ট্যালট্যালে ডাল ভাত দিয়েই পেট ভরাতে হবে। তার চেয়ে এই ভালো। ভবেশদাকে অন্তত আরেকটা কবিরাজি দিয়ে আটকে রাখা গেছে।

আমি ভবেশদার প্রশ্নর উত্তরে বললাম,

‘হুম, খুব চাপের কেস বটে। তবে হুনি চাইলে নিজের জামাইকেই দেশের রাজা বানাতে পারতেন তো। রাজত্ব আর রাজকন্যা দুটোই পাবে সে তাহলে।’

‘একদম ঠিক ধরেছ, স্পন্দন ভাই। ফারাও হুনি ঠিক এই কাজটাই করেছিলেন। নিজের সবচেয়ে বড়ো মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিলেন এমন একজনের যার বংশ নামকরা হলেও সেই বংশের কেউ কোনোদিন আগে ফারাও হননি। হুনির পরে ইনিই ফারাও হন। হঠাৎ ভাগ্যে শিকে ছেঁড়া এই লোকটির নাম ছিল নেফ্রু।’

‘মানে, খুফুর বাবা?’

‘হ্যাঁ, আর নেফ্রুর স্ত্রী, হুনির বড়োমেয়ে যার জন্য নেফ্রুর ফারাও হওয়া সম্ভব হল, সে হল রানি হেতেফেরিস। হেতেফেরিস শব্দের মানে হল সেই মেয়েটা যার হাসিমুখ।’

পিজি এবারে ফিচ করে হেসে বলল,

‘বুঝেছি, হেতেফেরিস বাঙালি হলে নাম হত সুহাসিনী!’

‘চ্যাংড়ামি শুরু করলে কিন্তু আমি উঠে যাব।’

‘না না, সরি সরি। আর কিছু বলব না, আপনি বলুন।’

পিজি জিভ কেটে চুপ করে বসল।

‘যেটা বলছিলাম, আরও অনেক রানি থাকলেও ফারাও নেফ্রু হেতেফেরিসকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন। কারণটা খুব স্বাভাবিক। ওই মেয়েটির জন্যই যে তিনি সম্রাট হতে পেরেছিলেন। আগেই বলেছি নেফ্রুর দুটো পিরামিড ছিল, একটা মেইদামে আরেকটা দাশুর নামের একটা জায়গায়। দাশুরের পিরামিডেই নেফ্রুকে সমাধিস্থ করা হয়। হেতেফেরিসকেও কবর দেওয়া হয় নেফ্রুরই পিরামিডের পাশে।’

‘বলছেনটা কী? হেতেফেরিসের সমাধি দাশুরে? আমরা তো জানতাম গিজাতে। খুফুর পিরামিডের পাশে।’

ভবেশদার কথায় আমি একটু অবাকই হলাম এবারে।

‘তুমি যেটা বলছ ঠিক, আবার আমার কথাও ঠিক।’

‘তার মানে হেতেফেরিসকে দু-বার সমাধিস্থ করা হয়?’

মুখে সেই ট্রেডমার্ক রহস্যাবৃত হাসিটা এনে ভবেশদা এবারে বললেন,

‘সেটা এখনই বলব না, আগে খুফুর একটা গল্প শোনো।’

একদিন খুফুর দরবারে একটা লোক ভয়ে ভয়ে হাজির। খারাপ একটা খবর সে নিয়ে এসেছে, ফারাও জানতে পারলে হয়তো তার জন্য চরম শাস্তিও পেতে হতে পারে একে, কিন্তু খবরটা এমনই যে ফারাওকে জানাতেই হবে।’

‘কী খবর?’

‘ডাকাতির।’

‘কোথায়?’

‘দাশুরে, খুফুর মায়ের সমাধিতে।’

‘বলেন কী!’

‘হুমম, তবে আর বলছি কী। দাশুরের সমাধিক্ষেত্রকে যারা পাহারা দেয়, এ তাদের প্রধান। অনেক সাবধানতা নেওয়া সত্ত্বেও রাতের অন্ধকারে নাকি রানি হেতেফেরিসের সমাধিতে ডাকাত ঢুকেছিল। তবে খুব বেশি ক্ষতি করতে পারেনি। সমাধির একটা দেওয়ালই শুধু ভেঙে গেছে। ডাকাতেরা ভেতর থেকে প্রায় কিছুই নিয়ে পালাতে পারেনি। তবে যেহেতু ওরা একবার সমাধিটার কথা জেনে গেছে তাই ফের কখনো সিঁধ কাটবার চেষ্টা করতেই পারে।’

আমি বললাম,

‘আচ্ছা এবারে বুঝলাম, সেইজন্যই খুফু ওর মায়ের সমাধিকে দাশুর থেকে সরিয়ে গিজাতে নিজের পিরামিডের কাছে নিয়ে চলে এলেন।’

‘কারেক্ট!’

‘কিন্তু ভবেশদা, তাহলে তো গিজার সমাধিতে হেতেফেরিসের মমি থাকার কথা। কিন্তু ছিল না কেন?!’

‘এত অধৈর্য হলে কি চলবে স্পন্দন ভাই? হেতেফেরিসের মমির কথা তো ছেড়েই দাও। সমাধিটাও খুঁজে পাওয়া যেত না যদি না একজন ফোটোগ্রাফারের ট্রাইপড পিছলাত।’

গল্পের মধ্যে আবার একটা নতুন গল্প, আমি আর পিজি এবারে শিরদাঁড়া সোজা করে বসলাম। ভবেশদা বলে চললেন,

‘পয়লা নভেম্বর ১৯২৪ সালে আমেরিকার হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির স্পনসরশিপে খুফুর পিরামিডের দক্ষিণ-পূর্বদিকে নতুন এক্সক্যাভেশন শুরু হয়, আমেরিকান আর্কিয়োলজিস্ট জর্জ রেসনারের নেতৃত্বে। কিন্তু জানুয়ারির শেষের দিকে রেসনারকে কয়েক মাসের জন্য হার্ভার্ডে ফিরে যেতে হয়। যাওয়ার সময় জর্জ কাজের দায়িত্ব দিয়ে যান সাইট ম্যানেজার অ্যালান রো-কে। আরেকটা বড়ো কাজ দেন মিশনের ফোটোগ্রাফার আবদৌকে। আবদৌ-এর কাজ ছিল রোজ কী কী কাজ হচ্ছে তার ছবি ডিটেলে তুলে রাখা। ভোরবেলায় আবদৌ সাইটে চলে আসত ক্যামেরা আর ট্রাইপড কাঁধে, শ্রমিকদের আসার ঘণ্টাখানেক আগে, কাজ শুরু হওয়ার আগে একবার ভালো করে ছবি তুলে রাখত। আবার বিকেল বেলায় সেদিনের মতো কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার পরে নতুন যা যা কিছু পাওয়া গেল সেগুলোর ছবি তুলত। সব মিলিয়ে হাজারের ওপরে ছবি তুলেছিল আবদৌ।

‘১৯২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের একটা ভোরবেলা। অন্য বাকি দিনগুলোর মতোই আবদৌ আজও পৌঁছে গেছে সাইটে। খুফুর পিরামিডের পূর্বদিকে একটা উঁচু জায়গা দেখে ট্রাইপড বসাতে গেল। কিন্তু কী অদ্ভুত! খরখরে বালির মধ্যেও ট্রাইপডটা স্লিপ করে গেল! ভাগ্যিস ক্যামেরার স্ট্র্যাপটা গলা দিয়ে ঝোলানো ছিল! নয়তো ওইটার বারোটা বাজত। আবদৌ এবারে ওইখান থেকে আরেকটু সরে এসে ট্রাইপড বসাল। কিন্তু খেয়াল করল ট্রাইপডটা বালির নীচে একটু একটু করে ডুবে যাচ্ছে। এমনটা তো হওয়ার কথা নয়। তাহলে কি এখানে বালির নীচে অন্য কিছু আছে? সামান্য একটু বালির আস্তরণ হাত দিয়ে সরাতেই সেই অন্য কিছুটা দেখতে পাওয়া গেল। ঝুরো ঝুরো ময়লা আর সাদা চুনাপাথরের গুঁড়ো! এমনটা তো এখানে থাকার কথা নয়। তাহলে কি...!

‘তখনই আবদৌ একছুটে ডেকে আনল অ্যালান রো-কে। শ্রমিকদের দিয়ে ওপরের বালি পরিষ্কার করিয়ে দেখা গেল একটা আয়তাকার গর্তের মুখ। সেখানে জমে থাকা চুনাপাথরের টুকরোগুলোকে সরানোর পরে বেরিয়ে এল বারো ধাপের একটা সিঁড়ি। কিন্তু সিঁড়ির শেষে কিছু নেই।’

‘যাহ! তার মানে ধাপ্পা!’

‘মোটেই তা নয়। সমাধি যাতে কেউ খুঁজে না পায় তাই সমাধির মুখ পাথরের টুকরো দিয়ে এইভাবেই বুজিয়ে রাখা হত। শ্রমিকরা এবারে নতুন উদ্যমে ভারী ভারী পাথরগুলোকে সরাতে লাগল। সিঁড়ি যেখানে শেষ হয়েছে সেখান থেকেই ন-মিটার গভীর গর্তে পৌঁছোনোর পরে একটা মসৃণ পাথর পাওয়া গেল। পাথরের পিছনেই একটা লুকোনো কুঠুরি, যেখানে রাখা আছে একটা মানুষের মাথার খুলি আর ষাঁড়ের তিনটে পায়ের হাড়।’

‘মাথার খুলি না হয় বুঝলাম। কিন্তু ষাঁড়!’

‘হ্যাঁ, দেবতাকে খুশি করার জন্য ষাঁড়ের বলি দেওয়া হত। রো এই হাড় দেখেই নিশ্চিত হলেন যে খুব কাছাকাছিই কোনো সমাধি আছে। গর্তটা আরও গভীর হতে হতে পঁচিশ মিটারে এসে থামল। এবারে একটা বড়ো পাথরের চাঁই সরাতেই বেরিয়ে পড়ল একটা অন্ধকার ঘর! কিন্তু মাটির অত নীচে থাকা সেই ঘরে সূর্যের আলো তো পৌঁছোতেই পারছে না। শ্রমিকরা এবারে দারুণ একটা বুদ্ধির আশ্রয় নিল। কাচের আয়না দিয়ে সেই খাড়াই গর্তের মধ্যে সূর্যের আলো ফেলা হল। তারপরে সেই আলো রিফ্লেক্ট করানো হল আরেকটা আয়নায়, তারপরে আরেকটায়, এইভাবে অন্ধকার ঘরটাতে অবশেষে আলো এসে পৌঁছোল। ওই আলোয় ঘরের যেটুকু দেখা গেল তাতেই চোখ ধাঁধিয়ে গেল সবার!

‘ঘরের মেঝে জুড়ে ছড়িয়ে আছে সোনার টুকরো! কাঠের বড়ো পালঙ্ক, চেয়ার রাখা আছে। সেগুলোও জায়গায় জায়গায় সোনায় মোড়া। কাঠের একটা বড়ো বাক্স পাওয়া গেল। তাতে আটখানা ছোটো ছোটো পাথরের কৌটো রাখা, যার মধ্যে রাখা আছে সুগন্ধি তেল। মেয়েদের সাজগোজের সরঞ্জামও পাওয়া গেল। আর আছে অ্যালাবাস্টার পাথরের একটা কফিন! নাও পিজি, এবারে তোমার হেতেফেরিসের কবরে পৌঁছে গেছি।’

রানির অ্যালাবাস্টােরর কফিন

পিজি একটু গোমড়া মুখ করে বলল,

‘বুঝলেন কী করে যে ওটা অন্য কারোর নয়, হেতেফেরিসেরই?’

‘নাম লেখা ছিল যে।’

‘অ্যাঁ, নাম লেখা ছিল?’

‘হ্যাঁ, একটা কাঠের পাতের ওপরে লেখা ছিল,

“উপরের আর নীচের ইজিপ্টের মাতা, হোরাসের অনুগামী, রানি হেতেফেরিস!”

আমি এবারে বললাম,

‘তাহলে হেতেফেরিসের এই সমাধির খোঁজ ডাকাতরা আর পায়নি।’

‘না পায়নি, তাই তো এত কিছু পাওয়া গিয়েছিল এর মধ্যে। তবে এবারে মুশকিলটা হল অন্য জায়গায়। জর্জ রেসনার হার্ভার্ড থেকে ফিরে আসার পরে হেতেফেরিসের সমাধির জিনিসপত্রগুলো বের করা শুরু হয়। সাড়ে চার হাজার বছরের পুরোনো কাঠের খাট, চেয়ার, বাক্সগুলোর হাল খুব খারাপ ছিল। অনেকগুলো জায়গাতে শত টুকরো হয়ে পড়ে ছিল মেঝেতে। সেইসব টুকরোগুলোকে খুব সাবধানে গুছিয়ে ওই পঁচিশ মিটার লম্বা গর্ত থেকে বের করতে লেগে গেল ৩২১ দিন। মাটিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ছোটো ছোটো সোনার টুকরোগুলো ওই আসবাবপত্র থেকেই খসে পড়েছিল। মোম গলিয়ে মাটিতে ফেলে তোলা হল ওগুলোকে। কিন্তু এই শত সহস্র টুকরোগুলোকে জোড়া লাগাবে কে? রেসনার নিজে পৃথিবীর তাবড় তাবড় এক্সপার্টের দ্বারস্থ হলেন। তাতেও কোনো সুবিধা করে উঠতে পারলেন না। শেষে কায়রো মিউজিয়ামের ডিপার্টমেন্ট অফ অ্যান্টিকুইটি থেকে পাঠানো হল আহমেদ ইউসুফ নামের একজনকে। রেসনার প্রথম প্রথম তাকে পাত্তা দেননি। কিন্তু চারিদিকে অনেক চেষ্টা করেও কোনো আশার আলো না দেখে রেসনার যখন হাল ছেড়ে দিতে বসেছেন তখন আহমেদ ওঁকে বললেন,

‘‘সুযোগ পেলেই আমি এই টুকরোগুলো জুড়ে দিতে পারি।’’

এই কথায় রেসনার বেশ হাসলেন। কিন্তু আহমেদ একদম অবিচলিতভাবে আবার বললেন,

‘‘আমাকে এক সপ্তাহ একদম একা ছেড়ে দিন।’’

এক সপ্তাহও লাগল না, ছ-দিনের মাথাতেই রেসনার অবাক হয়ে দেখলেন আহমেদ একটা গোটা বাক্স জোড়া লাগিয়ে ফেলেছেন। ওপরের সোনার সূক্ষ্ম কাজ নিয়ে! এই ঘটনার পরে রেস্টোরেশনের কাজটা রেসনার আহমেদের ওপরেই ছেড়ে দেন। আহমেদ একে একে রানির খাট আর চেয়ারগুলোও জোড়া লাগিয়ে ফেলেন। এগুলো এখন কায়রোর মিউজিয়ামে রাখা আছে।’

‘আর হেতেফেরিসের মমি?’

আহমেদ ইউসুফ যে বাক্সটা জোড়া লাগিয়েছিলেন

‘হ্যাঁ, এবারে তার কথায় আসি। হেতেফেরিসের অ্যালাবাস্টার কফিনটা দারুণ ভালো অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল। ৩ মার্চ, ১৯২৭ সালে জর্জ রেসনার এই কফিনটা খোলেন। কিন্তু ভেতরে কিছু পাননি। হেতেফেরিসের মমি হাওয়া! অথচ কফিনের সঙ্গেই চারটে ছোটো ছোটো পাথরের জারও পাওয়া গিয়েছিল। ওগুলোর মধ্যে ছিল হেতেফেরিসের ফুসফুস, স্টমাক, লিভার আর ইনটেস্টাইন।’

রানির বসার চেয়ার, শোওয়ার খাট

‘হেতেফেরিসের মমিটা তাহলে গেল কোথায়?! ওটাকে তো দাশুর থেকে তুলে নিয়ে এসে গিজার ওই কবরেই রাখা হয়েছিল বললেন?’

‘না তো, আমি কি বলেছি হেতেফেরিসের মমিসুদ্ধু সব কিছু আনা হয়েছিল দাশুর থেকে?’

‘মানে?’

‘মানে, মিথ্যে।’

‘মিথ্যে?’

‘হ্যাঁ, ফারাও খুফুকে সেদিন মিথ্যে কথা বলা হয়েছিল। ডাকাতরা হেতেফেরিসের সমাধি লুঠ করার সময় মমিটাকেও নষ্ট করে ফেলে। খুব সম্ভবত মমির গায়ে লাগানো সোনার জুয়েলারি আর দামি পাথরের জন্যই। কিন্তু সেই খবর খুফুকে দিলে কারোর শরীরে আর মাথা থাকত না। তাই সুকৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছিল ঘটনাটাকে। খুব তাড়াহুড়ো করে দাশুর থেকে সমাধির যেটুকু অবশিষ্ট ছিল সেইটুকুকে তুলে নিয়ে চলে আসা হয় গিজার সমাধিতে। ফাঁকা কফিনটাও সেই সময়েই নিয়ে এসে রেখে দেওয়া হয়। খুফু তো আর কফিন খুলে মৃত মায়ের মমি দেখতে চাইতেন না!’

‘কিন্তু এই ঘটনাটা জানা গেল কীভাবে? কোথাও লেখা ছিল নাকি?’

‘না, লেখা থাকবে কী করে? হেতেফেরিসের ফাঁকা কফিনের কারণটা জর্জ রেসনারেরই হাইপোথিসিস বলতে পারো। পাক্কা গোয়েন্দার মতো তিনি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন।’

‘কীভাবে!’

‘হেতেফেরিসের সমাধিতে ঢুকেই রেসনার খেয়াল করেন সমাধিতে অনেক আসবাবপত্র থাকলেও সেগুলো সব অগোছালোভাবে রাখা আছে। যেন কেউ খুব তাড়াহুড়ো করে কাজটা করতে চেয়েছে। তার একমাত্র লক্ষই ছিল যত জলদি সম্ভব হেতেফেরিসের জিনিসপত্রগুলোকে এক জায়গাতে রেখে সমাধিটা বন্ধ করে দেওয়া। আর পাথরের জারগুলোতে পাওয়া দেহের অংশই বলে দিচ্ছে যে কফিনের মধ্যেও একসময় হেতেফেরিস শুয়েছিলেন।’

‘তার মানে মমিটা সত্যিই পাওয়া যায়নি!’

‘না, যায়নি। তবে পরে আবার সেটা কফিনে ফিরেও আসেনি। শুনতে খারাপ লাগলেও এই জায়গাতে সুনীল গাঙ্গুলি ভুল ছিলেন। তাও ওঁর জন্যই তোমরা হেতেফেরিসের নামটা অন্তত শুনেছিলে।’

‘তবে বুঝলে মানিকজোড়, বইটাতে আরও দুটো ভুল আছে। হেতেফেরিসের সমাধির বর্ণনা ঠিক নেই। ১২৪ নম্বর পাতায় “কি অফ লাইফ”-এর ছবিটাও ভুল আঁকা আছে।’

‘কি অফ লাইফ!’

‘হুমম, সেটা কী জিনিস পরে বলব ’খন। এখন চলো, ওঠা যাক। অনেকক্ষণ ধরে ফাঁকা প্লেট সামনে রেখে আমরা গল্প করে যাচ্ছি। রেস্টুরেন্টের লোকেরা না তেড়ে আসে।’

দিলখুশা থেকে বেরিয়ে এম জি রোডের ওপরে এসে দাঁড়ালাম। ভবেশদা শিয়ালদার বাস ধরে নিলেই আমরা উলটোদিকে হোস্টেলের পথে হাঁটা লাগাব। দূরে দেখলাম শিয়ালদার বাস আসছে। ভবেশদা সেইদিকে তাকিয়ে বলল,

‘তোমাদের তাহলে গিজার পিরামিড চত্বরের প্রায় সব কিছুই বলে দিলাম, বাকি রয়ে গেল শুধু হোর-এম-আখেতের গল্প।’

‘হোর-এম-আখেত? সেটা কী?’

‘সেটা? সেটা হল…

স্ফিংস!!’

বলেই ভবেশদা টপ করে বাসে উঠে পড়ল।

স্ফিংস

‘আচ্ছা, বলো দেখি, সেটা কী যেটা ভোরবেলায় চারপেয়ে, দুপুরে দু-পেয়ে আর সন্ধেবেলায় তিনপেয়ে?’

এ শহরে শীত বলে কিছু নেই যেন। ঠান্ডাটা এই জানুয়ারি মাসেই অনেক কমে গেছে। তার সঙ্গে সেই চ্যাটচ্যাটে ঘামটাও ফিরেছে। সন্ধের দিকটায় তবু একটু হাওয়া দিচ্ছিল। আমরা তিনজনে বেনুদার দোকানে বসে ছিলাম। পিজি গ্লোবাল ওয়ার্মিং নিয়ে কী সব হাবিজাবি জ্ঞান দিচ্ছিল। হঠাৎই ভবেশদা ধাঁধাটা জিজ্ঞাসা করলেন আমাদের।

আমি বললাম,

‘ধাঁধা? কী ব্যাপার? আগের দিন কীসের গল্প বলবেন বলেছিলেন সেটা মনে আছে তো?’

‘মনে আছে রে বাবা। তাই তো ধাঁধাটা জিজ্ঞাসা করলাম। তোমরা এর উত্তর ভাবতে থাকো। আমি ততক্ষণে সাড়ে তিন হাজার বছরের পুরোনো একটা গল্প বলি, শোনো।

‘গ্রীষ্মকালের একটা দিন, খুফুর পিরামিড তৈরির হাজার বছর পরের কথা। রাজকুমার চতুর্থ তুতমোসিস গিজার মরুভূমিতে হরিণ শিকার করতে বেরিয়েছিলেন। দুপুরের দিকে মাথার ওপরের গনগনে সূর্য থেকে বাঁচতে একটা বড়ো পাথরের আড়ালে গিয়ে বসলেন। একটু পরেই ক্লান্ত চোখে ঘুম নেমে এল।

‘আচমকা তুতমোসিসের সামনে এসে দাঁড়ালেন দেবতা হোরাস! হোরাস তুতমোসিসকে বললেন বালির মধ্যে ডুবে থাকা তাঁরর মূর্তিটাকে বাঁচাতে। তাহলেই নাকি তুতমোসিস হবেন ভবিষ্যতের ফারাও!

‘ধড়ফড় করে উঠে বসলেন তুতমোসিস। স্বপ্ন দেখছিলেন এতক্ষণ ধরে! কিন্তু ফারাও কী করে হবেন তিনি? বাবা আমেনহোটেপের চতুর্থ সন্তান তিনি। প্রথম সন্তানেরই তো ফারাও হওয়ার কথা। যাই হোক, যে পাথরের ছায়ায় তুতমোসিস এতক্ষণ ঘুমোচ্ছিলেন এবারে সেটাকে ভালো করে দেখলেন। একটা মাথার আদল মনে হচ্ছে না?

‘বেশ কয়েক মাস ধরে শ্রমিকদের সাহায্যে পাথরের চারপাশের বালি সরানো সম্ভব হল। যেটা বেরিয়ে এল সেটা দেখে তুতমোসিস অবাক হয়ে গেলেন! তাঁরর সামনে বসে আছে একটা বিশাল সিংহ! তার মুখটা মানুষের। তুতমোসিস মূর্তিটার একটা ভাঙা পা সারালেন। লাল, নীল আর আর হলুদ রংও করালেন মূর্তিটার। তারপরে বসে থাকা সিংহটার দু-পায়ের মাঝখানে একটা শিলা বসালেন, যাতে লেখা হল তুতমোসিসের স্বপ্নের কথা। এখানেই এই ভগবানের নাম দেওয়া হল হোর-এম-আখেত, যার মানে হল দিগন্তের হোরাস। অবাক কাণ্ড এই যে, বাকি তিন ভাইকে টপকে তুতমোসিস ফারাও হয়ে গেলেন! ফারাও তুতমোসিসই পৃথিবীর প্রথম আর্কিয়োলজিস্ট। তুতমোসিসের বসানো সেই শিলার নাম এখন ড্রিম স্টেলা।’

অতীতের আলোকচিত্রে স্ফিংস

অ্যাসটেরিক্স কমিকসে স্ফিংসের নাক ভাঙার কাল্পনিক কাহিনি

পিজি এবারে বলল,

‘বুঝেছি। আর ওই বিশাল মূর্তিটাই হল স্ফিংস। কিন্তু স্ফিংসটা বানাল কে?’

লাক্সরের মন্দিরের বাইরে অ্যাভেনিউ অফ স্ফিংস

‘এ নিয়ে অনেক ধন্দ আছে, বুঝলে। স্ফিংসের বয়স ঠিক কত সেটা কেউ জানে না। স্ফিংস কে, কেন বানিয়েছিলেন সেটা কোথাও লেখা নেই। অনেকে ভাবে খুফুর সন্তান খাফরে, যিনি গিজার দ্বিতীয় পিরামিড বানিয়েছিলেন, তিনিই বানিয়েছিলেন স্ফিংসকে। স্ফিংসের মুখটা খাফরেরই। কেউ কেউ আবার বলে, না খাফরে না, স্ফিংস বানিয়েছিলেন খাফরের আরেক ভাই দেজাফ্রে। আবার অনেকে বলে, স্ফিংস খুফুর পিরামিডেরও আগের। তবে ইজিপ্ট দেশটা জুড়ে কিন্তু আরও অনেক স্ফিংস ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। কোনো মন্দির বা ফারাওয়ের সমাধির বাইরে স্ফিংসের মূর্তি রাখার চল ছিল। মিশরীয়রা ভাবত স্ফিংসই সেই মন্দিরকে পাহারা দেবে। লাক্সর আর কার্নাকের দুটো মন্দিরের মাঝের রাস্তার দু-ধারে রাখা ছিল হাজারেরও ওপরের স্ফিংস। এতগুলো একইরকম মূর্তি থাকলেও গিজার স্ফিংস বিখ্যাত ওর আকারের জন্য। লম্বায় তিয়াত্তর মিটার, উচ্চতায় কুিড় মিটার।’

আমি এবারে বললাম,

‘আচ্ছা, স্ফিংসের মুখটা এরকম ভাঙা কেন?’

‘সেটারও একটা গল্প আছে, বুঝলে। ১৩৭৮ সাল, মিশরে তখন ইসলাম ধর্ম একটু একটু করে ঢুকছে। স্থানীয় মানুষ সেই সময় স্ফিংসের পুজো করত। ওরা ভাবত এই স্ফিংসের জন্যই নীল নদে বন্যা আসে, যার জন্য নদীর দু-পাশের জমি উর্বর হয়। গিজাতে শেখ-সাইম-আল-দার নামের একজন সুফি ছিল। ইসলামে তো মূর্তিপুজোর চল নেই। এই সুফি একদিন রেগে-মেগে একটা ছেনি বাটালি নিয়ে স্ফিংসের ওপরে চড়াও হয়। ভেঙে দেয় স্ফিংসের নাকটা। তারপরে নাকি হোরাসের অভিশাপে চারপাশের গ্রামগুলো বালিতে ঢেকে যায়। গ্রামবাসীরা তখন সেই সুফিকে পিটিয়ে মেরে ফেলে। স্ফিংসের ভাঙা নাকের টুকরোগুলো খুঁজে পাওয়া যায়নি। যদিও থুতনির কাছে লেগে থাকা একটা লম্বা দাড়ি পাওয়া গিয়েছিল। সেই দাড়ির টুকরোটা এখন আছে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে।’

‘আমাদের কলকাতা মিউজিয়ামেই তো স্ফিংস রাখা আছে, তাই না?’

‘হ্যাঁ, আছে তো। মমির ঘরটাতে ঢোকার মুখেই রাখা আছে একটা পাথরের মাঝারি স্ফিংস। তবে মিউজিয়াম ছাড়াও কলকাতার আরেকটা জায়গাতে স্ফিংস রাখা আছে, একটা নয় আবার, একজোড়া। কোথায় বলো তো? হালের ইকো পার্কের স্ফিংসটা বাদ দিয়ে বলো।’

‘কলকাতাতে আরও দুটো স্ফিংস? কোথায়? জানি না তো!’

মিউজিয়ােম রাখা স্ফিংসের দািড়

‘শুনলে অবাক হবে, রাজভবনের ছোটো গেটের ওপরে। ছ-ফুট মতন লম্বা। টেরাকোটার ওপরে চুনের প্রলেপ দিয়ে বানানো। তার মধ্যে একটা ২০০৯ সালের আয়লাতে ভেঙে যায়। এগুলো কেন বানানো হয়েছিল কেউ জানে না। আরও অবাক করা একটা জিনিস তোমাদেরকে বলি। ব্রিটিশ মিউজিয়ামে ১৯১৫ সালে কাঠের ওপরে আঁকা একটা কালী ঠাকুরের ছবি আছে। এই কলকাতা থেকেই গিয়েছিল সেই ছবি। ছবিতে ঠাকুরের মাথার ওপরের যে চালা থাকে তার দু-পাশে দুটো স্ফিংস আঁকা আছে!’

‘বলেন কী! মা কালীর ছবিতেও স্ফিংস!’

কলকাতা রাজভবনের গেটের উপরে স্ফিংস

‘ইতিহাস বড়ো অদ্ভুত, স্পন্দন ভাই। এই স্ফিংসগুলোর এই কলকাতায় বসে থাকার কোনো কারণ আমি জানি না।’

পিজি এবারে বলল,

‘ভবেশদা, আমি শুনেছিলাম স্ফিংসের ভেতরে নাকি লুকোনো ঘর আছে। এটা কি সত্যি?’

কালী ঠাকুেরর ছবিতে স্ফিংস

‘কিছুটা সত্যি, বুঝলে। ১৯৮৭ সালে টোকিয়োর ওয়াসেদা ইউনিভার্সিটি থেকে একটা টিম এসে স্ফিংসের শরীরের ইলেকট্রোম্যাগনেটিক পরীক্ষা করে। ১৯৯১ সালে জন ওয়েস্ট নামের এক বিজ্ঞানী আবার স্ফিংসের পরীক্ষা করেন সিসমিক রিফ্র্যাকশন দিয়ে। দু-বারেই যে তথ্য সামনে আসে তাতে চমকে যায় সবাই! স্ফিংসের শরীরের মধ্যে দুটো ফাঁপা জায়গার আভাস পাওয়া গেছে। ওর দু-পায়ের মাঝেও মাটির নীচে দুটো ঘর আছে নাকি। কিন্তু সেগুলো খুঁড়ে দেখার পারমিশন কাউকে এখনও দেওয়া হয়নি।’

‘কেন?’

স্ফিংসের নীচের গুপ্তঘর

‘কারণ স্ফিংসের অবস্থা এখন বেশ খারাপ। কায়রো শহরের পলিউশনে মূর্তিটার অনেক ক্ষতি হচ্ছে। প্রায় ২০০০ পাথরের টুকরো ছ-বছর ধরে জোড়া লাগানো হয়েছে। এখন স্ফিংসের বাঁ-কাধের রেস্টোরেশন চলছে। সংরক্ষণের সব কাজ শেষ হলে হয়তো মাটির নীচের ঘরগুলোর খোঁজ শুরু করা যাবে। ততদিন স্ফিংস নিজের রহস্য নিজের কাছেই রেখে দেবে।’

আমি এবারে বললাম,

‘আপনি বললেন স্ফিংসের উল্লেখ মিশরের কোনো প্রাচীন লেখাতেই নেই। আর এখন স্ফিংসের মুখটাও তো ভাঙা। তাহলে আসলে এটাকে কেমন দেখতে ছিল সেটা কেউ জানতেই পারবে না কোনোদিন?’

‘ভালো প্রশ্ন করেছ, স্পন্দন ভায়া। তোমাদের তাহলে একটা পাগলা লোকের গল্প বলি। আমেরিকান ইজিপ্টোলজিস্ট মার্ক লেনার। এই লোকটার গোটা জীবনের একটাই লক্ষ্য, সেটা হিল স্ফিংসের সংরক্ষণ। একসময় মার্ক লেনার বছরের পর বছর কাটিয়েছেন ইজিপ্টে। গিজার ধু-ধু মরভূমিতে স্ফিংসের দু-পায়ের মাঝখানে তাঁরবু বানিয়ে থেকেছেন একটানা। নাওয়া-খাওয়া ভুলে মূর্তিটার মাথা থেকে পা অবধি খুঁটিয়ে পরীক্ষা করেছেন। স্টিরিয়োস্কোপিক ক্যামেরা দিয়ে প্রতিটা অ্যাঙ্গল থেকে স্ফিংসের অজস্র ছবি তুলেছিলেন লেনার। পরে তিনি এই ছবিগুলো দেন আমেরিকান আর্কিটেক্ট টমাস জ্যাগারসকে। জ্যাগারস এবারে ছবিগুলোর হেল্প নিয়ে কম্পিউটারে স্ফিংসের থ্রি-ডাইমেনশনাল একটা ছবি বানিয়ে ফেলেন! যে যে জায়গাগুলো ক্ষয়ে গেছে সেখানগুলোও ভরে ফেলেন। বাকি থাকল শুধু মুখটা। লেনার এবারে জ্যাগারসকে স্ফিংসের আশেপাশের সময়কার প্রায় সব ফারাওদের মুখের ছবি দেন। অবাক করার ব্যাপার হল এই যে, সবার মুখের মধ্যে শুধু ফারাও খাপরের মুখটাই স্ফিংসের সঙ্গে একদম মিলে গেছে। এখন তোমরা একটু গুগল করলেই স্ফিংসের এই রিকনস্ট্রাকটেড ছবিটা দেখতে পাবে।’

থ্রিডি রিকনস্ট্রাকশনের পর ও বর্তমানে স্ফিংস

একটানা এতটা বলে ভবেশদা একটু থামল। তারপরে প্লাস্টিকের জগ থেকে ঢকঢক করে অনেকটা জল খেয়ে বলল,

‘উফফ, অনেক বকাও তোমরা আমাকে। স্ফিংসের গল্প তো শুনলে। এবারে বলো তো এই নামটার মানে কী?’

‘নামের মানে? সেভাবে তো কখনো ভেবে দেখিনি।’

‘স্ফিংস শব্দটা কিন্তু ইজিপশিয়ান নয়, গ্রিক। গ্রিকদের সঙ্গে ইজিপশিয়ানদের ব্যাবসা-বাণিজ্যের খাতিরে বেশ ভালো যোগাযোগ ছিল। তাই খুব স্বাভাবিকভাবেই ওরা ইজিপ্টে ওই অদ্ভুত জীবের মূর্তি দেখে এসেছিল। তারপরে কখন যে স্ফিংস গ্রিক মাইথোলজির একটা অংশ হয়ে গেল সেটা কেউ জানে না।’

‘বলেন কী! গ্রিক মাইথোলজিতেও স্ফিংস!’

ইডিপাস আর স্ফিংস

‘হ্যাঁ, ঠিকই শুনছ। গ্রিক পুরাণে স্ফিংস হল একটা রাক্ষস, যার শরীরটা একটা সিংহীর, মুখটা মেয়ের, তার একজোড়া ইগলের ডানা আছে, লেজটা আবার সরীসৃপের। এই স্ফিংস নাকি থেবস নামের এক শহরকে পাহারা দেয়। শহরে যে-ই ঢুকতে যায় তাকেই স্ফিংস একটা ধাঁধা জিজ্ঞাসা করে। তার উত্তর দিতে না পারলেই স্ফিংস সেই লোকটার গলা টিপে মেরে ফেলে তাকে খেয়ে নেয়। গ্রিক শব্দ স্ফিংগো থেকে স্ফিংস শব্দটা এসেছে। স্ফিংগো মানে নিংড়ে নেওয়া।’

‘তাহলে স্ফিংসের ধাঁধার উত্তর কেউ দিতে পেরেছিল?’

‘পেরেছিল তো। ইডিপাসের নাম শুনেছ নিশ্চয়ই?’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ, ফ্রয়েডের ইডিপাস কমপ্লেক্সের নাম শুনেছি।’

‘ঠিক, এই ইডিপাস ছিলেন একজন গ্রিক বীর। ওঁর গল্প তোমাদের অন্য কোনো একসময় বলব না হয়। যাই হোক, ইডিপাস যখন থেবস শহরে ঢুকতে যান তখন স্ফিংস ওঁকে একটা ধাঁধা জিজ্ঞাসা করে। ইডিপাসই প্রথম যিনি ওর উত্তরটা পেরে যান। এর পরেই পাহাড়ের চুড়ো থেকে লাফিয়ে স্ফিংস আত্মহত্যা করে।’

পিজি এবারে বলল,

‘হুম, এই ইডিপাস ভদ্রলোক দেখছি বেশ স্মার্ট ছিলেন। তা ধাঁধাটা কী ছিল?’

ভবেশদা এর উত্তর না দিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসতে লাগলেন। এবারে সব কিছু পরিষ্কার হল আমার কাছে!

‘বুঝেছি, বুঝেছি! আপনার প্রথমে বলা ধাঁধাটাই স্ফিংস ইডিপাসকে জিজ্ঞাসা করেছিল! সেটা কী যেটা ভোরবেলায় চারপেয়ে, দুপুরে দু-পেয়ে আর সন্ধেবেলায় তিনপেয়ে?’

‘ঠিক, এবারে বলো দেখি উত্তরটা।’

আমরা এবারে একে অন্যের মুখের দিকে চাইলাম, পিজি বলল,

‘আপনার গল্পটা শুনতে শুনতেই ভাবছিলাম উত্তরটা। কিন্তু কিছুই মাথায় আসছে না তো।’

‘হুম, তাহলে তো তোমরা স্ফিংসের খাদ্য হতে!’

‘আপনি জানেন নাকি উত্তরটা?’

‘জানি তো।’

‘কী?!’

ভবেশদা এবারে আমাদের দু-জনের খুব কাছে মুখটা এনে ফিসফিস করে বলল,

‘মানুষ!!’

ওবেলিস্ক

গত শনিবার বইমেলাতে গিয়েছিলাম। আমি আর পিজি দু-জনে যাব বলেই ঠিক হয়েছিল। কিন্তু সাড়ে দশটা নাগাদ হোস্টেল থেকে বেরিয়ে পিজি বলল, ‘চল, দেখি ভবেশদা কী করছেন।’ আমাদের চলমান মিশরীয় এনসাইক্লোপিডিয়া তখন সবেমাত্র গুমটিটা খোলা শুরু করেছিলেন। কিন্তু সে-গুমটি আর তাঁরর খোলা হল না, আমি আর পিজি ওঁকেও বগলদাবা করে উঠে বসলাম করুণাময়ীর বাসে। ভবেশদা প্রথমে একটু গাঁইগুঁই করছিলেন বটে, সেন্ট্রাল পার্কে নাকি বইমেলার আমেজটাই পাওয়া যাবে না। তাই তিনি এবারে আর যাবেন না মেলাতে। কিন্তু পিজি ওর ব্রহ্মাস্ত্রটা বের করেছিল তখনই। তারপরে আর ভবেশদা না করতে পারেননি। বেনফিশের ফিশ কাটলেটকে না বলবে এমন বাঙালি খুব কমই আছে।

আট নম্বর গেট দিয়ে মেলায় ঢুকলাম। জায়গাটা ছোটো, তাই খুব একটা খোলামেলাভাবে স্টলগুলো ছিল না এবারে, বড়ো বড়ো পাবলিশারদের স্টলগুলোও যেন মাপে একটু ছোটো। তবে অবাক হওয়ার ব্যাপার এইটাই যে ভিড়টা বেশ কম। মেলাতেই এক স্টলের মালিকের কাছে শুনলাম চিংড়িঘাটাতে নাকি একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। ওইদিকের রাস্তা একেবারে বন্ধ। তাই অনেকেই চাইলেও বইমেলার দিকে আসতে পারছে না। এতে আমাদের যদিও বেশ ভালোই হল। মোটামুটি কোনো স্টলেই লাইনে দাঁড়াতে হল না। রাজার মতো ঢুকলাম। স্টলের ভেতরে ধাক্কাধাক্কিটাও এড়ানো গেল। অবশ্য ওই ভিড়ে ঠেলাঠেলি করতে করতে বই দেখা, বই কেনারও একটা আলাদা মজা আছে।

গোটা মেলাটা ঘুরে দেখতে ঘণ্টাতিনেক মতো লাগল। মেলাতে বইয়ে তেমন ডিসকাউন্ট পাওয়া যায় না। অন্যদিকে আজকাল বাড়িতে বসেই অনলাইনে বেশ ভালো ছাড়ে বই কেনা যায়। কিন্তু তবু বইমেলাতে এসে বই না কিনে ফিরতেও কেমন একটা লাগে। বইয়ের গন্ধ নাকে এলেই মনে হয় কিনে ফেলি। আমি কিনলাম বুদ্ধদেব বসুর কালের পুতুল আর তিথিডোর। ভবেশদা কিছুই কিনলেন না। আর পিজি কিনল অ্যাস্টেরিক্স।

অ্যাস্টেরিক্সের ওপরে পিজির একটা অদ্ভুত মোহ আছে খেয়াল করেছি। বাংলায় লেখা সবকটা বই তো ওর আছেই। ইংরেজিগুলোও কিনেছে ও। এমনকী ২০১০-এ আলবার্তো ইউদের্জো অ্যাস্টেরিক্স আঁকা আর লেখা ছেড়ে দেওয়ার পরেও যে দুটো বই বেরিয়েছিল সেগুলোও আছে পিজির কাছে। আমাকে ওগুলো পড়িয়েছিল, আমার কিন্তু আগের অ্যাস্টেরিক্সের মতো ভালো লাগেনি। কিছু একটা যেন নেই। তবে পিজিই আমাকে দেখিয়েছিল ২০১৫-তে বেরোনো অ্যাস্টেরিক্স অ্যান্ড দ্য মিসিং স্ক্রল-এ অ্যাস্টেরিক্সের সেই দুটো ছবি যেটা ইউদের্জো নিজে এঁকেছিলেন অবসর কাটিয়ে ফিরে এসে। সেই বছরেই প্যারিসে চার্লি হেবদোর দপ্তরে এলোপাথাড়ি গুলি চালিয়ে খুন করা হয় সাতজন কার্টুনিস্টকে। ওঁদের স্মৃতিকে সম্মান করেই যে ইউদের্জো ওই ছবিগুলো আঁকেন সেটাও পিজির কাছ থেকেই জানা। ছেলেটা এই কমিক্সটাকে গুলে খেয়েছে একেবারে। ২০১৭-র অক্টোবর মাসে যখন এই কমিক্সের সাঁইত্রিশ নম্বর টাইটল অ্যাস্টেরিক্স অ্যান্ড দ্য চ্যারিওট রেস বের হয় তখনই পিজি বলেছিল কিনবে। ওর এবারের বইমেলার সংগ্রহ ওই বইটাই।

মেলায় ঘুরে ঘুরে খিদেটা ভালোই পেয়েছিল। পিজির ভবেশদাকে দেওয়া কথামতো বেনফিশের স্টল থেকে দুটো ফিশ কাটলেট কেনা হল। পিজি নিজের জন্য কিনল চিংড়ির কাটলেট। তারপরে আমরা গুছিয়ে বসলাম আনন্দ-র স্টলের সামনে বড়ো চাতালটাতে। কাটলেট খেতে খেতেই পিজি অ্যাস্টেরিক্সটা বের করে পড়তে শুরু করল। আমি আর ভবেশদা গল্প করছিলাম। ১৯৯৭ সালে ময়দানের যে মেলাতে আগুন লেগেছিল তার কথা বলছিলেন ভবেশদা। ময়দানের মেলার যে আমেজটা ছিল সেটা মিলনমেলা বা এখানে একেবারে মিসিং সেসব কথাও উঠে এল।

একসময় পিজি হাতে-লেগে-থাকা কাটলেটের গুঁড়ো ঝাড়তে ঝাড়তে বলল,

‘বুঝলি, বইটা হাফ নামিয়ে দিলাম। ফেরি আর কনরাডের জুটি কিন্তু আগের দুটোর থেকে এটাকে বেটার বানিয়েছে।’

‘বলছিস?’

‘হুমম, তবে এই গল্পটা বািকগুেলার থেকে একটু অন্যরকম।’

‘তাই নাকি?’

‘হ্যাঁ, ওবেলিক্সকে দেখছি এবারে অনেকটা বেশি স্পেস দিয়েছে। অ্যাস্টেরিক্সের থেকেও বেশি। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে ও সাইডকিক না, মেন হিরোই।’

‘আচ্ছা, ওবেলিক্সের নামটা এমন কেন বলো দেখি?’

ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি ভবেশদা প্রশ্নটা ছুড়ে দিয়েই মুচকি হাসছে।

‘তা তো জানি না, ওই মেনহির পাথর চাগিয়ে ঘোরে বলেই কি?’

‘না ঠিক তা নয়, তবে ওই মেনরিরের সঙ্গে সামান্য মিল আছে বলতে পারো। ওবেলিক্স শব্দটা গ্রিক ওবেলিসকস থেকে এসেছে, যেটার উৎস আবার ওবেলস। এর মানে হল লম্বা পাথরের থাম, যার মাথাটা সূঁচলো। গ্রিকদের কাছে এটা ছিল শক্তির একটা প্রতীক। তবে জিনিসটা আদতে কিন্তু গ্রিক নয়।’

‘তাহলে?’

‘বিশাল উঁচু একটা থাম, একটাই পাথর কেটে তৈরি। তার মাথার উপরে বসানো একটা পিরামিড।’

‘এখানেও ইজিপ্ট!’

‘হ্যাঁ ভাই, ওই দেশটা না থাকলে আজকে হয়তো তোমার কমিকসের ওবেলিক্সের নামটাই অন্য কিছু হত।’

লাক্সর মন্দিরের ওবেলিস্ক

কাটলেটের সঙ্গেই কেনা কফিতে চুমুক দিয়ে ভবেশদা বলল,

‘পৃথিবীর সৃষ্টি হওয়া নিয়ে ইজিপশিয়ান মাইথোলজিতে অনেক রকমের গল্প আছে বুঝলে, তার মধ্যে একটা হল বেনু নামের এক পাখির। সৃষ্টিকর্তা নাকি বেনু পাখির রূপ ধরে একটা পাথরের ওপরে বসে আওয়াজ করেন। সেটাই প্রথম শব্দ। অসীম নিস্তব্ধতা ভেঙে সেই আওয়াজের সঙ্গেই জন্ম হয় পৃথিবীর। এই বেনু পাখির শরীর ছিল সূর্যের মতো উজ্জ্বল, একবার মারা যাওয়ার পরেও নাকি আবার সে বেঁচে ফিরত।’

‘অনেকটা ফিনিক্সের মতো না!’

‘অনেকটাই, গ্রিক পুরাণের বেশ কিছুটা মিশর থেকে ধার করা, এটাও হয়তো তার মধ্যে একটা। বেনু পাখি তৈরি হয়েছিল সূর্যের দেবতা ‘‘রা’’ আর মৃতদের দেবতা ‘‘ওসাইরিস’’কে মিলিয়ে। এবারে বেনু যে পাথরটায় বসে ডাক দিয়েছিল সেই পাথরটাই নাকি এই পৃথিবীর প্রথম বস্তু। এই পাথরটার নাম বেনবেন। উত্তর ইজিপ্টের হেলিওপলিসে ‘রা’-এর সঙ্গে সঙ্গে বেনবেনেরও পুজো হত। মিশরীয়রা এই বেনবেনের কল্পনা করেছিল পিরামিডের আকৃতিতে। আর সেখান থেকেই ওবেলিক্সের কনসেপ্টের সৃষ্টি। নেটে সার্চ ইজিপশিয়ান ওবেলিস্ক বলে সার্চ করো, তাহলেই পেয়ে যাবে।’

ওবেলিস্কের ছবিতে দেখলাম সত্যি একটা বিশাল পাথরের টুকরো, চারকোনা, গায়ে হায়রোগ্লিফ খোদাই করা। মাথাটায় একটা ছোটো পিরামিড। ভবেশদা বলতে লাগলেন,

‘ফারাওরা এই ওবেলিস্ক বানিয়ে ঈশ্বরের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার চেষ্টা করতেন, বুঝলে। ওবেলিস্কের গায়ে লেখা হত ফারাওয়ের গুণগান, আর ভগবানের স্তুতি। ওঁরা ভাবতেন মাটি থেকে অনেক উঁচু এই থামই ভগবানের কাছে রাজার বার্তা পৌঁছে দেবে। মাথার ওই ছোটো পিরামিডে খোদাই করা থাকত সূর্যদেবতা আর ফারাওয়ের ছবি। পিরামিডটা মোড়ানো থাকত সোনাতে। কারণ সূর্যের আলো পড়ে তা চকচক করে। আর তা ছাড়া ওরা ভাবত সোনা হল স্বয়ং ঈশ্বরের শরীরের মাংস, তাই খুব পবিত্র।

‘প্রথম ওবেলিস্ক তৈরি হয় টুয়েন্টিফিফথ সেঞ্চুরি বিসিতে। ফারাও উসারকাফের সময়। কিন্তু সেটা বানানো হয়েছিল চুনাপাথরের টুকরো একটার ওপরে আরেকটা সাজিয়ে। গোটা একটা পাথর কেটে ওবেলিস্ক বানানো শুরু হয় আরও পাঁচশো বছর পরে। প্রথম আর তৃতীয় তুতমোসিস, হাতসেপসুত, দ্বিতীয় রামেসিস এঁরা প্রচুর ওবেলিক্স বানিয়েছিলেন গোটা দেশ জুড়ে।’

পিজি এবারে বলল,

‘এগুলোর হাইট কেমন হত, ভবেশদা? দেখে তো বেশ উঁচুই মনে হচ্ছে।’

‘হ্যাঁ, মোটামুটি ধরো একটা দশতলা বাড়ির সমান।’

‘এত বড়ো একটা পাথর! ওভাবে বানাত কী করে! ওইটার ওজনও তো প্রচুর!’

‘ওবেলিস্ক বানানোর পদ্ধতিটা খুব ইন্টারেস্টিং ছিল, বুঝলে। সাধারণত গ্র্যানাইট, চুনাপাথর বা বালিপাথর কেটে বানানো হত। প্রথমে বিশেষজ্ঞরা পাথরের খনিতে গিয়ে একটা বড়ো পাথরের টুকরোকে পছন্দ করত। তারপরে সেই লম্বা পাথরের টুকরোর দু-পাশে দু-ফুট গভীর পরিখা কাটা হত। তার ভেতরে সারি দিয়ে বসত শ্রমিকেরা। তারা এবারে পাথরের টুকরোটাকে সমানভাবে কাটত। গা-টা পালিশ করত ডিওরাইটের মতো ভলক্যানিক পাথর দিয়ে। কারণ সেগুলো গ্র্যানাইটের থেকেও শক্ত হত। তারপরে তার গায়ে সম্রাটের আদেশ মতো হায়রোগ্লিফিক লিপি খোদাই করা হত। পাথরটাকে দু-পাশ থেকে কেটে চৌকো আকার দেওয়া হত। এবারে একদম শেষে পাথরের মাটিতে লেগে থাকা অংশটা ভাঙলেই তৈরি ওবেলিক্স!

যেভাবে ওবেলিস্ক তৈরি হত

‘তৈরি তো হল, কিন্তু এত ভারী জিনিসটাকে খনি থেকে তো নিয়েও যেতে হবে যেখানে বসাতে হবে সেখানে।’

‘হ্যাঁ, তারও পন্থা আছে বই কী। লাক্সরের মন্দিরের বাইরে বিশাল বড়ো একটা ওবেলিক্স আছে। সেটাকে কীভাবে আনা হয়েছিল, শোনো। আসওয়ানের খনিতে তো তাকে বানানো হল। তারপরে কাঠের পাটাতনের ওপরে চাপিয়ে তার নীচে কাঠের গুঁড়ি দিয়ে তাকে গড়িয়ে আনা হল নীল নদের তীরে। তারপরে সবাই অপেক্ষা করে রইল বর্ষার জন্য। বর্ষাকালে নীল নদে যখন বন্যা হল তখন জলের গভীরতা অনেক বেড়ে গেল। তখন সেই ওবেলিস্কটাকে একটা বিশাল নৌকোয় চাপিয়ে নিয়ে আসা হল লাক্সরে। এবারে আবার অপেক্ষা। কখন নদীর জল নামে। জল নেমে যাওয়ার পরে ওবেলিক্সকে আবার নৌকো থেকে নামিয়ে আগের মতো কাঠের পাটাতনের ওপরে চাপিয়ে নিয়ে আসা হল লাক্সরের মন্দিরের বাইরে। সেখানে আবার বালি দিয়ে একটা বিশাল উঁচু ঢিপি বানানো হল। তার গা বেয়ে এবারে ধীরে ধীরে দাঁড় করানো হল ওবেলিস্কটাকে। তারপরে বালি সরিয়ে নিতে যেটুকু সময় লাগে।’

যেভাবে ওবেলিস্ক দাঁড় করানো হত

‘বাবা রে! এ তো বিশাল ঝক্কির ব্যাপার! তবু ওদের ইঞ্জিনিয়ারিং স্কিলের তারিফ করতে হয়। কিন্তু ভবেশদা, একটা কথা বলুন, ওবেলিস্ক না হয় ফারাওদের সময় বেশ পপুলার ছিল। বললেন অনেকগুলো বানানোও হয়েছিল। কিন্তু আজকের আগে অবদি তো কখনো মিশরের কোনো ছবিতে এটাকে খেয়াল করিনি।’

‘সেটা না দেখারই কথা ভাই। কারণ বেশিরভাগ ওবেলিস্কই এখন সেদেশের বাইরে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ইউরোপ আর আমেরিকাতে।’

‘অত ভারী জিনিসও ওরা ছাড়েনি!’

‘ছাড়বে কেন? ওবেলিস্কগুলোকে দেখতেই তো দারুণ আকর্ষক ছিল। সেই রোমানদের সময় থেকে ওরা দেশছাড়া হওয়া শুরু করেছে। সম্রাট অগাস্টাস একটা ওবেলিস্ককে উপড়ে নিয়ে আসেন রোমে। সেই শুরু, তারপরে থিওডোসিয়াস আরেকটাকে আনেন কনস্ট্যান্টিনোপলে, যেটা এখন ইস্তানবুল। শ্যাম্পোলিয়নের কথা মনে আছে নিশ্চয়ই?’

‘মনে থাকবে না আবার! যিনি হায়রোগ্লিফ আবিষ্কার করেছিলেন।’

প্যারিসের ওবেলিস্ক

‘এগজ্যাক্টলি, সেই শ্যাম্পোলিয়ন যখন ইজিপ্টে ঘুরতে এসেছিলেন তখন লাক্সরের রামেসিসের মন্দিরের বাইরের একজোড়া ওবেলিস্কের মধ্যে একটাকে তুলে আনেন। সেটা এখন আছে প্যারিসে। আবার ব্রিটিশরা যখন ফ্রেঞ্চদের হারিয়ে দিল তখন ইজিপ্টের সুলতান ওদের একটা ওবেলিস্ক উপহার দেন। সেটা এখন লন্ডনে, থেমসের ধারে। ‘‘ক্লিওপেট্রা’স নিডল’’ নামেই এখন সবাই ওঁকে চেনে।’

‘বলেন কী! তার মানে ক্লিওপেট্রার সময়ে এটা তৈরি হয়েছিল।’

‘ধুস, সেই ফারাও ক্লিওপেট্রার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্কই নেই। এটা ফারাও তৃতীয় তুতমোসিসের সময়ের। তবে নামটা কেন হল সেটা বেশ মজার। প্রায় ২০০ টন ভারী ওবেলিস্কটাকে লন্ডনে নিয়ে আসার জন্য ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ার জন ডিক্সন লোহার একটা লম্বা সিলিন্ডারের মতো দেখতে ডিঙি বানান। এরই মধ্যে ওবেলিস্কটাকে ভরে ওল্গা নামের একটা জাহাজে করে সেই ডিঙিটাকে টেনে নিয়ে আসা হয় জলপথে। ডিক্সন ওঁর বানানো ডিঙির গালভরা নাম দিয়েছিলেন ‘‘ক্লিওপেট্রা’’। তাই সেই থেকে ওবেলিক্সটার নামও হয়ে যায় ক্লিওপেট্রা’স নিডল। এখন এটার সঙ্গে নিউইয়র্কে থাকা আরেকটা ওবেলিস্ক আর প্যারিসের ওবেলিস্ককেও ওই একই নামে ডাকে সবাই।’

লন্ডনের ওবেলিস্ক

‘আচ্ছা, ভবেশদা, ওই নিউইয়র্কের ওবেলিস্কটাই সেই ফরেস্ট গাম্প সিনেমাতে দেখিয়েছিল না! টম হ্যাংক্সের সেই বিখ্যাত স্পিচটা! আর তারপরে... উফফ কী দারুণ সিন ছিল!’

সিনেমার কথা বলার সময় হলেই পিজি উত্তেজিত হয়ে পড়ে দেখেছি। এবারেও সেরকমই হল। ভবেশদা ওর কথায় একটু হেসে উত্তর দিলেন,

‘না ভাই, ওইটা তো ওয়াশিংটন মনুমেন্ট। আমেরিকাতেই বানানো। ইজিপ্টের নয়। আইকন হিসেবে এটা এমনই স্ট্রং যে গোটা পৃথিবী জুড়েই অজস্র ওবেলিস্ক বানানো হয়েছে পরে।’

‘আমাদের দেশে এরকম কিছু নেই!?’

‘আমাদের এই শহরেই তো ছিল, ভায়া।’

‘তাই নাকি!’

‘হুম, হলওয়েল মনুমেন্টের নাম শুনেছ?’

‘শুনব না আবার! সিরাজদৌল্লার ফোর্ট উইলিয়াম দখলের পরে অন্ধকূপে ঠেলে দেওয়া হয় ব্রিটিশ বন্দিদের। তাতে মারা যান অনেকে। এর স্মৃতিতেই বানানো হয় হলওয়েল মনুমেন্ট।’

লন্ডনে যেভাবে ওবেলিস্ক এল। ২০০ টন ভারী ওবেলিস্ককে সিলিন্ডারের মতো ডিঙিতে (ক্লিওপেট্রা) ভরে জলপথে জাহাজ দিয়ে টেনে এনে স্থাপন করা হল লন্ডনে। (উপর থেকে নীচে)

‘বাহ! একদম ঠিক বলেছ, ১৭৫৬ সালে অন্ধকূপের হত্যাকাণ্ড হয়। সেই অন্ধকূপ থেকে যে কয়েকজন প্রাণ হাতে করে বেরিয়ে আসতে পেরেছিল তাদের মধ্যে একজন ছিলেন জন জেফানিয়া হলওয়েল। ১৭৫৯ সালে ইনিই উদ্যোগ নিয়ে হলওয়েল মনুমেন্ট বানান। এই মনুমেন্টটা ছিল ইজিপশিয়ান ওবেলিস্ক-এর আদলে।’

পিজি বলল,

‘বাহ! তাহলে এখন সেটা কোথায় গেল?’

‘সেটারও অনেক গল্প, ১৮২১ সালে ওয়ারেন হেস্টিংস হলওয়েল মনুমেন্ট ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেন। সেইসময়কার পাদরি জেমস লঙের মত অনুযায়ী যেহেতু এই মনুমেন্ট এদেশীয়দের হাতে ব্রিটিশদের লাঞ্ছনার প্রতীক তাই এটাকে ভেঙে ফেলাটাই বেটার বলে মনে করেন হেস্টিংস। তবে ১৯০২ সালের ১৯ ডিসেম্বরে আবার হলওয়েল মনুমেন্টের একটা ছোট্ট মার্বেলের রেপ্লিকা বানানো হয়, মনুমেন্টের আগের জায়গাতেই। সেটা বানান লর্ড কার্জন।’

‘ওকে, তার মানে রেপ্লিকাটা অ্যাটলিস্ট এখনও ওখানেই আছে।’

‘ধুস, গোটাটা শোনো আগে, ১৯৪০ সালে নেতাজি হলওয়েল মনুমেন্ট ভেঙে ফেলার জন্য আন্দোলন শুরু করেন। ঠিক হয় ৩ জুলাই, সিরাজের মৃত্যুদিনে এটাকে ভেঙে ফেলা হবে। ইংরেজরা বেগতিক বুঝে ২ জুলাই নেতাজিকে গ্রেফতার করে। কিন্তু তার পরেও আর রিস্ক নিতে চায়নি ওরা। কার্জনের বানানো রেপ্লিকাটাকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় সেন্ট জর্জ চার্চের প্রাঙ্গণে। এখনও ওখানেই আছে সেটা। কিন্তু আকারে এতটাই ছোটো এই রেপ্লিকা যে একে ওবেলিস্ক ঠিক বলা যাবে না, বুঝলে। তবে এদেশে একটা ওবেলিস্ক দাঁড়িয়ে আছে দিল্লিতে। আর এর সঙ্গেও আমাদের শহরের নাম জড়িয়ে আছে, জানো!’

রাইটার্স বিল্ডিং-এর সামনে হলওয়েল মনুমেন্ট (১৮২১ সােলর আগের ছবি)

‘তাই নাকি!’

‘হুমম, ১৯১১ সালের জুন মাসে ইংল্যান্ডের নতুন রাজা হন পঞ্চম জর্জ। সে-বছরেরই ১২ ডিসেম্বরে জর্জ আসেন দিল্লিতে। মুঘল রাজাদের আদলে পঞ্চম জর্জ দরবার বসান। সেইদিন একটা এমন ঘোষণা করেন যেটা স্মরণীয় করে রাখার জন্য একটা ওবেলিস্ক বানানো হয়। এখন সেটা আছে দিল্লির করোনেশন পার্কে।’

‘ঘোষণাটা কী ছিল?!’

‘আন্দাজ করতে পারো কি?’

যথারীতি অন্যবারের মতো এবারেও আমাকে আর পিজিকে চুপ করে থাকতে দেখে ভবেশদা নিজেই উত্তরটা দিয়ে দিলেন।

‘সেইদিনই আমাদের কলকাতা ব্রিটিশ রাজত্বের রাজধানীর তকমা হারায়। আর দিল্লি হয়ে যায় নতুন রাজধানী।’

খুফুর নৌকো

কালকে কলেজে প্যাথোলজির লেকচার ক্লাস চলছিল। আমি আর পিজি পিছনের দিকের একটা বেঞ্চে বসেছিলাম। অনেকক্ষণ ধরে লক্ষ করছিলাম বেটা মোবাইলে কী-একটা খুটখুট করছে, ক্লাসে মন নেই। ছুটির পরে বুঝলাম কারণটা।

‘ভবেশদাকে প্যাঁচে ফেলার মতো একটা জিনিস পেয়েছি, বুঝলি।’

‘ভবেশদাকে? কী সেটা?’

‘হুঁ হুঁ বাবা, ও কী ভাবে? ও মিশরের ইতিহাসের সব কিছু জানে? এমন একটা জিনিসের ব্যাপারে আজকে নেটে পড়লাম না, যেটা কোনো বাংলা বইতে লেখা নেই। আজ সন্ধেবেলায় চল ভবেশদার দোকানে। লোকটার নলেজের একটা অ্যাসিড টেস্ট হবে।’

পিজি একরকম টেনে নিয়েই গেল আমাকে ভবেশদার দোকানে। তখন ঘড়িতে বাজে সাড়ে ছ-টা।

‘কী ব্যাপার হে, মানিকজোড়? আজকে আবার গল্প শুনতে নাকি?’

পিজি বেশ গম্ভীর মুখ করে বলল,

‘ভবেশদা, খুফুর নৌকো নিয়ে কিছু বলতে পারবেন? না মানে, আমি একটু রিসার্চ করছিলাম নেটে...’

আমি ভাবলাম, খুফুর নৌকো? সেটা আবার কী জিনিস রে বাবা। ফারাও খুফুর নৌকো থাকতেই পারে। সেটা নিয়ে আবার কিছু জানার আছে নাকি? ভবেশদা কিন্তু পিজির মুখের কথা শেষ হওয়ার আগেই বললেন,

‘হুম, নেটে রিসার্চ করছিলে, ওই জিনিসটা গলিতে ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট খেলার মতো। তা কী পেলে তোমার রিসার্চে?’

পিজি রেগে গেলে কান দুটো লাল হয়ে যায়, এটা আমি বুঝতে পারি। আজকেও সেরকমই একটা ব্যাপার হল,

‘আমি নেটে কী পেলাম সেটা বলব পরে, আগে আপনি বলুন আপনি কী জানেন।’

‘আমি কী জানি? তা ভালো, না, খুব বেশি কিছু জানি না এ ব্যাপারে। তবে তুমি খুফুর কোন নৌকোর কথা বলছ?’

‘কোন নৌকো মানে? খুফুর তো একটাই নৌকো...’

‘উঁহু, একটা না, দুটো।’

‘দু... দুটো?’

‘হ্যাঁ ভাই, দুটো নৌকো তো, তুমি জানো না?’

এবারে পিজির ঢোঁক গেলার পালা। ও যখন মাথা চুলকোচ্ছে তখন আমি বললাম,

‘আপনারা কী কথা বলছেন আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না। খুফুর নৌকোর গল্পটা আজকে বলুন না তাহলে।’

‘না ভাই, আজকে বলার মতো মুড নেই। আসলে সকাল থেকে কেন জানি না গলাটা শুকিয়ে আছে, ঠান্ডা কিছু একটা পেলে...’

আমি বললাম,

‘কোনো ব্যাপার না, প্যারামাউন্টে চলুন, পিজি আজকে শরবত খাওয়াবে আমাদের। তাই না পিজি?’

ও আর কী বলবে? পরাজিত সৈনিকের মতো কাঁধ ঝুলিয়ে চলল আমাদের সঙ্গে।

সুড়ুৎ করে আওয়াজ করে ডাব শরবতে একটা চুমুক দিয়ে ভবেশদা বলল,

‘নৌকোর কথা ভাবলে প্রথমেই কি মাথায় আসে বলো তো?’

‘নদী?’

‘ঠিক, মানুষের মৃত্যুর পরের জীবনের সঙ্গে নদী অদ্ভুতভাবে জড়িয়ে আছে, বুঝলে। আমাদের পুরাণের কথাই ধরো না, মারা যাওয়ার পরে বৈতরণী নদী পার করে মৃত আত্মা পৌঁছে যাবে যমের দক্ষিণ দুয়ারে, যেখানে তার পাপ পুণ্যের বিচার হবে। সেই বিচার ঠিক করে দেবে সে স্বর্গে যাবে, নাকি, নরকে যাবে। আবার গ্রিক পুরাণের স্টাইকস নদীর কথা ধরো। এই নদী বেয়েও মৃত মানুষের আত্মা পৌঁছে যাবে নরকে, যেখানে তার বিচার করবে দেবতা হেইডিস। কিছুর সঙ্গে মিল পাচ্ছ এই গল্পের?’

‘পাব না আবার? মিশরের পুরাণেও তো মারা যাওয়ার পরে আত্মা যায় মাটির নীচের জগতে, ওসাইরিসের কাছে তার বিচার হয়। আপনিই বলেছিলেন বুক অফ দ্য ডেড-এর গল্প।’

‘বাহ! মনে আছে দেখে খুব ভালো লাগল। মিশরীয়রাও এই বৈতরণী আর স্টাইকস নদীর মতো নীল নদকে মনে করত মৃত্যুর পরের জগতে যাওয়ার রাস্তা। নীল নদেরই পশ্চিম তীরে ছিল অ্যাবিদস নামের একটা জায়গা, যেখানে ছিল ওসাইরিসের মন্দির। তাই ইজিপশিয়ানরা বিশ্বাস করত এই নদী পেরিয়েই আত্মা ওসাইরিসের কাছে পৌঁছোবে। কিন্তু বৈতরণী, স্টাইকস আর নীল, এই তিনটে নদীই পেরোতে গেলে কী লাগবে বলে মনে হয়?’

‘কী আবার, নৌকো।’

‘ঠিক, সেই হিসেবে ফারাও খুফুও যে মারা যাওয়ার পরে একটা নৌকো করেই ওসাইরিসের উদ্দেশে যাত্রা করবেন সেটা হওয়াই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু তাই বলে দু-খানা আস্ত নৌকো যে খুফুর সমাধির সঙ্গে রাখা থাকবে সেটা কেউ কখনো ভাবেনি আগে।’

‘কিন্তু খুফুর পিরামিড তো একদম ফাঁকা ছিল বলেছিলেন।’

‘আমি কি বলেছি নাকি যে নৌকোগুলো পিরামিডের মধ্যে রাখা ছিল? চলো, তোমাদেরকে চৌষট্টি বছর আগের একটা দিনে নিয়ে যাই।

‘২৪ এপ্রিল, ১৯৫৪, গিজার মরুভূমির দক্ষিণে কাজ করছিলেন আর্কিয়োলজিস্ট মহম্মদ জাকি আর ওঁর অ্যাসিস্ট্যান্ট গারাস ইয়ানি। অবশ্য জাকির কাজকে আর্কিয়োলজি না বলে ময়লা পরিষ্কার করা বলা যেতে পারে। সৌদি আরবের রাজা আবদেল আজিজ নাকি গিজার পিরামিড দেখতে আসবেন। তাই পিরামিডের আশেপাশের চলতে থাকা এক্সক্যাভেশনের কাজের জন্য তৈরি হওয়া আবর্জনা সরাবার দায়িত্বে ছিলেন ওঁরা। কিন্তু এইসব ছাইপাঁশ ঘাঁটতে ঘাঁটতেই ওঁদের হাতে চলে এল একটা অমূল্য রতন!

মৃতদেহকে যেমন ধরনের নৌকোয় করে নিয়ে যাওয়ার চল ছিল

‘অনেকগুলো বিশাল আয়তাকার চুনাপাথরের টুকরো। পাশাপাশি গায়ে গায়ে লাগানো আছে। দেখেই মনে হচ্ছে মাটির নীচের কিছু একটার ওপরের ঢাকনার কাজ করছে ওইটা! কয়েকটা পাথরের গায়ে আবার লেখা আছে—

‘‘এই সম্পদ তাঁরর বাবা খুফুকে অর্পণ করলেন ফারাও জেদেফ্রে!’’

‘আরেকটা নতুন আবিষ্কার তাহলে! ব্যস, সৌদির রাজা আসার চিন্তা পাশে সরিয়ে রেখে দু-জনে মিলে লেগে পড়লেন ওই পাথর পরিষ্কার করার কাজে। কাজ শেষ হতে লেগে গেল এক মাস।

‘২৫ মে, ১৯৫৪, সেইদিনই পাথরের ওপরের সব ময়লা সরানোর কাজ শেষ হল। এবারে খুলে দেখার অপেক্ষা। কিন্তু সেইদিনই মহম্মদ জাকির কাছে একটা খারাপ খবর এল। ওঁর ছোট্ট মেয়ে ওয়াফাকে হাসপাতালে ভরতি করতে হয়েছে। সব কাজ ফেলে জাকি ছুটলেন মেয়ের কাছে। দুঃখের খবর এই যে মেয়েকে বাঁচানো গেল না। মহম্মদও আর কাজে ফিরলেন না।

‘অন্যদিকে গারাস ইয়ানি পড়লেন আরেক ফাঁপরে। এক্সক্যাভেশনের কাজ তো এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। জাকিকে এই অবস্থায় পাওয়া যাবে না। এদিকে কাজ ফেলে রাখলে মরুভূমির ধুলোবালিতে আবার একটু একটু করে পাথর ঢাকা পড়ে যাবে। তাই একপ্রকার বাধ্য হয়েই ইয়ানি খুঁজে বার করলেন আরেকজন আর্কিয়োলজিস্টকে, কামাল এল মালাখ।

‘কামাল ইয়ানির সঙ্গে মিলে পাথরের চাঁইয়ের কোণের দিকের একটা ছোটো টুকরো ভেঙে ফেললেন। তারপরে নিজের ব্যাগে থাকা দাড়ি কামানোর ছোটো আয়নাটা দিয়ে সূর্যের আলো ফেললেন পাথরের নীচের গহ্বরে। আর সঙ্গেসঙ্গেই চমকে উঠলেন! খুব সামান্য আলোতেই আবছাভাবে দেখা যাচ্ছে একটা কাঠের তৈরি দাঁড়!! কামালের বুঝতে বাকি রইল না যে এই লম্বা গর্তটা কী ঐশ্বর্য লুকিয়ে রেখেছে! চার হাজার বছর পুরোনো একটা নৌকো!

পিরামিডের পাশে খুফুর নৌকোর গর্ত

চুনাপাথরের ঢাকনার নীচে খুফুর নৌকো

‘খ্যাতির লোভ মারাত্মক, বুঝলে। এই আবিষ্কারের সঙ্গেসঙ্গে সেইদিন রাতেই কামাল ‘‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’’কে একটা ইন্টারভিউ দিয়ে দেন। তাতে বলে দেন যে খুফুর নৌকোর আবিষ্কর্তা তিনি একাই! মহম্মদ জাকির নাম বেমালুম চেপে গেলেন কামাল। আর যেদিনকে এই মিথ্যে কথাটা বলছেন সেদিনই নিজের মেয়ের কবর দিচ্ছেন জাকি। তবে সত্যিটা কয়েকদিনের মধ্যেই সামনে আসে। কামালকে তীব্র ভর্ৎসনার মুখে পড়তে হয়।

‘যাই হোক, এই ঘটনার কয়েকদিন পর থেকেই ওই গর্ত থেকে বোটটা বের করার কাজ শুরু হয়। তবে নৌকোটার আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। ১,২২৪টা সিডার কাঠের টুকরো পাওয়া গেল। আর কিছু প্রায় নষ্ট-হতে-বসা কাপড় আর দড়ি। আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে, সেখানে একটাও লোহার পেরেক পাওয়া যায়নি। মিশরীয়রা মাটির নীচে থাকা খনিজ লোহার সন্ধান তখনও পায়নি। যেটুকু লোহা পাওয়া যেত সেটা আকাশ থেকে এসে পড়া উল্কা থেকে। তাই ওদের কাছে লোহা ছিল খুব দুর্লভ আর পবিত্র বস্তু। কাঠের খাঁজে কাঠ লাগিয়ে আর জায়গায় জায়গায় দড়ি দিয়ে বেঁধেই নৌকো বানানো হত।

‘তবে এত বড়ো একটা আবিষ্কারের পরেও সবার মনে একটা চিন্তা রয়েই গেল। এই বারোশো টুকরোর জিগ-স পাজল জুড়ে আসল নৌকো বানাবে কে? গোটা মিশরে এমন একটাই মাত্র মানুষের সেই ক্ষমতা ছিল। সেই লোকটা যে...’

‘বুঝেছি, বুঝেছি! যে রানি হেতেফেরিসের সমাধির আসবাবপত্রগুলোর রেস্টোরেশন করেছিল তো! কী নাম যেন...’

‘বাহ! তোমাদের মনে আছে দেখছি! লোকটার নাম আহমেদ ইউসুফ। ওঁকেই ডেকে আনা হল। প্রথমে বেশ ঘাবড়ে গেলেও পরে আহমেদ এই চ্যালেঞ্জটা নেন। তার পরেই শুরু হয় ওঁর একটা নতুন জীবন। তিন মাস ধরে কায়রোর নৌকো তৈরির কারখানায় গিয়ে কাজ শেখেন। তার পরে ওই ১,২২৪টা টুকরোর প্রতিটাকে আলাদা করে মার্ক করে ছোটো ছোটো নৌকোর রেপ্লিকা বানাতে থাকলেন। তারপরে হাত দিলেন আসল কাজে। যে যে টুকরোগুলো নষ্ট হয়ে গেছিল অবিকল সেই মাপের কাঠের টুকরো বানালেন। কুিড় বছর ধরে চলল খুফুর নৌকো জোড়া লাগানোর কাজ। একজন রেস্টোরার হয়ে গেলেন একজন বোট বিল্ডার। কাজ যখন শেষ হল তখন সেই বিশাল নৌকো দেখে সবাই অবাক হয়ে গেল! প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিটার লম্বা। দু-পাশে সারি দিয়ে রাখা দাঁড়। নৌকোর একপ্রান্তে কাপড় দিয়ে মোড়া একটা ছাউনি। নৌকোর নীচের দিকের কাঠে আর দাঁড়গুলোতে এমন ক্ষয়ের দাগ স্পষ্ট যা কিনা জল থেকেই হতে পারে।

খুফুর নৌকোর মডেলের পাশে আহমেদ ইউসুফ

জোড়া লাগানোর পর খুফুর প্রথম নৌকো, এখন যেমন

‘মানে, খুফুর নৌকো একসময় নীল নদের জলেও চলেছিল!!’

‘খুব সম্ভবত তাই। তবে এটাকে ঠিক খুফুর নৌকো বলাটা হয়তো ঠিক হবে না। ছেলে দেজেফ্রে মৃত বাবার উদ্দেশে এই নৌকো দান করেছিলেন। তবে খুফুর নিজের নৌকোও পাওয়া গেছে ১৯৮৭ সালে। সেই গল্পও বেশ মজার।

‘টোকিয়োর ওয়াসেদা ইউনিভার্সিটি থেকে আসা জাপানিজ আর্কিয়োলজির একটা দল আরেকটা চুনাপাথর চাপা দেওয়া প্রায় একইরকম আকারের একটা গর্তের সন্ধান পান। সেই গর্তটা আবার ১৯৫৪ সালে খুঁজে পাওয়া গর্তটার পাশেই ছিল। তাই ওঁরা মোটামুটি বুঝেই গেছিলেন যে এখানেও আরেকটা নৌকোই আছে। তবে এবারে আগেরবারের থেকেও সাবধানে কাজ শুরু করা হয়। চার হাজার বছরের পুরোনো বাতাসে বদ্ধ থাকা নৌকোর কাঠের টুকরোগুলো দুম করে বাইরের বাতাসের সংস্পর্শে এসে আরও ভঙ্গুর হয়ে যেতে পারে। তাই আর্কিয়োলজিস্টরা এবারে পাথরের গায়ে খুব ছোট্ট একটা ফুটো ড্রিল করে সেখানে ঢোকালেন একটা এন্ডোস্কোপ। আর, কী দেখতে পেলেন বলো তো?’

‘কী আবার? নৌকো?’

‘ধুস, ওঁরা দেখলেন একটা মাছি!’

‘অ্যাঁ, জ্যান্ত মাছি! অত হাজার বছর ধরে বেঁচে ছিল!’

‘না রে বাবা, চুনাপাথরের স্ল্যাবটা এক এক জায়গায় ভঙ্গুর হয়ে নিজে থেকেই ছোটো ছোটো গর্ত তৈরি হয়েছিল। সেই গর্ত দিয়ে ঢুকে ভেতরে মাছি আর পিঁপড়ে আস্তানা গেড়েছিল। সম্প্রতি পাথরের স্ল্যাবগুলোকে সরিয়ে ফেলে ভেতরের নৌকোর টুকরোগুলোকে তুলে আনা হয়েছে। সেগুলো জোড়া লাগানোর কাজ এখনও চলছে। আর সেই গর্ত থেকেই ফারাও খুফুর নাম খোদাই করা একটা পাথর পাওয়া গেছে। সম্রাট নিজের সমাধির জন্যই বানিয়েছিলেন এই নৌকোটা।’

একটানা এতটা বলার পরে এবারে চামচ দিয়ে গ্লাসের ভিতরে থাকা ডাবের শেষ শাঁসের টুকরোটা তুলে মুখে পুরে দিয়ে ভবেশদা পিজির দিকে তাকালেন,

‘তাহলে বুঝলে পিজি ভায়া, এইজন্যই বলেছিলাম খুফুর নৌকো একটা নয়, দুটো। আর এই গল্পটা তুমি ইন্টারনেট খুঁড়ে ফেললেও পেতে না।’

‘তাহলে আপনি এগুলো জানলেন কী করে?’

‘বই! বইয়ের বিকল্প কিছু হয় নাকি? যাক গে, আজকে খুফুর নৌকোর কথা শুনলে, জানলে নৌকো করে মৃতের অন্য জগতে পৌঁছোনোর কথা। কিন্তু একজন বাঙালি মেয়ে তার জীবদ্দশাতে ভেলায় চড়ে এরকম একটা নদী বেয়েই পৌঁছে গিয়েছিল স্বর্গের দ্বারে। কে বলো তো?’

‘বাঙালি? মেয়ে? এরকম তো আগে শুনিনি!’

‘শুনেছ, কিন্তু ভুলে গেছ। মনসামঙ্গল কাব্য হয়তো ভুলে যেতেই পার, কিন্তু সুমনকে ভুললে কী করে?’

বলেই ভবেশদা বেসুরো গলায় গেয়ে উঠলেন,

‘কাল কেউটের ফণায় নাচছে লখিন্দরের স্মৃতি,

বেহুলা কখনো বিধবা হয় না এটা বাংলার রীতি…’

রোসেটার পাথর

আগের উইকএন্ডে বাড়ি গিয়েছিলাম। সোমবার তেমন কোনো ভালো ক্লাস ছিল না। তাই সেদিনও দিনের বেলাটা বাড়িতে কাটিয়ে সন্ধেবেলায় যখন হোস্টেলের ঘরে ঢুকলাম দেখি ভবেশদা পিজির সঙ্গে বসে চা আর তেলেভাজা খাচ্ছেন। পিজি আমাকে দেখেই বলল,

‘এই দেখ, একদম ঠিক টাইমে এসে গেছিস, ভবেশদা গরমাগরম বেগুনি নিয়ে এসেছেন। ঝটপট বসে পড়।’

তেলেভাজা আবার ছাড়া যায় নাকি! আমি প্রায় ঝাঁপিয়েই পড়তে যাচ্ছিলাম আর তখনই ভবেশদা বললেন,

‘টি-শার্টটা তো বেশ। কোথা থেকে জোগাড় করলে এটা?’

‘মামা ইজিপ্টে বেড়াতে গিয়েছিল বলেছিলাম না? ওখান থেকে এনে দিয়েছে।’

গোলগলা টি-শার্টটাতে সাদার ওপরে কালো দিয়ে হায়রোগ্লিফিক অক্ষর প্রিন্ট করা ছিল। আমাদের চলমান মিশরীয় এনসাইক্লোপিডিয়ার চোখ এড়ায়নি সেটা। ভবেশদা আমাকে দাঁড় করিয়ে টি-শার্টটার ওপরে ঝুঁকে এলেন। মিনিটখানেক খুঁটিয়ে দেখার পরে বললেন,

‘ধুস, তোমার মামাকে বেকার জিনিস গছিয়েছে। হায়রোগ্লিফিক অক্ষর আছে। কিন্তু এলোমেলো। এগুলোর কোনো মানে নেই।’

পিছন থেকে পিজি বলল,

‘আপনি হায়রোগ্লিফ পড়তে পারেন?’

‘হুঁ, খুব সামান্য। হায়রোগ্লিফ পড়া কি অত সহজ হে, পিজি ভাই। এর রহস্য উদ্ধার করার জন্য কত মানুষ কত রাত জেগেছে জানো?’

‘হ্যাঁ, শুনেছিলাম খুব কঠিন ভাষা নাকি এটা।’

‘হ্যাঁ, সত্যি খুব কঠিন। সেকথায় পরে আসছি। আগে যে লোকটার জন্য শুধু হায়রোগ্লিফ না, গোটা মিশর দেশটাকেই পৃথিবীর মানুষ চিনল, তার কথা বলি। কয়েকটা হিন্টস দি তোমাদেরকে, দেখি পারো কি না।

‘লোকটার হাইট ৫ ফুট ৭ ইঞ্চি, যুদ্ধবাজ, প্রায় গোটা ইউরোপ দখল করে ফেলেছিলেন, কিন্তু বেড়ালকে ভয় পেতেন, সত্যজিৎ রায় যে লিজঁ দি অঁর পেয়েছিলেন সেটা ইনি চালু করেছিলেন।’

আমরা দু-জনেই মাথা চুলকোলাম একটু, ভবেশদা এবারে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

‘তোমাদের দেখলে মাঝে মাঝে মনে হয় উলুবনে মুক্তো ছড়াচ্ছি। ওকে, আরও দুটো শব্দ বলছি, দেখ পার কি না এবারে। ওয়াটারলু, সেন্ট হেলেনা।’

‘নেপোলিয়ন বোনাপার্টে!’

‘এই তো হয়েছে এবারে। স্কুলের ইতিহাস বইয়ের বাইরে আর কোনোদিন কিছু পড়নি বুঝতেই পারি।’

ভবেশদার কথা গায়ে মাখলে চলে না, আমি বললাম,

‘কিন্তু নেপোলিয়নের সঙ্গে ইজিপ্টের কী সম্পর্ক?’

‘ওই লোকটাই তো সব কিছুর উৎস!’

‘মানে?’

‘গুছিয়ে বলি, শোনো। সালটা ১৭৯৮, নেপোলিয়ন তখন ফ্রেঞ্চ অ্যাডমিরাল জেনারেল। হঠাৎ করে ওঁর মাথায় একটা ইচ্ছা চাপল। আলেকজান্ডার ছিল ওঁর ছোটোবেলাকার হিরো। সেই আলেকজান্ডারের পথ অনুসরণ করবেন। ইজিপ্ট দখল করতে হবে।’

‘আচ্ছা, এই হল নেপোলিয়নের মিশরে আসার কারণ।’

‘এইটা ছাড়াও আরেকটা কারণ ছিল যদিও। নেপোলিয়নের ফন্দি ছিল ইজিপ্ট দখল করে সুয়েজের মধ্যে দিয়ে ক্যানাল বানিয়ে রেড সি-তে এসে পড়া। সেখান থেকে আরব সাগরের পথ ধরে এশিয়ার একটা দেশে আসা।’

‘কোন দেশ?’

‘যে দেশে এখন আমরা বসে আছি।’

‘বলেন কী! নেপোলিয়ন ভারতে আসার চেষ্টা করেছিলেন?! কিন্তু কেন?’

‘কারণটা খুব সহজ। ভারত তখন ব্রিটিশদের অধীনে। নেপোলিয়নের লক্ষ্য ছিল দেশের এক রাজার সঙ্গে হাত মিলিয়ে ব্রিটিশদের ভারত থেকে উৎখাত করা। এতে ব্রিটিশদের শক্তি কমত। ইউরোপেও ওদের হারানো সহজ হয়ে যেত। এবারে, দেশের কোন রাজার সঙ্গে নেপোলিয়ন হাত মেলাবার কথা ভেবেছিলেন সেটা দেখো পিজি ভাই কেমন চট করে বলে দেবে।’

ভবেশদা এবারে পিজির দিকে তাকিয়ে বললেন,

‘তোমাদের ছোটোবেলায় দূরদর্শনে এঁকে নিয়ে খুব বিখ্যাত একটা সিরিয়াল হয়েছিল। এঁর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন সঞ্জয় খান। একবার সেটে আগুন লাগার জন্য এর শুটিং তিন বছর পিছিয়ে গিয়েছিল।’

‘হেঁ হেঁ, বুঝে গেছি, টিপু সুলতান।’

‘ওই দেখো, বল কোর্টে পড়ার সঙ্গেসঙ্গে ফোরহ্যান্ড স্ম্যাশ মেরেছে ছেলে। টিপু সুলতানকে নেপোলিয়ন নাকি চিঠিও পাঠিয়েছিলেন। সেই চিঠির কী হয়েছিল সেটা আজও কেউ জানে না। তো যাই হোক, আগের কথায় ফিরে আসি।’

‘হ্যাঁ, নেপোলিয়নের ইজিপ্টে আসা।’

‘ঠিক, পয়লা জুলাই, ১৭৯৮-এ কয়েকশো রণতরীতে চল্লিশ হাজার সৈন্য নিয়ে নেপোলিয়ন ইজিপ্টের উত্তরদিকে আলেকজান্দ্রিয়ার উপকূলে পৌঁছোলেন। আলেকজান্দ্রিয়ার শহর দখল করার পরে ফ্রেঞ্চ আর্মি ধীরে ধীরে কায়রোর দিকে এগোতে লাগল। বিখ্যাত গিজার যুদ্ধে তারা সেই সময়ের শাসক মামলুকদের হারিয়ে কায়রোর দখলও নিল, যাকে এখন বলে ব্যাটেল অফ দ্য পিরামিডস। ২১ জুলাই কায়রো ফ্রেঞ্চদের হাতে এল। কিন্তু নেপোলিয়নের গোটা ইজিপ্ট দখল করার স্বপ্ন সত্যি হয়নি। মরুভূমির প্রচণ্ড গরমের মধ্যেই অনেক সৈন্যর মৃত্যু হয়। অনেকে মারা যায় পেট খারাপে আর প্লেগে। অন্যদিকে ব্রিটিশ সৈন্যরাও চলে আসে ইজিপ্টে। খুফুর পিরামিডের গল্প বলার সময় অ্যাডমিরাল নেলসনের কথা বলেছিলাম, মনে আছে?’

‘হ্যাঁ, ক্রিকেটে ১১১ যাঁর নামে।’

নেপোলিয়নের মিশরে আসার পথ

‘কারেক্ট, এই অ্যাডমিরাল নেলসনের নেতৃত্বে ব্রিটিশ ন্যাভাল ফোর্স ফ্রেঞ্চদের প্রায় সবকটা রণতরী ধ্বংস করে ফেলে। ১৮০১ সালে ফ্রেঞ্চরা হার মানে ব্রিটিশদের কাছে। নেপোলিয়ন যদিও তার অনেক আগেই ফ্রান্সে পালিয়ে এসেছিলেন। ব্রিটিশদের জাহাজে করেই শেষমেষ ফ্রান্সে ফেরে মাত্র ১০০০ জন সৈন্য। নেপোলিয়নের আর সুয়েজ খাল কেটে ভারতে পৌঁছোনো হয়নি। সেটা হলে আমাদের ইতিহাসটা অন্যরকম হত।’

‘কিন্তু আপনি বলেছিলেন নেপোলিয়নের জন্যই পৃথিবীর মানুষ প্রাচীন মিশরকে চিনেছিল। সেরকম তো কিছু পেলাম না এতে।’

‘সেই কথাতেই আসছি এবারে, নেপোলিয়ন তো শুধু সৈন্যসামন্ত নিয়েই ইজিপ্টে আসেননি। ওঁর সঙ্গেই এসেছিল ১৬৭ জন স্কলার। তাদের মধ্যে ছিল ইঞ্জিনিয়ার, সার্ভেয়র, ডাক্তার, বোটানিস্ট, আর্কিয়োলজিস্ট, ইন্টারপ্রিটার, কেমিস্ট, জুলজিস্টরা। এদের কাজ ছিল মিশরের মাটিতে যা কিছু পাওয়া যাবে সেগুলোর পরীক্ষা করা, এক জায়গাতে নোট করা। আর তাদের হস্তগত করা দেশের জন্য। এরা মিশর থেকে অজস্র মূর্তি, প্রত্নসামগ্রী আর প্যাপিরাস নিয়ে দেশে ফেরে, যেগুলো ফ্রান্সে সাড়া ফেলে দেয়। সবার তখন এই অদ্ভুত দেশটা নিয়ে আগ্রহ, যেখানে নাকি বিশাল উঁচু পিরামিড আছে, অদ্ভুত দেখতে স্ফিংস আছে আর আছে মমি! মৃত মানুষের শরীরকে নাকি ওরা বাঁচিয়ে রাখে! ফ্রান্সের সবকটা বড়ো খবরের কাগজে এগুলো প্রথম পাতায় চলে আসে। সেখান থেকে বাকি ইউরোপে ছড়িয়ে পড়তে আর সময় লাগেনি। মানুষ সেই প্রথম চিনল অনেক দূরের একটা দেশকে। দেশে ফিরে আসার পরে এই স্কলাররাই একটা বিশাল বই প্রকাশ করেন। নাম দেস্ক্রিপশন দি ইজিপ্তে । ন-টা ভলিউমের টেক্সট, আবার এগােরাটা ভলিউম শুধু ছবির জন্য! মিশর দেশটার হেন কোনো জিনিস নেই যা এর মধ্যে ছিল না। তবে সবারই একটা জায়গাতে গিয়ে মুশকিল হল।’

‘সেটা কী?’

ভবেশদা কচরমচর করে বেগুনি চিবোতে চিবোতে বললেন,

‘যা কিছু পাওয়া গেছিল মিশরে তার সবেতেই একটা অদ্ভুত লিপিতে লেখা। অন্য সবরকম লিপির থেকে একদম আলাদা। ছোটো ছোটো ছবি ওপর থেকে নীচেতে নয়তো পাশাপাশি আঁকা। সাপ, পালক,পাখি, সূর্য... কেউ কিচ্ছু বুঝতে পারছিল না এর মানে। আবার এর অর্থ উদ্ধার না করা গেলে তো দেশটার ইতিহাসই অধরা থেকে যাবে!’

‘বুঝেছি, হায়রোগ্লিফের কথা বলছেন।’

‘হুম, হায়রোগ্লিফ শব্দটা হল গ্রিক, যার মানে খোদাই করা পবিত্র অক্ষর। মিশরের খুব হাতে-গোনা কয়েকজনই এই লিপির ব্যবহার জানতেন। তাঁরদের মধ্যে প্রায় সবাই ছিলেন পুরোহিত। এঁরা আর কাউকে এই বিদ্যা শেখাতেন না। তাই ফারাওদের যুগ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হায়রোগ্লিফ জানা মানুষও একসময় পৃথিবী থেকে হারিয়ে যায়। হায়রোগ্লিফ একটা লিপি যার সঙ্গে আশেপাশের আর কিচ্ছুর মিল নেই। সাধারণত কোনো নতুন লিপি উদ্ধার করার সময় তার কাছকাছি থাকা অন্য কোনো লিপির সাহায্য নেওয়া হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে তেমন কিছুই পাওয়া যাচ্ছিল না। আর এইখানেই একটা বড়ো আবিষ্কারের কথা লুকিয়ে আছে। একটা কালো পাথরের টুকরো।’

‘পাথর?!’

‘হ্যাঁ। রোসেটা স্টোনের নাম শুনেছ?’

‘না তো।’

‘তাহলে সেই গল্পটা ঝট করে বলে দিই, সালটা ১৭৯৯, ব্রিটিশ ন্যাভাল আর্মি তখন ফ্রেঞ্চদের চারিদিক থেকে ঘিরে ধরছে। তাই ফ্রেঞ্চরা চেষ্টা করল সমুদ্রের উপকূলগুলোতে নিজেদের ঘাঁটি শক্ত করতে। রোসেটা হল এমনই একটা জায়গা, নীল নদ যেখানে ভূমধ্যসাগরে এসে মিশেছে সেখানকার একটা পুরোনো পরিত্যক্ত শহর। ফ্রেঞ্চ অফিসার জ্যাভিয়ার পকার্ডের ওপরে দায়িত্ব পড়ল এই রোসেটাতে একটা আর্মি বেস তৈরি করার। ওখানে মামলুকদের আমলের একটা ভেঙে-পড়া প্রাসাদ ছিল, সেটাকেই সারিয়ে নিয়ে একটা আর্মি ব্যারাক আর ওয়াচ টাওয়ার বানাতে আরম্ভ করলেন পকার্ড। কাজ ভালোই চলছিল। কিন্তু ১৯ জুলাই একজন ফ্রেঞ্চ সৈন্য সেই ভাঙা প্রাসাদের ভেতরে দেখতে পেল একটা মাঝারি মাপের পাথরের চাঁই যার ওপরের আর নীচের দিকটা ভাঙা। সঙ্গেসঙ্গে খবর গেল পকার্ডের কাছে। পকার্ড একনজরে পাথরটাকে দেখেই বুঝেছিলেন এর গুরুত্ব। চকচকে মসৃণ কালো রং, লম্বায় তিন ফুট, প্রস্থে দু-ফুট, আর প্রায় দশ ইঞ্চি মোটা বেশ ভারী পাথর। তার গায়ে খোদাই করা তিনরকমের লিপি। একটা হায়রোগ্লিফ, একটা ডিমোটিক, যে ভাষা দেশের সাধারণ মানুষ ব্যবহার করত। আরেকটা হল গ্রিক।’

‘গ্রিক!’

‘হ্যাঁ, এতে অবাক হওয়ার তো কিছু নেই। গ্রিকরা বেশ কয়েকশো বছর রাজত্ব করেছিল মিশরে। তবে তাদের সময়কার কোনো লেখা এতদিন পাওয়া যায়নি। এই প্রথম এমন কিছু পাওয়া গেল যেখানে হায়রোগ্লিফের লিপিগুলোকে গ্রিক লিপির সঙ্গে মেলানো যাবে! পকার্ড সঙ্গেসঙ্গে খবর পাঠিয়ে দিলেন ফ্রান্সে। সেখানকার খবরের কাগজগুলোতে বড়ো করে বেরোল রোসেটা স্টোনের কথা। সবাই এবারে আশায় বুক বাঁধল। এবারে দুর্বোধ্য হায়রোগ্লিফের মানে উদ্ধার করা যাবে!’

‘দাঁড়ান, দাঁড়ান!’

শেষ কয়েক মিনিট দেখছিলাম পিজি মোবাইলে কী-একটা দেখছে। মোবাইলটা এবারে আমার হাতে দিতে দিতে বলল,

‘এই দেখ, রোসেটা স্টোন কেমন দেখতে। কিন্তু ভবেশদা, এখানে তো বলছে যে পাথরটা এখন আছে লন্ডনে, ব্রিটিশ মিউজিয়ামে!’

ফ্রান্সের শাম্পোলিয়ন ও ইংল্যান্ডের ডা থমাস ইয়ং যাঁরা হায়রোগ্লিফের পাঠোদ্ধার করেন

‘হ্যাঁ, তাই তো।’

‘কিন্তু আপনি যে বললেন…’

‘ফ্রেঞ্চদের হাত থেকে ব্রিটিশদের কাছে কী করে এল তাই ভাবছ তো? এটাও একটা মজার গল্প, একটু আগেই বললাম যুদ্ধে হেরে গিয়ে ফ্রেঞ্চদের ব্রিটিশ জাহাজে করেই দেশে ফিরতে হয়েছিল। তো, এই জাহাজের ক্যাপ্টেন ছিলেন জেনারেল হাচিনসন। ইনি একটা অদ্ভুত জেদ করে বসেন। তাঁরর হাতে পাথরটা দিয়ে তবেই ফ্রেঞ্চরা জাহাজে উঠতে পারবে। তার আগে নয়। হাচিনসনের বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না এই পাথরটার ব্যাপারে। শুধুমাত্র চকচকে কালো রঙের জন্য ইনি প্রায় জোর করেই রোসেটা স্টোনকে কেড়ে নেন ফ্রেঞ্চদের কাছ থেকে। তাই এই পাথরের ঠাঁই হয় ইংল্যান্ডে। ইজিপশিয়ান ডিপার্টমেন্ট অফ অ্যান্টিকুইটি এখন অনেক চেষ্টা চালাচ্ছে পাথরটাকে মিশরে ফেরত আনার। কিন্তু মিউজিয়াম কৰ্তৃপক্ষ একটা অদ্ভুত যুক্তি খাড়া করেছে। পাথরটাকে ওরা মিশরের মাটিতে পায়নি, পেয়েছে ফ্রেঞ্চ সৈন্যদের হাত থেকে। তাই মিশরে ওটাকে ফেরত পাঠাবার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।’

‘ঠিক এমনটাই আমাদের কোহিনুরের সঙ্গেও হয়েছে, তাই না?’

‘একদম তাই, কোহিনুরের মতোই রোসেটা স্টোনও তার উৎসে কোনোদিন ফিরতে পারবে বলে মনে হয় না।’

‘তাহলে এই পাথর থেকে হায়রোগ্লিফের রহস্যের সমাধান হয়েছিল কি?’

‘সেটা হয়েছিল, কিন্তু তাতে লেগেছিল আরও তেইশ বছর! আর যে লোকটা হায়রোগ্লিফের মানে উদ্ধার করেছিলেন তিনি কোনোদিন পাথরটাকে নিজের চোখে দেখার সুযোগও পাননি!’

‘বলেন কী?!’

‘হ্যাঁ ভাই। ইতিহাস বার বার আমাদের অবাক করে, তাই না!’

ঈশ্বরের লিপির রহস্য (প্রথম পর্ব)

‘আচ্ছা, ধরো তোমার কাছে একটা খুব দামি বই আছে। কিন্তু সেটা জার্মান ভাষায় লেখা। তুমি পড়তেই পারবে না। তখন তুমি কী করবে?’

ভবেশদার প্রশ্নের উত্তরে আমি বললাম,

‘এ আবার কী, এমন বই রাখবই-বা কেন যেটার ভাষা আমি জানি না!’

‘যদি বলি, বইটা অমূল্য! পৃথিবীতে মাত্র একটাই এমন বই আছে, মলাটটা আবার সোনা দিয়ে বাঁধানো, তাহলে কি রাখবে এমন বই?’

পিজি ফুট কাটল এবারে,

‘তখন তো আর সেটা শুধু বই থাকল না। ওরকম অ্যান্টিক জিনিস তো সবাই রাখতে চাইবে নিজের কাছে।’

‘ঠিক বলেছ। রোসেটা স্টোনটা পেয়ে ব্রিটিশদেরও এই একই হাল হয়েছিল। জেদ করে নিজের দেশে নিয়ে তো চলে এল। কিন্তু ওতে কী লেখা আছে সেটা বুঝতে না পারলে তো ওটা একটা দামড়া পাথরের চাঁই ছাড়া আর কিছুই নয়। তোমাদেরকে তো বললামই পাথরের ওপরে হায়রোগ্লিফ, ডেমোটিক আর গ্রিক ভাষায় লেখা ছিল। গ্রিক ভাষাটা অনেকে পড়তে জানত। তাই লেখাগুলোকে কপি করার কাজ শুরু হল।’

পিজি বলল,

‘ওরে বাবা, ছবিতে দেখে যা বুঝলাম অনেকগুলো লাইন লেখা ছিল তো! একটা অচেনা ভাষার অত লেখা দেখে কপি করা কি সোজা নাকি!’

‘না, একদমই সোজা ছিল না কাজটা, আর ওইভাবে কপি করতে গিয়ে প্রচুর ভুল ত্রুটিও হচ্ছিল। তাই এবারে অন্য পন্থা নেওয়া হল। নিকোলাস কন্তের নাম শুনেছ?’

‘না তো।’

ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রোসেটা স্টোন আগে যেভােব ছিল (ছবি উপরে) আর এখন যেভাবে আছে (ছবি নীচে)

‘এই ভদ্রলোক গ্র্যাফাইটের পেনসিল আবিষ্কার করেন। এই লোকটিই আবার রোসেটা স্টোনের কপি তৈরি করেন। লিপিগুলো পাথরের ওপরে খোদাই করা ছিল। এই খোদাই করা জায়গাগুলোতে গ্রিজ লেপে দেওয়া হল। আর পাথরের বাকি অংশে প্রলেপ দেওয়া হল রাবার আর নাইট্রিক অ্যাসিডের একটা মিশ্রণের। তারপরে পাথরের ওপরে কালি ঢালার পরে সেই কালি খোদাই করা জায়গাতে গিয়ে বসল। তখন একটা সাদা পাতা তার ওপরে চেপে ধরতেই সেই পাতায় গোটা লিপিটারই একটা ছাপ চলে এল। কন্তে এমন অনেকগুলো কপি তৈরি করেছিলেন। এইসব কপি ছড়িয়ে দেওয়া হল ইউরোপ আর আমেরিকার শহরগুলোতে। অক্সফোর্ড, কেম্ব্রিজ, ডাবলিন আর এডিনবরা ইউনিভাৰ্সিটি পেল একটা করে কপি। একটাই আশায়, যদি কেউ এই লিপির মানে উদ্ধার করতে পারেন। তাবড় তাবড় বিজ্ঞানী আর ভাষাবিদরা নিজেদের ঘরের দরজা বন্ধ রেখে একটা প্রতিযোগিতায় মেতে উঠল। কে আগে হায়রোগ্লিফের রহস্যভেদ করতে পারে!’

‘গ্রিক লেখাটার মানে উদ্ধার করা গেল না? সেটা করা গেলেই তো হায়রোগ্লিফের মানে বের করে ফেলা যেত।’

‘হ্যাঁ, গ্রিক ভাষায় লেখা লাইনগুলোর মানে তো কয়েকজন ভাষাবিদ করেই ফেলেছিলেন। সেগুলোকে আবার ল্যাটিন আর ফ্রেঞ্চ ভাষায় অনুবাদও করা হয় সাধারণের বোঝার জন্য। সেখান থেকেই বোঝা যায় এই পাথরে নাম লেখা আছে টলেমি বংশের রাজার।’

‘টলেমি?’

‘হ্যাঁ, এঁরা জাতিতে গ্রিক ছিলেন। যিশুর জন্মের আড়াইশো বছর আগে এঁদের রাজত্ব ছিল মিশরে। রোসেটার পাথরে এই রাজাদেরই জারি করা আদেশ লেখা ছিল। তাই একই কথা তিনটে ভাষায় থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। গ্রিক ভাষা গ্রিকদের জন্য। সাধারণ মানুষের জন্য ডেমোটিক। অন্যদিকে রাজা হলেন ফারাও, আর ফারাওরা ঈশ্বরেরই রূপ, সেইজন্যই পবিত্র ভাষা হায়রোগ্লিফও ছিল। যাঁরা এই লেখার মানে উদ্ধারের জন্য লড়াই করছিলেন তাঁররা ভেবেছিলেন যে কোনো একটা লাইনে গ্রিক শব্দ কত নম্বরে আছে দেখে সেই হায়রোগ্লিফের সেই লাইনের সেই শব্দটা আইডেন্টিফাই করতে পারলেই হল। তাহলেই বোঝা যাবে যে অক্ষরগুলো কী মানে বোঝাচ্ছে। কিন্তু সেইভাবে এগোতে গিয়ে কূলকিনারা হারিয়ে ফেললেন সবাই। অবাক হয়ে দেখলেন হায়রোগ্লিফে কোনো কোনো শব্দ শুধু একটা অক্ষরেরই। আবার কোনো শব্দে চার পাঁচটা অক্ষর। অক্ষর বলাটা অবশ্য ঠিক না। কয়েকটা ছবি যেমন সাপ, পেঁচা, গোরু, পালক, পর পর সাজানো। সেগুলোই অক্ষর! তবে দু-জন মানুষ এই লিপির মানে উদ্ধারে অনেকটা এগিয়ে যাচ্ছিলেন। একজন ইংল্যান্ডের, আরেকজন ফ্রান্সের।

‘জঁ ফ্রাঁসোয়া শাম্পোলিয়নের জন্ম হয়েছিল ১৭৯০ সালে, ফ্রান্সের ছোট্ট শহর ফিজেকে, বেশ গরিবের ঘরে। ওর বাবা ঘুরে ঘুরে বই বিক্রি করতেন। দশ বছর বয়স থেকে ও ওর দাদার কাছে গ্রেনোবেল শহরে থাকতে শুরু করে। ছোটোবেলা থেকেই ভীষণ গোঁয়ার ছিল এই শাম্পোলিয়ন। অঙ্ক, বিজ্ঞান ওর ভালো লাগত না। কিন্তু নতুন নতুন ভাষা শেখার ব্যাপারে ছিল প্রচণ্ড আগ্রহ। মাত্র এগারো বছর বয়সেই ল্যাটিন, গ্রিক, আরবিক, হিব্রু আর সিরিয়াক ভাষায় লিখতে পড়তে পারত সে। গ্রেনোবেল শহরেই ওর হাতে আসে প্যাপিরাসের একটা ছোটো টুকরো। নতুন দেখা একটা লিপির মানে বোঝার জন্য এবারে উঠে পড়ে লাগে শাম্পোলিয়ন। সেই শুরু, এর পরে প্রায় গোটা জীবনটাই কেটে যায় হায়রোগ্লিফের মানে উদ্ধারের নেশায়।

‘শাম্পোলিয়নের দাদার কাছে রোসেটা স্টোনের একটা কপি ছিল। সে নিজেও শখের বশে একবার এই লিপি নিয়ে নাড়াঘাঁটা করে রণে ক্ষান্ত দেয়। তবে এই কপিটা পেয়ে শাম্পোলিয়নের একটা বড়ো লাভ হল। একটা ব্যাপার ও বেশ ভালো করে বুঝতে পেরেছিল। হায়রোগ্লিফের মানে জানতে গেলে আগে মিশরের সাধারণ মানুষের ভাষা ডেমোটিককে বুঝতে হবে। সেই কাজটা করতেই কয়েক বছর কেটে গেল। সারা দিনরাত এক করে একটাই কাজ করে যেতে লাগল শাম্পোলিয়ন। অবসাদও কম হত না সেই সময়। মনে হত যদি অন্য কেউ তার আগে হায়রোগ্লিফ পড়ে ফেলে! তাহলে তো এত খাটনি সব জলে যাবে।’

‘হ্যাঁ, আপনি তো বললেন আরও অনেকেই এটা নিয়ে কাজ করছিল।’

‘হ্যাঁ, করছিল তো অনেকেই। কিন্তু শাম্পোলিয়নের মতোই বাকিদের থেকে এগিয়ে ছিলন আরেকটি মাত্র মানুষ। সেই লোকটা আবার ব্রিটিশ।

‘ড থমাস ইয়ং, একটা লোক যিনি চিকিৎসক ছাড়াও ছিলেন একজন নামকরা বিজ্ঞানী, অ্যাস্ট্রোনমার আর মিউজিশিয়ান! শাম্পোলিয়নের মতোই তিনিও অন্তত পাঁচটা ভাষা লিখতে পড়তে পারতেন অনায়াসে। ইনি কিন্তু হায়রোগ্লিফের চল্লিশখানা চিহ্নর মানে বের করে ফেলেছিলেন! ওঁর এই আবিষ্কার শাম্পোলিয়নকে অনেক সাহায্য করেছিল। দু-জনেই দু-জনের কাজের ব্যাপারে ওয়াকিবহাল ছিলেন। চিঠির আদান-প্রদান চলত। কিন্তু একটা চাপা প্রতিযোগিতাও ছিল। তবে ড ইয়ং-এর কাছে এই কাজটা ছিল একটা হবির মতো। অন্যদিকে শাম্পোলিয়নের কাছে এটাই ছিল সব কিছু।

‘এই একটা কাজের নেশাতে শাম্পোলিয়ন নিজের জীবনটাকেই ভুলতে বসেছিলেন। শরীর ক্ষয়ে যাচ্ছিল, সারাদিন একটা ঘরে নিজেকে বন্দি করে রাখতেন। প্রতিবেশীরা ওকে পাগল ভাবতে শুরু করেছিল। কিন্তু ১৮২১ সালের শেষের দিকে ওঁর কাজ অনেকটা এগিয়ে গিয়েছিল। ৩০০টা হায়রোগ্লিফের চিহ্নের মানে বের করতে পেরেছিলেন শাম্পোলিয়ন। সেগুলোকে সাজিয়ে শব্দ বানানোও শিখে গিয়েছিলেন।

‘১৮২২ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর সেইদিন যেদিন শাম্পোলিয়ন এতদিনের সাধনার ফল পেলেন। আবু সিম্বেলের মন্দিরের নাম শুনেছ?’

‘না তো।’

‘বাঙালির ইজিপ্টের জ্ঞান পিরামিড, মমি আর তুতানখামেনেই শেষ হয়ে যায়। তোমরাও তেমনই। আবু সিম্বেলের মন্দির বানিয়েছিলেন ফারাও দ্বিতীয় রামেসিস। হাজার বছর ধরে এই মন্দির মরুভূমির বালির তলায় চাপা পড়ে ছিল। এর আবিষ্কার নিয়ে একটা দারুণ গল্প আছে! পরে কোনো একসময় মনে করিয়ে দিয়ো। বলব ’খন।

‘তো, এখন যেটা বলছিলাম, ১৮২২ সালের ওই দিন শাম্পোলিয়নের হাতে আসে আবু সিম্বেল মন্দিরের গায়ে খোদাই করা হায়রোগ্লিফের কপি। সেই কপি হাতে পেয়েই শাম্পোলিয়ন চমকে উঠলেন! অনেকগুলো শব্দ তো উনি বেশ ভালোমতোই পড়তে পারছেন! এর জন্য তো আর অন্য কোনো ভাষার সাহায্য লাগছে না। তাহলে তিনি সত্যিই হায়রোগ্লিফের রহস্যভেদ করে ফেলেছেন! তুমুল উত্তেজনা আর আনন্দের চোটে ‘‘পেয়েছি পেয়েছি’’ বলতে বলতে রাস্তা দিয়ে ছুটতে আরম্ভ করেন শাম্পোলিয়ন। কাছেই ছিল ওঁর দাদার অফিস। সেখানে পৌঁছে দাদাকে খবরটা দিয়েই অজ্ঞান হয়ে যান। এতদিনের পরিশ্রমের ধকল আর শরীর নিতে পারেনি।

‘২৭ সেপ্টেম্বর ১৮২২ সালে প্যারিসের অ্যাকাদেমি অফ ইনস্ক্রিপশন থেকে শাম্পোলিয়নের একটা পেপার পাবলিশ করা হয়। বাকিটা ইতিহাস। ওই পেপার আরও আরও অনেক ভাষায় ট্রান্সলেটেড হয়ে ছড়িয়ে পড়ে সারা পৃথিবীতে। সবাই একবাক্যে স্বীকার করে শাম্পোলিয়নই প্রথম যিনি হায়রোগ্লিফকে পুরোপুরি জেনে ফেলতে সক্ষম হয়েছেন। অন্যদিকে শাম্পোলিয়নের ব্যস্ততা তখন তুঙ্গে। তিনি তখন ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা হায়রোগ্লিফের লিপির মানে উদ্ধারে ব্যস্ত। প্রাচীন মিশর সেই প্রথম মানুষের সামনে এল। ধরা দিল ওদের আচার, ব্যবহার, দর্শন, পুরাণ সব কিছু। ১৮২৬ সালে শাম্পোলিয়নকে প্যারিসের ল্যুভর মিউজিয়ামের ইজিপশিয়ান কালেকশনের কিউরেটর করে দেওয়া হয়। কায়রো মিউজিয়ামের পরে সবচেয়ে বেশি ইজিপশিয়ান প্রত্নসামগ্রী আছে এই ল্যুভর মিউজিয়ামেই।

‘যে মানুষটা নিজের গোটা জীবনটা ইজিপ্টকে দিয়েছিলেন, ১৮২৮ সালে সেই শাম্পোলিয়ন মিশরে যান। সেই প্রথম আর শেষবারের মতো। অবাক হয়ে দেখেছিলেন গিজার পিরামিড। আর আবু সিম্বেলের সেই মন্দির যার গায়ের হায়রোগ্লিফের ছবিটুকুই শুধুমাত্র তাঁরর কাছে ছিল।

‘কিন্তু এত বছর ধরে নিজের শরীরের ওপরে করা অযত্নের মাশুল দিতে হল শাম্পোলিয়নকে। ৪ মার্চ ১৮৩২ সালে ব্রেন স্ট্রোকে মারা গেলেন শাম্পোলিয়ন। তার আগে ভুগেছিলেন ডায়াবেটিস, গাউট, কিডনির রোগে। ওঁর শেষ কাজ ছিল হায়রোগ্লিফের ব্যাকরণের বই, যেটা বেরোয় উনি মারা যাওয়ার পরে।’

একটানা এতটা বলে ভবেশদা দ্বিতীয় রাউন্ডের চা-টা একটা লম্বা চুমুকে শেষ করলেন। আমি আর পিজি হাঁ করে দারুণ একটা মানুষের অধ্যবসায়ের গল্প শুনছিলাম এতক্ষণ ধরে। কিন্তু একটা প্রশ্ন এবারে করতেই হত।

‘ভবেশদা, একটা কথা বলুন, হায়রোগ্লিফের মানে আবিষ্কারের ইতিহাস তো শুনলাম। কিন্তু হায়রোগ্লিফ কী করে পড়তে হয় সেটা তো বললেন না।’

‘বলব ভায়া। আমি যতটুকু জানি না হয় বলব। কিন্তু অনেক রাত হয়ে গেল তো।’

পিজি বলল,

‘এখনই তো সাড়ে এগারোটা বাজে। কী করবেন আর বাড়ি গিয়ে। একটা ফোন করে বলে দিন আজ আর ফিরবেন না। ব্যস, মিটে গেল।’

‘বাড়িতে প্রাণী বলতে তো আমি একাই ভাই। ফোন করার দরকার নেই।’

‘বাহ! তাহলে তো খুব ভালো! আমাদের সঙ্গে মেসে খেয়ে নিন। আপনি না হয় রাতে আমার খাটে শুয়ে পড়বেন। আমি আর স্পন্দন একটা খাট শেয়ার করে নেব। নো চাপ।’

মেস থেকে খেয়ে এসে আমরা যখন আবার বসলাম, তখন রাত সাড়ে বারোটা। গোটা মেসটাই তখন একটু একটু করে ঘুমিয়ে পড়ছে।

আর তখনই আমরা সাড়ে চার হাজার বছরের পুরোনো একটা ভাষা শেখা শুরু করলাম।

ঈশ্বরের লিপির রহস্য (দ্বিতীয় পর্ব)

‘হায়রোগ্লিফ শিখতে তোমাদের বেশি সময় লাগবে না, তোমাদের জেনারেশনটা ওইদিকেই এগোচ্ছে... না না এগোচ্ছে না, বলা ভালো পিছিয়ে যাচ্ছে।’

মেস থেকে ডিনার করে ঘরে ফিরে পিজির টেবিলে রাখা হাজমোলার শিশিটা খুলে দুটো ট্যাবলেট মুখে পুরে দিলেন ভবেশদা। পুরেই ডান চোখ কুঁচকে মুখে টাক্ করে একটা শব্দ করলেন। তারপরে পিজির খাটটায় বসতে বসতে বললেন কথাগুলো।

আমি বললাম,

‘সুযোগ পেলেই আমাদেরকে খোঁটা দেন। কিন্তু হায়রোগ্লিফিক বোঝার সঙ্গে এই জেনারেশনের মিল নেই কোনো।’

‘কে বলল মিল নেই! আলবাত আছে! হায়রোগ্লিফের গোটাটাই হল ছবি দিয়ে কথা বলার চেষ্টা। তোমরা তো আজকাল তাই করছ। হোয়াটস অ্যাপে ফেসবুকে দেখি এখন ইমোজির ছড়াছড়ি। ‘‘দুঃখ পেলাম’’ এই দুটো শব্দ না লিখে এখন স্যাড ফেস পাঠাও। ‘‘ভালো লাগল’’ এইটা বলতে কষ্ট হয়, লাইক করো। দিনকে দিন দেখছি আবেগগুলো ন্যারো হয়ে যাচ্ছে। তোমরা তো ওই প্রাচীন যুগেই ফিরে যাচ্ছ একটু একটু করে।’

অকাট্য যুক্তি। অতএব এই নিয়ে কথা না বাড়ানোই ভালো। পিজিও মনে হয় বুঝতে পেরেছিল সেটা।

‘আপনি কোলবালিশটা টেনে নিয়ে ভালো করে বসুন, ভবেশদা। আরেকটা হাজমোলা খাবেন?’

‘অত অয়েলিং না করলেও চলবে, তোমার মুখে এমন কথা শুনলেই আমার ভয় লাগে। হায়রোগ্লিফ শিখবে তো? একটা কাগজ পেন নিয়ে এসে বোসো।’

বসলাম সব গুছিয়ে।

‘এবারে মোবাইলে একটা ছবি বের করো দেখি, সার্চ দাও— মেরেরিজ স্টেলা।’

‘এটা আবার কী?’

‘মেরেরি ছিল মিশরের দানদেরা অঞ্চলের পুরোহিতদের নেতা গোছের। এই স্টেলাটা হল ওর কবরে থাকা হায়রোগ্লিফ খোদাই করা পাথর। এখন স্কটল্যান্ডের একটা মিউজিয়ামে আছে। তবে নেটে পেয়ে যাবে ছবিটা।’

‘হুমম এই তো, এটার কথা বলছেন কি?’

‘দেখি, হ্যাঁ এটাই, এবারে এই ছবিটাকে ভালো করে দেখো তো জগাই মাধাই, দেখে বলো কী বুঝতে পারছ।’

আমরা দু-জনে মিলে ছবিটাকে বড়ো করে বেশ খুঁটিয়ে দেখলাম। কিন্তু কিছুই মাথায় ঢুকল না।

‘অনেকগুলো চিহ্ন দেখতে পাচ্ছি তো।’

‘হুমম, তার মধ্যে ক-টাকে চিনতে পারছ?’

‘বেশ কয়েকটাই। একটা মানুষ বাঁ-হাতে একটা লাঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একটা সিংহ, একটা পেঁচা, একটা গোরু, দুটো বসে থাকা লোক, একটা কোয়েলের মতো পাখি, একটা হাত, একটা চোখ।’

মেরেরিজ স্টেলা

‘ঠিক বলেছ, বাঁ-দিকের লোকটার ছবিটাই সবচেয়ে বড়ো, তাই না? তার মানে এতে নিশ্চয় ওই লোকটাকে নিয়েই কিছু লেখা আছে, তাই তো?’

‘এই লোকটাই মেরেরি?’

‘হ্যাঁ, মেরেরিকে নিয়ে কয়েকটা ভালো ভালো কথা লেখা আছে এখানে। এবারে ব্যাপারটা হল সেটা পড়া যাবে কী করে। খেয়াল করে দেখো স্টেলাটাতে চারটে কলাম, প্রথম আর দ্বিতীয় কলামটাকে ভাগ করা আছে মেরেরির হাতের লাঠিটা দিয়ে।’

‘হ্যাঁ, এটাও লক্ষ করলাম।’

‘চারটে কলামেই বাকি ছোটো ছোটো ছবিগুলো সাজানো আছে ওপর থেকে নীচে।’

‘ওহ, তার মানে হায়রোগ্লিফ ওপর থেকে নীচেতে পড়তে হয়?’

‘না, তা নয়। হায়রোগ্লিফের খুব বেসিক ক-টা নিয়ম বলে দিই শোনো আগে,

‘এক নম্বর, হায়রোগ্লিফে কোনো অ্যালফাবেট নেই, মানে এ বি সি ডি বা অ আ ক খ বলে ওদের কিছু ছিল না। এই প্রত্যেকটা চিহ্ন আসলে এক একটা উচ্চারণকে বোঝায়। মানে, এগুলো ফোনেটিক সাইনস। যেমন, পেঁচাটা হল ‘‘ম’’ উচ্চারণের জন্য, যেমনটা হয় আম, মা এই শব্দগুলোতে।

‘দু-নম্বর, হায়রোগ্লিফে লেখার সময় ভাওয়েলের দিকে কেউ খেয়াল রাখত না। যেমনটা এখন তোমরা মেসেজ করার সময় করো। যেমন ধরো, তুমি লিখলে, ‘‘ppl cn rd ths’’। মানে, people can read this, তাই তো?’

‘হ্যাঁ, টেক্সট করার সময়, চ্যাট করার সময় তো এরকমই করি।’

‘হায়রোগ্লিফেও তাই হত। ভাওয়েলগুলো বাদই থাকত। কিছু কিছু ভাওয়েলের উচ্চারণের হায়রোগ্লিফিক চিহ্ন আছে যদিও। যেমন অ, আ, ই, উ। দাঁড়াও, এবারে বেসিক হায়রোগ্লিফিক সাইনগুলো লিখে দিই।’

এই বলে ভবেশদা সামনে রাখা খাতাটাতে পেন দিয়ে লিখতে বসলেন, একটা জায়গাতে ‘ইস, ভুল হয়ে গেল’ বলে কেটে আবার লিখলেন। লিখে আমাদেরকে খাতাটা দিয়ে বললেন,

‘এই হল একদম বেসিক লেভেলের হায়রোগ্লিফের কয়েকটা অক্ষর। এবারে এগুলোর সঙ্গে মেরেরির স্টেলার চিহ্নগুলো মিলিয়ে দেখো তো ক-টা মিলছে।’

‘বাহ! অনেকগুলোই চিনতে পারছি তো এবারে, ই, ন, র, ম, ড, চ, ট!’

‘খুব ভালো, এবারে তাহলে তিন নম্বর নিয়মটা বলি।

‘হায়রোগ্লিফ এমন একটা ভাষা যেটা যেমন ডান দিক থেকে লেখা যায় তেমন বাঁ-দিক থেকেও লেখা যায়। আবার ওপর থেকে নীচেও লেখা যায়।’

‘ওরে বাবা, তাহলে পড়ার সময় বুঝব কী করে কোন দিক থেকে শুরু করব?’

ভবেশদা এবারে মুচকি হেসে বললেন,

‘সেটা বোঝা খুব সোজা, মেরেরির স্টেলাতে দেখ কলাম আছে, মানে ওপর থেকে নীচেই যে লেখা সেটা বুঝতে কোনো অসুবিধা হবে না। পাশাপাশি লেখা থাকলে খেয়াল করতে হবে কোনো জন্তুর, পাখির বা শরীরের কোনো অংশের ছবি থাকলে তার ফেস বা মুখ কোনদিকে আছে। যেদিক থেকে লেখা শুরু হবে সবকটা চিহ্নের ফেস সেইদিকে থাকবে। যেমন ধরো এই লেখাটা, আমার এঁকে দেওয়া ছবিগুলো মিলিয়ে পড়ার চেষ্টা করো তো দেখি।’

বলেই ভবেশদা খসখস করে একটা কিছু এঁকে আমাদেরকে দেখালেন, দু-জনেই হুমড়ি খেয়ে আঁকাটার সঙ্গে আগের এঁকে দেওয়া চিহ্নগুলো মেলাতে লাগলাম।

‘আরিব্বাস! এই তো পড়তে পারছি! ভ-ব-শ, ভাওয়েল নেই। তার মানে আপনার নাম এটা! ভবেশ!’

‘বাহ! একদম ঠিক বলেছ, এবারে বলো কী করে বুঝলে কোনদিক থেকে পড়তে হবে।’

‘খুব সোজা, ব-এর পা-টা বাঁ-দিকে মুখ করে আছে, লেখাটাও বাঁ-দিক থেকে পড়তে হবে।’

‘ভেরি গুড। এবারে এটা পড়ে দেখো।’

আবার একটা কিছু এঁকে আমাদের দিলেন ভবেশদা, আমরা আবার মেলাতে লাগলাম আগের চিহ্নগুলোর সঙ্গে।

‘পাখির মুখ ডান দিকে, তার মানে ডান দিক থেকে পড়তে হবে। তাহলে হল, ক, ট, ট, উ। কুট্টু লিখলেন নাকি! এটা তো আমার ডাকনাম!’

নিজের নাম হায়রোগ্লিফে দেখে আমি নিজেই অবাক হয়ে গেলাম।

‘একদম ঠিক বলেছ। বেশ ঝটপট বুঝে গেলে তো ব্যাপারটা। এবারে তাহলে চার নম্বর নিয়মটা বলি।

‘চার নম্বর, হায়রোগ্লিফে লেখা কোনো কোনো শব্দের সঙ্গে আরও একটা এক্সট্রা চিহ্ন থাকে। একে বলে ডিটারমিনেটিভ। মানে, এই চিহ্নগুলোও বুঝতে হেল্প করবে যে কী লেখা আছে শব্দটাতে। যেমন ধরো, একটা বসে-থাকা ছেলে বা মেয়ে বোঝায় শব্দটা রেস্পেক্টিভলি একটা ছেলে বা মেয়েকে বোঝাচ্ছে। আবার একটা বসে থাকা ছেলের মুখে দাড়ি মানে ভগবানের নাম লেখা আছে। তেমন আর কয়েকটা চিহ্ন এঁকে দিই, দাঁড়াও।’

‘আচ্ছা, তাহলে এগুলোকেও লেখার সময়ে ইউজ করা যাবে।’

‘হ্যাঁ, যাবে তো।’

পিজি এতক্ষণ চুপচাপ শুনছিল, এবারে বলল,

‘কিন্তু ভবেশদা, তাহলে আমার নামটা কী করে হায়রোগ্লিফে লেখা যাবে? প্র-এর কোনো চিহ্ন আছে নাকি?’

‘এই কথাতেই আমি আসছিলাম, আগের হায়রোগ্লিফিক চিহ্নগুলোতে তোমাদের দেখালাম এক একটা অক্ষরের উচ্চারণের এক একটা চিহ্ন। কিন্তু অনেক সময় আবার একটা হায়রোগ্লিফিক সাইন দিয়েই দুটো বা তিনটে অক্ষরের উচ্চারণ বোঝানো যায়। তেমন অনেক চিহ্ন আছে, সবকটা আমার মনে নেই, কয়েকটা এঁকে দেখাই, দাঁড়াও।’

‘আরিব্বাস! এই তো প্র-এর চিহ্ন আছে!’

‘হ্যাঁ, আছে তো। এবারে তাহলে নিজের নামটা লিখে দেখাও দেখি।’

পিজি এবারে খাতাটা টেনে নিল।

‘হুম, প্র-দী-প-ত... দেখুন তো হয়েছে কি না?’

‘এই তো, একদম পারফেক্ট হয়েছে! এবারে মেরেরির পায়ের কাছে কী লেখা আছে পড়ার চেষ্টা করো তো দেখি।’

‘এই তো, লেখা আছে ম্র-র-র-ই। মানে, মেরেরিরই নাম কি?’

‘বাহ! একদম ঠিক ধরেছ!’

‘তাহলে কি এবারে গোটা স্টেলাতে লেখা সব হায়রোগ্লিফের মানে পড়তে পারব?’

‘দেখো চেষ্টা করে।’

আমরা এতক্ষণের জ্ঞান সম্বল করে আবার মেরেরির স্টেলাটা পড়ার চেষ্টা করলাম।

‘না ভবেশদা, পারছি না তো এখনও। অনেকগুলো চিহ্নই চিনতে পারছি কিন্তু মানে বেরোচ্ছে না তো তার কোনো।’

‘সেটা বেরোবার কথাও না, ভাই। একটা জিনিস তোমরা ভুলে যাচ্ছ। এইটা লেখা আছে কিন্তু বাংলায় বা ইংরেজিতে নয়, প্রাচীন মিশরীয় ভাষায়। যেমন ধরো, দু-নম্বর কলামের এই জায়গাটা। বলো দেখি কী লেখা আছে।’

‘এই তো, চ, ন, ট, ট, তার পরে একটা গোরু, মানে ডিটারমিনেটিভ, তার আগে তিনটে দাগ, মানে অনেকগুলো গোরু।’

‘বাহ! এইটুকুই যে বুঝতে পেরেছ তাতেই তো অনেক। ওই ‘‘চনটট’’ মানে মন্দির। তার মানে, এই শব্দটা বোঝাচ্ছে মন্দিরে যে গবাদি পশুর সম্পত্তি ছিল তাকে।’

‘তাহলে হায়রোগ্লিফের লিপির মানে উদ্ধার হল কী করে?’

‘এটা তো আগের দিনই বললাম, ব্যাক ক্যালকুলেশন করে। এই হায়রোগ্লিফ থেকেই জন্ম হয়েছিল আরেকটা ভাষার। তার নাম কোপ্টিক। এর সঙ্গে গ্রিক ল্যাঙ্গুয়েজের অনেক মিল ছিল। মিশরে আরবদের শাসনের আগে সবাই এই ভাষাতেই কথা বলত। তাই প্রাচীন হায়রোগ্লিফ জানা মানুষ হারিয়ে গেলেও রিলেটিভলি নতুন এই ভাষাটা হারায়নি। অনেকেই এই ভাষা জানত। তাই ওই কোপ্টিক ভাষার হেল্পেই এই হায়রোগ্লিফিক ইনস্ক্রিপশনগুলোর মানে বের করা গিয়েছিল।’

‘বাহ! একটা হারিয়ে যাওয়া ভাষা লুকিয়ে ছিল নতুন আরেকটা ভাষার মধ্যে!’

‘একদম তাই। মেরেরির স্টেলাতে যেটা লেখা আছে তা হল, মন্দিরের গভর্নর মেরেরি, যে কিনা পুরোহিতদের প্রধান এবং মন্দিরের গবাদি পশুর অভিভাবকও বটে, সে পুজো দিচ্ছে দেবতা ওসাইরিসকে। একদম ডান দিকের কোণের ছবিটা দেখো, ওটা ওসাইরিসের চিহ্ন।’

আমি এবারে বললাম,

‘বুঝছি, ভাষাটা মোটেই সহজ কিছু নয়।’

‘একদমই সহজ নয়। আমি তোমাদের যেটুকু শেখালাম সেটুকু টিপ অফ দ্য আইসবার্গ বলতে পারো। বাকিটা আমি নিজেও ভালোভাবে জানি না। তবে এইটুকু জ্ঞান দিয়ে তোমরা টুকটাক ক-টা শব্দ হায়রোগ্লিফে লিখে ফেলতেই পারবে। যাই হোক, অনেক খাটালে আজকে তোমরা আমাকে। ক-টা বাজে দেখো তো।’

সময় যে কোথা থেকে গড়িয়ে গেল খেয়ালই করিনি। মোবাইলের স্ক্রিনে এবারে দেখলাম ভোর চারটে ! সেদিনের মতো আড্ডাটা ওখানেই বন্ধ রেখে শুয়ে পড়লাম। পরের দিন অবশ্য হোস্টেলে আমরা বিখ্যাত হয়ে গিয়েছিলাম। হায়রোগ্লিফে সবার নাম লিখে দিচ্ছিলাম যে!

আরো বই সংগ্রহ করুন

বইয়ের গ্রুপবইয়ের চ্যানেলবাংলা লাইব্রেরী

বাংলা ইবুক লাইব্রেরী একটি টেলিগ্রাম ভিত্তিক ইন্টারনেটে সহজলভ্য বইয়ের সংগ্রহশালা। এখানে দেয়া সকল বই ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহীত। আমরা নতুন করে কোন ধরনের বইয়ের ডিজিটাল ভার্শন বানাই না। কারো কপিরাইট লঙ্গনের কোনরুপ অভিপ্রায় আমাদের নেই। আমরা নতুন বই কিনে পড়ার সুপারিশ করি।

পৃথিবীর শুরু

‘আচ্ছা, একটা কথা বলো দেখি, ডিম আগে না মুরগি আগে?’

কলেজের সেমিস্টার এগজাম চলছিল, তাই বেশ কয়েক সপ্তাহ ভবেশদার সঙ্গে দেখা হয়নি আমাদের। কাল পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরে সন্ধের দিকে আমি আর পিজি বেনুদার দোকানে গিয়েছিলাম চা খেতে। দেখি ভবেশদা বসে আছেন। আমাদের দেখে বললেন,

‘আরে, মানিকজোড় যে, অনেকদিন পরে। পরীক্ষা কেমন হল?’

আর পরীক্ষা, সে কেমন হয়েছে নিজেরাই ভালো জানি না। তাই আমি আর পিজি যেভাবে মাথা নাড়লাম তার মানে ভালোও হতে পারে আবার খারাপও হতে পারে। তবে ভবেশদা মনে হয় না সেটা খেয়াল করেছেন বলে, আমাদের উত্তরের অপেক্ষা না করেই বললেন,

‘ডিমের অমলেট চলবে নাকি? অনেক খাটনি গেছে তোমাদের, চলো আজকে আমিই খাওয়াই। বেনুউউউ...’

সবার জন্য ডবল ডিমের অমলেট এল, আর এক কাপ করে চা। তারপর চামচ দিয়ে অমলেটের একটা টুকরো কেটে মুখে পুরতে পুরতে কথাটা বললেন ভবেশদা।

‘ডিম আগে না মুরগি আগে?’

‘এ তো খুব বোকা বোকা ধাঁধা, ভবেশদা। এর কোনো ঠিক উত্তর হয় নাকি?’

‘বোকা বোকা বলছ? এই ধাঁধার জনক কে জানো? গ্রিক ফিলোজফার প্লুটার্ক। এখন প্লুটার্ক কে সেটা জানতে চেয়ে তোমাদের লজ্জা দেব না। অমলেটটা দেখে একটা কথা মনে পড়ে গেল তাই প্রশ্নটা করলাম। আমি যদি বলি ডিম আগে তাহলে বিশ্বাস করবে?’

ভবেশদার ট্রেডমার্ক হাসিটা দেখেই বুঝলাম একটা দারুণ গল্প শুরু হল বলে। পিজির মনেও নির্ঘাত এটাই এসেছিল। পাশ থেকে বলল,

‘কে বলল এরকম?’

‘কে আবার বলবে, হিন্দুরাই এমন বলে গেছে। প্রাচীন ইজিপশিয়ানরাও বলেছে। পৃথিবীর সৃষ্টিই তো হল ওইভাবে।’

‘তাই নাকি!’

‘হুম, ইজিপশিয়ানদের গল্পটা শোনো তবে, সব কিছু শুরুর আগে কিছুই ছিল না। আলো, বাতাস, মাটি, আকাশ কিচ্ছু না। ছিল শুধু জল। তার গভীরতা কেউ জানে না। কেউ জানে না কোথায় সেই জলের শেষ। এর নাম ছিল নান, একদিন এই জলেই ভেসে উঠল একটা ডিম। আর হঠাৎ করে ডিমের খোলসটায় চিড় ধরল, এই চিড় ধরার আওয়াজই হল প্রথম শব্দ। ডিমটা ফেটে যেতেই তার মধ্যে থেকে বেরিয়ে এল জীবনের প্রথম স্পন্দন। দেখা গেল সেই ডিমের মধ্যে থেকে গজিয়ে উঠছে একটা মাটির ঢিবি। তার ওপরে বসে আছেন একজন পুরুষ। ইনিই প্রথম দেবতা। এঁর নাম আতুম। যিনি নিজেই নিজেকে তৈরি করলেন।’

‘স্বয়ম্ভু!’

‘বাহ, স্পন্দন ভাই! এই নামটা কোথা থেকে শুনলে?’

‘ছোটোবেলায় দাদুর কাছে শুনেছিলাম, ব্রহ্মার আরেকটা নাম, যিনি নিজেই নিজেকে তৈরি করেছেন।’

‘ঠিক বলেছ। মৎস্যপুরাণে আছে মহাপ্রলয়ের কথা, যার পরে চারিদিকে শুধু অন্ধকার ছিল। তারপর সৃষ্টির আদি বীজ ধারণ করে তৈরি হল একটা ডিম, যার নাম হিরণ্যগর্ভ। এই ডিম থেকে জন্ম নিলেন স্বয়ম্ভু। দুটো মিথোলজির মধ্যে কী অদ্ভুত মিল, তাই না!’

‘কিন্তু, এরকম মিল কী করে হতে পারে, ভবেশদা? অত হাজার বছর আগে কি দুটো সভ্যতার মধ্যে যোগাযোগ ছিল?’

‘ভারতবর্ষ আর মিশরের মধ্যে যোগাযোগ তৈরি হয় যিশুর জন্মের ১৪০০ বছর আগে। কিন্তু বেদের বয়স আরও বেশি। কীভাবে দুটো মিথোলজি এতটা এক হতে পারে তা আমার ধারণার বাইরে, বুঝলে। হয়তো কোনোদিন কেউ এই রহস্যের সমাধান করতে পারবে। যাই হোক, হিন্দু দেবদেবীদের গল্প তো আগেও অনেক শুনেছ। এবারে মিশরের ঈশ্বরদের কথা শোনো, আতুমের কথায় ফিরে আসি।

‘ডিম ফেটে জন্ম নেওয়ার পরে আতুমই তৈরি করলেন সূর্যকে। সেই থেকে সৃষ্টি হল আলোর। এরপরে আতুমেরই শরীরের রস থেকে জন্ম নিল ওঁর দুই সন্তান শু আর তেফনুত। শু হলেন শুকনো বাতাসের দেবতা আর তেফনুত হলেন আর্দ্রতার দেবী। এঁরা তিনজনে মিলে সেই মাটির ঢিপির পৃথিবীতে বেশ ভালোই ছিলেন। কিন্তু একদিন হঠাৎ শু আর তেফনুত ঢিপি থেকে পড়ে গিয়ে তলিয়ে গেলেন নান-এর জলের গভীরে।

‘দেবতা আতুম তাঁরর চোখকে পাঠালেন যমজ সন্তানদের খুঁজে আনতে। আতুমের চোখ নানের অতল থেকে তুলে আনল শু আর তেফনুতকে। সন্তানদের খুঁজে পাওয়ার খুশিতে আতুমের চোখ দিয়ে যে জল পড়ল তা থেকে তৈরি হল পুরুষ আর নারীর। এরপরে শু আর তেফনুতের সন্তান হল...’

‘অ্যাঁ! বলেন কী? ভাই বোনের মধ্যে...’

‘হ্যাঁ, এতে অবাক হওয়ার তো কিছু নেই। আগেও তো বলেছিলাম। মিশরের পুরাণে এমন ইন্সেসচুয়াস রিলেশনের ঝুড়ি ঝুড়ি উদাহরণ আছে। ফারাওরা নিজেরাই নিজেদের বোনেদের বিয়ে করতেন। সেকথা পরে বলব ’খন। এখন এই গল্পটা শোনো।

‘শু আর তেফনুতের সন্তান হল গেব আর নুত। গেব হল পৃথিবীর দেবতা আর নুত হল আকাশের দেবী। গেবের শরীরেই জন্ম হল নীল নদের, তার পাঁজর থেকে তৈরি হতে থাকল শস্য। গেব খুব জোরে হেসে উঠলে পৃথিবীতে ভূমিকম্প হয়, গেবের রাগে তৈরি হয় খরা। এই গেব আর নুতেরও অনেক সন্তান ছিল। সেই সন্তানেরা ছিল আকাশের তারা। একদিন খুব খিদের মাথায় নুত ওর সন্তানদের খেয়ে ফেলল। স্বাভাবিক কারণেই গেব গেল রেগে। গেবের রাগ কমানোর জন্য তখন নুত গেবের ওপরে ছাতার মতো উপুড় হয়ে শুয়ে থাকল। ওর দুই হাত আর দুই পায়ের পাতা স্পর্শ করে থাকল উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব আর পশ্চিম দিক। যাতে এরা দু-জনে ঝগড়া না করে তাই এবারে শু দু-জনের মাঝে হাঁটু গেড়ে বসলেন। তাই পৃথিবীকে ঢেকে রেখেছে আকাশ। আর এই দুইয়ের মাঝে আছে বাতাস। নুত হাসলে বাজ পড়ে আর কাঁদলে বৃষ্টি হয়।’

‘বাহ! গল্পটা কিন্তু দারুণ ভােলা!’

‘সবই মানুষের উর্বর মস্তিষ্কের ফসল, ভায়া।’

‘আচ্ছা, আতুমকে দেখতে কেমন ছিল?’

‘গুগলে আতুম লিখে সার্চ করো।’

তাই করলাম, বেশ কয়েকটা ছবি এল।

‘পেলে?’

আতুম

‘হুমম, কিন্তু এটা তো একটা মানুষের ছবি।’

‘হ্যাঁ, তাই তো হওয়ার কথা। মিশরের বেশির ভাগ দেবদেবীর আকারই একদম মানুষের মতো। মাথা বা শরীরের কোনো অংশ কখনো কখনো অন্য পশু বা পাখির হয়। যেমন, এই ছবিটায় দেখো।

‘এটা আতুমের মানুষের রূপ। মাথায় মিশরের ফারাওয়ের মুকুট পরে দাঁড়িয়ে আছেন। কারণ ফারাওরা নিজেদের দেবতার অবতার বলে মনে করতেন। তাই ছবি আঁকার সময় অনেক ক্ষেত্রেই ফারাও আর ভগবান মিলেমিশে এক হয়ে যেত। মুকুটের কালো অংশটাই যদি কেউ পরে থাকে তার মানে সে শুধু দক্ষিণ মিশরেরই রাজা। এর নাম ছিল দেশরেত। আর কেউ যদি শুধু সাদা অংশটা পরে থাকে তার মানে সে শুধু উত্তর মিশরের রাজা। এর নাম হেদজেত। এখানে দেখো, আতুম দুটোই পরে আছে। এই মুকুটটার নাম হল শেন্ত। মানে আতুম গোটা দেশটারই সম্রাট।’

‘আর হাতে এগুলো কী?’

আঁখ

‘লম্বা লাঠির মতো যেটা, সেটা হল রাজদণ্ড। দেশশাসনের ক্ষমতা যে তাঁরর হাতেই এটা বোঝানোর জন্য। একে বলে ‘‘ওয়াস’’। ওয়াসের হায়রোগ্লিফিক সাইনও দেখবে এঁকেছিলাম আগের দিন। এরকমই দেখতে। আর অন্য হাতে চাবির মতো যেটা আছে তার নাম ‘‘আঁখ’’। এটা হল জীবনের প্রতীক। এই আঁখ হাতে থাকলেই সে অমর হবে। মৃত্যুর পরের জীবনেও তার শরীরে প্রাণ আসবে। তাই অনেক দেবতার পাশাপাশি ফারাওদেরও দেখবে এই ‘‘আঁখ’’ ধরে আছে। তবে আতুমের কিন্তু আরও অনেক রকমের রূপ হয়, শরীরটা মানুষের থাকলেও মাথাটা বদলে হয়ে যেতে পারে সাপ, ছারপোকা বা পাহাড়ি ভেড়ার।’

‘অ্যাঁ, ছারপোকা!’

‘ঠিকই শুনেছ, কেন সেটা একটু পরেই বলছি। প্রথমের দিকে মিশরের মানুষ সূর্যদেব হিসেবে আতুমেরই পুজো করত। পরে তার জায়গাতে এল ‘‘রে’’ বা ‘‘রা’’।’

‘হ্যাঁ এই ‘‘রে’’-এর নাম তো শুনেছি।’

‘হ্যাঁ, বাইরের জগতে মিশরের যে কয়েকজন দেবতা খুব পপুলার তাদের মধ্যে ‘‘রে’’ একজন। সূর্যর তিন দশার জন্য তিনজন দেবতা তৈরি হয়। আতুম হয়ে যায় অস্তমিত সূর্য, রে হয় মাঝ আকাশের গনগনে সূর্য, আর ভোরবেলার সূর্যের নাম হয় খেপরি। এই খেপরির অবতার ছিল গুবরেপোকা। আরও ভালো করে বলতে গেলে বলতে হয় স্কারাব প্রজাতির বিটল। এদের আমাদের দেশেও দেখতে পাওয়া যায়। সূর্যের প্রতীক গুবরেপোকা হওয়ার কারণটা এবারে বলি, শোনো।

‘স্কারাব বিটল গোবরের ছোটো ছোটো বল বানিয়ে মাটির ওপর দিয়ে ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে যায়। ওই গোবরের বলের মধ্যে থাকে ওদের নিষিক্ত ডিম, সেই ডিম ফুটে বাচ্চা বেরিয়ে আসে আর উড়ে যায়। মিশরীয়রা এটা জানত না যে এই বিটলদের ছেলে মেয়ে দু-রকমেরই ভাগ হয়। ওরা ভাবত গুবরেপোকাগুলো শুধু পুরুষ প্রজাতিরই হয়। তারা নিজেরাই বাচ্চা তৈরি করে। আর গোবরের বলগুলো অনেকটা সূর্যের মতো গোল। ব্যস, অমনি গুবরেপোকারা জাতে উঠল। নিজেরাই নিজেদের সৃষ্টি করে। তাই ছারপোকা হয়ে গেল সূর্যদেবের প্রতীক।’

‘বোঝো ঠেলা।’

‘আরও কয়েকটা মজার গল্প শোনো তাহলে, আতুমের চোখের কথা বললাম না একটু আগে, যাকে আতুম পাঠিয়েছিল...’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ, বললেন তো, শু আর তেফনুতকে খুঁজে আনতে পাঠিয়েছিল।’

স্কারাব বিটল

‘ঠিক, এই চোখ আতুমের শরীরের অংশ, তাই এ আবার আতুমের মেয়েও। আতুমের এই চোখ শু আর তেফনুতকে খুঁজে নিয়ে বাবার কাছে এসে দেখল যে বাবা তার জায়গায় অন্য একটা নতুন চোখ লাগিয়ে নিয়েছে। ব্যস, সে তো রেগে কাঁই। আতুম তাই মেয়েকে ঠান্ডা করার জন্য ওকে একটা কোবরার রূপ দিলেন। সেই কোবরার মিশরীয় নাম হল ইউরেয়াস। এই সাপের ঠাঁই হল আতুমের কপালে, দুই চোখের মাঝখানে। অনেক ফারাওয়ের মুকুটে দেখবে এই সাপ আছে। তুতানখামেনের সোনার মুখোশে দেখতে পাবে ইউরেয়াসকে। আবার অন্য একটা গল্পতে বলা আছে যে এই চোখ রেগে গিয়ে একটা সিংহীর রূপ ধারণ করে, সে তখন একের পর এক মানুষকে মারতে থাকে আর খেতে থাকে। এই সিংহকে বাগে আনে ওর ভাই শু, তাকে সাহায্য করে দেবতা থথ। তারপরে নীল নদের জলে চুবিয়ে ওর মাথা ঠান্ডা করা হয়।’

‘থথ? ইনি কোন দেবতা?’

থথ

‘থথ হলেন জ্ঞান আর জাদুর দেবতা। থথই নাকি ইজিপশিয়ানদের লিখতে শিখিয়েছিলেন। থথের শরীরটা মানুষের হলেও মাথাটা ছিল আইবিস পাখি বা বেবুনের। তোমাদেরকে ‘‘রা’’-এর নৌকোর কথা বলেছিলাম মনে আছে? থথ এই নৌকোর একদিকে দাঁড়িয়ে থাকেন।’

‘আচ্ছা, বুক অফ দ্য ডেড-এও থথের কথা ছিল না?’

‘বাহ, তোমার মনে আছে দেখছি, পিজি ভাই। ঠিকই বলেছ। মৃতের যখন বিচার হয় তখন থথ দাঁড়িপাল্লার পাশে বসে সেই বিচারটা প্যাপিরাসে লিখে রাখেন। এই থথের একটা গল্প বলে আজকের আড্ডাটা শেষ করব।

আইবিস পাখি

‘তেফনুত যে আর্দ্রতার দেবী ছিলেন সেটা আগেই বললাম তোমাদের। এই তেফনুত একবার বাবা ‘‘রা’’-এর ওপরে রাগ করে মিশর ছেড়ে চলে গেলেন। তার ফলে গোটা দেশ শুকিয়ে গেল। তেফনুতকে ফিরিয়ে আনার জন্য রা পাঠালেন থথকে। থথের সঙ্গে যখন তেফনুতের দেখা হল তখন তেফনুত একটা ভয়ংকর সিংহীর রূপ ধরে আছেন, অনেকটা সেই আতুমের চোখের মতো গল্পটা। যাই হোক, থথ বুঝলেন যে তেফনুতের সঙ্গে শক্তিতে পারা যাবে না। তাই কথা দিয়ে থথ তেফনুতকে ভোলাতে শুরু করলেন। এইভাবে তেফনুতকে বশ মানিয়ে থথ ওঁকে মিশরে ফিরিয়ে আনলেন, দেশে আবার জল ফিরে এল। থথ তেফনুতকে অনেকগুলো গল্প বলেছিলেন, তার একটা শুধু বলি তোমাদের।

‘একটা জঙ্গলে একটা বিশাল বড়ো সিংহ থাকত। তার প্রবল পরাক্রম। সবাই তাকে ভয় পেত। একদিন একটা পাহাড়ের নীচে সিংহর সঙ্গে দেখা হল একটা চিতাবাঘের। আধমরা হয়ে শুয়ে আছে। গায়ের চামড়া কেউ একটা ছাড়িয়ে নিয়েছে। সিংহ ওকে জিজ্ঞাসা করল, কে করল এমন তোমার সঙ্গে?

‘‘চিতাবাঘ কোনোরকমে জবাব দিল, মানুষ।’’

‘‘মানুষ?”

‘‘হ্যাঁ, মানুষ, খুব ধূর্ত এরা, তুমি কখনো ভুলেও ওদের পাল্লায় পোড়ো না।”

আইবিস পাখির মমি

‘সিংহর তো মাথা গেল গরম হয়ে। এই মানুষকে দেখতে পেলেই শায়েস্তা করতে হবে। এই ভেবে সিংহ আর কয়েক পা এগিয়েছে, দেখল একজোড়া গাধা, ওদেরকে একটা জোয়াল দিয়ে কেউ বেঁধে দিয়েছে।

‘‘কে করল এরকম?”

‘‘মানুষ।”

‘‘মানুষ!”

‘‘হ্যাঁ, ওরা ভয়ানক প্রাণী! ভুলেও ওদের সামনে এসো না!”

‘সিংহর রাগ তো আরওই বেড়ে গেল। ও সব জায়গায় মানুষকে খুঁজে বেড়াতে লাগল। সেই সময় আরও বেশ কিছু জানোয়ারের সঙ্গে দেখা হল ওর। একটা ষাঁড় আর একটা গোরু যাদের নাকে ফুটো করা, একটা ভল্লুক যার নখগুলো কাটা, একটা অন্য সিংহ যার একটা পা একটা গাছের ফাঁকে আটকানো। সবই নাকি সেই মানুষের কীর্তি।

‘এই মানুষ নামের জীবকে হাতে পেলে মেরেই ফেলব, এই ভাবল সিংহ।

‘একদিন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে সিংহ হাঁটছে, এমন সময় একটা ছোটো ইঁদুর এসে ওর সামনে পড়ল। সিংহ থাবা উঁচিয়ে ইঁদুরটাকে মারতে যাবে এমন সময় ইঁদুরটা বলল,

‘‘দয়া করে আমাকে মারবেন না। এই এতটুকু শরীরটা খেয়ে তো আপনার খিদে মিটবে না। কিন্তু আপনি যদি আমাকে না মারেন তাহলে ভবিষ্যতে কখনো আমি আপনাকে সাহায্য করতে পারি।”

‘এইটুকু একটা প্রাণী আর কী-বা সাহায্য করবে, এই ভাবল সিংহ। কিন্তু দয়া পরবশ হয়ে ইঁদুরটাকে ছেড়েও দিল।

‘সেইদিনই সিংহ একটা শিকারির জালের ফাঁদে পড়ল। অনেক চেষ্টা করেও আর নিজেকে কিছুতেই ছাড়াতে পারল না। এমন সময় সেই ইঁদুরটা ওখান দিয়ে যাচ্ছিল। সিংহর এই অবস্থা দেখে ও এগিয়ে এল। তারপরে দাঁত দিয়ে জাল কেটে সিংহকে মুক্ত করল। সিংহ জাল থেকে বেরিয়ে বুঝল মানুষের সঙ্গে পেরে ওঠা যাবে না। এই ভেবে জঙ্গলের গভীরে পালিয়ে গেল।’

আমি আর পিজি চুপ করে গল্পটা শুনছিলাম, পিজি এবারে প্রায় বেঞ্চ থেকে লাফিয়ে উঠল,

‘আরিব্বাস! এই সিংহ আর ইঁদুরের গল্পটা অনেকটা ইশপের গল্পটার মতো না!’

‘হ্যাঁ ভাই, ইশপ কে ছিল বলো তো?’

‘সেটা তো জানি না।’

‘ইশপ ছিল একটা গ্রিক ক্রীতদাস। সে নাকি গল্পগুলো মুখে মুখে বলত। ইশপ যে সময়কার মানুষ সেই সময় গ্রিসের সঙ্গে মিশরের সম্পর্ক বেশ শক্তপোক্ত ছিল। তাই এটা একেবারেই অসম্ভব নয় যে মিশরের পুরাণের গল্পগুলোই ইশপের মুখে ফিরে এসেছে। তবে তোমাদের ডাক্তারির সঙ্গেও কিন্তু ইজিপশিয়ান মাইথোলজি জড়িয়ে আছে।’

‘বলেন কী!’

ভবেশদা এবারে একটা ভ্রূ তুলে বললেন,

‘একটা এমন চিহ্ন, যেটাকে তোমরা বার বার দেখেছ। তবুও কখনো ভাবনি এটা এল কোথা থেকে। দেখো, গুগল করে কিছু পাও কি না। কাল সন্ধের দিকে দোকানে এসে উত্তরটা বলে দিয়ে যেয়ো।’

হোরাসের চোখ

সেইদিন রাতেই বাড়ি ফিরে আমি আর পিজি গুগল ঘাঁটতে বসেছিলাম। ভবেশদা কোনো হিন্টও দেননি, তাই কোথা থেকে খোঁজাটা ঠিক শুরু করব সেটাই বুঝতে পারছিলাম না। তবে রাত এগারোটা নাগাদ পিজি হঠাৎ ‘মিল গয়া, মিল গয়া’ বলে ঘরের মধ্যে লাফাতে আরম্ভ করল। আমি জিজ্ঞাসা করতে বলল, ‘এখন বলব না, কালকেই দেখতে পাবি।’ বুঝলাম, এবারে বেটা ভবেশদার কাছে গিয়ে বেশ ঘ্যাম দেখাবে।

পরের দিন সন্ধেবেলায় হাজির হলাম ভবেশদার দোকানে। পিজি একটা বেশ জ্ঞানী সুলভ মুখ নিয়ে ভবেশদাকে বলল,

‘ইজিপ্ট নিয়ে আপনার নলেজ কিন্তু ইমেন্স। আমি সেটা বুঝতে পারছি আস্তে আস্তে।’

‘হুঁ, তুমি বুঝতে পেরেছ আমি এতে অনার্ড ফিল করছি। কয়েক মাস আগে তো মিশর মানে লিজ টেলর বুঝতে।’

‘ভালো কথা আপনাকে বলতে নেই, তাই না? ওইটা ছাড়াও আরও অনেক কিছুই জানতাম আমি, নেহাত কম কথা বলি তাই বুঝতে পারেন না আপনি।’

এবারে আমি আর ভবেশদা দু-জনেই হেসে ফেললাম। সেটাতে আরও বিরক্ত হয়ে পিজি বলল,

‘যাই হোক, কালকে আপনি ডাক্তারির সঙ্গে ইজিপশিয়ান মাইথোলজির যে মিলটার কথা বললেন, ওইটাও আমি আগে থেকে জানতাম, গুগল থেকে শুধু সেটাকে একবার কনফার্ম করে নিলাম। বলি?’

‘হুমম, শুনি কী জানো তুমি?’

‘‘‘আর এক্স’’-এর কথা বলছেন তো আপনি? মানে যেটা আমরা প্রেসক্রিপশন লেখার সময়ে লিখি।’

‘আমি এখনই কিছু বলব না, তুমি শেষ করো আগে, নাহলে আবার বলবে সেটাও জানতে, আমি বলতে দিইনি তোমাকে।’

‘সে তো অনেক সময়েই দেন না, সত্যিটা মানতে এত কষ্ট কেন হয় আপনার বুঝি না। যাই হোক, এই ‘‘আর এক্স’’-এর ‘‘আর’’টা আসলে এসেছে ল্যাটিন শব্দ রেসিপি থেকে, যার মানে, টু টেক। অর্থাৎ ডাক্তার এখানে রুগিকে কিছু নিতে অ্যাডভাইস দিচ্ছেন। সেটা ওষুধই, আগেকার দিনে ডাক্তাররাই তো ফার্মাসিস্টও ছিলেন। ওঁরাই ওষুধও বানাতেন। তাই সেই ওষুধই রুগিকে নিতে বলার জন্য আর এক্স লেখার শুরু। সেটাই এখনও চলে আসছে।’

‘আর এর সঙ্গে মিশরের মিল কোথায়?’

‘দেবতা হোরাসের চোখ! সেটার ছবি দেখলেই বোঝা যাবে যে তার সঙ্গে এই আর এক্স চিহ্নের অদ্ভুত মিল!’

এবারে আমি বললাম,

‘আই অফ হোরাস কেমন দেখতে? আমি তো আগে দেখিনি।’

ভবেশদা একটা কাগজের টুকরোতে ঝটপট এঁকে ফেললেন একটা চোখ, তার নীচের দিকে দুটো দাগ নেমে গেছে। একটা সোজাসুজি, আরেকটা বাঁকা। দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে অনেকটা আর-এর মতোই।

‘হোরাসের কথা একবার বলেছিলাম তোমাদের, মনে আছে?’

‘হ্যাঁ, সেই মমির গল্প বলার সময় বলেছিলেন তো। মৃত ওসাইরিসের শরীরে প্রাণ আসার পরে ওসাইরিস আর ওঁর স্ত্রী আইসিসের এক সন্তান জন্মায়। সে-ই হল হোরাস।’

‘ঠিক! কিন্তু হোরাসের চোখের থেকেই ডাক্তারির ওই চিহ্ন কেন তৈরি হল জানো?’

এবারে পিজি পড়ল ফ্যাসাদে। ওর মুখ দেখেই বুঝলাম ভবেশদার এই প্রশ্নের উত্তর ওর কাছে নেই। কিন্তু হার মানবার ছেলে তো ও নয়, বলল,

‘হ্যাঁ, এটাও জানতাম এককালে, কিন্তু এখন ভুলে গেছি। আপনি আরেকবার বলে দিন তো, তাহলে ফের মনে পড়ে যাবে।’

‘হুমম, এবারে আমি শুরু করি তবে, দেখো তোমার মনে পড়ে কী করে। এত কম বয়সে কী করে এত ভোলো, সেটা বুঝি না।’

‘প্রথম কথা ওই চিহ্নতে ‘‘আর’’ অক্ষরটা থাকলেও তার লেজে যে আড়াআড়ি কাটা দাগটা আছে সেটা এক্স নয়। হোরাসের চোখ উপড়ে নেওয়া হয়েছিল। সেই আঘাতের দাগই ওটা।’

‘হোরাসের চোখ উপড়ে নেওয়া হয়েছিল! কে নিয়েছিল!?’

‘দেবতা সেথ।’

‘সেথ? মানে ওসাইরিসের ভাই, যে ওকে খুন করেছিল?’

‘হ্যাঁ ভাই, এই সেই সেথ, কেন চোখ উপড়ে নিলেন সেই গল্পটাই বলি শোনো।’

‘ওসাইরিসকে খুন করে দেবতাদের সিংহাসনে বসেন সেথ। অন্যদিকে আইসিসের জাদুতে ওসাইরিসের মৃত শরীরে প্রাণ এলেও তিনি আর বাকি দেবতাদের দলে জায়গা পেলেন না। তাঁরকে চলে যেতে হল মিশরের পশ্চিমে, যেখানে মৃতদের কবর দেওয়া হত। ওসাইরিস হলেন মৃতদের দেবতা। সেথ কিন্তু রাজা হয়েও শান্তি পাননি, খবর পেয়েছিলেন যে আইসিসের এক সন্তান হয়েছে ওসাইরিসের ঔরসে। তাকে মারার জন্য উঠে-পড়ে লেগেওছিলেন।

‘বুদ্ধিমতী আইসিস হোরাসের জন্ম দেওয়ার পরেই সদ্যোজাত শিশুকে তুলে দেন দেবী হাথোরের হাতে। নীল নদের অববাহিকাতে প্যাপিরাস গাছে ভরা জলাভূমিতে বেড়ে উঠতে থাকলেন হোরাস। হোরাস যখন প্রাপ্তবয়স্ক হলেন তখন আইসিস ওঁকে নিয়ে এলেন দেবতাদের দরবারে, যাতে হোরাস সিংহাসনে ওঁর যোগ্য অধিকার দাবি করতে পারেন। কিন্তু সেথ সিংহাসন ছাড়তে রাজি হলেন না। তখন দেবতারা ঠিক করল সেথ আর হোরাস দু-জনকেই একবার করে সুযোগ দেওয়া হোক এইটা বলার যে কেন সে-ই সিংহাসনের ন্যায্য দাবিদার।

‘প্রথমে সেথ বলতে উঠলেন, বললেন, আমি দেবী নুতের সন্তান, তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী। প্রতিদিন আমিই রা-এর নৌকোতে থাকি, প্রতি রাতে আমিই তাকে সাহায্য করি আপেপ নামের সাপকে হত্যা করার জন্য। আর কেউ তো এই কাজ করতে পারবে না। তাই আমিই এই সিংহাসনে বসার যোগ্য।

‘এরপরে হোরাসের সুযোগ এল, কিন্তু তিনি শুধু বললেন, ওসাইরিসের সন্তান আমি, এই সিংহাসন রাজা ওসাইরিসের ছিল, তাই এখন তাঁরর অনুপস্থিতিতে এর ওপরে আমারই অধিকার। সেথ আমাকে ঠকাচ্ছেন।

‘দেবতাদের মধ্যে এবারে মতপার্থক্য দেখা দিল, কিছু জন যদিও ভাবলেন যে হোরাসকেই সিংহাসনে বসতে দেওয়া হোক, বেশির ভাগেরই মত ছিল সেথের দিকে। কারণ সেথ অনেক বেশি অভিজ্ঞ এবং সাহসী। দেবতাদের পাল্লা সেথের দিকে ভারী বেশি দেখে হোরাস সেথকে যুদ্ধে আহ্বান করে বসলেন। দু-জনেই দুটো জলহস্তীর আকার ধারণ করে ঝাঁপ দিলেন নীল নদের জলে। আইসিস এই সময় ছলনার আশ্রয় নিলেন। সেথকে আঘাত করার জন্য তির ছুড়লেন জলের মধ্যে। কিন্তু সেই তির গিয়ে লাগল হোরাসের পায়ে। আহত হোরাসকে জল থেকে উঠে আসতেই হল। সে লুকিয়ে পড়ল জঙ্গলের মধ্যে। সেথও ধাওয়া করলেন ওকে।

হোরাস ও সেথ ফারাওকে আশীর্বাদ করছে

‘সন্ধের দিকে সেথ খুঁজে পেলেন প্রায় অচৈতন্য হোরাসকে। একটা গাছের নীচে শুয়ে আছে। সেথ ঝাঁপিয়ে পড়লেন হোরাসের ওপরে। দুর্বল হোরাস সেই আক্রমণ ঠেকাতে পারল না। সেই সময়তেই সেথ হোরাসের দুটো চোখই উপড়ে নিলেন। এরপরে জঙ্গলের বাইরে বেরিয়ে এসে বলেন হোরাসকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। অতএব তিনিই রাজা।’

‘হোরাস তাহলে মারা গেলেন!’

‘আরে, এখানেই তো টুইস্টটা। মৃতপ্রায় হোরাসকে খুঁজে পান ওর পালিকা মা হাথোর। হাথোর এক বন্য হরিণকে ধরে তার দুধ দুয়ে নেন। তারপরে সেই দুধ একটু একটু করে ঢালেন হোরাসের দুই চোখের গহ্বরে। হাথোরের জাদুতে হোরাস ফের তাঁরর দৃষ্টি ফিরে পান। তারপরে আরও অনেক যুদ্ধ, বাগ্্বিতণ্ডা পেরিয়ে সেথকে হারিয়ে হোরাস রাজার সিংহাসনে বসেন। হোরাসের চোখের চিকিৎসা করেছিলেন হাথোর। তাই ইজিপশিয়ানদের বিশ্বাস ছিল এই চোখের জাদু ক্ষমতা আছে। মিশরীয় চিকিৎসকেরাও ওষুধের সঙ্গে সঙ্গে হোরাসের চোখের আকারে বানানো তাবিজ পরতে বলতেন। এইভাবেই হোরাসের চোখ মিশে গেছে ডাক্তারির ধ্যানধারণার সঙ্গে।’

পিজি এবারে আবার মুখ খুলল,

‘ইয়েস! আমি জানতাম এই গল্পটার কথা! আমার ন-দাদু বলেছিল ! মনে পড়ে গেল সব।’

আমি আর তারপরে থাকতে পারিনি, ওর মাথায় একটা গাঁট্টা মারতেই হল। গুল দেওয়ারও তো একটা লিমিট আছে নাকি!

ফারাও

‘স্পন্দন।’

‘হুঁ।’

‘স্পন্দন, শুনছিস?’

‘হুঁ, বল।’

‘কী রে? মোবাইলটা থেকে মুখ তুলে শোন আমি কী বলছি।’

পিজির জন্য গেমটা হারলাম। বিরক্ত মুখে ওর দিকে তাকাতেই ও বলল,

‘আমার না, ভবেশদাকে কেমন একটা সন্দেহ হয়, বুঝলি।’

‘কেন, সন্দেহ হওয়ার কী আছে?’

‘কি আছে! তুইই বল, আজকে ব্যাঙ্কে আসার কী মানে?’

‘মানে আবার কী? মানুষ তো ব্যাঙ্কে আসতেই পারে। এতে অবাক হওয়ার কী আছে?’

‘তোর মাথাটা ওই কমিউনিটি মেডিসিন পড়ে পড়ে ভোঁতা হয়ে গেছে। অন্য কোনো ব্যাঙ্কে এলে কথা ছিল না। কিন্তু একেবারে স্টেট ব্যাঙ্কের মেন অফিসে? ফরেন ট্রান্সাকশনের উইংয়ে! কলেজ স্ট্রিটের একটা বইয়ের গুমটির মালিকের এখানে আসার কী মানে? কে কী পাঠাচ্ছে বিদেশ থেকে? নাকি নিজেই বিদেশে...’

পিজির কথা শেষ হওয়ার আগেই এন আর আই উইংয়ের দরজা খুলে ভবেশদা বেরিয়ে এল। হাতে দেখলাম সেই ক্যাটক্যাটে লাল রঙের ফাইলটাই আছে, যেটা নিয়ে ঢুকেছিল।

‘যাক, কাজটা মিটল। থ্যাঙ্ক ইউ পিজি ভাই, তোমার মামা এই ব্রাঞ্চে ছিলেন, তাই কাজটা ভালোয় ভালোয় হয়ে গেল।’

‘আরে, এটা কোনো ব্যাপারই না, ভবেশদা। তা আপনার এখানে দরকারটা কী ছিল? মানে যদি...’

‘তেমন কিছু নয়। আসলে আমার এক মামাতো ভাই থাকে ইংল্যান্ডে। তো, ওর ক-টা কাজ আমাকে করতে দিয়েছিল। হয়ে গেছে। বাঁচা গেছে। চলো, এবারে তোমাদেরকে সেই দারুণ জিনিসটা খাওয়াব!’

গত সপ্তাহে ভবেশদাকে নিয়ে আমরা গিয়েছিলাম স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার স্ট্র্যান্ড রোডের ব্রাঞ্চে, যেটাকে সবাই সমৃদ্ধি ভবন বলে। ভবেশদার নাকি ওখানেই কী-একটা কাজ ছিল। পিজির মামা ওখানে চাকরি করে। কেউ চেনাশোনা থাকলে একটু সুবিধা হয়, তাই পিজির আসা ভবেশদার সঙ্গে। তবে আমার আসার কারণটা ছিল অন্য।

স্কুপ!

ব্যাঙ্কের কাজ ঠিকঠাকভাবে হয়ে গেলেই আমাদেরকে স্কুপে খাওয়াবেন ভবেশদা। এই ছিল পিজির শর্ত। এতদিন স্কুপের নামই শুনে এসেছিলাম। দারুণ দারুণ আইসক্রিম পাওয়া যায় নাকি! আমি আর পিজি কেউই আগে আসিনি এখানে। স্ট্র্যান্ড রোডের স্টেট ব্যাঙ্কের অফিস থেকে মিনিট তিরিশের হাঁটাপথে স্কুপ। প্রিন্সেপ ঘাটের একটু আগেই। গঙ্গার ধারে একটা ছোট্ট রেস্টুরেন্ট। দোতলা, ছিমছাম।

‘আইসক্রিম তো খাওয়াবই, তার আগে তোমাদেরকে স্কুপের আরেকটা জিনিস খাওয়াই বরং।’

‘কী? মেনুতে তো দেখছি পিৎজাও আছে।’

‘না না, পিৎজা না, ওটা এখানে এমন কিছু বানায় না। ফ্রেঞ্চ ফ্রাই খাই আগে চলো, এদের ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের কাছে ম্যাকডোনাল্ড, কেএফসি নস্যি।’

দুটো বড়ো ঠোঙা ভরতি করে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই কিনে আমরা এসে বসলাম গঙ্গার ধারে। তখন ঘড়িতে বাজে সাড়ে চারটে। রোদের চড়া ভাবটা গায়ে লাগছিল না আশেপাশের গাছগুলোর জন্য। একটা ঠান্ডা হাওয়া এসে লাগছিল মুখে-চোখে। স্কুপের ফ্রেঞ্চ ফ্রাই সত্যি খুব ভালো, কী-একটা মশলা দিয়েছে, তাতে টেস্ট আরও খোলতাই হয়েছে, মুচমুচেও বেশ। মনের সুখে পা ছড়িয়ে বসে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই খাচ্ছিলাম এমন সময় পিজি লাফিয়ে উঠল। দেখি এক পা তুলে নাচছে।

‘উফফ! কী জোর কামড়েছে রে! একদম ফুলে গেল!’

পিজি যেখানটায় বসেছিল সেখানে দেখি লাল ডেয়ো পিঁপড়ের দল, একেবারে গিজগিজ করছে, গাছের নীচে পড়ে-থাকা শুকনো পাতার আড়ালে ছিল তাই বুঝতে পারেনি। পিজি কী সব বিড়বিড় করতে করতে আর পা চুলকোতে চুলকোতে জায়গাটা বদলে বসল।

‘খুব রাগ ধরছে না, পিজি ভাই? এই পিঁপড়েরাই কিন্তু কয়েক হাজার বছর আগে মিশরের রাজাদের কামড়াত। তোমার একটু গর্ব করাও উচিত।’

ততক্ষণে পিজি আবার মুখে এক গাদা ফ্রাই পুরেছে, স্বর বেরোনোর জায়গা নেই। তাই আমিই বললাম,

‘মিশরের রাজা?! মানে ফারাওদের কথা বলছেন?’

‘হ্যাঁ, এই পিঁপড়েগুলোকে বলে ফারাও অ্যান্ট। প্রাচীন মিশরেই নাকি এদের সবচেয়ে বেশি দেখা যেত, তাই এরকম নাম।’

‘আপনি কিন্তু খুফু ছাড়া বাকি ফারাওদের নিয়ে আমাদের কিছু বলেননি।’

‘বলাই যায়, হাতে সময় আছে তো?’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ, সময় তো অঢেল। কাল তো রবিবার, কলেজের চাপ নেই।’

‘ওকে। তাহলে বলাই যায়। তবে ফারাও শব্দটা কিন্তু খুব পুরোনো নয়।’

‘মানে?’

‘মানে, মিশরের রাজাদের সবসময় ফারাও বলা হত না। প্রথম যে রাজাকে ফারাও বলে সম্বোধন করা হয় সে হল আখেনাতেন। সময়টা মোটামুটি ১৩৫০ বিসি। কিন্তু মিশরের রাজাদের ইতিহাস আরও অনেক অনেক পুরোনো। প্রথম যে রাজার হদিশ পাওয়া যায় সে হল নার্মার। যিশুর জন্মের একত্রিশশো বছর আগের কথা এটা।’

‘তাহলে আগে রাজাদের কী নামে ডাকা হত?’

‘সেইসময়ে রাজাদের একটা না, তিনটে নাম থাকত, বুঝলে।

প্রথমটা হল হোরাস নাম, মানে দেবতা হোরাসের সঙ্গে নিজেকে মেলানো।’

‘মানে?’

‘মানে ধরো এই নামগুলো— ‘‘যোদ্ধা হোরাস’’, ‘‘শক্তিশালী হোরাস’’, ‘‘সূর্যের সন্তান হোরাস’’ এরকম।

‘হোরাস নামের পরে যে নাম আসত সেটা হল ‘‘নেসুবিতি’’ নাম। মানে জন্মের সময় রাজার যে নাম ছিল।

‘আর নেসুবিতি নামের পরে আসত ‘‘নেবতি’’ নাম, যে নামের মানে রাজা মিশরের উত্তর আর দক্ষিণ এই দুই ভাগেরই অধীশ্বর। এই নামে রাজাকে লিঙ্ক করা হত উত্তর মিশরের দেবতা নেখবেত আর দক্ষিণ মিশরের দেবতা ওয়াজেতের সঙ্গে।’

পিজি এবারে বলল,

‘বাবা রে! এতগুলো নাম একজনের!’

‘এতে তো অবাক হওয়ার কিছু নেই, ভাই। আমাদের রাজাদেরও তো একগাদা উপাধি থাকত।’

‘হুমম, তা বটে। কিন্তু ফারাও নামটা এল কী করে?’

‘এর পিছনের গল্পটা বেশ ইন্টারেস্টিং, বুঝলে। মিশরীয়দের কাছে রাজাদের বিশাল প্রাসাদের উচ্চারণ ছিল ‘‘প্র-ও’’। রাজার হোরাস নাম লেখার সময় চৌকো রাজপ্রাসাদ এঁকে তার ভেতরে লেখা হত। একসময় এই রাজপ্রাসাদই রাজার নামের সঙ্গে মিশে যায়। পরে গ্রিকরা এই নাম উচ্চারণ করল পার-ও। আবার হিব্রু ভাষায় যখন ওল্ড টেস্টামেন্ট লেখা হল তখন রাজার নাম হল পার-ওহ। সেখান থেকে ল্যাটিনে এল ফারাও। কোরানেও এই রাজাদের কথা লেখা আছে বুঝলে, আরবিতে উচ্চারণ ছিল ফিরা-ওন। সবশেষে ইংরেজিতে ল্যাটিন নামটাই চলে এল। তাই আজকে সবাই ফারাও নামটাই জানে।’

‘আচ্ছা ভবেশদা, একটা জিনিস মাথায় ঢুকল না, ফারাওরা নিজেদের সঙ্গে ভগবানের নাম জুড়ত কেন? আমাদের কোনো রাজাকে এমনটা করতে দেখিনি।’

‘ফারাওদের তো নিজের নামের সঙ্গে ভগবানের নাম জুড়তেই হত! সাধারণ মানুষের কাছে ওরাই তো হল ভগবানের প্রতিভূ। দেবী ‘‘মাত’’-এর কথা বলেছিলাম মনে আছে?’

‘হ্যাঁ, বলেছিলেন তো বুক অফ দ্য ডেড-এর কথা বলার সময়।’

‘ঠিক, মাত ছিলেন ন্যায়ের দেবী। ফারাওদের প্রধান কাজটাই ছিল দেশ জুড়ে মাত বা ন্যায়কে বজায় রাখা। দেশের ভারসাম্য যাতে নষ্ট না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা। যা দেশের ব্যালান্স নষ্ট করে, তা-ই মাতের বিপক্ষে। তাই ফারাওদের যেমন বিদ্রোহ দমন করতে হত, বাইরের দেশের আক্রমণ প্রতিহত করতে হত তেমনই আবার দেশে খরা বা বন্যা হলে ফারাওদেরই দায়িত্ব ছিল ভগবানের উপাসনা করা। ভেবে দেখো একবার, কাজটা মোটেই সহজ ছিল না। ফারাওদের প্রায় গোটা বছরটাই কাটত নীল নদে, দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ট্রাভেল করে। তার ওপরে কোথাও যুদ্ধ লাগলে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে হত। ক্ষমতার লোভে রাজপরিবারের মধ্যেও খুনখারাপি কম হত না। তাই বেশিরভাগ ফারাওই তিরিশ-চল্লিশ বছরের বেশি বাঁচেননি।

‘এবারে তোমরা একটা কথা বলো দেখি, ফারাওদের ছবি দেখে চিনবে কী করে?’

পিজি বলল, ‘ছবি দেখেছি তো অনেক, মাথায় একটা কভারের মতো থাকে, মুখে আবার লম্বা দাড়ি, এদিকে গোঁফ কামানো।’

‘হুমম, কিছুটা ঠিক বলেছ। তবে ফারাও বলতেই আমরা যার ছবির কথা ভাবি সেটা তুতানখামেনের মুখোশ। কিন্তু ওই মাথার কভার আর দাড়ি ছাড়াও আরও অনেক কিছু বোঝার আছে। গুগলে সার্চ দিয়ে তুতানখামেনের ছবিটা বার করো তো।’

ছবিটা এতই বিখ্যাত যে খুঁজে পেতে দশ সেকেন্ডও লাগল না, আমার মোবাইলের স্ক্রিনের ওপরে ঝুঁকে এলেন ভবেশদা আর পিজি।

‘ভালো করে দেখো ছবিটা, মাথার ওপরে সাপটা দেখতে পাচ্ছ? ওটা কী বলো তো?’

‘ইউরেয়াস? সেই দেবতা আতুম-এর মেয়ে?’

‘বাহ! একদম ঠিক ধরেছ। সেই ইউরেয়াসই বটে। তবে এখানে এই সাপ হল দক্ষিণ মিশরের সেই দেবতা ওয়াজেতের প্রতীক, আর তার পাশে দেখো, একটা শকুনের মাথা দেখতে পাবে।’

‘বুঝে গেছি, এটা হল উত্তর মিশরের অন্য আরেকটা দেবতা, কী যেন নাম বলেছিলেন?’

‘নেখবেত। তুতানখামেনের মাথার যে কভারটা, ওর নাম হল নেমেস। মিশরের প্রায় সব রাজার মূর্তি বা ছবিতে এই নেমেস দেখতে পাবে। কিছুর সঙ্গে এই কভারটার মিল পাচ্ছ? দেখো, কেমন কানের মাথার দু-পাশ দিয়ে কাঁধের কাছে নেমে গেছে।’

‘অনেকটা সিংহের কেশরের মতো!’

‘ঠিক ধরেছ! সিংহের কেশরের মতো করেই নেমেসকে বানানো হয়েছিল, যাতে সিংহের মতো সাহস আর শক্তি যে রাজার মধ্যে আছে সেটা বোঝা যায়। এবারে দাড়িটার দিকে খেয়াল করো। মিশরে পুরুষদের গাল পরিষ্কার করে কামানো থাকত, গোঁফ বা দাড়ি রাখার চল ছিল না। কিন্তু ফারাওদের একটা নকল দাড়ি রাখা বাধ্যতামূলক ছিল। নিয়মটা এতটাই কড়া ছিল যে হাতসেপসুত নামের একজন রানি যখন নিজেকে ফারাও বলে ঘোষণা করেন তখন মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও তাকে এই ফলস দাড়ি লাগাতেই হয়। তুতানখামেনের দাড়ির নীচটা দেখো, একটু সামনের দিকে বাঁকা, তাই না?’

‘হ্যাঁ।’

‘এবারে চট করে রামেসিস সেকেন্ড বলে সার্চ দাও তো। যে ফারাওয়ের মূর্তিটা আসবে সেটা ভালো করে দেখো।’

রামেসিসের মূর্তিও চট করে পাওয়া গেল।

‘মাথার ওপরের সাপ আর নেমেস টুপিটা তো দেখতেই পাচ্ছ। শকুনটা নেই, মানে সেই সময় রামেসিস শুধুমাত্র দক্ষিণ মিশরের রাজা ছিলেন। এবারে দাড়িটা খেয়াল করো। কোনো তফাত আছে?’

‘আছে তো। এই দাড়িটা একদম সোজা নেমে গেছে দেখছি।’

‘হ্যাঁ, তার মানে যখন এই মূর্তি বানানো হয় তখন রাজা জীবিত ছিলেন। আর তুতানখামেনের মুখোশটা বানানো হয় ওঁর মারা যাওয়ার পরে। তাই দাড়িটাও সামনের দিকে বাঁকানো।’

‘বাহ, তাহলে শুধু মাথা দেখেই তো ফারাওয়ের ব্যাপারে অনেক কিছু বলে দেওয়া যায়!’

‘হ্যাঁ, যায়ই তো। এবারে তুতানখামেনের হাতের দিকে খেয়াল করো। কী দেখতে পাচ্ছ?’

দ্বিতীয় রােমসিসের শোয়ােনা মূর্তি

‘একটা হাতে একটা লাঠির মতো ধরা আছে, মাথার দিকটা গোল করে বাঁকানো। আরেক হাতে ধরা লাঠির মাথায় তিনটে ছোটো ছোটো কাঠি লাগানো আছে।’

‘পরের যে লাঠিটার কথা বললে সেটার বাংলা কোনো শব্দ নেই, ইংরেজিতে একে ফ্লেইল বলে। এইটা দিয়ে মেরে মেরে শস্য ঝাড়াই করা হত। এর মানে ফারাও দেশের শস্যেরও রক্ষাকর্তা। আর প্রথমে যে লাঠিটার কথা বললে সেটা হল রাজদণ্ড বা স্কেপটার। এটা সবসময় নেতার হাতে দেখবে, যেমনটা আগের দিন দেবতা আতুমের হাতে ছিল। এই মাথার কাছে বাঁকানো স্কেপটারের নাম হল হেকা। আবার আতুমের হাতে থাকা স্কেপটারের নাম হল ওয়াস। একটা মজার জিনিস দেখাই তোমাদের, মোজেসের একটা ছবি খুঁজে বার করো দেখি।’

বেরোল সেই ছবি।

‘এবারে ভালো করে দেখো তো মোজেসকে।’

‘হুমম, লম্বা দাড়িওলা, এক হাতে কমান্ডমেন্টস লেখা স্ল্যাব ধরে আছে, আরেক হাতে… আরে! সেই লাঠি! মাথাটা বাঁকানো! হেকা!’

‘ঠিক ধরেছ। বাইবেলের শুরুই তো মিশরে। মোজেসের এক্সোডাস মনে আছে? সেটা হয়েছিল ফারাও দ্বিতীয় আমেনহোতেপের সময়। ইংরেজি টেন কম্যান্ডমেন্টস সিনেমাটাতে যদিও দেখিয়েছিল দ্বিতীয় রামেসিসকে। সেটা একটা বেশ বড়ো ভুল।’

গল্প করতে করতে কখন ফ্রেঞ্চ ফ্রাই ফুরিয়ে গেছে খেয়াল ছিল না। পিজি এবারে ডাস্টবিনে ঠোঙাটা টিপ করে ফেলে বলল,

‘একটা কথা বললেন না, ভবেশদা। হায়রোগ্লিফ শেখার সময় খেয়াল করেছিলাম শুধু ফারাওদের নামগুলো কেমন একটা চ্যাপটা চাকতির মতো জিনিসে কভার করা।’

‘ও, আচ্ছা। কার্তুজের কথা বলছ?’

‘অ্যাঁ? ওগুলোকে কার্তুজ বলে?’

‘হ্যাঁ, তাই বলে তো। তবে প্রথমে কিন্তু এমনটা ছিল না বুঝলে, এটা ছিল একদম গোল। নাম ছিল শেন। আকারটা গোল ছিল কারণ এর কোনো শুরু বা শেষ নেই। তাই ফারাওদের অমরত্ব প্রমাণ করার জন্য ওদের নাম লেখা হত শেনের মধ্যে। তবে এতে একটা মুশকিল হল। ভালো করে গুছিয়ে ফারাওয়ের নামটা শেনের মধ্যে লেখা সম্ভব হচ্ছিল না। তাই শেনের আকার আস্তে আস্তে বদলে লম্বাটে হয়ে গেল।’

‘তাহলে কার্তুজ, এমন নাম কেন? এটাও কি ইজিপশিয়ান নাম?’

‘ধুস, মোটেই ইজিপশিয়ান নয়, ফ্রেঞ্চ। আর ফ্রেঞ্চ উচ্চারণে ওটা হয় কার্তুস।’

‘বলেন কী! ফ্রেঞ্চ?’

‘হ্যাঁ। নেপোলিয়নের সেনারা ইজিপ্টে আসার পরে চারিদিকের মন্দিরে, কবরের দেওয়ালে এই লম্বাটে চিহ্নগুলো দেখতে পাচ্ছিল। কিন্তু তখনও তো হায়রোগ্লিফের মানে কেউ জানতই না। তাই কী লেখা আছে ওতে সে-ব্যাপারে কোনো ধারণাই হয়নি ওদের। চিহ্নটা দেখতে অনেকটা বন্দুকের গুলির মতো ছিল, যার ফরাসি নাম কার্তুজ। তাই ওরকম নাম হয়ে গেল।’

‘আচ্ছা ভবেশদা, আপনি ফারাওদের গল্প জানেন? মানে আমরা তো যেটুকু জানি তা ওই তুতানখামেনেরই।’

‘হ্যাঁ, তুতানখামেন তো ওয়ান অফ দ্য মোস্ট ইনসিগনিফিক্যান্ট ফারাও ছিলেন। রামেসিস, হাতসেপসুত, আখেনাতেন, সেতি এদের গল্প বললে অবাক হয়ে যাবে! আমি জানি কিছু কিছু, আরও কিছু পড়ছি এখনও। বলব তোমাদের এক এক করে। তবে ফারাওদের গল্পটা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কবরে শুরু, বুঝলে।’

‘কবরে? মানে ঠিক বুঝলাম না।’

‘অধিকাংশ ফারাওদেরই তো জীবদ্দশায় লেখা কোনো জীবনী পাওয়া যায়নি। সেইসময় রাজদরবারে হওয়া কাজকর্মের রোজনামচা লিখে রাখারও কোনো চল ছিল না। তাই ফারাওদের সম্পর্কে যেটুকু জানা যায় তা ওই ফারাওদের প্রতিষ্ঠা করা মন্দিরের গায়ে অথবা ওদের কবরের গায়ে লিখে রাখা লিপি থেকে। অনেক ক্ষেত্রেই হয়তো সেগুলো অনেক বাড়িয়ে বলা, রাজাকে গ্লোরিফাই করার জন্য। তবে ওইটাই আমাদের একমাত্র সম্বল। সেইসব কবর আর মন্দির আবিষ্কার করার গল্পও দারুণ ইন্টারেস্টিং! তাই ফারাওদের গল্প বলতে গেলে তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আর্কিয়োলজিস্টদের গল্পও চলে আসবে।

‘যেমন হাওয়ার্ড কার্টার!’

‘শুধু কার্টার না, বেলজোনি, বুর্খার্ট, জাহি হাওয়াস এমন অনেকের কথা বলতে হবে। এখন চলো স্কুপে ফেরা যাক। আইসক্রিম খেতে খেতে গল্প করা যাবে না হয়।’

বেলজোনি

‘১৮০৩ সালের লন্ডন শহরের ওয়েস্টমিনিস্টার ব্রিজের কাছে সার্কাস বসেছে। কাপড় দিয়ে ঘেরা জায়গাটায় থিকথিক করছে লোক। মাঝের ফাঁকা গোল অংশে খেলা দেখানো চলছে। তবে সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে আছে শেষ খেলাটার জন্য। এইজন্যই এত ভিড়। খেলাটার নাম ‘হিউম্যান পিরামিড’! সাত ফুট লম্বা একজন মানুষ স্টেজের মাঝে এগিয়ে আসে। চওড়া কাঁধ, লম্বা চুল, নীল চোখের মণি। হারকিউলিসের মতো চেহারা। সেই লোকটার দু-দিকে ছড়িয়ে রাখা হাতের ওপর ভর দিয়ে একে একে কাঁধে উঠে পড়ে বারোজন মানুষ!’

‘অ্যাঁ! বারোজন!’

মুখের কাছে আইসক্রিমটা চামচে করে এনে হাঁ হয়ে রইল পিজি।

‘হ্যাঁ, বারোজন। কীরকম শক্তিশালী মানুষ খালি ভাবো। ওই পিরামিডের চুড়ো তৈরি করত একটা সুন্দরী মেয়ে। সে নাকি আবার এই দৈত্যের স্ত্রী। সার্কাসের রিং-এ এই লোকটার গালভরা নাম ‘‘প্যাটাগোনিয়ান স্যামসন’’। তবে মিশরের আর্কিয়োলজির ইতিহাসে ও অমর হয়ে আছে ওর আসল নামে। জিওভান্নি বাতিস্তা বেলজোনি।’

‘জিওভান্নি? নামটা শুনে ইতালিয়ান মনে হচ্ছে তো।’

‘ইতালিয়ানই তো। ১৭৭৮-এ ইতালির পাদুয়া নামের একটা ছোট্ট শহরে জন্ম হয়েছিল বেলজোনির। বাবা ছিল গরিব নাপিত। খুব ছোটো বয়স থেকেই ও বাবার দোকানে কাজ শুরু করেছিল। কিন্তু ওই কাজ ওর কোনোদিনই ভালো লাগত না। তাই ষোলো বছর বয়সে দাদা ফ্রাঞ্চেস্কোর সঙ্গে পালিয়ে এসেছিল রোমে। ১৭৯৭তে রোম দখল করল ফ্রেঞ্চরা। জোয়ানদের তখন ফ্রেঞ্চ আর্মিতে নাম লেখাতেই হবে। জিওভান্নি তাই পালিয়ে গেল হল্যান্ডে। সেখানে হাইড্রোলিক মেশিনের কাজ শিখল বেশ কয়েক বছর। তার পরে গন্তব্য লন্ডন। আশা ছিল ইঞ্জিনিয়ারের কাজ পাবে। কিন্তু কেউ ওকে কাজ দিতে রাজি হল না। অতঃপর জিওভানি বেলজোনির জায়গা হল লন্ডনের সার্কাস।’

‘কিন্তু একজন সার্কাসে খেলা দেখানো লোক আর্কিয়োলজিস্ট হয়ে গেল কী করে?!’

বেলজোনি

‘ডেস্টিনি স্পন্দন ভাই, ডেস্টিনি। সার্কাসে খেলা দেখিয়ে রোজগার মন্দ হত না। কিন্তু তাতে তো সম্মান ছিল না। ন-বছর বিলেতে কাটাবার পরে তাই একদিন বেলজোনি সব কিছু ছেড়েছুড়ে দিয়ে বেরিয়ে পড়ল নিজের ভাগ্য বদলাবার জন্য। সঙ্গে ওর স্ত্রী সারা আর খাস চাকর জেমস কার্টিন। অন্যদিকে মিশরে তখন একটা অদ্ভুত অবস্থায় পড়েছেন তখনকার শাসক পাশা মহম্মদ আলি। লজ্জায় প্রায় নাক কাটা যাবার উপক্রম বলতে পারো।’

পিজি বলল, ‘কী কেস?’

‘কেস খুব জন্ডিস তখন, বুঝলে। মামলুক লিডারদের সরিয়ে আলি পাশা মিশরের মসনদে বসার পরে ঠিক করেন দেশটাকে ভালো করে সাজাতে হবে। সেইমতো নতুন নতুন প্রাসাদ গড়ে উঠতে লেগেছিল কায়রো আর তার চারপাশের শহরগুলোতে। তবে শুধু শহর গড়লেই তো আর হবে না। দেশে জলের অভাব বরাবরই ছিল। চাষবাসের জন্য বা শহরের রোজকারের কাজে লাগাবার জন্য নীল নদ থেকে জল তুলে আনতে হবে। তার জন্য চাই ভালো কোয়ালিটির পাম্প। এদিকে সেই পাম্প বানানোর মতো ইঞ্জিনিয়ার গোটা দেশে নেই। যেটুকু জল ওঠে সেটা ষাঁড়ে-টানা সাক্কিয়া নামের একরকমের প্রাগৈতিহাসিক নকশার দুর্বল পাম্পে। ভালো পাম্প কেনার জন্য তাই পাশাকে তাকাতে হল ইউরোপের দিকে। প্রথম সুযোগেই ব্রিটিশরা ঝাঁপিয়ে পড়ল। ওরা বলল আমরা একটা দারুণ পাম্প আপনাকে দিতে পারি, যার কারিগরি সবচেয়ে আধুনিক। পাশা রাজি হয়ে গেলেন। একটা পাম্প কিনতে আলি পাশার খরচা হল তখনকার দিনের মুদ্রায় ১০,০০০ পাউন্ড। মানে, প্রায় নব্বই হাজার টাকা। এখনকার হিসেবে সেটা প্রায় তিরিশ চল্লিশ লাখ টাকা হবে।’

ষাঁড়ে টানা সাক্কিয়া

‘বলেন কী! অত টাকা দিয়ে একটা পাম্প! ব্রিটিশরা বেশ ভালো লেভেলে বোকা বানিয়েছিল তো দেখছি পাশাকে।’

‘দাঁড়াও দাঁড়াও, শুধু এখানেই বোকা বানানোর শেষ নেই। ব্রিটিশ পাম্প তো এসে পৌঁছোল পাশার কাছে। কিন্তু সেই পাম্প চালানো শেখাবার জন্য কেউ এল না ইংল্যান্ড থেকে। একটা আদ্দামড়া মেশিন নিয়ে পাশা বোকার মতো বসে রইলেন।’

‘এ বাবা। একদম যা তা লেভেলে ঠকেছিলেন দেখছি আলি পাশা।’

‘তা আর বলতে? পাশা সেইজন্য নিজের খুব কাছের একজনকে পাঠিয়েছিলেন ইউরোপে। তাঁরর নাম ইসমায়েল জিব্রালটার। জিব্রালটারের কাজ ছিল একজন ইঞ্জিনিয়ারকে ধরে পাশার কাছে নিয়ে আসা। এই জিব্রালটার যখন ইউরোপের উত্তর দিকের একটা ছোট্ট দ্বীপ মালটাতে ঘুরছেন তখন ওঁর সঙ্গে আলাপ হল একজন ইতালীয়র। কে বলো তো লোকটা?’

আমি আর পিজি দু-জনেই ভুরু কুঁচকে ভাবতে লাগলাম।

‘আচ্ছা, কয়েকটা হিন্ট দিচ্ছি। ইতালীয় হলেও সে থাকত ইংল্যান্ডে। লম্বা-চওড়া চেহারা, গালে দাড়ি। চোখের মণি নীল। ইসমায়েলের কাছে নিজের পরিচয় দিয়েছিল হাইড্রোলিক ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে। সার্কাসে খেলা দেখানোর কথা থোড়াই কেউ নিজের সিভিতে রাখে !’

‘বেলজোনি!’

‘একদম ঠিক ধরেছ । ইংল্যান্ড ছেড়ে বেরিয়ে এসে পোর্তুগাল, স্পেন, সিসিলি হয়ে বেলজোনি এসে পৌঁছোয় মালটাতে। ইসমায়েল পাম্প চালাবার ইঞ্জিনিয়ার খুঁজছে জানতে পেরে নিজেই আলাপ জমায়। এদিকে ইসমায়েলও বেলজোনিকে পেয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। ১৮১৫ সালের ১৯ মে জিওভান্নি বাতিস্তা বেলজোনি ওর স্ত্রী আর চাকরকে নিয়ে এসে পৌঁছোল মিশরে। তখনও বেলজোনির কোনো ধারণাই ছিল না যে ওর গোটা জীবনটাই বদলে যেতে চলেছে।

‘বেলজোনি পাশার সঙ্গে দেখা করেই জানিয়ে দিল যে ব্রিটিশ কোম্পানির দেওয়া পাম্প সে চালাতে জানে না। কিন্তু অনেক কম খরচে এমন একটা পাম্প ও বানিয়ে দিতে পারবে যেটা সাক্কিয়া পাম্পের থেকে ঢের ভালো কাজ করবে। এক বছর ধরে বেলজোনি সেই মেশিন বানাল। গোল ড্রামের মতো দেখতে একটা অংশকে একটা ষাঁড় ঘোরাবে। আর তার থেকে তৈরি হওয়া এনার্জিতেই জল উঠবে। ডেমনস্ট্রেশনের দিন সেই পাম্প বেশ ভালোই কাজ করল। ছ-টা সাক্কিয়া পাম্প যে পরিমাণ জল তোলে তার সমান জল তুলে দেখাল বেলজোনির মেশিন। পাশা তো খুব খুশি। কিন্তু বেলজোনির এই সাফল্য পাশার দরবারের অনেকের সহ্য হল না। আগে থেকেই তারা একটা প্ল্যান বানিয়ে রেখেছিল। তাদের মধ্যে একজন পাশাকে বলল, আচ্ছা, ষাঁড়ের বদলে যদি মানুষই ড্রামটাকে ঘোরায় তাহলে কী হবে। মজা দেখার আশায় পাশা রাজিও হলে গেল। ষঁাড়টাকে সরিয়ে পনেরো জন মানুষকে দাঁড় করানো হল সেই জায়গায়। তাদের মধ্যে বেলজোনির চাকর জেমসও ছিল। ড্রাম আস্তে আস্তে ঘুরতে লাগল। হঠাৎই জেমসকে ছেড়ে দিয়ে বাকি চোদ্দোজন সরে দাঁড়াল। বিশাল বড়ো আর ভারী ড্রামটা ভারসাম্য রাখতে না পেরে পড়ল জেমসের ওপরে। ওটা জেমসকে পিষেই ফেলত, যদি না বেলজোনি নিজের অতিমানবিক শক্তি দিয়ে ড্রামটাকে সামলে রাখত। কিন্তু ততক্ষণে বেচারা জেমসের থাইয়ের হাড় হয়ে গেছে দু-টুকরো। প্রথম কাজ করার দিনেই এই মেশিনে একজন আহত হল। অতএব এই মেশিন অপয়া। আলি পাশা এমনটাই মনে করলেন। বাতিল হয়ে গেল বেলজোনির মেশিন। এক বছরের পরিশ্রম জলে গেল। তার সঙ্গে বন্ধ হয়ে গেল রোজগারের পথও।’

পিজি এতক্ষণ ধরে মন দিয়ে গল্প শুনতে শুনতে খেয়াল করেনি যে ওর ভাগের সানডিটা গলে জল হয়ে গেছে। মুখ ব্যাজার করে একটা চুমুকে সেটা সাবাড় করল প্রথমে। তারপরে ভবেশদাকে বলল,

‘দেখলেন তো, আপনার গল্প শোনার চক্করে আমার আইসক্রিমটাই গলে গেল। এদিকে আপনার বেলজোনির এখনও আর্কিয়োলজিস্ট হয়ে ওঠা হল না।’

বাইরে তখন সন্ধে হচ্ছে। আমরা স্কুপের দোতলায় বিশাল বড়ো কাচের জানলাটার পাশের টেবিলে বসেছিলাম। সেকেন্ড ব্রিজের জ্বলে-ওঠা আলোতে নদীটাকে দেখতে দারুণ সুন্দর লাগছিল। মন চাইছিল না উঠতে ওখান থেকে। এদের ওয়েটারগুলোও ভালো। একদম তাড়া লাগায় না। আমি পিজিকে বললাম,

‘তোর টুটিফ্রুটি নিয়ে দুঃখ তো? ওকে আমি খাওয়া…’

‘আরে, তুমি কেন? আমিই খাওয়াচ্ছি। আজকে প্রদীপ্তর জন্য এত বড়ো একটা কাজ হল আমার। আর একটা আইসক্রিম খাওয়াতে পারব না? চলো, আরেক রাউন্ড করে হয়ে যাক।’

পিজি আইসক্রিমের অর্ডার দিয়ে আসার পরে ভবেশদা আবার গল্প বলা শুরু করলেন,

‘মিশরে থাকতে থাকতেই বেলজোনির আলাপ হয়েছিল একজন সুইস আর্কিয়োলজিস্টের সঙ্গে। নাম জোহান লাডউইগ বুৰ্কাৰ্ড। বুর্কার্ডই সম্ভবত প্রথম ইউরোপিয়ান, যিনি ইজিপ্ট দেশটার এমাথা থেকে ওমাথা চষে ফেলেছিলেন। এই বুর্কার্ডই আবু সিম্বেলের মন্দির খুঁজে বের করেছিলেন। সেই গল্পটাও দারুণ। তবে সেটা অন্য আরেকদিন হবে ’খন। আজকে বেলজোনির কথাই বলি। বুর্কার্ডের অ্যাডভেঞ্চারের গল্প বেলজোনিকে খুব টানত। সেইসময় আবার বুর্কার্ড প্ল্যান করছেন একটা ক্যারাভ্যানে করে সাহারা মরুভূমি পেরিয়ে টিমবাকটু যাওয়ার। সেই অভিযানে তিনি একাই যাবেন, আর কাউকে নেওয়ার ইচ্ছা নেই। তবে বুর্কার্ড বেলজোনিকে একটা অন্য ঐশ্বর্যের খবর দিলেন।

‘নীল নদের পশ্চিম পাড়ের কাছে থাকা একটা জায়গার নাম গুর্না। লাক্সর শহরের কাছেই। গুর্নাতে নাকি একটা ভাঙা মন্দির আছে। পরিত্যক্ত জায়গা, কেউ যায় না সেখানে। কিন্তু সেখানেই বেলজোনি একটা দারুণ জিনিসের খোঁজ পেয়েছেন। মসৃণ গ্র্যানাইট পাথরের তৈরি একটা বিশাল বড়ো ফারাওয়ের মূর্তি। ন-ফুট লম্বা, ওজন প্রায় সাত টন। মানে, প্রায় ৬,৫০০ কিলো! মাথাটা অক্ষত থাকলেও বুকের নীচের অংশ থেকে ভেঙে গেছে। সেইসময় ইজিপ্টের এদিকে-ওদিকে ফ্রেঞ্চ আর ব্রিটিশরা টুকটাক যা পাচ্ছে তুলে নিয়ে দেশে যাচ্ছে। এই মূর্তিটার কথাটাও অনেকেই জানত। কিন্তু এত বড়ো একটা কিছুকে হস্তগত করার কথা কেউ স্বপ্নেও ভাবেনি। মূর্তিটাকে টেনে নীল নদের পাড়ে নিয়ে আসাটাই তো প্রায় অসম্ভব। সেইসময় তো ফারাওয়ের নাম কেউ বুঝতে পারেনি। ইউরোপিয়ান এক্সপ্লোরাররা এর নাম দিয়েছিল কম বয়সের মেমনন। মেমনন ছিল ইলিয়াডের একটা চরিত্রের নাম। তবে তার আগেও গ্রিকরা এঁকে অন্য নামে ডাকত। অজিমেন্দিয়াস।

‘বেলজোনির মনে হল ওঁর জন্যই যেন পাথরের টুকরোটা অপেক্ষা করে আছে। তাই আরেকবার বেলজোনি আলি পাশার দরবারে হাজির হল। এবারে ইচ্ছাটা অন্যকম, মূর্তিটাকে ও তুলে ইংল্যান্ডে নিয়ে যেতে চায়।’

‘কিন্তু, ওই সাড়ে ছ-হাজার কিলোর পাথর টানা তো অসম্ভব ছিল বললেন।’

‘হুঁ, আলি পাশাও সেরকমই ভেবেছিল। বেলজোনির কথাগুলোকে পাগলের প্রলাপ ভেবে ওর প্রস্তাবে রাজি হয়ে গিয়েছিলেন। ব্যস, ১৮১৭ সালের জুলাই মাসে বেলজোনিকে দেখা গেল নীল নদের পশ্চিম তীরে, গুৰ্নাতে।

‘পাথরের মূর্তিটার বেশ খানিকটা মাটির নীচে গেঁথে ছিল। নেপোলিয়নের সৈন্যরা এর আগে চেষ্টা করেছিল একে তুলে ফ্রান্সে নিয়ে যাওয়ার। ওরা ভেবেছিল গানপাউডার দিয়ে মূর্তিটার কাঁধ থেকে মাথাটাকে আলাদা করে দেওয়া যাবে। তাহলে শুধু মুন্ডুটাকে বয়ে নিয়ে গেলেই হল। সেইজন্য ডান কাঁধে ড্রিল করে গর্তও বানিয়েছিল। কিন্তু সেই গানপাউডারের ব্লাস্টের চোটে মূর্তির মুখেও ক্ষতি হতে পারে, তখন অতটা বিষ্ফোরকের অপচয় ছাড়া আর কিছুই হবে না। এই ভেবে রণেভঙ্গ দেয় ওরা।

‘ব্রিটিশ কনসাল জেনারেল হেনরি সল্টকে খুব বুদ্ধি করে রাজি করায় বেলজোনি। সল্টের ওপরেই তখন দায়িত্ব ব্রিটিশ মিউজিয়ামে ইজিপ্টের প্রত্নতত্ত্বগুলোকে নিয়ে যাওয়ার। সল্ট দেখল বেশ ভালো সুযোগ, ওকে খাটতেও হবে না। খাটবে এই দানবের মতো চেহারার লোকটা। এদিকে মূর্তিটাকে ইংল্যান্ডে পাঠানোর জন্য ওর বেশ নামও হয়ে যাবে। তাই সল্টও এককথায় রাজি হয়ে গেল। সল্টের কাজ মূর্তিটাকে আলেকজান্দ্রিয়ার বন্দর থেকে ইংল্যান্ডে পাঠানো। আর বেলজোনির কাজ ওটাকে লাক্সর থেকে আলেকজান্দ্রিয়ায় নিয়ে আসা।

‘বেলজোনির সামনে দুটো চ্যালেঞ্জ ছিল। তার প্রথমটা অবশ্যই মূর্তিটাকে টেনে নীল নদের পাড়ে নিয়ে আসা। আর পরেরটা হল মরসুম। সামনেই আসছে বর্ষাকাল। নীল নদে বন্যা আসবে। দুই পাড়ই ভেসে যাবে। মূর্তিটা চলে যাবে জলের তলায়। জল নামলেও কাদামাটির মধ্যে থেকে মূর্তিটাকে তোলা অসম্ভব একটা কাজ হয়ে যাবে। অতএব হাতে সময় কম।

আশি জন মানুষ মূির্ত টেনে নিয়ে যাচ্ছে

‘কাঠের লিভার বানিয়ে মূর্তিটাকে মাটি থেকে তোলা গেল। তারপরে ওটাকে বসানো হল একটা বেশ বড়ো কাঠের পাটাতনে। সেই পাটাতনের নীচে লাগানো হল চারটে মোটা মোটা কাঠের গুঁড়ি। এবারে কাঠের পাটাতনটা চাকা লাগানো স্লেজগাড়ির মতো দেখতে হল বেশ। এই স্লেজকে টানতে লাগল আশিজন মানুষ। বেলজোনি নিজেও হাত লাগাল। টানা ষোলো দিন ধরে অমানুষিক পরিশ্রমের পরে যুবক মেমনন পৌঁছোল নীল নদের তীরে। তারপরে মাসকয়েকের মধ্যেই সেটা পৌঁছোল লন্ডনে। যেদিন ব্রিটিশ মিউজিয়ামে মূর্তিটাকে বসানো হল সেদিন গোটা লন্ডন শহর ভেঙে পড়ল দূর দেশ থেকে আনা সেই আশ্চর্যকে দেখার জন্য। সেই ভিড়ের মধ্যে ছিলেন একজন কবিও, নাম পার্সি শেলি। নাম শুনেছ?’

‘মেরি শেলির নাম শুনেছি, ‘‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’’ যার লেখা।’

‘হ্যাঁ, পার্সি শেলি ওঁর স্বামী ছিলেন, সেইসময়কার বেশ নামকরা কবি, কিন্তু স্ত্রী-র খ্যাতির কাছে ওঁর নাম চাপা পড়ে যায়। এই শেলি সেই মূর্তিটাকে দেখে একটা কবিতা লেখেন। ইংরেজি সাহিত্যে সেই কবিতা বেশ বিখ্যাত। এর নাম ‘‘অজিমেন্দিয়াস’’।’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ, এই নামের একটা কবিতার কথা শুনেছিলাম বটে। তবে এইটাই যে তার পিছনের গল্প, সেটা জানতাম না।’

গলার স্বরটা ভারী করে বলল পিজি। আমি ওর দিকে ভ্রূ কুঁচকে তাকাতেই বলল,

‘কী হয়েছে? আমি এটা জানতে পারি না? আমার মাসতুতো দিদি ইংরেজিতে এম এ করছে। ও বলেছিল।’

‘তোর আবার মাসি আছে নাকি? আমি তো জানতাম শুধু এক মামা, যে চুঁচড়োতে...’

দ্বিতীয় রােমসিসের মূির্ত

‘তোকে কি সব বলতে যাব নাকি? এই মাসি মায়ের জ্যাঠতুতো বোন। এবারে হয়েছে? দেখুন ভবেশদা, ভালো আলোচনাটার কেমন তাল কাটছে স্পন্দন। ওকে এবার থেকে আর এসব গল্পের মধ্যে ডাকবেন না।’

ভবেশদা মুখে কিছু না বলে পিজির দিকে তাকিয়ে শুধু বাঁকা হাসলেন। কিন্তু ছেলেটা সেটাকে অগ্রাহ্য করে ভবেশদাকে এবারে বলল,

‘আচ্ছা, তাহলে অজিমেন্দিয়াস আর যুবক মেমনন একই মূর্তির দুটো নাম, এটা বুঝলাম। কিন্তু ফারাওয়ের আসল নামটা তো বললেন না। এতদিনে নিশ্চয়ই জানা গেছে।’

‘সে তো গেছেই। এই একমাত্র ফারাও যে নব্বই বছর বেঁচেছিল। গোটা ইজিপ্ট জুড়ে বানিয়েছিল নিজের মন্দির। ইজিপ্টোলজিস্টরা একে বলে ‘‘দ্য ফারাও অফ প্রোপাগান্ডা’’। এই সেই দ্বিতীয় রামেসিস! যার আবু সিম্বেলের মন্দির আবিষ্কার করেছিল জোহান বুর্কার্ড।’

‘আরিব্বাস! রামেসিসের গল্পটাও বলবেন তো!!’

‘বলতেই পারি, যদি তোমাদের এনার্জি থাকে তো। বেলজোনির গল্পও তো অনেক বাকি এখনও।’

দুটো করে আইসক্রিম সাঁটিয়ে আমাদের এনার্জি তুঙ্গে ছিল। আর ভবেশদার মুখে এইসব গল্পগুলো ছাড়া যায় নাকি!

দ্বিতীয় রােমসিসের মমি

আবু সিম্বেলের মন্দির

স্কুপ থেকে বেরোতে বেরোতে সাড়ে সাতটা বেজেছিল। একগাদা ফ্রেঞ্চ ফ্রাই আর দুটো সানডি খাওয়ার পরে আমাদের কারোর পেটেই আর জায়গা ছিল না। রেস্টুরেন্টের বাইরের রেললাইনের পাশে দাঁড়িয়ে ছোট্ট ভুঁড়িটায় হাত বোলাতে বোলাতে ভবেশদা বললেন,

‘এইদিকটায় এলাম, কিন্তু একটা কাজ করা বাকি রয়ে গেল।’

পিজি বলল, ‘কী করবেন? চক্ররেলে চড়ার কথা ভাবছেন নাকি? ওতে কিন্তু গঙ্গার খুব একটা ভালো ভিউ পাওয়া যায় না, আমি একবার…’

‘ধুস, ওটার কথা বলছি না। গঙ্গাকে দেখার জন্য শুধু গঙ্গার পাশ দিয়ে গেলেই হবে নাকি?’

মিনিট কুড়ির মধ্যেই ভবেশ সামন্তর সঙ্গে নৌকোতে উঠতে দেখা গেল এই অধম আর পিজিকে।

রাতের অন্ধকারে গঙ্গার বুকে ভেসে থাকতে দারুণ লাগে। নদীর দুটো পাড়ে কলকাতা আর হাওড়া শহরের আলোগুলো দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল কোনো অচেনা জগতে বসে আছি। ঠান্ডা হাওয়াতে চুলগুলো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল। ভবেশদা বেশ খানিকক্ষণ চোখ বুজে বসে ছিলেন। তারপরে যেই না গুনগুন করে কী-একটা গান শুরু করার উপক্রম করেছেন অমনি পিজি বাধ সাধল তাতে,

‘বলছি, রামেসিসের গল্পটা…’

‘আগে গান হবে।’

এই বলে বেসুরো গলায় ‘আমি যামিনী তুমি শশী হে’ দু-লাইন গেয়ে পরের লাইনগুলো গুলিয়ে ফেলে থামলেন ভবেশদা। তারপরে বললেন,

‘হ্যাঁ, রামেসিসের যে গল্পটা বলব বলছিলাম...’

আমরা এবারে একটু নড়েচড়ে বসলাম।

‘দ্বিতীয় রামেসিস ছিলেন নাইন্টিন্থ ডাইনেস্টির ফারাও। এই ধরো যিশুর জন্মের সাড়ে বারোশো বছর আগের কথা। মিশরের দক্ষিণদিকে ছিল হিটাইট প্রজাতির রাজত্ব। রামেসিসের মনে হল এই হিটাইটদের জব্দ করতেই হবে। দেশের ফারাওকে মানবে না এ কেমন কথা! যেমনি ভাবা তেমনি কাজ, রামেসিস ২০০০০ সৈন্য নিয়ে যুদ্ধের জন্য বেরোলেন। সমান চার ভাগে ভাগ করা হল সেই সৈন্যদলকে। দলগুলোর নাম দেওয়া হল দেবতাদের নামে। আমেন, রে, তাহ আর সেথ। ফারাও ওদের নিয়ে একমাস ধরে পাহাড়, মরুভূমি ডিঙিয়ে এসে পৌঁছোলেন কাদেশ নামের এক শহরের কাছে ওরন্তেস নামে নদীর তীরে। সেখানে ওঁর সৈন্যদের হাতে ধরা পড়ে গেল দুই হিটাইট গুপ্তচর। ওদেরকে জেরা করে রামেসিস জানতে পারলেন যে হিটাইটদের রাজা মুওয়াতালিস ফারাওয়ের ভয়ে আরও এক-শো মাইল দূরে পালিয়েছে।

‘রামেসিস ভাবলেন, বাহ, তাহলে তো হাতে সময় পাওয়া গেল। এই ভেবে শুধুমাত্র আমেন দলের সৈন্যদের নিয়ে ওরন্তেস নদী পার করে ঘাঁটি গাড়লেন কাদেশ শহরের প্রান্তে। রে দলের সৈন্যরাও নদী টপকাল, আর আমেন দলের থেকে একটু দূরে থেকে তাঁবু ফেলল। বাকি দুটো দল রয়ে গেল নদীর অন্য পাড়েই। রামেসিসের প্ল্যান ছিল শান্তিতে রাতটা কাটিয়ে সকাল বেলায় কাদেশ আক্রমণ করা যাবে ’খন। মুওয়াতালিস তো কাপুরুষের মতো পালিয়েছে, শহর দখল করতে বেশি বেগ পেতে হবে না।

‘রামেসিস যেটা বুঝতে পারেননি সেটা হল সেই হিটাইট গুপ্তচরদের মুওয়াতালিস নিজেই পাঠিয়েছিল।’

‘বলেন কী? নিজেই নিজের লোককে ফারাওয়ের কাছে পাঠাল?’

‘হ্যাঁ, মিথ্যেটাকে সত্যি করে বলার জন্য।’

‘মিথ্যে!’

‘হুম, মুওয়াতালিস মোটেই পালিয়ে যাননি। নিজের বিশাল সৈন্যদল নিয়ে লুকিয়েছিলেন কাদেশ শহরের চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পাহাড়ের আড়ালে। রাতের অন্ধকারে আক্রমণ করলেন রামেসিসের তাঁরবুতে।

‘হঠাৎ হওয়া আক্রমণের চোটে রামেসিসের দুটো দলই ভয় পেয়ে গেল। অর্ধেক মারা পড়ল হিটাইট সেনাদের হাতে, বাকি অর্ধেক নিজের প্রাণের মায়ায় ফারাওকে একা ফেলে রেখে পালাল। যুদ্ধক্ষেত্রে তখন রামেসিসের পাশে শুধু ওর পতাকাবাহক সেনা। ওর রথকে চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলেছে হিটাইট সৈন্যরা। মৃত্যু আসন্ন।

‘এমন সময় রামেসিস স্মরণ করলেন কাদেশ থেকে কয়েকশো মাইল দূরে থেবসের মন্দিরে থাকা দেবতা আমেন-রে কে। আমেন-রে রামেসিসের ডাকে সন্তুষ্ট হয়ে ওকে আশীর্বাদ করেন। ফারাও হয়ে ওঠেন দেবতার মতো শক্তিশালী। একাই প্রবল বিক্রমে হিটাইটদের মারতে থাকেন। রাজার সেই সাহস দেখে চার দলের সৈন্যরাও ফিরে এল। হিটাইটদের তারপরে খুব সহজেই হারিয়ে দিলেন রামেসিস।

যুদ্ধবাজ ফারাও দ্বিতীয় রােমসিস

‘এই যুদ্ধজয়কে স্মরণীয় করে রাখার জন্যই মিশরের দক্ষিণে আবু সিম্বেলের মন্দির বানান রামেসিস। আকারে আর সৌন্দর্যে সে-মন্দির ছিল অতুলনীয়। একটা নয়। দুটো মন্দির বানান রামেসিস।

‘আসল মন্দিরটা ছিল উচ্চতায় তিরিশ মিটার, লম্বায় পঁয়ত্রিশ মিটার। মন্দিরের ঢোকার দরজার দু-পাশে দুটো করে মোট চারটে বিশাল মূর্তি ছিল রামেসিসের। প্রায় কুড়ি মিটার লম্বা! বছর কয়েক আগে দেশপ্রিয় পার্কে যে দুর্গা বানানো হয়েছিল প্রায় তেমন বড়ো!’

শিল্পীর কল্পনায় অতীতের আবু সিম্বেলের দুটি মন্দির

‘বলেন কী! এমন বড়ো মূর্তি ওরা বানাল কী করে!’

বর্তমানে আবু সিম্বেলের মন্দির

‘রামেসিস গোটা দেশ জুড়ে নিজের প্রায় পঞ্চাশটা মূর্তি বানিয়েছিলেন। বেলজোনি যে মূর্তির টুকরোটা লাক্সর থেকে লন্ডনে নিয়ে যায় সেটাও তার মধ্যে একটা, তাই এত বড়ো একটা কিছু বানানো মিশরীয় ভাস্করদের কাছে খুব একটা শক্ত কিছু ছিল না।

একটাই পাহাড়ের গায়ে তৈরি হয়েছিল আবু সিম্বেলের মন্দিরটা। সেই পাহাড়ের পাথর খোদাই করেই রামেসিসের মূর্তিগুলো বানানো হয়। মূর্তির পায়ের কাছে ছিল ওঁর স্ত্রী আর সন্তানদের ছোটো ছোটো মূর্তি। মন্দিরের ভেতরের প্রথম ঘরটা লম্বা আয়তাকার। আটটা পিলার সেখানে। প্রতিটা পিলারেই আবার রামেসিসের মূর্তি খোদাই করা। এখানে ফারাও ওসাইরিসের মতো দাঁড়িয়ে আছেন। সেই ঘরের দেওয়াল জুড়ে সাহসী আর শক্তিশালী ফারাওয়ের যুদ্ধজয়ের ছবি খোদাই করা।

মন্দিরের দেওয়ালে খোদাই করা কাদেশের যুদ্ধের ছবি

‘মন্দিরের একদম ভেতরে যে ছোটো গর্ভগৃহ ছিল সেখানে পাশাপাশি বসে থাকতেন দেবতা রা, আমুন, তাহ আর রামেসিস নিজে।

‘মিশরীয়দের অ্যাস্ট্রোনমি আর আর্কিটেকচারের জ্ঞান যে কত গভীর ছিল সেটা এই গর্ভগৃহ থেকেই বোঝা যায়। প্রতি বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি আর ২২ অক্টোবরেই মন্দিরের দরজা থেকে প্রায় দু-শো মিটার গভীরে এই ছোট্ট ঘরটায় সূর্যের আলো এসে ঢুকত। অদ্ভুতভাবে সেই আলো রা, আমুন আর রামেসিসকে আলোকিত করলেও দেবতা তাহ অন্ধকারেই থেকে যেতেন। কারণ তিনি মাটির নীচের জগতের ভগবান।’

‘আরেকটা তাহলে কী জন্য বানানো হয়েছিল?’

‘অন্য মন্দিরটা আকারে একটু ছোটো ছিল, বুঝলে। এটা রামেসিস বানিয়েছিলেন ওঁর স্ত্রী নেফারতারির জন্য। এই মন্দিরের দেওয়ালেও প্রায় দশ মিটার লম্বা ছ-টা স্ট্যাচু, চারটে রামেসিসের আর দুটো নেফারতারির। সমান আকারের। ফারাও নিজের স্ত্রীকে নিজের সমান সম্মান দিয়েছিলেন। মন্দিরের ভেতরে দেবী হাথোরের পুজো হত। সেই দেবীরই মূর্তি খোদাই করা আছে পিলারের গায়ে।’

‘এই মন্দিরই তাহলে আবিষ্কার করেন জোহান বুর্কার্ড?’

দ্বিতীয় রােমসিস ও রািন নেফারতারির মন্দির

‘হ্যাঁ, এটাই সেটা। রামেসিসের পরের ফারাওদের কাছে এই মন্দির অপাংক্তেয় হয়ে পড়ে। হাজার বছর ধরে একটু একটু করে মরুভূমির বালির নীচে হারিয়ে যায়। ১৮১৩ সালে বুৰ্কাৰ্ড আবার খোঁজ পায় এর। পেট্রার নাম শুনেছ? হারিয়ে যাওয়া শহর?’

‘হ্যাঁ, শুনেছি তো! ‘‘ইন্ডিয়ানা জোন্স অ্যান্ড দ্য লাস্ট ক্রুসেড’’ সিনেমাটায় দেখিয়েছিল না!’

পিজি বলল।

‘হ্যাঁ, একদম ঠিক, সেই পেট্রা শহর আবিষ্কার করেন এই জোহান বুর্কার্ডই। এই মানুষটার জীবন ইন্ডিয়ানা জোন্সের থেকে কিছু কম নয়। চার বছর ধরে সিরিয়াতে থেকে আরবিতে লিখতে পড়তে শেখেন। তারপরে শেখ ইব্রাহিম আবদুল্লাহ ছদ্মনাম নিয়ে এই জার্মান ভদ্রলোক ঘুরে বেড়িয়েছেন জর্ডান, ইজিপ্টে। পেট্রা আবিষ্কার করেছেন। ইনিই আবার প্রথম ইউরোপিয়ান যিনি মক্কা মদিনাতে পা রাখেন। কিন্তু মাত্র বত্রিশ বছর বয়সে ডিসেন্ট্রিতে মারা যান বুৰ্কার্ড। বেঁচে থাকলে আরও কত শত কীর্তি যে করতেন কে জানে। এই দেখো কথায় কথায় আবার বেলাইন হয়ে যাচ্ছি। আবু সিম্বেলে ফিরে আসি।

জোহান বুর্কার্ড

‘১৮১৩ সালের মার্চ মাসে বুৰ্কার্ড ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন মিশরের দক্ষিণে। সেই সময় এক বছর দশেকের ছোকরার কাছে একটা অদ্ভুত গল্প শোনেন। নীল নদের তীরে নাকি সে একটা মানুষের বিশাল বড়ো মাথা দেখতে পেয়েছে। পাথরের তৈরি। সেই ছেলেকে গাইড বানিয়েই ওই জায়গাতে গিয়ে পৌঁছোন বুৰ্কার্ড। দেখেন সত্যি মরুভূমির বালির মধ্যে জেগে আছে সেই পাথরের মূর্তি। মাথাটুকুই যা বাইরে। তখনও কিন্তু বুৰ্কার্ড বুঝতে পারেননি এর নীচে কী আছে। তবে বড়ো মন্দিরের পাশে ছোটো নেফারতারির মন্দিরটা বালি খুঁড়ে বের করতে সক্ষম হন বুৰ্কার্ড। তার থেকেই ওঁর ধারণা হয় যে ওই মূর্তির চারপাশের বালি সরাতে পারলেই নিশ্চয় আরেকটা মন্দির বেরোবে। তবে সেই কাজ করার জন্য যে পরিমাণ লোকবল লাগবে তা বুৰ্কার্ডের ছিল না। শেষমেষ বালির ভিতর থেকে রামেসিসের মন্দিরকে কে বের করেন জানো? প্যাটাগোনিয়ান স্যামসন।’

শিল্পীর কল্পনায় মরুভূিমর বালির মধ্যে জেগে আছে অতীতের আবু সিম্বেলের দুটি মন্দির

‘জিওভান্নি বেলজোনি! স্কুপে যাঁর কথা বলছিলেন!’

‘হ্যাঁ। বেলজোনি বুৰ্কার্ডের কাছে এই মন্দিরের কথা যে শুনেছিলেন সেটা তো তখনই বললাম। লাক্সর নীল নদের তীরে রামেসিসের মূর্তি যখন আলেকজান্দ্রিয়াতে ট্রান্সপোর্টের জন্য অপেক্ষা করছে তখন বেলজোনি আর সময় নষ্ট না করে চলে আসেন নুবিয়াতে। ঠিক যেখানে বুর্কার্ড ওঁর খুঁজে পাওয়া মন্দিরের কথা বলেছিলেন। তিনবারের চেষ্টার পরে ১৮১৭ সালের অগাস্ট মাসে বেলজোনি মন্দিরের দরজাটা খুঁজে পেলেন! বালির পাহাড় আর দরজার মাঝে যেটুকু ফাঁক ছিল তার মধ্যে দিয়েই বুকে ভর দিয়ে মন্দিরের ভেতরে ঢুকে পড়েন বেলজোনি। ঢুকেই অবাক হয়ে যান। ওঁর সামনে তখন দাঁড়িয়ে আছে আটখানা দৈত্যাকার পিলার। প্রত্যেকটাতে খোদাই করা আছে ফারাও রামেসিসের মূর্তি। দেওয়াল জুড়ে রামেসিসের কীর্তি। গর্ভগৃহে বসে থাকা চারজন দেবতা। বেলজোনি বুঝতে পেরেছিলেন এমন কোনো মন্দির এর আগে কেউ কখনো খুঁজে পায়নি। গোটা মন্দিরটার শরীর থেকে বালি সরাতে লাগে আরও এক বছর।’

‘এরকম একটা মন্দির থেকে বেলজোনি কোনো ঐশ্বর্য খুঁজে পাননি!’

শিল্পীর কল্পনায় অতীতের আবু সিম্বেল মন্দিরের দৈত্যাকার রামেসিসের মূর্তি

‘পেয়েছিলেন তো! তবে সেগুলো কী, সেটা আজও কেউ জানে না। সেইসময়ে তো আর আর্কিয়োলজিকাল ডিসকভারির ওপরে কোনো কড়া নিয়মকানুন ছিল না। বেলজোনি আবু সিম্বেলের মন্দিরে যা কিছু পেয়েছিলেন সেসব নিজের করায়ত্ত করেন। তার মধ্যে অনেক কিছু বেচে দেন ইউরোপের ধনকুবেরদের। শুনতে খারাপ লাগলেও এটাই সত্যি। সেই ঐশ্বর্যের খুব সামান্যকেই পরে উদ্ধার করা গেছে। সেগুলো ইংল্যান্ডের কয়েকটা মিউজিয়ামে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে এখন। তবে আবু সিম্বেলের মন্দিরের সবচেয়ে বড়ো ঐশ্বর্য হল মন্দিরটা নিজেই। একটা আর্কিটেকচারাল মার্ভেল বলতে পারো। ভাবতে পারছ, অত হাজার বছর আগেকার একটা মন্দির; যার গায়ের সবকটা কারুকার্য নিখুঁত; যার গর্ভগৃহে সূর্যের আলো বছরের দু-দিন একদম নিয়ম মেনে এসে ঢুকত; যে মন্দির এমন এক সম্রাটের বানানো যিনি তাঁরর স্ত্রীকে সমান মর্যাদা দিয়েছিলেন। সেই সময়ের মিশরে যা প্রায় দুর্লভ।’

পিজি এতক্ষণ ধরে গল্প শুনতে শুনতেই মোবাইলে আবার খুটখাট করতে লেগেছিল। এইটাই ওকে নিয়ে মুশকিল। নিজের জ্ঞান সীমিত, কিন্তু সেটা ঢাকবার জন্য বার বার গুগলকে হাতিয়ার করে। ও এবারে ভবেশদাকে বলল,

‘ভবেশদা, আবু সিম্বেলের মন্দির কিন্তু এখন আর সেই আগের জায়গাতে নেই। অনেকটা সরে এসেছে।’

‘সরে আসেনি। আনানো হয়েছিল। প্রায় দু-শো মিটার।’

‘বলেন কী! দু-দুটো মন্দিরকে সরিয়ে নিয়ে আসা হল! এটা সম্ভব নাকি!’

‘বিজ্ঞানের কাছে তো কিছুই অসম্ভব নয়, স্পন্দন ভাই। সরিয়ে না আনলে আবু সিম্বেলের মন্দির আজকে জলের তলায় থাকত।

১৯৬০ সালে আসওয়ান শহরের কাছে নীল নদের ওপরে একটা বিশাল বড়ো বাঁধ তৈরি করার কাজ শুরু হয়। এই বাঁধ তৈরির সময়েই নীল নদের উদ্বৃত্ত জল ধরে রাখার জন্য একটা লেক বানানো হয়। ইজিপ্টের দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসেরের নামে এর নাম দেওয়া হয় নাসের লেক। এটা হল মানুষের তৈরি পৃথিবীর অন্যতম বড়ো একটা হ্রদ। মুশকিল হল এই যে, এই হ্রদ বানাবার পরে দেখা গেল যে আসওয়ানের বাঁধ যখন পুরোপুরি তৈরি হয়ে যাবে তখন এই হ্রদের জলের লেভেল অনেক বেড়ে যাবে। সেই জলে ডুবে যাবে আবু সিম্বেলের মন্দির।

‘এই সময়ে এগিয়ে আসে ইউনেস্কো। এমন একটা প্রাচীন স্থাপত্য হারিয়ে যাবে এটা তো হয় না। যেভাবেই হোক এটাকে বাঁচাতেই হবে। অন্যদিকে আসওয়ানের বাঁধটাও তৈরি হওয়াটা খুব জরুরি। তাই একটাই উপায় ছিল হাতে। মন্দির দুটোকে সরিয়ে আনা।

নাসের লেকের ধারে সরিয়ে আনা এখনকার আবু সিম্বেলের মন্দির

‘এই কাজটা মোটেই সহজ ছিল না। প্রয়োজন ছিল প্রচুর অর্থের। ইজিপশিয়ান গভৰ্নমেন্টের ক্ষমতা ছিল না তার জোগান দেওয়ার। কিন্তু ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সেইসময় এগিয়ে এসেছিল ১১৩ টা দেশ। ১৯৬৪ সালে শুরু হল কাজ। দুটো মন্দিরকেই কয়েক হাজার টুকরোতে ভাগ করা হল। প্রতিটা টুকরোর গায়েই একটা নম্বর দেওয়া থাকল। তারপরে নাসের লেক থেকে পঁয়ষট্টি মিটার ওপরে আর ২০০ মিটার দূরে কংক্রিটের কাঠামো তৈরি করে সেটা ঢাকা দেওয়া হল পাথর দিয়ে। তার গায়েই এবারে একে একে টুকরোগুলো জোড়া লাগানো হল। নম্বর মিলিয়ে মিলিয়ে।’

আবু সিম্বেলের মন্দিরের টুকরো জোড়া হচ্ছে (১৯৬৪-৬৮)

‘এ তো একদম জিগ-স পাজলের মতো কাজ।’

‘ঠিক। এই পৃথিবীতে এত বড়ো জিগ-স পাজল সলভ আর কেউ করেনি। আবু সিম্বেলের মন্দির সরানো শেষ হয় ১৯৬৮তে। এখন প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষ আসেন এই মন্দিরকে দেখতে।’

‘কিন্তু ভবেশদা, এই মন্দির সরিয়ে একটা মুশকিল তো নিশ্চয় হয়েছিল। মন্দিরের জায়গা বদলে গেল। তাহলে তো আর আগের মতো বছরে দু-বার সূর্যের আলো এসে মন্দিরের ভেতরে ঢুকবে না।’

ভবেশদা এবারে মুচকি হেসে বললেন,

‘ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য বিজ্ঞান এত বড়ো একটা কাজ করল আর এই ট্র্যাডিশনটা বাঁচিয়ে রাখবে না এটা হয় নাকি! মন্দিরকে এমনভাবেই বসানো হয়েছিল যে আজও একইভাবে মন্দিরের ভেতরে সূর্যের সেই আলো এসে পৌঁছোয়। এখনও প্রতি ২২ ফেব্রুয়ারি আর ২২ অক্টোবর সূর্যের প্রথম আলোটা মন্দিরের গর্ভগৃহে প্রবেশ করে। আলোকিত হয়ে ওঠেন তিন দেবতা। অন্ধকারে রয়ে যান ‘‘তাহ’’।’

সেদিন রাতে বাড়ি ফিরতে ফিরতে ভাবছিলাম এখন ইরাকে, সিরিয়াতে একের পর এক মন্দিরকে মাটিতে মিশিয়ে দিচ্ছে সন্ত্রাসবাদীরা। কত না জানা গল্প মিশে যাচ্ছে মাটির সঙ্গে। যে মানুষ ষাট বছর আগে একটা ইতিহাসকে শেষ হয়ে যাওয়ার আগে বাঁচিয়েছিল, সেই মানুষই আজকে তাকে কবর দিতে ব্যস্ত।

সাকারার সেরাপিয়াম

আগের শুক্রবারের কথা, বাবা মা পুরী বেড়াতে গিয়েছিল বলে বর্ধমানের বাড়ি ফাঁকা। তাই আমিও হোস্টেলেই রয়ে গিয়েছিলাম। বিকেল বেলা ক্লাস শেষ হওয়ার পরেই পিজি চান-টান করে সেন্ট মেখে বাবু সেজে বেরিয়ে গেল। বেটা নতুন প্রেম করা শুরু করেছে। তাই প্রায়দিনই সন্ধেবেলায় তিনি ছোটেন রাধানাথ বোস লেনে কলকাতা ইউনিভার্সিটির লেডিজ হোস্টেলের দিকে। তার প্রেমিকাটি ওখানেই থাকেন কিনা। আমার এদিকে একটাও ভালোবাসার পাত্রী জোটেনি এখনও অবধি। সন্ধে সাড়ে ছ-টা নাগাদ তাই একাই বেরিয়ে পড়েছিলাম। বড়োবাজারে আমার এক পিসি থাকেন। প্ল্যান ছিল তাঁরর সঙ্গেই দেখা করে আসব।

আমাদের হোস্টেল থেকে বেরিয়ে কলেজ স্ট্রিটে এসে পড়লেই উলটোদিকের প্রেমচাঁদ বড়াল স্ট্রিটের মোড়ে একটা বেশ বড়োসড়ো শিবমন্দির আছে। হোস্টেল থেকে বেরোলেই মন্দিরটাতে ঢুকে ঢিপ করে একটা প্রণাম করা যেন অভ্যেসের মতো হয়ে গেছে। সেদিনও তাই ঢুকেছিলাম। বেরোতে যাব এমন সময় ভবেশদার গলা,

‘কী হে স্পন্দন ভাই, খবর কী?’

‘আপনি এদিকে! দোকান বন্ধ করে দিলেন নাকি?’

‘হ্যাঁ, আজকের মতো বন্ধ, তা তুমি একা কেন? শাগরেদ কোথায়?’

‘সে এখন অ্যাপোতে গেছে। আমি এই একটু পিসির বাড়িতে...’

‘ফিশ ফ্রাই খাবে?’

‘অ্যাঁ?’

‘অ্যাঁ আবার কী? আজ সকাল থেকে কেন জানি না ফিশ ফ্রাই খেতে ইচ্ছা করছিল, এসব জিনিস আবার একা একা খেলে ভালো টেস্ট পাই না। চলো কালিকায়। ফিশ ফ্রাই হয়ে যাক। আমি খাওয়াচ্ছি।’

‘কিন্তু পিসির বাড়ি?’

‘আরে, পিসি তো আর পালাচ্ছেন না?’

সত্যি কথা, পিসি পালাবে না। কিন্তু ফিশ ফ্রাইয়ের হাতছানিতে সাড়া না দেওয়াটা পাপ। তাই দু-জনে মিলে চললাম কালিকার দিকে।

দোকানের সামনেটায় খুব ভিড় থাকে সবসময়েই। ফ্রাইয়ের অর্ডার দিয়ে দু-জনে একটু দূরে এসে দাঁড়ালাম। এমন সময় ভবেশদা বললেন,

‘এই যে শিবমন্দিরে প্রণাম করে এলে, মন্দিরের চৌকাঠের কাছে একটা ষাঁড়ের মূর্তি আছে খেয়াল করেছ? ওইটা কে বলো তো?’

‘নন্দি তো।’

‘হ্যাঁ, এই নন্দিই আবার মিশরে গিয়ে হয়ে গেল এপিস।’

‘ইজিপশিয়ানরা গোরুর পুজো করতেন বলেছিলেন। হাথোর। ষাঁড়ও দেবতা ছিল?’

‘ছিল ভাই, ছোটোখাটো দেবতা নয়। মেমফিসে তার নামে ছিল এক বিশাল মন্দির। সেরাপিয়াম অফ এপিস বুলস। সেখানে ষাঁড়ের মমি বানিয়ে রাখত মিশরীয়রা।’

‘একটা গোটা ষাঁড়ের মমি!!’

গরম ফিশ ফ্রাইয়ের একটা কোনা কাসুন্দিতে ডুবিয়ে হালকা কামড় দিয়ে শুরু করলেন ভবেশদা।

‘দ্বিতীয় রামেসিসকে মনে আছে তো?’

‘হ্যাঁ, যাঁর সেই বিশাল বড়ো পাথরের মূর্তি আর আবু সিম্বেলের টেম্পলের কথা বলেছিলেন।’

‘হ্যাঁ, এই দ্বিতীয় রামেসিসের সময়ে আরেকজন দেবতার পুজো হত, বুঝলে। তার নাম ছিল তাহ। এই তাহ ছিল আর্ট আর ক্রাফটের দেবতা। আবার ওর ইচ্ছাতেই নাকি নীল নদে বন্যা আসত, জমিতে শস্য ফলত। তাই তাহ-এর গুরুত্ব ছিল অপরিসীম।

‘এই তাহ-এর পার্থিব রূপ ছিল একটা ষাঁড়। এরই নাম এপিস। ষাঁড় অনেক শক্তিশালী, সাহসী, এর প্রজনন ক্ষমতাও অনেক বেশি। তাই মিশরের ফারাওদের ইতিহাসের প্রথম থেকেই এপিসের পুজো হয়ে আসছিল। রামেসিসের সময় এর জনপ্রিয়তা তুঙ্গে পৌঁছোয়। জ্যান্ত ষাঁড়কেই তাহ-এর অবতার ধরে নিয়ে পুজো করা হত। তবে আবার যে-সে ষাঁড় হলে চলত না। কিছু স্পেসিফিক ক্রাইটেরিয়া ম্যাচ করতে হত।’

‘যেমন?’

‘যেমন, যে গোরু সেই ষাঁড়ের জন্ম দিয়েছে তার আগে কোনো সন্তান থাকলে চলবে না। আবার ষাঁড়ের শরীরেও কিছু নির্দিষ্ট লক্ষণ থাকতেই হবে। হেরোডটাস বর্ণনা দিয়ে গেছেন এর।

‘সেই বুল হবে একদম সাদা, শুধু পিঠের দিকে থাকবে কালো দাগ, সেটাও আবার উড়ন্ত চিলের আকারের হতে হবে, আর কপালে থাকবে ডায়মন্ড আকৃতির কালো ছোপ। লেজের চুল হতে হবে বিজোড় সংখ্যার, জিভের তলায় থাকতে হবে স্কারাব গুবরে পোকার মতো আরেকটা দাগ।’

‘হা হা, লেজের চুল গুনত ওরা বসে বসে?! তা ছাড়া চাপের কী আছে? ইভন নাম্বারের চুল পেলে একটাকে উৎপাটিত করলেই তো ঝামেলা মিটে যেত।’

এপিস বুল

‘তুমিও দেখছি পিজির মতো ফচকেমি করছ আজকাল, আমি যা পড়েছি সেটাই বললাম, সত্যি ওরা গুনে দেখত কি না থোড়াই জানি নাকি!’

‘সরি সরি, আপনি চটবেন না, আর কিছু বলছি না। আপনি এগোন।’

‘হুঁ, তো, এই ষাঁড় বেশ রাজকীয়ভাবে থাকত বুঝলে মন্দিরের মধ্যে। শুধু এর দেখভাল করার জন্য আলাদা করে প্রিস্ট রাখা হত, যিনি সারাদিন ধরে ওর প্রতিটা মুভমেন্ট ফলো করতেন, লিখে রাখতেন। সেইগুলো থেকেই নাকি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ হত। এপিস ষাঁড়ের শ্বাস নাকি ছিল খুব পবিত্র। সপ্তাহে একটা দিন তিনি আবার নাকি মন্দিরের জানলা দিয়ে ভক্তদের দর্শন দিতেন। বেশ কিছু গোরু নিয়ে তৈরি একটা হারেম থাকত ওঁর জন্য। অন্যদিকে যে গোরু সেই ষাঁড়ের জন্ম দিয়েছে তাকেও পুজো করা হত আলাদাভাবে। দেবতা তাহ বিদ্যুতের রূপে এসে নাকি তাকে গর্ভবতী করেছে।’

পবিত্র ষাঁড় এপিসের পুজো করছেন ফারাও

‘এ তো একদম এলাহি আয়োজন দেখছি!’

‘তা আর বলতে ! স্বয়ং ফারাও এই ষাঁড়ের আশীর্বাদ ছাড়া কোনো শুভ কাজ শুরু করতেন না। তবে এপিস বুল যেদিন মারা যেত সেদিন দেশ জুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসত। অনেক যত্ন নিয়ে ওর শরীরটাকে মমি বানানো হত। শরীরে সোনার অলংকার, মুখে সোনার মুখোশ পরিয়ে কবর দেওয়া হত ওকে। মারা যাওয়ার পরে নাকি এপিস একাত্ম হয়ে যাবে মৃত্যুর পরের দেবতা ওসাইরিসের সঙ্গে। তখন ওর নাম হবে ওসাইরাপিস। যখন একটা এপিস ষাঁড়কে মমি বানানো হচ্ছে তখনই দেশ জুড়ে তল্লাশি শুরু হত আরেকটা এমন ষাঁড়ের।

‘দ্বিতীয় রামেসিসের রাজত্বকালে এমন দুটো ষাঁড় মারা যায়, বুঝলে। তাদেরকে মমি বানিয়ে সাকারার মরুভূমিতে কবর দেওয়া হয়। তবে ওর সন্তান খায়েমওয়াসেত যখন ফারাও হয়ে আসেন তখন একটা খুব বড়ো সিদ্ধান্ত নেন।

এপিস বুলের মমি

‘যত এপিস বুল মারা যাবে তাদের সবার জন্য তৈরি করা হবে একটা বিশাল সমাধি। তার গোটাটাই হবে মাটির তলায়। একটা লম্বা গ্যালারি বানিয়ে তার দুই পাশে তৈরি করা হবে অনেকগুলো ঘর। প্রতিটা ঘরে থাকবে একজন এপিস বুলের সমাধি। আর মাটির ওপরে তৈরি করা হবে একটা বিশাল বড়ো মন্দির।

‘ফারাও যেমন ভেবেছিলেন ঠিক তেমনটাই করা হল। তারপর থেকে ইজিপ্টের ফারাওদের রাজত্বের শেষ দিন পর্যন্ত এই মন্দিরের জৌলুস অটুট ছিল। যিশুর জন্মের এক-শো বছর আগে স্ট্রাবো নামের এক গ্রিক ঐতিহাসিক এই তাক লাগানো মন্দিরের কথা লিখে গিয়েছিলেন। সাকারার এই সেরাপিয়াম থেকে মেমফিসের তাহ-এর মন্দির অবধি ছিল পাঁচ কিলোমিটার লম্বা একটা রাস্তা। সেই রাস্তার দু-পাশে রাখা ছিল অজস্র স্ফিংস।’

‘তাহলে এই মন্দির এখনও আছে?’

‘না ভাই, সেটা তো আর নেই। ৩৮৪ সালে রোমানদের হাত ধরে মিশরে খ্রিস্টান ধর্ম আসে। সঙ্গে সঙ্গেই সব পেগান ধর্মের চিহ্ন মিটিয়ে ফেলতে শুরু করে তারা। তাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এই সাকারার সেরাপিয়াম।’

‘আচ্ছা, আপনি এই মন্দিরটাকে বার বার সেরাপিয়াম বলছেন কেন বলুন তো?’

‘সেরাপিয়াম তো গ্রিক শব্দ। এর মানে সেরাপিসের মন্দির। ফারাওদের ইতিহাসের শেষের তিনশো বছরের সব রাজা ছিলেন গ্রিক। ওঁদেরকে বলা হত টলেমি। মনে করে দেখো, রোসেটার পাথরের কথা বলার সময় এঁদের কথা বলেছিলাম। টলেমিরা এপিস আর ওসাইরিসকে মিলিয়ে নিজেদের এক দেবতা বানান, তাঁররই নাম সেরাপিস। সেরাপিসকে কিন্তু দেখতে ছিল মানুষেরই মতো। তাঁরর সঙ্গে থাকত তিন মাথাওয়ালা একটা কুকুর। নাম কারবেরাস। যাই হোক, টলেমিরা কিন্তু সাকারার এপিসের মন্দিরের আকারের কোনো অদলবদল করেননি। শুধু দেবতার নামটুকুই বদলে যায়।’

‘ওহ, এবারে বুঝলাম ব্যাপারটা। এবারে বলুন খ্রিস্টানরা এই মন্দিরের কী করেছিল।’

সেরাপিস

‘ওরা মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছিল সেরাপিয়ামকে। শুধু মাটির নীচের এপিস ষাঁড়ের কবরখানা আর সেই স্ফিংসের পথ রয়ে গিয়েছিল। পরের দেড় হাজার বছরে সেটাও চলে গিয়েছিল মরুভূমির বালির নীচে।’

‘তাহলে ফের খুঁজে পাওয়া গেল কী করে !!’

‘সেটা সম্ভব হয়েছিল এক ডাক্তারের জন্য, বুঝলে। ফিলিবার্তো মনক্যালেরি ছিলেন ইতালিয়ান। কায়রোতেই ডাক্তারি করছিলেন। কিন্তু ছিল টুকটাক আর্কিয়োলজির শখ। তা, এই ডাক্তারবাবু একসময় দেখলেন খোঁড়াখুঁড়ি করে যা আর্টিফ্যাক্ট পাওয়া যাচ্ছে, তা বিক্রি করে ডাক্তারির থেকে বেশি উপার্জন করা যায়। ব্যস, অমনি তিনি ডাক্তারি ছেড়ে দিয়ে ফুলটাইম আর্কিয়োলজিস্ট হয়ে গেলেন।

‘১৮৩২ সালে সাকারার সেই বিখ্যাত স্টেপ পিরামিডের উত্তরে ঢিল ছোড়া দূরত্বে কাজ করছিলেন ফিলিবার্তো। তখনই একটা অদ্ভুত জিনিস চোখে পড়ে ওঁর। বালির মাঝখান থেকে জেগে আছে একটা পাথরের মাথা। আশেপাশের বালি সরাতেই বেরিয়ে পড়ল স্ফিংসের গোটা শরীর। চারপাশের আরও বালি সরাতে সরাতে সামনে আসতে থাকল একের পর এক আরও স্ফিংসের মূর্তি, যেন একটা রাস্তার দু-পাশে সারি দিয়ে রাখা আছে ওদের।’

‘এটাই কি সেই রাস্তা যেটা সাকারার সেরাপিয়ামের সঙ্গে জুড়ত মেমফিসের তাহ-এর মন্দিরকে !’

‘একদম ঠিক ধরেছ। ফিলিবার্তো আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন অ্যাভিনিউ অফ স্ফিংস। কিন্তু শখের এই আর্কিয়োলজিস্টের ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা বিশেষ ছিল না। তাই বুঝতে পারেননি যে এটাই সেরাপিয়ামে যাওয়ার রাস্তা। তিরিশটা মতো স্ফিংসের মূর্তি ওখান থেকে তুলে নিয়েই ফিলিবার্তো খুশি হয়ে গিয়েছিলেন। সেই তিরিশটা স্ফিংসের বােরাখানা কিনে নিয়েছিলেন ইজিপ্টের বেলজিয়ান কনসাল জেনারেল সেসিনা পাশা। ছ-টা মূর্তি কিনেছিলেন দেশেরই কিছু ধনকুবের। ১৮৪৪-এ আর বাকি বারোটা মূর্তি কিনেছিল ব্রিটিশ সরকার।’

‘তাহলে এপিস বুলের সমাধির কী হল?’

‘আসছি সেই কথাতেই। ১৮৫০ সালে ফ্রান্সের ল্যুভর মিউজিয়াম থেকে একজন তরুণ আর্কিয়োলজিস্টকে পাঠানো হয় মিশরে। লক্ষ্য ছিল কোপটিক ভাষায় লেখা কিছু প্যাপিরাস মিউজিয়ামের জন্য নিয়ে আসা। লম্বা-চওড়া চেহারার মুখে হালকা দাড়িওয়ালা এই আর্কিয়োলজিস্টের নাম ছিল অগাস্ট মারিয়েতে।

‘মারিয়েতে ইজিপ্টে এসে মাসকয়েক কাটানোর পরেই বুঝলেন কোপ্টিক প্যাপিরাসের সন্ধান কেউ দিতে পারছে না। এদিকে দেশে খালি হাতে ফেরাটাও বোকামির কাজ হবে। তখন একদিন ভাগ্য গেল খুলে।

মারিয়েতে

‘সেসিনা পাশার প্যালেসে একদিন ডিনারের নেমন্তন্ন ছিল মারিয়েতের। সেদিন সন্ধেবেলায় পাশার বাগানে ঘোরার সময়ে ওঁর নজর পড়ে বাগানে রাখা বারোটা স্ফিংসের ওপরে। একটু ভালো করে পরীক্ষা করেই মারিয়েতে বুঝতে পেরে যান এই স্ফিংস সাকারার হারিয়ে যাওয়া সেরাপিয়ামের রাস্তারই। পাশার থেকে ফিলিবার্তোর ঠিকানা নিয়ে দেখা করেন ওর সঙ্গে। তারপরে ১৮৫০ সালের পয়লা নভেম্বর খোঁড়া শুরু করলেন ঠিক সেই জায়গা থেকে যেখানে ফিলিবার্তো খুঁজে পেয়েছিলেন প্রথম স্ফিংসের মূর্তি।

‘এক মাসের মধ্যে মারিয়েতে খুঁজে পেয়ে গেলেন সেরাপিয়ামের ভিত! আর তার নীচেই ছিল এপিস বুলের সমাধি!

‘মারিয়েতে এখানে একটা ভুল করেন, বুঝলে। তাড়াহুড়ো করে সমাধির ভেতরে ঢোকার জন্য এক্সপ্লোসিভ দিয়ে সমাধির বাইরের দরজা উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। এতে সমাধির ভেতরের সিলিংয়ের একটা অংশ ভেঙে পড়ে। দেওয়ালের অনেক কারুকার্য খসে পড়ে। মারিয়েতে সমাধিতে ঢোকার পরে লম্বা সেই গ্যালারির দুই পাশে মোট চব্বিশটা ঘর খুঁজে পান। প্রতিটা ঘরে রাখা ছিল একটা করে বিশাল পাথরের তৈরি কফিন, যার এক একটার ওজনই প্রায় ১০০ টন! কিন্তু দুর্ভাগ্যের ব্যাপার ছিল এই যে, প্রতিটা কফিনই ছিল ফাঁকা।’

‘অ্যাঁ! ফাঁকা!! ষাঁড়ের মমি গায়েব!’

প্রতিটা ঘরে রাখা পাথরের তৈরি বিশাল কফিন

‘হ্যাঁ, ভাই। মিশরের অন্যান্য সমাধির মতো এতেও তো বহুবার ডাকাতি হয়। ডাকাতরা কফিনগুলো থেকে চেঁছেপুঁছে সব নিয়ে গিয়েছিল। সেইসময়েই খুব সম্ভবত মমিগুলোকেও বের করে নিয়ে নষ্ট করে ফেলে। তোমাকে আগে বলেছিলাম মনে আছে নিশ্চয়, যে, অনেক সময়েই মমিগুলো ডাকাতদের মশালের জ্বালানির কাজ করত। এপিস বুলের মমিরও সেই হাল হয়েছিল খুব সম্ভবত। তুমি এখন যেমন হতাশ হলে শুনে, ঠিক তেমনই হতাশ হয়েছিলেন অগাস্ট মারিয়েতে। তবে তিনি হাল ছাড়েননি। আর তার পুরষ্কারও পেয়েছিলেন।

‘সমাধির একদম শেষপ্রান্তে এসে একটা লুকোনো করিডোরের মধ্যে একজোড়া অক্ষত ষাঁড়ের মমি খুঁজে পান মারিয়েতে। সেখানে ডাকাতদের হাত পড়েনি। সেই জায়গায় ঢুকেই চমকে ওঠেন তিনি। কবরের মেঝেতে বালির ওপরে পায়ের ছাপ। তিন হাজার বছর পুরোনো। খুব সম্ভবত যারা মমি দুটোকে সমাধিস্থ করার জন্য এনেছিল তাদেরই। সেই এপিস বুলদের মমির গায়ে ছিল সোনার অলংকার, পরজন্মে এদের সুবিধার জন্য বড়ো বড়ো জারে রাখা ছিল শস্য। কবরের দেওয়ালে খোদাই করা ছিল ফারাও দ্বিতীয় রামেসিস আর খায়েমওয়াসেতের নাম। এই মমিগুলো এখন রাখা আছে কায়রোর এগ্রিকালচার মিউজিয়ামে। মারিয়েতে এপিস বুলের একটা বিশাল বড়ো পাথরের মূর্তি নিয়ে যান দেশে। সেটা এখনও ল্যুভর মিউজিয়ামে রাখা আছে।’

‘ফ্যাসিনেটিং স্টোরি, সত্যি!’

‘তা আর বলতে, মিশরের ইতিহাসে এমন আরও কত কত গল্প যে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে তার ইয়ত্তা নেই। তবে আরও ফ্যাসিনেটিং একটা কথা বলি তোমায়। ডাক্তার ফিলিবার্তো বােরাটা স্ফিংস ব্রিটিশ গভর্নমেন্টকে বিক্রি করেছিলেন মনে আছে?’

‘হ্যাঁ, বললেন তো।’

‘তার একটাও কিন্তু ইংল্যান্ডে পৌঁছোয়নি।’

‘তাহলে কোথায় গেল?’

ভবেশদা এবারে সেই ট্রেডমার্ক হাসিটা হেসে বললেন,

‘ভারতে, স্যার। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ওগুলোকে এদেশে পাঠায়। আরও ভালো করে বলতে গেলে পাঠায় দেশের রাজধানীতে।’

‘রাজধানীতে? তখন তো রাজধানী... কলকাতা!!’

‘ঠিক, ভাই। তার একটা স্ফিংসই দেখতে পাবে ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামে গেলে।’

‘তাহলে বাকি এগারোটার কী হল?’

‘সেটাই রহস্য, ভায়া। বাকি এগারোটার কী হল সেটা কেউ জানে না!’

ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামের স্ফিংস

রাজাদের উপত্যকা

দিন পনেরো ভবেশদার কোনো খবর ছিল না। একদম বেপাত্তা! দোকান বন্ধ, ফোন সুইচড অফ। সেইসময়েই খেয়াল করেছিলাম যে আমরা ভবেশদার বাড়িটা আসলে কোথায় সেটাই জানি না! অথচ সেই মানুষটার সঙ্গে এতগুলো মাস কাটালাম, এত আড্ডা মারলাম। আমার আর পিজির দু-জনেরই চিন্তা হচ্ছিল, কলেজ স্ট্রিটে ওঁর দোকানের আশেপাশের দোকানগুলোতে জিজ্ঞাসা করেও খুব একটা সুবিধা হল না। সবাই চেনে ভবেশদাকে। কিন্তু বাড়ি কোথায় সেটা কেউ জানে না।

দু-দিন আগেই যদিও ভদ্রলোক হঠাৎই উদয় হলেন। একেবারে আমাদের রুমের দরজায়। দিনটা ছিল শুক্রবার। বিকেলের দিক। সদ্য মেডিসিনের ক্লাস শুরু হয়েছে, আমি পিজিকে পেশেন্ট বানিয়ে বিছানায় শুইয়ে ক্লিনিকাল এগজামিনেশন প্র্যাকটিস করছিলাম আর পিজি ‘এই আমার পেটে হাত দিস না, কাতুকুতু লাগছে’ বলে বার বার লাফিয়ে উঠছিল। এমন সময় নাকে এল চেনা বিড়ির গন্ধ, পিছনে ঘুরে দেখি আমাদের মমিদা দাঁড়িয়ে আছে। ভবেশদার এই নামটা পিজির দেওয়া, যদিও ভুলেও কখনো ওকে এই নামে ডাকি না। ভবেশদার কাঁধে সেদিন আবার গাঢ় নীল রঙের ঢাউস একটা ব্যাগ ছিল।’

‘কী ব্যাপার, মানিকজোড়? কোনো খবর নেই তোমাদের, তাই দেখা করতে চলে এলুম।’

‘খবর তো আপনার নেই। একদম হাওয়া হয়ে গেছিলেন। আর এখন এসে আমাদের বলছেন। কোথায় ছিলেন এতদিন?’

‘আরে, কোথায় আবার থাকব, বাড়িতেই ছিলাম। একটু পড়াশোনা করছিলাম।’

‘আপনি আবার কী পড়ছিলেন?’

ভবেশদা কাঁধের ব্যাগটা মাটিতে নামিয়ে চেয়ার টেনে বসতে বসতে বললেন,

‘রাজাদের উপত্যকার কথা। অদ্ভুত একটা জায়গা, যেটা পাঁচশো বছর ধরে ফারাওদের কবরখানা ছিল।’

পিজিকে দেখলাম ক্যান্টিনে ফোন করে টুক করে চা আর ঘুগনির অর্ডার দিয়ে দিল, আড্ডা যে জমে যাবে সেটা দু-জনেই ভালো বুঝছিলাম।

হাচিসনের ক্লিনিকাল মেথডের বইটাকে বন্ধ করে রাখতে রাখতে আমি বললাম, ‘রাজাদের উপত্যকা? মানে ভ্যালি অফ দ্য কিংসের কথা বলছেন?’

‘হুঁ, আরবিতে জায়গাটার নাম ওয়াদি আবওয়াব আল মুলুক, মানে ভ্যালি অফ দ্য গেটস অফ দ্য কিংস। সেটাই পপুলার কালচারে ভ্যালি অফ দ্য কিংস হয়ে গেছে।’

‘আচ্ছা, এখানেই তুতানখামেনের সমাধি ছিল না!’

‘হ্যাঁ, এখানেই ছিল তো। কেভি৬২। তবে তুতানখামেন ছাড়াও আরও তেষট্টিখানা কবর আছে ভাই এখানে। এখনও লুকিয়ে থাকা নতুন নতুন কবরের খোঁজ পাচ্ছেন আর্কিয়োলজিস্টরা। বছর দশেক আগেই একটা এরকম কবর পাওয়া গেল ওখানে। জায়গাটা কত রহস্য যে বুকে নিয়ে বসে আছে সেটা বই পড়ার আগে জানতেই পারতাম না।’

পিজি এবারে দাঁত বের করে হাসতে হাসতে বলল,

‘আমাদের আর বই পড়ে কী হবে! আপনিই আছেন তো!’

‘হুঁ, এত গল্প যে বলি সেগুলো মাথায় তো রাখতে পারো বলে মনে হয় না।’

‘কী বলছেন! স্পন্দন আপনার গল্পগুলো সব লিখে রাখে, জানেন! ওর হেব্বি মেমোরি! অ্যানাটমিতে অনার্স এমনি এমনি পেয়েছিল নাকি!’

‘বল কী, স্পন্দন ভাই। তুমি সব লিখে রাখছ! প্ল্যানটা কী?’

‘কিছুই প্ল্যান না, আপনার গল্পগুলো শুনতে ভালো লাগে। তাই লিখে রাখার চেষ্টা করি।’

‘আরিব্বাস! তাহলে একেবারে উলুবনে মুক্তো ছড়াচ্ছি না, কি বলো?! ভ্যালি অফ দ্য কিংসের গল্পই হোক তাহলে।’

চেয়ার থেকে নিজেকে পিজির বিছানাতে শিফট করে ভবেশদা শুরু করলেন,

‘নীল নদের পশ্চিম পাড়ে, লাক্সর শহর, আগে যার নাম ছিল থেবস, তার কাছে এই উপত্যকা। দু-পাশে খাড়াই চুনাপাথরের পাহাড়। ভ্যালিতে ঢোকার রাস্তাটাও সরু। এখানেই পাহাড় কেটে বানানো হত রাজাদের কবর।’

ভ্যালি অফ দ্য কিংস-এ পাহাড় কেটে বানানো সমাধি

‘কেন? ফারাওরা তো পিরামিড বানাত, মাস্তাবা বানাত। সেখানে এরকম পাহাড় কেটে সমাধি বানানোর কী মানে?’

‘মানে তো আছেই। ফারাওদের পিরামিড, মাস্তাবাগুলোর ঐশ্বর্য ডাকাতদের বার বার টেনে আনত। কবরখানার রাস্তায় গোলকধাঁধা বানিয়ে, পিরামিডের মধ্যে ফলস দরজা তৈরি করেও ডাকাতির হাত থেকে কোনো রেহাই মেলেনি। কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রে পিরামিড বানানোর সময় কাজ করা শ্রমিকই ডাকাত হয়ে ফিরে আসত। গুপ্ত দরজার হদিশ ছিল তাদের মুখস্থ। ফলত এককণা সোনাও আর সেইসব সমাধিতে অবশিষ্ট ছিল না। সোনার লোভে ফারাওদের মমিও তছনছ করে ফেলত ওরা। সোনা গেলে যাক, কিন্তু মমি নষ্ট হলে তো ফারাওয়ের মৃত্যুর পরের জগতে যাওয়ার পথই বন্ধ হয়ে যাবে। তাই ১৫৩৯ বিসি থেকে ভ্যালি অফ দ্য কিংসে ফারাওদের নতুন সমাধি বানানো শুরু হতে লাগল।

ফারাওয়ের সমাধিতে প্রদীপের আলোয় ছবি ও লিপি আঁকা

‘প্রথম যে ফারাওয়ের সমাধি তৈরি হল, সে হল প্রথম তুতমোসিস । যে আর্কিটেক্ট সেটা বানায় সে হল ইনেনি, ইনেনিই এই জায়গাটা খুঁজে বের করেছিল। ফারাওয়ের সমাধি বানানোর পরে ইনেনি গর্ব করে বলেছিল যে এমন জায়গায় কবরটা লুকোনো আছে যেখানকার কথা কেউ কোনোদিন শোনেনি, কেউ কোনোদিন দেখেনি।’

‘কিন্তু সমাধি বানাতে নিশ্চয়ই বেশ কিছু লোক লেগেছিল। তারাই তো এর কথা বাইরে ফাঁস করে দিতে পারত।’

‘যাতে না পারে তার জন্য যে সবরকম ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। খুব কম সংখ্যক লোককেই এই কাজে লাগানো হয়েছিল। তাদের প্রত্যেককে কাজে যোগ দেওয়ার আগে শপথ নিতে হত। এদেরকে বলা হত সত্যের ভৃত্য। কোথাও মুখ খুললেই এদের মৃত্যু ছিল অনিবার্য। সবাই মোটা টাকা মাইনে পেত। কিন্তু প্রত্যেককেই ভ্যালির পাশেই দেইর এল মেদিনা নামের একটা জায়গায় থাকতে হত পরিবার নিয়ে। সেই জায়গাটার চারিদিকে উঁচু পাঁচিল দেওয়া ছিল। বাইরের জগতের সঙ্গে কোনো সংস্পর্শেই আসতে দেওয়া হত না তাদের। ভ্যালিতে আবার যখন-তখন সারপ্রাইজ ভিজিট চলত, যাতে কাজের গোপনীয়তা রক্ষা হচ্ছে কি না জানা যায়।’

‘আচ্ছা ভবেশদা, আপনি বললেন তুতানখামেেনর টুম্বটা হল কে ভি ৬২। এর কী মানে?’

‘কে ভি মানে হল কিংস ভ্যালি, ইজিপ্টোলজিস্ট জন গার্ডনার উইলকিনসন এই নাম্বারিং সিস্টেম চালু করেছিলেন সমাধিগুলোর জন্য। রানিদের কবর দেওয়ার জন্য আলাদা একটা উপত্যকা ছিল, বুঝলে। তার নাম ভ্যালি অফ দ্য কুইনস। এখানকার টুম্বগুলোর নাম্বারিং তাই কিউভি ১,২,৩... এরকম।’

‘তাহলে গার্ডনারই প্রথম ভ্যালি অফ দ্য কিংস খুঁজে পান?’

‘ধুস, এই জায়গাটার অস্তিত্বের কথা একসময় বাইরের জগতের সামনে চলেই আসে। রোমান সময়ে এটা একটা টুরিস্ট স্পট ছিল বলতে পারো। নেপোলিয়নের সময়েও কিছু আর্কিয়োলজিস্ট এখানে এসেছিলেন। তাঁরদের মধ্যে এডোয়ার্ড টেরেজ নামের একজন সাহেব তৃতীয় আমেনহোটেপের টুম্বও খুঁজে পেয়েছিলেন। কিন্তু প্রথম যে আর্কিয়োলজিস্ট এখানে খোঁড়াখুঁড়ির কাজ শুরু করেন তিনি হলেন অন্য আরেকজন। কে বলো তো? আগের দিন এর কথাই বললাম তো, যুবক মেমনন, আবু সিম্বেলের মন্দির…’

‘জিওভান্নি বেলজোনি! এখানেও!’

‘হ্যাঁ, ভাই। এখানেও বেলজোনি। আবু সিম্বেল থেকে ফেরার পরে বেলজোনি নজর দেন ভ্যালি অফ দ্য কিংসের দিকে, খোঁড়াখুঁড়ি করতে করতে বেলজোনি খুঁজে পেয়েছিলেন ফারাও আই-এর কবর, যে তুতানখামেনের পরে মসনদে বসেছিল। প্রথম রামেসিসের কবরও পাওয়া যায়। তবে দুটোতেই আশাপ্রদ তেমন কিছুই পাওয়া যায়নি। বেলজোনি কিন্তু একটুও না দমে কাজ চালিয়ে যান। তার ফলও পেলেন যদিও।

‘১৮১৭ সালের অক্টোবর মাসের একটা দিন। বেলজোনি হঠাৎ খেয়াল করলেন একটা পাহাড়ের গায়ে জল গড়িয়ে পড়ার নালি পথ। কোনো একসময়ে হয়তো এখান দিয়ে সত্যিই জল পড়ত, সেইজন্যই পাথর ক্ষয়ে ক্ষয়ে এরকম চ্যানেল তৈরি হয়েছে। কিন্তু বেলজোনি খেয়াল করলেন সেই চ্যানেল নীচের দিকে নামতে নামতে হঠাৎ ছোটো ছোটো পাথরের ধ্বংসস্তূপের মাঝে হারিয়ে গেছে। তাহলে কি ওর পিছনে কিছু আছে!

‘কয়েক হাজার বছর ধরে জমে থাকা নুড়িপাথরের স্তূপ সরানো খুব মুশকিলের হল। জায়গায় জায়গায় পাথরের টুকরোগুলো জমাট বেঁধে গেছে। বেলজোনি একটা খেজুর গাছের গুঁড়ি তুলে এনে শ্রমিকদের বললেন সেটাকে হরাইজন্টালি ধরে বার বার সেই পাথরের স্তূপে আঘাত করতে, যাতে পাথরের টুকরোগুলো আলগা হয়ে পড়ে।’

‘বুঝেছি! ব্যাটারিং র‌্যাম! পদ্মাবতে দেখেছিলাম তো! তা ছাড়া গেম অফ থ্রোনসে…’

পিজির মুখের কথা শেষ হল না। ভবেশদার রক্তচক্ষু দেখে ওকে থামতে হল। ছেলেটার বাজে বকার অভ্যেসটা কোনোদিন শুধরোবে না।

‘তা যেটা বলছিলাম, বেলজোনির এই টেকনিকে কিন্তু ভালো কাজ হল। পাথর সরানো গেল বেশ খানিকটা। বেরিয়ে এল একটা বড়ো পাথরের দরজা। মানে একটা সমাধির দরজা। বেলজোনি এই সমাধি আবিষ্কার করার বেশ কয়েক বছর পরে জানা যায় যে সেই কবরটা ছিল ফারাও সেতির।’

‘সেতি?’

‘হ্যাঁ, ইনি ছিলেন দ্বিতীয় রামেসিসের বাবা। উনিশতম ডাইনেস্টির রাজা। খুব জনপ্রিয় ফারাও ছিলেন সেতি। ওঁর সময়েই দেশ জুড়ে রেশনের ব্যবস্থা চালু হয়। দেশের প্রতিটা মানুষের জন্য বরাদ্দ হয় রুটি, রোস্টেড মাংস, আর কিছু শাকসবজি। মাসে দু-বার করে সবাইকে দু-বস্তা করে গমও দেওয়া হত। এহেন জনদরদি রাজার কবরও ছিল দেখবার মতো।

‘সমাধির দরজার গায়ের ফাটল দিয়ে কোনোরকমে ভেতরে ঢুকেই বেলজোনি অবাক হয়ে গেলেন! একটা বিশাল হল ঘরে এসে পড়েছেন উনি। ওঁর চারিদিকের দেওয়ালে আঁকা রঙিন ছবি। আর খোদাই করা আছে হায়রোগ্লিফের লিপি।

সেতির সমাধিতে ঢোকার গুপ্ত সুড়ঙ্গের ম্যাপ

‘সেই বড়ো ঘর থেকে বেরোতেই দেখা গেল মাটি নীচের দিকে ঢালু হয়ে নেমে গেছে। সেই রাস্তায় হঠাৎ একটা বড়ো কুয়ো। এতটাই গভীর যে মশালের আলোতেও তার তল পাওয়া গেল না। সামান্য অসাবধান হলেই এতে পড়ে মৃত্যু অনিবার্য ছিল। কুয়োর অন্যপ্রান্তে উঠে গেছে একটা বড়ো দেওয়াল। সেই দেওয়ালের গায়ে একটা বেশ বড়ো গর্ত। তবে দেওয়ালে আরেকটা জিনিস দেখে বেলজোনি বেশ অবাক হলেন। দেওয়াল বেয়ে একটা বেশ মোটা দড়ি ঝুলছে।’

‘অ্যাঁ, দড়ি এল কোথা থেকে?’

‘চোরের দলের লাগানো দড়ি।’

‘এখানেও! মানে ভ্যালি অফ দ্য কিংসেও ডাকাতি হয়েছিল!’

মিউজিয়ামে রাখা সেতির সমাধিতে পাওয়া দড়ি

‘হয়েছিলই তো। এসব কথা কতদিন আর চাপা থাকে। তাও ৫০০ বছর জায়গাটা লোকচক্ষুর আড়ালে ছিল।

‘তারপরে ওদের হাল হয় সেই পিরামিড আর মাস্তাবার মতোই। ডাকাতরা সবই লুঠ করে নিয়ে যায়।’

‘যাহ, তার মানে এই সমাধিতেও বেলজোনি কিছুই পাননি!’

সেতির সমাধিতে নামার পথের চারদিকে দেওয়াল জুেড় আঁকা ছবি

‘তা কি আমি বলেছি? সবুর করো। বেলজোনি এখন কুয়োর পাশে দাঁড়িয়ে টপকাবার পথ ভাবছে। পর পর ক-টা খেজুর গাছের গুঁড়ি পাশাপাশি পেতে ব্রিজ বানিয়ে কুয়োর অন্য প্রান্তে যাওয়া হল। অন্যদিকের দেওয়ালে লাগানো দড়ির টুকরোটাতে ঝুলে গর্তের ভেতর দিয়ে আরেকটা বড়ো ঘরে এসে পৌঁছোলেন বেলজোনি। সেই ঘরের একপাশে আবার নীচের দিকে সিঁড়ি নেমে গেছে। সেই সিঁড়ি শেষ হল আরেকটা বড়ো ঘরে, সেই ঘরের দেওয়াল জুড়ে মিশরীয় দেবদেবীদের ছবি। তাদের গায়ের রং তখনও অটুট আছে। ঘরের এক পাশ থেকে পাওয়া গেল বেশ কিছু উশাবতি।’

‘উশাবতি? মানে সেই পুতুলগুলো যাদের মমির সঙ্গে রাখা হত, যাতে তারা মৃত্যুর পরের রাজ্যে ফারাওদের জন্য কাজ করে দেয়।’

‘বাহ! তোমার তো মনে আছে দেখছি। উশাবতিদের পেতেই বেলজোনি বুঝল ফারাওয়ের মমিও নিশ্চয় খুব কাছাকাছিই আছে! পাশের আরেকটা ছোটো ঘরেই পাওয়া গেল ফারাওয়ের কফিন!

দেইর-এল-বাহারিতে পাওয়া সেতির মমি (অধ্যায় ২১)

‘প্রায় স্বচ্ছ অ্যালাবাস্টার পাথরের তৈরি। গায়ে বুক অফ দ্য ডেড-এর মন্ত্র খোদাই করা আছে। ইজিপশিয়ান আর্টের মাস্টারপিস বলা যেতে পারে এই কফিনকে। এখন রাখা আছে লন্ডনের স্যার জন স্লোয়ান মিউজিয়ামে।’

সেতির সমাধির ভেতরে দেওয়াল জুেড় আঁকা ছবি

‘কফিন খুলেই ফারাওয়ের মমি পাওয়া গেল!?’

‘ধুর, কফিন একদম ফাঁকা ছিল।’

‘মানেটা কী? মমি কোথায় গায়েব হয়ে গেল?’

‘শুধু সেতির টুম্বে নয়, ভ্যালি অফ দ্য কিংসের অন্য আর দুটো টুম্ব বাদ দিয়ে বাকিগুলোর একটাতেও কোনো মমি পাওয়া যায়নি!’

‘বলেন কী? যার জন্য এত বড়ো কবরখানা বানানো সেই মমিই গায়েব!’

‘সেইসব মমিরা কোথায় গেল সেটা না হয় তোমাদের পরে আরেকদিন জিজ্ঞাসা করব। গুগল করে দেখে রেখো। বেলজোনির এই কবর আবিষ্কারের সঙ্গে একটা বেশ মজার ঘটনা জড়িয়ে আছে বুঝলে, সেটা বলি আগে, না হলে আবার ভুলে যাব।

প্রায় স্বচ্ছ অ্যালাবাস্টার পাথরের তৈরি সেতির কফিন

‘বেলজোনির সেতির কবর আবিষ্কারের খবরটা দাবানলের মতো ছড়িয়ে গিয়েছিল চারিদিকে। খবর তো আর খবর থাকে না, গুজবে বদলে যায়। সেই গুজব কানে গিয়ে পৌঁছোল হামিদ আঘার কানে। হামিদ আঘা ছিল ‘‘কেনা’’ নামের একটা শহরের মাতব্বর গোছের। সেতির কবরের মধ্যে নাকি একটা দারুণ ঐশ্বর্য পাওয়া গেছে! এটা শোনার সঙ্গেসঙ্গেই বেশ কয়েকটা পুলিশকে বগলদাবা করে আঘা ঘোড়া ছোটাল ভ্যালি অফ দ্য কিংসের দিকে।

‘গুপ্তধনের লোভে দু-দিনের রাস্তা দেড়দিনে পার করে আঘা যখন সেতির সমাধির মধ্যে ঢুকল তখন বেলজোনি ওখানেই ছিলেন। সমাধির দেওয়ালে দেওয়ালে আঁকা দারুণ ছবিগুলোর দিকে আঘা একবার তাকিয়েই মন্তব্য করল, এসব মেয়েমানুষদেরই ভালো লাগবে।

‘কিন্তু যার জন্য এতটা পথ আসা সেটা কোথায়! সমাধি তন্নতন্ন করে খুঁজেও কিছু পাওয়া গেল না। এবারে শুধু একদম ভেতরের ঘরটা দেখা বাকি।

‘সেই ছোট্ট ঘরটাতে ঢুকেই আঘা দেখল বেলজোনি বসে আছেন সেতির অ্যালাবাস্টার পাথরের তৈরি কবরের ওপরে।

‘ ‘‘গুপ্তধন কোথায়?!’’

‘ ‘‘কোন গুপ্তধন?’’

‘ ‘‘যেটা তুমি লুকিয়ে রেখেছ।’’

‘ ‘‘আমি এখানে কিচ্ছু পাইনি তো খুঁজে। একটা সোনার কণাও ছিল না।’’

‘ ‘‘ইয়ার্কি হচ্ছে! জানো আমি কে? আমার একটা আদেশে তোমার মাথা আলাদা হয়ে যাবে শরীর থেকে। ভালো চাও তো বলো সেই গুপ্তধনটা কোথায়?’’

‘ ‘‘কোন গুপ্তধনের কথাটা বলছেন সেটা তো বলুন আগে?!’’

‘আঘা এবারে বেলজোনিকে বলল তার কথা, যেটার লোভে ওর এতটা পথ উজিয়ে আসা। কিন্তু আঘার কথা শুনে বেলজোনি হাসি আর চেপে রাখতে পারলেন না। ওইটুকু ঘরটা হাসির চোটে গমগম করতে লাগল।

‘সেকী? হাসির কী হল?’

‘হাসবে না? আঘা কোন গুপ্তধনের খোঁজে এসেছিল জানো?’

‘কী?’

‘আঘা শুনেছিল যে সেতির সমাধিতে নাকি সোনার তৈরি একটা ইয়াব্বড়ো পেনিস পাওয়া গেছে। সেটা আবার হিরে আর মুক্তোতে মোড়ানো! গুজবের লেভেল কোথায় যেতে পারে খালি ভাব!’

শেষে সোনার তৈরি পেনিস!! আমি আর পিজি দু-জনেরই হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে গেল। পিজি বলল,

‘এই হামিদ আঘা তো হেব্বি গামবাট টাইপের ছিল! তা, এরপরে কী হল?’

‘কী আবার হবে? বেলজোনির হাসির চোটে আঘা বেশ অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। বেটা তখন ভালোই বুঝতে পেরেছে নিজের বোকামিটা। তাই আর কথা না বাড়িয়ে সুড়সুড় করে ওখান থেকে পালিয়ে আসে।’

‘আর বেলজোনি?’

‘সে-ভদ্রলোকের ধৈর্য অপরিসীম, বুঝলে। আলেকজান্ডার রিকি নামের এক ইতালিয়ান পেইন্টারের সঙ্গে মিলে বেলজোনি সেতির কবরের দেওয়ালে আঁকা প্রতিটা ছবি কপি করতে থাকেন। কিছু পাতায় জলরঙে এঁকে। আর কিছুর মোমের ছাপ নিয়ে। সমাধির প্রচণ্ড গরমে মোম বার বার গলে যেত। তাও সব মিলিয়ে ওঁরা প্রায় এক হাজার ছবি আর পাঁচশো হায়রোগ্লিফিক ইনস্ক্রিপশনের কপি তৈরি করেন।

‘১৮২০ সালে জিওভান্নি বেলজোনি লন্ডনে ফেরত আসেন। গোটা দেশের সবকটা নিউজপেপারের প্রথম পাতায় তখন ওঁর ছবি আর ওঁর অ্যাডভেঞ্চারের কথা। ওঁকে নিয়ে লেখা বই ইতালিয়ান, ফ্রেঞ্চ আর জার্মান ভাষায় অনূদিত হয়। সে এক হইহই ব্যাপার, বুঝলে।

‘১৮২১-এর মে মাসে বেলজোনি লন্ডনের পিকাডিলিতে নিজের এগজিবিশন শুরু করেন। প্রথম দিনেই মিশরের ঐশ্বর্য দেখতে ভিড় করেছিল ১৯০০ মানুষ! সেদিন সকলকে তাক লাগিয়ে দেওয়ার জন্য বেলজোনি একটা নাম-না-জানা মমিও আন-র‌্যাপ করেছিলেন। অবশ্যই একদম হাতুড়ে পদ্ধতিতে। সেইদিনই আবার বেলজোনি সেতির কবর থেকে পাওয়া ফারাওয়ের নাম লেখা দুটো কার্তুজ দান করেন একজন ইংরেজ ডাক্তারকে। কে বলো তো? থমাস ইয়ং।’

১৮২০ সােল লন্ডন থেকে প্রকাশিত বেলজোনির অ্যাডভেঞ্চারের বই

বেলজোনির অ্যাডভেঞ্চারের আর্ট প্লেট

‘মানে, যিনি সেই হায়রোগ্লিফের মানে বের করার কাজে লেগেছিলেন?’

‘ঠিক, এই সেই থমাস ইয়ং, বেলজোনির দেওয়া কার্তুজ থেকেই থমাস কয়েকটা হায়রোগ্লিফিক চিহ্নর মানে বের করতে সক্ষম হন। সেটা আবার শাম্পোলিয়নকে সাহায্য করে বাকি হায়রোগ্লিফের মানে বের করতে।’

‘বাপ রে! বেলজোনি না থাকলে মিশরের ইতিহাসটাই অর্ধেক অজানা থেকে যেত তো।’

‘ঠিক তাই। একজন সার্কাসে-খেলা-দেখানো পালোয়ানের জন্য ইজিপ্টের কত অজানা ইতিহাস আজকে আমরা জানতে পারছি বলো। বেলজোনির নামে পরে কয়েন বেরোয়। ওঁর জন্মভূমি পাদুয়াতে ওঁর একটা স্ট্যাচুও আছে।’

‘আচ্ছা, লন্ডনের এগজিবিশনের পরে বেলজোনির কী হল?’

১৮২১ সােল লন্ডনের ইজিপশিয়ান হলে বেলজোনির এগজিবিশন

‘অন্য যে কোনো লোক হলে অত নামডাক, প্রভাব প্রতিপত্তিতেই গা ভাসিয়ে দিত। কিন্তু এ যে বেলজোনি। ১৮২৩ সালে বেলজোনি আবার বেরিয়ে পড়েন অ্যাডভেঞ্চারে। এবারের লক্ষ্য পশ্চিম আফ্রিকার নিগার নদী ধরে এগিয়ে হারানো শহর টিমবাকটুকে খুঁজে বের করা। ঠিক যে স্বপ্নটা দেখেছিলেন ওঁর গুরু জোহান বুর্কার্ড। অদ্ভুতভাবে বেলজোনিও পারেননি সেই শহর খুঁজে বের করতে। বুর্কার্ডের মতোই বেলজোনিও ডিসেন্ট্রির কবলে পড়ে আফ্রিকার জঙ্গলের মধ্যে মারা যান ১৮২৩-এর তেসরা ডিসেম্বর। একটা গাছের নীচে কবর দেওয়া হয় তাঁরকে। যে মানুষটা নিজে এত কিছু আবিষ্কার করেছিলেন তাঁরর কবর আজ অবধি কেউ আর খুঁজে পায়নি।

‘একটা দারুণ মানুষের গল্প বললেন, সত্যি। শুধু বেলজোনির জীবন নিয়েই হলিউড একটা ব্লকবাস্টার সিনেমা বানিয়ে ফেলতে পারে। কিন্তু ভবেশদা, বেলজোনির পরে ভ্যালি অফ দ্য কিংসের কী হল?’

‘ভিক্টর লোরেট নামের এক ব্রিটিশ আর্কিয়োলজিস্ট ব্যাপক খোঁড়াখুঁড়ি চালান ওখানে। সেই সময়েই ফারাও তৃতীয় তুতমোসিস, দ্বিতীয় আমেনহোতেপের সমাধি পাওয়া যায়। তারপরে আরেক আর্কিয়োলজিস্ট থিওডোর ডেভিস এখানে কাজ করেন টানা বােরা বছর। একে একে আবিষ্কার হতে থাকে বাকি ফারাওদের সমাধিও। একটা সময় মোটামুটি সবাই ধরে নেয় যে ভ্যালি অফ দ্য কিংসের আর কিছু দেওয়ার নেই। সবই আবিষ্কার হয়ে গেছে। শুধু একজন মানুষ এই কথায় বিশ্বাস করেননি। আর এই অবিশ্বাসের জন্যই ইজিপ্টোলজির ইতিহাসে আজকে সবার আগে তাঁরর নামটাই আসে মুখে।’

ভবেশদা কার কথা বলছেন সেটা বুঝতে আর বাকি রইল না আমাদের।

হাওয়ার্ড কার্টার!!

তবে সেই গল্প শুরু হল মেস থেকে ডিনার করে আসার পরে।

তুতানখামেন

‘যিশুর জন্মের প্রায় তেরোশো বছর আগেকার কথা। হঠাৎ করে রাজা আখেনাতেনের মৃত্যুর পরে মিশরের মসনদে যে নতুন রাজা এলেন তাঁরর বয়স মাত্র নয়। ওঁর জন্মের সময়েই মা কিয়া মারা যান। বড়ো হয়ে ওঠা ধাইমা মাইয়ার কাছে। বালক রাজাকে সিংহাসনে বসিয়ে রাজত্ব চালাতে লাগলেন মন্ত্রী আই। ছোটোবেলা থেকেই সে-ছেলে দুর্বল। লাঠি ছাড়া হাঁটতে পারত না, বার বার ম্যালেরিয়াতে ভুগত। নিজেরই সৎ বোন আনখেসেনামেনকে বিয়ে করে সে। দু-জন সন্তান হয়, কিন্তু তাদের দু-জনেই মারা যায় গর্ভাবস্থাতেই। রাজা নিজেও হঠাৎই মাত্র উনিশ বছর বয়সে মারা যান। সঙ্গেসঙ্গেই তড়িঘড়ি করে তাঁরকে সদ্য সদ্য বানানো একটা ছোট্ট সমাধিতে শুইয়ে নিজের দায়িত্ব সারেন মন্ত্রী ‘‘আই’’। তারপরেই নিজেকে মিশরের ফারাও বলে ঘোষণা করেন। যেখানে যেখানে এই বালক রাজার নাম লেখা ছিল তা মুছে ফেলা হয়। মন্দিরের দেওয়ালে খোদাই করা ছবি নষ্ট করে দেওয়া হয়। আই চেয়েছিলেন যাতে এই ফারাওকে কেউ আর মনে না রাখে। কিন্তু ইতিহাসের মজাটা এমনই যে আজকে আইকেই কেউ মনে রাখেনি। অন্যদিকে হেন মানুষ নেই যে সেই অতিসাধারণ রুগ্ন ফারাওয়ের নাম শোনেনি। তার নামের মানে ছিল সূর্যদেবতা আমেনের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। আমরা ওকে চিনি তুতানখামেন বলে।’

‘তার মানে বলছেন তুতানখামেন একজন খুব ইনসিগনিফিক্যান্ট ফারাও। তাহলে এত বিখ্যাত কেন?’

‘বিখ্যাত হওয়ার কারণটা তো খুবই সহজ, স্পন্দন ভাই। একমাত্র তুতানখামেনই সেই ফারাও যাঁর কবর প্রায় অক্ষত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল। সেই কবরের ঐশ্বর্যে তাক লেগে যায় গোটা পৃথিবীর। সঙ্গে এসে বসে একটা মিথ। ফারাওয়ের অভিশাপের! ব্যস, এর পরে মানুষ আর কিং তুতকে ভুলতে পারেনি।’

পিজি বলল,

‘হ্যাঁ, পড়েছিলাম বটে যে তুতানখামেনের সমাধি আবিষ্কারের সঙ্গে যে অভিশাপটার কথা আগে বলা হত তার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।’

‘ঠিক বলেছ, একদমই নেই। তবে রহস্য জড়িয়েই আছে। আর আছে রাজনীতি, যে ব্যাপারে অনেকেই কথা বলে না।’

‘রাজনীতি? সেটা কীভাবে?’

ভবেশদা এতক্ষণ একটা টুথপিক দিয়ে দাঁত খোঁচাতে খোঁচাতে কথা বলছিলেন, মেসের মৌরির টুকরো আটকে গিয়েছিল মনে হয়। এবারে টুথপিকটাকে জানলা দিয়ে বাইরে ফেলে দিয়ে বললেন,

‘তাহলে একদম গোড়া থেকেই গল্পটা বলি শোনো।

‘১৮৯১ সালের মে মাসের একটা দিন, ইংল্যান্ড। ইজিপ্টোলজিস্ট পার্সি নিউবেরি মিশরে যাবেন এক্সক্যাভেশনের কাজে। তাঁরর একজন এমন হেল্পারের দরকার যে খুব ভালো ছবি আঁকতে পারে। এই কথাটা বন্ধু উইলিয়াম আর্মহার্স্টকে বলার সঙ্গেসঙ্গেই সে বলল তার আরেক বন্ধুর এক ছেলে আছে বটে। পড়াশোনা তেমন কিছু হয়নি ছোটোবেলা থেকে। তবে খুব ভালো আঁকতে পারে সে। যা দেখবে চটজলদি একেবারে অবিকল এঁকে দেবে। ব্যস, মাত্র সতেরো বছর বয়সে সেই ছেলে বাড়ি ছেড়ে পাড়ি দিল ইজিপ্টে। সে-ই পরের মাত্র পনেরো বছরের মধ্যে হয়ে উঠল উত্তর ইজিপ্টের ডিপাৰ্টমেন্ট অফ অ্যান্টিকুইটির ম্যানেজার! ওর কথা ছাড়া মাটিতে বেলচা চালানোই যাবে না। এ-ই হল হাওয়ার্ড কার্টার।’

‘মানে, আর্কিয়োলজিস্ট নিজেই অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের হেড?’

‘তবে আর বলছি কী। কার্টার নিজেই ঠিক করতেন কাকে কোথায় এক্সক্যাভেশনের কাজ দেওয়া হবে। মিশরের রাজনৈতিক মানচিত্রটা তখন অদ্ভুত, বুঝলে। দেশ চালানোর দায়িত্ব মিশরের গভর্নমেন্টের থাকলেও আর্কিয়োলজির দিকটা পুরোপুরি ছিল ব্রিটিশদের দখলে। কায়রো হোটেলের লবিতে তখন প্রতিদিন দেখা যেত ইউরোপীয় ধনকুবেরদের। সবার একটাই লক্ষ্য। একটা ভালো জায়গায় খুঁড়তে দেওয়ার পারমিশন জোগাড় করা, তার পরে সেখানে একজন ভালো আর্কিয়োলজিস্ট লাগিয়ে কাজ করানো। তারপরে সেখান থেকে যা সম্পদ উঠবে তা নিয়ে দেশে ফেরা। কতটুকু মিশরের গভৰ্নমেন্টের হাতে থাকবে সেটাও ডিপাৰ্টমেন্ট অফ অ্যান্টিকুইটিই ঠিক করে দেবে। এইভাবেই কতশত ঐশ্বর্য যে ইউরোপের কোণে কোণে ছড়িয়ে পড়েছে তার ইয়ত্তা নেই। এইসব মিলিওনিয়ারদের একজন ছিলেন জর্জ হার্বার্ট, যাঁকে ছাড়া তুতানখামেনের সমাধি খুঁজে বের করা সম্ভব ছিল না।’

‘ইনি আবার কে? আমরা তো...’

‘লর্ড কার্নারভনের নাম শুনেছ তো? জর্জ হার্বার্ট ছিলেন ইংল্যান্ডের কার্নারভন শহরের পঞ্চম আর্ল। সেখান থেকেই এমন নাম।

‘নামে লর্ড হলেও সেইসময় লর্ড কার্নারভনের অবস্থা খুব একটা ভালো কিছু নয়। বাজারে বিশাল দেনা। যেকোনো দিন নিজের জমিজায়গা বিক্রি করতে হতে পারে। এই দেনা শোধ করতে যে টাকা লাগবে সেটা আনার পথ কী? একমাত্র জুয়ো খেলেই রাতারাতি সেই টাকা জোগাড় করা সম্ভব। লর্ড কার্নারভন নিজের শেষ সম্বল দিয়ে সেই জুয়ো খেললেন মিশরের ওপরে।

‘কায়রো আসার পরেই কার্নারভনের সঙ্গে দেখা হয় কার্টারের। কার্টার কার্নারভনকে বোঝান যে ভ্যালি অফ দ্য কিংসে তিন হাজার বছরের পুরোনো এক রাজার ঐশ্বর্য লুকিয়ে আছে। সেটা একবার খুঁজে পেতে পারলে কার্নারভনের দেনা হেসে-খেলে শোধ করে দেওয়া যাবে। বলা বাহুল্য, কার্টার এখানে তুতানখামেনের সমাধির কথাই বলছিলেন।’

‘কিন্তু ভবেশদা, এখানে একটা খটকা থেকে গেল। একটু আগে আপনি বললেন যে ভ্যালি অফ দ্য কিংসে এতবার খোঁড়াখুঁড়ি হয়ে এত কবর আবিষ্কার হয় যে সবাই ভেবেই নিয়েছিল যে সেখানে আর কিছু নেই। তাহলে হাওয়ার্ড কার্টার এত শিয়োর হলেন কী করে?’

‘ঠিক শিয়োর না বুঝলে, তবে একটা বড়োসড়ো অনুমান উনি করতে পেরেছিলেন। ভ্যালি অফ দ্য কিংস থেকেই পাওয়া ছোটো ছোটো ক্লু ওঁকে বলে দিয়েছিল যে কাছেপিঠেই কোথাও তুতানখামেনের সমাধি লুকিয়ে থাকলেও থাকতে পারে। যেমন ধরো, একটা ভাঙা কাপে আর একটা ছোটো কাঠের বাক্সে ফারাওয়ের নাম পাওয়া গিয়েছিল। আবার ওই ভ্যালিতেই একটা ছোটো গর্তে পাওয়া গিয়েছিল তুতানখামেনকে মমি বানানোর জন্য ব্যবহৃত মালমশলা।

১৯২২ সােলর ভ্যালি অফ দ্য কিংস। হাওয়ার্ড কার্টার তখন খোঁড়াখুঁড়ি করছেন।

প্রায় সােড় তিন হাজার বছর আগে ভ্যালি অফ দ্য কিংস-এ তুতানখামেনের সমাধিযাত্রা

‘তা যেটা বলছিলাম, কার্নারভনকে রাজি করিয়ে হাওয়ার্ড কার্টার নিজেই ভ্যালি অফ দ্য কিংসের আর্কিয়োলজির কাজ অথোরাইজ করলেন। নিজের নামই দিলেন চিফ আর্কিয়োলজিস্ট হিসেবে। তারপরে কাজ হল শুরু।

‘কার্টার কাজ শুরু করেন ১৯১৪ সালে। কিন্তু গোটা ভ্যালি অফ দ্য কিংস তন্নতন্ন করে খুঁজে ফেলেও কিচ্ছু পাওয়া যাচ্ছিল না। শুধু পঞ্চম রামেসিসের একটা সমাধি খুঁজে পাওয়া গেল, সেটাও তেমন কিছু নয়। অন্যদিকে লর্ড কার্নারভনের ধৈর্য আর অর্থ দুইই ফুরিয়ে আসছিল। ১৯২২ ছিল কার্টারের জন্য শেষ সুযোগের বছর।

‘২৮ অক্টোবর, ১৯২২। হাওয়ার্ড কার্টার তখন আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছেন। অন্যদিকে এতবার খোঁড়াখুঁড়ি চালাবার জন্য বিস্তর ময়লা জমা হয়েছিল গোটা ভ্যালি জুড়ে। একটা বড়ো ঢিপি তৈরি হয়েছিল সদ্য-খুঁজে-পাওয়া ষষ্ঠ রামেসিসের কবরের বাইরে। সেইখানটাই আবার ভ্যালিতে ঢোকার রাস্তা। সামনেই শীতকাল আসছে। দলে দলে টুরিস্ট আসতে শুরু করবে। ওই ময়লার ঢিপি পরিষ্কার না করলে তাঁররা ভ্যালিতে ঢুকবেন কী করে?

‘লেবাররা যখন ময়লা পরিষ্কারের কাজ করছে তখন হাওয়ার্ড নিজের তাঁবুতে বসে একটা সিগারেট ধরিয়েছেন। সেটা অর্ধেক শেষ হয়েছে এমন সময় একজন শ্রমিক হাঁফাতে হাঁফাতে ওঁর তাঁবুতে এসে ঢুকল। ময়লা পরিষ্কার করার সময়ে বালির নীচে নাকি একটা মসৃণ পাথরের স্ল্যাব দেখা গেছে, দেখে মনে হচ্ছে একটা সিঁড়ির প্রথম ধাপ! নেমে গেছে ষষ্ঠ রামেসিসের সমাধির নীচের দিকে।

‘দিন সাতেক পরে যখন আরও বালি, নুড়ি, পাথর সরানো সম্ভব হল তখন কার্টার দেখলেন এটা সত্যি একটা সিঁড়ি। দশ ফুট মতো নীচে নেমে গেছে। নভেম্বরের ৫ তারিখে কার্টার সেই সিঁড়ির শেষ ধাপে গিয়ে পৌঁছোলেন। ওঁর সামনে তখন একটা পাথরের দরজা! দরজার গায়ে লাগানো সিলে একটা কার্তুজ আঁকা। তাতে গোটা গোটা করে হায়রোগ্লিফে লেখা আছে আমেন-তুথ-আঁখ। মানে, এইটাই তুতানখামেনের সমাধি!!’

‘কার্টার দরজাটা খুললেন তখন?! কী পেলেন!’

‘না ভায়া, দরজা খোলার বদলে কার্টার ওঁর শ্রমিকদের নির্দেশ দিলেন সিঁড়িটা আবার নুড়িপাথর দিয়ে বুজিয়ে দিতে।’

‘অ্যাঁ, এ কীরকম উদ্ভট চিন্তাভাবনা।’

‘উদ্ভট চিন্তা নয়। কার্টারের কৃতজ্ঞতা জানাবার ভাষা এটা। লর্ড কার্নারভনের সাহায্য ছাড়া তো এই সমাধি কার্টার আবিষ্কার করতে পারতেন না। তাই উনি চেয়েছিলেন কার্নারভনই যেন সেই সমাধিতে প্রথম পা রাখেন। রাতারাতি একটা ছোটো নৌকোয় চড়ে কার্টার চলে এলেন লাক্সরে। সেখানকার টেলিগ্রাম অফিস থেকে কার্নারভনকে একটা মেসেজ পাঠালেন। তার জবাবও এল জলদি।

‘পরের তিনটে সপ্তাহ কার্টারের কাটল অপেক্ষা করতে করতে। টেনশনে রাতের ঘুম চলে গেছে। যদিও মোটা টাকার বিনিময়ে শ্রমিকদের কাছ থেকে এই আশ্বাস আদায় করা গেছে যে তারা এই টুম্বের কথা কাউকে বলবে না, তবুও যদি কেউ একবার জেনে ফেলে! মরুভূমির মধ্যে ডাকাতদের আক্রমণের সামনে কার্টার কিচ্ছু করতে পারবেন না। অবশেষে নভেম্বরের ২৩ তারিখে কার্নারভন কায়রোতে এসে পৌঁছোলেন। সঙ্গে ওঁর একুশ বছরের মেয়ে লেডি এভিলিন। সেই দিনটা হোটেলে রেস্ট নিয়ে ২৪ তারিখের ভোরবেলায় চলে এলেন ভ্যালি অফ দ্য কিংসে। ততক্ষণে কার্টারের দলবল আবার সেই সিঁড়ির মধ্যের বালি সরানো শুরু করে দিয়েছে। আবার একটা গোটা দিন লাগল সেই পাথরের দরজাটা অবদি পৌঁছোতে।

তুতানখামেনের সমাধির প্রবেশপথ

‘২৫ নভেম্বর। কার্নারভন দাঁড়িয়ে সেই দরজার সামনে। ওঁর দিকে তাক করে থাকা ক্যামেরা অপেক্ষা করছে ঐতিহাসিক মুহূর্তটাকে ধরে রাখার জন্য। খোলা হল সেই দরজা আর সঙ্গেসঙ্গেই দেখা গেল...’

‘তুতানখামেনের ঐশ্বর্য!’

‘ধুস, দেখা গেল নীচে নেমে যাওয়ার আরেকটা সিঁড়ি। সেটা গিয়ে শেষ হয়েছে আরেকটা পাথরের দরজাতে। তার গায়েও তুতানখামেনের নাম লেখা সিলমোহর।

তুতানখামেনের সমাধির সামনে হাওয়ার্ড কার্টার ও লর্ড কার্নারভন

পাথরের দরজার গায়ে লাগানো সিলে হায়রোগ্লিফের লেখা

‘২৬ নভেম্বরের সকাল বেলায় আবার সবাই মিলে আগের দিনের খুঁজে পাওয়া দরজার সামনে উপস্থিত হলেন। এবারে কার্টার লোহার রড দিয়ে সেই দরজার গায়ে একটা গর্ত করলেন। তারপরে একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে ভিতরে উঁকি

মারলেন।

অনেকদিনের জমে থাকা বাতাসে মোমবাতির শিখা প্রথমে কেঁপে উঠে শান্ত হল। ভেতরের অন্ধকারের সঙ্গে কার্টারের চোখের ধাতস্থ হতে সময় লাগল একটু। এবারে ওঁর চোখ দুটো খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল! পিছন থেকে লর্ড কার্নারভন ফিসফিস করে জানতে চাইলেন

‘ ‘‘কিছু দেখতে পাচ্ছ!?’’

‘উত্তরে কার্টার বলল,

‘‘ইয়েস, ওয়ান্ডারফুল থিংস!!’’

‘কার্টারের চোখের সামনে তখন সোনা চকচক করছে! আর মোমবাতির আলোয় যে ছায়া তৈরি হয়েছে তাতে দেখা যাচ্ছে একটা অদ্ভুত জন্তুকে!

‘পাথরের দরজা পুরোপুরি সরিয়ে ফেলার পরে ব্যাপারটা ভালো করে বোঝা গেল। একটা ছোটো ঘর। তাতে ঠেসে বোঝাই করা আসবাবপত্র। গোটা তিনেক খাট, কাঠের তৈরি, সোনায় মোড়ানো। খাটগুলোর পায়ার জায়গায় জন্তুর মুখ বানানো। তার ছায়াই কার্টার দেখতে পেয়েছিলেন। সেই ঘরের পশ্চিমের দেওয়ালে পাওয়া গেল আরেকটা ছোটো ঘর। দুটো ঘর মিলিয়ে খাটগুলো ছাড়াও আর যা যা ছিল সেগুলো হল একটা রথ, বাক্স বোঝাই জামাকাপড়, পারফিউমের বোতল। আর পাওয়া গিয়েছিল কিছু শুকিয়ে যাওয়া ফল, রুটি আর মদের পাত্র।’

সেই মুহূর্ত !!

‘মানে, মৃত রাজার যাতে পরবর্তী জগতে কোনো প্রবলেম না হয় তার সব রকমের ব্যবস্থাই। এটা আগেও বলেছিলেন তো।’

‘হ্যাঁ, এরকমটা সব সমাধিতেই থাকত।’

‘কিন্তু, সেই আসল জিনিসটা কোথায়?! তুতানখামেনের মমি!’

তুতানখামেনের কবরের ঐশ্বর্য (দ্রষ্টব্য রঙিন ছবি পৃ. ১৭)

‘সবুর করো, বলছি। কার্টার এত বড়ো একটা ঐশ্বর্য পেয়েও নিজেকে আশ্চর্যরকম শান্ত রেখেছিলেন। গোটা মিশরের আর্কিয়োলজির ইতিহাসে এমন কিছু আর হয়নি। সেটা উনি খুব ভালোভাবেই জানতেন। তাই সমাধির প্রতিটা জিনিসকে যত্ন করে প্রিজার্ভ করার দিকে আগে মন দিলেন। ইউরোপ আর আমেরিকার সেরা এক্সপার্টদের ডেকে আনা হল। তাদের কাজ করার জায়গা হল আশেপাশের সমাধিগুলো। আর্কিয়োলজিকাল ফোটোগ্রাফার হ্যারি বার্টন সেই সময়ে ওখানেই ছিলেন, নিউইয়র্কের মেট্রোপলিটন মিউজিয়ামের হয়ে কাজ করতে। তাঁরকে দলে নেওয়া হল। হ্যারির কাজ ছিল সমাধির প্রতিটা জিনিসের গায়ে হাত দেওয়ার আগে তার ছবি আগে তুলে রাখা। ছবিগুলো ডেভেলপ করার জন্য কে ভি ৫৫ বেছে নেওয়া হল, যেটা ছিল তুতানখামেনের ভাইয়ের সমাধি। আরও কয়েকটা টুম্বের মধ্যে তৈরি করা হল ল্যাবরেটরি আর ওয়ার্কশপ। এগুলো করতেই লেগে গেল দু-মাস।

‘বাইরের জগতে ততদিনে তুতানখামেনের সমাধি আর তাঁরর গুপ্তধনের কথা ছড়িয়ে গেছে। ভ্যালি অফ দ্য কিংসে তখন গিজগিজ করছে রিপোর্টার আর টুরিস্ট। সবাই রোজ ভোর বেলায় টিফিন বক্সে খাবার আর বোতলে জল নিয়ে চলে আসে, এসে জটলা করে সমাধির উলটোদিকের উঁচু পাঁচিলে। সারাদিন ধরে তারা হাঁ করে টুম্বের দরজার দিকে তাকিয়ে বসে থাকে। এই যদি একটা নতুন আবিষ্কার হওয়া জিনিস দেখা যায়! মাঝে মাঝে কার্টারের মনে হত এত লোকের চাপে ওই পাঁচিল না ভেঙে পড়ে। তাহলে আরেকটা নতুন সমাধি তৈরি হয়ে যাবে!

ভ্যালি অফ দ্য কিংস-এ তখন গিজগিজ করছে রিপোর্টার আর টুরিস্ট

দরজার দু-পাশে দাঁড় করানো মূর্তি

‘সেই যে ছোটো ঘরটার মধ্যে খাটগুলো পাওয়া গিয়েছিল তার উত্তরদিকের দেওয়ালে ছিল আরেকটা দরজা। দরজার দু-পাশে দাঁড় করানো ছিল দুটো প্রমাণ সাইজের তুতানখামেনের মূর্তি। যেন ওরা অতন্দ্র প্রহরীর মতো কিছু পাহারা দিচ্ছে। কার্টার বুঝতে পেরেছিলেন ওর পিছনেই আছে তুতানখামেনের সারকোফেগাস। একদিন রাতের অন্ধকারে কাউকে কিছু না বলে সেই দেওয়ালের গায়ে গর্ত করে কার্টার, কার্নারভন আর লেডি এভিলিন ঢোকেন। সামনে রাখা বিশাল সোনায় মোড়ানো একটা বাক্স দেখে ফিরে আসেন।

‘তিনমূর্তির এই রঁদেভুর কথা যদিও আর কাউকে জানানো হয়নি। ১৭ নভেম্বরে ঘটা করে বেশ কিছু আর্কিয়োলজিস্ট আর গভর্নমেন্টের অফিশিয়ালদের সামনে উত্তরের দরজাটা খোলেন কার্টার। দরজা খুলতেই দেখা গেল সেই সোনায় মোড়ানো বাক্সটাকে। তার সামনেই ছিল একটা দরজা। সেই দরজা খুলে বেরোল আরেকটা বাক্স। তার মধ্যে আরেকটা বাক্স।

‘এত অবধি কাজ এগোবার পরে কার্টারের মনে হল এই ক-মাসে অক্লান্ত পরিশ্রমের পরে একটু বিশ্রাম নেওয়ার দরকার। অন্তত দিন দশেকের জন্য। তারপরে না হয় আবার পুরোনো উদ্যমের সঙ্গে কাজ শুরু করা যাবে।

‘টুম্বের দরজায় লোহার গেট বসিয়ে বাইরে আঁটোসাটো গার্ডের ব্যবস্থা করা হল। কার্টার চলে এলেন লাক্সরের হোটেলে। লর্ড কার্নারভন মেয়ের সঙ্গে বেরিয়ে পড়লেন আসওয়ানের উদ্দেশে। নীল নদের পথে। নিছকই টুরিস্ট হিসেবে।

তুতানখামেনের সারকোফেগাসকে ঘিরে একাধিক সোনায় মোড়ানো বাক্স

বর্তমানে কায়রো মিউজিয়ামে রাখা তুতানখামেনের সোনায় মোড়ানো কাঠের বাক্স

‘নৌকোতেই কার্নারভনের গলায় একদিন একটা মশা কামড়াল। খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু পরের দিন শেভ করার সময় সেই জায়গাটা আবার কেটে ফেললেন কার্নারভন। সঙ্গেসঙ্গে সেখানে আয়োডিন লাগালেও ঘা সারল না। রক্তে ইনফেকশন ছড়িয়ে পড়ল। তার সঙ্গে হল নিউমোনিয়া। ওঁকে জলদি কায়রোতে চিকিৎসার জন্য নিয়ে আসা হলেও বাঁচানো গেল না। ৫ এপ্রিল, ১৯২৩-এ রাত ১.৪৫-এ মারা গেলেন জর্জ হার্বার্ট ওরফে লর্ড কার্নারভন। ঠিক সেই সময়েই নাকি ইংল্যান্ডে কার্নারভনের পোষা কুকুরটিও মারা যায়। এই ঘটনার ক-দিন আগে কার্টারের পোষা ক্যানারি পাখিরও নাকি একই পরিণতি হয় বিষাক্ত কোবরার ছোবলে।

হাওয়ার্ড কার্টারের তত্ত্বাবধানে তুতানখামেনের সমাধি থেকে ঐশ্বর্য বের করে আনা হচ্ছে

‘কয়েক সপ্তাহ পরে ইংল্যান্ডের বিকন হিলে যখন কার্নারভনকে কবর দেওয়া হচ্ছে তখন আকাশে খুব নীচু দিয়ে উড়ছিল মিডিয়ার ভাড়া করা এরোপ্লেন। লক্ষ্য একটাই, লর্ডের শেষ মুহূর্তের ছবি তুলে রাখা।

‘পরের দিনই সবকটা নিউজপেপারের প্রথম পাতার খবর ছিল একই। ফারাওয়ের অভিশাপেই নাকি কার্নারভনের মৃত্যু হয়েছে! হাওয়ার্ড কার্টার নিজে বার বার বলার চেষ্টা করলেন, যে তুতানখামেনের কবরে কোনো বিষ, কোনো অভিশাপ ছিল না। তাও কেউ ওঁর কথার পাত্তাই দেয়নি সেইসময়ে।’

কার্নারভনের মৃত্যু নিয়ে সংবাদপত্রের খবর

‘কিন্তু ভবেশদা, আমি শুনেছিলাম তুতানখামেনের কবরের গায়ে নাকি লেখা ছিল, যে এই সমাধির ভিতরে ঢুকবে, ফারাওয়ের অভিশাপ তাকেই গ্রাস করবে।’

‘ধুর, এরকম কিচ্ছু ছিল না আদৌ, গোটাটাই গুজব।’

‘কিন্তু শুধু তো কার্নারভনই নন, কার্টারের টিমের আরও দু-জন নাকি পর পর মারা যান ওই সময়েই।’

‘দেখো, সেটাও কোইন্সিডেন্স ছাড়া আর কিছুই নয়। তুতানখামেনের টুম্ব খুঁজে বের করার কাজে জড়িত ছিলেন সব মিলিয়ে ছািব্বশ জন। তাঁরদের মধ্যে মাত্র ছ-জন পরের দশ বছরে মারা যান। স্বয়ং হাওয়ার্ড কার্টার বহাল তবিয়তে বেঁচেছিলেন আরও ষোলো বছর। আর লেডি এভিলিন মারা যান ১৯৮০তে। তুতানখামেনের অভিশাপ একটা মিথ ছাড়া আর কিচ্ছু না। সেইসময় পপুলার কালচারে অবশ্য এর বেশ ভালো প্রভাব পড়েছিল। মমির অভিশাপ নিয়ে বেশ কিছু সিনেমা তৈরি হয় সেইসময়। অনেক নীচু মানের থ্রিলার বইও বেরোয় বাজারে।’

পিজি এবারে বলল,

‘হুম, আমিও ভেবেছিলাম এটা গুজবই। এই স্পন্দনের মতো ভূতে-ভয়-পাওয়া কয়েকটা লোকজনই নির্ঘাত এটা ছড়িয়েছিল। আপনি কার্টারের গল্পে ফিরে আসুন ভবেশদা। তুতানখামেনের মমির কী হল?’

অন্য সময় হলে পিজি আমার হাতে মার খেত। কিন্তু তখন ভবেশদার ইকুইলিব্রিয়ামটা নষ্ট করার কোনো ইচ্ছা ছিল না আমার। তাই চুপ রইলাম। ভবেশদা ঢকঢক করে আধ বোতল জল খেয়ে আবার শুরু করলেন,

‘১৯২৪-এর ফেব্রুয়ারি মাসে তুতানখামেনের সমাধিতে আবার কাজ শুরু করেন কার্টারবাবু। শেষ বাক্সটা খোলার পরেই দেখা যায় হলুদ কোয়ার্টজাইট পাথরের তৈরি একটা সারকোফেগাস। সেটা খোলার পরেই দেখা গেল কাঠের তৈরি কফিন। ফারাওয়েরই অবয়বে তৈরি। গলায় শুকনো ফুলের মালা। এরকম আরও দুটো কফিনের পরে পাওয়া গেল একদম সোনা দিয়ে তৈরি করা সেই কফিন, যার মধ্যে শোয়ানো আছে তুতানখামেনকে। ফারাওয়ের মুখের ওপরে বসানো সোনার তৈরি মুখোশ, যেটা কাঁধ অবদি নেমে এসেছে। তুতানখামেন বলতে এখন এই মুখোশটার ছবিই সবাই জানে। ফারাওয়ের কোমরের কাছে রাখা ছিল একটা সোনার তৈরি ছুরি। সারা শরীরে ছিল ১৪৩ পিস অ্যামুলেট, যাতে রাজা ঠিকঠাক অন্য জগতে যেতে পারে।

তুতানখামেনের মমি (উপরে),

তাঁর অবয়বে তৈরি একাধিক কফিন (পাশে)

কায়রো মিউজিয়ামে রাখা তুতানখামেনের চেয়ার, ছুির ও অ্যামুলেট (তাবিজ)

‘ফারাওয়ের মমির অবস্থা কিন্তু খুব একটা ভালো ছিল না, সমাধিস্থ করার সময় পুরোহিতরা মমির গায়ে যে রেজিনের প্রলেপ লাগিয়েছিল সেটা তিন হাজার বছরে অক্সিডাইজড হয়ে কালো চ্যাটচ্যাটে একটা পদার্থে পরিণত হয়। তুতানখামেনের মমিকে সাবধানে কফিন থেকে বের করতেই কালঘাম ছুটে গিয়েছিল সবার। এর মাঝে কার্টার নিজেও একটা ভুল করে বসেন। ফারাওয়ের মুখোশটা মমির গায়ে একদম চেপে বসেছিল। ছুরির ডগা গরম করে সেটা দিয়ে মুখোশটাকে আলাদা করেন কার্টার। তাতে তুতানখামেনের মুখের অনেক ক্ষতি হয়। এখন সেই মমি রাখা আছে তুতানখামেনের সেই সমাধিতেই। ভ্যালি অফ দ্য কিংসে, কে ভি ৬২।’

‘ভবেশদা, ছোটোবেলায় ‘‘আনন্দমেলা’’তে একটা আর্টিকল পড়েছিলাম, যে, তুতানখামেনকে নাকি খুন করা হয়, এটা কি সত্যি?’

‘সেটা বলা খুব মুশকিল ভায়া, তুতানখামেনের মৃত্যুটা বেশ রহস্যময়, বুঝলে। খুন না অ্যাক্সিডেন্ট, সেটা কেউ ভালো করে বুঝতে পারেনি এখনও।’

‘অ্যাক্সিডেন্ট? বুঝল কেমন করে?’

‘তুতানখামেনের মতো সেলিব্রেটেড ফারাও তো আর দুটো নেই। তাই ওর মমির ওপরেও বিস্তর পরীক্ষানিরীক্ষা চলেছে।’

পিজি যথারীতি গুগল খুলে বসে গিয়েছিল, ও এবারে বলল,

‘হ্যাঁ, এই তো দেখছি তুতানখামেনের মমির অনেকগুলো এক্স-রে, সিটি স্ক্যান হয়েছিল। বেশ কয়েকটা জন্মগত রোগও ছিল দেখছি।’

ভবেশদা বললেন, ‘এটা তোমাদের ডাক্তারির ব্যাপার, আমি ভালো বুঝব না, কী রোগ ছিল বলো তো?’

বর্তমানে ভ্যালি অফ কিংস, কে. ভি ৬২-তে রাখা তুতানখামেনের মমি

পিজি জ্ঞান দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে, আর ছাড়ে?

‘প্রথমত, তুতানখামেনের ছিল ক্লিপেল-ফেইল সিনড্রোম। ওর ঘাড়ের যে শিরদাঁড়ার হাড়, যাকে আমরা সারভাইকাল ভার্টিব্রা বলি, তার সবকটাই একটা আরেকটার সঙ্গে জোড়া লাগানো ছিল। মানে রাজা ঘাড় ঘোরাতে পারত না। তার সঙ্গে আবার সামান্য স্কোলিয়োটিক মানে কুঁজও ছিল। পায়ের পাতার হাড়ে আবার ক্ষয়ের চিহ্ন দেখা গেছে। একে বলে কোহলার সিনড্রোম। মানে ফারাও ভালোভাবে হাঁটতেও পারত না।’

‘এটা ঠিক বলেছ পিজি, তুতানখামেনের সমাধিতে বেশ কয়েকটা ওয়াকিং স্টিক পাওয়া যায়।’

‘হুম, ফারাওয়ের ডিএনএ-তে নাকি আবার বেশ কয়েকটা ম্যালেরিয়ার প্যারাসাইটের ডিএনএ-ও পাওয়া যায়। আপনি তো বলেইছিলেন ম্যালেরিয়াতে ভুগতেন তুতানখামেন। এরকমটা হলে তো এমনিতেই যেকোনো কারো ইমিউনিটি খুব উইক হয়ে যাবে।’

তুতানখামেনের থ্রি-ডি গ্রাফিক

এবারে আমি বললাম, ‘কিন্তু ভবেশদা, আপনি যে বললেন অ্যাক্সিডেন্টে মৃত্যু?’

‘হ্যাঁ ভাই, সেটাও হতে পারে বলে অনেকেরই মত। ২০১৩ সালে একটা ব্রিটিশ টিম ফারাওয়ের এক্স-রে আর সিটি স্ক্যানগুলো আবার ভালো করে পরীক্ষা করে। তাতে দেখা যায় যে ওর বাঁ-পায়ের থাইয়ের হাড় ভাঙা।’

‘ফিমার?’

‘হ্যাঁ, তোমরা ওই হাড়টাকে তো তাই বল। এই ভাঙার ধরন দেখে এক্সপার্টরা প্রেডিক্ট করেছে যে খুব সম্ভবত রথ চালাবার সময় অ্যাক্সিডেন্ট হয়। তাতেই ফারাওয়ের পায়ের হাড় ভাঙে। সেখান থেকেই মৃত্যু। তবে এর এগেইনস্টেও যুক্তি আছে বুঝলে, যে ফারাও ঠিক করে হাঁটতেই পারত না সে কীভাবে রথ চালাবে? সুতরাং সব মিলিয়ে তুতানখামেনের মারা যাওয়ার কারণ এখনও একটা বড়ো মিস্ট্রি। আরেকটা ইন্টারেস্টিং ফ্যাক্ট বলি তোমাদের। তুতানখামেনের সমাধিতে আরও দুটো মমি ছিল, এটা জানো?’

‘অ্যাঁ, বলেন কী?! এরকম তো আগে কখনো শুনিনি!’

‘হুম, ওই কে ভি ৬২-র সমাধিতেই একটা ছোটো বাক্স পাওয়া যায়। সেটা খোলার পরে দেখা যায় তাতে রাখা আছে ছোট্ট ছোট্ট দুটো কফিন। তার মধ্যে ছিল তিরিশ সেন্টিমিটার লম্বা দুটো মমি। তুতানখামেনের স্ত্রী দু-জন মৃত সন্তান প্রসব করেন বলেছিলাম না! এগুলো তাদেরই। ওরা বাবার কাছেই শুয়ে ছিল তিন হাজার বছর ধরে।’

‘আচ্ছা ভবেশদা, তুতানখামেনের স্ত্রী সেই আনখেসেনামেনের কী হল?’

‘ফারাও মারা যাওয়ার পরেই আনখেসেনামেন একটা বুদ্ধি বের করেন। মিশরের পাশে আনাতোলিয়াতে ছিল হিটাইট প্রজাতির রাজত্ব, তাদের রাজা একটা চিঠি পান। রাজার এক সন্তানকে নাকি রানি আনখেসেনামেন বিয়ে করতে চান। এমন সুযোগ কেউ ছাড়ে নাকি! আনখেসেনামেনকে বিয়ে করা মানেই তো মিশরের ফারাও বনে যাওয়া। রাজপুত্র জিনাজা তাই মিশরের উদ্দেশে রওনা দেয়। কিন্তু সে মিশরে পৌঁছোতে পারেনি। মরুভূমির মধ্যেই কোথাও একটা তাকে খুন করা হয়। খুব সম্ভবত তুতানখামেনের মন্ত্রী আই-ই খুনটা করিয়েছিলেন। আই ফারাও হয়ে বসার পরে আনখেসেনামেনও মিশরের ইতিহাস থেকে হারিয়ে যান। ওর মমি আজও কেউ খুঁজে পায়নি।’

সেইদিন আড্ডা যখন শেষ হল তখন রাত বারোটা। ভবেশদা আমাদের রুমেই থেকে গিয়েছিলেন। কিন্তু যখন শুতে যাব ঠিক তার আগেই পিজি আমাকে হোস্টেলের করিডোরে বের করে নিয়ে এসে একটা অদ্ভুত কথা বলল,

‘ভবেশদা আমাদের মিথ্যে কথা বলেছেন, বুঝলি!’

‘মিথ্যে?’

‘হ্যাঁ, উনি বললেন না যে ও এই পনেরো দিন বাড়িতে ছিলেন, একদম ডাহা মিথ্যে বলেছে।’

‘তুই জানলি কী করে?’

‘আমি তোর মতো দুমদাম কাউকে বিশ্বাস করে নিই না। আর সবসময় ফাজলামি করি বলে এটা ভাবিস না যে প্রদীপ্ত ঘোষ বোকা।’

‘না না, সেটা কি আমি বলেছি নাকি? কিন্তু তুই ভাবছিস কী করে যে ভবেশদা মিথ্যে বলেছিলেন?’

‘আড্ডার মাঝে মনে আছে তুই একবার উঠে গেলি মেসে এক্সট্রা মিলের অর্ডার দিতে? ভবেশদাও সেইসময় একবার বাথরুমে গিয়েছিলেন। আমি সেই ফাঁকে ওঁর ওই নীল রঙের ব্যাগটা খুলে চেক করেছিলাম।’

‘বলিস কী! এটা কিন্তু ঠিক করিসনি তুই।’

‘আরে ধুর, ঠিক ভুলের নিকুচি করেছে। ওঁর ওই পনেরোদিন ধরে বাড়িতে বসে বই পড়াটাকে আমি মেনে নিতে পারিনি। তার ওপরে সঙ্গে ওরকম ঢাউস ব্যাগ নিয়ে কী করছিলেন? তাই খুলে দেখলাম।’

‘কী পেলি!’

পিজি এবারে খপ করে আমার হাতটা চেপে ধরল,

‘ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইটের টিকিট, ভবেশদা এই ক-দিন ইন্ডিয়াতে ছিলেন না, স্পন্দন!’

‘তাহলে কোথায় ছিলেন?’

‘ইজিপ্ট!’

দেইর-এল-বাহরির গুপ্তধন

একটা মানুষকে এই ক-মাস ধরে চিনি, আমরা দু-জনেই অনেকটা সময় কাটিয়েছি তাঁরর সঙ্গে। শুনেছি দারুণ দারুণ গল্প। ইজিপ্ট নিয়ে আমাদের কৌতূহলটাকে অনেক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছেন ভবেশদা। কিন্তু এত বড়ো একটা কিছু উনি চেপে যাবেন? কেন? কী জন্য ওঁকে যেতে হল মিশরে?

প্রশ্ন আমাদের দু-জনের মধ্যেই জমা হচ্ছিল। কিন্তু উত্তর কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছিলাম না। উত্তরগুলো ভবেশদাকেই দিতে হত। সেই সুযোগটাও এসে গেল।

ভবেশদা নিজেই ওঁর বাড়িতে আমাদের নেমন্তন্ন করলেন। আমি একটু হেজিটেট করছিলাম, কিন্তু পিজি বলল,

‘লোকটা তো এখনও অবদি আমাদের কোনো ক্ষতি করেনি। একটা রিস্ক নিয়েই দেখি না?’

ভবেশদার বাড়ি সোনারপুরে। আনন্দপল্লি নামের একটা পাড়ায়। শিয়ালদা থেকে প্রথমে ট্রেন, তারপরে স্টেশনে নেমে রিকশাতে মিনিট পনেরো লাগল। বাড়িটা একটা সরু গলির মধ্যে। খুঁজে পেতে বেশ বেগ পেতে হত যদি না ভবেশদা গলির মোড়ে আমাদের জন্য অপেক্ষা করতেন।

‘একটু দেখে ঢোকো। স্পন্দন আবার যা লম্বা, মাথা না ঠুকে যায় ওর।’

ভবেশদার বাড়ির ঢোকার দরজাটা সত্যি একটু বেশিই নীচু। একতলা বাড়ি, দেখলেই বোঝা যায় শেষ তিরিশ বছরে এর গায়ে কেউ হাত দেয়নি। দেওয়ালের নীল রংটা কালচে হয়ে এসেছে। জানলার গ্রিলগুলোও জং ধরা। বাড়ির ভেতরের অবস্থাও একই রকমের। ভবেশদা অকৃতদার। একা মানুষ থাকেন এই বাড়িতে। তাই জিনিসপত্র একটু অগোছালো। একটা ছোটো বসার ঘর, একটা ডাইনিং স্পেস, তার গায়ে লাগানো একটা শোয়ার ঘর আর কিচেন। বাথরুমটা বেডরুমের সঙ্গে অ্যাটাচড। বসার ঘরে পেতে রাখা সোফাটায় আমি আর পিজি বসলাম। বসতে বসতেই একটা জিনিস খেয়াল করে অবাক হলাম একটু। ঘরের মলিন দেওয়াল, অতি সাধারণ আসবাবপত্রের মধ্যে দেওয়ালের সঙ্গে সেট করা শোকেসটা একদম মিসফিট। তার দুটো তাকে থরে থরে বই সাজানো। কী বিষয় নেই সেখানে! মিশর তো আছেই, আরও আছে মিডিভাল সময়ের ইউরোপের ইতিহাস, অর্থনীতি, ফিলোজফি, ফাইন আর্টসের ওপরে লেখা একগাদা বই। তাদের মধ্যে আবার ইউভাল হারারির লেখা স্যাপিয়েনস বইটাও নজরে পড়ল। সত্যি লোকটা একটা বইপোকা বটে।

পিজি এই সময়েই কনুই দিয়ে আমাকে সামান্য নাড়া দিল। ওর দিকে তাকাতে চোখ দিয়ে ইশারা করল শোকেসের একদম নীচের তাকের দিকে। সেখানে রাখা আছে অনেকগুলো শোপিস। বেশির ভাগই মিশরীয়। আনুবিস, হোরাস, স্ফিংসের মূর্তি, স্কারাব বিটলের অ্যামুলেট, কাঠের তৈরি আঁখ আরও কত কী। মূর্তিগুলো যেভাবে চকচক করছিল, ইচ্ছা করছিল হাতে নিয়ে দেখতে। কিন্তু সে-লোভ সামলিয়ে চুপ করে বসলাম।

‘এই নাও আমপোড়ার শরবত। নিজেই বানালাম, খেয়ে বলো দেখি কেমন হয়েছে।’

পিজি এবারে গ্লাসটা হাতে নিয়ে সন্দেহের চোখে একঝলক দেখল সবুজ শরবতটার দিকে। তারপরে গ্লাসটা পাশের টেবিলে রেখে ভবেশদাকে বলল,

‘হ্যাঁ, খাচ্ছি। তার আগে আমার একটা কথার উত্তর দিন তো দেখি।’

আমাদের সোফার উলটোদিকের চেয়ারে বসতে বসতে ভবেশদা বললেন,

‘জানি, জিজ্ঞাসা করবে এই সময়ে কাঁচা আম কোথা থেকে পেলাম, তাই তো? আরে বাজারে এখন পাকা আম চলে এলেও আজকে একটা দোকানদারের কাছে...’

‘না, সেটা নয়।’

‘তাহলে কী?’

‘আমার হাতে-থাকা গ্লাসটার ওপরে চাপটা একটু বাড়ল। পিজি কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বলল,

‘আপনি ইজিপ্টে কী করতে গিয়েছিলেন?’

কথাটা শুনেই ভবেশদা যেন চমকে গেলেন একটু। তারপরে সামান্য হেসে বললেন, ‘বুঝেছি, আগের দিন আমার ব্যাগটা চেক করেছিলে মনে হয়।’

‘হুঁ, সরি খুব ভুল করেছিলাম, কিন্তু আপনিও তো এত বড়ো একটা কিছু আমাদের থেকে বেমালুম লুকিয়ে গেছিলেন।’

‘আমি ইজিপ্টে গিয়েছিলাম এটা যখন জেনেই গেছ তখন আরেকটা কথাও বলি তোমাদেরকে। কয়েক মাস আগে ধর্মতলার এসবিআই-এর এনআরআই ব্রাঞ্চে গেছিলাম তোমাদের সঙ্গে, মনে আছে?’

‘হ্যাঁ, আছে তো।’

‘সেদিন আমার কোনো ভাইয়ের কাজ করতে ওখানে যাইনি। আমার সেরকম কোনো ভাইই নেই। গিয়েছিলাম নিজের কাজে। একটা ফরেন ট্রানজাকশনের দরকার ছিল।’

পিজি এবারে টক করে একবার আমার দিকে তাকাল। মুখে কিছু না বললেও চোখ দুটো তখন বলছে, দেখেছিস তো, সেদিনও আমার সন্দেহটা ঠিক ছিল!

আমরা দু-জনেই যখন হতবাক হয়ে বসে আছি তখন ভবেশদা আমাদের দিকে একটু ঝুঁকে এসে বললেন,

‘আমি জানি, তোমাদের মনে অনেক প্রশ্ন জমে আছে। উত্তর দিতে পারি। কিন্তু একটা কথা বলো তার আগে, তোমাদের ওপরে কি আমি আস্থা রাখতে পারি? যা বলব তা প্লিজ নিজেদের কাছেই রেখে দিতে পারবে?’

ভবেশ সামন্ত কলকাতা ইউনিভার্সিটি থেকে ইতিহাসে অনার্স নিয়ে বিএ করে ১৯৮৯তে আর্কিয়োলজিতে পোস্টগ্র্যাজুয়েশন করেন বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটি থেকে। তারপরে বছর তিনেক আর্কিয়োলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়াতে কাজ করে পাড়ি জমান ইজিপ্টে। সেখানে ছিলেন টানা পনেরো বছর। ২০০৭ সালে পাকাপাকিভাবে ফিরে আসেন দেশে।

‘কিন্তু, দেশে ফিরে কলেজ স্ট্রিটে বইয়ের গুমটি দিলেন? এটা তো মিলল না।’

ভবেশদা এবারে স্বরটা আরও একটু নীচু করে বললেন,

‘এত কিছু যখন বললামই তখন আরও একটা কথা বলি তোমাদের। মিশরে থাকাকালীন আমি যা রোজগার করেছি তাতে আমার এ জীবনে আর অর্থের অভাব হবে না। কিন্তু সেই টাকার প্রতিফলন যদি আমি রোজকার জীবনে দেখাতাম তাহলে আমার প্রাণ সংশয় হত। কলকাতায় ফিরে এসে নিজেকে একটা লো প্রোফাইলে রাখতেই হত। তাই কলেজ স্ট্রিটে বইয়ের দোকানটা নেওয়া। রোজ ঘণ্টা ছয়েক ওখানে কাটিয়ে চলে আসি।

‘কিন্তু, আপনাকে কে মারতে চাইবে?!’

‘তেমন লোকদের অভাব নেই এই দেশে, স্পন্দন ভাই। এই শহরেও এমন অনেকে আছে। যেসব আর্টিফ্যাক্ট নিয়ে আমার কাজ ছিল তাদের এক একটার মূল্য কয়েক কোটি টাকা। দেশে ফেরার পরেও সেই কাজ চলছে। তবে ইললিগালি আমি কিছু করি না এটুকু তোমাদের বলতে পারি। এদেশের অনেক প্রাইভেট কালেক্টর চেনেন আমাকে। তাঁররাই আসেন কোনো আর্টিফ্যাক্ট জেনুইন না ফেক সেটা যাচাই করাবার জন্য। ওই বইয়ের দোকানের আড়ালে এটাই আমার পেশা বলতে পারো। আজকেও এমন একজনের আসার কথা আছে। বিকেলের দিকে আসবে সে।’

‘তাহলে হঠাৎ ইজিপ্ট গেলেন কেন? এমনটা কি প্রায়ই যান নাকি?’

‘না ভাই, এগারো বছর আগে ফিরে আসার পরে ভাবিনি আবার কখনো যেতে হবে। কিন্তু হল তাও।’

‘কেন?’

‘সেটা আমি এখনই তোমাদেরকে বলতে পারব না। কিন্তু এটুকু বলতে পারি আমার থেকে তোমাদের কোনো ক্ষতি হবে না। আমার তিন কুলে কেউ জীবিত নেই। বন্ধুবান্ধবদের সংখ্যাও শূন্য। কিন্তু তোমাদের সঙ্গে মিশতে মিশতে একটা ভালোলাগা তৈরি হয়ে গেছে কখন। সেখান থেকেই হয়তো বিশ্বাস জন্ম নিয়েছে। আজকে সেই বিশ্বাসের বশেই এতগুলো কথা বললাম তোমাদের।’

এই কথাগুলো বলতে বলতেই ভবেশদা আবেগের বশে আমাদের দু-জনের হাত ধরে ফেলেছিলেন। যে লোকটা জ্ঞানের পাহাড়, পেটুক, হেঁয়ালি করাতে মাস্টার তাকে এরকমভাবে কখনো দেখব বলে ভাবিনি। ওর কথাগুলো শুনতে শুনতে মনে হয়নি মিথ্যে বলছে বলে। আর আমি আর পিজি দু-জনেই যথেষ্ট প্রাপ্তবয়স্ক। এই ভবেশদার সিক্রেটটা নিজেদের কাছে রেখে দিতেই পারব। ঘরের বাতাসটা একটু ভারী হয়েছিল। পিজি মনে হয় সেটাকে হালকা করার জন্যই এবারে বলে উঠল,

‘উফফ, অনেক রাজ কি বাত জানা হল আপনার। করিতকর্মা লোক মশাই আপনি। তা, আজকে বাড়িতে ডেকে এনে শুধু এই আমপোড়ার শরবতই খাওয়াবেন, নাকি লাঞ্চে আরও কিছু আছে?’

মুরগির মাংসর ঝোল দিয়ে ভাত মাখতে মাখতে আমি ভবেশদাকে জিজ্ঞাসা করলাম,

‘আচ্ছা, আপনিও মিশরে অত বছর ছিলেন! চোরাকারবার নিশ্চয়ই ভালোই চলে ওখানে।’

‘তা আর চলবে না! সরকার যতই নিয়ম কড়া করুক না কেন। তার ফাঁক গলে এখনও প্রতিদিন কায়রো এয়ারপোর্ট থেকে কোনো-না-কোনো প্লেন পেটের মধ্যে হাজার বছরের পুরোনো আর্টিফ্যাক্ট নিয়ে উড়ে যাচ্ছে পৃথিবীর অন্য দেশে। আবার কখনো কখনো এই চোরাকারবারিদের জন্যেই আর্কিয়োলজিস্টরা দারুণ দারুণ জিনিস আবিষ্কারও করেছেন।’

‘সেটা কীরকম?’

‘দেইর এল বাহরির গুপ্তধনের কথা শোননি?’

‘না তো!’

ব্যস, লাঞ্চের টেবিলে উঠে এল এক টুকরো মিশর।

‘১৮৭১ সালের কথা, লাক্সর শহরের পশ্চিমদিকে দেইর এল বাহরি নামের একটা জায়গা। ছোটো ছোটো চুনাপাথরের পাহাড়ে ভরতি। সেখানে দুটো ভেঙে-পড়া খ্রিস্টান মনাস্ট্রি ছাড়াও ছিল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্রাচীন মিশরীয়দের কবর। এর পাশেই ছিল একটা গ্রাম, নাম কুর্না। জনসমক্ষে কুর্নার বাসিন্দাদের পেশা ছিল চাষবাস আর মেষপালন। কিন্তু তার তলায় তলায় ছিল আরেকটা লুকোনো কারবার। সেটা হল ইজিপশিয়ান আর্টিফ্যাক্ট বিক্রি করা। রাতের অন্ধকারে কবর খুঁড়ে টুকটাক মূর্তি, অ্যামুলেট, পুরোনো প্যাপিরাস ইত্যাদি যা কিছু পাওয়া যেত তা-ই ওরা বিক্রি করত। ক্রেতা ছিল মূলত টুরিস্টরা, আর কিছু দালাল, যারা আবার সেইগুলোকে বিক্রি করত ইউরোপে আর আমেরিকায়।

দেইর এল বাহরি পাহাড় ও প্রাচীন মিশরীয় সমাধির গুপ্ত সুড়ঙ্গ

‘আহমেদ মোহামেদ আবদুল রসুল থাকত ওই গ্রামেতেই। একদিন ভোরবেলায় আহমেদ ভেড়া চরাতে বেরিয়েছিল। ফেরার সময় খেয়াল করল একটা ভেড়া কম। বেটা নির্ঘাত পাহাড়ের ওপরে উঠে বসে আছে। এরকম মাঝেমধ্যেই হয়। আহমেদ ভেড়াটার ডাক শুনে শুনে একটা ছোটো টিলার ওপরে উঠল, আগে কখনো আসেনি এখানে। টিলাতে পৌঁছেই আহমেদ একটা গুহা দেখতে পেল। হারিয়ে-যাওয়া ভেড়াটার ডাক আসছে ওখান থেকেই। বেটা ওখানেই ঢুকে বসে আছে।

‘আহমেদ গুহাতে ঢুকে ভেড়াটা নিয়ে বেরিয়ে আসতে যাবে এমন সময় ওর নজর পড়ল গুহার একটা কোণে। একটা গর্তমতো দেখা যাচ্ছে না? কাছে গিয়ে বোঝা গেল যে সেটা শুধু একটা গর্তই না। একটা সুড়ঙ্গের মুখ! বুকে ভয় নিয়েই আহমেদ ঢুকে পড়ল সেই সুড়ঙ্গে। কিন্তু একটু এগোতেই পথ শেষ হয়ে গেল।’

‘যাহ! ব্লাইন্ড এন্ড?’

‘সেরকমই ভেবেছিল আহমেদও। কিন্তু সুড়ঙ্গ যেখানে শেষ হল সেখানকার পাথর দেখে আহমেদের সন্দেহ হল। যেন কিছু একটাকে বালি আর ছোটো ছোটো পাথরের টুকরো দিয়ে ঢাকা আছে। এর আগে ছোটোখাটো কবর খুঁড়ে চোরাকারবারিতে হাত পাকানোই ছিল ওর। তাই এবারেও ওর মনে হল এই বালি পাথরের পিছনে একটা লুকোনো সমাধি থাকতে পারে।

সুড়ঙ্গের মুখে আহমেদ রসুল

বর্তমান সময়ে দেইর এল বাহরি সমাধির সুড়ঙ্গের বাইরে ও ভেতরে

‘বাড়ি ফিরে আহমেদ ওর দুই ভাইকে এই কথা বলল, সেদিনই রাতের অন্ধকারে তিনজনে মিলে বেলচা হাতে চলল সেই টিলার দিকে। পাথর সরাবার পরে ওরা একটা ছোটো ঘর দেখতে পেল। সেই ঘর ফাঁকা হলেও তার উলটোদিকের দেওয়ালে একটা দরজা ছিল। সেই দরজা খুলতেই মিলল একটা লম্বা করিডোর। করিডোরের শেষে আরেকটা ঘর। এবারে এই ঘরে ঢুকেই তিনজনের চক্ষু ছানাবড়া হয়ে গেল।

‘ঘরের মধ্যে ঠেসে রাখা আছে চল্লিশটা মমি!!’

‘একটা কবরে চল্লিশটা মমি! বলেন কী! এরকমটা তো হওয়ার কথা নয়।’

‘হওয়ার কথা নয়ই তো। কিন্তু অনেকটা বাধ্য হয়েই এদেরকে একসঙ্গে রাখা হয়েছিল। কোথা থেকে এল বলো তো এরা?’

‘কোথা থেকে?’

‘ভ্যালি অফ দ্য কিংস। এই সবকটা মমি কোনো-না-কোনো ফারাও বা তাদের আত্মীয়র ছিল। আগেই বলেছিলাম তো তোমাদের, ভ্যালি অফ দ্য কিংসে অতগুলো সমাধি থাকলেও সবকটাই পাওয়া যায় ফাঁকা অবস্থায়। শুধু তুতানখামেনের মমিই ওর সমাধিতে মেলে। আর দ্বিতীয় আমেনহোতেপের সমাধিতে পাওয়া যায় গোটা চারেক মমি। বাকি কবরের মমিগুলোর জায়গা ছিল এই দেইর এল বাহরির লুকোনো টুম্ব।’

‘কিন্তু এখানে এদেরকে আনল কে?’

‘সে আরেক গল্প, বুঝলে। ফারাও নবম রামেসিসের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই মিশরের বিশতম ডাইনেস্টি শেষ হয়। গোটা দেশ জুড়ে তখন অরাজকতা চলছে। ডাকাতেরা ততদিনে ভ্যালি অফ দ্য কিংসের খোঁজ পেয়ে গেছে। লুঠ চলছে অবাধে। এরই মধ্যে ইজিপ্টের উত্তর আর দক্ষিণে দু-জন আলাদা রাজা তৈরি হয়। উত্তরের ফারাওয়ের নাম ছিল নেসবানেবজেদ, দক্ষিণে কার্নাকের মন্দিরে প্রধান পুরোহিতই নিজেকে ফারাও বলে ঘোষণা করে বসেন। তাঁরর নাম ছিল পিয়াখঁ। এঁর ছেলে পিনেদজেম যখন ফারাও হলেন তখনই তৎপর হলেন ভ্যালি অফ দ্য কিংসের ফারাওদের মমিগুলোকে বাঁচানোর জন্য। ওঁর নির্দেশেই সব ফারাওদের ওখান থেকে তুলে এনে জড়ো করা হয় ইনহেপ নামের এক রানির সমাধিতে। আর সেই সমাধিটাই খুঁজে পায় এই আহমেদ রসুল।’

‘তাহলে রসুল তো রাতারাতি বড়োলোক হয়ে গেল!’

‘তা আর বলতে! দেইর এল বাহরির সেই সমাধির ঘরে মমি ছাড়াও ছিল প্রচুর প্যাপিরাস আর পাথরের মূর্তি। তিন ভাই বুঝতেই পেরেছিল যে ওদের হাতে কী লটারি লেগেছে। কিন্তু অতগুলো আর্টিফ্যাক্ট একসঙ্গে বিক্রি করতে গেলেই লোকের চোখে লাগবে, তাই তাদের মধ্যে কয়েকটাকেই তুলে আনল। সমাধির মুখটা আবার পাথর দিয়ে বুজিয়ে সেই সুড়ঙ্গের মুখে একটা গাধাকে মেরে ফেলে রাখল, যাতে গন্ধের চোটে কেউ আর ওই জায়গার ধারেকাছে না ঘেঁষে।’

‘বাপ রে! হেবি চালাক ছিল তো!’

‘চালাক তো বটেই, তার সঙ্গে সাবধানিও। তিন ভাই মিলে শপথ নেয় যে এই গুপ্তধনের কথা আর কাউকে বলবে না। মিশরের অ্যান্টিকুইটি ডিপার্টমেন্ট তখন খুব কড়া। দেশ জুড়ে প্রচণ্ড ধরপাকড় চলছে, চোরাকারবারি দেখলেই সোজা জেলে পুরে দেওয়া হচ্ছে তাদের। তাই রসুল ভাইরাও খুব ভেবেচিন্তে ক্লায়েন্ট সিলেক্ট করত। কাউকে দুম করে আর্টিফ্যাক্ট দেখাতও না। তবে বিক্রি করত বেশ চড়া দামে। সত্যি কথা বলতে কী, অত কড়াকড়ির মাঝেও খদ্দেরের তো অভাব ছিল না, তাই বছর দশেকের মধ্যেই রসুল ভায়েরা বড়োলোক হয়ে ওঠে। এত বছরে ওরা কিন্তু ওই সমাধি গিয়েছিল মাত্র তিনবার। তাও শেষ রক্ষা হল না।’

‘ধরা পড়ে গেল?!’

‘হুম, সেইসময় মিশরে ডিপার্টমেন্ট অফ অ্যান্টিকুইটির হেড গ্যান্সটন ম্যাসপেরো লাক্সরের চারপাশে লুকিয়ে চলা অ্যান্টিকের কেনাবেচার কারবারিদের ধরার চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। এতে ওঁকে সাহায্য করছিল ওঁর এক আমেরিকান ছাত্র, তার নাম চার্লস উইলবার। চার্লসের মুখের মধ্যে একটা আভিজাত্যের ছাপ ছিল। সেইটাকে কাজে লাগিয়ে চার্লস একজন আমেরিকান ধনকুবেরের ছদ্মবেশে লাক্সর হোটেলে গিয়ে উঠল। ভালো খদ্দের এসেছে, এই খবরটা আবদুল রসুলের কাছে পৌঁছোতে দেরি হয়নি। রসুল নিজে থেকেই চার্লসের সঙ্গে যোগাযোগ করে ওকে নিয়ে এল কুৰ্না গ্রামে নিজের বাড়িতে। হতদরিদ্র গ্রামের মধ্যে রসুল ভাইদের বিশাল বাড়ি দেখেই চার্লসের সন্দেহ হয়েছিল। তাই ওকে রসুল যখন একটা বেশ বড়ো প্যাপিরাস দেখিয়ে সাড়ে তিনশো পাউন্ড দাম চাইল তখন চার্লস বলল, ছোঃ, আমাকে আরও দামি কিছু দেখান। রসুল ভাইরা কিন্তু সঙ্গেসঙ্গে বলে দিল তাদের কাছে এর চেয়ে দামি আর কিছু নেই।

‘চার্লসও ছাড়ার পাত্র নয়। এবারে বেশ বড়ো একটা অ্যামাউন্টের অর্থের লোভ দেখাল ওদের। সেই লোভে পড়েই তখন ওরা বের করে নিয়ে এল বেশ কয়েকটা স্ক্রোল। চামড়া আর কাপড়ের তৈরি। যেগুলোতে সেই বুক অফ দ্য ডেড-এর মন্ত্র লেখা থাকত। স্ক্রোল দেখেই চার্লস বুঝেছিল এটা কোনো ফারাওয়ের কবর থেকেই আসছে। সেই স্ক্রোলে একটা কার্তুজও আঁকা ছিল, কিন্তু সেটার পাঠোদ্ধার করতে না পেরে সেটাকে ও পাঠাল কায়রোতে ম্যাসপেরোর কাছে। কয়েকদিনের মধ্যেই একটা টেলিগ্রাম এল, কার্তুজে লেখা আছে ফারাও পিনেদজেম-এর নাম!! যাঁর নির্দেশে ভ্যালি অফ দ্য কিংস খালি করে মমিদের সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তাহলে সেই গুপ্তধন এখানেই কোথাও একটা আছে!!

‘চার্লস এবারে নিজের আসল পরিচয়টা বলতেই রসুল ভাইরা ভয় পেয়ে গেল। ও ওদের এই বলে ভয় দেখাল যে ফারাওয়ের কবরে ওকে নিয়ে যেতেই হবে নাহলে ও পুলিশে খবর দেবে চার্লস উইলবারের এই হুমকির চোটে অবশেষে রসুল ভাইরা ওকে সেই সমাধিতে নিয়ে যেতে রািজ হল।

‘পাহাড়ের আড়ালে সমাধির ভিতরে চার্লস ঢুকল রসুল ভাইদের সঙ্গে। কিন্তু সেখানে ছিল মাত্র একটা মমি।’

‘কিন্তু, আপনি যে বলেছিলেন চল্লিশটা মমি ছিল!’

‘চল্লিশটাই ছিল, কিন্তু রসুলরা তো প্রচণ্ড চালাক, তাই ওরা রাতের অন্ধকারে সেই সমাধি থেকে একটা মমিকে তুলে এনে অন্য একটা ছোটো সমাধিতে রেখে দেয়। তার আশেপাশে কয়েকটা প্যাপিরাস আর মূর্তি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রেখে চার্লসকে নিয়ে আসে সেই নকল কবরে।

‘ও কিন্তু বুঝতেই পেরেছিল যে রসুল ভাইরা ওকে ঠকাচ্ছে। কিন্তু সেইদিন মুখে কিছু না বলে চুপচাপ সেখান থেকে চলে আসে। খুব জোর বেঁচে গেলাম, এটাই হয়তো তখন মনে মনে ভাবছিল রসুলরা।

‘কয়েক সপ্তাহ পরে স্বয়ং গ্যাসটন ম্যাসপেরো লাক্সরে এলেন। এসেই শহরে পুলিশ চিফকে নির্দেশ দিলেন আহমেদ রসুলকে গ্রেফতার করার। বেশ কয়েকদিন ধরে ম্যাসপেরো জেরা করলেন আবদুলকে। কিন্তু সে নির্বিকার চিত্তে জানিয়ে দিল যে তার কাছে আর গুপ্তধনের সন্ধান নেই। যা ছিল তা চার্লস উইলবারকে দেখানো হয়ে গেছে। যদি বিশ্বাস না হয় তাহলে পুলিশ ওর বাড়িতে সার্চও করতে পারে। তন্নতন্ন করে গোটা বাড়ি খুঁজেও কিচ্ছু পাওয়া গেল না। আবদুল রসুল হাসতে হাসতে জেল থেকে ছাড়া পেয়ে ওর গ্রামে ফিরে গেল।

‘সোজা আঙুলে ঘি যখন উঠছে না তখন এবারে আঙুল বেঁকাতেই হল ম্যাসপেরোকে। তিন রসুল ভাইকেই আবার অ্যারেস্ট করা হল। এবারে নিয়ে যাওয়া হল ‘‘কেনা’’ নামের একটা শহরের জেলখানাতে।’

‘বেলজোনির প্রথম সেতির টুম্ব আবিষ্কারের সময়ে এই শহরের নাম বলেছিলেন না?’

‘হ্যাঁ, ঠিক বলেছ। এই ‘‘কেনা’’ শহরের জেলখানাতে ওদের আনার একমাত্র কারণ ছিল পুলিশের চিফ দাউদ পাশা। আসামিদের জেরা করে খবর বের করতে ওর কোনো জুড়ি ছিল না।

‘দু-মাস ধরে তিন ভাইয়ের ওপরে প্রচণ্ড অত্যাচার চালাল দাউদ পাশা। আহমেদের পায়ের নখ একে একে উপড়ে ফেলা হল। আরেক ভাইয়ের পা ভেঙে দেওয়া হল। তাতেও তিনজনের কেউ মুখ খুলল না। দাউদ এবারে একটা চালাকি করলেন। হঠাৎ একদিন তিনজনকেই ছেড়ে দিলেন।

‘আহমেদরা বাড়ি ফিরে দেখল ওদের গোটা বাড়ি তছনছ করে দিয়েছে দাউদের পুলিশরা। বাড়ির বউ মেয়েরা ভয়ে কাঁপছে। নিজের প্রাণের মায়া না থাকলেও পরিবারের জন্য তো সবাইকেই চিন্তা করতে হয়। তিন ভাইয়ে মিলে সেইদিন রাতে অনেক আলোচনা করল। ওদের আর বুঝতে বাকি ছিল না যে এইভাবে আর পুলিশদের সঙ্গে লড়াই করা যাবে না।

‘পরের দিনই আবার ‘‘কেনা’’ শহরের পুলিশ স্টেশনে দেখা গেল আহমেদকে। নিজে থেকে আত্মসমর্পণ করতে এসেছে সে। তবে তার শর্ত আছে কয়েকটা, ওর পরিবারের ওপরে অত্যাচার বন্ধ করতে হবে। তিন ভাইয়ের ছেলেদের সরকারি চাকরির ব্যবস্থা করে দিতে হবে। খবর গেল ম্যাসপেরোর কাছে। আহমেদের শর্ত মানতে কোনো অসুবিধাই ছিল না ওঁর।

‘গ্যাসটন ম্যাসপেরো এবারে নিজে না এলেও পাঠালেন ওঁর আর এক অ্যাসিস্ট্যান্টকে। নাম এমিল ব্রুজ। ১৮৮১ সালের ৪ জুলাই ব্রুজ রসুল ভাইদের সঙ্গে ঢুকলেন দেইর এল বাহরির সেই সমাধিতে। সঙ্গে জনাকয়েক পুলিশ। টুম্বের বাইরে তখন ভিড় করে আছে গ্রামের লোকেরা। এত বড়ো একটা ঐশ্বর্যকে রাতারাতি সরাতে না পারলে ব্রুজের নিজেরই বিপদ। গ্রামের লোকেরা জেনে গেছে এর ঠিকানা। এবারে একবার যদি আক্রমণ করে বসে তাহলে ওই হাতে-গোনা কয়েকজন পুলিশ দিয়ে ওদের ঠেকানো যাবে না।

‘সেইদিনই কায়রোতে টেলিগ্রাম করলেন এমিল। বিশাল বড়ো একটা জাহাজ পাঠানো হল লাক্সর বন্দরে। অন্যদিকে মোটা টাকা দিয়ে ভাড়া করা হল গ্রামেরই তিনশো লোককে। তাদেরকে দিয়ে শুরু হল কবর খালি করার কাজ। মরুভূমির বালির ওপরে সাপের মতো লাইন দিয়ে চলল ওরা। কাঁধে চল্লিশটা কফিন বন্দি মমি, প্রচুর প্যাপিরাস, অগুনতি মূর্তি আর আসবাবপত্র। ১৪ জুলাই সেই গুপ্তধন বোঝাই জাহাজ ছাড়ল লাক্সর থেকে। জাহাজ যখন নীল নদের ওপর দিয়ে যাচ্ছে তখন অদ্ভুত একটা দৃশ্য দু-পাশের তীরেতে। সাধারণ মানুষের ভিড় জাহাজ দেখার জন্য। তাদের মধ্যে কেউ কেউ রাগ করে পাথর ছুড়ে মারছে। কেউ হতাশায় কাঁদছে। বিদেশিদের হাতে দেশের সম্পদ চলে যাওয়ার কষ্টে।’

‘এই একই হাল তো আমাদের দেশেও হয়েছিল। ইংরেজরা কত কিছু তুলে নিয়ে চলে গেছে বলুন তো!’

‘সেটা ঠিক কথা, কিন্তু ম্যাসপেরোকে দোষও দেওয়া যায় না। ও না থাকলে রসুল ভাইরা একে একে ওই সমাধির সব ঐশ্বর্যই বিক্রি করে দিত। মমিগুলোর তো কোনো দামই ছিল না ওদের কাছে। হয়তো নষ্টই করে দিত ওদের। তাহলে মিশরের ইতিহাসের একটা কত বড়ো অংশ অজানা থেকে যেত ভাবতে পারছ? ওহো, একটা মজার কথা বলা হয়নি, সেই জাহাজ যখন কায়রোর পোর্টে এসে পৌঁছোল তখন পোর্টের ক্লার্করা একটা ধন্দে পড়ল। ট্যাক্স তো নিতে হবে জাহাজে থাকা মালের বাবদ। কিন্তু মমির জন্য কত টাকা ট্যাক্স হয় সেটা তো কারোর জানা নেই। শেষে ওরা কীসের নামে ট্যাক্স নিল জানো?’

‘কীসের?’

‘শুঁটকি মাছ! শুকনো মমির নিয়ারেস্ট এটাকেই পেয়েছিল।’

বলেই ভবেশদা ঘর কাঁপিয়ে নিজেই হাসতে লাগলেন। সঙ্গে আমরাও।

হাসি থামতে আমি এবারে বললাম,

‘আচ্ছা ভবেশদা, তাহলে কার কার মমি পাওয়া গেল ওখানে?’

‘অনেক ফেমাস ফারাওদের মমি মিলেছিল ভায়া, প্রথম, দ্বিতীয় আর তৃতীয় রামেসিস আর তুতমোসিস, প্রথম সেতি আর আমুনহোতেপ, রানি নেফারতারি তাদের মধ্যে কয়েকজন। এঁদেরকে এখন রাখা আছে কায়রোর মিউজিয়ামে। তবে একজন রাজপুত্রর মমিও রাখা আছে সেখানে, যাকে দেখতে সবচেয়ে বেশি ভিড় হয়।’

এবারে আমাদের কোঁচকানো ভ্রূর দিকে তাকিয়ে ভবেশদা বললেন, ‘এক কাজ করো, গুগল ইমেজে সার্চ করো, ‘‘আননোন ম্যান ই’’।’

নেফারতারির মমি

ভবেশদার ঘরে দেখলাম মোবাইলের নেটওয়ার্ক খুব ভালো নয়। ছবিটা ডাউনলোড হতে তাই কয়েক সেকেন্ড বেশি সময় লাগল। কিন্তু গোটা ছবিটা মোবাইলের স্ক্রিনে ফুটে ওঠার সঙ্গেসঙ্গেই আমি শিউরে উঠলাম। পিজির হাতে মোবাইলটাও কেঁপে উঠল।

এ কেমন মমি! ঘাড়টা অস্বাভাবিকভাবে পিছনের দিকে হেলানো। মুখটা বিশ্রীভাবে হাঁ হয়ে আছে। যেন প্রচণ্ড যন্ত্রণায় চিৎকার করছে। দেখে মনে হচ্ছে যেন একটা ভয়ংকর মৃত্যু হয়েছিল এর!

‘দেখে ভয় পেয়ে গেলে তো, এমিল ব্রুজও ভয় পেয়ে গেছিলেন।’

‘মানে দেইর এল বাহরির সেই সমাধিতেই একেও পাওয়া যায়!?’

‘হ্যাঁ, তবে অন্যদের থেকে একদম আলাদা অবস্থায়। সাধারণ সিডার কাঠের তৈরি কফিনে। অন্যান্য মমির মতো এর গায়ে কোনো কাপড়ের ব্যান্ডেজ জড়ানো ছিল না। শরীরটা মোড়ানো ছিল ভেড়ার চামড়া দিয়ে, যেটা কিনা ইজিপশিয়ানদের কাছে খুব অপবিত্র একটা জিনিস। মমির শরীর থেকে নাড়িভুঁড়ি বা মাথার ঘিলুও বের করে নেওয়া হয়নি। গায়ে লাগানো হয়নি রেজিনের প্রলেপ, কফিনের শুকনো পরিবেশেই মৃতদেহ শুকিয়ে গিয়ে এমন বীভৎস রূপ নেয়। দেখেই বোঝা যাচ্ছিল যে খুব তাড়াহুড়োর মধ্যে একে মমি বানানো হয়। আর ইচ্ছা করেই এর গায়ে জড়িয়ে দেওয়া হয় ভেড়ার চামড়া, ঢুকিয়ে দেওয়া হয় সাধারণ একটা কফিনে, যার গায়ে বুক অফ দ্য ডেড-এর কোনো মন্ত্রই লেখা ছিল না।’

‘এরকমটা কেন করা হল?’

‘কারণটা খুবই স্পষ্ট, যে বা যারা ওকে কবর দেয় তারা চায়নি ও মৃত্যুর পরে অন্য জীবনে যাক। যে পাপ ও করেছিল তার শাস্তি তো ওকে পেতেই হত।’

‘কী পাপ?’

‘মিশরের টুয়েনটিয়েথ ডাইনেস্টির ফারাও ছিলেন তৃতীয় রামেসিস। ওঁর উপপত্নী ‘‘টিয়ে’’ ওঁকে খুন করার প্ল্যান করে। টিয়ের লক্ষ্য ছিল রামেসিসকে মেরে নিজের সন্তান পেন্টাওয়েরকে ফারাও বানানো। তা না হলে রামেসিসের পাটরানি ইসেতের সন্তানই ফারাও হত। এই চক্রান্তে নেতৃত্ব দেয় রাজকুমার পেন্টাওয়ের স্বয়ং। নিজের কয়েকজন চ্যালাদের নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন রাজার ওপরে। পরে রাজপুত্র আর ওর সাঙ্গোপাঙ্গদের ধরে ফেলা হয়। রাজদ্রোহের একটাই শাস্তি তখন, মৃত্যু। পেন্টাওয়েরের সঙ্গে যারা ছিল তাদেরকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারলেও পেন্টাওয়েরের সঙ্গে সেটা করা যায়নি। ফারাওয়ের সন্তান তো, তাকে পুড়িয়ে ছাই করে দিলে সে পরজন্মে যেতে পারবে কী করে? তাই ওকে ফাঁসি দেওয়া হয়। কিন্তু ওর মমিকে এমনভাবে বানানো হল যে ওর প্রাণ তো ফিরে আসবে। তবে গায়ে সেই অপবিত্র ভেড়ার চামড়ার জন্য অন্য জীবনে ও প্রবেশ করতে পারবে না। এই পৃথিবী আর মৃত্যুর পরের জগতের মাঝখানে আটকা থেকে যাবে ও।’

আননোন ম্যান ই

‘তাহলে এই পেন্টাওয়েরই...’

‘হ্যাঁ, পেন্টাওয়েরই যে এই ‘‘আননোন ম্যান ই’’ সেটা প্রমাণ হয় কয়েক বছর আগে। তৃতীয় রামেসিসের ডিএনএ-র সঙ্গে এর ডিএনএ-র অনেক মিল পাওয়া যায়।’

‘আচ্ছা ভবেশদা, যার জন্য পেন্টাওয়েরকে এই ভয়ানক শাস্তি পেতে হল সেই তৃতীয় রামেসিসের কী হল?’

‘রামেসিসের মমি সেই দেইর এল বাহরির সমাধিতেই পাওয়া যায়। ২০১২ সালে সেই মমির সিটি স্ক্যান হয় কায়রো ইউনিভার্সিটির রেডিয়োলজি ডিপার্টমেন্টে। তাতে দেখা যায় রামেসিসের গলায় গভীর ক্ষত। সেই ক্ষত এতটাই গভীর যে গলার সারভাইকাল স্পাইন অবদি পৌঁছেছিল।

‘রামেসিসকে খুনই করা হয়। রাজপুত্র পেন্টাওয়েরই সেই খুনি!’

তৃতীয় রামেসিসের মমি

আখেনাতেন

লাঞ্চ করার পরে আড্ডা মেরে অনেকটা টাইম কেটে গেল। আমাদের বিকেল পাঁচটা নাগাদ বেরোবার প্ল্যান ছিল। কিন্তু ভবেশদা বলল, ‘একটু ওয়েট করে যাও। একজন কালেক্টর আজকে একটা জিনিস দেখাবার জন্য নিয়ে আসছেন বললাম না, কে জানে হয়তো একটা দারুণ আর্টিফ্যাক্ট দেখতে পেয়ে যাবে।’

সাড়ে পাঁচটা নাগাদ একটা ফোন এল ভবেশদার কাছে।

‘হ্যাঁ, কত দূরে আছেন? আচ্ছা… না না, গাড়ি নিয়ে আমার বাড়ি অবদি আসতে যাবেন না। স্টেশনের কাছে বড়ো পার্কিং লট আছে। ওখানে গাড়ি রেখে একটা রিকশা নিয়ে আসুন। ঠিকানা তো আছেই আপনার কাছে।’

ফোনটা রেখে ভবেশদা বললেন,

‘মক্কেল এসে গেছে প্রায়।’

ভবেশদার বাড়িতে যে লোকটা ঢুকল তাকে দেখে কেন জানি না অনেকটা অমরেশ পুরীর মতো লাগল। ওই কাঁচাপাকা গোঁফ আর লম্বা জুলপির জন্যই মনে হয়। বয়স মনে হল পঞ্চাশের কাছাকাছি। বেশ লম্বা। পরনে একটা পোলোর টি-শার্ট আর কৰ্ডুরির প্যান্ট। চোখে-মুখে একটা আভিজাত্যের ছাপ আছে।

‘নমস্কার, আমিই শোভন জাটলা।’

‘আসুন, আমি ভবেশ সামন্ত।’

জাটলার চোখ এবারে আমাদের দিকে পড়েই কুঁচকে গেল। ভবেশদা সেটা খেয়াল করে বললেন,

‘ওরা আমার ভাইয়ের মতো, প্রদীপ্ত আর স্পন্দন।’

‘হুম, কিন্তু আমি ভেবেছিলাম আমাদের মিটিংটার প্রাইভেসি থাকবে। আসলে এটা ইতনা সেন্সিটিভ আর ট্রিকি ইসু যে কারোর ওপরে ভরোসা না করে আমি নিজেই এলাম...’

‘আপনি চিন্তা করবেন না মিস্টার জাটলা। ওরা আমার নিজেরই লোক বলতে পারেন। আপনার সিক্রেটটা এই বাড়ির বাইরে কখনো বেরোবে না।’

‘ওহ, ওকে।’

মুখে ওকে বললেও মনে হল না শোভনবাবুর খুব একটা পছন্দ হল না আমাদের উপস্থিতিটা। তবে কথা আর না বাড়িয়ে ড্রয়িং রুমের সোফাতে বসলেন।

‘কী খাবেন বলুন, চা না কফি?’

‘কুছ নেহি, একটু জল দিন, তাহলেই হবে।’

এক ঢোঁকে গ্লাসের অর্ধেক জল শেষ করে শোভন জাটলা সেটা সামনের টেবিলে রাখলেন। ভবেশদা এবারে বললেন,

‘আপনার সারনেমটা দেখে মনে হয় না আপনি বাঙালি বলে, অথচ দিব্যি ভালো বাংলা বলছেন কিন্তু।’

‘হা হা, আমাদের আদি বাড়ি রাজস্থানের সিয়ান জেলায়, বুঝলেন। কিন্তু দাদু চলে এসেছিলেন কলকাতায়। আমি তো নব নালন্দায় পড়েছি। তাই জাতে মাড়োয়ারি হলেও এখন আদ্যোপান্ত বাঙালিই বলতে পারেন। তবে কথার মাঝে একটু অবাঙালি টান মিলতেও পারে।’

‘বাহ! বেশ, বেশ। তা আপনার যেটা দেখাবার ছিল ওইটা...’

‘ও, হ্যাঁ।’

শোভন জাটলা এবারে ওর সঙ্গে আনা ব্রিফকেসটা খুললেন। ভেতর থেকে বার করে আনলেন একটা রেকট্যাঙ্গুলার চ্যাপটা মতো কিছু। বাবল র‌্যাপ দিয়ে মোড়ানো। এবারে ওটা ভবেশদার হাতে তুলে দিতে দিতে বললেন,

‘একটু সাবধানে হ্যান্ডল করবেন, খুব ফ্র্যাজাইল আছে কি না।’

‘গত কুড়ি বছর ধরে আমি এমন জিনিস নিয়েই ঘাঁটাঘাঁটি করছি, মিস্টার জাটলা। আপনার কোনো চিন্তা নেই।’

ভবেশদা উঠে গিয়ে অন্য ঘর থেকে একজোড়া গ্লাভস নিয়ে এলেন। সেটা হাতে পরে নিয়ে বাবল র‌্যাপটা খুললেন। এবারে দেখলাম তার মধ্যে থেকে বেরিয়ে এল একটা কালচেমতো স্ল্যাব। দেখে মনে হচ্ছিল পোড়ামাটির তৈরি। তার ওপরে খুব ছোটো ছোটো অক্ষরে কিছু লেখা। আমরা দু-জনে ঝুঁকে পড়ে সেটা দেখলাম। কিন্তু মাথামুন্ডু কিচ্ছু বুঝতে পারলাম না।

ভবেশদা বেশ খানিকক্ষণ লেখাগুলোর দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপরে জাটলার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন,

‘এটা আমার্নার লেটার নয়, শোভনবাবু।’

‘মানে!’

‘এটা ফেক।’

‘কী বলছেন কী? আমি অলরেডি এটার জন্য ছ-লাখ অ্যাডভান্স করেছি!’

‘যাকে করেছেন তাকে বলুন টাকাটা ফেরত দিতে। আর বলুন খুব কাঁচা একটা কাজ করেছে সে। মিনিমাম একটা পড়াশোনা না থাকলে ফেক জিনিস প্রোডিউস করা যায় না।’

‘আপনি কী করে শিয়োর হচ্ছেন যে এটা আসলি নয়?’

‘এটাই তো আমার কাজ, এইজন্যই আপনি এসেছেন আমার কাছে, তাই নয় কি? এর গায়ে খোদাই করা লিপিগুলো দেখছেন?’

‘হ্যাঁ, দেখেছি তো।’

‘এটা লেখা আছে ডেমোটিক ভাষায়, যেটা মিশরের সাধারণ মানুষের ভাষা ছিল।’

‘হুম, তো?’

‘আসল আমার্নার চিঠিগুলো লেখা ছিল কিউনিফর্ম হরফে, আক্কাডিয়ান ভাষায়, যেটা এর থেকে অনেক অনেক আলাদা। যে এই কাজটা করেছে সে এটা জানত না যে এই চিঠির লেখক মিশরীয় নয়। একজন ব্যাবিলনিয়ান।’

শোভন জাটলা এবারে উত্তেজনার চোটে টেবিলে একটা ঘুসি মারলেন। জলের গ্লাসটা আরেকটু হলেই উলটে পড়ছিল।

‘মাই গড। ভাগ্যিস আপনার খোঁজ পেয়েছিলাম মিস্টার সামন্ত। খুব বাঁচালেন আমাকে এযাত্রায়!’

‘ইট’স ওকে, এইজন্যই তো আপনার আসা আমার কাছে।’

‘তা বটে, তা বটে। আচ্ছা আপনার কাছে কিছু...’

এই কথা যখন বলছেন জাটলা তখন ওর চোখ দেরাজের নীচের দিকের তাকটায়।

‘না মিস্টার জাটলা, আমি কোনো আর্টিফ্যাক্টের কেনাবেচা করি না। আর এইগুলো সব শোপিস। পিতলের তৈরি।’

‘ওহ, আচ্ছা।’

জাটলাকে দেখে মনে হল সামান্য মনঃক্ষুণ্ণ হলেন।

‘এনিওয়ে, আপনার ফিজটা...’

‘ক্যাশে দেওয়ার দরকার নেই। ব্যাঙ্ক ডিটেল দিয়ে দেব। ট্রান্সফার করে দেবেন।’

শোভন জাটলা চলে যাওয়ার পরে আমি ভবেশদাকে বললাম,

‘আপনার সত্যি এলেম আছে কিন্তু! কীরকম ঝট করে দেখে বলে দিলেন ওটা ফেক।’

‘তোমাদের মনে হচ্ছে ঝট করে বলে দিলাম ভাই। কিন্তু এটার জন্য আমাকে কত বছর পড়াশোনা করতে হয়েছে একবার ভাবো তো।’

‘তা ঠিক, কিন্তু ওই মাটির স্ল্যাবটা আসলে একটা চিঠি? বললেন ব্যাবিলন থেকে এসেছিল। কাকে লিখেছিল?’

‘যাকে লেখা হয়েছিল সে ছিল মিশরের এমন একজন ফারাও যাকে প্রায় ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা হয়েছিল। আবার সেই লোকটারই ফ্যান ছিল অ্যাডলফ হিটলার। সিগমুন্ড ফ্রয়েড ওকে নিয়েই একবার একটা উত্তপ্ত বাগ্বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েছিলেন। আবার ওকে নিয়ে কয়েক বছর আগে ইংল্যান্ডে অপেরাও হয়ে গেল।’

‘বাপ রে! সেলিব্রিটি লোক তো! কে সে?’

‘তুতানখামেনের বাবা।’

‘এইটিন্থ ডাইনেস্টির ফারাও তৃতীয় আমেনহোতেপের মৃত্যুর পরে মিশরের সিংহাসনে আসেন চতুর্থ আমেনহোতেপ। কিন্তু নিজের রাজত্বের পাঁচ বছরের মাথায় এমন একটা কিছু উনি করে বসলেন যাতে গোটা দেশটাই কেঁপে উঠল।

‘ততদিন অবধি দেশ জুড়ে ছিল অজস্র দেবদেবী। আইসিস, হোরাস, মাত, ওসাইরিস, আনুবিস...। আর তাদের সবার ওপরে ছিলেন আমুন। থেবসে আমুনের মন্দিরে স্বয়ং ফারাও পুজো দিতে যেতেন। কিন্তু চতুর্থ আমেনহোতেপ ঠিক করলেন যে এতগুলো দেবদেবীর আর দরকার নেই। একজনকে পুজো করলেই হবে।’

‘একেশ্বরবাদ?’

‘একদম ঠিক ধরেছ, স্পন্দন ভাই। একেশ্বরবাদই বটে। যেমন মুসলিম বা খ্রিস্টান ধর্ম। যেমন ছিল আমাদের ব্রাহ্মধর্ম।

‘আমেনহোতেপ পুজো করতে শুরু করলেন দেবতা আতেন-এর। ইনি সূর্যের দেবতা। অন্যান্য দেবতার মতো এঁর কোনো মানুষ বা পশুর রূপ নেই। শুধুমাত্র একটা গোল চাকতিই বোঝায় আতেনকে। রাজা রাতারাতি নিজের নামও বদলে ফেলে রাখলেন, ‘‘আখেনাতেন’’, যার মানে আতেনের জীবন্ত আত্মা। রাজা আখেনাতেন আর রানি নেফারতিতিই নাকি এই পৃথিবীর দুই নরনারী যাঁরা আতেনের সঙ্গে কথা বলতে পারেন।

‘শুধুমাত্র তো নিজের নাম বদলালে হবে না। দেশের মানুষের মনেও সেই ধর্মীয় বিশ্বাস ঢুকিয়ে দিতে হবে। তাই আখেনাতেনের নির্দেশে মিশরের বড়ো বড়ো মন্দিরগুলোতে আমুন, হোরাস, মাত এঁদের মূর্তিগুলো ভেঙে ফেলা হল। কার্নাকে আর লাক্সরে তৈরি করা হল আতেনের নতুন মূর্তি।’

‘তারপর!’

দেবতা আতেন-এর পুজো করছেন আমেনহোতেপ

‘তারপরে রাজার খেয়াল হল যে নিজের একটা নতুন রাজধানীরও দরকার। সেই মতো জায়গা খোঁজা শুরু হল। ফারাওয়ের মনে ধরল নীল নদের পূর্ব পাড়ে নদী থেকে কয়েকশো মাইল দূরে একটা তিনদিক পাহাড়ে ঘেরা মরুভূমি। নাম আমার্না।’

‘এটাই সেই আমার্না লেটারের আমার্না?’

‘হ্যাঁ।’

‘কিন্তু নদী থেকে এত দূরে রাজধানী! ফারাওয়ের কি মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছিল নাকি?’

‘না ভাই, এর মতো বুদ্ধিমান ফারাও মিশরের ইতিহাসে আর দুটো নেই। আখেনাতেন বুঝতে পেরেছিলেন যে পুরোনো মন্দির ভেঙে নতুন মন্দির করলেও মানুষের মনের কোণে সেই দেবদেবীরা রয়েই যাবে। তাই এমন একটা জায়গা চাই যেখানে আগে কখনো কোনো মন্দিরের অস্তিত্বই ছিল না। সেখানে তৈরি হবে দেশের সবচেয়ে বড়ো আতেনের মন্দির। সেই মন্দিরকে ঘিরে তৈরি হবে ফারাওয়ের নতুন রাজধানী।

‘যেমনি ভাবা তেমনি কাজ। প্রস্তাবিত রাজধানীর সীমানায় বসিয়ে দেওয়া হল অনেকগুলো পাথরের স্টেলা। তার প্রতিটায় একটাই জিনিস খোদাই করা। দেবতা আতেন তাঁরর গোল চাকতি নিয়ে। সেই চাকতি থেকে যে রশ্মিগুলো বেরিয়ে আসছে তাদের প্রান্তগুলো হাতের চেটোর মতো। তারা আশীর্বাদ করছে ফারাও আখেনাতেন আর ওঁর স্ত্রী নেফারতিতিকে। দেশের সেরা আর্কিটেক্টদের কাজে লাগানো হল। শ্রমিকদের দিনরাত একটানা খাটিয়ে মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে বানিয়ে ফেলা হল নতুন রাজধানী। ফারাও এর নাম দিলেন আখেতাতেন, যার মানে দিগন্তের সূর্য।’

‘আখেতাতেন একটা দারুণ প্ল্যানড শহর ছিল, বুঝলে। সেখানে ছিল বিশাল বড়ো রাজপ্রাসাদ, রাজার খাস লোকেদের জন্য বিলাসবহুল বাড়ি, অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ কাজকর্মের জন্য অফিস, সাধারণ মানুষদের জন্য বানানো একতলা ঘর। শহরের মাঝ বরাবর ছিল বড়ো রাজপথ। নদী অনেক দূরে থাকার জন্য আখেতাতেন আর নীল নদের মধ্যে বানানো হয়েছিল আরেকটা চওড়া রাস্তা। পশুদের পিঠে করে প্রতিদিন সেই পথে আসত শহরের প্রয়োজনীয় জল। ৩০,০০০ জন মানুষ বাস করত সেই শহরে।

‘আর আতেনের মন্দির?’

‘এটার কথাই বলতে যাচ্ছিলাম। আতেনের মন্দিরের প্ল্যানটাও ছিল বেশ অদ্ভুত রকমের, বুঝলে। কয়েক মাইল জুড়ে একটা আয়তাকার জায়গার মধ্যে ছিল এটা। মন্দিরের প্রবেশপথে ছিল পাথরের তৈরি বিশাল গেট। কিন্তু ভেতরে কোনো বাড়ি ছিল না। আতেনের গোল চাকতি রাখা ছিল খোলা আকাশের নীচে। সেখানেই পুজো হত দেবতার। দেবতার সামনে ছিল সাতশো একানব্বইটা পাথরের তৈরি বেদি। রোজ সেই বেদি ভরে উঠত নৈবেদ্যতে।’

‘অদ্ভুত লোক ছিলেন বটে আখেনাতেন! এত রাডিকাল একটা কিছু করার কথা ভাবলেন কী করে!’

‘এ তো কিছুই নয়, ভাই। আখেনাতেনের ইচ্ছাতে মন্দিরের গায়ে যে সমস্ত ছবি খোদাই করা হল, শুধু তা দেখেই দেশের মানুষ চমকে উঠেছিল। সাধারণত সেখানে থাকত ফারাওদের বিজয়গাথা। এবারে সেখানে জায়গা পেল খুব সাধারণ মানুষের জীবন। প্রকৃতির ছবি। ফারাওয়ের নিজের ছবিও খোদাই করা হল একদম অন্যভাবে। অন্যদের মতো দেবতার উপাসনা করার মতো নয়, বা রথে দাঁড়িয়েও নয়। মিশরের মানুষ দেখল ফারাও আখেনাতেনের অন্দরমহলের একটা ছবি। সেখানে রাজা বসে আছেন ওঁর রানি নেফারতিতির সঙ্গে। ওঁদের কোলে ওঁদের তিন কন্যা। তাদের আদর করে চুমু খাচ্ছেন রাজা রানি।

‘আখেনাতেনের মূর্তিও ছিল বাকি ফারাওদের থেকে একদম আলাদা, বুঝলে। গুগলে আখেনাতেন বলে সার্চ করে একটা ছবি দেখো, তাহলেই বুঝতে পারবে।’

সত্যি দেখলাম ফারাওয়ের মূর্তিটা অদ্ভুতুড়ে রকমের।

‘এ কী, একম উদ্ভট কেন?’

আখেনাতেন

আখেনাতেনের মমি

‘উদ্ভট নয়, ভাই। খুব সম্ভবত এটাই কোনো ফারাওয়ের সবচেয়ে ঠিকঠাক রিফ্লেকশন। বাকিরা নিজেদের দেবতা বানানোর জন্য এতই ব্যস্ত ছিল যে তাদের সবার মূর্তি হত একইরকমের। গোল মুখ, চোখ, চওড়া কাঁধ, মেদ বর্জিত শরীর। অথচ ওদের কারোর মমির সঙ্গে এই আদল কখনো মেলেনি। কিন্তু আখেনাতেন চেয়েছিলেন দেশের মানুষ তাঁরর আসল রূপটাকেই মনে রাখুক। তাই ওঁর মূর্তিতে লম্বাটে নাক, মুখ, সামনের দিকে এগিয়ে আসা থুতনি, মোটা ঠোঁট। আমার্না শহরের বাউন্ডারিতে ফারাও আর নেফারতিতির ছবি আঁকা যে স্টেলা ছিল সেটা লক্ষ করলে আরও দেখতে পাবে যে ফারাওয়ের চওড়া কোমর, নেয়াপাতি ভুঁড়ির আভাস। আখেনাতেনের মমি পাওয়া গিয়েছিল ভ্যালি অফ দ্য কিংসের ৫৫ নম্বর টুম্বে। ২০০৭ সালে সেই মমির যখন সিটি স্ক্যান করা হয় তখন দেখা যায় যে এইসব ছবি, মূর্তির সঙ্গে আসল মানুষটার হুবহু মিল!’

পিজি এবারে খুব কাজের একটা কথা বলল,

‘কিন্তু, একটা কথা বলুন, ভবেশদা। আখেনাতেনের পরেও তো অনেক ফারাও এসেছেন। রামেসিস যেমন। তাঁরদের গল্প বলার সময় তো কখনো আতেনের কথা বলেননি। আখেতাতেনের শহরের কথাও শুনিনি।’

‘হ্যাঁ, শোননি, তার কারণ হল আখেনাতেন মারা যাওয়ার পরে ওঁর লেগাসি ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া হয়।’

‘আতেন দেশের একমাত্র আরাধ্য দেবতা হওয়ায় ক্ষতি হয়েছিল বাদবাকি মন্দিরের পুরোহিতদের। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল আমুনের মন্দিরের পুরোহিতরা। ওদের প্রতিপত্তি কমে গিয়েছিল। মন্দিরের রেভিনিউ বলেও কিছু ছিল না আর। ১৭ বছর রাজত্ব করার পরে ১৩৩৬ বিসি-তে আখেনাতেন মারা যান। তারপরে মাত্র তিন বছরের জন্য ফারাও হয়েছিলেন ওঁর ভাই স্মেনখেরে। তিনিও মারা গেলে পরে ফারাও বানিয়ে দেওয়া হয় দশ বছরের তুতানখাতেনকে। এই সময় আমুনের মন্দিরের পুরোহিতরা আবার হাল ধরেন। তুতানখাতেনের নাম বদলে রাখা হয় তুতানখামুন। আতেনের সব মন্দির ভেঙে ফেলা হয়। তুতানখামেনের পরের ফারাও হোরেমহেব আর তারও পরে দ্বিতীয় রামেসিস সিস্টেমেটিকালি ফারাও আখেনাতেনের সব মূর্তি ভেঙে মাটির তলায় পুঁতে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। কোনোরকম ডকুমেন্টে ওঁর নাম রাখা হয়নি। ওদের কাছে আখেনাতেন ছিলেন শয়তান। ওঁর সময়টা ছিল অভিশপ্ত। তাই তাঁরদের কোনো চিহ্নই আর রাখতে চাননি ওঁরা।’

‘আর আখেতাতেন শহরের কী হল?’

‘তুতানখামেন রাজা হওয়ার চার বছরের মধ্যে আখেতাতেনের শহর খালি করে রাজধানী আবার সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় থেবসে। পরিত্যক্ত শহরকে গ্রাস করে মরুভূমি। ১৮৯১ সালে ব্রিটিশ আর্কিয়োলজিস্ট ফ্লিন্ডার্স পেট্রি আবার এই শহর খুঁজে বের করেন।’

‘আর আমার্নার চিঠিগুলোর কথা বললেন না?’

‘ও হ্যাঁ, সে এক মজার গল্প, বুঝলে। ১৮৮৭ সালের একটা শীতের সকাল। আমার্নার বালির নীচে এক মহিলা জ্বালানি খুঁজছিলেন। আখেনাতেন শহর তৈরির সময় যে কাদামাটির ইট ব্যবহার করা হত বহু বছর মাটির নীচে থেকে থেকে সেটাই ভালো জ্বালানির কাজ করত। না জেনেবুঝে সেই ইটই গ্রামের মানুষ বালি খুঁড়ে তুলে নিয়ে যেত উনুন ধরানোর জন্য।

‘তা, সেই ইট খুঁজতে খুঁজতে মহিলাটির হাতে এসে পড়ে একটা ভাঙাচোরা কাঠের বাক্স। সেই বাক্সতে ছিল প্রায় ৪০০ খানা পোড়ামাটির তৈরি ট্যাবলেট। এর মূল্য সেই মহিলা বুঝতে পারেননি। তাই গ্রামেরই একজনের কাছে মাত্র কুিড় ইজিপশিয়ান মুদ্রার বিনিময়ে গোটা বাক্সটাই বিক্রি করে দেন। সেই লোকটি আবার বাক্সটা নিয়ে হাজির হন লাক্সরের এক অ্যান্টিক ডিলারের কাছে। সেই ডিলার এবারে এক একটা ট্যাবলেট চড়া দামে বিক্রি করতে থাকে চোরাবাজারে। ব্রিটিশ মিউজিয়ামের ইজিপশিয়ান ডিপার্টমেন্টের কিউরেটর ওয়ালিস বাজ সেসময় লাক্সরেই ছিলেন। তাঁরর হাতে এসে পৌঁছোয় কয়েকটা ট্যাবলেট।

‘ওয়ালিস বাজ কিউনিফর্ম লিপি পড়তে পারতেন। তাই ট্যাবলেটগুলো পড়ে বুঝতে পেরে যান এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব। প্রতিটা পোড়ামাটির স্ল্যাবই এক একটা চিঠি, যেগুলো মিশরের আশেপাশের ছোটো ছোটো প্রতিবেশী দেশের রাজারা লিখেছিলেন আখেনাতেনকে। সেখান থেকে ফারাওয়ের ফরেন পলিসির সম্পর্কে একটা দারুণ ধারণা পাওয়া যায়। পরে মোট অষ্টআশি খানা আমার্না লেটার ওয়ালিস বাজ উদ্ধার করে পাঠান ব্রিটিশ মিউজিয়ামে। আর কিছু চিঠি আছে কায়রো, বার্লিন আর ল্যুভর মিউজিয়ামে। যেগুলোর চোরাচালান আগেই হয়ে গিয়েছিল সেগুলোর কোনো পাত্তা এখন আর পাওয়া যায় না। শোভন জাটলা ভেবেছিলেন যে তেমনই একটা ট্যাবলেট হয়তো ওঁর হাতে এসে গেছে।’

‘আচ্ছা, এবারে কেসটা ভালোভাবে বুঝলাম।’

‘হুম, সবশেষে আরেকটা ইন্টারেস্টিং গল্প তোমাদের বলে রাখি, এটা না বললে আখেনাতেনের কথা শেষ হবে না। সেটা হল ওঁর স্ত্রী নেফারতিতির কথা।’

পিজি সঙ্গেসঙ্গে বলল,

‘হ্যাঁ, শুনেছি উনি নাকি দারুণ সুন্দরী ছিলেন!’

‘নেফারতিতি থেকে লিজ টেলর। যেকোনো সুন্দরী মহিলাকেই দেখছি তুমি চেনো, পিজি ভাই। আখেনাতেনের রানি সত্যিই ছিলেন অসামান্যা সুন্দরী। নেফারতিতি শব্দের মানেই হল ‘‘দ্য বিউটিফুল ওয়ান হ্যাজ কাম’’। ফারাও আমেনহোতেপ তাঁরর স্ত্রীকে প্রচণ্ড সম্মান দিতেন। ফারাওয়ের অধিকাংশ ছবিই থাকত স্ত্রী-র সঙ্গে। নিজের সঙ্গে সঙ্গে স্ত্রীকেও দেবতা আতেনের দূত হিসেবে পরিচয় দিতেন আখেনাতেন। এমনকী নেফারতিতির নামের দুটো কার্তুজও পাওয়া যায়, যে কার্তুজে শুধুমাত্র ফারাওদের নাম লেখারই চল ছিল।’

‘মানে ভদ্রমহিলা খুব ইনফ্লুয়েনশিয়ালও ছিলেন!’

‘তা আর বলতে! তো, আসলে যে গল্পটা বলব বলছিলাম। ১৯১২ সালে জার্মান আর্কিয়োলজিস্ট লাডউইগ বুর্কার্ড আখেতাতেন শহরের রুইনের মধ্যে একটা ভেঙে-পড়া বাড়ি খুঁজে পান। সেটা ছিল রয়াল স্কাল্পটার তুতমোসের। সেই বাড়িতে বিশাল বেডরুম, বাথরুম, স্টোরেজ প্লেস ছাড়াও ছিল একটা ওয়ার্কশপ। আর এই ওয়ার্কশপেই বুর্কার্ড খুঁজে পান স্বয়ং রানি নেফারতিতির একটা দারুণ আবক্ষ মূর্তি! চুনাপাথরের তৈরি, তার ওপরে জিপসামের প্লাস্টার করা। রানি যে কী দারুণ সুন্দরী ছিলেন সেটা এই মূর্তি দেখেই বোঝা যায়। ১৯৩৩ সালে ইজিপ্ট গভৰ্নমেন্ট জার্মানির কাছ থেকে এই মূর্তি ফেরত চান। কিন্তু হিটলার বেঁকে বসেন। ওঁর ইচ্ছা ছিল শুধুমাত্র ইজিপশিয়ান আর্টিফ্যাক্ট নিয়ে একটা বিশাল মিউজিয়াম বানানোর। আর সেই মিউজিয়ামের ঠিক মাঝখানে একটা ঘরে থাকবে নেফারতিতির সেই মূর্তি। তবে এই মূর্তির একটা অদ্ভুত রহস্য আছে, জানো। যেটার কিনারা করার জন্য আজও আর্কিয়োলজিস্টরা ইতিহাস হাতড়ে বেড়াচ্ছেন।’

‘এখানেও রহস্য! কী সেটা?’

‘নেফারতিতির মূর্তির গোটাটা রং করা হলেও ডান চোখটা ছিল আলাদাভাবে পাথরের তৈরি। তার ওপরে আঁকা কালো পিউপিল।’

‘আর বাঁ-চোখটা?’

‘ওখানেই তো রহস্য। সেখানে শুধু চোখের কোটরটাই আছে। নেফারতিতির মূর্তির বাঁ-চোখটা কোথায় সেটা কেউ জানে না !’

আরো বই সংগ্রহ করুন

বইয়ের গ্রুপবইয়ের চ্যানেলবাংলা লাইব্রেরী

বাংলা ইবুক লাইব্রেরী একটি টেলিগ্রাম ভিত্তিক ইন্টারনেটে সহজলভ্য বইয়ের সংগ্রহশালা। এখানে দেয়া সকল বই ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহীত। আমরা নতুন করে কোন ধরনের বইয়ের ডিজিটাল ভার্শন বানাই না। কারো কপিরাইট লঙ্গনের কোনরুপ অভিপ্রায় আমাদের নেই। আমরা নতুন বই কিনে পড়ার সুপারিশ করি।

হাতসেপসুত

গেল বুধবারে বিকেলের দিকে আমরা ভবেশদার দোকানে গিয়েছিলাম। তবে এবারে দু-জনে না, তিনজনে। আমি, পিজি আর সেতু। সেতু পিজির গার্লফ্রেন্ড, যার সঙ্গে রোজ রাত দুটো অবধি পিজি হেডফোনে গুজুর গুজুর করে। মেয়েটা বেশ মিশুকে। দক্ষিণ কলকাতায় বাড়ি। একবারের আলাপেই আমাদের বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল। পিজির কাছে সেতু ভবেশদার বলা অনেক গল্প শুনেছিল। নিজে ইতিহাসের ছাত্রী, তাই পিজি যেদিন আমাকে বলল সেতু ভবেশদার সঙ্গে আলাপ করতে চায় সেদিন আমি অবাক হইনি একদমই।

দোকানে গিয়ে দেখলাম ভবেশদা যথারীতি বই মুখে নিয়ে বসে আছেন। আমাদের দিকে মুখ তুলে তাকালেন। তারপরে সেতুকে দেখে কপালে জিজ্ঞাসার ভাঁজ পড়ল। পিজি একগাল হেসে বলল,

‘হেঁ হেঁ ভবেশদা, এ হল গিয়ে আমার বিশেষ বান্ধবী।’

‘হুঁ, সে তোমার দেঁতো হাসি দেখেই বুঝলাম।’

তারপরে সেতুর দিকে ফিরে বললেন,

‘কী নাম তোমার কন্যা?’

‘অদ্বিতীয়া, অদ্বিতীয়া চ্যাটার্জি। আমি এই প্রেসিডেন্সিতেই পড়ি। হিস্ট্রি অনার্স। প্রদীপ্তর মুখে আপনার অনেক কথা শুনেছি। বিগ ফ্যান হিয়ার! এবার থেকে মাঝে মাঝেই কিন্তু আমি ওদের সঙ্গে চলে আসব আপনাকে জ্বালাতে, যদি না আপনার আপত্তি থাকে।’

‘আরে, আপত্তি কীসের, এসব গল্প বলতে তো আমারও ভালোই লাগে। তোমার নামটা দারুণ সুন্দর। কিন্তু এত বড়ো নাম ধরে ডাকতে অসুবিধা হবে তো।’

‘আপনি আমাকে সেতু বলে ডাকতে পারেন, ডাকনাম আমার।’

‘বাহ, তবে তাই হবে, তবে সেতু, তোমার ভালোনামের সঙ্গে কিন্তু ইজিপ্টের এক বিখ্যাত ফারাওয়ের নামের বেশ মিল আছে।’

আমার একটু খটকা লাগল এবারে, বললাম,

‘ফারাওয়ের নামের সঙ্গে মিল? কিন্তু ফারাওরা তো সবাই পুরুষই হত।’

‘না, হাতে-গোনা কয়েকজন নারীও ফারাও হয়ে রাজত্ব করে গেছেন। ক্লিওপেট্রা নিজেই তো ফারাও ছিলেন। তবে এখন যাঁর কথা বলছি সে ক্লিওপেট্রার অনেক আগের। পৃথিবীর ইতিহাসের প্রথম সেলিব্রিটি মহিলা বলতে পারো।’

সেতু এটা শুনে প্রায় লাফিয়ে উঠল,

‘আরিব্বাস! আমার নামে ফারাওয়ের নাম! এই গল্পটা আপনাকে আজকেই বলতে হবে, ভবেশদা।’

ভবেশদা এবারে মুচকি হেসে বললেন,

‘তুমি আজ আমাদের গেস্ট, তোমার আবদার ফেলি কী করে? চলো, তাহলে বেনুর দোকানেই যাওয়া যাক।’

‘হাতসেপসুত, যে নামের মানে প্রথমা, অদ্বিতীয়া। প্রায় ১৫০০ বিসি-র কথা, বুঝলে। এইটিন্থ ডাইনেস্টির রাজা প্রথম তুতমোসিস আর তাঁরর রানি আহমোসের কন্যাসন্তান ছিলেন এই হাতসেপসুত।’

‘এই প্রথম তুতমোসিসের নির্দেশেই ভ্যালি অফ দ্য কিংসে রাজাদের কবর তৈরি করা শুরু হয় বলেছিলেন না?’

‘ঠিক ধরেছ, এ-ই সে। প্রথম তুতমোসিস একজন দুর্ধর্ষ রাজা ছিলেন। ইনি ইউফ্রেটিস নদী পেরিয়ে রাজত্ব ছড়িয়ে দেন উত্তর সিরিয়া আর পূর্ব ইরাকে। তুতমোসিস পনেরো বছর রাজত্ব করার পরে যখন মারা গেলেন তখন ওঁর জায়গাতে ফারাও হয়ে এলেন ওঁর আরেক সন্তান দ্বিতীয় তুতমোসিস। তোমাদের তো বলেইছি, মিশরের অনেক রাজপরিবারেই ভাই আর বোনের মধ্যে বিয়ে হত। এতে মনে করা হত রাজরক্ত অটুট থাকবে। তুতানখামেনও ওঁর বোনকে বিয়ে করেন। তা, সেরকমই হাতসেপসুতও বিয়ে করেন দ্বিতীয় তুতমোসিসকে। ওঁদের একটা মেয়ে হয়, নাম ছিল নেফেরুরে। দ্বিতীয় তুতমোসিসের অন্য আরেক স্ত্রী-র গর্ভে এক রাজপুত্রের জন্ম হয়, তৃতীয় তুতমোসিস।

‘কিন্তু একদিন যখন হঠাৎ দ্বিতীয় তুতমোসিস মারা গেলেন তখন রাজকুমারের বয়স মাত্র চার। সে ফারাও যদিও-বা হল কিন্তু তার পক্ষে তো আর রাজত্ব শাসন করা সম্ভব নয়। তাই সেই কাজে এগিয়ে এলেন ওর সৎমা হাতসেপসুত। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই দেখা গেল রানি নিজেকেই ফারাও বলে ঘোষণা করে দিলেন।’

পিজি এবারে বলল,

‘এরকমটা করলেই হল নাকি? দেশের লোকেরা ছেড়ে দেবে থোড়াই। চাইলাম আর ফারাও হয়ে গেলাম? তাও আবার মেয়ে হয়ে?’

সেতু এবারে পিজির দিকে কটমট করে তাকাতে পিজি ব্যাকফুটে চলে এল,

‘না, মানে দেখ, আমি ফেমিনিজমের এগেইনস্টে গিয়ে কিছু বলছি না। কিন্তু এতদিন ধরে ভবেশদার গল্প শুনে যা বুঝেছি তাতে ইজিপশিয়ান রয়াল ফ্যামিলিতে তো প্যাট্রিয়ার্কিটা খুব বেশি ছিল, তাই...’

ভবেশদা এবারে পিজিকে মাঝপথে থামিয়ে বললেন,

‘পিজি ভাই কিন্তু খুব ভুল কিছু বলেনি সেতু। এরকম চিন্তা হওয়াটা স্বাভাবিক। তবে রানি হাতসেপসুত ছিলেন মারাত্মক রকমের বুদ্ধিমতী, বুঝলে। দু-ভাবে নিজেকে ফারাও বানিয়েছিলেন তিনি।

‘প্রথমত রানি এটা বুঝেছিলেন যে স্রোতের বিপরীতে হাঁটতে গেলে দেশের সাধারণ মানুষের সাপোর্ট খুব দরকার। তাই প্রথম থেকেই দারুণ জনদরদি রূপ নিয়েছিলেন হাতসেপসুত। যেখানে ফারাওরা দেশের মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন সেখানে এই নতুন ফারাও কিন্তু দেশের মানুষের সঙ্গে মিশে গিয়েছিলেন। ওঁর রাজত্বকালেই প্রথমবার রাজসভার উঁচু উঁচু পদগুলো দেওয়া হয় সমাজের একদম গ্রাসরুট লেভেলের মানুষদের, যাদের হয়তো কোনো রয়াল লিনিয়েজ নেই, কিন্তু যোগ্যতা আছে। হাতসেপসুতের মন্ত্রী সেনেনমুতও ছিল এমনই একজন।

‘আর দ্বিতীয়ত হাতসেপসুত আরেকটা এমন পন্থা নিয়েছিলেন যাতে ওঁর অধস্তনেরা ওঁকে ফারাও বলে মানতে বাধ্য হয়। সেটা হল নিজের নামে মিথ তৈরি করা। তিনি নাকি স্বয়ং সূর্যদেব আমুন-রে-র সন্তান।’

‘মানে নিজেই নিজের জন্য মাইথোলজির গল্প বানিয়েছিলেন?’

‘একদমই তাই। এই প্রোপাগান্ডাকে সফল করার জন্য হাতসেপসুত নিজের নামে একটা বিশাল বড়ো মরচুয়ারি টেম্পল বানান, সেখানে দেবী হাথোর আর আনুবিসের মন্দিরও ছিল। এই টেম্পল ছিল ভ্যালি অফ দ্য কিংসের কাছেই। হাতসেপসুতের সেই মন্দিরের গায়ে ওঁর ওই বানানো গল্প খোদাই করা আছে।

‘স্বর্গে নাকি একদিন আমুন-রে ঠিক করেন যে তাঁরর একটা কন্যা হবে, যে মিশরে রাজত্ব করবে। জ্ঞানের দেবতা থত ঠিক করেন যে সেই মেয়েকে ধারণ করবেন রানি আহমোসে। সেইমতো আমুন নাকি আহমোসের সামনে এসে ওঁকে আশীর্বাদ করেন।’

হাতসেপসুতের মন্দির

পিজি এবারে ফিক করে হেসে বলল,

‘ব্যস, আশীর্বাদ করল আর অমনি... এ তো একদম আমাদের কুন্তীর মতো গল্প দেখছি।’

‘হ্যাঁ, সেরকমই বলতে পারো। তা, আমুনের এই আশীর্বাদের পরেই দেবতা খুম কুমোরের চাকা থেকে নিখুঁতভাবে তৈরি করেন হাতসেপসুতের আত্মাকে। ন-মাস পরে আহমোসে প্রসব করেন হাতসেপসুতকে। ব্যস, এভাবেই হাতসেপসুত হয়ে গেলেন আমুনের সন্তান। ওঁর জন্মের আগেই নাকি ঠিক ছিল যে উনি ফারাও হবেন। গুগলে হাতসেপসুত টেম্পল ওয়াল গ্রাফিতি বলে সার্চ করলেই দেখো ছবিগুলো পেয়ে যাবে।’

ভবেশদা বলার সঙ্গেসঙ্গেই সেতু সেই ছবি বের করে ফেলল, তিনজনে মিলে দেখলাম সেই ছবি। তখনই সেতু ভবেশদাকে বলল,

‘কিন্তু দাদা, এখানে তো হাতসেপসুতকে একদমই মেয়েদের মতো লাগছে না, আই মিন...’

‘আমি বুঝতে পেরেছি কী বলতে চাইছ, নারী শরীরের কোনো চিহ্নই নেই এর মধ্যে, তাই তো?’

‘হ্যাঁ।’

‘হাতসেপসুতের প্রথমদিককার কয়েকটা মূর্তি আছে বুঝলে, সেগুলো দেখলে কিন্তু বোঝা যেত এটা একজন মেয়েরই। তবে ওর রাজত্বের সপ্তম বছর থেকেই হাতসেপসুত একটা অদ্ভুত কাণ্ড করে বসেন। নিজেকে পুরোপুরি ফারাও প্রমাণ করার জন্য নিজের ছবি, মূর্তি সবেতেই নিজেকে পুরুষ হিসেবে দেখাতে থাকেন। পরনের জামাকাপড়ও হয়ে যায় একদম পুরুষেরই মতো। এমনকী নকল দাড়িও লাগাতে থাকেন হাতসেপসুত। প্রচ্ছন্নে বলতে পারো ফারাওদের প্যাট্রিয়ার্কির জয় হয়েছিল সেখানে। এমন দারুণ একজন মহিলাকেও নিজেকে বিপরীত লিঙ্গের বলে প্রতিপন্ন করতে হয়।’

হাতসেপসুত

সেতু এবারে বলল,

‘কিন্তু একটা জায়গাতে আমার একটু অদ্ভুত লাগছে, ভবেশদা। তৃতীয় তুতমোসিস তো একদিন নিশ্চয় সাবালক হয়েইছিল। সে এটা মেনে নিল কী করে যে তার সৎমা দেশের ফারাও, যেখানে থ্রোনেতে ওর অধিকারটাই বেশি?’

‘এটা একটা খুব ভালো প্রশ্ন করলে, বুঝলে। তুতমোসিস কোনোদিনই এটাকে মানতে পারেননি। কিন্তু হাতসেপসুতের জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে। ওঁকে সরিয়ে নিজেকে ফারাও বানাতে গেলে দেশের মানুষের রাগের কারণ হতে হত। তাই তুতমোসিসকে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হয়। সাড়ে বাইশ বছর রাজত্ব করার পরে হাতসেপসুত মারা যান। এরপরে তুতমোসিস রাজা হয়েই সৎমা-র ওপরে বদলা নিতে থাকেন।’

‘সেটা কীভাবে?’

‘কীভাবে আবার, ইতিহাস থেকে এই নারী ফারাওয়ের নাম মুছে দিতে চেয়েছিলেন ফারাও তুতমোসিস। তাই হাতসেপসুতের মন্দিরে থাকা ওঁর মূর্তিগুলো ভেঙে একটা গর্তে ফেলে দেওয়া হয়। কার্নাকের মন্দিরের গায়ে হাতসেপসুতের খোদাই করা ছবিও ছেনি দিয়ে তুলে দেওয়া হয়। ঠিক যেমনটা হয়েছিল তুতানখামেনের সঙ্গেও। অথচ দেখো দু-জনেই আজকে কত বিখ্যাত।’

‘আচ্ছা ভবেশদা, হাতসেপসুতের মমিটা কোথায় আছে?’

‘হাতসেপসুতের মমি মাত্র বারো বছর আগে আইডেন্টিফাই করা গেছে, স্পন্দন ভাই। সে আরেক ইন্টারেসটিং গল্প বুঝলে।

‘১৯০৩ সালে হাওয়ার্ড কার্টার ভ্যালি অফ দ্য কিংসে হাতসেপসুতের সমাধি খুঁজে পান। সেই সমাধির নম্বর ছিল কে ভি ২০। কিন্তু অন্য বাকি বেশিরভাগ টুম্বের মতোই কে ভি ২০তেও কোনো মমি পাওয়া যায়নি। শুধু পাওয়া গিয়েছিল হাতসেপসুতের নাম লেখা একটা বিশাল সারকোফেগাস। আবার সেই সালেই কাছাকাছির মধ্যেই আরেকটা খুব ছোট্ট কবর খুঁজে পান কার্টার। তার নাম ছিল কে ভি ৬০এ। এখানে একজন নারীর মমি খুঁজে পাওয়া যায়, বুঝলে। তার শরীরে ফারাওদের কোনো অ্যামুলেট ছিল না। ওটা ছিল হাতসেপসুতের ধাইমার মমি।

দেইর এল বাহরি থেকে পাওয়া কাঠের বাক্স

‘আবার অন্যদিকে ১৮৮১ সালে দেইর এল বাহরিতে অতগুলো মমি খুঁজে পাওয়া গেলেও হাতসেপসুতের মমি পাওয়া যায়নি। তবে খুব অদ্ভুতভাবে পাওয়া গিয়েছিল একটা বাক্স, তার গায়ে এই ফারাওয়ের নাম লেখা। বাক্সের ভেতরে ছিল একটা মামিফায়েড লিভার আর একটা দাঁত। মাড়ির পিছনের দিকের, তোমরা কী-একটা বল না এটাকে?’

‘মোলার?’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ, বাঁ-দিকের ওপরের পাটির মোলার দাঁত।’

‘সারকোফেগাস পাওয়া গেল, শরীরের ভেতরের অংশ পাওয়া গেল, এদিকে রানির মমিটাই হাওয়া!’

‘হাওয়া নয় মোটেই, ভায়া। হাওয়ার্ড কার্টারেরই দোষ বলতে পারো। যে মানুষটা দুর্দান্ত দক্ষতার সঙ্গে তুতানখামেনের সমাধি খুঁজে বের করেছিলেন সেই কে ভি ৬০-এর ভেতরে ভালো করে দেখেননি। পরের দেড়শো বছরে বালির নীচে ঢাকা পড়ে যায় এই কবরের মুখ।

‘১৮৮৯তে আমেরিকান আর্কিয়োলজিস্ট ডোনাল্ড রায়ান সেই ভ্যালি অফ দ্য কিংসেই কাজ করছিলেন। অন্য একটা কবরে ঢোকার আগে রাস্তা পরিষ্কার করার জন্য যখন মাটিতে ঝাঁট দিচ্ছেন তখনই একটা বড়ো পাথরের টুকরোতে ফাটল দেখতে পান। সেই পাথর সরাতেই আবার কে ভি ৬০-এর মুখটা খুলে যায়।

হাতসেপসুতের মমি

হাতসেপসুতের মমির সিটি স্ক্যান

‘অন্ধকার ছোট্ট কবরটা ছিল খুবই সাধারণ, কবরের দেওয়ালে তেমন কিছু দারুণ ছবিও আঁকা ছিল না। তবে কবরের এককোণে মেঝের দিকে তাকাতেই অবাক হয়ে যান ডোনাল্ড। সেখানে পড়ে আছে এক মহিলার মমি! বাঁ-হাতটা বুকের কাছে যেভাবে জড়ো করা ছিল তাতেই ডোনাল্ড বুঝতে পারেন যে এই মমি রাজপরিবারের কারোরই। তিনি তখন লাক্সরের একটা দোকান থেকে কাঠের কফিন বানিয়ে তাতে সেই মমিকে পুরে সেই সমাধির মধ্যেই রেখে দিয়ে আসেন।

‘এর পরে কেটে গিয়েছিল আরও সতেরো বছর। ২০০৬ সালে ইজিপ্টের আর্কিয়োলজিস্ট জাহি হাওয়াস আবার ব্যাপারটা নিয়ে মাথা ঘামাতে শুরু করেন। ততদিনে বাকি সব মহিলার মমি পরীক্ষানিরীক্ষা করে দেখা হলেও কোনোটাকেই হাতসেপসুতের মমি বলে আইডেন্টিফাই করা যায়নি। বাকি রয়ে গিয়েছিল ওই একটি মমিই। তাই ওটাকে ভ্যালি অফ দ্য কিংসের সেই কবর থেকে তুলে আনা হয় কায়রো ইউনিভার্সিটিতে। সেখানেই মমির সিটি স্ক্যান করা হয়। সিটি স্ক্যানের রিপোর্ট তৈরি করার সঙ্গেসঙ্গেই রেডিয়োলজিস্ট আসরাফ সেলিম দেখা করেন জাহি হাওয়াসের সঙ্গে। মমিতে উল্লেখযোগ্য কিছুই পাওয়া যায়নি। তবে ওপরের চোয়ালের একটা দাঁত মিসিং, হয়তো বয়সের কারণেই পড়ে গিয়েছিল।

‘এটা শুনেই জাহির মনে পড়ে যায় ১২০ বছর আগে দেইর এল বাহরি থেকে পাওয়া সেই কাঠের বাক্সটার কথা, তাতে একটা দাঁত পাওয়া গিয়েছিল না! সেই বাক্স রাখা ছিল কায়রো মিউজিয়ামেই। তাই সেই দাঁত খুঁজে পেতেও সমস্যা হল না। দেখা গেল দাঁতটা একদম মমির চোয়ালের সেই ফাঁকা জায়গাটায় বসে যাচ্ছে, একেবারে খাপে খাপ! ফারাও হাতসেপসুতের মমি এভাবেই খুঁজে পাওয়া গেল।’

‘দাঁত না থাকলে তবেই যে সেই দাঁতের মর্যাদা বোঝা যায়, হাতসেপসুত তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।’

আলেকজান্দ্রিয়া

‘দাদা, এখানে একটু আস্তে আস্তে কথা বলুন, আর এত ভিড় দাঁড়িয়ে গেলে বাকিরা ঢুকবে কী করে?’

‘আরে ভাই, আপনি একটু চুপ করুন না। দেখছেন না কী দারুণ সব গল্প বলছেন ইনি? এসব থোড়াই লেখা আছে আপনাদের ডিসপ্লে বোর্ডে?’

‘বেশ, ভালো। তাহলে আপনারা ওঁকে নিয়ে ঘরের বাইরে গিয়ে গল্প শুনুন।’

গতকাল আমরা তিনজনে মিলে ভবেশদাকে নিয়ে ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামে গিয়েছিলাম। একপ্রকার সেতুর গোঁয়ারতুমিতেই যাওয়া। কিন্তু গিয়ে বুঝলাম খুব একটা ভুল কিছু করিনি। সেই ছোট্টবেলায় বাবা মায়ের হাত ধরে একবার এসেছিলাম, আর এইবারে এলাম। এই বাড়িটা আমাদের শহরের একটা গর্ব, সত্যি। আমি আগে দিল্লির মিউজিয়ামও দেখে এসেছি, কিন্তু সেটা এর ধারেকাছেও আসে না। সম্রাট অশোকের পিলার, প্যালিওক্সডনের দাঁত, তিমির স্কেলিটন, আর্মাডিলোর খোলস, সিয়ামিজ টুইন, পাথরের ওপরে খোদাই করা বুদ্ধের বিশাল পায়ের ছাপ দেখে ঢুকলাম মমির ঘরে। এই মমির গল্প ভবেশদা আমাদেরকে আগেই বলেছিলেন। কিন্তু সেতুর সেই গল্প জানা না থাকায় ভবেশদা আবার শুরু করল। মিনিট তিনেকের মধ্যেই দেখলাম ওর চারপাশে একটা বেশ ভিড় জমে গেছে। সবাই চোখ বড়ো বড়ো করে মমি বানানোর প্রক্রিয়ার কথা শুনছে। এমন সময়েই বাধ সাধল সেই ঘরের গার্ড। বাইরে নাকি লম্বা লাইন পড়ে গেছে। কেউ আর ঘরে ঢুকতে পারছে না। অগত্যা জনা তিরিশ মানুষের ভিড়টাকে নিয়ে ভবেশদাকে মমি রুমের বাইরে বেরোতেই হল।

মমি রুমের বাইরের করিডোরটাতেই ভবেশদা স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে গল্প বলে যেতে লাগলেন। ভিড় আরও গেল বেড়ে। শেষে ‘চলুন ভবেশদা, আমাদের লেট হয়ে যাচ্ছে’ এই বলে পিজি ওঁর হাত ধরে টেনে বের করে নিয়ে এল।

‘কীসের লেট বলো তো? আর কোথাও যাবে নাকি আজকে?’

‘না, আর কোথায় আবার যাব? কিন্তু আমি না ডাকলে তো আজকে মিউজিয়াম বন্ধ না হওয়া অবদি আপনি বকবক করেই যেতেন ওদের সঙ্গে। এদিকে আমার খুব খিদেও পেয়ে গেছে।’

‘চলো, তাহলে বেরিয়ে পড়ি। সবই তো দেখা হয়ে গেল।’

পিজি এবারে বিজ্ঞের মতো গম্ভীরভাবে বলল,

‘না সব তো হয়নি, হ্যান্ডিক্রাফটের ঘরটা আমার একটু ভালো করে দেখার ইচ্ছা আছে।’

আমি বললাম, ‘তুই কী বুঝিস হ্যান্ডিক্রাফটের?’

‘অনেক কিছু বুঝি, জানিস, স্কুলে আমি অরিগামিতে ফার্স্ট হয়েছিলাম।’

‘হ্যাঁ বুঝলাম, কাগজের নৌকো, ফুল বানাতে পারলেই হ্যান্ডিক্রাফটে দিগ্্গজ হওয়া যায়। এত বুদ্ধি রাখিস কোথায় তুই বল তো?’

পিজি এবারে রেগে-মেগে আমাকে আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু সেতু থামাল ওকে।

‘তোরা থামবি এবারে? কথায় কথায় বাচ্চাদের মতো লড়িস দু-জনে। গ্রো আপ গাইজ! পিজি, তুই অন্য আরেকদিন এসে ওইসব জিনিস দেখে যাস। চলুন ভবেশদা, লাঞ্চটা করে নিই। আমি বাড়ি থেকে চিকেন স্যান্ডউইচ নিয়ে এসেছি। মা এটা হেব্বি বানায়!’

মিউজিয়াম থেকে বেরিয়ে উলটোদিকের ময়দানে একটা গাছের নীচে বসলাম চারজনে। সবাইকে স্যান্ডউইচ দিয়ে নিজেরটাতে এক কামড় বসিয়ে সেতু এবারে বলল,

‘ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম কারা তৈরি করেছিল বল তো?’

‘জানি তো, এশিয়াটিক সোসাইটি, ১৮১৪তে। মিউজিয়ামে ঢোকার মুখে একটা পাথরের স্ল্যাবে লেখা আছে দেখলি না?’

‘দেখেছি, কিন্তু এটা তৈরি হওয়ার পিছনে কিন্তু ইংরেজদের হাত ছিল না। ছিল একজন ড্যানিশ লোক।’

‘ড্যানিশ?’

‘হ্যাঁ, নাথানিয়েল ওয়ালিচ ছিলেন একজন ড্যানিশ বটানিস্ট। তিনিই তাঁরর ব্যক্তিগত সংগ্রহ নিয়ে একটা সংগ্রহশালা করার কথা বলেন এশিয়াটিক সোসাইটিকে। সেটাই আজকে ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম।’

ভবেশদা চুপ করে শুনছিলেন সব, এবারে বললেন,

‘আচ্ছা, মিউজিয়াম নামটা কোথা থেকে এল কেউ বলতে পারবে?’

এটা তো কারোরই জানা ছিল না, তিনজনেই চুপ করে আছি দেখে ভবেশদা এবারে নিজেই বললেন,

‘ইজিপ্ট দেশটা না থাকলে আজকে আমরা যেখানে বসে আছি তার নাম মিউজিয়াম না হয়ে অন্য কিছু হতে পারত কিন্তু।’

‘এখানেও ইজিপ্ট?’

‘হ্যাঁ ভাই, আরও ভালো করে বলতে গেলে দেশের উত্তরে সাগরের পাড়ের একটা শহর, যেখানে ছিল প্রাচীন পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের একটা, আর একটা পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো লাইব্রেরি।’

সেতু এবারে হাত তুলে বলল,

‘আমি জানি, আমি জানি! আলেকজান্দ্রিয়ার কথা বলছেন! সেই আশ্চর্যটা ছিল একটা লাইটহাউস। আর আলেকজান্দ্রিয়ার লাইব্রেরির কথাও শুনেছি তো। আগুনে পুড়ে শেষ হয়ে গিয়েছিল।’

‘একদম ঠিক বলেছ। আলেকজান্দ্রিয়ার লাইব্রেরিকে কী নামে ডাকা হত জানো?’

‘সেটা তো জানি না।’

ভবেশদা এবারে সেই ট্রেডমার্ক হাসিটা হেসে বললেন,

‘মিউজিয়াম!’

‘লাইব্রেরির নাম মিউজিয়াম?’

আলেকজান্ডারের দুষ্প্রাপ্য ছবি

‘হ্যাঁ, তাই। চলো, তাহলে আলেকজান্দ্রিয়ার গল্পটা গোড়া থেকেই বলা যাক। তাহলে তোমাদের বুঝতে সুবিধা হবে।

‘৩৩২ বিসি-তে পারসিয়ানদের হারিয়ে তার বিশাল বড়ো গ্রিক সেনাবাহিনী নিয়ে মিশরে ঢুকে পড়ল এক চব্বিশ বছরের যুবক। দেশের সাধারণ মানুষ পারসিয়ানদের অত্যাচার থেকে মুক্তি পেয়ে কৃতজ্ঞতায় মাথা নত করল সেই যুবকের কাছে। মেমফিস শহরে আমুনের মন্দিরের পুরোহিত তাকে ঘোষণা করল ভগবানের সন্তান হিসেবে। ঠিক যেমনভাবে তিন হাজার বছর ধরে বাকি ফারাওদের মানুষ চিনে এসেছে। লাক্সর আর কার্নাকের মন্দিরে খোদাই করা হল তার নাম, তার ছবি। আলেকজান্ডার হয়ে গেলেন মিশরের নতুন রাজা।

‘কিন্তু মেমফিসে বসে থাকলেন না আলেকজান্ডার। বেরিয়ে পড়লেন উত্তরের দিকে। হোমারের লেখা ওডিসি-তে পড়েছিলেন এমন একটা গ্রামের কথা যা নীল সমুদ্রের তীরে, যার কাছেই জলের মধ্যে জেগে উঠেছে একটা দ্বীপ। নাম ফারোস। সেই গ্রাম আর সেই দ্বীপ সত্যি খুঁজে পেলেন আলেকজান্ডার। এখান থেকে বাকি উপনিবেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করাটা খুব সহজ হয়ে যাবে, এই ভেবে তিনি ঠিক করলেন এখানেই একটা নতুন শহর গড়ে তোলা হোক। যেমন ভাবা তেমনি কাজ, এক বছরের মধ্যে আর্কিটেক্ট ডেইনোক্রাটিস বানিয়ে ফেলল সেই শহর, তার নাম দেওয়া হল আলেকজান্দ্রিয়া।

‘আলেকজান্দ্রিয়া গড়ে ওঠার এক বছরের মধ্যেই ৩৩১ বিসি-তে আলেকজান্ডার ইজিপ্ট ত্যাগ করে এগিয়ে যান মেসোপটেমিয়া জয় করতে। আট বছর পরে সম্রাট আবার ফিরে আসেন নিজের বানানো শহরে। তবে সেবারে কফিন বন্দি হয়ে।’

‘কিন্তু লাইব্রেরির কথাটা...’

‘হ্যাঁ, এবারে আসছি সেই কথায়। আলেকজান্ডার মারা যাওয়ার পরে বিশাল সাম্রাজ্য ভাগ হয়ে যায় ওঁর জেনারেলদের মধ্যে। তাঁরদের মধ্যেই একজন ছিলেন প্রথম টলেমি সোতার, যাঁর হাত ধরেই মিশরে শুরু হয় টলেমিদের যুগ। এই প্রথম টলেমির রাজসভাতে ছিলেন একজন দার্শনিক, নাম ছিল ডেমেট্রিয়াস। ডেমেট্রিয়াসই ফারাওকে বলেন আলেকজান্দ্রিয়াতে একটা লাইব্রেরি বানাবার কথা, যেখানে পৃথিবীর সব বইয়ের অন্তত একটা করে কপি থাকবে। সোতার সঙ্গেসঙ্গে রাজিও হয়ে যান।

‘তারপরে যে বিশাল লাইব্রেরি তৈরি হল ডেমেট্রিয়াস তার নাম রাখলেন ‘‘টেম্পল অফ মিউজেস’’। এরই গ্রিক নাম মিউজিয়াম।’

‘মিউজেস? এরা কারা?’

‘দেবতা জিউস আর নিমোসাইনের নয় কন্যা। ক্যালিওপে, সিলো, এরাটো, ইউটার্পে, মেলপোমেনে, পলিহিমনিয়া, তার্পসিশোরে, থালিয়া আর ইউরানিয়া। এঁরা ছিলেন সাহিত্য, কলা আর বিজ্ঞানের দেবী। তাই স্বাভাবিকভাবেই ডেমেট্রিয়াস আলেকজান্দ্রিয়ার লাইব্রেরিকে এঁদের নামে উৎসর্গ করেন।

নয় মিউজের সঙ্গে দেবতা অ্যাপোলো

‘সোতারের ছেলে ফারাও ফিলাদেলফিয়াসের সময় এই লাইব্রেরির আকার আরও বাড়ে। এক-শো জন স্কলার কাজ করত সেই লাইব্রেরিতে। তাদের কাজ ছিল পৃথিবীর চারিদিকের পাণ্ডুলিপি জোগাড় করা, তারপরে সেগুলোকে গ্রিক ভাষায় কপি করে জমানো। ইজিপশিয়ান তো বটেই, হিব্রু, আসিরিয়ান,পারসিয়ান এমনকী প্রচুর বুদ্ধিস্ট ম্যানাসক্রিপ্টও ছিল আলেকজান্দ্রিয়ার লাইব্রেরিতে। সব মিলিয়ে নাকি প্রায় পাঁচ লাখ পাণ্ডুলিপি ছিল এখানে!’

‘কিন্তু এত বড়ো একটা লাইব্রেরিতে আগুন লাগল কী করে?’

শিল্পীর কল্পনায় অতীতের আলেকজান্দ্রিয়া

আলেকজান্দ্রিয়ার লাইব্রেরি

আলেকজান্দ্রিয়ার লাইব্রেরি জ্বলছে, সামনে লাইট হাউস

‘আগুনই কিন্তু আলেকজান্দ্রিয়ার লাইব্রেরিকে শেষ করেনি, সেতু। তার সঙ্গে ছিল ধর্মান্ধতা।’

‘৪৮ বিসি-র কথা, রোমে তখন সিভিল ওয়ার চলছে জুলিয়াস সিজার আর পম্পেই নামের এক মিলিটারি লিডারের মধ্যে। ফারসালাসের যুদ্ধে সিজারের কাছে হেরে পম্পেই আশ্রয় নেন ইজিপ্টে। সিজার তখন মিশর আক্রমণ করে বসেন। আলেকজান্দ্রিয়ার সমুদ্রতীরে দাঁড় করিয়ে রাখা ইজিপশিয়ান জাহাজগুলোতে আগুন লাগিয়ে দেয় সিজারের সৈন্যরা। কিন্তু সেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে শহরের মধ্যেও। সেই আগুনেই আংশিকভাবে পুড়ে যায় আলেকজান্দ্রিয়ার লাইব্রেরি।’

‘আর বাকিটা?’

‘এই ঘটনার প্রায় ৭০০ বছর পরে ৬৪০ সালে আরবের হাতে চলে আসে মিশর। সেইসময়ে ওদের এক ধর্মীয় শাসক ছিল ক্যালিফ ওমর। ওমর এই লাইব্রেরির খবর পায়। তার মনে হয় এই লাইব্রেরিতে যা জ্ঞান আছে তার সব হয় কোরানের বিপক্ষে, নয়তো অবাস্তব। ওর নির্দেশেই লাইব্রেরি খালি করে সব পাণ্ডুলিপিগুলোকে নিয়ে এসে পাঠানো হয় শহরের ৪,০০০ স্নানাগারে।’

‘অ্যাঁ, সেখানে ম্যানাসক্রিপ্টগুলো কী করবে?’

‘শুনলে খুব খারাপ লাগবে, পাণ্ডুলিপিগুলো পুড়িয়ে সেইসব বাথ হাউসের জল গরম করা হয়, ছ-মাস ধরে পুড়তে থাকে প্রাচীন পৃথিবীর এই ঐশ্বর্য।’

পিজি এবারে বলল,

‘ধর্ম যে মানুষকে অন্ধ করে দেয় তার এর চেয়ে ভালো উদাহরণ মনে হয় আর হয় না। আমাদের দেশেরও কত প্রাচীন পুথি এইভাবে নষ্ট হয়ে গেছে। তবে ভবেশদা আপনি তো সেই লাইটহাউসটার ব্যাপারে কিছু বললেন না!’

‘আজকেই শুনবে? আমাকে যে উঠতে হবে এবারে। একজন দেখা করতে আসবে বাড়িতে।’

পিজি চট করে নিজের কবজির দিকে তাকিয়ে বলল,

‘সবে তো চারটে বাজে। আপনি বলুন লাইটহাউসের গল্পটা। আপনার আজকে লেট হওয়ার খেসারত হিসেবে আমি সবাইকে অনাদির মোগলাই খাইয়ে দেব না হয়।’

‘বাবা, একেবারে মোগলাই! তাহলে তো একঘণ্টা কেন, ঘণ্টা পাঁচেক লেট হলেও কিছু এসে যাবে না।’

এই বলে ভবেশদা উঠে গিয়ে একটু দূরে দাঁড়িয়ে খুব নীচু স্বরে ফোনে কারোর সঙ্গে কথা বলে এলেন। আমাদের সামনে বললে কী হত কে জানে। কথা শেষ হওয়ার পরে আবার ময়দানের ঘাসের ওপরে বসতে বসতে বললেন,

‘অল সেট, এবারে লাইটহাউসের কথা। প্রাচীন পৃথিবীর আরেকটা আশ্চর্য! যার আলো নাকি ১০০ মাইল দূর থেকেও দেখা যেত। একটু আগে ফারোজের দ্বীপের কথা বললাম না...’

‘হ্যাঁ, যার কথা ওডিসি-তে লেখা ছিল।’

‘হ্যাঁ, সেই দ্বীপেই ছিল এই লাইটহাউস। লাইব্রেরি যার সময় বানানো সেই প্রথম টলেমি সোতারই এটা বানানো শুরু করেছিলেন, কিন্তু শেষ হয় ওঁর ছেলে ফিলাডেলফিয়াসের সময়। আলেকজান্দ্রিয়ার মুল ভূখণ্ড থেকে ফারোর দ্বীপ অবদি সমুদ্রের বুকে তৈরি করা হয়েছিল গ্র্যানাইটের তৈরি একটা লম্বা সেতু। তার ওপর দিয়ে পৌঁছোনো যেত এখানে।’

‘এটা বানানো নিয়ে একটা মজার গল্প আছে জানো, সোসট্রাটোস নামের এক গ্রিক আর্কিটেক্টকে দেওয়া হয় লাইটহাউস বানানোর কাজ। ততদিনে সে গ্রিসে ডেলফি আর ডেলোসের দ্বীপে অ্যাপোলোর মন্দির বানিয়ে বেশ নামডাক করেছে। সেই লোক এমন একটা দারুণ কিছু বানিয়ে তাতে নিজের নাম লিখে রাখবে সেটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু টলেমির ইগোতে লেগেছিল এটা। সম্রাটের রাজত্বে সবেতেই সম্রাটের নামই থাকবে। এই ভেবে সোসট্রাটোসের খোদাই করা পাথরের ওপরে প্লাস্টার করে তার ওপরে দ্বিতীয় টলেমির নাম লেখা হল। কিন্তু বছর পঞ্চাশের মধ্যেই সেই প্লাস্টার খসে গেল। ততদিনে টলেমিও অক্কা পেয়েছেন। পরের ফারাওরা আর এইটা নিয়ে মাথা ঘামায়নি। তাই টলেমি না, সোসট্রাটোসের নাম বুকে নিয়েই দাঁড়িয়ে ছিল আলেকজান্দ্রিয়ার লাইটহাউস।’

পিজি এবারে লাফিয়ে উঠল,

‘আরে! এবারে মনে পড়েছে, অ্যাসাসিনস ক্রিড অরিজিন গেমটাতে এই লাইটহাউসটা ছিল...’

চট করে একটা চিমটি কেটে সেতু পিজিকে থামাল। পিজির অসময়ে বাজে বকার অভ্যেসের কথা যে ও জানে, সেটা বুঝলাম। ভবেশদা বলে চললেন,

‘প্রায় ১১৭ মিটার লম্বা ছিল এই বাতিঘর। মানে চল্লিশতলা একটা বাড়ির সমান! তিনটে তলা ছিল। একতলাটা চারকোনা। দোতলা অক্টাগোনাল আর একদম ওপরের তলাটা গম্বুজের মতো। সমুদ্রের নাবিকদের আলেকজান্দ্রিয়ার বন্দর চেনানোর জন্য বানানো হলেও একসময় একটা নাম করা টুরিস্ট অ্যাট্রাকশন হয়ে যায় এটা, বুঝলে। হাজার হাজার মানুষ আসত এটা দেখতে, একতলাতে আবার একটা রেস্তরাঁও ছিল টুরিস্টদের খাওয়ানোর জন্য। একটা প্যাঁচালো সিঁড়ি বেয়ে লাইটহাউসের একদম চূড়ায় উঠতে পারত তারা। মানে এখনকার আইফেল টাওয়ারের মতো ব্যবস্থা বলতে পারো।’

আলেকজান্দ্রিয়ার লাইট হাউস

‘কিন্তু তাহলে আলোটা আসত কোথা থেকে?’

‘কেন, সেটার সোর্স ওই চূড়াতেই। কাঠের জ্বালানির আগুন থেকেই আসত আলো। সেখানে দেবতা জিউস আর সমুদ্রের দেবতা পোসাইডনের মূর্তিও নাকি ছিল। আলেকজান্দ্রিয়ার লাইটহাউসের আলো নিয়ে অনেক মিথ আছে, জানো। অনেকে ভাবত ওখানে নাকি একটা বিশাল কাচের লেন্স বসানো ছিল! যেটা দিয়ে নাকি সমুদ্রে জাহাজে আগুন লাগিয়ে দেওয়া যেত! আবার কেউ ভাবত লেন্সের জায়গাতে একটা চকচকে ধাতব আয়না বসানো আছে। যার গায়ে আগুনের আলো রিফ্লেক্ট করে, তাই অত দূর থেকে দেখা যায় লাইটহাউসের আলো। তবে এর কোনোটাই প্রমাণিত নয়। গোটা সৌধটাই এখন সমুদ্রের তলায়।’

‘যাহ, এখন তার মানে ওর কিছুই আর দেখতে পাওয়া যায় না?’

‘না, ওই যে বললাম গোটাটাই এখন জলের নীচে। ১৯৬২ সালে জলের তলা থেকে পোসাইডনের মূর্তিটা উদ্ধার করা গিয়েছিল। আর কিছু পাথরের টুকরো। সেগুলোকে এখন আলেকজান্দ্রিয়ার মিউজিয়ামে রাখা আছে।’

‘এত বড়ো একটা লাইটহাউস জলের তলায় তলিয়ে গেল?! কী করে?’

‘একদিনে তো যায়নি, স্পন্দন ভাই। ১৬০০ বছর ধরে নাবিকদের আলো দেখিয়েছে এই লাইটহাউস। তারপরে একটু একটু করে ধ্বংস হয়ে গেছে। তার জন্য দায়ী প্রকৃতি আর মানুষের বোকামি।

‘৭৯৬ সালে একটা ভূমিকম্পে আলেকজান্দ্রিয়ার বাতিঘরের চূড়াটা ভেঙে পড়ে। পরে ৮৫০ সাল নাগাদ সুলতান ইবন তুলুন লাইটহাউসের চূড়ায় একটা মসজিদ বানান। অন্যদিকে কনস্ট্যান্টিনোপলের রাজার এটা নিয়ে একটা গাত্রদাহ ছিল। তাই একটা ফন্দি আঁটে এটাকে নষ্ট করার। মিশরে একটা গুজব ছড়িয়ে যায় যে এর নীচে নাকি প্রচুর ঐশ্বর্য পোঁতা আছে। ব্যস, লোভে পড়ে সুলতান আরম্ভ করে দিলেন বাতিঘর ভাঙতে। যতক্ষণে বুঝতে পারলেন বোকা বনেছেন ততক্ষণে আর প্রায় কিছুই বাকি নেই। একতলাটা শুধু অবশিষ্ট ছিল। পরে সেটুকুও গুঁড়িয়ে যায় ১৩০৩ সালের আরেক ভূমিকম্পে। এখন সেই জায়গায় সুলতান সালাদিনের কেল্লা দাঁড়িয়ে আছে।’

সেতু এবারে বাচ্চাদের মতো হাততালি দিয়ে বলল,

‘বাহ! একদিনে দুটো গল্প শুনে ফেললাম! সত্যি ভবেশদা, আপনার জবাব নেই!’

‘কিন্তু আলেকজান্দ্রিয়ার আসল মানুষটার গল্প তো বলা বাকি রয়ে গেল। সেটা না হয় অন্য কোনোদিন হবে। এখন চলো অনাদিতে।’

পিজি বলল,

‘আরে, মোগলাই তো আমি খাওয়াবই। ওঠার আগে এটা তো বলে দিন কার কথা বলছেন?’

‘বলে দেব? চিনতে পারবে তো? যদি বলি রানি তলাপাত্র?’

নাহ, ভবেশদার হেঁয়ালি করার অভ্যেসটা আর গেল না।

শেষ গল্প

আগের দিন মিউজিয়াম থেকে ধর্মতলার মোড় অবদি হেঁটে আসতে আসতেই মনে হচ্ছিল রানি তলাপাত্র নামটা কোথায় যেন শুনেছি। অনাদির মোগলাইতে কামড় দিয়েই মাথায় বিদ্যুৎ খেলে গিয়েছিল! তলাপাত্র... ব্লু নাইল বার... বসির খান!!

‘জুলফিকার! গট ইট!’

উত্তেজনার চোটে এত জোরে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়েছিলাম যে টেবিলে রাখা সসের বোতলটাই উলটে গেল। পিজি, সেতু, ভবেশদা তিনজনেই হাঁ করে তাকিয়ে ছিল আমার দিকে।

‘কী রে স্পন্দন! পাগল হলি নাকি!’

‘ইয়ে... মানে সরি... একটু এক্সাইটেড হয়ে গিয়েছিলাম।’

ভবেশদা আবার মাথা নীচু করে খাওয়ার দিকে মন দিয়েছিলেন। কাঁটা চামচে গাঁথা মোগলাইয়ের টুকরোতে কামড় দিয়ে বলেছিলেন,

‘স্পন্দন ভাই কিন্তু ঠিক ধরে ফেলেছে।’

‘কী ধরে ফেলেছে?’ পিজির মুখে-চোখে প্রশ্ন তখনও।

‘রানি তলাপাত্র! ধরে ফেলেছি!’

‘কে সে? বুঝতে পারলি?’

‘সৃজিত মুখার্জির জুলফিকার, মনে করে দেখ, তুই আর সেতু একসঙ্গে প্রিয়াতে দেখতে গিয়েছিলি, মনে আছে? আমাকে ডজ করে। আমি তখন বর্ধমানে ছিলাম। তারপরে আমাকে সেকেন্ড ইয়ারের অনীকের সঙ্গে...’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ মনে আছে, এত কিছু না বললেও চলবে, তোর গার্লফ্রেন্ড নেই তো আমি কী করব? জুলফিকারে রানি তলাপাত্র ছিল? কোনটা বল তো? ও ও! মনে পড়েছে! নুসরত জাহান করেছিল না ক্যারেক্টারটা?’

‘হ্যাঁ, এবারে ভাব সৃজিত জুলফিকারটা কোন প্লে দুটোর আদলে বানিয়েছিল।’

‘ওই তো, জুলিয়াস সিজার আর অ্যান্তনি ও...’

‘ক্লিওপেট্রা! রানি তলাপাত্রর রোলটা তো ক্লিওপেট্রার আদলেই ছিল, না!’

সেতু পিজির মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলল।

‘স্পট অন! কী ভবেশদা, ঠিক বলিনি?’

‘একদম ঠিক ধরেছ। এবারে মন দিয়ে খাও। এসব জিনিস ঠান্ডা হলে খেতে ভালো লাগে না অত।’

‘তাহলে ক্লিওপেট্রার গল্পটা কবে বলছেন!!’

সেদিনই ঠিক হল ভবেশদার বাড়িতেই সেই গল্প হবে। সেইমতো আগের রবিবার আমরা দু-জনে সোনারপুরে ওঁর বাড়ি গিয়েছিলাম। লাঞ্চের নেমন্তন্নও ছিল। সেতুরও যাওয়ার খুব ইচ্ছা ছিল, কিন্তু ওর মাসতুতো দাদার বিয়ে থাকায় যেতে পারেনি।

ভবেশদার বাড়ি পৌঁছোতে পৌঁছোতেই দুপুর আড়াইটে বেজে গিয়েছিল। খিদের চোটে পেটে ছুঁচোর রিলে রেস চলছিল, তাই গিয়েই বসে পড়লাম লাঞ্চের টেবিলে। ভবেশদাও আমাদের সঙ্গেই বসলেন।

‘ভাতের সঙ্গে মুগের ডাল, মাছের ডিমের বড়া, পাঁঠার মাংস আর চাটনি, ব্যস। এই আজকের মেনু। চলবে তো?’

‘চলবে মানে! দৌড়োবে!’

ভবেশদা যে রান্নাটা ফাটাফাটি করেন সেটা জানতামই। নিমেষের মধ্যে ডাল, ডিমের বড়া উড়িয়ে দিয়ে এসে পড়লাম মাংসের সমুদ্রে। খেতে খেতেই মনে পড়ল ক্লিওপেট্রার গল্পটা তো শোনা হচ্ছে না!

‘ও হ্যাঁ, ওইটা আজকে বলব বলেছিলাম, না? এটা বললেই আমার স্টক মোটামুটি শেষ, বুঝলে।’

‘যা! মানে, আর গল্প বলবেন না?’

‘অনেক তো শুনলে কয়েক মাস ধরে। এবারে না হয় নিজেরাও একটু পড়বে। যাই হোক, ক্লিওপেট্রার গল্পটা তাহলে শুরু করা যাক, নাকি? আগে বলো দেখি কতজন ক্লিওপেট্রা ছিলেন?’

‘কতজন মানে? আমি তো একজনকেই চিনি। সেই অ্যান্তনি আর ক্লিওপেট্রার গল্প। উফফ আবার মনে পড়ে গেল... লিজ টেলর...’

পিজি এর বেশি এগোবার আগেই আমি টেবিলের নীচে ওর পা-টা মাড়িয়ে দিলাম। বেটা বুঝতে পেরে থামল। আমি এবারে ভবেশদাকে বললাম,

‘একই নামের অনেক মানুষ ছিলেন নাকি?’

‘হ্যাঁ, ভাই। মিশরের ইতিহাসে তো এরকম অনেক উদাহরণ আছে। যেমন, রামেসিস প্রথম, দ্বিতীয়, আমেনহোতেপ প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ। তেমনই আমাদের এই ক্লিওপেট্রাও আসলে সপ্তম। মানে তার আগে ওই নামের আরও ছ-জন ছিলেন। গ্রিক ভাষায় ক্লিওস মানে গর্ব, আর পাট্রোস মানে পিতা। ক্লিওপেট্রা মানে হল পিতার গর্ব। আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের বোনের নাম ছিল ক্লিওপেট্রা। তাই অনেক টলেমি রাজাই নিজের কন্যার নাম ওই নামে রাখতেন। যদিও সপ্তম ক্লিওপেট্রার নিজেরও একটা নাম ছিল, ফিলোপাটোর।’

‘আচ্ছা, ক্লিওপেট্রাই মিশরের শেষ ফারাও ছিলেন, না?’

‘হ্যাঁ, টলেমিদের সঙ্গে সঙ্গেই মিশরে ফারাওদের রাজত্ব শেষ হয়। ক্লিওপেট্রার বাবা ছিলেন টুয়েলভথ টলেমি, তিনি যখন মারা যান তখন মিশরের সিংহাসনে একসঙ্গে রাজত্ব করতে শুরু করেন আঠেরো বছর বয়সের ক্লিওপেট্রা আর ওঁর ভাই থার্টিন্থ টলেমি। তবে একসময় দিদিকে দেশ থেকে তাড়িয়ে সিংহাসনে টলেমি একা বসে পড়েন। ক্লিওপেট্রা তখন সিরিয়াতে পালিয়ে যান, সেখানে গোপনে নিজের সেনাদল তৈরি করতে থাকেন।

‘আগের দিন তোমাদের পম্পেইয়ের কথা বলেছিলাম মনে আছে? যে মিশরে আশ্রয় নেওয়ার পরে সিজার আলেকজান্দ্রিয়া আক্রমণ করেন ৪৮ বিসি-তে?’

‘হ্যাঁ, বলেছিলেন তো। তখনই আলেকজান্দ্রিয়ার লাইব্রেরির একটা বড়ো অংশ পুড়ে যায়।’

‘ঠিক বলেছ। কিন্তু সিজার তারপরে কী করেন সেটা তো বলিনি। টলেমি প্রথমে পম্পেইকে আশ্রয় দিলেও সিজারের আক্রমণে ভয় পেয়ে ওঁকে হত্যা করেন। কিন্তু এতে জুলিয়াসের রাগ কমেনি। আলেকজান্দ্রিয়া দখল করেই সিজার শমন পাঠান। লক্ষ্য ছিল দুই ভাইবোনকেই দমন করে মিশরের দখল নেওয়া। ফারাও টলেমি আর ওদের আরও এক বোন আরসিনোই আর ফর্টিন্থ টলেমিকে বন্দি করা হল। বাকি রইল ক্লিওপেট্রা।’

অ্যাসটেরিক্স ও ক্লিওপেট্রা

‘একদিন জাহাজে করে সিরিয়া থেকে সিজারের জন্য একটা উপহার এল। একটা দারুণ সুন্দর কার্পেট। সেই কার্পেটকে সিজারের ঘরে নিয়ে যাওয়া হল। সিজারের বন্ধ ঘরে সেই গোটানো কার্পেটের মধ্যে থেকে বেরিয়ে এলেন ক্লিওপেট্রা। রাতারাতি ক্লিওপেট্রা হয়ে গেলেন সিজারের প্রেমিকা। তখন ওর বয়স একুশ, আর সিজারের বয়স বাহান্ন। সিজার তখন বিবাহিত।’

‘সিজারের ওপরে কেমন জাদু করে ফেলেছিলেন না ক্লিওপেট্রা! শুনেছিলাম নাকি ফাটাফাটি রকমের সুন্দরী ছিলেন!’

পিজি এবারে আমার কথার রেশ টেনে বলল,

‘হ্যাঁ, ‘‘অ্যাসটেরিক্স ও ক্লিওপেট্রা’’ কমিক্সটা পড়েছিলি তো। ওতে তো এটাসেটামিক্স বার বার বলছে ক্লিওপেট্রা দারুণ সুন্দরী। আর ওঁর নাকটা নাকি সবচেয়ে সুন্দর।’

‘তবে, সত্যি বলতে কী, চেহারায় কিন্তু রানি ক্লিওপেট্রা মোটেই মারকাটারি সুন্দরী ছিলেন না।’

‘তাই নাকি?’

‘হ্যাঁ ভাই, সৌন্দর্য তো আর শুধু শরীরে হয় না। ব্যক্তিত্বেও হয়। রানির ব্যক্তিত্বই নাকি তাঁরকে মোহময়ী করে তুলেছিল। প্লুটার্ক নামের এক হিস্টোরিয়ানের লেখাতে ক্লিওপেট্রার সম্পর্কে অনেকটা জানা যায়। তাঁরর মতে রানির মধ্যে নাকি একটা অদ্ভুত চার্ম ছিল। তিনি কথা বললে নাকি মনে হত বাদ্যযন্ত্রের অনেকগুলো তার পর পর কেঁপে উঠছে। এমনই মিষ্টি ছিল সেই গলার স্বর। তার সঙ্গে সঙ্গে ক্লিওপেট্রা ছিলেন দারুণ বিদুষীও। ম্যাথ, ফিলোজফি, অ্যাস্ট্রোলজিতে নাকি ছিল গভীর জ্ঞান। তা ছাড়া সাতটা ভাষায় কথা বলতে পারতেন। ক্লিওপেট্রাই টলেমিদের মধ্যে প্রথম যিনি মিশরীয়দের ভাষায় লিখতে পড়তে পারতেন। এবারে তোমরাই বলো, এহেন মহিলার আকর্ষণ উপেক্ষা করা কি সম্ভব কারোর পক্ষে?’

‘বাপ রে! সিজারকে দোষ দেওয়া যাবে না তাহলে দেখছি।’

জুলিয়াস সিজার ও ক্লিওপেট্রা

‘না, একদমই দেওয়া যাবে না। ক্লিওপেট্রা কৌশলে নিজের শত্রুকে বানিয়ে নিয়েছিলেন নিজের প্রেমিক। থার্টিন্থ টলেমি সিজারের বন্দিদশা থেকে পালিয়ে সম্রাটের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। সেই যুদ্ধে সিজার সহজেই জিতে যান আর পালাবার সময় ভূমধ্যসাগরে ডুবে যান টলেমি। মিশরের সিংহাসনে সিজার বসান ক্লিওপেট্রাকে।

‘ফারাও হওয়ার সঙ্গেসঙ্গেই ক্লিওপেট্রা নিজের কৌশলে দেশের মানুষের মন জয় করে নেন। নিজেকে ঘোষণা করেন দেবী আইসিসের অবতার হিসেবে। নিজের পোশাকও পরতে থাকেন আইসিসের মতোই। মিশরের মানুষ ওঁকে পুজো করতে থাকে। সিজার আর ক্লিওপেট্রার এক সন্তানও হয়। তার নাম রাখা হয় টলেমি সিজার। দেশের মানুষ আদর করে তার নাম রাখে সিজারিওন, মানে লিটল সিজার।

‘৪৬ বিসি-তে নিজের ছেলেকে নিয়ে ক্লিওপেট্রা এলেন রোমে সিজারের কাছে। সিজার সেইসময়ে ওঁর প্রেমে এতটাই পাগল যে রোমে ভেনাসের মন্দিরে আইসিস রূপী ক্লিওপেট্রার মূর্তি বসান। সেই মূর্তি ছিল সোনার তৈরি। পবিত্র মন্দিরে ভিন দেশের দেবীর মূর্তি, তাও রাজার উপপত্নীর আদলে। রোমে সেইসময় ঝড় উঠলেও সিজার পাত্তা দেননি।

‘তবে রানির সুখ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি, বুঝলে। আইডিস অফ মার্চের নাম শুনেছ?’

‘হ্যাঁ, এটা শুনব না! এই দিনেই জুলিয়াস সিজারকে খুন করা হয় তো।’

‘হ্যাঁ, ১৫ মার্চ, ৪৪ বিসি। রোমান সেনেটের মধ্যে সিজারকে খুন করল ষাট জন মিলে। তাদের নেতৃত্ব দিল ব্রুটাস আর ক্যাসিয়াস। ক্লিওপেট্রা সেইসময় রোমেই ছিলেন। সিজার মারা যাওয়ার পরেই আবার চলে এলেন মিশরে। তার কিছুদিন পরে ক্লিওপেট্রার আরেক ছোটোভাই ফর্টিন্থ টলেমি মারা গেল অস্বাভাবিকভাবে। অনেকে মনে করেন রানি নিজেই ওকে খুন করিয়েছিলেন।’

আমরা খাওয়া শেষ করে বসবার ঘরের সোফায় এসে বসলাম, ভবেশদা মুখে মৌরি নিয়ে চিবোতে চিবোতে আবার বলা শুরু করলেন,

‘সিজার মারা যাওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই সিজারের বন্ধু অ্যান্তনি আর সিজারের উত্তরাধিকারী অক্টাভিয়ান ওর হত্যাকারীদের খোঁজা শুরু করল। ওরা ক্লিওপেট্রার কাছে সাহায্য চাইল। রানিও নিজের যুদ্ধজাহাজগুলো নিয়ে রওনা দিলেন, কিন্তু পথে ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়ে অনেক জাহাজ নষ্ট হল। ক্লিওপেট্রাকে মিশরে ফিরে আসতে হল। অন্যদিকে ব্রুটাস আর ক্যাসিয়াস আত্মহত্যা করল। রোমান সাম্রাজ্যর অধিপতি হয়ে বসলেন অক্টাভিয়ান আর অ্যান্তনি।

অ্যান্তনি ও ক্লিওপেট্রা

‘অ্যান্তনির রাগ এবারে গিয়ে পড়ল ক্লিওপেট্রার ওপরে। যুদ্ধের সময় সাহায্য চেয়েও পাওয়া যায়নি। এর শাস্তি মিশরের ফারাওকে পেতেই হবে। অ্যান্তনি ডেকে পাঠালেন ক্লিওপেট্রাকে। এবারে রানিকে নিজের অস্তিত্ব রক্ষা করার জন্য কিছু একটা করতেই হত।’

‘ক্লিওপেট্রা এবারে অ্যান্তনিকে বশ করে ফেললেন, তাই তো?’

‘একদম তাই। এই অংশটা আর এর পরিণতি নিয়েই শেক্সপিয়রের প্লে আছে। ১৯৬৩ সালে রিলিজ হওয়া সেই বিখ্যাত সিনেমাটা আছে। ক্লিওপেট্রা অ্যান্তনির সঙ্গে দেখা করার জন্য যে জাহাজে করে গেলেন তা ছিল সোনায় মোড়ানো। তার দাঁড়গুলো ছিল রুপোর। পাল ছিল গোলাপি। স্বয়ং রানি অ্যান্তনির সামনে এলেন দেবী আইসিসের বেশে। ব্যস, এবারে অ্যান্তনির মুগ্ধ হওয়ার পালা। এবং সেটাই হলও। ক্লিওপেট্রা রাজি হলেন অ্যান্তনিকে প্রয়োজনে যুদ্ধে সাহায্য করার জন্য। তার বদলে ওঁর বোন আরসিনোইকে খুন করতে হবে।’

‘ক্লিওপেট্রা নিজের বোনকেও ছাড়েননি!’

‘না, কেন ছাড়বে? সিংহাসনের দাবিদারদের সরিয়ে দিতে হবে না! অ্যান্তনির নির্দেশে রোমে মন্দিরের সিঁড়িতে খুন করা হল আরসিনোইকে। অ্যান্তনি ক্লিওপেট্রার সঙ্গেই বেশ কয়েক বছর কাটালেন ইজিপ্টে। অ্যান্তনির খুব শখ ছিল নিজেকে রোমান দেবতা বাক্কাসের মতো দেখার। ওকে সঙ্গ দেওয়ার জন্য ক্লিওপেট্রা এবারে বাক্কাসের স্ত্রী দেবী অ্যাফ্রোদিতির মতো সাজতে লাগলেন। দু-জনে মিলে সমাজের উঁচু অংশের মানুষদের নিয়ে একটা দল খুললেন, সেই দলের কাজই ছিল মদ খাওয়া, ফুর্তি করা আর জুয়ো খেলা। সেইসময় ওঁদের দুটি সন্তানও হয়, তাদের নাম ছিল আলেকজান্ডার হেলিওস আর ক্লিওপেট্রা সিলিন। গ্রিক হেলিওস মানে সূর্য আর সিলিন মানে চাঁদ। এর দু-বছর বাদে ওদের আরেকজন পুত্রসন্তান জন্মায়। দ্বিতীয় টলেমির নামে ক্লিওপেট্রা তার নাম রাখেন ফিলাডেলফাস।

‘এমন সময়ই হঠাৎ অ্যান্তনির ভাই লুসিয়াস অক্টাভিয়ানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করে দেয়। সেই যুদ্ধে লুসিয়াস হেরে গেলেও অ্যান্তনির সঙ্গে অক্টাভিয়ানের সম্পর্ক তিক্ত হতে থাকে।

‘৩২ বিসি-তে অক্টাভিয়ান অ্যান্তনির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন । পৃথিবীর ইতিহাসে এটা বিখ্যাত ‘‘ব্যাটেল অফ অ্যাক্টিয়াম’’ নামে। ক্লিওপেট্রা আর অ্যান্তনির সামরিক শক্তি ছিল অক্টাভিয়ানের দ্বিগুণ। কিন্তু তার পরেও ওরা হেরে বসে অক্টাভিয়ানের কাছে।’

‘কেন?’

‘কারণ ভালো নেতৃত্বের অভাব। প্রচুর সৈন্য থাকলেও ভালো সেনাপতি ছিল না ওদের। অন্যদিকে অক্টাভিয়ানের সেনাপতি ছিল আগ্রিপ্পা। ওর ওয়ার স্ট্র্যাটেজির কাছে বিশ্রীভাবে হেরে যায় অ্যান্তনি আর ক্লিওপেট্রা। তারপরেই দু-জনে পালিয়ে আসে ইজিপ্টে। পিছনে ধাওয়া করতে করতে আসেন অক্টাভিয়ান।

‘অক্টাভিয়ান মিশরে পৌঁছোনোর পরে অ্যান্তনি আরও একবার চেষ্টা করেন যুদ্ধে জেতবার। এবারেও ফল হয় এক। অ্যান্তনি এবারে আত্মহত্যা করার জন্য নিজের পেটে তলোয়ার বসিয়ে দেন। রক্তাক্ত অ্যান্তনিকে আনা হয় ক্লিওপেট্রার কাছে। ওঁর কোলেই অ্যান্তনি মারা যান। কিন্তু ক্লিওপেট্রা আত্মহত্যা করার আগেই সেখানে অক্টাভিয়ানের সৈন্যরা চলে আসে। বন্দি করা হয় ওঁকে।

‘ক্লিওপেট্রাকে বাঁচিয়ে রাখার পিছনে অক্টাভিয়ানের একটা উদ্দেশ্য ছিল। তিনি ভেবেছিলেন রোমের রাস্তা দিয়ে বন্দিনী ফারাওকে হাঁটিয়ে নিয়ে যাবেন। কিন্তু সেই খবর কোনোভাবে ক্লিওপেট্রার কাছে পৌঁছে যায়। তার পরেই ক্লিওপেট্রা আত্মহত্যা করেন।’

অক্টাভিয়ান ও ক্লিওপেট্রা

আমি এবারে বললাম,

‘ক্লিওপেট্রার আত্মহত্যাটাও একটা মিথ না ! শুনেছিলাম সাপের বিষে তিনি মারা যান।’

ক্লিওপেট্রার আত্মহত্যা

‘বিষের ব্যাপারে রানির অনেক জ্ঞান ছিল, বুঝলে ভায়া। যতরকমের বিষ হয় তার সব রকমের প্রয়োগ তিনি করতেন মৃত্যুদণ্ড পাওয়া আসামিদের ওপরে। তারপরে দেখতেন কোন বিষ কত জলদি কাজ করে, কোনটায় ব্যথা হয়, কোনটায় ব্যথা হয় না। জেলখানার প্রহরীদের চোখে ধুলো দিয়ে রানির জন্য একঝুড়ি ভরতি মিষ্টি ডুমুর ফল আনা হয়। তার ভিতরে লুকোনো ছিল বিষাক্ত অ্যাস্প সাপ। এটা একরকমের ইজিপশিয়ান কোবরা, বুঝলে। এই সাপেরই ছোবল নিজের বুকে নেন রানি। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ওঁর শরীর ঘামতে থাকে, স্নায়ু দুর্বল হয়ে যায়। ঘুম এসে যায়। ক্লিওপেট্রার গোটা শরীরের নড়াচড়ার ক্ষমতা হারিয়ে যায়।’

‘হুমম, কোবরার বিষ তো নিউরোটক্সিন, ফরেনসিক মেডিসিনে পড়েছিলাম, একটা ছোবলে প্রায় আড়াইশো মিলিগ্রাম বিষ থাকে। আর মাত্র পনেরো মিলিগ্রামই একটা মানুষকে মেরে ফেলার জন্য যথেষ্ট।’

জ্ঞান দেওয়ার সুযোগ পেলে পিজি ছাড়ে না।

ভবেশদা পিজির দিকে তাকিয়ে সম্মতিসূচকভাবে ঘাড় নেড়ে এবারে বললেন,

‘আত্মহত্যার খবর পেয়ে অক্টাভিয়ান যখন ক্লিওপেট্রার কাছে পৌঁছোলেন তখনও ওঁর দেহে ক্ষীণ হলেও প্রাণ আছে। রাজা নাকি তখন বিষ বের করার জন্য ওঝাদের ডেকে পাঠান কিন্তু তারা এসে পৌঁছোনোর আগেই সব শেষ হয়ে যায়। মিশরের শেষ ফারাও মারা যান ১২ অগাস্ট, ৩০ বিসি। এর পরেই মিশরে শুরু হয় রোমানদের রাজত্ব। এই অগাস্ট মাসের নামকরণের সঙ্গেও ক্লিওপেট্রা জড়িয়ে আছেন, জানো!’

‘সেটা কীরকম?’

‘অক্টাভিয়ান যুদ্ধ জিতে দেশে ফিরে রোমান সাম্রাজ্যের রাজা হয়ে বসেন নতুন উপাধি নিয়ে, অগাস্টাস। এই সময় সম্রাটকে নিজের পছন্দমতো একটা মাসের নামকরণ করতে দেওয়া হয়। অগাস্টাস নবম মাসে জন্মালেও কিন্তু নিজের জন্ম মাসকে বেছে নেননি। নিয়েছিলেন অষ্টম মাসকে। কারণ সেই মাসেই ক্লিওপেট্রা মারা যান। যেটা সম্রাটের কাছে বেশি গর্বের বিষয় ছিল।’

‘আচ্ছা, একটা কথা বললেন না, ক্লিওপেট্রার সন্তানদের কী হল?’

‘ক্লিওপেট্রা মারা যাওয়ার সতেরো দিনের মাথায় সিজারিয়নকে খুন করেন অক্টাভিয়ান। কারণ ওর শরীরে ছিল সিজারের রক্ত। তাই বড়ো হয়ে রোমের মসনদের দাবি করতেই পারত। ক্লিওপেট্রার বাকি দুই ছেলে আর এক মেয়েকে রোমে নিয়ে আসেন অক্টাভিয়ান।’

‘আর ক্লিওপেট্রার সমাধি?’

‘ওইটা এখনও পর্যন্ত একটা রহস্যই রয়ে গেছে, বুঝলে। অ্যান্তনি আর ক্লিওপেট্রাকে একসঙ্গে কবর দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেটার খোঁজ আজ অবদি কেউ পায়নি। ’

সেদিন যখন ভবেশদার বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসছি তখন ভবেশদা হঠাৎ বললেন,

‘আরে এক মিনিট ওয়েট করে যাও, একটা জিনিস ভুলেই গেছি।’

এই বলে আমাদের বাড়ির চৌকাঠেই দাঁড় করিয়ে রেখে ভেতরের ঘরে গেল। মিনিট পাঁচেক অপেক্ষা করিয়ে রাখার পরে বেরিয়ে এলেন হাতে একটা বাক্সমতো নিয়ে। লাল চকচকে কাগজ দিয়ে মোড়ানো। গিফট র‌্যাপের মতো। সেইটা পিজির হাতে দিয়ে বললেন,

‘এইটা তোমাদের জন্য।’

‘কী এটা?’

‘একটা বই, জয়েস টিলডেসলির লেখা। ইজিপশিয়ান আর্কিয়োলজির নাম করা প্রফেসর। এই বইটা এখন দুষ্প্রাপ্য, আউট অফ প্রিন্ট। কিন্তু তোমাদের ইজিপ্ট নিয়ে যা আগ্রহ দেখলাম তাতে মনে হল এটা তোমাদের পড়া উচিত।’

‘কিন্তু এত দামি একটা বই গিফট করে দেওয়ার কী দরকার ছিল? আমরা না হয় পড়ে আপনাকে ফেরত দিয়ে দিতাম।’

‘আরে না না, বইটা আমার পড়া, আর দাদা কি ভাইদের কিছু দিতে পারে না নাকি? এখন মুখ বুজে এটা নিয়ে বাড়ি যাও দেখি।’

হোস্টেলের ঘরে ঢুকেই দু-জনে মিলে বসে গেলাম গিফটটা নিয়ে। লাল র‌্যাপটা সরাতেই বেরিয়ে এল ভেতরের বইটা। বেশ মোটা, কালো রঙের মলাট। মলাটের ওপরে দ্বিতীয় রামেসিসের ছবি। বইটার নাম ‘ফারাওস’।

বইটাতে ফারাওয়ের সময়ের প্রথম দিন থেকে ডাইনেস্টি অনুযায়ী তাদের কথা লেখা আছে দেখলাম। তার সঙ্গে দারুণ দারুণ হাই ডেফিনিশন ছবি! এক ঝলকের জন্য পিজি পাতা উলটে উলটে দেখছিল, আমি ওর পাশে বসে ছিলাম। কিন্তু হঠাৎ এমন একটা কিছু দেখতে পেলাম যেটার জন্য আমরা কেউই প্রস্তুত ছিলাম না!

বইটাকে বাইরে থেকে দেখে বুঝতেই পারিনি যে ওর প্রথম পঞ্চাশটা পাতার পরের পাতাগুলোর মধ্যে একটা চৌকো গর্ত করা! দেখে মনে হচ্ছিল কেউ খুব যত্ন নিয়ে পাতার মাঝখানগুলো কেটে গর্তটা বানিয়েছে। গর্তের ভিতরে রাখা একটা ভাঁজ করা কাগজ আর একটা ছোট্ট লাল ভেলভেটের বাক্স। মেয়েদের আংটি বা কানের দুলের বাক্স যেমন হয়।

আমরা হতভম্বের মতো মুখ নিয়ে দু-জন দু-জনের দিকে তাকালাম। কাঁপা কাঁপা হাতে কাগজটা নিয়ে পিজি পড়তে শুরু করল,

‘আর হয়তো কোনদিনও তোমাদের সঙ্গে আমার দেখা হবে না। আমি নিজে আর কতদিন বেঁচে থাকব সেটাই জানি না। যেকোনোদিন খুন হয়ে যেতে পারি...’

এতটা পড়েই সঙ্গেসঙ্গে পিজি ফোনটা নিয়ে ভবেশদাকে কল করল, বারকয়েক চেষ্টা করার পরে আমার দিকে তাকিয়ে বলল,

‘সুইচড অফ বলছে! এক্ষুনি ওর বাড়ি যেতে হবে, কুইক!’

‘পাবি না ওঁকে বাড়িতে গেলে, দেখ কী লেখা আছে।’

চিঠির বাকিটা ছিল এরকম,

...তোমরা যখন এই চিঠিটা পড়ছ ততক্ষণে আমি কলকাতা এয়ারপোর্টে, আমাকে খোঁজার চেষ্টা কোরো না, প্লিজ। তোমাদের দায়িত্ব আজ থেকে অনেক বেড়ে গেল। আমার একটা সম্পদ তোমাদেরকে দিয়ে গেলাম। আর কারোর ওপরে ভরসা করতে পারলাম না। খুব সাবধানে রেখো নিজের কাছে। কাউকে বিশ্বাস কোরো না, কাউকে না। যদি বেঁচে থাকি তাহলে আমি নিজেই যোগাযোগ করব তোমাদের সঙ্গে।’

চিঠিটার মাথামুন্ডু কিচ্ছু বুঝতে পারছিলাম না। কীসের দায়িত্ব? কে খুন করতে চাইবে ভবেশদাকে? কোন সম্পদের কথা বলছেন উনি?

তখনই খেয়াল হল লাল বাক্সটার কথা,

কাঁপা কাঁপা হাতে ছোট্ট বাক্সটা খুলে দেখলাম ভিতরে ফোমের আস্তরণ । সেটা সরাতেই বেরিয়ে এল একটা সাদা পাথরের টুকরো। কিন্তু কালচে হয়ে এসেছে। বোঝা যায় এর বয়স অনেক।

টুকরোটা চকচকে, মসৃণ। মাকুর মতো আকার। তার মাঝখানে কালো গোল দাগ, সেই দাগের চারিদিকে একটা গাঢ় বাদামি রিং। ওটাকে চেনার জন্য ডাক্তারির ছাত্রের দরকার নেই।

আমার হাতের তালুতে যেটা ছিল সেটা একটা পাথরের চোখ!

রানি নেফারতিতির চোখ ভবেশদার কাছে কী করে এল?

কোথায় গেল ভবেশদা?

পিজি ও স্পন্দন কি পারল ভবেশদাকে খুঁজে বের করতে?

আসছে এমন এক অ্যাডভেঞ্চার যাতে জুড়ে আছে

আমাদের শহর কলকাতা,

টেমস আর স্প্রি নদীর পাড়ের

দুটো শহর আর

হায়রোগ্লিফের দেশটা।

পরিশিষ্ট ১

মিশরের ইতিহাসের সময়পঞ্জি

পরিশিষ্ট ২

আধুিনক মিশরের ম্যাপ

পরিশিষ্ট ৩

মিশরীয় দেবদেবী

আতুম: প্রথম দেবতা। যিনি সৃষ্টি করেছেন সব কিছুকে।

তেফনুত: আর্দ্রতার দেবী। তেফনুতের শরীর মানবীর হলেও মাথা সিংহীর।

শু: তেফনুতের স্বামী, নুত আর গেবের বাবা। তেফনুত আর শু-ই প্রথম দেবদেবী, যাঁদের জন্ম দেন আতুম। শু আলো আর বাতাসের দেবতা।নুত- দেবতা ওসাইরিস, আইসিস, সেথ আর নেফথিসের মা। নুতের লম্বা শরীর আকাশের মতো পৃথিবীকে ঘিরে থাকে। প্রতিদিন সকালে নুত সূর্যের জন্ম দেন, আবার সন্ধেবেলায় গিলে নেন। কফিনে, কবরের ছাদে বা মন্দিরের সিলিংয়ে আঁকা থাকত নুতের ছবি। গেব- গেব নুতের ভাই, আবার স্বামীও। গেব পৃথিবীর দেবতা। মানুষ মারা গেলে গেব তাকে তাঁর শরীরে স্থান দেন।

আমুন: অন্য আরও নাম- আমেন, আমন। মিশরের থেবস শহরের প্রধান দেবতা। একসময় এঁর সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয় সূর্যের দেবতা রা-কে। নতুন নাম হয় আমুন-রা। আমুনের দেহ মানুষের হলেও কখনো কখনো পাহাড়ি ভেড়া বা রাজহাঁসেরও রূপ ধারণ করেন। আমুন কথার মানেই হল যা লুকোনো, ছদ্মবেশী। আমুনের কাল্ট পরে ছড়িয়ে পড়ে ইথিওপিয়া, লিবিয়া, নুবিয়া, প্যালেস্তিনে। গ্রিকরা আতুমকে দেবতা জিউসের সঙ্গে তুলনা করত।

আনুবিস: শেয়ালদেবতা৷ বাবা সেথ, মা নেফথিস। মামিফিকেশনের দেবতা। আনুবিসই প্রথম মমি তৈরি করেন। সেই মমি ছিল দেবতা ওসাইরিসের। মৃতের আত্মার বিচারের সময়ও সেখানে আনুবিস থাকেন।

রা: সূর্যদেবতা৷ মাথাটা বাজপাখির, মুকুটে সূর্য আর একটা সাপ থাকে। রাতের বেলায় রা যখন মাটির নীচে যাত্রা করেন তখন তাঁর মাথাটা হয়ে যায় ভেড়ার। রা-এর সঙ্গে অনেক দেবতাকে মিশিয়ে দেওয়া হয় পরে। যেমন আমুনের সঙ্গে মিশে আমুন-রা, দেবতা মন্টুর সঙ্গে মিশে মন্টু-রা, আবার দেবতা হোরাসের সঙ্গে মিশে রা-হোরাখতি। মনে করা হত সব ফারাওরাই রা- এর সন্তান। হেলিওপলিসে ছিল এঁর মন্দির।

বাস্তেত: এঁর মাথাটা বিড়ালের। সুখ, আনন্দের দেবী। বাস্তেতের মন্দির ছিল বুবাস্তিস নামের এক শহরে। সেই শহরে বিড়ালের পুজো হত। তারা মারা গেলে তাদের মমি করে রাখার চল ছিল।

বেস: অন্যান্য দেবদেবীর থেকে একদম আলাদা বেস। বেঁটে, অদ্ভুত রকমের দেখতে, জিভ বেরিয়ে আছে বাইরে। ইনি ভালো সময়ের দেবতা। আবার প্রসবের সময় হবু মায়েদের রক্ষা করতেন বেস।

হাপি: নীল নদের বানে যে পলি পড়ত তার দেবতা হাপি। উর্বরতার দেবতা। হাপির একটা বড়ো ভুঁড়ি আছে। পুরুষ হলেও স্তন বড়ো। হাপির মাথার মুকুট জলজ উদ্ভিদ দিয়ে বানানো। হাপির মন্দির ছিল আসওয়ানে।

আইসিস: ওসাইরিসের স্ত্রী, হোরাসের মা। মৃত ওসাইরিসকে নতুন জীবন দিয়েছিলেন আইসিস, তাই তিনি ডাক্তারির দেবী। আইসিসের মুকুটে একটা সিংহাসন থাকে। আইসিসের সবচেয়ে বড়ো মন্দির ছিল ফিলিতে। লন্ডনেও রোমান সাম্রাজ্যের সময়কার আইসিসের একটা মন্দির পাওয়া গেছে।

ওসাইরিস: প্রথম দেবতা যাঁর মমি তৈরি হয়েছিল। মাটির নীচের জগতের রক্ষাকর্তা ইনি। এঁর শরীরের গঠনও মমির মতো। ইনি চাষবাসেরও দেবতা। ওসাইরিসের সবচেয়ে বড়ো মন্দির ছিল অ্যাবিদসে।

সেথ: অন্য নাম- সেত, সেতেখ, সুতি, সুতেখ। দেবতা ওসাইরিসের ভাই। ইনি ওসাইরিসকে খুন করেন। এঁর সঙ্গেই পরে সিংহাসনের অধিকার নিয়ে লড়াই হয় হোরাসের। এঁর শরীরটা মানুষের হলেও মাথাটা এক অদ্ভুত দর্শন প্রাণীর। সেথ দেবতা রা-এর সঙ্গে থাকেন। বাজে আবহাওয়া আর ঝড়ের জন্য দায়ী ইনি।

নেফথিস: গেব আর নুতের সন্তান, দেবতা সেথের স্ত্রী। মৃত আত্মাকে রক্ষা করেন নেফথিস। তাই মমির কফিনে নেফথিসের ছবি থাকত, যেখানে দুটো হাত পাখির ডানার মতো।

হাথোর: দেবতা রা-এর মেয়ে। দেবতা হোরাসের স্ত্রী। প্রেম, সৌন্দর্য, আনন্দ, সংগীতের দেবী। হাথোরের তিনটে রূপ। গোরুর মতো, নারীর শরীর যার কান দুটো গোরুর আর নারী যার মুকুটে গরুর শিং আছে। হাথোরের সবচেয়ে বড়ো মন্দির ছিল দেনদারাতে। কূট মানবজাতিকে শাস্তি দেওয়ার জন্য দেবতা রা একবার হাথোরকে পৃথিবীতে পাঠান। হাথোর উন্মত্ত অবস্থায় নির্বিচারে মানুষ মারতে থাকেন। শেষে মদ খাইয়ে নেশাতুর করে তাঁকে শান্ত করা হয়।

হোরাস: ওসাইরিস এবং আইসিসের সন্তান। এঁর মাথাটা বাজপাখির। ফারাওদের রক্ষাকর্তা হলেন হোরাস। হোরাসের সবচেয়ে বড়ো মন্দির ছিল এডফুতে।

খুম: সেই দেবতা যিনি নীল নদ তৈরি করেছিলেন। এঁর শরীরটা মানুষের হলেও মাথাটা মেষের। খরার সময় মিশরীয়রা খুমের পুজো করত।

খনসু: অন্য নাম- খেনসু, খনস, খুনস। চাঁদের দেবতা। এঁর মাথাটা ছিল বাজপাখির, মুকুটে থাকত একফালি চাঁদ আর পূর্ণিমার চাঁদ। শয়তান আত্মাদের দেবতা খনসু দূর করতেন। রাজা দ্বিতীয় রামেসিস তাঁর বন্ধু এক সিরিয়ান রাজার কাছে খুনসুর মুর্তি পাঠান, সেই রাজার অসুস্থ মেয়ের দ্রুত আরোগ্য কামনা করে। কার্নাকে ছিল এঁর মন্দির।

মাত: ন্যায় এবং বিচারের দেবী। জগতের ভারসাম্য রক্ষার দায়িত্ব ছিল মাতের ওপরে। মৃত্যুর পরে আত্মার বিচারও করতেন মাত।

মন্টু: যুদ্ধের দেবতা। এঁর আশীর্বাদেই নাকি সমগ্র মিশরকে এক রাজত্বের ছাতার তলায় আনতে পেরেছিলেন ফারাওরা।

মুত: দেবতা রা-এর কন্যা, আমুনের স্ত্রী। মায়ের মতো ইনি ফারাওদের রক্ষা করতেন। এঁর মুকুটে একটা শকুন থাকত।

তাহ: কারিগরি বিদ্যার দেবতা। আবার কোনো কোনো পুরাণে বলা আছে ইনি নাকি পৃথিবীর সৃষ্টিও করেছিলেন। তাহ-এর শরীরটা মমির মতো, মাথা মোড়ানো। মেমফিসে তাহ-এর মন্দির ছিল।

সোবেক: কুমিরের মাথাওয়ালা দেবতা। মুকুটে একজোড়া শিং-এর সঙ্গে থাকত একজোড়া পালক৷ কোম ওম্বোতে ছিল এঁর মন্দির। সেখানে কুমিরের মমি বানিয়ে রাখা হত। এখনও সেই মমি দেখতে পাওয়া যায়।

থথ: বিদ্যা আর জ্ঞানের দেবতা। শরীরটা মানুষের হলেও মাথাটা আইবিস পাখির মতো। কখনো আবার বেবুনের রূপও ধারণ করেন। ইনিই নাকি হায়রোগ্লিফিক হরফ সৃষ্টি করেন। গ্রিকরা এঁকে দেবতা হারমিসের সঙ্গে তুলনা করত৷ মৃতের আত্মার বিচারের সময় থথ পাপ পুণ্যের হিসেব লিখে রাখেন। এঁর মন্দির ছিল হারমোপলিসে।

আতেন: এই দেবতার কোনো মানুষ বা পশুর রূপ নেই। আতেনের প্রতীক একটা গোল চাকতি, সূর্য। ফারাও চতুর্থ আমেনহোতেপ আতেনের পুজো শুরু করেন। তখন তিনি নিজের নাম বদলে রাখেন আখেনাতেন।

নেইথ: অন্য নাম- নিত, নেত। শিকার আর যুদ্ধের দেবী। মিশরের দক্ষিণে নীল নদের পশ্চিম পাড়ে ছিল এই দেবীর মন্দির।

সেখমেত: অন্য নাম- সাখমেত, সাকমিস, সাখেত। যুদ্ধ আর শুশ্রূষার দেবী। যুদ্ধের সময় ইনি ফারাওদের রক্ষা করতেন। সেখমেতের মাথাটা ছিল সিংহীর। এঁর শ্বাস থেকেই নাকি মরুভূমির সৃষ্টি হয়েছিল।

তাওয়ারেত: উর্বরতার দেবী। মেয়েরা সন্তান লাভের আশায় এঁর পুজো করত। এঁর গোটা শরীরটা জলহস্তীর মতো হলেও পিঠটা কুমিরের।

সেশাত: বুদ্ধি, জ্ঞানের দেবী। ইনি প্যাপিরাসের ওপরে সময়ের ইতিহাস লিখে রাখেন। এঁর পুজো মন্দিরে হত না, হত লাইব্রেরিতে।

সহায়ক গ্রন্থতালিকা

1. Joyce Tyldesley.

Egypt, How a Lost Civilization was Rediscovered,

BBC Books, 2005.

2. TGH James.

An Introduction to Ancient Egypt.

British Museum Publications Limited, 1979

3. Bill Manley.

Egyptian Hieroglyphs for Complete Beginners.

Thames and Hudson, 2012.

4. Mark Collier, Bill Manley

How to Read Egyptian Hieroglyphs.

British Museum Press, 1998.

5. Ahmed M Abul Ella

By Way of Accident.

Self published, Printed in Great Britain by Amazon, 2014.

6. Joyce Tyldesley.

The Penguin Book of Myths and Legends of Ancient Egypt.

Penguin books, 2011.

7. National Geographic History Magazines.

Jan-Feb 2016

July-Aug 2017

Nov-Dec 2017

8. Editor- Dale M Brown.

Egypt: Land of The Pharaohs.

Time-Life Books, 1992.

9. Joyce Tyldesley.

The Pharaohs.

Quercus Books, 2009.