CastFM
টেক্সট সাইজ
120%
মার্জিন
5%
লাইন স্পেসিং
1.5

জলযাত্রা

নৌকো বেঁধে কোথায় গেল, যা ভাই, মাঝি ডাকতে―
মহেশগঞ্জে যেতে হবে শীতের বেলা থাকতে।
পাশের গাঁয়ে ব্যাবসা করে ভাগ্নে আমার বলাই,
তার আড়তে আসব বেচে ক্ষেতের নতুন কলাই।
সেখান থেকে বাদুড়ঘাটা আন্দাজ তিন-পােয়া,
যদুঘােষের দোকান থেকে নেব খইয়ের মােয়া।
পেরিয়ে যাব চন্দনীদ’ মুন্সিপাড়া দিয়ে―
মালসি যাব, পুঁটকি সেথায় থাকে মায়ে ঝিয়ে।
ওদের ঘরে সেরে নেব দুপুর-বেলার খাওয়া―
তার পরেতে মেলে যদি পালের যােগ্য হাওয়া
এক পহরে চলে যাব মুখ্‌লুচরের ঘাটে,
যেতে যেতে সন্ধে হবে খড়কেডাঙার হাটে।
সেথায় থাকে নওয়াপাড়ায় পিসি আমার আপন―
তার বাড়িতে উঠব গিয়ে, করব রাত্রিযাপন।

ছড়ার ছবি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (page 13 crop).jpg

তিন পহরে শেয়ালগুলো উঠবে যখন ডেকে
ছাড়ব শয়ন ঝাউয়ের মাথায় শুকতারাটি দেখে।
লাগবে আলোর পরশমণি পুব আকাশের দিকে,
একটু ক’রে আঁধার হবে ফিকে।
বাঁশের বনে একটি-দুটি কাক
দেবে প্রথম ডাক।
সদর পথের ঐ পারেতে গোঁসাইবাড়ির ছাদ
আড়াল করে নামিয়ে নেবে একাদশীর চাঁদ।
উসুখুসু করবে হাওয়া শিরীষ গাছের পাতায়,
রাঙা রঙের ছোঁওয়া দেবে দেউল-চুড়োর মাথায়।
বোষ্টমি সে ঠুনুঠুনু বাজাৱে মন্দিরা,
সকাল-বেলার কাজ আছে তার নাম শুনিয়ে ফিরা।

হেলেদুলে পােষা হাঁসের দল
যেতে যেতে জলের পথে করবে কোলাহল।
আমারও পথ হাঁসের যে পথ, জলের পথে যাত্রী
ভাসতে যাব ঘাটে ঘাটে ফুরােবে যেই রাত্রি।
সাঁতার কাটব জোয়ার-জলে পৌঁছে উজিরপুরে,
শুকিয়ে নেব ভিজে ধুতি বালিতে রােদ্দুরে।
গিয়ে ভজনঘাটা
কিনব বেগুন পটোল মুলাে, কিনব সজনেডাঁটা।
পৌঁছব আটবাঁকে―
সূর্য উঠবে মাঝগগনে, মহিষ নামবে পাঁকে।
কোকিল-ডাকা বকুল-তলায় রাঁধব আপন হাতে,
কলার পাতায় মেখে নেব গাওয়া ঘি আর ভাতে।
মাখনাগাঁয়ে পাল নামাবে, বাতাস যাবে থেমে―
বনঝাউ-ঝােপ রঙিয়ে দিয়ে সূর্য পড়বে নেমে।
বাঁকাদিঘির ঘাটে যাব যখন সন্ধে হবে,
গােষ্ঠে-ফেরা ধেনুর হাম্বারবে।
ভেঙে-পড়া ডিঙির মতাে হেলে-পড়া দিন
তারা-ভাসা আঁধার-তলায় কোথায় হবে লীন।

জ্যৈষ্ঠ ১৩৪৪

আলমােড়া

ছড়ার ছবি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (page 15 crop).jpg

ভজহরি

হঙকঙেতে সারাবছর আপিস করেন মামা―
সেখান থেকে এনেছিলেন চীনের দেশের শ্যামা,
দিয়েছিলেন মাকে,
ঢাকার নীচে যখন-তখন শিষ দিয়ে সে ডাকে।
নিচিনপুরের বনের থেকে ঝুলির মধ্যে ক’রে
ভজহরি আনত ফড়িঙ ধরে।
পাড়ায় পাড়ায় যত পাখি খাঁচায় খাঁচায় ঢাকা
আওয়াজ শুনেই উঠত নেচে, ঝাপট দিত পাখা।
কাউকে ছাতু, কাউকে পােকা, কাউকে দিত ধান―
অসুখ করলে হলুদজলে করিয়ে দিত স্নান।
ভজু বলত, ‘পােকার দেশে আমিই হচ্ছি দত্যি,
আমার ভয়ে গঙ্গাফড়িঙ ঘুমােয় না একরত্তি।
ঝােপে ঝােপে শাসন আমার কেবলই ধরপাকড়,
পাতায় পাতায় লুকিয়ে বেড়ায় যত পােকামাকড়।’

ছড়ার ছবি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (page 17 crop).jpg

একদিন সে ফাগুন মাসে মাকে এসে বলল,
‘গোধূলিতে মেয়ের আমার বিয়ে হবে কল্য।’
শুনে আমার লাগল ভারী মজা—
এই আমাদের ভজা
এরও আবার মেয়ে আছে, তারও হবে বিয়ে
রঙিন চেলির ঘোমটা মাথায় দিয়ে।
সুধাই তাকে, ‘বিয়ের দিনে খুব বুঝি ধুম হবে?’
ভজু বললে, ‘খাঁচার রাজ্যে নইলে কি মান রবে!

কেউ বা ওরা দাঁড়ের পাখি, পিঁজরেতে কেউ থাকে―
নেমন্তন্ন চিঠিগুলাে পাঠিয়ে দেব ডাকে।
মােটা মােটা ফড়িঙ দেব, ছাতুর সঙ্গে দই―
ছােলা আনব ভিজিয়ে জলে, ছড়িয়ে দেব খই।
এমনি হবে ধুম,
সাত পাড়াতে চক্ষে কারও রইবে না আর ঘুম।
ময়নাগুলাের খুলবে গলা, খাইয়ে দেব লঙ্কা―
কাকাতুয়া চীৎকারে তার বাজিয়ে দেবে ডঙ্কা।
পায়রা যত ফুলিয়ে গলা লাগাবে বক্‌বকম―
শালিকগুলাের চড়া মেজাজ, আওয়াজ নানারকম।
আসবে কোকিল, চন্দনাদের শুভাগমন হবে―
মন্ত্র শুনতে পাবে না কেউ পাখির কলরবে।
ডাকবে যখন টিয়ে
বরকর্তা রবেন বসে কানে আঙুল দিয়ে।’


জ্যৈষ্ঠ ১৩৪৪

আলমােড়া

ছড়ার ছবি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (page 19 crop).jpg

পিস্‌নি

কিশাের-গাঁয়ের পুবের পাড়ায় বাড়ি,
পিস্‌নি বুড়ি চলেছে গ্রাম ছাড়ি।

একদিন তার আদর ছিল, বয়স ছিল ষােলাে―
স্বামী মরতেই বাড়িতে বাস অসহ্য তার হল।
আর-কোনাে ঠাঁই হয়তাে পাবে আর-কোনাে এক বাসা―
মনের মধ্যে আঁকড়ে থাকে অসম্ভবের আশা।
অনেক গেছে ক্ষয় হয়ে তার, সবাই দিল ফাঁকি―
অল্প কিছু রয়েছে তার বাকি।
তাই দিয়ে সে তুলল বেঁধে ছােট্ট বােঝাটাকে,
জড়িয়ে কাঁথা আঁকড়ে নিল কাঁখে।
বাঁ হাতে এক ঝুলি আছে, ঝুলিয়ে নিয়ে চলে―
মাঝে মাঝে হাঁপিয়ে উঠে বসে ধূলির তলে।
সুধাই যবে কোন্ দেশেতে যাবে,
মুখে ক্ষণেক চায় সকরুণ ভাবে—
কয় সে দ্বিধায়, ‘কী জানি ভাই, হয়তাে আলম্‌ডাঙা,
হয়তাে সান্‌কিভাঙা,
কিংবা যাব পাটনা হয়ে কাশী।’
গ্রাম-সুবাদে কোন্‌কালে সে ছিল যে কার মাসি,
মণিলালের হয় দিদিমা, চুনিলালের মামি―
বলতে বলতে হঠাৎ সে যায় থামি,
স্মরণে কার নাম যে নাহি মেলে।
গভীর নিশাস ফেলে
চুপটি ক’রে ভাবে,
এমন করে আর কতদিন যাবে।
দূরদেশে তার আপন জনা, নিজেরই ঝঞ্ঝাটে
তাদের বেলা কাটে।
তারা এখন আর কি মনে রাখে
এতবড়ো অদরকারি তাকে।

চোখে এখন কম দেখে সে, ঝাপসা যে তার মন―
ভগ্নশেষের সংসারে তার শুকনাে ফুলের বন।
স্টেশন-মুখে গেল চলে পিছনে গ্রাম ফেলে,
রাত থাকতে―পাছে দেখে পাড়ার মেয়ে ছেলে।
দূরে গিয়ে, বাঁশবাগানের বিজন গলি বেয়ে
পথের ধারে বসে পড়ে―শূন্যে থাকে চেয়ে।


৩ জ্যৈষ্ঠ ১৩৪৪
আলমােড়া

ছড়ার ছবি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (page 22 crop).jpg

কাঠের সিঙ্গি

ছােটো কাঠের সিঙ্গি আমার ছিল ছেলেবেলায়,
সেটা নিয়ে গর্ব ছিল বীরপুরুষি খেলায়।

গলায় বাঁধা রাঙা ফিতের দড়ি,
চিনেমাটির ব্যাঙ বেড়াত পিঠের উপর চড়ি।
ব্যাঙটা যখন পড়ে যেত ধম্‌কে দিতেম ক’ষে,
কাঠের সিঙ্গি ভয়ে পড়ত বসে।
গাঁ গাঁ করে উঠছে বুঝি যেমনি হত মনে,
'চুপ করাে’ যেই ধম্‌কানো আর চম্‌কাত সেইখনে।
আমার রাজ্যে আর যা থাকুক সিংহভয়ের কোনাে
সম্ভাবনা ছিল না কখ্‌খোনো।
মাংস বলে মাটির ঢেলা দিতেম ভাঁড়ের ’পরে,
আপত্তি ও করত না তার তরে।
বুঝিয়ে দিতেম, গােপাল যেমন সুবােধ সবার চেয়ে
তেমনি সুবােধ হওয়া তাে চাই যা দেব তাই খেয়ে।
ইতিহাসে এমন শাসন করে নি কেউ পাঠ,
দিবানিশি কাঠের সিঙ্গি ভয়েই ছিল কাঠ।
খুদি কইত মিছিমিছি, ‘ভয় করছে দাদা!’
আমি বলতেম, ‘আমি আছি, থামাও তোমার কাঁদা—
যদি তােমায় খেয়েই ফেলে এমনি দেব মার
দু চক্ষে ও দেখবে অন্ধকার।’
মেজ্‌দিদি আর ছােড়্দিদিদের খেলা পুতুল নিয়ে,
কথায় কথায় দিচ্ছে তাদের বিয়ে।
নেমন্তন্ন করত যখন যেতুম বটে খেতে,
কিন্তু তাদের খেলার পানে চাই নি কটাক্ষেতে।
পুরুষ আমি, সিঙ্গিমামা নত পায়ের কাছে,
এমন খেলার সাহস বলো ক’জন মেয়ের আছে?


জ্যৈষ্ঠ ১৩৪৪

আলমােড়া

ছড়ার ছবি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (page 24 crop).jpg

ঝড়

দেখ্ রে চেয়ে নামল বুঝি ঝড়,
ঘাটের পথে বাঁশের শাখা ঐ করে ধড়্ফড়্।
আকাশতলে বজ্রপাণির ডঙ্কা উঠল বাজি,
শীঘ্র তরী বেয়ে চল্ রে মাঝি।
ঢেউয়ের গায়ে ঢেউগুলো সব গড়ায় ফুলে ফুলে,
পুবের চরে কাশের মাথা উঠছে দুলে দুলে।
ঈশান কোণে উড়তি বালি আকাশখানা ছেয়ে
হু হু করে আসছে ছুটে ধেয়ে।
কাকগুলাে তার আগে আগে উড়ছে প্রাণের ডরে,
হার মেনে শেষ আছাড় খেয়ে পড়ে মাটির ’পরে।
হাওয়ার বিষম ধাক্কা তাদের লাগছে ক্ষণে ক্ষণে―
উঠছে পড়ছে, পাখার ঝাপট দিতেছে প্রাণপণে।
বিজুলি ধায় দাঁত মেলে তার ডাকিনীটার মতাে,
দিক্‌দিগন্ত চমকে ওঠে হঠাৎ মর্মাহত।
ঐ রে, মাঝি, ক্ষেপল গাঙের জল,
লগি দিয়ে ঠেকা নৌকো, চরের কোলে চল্।
সেই যেখানে জলের শাখা, চখাচখীর বাস,
হেথা-হােথায় পলিমাটি দিয়েছে আশ্বাস
কাঁচা সবুজ নতুন ঘাসে ঘেরা―
তলের চরে বালুতে রােদ পােহায় কচ্ছপেরা।
হােথায় জেলে বাঁশ টাঙিয়ে শুকোতে দেয় জাল,
ডিঙির ছাতে বসে বসে শেলাই করে পাল।

রাত কাটাব ঐখানেতেই করব রাঁধাবাড়া,
এখনি আজ নেই তাে যাবার তাড়া।
ভাের থাকতে কাক ডাকতেই নৌকো দেব ছাড়ি,
ইঁটেখােলার মেলায় দেব সকাল-সকাল পাড়ি।


১২।৬।৩৭

আলমােড়া

খাটুলি

একলা হােথায় বসে আছে, কেই বা জানে ওকে—
আপন-ভােলা সহজ তৃপ্তি রয়েছে ওর চোখে।
খাটুলিটা বাইরে এনে আঙিনাটার কোণে
টানছে তামাক বসে আপন-মনে।
মাথার উপর বটের ছায়া, পিছন দিকে নদী
বইছে নিরবধি।
আয়ােজনের বালাই নেইকো ঘরে,
আমের কাঠের নড়্ নড়ে এক তক্তপােষের ’পরে
মাঝখানেতে আছে কেবল পাতা
বিধবা তার মেয়ের হাতের শেলাই-করা কাঁথা।
নাৎনি গেছে, রাখে তারি পােষা ময়নাটাকে—
তেমনি কচি গলায় ওকে ‘দাদু’ ব’লেই ডাকে।
ছেলের গাঁথা ঘরের দেয়াল, চিহ্ন আছে তারি
রঙিন মাটি দিয়ে আঁকা সিপাই সারি সারি।
সেই ছেলেটাই তালুকদারের সর্দারি পক্ষ পয়ে
জেলখানাতে মরছে পচে দাঙ্গা করতে যেয়ে।
দুঃখ অনেক পেয়েছে ও, হয়তাে ডুবছে নােয়,
হয়তাে ক্ষতি হয়ে গেছে তিসির বেচা-কেনায়।
বাইরে দারিদ্র্যের
কাটা-ছেঁড়ার আঁচড় লাগে ঢের,
তবুও তার ভিতর-মনে দাগ পড়ে না বেশি,
প্রাণটা যেমন কঠিন তেমনি কঠিন মাংসপেশী ।

ছড়ার ছবি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (page 28 crop).jpg

হয়তো গােরু বেচতে হবে মেয়ের বিয়ের দায়ে,
মাসে দুবার ম্যালেরিয়া কাঁপন লাগায় গায়ে,
ডাগর ছেলে চাকরি করতে গঙ্গাপারের দেশে
হয়তাে হঠাৎ মারা গেছে ঐ বছরের শেষে—
শুকনাে করুণ চক্ষু দুটো তুলে উপর-পানে
কার খেলা এই দুঃখসুখের, কী ভাবলে সেই জানে।
বিচ্ছেদ নেই খাটুনিতে, শশাকের পায় না ফাঁক—
ভাবতে পারে স্পষ্ট ক’রে নেইকো এমন বাক্।
জমিদারের কাছারিতে নালিশ করতে এসে
কী বলবে যে কেমন ক’রে পায় না ভেবে শেষে।
খাটুলিতে এসে বসে যখনি পায় ছুটি,
ভাব্নাগুলাে ধোঁওয়ায় মেলায়, ধোঁওয়ায় ওঠে ফুটি।
ওর যে আছে খোলা আকাশ, ওর যে মাথার কাছে
শিষ দিয়ে যায় বুলবুলিরা আলােছায়ার নাচে,
নদীর ধারে মেঠো পথে টাট্টু চলে ছুটে,
চক্ষু ভােলায় ক্ষেতের ফসল রঙের হরির-লুটে—
জন্মমরণ ব্যেপে আছে এরা প্রাণের ধন
অতি সহজ বলেই তাহা জানে না ওর মন।


জ্যৈষ্ঠ ১৩৪৪
আলমােড়া

ছড়ার ছবি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (page 30 crop).jpg

ঘরের খেয়া

সন্ধ্যা হয়ে আসে;
সােনা-মিশােল ধূসর আলাে ঘিরল চারি পাশে।
নৌকোখানা বাঁধা আমার মধ্যিখানের গাঙে-
অস্তরবির কাছে নয়ন কী যেন ধন মাঙে।
আপন গাঁয়ে কুটীর আমার দূরের পটে লেখা,
ঝাপসা আভায় যাচ্ছে দেখা বেগনি রঙের রেখা।
যাব কোথায় কিনারা তার নাই,
পশ্চিমেতে মেঘের গায়ে একটু আভাস পাই।
হাঁসের দলে উড়ে চলে হিমালয়ের পানে,
পাখা তাদের চিহ্নবিহীন পথের খবর জানে।
শ্রাবণ গেল, ভাদ্র গেল, শেষ হল জল-ঢালা,
আকাশতলে শুরু হল শুভ্র আলাের পালা।
ক্ষেতের পরে ক্ষেত একাকার প্লাবনে রয় ডুবে-
লাগল জলের দোলযাত্রা পশ্চিমে আর পুবে।
আসন্ন এই আঁধার-মুখে নৌকোখানি বেয়ে
যায় কারা ঐ, শুধাই ‘ওগাে নেয়ে,
চলেছ কোন্‌খানে?’
যেতে যেতে জবাব দিল, ‘যাব গাঁয়ের পানে।’
অচিন-শূন্যে-ওড়া পাখি চেনে আপন নীড়,
জানে বিজন-মধ্যে কোথায় আপন জনের ভিড়।

অসীম আকাশ মিলেছে ওর বাসার সীমানাতে,
ঐ অজানা জড়িয়ে আছে জানাশােনার সাথে।
তেমনি ওরা ঘরের পথিক ঘরের দিকে চলে
যেথায় ওদের তুলসি-তলায় সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বলে।
দাঁড়ের শব্দ ক্ষীণ হয়ে যায় ধীরে,
মিলায় সুদূর নীরে।
সেদিন দিনের অবসানে সজল মেঘের ছায়ে
আমার চলার ঠিকানা নাই, ওরা চলল গাঁয়ে।


২৮|৫|৩৭
আলমােড়া

যােগীনদা

যােগীনদাদার জন্ম ছিল ডেরাস্মাইলখাঁয়ে।
পশ্চিমেতে অনেক শহর অনেক গাঁয়ে গাঁয়ে
বেড়িয়েছিলেন মিলিটারি জরিপ করার কাজে,
শেষ বয়সে স্থিতি হল শিশুদলের মাঝে।
‘জুলুম তােদের সইব না আর’ হাঁক চালাতেন রােজই,
পরের দিনেই আবার চলত ঐ ছেলেদের খোঁজই।
দরবারে তাঁর কোনাে ছেলের ফাঁক পড়বার জো কী—
ডেকে বলতেন, ‘কোথায় টুনু, কোথায় গেল খোঁকি?’
‘ওরে ভজু, ওরে বাঁদর, ওরে লক্ষ্মীছাড়া’
হাঁক দিয়ে তার ভারী গলায় মাতিয়ে দিতেন পাড়া।
চার দিকে তাঁর ছােটো বড়াে জুটত যত লােভী—
কেউ বা পেত মার্বেল কেউ গণেশমার্কা ছবি,
কেউ বা লজঞ্জুস,
সেটা ছিল মজলিসে তাঁর হাজরি দেবার ঘুষ।
কাজলি যদি অকারণে করত অভিমান
হেসে বলতেন ‘হাঁ করো তাে’, দিতেন ছাঁচি পান।
আপন-সৃষ্ট নাৎনিও তাঁর ছিল অনেকগুলি—
পাগলি ছিল, পটলি ছিল, আর ছিল জঙ্গুলি।
কেয়া-খয়ের এনে দিত, দিত কাসুন্দিও—
মায়ের হাতের জারকলেবু যােগীনদাদার প্রিয়।

তখনো তাঁর শক্ত ছিল মুগুর-ভাজা দেহ,
বয়স যে ষাট পেরিয়ে গেছে বুঝত না তা কেহ।
ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি, চোখদুটি জ্বল্জ্বলে—
মুখ যেন তাঁর পাকা আমটি, হয় নি সে থল্থলে।
চওড়া কপাল, সামনে মাথায় বিরল চুলের টাক,
গোঁফ-জোড়াটার খ্যাতি ছিল, তাই নিয়ে তাঁর জাঁক।
দিন ফুরােত, কুলুঙ্গিতে প্রদীপ দিত জ্বালি,
বেলের মালা হেঁকে যেত মােড়ের মাথায় মালী।
চেয়ে রইতেম মুখের দিকে শান্তশিষ্ট হয়ে,
কাঁসর-ঘণ্টা উঠত বেজে গলির শিবালয়ে।
সেই সেকালের সন্ধ্যা মােদের সন্ধ্যা ছিল সত্যি,
দিন-ভ্যাঙানাে ইলেকট্রিকের হয় নিকো উৎপত্তি।
ঘরের কোণে কোণে ছায়া, আঁধার বাড়ত ক্রমে—
মিট্মিটে এক তেলের আলােয় গল্প উঠত জমে।
শুরু হলে থামতে তাঁরে দিতেম না তাে ক্ষণেক,
সত্যি মিথ্যে যা-খুশি তাই বানিয়ে যেতেন অনেক।
ভূগােল হত উলটো-পাল্টা, কাহিনী আজগুবি—
মজা লাগত খুবই।
গল্পটুকু দিচ্ছি, কিন্তু দেবার শক্তি নাই তাে
বলার ভাবে যে রঙটুকু মন আমাদের ছাইত।
হুশিয়ারপুর পেরিয়ে গেল ছন্দৌসির গাড়ি,
দেড়টা রাতে সরহরােয়ায় দিল স্টেশন ছাড়ি।

ভাের থাকতেই হয়ে গেল পার
বুলন্দশর আম্লোরিসর্সার।
পেরিয়ে যখন ফিরােজাবাদ এল
যােগীনদাদার বিষম খিদে পেল।
ঠোঙায়-ভরা পকৌড়ি আর চলছে মটরভাজা,
এমন সময় হাজির এসে জৌনপুরের রাজা।
পাঁচশাে-সাতশাে লােকলস্কর, বিশ-পঁচিশটা হাতি—
মাথার উপর ঝালর-দেওয়া প্রকাণ্ড এক ছাতি।
মন্ত্রী এসেই দাদার মাথায় চড়িয়ে দিল তাজ—
বললে, ‘যুবরাজ,
আর কতদিন রইবে, প্রভু, মােতিমহল ত্যেজে?’
বলতে বলতে রামশিঙা আর ঝাঁঝর উঠল বেজে।
ব্যাপারখানা এই—
রাজপুত্র তেরাে বছর রাজভবনে নেই।
সদ্য ক’রে বিয়ে,
নাথদোয়ারার সেগুনবনে শিকার করতে গিয়ে
তার পরে যে কোথায় গেল, খুঁজে না পায় লোক।
কেঁদে কেঁদে অন্ধ হল রানীমায়ের চোখ।
খোঁজ পড়ে যায় যেমনি কিছু শােনে কানাঘুষায়—
খোঁজে পিণ্ডিদাদনখাঁয়ে, খোঁজে লালামুসায়।
খুঁজে খুঁজে লুধিয়ানায় ঘুরেছে পঞ্জাবে—
গুলজারপুর হয় নি দেখা, শুনছি পরে যাবে।
চঙ্গামঙ্গা দেখে এল সরাই আলমগিরে,
রাওলপিণ্ডি থেকে এল হতাশ হয়ে ফিরে।

ইতিমধ্যে যােগীনদাদা হাৎরাশ জংশনে
গেছেন লেগে চায়ের সঙ্গে পাঁউরুটি-দংশনে।
দিব্যি চলছে খাওয়া,
তারি সঙ্গে খােলা গায়ে লাগছে মিঠে হাওয়া—
এমন সময় সেলাম করলে জৌনপুরের চর;
জোড় হাতে কয়, ‘রাজাসাহেব, কঁহা আপ্কা ঘর?’
দাদা ভাবলেন, সম্মানটা নিতান্ত জম্কালো,
আসল পরিচয়টা তবে না দেওয়াই তাে ভালাে।
ভাবখানা তাঁর দেখে চরের ঘনালো সন্দেহ,
এ মানুষটি রাজপুত্রই, নয় কভু আর-কেহ।
রাজলক্ষণ এতগুলাে একখানা এই গায়,
ওরে বাস্ রে, দেখে নি সে আর কোনাে জায়গায়।
তার পরে মাস পাঁচেক গেছে দুঃখে সুখে কেটে,
হারাধনের খবর গেল জৌনপুরের স্টেটে।
ইস্টেশনে নির্ভাবনায় বসে আছেন দাদা,
কেমন করে কী যে হল লাগল বিষম ধাঁধা।
গুর্খা ফোউজ সেলাম করে দাঁড়ালাে চার দিকে,
ইস্টেশনটা ভরে গেল আফগানে আর শিখে।
ঘিরে তাঁকে নিয়ে গেল কোথায় ইটার্সিতে,
দেয় কারা সব জয়ধ্বনি উরদুতে ফার্সিতে।
সেখান থেকে মৈনপুরী, শেষে লছ্মন-ঝােলায়
বাজিয়ে সানাই চড়িয়ে দিল ময়ুরপংখি দোলায়।
দশটা কাহার কাঁধে নিল, আর পঁচিশটা কাহার
সঙ্গে চলল তাঁহার।

ছড়ার ছবি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (page 37 crop).jpg

ভাটিণ্ডাতে দাঁড় করিয়ে জোরালাে দূরবীনে
দখিনমুখে ভালাে করে দেখে নিলেন চিনে
বিন্ধ্যাচলের পর্বত।
সেইখানেতে খাইয়ে দিল কাঁচা আমের শর্বৎ।
সেখান থেকে এক পহরে গেলেন জৌনপুরে
পড়ন্ত রােদ্দুরে।
এইখানেতেই শেষে
যােগীনদাদা থেমে গেলেন যৌবরাজ্যে এসে।
হেসে বললেন, ‘কী আর বলব দাদা,
মাঝের থেকে মটর-ভাজা খাওয়ায় পড়ল বাধা।’
‘ও হবে না’ ‘ও হবে না’ বিষম কলরবে
ছেলেরা সব চেঁচিয়ে উঠল, ‘শেষ করতেই হবে।’
যােগীনদা কয়, ‘যাক গে,
বেঁচে আছি শেষ হয় নি ভাগ্যে।
তিনটে দিন না যেতে যেতেই হলেম গলদঘর্ম।
রাজপুত্র হওয়া কি, ভাই, যে-সে লােকের কর্ম?
মােটা মােটা পরােটা আর তিন-পােয়াটাক ঘি
বাংলাদেশের-হাওয়ায়-মানুষ সইতে পারে কি?
নাগরা জুতায় পা ছিঁড়ে যায়, পাগড়ি মুটের বােঝা-
এগুলি কি সহ্য করা সােজা?
তা ছাড়া এই রাজপুত্রের হিন্দি শুনে কেহ
হিন্দি বলেই করলে না সন্দেহ।
যেদিন দূরে শহরেতে চলছিল রামলীলা
পাহারাটা ছিল সেদিন ঢিলা।

সেই সুযােগে গৌড়বাসী তখনি এক দৌড়ে
ফিরে এল গৌড়ে।
চলে গেল সেই রাত্রেই ঢাকা—
মাঝের থেকে চর পেয়ে যায় দশটি হাজার টাকা।
কিন্তু, গুজব শুনতে পেলেম শেষে
কানে মােচড় খেয়ে টাকা ফেরত দিয়েছে সে।’
‘কেন তুমি ফিরে এলে’ চেঁচাই চারি পাশে,
যােগীনদাদা একটু কেবল হাসে।
তার পরে তাে শুতে গেলেম, আধেক রাত্রি ধ’রে
শহরগুলাের নাম যত সব মাথার মধ্যে ঘােরে।
ভারতভূমির সব ঠিকানাই ভুলি যদি দৈবে,
যােগীনদাদার ভূগােল-গােলা গল্প মনে রইবে।


জ্যৈষ্ঠ ১৩৪৪
আলমােড়া

ছড়ার ছবি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (page 40 crop).jpg

বুধু

মাঠের শেষে গ্রাম,
সাতপুরিয়া নাম।
চাষের তেমন সুবিধা নেই কৃপণ মাটির গুণে,
পঁয়ত্রিশ ঘর তাঁতির বসত- ব্যাবসা জাজিম বুনে।
নদীর ধারে খুঁড়ে খুঁড়ে পলির মাটি খুঁজে
গৃহস্থেরা ফসল করে কাঁকুড়ে তরমুজে।
ঐখানেতে বালির ডাঙা, মাঠ করছে ধু ধু,
ঢিবির ’পরে বসে আছে গাঁয়ের মােড়ল বুধু।
সামনে মাঠে ছাগল চরছে ক’টা—
শুকনাে জমি, নেইকো ঘাসের ঘটা।

কী যে ওরা পাচ্ছে খেতে ওরাই সেটা জানে,
ছাগল বলেই বেঁচে আছে প্রাণে।
আকাশে আজ হিমের আভাস, ফ্যাকাশে তার নীল,
অনেক দূরে যাচ্ছে উড়ে চিল।
হেমন্তের এই রােদ্দুরটা লাগছে অতি মিঠে,
ছােটো নাতি মােগ্লুটা তার জড়িয়ে আছে পিঠে।
স্পর্শপুলক লাগছে দেহে, মনে লাগছে ভয়—
বেঁচে থাকলে হয়।
গুটি তিনটি ম’রে শেষে ঐটি সাধের নাতি,
রাত্রিদিনের সাথি!
গােরুর গাড়ির ব্যাবসা বুধুর চলছে হেসে-খেলেই,
নাড়ী ছেঁড়ে এক পয়সা খরচ করতে গেলেই।
কৃপণ ব’লে গ্রামে গ্রামে বুধুর নিন্দে রটে,
সকালে কেউ নাম করে না উপােস পাছে ঘটে।
ওর যে কৃপণতা সে তত ঢেলে দেবার তরে,
যত কিছু জমাচ্ছে সব মােগ্লু নাতির ’পরে।
পয়সাটা তার বুকের রক্ত, কারণটা তার ঐ—
এক পয়সা আর কারাে নয় ঐ ছেলেটার বৈ।
খেয়ে, না প’রে, নিজের শােষণ ক’রে প্রাণ
যেটুকু রয় সেইটুকু ওর প্রতি দিনের দান।
দেব্তা পাছে ঈর্ষাভরে নেয় কেড়ে মােগ্লুকে,
আঁকড়ে রাখে বুকে।
এখনাে তাই নাম দেয় নি, ডাক নামেতেই ডাকে—
নাম ভাঁড়িয়ে ফাঁকি দেবে নিষ্ঠুর দেব্তাকে।


জ্যৈষ্ঠ ১৩৪৪
আলমােড়া

ছড়ার ছবি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (page 42 crop).jpg

চড়িভাতি

ফল ধরেছে বটের ডালে ডালে;
অফুরন্ত আতিথ্যে তার সকালে বৈকালে
বনভোজনে পাখিরা সব আসছে ঝাঁকে ঝাঁক—
মাঠের ধারে আমার ছিল চড়িভাতির ডাক।
যে যার আপন ভাঁড়ার থেকে যা পেল যেইখানে
মাল-মসলা নানারকম জুটিয়ে সবাই আনে।
জাত-বেজাতের চালে ডালে মিশােল ক’রে শেষে
ডুমুরগাছের তলাটাতে মিলল সবাই এসে।

বারে বারে ঘটি ভ’রে জল তুলে কেউ আনে,
কেউ চলেছে কাঠের খোঁজে আম-বাগানের পানে।
হাঁসের ডিমের সন্ধানে কেউ গেল গাঁয়ের মাঝে,
তিন কন্যা লেগে গেল রান্না-করার কাজে।
গাঁঠ-পাকানাে শিকড়েতে মাথাটা তার থুয়ে
কেউ পড়ে যায় গল্পের বই জামের তলায় শুয়ে।
সকল-কর্ম-ভােলা
দিনটা যেন ছুটির নৌকা বাঁধন-রশি-খােলা
চলে যাচ্ছে আপনি ভেসে সে কোন্ আঘাটায়
যথেচ্ছ ভাঁটায়।
মানুষ যখন পাকা ক’রে প্রাচীর তােলে নাই,
মাঠে বনে শৈলগুহায় যখন তাহার ঠাঁই,
সেইদিনকার আল্গা-বিধির-বাইরে-ঘােরা প্রাণ
মাঝে মাঝে রক্তে আজও লাগায় মন্ত্রগান।
সেইদিনকার যথেচ্ছ-রস আস্বাদনের খোঁজে
মিলেছিলেম অবেলাতে অনিয়মের ভােজে।
কারাে কোনো স্বত্বদাবীর নেই যেখানে চিহ্ন,
যেখানে এই ধরাতলের সহজদাক্ষিণ্য,
হালকা সাদা মেঘের নীচে পুরানো সেই ঘাসে,
একটা দিনের পরিচিত আম-বাগানের পাশে,
মাঠের ধারে, অনভ্যাসের সেবার কাজে খেটে
কেমন ক’রে কয়টা প্রহর কোথায় গেল কেটে।
সমস্ত দিন ডাকল ঘুঘু দুটি,
আশে পাশে এঁটোর লােভে কাক এল সব জুটি,
গাঁয়ের থেকে কুকুর এল, লড়াই গেল বেধে−
একটা তাদের পালালাে তার পরাভবের খেদে।

রৌদ্র পড়ে এল ক্রমে, ছায়া পড়ল বেঁকে,
ক্লান্ত গােরু গাড়ি টেনে চলেছে হাট থেকে।
আবার ধীরে ধীরে
নিয়ম-বাঁধা যে-যার ঘরে চলে গেলেম ফিরে।
একটা দিনের মুছল স্মৃতি, ঘুচল চড়িভাতি,
পােড়াকাঠের ছাই পড়ে রয়— নামে আঁধার রাতি।


আষাঢ় ১৩৪৪
আলমােড়া

ছড়ার ছবি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (page 45 crop).jpg

কাশী

কাশীর গল্প শুনেছিলুম যােগীনদাদার কাছে,
পষ্ট মনে আছে।
আমরা তখন ছিলাম না কেউ, বয়েস তাঁহার সবে
বছর-আষ্টেক হবে।
সঙ্গে ছিলেন খুড়ি,
মােরব্বা বানাবার কাজে ছিল না তাঁর জুড়ি!
দাদা বলেন, আম্লকি বেল পেঁপে সে তাে আছেই,
এমন কোনাে ফল ছিল না এমন কোনাে গাছেই

তাঁর হাতে রস জমলে লােকের গােল না ঠেকত- এটাই
ফল হবে কি মেঠাই।
রসিয়ে নিয়ে চালতা যদি মুখে দিতেন গুঁজি
মনে হত বড়ােরকম রসগােল্লাই বুঝি।
কাঁঠাল-বিচির মােরব্বা যা বানিয়ে দিতেন তিনি
পিঠে ব’লে পৌষমাসে সবাই নিত কিনি।
দাদা বলেন, ‘মােরব্বাটা হয়তাে মিছেমিছিই,
কিন্তু মুখে দিতে যদি বলতে কঁঠাল-বিচিই।’
মােরব্বাতে ব্যাবসা গেল জ’মে,
বেশ কিঞ্চিৎ টাকা জমল ক্রমে।
একদিন এক চোর এসেছে তখন অনেক রাত,
জানলা দিয়ে সাবধানে সে বাড়িয়ে দিল হাত।
খুড়ি তখন চাটনি করতে তেল নিচ্ছেন মেপে,
ধড়াস করে চোরের হাতে জানলা দিলেন চেপে।
চোর বললে ‘উহু উহু’; খুড়ি বললেন, ‘আহা,
বাঁ হাত মাত্র, এইখানেতেই থেকে যাক-না তাহা।’
কেঁদে-কেটে কোনােমতে চোর তাে পেল খালাস;
খুড়ি বললেন, ‘মরবি, যদি এ ব্যাবসা তাের চালাস।’
দাদা বললেন, ‘চোর পালালাে, এখন গল্প থামাই?
ছ’দিন হয় নি ক্ষৌর করা, এবার গিয়ে কামাই’
আমরা টেনে বসাই; বলি, ‘গল্প কেন ছাড়বে?’
দাদা বলেন, ‘রবার নাকি, টানলেই কি বাড়বে?—
কে ফেরাতে পারে তােদের আবদারের এই জোর,
তার চেয়ে যে অনেক সহজ ফেরানাে সেই চোর।

ছড়ার ছবি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (page 47 crop).jpg

আচ্ছা তবে শােন্− সে মাসে গ্রহণ লাগল চাঁদে,
শহর যেন ঘিরল নিবিড় মানুষ-বােনা ফাঁদে।
খুড়ি গেছেন স্নান করতে বাড়ির দ্বারের পাশে,
আমার তখন পূর্ণগ্রহণ ভিড়ের রাহুগ্রাসে।
প্রাণটা যখন কণ্ঠাগত, মরছি যখন ডরে,
গুণ্ডা এসে তুলে নিল হঠাৎ কাঁধের ’পরে।
তখন মনে হল এ তাে বিষ্ণুদূতের দয়া,
অর-একটুকু দেরি হলেই প্রাপ্ত হতেম গয়া।
বিষ্ণুদূতটা ধরল যখন যমদূতের মূর্তি
এক নিমেষেই একেবারেই ঘুচল আমার ফুর্তি।

সাত গলি সে পেরিয়ে শেষে একটা এঁধােঘরে
বসিয়ে আমায় রেখে দিল খড়ের আঁঠির ’পরে।
চোদ্দ আনা পয়সা আছে পকেট দেখি ঝেড়ে,
কেঁদে কইলাম, ‘ও পাঁড়েজি, এই নিয়ে দাও ছেড়ে।’
গুণ্ডা বলে, ‘ওটা নেব, ওটা ভালাে দ্রব্যই,
আরাে নেব চারটি হাজার নয়শাে নিরেনব্বই—
তার উপরে আর দু আনা। খুড়িটা তাে মরবে,
টাকার বোঝা বয়ে সে কি বৈতরণী তরবে?
দেয় যদি তো দিক চুকিয়ে, নইলে-’ পাকিয়ে চোখ
যে ভঙ্গিটা দেখিয়ে দিলে সেটা মারাত্মক।
এমন সময়, ভাগ্যি ভালাে, গুণ্ডাজির এক ভাগ্নি—
মূর্তিটা তার রণচণ্ডী, যেন সে রায়বাঘ্নি—
আমার মরণদশার মধ্যে হলেন সমাগত
দাবানলের উর্ধ্বে যেন কালাে মেঘের মতাে।
রাত্তিরে কাল ঘরে আমার উঁকি মারল বুঝি,
যেমনি দেখা অমনি আমি রইনু চক্ষু বুজি।
পরের দিনে পাশের ঘরে, কী গলা তার বাপ,
মামার সঙ্গে ঠাণ্ডা ভাষায় নয় সে বাক্যালাপ।
বলছে, ‘তােমার মরণ হয় না, কাহার বাছনি ও,
পাপের বােঝা বাড়িয়ে না আর, ঘরে ফেরৎ দিয়ো—
আহা, এমন সােনার টুকরাে—’। শুনে আগুন মামা;
বিশ্রী রকম গাল দিয়ে কয়, ‘মিহি সুরটা থামা।’
এ’কেই বলে মিহি সুর কি, আমি ভাবছি শুনে।
দিন তাে গেল কোনােমতে কড়ি বরগা গুনে।

রাত্রি হবে দুপুর, ভাগ্নি ঢুকল ঘরে ধীরে;
চুপিচুপি বললে কানে, ‘যেতে কি চাস ফিরে?’
লাফিয়ে উঠে কেঁদে বললেম, ‘যাব যাব যাব।’
ভাগ্নি বললে, ‘আমার সঙ্গে সিঁড়ি বেয়ে নাবো—
কোথায় তােমার খুড়ির বাসা অগস্ত্যকুণ্ডে কি,
যে ক’রে হােক আজকে রাতেই খুঁজে একবার দেখি—
কালকে মামার হাতে আমার হবেই মুণ্ডপাত।’
আমি তাে, ভাই, বেঁচে গেলেম; ফুরিয়ে গেল রাত।’
হেসে বললেম যােগীনদাদার গম্ভীর মুখ দেখে,
ঠিক এমনি গল্প বাবা শুনিয়েছে বই থেকে।
দাদা বললেন, ‘বিধি যদি চুরি করেন নিজে
পরের গল্প, জানি নে ভাই, আমি করব কী যে।’

১০।৬।৩৭
আলমােড়া

ছড়ার ছবি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (page 50 crop).jpg

প্রবাসে

বিদেশমুখাে মন যে আমার কোন্ বাউলের চেলা,
গ্রাম-ছাড়ানাে পথের বাতাস সর্বদা দেয় ঠেলা।

তাই তো সেদিন ছুটির দিনে টাইম-টেবিল প’ড়ে
প্রাণটা উঠল নড়ে।
বাক্সো নিলেম ভর্তি করে, নিলেম ঝুলি থ’লে—
বাংলাদেশের বাইরে গেলেম গঙ্গাপারে চ’লে।
লােকের মুখে গল্প শুনে গােলাপ-খেতের টানে
মনটা গেল এক দৌড়ে গাজিপুরের পানে।
সামনে চেয়ে চেয়ে দেখি গম-জোয়ারির খেতে
নবীন অঙ্কুরেতে
বাতাস কখন হঠাৎ এসে সােহাগ করে যায়
হাত বুলিয়ে কাঁচা শ্যামল কোমল কচি গায়।
আটচালা ঘর, ডাহিন দিকে সবজি-বাগানখানা
শুশ্রূষা পায় সারা দুপুর জোড়া-বলদ-টানা
আঁকাবাঁকা কলকলানি করুণ জলের ধারায়—
চাকার শব্দে অলস প্রহর ঘুমের ভারে ভারায়।
ইঁদারাটার কাছে
বেগনি ফলে তুঁতের শাখা রঙিন হয়ে আছে।
অনেক দূরে জলের রেখা চরের কূলে কূলে,
ছবির মতাে নৌকো চলে পাল-তােলা মাস্তুলে।
সাদা ধুলাে হাওয়ায় ওড়ে, পথের কিনারায়
গ্রামটি দেখা যায়।
খােলার চালের কুটীরগুলি লাগাও গায়ে গায়ে
মাটির প্রাচীর দিয়ে ঘেরা আম-কাঁঠালের ছায়ে
গােরুর গাড়ি পড়ে আছে মহানিমের তলে,
ডােবার মধ্যে পাতা-পচা পাঁক-জমানাে জলে
গম্ভীর ঔদাস্যে অলস আছে মহিষগুলি
এ ওর পিঠে আরামে ঘাড় তুলি।

বিকেল-বেলায় একটুখানি কাজের অবকাশে
খােলা দ্বারের পাশে
দাঁড়িয়ে আছে পাড়ার তরুণ মেয়ে
আপন-মনে অকারণে বাহির-পানে চেয়ে।
অশথতলায় বসে তাকাই ধেনুচারণ মাঠে,
আকাশে মন পেতে দিয়ে সমস্ত দিন কাটে।
মনে হ’ত চতুর্দিকে হিন্দি ভাষায় গাঁথা
একটা যেন সজীব পুঁথি, উলটিয়ে যাই পাতা-
কিছু বা তার ছবি-আঁকা কিছু বা তার লেখা,
কিছু বা তার আগেই যেন ছিল কখন্ শেখা।
ছন্দে তাহার রস পেয়েছি, আউড়িয়ে যায় মন-
সকল কথার অর্থ বােঝার নাইকো প্রয়ােজন।


আষাঢ় ১৩৪৪
আলমােড়া

পদ্মায়

আমার নৌকো বাঁধা ছিল পদ্মানদীর পারে,
হাঁসের পাঁতি উড়ে যেত মেঘের ধারে ধারে-
জানি নে মন-কেমন-করা লাগত কী সুর হাওয়ার
আকাশ বেয়ে দূর দেশেতে উদাস হয়ে যাওয়ার।
কী জানি সেই দিনগুলি সব কোন্ আঁকিয়ের লেখা,
ঝিকিমিকি সােনার রঙে হালকা তুলির রেখা।
বালির ’পরে বয়ে যেত স্বচ্ছ নদীর জল,
তেমনি বইত তীরে তীরে গাঁয়ের কোলাহল-
ঘাটের কাছে, মাঠের ধারে, আলাে-ছায়ার স্রোতে।
অলস দিনের উড়্ নিখানার পরশ আকাশ হতে
বুলিয়ে যেত মায়ার মন্ত্র আমার দেহে মনে।
তারই মধ্যে আসত ক্ষণে ক্ষণে
দূর কোকিলের সুর,
মধুর হত আশ্বিনে রােদ্দুর।
পাশ দিয়ে সব নৌকো বড়াে বড়ো
পরদেশিয়া নানা ক্ষেতের ফসল ক’রে জড়াে
পশ্চিমে হাট বাজার হতে, জানি নে তার নাম,
পেরিয়ে আসত ধীর গমনে গ্রামের পরে গ্রাম
ঝপ্ ঝপিয়ে দাঁড়ে।
খােরাক কিনতে নামত দাঁড়ি ছায়ানিবিড় পাড়ে।
যখন হত দিনের অবসান
গ্রামের ঘাটে বাজিয়ে মাদল গাইত হােলির গান।

ছড়ার ছবি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (page 54 crop).jpg

ক্রমে রাত্রি নিবিড় হয়ে নৌকো ফেলত ঢেকে,
একটি কেবল দীপের আলো জ্বলত ভিতর থেকে।
শিকলে আর স্রোতে মিলে চলত টানের শব্দ,
স্বপ্নে যেন ব’কে উঠত রজনী নিস্তব্ধ।
পুবে হাওয়ার এল ঋতু, আকাশ-জোড়া মেঘ—
ঘরমুখো ঐ নৌকোগুলােয় লাগল অধীর বেগ।
ইলিশ মাছ আর পাকা কাঁঠাল জমল পারের হাটে,
কেনাবেচার ভিড় লাগল নৌকো-বাঁধা ঘাটে।
ডিঙি বেয়ে পাটের আঁঠি আনছে ভারে ভারে,
মহাজনের দাড়িপাল্লা উঠল নদীর ধারে।
হাতে পয়সা এল, চাষি ভাব্না নাহি মানে—
কিনে নতুন ছাতা জুতে চলেছে ঘর-পানে।
পরদেশিয়া নৌকোগুলাের এল ফেরার দিন,
নিল ভরে খালি-করা কেরােসিনের টিন--
একটা পালের ’পরে ছােটো আরেকটা পাল তুলে
চলার বিপুল গর্বে তরীর বুক উঠেছে ফুলে।
মেঘ ডাকছে গুরু গুরু, থেমেছে দাড় বাওয়া—
ছুটছে ঘােলা জলের ধারা, বইছে বাদল হাওয়া।

৬।৬।৩৭
আলমােড়া

ছড়ার ছবি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (page 56 crop).jpg

বালক

বয়স তখন ছিল কাঁচা; হালকা দেহখানা
ছিল পাখির মতো, শুধু ছিল না তার ডানা।
উড়ত পাশের ছাদের থেকে পায়রাগুলাের ঝাঁক,
বারান্দাটার রেলিঙ-’পরে ডাকত এসে কাক।
ফেরিওয়ালা হেঁকে যেত গলির ওপার থেকে,
তপসিমাছের ঝুড়ি নিত গামছা দিয়ে ঢেকে।
বেহালাটা হেলিয়ে কাঁধে ছাদের ’পরে দাদা,
সন্ধ্যাতারার সুরে যেন সুর হত তাঁর সাধা।
জুটেছি বৌদিদির কাছে ইংরেজি পাঠ ছেড়ে,
মুখখানিতে-ঘের-দেওয়া তাঁর শাড়িটি লালপেড়ে।
চুরি ক’রে চাবির গােছা লুকিয়ে ফুলের টবে
স্নেহের রাগে রাগিয়ে দিতেম নানান উপদ্রবে।
কঙ্কালী চাটুজ্জে হঠাৎ জুটত সন্ধ্যা হলে—
বাঁ হাতে তার থেলাে হুঁকো, চাদর কাঁধে ঝোলে।
দ্রুত লয়ে আউড়ে যেত লবকুশের ছড়া,
থাকত আমার খাতা লেখা, পড়ে থাকত পড়া—
মনে মনে ইচ্ছে হত যদিই কোনাে ছলে
ভর্তি হওয়া সহজ হত এই পাঁচালির দলে
ভাব্না মাথায় চাপত নাকো ক্লাসে ওঠার দায়ে,
গান শুনিয়ে চলে যেতুম নতুন নতুন গাঁয়ে।
স্কুলের ছুটি হয়ে গেলে বাড়ির কাছে এসে
হঠাৎ দেখি, মেঘ নেমেছে ছাদের কাছে ঘেঁষে।
আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামে, রাস্তা ভাসে জলে,
ঐরাবতের শুড় দেখা দেয় জল-ঢালা সব নলে।

অন্ধকারে শােনা যেত রিম্ঝিমিনি ধারা,
রাজপুত্র তেপান্তরে কোথা সে পথহারা।
ম্যাপে যে-সব পাহাড় জানি, জানি যে-সব গাঙ
কুয়েন্লুন আর মিসিসিপি ইয়াংসিকিয়াঙ,
জানার সঙ্গে আধেক জানা, দূরের থেকে শােনা,
নানা রঙের নানা সুতােয় সব দিয়ে জাল-বােনা,
নানারকম ধ্বনির সঙ্গে নানান চলাফেরা,
সব দিয়ে এক হালকা জগৎ মন দিয়ে মাের ঘেরা—
ভাব্নাগুলো তারই মধ্যে ফিরত থাকি থাকি
বানের জলে শ্যাওলা যেমন মেঘের তলে পাখি।

আষাঢ় ১৩৪৪
শান্তিনিকেতন

ছড়ার ছবি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (page 59 crop).jpg


দেশান্তরী

প্রাণ-ধারণের বােঝখানা বাঁধা পিঠের ’পরে
আকাল পড়ল, দিন চলে না, চলল দেশান্তরে।

দূর শহরে একটা কিছু যাবেই যাবে জুটে,
এই আশাতেই লগ্ন দেখে ভােরবেলাতে উঠে
দুর্গা ব’লে বুক বেঁধে সে চলল ভাগ্যজয়ে—
মা ডাকে না পিছুর ডাকে অমঙ্গলের ভয়ে।
স্ত্রী দাঁড়িয়ে দুয়ার ধরে দুচোখ শুধু মােছে,
আজ সকালে জীবনটা তার কিছুতেই না রােচে
ছেলে গেছে জাম কুড়ােতে দিঘির পাড়ে উঠি,
মা তারে আজ ভুলে আছে তাই পেয়েছে ছুটি।
স্ত্রী বলেছে বারে বারে যে করে হােক খেটে
সংসারটা চালাবে সে, দিন যাবে তার কেটে।
ঘর ছাইতে খড়ের আঁঠির জোগান দেবে সে যে,
গোবর দিয়ে নিকিয়ে দেবে দেয়াল পাঁচিল মেঝে।
মাঠের থেকে খড়কে কাঠি আনবে বেছে বেছে,
ঝাঁটা বেঁধে কুমােরটুলির হাটে আসবে বেচে।
ঢেঁকিতে ধান ভেনে দেবে বামুনদিদির ঘরে,
খুদকুঁড়াে যা জুটবে তাতেই চলবে দুর্বছরে।
দূর দেশেতে বসে বসে মিথ্যা অকারণে
কোনোমতেই ভাব্না যেন না রয় স্বামীর মনে।
সময় হল, ঐ তাে এল খেয়াঘাটের মাঝি,
দিন না যেতে রহিমগঞ্জে যেতেই হবে আজি।
সেইখানেতে চৌকিদারি করে ওদের জ্ঞাতি,
মহেশখুডাের মেঝো জামাই, নিতাই দাসের নাতি।
নতুন নতুন গা পেরিয়ে অজানা এই পথে
পৌঁছবে পাঁচ দিনের পরে শহর কোনােমতে।
সেইখানে কোন্ হালসিবাগান, ওদের গ্রামের কালাে
শর্ষেতেলের দোকান সেথায় চালাচ্ছে খুব ভালাে।

গেলে সেথায় কালুর খবর সবাই বলে দেবে—
তার পরে সব সহজ হবে, কী হবে আর ভেবে।
স্ত্রী বললে, ‘কালুদাকে খবরটা এই দিয়ো,
ওদের গাঁয়ের বাদল পালের জাঠতুত ভাই প্রিয়
বিয়ে করতে আসবে আমার ভাইঝি মল্লিকাকে
উনত্রিশে বৈশাখে।’

আষাঢ় ১৩৪৪
শান্তিনিকেতন

ছড়ার ছবি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (page 62 crop).jpg

অচলা বুড়ি

অচলবুড়ি, মুখখানি তার হাসির রসে ভরা,
স্নেহের রসে পরিপক্ক অতিমধুর জরা।
ফুলে ফুলাে দুই চোখে তার দুই গালে আর ঠোঁটে
উছলে-পড়া হৃদয় যেন ঢেউ খেলিয়ে ওঠে।
পরিপুষ্ট অঙ্গটি তার, হাতের গড়ন মোটা,
কপালে দুই ভুরুর মাঝে উলকি-আঁকা ফোঁটা।
গাড়ি-চাপা কুকুর একটা মরতেছিল পথে,
সেবা ক’রে বাঁচিয়ে তারে তুলল কোনােমতে।
খােড়া কুকুর সেই ছিল তার নিত্যসহচর;
আধপাগলি ঝি ছিল এক, রাড়ি বালেশ্বর।
দাদাঠাকুর বলত, ‘বুড়ি, জমল কত টাকা,
সঙ্গে ওটা যাবে না তাে, বাক্সে রইল ঢাকা-
ব্রাহ্মণে দান করতে না চাও নাহয় দাও-না ধার ।
জানােই তাে এই অসময়ে টাকার কী দরকার।’
বুডি হেসে বলে, ‘ঠাকুর, দরকার তাে আছেই,
সেইজন্যে ধার না দিয়ে রাখি টাকা কাছেই।’
সাঁৎরাপাড়ার কায়েতবাড়ির বিধবা এক মেয়ে,
এক কালে সে সুখে ছিল বাপের আদর পেয়ে।
বাপ মরেছে, স্বামী গেছে, ভাইরা না দেয় ঠাঁই
দিন চালাবে এমনতরো উপায় কিছু নাই।
শেষকালে সে ক্ষুধার দায়ে, দৈন্যদশার লাজে,
চলে গেল হাঁসপাতালে রােগীসেবার কাজে।

ছড়ার ছবি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (page 64 crop).jpg

এর পিছনে বুড়ি ছিল আর ছিল লােক তার
কংসারি শীল বেনের ছেলে মুকুন্দ মােক্তার।

গ্রামের লােকে ছি-ছি করে, জাতে ঠেলল তাকে—
একলা কেবল অচল বুড়ি আদর করে ডাকে।
সে বলে, ‘তুই বেশ করেছিস যা বলুক-না যেবা,
ভিক্ষা মাগার চেয়ে ভালাে দুঃখী দেহের সেবা।’
জমিদারের মায়ের শ্রাদ্ধ, বেগার খাটার ডাক—
রাই ডোম্নির ছেলে বললে, কাজের যে নেই ফাঁক,
পারবে না আজ যেতে। শুনে কোতলপুরের রাজা
বললে, ওকে যে ক’রে হােক দিতেই হবে সাজা।
মিশনরির স্কুলে পড়ে, কম্পােজিটরের
কাজ শিখে সে শহরেতে আয় করেছে ঢের—
তাই হবে কি ছােটোলােকের ঘাড়-বাঁকানাে চাল!
সাক্ষ্য দিল হরিশ মৈত্র, দিল মাখনলাল—
ডাক-লুঠের এক মােকদ্দমায় মিথ্যে জড়িয়ে ফেলে
গােষ্ঠকে তাে চালান দিল সাত বছরের জেলে।
ছেলের নামের অপমানে আপন পাড়া ছাড়ি
ডােম্‌নি গেল ভিন গাঁয়েতে পাততে নতুন বাড়ি।
প্রতি মাসে অচলবুড়ি দামােদরের পারে
মাস-কাবারের জিনিস নিয়ে দেখে আসত তারে।
যখন তাকে খোঁটা দিল গ্রামের শম্ভু পিসে
‘রাই ডোম্নির ’পরে তােমার এত দরদ কিসে’
বুড়ি বললে, ‘যারা ওকে দিল দুঃখরাশি
তাদের পাপের বােঝা আমি হালকা করে আসি।’
পাতানাে এক নাৎনি বুড়ির একজ্বরি জ্বরে
ভুগতেছিল স্বরূপগঞ্জে আপন শ্বশুরঘরে।

মেয়েটাকে বাঁচিয়ে তুলল দিন রাত্রি জেগে,
ফিরে এসে আপনি পড়ল রােগের ধাক্কা লেগে।
দিন ফুরলাে, দেব্তা শেষে ডেকে নিল তাকে-
এক আঘাতে মারল যেন সকল পল্লীটাকে।
অবাক হল দাদাঠাকুর, অবাক স্বরূপকাকা—
ডােমনিকে সব দিয়ে গেছে বুড়ির জমা টাকা।
জিনিসপত্র আর যা ছিল দিল পাগল ঝিকে,
সঁপে দিল তারই হাতে খোঁড়া কুকুরটিকে।
ঠাকুর বললে মাথা নেড়ে, ‘অপাত্রে এই দান!
পরলােকের হারালাে পথ, ইহলােকের মান।

[? আষাঢ়] ১৩৪৪
শান্তিনিকেতন

সুধিয়া

গয়লা ছিল শিউনন্দন, বিখ্যাত তার নাম,
গােয়ালবাড়ি ছিল যেন একটা গােটা গ্রাম।
গােরু-চরার প্রকাণ্ড ক্ষেত, নদীর ওপার চরে,
কলাই শুধু ছিটিয়ে দিত পলি-জমির ’পরে ।
জেগে উঠত চারা তারই, গজিয়ে উঠত ঘাস,
ধেনুদলের ভােজ চলত মাসের পরে মাস।
মাঠটা জুড়ে বাঁধা হত বিশ-পঞ্চাশ চালা,
জমত রাখাল ছেলেগুলাের মহােৎসবের পালা।
গােপাষ্টমীর পর্বদিনে প্রচুর হত দান,
গুরুঠাকুর গা ডুবিয়ে দুধে করত স্নান।
তার থেকে সর ক্ষীর নবনী তৈরি হত কত,
প্রসাদ পেত গাঁয়ে গাঁয়ে গয়লা ছিল যত।
বছর তিনেক অনাবৃষ্টি, এল মন্বন্তর ;
শ্রাবণ মাসে শােণনদীতে বান এল তার পর ।
ঘুলিয়ে ঘুলিয়ে পাকিয়ে পাকিয়ে গর্জি ছুটল ধারা,
ধরণী চায় শূন্য-পানে সীমার চিহ্নহারা ।
ভেসে চলল গােরু বাছুর, টান লাগল গাছে।
মানুষে আর সাপে মিলে শাখা আঁকড়ে আছে।
বন্যা যখন নেমে গেল, বৃষ্টি গেল থামি
আকাশ জুড়ে দৈত্য-দেবের ঘুচল সে পাগলামি।
শিউনন্দন দাঁড়ালো তার শূন্য ভিটেয় এসে-
তিনটে শিশুর ঠিকানা নেই, স্ত্রী গেছে তার ভেসে।

ছড়ার ছবি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (page 68 crop).jpg

চুপ করে সে রইল বসে, বুদ্ধি পায় না খুঁজি
মনে হল সব কথা তার হারিয়ে গেল বুঝি।
ছেলেটা তার ভীষণ জোয়ান, সামরু বলে তাকে;
এক-গলা এই জলে-ডােবা সকল পাড়াটাকে
মথন করে ফিরে ফিরে তিনটে গােরু নিয়ে
ঘরে এসে দেখলে, দু হাত চোখে ঢাকা দিয়ে
ইষ্টদেবকে স্মরণ করে নড়ছে বাপের মুখ;
তাই দেখে ওর একেবারে জ্বলে উঠল বুক—
বলে উঠল, ‘দেব্তাকে তাের কেন মরিস ডাকি?
তার দয়াটা বাঁচিয়ে যেটুক আজও রইল বাকি
ভার নেব তার নিজের ’পরেই, ঘটুক-নাকো যাই আর,
এর বাড়া তাে সর্বনাশের সম্ভাবনা নাই আর।’

এই বলে সে বাড়ি ছেড়ে পাঁকের পথে ঘুরে
চিহ্ন-দেওয়া নিজের গােরু অনেক দূরে দূরে
গােটা পাঁচেক খোঁজ পেয়ে তার আনলে তাদের কেড়ে,
মাথা ভাঙবে ভয় দেখাতেই সবাই দিল ছেড়ে।
ব্যাবসাটা ফের শুরু করল নেহাত গরিব চালে,
আশা রইল উঠবে জেগে আবার কোনােকালে।
এ দিকেতে প্রকাণ্ড এক দেনার অজগরে
একে একে গ্রাস করছে যা আছে তার ঘরে।
একটু যদি এগােয় আবার পিছন দিকে ঠেলে,
দেনা পাওনা দিনরাত্রি জোয়ার-ভাঁটা খেলে।
মাল তদন্ত করতে এল দুনিয়াচাঁদ বেনে,
দশ বছরের ছেলেটাকে সঙ্গে করে এনে।
ছেলেটা ওর জেদ ধরেছে— ঐ সুধিয়া গাই
পুষবে ঘরে আপন ক’রে ঐটে নেহাত চাই।
সামরু বলে, ‘তােমার ঘরে কী ধন আছে কত
আমাদের এই সুধিয়াকে কিনে নেবার মতো?
ও যে আমার মানিক, আমার সাত রাজার ঐ ধন,
আর যা আমার যায় সবই যাক, দুঃখিত নয় মন।
মৃত্যুপারের থেকে ও যে ফিরেছে মাের কাছে,
এমন বন্ধু তিন ভুবনে আর কি আমার আছে!’
বাপের কানে কী বললে সেইচাঁদের দুনি ছেলে,
জেদ বেড়ে তার গেল বুঝি যেমনি বাধা পেলে।
শেঠজি বলে মাথা নেড়ে, ‘দুই-চারি মাস যেতেই
ঐ সুধিয়ার গতি হবে আমার গােয়ালেতেই।’

ছড়ার ছবি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (page 70 crop).jpg

কালােয় সাদায় মিশােল বরন, চিকন নধর দেহ,
সর্ব অঙ্গে ব্যাপ্ত যেন রাশীকৃত স্নেহ।
আকাল এখন, সামরু নিজে দুইবেলা আধ-পেটা;
সুধিয়াকে খাওয়ানাে চাই যখনি পায় যেটা।
দনের কাজের অবসানে গােয়ালঘরে ঢুকে
ব’কে যায় সে গাভীর কানে যা আসে তার মুখে।
কারাে ’পরে রাগ সে জানায়, কখনাে সাবধানে
গােপন খবর থাকলে কিছু জানায় কানে কানে।
সুধিয়া সব দাঁড়িয়ে শােনে কানটা খাড়া ক’রে,
বুঝি কেবল ধ্বনির সুখে মন ওঠে তার ভরে।

সামরু যখন ছােটো ছিল পালােয়ানের পেশা
ইচ্ছা করেছিল নিতে, ঐ ছিল তার নেশা।
খবর পেল, নবাববাড়ি কুস্তিগিরের দল
পাল্লা দেবে— সামরু শুনে অসহ্য চঞ্চল।
বাপকে ব’লে গেল ছেলে, ‘কথা দিচ্ছি শােনো,
এক হপ্তার বেশি দেরি হবে না কখ্খােনো!’
ফিরে এসে দেখতে পেলে, সুধিয়া তার গাই
শেঠ নিয়েছে ছলে-বলে, গােয়ালঘরে নাই।
যেমনি শােনা অমনি ছুটল, ভোজালি তার হাতে,
দুনিচাঁদের গদি যেথায় নাজির-মহল্লাতে।
‘কী রে সামরু, ব্যাপারটা কী’ শেঠজি শুধায় তাকে।
সামরু বলে ‘ফিরিয়ে নিতে এলুম সুধিয়াকে।’
শেঠ বললে, ‘পাগল নাকি, ফিরিয়ে দেব তােরে,
পরশু ওকে নিয়ে এলুম ডিক্রিজারি করে।
‘সুধিয়া রে' ‘সুধিয়া রে’ সামরু দিল হাঁক,
পাড়ার আকাশ পেরিয়ে গেল বজ্রমন্দ্র ডাক।
চেনা সুরের হাম্বা ধ্বনি কোথায় জেগে উঠে,
দড়ি ছিঁড়ে সুধিয়া ঐ হঠাৎ এল ছুটে।
দু চোখ বেয়ে ঝরছে বারি, অঙ্গটি তার রােগা,
অন্নপানে দেয় নি সে মুখ, অনশনে-ভােগা।
সামরু ধরল জড়িয়ে গলা, বললে, ‘নাই রে ভয়,
আমি থাকতে দেখব এখন কে তােরে আর লয়।—
তােমার টাকায় দুনিয়া কেনা, শেঠ দুনিচাঁদ, তবু
এই সুধিয়া একলা নিজের, আর কারাে নয় কভু।
আপন ইচ্ছামতে যদি তােমার ঘরে থাকে
তবে আমি এই মুহূর্তে রেখে যাব তাকে।’

চোখ পাকিয়ে কয় দুনিচাঁদ, ‘পশুর আবার ইচ্ছে!
গয়লা তুমি, তােমার কাছে কে উপদেশ নিচ্ছে!
গােল কর তাে ডাকব পুলিস।’ সামরু বললে, ‘ডেকো।
ফাঁসি আমি ভয় করি নে, এইটে মনে রেখাে।
দশ বছরের জেল খাটব, ফিরব তো তার পর,
সেই কথাটাই ভেবে বসে, আমি চললেম ঘর।’


আষাঢ় ১৩৪৪
শান্তিনিকেতন

ছড়ার ছবি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (page 73 crop).jpg

মাধো

রায়বাহাদুর কিষনলালের স্যাকরা জগন্নাথ,
সােনারুপাের সকল কাজে নিপুণ তাহার হাত।
আপন বিদ্যা শিখিয়ে মানুষ করবে ছেলেটাকে
এই আশাতে সময় পেলেই ধরে আনত তাকে;
বসিয়ে রাখত চোখের সামনে, জোগান দেবার কাজে
লাগিয়ে দিত যখন তখন; আবার মাঝে মাঝে
ছােটো মেয়ের পুতুল-খেলার গয়না গড়াবার
ফর্মাশেতে খাটিয়ে নিত; আগুন ধরাবার
সােনা গলাবার কর্মে একটুখানি ভুলে
চড়-চাপড়টা পড়ত পিঠে, টান লাগাত চুলে।
সুযােগ পেলেই পালিয়ে বেড়ায় মাধ্যে যে কোন্‌খানে
ঘরের লােকে খুঁজে ফেরে বৃথাই সন্ধানে।
শহরতলির বাইরে আছে দিঘি সাবেক-কেলে
সেইখানে সে জোটায় যত লক্ষ্মীছাড়া ছেলে।
গুলিডাণ্ডা খেলা ছিল, দোলনা ছিল গাছে,
জানা ছিল যেথায় যত ফলের বাগান আছে।
মাছ ধরবার ছিপ বানাত, সিমুডালের ছড়ি;
টাট্টুঘােড়ার পিঠে চড়ে ছােটাত দড়্ বড়ি।

কুকুরটা তার সঙ্গে থাকত, নাম ছিল তার বটু—
গিরগিটি আর কাঠবেড়ালি তাড়িয়ে ফেরায় পটু।
শালিখ পাখির মহলেতে মাধাের ছিল যশ,
ছাতুর গুলি ছড়িয়ে দিয়ে করত তাদের বশ।
বেগার দেওয়ার কাজে পাড়ায় ছিল না তার মতো,
বাপের শিক্ষানবিশিতেই কুঁড়েমি তার যত।
কিষনলালের ছেলে, তারে দুলাল ব’লে ডাকে—
পাড়াসুদ্ধ ভয় করে এই বাঁদর ছেলেটাকে।
বড়োলােকের ছেলে ব’লে গুমর ছিল মনে,
অত্যাচারে তারই প্রমাণ দিত সকল খনে।
বটুর হবে সাঁতারখেলা, বটু চলছে ঘাটে,
এসেছে যেই দুলালচাঁদের গােলা খেলার মাঠে
অকারণে চাবুক নিয়ে দুলাল এল তেড়ে;
মাধাে বললে, ‘মারলে কুকুর ফেলব তােমায় পেড়ে।’
উঁচিয়ে চাবুক দুলাল এল, মানল নাকো মানা,
চাবুক কেড়ে নিয়ে মাধো করলে দু-তিন-খানা।
দাঁড়িয়ে রইল মাধো, রাগে কাঁপছে থরােথরাে—
বললে, ‘দেখব সাধ্য তােমার, কী করবে তা করাে।’
দুলাল ছিল বিষম ভীতু, বেগ শুধু তার পায়ে—
নামের জোরেই জোর ছিল তার, জোর ছিল না গায়ে।
দশ-বিশ-জন লােক লাগিয়ে বাপ আনলে ধরে,
মাথােকে এক খাটের খুরােয় বাঁধল কষে জোরে।
বললে, ‘জানিস নেকো, বেটা, কাহার অন্ন ধারিস!
এত বড়াে বুকের পাটা, মনিবকে তুই মারিস!

আজ বিকালে হাটের মধ্যে হিঁচড়ে নিয়ে তােকে
দুলাল স্বয়ং মারবে চাবুক, দেখবে সকল লােকে।’
মনিববাড়ির পেয়াদা এল দিন হল যেই শেষ।
দেখলে দড়ি আছে পড়ি, মাধো নিরুদ্দেশ।
মাকে শুধায়, ‘এ কী কাণ্ড।’ মা শুনে কয়, ‘নিজে
আপন হাতে বাঁধন তাহার আমিই খুলেছি যে।
মাধাে চাইল চলে যেতে; আমি বললেম, যেয়াে,
এমন অপমানের চেয়ে মরণ ভালাে সেও।’
স্বামীর ’পরে হানল দৃষ্টি দারুণ অবজ্ঞার;
বললে, “তােমার গােলামিতে ধিক্ সহস্রবার।”
পেরােলাে বিশ-পঁচিশ বছর; বাংলাদেশে গিয়ে
আপন জাতের মেয়ে বেছে মাথাে করল বিয়ে।
ছেলে মেয়ে চলল বেড়ে, হল সে সংসারী;
কোন্‌খানে এক পাটকলে সে করতেছে সর্দারি।
এমন সময় নরম যখন হল পাটের বাজার
মাইনে ওদের কমিয়ে দিতেই, মজুর হাজার হাজার
ধর্মঘটে বাঁধল কোমর; সাহেব দিল ডাক—
বললে, ‘মাধাে, ভয় নেই তাের, আলগােছে তুই থাক্।
দলের সঙ্গে যােগ দিলে শেষ মরবি-যে মার খেয়ে।’
মাধাে বললে, ‘মরাই ভালাে এ বেইমানির চেয়ে।’
শেষ পালাতে পুলিস নামল, চলল গুঁতােগাঁতা;
কারাে পড়ল হাতে বেড়ি, কারাে ভাঙল মাথা।
মাথাে বললে, ‘সাহেব, আমি বিদায় নিলেম কাজে,
অপমানের অন্ন আমার সহ্য হবে না যে।’

ছড়ার ছবি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (page 77 crop).jpg

চলল সেথায় যে দেশ থেকে দেশ গেছে তার মুছে—
মা মরেছে, বাপ মরেছে, বাঁধন গেছে ঘুচে।
পথে বাহির হল ওরা ভরসা বুকে আঁটি—
ছেঁড়া শিকড় পাবে কি আর পুরােনাে তার মাটি।


শ্রাবণ ১৩৪৪

আতার বিচি


আতার বিচি নিজে পুঁতে পাব তাহার ফল
দেখব ব’লে ছিল মনে বিষম কৌতূহল।
তখন আমার বয়স ছিল নয়,
অবাক লাগত কিছুর থেকে কেন কিছুই হয় ।
দোতলাতে পড়ার ঘরের বারান্দাটা বড়াে,
ধুলো বালি একটা কোণে করেছিলুম জড়াে ।
সেথায় বিচি পুঁতেছিলুম অনেক যত্ন করে,
‘গাছ বুঝি আজ দেখা দেবে’ ভেবেছি রােজ ভােরে।
বারান্দাটার পূর্বধারে টেবিল ছিল পাতা,
সেইখানেতে পড়া চলত- পুঁথিপত্র খাতা
রােজ সকালে উঠত জমে দুর্ভাবনার মতো;
পড়া দিতেন, পড়া নিতেন মাস্টার মন্মথ।
পড়তে পড়তে বারে বারে চোখ যেত ঐ দিকে,
গোল হত সব বানানেতে, ভুল হত সব ঠিকে।
অধৈর্য অসহ্য হত, খবর কে তার জানে
কেন আমার যাওয়া-আসা ঐ কোণটার পানে।
দু মাস গেল, মনে আছে, সেদিন শুক্রবার—

ছড়ার ছবি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (page 79 crop).jpg

অঙ্কুরটি দেখা দিল নবীন সুকুমার।
অঙ্ক-কষার বারান্দাতে চুন-সুরকির কোণে
অপূর্ব সে দেখা দিল, নাচ লাগালাে মনে।
আমি তাকে নাম দিয়েছি আতা গাছের খুকু—
ক্ষণে ক্ষণে দেখতে যেতেম, বাড়ল কতটুকু।
দুদিন বাদেই শুকিয়ে যেত সময় হলে তার,
এ জায়গাতে স্থান নাহি ওর করত আবিষ্কার।
কিন্তু যেদিন মাস্টার ওর দিলেন মৃত্যুদণ্ড,
কচিকচি পাতার কুঁড়ি হল খণ্ড খণ্ড,
আমার পড়ার ত্রুটির জন্যে দায়ী করলেন ওকে,
বুক যেন মাের ফেটে গেল— অশ্রু ঝরল চোখে।
দাদা বললেন, কী পাগলামি, শান-বাঁধানাে মেঝে,
হেথায় আতার বীজ লাগানাে ঘাের বােকামি এ যে ।
আমি ভাবলুম সারা দিনটা বুকের ব্যথা নিয়ে,
বড়ােদের এই জোর খাটানাে অন্যায় নয় কি এ!
মূর্খ আমি ছেলেমানুষ, সত্য কথাই সে তাে—
একটু সবুর করলেই তা আপনি ধরা যেত।


শ্রাবণ ১৩৪৪

মাকাল।

গৌরবর্ণ নধর দেহ, নাম শ্রীযুক্ত রাখাল,
জন্ম তাহার হয়েছিল, সেই যে-বছর আকাল।
গুরুমশায় বলেন তারে,
‘বুদ্ধি যে নেই একেবারে;
দ্বিতীয়ভাগ করতে সারা ছ’মাস ধরে নাকাল।’
রেগেমেগে বলেন, ‘বাঁদর, নাম দিনু তাের মাকাল।’
নামটা শুনে ভাবলে প্রথম বাঁকিয়ে যুগল ভুরু;
তার পর সে বাড়ি এসে নৃত্য করলে শুরু।
হঠাৎ ছেলের মাতন দেখি
সবাই তাকে শুধায়, এ কী!
সকলকে সে জানিয়ে দিল, নাম দিয়েছেন গুরু—
নতুন নামের উৎসাহে তার বক্ষ দুরুদুরু।
কোলের ’পরে বসিয়ে দাদা বললে কানে-কানে,
‘গুরুমশায় গাল দিয়েছেন, বুঝিস নে তার মানে!’
রাখাল বলে, ‘কখ্‌খােনাে না,
মা যে আমায় বলেন সােনা,
সেটা তাে গাল নয় সে কথা পাড়ার সবাই জানে।
আচ্ছা, তােমায় দেখিয়ে দেব, চলাে তাে ঐখানে।’

ছড়ার ছবি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (page 82 crop).jpg

টেনে নিয়ে গেল তাকে পুকুর-পাড়ের কাছে,
বেড়ার ’পরে লতায় যেথা মাকাল ফ’লে আছে।

বললে, ‘দাদা সত্যি বােলো,
সােনার চেয়ে মন্দ হল?
তুমি শেষে বলতে কি চাও গাল ফলেছে গাছে?’
‘মাকাল আমি’ ব’লে রাখাল দু হাত তুলে নাচে।
দোয়াত কলম নিয়ে ছােটে, খেলতে নাহি চায়;
লেখাপড়ায় মন দেখে মা অবাক হয়ে যায়।
খাবার বেলায় তাবশেষে
দেখে ছেলের কাণ্ড এসে—
মেঝের ’পরে ঝুঁকে প’ড়ে খাতার পাতাটায়
লাইন টেনে লিখছে শুধু- মাকালচন্দ্র রায়।


৮ ডিসেম্বর ১৯৯১

পাথরপিণ্ড

সাগরতীরে পাথর-পিণ্ড ঢুঁ মারতে চায় কাকে
বুঝি আকাশটাকে।
শান্ত আকাশ দেয় না কোনাে জবাব-
পাথরটা রয় উঁচিয়ে মাথা, এমনি সে তার স্বভাব।
হাতের কাছেই আছে সমুদ্রটা
অহংকারে তারই সঙ্গে লাগত যদি ওটা
এমনি চাপড় খেত, তাহার ফলে
হুড়্মুড়িয়ে ভেঙেচুরে পড়ত অগাধ জলে।
ঢুঁ-মারা এই ভঙ্গীখানা কোটি বছর থেকে
ব্যঙ্গ ক’রে কপালে তার কে দিল ঐ এঁকে।
পণ্ডিতেরা তার ইতিহাস বের করেছেন খুঁজি-
শুনি তাহা, কতক বুঝি, নাইবা কতক বুঝি।
অনেক যুগের আগে
একটা সে কোন্ পাগলা বাষ্প আগুন-ভরা রাগে
মা ধরণীর বক্ষ হতে ছিনিয়ে বাঁধন-পাশ
জ্যোতিষ্কদের ঊর্ধ্ব পাড়ায় করতে গেল বাস।
বিদ্রোহী সেই দুরাশা তার প্রবল শাসন-টানে
আছাড় খেয়ে পড়ল ধরার পানে।
লাগল কাহার শাপ,
হারালাে তার ছুটোছুটি, হারালাে তার তাপ।
দিনে দিনে কঠিন হয়ে ক্রমে
আড়ষ্ট এক পাথর হয়ে কখন গেল জমে।

ছড়ার ছবি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (page 85 crop).jpg

আজকে যে ওর অন্ধ নয়ন, কাতর হয়ে চায়
সম্মুখে কোন্ নিঠুর শূন্যতায়।
স্তম্ভিত চীৎকার সে যেন, যন্ত্রণা নির্বাক্,
যে যুগ গেছে তার উদ্দেশে কণ্ঠহারার ডাক।
আগুন ছিল পাখায় যাহার আজ মাটি-পিঞ্জরে
কান পেতে সে আছে ঢেউ, তরল কলস্বরে।
শােনার লাগি ব্যগ্র তাহার ব্যর্থ বধিরতা
হেরে-যাওয়া সে যৌবনের ভুলে-যাওয়া কথা।


জ্যৈষ্ঠ ১৩৪৪
আলমােড়া

ছড়ার ছবি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (page 86 crop).jpg

তালগাছ

বেড়ার মধ্যে একটি আমের গাছে
গম্ভীরতায় আসর জমিয়ে আছে।
পরিতৃপ্ত মূর্তিটি তার তৃপ্ত চিকন পাতায়,
দুপুরবেলায় একটুখানি হাওয়া লাগছে মাথায়।
মাটির সঙ্গে মুখােমুখি ঘাসের আঙিনাতে
সঙ্গিনী তার শ্যামল ছায়া, আঁচলখানি পাতে।
গােরু চরে রৌদ্রছায়ায় সার প্রহর ধরে;
খাবার মতাে ঘাস বেশি নেই, আরাম শুধুই চ’রে।
পেরিয়ে বেড়া ঐ যে তালের গাছ,
নীল গগনে ক্ষণে ক্ষণে দিচ্ছে পাতার নাচ।

আশেপাশে তাকায় না সে, দূরে-চাওয়ার ভঙ্গী,
এমনিতরাে ভাবটা যেন নয় সে মাটির সঙ্গী।
ছায়াতে না মেলায় ছায়া বসন্ত-উৎসবে,
বায়না না দেয় পাখির গানের বনের গীতরবে।
তারার পানে তাকিয়ে কেবল কাটায় রাত্রিবেলা,
জোনাকিদের পরে যে তার গভীর তাবহেলা।
উলঙ্গ সুদীর্ঘ দেহে সামান্য সম্বলে
তার যেন ঠাঁই উর্ধ্ববাহু সন্ন্যাসীদের দলে।


১৩।৬।৩৭
আলমােড়া

ছড়ার ছবি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (page 88 crop).jpg

শনির দশা

আধবুড়ো ঐ মানুষটি মাের নয় চেনা—
একলা বসে ভাবছে কিংবা ভাবছে না,
মুখ দেখে ওর সেই কথাটাই ভাবছি,
মনে মনে আমি যে ওর মনের মধ্যে নাবছি।

বুঝিবা ওর মেঝেমেয়ে পাতা ছয়েক ব’কে
মাথার দিব্যি দিয়ে চিঠি পাঠিয়েছিল ওকে।
উমারানীর বিষম স্নেহের শাসন,
জানিয়েছিল চতুর্থীতে খােকার অন্নপ্রাশন—
জিদ ধরেছে, হােক-না যেমন ক’রেই
আসতে হবে শুক্রবার কি শনিবারের ভােরেই।
আবেদনের পত্র একটি লিখে
পাঠিয়েছিল বুড়াে তাদের কর্তাবাবুটিকে।
বাবু বললে, ‘হয় কখনাে তা কি,
মাস-কাবারের ঝুড়িঝুড়ি হিসাব লেখা বাকি,
সাহেব শুনলে আগুন হবে চ’টে,
ছুটি নেবার সময় এ নয় মােটে।’
মেয়ের দুঃখ ভেবে
বুড়াে বারেক ভেবেছিল কাজে জবাব দেবে।
সুবুদ্ধি তার কইল কানে রাগ গেল যেই থামি,
আসন্ন পেনসনের আশা ছাড়াটা পাগলামি।
নিজেকে সে বললে, “ওরে, এবার না হয় কিনিস
ছােটোছেলের মনের মতাে একটা-কোনাে জিনিস।
যেটার কথাই ভেবে দেখে দামের কথায় শেষে
বাধায় ঠেকে এসে।
শেষকালে ওর পড়ল মনে জাপানি ঝুম্ঝুমি,
দেখলে খুশি হয়তাে হবে উমি।
কেইবা জানবে দামটা যে তার কত,
বাইরে থেকে ঠিক দেখাবে খাঁটি রুপাের মতাে।
এমনি করে সংশয়ে তার কেবলই মন ঠেলে,
হাঁ-না নিয়ে ভাব্নাস্রোতে জোয়ার-ভাঁটা খেলে।

রােজ সে দেখে টাইম্টেবিলখানা,
ক’দিন থেকে ইসটিশনে প্রত্যহ দেয় হানা।
সামনে দিয়ে যায় আসে রােজ মেল,
গাড়িটা তার প্রত্যহ হয় ফেল।
চিন্তিত ওর মুখের ভাবটা দেখে
এমনি একটা ছবি মনে নিয়েছিলেম এঁকে।
কৌতূহলে শেষে
একটুখানি উসখুসিয়ে একটুখানি কেশে
শুধাই তারে ব’সে তাহার কাছে,
‘কী ভাবতেছেন, বাড়িতে কি মন্দ খবর আছে?’
বললে বুড়াে, ‘কিচ্ছুই নয়, মশায়,
আসল কথা— আছি শনির দশায়।
তাই ভাবছি কী করা যায় এবার
ঘােড়দৌড়ে দশটি টাকা বাজি ফেলে দেবার।
আপনি বলুন, কিনব টিকিট আজ কি।’
আমি বললেম, ‘কাজ কী?’
রাগে বুড়াের গরম হল মাথা;
বললে, ‘থামাে, ঢের দেখেছি পরামর্শদাতা!
কেনার সময় রইবে না আর আজিকার এই দিন বৈ!
কিনব আমি, কিনব আমি, যে করে তােক কিনবই।’


৪|৬।৩৭
আলমােড়া


রিক্ত

বইছে নদী বালির মধ্যে, শূন্য বিজন মাঠ,
নাই কোনাে ঠাঁই ঘাট।
অল্প জলের ধারাটি বয়, ছায়া দেয় না গাছে,
গ্রাম নেইকো কাছে!
রুক্ষ হাওয়ায় ধরার বুকে সূক্ষ্ম কাঁপন কাঁপে
চোখ-ধাঁধাঁনাে তাপে।
কোথাও কোনাে শব্দ-যে নেই তারই শব্দ বাজে
ঝাঁ-ঝাঁ করে সারাদুপুর দিনের বক্ষোমাঝে।
আকাশ যাহার একলা অতিথ শুষ্ক বালুর স্তূপে
দিগ্বধূ রয় অবাক হয়ে বৈরাগিণীর রূপে।

ছড়ার ছবি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (page 92 crop).jpg

দূরে দূরে কাশের ঝােপে শরতে ফুল ফোটে,
বৈশাখে ঝড় ওঠে।
আকাশ ব্যেপে ভূতের মাতন বালুর ঘূর্ণি ঘােরে;
নৌকো ছুটে আসে না তাে সামাল সামাল ক’রে।
বর্ষা হলে বন্যা নামে দূরের পাহাড় হতে,
কূল-হারান স্রোতে
জলে স্থলে হয় একাকার— দমকা হওয়ার বেগে
সওয়ার যেন চাবুক লাগায় দৌড়-দেওয়া মেঘে।
সারা বেলাই বৃষ্টিধারা ঝাপট লাগায় যবে
মেঘের ডাকে সুর মেশে না ধেনুর হাম্বারবে।
খেতের মধ্যে কঙ্কলিয়ে ভােলা স্রোতের জল
ভাসিয়ে নিয়ে আসে না তাে শ্যাওলা-পানার দল।
রাত্রি যখন ধ্যানে বসে তারাগুলির মাঝে
তীরে তীরে প্রদীপ জ্বলে না যে—
সমস্ত নিঃঝুম
জাগাও নেই কোনােখানে, কোত্থাও নেই ঘুম।


জ্যৈষ্ঠ ১৩৪৪
আলমােড়া

বাসাবাড়ি

এই শহরে এই তাে প্রথম আসা।
আড়াইটা রাত, খুঁজে বেড়াই কোন্ ঠিকানায় বাসা।
লণ্ঠনটা ঝুলিয়ে হাতে আন্দাজে যাই চলি,
অজগরের ভূতের মতন গলির পরে গলি।
ধাঁধাঁ ক্রমেই বেড়ে ওঠে, এক জায়গায় থেমে
দেখি পথে বাঁ দিক থেকে ঘাট গিয়েছে নেমে।
আঁধার-মুখােষ-পরা বাড়ি সামনে আছে খাড়া;
হাঁ-করা-মুখ দুয়ারগুলাে, নাইকো শব্দসাড়া।
চৌতলাতে একটা ধারে জানলাখানার ফাঁকে
প্রদীপশিখা ছুঁচের মতাে বিঁধছে আঁধারটাকে।
বাকি মহল যত
কালােমােটা ঘােমটা-দেওয়া দৈত্যনারীর মতাে।
বিদেশীর এই বাসাবাড়ি— কেউবা কয়েক মাস
এইখানে সংসার পেতেছে, করছে বসবাস;
কাজকর্ম সাঙ্গ করি কেউবা কয়েক দিনে
চুকিয়ে ভাড়া কোনখানে যায়, কেই বা তাদের চিনে।

ছড়ার ছবি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (page 95 crop).jpg

সুধাই আমি, ‘আছ কি কেউ, জায়গা কোথায় পাই?’
মনে হল জবাব এল, ‘আমরা নাই না ই।’
সকল দুয়াের জানলা হতে, যেন আকাশ জুড়ে
ঝাঁকে ঝাঁকে রাতের পাখি শূন্যে চলল উড়ে।
একসঙ্গে চলার বেগে হাজার পাখা তাই
অন্ধকারে জাগায় ধ্বনি, ‘আমরা নাই না ই।’
আমি সুধাই, ‘কিসের কাজে এসেছ এইখানে?’
জবাব এল, ‘সেই কথাটা কেহই নাহি জানে।
যুগে যুগে বাড়িয়ে চলি নেই-হওয়াদের দল,
বিপুল হয়ে ওঠে যখন দিনের কোলাহল
সকল কথার উপরেতে চাপা দিয়ে যাই—
না ই, না ই, না ই।’

পরের দিনে সেই বাড়িতে গেলাম সকালবেলা—
ছেলেরা সব পথে করছে লড়াই-লড়াই খেলা,
কাঠি হাতে দুই পক্ষের চলছে ঠকাঠকি।
কোণের ঘরে দুই বুড়ােতে বিষম বকাবকি—
বাজিখেলায় দিনে দিনে কেবল জেতা হারা,
দেনা-পাওনা জমতে থাকে, হিসাব হয় না সারা।
গন্ধ আসছে রান্নঘরের, শব্দ বাসন-মাজার;
শূন্য ঝুড়ি দুলিয়ে হাতে ঝি চলেছে বাজার।
একে একে এদের সবার মুখের দিকে চাই,
কানে আসে রাত্রিবেলার ‘আমরা নাই না ই।


৯।৬।৩৭
আলমােড়া

আকাশ

শিশুকালের থেকে
আকাশ আমার মুখে চেয়ে একলা গেছে ডেকে।
দিন কাটত কোণের ঘরে দেয়াল দিয়ে ঘেরা
কাছের দিকে সর্বদা মুখ-ফেরা;
তাই সুদূরের পিপাসাতে
অতৃপ্ত মন তপ্ত ছিল। লুকিয়ে যেতেম ছাতে,
চুরি করতেম আকাশ-ভরা সোনার-বরন ছুটি,
নীল অমৃতে ডুবিয়ে নিতেম ব্যাকুল চক্ষু দুটি।
দুপুর রৌদ্রে সুদূর শূন্যে আর কোনো নেই পাখি,
কেবল একটি সঙ্গীবিহীন চিল উড়ে যায় ডাকি
নীল অদৃশ্যপানে;
আকাশপ্রিয় পাখি ওকে আমার হৃদয় জানে।
স্তব্ধ ডানা প্রখর আলোর বুকে
যেন সে কোন্ যোগীর ধেয়ান মুক্তি-অভিমুখে।
তীক্ষ্ণ তীব্র সুর
সূক্ষ্ম হতে সূক্ষ্ম হয়ে দূরের হতে দূর
ভেদ করে যায় চলে।
বৈরাগী ঐ পাখির ভাষা মন কাঁপিয়ে তোলে।

ছড়ার ছবি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (page 98 crop).jpg

আলাের সঙ্গে আকাশ যেথায় এক হয়ে যায় মিলে
শুভ্রে এবং নীলে
তীর্থ আমার জেনেছি সেইখানে
অতল নীরবতার মাঝে অবগাহন-স্নানে।
আবার যখন ঝঞ্ঝা, যেন প্রকাণ্ড এক চিল
এক নিমেষে ছোঁ মেরে নেয় সব আকাশের নীল,
দিকে দিকে ঝাপটে বেড়ায় স্পর্ধাবেগের ডানা,
মানতে কোথাও চায় না কারাে মানা,
বারে বারে তড়িৎশিখার চঞ্চু-অঘাত হানে।
অদৃশ্য কোন্ পিঞ্জরটার কালো নিষেধ-পানে,
আকাশে আর ঝড়ে
আমার মনে সব-হারানাে ছুটির মূর্তি গড়ে।
তাই তাে খবর পাই—
শান্তি সেও মুক্তি, আবার অশান্তিও তাই।

৯।৬।৩৭ আলমােড়া

ছড়ার ছবি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (page 100 crop).jpg

খেলা

এই জগতের শক্ত মনিব সয় না একটু ত্রুটি,
যেমন নিত্য কাজের পালা তেমনি নিত্য ছুটি ।
বাতাসে তার ছেলেখেলা, আকাশে তার হাসি,
সাগর জুড়ে গদ্গদ ভাষ বুদ্বুদে যায় ভাসি।
ঝরনা ছােটে দূরের ডাকে পাথরগুলাে ঠেলে—
কাজের সঙ্গে নাচের খেয়াল কোথার থেকে পেলে।
ঐ হােথা শাল, পাঁচশাে বছর মজ্জাতে ওর ঢাকা—
গম্ভীরতায় অটল যেমন, চঞ্চলতায় পাকা।
মজ্জাতে ওর কঠোর শক্তি, বকুনি ওর পাতায়—
ঝড়ের দিনে কী পাগলামি চাপে যে ওর মাথায়।
ফুলের দিনে গন্ধের ভােজ অবাধ সারাক্ষণ,
ডালে ডালে দখিন হাওয়ার বাঁধা নিমন্ত্রণ।
কাজ ক’রে মন অসাড় যখন মাথা যাচ্ছে ঘুরে
হিমালয়ের খেলা দেখতে এলেম অনেক দূরে।
এসেই দেখি নিষেধ জাগে কুহেলিকার স্তূপে,
গিরিরাজের মুখ ঢাকা কোন্ সুগম্ভীরের রূপে।
রাত্তিরে যেই বৃষ্টি হল, দেখি সকালবেলায়
চাদরটা ওর কাজে লাগে চাদর-খােলার খেলায়।
ঢাকার মধ্যে চাপা ছিল কৌতুক একরাশি,
প্রকাণ্ড এক হাসি।

জ্যৈষ্ঠ ১৩৪৪
আলমােড়া

ছবি-আঁকিয়ে

ছবি আঁকার মানুষ ওগো পথিক চিরকেলে,
চলছ তুমি আশেপাশে দৃষ্টির জাল ফেলে;
পথ-চলা সেই দেখাগুলো লাইন দিয়ে এঁকে
পাঠিয়ে দিলে দেশ-বিদেশের থেকে।
যাহা-তাহা যেমন-তেমন আছে কতই কী যে,
তোমার চোখে ভেদ ঘটে নাই চণ্ডালে আর দ্বিজে।
ঐ যে গরিবপাড়া,
আর-কিছু নেই ঘেঁষাঘেঁষি কয়টা কুটীর ছাড়া।
তার ও পারে শুধু
চৈত্রমাসের মাঠ করছে ধূ ধূ।
এদের পানে চক্ষু মেলে কেউ কভু কি দাঁড়ায়?
ইচ্ছে ক’রে এ ঘরগুলোর ছায়া কি কেউ মাড়ায়?
তুমি বললে, দেখার ওরা অযোগ্য নয় মোটে;
সেই কথাটিই তুলির রেখায় তক্ষনি যায় রটে।
হঠাৎ তখন ঝেঁকে উঠে আমরা বলি, তাই তো,
দেখার মতোই জিনিস বটে, সন্দেহ তার নাই তো।
ঐযে কারা পথে চলে, কেউ করে বিশ্রাম,
নেই বললেই হয় ওরা সব, পোঁছে না কেউ নাম—
তোমার কলম বললে, ওরা খুব আছে এই জেনো।
অমনি বলি, তাই বটে তো, সবাই চেনো-চেনো।
ওরাই আছে, নেইকো কেবল বাদশা কিংবা নবাব;
এই ধরণীর মাটির কোলে থাকাই ওদের স্বভাব।
অনেক খরচ ক’রে রাজা আপন ছবি আঁকায়,
তার পানে কি রসিক লোকে কেউ কখনো তাকায়?

ছড়ার ছবি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (page 103 crop).jpg

সে-সব ছবি সাজে-সজ্জায় বােকার লাগায় ধাঁধা,
আর এরা সব সত্যি মানুষ সহজ রূপেই বাঁধা।

ওগাে চিত্রী, এবার তােমার কেমন খেয়াল এ যে,
এঁকে বসলে ছাগল একটা উচ্চশবা ত্যেজে।
জন্তুটা তাে পায় না খাতির হঠাৎ চোখে ঠেকলে,
সবাই ওঠে হাঁ হাঁ করে সবজি-ক্ষেতে দেখলে।
আজ তুমি তার ছাগ্লামিটা ফোটালে যেই দেহে
এক মুহূর্তে চমক লেগে বলে উঠলেম, কে হে!
ওরে ছাগলওয়ালা, এটা তােরা ভাবিস কার—
আমি জানি একজনের এই প্রথম আবিষ্কার।


জ্যৈষ্ঠ ১৩৪৪

আলমােড়া

ছড়ার ছবি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (page 105 crop).jpg

ছড়ার ছবি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (page 106 crop).jpg

অজয় নদী

এক কালে এই অজয়নদী ছিল যখন জেগে
স্রোতের প্রবল বেগে
পাহাড় থেকে আনত সদাই ঢালি
আপন জোরের গর্ব করে চিকন-চিকন বালি।
অচল বােঝা বাড়িয়ে দিয়ে যখন ক্রমে ক্রমে
জোর গেল তার কমে,
নদীর আপন আসন বালি নিল হরণ করে,
নদী গেল পিছন-পানে সরে;
অনুচরের মতাে
রইল তখন আপন বালির নিত্য-অনুগত।

কেবল যখন বর্ষা নামে ঘােলা জলের পাকে
বালির প্রতাপ ঢাকে।
পূর্বযুগের আক্ষেপে তার ক্ষোভের মাতন আসে,
বাঁধন-হারা ঈর্ষা ছােটে সবার সর্বনাশে।
আকাশেতে গুরুগুরু মেঘের ওঠে ডাক,
বুকের মধ্যে ঘুরে ওঠে হাজার ঘূর্ণিপাক।
তার পরে আশ্বিনের দিনে শুভ্রতার উৎসবে
সুর আপনার পায় না খুঁজে শুভ্র আলাের স্তবে।
দূরের তীরে কাশের দোলা, শিউলি ফুটে দূরে,
শুষ্ক বুকে শরৎ নামে বালিতে রােদ্দুরে।
চাদের কিরণ পড়ে যেথায় একটু আছে জল
যেন বন্ধ্যা কোন্ বিধবার লুটানাে অঞ্চল।
নিঃস্ব দিনের লজ্জা সদাই বহন করতে হয়,
আপনাকে হায় হারিয়ে-ফেলা অকীর্তি অজয়।


জ্যৈষ্ঠ ১৩৪৪
আলমােড়া

পিছু-ডাকা

যখন দিনের শেষে
চেয়ে দেখি সমুখপানে সূর্য ডােবার দেশে
মনের মধ্যে ভাবি—
অস্তসাগর-তলায় গেছে নাবি
অনেক সূর্য-ডােবার সঙ্গে অনেক আনাগােনা,
অনেক দেখাশােনা,
অনেক কীর্তি, অনেক মূর্তি, অনেক দেবালয়,
শক্তিমানের অনেক পরিচয়।
তাদের হারিয়ে যাওয়ার ব্যথার টান লাগে না মনে,
কিন্তু যখন চেয়ে দেখি সামনে সবুজ বনে

ছড়ার ছবি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (page 109 crop).jpg

ছায়ায় চরছে গােরু,
মাঝ দিয়ে তার পথ গিয়েছে সরু,
ছেয়ে আছে শুক্‌নো বাঁশের পাতায়,
হাট করতে চলে মেয়ে ঘাসের আঁঠি মাথায়,
তখন মনে হঠাৎ এসে এই বেদনাই বাজে—
ঠাঁই রবে না কোনােকালেই ঐ যা-কিছুর মাঝে।
ঐ যা-কিছুর ছবির ছায়া দুলেছে কোন্‌কালে
শিশুর-চিত্ত-নাচিয়ে-তােলা ছড়াগুলির তালে—
তিরপূর্নির চরে
বালি ঝুর্‌ঝুর্‌ করে,
কোন্ মেয়ে সে চিকন-চিকন চুল দিচ্ছে ঝাড়ি,
পরনে তার ঘুরে-পড়া ডুরে একটি শাড়ি।
ঐ যা-কিছু ছবির আভাস দেখি সাঁঝের মুখে
মর্তধরার পিছু-ডাকা দোলা লাগায় বুকে।

জ্যৈষ্ঠ ১৩৪৪ আলমােড়া

ছড়ার ছবি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (page 111 crop).jpg

ভ্রমণী

মাটির ছেলে হয়ে জন্ম, শহর নিল মােরে
পােষ্যপুত্র করে।
ইঁট-পাথরের আলিঙ্গনের রাখল আড়ালটিকে
আমার চতুর্দিকে।
বই প’ড়ে তাই পেতে হত ভ্রমণকারীর দেখা
ছাদের উপর একা।
কষ্ট তাদের, বিপদ তাদের, তাদের শঙ্কা যত
লাগত নেশার মতো।
পথিক যে জন পথে পথেই পায় সে পৃথিবীকে,
মুক্ত সে চৌদিকে।
চলার ক্ষুধায় চলতে সে চায় দিনের পরে দিনে
অচেনাকেই চিনে।
লড়াই ক’রে দেশ করে জয়, বহায় রক্তধারা,
ভূপতি নয় তারা।
পলে পলে পার যারা হয় মাটির পরে মাটি
প্রত্যেক পদ হাঁটি—
নাইকো সেপাই, নাইকো কামান, জয়পতাকা নাহি-
আপন বােঝা বাহি
অপথেও পথ পেয়েছে, অজানাতে জানা,
মানে নাইকো মানা—
মরু তাদের, মেরু তাদের, গিরি অভ্রভেদী
তাদের বিজয়বেদী।

সবার চেয়ে মানুষ ভীষণ, সেই মানুষের ভয়
ব্যাঘাত তাদের নয়।
তারাই ভূমির বরপুত্র, তাদের ডেকে কই,
তােমরা পৃথ্বীজয়ী।

৬ আষাঢ় ১৩৪৪
[আলমােড়া]

ছড়ার ছবি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (page 114 crop).jpg

আকাশপ্রদীপ

অন্ধকারের সিন্ধুতীরে একলাটি ঐ মেয়ে
আলাের নৌকা ভাসিয়ে দিল আকাশ-পানে চেয়ে।
মা যে তাহার স্বর্গে গেছে এই কথা সে জানে,
ঐ প্রদীপের খেয়া বেয়ে আসবে ঘরের পানে।
পৃথিবীতে অসংখ্য লােক, অগণ্য তার পথ,
অজানা দেশ কত আছে অচেনা পর্বত,
তারই মধ্যে স্বর্গ থেকে ছােট্ট ঘরের কোণ।
যায় কি দেখা যেথায় থাকে দুটিতে ভাইবােন!
মা কি তাদের খুঁজে খুঁজে বেড়ায় অন্ধকারে,
তারায় তারায় পথ হারিয়ে যায় শূন্যের পারে!
মেয়ের হাতের একটি আলাে জ্বালিয়ে দিল রেখে,
সেই আলাে মা নেবে চিনে অসীম দূরের থেকে।
ঘুমের মধ্যে আসবে ওদের চুমাে খাবার তরে
রাতে রাতে মা-হারা সেই বিছানাটির ’পরে ।


৮ শ্রাবণ ১৩৪৪

পতিসর