শুরুর কথা
রাত ১১-২০, শনিবার
মাগাঙ্গা মাটিটু
লুডেওয়া, তাঞ্জানিয়া
পূর্ব আফ্রিকা
গত সোমবার তিন নম্বর পিট্ থেকে একটা দারুণ নমুনা পাওয়া গেছে, পাওয়া এস্তক গডফ্রে খুব উত্তেজিত ছিলো। উত্তেজিত কারণ ম্যাগনেটাইট ওরের মধ্যে এই ধরনের কিছু পাওয়া যেতে পারে সে কখনো শোনেনি। তাই বিশ্বাস হয় না। কিন্তু সত্যি হলে বড়ো খবর। গডফ্রে এই প্রজেক্টের সহকারী ভূবিজ্ঞানী। নমুনাটা আনতে আনতে প্রায় সন্ধ্যে হয়ে গিয়েছিলো। পুরো প্রমাণ হাতে না পেয়ে লাফালাফি করে লোক হাসাবার পাত্র গডফ্রে নয়। তবু এখানকার প্রধান ভূবিজ্ঞানী জোসেফকে কিছু একটা না বললে চলে না। ফিরে এসে জোসেফকে বলাতে ও কোনো গুরুত্বই দিলো না। বরং একটু রেগে গিয়ে অনুসন্ধান পরিকল্পনার বাইরে পাকামো করতে মানা করে দিলো। গডফ্রে কত করে বোঝানোর চেষ্টা করলো, আজকের নমুনাটা অনেকটা আলাদা, নতুন কিছু পাবার সম্ভাবনা আছে। একবার দার এস সালামে এক্স.আর.এফ করতে দেওয়া উচিত। এক্স.আর.এফ মেশিনে পরীক্ষা করলে তবেই না নির্ভুল ভাবে জানা যাবে ওই নমুনায় কোন উপাদান কতটা আছে। চোখে দেখে যা মনে হচ্ছে, সেটা বড়ো ব্যাপার। তাই সঠিক যন্ত্র দিয়ে পরীক্ষা করিয়ে সেটাকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। তাতে জোসেফ আরও বিরক্ত হয়ে ওকে বললো, ‘দেখো বেশি সেয়ানাগিরি দেখিও না, আয়রন ওর আর কয়লা খোঁজা আমাদের কাজ, সেজন্যই টাকা পাই। যদি চাকরিটা করে যেতে চাও, তবে নিজের কাজে মতলব রাখো। যখন নিয়ে এসেছো, তখন যাও নমুনাটাকে কোরশেডের ভিতরে ছোট শেডটার সামনে রেখে এসো। মার্কিং করে নম্বর দিয়ে রাখবে। অন্য নমুনার সাথে যেন মিশে না যায়।’
২০১২ সাল থেকে জম্বে অঞ্চলের ছটা জেলার মধ্যে একটা হলো লুডেওয়া। দার এস সালাম থেকে আটশো কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে একটা অনুন্নত এলাকা লুডেওয়া। মাগাঙ্গা মাটিটুতে আয়রন ওরের খনি আর কাটেওয়াকে কয়লার খনি এখনো তেমন ভাবে লোকচক্ষুর সামনে আসেনি। মেহেতা গ্রুপের পূর্ব আফ্রিকাতে বেশ কিছু ব্যবসা আছে, হোটেল, সিমেন্ট, সার আরও কত কী! গত দশ বছরে মেহেতা গ্রুপের উন্নতি চোখে পড়ার মতো। মেহেতা গ্রুপ এই ইস্পাতের ব্যবসায় নতুন। দুটো খনির লাইসেন্স নিয়ে, একদল ভূবিজ্ঞানী আর রসায়নবিদ নিয়ে দল বানিয়ে গত ক’মাস ধরে ক্যাম্প বানিয়ে আছে। ক্যাম্প বলতে বাঁশ পাতার ঘর, মানানসই একটা হল যেখানে খাওয়া আর টিভি দেখা হয়। একটু দূরে সবার জন্য রান্নার থাকার জায়গা ইত্যাদি। শক্ত পোক্ত পাকা বলতে কোর শেডটা। কোরশেডে মাটি খুঁড়ে আনা নমুনা ঠিকঠাক লোহার তাকে গুছিয়ে রাখা থাকে। বিদ্যুতের জন্য জেনারেটার আছে, তবে হিসেবে করে চালানো হয়। দিনের বেলা কাজের দরকার না হলে বন্ধ থাকে। যাতায়াতের জন্য দুটো জায়গা মিলিয়ে তিনটে গাড়ি আছে। রাসায়নাগারটি একেবারে ছোটো, আসল কাজ হেড অফিসে হয়। এই দলটার কাজ হ’ল একটা রিসোর্সে রিপোর্ট বানানো। মাগাঙ্গা মাটিটুর খনি প্রধানত তিনটে ছোট ছোট পাহাড়ের মধ্যে ছড়িয়ে আছে। কোম্পানি নিশ্চিত ভাবে জানতে চায়, এই পাহাড় - বনে কত লক্ষ টন আকর জমা আছে। আকর বলতে প্রাথমিক ভাবে লোহা আর কয়লার খনিতে কয়লা। সেটাই প্রথম কাজ। তারপর জানতে হয় এই লক্ষ লক্ষ টন আকর থেকে বাস্তবে কত টন ইস্পাত তৈরি হতে পারে। তার ওপর হিসেবে হবে এখানে এসে পয়সা ও পরিশ্রম খরচটা লাভজনক হবে কিনা। সেটা নির্ধারণ করার বিশেষজ্ঞরা আলাদা। পুরো ব্যাপারটা বিশেষ গোপনীয়তার সাথে চলছে। বালি পাথর মাটির সাথে কতটা কী মিশে আছে, যত কম লোকে জানে কোম্পানির পক্ষে ততই ভালো।
গডফ্রের প্রচুর জীবনীশক্তি। একদম বসে থাকতে ভালোবাসে না, ঘুরে বেড়াতে আর মাথা খাটাতে ভালোবাসে। আর সেই মাথা খাটানোটা যখন নিজের রোজকার কাজের গন্ডি ছাড়িয়ে যায়, তখন কখনো কখনো অসুবিধের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যেমন ওদের প্ল্যান্টের জন্য যে জমিটা নেওয়া হয়েছে, সেটার চেয়ে ভালো জমি পাওয়া যাবে বলে ওর মনে হয়েছে। গডফ্রে প্রজেক্টের লোক নয়। কিন্তু জল, বিদ্যুৎ আর রাস্তা জমির কাছে থাকাটা যে দরকার, সেটা সে বোঝে। তাই লুপালী নদীর পাশের জমিটা ওর বেশি উপযুক্ত মনে হয়েছে। জমিটার বিবরণ আর সুবিধার কথা একটা রিপোর্ট বানিয়ে, কোম্পানির চেয়ারম্যান মিঃ মেহেতার কাছে পাঠিয়ে দেয়। রিপোর্টটা ওনার পছন্দ হয়, এবং ওনার পি এ ফোন করে গডফ্রেকে, জমিটার পুরো ম্যাপ বানিয়ে পাঠাতে বলে। উনি আরও বলে দেন, ভারত থেকে যে বিশেষজ্ঞ আসবে, তার কাছ থেকে এ বিষয়ে যেন বিশেষ রায় নেওয়া হয়। ওনার মতামত পাবার পর, কোম্পানি জমিটার জন্য সরকারের কাছে আবেদন করতে চায়। আপাতত খনির একটা সঠিক মূল্যায়ন হোক আর মন্ত্রালয় থেকে জমিটা সম্বন্ধে খোঁজ খবর চলুক। খবরটা চাপা থাকে না। জোসেফ ওকে প্রকান্তরে বুঝিয়ে দিয়েছে ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাওয়া ওর পছন্দ নয়। গডফ্রে হেসে বলেছিলো, ‘আমার আর ঘাসের মাঝখানে না থাকলেই তো পারো।’
দার এস সালামের সামোরা এভিনিউয়ে তানজানিয়ার খনি মন্ত্রালয়। সকাল সাড়ে সাতটায় অফিস খুলে যায়। সেখান থেকে ইস্মানি রোডে ফোন গেলো।
‘স্যার, মাগাঙ্গা মাটিটুর জমির জন্য একটা দরখাস্ত আসতে চলেছে। আপনি বলেছিলেন আপনাকে ব্যক্তিগতভাবে খবর দিতে।’
‘এক ঘন্টার মধ্যে লোক পাঠাচ্ছি, জমির কো-অর্ডিনেটস, ম্যাপ সব খবর দিয়ে সিল করা খাম হাতে হাতে দেবে।’
‘দরখাস্ত জমা পড়লে কিন্তু বেশিদিন আটকে রাখা যাবেনা। মাননীয় মন্ত্রী নিজে চাইছেন ওখানে কারখানা হোক। স্থানীয় লোকেদের কিছু রোজগারের পথ খুলুক।’
‘হোক। আমি বাধা দেবার কে? কেনই বা দিতে যাবো। শুধু যেখানে সেখানে যেন না হয়। তোমাকে মাথা ঘামাতে হবে না, দরখাস্ত আসবে না।।’
কোর ড্রিলিং তো শেষের দিকেই ছিলো তবু পুরো কাজটা শেষ হবার আগে গডফ্রেকে, পরের দিন থেকে ম্যাপিং করতে পাঠানো হলো। এ নিয়ে আপত্তি করার তো উপায় নেই। তানজানিয়ার বাজারে ভূবিজ্ঞানীর কাজ খুব কম, পাকামো করে নিজের কৌতুহল মিটাতে গিয়ে কাজ খোয়ালে আর পাওয়া যাবে না। এর দুদিন পর কোর শেডে গিয়ে গডফ্রের চোখে পড়লো, ওর আনা স্যাম্পলটা যেখানে রেখেছিলো সেখানে নেই। গডফ্রের মনে হলো, জোসেফ যেমন ত্যাঁদড়, ফেলে দিলো নাকি? ওদের কোর শেডটা বেশ বড়। তার ডানদিকে দুটো ঘর, তালা মারাই থাকে। আজ খোলা আছে, আর কিছু কোর বক্স গাড়িতে তোলা হচ্ছে। স্যাম্পল সাইটের বাইরে পাঠানোর কাজটা গডফ্রের। কাজটা সাবধানে না করলে উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে যাবার সম্ভাবনা আর সবাই গডফ্রেকে কাজের ছেলে বলে জানে। গাড়িটা চলে যাবার পর দেখলো নোয়েল দরজা বন্ধ করতে যাচ্ছে।
গডফ্রের কী মনে হলো জিজ্ঞেস করলো, ‘সাত এ নম্বর কোর বক্সটা পাঠালি?’ নোয়েল একটু অবাক হয়ে বললো, ‘জোসেফ যে লিস্ট দিয়েছে তাতে সাত এ নেই।’
‘নেই, কী যে করে না। চলতো ভিতরে গিয়ে দেখি।’ নোয়েল একটু ইতস্তত করে দরজাটা খুললো।
সাত এ বলে কোনো বাক্স পাওয়া গেলোনা। নোয়েল গজগজ করতে করতে দরজা বন্ধ করলো। কিন্তু গডফ্রের তখন অনেক কিছু দেখা হয়ে গেছে। কোর স্যাম্পল চিরকাল খোলা শেডে তাকের ওপর থাকে। ঘরের মধ্যে তালা মারা কেন রে বাবা। আর একটা ভাঙা কোরের টুকরো দেখে হাতে তুলে নিলো গডফ্রে। সোমবারে পাওয়া কোরটার সাথে কোথাও যেন মিল আছে। কী আছে ওই পিট গুলোতে, যে স্যাম্পলগুলোকে এমন চোখের আড়ালে রাখতে হবে।
নোয়েলের চোখ বাঁচিয়ে গডফ্রে স্যাম্পলটা সাথে নিলো। নোয়েল এমনিতেই গডফ্রেকে বিশেষ পছন্দ করে না। তাই দেখে ফেললে বিরাট ঝামেলা করবে। নোয়েলের রাগের কারণ পেশাদারি নয়। কারণটা গ্রেস। এই ক্যাম্পে তিনজন নারীর মধ্যে একজন। যেমনটা সাধারণ নিয়মে হয়ে থাকে গডফ্রে আর গ্রেসের মধ্যে একটা সম্পর্ক ক্যাম্পে তৈরি হয়েছে। আর সবাই ভাবে ক্যাম্প ভেঙে গেলে হয়তো সম্পর্কও ভেঙে যাবে। এই পাহাড় জঙ্গলের জীবন, তার প্রয়োজনীয়তা বিচিত্র। শহরের আপাত সভ্য এখানকার পরিবেশে সেটা অবাস্তব ও অসত্য। গ্রেস তা মোটেই ভাবে না, সে নিজের মতো করে গডফ্রেকে ভালোবাসে। ঘর বাঁধতে চায়, যতদিন তা না হচ্ছে, সেই স্বপ্ন নিয়ে খুশি থাকতে চায়। আর মনে প্রাণে বিশ্বাস করে গডফ্রেও তার মতোই ভাবছে। সব জেনেও নোয়েল গ্রেসকে একান্ত নিজের করে রাখতে চায়। তার ধারণা তার লম্বা পেটানো শরীর তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের দূরে রাখবে। গডফ্রে যতটা না গ্রেসকে পছন্দ করে, গ্রেস গডফ্রেকে পছন্দ করে অনেকটা বেশি। ক্যাম্পের আকর্ষণ, প্রেম এই পরিবেশের মতোই বন্য। গতকাল লুপালী নদীর ধারের জমিটার ড্রিলিং করতে গিয়ে যা দেখেছে তাতে গডফ্রে স্বাভাবিক ভাবে ভয় পেয়ে গিয়েছে। কাউকে কিছু বলতে পারছে না।
দেওয়ালের কান আছে। বেচারা গডফ্রে জানে না দেওয়ালের কান থাকলে, খোলা মাঠের চোখ আছে।
ক্যাম্পের আইন কানুন একটু ঢিলে ঢালা হলেও, কাজের সময় মদ খাওয়া ভালো চোখে দেখা হয় না। সন্ধ্যাবেলা রেশন করে দেওয়া আলোয় সবাইকে একসাথে মিলতেই হয়। শনিবার রাতে টিভিতে যতটা দেখা যায়। তারপর গিটার বাজিয়ে গান, নাচ, মদ্যপান। গডফ্রের গিটারে আর গলায় অনেক সুর। সবাই ওর গানের প্রতীক্ষায় থাকে। গন্ডগোলটা কিভাবে শুরু হয়েছিল কারোর ঠিক জানা নেই। দুনিয়ার অর্ধেক চেঁচামেচির দায়, হয় সুরা নয় ব্লাড প্রেসারের ওপর গিয়ে পরে। নোয়েল গডফ্রের ওপর রাগ করে চেঁচাচ্ছিলো। আসল কথা না ব’লে, ‘কাজ করিস না। কোর শেডে ছোঁক ছোঁক করিস ইত্যাদি।’ বলে চেঁচাচ্ছিলো। আসল কথা বলে চেঁচালে লাভ নেই। নারীর দেহ মন জয় করতে গেলে অধিকার ফলালেই চলে না। যাহোক জোসেফ এসে নোয়েলকে নিয়ে চলে গেলো। কিন্তু আসরের ছেঁড়া সুর আর জোড়া লাগলো না। গডফ্রে সন্ধ্যের আগেই একবার দরকারি কথা বলতে গ্রেসের ঘরে এসেছিলো। তখনি কিন্তু গ্রেসের অদ্ভুত লাগছিলো। রাতে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে গডফ্রে চলে গিয়েছিলো। এতোসব হবার পর গ্রেস নিশ্চিত ছিলো না, রাতে গডফ্রে ওর কাছে আসবে কী না। রাতে গডফ্রে না আসাতে গ্রেস একটু হতাশ হলো। পরদিন রবিবার। ছুটির দিন, তাই সকালে কেউ কারোর বিশেষ খোঁজ রাখে না। সকালে ব্রেকফাস্টের টেবিলে গডফ্রেকে না দেখেও কারোর কিছু মনে হয়নি। দুপুরে খাবার সময় না দেখা যেতে ডেভিড গিয়ে ওর ঘরটা দেখে এলো। গডফ্রে ছিমছাম মানুষ। ঘর সাফ সুতরো রাখে। বিছানা দেখে মনে হচ্ছে, রাতে ব্যবহার হয়নি।
এবার সবার টনক একটু নড়লো। এদিক ওদিক দেখা শুরু হলো। শেষে খাদের ধারে গডফ্রের দেহ পাওয়া গেলো।
মাথায় ভারি জিনিস, সম্ভবত মদের বোতল দিয়ে মারা হয়েছে। রাতের অন্ধকারে গডফ্রে এতদূর এসে কী করছিল? ক্যাম্পের মাঝে খুন, কে করলো, কেনই বা করলো!
এক
ক’লকাতা
‘তোরা ইয়েলো ফিভারের টিকা দিস?’ শান্তনু চ্যাটার্জির একটু ব্যস্ত হয়ে পরার অভ্যেস আছে, সেটা শুধু তার ডাক্তার ছেলে বিনীত নয়, সবাই কম বেশি জানে।
‘তার মানে তোমার তানজানিয়া যাবার ব্যাপারটা ফাইনাল হলো।’ ডঃ বিনীত চ্যাটার্জী, কলকাতার বি. সি রায় শিশু হাসপাতালে ডাক্তারি করে। শান্তনুর নিজের অফিস, দেরী হলে কাউকে জবাবদিহি করার নেই, তবু দেরী করতে পছন্দ করে না। বিনীতকে অনেকটা যেতে হবে, তাই খাবার টেবিলে বসে চটপট খাচ্ছিলো।
‘যাবার কথা হচ্ছে, এই মাত্র মেল এসেছে প্যাটেলের কাছ থেকে। বললি না তো তোদের ওখানে টীকা দেয় কিনা।’
‘বাবা, আমাদেরটা বাচ্চাদের হাসপাতাল, এখানে পোলিও খাওয়ানো হয়।’
‘তার মানে কী হলো? বাচ্চাদের ইয়েলো ফিভার হয় না।’
‘সেটা আবার কে বললো? তবে ইয়েলো ফিবারের ভ্যাকসিন সব জায়গায় সব দিন দেয় না। তুমি টেনশন নিও না, আমি তোমার জন্য একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে দিচ্ছি।’ বিনীত মার হাত থেকে টিফিনের বাক্সটা নিয়ে, গাড়ির চাবিটা তুলে নিয়ে আর দাঁড়ালো না।
শান্তনু চ্যাটার্জীর বয়েসটা যদি পঞ্চান্ন না হয়ে তিরিশ হত, তাহলে সুরেশ প্যাটেলের তানজানিয়া আসার আমন্ত্রণে লাফিয়ে উঠতো। শান্তনু চ্যাটার্জী তিরিশ বছরের বেশি সময় ধরে, দেশের নানান খনিতে, কারখানায় লোহা আর ইস্পাত তৈরি করে আপতত কলকাতায় কন্সালটেন্সির ব্যবসা খুলেছেন।
শান্তনু চ্যাটার্জী কাজের সূত্রে চীন, অস্ট্রেলিয়া, ইরান ঘুরে এসেছেন। কাজও করেছেন সুনামের সঙ্গে। কিন্তু আফ্রিকা এই প্রথম বার। কী করে লোহার আকর থেকে ইস্পাত বানাতে হয়, সেটা বিজ্ঞানের সব ছাত্রকে স্কুলেই পড়তে হয়। আরও বিস্তারিত ভাবে জানতে হয়। কিন্তু লোহার আকর বেনিফিসিয়েশন যে কী, কী করে কী করে, কী পদ্ধতি বা যন্ত্রপাতি, সেটা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে বের হবার সময় শান্তনুর জানা ছিলো না। ভারতের দক্ষিণ প্রান্তে, নিকল নামক ভারত সরকারের একটি উদ্যোগে যোগ দেবার পর, জানতে পারলো কোম্পানির প্রধান কাজ আয়রন ওর বেনিফিসিয়েশন, তারপর সেই আকরের প্যালেট বানানো আর তার থেকে স্পঞ্জ আয়রন। এই দেশে, শুধু দেশে কেন সারা পৃথিবীতে প্রচুর আকরিক ধাতু রয়েছে, যেটা সরাসরি ব্যবহার করা যায় না। তাকে নানান পদ্ধতিতে উন্নত ও ব্যবহার যোগ্য করার নাম হলো বেনিফিসিয়েশন। নিজের চেষ্টায়, আগ্রহে, পরিশ্রমে, আজকের দিনে শান্তনু চ্যাটার্জি দেশের বেনিফিসিয়েশন ও সেই আকর থেকে ধাতু বানানোয় বিশেষজ্ঞদের মধ্যে অন্যতম।
তানজানিয়া সংক্রান্ত পুরো ব্যাপারটা শুরু হয়েছিল এ বছরই এপ্রিলের প্রথম দিকে। কলকাতার হোটেল হায়াতে স্টিল ওয়ার্ল্ডের এক সেমিনারে বক্তা ছিলো শান্তনু। চৈত্র মাস। গরমেও পাতলা স্যুট আর টাই পরে এসেছিলো শান্তনু। স্টিল ওয়ার্ল্ডের অনুষ্ঠানে দেশ বিদেশ থেকে লোহা আর ইস্পাতের সাথে যুক্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা আসে। মঞ্চে উঠে বক্তব্য রাখবে, তাই ছেলে জোরজার করলো ভালো পোষাক পরে যেতে। গাড়ি এসি, হোটেল এসি। চিন্তা কী? শান্তনু বলা শেষ করেছিল স্বভাবসিদ্ধ কায়দায়, ‘আমাকে যে কোনো ওর দিন আর আমি আপনাকে মেটাল বের করে দেখাবো।’ (ওর স্ত্রী বলে থাকে, ‘কায়দা তো নয়, আল-কায়দা। যেদিন ঝামেলায় পড়বে, বুঝবে।’) শান্তনুদের সেশনের পরেই নেট ওয়ার্কিং লাঞ্চ। নেট ওয়ার্কিং মাথায় উঠলো, বেশির ভাগেরই লাঞ্চের দিকেই ঝোঁকটা বেশি দেখা গেলো। দেখেই মনে হয় বেচারাদের বাড়িতে প্রচুর নিয়মে থাকতে হয়, আজ গরু ছাড়া পেয়েছে। শান্তনু, একটু কোণের দিকে একটা টেবিল জুটিয়ে, নাম না জানা সুপে চামচ চালাচ্ছিলো। এক জন ডার্ক স্যুট পড়া, অবাঙালি মধ্যবয়েসী ভদ্রলোক কাছে এসে দাঁড়ালেন। শক্ত-পোক্ত চেহারা, রোদে পোড়া গায়ের রং, মুখটা হাসি হাসি।
‘নমস্কার, আমি সুরেশ প্যাটেল। আপনার সাথে আলাপ করতে চাই। এই টেবিলে বসতে পারি?’
‘অবশ্যই পারেন। বসুন।’ চামচ ধরা হাতে করমর্দন করাটা দরকার নেই, সিদ্ধান্ত নিয়ে, শান্তনু ঘাড় কাত করে মুখটা হাসি হাসি করলো।
ভদ্রলোক একটা সুদৃশ্য কার্ড হোল্ডার থেকে একটা কার্ড বের করে এগিয়ে দিলো।
কার্ডে লেখা, সুরেশ প্যাটেল। ভাইস প্রেসিডেন্ট (মেহেতা গ্রুপ : দার এস সালাম, তানজানিয়া)
এবার তো শান্তনুকেও কার্ডটা দিতে হয়। সুরেশ প্যাটেল, যেন মনের কথা বুঝতে পেরে বললেন, ‘আপনার কার্ড তো নিশ্চয়ই নেব, তাড়াহুড়োর কিছু নেই, আগে খেতে খেতে আলাপটা হয়ে যাক। আপনার সাথে একটা প্রজেক্টের ব্যাপারে আলোচনা করতে চাই।’ এক বছরের ওপর স্টিল উদ্যোগে তো প্রায় তালা পড়ার জোগাড়। হাতে কোনো ভদ্র-সদ্র কাজ নেই, তাই খাওয়ার থেকেও প্যাটেলের দিকে মন দেওয়াটা বেশি দরকার বলে মনে হলো শান্তনুর।
‘আপনার ভাষণটা খুব মন দিয়ে শুনলাম। আমার আশা আরও বেড়ে গেলো। আপনার নাম আগেই শুনেছিলাম, আলাপ করার খুব ইচ্ছে ছিলো।’ প্যাটেল ততক্ষণে একপাত্র, লেবু আর ধনে পাতা মেশানো নিরামিষ স্যুপ আর ক্রোকে নিয়ে এসেছে।
এসব মিষ্টি মিষ্টি কথার মিষ্টি মিষ্টি উত্তর দিয়ে কাজের কথাটার জন্য শান্তনু কান পেতে রইলো।
মেহেতা গ্রুপ তানজানিয়ায় অনেক বছর আছে। নানান ব্যবসা। গত বছর লুডেবা জেলার আমিনা গ্রামের কাছে দুটো খনিতে লীজ নিয়েছে মেহেতারা। প্রথম খনিটা আয়রন ওরের, প্রধানত ম্যাগনেটাইট, আর সাথে মিশে আছে অনেক অন্য ধাতু। সেখানে, জল, কয়লার অভাব নেই। দ্বিতীয় খনিটা কয়লার। ওদের ইচ্ছে সেখানে বেনিফিসিয়েশন থেকে শুরু করে স্টিল অবধি যাওয়া। অনেক বড় স্বপ্ন। টাকা দেবার জন্য গৌরী সেনও রাজি। তার আগে ওরা একটা পাইলট প্ল্যান্ট করে দেখে নিতে চায়। পাইলট প্ল্যান্ট হ’লো একেবারে ছোট করে, মূল প্ল্যান্টের কাজ করবে এমন একটা মডেল। তবে এখানে মডেলটা একেবারে আসল। পুরো কাজ করবে। শুধু আকার আয়তনে অনেক ছোট। সুরেশ প্যাটেল জানতে চাইছেন, একটা পাইলট প্ল্যান্টের পুরো কাজটা শান্তনু চ্যাটার্জী করতে চান কী?
শুধু পাইলট প্ল্যান্ট? শান্তনুর মনটা দমে গেল। ছোট কাজ, আর না কাজ করে সুখ, না পয়সা পাওয়া যাবে। মাঝ থেকে আইডিয়াটা ওদের হাতে চলে যাবে। কথাটা বলে নেওয়া উচিত মনে করে, শান্তনু বললো, ‘একটা কথা বলি মিঃ প্যাটেল, যেমন শুনলাম আপনাদের ওরটা একটু ঘোরালো, তাই সেটাকে খুব সাবধানে বেনিফিশিয়েট করতে হবে। আর প্ল্যান্টের সাইজ যাই হোক না কেন, আমার খাটনি কিন্তু একই। তাই বলছিলাম...’
‘আরে না না, মিঃ চ্যাটার্জী, আপনি ভুল বুঝলেন। পাইলট প্ল্যান্ট তো শুধু শুরু। আমরা পুরো প্রজেক্টটা বানাবো, কিন্তু ধীরে ধীরে। আর আপনার পুরো ফিস আমরা দেব। আপনার পাইলট প্ল্যান্ট প্রজেক্ট সাকসেস হোলে, আমার সাহস পাবো। আমাদের কোম্পানি অনেকগুলো টাকা বিনিয়োগ করতে যাচ্ছে। কোনো বিরাট মতপার্থক্য না হলে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আপনি আমাদের কোম্পানির পরামর্শদাতা থাকবেন।’
কথাটা সত্যি, প্রত্যেক ওরের একটা নিজস্ব চরিত্র আছে, সেটা একবার পরীক্ষা না করে একবারে নেমে পড়াও কোনো কাজের কথা নয়।
‘আপনাদের প্রজেক্টের জন্য জমি নেওয়া কি হয়ে গিয়েছে?’
‘ওই মানে একরকম, ঠিক আছে। ওখানে তো এখন জিওলজিকাল পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছে। তার জন্য একটা ক্যাম্প বানানো হয়েছে।’
শান্তনু মুখে একটু হাসি টেনে এনে বললো, ‘দেখুন একটা কথা বলি। আপনাদের মতো প্রজেক্টে, ঠিকঠাক জমি দেখাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। প্রজেক্টের সাফল্যের অনেকটাই, প্রজেক্ট কোথায় করছেন তার ওপর নির্ভর করে।’
‘একবার পাইলট প্ল্যান্টটা চালু হয়ে যাক, আপনাকে ওখানে দেখতে আমন্ত্রণ জানানো হবে, তখন জমির ব্যাপারে আপনার মূল্যবান মতামত তো নেওয়াই হবে। আপাতত, আপনার জন্য পাইলট প্ল্যান্টের সাইট একেবারে তৈরি।’
ঘন্টায় পাঁচশো কেজির পাইলট প্ল্যান্ট নিয়ে আদিখ্যেতা, শান্তনুর বোঝার বাইরে।
‘কোথায় হবে আপনাদের পাইলট প্ল্যান্ট? দার এস সালামে?’
‘না না, সব কিছু হবে মাইনসের পাশেই।’
‘তো মাইনসটা একবার দেখতে হবে, তার আসে পাশের জল জায়গা রাস্তা দেখতে হবে।’
‘মাগাঙ্গা মাটিটু? আপনি যাবেন! দার এস সালামের থেকে আটশো কিলোমিটারের বেশি হবে, পুরো রাস্তাটা গাড়িতে যেতে হবে। আপনার বয়েস হয়েছে, খুব কষ্ট হবে। আমরা আপনাকে সব ছবি, ম্যাপ আর টেস্ট রিপোর্ট পাঠিয়ে দেব, আপনার এত এক্সপেরিয়েন্স, আপনি তো কলকাতায় ব’সে বানিয়ে দেবেন।’
বয়েস হয়েছে কথাটা শান্তনুর বিশেষ অপছন্দ। সংখ্যা দিয়ে মানুষের ক্ষমতা সম্বন্ধে ধারণা করা যায়! ‘দেখুন কলকাতায় বসে পাইলট প্ল্যান্টের নকশা আমি বানিয়ে দেব। কিন্তু যে আসল প্ল্যান্টের জন্য এই পাইলট প্ল্যান্ট, সেটা প্রাথমিক ভাবে আদৌ সম্ভব কিনা না দেখে নিয়ে পাইলট প্ল্যান্ট করতে যাওয়াটা ভুল হবে।’
‘ভুলের তো কোনো কথা নেই চ্যাটার্জী সাব। যদি পাইলট টেস্টে দেখা যায়, স্টিল প্ল্যান্ট করা যাবে না, তাহলে কোম্পানি আপনাকে দোষ দেবে না।’
‘একটা প্রজেক্টে টেস্টিং ছাড়াও অনেক কিছু থাকে। যেটা সাইটে গিয়ে জানা যায়। সাইট না দেখে প্ল্যান্ট বানালে লোকে আমাকে পাগল বলবে। বাজারে আমার একটা সুনাম আছে, সেটা একেবারে মাটিতে মিশে যাবে। যত কষ্টই হোক আমি যেতে চাই।’ এতক্ষণে শান্তনুর জেদি চেহারাটা বেরিয়ে এসেছে।
‘অনেক ঝামেলা আছে কিন্তু। ইয়েলো ফিবারের ভ্যাকসিন নিতে হবে, তাছাড়া আজকাল ইবোলার ঝামেলা আছে। তাই বলছিলাম। তাছাড়া এতে কাজ শুরু করতে দেরী হয়ে যাবে, সেটাও তো ভেবে দেখুন।’
এবার শান্তনু বিরক্ত হলো। আচ্ছা কিপ্টে তো। এত বড় প্রজেক্ট করতে যাচ্ছে আর একটা ভিজিটের টাকার জন্য এতগুলো বাজে কথা বলছে। ওর এক ভাইপো ঘানায় থাকে, তাই শান্তনু ইবোলার সম্বন্ধে যথেষ্ট খবর রাখে। তানজানিয়ায় ইবোলা ভাইরাস নেই। আর ইয়েলো ফিবারের ভ্যাকসিন এমন কী হাতি ঘোড়া হবে! মুখে বললো, ‘আমার কাজ করার একটা পদ্ধতি আছে মি.প্যাটেল। সেটা পাল্টাতে পারবো না।’
প্যাটেল কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর, ‘আমাকে ভুল বুঝবেন না, ঠিক আছে, ম্যানেজমেন্টের সাথে কথা বলে বলছি। তবে ব্যাপারটা হলো, আমাদের একটু তাড়া আছে, তাই বলছিলাম আপনি আমাদের টার্মস অ্যাকসেপ্ট করে নিলে ম্যানেজমেন্ট কিছু এক্সট্রা পেমেন্টের কথাও ভাবতে পারে।’ শান্তনু এমন কথার কী জবাব দেবে! চুপ করে থাকলো। প্যাটেল বুঝতে পারলো আর কথা এগোচ্ছে না, তাই প্যাটেল শান্তনুর হাত টাত ঝাঁকিয়ে উঠে পড়লো। শান্তনু উঠে মুখ ধুতে ধুতে ভাবছিল, কাজটা ঠিক করলাম তো? লোকটা বেশ আজব কিন্তু, কাজ না করার জন্য বেশি টাকার লোভ দেখাচ্ছিল!
তবে মেহেতা গ্রুপ আর যাই হোক না কেন কিপ্টে নয়। দিন দশেকের মধ্যে প্যাটেলের ফোন এলো। পয়সা কড়ি শান্তনু যা চেয়েছে, আপত্তি করেনি। তাছাড়া মি.মেহেতার অফিস থেকে একটা মেল এলো, যাতে লেখা আছে, ‘মি. মেহেতা আশা করেন, মি. চ্যাটার্জী প্রজেক্টের জন্য জমি নির্বাচন করতে কোম্পানিকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেবেন।’ টাকার পরিমাণে শান্তনু এতদিন বেশ খুশি ছিলো। মানব চরিত্র, কী অদ্ভুত! পরে মনে হলো বেশি চাইলেও বোধহয় না করতো না। তখন প্রথমে নিজের ওপর রাগ হলো আর শেষে মনে হলো প্যাটেলটা পাজি, ঠকিয়ে দিলো! যখন প্যাটেল ভিজিটের জন্য রাজি হচ্ছিল না, তখন শান্তনুও ঘাড় কাত করেনি। কিন্তু আজ যখন মেল এলো তানজানিয়া যাবার জন্য, তখন শান্তনুর এক সাথে অনেক টেনশন। তার প্রথমটাই হলো একটা ইয়েলো কার্ড করানো।
বিনীত ফোন টোন করে সব ঠিক করে রেখেছিল। সল্টলেকের সেক্টর থ্রিতে শুক্রবার সকাল দশটায় গিয়ে হাজির হয়ে গেল শান্তনু। বিনীত জিজ্ঞেস করেছিল, ‘সাথে যাব?’
‘কেন? আমি কী তোর হাসপাতালের বাচ্চা! যে একটা ইনজেকশন নিতে সাথে গার্ডিয়ান নিয়ে যেতে হবে!’
অখিল ভারত স্বচ্ছতা ও জনস্বাস্থ্য কেন্দ্র, এখানকার নিপাট সরকারি ব্যাপার স্যাপার দেখে একটু কেমন যেন লাগতে থাকলো শান্তনুর। অনেক লোক এসেছেন সুঁচ ফোটাতে, এমন কী ওয়েটিং লিস্টেও আছে জনা কয়েক। সেই স্কুলে লাইন করিয়ে বি সি জি র টিকা দেবার মতো প্রায়। শান্তনু পাসপোর্ট আর তিনশ’ টাকা জমা দিয়ে ইনজেকশন নিতে গেলো মাইক্রোবায়োলজি বিভাগে। সাদা ডাক্তারি কোট পরা এক মহিলা তৈরি হতে হতে, একবার জিজ্ঞেস করে নিলেন, ‘ডিম টিম খেলে অ্যালার্জি হয় নাতো?’
সন্ধ্যাবেলা ছেলে হাসপাতাল থেকে ফিরতেই শান্তনু মুখ হাঁড়ি করে বললো, ‘জ্বর হবে আগে বলিস নি তো!’
বিনীত বললো, ‘কেন, আগে বললে কী করতে? টীকা নিতে না, না ক্রোসিন খেয়ে ব’সে থাকতে?’
তানজানিয়া যাবার দিন ঠিক হয়ে গেলো। টিকিট হাতে পাবার দু’দিন আগে একটা আজব ফোন এলো। ফোনটা আক্ষরিক অর্থেও অজানা নম্বর থেকে, নম্বরের জায়গায় মোবাইলে তাই ফুটে উঠছিলো। ভাষাটা ইংরেজি, ফোনটা করেছেন কোনো এক ভবিষ্যৎ বক্তা, অবশ্যই অচেনা। শান্তনু হাত দেখা, ভবিষ্যৎ বাণী, পাথর শেকড় ইত্যাদিতে একদম বিশ্বাস করেন না। যিনি ফোন করেছেন তিনি শান্তনুর নাম জানেন, পরিবারের সম্বন্ধেও বেশ কিছু জানেন। শান্তনু শুনেছে, কোনো কোনো এফ.এম চ্যানেলে মানুষকে এমনটাই ফোন করে উল্টোপাল্টা কথা বলে শেষে মুরগি বা মোরগ বানানো হয়। তাই সোজা জিজ্ঞেস করলো, ‘কোন চ্যানেল ভাই? ব্যস্ত আছি। বিরক্ত করবেন না।’
ওপার থেকে একটা চাপা হাসির আওয়াজ এলো, ‘খুব ব্যস্ত? কোথায় যাবি, তানজানিয়া - মাগাঙ্গা মাটিটু?’
এবার শান্তনুর চমকানোর পালা। মাগাঙ্গা মাটিটু নামটা ও কাউকে বলেনি। বলার তেমন প্রয়োজন বোধ হয়নি। তাই একজন বাইরের লোকের মুখে নামটা শুনে, যথেষ্ট অবাক হ’লো।
‘কে আপনি? এতসব কী করে জানলেন?’
‘বাবা সব জানে।’
শান্তনু বলতে যাচ্ছিলো, কার বাবা? কিন্তু আর আগেই আবার হাসির শব্দ, এবারের হাসিটা স্বর্গীয়, ‘যাস্ না, আমার কথা শোন, ইবোলায় মরবি। যাস্ না, গেলেই সাতদিনের মধ্যে মৃত্যু।’
যেহেতু মাগাঙ্গা মাটিটু নামটা বেশ খটোমটো, তাই প্রথম প্রথম তো শান্তনুর নিজেরই মনে থাকছিল না। ফেসবুকে অনেককেই দেখেছে, ভিসা পাবার পর থেকে বাজার গরম করা শুরু করে দেয়। এই বিমানবন্দরে বসে আছি, এই নামলাম, এই খেলাম, এখানে আছি, ধারাবাহিক সচিত্র ভ্রমণ কাহিনি। যারা দেয় তারা দেয়, তাতে শান্তনু লাইকও দেয়, কিন্তু নিজের কাজ নিয়ে ফেসবুক বা অন্য কোথাও ছালা খুলে বলার লোক সে নয়। নিজের বাড়ির লোককেও মাগাঙ্গা মাটিটু নামটা বলার প্রয়োজন বোধ করেনি। তাহলে এই বাবা লোকটা এতো সব জানলো কী করে? এইসব বাবা টাবা শান্তনুর দু’চোখের বিষ। কথা নেই বার্তা নেই যাওয়াটা চটকাতে চাইছে। কী চায়? শান্তনুকে সাবধান করে ওর লাভ কী? এরা একটা প্রশ্নের উত্তর দিতেও পয়সা চায়। সাবধান করা, না ভয় দেখানো? ইবোলা? তাও আবার তানজানিয়ায়? যত সব বাজে কথা। কিন্তু একটু খোঁচা রয়েই গেলো।
দুই
শান্তনুর প্লেন ছাড়ার সময় রাত চারটে প্রায়, ভোর ও বলা যায়। এরা আর প্লেন পায়নি। শান্তনুর দৃঢ় ধারণা প্যাটেল এই টিকিটটাই সবচেয়ে সস্তায় পেয়েছে। কলকাতা থেকে দোহা পাঁচ ঘন্টা দশ মিনিটের যাত্রা। ভারত আর কাতারের মধ্যে সময়ের তফাত আড়াই ঘন্টার। তাতে করে দোহাতে শান্তনু যখন পৌঁছাবে তখন ওদের ঘড়িতে বাজবে সকাল ছটা পঁয়ত্রিশ আর ঠিক এক ঘন্টা পরই দার এস সালামের ফ্লাইট ধরতে হবে। এক ঘন্টা নিয়ে একটা টেনশন তো থাকেই।
অত রাতে প্যাঁচার মত ফ্লাইট ধরা, তার ওপর শান্তনু এমনিতেই একটু ব্যস্তবাগীশ। তাই আগে ভাগে এসে কলকাতা এয়ারপোর্টে বসে থেকে সব করে ফেলার চেষ্টা করলো। চেক ইন কাউন্টারে প্রথম বাধা, ‘ভিসা কোথায়?’
‘ভিসা তো অন অ্যারাইভাল পৌঁছে করতে হবে, তাই তো বলা আছে।’ কাউন্টারে বসা মহিলা শান্তনুর কথায় এক ফোঁটা গুরুত্ব না দিয়ে আবার ভিসা চাইলো। শান্তনুর একটা জিনিস দেখা আছে। টাকা পয়সা নেওয়া হয়ে গেলে, অল্প বিস্তর সবাই সর্দারি করে, সিনেমা হলের সিট দেখানো টর্চ বাবুর মতো। যদিও শান্তনু একেবারেই নারী বিদ্বেষী নয়, তবু ওর অভিজ্ঞতা বলে এয়ারলাইন্স-এর কাউন্টারে মহিলারা বেশি ঝামেলা দেয়। আধখামচা নিয়ম দেখায়, ওজন নিয়ে এমন ভাব করে যেন তুমি মাদক নিয়ে যাচ্ছো। আজও তাই হ’লো। একটু সময় এবং কিছু কথা খরচ করে বোর্ডিং পাস পাওয়া গেলো। হাতে একটা লাগেজ। কিন্তু আসল ঝামেলা হলো ইমিগ্রেশনে গিয়ে। লাইন দিয়ে শান্তনু যে কাউন্টারে পৌঁছালো, সেখানকার ভদ্রলোক ওর পাসপোর্টটা উল্টে পাল্টে দেখে বিরক্ত মুখে বললো, ‘ভিসা কোথায়? ভিসা ছাড়া হবে না।’ বোঝো কারবার, শান্তনু যত বলে, ‘তানজানিয়ায় পৌঁছে ভিসা ক’রবো।’ ভদ্রলোক রাজি হন না। তারপর শুরু হলো ভূগোল ক্লাস। তানজানিয়া কোথায়, কার পাশে ইত্যাদি। তখন বেশ রাত, শান্তনুর প্রবল বিরক্তি লাগছিল। ইমিগ্রেশনের লোকটা বোকা না অসৎ ঠিক বোঝা যাচ্ছিল না। হঠাৎ করে কোথা থেকে আর একজন এসে বললো, ‘দার এস সালাম? কোনো অসুবিধে নেই তো, তানজানিয়া - নন ইবোলা দেশ, ভিসা তো অন অ্যারাইভাল হবে।’ তারপর পাসপোর্টের ওপর দুম দুম করে স্ট্যাম্প মেরে দিয়ে বললো, ‘সোজা ক্যামেরার দিকে তাকান।’ শান্তনু এতক্ষণ পরে এবার একটু হাসি হাসি মুখ করলো।
সুরক্ষা দরজাটা নিরুপদ্রবে পার হয়ে যাবার পর শান্তনুর কাজ আপাতত শেষ। কাতার যাবার যাত্রী খুব বেশি নয়। তেইশ নম্বর গেট থেকে বোর্ডিং। শান্তনু বোর্ডিং গেটের কাছে এসে একটা সিট দখল করে বসে রইলো। একটু সতর্ক থাকলো যাতে ঘুমিয়ে না পড়ে। সাথে একটা বই ছিলো। কিন্তু বই পড়লে ঘুম বেশি পায়। একসময় গায়ে মৃদু ধাক্কা খেয়ে শান্তনু ধর ফর করে উঠে বসলো। ‘এই যাঃ, ঘুমোবো না ঘুমাবো না বলতে বলতে সেই ঘুমিয়ে পড়লাম।’ শান্তনু তাকিয়ে দেখলো এক রাত জাগা পাখি তার দিকে তাকিয়ে হাসি হাসি মুখে বলছে, ‘দোহা? স্যার আপনার বোর্ডিং ঘোষণা করা হয়েছে।’
শান্তনু প্লেন ফ্লেন নিয়ে বিশেষ মাথা ঘামায় না। তবে ছেলে অনেক কিছু বলে দিয়েছিলো, যার অনেক কিছু সে কান থেকেই ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছে। মনে রাখার মধ্যে এটা কাতার এয়ারওয়েসের এয়ারবাস এ ৩২০। কম্বল, বালিশ, হেড ফোন সব সামলে শান্তনু যখন জানালার ধারে বসলো, তখন ঘুম টুম পুরো গায়েব।
অতো রাতে কিছু খাওয়া যায় না কথাটা শান্তনুর ক্ষেত্রে অন্তত খাটলো না। ফ্লাইটে যা দিলো সোনা মুখ করে খেলো। ছেলে বলে দিয়েছিলো, জল জুস্ বারবার খাবে আর মাঝে মাঝে সিট ছেড়ে উঠে একটু হেঁটে নেবে। জল কম জুস্ বেশি নিয়ে, সময়, অভ্যেসের পরোয়া না করে দিব্যি চালিয়ে গেলো শান্তনু। কিছুটা সামনের সিটের পিছে থাকা স্ক্রিনে মুভি দেখে, কিছুটা ঝিমিয়ে পাঁচ ঘন্টা কাটলো। এর মধ্যে আবার চিন্তা, দেরি যেন না হয়। দোহা থেকে আবার দার এস সালামের ফ্লাইট ধরতে হবে তো, দুই ফ্লাইটের মধ্যে সময় বেশি নেই।
দোহার হামাদ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে যখন প্লেন নামলো তখন স্থানীয় সময় প্রায় পৌনে সাতটা। দু’দিকে নীলচে সবুজ জল। কিন্তু টেনশনের ঠেলায় শান্তনুর আর কিছু ভালো লাগছিলো না। নামা-নামি করতে আরও কিছু সময় নষ্ট হলো। এয়ারপোর্টটা নতুন, বিশাল আর দারুণ সাজানো।
সেসব দেখার সময় শান্তনুর একেবারে নেই। বোর্ডিং পাস কলকাতাতেই নেওয়া ছিলো। বোর্ডিং গেট বন্ধ হবার আগে সেখানে পৌঁছানোটাই ব্যাপার। কে জানতো এতটা হাঁটতে হবে। হাতের ব্যাগটা ভারি লাগতে শুরু করেছে, হাত বদল করেও আর পোষাচ্ছে না। ভাগ্যিস একটু পরে পরেই চলন্ত ফুটপাথ, যাকে ট্রাভোলেটার বলে সেগুলো ছিলো। তাই শান্তনু হাঁফাতে হাঁফাতে গেট বন্ধ হওয়ার আগেই বোর্ডিং গেটের সামনে পৌঁছে গেলো। শান্তনু যখন বোর্ডিং গেটে পৌছালো তখন আর প্লেন ছাড়তে মিনিট কুড়ি বাকি। গেটের ভদ্রলোক অলস হাতে বোর্ডিং পাসটা দেখে বললেন, ‘একটা সমস্যা আছে। আপনার মালপত্র এসে পৌঁছায়নি।’
‘সে আবার কী?’
রাতজাগার পর আর এইসব ঝামেলা শান্তনুর একেবারে ভালো লাগলো না। কাতার এয়ারলাইন্সের ওপর প্রচন্ড রেগে গেলো। গেটের লোকটাকে বকাবকি শুরু করে দিলো। লোকটা একটু শুনে নির্লিপ্ত গলায় বললো, ‘এখনই গেট বন্ধ হবে। ঠিক করুন, মাল ছাড়া আসবেন, না মালের সাথে পরে আসবেন।’ শান্তনু আরেক প্রস্থ হৈ চৈ করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো, হঠাৎ এক অল্প বয়েসী মহিলা কপালকুন্ডলার কায়দায় এসে বললেন, ‘আমার সাথে চলে আসুন। চিন্তা করবেন না। পরের ফ্লাইটে আপনার মাল চলে আসবে। আপনার কাছে পৌঁছে যাবে।’
শান্তনু এক মুহূর্তে চিন্তা করে নিলো। এ ফ্লাইটটা ছেড়ে দিলে অনেক অসুবিধে। সব প্রোগ্রামে দেরি হয়ে যাবে। পরের ফ্লাইটটা কখন তাও তো জানা নেই। তারপর তানজানিয়ায় প্যাটেলকে যদি জানাতে না পারা যায়, তাহলে হাঁ করে এয়ারপোর্টে বসে থাকতে হবে। তাছাড়া বাড়িতেও চিন্তা করবে। তার ওপর বোর্ডিং পাস একবার বাতিল হলে, কী হবে কে জানে!
সেই একই কাতার এয়ারলাইন্স, প্লেনের একই চেহারা। শান্তনু ভেবেছিলো, এয়ারপোর্টের ওয়াই ফাই থেকে বাড়িতে একটু জানিয়ে দেবে, সেটা আর হলো না। ইন্টারন্যাশনাল রোমিং অনেক খরচের ব্যাপার, তাই করায় নি। আর প্যাটেল বলেছে ওখানে পৌঁছালে একটা স্থানীয় সিম দেবে। তাছাড়া আজকাল সব হোটেলেই ওয়াই ফাই থাকে। একবার পৌঁছে গেলে চিন্তা নেই। শান্তনুর এখন প্রধান চিন্তা ফেলে আসা মালটা নিয়ে। ভাগ্যক্রমে ল্যাপটপ, ডলার, কার্ড সব সাথে আছে। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস সব হোটেল থেকেই দেয়। কিন্তু বাড়িতে বাইরে পরার জামা কাপড় সব তো লাগেজে। এই লম্বা সফরের পর একই জামা কাপড়ে রাতে শোয়ার কথা ভাবতেই শান্তনুর বিশ্রী লাগলো। আরও টেনশন, যদি মালটা আদৌ না আসে! খুব বাজে ব্যাপার হবে। এই সব ভাবনা চিন্তায় এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে শান্তনু, স্থানীয় সময় দুপুর দেড়টা নাগাদ জুলিয়াস ন্যেরেরে আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে পোঁছালো। যথেষ্টই ভিড় ভাট্টা, নেমে পঞ্চাশ ডলার দিয়ে টুরিস্ট ভিসা করিয়ে ব্যাগের খোঁজে চললো। যদিও কাতার এয়ারলাইন্স ওকে ভরসা দিয়েছিলো যে মালটা আপনা আপনিই পৌঁছে যাবে, তাতে আশ্বস্ত হবার মানুষ শান্তনু নয়। কিন্তু কাতার এয়ারলাইনসের হারানো - প্রাপ্তি ধরনের কোনো কাউন্টার এয়ারপোর্ট টার্মিনালে দেখা গেলো না। পরে বোঝা গেলো, এখন এসব দেখবে সুইস পোর্ট বলে একটা কোম্পানি। সুইস পোর্টের কাউন্টারে এক মহিলা নির্লিপ্ত মুখে ফর্ম ভরিয়ে, পাসপোর্ট, টিকিট আর হোটেলের বিবরণ কপি করে রেখে দিলো। শান্তনু যতই জানতে চায়, সুটকেস কবে পাওয়া যাবে, মহিলা বলেন, ‘ফোন নম্বর রেখে যান, আসলে জানিয়ে দেবো।’ মহা জ্বালা, শান্তনুর তো ফোন নম্বরই নেই। হোটেলের রুম নম্বর জানা নেই। অগত্যা হোটেলের নম্বরে ফোন করতে বলতে হ’লো।
আফ্রিকা, মানে জংলি, জঙ্গল আর সিংহ এই তো শুনে এসেছে শান্তনু। চাঁদের পাহাড় নয়তো সাহারায় শিহরণ। দার এস সালাম এয়ারপোর্টের বাইরে এসে তেমন কোনো ভাবনাই মনে এলো না, বরং একজনের হাতের নিজের নাম লেখা বোর্ড দেখে খুশি হয়ে গেলো, নামের বানান ভুলটা ধর্তব্যের মধ্যেই আনলো না। যেন শত্রু পুরীতে এক আপনজন। ছেলেটা নিজে থেকে বললো, ‘আমার নাম ম্যাক। আমি গাড়ি নিয়ে এসেছি। আপনার মালপত্র সব কোথায়?’
শান্তনুর মুখে যতটা হাসি লেগেছিলো, সব খসে পড়লো।
শান্তনুর যেখানে থাকার ব্যবস্থা হয়েছে, সেটা ওশান ব্লু বিচ রিসর্ট। মেহেতাদের অনেক ব্যাবসার একটি। শহর থেকে বেশ দূরে, এয়ারপোর্ট থেকে ততো দূরে নয়। কিন্তু রাস্তায় এমন জ্যাম যে পৌঁছাতে সোয়া ঘন্টার ওপর সময় লেগে গেলো। রাস্তায় গাড়ি জ্যামে আটকে থাকলে গাড়ির পাশে ফেরিওয়ালাদের ভিড় লেগে যায়। ‘কোথায় যাবে তুমি? যেখানে যাও সেই, একই মাটি ঘাস, একই নীলাকাশ।’ মাসাইদের অনেক গল্প পড়েছে শান্তনু, সবই বেশ রোমহর্ষক। রিসোর্টের গেটে একজন মাসাইকে দেখলো। যেমন ছবিতে দেখা যায় তেমনি পোশাক, হাতে একটা বর্ষা, রোগা সাত ফুটের মতো লম্বা। রিসোর্টের রিসেপশনে অনেকটা জায়গা, বেশ সাজানো, নানান বড়ো বড়ো কাঠের মূর্তি, জন্তু, মাসাই অনেক কিছু। দেয়ালে অনেক ছবি। কিলিমাঞ্জারো পাহাড়ে সূর্যাস্ত, শিকার কত কিছু। লাউঞ্জে বসার জন্যও সুন্দর ব্যবস্থা আছে। তখন শান্তনুর বোধগম্য হলো ওই মাসাই, রিসোর্টের দারোয়ান। দার এস সালাম নামের মানে শান্তির নীড়, ওশান ব্লুতে আসলে তার সার্থকতা বোঝা যায়। সামনে বিশাল ভারত মহাসাগর। বালিয়াড়ির ধার ঘেঁষে ছোট বড় কটেজ। এপাশে ওপাশে দুটো রেস্তোরাঁ। বালিয়াড়ির ওপর লম্বা লম্বা কাঠের জেটি বানানো রয়েছে। আপাত শান্ত মহাসমুদ্রর ছোট ছোট ঢেউ সেই কাঠের খুঁটির ওপর খেলা করছে। এদিক ওদিক কটা নৌকো রাখা আছে। স্বপ্নের পিকচার পোস্ট কার্ডের থেকেও সুন্দর। চোখ জুড়িয়ে যায়। গরম নেই, ফুরফুরে হওয়া বইছে। শান্তনু তখন বাক্সের বিচ্ছেদ বেদনা প্রায় ভুলে এসেছে।
যেটায় শান্তনুর থাকার ব্যবস্থা হয়েছে কটেজটা সুন্দর। ঘরটা মাঝারি মাপের, একটা বড়ো বিছানা। চা কফি বানানোর জায়গা। জলও আছে। জল থাকাটা শান্তনুর কাছে একটা নিশ্চিন্তি। একগাদা দাম দিয়ে জল কিনতে প্রাণে বড়ো লাগে। শান্তনু সব হোটেলের স্নান ঘর দেখে নেয়। এখানে দেখে সন্তুষ্ট হলো। এক কাপ চা বানিয়ে বারান্দায় এসে ব’সলো। দিনের আলো ধীরে ধীরে কমে আসছে। সূর্য আকাশের ক্যানভাসে সৌন্দর্যের যন্ত্রণাহীন জন্ম দিচ্ছে। দরজায় ঘন্টি বাজলো। হোটেলের হাউস কিপিং এর মহিলা। ঘরে মশা মারার ওষুধ দেওয়ার জন্য। দেশটা আফ্রিকা, যদিও ঘরে সাদা নেটের মশারি আছে, তবু সাবধানের মার নেই। নাকি তাও আছে।
ফোনটা বেজে উঠলো। রিসেপশন থেকে জানালো ওর জন্য মেহেতা গ্রুপের কোনো এক সুশীলা মোরাবিয়া অপেক্ষা করছে। সুশীলা মোরাবিয়ার নাম শান্তনু আগে কখনো শোনেনি। রিসেপশনে গিয়ে এদিক ওদিক তাকাতে একজন মহিলা ওঠে এলো। বয়েস আঠাশ থেকে বত্রিশ যা কিছু হতে পারে। চেহারা, সুশ্রী, সপ্রতিভ, ফিটফাট জামা কাপড়। হাসি মুখে হাত বাড়িয়ে বললো, ‘আমি সুশীলা স্যার। দার এস সালামে স্বাগত।’
সুশীলা একটা কাজের কাজ করেছে, একটা ফোন নিয়ে এসেছে লোকাল সিম সমেত। ‘নোকিয়া ফোন স্যার। আপনার কাছে রাখুন। প্যাটেল স্যার, আমার ফোন নম্বর লোড করা আছে। বারো হাজার সিলিং ভরা আছে। যতদিন এখানে আছেন ব্যবহার করুন। যাবার সময় দিয়ে যাবেন।’
বারো হাজার শিলিং শুনে শান্তনুর চোখ কপালে। পরে বুঝলো এখানকার হাজার শিলিং ভারতের আঠাশ টাকার সমান।
‘সব সিম তো সব ফোনে লাগে না, তাই চান্স নিলাম না। আপনি এসে ফ্রেশ হয়ে গেছেন তো স্যার?’
শান্তনু হাসবে না কাঁদবে? গায়ে সেই ক’লকাতার পোশাক, ব্যাগের খোঁজ নেই, ফ্রেশটা হবে কী করে, নাকি ফ্রেশের মানেটাই পাল্টে গেছে?
শান্তনু ব্যাগের কথাটা সুশীলাকে বলতে বললো, ‘আমাকে ডকুমেন্ট দিয়ে দিন। আমি আনিয়ে নেবো। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন স্যার, আমি আছি তো। সোয়াহিলিতে একটা কথা আছে হাকুনা মাটাটা, মানে নো ওরিস।’
অন্যের ওপর নিজের চিন্তা ছেড়ে বিন্দাস হবার মানুষ শান্তনু চ্যাটার্জী নয়। তবে বিদেশে স্থানীয় সাহায্য পেলে ভালো লাগে।
সুশীলার আগ্রহে দু’জনে রিসর্টের একটা রেস্তোরাঁয় গিয়ে ব’সলো। নাম দ্য পাম। অনেকটা জায়গা নিয়ে সাজানো গোছানো রেস্তোরাঁ। লোকজন বেশি নেই, আর হৈ চৈ একদম না। দিনের আলো নিভে এলেও, রাতের আলোয় ভারত মহাসাগরকে অপরূপ দেখাচ্ছে। হালকা আলো আর স্থানীয় সজ্জায়, দ্য পাম কে ভারি মনোরম দেখাচ্ছে।
‘স্যার দুটো কুল ড্রিঙ্কস কি বলবো? এখানে আবার হার্ড ড্রিঙ্কস নিলে কোম্পানি অনুমোদন দেয় না।’
শান্তনুর খিদে যথেষ্টই পেয়েছে, কিন্তু কী খাবে, মানে সামনের মেনু কার্ডের কোনটা খাওয়া যায় বুঝে উঠতে পারছে না। তবে বিদেশে গিয়েও যারা ভারতীয় খাবারের জন্য হন্যে হয়ে যায়, শান্তনু তাদের দলে নয়। নতুন খাবার চেখে দেখতে ভালোই লাগে। খাবার দেখে জায়গাটার চরিত্রের একটা দিক বোঝা যায়।
‘উগালি খেয়ে দেখবেন?’
বন্ধু মহলে থাকলে শান্তনু বলতো, ‘উৎকৃষ্ট গালি হলো উগালি?’
মুখে বললো, ‘উগালি, না মানে?’
‘উগালি এখানকার রোজকার খাবার। ভুট্টার গুঁড়ো লবন দিয়ে সিদ্ধ করে তৈরি করে।’
‘খেতে ঠিক হবে তো?’
‘খেয়ে দেখুন, আপনি কি ভেজেটেরিয়ান?’
‘না না, নন, মানে চিকেন টিকেন খাই। মাছ তো খাই।’
‘হা, হা! বাঙালি মানেই তো মাছের ঝোল আর রোসোগোল্লা! ‘
বাঙালি সম্বন্ধে এমন কথা আগেও শুনতে হয়েছে। শান্তনু অকারণে তর্ক না বাড়িয়ে, খাবারের দিকে মন দিলো। উগালি, প্লেটের উপর বাটি ওল্টানো সুজির মতো। সাথে স্যালাড আর মুরগির ঝোল। এবার ওই মন্ডটা থেকে ছোট ছোট কাগের দলা, বগের দলা বানিয়ে, মাথায় একটা জায়গা করতে হবে। তাতে সেই ঝোল ঢেলে খেতে হবে। ভুট্টার দলার তো কোনো স্বাদ নেই, ঝোলটা পাতলা। খেতে খারাপ ভালো বলার মতো কিছু নয়। ওই একটা অভিজ্ঞতা হয়ে থাকলো।
চারদিকে আলো অন্ধকারের একটা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান চলছে। সময়টা কলকাতার তুলনায় আড়াই ঘন্টা পিছে। তাই খাওয়ার পাট মিটিয়ে বাড়ির সঙ্গে কথা বলে নেওয়াটা ভালো। তাছাড়া আজ থেকেই শান্তনু পাইলট প্ল্যান্টের প্রাথমিক ডিজাইন নিয়ে বসতে চায়। এরা যখন এতটা ব্যস্ত হয়ে পড়েছে, তখন আর ফেলে রাখা কেন! হঠাৎ শান্তনুর মনে হলো পিছে কেউ দাঁড়িয়ে। গা টা একটু শির শির করে উঠলো। সেই গেটের মাসাই। নিঃশব্দে এসে দাঁড়িয়েছে। শান্তনুর কেন যেন মনে হ’লো, সুশীলা আর মাসাইয়ের চোখে চোখে কথা হ’লো। ‘নাঃ! সত্যিই বয়েস হয়ে যাচ্ছে।’ ভাবতে ভাবতে শান্তনু শুনলো সুশীলা বলছে, ‘জানেন তো, মাসাইরা নিয়মিত দুধ আর রক্ত খায়।’
তিন
আড়াই ঘন্টার ফারাক খুব কিছু বেশি নয়, তবু মানিয়ে নিতে শান্তনুর দু তিন দিন লাগবে। তারপর সক্কাল সক্কাল স্থানীয় ফোনটায়, সেই রহস্যময় বাবার আওয়াজ। ‘বলেছিলাম না আসতে, বাবার কথা শুনলি না। এখনো বলছি, যদি বাঁচতে চাস তো এখান থেকে ফিরে যা।’
শান্তনুর রাতে ভালো ঘুম হয়নি, তারপর বাসি মুখে দৈববাণী, তাও তুই তুই করে। একটা যুৎসই জবাব খুঁজে পাবার আগেই, লোকটা ফোনটা কেটে দিলো। তাতে শান্তনুর মেজাজটা পুরো গরম হয়ে গেলো। সকালের আলোয় সমুদ্র, জেটি, সাদা বালি খুব সুন্দর দেখাচ্ছে। কিন্তু স্নান ক’রে আবার নোংরা জামা পড়তে হলো বলে শান্তনুর তেতো মুখ তেতোই রয়ে গেলো।
সকালে প্রাতরাশ করতে যেতে হয় কিফারু বলে একটা রেস্তোরাঁয়। সেখানে ছবি দেখে মনে হয় কিফারু মানে গন্ডার। বিশাল কিছু না হলেও, আয়োজন মন্দ নয়। চেনা খাবার জিনিস খানিকটা অন্য চেহারায় বুফের টেবিলে হাজির। শান্তনু নিজের অভ্যেস মতো একবার পরিস্থিতিটা দেখে নিয়ে, একটা সম্ভাব্য খাদ্যতালিকা তৈরি করে ফেললো। ডাক্তার ছেলের অভিভাবকত্বে, শান্তনু ডিমের কুসুম খায় না।এখানে ডিমের সাদা দিয়ে ওমলেট পেতে শান্তনুকে বেশ বেগ পেতে হ’লো। এসব মামুলি ব্যাপার নিয়ে শান্তনু কখনো মাথা গরম করে না। কিন্তু আজ একটু বেশি হৈ চৈ করে ফেললো। তারপর খাবার শেষে কফির কাপ হাতে নিয়ে, রুপালি তবকে মোড়া মহাসাগরের দিকে তাকিয়ে মাথাটা ঠান্ডা করার চেষ্টা ক’রলো। এখন তো ওই বাবার ব্যাপারটা আর ঠাট্টা ইয়ার্কির মধ্যে রইলো না। পরিকল্পনাটা আর যাই হোক না কেনো কোন এফ এম চ্যানেলের মোরগ বানানোর রোগ নয়। সবচেয়ে অবাক কথা, যে স্থানীয় নম্বর তার নিজেরই ঠিক করে মনে নেই, সেটা ওই বাবা জানলো কী করে! কে তাকে কাজটা করতে বাধা দিচ্ছে, কী উদ্দেশ্য? কথায় বলে বাবারও বাবা থাকে। এরও নিশ্চয়ই আছে।
সকাল নটার মধ্যেই সব সেরে, শান্তনু রিসোর্টের বিজনেস সেন্টারের একটা কোণ দখল করে ল্যাপটপ খুলে বসলো। এখানে বসে কাজ করার খুব ভালো ব্যবস্থা। শান্তনুর মনে মনে আশা ছিলো যে, আজ সকালে ওর বাক্সটা পৌঁছে যাবে। ও যখন সুইস পোর্টে ফোন করেছিল, তারাও তাই বলেছিলো। কাতারে কী রোজ কাতারে কাতারে বাক্স হারায়? আর সে অর্থে ওর বাক্সটা মোটেই হারায়নি। পরের ফ্লাইটে উঠিয়ে দিলে আর কত দেরি হয়। কিন্তু সকালে সুশীলাকে হাতে করে শুধু একটা প্যাকেট নিয়ে আসতে দেখে হতাশ হ’লো। প্যাকেটে এক সেট অবশ্য প্রয়োজনীয় কাপড় আর একটা স্লিপিং স্যুট। এর মানে কী শান্তনুর ব্যাগ পেতে আরও দেরি হবে? নাকি ব্যাগটা আর পাওয়াই যাবে না। ব্যাগটা না নিয়ে সাইটে গেলে খুব অসুবিধে হবে। শান্তনু সুশীলাকে জামা কাপড়ের জন্য ধন্যবাদ দিয়েও বললো, ‘সুইস পোর্টটা কেমন মিথ্যে বললো! আবার সন্ধ্যের দিকে ফোন করতে হবে।’
আপনি ব্যস্ত হবেন না স্যার। আমি তো মাঝে মাঝেই খোঁজ নিচ্ছি। আমার তো টেনশন, আপনার কাপড়গুলোর মাপ ঠিক হলো কী না।
‘একটা কথা বলতো, আমার এই ফোনের নম্বরটা কত জনের জানা?’
সুশীলা একটু থতো মতো খেয়ে বললো, ‘কেন স্যার? কোনো অসুবিধে হয়েছে।’
প্রশ্নের উত্তরে প্রশ্ন শুনলে শান্তনুর বাজে লাগে। কোনো উষ্মা না দেখিয়ে আবার বললো, ‘কত জন জানে?’
‘অনেকেই জানতে পারে স্যার। এই ফোনটা আপনার মতো ভিজিটরদের দেওয়া হয়। তাই বুঝতেই পারছেন।’
শান্তনু ভেবে রেখেছিলো, অনেকটা জমি তৈরিই করা আছে, তাই প্রথমে সাইট দেখে পরিস্থিতি বুঝে নিয়ে তারপর প্ল্যানটা শেষ করা যাবে। সেটাই উচিত। কিন্তু বর্তমান পরিস্হিতিতে বসে বসে সময় নষ্ট করলে তো চলবে না। ফেরার টিকিট কাটা আছে। মেহেতা গ্রুপের চেয়ারম্যানের সাথে শেষের দিন দেখা করে প্রেসেন্টেশন দেওয়ার কথা। পাইলট প্ল্যান্টে যদি দেরি হয় তবে আসল কাজ হাতে আসবে কী করে? মিস্টার মেহেতা তো সব জানবেন না, মাঝ থেকে শান্তনুকে অকর্মণ্য ভাববেন। এই বাজারে এমন একটা কাজের সুযোগ হারানো খুব দুর্ভাগ্যজনক হবে। শান্তনু সময় নষ্ট না করে, সুশীলাকে নিয়ে বসে গেলো। সুশীলা বেশ কিছু ডাটা নিয়ে এসেছিলো। কিছু ওরা আগেই মেলে পাঠিয়েছিল। শান্তনু সেসব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে মিলিয়ে দেখতে শুরু করলো।
মেহেতারা যে পাইলট প্ল্যান্ট বানাতে চাইছে, তাকে ঠিক পাইলট প্ল্যান্ট বলা যায় না। যেন ছোট মাপের একটা কারখানা। এই নিয়ে শান্তনু আগেও প্যাটেলকে বলেছিল’। খরচের দিকটাও তো দেখতে হবে। প্যাটেল জানিয়েছিল, ওদের বস নাকি এমনটাই চান। মুশকিলটা হচ্ছে আগে একবার মি. মেহেতার সাথে কথা হলে, শান্তনু তাকে বুঝিয়ে বলতে পারতো, যে অযথা পুঁচকি প্ল্যান্টের পিছনে পয়সা খরচ করার দরকার নেই। তবে এখানে এসে মেহেতাদের সম্পত্তির নমুনা দেখে বুঝেছে, আর যাই হোক টাকা পয়সা মেহেতাদের যথেষ্টই আছে। আছে তো বেশ, তা বলে জলে ফেলতে হবে। ধীরে ধীরে কাজের মধ্যে ডুবে গেলো শান্তনু। মেহেতারা তো বৈজ্ঞানিক নয়, ব্যবসায়ী। এদের কথায় বোঝা গেলো এরা পাইলট প্ল্যান্ট, একেবারে নিখুঁত করে বানাতে চায়। যেন সব অটোমেশন নিয়ে একটা ছোট্টো কিন্তু পুরো দস্তুর প্ল্যান্ট। যেখানে বাকি ওরের থেকে আয়রন ওর কে আলাদা করা যাবে। শুধু তাই নয়। আয়রন ওর আলাদা করার পর, যেসব ধাতু চুম্বকে আকৃষ্ট হয় না তাদের প্রত্যেকটাকে আলাদা করে দিতে হবে। এই কাজটা গতানুগতিক কাজের বাইরে, সাধারণত, লোহা বের করে নিয়ে বাকি সামান্য যা থাকে সেটা ফেলে দেওয়া হয়। কিন্তু এরা তো কিছুই ফেলতে চায় না। আর এই বিশেষ প্রযুক্তিই শান্তনুর বিশেষত্ব। কলকাতায় বসে শান্তনু ওদের টেস্ট রিপোর্ট দেখে টেখে মোটামুটি কী ভাবে কী করবে ছকে রেখেছিলো, কাজ হাতে পেলে এগিয়ে রাখা শান্তনুর স্বভাব, খোঁজ খবর, যোগাযোগ করে প্রাথমিক কাজটা করে রেখেছে। এখন সুশীলার কাছে নতুন পাওয়া তথ্যগুলো মিলিয়ে দেখে নিয়ে শান্তনু ঝড়ের বেগে কাজ করে চললো। সুশীলা যদিও কোনো সাহায্য করতে পারছিলো না। আরও ঠিক করে বললে, শান্তনু তার কাজে অন্য কারো নাক গলানো সহ্য করে না। কাজের মাঝখানে উঠে গেলে কম্পিউটার বন্ধ করে যায়। আগে এতটা সাবধান ছিলো না। এক দুবার ঠেকে এবং ঠকে তবেই শিখেছে। ফোন আর ল্যাপটপ একই গোত্রের ব’লে একটা গাঁটছড়া বাঁধা আছে। তাছাড়া আঙুলের ছাপ, পাসওয়ার্ড তো আছেই। সুশীলা চুপচাপ ব’সে রইলো, কখনো উঠে গেলো, ফোনে কথা বললো। দুপুরের দিকে সুশীলা উসখুস করছিল।
‘স্যার লাঞ্চ করবেন না?’
শান্তনু কাজে এতটাই মশগুল হয়ে গিয়েছিলো যে ভেবেছিলো, পিৎজা টিজা আনিয়ে কাজ চালাবে।
সুশীলার ওসব খেতে ঘোর আপত্তি। শেষে স্থানীয় খাবার খাওয়া ঠিক হলো।
একটা থালিতে অনেক কিছু, পিলাউ মানে প্রায় পোলাও - প্রচুর গরম মসলা দেওয়া হলুদ রঙের ভাত। অচিচা মানে পালং শাকের তরকারি, বিনসের তরকারি, মোটা সাদা ভাত, একখানা পুরো মাছ কায়দা করে কাটা আর মাংস। শান্তনুর তো দিব্যি লাগলো। খেয়াল করে দেখলো সুশীলা দিব্যি মুরগির ঠ্যাং চিবোচ্ছে।
শান্তনু অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো, ‘তোমার নন ভেজ চলে?’
‘আমাকে সব কিছু চালাতে হয় স্যার।’
শান্তনু কথাটার মর্মোদ্ধার করতে না পারলেও চেপে গেলো। যদিও দুদিন ধরে সুশীলাকে দেখছে, তবু ওর বিয়ে হয়েছে কিনা জানে না। একটু মন দিলে হয়তো সেটা অনুমান করা যেত, কিন্তু শান্তনু ঠিক পরনারীতে মনোনিবেশ করার মানসিকতা রাখে না। ও প্যাটেলের সহকারিণী, সে তো ঠিক আছে, কিন্তু শিক্ষাগত যোগ্যতা ইত্যাদি বোঝার উপায় নেই।
বিকেলে চা খাবার সময়, সুশীলা একবার বললো, ‘স্যার সারাদিন তো অনেক কাজ হলো, আজ সন্ধ্যেবেলা বাইরে যাবেন, ডিনারে? এখানে আকেমি বলে একটা রিভলভিং রেস্তোরাঁ আছে। গোল্ডেন জুবলি টাওয়ারের একুশ তলায়। সারা শহরটা খুব সুন্দর দেখায়। ভালো লাগবে স্যার।’ শান্তনু ভাবলো এই মেয়েটার মাথায় খাওয়া ছাড়া কী আর কিছু নেই। এই তো দুপুরেই এতগুলো খাওয়া হলো।
শান্তনু বিরক্ত হয়ে বললো, ‘বাইরে ডিনারে যাবো এই নোংরা জামা কাপড়ে? রেস্তোরাঁর দারোয়ান দরজা থেকে ভাগিয়ে দেবে। আমি বরং আজ রাতে ঘরে খাবার নিয়ে নেবো আর প্রসেস ডিজাইনটা শেষ করে ফেলবো।’
সুশীলা আর পীড়াপীড়ির মধ্যে গেলো না। বাইরে যাবার পরিকল্পনা যখন ভেস্তে গেলো, তখন সন্ধ্যের দিকে সুশীলা উঠবো উঠবো করছিল, তখনই হঠাৎ করে এক গাল হাসি নিয়ে সুরেশ প্যাটেল এসে হাজির। প্রথমত কাল থেকে একটা ফোন ছাড়া আর কোনো পাত্তাই নেই, তার উপর ধপধপে জামাকাপড় পরে এসেছে। শান্তনুর পিত্তি জ্বলে গেলেও মুখে হাসি মেখে হাত বাড়িয়ে দিলো। তারপর প্যাটেলের ন্যাকা ন্যাকা করে, ‘কোনো কিছুর অসুবিধে নেই তো?’ শুনেও মাথা ঠিক রাখলো।
সুশীলা মুখ উজ্জ্বল করে বললো, ‘কাজ খুব ভালো হচ্ছে স্যার। চ্যাটার্জী সাবের পাইলট প্ল্যান্টের ডিজাইন তো প্রায় হয়েই এসেছে।’
প্যাটেল বোদ্ধার মতো মুখ করে বললো, ‘তাহলে তো ভালো হবে। ডিজাইনটা টেকনিক্যাল টিমের হাতে দিয়ে দাও, ওরা ফ্লো চার্ট বানাতে শুরু করুক। কাজ এগিয়ে যাবে।’
এদের এক কথা কতবার বলতে হয়? আজকের দিনে ঘরে ব’সে কাজ করতে চাইলে কলকাতা আর দার এস সালামে বিশেষ তফাৎ নেই। এই রিসোর্টে ব’সে শান্তনু যা করেছে, সেটা অঙ্ক। সেটা ঠিক না ভুল তা সাইটে গিয়ে জানতে পারবে। শান্তনুর মনে হলো একটু চাঁচাছোলা কথা বলার সময় এসেছে, ‘এতো তাড়াহুড়ো ভালো নয়, মিঃ প্যাটেল। জানেন তো, ঘোড়ার নালের জন্য রাজ্য চলে যায়। শুধু পাইলট প্ল্যান্ট করলেই তো কাজ শেষ নয়। আপনি কী জানেন না, আপনাদের বস, আমাকে জমি নির্বাচনেও মতামত দিতে বলেছেন। সেটাতো এখানে বসে হবে না। তাই সাইট না দেখে আমি প্ল্যান কাউকে দেবো না।’
প্রায় তিরিশ সেকেন্ডের মতো নীরবতা।
সুশীলা ক্যাবলা ক্যাবলা মুখ করে থাকলো। আর প্যাটেল নিরুত্তাপ মুখ করে বললো, ‘কাল সকাল সাড়ে আটটায় গাড়ি আসবে, আমরা সাইট দেখতে যাবো। চেক আউট করে তৈরি থাকবেন। পেমেন্ট আমরা করবো।’
শান্তনু অবাক, ওর জামা কাপড় ছাড়া যাবে কী করে? যেন ওর মনের কথা বুঝতে পেরে প্যাটেল বললো, ‘ভালো খবর, আপনার লাগেজ এসে গিয়েছে। রিসেপশন থেকে আপনার ঘরে পাঠিয়ে দেবে। শুভরাত্রি।’
ঘরে ঢুকে টেবিলের ওপর নিজের ছেড়ে আসা সুটকেসটা পেয়ে পুরোনো বন্ধুর সাথে পুনর্মিলনের আনন্দ হ’লো শান্তনুর। সুটকেসটার গায়ে বেশ কিছু অতিরিক্ত কাগজ ও সাঁটা আছে। কম্বিনেশন ঠিক করে তাড়াহুড়ো করে সুটকেসটা খুলে ফেললো শান্তনু। দেখে তো মনে হলো সবই ঠিক ঠাক আছে। কিছু খোয়া যায়নি, যাবার কথাও নয়। কিন্তু কী যেন একটা অসুবিধে লাগছে। মনে হচ্ছে, ভিতরের জিনিস ঘাঁটাঘাঁটি হয়েছে, তারপর একদম সুন্দর করে গুছিয়ে রাখা হয়েছে। তালা তো বন্ধ ছিলো আর ভিতরে দামি কিছু তো ছিলো না। তাহলে এসব কী হচ্ছে!
ঘন্টা দুয়েক কাজ করে প্রাথমিক কাজটা শেষ করলো শান্তনু। এরপর যা সংগ্রহ হবে, তারপর পুরো রিপোর্টের চেহারা নির্ভর করছে। কিছু কিছু কাজ কলকাতায় তার সহকারীকে দিয়ে এসেছিলো শান্তনু। সেই মেলটাও এসে গিয়েছে। প্যাটেলের সাধের পাইলট প্ল্যান্ট মোটের ওপর তৈরি। আর আধ ঘন্টা খানেক সময় দিয়ে শেষ ছোঁয়াটা দিতে হবে।
রাতে ছেলেকে হোয়াটস্যাপে ডাকলো শান্তনু।
‘বাবা, ছবিগুলো দারুণ এসেছে।’
‘হ্যাঁ, ওই ছবি তুলতেই তো এখানে এসেছি।’
‘কী ব্যাপার? অসন্তুষ্ট হলে কেন, সুটকেস পৌঁছায়নি। আর কী? খাওয়া ঠিক হয়নি?’
‘তুই ও সুশীলার মতো খালি খাওয়া।’
‘সেটা আবার কে?’
‘আছে, প্যাটেলের চর, আমার ঘাড়ের ওপর বসে থাকে।’
‘আর?’
‘এদের হাবভাব, ঠিক লাগছে না।’
‘এদের মানে কাদের? কোম্পানি না তোমার প্যাটেলদের?’
‘প্যাটেল আর কোম্পানি কী আলাদা?’
‘হতেও তো পারে।’
‘তাহলে তো আরো গোলমাল! সব কিছুই কেমন কেমন জানি।
‘আরেকটু খুলে বোলো। কী কেমন কেমন?’
শান্তনু বিনীতকে সব শঙ্কার কথা খুলে ব’ললো।
‘তোমার ওই মেয়েটা খাওয়া ছাড়াও কিছু কিছু জানে বাবা। ধরে নিলাম, ওই মেয়েটার দেওয়া ফোনের নম্বরটা অনেকেরই জানা। কিন্তু সেই বাবা তো দুবার ফোন করেছিল। এমন মানুষ তো বেশি নেই যারা তোমার দুটো নম্বরই জানে?’
‘প্যাটেলটা তো তাহলে পাজি আছে। কিন্তু কেন?’
‘আচ্ছা, তোমাকে যে ফোনটা দিয়েছে, সেটা কেমন ফোন। মানে স্মার্ট ফোন কি?’
‘না, না নোকিয়ার সেই পাতি আনস্মার্ট ফোন।’
‘ভালো তার মানে কোনো স্পাই অ্যাপ ট্যাপ লাগাতে পারবে না। তাও একবার ফোনটা খুলে পুরো চেক করো। ভিতরে বাড়তি কিছু দেখলেই খুলে রেখে দেবে।’
‘মনে হচ্ছে এদের পাইলট প্ল্যান্টের ডিজাইনটা নিয়ে সব মাথা ব্যথা। ঠিক বলে বোঝাতে পারবো না।’
‘তাতে দোষের কী?’
‘যেটা আসল কাজ, মানে স্টিল প্ল্যান্ট। যেন এলেবেলে। যেন না করলেও চলবে।’
‘হয়তো তাড়াতাড়ি করে কিছু করবে না। কয়েক মাস শুধু পাইলট প্ল্যান্টই চালাবে।’
‘তেমন আবার কেউ করে নাকি? আর যদি করে, তবে কেন?’
‘বুঝলাম। একটা কাজ করো। ওখানে নেট কেমন।’
‘ভালো।’
‘বেশ, যা বলছি, কোনোটা বাদ না দিয়ে এক এক ক’রে ক’রে যাও।’
ছেলে যেমনটা বলেছিলো, ঠিক তাই করে খুশি হয়ে গেলো শান্তনু।
‘ডিজাইন চাই? দেখ কেমন লাগে।’
চার
দার এস সালাম শুধু তানজানিয়া নয়, সমস্ত পূর্ব আফ্রিকার সবচেয়ে বড় শহর। কিন্তু তানজানিয়ার রাজধানী দোদোমা। অনেকটা পথ, দুটো গাড়ি নেওয়া হলো। প্যাটেল আর সুশীলা সাথে আছে। জল, কিছু খাওয়ার ও উঠলো।
দার এস সালাম সমুদ্রের ধারে, তাই না শীত না গরম। কিন্তু সাইট ঠান্ডা হতে পারে। এ খবরটা শান্তনুর মোটেই জানা ছিলো না। এখন তো আর কিছু করার নেই। জানলে সাথে অন্তত একটা জ্যাকেট নিয়ে আসতো। প্যাটেল, সুশীলা দিব্যি তৈরি হয়ে এসেছে। এদের এই দলবাজিতে শান্তনু একটু ক্ষুণ্ন হলো।
‘জানেন স্যার এখন থেকে সবাই মাউন্ট কিলিমাঞ্জারো আর জাঞ্জিবার আইল্যান্ড দেখতে যায়।’
‘এবার তো আর সময় হবে না। সামনের বার নিশ্চয়ই যাবো।’
ওরা বেরিয়ে যেতেই দু’জন স্বাস্থ্যবান কালো জ্যাকেট পরা লোক হোয়াইট স্যান্ডের রিসেপশনে এসে দাঁড়ালো।
‘আপনাদের রিসোর্টে কোনো ইন্ডিয়ান এসেছে?’
‘এসব খবর দেওয়ার অনুমতি আমাদের নেই।’
‘এসব খবর নেওয়ার অনুমতি আমাদের আছে। কথা না বাড়িয়ে কাজের কথা বলুন।’
‘আজ সকালে চেক আউট করে গেছে।’
‘ছবিটা দেখুন। এই কী না?
‘হ্যাঁ, এই।’
‘হতেই হবে, কোথায় গিয়েছে?’
‘আমি জানি না।’
‘আমি জানি, যদি তুলে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করি, তাহলে হয়তো আপনারও মনে পড়তেও পারে। কী বলেন মিস?’
‘মাগাঙ্গা মাটিটু।’
‘এইতো মনে পড়েছে, এখন সময় নষ্ট না করে ওর পাসপোর্টের কপি, বাকি সবার নাম ধাম আর গাড়ির নম্বর গুলো দিয়ে দিন।’
সোজা বেরিয়ে গিয়ে ওদের গাড়ি দুটো হাইওয়ে ধরলো। সুশীলা, শান্তনুর গাড়িতে আর প্যাটেল অন্য গাড়িতে। এখানে রাস্তার নাম এ ৭। শান্তনুর চোখে পড়লো সুশীলার গায়ে একটা বাহারি টি শার্ট, তাতে লেখা কিবোকো। কৌতূহল চেপে না রাখতে পেরে, জিজ্ঞেস করলো, ‘কিবোকো? মানে কী হলো।’
‘হিপ্পো স্যার।’ হৃদয়ে হিপ্পো নিয়ে ঘুরছে, কী দিনকাল পড়েছে!
এখানে একটা ব্যাপার খুব কড়াকড়ি। বড়ো রাস্তার ধারে ঝোপে পুলিশ লুকিয়ে থাকে। ঘন্টায় পঞ্চাশ কিলোমিটারের বেশি জোরে গাড়ি চালালেই ব্যাস, ধরে জরিমানা। এখানে ড্রাইভারদের মধ্যে কী দারুণ বোঝাপড়া। যদি একজনের জরিমানা হয়, সে তখন যেতে যেতে হাতের ভঙ্গিতে উল্টো দিক থেকে আসা গাড়িদের আগামী বিপদ থেকে সাবধান করে দেয়। কাঁকড়ার অভ্যেস নেই।
প্যাটেল অন্য গাড়িতে আছে, ওর গাড়ি এরিক বলে একজন চালাচ্ছে। মাঝ বয়েসী, স্বাস্থ্যবান, খুব কম কথা বলে। একটা রাগি রাগি ভাব আছে। শান্তনুদের গাড়ি চালাচ্ছে ম্যাক, একেবারেই অল্প বয়েসী। একটু বেশিই ছটফটে। সুশীলা টুকটাক কথা বলতে বলতে চলেছে। বেলা বারোটা নাগাদ মোরোগোরো বলে একটা জায়গায় এসে জানা গেল, গাড়িটা এখন মিকুমি অভয় অরণ্যের ধার ঘেঁষে যাবে। যেতে যেতে জানলা দিয়ে গলা বের করে শান্তনু, ঐরে জিরাফ, জেব্রা নাকি? করে গেল। সুশীলা হেসে বললো, ‘স্যার আপনি বন্যপ্রাণী দেখতে ভালোবাসেন তাই না। প্যাটেল স্যার বলছিলেন ফেরার পথে মিকুমিতে ঢুকবেন।’
অভয় অরণ্যের শেষে গাড়ি দুটো থামলো একটা খাবার জায়গায়। নামটা বেশ, সেভিয়ার। গাছ পালা নিয়ে জায়গাটা বেশ ভালো। একটা হলঘরে বুফে সাজানো রয়েছে। পাশে খাদ্য বস্তুর নামও লেখা আছে। সব খাবারের টুকরোই বেশ বড়ো বড়ো। এতে নিরীহ জিনিসও, সন্দেহজনক হয়ে ওঠে। প্যাটেল বাড়ি থেকে দিস্তে দিস্তে রুটি এনেছে। আচার, ঝুরি ভাজা, এসব দিয়েই লাঞ্চ সারার ইচ্ছে। শান্তনু না না করেও একটা রুটি নিলো, আর স্থানীয় খাবার, ভাত - তরকারি, মাছ। কিসের তরকারি, কী মাছ সেসব নিয়ে শান্তনু আর মাথা ঘামালো না।
‘স্যার, এখন থেকে তানজানাইট নিয়ে যাবেন না?’
সুশীলার প্রশ্নে শান্তনু নড়ে চড়ে বসলেন। তানজানাইট নামটাই প্রথম শুনলেন। নাম শুনে স্থানীয় পাথর মনে হয়, কিন্তু আর কিছুই জানা নেই শান্তনুর।।
‘সেটা আবার কী?’
‘তানজানাইট এখানকার বিশেষ দামি পাথর। প্রায় হিরের মতো দামি। নীল রঙের হয়। খুব সুন্দর। নিয়ে যান, ভাবীজি খুব খুশি হবে।’
হিরে তো জিরে নয়, হট করে কেনা যায় না। আর হিরে তো দক্ষিণ আফ্রিকায় ভালো পাওয়া যায়। সেটা বলতে সুশীলা হেসে উঠলো। ‘হিরে না স্যার, এটা শুধু এখানেই পাওয়া যায়। আবিষ্কারই তো হ’লো ষাটের দশকের শেষে।’
‘অনেক দাম হবে।’
‘না স্যার, দুই আড়াই হাজার ডলারে ঠিক ঠাক গয়না চলে আসবে।’
‘কাষ্টম টাষ্টম ঝামেলা করবে না? মানে আমি কোনো আইন ভাঙতে চাই না।’
‘না না স্যার, আমরাই কী আইন ভাঙতে চাই? আপনি একবার হুকুম করবেন, আমি আপনার সঙ্গে গিয়ে পছন্দ করিয়ে দেব।’
সুশীলা মোবাইলের স্ক্রিনে কিছু ছবি দেখালো। শান্তনুর গয়নাগাটিতে কোনো উৎসাহ নেই, তবু দেখে দিব্য লাগলো। শান্তনু ভেবে রেখেছেন ভালোয় ভালোয় কাজটা হয়ে গেলে, কিছু শপিং করে নিয়ে যাবেন। তবে আগের কাজ আগে।
ইরিঙ্গার আগে পথে অনেক বাওবাব গাছ; কান্ডটা মোটা, তারপর অনেক শাখা প্রশাখা। একটাও পাতা নেই। শান্তনুদের গাড়িটা থামলো। সুশীলা বললো, ‘জানেন তো স্যার, বাওবাব গাছ হলো কল্প বৃক্ষ। আপনি কী চাইবেন।’
শান্তনু হেসে বললো, ‘গাছ ভর্তি পাতা হয়ে যাক।’
সুশীলা কিন্তু বেশ কিছুটা হেঁটে গাছের সামনে গিয়ে হাঁটু মুড়ে বসলো। দু’হাত দু’দিকে ছড়িয়ে কিছু প্রার্থনা জানালো আর তারপর মাথা ঝুঁকিয়ে প্রণামের মতো করলো। শান্তনু কটা ছবি তুলে রাখলো। সুশীলা ফিরে এসে গাড়িতে বসলো। শান্তনু জিজ্ঞেস করলো, ‘কী চাইলে?’
‘হয়ে গেলে ব’লবো।’
যেমন কথা ছিলো সে রাতে সাইটের থেকে প্রায় একশ কিলোমিটার দূরে
একটা সরাইখানায় রাত কাটানোর ব্যবস্থা হলো। জায়গার অনুপাতে ব্যবস্থা মন্দ নয়। ঘরটা ছোট, তবে বাথরুম পরিষ্কার। এক রাতের তো ব্যাপার। শান্তনুর অত বায়নাক্কা নেই। কাল সক্কাল সক্কাল বেরিয়ে প্রথম দিন কাটেওয়াক, আর পরদিন মাগাঙ্গা মাটিটু। শান্তনুর একবার মনে হচ্ছিলো, সারাটা দিন এতটাই যখন চললাম, তখন সোজা সাইটের ক্যাম্প অফিসে গিয়ে উঠলেই তো হতো। কথাটা প্যাটেলকে বললেন। প্যাটেল সে প্রস্তাব একেবারে উড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘সামনের রাস্তাটা একটু খারাপ। অনেকটা সময় লাগবে। আর ক্যাম্প অফিসে আমাদের মতো লোকের থাকার ব্যবস্থা নেই। প্ল্যান্ট তৈরি হোক কিছু একটা ব্যবস্থার কথা ভাববো।’
গ্রেস দু’দিন আগে গডফ্রের ঘরটা গিয়েছিল। ঘরটা একদম এলোমেলো করা। কে বা কারা তন্ন তন্ন করে ঘরের ভিতর কিছু খুঁজেছে। একথাটা গ্রেসের মাথায় ঢোকে না। সবাই জানে খুনটা নোয়েল করেছে, সেই রাতের পর থেকে নোয়েল ফেরার। তাহলে গডফ্রের ঘরটা এলোমেলো করলো কে? আর যেই করে থাকুক, নোয়েল তো হতে পারে না। গডফ্রের মৃত্যু গ্রেসকে শোকের সাথে সাথে পাপবোধও দিয়েছে। তার জন্য গডফ্রেকে মরতে হলো একথাটা তার কাছে অসহ্য পীড়াদায়ক। আর সবচেয়ে বড়ো ভুল হলো, নোয়েলকে বুঝতে না পারা। কেন যে কখনো মনে হয়নি, নোয়েল এমন সাংঘাতিক একটা কাজ করতে পারে। তাহলে আগে ভাগে গডফ্রেকে সাবধান করে দিতো।
আজ রাতের রান্নার দায়িত্বটা গ্রেসের নয়। সন্ধ্যে হতেই ঝুপ করে একরাশ মন খারাপের পাথর বুকের ভিতর চেপে বসে। কখনো মনে হয় কাজের মধ্যে থাকলেই ভালো। তবু শরীর বিশ্রাম চায়। তাই গ্রেস ভাবলো ঘরে এসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করবে। ঘরে ঢুকে আলো জ্বালার আগেই পিছন থেকে কে যেন ওর মুখ টা চেপে ধরলো।
‘গ্রেস প্লিজ। চেঁচিও না।’
নোয়েল, গ্রেস ভয়ে বিস্ময়ে প্রাণপন নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করলো। নোয়েল তাকে মারতে এসেছে, নাকি জোর করে অধিকার করতে এসেছে।
‘গ্রেস, আমার কথা শোনো। আমি কোনো অপরাধ করিনি। গডফ্রেকে আমি মারিনি।’
নোয়েল যে মিথ্যে বলছে তাতে গ্রেসের কোনো দ্বিমত নেই, কী চায় নোয়েল? আজ গ্রেস নোয়েলকে ছাড়বে না।
‘বোঝার চেষ্টা কারো গ্রেস আমি তো সে রাতে কোথাও যাইনি। ঝগড়া হবার পর মাথা গরম ছিলো। জোসেফ এক কোণে বসিয়ে দিয়ে হাতে একটা বোতল ধরিয়ে দিলো। আমি বোতল শেষ করে ওখানেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। আমার হুঁশ ছিলো না। সে রাতে আমি গডফ্রেকে মারতে চাইলেও সম্ভব হতো না।’
গ্রেস ছাড়া পেয়ে আলো জ্বালাতে গেলো।
‘আলো জ্বালিও না। ক্যাম্পের লোকেরা আমাকে পেলে মেরে ফেলবে।’
‘আমিও তোকে মেরে ফেলবো। খুনি তুই। আমার গডফ্রেকে খুন করেছিস।’
‘ভুল গ্রেস ভুল। ক্যাম্পে কোনো গোলমাল আছে। গডফ্রে খুব এদিক ওদিক ঘুরতো। কী পেয়েছিলো, কী করেছিল জানিনা। কেউ একজন গডফ্রেকে খুন করে আমাকে ফাঁসিয়ে দিয়েছে। আমার নিস্তার নেই আমি জানি। তোমার জন্য আমার ভয় হচ্ছে। সাবধানে থাকবে। আবার বলছি আমি খুনি নই।’
গ্রেস কিছু করার আগেই নোয়েল অন্ধকারে মিশে গেলো।
শান্তনুর একটু শীত শীত করছে। ঘরেই রাতের খাবার খেয়ে, প্লেটটা বাইরে বের করে দিলো। যদি নিয়ে না যায় তবে সকালে বিরক্তির কারণ হবে। নতুন জায়গা, তার ওপর এতো তাড়াতাড়ি ঘুমোনোর অভ্যেস নেই। ল্যাপটপ খুলে একবার নিজের কাজটা দেখে নিচ্ছিলো। এদিক ওদিকে কিছু জানতে চেয়ে মেল পাঠানো হয়েছিল। তার জবাবগুলো দেখছিলো শান্তনু। এরপর কী করা যায়, ভেবে বের করার আগেই, দরজায় টোকা পড়লো।
‘একদম ঘুম আসছেনা স্যার। ভাবলাম রাত তো বেশি হয়নি, যাই স্যারের সাথে একটু গল্প করে আসি। কাল সকাল থেকে তো আবার অনেক দৌড়া দৌড়ি।’ (কেনো? স্যার কী ঘুমের বড়ি? না গল্প দাদুর আসর?)
সুশীলা একটা বাড়ির পোশাক পরে, চুল ছেড়ে এসেছে। দেখতে অন্যরকম, মানে ভালোই লাগছে। সুশীলা যেন কোনো অপ্সরা, ঋষির ধ্যান ভঙ্গ করতে এসেছে। এই ধ্যানের মাঝে কমার্শিয়াল ব্রেক, ব্যবসার জন্য কতটা অনুকূল জানা নেই, কিন্তু ঋষির পক্ষে মোটেই কূল নয়। (যেমন ঋষি, তার তেমনি ম্যাচিং অপ্সরা)। শান্তনুর ঘরটা বিশেষ বড়ো নয়, তার ওপর চেয়ারের ওপর ল্যাপটপ খুলে রেখেছিল, কী করবে ভেবে না পেয়ে ল্যাপটপ বন্ধ করে সরিয়ে রাখলো। সুশীলাকে কোথায় বসাবে ভাবার আগেই সুশীলা ওর পাশে বিছানায় বসে পড়লো। বলা নেই কওয়া নেই সুশীলা হঠাৎ ওর মোবাইল বের করে, ‘একটা সেলফি নিয়ে নি।’ বলে পট পট করে ছবি তুলে নিলো।
‘দেখুন স্যার ভালো উঠেছে না?’ বলে যখন ছবিটা দেখালো, তখন শান্তনুর রীতিমতো অস্বস্তি হলো। ছবিটা একটু বেশিই অন্তরঙ্গ, তার ওপর আবার বাড়ির পোশাকে, বিছানার ওপর। মেয়েটার কান্ডজ্ঞান একটু কম। সুশীলা কোনো ফরাসি পারফিউম মেখে এসেছে। গন্ধে একটা হালকা মাদকীয় আমেজ রয়েছে। শান্তনু নিজের কান্ডজ্ঞানটাকে বেঁধে রাখার চেষ্টা চালাচ্ছিলো।
‘আপনাকে আবার বিরক্ত করলাম না তো?’ এবার স্যারটা লক্ষণীয় ভাবে অনুপস্থিত।
শান্তনুর আরেকটু বেশিই শীত করছিল। কোনোমতে মুখে হাসি টেনে বললো, ‘না না, ঠিক আছে।’
‘আপনার কী শীত করছে?’
‘ওই একটু, মানে আগে থেকে জানা ছিলো না তো।’
‘একটা ছোটো ক’রে ড্রিংক নিয়ে নিন।’
মদ্যপান শান্তনুর স্বভাব নয়। কখনো কখনও নিয়েছেন, এই মাত্র।
শীত তাড়াতে অল্প ক’রে নিলে আর কী? সুশীলা যেন তৈরিই ছিলো। দরজা খুলে কাউকে কিছু বলে চটপট ব্যবস্থা করে ফেললো। শুরুটা ছোট করেই হয়েছিল। কিন্তু তারপর আর শান্তনুর বিশেষ মনে নেই। একটু আবছা আবছা মনে হচ্ছিলো, কেউ হাত ধরে টানছে। অভ্যাসবশে হাতটা ছাড়ানোর চেষ্টা করলো। কিন্তু ছাড়ানো অতটা সোজা হ’লো না।
পাঁচ
সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে শান্তনুর মাথাটা ভারি ভারি লাগছিলো। এখানকার চাই বোরা খেয়ে মাথা ধরা কিছুটা কমলেও মুখের স্বাদ বিগড়ে গেলো। গতরাতের স্মৃতি আবছা আবছা মনে পড়তেই মুখটা আরও তেতো হয়ে গেলো। শান্তনু মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে ফেললো, ‘শীত করলে কম্বল মুড়ি দেবো, কিন্তু ওসব আর না। পৃথিবীর অধিকাংশ লোক ঠান্ডা লাগলে গায়ে গরম জামা দেয়, আগুন তাপায়, বোতল খোলে না।
শান্তনু তৈরি হয়ে দেখলো, বাকিরা সবাই ততক্ষণে প্রাতরাশের টেবিলে। জ্যাম মাখানো পাঁউরুটি খেতে খেতে প্যাটেল জিজ্ঞেস করলো, ‘রাতে ভালো ঘুম হয়েছিল তো?’ তারপর উত্তরের আশা না করেই বললো, ‘পনেরো মিনিটের মধ্যে বেরোতে হবে। আজ কাটেওয়াকায় যাবো, কাল যাবো মাগাঙ্গা মাটিটু।
কাটেওয়াকা কয়লার খনি। কিন্তু কয়লা মাটির বেশি নিচে নয়। পাশ দিয়ে কাটেওয়াকা নদী। গাড়ি থেকে নেমে কিছুটা পায়ে হেঁটে পিটগুলো দেখছিলো শান্তনু। এখানে যেমন দেখা যায়, হালকা জঙ্গল। কয়লার সাথে মাইকাও আছে, আছে আরও কিছু। শান্তনু ভূবিজ্ঞানী নয়, তেমন ভাবে পাথর চেনে না। সাথে একজন স্থানীয় ভদ্রলোক আছেন, এখানকার সব কিছু দেখে, নাম জোসেফ। জোসেফ বললো, ‘কয়লার খনিতে এখানে সেখানে আরও কিছু পাওয়া যেতেই পারে, তবে পরিমাণে এতো কম হয়, যে হাত দিয়ে লাভ হয় না।’
‘হিরে পাওয়া যায়?’
জোসেফ একটু হেসে ঘুরে তাকালো --
‘এই খনিতে তার সম্ভাবনা বেশ কম।’
‘আর তানজানাইট?’
‘তানজানাইট! আপনি জানেন?’ জোসেফ একটু অবাক হলো।
‘ওই আসতে আসতে শুনলাম।’ শান্তনু লজ্জা লজ্জা করে বললো।
‘তানজানাইট পাওয়া যায় কিলিমাঞ্জারো পর্বতের পাশেই। মেরেরানি পাহাড়ের পাশে প্রায় পাঁচ বর্গমাইল এলাকা জুড়ে রয়েছে এই পাথর। হিরের চেয়ে অনেক বেশি দুষ্প্রাপ্য, কিন্তু আমাদের দেশ তার সদ্ব্যবহার করতে পারলো কই?’ জোসেফ হাঁটতে হাঁটতে বললো।
শান্তনু সেলফি তোলার পক্ষে নয়। নিজের ছবি নিজেই? নাম সেলফি, না সেলফিশ? নিজেই কটা ছবি তুললো, আর একে ওকে বলে আরো কটা ছবি তুলিয়ে নিলো। একটু বেলা করে সবাই মিলে ক্যাম্পে পৌঁছাল। প্যাটেলরুটির মধ্যে ঝুরি ভাজা পুরে সস টস লাগিয়ে দিব্যি রোল বানিয়ে ফেললো। তাছাড়া শান্তনুর সম্মানার্থে ওখানে মুরগি রান্না হয়েছিল। শান্তনুর মনে হলো মাংস এরা বেশ কম সিদ্ধ করে। সেখানে গিয়ে খাওয়ার পর প্যাটেল জোসেফের সাথে মিটিং করতে বসলো। কাটেওয়াকাতে কয়লার প্রাচুর্য দেখে, এখানে একটা তাপবিদ্যুৎ কারখানার কথা মাথায় এলো শান্তনুর। কয়লার প্রক্সিমিটি অ্যানালিসিসের রিপোর্টগুলো চাই শান্তনুর। শান্তনু নোটবুকে, কিছু দরকারি তথ্য লিখে রাখতে লাগলো।
নোট লেখা শেষ করে শান্তনু একটু হেঁটে বেড়াচ্ছিল।
‘মাফ করবেন, আপনি কী ভারতীয় বিশেষজ্ঞ?’
যিনি বললেন, তার উচ্চতা শান্তনুর মাথার ওপর অনেকটা। জিনসের প্যান্ট, জিনসের জ্যাকেট। পেশিবহুল চেহারা। তার সাথের লোকটির চোখে চশমা আর বয়েস একটু বেশি।
‘ভারতীয় তো বটেই। আর যারা আমাকে এক্সপার্ট মনে করে দায়িত্বটা তাদের।’
রসিকতায় বিন্দুমাত্র না হেসে বয়স্ক ভদ্রলোক বললেন, ‘আমি ডঃ উইলসন আর আমার সাথে মিস্টার মোসেস। আমরা রক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে আসছি।’
‘আমি এস. চ্যাটার্জী, এই কোম্পানির কেউ নই, আপনারা বোধ হয় মিস্টার প্যাটেলের সাথে কথা বলতে চাইবেন।’
ডঃ উইলসন বললেন, ‘আমাদের দরকারটা আপনার সাথে। আসুন একটু বসি।’ গলায় একটু আদেশের সুর। শান্তনু আপত্তি করতে গিয়ে ঢোঁক গিলে ফেললো।
বসার জন্য তেমন ভালো কিছু আয়োজন ছিলো না। ওরা একটু সরে গিয়ে একটা বাঁশের মাচায় বসলো। শান্তনুর অস্বস্তি হচ্ছিলো, আগন্তুকদেরও অসুবিধে হচ্ছিলো, যদিও তাদের মুখে কোন ছাপ পড়লো না।
‘আপনার এখানে কাজটা কী একটু বিশদ ভাবে বলবেন কী?’ ডঃ উইলসন কোনো ভনিতা না করেই শুরু করলো।
‘কিছু মনে করবেন না, ব্যাপারটা আমার আর মেহেতা গ্ৰুপের মধ্যে। আমার পক্ষে কিছু বলা সম্ভব নয় যা জানার মেহেতা গ্ৰুপের কাছে জানবেন।’
মোসেস বিরক্ত হয়ে বললো, ‘আমাদের কাছে খবর আছে, আপনি আমাদের দেশের সুরক্ষা সংক্রান্ত খবর জোগাড় করছেন। তাই বেশি তেজ দেখবেন না। একবার জেলে ঢুকিয়ে দিলে এই অপরাধে আর বেরোতে হবে না।’
শান্তনু অবাক হয়ে গেলো, ‘আমি এসেছি, মেহেতা গ্ৰুপের আমন্ত্রণে, ওদের স্টিল প্ল্যান্টের পরামর্শ দাতা হিসেবে। আমার সাথে সুরক্ষার কী সম্পর্ক?’
ডঃ উইলসন বললেন, ‘সেটা আমরা বুঝবো। আপনি উত্তেজিত না হয়ে ঠিক ঠাক আমাদের প্রশ্নের উত্তর দিন।’ শান্তনু বেশ অবাক হয়ে ওদের দিকে তাকালো। কেন যেন মনে হলো, মোসেসের সাথে অস্ত্র আছে। ধীরে ধীরে নিজের কাজের কথা বললো। হাতি ঘোড়া কিছু তো নয়। মোসেস কথাগুলো রেকর্ড করছিল। ডঃ উইলসন মন দিয়ে শুনছিলো আর মাঝে মাঝে একটা দুটো প্রশ্ন করছিল।
‘যাবার আগে একটা কথা বলে দিয়ে যাই। আপনি শুধু আপনার পাইলট প্রজেক্টের কাজ নিয়েই থাকবেন, অন্য কোনো ব্যাপারে যাবেন না। কোনো জায়গায় মাটি খুঁড়বেন না বা খুঁড়তে বলবেন না। আর মেহেতা গ্রুপের বর্তমান এলাকার বাইরে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করবেন না। আমাদের নজর আপনার ওপর থাকবে।’
ওরা যাবার পর শান্তনু কিছুক্ষণ গুম মেরে রইলো। এদের খবরদারিতে শান্তনুর আত্মাভিমানে যথেষ্ট ধাক্কা লেগেছে। হাজার হোক দেশে ওর একটা সম্মান আছে। দুটা গুন্ডা মতো পুলিশের লোক বিনা কারণে মুখের ওপর গুপ্তচর বলে গেলো, শান্তনু ঠিক মতো প্রতিবাদ ও করতে পারলো না। একটা সাধারণ ব্যাপারকে এরা এতো কেন ঘাঁটছে, শান্তনুর মাথায় ঢুকছে না। আর কী কী বাকি আছে কে জানে? এই প্রথম মনে হলো, না এলেই ভালো ছিলো। প্যাটেলের কথা মেনে নিয়ে ঘরে বসে পাইলট প্লান্টের ডিসাইন করে টাকাটা ট্যাঁকে গুঁজলেই ভালো হ’তো। ওকে নিয়ে সবারই সাতশো অসুবিধে।
একটু পরেই সুশীলা এসে উপস্থিত, ‘ওরা কারা স্যার?’
‘তোমার কোনো আত্মীয় হবে।’
‘আমি তো গুজরাতি স্যার।’
ন্যাকামোটা শান্তনুর বিশেষ সহ্য হয় না।
‘এ সমস্ত কী হচ্ছে একটু বলবে?’
‘আমি কিছু বুঝতে পারছি না, স্যার। আপনি কী বলতে চাইছেন।’
‘তোমাদের এলাকায় ঢুকে দু’জন লোক হলিউডি কায়দায় আমাকে প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়ে যায়। আর তোমরা কিছুই জানো না।’
‘এসব রুটিন ব্যাপার স্যার। এত সিরিয়াসলি কিছু নেবেন না স্যার। হাকুনা মাটাটা স্যার।’
সন্ধ্যাবেলা ওরা মাগাঙ্গা মাটিটু থেকে চল্লিশ কিলোমিটার দূরে যে সরাইখানায় থাকতে এলো, সেরকম থাকার জায়গা পাওয়া যাবে তা শান্তনু ভাবেইনি। আর আফ্রিকা বলতে সব সময়েই সিংহ আর জঙ্গল ভেবে এসে, এখানে ডুয়ার্সের থেকেও কম জঙ্গল দেখে শান্তনু একটু আশাহত। রাতে রুটি, বড়ো বড়ো মাংস, টমেটো ভাসা ঝোল আর কোক। ঘরে ফিরে স্কাইপে ছেলের সাথে খবর বিনিময় করলো শান্তনু।
‘আচ্ছা তোমার ওই ডঃ উইলসন কেমন দেখতে? মর্গান ফ্রীম্যানের মতো? না লরেন্স ফিসবর্ণের মতো গাঁট্টাগোঁট্টা?’
‘মর্গান ফ্রীম্যান তো ভগবান সেজেছিল, এর বয়েস একটু কম। আর লরেন্স ফিসবর্ণটা আবার কে?’
‘আরে ওই ম্যাট্রিক্সের মর্ফিয়াস। ছবি পাঠাবো?’
‘তুই মজা পেয়েছিস? এদিকে আমি বিরক্ত হয়ে গেলাম।’
‘তোমার মাগাঙ্গা মাটিটুর ইতিহাসটা একবার নেটে খুঁজে দেখি। তোমাকে পরে বলছি। পেন ড্রাইভটা সামলে ব্যাস।’
পরদিন সকাল সকাল ডিম রুটি চা খেয়ে শান্তনু তৈরি। দুটো গাড়ি চললো মাগাঙ্গা মাটিটুর দিকে। রাস্তা বেশ খারাপ। খনি এলাকার রাস্তা আবার ভালো হয় কবে? ওরা প্রথমে ক্যাম্পে পৌঁছালো। জায়গাটা কাটেওয়াকের চেয়ে অনেকটা বড়ো। কোর শেড, থাকার জায়গা, খালি জায়গা অনেকটাই। ওখান থেকে খনি দেখতে একটু জঙ্গলের পথে যেতে হয়। কিছুটা গিয়ে একটা ফাঁকা জায়গা দেখিয়ে প্যাটেল বললো। এখানে হবে আপনার পাইলট প্ল্যান্ট। শান্তনুর মেজাজটা তখনও ঠিক হয় নি। তাই মৃদুস্বরে বললো,’আমার বাবার প্ল্যান্ট।’তারপর অবাক হয়ে বললো, ‘এখানে? কাজের লোকেরা সব থাকবে কোথায়?’
‘কেন, ক্যাম্প তো দূরে নয়। আর ছোট একটা পুরো অটোমেটিক প্ল্যান্ট, চালাতে কটা লোক চাই?’
‘তা নয়, পাইলট প্ল্যান্ট তো ক্যাম্পের মধ্যেই করা যেত।’
‘আমাদের কোম্পানি চায় না, ক্যাম্পের মধ্যে আয়রন ওর উড়ুক। তাছাড়া টেস্টের খবর বাইরে যেতে দেওয়া হবে না।’
শান্তনু নোট খাতা বের করে, জমির একটা ম্যাপ বানালো, প্যাটেলের লোকেদের দিয়ে জমিটা মাপালো, তাছাড়াও জমির উচ্চতা, কোঅর্ডিনেটস লিখে, অনেক কটা ছবি তুলে নিলো। তারপর মুখ তুলে জিজ্ঞেস করলো,
‘আর আপনাদের আসল প্ল্যান্টটা কোথায় ভাবছেন?’
‘সামনে চলুন দেখাচ্ছি।’
ইতিমধ্যে ওরা খনির দু তিনটে স্যাম্পলিং পিট্ দেখে নিলো। শান্তনু ভূবিজ্ঞানী না হলেও খনিজের চেহারা দেখে চমৎকৃত না হয়ে পারলো না। দেখে মনে হয় লোহার সাথে তামা আর আরও কিছু মিশে আছে। তামার কথাটা প্যাটেলকে বলতে হেসে বললো, ‘সেটা তো আপনি করে দেবেন, সব মেটাল গুলোকে আলাদা করে দিন।’
সামনে একটা বড়ো আকারের ঘাস জমি, সেটা দেখিয়ে প্যাটেল বললো, ‘এখানে হবে আপনার ওর ড্রেসিং ইউনিট আর স্টিল প্ল্যান্টটা হবে নিচে।’ শান্তনু এবার বলেই ফেললো, ‘সবই তো আমার, আপনাদের তো কিছু নেই।’
সুশীলা কথাটায় জোরে জোরে হাসলো, যেন এমন মজার কথা জীবনে শোনেনি।
‘এই জমিটার ম্যাপ আছে? না বানাতে হবে?’
‘আছে। হঠাৎ করে ঘাসজমির ভিতর যাবেন না। বিপদ থাকতে পারে।’
বিপদ মানে কী শুধু বন্যপ্রাণী। শান্তনুর জানা নেই, বা এখনো জানার বাকি আছে।
শান্তনু আবার অনেক ছবি তুললো। প্রশ্ন করে বেশ কিছু উত্তর জেনে নোট করে নিলো।
‘আচ্ছা এখানে জল কোথায়?’
‘মাটির তলায় আছে, ওদিকে লুপালী নদী আছে।’
‘লুপালী নদীর ধারের জমিটা কার? ওটাই তো ভালো লোকেশন হতে পারতো।’
‘ওটা আমাদের লীজের বাইরে। সরকারি জমি।’
‘ওখানে একবার যাওয়া যায়?’
‘দুপুরে খেতে কিন্তু দেরি হয়ে যাবে।’
ঐতো খাওয়ার ছিরি, শান্তনু মনে মনে ভাবলো, এতদূর এসে যদি সবটা না দেখা যায় তবে আসাটা কেন?
লুপালী নদী একটু নিচে, ছোট তবে জল যথেষ্টই। নদীর ধারে অনেকটা পাতলা ঘাসের জমি। জমিটা অনেক পরিষ্কার। অনায়াসে হাঁটা যায়, শান্তনুর জমিটা মাপার ইচ্ছে ছিলো। ওদের আলসেমি দেখে আর বললো না। শান্তনুর মনে অনেক প্রশ্ন আসছিলো। ওদের কাছ থেকে বিশেষ সদুত্তর না পেয়ে, খাতায় লিখে রাখলো। সুশীলা প্রায় শান্তনুর ব্যক্তিগত ফটোগ্রাফার হয়ে গিয়েছে। যেখানেই যায়, ‘স্যার, আপনার একটা ফটো তুলি?’ কেনোরে বাপু? শান্তনু কী অমিতাভ?
ক্যাম্পে দুপুরের খাওয়ার বিশেষ আয়োজন। তবে প্যাটেল তো এসব ছোঁবেও না, তাহলে কেন খাই খাই করছিল, তা শান্তনুর বোধগম্য হলো না।
ক্যাম্পে বাকিরাও শান্তনুদের সাথেই খেতে বসলো। শান্তনু ক’জনের নাম জানলো। একটি মেয়ের নাম শুনে ভালো করে দেখলো। গ্রেস, এখানকার আবলুশ কাঠ দিয়ে তৈরি এক যুবতী। চাকরির প্রথম দিকে শান্তনু যখন কিছুদিন গোয়ার চোগলদের কোম্পানিতে ডেপুটেশনে ছিলো, সেখানে গ্রেস বলে একটি মেয়ের সাথে একটু বেশি আলাপ হয়েছিল। কোঙ্কনি খ্রিস্টান, মিশুকে। শান্তনুকে অনেক সাহায্য করেছিল। আজ হঠাৎ করে মনে পরে গেলো নামটা গ্রেস ফার্নান্ডেজ। মেয়েটা হাত ধোবার সময় এগিয়ে এসে শান্তনুকে সাহায্য করলো। তারপর হাতের ইশারায় ওদের থাকা খাওয়ার জায়গাটা দেখিয়ে বললো, ‘সি।’ শান্তনুর ওদের জীবন যাত্রার ওপর একটা উৎসাহ আছেই, তাই রাজি হয়ে গেলো। সুশীলা লেজুড় ধরার আগেই, গ্রেসের সাথে ওদের রান্নার জায়গা, থাকার জায়গায় ঢুকে পড়লো। গ্রেস একটা একটা শব্দ বলতে পারে। সেটাও কম কিছু নয়। মেয়েদের থাকার জায়গাটা আলাদা, সেখানে ঘরের মধ্যে ঢুকে গ্রেস হাত দিয়ে ইশারা করে চুপ থাকতে বললো। তারপর নিজের বাক্স থেকে একটা নোট বুক আর কাগজে মোড়া একটা কোর স্যাম্পলের টুকরো বের করে শান্তনুর হাতে গুঁজে দিলো। শান্তনু খুলে দেখতে গেলে গ্রেস ইশারায় বললো, এখানে নয়। শান্তনু বেরিয়ে এসে দেখে সুশীলা কৌতূহলে ফেটে যাচ্ছে। ‘ওদের ঘর টর সব দেখছিলেন স্যার?’
‘আরে না, মেয়েটার সাথে সেলফি তুলছিলাম।’
ক্যাম্প থেকে ওদের ফেরার পালা। আজ রাতের আগে যতটা পারা যায় এগিয়ে গেলে, আগামী কাল একটু তাড়াতাড়ি দার এস সালামে যাবে। পথে মিকুমি দেখে যাবার কথাও আছে।
গডউইন গডফ্রে, নোট বইটার প্রথম পাতায় লেখা আছে, ভূবিজ্ঞানী। কাউকে না দেখিয়ে এতটুকুই পড়তে পেলো শান্তনু। মেয়েটার গোপনীয়তার চেষ্টা দেখে শান্তনুও সাবধান হয়ে গেছে। সন্ধ্যের আগে আগে ওদের গাড়ি অনেকটাই চলে এলো। পথের পাশে অনেক হাতে আঁকা ছবি রাখা থাকে। শান্তনু সে অর্থে ছবি বোঝে না। কিন্তু ভালো লাগলো।
খাওয়ার টেবিলে শান্তনু চুপচাপ ছিলো দেখে, প্যাটেল জিজ্ঞেস করলো, ‘কেমন দেখলেন আমাদের সাইট।’
‘দেখা তো খুব ভালো হলো। না আসলে অনেক কিছুই বুঝতে পারতাম না। এখন কাজটা অনেক সোজা হবে।’
‘সে তো খুব ভালো কথা। আমাদের পাইলট প্ল্যান্টটা তিন চার মাসের মধ্যে করে ফেলতে পারবেন?’
‘আপনারা করতে চাইলে তো চার মাসে অবশ্যই। তবে আপনাদের এখানে চটপট শেডটা বানাতে হবে। ছোট প্ল্যান্ট, বানাতে তো কোনো অসুবিধে নেই। যা দেরি হবে অটোমেশনের জন্য। খরচও বেশি ওরই জন্য।’
‘আপনি আমাদের বসের সামনে একটু সুপারিশ করে দিলে হয়ে যাবে।’
‘সুপারিশ মানে?’
‘মানে পাইলট প্ল্যান্টটা একটু খরচ করে বানালে ভবিষ্যতে লাভই হবে।’
‘সে তো বটেই। অনেক টাকার প্রজেক্ট। আজ একটু হিসাব করে দেখি।’
‘হুম’ বলে প্যাটেল বিয়ারে চুমুক দিলো। বিয়ারটাতো আমিষ নয়।
‘আচ্ছা, গডফ্রে কে? আজ দেখলাম না তো!’
টেবিলে উপস্থিত সবাই চমকে গেলো।
প্যাটেল একটু সামলে প্রশ্ন করলো, ‘এই নামটা কোথা থেকে শুনলেন?’
প্রশ্নটা আসবে সেটা শান্তনু জানতো, তাই উত্তর তৈরি ছিলো।
‘আমাকে যে রিপোর্টগুলো দিয়েছিলেন তার নিচে নাম ছিলো। ভেবেছিলাম এখানে এসে দেখা হ’লে, কিছু কথা জেনে নেবো।’
‘গডফ্রে এখানে সহকারী ভূবিজ্ঞানী ছিলো। কিছুদিন হলো কাজ ছেড়ে দিয়ে চলে গিয়েছে। আপনার যা যা জানার জোসেফের কাছ থেকে জানতে পারবেন।’
গ্রেস বেশি কথা বলেনি বটে, কিন্তু ইশারায় শান্তনুকে দেখিয়েছিলো গডফ্রে মারা গেছে। মুখে বলেছিলো, ‘ডেড।’
তাহলে প্যাটেল এমন মিথ্যে কথা বললো কেন?
একটু রাতে খাওয়া দাওয়ার পর জোসেফ গ্রেসের ঘরে ঢুকে বললো, ‘গডফ্রে তো যাবার ছিলো গেছে। তোকে তো বাঁচতে হবে। ওর ঘরে ঘুর ঘুর করবি না।’
গ্রেস চুপ করে রইলো। জোসেফের সাথে একটা রামের বোতল। জোসেফ সেটা গ্রেসের হাতে তুলে দিলো।
‘নোয়েলের এতো মাথা গরম কে জানতো? তোকে আমার বরাবই ভালো লাগে। এই ক্যাম্পে থাকতে হলে আমার সাথে ভালো সম্পর্ক রেখে চলবি।’
গ্রেস কোনো কথা না বলে, জল গেলাস আনতে গেলো। জোসেফ গ্রেসের বিছানায় অধিকার জমিয়ে আধ শোয়া হয়ে বসে একটা, সিগারেট ধরালো।
‘ওই ইন্ডিটা ঘরে এসে কী করছিল? কিছু জিজ্ঞেস করেছে?’
‘ছবি তুলছিল। কিছু বলেনি।’
‘কী ছবি? তোর স্পেশাল ছবি।’ জোসেফ অশ্লীল ভাবে হাসলো। ‘বুড়োর খুব রস।’
গ্রেস জোসেফের হাতে গেলাসটা এগিয়ে দিতেই, জোসেফ ওর হাত ধরে ফেললো। গ্রেস কিছু না বলে তাকালো। গেলাসে একটা লম্বা চুমুক দিতেই, হাতটা খসে গেলো।
নোয়েল নিঃশব্দে ঘরে ঢুকলো। জোসেফের ছোট খাটো মৃত শরীরটা অক্লেশে তুলে নিয়ে যেতে যেতে একবার গ্রেসের দিকে তাকিয়ে বললো, ‘এবার ক্ষমা করে দিও।’
গ্রেস কোনো জবাব না দিয়ে ঘরটা পরিষ্কার করতে লাগলো।
‘একটা কথা আমার মাথায় ঢুকছে না স্যার। ওই চ্যাটার্জী কী দুনিয়ার একমাত্র কাজের লোক? ও যখন আপনার শর্তে রাজি হলো না, তখন অন্য লোককে চেষ্টা করলেন না কেন?’
‘চেষ্টা করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আমাদের বস ওনার প্রবন্ধ পড়ে একেবারে মুগ্ধ। তাছাড়া উনিও চাইছিলেন, আমাদের বিশেষজ্ঞ একবার সাইটটা দেখুক। আমি বেশি আপত্তি করলে মেহেতাজির সন্দেহ হতো।’
‘ওকে মাইনসে নিয়ে আসা একদম কাজের কথা হয়নি। খুব বিপদজ্জনক কাজ।’
‘আরে না। ওতো জিওলজিস্ট নয়, সন্দেহ হবার কথা নয়।’
‘অন্য ভাবে তো আটকানো যেত?’
‘চেষ্টা তো করলাম, যাতে নিজে থেকে বলে, যাবো না। লোকটা খুব জেদি। মানলো না।’
‘আমি কী করবো স্যার?’
‘ওকে দিয়ে কাজটা পুরো করিয়ে নিয়ে, তারপর, অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা।’
রাতের বেলা ঘরে এসে শান্তনু দরজা ভালো করে এঁটে, গডফ্রের নোটবই খুলে বসলো। অনেক কিছুই লেখা। তারিখ দিয়ে কিছু নমুনার বিবরণ লেখা। ছোট ছোট ড্রয়িং করা। এক দু জায়গায় গ্রেস ও লেখা আছে। শেষ কটা পাতায় তিন নম্বর পিটের কথা লেখা আছে আর লেখা আছে এক স্যাম্পলের কথা। আর যা লেখা আছে, তা পড়ে শান্তনু চমকে উঠলো। লুপালী নদীর ধারে মাটি খুঁড়ে গডফ্রে মানুষের হাড় পেয়েছিলো। দিনটা মাস খানেক আগের এক শুক্রবার।
জমির নিচে কঙ্কাল পাওয়া যাওয়া এতকিছু অবাক করা ব্যাপার নয়। মানুষ যখন আশ্চর্যতম প্রাণী, তার আচরণ আশ্চর্যরকম হবে বৈকি। একটা কঙ্কাল পাওয়া যাওয়াটা, গডফ্রে হয়তো কাউকে জানায়নি।
হয়তো এটার বিশেষ কোনো গুরুত্ব নেই, ও এমনিই লিখেছে। গ্রেসের হাবে ভাবে শান্তনুর মনে হলো ডায়রিটা গডফ্রে গ্রেসকে দিয়েছিলো তাকে দেবার জন্য। কিন্তু মুশকিল হলো, শান্তনুকে গডফ্রে চেনে না, শান্তনু ও না। আর শান্তনুকে দেওয়া মানে এর মধ্যে এমন কিছু তথ্য আছে, যা শান্তনুর সাথে জড়িত। সেটা কী? সারা দিন ঘোরা ঘুরির পর ঘুম পাচ্ছে শান্তনুর, ভাবছিলো সব কিছু গুটিয়ে ঘুমিয়ে নি। তখনি ছেলের মেসেজ এলো একবার অনলাইনে এসো কথা আছে।
‘ঘুম পাচ্ছে।’
‘উড়িয়ে দিচ্ছি। তিন বছর আগে, লুডেওয়ায় একটা বাজে ঘটনা হয়েছিল।’
‘বাজে ঘটনা মানে?’
‘ওখানে একটা ছোট বসতি ছিলো। সেখানে সেনার একটা ছাউনি হবে বলে, গ্রামের লোকদের চলে যেতে বলে। চলে যাবার সময় চল্লিশ জন নদীতে ডুবে মারা যায়।’
‘আষাঢ়ে গল্প। নদী বলতে তো লুপালী! হেঁটে পার হওয়া যায়। সেখানে চল্লিশ জন ডুবে মরবে! বিশ্বাসযোগ্য নয়।।’
‘হ্যাঁ, লুপালী নদীর কথাই লেখা আছে।’
‘এখানে এতো কিছু বর্ষা হয় না যে নদী তেমন ফুলে ফেঁপে উঠবে।’
‘শোনো বাবা, লোক তো মারা গিয়েই ছিলো, সে যে ভাবেই যাক।’
‘আরে হ্যাঁ। গডফ্রে নদীর ধারে মানুষের হাড় খুঁজে পেয়েছিলো।’
‘বাবা, একটা বাজে সন্দেহ হচ্ছে। তোমার জন্য চিন্তা হচ্ছে। তুমি তো বলেছিলে তোমার সুটকেস থেকে
কিছুই খোয়া যায়নি। কোনো অচেনা জিনিস
বেশি লাগছিলো?’
‘কী যে হেঁয়ালি করিস! তুই বলছিস, কেউ কিছু পুরে দিয়েছে কি না।’
‘ঠিক তাই। খুঁজে দেখো তোমার বাক্সে ক্যামেরা, রেকর্ডার বা ট্র্যাকার কিছু লাগানো কিনা। পুরো বাক্স খালি করে লাইনিং এর তলে দেখো।’
‘কী বলছিস?’
‘সময় নষ্ট করোনা বাবা, দেখো। কিছু পেলে?
‘হ্যাঁ। এ কিরে, একটা গোলমতো জিনিস।’
‘মনে হয় ট্র্যাকার।’
‘এখন কী করবো?’
‘না ভেঙে খুলে বের করো। যেন অকেজো হয়ে না যায়। কাল বের হবার আগে জিনিসটা অন্য অচেনা কারোর গাড়ি, ট্রাক, বাইক যা পাবে তাতে ফেলে দেবে।’
‘যদি কেউ দেখে ফেলে।’
‘সাবধানে করবে। তোমার ভদ্র সদ্র চেহারা, কেউ সন্দেহ করবে না।’
‘ভদ্র সদ্র চেহারা মানে? ভদ্র লোকের তো ভদ্র চেহারাই হবে।’
‘ঠিক আছে, ঠিক আছে, আমার কথা মন দিয়ে শোনো। আমার মনে হয় না এটা তোমার মেহেতা গ্রুপের কীর্তি। তুমি সব সময়েই ওদের নজরের সামনে আছো, ওদের সাথেই ঘুরছো। তাই এটা সম্ভবত ডঃ উইলসনের কাজ। যা যা করতে হবে এক এক করে বলছি। আর তোমার নিজের ফোনটাতে, রোমিং করিয়ে দিচ্ছি। প্যাটেল যাই বলুক, তুমি নিজের সন্দেহের কথা ওকে বলবে না। ফোনটা পুরো চার্জ করে রাখবে।’
শান্তনু গডফ্রের ডায়রির প্রতিটা পাতা ছেলে বিনীতকে ছবি তুলে পাঠিয়ে তবে শুতে গেলো।
ছয়
শান্তনু ভেবেছিলো, এতসবের পরে রাতে ভালো ঘুম হবে না। বরং ক্লান্তিতে চটপট ঘুম এলো। সক্কাল সক্কাল উঠে তৈরি হয়ে নিলো। সুটকেসের তালার কম্বিনেশনটা কাল রাতেই পাল্টেছিলো, সেটা মনে ছিলো না। তাতেই একটু দেরি হলো। জিপিএস ট্র্যাকারটা হাতের মুঠোয় নিয়ে অলস ভাবে সরাইখানার পার্কিঙে এলো। ওদের গাড়ি দুটো ছাড়া একটা মিনি ট্রাক ছিলো। কেউ দেখছে না, দেখে নিয়ে টুক করে ট্রাকটায় ওটা ফেলে দিলো। কাজটা ক’রে, শান্তনুর বেশ একটা ছেলেমানুষি আনন্দ হলো। ‘দেখ এবার সেয়ানে সেয়ানে কোলাকুলি।’
‘গুড মর্নিং স্যার।’
শান্তনু চমকে দেখলো, ওদের গাড়ির ড্রাইভার ম্যাক। গাড়িটায় জল ঢেলে পরিষ্কার করছে। দেখে ফেললো নাকি।
‘গুড মর্নিং ম্যাক।’
‘স্যার আজ আপনি আমার গাড়িতে থাকবেন।’
‘তোমার গাড়িতেই কেন? সিংহ দেখাবে?’
‘সিরিয়াস ব্যাপার স্যার। একটু সতর্ক থাকবেন।’ শান্তনু আরও কিছু জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিলো, কিন্তু ম্যাক হঠাৎ কথা বন্ধ করে গাড়ি মুছতে শুরু ক’রলো। শান্তনু পিছে তাকিয়ে দেখে কিছুটা দূরে সুশীলা ওদের দিকেই আসছে। ওদের কথা বলতে দেখেছে, কিন্তু শুনতে পায়নি। আজ সুশীলা একটা চকরা বকরা বারমুডার সাথে ভারি জুতো পড়েছে। মাথায় টুপি।
‘মর্নিং।’ শান্তনু নিজের অপ্রস্তুত ভাবটা ঢাকবার জন্য যোগ করলো। ‘দেখে মনে হচ্ছে আফ্রিকান সাফারির জন্য একেবারে তৈরি।’
‘মিকুমি যাবো তো।’
‘আরে সিগনালটা এমন দেখাচ্ছে কেন? আজ তো ওদের ফেরার কথা। এতো গ্রামের দিকে যাচ্ছে।’
‘আমি বলেছি, ইন্ডিয়ানটা মহা সেয়ানা। দেখতেই নিরীহ। আমাদের ঘোল খাওয়ানোর চেষ্টা করছে।’
‘তার মানে, ও ট্র্যাকারটার কথা জানতে পেরেছে।’
‘চলো ওকে খুঁজে বের করতে হবে।
ওদের গাড়ি বেলা বারোটার আগেই মিকুমি পৌঁছে গেলো। দার এস সালামের রাস্তার প্রায় ওপরেই মিকুমির দরজা। সকাল সাতটায় খুলে যায়। সেই ভোরের কুয়াশার চাদরের আলসেমিতে সূর্যের পৌঁছাতে একটু দেরিই হয়ে যায়। আর সেই কুয়াশার বুক চিরে সূর্যের আলোর বর্শা ঘন ঘাস বনকে বিঁধে ফেলে। মিকুমিতে সবাই নাকি প্রধানত পাঁচটা পশু দেখতে যায়, চিতা, সিংহ, হাতি, জংলী মহিষ আর গন্ডার। শান্তনুর জলদাপাড়াতে গন্ডার ভালোমতো দেখা আছে। বরং জিরাফ, জেব্রা দেখলে বেশি খুশি হবে। শান্তনু এখন অভয়ারণ্যের ভিতরে ঢোকার জন্য অধীর, আর ঠিক তখন প্যাটেলের খাইখাই শান্তনুর অসহ্য লাগে। আরে বাবা খাবি তো ওই রুটি আর ঝুরি ভাজা। কী আর করা যাবে, তাড়াতাড়ি করে খেয়ে নিয়ে গাড়ি নিয়ে ভিতরে ঢোকা হলো। মিকুমিতে ঢোকার আগে প্যাটেল বললো, ‘আমার গাড়িতে আসুন চ্যাটার্জী সাব। আপনার সাথে কথা আছে, আর আমি মিকুমিতে আগে অনেকবার এসেছি। আপনাকে সব জন্তু জানোয়ার দেখিয়ে দেবো।’
শান্তনুর আর মানা করতে পারলো না। এই গাড়ি বদল করার কথাটা ম্যাকের জানা ছিলো না। কিন্তু ব্যাপারটা তার পছন্দ হলো না, কিন্তু কিছু করারও তো নেই। প্যাটেল, শান্তনুর সাথে এক গাড়িতেই। অন্য গাড়িতে ম্যাকের সাথে সুশীলা। জঙ্গল বলতে প্রধানত ঘাস বন। আর মাঝে মাঝে কিছু গাছ। এখানে ওই ঘাসবনেই সিংহ পেটভরা থাকলে অলস বিড়ালের মতো শুয়ে থাকে। জংলী মহিষ অত্যন্ত ভয়ঙ্কর প্রাণী। ওর আসে পাশে না যাওয়াই ভালো। প্যাটেল আগেও কয়েকবার এসেছে, তাই এলাকাটা মোটের ওপর জানা। পালে পালে হরিণ, জেব্রা দেখে শান্তনু পাগলের মতো ছবি তুলছিলো। জিরাফের দল, সাথে বাচ্চা, ঠিক যেন বাঁকুড়ার ঘোড়া। আরেকটা প্রাণী, যাকে শান্তনু আগে কখনো দেখেনি, প্যাটেল বললো, ‘বিস্ট।’ ওরা ঘুরতে ঘুরতে একটা পুকুরের কাছে এলো। দৃষ্টিটা একটু ঠিক করলেই জলে হিপ্পো আর কুমির, শুধু নাকের ডগাটাই দেখা যাচ্ছে। শান্তনু ছবি তোলার অত্যুৎসাহে প্যাটেল কিছু বলার আগেই গাড়ির দরজা খুলে নেমে এলো। সাথে সাথেই একটু দূর দিয়ে একটা কুমির সরসর শব্দে জলে নেমে গেলো। পাশের গাড়ি থেকে ম্যাক চিৎকার করলো, ‘স্যার উঠে আসুন।’ শান্তনু ঘাবড়ে গিয়ে গাড়িতে বসলো। ‘হাজার হোক এটা আফ্রিকা মি.চ্যাটার্জী। সাবধান থাকবেন তো বেঁচে থাকবেন।’ প্যাটেল গম্ভীর গলায় বললো।
শান্তনু নিজের হঠকারিতার জন্য লজ্জিত হলো।
‘কাল আপনার প্রেসেন্টেশন আছে মি.চ্যাটার্জী। আজ এসব করলে চলবে! আপনার কিছু হয়ে গেলে কী হবে?’
শান্তনুর মনে হলো, কাল যদি প্রেসেন্টেশন না থাকতো তবে, আজ ও কুমিরের পেটে গেলে প্যাটেলের বিশেষ আপত্তি ছিলো না। কী ছোটোলোক দেখেছো!
‘আপনার পেপার তো তৈরি, তাই না মি.চ্যাটার্জী। কাল রাতে অনেকক্ষণ কাজ করছিলেন।’
‘আমি কাজ ফেলে রাখি না। আর কালকে সকাল দশটায় মিটিং। সময় কোথায়?’
‘বাঃ, কোথায় আপনার রিপোর্ট? আমার সাথে তো আপনি ডিসকাস করলেনই না।’
‘আপনার সাথে ডিসকাস করার বিশেষ কিছু নেই। কাল তো আপনিও থাকবেন। তখনি সব বিস্তারিত বুঝিয়ে বলবো। আপনাদের মাগাঙ্গা মাটিটুর আয়রন ওর ইস্পাত বানানোর জন্য উপযুক্ত নয়। ম্যাগনেটাইটের সাথে টাইটেনিয়াম এমন ভাবে মিশে আছে যে আলাদা করা কঠিন। তাই পাইলট প্ল্যান্টেরও কোনো দরকার নেই। ব্যাপারটা একটু জটিল, কাল প্রেসেন্টেশনে বুঝিয়ে বলবো।’
‘এটা কেমন কথা হলো মি.চ্যাটার্জী। আপনি তো যে কোনো আয়রন ওর থেকে ইস্পাত করতে পারেন। তাই তো বলেন আপনি? নাকি ওটা আপনার ফাঁকা বুলি?’ প্যাটেলের মুখে ব্যঙ্গ খুব স্পষ্ট।
‘সেটা এখনো পারি, কিন্তু এক্ষেত্রে ইস্পাত এতো কম বের হবে, খরচ এতো বেশি হবে যে, তাতে ব্যবসা করে লাভ করা যাবে না।’
‘ইস্পাতের ব্যবসা আপনি ভুলে যান মি.চ্যাটার্জী। আপনি শুধু মেটালগুলো আলাদা করার টেকনোলজিটা ডিসাইন করে দিন।’
‘কেন তাতে কী লাভ হবে? এতদূরে এসে, একটা ছোট প্ল্যান্ট বানিয়ে নগন্য ট্রেস মেটাল পর্যন্ত উদ্ধার করে কী করবেন আপনারা। কী আছে ওই ট্রেস মেটেরিয়ালে?’
‘কিছু মনে করবেন না চ্যাটার্জী সাব, জিওলজি আপনার বিষয় নয়। আপনি তো পেশাদার। নিজের এলাকার বাইরে গিয়ে কৌতূহল দেখানো কী ভালো?’
ওরা ঘুরতে ঘুরতে একটা ছোট নদীর কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। একপাল হাতি সাথে একটা বাচ্চা। একটা হাতি বাচ্চা হাতিটাকে স্নান করাচ্ছে। নদীর এপারে উত্তেজনায় গাড়ি থেকে নেমে পড়লো শান্তনু। সাথে সাথে প্যাটেল ও।
ওদের গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ করা আছে, যাতে শব্দ না হয়। হাতি প্রাণীটিকে শান্তনুর কখনো ভয়ঙ্কর বোধ হয়নি। সার্কাসে, চিড়িয়াখানায়, রাস্তায় হাতিকে খোলা ঘুরতে দেখেছে। হাতির পিঠে চড়েছেও বেশ ক’বার। কিন্তু সামনে যা দেখছে তা অনেক বিশাল। বিশাল বলতে উচ্চতা বেশি, আকারে বড়, বিরাট কান যেন আফ্রিকার ম্যাপ। আর সবগুলো দাঁতালো। এমনকি মাথাটাও বেশ বড়ো আর গোল, শুঁড়টাও বড়ো মনে হয়। তবে হাতি তো সাথীই হয়। তাই নিশ্চিন্তে শান্তনু একটু আগে হওয়া বাদানুবাদ পাশে রেখে, যত্ন করে ভিডিও ছবি তুলছিলো। বিনীত দেখলে খুশি হবে।
‘তো আপনি খুশি হয়েছেন তো মি.চ্যাটার্জী।’
‘অবশ্যই।’ শান্তনুর ভিডিও করা শেষ। মোবাইলে আর বেশি জায়গা বাকি নেই।
‘তো আমাকে দুঃখী করছেন কেন?’
‘সরি, কী বললাম। আপনি দুঃখী হলেন কেন?’ শান্তনু অবাক হওয়ার ভান করলো।
‘আমি এতো কষ্ট করে, আপনাকে কলকাতা থেকে নিয়ে আসলাম। আর আপনি আমার পাইলট প্ল্যান্টটা করলেন না।’
‘আরে পাইলট প্ল্যান্ট কোনো ব্যাপার নাকি? ঘন্টায় পাঁচশো কেজি? সেটা নিয়ে ভাবছেন কেন? আসল প্ল্যান্টটার কথাটা ভাবুন যেটা ঘন্টায় একশো টন।’
‘দাদা, পুরো প্ল্যান্ট পরের কথা। ওটাতো মেহেতাজীর প্রজেক্ট। বড়ো মানুষ, তার বড়ো ব্যাপার। আপনি এখন আমাকে আমার পাইলট প্ল্যান্ট করে দিন।’
‘আপনার পাইলট প্ল্যান্ট? তার মানে?’
‘দাদা আপনাকে নিজের লোক মনে করি বলে বলছি, এর সাথে মি.মেহেতা জড়িত নয়। পাইলট প্ল্যান্টটা আমার দরকার।’
‘আপনি যে রকম টিপটপ পাইলট প্ল্যান্ট চাইছেন তাতে মেহেতা গ্রুপের ষাট-সত্তর হাজার ডলার খরচ হবে। টাকাটা বরবাদ হবে মি.প্যাটেল।’
‘সেভেন্টি কে, ব্যাস! ওটা একটা অ্যামাউন্ট হলো চ্যাটার্জী সাব? মেহেতা গ্রুপের কাছে ওটা হাতের ময়লা। ওসব চিন্তা আপনি আমার ওপর ছেড়ে দিন। আপনি টেকনিক্যাল ব্যাপারটা দেখুন।’
‘আমার কাছে কোনো নির্ভুল প্রমাণ নেই, খনিতে অন্য কিছু আছে কিনা। সবই অনুমান। তাই ওসব কোনো কথা যদি এখন আমার রিপোর্টে নাও বলি, তবু কালকে আমার প্রাথমিক রিপোর্ট শুনলেই মেহেতা গ্রুপ পিছিয়ে আসবে। পাইলট প্ল্যান্টের নাম করে আপনার মিনি ট্রেস মেটাল একস্ট্রাকশন প্ল্যান্ট আর হবে না। আর যদি মেহেতা গ্রুপ নিজেই ট্রেস মেটালে উৎসাহ দেখায়, তাহলে তো পুরো গল্পটাই পাল্টে যাবে মি.প্যাটেল।’
‘গল্প আমি থাকতে পাল্টাবে না চ্যাটার্জী সাব। এতদিন ধরে এতো সব প্ল্যানিং আপনার বোকামির জন্য নষ্ট হতে দেবো না। আপনাকে শেষ সুযোগ দিচ্ছি। আপনার রিপোর্টে লিখুন ওরটা গোলমেলে আছে পাইলট টেস্ট না করে কিছু বলা যাচ্ছে না। মিথ্যে তো নয়।’
‘আলবাত মিথ্যে। আমার একটা অভিজ্ঞতা আছে। সেই অভিজ্ঞতা বলছে পাইলট প্ল্যান্ট চাই না। দুশো কেজি আয়রন ওর পাঠিয়ে দেবেন, ভুবনেশ্বর, নয়তো জামশেদপুরে বেঞ্চ স্কেল টেস্ট করে একদম পাক্কা বলে দেব, কত ওরে কতটা কী বের হবে।’
‘আপনি খুব জেদি মানুষ চ্যাটার্জী সাব। একটা কাজ করুন। আপনার ল্যাপটপটা খুলে দিন আর কিছু করতে হবে না। কাল আপনি সিক হয়ে যান, মেহেতা সাবকে আমি ম্যানেজ করবো। আপনার পুরো পেমেন্ট তো করবোই, তার সাথে লাভের একটা অংশ ও আপনি পাবেন।’
তখনি পুরো ব্যাপারটাই শান্তনুর সামনে একেবারে পরিষ্কার হয়ে গেলো।
ভূবিজ্ঞানী জোসেফ সোনার খোঁজটা পায়, সে জানতো একা একা কিছু করতে পারবে না। লোকবল চাই, টাকা চাই। প্যাটেল লোভী আর অসৎ সেটা জোসেফের জানা ছিল। তাই একান্তে প্যাটেলকে বলেছিলো। জমি, লোকজন টাকার যোগান, সবই আসবে মেহেতাদের কাছ থেকে। আর জোসেফ আর প্যাটেল দল পাকিয়ে, যা সোনা আছে, দেড় দু’বছরে তুলে নেবে। বাইরে থাকবে মেহেতাদের ইস্পাতের কারখানার মোড়ক। শান্তনুর বানানো পাইলট প্ল্যান্ট আসলে ওদের সোনা বানানোর প্ল্যান্ট। জঙ্গলের ভিতর, পুরো অটোমেটিক, লোকের চোখের আড়ালে। খনির একটা বিশেষ জায়গায় সোনাটা লোহার আকরের সাথে মিশে আছে। শান্তনুর পছন্দ করা যন্ত্র যে লোহাটা আলাদা করবে, সে লোহাটা ওদের মোটেও চাই না। লোহাটা ওরা ফেলে দেবে আর আর ওই পাঁচশো ভাগের এক ভাগ, সেই নাম না জানা ট্রেস মেটেরিয়াল তৈরি হবে সেটাই হবে আসল প্রোডাক্ট। দিনে বারো টনের প্ল্যান্টের আসল হলো তিরিশ কেজি সোনা। বছরে প্রায় এক টন।
‘আপনি আমাকে নাটক করতে বলছেন মি.প্যাটেল?
‘ঠিক তাই। এতে দোষের কী আছে?’
‘পুরোটাই দোষের। খনি থেকে যাই তুলবেন তার জন্য সরকারকে জানাতে হবে। অনুমতি নিতে হবে সরকারের কাছ থেকে। আর আপনি তো এই দেশকে, আপনার বসকে ঠকাচ্ছেন। আমাকেও ছাড়েননি।’
‘অনুমতি নিয়ে কিছু করতে গেলে আমার সারাটা জীবন চলে যাবে। যারা অমন দামি সম্পদ তানজানাইটকে কাজে লাগাতে পারে না, তারা আমাকে কী করতে দেবে? আপনি ট্যালেন্টেড ইঞ্জিনিয়ার চ্যাটার্জী সাব। আমার দেশের লোক। আপনি একটু সমঝদারি দেখান, আপনাকে ঠকাবো না। আপনি মুখটা একটু বুঝে সুঝে খুলবেন। অনেক টাকার ব্যাপার। এ টাকার জন্য অনেক কিছু হতে পারে। আপনি শুধু বুদ্ধি করে রিপোর্টটা লিখুন।’
‘তোমার লোভ খুব বেশি প্যাটেল। খনি ও তোমার না, জমিও তোমার না, টাকাটাও তোমার না। তাই সেই খনি থেকে যা বের হবে তাও তোমার না।’
‘বাঙালিগুলোর খুব বাজে অভ্যেস। পরিস্থিতি না দেখেই ভাষণ দিতে শুরু করে। চোখ মেলে দেখুন। এটা আপনার পশ্চিম বাঙাল না, আফ্রিকা। আর সামনে আফ্রিকান এলিফ্যান্ট।’
‘গডফ্রেকে মারলেন কেন?’
‘গডফ্রেকে আমি মেরেছি!’
‘নিজে কী আর মেরেছেন। লোক দিয়ে মারিয়েছেন।’
‘কে বললো আমি মারিয়েছি। আমি বিজনেস করতে চাই খুন জখম নয়। ও একটু বেশি মাথা খাটাচ্ছিলো, সেতো টাকা পেলে চুপ করে যেত। এখানে সব কিছু কেনা যায় দাদা। ওসব লাভ ট্র্যাংগলের পরিণাম। ওসব ফালতু ব্যাপারে টাইম ওয়েস্ট করবেন না দাদা। ল্যাপটপটা খুলে দিন।’
‘নিজে খুলে নিন, চেষ্টা তো কম করেন নি।’
‘আর কথা নয়। ল্যাপটপ খুলে দিন।’
‘আপনার অ্যাসিস্ট্যান্ট মেয়েটাকে বলুন। খুলে দেবে।’
‘আপনার বুড়ো আঙুলের ছাপ তো তোলাই আছে, আপনি অনেক সিকিউরিটি দিয়ে রেখেছেন। কোনো ব্যাপার না। সময় পেলে ল্যাপটপ তো আমরা খুলে নেবো, কিন্তু আপনার একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে গেলে ভালো হবে না মি.চ্যাটার্জী।’
‘ভয় দেখাচ্ছ প্যাটেল? ও ল্যাপটপ তোমার কোনো কাজে লাগবে না। তোমাদের হাবভাব, আমার কখনোই ভালো লাগে নি। যা করতে হয় করো। তোমাদের আমি বিশ্বাস করি না। আর জেনে রাখো, সবাইকে লোভ দেখিয়ে কেনা যায় না।’
সত্যি ল্যাপটপে কিছু নেই। আগেই সব বিনীতকে মেল পাঠিয়ে দিয়ে, মেলবক্স, ব্যাকআপ সব মুছে দিয়েছে শান্তনু। আর গডফ্রের সেই বিশেষ স্যাম্পল, পেন ড্রাইভ গায়ে পরা জামার পকেটে সতর্ক অবহেলায় আছে।
‘তো সত্যি কথাটা জেনে নিন চ্যাটার্জী সাব। আসতে কত মানা করলাম, শুনলেন না। মেহেতা সাবকে পটিয়ে যখন চলে এলেন, তখন থেকেই আপনার অ্যাক্সিডেন্ট পাক্কা হয়ে গেলো। আপনি খুব বেশি বেশি জানতে চান। একদম সেফ না। গুড বাই।’ প্যাটেল গাড়িতে উঠে পড়লো। ড্রাইভারকে বললো, ‘স্টার্ট দাও।’ শান্তনু গাড়িতে উঠতে গিয়ে দেখে, প্যাটেল দরজা বন্ধ করে কাঁচ তুলে দিয়েছে। ততক্ষণে হাতিদের স্নান শেষ। গাড়ির আওয়াজে হাতিরা বিরক্ত হচ্ছে, আর সাথে বাচ্চা আছে তাই যে কোনো মুহূর্তে বিরক্তিটা অন্য চেহারা নিতে পারে। প্যাটেলের গাড়িটা হঠাৎ হর্ণ বাজাতে শুরু করলো। মিকুমির ভিতর এমন করে হর্ণ বাজানো নিষিদ্ধ।
শান্তনু প্যাটেলের অভিনব চালাকিতে ঘাবড়ে গেলো। এবার হাতির দল ওদের দিকে আসতে শুরু করলো। ম্যাক যে গাড়িতে ছিলো, সেটা হুড়মুড় করে শান্তনুর দিকে এগিয়ে এলো। ওই গাড়িতেই শান্তনুর সুটকেস আর ল্যাপটপ ব্যাগ। জানলাটা সামান্য খুলে ম্যাক চেঁচিয়ে বললো, ‘উঠে পড়ুন স্যার। দেরি করবেন না।’ সুশীলা পিছনের সিটে বসেছিল, কিছু করার আগেই শান্তনু উঠে পড়লো। ‘সিট্ বেল্ট বাঁধুন, এখুনি।’ ম্যাক চাপা গলায় চিৎকার করে উঠলো। তারপর সবাইকে অবাক করে দিয়ে ম্যাক নিজের গাড়িটা দিয়ে প্যাটেলের গাড়িটাকে বিশ্রীভাবে ধাক্কা মেরে বসলো। ম্যাক নিজের গাড়ি সামলে নিলো, কিন্তু প্যাটেলের গাড়ি গিয়ে পড়লো সামনের একটা গর্তে। প্যাটেল আর তার ড্রাইভার এরিক, অল্পবিস্তর আহত হওয়ার সাথে সাথে প্রচন্ড ভয় পেয়ে গেলো। সুশীলার আর করার কিছু নেই। শান্তনুর পুরো শরীরটা ঝাঁকিয়ে উঠেছে। কোনো এক অতীতে মৃত্যুর সাথে কানামাছি খেলার অভ্যেসটা এখন গল্পের পাতায়। হাতির দল তখন আরও কাছে চলে এসেছে। ম্যাক গাড়িটা চালু রেখেছিলো, ব্যাক গিয়ার দিয়ে, সুশীলা একবার, প্যাটেল স্যার, জাতীয় আধখানা কথা বলার আগেই মিকুমির গেটের দিকে রওনা দিলো। প্যাটেলের গাড়িটা ফেঁসে রইলো। যেহেতু প্যাটেলের গাড়ি আওয়াজ করছে, তাই হাতির প্রাথমিক লক্ষ্য সেটাই। শান্তনু একবার পিছে তাকিয়ে দেখলো হাতির পাল প্যাটেলের গাড়ির ওপর চড়াও হয়েছে।
মিকুমির দরজায় পৌঁছাতেই, ওদের পথ আটকানো হলো। মোজেস, ওদের গাড়ির সামনে এসে আদেশের সুরে বললো, ‘নেমে আসুন।’ ম্যাক শান্তনুর আদেশের অপেক্ষায় আছে। শান্তনু ম্যাককে হাত দিয়ে ইশারা করে, গাড়ি থেকে নেমে এলো। সাথে সাথে সুশীলা উদ্ভ্রান্তের মতো গাড়ি থেকে নেমে গেম পার্কের অফিসের খোঁজে ছুটলো। প্যাটেলকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টা। শান্তনুকে নিয়ে মোজেস আরেকটা গাড়িতে গিয়ে উঠলো। গাড়িতে বসে আছে ডঃ উইলসন। ভাবলেশহীন মুখ।
‘উঠে আসুন কথা আছে।’ শান্তনুর না বলার উপায় নেই। চুপচাপ গাড়িতে পিছনের সিটে গিয়ে ব’সলো। গাড়ি চললো দার এস সালামের দিকে। কেউ কোনো কথা বলছে না। শান্তনু এখনো বুঝতে পারছে না, ওই উইলসনের দল তাকে সাথে নিলো কেন, আর কোথায় নিয়ে যাচ্ছে! পথের ধারে একটা ছোট রেস্তোরাঁর সামনে গাড়ি থামলো।
‘আপনি ঠিক আছেন মি.চ্যাটার্জী?’
‘ঠিক আছি, আমার বাক্স, ল্যাপটপ কিন্তু আমার সাথে নেই কাছে।’
‘সে আপনি সব পেয়ে যাবেন। চলুন একটু বসে কফি খেতে খেতে কথা বলি।’
সাত
বিনীতকে খেতে ডেকে ডেকে হয়রান হয়ে ওর মা বিরক্ত হয়ে বললো, ‘কী এতো খুটখুট করছিস ল্যাপটপে।’
‘বোসো বলছি।’
‘আমার কাজ আছে।’
‘কাজ পরে হবে। বোসো, খুব দরকারি কথা আছে।’
‘সিরিয়া না আফগানিস্তান?’
‘এবার তানজানিয়া।’
‘এক তোর বাবায় রক্ষা নেই, আবার তুই। তানজানিয়ার দেখছি খুব খারাপ অবস্থা।’
‘বাবা যেখানে প্ল্যান্ট বানাবে বলে গিয়েছে না, সেই জায়গাটার নাম মাগাঙ্গা মাটিটু।’
‘কী সুন্দর নাম। একদম জলতরঙ্গ বেজে উঠলো!’
‘শোনো না, পুরো হলিউড ছবির গল্প। মাগাঙ্গা মাটিটুর কাছে লুপালী নদীর ধারে একটা গ্রাম মতো ছিলো। সেখানে সাত আট বছর আগে কর্নেল নোয়াম বলে একজন আর্মি অফিসার, তার দলবল নিয়ে অস্থায়ী ক্যাম্প বসাবে বলে ওখানকার লোকদের জায়গাটা খালি করতে বলে। গ্রাম খালি করে দাও বললেই হলো। তবে মিলিটারি বলে কথা। গ্রামের কিছু লোক ভয় পেয়ে পালায়। কিন্তু কিছু লোক বলে, গ্রাম ছাড়বো না। সেখান থেকে বাদানুবাদ শুরু হয়। কর্নেল নোয়াম মত্ত অবস্থায় গ্রামবাসীদের ওপর গুলি চালায়। তারপর সবাইকে নদীর ধারে কবর দিয়ে দেয়। দেশের প্রত্যন্ত জায়গায় নরসংহারের খবর, মিথ্যে রিপোর্টের নিচে চাপা পড়ে যায়। কর্নেলের সঙ্গীরাও কেউ মুখ খোলে না। অবস্থার ফেরে কর্নেল নোয়াম এখন দেশের রক্ষা বিভাগের চূড়ায়। নোয়াম নিজে সতর্ক থাকে যাতে ওই জমিতে আবার করে কোনো কিছু না হয়। যদি মেহেতা গ্রুপ প্রজেক্ট করার জন্য ওই জমিটা নেয়, তাহলে তো জমি খুঁড়লেই গণ কবর বেরিয়ে পড়বে। ও সেটা হতে দেবে না, যে করেই হোক সেটা আটকাবে। আর ওর হাতে অনেক ক্ষমতা।’
‘সে কিরে? তোর বাবা তো ওখানেই গেছে। ও যেন এসব ব্যাপারে একদম নাক না গলায়।’
‘আরে না, বাবা এমন লোকই না, নামের মতোই শান্ত।’
‘কিন্তু ওরা যদি পিছনে লাগে। যদি ক্ষতি করার চেষ্টা করে।’
‘হুম। সেটাই। তবে বাবা তো রওনা হয়ে যাচ্ছে।’
‘এত সব তুই জানলি কী করে?’
‘কিছুটা বাবার কাছে শুনে, কিছুটা নেট ঘেঁটে, কিছুটা কল্পনা। তবে ওই লুপালী নদীর ধারে একটা মাস গ্রেভ আছে তাতে সন্দেহ নেই।’
‘এখানে এই কলকাতায় বসে তুই কী করছিস?’
‘আমি তো একটা প্রেস রিলিজ বানালাম, পুরো গল্পটা লিখলাম। যা তথ্য প্রমাণ ছিলো সব দিলাম। ছবি টোবি দিয়ে। তারপর নেট থেকে তানজানিয়ার অনেক কটা টিভি আর খবরের কাগজের মেল আইডি জোগাড় করলাম। বাবার কাছ থেকে সিগন্যাল পেলে, তার পর মেলগুলো পাঠাবো। কাল দার এস সালামে একটা ফাটানো খবর হবে। যাকে চলতি ভাষায় বলে ব্রেকিং নিউজ।’
‘ওরা যদি পাত্তা না দেয়? ভাবে কে না কে মজা করছে।’
‘সবাই এক কথা ভাববে? আরে নোয়ামেরও তো প্রতিদ্বন্দ্বী আছে, তারা উঠে পড়ে লাগবে। তোমার ওই নোয়াম একেবারে কেঁপে যাবে।’
‘আপদ! নোয়াম টোয়াম আবার আমার হলো কবে থেকে।’
‘হা হা হা!’
‘এখন তোর বাবার কী খবর, সব ভালোয় ভালোয় মিটেছে। হোটেলে ঢুকেছে? আবার সুটকেস হারায়নি তো।’
‘তুমি তো অন্তর্যামী। তবে পেয়েছে।’
একটু ফিরে গিয়ে,
গতকাল বিকেলে শান্তনু আর উইলসনের দল রাস্তার ধারের একটা কফি শপের কোণের টেবিলে গিয়ে বসলো।
‘কফির সাথে স্যান্ডউইচ?’ শান্তনু সম্মতি সূচক ঘাড় নাড়লো।
‘আপনার প্রজেক্ট রিপোর্টটা সরকার দেখতে চায় মি.চ্যাটার্জী। তার সাথে আপনি কী কী ডকুমেন্ট জোগাড় করলেন তাও।’
অনেক দুঃখে শান্তনুর মুখে হাসি ফুটলো, ‘প্রজেক্ট কিসের প্রজেক্ট?’
‘কেন, মেহেতা গ্রুপের স্টিল প্ল্যান্ট।’
‘ওখানে কোনো স্টিল প্ল্যান্ট হবে না, ডঃ উইলসন। কোনোদিন না।’
‘তার মানে? আমরা যে শুনলাম।’
‘আমিও শুনেছিলাম। কিন্তু এসে যা দেখলাম তা থেকে বুঝতে পারলাম ওই ওরে টাইটেনিয়াম এমন ওতপ্রোত ভাবে মিশে আছে যে বেনিফিসিয়েশন করে তাকে আলাদা করা খুব কঠিন। এতে যা খরচ হবে, তাতে স্টিল বানিয়ে পোষাবে না। ওই ওর দিয়ে স্টিল বানালে কোনো লাভ নেই। তাই এমন পাগলামো ভবিষ্যতেও কেউ করবে না।’
‘আপনি নিশ্চিত জানেন? ওখানে স্টিল প্ল্যান্ট হবে না।’
‘এই জানাটাই তো আমার কাজ ডক্টর।’
‘ও ভগবান। তাহলে তো এতসবের দরকারই ছিলো না।’
‘ছিলো নাই তো। মাঝ থেকে কটা প্রাণ গেলো। একটা কথা জিজ্ঞেস করবো ডক্টর, ওখানে ইস্পাতের কারখানা হলে, রক্ষা মন্ত্রণালয়ের কী অসুবিধে?’
‘সে সব আমাদের নিজেদের ব্যাপার। আপনি না জানলেও চলবে।’ মোজেস বিশ্রী ভাবে বলে উঠলো।
ডঃ উইলসন তাকে হাত দিয়ে ইশারা করে বললো, ‘ওখানে আমাদের একটা প্রজেক্ট আসছে। আমাদের ব্যাপার একান্ত গোপনীয়। তাই এসব নিয়ে কোনো রকম আলোচনায় থাকবেন না। আমাদের দেখা হয়নি ভেবে ভুলে যান।’ উইলসন কফি ছেড়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো। সাথে সাথে মোজেসও।
‘আপনি আমাদের সাথে আসতে পারেন। আমরা আপনাকে আপনার হোটেলে ছেড়ে দেব। কাল রাতের ফ্লাইটে দেশে ফিরছেন তো?’
এদের সঙ্গ একদমই স্বস্তিকর নয় জেনেও, শান্তনু অচেনা জায়গায় কী করবে ভেবে না পেয়ে, ওদের গাড়িতে যাওয়াই মনে মনে স্থির করলো। সাথে সাথে ওর ফোনে একটা মেসেজ এলো। নম্বর চেনা নয়। ‘ওদের সাথে যেও না- ম্যাক।’
‘কী, আসবেন মি.চ্যাটার্জী?’
শান্তনুর মুখটা যথেষ্টই বেজার ছিলো, তাই আর চেষ্টা করে কিছু করতে হলো না।
‘আপনারা রওনা হয়ে যান ডক্টর। আমি একটু বিশ্রাম নেবো। অনেক ধন্যবাদ।’
ওরা আর কথা না বাড়িয়ে রওনা হয়ে যাওয়া মাত্রই কোথা থেকে ম্যাক এসে হাজির।
‘মেসেজ তুমি পাঠিয়েছিলে?’
‘হ্যাঁ স্যার। ওরা খারাপ লোক। ওদের গাড়ির ব্রেকও খারাপ। যে কোনো সময় অ্যাক্সিডেন্ট হতে পারে।’
‘তার মানে?’
‘গাড়িতে উঠে আসুন। আমি সব বলছি।’
ম্যাকের গল্পটা বড়ো অদ্ভুত।
ম্যাকের বাড়ি ছিলো লুপালী নদীর ধারে। পুরো গ্রামেরই কাজ ছিলো পাশের পাহাড়ের গা থেকে পাথর নিয়ে এসে, ভেঙ্গে, ধুয়ে, গলিয়ে তামা তৈরি করা। অবশ্যই বেআইনি কাজ, কিন্তু আইনের শাসন ওদের জীবনে কোনো প্রভাব ফেলেনি। একজন মাঝে মাঝে এসে তামা নিয়ে যেত। দিয়ে যেত, ভুট্টা, মিষ্টি আলু, চাল, লবন, কাপড় আরও কত কী। বেশ চলে যাচ্ছিলো ওদের জীবন। বছর আটেক আগে একদিন, তখন ম্যাকের বয়েস বারো তেরো হবে। আর্মির লোক এসে বললো, জায়গা খালি কারো। সেই দলে এই মোজেসও ছিলো। বলে যুবতী মেয়েরা শুধু থাকুক। ক্যাম্পের কাজ করবে। বাকিরা চলে যাক। ম্যাকের বাবা সেই ক’জনের মধ্যে ছিলো যারা বাধা দেয়।
ওরা তখন কিছু বলে না চলে যায়। গ্রামের লোকেরা সন্ধ্যে বেলা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে একমত হতে পারলো না। ম্যাক দূর থেকে শুনেছিলো। মিলিটারিকে এরা ভয় পায়, কিন্তু যাবার জায়গায় তো নেই। সিদ্ধান্ত হয় আর্মির কথা না শোনার। কেউ কেউ রাতের বেলাতেই পালিয়ে গেলো। ভোর রাতের দিকে, আর্মি ফিরে এসে ওদের ওপর গুলি চালায়। মোজেসকে ম্যাক ভুলবে না। বাবাকে গুলি খেয়ে মাটিতে পড়ে যেতে দেখেছে। বাবা বললেন, পালা। কিভাবে পালিয়ে কাছের গ্রামে পৌঁছেছিল, সেই জানে। আর্মি দলের প্রধান এখন খুব প্রভাবশালী লোক। মুখ খুললেই মাথা থাকবে না। ম্যাকের ধারণা স্যার তো বাইরের লোক। স্যার যদি কিছু করতে চায়, করতে পারে। মোজেসকে ও রিসোর্টে আসতে দেখেছে। ও চেহারা ভোলার নয়। তখনি ভেবেছে, প্রতিশোধ নিতে হবে আর এই ভারতীয় স্যারের মাধ্যমে কথাটা সবাইকে জানাতে হবে।
ফেরার পথে দেখলো ড.উইলসনের গাড়িটা উল্টে পড়ে আছে। একটা মালবাহী গাড়ির সাথে ধাক্কা লেগেছে। ইতস্তত রক্তের দাগ। গাড়ির আরোহীদের নাকি হাসপাতাল নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ড্রাইভার নাকি মারাই গেছে। পিছের সীটের জনেরও অবস্থা ভালো নয়। দেখে শান্তনুর হাত পা কাঁপছিলো, কিন্তু
ম্যাক বেশ নির্লিপ্ত ছিলো।
‘আমি যতটা পারলাম, করলাম স্যার। পরের কাজটা আপনার।’
রিসর্টে আসতেই রিসেপশন থেকে বললো, মি. মেহেতার অফিস থেকে শান্তনুর খোঁজ হচ্ছে।
‘মি. চ্যাটার্জী। ভগবানকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আপনি ঠিক আছেন। স্যার আপনার সাথে কথা বলতে চান।’
‘হ্যালো! আমি চ্যাটার্জী।’
‘মি. চ্যাটার্জী, এসব কি হয়ে গেলো! সুশীলা খবর দিলো, প্যাটেল আর ড্রাইভার খুব মারাত্মক ভাবে জখম হয়েছে। আর আপনাকে পাওয়া যাচ্ছে না।’
‘আমি ঠিক আছি। কাল আপনার অফিসে আপনার সাথে মিটিং করে সব বলবো। আজ খুব ক্লান্ত। তবে একটা কথা, আপনি ছাড়া মিটিঙে আর কেউ যেন না থাকে।’
‘ঠিক আছে আমার সেক্রেটারিকে বলে দিচ্ছি, সব ব্যবস্থা করে দেবে।’
ঘরে ঢুকেই শান্তনু বিনীতকে যোগাযোগ করলো। এলোমেলো করে হলেও সব কথাই বললো। বিনীত মন দিয়ে শুনলো। তারপর বললো, ‘উসিএ না ওয়াসিওয়াসী, বোয়ানা।’
‘বোয়ানা কথাটা জানি, ঘনাদার গল্পে পড়েছি।’
‘চিন্তা কোরো না। আমি একটা বুদ্ধি করছি শোনো।’
রাতে সুশীলার ফোন এলো। কাঁদো কাঁদো আওয়াজ।
‘স্যার, আপনি ভালো আছেন তো? ওরা আপনার কিছু করেনি তো?’
‘হতাশ করার জন্য দুঃখিত। ভালো আছি।’
‘এমন কথা বলবেন না স্যার, আমি কখনো আপনার খারাপ চাইনি।’
‘তোমার চাওয়া তুমিই জানো! তো, কেমন আছে তোমাদের প্যাটেল?’
‘ভালো না স্যার, বাঁচলেও কতটা ঠিক হবে বলা যায় না।’
‘একটা কথা বলি সুশীলা, তোমার বয়েস অল্প, এসবের মধ্যে আর এসো না।’
‘আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন স্যার। আমি যা করেছি, প্যাটেল স্যারের আদেশে। আমার নামটা কাউকে বলবেন না। আপনি যা বলবেন...’
‘নাহ! আবার ঘুষ দেবার চেষ্টা করছো!’
‘ভুল বুঝবেন না স্যার। চাকরিটা গেলে আমার চলবে না।’
‘বেশি চিন্তা করো না। তুমিই তো শিখিয়েছো, হাকুনা মাটাটা।’
বিনোদভাই মেহেতা জন্মসূত্রে তানজানিয়ায় আছেন। মেহেতা গ্রুপের প্রতিষ্ঠা তার বাবা হারসুখলাল মেহেতার হাতে। তাঞ্জানিয়াতে তখন প্রচুর ব্যবসার সুযোগ। ধীরে ধীরে ভারতীয়রা আরও সোজা করে বললে গুজরাতিরা জাঞ্জিবারের পুরো ব্যবসাটাই প্রায় দখল করে নেয়। এতে স্থানীয় লোকেদের মধ্যে অসন্তোষ ছড়িয়ে পরে। মেহেতারা তখন তানজানিয়া আর তার আশেপাশের দেশে কারখানা বসাতে থাকে। সরকারি মহলে বন্ধু বাড়ে। মেহেতাদের কোম্পানিতে গুজরাতির সংখ্যা বাড়তে থাকে। দার এস সালামে হিন্দু মন্দির, হাসপাতাল তৈরি হয়। দোকানে ঢোকলা, খেপলা, খাকরা এসব পাওয়া যেতে থাকে।
বিনোদভাই মাতৃভাষার সাথে স্থানীয় ভাষা সমান দক্ষতায় বলতে পারেন। শিক্ষিত, বয়েস তেষট্টি হলেও বেশ কর্মঠ। ইংরেজি, হিন্দী দুটোই গুজরাতি টানে বলেন।
নিজের অফিস ঘরে বসে শান্তনুর সব কথা শুনলেন বিনোদভাই। শুনতে শুনতে সামনের প্যাডে কিছু কিছু লিখলেনও।
‘স্টিল প্ল্যান্ট করা যাবে না সেজন্য হতাশ হবার কিছু নেই। এর থেকে থেকে সোনা আর সাথে তামা বের করলে অনেক বেশি লাভ হবে। আপনি হয়তো জানেন এমনিতেই তানজানিয়ায় বছরে পঞ্চাশ টন সোনা তৈরি হয়, যার অনেকটাই রপ্তানি হয়। ভারতেও যায়। এক্ষুনি আপনার প্ল্যান্ট বানানোর দরকার নেই, আর সোনার জন্য আমার প্ল্যানটা বেশ কিছুটা পাল্টাবো। আমার সাথে অল্প পরিমাণ স্যাম্পল নিয়ে যাচ্ছি, এক্স রে ফ্লুরোসেন্স যন্ত্রে টেস্ট করার জন্য যথেষ্ট। আপনার তো উপর মহলে যথেষ্ট প্রতিপত্তি, আশাকরি অনুমতি পেতে বেশি সময় লাগবে না।’ শান্তনু রিসর্টের থেকেই পঞ্চাশ পাতার রিপোর্ট ছাপিয়ে এনেছিল, এক কপি বিনোদ ভাইয়ের হাতে তুলে দিলো। ‘একবার নমুনা পরীক্ষায় আমার কথা প্রমাণ হয়ে যাক, আর যদি কাজ কিছু শিখে থাকি তাহলে আমার অনুমান নির্ভুল, সবকিছু প্রমাণ যোগ করে রিপোর্টটা দেশে গিয়ে দু’সপ্তাহের মধ্যে আপনাকে পাঠিয়ে দেব। ততদিন জায়গাটার নিরাপত্তা ব্যবস্থা একদম কড়া করে দিন আর অসৎ লোকেদের সরিয়ে দেবেন, সেটা তো আর বলার অপেক্ষা রাখে না।’
‘আপনাকে অনেক ধন্যবাদ, চ্যাটার্জী সাব। আপনার সাথে যা যা হয়েছে, তার জন্য আমি আন্তরিক দুঃখিত। আপনি ইন্ডিয়ায় ফিরে গিয়ে আপনার ইনভয়েসটা পাঠিয়ে দেবেন, পেমেন্ট হয়ে যাবে। বছর খানেক পর, আপনাকে আবার আসতে হবে। এর মধ্যে আমরা তো যোগাযোগ করেই চলবো। আর আপনার জন্য একটা সামান্য উপহার। অনুগ্রহ করে গ্রহণ করুন।’
এয়ারপোর্টে পৌঁছে সব কিছু সেরে শান্তনুর হাতে প্রায় ঘণ্টা খানেক সময়। দোকানে যাবার সময় হয়নি। তাই বেশি দাম হলেও এয়ারপোর্টের দোকান থেকে কিছু উপহার কিনলো। বিনোদ ভাইয়ের গিফটের ছবি তুলে বিনীতকে পাঠিয়েছিল শান্তনু। এয়ারপোর্টে ব’সে, হোয়াটসঅ্যাপে দেখলো বিনীত লিখেছে, ‘এই তাহলে তানজানাইট। বিনোদভাই মেহেতা তোমার ওপর দেখছি বেজায় খুশি। নাকি তোমার হয়রানির ক্ষতিপূরণ? প্যাটেল তো আলাদা করে কেউ না, মেহেতা গ্রুপের লোক। ওনার পিঠের পিছে গ্রুপের লোক কোথায় কী করছে হয়তো সব জানা মি. মেহেতার পক্ষে সম্ভব না। কিন্তু এতো বড় ষড়যন্ত্র আর উনি কিছুই জানছেন না, সেটা কোনো কাজের কথা নয়। বলতে খারাপ লাগছে, তবে তোমাদের বিনোদ ভাই বিদেশে জন্মেও প্রাদেশিকতার উর্দ্ধে উঠতে পারেনি। যাক এখন থেকে ঠিক দেড় ঘন্টা পর মেলটা ছাড়ছি। ফ্লাইট দেরি হলে অবশ্যই জানাবে, মেল পাঠাবার সময়টা পিছিয়ে দেবো। আমার জন্য টি শার্ট নিয়েছো?’
‘ওই তাড়া হুড়ো করে নিলাম, তবে বুকের ওপর কিন্তু একটু আঁকা টাকা আছে। তুই পরবি তো আবার! আর লেখাও আছে, হাকুনা মাটাটা।’