খুঁজি খুঁজি নারি
রামেশ্বরবাবুর সঙ্গে ব্যোমকেশের পরিচয় প্রায় পনেরো বছরের। কিন্তু এই পনেরো বছরের মধ্যে তাঁহাকে পনেরো বার দেখিয়াছি কিনা সন্দেহ। শেষের পাঁচ-ছয় বছর একেবারেই দেখি নাই। কিন্তু তিনি যে আমাদের ভোলেন নাই তাহার প্রমাণ বছরে দুইবার পাইতাম। প্রতি বৎসর পয়লা বৈশাখ ও বিজয়ার দিন তিনি ব্যোমকেশকে নিয়মিত পত্ৰাঘাত করিতেন।
রামেশ্বরবাবু বড়মানুষ ছিলেন। কলিকাতায় তাঁহার আট-দশখানা বাড়ি ছিল, তাছাড়া নগদ টাকাও ছিল অপব্যাপ্ত; বাড়িগুলির ভাড়া হইতে যে আয় হইত। তাহার অধিকাংশই জমা হইত। সংসারে তাঁহার আপনার জন ছিল দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী কুমুদিনী, প্রথম পক্ষের পুত্ৰ কুশেশ্বর ও কন্যা নলিনী। সবোপরি ছিল তাঁহার অফুরন্ত হাস্যরসের প্রবাহ।
রামেশ্বরবাবু হাস্যরসিক ছিলেন। তিনি যেমন প্ৰাণ খুলিয়া হাসিতে পারিতেন তেমনি হাসাইতেও পারিতেন। আমি জীবনব্যাপী বহুদর্শনের ফলে একটি প্রাকৃতিক নিয়ম আবিষ্কার করিয়াছিলাম যে, যাহাদের প্রাণে হাস্যরস আছে তাহারা কখনও বড়লোক হইতে পারে না, মা লক্ষ্মী কেবল প্যাঁচাদেরই ভালোবাসেন। রামেশ্বরবাবু আমার আবিষ্কৃত এই নিয়মটিকে ধূলিসাৎ করিয়া দিয়াছিলেন। অন্তত নিয়মটি যে সার্বজনীন নয় তাহা অনুভব করিয়াছিলাম।
রামেশ্বরবাবুর আর একটি মহৎ গুণ ছিল, তিনি একবার যাহার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হইতেন তাহাকে কখনও মন হইতে সরাইয়া দিতেন না। ব্যোমকেশের সহিত তাঁহার পরিচয় ঘটিয়াছিল তাঁহার বাড়িতে চৌর্য ঘটিত সামান্য একটি ব্যাপার লইয়া। ব্যাপারটি কৌতুকপ্ৰদ প্রহসনে সমাপ্ত হইয়াছিল, কিন্তু তদবধি তিনি ব্যোমকেশকে সস্নেহে স্মরণ করিয়া রাখিয়াছিলেন। কয়েকবার তাঁহার গৃহে নিমন্ত্রণও খাইয়াছি। তিনি আমাদের চেয়ে বয়সে অনেক বড় ছিলেন, শেষ বরাবর তাঁহার শরীর ভাঙিয়া পড়িয়াছিল; কিন্তু হাস্যরস যে তিলমাত্র প্রশমিত হয় নাই তাহা তাঁহার ষান্মাসিক পত্র হইতে জানিতে পারিতাম।
আজ রামেশ্বরবাবুর অন্তিম রসিকতার কাহিনী লিপিবদ্ধ করিতেছি। ঘটনাটি ঘটিয়াছিল কয়েক বছর আগে; তখন আইন করিয়া পিতৃ-সম্পত্তিতে কন্যার সমান অধিকার স্বীকৃত হয় নাই।
সেবার পয়লা বৈশাখ অপরাহ্ণের ডাকে রামেশ্বরবাবুর চিঠি আসিল। পুরু অ্যান্টিক কাগজের খাম, পরিচ্ছন্ন অক্ষরে নাম-ধাম লেখা; খামটি হাতে লইতেই ব্যোমকেশের মুখে হাসি ফুটিল। লক্ষ্য করিয়াছি রামেশ্বরবাবুকে মনে পড়িলেই মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়া ওঠে। ব্যোমকেশ সস্নেহে খামটি নিরীক্ষণ করিয়া বলিল, অজিত, রামেশ্বরবাবুর বয়স কত আন্দাজ করতে পারো?
বলিলাম, নবাবুই হবে।
ব্যোমকেশ বলিল, অত না হলেও আশি নিশ্চয়। এখনো কিন্তু ভীমরতি ধরেনি। হাতের লেখাও বেশ স্পষ্ট আছে ৷
সন্তৰ্পণে খাম কাটিয়া সে চিঠি বাহির করিল। দু-ভাঁজ করা তকতকে দামী কাগজ, মাথায় মনোগ্রাম ছাপা। গোটা গোটা অক্ষরে জরার চিহ্ন নাই। রামেশ্বরবাবু লিখিয়াছেন—
বুদ্ধিসাগরেষু,
ব্যোমকেশবাবু, আপনি ও অজিতবাবু আমার নববর্ষের শুভেচ্ছা গ্ৰহণ করিবেন। আপনার বুদ্ধি দিনে দিনে শশিকলার ন্যায় পরিবর্ধিত হোক; অজিতবাবুর লেখনী ময়ুরপুচ্ছে পরিণত হোক!
আমি এবার চলিলাম। যমরাজের সমান আসিয়াছে, শীঘ্রই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আসিবে। কিন্তু ‘থাকিতে চরণ মরণে কি ভয়?’ যমদূতেরা আমাকে ধরিবার পূর্বেই আমি বৈকুণ্ঠে গিয়া পৌঁছিব। কেবল এই দুঃখ আগামী বিজয়ার দিন আপনাদের স্নেহাশিস জানাইতে পারিব না।
মৃত্যুর পূর্বে বিষয়-সম্পত্তির ব্যবস্থা করিয়াছি। আপনি দেখিবেন, আমার শেষ ইচ্ছা যেন পূর্ণ হয়। আপনার বুদ্ধির উপর আমার অগাধ বিশ্বাস আছে।
বিদায়। আমার এই চিঠিখানির প্রতি অবজ্ঞা দেখাইবেন না। আপনি পাঁচ হাজার টাকা পাইলেন কিনা তাহা আমি বৈকুণ্ঠ হইতে লক্ষ্য করিব।
পুনরাগমনায় চ।
শ্ৰীরামেশ্বর রায়
চিঠি পড়িয়া ব্যোমকেশ ভ্রূকুঞ্চিত করিয়া বসিয়া রহিল। আমিও চিঠি পড়িলাম। নিজের মৃত্যু লইয়া পরিহাস হয়তো তাঁহার চরিত্রানুগ, কিন্তু চিঠির শেষের দিকে যে-সকল কথা লিখিয়াছেন, তাহার অর্থবোধ হইল না। ...আমার শেষ ইচ্ছা যেন পূর্ণ হয়...কোন ইচ্ছা? আমরা তো তাঁহার কোনও শেষ ইচ্ছার কথা জানি না, চিঠিতে কিছু লেখা নাই। তারপর-পাঁচ হাজার ুটাকা পাইলেন কিনা… কোন্ পাঁচ হাজার টাকা? ইহা কি রামেশ্বরবাবুর নূতন ধরনের রসিকতা, কিংবা এতদিনে সত্যই তাঁহার ভীমরতি ধরিয়াছে।
ব্যোমকেশ হঠাৎ বলিল, চল, কাল সকালে রামেশ্বরবাবুকে দেখে আসা যাক। কোনদিন আছেন কোনদিন নেই।
বলিলাম, বেশ, চল। চিঠি পড়ে তোমীর কি মনে হয় না যে, রামেশ্বরবাবুর ভীমরতি ধরেছে?
ব্যোমকেশ খানিক চুপ করিয়া থাকিয়া বলিল, পিতামহ ভীষ্মের কি ভীমরতি ধরেছিল?
সম্প্রতি ব্যোমকেশ রামায়ণ মহাভারত পড়িতে আরম্ভ করিয়াছে, হাতে কাজ না থাকিলেই মহাকাব্য লইয়া বসে। ইহা তাহার বয়সোচিত ধৰ্মভাব অথবা কাব্য সাহিত্যের মূল অনুসন্ধানের চেষ্টা বলিতে পারি না। অন্য মতলবও থাকিতে পারে। তবে মাঝে মাঝে তাহার কথাবার্তায় রামায়ণ মহাভারতের গন্ধ পাওয়া যায়।
বলিলাম, রামেশ্বরবাবুকি পিতামহ ভীষ্ম?
ব্যোমকেশ বলিল, খানিকটা সাদৃশ্য আছে। কিন্তু রামায়ণের দশরথের সঙ্গেই সাদৃশ্য বেশি।
বলিলাম, দশরথের তো ভীমরতি ধরেছিল।
সে বলিল, হয়তো ধরেছিল। সেটা বয়সের দোষে নয়, স্বভাবের দোষে। কিন্তু রামেশ্বরবাবু যদি একশো বছর বেঁচে থাকেন ওঁর ভীমরতি ধরবে না।
রামেশ্বরবাবুর পরিবারিক পরিস্থিতি সম্বন্ধে আমাদের জ্ঞান অতি সংক্ষিপ্ত। কলিকাতার উত্তরাংশে নিজের একটি বাড়িতে থাকেন। দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী কুমুদিনীর বয়স এখন বোধ করি পঞ্চাশোর্ধে, তিনি নিঃসন্তান। প্রথম পক্ষের পুত্রের নাম সম্ভবত রামেশ্বরবাবু নিজের নামের সহিত মিলাইয়া কুশেশ্বর রাখিয়াছিলেন। কুশেশ্বরের বয়সও পঞ্চাশের কম নয়, মাথার কিয়দংশে পাকা চুল, কিয়দংশে টাক। সে বিবাহিত, কিন্তু সন্তান-সন্ততি আছে কিনা বলিতে পারি না। তাহাকে দেখিলে মেরুদণ্ডহীন অসহায় গোছের মানুষ বলিয়া মনে হয়। তাহার কনিষ্ঠ ভগিনী নলিনী শুনিয়াছি প্রেমে পড়িয়া একজনকে বিবাহ করিয়াছিল, তাহার সহিত রামেশ্বরবাবুর কোনও সম্পর্ক নাই। মোট কথা তাঁহার পরিবার খুব বড় নয়, সুতরাং অশান্তির অবকাশ কম। তাঁহার অগাধ টাকা, প্ৰাণে অফুরন্তু হাস্যরস। তবু সন্দেহ হয় তাঁহার পারিবারিক জীবন সুখের নয়।
পরদিন বেলা নটার সময় রামেশ্বরবাবুর বাড়িতে উপস্থিত হইলাম।
বাড়িটা সরু লম্বা গোছের; দ্বারের সামনে মোটর দাঁড়াইয়া আছে। আমরা বন্ধ দ্বারের কড়া নাড়িলাম।
অল্পক্ষণ পরে দ্বার খুললেন একটা মহিলা। তিনি বোধ হয় অন্য কাহাকেও প্রত্যাশা করিয়াছিলেন, তাই আমাদের দেখিয়া তাঁহার কলহোদ্যত প্রখর দৃষ্টি নরম হইল; মাথায় একটু আঁচল টানিয়া দিয়া তিনি পাশ ফিরিয়া দাঁড়াইলেন, মুদুকণ্ঠে বলিলেন, কাকে চান?
রামেশ্বরবাবুর বাড়ির দুটি স্ত্রীলোকের সহিত আলাপ না থাকিলেও তাঁহাদের দেখিয়াছি। ইনি কুশেশ্বরের স্ত্রী; দৃঢ়গঠিত বেঁটে মজবুত চেহারা, বয়স আন্দাজ চল্লিশ। ব্যোমকেশ বলিল, আমার নাম ব্যোমকেশ বক্সী, রামেশ্বরবাবুর সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।
মহিলার চোয়ালের হাড় শক্ত হইল; তিনি বোধ করি দ্বার হইতেই আমাদের বিদায় বাণী শুনাইবার জন্য মুখ খুলিয়াছিলেন, এমন সময় সিঁড়িতে জুতার শব্দ শোনা গেল। মহিলাটি একবার চোখ তুলিয়া সিঁড়ির দিকে চাহিলেন, তারপর দ্বার হইতে অপসৃত হইয়া পিছনের একটি ঘরে প্রবেশ করিলেন। ঘরটি নিশ্চয় রান্নাঘর, কারণ সেখান হইতে হাতা-বেড়ির শব্দ আসিতেছে।
সিঁড়ি দিয়া দুটি লোক নামিয়া আসিলেন; একজন কুশেশ্বর, দ্বিতীয় ব্যক্তি বিলাতি বেশধারী প্ৰবীণ ডাক্তার। দ্বারের দিকে অগ্রসর হইতে হইতে ডাক্তার বলিলেন, উপস্থিত ভয়ের কিছু দেখছি না। যদি দরকার মনে কর, ফোন কোরো।
ডাক্তার মোটরে গিয়া উঠিলেন, মোটর চলিয়া গেল। আমরা দ্বারের বাহিরে দাঁড়াইয়া আছি, কুশেশ্বর এতক্ষণ তাহা লক্ষ্য করে নাই; এখন ফ্যালফ্যাল করিয়া তাকাইল। তাহার টাক একটু বিস্তীর্ণ হইয়াছে অবশিষ্ট চুল আর একটু পাকিয়াছে। ব্যোমকেশ বলিল, আমাদের বোধ হয় চিনতে পারছেন না, আমি ব্যোমকেশ বক্সী। আপনার বাবার সঙ্গে দেখা করতে চাই ৷
কুশেশ্বর বিহ্বল হইয়া বলিল, ব্যোমকেশ বক্সী! ও-তা-হ্যাঁ, চিনেছি বৈকি। বাবার শরীর ভাল নয়—
ব্যোমকেশ বলিল, কি হয়েছে?
কুশেশ্বর বলিল, কাল রাত্রে হঠাৎ হার্ট-অ্যাটাক হয়েছিল। এখন সামলেছেন। তাঁর সঙ্গে দেখা করবেন? তা-তিনি তেতলার ঘরে আছেন—
এই সময় রান্নাঘরের দিক হইতে উচ্চ ঠকঠক শব্দ শুনিয়া চমকিয়া উঠিলাম। কড়া আওয়াজ; আমরা তিনজনেই সেইদিকে তাকাইলাম; রান্নাঘরের ভিতর হইতে একটি অদৃশ্য হস্ত কপাটের উপর সাঁড়াশি দিয়া আঘাত করিতেছে। কুশেশ্বরের দিকে চাহিয়া দেখি তাহার মুখের ভাব বদলাইয়া গিয়াছে। সে কাশিয়া গলা সাফ করিয়া বলিল, বাবার সঙ্গে তো দেখা হতে পারে না, তাঁর শরীর খুব খারাপ-ডাক্তার এসেছিলেন—
ওদিকে ঠকঠক শব্দ তখন থামিয়াছে। ব্যোমকেশ একটু হাসিয়া বলিল, বুঝেছি। ডাক্তারবাবুর নাম কি?
কুশেশ্বর আবার উৎসাহিত হইয়া বলিল, ডাক্তার অসীম সেন। চেনেন না? মস্ত হার্ট স্পেশালিস্ট।
চিনি না, কিন্তু নাম জানি। বিবেকানন্দ রোডে ডিসপেন্সারি।
হ্যাঁ।
তাহলে রামেশ্বরবাবুর সঙ্গে দেখা হবে না?
‘মানে-ডাক্তারের হুকুম নেই—’ কুশেশ্বর একবার আড়চোখে রান্নাঘরের পানে তাকাইল।
কত দিন থেকে ওঁর শরীর খারাপ যাচ্ছে?
শরীর তো একরকম ভালই ছিল; তবে অনেক বয়স হয়েছে, বেশি নড়াচড়া করতে পারেন না, নিজের ঘরেই থাকেন। কাল সকালে অনেকগুলো চিঠি লিখলেন, তারপর রাত্তিরে হঠাৎ—
রান্নাঘরের দ্বারে অধীর সাঁড়াশির শব্দ হইল; কুশেশ্বর অর্ধপথে থামিয়া গেল। ব্যোমকেশ বলিল, টরো-টক্কা! আপনার স্ত্রী বোধ হয় রাগ করছেন। —চললাম, নমস্কার।
ফুটপাথে নামিয়া পিছন ফিরিয়া দেখি সদর দরজা বন্ধ হইয়া গিয়াছে। ব্যোমকেশ কিছুক্ষণ বিমনাভাবে দাঁড়াইয়া থাকিয়া বলিল, ডাক্তার অসীম সেনের ডিসপেন্সারি বেশি দূর নয়। চল, তাঁর সঙ্গে দেখা করে যাই।
ভাগ্যক্রমে ডাক্তার সেন ডিসপেন্সারিতে ছিলেন, তিন-চারটি রোগীও ছিল। বোমকেশ চিরকুট নাম লিখিয়া পাঠাইয়া দিল। ডাক্তার সেন বলিয়া পাঠাইলেন-একটু অপেক্ষা করিতে হইবে।
আধা ঘণ্টা পরে রোগীদের বিদায় করিয়া ডাক্তার সেন আমাদের ডাকিয়া পাঠাইলেন। আমরা তাঁহার খাস কামরায় উপনীত হইলাম। ডাক্তারি যন্ত্রপাতি দিয়া সাজানো বড় ঘরের মাঝখানে বড় একটি টেবিলের সামনে ডাক্তার বসিয়া আছেন, ব্যোমকেশের দিকে চাহিয়া বলিলেন, আপনিই ব্যোমকেশবাবু? আজ রামেশ্বরবাবুর বাড়ির সদরে আপনাদের দেখেছি না?
ব্যোমকেশ বলিল, হ্যাঁ। আমরা কিন্তু হৃদযন্ত্র পরীক্ষা করাবার জন্য আসিনি, অন্য একটু কাজ আছে। আমার পরিচয়—
ডাক্তার সেন হাসিয়া বলিলেন, পরিচয় দিতে হবে না। বসুন। কি দরকার বলুন।
আমার অনেক দিনের পরিচয়। কাল তাঁর নববর্ষের শুভেচ্ছাপত্ৰ পেলাম, তাতে তিনি আর বেশি দিন বাঁচবেন না। এমনি একটা সংশয় জানিয়েছিলেন; তাই আজ সকালে তাঁকে দেখতে এসেছিলাম। এসে শুনলাম, রাত্রে তাঁর হার্ট-অ্যাটাক হয়েছিল। তাঁর সঙ্গে দেখা করতে পেলাম না, তাই আপনার কাছে এসেছি তাঁর খবর জানতে। আপনি কি রামেশ্বরবাবুর ফ্যামিলি ডাক্তার?
ডাক্তার সেন বলিলেন, পারিবারিক বন্ধু বলতে পারেন। ত্ৰিশ বছর ধরে আমি ওঁকে দেখছি। ওঁর হৃদযন্ত্ৰ সবল নয়, বয়সও হয়েছে প্রচুর। মাঝে মাঝে অল্পস্বল্প কষ্ট পাচ্ছিলেন; তারপর কাল হঠাৎ গুরুতর রকমের বাড়াবাড়ি হল। যাহোক, এখন সামলে গেছেন।
উপস্থিত তাহলে মৃত্যুর আশঙ্কা নেই?
তা বলতে পারি না। এ ধরনের রুগীর কথা কিছুই বলা যায় না; দু' বছর বেঁচে থাকতে পারেন, আবার আজই দ্বিতীয় অ্যাটাক হতে পারে। তখন বাঁচা শক্ত ৷
ডাক্তারবাবু, আপনার কি মনে হয় রামেশ্বরবাবুর যথারীতি সেবা-শুশ্রুষা হচ্ছে?
ডাক্তার কিছুক্ষণ চাহিয়া রহিলেন, শেষে ধীরে ধীরে বলিলেন, আপনি যা ইঙ্গিত করছেন তা আমি বুঝেছি। এরকম ইঙ্গিতের সঙ্গত কারণ আছে কি?
ব্যোমকেশ বলিল, আমি রামেশ্বরবাবুকেই চিনি, ওঁর পরিবারের অন্য কাউকে সেভাবে চিনি না। কিন্তু আজ দেখেশুনে আমার সন্দেহ হল, ওঁরা বাইরের লোককে রামেশ্বরবাবুর কাছে ঘেঁষতে দিতে চান না।
ডাক্তার বলিলেন, তা ঠিক। আপনি রামেশ্বরবাবুর ফ্যামিলিকে ভালভাবে চেনেন না। কিন্তু আমি চিনি। আশ্চর্য ফ্যামিলি। কারুর মাথার ঠিক নেই। রামেশ্বরবাবুর স্ত্রী কুমুদিনীর বয়স ষাট, অথর্ব মোটা হয়ে পড়েছেন; কিন্তু এখনো পুতুল নিয়ে খেলা করেন, সংসারের কিছু দেখেন না। কুশেশ্বরটা ক্যাবলা, স্ত্রীর কথায় ওঠেবসে। একমাত্র কুশেশ্বরের স্ত্রী লাবণ্যর হুঁশ-পর্ব আছে, কাজেই অবস্থাগতিকে সে সংসারের কর্ণধার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কিন্তু বাড়িতে চাকর-বামুন নেই কেন?
লাবণ্য চাকর-বাকর সহ্য করতে পারে না, তাই সবাইকে তাড়িয়েছে। নিজে রাঁধতে পারে না, শুধু এটা হাবা কালা বামনী রেখেছে বাকি সব কাজ নিজে করে। কুশেশ্বরকে বাজারে পাঠায়।
কিন্তু কেন? এসবের একটা মানে থাকা চাই তো।
ডাক্তার চিন্তা করিয়া বলিলেন, আমার বিশ্বাস, এসবের মূলে আছে নলিনী।
নলিনী। রামেশ্বরবাবুর মেয়ে?
হ্যাঁ। অনেক দিনের কথা, আপনি হয়তো শোনেননি। নলিনী বাড়ির সকলের মতের বিরুদ্ধে এক ছোকরাকে বিয়ে করেছিল, সেই থেকে তার ওপর সকলের আক্ৰোশ। সবচেয়ে বেশি আক্রোশ লাবণ্যর। রামেশ্বরবাবু প্রথমটা খুবই চটেছিলেন, কিন্তু ক্ৰমে তাঁর রাগ পড়ে গেল। লাবণ্যর কিন্তু রাগ পড়ল না। সে নলিনীকে বাড়িতে ঢুকতে দিতে চায় না, বাপের সঙ্গে দেখা করতে দেয় না। পাছে রামেশ্বরবাবু চাকর-বাকরকে দিয়ে মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন। তাই তাদের সরিয়েছে। রামেশ্বরবাবু বলতে গেলে নিজের বাড়িতে নজরবন্দী হয়ে আছেন, কিন্তু তাঁর সেবাশুশ্রুষার কোন ক্রুটি হয় না।
ব্যোমকেশ ক্ষণেক নীরব থাকিয়া বলিল, হুঁ, পরিস্থিতি কতকটা বুঝতে পারছি। আচ্ছা, রামেশ্বরবাবু উইল করেছেন কিনা আপনি বলতে পারেন?
ডাক্তার সেন সচকিতে ব্যোমকেশের পানে চাহিলেন, করেছেন। আমার বিশ্বাস তিনি উইল করে নলিনীকে সম্পত্তির অংশ দিয়ে গেছেন। আমি জানতাম না, কাল রাত্রে জানতে পেরেছি।
কি রকম?
কাল রাত্রি দশটার সময় রামেশ্বরবাবুর হার্ট-অ্যাটাক হয়; আমাকে ফোন করল, আমি গেলাম। ঘন্টাখানেক পরে রামেশ্বরবাবু সামলে উঠলেন। তখন আমি সকলকে খেতে পাঠিয়ে দিলাম। রামেশ্বরবাবু চোখ মেলে এদিক-ওদিক তাকালেন, তারপর ফিসফিস করে বললেন, ‘ডাক্তার, আমি উইল করেছি। যদি পটল তুলি, নলিনীকে খবর দিও।’ এই সময়ে লাবণ্য আবার ঘরে ঢুকল আর কোন কথা হল না।
ব্যোমকেশ বলিল, স্পষ্টই বোঝা যায় ওরা রামেশ্বরবাবুকে উইল করতে দিচ্ছে না, পাছে তিনি নলিনীকে সম্পত্তির অংশ লিখে দেন। উনি যদি উইল না করে মারা যান তাহলে সাধারণ উত্তরাধিকার নিয়মে ছেলে আর শ্ৰী সম্পত্তি পাবে, মেয়ে কিছুই পাবে না—রামেশ্বরবাবুরর বাঁধা উকিল কে?
ডাক্তার সেন বলিলেন, বাঁধা উকিল কেউ আছে বলে তো শুনিনি।
ব্যোমকেশ উঠিয়া পড়িল, আপনার অনেক সময় নষ্ট করলাম। ভাল কথা, নলিনীর সাংসারিক অবস্থা কেমন?
ডাক্তার বলিলেন, নেহাত ছা-পোষা গোরস্ত। ওর স্বামী দেবনাথ সামান্য চাকরি করে, তিন-চারশো টাকা মাইনে পায়। কিন্তু অনেকগুলি ছেলেপুলে—
অতঃপর আমরা ডাক্তার সেনকে নমস্কার জানাইয়া চলিয়া আসিলাম। রামেশ্বরবাবুর পারিবারিক জীবনের চিত্রটা আরও পূর্ণাঙ্গ হইল বটে, কিন্তু আনন্দদায়ক হইল না। বৃদ্ধ হাস্যরসিক, অন্তিমকালে সত্যই বিপাকে পড়িয়াছেন, অথচ তাঁহাকে সাহায্য করিবার উপায় নাই। ঘরের টেকি যদি কুমীর হয়, সে কি করিতে পারে?
দিন আষ্টেক পরে একদিন দেখিলাম, সংবাদপত্রের পিছন দিকের পাতার এক কোণে রামেশ্বরবাবুর মৃত্যু-সংবাদ বাহির হইয়াছে। তিনি খ্যাতিমান ব্যক্তি ছিলেন না, কিন্তু তাঁহার টাকা ছিল, তাই বোধ হয় তাঁহার মৃত্যু-সংবাদ দৈনিক পত্রের পৃষ্ঠা পর্যন্ত পৌঁছিয়াছে।
ব্যোমকেশ খবরের কাগজে কেবল বিজ্ঞাপন পড়ে, তাই তাহাকে খবরটা দেখাইলাম। আজ রমেশ্বরবাবুর নামোল্লেখে তাহার মুখে হাসি ফুটিল না, সে অনেকক্ষণ চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। তারপর পাশের ঘরে গিয়া টেলিফোনে কাহার সহিত কথা বলিল।
সে ফিরিয়া আসিলে জিজ্ঞাসা করিলাম, কাকে?
সে বলিল, ডাক্তার অসীম সেনকে, পরশু রাত্রে রামেশ্বরবাবুর মৃত্যু হয়েছে। আবার হার্ট-অ্যাটাক হয়েছিল, ডাক্তার সেন উপস্থিত ছিলেন; কিন্তু বাঁচাতে পারলেন না। ডাক্তার স্বাভাবিক মৃত্যুর সার্টিফিকেট দিয়েছেন।
জিজ্ঞাসা করিলাম, তোমার কি সন্দেহ ছিল যে—?
সে বলিল, ঠিক সন্দেহ নয়। তবে কি জানো, এ রকম অবস্থায় একটু অসাবধানতা, একটু ইচ্ছাকৃত অবহেলা মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে। রামেশ্বরবাবু মারা গেলে ওদের কারুরই লোকসান নেই, বরং সকলেরই লাভ। এখন কথা হচ্ছে, তিনি যদি উইল করে গিয়ে থাকেন এবং তাতে নলিনীকে ভাগ দিয়ে থাকেন, তাহলে সে-উইল কি ওরা রাখবে? পেলেই ছিঁড়ে ফেলে দেবে।
সেদিন অপরাহ্ণে নলিনী ও তাহার স্বামী দেবনাথ দেখা করিতে আসিল। নলিনীর বয়স চল্লিশের কাছাকাছি; সন্তান-সৌভাগ্যের আধিক্যে শরীর কিছু কৃশ, কিন্তু যৌবনের অস্তলীলা দেহ হইতে সম্পূর্ণ মুছিয়া যায় নাই। দেবনাথের বয়স আন্দাজ পঁয়তাল্লিশ; এককালে সুশ্ৰী ছিল, হাত তুলিয়া আমাদের নমস্কার করিল।
নলিনী সজলচক্ষে বলিল, বাবা মারা গেছেন। তাঁর শেষ আদেশ আপনার সঙ্গে যেন দেখা করি। তাই এসেছি।
ব্যোমকেশ তাঁহাদের সমাদর করিয়া বসাইল। সকলে উপবিষ্ট হইলে বলিল, রামেশ্বরবাবুর শেষ আদেশ কবে পেয়েছেন?
নলিনী বলিল, পয়লা বৈশাখ। এই দেখুন চিঠি।
খামের উপর কলিকাতার অপেক্ষাকৃত দুর্গত অঞ্চলের ঠিকানা লেখা। চিঠিখানি ব্যোমকেশকে লিখিত চিঠির অনুরূপ সেই মনোগ্রাম করা কাগজ। চিঠি কিন্তু আরও সংক্ষিপ্ত—
কল্যাণীয়াষু,
তোমরা সকলে আমার নববর্ষের আশীবাদ লইও। যদি ভালোমন্দ কিছু হয়, শ্ৰীযুক্ত ব্যোমকেশ বক্সী মহাশয়ের সঙ্গে দেখা করিও। ইতি—
শুভাকাঙ্ক্ষী
বাবা
পত্র রচনায় মুন্সিয়ানা লক্ষণীয়। কুশেশ্বর ও লাবণ্য যদি চিঠি খুলিয়া পড়িয়া থাকে, সন্দেহজনক কিছু পায় নাই। ‘ভালোমন্দ কিছু হয়’—ইহার নিগুঢ় অর্থ যে নিজের মৃত্যু সম্ভাবনা তাহা সহসা ধরা যায় না, সাধারণ বিপদ-আপদও হইতে পারে। তাই তাহারা চিঠি আটকায় নাই।
চিঠি ফেরত দিয়া ব্যোমকেশ বলিল, শেষবার কবে রামেশ্বরবাবুর সঙ্গে আপনার দেখা হয়েছিল?
নলিনী বলিল, ছ-মাস আগে। পুজোর পর বাবাকে প্ৰণাম করতে গিয়েছিলুম, সেই শেষ দেখা। তা বৌদি সারাক্ষণ কাছে দাঁড়িয়ে রইল, আড়ালে বাবার সঙ্গে একটা কথাও কইতে দিলে না।
বৌদির সঙ্গে আপনার সদ্ভাব নেই?
সম্ভাব! বৌদি আমাকে পাশ পেড়ে কাটে।
কোন কারণ আছে কি?
কারণ আর কি! ননদ-ভাজ, এই কারণ। বৌদি বাঁজা, আমার মা ষষ্ঠীর কৃপায় ছেলেপূলে হয়েছে, এই কারণ ৷
ডাক্তার সেনের সঙ্গে সম্প্রতি আপনাদের দেখা হয়েছে?
সেন-কাকা কাল সকালে আমাদের বাসায় গিয়েছিলেন। তিনি বললেন, বাবা নাকি উইল করে গিয়েছেন।
সেই উইল কোথায় আপনারা জানেন?
কি করে জানব? বাবাকে ওরা একরকম বন্দী করে রেখেছিল। বাবা অথর্ব হয়ে পড়েছিলেন, তেতলায় নিজের ঘর ছেড়ে বেরুতে পারতেন না; ওরা যক্ষির মত বাবাকে আগলে থাকত।
বাবা যেসব চিঠি লিখতেন ওরা খুলে দেখত, যে-চিঠি ওদের পছন্দ নয় তা ছিঁড়ে ফেলে দিত। বাবা যদি উইল করেও থাকেন তা কি আর আছে? বৌদি ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছে।
নিশ্চয় এমন কোথাও লুকিয়ে রেখে গেছেন যে সহজে কেউ খুঁজে পাবে না। এখন কাজ হচ্ছে ওরা সেটা খুঁজে পাবার আগে আমাদের খুঁজে বার করা।
নলিনী সংগ্রহে বলিল, হ্যাঁ ব্যোমকেশবাবু। বাবা যদি উইল করে থাকেন নিশ্চয় আমাদের কিছু দিয়ে গেছেন, নইলে উইল করার কোন মানে হয় না। কিন্তু এ অবস্থায় কি করতে হয় আমরা কিছুই জানি না— নলিনী কাতর নেত্ৰে ব্যোমকেশের পানে চাহিল।
এই সময় দেবনাথ গলা খাঁকারি দিয়া সর্বপ্রথম কিছু বলিবার উপক্ৰম করিল। ব্যোমকেশ তাহার দিকে চক্ষু ফিরাইলে সে একটু অপ্রতিভভাবে বলিল, ‘একটা কথা মনে হল। শুনেছি উইল করলে দুজন সাক্ষীর দস্তখত দরকার হয়। কিন্তু আমার শ্বশুর দুজন সাক্ষী কোথায় পাবেন?
ব্যোমকেশ বলিল, আপনার কথা যথার্থ; কিন্তু একটা ব্যতিক্রম আছে। যিনি উইল করেছেন তিনি যদি নিজের হাতে আগাগোড়া উইল লেখেন তাহলে সাক্ষীর দরকার হয় না।
নলিনী উজ্জ্বল চোখে স্বামীর পানে চাহিয়া বলিল, শুনলে? এই জন্যে বাবা ওঁর সঙ্গে দেখা করতে বলেছিলেন।—ব্যোমকেশবাবু, আপনি একটা উপায় করুন।
ব্যোমকেশ বলিল, চেষ্টা করব। উইল বাড়িতেই আছে, বাড়ি সার্চ করতে হবে। কিন্তু ওরা যাকে-তাকে বাড়ি সার্চ করতে দেবে কেন? পুলিসের সাহায্য নিতে হবে। ডাক্তার অসীম সেনকেও দরকার হবে। দু-চার দিন সময় লাগবে। আপনারা বাড়ি যান, যা করবার আমি করছি। উইলের অস্তিত্ব যদি থাকে, আমি খুঁজে বার করব।
ব্যোমকেশ যখন সরকারী মহলে দেখাশুনা করিতে যাইত, আমাকে সঙ্গে লইত না। আমারও সরকারী অফিসের গোলকধাঁধায় ঘুরিয়া বেড়াইতে ভালো লাগিত না।
দুই দিন ব্যোমকেশ কোথায় কোথায় ঘুরিয়া বেড়াইল জানি না। তৃতীয় দিন সন্ধ্যায় বাসায় ফিরিয়া সুদীর্ঘ নিশ্বাস ছাড়িয়া বলিল, সব ঠিক হয়ে গেছে।
জিজ্ঞাসা করিলাম, কী ঠিক হয়ে গেছে?
সে বলিল, খানাতল্লাশের পরোয়ানা পাওয়া গেছে। কাল সকালে পুলিস সঙ্গে নিয়ে আমরা রামেশ্বরবাবুর বাড়ি সার্চ করতে যাব।
পরদিন সকালবেলা আমরা রামেশ্বরবাবুর বাড়িতে উপস্থিত হইলাম। সঙ্গে পাঁচ-ছয় জন পুলিসের লোক এবং ইন্সপেক্টর হালদার নামক জনৈক অফিসার।
কুশেশ্বর প্রথমটা একটু লম্ফঝাম্প করিল, তাহার স্ত্রী লাবণ্য আমাদের নয়ন বহ্নিতে ভস্ম করিবার নিস্ফল চেষ্টা করিল। কিন্তু কিছুতেই কিছু হইল না, ইন্সপেক্টর হালদার তাঁহাদের এবং বিধবা কুমুদিনীকে একজন পুলিসের জিম্মায় রান্নাঘরে বসাইয়া তল্লাশ আরম্ভ করিলেন। ত্রিতল বাড়িরকোনও তলই বাদ দেওয়া হইল না; দুইজন নীচের তলা তল্লাশ করিল, দুইজন দ্বিতলে কুশেশ্বর ও লাবণ্যর ঘরগুলি অনুসন্ধানের ভার লইল, ব্যোমকেশ, ইন্সপেক্টর হালদার ও আমি তিনতলায় : রামেশ্বরবাবু তিনতলায় থাকিতেন, সুতরাং সেখানেই উইল পাওয়া যাইবার সম্ভাবনা দুইটি ঘর লইয়া তিনতলা। ছোট ঘরটি গৃহিণীর শয়নকক্ষ, বড় ঘরটি একাধারে রামেশ্বরবাবুর শয়নকক্ষ এবং অফিস-ঘর। এক পাশে তাঁহাদের শয়নের পালঙ্ক, অন্য পাশে টেবিল চেয়ার বইয়ের আলমারি প্রভৃতি। এই ঘর হইতে একটি সরু দরজা দিয়া স্নানের ঘরে যাইবার রাস্তা।
আমরা তল্লাশ আরম্ভ করিলাম। তল্লাশের বিস্তারিত বিবরণ প্রয়োজন নাই। দুইটি ঘরের বহু আসবাব, খাট বিছানা টেবিল চেয়ার আলমারির ভিতর হইতে এক টুকরা কাগজ খুঁজিয়া বাহির করিতে হইবে, সুতরাং পুঙ্খানুপুঙ্খরূপেই তল্লাশ করা হইল। তল্লাশ করিতে করিতে একটি তথ্য আবিষ্কার করিলাম; আমাদের পূর্বে আর একদফা তল্লাশ হইয়া গিয়াছে। কুশেশ্বর এবং তাহার স্ত্রী উইলের খোঁজ করিয়াছে।
ব্যোমকেশ আমার কথা শুনিয়া বলিল, হুঁ। এখন কথা হচ্ছে ওরা খুঁজে পেয়েছে কিনা ৷
আড়াই ঘণ্টা পরে আমরা ক্লান্তভাবে টেবিলের কাছে আসিয়া বসিলাম। টেবিলের এক পাশে একটি পিতলের ছোট্ট হামানদিস্তা ছিল, রামেশ্বরবাবু তাহাতে পান ছেঁচিয়া খাইতেন; ব্যোমকেশবাবু সেটা সামনে টানিয়া আনিয়া অন্যমনস্কভাবে নাড়াচাড়া করিতে লাগিল। ইতিপূর্বে, নিম্নতলে যাহারা তল্লাশ করিতেছিল তাহারা জানাইয়া গিয়াছে যে সেখানে কিছু পাওয়া যায় নাই।
ইন্সপেক্টর হালদার বলিল, তেতলায় নেই। তার মানে রামেশ্বরবাবু উইল করেননি, কিংবা ওরা আগেই উইল খুঁজে পেয়েছে।
ব্যোমকেশ বলিল, উইল করা সম্বন্ধে আমার মনে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু—
এই সময় ইন্সপেক্টর হালদার অলস। হস্তে গঁদের শিশির ঢাকনা তুলিলেন।
টেবিলের উপর কাগজ কলম লেফাফা পিন-কুশন গাঁদের শিশি প্রভৃতি সাজানো ছিল, আমরা পূর্বেইে টেবিল ও তাহার দেরাজগুলি খুঁজিয়া দেখিয়াছি, কিন্তু গাঁদের শিশির ঢাকনা খোলার সঙ্গে সঙ্গে একটা ঝাঁঝালো গন্ধ নাকে আসিয়া লাগিল।
কাঁচা পেয়াজের গন্ধ!
ব্যোমকেশ খাড়া হইয়া বসিল, কিসের গন্ধ! কাঁচা পেয়াজ! দেখি।
গাঁদের শিশি কাছে টানিয়া লইয়া সে গভীরভাবে তাহার ঘ্রাণ লইল। শিশি কাত করিয়া দেখিল, ভিতরে গাঢ় শ্বেতাভ পদার্থ দেখিয়া গাঁদের আঠা বলিয়াই মনে হয়। কিন্তু তাহাতে পেয়াজের গন্ধ কেন? কোথা হইতে পেয়াজ আসিল?
গঁদের শিশি হাতে লইয়া ব্যোমকেশ কিছুক্ষণ নিশ্চল বসিয়া রহিল। নিশ্চলতার অন্তরালে প্রচণ্ড মানসিক ক্রিয়া চলিতেছে তাহা তাহার চোখের তীব্র-প্রখর দৃষ্টি হইতে অনুমান করা হয়। আমি ইন্সপেক্টর হালদারের সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় করিলাম। পেঁয়াজ-গন্ধী গাঁদের শিশির মধ্যে ব্যোমকেশ কোন রহস্যের সন্ধান পাইল!
ইন্সপেক্টর হালদার, দয়া করে একবার কুশেশ্বরের স্ত্রীকে ডেকে আনবেন?
অল্পক্ষণ পরে লাবণ্য প্রতি পদক্ষেপে বিদ্রোহ ঘোষণা করিতে করিতে ঘরে প্রবেশ করিল। ব্যোমকেশ উঠিয়া নিজের চেয়ার নির্দেশ করিয়া বলিল, বসুন। আপনাকে একটা প্রশ্ন করব।
লাবণ্য উপবেশন করিল। তাহার চোয়ালের হাড় শক্ত, চক্ষে কঠিন সন্দিগ্ধতা। তিনজন অপরিচিত পুরুষ দেখিয়াও তাহার দৃষ্টি নরম হইল না।
ব্যোমকেশ প্রশ্ন করিল, আপনার শ্বশুরমশায় কি কাঁচা পেয়াজ খেতে ভালোবাসতেন?
লাবণ্য চকিতভাবে ব্যোমকেশের পানে চাহিল, তাহার মুখের বিদ্রোহ অনেকটা প্রশমিত হইল। সে বলিল, ভালোবাসতেন না, কিন্তু যাবার কিছুদিন আগে কাঁচা পেয়াজের ওপর লোভ হয়েছিল। ভীমরতি অবস্থা হয়েছিল, তার ওপর একটিও দাঁত ছিল না; হামানদিস্তায় পেঁয়াজ ছেঁচে তাই খেতেন।
ব্যোমকেশ বলিল, ও। মৃত্যুর কতদিন আগে পেয়াজের বাতিক হয়েছিল?
লাবণ্য ভাবিয়া বলিল, দশ-বারো দিন আগে। চৈত্র মাসের শেষের দিকে।
ব্যোমকেশ সহাস্যে হাত জোড় করিয়া বলিল, ধন্যবাদ। আপনাদের মিছে কষ্ট দিলাম, সেজন্য ক্ষমা করবেন। চল অজিত, চলুন ইন্সপেক্টর হালদার। এখানে আমাদের কাজ শেষ হয়েছে ৷
কোথা দিয়া কেমন করিয়া কাজ শেষ হইল কিছুই বুঝিলাম না, আমরা গুটি গুটি বাহির হইয়া আসিলাম। ফুটপাথে নামিয়া ব্যোমকেশ বলিল, ইন্সপেক্টর হালদার, আপনি চলুন আমাদের বাসায়। আপনার সঙ্গীদের আর দরকার হবে না।
বাসায় পৌঁছিয়া সে আমাকে প্রশ্ন করিল, অজিত, নববর্ষে রামেশ্বরবাবু আমাকে যে চিঠি লিখেছিলেন, সেটা কোথায়?
এদিক-ওদিক চাহিয়া বলিলাম, আমি তো সে-চিঠি আর দেখিনি। এইখানেই কোথাও আছে, যাবে কোথায় ৷
আমাদের ব্যক্তিগত চিঠির কোনও ফাইল নাই, চিঠি পড়া হইয়া গেলে কিছু দিন যত্রতত্র পড়িয়া থাকে, তারপর পুটরাম ঝাঁট দিয়া ফেলিয়া দেয়।
ব্যোমকেশ অত্যন্ত বিচলিত হইয়া বলিল, দ্যাখো-খুঁজে দ্যাখো, চিঠিখানা ভীষণ জরুরী। রামেশ্বরবাবু তাতে লিখেছিলেন—আমার এই চিঠিখানির প্রতি অবজ্ঞা দেখাইবেন না। তখন ও-কথায় মানে বুঝিনি—
ইন্সপেক্টর হালদার বলিলেন, কিন্তু কথাটা কি? ও-চিঠিখানা হঠাৎ এত জরুরী হয়ে উঠল কি করে?
ব্যোমকেশ বলিল, বুঝতে পারলেন না! ওই চিঠিখানাই রামেশ্বরবাবুর উইল।
অ্যাঁ। সেকি?
হাঁ। আজ গাঁদের শিশিতে পেয়াজের রস দেখে বুঝতে পারলাম। রামেশ্বরবাবু অদৃশ্য কালি দিয়ে উইল লিখে আমাকে পাঠিয়েছিলেন।
কিন্তু—অদৃশ্য কালি—
পরে বলব। অজিত, চারিদিকে খুঁজে দ্যখো, পুটরামকে ডাকো। ও-চিঠি যদি না পাওয়া যায়, নলিনী আর দেবনাথের সর্বনাশ হয়ে যাবে।
পুঁটরামকে ডাকা হইল, সে কিছু বলিতে পারিল না। ব্যোমকেশ মাথায় হাত দিয়া বসিল, তারপর পাংশু মুখ তুলিয়া বলিলল থামো, থামো। বাইরে খুঁজলে হবে না, মনের মধ্যে খুঁজতে হবে।
ইজি-চেয়ারে পা ছড়াইয়া শুইয়া সে সিগারেট ধরাইল, কড়িকাঠের পানে চোখ তুলিয়া ঘন ঘন ধূম উদগিরণ করিতে লাগিল।
আমরাও সিগারেট ধরাইলাম। পনরো মিনিট পরে সে ধড়মড় করিয়া উঠিয়া বসিয়া বলিল, সেদিন আমি কোন বই পড়ছিলাম মনে আছে?
বলিলাম, কবে? কোনদিন?
যেদিন রামেশ্বরবাবুর চিঠিখানা এল। পয়লা বৈশাখ, বিকেলবেলা। মনে নেই?
মনের পটে সেদিনের দৃশ্যটি আঁকিবার চেষ্টা করিলাম। পোস্টম্যান দ্বারে ঠকঠক শব্দ করিল; ব্যোমকেশ তক্তপোশে পদ্মাসনে বসিয়া একটা মোটা বই পড়িতেছিল; কালী সিংহের মহাভারত, না হেমচন্দ্র-কৃত রামায়ণ?
ব্যোমকেশ বলিয়া উঠিল, মহাভারত, দ্বিতীয় খণ্ড। পিতামহ ভীষ্মের কথা উঠল মনে নেই?
ছুটিয়া গিয়া শেলফ হইতে মহাভারতের দ্বিতীয় খণ্ড বাহির করিলাম। পাতা খুলিতেই খামসমেত রামেশ্বরবাবুর চিঠি বাহির হইয়া পড়িল।
ব্যোমকেশ উল্লাসে চীৎকার করিয়া উঠিল, পাওয়া গেছে! পাওয়া গেছে!—পুঁটরাম, একটা আংটায় কয়লার আগুন তৈরি করে নিয়ে এস ৷
ব্যোমকেশের টেলিফোন পাইয়া ডাক্তার অসীম সেন আসিয়াছেন। নলিনী ও দেবনাথকে সঙ্গে লইয়া। ঘরের মেঝোয় আগুনের আংটা ঘরের বাতাবরণকে আরও উত্তপ্ত করিয়া তুলিয়াছে।
ব্যোমকেশ চিঠিখানি সযত্নে হাতে ধরিয়া বলিতে আরম্ভ করিল—
রামেশ্বরবাবু হাস্যরসিক ছিলেন, উপরন্তু মহা বুদ্ধিমান ছিলেন। কিন্তু তাঁর শরীর অসমর্থ হয়ে পড়েছিল। স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষমতা তাঁর ছিল না। তিনি ছেলে আর পুত্রবধুর হাতের পুতুল হয়ে হয়ে পড়েছিলেন।
তিনি যখন বুঝতে পারলেন যে তাঁর আয়ু ফুরিয়ে আসছে, তখন তাঁর ইচ্ছা হল মেয়েকেও কিছু ভাগ দিয়ে যাবেন। কিন্তু মেয়েকে সম্পত্তির ভাগ দিতে গেলে উইল করতে হয়, বর্তমান আইন অনুসারে মেয়ের পিতৃ-সম্পত্তির ওপর কোনো স্বাভাবিক দাবি নেই। রামেশ্বরবাবু স্থির করলেন তিনি উইল করবেন।
কিন্তু শুধু উইল করলেই তো হয় না; তাঁর মৃত্যুর পর উইল যে বিদ্যমান থাকবে তার স্থিরতা কি? কুশেশ্বর আর লাবণ্য সম্পত্তির ভাগ নলিনীকে দেবে না, তারা নলিনীকে দুচক্ষে দেখতে পারে না। তারা নলিনীকে বাপের সঙ্গে দেখা করতে দেয় না, সর্বদা রামেশ্বরবাবুকে আগলে থাকে; তিনি যে-সব চিঠি লেখেন তা খুলে তদারক করে, চিঠিতে সন্দেহজনক কোনো কথা থাকলে, চিঠি ছিড়ে ফেলে দেয়।
তবে উপায়? রমেশ্বরবাবু বুদ্ধি খেলিয়ে উপায় বার করলেন। সকলে জানে না, পেয়াজের রস দিয়ে চিঠি লিখলে কাগজের ওপর দাগ পড়ে না, লেখা অদৃশ্য হয়ে যায়। কিন্তু ওই অদৃশ্য লেখা ফুটিয়ে তোলবার উপায় আছে, খুব সহজ উপায়। কাগজটা আগুনে তাতালেই অদৃশ্য লেখা ফুটে ওঠে। আমি যখন স্কুলে পড়তাম তখন ম্যাজিক দেখানোর শখ ছিল; অনেকবার সহপাঠীদের এই ম্যাজিক দেখিয়েছি।
রামেশ্বরবাবু এই ম্যাজিক জানতেন। তিনি আবদার ধরলেন, কাঁচা পেয়াজ খাবেন। তাঁর ছেলে-বৌ ভাবল ভীমরতির খেয়াল; তারা আপত্তি করল না। রামেশ্বরবাবু হামানদিস্তায় পান ছেঁচে খেতেন; তাঁর পান খাওয়ার শখ ছিল, কিন্তু দাঁত ছিল না। পেঁয়াজ হাতে পেয়ে তিনি হামানদিস্তায় থেতো করলেন; গাঁদের শিশি থেকে গদ ফেলে দিয়ে তাতে পেয়াজের রস সঞ্চয় করে রাখলেন। কেউ জানতে পারল না। তাঁর প্রাণে হাস্যরস ছিল; এই কাজ করবার সময় তিনি নিশ্চয় মনে মনে খুব হেসেছিলেন।
পয়লা বৈশাখ তিনি তাঁর ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের শুভেচ্ছা জানিয়ে চিঠি লিখতেন। এবার নববর্ষ সমাগত দেখে তিনি চিঠি লিখতে আরম্ভ করলেন। আমাকে প্রতি বছর চিঠি লেখেন, এবারও লিখলেন: তারপর চিঠির পিঠে অংশ পেঁয়াজের রস দিয়ে উইল লিখলেন। এই সেই চিঠি আর ব্যোমকেশ খাম খুলিয়া সাবধানে চিঠি বাহির করিল, চিঠির ভাঁজ খুলিয়া দুই হাতে তাহার দুই প্রান্ত ধরিয়া আংটার আগুনের উপর ধীরে ধীরে সঞ্চালিত করিতে লাগিল। আমরা শ্বাস রুদ্ধ করিয়া সেইদিকে তাকাইয়া রহিলাম।
এক মিনিট রুদ্ধশ্বাসে থাকিবার পর আমাদের সমবেত নাসিকা হইতে সশব্দ নিশ্বাস বাহির হইল। কাগজের পিঠে বাদামী রঙের অক্ষর ফুটিয়া উঠিতেছে।
পাঁচ মিনিট পরে কাগজখানি আগুনের উপর হইতে সরাইয়া ব্যোমকেশ একবার তাহার উপর চোখ বুলাইল, তারপর তাহা ডাক্তার সেনের দিকে বাড়াইয়া বলিল, ডাক্তার সেন, রমেশ্ববাবু আপনাকে যে উইলের কথা বলেছিলেন, এই সেই উইল। —পড়ুন, আমরা সবাই শুনব।
ডাক্তার সেন একবার উইলটা মনে মনে পড়িলেন, তাঁহার মুখে স্মরণাত্মক হাসি ফুটিয়া উঠিল। তারপর তিনি গলা পরিষ্কার করিয়া মন্দ্ৰকণ্ঠে পড়িতে আরম্ভ করিলেন—
নমো ভগবতে বাসুদেবায়
আমি শ্ৰীরামেশ্বর রায়, সাকিম, ১৭ নং শ্যামধন মিত্রের লেন, বাগবাজার, কলিকাতা, অদ্য সুস্থ শরীরে এবং বাহাল তবিয়াতে আমার শেষ উইল লিখিতেছি। অবস্থা গতিকে উইলের সাক্ষী যোগাড় করা সম্ভব হইল না, তাই নিজ হস্তে আগাগোড়া উইল লিখিতেছি। আমার বুদ্ধিভ্রংশ বা মস্তিষ্ক বিকার হয় নাই, ডাক্তার অসীম সেন তাহার সাক্ষী। এখন আমার শেষ ইচ্ছা অর্থাৎ Last will and testament লিপিবদ্ধ করিতেছি।
কলিকাতায় আমার যে আটটি বাড়ি আছে এবং ব্যাঙ্কে যত টাকা আছে, তন্মধ্যে হ্যারিসন রোডের বাড়ি এবং নগদ পঁচাত্তর হাজার টাকা আমার কন্যা শ্ৰীমতী নলিনী পাইবে। আমার স্ত্রী শ্ৰীমতী কুমুদিনী যাবজ্জীবন আমার শ্যামপুকুরের বাড়ির উপস্বত্ব ভোগ করবেন। তাঁহার মৃত্যুর পর ওই বাড়ি আমার কন্যা নলিনীকে অর্সিবে। আমার বাকী যাবতীয় সম্পত্তি, ছয়টি বাড়ি এবং ব্যাঙ্কের টাকা পাইবে আমার পুত্ৰ শ্ৰীকুশেশ্বর রায়। স্বনামধন্য সত্যান্বেষী শ্ৰীব্যোমকেশ বক্সী ও বিখ্যাত ডাক্তার অসীম সেনকে আমার উইলের একজিকিউটর নিযুক্ত করিয়া যাইতেছি; তাঁহারা যথানির্দেশ ব্যবস্থা করিবেন এবং আমার এস্টেট হইতে প্রত্যেকে পাঁচ হাজার টাকা পারিশ্রমিক পাইবেন।
তারিখ পয়লা বৈশাখ
১৩৬০
স্বাক্ষর বকলম খাস
শ্রীরামেশ্বর রায়
উইল পড়া শেষ হইলে কেহ কিছুক্ষণ কথা কহিল না, তারপর আমরা সকলে একসঙ্গে হর্ষধ্বনি করিয়া উঠিলাম। নলিনী গলদশু নেত্ৰে ছুটিয়া আসিয়া ব্যোমকেশের পদধূলি লইল। গদগদ স্বরে বলিল, আপনি আমাদের নতুন জীবন দিলেন।
ব্যোমকেশ করুণ হাসিয়া বলিল, তা তো দিলাম। কিন্তু এ উইল কোর্টে মঞ্জুর করানো যাবে কি?
ইন্সপেক্টর হালদার আসিয়া সবেগে ব্যোমকেশের করমর্দন করিলেন, বলিলেন, আপনি ভাববেন না। ওরা উইল contest করতে সাহস করবে না। যদি করে আমি সাক্ষী দেব।
ডাক্তার অসীম সেন বলিলেন, আমিও।
অদ্বিতীয়
প্রকৃতির অলঙ্ঘনীয় বিধানে ব্যোমকেশের সহিত যখন সত্যবতীর দাম্পত্য কলহ বাধিয়া যাইত, তখন আমি নিরপেক্ষভাবে বসিয়া তাহা উপভোগ করিতাম। কিন্তু দাম্পত্য কলহে যখন স্ত্রীজাতি এবং পুরুষজাতির আপেক্ষিক উৎকর্ষের প্রসঙ্গ আসিয়া পড়িত তখন বাধ্য হইয়া আমাকে ব্যোমকেশের পক্ষ অবলম্বন করিতে হইত। তবু দুই বন্ধু একজোট হইয়াও সব সময় সত্যবতীর সহিত আঁটিয়া উঠিতাম না। বস্তুত মানুষের ইতিহাসে পুরুষজাতির দুষ্কৃতির নজির এত অপব্যাপ্ত লিপিবদ্ধ হইয়া আছে যে, তাহা খণ্ডন করা এক প্রকার অসম্ভব। শেষ পর্যন্ত আমাদের রণে ভঙ্গ দিতে হইত।
কিছুকাল হইতে কলিকাতা শহরে এক নূতন উৎপাতের প্রাদুভাব হইয়াছে, একদিন শীতের সকালবেলা সংবাদপত্র সহযোগে চা পান করিতে করিতে ব্যোমকেশ ও আমি তাহাই আলোচনা করিতেছিলাম। যে ব্যাপার ঘটিতে আরম্ভ করিয়াছে তাহার প্রক্রিয়া মোটামুটি এইরূপ : কখনও একটি, কখনও বা একাধিক ভদ্ৰশ্রেণীর যুবতী তাক বুঝিয়া দুপুরবেলা বাহির হয়। পুরুষেরা তখন কাজে গিয়াছে, বাড়িতে মেয়েরা আহারাদি সম্পন্ন করিয়া দিবানিদ্রার উদ্যোগ করিতেছে। এই সময় যুবতীরা গিয়া দরজায় টোকা মারে। বাড়ির গৃহিণী যদি সতর্ক হন, তিনি দ্বার না খুলিয়াই জিজ্ঞাসা করেন, “কে? একটি যুবতী বাহির হইতে বলে, “চিকনের কাজ করা ভাল সায়া-ব্লাউজ এনেছি, দাম খুব সস্তা-কিনিবেন? গৃহিণী ভবেন ফেরিওয়ালী, তিনি দ্বার খুলিয়া দেন। অমনি যুবতীরা ঘরে ঢুকিয়া পড়ে, ছুরি বা পিস্তল দেখাইয়া টাকাকড়ি গহনাপত্র কড়িয়া লইয়া প্ৰস্থান করে।
এই ধরনের ঘটনা পূর্বে কয়েকবার ঘটিয়া গিয়াছে, আসামীরা ধরা পড়ে নাই। সেদিন কাগজ খুলিয়া দেখি অনুরূপ ব্যাপার ঘটিয়াছে আগের দিন দুপুরবেলা কাশীপুরের একটি গৃহস্থের বাড়িতে। ব্যোমকেশকে খবরটি পড়িয়া শুনাইলাম। সে একটু বঙ্কিম হাসিয়া বলিল, এতে আশ্চর্য হবার কী আছে! মেয়েরা তো দুপুরে ডাকাতি করেই থাকে।
এই সময় সত্যবতী ঘরে প্রবেশ করিল। দ্বারের কাছে দাঁড়াইয়া ব্যোমকেশের পানে কুটিল কটাক্ষপাত করিয়া বলিল, আহা! মেয়েরা দুপুরে ডাকাতি করে, আর তোমরা সব সাধুপুরুষ।
ব্যোমকেশ সত্যবতীকে শুনাইবার জন্য কথাটা বলে নাই; কিন্তু সত্যবতী যখন শুনিয়া ফেলিয়াছে এবং জবাব দিয়াছে তখন আর পশ্চাৎপদ হওয়া চলে না। বোমকেশ বলিল, আমরা সবাই সাধুপুরুষ এমন কথা বলিনি। কিন্তু তোমরাও কম যাও না।
সুতরাং তৰ্ক আরম্ভ হইয়া গেল। সত্যবতী তক্তপোশের কিনারায় বসিল, বলিল, মেয়েদের নিন্দে করা তোমাদের স্বভাব। মেয়েরা কী করেছে শুনি?
ব্যোমকেশ বলিল, বেশি কিছু নয়, দুপুরে ডাকাতি।
আমি খবরের কাগজ হইতে দুপুরে ডাকাতির অংশটা পড়িয়া শুনাইলাম।
সত্যবতী বলিল, বেশ, মেনে নিলাম, ওরা দোষ করেছে, পেটের দায়ে অন্যায় করেছে। কিন্তু তোমরা যে খুন-জখম করছ, যুদ্ধ বাঁধিয়ে হাজার হাজার লোক মারছ, তার বেলা কিছু নয়? তোমাদের তুলনায় মেয়েরা ক’টা খুন করেছে।
বেগতিক দেখিয়া ব্যোমকেশ বলিল, তোমরা এতদিন ঘরের মধ্যে বন্ধ ছিলে তাই বিশেষ সুবিধে করতে পারনি; এখন স্বাধীনতা পেয়ে তোমাদের বিক্রম বেড়েছে, ক্রমে আরো বাড়বে। বঙ্কিমচন্দ্ৰ কতকাল আগে দেবী চৌধুরানীর কথা লিখে গেছেন। দেবী চৌধুরানী সেকেলে মেয়ে ছিল, তাতেই এই। যদি একালের মেয়ে হত তাহলে কী কাণ্ডটা হত ভেবে দেখ অজিত!
সত্যবতী হাত নাড়িয়া বলিল, ওসব বাজে কথা বলে আমার চোখে ধুলো দিতে পারবে না। সত্যিকার ক’টা দৃষ্টান্ত দেখাতে পারো যেখানে মেয়েমানুষ খুন করেছে?
ব্যোমকেশ বলিল, সত্যিকারের দৃষ্টান্ত চাও! আরে এই তো সেদিন-বড়জোর মাস দুই হবে-জেনানা ফাটকের এক বন্দিনী জেলখানার গার্ডকে খুন করে নিরুদ্দেশ হয়েছে।
সত্যবতী হাসিয়া উঠিল, দু’মাস আগে একটা মেয়ে একটা খুন করেছিল। এই দু মাসের মধ্যে তোমরা ক’টা খুন করেছ তার হিসেব দাও দেখি।
আজিকার কাগজেও একটা পুরুষ-কৃত খুনের খবর ছিল কিন্তু আমি তাহা চাপিয়া গেলাম: তৎপরিবর্তে বলিলাম, ‘আজকের কাগজে স্ত্রীজাতির নৃশংতার একটা গুরুতর দৃষ্টান্ত রয়েছে। একটা ধোপা এক মহিলার দামী সিন্ধের শাড়িতে খোঁচ লাগিয়েছিল, মহিলাটি বঁটি দিয়ে তার নাক কেটে নিয়েছেন। ধোপার অবস্থা শোচনীয়, হাসপাতালে আছে, বাঁচবে কিনা সন্দেহ।
সত্যবতী নির্দয় হাসিয়া বলিল, মিছে কথা বলতেও তোমাদের জোড়া নেই। তোমরা সবাই মিথ্যেবাদী চোর ডাকাত খুনী—
আমাদের তর্ক কতদূর গড়াইত বলা যায় না, কিন্তু এই সময় বহিদ্বারের কড়া খটখট শব্দে নড়িয়া উঠিল। সত্যবতী বিজয়িনীর ন্যায় উন্নত মস্তকে ভিতরে চলিয়া গেল। আমি দ্বার খুলিয়া দেখিলাম, ডাকপিওন; একটা পুরুষ্টুগোছের লম্বা খাম দিয়া চলিয়া গেল।
ব্যোমকেশের নামে খাম, প্রেরকের উল্লেখ নাই। তাহাকে খাম আনিয়া দিলে সে শঙ্কিতভাবে উহা টিপিয়া-টুপিয়া বলিল, নবীন লেখকের পাণ্ডুলিপি মনে হচ্ছে। প্ৰভাতের কাছে পাঠিয়ে দাও।
আমরা পুস্তক প্রকাশকের ব্যবসায় শরিক হইয়া পড়িবার পর হইতে উৎসাহশীল নবীন লেখকেরা প্রায়ই আমাদের কাছে পাণ্ডুলিপি পঠাইয়া থাকেন, তাই ব্যোমকেশ মোটা খামের চিঠি দেখিলেই তটস্থ হইয়া ওঠে।
বলিলাম, পাণ্ডুলিপি নাও হতে পারে। খুলেই দেখা না।
সে বলিল, তুমি খুলে দেখ।
খাম খুলিলাম। পাণ্ডুলিপি নয় বটে, কিন্তু ব্যোমকেশকে কেহ লম্বা চিঠি লিখিয়াছে; প্রায় একটা ছোটগল্পের শামিল। ব্যোমকেশ অনেকটা আশ্বস্ত হইয়া তক্তপোশের উপর লম্বা হইল, বলিল, প্রেমপত্র নয় নিশ্চয়। সুতরাং তুমি পড়, আমি শুনি।
তক্তপোশের পাশে চেয়ার টানিয়া আমি চিঠি পড়িতে আরম্ভ করিলাম। হাতের লেখা খুব স্পষ্ট নয়, একটু কষ্ট করিয়া পড়িতে হয়; কিন্তু ভাষা বেশ ঝরঝরে—
শ্ৰীব্যোমকেশ বক্সী মহাশয় সমীপে
সবিনয় নমস্কারপূর্বক নিবেদন,
আমার নাম শ্ৰীচিন্তামণি কুণ্ডু। পুলিস আমাকে খুনের মামলায় জড়াইবার চেষ্টা করিতেছে, তাই নিরুপায় হইয়া আপনার শরণ লইয়াছি। শক্তি থাকিলে আমি আপনার সঙ্গে দেখা করিতাম, আমার বক্তব্য মুখে বলিলে আরও পরিষ্কার হইত। কিন্তু কয়েক বৎসর যাবৎ আমি পক্ষাঘাত রোগে পঙ্গু হইয়াছি, আমার বাম অঙ্গ অচল হইয়া পড়িয়াছে; ঘরের মধ্যে অল্প চলাফেরা করিতে পারি মাত্র। তাই বাধ্য হইয়া পত্র লিখিতেছি।
যে গুরুতর ব্যাপার ঘটিয়াছে তাহা বিবৃত করিবার পূর্বে আমার নিজের পরিচয় কিছু জানাইতে ইচ্ছা করি। আমার বয়স এখন সাতান্ন বৎসর; স্ত্রী-পুত্ৰ নাই, কেবল তিনটি বাড়ি আছে। বাড়িগুলি ভাড়া দিয়াছি, তন্মধ্যে একটি বাড়ির দ্বিতলে দুইটি ঘর লইয়া আমি থাকি। ভৃত্য রামাধীন আমার পরিচর্যা করে।
শিরোনামায় ঠিকানা দেখিয়া বুঝিবেন আমি কলিকাতার পূর্ব-দক্ষিণ অঞ্চলে থাকি। রাস্তাটি বেশ চওড়া; যে-বাড়িতে আমি থাকি সেটি রাস্তার এক দিকে, আমার অন্য বাড়ি দুটি প্রায় তাহার সামনাসামনি, রাস্তার অপর দিকে। এই বাড়ি দুটি অপেক্ষাকৃত ছোট এবং একতলা; ইহাদের যমজ বাড়ি বলিতে পারেন। দুটি বাড়ির মাঝখান দিয়া খিড়কির দিকে যাইবার সরু গলি আছে।
আমি রোগে পঙ্গু, দুটি ঘরের মধ্যেই আমার জীবন ৷ পক্ষাঘাত হওয়ার আগে আমি দালালি করিতাম, অনেক ছুটাছুটি করিয়াছি; ছুটাছুটি করিতেই আমি অভ্যস্ত। তাই এখন সারা বেলা জানালার সামনে বসিয়া থাকি, রাস্তার লোক চলাচল দেখি। একটি বাইনোকুলার কিনিয়াছি, তাহাই চোখে দিয়া দূরের দৃশ্য দেখি। বাইনোকুলার দিয়া অনেক বাড়ির ভিতরের দৃশ্যও দেখা যায়; আমার যমজ বাড়ির ভাড়াটেদের উপর নজর রাখিতে পারি। যাহাদের ক্ষমতা আছে। তাহারা সিনেমা থিয়েটার দেখে; আমি জানালায় বসিয়া সাদা চোখে প্রবহমান জীবনস্রোত দেখি এবং চোখে দূরবীন লাগাইয়া নেপথ্যদৃশ্য দেখি। কত বিচিত্র দৃশ্য যে দেখিয়াছি শুনিলে আশ্চর্য হইয়া যাইবেন। কিন্তু সে-কথা যাক।
মাস দেড়েক আগে পৌষ মাসের মাঝামাঝি একটি ছোকরা আমার সঙ্গে দেখা করিতে আসিল। বেঁটে-খাটো চেহারা, ঘাড়ে-ছােটা তামাটে রঙের চুল, তরতরে মুখ, নাকের নীচে ছোট্ট একটি প্রজাপতি-গোঁফ আছে। পরিধানে দামী বিলাতি পোশাক, তাহার উপর ক্যামেলাহেয়ার কাপড়ের ওভারকেট। দ্বারের কাছে দাঁড়াইয়া সসম্ভ্রমে বলিল, আমার নাম তপন সেন। আসতে পারি?
আমি তখন জানালার কাছে বসিয়া খবরের কাগজ পড়িতেছিলাম, মুখ তুলিয়া বলিলাম, আসুন।
তপন সেন আসিয়া একটা চেয়ার টানিয়া আমার সম্মুখে বসিল। আমি বলিলাম, কি দরকার বলুন তো?
সে জানালার বাহিরে আঙুল দেখাইয়া বলিল, আপনার জোড়া-বাড়ির একটা বাড়ি খালি হয়েছে। তাই এলাম, যদি আমাকে ভাড়া দেন।
বাড়িটা কিছুদিন হইতে খালি পড়িয়া ছিল। আগের ভাড়াটে বাড়ি তছনছ করিয়া দিয়াছিল, আবার তাহা মেরামত ও চুনকাম করাইয়া রাখিয়াছিলাম; ঠিক করিয়াছিলাম ভাল ভাড়াটে না পাইলে ভাড়া দিব না। ছোকরাকে দেখিয়া শুনিয়া ভালই মনে হইল, সাজপোশাক হইতে অবস্থাপন্ন বলিয়া মনে হয়। জিজ্ঞাসা করিলাম, আপনার কি করা হয়?
সে ওভারকেটের পকেট হইতে সিগারেটের কোটা বাহির করিয়া আবার রাখিয়া দিল; বোধ হয়। আমার ন্যায় বয়োবৃদ্ধের প্রতি সম্ভ্রমবশতই সিগারেট ধরাইল না। বলিল, খবরের কাগজের অফিসে চাকরি করি। নাইট এডিটর। সারা রাত কাজ করি আর সারা দিন ঘুমোই। বলিয়া একটু হাসিল।
প্রশ্ন করিলাম, সংসারে কে কে আছে?
সে স্মিতমুখে বলিল, সবেমাত্র সংসার আরম্ভ করেছি। আমি আর আমার স্ত্রী। আর কেউ নেই।
মনে মনে খুশি হইলাম। ছেলেপিলে থাকিলে বাড়ি নষ্ট করে, দেয়ালে কালি দিয়া ছবি আঁকে। বলিলাম, বেশ, আপনাকে ভাড়া দেব। দেড় শো টাকা ভাড়া।
সে ইতস্তত করিয়া বলিল, আমার পক্ষে একটু বেশি হয়ে যায়—
বলিলাম, সাজানো বাড়ি। খাট-বিছানা টেবিল-চেয়ার কাবার্ড সব পাবেন।
আচ্ছা, তাহলে রাজী। বাড়িটা একবার দেখতে পারি কি?
চাবি দিলাম, তপন সেন গিয়া বাড়ি দেখিয়া আসিল। তারপর দেড় শো টাকা বাহির করিয়া দিয়া বলিল, এই নিন। এক মাসের ভাড়া।
আমি টাকার রসিদ লিখিয়া দিয়া বলিলাম, কবে থেকে বাড়িতে আসবেন?
সে বলিল, কাল ইংরেজি মাসের পয়লা। বাড়ি তো খালিই পড়ে আছে, যদি অনুমতি দেন আজই কোনো সময় আসতে পারি।
বলিলাম, বেশ, যখন ইচ্ছে আসবেন।
তপন সেন চাবি লইয়া চলিয়া গেল। ভাল ভাড়াটে পাইয়াছি ভাবিয়া মনে মনে উৎফুল্ল হইলাম।
সেদিন সারা বিকালবেলা জানালায় বসিয়া বাড়ির দিকে তাকাইয়া রহিলাম, কিন্তু তপন তাহার স্ত্রীকে লইয়া আসিল না।
সকালবেলা জানালা খুলিয়া দেখি উহারা আসিয়াছে। সদর দরজা খোলা। নিশ্চয় রাত্রে কোনো সময় মালপত্ৰ লইয়া আসিয়াছে।
আমার কৌতুহলী চক্ষু ওই দিকেই যাতায়াত করিতে লাগিল। বেলা সাড়ে ন’টার সময় একটি যুবতী আসিয়া ভিতর দিক হইতে সদর দরজা বন্ধ করিয়া দিল। তারপর কয়েক মিনিট গত হইলে খিড়কি দরজার গলি দিয়া সে বাহির হইয়া আসিল।
তখন তাহাকে ভাল করিয়া দেখিলাম। লম্বা ছিমছাম চেহারা, মাথায় একমাথা চুল এলো খোঁপার আকারে ঘাড়ের উপর বিন্যস্ত, হাতে একটি ছোট অ্যাটাচি-কেস। ভাবিলাম, সারা রাত কাজ করিয়া তখন ঘুমাইতেছে, তাই তার বউ বাজার করিতে চলিয়াছে।
কিন্তু দুপুর কাটিয়া গেল সে ফিরিয়া আসিল না। একেবারে ফিরিল অপরাহ্ণে আন্দাজ চারটার সময়। সদর দরজার কড়া নাড়িল না, গলি দিয়া খিড়কির দিকে চলিয়া গেল বোধ হয়। স্বামী মহাশয়ের নিদ্ৰাভঙ্গ করিতে চায় না।
কিছুক্ষণ পরে আমি রামাধীনকে পাঠাইলাম। নূতন ভাড়াটে, তাহাদের সুবিধা অসুবিধার খোঁজ-খবর লওয়া দরকার। জানালায় বসিয়া দেখিলাম রামাধীন গিয়া দ্বারের কড়া নাড়িল। মেয়েটি দ্বার খুলিয়া দিল। রামাধীনের সহিত কথা বলিয়া মেয়েটি একবার চোখ তুলিয়া আমার জানালার পানে চাহিল, তারপর রামাধীনের সঙ্গে দ্বিতলে আমার কাছে উঠিয়া আসিল।
দূর হইতে তাহাকে দেখিয়াছিলাম, এখন কাছে হইতে দেখিলাম। ভারী সুশ্ৰী চেহারা, লম্বা একহারা, মেদ-গ্রন্থির বাহুল্য নাই; বাঁ গালের উপর মসুরের মত একটি লাল তিল, তাহাতে মুখের লালিত্য আরও বাড়িয়াছে। একটি বিষয় লক্ষ্য করিলাম, স্বামী-স্ত্রীর বয়স প্রায় একই রকম-তেইশ-চব্বিশ। হয়তো প্রেমে পড়িয়া বিবাহ করিয়াছে। আজকাল তো কতই এমন দেখা যায়।
ছোট্ট নমস্কার করিয়া বলিল, ‘আমার নাম শান্তা। আমাদের কোনো অসুবিধে নেই; খুব সুন্দর বাড়ি পেয়েছি।’ তাহার কথা বলিবার ভঙ্গী যেমন মিষ্ট, গলার স্বরও তেমনি নরম।
বলিলাম, বসুন। আপনি—
সে মাথা নাড়িয়া বলিল, আমাকে “আপনি বলবেন না। আমি আপনার মেয়ের বয়সী।
বলিয়াম, তা-আচ্ছা। তোমাদের ঝি-চাকর যদি দরকার থাকে, নতুন পাড়ায় এসেছ—
সে বলিল, ঝি-চাকরের দরকার নেই। দুজনের সংসার, আমি একাই সব কাজ সামলে নিতে পারব।
বলিলাম, বেশ বেশ। তা-আজ তুমি সকালবেলা বেরিয়েছিলে, এখন ফিরলে। সারা দিন কোথায় ছিলে?
সে বলিল, আমি স্কুলে পড়াই। চেতলার দিকে একটা ছােট মেয়েদের স্কুল আছে, সেখানে শিক্ষয়িত্রীর কাজ করি। —আচ্ছা, আজ যাই, ওর খাবার তৈরি করতে হবে। সন্ধ্যার পর ও কাজে বেরুবে। শান্তা একটু হাসিয়া ঘাড় হেলাইয়া চলিয়া গেল।
ইহাদের দু’জনকেই আমার ভাল লাগিয়াছে। বর্তমানে ভাড়াটেদের লইয়াই আমার জীবন। তাহারা আমার বাড়িতে বাস করে, ভাড়া দেয়, নিজের ধান্দায় থাকে; মেলামেশা নাই। জোড়া-বাড়ির অন্য অংশে একটি মাদ্রাজী পরিবার থাকে; তাহারা আমার ভাষা বোঝে না, কেবল মাসান্তে ভাড়া দিয়া রসিদ লইয়া যায়। ইহাদের সহিত আমার হৃদয়ের কোনও যোগ নাই। কিন্তু এই নবীন বাঙালী দম্পতি আমার হৃদয় আকর্ষণ করিয়াছে।
জানালায় বসিয়া দেখিলাম, সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হইবার পর তপন কোট প্যান্ট ও ওভারকেট চড়াইয়া খিড়কির গলি দিয়া বাহির হইল, বাড়ির সামনে ল্যাম্পের নীচে দাঁড়াইয়া সিগারেট ধরাইল, তারপর বাস-রাস্তার দিকে চলিয়া গেল। সারা রাত বাহিরে থাকিবে, ভোরের দিকে কাজ শেষ করিয়া অতঃপর উহাদের নিয়ম-বাঁধা জীবনযাত্ৰা চলিতে লাগিল। সকালে সাড়ে ন’টার সময় শান্তা স্কুলে পড়াইতে চলিয়া যায়, বিকালে ফিরিয়া আসে। তপন সন্ধ্যার পর বাহির হয়, রাত্রে কখন ফেরে জানি না। উহাদের জীবনযাত্রা অতি শান্ত; বাড়িতে অতিথি আসে না, হয়তো বন্ধুবান্ধব চেনা-পরিচিত কেহ কাছাকাছি নািই। তপন বাড়ি হইতে রাত্রে বাহির হইবার পর বাড়ির ইলেকট্রিক বাতি নিবিয়া যায়, কেবল সামনের ঘরে মৃদু মোমবাতি জ্বলে। তাহাও আটটা বাজিতে না বাজিতে নিবিয়া যায়। শান্তা বোধ হয় সারা দিনের ক্লান্তির পর তাড়াতাড়ি শুইয়া পড়ে।
উহাদের বিষয়ে আমার মনে যথেষ্ট কৌতুহল আছে, তাই যখন তখন চোখে দূরবীন লাগাইয়া বাড়িটা দেখি। কিন্তু বাহির হইতে বাড়ির অভ্যন্তর কিছুই দেখা যায় না; সদর দরজা। যেমন বন্ধ থাকে, সদরের জানালায় তেমনি পর্দা টানা থাকে। কেবল রাত্রিকালে পর্দার ভিতর দিয়া মোমবাতির মোলায়েম আলো দেখা যায়।
একদিন রবিবার সকালবেলা শান্তা আসিয়া খানিকক্ষণ আমার সঙ্গে গল্পসল্প করিল। আমি রহস্যচ্ছলে জিজ্ঞাসা করিলাম, তোমার কর্তাটি এখনো ঘুমোচ্ছেন বুঝি?
সে সলজভাবে বলিল, হ্যাঁ, সারা রাত ঘুমোতে পায় না, তাই—
আমি বলিলাম, তুমি রাত্রে ইলেকট্রিক বাতি জ্বালাও না দেখেছি। কেন বল দেখি?
শান্তা সচকিত হইয়া বলিল, আমার চোখ ভাল নয়, উজ্জ্বল আলো বেশিক্ষণ সহ্য হয় না। ও আবার কম আলোয় দেখতে পায় না। তাই ও চলে গেলেই ইলেকট্রিক নিবিয়ে পিদিম জ্বালি। আপনি লক্ষ্য করেছেন বুঝি?
হ্যাঁ। আমি তো সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত এই জানালার ধারেই বসে থাকি।
শান্তা সহানুভূতিপূর্ণ স্বরে বলিল, সত্যি, আপনার তো কোথাও যাবার উপায় নেই। তা আমি মাঝে মাঝে আসব, ওকেও পাঠিয়ে দেব।
এইভাবে চলিতেছে। একদিন সন্ধ্যার পর তপন ও কাজে যাইবার পথে আমার কাছে আসিয়া দুই চারিটা কথা বলিয়া গেল।
তারপর একদিন গভীর রাত্রে একটি ব্যাপার লক্ষ্য করিলাম। আমি সাধারণত রাত্রি সাড়ে ন’টার সময় শয়ন করি। কিন্তু আমার অনিদ্রা রোগ আছে, মাঝে মাঝে রাত্রে ঘুম হয় না, তখন প্রায় সারা রাত জাগিয়া থাকি। দুই হপ্তা আগে রাত্রে যথাসময় শয়ন করিলাম। কিন্তু কিছুতেই ঘুম আসিল না। বারোটা পর্যন্ত সাধ্যসাধনা করিয়া উঠিয়া পড়িলাম; ভাবিলাম এক পেয়ালা গরম কোকো পান করিলে ঘুম আসিতে পারে। স্টোভ জ্বালিয়া জল চড়াইয়া দিলাম। রামাধীন আমার ঘরের বাহির দ্বারের সম্মুখে শয়ন করে, তাহাকে আর জাগাইলাম না।
শীতের রাত্রি, জানালা বন্ধ আছে। হঠাৎ কি মনে হইল, জানালার খড়খড়ি তুলিয়া বাহিরে তাকাইলাম। নিষুতি রাত্রে রাস্তায় জনমানব নাই; জোড়া-বাড়ির সামনে রাস্তার আলোটা জ্বলিতেছে। বাড়ি দুটার ভিতরে অন্ধকার।
একটা লোক ওদিকের ফুটপাথ দিয়া আসিতেছে। তাহার মাথা হইতে হাঁটু পর্যন্ত কালো র্যাপারে ঢাকা; জোড়া-বাড়ির বরাবর আসিয়া সে থামিল, ঘাড় ফিরাইয়া পিছনে ও আশেপাশে দেখিল, তারপর সুট্ করিয়া দুই বাড়ির মাঝখানে গলির মধ্যে ঢুকিয়া পড়িল। আর তাহাকে দেখিতে পাইলাম না। কিন্তু কিছুক্ষণ পরে তপনের ঘরে বিদ্যুৎবাতি জ্বলিয়া উঠিয়া আবার নিবিয়া গেল।
কোকো প্ৰস্তুত করিয়া পান করিতে করিতে চিন্তা করিলাম। কে লোকটা? তাহার ভাবভঙ্গীতে যেন সতর্ক সাবধানতা রহিয়াছে। ওই গলি গিয়া মাদ্রাজীদের খিড়কি দরজাতেও যাওয়া যায়। কিন্তু মাদ্রাজীরা সংখ্যায় অনেকগুলি, সন্ধ্যার পর দোর তালাবন্ধ করিয়া ঘুমাইয়া পড়ে; এই লোকটা নিঃসন্দেহে তপনের ঘরে গিয়াছে। তপন রাত্রে বাড়ি থাকে না, শান্তা একলা থাকে; এই সময় লোকটা চুপিচুপি আসিয়াছে। কী ব্যাপার!
গভীর রাত্রি, স্বামী অনুপস্থিত, বাড়িতে একটি যুবতী ছাড়া অন্য কেহ নাই; এই সময় র্যাপার মুড়ি দিয়া লোক আসে। অর্থাৎ-—?
মনটা খারাপ হইয়া গেল। শান্তাকে ভাল মেয়ে বলিয়াই মনে হইয়াছিল; কিন্তু আজকাল মুখ দেখিয়া স্ত্রী-চরিত্র বোঝা দুষ্কর। —মরুক গে, আমার কি! ভাড়াটেদের স্ত্রী কী করিতেছে তাহার খোঁজে আমার প্রয়োজন কি? আমার যথাসময়ে ভাড়া পাইলেই হইল।
একবার ভাবিলাম জানালায় দাঁড়াইয়া দেখি লোকটা কতক্ষণে বাহির হয়। কিন্তু কোকো পান করিয়া একটু ঘুমের আমেজ আসিতেছিল, আমি শুইয়া পড়িলাম। আসন্ন ঘুমকে খোঁচা দিয়া তাড়াইলে হয়তো সারা রাত জাগিয়া থাকিতে হইবে।
এই ঘটনার পর দুই হপ্তা কাটিয়া গিয়াছে। গত রবিবার তপন আসিয়া বাড়িভাড়া দিয়া গিয়াছে, উল্লেখযোগ্য আর কিছু ঘটে নাই। তপনকে নৈশ আগন্তুকের কথা বলি নাই। কী দরকার আমার?
তারপর হঠাৎ পরশু রাত্রির ব্যাপার! —পরশু রাত্রেও আমাকে অনিদ্রা রোগে ধরিয়াছিল। বারোটা পৰ্যন্ত বিছানায় এ-পাশ ও-পাশ করিয়া উঠিয়া পড়িলাম; স্টোভে কোকোর জল চড়াইয়া দিয়া জানলার খড়খড়ি তুরিয়া উঁকি মারিলাম। লোকটা যেন আমার উঁকি মারার জন্যই অপেক্ষা করিতেছিল-সেই র্যাপার-ঢাকা লোকটা। সে ফুটপাথ দিয়া দ্রুতপদে আসিয়া গলির ঠিক মুখের কাছে একটু ভিতর দিকে লুকাইয়া পড়িল। তারপর একই দিক হইতে আর একটা লোক আসিতেছে দেখিলাম; গলায় কম্ফর্টার-জড়ানো লোকটা গলির মুখ পর্যন্ত আসিয়া দাঁড়াইয়া পড়িল, অনিশ্চিতভাবে এদিক-ওদিক চাহিতে লাগিল। মনে হইল সে র্যাপার-ঢাকা লোকটাকে অনুসরণ করিয়াছিল, এখন আর তাহাকে খুঁজিয়া পাইতেছে না।
এই সময় র্যাপার-ঢাকা লোকটা মুখ হইতে র্যাপার সরাইল। সবিস্ময়ে চিনিলাম—তপন। তারপর মুহুর্তে মধ্যে একটা ভয়ঙ্কর ব্যাপার ঘটিয়া গেল। তপনের হাতে একটি ছুরি ঝালকাইয়া উঠিল, সে এক লাফে সামনে আসিয়া কম্ফর্টার-জড়ানো লোকটার বুকে ছুরি বিঁধিয়া দিল। লোকটা ফুটপাথের উপর পড়িয়া গেল। তপন বিদ্যুৎবেগে আবার গলির মধ্যে ঢুকিয়া পড়িল।
আমি হতভম্বভাবে চাহিয়া রহিলাম। লোকটা ফুটপাথের উপর নিশ্চল হইয়া পড়িয়া আছে, একটা কাকুতি পর্যন্ত তাহার মুখ দিয়া বাহির হইতেছে না। নিশ্চয় মরিয়া গিয়াছে—
আমার ঘরে টেলিফোন আছে। এই ঘটনার ধাক্কা সামালাইয়া আমি থানায় ফোন করিলাম। আমাদের থানা কাছেই, পাঁচ মিনিটের মধ্যে পুলিস আসিয়া পড়িল। দারোগাবাবু আমার বয়ান শুনিয়া তপনের বাসা ঘেরাও করিলেন।
তপনকে কিন্তু বাড়িতে পাওয়া গেল না। শান্তা ঘুমাইতেছিল, সে কিছু জানিতে পারে নাই। তপন খিড়কির দরজা খুলিয়া বাড়িতে আসিয়াছিল তাহাতে সন্দেহ নাই; সে বাসায় বস্ত্ৰাদি বদল করিয়া শান্তাকে না জাগাইয়া চুপিচুপি পলায়ন করিয়াছে।
সে-রত্রে মৃতদেহ সনাক্ত হয় নাই; পরে জানা গিয়াছে মৃত ব্যক্তির নাম বিধুভুষণ আইচ, বর্ধমানের পুলিসের কর্মচারী ছিল, সম্প্রতি ছুটি লইয়া কলিকাতায় আসিয়াছিল।
তপনের বাসায় পুলিসের পাহারা কায়েম আছে। তপন এখনও ধরা পড়ে নাই। দারোগাবাবু ক্ৰমাগত শান্তাকে জেরা করিয়া চলিয়াছেন। অথচ সে বেচারী নির্দোষ। আমি তাহার প্রতি অন্যায় সন্দেহ করিয়াছিলাম সেজন্য লজ্জিত আছি। এখন বুঝিয়াছি তপনই মধ্যরাত্রে র্যাপার মুড়ি দিয়া বাসায় ফিরিয়া আসিত।
এদিকে আমার অবস্থা শোচনীয় হইয়া উঠিয়াছে। তপন কেন খুন করিয়াছে আমি কিছুই জানি না, অথচ ঘণ্টায় ঘণ্টায় নূতন পুলিস অফিসার আসিয়া আমাকে জেরা করিয়া যাইতেছেন। আমি চলচ্ছক্তিহীন পঙ্গু মানুষ কিন্তু পুলিস বোধ হয় সন্দেহ করে যে খুনের জন্য আমি দায়ী। আমার অপরাধ এই যে, তপন আমার ভাড়াটে এবং আমি হত্যাকাণ্ড প্ৰত্যক্ষ করিয়াছি।
এখন আপনার কাছে বিনীত অনুরোধ, আপনি আমাকে উদ্ধার করুন; আমার প্রাণ অতিষ্ঠ হইয়া উঠিয়াছে। পুলিস হয়তো সন্দেহের উপর আমাকে ধরিয়া লইয়া গিয়া হাজতে পুরবে; তাহা হইলে আমি মরিয়া যাইব। আমার টাকা আছে; আপনি যদি আমাকে উদ্ধার করিতে পারেন। আমি আপনাকে খুশি করিয়া দিব।
আর অধিক কি।যত শীঘ্ৰ পারেন আমাকে পুলিসের ঝামেলা হইতে রক্ষা করুন। আমি আপনার নিকট চিরকৃতজ্ঞ থাকিব।
বশংবদ
শ্ৰীচিন্তামণি কুণ্ডু
দুই
চিঠি পড়া শেষ হইলে ব্যোমকেশ আমার হাত হইতে চিঠি লইয়া মনে মনে পড়িতে আরম্ভ করিল। আমি আর এক পেয়ালা চা সংগ্রহের উদ্দেশ্যে রান্নাঘরের অভিমুখে যাত্ৰা করিলাম। সত্যবতী হয়তো রাগিয়া আছে, তাহাকে ঠাণ্ডা করাও দরকার।
আধা ঘণ্টা পরে ফিরিয়া আসিয়া দেখি ব্যোমকেশ চিঠি কোলে লইয়া বসিয়া আছে এবং আপনি মনে হাসিতেছে। জিজ্ঞাসা করিলাম, হাসি কিসের?
ব্যোমকেশ বলিল, ব্যাপারটাই হাসির। চিন্তামণি কুণ্ডু মশায় কিন্তু একটি বিষয়ে ভুল করেছেন, তপনের বাড়িতে বিদ্যুৎবাতি নিবে যাওয়ার সময়টা তিনি ভাল করে লক্ষ্য করেননি।
তুমি কি করে তা জানলে?
‘আমার অনুমান যদি সত্যি হয় তাহলে তিনি নিশ্চয় ভুল করেছেন। আর একটা ভুল করেছেন, সেটা অবশ্য স্বাভাবিক ৷’ ব্যোমকেশ আবার মৃদু বঙ্কিম হাসিতে লাগিল। তারপর গভীর হইয়া বলিল, ‘অজিত, চিন্তামণিবাবুর ঘরে টেলিফোন আছে, তুমি তাঁর নম্বর খুঁজে তাঁকে ফোন কর। একটা জরুরী প্রশ্নের উত্তর দরকার। তাঁকে জিজ্ঞেস কর তপনের গলার আওয়াজ কি রকম।
নিশ্চয় খুব জরুরী প্রশ্ন আর কিছু জানতে চাও?
আর কিছু না। তাঁকে বোলো, ভাবনার কিছু নেই, আমি অবিলম্বে যাচ্ছি।
চিন্তামণিবাবুকে ফোন করিলাম, তারপর ফিরিয়া আসিয়া বলিলা, তপনের গলার আওয়াজ চেরা-চেরা।
ব্যোমকেশ বলিল, চেরা-চেরা! তাহলে ঠিক ধরেছি, আর কোন সন্দেহ নেই।
বলিলাম, কি ধরেছ তুমিই জান। কিন্তু চিন্তামণিবাকুর গলাও চেরা-চেরা মনে হল।
ব্যোমকেশ বলিল, তাতে আর আশ্চর্য কি। একে পক্ষাঘাত, তার ওপর পুলিসের আতঙ্ক—চল, বেরিয়ে পড়া যাক। কাজ সেরে ফিরে এসে মধ্যাহ্ন ভোজন করা যাবে।
চিন্তামণিবাবুর বাড়ির রাস্তাটা বেশ চওড়া নূতন রাস্তা; শহরের অন্তিম প্রান্তে বলিয়া অপেক্ষাকৃত নির্জন। তপন সেনের বাসা পুলিসের পাহারা দেখিয়া সহজেই সনাক্ত করা গেল। তাহার উল্টোদিকে চিন্তামণিবাবুর দ্বিতল বাড়ি। আমরা উপরে উঠিয়া গেলাম।
আমরা দ্বারের কড়া নাড়িবার পূর্বেই হিন্দুস্থানী ভৃত্য রামাধীন দ্বার খুলিয়া পাশে সরিয়া দাঁড়াইল। আমরা প্রবেশ করিলাম। খোলা জানালার পাশে চিন্তামণিবাবু চেয়ারে বসিয়া ছিলেন, সাগ্রহে গলা বাড়াইয়া বলিলেন, ব্যোমকেশবাবু। রাস্তায় আসতে দেখেই চিনেছি।, আসুন।
রামাধীন দুটি চেয়ার আগাইয়া দিল, আমরা বসিলাম। টেলিফোনে গলার আওয়াজ শুনিয়া চিন্তামণিবাবুর চেহারা যেমন আন্দাজ করিয়াছিলাম আসলে তেমন নয়; কৃষ্ণবৰ্ণ মোটাসোটা মানুষ, উপবিষ্ট অবস্থায় দেখিয়া পক্ষাঘাতগ্ৰস্ত বলিয়া মনে হয় না। তাঁহার পাশে টিপাই-এর উপর একটি দামী বাইনোকুলার রাখা রহিয়াছে।
চিন্তামণিবাবু বলিলেন, আগে কি খাবেন বলুন। —চা-কোকো-ওভালটিন—
ব্যোমকেশ বলিল, এখন কিছু দরকার নেই। —পুলিস আজ। আপনার কাছে এসেছিল নাকি?
চিন্তামণিবাবু বলিলেন, আসেনি আবার! দারোগ একবার আমার দিকে তেড়ে আসছে, একবার ও বাড়িতে শান্তার দিকে তেড়ে যাচ্ছে। কী যে চায় ওরা বুঝি না। একই প্রশ্ন পঞ্চাশবার। আমার পক্ষাঘাত হয়েছে, সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামতে পারি কিনা, বাইনোকুলার রেখেছি কেন, তপন সেনকে বাড়ি ভাড়া দিয়েছি কেন? বলুন দেখি ব্যোমকেশবাবু, এ সব প্রশ্নের কী জবাব দেব? জবাব দিতে দিতে আমার প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়েছে। এখন আপনি আমাকে বাঁচান ৷
ব্যোমকেশ বলিল, ভাববেন না, সব ঠিক হয়ে যাবে। এখন দারোগাবাবুর সঙ্গে একবার দেখা করা দরকার। তিনি কি—
বলিতে বলিতে দারোগাবাবু দ্বারের সামনে আসিয়া দাঁড়াইলেন। দশ বারো বছর আগে বিজয় ভাদুড়ী যখন ছোট দারোগা ছিলেন তখন তাঁহার সহিত পরিচয় হইয়াছিল। রোগা লম্বা বেউড় বাঁশের মত চেহারা, কিন্তু অত্যন্ত কর্মতৎপর ও সন্দিগ্ধচিত্ত ব্যক্তি। দশ বছরে তিনি বড় দারোগা হইয়াছেন। কিন্তু চেহারার তিলমাত্র পরিবর্তন ঘটে নাই। এবং মনও যে পূর্ববৎ সন্দেহপরায়ণ আছে তাহা তাঁহার চোখের দৃষ্টি হইতে অনুমান করা যায়।
দ্বারের নিকট হইতে প্রখর চক্ষে আমাদের নিরীক্ষণ করিয়া তিনি ঘরে প্রবেশ করিলেন, শুষ্ক স্বরে বলিলেন, ব্যোমকেশবাবু যে!
ব্যোমকেশ হাসিয়া বলিল, চিনতে পেরেছেন দেখছি। তা-আপনার আসামী, মানে, তপন সেন ধরা পড়ল?
বিজয় ভাদুড়ী একবার চিন্তামণিবাবুকে বক্রদৃষ্টিতে বিদ্ধ করিয়া বলিলেন, ধরা পড়েনি এখনো কিন্তু যাবে কোথায়? আপনি হঠাৎ এখানে কী উদ্দেশ্যে, ব্যোমকেশবাবু?
ব্যোমকেশ বলিল, চিন্তামণিবাবু আমার মক্কেল। ওঁর বাড়িতে খুন হয়েছে, ওঁর ভাড়াটে খুন করেছে, আপনারা ওঁকে বিরক্ত করছেন। তাই নিজের স্বার্থরক্ষার জন্যে উনি আমাকে নিযুক্ত করেছেন।
বিজয় ভাদুড়ী কুটিল-কুঞ্চিত চক্ষে ব্যোমকেশের পানে চাহিয়া রহিলেন, বোধ করি মনে মনে বিবেচনা করিলেন ব্যোমকেশকে গলা-ধাক্কা দিবেন কি না। তারপর তিনি যখন কথা বলিলেন তখন তাঁহার সুর একেবারে বদলাইয়া গিয়াছে। তিনি ব্যোমকেশের দিকে ঝুঁকিয়া ঈষৎ হ্রস্বকণ্ঠে বলিলেন, একবার বাইরে আসবেন? দুটো কথা আছে।
চলুন।
আমরা ঘরের বাহিরে লম্বা বারান্দার এক কোণে গিয়া দাঁড়াইলাম। বিজয়বাবু মুখে একটা জোর করা হাসি টানিয়া আনিয়া বলিলেন, দেখুন ব্যোমকেশবাবু, উঁচু মহলে আপনার প্রতিপত্তি আছে, আপনি যদি এ মামলায় মাথা গলাতে চান আমি আপনাকে আটকাতে পারব না। কিন্তু আমি অনুরোধ করছি আপনি চিন্তামণি কুণ্ডুকে সাহায্য করবেন না। আমার বিশ্বাস, ও আর ঐ খোট্টা চাকরিটা তলে তলে এই ব্যাপারের সঙ্গে জড়িত আছে।
ব্যোমকেশ স্থির হইয়া বিজয়বাবুর কথা শুনিল, তারপর বলিল, কে খুন করেছে আপনি জানেন?
বিজয়বাবু বলিলেন, অবশ্য খুন করেছে তপন সেন, কিন্তু বুড়োটাও এর মধ্যে আছে।
বুড়োটাও যদি এর মধ্যে থাকতো তাহলে তপনের নামে খুনের অভিযোগ আনতো কি?
ঐখানেই চালাকি। তপনকে ধরিয়ে দিয়ে বুড়ো নিজেকে বাঁচাতে চায়।
ব্যোমকেশ বিরক্ত স্বরে বলিল, মাপ করবেন বিজয়বাবু, আপনি এ মামলার কিছুই বুঝতে পারেননি।
ভ্রূকুটি করিয়া বিজয়বাবু বলিলেন, তার মানে?
ব্যোমকেশ বলিল, মানে পরে বলব। আগে আপনি আমার কয়েকটা প্রশ্নের জবাব দিন দেখি। —যে ছুরি দিয়ে খুন হয়েছিল সেটা পাওয়া গেছে কি?
না। তপন সেটা নিয়ে পালিয়েছে।
তপনের বাড়ি তল্লাশ করে কিছু পেয়েছেন?
না, এমন কিছু পাইনি যাতে হদিস পাওয়া যায়। তবে সিন্দুকটা এখনো খোলা হয়নি, তার চাবি তপনের কাছে
শান্তাকে জেরা করে কিছু পেয়েছেন?
কাজের কথা কিছু পাইনি। মাস চারেক আগে ওদের বিয়ে হয়েছে; স্বামীর কাজকর্মের কথা শান্তা কিছুই জানে না।
আমি কিন্তু সব জানি। কে খুন করেছে জানি, এমন কি আসামী কোথায় আছে তাও জানি—
বিজয়বাবু লাফাইয়া উঠিলেন, জানেন তবে এতক্ষণ বলেননি কেন?
ব্যোমকেশ হাসিল, সময় হলেই বলব। তার আগে আমি তপনের বাসাটা একবার ঘুরে ফিরে দেখতে চাই। আর শান্তাকে কয়েকটা প্রশ্ন করতে চাই। আপনি অবশ্য তাকে যথেষ্ট জেরা করেছেন এবং সন্তোষজনক উত্তরও পেয়েছেন। আমি কেবল দুচারটে প্রশ্ন করব।
বিজয়বাবু বলিলেন, তা বেশ। কিন্তু আসামী—
আসামীকেও পাবেন।
কোথায়? ওই বাড়িতে? আপনি কী বলছেন কিছুই বুঝতে পারছি না।
পারবেন। আগে চলুন ওই বাড়িতে। আসামীকে ধরার জন্যে প্রস্তুত থাকবেন।
তার মানে-আপনি বলতে চান তপন সেন বাসায় ফিরে আসবে, কিম্বা বাসাতেই লুকিয়ে আছে—
‘আসুন আসুন—’ ব্যোমকেশ অগ্রগামী হইয়া সিঁড়ির দিকে চলিল, চিন্তামণিবাবুর দ্বারের সম্মুখে দাঁড়াইয়া বলিল, চিন্তামণিবাবু, আপনি নিৰ্ভয়ে থাকুন। আমরা একবার ও বাড়িতে যাচ্ছি, ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই খুনের কিনারা হয়ে যাবে।
তারপর আমরা সিঁড়ি দিয়ে নামিয়া গেলাম।
তপনের বাসার বুকে-পিঠে পুলিস পাহারা। একটি বিচিত্র ব্যাপার লক্ষ্য করিয়াছি, চোর পালাইলে পুলিসের বুদ্ধি বাড়ে। অপরাধী যখন অপরাধ করিয়া চম্পট দিয়াছে তখন অকুস্থলের চারিপাশে কড়া পাহারা বসাইয়া কী লাভ হয় আমি আজ পর্যন্ত বুঝিয়া উঠিতে পারি নাই।
ব্যোমকেশ গলি দিয়া খিড়কির দরজার দিকে যাইতে বলিল, সদর আর খিড়কির দরজা ছাড়া বাড়ি থেকে পালাবার আর কোনো রাস্তা নেই? পাঁচিল ডিঙিয়ে পালানো যায় না?
দারোগ বিজয়বাবু বলিলেন, না।
খিড়কির দরজায় একজন পাহারাওলা দাঁড়াইয়া আছে, উপরন্তু দরজায় তালা লাগানো। বিজয়বাবুর হুকুমে পাহারাওলা তালা খুলিয়া দিল, আমরা ভিতরে গেলাম।
ছোট্ট এক টুকরা উঠানের গায়ে দুটি ঘর, পাশে রান্নাঘর ও স্নানের ঘর। ব্যোমকেশ বলিল, বিজয়বাবু, আপনি আর অজিত শান্তার কাছে গিয়ে বসুন, আমি স্নানের ঘর আর রান্নাঘর এক নজর দেখে যাই। বলিয়া সে পাশের দিকে চলিল।
আমরা সামনের ঘরে প্রবেশ করিলাম। এটি বসিবার ঘর। বেতের আসবাব দিয়া সাজানো। একটি বেতের চেয়ারে শান্তা উদাস অসহায়ভাবে বসিয়া আছে। চিন্তামণি কুণ্ডু তাহার চেহারার যে বৰ্ণনা দিয়াছিলেন তাহা সত্য; বর্তমানে তাহার মাথার চুলগুলি অবিন্যস্ত; চোখ দুটিও ফুলোফুলো। বোধহয় কান্নাকাটি করিয়াছে।
আমরা ঘরে প্রবেশ করিলে সে মুখ তুলিল। আমাকে লক্ষ্যই করিল না, বিজয়বাবুর দিকে সপ্রশ্ন চক্ষে চাহিল। বিজয়বাবু কিছু বলিলেন না, একটা চেয়ারে উপবেশন করিলেন। আমিও বসিলাম।
তিনজনে নির্বাক বসিয়া আছি। আমি চিন্তা করিতেছি—পুলিসের জেরা শুনিয়া শুনিয়া মেয়েটা ক্লান্ত হইয়া পড়িয়াছে। সে যদি নির্দোষ হয়, স্বামীর অপরাধের সহিত তাহার যদি কোনও সংযোগ না থাকে, তবু তাহার নিষ্কৃতি নাই। কিন্তু তপন ওই লোকটাকে খুন করিল কেন? যৌন ঈষা? শান্তার সঙ্গে ঐ লোকটার কি-?
ব্যোমকেশ শয়নকক্ষ হইতে প্রবেশ করিল; তাহার মুখ হাসি হাসি। সে শান্তার সম্মুখে চেয়ার টানিয়া বসিয়া স্মিতমুখে তাহার পানে চাহিয়া রহিল।
শান্তাও ক্লান্তভাবে তাহার পানে চাহিল, তারপর ধীরে ধীরে তাহার চোখে শঙ্কা ও সতর্কতা ফুটিয়া উঠিল। সে সোজা হইয়া বসিয়া একটু বিহ্বলভাবে বলিল, কী—কী—?
ব্যোমকেশ প্রফুল্ল স্বরে বলিল, আপনার শোবার ঘরে একটা ছোট লোহার সিন্দুক রয়েছে দেখলাম। ওতে কী আছে?
শান্তা বলিল, দারোগীবাবুকে তো বলেছি, কি আছে আমি জানি না। আমার স্বামী সিন্দুকের চাবি নিজের কাছে রাখতেন।
বিজয়বাবু বলিলেন, সিন্দুকের তালা ভাঙবার ব্যবস্থা করেছি।
বেশ বেশ, ওতে অনেক মাল পাবেন; চোরাই মাল, দুপুরে ডাকাতির গয়নাপত্র। —ব্যোমকেশ শান্তার দিকে ফিরিল, আচ্ছা, বলুন দেখি, আপনার স্বামী কি দাড়ি কামাতেন না? বাড়িতে দাড়ি কামানোর সরঞ্জাম নেই।
শান্তার মুখ ফ্যাকাসে হইয়া গিয়াছিল, সে অস্পষ্ট স্বরে বলিল, তিনি সেলুনে দাড়ি কামাতেন।
ব্যোমকেশ বলিল, ও। আপনার স্বামী দেখছি অসামান্য লোক ছিলেন। তিনি সেলুনে দাড়ি কামাতেন, কিন্তু বাড়িতে চটি জুতো পরতেন না। কোনাে কারণ ছিল কি?
শান্তা চক্ষু নত করিয়া বলিল, ওঁর চটি ছিড়ে গিয়েছিল, নতুন চটি কেনা হয়নি। যখন বাড়িতে থাকতেন। আমার চটি পরতেন।
ব্যোমকেশ বলিল, তাই নাকি। আপনাদের দুজনের পায়ের মাপ তাহলে সমান?
শান্তা বলিল, প্ৰায় সমান।
ব্যোমকেশ বলিল, বাঃ! কত সুবিধে! আপনাদের স্বামী-স্ত্রীর দেখছি প্ৰায় সবই সমান, কেবল চুলের রঙ আলাদা। চিন্তামণিবাবু জানিয়েছিলেন তপনের চুলের রঙ তামাটে। ঠিক তো?
শান্তা ঢোক গিলিয়া বলিল, হ্যাঁ।
বিজয়বাবু এতক্ষণ চোখ বাহির করিয়া প্রশ্নোত্তর শুনিতেছিলেন, হঠাৎ উঠিয়া দাঁড়াইয়া তীব্ৰ উত্তেজনার কণ্ঠে বলিলেন, ব্যোমকেশবাবু—!
ব্যোমকেশ হাত তুলিয়া বলিল, দাঁড়ান। তৈরি থাকুন, এবার আমার শেষ প্রশ্ন। —শান্তা দেবি, চিন্তামণিবাবু দেখেছিলেন। আপনার গালে মসুরের মত লাল তিল আছে, সে তিলটা গেল কোথায়?
শান্তা চকিতে নিজের বা গালে হাত দিল, তারপর সামলাইয়া লইয়া বলিল, তিল! আমার গালে তো তিল নেই, চিন্তামণিবাবু ভুল দেখেছেন। হয়তো লাল কালির ছিটে লেগেছিল—
ব্যোমকেশের মুখে হিংস্ৰ হাসি ফুটিয়া উঠিল, সে বলিল, ‘সব প্রশ্নেরই জবাব তৈরি করে রেখেছেন দেখছি। কিন্তু এ প্রশ্নের কি জবাব দেবেন।’ ক্ষিপ্ৰহস্তে সে শান্তার চুল ধরিয়া টান দিল, সঙ্গে সঙ্গে পরচুলা খসিয়া আসিল, ভিতর হইতে ঘাড়ে-ছাঁটা তামাটে রঙের চুল বাহির পড়িল।
শান্তাও বিদ্যুৎবেগে জবাব দিল। একটু অবনত হইয়া সে নিজের ডান পা হইতে শাড়ির প্রান্ত তুলিল। পায়ের সঙ্গে রবারের গার্টার দিয়া আটকানো ছিল একটা লিকলিকে ছুরি। ক্ষিপ্ৰহস্তে ছুরি মুষ্টিতে লইয়া শান্তা ব্যোমকেশের কণ্ঠ লক্ষ্য করিয়া ছুরি চালাইল। আমি ভয়ার্তা সম্মোহিতভাবে শুধু চাহিয়া রহিলাম; একটি স্ত্রীলোকের সুশ্ৰী কোমল মুখ যে চক্ষের নিমেষে। এমন কুশ্রী ও কঠিন হইয়া উঠিতে পারে তাহা কল্পনা করা যায় না।
দারোগা বিজয়বাবু যদি প্ৰস্তুত না থাকিতেন তাহা হইলে ব্যোমকেশের প্রাণ বাঁচিত কিনা সন্দেহ। তিনি বাঘের মত লাফাইয়া পড়িয়া শান্তার কব্জি ধরিয়া ফেলিলেন; ছুরি শান্তার মুষ্টি হইতে স্বলিত হইয়া মাটিতে পড়িল। সে বিষাক্ত চক্ষে ব্যোমকেশের পানে চাহিয়া সৰ্প-তর্জনের মত নিশ্বাস ফেলিতে লাগিল।
ব্যোমকেশ হাসিমুখে উঠিয়া দাঁড়াইল, বিজয়বাবু, এই নিন। আপনার খুনী আসামী, আর এই নিন খুনের অস্ত্ৰ!
বিজয়বাবু একটু দ্বিধাগ্ৰস্তভাবে বলিলেন, কিন্তু চিন্তামণিবাবু বলেছিলেন তপন সেন—
ব্যোমকেশ বলিল, তপন সেনের অস্তিত্ব নেই, বিজয়বাবু। আছেন কেবল অদ্বিতীয় শান্তা সেন; ইনিই রাত্রে তপন সেন, দিনে শান্তা সেনা-সাক্ষাৎ অর্ধনারীশ্বর মূর্তি। মহীয়সী মহিলা ইনি। ভাববেন না যে, বিধুভুষণ আইচকে খুন করাই এর একমাত্র কীর্তি। মাস দুই আগে ইনি বর্ধমান জেলের এক গার্ডকে খুন করে জেল থেকে পালিয়েছিলেন। এঁর আসল নাম আমার জানা নেই; আপনি পুলিসের লোক, ফেরারী কয়েদীর নাম জানতে পারেন।
বিজয়বাবু শান্তার হাত বজ্রমুষ্টিতে ধরিয়া সবর্তুল চোখে তাহার পানে চাহিয়া রহিলেন, চিবাইয়া চিবাইয়া বলিলেন, প্ৰমীলা পাল। এবার সব বুঝেছি। স্বামীকে বিষ খাওয়ানোর জন্যে তোমার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছিল। দু’বছর জেল খাটবার পর তুমি জেলের গার্ডকে খুন করে পালিয়েছিলে। পালিয়ে এখানে এসে একাই স্বামী-স্ত্রী সেজে লুকিয়েছিলে। তারপর সে-রাত্রে বিধুভুষণ তোমাকে দেখতে পায়। বিধুভুষণ তোমাকে চিনতে পেরে তোমার পিছু নিয়েছিল। এইখানে বাড়ির সামনে এসে তুমি তাকে খুন করেছ।
ব্যোমকেশের দিকে চক্ষু ফিরাইয়া বিজয়বাবু বলিলেন, কেমন—এই তো?’
ব্যোমকেশ বলিল, মোট কথা এই বটে।
জমাদার ঘরের বাহিরেই ছিল, প্রবেশ করিল। বিজয়বাবু বলিলেন, হাতকড়া লাগাও।
চিন্তামণিবাবুর ঘরে বসিয়া চা পান করিতে করিতে ব্যোমকেশ বলিল, আপনার চিঠি পড়ে খটকা লেগেছিল, চিন্তামণিবাবু। আপনি ওদের দুজনকে একসঙ্গে কখনাে দেখেননি, দূরবীন লাগিয়েও ওদের বৃহ ভেদ করতে পারেননি। কেন? পুরুষটা বেঁটে, মেয়েটা লম্বা; হরে দরে হাঁটু জল। ওরা সদর দরজা দিয়ে যাতায়াত করে না, খিড়কি দিয়ে আসে যায়; পুরুষটা চেরা-চেরা গলায় কথা বলে। কেন? সন্দেহ হয় যে কোথাও লুকোচুরি চলছে।
কিন্তু বেশি ফলাও করে সব কথা বলবার দরকার নেই। স্থূলভাবে ব্যাপারটা এই—জেল ভেঙে পালাবার পর প্রমীলা পালের দুটো জিনিস দরকার হয়েছিল; ছদ্মবেশ আর রোজগার। তার মাথার চুল তামাটে রঙের, সহজেই দৃষ্টি আকর্ষণ করে; তাই তাকে চুল ছোট পুরুষ সাজতে হল। কিন্তু দুপুরে ডাকাতি করে রোজগার করার জন্য তার মেয়েমানুষ সাজা দরকার, তাই সে একটি সুন্দর বিলিতি পরচুলো যোগাড় করল। কোথায় চুল ছেটেছিল, কোথা থেকে পরচুলো যোগাড় করল আমি জানি না; কিন্তু তার দ্বৈত-জীবন আরম্ভ হল। এখন শীতকাল চলছে, স্ত্রীলোকের পক্ষে পুরুষ সাজার খুব সুবিধা। সে নাকের নীচে একটি ছোট্ট প্রজাপতি-গোঁফ লাগালো, গায়ে কোট-প্যান্টের ওপর ওভারকোট চড়ালো, তারপর আপনার কাছে বাড়ি ভাড়া নিতে এল; পাছে মেয়েলি গলা ধরা পড়ে। তাই আপনার সঙ্গে চেরা-চেরা গলায় কথা কইল। কলকাতা শহরে ছদ্মবেশে থাকার খুব সুবিধা, পাড়াপড়শী কেউ কারুর খবর রাখে না। কিন্তু সে লক্ষ্য করল আপনি সারাক্ষণ জানালার কাছে বসে থাকেন, আপনার বাইনোকুলার আছে। তাকে সাবধান থাকতে হবে।
সে-রাত্রে আপনি শুয়ে পড়বার পর সে নিজের জিনিসপত্র নিয়ে বাড়ি দখল করতে এল। কেউ জানতে পারল না যে মাত্র একজন লোক এসেছে, দুজন নয়। তার সঙ্গে একটা ছোট্ট লোহার সিন্দুক ছিল, সেটা সে শোবার ঘরে রাখল।
তারপর তার দৈনন্দিন জীবনযাত্রা আরম্ভ হল। সকালবেলা সে স্কুলে পড়বার নাম করে বেরিয়ে যায়, দুপুরবেলা ‘দুপুর ডাকাতি’ করার মতলবে ঘুরে বেড়ায়, বিকেলবেলা ফিরে আসে। আবার সন্ধের পর পুরুষ সেজে বেরোয় আপনাকে ধাপ্পা দেবার জন্যে। ঘরের বিদ্যুৎবাতি নিবিয়ে পিদিম জ্বেলে রেখে বেরোয়; তেল ফুরোলে পিদিম নিবে যায়, আপনি ভাবেন শান্তা আলো নিবিয়ে শুয়ে পড়ল। আপনি কেবল একটা ভুল করেছিলেন; ইলেকট্রিক বাতি যে তপন বাড়ি থেকে বেরুবার আগে নেবে সেটা লক্ষ্য করেননি। আপনার মনে সন্দেহ ছিল না। তাই লক্ষ্য করেননি।
যাক, আপনি শুয়ে পড়বার পর সে আবার বাড়িতে ফিরে আসে এবং ঘুমোয়। একটা আলোয়ান সে সম্ভবত ওভারকেটের নীচে কোমরে জড়িয়ে নিয়ে বেরুতো, ফেরবার সময় সেটা গায়ে জড়িয়ে নিত। তাই প্রথম যে-রাত্রে আপনি খড়খড়ি তুলে তাকে ফিরতে দেখলেন, আপনি ভাবলেন সে শান্তার গুপ্ত প্ৰণয়ী।
এইভাবে চলছিল। তারপর প্রমীলার হঠাৎ ভীষণ বিপদ উপস্থিত হল। বিধুভুষণ আইচ পুলিসের কর্মচারী, প্রমীলাকে আগে দেখেছিল, ছুটিতে কলকাতায় এসে সে প্রমীলাকে দেখতে পেল এবং পুরুষের ছদ্মবেশ সত্ত্বেও চিনতে পারল। সে প্রমীলার পিছু নিল। হয়তো কোনো হোটেলে দুজনের দেখা হয়েছিল। প্রমীলা নিশ্চয় তাকে ঝেড়ে ফেলবার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু যখন পারল না, তখন—
বাক্য অসমাপ্ত রাখিয়া ব্যোমকেশ থামিল, সিগারেট বাহির করিয়া ধরাইল। আমি বলিলাম, একটা কথা। বিধুভুষণকে খুন করে প্রমীলা বাড়ি ছেড়ে পালাল না কেন?
ব্যোমকেশ বলিল, পালাবার সময় পেল না। সে তো জানত না যে চিন্তামণিবাবু খড়খড়ি তুলে হত্যাকাণ্ডটা দেখে নিয়েছেন। তাই তার বিশেষ তাড়া ছিল না; ভেবেছিল দামী জিনিসপত্র গয়নাগটি নিয়ে ধীরে সুস্থে পালাবে। কারণ ও বাড়িতে থাকা আর তার পক্ষে নিরাপদ নয়; বাড়ির সামনে লাশ পড়ে আছে, পুলিস নিশ্চয় তাকে জেরা করতে আসবে। প্রমীলা পাল জেল-ভাঙা খুনী আসামী, যদি পুলিসের মধ্যে কেউ তাকে চিনতে পারে? সুতরাং নিশ্চয় সে পালাতো। কিন্তু হঠাৎ পাঁচ মিনিটের মধ্যে পুলিস এসে বাড়ি ঘেরাও করে ফেলল। তখন আর
গালের তিলটা আঁকতে ভুলে গেল।
গালে তিল আঁকতো কেন?
দুটো চেহারায় রকমফের আনবার জন্যে। পুরুষবেশে নাকের নীচে গোঁফ লাগাতো, আর স্ত্রীবেশে পরচুলো ছাড়াও গালে তিল আঁকত। বুঝেছি?—আজ তাহলে উঠি, চিন্তামণিবাবু।
চিন্তামণিবাবু গদগদ ধন্যবাদ সহ একটি দুইশত টাকার চেক লিখিয়া দিলেন। আমরা ফিরিয়া চলিলাম।
বেলা দুটা বাজিতে বিলম্ব নাই। পুলিস আসামীকে লইয়া অন্তৰ্হিত হইয়াছে। এখানে তাহাদের আর প্রয়োজন নাই। শ্ৰীযুক্ত বিজয় ভাদুড়ী মহাশয় খুনী আসামীকে গ্রেপ্তার করিয়া নিশ্চয় প্রচুর প্রশংসা অর্জন করিবেন।
বাসায় পৌঁছিয়া দেখি সত্যবতী দরজার কাছে উৎকণ্ঠিতভাবে দাঁড়াইয়া আছে, আমাদের দেখিয়া ভ্রূ তুলিয়া সপ্রশ্ন নেত্ৰে চাহিল। অর্থাৎ-এত দেরি যে!
ব্যোমকেশ হঠাৎ হো হো শব্দে হাসিয়া উঠিল। তারপর হাত বাড়াইয়া সত্যবতীর চিবুক একটু নাড়িয়া দিয়া বলিল, তোমরাও কম যাও না।
মগ্নমৈনাক
স্বাধীনতা লাভের পর পনেরো বছর অতীত হইয়াছে। সনাতন ভারতীয় আইন অনুসারে আমাদের স্বাধীনতা দেবী সাবালিকা হইয়াছেন, পলায়নী মনোবৃত্তি ত্যাগ করিয়া কঠিন সত্যের সম্মুখীন হওয়ার সময় উপস্থিত। সুতরাং এ কাহিনী বলা যাইতে পারে।
নেংটি দত্ত নামধারী অকালপক্ক বালককে লইয়া কাহিনী আরম্ভ করিতেছি, কারণ সে না থাকিলে এই ব্যাপারের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ ঘটিত না। নেংটি একরকম জোর করিয়াই আমাদের বাসায় আসিয়া ব্যোমকেশের সহিত আলাপ জমাইয়াছিল। অত্যন্ত সংপ্রতিভ ছেলে, নাকে-মুখে কথা, বয়স সতেরো কি আঠারো, কিন্তু চেহারা রোগা-পাটকা বলিয়া আরো কম বয়স মনে হইত। এই বয়সে সে যথেষ্ট বুদ্ধি সংগ্রহ করিয়াছিল, অথচ সেই সঙ্গে একটু ন্যাকা-বোকাও ছিল; একাধারে ছেলেমানুষ এবং এঁচড়ে-পাকা। অল্প পরিচয়ে অত্যন্ত ফাজিল ও ডেপো মনে হইলেও আসলে সে যে মন্দ ছিল না। তাহার পরিচয় আমরা পাইয়াছিলাম। ব্যোমকেশকে সে মনে মনে গভীরভাবে শ্রদ্ধা করিত, কিন্তু তাহার কথা শুনিয়া মনে হইত। ব্যোমকেশের সমস্ত চালাকি সে ধরিয়া ফেলিয়াছে, ব্যোমকেশের চেয়ে তাহার বুদ্ধি অনেক বেশি।
যখনই সে আমাদের বাসায় আসিত, ব্যোমকেশের সঙ্গে অপরাধ-বিজ্ঞান লইয়া পরম বিজ্ঞের মত আলোচনা করিত। ছেলেটা লেখাপড়ায় বহুদিন ইস্তফা দিয়াছে কিন্তু একেবারে অজ্ঞ নয়, ব্যোমকেশ হাসি মুখে তাহাকে আস্কারা দিত। বয়সের ব্যবধান সত্ত্বেও দু’জনের মধ্যে প্রীতি-কৌতুক মিশ্রিত একটা সম্পর্ক গড়িয়া উঠিয়াছিল।
দুচার দিন আনাগোনা করার পর নেংটি হঠাৎ একদিন হাত বাড়াইয়া বলিল, ‘ব্যোমকেশবাবু্, একটা সিগারেট দিন না।’
ব্যোমকেশ বিস্ফারিত চক্ষে চাহিল, তারপর ধমক দিয়া বলিল, ‘এতটুকু ছেলে, তুমি সিগারেট খাও।‘
নেংটি বলিল, ‘পাব কোথায় যে খাব? মাসিমা একটি পয়সা উপুড়-হস্ত করে না, মাঝে-মধ্যে মেসোমশাইয়ের টিন থেকে দুএকটা চুরি করে খাই। তাছাড়া বাড়িতে কি সিগারেট খাওয়ার জো আছে? ধোঁয়ার গন্ধ পেলেই মাসিমা মারমার করে তেড়ে আসে। দিন না একটা।’
ব্যোমকেশ তাহাকে একটা সিগারেট দিল, সে তাহা পরম যত্নে সেবন করিয়া শীঘ্র আবার আসিবার আশ্বাস দিয়া প্রস্থান করিল।
অতঃপর সে যখনই আসিত তাহাকে একটা সিগারেট দিতে হইত।
একদিন নেংটি অত্যন্ত উত্তেজিতভাবে আসিয়া বলিল, ‘জানেন ব্যোমকেশদা, আমাদের বাড়িতে একটা মেয়ে এসেছে, ঠিক বিলিতি মেমের মত দেখতে।’
ব্যোমকেশ কিছুমাত্র বিচলিত না হইয়া বলিল, ‘তাই নাকি।’
নেংটি বলিল, ‘হ্যাঁ, এত সুন্দর মেয়ে আমি আর কখনো দেখিনি। আপনি যদি দেখেন ট্যারা হয়ে যাবেন।’
ব্যোমকেশ বলিল, ‘তাহলে দেখব না। কে তিনি?’
নেংটি বলিল, ‘মেসোমশাইয়ের বন্ধুর মেয়ে। পূর্ববঙ্গে থাকত, হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গায় বাপ-মা মরে গেছে; মেয়েটা কোন মতে প্ৰাণ নিয়ে পালিয়ে এসেছে। মেসোমশাই তাকে আশ্রয় দিয়েছেন, বাড়িতে থাকতে দিয়েছেন। আমারই মত অবস্থা।’
মনে মনে নেংটির মেসোমশাই সন্তোষ সমাদ্দারকে সাধুবাদ করিলাম। তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ পরিচয় না থাকিলেও নেংটির মারফৎ তাঁহার কথা জানিতাম। তিনি খ্যাতিমান ব্যক্তি, তাঁহার রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক কীর্তিকলাপ বাংলাদেশে কাহারও অবিদিত নয়। আমরা তাঁহার পারিবারিক পরিস্থিতির কথাও জানিতাম। বস্তুত, যে কাহিনী লিখিতেছি তাহা সন্তোষবাবুরই পারিবারিক ঘটনা।
ঘটনার পূর্বকালে ও উত্তরকালে এই পরিবারের মানুষগুলি সম্বন্ধে যাহা জানিতে পারিয়াছিলাম, তাহা স্থূলভাবে এখানে লিপিবদ্ধ করিতেছি। আকস্মিক মৃত্যু আসিয়া এই সমৃদ্ধ পরিবারের সহিত আমাদের সংযোগ ঘটাইয়াছিল। আবার আকস্মিক মৃত্যুই নাটকের শেষ অঙ্কে যবনিকা টানিয়া দিয়াছিল। অনেক দিন নেংটিকে দেখি নাই–। কিন্তু যাক।
সন্তোষ সমাদ্দার ধনী ব্যবসায়ী ছিলেন, রাজনীতির ক্ষেত্রে স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন। চৌরঙ্গী হইতে দক্ষিণ দিকে কিছুদূর যাইলে একটি উপ-রাস্তার উপর তাঁহার প্রকাণ্ড দ্বিতল বাগান-ঘেরা বাড়ি। সন্তোষবাবু কিন্তু বাড়িতে কমই থাকিতেন; সারা দিন ব্যবসা-ঘটিত কাজে-কর্মে এবং রাজনৈতিক সভা-সমিতিতে কাটাইয়া সন্ধ্যার পর বাড়ি ফিরিতেন। তাও শনিবার সন্ধ্যার পর তাঁহাকে বাড়ি পাওয়া যাইত না, অফিসের কাজ-কর্ম সারিয়া তিনি এক কীর্তন-গায়িকার গৃহে গান শুনিতে যাইতেন; তারপর একেবারে সোমবার সকালে সেখান হইতে অফিসে যাইতেন। তখন তাঁহার বয়স ছিল আন্দাজ আটচল্লিশ বছর।
তাঁর স্ত্রী চামেলি সমাদ্দার বয়সে তাঁর চেয়ে দুতিন বছরের ছোট। শীর্ণ লম্বা স্নায়ুবিক প্রকৃতির স্ত্রীলোক, যৌবনকালে সন্ত্রাসবাদীদের সহিত যুক্ত ছিলেন। সন্তোষবাবুর সহিত বিবাহের পর কয়েক বছর শান্তভাবে সংসারধর্ম পালন করিয়া ছিলেন, দু’টি যমজ পুত্রসন্তানও জন্সিয়াছিল। ক্রমে তাঁহার চরিত্রে শুচিবাই দেখা দিল, স্বভাব তীক্ষ্ণ ও ছিদ্রান্বেষী হইয়া উঠিল। বাড়িতে মাছ-মাংস রহিত হইল, স্বামীর সহিত এক বাড়িতে থাকা ছাড়া আর অন্য কোন সম্পর্ক রহিল না। এইভাবে গত দশ-বারো বছর কাটিয়াছে।
ইঁহাদের দুই যমজ পুত্র যুগলচাঁদ ও উদয়চাঁদ। বয়স কুড়ি বছর, দু’জনেই কলেজে পড়ে। যমজ হইলেও দুই ভাইয়ের চেহারা ও চরিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত; যুগলচাঁদের ছিপছিপে চেহারা, তরতরে মুখ; উদয়চাঁদ একটু গ্যাঁটা-গোটা ষণ্ডা-গুণ্ডা ধরনের। যুগলচাঁদ ঠাণ্ডা মেজাজের ছেলে; লেখাপড়ায় ভাল, লুকাইয়া কবিতা লেখে। উদয় দাম্ভিক ও দুদন্তি, সকলের সঙ্গে ঝগড়া করে, মায়ের ইচ্ছার বিরুদ্ধে হোটেলে গিয়া মুর্গী খায়। শ্ৰীমতী চামেলি তাহাকে শাসন করিতে পারেন না, কিন্তু মনে মনে বোধহয় দুই ছেলের মধ্যে তাঁহাকেই একটু বেশি ভালবাসেন।
এই চারজন ছাড়া আরো তিনটি মানুষ বাড়িতে থাকে। প্রথমত, নেংটি ও তাহার ছোট বোন চিংড়ি। বছর দুই আগে তাঁহাদের মাতা পিতা একসঙ্গে কলেরা রোগে মারা গিয়াছিলেন, নেংটি ও চিংড়ি অনাথ হইয়া পড়িয়াছিল। শ্ৰীমতী চামেলি তাঁহাদের সাক্ষাৎ মাসি নন, কিন্তু তিনি তাহাদের নিজের কাছে আনিয়া রাখিয়াছিলেন; সেই অবধি তাহারা এখানেই আছে। নেংটির পরিচয় আগেই দিয়াছি, চিংড়ি তাহার চেয়ে তিন-চার বছরের ছোট। তাহার চেহারাটি ছোটখাটো, মোটের উপর সুশ্ৰী; এই বয়সেই সে ভারি বুদ্ধিমতী ও গৃহকর্মনিপুণা হইয়া উঠিয়াছে। মাসিমা শুচিবাই-এর জন্য অধিকাংশ সময় কল-ঘরে থাকেন, চিংড়িই সংসার চালায়। যুগলচাঁদ তাহার নাম দিয়াছে কুচোচিংড়ি।
তৃতীয় যে ব্যক্তিটি বাড়িতে থাকেন তাঁহার নাম রবিবর্মা। পুরা নাম বোধকরি রবীন্দ্রনাথ বর্মণ; কিন্তু তিনি রবিবর্মা নামেই সমধিক পরিচিত। দীর্ঘ কঙ্কালসার আকৃতি; মুখের ডৌল, চোখের বক্রতা এবং গোঁফ-দাড়ির অপ্রতুলতা দেখিয়া ত্রিপুরা অঞ্চলের সাবেক অধিবাসী বলিয়া সন্দেহ হয়; বয়স আন্দাজ চল্লিশ। ইনি সন্তোষবাবুর একজন কর্মচারী, তাঁহার রাজনীতি-ঘটিত ক্রিয়াকলাপের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি। নিজের সংসার না থাকায় তিনি সন্তোষবাবুর গৃহেই থাকেন, বাড়ির একজন হইয়া গিয়াছেন; প্রয়োজন হইলে বাড়ির কাজকর্মও দেখাশোনা করেন।
এই সাতটি মানুষের সংসারে হঠাৎ যেদিন একটি অপরূপ সুন্দরী যুবতীর আবির্ভাব ঘটিল, সেদিন মৃত্যু-দেবতার মুখে যে কুটিল হাসি ফুটিয়াছিল তাহা কেহ দেখিতে পায় নাই। নেংটি প্রথম দিনই আসিয়া যুবতীর আবিভাবের খবর দিয়াছিল; তারপর যতবারই আসিয়াছে মশগুল হইয়া যুবতীর প্রসঙ্গ আলোচনা করিয়াছে, পরিবারের মধ্যে যে আকর্ষণ-বিকর্ষণের প্রবল আবহ সৃষ্টি হইয়াছিল তাহার বর্ণনা করিয়াছে। শুনিতে শুনিতে আমার মনে হইয়াছে নেংটিদের সংসারে একটি দুর্যোগ ঘনাইয়া আসিতেছে, কিন্তু তাহা যে এমন মারাত্মক আকার ধারণ করিবে তাহা কল্পনা করি নাই।
যুবতীর আবিভবের মাস ছয়েক পরের কথা। দুৰ্গাপূজা শেষ হইয়া কালীপূজার তোড়জোড় আরম্ভ হইয়াছে, এই সময় একদিন সন্ধ্যার পর ব্যোমকেশ আমাদের বসিবার ঘরে আলো জ্বালিয়া একমনে রামায়ণ পড়িতেছিল। রাজশেখর বসু মহাশয় মূল বাল্মীকি রামায়ণের চুল ছটিয়া দাড়ি-গোঁফ কামাইয়া তারতরে ঝরঝরে করিয়া দিয়াছেন, ব্যোমকেশ কর্মহীন দিবসের আলুনি প্রহরগুলি তাহারই সাহায্যে গলাধঃকরণ করিবার চেষ্টা করিতেছিল। আমি তক্তপোশে চিৎ হইয়া অলসভাবে এলোমেলো চিন্তা করিতেছিলাম। সাম্প্রতিক শারদীয়া পত্রিকায় যে কয়টি রচনা পড়িয়াছি, তাহা হইতে মনে হয় বাঙালী লেখক বাংলা ভাষা লিখিতে ভুলিয়া গিয়াছেন; রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে আমরা যেমন স্বাধীনতা পাইয়াছি, ভাষার ক্ষেত্ৰেও তেমনি-শাসনহীন অবাধ স্বৈরাচার.মানুষের মন আজ উন্মাৰ্গগামী, জলে-স্থলে-আকাশে সর্বত্র সে ধৃষ্টতা করিয়া বেড়াইতেছে…আজ সকালে সংবাদপত্রে দেখিলাম একটা এরোপ্লেন চাটগাঁ হইতে কলকাতা আসিতেছিল, বানচাল হইয়া সমুদ্রে ডুবিয়াছে. পাকিস্তান এয়ার লাইনসের প্লেন—একটি লোকও বাঁচে নাই, মৃতদেহের দীর্ঘ ফিরিস্তি বাহির হইয়াছে…আমরা আকাশচারী হইয়া উঠিয়াছি, মাটিতে আর পা পড়ে না…কবি সত্যেন দত্ত এরোপ্লেন সম্বন্ধে লিখিয়াছেন, ‘উদ্গত-পাখা জাঁদরেল পিপীলিকা’–উপমাটা ভারি চমকপ্রদ।
‘পাৰ্বতীর দাদার নাম জানো?’
তক্তপোশে উঠিয়া বসিলাম। ব্যোমকেশ রামায়ণ রাখিয়া সিগারেট ধরাইতেছে। বলিলাম, ‘পার্বতীর দাদা! কোন পার্বতী?
ব্যোমকেশ ধোঁয়া ছাড়িয়া বলিল, ‘মহাদেবের পার্বতী, হিমালয়-কন্যা পার্বতী।’
‘ও, বুঝেছি। পার্বতীর দাদা ছিল নাকি?’
‘ছিল।’ ব্যোমকেশ তর্জনি তুলিয়া বক্তৃতার ভঙ্গীতে বলিতে আরম্ভ করিল, ‘তার নাম মৈনাক পর্বত। সেকালে পাহাড়দের পাখনা ছিল, উড়ে উড়ে বেড়াতো, যখন ইচ্ছে নগর-জনপদ প্রভৃতি লোকালয়ের ওপর গিয়ে বসতো। নগর-জনপদের কী অবস্থা হত বুঝতেই পারছি। দেখে-শুনে দেবরাজ ইন্দ্র চটে গেলেন, বজ্র নিয়ে বেরুলেন। পৃথিবীর যেখানে যত পাহাড় পর্বত আছে, বজ্র দিয়ে সকলের পাখনা পুড়িয়ে দিলেন। কেবল হিমালয়-পুত্র মৈনাক পালানো, সেতুবন্ধ রামেশ্বরে গিয়ে সমুদ্রে ডুবে রইল। সেই থেকে মৈনাক সমুদ্রের তলায় আছে, মাঝে মাঝে নাক বার করে, আবার ডুব মারে। অনেকটা ফেরারী আসামীর মত অবস্থা।’
জিজ্ঞাসা করিলাম, ইন্দ্র এত বড় দেবতা, তিনি মৈনাককে ধরতে পারলেন না?’
ব্যোমকেশ বলিল, ‘ইন্দ্র দেবরাজ ছিলেন বটে, কিন্তু সত্যান্বেষী ছিলেন না। তাছাড়া, তিনি প্রচণ্ড মাতাল এবং লম্পট ছিলেন।’
প্রচণ্ড মাতাল এবং লম্পট হওয়া সত্ত্বেও ইন্দ্র দেবতাদের রাজা হইলেন কি করিয়া ভাবিতেছি, এমন সময় পাশের ঘরে কিড়িং কিড়িং। শব্দে টেলিফোন বাজিয়া উঠিল। অনেকদিন এমন মধুর আওয়াজ শুনি নাই; মনটা নিমেষে উৎফুল্ল হইয়া উঠিল। নিশ্চয় কেহ বিপদে পড়িয়া ব্যোমকেশের শরণাপন্ন হইয়াছে। ব্যোমকেশ চেয়ার ছাড়িয়া উঠিবার আগেই আমি তড়াক করিয়া গিয়া ফোন ধরিলাম। বিপন্ন শরণার্থীকে দাঁড় করাইয়া রাখা ঠিক নয়।
ফোনে নেংটির গলা শুনিয়া একটু দমিয়া গিয়াছিলাম, তারপর তাহার বাতা শুনিয়া আবার চাঙ্গা হইয়া উঠিলাম। নেংটি বলিল, ‘অজিতবাবু্, শীগগির ব্যোমকেশদাকে নিয়ে আসুন। হেনা মল্লিক মরে গেছে।’
হেন মল্লিক, অর্থাৎ সেই অপূর্ব সুন্দরী যুবতী। উত্তেজিত হইয়া বলিলাম, ‘মরে গেছে। কী হয়েছিল?’
নেংটি বলিল, ‘তেতলার ছাদ থেকে পড়ে গিয়ে মরে গেছে। পুলিস এসেছে। মেসোমশাই বাড়ি নেই-আজ শনিবার—আপনারা শীগগির আসুন।’
ব্যোমকেশ আসিয়া আমার হাত হইতে টেলিফোন লইল, বলিল, ‘কে, নেংটি! কী হয়েছে?’
সে কিছুক্ষণ ধরিয়া শুনিল, তারপর–’আচ্ছা-দেখি’–বলিয়া টেলিফোন রাখিয়া দিল। আমরা বসিবার ঘরে ফিরিয়া আসিলাম। ঘড়িতে তখন সাতটা বাজিয়া পঁয়ত্ৰিশ মিনিট হইয়াছে।
ব্যোমকেশ ভ্রূ কুঞ্চিত করিয়া পায়চারি করিতে লাগিল। আমি কিছুক্ষণ তাহাকে নিরীক্ষণ করিয়া বলিলাম, যাবে কি না ভাবছ?’
সে বলিল, ‘যাওয়া উচিত কি না ভাবছি। গৃহস্বামী ডাকেননি, হয়তো ব্যাপারটা অপঘাত ছাড়া আর কিছুই নয়; এ অবস্থায় নেংটির ডাক শুনে যাওয়া উচিত হবে কি?’
আমি বিবেচনা করিয়া বলিলাম, ‘গৃহস্বামী বাড়ি নেই। আর যারা আছে তারা ছেলেমানুষ। বাড়িতে পুলিস এসেছে। নেংটিকে হয়তো তার মাসিম আমাদের কাছে খবর পাঠাতে বলেছেন। এ ক্ষেত্রে পারিবারিক বন্ধু হিসেবে আমরা যদি যাই, খুব অন্যায় হবে কি?’
ব্যোমকেশ আরো কিছুক্ষণ ভ্রূকুটি করিয়া থাকিয়া বলিল, ‘তা বটে। চল তবে বেরুনো যাক।’
সন্তোষবাবুর বাড়িতে পৌঁছিলাম সাড়ে আটটা নাগাদ। ফটকের দেউড়িতে কেহ নাই। বাড়িটা অন্ধকারে দেখা গেল না, কেবল বাড়ির বহিভাগে দেওয়ালের গায়ে ভারা বাঁধা হইয়াছে চোখে পড়িল। বোধহয় দেওয়ালির আগে মেরামত ও চুনকামের কাজ চলিতেছে।
বাড়িতে প্রবেশ করিলেই বড় একটি সাজানো হল-ঘর, মাথার উপর চার-পাঁচটা তীব্র বৈদ্যুতিক বালব ঘরটিকে দিনের মত উজ্জ্বল করিয়া তুলিয়াছে। ঘরের মাঝামাঝি স্থানে একটু নীচু গোল টেবিল, তাহাকে ঘিরিয়া কয়েকটা চেয়ার এবং সোফা। আমরা ঘরে উপস্থিত হইয়া দেখিলাম সেখানে আট-দশ জন পুরুষ রহিয়াছেন, তাহাদের মধ্যে অধিকাংশই ইউনিফর্ম-পরা পুলিস।
আমরা প্রবেশ করিলাম কেহ লক্ষ্য করিল না। একজন ইন্সপেক্টর টেবিলের সামনে বসিয়া নত হইয়া ডায়েরিতে কিছু লিখিতেছিলেন, বাকি সকলে টেবিল ঘিরিয়া দাঁড়াইয়া ছিল; সকলের
তাহাদের মধ্যে নেংটিকে চিনিতে পারিলাম। বাকি তিনজনের মধ্যে একজন যে সেক্রেটারি রবিবর্মা তাহা তাহার মঙ্গোলীয় মুখ দেখিয়া সহজেই বোঝা যায়। অবশিষ্ট দুইজন অল্পবয়স্ক যুবক, সুতরাং নিশ্চয় যুগলচাঁদ ও উদয়চাঁদ। দু’জনের মুখেই শক-খাওয়া জবুথবু ভাব, এখনো প্রতিক্রিয়া আরম্ভ হয় নাই।
আমরা প্রবেশ করিয়া দ্বারের কাছে দাঁড়াইলাম। ব্যোমকেশ একবার ঘরের চারিদিকে চক্ষু ফিরাইল। বাঁ দিকে আসবাব কিছু নাই, কেবল দূরের কোণে উচু টিপয়ের উপর টেলিফোন, মাঝখানে গোল টেবিল ঘিরিয়া কয়েকজন লোক, ডান দিকে প্ৰায় দেওয়ালের কাছে সাদা কাপড়-ঢাকা একটি মূর্তি মেঝোয় পড়িয়া আছে; তাহার ওপারে দ্বিতলে উঠিবার সিঁড়ির নিম্নতম ধাপে দুইটি স্ত্রীলোক ঘেঁষাৰ্ঘেষি হইয়া বসিয়া আছে; নিশ্চয় শ্ৰীমতী চামেলি ও চিংড়ি। তাঁহাদের চোখে অবিমিশ্র বিভীষিকা; তাঁহারা চাদর-ঢাকা মৃতদেহের পানে চাহিতেছেন না, একদৃষ্টি ঘরের মাঝখানে সমবেত মানুষগুলির পানে চাহিয়া আছেন।
ব্যোমকেশও এক নজরে সব দেখিয়া লইয়া সেইদিকেই অগ্রসর হইল, টেবিলের সম্মুখস্থ হইয়া বলিয়া উঠিল, ‘আরো! এ কে রে!’
ইন্সপেক্টর ডায়েরি হইতে মুখ তুলিলেন; অন্য সকলে ঘাড় ফিরাইয়া চাহিল। ইন্সপেক্টর ডায়েরি বন্ধ করিয়া ব্যোমকেশের সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইলেন, হাত বাড়াইয়া দিয়া বলিলেন, ‘ব্যোমকেশ! তুমি কোত্থেকে?’
ব্যোমকেশ তাঁহার হাতে হাত মিলাইল, কিন্তু প্রশ্নের উত্তর দিল না; আমার সহিত পরিচয় করাইয়া দিল। জানিতে পারিলাম, ইহার নাম অতুলকৃষ্ণ রায়, সংক্ষেপে এ কে রে। কলেজে ব্যোমকেশের সহাধ্যায়ী ছিলেন, এখন কলিকাতায় আছেন। আমার সহিত ইতিপূর্বে দেখা না হইলেও ব্যোমকেশের সহিত কলে-ভদ্রে দেখাশোনা হয়। পরে জানিতে পারিয়াছিলাম, খুব আমুদে লোক, কিন্তু কাজের সময় গম্ভীর ও মিতভাষী।
ব্যোমকেশ বলিল, ‘ব্যাপার কি? শুনলাম একটি মেয়ের মৃত্যু হয়েছে!’
‘হ্যাঁ।’ কিছুক্ষণ নত-চক্ষে চিন্তা করিয়া এ কে রে বলিলেন, ‘এস, তোমাকে বলছি।’
আমরা দল হইতে একটু দূরে সরিয়া গিয়া দাঁড়াইলাম, এ কে রে অল্প কথায় ঘটনা বিবৃত করিলেন।–তিনি এখন এই এলাকার থানার দারোগা। আজ সন্ধ্যা সাতটা বাজিতে দশ মিনিটে তিনি টেলিফোনে খবর পান যে, সন্তোষবাবুর বাড়িতে একটি অপঘাত মৃত্যু ঘটিয়াছে; ফোন করিয়াছিলেন। সেক্রেটারি রবিবর্মার্ণ। এ কে রে তৎক্ষণাৎ লোকজন লইয়া উপস্থিত হইলেন। বাড়ির পশ্চিমদিকে, যেদিকে ভারা বাঁধা হয় নাই, সেইদিকে বাড়ির ঠিক ভিতের কাছে মৃত্যু যুবতীর দেহ পাওয়া গিয়াছে। এ কে রে পুলিস ডাক্তারকে সঙ্গে আনিয়াছিলেন, ডাক্তার পরীক্ষা করিয়া বলিলেন, উচ্চ স্থান হইতে পতনের ফলে ঘাড়ের কশেরু ভাঙিয়া মৃত্যু হইয়াছে, মৃত্যুর কাল অনুমান একঘন্টা আগে, অর্থাৎ সাড়ে ছাঁটার সময়। এ কে রে তখন তিনতলার খোলা ছাদে গিয়া দেখিলেন, ছাদের মাঝখানে একটি ছোট মাদুরের আসন পাতা রহিয়াছে, তার পাশে এক জোড়া মেয়েলি চপ্পল। খবর লইয়া তিনি জানিতে পারিলেন যে, মেয়েটি প্রত্যহ সূৰ্য্যস্তের সময় ছাদে আসিয়া বসিত। সন্দেহ রহিল না যে আজও মেয়েটি ছাদে গিয়াছিল এবং ছাদ হইতে পড়িয়া মরিয়াছে।
বিবৃতি শেষ করিয়া এ কে রে পুনশ্চ প্রশ্ন করিলেন, ‘কিন্তু তোমাকে খবর দিল কে?’
ব্যোমকেশ নেংটির দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া বলিল, ‘ওই ছেলেটি। ওর নাম নেংটি দত্ত। ও আমার কাছে যাতায়াত করে। বোধহয় ঘাবড়ে গিয়ে আমাকে ফোন করেছিল।’
নেংটি কিছু দূরে দাঁড়াইয়া আমাদের দিকেই তাকাইয়াছিল, এ কে রে কিছুক্ষণ তাহাকে নিবিষ্ট চক্ষে নিরীক্ষণ করিয়া বলিলেন, ‘হুঁ। তা, তুমি এখন কি করতে চাও?’
ব্যোমকেশ বলিল, ‘কি আর করব। নেহাৎ পারিবারিক বন্ধু হিসেবেই এসেছি, সত্যান্বেষী হিসেবে নয়। তোমার কী মনে হচ্ছে? অপঘাত মৃত্যু?
এ কে রে বলিলেন, ‘অ্যাকসিডেন্টই মনে হচ্ছে। তবে—’ তিনি বাক্যটি অসমাপ্ত রাখিয়া দিলেন, তাঁহার চোখে একটু হাসির আভাস দেখা দিল।
ব্যোমকেশ ঘাড় নাড়িল। বলিল, ‘বাড়ির সকলের জবানবন্দী নিয়েছ?’
এ কে রে বলিলেন, ‘হ্যাঁ। কেবল গৃহস্বামীকে এখনো পাইনি। তিনি কোথায় তাও কেউ সুপ্রিয় না। শুনলাম উইক এন্ডএ তিন বাড়ি থাকেন না।‘ আবার তাঁহার চোখের মধ্যে হাসি ফুটিল।
ব্যোমকেশ বলিল, ‘জবানবন্দীর নকল তৈরি হলে আমাকে এক কপি দেবে?’
এ কে রে বলিলেন, ‘দেব। কাল বিকেলে পাবে। লাশ দেখতে চাও?’
ব্যোমকেশ বলিল, ‘দেখতে পারি। ক্ষতি কি?’
যেখানে চাদর-ঢাকা মৃতদেহ পড়িয়াছিল। এ কে রে আমাদের সেখানে লইয়া গেলেন, চাদরের খুঁট ধরিয়া চাদর সরাইয়া দিলেন। আত্মজ্জ্বল আলোকে মৃত্যু হেনা মল্লিককে দেখিলাম।
সে রূপসী ছিল বটে, নেংটি মিথ্যা বলে নাই। গায়ের রঙ দুধে আলতা, ঘন সুকৃষ্ণ চুল অবিন্যস্ত হইয়া যেন মুখখানিকে আরো ঘনিষ্ঠ কমনীয় করিয়া তুলিয়াছে, ভুরু দু’টি তুলি দিয়া আকা। চক্ষু অর্ধ-নিমীলিত, গাঢ়-নীল চোখের তারা অর্ধেক দেখা যাইতেছে, দেহে ভরা যৌবনের উচ্ছলিত প্রগলভতা। মৃত্যু তাহার প্রাণটুকুই হরণ করিয়া লইয়াছে, দেহে কোথাও আঘাতচিহ্ন রাখিয়া যায় নাই, যৌবনের লাবণ্য তিলমাত্র চুরি করিতে পারে নাই। এই দেহ দুদিনের মধ্যে পুড়িয়া ছাই হইয়া যাইবে ভাবিতেও কষ্ট হয়।
আমরা মন্ত্রমুগ্ধ হইয়া দেখিতেছি, হঠাৎ পিছন দিকে শব্দ শুনিয়া ঘাড় ফিরাইলাম। যুগল ও উদয় আমাদের পিছনে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে। উদয়ের চক্ষু রক্তবর্ণ, দুই হাত মুষ্টিবদ্ধ, সে যুগলের দিকে ফিরিয়া গর্জন করিয়া উঠিল, ‘যুগল, তুই হেনাকে মেরেছিস।’
যুগল আগুন-ভরা চোখ তুলিয়া উদয়ের পানে চাহিল, শীর্ণ কঠিন স্বরে বলিল, ‘আমি—হেনাকে-মেরেছি! মিথ্যেবাদী! তুই মেরেছিস।’
এক মুহুর্ত বিলম্ব হইলে বোধকরি দুই ভাইয়ের মধ্যে শুম্ভ-নিশুম্ভের যুদ্ধ বাধিয়া যাইত। কিন্তু সিঁড়ির উপর উপবিষ্ট দু’টি স্ত্রীলোকই তাহা হইতে দিল না। শ্ৰীমতী চামেলি এবং চিংড়ি একসঙ্গে ছুটিয়া আসিয়া তাঁহাদের মাঝখানে দাঁড়াইলেন। চামেলি উদয়ের বুকে দু’হাত রাখিয়া তাহাকে ঠেলিয়া দিতে দিতে তীক্ষ্ণ ভাঙা-ভাঙা গলায় বলিলেন, হতভাগা! এসব কী বলছিস তুই! চলে যা এখান থেকে, নিজের ঘরে যা। হেনাকে কেউ মারেনি, ও নিজে ছাদ থেকে পড়ে মরেছে।’
ওদিকে চিংড়ি যুগলের হাত চাপিয়া ধরিয়া ব্যগ্র-হ্রস্ব কণ্ঠে বলিতেছে, ‘দাদা, দু’টি পায়ে পড়ি, চলে এস, এখানে থেকে না। চল তোমার শোবার ঘরে-লক্ষ্মীটি!’
যুদ্ধ থামিল বটে, কিন্তু দু’জনের কেহই ঘর ছাড়িয়া গেল না, রক্তিম চক্ষে পরস্পরকে নিরীক্ষণ করিতে লাগিল।
ব্যোমকেশ বা পুলিসের লোকেরা কেহই এই সহসা-স্ফরিত কলহ নিবারণের চেষ্টা করে নাই, সম্পূর্ণ নির্লিপ্তভাবে দাঁড়াইয়া দেখিতেছিল। তাঁহাদের ভাব দেখিয়া মনে হয় তাহারা প্রতীক্ষ্ণ করিতেছে এই ঝগড়ার সূত্রে যদি কোন গুপ্তকথা প্রকাশ হইয়া পড়ে। কিন্তু ঝগড়া যখন অর্ধপথে বন্ধ হইয়া গেল তখন এ কে রে উদয়ের কাছে গিয়া বলিলেন, ‘আপনি এখনি অভিযোগ করলেন যে, আপনার ভাই হেনাকে মেরেছে। এ অভিযোগের কোন ভিত্তি আছে কি?’
উদয় উত্তর দিল না, গোঁজ হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল। শ্ৰীমতী চামেলি তীব্রদূষ্টিতে ইন্সপেক্টরের দিকে চাহিলেন, কিন্তু তিনি কোন কথা বলিবার পূর্বেই হঠাৎ ঘরের আবহাওয়া যেন মন্ত্রবলে পরিবর্তিত হইল।
সদর দরজার সামনে একটি আধাবয়সী ভদ্রলোক আসিয়া দাঁড়াইয়াছেন। মধ্যমাকৃতি মানুষ, একটু ভারী গোছের গড়ন, কিন্তু মোটা নয়; মুখে লালিত্য না থাক, দৃঢ়তা আছে। বেশভূষা একটু শৌখিন ধরনের, গিলেকরা পাঞ্জাবি ও কোঁচানো থান-ধুতির নীচে সাদা চামড়ার বিদ্যাসাগরী চটি। খবরের কাগজে তাঁহার অজস্র ছবি দেখিয়াছি; সুতরাং সন্তোষ সমাদ্দারকে চিনিতে কষ্ট হইল না। কিন্তু ছবিতে যাহা পাই নাই তাহা এখন পাইলাম, লোকটির একটি প্রবল ব্যক্তিত্র আছে, তিনি যেখানে উপস্থিত আছেন সেখানে তিনিই প্রধান, অন্য কেহ সেখানে কলকে পায় না।
তাঁহাকে দেখিয়া শ্ৰীমতী চামেলি বাঙুনিস্পত্তি করিলেন না, দ্রুতপদে সিঁড়ি দিয়া উপরে চলিয়া সুন্ন ক্ষক পরে উন্নয়ও উপরে চলিয়া গেল। বাকি সকলে যেমন ছিল তেমনি দাঁড়াইয়া রহিল।
আমি যখন সন্তোষবাবুকে দেখিলাম তখন তিনি দ্বারের কাছে দাঁড়াইয়া নির্নিমেষ চক্ষে ভূমি-শায়িত মৃতদেহের পানে চাহিয়া আছেন। কোন দিকে লক্ষ্য না করিয়া তিনি মৃতের পায়ের কাছে আসিয়া দাঁড়াইলেন। চাহিয়া চাহিয়া তাঁহার মুখের পেশীগুলি কঠিন হইয়া উঠিল, চোখের দৃষ্টি একবার বাষ্পাচ্ছন্ন হইয়া আবার পরিষ্কার হইল। তিনি কাহাকেও সম্বোধন না করিয়া ধীরে ধীরে বলিলেন, ‘যাক, বাপ-মা-মেয়ে সবাই অপঘাতে গেল! আশ্চর্য ভবিতব্য।’
আশ্রিতা বন্ধুকন্যার মৃত্যুতে তিনি শোকে অভিভূত হইবেন কেহ প্রত্যাশা করে নাই, তবু তাঁহার এই অটল সংযমের জন্যও প্রস্তুত ছিলাম না; একটু বেশি নীরস ও কঠিন মনে হইল। যাহোক, তিনি মৃতদেহ হইতে চক্ষু তুলিয়া একে একে আমাদের দিকে দৃষ্টি ফিরাইলেন।
ব্যোমকেশ একটু অপ্রস্তুতভাবে গলা-ঝাড়া দিয়া বলিল, ‘অনাহূত অতিথি বলতে পারেন। আমার নাম ব্যোমকেশ বক্সী, ইনি আমার বন্ধু অজিত বন্দ্যোপাধ্যায়। আমাদের আপনি চেনেন না, কিন্তু নেংটি—‘
সন্তোষবাবু বলিলেন, না চিনলেও নাম জানি। নেংটি আপনাদের ডেকে এনেছে? তিনি নেংটির দিকে চক্ষু ফিরাইলেন।
নেংটি পিছনে দাঁড়াইয়াছিল, শঙ্কিত কণ্ঠে বলিল, ‘আমি-মাসিমা খুব ভয় পেয়েছিলেন—’
‘বেশ করেছ তুমি ব্যোমকেশবাবুকে খবর দিয়েছ। বিপদের সময় বন্ধুর কথাই আগে মনে পড়ে।’ তাঁহার কণ্ঠস্বরে প্রসন্নতার আভাস পাওয়া গেল, তিনি ব্যোমকেশের দিকে ফিরিয়া বলিলেন, ‘নেংটি বুঝি আপনার বন্ধু?
ব্যোমকেশ বলিল, ‘বলতে পারেন।’
সন্তোষবাবু বলিলেন, ‘ভাল ভাল।’ এ কে রে’কে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, ‘আপনার কাজ কি শেষ হয়েছে?’
এ কে রে বলিলেন, ‘আর সব কাজই শেষ হয়েছে, লাশ চালান দিয়েই আমরা চলে যাব।’
কথাটা বোধহয় সন্তোষবাবুর মনে আসে নাই, তিনি থমকিয়া বলিলেন, ‘ঠিক তো। পোস্ট-মর্টেম করতে হবে।’ তিনি একবার চকিতের জন্য মৃতদেহের পানে দৃষ্টি ফিরাইয়া বলিলেন, ‘আমার কিছু বলবার নেই, আপনার যা কর্তব্য তাই করুন।’
তিনি সিঁড়ির দিকে পা বাড়াইলে এ কে রে বলিলেন, ‘যদি আপত্তি না থাকে, আপনাকে দুচারটে প্রশ্ন করতে চাই।’
সন্তোষবাবু থামিয়া গিয়া বলিলেন, ‘আপত্তি কিসের? আপনারা বসুন, আমি এখনি আসছি। রবি, এঁদের খাবার-ঘরে বসাও। আর চিংড়ি, তুমি এঁদের জন্যে চা-জলখাবারের ব্যবস্থা কর।’
তিনি উপরে চলিয়া গেলেন। রবিবামী সামনে আসিয়া বলিল, ‘আপনারা আসুন আমার সঙ্গে।’
এ কে রে একজন অফিসারকে মৃতদেহের কাছে দাঁড় করাইয়া রবিবর্মার অনুসরণ করিলেন, আমরাও তাঁহার সঙ্গে চলিলাম।
পাঠকের সুবিধার জন্য এইখানে বাড়ির একটি প্ল্যান দেওয়া হইল।
সন্তোষবাবুর ভোজন-কক্ষটি বেশ বড়, লম্বা টেবিলে বারো-চৌদ্দ জন একসঙ্গে বসিয়া আহার করিতে পারে। আমরা গিয়া চেয়ারগুলিতে উপবিষ্ট হইলাম। লক্ষ্য করিলাম, যুগলচাঁদ, নেংটি ও চিংড়ি আমাদের সঙ্গে আসে নাই। রবিবর্মা বসিল না, কর্তার আগমনের প্রতীক্ষ্ণয় দ্বারের কাছে দাঁড়াইয়া রহিল।
এ কে রে’র পাশের চেয়ারে ব্যোমকেশ বসিয়াছিল, জিজ্ঞাসা করিল, ‘হেন মল্লিকের ঘরটা দেখেছি নাকি?’
এ কে রে বলিলেন, ‘মোটামুটি দেখেছি! অতি সাধারণ একটা শোবার ঘর। আসবাবপত্রও বেশি কিছু নেই।’
ব্যোমকেশ বলিল, ‘চিঠিপত্র?’
এ কে রে বলিলেন, ‘এখনও ভাল করে দেখা হয়নি। যাবার আগে আর একবার দেখে যাব। তুমি দেখবে?
‘দেখব।’
এই সময় যে অফিসারটি লাশ পাহারা দিতেছিল, সে আসিয়া এ কে রোর কানের কাছে খাটো গলায় বলিল, ‘ভ্যান এসেছে, লাশ রওনা করে দেব?
এ কে রে বলিলেন, ‘দাও।’
অফিসার চলিয়া গেল। আমরা নিস্তব্ধ বসিয়া রহিলাম। খোলা দ্বারের কাছে দাঁড়াইয়া রবিবর্মা হল-ঘরের দিকে অপলক চাহিয়া ছিল, আমরা তাহার চক্ষু দিয়াই যেন মৃতদেহ স্থানান্তরণের কার্যটা দেখিতে পাইলাম। ক্ষণেকের জন্য তাহারা মঙ্গোলীয় চোখে একটা ক্ষুধিত অতৃপ্ত লালসা দেখা দিয়াই মিলাইয়া গেল। এই পলকের দৃষ্টি জানাইয়া দিয়া গেল, সেক্রেটারি রবিবর্মার মন হেনা সম্বন্ধে সম্পূর্ণ নিরাসক্ত ছিল না।
তারপর সন্তোষবাবু আসিয়া টেবিলের শীর্ষস্থিত চেয়ারে বসিলেন। তিনি শৌখিন কেশ-বাস ত্যাগ করিয়া মামুলি আটপৌরে জাম-কাপড় পরিয়াছেন। উপবেশন করিয়া বলিলেন, ‘রবি, সিগারেট নিয়ে এস।’
রবিবর্মা তাড়াতাড়ি সিগারেট আনিতে গেল, সন্তোষবাবু এ কে রে’র পানে চাহিয়া বলিলেন, ‘আপনি বোধহয় হেনা সম্বন্ধে আমাকে প্রশ্ন করতে চান? দুঃখের বিষয়, তার কথা আমি বিশেষ কিছু জানি না। মেয়েটাকে আশ্রয় দিয়েছিলাম বটে, কিন্তু তাকে ভাল করে জানিবার সুযোগ হয়নি। একে তো আমি বাড়িতে কম থাকি, তাছাড়া হেনাও খুব মিশুকে মেয়ে ছিল না। যাহোক—‘
রবিবর্মা সিগারেটের কৌটা ও দেশলাই আনিয়া সন্তোষবাবুর সম্মুখে রাখিল, তিনি কৌটার ঢাকা খুলিয়া আমাদের সম্মুখে ধরিলেন—’আসুন।’ সিগারেট লাইতে লইতে ব্যোমকেশ একটু হাসিয়া বলিল, ‘শুনেছিলাম এ বাড়িতে ধূমপান নিষিদ্ধ।’
সন্তোষবাবু ঈষৎ ভ্রূকুটি করিয়া বলিলেন, ‘আপনাদের জন্যে নিষিদ্ধ নয়।’ তিনি নিজে একটা সিগারেট মুখে দিলেন, দেশলাই জ্বলিয়া আমাদের দিকে বাড়াইয়া দিলেন।
‘এবার কি প্রশ্ন করবেন করুন।’
এ কে রে রাইটার জমাদারকে ইশারা করিলেন, সে খাতা-পেন্সিল বাহির করিল। তখন প্রশ্নোত্তর আরম্ভ হইল।
প্রশ্ন : হেনার বাবার নাম কি?
উত্তর : কমল মল্লিক।
প্রশ্ন : কমল মল্লিক আপনার বন্ধু ছিলেন?
উত্তর : হ্যাঁ। তাঁকে প্রায় পনেরো বছর ধরে চিনতাম। ব্যবসার সূত্রে আমাকে ভারতবর্ষের সর্বত্র ঘুরে বেড়াতে হত, এখনো হয়। কমল মল্লিকের সঙ্গে ঢাকায় জানাশোনা হয়েছিল, তারপর ক্রমে ঘনিষ্ঠতা হয়।
প্রশ্ন : তাহলে হেন কলকাতায় আসবার আগেও তাকে দেখেছেন?
উত্তর; অনেক বার। ওর তিন-চার বছর বয়স থেকে ওকে দেখছি।
প্রশ্ন; ওকে আশ্রয় দেবার ফলে বাড়িতে কোন চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছিল কি?
একটু থমকিয়া গিয়া সন্তোষবাবু বলিলেন, ‘আমার স্ত্রী অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। তাঁর শুচিবাই আছে; হেনা পাকিস্তানের মেয়ে, তার আচার-বিচার নেই, এই অছিলায় তিনি হেনাকে নিজের হাঁড়ি-হেঁশেল থেকে খেতে দিতে অসম্মত হয়েছিলেন। কাছেই একটা হোটেল আছে, সেখান থেকে হেনার খাবার আনার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলাম।’
প্রশ্ন; আর কেউ আপত্তি করেনি?
উত্তর : আর কারুর আপত্তি করার সাহস নেই।
প্রশ্ন : বাড়িতে কারুর সঙ্গে হেনার মেলামেশা ছিল না?
উত্তর : মেলামেশার বাধা ছিল না। তবে হেনা মিশুকে মেয়ে ছিল না, বাপ-মায়ের মৃত্যুর শকটাও বোধহয় সামলে উঠতে পারেনি। তাই সে একা-একাই থাকতো, নিজের ঘর ছেড়ে বড় একটা বেরতো না।
প্রশ্ন : সে রোজ সন্ধ্যেবেলা তেতলার ছাদে উঠে। বেড়াতে আপনি জানেন?
উত্তর : আগে জানতাম না, আজ জানতে পেরেছি।
প্রশ্ন; কার কাছে জানতে পারলেন?
উত্তর : যে আমাকে টেলিফোনে মৃত্যু-সংবাদ দিয়েছিল তার কাছে।
প্রশ্ন: কে মৃত্যু-সংবাদ দিয়েছিল?
সন্তোষবাবু কিছুক্ষণ গালে হাত দিয়া রহিলেন, তারপর মুখ তুলিয়া বলিলেন, ‘তাই তো, কে খবর দিয়েছিল তা তো লক্ষ্য করিনি। আমি যেখানে ছিলাম। সেখানকার ঠিকানাও তো কেউ জানে না।’ তিনি হঠাৎ রবিবর্মার দিকে তীব্র চক্ষু ফিরাইয়া বলিলেন, ‘রবি।’
রবিবর্মা গাঢ়স্বরে বলিল, ‘আৰ্জেজ্ঞ না, আমি ফোন করিনি।’
আমরা একবার মুখ তাকাতাকি করিলাম। এ কে রে বলিলেন, ‘টেলিফোনে গলার আওয়াজ শুনে চিনতে পারেননি?’
সন্তোষবাবু বলিলেন, ‘খবরটা পাবার পর অন্য কোন প্রশ্ন মনেই আসেনি। কিন্তু–’
এ কে রে এবার অনিবাৰ্য প্রশ্ন করিলেন, ‘আপনি কোথায় ছিলেন?’
সন্তোষবাবুর মুখে ঈষৎ রক্তসঞ্চার হইল, তিনি একে একে আমাদের সকলের মুখের উপর দৃষ্টি বুলাইয়া বলিলেন, ‘একথা জানা কি নিতান্তাই দরকার?’
এ কে রে একটু অস্বস্তি বোধ করিতেছেন, তাহা তাঁহার ভাবভঙ্গী হইতে প্রকাশ পাইল; তিনি অপ্রতিভভাবে বলিলেন, ‘আমাকে ক্ষমা করবেন, কিন্তু হেন মল্লিকের মৃত্যু সম্বন্ধে আমি এখনো নিঃসংশয় হতে পারিনি। খুব সম্ভব সে অসাবধানে ছাদ থেকে নিজেই পড়ে গিয়েছিল, কিন্তু কেউ তাকে ছাদ থেকে ঠেলে ফেলে দিয়েছিল— এ সম্ভাবনাও একেবারে বাদ দেওয়া যায় না। তাই সব কথা আমাদের জানা দরকার।’
সন্তোষবাবু ভ্রূ তুলিয়া কিছুক্ষণ এ কে রে’র পানে চাহিয়া রহিলেন, তারপর বলিলেন, ‘হেনকে কেউ ঠেলে ফেলে দিয়েছিল এ সম্ভাবনাও আছে?’
এ কে রে বলিলেন, ‘আজ্ঞে আছে।’
সন্তোষবাবু ঈষৎ গলা চড়াইয়া বলিলেন, ‘কিন্তু কে তাকে মারবে? কেন মারবে?’
এ কে রে মাথা নাড়িয়া বলিলেন, ‘তা এখনো জানি না। কিন্তু সব সম্ভাবনাই আমাদের অনুসন্ধান করে দেখতে হবে।’
সন্তোষবাবু আবার কিছুক্ষণ গালে হাত দিয়া বসিয়া রহিলেন, তারপর সহসা খাড়া হইয়া বসিলেন; কড়া চোখে আমাদের সকলকে নিরীক্ষণ করিয়া কড়া সুরে বলিলেন, ‘বেশ, কোথায় ছিলাম বলছি। কিন্তু এটা আমার জীবনের একটা গুপ্তকথা, এ নিয়ে যেন কথা-চালাচালি না। হয়।’
‘কথা-চালাচালি হবে না। আপনি যা বলবেন, অফ-রেকর্ড থাকবে।’ এ কে রে অন্য পুলিস কর্মচারীদের ইশারা করিলেন, তাহারা উঠিয়া হল-ঘরে গেল, রাইটার জমাদারও খাতা বন্ধ করিয়া শুনা করিল। ব্যোমকেশ উঠিবার উপক্রম করিয়া বলিল, ‘আমরাও তাহলে পাশের ঘরে গিয়ে বসি।‘
সন্তোষবাবু হাত তুলিয়া দৃঢ়স্বরে বলিলেন, ‘না, আপনারা বসুন। আপনি উপস্থিত আছেন ভালই হল, আমি আপনাকে আমার পারিবারিক স্বার্থরক্ষার কাজে নিযুক্ত করলাম।’
ব্যোমকেশ আবার বসিয়া পড়িল। সন্তোষবাবু আর-একটা সিগারেট ধরাইয়া মৃদু মৃদু টান দিতে লাগিলেন, আমরা অপেক্ষা করিয়া রহিলাম।
চিংড়ি দ্বারের নিকট হইতে গলা বাড়াইয়া জিজ্ঞাসা করিল, চা নিয়ে আসব?
সন্তোষবাবু বলিলেন, ‘এস।’
চিংড়ি ঘরে প্রবেশ করিল। তাহার পিছনে খাবার ও চায়ের ট্ৰে লইয়া দুইজন ভৃত্য। চিংড়ি আমাদের সামনে চা ও জলখাবারের রেকবি রাখিতে রাখিতে একবার বিস্মফারিত নেত্ৰে ব্যোমকেশের পানে চাহিল। নেংটির নিকট নিশ্চয় ব্যোমকেশের পরিচয় শুনিয়াছে। তাহার দৃষ্টিতে কৌতূহল ছাড়াও এমন কিছু ছিল, যাহা নির্ণয় করা কঠিন। বোধহয় সে মনে মনে ভয় পাইয়াছে।
সন্তোষবাবু বলিলেন, ‘বাইরে যাঁরা আছেন তাঁদেরও দাও।’
চিংড়ি চাকরদের লইয়া হল-ঘরে গেল, রবিবর্মা বাহিরে গিয়া নিঃশব্দে দ্বার ভেজাইয়া দিল।
আমরা পানাহারে মনোনিবেশ করিলাম। সন্তোষবাবু কেবল এক পেয়ালা চা লইয়াছিলেন, তিনি তাহাতে একটু মৃদু চুমুক দিয়া আমাদের দিকে না চাহিয়াই বলিতে আরম্ভ করিলেন, ‘আমি অকলঙ্ক চরিত্রের লোক নই, কিন্তু সেজন্যে নিজেকে ছাড়া কাউকে দোষ দিই না। আমার অসংখ্য দোষের মধ্যে একটা দোষ, আমি কীর্তন শুনতে ভালবাসি।’
আমরা মুখ তুলিয়া চাহিলাম। রাজনীতির ক্ষেত্রে সন্তোষবাবু বিখ্যাত বক্তা্্, তিনি যে তাঁহার গুপ্তকথা মৰ্মস্পশীী ভঙ্গীতে বলিবেন তাহাতে সন্দেহ রহিল না। বস্তুত তাঁহার প্রস্তাবনার বৈচিত্র্যে তিনি আমাদের অখণ্ড মনোযোগ আকর্ষণ করিয়া লইলেন।
আর-এক চুমুক চা পান করিয়া তিনি সিগারেটে লম্বা টান দিলেন, তারপর পেয়ালার মধ্যে সিগারেটের দগ্ধাংশ ফেলিয়া এক পাশে সরাইয়া রাখিতে রাখিতে বলিতে আরম্ভ করিলেন,–
‘কীৰ্তন-গাইয়ে সুকুমারীর নাম বোধহয় আপনারা শুনেছেন। গান গাওয়া তার ব্যবসা, টাকা নিয়ে সভায়-মজলিশে গান গায়। দশ বছর আগে তার গান শুনে আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম। আমার দাম্পত্য-জীবন সুখের নয়, আমি সুকুমারীর প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলাম। তখন সুকুমারীর বয়স বাইশ-তেইশ বছর। কিছুদিন লুকিয়ে তার বাড়িতে যাতায়াত করেছিলাম, তার সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল। কিন্তু তার বাড়িতে নানা রকম লোক আসত, কেউ গান শুনতে আসত, কেউ বায়না দিতে আসত। দেখলাম, এখানে যাতায়াত করা আমার পক্ষে নিরাপদ নয়।
‘আপনারা জানেন, আমার জীবন রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। স্বাধীনতার যুদ্ধে দেশ-বিভাগের সময় দুই পক্ষের মধ্যে দূতের কাজ করেছি। রাজনীতির ক্ষেত্রে আমার খ্যাতি আছে, প্রতিপত্তি আছে। তেমনি আবার শত্ৰুও আছে। শত্রুপক্ষ যদি আমার নামে কলঙ্ক রটাবার সুযোগ পায়, তাহলে আমার যশ পদমর্যাদা কিছুই থাকবে না। ভেবে-চিন্তে আমি এক কাজ করলাম, বেনামে একটি ছোট্ট বাড়ি ভাড়া নিলাম। উদ্দেশ্য, সুকুমারীকে সেখানে নিয়ে গিয়ে তুলিব, তার প্রকাশ্য গায়িক-জীবন শেষ হবে। কিন্তু সুকুমারী তাতে রাজী হল না। শেষ পর্যন্ত স্থির হল সে নিজের বাসাতেই থাকবে এবং গানের ব্যবসা চালাবে, কেবল হগুপ্তার মধ্যে দুদিন, শনিবার এবং রবিবার, সে আমার ভাড়া-করা গোপন বাড়িতে এসে থাকবে। আমি সেখানে এমনভাবে যাতায়াত করব যে কেউ জানতে পারবে না।
‘গত দশ বছর ধরে এইভাবে চলেছে। আমি শনিবার বিকেলের দিকে অফিসের কাজ সেরে সেখানে চলে যাই, তারপর সোমবার সকালে সেখান থেকে সটান অফিসে যাই। আজও তাই হয়েছিল, বেলা আন্দাজ সাড়ে তিনটের সময় সেখানে গিয়েছিলাম। তারপর— রাত্রি আটটার সময় টেলিফোন পেয়ে তৎক্ষণাৎ চলে এলাম।’ তাঁহার মুখে নীরস ব্যঙ্গ ফুটিয়া উঠিল, ‘এই আমার অ্যালিবাই।’
ব্যঙ্গের খোঁচা হজম করিয়া এ কে রে বিনীত স্বরে বলিলেন, ‘ধন্যবাদ। খৃষ্টতা ক্ষমা করবেন, আর দু-একটা প্রশ্ন করেই আপনাকে নিস্কৃতি দেব। ভাড়াটে বাড়িতে চাকর-বাকর কেউ আছে?
সন্তোষবাবু বলিলেন, ‘না, ইচ্ছে করেই চাকর রাখিনি। প্রত্যেক শনিবার দুপুরবেলা সুকুমারী নিজের বাসা থেকে ভাড়াটে বাসায় চলে আসে, ঘরদের পরিষ্কার করে রাখে। আমি বিকেলবেলা যাই। তারপর সোমবারে আমি অফিসে চলে যাবার পর, সে বাড়িতে তালা দিয়ে নিজের বাসায় ফিরে যায়। হাপ্তার বাকি দিন বাড়ি বন্ধ থাকে।’
প্রশ্ন : টেলিফোন রেখেছেন কেন?
উত্তর : নিজের জন্য নয়, সুকুমারীর জন্যে। সে যে-সময় ভাড়াটে বাড়িতে থাকে, সে-সময় নিজের বাসার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে চায়। কিন্তু প্ৰাইভেট নম্বর, ডিরেকটরিতে পাবেন না।
প্রশ্ন : সেক্রেটারিকে নম্বর বলেননি?
উত্তর : না।
প্রশ্ন : কার জানা সম্ভব?
উত্তর : কারুর জানা সম্ভব নয়। আমি কাউকে বলিনি, সুকুমারীও কাউকে বলবে না।
প্রশ্ন : তাঁকে আপনি বিশ্বাস করেন?
উত্তর : করি। আমি তাকে মাসে হাজার টাকা দিই। সে নির্বোধ নয়, নিজের পায়ে কুডুল মারবে না।
প্রশ্ন; আজ যখন টেলিফোন পেলেন, তখন আপনি কি করছিলেন?
উত্তর : কীর্তন শুনছিলাম। সুকুমারী চণ্ডীদাসের পদ গাইছিল।
এ কে রে ব্যোমকেশের পানে চক্ষু ফিরাইলেন; ব্যোমকেশ নিঃশব্দে মাথা নাড়িল, অর্থাৎ, আর কোন প্রশ্ন নাই। তখন এ কে রে গাত্ৰোত্থান করিয়া বলিলেন, ‘আজ এই পর্যন্ত থাক। কষ্ট দিলাম, কিছু মনে করবেন না। আজ কি আপনি আবার–?’
‘না, ফিরে যাব না, বাড়িতেই থাকব।’ সন্তোষবাবুর গভীর চোখে কৌতুকের কটাক্ষ খেলিয়া গেল, তিনি বলিলেন, ‘আমার পিছনে গুপ্তচর লাগিয়ে আমার বাসার সন্ধান পাবেন না।’
এ কে রে জিভ কাটিয়া বলিলেন, ‘না না, সে কি কথা! আপনার গুপ্ত বাসা সম্বন্ধে আমার তিলমাত্র কৌতূহল নেই। আপনি যা বললেন, আমাদের তদন্তের পক্ষে তাই যথেষ্ট। কেবল-শ্ৰীমতী সুকুমারীর সঙ্গে একবার দেখা করতে পারলে ভাল হত।’
‘তাকে তার বাসার ঠিকানায় পাবেন।’ সন্তোষবাবু সুকুমারীর ঠিকানা দিয়া উঠিয়া দাঁড়াইলেন, ‘দশটা বাজে। আপনার কাজ বোধহয় এখনো শেষ হয়নি, যতক্ষণ দরকার থাকুন।। ব্যোমকেশবাবু্, আপনি আমার পক্ষ থেকে ইন্সপেক্টরের সঙ্গে থাকবেন তো?’
‘নিশ্চয়’ বলিয়া ব্যোমকেশ উঠিয়া দাঁড়াইল।
সন্তোষবাবু বলিলেন, ‘আচ্ছা, আমি তাহলে বিশ্রাম করি গিয়ে। একটু ক্লান্তি বোধ হচ্ছে।’
তিনি দৃঢ়পদে ঘর হইতে বাহির হইয়া গেলেন। তাঁহার শরীরে ক্লান্তির কোন লক্ষণ চোখে পড়িল না। বোধহয় মনের ক্লান্তি। বাড়িতে এতবড় একটা দুর্ঘটনা ঘটিয়া যাইবার পর–
সন্তোষবাবু যেভাবে তাঁহার গুপ্তকথা প্রকাশ করিলেন তাহাতে ঢাকাঢাকা গুড়গুড় নাই, নিজের সম্বন্ধে সাফাই গাঁহিবার চেষ্টা নাই—জীবনের গৃঢ় সত্য কথা যখন বলিতেই হইবে তখন স্পষ্টভাবে বলাই ভাল। তবু তাঁহার নির্মম সত্যবাদিতা আমার মনকে পীড়া না দিয়া পারিল না। তিনি পাকা ব্যবসায়ী এবং ঝানু রাজনীতিজ্ঞ, তাঁহার চরিত্রে এই কালো দাগটা না থাকিলেই বোধহয় ভাল হইত।
এ কে রে ব্যোমকেশকে প্রশ্ন করিলেন, ‘অতঃপর?’
ব্যোমকেশ বলিল, ‘চল, হেনার ঘরটা একবার দেখে যাই।’
‘চল।–ছাদে যাবে নাকি?’
‘যাব। এসেছি। যখন, যা-যা দ্রষ্টব্য আছে সবই দেখে যাই।’
হল-ঘরের গোল টেবিলের কাছে বসিয়া পুলিসের বাকি কর্মচারীরা নিম্নস্বরে বাক্যালাপ করিতেছিলেন, রবিবর্মা ছাড়া বাড়ির লোক আর কেহ উপস্থিত ছিল না। হেনীর ঘর ডাইনিং-রুম হইতে কোনাকুনিভাবে হল-ঘরের অপর প্রান্তে। [প্ল্যান পশ্য]। হেনার ঘরের দ্বার ঈষৎ উন্মুক্ত, আলো জ্বলিতেছে। আমরা তিনজনে ঘরে প্রবেশ করিলাম। রবিবর্মা আমাদের পিছন পিছন আসিল।
ঘরটি বেশ বড়। সদরের দিকে ধনুরাকৃতি বড় জানালা, পূর্বদিকের দেয়ালেও একটি সাধারণ জানালা আছে। এই জানালার সামনে টেবিল ও চেয়ার, পাশে বইয়ের শেলফ। ঘরের অন্য পাশে সংকীর্ণ একহারা খাটের উপর বিছানা পাতা; খাটের নীচে বড় বড় দু’টি সুটকেস দেখা যাইতেছে। উত্তরদিকের দেয়ালের কোণে একটি সরু দরজা সংলগ্ন বাথরুমের সহিত সংযোগ স্থাপন করিয়াছে। ঘরে আসবাবের বাহুল্য নাই, তাই ঘরটি বেশ পরিচ্ছন্ন দেখাইতেছে। সম্ভবত হেনাও পরিচ্ছন্ন স্বভাবের মেয়ে ছিল।
ঘরের মাঝখানে দাঁড়াইয়া চারিদিকে দৃষ্টিপাত করিতে করিতে ব্যোমকেশ বলিল, ‘ঘরের দরজা কি খোলা ছিল?’
এ কে রে বলিলেন, ‘না, তালা লাগানো ছিল। মৃতদেহের হাতে একটা চামড়ার হ্যান্ড-ব্যাগ ছিল, তার মধ্যে চাবির রিঙ পাওয়া গেছে। এই যে।’ তিনি পকেট হইতে একটি চাবির গোছা বাহির করিয়া দিলেন।
চাবি হাতে লইয়া ব্যোমকেশ বলিল, ‘হেনা তাহলে ঘরে তালা দিয়ে ছাদে গিয়েছিল।’
এ কে রে বলিলেন, ‘তাই তো দেখা যাচ্ছে।’
রবিবর্মা মুখের সামনে মুষ্টি রাখিয়া কাশির মত একটা শব্দ করিল। ব্যোমকেশ তাহার দিকে চক্ষু ফিরাইলে সে বলিল, ‘হেনা দোর খুলে রেখে ঘর থেকে কখনো এক পা বেরুতো না, যখনি বেরুতে দোরে তালা দিয়ে বেরুতো।’
ব্যোমকেশ বলিল, ‘তাই নাকি? গোড়া থেকেই এই রকম, না, কোন উপলক্ষ হয়েছিল?’
‘গোড়া থেকেই এই রকম।’
ব্যোমকেশ আর কিছু বলিল না, চাবির রিঙ পর্যবেক্ষণ করিয়া বলিল, ‘পাঁচটা চাবি রয়েছে দেখছি। একটা তো দোরের তালার চাবি। আর অন্যগুলো?’
এ কে রে বলিলেন, ‘বাকিগুলোর মধ্যে দুটো হচ্ছে সুটকেসের চাবি। অন্য দুটো কোথাকার চাবি জানা গেল না।’
ব্যোমকেশ চাবিগুলি একে একে পরীক্ষা করিয়া বলিল, ‘একটা চাবিতে নম্বর খোদাই করা রয়েছে-৭ নম্বর। দেখ তো, এ চাবিটা কোথাও লাগে কি না।’
এ কে রে চাবিটি দেখিয়া বলিলেন, ‘না। যে চাবি দুটোর তালা পাওয়া যাচ্ছে না, এটা তারই একটা।’
‘টেবিলের দেরাজে। গা-তালা নেই?’
‘আছে। কিন্তু দেরাজগুলো সব খোলা। চাবি নেই।’
‘হুঁ।–কি মনে হয়?’
দু’জনে চোখে চোখে ক্ষণেক চাহিয়া রহিল, শেষে এ কে রে বলিলেন, ‘বলা শক্ত। অনেক সময় দেখা যায়। তালা হারিয়ে গেছে, কিন্তু চাবিটা রিঙে রয়ে গেছে।’
ব্যোমকেশ রবিবর্মার দিকে চাহিয়া বলিল, ‘আপনি কিছু বলতে পারেন?’
রবিবাম ঘাড় নাড়িল, ‘এ-ঘরের ভিতরের কথা আমি কিছু বলতে পারি না। এই প্রথম ঘরে ঢুকলাম।’
ব্যোমকেশ গলার মধ্যে শব্দ করিল, চাবির গোছা এ কে রে-কে ফেরৎ দিয়া টেবিলের সামনে গিয়া দাঁড়াইল।
একদিকে দেরাজযুক্ত টেবিল, লাল বনাত দিয়া ঢাকা, তাহার উপর দু-একটি বই ছাড়া আর কিছু নাই। তারপর চোখে পড়িল লাল বানাতের উপর একটি লাল গোলাপফুল পড়িয়া আছে। ঘরে ফুলদানি নাই, গোলাপফুলটা এমন অনাদৃতভাবে পড়িয়া আছে যে, আশ্চর্য লাগে।
ব্যোমকেশ ফুলটিকে স্পর্শ করিল না, সম্মুখে ঝুকিয়া সেটি ভালভাবে দেখিল, তারপর টেবিলের শিয়রে খোলা জানালার দিকে চোখ তুলিয়া বলিল, ‘তাজা ফুল। বাগানে গোলাপফুল আছে?’ জানালার বহিভাগের দৃশ্য অন্ধকারে দেখা যাইতেছিল না।
রবিবর্মা বলিল, ‘আছে।’
ব্যোমকেশ এ কে রে-কে বলিল, ‘গোলাপটা দেখে কী মনে হয়? এমনভাবে টেবিলের ওপর পড়ে আছে কেন?’
এ কে রে নীরবে জানালার বাহিরে অঙ্গুলি নির্দেশ করিলেন।
ব্যোমকেশ ঘাড় নাড়িয়া সায় দিল, ‘আমারও তাই মনে হচ্ছে। হেনা যখন ঘরে ছিল না, সেই সময় কেউ বাগান থেকে ফুলটা তুলে জানালার গরাদের ফাঁকে টেবিলের ওপর ফেলে দিয়েছে।’ আমাদের সকলের চক্ষু রবিবর্মার দিকে ফিরিল, সকলের চোখে একই প্রশ্ন-কে ফেলতে পারে?
রবিবর্মা কিন্তু আমাদের জিজ্ঞাসু চক্ষু এড়াইয়া এদিকে-ওদিকে চাহিতে লাগিল, শেষে বলিল, ‘আমি কিছু জানি না।’
ব্যোমকেশ নিশ্বাস ফেলিয়া দেরাজগুলি খুলিয়া খুলিয়া দেখিতে লাগিল, আমি বইয়ের শেলফের সামনে গিয়া দাঁড়াইলাম।
দু-সারি বই। প্রথম সারিতে রবীন্দ্রনাথের সঞ্চয়িতা, সত্যেন দত্তের কাব্যসঞ্চয়ন, নজরুলের সঞ্চিতা এবং আধুনিক লেখকদের রচিত কয়েকটি কথােকাহিনীর পুস্তক। দ্বিতীয় সারিতে অনেকগুলি ইংরেজি উপন্যাসের সুলভ সংস্করণ। হেনা বিদেশী রহস্য-রোমাঞ্চের বইও পড়িত।
‘অজিত, দ্যাখো।’
আমি ফিরিয়া দেখিলাম, ব্যোমকেশ দেরাজ হইতে একটি ফটোগ্রাফ বাহির করিয়াছে এবং একদৃষ্টি তাহা দেখিতেছে। কার্ডবোর্ডের উপর আটা পোস্টকার্ড সাইজের ছবিতে কেবল একটি রমণীর প্রতিকৃতি! আমি এক নজর দেখিয়া বলিয়া উঠিলাম, ‘হেনার ফটো।’
ব্যোমকেশ মাথা নাড়িয়া বলিল, ‘না। ছবিটা কয়েক বছরের পুরনো, দেখছি না হলদে হয়ে গেছে, অথচ মহিলাটির বয়স পঁচিশের কম নয়। হেনা হতে পারে না, বোধহয় হেনার মা। হেনা এত রূপ কোথা থেকে পেয়েছিল বোঝা যাচ্ছে।’
হেনাকে জীবিত অবস্থায় দেখি নাই, মৃতদেহ দেখিয়া রূপ অনুমান করিয়াছিলাম। এখন এই ফটো দেখিয়া মনে হইল, হেনাকে জীবন্ত অবস্থায় দেখিতেছি। শুধু রূপ নয়, অফুরন্ত প্রাণশক্তি সর্বাঙ্গ দিয়া বিছুরিত হইতেছে।
ব্যোমকেশ ছবিটা এ কে রে-র হাতে দিয়া বলিল, ‘এটা রাখো। সন্তোষবাবুকে জিজ্ঞেস করতে হবে ছবিটা হেনার মায়ের কিনা।’
এ কে রে ছবিটি লইয়া চোখ বুলইলেন, রবিবর্মা গলা বাড়াইয়া দেখিয়া লইল। লোকটির চোখ-মুখ দেখিয়া কিছু বোঝা যায় না, কিন্তু প্ৰাণে যথেষ্ট কৌতূহল আছে।
এ কে রে ফটো পকেটে রাখিলেন, বলিলেন, ‘আচ্ছা। দেরাজে আর কিছু পেলে?’
না। খুচরো দু-চারটে পয়সা আছে; এমন কিছু নেই। রবিবাবু্, হেনার নামে চিঠিপত্র আসত কিনা। আপনি জানেন?’
রবিবর্মা বলিল, ‘চিঠি আসার সময় আমি বাড়িতে থাকি না। নেংটি কিংবা চিংড়ি বলতে পারে।’
আর কিছু না বলিয়া ব্যোমকেশ বইয়ের শেলফের কাছে আসিল, বইগুলির মলাটের উপর একবার চোখ বুলাইয়া সঞ্চয়িতা বইখানি হাতে লইল। মলাট খুলিতেই দেখা গেল, এক টুকরা গোলাপী কাগজ ভাঁজের মধ্যে রহিয়াছে। কাগজের উপর চার ছত্র হাতের লেখা! ব্যোমকেশ কাগজটি দু’ আঙুলে তুলিয়া ধরিয়া দেখিতেছে, রবিবর্মা বকের মত সেদিকে গলা বাড়াইল। ব্যোমকেশ কিন্তু তাহাকে লেখাটি পড়িতে দিল না, চট্ করিয়া কাগজ পকেটে পুরিল। রবিবর্মার মুখে ভাবোস্তর হইল না বটে, কিন্তু তাহার প্রাণটা যে ঐ লেখাটি পড়িবার জন্য আকুলি-বিকুলি করিতেছে, তাহা অনুমান করা শক্ত হইল না।
ব্যোমকেশ একে একে অন্য বইগুলি খুলিয়া দেখিতে আরম্ভ করিল, এ কে রে এবং আমি দুইপাশে দাঁড়াইয়া তাহার কার্যকলাপ দেখিতে লাগিলাম। আমাদের পিছনে রবিবাম অতৃপ্ত প্রেতীয়ার মত ঘুরিয়া বেড়াইতে লাগিল। আমাদের পিছনে থাকিয়া সে দেখিতে পাইতেছে না। আমরা কি করিতেছি, তাই দুৰ্নিবার কৌতূহলে ছটফট করিতেছে। এত কৌতূহল কিসের?
উপরের থাকে বাংলা বইগুলিতে আর কিছু পাওয়া গেল না। বইগুলির প্রথম পৃষ্ঠায় পরিচ্ছন্ন মেয়েলি ছাঁদে লেখা আছে-হেন মল্লিক।
নীচের থাকের ইংরেজি বইগুলিতেও কাগজপত্র কিছু নাই, কিন্তু একটি বিষয়ে ব্যোমকেশ আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করিল। কয়েকটি বইয়ের নাম-পৃষ্ঠায় রবারস্ট্যাম্প দিয়া ঢাকার একটি পুস্তক-বিক্রেতার নাম ছাপা আছে। এ কে রে ভ্রূ তুলিয়া ব্যোমকেশের পানে চাহিলেন, আমিও লু তুলিলাম। কিন্তু ব্যোমকেশ কিছু বলিল না; রবিবর্মার সান্নিধ্যবশতাই বোধহয় মুখ খুলিল না।
বই দেখা শেষ হইলে ব্যোমকেশ বলিল, ‘সুটকেস দুটোতে কি আছে, খোল না একবার দেখি।‘
এ কে রে চাবির গোছা বাহির করিয়া সুটকেস দু’টি খুলিলেন। দেখা গেল, তাদের মধ্যে নানা জাতীয় মেয়েলি পোশাক থরে থরে সাজানো রহিয়াছে। শাড়ি-স্কার্ট-ঘাঘরাওড়না-কামিজ-পায়জামা প্রভৃতি সর্বজাতীয় পরিচ্ছদ। সবই দামী জিনিস। ব্যোমকেশ সেগুলি উল্টাইয়া পাল্টাইয়া দেখিল, তারপর নিশ্বাস ফেলিয়া বলিল, ‘না, কাজের জিনিস কিছু নেই। বাথরুমটা তো তুমি দেখেছ?’
এ কে রে বলিলেন, ‘দেখেছি। বিশেষ দ্রষ্টব্য কিছু নেই।’
‘আমিও একবার দেখে যাই।’ ব্যোমকেশ বাথরুমে প্রবেশ করিল। মিনিট দুই-তিন পরে ফিরিয়া আসিয়া বলিল, ‘চল, এবার ছাদে যাওয়া যাক।’
ঘরের দরজা হইতে কয়েক পা সামনের দিকে সিঁড়ি আরম্ভ হইয়াছে। বেশ চওড়া বাহারে সিঁড়ি। ব্যোমকেশ সিঁড়ির নীচের ধাপে ফিরিয়া দাঁড়াইয়া বলিল, রবিবাবু্, আপনি আর আমাদের সঙ্গে আসবেন না, ছাদ আমরা নিজেরাই দেখে নিতে পারব।’ কথাগুলি বলার ভঙ্গীতে এমন একটি দৃঢ়তা ছিল যে, রবিবর্মা আর অগ্রসর হইল না, সিঁড়ির পদমূলে দাঁড়াইয়া রহিল। আমরা উপরে উঠিয়া গেলাম।
দোতলাকে স্পর্শ করিয়া সিঁড়ি তেতলায় উঠিয়া গিয়াছে, মোড় ঘুরিয়াব্র সময় দ্বিতল যতখানি দেখা গেল এক নজরে দেখিয়া লইলাম। হল-ঘরের উপরে অবিকল আর একটি হল-ঘর, সামনের দিকে দুই কোণে দু’টি ঘর। তফাৎ এই যে, নীচের তলায় পিছনের দেয়ালের দরজা ছিল না, দ্বিতলে সারি সারি তিনটি দরজা। অথাৎ, নীচের রান্নাঘর ভাঁড়ারঘর প্রভৃতির উপরে কয়েকটি শয়নকক্ষ, দরজাগুলি উপরের হল-ঘরের সহিত তাহদের যোগসাধন করিয়াছে।
ত্ৰিতলে সিঁড়ি যেখানে শেষ হইয়াছে সেখানে একটি বন্ধ দ্বার। এ কে রে ছিটিকিনি খুলিয়া দ্বার উন্মুক্ত করিয়া দিলেন এবং দ্বারের পাশে একটি সুইচ টিপিয়া ছাদের আলো জ্বলিলেন; ফ্লাড় লাইটের আলোয় প্রকাণ্ড ছাদ উদভাসিত হইল।
আমরা তিনজনে ছাদে পদাৰ্পণ করিলাম। ব্যোমকেশ প্রথমেই দরজাটা পরীক্ষা করিয়া বলিল, ‘ভিতরে এবং বাইরে দুদিক থেকেই দরজা বন্ধ করার ব্যবস্থা আছে দেখছি; ভিতরে ছিটিকিনি বাইরে শিকল। এ কে রে, তুমি যখন ছাদে এসেছিলে তখন কি দরজা বন্ধ ছিল?’
এ কে রে বলিলেন, ‘না, দুদিক থেকেই খোলা ছিল।’
বৈদ্যুতিক বন্যালোক তো ছিলই, উপরন্তু এতক্ষণে কৃষ্ণপক্ষের খণ্ডচন্দ্র মাথা তুলিয়াছে। আমরা ছাদের মাঝখানে গিয়া দাঁড়াইলাম।
ছাদটি প্রকাণ্ড, ইহার উপর সুন্দর একটি টেনিস-কোর্ট তৈরি করা চলে। ছাদ ঘিরিয়া নিরেট গাঁথুনির আলিসা, আলিসার গায়ে বাহির হইতে বাঁশের ডগা উচু হইয়া আছে, কেবল পূর্বদিকে
দূরে বাগানের সীমানায় একসারি দীর্ঘ সিলভার পাইনের গাছ। সমব্যবধানে দাঁড়াইয়া বাড়িটিকে যেন প্রহরীর মত ঘিরিয়া রাখিয়াছে। ছাদ হইতে তাহাদের উধ্বঙ্গি মন্দিরের চুড়ার মত দেখাইতেছে।
ব্যোমকেশ একবার চারিদিকে মুণ্ড ঘুরাইয়া সমগ্র দৃশ্যটা দেখিয়া লইল, তারপর তাহার দৃষ্টি ছাদের অভ্যস্তরে ফিরিয়া আসিল। ছাদে অন্য কিছু নাই, কেবল মধ্যস্থলে একটু পশ্চিমদিকে ৰ্ঘেষিয়া একটি মাদুর পাতা রহিয়াছে এবং তাহার পাশে একজোড়া মেয়েলি চটিজুতা।
একটি চিত্র মনশ্চক্ষে ভাসিয়া উঠিল; হেনা ছাদে আসিয়া মাদুর পাতিল, চটিজুতা খুলিয়া তাহার উপর বসিল। তারপর-?
রহিল, তারপর মুখ তুলিয়া জিজ্ঞাসা করিল, ‘হেনা কোন দিকে পড়েছিল?’
যেদিকে ভারা বাঁধা নাই সেই দিকে নির্দেশ করিয়া এ কে রে বলিলেন, ‘এই দিকে।’
তিনজনে পূর্বদিকের আলিসার কিনারায় গিয়া দাঁড়াইলাম। সামনেই চাঁদ। পঁচিশ হাত দূরে পাইনগাছের সারি মৃদু বাতাসে মর্মরধ্বনি করিতেছে, যেন হেনার অপমৃত্যু সম্বন্ধে হ্রস্বকণ্ঠে জল্পনা করিতেছে। তাহারা যদি মানুষের ভাষায় কথা বলিতে পারিত বোধহয় প্রত্যক্ষদশীর সাক্ষ্য পাইতাম। ‘ঐখানে পড়েছিল!’ এ কে রে নীচের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া দেখাইলেন। আমরা উঁকি মারিয়া দেখিলাম। পাইনগাছের ছায়ায় বিশেষ কিছু দেখা গেল না। আলিসাটা আমার কোমর পর্যন্ত উঁচু, এক ফুট চওড়া। হেনা আমার চেয়ে দৈর্ঘ্যে ছোটই ছিল নিশ্চয়, সে যদি কোনো কারণে নীচের দিকে উঁকি মারিয়াও থাকে, আলিসা ডিঙাইয়া পড়িয়া যাইবার সম্ভাবনা কম।
ব্যোমকেশও বোধকরি মনে মনে মাপজোক করিতেছিল, এ কে রে’র দিকে ফিরিয়া বলিল, ‘হুঁ। আলসের খাড়াই আন্দাজ চার ফুট। হেনরি খাড়াই কত ছিল?
এ কে রে ব্যোমকেশের মনের কথা বুঝিয়া বলিলেন, ‘আন্দাজ পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চি। কিন্তু তাহলেও অসম্ভব নয়।’
‘অসম্ভব বলিনি।’ ব্যোমকেশ ধীরে ধীরে আলিসার ধারা দিয়া পরিক্রমণ করিল। ভারাগুলি মাটি হইতে ছাদ পর্যন্ত মই রচনা করিয়াছে, একটু শক্ত-সমর্থ মানুষ সহজেই মই দিয়া উপরে উঠিয়া আসিতে পারে।
ছাদ পরিদর্শন শেষ করিয়া ব্যোমকেশ ঈষৎ নিরাশ স্বরে বলিল, অনেক রাত হয়েছে, আজ এই পর্যন্ত থাক। —হেনীর ঘরটা কি সীল করবে?’
এ কে রে বলিলেন, ‘সীল করার দরকার দেখি না। ও-ঘরে হেনার মৃত্যুর হয়নি। উপরন্তু আমরা দু’জনেই ঘরটা খানাতল্লাশ করেছি।’
ব্যোমকেশ আর কিছু বলিল না। এ কে রে আলো নিভাইয়া সিঁড়ি দিয়া নামিয়া চলিলেন, আমরা তাঁহার পিছনে চলিলাম।
নিঃশব্দে নামিতেছি। দ্বিতল পর্যন্ত নামিয়া মোড় ঘুরিবার উপক্রম করিতেছি, পাশের দিক হইতে একটা চাপা তীক্ষ্ণ স্বর কানে আসিল—’তুমি চুপ করে থাকবে, কোনো কথা কইবে না।’
চকিতে ঘাড় ফিরাইয়া দেখি দ্বিতলে হল-ঘরের অন্য প্রাস্তে রবিবর্মার্ণ ও শ্ৰীমতী চামেলি মুখোমুখি দাঁড়াইয়া আছেন। রবিবর্মা আমাদের দেখিতে পাইয়া বোধহয় নিঃশব্দে শ্ৰীমতী চামেলিকে ইশারা করিল, তিনি আমাদের দিকে ফিরিয়া চাহিলেন। তারপর ধারালো চোখে প্রখর অসহিষ্ণুতা ফুটাইয়া তিনি দ্রুতপদে পিছনের একটি ঘরে প্রবেশ করিলেন।
নীচে নামিয়া আসিয়া ব্যোমকেশ এ কে রে’র দিকে বঙ্কিম কটাক্ষপাত করিয়া বলিল, ‘শুনলে?’
এ কে রে একটু ঘাড় নাড়িলেন, বলিলেন, ‘চল, পুলিস-ভ্যানে তোমাদের বাসায় পৌঁছে দিয়ে যাই।’
পরদিন রবিবার সকাল সাতটার সময় ব্যোমকেশ ও আমি সবেমাত্র চায়ের পেয়ালা লইয়া বসিয়াছি, হুড়মুড় শব্দে নেংটি ঘরে প্রবেশ করিয়া বলিল, ‘ব্যোমকেশদা, ভীষণ কাণ্ড!’
ব্যোমকেশ ভ্রূ তুলিয়া বলিল, ‘ভীষণ কাণ্ড!’
নেংটি বলিল, ‘হ্যাঁ। একটা সিগারেট দিন।’
ব্যোমকেশ সিগারেট দিল, নেংটি তাহা ধরাইয়া দুই-তিনটা লম্বা টান দিয়া বলিল, ‘কাল রাত্তিরে হেনার ঘরটা কে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে।’
আমি বলিলাম, ‘অ্যাঁ! বাড়ি পুড়ে গেছে!’
নেংটি বলিল, ‘বাড়ি নয়, শুধু হেনার ঘরটা পুড়েছে। খাট-বিছানা, টেবিল-আলমারি কিছু নেই, সব ছাই হয়ে গেছে।’
ব্যোমকেশ কিছুক্ষণ স্তব্ধ হইয়া রহিল, শেষে বলিল, ‘রাত্তিরে কখন তোমরা জানতে পারলে?’
নেংটি বলিল, ‘আমরা রাত্তিরে জানিব কোথেকে, আমরা তো দোতলায় শুই। রবিবর্মা নীচের তলায় শোয়, সে-ই কিছু জানতে পারেনি। একেবারে সকালবেলায় জনাজানি হল।’
‘তারপর?’
‘তারপর আর কি, বাড়িতে চেঁচামেচি হৈ হৈ চলছে। আমি স্যুট করে পালিয়ে এসেছি আপনাকে খবর দিতে।’
‘হুঁ। কে ঘরে আগুন দিতে পারে, বাড়ির লোক না বাইরের লোক?’
‘তা আমি কি করে বলব? রাত্তিরে নীচের তলার দরজা-জানালা সব বন্ধ থাকে।’
‘সকালে যখন দেখলে তখন কি হেনার ঘরের জানোলা দুটো খোলা ছিল?’
‘দরজা-জানালা সব পুড়ে কয়লা হয়ে গিয়েছে, খোলা ছিল কি বন্ধ ছিল বোঝবার উপায় নেই। তবে–’ বলিয়া নেংটি থামিয়া গেল।
ব্যোমকেশ প্রশ্ন করিল, ‘তবে কি?’
নেংটির সিগারেট আধাআধি পুড়িয়ছিল, বাকি অর্ধেক নিভাইয়া সে সযত্নে পকেটে রাখিল, বলিল, ‘সিঁড়ির তলায় এক টিন পেট্রোল রাখা থাকতো, দেখা গেল টিন খালি।’
‘তার মানে—’ ব্যোমকেশ কথা অসমাপ্ত রাখিয়া চিন্তার মধ্যে ডুবিয়া গেল।
নেংটি উঠিয়া পড়িল, বলিল, ‘আমি পালাই। মাসিমা যদি জানতে পারে আমি বাড়ি নেই, রক্ষে থাকবে না।’
ব্যোমকেশ মুখ তুলিয়া বলিল, ‘বোসো। তোমাকে দু-একটা কথা জিজ্ঞেস করব।’
নেংটি অনিচ্ছাভরে বসিয়া বলিল, ‘আর কি জিজ্ঞেস করবেন, যা জানি সব বলেছি। এবার আপনি বুদ্ধি খাটিয়ে বের করুন, কে খুন করেছে।’
ব্যোমকেশ বলিল, ‘খুন করেছে তার কোন প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। কিন্তু সে যাক। যে-সময় হেনা ছাদ থেকে পড়ে যায় সে-সময় তুমি কোথায়?’
নেংটি বলিল, ‘আমি বাড়ির মধ্যে ছিলাম না, সিগারেট খেতে বেরিয়েছিলাম।’
‘কি করে জানলে যে, তুমি যখন সিগারেট খেতে বেরিয়েছিলে ঠিক সেই সময় হেনা ছাদ থেকে পড়ে যায়?’
‘শুনুন। সাড়ে পাঁচটার একটু আগে আমি যখন বাড়ি থেকে বেরুচ্ছি, তখন হেনার ঘরের দোর একটু ফাঁক হয়ে ছিল, দেখলাম সে খাটে বসে কাঠি দিয়ে পশমের গেঞ্জি বুনছে। আধঘণ্টা পরে যখন ফিরে এলাম, তখন বাড়িতে ভীষণ কাণ্ড, সবেমাত্র হেনরি লাশ পাওয়া গেছে।’
‘কে লাশ পেয়েছিল?’
‘রবিবর্মা।’
‘তুমি যখন বেরুচ্ছিলে তখন হল-ঘরে আর কেউ ছিল?’
‘উদয়দা ছিল, আর কেউ ছিল না।’
‘তুমি যখন সিগারেট খেয়ে ফিরে এলে তখন বাড়ির সবাই বাড়িতেই উপস্থিত ছিল?’
নেংটি একটু ভাবিয়া বলিল, ‘মেসোমশাই ছাড়া আর সবাই উপস্থিত ছিল।’
ব্যোমকেশ কিছুক্ষণ চুপ করিয়া ভাবিল, তারপর বলিল, ‘আর একটা কথা। হেনার চিঠিপত্র আসতো। কিনা জানো?’
নেংটি দৃঢ়স্বরে বলিল, ‘আসতো না। সকাল বিকেল যখনই চিঠি আসে, আমি পিওনের হাত থেকে চিঠি নিই। হেনার নামে একটাও চিঠি আজ পর্যন্ত আসেনি।’
বাইরের কারুর সঙ্গে হেনার কোন যোগাযোগ ছিল না?’
নেংটি মাথা নাড়িতে গিয়া থামিয়া গেল, তারপর কুঞ্চিত চক্ষে ব্যোমকেশের পানে চাহিল। ব্যোমকেশ বলিল, ‘কী?’
নেংটি বলিল, ‘কথাটা বলতে ভুলে গিয়েছিলাম, ব্যোমকেশদা। তুচ্ছ কথা বলেই বোধহয় মনে ছিল না—‘
ব্যোমকেশ বলিল, ‘হোক তুচ্ছ, বলে শুনি।’
নেংটি ধীরে ধীরে ভাবিয়া ভাবিয়া বলিতে আরম্ভ করিল, ‘হেনা আসবার দশ-বারো দিন পর থেকেই ব্যাপারটা আরম্ভ হয়। আমাদের রাস্তায় বেশি গাড়ি-মোটরের চলাচল নেই, নির্জন বড়মানুষের পাড়া। একদিন বিকেলবেলা একটা ট্যাক্সি আস্তে আস্তে বাড়ির সামনে দিয়ে চলে গেল, তার ভেতরে একটা লোক বসে মাউথ-অগনি বাজাচ্ছে। মাউথ-অগনি জানেন তো। চশমার খাপের মত দেখতে, ঠোঁটের ওপর ঘষলে প্যাপপো পাপপো করে বাজে-খুব জোর আওয়াজ হয়—‘
‘জানি। তারপর বলে।’
ট্যাক্সি চলে গেল, দুতিন মিনিট পরে আবার উল্টে দিক থেকে মাউথ-অগনি বাজাতে বাজাতে বাড়ির সামনে দিয়ে গেল। এই ঘটনার দশ-পনেরো মিনিটের মধ্যে হেনা ঘরে তালা লাগিয়ে বেরুলো। আমি প্রথমবার যোগাযোগটা বুঝতে পারিনি—’
‘যে লোকটা মাউথ-অগনি বাজাচ্ছিল তাকে দেখেছিলে?’
‘দেখেছিলাম। কোট-প্যান্ট-পরা একটা লোক।’
‘তারপর!’
‘তারপর দশ-বারো দিন চুপচাপ, হেনা বাড়ি থেকে বেরুলো না। একদিন আমি দোতলার বাড়ির কাছাকাছি আসতেই তার ভেতর থেকে মাউথ-অগনি বেজে উঠলো, আবার বাড়ি পার হয়েই থেমে গেল। কিছুক্ষণ পরে ট্যাক্সি ফিরে এল, বাড়ির সামনে আর একবার প্যাপপো পাপপো বাজিয়ে চলে গেল। আমি ভাবতে লাগলাম, কী ব্যাপার, আমাদের বাড়ির সামনেই মাউথ-অগনি বাজায় কেন? এমন সময় দেখি, হেনা বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেদিকে ট্যাক্সি গেছে। সেই দিকে চলে গেল। হঠাৎ বুঝতে পারলাম, কেউ হেনাকে ইশারা করে যায়, অমনি হেনা তার সঙ্গে দেখা করতে বেরোয়।’
‘‘হেনা কখন ফিরে আসতো?’
‘ঘণ্টাখানেক পরেই ফিরে আসতো।’
‘কোথায় যায় তুমি জানো?’
‘কি করে জানব? একবার হেনার পিছু নিয়েছিলাম। বাড়ি থেকে শাখানেক গজ দূরে রাস্তার ধারে ট্যাক্সিটা দাঁড়িয়ে ছিল, হেনা টুক করে তাতে উঠে পড়ল, ট্যাক্সি চলে গেল।’
‘হুঁ। শেষবার কবে হেনা বেরিয়েছিল?’
‘দশ-বারো দিন আগে। —আচ্ছা ব্যোমকেশদা, আজ তাহলে আমি পালাই, বডড দেরি হয়ে গেল। সুবিধে পেলেই আবার আসব।’
‘আচ্ছা, এস।’
নেংটি চলিয়া যাইবার পর ব্যোমকেশ অনেকক্ষণ চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। অবশেষে আমি নীরবতা ভঙ্গ করিয়া বলিলাম, ‘কি বুঝছ?’
ব্যোমকেশ অন্যমনস্কভাবে সিগারেট ধরাইতে ধরাইতে বলিল, ‘মাউথ-অগানের ব্যাপারটা গোলমেলে ঠেকছে, কিন্তু একটা জিনিস বোঝা যায়। হেনা কলকাতা শহরে নেহাৎ একলা ছিল না! যাহোক, হেনার মৃত্যু সম্বন্ধে নিশ্চয় হওয়া গেল; অপঘাত মৃত্যু নয়, তাকে কেউ খুন করেছে। এখন প্রশ্ন–মগ্নমৈনাকটি কে?’
বলিলাম, ‘ঘরে যে আগুন লাগিয়েছিল সে-ই নিশ্চয়।’
কথাটা ব্যোমকেশের মনঃপূত হইল না, সে মাথা নাড়িয়া বলিল, ‘হতে পারে, আবার না-ও হতে পারে। ব্যাপারটা বুঝে দেখ। একটা লোক হেনাকে খুন করেছে, তার মোটিভ আমরা জানি না। যৌন-ঈর্ষা হতে পারে, আবার অন্য কিছুও হতে পারে। কিন্তু যে-লোকটা ঘরে আগুন দিয়েছে তার উদ্দেশ্য স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে; হেনার ঘরে এমন একটা মারাত্মক জিনিস আছে যা সে নষ্ট করে ফেলতে চায়। আমরা ঘরটা একবার মোটামুটি রকম তল্লাশ করেছি, কিন্তু মারাত্মক কিছু পাইনি। আবার তল্লাশ করে যদি মারাত্মক বস্তুটি খুঁজে পাই! অতএব পুড়িয়ে শেষ করে দাও।’
‘কী মারাত্মক জিনিস হতে পারে?’
‘হয়তো কাগজ, এক টুকরো কাগজ। বড় জিনিস হলে আমরা খুঁজে পেতাম।’
হঠাৎ মনে পড়িয়া গেল, বলিলাম, ‘ব্যোমকেশ, সেই গোলাপী কাগজের টুকরো! তাতে কি লেখা আছে?’
ব্যোমকেশ দেরাজ হইতে কাগজের টুকরাটি বাহির করিয়া দিল, বলিল, ‘কবিতা। পড়ে দেখ দেখি, কাব্য হয়েছে কি না।’
কবিতা পড়িলাম–
তোমার হাসির ঝিলিকটুকু
ছুরির মত রইল বিঁধে বুকে
বিনা দোষে শাস্তি দিতে
পারে তোমার ঠোঁটদুটি টুকটুকে।
বলিলাম, মন্দ নয়, অনেকটা সংস্কৃত উদ্ভট কবিতার মত। কে লিখেছে?
ব্যোমকেশ বলিল, ‘ওদের বাড়িতে কবি একজনই আছে-যুগল।’
অপরাহ্নে এ কে রে স্বয়ং জবানবন্দীর নকল লইয়া আসিলেন।
আজ তাঁহার চরিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। আমাদের সঙ্গে ফষ্টি-নিষ্টি করিলেন, দুই চারিটা মজাদার গল্প বলিলেন, ব্যোমকেশ যে পুলিসে যোগ না দিয়া শূন্যোদরে বন্যমহিষ তাড়াইয়া বেড়াইতেছে তাহা প্রমাণ করিলেন, সময়োচিত পানাহার গ্রহণ করিলেন; তারপর কাজের কথায় উপস্থিত হইলেন। জবানবন্দীর ফাইল ব্যোমকেশকে দিয়া বলিলেন, ‘এই নাও, পড়ে দেখতে পার। কিন্তু তোমার কোন কাজে লাগবে না।’
ভু তুলিয়া ব্যোমকেশ বলিল, ‘কাজে লাগবে না কেন?
এ কে রে বলিলেন, ‘পুলিস-দপ্তরের মতে হেনীর মৃত্যু অপঘাত ছাড়া আর কিছু নয়, তদন্ত চালানো নিরর্থক।’
ব্যোমকেশ কিছুক্ষণ চাহিয়া থাকিয়া বলিল, ‘আগুন লাগার খবর পেয়েছ?’
এ কে রে বলিলেন, ‘পেয়েছি। ওটা সমাপতন। ইচ্ছে করে কেউ আগুন লাগিয়েছিল তার কোন প্রমাণ নেই।’
ব্যোমকেশ একবার তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তাঁহাকে নিরীক্ষণ করিয়া জানালার বাহিরে চাহিয়া রহিল। শেষে বলিল, ‘তাহলে সন্তোষবাবু আমাকে যে কাজ দিয়েছিলেন, সেটা গেল। তাঁর পরিবারিক স্বার্থরক্ষার আর দরকার নেই।’
এ কে রে হাসিয়া বলিলেন, ‘না। তুমি তাঁকে আশ্বাস দিতে পোর পুলিস তাঁর পরিবারের ওপর আর কোনো জুলুম করবে না। —ভাল কথা, আগুন লাগার খবর পেয়ে আমি সন্তোষবাবুর বাড়িতে গিয়েছিলাম। তিনি উপস্থিত ছিলেন। কাল হেনার দেরাজের মধ্যে যে ফটোগ্রাফ পাওয়া গিয়েছিল, সেটা তাঁকে দেখলাম। তিনি বললেন, ওটা হেনার মায়ের ছবি।’
ব্যোমকেশ ঘাড় নাড়িল, বলিল, ‘ময়না তদন্তে কী পেলে?’
এ কে রে বলিলেন, ‘এ রকম অবস্থায় যা আশা করা যায়। তার বেশি কিছু নয়। পাঁজরার একটা হাড় ভেঙ্গে হৃৎপিণ্ডকে ফুটো করে দিয়েছে, তৎক্ষণাৎ মৃত্যু হয়েছে। অন্য কোন জটিলতা নেই।’
‘মৃত্যুর সময়?’
‘সাড়ে পাঁচটা থেকে ছাঁটার মধ্যে।’
তারপর এ কে রে দু’ একটা হাসি-তামাশার কথা বলিয়া ব্যোমকেশের পিঠ চাপড়াইয়া প্রস্থান করিলেন। ব্যোমকেশ অনেকক্ষণ নীরবে বসিয়া রহিল।
আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, ‘এ কে রে কি খুব বুদ্ধিমান লোক?’
ব্যোমকেশ আমার পানে চোখ তুলিয়া বলিল, ‘ওর বুদ্ধি কারুর চেয়ে কম নয়।’
বলিলাম, ‘দোষের মধ্যে পুলিস।’
‘হ্যাঁ, দোষের মধ্যে পুলিস।’ ব্যোমকেশ জবানবন্দীর ফাইলটা তুলিয়া লইল।
আধঘণ্টা পরে জবানবন্দী পাঠ শেষ করিয়া সে ফাইল আমাকে দিল, বলিল, ‘বিশেষ কিছু নেই, দেখতে পারো।–আমি একটু ঘুরে আসি।’
‘কোথায় যাচ্ছ?
‘অনেক দিন দোকানে যাওয়া হয়নি, যাই দেখে আসি প্রভাত কি করছে।’
সে চলিয়া গেল। আমি ফাইল খুলিয়া জবানবন্দী পড়িতে আরম্ভ করিলাম—
রবীন্দ্রনাথ বর্মণ। বয়স ৩৯। সন্তোষ সমাদ্দারের অন্যতম সেক্রেটারি। সন্তোষবাবুর বাড়িতে থাকেন। বেতন ৩৫০ টাকা।
আজ শনিবার। কত অফিস থেকে চলে যাবার পর আমি আন্দাজ সাড়ে তিনটের সময় ফিরে আসি। হেনা তখন কোথায় ছিল আমি লক্ষ্য করিনি। সম্ভবত নিজের ঘরেই ছিল।
আমি কিছুক্ষণ নিজের ঘরে বিশ্রাম করলাম। সাড়ে চারটের সময় চাকর চা-জলখাবার এনে দিল, আমি খেলাম। তারপর পাঁচটা নাগাদ বাড়ি থেকে বেরুলাম। বাজারে কিছু কেনাকাটা করবার ছিল, সাবান টুথপেস্ট দাড়ি কামাবার ব্লেড অ্যাসপিরিন, এই সব।
আমি যখন বেরুই, তখন হল-ঘরে কেবল একজন মানুষ ছিল-উদয়। তার সঙ্গে আমার কোন কথা হয়নি, সে কিছুই করছিল না, বুকে হাত বেঁধে ঘরময় ঘুরে বেড়াচ্ছিল। উদয় কলেজে পড়ে। বইকি, তবে যখন ইচ্ছে চলে আসে, পড়াশুনোয় মন নেই।
আমি বাজার করে ফিরলাম ছাঁটার সময়। তখনো অন্ধকার হয়নি, আমি নিজের ঘরে জিনিসপত্র রেখে পুবদিকের গোলাপ-বাগানে গেলাম। সেখানে কিছুক্ষণ বেড়াবার পর হঠাৎ নজরে পড়ল বাড়ির কোলে মানুষের চেহারার মত কি যেন একটা পড়ে আছে। কাছে গিয়ে দেখি-হেনা।
চেঁচামেচি করে লোক ডাকলাম। চাকরেরা ছুটে এল, যুগল আর উদয়ও এল-হ্যাঁ, ওরা দু’জনেই বাড়িতে ছিল। সবাই মিলে ধরাধরি করে লাশ বাড়িতে নিয়ে এলাম, তারপর পুলিসকে ফোন করলাম। না, কর্তা বাড়িতে ছিলেন না। শনিবার-রবিবার তিনি বাড়িতে থাকেন না। কোথায় থাকেন আমি জানি না।
যুগলচাঁদ সমাদ্দার। বয়স ২০। সন্তোষ সমাদ্দারের পুত্র।
আমি কলেজে পড়ি। আজ দুটোর পর ক্লাস ছিল না, তাই তিনটের সময় বাড়ি ফিরে এসেছিলাম। আমার ঘর দোতলায়, রবিবর্মার ঘরের ওপরে।
ঘরে এসে একটা বই নিয়ে বিছানায় শুয়েছিলাম, তারপর ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ঘুম ভাঙল একেবারে সাড়ে পাঁচটার সময়ে। তাড়াতাড়ি উঠে নীচে নেমে গেলাম। না, হল-ঘরে কেউ ছিল না। আমি গোলাপ-বাগানে গিয়ে কিছুক্ষণ বেড়ালাম, তারপর ফিরে এসে দোতলায় গেলাম। চিংড়ি আমাকে চা-জলখাবার এনে দিল, আমি খেলাম। তারপর নিজের ঘরে গিয়ে লেখাপড়া করতে বসলাম।
বাগানে আমি বেশিক্ষণ ছিলাম না, পনেরো-কুড়ি মিনিট ছিলাম। ধরুন, সাড়ে পাঁচটা থেকে পৌঁনে ছটা পর্যন্ত। না, রব্বিমাকে বাগানে দেখিনি। বাড়ির পাশে হেনার মৃতদেহ দেখিনি। ছাঁটার পর নীচে চেঁচামেচি শুনে আমি নেমে এলাম। ওরা তখন হেনার মৃতদেহ বাড়ির মধ্যে নিয়ে আসছে।
আমার সঙ্গে হেনার ঘনিষ্ঠতা ছিল না, কারুর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা ছিল না। সে কারুর সঙ্গে মিশতো না।
উদয়চাঁদ সমাদ্দার। বয়স ২০। সন্তোষ সমাদ্দারের পুত্র।
আজ আমি কলেজে যাইনি। দুপুরবেলা বিলিয়ার্ড খেলতে ক্লাবে গিয়েছিলাম। ক্লাবের নাম গ্রেট ইস্টার্ন স্পোর্টিং ক্লাব।
সাড়ে চারটের সময় আমি বাড়ি ফিরেছি। দোতলায় হেনার ঘরের ওপর আমার ঘর। আমি নিজের ঘরে গেলাম, কাপড়-চোপড় বদলে নীচের হল-ঘরে নেমে এলাম। কেন নেমে এলাম তার কৈফিয়ৎ দিতে বাধ্য নই। আমার বাড়ি, আমি যখন যেখানে ইচ্ছা থাকি।
প্রশ্ন : আপনি যতক্ষণ হল-ঘরে ছিলেন, সেই সময়ের মধ্যে অন্য কাউকে হল-ঘরে দেখেছিলেন?
উত্তর: রবিবর্মা নিজের ঘরে ছিল, মাঝে মাঝে হল-ঘরে আসছিল। সে আন্দাজ পাঁচটার সময় বেরিয়ে গেল।
প্রশ্ন: আর কেউ?
উত্তর : নেংটি ছোঁক ছোঁক করে বেড়াচ্ছিল, আমার কাছ থেকে একটা সিগারেট চেয়ে নিয়ে বাইরে চলে গেল।
প্রশ্ন : হেনা তখন কোথায় ছিল?
উত্তর: নিজের ঘরে।
প্রশ্ন : আপনি হল-ঘরে থাকতে থাকতেই হেনা ছাদে যাবার জন্যে নিজের ঘর থেকে বেরিয়েছিল?
উত্তর : হ্যাঁ।
প্রশ্ন : তার হাতে কিছু ছিল?
উত্তর; একটা ছোট মাদুর ছিল। ভ্যানিটি-ব্যাগ ছিল।
প্রশ্ন : আপনি তার সঙ্গে কথা বলেছিলেন?
উত্তর : নো কমেন্ট।
প্রশ্ন : হেনা চলে যাবার পর আপনি হল-ঘরে কতক্ষণ ছিলেন?
উত্তর: পাঁচ মিনিট।
প্রশ্ন : তারপর কোথায় গেলেন?
উত্তর: নিজের ঘরে।
প্রশ্ন : হেনার সঙ্গে আপনার ঘনিষ্ঠতা ছিল?
উত্তর : নো কমেন্ট।
শ্ৰীমতী চামেলি সমাদ্দার। বয়স ৪৪। সন্তোষ সমাদ্দারের স্ত্রী।
ছ’মাস আগে হেনা মল্লিক। আমার বাড়িতে এসেছিল। তার সঙ্গে আমার কোনো সম্বন্ধ ছিল না, তাকে কখনো দোতলায় উঠতে বলিনি। আমি মুখ দেখে মানুষ চিনতে পারি, হেনা ভাল মেয়ে ছিল না। আমার স্বামী কেন তাকে বাড়িতে এনেছিলেন। আমি জানি না। আমি বিরক্ত : হয়েছিলাম। কিন্তু কর্তার ইচ্ছায় কর্ম, আমি কী করতে পারি। হেনাকে নিয়ে স্বামীর সঙ্গে আমার ঝগড়া হয়নি, কোন কথাই হয়নি।
আমার দুই ছেলেই ভাল ছেলে, সচ্চরিত্র ছেলে। হেনার সঙ্গে তাদের কোন সম্পর্ক ছিল না, উটুকো মেয়ের সঙ্গে তারা মেলামেশা করে না।
আজ পাঁচটা থেকে ছাঁটার মধ্যে আমি চিংড়ির চুল বেঁধে দিয়েছিলুম, চিংড়ি আমার চুল বেঁধে দিয়েছিল, তারপর আমি বাথরুমে গা ধুতে গিয়েছিলুম! হেনাকে তেতলার ছাদে যেতে দেখিনি, ছাদের ওপর কোন শব্দ শুনিনি।
শেফালিকা, ওরফে চিংড়ি। বয়স ১৫। সন্তোষবাবুর গৃহে পালিত। দু’বছর আগে আমাদের মা-বাবা মারা যান। সেই থেকে দাদা আর আমি মাসিমার কাছে আছি।
হেনা যখন এ-বাড়িতে এসেছিল, তখন তাকে দেখে আমার খুব ভাল লেগেছিল। এত সুন্দর মেয়ে আমি দেখিনি। আমি একবার গিয়েছিলুম ভাব করতে, কিন্তু সে আমার মুখের ওপর দোর বন্ধ করে দিল। সেই থেকে আমি আর ওর কাছে। যাইনি, মাসিমা মানা করে দিয়েছিলেন। ওকে দু-একবার মেসোমশাইয়ের সঙ্গে কথা বলতে শুনেছি। মেসোমশাইয়ের সঙ্গে ও ভালভাবে কথা বলত। দশ-বারো দিন অন্তর ভাল কাপড়-চোপড় পরে বাইরে যেত। কোথায় যেত। জানি না। একলা যেত, আবার ঘন্টাখানেক পরে ফিরে আসত। হ্যাঁ, রোজ সন্ধ্যার সময় হেনা ছাদে যেত, সেখানে একলা কি করত। জানি না; বোধহয় পায়চারি করত, কিংবা মাদুর পেতে বসে থাকত। মাসিমার বিশ্বাস, হেনা ছাদে গিয়ে লুকিয়ে সিগারেট খেত।
আমি স্কুলে পড়ি না, মাসিম আমাকে স্কুলে পড়তে দেননি। তিনি বলেন, স্কুল-কলেজে পড়লে মেয়েরা বিগড়ে যায়, সিগারেট খেতে শেখে। আমি মাসিমার কাছে ঘর-কান্নার কাজ শিখেছি।
আজ বিকেলবেলা মাসিম আমার চুল বেঁধে দিলেন, আমি মাসিমার চুল বেঁধে দিলুম; তারপর মাসিম বাথরুমে গেলেন। আমি দাদাদের জলখাবার দিতে গেলুম। যুগলদা নিজের ঘরে ছিলেন, তাঁকে খাবার দিয়ে উদয়দা’র ঘরে গেলুম। উদয়ন্দা ঘরে ছিলেন না; তাঁর টেবিলে খাবার রেখে আমি চলে এলুম। তারপর আমিও বাথরুমে গা ধুতে গেলুম। দোতলায় পাঁচটা বাথরুম আছে।
না, হেনা কখন ছাদে গিয়েছিল। আমি জানতে পারিনি। ছাদের ওপর শব্দ শুনিনি। বাথরুম থেকে বেরুবার পর নীচের তলা থেকে চেঁচামেচি শুনতে পেলুম, জানতে পারলুম হেনা ছাদ থেকে পড়ে মরে গেছে।
নির্মলচন্দ্র দত্ত, ওরফে নেংটি। বয়স ১৭। সন্তোষবাবুর গৃহে পালিত।
চিংড়ি আমার বোন। আমরা মা-বাবার মৃত্যুর পর থেকে মাসিমার কাছে আছি। আমি লেখা পড়া করি না। মেসোমশাই বলেছেন, আমার আঠারো বছর বয়স হলে তিনি তাঁর কোম্পানিতে চাকরি দেবেন।
হেনা দেখতে খুব সুন্দর ছিল, কিন্তু ভারি অহংকারী ছিল, আমার সঙ্গে কথাই বলত না। বাড়িতে কেবল মেসোমশাইয়ের সঙ্গে হেসে কথা বলত, যুগলদা আর উদয়দা’র সঙ্গে দুটো-একটা কথা বলত। হেনা সম্বন্ধে আমি কিছুই জানি না।
আজ বিকেল সাড়ে পাঁচটার সময় আমি বেড়াতে বেরিয়েছিলাম। তখন হেনা নিজের ঘরে ছিল। ছটার পর ফিরে এসে শুনলাম সে ছাদ থেকে পড়ে মরে গেছে। এর বেশি আমি আর কিছু জানি না।
জবানবন্দী পড়া শেষ করিয়া কিছুক্ষণ নীরবে সিগারেট টানিলাম। এই কয়জনের মধ্যেই কেহ হেনাকে ছাদ হইতে ঠেলিয়া ফেলিয়া দিয়াছিল মনে হয় না। উদয় ছেলেটা একটু উদ্ধত, কিন্তু তাহাতে কিছুই প্রমাণ হয় না। সত্যিই কি কেহ হেনাকে ছাদ হইতে ফেলিয়া দিয়াছিল? হয়তো পুলিসের অনুমানই ঠিক, ব্যোমকেশ ঝোপে ঝোপে বাঘ দেখিতেছে। কিন্তু ঘরে আগুন লাগাও কি আকস্মিক?
নেংটি একটা লোকের কথা বলিল, হেনা দশ-বারো দিন অন্তর মাউথ-অগানের বাজনা শুনিয়া তাহার সহিত দেখা করিতে যাইত। লোকটা কে? সে-ই কি কোন অজ্ঞাত কারণে হেনাকে খুন করিয়াছে? সম্ভোষবাবুর তেতলার ছাদটি অবস্থা গতিকে বাহিরের লোকের পক্ষে সহজগম্য হইয়া পড়িয়াছে, ভারার মই বাহিয়া যে কেহ ছাদে উঠিতে পারে; অর্থাৎ, বাড়ির লোক এবং বাহিরের লোক সকলেরই ছাদে উঠিবার সমান সুবিধা।
সান্ধ্য চায়ের সময় হইলে ব্যোমকেশ ফিরিল। জিজ্ঞাসা করিলাম, ‘দোকানে কী মতলবে গিয়েছিলে?’
সে চায়ের পেয়ালায় চামচ ঘুরাইতে ঘুরাইতে বলিল, ‘মতলব কিছু ছিল না। মাথার মধ্যে গুমোট জমে উঠেছিল, তাই একটু হাওয়া-বাতাস লাগাতে বেরিয়েছিলাম। দোকানে বিকাশের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। সে মাঝে মাঝে প্রভাতের সঙ্গে আড্ডা দিতে দোকানে আসে।’ চায়ে একটি চুমুক দিয়া সে সিগারেট ধরাইল, বলিল, ‘বিকাশের সঙ্গে দেখা হল ভালই হল, তাকে কাল বিকেলে আসতে বলেছি।’
‘তাকে তোমার কী দরকার?’
‘দরকার হবে কিনা সেটা নির্ভর করছে সন্তোষবাবুর ওপর। কাল সকালে তাঁর সঙ্গে দেখা করব। তিনি যদি আমায় বরখাস্ত করেন তাহলে আর কিছু করবার নেই।’ সে পৰ্যায়ক্রমে চা ও সিগারেটের প্রতি মনোনিবেশ করিল। আরো কয়েকটা প্রশ্ন করিয়া ভাসা-ভাসা উত্তর পাইলাম। তাহার স্বভাব জানি। তাই আর নিষ্ফল প্রশ্ন করিলাম না।
পরদিন ঠিক ন’টার সময় আমরা দুইজনে সন্তোষবাবুর অফিসে উপস্থিত হইলাম। ক্লাইভ স্ট্রীটে প্রকাণ্ড সওদাগরী সৌধ, তাহার দ্বিতলে সন্তোষবাবুর অফিস।
সন্তোষবাবু সবেমাত্র অফিসে আসিয়াছেন, এত্তেলা পাইয়া আমাদের ডাকিয়া পাঠাইলেন। আমরা তাঁহার খাস কামরায় প্রবেশ করিলাম। টেবিলের উপর কাগজপত্রের ফাইল, দু’টি টেলিফোন, সন্তোষবাবু টেবিলের সামনে একাকী বসিয়া আছেন। আজ তাঁহার পরিধানে বিলাতি বেশ; কোট খুলিয়া রাখিয়াছেন; লিনেনের শার্টের সম্মুখভাগে দামী সিল্কের টাই শোভা পাইতেছে।
সন্তোষবাবু হাত নাড়িয়া আমাদের সম্ভাষণ করিলেন। আমরা টেবিলের পাশে উপবিষ্ট হইলে তিনি ভ্রূ তুলিয়া ব্যোমকেশকে প্রশ্ন করিলেন, ‘কি খবর?
ব্যোমকেশ বলিল, ‘শুনেছেন বোধহয়, পুলিস সাব্যস্ত করেছে হেনার মৃত্যু সম্পূর্ণ আকস্মিক ঘটনা।’
সন্তোষবাবু চকিত হইয়া বলিলেন, ‘তাই নাকি! আমি শুনিনি।’ তারপর আরামের একটা নিশ্বাস ফেলিয়া বলিলেন, ‘যাক, বাঁচা গেল। মনে একটা অস্বস্তি লেগে ছিল।’
ব্যোমকেশ বলিল, ‘কিন্তু আমি এখনো নিঃসংশয় হতে পারিনি।’
সন্তোষবাবু একটু বিস্ময়ের সহিত তাহার পানে চাহিয়া রহিলেন, শেষে বলিলেন, ‘ও–মানে আপনার বিশ্বাস হেনাকে কেউ খুন করেছে?—কোন সূত্র পেয়েছেন কি?’
ব্যোমকেশ বলিল, ‘প্রথমত, ঘরে আগুন লাগাটা স্বাভাবিক মনে হয় না।’
সন্তোষবাবু শূন্য পানে চাহিয়া ধীরে ধীরে বলিলেন, ‘তা বটে, ঘরে আগুন লাগাটা আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়। আর কিছু?’
ব্যোমকেশ তখন মাউথ-অগনিবাদকের কথা বলিল। সন্তোষবাবু গভীর মনোযোগের সহিত শুনিলেন, তারপর বলিলেন, ‘হুঁ। কিন্তু আমি যতদূর জানি এখানে হেনার চেনা-পরিচিত কেউ নেই।’
ব্যোমকেশ বলিল, ‘পাকিস্তানের লোক হতে পারে। হয়তো কাজের সূত্রে দশ-বারো দিন অন্তর কলকাতায় আসতো, আর হেনার সঙ্গে দেখা করে যেত।’
এই সময় টেলিফোন বাজিয়া উঠিল। সন্তোষবাবু টেলিফোন কানে দিয়া শুনিলেন, দু’বার ই হু করিলেন, তারপর যন্ত্র রাখিয়া দিলেন। ব্যোমকেশের দিকে ফিরিয়া বলিলেন, ‘হতে পারে-হতে পারে। তা, আপনি এখন কি করতে চান?
ব্যোমকেশ বলিল, ‘আপনার যদি অনুমতি থাকে, আমি একবার বাড়ির সকলকে জেরা করে দেখতে পারি।’
সন্তোষবাবু একটু নীরব থাকিয়া বলিলেন, ‘দেখুন ব্যোমকেশবাবু্, আপনাকে আমি আমার পারিবারিক স্বার্থরক্ষার জন্যে নিযুক্ত করেছিলাম। কিন্তু পুলিস যখন বলছে এটা দুর্ঘটনা, তখন আপনার দায়িত্র শেষ হয়েছে। অবশ্য, আপনার পারিতোষিক আপনি পাবেন–’
ব্যোমকেশ বলিল, ‘পারিতোষিকের জন্যে আমি ব্যগ্র নই মিস্টার সমাদার, এবং বেশি কাজ দেখিয়ে বেশি পারিতোষিক আদায় করার মতলবও আমার নেই। আমি শুধু সত্য আবিষ্কার করতে চাই।’
সন্তোষবাবু ঈষৎ অধীরভাবে বলিলেন, ‘সত্য আবিষ্কার! পুলিসের হাঙ্গামা থেকে যখন রেহাই পেয়েছি, তখন নিছক সত্য আবিষ্কারে আমার আগ্রহ নেই-?
আবার টেলিফোন বাজিল। সন্তোষবাবু ফোনে কথা বলা শেষ করিতে না করিতে অন্য ফোনটা বাজিয়া উঠিল। একে একে দুইটি ফোনে কথা বলা শেষ করিয়া তিনি আমাদের পানে চাহিয়া হাসিলেন। ব্যোমকেশ উঠিয়া দাঁড়াইয়া বলিল, ‘কাজের সময় আপনাকে বিরক্ত করব না। তাহলে–আপনার আগ্রহ নেই?’
সন্তোষবাবু বলিলেন, ‘আগ্রহ নেই, তেমনি আপত্তিও নেই। আপনি বাড়ির সকলকে জেরা করুন।’
‘ধন্যবাদ। রবিবর্মা কি অফিসে আছেন?’
‘না, তার শরীর খারাপ, সে আজ অফিসে আসেনি। বাড়িতেই আছে।’
‘আচ্ছা। আপনি দয়া করে বাড়িতে জানিয়ে দেবেন। আমরা যাচ্ছি।’
‘আচ্ছা।’ তিনি টেলিফোন তুলিয়া নম্বর ঘুরাইতে লাগিলেন। আমরা চলিয়া আসিলাম।
সন্তোষবাবুর বাড়িতে পৌঁছিলাম আন্দাজ সাড়ে ন’টার সময়। দেউড়ি দিয়া প্রবেশ করিতে করিতে ব্যোমকেশ বলিল, ‘চল, আগে বাগানটা দেখে যাই।’
আমরা পূর্বদিকে মোড় ঘুরিলাম। বাড়ির কোণে হেনার ঘরের পোড়া কাঁচভাঙা জানালা দুটা গহ্বরের মত উন্মুক্ত হইয়া আছে। গোলাপের বাগানে সিলভার পাইনের ছায়া পড়িয়াছে, অজস্র শ্বেত-রক্ত-পীত ফুল ফুটিয়া আছে। এদিকে ভারা নাই, চুনকাম-করা দেয়াল রৌদ্র প্রতিফলিত করিতেছে। হেনা এই দেয়ালের পদমূলে পড়িয়া মরিয়াছিল, কিন্তু কোথাও কোনো চিহ্ন নাই। হত্যায় খচিত এই ধরণীর ধূলি, কিন্তু চিহ্ন থাকে না।
বাড়ির পিছন দিকে ভারা লাগানো আছে। মিস্ত্রিরা মেরামতের কাজ আরম্ভ করিয়াছে, দুইজন মজুর মাথায় লোহার কড়া লইয়া ভারা-সংলগ্ন মই দিয়া ওঠা-নামা করিতেছে। মন্থরভাবে কাজ চলিতেছে।
পিছন দিক বেড়িয়া আমরা বাড়ির পশ্চিমদিকে উপস্থিত হইলাম। এখানেও দেয়ালের গায়ে ভারা লাগানো, মিস্ত্রিরা কাজ করিতেছে, মজুর ওঠা-নমা করিতেছে। ব্যোমকেশ কিছুক্ষণ ঊর্ধ্বমুখ হইয়া দেখিল, তারপর মই বাহিয়া তরুতর করিয়া উপরে উঠিয়া গেল।
তিনতলার আলিসার উপর দিয়া একবার ছাদে উঁকি মারিয়া সে আবার নামিয়া আসিল। আমি উত্তেজিত হইয়া বলিলাম, ‘কি ব্যাপার। ছাদে কী দেখলে?’
সে হাসিয়া বলিল, ‘ছাদে দর্শনীয় কিছু নেই। দর্শনীয় বস্তু ঐখানে।’ বলিয়া বাহিরের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করিল।
ঘাড় ফিরাইয়া দেখিলাম, খিড়কির ফটক। ব্যোমকেশ সেই দিকে অগ্রসর হইল, আমি চলিলাম। বাগানের এই দিকটাতে আম-লিচু-পেয়ারা-জামরুল প্রভৃতি ফলের গাছ; আমরা এই ফলের বাগান পার হইয়া বাড়ির বহিঃপ্রাচীরের নিকট উপস্থিত হইলাম।
খিড়কির ফটকটি সঙ্কীর্ণ লোহার শিক-যুক্ত কপট আন্দাজ পাঁচ ফুট উঁচু। তাঁহাতে তালা লাগাইবার ব্যবস্থা থাকিলেও মরিচা-ধরা অবস্থা দেখিয়া মনে হয়। বহুকাল তালা লাগানো হয় নাই। ফটকের বাহিরে একটি সরু গলি গিয়াছে। এই পথ দিয়া বাড়ির চাকর-বাকর যাতায়াত করে।
ব্যোমকেশ আমার দিকে ভ্রূ বাঁকাইয়া বলিল, ‘কি বুঝলে?’
বলিলাম, ‘এই বুঝলাম যে, বাইরে থেকে অলক্ষিতে বাগানে প্রবেশ করা যায় এবং বাগান থেকে মই বেয়ে ছাদে উঠে যাওয়াও শক্ত নয়।’
সে আমার পিঠ চাপড়াইয়া বলিল, ‘শাবাশ।-চল, এবার বাড়ির মধ্যে যাওয়া যাক।’
হল-ঘরে নেংটি হেনরি পোড়া ঘরের বাহিরে দাঁড়াইয়া সেই দিকে চাহিয়া ছিল, আমাদের দেখিয়া আগাইয়া আসিল। ব্যোমকেশ বলিল, ‘কি দেখছিলে?’
নেংটি বলিল, ‘কিছু না। আজ সকালে মাসিম এসে ঘরে গঙ্গাজল ছিটিয়ে দিয়েছেন। কাল থেকে মিস্ত্রি লাগবে। নতুন দোর-জানোলা বসানো হবে, ঘরের প্ল্যাস্টার তুলে ফেলে নতুন করে প্ল্যাস্টার লাগানো হবে। ভাগ্যিস আগাগোড়া কংক্রিটের বাড়ি, নইলে সারা বাড়িটাই পুড়ে ছাই হয়ে যেত। সেই সঙ্গে আমরাও।’
ব্যোমকেশ বলিল, ‘হুঁ। বাড়ির সব কোথায়?’
নেংটি বলিল, ‘বাড়িতেই আছে, মেসোমশাই ফোন করেছিলেন। দাদারা কলেজে যায়নি। ডেকে আনিব?’
ব্যোমকেশ বলিল, ‘না, আমি প্রত্যেকের ঘরে গিয়ে দেখা করব। রবিবর্মা কোথায়?’
‘নিজের ঘরে।’ বলিয়া নেংটি আঙুল দেখাইল।
‘আচ্ছা। তুমি তাহলে দোতলায় গিয়ে সবাইকে জানিয়ে দাও। আমি রবিবর্মার সঙ্গে দেখা করেই যাচ্ছি।’
নেংটি দ্বিতলে চলিয়া গেল, আমরা রবিবর্মার দ্বারের সম্মুখে গিয়ে দাঁড়াইলাম। দ্বার ভেজানো ছিল, ব্যোমকেশ টোকা দিতেই খুলিয়া গেল। রবিবর্মা বলিল, ‘আসুন।’ তাহার গায়ে ধূসর। রঙের আলোয়ান জড়ানো, শীর্ণ মুখ আরও শুষ্ক দেখাইতেছে—’শরীরটা ভাল নেই, তাই অফিস যাইনি।’ বলিয়া কাশি চাপিবার চেষ্টা করিল।
আমরা ঘরে প্রবেশ করিলাম। ঘরটি আয়তনে হেনার ঘরের সমতুল্য। আসবাবও অনুরূপ; একহারা খাট, টেবিল, চেয়ার, বইয়ের শেলফ। ঘরটি রবিবর্মা বেশ পরিচ্ছন্ন রাখিয়াছে।
ব্যোমকেশ রব্বিমাকে কিছুক্ষণ মনোনিবেশ সহকারে নিরীক্ষণ করিয়া বলিল, ‘রবিবাবু্, তুমুপনি সত্যিই সন্তোষবাবুর নিভৃত কুঞ্জের ফোন নম্বর জানেন না?’
রবিবর্মা দৃঢ়ভাবে মাথা নাড়িয়া বলিল, ‘আজ্ঞে না, সত্যি জানি না। কর্তা আমাকে জানাননি, তাই আমিও জািনবার চেষ্টা করিনি। আমি মাইনের চাকর, আমার কি দরকার বলুন?’
ব্যোমকেশ বলিল, ‘তা বটে। সুকুমারীর নিজের বাসার ফোন নম্বর তো আপনার জানা আছে, সেখানেও হেনার মৃত্যুর খবর দেননি?
‘আজ্ঞে না।’
‘সে-সময় অন্য কাউকে ফোন করতে দেখেছিলেন?’
‘আজ্ঞে-গোলমালের মধ্যে সব দিকে নজর ছিল না। মনে হচ্ছে পুলিস আসবার পর নেংটি কাউকে ফোন করেছিল।’
‘নেংটি আমাকে ফোন করেছিল। সে যাক। —বলুন দেখি, পরশু রাত্রে যখন হেনীর ঘরে আগুন লেগেছিল, আপনি কিছুই জানতে পারেননি?’
রবিবর্মা কাশিতে লাগিল, তারপর কাশি সংবরণ করিয়া রুদ্ধ কণ্ঠে বলিল, ‘আজ্ঞে না, আমি জানতে পারিনি।’
‘আশ্চর্য।’
‘আজ্ঞে আশ্চর্য নয়, আমি ঘুমের ওষুধ খেয়ে শুয়েছিলাম। আমার মাঝে মাঝে অনিদ্ৰা হয়, সারা রাত জেগে থাকি। শনিবার ওই সব ব্যাপারের পর ভাবলাম ঘুম আসবে না। তাই শোবার সময় আসপিরিনের বড়ি খেয়েছিলাম। তারপর রাত্রে কী হয়েছে কিছু জানতে পারিনি।‘
ব্যোমকেশ এদিক-ওদিক চাহিল। টেবিলের উপর একটা শিশি রাখা ছিল, তুলিয়া দেখিল-অ্যাসপিরিনের শিশি; প্রায় ভরা অবস্থায় আছে। শিশি রাখিয়া দিয়া সে একথোলো চাবি তুলিয়া লইল। অনেকগুলি চাবি একটি রিংয়ে গ্রথিত, ওজনে ভারী। ব্যোমকেশ জিজ্ঞাসা করিল, ‘এগুলো কোথাকার চাবি?’
‘অফিসের চাবি।’ রবিবর্মা চাবির গোছা ব্যোমকেশের হাত হইতে লইয়া নিজের পকেটে রাখিল–’অফিসের বেশির ভাগ দেরাজ-আলমারির চাবি আমার কাছে থাকে।’
ব্যোমকেশ সহসা প্রশ্ন করিল, ‘রবিবাবু্, আপনার দেশ কোথায়?’
থতমত খাইয়া রবিবর্মা বলিল, ‘দেশ? কুমিল্লা জেলায়।’
‘হেনাকে আগে থাকতে চিনতেন?’
রবিবর্মার তির্যক চোখে শঙ্কার ছায়া পড়িল, সে কাশির উপক্রম দমন করিয়া বলিল, ‘আজ্ঞে না।’
‘তার বাপ কমল মল্লিককে চিনতেন না?’
‘অ্যাঞ্জে না।’
‘হেনার মৃত্যু সম্পর্কে আপনি কিছুই জানেন না?’ রবিবর্মা একটু ইতস্তত করিল, গলা বাড়াইয়া একবার হল-ঘরের দিকে উঁকি মারিল, তারপর চুপিচুপি বলিল, ‘কাউকে বলবেন না, একটা কথা আমি জানি।’
‘কি জানেন বলুন?’
‘সেদিন হেনার ঘরে দেখেছিলাম হেনা উলের জামা বুনছিল। কার জন্যে জামা বুনছিল জানেন? উদায়ের জন্যে।’
‘উদয়ের জন্যে! আপনি কি করে জানলেন?’
‘একদিন বিকেলবেলা আমি দেখে ফেলেছিলাম। উদয় এক বাণ্ডিল উল এনে হেনাকে দিচ্ছে। হেনা সেই উল দিয়ে সোয়েটার তৈরি করছিল।’
‘উদয়ের সঙ্গে তাহলে হেনার ঘনিষ্ঠতা ছিল?’ রবিবর্মা সশঙ্ক চক্ষে চুপ করিয়া রহিল। ব্যোমকেশ বলিল, ‘আর যুগলের সঙ্গে?’
‘আমি জানি না। ব্যোমকেশবাবু্, আমি যে আপনাকে কিছু বলেছি, তা যেন আর কেউ জানতে না পারে। বৌদি জানতে পারলে—’
বৌদি, অর্থাৎ, শ্ৰীমতী চামেলি। সকলেই তাঁহার ভয়ে আড়ষ্ট। মনে পড়িল, সে-রাত্ৰে সিঁড়ি দিয়া নামিবার সময় তাঁহার চাপা কণ্ঠস্বর শুনিয়াছিলাম, তুমি চুপ করে থাকবে, কোন কথা বলবে না।
ব্যোমকেশ বলিল, ‘আপনার সঙ্গে হেনার ঘনিষ্ঠতা ছিল না?’
রবিবর্মা চমকিয়া উঠিল, ‘আমার সঙ্গে–আমি সারা জীবন মেয়েলোককে এড়িয়ে চলেছি। ওসব রোগ আমার নেই, ব্যোমকেশবাবু।’
‘ভাল। চল অজিত, ওপরে যাওয়া যাক।।’
দোতলায় যুগলের ঘরের উন্মুক্ত দ্বারের সম্মুখে গিয়া একটি নিভৃত দৃশ্য দেখিয়া ফেলিলাম। যুগল টেবিলের সামনে বসিয়া আছে, হাতে কলম, সম্মুখে খাতা, চিংড়ি চেয়ারের পিছনে দাঁড়াইয়া তাহার গলা জড়াইয়া কানে কানে ফিসফিস করিয়া কি বলিতেছে। আমাদের দেখিয়া সে ত্রস্তা হরিণীর মত চাহিল, তারপর আমাদের পাশ কাটাইয়া ছুটিয়া চলিয়া গেল।
যুগল ঈষৎ লজ্জিতভাবে উঠিয়া দাঁড়াইল, ‘আসুন।’
ব্যোমকেশ হাসিয়া বলিল, ‘আপনাকে দুতিনটে প্রশ্ন করেই ছেড়ে দেব, তারপর আপনি যদি কলেজে যেতে চান যেতে পারেন।’
যুগল ঘড়ি দেখিয়া বলিল, ‘দেরি হয়ে গেছে, সকালের দিকেই ক্লাস ছিল।’ সে টেবিলের নিকট হইতে সরিয়া আসিয়া খাটের পাশে বসিল, ‘কি জানতে চান বলুন? তাহার কথা বলিবার ভঙ্গীতে ধীর নম্রতা প্রকাশ পাইল। সে-রক্রির সেই বাজাহত বিভ্ৰান্তির ভাব আর নাই।
ব্যোমকেশ তাহারপাশে বসিয়া বলিল, ‘আপনি কবিতা লেখেন?’
যুগল অপ্রতিভ হইয়া পড়িল, ক্ষীণস্বরে বলিল, ‘মাঝে মাঝে লিখি।’
ব্যোমকেশ পকেট হইতে এক টুকরা গোলাপী কাগজ লইয়া যুগলের সম্মুখে ধরিল, বলিল, ‘দেখুন তো, এটা কি আপনার লেখা?
দেখিলাম যুগলের সুশ্ৰী মুখ ধীরে ধীরে লাল হইয়া উঠিতেছে। সে কাগজের টুকরা লইয়া সংশয়িত চিত্তে নাড়াচাড়া করিতেছে, আমি ইত্যবসরে টেবিলের উপর হইতে খাতা লইয়া চোখ বুলাইলাম। কবিতার খাতা, তাহাতে চতুষ্পদী জাতীয় কয়েকটি ক্ষুদ্র কবিতা লেখা রহিয়াছে। সবগুলিই অনুরাগের কবিতা, তার মধ্যে একটি মন্দ লাগিল না–
গোলাপ, তোমারে ধরিনু বুকের মাঝে
বিনিময়ে তুমি কাঁটায় ছিড়িলে বুক
রক্ত আমার দরদর ঝরিয়াছে
সেই শোণিমায় রাঙা করে নাও মুখ।
এখানে গোলাপ কে তাহা অনুমান করিতে কষ্ট হয় না।
ওদিকে যুগল দু’বার গলা খাঁকারি দিয়া বলিল, ‘হ্যাঁ, আমারই লেখা।’
ব্যোমকেশ কণ্ঠস্বরে সমবেদনা ভরিয়া বলিল, ‘হেনার সঙ্গে আপনার ভালবাসা হয়েছিল।’
যুগল কিয়াৎকোল নতমুখে বসিয়া রহিল, তারপর মুখ তুলিয়া বলিল, ‘ভালবাসা-কি জানি। হেন যতদিন বেঁচে ছিল ততদিন একটা নেশায় আচ্ছন্ন করে রেখেছিল–তারপর এখন—’
ব্যোমকেশ প্রফুল্লম্বরে বলিল, ‘নেশা কেটে যাচ্ছে। বেশ বেশ। জানালা দিয়ে গোলাপফুল আপনিই ফেলেছিলেন?’
‘হ্যাঁ।‘
‘হেনা তখন ঘরে ছিল না?’
‘না।‘
‘যুগলবাবু্, সে-রত্রে আপনার ভাই উদয়বাবু অভিযোগ করেছিলেন যে, আপনি হেনাকে মেরেছেন। এ অভিযোগের কারণ কি?’
যুগল ধীরে ধীরে বলিল, ‘কারণ-ঈর্ষা।’
ব্যোমকেশ বলিল, ‘তাহলে উদয়বাবুও কোর প্রতি আসক্ত হয়েছিলেন?’
‘হ্যাঁ।‘
সেই অতি পুরাতন নিশুম্ভ ও মোহিনীর কাহিনী। ভাগ্যক্রমে কাহিনীর উপসংহার ভিন্নপ্রকার দাঁড়াইয়াছে।
ব্যোমকেশ বলিল, ‘আপনাদের দু’জনের মধ্যে হেনা কাকে বেশি পছন্দ করত?’
যুগল ক্ষণেক নীরব থাকিয়া বলিল, ‘এখন মনে হচ্ছে হেনা কাউকেই পছন্দ করত না।’
‘আপনারা দুভাই ছাড়া আর কেউ হেনার প্রতি আসক্ত হয়েছিল? যেমন ধরুন—রবিবর্মা?’
যুগল চকিতে মুখ তুলিল। তাহার মুখে অবিশ্বাসের ভাব ফুটিয়া উঠিল।
সে বলিল, ‘রবিবর্মা! কি জানি, বলতে পারি না।’
উদয় নিজের ঘরে বসিয়া টেনিস র্যাকেটের তাঁতে তেল লাগাইতেছিল, আমরা দ্বারের কাছে উপস্থিত হইতেই সে ঘন ভুরুর নীচে রূঢ় চক্ষু রাঙাইয়া বলিল, ‘আবার কি চাই?’
ব্যোমকেশের মুখ কঠিন হইয়া উঠিল, সে তর্জনী তুলিয়া বলিল, ‘তুমি হেনাকে উল এনে দিয়েছিলে তোমার সোয়েটার বুনে দেবার জন্যে।’
উদয় উদ্ধতস্বরে বলিল, ‘হ্যাঁ, দিয়েছিলাম। তাতে কী প্রমাণ হয়?’
ব্যোমকেশ বলিল, ‘প্রমাণ হয় তোমার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা ছিল। সেদিন সে যখন ছাদে গেল, তখন তুমিও তার পিছন পিছন ছাদে গিয়েছিলে। সেখানে তার সঙ্গে তোমার ঝগড়া হয়, তুমি তাকে ছাদ থেকে ঠেলে ফেলে দিয়েছিলে।’
উদয় হতভম্ব হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল, তাহার মুখ ফ্যাকাসে হইয়া গেল। সে সভয়ে বলিয়া উঠিল, ‘না-না! আমি ছাদে যাইনি। আমি হেনার পিছন পিছন সিঁড়ি দিয়ে উঠেছিলাম, কিন্তু ছাদে পৌঁছুবার আগেই হেনা দোরে শিকল তুলে দিয়েছিল। আমি-আমি তাকে ঠেলে ফেলে দিইনি-আমি তাকে ভালবাসতাম, সেও আমাকে ভালবাসতো।’
ব্যোমকেশ নিষ্ঠুরস্বরে বলিল, ‘হেনা আর যাকেই ভালবাসুক, তোমাকে ভালবাসতো না। সে তোমাকে বাঁদর-নাচ নাচাচ্ছিল। এস অজিত।’
আমরা হল-ঘরের মধ্যস্থিত গোল টেবিলের কাছে গিয়া বসিলাম। ঘাড় ফিরাইয়া দেখিলাম, উদয় ক্ষণকাল আচ্ছল্লের মত দাঁড়াইয়া থাকিয়া নিঃশব্দে ঘরের দ্বার বন্ধ করিয়া দিল।
সামনে ফিরিয়া দেখি পিছনের সারির একটি ঘর হইতে শ্ৰীমতী চামেলি বাহির হইয়া আসিতেছেন। তিনি বোধ হয়। সদ্য স্নান করিয়াছেন, ভিজা চুলের প্রান্ত হইতে এখনো জল ঝরিয়া পড়িতেছে, শাড়ির আচলটা কোনমতে মাথাকে আবৃত করিয়াছে, চোখে সন্দিগ্ধ উদ্বেগ। আমরা উঠিয়া দাঁড়াইলাম।
শ্ৰীমতী চামেলি তীব্র অনুচ্চস্বরে ব্যোমকেশকে বলিলেন, ‘কী বলছিল উদয় আপনাকে?’ ব্যোমকেশ বলিল, ‘মারাত্মক কিছু বলেনি, আপনি ভয় পাবেন না। বসুন, আপনার কাছে দু-একটা কথা জানিবার আছে।’
শ্ৰীমতী চামেলি বসিলেন না, চেয়ারে বসিলে বোধ করি দেহ অশুচি হইয়া যাইবে। অসন্তুষ্ট কণ্ঠে বলিলেন, ‘আপনারা কেন আমাদের উত্ত্যক্ত করছেন। আপনারাই জানেন। কি জানতে চান বলুন?
দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া প্রশ্নালাপ হইল। ব্যোমকেশ প্রশ্ন করিল, ‘আপনি আগে সন্ত্রাসবাদীদের দলে ছিলেন?’
শ্ৰীমতী চামেলি বলিলেন, ‘হ্যাঁ, ছিলাম।’
প্রশ্ন : আপনি অহিংসায় বিশ্বাস করেন না?
উত্তর: না, করি না।
প্রশ্ন : বর্তমানে স্বামীর সঙ্গে আপনার সদ্ভাব নেই?
উত্তর : সে-কথা সবাই জানে।
প্রশ্ন : অসদ্ভাবের কারণ কি?
উত্তর: যথেষ্ট কারণ আছে।
প্রশ্ন: আপনার সন্দেহ-হেনা আপনার স্বামীর উপপত্নী ছিল?
উত্তর : হ্যাঁ। আমার স্বামীর চরিত্র ভাল নয়।
এই নির্ভীক স্পষ্টবাদিতায় ব্যোমকেশ যেন ধাক্কা খাইয়া থামিয়া গেল। শেষে অন্য প্রসঙ্গ তুলিয়া বলিল, ‘নেংটি এবং চিংড়ি আপনার নিজের বোনপো বোনঝি?’
শ্ৰীমতী চামেলি একটু থমকিয়া গেলেন, তাঁহার উত্তরের উগ্রতাও একটু কমিল। তিনি বলিলেন, ‘না, ওদের মা আমার ছেলেবেলার সখী ছিল, তার সঙ্গে গঙ্গাজল পাতিয়েছিলুম। রক্তের সম্পর্ক নেই।’
প্রশ্ন: ওরা জানে?
উত্তর: না, এখনো বলিনি। সময় হলে বলব।
ব্যোমকেশ হাসিমুখে নমস্কার করিয়া বলিল, ‘ধন্যবাদ। আর আপনাকে উত্ত্যক্ত করব না। চললাম।’
শ্ৰীমন্ত্র চামেলি তীব্রটিতে আমাদের পানে চাহিয়া রছিলেন, আমরা নীচের তলায় নামিয়া নেংটি ফটক পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে আসিল। ব্যোমকেশের পানে রহস্যময় কটাক্ষপাত করিয়া বলিল, ‘কিছু বুঝতে পারলেন?’
ব্যোমকেশ একটু বিরক্তস্বরে বলিল, ‘না। তুমি বুঝতে পেরেছ নাকি?’
নেংটি বলিল, ‘আমার বোঝার কী দরকার। আপনি সত্যান্বেষী, আপনি বুঝবেন।’
ফুটপাথে আসিয়া ব্যোমকেশ ঘড়ি দেখিল–’সাড়ে দশটা। চল, এখনো সময় আছে, শ্ৰীমতী সুকুমারীকে দর্শন করে যাওয়া যাক।’
শ্ৰীমতী সুকুমারীর বাসা মধ্য কলিকাতার ভদ্রপল্লীতে, আমাদের বাসা হইতে বেশি দূর নয়। বাড়ির নীচের তলায় দোকানপাট, দ্বিতলে শ্ৰীমতী সুকুমারীর বাসস্থান।
সিঁড়ি দিয়া উঠিতে উঠিতে মৃদঙ্গ ও খঞ্জনির মৃদু নিক্কণ শুনিতে পাইলাম। সঙ্গে তরল বিগলিত কণ্ঠস্বর-রাধেশ্যাম, জয় রাধেশ্যাম! এটা বোধহয় সুকুমারী বৈষ্ণবীর গলা-সাধার সময়।
কড়া নাড়ার উত্তরে একটি বর্ষীয়সী স্ত্রীলোক আসিয়া দ্বার খুলিয়া দিল। থান-পরা গোলগাল চেহারা, চোখে স্টীলের চশমা, মুখখানি জীবনের অভিজ্ঞতায় পরিপক্ক। অনুমান করিলাম-সুকুমারীর ‘মাসি’ এবং ‘বিজনেস ম্যানেজার’।
একটি ক্ষুদ্র ঘরে আমাদের বসাইয়া মাসি ভিতরে গেল। আমরা জাজিমপাতা তক্তপোশের কিনারায় বসিলাম। ঘরে অন্য আসবাব নাই, কেবল দেয়ালে গৌর-নিতাইয়ের একটি যুগ্নচিত্র বুলিতেছে।
ভিতরের ঘরে যন্ত্রসঙ্গীত বন্ধ হইল। মাসি আসিয়া আমাদের ভিতরে লইয়া গেল। এটি বেশ বড় ঘর, মেঝেয় কাপেট পাতা। একজন শীর্ণকায় কঠিধারী বৈষ্ণব মৃদঙ্গ কোলে লইয়া যামিনী রায়ের ছবির ন্যায় বসিয়া ছিলেন, আমাদের দেখিয়া কঠোর চক্ষে চাহিলেন, তারপর উঠিয়া চলিয়া গেলেন। অদূরে সুকুমারী খঞ্জনি হাতে বসিয়া ছিল, নতশিরে আমাদের প্রণাম করিয়া ললিতকণ্ঠে বলিল, ‘আসুন।’
এক একজন মানুষ আছে যাহাদের যৌবনকাল অতীত হইলেও যৌবনের কুহক থাকিয়া যায়। সুকুমারীর বয়স সাঁইত্রিশ-আটত্রিশের কম নয়, কিন্তু ওই যে ইংরেজিতে যাহাকে যৌন-আবেদন বলে তাহা এখনো তাহার সবঙ্গে প্রচুর পরিমাণে বিদ্যামান; সাদা কথায়, তাহাকে দেখিলে পুরুষের মন অশ্লীল হইয়া ওঠে। উন্নত দীঘল দেহ, মুখখানিতে স্নিগ্ধ সরলতা মাখানো, চোখ দু’টি ঈষৎ ঢুলঢুলে। ছলাকলার কোন চেষ্টা নাই, অকপট সহজতাই যেন তাহাকে কেন্দ্ব করিয়া নিবিড় মায়াজাল বিস্তার করিয়াছে। তাহাকে দেখিয়া প্রত্যয় হয়, কেবল সুকণ্ঠের জন্যই সে বিখ্যাত কীৰ্তন-গায়িকা হয় নাই, রূপ-গুণ-চরিত্র মিশিয়া যে সত্তাটি সৃষ্টি হইয়াছে তাহাই বিদগ্ধজনের চিত্ত আকর্ষণ করিয়া লইয়াছে; সে যেন মহাজন কবিদের কল্প লোকবাসিনী চিরায়মানা বৈষ্ণবী।
ব্যোমকেশ বলিল, ‘সন্তোষবাবু আপনার ঠিকানা দিয়েছিলেন, তাই ভাবলাম—’
সুকুমারী ব্যোমকেশের মুখের উপর মোহভরা চক্ষু রাখিয়া বলিল, উনি আপনার কথা ফোনে জানিয়েছেন।’ শুধু গানের গলা নয়, তাহার কথা বলার কণ্ঠস্বরও মধুক্ষরা।
ব্যোমকেশ বলিল, ‘তাহলে হেনার কথা শুনেছেন?’
সুকুমারী একটু বিষণ্ণভাবে ঘাড় নাড়িয়া বলিল, ‘হ্যাঁ।’
‘হেনা নামে একটি মেয়েকে সন্তোষবাবু নিজের বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছেন, একথা আপনি আগে থেকেই জানতেন?’
‘হ্যাঁ। বাপ-মা হারা বন্ধুর মেয়েকে আশ্রয় দিয়েছিলেন আমি জানতাম।’
ব্যোমকেশ একটু কুষ্ঠিতভাবে বলিল, ‘দেখুন, আপনার সঙ্গে সন্তোষবাবুর দীর্ঘকালের ঘনিষ্ঠতার কথা আমি জানি, সুতরাং আমার কাছে সঙ্কোচ করবেন না। সেদিন—অর্থাৎ শনিবার দুপুরবেলা থেকে কি কি হয়েছিল আমায় বলুন।’
সুকুমারী কিছুক্ষণ নতমুখে পায়ের নখ খুঁটিয়া বলিল, ‘আমার মনে কোন সঙ্কোচ নেই, বরং গৌরব। কিন্তু ওঁর মান ইজ্জত আছে, তাই লুকিয়ে রাখতে হয়। সেদিনের কথা শুনতে চান বলছি। ও বাড়িটাকে আমরা ছোট বাড়ি বলি। সেদিন বেলা আন্দাজ দুটোর সময় এখানকার কাজকর্ম সেরে আমি ছোট বাড়িতে গেলুম। পাঁচ দিন বাড়ি বন্ধ থাকে, ঝাড়া মোছা করতে সাড়ে তিনটে বেজে গেল। তারপর উনি এলেন।
‘এসে অফিসের কাপড়-চোপড় ছেড়ে স্নান করলেন। ছোট বাড়িতে ওঁর পাঁচ সেট জামা-কাপড় আছে, অনেক ইংরেজি বই আছে। উনি নিজের ঘরে গিয়ে বই নিয়ে বসলেন, আমি জলখাবার তৈরি করতে গেলুম। বাজারের খাবার উনি খান না।
‘ছটার সময় উনি জলখাবার খেলেন। তুতারপর গান শুনতে বসলেন। ছোট বাড়িতে সঙ্গীতের যন্ত্র কিছু নেই, আমি কেবল খঞ্জনি বাজিয়ে গান গাই। মনে আছে, সেদিন তিনটে পদ গেয়েছিলাম। একটি চণ্ডীদাসের, একটি গোবিন্দদাসের, আর একটি জগদানন্দর।
‘একটি পদ গাইতে অন্তত আধা ঘন্টা সময় লাগে। আমি জগদানন্দর ‘মঞ্জু বিকচ কুসুম-পুঞ্জ’ পদটি শেষ করে এনেছি, এমন সময় পাশের ঘরে টেলিফোন বেজে উঠল। আমি উঠবার আগেই উনি গিয়ে ফোন ধরলেন। দুমিনিট পরে ফিরে এসে বললেন, ‘আমি এখনি যাচ্ছি, হেনা ছাদ থেকে পড়ে মারা গেছে।’
‘তিনি যে-বেশে ছিলেন সেই বেশে বেরিয়ে গেলেন।’
সুকুমারী নীরব হইলে ব্যোমকেশও কিছুক্ষণ চুপ করিয়া রহিল, শেষে বলিল, ‘কে টেলিফোন করেছিল। আপনি জানেন না?’
সুকুমারী বলিল, ‘না। তারপর আমি এ-বাড়িতে খোঁজ নিয়েছিলাম, কিন্তু এ-বাড়ি থেকে কেউ ফোন করেনি।’
‘এ-বাড়িতে কে কে ফোন নম্বর জানে?’
‘কেবল দিদিমণি জানেন, আর কেউ না।’
‘দিদিমণি?
‘আমার অভিভাবিকা, কাজকর্ম দেখেন। তাঁকে ডাকব?’
‘ডাকুন।’
যাহাকে মাসি ভাবিয়ছিলাম। তিনিই দিদিমণি; আজকাল বোধহয় উপাধির পরিবর্তন ঘটিয়াছে। ব্যোমকেশের প্রশ্নের উত্তরে তিনি সুকুমারীর বাক্য সমর্থন করিলেন। সেদিন তিনি টেলিফোন করেন নাই, এ-বাড়িতে তিনি ও সুকুমারী ছাড়া ছোট বাড়ির টেলিফোন নম্বর আর কেহ জানে না।
দিদিমণি প্রস্থান করিলে ব্যোমকেশ উঠিবার উপক্রম করিয়া বলিল, ‘আপনার সকালবেলাটা নষ্ট হল।‘
সুকুমারী হাত জোড় করিয়া বলিল, ‘যদি পায়ের ধুলো দিয়েছেন, একটা গান শুনে যান। আমার তো আর কিছুই নেই।’
সাদা গলায় কেবল খঞ্জনি বাজাইয়া সুকুমারী গান করিল। বিদ্যাপতির আত্মনিবেদন-মাধব, বহুত মিনতি করি তোয়।
তাহার গান পূর্বে কখনো শুনি নাই, শুনিয়া বিভোর হইয়া গেলাম। কণ্ঠের মাধুর্যে উচ্চারণের বিশুদ্ধতায়, অনুভবের সুগভীর ব্যঞ্জনায় আমার মনটাকে সে যেন কোন দুর্লভ আনন্দঘন রসলোকে উপনীত করিল। এতক্ষণ তাহার চিত্তচাঞ্চল্যকর কুহকিনী মূর্তিই দেখিয়ছিলাম, এখন তাহার শুদ্ধশান্ত তদগত তাপসী রূপ দেখিলাম।
সেদিন বাসায় ফিরিতে বেলা একটা বাজিয়া গেল।
স্নানাহার সারিয়া আমি বাহিরের ঘরে আসিয়াছি, ব্যোমকেশ তখনো আচাইতেছে, টেলিফোন বাজিয়া উঠিল। তাড়াতাড়ি গিয়া ফোন তুলিয়া লইলাম। সঙ্গে সঙ্গে নারীকণ্ঠে প্রবল বাক্যস্রোত বাহির হইয়া আসিল–’হ্যালো, ব্যোমকেশবাবু্, আমি চামেলি সমাদ্দার। দেখুন, আপনি সন্দেহ করেন আমার ছেলেরা হেনাকে খুন করেছে। ভুল-ভুল। আমার ছেলেরা বাপের মত নয়, ওরা সচ্চরিত্র ভাল ছেলে। ওরা কেন হেনাকে খুন করতে যাবে? আমি বলছি আপনাকে, কেউ হেনাকে খুন করেনি, সে নিজে ছাদ থেকে পড়ে মরেছে। নীচের দিকে উঁকি মেরে দেখছিল, তাল সামলাতে পারেনি।’
এই পর্যন্ত বলিয়া তিনি দম লইবার জন্য থামিলেন, আমি অত্যন্ত সঙ্কুচিতভাবে বলিলাম, ‘দেখুন, আমি ব্যোমকেশ নই, অজিত। ব্যোমকেশকে ডেকে দিচ্ছি।’
কিছুক্ষণ হতচকিত নীরবতা, তারপর কটু করিয়া টেলিফোন কাটিয়া গেল।
ইতিমধ্যে ব্যোমকেশ আসিয়া দাঁড়াইয়াছিল, তাহাকে শ্ৰীমতী চামেলির কথা বলিলাম। সে সিগারেট ধরাইয়া পায়চারি করিতে করিতে বলিল–’মহিলাটির প্রকৃতি স্নায়ুপ্রধান। আজ আমি। তাঁর ছেলেদের যে-সব প্রশ্ন করেছি তা বোধহয় জানতে পেরেছেন, তাই ভয় হয়েছে। পুলিস যে হাত গুটিয়েছে তা জানেন না, জানলে আমাকে ফোন করতেন না।’ আমি বলিলাম, ‘ব্যোমকেশ, আজ তো সকলকেই নেড়েচেড়ে দেখলে। কিছু আন্দাজ করতে পেরেছে?’
সে হাত তুলিয়া বলিল, ‘দাঁড়াও, আরো ভাবতে দাও।’
অপরাহ্নে বিকাশ আসিল, সঙ্গে একটি ক্ষীণকায় যুবক। বিকাশের চেহারা বা বাকভঙ্গীতে কোনো পরিবর্তন নাই; সে যুবকের দিকে তর্জনি নির্দেশ করিয়া বলিল, ‘এর নাম গুপীকেষ্ট, আমার শাকরেদ। যদি দরকার হয় তাই সঙ্গে এনেছি স্যার।’
এমন লোক আছে যাহাকে একবার দেখিয়া ভোলা যায় না। গুপীকেষ্ট ঠিক তাহার বিপরীত, তাহার চেহারা এতাই বৈশিষ্ট্যহীন যে হাজার বার দেখিলেও মনে থাকে না, বহুরূপী গিরগিটির মত বাতাবরণের সঙ্গে বেবাক মিশিয়া অদৃশ্য হইয়া যায়।
ব্যোমকেশ গুপীকেষ্টকে পরিদর্শন করিয়া সহাস্যে বলিল, ‘বেশ বেশ, বোসো তোমরা। দু’জনকেই দরকার হবে। আরো দু’জন পেলে ভাল হত।’
বিকাশ সোৎসাহে বলিল, ‘আরো আছে স্যার। কয়েকটা ছেলেকে টিকটিকি-তালিম দিচ্ছি। যদি পিছনে লাগার কাজ হয়, তারা পারবে।’
ব্যোমকেশ বলিল, ‘হ্যাঁ, পিছনে লাগার কাজ। চারজন লোকের গতিবিধির ওপর লক্ষ্য রাখতে হবে।’
‘ব্যস, ঠিক আছে। বাবুই আর চিচিংকে লাগিয়ে দেব। ছেলেমানুষ হলেও ওরা হাঁশিয়ার আছে।’ বিকাশ ও গুপীকেষ্ট তক্তপোশের প্রান্তে বসিল, বিকাশ বলিল, ‘এবার সব কথা বলুন স্যার।‘
ব্যোমকেশ পুঁটিরামকে ডাকিয় চা-জলখাবার হুকুম করিল। তারপর মোটামুটি পরিস্থিতি বিকাশকে বুঝাইয়া দিল; চারজন লোকের উপর নজর রাখিতে হইবে; সন্তোষবাবু্, রবিবর্মা, যুগল এবং উদয়। তাহারা কোথায় যায়, কাহার সহিত কথা বলে, অগতানুগতিক কিছু করে কিনা। রোজ ব্যোমকেশকে রিপোর্ট দিবার প্রয়োজন নাই, কিন্তু কোনো বিষয়ে খাটুকা লাগিলে তৎক্ষণাৎ রিপোর্ট দিতে হইবে।
কাজকর্ম বুঝাইয়া দিয়া ব্যোমকেশ বলিল, ‘কাল থেকে কাজ শুরু করে দাও। আজ লোকগুলোকে তোমাদের চিনিয়ে দেব। সন্তোষবাবুর অফিস থেকে ফেরার সময় হল। চা খেয়ে নাও, তারপর আমি তোমাদের নিয়ে বেরুব।’ বিকাশ বলিল, ‘আপনার যাবার কিছু দরকার নেই স্যার। সন্তোষবাবুর ঠিকানা দিন, আমরা সবাইকে চিনে নেব।’
ব্যোমকেশ ঠিকানা দিল। বিকাশ বলিল, ‘এখন বলুন স্যার, কে কার পিছনে লাগবে। আমি কার পিছনে লাগব? সন্তোষবাবু?’
ব্যোমকেশ একটু চিন্তা করিয়া বলিল, ‘না, তুমি লাগবে রবিবর্মার পিছনে। আর গুপীকেষ্ট লাগবে সন্তোষবাবুর পিছনে। বাকি দু’জন যেমন তেমন হলেই হল।’
‘তাই হবে স্যার।’ তাড়াতাড়ি জলযোগ সারিয়া বিকাশ ও গুপীকেষ্ট চলিয়া গেল। আমি বলিলাম, ‘সন্তোষবাবুকেও তাহলে তুমি সন্দেহ করা?’
ব্যোমকেশ বলিল, ‘আমি সকলকেই সন্দেহ করি। তুমি যদি সেদিন ওখানে উপস্থিত থাকতে, তাহলে তোমাকেও সন্দেহ করতাম।’
প্রশ্ন করলাম, ‘নেংটিকে সন্দেহ কর?’
সে বলিল, ‘নেংটি যদি আমাকে খবর না দিত তাহলে তাকেও সন্দেহ করতাম।’
‘আর চিংড়িকে?
‘চিংড়িকে সন্দেহ করি। বোধহয় লক্ষ্য করেছ, বয়সে ছেলেমানুষ হলেও সে যুগলকে ভালবাসে। হেনা হয়ে দাঁড়িয়েছিল তার প্রতিদ্বন্দ্বিনী, সুতরাং তার মোটিভ আছে। সুযোগও প্রচুর।’
‘কোথায় সুযোগ? যদি উদয়ের কথা বিশ্বাস করা যায়, হেনা ছাদে গিয়ে দোর বন্ধ করে দিয়েছিল।’
‘চিংড়ি আগে থাকতে ছাদে গিয়ে লুকিয়েছিল। কিনা কে জানে। এ যুক্তি শ্ৰীমতী চামেলির বেলাতেও খাটে। তিনি হেনাকে সহ্য করতে পারতেন না, তিনি মনে করতেন হেনার সঙ্গে তাঁর স্বামীর অবৈধ সম্পর্ক আছে।’
ব্যোমকেশের কথাগুলো কিছুক্ষণ মনের মধ্যে তোলাপাড়া করিয়া বলিলাম, ‘ব্যোমকেশ, তুমি এই কেস সম্বন্ধে কী বুঝেছি আমায় বল।’
ব্যোমকেশ বলিল, ‘একটি কথা নিঃসংশয়ে বলতে পারি—এটা দুর্ঘটনা নয়, খুন। এখন প্রশ্ন্্, কে খুন করেছে? একে একে সন্দেহভাজন লোকগুলিকে ধর। প্রথমে ধর সন্তোষবাবু। তিনি মস্ত বড় মানুষ, নামজাদা রাজনৈতিক নেতা। কিন্তু তাঁর একটি দুর্বলতা আছে। মৃত বন্ধুর অপূর্ব সুন্দরী মেয়েকে তিনি আশ্রয় দিলেন। তাঁর এই সৎকার্যটি সম্পূর্ণ নিঃস্বর্থ দয়াদাক্ষিণ্য না হতে পুঞ্জ, কিন্তু তিনি হেনাকে খুন করবেন কেন? সুন্ন করার কোন মোটিভ নেই থাকলেও আমরা জানি না।‘
বলিলাম, ‘সুকুমারীর ব্যাপার নিয়ে হেনা তাঁকে ব্ল্যাকমেল করছিল এমন হতে পারে না কি?’
‘হেনা পাকিস্তানের মেয়ে, সুকুমারী-ঘটিত ব্যাপার তার জানার কথা নয়। তবু মনে কর সে জানত। তাহলে সন্তোষবাবু তাকে নিজের বাড়িতে ঠাঁই দিলেন কেন? আর ব্ল্যাকমেলে তাঁর ভয়ই বা কিসের! তাঁর স্ত্রী জানেন তাঁর চরিত্র ভাল নয়, ছেলেরা জানে বাপ শনিবারে-রবিবারে বাড়ি আসে না। রবিবর্মা জানে নেংটি জানে, বাড়ির সবাই জানে, সুতরাং বাইরের লোকও জানে। কিন্তু কারুর কিছু বলবার সাহস নেই, কেউ কিছু প্রমাণ করতে পারে না।–হেনাকে সন্তোষবাবু ভয় করবেন কেন?’
‘তা বটে। তাছাড়া তাঁর অ্যালিবাই আছে।’
‘শুধু তাঁর অ্যালিবাই নয়, সুকুমারীরও। দু’জনে দু’জনের অ্যালিবাই যোগাচ্ছেন। সুকুমারীকেও সন্দেহ থেকে বাদ দেওয়া যায় না, তার সুযোগ যত কমই হোক, মোটিভ যথেষ্ট ছিল। সন্তোষবাবুর কাছ থেকে সে হাজার টাকা মাইনে পায়, হয়তো কিছু ভালবাসাও আছে। হেনাকে যদি সে নিজের প্রতিদ্বন্দ্বিনী মনে করে তাহলে হেনাকে খুন করার মোটিভ তার আছে।’
‘তুমি সত্যিই সুকুমারীকে সন্দেহ কর?’
‘সত্যি-মিথ্যের কথা নয়, এ হচ্ছে হিসেবের কড়ি, একটি কানাকড়ি বাদ দেওয়া চলে না।’
‘তারপর?’
‘তারপর রবিবর্মা। তার সুযোগ ছিল প্রচুর, কিন্তু মোটিভ নিয়েই গণ্ডগোল। লোকটির প্রকৃতি পাঁকাল মাছের মত, ধরা-ছোঁয়া যায় না, ধরতে গেলেই পিছলে যায়। আমার মনে হয় রবিবর্মা আগে থেকে হেনাকে চিনত। হেনার প্রতি তার আকর্ষণ বিকর্ষণ দুইই ছিল। আকর্ষণ বুঝতে পারি, রবিবর্মা অবিবাহিত, হেনার মত সুন্দরী মেয়ের প্রতি সে আকৃষ্ট হবে এতে আশ্চর্য কিছু নেই। কিন্তু বিকর্ষণ কিসের জন্যে? হেনা কি তার কোন বিপজ্জনক গুপ্তকথা জানত? হেনা তাকে প্রণয়-ব্যাপারে প্রশ্বয় দেয়নি। তাই আক্রোশ? তাই কি সে উদয়কে ফাঁসাতে চায়?’
‘উদয়কে ফাঁসিতে চায়?’
‘উদয় হেনাকে উল কিনে দিয়েছিল, হেনা তার জন্যে সোয়েটার বুনছিল–একথা আমাকে বলবার দরকার ছিল না। এ থেকে মনে হয়, সে নিজের ঘাড় থেকে সন্দেহ নামিয়ে উদয়ের ঘাড়ে চাপাতে চায়।’
‘হুঁ। তারপর?’
‘তারপর উদয়। গোঁয়ার-গোবিন্দ ছেলে, কড়া মেজাজ, কিন্তু হেনার প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হয়েছিল। হেনা বোধহয় তাকে অন্যদের চেয়ে একটু বেশি আশকারা দিত, উদয় ভাবত হেনা তাকেই ভালবাসে। তারপর সে জানতে পারল যুগলের সঙ্গে হেনার কবিতা লেখালেখি চলছে, গোলাপফুলের আদান-প্রদান চলছে। ছাদের ওপর এই নিয়ে হেনার সঙ্গে উদয়ের ঝগড়া হল, রাগের মাথায় উদয় হেনাকে ছাদ থেকে ঠেলে ফেলে দিল। হয়তো তার খুন করবার ইচ্ছা ছিল না—‘
বলিলাম, ‘আর যুগল? তার কী মোটিভ ছিল?’
সে বলিল, ‘একই মোটিভ-যৌন-ঈর্ষা। যুগল শান্তশিষ্ট কবি মানুষ, কিন্তু তার প্রাণের মধ্যে কি রকম দুবার আগুন জ্বলে উঠেছিল কে বলতে পারে। সে যদি জানতে পেরে থাকে যে, হেনা উদয়ের জন্যে পশমের জামা বুনছে—‘
‘কিন্তু সে ছাদে গেল কি করে? উদয় সিঁড়ি দিয়ে হেনার পিছু পিছু গিয়েছিল।’
‘যুগল বাগানে গিয়েছিল, বাগান থেকে গোলাপফুল তুলে জানোলা দিয়ে হেনরি টেবিলে ফেলে দিয়েছিল। তারপর ভারার মই বেয়ে ছাদে উঠে যাওয়া কি তার পক্ষে খুব শক্ত?’
‘না, শক্ত নয়। কিন্তু গোলাপফুল উপহার দিয়েই তাকে খুন করল?’
‘গোলাপফুলটা হয়তো ভাঁওতা, পুলিসের চোখে ধুলো দেবার চেষ্টা।’
‘বুঝলাম। আর কে বাকি রইল?’
‘শ্ৰীমতী চামেলি এবং চিংড়ি। দু’জনেরই মোটিভ আছে, দু’জনেরই সুযোগ সমান। শ্ৰীমতী চামেলি যখন বাথরুমে ছিলেন চিংড়ি তখন একলা ছিল, আবার চিংড়ি যখন বাথরুমে ছিল, শ্ৰীমতী চামেলি তখন একলা ছিলেন।’
আমি বলিলাম, ‘তাহলে দাঁড়াল কী? এই সাতজনের মধ্যে আসল দোষী কে?’
সে বলিল, ‘শুধু সাতজন নয়, আর একটি ছিপে রুস্তম আছেন যিনি মাউথ-অগনি বাজিয়ে হেনাকে ইশারা দিয়ে যেতেন।’
ঠিক তো, বংশীবদন বনমালীর কথা মনে ছিল না। প্রশ্ন করিলাম, ‘ব্যোমকেশ, ও লোকটা কে?’
ব্যোমকেশ চিন্তা করিতে করিতে বলিল, ‘হিন্দু কি মুসলমান বলতে পারি না, কিন্তু পাকিস্তানী লোক সন্দেহ নেই। বোধহয় দু’জনের মধ্যে প্রণয় ছিল, লোকটা পাকিস্তান থেকে হেনাকে বই এনে দিত। প্রণয়-ঘটিত ব্যাপারে কখন কি ঘটে কিছুই বলা যায় না। প্রণয় হয়তো ক্রমশ বিষ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, হেনার মন উদয়ের দিকে ঢলেছিল।’
‘লোকটা দশ-বারো দিন অন্তর আসত কেন?’
‘হয়তো সে প্লেনে আসত, হয়তো সে প্লেনের একজন অফিসার; দশ-বারো দিন অন্তর দমদমে নামে, হেনার সঙ্গে লুকিয়ে দেখা করে যায়। সবই অবশ্য অনুমান।’
কিছুক্ষণ নীরব থাকিয়া সে হঠাৎ উঠিয়া পাশের ঘরে গেল, শুনিতে পাইলাম কাহাকে ফোন করিতেছে। দু-তিন মিনিট পরে ফিরিয়া আসিলে জিজ্ঞাসা করিলাম, ‘কাকে?’
সে বলিল, ‘নেংটিকে। বংশীধারী লোকটি হেনার মৃত্যুর পর আর এসেছিল। কিনা খবর নিচ্ছিলাম। নেংটি বলল, আসেনি।’
‘না আসার কি কারণ থাকতে পারে?’ ‘হয়তো হেনীর মৃত্যুর খবর জানতে পেরেছে, কিংবা অসুখে পড়েছে, কিংবা মরে গেছে। কত রকম কারণ থাকতে পারে।’ হঠাৎ ব্যোমকেশ স্থিরদৃষ্টিতে আমার পানে চাহিল, অনেকক্ষণ চাহিয়া রহিল। দেখিলাম সে আমার দিকে চাহিয়া আছে বটে। কিন্তু আমাকে দেখিতেছে না, মনশ্চক্ষু দিয়া অভাবনীয় কিছু প্রত্যক্ষ করিতেছে। তারপর সে চাপা গলায় বলিল, ‘অজিত।’
বলিলাম, ‘কি হল?’ সে বলিল, ‘যেদিন হেনা মারা যায় সেদিনের কথা মনে আছে?’
‘মনে থাকবে না কেন? সে তো পরশু!’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ, দুপুরবেলা তুমি খবরের কাগজ পড়ে শোনালে। একটা পাকিস্তানী প্লেন বানচাল হয়ে বঙ্গোপসাগরে ডুবেছে, মনে আছে? আমি মৈনাক পর্বতের গল্প বললাম—‘
‘মনে আছে বৈকি?’
‘সেদিনকার খবরের কাগজটা খুঁজে বার করতে পার?’
‘পারি।‘
পুরানো খবরের কাগজগুলো একস্থানে জমা করা হইত, মাসের শেষে পুঁটিরাম সেগুলিকে বিক্রয় করিত। আমি সেদিনের কাগজটা খুঁজিয়া আনিয়া ব্যোমকেশকে দিলাম, সে সাগ্রহে কাগজের পাতা উল্টাইয়া বিমান-বিপর্যয়ের ব্বিরণ দেখিতে লাগিল।
জিজ্ঞাসা করিলাম, ‘কি দেখছ?’
সে কাগজের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখিয়া বলিল, ‘ডাকোটা প্লেন। সিঙ্গাপুর থেকে কায়রো পর্যন্ত দৌড়। অফিসার সবাই মুসলমান, কেবল একজন পাইলট ইংরেজ। যাত্ৰিদলের মধ্যে সব জাতের লোক ছিল—‘
ধীরে ধীরে কাগজ মুড়িয়া রাখিয়া ব্যোমকেশ শূন্যদৃষ্টিতে কড়িকাঠের দিকে চাহিয়া রহিল।
অতঃপর আমাদের যে কর্মচঞ্চলতা আসিয়াছিল, তাহা যেন দমকা বাতাসের মত অকস্মাৎ শান্ত হইয়া গেল। দুদিন আর কোনো সাড়াশব্দ নাই। কেবল বিকাশ একবার টেলিফোন করিয়া জানাইল তাহারা শিকারের পিছনে লাগিয়া আছে। সন্তোষবাবু ও রবিবর্মা নিয়মিত অফিস যাইতেছেন ও বাড়ি ফিরিতেছেন; যুগল ও উদয় কলেজ যাইতেছে ও বাড়ি ফিরিতেছে; উদয় মাঝে একদিন বিকালবেলা হকি খেলিতে গিয়াছিল। উল্লেখযোগ্য অন্য কোনো খবর নাই।
তৃতীয় দিন, অথাৎ, বৃহস্পতিবারে আবার আমাদের জীবনে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরিয়া আসিল, তৈলাভাবে নিবন্ত প্রদীপ আবার ভাস্বর হইয়া উঠিল।
সকালবেলা নেংটি আসিল। তাহার ভাবভঙ্গীতে একটু অস্বস্তির লক্ষণ। ব্যোমকেশ তাহাকে একটি সিগারেট দিয়া বলিল, ‘কি খবর?’
নেংটি তৎক্ষণাৎ উত্তর দিল না, সিগারেট ধরাইয়া কুঞ্চিত চক্ষে ব্যোমকেশের পানে চাহিল। তারপর বলিল, ‘ব্যোমকেশদা, আপনি কি উদয়দার পিছনে গুপ্তচর লাগিয়েছেন?’
ব্যোমকেশ ভ্রূ তুলিল, ‘কে বলল?’
‘উদয়দা বলল, একটা সিড়িঙ্গে ছোড়া তার পিছনে ঘুরে বেড়াচ্ছে।’
‘উদয় বুঝি খুব ঘাবড়ে গেছে?’
‘ঘাবড়াবার ছেলে উদয়ন্দা নয়, সে বুক ফুলিয়ে বেড়াচ্ছে; যেন ভারি গৌরবের কথা। মাসিমা কিন্তু ভয় পেয়েছেন।’
ব্যোমকেশ চকিত হইয়া চাহিল, ‘তাই নাকি। কিন্তু তিনি ভয় পেলেন কেন?’
নেংটি মাথা নাড়িয়া বলিল, ‘তা জানি না। কাল উদয়ন্দা মাসিমার কাছে বড়াই করছিল, জানো মা, আমার পিছনে পুলিস-গোয়েন্দা লেগেছে। তাই শুনে মাসিমার মুখ শুকিয়ে গেল। একেই তো ছটফট মানুষ, সেই থেকে আরো ছটফট করে বেড়াচ্ছিলেন। আজ সকালে আমাকে বললেন, তুই ব্যোমকেশবাবুকে ডেকে নিয়ে আয়, তাঁর সঙ্গে কথা বলার।’
‘আমার সঙ্গে কথা বলবেন?’
‘হ্যাঁ।–ব্যোমকেশদা, কিছু হদিস পেলেন?’
ব্যোমকেশ একটু চুপ করিয়া থাকিয়া বলিল, ‘কিছু হদিস পেয়েছি।’
নেংটি বিস্ফারিত চক্ষে বলিল, ‘পেয়েছেন।’
‘বোধহয় পেয়েছি, কিন্তু তা এখনও বলবার মত নয়। চল, তোমার মাসিমা কি বলেন শুনে আসি। ওঠ অজিত।’
সন্তোষবাবুর বাড়িতে উপস্থিত হইয়া দেখিলাম, নীচের তলার হল-ঘরে হৈ-হুল্লোড় চলিতেছে। চিংড়ি একটা তালপাতার পাখা লইয়া যুগলকে মারিতে ছুটিয়াছে, উদয় চিংড়ির লম্বা বেণী ঘোড়ার রাশের মত ধরিয়া তাহাকে নিয়ন্ত্রিত করিতেছে এবং বলিতেছে-‘হ্যাট ঘোড়া-হ্যাটু হ্যাট।’। চিংড়ি বলিতেছে, ‘কেন আমার খোঁপা খুলে দিলে?’ তিনজনেই উচ্চকণ্ঠে হাসিতেছে এবং ঘরময় ছুটাছুটি করিতেছে। তিনজনের মুখেই খুনসুড়ির উল্লাস।
আমাদের আবিভাবে রঙ্গক্রীড়া অর্ধপথে থামিয়া গেল। ক্ষণকালের জন্য তিনজনে অপ্রতিভভাবে দাঁড়াইয়া রহিল, তারপর চিংড়ি লজ্জিত মুখে সিঁড়ি দিয়া উপরে পলায়ন করিল; যুগল ও উদয় অপেক্ষাকৃত মস্থর পদে তাহার অনুবতী হইল।
নেংটি আমাদের বসাইয়া মাসিমাকে খবর দিতে গেল। আমি চুপি চুপি ব্যোমকেশকে বলিলাম, ‘ভায়ে ভায়ে ভাব হয়ে গেছে দেখেছি?’
ব্যোমকেশ একটু গভীর হাসিয়া বলিল, ‘এর নাম যৌবন।’
নেংটি নামিয়া আসিয়া বলিল, ‘মাসিমা আপনাদের ওপরে ডাকছেন।’
দ্বিতলে উঠিলাম, কিন্তু হল-ঘরে কেউ নাই। এই খানিক আগে যাহারা উপরে আসিয়াছিল, তাহারা বোধকরি স্ব স্ব কক্ষে প্রবেশ করিয়াছে। নেংটি একটি ভেজানো দোরের কপাটে টোকা মারিল। ভিতর হইতে আওয়াজ হইল, ‘এস।’
নেংটি দ্বার ঠেলিয়া আমাদের ভিতরে লইয়া গেল।
ঘরটি শয়নকক্ষ হিসাবে বেশ বিস্তৃত; একপাশে জোড়া-খাট ঘরের বিস্তার খর্ব করিতে পারে নাই। খাটটিতে সম্ভবত শ্ৰীমতী চামেলি চিংড়িকে লইয়া শয়ন করেন। খাট ছাড়া ঘরে ওয়ার্ডরোব, কাপড়ের আলনা, ড্রেসিং-টেবিল, দুইটি আরাম-কেন্দারা। দেয়ালে একটি লেলিহরসনা মা-কালীর পট। দুইটি বড় বড় জানোলা দিয়া বাড়ির পিছন দিকের পাইনের সারি দেখা যাইতেছে।
ঘরে দুইটি স্ত্রীলোক। এক, শ্ৰীমতী চামেলি; তিনি স্নান করিয়া গরদের শাড়ি পরিয়াছেন, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা, কপালে আধুলির মত একটি সিঁদুরের ফোঁটা, মুখ গভীর, চক্ষে চাপা উত্তেজনার অস্বাভাবিক দীপ্তি। দ্বিতীয়, চিংড়ি। তাহার ক্রীড়া-চপলতা আর নাই। সে জানালার সম্মুখে দাঁড়াইয়া ঘাড় বাঁকাইয়া বিস্ফারিত নেত্ৰে আমাদের পানে চাহিয়া আছে।
শ্ৰীমতী চামেলি বলিলেন, ‘নেংটি, চিংড়ি, তোরা বাইরে যা, আমি এদের সঙ্গে কথা কইব।’
চিংড়ির যাইবার ইচ্ছা ছিল না, সে শম্বুকগতিতে জানালা হইতে দ্বারের দিকে পা বাড়াইতেছিল, নেংটি গভীর ভূকুটি করিয়া মস্তক-সঞ্চালনে তাহাকে ইশারা করিল। দু’জনে ঘর হইতে বাহির হইল, নেংটি দ্বার ভেজাইয়া দিল।
শ্ৰীমতী চামেলি চেয়ার নির্দেশ করিয়া বলিল, ‘আপনারা বসুন।’ তাঁহার কথা বলিবার ভঙ্গী কাটা-কাটা, যেন অত্যন্ত সতর্কভাবে কথা বলিতেছেন।
ব্যোমকেশ বলিল, ‘আপনি বসুন।’ ঘরে দু’টি মাত্র চেয়ার ছিল, তৃতীয় ব্যক্তিকে বসিতে হইলে খাটের কিনারায় বসিতে হয়। শ্ৰীমতী চামেলি একবার খাটের দিকে দৃষ্টিনিক্ষেপ করিয়া মুখ ঈষৎ কুঞ্চিত করিলেন, বলিলেন, ‘আমি বসব না, আমার এখনো পুজো হয়নি। আপনারা বসুন।’
চেয়ারে বসিতে বসিতে ভাবিলাম, ইনি একদিন সন্ত্রাসবাদিনী ছিলেন, বন্দুক চালাইতেন; তখন নিশ্চয় শুচিবাই ছিল না। অবস্থাচক্ৰে মনের কত পরিবর্তনই না হয়।
আমরা উপবিষ্ট হইলে শ্ৰীমতী চামেলি কথা বলিতে আরম্ভ করিলেন, ধীরে ধীরে গুনিয়া শুনিয়া কথা বলিতে লাগিলেন। সংসারের সাধারণ কথা, যাহা ব্যোমকেশকে শুনাইবার কোনই সার্থকতা নাই; মনে হইল তিনি ভয় পাইয়াছেন, তাই আসল কথাটা বলিবার আগে খানিকটা ভণিতা করিয়া লইতেছেন।
কিছুক্ষণ নিবিষ্ট মনে শুনিয়া ব্যোমকেশ মুখ তুলিল, বলিল, ‘দেখুন, আপনি উদ্বিগ্ন হবেন না। আমি এ পরিবারের বন্ধু, সন্তোষবাবু আপনাদের সকলের স্বার্থরক্ষার জন্যে আমাকে নিযুক্ত করেছেন। হেনার মৃত্যু-সম্বন্ধে আপনার যদি কিছু জানা থাকে, আমাকে খুলে বলতে পারেন।’
শ্ৰীমতী চামেলি একটু থমকিয়া গেলেন, ব্যোমকেশকে যেন নূতন চক্ষু দিয়া নিরীক্ষণ করিয়া বলিলেন, ‘আপনি পুলিসের দলের লোক নয়?
ব্যোমকেশ বলিল, ‘না, পুলিসের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।’
‘কিন্তু–কিন্তু–আপনি জানেন পুলিস আমার ছেলেদের পিছনে গোয়েন্দা লাগিয়েছে।’
বুঝিলাম, শ্ৰীমতী চামেলি জানেন না যে পুলিস এ মামলা হইতে হাত গুটোইয়াছে। সন্তোষবাবুর সঙ্গে বাক্যালাপ বন্ধ, কে-ই বা তাঁহাকে বলিবে।
ব্যোমকেশ চুপ করিয়া রহিল। শ্ৰীমতী চামেলির স্বর তীব্র হইয়া উঠিল, ‘এ কি অন্যায়; আমার ছেলেরা নির্দোষ। তবু তাদের পিছনে গুপ্তচর লাগবে কেন?’
ব্যোমকেশ শান্তস্বরে বলিল, ‘তারা নির্দোষ কিনা জানতে চায় বলেই বোধহয় গুপ্তচর লেগেছে।’
‘আমি হাজার বার বলেছি আমার ছেলেরা নির্দোষ, তবু তাদের বিশ্বাস হয় না।’
‘কিন্তু ওরা নির্দোষ তা আপনিই বা জানলেন কি করে? দেখুন, কিছু মনে করবেন না, আপনি ওদের মা, আপনার পক্ষে ওদের নিদোষিতায় বিশ্বাস করা স্বাভাবিক। কিন্তু বাইরের লোকের পক্ষে তো তা নয়। তাদের চোখে সবাই সমান।’
শ্ৰীমতী চামেলির চোখে আভ্যন্তরিক জল্পনার ছায়া পড়িল, তিনি এক পা সম্মুখে আসিয়া হঠাৎ চাপা সুরে বলিলেন, ‘ব্যোমকেশবাবু্, আমি জানি হেনা কি করে মরেছে। আমি স্বচক্ষে দেখেছি।’
ব্যোমকেশ চমকিয়া চক্ষু বিস্ফারিত করিল—’স্বচক্ষে দেখেছেন।’
‘হ্যাঁ!’ শ্ৰীমতী চামেলি এক নিশ্বাসে বলিয়া গেলেন, ‘সেদিন চিংড়ি বাথরুমে যাবার পর আমি বাইরে এসে দেখলুম, হেনা তেতলার ছাদে যাচ্ছে। সকলেই জানে আমি হেনাকে সহ্য করতে পারি না, হেনাও আমাকে ভয় করে। আমি ভাবলুম, এই সুযোগে আমিও ছাদে গিয়ে যদি তাকে বেশ দু-চার কথা শুনিয়ে দিই, তাহলে সে আমার বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে, আমার ছেলেরা নিরাপদ হবে।’
‘তাহলে ছেলেদের নিরাপত্তা সম্বন্ধে আপনি উদ্বিগ্ন হয়েছিলেন? যাহোক, তারপর?’
‘আমিও সিঁড়ি বেয়ে তেতলার ছাদে গেলুম। আমাকে দেখেই হেনা ভয় পেয়ে আলসের দিকে ছুটে গিয়ে আলসের গায়ে আছড়ে পড়ল। তারপর তাল সামলাতে না পেরে উলটে নীচে পড়ে গেল। আমাকে দেখে বোধহয় তার ভয় হয়েছিল যে আমি তাকে মারব।’
ব্যোমকেশ তাঁহার পানে নিষ্পলক চাহিয়া থাকিয়া বলিল, ‘এসব কথা আগে বলেননি কেন?’
শ্ৰীমতী চামেলি মুখের একটা অধীর ভঙ্গী করিয়া বলিলেন, ‘বললে কি কেউ বিশ্বাস করত? উল্টে সন্দেহ করত। আমিই হেনাকে ঠেলে ফেলে দিয়েছি।’
ব্যোমকেশ একবার ঘাড় হেঁট করিয়া আবার মুখ তুলিল, ‘তা বটে। আচ্ছা, আপনি যখন সিঁড়ি দিয়ে ছাদে গেলেন তখন উদয়কে দেখেছিলেন?’
শ্ৰীমতী চামেলি ঈষৎ শঙ্কিত কণ্ঠে বলিলেন, ‘না, উদয় সেখানে ছিল না।’
‘কাউকে দেখেননি?’
না, কাউকে না।’
‘সিঁড়ির দরজা, ছাদে যাবার দরজা, নিশ্চয় খোলা ছিল?’
‘হ্যাঁ, খোলা ছিল।‘
‘আপনি যখন হেনাকে দেখলেন, তখন সে কী করছিল?’
‘ছাদের মাঝখানে দাঁড়িয়েছিল।’
‘তার হাতে কিছু ছিল?’
‘লক্ষ্য করিনি।‘
ব্যোমকেশ নিশ্বাস ছাড়িয়া উঠিয়া দাঁড়াইল, বলিল, ‘আর বোধহয় আপনার কিছু বলবার নেই। আচ্ছা, তাহলে আসি। পুলিসকে আপনার কথা বলে দেখতে পারেন।’
শ্ৰীমতী চামেলি শক্ত হইয়া দাঁড়াইয়া রহিলেন, আমরা চলিয়া আসিলাম।
বাসায় ফিরিতে বেলা দ্বিপ্রহর হইল।
শ্ৰীমতী চামেলি ছেলেদের বাঁচাইবার জন্য যে নিপুণ কল্পকথা রচনা করিয়াছিলেন, তাহা ব্যোমকেশকে আরও বিভ্রান্ত ও বিমর্ষ করিয়া তুলিয়াছিল। সে তক্তপোশের উপর লম্বা হইয়া বিক্ষুব্ধ স্বরে বলিল, ‘কিছু হচ্ছে না-কিছু হচ্ছে না, শুধু ভাঁওতা, শুধু ধাপ্পা। সবাই আমার চোখে ধুলো দেবার চেষ্টা করছে।’
আমি বলিলাম, ‘তোমারই বা কিসের গরজ, ব্যোমকেশ? পুলিস হাল ছেড়ে দিয়েছে, সন্তোষবাবুরও আগ্রহ নেই। তবে তুমি কেন মিছে খেটে মরছ!’
ব্যোমকেশ ক্লিষ্ট স্বরে বলিল, ‘মুশকিল কি হয়েছে জানো? আমি সত্যান্বেষী, সত্যি কথাটা যতক্ষণ না জানতে পারছি, আমার প্রাণে শান্তি নেই। দুক্তোর! এ সময়ে যদি অন্য একটা কাজ হাতে থাকতো তাহলে হয়তো ভুলে থাকতে পারতাম।–’
এই সময় সদর দরজার সামনে পোস্টম্যান আসিয়া দাঁড়াইল।
ইন্সিওর-করা রেজিস্ট্রি খাম। প্রেরকের নাম-উড়িষ্যা রাজ্য সরকারের দপ্তর। কৌতূহলী হইয়া উঠিলাম-কী ব্যাপার! ব্যোমকেশ খাম খুলিয়া একটি টাইপ-করা চিঠি বাহির করিল।
প্রিয় মহাশয়, মান্যবর মুখ্যমন্ত্রী মহাশয়ের আদেশে এই পত্র লিখিতেছি। আপনি ইতিপূর্বে কেন্দ্রীয় সরকার ও বোম্বাই সরকারের পক্ষে যে কাজ করিয়াছেন তাহা আমাদের অবিদিত নহে।
সম্প্রতি উড়িষ্যা সরকারের দপ্তরে কিছু রহস্যময় ব্যাপার ঘটিতে আরম্ভ করিয়াছে। দপ্তর হইতে মূল্যবান ও অতি গোপনীয় দলিল অদৃশ্য হইয়া যাইতেছে, কিন্তু অপরাধীকে ধরা যাইতেছে না। এ বিষয়ে উড়িষ্যা সরকার আপনার সাহায্যপ্রার্থী। আপনি অবিলম্বে কটিকে আসিয়া তদন্তের ভার গ্রহণ করিলে বাধিত হইব। বিলম্বে রাষ্ট্রের ইষ্টহানির সম্ভাবনা।
আপনি কবে আসিতেছেন তার-যোগে জানাইলে উপকৃত হইব। আপনার রাহা-খরচ ইত্যাদি বাবদ ৫০০ টাকার চেক অত্রসহ পাঠানো হইল।
ধন্যবাদান্তে নিবেদন ইতি।–
ব্যোমকেশ প্রফুল্ল মুখে চিঠি ও চেক আমার হাতে দিল, বলিল, ‘সরকারী মহলে আমার খ্যাতি রাষ্ট্র হয়ে গেছে দেখছি।’
চিঠি পড়িয়া মুখ তুলিয়া দেখিলাম সে দুই হাত পিছন দিকে শৃঙ্খলিত করিয়া পায়চারি করিতেছে। বলিলাম, যা চাইছিলে তাই হল। যাবে তো?’
‘দেশের কাজ। যাব বৈকি।’
‘কবে যাবে?’
সে পদচারণে বিরতি দিয়া বলিল, ‘অজিত, তুমি খাওয়া-দাওয়া সেরে চেকটা ব্যাঙ্কে জমা দিয়ে এস। আর কটকে একটা তার করে দাও, আমরা অবিলম্বে যাচ্ছি।’
প্রশ্ন করিলাম, ‘অবিলম্বেটা কবে?’
সে হাসিয়া বলিল, ‘আজ কালের মধ্যে।’
সন্ধ্যা হয়-হয় এমন সময় বিকাশ আসিল, বলিল, ‘খবর আছে স্যার।’
বিকাশ, গুপীকেষ্ট, বাবুই ও চিচিং নামধারী চারিটি যুবক যে বোমকেশের পক্ষ হইতে টিকটিকির কাজ করিতেছে, তাহা ভুলিয়া গিয়াছিলাম। মনটা অগ্রবর্তী হইয়া কটকের দিকে ছুটিয়াছিল।
তিনজনে ঘন-সন্নিবিষ্ট হইয়া তক্তপোশের উপর বসিলাম। বিকাশ বলিল, ‘চীনেম্যানটা বড় জ্বালিয়াছে স্যার।‘
‘চীনে ম্যান!’
ওই যে আপনার রবিবর্মা। নাক-মুখ-চোখ চীনেম্যানের মত; নিশ্চয় লুকিয়ে লুকিয়ে আরশোলা খায়।‘
‘বিচিত্র নয়। তারপর বল, জ্বালিয়েছে কি ভাবে?’
‘কদিন ধরে লোকটার পিছনে লেগে আছি, তা একবার কি এদিক-ওদিক যাবে! না, বাড়ি থেকে অফিস, আর অফিস থেকে বাড়ি। হয়রান হয়ে গিয়েছিলাম স্যার। তারপর আজ—‘
‘আজ কী হয়েছে?’
‘অন্যদিন পাঁচটার সময় অফিস থেকে বেরোয়, আজ সাড়ে চারতের সময় বেরুলো। বাড়ির দিকে গেল না, বৌবাজারের বাসে উঠল। আমিও উঠলাম। লোকটার মনে পাপ আছে বেশ বোঝা যায়, বারবার পিছু ফিরে চাইছে। আমি ঘাপটি মেরে আছি। শেষে শিয়ালদার কাছাকাছি এসে রবিবর্মা টুক করে নেমে পড়ল। আমিও নামলাম।
‘আপনি লক্ষ্য করেছেন বোধহয় ঐখানে একটা হোটেল আছে—নাম ইন্দো-পাক হোটেল। তিনতলা বাড়ি, কিন্তু একটু ঘুপ্সি গোছের। যারা পাকিস্তান থেকে যাওয়া-আসা করে, তারাই বেশির ভাগ এই হোটেলে ওঠে। নীচের তলায় রেস্তরাঁ, মুর্গী-মটম চলছে, ওপরতলায় থাকবার ঘর। রবিবর্মা হোটেলে ঢুকে পড়ল।
‘রেস্তরাঁয় হট্টগোল চলছে, রবিবর্মা সেদিকে গেল না। পাশের একটা অন্ধকার সিঁড়ি দিয়ে চুপি চুপি ওপরে উঠে গেল।
‘আমিও গেলাম। সিঁড়ি যেখানে দোতলায় গিয়ে তেতলার দিকে মোড় ঘুরেছে, সেখানে সরু গলির মস্ত একটা বারান্দা, তার দু’পাশে সারি সারি ঘরের ঘর; মাথার ওপর ধোঁয়াটে একটা বাল্ব ঝুলছে। আমি সিঁড়ির মোড় থেকে উঁকি মেরে দেখলাম রবিবর্মা কোণের দিকের একটা ঘরের দরজা চাবি দিয়ে খুলছে। দরজা কিন্তু খুলল না; তখন রবিবর্মা চাবির গোছ থেকে আর একটা চাবি বেছে নিয়ে তালায় পরালো, কিন্তু তবু তালা খুলল না।
‘এই সময় তেতিলার দিক থেকে সিঁড়ির ওপর পায়ের আওয়াঙ্গ হল, দু-তিনজন ভাড়াটে নেমে আসছে। আমি তখন এমন ভাব দেখালাম যেন আমি দোতলায় থাকি, পকেট থেকে চাবি বার করতে করতে একটা ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম; রবিবর্মা চট করে চাবির গোছা পকেটে-পুরে নীচে নেমে গেল; আমিও তার দরজাটা এক নজরে দেখে নিয়ে তাঁর পিছু নিলাম।
‘তারপর রবিবর্মা সটান বাড়ি ফিরে গেল। তাকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসছি।‘
বোমকেশের চক্ষু কিছুক্ষণ অন্তর্নিমগ্ন হইয়া রহিল।
‘ইন্দো-পাক হোটেল—হেনা পাকিস্তানের মেয়ে ছিল—রবিবর্মা—‘ বিকাশের দিকে চোখ তুলিয়া ব্যোমকেশ বলিল, ‘ঘরের নম্বরটা লক্ষ্য করেছিলে?’
বিকাশ বলিল, ‘হ্যাঁ স্যার; দোরের মাথায় পেতলের নম্বর মারা ছিল—৭ নম্বর।‘
‘৭ নম্বর!’ ব্যোমকেশের চোখ ধক করিয়া জ্বলিয়া উঠিল।
‘হ্যা স্যার, ৭ নম্বর।‘
ব্যোমকেশ আবার চক্ষু মুদিয়া ধ্যানস্থ হইয়া পড়িল; আমারও মনে হইল সাত নম্বর কথাটা কোথায় যেন শুনিয়াছি, হঠাৎ স্মরণ করিতে পারিলাম না। বিকাশ চুপি চুপি আমাকে জিজ্ঞাসা করিল, ‘৭ নম্বরের কোন মাহাত্ম্য আছে নাকি স্যার?’
কোমকেশ চক্ষু খুলিল, বিকাশের কাঁধে হাত রাখিয়া বলিল, ‘তুমিই আমাদের মধ্যে সবচেয়ে কাজের লোক! কিন্তু কাজ এখনো শেষ হয়নি। তুমি ইন্দো-পার্ক হোটেলে ফিরে যাও, ৭ নম্বর ঘরের সামনে পাহা্রা দাও। আমরা আধা ঘন্টার মধ্যেই যাচ্ছি।’
‘আচ্ছা স্যার।’ বিকাশ চলিয়া গেল।
ব্যোমকেশ পাশের ঘরে উঠিয়া গিয়া ফোন তুলিয়া লইল। সংযোগ স্থাপিত হইলে বলিল, ‘এ কে রে? আমি ব্যোমকেশ…একটু দরকার আছে..হেনার চাবির গোছা তোমার কাছে আছে তো?…বেশ বেশ। আমরা এখনি তোমার কাছে যাচ্ছি, চাবির গোছোটা দরকার…সাক্ষাতে বলব…তুমি যদি আমাদের সঙ্গে আসতে পারো তো ভাল হয়…বেশ বেশ, আমরা এখনি যাচ্ছি।’
ফোন রাখিয়া দিয়া সে বলিল, ‘চল, আজ রাত্রেই হেনা-রহস্যের সমাধান হবে মনে হচ্ছে।’
এতক্ষণে মনে পড়িল হেনার চাবির গোছায় একটা চাবিতে ৭ নম্বর ছাপ মারা ছিল।
এ কে রে-কে ট্যাক্সিতে তুলিয়া লইয়া আমরা আন্দাজ আটটার সময় ইন্দো-পাক হোটেলের সম্মুখে উপস্থিত হইলাম। পথে একবার মাত্র কথা হইল, এ কে রে বলিলেন, ‘আমি কিন্তু এখন পুলিস নই, স্রেফ তোমার বন্ধু।’
ব্যোমকেশ বলিল, ‘তাই সই।‘
দোতলার সিঁড়ির মুখে বিকাশ রেলিংয়ে ঠেস দিয়া দাঁড়াইয়া ছিল, আমাদের দেখিয়া খাড়া হইল। ব্যোমকেশ চুপি চুপি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিল, ‘সাত নম্বর ঘরের খবর কি?’
বিকাশ বলিল, ‘ভাল। আর কেউ আসেনি।’
‘হোটেলের ম্যানেজার কোথায় থাকে জানো?’
‘ঐ ঘরে!’ বিকাশ সামনের ঘরের দিকে আঙুল দেখাইল।
ব্যোমকেশ এ কে রে-র দিকে দৃষ্টি ফিরাইল : চোখে চোখে কথা হইল। এ কে রে ঘাড় নাড়িয়া ম্যানেজারের ঘরের বন্ধ দ্বারে টোকা দিলেন।
দ্বার খুলিয়া একটি মধ্যবয়স্ক ব্যক্তি দাঁড়াইলেন। তাঁহার পিছনে আলোকিত ঘরটি দেখিতে পাইলাম, টেবিল-চেয়ার দিয়া সাজানো ঘর, ঘরে অন্য কেহ নাই, কেবল টেবিলের ওপর একটি বোতল শোভা পাইতেছে।
এ কে রে বলিলেন, ‘আপনি হোটেলের ম্যানেজার?’
ম্যানেজার ঢুলু ঢুলু চক্ষে এ কে রে-র পোশাক অবলোকন করিয়া বলিলেন, ‘আজ্ঞে হ্যাঁ, আসতে আজ্ঞা হোক।’ বলিয়া তিনি আভুমি অবনত হইয়া অভিবাদন করিতে গিয়া গোঁত্তা খাইয়া পড়িয়া যাইতেছিলেন, এ কে রে তাঁহাকে ধরিয়া ফেলিলেন। বলিলেন, ‘আমি পুলিসের কাজে আসিনি। আপনার সঙ্গে আলাপ করতে এলাম।’
ম্যানেজারের কণ্ঠ হইতে বিগলিত হাসির খিকখিক আওয়াজ নিৰ্গত হইল। এ কে রে ঘাড় ফিরাইয়া ব্যোমকেশকে চোখের ইশারা করিলেন, পকেট হইতে হেনার চাবির রিঙ লইয়া তাহার হাতে দিলেন, তারপর ঘরে প্রবেশ করিয়া দ্বার ভেজাইয়া দিলেন। আমরা তিনজন বাহিরে রহিলাম।
ব্যোমকেশ বলিল, ‘এবার সাত নম্বর।’
সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তে সাত নম্বর ঘর। টিমটিমে বালবের আলোয় চাবি বাছিয়া লইয়া ব্যোমকেশ তালায় চাবি পরাইল। সঙ্গে সঙ্গে তালা খুলিয়া গেল। চাবিটা যে এই ঘরেরই এবং হেনার এই ঘরে যাতায়াত ছিল তাহাতে সন্দেহ রহিল না।
ঘর অন্ধকার। ঘরে পদার্পণ করিতে গিয়া মনে হইল একটা কালো হিংস্ব জন্তু ঘরের কোণে ওৎ পাতিয়া আছে, আমরা পা বাড়াইলেই ঘাড়ে লাফাইয়া পড়িবে। ব্যোমকেশ বলিল, ‘দাঁড়াও, দেশলাই বার করি।’
কিন্তু বিকাশ তৎপূর্বেই ঘরে প্রবেশ করিয়া দ্বারের পাশে হাতুড়াইয়া সুইচ টিপিল। দিপ করিয়া ঘরটা আলোকিত হইয়া উঠিল। আমরা ভিতরে গিয়া দ্বার ভেজাইয়া দিলাম।
ঘরের বদ্ধ বাতাসে সেঁতা-সেঁতা গন্ধ। একটি মাত্র জানালা বন্ধ। ঘরটি প্রায় নিরাভরণ; একদিকের দেওয়াল ঘেঁষিয়া একটি লোহার খাট নগ্ন অবস্থায় পড়িয়া আছে, অন্য দেওয়ালে একটি মধ্যমাকৃতি গোদরেজের স্টীলের আলমারি। আর কিছু নাই।
ব্যোমকেশের দৃষ্টি প্রথমেই স্টীলের আলমারির দিকে গিয়াছিল, সে চাবির রিঙ হইতে আর একটি চাবি লইয়া আলমারিতে লাগাইয়া পাক দিতেই কপাট খুলিয়া গেল। বিকাশ ও আমি ব্যোমকেশের পিছন হইতে ঝুঁকিয়া দেখিলাম–
আলমারির তিনটি থাক। নীচের দু’টি থাক খালি, উপরের থাকে একটি বই এবং রেক্সিনে বাঁধানো পুস্তকাকার একটি ফাইল রহিয়াছে। পিছন দিকে একটি কৃষ্ণবর্ণ বস্তু অস্পষ্টভাবে দেখা যাইতেছিল, ব্যোমকেশ হাত বাড়াইয়া সেটি বাহিরে আনিল। দেখা গেল সেটি একটি ভাঙা মাউথ-অর্গান।
মাউথ-অর্গানটি নাড়িয়া-চাড়িয়া ব্যোমকেশ আবার রাখিয়া দিল। তারপর বইখানি তুলিয়া লইল। জগজগে বাঁধানো কোয়াটো সাইজের বাংলা বই, মলাটে ফারসী লিপির অনুকরণে নাম লেখা আছে—ব্রুবাইয়াৎ-ই-ওমর খৈয়াম। ব্যোমকেশ পাতা উল্টাইয়া দেখিল উপহার-পৃষ্ঠায় লেখা আছে—শ্ৰীমতী মীনা ‘মাতাহারি’ প্রিয়তমাসু। তিন্নিম্নে উপহর্তার নাম দেখিয়া চমকিয়া উঠিলাম। নামটা একান্ত পরিচিত।
বইখানি আমার হাতে দিয়া ব্যোমকেশ রেক্সিন-বাঁধানো ফাইলটি হাতে লইল, সন্তর্পণে পাতা খুলিয়া আবার চট্ট করিয়া বন্ধ করিয়া ফেলিল। যতটুকু দেখিতে পাইলাম, মনে হইল কয়েকটি বাংলা হরফে লেখা চিঠি তাহার মধ্যে রহিয়াছে।
ব্যোমকেশ বলিল, ‘চল, এখানে আমাদের কাজ শেষ হয়েছে।’ দেখিলাম, তাহার চোখ উত্তেজনায় জ্বলজ্বল করিতেছে। ঘরের বাহিরে আসিয়া সে দরজায় তালা লাগাইল, বলিল,’এবার ম্যানেজারের সঙ্গে দেখা করা যেতে পারে।’
ম্যানেজারের ঘরে তখন আসর। জমিয়া উঠিয়াছে; নিঃশেষিত বোতলটি টেবিলের উপর গড়াইতেছে। এ কে রে একটি অর্ধ-পূর্ণ পাত্র হাতে লইয়া বসিয়া আছেন, ম্যানেজার হাত-জোড় করিয়া তাঁহাকে সনির্বন্ধ অনুরোধ করিতেছেন–’আর এক চুমুক স্যার, স্রেফ একটি চুমুক। আমার মাথার দিব্যি।’
আমরা প্রবেশ করিলে বোমকেশের সঙ্গে এ কে রে-র দৃষ্টি বিনিময় হইল, ব্যোমকেশ একটু ঘাড় নাড়িল। এ কে রে উঠিবার উপক্রম করিয়া বলিলেন, ‘আচ্ছা, আজ তাহলে–’
ম্যানেজার গদগদ হাস্য করিয়া বলিলেন, ‘তা কি হয়! ভদ্র মহো-মহোদয়েরা এসেছেন, এক চুমুক না খেয়ে যেতে পাবেন না। আমি আর এক বোতল ভাঙছি।’
তিনি আলমারির দিকে অগ্রসর হইলেন, ব্যোমকেশ বাধা দিয়া বলিল, ‘না না, আজ থাক, আর একদিন হবে। আচ্ছা ম্যানেজারবাবু্, আপনার ৭ নম্বর ঘরে কে থাকে বলুন দেখি?’
‘৭ নম্বর!’ ম্যানেজার কিছুক্ষণ চক্ষু মিটমিটি করিয়া বলিলেন, ‘ও ৭ নম্বর। একটি পাকিস্তানী ভদ্রলোক ভাড়া নিয়েছেন। ভারি মজার লোক! মাসে মাসে ভাড়া গোনেন, কিন্তু মাসের মধ্যে বড় জোর তিন দিন আসেন। আধা ঘন্টা থেকেই চলে যান। ভারি মজার লোক।’
‘তাঁর সঙ্গে কেউ আসে?’
ম্যানেজারের চোখে একটু ধূৰ্ততার ছায়া পড়িল, তিনি বলিলেন, ‘একটি পরী আসে।’
‘ভদ্রলোকের নাম কি?’
‘নাম!’ ম্যানেজার আকাশ-পাতাল চিন্তা করিয়া বলিলেন, ‘নামটা বিস্মরণ হয়ে গেছে। কিন্তু কুচ পরোয়া নেই, রেজিস্টারে নাম আছে।’
একটি বাঁধানো খাতা খুলিয়া তিনি বলিলেন, ‘ঠিক ধরেছি, যাবে কোথায়? এই যে ভদ্রলোকের নাম-ঢাকা পাকিস্তান ওমর শিরাজি।’ তিনি বিজয়োৎফুল্ল নেত্ৰে চাহিলেন।
ব্যোমকেশ বলিল, ‘ওমর শিরাজি। ধন্যবাদ–অশেষ ধন্যবাদ। আজ চলি, আবার একদিন আসব।’
ম্যানেজারের আর একটি বোতল ভাঙিবার সনির্বন্ধ প্রস্তাব এড়াইয়া আমরা নীচে নামিলাম। ব্যোমকেশ বিকাশের পিঠ চাপড়াইয়া বলিল, ‘তোমাদের কাজ শেষ হয়েছে। আজ বাড়ি যাও। শীগগির একদিন এস।’
বিকাশ প্রস্থান করিল। আমরা একটা ট্যাক্সি ধরিয়া এ কে রে-র থানার দিকে চলিলাম, তাঁহাকে পৌঁছাইয়া দিয়া বাসায় ফিরিব।
পথে যাইতে যাইতে এ কে রে বলিলেন, ‘ম্যানেজার ভদ্রতার অবতার, একেবারে নাছোড়বান্দা ভদ্রলোক, আমাকে এক পেগ খাইয়ে তবে ছাড়লো। আরো খাওয়াবার তালে ছিল। —যাহোক, তোমার কাজ হল?’
ব্যোমকেশ চাবি তাহাকে ফেরত দিয়া বলিল, ‘হল। তুমি কিছু জানতে চাও না?’
এ কে রে দৃঢ়ভাবে মাথা নাড়িলেন, ‘না।’
বাসায় ফিরিয়া ব্যোমকেশ প্রথমেই ওমর খৈয়ামের কাব্য ও চিঠির ফাইল সযত্নে দেরাজের মধ্যে চাবি বন্ধ করিয়া রাখিল। আমি প্রশ্ন করিলাম, ‘ওমর খৈয়ামকে তো চিনি, ওমর শিরাজি লোকটি কে?’
পুরনো খবরের কাগজটা টেবিলের ওপরেই ছিল, ব্যোমকেশ তাহার পাতা খুলিয়া আমাকে দেখাইল। পাকিস্তানী বিমান-দুর্ঘটনায় মৃতের তালিকায় নাম রহিয়াছে-ওমর শিরাজি, ন্যাভিগেটর।
রাত্রের আহারাদি সম্পন্ন করিয়া ব্যোমকেশ চিঠির ফাইল লইয়া বসিল।
পরদিন বেলা ন’টার সময় সন্তোষবাবুর অফিসে উপস্থিত হইলাম।
সন্তোষবাবু সবেমাত্র আসিয়া অফিসে বসিয়াছেন, ব্যোমকেশকে দেখিয়া সবিস্ময়ে বলিয়া উঠিলেন, ‘একি! আপনি এখনো এখানে?’
ব্যোমকেশ পূর্ণদৃষ্টিতে তাঁহাকে নিরীক্ষণ করিয়া বলিল, ‘আপনার জন্যে ফাঁদ পাতব ভেবেছিলাম, তা আর দরকার হল না। হ্যাঁ , উড়িষ্যা সরকারের নিমন্ত্রণ আমি পেয়েছি, কিন্তু এখনো যাওয়া হয়নি। বসতে পারি?’ অনুমতির অপেক্ষা না করিয়াই সে চেয়ারে বসিল। আমিও বসিলাম।
বেফাঁস কথা মুখ দিয়া বাহির হইয়া গিয়াছে। সন্তোষবাবুর মুখ ক্ষণকালের জন্য লাল হইয়া উঠিল। তারপর তিনি আত্মসংবরণ করিয়া বলিলেন, ‘উড়িষ্যা সরকার!’
ব্যোমকেশের ঠোঁটে একটু হাসি খেলিয়া গেল, সে বলিল, ‘আপনার সুপারিশে উড়িষ্যা সরকার আমাকে ডেকে পাঠিয়েছেন; আপনার উদ্দেশ্য তো তাঁরা জানেন না। কিন্তু ও-কথা যাক। সন্তোষবাবু্, হেনা মল্লিককে কে ছাদ থেকে ঠেলে ফেলে দিয়েছিল আমি জানতে পেরেছি।’
আমি সন্তোষবাবুকে লক্ষ্য করিতেছিলাম, দেখিলাম তাঁহার মুখ পাঙাস হইয়া যাইতেছে, সঙ্গে সঙ্গে চক্ষু দুটা সৰ্পচক্ষুর ন্যায় হিংস্র হইয়া উঠিতেছে। তিনি যে কিরূপ ভয়ঙ্কর প্রকৃতির লোক, কোণঠাসা বন-বিড়ালের মত তাঁহার সম্মুখীন হওয়া যে অতিশয় বিপজ্জনক কাজ, তাহা নিমেষ মধ্যে পরিস্ফুট হইয়া উঠিল। দাঁতে দাঁত চাপিয়া তিনি বলিলেন, ‘কে তাকে ঠেলে ফেলে দিয়েছিল?
ব্যোমকেশ সহজ সুরে বলিল, ‘আপনি।’
যেন কেহ তাঁহার গলা চাপিয়া ধরিয়াছে এমনি স্বরে সন্তোষবাবু বলিলেন, ‘প্রমাণ করতে পারেন?’
ব্যোমকেশ শান্তভাবে মাথা নাড়িল, ‘না। তবে আপনার মোটিভ আছে তা প্রমাণ করা যায়।’
‘তাই নাকি। আমি আপনার নামে মানহানির মোকদ্দমা করে আপনাকে জেলে পাঠাতে পারি তা জানেন?’
‘আমার নামে মোকদ্দমা করবার সাহস আপনার নেই, সন্তোষবাবু! আমার কাছে আস্ফালন করেও লাভ নেই। শুনুন, আপনি আমাকে আপনার পরিবারিক স্বার্থরক্ষার কাজে নিযুক্ত করেছিলেন, সে কাজ আমি করেছি। যে কারণেই হোক, পুলিস হেনার মৃত্যুর তদন্ত বন্ধ করে দিয়েছে, আমার ও-বিষয়ে কোন কর্তব্য নেই। কিন্তু সত্য কথা জানিবার অধিকার সকলেরই আছে। আমি সত্য কথা জানতে পেরেছি।’
সন্তোষবাবু কিয়ৎকাল চাহিয়া রহিলেন। তাঁহার চোখের মধ্যে কত প্রকার চিন্তা বিদ্যুতের মত খেলিয়া গেল তাহা নির্ণয় করা যায় না। শেষে তিনি বলিলেন, ‘কি সত্য কথা জানতে পেরেছেন আপনি?’
ব্যোমকেশ বলিল, ‘আপনি যা খুঁজেছিলেন, কিন্তু আপনি পাননি, যার জন্যে আপনি ঘরে আগুন দিয়েছিলেন, আমি তাই পেয়েছি! একখানা বই-রুবাইয়াৎ-ই-ওমর খৈয়াম, আর কয়েকটা চিঠি।’
সন্তোষবাবুর রগের শিরা ফুলিয়া উঠিল। তিনি অসহায় বিষাক্ত চোখে চাহিয়া বলিলেন, ‘কি চান আপনি? টাকা?’
ব্যোমকেশ শুষ্কস্বরে বলিল, ‘আমাকে ঘুষ দিতে পারেন এত টাকা আপনারও নেই, সম্ভোষবাবু। আপনি বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন, দেশদ্রোহিতা করেছেন, তার শাস্তি পেতে হবে।’
সন্তোষবাবু নির্বাক চাহিয়া রহিলেন, তাঁহার রাগের শিরা দপদপ করিতে লাগিল।
‘হেনার মা মীনার সঙ্গে আপনার প্রণয় ছিল। দেশ ভাগাভাগির সময় আপনি ঢাকায় যেতেন, মীনার সঙ্গে দেখা করতেন। আপনি জানতেন মীনা বিপক্ষ দলের গুপ্তচর, তা জেনেও আপনি নিজের দলের গুপ্তকথা তাকে বলতেন। শুধু মুখে বলেই নিশ্চিন্ত হননি, চিঠি লিখে নিজের দলের সমস্ত সলা-পরামর্শ তাকে জানাতেন। তার ফলে পদে পদে আমাদের হার হয়েছে, আমাদের প্রাপ্য ভূখণ্ড আমরা হারিয়েছি।
‘আপনার চিঠিগুলো মীনা রেখে দিয়েছিল। তারপর হঠাৎ সে মরে গেল, চিঠিগুলো তার মেয়ে হেনার হাতে এল। হেনার একজন দোসর ছিল-ওমর শিরাজি। দু’জনে মিলে ষড়যন্ত্র করল, তারপর হেনা এসে আপনার বুকে চেপে বসে ব্ল্যাকমেল শুরু করল।’
সন্তোষবাবুর চোখ দুটা রক্তবর্ণ হইয়া উঠিয়াছিল, তিনি হঠাৎ হাত বাড়াইয়া বলিয়া উঠিলেন, ‘এক লাখ টাকা দেব, চিঠিগুলো আমায় ফেরৎ দিন।’
ব্যোমকেশ উঠিয়া দাঁড়াইল, সঙ্গে সঙ্গে সন্তোষবাবু দাঁড়াইলেন, রক্তাক্ত ভীষণ চক্ষে চাহিয়া বলিলেন, ‘দেবেন না?’
ব্যোমকেশ মাথা নাড়িল, তারপর আস্তে আস্তে বলিল, ‘কাল থেকে একটি বিশিষ্ট দৈনিক সংবাদপত্রে আপনার চিঠিগুলির ফ্যাকসিমিলি একে একে ছাপা হবে। প্রস্তুত থাকবেন।’
সন্তোষবাবু দুই চক্ষে অগ্নি বিকীর্ণ করিতে করিতে বসিয়া পড়িলেন। ব্যোমকেশ আমাকে ইশারা করিল, আমরা দ্বারের দিকে চলিলাম।
পিছন হইতে ডাক আসিল, ‘ব্যোমকেশবাবু!’
আমরা ফিরিয়া গিয়া সন্তোষবাবুর সামনে দাঁড়াইলাম, তিনি টেবিলের উপর দুই কনুই রাখিয়া দুহাতে চোখ ঢাকিয়া বসিয়া আছেন। এক মিনিট পরে তিনি হাত নামাইলেন; দেখিলাম তাঁহার মুখ ভাবলেশহীন। তিনি বলিলেন, ‘আমাকে একদিন সময় দেবেন? আজ বিকেল পাঁচটার সময় পার্ক সার্কাস মাঠে আমার বক্তৃতা আছে—‘
ব্যোমকেশ তাঁহার মুখের উপর গভীর দৃষ্টি রাখিয়া ধীরস্বরে বলিল, ‘একদিন সময় দিলাম। কাল, সকালে সংবাদপত্রে আপনার চিঠি ছাপা হবে না। কিন্তু একটা কথা জানিয়ে রাখি। গুণ্ডা লাগিয়ে আমাকে খুন করালেও কোনো লাভ হবে না, চিঠিগুলির নাগাল আপনি পাবেন না। যথাসময়ে সেগুলি ছাপা হবে।’
‘ধন্যবাদ।’
সারাদিন ব্যোমকেশ তক্তপোশে শুইয়া কড়িকাঠ গণনা করিল, কথা বলিল না। বেলা চারটের সময় চা আসিলে উঠিয়া বসিয়া চা পান করিল, তারপর বলিল, ‘চল, বেরনো যাক।।’
‘কোথায় যাবে?
‘সন্তোষবাবুর লেকচার শুনতে।’
সুতরাং বাহির হইলাম। মাথার উপর যাহার খাঁড়া ঝুলিতেছে, সে কিরূপ বক্তৃতা দিবে। শুনিবার কৌতূহল বোধকরি স্বাভাবিক।
পার্ক সার্কাসের মাঠে মঞ্চ রচিত হইয়াছে, মঞ্চের উপর এক সারি গণ্যমান্য ব্যক্তি উপবিষ্ট, প্রধান সচিবও আছেন। সম্মুখে বৃহৎ জনতা। রাজনৈতিক কোনো একটা গুরুতর প্রসঙ্গ জনসাধারণের গোচর করার উদ্দেশ্যে এই সভা আহূত হইয়াছে। আমরা জনতার পিছনে গিয়া দাঁড়াইলাম।
প্রথমে প্রধানমন্ত্রী উঠিলেন, তিনিই সভাপতি। মাইকের সম্মুখে দাঁড়াইয়া বিষয়বস্তুর অবতারণা করিলেন। তারপর একে একে বক্তারা উঠিলেন। সামান্য যুক্তিতর্কের ফোড়ন দিয়া প্রবল হৃদয়বেগপূর্ণ বক্তৃতা। মুগ্ধ হইয়া বাক্যতরঙ্গে ভাসিয়া চলিলাম।
সর্বশেষে মাইকের সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইলেন সন্তোষবাবু। তাঁহার মুখের দৃঢ় গাম্ভীর্য বিষয়বস্তুর গুরুত্র সূচনা করিতেছে। ক্ষণকাল নীরবে দাঁড়াইয়া থাকিয়া তিনি ধীরে ধীরে বলিতে আরম্ভ করিলেন।
লোকটির বক্তৃতা দিবার ক্ষমতা আছে। উচ্ছ্বাস নাই, ভাবালুতা নাই, কেবল দুনিবার যুক্তির দ্বারা তিনি শ্রোতার সমগ্র মনোযোগ আকর্ষণ করিয়া লইলেন। ক্রমে তাঁহার ভাষণের ছন্দ দ্রুত হইতে লাগিল, অন্তৰ্গঢ় আবেগে কণ্ঠস্বর মৃদঙ্গর ন্যায় ধ্বনিত হইয়া উঠিল। তারপর তিনি যখন বস্তৃক্ততার শেষে উদাত্ত কণ্ঠে বন্দে মাতরম উচ্চারণ করিলেন, তখন শ্রোতাদের কণ্ঠ হইতেও স্বতরুৎসারিত জয়ধ্বনি উত্থিত হইল।
ভাষণ শেষ করিয়া সন্তোষবাবু নিজ আসনে গিয়া বসিলেন।’ আমার দৃষ্টি তাঁহার উপরেই নিবদ্ধ ছিল, দেখিলাম। তিনি পকেট হইতে একটি কোটা বাহির করিয়া কিছু মুখে দিলেন। ভাবিলাম, হয়তো পেনিসিলিনের বড়ি।
ইতিমধ্যে প্রধান সচিব আসিয়া সভা সংবরণের ভাষণ আরম্ভ করিয়াছেন, শ্রোতারা উঠি-উঠি করিতেছে, এমন সময় হঠাৎ মঞ্চের উপর একটা চাঞ্চল্য দেখা গেল। মুহুর্তে আমার দৃষ্টি সেইদিকে ছুটিয়া গেল; দেখিলাম সন্তোষবাবু নিজ আসনে এলাইয়া পড়িয়াছেন, আশেপাশে যাঁহারা ছিলেন তাঁহারা উদ্বিগ্নভাবে তাঁহার দিকে ঝুকিয়া দেখিতেছেন। প্রধানমন্ত্রী ভাষণ থামাইয়া সেইদিকে ছুটিয়া গেলেন। শ্রোতাদের মধ্যে একটা উত্তেজিত গুঞ্জন উঠিল।
পাঁচ মিনিট পরে প্রধানমন্ত্রী মাইকের কাছে ফিরিয়া আসিয়া আবেগপূর্ণ স্বরে বলিলেন, ‘মর্মান্তিক দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি, আমাদের প্রিয় সুহৃৎ, দেশের সুসন্তান সন্তোষ সমাদ্দার ইহলোক ত্যাগ করেছেন—?
তিনি ভগ্নস্বরে বলিয়া চলিলেন। ব্যোমকেশ আমার হাত ধরিয়া টানিয়া লইল, বলিল, ‘চল। পঞ্চমাঙ্কে যবনিকা পতন হয়েছে।’
পার্কের বাহিরে আসিয়া ব্যোমকেশ সিগারেট ধরাইল, বলিল, ‘চল, হাঁটা যাক।’
পথ অনেকখানি, তবু ট্রামে-বাসে চড়িবার ইচ্ছা হইল না। আমিও সিগারেট ধরাইয়া বলিলাম, ‘চল।’
পাশাপাশি চলিতে চলিতে ব্যোমকেশ বলিতে আরম্ভ করিল–
‘সন্তোষবাবু প্রতিভাবান পুরুষ ছিলেন, কিন্তু তিনি চরিত্রবান ছিলেন না। ইংরেজিতে কথা আছে-নাবিকদের বন্দরে বন্দরে বৌ, সন্তোষবাবুরও ছিল তাই। তিনি কাজের সূত্রে মাদ্রাজ বোম্বাই দিল্লী সর্বত্র ঘুরে বেড়াতেন, আমার বিশ্বাস প্রত্যেক শহরেই তাঁর একটি করে প্ৰেয়সী ছিল। বুড়ো বয়সেও তাঁর ও-রোগ সারেনি।
‘কলকাতাতে যেমন তাঁর ছিল সুকুমারী, ঢাকায় তেমনি ছিল মীনা। মীনা ধর্মে মুসলমানী ছিল। সকল দেশে সকল সভ্য সমাজেই এক শ্রেণীর স্ত্রীলোক থাকে যারা বাইরে বেশ সভ্য-ভাব্য, কিন্তু ভিতরে ভিতরে বিলাসিনীর ব্যবসা চালায়। পাশ্চাত্য দেশে ওদের নাম-ডেমি মনডোন। মীনা ছিল ডেমি মনডোন। তার স্বামী ছিল কিনা জানি না, বোধহয় সাক্ষীগোপাল গোছের একজন কেউ ছিল, তার নাম কমল মল্লিক। কমল মল্লিক নামটা হিন্দু নাম, আবার কামাল মল্লিক বললে মুসলমান নাম হয়ে যায়। হেনা মল্লিক নামটাও তাই। মল্লিক পদবী হিন্দুদের মধ্যে আছে, কিন্তু আসলে ওটা মুসলমানী খেতাব।
‘মীনার ছবি দেখেছ, সে ছিল অপরূপ সুন্দরী। সমাজের উঁচু মহলে তার প্রসার ছিল। সন্তোষবাবুকেও সে কুহকের নাগপাশে বেঁধে ফেলেছিল, যখনই তিনি ঢাকায় যেতেন। মীনার সঙ্গে তাঁর দেখা হত। সে বোধহয় তাঁকে গজল শোনাতো।
‘তারপর এল স্বাধীনতা, এল দেশ-ভাগাভাগির যুদ্ধ। সে যে কী নৃশংস যুদ্ধ তা কারুর ভোলবার কথা নয়। এই সময় সন্তোষবাবু আমাদের দলের একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা। দুই পক্ষের মধ্যে যখন দূতের প্রয়োজন হল, তখন সন্তোষবাবু আমাদের পক্ষ থেকে দৌত্যকার্যে নিযুক্ত হলেন। তিনি বারবার কলকাতা থেকে ঢাকা যাতায়াত করতে লাগলেন। স্বভাবতাই মীনার সঙ্গে তাঁর দেখা-সাক্ষাৎ হতে লাগিল।
সন্তোষবাবু তখন মীনার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছেন, তিনি নিজের দলের অতিবড় গুপ্তকথাগুলিও মীনার কাছে প্রকাশ করে ফেলতে লাগলেন। মীনা রঙ্গিণী মেয়ে হলেও নিজের দলের স্বার্থচিস্তা তার মনে ছিল, সে গুপ্ত সংবাদগুলি যথাস্থানে পৌঁছে দিতে লাগল। অবস্থাটা ভেবে দেখ, রাজনৈতিক কূটযুদ্ধ চলছে, ওদের গুপ্ত অভিপ্ৰায় আমরা কিছুই জানি না, ওরা আমাদের গুপ্ত অভিপ্ৰায় সমস্ত জানে। ফল অনিবাৰ্য।
‘সন্তোষবাবুর তখন এমন মোহমত্ত অবস্থা যে, তিনি মীনাকে কেবল মৌখিক গুপ্তকথা জানিয়ে নিরস্ত হননি, যখন কলকাতায় থাকতেন তখন চিঠি লিখে তাকে গুপ্ত সংবাদ জানাতেন। এই বিশ্বাসঘাতকতার কারণ কী আমি জানি না, সম্ভবত অন্য কোন দেশনেতার প্রতি ব্যক্তিগত ঈর্ষা। কিন্তু তিনি যে জেনেশুনে মীনাকে খবর পাঠাতেন, তাতে সন্দেহ মাত্র নেই। রুবাইয়াৎ-ই-ওমর খৈয়াম বইয়ের উপহার পৃষ্ঠায় তিনি লিখেছিলেন—মীনা মাতাহারি। তিনি জানতেন মীনা বিপক্ষ দলের গুপ্তচর।
যাহোক, দেশ-ভাগাভাগির লড়াই একদিন শেষ হল। তারপর কয়েক বছর কেটে গেল। মীনা সন্তোষবাবুর চিঠিগুলি যত্ন করে রেখে দিয়েছিল, নষ্ট করেনি। তার কি মতলব ছিল বলতে পারি না, হয়তো ভেবেছিল কোনদিন সন্তোষবাবু যদি বাঁধন ছেঁড়বার চেষ্টা করেন তখন চিঠিগুলো কাজে লাগবে। কিন্তু হঠাৎ একদিন মীনা মারা গেল। বোধহয় অ্যাকসিডেন্টেই মারা গিয়েছিল।
‘মীনার একটি মেয়ে ছিল–হেনা। মা যখন মারা গেল তখন সে সাবালিকা হয়েছে। সে মায়ের কাগজপত্রের মধ্যে সন্তোষবাবুর চিঠিগুলো খুঁজে পেল। হেনার নিশ্চয় দু-চারজন উমেদার ছিল, তাদের মধ্যে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধুর নাম ওমর শিরাজি। শিরাজি বিমান কোম্পানিতে কাজ করত, এরোপ্লেনের ন্যাভিগেটর। দেশে দেশে উড়ে বেড়াতো, তার প্লেনের দৌড় সিঙ্গাপুর থেকে কায়রো। দশ-বারো দিন অন্তর তার প্লেন দমদমে নামতো।
‘হেনা ওমর শিরাজিকে চিঠির কথা বলল, দু’জনে পরামর্শ করল সন্তোষবাবুকে ব্ল্যাকমেল করবে। তারা কলকাতায় এসে সোজাসুজি তাদের মতলব সন্তোষবাবুকে জানালো। হেনা এসে তাঁর বাড়িতে জাঁকিয়ে বসল। ওরা ভেবে দেখেছিল সন্তোষবাবুর বাড়িই হেনার পক্ষে সবচেয়ে নিরাপদ স্থান। সন্তোষবাবু জাঁতিকালে পড়ে গেলেন। ইচ্ছে থাকলেও হেনাকে খুন করতে পারেন না, তাহলেই ওমর শিরাজি তাঁর গুপ্তকথা ফাঁস করে দেবে। তিনি ব্ল্যাকমেলের টাকা শুনতে লাগলেন।
মারাত্মক চিঠিগুলো হেনা কোথায় লুকিয়ে রেখেছে সন্তোষবাবু আবিষ্কার করতে পারেননি, তবে সন্দেহ করেছিলেন যে হেনা তাঁর বাড়িতে নিজের ঘরে চিঠিগুলো লুকিয়ে রেখেছে। কিন্তু নিজের বাড়ি বলেই সেখানে তল্লাশ করবার সুবিধা নেই। হেন সর্বদা নিজের ঘরে থাকে, কেবল সন্ধ্যেবেলা নমাজ পড়বার জন্যে একবার ছাদে যায়। তাও দোরে তালা লাগিয়ে।
‘ওমর শিরাজি ইন্দো-পাক হোটেলে একটা ঘর ভাড়া নিয়েছিল। সেই ঘরে ওদের সাক্ষী প্রমাণ যাবতীয় চিঠিপত্র ওরা লুকিয়ে রেখেছিল। বোধহয় ব্যবস্থা ছিল, সন্তোষবাবু হেনাকে হগুয় হগুপ্তায় টাকা দেবেন। কত টাকা দিতেন জানি না, সন্তোষবাবুর ব্যাঙ্কের হিসেব পরীক্ষা করলে জানা যাবে। যাহোক, টাকা নিয়ে হেনা ওমর শিরাজির অপেক্ষা করত। যথাসময়ে শিরাজি এসে মাউথ-অর্গান বাজিয়ে তাকে সঙ্কেত জানাতো, তারপর দু’জনে ইন্দো-পাক হোটেলে যেত। সেখানে হেনা শিরাজিকে টাকা দিত, শিরাজি টাকা নিয়ে পাকিস্তানে চলে যেত। এই ছিল তাদের মোটামুটি কর্মপদ্ধতি।’
বলিলাম, ‘ভারতীয় টাকা নিয়ে যেত?’
ব্যোমকেশ বলিল, ‘টাকা নিয়ে যেত, কিংবা সোনা কিনে নিয়ে যেত, কিংবা কলকাতার কোন ব্যাঙ্কে টাকা জমা রেখে যেত। আমার বিশ্বাস টাকা নিয়ে যেত।’
‘তারপর বলো।’
‘হেনা যে সন্তোষবাবুর অনাথ বন্ধু-কন্যা নয়, সে তাঁর রক্ত-শোষণ করছে, একথা কেবল একজনই সন্দেহ করেছিল। রবিবর্মা। সে সন্তোষবাবুর সেক্রেটারি, তার ওপর ভীষণ ধূর্ত ধড়িবাজ লোক। হেনাকে সে আগে থাকতে চিনত কিনা বলা যায় না, কিন্তু কোন সময় সে হেনার পিছু নিয়ে ইন্দো-পাক হোটেলের সন্ধান পেয়েছিল, বুঝেছিল যে ৭ নম্বর ঘরে মারাত্মক দলিল আছে। সে এক গোছা চাবি যোগাড় করে তাক বুঝে ৭ নম্বর ঘরে ঢোকবার চেষ্টা করছিল। কিন্তু দরজা খুলতে পারেনি। তার বোধহয় মতলব ছিল দলিলগুলো হস্তগত করতে পারলে সে-ই সন্তোষবাবুকে ব্ল্যাকমেল করবে। কিন্তু তার উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়নি। হেনার মৃত্যুর পর সে একবার চেষ্টা করেছিল। বিকাশ তার পিছনে লেগেছিল, সে দেখে ফেলল। বিকাশ যদি তাকে ইন্দো-পাক হোটেলের ৭ নম্বর ঘরের সামনে দেখতে না পেত, তাহলে সন্তোষবাবুকে ধরা যেত না।’
আমি বলিলাম, ‘একটা কথা। এমন কি হতে পারে না যে, সন্তোষবাবুই রবিবর্মাকে নিযুক্ত করেছিলেন দলিলগুলো উদ্ধার করার জন্যে?’
ব্যোমকেশ বলিল, ‘না। সন্তোষবাবু এর মধ্যে থাকলে ছিঁচকে চোরের মত কাজ করতেন না। ম্যানেজারকে মোটা ঘুষ দিয়ে কার্যসিদ্ধি করতেন। যাহোক, পরের কথা আগে বলব না। সন্তোষবাবু জাঁতিকালে পড়ে যন্ত্রণা ভোগ করছেন, ছ-মাস কেটে গেছে, আরো কতদিন চলবে ঠিক নেই, এমন সময় এক ব্যাপার ঘটল। একদিন সকালবেলা খবরের কাগজ খুলে সন্তোষবাবু দেখলেন একটি পাকিস্তানী বিমান সমুদ্রে ডুবেছে, মৃতদের মধ্যে নাম পেলেন-ওমর শিরাজি।
‘ব্যাস, সন্তোষবাবু উদ্ধারের পথ দেখতে পেলেন। হেনা খবরের কাগজ পড়ে না, সে এখনো জানতে পারেনি; সে খবর পাবার আগেই তাকে শেষ করতে হবে। তিনি জানতেন, হেনা রোজ সন্ধ্যেবেলা নমাজ পড়তে ছাদে যায়। বর্তমানে বাড়ি মেরামত হচ্ছে, ভারা বেয়ে বাইরে থেকে ছাদে ওঠা সহজ। তিনি ঠিক করে ফেললেন কী করে হেনাকে মারবেন। এমনভাবে মারবেন যাতে অপঘাত মৃত্যু বলে মনে হয়।
‘দিনটা ছিল শনিবার। বিকেলবেলা তিনি সুকুমারীর কাছে গেলেন, সুকুমারীর সঙ্গে পরামর্শ করে নিজের অ্যালিবাই তৈরি করলেন। আট-ঘাট বেঁধে কাজ করতে হবে।’
আমি বলিলাম, ‘সুকুমারী যে আমাদের কাছে ডাহা মিথ্যে কথা বলেছিল তা বুঝতে পারিনি।’
ব্যোমকেশ বলিল, ‘হ্যাঁ। সন্তোষবাবুর প্রতি সুকুমারীর প্রাণের টান ছিল, নইলে সে তাঁর জন্যে নিজেকে খুনের মামলায় জড়িয়ে ফেলত না। সন্তোষবাবুর মৃত্যুতে যদি কেউ দুঃখ পায় তো সে সুকুমারী।
‘খিড়কির ফটক দিয়ে সন্তোষবাবু নিজের বাড়িতে প্রবেশ করলেন, ভারা বেয়ে ওপরে উঠে গেলেন। হেনা বোধ হয় তখন মাদুর পেতে পশ্চিমদিকে মুখ করে নামাজ পড়বার উপক্রম করছিল, দেখল সন্তোষবাবু উঠে আসছেন। তাঁর অভিপ্ৰায় বুঝতে হেনার দেরি হল না, সে ভয় পেয়ে ছাদের পুবদিকে পালাতে লাগল। কিন্তু পালিয়ে যাবে কোথায়? আলসের কাছে আসতেই সন্তোষবাবু পিছন থেকে ছুটে এসে তাকে ধাক্কা দিলেন, সে ছাদ থেকে নীচে পড়ে গেল।
‘সন্তোষবাবু ছাদের শিকল খুলে দিয়ে, যেমন এসেছিলেন তেমনি ভারা বেয়ে নেমে গেলেন। শিকল খুলে দেবার কারণ—যদিও কেউ হেনার মৃত্যুকে খুন বলে সন্দেহ করে, তাহলেও আততায়ী কোন দিক থেকে ছাদে উঠেছে তা অনিশ্চিত থেকে যাবে।
‘সন্তোষবাবু বাড়িতে এসেছিলেন তা কেউ জানল না, তিনি কর্তব্যকর্ম সুসম্পন্ন করে সুকুমারীর কাছে ফিরে গেলেন। কিন্তু একটা কাজ বাকি ছিল।
‘চিঠিগুলো নিশ্চয় হেনার ঘরে আছে। পুলিস খুঁজে পায়নি বটে, কিন্তু পরে পেতে পারে। গভীর রাত্রে যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে, তখন তিনি চুপি চুপি নেমে এসে হেনার ঘর তল্লাশ করলেন। কিন্তু চিঠি খুঁজে পেলেন না। তখন তিনি পেট্রোল ঢেলে হেনার ঘরে আগুন লাগিয়ে দিলেন। ঢাকীসুদ্ধ বিসর্জন।’
ব্যোমকেশ চুপ করিল। কিছুক্ষণ নীরবে চলিবার পর জিজ্ঞাসা করিলাম, ‘সন্তোষবাবুকে টেলিফোন করেছিল কে?’
সে বলিল, ‘কেউ না। ওটা কপোলকল্পিত। নিভৃত নিকুঞ্জগৃহে ফিরে গিয়ে সন্তোষবাবু নিশ্চিন্ত হতে পারেননি, হেনা যদি দৈবাৎ না মরে থাকে! তাছাড়া চিঠিগুলো হেনার ঘর থেকে সরাতে হবে। তাই তিনি একটি অজ্ঞাত সংবাদদাতা সৃষ্টি করলেন; সুকুমারীকে টেলিফোন সম্বন্ধে তালিম দিয়ে বাড়িতে ফিরে এলেন।’
‘অদ্ভূত অভিনেতা কিন্তু সন্তোষবাবু।’
‘হ্যাঁ। অদ্ভুত বক্তা, অদ্ভুত অভিনেতা-এরা সব এক জাতের।’
‘আচ্ছা ব্যোমকেশ, সন্তোষবাবু তোমাকে পারিবারিক স্বার্থরক্ষার জন্যে নিযুক্ত করলেন কেন? গোড়াতেই তোমাকে বিদেয় করলেন না কেন?’
‘নেংটি একটা দুষ্কার্য করে ফেলেছিল, আমাকে ডেকেছিল। আমাকে বিদেয় করে দিলে তাঁর ওপর সকলের সন্দেহ হত, তাই তিনি সাধু সেজে আমাকে তাঁর পরিবারিক স্বার্থরক্ষার জন্যে নিযুক্ত করলেন। পরে অবশ্য ছাড়াবার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তখন কমলি নেহি ছোড়তি।’
‘তুমি কখন ওঁকে সন্দেহ করলে?’
‘ঘরে আগুন লাগার খবর পেয়ে বুঝলাম কোনো দাহ্য পদার্থ পুড়িয়ে দেবার জন্যেই ঘরে আগুন দেওয়া হয়েছে। কি রকম দাহ্য পদাৰ্থ? নিশ্চয় এমন কোনো দাহ্য পদার্থ, যা সহজে খুঁজে পাওয়া যায় না। স্বভাবতাই দলিলের কথা মনে আসে। কি রকম দলিল? যার সাহায্যে ব্ল্যাকমেল করা যায়। তাহলে হেনা কাউকে ব্ল্যাকমেলা করছিল? কাকে ব্ল্যাকমেল করছিল? যুগল আর উদয়কে বাদ দেওয়া যায়; বাকি রইল রবিবর্মা এবং সন্তোষবাবু। কিন্তু রবিবর্মা সামান্য লোক, তাকে ব্ল্যাকমেল করে বেশি টাকা আদায় করা যায় না। অপর পক্ষে সন্তোষবাবু বড়লোক, তাঁর পূর্ববঙ্গে নিত্য যাতায়াত, হেনাকে তিনি নিজের বাড়িতে থাকতে দিয়েছেন। পুলিসের শৈথিল্যের পিছনেও হয়তো তাঁর প্রভাব কাজ করছে। আমাকে কলকাতা থেকে সরিয়ে কটকে পাঠানোর চেষ্টার পিছনেও তিনি আছেন। সুতরাং তিনিই সব দিক দিয়ে যোগ্য পাত্র।–ভাল কথা কাল সকালে কটকে একটি টেলিগ্রাম পাঠাতে হবে, জানা দরকার তারা এখনো আমাকে চায় কিনা।’
‘বেশ। সন্তোষবাবুর চিঠিগুলো কি করবে?’
‘পুড়িয়ে ফেলব। ও চিঠির কাজ শেষ হয়েছে। সন্তোষবাবু প্ৰায়শ্চিত্ত করেছেন, তাঁর সুনাম নষ্ট করে কারুর লাভ নেই। মগ্নমৈনাক মগ্নই থাক।’
বাসায় ফিরিয়া দেখি নেংটি বসিয়া আছে। সত্যবতীর নিকট হইতে চা ও সিগারেট সংগ্রহ করিয়া পরম আরামে সেবন করিতেছে। সে সন্তোষবাবুর মৃত্যু-সংবাদ পায় নাই। ব্যোমকেশকে দেখিয়া ভ্রূ তুলিয়া ব্যগ্রভরে বলিল, ‘কী, এখনো হেনার খুনীকে ধরতে পারলেন না।’
ব্যোমকেশ বিরক্ত স্বরে বলিল, ‘পেরেছি। তুমি এখানে কি করছ?’
নেংটি সচকিত অবিশ্বাসের স্বরে বলিয়া উঠিল, ‘পেরেছেন।’
ব্যোমকেশ বলিল, ‘হ্যাঁ। তুমি পেরেছ নাকি।’
নেংটি আমতা আমতা করিয়া বলিল, ‘আমি–আমি তো গোড়া থেকেই জানি।’
‘গোড়া থেকেই জানো! কি করে জানলে? বুদ্ধি খাটিয়ে বের করেছ? আততায়ীর নাম বল তো শুনি?’
নেংটি স্খলিত স্বরে বলিল, ‘মেসোমশাই।’
ব্যোমকেশ ক্ষণকাল অবাক বিস্ময়ে চাহিয়া থাকিয়া বলিল, ‘তুমি জানো! কি করে জানলে?’
নেংটি দ্রুত বিহ্বল কণ্ঠে বলিল, ‘আমি যে স্বচক্ষে দেখেছি, ব্যোমকেশদা। আমি বাড়ির পিছন দিকের পাইনগাছে উঠে সিগারেট খাচ্ছিলাম। এমন সময় হেনা ছাদে এল, মাদুরটা পেতে বসতে যাবে, হঠাৎ মেসোমশাই পশ্চিমদিকের ভারা বেয়ে উঠে এলেন। তাঁকে দেখেই হেনা দৌড়ে পুবদিকে গেল, তিনিও তার পিছনে ছুটলেন, তাকে ঠেলা দিয়ে ছাদ থেকে ফেলে দিলেন।’
ব্যোমকেশ কঠোর চক্ষে চাহিয়া বলিল, ‘তুমি এতদিন একথা বলনি কেন?’
নেংটি কাতর স্বরে বলিল, ‘কি করে বলি, ব্যোমকেশদা। উনি আমাদের অন্নদাতা, ওঁকে পুলিসে ধরিয়ে দেব কি বলে? তবু আপনাকে খবর দিয়েছিলাম, জানতাম, কেউ যদি অপরাধীকে ধরতে পারে তো সে আপনি।’
ব্যোমকেশের মুখ নরম হইল, সে নেংটির-কাঁধে হাত রাখিয়া বলিল, ‘নেংটি, তুমি তাড়াতাড়ি বাড়ি যাও। সন্তোষবাবু মারা গেছেন।’
দুষ্টচক্র
ডাক্তার সুরেশ রক্ষিত বলিলেন, আপনাকে একবার যেতেই হবে, ব্যোমকেশবাবু। রোগীর যেরকম অবস্থা, আপনি গিয়ে আশ্বাস না দিলে বাঁচানো শক্ত হবে।
ডাক্তার সুরেশ রক্ষিতের বয়স চল্লিশের আশেপাশে, একটু রোগা শুষ্ক গোছের চেহারা, দামী এবং নূতন বিলাতি পোশাক তাঁহার গায়ে যেন মানায় নাই। কিন্তু ভাবভঙ্গী বেশ চটপটে এবং বুদ্ধিমানের মত। আজ সকালে তিনি ব্যোমকেশের সঙ্গে দেখা করিতে আসিয়াছেন এবং এক বিচিত্ৰ প্ৰস্তাব করিয়াছেন।
বলা বাহুল্য, ব্যোমকেশের রোগী দেখিতে যাইবার ইচ্ছা নাই। সে অর্ধ-নিমীলিত নেত্ৰে ডাক্তার রক্ষিতের দিকে চাহিয়া বলিল, রোগটা কী?
ডাক্তার বলিলেন, প্যারালিসিস- মানে পক্ষাঘাত। প্ৰায় তিন মাস আগে অ্যাটাক হয়েছিল। প্রথম ধাক্কাটা সামলে গেছেন, কিন্তু রক্তচাপ খুব বেশি। মাথাটা অবশ্য পরিষ্কার আছে। আমাকে পাঠালেন, আপনি যদি দয়া করে একবার আসেন। মনে ভরসা পেলে হয়তো বেঁচে যেতে পারেন।
ব্যোমকেশ বলিল, আপনি চিকিৎসা করছেন?
ডাক্তার বলিলেন, আজ্ঞে হ্যাঁ। আমি তাঁর বাড়ির একতলার ভাড়াটে। এবং গৃহ-চিকিৎসকও। লোকটি মহা ধনী, সুদের কারবার করেন। বিশু পালের নাম হয়তো আপনারা শুনে থাকবেন।
ব্যোমকেশ বলিল, কি নাম বললেন— শিশুপাল?
ডাক্তার হাসিলেন, বিশু পাল। তবে কেউ কেউ শিশুপালও বলে। কেন বলে জানি না, লোকটি সুদখোর মহাজন বটে কিন্তু অর্থ-পিশাচ নয়। বিশেষত গত তিন মাস শয্যাশায়ী থেকে একেবারেই অসহায় হয়ে পড়েছেন।
ব্যোমকেশ বলিল, কিন্তু আমি কি করতে পারি? আমি তো আর ডাক্তার নই।
ডাক্তার কহিলেন, তবে আসল কথা বলি। বিশু পালের এক খাতক আছে, নাম অভয় ঘোষাল। লোকটা ভয়ঙ্কর পাজি। বিপদে পড়ে বিশু পালের কাছ থেকে অনেক টাকা ধার নিয়েছিল, এখন আর শোধ দিচ্ছে না। বিশু পাল জোর তাগাদা লাগিয়েছিলেন, তাইতে অভয় ঘোষাল নাকি ভয় দেখিয়েছে, টাকা চাইলে তাঁকে খুন করবে। তারপরই বিশু পালের ষ্ট্রোক হয়, সেই থেকে তিন মাস বিছানায় পড়ে আছেন। অবশ্য প্রাণের আশঙ্কা নেই, সাবধানে চিকিৎসা করলে হয়তো আবার চলে ফিরে বেড়াতে পারবেন। কিন্তু আসল কথা তা নয়, ওঁর প্রাণে ভয় ঢুকেছে। অভয় ঘোষাল ওঁকে খুন করবেই, তিনি যদি টাকা ছেড়েও দেন তবু খুন করবে। —আপনাকে চিকিৎসা করতে হবে না, বিশু পালের ইচ্ছে আপনার কাছে তাঁর হৃদয়-ভার লাঘব করেন; আপনি যদি কিছু উপদেশ দেন তাও তাঁর কাজে লাগতে পারে।
ব্যোমকেশ একটু বিমনা থাকিয়া বলিল, কেউ যদি শিশুপাল বধের জন্য বদ্ধপরিকর হয়ে থাকে তাকে ঠেকিয়ে রাখা শিবের অসাধ্য। যাহোক, ভদ্রলোক যখন আমার সঙ্গলাভের জন্যে এত ব্যাকুল হয়েছেন তখন আমি যাব। ইহলোকেই হোক আর পরলোকেই হোক, মহাজনদের হাতে রাখা ভালো। কি বল, অজিত?
আমি বলিলাম, তা তো বটেই।
ডাক্তার রক্ষিত উঠিয়া দাঁড়াইলেন, হাসিমুখে বলিলেন, ধন্যবাদ। এই নিন আমাদের ঠিকানা। কখন আসবেন? তিনি একটি কার্ড বাহির করিয়া ব্যোমকেশের হাতে দিলেন।
ব্যোমকেশ কার্ডটি দেখিয়া আমার দিকে বাড়াইয়া দিল। দেখিলাম বিশু পালের বাসস্থান বেশি দূর নয়, আমহার্স্ট ষ্ট্রীটের একটা গলির মধ্যে। ব্যোমকেশ বলিল, আজ বিকেলবেলা পাঁচটা নাগাদ যাব। —আচ্ছা, আসুন।
ডাক্তার প্রস্থান করিলে ব্যোমকেশ হাসিতে হাসিতে বলিল, পক্ষাঘাতগ্রস্ত রুগীকে সাস্তুনা দেবার কাজ আমার এই প্ৰথম।
গলিটি বিসৰ্পিল; নানা ভঙ্গীতে আঁকিয়া বাঁকিয়া পার্বত্য নদীর মত চলিয়াছে। দুই পাশে তিনতলা চারতলা বাড়ি। গলি যতই সরু হোক, দেখিয়াছি বাড়ি কখনও ছোট হয় না, আড়ে বাড়িবার জায়গা না পাইয়া দীঘে বাড়ে।
একটি তেতলা বাড়ির দ্বারপার্শ্বে ডাক্তার সুরেশ রক্ষিতের শিলালিপি দেখিয়া বুঝিলাম এই বিশু পালের বাড়ি। ডাক্তার রক্ষিত জানালা দিয়া আমাদের দেখিতে পাইয়া বাহির হইয়া আসিলেন বলিলেন, আসুন।
বাড়িটি পুরানো ধরনের; এক পাশে সুড়ঙ্গের মত সঙ্কীর্ণ বারান্দা ভিতর দিকে চলিয়া গিয়াছে, তাহার এক পাশে দ্বার, অন্য পাশে দুটি জানালা। দ্বার দিয়া ডাক্তারখানা দেখা যাইতেছে; তকতকে ঝকঝকে একটি ঘর। কিন্তু রোগীর ভিড় নাই। একজন মধ্যবয়স্ক কম্পাউন্ডার দ্বারের নিকট দাঁড়াইয়া আছে। ডাক্তার রক্ষিত আমাদের ডাক্তারখানায় লইয়া গেলেন না, বলিলেন, সিঁড়ি ভাঙতে হবে। বিশুবাবু তিনতলায় থাকেন।
ব্যোমকেশ বলিল, বেশ তো। আপনি কি এই বাড়িতেই থাকেন? না কেবলই ডাক্তারখানা?
ডাক্তার বলিলেন, তিনটে ঘর আছে। দুটোতে ডাক্তারখানা করেছি, একটাতে থাকি। একলা মানুষ, অসুবিধা হয় না।
দোতলাতেও তিনটি ঘর। ঘর তিনটিতে অফিস বসিয়াছে। টেবিল চেয়ারের অফিস নয়, মাড়োয়ারীদের মত গদি পাতিয়া অফিস। অনেকগুলি কেরানি বসিয়া কলম পিষিতেছে।
ব্যোমকেশ বলিল, এটা কি?
ডাক্তার বলিলেন, বিশুবাবুর গদি। মস্ত কারবার, অনেক রাজা-রাজড়ার টিকি বাঁধা আছে। ওঁর কাছে।
ব্যোমকেশ আর কিছু বলিল না। আমি মনে মনে ভাবিলাম, বিশু পাল শুধু শিশুপালই নয়, জরাসন্ধও বটে।
তেতলার সিঁড়ির মাথায় একটি গুর্খা রণসাজে সজ্জিত হইয়া গাদা-বন্দুক হস্তে টুলের উপর বসিয়া আছে; পদশব্দ শুনিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল এবং আমাদের পানে তির্যক নেত্ৰপাত করিল। ডাক্তার বলিলেন, ‘ঠিক হ্যায়।’ তখন গুর্খা স্যালুট করিয়া সরিয়া দাঁড়াইল।
বারান্দা দিয়া কয়েক পা যাইবার পর একটি বন্ধ দ্বার। ডাক্তার দ্বারে টোকা দিলেন। ভিতর হইতে নারীকণ্ঠে প্রশ্ন আসিল, কে?
ডাক্তার বলিলেন, আমি ডাক্তার রক্ষিত। দোর খুলুন।
দরজা একটু ফাঁক হইল। একটি প্রৌঢ় সধবা মহিলার শীর্ণ মুখ ও আতঙ্কভরা চক্ষু দেখিতে পাইলাম। তিনি একে একে আমাদের তিনজনের মুখ দেখিয়া বোধহয় আশ্বস্ত হইলেন, দ্বার পুরাপুরি খুলিয়া গেল। আমরা একটি ছায়াচ্ছন্ন ঘরে প্রবেশ করিলাম।
পুরুষ কণ্ঠে শব্দ হইল, আলোটা জ্বেলে দাও গিন্নি।
মহিলাটি সুইচ টিপিয়া আলো জ্বলিয়া দিলেন, তারপর মাথায় আঁচল টানিয়া পাশের ঘরে চলিয়া গেলেন।
এইবার ঘরটি স্পষ্টভাবে দেখিলাম। মধ্যমাকৃতি ঘর, মাঝখানে একটি খাট। খাটের উপর প্ৰেতাকৃতি একটি মানুষ গায়ে বালাপোশ জড়াইয়া শুইয়া আছে। খাটের পাশে একটি ছোট টেবিলের উপর ওষুধের শিশি জলের গেলাস প্রভৃতি রাখা আছে। ঘরে অন্যান্য আসবাব যাহা আছে তাহা দেখিয়া নাসিং হোমে রোগীর কক্ষ স্মরণ হইয়া যায়।
প্রেতাকৃতি লোকটি অবশ্য বিশু পাল। জীৰ্ণগলিত মুখে নিম্প্রভ দুটি চক্ষু মেলিয়া তিনি আমাদের পানে চাহিয়া আছেন। মাথার চুল পাঁশুটে সাদা, সম্মুখের দাঁতের অভাবে অধরোষ্ঠ অন্তঃপ্রবিষ্ট হইয়াছে। বয়স পঞ্চাশ কিম্বা ষাট কিম্বা সত্তর পর্যন্ত হইতে পারে। তিনি স্থলিত স্বরে বলিলেন, ব্যোমকেশবাবু এসেছেন? আমার কী সৌভাগ্য। আসতে আজ্ঞা হোক।
আমরা খাটের কাছে গিয়া দাঁড়াইলাম। বিশু পাল কম্পিত হস্ত জোড় করিয়া বলিলেন, আপনাদের বড় কষ্ট দিয়েছি। আমারই যাওয়া উচিত ছিল, কিন্তু দেখছেন তো আমার অবস্থা—
ডাক্তার বলিলেন, আপনি বেশি কথা বলবেন না।
বিশু পাল কাতর কণ্ঠে বলিলেন, বেশি কথা না বললে চলবে কি করে ডাক্তার? ব্যোমকেশবাবুকে সব কথা বলতে হবে না?
‘তবে যা বলবেন চটপট বলে নিন।’ ডাক্তার টেবিল হইতে একটি শিশি লইয়া খানিকটা তরল ঔষধ গেলাসে ঢালিলেন, তাহাতে একটু জল মিশাইয়া বিশু পালের দিকে বাড়াইয়া দিলেন, বলিলেন, এই নিন, এটা আগে খেয়ে ফেলুন।
বিশু পাল রুগ্ন বিরক্তিভরা মুখে ঔষধ গলাধঃকরণ করিলেন। অতঃপর অপেক্ষাকৃত সহজ স্বরে তিনি বলিলেন, ‘ডাক্তার, এঁদের বসবার চেয়ার দাও।’ ডাক্তার দুটি চেয়ার খাটের পাশে টানিয়া আনিলেন, আমরা বসিলাম। বিশু পাল ব্যোমকেশের পানে চাহিয়া বলিতে আরম্ভ করিলেন, ‘বেশি কথা বলব না, ডাক্তার রাগ করবে। সাঁটে বলছি। আমার তেজারিতি কারবার আছে, নিশ্চয় শুনেছেন। প্ৰায় পাঁচিশ বছরের কারবার, বিশ লক্ষ টাকা খাটছে। অনেক বড় বড় খাতক আছে।
আমি কখনো জামিন জামানত না রেখে টাকা ধার দিই না। কিন্তু বছর দুই আগে আমার দুর্বুদ্ধি হয়েছিল, তার ফল এখন ভুগছি। বিনা জামিনে ত্ৰিশ হাজার টাকা ধার দিয়েছিলাম।
অভয় ঘোষালকে আপনি চেনেন না। আমি তার ব্যাপকে চিনতাম, মহাশয় ব্যক্তি ছিলেন অধর ঘোষাল। অনেক বিষয়-সম্পত্তি করেছিলেন। আমার সঙ্গে তাঁর কিছু কাজ-কারবারও হয়েছিল। তাই তাঁকে চিনতাম; সত্যিকার সজ্জন।
বিছর দশেক আগে অধর ঘোষাল মারা গেলেন, তাঁর একমাত্র ছেলে অভয় ঘোষাল বিপুল সম্পত্তির মালিক হয়ে বসল।
অভয়কে আমি তখনো দেখিনি। বাপ মারা যাবার পর তার সম্বন্ধে দু-একটা গল্পগুজব কানে আসত। ভাবতাম পৈতৃক সম্পত্তি হাতে পেলে সব ছেলেই গোড়ায় একটু উদ্ধৃঙ্খলতা করে, কালে শুধরে যাবে। এমন তো কতই দেখা যায়।
আজ থেকে বছর দুই আগের ব্যাপার। অভয় ঘোষালের কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছি, হঠাৎ একদিন সে এসে উপস্থিত। তাকে দেখে, তার কথা শুনে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। কার্তিকের মত চেহারা, মুখে মধু ঝরে পড়ছে। নিজের পরিচয় দিয়ে বলল, তার বাবা আমার বন্ধু ছিলেন, তাই সে বিপদে পড়ে আগে আমার কাছেই এসেছে। বড় বিপদ তার, শক্ররা তাকে মিথ্যে খুনের মামলায় ফাঁসিয়েছে। কোনো মতে জামিন পেয়ে সে আমার কাছে ছুটে এসেছে, মামলা চালাবার জন্যে তার ত্ৰিশ হাজার টাকা চাই।
বললে বিশ্বাস করবেন না, আমি বিশু পাল বিনা জামানতে শুধু হ্যান্ডনোট লিখিয়ে নিয়ে তাকে ত্ৰিশ হাজার টাকা দিলাম। ছোঁড়া আমাকে গুণ করেছিল, মন্ত্ৰমুগ্ধ করেছিল।
যথাসময়ে আদালতে খুনের মামলা আরম্ভ হল। খবরের কাগজে বয়ান বেরুতে লাগল; সে এক মহাভারত। এমন দুষ্কর্ম নেই যা অভয় ঘোষাল করেনি, পৈতৃক বিষয়-সম্পত্তি প্রায় সবই উড়িয়ে দিয়েছে। কত মেয়ের সর্বনাশ করেছে তার হিসেব নেই। একটি বিবাহিতা যুবতীকে ফুসলে নিয়ে এসেছিল, তারপর বছরখানেক পরে তাকে বিষ খাইয়ে খুন করেছে। তাইতে মোকদ্দমা। আমি একদিন এজলাসে দেখতে গিয়েছিলাম; কাঠগড়ায় অভয় ঘোষাল বসে আছে, যেন কোণ-ঠাসা বন-বেরাল! দেখলেই ভয় করে। ও বাবা, এ কাকে টাকা ধার দিয়েছি!
কিন্তু মোকদ্দমা টিকলো না, আইনের ফাঁকিতে অভয় ঘোষাল রেহাই পেয়ে গেল। একেবারে বেকসুর খালাস। তার বিরুদ্ধে খুনের অভিযোগ প্রমাণ হল না।
তারপর আরো বছরখানেক কেটে গেল। আমি অভয় ঘোষালের ওপর নজর রেখেছিলাম, খবর পেলাম সে তার বসত-বাড়ি বিক্রি করবার চেষ্টা করছে। এইটে তার শেষ স্থাবর সম্পত্তি, এটা যদি সে বিক্রি করে দেয়, তাহলে তাকে ধরবার আর কিছু থাকবে না, আমার টাকা মারা যাবে।
টাকার তাগাদা আরম্ভ করলাম। প্ৰথমে অফিস থেকে চিঠি দিলাম, কোন জবাব নেই! বার তিনেক চিঠি দিয়েও যখন সাড়া পেলাম না, তখন আমি নিজেই একদিন তার সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। আমরা মহাজনেরা দরকার হলে বেশ আঁতে ঘা দিয়ে কথা বলতে পারি, ভাবলাম মামলা রুজু করবার আগে তাকে কথা শুনিয়ে আসি, তাতে যদি কাজ হয়। সে আজ তিন মাস আগেকার কথা।
একটা গুর্খাকে সঙ্গে নিয়ে গেলাম তার বাড়িতে। সামনের ঘরে একটা চেয়ারে অভয় ঘোষাল একলা বসে ছিল। আমাকে দেখে সে চেয়ার থেকে উঠল না, কথা কইল না, কেবল আমার মুখের পানে চেয়ে রইল।
কাজের সময় কাজী কাজ ফুরোলে পাজি। গালাগালি দিতে এসেছিলাম, তার ওপর রাগ হয়ে গেল। আমি প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে তার চৌদ্দ পুরুষের শ্রাদ্ধ করলাম। তারপর হঠাৎ নজর পড়ল তার চোখের ওপর; ওরে বাবা, সে কী ভয়ঙ্কর চোখ। লোকটা কথা কইছে না, কিন্তু তার চোখ দেখে বোঝা যায় যে সে আমাকে খুন করবে। যে-লোক একবার খুন করে বেঁচে গেছে, তার তো আশকারা বেড়ে গেছে। ভয়ে আমার অন্তরাত্মা শুকিয়ে গেল।
আর সেখানে দাঁড়ালাম না, উর্ধ্বশ্বাসে বাড়ি ফিরে এলাম। বাড়ি ফিরে সর্বাঙ্গে কাঁপুনি ধরল, কিছুতেই কাঁপুনি থামে না। তখন ডাক্তারকে ডেকে পাঠালাম। ডাক্তার এসে কোনো মতে ওষুধ দিয়ে কাঁপুনি থামালো। তখনকার মত সামলে গেলাম বটে, কিন্তু শেষ রাত্রির দিকে আবার কাঁপুনি শুরু হল। তখন বড় ডাক্তার ডাকানো হল; তিনি এসে দেখলেন স্ট্রোক হয়েছে, দুটো পা অসাড় হয়ে গেছে।
তারপর থেকে বিছানায় পড়ে আছি। কিন্তু প্ৰাণে শান্তি নেই। ডাক্তারেরা ভরসা দিয়েছেন রোগে মরব না, তবু মৃত্যুভয় যাচ্ছে না। অভয় ঘোষাল আমাকে ছাড়বে না। আমি বাড়ি থেকে বেরুই না, দোরের সামনে গুর্খা বসিয়েছি, তবু ভরসা পাচ্ছি না। —এখন বলুন ব্যোমকেশবাবু, আমার কি উপায় হবে।
বিবরণ শেষ করিয়া বিশু পাল অর্ধমৃত অবস্থায় বিছানায় পড়িয়া রহিলেন। ডাক্তার একবার তাঁহার কব্জি টিপিয়া নাড়ি দেখিলেন, কিন্তু ঔষধ দিবার প্রয়োজন বোধ করিলেন না। ব্যোমকেশ গভীর ভ্রূকুটি করিয়া নতমুখে বসিয়া রহিল।
এই সময় বিশু পালের স্ত্রী ঘরে প্রবেশ করিলেন। মাথায় আধ-ঘোমটা, দুই হাতে দু-পেয়ালা চা। আমরা উঠিয়া দাঁড়াইলাম, তিনি আমাদের হাতে চায়ের পেয়ালা দিয়া স্বামীর প্রতি ব্যগ্র উৎকণ্ঠার দৃষ্টি হানিয়া প্রস্থান করিলেন। নীরব প্রকৃতির মহিলা, কথাবার্তা বলেন না।
আমরা আবার বসিলাম। দেখিলাম বিশু পাল সপ্রশ্ন নেত্ৰে ব্যোমকেশের মুখের পানে চাহিয়া আছেন।
ব্যোমকেশ চায়ের পেয়ালায় ক্ষুদ্র একটি চুমুক দিয়া বলিল, আপনি যথাসাধ্য সাবধান হয়েছেন, আর কি করবার আছে। খাবারের ব্যবস্থা কি রকম?
বিশু পাল বলিলেন, একটা বামুন ছিল তাকে বিদেয় করে দিয়েছি। গিন্নি রাঁধেন। বাজার থেকে কোনো খাবার আসে না।
চাকর-বাকর?
একটা ঝি আর একটা চাকর ছিল, তাদের তাড়িয়েছি। সিঁড়ির মুখে গুর্খা বসিয়েছি। আর কি করব বলুন।
ব্যবসার কাজকর্ম চলছে কি করে?
সেরেস্তাদার কাজ চালায়। নেহাৎ দরকার হলে ওপরে এসে আমাকে জিজ্ঞেস করে যায়। কিন্তু তাকেও ঘরে ঢুকতে দিই না, দোরের কাছে দাঁড়িয়ে কথা বলে যায়। বাইরের লোক ঘরে আসে কেবল ডাক্তার।
চায়ের পেয়ালা নিঃশেষ করিয়া ব্যোমকেশ উঠিয়া দাঁড়াইল, হাসিয়া বলিল, যা-যা করা দরকার সবই আপনি করেছেন, আর কী করা যেতে পারে ভেবে পাচ্ছি না। কিন্তু সত্যিই কি অভয় ঘোষাল আপনাকে খুন করতে চায়?
বিশু পাল উত্তেজিতভাবে উঠিয়া বসিবার চেষ্টা করিয়া আবার শুইয়া পড়িলেন, ব্যাকুল স্বরে বলিলেন, হ্যাঁ ব্যোমকেশবাবু, আমার অন্তরাত্মা বুঝেছে ও আমাকে খুন করতে চায়। নইলে এত ভয় পাব কেন বলুন! কলকাতা শহর তো মগের মুল্লুক নয়।
ব্যোমকেশ বলিল, তা বটে। কিন্তু এভাবে কতদিন চলবে?
বিশু পাল বলিলেন, সেই তো ভাবনা, এভাবে কতদিন চলবে। তাই তো আপনার শরণ নিয়েছি, ব্যোমকেশবাবু। আপনি একটা ব্যবস্থা করুন।
ব্যোমকেশ বলিল, ভেবে দেখব। যদি কিছু মনে আসে, আপনাকে জানাব। —আচ্ছা, চলি।
বিশু পাল বলিলেন, ডাক্তার।
ডাক্তার রক্ষিত অমনি পকেট হইতে একটি একশো টাকার নোট বাহির করিয়া ব্যোমকেশের সম্মুখে ধরিলেন। ব্যোমকেশ সবিস্ময়ে ভ্রূ তুলিয়া বলিল, এটা কি?
বিশু পাল বিছানা হইতে বলিলেন, আপনার মর্যাদা। আপনাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি, অনেক সময় নষ্ট করেছি।
কিন্তু এ রকম তো কোনো কথা ছিল না।
তা হোক। আপনাকে নিতে হবে।
অনিচ্ছাভরে ব্যোমকেশ টাকা লইল। তারপর ডাক্তার আমাদের নীচে লইয়া চলিলেন। সিঁড়ির মুখে গুর্খা স্যালুট করিল। সিঁড়ি দিয়া নামিতে নামিতে ব্যোমকেশ বলিল, এই লোকটা সারাক্ষণ পাহারা দেয়?
ডাক্তার বলিলেন, না, ওরা দুজন আছে। পুরোনো লোক, আগে দোতলায় পাহারা দিত। একজন বেলা দশটা থেকে রাত্রি আটটা পর্যন্ত থাকে, দ্বিতীয় ব্যক্তি রাত্রি দশটা থেকে বেলা আটটা পর্যন্ত পাহারা দেয়।
ব্যোমকেশ বলিল, সকালে দু-ঘণ্টা এবং রাত্রে দু-ঘণ্টা পাহারা থাকে না?
ডাক্তার বলিলেন, না, সে-সময় আমি থাকি।
দ্বিতলে নামিয়া দেখিলাম দপ্তর বন্ধ হইয়া গিয়াছে কেরানির দ্বারে তালা লাগাইয়া বাড়ি গিয়াছে।
নীচের তলায় নামিয়া ব্যোমকেশ বলিল, আপনাকে দু-একটা প্রশ্ন করতে চাই, ডাক্তারবাবু। বেশ তো, আসুন আমার ডিসপেন্সারিতে।
আমরা সামনের ঘরে প্রবেশ করিলাম। এটি রোগীদের ওয়েটিং রুম, নূতন টেবিল চেয়ার বেঞ্চি ইত্যাদিতে সাজানো গোছানো। কম্পাউন্ডার পাশের দিকের একটি বেঞ্চিতে এক হাঁটু তুলিয়া বসিয়া ঢুলিতেছিল, আমাদের দেখিয়া পাশের ঘরে উঠিয়া গেল। ব্যোমকেশ ঘরের চারিদিকে দৃষ্টি ফিরাইয়া বলিল, খাসা ডাক্তারখানা সাজিয়েছেন।
ডাক্তার শুষ্ক স্বরে বলিলেন, সাজিয়ে রাখতে হয়; জানেন তো, ভেক না হলে ভিখ, মেলে না।
কিতদিনের প্র্যাকটিস আপনার?
এখানে বছর তিনেক আছি, তার আগে মফঃস্বলে ছিলাম।
ভালই চলছে মনে হয়— কেমন?
মন্দ নয় চলছে— টুকটাক করে। দু-চারটে বাঁধা ঘর আছে। সম্প্রতি পসার কিছু বেড়েছে। বিশুবাবুকে যদি সারিয়ে তুলতে পারি—
ব্যোমকেশ ঘাড় নাড়িল, হ্যাঁ। — আচ্ছা ডাক্তারবাবু, বিশু পালের এই যে মৃত্যুভয়, এটা কি ওঁর মনের রোগ? না সত্যিই ভয়ের কারণ আছে?
ডাক্তার একটু চুপ করিয়া থাকিয়া বলিলেন, ভয়ের কারণ আছে। অবশ্য যাদের অনেক টাকা তাদের মৃত্যুভয় বেশি হয়। কিন্তু বিশু পালের ভয় অমূলক নয়। অভয় ঘোষাল লোকটা সত্যিকার খুনী। আমি শুনেছি ও গোটা তিনেক খুন করেছে। এমন কি ও নিজের বাপকে বিষ খাইয়েছিল কিনা সে বিষয়েও সন্দেহ আছে।
ব্যোমকেশ বলিল, তাই নাকি! ভারি গুণধর ছেলে তো। এখন মনে পড়ছে বছর দুই আগে ওর মামলার বয়ান খবরের কাগজে বেরিয়েছিল। ওর ঠিকানা আপনি জানেন নাকি?
ডাক্তার বলিলেন, জানি। এই তো কাছেই, বড়জোর মাইলখানেক। যদি দেখা করতে চান ঠিকানা দিচ্ছি।
এক টুকরা কাগজে ঠিকানা লিখিয়া ডাক্তার ব্যোমকেশকে দিলেন, সে সেটি মুড়িয়া পকেটে রাখিতে রাখিতে বলিল, আর একটা কথা। বিশুবাবুর স্ত্রীর কি কোনো রোগ আছে?
ডাক্তার বলিলেন, স্নায়ুর রোগ। স্নায়বিক প্রকৃতির মহিলা, তার ওপর ছেলেপুলে হয়নি—
বুঝেছি। — আচ্ছা, চললাম। বিশুবাবু একশো টাকা দিয়ে আমাকে দায়ে ফেলেছেন। তাঁর সমস্যাটা ভেবে দেখব।
বাহিরে তখন, রাস্তার আলো জ্বলিয়াছে। ব্যোমকেশ হাতের ঘড়ি দেখিয়া বলিল, সাড়ে ছটা। চল, খুনি আসামী দর্শন করে যাওয়া যাক। বিশু পাল যখন টাকা দিয়েছেন, তখন কিছু তো করা দরকার।
মোড়ের মাথায় একটা রিকশা পাওয়া গেল, তাহাতে চড়িয়া আমরা উত্তর দিকে চলিলাম। লক্ষ্য করিয়াছি, আমহার্স্ট ষ্ট্রীটে লোক চলাচল অপেক্ষাকৃত কম; আশেপাশে সামনে পিছনে যখন জোয়ারের সমুদ্রের মত জনস্রোত ছুটিয়াছে, তখনও আমহার্স্ট ষ্ট্রীটে লোক চলাচল অপেক্ষাকৃত কম; আমহার্স্ট ষ্ট্রীট সমুদ্রের সমান্তরাল সঙ্কীর্ণ খালের মত নিস্তরঙ্গ পড়িয়া আছে।
রাস্তায় উত্তর প্রাস্তে আসিয়া একটি নম্বরের সামনে রিকশা থামিল, আমরা নামিলাম। ব্যোমকেশ নম্বর মিলাইয়া বলিল, এই বাড়ি।
বাড়িটি ঠিক ফুটপাথের ধারে নয়, মাঝখানে একটু খোলা জমি আছে, তাহাতে কাঁঠালি চাঁপার ঝাড় বাড়িটিকে রাস্তা হইতে আড়াল করিয়া রাখিয়াছে। দ্বিতল বাড়ির উপরতলা অন্ধকার, নীচের একটা জানালা দিয়া পত্রান্তরাল ভেদ করিয়া ঝিকিমিকি আলো আসিতেছে।
আমরা ছেট ফটক দিয়া ভিতরে প্রবেশ করিলাম। সামনের ঘর টেবিল চেয়ার দিয়া সাজানো, যেন অফিস ঘর। একটি লোক চেয়ারে বসিয়া অলসভাবে পেন্সিল দিয়া কাগজের উপর হিজিবিজি কাটিতেছে। আমরা দ্বারের কাছে আসিলে সে চোখ তুলিয়া চাহিল।
সুপুরুষ বটে। বয়স আন্দাজ পঁয়ত্রিশ, টকটকে রঙ, কোঁকড়া চুলের মাঝখানে সিঁথি, নাক চোখ যেন তুলি দিয়া অাঁকা। আমিও বিশু পালের মত মুগ্ধ হইয়া গেলাম।
ব্যোমকেশ দ্বারের নিকট হইতে বলিল, আসতে পারি? আমার নাম ব্যোমকেশ বক্সী, ইনি অজিত বন্দ্যো।
অভয় ঘোষালের চোখের দৃষ্টি সতর্ক। তারপর সে অধর প্রান্তে একটি মুকুলিত হাসি ফুটাইয়া বলিল, সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ বক্সী! কী সৌভাগ্য। আসুন।
আমরা গিয়া অভয় ঘোষালের মুখোমুখি বসিলাম। সে পেন্সিল নামাইয়া রাখিয়া বলিল, কি ব্যাপার বলুন দেখি। সম্প্রতি কোনো কু-কাৰ্য করেছি বলে তো মনে পড়ছে না।
ব্যোমকেশ হাসিল, আপনাকে দেখতে এলাম।
অভয় ঘোষাল বলিল, ধন্যবাদ! আমি তাহলে একটি দর্শনীয় জীব। আপনি নিজের ইচ্ছেয় এসেছেন, না কেউ পাঠিয়েছে?
ব্যোমকেশ বলিল, পাঠায়নি কেউ। কিন্তু মহাজন বিশু পাল তাঁর দুঃখের কথা আমাকে শোনালেন, তাই ভাবলাম আপনাকে দর্শন করে যাই।
ও— শিশুপাল। অভয় ঘোষাল ক্ষণেক থামিয়া বলিল, আপনাকে কেউ পাঠিয়েছে। বুঝেছিলাম, কিন্তু শিশুপালের কথা মনে আসেনি।
ব্যোমকেশ বলিল, জানেন বোধ হয়, বিশু পালের পক্ষাঘাত হয়েছে।
অভয় বিস্ময় প্ৰকাশ করিয়া বলিল, তাই নাকি; আমি জানতাম না। মাস তিনেক আগে শিশুপাল আমার বাড়িতে এসেছিল, আমাকে চৌদ্দ-পুরুষান্ত করে গেল। ভগবান আছেন।
তাহার মুখে বা কণ্ঠস্বরে কোনো উষ্মা প্রকাশ পাইল না। পেন্সিলটা তুলিয়া লইয়া সে আবার কাগজে হিজিবিজি কাটিতে লাগিল।
ব্যোমকেশ বলিল, এখান থেকে ফিরে গিয়েই তাঁর স্ট্রোক হয়েছিল। সেই থেকে তিনি নিজের বাড়ির মধ্যে আবদ্ধ হয়ে আছেন। অবশ্য পক্ষাঘাতই তাঁর বাড়িতে আবদ্ধ থাকার একমাত্র কারণ নয়। আপনার ভয়ে তিনি বাড়ি থেকে বের হন না।
আমার ভয়ে— বলেন কি! আমি খাতক, সে মহাজন, আমারই তার ভয়ে লুকিয়ে থাকার কথা। অভয় ঘোষাল ভ্রূ তুলিয়া পরম বিস্ময়ভরে কথাগুলি বলিল, কিন্তু তাহার অধর-প্রান্তে হাসি লাগিয়া রহিল।
ব্যোমকেশ বলিল, তাঁর ভয় হয়েছে আপনি তাঁকে খুন করবেন।
এই দেখুন। যত দোষ নন্দ ঘোষ! আমি একটিবার খুনের মামলায় ফেঁসে গিয়েছিলাম, অমনি সবাই ভেবে নিলে আমি খুনী আসামী। আমি যে বেকসুর খালাস পেয়েছি সেটা কেউ ভাবল না। অভয় ঘোষাল একটু থামিয়া অপেক্ষাকৃত মন্থর কণ্ঠে বলিল, তবে একটা কথা সত্যি। আমার কোষ্ঠীর ফল— যারা আমার শক্ৰতা করে তারা বেশি দিন বাঁচে না। —উঠছেন নাকি?
ব্যোমকেশ উঠিয়া দাঁড়াইয়া বলিল, হ্যাঁ। আপনাকে দেখতে এসেছিলাম, দেখা হয়েছে। এবার যাওয়া যাক। —একটা কথা বলে যাই। বিশু পালের যদি অপঘাতে মৃত্যু হয় আমি খুব দুঃখিত হব। এবং আপনিও শেষ পর্যন্ত দুঃখিত হবেন।
অভয় ঘোষালের মুখে হঠাৎ পরিবর্তন হইল। মুখের হাসি মুছিয়া গিয়া চোখে একটা নৃশংস হিংস্ৰতা ফুটিয়া উঠিল। সে নির্নিমেষ সৰ্প-চক্ষু মেলিয়া ব্যোমকেশের পানে চাহিয়া রহিল।
আমার বুকের একটা স্পন্দন থামিয়া গিয়া আবার সবেগে চলিতে আরম্ভ করিল। এই দৃষ্টি বিশু পালকে ভয়ে দিশাহারা করিয়াছিল। চোখের দৃষ্টিতে মৃত্যুর শপথ এত স্পষ্টভাবে আর কাহারো চোখে দেখি নাই।
ব্যোমকেশ তাহার প্রতি একটি অবজ্ঞাপূর্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া বলিল, চল অজিত।
ফুটপাথে পৌঁছিয়া দেখিলাম, রাস্তায় পরপারে একটা ট্যাক্সি দাঁড়াইয়া আছে। ড্রাইভারকে ডাকিবার জন্য হাত তুলিয়াছি, ট্যাক্সিটা চলিতে আরম্ভ করিল, দ্রুত বেগ সংগ্ৰহ করিয়া অদৃশ্য হইয়া গেল।
আমি ব্যোমকেশের পানে চাহিলাম। সে বিলীয়মান ট্যাক্সির দিকে চাহিয়া থাকিয়া বলিল, ভেতরে কেউ ছিল?
বলিলাম, দেখিনি। ড্রাইভারটা কিন্তু আমাদের দিকেই তাকিয়ে ছিল, তাই ভেবেছিলাম খালি ট্যাক্সি। হয়তো পিছনের সিটে কেউ ছিল।
হুঁ। ব্যোমকেশ চলিতে আরম্ভ করিল, কেউ বোধ হয় আমাদের পিছু নিয়েছিল।
কে পিছু নিতে পারে?
ডাক্তার রক্ষিত ছাড়া আর তো কেউ জানে না যে আমরা এখানে এসেছি।
কিন্তু কেন? কী উদ্দেশ্য?
তা জানি না। অবশ্য সমাপতনও হতে পারে। ট্যাক্সিতে আমাদের অজানা আরোহী ছিল, কোনো কারণে ড্রাইভার গাড়ি দাঁড় করিয়েছিল, তারপর চলে গেল।
রাত্রি সাড়ে সাতটা। আমরা পদব্ৰজে বাসার দিকে চলিলাম। মনে কিন্তু একটা ধোঁকা লাগিয়া রহিল।
পরদিন সকালে খবরের কাগজ খুলিয়াই বলিয়া উঠিলাম, ওহে—!
ব্যোমকেশ চকিতে আমার দিকে ঘাড় ফিরাইল, কী! বিশু পাল খুন হয়েছে?
বলিলাম, বিশু পাল নয়-অভয় ঘোষাল।
ব্যোমকেশ কিছুক্ষণ বোকার মত আমার মুখের পানে চাহিয়া রহিল, তারপর কাগজখানা আমার হাত হইতে কাড়িয়া লইয়া পড়িতে আরম্ভ করিল।
সংবাদপত্রের বিবরণ অতি সংক্ষিপ্ত। গত রাত্রে আমহার্স্ট স্ট্রীট নিবাসী অভয় ঘোষাল নামক এক ধনী ব্যক্তি ঘুমন্ত অবস্থায় শয্যায় খুন হইয়াছেন। পুলিস ঘটনাস্থলে উপস্থিত হইয়াছে; কে খুন করিয়াছে তাহা এখনাে জানা যায় নাই। দুই বৎসর পূর্বে অভয় ঘোষাল খুনের অভিযোগে আসামী হইয়া বেকসুর খালাস হইয়াছিলেন। —
মনটা অন্য প্রকার সম্ভাবনার জন্য প্রস্তুত ছিল, তাই অনেকক্ষণ বিমুঢ় রহিলাম। কাল রাত্রি সাড়ে সাতটা পর্যন্ত আমরা তাহাকে দেখিয়াছি, সে হাসিমুখে পরম স্বচ্ছন্দভাবে ব্যোমকেশের সহিত প্রচ্ছন্ন বাকযুদ্ধ করিয়াছে। তারপর কী হইল? সে ব্যঙ্গভরে বলিয়াছিল, তাহার অনেক ‘বন্ধু’ আছে। ট্যাক্সিতে তবে কি তাহার ‘বন্ধু’ ওৎ পাতিয়া বসিয়া ছিল, আমরা চলিয়া যাইবার পর ফিরিয়া আসিয়া তাহাকে খুন করিয়াছে? কিম্বা ট্যাক্সির লোকটি ডাক্তার রক্ষিত? কিন্তু ডাক্তার রক্ষিত তাহাকে খুন করিতে যাইবে কেন?
বেশি জল্পনা-কল্পনা করিবার আগেই দারোগা রমাপতিবাবু উপস্থিত হইলেন। রমাপতিবাবুর সহিত কর্ম সম্পর্কে আমাদের ঘনিষ্ঠতা না থাকিলেও অল্প পরিচয় ছিল। কাজের লোক বলিয়া পুলিস বিভাগে তাঁহার সুনাম আছে। আমাদেরই সমবয়স্ক ব্যক্তি; মজবুত চেহারা, অমায়িক বাচনভঙ্গী, চোখের দৃষ্টি মৰ্মভেদী।
ব্যোমকেশ সমাদর করিয়া তাঁহাকে বসাইল, বলিল, কাগজে দেখলাম। আপনার এলাকায় অভয় ঘোষাল খুন হয়েছে।
রমাপতিবাবু চক্ষু কুঞ্চিত করিয়া বলিলেন, আপনি অভয় ঘোষালকে চিনতেন?
ব্যোমকেশ বলিল, চিনতাম না, কাল সন্ধ্যেবেলা পরিচয় হয়েছিল। আমরা তার বাড়িতে গিয়েছিলাম তার সঙ্গে দেখা করতে?
তাই নাকি! দেখা করতে গিয়েছিলেন কেন?
ব্যোমকেশ সহস্যে মাথা নাড়িয়া বলিল, আগে আপনি খবর বলুন, তারপর আমি বলব।
রমাপতিবাবু ক্ষণেক ইতস্তত করিয়া বলিলেন, আচ্ছা, আমিই আগে বলছি। অভয় ঘোষালের ওপর অনেক দিন থেকে পুলিসের নজর ছিল। লোকটা ভদ্রতার মুখোশ পরে বেড়াতো, কিন্তু এত বড় শয়তান খুব কম দেখা যায়। কত ভদ্রঘরের মেয়ের সর্বনাশ করেছে তার ঠিক-ঠিকানা নেই। নিজের একটা স্ত্রী ছিল, হঠাৎ তার অপঘাত মৃত্যু হয়। তারপর এক ভদ্রলোকের স্ত্রীকে নিয়ে উধাও হয়েছিল; ভদ্রলোক স্ত্রীকে ডিভোর্স করেন। তখন স্ত্রীলোকটি বোধ হয় অভয়কে বিয়ে করার জন্যে বায়না ধরেছিল, অভয় তাকে বিষ খাইয়ে মারে।
অভয় ঘোষালকে পুলিস অ্যারেস্ট করল, মামলা কোর্টে উঠল। কিন্তু মামলা টিকল না, অভয়ের অপরাধ পাকাপাকি প্রমাণ হল না। ৩০২ ধারার মামলা, হয় এসপার নয় ওসপার, অভয় ঘোষাল ছাড়া পেয়ে গেল।
এই হল অভয় ঘোষালের ইতিহাস। কলকাতা শহরেই অন্তত দশজন লোক আছে যারা তাকে খুন করতে পারলে খুশি হয়।
কাল রাত্রে আন্দাজ বারোটার সময় অভয়ের বাড়ির চাকরানী থানায় এসে খবর দেয় যে অভয় খুন হয়েছে। আমি তখন থানায় ছিলাম না, খবর পেয়ে তদন্ত করতে গেলাম। অভয় ঘোষালের আর্থিক অবস্থা এখন পড়ে গেছে; বাড়িতে একলা থাকে, কেবল একটা কম-বয়সী চাকরানী দেখাশোনা করে। এই চাকরানীটাই থানায় খবর দিতে এসেছিল।
গিয়ে দেখলাম অভয় দোতলার ঘরে বিছানায় পাশ ফিরে শুয়ে আছে, তার পিঠের বাঁ দিকে গুনাছুঁচের মত একটা শলা বিঁধে আছে। চাকরানীকে সওয়াল করে জানা গেল যে অভয় রাত্রি নটার সময় খাওয়া-দাওয়া করে শুতে গিয়েছিল; চাকরানী বাড়ির কাজকর্ম সেরে, নিজে খেয়ে, দোর জানলা বন্ধ করে অভয়ের ঘরে গিয়ে দেখল ইতিমধ্যে কেউ এসে অভয়কে খুন করে রেখে গেছে।
আমরা চাকরানীটাকে আটক করে রেখেছি, কিন্তু সে বোধ হয় খুন করেনি। কে খুন করেছে তাও জানা যাচ্ছে না। অভয়ের সঙ্গে যাদের শক্ৰতা ছিল- মামলায় যারা অভয়ের বিরুদ্ধে সাক্ষী দিয়েছিল— তাদের সকলের অ্যালিবাই যাচাই করে দেখেছি, তারা কেউ নয় বলেই মনে হয়।
এই হচ্ছে বর্তমান পরিস্থিতি! এখন আপনি কি জানেন বলুন?
ব্যোমকেশ বলিল, আমি যে কিছু জানি তা আপনি জানলেন কি করে?
রামপতিবাবু পকেট হইতে একখণ্ড কাগজ বাহির করিয়া ব্যোমকেশের দিকে বাড়াইয়া দিলেন, এই কাগজের টুকরোটা নীচের তলায় অভয়ের বসবার ঘরে টেবিলের ওপর রাখা ছিল।
গলা বাড়াইয়া দেখিলাম, কাগজের উপর পেন্সিল দিয়া হিজিবিজি কাটা, তারপর লেখা আছে- ব্যোমকেশ বক্সী—শিশুপাল—। মনে পড়িয়া গেল কাল রাত্ৰে অভয় ঘোষাল আমাদের সামনে বসিয়া হিজিবিজি কাটিতেছিল।
রমাপতিবাবু বলিলেন, আপনার নাম দেখে মনে হল আপনি হয়তো কিছু জানেন। তাই এলাম।
ব্যোমকেশ বলিল, ঠিক। এবার আমি যা জানি শুনুন।
ব্যোমকেশ কাল সকালে ডাক্তার রক্ষিতের আগমন হইতে সমস্ত ঘটনা আনুপূর্বক বর্ণনা করিল। রমাপতিবাবু গাঢ় মনোযোগ দিয়া শুনিলেন; ব্যোমকেশ কাহিনী শেষ করিলে তিনি দ্বিধাগ্রস্ত মুখে বলিলেন, সন্দেহজনক বটে। কিন্তু বিশু পালের কোনো মোটিভ পাচ্ছি না। তার ওপর লোকটা পঙ্গু। —আপনার কি মনে হয়?”
ব্যোমকেশ বলিল, আমি এখনো ঠিক বুঝতে পারছি না। ক’টার সময় মৃত্যু হয়েছে জানেন কি?
পুলিস সার্জন বলছেন, রাত্ৰি ন’টার পর এবং বারোটার আগে।
হুঁ—ব্যোমকেশ একটু চিন্তা করিয়া বলিল, আমার মনে হয়, বিশু পাল সত্যি পঙ্গু, কিনা ভাল করে যাচাই করে দেখা উচিত।
রমাপতিবাবু বলিলেন, তা বটে। আর কাউকে যখন পাওয়া যাচ্ছে না। তখন বিশু পালকেই নেড়েচেড়ে দেখা যাক। আপনার ফোন আছে, আমাকে একবার ব্যবহার করতে দেবেন?
‘নিশ্চয়। আসুন।’ ব্যোমকেশ তাঁহাকে পাশের ঘরে লইয়া গেল।
কিছুক্ষণ পরে রমাপতিবাবু ফিরিয়া আসিয়া বলিলেন, পুলশ সার্জনকে বিশু পালের বাড়িতে যেতে বললাম। আমিও যাচ্ছি। আপনারা আসবেন?
বেশ তো, চলুন না।
আমরা পাঁচ মিনিটের মধ্যে প্ৰস্তুত হইয়া রমাপতিবাবুর সঙ্গে বাহির হইলাম। বিশু পালের বাড়ির সামনে ঈষৎ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হইয়াছে। পুলিস সার্জন বাড়ির দ্বারের কাছে পুলিসের ছাপ-মারা গাড়িতে বসিয়া আছেন, রাস্তায় ভিড় জমিয়াছে। ডাক্তার রক্ষিত দ্বারের কাছে উৎকণ্ঠিতভাবে দাঁড়াইয়া আছেন। আমরা উপস্থিত হইলে সার্জন সুশীলবাবু গাড়ি হইতে নামিলেন। ডাক্তার রক্ষিত আমাদের দিকে আগাইয়া আসিয়া বলিলেন, ব্যোমকেশবাবু! কী হয়েছে?
পুলিসের ডাক্তার বিশু পালকে পরীক্ষা করে দেখতে চান। আপনার আপত্তি আছে?
ডাক্তার রক্ষিত ক্ষণেক অবাক হইয়া রহিলেন, তারপর বলিলেন, আপত্তি! বিন্দুমাত্র না। কিন্তু কেন? কি হয়েছে?
রমাপতিবাবু বলিলেন, অভয় ঘোষাল নামে এক ব্যক্তিকে কাল রাত্রে কেউ খুন করেছে।
ডাক্তার রক্ষিত প্ৰতিধ্বনি করিলেন, অভয় ঘোষালকে খুন করেছে! ও— বুঝেছি, আপনাদের সন্দেহ বিশুবাবু অভয় ঘোষালকে খুন করেছেন। তাঁর মুখে একটু শুষ্ক হাসি দেখা দিল— ‘অর্থাৎ বিশুবাবুর পক্ষাঘাত সত্যিকার পক্ষাঘাত নয়, ভান মাত্র। বেশ তো আসুন, পরীক্ষা করে দেখুন!’
আমরা সিঁড়ি দিয়া উপরে চলিলাম। দ্বিতলে সেরেস্তা বসিয়াছে। ত্রিতলে সিঁড়ির মুখে গুর্খা সমাসীন। তাহাকে আশ্বস্ত করিয়া ডাক্তার রক্ষিত বন্ধ দরজায় টোকা দিলেন। দরজা অল্প খুলিয়া বিশু পালের স্ত্রী ভয়ার্তা চোখে চাহিলেন। সমস্ত প্রক্রিয়াই কাল সন্ধ্যার মত।
বিশু পালের স্ত্রী পাশের ঘরে চলিয়া গেলেই, আমরা পাঁচজন ঘরে প্রবেশ করিলাম। ডাক্তার রক্ষিত আলো জ্বালিয়া দিলেন।
বিছানায় বিশু পাল বালাপোশ জড়াইয়া শুইয়া আছেন, কলহশীর্ণ কন্ঠে বলিয়া উঠলেন, কী চাই। ডাক্তার, এত লোক কেন?
ডাক্তার রক্ষিত তাঁহার শয্যাপার্শ্বে নত হইয়া বলিলেন, পুলিসের পক্ষ থেকে ডাক্তার এসেছেন, আপনাকে পরীক্ষা করতে চান।
বিশু পালের কন্ঠস্বর আরও তীক্ষ্ন হইয়া উঠিল, কেন? পুলিশের ডাক্তার আমাকে পরীক্ষা করতে চায় কেন?
ডাক্তার রক্ষিত ধীর স্বরে কহিলেন, অভয় ঘোষাল খুন হয়েছে, তাই—
বিশু পালের উর্ধ্বাঙ্গ ধড়ফড় করিয়া উঠিল, কে খুন হয়েছে! কী বললে তুমি ডাক্তার?
ডাক্তার আবার বলিলেন, অভয় ঘোষাল খুন হয়েছে।
বিশু পালের মুখে পরিত্রাণের আলো ক্ষণেক ফুটিয়া উঠিয়াই মুখ আবার অন্ধকার হইয়া গেল; তিনি স্থলিত স্বরে বলিলেন, অভয় ঘোষাল খুন হয়েছে! কিন্তু— আমি যে তাকে ত্ৰিশ হাজার টাকা ধার দিয়েছি, সুদে-আসলে তেত্রিশ হাজার দাঁড়িয়েছে। আমার টাকার কি হবে?
ডাক্তার নীরস কণ্ঠে বলিলেন, টাকার কথা পরে ভাববেন। এখন এরা এসেছেন যাচাই করতে সত্যি সত্যি আপনার পক্ষাঘাত হয়েছে কিনা।
তার মানে? বিশু পাল তীব্র চক্ষু ফিরাইয়া আমাদের পানে চাহিলেন।
রমাপতিবাবু খাটের ধারে আগাইয়া গেলেন, শান্তভাবে বলিলেন, দেখুন, আমাদের কোনো মতলব নেই। আমাদের ডাক্তার কেবল আপনাকে পরীক্ষা করে দেখতে চান। আপনার আপত্তি আছে কি?
আপত্তি! কিসের আপত্তি! পুলিসের ডাক্তার আমার রোগ সারিয়ে দিতে পারবে?
সুশীলবাবু বলিলেন, তা-চেষ্টা করে দেখতে পারি।
আরো কিছুক্ষণ সওয়াল জবাবের পর বিশু পাল রাজী হইলেন। সুশীলবাবু তাঁহার অঙ্গ হইতে বালাপোশ সরাইয়া পরীক্ষা আরম্ভ করিলেন। বিশু পালের পা দুটি পক্ষাঘাতে অবশ, উর্ধ্বাঙ্গ সচল আছে। সুশীলবাবু পায়ে ছুঁচ ফুটাইয়া দেখিলেন, কোনো সাড়া পাইলেন না। তারপর আরো অনেকভাবে পরীক্ষা করিলেন; নাড়ি দেখিলেন, রক্ত-চাপ পরীক্ষা করিলেন, ডাক্তার রক্ষিতকে নানাপ্রকার প্রশ্ন করিলেন। শেষে দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া বিশু পালের গায়ে বালাপোশ মুড়িয়া দিলেন।
তাঁহার পরীক্ষাকালে এক সময় আমার দৃষ্টি অন্দরের দিকে সঞ্চালিত হইয়াছিল। দেখিলাম বিশুবাবুর স্ত্রী দরজা একটু ফাঁক করিয়া নিস্পলক চোখে স্বামীর দিকে চাহিয়া আছেন। তাঁহার উদ্বেগ যেন স্বাভাবিক উদ্বেগ নয়, একটা বিকৃত ভয়ার্ত উত্তেজনা—
সুশীলবাবু বলিলেন, দেখা হয়েছে। চলুন, যাওয়া যাক।
আমরা দ্বারের দিকে ফিরিলাম। পিছন হইতে বিশু পালের গলা আসিল, কেমন দেখলেন? সারবে রোগ?
সুশীলবাবু একটু অপ্রস্তুতভাবে বলিলেন, সারতে পারে। আপনার ডাক্তারবাবু ভালই চিকিৎসা করছেন। — আচ্ছা, নমস্কার।
পুলিসের গাড়িতে বাসায় ফিরিবার পথে ব্যোমকেশ জিজ্ঞাসা করিল, তাহলে রোগটা যথার্থ অভিনয় নয়।
সুশীলবাবু বলিলেন, না, অভিনয় নয়।
সেদিন সারা দুপুর ব্যোমকেশ উদ্ভ্রান্ত চক্ষে কড়িকাঠের দিকে চাহিয়া তক্তপোশে পড়িয়া রহিল এবং অসংখ্য সিগারেট ধ্বংস করিল। অপরাহ্ণে যখন চা আসিল, তখনো সে উঠিল না দেকিয়া আমি বলিলাম, পুলিশ তো তোমাকে অভয় ঘোষালের খুনের তদন্ত করতে ডাকেনি, তবে তোমার এত ভাবনা কিসের?
সে বলিল, ভাবনা নয়, অজিত, বিবেকের দংশন।
তারপর সে হঠাৎ উঠিয়া পাশের ঘরে চলিয়া গেল। শুনিলাম কাহাকে ফোন করিতেছে। মিনিট কয়েক পরে যখন ফিরিয়া আসিল, দেখিলাম তাহার মুখ একটু প্ৰফুল্ল হইয়াছে।
কাকে ফোন করলে?
ডাক্তার অসীম সেনকে।
ডাক্তার অসীম সেনের সঙ্গে ‘খুজি খুঁজি নারি’ ব্যাপারে আমাদের পরিচয় হইয়াছিল।
ব্যোমকেশ এক চুমুকে কবোঞ্চ চা গলাধঃধরণ করিয়া বলিল, চল, বেরুনো যাক।
কোথায়?
বিশু পালের বাড়ি।
বিশু পালের বাড়িতে কেরানির দিনের কাজ শেষ করিয়া সিঁড়ি দিয়া নামিতেছে। ডাক্তার রক্ষিত রোগী দেখার ঘরে টেবিলের উপর পা তুলিয়া দিয়া সিগারেট টানিতেছিলেন, আমাদের দেখিয়া ত্বরিতে পা নামাইলেন।
ব্যোমকেশ বলিল, আপনার রোগী কেউ নেই দেখছি। একবার ওপরে চলুন, আপনার সামনে বিশুবাবুকে দুটো কথা বলব।
ডাক্তার প্রসন্ন নেত্ৰে ব্যোমকেশের পানে চাহিলেন, তারপর বাঙনিস্পত্তি না করিয়া আমাদের উপরে লইয়া চলিলেন।
গুর্খা অন্তৰ্হিত হইয়াছে, বিশুবাবুর ঘরের দ্বার খোলা। আমরা প্রবেশ করিলাম। আজ আর আলো জ্বলিবার প্রয়োজন হইল না, খোলা জানালা দিয়া পর্যাপ্ত আলো আসিতেছে। বিশু পালের অপঘাত-মৃত্যুভয় কাটিয়াছে।
তিনি পিঠের নীচে কয়েকটা বালিশ দিয়া শয্যায় অর্ধশয়ান ছিলেন, আমাদের পদশব্দে চকিতে ঘাড় ফিরাইলেন।
ব্যোমকেশ শয্যার পাশে গিয়া কিছুক্ষণ বিশু পালের পানে চাহিয়া রহিল, তারপর ধরে ধীরে বলিল, খুব খেলা দেখালেন আপনি।
বিশু পালের চক্ষু দুটি প্যাঁচার চোখের মত ব্যোমকেশের পানে চাহিয়া রহিল। ব্যোমকেশ দাঁতে দাঁত চাপিয়া বলিল, ডাক্তারকে দলে টেনেছিলেন, তার কারণ ডাক্তার না হলে আপনার কার্যসিদ্ধি হত না। কিন্তু আমাকে দলে টানলেন কেন? আমি আপনার পক্ষে সাক্ষী দেব এই জন্যে?
ডাক্তার এতক্ষণ আমাদের পিছনে ছিলেন, এখন লাফাইয়া সামনে আসিলেন, উগ্র কণ্ঠে বলিলেন, এসব কী বলছেন আপনি! আমার নামে কী বদনাম দিচ্ছেন।
খোঁচা খাওয়া বাঘের মত ব্যোমকেশ তাঁহার দিকে ফিরিল, ডাক্তার, প্রোকেন নামে কোনো ওষুধের নাম শুনেছ?
ডাক্তার ফুটা বেলুনের মত চুপসিয়া গেলেন। ব্যোমকেশ আরো কিছুক্ষণ তাঁহার পানে আরক্ত নেত্ৰে চাহিয়া থাকিয়া বিশু পালের দিকে ফিরিল, পকেট হইতে একশো টাকার নোট বাহির করিয়া বিছানার উপর ফেলিয়া দিয়া বলিল, এই নিন আপনার টাকা। আমি আপনাদের দু’জনকে ফাঁসিকাঠে তুলতে পারি, এই কথাটা ভুলে যাবেন না। আপনাকে দু-দিন হাজতে রাখলেই পক্ষাঘাতের প্রকৃত স্বরূপ বেরিয়ে পড়বে।
বিশু পাল প্রায় কাঁদিয়া উঠিলেন, ব্যোমকেশবাবু, দয়া করুন। আমি যা করেছি প্ৰাণের দায়ে করেছি, নিজের প্রাণ বাঁচাবার জন্যে করেছি।
ব্যোমকেশ বলিল, এক শর্তে দয়া করতে পারি। আপনাকে এক লক্ষ টাকা প্রতিরক্ষা তহবিলে দান করতে হবে। রাজী আছেন?
বিশু পাল শীর্ণ কণ্ঠে বলিলেন, এক লক্ষ টাকা।
হ্যাঁ, এক লক্ষ টাকা, এক পয়সা কম নয়। কাল সকালে আপনি রিজার্ভ ব্যাঙ্কে এক লক্ষ টাকা জমা দিয়ে আমার কাছে পাঠিয়ে দেবেন। যদি টাকা না দেন—
আচ্ছা, আচ্ছা, দেবো এক লক্ষ টাকা।
অপেক্ষা করব। —চল অজিত।
বাড়িতে ফিরিয়া আর এক দফা চা পান করিতে করিতে ভাবিতেছিলাম, প্রতিরক্ষা তহবিলে এক লক্ষ টাকা চাঁদা খুবই আনন্দের কথা, কিন্তু ব্যোমকেশ দুটা খুনীকে হাতে পাইয়া ছাড়িয়া দিল কেন? ব্যোমকেশ বোধ হয় আমার মুখ দেখিয়া মনের কথা বুঝিতে পারিয়াছিল; বলিল, বিশু পালকে ছেড়ে না দিয়ে উপায় ছিল না। মোকদ্দমা কোর্টে উঠলেও সে ছাড়া পেয়ে যেতো। হত্যার মোটিভ কেউ বিশ্বাস করত না।
বলিলাম, কিন্তু মোটিভটা তো খাঁটি?
বিশু পালের দিক থেকে খাঁটি, সে সত্যিই নিজের প্রাণ বাঁচাবার জন্যে অভয় ঘোষালকে খুন করেছিল। কিন্তু জুরী বিশ্বাস করত না, হেসে উড়িয়ে দিত।
আচ্ছা, একটা কথা বলো। আত্মরক্ষার জন্যে নরহত্যা করলে দোষ নেই আইনে একথা বলে, কেমন? তাহলে বিশু পাল অভয় ঘোষালকে খুন করে কী দোষ করেছে?
আত্মরক্ষার জন্যে নরহত্যার অধিকার মানুষের আছে, কিন্তু তিন মাস ধরে ষড়যন্ত্র করে নরহত্যা করলে আইন তা স্বীকার করবে না। বিশু পাল তা জানত বলেই এত সাবধানে আট-ঘাট বেঁধে কাজে নেমেছিল।
ব্যাপার বুঝলাম। তবু তুমি সব কথা পরিষ্কার করে বলে।
ব্যোমকেশ তখন বলিতে আরম্ভ করিল—
অভয় ঘোষালকে কাল আমরা দেখেছিলাম। মুখে হাসি লেগে আছে, কিন্তু চোখে জল্লাদের নিষ্ঠুরতা। লোকটা সত্যিকার খুনী। ওর সম্বন্ধে আমরা যা শুনেছি তা একবর্ণ মিথ্যে নয়।
বিশু পাল মিষ্টি কথায় ভুলে অভয় ঘোষালকে ত্ৰিশ হাজার টাকা ধার দিয়েছিল। তারপর যখন ধার শোধ করার পালা এল, তখন আর অভয় ঘোষালের দেখা নেই। কে কার টাকা ধারে! ‘বিশু পাল তখনো অভয় ঘোষালকে পুরোপুরি চিনত না, সে একদিন তার বাড়িতে গিয়ে তার চৌদ্দ-পুরুষান্ত করল। অভয় ঘোষাল একটি কথা বলল না, কেবল তার পানে চেয়ে রইল। সেই চাউনি দেখে বিশু পাল ভয় পেয়ে গেল। সে বুঝতে পারল অভয় ঘোষাল কী ধাতুর লোক; সে আগেও খুন করেছে, এবার তাকে খুন করবে!’
বিশু পালও কম নয়। সে যখন পাকাপাকি বুঝলো যে অভয় ঘোষাল তাকে খুন না করে ছাড়বে না, তখন সে ঠিক করল অভয় ঘোষালকে সে আগে খুন করবে। তার টাকা মারা যাবার ভয় নেই, কারণ অভয় ঘোষালের একটা বাড়ি আছে, সেটা ক্রোক করে টাকা আদায় করা যাবে।
খুন করার ব্যাপারে বিশু পালের একটা সুবিধা ছিল। সে জানত যে অভয় ঘোষাল তাকে খুন করতে চায়, কিন্তু বিশু পাল যে অভয় ঘোষালকে খুন করতে চায়, একথা অভয় ঘোষাল জানত না। তাই সে সাবধান হয়নি।
বিশু পালের বাড়ি থেকে বেরুনো বন্ধ হল। সিঁড়ির মুখে গুর্খা মোতায়েন হল। তারপর বিশু পাল প্ল্যান ঠিক করতে বসলো।
নীচের তলার ভাড়াটে ডাক্তার সুরেশ রক্ষিত। বেশ বোঝা যায় তার প্র্যাকটিস নেই। সে বাড়িভাড়া দিতে পারে না, তাই বিশু পালের খাতক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশু পাল তাকে ডেকে নিজের প্ল্যান বলল। ডাক্তারের গলায় ফাঁস, সে রাজী হল।
বিশু পাল নতুন আসবাব কিনে ডাক্তারের ডিসপেন্সারি সাজিয়ে দিল, যাতে মনে হয় ডাক্তার হেঁজিপেঁজি ডাক্তার নয়, তার বেশ পসার আছে। তারপর বিশু পালের পক্ষাঘাত হল।
আজকাল ডাক্তারি শাস্ত্রের অনেক উন্নতি হয়েছে। আগে অপারেশনের জন্যে রুগীকে অজ্ঞান করতে হলে ক্লোরোফর্ম দিতে হতো, এখন আর তা দরকার হয় না। প্রোকেন জাতীয় এক রকম ওষুধ বেরিয়েছে, মেরুদণ্ডের স্থান-বিশেষে ইনজেকশন দিলে শরীরের স্থান-বিশেষ অসাড় হয়ে যায়; তখন শরীরের সেই অংশে স্বচ্ছন্দে অপারেশন করা যায়, রোগী ব্যথা অনুভব করে না।
ডাক্তার রক্ষিত তাই করল, বিশু পালের পা দুটো অসাড় হয়ে গেল। তখন একজন নামকরা বড় ডাক্তারকে ডাকা হল; তিনি দেখলেন পক্ষাঘাত, সেই রকম ব্যবস্থা করে গেলেন।
প্রোকেন জাতীয় ওষুধের ফল পাঁচ-ছয় ঘণ্টা থাকে। তারপর আর থাকে না। কিন্তু সে খবর বাইরের লোক জানে না, কেবল বিশু পালের স্ত্রী আর ডাক্তার জানে। কেরানিরা দোতলায় আসে, তারা জানতে পারে মালিকের পক্ষাঘাত হয়েছে। সেরেস্তাদার ঘরে ঢুকতে পায় না, দোরের কাছ থেকে দেখে যায় মালিক বিছানায় পড়ে আছে। কারুর অবিশ্বাস হয় না, অবিশ্বাসের কোন কারণ নেই।
কিন্তু বিশু পাল ঝানু লোক, সে কাঁচা কাজ করবে না। নিরপেক্ষ নির্লিপ্ত সাক্ষী চাই; এমন সাক্ষী চাই যাদের কথা কেউ অবিশ্বাস করবে না। কাল সকলে সে ডাক্তারকে দিয়ে আমাকে ডেকে পাঠালো। আমি যেতে রাজী হলাম। ডাক্তার ফিরে গিয়ে বেলা একটা আন্দাজ বিশু পালের শিরদাঁড়ায় প্রোকেন ইনজেকশন দিল।
আমরা পাঁচটার সময় গিয়ে দেখলাম বিশু পাল শয্যাশায়ী, উত্থানশক্তি রহিত। সে তার দুঃখের কথা আমাকে শোনালো, তারপর একশো টাকা দক্ষিণা দিয়ে বিদায় করল। তার মতলব ঠিক করা ছিল, কাল রাত্রেই অভয়কে খুন করবে।
আমি অভয়ের ঠিকানা নিয়েছি সে খবর ডাক্তার বিশু পালকে জানালো। বিশু পালের ভাবনা হল, আমরা যদি বেশি রাত পর্যন্ত অভয় ঘোষালের বাড়িতে থাকি, তাহলে তার প্লান ভেস্তে যাবে। সে ডাক্তারকে পাঠালো আমাদের ওপর নজর রাখতে; ডাক্তার ট্যাক্সিতে অভয় ঘোষালের বাড়ির সামনে এসে অপেক্ষা করতে লাগল, তারপর আমরা যখন অভয়ের বাড়ি থেকে বেরুলাম তখন সে নিশ্চিন্ত হয়ে চলে গেল। লাইন ক্লিয়ার!
সন্ধ্যে সাতটা নাগাদ বিশু পালের শরীরের জড়ত্ব কেটে গেল, সে চাঙ্গা হয়ে উঠল।
রাত্রি আটটার সময় একটা গুর্খা চলে যায়, দ্বিতীয় গুর্খা আসে দশটার সময়। বিশু পাল আন্দাজ ন’টার সময় বাড়ি থেকে বেরুলো, বোধ হয়। র্যাপার মুড়ি দিয়ে বেরিয়েছিল, হাতে ছিল গুনাছুঁচের মত একটা অস্ত্ৰ। গত তিন মাসে সে অভয় ঘোষালের চাল-চলন সম্বন্ধে খোঁজ-খবর নিয়ে রেখেছিল। বাড়িতে একটা ঝি ছাড়া আর কেউ থাকে না; অভয় ঘোষাল নটর সময় খাওয়া-দাওয়া সেরে শুতে যায়; সদর দরজা ভেজানো থাকে, চাকরানী বোধ হয় দশটার পর রান্নাঘরের কাজকর্ম সেরে সদর দরজা বন্ধ করে।
সুতরাং বিশু পালের কোনই অসুবিধা হল না। অভয় ঘোষালকে খুন করে সে দশটার আগেই নিজের বাড়িতে ফিরে এল; কেউ জানতে পারল না। যদি কেউ তাকে দেখে ফেলত। তাহলেও বিশু পালের অ্যালিবাই ভাঙা শক্ত হতো। যে লোক তিন মাস পক্ষাঘাতে শয্যাশায়ী সে খুন করতে যাবে কি করে? খুন করার মোটিভ কোথায়?
আজ ভোরবেল বিশু পাল আর একটা ইনজেকশন নিল। সাবধানের মার নেই। তারপর পুলিস-ডাক্তারকে নিয়ে আমরা গেলাম। পুলিস-ডাক্তার পরীক্ষা করে দেখলেন পক্ষাঘাতই বটে।
আমার মনটা গোড়া থেকেই খুঁৎখুঁৎ করছিল। একটা সুদখোর মহাজন কেবল আমাকে তার দুঃখের কাহিনী শোনাবার জন্য একশো টাকা খরচ করবে? ওইখানেই বিশু পাল একটু ভুল করে ফেলেছিল। তারপর আজ সকালে যখন কাগজে অভয় ঘোষালের মৃত্যু-সংবাদ পড়লাম, তখন আর সন্দেহ রইল না যে বিশু পালই অভয় ঘোষালের মৃত্যু ঘটিয়েছে। কিন্তু কী করে?
তিনজন লোক আছে: বিশু পাল নিজে, তার স্ত্রী এবং ডাক্তার রক্ষিত। ডাক্তার রক্ষিত খুবই প্যাঁচে পড়েছে, সে বিশু পালকে পরোক্ষভাবে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু নিজের হাতে খুন করবে কি? বিশ্বাস হয় না। বিশু পালের স্ত্রী মেয়েমানুষ, স্বামীকে বাঁচাবার জন্যে সে অভয় ঘোষালকে হাতের কাছে পেলে বিষ খাওয়াতে পারে। কিন্তু অত দূরে গিয়ে ছুরি চালানো তার পক্ষে সম্ভব নয়। ছুরি মেয়েমানুষের অস্ত্র নয়। বাকি রইল বিশু পাল। কিন্তু সে তো পক্ষাঘাতে পঙ্গু—
গুর্খা দুটোকে গোড়াতেই বাদ দিয়েছি। প্ৰাণীহত্যায় তাদের অরুচি নেই, তারা কুকরি চালাতেও জানে। কিন্তু বিশু পাল নিজের গুর্খা দারোয়ানকে দিয়ে খুন করাবে এত কাঁচা ছেলে সে নয়। গুর্খাদের মাথায় প্যাঁচালো বুদ্ধি নেই, তারা সরল এবং গোঁয়ার। ধরা পড়লেই সত্যি কথা বলে ফেলবে।
তবে?
হঠাৎ আসল কারসাজিটা আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল। ডাক্তারি শাস্ত্ৰে জ্ঞান থাকলে অনেক আগেই বুঝতে পারতাম। বিশু পালের পক্ষাঘাত সত্যিকারের পক্ষাঘাত নয়, পক্ষাঘাতের অস্থায়ী বিকল্প, ডাক্তারি প্রক্রিয়ার দ্বারা তৈরি করা হয়েছে।
ডাক্তার অসীম সেনকে ফোন করলাম। তিনি প্রবীণ ডাক্তার, এক কথায় বুঝিয়ে দিলেন।
আমার দুঃখ এই যে বিশু পালের সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তার রক্ষিতও ছাড়া পেয়ে গেল। ডাক্তার হয়ে যে কাজ করেছে, তার ক্ষমা নেই। — যাহোক, প্রতিরক্ষা তহবিলে এক লক্ষ টাকাই বা মন্দ কি?
হেঁয়ালির ছন্দ
১
ব্যোমকেশ সরকারী কাজে কটকে গিয়াছিল, আমিও সঙ্গে ছিলাম। দু’চার দিন সেখানে কাটাইবার পর দেখা গেল, এ দু’চার দিনের কাজ নয়, সরকারী দপ্তরের পর্বতপ্রমাণ দলিল দস্তাবেজ ঘাঁটিয়া সত্য উদঘাটন করিতে সময় লাগিবে। তখন ব্যোমকেশ কটকে থাকিয়া গেল, আমি কলিকাতায় ফিরিয়া আসিলাম। বাড়িতে একজন পুরুষ না থাকিলে বাঙালী গৃহস্থের সংসার চলে কি করিয়া।
কলিকাতায় আসিয়া চুপ করিয়া বসিয়া আছি। ব্যোমকেশ নাই, নিজেকে একটু অসহায় মনে হইতেছে। শীত পড়িতে আরম্ভ করিয়াছে, বেলা ছোট হইতেছে; তবু সময় কাটিতে চায় না। মাঝে মাঝে দোকানে যাই, প্ৰভাতের কাজকর্ম দেখি, নূতন পাণ্ডুলিপি আসিলে পড়ি। কিন্তু তবু দিনের অনেকখানি সময় শূন্য পড়িয়া থাকে।
তারপর হঠাৎ একদিন সন্ধ্যা কাটাইবার একটা সুযোগ জুটিয়া গেল।
আমাদের বাসাবাড়িটা তিনতলা। উপরতলায় গোটা পাঁচেক ঘর লইয়া আমরা থাকি, মাঝের তলার ঘরগুলিতে দশ-বারো জন চাকুরে ভদ্রলোক মেস করিয়া আছেন। নীচের তলায় ম্যানেজারের অফিস, ভাঁড়ার ঘর, রান্নাঘর, খাওয়ার ঘর, কেবল কোণের একটি ঘরে এক ভদ্রলোক থাকেন। এঁদের সকলের সঙ্গেই আমাদের মুখ চেনাচিনি আছে, কিন্তু বিশেষ ঘনিষ্ঠতা নাই।
সেদিন সন্ধ্যার পর আলো জ্বালিয়া একটা মাসিকপত্ৰ লইয়া বসিয়াছি, দ্বারে টোকা পড়িল। দ্বার খুলিয়া দেখিলাম, একটি মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক বিনীত হাস্যমুখে দাঁড়াইয়া আছেন। তাঁহাকে আগে দু’একবার বাসাবাড়ির দ্বিতলে দেখিয়াছি, কিছুদিন হইল মেসে বাসা লইয়াছেন। দ্বিতলের এক কোণে সেরা ঘরটি ভাড়া লইয়া একাকী বাস করিতেছেন। একটু শৌখিন গোছের লোক, সিল্কের চুড়িদার পাঞ্জাবির উপর গরম জবাহর-কুর্তা, মাথার চুল পাকার চেয়ে কাঁচাই বেশি। ফিট্ফট চেহারা।
যুক্ত করে নমস্কার করিয়া বলিলেন, মাপ করবেন, আমার নাম ভূপেশ চট্টোপাধ্যায়, দোতলায় থাকি।
বলিলাম, আপনাকে কয়েকবার দেখেছি। নাম জানতাম না। আসুন।
ঘরে আনিয়া বসাইলাম। তিনি বলিলেন, মাস দেড়েক হল কলকাতায় এসেছি, বীমা কোম্পানিতে কাজ করি, কখন কোথায় আছি কিছু ঠিক নেই। হয়তো কালই অন্য কোথাও বদলি করে দেবে।
আমি একটু অস্বস্তি বোধ করিয়া বলিলাম, আপনি বীমা কোম্পানির লোক! কিন্তু আমি তো কখনো জীবনবীমা করাইনি, করাবার পরিকল্পনাও নেই।
তিনি হাসিয়া বলিলেন, না না, আমি সেজন্যে আসিনি। আমি বীমা কোম্পানির অফিসে কাজ করি বটে, কিন্তু দালাল নই। আমি এসেছিলাম—? একটু অপ্ৰস্তুতভাবে থামিয়া বলিলেন, আমার ব্রিজ খেলার নেশা আছে। এখানে এসে অবধি খেলতে পাইনি, পেট ফুলছে। অতি কষ্টে দুটি ভদ্রলোককে যোগাড় করেছি। তাঁরা দোতলায় তিন নম্বর ঘরে থাকেন। কিন্তু চতুর্থ ব্যক্তিকে পাওয়া যাচ্ছে না। কয়েকদিন কটগ্রেট ব্রিজ খেলে কাটালাম, কিন্তু দুধের স্বাদ কি ঘোলে মেটে। আজ ভাবলাম দেখি যদি অজিতবাবুর ব্রিজ খেলার শখ থাকে।
এক সময় ব্রিজ খেলার শখ ছিল। শখ নয়, প্ৰচণ্ড নেশা। অনেকদিন খেলি নাই, নেশা মরিয়া গিয়াছে। তবু মনে হইল সঙ্গিহীনভাবে নীরস পত্রিকা পড়িয়া সন্ধ্যা কাটানাের চেয়ে বরং ব্রিজ ভাল।
বলিলাম, বেশ তো, বেশ তো। আমার অবশ্য অভ্যোস ছেড়ে গেছে, তবু— মন্দ কি।
ভূপেশবাবু ত্বরিতে উঠিয়া বলিলে, তাহলে চলুন, আমার ঘরে ব্যবস্থা করা রেখেছি। মিছে সময় নষ্ট করে লাভ নেই।
বলিলাম, আপনি এগোন, আমি চা খেয়েই যাচ্ছি।
তিনি বলিলেন, না না, আমার ঘরেই চা খাবেন। —চলুন।
তাঁহার আগ্রহ দেখিয়া হাসি পাইল। এক কালে আমারও এমনি আগ্রহ ছিল, সন্ধ্যার সময় ব্রিজ না খেলিলে মনে হইত দিনটা বৃথা গেল।
উঠিয়া পড়িলাম। সত্যবতীকে জানাইয়া ভূপেশবাবুর সঙ্গে নীচে নামিয়া চলিলাম। সিঁড়ি দিয়া নামিয়া দ্বিতলের প্রথম ঘরটি ভূপেশবাবুর। নিজের দ্বারের কাছে দাঁড়াইয়া তিনি হাঁক দিলেন, ‘রামবাবু, বনমালীবাবু, আপনারা আসুন। অজিতবাবুকে পাকড়েছি।
বারান্দার মধ্যস্থিত তিন নম্বর ঘরের দ্বার হইতে দুটি মুণ্ডু উঁকি মারিল, তারপর ‘আসছি বলিয়া অদৃশ্য হইয়া গেল। ভূপেশবাবু আমাকে লইয়া নিজের ঘরে প্রবেশ করলেন এবং আলো জ্বলিয়া দিলেন।
ভূপেশবাবুর ঘরটি বেশ সুপরিসর। বাহিরের দিকের দুই দেয়ালে দুটি গরাদযুক্ত জানালা। ঘরের এক পাশে তক্তপোশের উপর সুজনি-ঢাকা বিছানা, অন্য পাশে খালি আলমারির মাথায় ঝকঝকে স্টোভ, চায়ের সরঞ্জাম ইত্যাদি। ঘরের মাঝখানে একটি নীচু টেবিল ঘিরিয়া চারখানি চেয়ার, স্পষ্টই বোঝা যায় তাস খেলিবার টেবিল। তা ছাড়া ঘরে ড্রেসিং টেবিল, কাপড় রাখার দেরাজ প্রভৃতি যে-কয়টি ছােটখাটাে আসবাব আছে সমস্তই সুরুচির পরিচায়ক। ভূপেশবাবুর রুচি একটু বিলাত-ঘেঁষা।
ভুপেশবাবু আমাকে চেয়ারে বসাইয়া বলিলেন, চায়ের জলটা চড়িয়ে দিই, পাঁপ মিনিটে তৈরী হয়ে যাবে।
তিনি স্টোভ জ্বলিয়া জল চড়াইলেন। ইতিমধ্যে রামবাবু ও বনমালীবাবু আসিয়া উপস্থিত হইলেন।
পূর্বে পরিচয় থাকিলেও ভূপেশবাবু আর একবার পরিচয় করাইয়া দিলেন, ইনি রামচন্দ্র রায়, আর ইনি বনমালী চন্দ। দুজনে একই ঘরে থাকেন এবং একই ব্যাঙ্কে কাজ করেন।
আমি লক্ষ্য করিলাম, আরো ঐক্য আছে; একসঙ্গে দু’জনকে কখনো দেখি নাই বলিয়াই বোধ হয় লক্ষ্য করি নাই। দুজনেরই বয়স পঁয়তাল্লিশ হইতে পঞ্চাশের মধ্যে, দুজনেরই মোটাসোটা মাঝারি দৈর্ঘ্যের চেহারা, দুজনেরই মুখের ছাঁচ একরকম; মোটা নাক, বিরল ভুরু, চওড়া চিবুক। সাদৃশ্যটা স্পষ্টই বংশগত। আমার লোভ হইল ইহাদের চমক লাগাইয়া দিই। হাজার হোক, আমি ব্যোমকেশের বন্ধু।
বলিলাম, আপনারা কি মাসতুত ভাই?
দুজনে চমকিয়া চাহিলেন; রামবাবু ঈষৎ রুক্ষস্থরে বলিলেন, না। আমি বৈদ্য, বনমালীবাবু কায়স্থ।
অপ্ৰতিভ হইয়া পড়িলাম। আমতা আমতা করিয়া কৈফিয়ত দিবার চেষ্টা করিতেছি, ভূপেশবাবু এক প্লেট শিঙাড়া আনিয়া আমাকে উদ্ধার করিলেন। তারপর চা আসিল। তাড়াতাড়ি চা-পর্ব শেষ করিয়া আমরা খেলিতে বসিলাম। মাসতুত ভাই-এর প্রসঙ্গ চাপা পড়িয়া গেল।
খেলিতে বসিয়া দেখিলাম। এতদিন পরেও ব্রিজ খেলা ভুলি নাই; খেলার এবং ডাকের কলাকৌশল সবই আয়ত্তের মধ্যে আছে। সামান্য বাজি রাখিয়া খেলা, খেলার শেষে বড়জোর চার আনা লাভ লোকসান থাকে। কিন্তু এই বাজিটুকু না থাকিলে খেলার রস জমে না।
প্রথম রাবারে আমি ও রামবাবু জুড়িদার হইলাম। রামবাবু একটি মোটা চুরুট ধরাইলেন; ভূপেশবাবু ও আমি সিগারেট জ্বলিলাম, বনমালীবাবু কেবল সুপুরি-লবঙ্গ মুখে দিলেন।
তারপর খেলা চলিতে লাগিল। একটা রাবার শেষ হইলে তাস কাটিয়া জুড়িদার বদল করিয়া আবার খেলা চলিল। এঁরা তিনজনেই ভাল খেলোয়াড়; কথাবার্তা বেশি হইতেছে না, সকলের মনই খেলায় মগ্ন। কেবল সিগারেট ও সিগারের আগুন আনির্বাণ জ্বলিতেছে। ভূপেশবাবু এক সময় উঠিয়া গিয়া জানালা খুলিয়া দিয়া নিঃশব্দে আসিয়া বসিলেন।
খেলা শেষ হইল তখন রাত্ৰি নটা বাজিয়া গিয়াছে, মেসের চাকর দু’বার খাওয়ার তাগাদা দিয়া গিয়াছে। হারজিতের অঙ্ক কষিয়া দেখা গেল, আমি দুই আনা জিতিয়াছি। মহানন্দে জিতের পয়সা পকেটস্থ করিয়া উঠিয়া পড়িলাম। ভুপেশবাবু স্মিতমুখে বলিলেন, কাল আবার বসবেন তো?
বলিলাম, বসব।
উপরে আসিয়া সত্যবতীর কাছে একটু বকুনি খাইলাম। শীত ঋতুতে রাত্রি সওয়া নটা কম নয়। কিন্তু অনেকদিন পরে ব্রিজ খেলিয়া মনটা ভরাট ছিল, সত্যবতীয় বকুনি হাসিয়া উড়াইয়া দিলাম।
অতঃপর প্রত্যহ আমাদের তাসের আড্ডা বসিতে লাগিল; ঘরে সন্ধ্যাবাতি জ্বালার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে সভা বসে, রাত্ৰি নটা পর্যন্ত চলে। পাঁচ-ছয় দিনে এই তিনটি মানুষ সম্বন্ধে একটা ধারণা জন্মিল। ভূপেশবাবু সহৃদয় মিষ্টভাষী অতিথিবৎসল, ব্রিজ খেলার প্রতি গাঢ় অনুরাগ। রামবাবু একটু গভীর প্রকৃতির; বেশি কথা বলেন না, কেহ খেলায় ভুল করিলে তর্ক করেন না। বনমালীবাবু রামবাবুকে অতিশয় শ্রদ্ধা করেন, তাঁহার অনুকরণে ভারিক্কি হইবার চেষ্টা করেন, কিন্তু পারেন না। দুজনেই অল্পভাষী; তাস খেলার প্রতি গভীর আসক্তি। দুজনেরই কথায় সামান্য পূর্ববঙ্গের টান আছে।
ছয় দিন আনন্দে তাস খেলিতেছি, আমাদের আড্ডা একটি চিরস্থায়ী প্ৰতিষ্ঠানে পরিণত হইবার উপক্ৰম করিতেছে, এমন সময় নীচের তলায় একটি মারাত্মক ব্যাপার ঘটিয়া আমাদের সভাটিকে টলমল করিয়া দিল। নীচের তলার একমাত্র বাসিন্দা নটবর নস্কর হঠাৎ খুন হইলেন। তাঁহার সহিত অবশ্য আমাদের কোনই সম্পর্ক ছিল না, কিন্তু মাঝগঙ্গা দিয়া জাহাজ যাইলে তাহার ঢেউ তীরে আসিয়া লাগে।
সেদিন-সাড়ে ছাঁটার সময় একটি র্যাপার গায়ে জড়াইয়া আমি আড্ডায় যাইবার জন্য বাহির হইলাম। আমার একটু দেরি হইয়া গিয়াছে, তাই সিঁড়ি দিয়া চটি ফটফট করিয়া তাড়াতাড়ি নামিতেছি। শেষের ধাপে পৌঁছিয়ছি। এমন সময় দুম করিয়া একটি শব্দ শুনিয়া দাঁড়াইয়া পড়িলাম। শব্দটা কোথা হইতে আসিল ঠিক ঠাহর করিতে পারিলাম না। রাস্তায় হয়তো মোটর ব্যাক-ফায়ার করিয়াছে, কিন্তু বেশ জোর আওয়াজ। রাস্তা হইতে এত জোর আওয়াজ আসিবে না।
ক্ষণকাল থামিয়া আমি আবার নামিয়া ভূপেশবাবুর ঘরে প্রবেশ করিলাম। ঘরে আলো জ্বলিতেছে, দেকিলাম ভুপেশবাবু পাশের দিকের জানালার গরাদ ধরিয়া দাঁড়ােইয়া বাহিরের পানে কিছু দেখিতেছেন, রামবাবু ও বনমালীবাবু তাঁহার পিছন হইতে জানালা দিয়া উঁকি মারিবার চেষ্টা করিতেছেন। আমি যখন প্রবেশ করিলাম, তখন ভূপেশবাবু উত্তেজিত স্বরে বলিতেছেন, ঐ-ঐ-গলি থেকে বেরিয়ে গেল, দেখতে পেলেন? গায়ে বাদামী রঙের আলোয়ান—
আমি পিছন হইতে বলিলাম, কি ব্যাপার?
সকলে ভিতর দিকে ফিরিলেন। ভূপেশবাবু বলিলেন, আওয়াজ শুনতে পেয়েছেন? এই জানালার নীচের গলি থেকে এল। সবেমাত্র জানালাটি খুলেছি অমনি নীচে দুম করে শব্দ। গলা বাড়িয়ে দেখলাম একটা লোক তাড়াতাড়ি গলি থেকে বেরিয়ে গেল।
আমাদের বাসাবাড়িটি সদর রাস্তার উপর। বাড়ির পাশ দিয়া একটি ইট-বাঁধানো সরু কানা গলি বাড়ির খিড়কির সহিত সদর রাস্তার যোগসাধন করিয়াছে; বাসার চাকর-বাকর সেই পথে যাতায়াত করে। আমার একটু খটকা লাগিল। বলিলাম, এই ঘরের নীচের ঘরে এক ভদ্রলোক থাকেন। তাঁর ঘর থেকে শব্দটা আসেনি তো?
ভূপেশবাবু বলিলেন, কি জানি। আমার ঘরের নীচে এক ভদ্রলোক থাকেন বটে, কিন্তু তাঁর নাম জানি না।
রামবাবু ও বনমালীবাবু মুখ তাকাতাকি করিলেন, তারপর রামবাবু গলা ঝাড়া দিয়া বলিলেন, নীচের ঘরে থাকেন নটাবর নস্কর।
বলিলাম, চলুন। তিনি যদি ঘরে থাকেন, বলতে পারবেন কিসের আওয়াজ।
ওঁদের তিনজনের বিশেষ আগ্রহ ছিল না, কিন্তু আমি সত্যান্বেষী ব্যোমকেশের বন্ধু, আমি শব্দের মূল অনুসন্ধান না করিয়া ছাড়িব কেন? বলিলাম, চলুন, চলুন, একবারটি দেখে এসেই খেলায় বসা যাবে। শব্দটি যদি স্বাভাবিক শব্দ হতো তাহলে কথা ছিল না, কিন্তু গলি দিয়ে একটা লোক এসে যদি নটবরবাবুর ঘরে চীনে-পাটুকা ছুড়ে থাকে তাহলেও তো খোঁজ নেওয়া দরকার।
অনিচ্ছাভরে তিনজন আমার সঙ্গে চলিলেন।
নীচের তলায় ম্যানেজার শিবকালীবাবুর অফিসে তালা ঝুলিতেছে, স্টোর-রুমের দ্বারাও বন্ধ। ভোজনকক্ষটি খোলা আছে, কারণ সেখানে কয়েকটি কাঠের পিঁড়ি ছাড়া আর কিছুই নাই। কেবল নটবরবাবুর দরজা ভেজানো রহিয়াছে, বাহিরে তালা লাগানো নাই। সুতরাং তিনি ঘরেই আছেন। এরূপ অনুমান করা অন্যায় হইবে না। আমি ডাক দিলাম, নটবরবাবু!
সাড়া নাই। আর একবার অপেক্ষাকৃত উচ্চকণ্ঠে ডাকিয়াও যখন উত্তর পাওয়া গেল না, তখন আমি আস্তে আস্তে দরজা ঠেলিলাম। দরজা একটু ফাঁক হইল।
ঘর অন্ধকার, কিছু দেখা যায় না; কিন্তু একটা মৃদু গন্ধ নাকে আসিল। বারুদের গন্ধা! আমরা সচকিত দৃষ্টি বিনিময় করিলাম।
ভুপেশবাবু বললেন, দোরের পাশে নিশ্চয় আলোর সুইচ আছে। দাঁড়ান, আমি আলো জ্বালছি।
তিনি আমাকে সরাইয়া ঘরের মধ্যে উঁকি মারিলেন, তারপর হাত বাড়াইয়া সুইচ খুঁজতে লাগিলেন। কট করিয়া শব্দ হইল, আলো জ্বলিয়া উঠিল।
মাথার উপর বিদ্যুতের নির্মম আলোকে প্রথম যে বস্তুটি চোখে পড়িল তাহা নটবরবাবুর মৃতদেহ। তিনি ঘরের মাঝখানে হাত-পা ছড়াইয়া চিত হইয়া পড়িয়া আছেন; পরিধানে সাদা সোয়েটার ও ধুতি। সোয়েটারের বুকের নিকট হইতে গাঢ় রক্ত গড়াইয়া পড়িয়াছে। নটবর নস্কর জীবিত অবস্থাতেও খুব সুদৰ্শন পুরুষ ছিলেন না, দোহারা পেটমোটা গোছের শরীর, হামদো মুখে গভীর বসন্তের দাগ, কিন্তু মৃত্যুতে তাঁহার মুখখানা আরো বীভৎস হইয়া উঠিয়াছে। সে বীভৎসতার বর্ণনা দিব না। মৃত্যুভয় যে কিরূপ কুৎসিত আবেগ তাহা তাঁহার মুখ দেখিয়া বোঝা যায়।
কিছুক্ষণ কাষ্ঠপুত্তলির ন্যায় দাঁড়াইয়া থাকিবার পর রামবাবু গলার মধ্যে হেঁচকি তোলার মত শব্দ করিলেন। দেখিলাম তিনি মোহাবিষ্ট অবিশ্বাস-ভরা চোখে মৃতদেহের প্রতি চাহিয়া আছেন। বনমালীবাবু হঠাৎ তাঁহার একটা হাত খামচাইয়া ধরিয়া রুদ্ধস্বরে বলিলেন, ‘দাদা, নটবর নস্কর মরে গেছে।’ তাঁহার অভিব্যক্তি দুঃখের কিংবা বিস্ময়ের কিংবা আনন্দের ঠিক ধরিতে পারিলাম না।
ভূপেশবাবু শুষ্কমুখে বলিলেন, মরে গেছে তাতে সন্দেহ নেই। বন্দুকের গুলিতে মরেছে!— ঐ যে। ঐ যে। জানালার ওপর দেখতে পাচ্ছেন?
গরাদ-যুক্ত জানালা খোলা রহিয়াছে, তাহার পৈঁঠার উপর একটি পিস্তল। চিত্রটি স্পষ্ট হইয়া উঠিল: জানালার বাহিরের গলিতে দাঁড়াইয়া আততায়ী নটবর নস্করকে গুলি করিল, তারপর পিস্তলটি জানালার পৈঁঠার উপর রাখিয়া প্ৰস্থান করিল।
এই সময় পিছন দিকে দ্রুত পদশব্দ শুনিয়া ঘাড় ফিরাইলাম। মেসের ম্যানেজার শিবকালী চক্রবর্তী আসিতেছেন। তাঁহার চিমড়ে চেহারা, গতি অকারণে ক্ষিপ্র, চোখের দৃষ্টি অকারণে ব্যাকুল; কথা বলিবার সময় একই কথা একাধিকবার উচ্চারণ না করিয়া শান্তি পান না। তিনি আমাদের কাছে আসিয়া বলিলেন, আপনারা এখানে? এখানে? কি হয়েছে? কি হয়েছে?
নিজের চোখেই দেখুন—আমরা দ্বারের সম্মুখ হইতে সরিয়া দাঁড়াইলাম। শিবকালীবাবু রক্তাক্ত মৃতদেহ দেখিয়া আঁতকাইয়া উঠিলেন, অ্যাঁ! এ কি-এ কি। নটবর নস্কর মারা গেছেন। রক্ত, রক্ত! কি করে মারা গেলেন?
পিস্তল দেখিয়া শিবকালীবাবু আবার ত্ৰাসোক্তি করিলেন, “অ্যাঁ- পিস্তল- পিস্তল। পিস্তলের গুলিতে নটবরবাবু খুন হয়েছেন! কে খুন করেছে— কখন খুন করেছে?
বলিলাম, কে খুন করেছে জানি না, কিন্তু কখন খুন করেছে বলতে পারি। মিনিট পাঁচেক আগে৷
সংক্ষেপে পরিস্থিতি বুঝাইয়া দিলাম। তিনি ব্যাকুল নেত্ৰে মৃতদেহের পানে চাহিয়া রহিলেন। এতক্ষণ লক্ষ্য করি নাই, হঠাৎ চোখে পড়িল, শিবকালীবাবুর গায়ে বাদামী রঙের আলোয়ান। বুকটা ধড়াস করিয়া উঠিল। বুকের ধড়ফড়ানি দমন করিয়া বলিলাম, আপনি কি বাসায় ছিলেন না? বেরিয়েছিলেন?
তিনি উদভ্ৰান্তভাবে বলিলেন, অ্যাঁ— আমি কাজে বেরিয়েছিলাম। কিন্তু-কিন্তু—এখন উপায়? কৰ্তব্য কী—কর্তব্য?
বলিলাম, প্রথম কর্তব্য পুলিসকে খবর দেওয়া।
শিবকালীবাবু বলিলেন, তাই তো, তাই তো। ঠিক কথা— ঠিক কথা! কিন্তু আমার তো টেলিফোন নেই। অজিতবাবু, আপনাদের টেলিফোন আছে, আপনি যদি—
আমি বলিলাম, এখনি পুলিসকে টেলিফোন করছি। — আপনারা কিন্তু ঘরে ঢুকবেন না, যতক্ষণ না পুলিস আসে এইখানে দাঁড়িয়ে থাকুন।
আমি তাড়াতাড়ি উপরে উঠিয়া আসিলাম। ঘরে প্রবেশ করিতে আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব চোখে পড়িল। আমার গায়েও বাদামী রঙের আলোয়ান।
আমাদের পাড়ার তৎকালীন দারোগা প্রণব গুহ মহাশয়ের সহিত আমাদের পরিচয় ছিল। কর্মপটু বয়স্থ লোক, কিন্তু ব্যোমকেশের প্রতি তিনি প্রসন্ন ছিলেন না। অবশ্য তাঁহার প্রসন্নতা কোনো প্রকার বাক-পারুষ্য বা রূঢ়তার মাধ্যমে প্রকাশ পাইত না, ব্যোমকেশকে তিনি অতিরিক্ত সম্মানপ্রদর্শনপূর্বক কথা বলিয়া কথার শেষে অনুচ্চস্বরে একটু হাসিতেন। বােধ হয় দুইজনের মনের ধাতুগত বিরোধ ছিল; তা ছাড়া সরকারী কার্যকলাপে বে-সরকারী স্থূল হস্তাবলেপ প্রণববাবু পছন্দ করিতেন না।
টেলিফোনে আমার বাত শুনিয়া তিনি ব্যঙ্গভরে বলিলেন, বলেন কি! বাঘের ঘরে ঘোগের বাসা, সর্ষের মধ্যে ভূত! তা ব্যোমকেশবাবু যখন রয়েছেন তখন আমাকে আর কী দরকার? তিনিই তদন্ত করুন।’
বিরক্ত হইয়া বলিলাম, ব্যোমকেশ কলকাতায় নেই, থাকলে অবশ্য করত।
প্রণব দারোগ বলিলেন, আচ্ছা আচ্ছা, তাহলে আমি যাচ্ছি। খিক্ খিক হাস্য করিয়া তিনি ফোন রাখিয়া দিলেন। আমি আবার নীচের তলায় নামিয়া গেলাম।
আধা ঘণ্টা পরে প্রণববাবু দলবল লইয়া আসিলেন। আমাকে দেখিয়া খিক্ খিক্ হাসিলেন, তারপর গভীর হইয়া লাশ তদারক করিলেন। জানালা হইতে পিস্তলটি রুমালে জড়াইয়া সন্তপর্ণে পকেটে রাখিলেন। অবশেষে লাশ চালান দিয়া ঘরের একটি মাত্র চেয়ারে বসিয়া বাসার সকলকে জেরা আরম্ভ করিলেন।
আমি যাহা জানিতাম বলিলাম। বাকি সকলের বয়ান সংক্ষেপে লিখিতেছি—
ম্যানেজার শিবকালীবাবু ব্ৰহ্মচারী ব্ৰতধারী পুরুষ, অর্থাৎ অবিবাহিত। পঁচিশ বছর ধরিয়া মেস চালাইতেছেন, এই মেসই তাঁহার স্ত্রী-পুত্র পরিবার।...নটবর নস্কর প্রায় তিন বছর পূর্বে নীচের তলার এই ঘরটিতে বাসা বাঁধিয়াছিলেন, তদবধি এখানেই ছিলেন। তাঁহার বয়স অনুমান পঞ্চাশ, কাহারো সহিত বেশি মেলামেশা ছিল না। রামবাবু এবং বনমালীবাবু কালেভদ্রে তাঁহার ঘরে আসিতেন। শিবকালীবাবুর সহিত নটবর নস্করের অপ্রীতি ছিল না, কারণ নটবর প্রতি মাসের পয়লা তারিখে মেসের পাওনা চুকাইয়া দিতেন। —শিবকালীবাবু আজ বিকালে খবর পাইয়াছিলেন যে, কোনো এক গুদামে সস্তায় আলু পাওয়া যাইতেছে, তাই তিনি আলু কিনিতে গিয়াছিলেন। কিন্তু আলু পূর্বেই বিক্রি হইয়া গিয়াছিল, তাই তিনি শূন্য হাতে ফিরিয়া আসিয়াছেন।
ভূপেশবাবু বীমা কোম্পানিতে চাকরি করেন, মাস দেড়েক হইল বদলি হইয়া কলিকাতায় আসিয়াছেন। বয়স পঁয়তাল্লিশ, বিপত্নীক, নিঃসন্তান। গৃহ বলিতে কিছু নাই, কর্মসূত্রে ভারতের যত্রতত্র ঘুরিয়া বেড়াইয়াছেন। তাস খেলায় দল বাঁধা এবং আজ সন্ধ্যার ঘটনা ভূপেশবাবু যথাযথ বর্ণনা করিলেন, বাদামী আলোয়ান গায়ে লোকটারও উল্লেখ করিলেন। লোকটার মুখ তিনি ভাল করিয়া দেখিতে পান নাই, অপসারণশীল মানুষের মুখ পিছন হইতে দেখা যায় না; ভবিষ্যতে তাহাকে দেখিলে চিনিতে পারিকেন এমন সম্ভাবনা কম।
রামচন্দ্র রায় ও বনমালী চন্দের এজাহার প্রায় একই প্রকার। লক্ষ্য করিলাম, রামবাবু ধীরস্থিরভাবে উত্তর দিলেও বনমালীবাবু একটু বিচলিত হইয়া পড়িয়াছেন। তাঁহারা পূর্বে ঢাকায় ছিলেন, একসঙ্গে একটি বিলাতি কোম্পানিতে চাকরি করিতেন। দেশ বিভাগের হাঙ্গামায় তাঁহাদের স্ত্রী-পুত্র পরিবার সকলেই নিহত হয়, তাঁহারা অতি কষ্টে প্রাণ লইয়া পলুইয়া আসেন। রামবাবুর বয়স আটচল্লিশ, বনমালীবাবুর পঁয়তাল্লিশ। তাঁহারা কলিকাতায় আসিয়া এই মেসে আছেন এবং একটি ব্যাঙ্কে কাজ করিতেছেন। এইভাবে তিন বছর কাটিয়াছে।
তাঁহাদের ব্রিজ খেলার শখ আছে, কিন্তু কলিকাতায় আসার পর খেলার সুযোগ হয় নাই। কয়েকদিন আগে ভূপেশবাবু নিজের ঘরে ব্রিজ খেলার ব্যবস্থা করিয়াছিলেন; সেই অবধি বেশ আনন্দে সন্ধ্যা কাটিতেছিল। তারপর আজ তাঁহারা ভূপেশবাবুর ঘরে পদার্পণ করিবার পাঁচ মিনিট পরে হঠাৎ গলির মধ্যে দুম করিয়া আওয়াজ হইল! —নটবরবাবুর সহিত তাঁহাদের ঢাকায় আলাপ ছিল; সামান্য আলাপ, বেশি ঘনিষ্ঠতা নয়। নটবরবাবু ঢাকায় নানাপ্রকার দালালির কাজ করিতেন। এখানে একই মেসে থাকার জন্য তাঁহাদের মাঝে-মধ্যে দেখাশোনা হইত; রামবাবু ও বনমালীবাবু এই ঘরে আসিয়া গল্পসল্প করিতেন। নটবরবাবুর অন্য কোন বন্ধুবান্ধব আছে কিনা তাঁহারা জানেন না। —বাদামী আলোয়ান গায়ে লোকটাকে তাঁহারা গলির মোড়ে সন্ধ্যার আবছায়া আলোয় পালকের জন্য দেখিয়াছিলেন, আবার দেখিলে চিনিতে পরিবেন না।
মেসে অন্য যাঁহারা থাকেন তাঁহারা কেহ কিছু বলিতে পারিলেন না। দ্বিতলের অন্য প্রান্তে একটি ঘরে পাশার আড্ডা বসিয়াছিল; চারজন খেলুড়ে এবং আরো গুটিচারেক দর্শক সেখানে উপস্থিত ছিলেন; তাঁহারা বন্দুকের শব্দ শুনিতে পান নাই। মেসের কাহারো সঙ্গে নটবরবাবুর সামান্য মুখ চেনাচেনি ছাড়া অন্য কোনো সম্পর্ক ছিল না।
কেবল মেসের ভূত্য হরিপদ একটা কথা বলিল যাহা অবান্তর হইতে পারে আবার অর্থপূর্ণ হইতে পারে। সন্ধ্যা ছয়টার সময় দ্বিতলের সুরেনবাবু হরিপদকে পাঠাইয়াছিলেন মোড়ের হোটেল হইতে আলুর চপ কিনিয়া আনিতে। চপ কিনিয়া খিড়কির পথে ফিরিবার সময় হরিপদ শুনিতে পাইয়াছিল, নটবরবাবুর ঘরে কেহ আসিয়াছে এবং মৃদুগুঞ্জনে কথা বলিতেছে। নটবরবাবুর দরজা ভেজানো ছিল বলিয়া ঘরের ভিতর কে আছে হরিপদ দেখিতে পায় নাই; গলার স্বরও চিনিতে পারে নাই। নটবরবাবুর ঘরে কেহ বড় একটা আসে না, তাই হরিপদ বিশেষ করিয়া ইহা লক্ষ্য করিয়াছিল। সময় সম্বন্ধে সে স্পষ্টভাবে কিছু বলিতে পারিল না, তবে সুরেনবাবু স্পষ্টক্ষরে বলিলেন যে, তিনি সন্ধ্যা ছ’টার সময় চপ আনিতে দিয়াছিলেন।
অর্থাৎ মৃত্যুর আধা ঘণ্টা আগে নটবরবাবুর ঘরে লোক আসিয়াছিল। মেসের কেহ নয়, কারণ কেহই স্বীকার করিল না যে, সে নটবরবাবুর ঘরে গিয়াছিল। সুতরাং বাহিরের লোক। হয়তো বাদামী আলোয়ান গায়ে লোকটা। কিংবা অন্য কেহ; হরিপদর এজেহার হইতে কিছুই ধরা-ছোঁয়া যায় না।
সকলের এজেহার লিখিত হইবার পর প্রণব দারোগা বলিলেন, আপনারা এখন যেতে পারেন, আমরা ঘর খানাতল্লাশ করব। হ্যাঁ, অজিতবাবু এবং শিবকালীবাবুকে জানিয়ে দিচ্ছি, যতদিন খুনের কিনারা না হয়, ততদিন আপনারা আমার অনুমতি না নিয়ে কলকাতার বাইরে যাবার চেষ্টা করবেন না।
অবাক হইয়া বলিলাম, তার মানে?
প্রণব দরোগা বলিলেন, তার মানে, আপনার এবং শিবকালীবাবুর গায়ে বাদামী রঙের আলোয়ান রয়েছে। খিকখিক। —আচ্ছা, আসুন।
তিনি আমাদের মুখের উপর দরজা বন্ধ করিয়া দিলেন। আমরা যে যার কোটরে ফিরিয়া আসিলাম। তাস খেলার কথা মনেই রহিল না।
পরের দিনটা নিক্রিয় বৈচিত্র্যহীনভাবে কাটিয়া গেল। পুলিসের দিক হইতে সাড়াশব্দ নাই। প্ৰণব দরোগা গত রাত্ৰে নটবরবাবুর ঘর খানাতল্লাশ করিয়া দ্বারে তালা লাগাইয়া চলিয়া গিয়াছেন, কিছু কাগজপত্ৰ লইয়া গিয়াছেন। লোকটি আমাদের প্রতি বিদ্বেষভাবাপন্ন; কিন্তু এমন মিষ্টভাবে বিদ্বেষ প্রকাশ করেন যে, কিছু বলিবার থাকে না। তিনি জানেন আমার অকাট্য অ্যালিবাই আছে, তবু তুচ্ছ ছুতা করিয়া আমার উপর কলিকাতা ত্যাগের নিষেধাজ্ঞা জারি করিয়া গেলেন। আমি ব্যোমকেশের বন্ধু, তাই আমাকে উত্ত্যক্ত করাই তাঁহার একমাত্র উদ্দেশ্য।
সকালবেলা মেসের বাবুরা নিজ নিজ অফিসে চলিয়া গেলেন। কাহারো মনে কোনো বিকার নাই। নটবর নস্কর নামক যে মানুষটি তিন বছর মেসে ছিলেন, তিনি যে বন্দুকের গুলিতে মারা গিয়াছেন। সেজন্য কাহারো আক্ষেপ নাই। ‘জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা কবে’— সকলেরই এইরূপ একটি পারমার্থিক মনোভাব।
সন্ধ্যাবেলা ভূপেশীবাবুর ঘরে গেলাম। রামবাবু ও বনমালীবাবুও উপস্থিত হইয়াছেন। সকলেরই একটু নিস্তেজ অবস্থা। খেলার কথা আজ কেহ উল্লেখ করিল না। চা পান করিতে করিতে মনমরাভাবে নটবর নস্করের মৃত্যু সম্বন্ধে আলোচনা করিয়া এবং পুলিসের অকৰ্মণ্যতার নিন্দা করিয়া সভা ভঙ্গ হইল।
সিঁড়ি দিয়া উপরে উঠিতে উঠিতে একটা আইডিয়া মাথায় আসিল। প্রণব দরোগা যত কর্মকুশলীই হোন। তাঁহার দ্বারা নটবরবাবুর খুনের কিনারা হইবে না। ব্যোমকেশ এখানে নাই; তাসের আড্ডা ম্রিয়মাণ, এ অবস্থায় নিষ্কর্মার মত বসিয়া না থাকিয়া আমি যদি ঘটনাটি লিখিয়া রাখি তাহা হইলে মন্দ হয় না। আমারো কিছু করা হইবে এবং ব্যোমকেশ ফিরিয়া আসিয়া আমার লেখা পড়িলে হয়তো খুনের একটা হেস্তনেস্ত করিতে পরিবে।
রাত্রেই লিখিতে বসিয়া গেলাম। ব্যোমকেশ যাহাতে খুঁত ধরিবার সুযোগ না পায় এমনিভাবে ঘটনার ভূমিকা হইতে আরম্ভ করিয়া আমার দৃষ্টিকোণ হইতে সমস্ত খুঁটিনাটি লিপিবদ্ধ করিলাম। লেখা শেষ হইল পরদিন অপরাহ্ণে।
লেখা শেষ হইল বটে। কিন্তু কাহিনীটি শেষ হইল না। কবে কোথায় গিয়া নটবরবাবুর হত্যা কাহিনী শেষ হইবে কে জানে। হয়তো হত্যাকারীর নাম চিরদিন অজ্ঞাত থাকিয়া যাইবে। একটু অপরিতৃপ্ত মন লইয়া সবেমাত্র সিগারেট ধরাইয়াছি। এমন সময় সুটকেশ হাতে গুটিগুটি ব্যোমকেশ প্ৰবেশ করিল।
আমি লাফাইয়া উঠিলাম, আরে! তুমি ফিরে এসেছ! কাজ শেষ হয়ে গেল?
ব্যোমকেশ বলিল, কাজ এখনো আরম্ভই হয়নি। সরকারের দুই দপ্তরে ঝগড়া বেধে গেছে। আগে কেবা প্ৰাণ করিবেক দান তারি লাগি কাড়াকড়ি। দেখে শুনে আমি চলে এলাম। ওদের কামড়া-কামড়ি থামলে আবার যাব।
সত্যবতী ভিতর হইতে ব্যোমকেশের কণ্ঠস্বর শুনিতে পাইয়াছিল, আঁচলে হাত মুছিতে মুছিতে ছুটিয়া আসিল। তাঁহাদের দাম্পত্য জীবন নূতন নয়, কিন্তু এখনো ব্যোমকেশকে অপ্রত্যাশিতভাবে কাছে পাইলে সত্যবতীর চোখে আনন্দবিহ্বল জ্যোতি ফুটিয়া ওঠে।
দাম্পত্য পুনর্মিলনের পালা শেষ হইলে আমি নটবর প্রসঙ্গ উত্থাপন করিলাম এবং লেখাটি পড়িতে দিলাম। ব্যোমকেশ চায়ে চুমুক দিতে দিতে পড়িল।
সন্ধ্যা ছটা বাজিলে সে লেখাটা আমাকে ফেরত দিয়া বলিল, প্ৰণব দারোগা তোমাকে শহরবন্দী করে রেখেছে। লোকটা যে আমাদের কী চোখেই দেখেছে! কাল তার সঙ্গে দেখা করতে যাব। চল, আজ ভুপেশবাবুর সঙ্গে আলাপ করে আসি।
বুঝিলাম ব্যোমকেশ আকৃষ্ট হইয়াছে। খুশি হইয়া বলিলাম, চল। রামবাবু আর বনমালীবাবুর সঙ্গেও দেখা হতে পারে।
দ্বিতলে ভূপেশবাবুর ঘরে ব্যোমকেশকে লইয়া গেলাম। আমার অনুমান মিথ্যা নয়, রামবাবু ও বনমালীবাবু উপস্থিত আছেন। পরিচয় করাইয়া দিতে হইল না, সকলেই ব্যোমকেশের চেহারার সঙ্গে পরিচিত। ভূপেশবাবু সমাদরের সহিত ব্যোমকেশকে অভ্যর্থনা করিলেন এবং চায়ের জল চড়াইলেন। রামবাবুর গম্ভীর্য্য অটল রহিল, কিন্তু বনমালীবাবুর চোখে ত্ৰস্ত সতর্কতা উঁকিঝুঁকি মারিতে লাগিল।
ব্যোমকেশ একটি চেয়ারে উপবেশন করিয়া বলিল, আমারও এক সময় ব্রিজের নেশা ছিল। তারপর অজিত দাবা খেলতে শিখিয়েছিল। কিন্তু এখন আর খেলাধুলো ভাল লাগে না।
ভূপেশবাবু স্টোভের উপর ফুটন্ত জলে চায়ের পাতা ছাড়িতে ছাড়িতে তাহার দিকে ঘাড় ফিরাইলেন, হাসিমুখে বলিলেন, এখন শুধু পরাণের সাথে খেলিব আজিকে মরণ খেলা।
ভূপেশবাবুর মুখে রবীন্দ্র কাব্য শুনিয়া একটু চমকিত হইলাম। তিনি বীমার অফিসে চাকরি করেন আবার কাব্যচৰ্চাও করেন।
ব্যোমকেশ শান্তভাবে বলিল, ঠিক বলেছেন। মৃত্যুর সঙ্গে সারা জীবন খেলা করে করে এমন অবস্থা হয়েছে যে হালকা খেলায় আর মন বসে না।
ভূপেশবাবু বলিলেন, আপনার কথা স্বতন্ত্র। আমিও মৃত্যু নিয়ে কারবার করি, বীমার কাজ মৃত্যুর ব্যবসা ছাড়া আর কী বলুন? কিন্তু আমার এখনো ব্রিজ খেলতে ভাল লাগে।
ব্যোমকেশ ভূপেশীবাবুর সঙ্গে কথা বলিতেছিল বটে, কিন্তু তাহার চক্ষু রামবাবু এবং বনমালীবাবুর দিকেই ঘোরাফেরা করিতেছিল। তাঁহারা নির্বাক বসিয়াছিলেন এই ধরনের হাল্কা অথচ মার্জিত-রুচি বাক্যালাপের সঙ্গে তাঁহাদের ঘনিষ্ঠতা নাই।
ভূপেশবাবু চায়ের পেয়ালা এবং ক্রিমকেকার আনিয়া সম্মুখে রাখিলেন। ব্যোমকেশ যেন চিন্তা করিতে করিতে বলিল, আপনিও স্বতন্ত্র প্রকৃতির মানুষ। ব্রিজ খেলা বুদ্ধির খেলা, যাদের বুদ্ধি আছে তারা স্বভাবতই এই খেলার দিকে আকৃষ্ট হয়। কেউ কেউ জীবন-যন্ত্রণা থেকে কিছুক্ষণের জন্যে মুক্তি পাবার আশায় তাস খেলতে বসে। আমি অনেক দিন আগে একজনকে জানতাম, সে পুত্ৰশোক ভোলবার জন্যে ব্রিজ খেলত।
তিনজনের চক্ষু যেন যন্ত্রচালিতবৎ ব্যোমকেশের দিকে ফিরিল। কেহ কোনো কথা বলিলেন না, কেবল বিস্ফারিত চোখে চাহিয়া রহিলেন। ঘরের মধ্যে একটি গুরুভার নিস্তব্ধতা নামিয়া আসিল।
নীরবে চা-পান সম্পন্ন হইল। তারপর ব্যোমকেশ রুমালে মুখ মুছিয়া সহজ সুরে নীরবতা ভঙ্গ করিল, আমি কটকে গিয়েছিলাম, আজই বিকেলবেলা ফিরেছি। ফেরার সঙ্গে সঙ্গে অজিত আমাকে নটবর নস্করের মৃত্যুর খবর জানালো। নটবরবাবুর সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল না, কিন্তু তাঁর মৃত্যু-সংবাদ শুনে কৌতুহল হল। নিজের দোরগোড়ায় হত্যাকাণ্ড বড় একটা দেখা যায় না। তাই ভাবলাম আপনাদের সঙ্গে আলাপ করে আসি।
ভূপেশবাবু বলিলেন, ভাগ্যিস হত্যাকাণ্ডটা ঘটেছিল। তাই আমার ঘরে আপনার পায়ের ধুলো পড়ল। আমি কিন্তু নটবর নস্কর সম্বন্ধে কিছু জানি না, জীবিত অবস্থায় তাকে চোখেও দেখিনি। রামবাবু আর বনমালীবাবুর সঙ্গে সামান্য পরিচয় ছিল।
ব্যোমকেশ রামবাবুর পানে তাকাইল। রামবাবুর গাম্ভীর্যের উপর যেন ঈষৎ শঙ্কার ছায়া পড়িয়াছে। তিনি উসখুস করিলেন, একবার গলা ঝাড়া দিয়া কিছু বলিবার উপক্ৰম করিয়া আবার মুখ বন্ধ করিলেন। ব্যোমকেশ তখন বনমালীবাবুর দিকে চক্ষু ফিরাইয়া বলিল, নটবরবাবু কেমন লোক ছিলেন। আপনি নিশ্চয় জানেন?
বনমালীবাবু চমকিয়া উঠিয়া বলিলেন, অ্যাঁ—তা—লোক মন্দ নয়— বেশ ভালই লোক ছিলেন— তবে—
এতক্ষণে রামবাবু বাকশক্তি ফিরিয়া পাইলেন, তিনি বনমালীবাবুর অসমাপ্ত কথার মাঝখানে বলিলেন, দেখুন, নটবরবাবুর সঙ্গে আমাদের মোটেই ঘনিষ্ঠতা ছিল না। তবে যখন ঢাকায় ছিলাম তখন নটবরবাবু পাশের বাড়িতে থাকতেন, তাই সামান্য মুখ চেনাচেনি ছিল। ওঁর চরিত্র সম্বন্ধে আমরা কিছুই জানি না।
ব্যোমকেশ প্রশ্ন করিল, কতদিন আগে আপনারা ঢাকায় ছিলেন?
রামবাবু ঢোক গিলিয়া বলিলেন, পাঁচ-ছয় বছর আগে। তারপর দেশ ভাগাভাগির দাঙ্গা শুরু হল, আমরা পশ্চিমবঙ্গে চলে এলাম।
ব্যোমকেশ বনমালবিাবুকে জিজ্ঞাসা করিল, ঢাকায় আপনারা দু’জনে একই অফিসে চাকরি করতেন বুঝি?”
বনমালীবাবু বলিলেন, আজ্ঞে হ্যাঁ। গডফ্রে ব্ৰাউন কোম্পানির নাম শুনেছেন, মস্ত বিলিতি কোম্পানি। আমরা সেখানেই—
তাঁহার কথা শেষ হইবার পূর্বেই রামবাবু সহসা উঠিয়া দাঁড়াইলেন, বলিলেন, বনমালী! আজ সাতটার সময় নারায়ণবাবুর বাসায় যেতে হবে মনে আছে?—আচ্ছা, আজ আমরা উঠি।
বনমালীকে সঙ্গে লইয়া রামবাবু দ্রুত নিস্ক্রান্ত হইলেন। ব্যোমকেশ ঘাড় ফিরাইয়া তাঁহাদের নিষ্ক্রমণ ক্রিয়া দেখিল।
ভূপেশবাবু মৃদু মৃদু হাসিতে লাগিলেন। বলিলেন, ব্যোমকেশবাবু, আপনার প্রশ্নগুলি শুনতে খুবই নিরীহ, কিন্তু রামবাবুর অাঁতে ঘা লেগেছে।
ব্যোমকেশ ভালমানুষের মত বলিল, কেন অাঁতে ঘা লাগল বুঝতে পারলাম না। আপনি কিছু জানেন?
ভূপেশীবাবু মাথা নাড়িয়া বলিলেন, কিছুই জানি না। দাঙ্গার সময় আমি অবশ্য ঢাকায় ছিলাম, কিন্তু ওঁদের সঙ্গে তখন পরিচয় ছিল না। ওঁদের অতীত সম্বন্ধে আমি কিছু জানি না।
দাঙ্গার সময় আপনিও ঢাকায় ছিলেন?
হ্যাঁ। দাঙ্গার বছরখানেক আগে ঢাকায় বদলি হয়েছিলাম, দেশ ভাগ হবার পর ফিরে আসি৷
কিছুক্ষণ কোনাে কথা হইল না। ব্যোমকেশ সিগারেট ধরাইল। ভূপেশবাবু কিছুক্ষণ তাহার পানে চাহিয়া থাকিয়া বলিলেন, ব্যোমকেশবাবু, আপনি যে গল্প বললেন, পুত্ৰশোক ভোলবার জন্যে একজন ব্রিজ খেলত, সেটা কি সত্যি গল্প?
ব্যোমকেশ বলিল, হ্যাঁ, সত্যি গল্প। অনেক দিন আগের কথা আমি তখন কলেজে পড়তাম। কেন বলুন দেখি?
ভূপেশবাবু উত্তর দিলেন না, উঠিয়া গিয়া দেরাজ হইতে একটি ফটােগ্রাফ আনিয়া ব্যোমকেশের হাতে দিলেন। একটি নয়-দশ বছরের ছেলের ছবি; কৈশোরের লবণ্যে মুখখানি টুলটুল করিতেছে। ভূপেশবাবু অস্ফুট স্বরে বলিলেন, আমার ছেলে?
ছবি হইতে ভূপেশীবাবুর মুখের পানে উৎকণ্ঠিত চক্ষু তুলিয়া ব্যোমকেশ বলিল, ছেলে—
ভূপেশীবাবুঘাড় নাড়িলেন, মারা গেছে। ঢাকায় যেদিন দাঙ্গা শুরু হয় সেদিন স্কুলে গিয়েছিল, স্কুল থেকে আর ফিরে এল না।
দুৰ্বহ মৌন ভঙ্গ করিয়া ব্যোমকেশ অর্ধোচ্চারিত প্রশ্ন করিল, আপনার স্ত্রী—?
ভূপেশবাবু বলিলেন, সেও মারা গেছে। হার্ট দুর্বল ছিল, পুত্ৰশোক সইতে পারল না। আমি মরলাম না, ভুলতেও পারলাম না। পাঁচ ছয় বছর কেটে গেছে, এতদিনে ভুলে যাবার কথা। কিন্তু কাজ করি, তাস খেলি, হেসে খেলে বেড়াই, তবু ভুলতে পারি না। ব্যোমকেশবাবু, শোকের স্মৃতি মুছে ফেলবার কি কোনো ওষুধ আছে?
ব্যোমকেশ গভীর নিশ্বাস ফেলিয়া বলিল, একমাত্র ওষুধ মহাকাল।
২
পরদিন সকালে চা পান করিতে করিতে ব্যোমকেশ বলিল, চল, শ্রীমৎ প্রণবানন্দ স্বামীকে দর্শন করে আসা যাক।’
কাল রাত্রে ভূপেশবাবুর জীবনের ট্র্যাজেডি শুনিয়া মনটা ছায়াচ্ছন্ন হইয়া ছিল, প্রণব দারোগার সম্মুখীন হইতে হইবে শুনিয়া আরো দমিয়া গেলাম। বলিলাম, প্রণবানন্দ বাবাজিকে দর্শন করা কি একান্ত দরকার?
ব্যোমকেশ বলিল, পুলিসের সন্দেহ থেকে যদি মুক্ত হতে না চাও তাহলে দরকার নেই।
চল।
সাড়ে ন’টার সময় সিঁড়ি দিয়া দ্বিতলে নামিয়া দেখিলাম ভূপেশবাবুর দ্বারে তালা লাগানো! তিনি নিশ্চয় অফিসে গিয়াছেন। তিন নম্বর ঘর হইতে রামবাবু ও বনমালীবাবু ধড়চূড়া পরিয়া বাহির হইতেছিলেন, আমাদের দেখিয়া আবার ঘরে ঢুকিয়া পড়িলেন। ব্যোমকেশ আমার পানে চোখ বাঁকাইয়া হাসিল।
নীচের তলায় শিবকালীবাবু অফিসে বসিয়া হিসাব দেখিতেছিলেন, ব্যোমকেশকে দেখিতে পাইয়া লাফাইয়া দ্বারের কাছে আসিলেন, ব্যাকুল চক্ষে চাহিয়া বলিলেন, ‘ব্যোমকেশবাবু! কটক থেকে কবে এলেন— কখন এলেন? নটবর নস্করের কথা শুনেছেন তো! কি মুশকিল দেখুন দেখি, পুলিস আমাকে ধরে টানাটানি করছে— নাহক টানাটানি করছে।
ব্যোমকেশ বলিল, শুধু আপনাকে নয়, অজিতকে নিয়েও টানাটানি করছে।
হ্যাঁ হ্যাঁ, তাই তো, তাই তো। বাদামী র্যাপার। মানে হয় না— মানে হয় না। —আপনি একটা ব্যবস্থা করুন।
দেখি চেষ্টা করে।
‘গলিটা’ মানে আমাদের বাসার পাশের গলি, যে গলি দিয়া বাদামী আলোয়ান গায়ে লোকটা নটবরবাবুকে গুলি করিয়া পলায়ন করিয়াছিল। অত্যন্ত সঙ্কীর্ণ গলি, দুইজন মানুষ পাশাপাশি হাঁটিতে পারে না। আমরা আগে পিছে গলিতে প্ৰবেশ করিলাম; ব্যোমকেশ ইট-বাঁধানো মেঝের উপর দৃষ্টি রাখিয়া ধীরে ধীরে অগ্রসর হইল। তাহার মনে কী আছে জানি না, কিন্তু তিন দিন পরে গলির মধ্যে হত্যাকারীর কোনাে নিশানা পাওয়া যাইবে ইহা আশা করাও দুরাশা।
নটবরবাবুর ঘরের জানালা বন্ধ। ব্যোমকেশ সেইখানে গিয়া ইট-বাঁধানো জমির উপর সন্ধানী চক্ষু বুলাইতে লাগিল। জানালাটি গলি হইতে চার ফুট উঁচুতে অবস্থিত, কপাট খোলা থাকিলে গলিতে দাঁড়াইয়া স্বচ্ছন্দে ঘরের মধ্যে গুলি চালানো যায়।
ওটা কিসের দাগ?
ব্যোমকেশের অঙ্গুলি নির্দেশ অনুসরণ করিয়া দেখিলাম, ঠিক জানালার নীচে ইট-বাঁধানাে মেঝের উপর পাঁশুটে রঙের একটা দাগ রহিয়াছে; তিন ইঞ্চি ব্যাসের নক্ষত্রাকার একটা দাগ। গলিতে মাঝে মাঝে ঝাঁট পড়ে, কিন্তু সম্মার্জনীর তাড়না সত্ত্বেও দাগটা মুছিয়া যায় নাই। দুই তিন দিনের পুরানো দাগ মনে হয়।
কলিলাম, কিসের দাগ?
ব্যোমকেশ উত্তর দিল না, হঠাৎ গলির মধ্যে ডন ফেলার ভঙ্গীতে লম্বা হইয়া দাগের উপর নাসিক স্থাপন করিল। বিস্মিত হইয়া বলিলাম, ওকি! মাটিতে নাক ঘাষছ কেন?
ব্যোমকেশ উঠিয়া দাঁড়াইয়া বলিল, নাক ঘষিনি। শুকছিলাম।
শুকছিলে! কেমন গন্ধ?
যদি জানতে চাও তুমিও শুঁকে দেখতে পার।
আমার দরকার নেই।
তাহলে চল থানায়।
গলি হইতে বাহির হইয়া থানার দিকে চলিলাম। দু'একবার ব্যোমকেশের মুখের পানে অপাঙ্গদৃষ্টি নিক্ষেপ করিলাম, কিন্তু রাস্তার গন্ধ শুঁকিয়া সে কিছু পাইয়াছে কিনা বোঝা গেল না।
থানায় প্রণব দারোগ ঘর আলো করিয়া বসিয়া আছেন। তাঁহার চেহারা মোটের উপর ভালাই, দোহার উজ্জ্বল শামক শরীর; দোষের মধ্যে শরীরের খাড়াই মাত্ৰ পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চি।
ব্যোমকেশকে দেখিয়া তাঁহার চোখে প্ৰথমে বিস্ময়, তারপর ছদ্মবিনয় ভাবে ফুটিয়া উঠিল, তিনি বলিলেন, ব্যোমকশবাবু! উঠেই আপনার মুখ দেখলাম— কী সৌভাগ্য। খিকখিক।
ব্যোমকেশ বলিল, “আমার সৌভাগ্যও কম নয়। সকালবেলা বেঁটে মানুষ দেখলে কী ফল হয় তা শাস্ত্রেই লেখা আছে—রথস্থং বামনং দৃষ্টা পুনর্জন্ম ন বিদ্যুতে।
প্রণব দরোগা থতমত খাইয়া গেলেন। ব্যোমকেশ চিরদিন প্রণব দারোগার ব্যঙ্গ বিদ্রূপ অগ্রাহ্য করিয়া চলিয়াছে, কিন্তু আজ তাহার মেজাজ অন্য রকম। প্রণববাবু প্রত্যাঘাতের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না, তিনি গভীর হইয়া বললেন, আমার চেহারা আকাশ পিদ্দিমের মত নয় তা স্বীকার ব্যোমকেশ হাসিল, স্বীকার না করে উপায় নেই। আকাশ পিদ্দিমের মাথায় আলো জ্বলে; ঐখানেই আপনার সঙ্গে তফাত।
প্রণববাবুর মুখ কালো হইয়া উঠিল, তিনি চেষ্টাকৃত কাষ্ঠহাসি হাসিয়া বলিলেন, কি করব বলুন, সকলের মাথায় তো গ্যাস-লাইট জ্বলে না। —কিছু দরকার আছে কি?
ব্যোমকেশ বলিল, আছে বইকি। প্রথমত, অজিত যে ফেরারী হয়নি তার প্রমাণস্বরূপ ওকে ধরে এনেছি। আপনি নিৰ্ভয়ে থাকুন, আমি ওর ওপর নজর রেখেছি, আমার দৃষ্টি এড়িয়ে ও পালাতে পারবে না।
প্রণববাবু অপ্ৰস্তুতভাবে হাসিবার চেষ্টা করিলেন। ব্যোমকেশ নির্দয়ভাবে বলিয়া চলিল, আপনি অজিতকে শহরবন্দী করে রেখেছেন একথা শুনলে কমিশনার সাহেব কি বলবেন আমি জানি না, কিন্তু জানিবার আগ্রহ আছে। দেশে আইন আদালত আছে, জনসাধারণের স্বাধীনতার ওপর অকারণ হস্তক্ষেপ করলে পুলিস কর্মচারীরাও সাজা হতে পারে। যাহোক, এসব পরের কথা। আমার দ্বিতীয় প্রশ্ন, নটবর নস্করের মৃত্যু সম্বন্ধে আপনি কোনো সংবাদ সংগ্ৰহ করতে পেরেছেন কিনা।
প্রণববাবু এই প্রশ্নের রূঢ় উত্তর দিবেন। কিনা চিন্তা করিলেন। কিন্তু ব্যোমকেশকে তাহার বর্তমান মানসিক অবস্থায় ঘটানো উচিত হইবে না বুঝিয়া তিনি ধীরস্বরে বলিলেন, ব্যোমকেশবাবু, এই কলকাতা শহরের জনসংখ্যা কত আপনার জানা আছে কি?
ব্যোমকেশ তাচ্ছিল্যভারে বলিল, কখনো গুনে দেখিনি, লাখ পঞ্চাশেক হবে।
প্ৰণববাবু বলিলেন, ধরুন পঞ্চাশ লাখ। এই অর্ধকোটি মানুষের মধ্যে থেকে বাদামী আলোয়ান গায়ে একটি লোককে ধরা কি সহজ? আপনি পারেন?
সব খবর পেলে হয়তো পারি।
বািইরের লোককে সব খবর জানানো যদিও আমাদের নীতি বিরুুদ্ধ, তবু যতটুুকু জানি আপনাকে বলতে পারি।
বেশ, বলুন! নটবর নস্করের আত্মীয়-স্বজনের কোনো সন্ধান পাওয়া গেছে?
না। কাগজে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে, কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেনি।
ময়না তদন্তের ফলাফল কি রকম?
বুকের হাড় ফুটাে করে গুলি হৃদযন্ত্রে ঢুকেছে। পিস্তলের সঙ্গে গুলি মিলিয়ে দেখা গেছে, গুলি ওই পিস্তল থেকেই বেরিয়েছে।
আর কিছু?
শিরীর সুস্থই ছিল, কিন্তু চোখে ছানি পড়বার উপক্রম হয়েছিল।
পিস্তলের মালিক কে?
মার্কিন ফৌজি পিস্তল, কালোবাজারে কিনতে পাওয়া যায়। মালিকের নাম জানার উপায় নেই।
ঘর তল্লাশ করে কিছু পেয়েছেন?
দরকারী জিনিস যা পেয়েছি তা ওই টেবিলের ওপর আছে। একটা ডায়েরি, গোটা পাঁচেক টাকা, ব্যাঙ্কের পাস-বুক, আর একটা আদালতের রায়ের বাজাপ্তা নকল। আপনি ইচ্ছে করলে দেখতে পারেন।
ঘরের কোণে একটা টেবিল ছিল, ব্যোমকেশ উঠিয়া সেইদিকে গেল, আমি গোলাম না। প্রণব দারোগা লোক ভাল নয়, তিনি যদি আপত্তি করেন একটা অপ্রীতিকর পরিস্থিতির উদ্ভব হইবে। বসিয়া বসিয়া দেখিলাম, ব্যোমকেশ ব্যাঙ্কের খাতা পরীক্ষা করিল, ডায়েরির পাতা উল্টাইল, স্ট্যাম্প কাগজে লেখা আদালতী দলিল মন দিয়া পড়িল। তারপর ফিরিয়া আসিয়া বলিল, দেখা হয়েছে।
প্রণব দারোগার দুষ্টবুদ্ধি এতক্ষণে আবার চাড়া দিয়াছে, তিনি মিটমিটি চাহিয়া বলিলেন, আমি যা-যা দেখেছি আপনিও তাই দেখলেন। আসামীর নাম-ধাম সব জানতে পেরে গেছেন?
ব্যোমকেশ বলিল, হ্যাঁ, পেরেছি।
ভ্রূ আকাশে তুলিয়া প্রণববাবু বলিলেন, বলেন কি! এরি মধ্যে! আপনার তাে ভারি বুদ্ধি! তা দয়া করে আসামীর নামটা আমায় বলুন, আমি তাকে গ্রেপ্তার করে ফেলি?
ব্যোমকেশ চোয়াল শক্ত করিয়া বলিল, আসামীর নাম আপনাকে বলব না দারোগাবাবু; ওটা আমার নিজস্ব আবিষ্কার। আপনি এই কাজের জন্যে মাইনে খান, আপনাকে নিজে থেকে খুঁজে বার করতে হবে। তবে একটু সাহায্য করতে পারি। মেসের পাশের গলিটা খুঁজে দেখবেন।
সেখানে আসামী তার পদচিহ্ন রেখে গেছে নাকি! খিক্ খিক্।
না, পদচিহ্নের চেয়েও গুরুতর চিহ্ন রেখে গেছে। —আর একটা কথা জানিয়ে যাই। দুচার দিনের মধ্যেই আমি অজিতকে নিয়ে কটকে চলে যাব। আপনার যদি সাহস থাকে তাকে আটকে রাখুন। —চল অজিত।
থানা হইতে বাহির হইয়া আমি উত্তেজিত কণ্ঠে বলিলাম, কে আসামী, ধরতে পেরেছ?
ব্যোমকেশ ঘাড় নাড়িয়া বলিল, থানায় আসার আগেই জানতে পেরেছি, কিন্তু প্ৰণব দরোগা একটা ইয়ে। বুদ্ধি নেই তা নয়, বিপরীত বুদ্ধি। ও কোনো কালে নটাবর নস্করের খুনীকে ধরতে পারবে না।
প্রশ্ন করিলাম, নটবর নস্করের খুনী কে? চেনা লোক?
পরে বলব। আপাতত এইটুকু জেনে রাখো যে, নটবর নস্করের পেশা ছিল ব্ল্যাকমেল করা। তুমি বাসায় ফিরে যাও, আমি অফিস-পাড়ায় যাচ্ছি। কলকাতাতেও গডফ্রে ব্রাউনের প্রকাণ্ড ব্যবসা আছে, তাদের অফিসে কিছু খোঁজ-খবর পাওয়া যেতে পারে। আচ্ছা, আমার ফিরতে দেরি হবে হাত নাড়িয়া সে চলিয়া গেল।
আমি একাকী বাসায় ফিরিলাম। ব্যোমকেশ ফিরিল বেলা তখন দেড়টা।
স্নানাহারের পর সে বলিল, একটা কাজ করতে হবে; বিকেলবেলা তুমি গিয়ে রামবাবুকে, বনমালীবাবুকে এবং ভূপেশবাবুকে চায়ের নেমন্তন্ন করে আসবে। সন্ধের পর এই ঘরে সভা বসবে৷
তথাস্তু। কিন্তু ব্যাপার কি! গডফ্রে ব্রাউনের অফিসে গিয়েছিলে কেন?
থানায় নটাবর নস্করের জিনিসগুলোর মধ্যে একটা আদালতের রায় ছিল। সেটা পড়ে দেখলাম রাসবিহারী বিশ্বাস এবং বনবিহারী বিশ্বাস নামে দুই ভাই গডফ্রে ব্ৰাউন কোম্পানির ঢাকা ব্ৰাঞ্চে যথাক্রমে খাজাঞ্চী ও তস্য সহকারী ছিল। সাত বছর আগে তারা অফিসের টাকা চুরির অপরাধে ধরা পড়ে। মামলা হয় এবং বনবিহারীর দু’বছর ও রাসবিহারীর তিন বছর জেল হয়। সেই মোকদ্দমার রায় নটবর নস্কর যোগাড় করেছিল। তারপর তার ডায়েরি খুলে দেখলাম, প্রতি মাসে সে রাসবিহারী ও বনবিহারী বিশ্বাসের কাছ থেকে আশি টাকা পায়। গডফ্রে ব্রাউনের অফিসে গিয়ে চুরি-ঘটিত মামলার কথা যাচাই করে এলাম। সত্যি ঘটনা। সন্দেহ রইল না, নটবর তাদের ব্ল্যাকমেলা করছিল।
কিন্তু—রাসবিহারী বনবিহারী— এরা কারা? এদের কোথায় খুঁজে পাবে?
বেশি দূর খুঁজতে হবে না, এই মেসের তিন নম্বর ঘরে তাঁদের পাওয়া যাবে।
অ্যাঁ। রামবাবু আর বনমালীবাবু!
হ্যাঁ। তুমি কাছাকাছি আন্দাজ করেছিলে। ওরা মাসতুত ভাই নয়, সাক্ষাৎ সহোদর ভাই। তবে যদি চোরে চোরে মাসতুত ভাই এই প্রবাদ-বাক্যের মর্যাদা রাখতে চাও তাহলে মাসতুত ভাই বলতে পার।
কিন্তু- কিন্তু-এরা তো নটাবর নস্করকে খুন করতে পারে না। নটবর যখন খুন হয় তখন তো ওরা—
হাত তুলিয়া ব্যোমকেশ বলিল, ধৈর্য ধারণ কর। আগাগোড়া কাহিনী আজ চায়ের সময় শুনতে পাবে।
মাড়োয়ারীর দোকানের রকমারি ভাজা ভুজি ও চা দিয়া অতিথি সৎকারের ব্যবস্থা হইয়াছে। প্রথমে দেখা দিলেন ভূপেশবাবু। ধুতি পাঞ্জাবির উপর কাঁধে পাট-করা ধূসর রঙের শাল, মুখে উৎসুক হাসি। বলিলেন, ব্রিজ খেলার ব্যবস্থা আছে নাকি।
ব্যোমকেশ বলিল, আপনারা যদি খেলতে চান ব্যবস্থা করা যাবে।
কিছুক্ষণ পরে রামবাবু ও বনমালীবাবু আসিলেন। গায়ে গলাবন্ধ কোট, চোখে সতর্ক দৃষ্টি। ব্যোমকেশ বলিল, আসুন আসুন।
পানাহারের সঙ্গে ব্যোমকেশ সরস বাক্যালাপ করিতে লাগিল। কিছুক্ষণ পরে লক্ষ্য করিলাম, রামবাবু ও বনমালীবাবুর আড়ষ্ট ভাব শিথিল হইয়াছে। তাঁহারা সহজভাবে কথাবার্তায় যোগ দিতেছেন।
মিনিট কুড়ি পরে জলযোগ সমাপ্ত করিয়া রামবাবু চুরুট ধরাইলেন; ব্যোমকেশ ভূপেশবাবুকে সিগারেট দিয়া সিগারেটের টিন বনমালীবাবুর সামনে ধরিল, আপনি একটা নিন, বনবিহারীবাবু।
বনমালীবাবু বলিলেন, আজ্ঞে, আমি সিগারেট খাই না— বলিয়া একেবারে ফ্যাকাসে হইয়া গেলেন—‘আজ্ঞে— আমার নাম—
আপনাদের দুই ভায়েরই প্রকৃত নাম আমি জানি—রাসবিহারী এবং বনবিহারী বিশ্বাস। ’—ব্যোমকেশ নিজের চেয়ারে গিয়া বসিল, নটাবর নস্কর আপনাদের ব্ল্যাকমেল করছিল। আপনারা মাসে মাসে তাকে আশি টাকা দিচ্ছিলেন—
রাসবিহারী ও বনবিহারী দারুমূর্তির ন্যায় বসিয়া রহিলেন। ব্যোমকেশ নিজে সিগারেট ধরাইয়া ধোঁয়া ছাড়িতে ছাড়িতে বলিল, নটবর নস্কর লোকটা ছিল অতি বড় শয়তান। যখন ঢাকায় ছিল তখন প্রকাশ্যে দালালির কাজ করত, আর সুবিধা পেলে ব্ল্যাকমেলের ব্যবসা চালাত। আপনারা দুই ভাই যখন জেলে গেলেন তখন সে ভবিষ্যতের কথা ভেবে আদালতের রায়ের নকল যোগাড় করে রাখল। মতলব, আপনারা জেল থেকে বেরিয়ে আবার যখন চাকরি-বাকরি করবেন তখন আপনাদের রক্ত শোষণ করবে।
তারপর একদিন দেশ ভাগাভাগি হয়ে গেল। ঢাকায় নটবরের ব্যবসা আর চলল না, সে কলকাতায় পালিয়ে এল। কিন্তু এখানে তার জানা-শোনা লোকের সংখ্যা কম, বৈধ এবং অবৈধ কোনাে রকম ব্যবসারই সুবিধে নেই, ব্ল্যাকমেল করার উপযুক্ত পাত্র নেই। তার ব্যবসায় ভাঁটা পড়ল। এই মেসে এসে একটা ঘর নিয়ে সে রইল; সামান্য যা টাকা সঙ্গে আনতে পেরেছিল তাই দিয়ে জীবন নিবাহ করতে লাগল।
এখানে থাকতে থাকতে হঠাৎ একদিন সে আপনাদের দেখল এবং চিনতে পারল। আপনারা এই মেসেই থাকেন। খোঁজখবর নিয়ে সে জানতে পারল যে আপনারা ছদ্মনামে এক ব্যাঙ্কে চাকরি করছেন। নটবর নস্কর রোজগারের একটা রাস্তা পেয়ে গেল। ভগবান যেন আপনাদের হাত-পা বেঁধে তার হাতে সঁপে দিলেন।
নটবর আপনাদের বলল, টাকা দাও, নইলে ব্যাঙ্কে তোমাদের প্রকৃত পরিচয় জানিয়ে দেব। আপনারা নিরুপায় হয়ে মাসে মাসে টাকা গুনতে লাগলেন। টাকা অবশ্য বেশি নয়, মাসে আশি টাকা। কিন্তু নটবরের পক্ষে তাই বা মন্দ কি। অন্তত মেসের খরচটা উঠে আসে।
এইভাবে চলছিল। আপনাদের প্রাণে সুখ নেই, কিন্তু নটবরের হাত ছাড়ানোর উপায়ও নেই। একমাত্র উপায়, যদি নটবরের মৃত্যু হয়।
ব্যোমকেশ থামিল। রুদ্ধশ্বাস নীরবতা ভাঙিয়া বনবিহারী হাউমাউ করিয়া উঠিলেন, দোহাই ব্যোমকেশবাবু, আমরা নটবর নস্করকে মারিনি। নটবর যখন মরে তখন আমরা ভূপেশবাবুর ঘরে ছিলাম।
‘তা বটে!’ বোমকেশ চেয়ারে হেলান দিয়ে উর্ধ্বদিকে ধোঁয়া ছাড়িল, অবহেলাভরে বলিল, কে নটবরকে খুন করেছে তা নিয়ে আমার মাথা-ব্যথা নেই। মাথা-ব্যথা পুলিসের। কিন্তু আপনারা ব্যাঙ্কে চাকরি করেন। ব্যাঙ্কে যদি কোনো দিন টাকার গরমিল হয় তখন আমাকে আপনাদের আসল পরিচয় প্ৰকাশ করতে হবে।
এবার রামবাবু ওরফে রাসবিহারীবাবু কথা বলিলেন, ব্যাঙ্কের টাকার গরমিল হবে না। আমরা একবার যে-ভুল করেছি। দ্বিতীয়বার সে-ভুল করব না।
ভাল কথা। তাহলে আমি আর অজিত নীরব থাকব। ব্যোমকেশ ভূপেশবাবুর পানে চাহিয়া প্রশ্ন করিল, আপনি?
ভূপেশবাবুর মুখে বিচিত্ৰ হাসি খেলিয়া গেল, তিনি মৃদুস্বরে বলিলেন, আমিও নীরব। আমার মুখ দিয়ে একটি কথা বেরুবে না।
অতঃপর ঘর কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ হইয়া রহিল। তারপর রামবাবু উঠিয়া দাঁড়াইলেন, হাত জোড় করিয়া বলিলেন, আপনাদের দয়া জীবনে ভুলব না। আচ্ছা, আজ আমরা যাই, আমার শরীর একটু অসুস্থ বোধ হচ্ছে।
আসুন। ব্যোমকেশ তাঁহাদের দ্বার পর্যন্ত আগাইয়া দিল, তারপর দ্বার বন্ধ করিয়া ফিরিয়া আসিয়া বসিল।
ভূপেশবাবু ব্যোমকেশের পানে চাহিয়া মৃদু মৃদু হাসিতেছেন দেখিলাম। ব্যোমকেশও প্রত্যুত্তরে হাসিল। ভূপেশবাবু বলিলেন, রামবাবু আর বনমালীবাবুর সঙ্গে নটবর নস্করের অবৈধ যোগাযোগ আছে আমি জানতাম না, ব্যোমকেশবাবু। ওটা সমাপতন। আপনি বােধ হয় সবই বুঝতে পেরেছেন— কেমন?
ব্যোমকেশ গভীর নিশ্বাস ফেলিয়া বলিল, সব বুঝতে পারিনি, তবে মোট কথা বুঝেছি।
ভূপেশবাবু বলিলেন, আপনি তাহলে গল্পটা বলুন। আমার যদি কিছু বলবার থাকে আমি পরে বলব।
ব্যোমকেশ ভূপেশবাবুকে একটি সিগারেট দিল, নিজে একটি ধরাইয়া আমার পানে চাহিয়া ধীরে ধীরে বলিতে আরম্ভ করিল, ‘তুমি নটবরের মৃত্যুর একটা বিবরণ লিখেছ। সেটা পড়ে আমার খটকা লাগল। পিস্তলের আওয়াজ এত জোরে হয় না; এ যেন ছররা বন্দুকের আওয়াজ, কিম্বা বোমা ফাটার আওয়াজ। অথচ নটবর মরেছে পিস্তলের গুলিতে।
রামবাবু এবং বনমালীবাবুর মধ্যে চেহারার সাদৃশ্য তুমি লক্ষ্য করেছিলে। আমি তাঁদের সঙ্গে কথা কয়ে দেখলাম তাঁরা কিছু লুকোবার চেষ্টা করছেন। নটবরের ঘরে তাঁদের যাতায়াত ছিল, সুতরাং তাঁদের সম্বন্ধে আমার মনে কৌতুহল হল।
কিন্তু যখন বন্দুকের আওয়াজ হয় তখন ওঁরা দোতলায় ভূপেশবাবুর ঘরে ছিলেন। ভূপেশবাবুর ঘরের পরিস্থিতি আতিশয় নিরুদ্বেগ ও স্বাভাবিক। তিনি নিজের ঘরে আছেন, ছ’টা বেজে পঁচিশ মিনিটে রাসবিহারী ও বনবিহারী তাস খেলতে এলেন। কিন্তু অজিত না আসা পর্যন্ত তাস খেলা আরম্ভ হচ্ছে না। দুমিনিট পরে সিঁড়িতে অজিতের ফট্ফট্ চটির শব্দ শোনা গেল। ভূপেশবাবু উঠে গিয়ে গলির দিকের জানলা খুলে দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে গলিতে দুম করে শব্দ হল। রাসবিহারী ও বনবিহারী জানালার কাছে গেলেন। ভূপেশবাবু বলে উঠলেন, ঐ-ঐ- গলি থেকে বেরিয়ে গেল, দেখতে পেলেন? গায়ে বাদামী রঙের আলোয়ান—?
গলির মুখের কাছে সদর রাস্তা দিয়ে লোক যাতায়াত করছিল, রাসবিহারী ও বনবিহারী তাদেরই একজনকে দেখে ভাবলেন সে গলি থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। তাঁদের সন্দেহ রইল না যে, ভূপেশবাবু ঠিক কথাই বলছেন। তাঁদের বিশ্বাস হল যে, তাঁরাও লোকটাকে গলি থেকে বেরিয়ে যেতে দেখেছেন। এই ধরনের ভ্রান্তি চেষ্টা করলে সৃষ্টি করা যায়।
পরে নটবরের ঘরের জানলার ওপর পিস্তলটা পাওয়া গেল। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, আততায়ী পিস্তলটিা ফেলে গেল কেন? অস্ত্র ফেলে যাওয়ার কোনো ন্যায্য কারণ নেই। আমার সন্দেহ হল এই সহজ স্বাভাবিক পরিস্থিতির আড়ালে মস্ত একটা ধাপ্পাবাজি রয়েছে।
মেসের চাকর হরিপদ সন্ধ্যে ছ’টার সময় শুনেছিল নটবরের ঘরে লোক আছে। যদি সেই লোকটাই নটবরকে খুন করে থাকে? এবং নিজের অ্যালিবই তৈরি করার জন্যে মৃত্যুর সময়টা এগিয়ে এনে থাকে? পনেরো কুড়ি মিনিটের তফাত ময়না তদন্তে ধরা পড়ে না।
আমার দৃঢ় বিশ্বাস হল, খুন যে-ই করুক, সে বাইরের লোক নয়, মেসের লোক। কিন্তু লোকটা কে? শিবকালীবাবু? রাসবিহারী-বনবিহারী? কিম্বা অন্য কেউ। কার মোটিভ আছে জানি না, কিন্তু সুযোগ আছে একমাত্র শিবকালীবাবুর। অন্য সকলের অকাট্য অ্যালিবাই আছে।
মনটা বাষ্পাচ্ছন্ন হয়ে রইল, কিছুই পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি না। লক্ষ্য করেছিলাম যে, ভূপেশবাবুর ঘরের নীচে নটবরের ঘর এবং গলির দিকে ভূপেশবাবুর জানলার নীচে নটবরের জানলা। কিন্তু পটকার কথা একেবারেই মনে আসেনি। হ্যাঁ, পটকা। যে পটকা আছাড় মারলে কিম্বা উঁচু থেকে শক্ত মেঝের উপর ফেললে আওয়াজ হয়। সেই পটকা।
আজ সকালে থানায় যাচ্ছিলাম, যদি থানায় গিয়ে কিছু নতুন খবর পাই এই আশায়। বেরুবার সময় মনে হল, দেখি তো গলির মধ্যে নটবরের জানলার কাছে কোনো চিহ্ন পাই কিনা।
চিহ্ন পেলাম। ঠিক নটবরের জানলার নীচে ইট-বাঁধানো মেঝের ওপর পটকা ফাটার পাঁশুটে দাগ। শুঁকে দেখলাম অল্প বারুদের গন্ধও রয়েছে। আর সন্দেহ রইল না। চমৎকার একটি অ্যালিবাই সাজানো হয়েছে। কে অ্যালিবাই সাজিয়েছে? ভূপেশবাবু ছাড়া আর কেউ হতে পারে না। কারণ তিনিই জানলা খুলেছিলেন। রাসবিহারী এবং বনবিহারী জানলার কাছে এসেছিলেন আওয়াজ হওয়ার পরে।
সেদিন সন্ধে ছ’টার সময় ভূপেশবাবু অন্ধকারে গা-ঢাকা দিয়ে নিঃশব্দে নীচে নেমে গিয়েছিলেন। পিস্তল আগে থাকতেই যোগাড় করা ছিল, তিনি নটবরের ঘরে ঢুকে নিজের পরিচয় দিয়ে তাকে গুলি করলেন। গলির দিকের জানলা খুলে দিয়ে সেখানে পিস্তল রেখে নিজের ঘরে ফিরে এলেন। ভাগ্যক্রমে কেউ তাঁর যাতায়াত দেখতে পেল না। কিন্তু যদি কেউ দেখে ফেলে থাকে তাই অ্যালিবাই দরকার। তিনি নিজের ঘরে এসে অপেক্ষা করতে লাগলেন। দশ মিনিট পরে রাসবিহারী ও বনবিহারী তাস খেলতে এলেন। কিন্তু অজিত তখনো আসেনি, তাই তিনজনে অপেক্ষা করতে লাগলেন।
তারপর ভূপেশবাবু সিঁড়িতে অজিতের চটির ফট্ফট্ শব্দ শুনতে পেলেন। তিনি তৈরি ছিলেন, তাঁর মুঠোর মধ্যে ছিল একটি মার্বেলের মত পটকা। ঘরের বন্ধ হাওয়ার অজুহাতে তিনি গলির দিকের জানলা খুলে দিলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে মুঠি থেকে পটকাটি জানলার বাইরে ফেলে দিলেন। নীচে দুম করে শব্দ হল। রাসবিহারী ও বনবিহারী ছুটে জানলার কাছে গেলেন; ভূপেশবাবু তাঁদের বাদামী আলোয়ান গায়ে কাল্পনিক আততায়ী দেখালেন।
তারপর ভূপেশবাবুকে আর কিছু করতে হল না; স্বাভাবিক নিয়মে যথাসময়ে লাশ আবিষ্কৃত হল। পুলিস এল, লাশ নিয়ে চলে গেল। যবনিকা পতন।
ব্যোমকেশ চুপ করিল। ভূপেশবাবু এতক্ষণ নিবাত নিষ্কম্প বসিয়া শুনিতেছিলেন, এখনো নিশ্চল বসিয়া রছিলেনন। ব্যোমকেশ তাঁহার পানে ভ্রূ বাঁকাইয়া বলিল, কোথাও ভুল পেলেন কি?
ভূপেশবাবু এবার নড়িয়া চড়িয়া বসিলেন, স্মিতমুখে মাথা নাড়িয়া বলিলেন, না, ভুল পাইনি। ভুল আমিই করেছিলাম, ব্যোমকেশবাবু। আপনি যে এত তাড়াতাড়ি ফিরে আসবেন তা ভাবিনি। ভেবেছিলাম আপনি ফিরে আসতে আসতে নটবরের মামলা ঠাণ্ডা হয়ে যাবে।
ব্যোমকেশ একটু হাসিল, বলিল, দুটাে প্রশ্নের উত্তর পাইনি। এক, আপনার মোটিভ কি। দুই, পিস্তলের আওয়াজ চাপা দিলেন কেমন করে। বন্ধ ঘরের মধ্যে পিস্তল ছুঁড়লেও আওয়াজ বাইরে যাবার সম্ভাবনা। এ বিষয়ে আপনি কি কোনো সতর্কতাই অবলম্বন করেননি?
দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর আগে দিচ্ছি— ভূপেশবাবু কাঁধ হইতে পাট-করা শাল লইয়া দুই হাতে আমাদের সামনে মেলিয়া ধরিলেন; দেখিলাম নুতন শালের গায়ে একটি ক্ষুদ্র ছিদ্র রহিয়াছে। তিনি বললেন, এই শাল গায়ে জড়িয়ে নটবরের ঘরে গিয়াছিলাম, শালেল মধ্যেই চাপা ছিল। নটবরকে শালের ভিতর থেকে গুলি করেছিলাম; গুলির আওয়াজ শালের মধ্যেই চাপা। পড়েছিল, বাইরে যেতে পারেনি।
ব্যোমকেশ আস্তে আস্তে ঘাড় নাড়িল। বলিল, আর প্রথম প্রশ্নের উত্তর? আমি কতকটা আন্দাজ করেছি; কাল আপনি ছেলের ফটাে দেখিয়েছিলেন। যাহোক, আপনি বলুন।
ভূপেশবাবুর কপালের শিরা দপদপ করিয়া উঠিল, কিন্তু তিনি সংযত স্বরেই বলিলেন, ছেলের ফটো দেখিয়েছিলাম, কারণ আমি বুঝতে পেরেছিলাম আপনি সত্য আবিষ্কার করবেন। তাই আগে থেকে নিজের সাফাই গেয়ে রেখেছিলাম। ঢাকায় যেদিন দাঙ্গা বাধে সেদিন নটবর আমার ছেলেকে স্কুল থেকে ভুলিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। সেদিন সন্ধের পর সে আমার বাসায় এসে বলল, দশ হাজার টাকা পেলে আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দিতে পারে। নগদ দশ হাজার টাকা আমার কাছে ছিল না; যা ছিল সব দিলাম, আমার স্ত্রী গায়ের সমস্ত গয়না খুলে দিলেন। নটবর সব নিয়ে চলে গেল, কিন্তু আমি ছেলেকে ফিরে পেলাম না। নটবরের দেখাও আর পেলাম না। তারপর কয়েক বছর কেটে গেছে, আমি স্ত্রী-পুত্ৰ হারিয়ে কলকাতায় চলে এসেছি, হঠাৎ একদিন রাস্তায় নটবরকে দেখতে পেলাম। তারপর—
ব্যোমকেশ বলিল, বুঝেছি। আর বলবার প্রয়োজন নেই, ভূপেশীবাবু।
ভূপেশবাবু কিছুক্ষণ নিশ্চেষ্ট থাকিয়া শেষে বলিলেন, এখন আমার সম্বন্ধে আপনি কি করতে চান?
ব্যোমকেশ উর্ধ্বদিকে ক্ষণেক চাহিয়া রহিল, তারপর বলিল, সাহিত্য সম্রাট শরৎচন্দ্ৰ কোথায় যেন একবার বলেছিলেন, ‘দাঁড় কাক মারলে ফাঁসি হয় না।’ আমার বিশ্বাস শকুনি মারলেও ফাঁসি হওয়া উচিত নয়। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।
রুম নম্বর দুই
নিরুপমা হোটেলের ম্যানেজার হরিশচন্দ্র হোড় ঘুম ভেঙেই ঘড়ি দেখলেন–সাড়ে, ছটা। তিনি ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসলেন। ইঃ, আজ বেজায় দেরি হয়ে গেছে। তিনি ডাকলেন, ‘গুণধর!’
তকমা-উর্দি পর সদর খানসামা গুণধর এসে দাঁড়াল। শীর্ণকান্তি অত্যন্ত কর্মকুশল চৌকশ লোক, হোটেলের প্রত্যেকটি খুঁটিনাটির প্রতি নজর আছে। হরিশচন্দ্র তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘বেড-টি দেওয়া হয়েছে?’
গুণধর বলল, ‘আজ্ঞে। তেতলার সবাই চা নিয়েছেন, কেবল দোতলার দুনম্বর ঘরে টোকা দিয়ে সাড়া পেলাম না।’
হরিশচন্দ্র বললেন, ‘দোতলার দু’নম্বর–রাজকুমারবাবু। পনেরো মিনিট পরে আবার টোকা দিও।–বাজারে কে গেছে?’
‘জেনারেলকে নিয়ে সরকার মশায় গেছেন।’
‘বেশ। আমার চা নিয়ে এস।’ হরিশচন্দ্র উঠে কক্ষ-সংলগ্ন বাথরুমে প্রবেশ করলেন।
রাসবিহারী অ্যাভেন্ম ও গড়িয়াহাটার চৌমাথা থেকে অনতিদূরে নিরুপমা হোটেল। দেশী হোটেল হলেও তার ভাবভঙ্গী একটু বিলিতি-ঘেষা। চাকরেরা খানসামার মত তকমা-উর্দি পারে, সদর দরজার সামনে সকাল বিকেল জেনারেলের মত সাজপোশাক পরা দারোয়ান দাঁড়িয়ে থাকে এবং যোগ্য ব্যক্তিকে সেলাম করে। তিনতলা বাড়ির প্রত্যেক তলায় আটখানি ঘর। নীচের তলায় ম্যানেজারের দু’টি ঘর, বাসকক্ষ ও অফিস; টেবিল চেয়ার দিয়ে সাজানো ডাইনিং রুম; রান্নাঘর, বাবুর্চিখানা, চাকরদের ঘর, স্টোর-রুম ইত্যাদি। হোটেলে দেশী ও বিলিতি দুরকম খাদ্যই পাওয়া যায়, যার যেমন ইচ্ছা খেতে পারেন। হোটেলে থাকার মাশুল বিলিতি হোটেলের চেয়ে কম, কিন্তু সাধারণ দেশী হোটেলের চেয়ে বেশি। ছোট হোটেল, তাই অধিকাংশ সময়ই পূর্ণ থাকে, উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অতিথি এখানে আসেন।
আধঘণ্টা পরে হরিশচন্দ্র বাথরুম থেকে বিলিতি পোশাক পরে বেরুলেন। দোহারা আকৃতির লোক, তাই কোট-প্যান্ট পরলে বেশ মানায়; বয়স আন্দাজ পায়তাল্লিশ, চোখের দৃষ্টিতে অভিজ্ঞতা এবং সংসারবুদ্ধি পরিস্ফুট।
টেবিলের ওপর চা এবং প্রাতরাশ সাজিয়ে গুণধর দাঁড়িয়ে ছিল, হরিশচন্দ্র খেতে বসলেন। চা টেস্ট মাখন ও দু’টি অর্ধ সিদ্ধ ডিম। আহারের সময় হরিশচন্দ্র কথা বলেন না, পাঁচ মিনিটের মধ্যে প্রাতরাশ শেষ করে মুখ মুছতে মুছতে বললেন, ‘রাজকুমারবাবুর খবর আর নিয়েছিলে?’
গুণধার বলল, ‘আম্ভেজ্ঞ, এবারও সাড়া পাওয়া গেল না।’
হরিশচন্দ্র ভ্রূকুটি করলেন। তারপর উঠে অফিস-ঘরে গেলেন। দেরাজ থেকে চাবির গোছা নিয়ে পকেটে ফেললেন, ‘চল, দেখি।’
ফাল্গুন মাস হলেও সাতটার সময় বেলা চড়েছে; কলতলায়, রান্নাঘরে, ডাইনিং রুমে বিষ্ণু-চাকরের কর্মতৎপরতা। আটটার সময় অতিথিদের ব্রেক-ফার্স্ট দিতে হবে।
সিঁড়িতে উঠতে উঠতে হরিশচন্দ্র পশ্চাদ্বতী গুণাধরকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কাল রাত্তিরে
গুণধর বলল, ‘আজ্ঞে, ছিলেন। রাত্রি পৌঁনে ন’টার সময় আমি নিজের হাতে তাঁকে ডিনার পৌছে দিয়েছি।’
‘রাত্তিরে সদর দরজা। কখন বন্ধ হয়েছিল?’
‘আপনি ফিরলেন এগারোটার সময়, তারপর আমি সদর বন্ধ করেছি।’
দোতলায় এক সারিতে আটটি ঘর, সামনে টানা বারান্দা। সিঁড়ির মুখেই ঘরের নম্বর আরম্ভ হয়েছে। সব দরজা ভেজানো। হরিশচন্দ্র দুনম্বর ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে একটু কড়াভাবে টোকা দিলেন।
কেউ সাড়া দিল না। হরিশচন্দ্র তখন ডাক দিলেন, ‘রাজকুমারবাবু!’
এবারেও সাড়া এল না। হরিশচন্দ্র আরো গলা চড়িয়ে ডাকলেন, ‘রাজকুমারবাবু!’ তবু সাড়া নেই। হরিশচন্দ্র তখন দোরের হ্যান্ডেল ঘোরালেন, কিন্তু হ্যান্ডেল ঘুরল না। দোরে ইয়েল তালা লাগানো, চাবি না ঘোরালে বাইরে থেকে দোর খুলবে না।
হরিশচন্দ্র পকেট থেকে চাবির গোছা বার করলেন। এই সময় দুনম্বর ঘরের দুদিক থেকে দরজা খুলে দু’টি মুণ্ড উঁকি মোরল। এক নম্বর থেকে যিনি উঁকি মারলেন তিনি একটি বর্ষীয়সী। মহিলা। জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কী হয়েছে?’ তিন নম্বর ঘর থেকে গলা বাড়িয়েছিলেন মধ্যবয়স্ক একটি পুরুষ; বললেন, ম্যানেজারবাৰু্্, আমার জ্বর হয়েছে শীগগির একজন ডাক্তার ডেকে পাঠান।
মহিলাটি বেরিয়ে এলেন, বললেন, ‘আমি ডাক্তার।’ তিনি হরিশ্চন্দ্বকে পেরিয়ে তিন নম্বর ঘরের সামনে গেলেন। তিন নম্বরের অধিবাসী শচীতোষ সান্যাল আরক্ত চক্ষু বিস্ফারিত করে একবার ডাক্তারের পানে তাকালেন, তারপর দরজা থেকে সরে গিয়ে বললেন, ‘আসুন।’
হরিশচন্দ্র গোছা থেকে চাবি বেছে নিয়ে তালায় পর্যালেন, দরজা একটু ফাঁক করে ভিতরে দেখলেন; কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন, তারপর দরজা টেনে আবার বন্ধ করে দিলেন।
বারান্দায় কেউ নেই। হরিশচন্দ্র এদিক ওদিক তাকিয়ে খাটো গলায় গুণধারকে বললেন, ‘গুণধর, তুমি এখানে থাকো, কোথাও যেও না। আমি এখনি আসছি।’ তাঁর কণ্ঠস্বর চাপা। উত্তেজনায় শীৎকারের মত শোনাল।
তিনি পা টিপে টিপে নীচে নেমে গেলেন। তিন নম্বর ঘরে মহিলা ডাক্তার শোভনা রায় রোগী শচীতোষ সান্যালকে বিছানায় শুইয়ে তাঁর টেম্পরেচার নিলেন, নাড়ি দেখলেন, জিভ পরীক্ষা করলেন। তারপর বললেন, ‘কিছু নয়, সামান ঠাণ্ডা লেগেছে। দুটো অ্যাসপিরিনের বড়ি খেয়ে শুয়ে থাকুন।’
শচীতোষ বললেন, ‘জ্বর কত?’
‘নাইনটি-নাইন।’
‘গায়ে যে ভীষণ ব্যথা।’
‘ও কিছু নয়। দো-রসার সময় হঠাৎ ঠাণ্ডা লেগে যায়। আমি অ্যাসপিরিনের বড়ি পাঠিয়ে ििछ!’
‘আপনার ফি কত?
‘ফি দিতে হবে না।’
তিন নম্বর থেকে বেরিয়ে শোভনা রায় দেখলেন, গুণধর দুনিম্বরের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এ ঘরে কী হয়েছে?’
গুণধর কেবল মাথা নাড়ল। শোভনা রায় আর কোনো প্রশ্ন না করে নিজের ঘরে প্রবেশ করলেন।
নীচে হরিশচন্দ্র তখন নিজের অফিস-ঘর থেকে পুলিসকে ফোন করছেন, ‘শীগগির আসুন, খুন হয়েছে–!’
গত রাত্রে ইন্সপেক্টর রাখাল সরকারের বাড়িতে সত্যান্বেষী ব্যোমকেশের নেমন্তন্ন ছিল। সরকার মশায় দক্ষিণ কলকাতার একটি থানার অধিকারী থানাদার। ব্যোমকেশরা যখন কেয়াতলায় জমি কিনে বাড়ি তৈরি করতে আরম্ভ করেছিল তখন তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল; পরিচয় ক্রমে বন্ধুত্বে পরিণত হলো। সরকার মশায় পুলিস হলেও অত্যন্ত মিশুক এবং সহৃদয় বুড়ি বয়সে বোমকেশের চেয়ে কিছু ছোট, তাই বন্ধুত্বের সঙ্গে অনেকখানি সম্ভ্রম মেশানো ছিল।
ব্যোমকেশের সঙ্গে অজিতও এসেছিল নেমন্তন্ন খেতে। গল্পসল্প চলল। অনেক রাত পর্যন্ত। রাত বাড়ল কিন্তু গল্প শেষ হলো না। খাওয়া-দাওয়ার পর অজিত উঠি-উঠি করছে দেখে রাখালবাবু বললেন, ‘ব্যোমকেশদা, আপনি আজ রাতটা না হয় এখানেই থেকে যান। কাল সকালে একেবারে বড়ির কাজ তদারক করে বাসায় ফিরবেন।‘
ব্যোমকেশ বলল, ‘মন্দ কথা নয়। অজিত তুমি আজ ফিরে যাও, আমি কাল কাজকর্ম দেখে ফিরব।’
অজিত চলে গেল। কলকাতা শহরে এপাড়া থেকে ওপাড়া যাওয়া বিদেশ-যাত্রার সমান।
পরদিন সকাল পৌনে আটটার সময় ব্যোমকেশ চা-জলখাবার খেয়ে বেরুবার উপক্রম করছে। এমন সময় টেলিফোন বেজে উঠল। রাখালবাবু ফোন ধরে কিছুক্ষণ নিবিষ্ট মনে শুনলেন : দুএকটা কথা বললেন, তারপর ফোন রেখে দিয়ে ব্যোমকেশকে বললেন, ‘থানা থেকে বলছিল। আমার এলাকায় একটা হোটেলে খুন হয়েছে। বেশ রহস্যময় ব্যাপার মনে হচ্ছে। আপনি যাবেন আমার সঙ্গে?’
ব্যোমকেশ বলল, ‘রহস্যময় খুন! নিশ্চয় যাব।’
ইন্সপেক্টর রাখাল সরকার ব্যোমকেশকে নিয়ে যখন নিরুপমা হোটেলে পৌঁছুলেন তখন থানা থেকে দু’জন সাব-ইন্সপেক্টর সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে এসে হোটেল দখল করেছে। সদর দরজায় একজন কনস্টেবল দাঁড়িয়ে আছে। হোটেলের লোককে হোটেলে রাখা হয়েছে, বাইরের লোককে বাইরে।
রাখালবাবু্, হরিশচন্দ্রের অফিসে প্রবেশ করে দেখলেন, পুলিসের ডাক্তার কালো ব্যাগ নিয়ে অপেক্ষা করছেন। রাখালবাবু বললেন, ‘এই যে ডাক্তার এসে গেছেন দেখছি–আপনি হোটেলের ম্যানেজার?’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ।’
‘আপনিই লাশ আবিষ্কার করেছেন?’
‘হ্যাঁ।’
ইন্সপেক্টর সরকার এবং ব্যোমকেশ বক্সী পাশাপাশি চেয়ারে বসলেন, রাখালবাবু বললেন, ‘বেশ। আপনি কী জানেন সংক্ষেপে বলুন।’
আজ সকাল থেকে যা যা ঘটেছিল হরিশচন্দ্র বললেন। শুনে রাখালবাবু ব্যোমকেশের দিকে তাকালেন, ব্যোমকেশ একটু ঘাড় নাড়ল। রাখালবাবু তখন উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘আপনি ঠিক কাজ করেছেন। চলুন ডাক্তার, এবার লাশ পরিদর্শন করা যাক।।’
হরিশচন্দ্র আগে আগে সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় চললেন; তাঁর পিছনে রাখালবাবু্, ব্যোমকেশ ও ডাক্তার।
দোতলায় দুনম্বর ঘরের সামনে গুণধরের বদলে একজন কনস্টেবল দাঁড়িয়ে আছে। হরিশচন্দ্র চাবি দিয়ে ঘর খুলে দিলেন। তখন ঘরের ভিতরটি দেখা গেল।
ঠিক দরজার সামনে মেঝের ওপর একটি পুরুষের মৃতদেহ ডানদিকে কত হয়ে পড়ে আছে; পরনে লুঙ্গি এবং গেঞ্জি। মুখখানা দেখে চমকে উঠতে হয়; কেউ যেন ধারালো ছুরি দিয়ে মুখখানাকে ফাল-ফালা করে কেটেছে, তারপর অত্যন্ত অযত্নভরে আবার জোড়া দিয়েছে। কাটা দাগগুলো তাজা নয়, অনেকদিনের পুরনো; শুকনো ক্ষতের দাগ মুখখানাকে কদাকার করে দিয়েছে।
মৃত্যুর কারণ কিন্তু অন্যত্র। গেঞ্জির বুকের ওপর খানিকটা রক্ত শুকিয়ে আছে।
দোরের কাছ থেকে কিছুক্ষণ মৃতদেহ পরিদর্শন করে রাখালবাবু বললেন, ‘ডাক্তার, আপনি আগে লাশ পরীক্ষা করুন। আপনার কাজ হয়ে গেলে আমরা ঘরে ঢুকব।’
ডাক্তার ঘরে প্রবেশ করলেন, বাকি তিনজন লাশের দিকে একদৃষ্টি তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। ব্যোমকেশ একবার আড়চোখে হরিশচন্দ্রের মুখের পানে তাকালো, কিন্তু সেখানে ভয়ার্তি ছাড়া আর কিছুই দেখতে পেল না।
‘কী ব্যাপার বলুন দেখি? আমাকে এখনি বেরুতে হবে, কিন্তু পুলিস বেরুতে দিচ্ছে না। এর মানে কি?’ মহিলা কণ্ঠের উষ্ণ স্বর শুনে তিনজনে পিছু ফিরে তাকালেন। একটি মহিলা ক্রুদ্ধ ভঙ্গীতে দাঁড়িয়ে আছেন দেখে রাখালবাবু প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি কে?’
হরিশচন্দ্র পরিচয় করিয়ে দিলেন, ‘ইনি এক নম্বর ঘরে থাকেন, ডক্টর মিসেস শোভনা রায়।’
রাখালবাবু মিনতির সুরে বললেন, ‘দেখুন, এই ঘরে কাল রাত্রে এক ভদ্রলোক খুন হয়েছেন। এ হোটেলে যাঁরা আছেন। সকলকেই আমাদের জেরা করতে হবে। জেরা করার আগে কাউকে বাইরে যেতে দিতে পারি না। কিন্তু আপনি নিশ্চিন্তু থাকুন, সকলের আগে আমি আপনাকে জেরা করে ছেড়ে দেব।’
মহিলাটির মুখের ভাব বদলে গেল, তিনি শঙ্কিত চক্ষে চেয়ে বললেন, ‘খুন হয়েছে! আমার পাশের ঘরে খুন হয়েছে। কখন? কে খুন করেছে?’
ইন্সপেক্টর মাথা নেড়ে বললেন, ‘তা এখনো জানা যায়নি। আপনি নিজের ঘরে গিয়ে বসুন, আমরা এখনি আসছি।’
মহিলাটি একটু ইতস্তত করলেন, একবার দুনম্বর ঘরের দিকে উঁকি মারলেন, তারপর নিজের ঘরে গিয়ে দরজা ভেজিয়ে দিলেন।
ইতিমধ্যে সাব-ইন্সপেক্টর দু’জন উপস্থিত হয়েছিল, রাখালবাবু তাদের বললেন, ‘তোমরা একজন তেতলায় এবং একজন দোতলায় যত অতিথি আছেন। সকলের নাম-ধাম ঠিকানা নিয়ে নাও, কাল রাত্রে কে কোথায় ছিল খবর নাও। কেবল এক নম্বর আর তিন নম্বর ঘরে তোমাদের যাবার দরকার নেই, ওঁদের আমি জেরা করব।’
সাব-ইন্সপেক্টর দু’জন চলে গেল।
পাঁচ মিনিট পরে ডাক্তার ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। বললেন, ‘এবার লাশ সরাতে পারেন।’
রাখালবাবু বললেন, ‘কি দেখলেন?’
ডাক্তার উত্তর দিলেন, ‘ছুরির আঘাতে মৃত্যু হয়েছে; ছুরি কিংবা ওই রকম কোনো সরু ধারালো অস্ত্র। পাঁজরার ফাঁক দিয়ে একেবারে হৃদযন্ত্রে প্রবেশ করেছে। এ পেশাদার খুনীর কাজী : ওই একটি বই ক্ষতচিহ্ন নেই, প্রথম মারেই মর্মস্থানে পৌঁচেছে।’
‘হুঁ। মৃত্যুর সময়?’
‘অটপ্সি না করে নিশ্চয়ভাবে বলা শক্ত, সম্ভবত কাল রাত্ৰি নটা থেকে বারোটার মধ্যে।’
ব্যোমকেশ বলল, ‘মুখের দাগগুলো কতদিনের পুরনো?’
‘দশ বারো বছরের কম নয়।’ ‘বয়স কত হবে? মুখ দেখে তো বোঝা যায় না।’
‘চল্লিশের আশেপাশে–আচ্ছা, এখন আমি চলি। তাড়াতাড়ি লাশ পাঠিয়ে দেবেন, আজই কাটবো। কাল রিপোর্ট পাবেন।’ ডাক্তার চলে গেলেন।
রাখালবাবু হরিশচন্দ্রকে বললেন, ‘আপনি নিজের কাজে যান। অফিসেই থাকবেন। এ ঘরের চাবিটা আমায় দিন।’
আধঘণ্টা পরে লাশ চালান করে দিয়ে রাখালবাবু ব্যোমকেশের পানে তাকালেন। অর্থাৎ—অতঃ কিম?
ব্যোমকেশ এক নম্বর ঘরের দিকে আঙুল দেখালে, ‘মহিলাটির সওয়াল-জবাব আগে সেরে নিন। মহিলা এবং ডাক্তারের অধিকার আগে।’
‘ঠিক ঠিক। ওঁকে ছেড়ে দিয়ে তারপর এ ঘরটা দেখা যাবে।’ রাখালবাবু দুনম্বরের দোরে ঢাবি দিয়ে বললেন, ‘আসুন।’
এক নম্বরের দোরে টোকা দিতেই দোর খুলে গেল। মহিলাটির মুখ অপ্রসন্ন। তাঁর বেঁটে নিরেট গোছের শরীরটি আঁটসাঁট পোশাকের মধ্যে যেন অধীরতায় ফেটে পড়বার উপক্রম করছে। তিনি বললেন, ‘যত শীগগির পারেন আমাকে ছেড়ে দিন দারোগাবাবু। আমার কাজের ক্ষতি হচ্ছে।’
‘দুচারটে প্রশ্ন করেই আপনাকে ছেড়ে দেব।’ রাখালবাবু খাতা পেন্সিল বার করে প্রশ্ন আরম্ভ করলেন, ‘আপনার পুরো নাম?’
‘মিসেস শোভনা রায়।’
‘বয়স?’
‘উনপঞ্চাশ।’
‘স্বামীর নাম?’
‘স্বর্গীয় রামরতন রায়।’
‘আপনি ডাক্তার। কোথায় ডাক্তারি করেন?’
‘বহরমপুরে।’
‘কলকাতায় এসেছেন কেন?’
‘আমি গাইনকোলজিস্ট, প্রধানত স্ত্রী-রোগের চিকিৎসা করি। সেবা সদনের সঙ্গে আমার যোগাযোগ আছে, মাঝে মাঝে আসি।’
‘কলকাতায় আপনার আত্মীয়স্বজন কেউ নেই?’
‘আমার কোথাও কেউ নেই।’
‘ছেলে।পুলে?’
না। একটা মেয়ে ছিল, অনেকদিন মরে গেছে।’
মিসেস রায়ের মুখ ক্ষণেকের জন্য কঠিন হয়ে উঠল, তারপর আবার স্বাভাবিক হলো। মহিলাটির মুখখানি সুশ্ৰী নয়, কঠিন হলে আরো কুশ্রী দেখায়।
‘কলকাতায় যখন আসেন। এখানেই ওঠেন?’
‘হ্যাঁ। এখানে উঠলে সুবিধে হয়।’
‘এবার কবে এসেছেন?’
‘পরশু।‘
‘কাল রাত্রে পাশের ঘরে রাজকুমার বসু নামে এক ভদ্রলোক খুন হয়েছেন। তাঁকে আপনি চিনতেন?’
‘না, কখনো নাম শুনিনি।’
‘আগে কখনো দেখেননি? পাশাপাশি ঘরে ছিলেন। তাই জিজ্ঞাসা করছি।’
‘না। ও মুখ দেখলে মনে থাকত।’
‘কাল রাত্রি আটটার পর আপনি কোথায় ছিলেন?’
‘আটটার সময় আমি সেবা সদন থেকে ফিরে আসি।। ঘরে এসে হাত-মুখ ধুয়ে কাপড়-চোপড় বদলে নীচে ডাইনিং রুমে খেতে গেলুম। ন’টার আগেই ঘরে ফিরে এলুম। তারপর আর ঘর থেকে বেরোইনি।’
‘রাত্রে কিছু জানতে পেরেছিলেন?’
‘আমি সওয়া ন’টার সময় শুয়ে পড়েছিলুম; কিন্তু বার বার ঘুমের বিঘ্ন হচ্ছিল। পাশের ঘরের শব্দে চটকা ভেঙে যাচ্ছিল।’
‘পাশের ঘরে শব্দ হচ্ছিল?’
‘ঘরে শব্দ হচ্ছিল। কিনা শুনতে পাইনি। কিন্তু ঘরের দরজা বার বার খুলছিল। আর বন্ধ হচ্ছিল।’
‘রাত্রি তখন কত?’
‘ঘড়ি দেখিনি। আন্দাজ সাড়ে ন’টা থেকে দশটার মধ্যে।’
‘আপনি কিছু করলেন?’
‘কী করব! হোটেলে অনেক অবিবেচক লোক আসে, তারা পরের সুবিধা অসুবিধা বোঝে না।’
‘আজ সকলে কখন জানতে পারলেন?’
‘খুন হয়েছে আপনার কাছে জানলাম। ভোরবেলা চাকর বেড়-টি দিয়ে গেল। তারপর আমি তৈরি হয়ে বেরুতে যাচ্ছি, নীচে ব্রেক-ফার্স্ট খেয়ে কাজে যাব, এমন সময় পাশের ঘরে দোর-ঠেলাঠেলি চেঁচামেচি শুনতে পেলুম। বেরিয়ে দেখলুম ম্যানেজার; জিজ্ঞেস করলুম কী হয়েছে, সে কিছু বলল না। তারপর তিন নম্বর ঘরে গেলাম—’
‘তিন নম্বর ঘরে গেলেন কেন?’
‘তিন নম্বরের ভদ্রলোকটির শরীর খারাপ হয়েছে, ডাক্তার খুঁজছিলেন। তাই তাঁকে দেখতে গিয়েছিলুম।’
‘তাকে আগে থাকতে চিনতেন বুঝি?
‘দেখেছি। কিন্তু চেনা-পরিচয় কিছু ছিল না। তাঁর নামও জানি না।
‘ও-কি হয়েছে ভদ্রলোকের?’
‘ঠাণ্ডা লেগে সামান্য জ্বর হয়েছে।’
রাখালবাবু ব্যোমকেশের পানে তাকালেন, ব্যোমকেশ মাথা নেড়ে জানাল আর কোনো প্রশ্ন নেই। রাখালবাবু শোভনা রায়কে বললেন, ‘আপাতত আর কোনো প্রশ্ন নেই, আপনি কাজে যেতে পারেন। কিন্তু আমাদের না জানিয়ে কলকাতা ছাড়বেন না।’
শোভনা রায়ের মুখ বিরক্ত হয়ে উঠল। তিনি উত্তর না দিয়ে ব্যাগ হাতে উঠে দাঁড়ালেন।
দুনম্বর ঘরের দরজা খুলতে খুলতে রাখালবাবু বললেন, ‘মহিলাটির মেজাজ একটু কড়া। ভয় পাননি; বোধহয় পুলিসের কার্যকলাপের সঙ্গে পরিচয় আছে। ডাক্তার তো।—যাহোক, আসুন দেখা যাক ঘরের মধ্যে আততায়ী কোনো চিহ্ন রেখে গেছে। কিনা।–কনস্টেবল হাজরা, তুমি নীচে গিয়ে হেড-অফিসে ফোন করে–যেন ফিঙ্গারপ্ৰিণ্ট এক্সপার্টদের পাঠানো হয়।’ কেলেস্টরল সালুট করে চলে গেল। য়াখালবাবু ব্যোমকেশকে নিয়ে ঘরে ঢুকে দোর ভেজিয়ে
ঘরটি আয়তনে দশ ফুট বাই বারো ফুট। একটি একহারা লোহার খািট; ছোট টেবিল এবং চেয়ার, দেয়ালে আয়না লাগানো। তার পাশে কাপড় রাখার আলনা; মাথার ওপর ফ্যান। দু’জনে ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে চারিদিকে দৃষ্টি ফেরালেন।
রাখালবাবু বললেন, ‘বিছানাটা দেখেছেন?’
‘দেখেছি। বিছানা এবং আলনা— দুইই দ্রষ্টব্য।’
বিছানা দেখে মনে হয় কাল রাত্রে রাজকুমার বসু বিছানায় শুয়েছিল; চাদর একটু কুঁচকে আছে, বালিশের ওপর মাথার দাগ। আলনায় একটি কোঁচানো ধুতি ও পাঞ্জাবি টাঙানো রয়েছে।
রাখালবাবু বললেন, ‘হুঁ। কি মনে হচ্ছে?’
‘মনে হচ্ছে কাল রাত্রে রাজকুমার বসু কাপড় পাঞ্জাবি ছেড়ে লুঙ্গি আর গেঞ্জি পরে শুয়েছিল। তারপর একসময় দোরে টোকা পড়ল। রাজকুমার বিছানা থেকে উঠে যেই দোর খুলল আততায়ী অমনি বাইরে থেকে তার বুকে ছুরি মারল। রাজকুমার পড়ে গেল। আর উঠল না। আততায়ী দরজা টেনে বন্ধ করে চলে গেল। আমার বিশ্বাস আততায়ী ঘরে ঢোকেনি, ফিঙ্গারপ্ৰিণ্ট এক্সপার্ট রাজকুমার ছাড়া আর কারুর আঙুলের ছাপা ঘরের মধ্যে পাবে না। দোরের হাতলে আততায়ীর আঙুলের ছাপা হয়তো ছিল, কিন্তু এখন আর পাওয়া যাবে না। তার ওপর আরো অনেক আঙুলের ছাপা পড়েছে।’
রাখালবাবু বললেন, ‘তা বটে। তবু অধিকন্তু ন দোষায়। আসুন, ঘরটা তল্লাশ করে দেখা यांक।?
ব্যোমকেশ বলল, ‘আপনি তল্লাশ করুন। আমি কোনো জিনিসে হাত দেব না, তাতে আঙুলের ছাপ বেড়ে যাবে।’
‘বেশ, আপনি তাহলে দাঁড়িয়ে তদারক করুন।’
রাখালবাবু বিধিবদ্ধভাবে তল্লাশ আরম্ভ করলেন। টেবিলের দেরাজ, পাঞ্জাবির পকেট, বিছানার তেশকের নীচে, সর্বত্র অনুসন্ধান করলেন। কিন্তু কিছু পেলেন না। অবশেষে খাটের তলা শুধু একটা সুটকেস টেন বার করলেন। মৃতের এই একটিমাত্র মাল ধরে আছে, আর কিছু নেই।
সুটকেসের গায়ে চাবি লাগানো ছিল, রাখালবাবু ডালা তুললেন। দেখা গেল, দু’ সেট জামাকাপড় রয়েছে। কাপড়ের নীচে এক গোছা দশ টাকার নোট, আর একটি ডায়েরির আকারের ছোট বাঁধানো খাতা।
খাতাটি সরিয়ে রেখে রাখালবাবু প্রথমে দশ টাকার নোটগুলি শুনলেন; একশো কুড়িখানা নোট, অর্থাৎ ঠিক ১২০০ টাকা। তিনি নোটগুলি নিজের পকেটে রাখতে রাখতে বললেন, ‘দেখা যাচ্ছে, যে খুন করেছে তার টাকার লোভ নেই।’ তিনি খাতাটি তুলে নিলেন।
খাতার নাম পৃষ্ঠায় নাম লেখা রয়েছে–সুকান্ত সোম। রাখালবাবু ব্যোমকেশের পানে তাকালেন। ব্যোমকেশ বলল, ‘রাজকুমার নামটা তাহলে মেকি। কিন্তু–সুকান্ত সোম! যেন কোথায় শুনেছি, মাথার মধ্যে একটা ঘন্টি বাজছে। আপনি শোনেননি?’
‘মনে পড়ছে না।’ রাখালবাবু খাতার পাতা ওলটাতে লাগলেন। প্রত্যেক পাতার মাথায় একটি শহরের নাম, যেমন–কাশী কলকাতা কটক। শহরের নীচে কয়েকটি নাম ও ঠিকানা, সম্ভবস্থলে টেলিফোন নম্বর। কলকাতার পাতায় চারটি নাম লেখা আছে, প্রায় প্রত্যেক নামের পাশে একটি টাকার অঙ্ক। যথা—
মোহনলাল কুণ্ডু
১১৭ডি, পানাপুকুর লেন
শ্যামাকান্ত লাহিড়ী ৫০০্
৩০/১, লোক কলোনী
জগবন্ধু পাত্র ৪০০্
৫৬, রাম ভাদুড়ী লেন
লতিকা চৌধুরী ৩০০্
১৭, গান্ধী পার্ক
খাতাখানা ব্যোমকেশের হাতে দিয়ে রাখালবাবু বললেন, ‘দেখুন যদি কিছু হদিস পান।’
ব্যোমকেশ খাতাখানা মন দিয়ে পরীক্ষা করে বলল, ‘আমার সন্দেহ হচ্ছে লোকটার পেশা ছিল ব্ল্যাকমেল করা।’
‘অন্য পেশা কি সম্ভব নয়? যেমন ধরুন, বীমার দালাল।’
‘অসম্ভব বলছি না। কিন্তু বীমার দালালকে কেউ খুন করে না। তারা ছদ্মনামেও ঘুরে বেড়ায় না।’
‘তাহলে আপনি মনে করেন, রাজকুমার বসু যাদের ব্ল্যাকমেলা করছিল তাদের মধ্যে কেউ তাকে খুন করেছে?’
‘কলকাতার ফিরিস্তিতে যাদের নাম আছে তাদের সওয়াল করলে কতকটা আন্দাজ করা যাবে।–চলুন, এবার তিন নম্বর মক্কেলের সঙ্গে দেখা করা যাক।’
‘চলুন।’
তিন নম্বর ঘরে শচীতোষ সান্যাল বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে ছিলেন, পদশব্দ শুনে ঘাড় তুললেন। বললেন, ‘কে?’
রাখালবাবু সংক্ষেপে বললেন, ‘পুলিস।’
শচীতোষবাবু উঠে বসলেন, চক্ষু গোল করে বললেন, ‘পুলিস! কী চাই?’
রাখালবাবু বললেন, ‘আপনাকে দুচারটে প্রশ্ন করতে চাই। জানেন বোধহয় পাশের দুনিম্বর ঘরে খুন হয়েছে।’
শচীতোষবাবু মুহুর্তকাল নির্বাক থেকে আঁৎকে উঠলেন, ‘খুন হয়েছে! কে খুন হয়েছে?’
তিন নম্বর ঘরটি আয়তনে এবং আসবাবপত্রে অন্য দু’টি ঘরের অনুরূপ। রাখালবাবু বিছানার ধারে বসলেন। ব্যোমকেশ চেয়ারে বসল। রাখালবাবু বললেন, ‘দু নম্বরে যিনি ছিলেন কাল রাত্রে তিনি খুন হয়েছেন, তাঁর নাম রাজকুমার বসু। আপনি তাঁকে চিনতেন নাকি?’
‘রাজকুমার বোস-না, চিনতাম না। কে খুন করেছে?’
‘তা এখন জানা যায়নি। আপনার নাম কি?’
‘শচীতোষ সান্যাল।’
‘নিবাস?’
‘ভাগলপুর। — আমার শরীর খারাপ, ডাক্তার শুয়ে থাকতে বলেছে।’
‘কোন ডাক্তার?’
‘মেয়ে ডাক্তার। ঠাণ্ডা লেগেছে, অ্যাসপিরিনের বড়ি খেয়ে শুয়ে থাকতে বলল। আচ্ছা, মেয়েরা কি ভাল ডাক্তার হয়?’
‘হাতে বাধা নেই। ঠাণ্ডা লাগালেন কি করে?
‘কাল সন্ধ্যের পর বেরিয়েছিলাম। গায়ে আলোয়ান ছিল না, ঠাণ্ডা লেগে গেছে।’
‘রাত্তিরে ঘর থেকে বেরোননি?’
‘না। ন’টার সময় ডাইনিং রুম থেকে খেয়ে এসে ঘরে ঢুকেছিলাম, আর বেরোইনি।’
‘ও কথা থাক। আপনি কবে কলকাতায় এসেছেন?’
‘তিন দিন হলো। আজ ফিরে যাবার কথা, কিন্তু
‘আপনি কলকাতায় এসেছেন কেন?’
‘আমার ঘিয়ের ব্যবসা আছে, গাঙ্গুরামকে ঘি যোগান দিই। তাই মাঝে মাঝে আসতে হয়। আচ্ছা, ঠাণ্ডা লাগা থেকে তো নিউমোনিয়া হতে পারে।’
‘তা পারে, কিন্তু আপনার হবে না। আপনি বেশ তাগড়া আছেন।–বয়স কত?’
‘বিয়াল্লিশ। দেখতে তাগড়া বটে, কিন্তু আমার শরীর ভারি পলকা, একটুতেই রোগে ধরে। বেজায় ক্ষিদে পেয়েছে; কিছু খেলে রোগ বেড়ে যাবে না তো?’
‘গরম দুধ আর পাউরুটি খান। — রাজকুমার বোসকে তাহলে চিনতেন না?’
‘না, কখনো নাম শুনিনি।’
ব্যোমকেশ বলল, ‘সুকান্ত নামটা কখনো শুনেছেন?’
শচীতোষ বললেন, ‘সুকান্ত? না। আমার শালার নাম ছিল শ্ৰীকান্তকুমার লাহিড়ী, মারা গেছে।’
রাখালবাবু প্রশ্ন করলেন, ‘কাল রাত্রে আপনি পাশের ঘরে কোনো শব্দ শুনেছিলেন?’
‘শব্দ? নাঃ। খেয়ে এসেই শুয়েছি, শুয়েই ঘুমিয়ে পড়েছি। বউ বলে, আমি একবার ঘুমেলে ডাকাত পড়লেও ঘুম ভঙে না। পাশের ঘরের লোকটাকে কী দিয়ে খুন করেছে? বন্দুক দিয়ে?’
‘না, ছুরি দিয়ে।’ রাখালবাবু উঠে পড়লেন, ‘আপনি পুলিসকে খবর না দিয়ে কলকাতা ছেড়ে যাবেন না। চলুন ব্যোমকেশদা।’
নীচে অফিস-ঘরে হরিশচন্দ্র জবুথবুভাবে বসেছিলেন, ব্যোমকেশদের দেখে উঠে দাঁড়ালেন, কুষ্ঠিত প্রশ্ন করলেন, ‘কী হলো?’
রাখালবাবু প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বললেন, ‘এবার আপনাদের, অর্থাৎ হোটেলের স্টাফের এজেহার নেব। আপনাকে দিয়েই আরম্ভ করি। বসুন।’
তিনজনে বসলেন। রাখালবাবু সওয়াল-জবাব আরম্ভ করলেন, ‘আপনার পুরো নাম?’
‘হরিশচন্দ্র হোড়।’
‘আপনি হোটেলের ম্যানেজার। এখানেই থাকেন?’
‘হ্যাঁ।’
‘কতদিন আছেন?
‘আট বছর।’
‘মৃত রাজকুমার বোস সম্বন্ধে কী জানেন বলুন।’
হরিশচন্দ্র মোটা খাতা বার করে খুললেন, ‘রাজকুমার বসু্্, ঠিকানা আদমপুর, পাটনা। গত পাঁচ বছর ধরে তিনি বছরে দু’বার এখানে আসতেন, দু’ তিনদিন থাকতেন। হোটেল থেকে বেরুতেন না, এই অফিসে এসে তিন-চারজন বন্ধুকে টেলিফোন করতেন। তাঁরা এসে সন্ধ্যের পর তাঁর সঙ্গে দেখা করতেন। এর বেশি আমি কিছু জানি না।’
‘এবার তিনি কবে এসেছিলেন?’
‘পরশু।‘
‘টেলিফোন করেছিলেন?’
‘পরশু রাত্রে এলেন, সে-রাত্রে টেলিফোন করেননি। কাল সকালে করেছিলেন।’
‘রাজকুমারবাবু যখন আসতেন ওই দু’ নম্বর ঘরেই থাকতেন?’
না, যখন যে-ঘর খালি থাকত সেই ঘরে থাকতেন।’
‘রাজকুমারবাবুকি কাজ করতেন। আপনি জানেন?
‘আজ্ঞে না।’
‘আপনি কাল রাত্ৰে নিশ্চয় হোটেলেই ছিলেন?’
‘আজ্ঞে–’। হরিশচন্দ্র একটু ইতস্তত করে বললেন, ‘ঘণ্টা দুয়ের জন্যে একবার বেরিয়েছিলাম। আমি হোটেলে থাকি বটে, কিন্তু আমার পরিবার বাইরে ভাড়া বাড়িতে থাকে; মাঝে মাঝে তাদের দেখতে যাই। কাল রাত্রে অতিথিরা খেতে বসবার পর আমি বেরিয়েছিলাম, তারপর এগারোটা নাগাদ ফিরে আসি।’
‘আপনার অবর্তমানে হোটেলের ইন-চার্জ থাকে কে?’
‘সদার খানসামা গুণধর গুঁই।’
‘গুণধরকে একবার ডাকুন।’
গুণধরকে ডাকা হলো, সে এসে দাঁড়াল। আবার প্রশ্নোত্তর আরম্ভ হলো।
‘রাজকুমার বোস–যিনি খুন হয়েছেন–তাঁর সম্বন্ধে তুমি কী জান?’
‘আজ্ঞে, বেশি কিছু জানি না। তিনি মাঝে মাঝে আসতেন, দু’ তিনদিন থেকে চলে যেতেন।’
‘তোমার সঙ্গে তাঁর কোনো কথাবার্তা হতো না?’
‘আজ্ঞে, খুব কম। ফাই-ফরমাস করতেন, তার বেশি নয়।’
‘তাঁর দেখাশোনা করত কে?’
‘আজ্ঞে, আমি করতাম। সকালে বেড়-টি নিয়ে যেতাম, তারপর ব্রেকফার্স্ট লাঞ্চ ডিনার সব আমিই পৌঁছে দিতাম। দোতলায় যাঁরা থাকেন আমিই তাঁদের দেখাশোনা করি। তেতিলায় দেখাশোনা করে–’
‘ও—তাহলে রাজকুমারবাবু ডাইনিং রুমে খেতে নামতেন না।’
‘আজ্ঞে না।‘
‘কাল তুমি তাঁকে শেষবার কখন দেখেছ?’
‘রাত্রি পৌঁনে ন’টার সময় তাঁকে ডিনার দিতে গেছলাম, তারপর নাটার সময় এটো বাসন-কোসন আনতে গেছলাম। তখন তিনি বেঁচে ছিলেন।’
‘বুঝলাম। কিন্তু তিনি ডাইনিং রুমে যেতেন না কেন বলতে পার?’
‘তা-জানি না হুজুর। তবে— বোধহয়–তাঁর মুখখানা কাটাকুটি হয়ে বড় ইয়ে হয়ে গিয়েছিল-তাই তিনি সহজে লোকের সামনে বেরুতেন না।’
‘তা হতে পারে। কিন্তু তাঁর কাছে লোক আসত?’
‘তা আসত হুজুর।’
‘কাল কে কে এসেছিল তুমি জান?
‘আমি জানি না, জেনারেল সিং বলতে পারে।’
‘জেনারেল সিং।’
‘আজ্ঞে, আমাদের দারোয়ান। তার নাম রামপিরিত সিং, সবাই তাকে জেনারেল সিং বলে ডাকে।‘
‘ডাকো জেনারেল সিংকে।’
ভোজপুরী জোয়ান রামপিরিত সিং এসে গোড়ালিতে গোড়ালি ঠেকিয়ে স্যালুট করল। আখাম্বা চেহারা, জাঁদরেল পোশাক, ইয়া গোঁফ। রাখালবাবু তার আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করে বললেন, ‘হ্যাঁ, জেনারেল বটে। তুমি হোটেলের সদরে পাহারা দাও?’
রামপিরিত বলল, ‘জি। সকালে নটা থেকে বারোটা, বিকেলে পাঁচটা থেকে দশটা আমার ডিউটি।‘
‘হোটেলে যারা অতিথিদের সঙ্গে দেখা করতে আসে তাদের নাম-ধাম তুমি লিখে রাখ?’
‘জি না, সে-রকম হুকুম নেই। যারা ভাল সাজ-পোশাক পরে আসে তাদের স্যালুট করি, যারা অতিথির রুম নম্বর জানতে চায় তাদের রুম নম্বর বলি।’
‘কাউকে আটকাও না?’
‘জি, ভাল জামা-কাপড় পরা থাকলে আটকাই না।’
‘আর যদি ছেঁড়া জাম-কাপড় হয়?’
‘তখন কটমট করে তাকাই।’
‘শাবাশ। এবার বল দেখি, কাল সন্ধ্যের পর দোতলার দু’ নম্বর ঘরের বাবুর সঙ্গে কেউ দেখা করতে এসেছিল?’
‘জি, এসেছিল। দু’জন মরদ আর একজন ঔরৎ। রাত্রি সওয়া ন’টার সময় এলেন ঔরৎ, তিনি ঘরের নম্বর জেনে নিয়ে দোতলায় গেলেন; পাঁচ মিনিট পরে তিনি চলে গেলেন।’
‘তাঁর বয়স কত?
‘বিশ-পঁচিশ হবে হুজুর। গোরী, পাতলা লম্বা চেহারা, চোখে চশমা ছিল।’
‘বেশ। তারপর?’
‘তারপর সাড়ে ন’টার সময় এলেন এক মরদ। তিনি ঘরের নম্বর নিয়ে ওপরে গেলেন, পাঁচ মিনিট পরে ফিরে চলে গেলেন। এর চেহারা দুবলা, মুছ-দাড়ি আছে। থোড়া থোড়া।’
‘তারপর?’
‘পৌঁনে দশটার সময় আর একজন মরদ এলেন। মোটা-তাজা শরীর, খাঁটি বাঙ্গালী বাবু। তিনিও ওপরে গিয়ে পাঁচ মিনিট ছিলেন। তারপর আমার ডিউটির মধ্যে আর কেউ আসেনি হুজুর।’
জেনারেল রামপিরত সিং-এর চেহারা যত স্থূলই হোক, স্মৃতিশক্তি যে খুব তীক্ষ্ণ তাতে সন্দেহ নেই। রাখালবাবু খুশি হয়ে বললেন, ‘বহুৎ আচ্ছা। তুমি এখন আরাম কর গিয়ে।’
জেনারেল জোড়া পায়ে স্যালুট করে চলে গেল।
রাখালবাবু পকেট থেকে ১২০০ টাকার নোট বার করে হরিশচন্দ্রের হাতে দিলেন, বললেন, ‘আপাতত এ টাকাটা আপনার কাছে রাখুন, মৃতের সুটকেসে পাওয়া গেছে। টাকার জন্যে একটা রসিদ দিন।‘
ঘরে একটি লোহার সিন্দুক ছিল, হরিশচন্দ্র নোটগুলি সিন্দুকে রেখে রসিদ লিখে দিলেন। ব্যোমকেশ ভুরু কুঁচকে বসে রইল।
ইতিমধ্যে সাব-ইন্সপেক্টর দু’জন নেমে এসে দাঁড়িয়েছিল, রাখালবাবু তাদের প্রশ্ন করলেন, ‘কি হলো?’
একটি সাব-ইন্সপেক্টর বলল, ‘আমি তেতলায় গিয়েছিলাম। সকলের নাম-ধাম লিখে দুয়েছি, সকলেই বলল, ন’টার পর ভিলার খেয়ে তার ঘরে ফিরে এসেছিল, আর ঘর থেকে বেরোয়নি।’
‘তাদের কথা সত্যি কিনা যাচাই করেছিলে?’
‘কি করে যাচাই করব? প্রত্যেকের আলাদা ঘর। তবে একটা প্রমাণ আছে, রাত্রে খাওয়া-দাওয়ার পালা শেষ হলে একটা চাকর তেতলার সিড়ির সামনে শোয়; তাকে ডিঙিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামা সম্ভব নয়। আমি চাকরিটাকে জিজ্ঞেস করেছি, সে বলল, রাত্রি সাড়ে দশটার সময় সে শুতে গিয়েছিল, তারপর আর কেউ সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামেনি।’
‘বেশ। —আর তুমি?’
দ্বিতীয় সাব-ইন্সপেক্টর বলল, ‘দোতলাতেও একই অবস্থা। সকলের নাম-ঠিকানা লিখে নিয়েছি। দোতলার সিঁড়ির মুখে যো-চাকরটা শোয় সে বলল, পৌঁনে এগারোটার সময় সে শুতে গিয়েছিল, তারপর আর কেউ ঘর থেকে বেরোয়নি।’
ম্যানেজার বললেন, ‘রাত্রে যদি কোনো অতিথির কিছু দরকার হয়, তাই এই ব্যবস্থা।’
‘বুঝলাম।’–রাখালবাবু ঘড়ি দেখলেন, বারোটা বেজে গেছে। তিনি ব্যোমকেশকে বললেন, ‘এখানকার কোজ আপাতত এই পর্যন্ত। চলুন এবার বেরিয়ে পড়া যাক, রাস্তায় কোথাও খেয়ে নেওয়া যাবে। ভাগ্যক্রমে চারজন মক্কেলের বাড়ি কাছাকাছির মধ্যেই, বেশি ঘোরাঘুরি করতে হবে না। আপনার বাড়ি ফিরতে দেরি হয়ে গেল–’
ব্যোমকেশ বলল, ‘কোনো ক্ষতি নেই, আমি অজিতকে টেলিফোন করে দিচ্ছি।’
সে টেলিফোন তুলে নিল। হরিশচন্দ্র বললেন, ‘যদি আপত্তি না থাকে এখানেই আপনাদের সকলের আহারের ব্যবস্থা করেছি।’
রাখালবাবু হেসে বললেন, ‘খুব ভাল কথা।’
নিরুপমা হোটেলের রান্না ভাল।
মধ্যাহ্ন ভোজন দেশী ও বিলাতি মতে সমাধা করে পুলিসের দল ডাইনিং রুম থেকে বেরুলেন, সঙ্গে ব্যোমকেশ। রাখালবাবু দ্বিতীয় সাব-ইন্সপেক্টরকে বললেন, ‘দত্ত, তুমি এখানে থাকে। এই নাও, দু’ নম্বর ঘরের চাবি। ফিঙ্গারপ্রিন্টের দল এখনি আসবে, তাদের ঘর খুলে দিও। আমি ঘোষকে নিয়ে বেরুচ্ছি। আসুন ব্যোমকেশদা।’
তিনজনে ফুটপাথে গিয়ে দাঁড়ালেন। রাখালবাবু পকেট থেকে খাতা বার করে বললেন, ‘এ সময় কাউকে বাড়িতে পাব। কিনা বলা যায় না। যাহোক, চলুন আগে জগবন্ধু পাত্রকে দেখা যাক! লোকটিকে ওড্র-কুলোদ্ভব মনে হচ্ছে।’
ব্যোমকেশ বলল, ‘হুঁ।’
একটা ট্যাক্সি ধরে তিনজনে উঠে বসলেন, ট্যাক্সি জগবন্ধু পাত্রের ঠিকানা লক্ষ্য করে ছুটিল। রাখালবাবু বললেন, ‘ব্যোমকেশদা, আজ আপনি এমন চুপচাপ কেন? কিছু বলছেন না।’
ব্যোমকেশ বলল, ‘এখন কেবল শুনে যাচ্ছি, বলা-কওয়ার সময় এখনো আসেনি।–সময় যেদিন আসিবে আপনি যাইব তোমার কুঞ্জে।’
জগবন্ধু থাকেন একটি তেতলা বাড়ির নীচের ফ্ল্যাটে। রাখালবাবু কড়া নাড়লেন, একটি লোক দোর খুলে দাঁড়াল। ছাঁটা দাড়ি, কোল-কুঁজো ধরনের চেহারা, বয়স আন্দাজ চল্লিশ। রাখালবাবু বললেন, ‘আপনার নাম জগবন্ধু পাত্র?
‘হাঁ।’ জগবন্ধু পুলিসের ইউনিফর্ম দেখে একটু সচকিত হয়ে বললেন, ‘কি দরকার?’
‘নিরুপমা হোটেলে রাজকুমার বসু নামে এক ব্যক্তি খুন হয়েছেন—‘
‘জগবন্ধু পাত্রের মুখে অকৃত্রিম বিস্ময় ফুটে উঠল, তিনি বলে উঠলেন, ‘রাজকুমার খুন হয়েছে!’ ‘হ্যাঁ। আপনাকে দু’ একটা প্রশ্ন করতে চাই।’
‘আসুন।’ জগবন্ধু পাত্র একটি ঘরে নিয়ে গিয়ে তাঁদের বসলেন, ‘বসুন, আমি এখনি আসছি।’
তিনি পাশের ঘরে চলে গেলেন।
বসবার ঘরটি ছোট এবং নিরাভরণ; একটি টেবিল ও তিনটি চেয়ার আছে; টেবিলের ওপর টেলিফোন। ব্যোমকেশ সিগারেট ধরিয়ে ঘরের এদিক-ওদিক তাকাতে লাগল, কিন্তু কোথাও গৃহস্বামীর চরিত্রের কোনো পরিচয় পেল না।
পাঁচ মিনিট কাটল, দশ মিনিট কাটল, জগবন্ধু পাত্রের দেখা নেই। রাখালবাবু তখন গলা চড়িয়ে ডাকলেন, ‘জগবন্ধুবাবু!’ কিন্তু উত্তর এল না।
ব্যোমকেশ মুখ টিপে হাসল, বলল, ‘মনে হচ্ছে জগবন্ধু পাত্র গৃহত্যাগ করেছেন।’
রাখালবাবু উত্তেজিত হয়ে বললেন, ‘পালিয়েছে! এসো ঘোষ, বাড়ির ভেতরটা দেখা যাক। আসুন ব্যোমকেশদা।’
ব্যোমকেশ কিন্তু গেল না; ঘোষকে নিয়ে রাখালবাবু ভিতরে গেলেন। দেখলেন, কেউ নেই, খিড়কির দোর খোলা।
রাখালবাবু ফিরে এসে বললেন, ‘পাখি উড়েছে।’
ব্যোমকেশ ইতিমধ্যে টেবিলের দেরাজ খুলে একটা বাঁধানো খাতা বার করেছিল, তার পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে বলল, ‘লোকটা বোধহয় ঘোড়দৌড়ের টাউট ছিল।’
‘তাই নাকি! কিন্তু পালাল কেন?’
‘নিশ্চয় গুরুতর গলদ আছে। শুধু ঘোড়দৌড় হলে পালাত না।’
রাখালবাবু থানায় ফোন করলেন। পলাতকের বর্ণনা দিলেন, আরো লোক ডেকে পাঠালেন। তারপর ফোন নামিয়ে বললেন, ‘ঘোষ, তুমি এখানে থাকে, আমরা অন্য কাজে যাচ্ছি। এখনি থানা থেকে আরো লোক এসে পড়বে। বাড়ি তন্ন তন্ন করে তল্লাশ করো। আঙুলের ছাপ নিশ্চয় পাবে; ততক্ষণাৎ হেডু অফিসে পাঠিয়ে দেবে। লোকটা বোধহয় দাগী আসামী।’
জগবন্ধু পাত্রের বাসা থেকে বেরিয়ে রাখালবাবু ব্যোমকেশকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কি মনে হয়? জগবন্ধু পাত্রই আমাদের আসামী?
ব্যোমকেশ একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘বলা যায় না। লোকটা রাজকুমারের মৃত্যু-সংবাদ শুনে চমকে উঠেছিল। তবে অভিনয় হতে পারে।’
অতঃপর মোহনলাল কুণ্ডুর বাসায় গিয়ে জানা গেল, কুণ্ডু মশাই কলকাতায় নেই। সস্ত্রীক কাশী গিয়েছেন। কবে ফিরবেন ঠিক নেই।
সেখান থেকে তাঁরা শ্যামাকান্ত লাহিড়ীর বাড়ি গেলেন। কিন্তু এখানেও নিরাশ হতে হলো। শ্যামাকান্ত বাড়ি নেই, অফিসে গেছেন। শ্যামাকান্ত পোর্ট কমিশনারের অফিসে বড় চাকরি করেন। এইটুকুই শুধু জানা গেল। সন্ধ্যের আগে তাঁকে পাওয়া যাবে না।
রাখালবাবু নিশ্বাস ফেলে বললেন, ‘বাকি রইলেন শুধু লতিকা চৌধুরী। ইনি যখন মহিলা তখন আশা করা যায় দুপুরবেলা এঁকে বাসায় পাওয়া যাবে।’
শ্ৰীমতী চৌধুরী স্বতন্ত্র বাড়িতে থাকেন, ফ্ল্যাট নয়। ছোটখাটো বাড়িটি, বেশ পরিচ্ছন্ন, সামনে একফালি ফুলের বাগান। ঘণ্টি বাজাতেই একটি চশমা-পরা মহিলা দোর খুলে বললেন, ‘কাকে চাই? কর্তা বাড়ি নেই।’ তারপরই তাঁর চকিত দৃষ্টি পড়ল রাখালবাবুর ইউনিফর্মের ওপর।
জেনারেল রামপিরিত যে বৰ্ণনা দিয়েছিল, মহিলাটির সঙ্গে তার মিল আছে। তবে বয়স বিশ-পঁচিশ নয়, আরো বেশি। ত্রিশ-বত্ৰিশ বছর বয়সেও কিন্তু ছিমছাম গড়ন এবং সুশ্ৰী মুখ থেকে যৌবনের রেশ সম্পূর্ণ মুছে যায়নি।
রাখালবাবু বললেন, ‘আপনার নাম শ্ৰীমতী লতিকা চৌধুরী?’
শ্ৰীমতী চৌধুরীর ঠোঁট হঠাৎ আলগা হয়ে গেল, তিনি স্খলিতস্বরে বললেন, ‘হ্যাঁ। কি দরকার?’
রাখালবাবু বললেন, ‘আপনাকে দু-চারটে প্রশ্ন করতে চাই। আমি পুলিসের লোক।’
শঙ্কা-শীর্ণ মুখে মিসেস চৌধুরী বললেন, ‘আসুন।’
বসবার ঘরটি পরিপাটিভাবে সাজানো; নীচু চেয়ার, সোফা, সেন্টার পিস। দেয়ালে একটি মধ্যবয়স্ক পুরুষের আবক্ষ ফটোগ্রাফ টাঙানো রয়েছে; মুখখানা কঠোর, চোখের নির্মম দৃষ্টি দর্শককে সর্বত্র অনুসরণ করে বেড়াচ্ছে; এ ঘরে থাকলে ওই সন্ধানী দৃষ্টি এড়িয়ে যাবার উপায় নেই।
ব্যোমকেশ ও রাখালবাবু পাশাপাশি সোফায় বসলেন; শ্ৰীমতী চৌধুরী একটি চেয়ারের কিনারায় বসে ভয়ার্তা চোখে তাঁদের পানে চাইলেন।
‘আপনার স্বামীর নাম কি?’
‘তারাকুমার চৌধুরী।’
‘কি কাজ করেন?’
‘ইঞ্জিনীয়র। রেলের ইঞ্জিনীয়র।’
‘ছেলেপুলে?’
‘নেই। আমরা নিঃসন্তান।’
‘কাল রাত্রি সওয়া ন’টার সময় আপনি নিরুপমা হোটেলে গিয়েছিলেন?’
শ্ৰীমতী চৌধুরীর চোখ দু’টি চশমার ভেতরে বিস্ফারিত হলো, ‘আমি! না না, আমি তো সিনেমা দেখতে গিয়েছিলুম।’
‘হোটেলের দরোয়ান আপনাকে কাল দেখেছে, সে আপনাকে সনাক্ত করতে পারবে।’
শ্ৰীমতী চৌধুরীর মুখ শুকিয়ে গেল, তিনি ঠোঁট চেটে বললেন, ‘কিন্তু আমি সিনেমা দেখতে গিয়েছিলুম–আলেয়া সিনেমাতে। টিকিটের প্রতিপত্র দেখাতে পারি।’
‘আপনি সিনেমার টিকিট কিনেছিলেন ঠিকই, কিন্তু ছবি শেষ হবার আগেই নিরুপমা হোটেলে গিয়েছিলেন, রাজকুমার বোসের সঙ্গে দেখা করেছিলেন।’
রাজকুমারের নাম শুনে শ্ৰীমতী চৌধুরীর মুখ মড়ার মত হয়ে গেল। তাঁর ঠোঁট দুটো অস্ফুটভাবে নড়তে লাগল, ‘রাজকুমার বসু–তাকে তো আমি চিনি না—’
ব্যোমকেশ বন্দুকের গুলির মত প্রশ্ন করল, ‘সুকান্ত সোমকে চেনেন?’
শ্ৰীমতী চৌধুরী জলবদ্ধ হরিণীর মত ব্যোমকেশের পানে চাইলেন, তারপর দু’ হাতে মুখ ঢেকে কেঁদে উঠলেন।
ব্যোমকেশ নরম সুরে বলল, ‘আমরা জানি, রাজকুমার বোস আর সুকান্ত সোম একই ব্যক্তি। সে আপনাকে ব্ল্যাকমেলা করছিল। কাল রাত্রি সওয়া ন’টার সময় সিনেমা-ফেরত আপনি তাকে টাকা দিতে গিয়েছিলেন। এখন বাকি কথা সব বলুন, আপনার কোনো ভয় নেই।’
শ্ৰীমতী চৌধুরী কিছুক্ষণ ফোঁপালেন, তারপর চোখ মুছে মুখ তুললেন, ভাঙা-ভাঙা গলায় বললেন, ‘বলছি। কেন জানতে চান আপনারাই জানেন, কিন্তু দোহাই আপনাদের, আমার স্বামী যেন কিছু জানতে না পারেন।’
ব্যোমকেশ দেয়ালের ছবির দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, ‘ইনি আপনার স্বামী?’
‘হ্যাঁ।’ ‘কড়া প্রকৃতির লোক মনে হয়। কিন্তু আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, নিতান্ত প্রয়োজন না হলে আমরা কাউকে কিছু বলব না।’
তারপর মিসেস চৌধুরী লজ্জানত চোখে দ্বিধাজড়িত কণ্ঠে যে কাহিনী বললেন তার সারাংশ এই :
বারো-তেরো বছর আগে শ্ৰীমতী চৌধুরী যখন কুমারী ছিলেন তখন তাঁর প্রকৃতি ছিল অন্য রকম, তিনি নিজেকে সংস্কারমুক্ত অতি-আধুনিক মনে করতেন। বাপের বাড়িতে টাকা ছিল বেশি, শাসন ছিল কম। লতিকা চক্রবর্তী বন্ধু-বান্ধবীর সঙ্গে হৈ হৈ করে, সিনেমা-থিয়েটার দেখে সময় কাটাতেন।
সে-সময় চিত্র-জগতে সুকান্ত সোম নামে একজন হীরো ছিল, যেমন তার চেহারা তেমনি অভিনয়। লতিকা চক্রবর্তী তার প্রেমে পড়ে গেলেন, সাধারণ প্রেম নয়, একেবারে বাঁধন-ছেড়া প্রেম। তিনি সুকান্তকুমারকে প্রবল অনুরাগপূর্ণ চিঠি লিখতে আরম্ভ করলেন। তারপর লুকিয়ে লুকিয়ে দেখা হতে লাগল।
লতিকা সুকাস্তকে বিয়ে করবার জন্যে ক্ষেপে উঠেছিলেন, কিন্তু একদিন জানতে পারলেন, সুকান্তর ঘরে একটি স্ত্রী আছে। তাঁর প্রেমে ভাটা পড়ল। তাঁর বাবা বোধহয় কিছু সন্দেহ করেছিলেন, তিনি তাড়াতাড়ি মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিলেন।
তারপর দু’বছর কাটল। লতিকা দেবীর স্বামী লোকটি অতিশয় সজ্জন। কিন্তু যৌন শিথিলতা সম্বন্ধে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গী অত্যন্ত কড়া। বিয়ের পর লতিকা চৌধুরীর রোমাঞ্চের নেশা ছুটে গিয়েছিল, স্বামীকে তিনি প্রীতি ও শ্রদ্ধার চোখে দেখতে আরম্ভ করেছিলেন। সন্তানাদি না হলেও তাঁদের দাম্পত্য জীবন সুখের হয়ে উঠেছিল।
একদিন কাগজে ভয়ঙ্কর খবর বেরুল, সুকান্ত নিজের স্ত্রীকে খুন করেছে। কেস আদালতে উঠল। আসামী অবশ্য খালাস পেয়ে গেল, কারণ সে আত্মরক্ষার্থে খুন করেছে; স্ত্রী ছুরি নিয়ে তাকে আক্রমণ করেছিল, তার মুখ এবং সবঙ্গে কেটে ফালা-ফালা করে দিয়েছিল, সে নিজের প্ৰাণ বাঁচাবার জন্যে স্ত্রীকে গলা টিপে মেরেছে। যতদিন মোকদ্দমা চলেছিল। ততদিন লতিকা দেবী ভয়ে কাঁটা হয়ে ছিলেন, পাছে কোনো সূত্রে তাঁর নামটা প্রকাশ হয়ে পড়ে। কিন্তু সাক্ষী বা আসামী কেউ তাঁর নাম করল না; তখন তিনি নিশ্চিন্ত হলেন।
অতঃপর দু-তিন বছর নিরুপদ্রবে কেটে গেল।
সুকান্তর সিনেমার কাজ শেষ হয়েছিল; ও রকম একটা মুখ নিয়ে সিনেমার হীরো সাজা যায় না। সে কোথায় নিরুদ্দেশ হয়েছিল। হঠাৎ একদিন সুকান্ত তার বীভৎস মুখ নিয়ে লতিকা দেবীর সঙ্গে দেখা করল, বলল, ‘আমার টাকার দরকার, তোমাকে দিতে হবে। বেশি নয়, ছাঁ মাস অন্তর তিন শো টাকা; তোমার পক্ষে অতি সামান্য। যদি না দাও, তুমি আমাকে যে-সব চিঠি লিখেছিলে সেগুলি তোমার স্বামীকে দেখাব।’
সেই থেকে শ্ৰীমতী চৌধুরী ছ’ মাস অন্তর তিন শো টাকা গুনছেন। ছ’ মাসে তিন শো টাকা তাঁর গায়ে লাগে না, কিন্তু সদাই ভয়, পাছে স্বামী জানতে পারেন।
কাল রাত্রে তিনি টাকা দিতে নিরুপমা হোটেলে গিয়েছিলেন, দু’নম্বর ঘরের দোরের বাইরে থেকে সুকান্ত সোমকে টাকা দিয়ে চলে এসেছিলেন। আর কিছু জানেন না।
শ্ৰীমতীর কাহিনী শেষ হলে শ্রোতা দু’জন কিছুক্ষণ নীরবে বসে রইলেন। তারপর ব্যোমকেশ নিশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘আচ্ছা, আজ আমরা যাই। একটা সুখবর দিয়ে যাই, কাল রাত্রি সওয়া নটা থেকে এগারোটার মধ্যে সুকান্ত সোম ওরফে রাজকুমার বোস খুন হয়েছে।’
বাড়ি থেকে বেরিয়ে দু’জনে ফুটপাথে এসে দাঁড়ালেন। রাখালবাবু বললেন, ‘শ্ৰীমতীর আত্মকথা তো শুনলাম। কিন্তু খুনের হদিস পাওয়া গেল না।’
ব্যোমকেশ বলল, ‘একেবারে কিছুই পাওয়া যায়নি এমন কথা বলা যায় না। আজ যতগুলি লোকের এজেহার শুনেছি তাদের মধ্যে একজন একটা বেফাঁস কথা বলেছে। কিন্তু কে বলেছে। মনে করতে পারছি না।’
‘কী বেফাঁস কথা?’
‘সেইটেই মনে আসছে না। অনেক কথার মধ্যে ওই কথাটা মগ্নচৈতন্যে ডুব মেরেছে।’
রাখালবাবু ঘড়ি দেখলেন, প্রায় তিনটে বাজে। বললেন, ‘আমি এখন থানায় ফিরব। আপনি?’
‘আমি একবার নতুন বাড়ির কাজকর্ম তদারক করে বাসায় ফিরব। কাল সকালে আবার দেখা হবে। ইতিমধ্যে যদি নতুন খবর কিছু পান, দয়া করে টেলিফোন করবেন।’
পাঁচটার পর বাসায় ফিরে ব্যোমকেশ এক পেয়ালা চা খেল, তারপর সিগারেট ধরিয়ে তক্তপোশের ওপর লম্বা হলো। অজিত বাড়ি নেই, সাড়ে চারটের সময় দোকানে গেছে। ব্যোমকেশ একলা একলা চোখ বুজে শুয়ে সিগারেট টানতে লাগল।
সাড়ে ছাঁটার সময় সে ধড়মড়িয়ে উঠে বসল। সত্যবতী কী একটা কাজে ঘরে এসেছিল, চমকে উঠে বলল, ‘কি হলো?’
ব্যোমকেশ উদ্ভাসিত মুখে বলল, ‘মনে পড়েছে!’
‘কী মনে পড়ল?’
‘কাছে এসো, কানে কানে বলছি।’
কানে কানে কথা শুনে সত্যবতী হাসিমুখে ব্যোমকেশের বাহুতে একটি ছোট্ট চড় মারল। ব্যোমকেশ উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘আমাকে একবার বেরুতে হবে।’
‘আবার বেরুবে। কোথায় যাবে?’
‘কালকেতু খবরের কাগজের অফিসে। দশ বছরের পুরনো কাগজের ফাইল দেখতে হবে।’
‘ফিরতে নিশ্চয় রাত করবে। জলখাবার খেয়ে যাও।’
‘দরকার নেই। পেটে নিরুপমা হোটেলের গদ আছে।’
পরদিন সকালবেলা ব্যোমকেশ রাখালবাবুকে টেলিফোন করল, ‘তাজা খবর কিছু আছে নাকি?’
রাখালবাবু বললেন, ‘সাড়া-জাগানো কোনো খবর নেই। লাশ পরীক্ষা করে অপ্রত্যাশিত কোনো খবর পাওয়া যায়নি; মৃত্যুর সময় ডিনারের আন্দাজ দেড় ঘণ্টা পরে। দুনম্বর ঘরে রাজকুমার আর গুণধরের আঙুলের ছাপ পাওয়া গেছে। — শ্যামাকান্ত লাহিড়ীর বাসায় আবার গিয়েছিলাম; সে পরিষ্কার অস্বীকার করল, বলল, নিরুপমা হোটেলে যায়নি। জেনারেল রামপিরিত কিন্তু তাকে সনাক্ত করেছে। শ্যামাকাস্তকে অ্যারেস্ট করিনি, কিন্তু তার পেছনে লেজুড় লাগিয়েছি।’
‘তারপর?
‘জগবন্ধু পাত্রের আসল নাম জানা গিয়েছে–ভগবান মহান্তি। দাগী আসামী; মেদিনীপুরে একটা স্ত্রীলোককে খুন করে চৌদ্দ বছর জেলে গিয়েছিল, তারপর জেল ভেঙে পালায়। কলকাতায় এসে ছদ্মনামে ঘোড়দৌড়ের দালালি করছিল।’
‘আর কিছু?’
‘লিতিকা দেবীর স্বামী তারাকুমার চৌধুরী সম্বন্ধে খোঁজখবর নিয়ে জানলাম। তিনি সে-রাত্রে এগারোটার পর বাড়ি ফিরেছিলেন। কিন্তু এতক্ষণ কোথায় ছিলেন জানা যাচ্ছে না।’
‘জানার দরকার নেই। হোটেলের খবর কি?’
‘হোটেলের অতিথিরা বড় অস্থির হয়ে উঠছেন। ভাবছি আজ বিকেলবেলা তাদের ছেড়ে দেব।–আপনি কিছু পেলেন?’
‘পেয়েছি। আমি এখনি নিরুপমা হোটেলে যাচ্ছি। আপনিও আসুন।’
এক নম্বর ঘরের বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রাখালবাবু ও ব্যোমকেশের মধ্যে দৃষ্টি বিনিময় হলো। রাখালবাবু দোরে টোকা দিলেন।
দোর খুলে গেল। মিসেস শোভনা রায় রাখালবাবুকে দেখে জ্বলে উঠলেন, ‘এই যে। আপনি আর কতদিন আমাকে আটকে রাখবেন। আমার মত একজন ডাক্তারকে এমনভাবে আটকে রাখা আইনবিরুদ্ধ তা জানেন কি?’
রাখালবাবু বললেন, ‘আমার বিরুদ্ধে আপনার যদি কোনো নালিশ থাকে আদালত আছে। আপাতত আপনাকে আমরা দু-চারটে কথা বলতে চাই।’
দু’জনে ঘরে প্রবেশ করলেন, ব্যোমকেশ চেয়ারে বসে বলল, ‘আপনাকে একটা গল্প শোনাতে চাই, মিসেস রায়।’
মিসেস বায় আবার জ্বলে উঠলেন, রূঢ়কণ্ঠে বললেন, ‘আপনি আবার কে! ঠাট্টা করছেন নাকি?’
রাখালবাবু বললেন, ‘ইনি ব্যোমকেশ বক্সী। নাম শুনে থাকবেন।’
ব্যোমকেশ বলল, ‘ঠাট্টা করছি না, মোটেই ঠাট্টা করছি না। আপনি বসুন।’
ব্যোমকেশের নাম শুনে মিসেস রায় থতিয়ে গিয়েছিলেন, খাটের ধারে বসলেন। রুক্ষ স্বর যথাসম্ভব নরম করে বললেন, ‘কি বলবেন বলুন। আমি কিন্তু আজই বহরমপুর ফিরে যাব।’
ব্যোমকেশ বলল, ‘সেটা ভবিষ্যতের কথা।—গল্পটি খবরের কাগজে পড়লাম, সংক্ষেপে শোনাচ্ছি। —সুকান্ত সোম একজন সিনেমা আর্টিস্ট ছিল—’
মিসেস রায়ের শরীর শক্ত হয়ে উঠল, তিনি অপলক চক্ষে ব্যোমকেশের পানে চেয়ে রইলেন। ব্যোমকেশ শুষ্ক স্বরে বলল, ‘চেনেন দেখছি। চেনবারই কথা, সে আপনার জামাই ছিল। —সুকান্ত সোম সিনেমা করে খুব নাম করেছিল। আপনি তখন বর্ধমানে প্র্যাকটিস করতেন। বিধবা মানুষ, সংসারে কেবল একটি মেয়ে। বর্ধমানে সুকাস্তের যাওয়া-আসা ছিল। সে একদিন আপনার মেয়েটিকে ভুলিয়ে নিয়ে ইলোপ করল। সুকান্ত আপনার মেয়েকে লোভ দেখিয়েছিল তাকে সিনেমার হিরোইন করবে। আপনি সুকান্তকে পছন্দ করতেন না, তাই ইলোপমেন্ট।
‘একসঙ্গে কিছু দিন বাস করবার পর দু’জনের প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ হয়ে পড়ল; দু’জনেরই মিলিটারি মেজাজ। ঝগড়া আরম্ভ হলো। ঝগড়ার প্রধান কারণ, সুকান্ত আপনার মেয়েকে হিরোইন বানাতে পারেনি। একদিন ঝগড়া চরমে উঠল, আপনার মেয়ে ছুরি দিয়ে সুকান্তর মুখ কেটে ফালা-ফালা করে দিল। সুকান্ত নিজের প্রাণ বাঁচাবার তাগিদে আপনার মেয়েকে গলা টিপে খুন করল।
‘খুনের আসামী সুকান্ত তিন মাস পুলিসের হাসপাতালে রইল। সেখান থেকে তাকে যখন বিচারের জন্যে আদালতে হাজির করা হলো তখন তার বীভৎস মুখ দেখে জজ সাহেব পর্যন্ত চমকে গেলেন। জেলের হাসপাতালে প্লাস্টিক সাজারির ব্যবস্থা নেই; সুকান্তর মুখের ঘা শুকিয়েছে বটে, কিন্তু সিনেমার হিরোর পার্ট করার মত মুখ আর নেই।
‘বিচার হলো। আপনি সুকান্তর বিরুদ্ধে সাক্ষী ছিলেন, মিসেস রায়। কিন্তু তাকে ফাঁসিকাঠে ঝোলাতে পারলেন না। তার হাতে অস্ত্র ছিল না, আপনার মেয়ের হাতে অস্ত্র ছিল; আত্মরক্ষার অজুহাতে সুকান্ত ছাড়া পেয়ে গেল।’—
মিসেস শোভনা রায় আগুন-ভরা চোখে বললেন, ‘মিছে কথা। ও আগে আমার মেয়েকে গলা টিপে মেরেছিল, তারপর নিজে নিজের মুখ ছুরি দিয়ে কেটেছিল।’,
ব্যোমকেশ মাথা নেড়ে বলল, ‘কথাটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। সুকান্ত সিনেমা আর্টিস্ট, সে কখনো নিজের মুখে ছুরি মেরে নিজের আখের নষ্ট করত না; নিজের গায়ে ছুরি মারত। যাহোক, সুকান্ত খুনের দায় থেকে রেহাই পেল বটে, কিন্তু তার সিনেমা-জীবন শেষ হয়ে গেল। সৎপথে থেকে অন্য কোনো উপায়ে জীবিকা অর্জনের রাস্তা সে জানত না, সে কলকাতা থেকে পালিয়ে গিয়ে পাটনায় বাসা বাঁধিল এবং ব্ল্যাকমেলের ব্যবসা শুরু করল। গত দশ বছরে কলকাতায় কটকে কাশীতে দিল্লীতে তার অনেক খদ্দের জুটেছে। কারুর ওপর সে অযথা উৎপীড়ন করে না, ছ’ মাস অন্তর এসে বাঁধা-বরাদ্দ আদায় তসিল করে। এই তার জীবিকা।
‘সুকান্ত যখন আদায় তসিলের জন্যে কলকাতায় আসত তখন এই নিরুপমা হোটেলেই থাকত। আপনি ইতিমধ্যে বর্ধমানের বাস তুলে দিয়ে বহরমপুরে গিয়ে প্র্যাকটিস শুরু করেছেন, আপনিও মাঝে-মধ্যে এসে এই হোটেলে থাকেন। কিন্তু ঠিক একই সময়ে দু’জনের আসা আগে ঘটেনি, আপনি সুকান্তকে এখানে দেখেননি।
‘দৈবক্রমে এবার আপনি তাকে দেখতে পেলেন, সে আপনার পাশের ঘরেই উঠেছে। সে বোধ হয় আপনাকে দেখতে পায়নি। পেলে সাবধান হতো। আপনি তাকে পেলে খুন করবেন। এই ধরনের একটা ইচ্ছে আপনার মনে ছিল, কিন্তু দশ বছর সে-আগুন ছাই-চাপা পড়েছিল। এখন সুকান্তকে হাতের কাছে পেয়ে ছাই-চাপা আগুন দাউ-দাউ করে জ্বলে উঠল। আপনার মেয়েকে যে খুন করেছে তাকে আপনি বেঁচে থাকতে দেবেন না। আপনার মেয়ে বোধ হয় আপনার কাছ থেকেই তার উগ্র হিংস্র প্রকৃতি পেয়েছিল।
‘সে-রাত্রে ডিনার খেয়ে এসে আপনি নিজের ঘরে অপেক্ষা করে রইলেন। কিভাবে তাকে খুন করবেন তার প্ল্যান ঠিক করে ফেলেছেন; এখন শুধু শুভমুহূর্তের অপেক্ষা।
‘সওয়া নটা থেকে সুকান্তর ঘরে লোক আসতে শুরু করল। আপনি নিজের ঘরে ওত পেতে আছেন। দশটার সময় লোক আসা বন্ধ হলো। আপনি অস্ত্র হাতে নিয়ে বেরুলেন। দোতলার অন্য অতিথিরা দোর বন্ধ করে শুয়ে পড়েছে, যে-চাকরটা সিঁড়ির সামনে শোয় সে এখনো আসেনি। এই সুযোগ।
‘আপনি দু’ নম্বর দোরে টোকা দিলেন। সুকান্ত তখন শুয়ে পড়েছিল, সে উঠে দোর খুলল; আপনি সঙ্গে সঙ্গে তার বুকে অস্ত্রটা ঢুকিয়ে দিলেন। তারপর দোর টেনে বন্ধ করে নিজের ঘরে ফিরে এলেন। আপনার সঙ্গে যে রাজকুমার বোসের সম্বন্ধ আছে তা কেউ জানে না, আপনাকে কে সন্দেহ করতে পারে! বরং রাত্রে যারা রাজকুমারের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল, সন্দেহ পড়বে তাদের ওপর।
‘আপনি একটি ছোট্ট ভুল করেছিলেন। ইন্সপেক্টর যখন আপনাকে জেরা করেন তখন আপনি বলেছিলেন, রাজকুমারকে আপনি আগে কখনো দেখেননি; তার পরেই বললেন, ও মুখ দেখলে মনে থাকত। রাজকুমারের মুখ যে মনে রাখার মত তা আপনি জানলেন কি করে? ঘরের দিকে
রাজকুমারের মুখ আপনি দেখতে পাননি। এই বেফাঁস কথাটা যদি আপনি না বলতেন তাহলে দশ বছরের পুরনো খবরের কাগজের ফাইল দেখার কথা আমার মনে আসত না।’
এই পর্যন্ত বলে ব্যোমকেশ চুপ করল। মিসেস রায় কামারের হাপরের গানগনে আগুনের মত জুলতে লাগলেন। তারপর দাঁতে দাঁত চেপে বললেন, ‘সব মিছে কথা। সুকান্ত আমার মেয়েকে খুন করেছিল, কিন্তু আমি তাকে খুন করিনি। কি দিয়ে খুন করব? আমার কাছে কি ছোরা-জুরি আছে?’
ব্যোমকেশ তাঁর ডাক্তারি ব্যাগের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, ‘আছে। ওই ব্যাগের মধ্যে আছে।’
মিসেস রায়ের চোখ দুটো ঘোলাটে হয়ে গেল।
‘না, নেই। এই দেখুন—’
ব্যাগ খুলে ক্ষিপ্র হস্তে তার ভিতর থেকে তিনি একটি কাঁচি বার করলেন। লম্বা লিকলিকে সার্জিকাল কাঁচি, তার দুটো ফলা আলাদা করা যায়। মিসেস রায় কাঁচির একটা ফলা খুলে নিয়ে নিজের বুকে বসিয়ে দিতে গেলেন। কিন্তু রাখালবাবু প্রস্তুত ছিলেন, তিনি বিদ্যুৎবেগে মিসেস রায়ের মণিবন্ধ চেপে ধরলেন। মিসেস রায় উন্মত্ত কণ্ঠে চীৎকার করে উঠলেন, ‘ছেড়ে দাও–ছেড়ে দাও
ব্যোমকেশ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বলল, ‘যাক, অস্ত্রটাও পাওয়া গেছে। ওটা না পেলে মুশকিল হতো।’
ছলনার ছন্দ
টেলিফোন তুলে নিয়ে ব্যোমকেশ বলল–’হ্যালো?
ইন্সপেক্টর রাখালবাবুর গলা শোনা গেল— ‘ব্যোমকেশদা, আমি রাখাল। নেতাজী হাসপাতাল থেকে কথা বলছি। একবার আসবেন?’
‘কি ব্যাপার?’
‘খুনের চেষ্টা। একটা লোককে কেউ গুলি করে মারবার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু মারতে পারেনি। আহত লোকটাকে হাসপাতালে আনা হয়েছে। সে এক বিচিত্র গল্প বলছে।’
‘তাই নাকি? আচ্ছা, আমি যাচ্ছি।’
কেয়াতলায় ব্যোমকেশের বাড়ি থেকে নেতাজী হাসপাতাল বেশি দূর নয়। আধা ঘণ্টা পরে বিকেল আন্দাজ পাঁচটার সময় ব্যোমকেশ সেখানে পৌঁছে দেখল, এমার্জেন্সি ওয়ার্ডের সামনে দারোগা রাখাল সরকার দাঁড়িয়ে আছেন।
এইখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই তিনি আরো কিছু তথ্য উদঘাটন করলেন। আহত লোকটির নাম গঙ্গাপদ চৌধুরী, ভদ্রশ্রেণীর লোক। ফ্রেজার রোড থেকে একটা ছোট রাস্তা বেরিয়েছে, সেই রাস্তায় একটা বাড়ির দোতলার ঘরে অজ্ঞান হয়ে পড়ে ছিল। বাড়ির ঠিকে চাকর বেলা তিনটের সময় কাজ করতে এসে গঙ্গাপদকে আবিষ্কার করে। তারপর হাসপাতাল পুলিস ইত্যাদি। গঙ্গাপদর জ্ঞান হয়েছে, কিন্তু প্রচুর রক্তপাতের ফলে এখনো ভারি দুর্বল।
গঙ্গাপদ আজ বিকেলবেলা তার দোতলার ঘরে রাস্তার দিকে জানলার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল, হঠাৎ সামনের দিক থেকে বন্দুকের গুলি এসে তার চুলের মধ্যে দিয়ে লাঙল চষে চলে যায়। খুলির ওপর গভীর টানা দাগ পড়েছে, কিন্তু গুলি খুলি ফুটো করে ভিতরে ঢুকতে পারেনি, হাড়ের ওপর দিয়ে পিছলে বেরিয়ে গেছে।
বন্দুকের গুলিটা ঘরের মধ্যেই পাওয়া গিয়েছে, দেখে মনে হলো পিস্তল কিংবা রিভলবারের গুলি। পরীক্ষার জন্যে পাঠিয়েছে।
এবার চলুন গঙ্গাপদর বয়ান শুনবেন। তাকে খানিকটা রক্ত দেওয়া হয়েছে, এতক্ষণে সে বোধ হয় বেশ চনমনে হয়েছে।
গঙ্গাপদ চৌধুরী একটি ছোট ঘরে সঙ্কীর্ণ লোহার খাটের ওপর শুয়ে ছিল। মাথার ওপর পাগড়ির মত ব্যান্ডেজ, তার নীচে শীর্ণ লম্বাটে ধরনের একটি মুখ। মুখের রঙ বোধ করি রক্তপাতের ফলে ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। বয়স আন্দাজ পঁয়ত্ৰিশ। ভাবভঙ্গীতে ভালমানুষীর ছাপ।
ব্যোমকেশ ও রাখালবাবু খাটের দু’পাশে চেয়ার টেনে বসলেন। গঙ্গাপদ একবার এর দিকে একবার ওর দিকে তাকাল; তার পাংশু অধরে একটুখানি ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠল। লোকটি মৃত্যুর সিংদরজা থেকে ফিরে এসেছে, কিন্তু তার মুখে চোখে ত্ৰাসের কোনো চিহ্ন নেই।
রাখালবাবু বললেন–‘এঁর নাম ব্যোমকেশ বক্সী। ইনি আপনার গল্প শুনতে এসেছেন।’
গঙ্গাপদর চক্ষু হষোৎফুল্ল হয়ে উঠল, সে ধড়মড় করে উঠে বসবার চেষ্টা করলে ব্যোমকেশ তার বুকে হাত রেখে আবার শুইয়ে দিল, বলল—’উঠবেন না, শুয়ে থাকুন।’
গঙ্গাপদ বুকের ওপর দু’হাত জোড় করে সংহত সুরে বলল–’আপনি সত্যান্বেষী ব্যোমকেশবাবু! কী সৌভাগ্য। আমার কলকাতা আসা সার্থক হলো।’
রাখালবাবু বললেন–‘আপনি যদি শরীরে যথেষ্ট বল পেয়ে থাকেন তাহলে ব্যোমকেশবাবুকে আপনার গল্প শোনান। আর যদি এখনো দুর্বল মনে হয় তাহলে থাক, আমরা পরে আবার আসব।’
গঙ্গাপদ বলল— ‘না না, আমার আর কোনো দুর্বলতা নেই। খুব খানিকটা রক্ত নাড়ির মধ্যে ঠুসে দিয়েছে কিনা।’ বলে হেসে উঠল।
‘তাহলে বলুন।’
খাটের পাশে টিপাইয়ের ওপর এক গ্লাস জল রাখা ছিল, গঙ্গাপদ বালিশের ওপর উচু হয়ে শুয়ে এক চুমুক জল খেলো, তারপর হাসি-হাসি মুখে গল্প বলতে আরম্ভ করল :
আমার নাম কিন্তু গঙ্গাপদ চৌধুরী নয়, অশোক মাইতি। কলকাতায় এসে আমি কেমন করে গঙ্গাপদ চৌধুরী বনে গেলাম সে ভারি মজার গল্প। বলি শুনুন।
আমার বাড়ি মীরাটে। সিপাহী যুদ্ধেরও আগে আমার পূর্বপুরুষ মীরাটে গিয়ে বাসা বেঁধেছিলেন। সেই থেকে আমরা মীরাটের বাসিন্দা, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক খুব বেশি নেই।
আমি মীরাটে সামান্য চাকরি করি। বাড়িতে বিধবা মা আছেন; আর একটি আইবুড়ো বোন। আমি বিয়ে করেছিলাম। কিন্তু বছর পাঁচেক আগে বিপত্নীক হয়েছি। আর বিয়ে করিনি। বোনটাকে পাত্রস্থ না করা পর্যন্ত
কিন্তু সে যাক। অফিসে এক মাস ছুটি পাওনা হয়েছিল, ভাবলাম কলকাতা বেড়িয়ে আসি। কলকাতায় আমার আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব কেউ নেই; আমি ছেলেবেলায় একবার কলকাতায় এসেছিলাম, তারপর আর আসিনি। ভাবলাম স্বদেশ দেখাও হবে, আর সেই সঙ্গে বোনটার জন্যে যদি একটি পাত্র পাই—
হাওড়ায় এসে নোমলাম। মীরাট থেকে এক হিন্দুস্থানী ধর্মশালার ঠিকানা এনেছিলাম, ঠিক ছিল সেখানেই উঠিব। ট্রেন থেকে নেমে ফটকের দিকে চলেছি, দেখি একটা দাড়িওয়ালা লোক আমার পাশে পাশে চলেছে, আর ঘাড় ফিরিয়ে ফিরিয়ে আমার পানে তাকাচ্ছে। একবার মনে হলো কিছু বলবে, কিন্তু মুখ খুলে কিছু না বলে আবার মুখ বন্ধ করল। আমি ভাবলাম, এ আবার কে? হয়তো হোটেলের দালাল।
ধৰ্মশালায় পৌঁছে কিন্তু মুশকিলে পড়ে গেলাম। সেখানে একটি কুঠুরিও খালি নেই, সব ভর্তি, এখন হোটেলে যেতে হয়; কিন্তু হোটেলে অনেক খরচ, অতি খরচ আমার পোষাবে না। কি করব ভাবছি, এমন সময় সেই দাড়িওয়ালা লোকটি এসে উপস্থিত। চোখে নীল চশমা। লাগিয়েছে। বলল–’জায়গা পেলেন না?’
বললাম-‘না। আপনি কে?’
সে বলল–’আমার নাম গঙ্গাপদ চৌধুরী। আপনি কোথা থেকে আসছেন?’
বললাম— ‘মীরাট থেকে। আমার নাম অশোক মাইতি। আপনি কি হোটেলের এজেন্ট?’
সে বলল— ‘না। হাওড়া স্টেশনে আপনাকে দেখেছিলাম, দেখেই চমক লেগেছিল। কেন চমক লেগেছিল। সে কথা পরে বলছি। এখন বলুন দেখি, কলকাতায় কি আপনার থাকবার জায়গা নেই?’
বললাম।—’থাকলে কি ধর্মশালায় আসি? কিন্তু এখানেও দেখছি জায়গা নেই। হোটেলের খরচ দিতে পারব না। তাই ভাবছি কী করি।’
গঙ্গাপদ বলল–‘দেখুন, আমার একটা প্রস্তাব আছে। কলকাতায় আমি থাকি, দক্ষিণ কলকাতায় আমার বাসা আছে। আমি মাসখানেকের জন্যে বাইরে যাচ্ছি, বাসাটা খালি পড়ে থাকবে। তা আপনি যদি আমার বাসায় থাকেন আপনারও সুবিধে আমারও সুবিধে। আমার একটা ঠিকে চাকর আছে, সে আপনার দেখাশোনা করবে, কোনো কষ্ট হবে না।’
আমি আশ্চর্য হয়ে বললাম।—’আমার মত একজন অচেনা লোকের হাতে আপনি বাসা ছেড়ে দেবেন!’
গঙ্গাপদ একটু হেসে বলল–‘তাহলে চমক লাগার কথাটা বলি। স্টেশনে আপনাকে দেখে মনে হয়েছিল। আপনি আমার ভাই দুগাপদ। তারপর ভুল বুঝতে পারলাম। দুগাপদ দু’ বছর আগে নিরুদেশ হয়ে গিয়েছিল, বোধ হয় সন্ন্যাসী হয়ে গেছে। আপনার সঙ্গে তার চেহারার খুব মিল আছে। তাই-মানে—আপনার প্রতি আমার একটু-ইয়ে—। আপনি যদি আমার বাসায় থাকেন আমি খুব নিশ্চিন্ত হব।’
আমার ভাগ্যে এমন যোগাযোগ ঘটবে স্বপ্নেও ভাবিনি। খুশি হয়ে রাজী হয়ে গেলাম।
গঙ্গাপদ আমাকে ট্যাক্সিতে তুলে তার বাসায় নিয়ে গেল। ছোট রাস্তায় ছোট বাড়ির দোতলায় একটি মাঝারি গোছের ঘর, ঘরে তক্তপোশের ওপর বিছানা, দেয়ালে আলমারি, দু’ একটা বাক্স সুটকেস। আর কিছু নেই।
হিন্দুস্থানী চাকরাটা উপস্থিত ছিল। তার নাম রামচতুর। গঙ্গাপদ তাকে পয়সা দিল দোকান থেকে চা জলখাবার আনতে। সে চলে গেলে গঙ্গাপদ রাস্তার দিকের জানলাটা খুলে দিয়ে তক্তপোশে এসে বসল, বলল–‘বসুন, আপনার সঙ্গে আরো কিছু কথা আছে।’
আমিও তক্তপোশে বসলাম। গঙ্গাপদ বলল—’আমার বাড়িওয়ালা কাশীপুরে থাকে, লোকটা ভাল নয়। সে যদি জানতে পারে। আমি অন্য কাউকে ঘরে বসিয়ে একমাসের জন্য বাইরে গেছি। তাহলে হাঙ্গামা বাধাতে পারে। তাই আপনাকে একটি কাজ করতে হবে। যদি কেউ আপনার নাম জিজ্ঞেস করে, আপনি বলবেন–গঙ্গাপদ চৌধুরী। লোকে ভাববে। আমি দাড়ি কামিয়ে ফেলেছি।’
শুনে আমার খুব মজা লাগল, বললাম–’বেশ তো, এ আর বেশি কথা কি?’
তারপর রামচতুর চা জলখাবার নিয়ে এল; গঙ্গাপদ আমাকে জলযোগ করিয়ে উঠে পড়ল, বলল— আচ্ছা, এবার তাহলে আমি চলি। আমার জিনিসপত্র ঘরে রইল। নিশ্চিন্ত মনে বাস করুন! নমস্কার।’
দোর পর্যন্ত গিয়ে গঙ্গাপদ ফিরে এল, বলল–’একটা কথা বলা হয়নি। যখন ঘরে থাকবেন, মাঝে মাঝে জানলা খুলে রাস্তার দিকে তাকাবেন; লক্ষ্য করবেন রাস্তা দিয়ে লাল কোট পরা কোনো লোক যায় কিনা। যদি দেখতে পান, তারিখ আর সময়টা লিখে রাখবেন। কেমন?
‘আচ্ছা।’
গঙ্গাপদ চলে গেল। আমার সন্দেহ হলো তার মাথায় ছিট আছে। কিন্তু থাকুক ছিট, লোকটা ভাল। আমি বেশ আরামে রইলাম। রামচতুর আমার সেবা করে। আমি সকাল বিকেল এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াই, দুপুরে আর রাত্রে ঘরে থাকি। মাঝে মাঝে জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দেখি, রাস্তা দিয়ে লাল কোট পরা কেউ যাচ্ছে কিনা। লাল কোট পরে কলকাতার রাস্তায় কেউ ঘুরে বেড়াবে এ যেন ভাবাই যায় না। তবু গঙ্গাপদ যখন বলেছে, হবেও বা।
হগুপ্তাখানেক বেশ আরামে কেটে গেল।
আজ সকালে খবরের কাগজের অফিসে গেছলাম বোনের পাত্র সম্বন্ধে একটা বিজ্ঞাপন দিতে। ফিরে এসে খাওয়া-দাওয়া সেরে তক্তপোশে শুলাম। রামচতুর চলে গেল।
ঘুম ভাঙল আন্দাজ পৌঁনে তিনটের সময়। বিছানা থেকে উঠে জানলা খুলে দিলাম। জানলার সামনে দাঁড়িয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়েছি, হঠাৎ মাথাটা ঝনঝনি করে উঠল, উলটে মেঝের ওপর পড়ে গেলাম। তারপর আর কিছু মনে নেই, অসহ্য যন্ত্রণায় অজ্ঞান হয়ে পড়লাম।
হাসপাতালে জ্ঞান হলো। মাথায় পাগড়ি বেঁধে শুয়ে আছি! কে নাকি আমার মাথা লক্ষ্য করে বন্দুক ছুঁড়েছিল, বন্দুকের গুলি আমার খুলির ওপর আঁচড় কেটে চলে গেছে।–‘কী ব্যাপার বলুন দেখি ব্যোমকেশবাবু?’
‘সেটা বুঝতে সময় লাগবে। আপনি এখন বিশ্রাম করুন।’ ব্যোমকেশ উঠে দাঁড়াল।
পরদিন বেলা সাড়ে দশটা নাগাদ রাখালবাবু ব্যোমকেশের বাড়িতে এলেন। ব্যোমকেশ তার অফিস ঘরে বসে। অলসভাবে খবরের কাগজের বিজ্ঞাপন পড়ছিল, রাখালবাবুকে একটি সিগারেট দিয়ে বলল— ‘নতুন খবর কিছু আছে নাকি?’
রাখালবাবু সিগারেট ধরিয়ে বললেন–’রামচতুর পালিয়েছে।’
‘রামচতুর! ও—সেই চাকরাটা।’
‘হাঁ। কাল বিকেলবেল পুলিসকে খবর দিয়ে সেই যে গা-ঢাকা দিয়েছে তাকে আর পাওয়া যাচ্ছে না।’
‘সত্যিই রাম-চতুর। পুলিসের হাঙ্গামায় থাকতে চায় না। এতক্ষণ বোধ হয় বেহার প্রদেশে ফিরে গিয়ে ভুট্টা পুড়িয়ে খাচ্ছে। আর কিছু?’
‘বাড়িওয়ালাকে কাশীপুর থেকে খুঁজে বার করেছি। আজ সকালে তাকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলাম। অশোক মাইতিকে দেখে বলল, এই গঙ্গাপদ চৌধুরী; তারপর গলার আওয়াজ শুনে বলল, না গঙ্গাপদ নয়, কিন্তু চেহারার খুব মিল আছে।’
এই পর্যন্ত শুনে ব্যোমকেশ বলল— ‘গঙ্গাপদ চৌধুরীর সঙ্গে অশোক মাইতির চেহারার মিল আছে?’
রাখালবাবু বললেন–’হ্যাঁ, গঙ্গাপদ বলেছিল তার ভায়ের সঙ্গে মিল আছে, গঙ্গাপদ এবং তার ভায়ের চেহারা যদি এক রকম হয়–‘
‘গঙ্গাপদর দাড়িটা মেকি মনে হচ্ছে।’
‘আমারও তাই মনে হচ্ছে। কিন্তু তার উদ্দেশ্য ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। অশোক মাইতিকে এনে নিজের বাসায় ভুলল কেন? নিজের নামটাই বা তাকে দান করুল কেন? আসল কারণটা কী?’
ব্যোমকেশ কি-একটা বলতে গিয়ে থেমে গেল, তারপর অলস কণ্ঠে বলল— ‘চিন্তার কথা বটে। আসল গঙ্গাপদ বোধ করি এখনো নিরুদেশ।’
‘হ্যাঁ। তার ঘরের আলমারি থেকে কিছু কাগজপত্র পাওয়া গেছে, তা থেকে জানা যায়। সে কলকাতায় এক লোহার কারখানায় কাজ করে, সম্প্রতি একমাসের ছুটি নিয়ে অদৃশ্য হয়েছে।’
‘গুলিটা কোথা থেকে এসেছিল জানা গেছে?’
‘সামনের বাড়ি থেকে। রাস্তার ওপারে একটা পোড়ো বাড়ি কিছুদিন থেকে খালি পড়ে আছে, তার দোতলার জানলা থেকে কেউ গুলি ছুড়েছিল। পোড়ো বাড়ির ঘরের মধ্যে কয়েকটা তাজা আঙুলের ছাপ পাওয়া গেছে, কিন্তু করি আঙুলের ছাপ তা সনাক্ত করার উপায় নেই।’
ব্যোমকেশ কিছুক্ষণ সংবাদগুলিকে একত্র করে মনের মধ্যে রোমন্থন করল, তারপর বলল—‘রহস্যটা কিছু পরিষ্কার হলো?’
রাখালবাবু সিগারেটে দুটো লম্বা টান দিয়ে সেটাকে অ্যাশ-ট্রের ওপর নিবিয়ে দিলেন, আস্তে আস্তে ধোঁয়া ছেড়ে বলতে আরম্ভ করলেন–‘গঙ্গাপদ চৌধুরীর দাড়ি যে নকল দাড়ি তার একটা জোরালো প্রমাণ, তার বাড়িওয়ালা তার মুখে কখনো দাড়ি-গোঁফ দেখেনি; আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তাহলে প্রশ্ন উঠছে, গঙ্গাপদ ছদ্মবেশে বেড়ায় কেন। একটা কারণ এই হতে পারে যে, সে ছদ্মবেশে কোনো গুরুতর অপরাধ করতে চায়। তারপর একদিন হাওড়া স্টেশনে সে অশোক মাইতিকে দেখতে পায়, নিজের চেহারার সঙ্গে সাদৃশ্য দেখে তাকে ভুলিয়ে নিজের বাসায় এনে বসায়, তারপর নিজে গা-ঢাকা দেয়। হয়তো সে নিজেই সামনের বাড়ি থেকে অশোককে খুন করার চেষ্টা করেছিল, যাতে লোকে মনে করে যে, গঙ্গাপদই মরেছে। হয়তো এইভাবে সে জীবনবীমার টাকা সংগ্রহ করতে চেয়েছিল। যাই হোক, এখন অবস্থা দাঁড়িয়েছে এই যে, তার পরিচয় এবং বর্তমান ঠিকানা আমরা জানি না; সে অশোক মাইতিকে খুন করবার চেষ্টা করেছিল কিনা তা নিশ্চয়ভাবে জানি না, কারণ তার কাগজপত্রের মধ্যে জীবনবীমার পলিসি পাওয়া যায়নি। এখন কর্তব্য কি?’
ব্যোমকেশ একটু ভেবে বলল— ‘মীরাটে খোঁজখবর নেওয়া হয়েছে?’
রাখালবাবু বললেন–‘অশোক মাইতিকে দিয়ে মীরাটে তার মা’র নামে টেলিগ্রাম করিয়েছি। এখনো জবাব আসেনি। কেন, আপনি কি অশোক মাইতিকে সন্দেহ করেন?’
‘অশোক মাইতিকে বড় বেশি ভাল মানুষ বলে মনে হয়। সে হয়তো সত্যি কথাই বলছে, কিন্তু তার কোনো সমর্থন নেই। রামচতুর সমর্থন করতে পারত, কিন্তু সে পালিয়েছে। —যাক, গঙ্গাপদ কোথায় কাজ করে?’
‘কলকাতার উপকণ্ঠে একটা লোহার কারখানা আছে সেইখানে।’ রাখালবাবু পকেট থেকে নোটবুক বার করেপ পড়লেন–‘Scrap Iron & Steel Factory Ltd.’
‘সেখানে খোঁজ নিলে কিছু খবর পাওয়া যেতে পারে।’
‘সেখানে যাব বলেই বেরিয়েছি। আপনি আসবেন সঙ্গে?’
‘যাব। বাড়িতে বেকার বসে থাকার চেয়ে ঘুরে বেড়ালে স্বাস্থ্য ভাল থাকে।’
কলকাতার দক্ষিণ সীমানার বাইরে বিঘে দুই জমির ওপর লোহার কারখানা। জমির এধারে ওধারে কয়েকটা করোগেট টিনের উঁচু ছাউনি, তাদের ফাঁকে ফাঁকে এখানে ওখানে স্তুপীকৃত জং-ধরা ঝুনো পুরনো লোহা। চারিদিকে কমীদের তৎপরতা দেখে মনে হয় কারখানার কাজ চালু আছে। ফটকের পাশে একটি ছোট পাকা বাড়ি, এটি কোম্পানির অফিস।
রতনলাল কাপড়িয়া অফিস ঘরে ছিলেন। রতনলাল মাড়োয়ারী হলেও তিন পুরুষ ধরে বাংলাদেশে আছেন, প্রায় বাঙালী হয়ে গেছেন; পরিষ্কার বাংলা বলেন। দু’জনকে সামনে বসিয়ে পান সিগারেট দিলেন, বললেন—‘হুকুম করুন।’
রাখালবাবু একবার ব্যোমকেশের পানে তাকিয়ে প্রশ্ন আরম্ভ করলেন, ব্যোমকেশ চুপ করে বসে শুনতে লাগল।–
‘গঙ্গাপদ চৌধুরী এখানে কাজ করে?’
‘হ্যাঁ। উপস্থিত ছুটিতে আছে।’
‘সে কী কাজ করে?
ইলেকট্রিক ফার্নেসের মেল্টার।’
‘সে কাকে বলে?’
‘আজকাল ইলেকট্রিক আগুনে লোহা গলানো হয়। যে লোক এই কাজ জানে তাকে মেল্টার বলে। গঙ্গাপদ আমার সর্দার মেল্টার। সে ছুটিতে গেছে বলে আমার একটু অসুবিধে হয়েছে। তার অ্যাসিস্টেন্ট দু’জন আছে বটে, কোনো মতে কাজ চালিয়ে নিচ্ছে। আমাদের দেশে ভাল মেল্টার বেশি নেই, যে দু’চারজন আছে, গঙ্গাপদ তাদের একজন।’
‘তাই নাকি! সে ছুটি নিল কেন?’
‘তার একমাস ছুটি পাওনা হয়েছিল। মনে হচ্ছে যেন বলেছিল ভারত ভ্বমণে যাবে; আজকাল সব স্পেশাল ট্রেন হয়েছে সারা দেশ ঘুরিয়ে নিয়ে বেড়ায়।’
‘হ্যাঁ। ওর আত্মীয়স্বজন কেউ আছে?’
‘বোধ হয়না। একলা থাকত।’
‘ওর স্বভাব-চরিত্র কেমন?’
‘খুব কাজের লোক। বুদ্ধিসুদ্ধি আছে। হাঁশিয়ার।’
রাখালবাবু ব্যোমকেশের পানে তাকালেন। ব্যোমকেশ যেন ঝিমিয়ে পড়েছিল, একটু সজাগ হয়ে বলল— ‘গঙ্গাপদর কোনো শত্ৰু আছে কিনা। আপনি জানেন?’
রতনলাল ভুরু তুললেন-‘শত্রু! কই, গঙ্গাপদর শক্র আছে এমন কথা তো কখনো শুনিনি-ওঃ!’
তিনি হঠাৎ হেসে উঠলেন–’একজনের সঙ্গে গঙ্গাপদর শক্রতা হয়েছিল, সে এখন জেলে।’
‘তিনি কে?’
‘তার নাম নরেশ মণ্ডল। তিন বছর আমার সর্দার মেল্টার ছিল, গঙ্গাপদ ছিল তার অ্যাসিস্টেন্ট। দু’জনের মধ্যে খিটিমিটি লেগে থাকত। নরেশ ছিল রাগী, আর গঙ্গাপদ মিটমিট বজ্জাত। কিন্তু দু’জনেই সমান কাজের লোক। আমি মজা দেখতাম। তারপর হঠাৎ একদিন নরেশ একজনকে খুন করে বসল। গঙ্গাপদ তার বিরুদ্ধে সাক্ষী দিল। নরেশের জেল হয়ে গেল।’
‘খুনের জন্যে জেল! কতদিনের মেয়াদ জানেন?’
‘ঠিক জানি না। চার পাঁচ বছর হবে। নরেশ জেলে যাবার পর গঙ্গাপদ সদার মেল্টার হয়ে বসল।’ বলে রতনলাল হো হো শব্দে হাসলেন।
ব্যোমকেশ হাসিমুখে উঠে দাঁড়াল–’আপনাকে অনেক বিরক্ত করেছি, এবার উঠি। একটা কথা–গঙ্গাপদকে আপনি শেষবার দেখেছেন কবে?’
‘দিন বারো-চোদ্দ আগে।’
‘তখন তার মুখে দাড়ি ছিল?’
‘দাড়ি! গঙ্গাপদর কস্মিনকালেও দাড়ি ছিল না।’
‘ধন্যবাদ।’
রাস্তায় বেরিয়ে রাখালবাবু প্রশ্ন করলেন–‘অতঃপর?’
ব্যোমকেশ বলল–’অতঃপর অন্ধকারে হাতড়ে বেড়ানো ছাড়া আর তো কোনো রাস্তা দেখছি না।–এক কাজ করা যেতে পারে। চার পাঁচ বছর আগে নরেশ মণ্ডল খুন করে জেলে গিয়েছিল; তার বিচারের দলিলপত্র আদালতের দপ্তর থেকে তুমি নিশ্চয় যোগাড় করতে পারবে। অন্তত হাকিমের রায়টা যোগাড় কর। সেটা পড়ে দেখলে হয়তো কিছু হদিস পাওয়া যাবে।’
রাখালবাবু বললেন–’বেশ, রায় যোগাড় করব। নেই কাজ তো খাই ভাজ। কাল সকালে আপনি খবর পাবেন।’
ব্যোমকেশরা প্ৰায় মাস ছয়েক হলো কেয়াতলার নতুন বাড়িতে এসেছে। বাড়িটি ছোট, কিন্তু দোতলা। নীচে তিনটি ঘর, ওপরে দু’টি। সত্যবতী এই বাড়িটি নিয়ে সারাক্ষণ যেন পুতুল খেলা করছে। আনন্দের শেষ নেই; এটা সাজাচ্ছে, ওটা গোছাচ্ছে, নিজের হাতে ঝাঁট দিচ্ছে, ঝাড়-পোছ করছে। ব্যোমকেশ কিন্তু নির্বিকার, শালগ্রামের শোয়া-বসা বোঝা যায় না।
পরদিন বিকেলবেলায় ব্যোমকেশ তার বসবার ঘরের জানলায় দাঁড়িয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিল, দেখছিল লাল কোট পরা কোনো লোক চোখে পড়ে কি না। কয়েকটি লাল শাড়ি পরা মহিলা গেলেন, দু’ একটি লাল ফ্রক পরা খোকাথুকিকেও দেখা গেল, কিন্তু লাল কোট পরা বয়স্থ পুরুষ একটিও দৃষ্টিগোচর হলো না। অনুমান হয় আজকাল লাল কোট পরে কোনো পুরুষ কলকাতার রাস্তায় বেরোয় না।
এই সময় টেলিফোন বাজল। রাখালবাবু বললেন–’ব্যোমকেশদা, মামলার রায় পেয়েছি। পড়ে দেখলাম আমাদের কাজে লাগতে পারে এমন কিছু নেই। পিওনের হাতে পাঠিয়ে দিচ্ছি, আপনি পড়ে দেখুন।’
আধা ঘণ্টা পরে থানা থেকে কনস্টেবল এসে রায় দিয়ে গেল। আলিপুর আদালতের জজ সাহেবের রায়, কড়া সরকারী কাগজে বাজাপ্ত নকল। পনেরো-ষোল পৃষ্ঠা। ব্যোমকেশ সিগারেট ধরিয়ে পড়তে বসল।
রায়ের আরম্ভে জজ সাহেব ঘটনার বয়ান করেছেন। তারপর সাক্ষী-সাবুদের আলোচনা করে দণ্ডাজ্ঞা দিয়েছেন। রায়ের সারাংশ এই;
‘আসামী নরেশ মণ্ডল, বয়স ৩৯। Scrap Iron & Steel Factory Ltd. নামক লোহার কারখানায় কাজ করে। অপরাধ–রাস্তায় একজন ভিক্ষুককে খুন করিয়াছে। পিনাল কাডের ৩০৪/৩২৩ ধারা অনুযায়ী দায়রা সোপর্দ হইয়াছে।
‘প্রধান সাক্ষী গঙ্গাপদ চৌধুরী এবং অন্যান্য সাক্ষীর এজাহার হইতে জানা যায় যে, আসামী অত্যন্ত বদরাগী ও কলহপ্ৰিয়। ঘটনার দিন বিকাল আন্দাজ পাঁচটার সময় আসামী নরেশ মণ্ডল ও সাক্ষী গঙ্গাপদ চৌধুরী একসঙ্গে কর্মস্থল হইতে বাসায় ফিরিতেছিল। দু’জনে পূবেক্তি লোহার কারখানায় কাজ করে, গঙ্গাপদ চৌধুরী নরেশ মণ্ডলের সহকারী।
‘পথ চলিতে চলিতে বাজারের ভিতর দিয়া যাইবার সময় নরেশ সামান্য কারণে গঙ্গাপদর সঙ্গে ঝগড়া জুড়িয়া দিল; তখন গঙ্গাপদ তাহার সঙ্গে সঙ্গে না গিয়া পিছাইয়া গেল; নরেশ আগে আগে চলিতে লাগিল, গঙ্গাপদ তাহার বিশ গজ। পিছনে রহিল।
‘এই সময় একটা কোট-প্যান্ট পরা মাদ্রাজী ভিক্ষুক নরেশের পিছনে লাগিল, ভিক্ষা চাহিতে চাহিতে নরেশের সঙ্গে সঙ্গে চলিল। ভিক্ষুকটার চেহারা জীৰ্ণ শীর্ণ, কিন্তু সে ইংরাজিতে কথা বলে। বাজারে অনেকেই তাহাকে চিনিত।
‘গঙ্গাপদ তাঁহাদের পিছনে যাইতে যাইতে দেখিল, নরেশ ক্রুদ্ধভাবে হাত নাড়িয়া তাহাকে তাড়াইবার চেষ্টা করিতেছে, কিন্তু ভিক্ষুক তাহার সঙ্গ ছাড়িতেছে না। তারপর হঠাৎ নরেশ পাশের দিকে ফিরিয়া ভিক্ষুকের ‘গালে সজোরে একটা চড় মারিল। ভিক্ষুক রাস্তার উপর পড়িয়া গেল। নরেশ আর সেখানে দাঁড়াইল না, গট গঢ় করিয়া চলিয়া গেল।
‘গঙ্গাপদ বিশ গজ। পিছন হইতে সবই দেখিয়াছিল, সে তাড়াতাড়ি আসিয়া দেখিল ভিক্ষুক অনড় পড়িয়া আছে; তারপর তাহার নাড়ি টিপিয়া দেখিল সে মরিয়া গিয়াছে। ডাক্তারের রিপোর্ট থেকে জানা যায় তাহার প্রাণশক্তি বেশি ছিল না, অল্প আঘাতেই মৃত্যু হইয়াছে।
‘ইতিমধ্যে আরও অনেক লোক আসিয়া জুটিয়াছিল; তাহাদের মধ্যে কেহ কেহ নরেশকে চড় মুক্তি দেখিয়াছিল। তাহারা পুলিস খবর দিল। পুলিস নরশেরর বাসায় গিয়া তাহাকে প্রেপ্তার করিল।
‘পুলিসের পক্ষে এই মামলায় যাহারা সাক্ষী দিয়াছে তাহারা সকলেই নিরপেক্ষ, কেবল গঙ্গাপদ ছাড়া। আসামী অপরাধ অস্বীকার করিয়াছে; তাহার বক্তব্য–গঙ্গাপদ তাহার শত্ৰু, তাহাকে সরাইয়া কর্মক্ষেত্রে তাহার স্থান অধিকার করিতে চায়; তাই সে মিথ্যা মামলা সাজাইয়া তাহাকে ফাঁসাইয়াছে।
‘এ কথা সত্য যে সাক্ষী গঙ্গাপদ নিঃস্বাৰ্থ ব্যক্তি নয়; কিন্তু অন্য সাক্ষীদের সঙ্গে তাহার এজাহার মিলাইয়া দেখিলে স্পষ্টই প্রতীয়মান হয় যে, গঙ্গাপদর সাক্ষ্য মিথ্যা নয়।
‘এ অবস্থায় আসামীকে দোষী সাব্যস্ত করিয়া অনিচ্ছাকৃত হত্যার জন্য ৩০৪ ধারা অনুসারে ৩ বৎসর সশ্রম কারাদণ্ড ধাৰ্য হইল।’
ব্যোমকেশের রায় পড়া যখন শেষ হলো তখন সন্ধ্যা নেমেছে, ঘর অন্ধকার হয়ে গেছে। ব্যোমকেশ অনেকক্ষণ অন্ধকারে চুপ করে বসে রইল, তারপর আলো জেলে টেলিফোন তুলে নিল–
‘রাখাল! রায় পড়লাম।’
‘কিছু পেলেন?’
‘একটা রাগী মানুষের চরিত্র পেলাম।’
‘তাহলে রায় পড়ে কোনো লাভ হলো না?’
‘বলা যায় না।—যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখ তাই, পাইলে পাইতে পার লুকানো রতন।’
‘তা বটে।’
‘ভাল কথা, পোড়ো বাড়িতে যে আঙুলের ছাপ পাওয়া গিয়েছিল তার ফটো নেওয়া হয়েছে?’
‘হয়েছে।’
‘গঙ্গাপদ চৌধুরীর পাত্তা পাওয়া যায়নি?’
‘না। ভারত ভ্রমণের যত স্পেশাল ট্রেন আছে তাদের অফিসে খোঁজ নিয়েছিলাম। কিন্তু গঙ্গাপদ চৌধুরী নামে কোনো যাত্রীর নাম নেই।’
‘হুঁ। হয়তো ছদ্মনামে গিয়েছে।’
‘কিংবা যায়নি। কলকাতাতেই কোথাও লুকিয়ে বসে আছে।’
‘তাও হতে পারে। আর কোনো নতুন খবর আছে?’
‘এইমাত্র মীরাট থেকে ‘তার’ এসেছে। অশোক মাইতি খাঁটি মীরাটের লোক। ওখানে কোনো জাল-জুচ্চুরি নেই।’
‘ভাল; আর কিছু।’
‘নতুন খবর আর কিছু নেই। এখন কর্তব্য কি বলুন!’
‘কর্তব্য কিছু ভেবে পাচ্ছি না। একটা কথা। নরেশের জেলের মেয়াদ এতদিনে ফুরিয়ে আসার কথা, সে জেল থেকে বেরিয়েছে কিনা খবর নিতে পোর?’
‘পারি। কাল সকালে খবর পাবেন।’
পরদিন বেলা ন’টার সময় রাখালবাবু ব্যোমকেশের কাছে এলেন। মুখ গম্ভীর। বললেন–‘ব্যাপার গুরুতর। দেড়মাস আগে নরেশ মণ্ডল জেল থেকে ছাড়া পেয়েছে। জেলে ভাল ছেলে সেজে ছিল তাই কিছু দিনের রেয়াত পেয়েছে।’
ব্যোমকেশ বলল–’হুঁ। জেল থেকে বেরিয়ে সে কোথায় গেছে সন্ধান পেয়েছ?’
‘তার পুরোনো বাসায় যায়নি। কারখানাতেও যায়নি, কাল রতনলাল কাপড়িয়ার মুখে তা জানতে পেরেছি। সুতরাং সে ডুব মেরেছে।’
ব্যোমকেশ একটু চুপ করে থেকে বলল–‘ব্যাপারটা এখন পরিষ্কার হচ্ছে। নরেশের মনে যদি পাপ না থাকবে তাহলে সে ডুব মারবে কেন? সে রতনলালের কাছে গিয়ে চাকরিটা আবার ফিরে পাবার চেষ্টা করত।’
‘আমারও তাই মনে হয়।’
‘গল্পটা এখন কালানুক্রমে সাজানো যেতে পারে।–নরেশ মণ্ডল রাগী এবং ঝগড়াটে, গঙ্গাপদ মিটমিটে শয়তান। দু’জনে এক কারখানায় কাজ করত; দু’জনের মধ্যে খিটিমিটি লেগেই থাকত। গঙ্গাপদর মতলব নরেশকে সরিয়ে নিজে তার জায়গায় বসবে। কিন্তু নরেশকে সরানো সহজ নয়, সে কাজের লোক।
‘হঠাৎ গঙ্গাপদ সুযোগ পেয়ে গেল। নরেশ রাস্তায় একটা ভিখিরিকে চড় মেরে শেষ করে দিল। আর যায় কোথায়! গঙ্গাপদ নরেশকে ফাঁসিকাঠে ঝোলাবার জন্যে উঠে-পড়ে লাগল।
‘নরেশের কিন্তু ফাঁসি হলো না। সে দোষী সাব্যস্ত হলেও তার তিন বছর কারাদণ্ড হলো। গঙ্গাপদর পক্ষে একটা মন্দের ভাল, সে কারখানায় সদর মোল্টার হয়ে বসল। নরেশ জেলে গেল।
নিরেশ লোকটা শুধু বদমেজাজী নয়, সে মনের মধ্যে রাগ পুষে রাখে। জেলে যাবার সময় সে বোধ হয় প্রতিজ্ঞা করেছিল, গঙ্গাপদকে খুন করে প্রতিহিংসা সাধন করবে। তিন বছর ধরে সে এই প্রতিহিংসার আগুনে ঘৃতাহুতি দিয়েছে।
‘গঙ্গাপদ জানত নরেশের তিন বছরের জেল হয়েছে, সে তঙ্কেতকে ছিল। তাই নরেশ যখন মেয়াদ ফুরবার আগেই জেল থেকে বেরুল, গঙ্গাপদ জানতে পারল। তার প্রাণে ভয় ঢুকল। হয়তো সে দেখেছিল নরেশ তার বাসার আশেপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে কিংবা সামনের পোড়ো বাড়ি থেকে উকিঝুকি মারছে। গঙ্গাপদ ঠিক করল কিছুদিনের জন্যে বাসা থেকে উধাও হবে।
‘সে কারখানা থেকে একমাসের ছুটি নিল এবং একটা দাড়ি যোগাড় করে তাই পরে ঘুরে বেড়াতে লাগল, যাতে নরেশ তাকে দেখলেও চিনতে না পারে। গঙ্গাপদ বোধহয় সত্যিই ভারত ভ্বমণে যাবার মতলব করেছিল, তারপর হঠাৎ একদিন হাওড়া স্টেশনে অশোক মাইতির সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। সে দেখল। অশোক মাইতির চেহারা অনেকটা তার নিজের মত।
‘গঙ্গাপদ লোকটা মহা ধূর্ত। তার মাথায় বুদ্ধি খেলে গেল, অশোক মাইতিকে যদি কোনোমতে নিজের বাসায় এনে তুলতে পারে তাহলে নরেশ ভুল করে তাকেই খুন করবে এবং ভাববে, গঙ্গাপদকে খুন করেছে। গঙ্গাপদ নিরাপদ হবে, তাকে আর প্রাণের ভয়ে পালিয়ে বেড়াতে হবে না। চাকরিটা অবশ্য যাবে; কিন্তু প্ৰাণ আগে, না চাকরি আগে? গঙ্গাপদ নিশ্চয় বুঝেছিল যে, নরেশ তাকে সামনের জানলা থেকে গুলি করে মারবে।
‘এবার নরেশের দিকটা ভেবে দেখা যাক। নরেশ জেল থেকে বেরিয়ে একটা পিস্তল যোগাড় করেছিল। পুরোনো বাসায় ফিরে যাবার কোনো মনে হয় না, সে অন্য কোথাও আড়া গেড়েছিল এবং গঙ্গাপদর বাসার সামনে পোড়ো বাড়িটায় যাতায়াত করেছিল। তার বোধ হয় মতলব ছিল গঙ্গাপদ কখনো তার জানলা খুলে দাঁড়ালে সে রাস্তার ওপর থেকে তাকে গুলি করে মারবে, তারপর কলকাতা ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাবে। গঙ্গাপদ খুন হবার পর কলকাতা শহর আর তার পক্ষে নিরাপদ নয়, পুলিস তাকে সন্দেহ করতে পারে।
‘যাহোক, গঙ্গাপদ অশোক মাইতিকে নিজের বাসায় বসিয়ে লোপাট হলো। অশোক মাইতিকে উপদেশ দিয়ে গেল, সে যেন মাঝে মাঝে জািনলা খুলে লক্ষ্য করে, রাস্তা দিয়ে লাল কোট পরা কেউ যায় কি না। লাল কোট পরা মানুষটা নিছক কল্পনা; আসল উদ্দেশ্য অশোক মাইতি জানিলা খুলে দাঁড়াবে এবং নরেশ সামনের জানলা থেকে তাকে গুলি করবে।
‘সবই ঠিক হয়েছিল। কিন্তু একটা চুক হয়ে গেল; অশোক মাইতি আহত হলো, মরাল না। সে পুলিসকে সব ঘটনা বলল। এখন গঙ্গাপদ আর নরেশ দু’জনের অবস্থাই সমান, ওরা কেউ আর আত্মপ্রকাশ করতে পারে না। খবরের কাগজে সংবাদ ছাপা হয়েছে, দু’জনকেই পুলিস খুঁজে বেড়াচ্ছে।
নিরেশ অবশ্য আইনত অপরাধী, সে খুন করবার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু গঙ্গাপদ লোকটা মহা পাষণ্ড; জেনেশুনে সে একজন নিরীহ লোককে অনিবাৰ্য মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিল। কিন্তু সে যদি ধরাও পড়ে তাকে শাস্তি দেওয়া যাবে কি না সন্দেহ।’
ব্যোমকেশ চুপ করল। রাখালবাবুও নীরবে কিছুক্ষণ টেবিলের ওপর আঙুল দিয়ে আকিজোক কেটে বললেন–‘তা যেন হলো। কিন্তু যাকে আইনত শাস্তি দেওয়া যাবে তাকে ধরবার উপায়। কি বলুন!’
আবার খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে ব্যোমকেশ বলল–’একমাত্র উপায়–বিজ্ঞাপন।’
‘বিজ্ঞাপন!’
‘হ্যাঁ।–পুকুরে ছিপ ফেলে বসে থাকা। মাছ যদি টোপ গেলে তবেই তাকে ধরা যাবে।’
তিন দিন পরে কলকাতার দুইটি প্রধান সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন বেরুল :
বম্বে স্টীল ফাউন্ড্রি লিমিটেড–
আমাদের বম্বের কারখানার জন্য অভিজ্ঞ ইলেকট্রিক মেল্টার চাই।
বেতন-৭০০-২৫-১০০০্।
প্রশংসাপত্র সহ দেখা করুন।
গড়িয়াহাট বাজারের কাছে রাস্তার উপর একটি ঘর, তার মাথার উপর সাইনবোর্ড ঝুলছে—
বম্বে স্টীল ফাউন্ড্রি লিমিটেড (ব্রাঞ্চ অফিস)।
ঘরের মধ্যে একটি টেবিলের সামনে রাখালবাবু বসে আছেন, তাঁর পরিধানে সাদা কাপড়চোপড়। তিনি অত্যন্ত মনোযোগের সঙ্গে নথিপত্র দেখছেন। অদূরে অন্য একটি ছোট টেবিলে ব্যোমকেশ টাইপরাইটার নিয়ে বসেছে। ঘরের দোরের কাছে তকমা-আঁটা একজন বেয়ারা। আর যারা আছে তারা প্রচ্ছন্নভাবে এদিকে ওদিকে আছে, তাদের দেখা যায় না।
প্রথম দিন ব্যোমকেশ ও রাখালবাবু বেলা দশটা থেকে পাঁচটা পর্যন্ত অফিস ঘরে বসে রইলেন, কোনো চাকরি-প্ৰাৰ্থ দেখা করতে এল না। পাঁচটার সময় ঘরের দোরে তালা লাগাতে লাগাতে রাখালবাবু বললেন– ‘বিজ্ঞাপন চালিয়ে যেতে হবে।’
পরদিন একটা লোক দেখা করতে এল। রোগা-পাটকা লোক, এক চড়ে মানুষ মেরে ফেলবে এমন চেহারা নয়। তার প্রশংসাপত্র দেখে জানা গেল, তার নাম প্রফুল্ল দে, সে একজন ইলেকট্রিকের মিস্ত্রী। ইলেকট্রিক মেল্টারের কাজ সে কখনো করেনি বটে, কিন্তু সুযোগ পেলে চেষ্টা করতে রাজী আছে। রাখালবাবু তার নাম-ধাম লিখে নিয়ে মিষ্টি কথায় বিদায় দিলেন।
তৃতীয় দিন তৃতীয় প্রহরে একটি লোক দেখা করতে এল। তাকে দেখেই রাখালবাবুর শিরদাঁড়া শক্ত হয়ে উঠল। মজবুত হাড়-চওড়া শরীর, গায়ের রং কালো, চোখের কোণে একটু রক্তিমাভা; গায়ে খাকি কোট, মাথায় চুল ক্রু-কাট করে ছাঁটা। সে সতর্কভাবে এদিক ওদিক চাইতে চাইতে ঘরে ঢুকল। রাখালবাবুর টেবিলের সামনে দড়িয়ে ধরা-ধরা গলায় বলল–’বিজ্ঞাপন দেখে এসেছি।’
‘বসুন।’
লোকটি সন্তপণে সামনের চেয়ারে বসল, একবার ব্যোমকেশের দিকে তীক্ষ্ণ সতর্ক চোখ ফেরাল। রাখালবাবু সহজ সুরে বললেন— ‘ইলেকট্রিক মেল্টারের কাজের জন্য এসেছেন?’
‘হ্যাঁ।’
‘সাটিফিকেট এনেছেন?’
লোকটি খানিক চুপ করে থেকে বলল–’আমার সার্টিফিকেট হারিয়ে গেছে। তিন বছর অসুখে ভুগেছি, কাজ ছেড়ে দিতে হয়েছিল। তারপর–সাটিফিকেট হারিয়ে ফেলেছি।’
‘আগে কোথায় কাজ করতেন?’
‘নাগপুরে একটা আয়রন ফাউন্ড্রি আছে, সেখানে কাজ করতাম।–দেখুন, আমি সত্যিই ইলেকট্রিক মেল্টারের কাজ জানি। বিশ্বাস না হয় আমি নিজের খরচে বম্বে গিয়ে তা প্রমাণ করে দিতে পারি।’
রাখালবাবু লোকটিকে ভাল করে দেখলেন, তারপর বললেন–’সে কথা মন্দ নয়। কিন্তু আমাদের এটা ব্রাঞ্চ অফিস, সবেমাত্র খোলা হয়েছে। আমি নিজের দায়িত্বে কিছু করতে পারি না। তবে এক কাজ করা যেতে পারে। আমি আজ বম্বেতে হেড অফিসে ‘তার করব, কাল বিকেল নাগাদ উত্তর পাব। আপনি কাল এই সময়ে যদি আসেন–’
‘আসব, নিশ্চয় আসব।’ লোকটি উঠে দাঁড়াল।
রাখালবাবু ব্যোমকেশের দিকে তাকিয়ে বললেন–‘বক্সী, ভদ্রলোকের নাম আর ঠিকানা লিখে নাও।‘
ব্যোমকেশ বলল–’আজ্ঞে।’
নাম আর ঠিকানা দিতে হবে শুনে লোকটি একটু থতিয়ে গেল, তারপর বলল–’আমার নাম নৃসিংহ মল্লিক। ঠিকানা ১৭ নম্বর কুঞ্জ মিস্ত্রী লেন।’
ব্যোমকেশ নাম ঠিকানা লিখে নিল। ইতিমধ্যে রাখালবাবু টেবিলের তলায় একটি গুপ্ত বোতাম টিপেছিলেন, বাইরে তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গদের কাছে খবর গিয়েছিল যে, ঘর থেকে যে ব্যক্তি বেরুবে তাকে অনুসরণ করতে হবে। রাখালবাবু নিঃসংশয়ে বুঝেছিলেন যে, এই ব্যক্তিই নরেশ মণ্ডল। কিন্তু তাকে গ্রেপ্তার করার আগে তার বাসার ঠিকানা পাকিভাবে জানা দরকার। সেখানে বন্দুক পাওয়া যেতে পারে।
কিন্তু কিছুই প্রয়োজন হলো না।
নরেশ দোরের দিকে পা বাড়িয়েছে এমন সময় আর একটি লোক ঘরে প্রবেশ করল। নবাগতকে চিনতে তিলমাত্র বিলম্ব হয় না, একেবারে অশোক মাইতির যমজ ভাই। সুতরাং গঙ্গাপদ চৌধুরী। আজ আর তার মুখে দাড়ি নেই।
গঙ্গাপদ নরেশকে দেখার আগেই নরেশ গঙ্গাপদকে দেখেছিল; বাঘের মত চাপা গর্জন তার গলা থেকে বেরিয়ে এল, তারপর সে গঙ্গাপদর ঘাড়ের ওপর লাফিয়ে পড়ল। দুহাতে তার গলা টিপে ধরে ঝাঁকানি দিতে দিতে বলতে লাগল— ‘পেয়েছি তোকে! শালা— শূয়ার কা বাচ্চা— আর যাবি কোথায়!’
রাখালবাবু দ্রুত পকেট থেকে বাঁশি বার করে বাজালেন। আরদালি এবং আর যেসব পুলিসের লোক আনাচে-কানাচে ছিল তারা ছুটে এল। গলা টিপুনি খেয়ে গঙ্গাপদর তখন জিভ বেরিয়ে পড়েছে। সকলে মিলে টানাটানি করে নরেশ আর গঙ্গাপদকে আলাদা করল। রাখালবাবু নরেশের হাতে হাতকড়া পর্যালেন। বললেন— নরেশ মণ্ডল, গঙ্গাপদ চৌধুরীকে খুনের চেষ্টার অপরাধে তোমাকে গ্রেপ্তার করা হলো।’
নরেশ মণ্ডল রাখালবাবুর কথা শুনতেই পেল না, গঙ্গাপদর পানে আরক্ত চক্ষু মেলে গজরাতে লাগল–‘হারামজাদা বেইমান, তোর বুক চিরে রক্ত পান করব–’
ব্যোমকেশ এতক্ষণ বসেছিল, চেয়ার ছেড়ে ওঠেনি। সে এখন টেবিলের ওপর পা তুলে দিয়ে সিগারেট ধরাল।
রাখালবাবু তাঁর একজন সহকর্মীকে বললেন–‘ধীরেন, এই নাও নরেশ মণ্ডলের ঠিকানা। ওর ঘর খানাতল্লাশ কর। সম্ভবত একটা রিভলবার কিংবা পিস্তল পাবে।—আমরা এদের দু’জনকে লক-আপ-এ নিয়ে যাচ্ছি।’
গঙ্গাপদ মেঝোয় বসে গলায় হাত বুলোচ্ছিল, চমকে উঠে বলল–’আমাকে লক-আপ-এ রাখবেন। আমি কী অপরাধ করেছি?’
রাখালবাবু বললেন–‘তুমি অশোক মাইতিকে খুন করাবার চেষ্টা করেছিলে। তোমার অপরাধ পিনাল কোডের কোন দফায় পড়ে পাবলিক প্রসিকিউটার তা স্থির করবেন। ওঠো এখন। ‘
সন্ধ্যের পর ব্যোমকেশের বসবার ঘরে চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিয়ে রাখালবাবু বললেন–’আচ্ছা ব্যোমকেশদা, নরেশ মণ্ডল আর গঙ্গাপদ চৌধুরী–দু’জনেই চাকরির খোঁজে আসবে আপনি আশা করেছিলেন?’
ব্যোমকেশ বলল–’আশা করিনি, তবে সম্ভাবনাটা মনের মধ্যে ছিল। কিন্তু ওরা যে একই সময়ে এসে গজ-কচ্ছপের যুদ্ধ শুরু করে দেবে তা কল্পনা করিনি। ভালই হলো, একই ছিপে জোড়ামাছ উঠল। — নরেশ মণ্ডলের ঘরখানা তল্লাশ করে কী পেলে?’
‘পিস্তল পাওয়া গেছে। ওর বিরুদ্ধে মামলা পাকা হয়ে গেছে। এখন দেখা যাক গঙ্গাপদকে পাকড়ানো যায় কি না। তাকে হাজতে রেখেছি, আর কিছু না হোক, কয়েকদিন হাজত-বাস করে পাপের প্রায়শ্চিত্ত করুক।’
‘হুঁ। অশোক মাইতির খবর কি?’
‘সে এখনো হাসপাতাল থেকে বেরোয়নি। বেরুলেও তাকে এখন কলকাতায় থাকতে হবে। সে আমাদের প্রধান সাক্ষী।‘
ব্যোমকেশ হঠাৎ হেসে উঠল, বলল— ‘কথায় বলে, রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, উলুখাগড়ার প্রাণ যায়। অশোক মাইতি খুব বেঁচে গেছে। ও না বাঁচলে এমন রহস্যটা রহস্যই থেকে যেত।’
সজারুর কাঁটা
উপক্রম
ব্যাপারটা আরম্ভ হয়েছিল মাস তিনেক আগে এবং কলকাতার দক্ষিণ অঞ্চলেই আবদ্ধ হয়ে ছিল।
গোল পার্কের আড়-পার একটা রাস্তার কোণের ওপর একটি অস্থায়ী চায়ের দোকান। দিনের আলো ফোটবার আগেই সেখানে চা তৈরি হয়ে যায়। মাটির ভাঁড়ে গরম চা। সঙ্গে বিস্কুটও পাওয়া যায়। এই দোকানের অধিকাংশ খদের ট্যাকসি ড্রাইভার, বাস কন্ডাক্টর ইত্যাদি। যাদের খুব সকালে কাজে বেরুতে হয় তারা এই দোকানের পৃষ্ঠপোষক।
বুড়ো ভিখিরি ফাগুরাম ছিল এই দোকানের খদের। সে রাত্রে ফুটপাথের একটা ঘোঁজের মধ্যে শুয়ে থাকত, ভোর হতে না হতে দোকান থেকে এক ভাঁড় চা আর দু’টি বিস্কুট কিনে তার ভিক্ষাস্থানে গিয়ে বসত। ফাগুরামের বয়স অনেক, উপরন্তু সে বিকলাঙ্গ, তাই দিনান্তে সে এক টাকার বেশি রোজগার করত।
সেদিন ফান্ধুন মাসের প্রত্যুষে আকাশ থকে তখনো কুয়াশার ঘোর কাটেনি, ফাগুরাম দোকান থেকে চায়ের ভাঁড় আর বিস্কুট নিয়ে নিজের জায়গায় এসে বসল। চায়ের দোকানে লোক থাকলেও রাস্তায় তখনো লোক চলাচল আরম্ভ হয়নি।
ফাগুরামের অভ্যাস, সে রাস্তার দিকে পিছন ফিরে দেয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে খায়। সে এক চুমুক চা খেয়ে বিস্কুটে একটি ছোট্ট কামড় দিয়েছে, তার মনে হল পিছনে কেউ এসে দাঁড়িয়েছে। সে পিছন দিকে ঘাড় ফেরালো, কিন্তু স্পষ্টভাবে কিছু দেখবার আগেই সে পিঠের দিকে কাঁটা ফোটার মত তীক্ষ্ণ ব্যথা অনুভব করল। অর্ধভুক্ত বিস্কুট তার হাত থেকে পড়ে গেল। তারপর সব অন্ধকার হয়ে গেল।
ভিক্ষুক ফাগুরামের অপমৃত্যুতে বিশেষ হইচই হল না। দিনের আলো ফুটলে তার মৃতদেহটা পথচারীদের চোখে পড়ল, তারা মৃতদেহকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। তারপর লাশ স্থানান্তরিত হল। খবরের কাগজের এক কোণে খবরটা বেরুল বটে, কিন্তু সেটা মারণাস্ত্রের বৈশিষ্ট্যের জন্যে। ভিক্ষুকের পিঠের দিক থেকে একটা ছয় ইঞ্চি লম্বা শজারুর কাঁটা তার হৃদযন্ত্রের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে।
সংবাদপত্রে যারা খবরটা পড়ল। তারা এই নিয়ে একটু আলোচনা করল। ভিক্ষুককে কে খুন করতে পারে? হয়তো অন্য কোনো ভিক্ষুক খুন করেছে। কিন্তু শজারুর কাটা কেন? এ প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর নেই। পুলিস এ ব্যাপার নিয়ে বেশি দিন মাথা ঘামাল না।
মোসখানেক পরে কিন্তু ভিক্ষুকের অপমৃত্যুর কথাটা আবার সকলের মনে পড়ে গেল। আবার শজারুর কাঁটা। রাত্রে রবীন্দ্র সরোবরের একটা বেঞ্চিতে শুয়ে একজন মুট-মজুর শ্রেণীর লোক ঘুমোচ্ছিল, আততায়ী কখন এসে নিঃশব্দে তার বুকের বাঁ দিকে শজারুর কাঁটা বিঁধে দিয়ে চলে গেছে। সকালবেলা যখন লাশ আবিষ্কৃত হল তখন মৃতদেহ শক্ত হয়ে গেছে। মৃতের পরিচয় তখনো জানা যায়নি।
এবার সংবাদপত্রের সামনের দিকেই খবরটা বেরুল এবং বেশ একটু সাড়া জাগিয়ে তুলল। ছোরাজুরির বদলে শজারুর কাঁটা দিয়ে খুন করার মানে কি! খুনী কি পাগল? ক্রমে মৃত ব্যক্তির পরিচয় বেরুল, তার নাম মঙ্গলরাম; সে সামান্য একজন মজুর, তার থাকবার জায়গা ছিল না, তাই যখন যেখানে সুবিধা হত। সেখানে রাত কাটাত। তার শত্ৰু কেউ ছিল না, অন্তত খুন করতে পারে এমন শত্ৰু ছিল না। পুলিস দু-চার দিন তল্লাশ করে হাল ছেড়ে দিল।
তৃতীয় দিনের ঘটনাটা হল আরো দু’ হস্তী পরে। গরম পড়ে গেছে, দিন বাড়ছে, রাত কমছে।
গুণময় দাসের জীবনে সুখ ছিল না। তাঁর একটি ছোট মনিহারীর দোকান আছে, একটি ছোট পৈতৃক বাস্তুভিটা আছে আর আছে একটি প্রচণ্ড দাজ্জাল বউ। তার চল্লিশ বছর বয়সেও ছেলে।পুলে হয়নি, হবার আশাও নেই। তাই রসের অভাবে তাঁর জীবনটা শুকিয়ে ঝামা হয়ে গিয়েছিল। তিনি লুকিয়ে লুকিয়ে মদ ধরেছিলেন। জীবন যখন শুকায়ে যায় তখন ওই বস্তুটি নাকি করুণাধারায় নেমে আসে।
রাত্রি আটটার সময় গুণময়বাবু দোকান বন্ধ করে বাড়ির অভিমুখে যাত্রা করেছিলেন। বাড়ি ফিরে যাবার জন্যে তাঁর প্রাণে কোনো উৎসাহ ছিল না, বরং বাড়ি ফিরে গিয়ে আজ তিনি স্ত্রীর কোন প্রলয়ঙ্কর মূর্তি দেখবেন এই চিন্তায় তাঁর পদক্ষেপ মন্থর হয়ে আসছিল। তারপর সামনেই যখন মদের দোকানের দরজা খোলা পাওয়া গেল তখন স্যুট করে সেখানে ঢুকে পড়লেন।
এক ঘণ্টা পরে দোকান থেকে বেরিয়ে তিনি আবার গড়িয়ার দিকে চললেন; ওই দিকেই তাঁর বাড়ি। যেতে যেতে তাঁর পা একটু টলতে লাগল, তিনি বুঝলেন আজ মাত্রা একটু বেশি হয়ে গেছে। স্ত্রী যদি বুঝতে পারে, যদি মুখে গন্ধ পায়–
আরো কিছু দূর যাবার পর রবীন্দ্র সরোবরের রেলিং আরম্ভ হল রাস্তার ডান পাশে। পথে লোকজন বেশি নেই, লেকের অন্ধকার এবং রাস্তায় আলো মিলে একটা অস্পষ্ট কুজাঝটিকার সৃষ্টি করেছে।
গুণময়বাবু রাস্তার একটা নিরিবিলি অংশে এসে লেকের দিকে মুখ করে দাঁড়ালেন, রেলিং-এ হাত রেখে প্যাঁচার মত চক্ষু মেলে ভিতরের দিকে চেয়ে রইলেন।
একটি লোক গুণময়বাবুর কুড়ি-পঁচিশ হাত পিছনে আসছিল; সে গুণময়বাবুর পদসঞ্চারের টলমল ভাব লক্ষ্য করেছিল। তাই তিনি যখন রেলিং ধরে দাঁড়ালেন তখন সেও বিশ-পাঁচিশ হাত দূরে দাঁড়িয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাঁকে নিরীক্ষণ করে অলস পদে তাঁর দিকে অগ্রসর হল।
লোকটি যখন গুণময়বাবুর পিছনে এসে দাঁড়াল তখনো তিনি কিছু জানতে পারলেন না। লোকটি এদিক ওদিক চেয়ে দেখল লোক নেই। সে পকেট থেকে শলাকার মত একটি অস্ত্র বার করল, অস্ত্রটিকে আঙুল দিয়ে শক্ত করে ধরে গুণময়বাবুর পিঠের বা দিকে পাঁজরার হাড়ের ফাঁক দিয়ে গভীরভাবে বিধিয়ে দিল। গুণময়বাবুর গায়ে মলমলের পাঞ্জাবি ছিল, শলাকা সটান তাঁর হৃদযন্ত্রের মধ্যে প্রবেশ করল।
গুণময়বাবু পলকের জন্যে বুকে একটা তীব্র বেদনা অনুভব করলেন, তারপর তাঁর সমস্ত অনুভূতি অসাড় হয়ে গেল।
অতঃপর খবরের কাগজে তুমুল কাণ্ড আরম্ভ হল। একটা বেহেড পাগল শজারুর কাঁটা নিয়ে শহরময় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে কিন্তু অকৰ্মণ্য পুলিস তাকে ধরতে পারছে না, এই আক্ষেপের উম্মা কলকাতার অধিবাসীদের, বিশেষত দক্ষিণ দিকের অধিবাসীদের গরম করে তুলল। বৈঠকে বৈঠকে উত্তেজিত জল্পনা চলতে লাগল। সন্ধ্যার পর পার্কের জনসমাগম প্রায় শূন্যের কোঠাতে গিয়ে দাঁড়াল।
এইভাবে দিন দশ-বারো কাটল। বলা বাহুল্য, আততায়ী ধরা পড়েনি, কিন্তু উত্তেজনার আগুন স্তিমিত হয়ে এসেছে। একদিন ব্যোমকেশের কেয়াতলার বাড়িতে রাত্রি সাড়ে ন’টার পর ইন্সপেক্টর রাখালবাবু এসেছিলেন, অজিতও উপস্থিত ছিল; স্বভাবতাই শজারুর কাঁটা নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল।
অজিত বলল,–’কিন্তু এত অস্ত্রশস্ত্র থাকতে শজারুর কাটা কেন?’
রাখালবাবু সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে আড়চোখে ব্যোমকেশের পানে তাকালেন; ব্যোমকেশ গম্ভীর মুখে বলল–’সম্ভবত আততায়ীর পোষা শজারু আছে। বিনামূল্যে কাঁটা পায় তাই ছোরাছুরির দরকার হয় না।’
অজিত বলল—’বাজে কথা বলে না। নিশ্চয় কোনো গূঢ় উদ্দেশ্য আছে। আচ্ছা রাখালবাবু্, এই যে তিন-তিনটে খুন হয়ে গেল, আসামী তিনজন কি একজন সেটা বুঝতে পেরেছেন?’
রাখালবাবু বললেন—’একজন বলেই তো মনে হয়।’
ব্যোমকেশ বলল–’তিনজন হতেও বাধা নেই। মনে কর, প্রথমে একজন হত্যাকারী ভিখিরিকে শজারুর কাঁটা দিয়ে খুন করল। তাই দেখে আর একজন হত্যাকারীর মাথায় আইডিয়া খেলে গেল, সে একজন ঘুমন্ত মজুরকে কাঁটা দিয়ে খুন করল। তারপর–
‘আর বলতে হবে না, বুঝেছি। তিন নম্বর হত্যাকারী তাই দেখে একজন দোকানদারকে খুন করল।’
ব্যোমকেশ বলল–’সম্ভব। কিন্তু যা সম্ভব তাই ঘটেছে এমন কথা বলা যায় না। তার চেয়ে ঢের বেশি ইঙ্গিতপূর্ণ কথা হচ্ছে, যারা খুন হয়েছে তাদের মধ্যে একজন ভিখিরি, একজন মজুর এবং একজন দোকানদার।’
‘এর মধ্যে ইঙ্গিতপূর্ণ কী আছে, আমার বুদ্ধির অগম্য। তোমরা গল্প কর, আমি শুতে চললাম।’ অজিত উঠে গেল। তার আর রহস্য-রোমাঞ্চের দিকে ঝোঁক নেই।
রাখালবাবু ব্যোমকেশের পানে চেয়ে মৃদু হাসলেন, তারপর গভীর হয়ে বললেন—’সত্যিই কি পাগলের কাজ? নইলে তিনজন বিভিন্ন স্তরের লোককে খুন করবে। কেন? কিন্তু পাগল হলে কি সহজে ধরা যেত না?’
ব্যোমকেশ বলল–’পাগল হলেই ন্যালাক্ষ্যাপা হয় না। অনেক পাগল আছে যারা এমন ধূর্ত যে তাদের পাগল বলে চেনাই যায় না।’
রাখালবাবু বললেন—’তা সত্যি। ব্যোমকেশদা, আপনি যতাই থিওরি তৈরি করুন, আপনার অন্তরের বিশ্বাস একটা লোকই তিনটে খুন করেছে। আমারও তাই বিশ্বাস। এখন বলুন দেখি, যে লোকটা খুন করেছে সে পাগল—এই কি আপনার অন্তরের বিশ্বাস?’
ব্যোমকেশ দ্বিধাভরে খানিকক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর কি একটা বলবার জন্যে মুখ তুলেছে এমন সময় দ্রুতচ্ছন্দে টেলিফোন বেজে উঠল। ব্যোমকেশ টেলিফোন তুলে নিয়ে কিছুক্ষণ শুনল, তারপর রাখালবাবুর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল–’তোমার কলা।’
ফোন হাতে নিয়ে রাখালবাবু বললেন-‘হ্যালো–’ তারপর অপর পক্ষের কথা শুনতে শুনতে তাঁর মুখের ভাব বদলে যেতে লাগল। শেষে-আচ্ছা, আমি আসছি বলে তিনি আস্তে আস্তে ফোন রেখে দিলেন, বললেন–’আবার শজারুর কাঁটা। এই নিয়ে চার বার হল। এবার উচ্চ শ্রেণীর ভদ্রলোক। কিন্তু আশ্চর্য! ভদ্রলোক মারা যাননি। তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।’
ব্যোমকেশ চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠে বলল–’মারা যাননি?’ রাখালবাবু বললেন—’না। কি যেন একটা রহস্য আছে। আমি চলি। আসবেন নাকি?’ ব্যোমকেশ বলল—’অবশ্য।’
কাহিনী
দক্ষিণ কলকাতার ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্টের নতুন রাস্তার ওপর একটি ছোট দোতলা বাড়ি। বাড়ির চারিদিকে বেশ খানিকটা খোলা জায়গা পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। খোলা জায়গায় এখানে ওখানে কয়েকটা অনাদৃত ফুলের গাছ।
বাড়িটি কিন্তু অনাদৃত নয়। বাড়ির বহিরঙ্গ যেমন ফিকে নীল রঙে রঞ্জিত এবং সুশ্রী, ভিতরটিও তেমনি পরিচ্ছন্ন ছিমছাম। নীচের তলায় একটি বসবার ঘর; তার সঙ্গে খাবার ঘর, রান্নাঘর এবং চাকরের ঘর। দোতলায় তেমনি একটি অন্তরঙ্গ বসবার ঘর এবং দু’টি শয়নকক্ষ। বছর চার-পাঁচ আগে যিনি এই বাড়িটি প্রৌঢ় বয়সে তৈরি করিয়েছিলেন তিনি এখন গতাসু, তাঁর একমাত্র পুত্র দেবাশিস এখন সস্ত্রীক এই বাড়িতে বাস করে।
একদিন চৈত্রের অপরাহ্নে দোতলার বসবার ঘরে দীপা একলা বসে রেডিও শুনছিল। দীপা দেবাশিসের বউ; মাত্র দু’মাস তাদের বিয়ে হয়েছে। দীপা একটি আরাম-কেদারায় হেলান দিয়ে পা ছড়িয়ে বসে ছিল। ঘরে আসবাব বেশি নেই; একটি নীচু টেবিল ঘিরে কয়েকটি আরাম-কেদারা; দেয়াল ঘেঁষে একটি তক্তপোশ, তার ওপর ফরাশ ও মোটা তাকিয়া। এ ছাড়া ঘরে আছে রেডিওগ্রাম এবং এক কোণে টেলিফোন।
রেডিওগ্রামের ঢাকনির ভিতর থেকে গানের মৃদু গুঞ্জন আসছিল। ঘরটি ছায়াচ্ছন্ন, দোর জানিলা ভেজানো। দীপা চেয়ারের পিঠে মাথাটা এলিয়ে দিয়ে চোখ বুজে শুয়ে ছিল। বাড়িতে একলা তার সারা দুপুর এমনিভাবেই কাটে।
দীপার এই আলস্যশিথিল চেহারাটি দেখতে ভাল লাগে। তার রঙ ফসইি বলা যায়, মুখের গড়ন ভাল; কিন্তু ভ্রূর ঋজু রেখা এবং চিবুকের দৃঢ়তা মুখে একটা অপ্রত্যাশিত বলিষ্ঠতা এনে দিয়েছে, মনে হয়। এ মেয়ে সহজ নয়, সামান্য নয়।
দেয়ালের ঘড়িতে ঠুং ঠুং করে পাঁচটা বাজল। দীপার চোখ দু’টি অমনি খুলে গেল; সে ঘড়ির দিকে একবার তাকিয়ে রেডিও বন্ধ করে দিল, তারপর উঠে বাইরের দরজার দিকে চলল। দরজা খুলতেই সামনে সিঁড়ি নেমে গেছে। দীপা সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে সামনের দিকে ঝুকে ডাকল-নকুল।’
নকুল বাড়ির একমাত্র চাকর এবং পাচক, সাবেক কাল থেকে আছে। সে একতলার খাবার ঘর থেকে বেরিয়ে এসে উঁচু দিকে চেয়ে বলল—’হ্যাঁ বউদি, দাদাবাবুর জলখাবার তৈরি আছে।’
দীপা তখন গায়ের শিথিল কাপড়-চোপড় গুছিয়ে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগল। সিঁড়ির শেষ ধাপে পৌঁচেছে এমন সময় কিড়িং কিড়িং শব্দে সদর দরজার ঘন্টি বেজে উঠল।
দীপা গিয়ে দোর খুলে দিল। কোট-প্যান্ট পরা দেবাশিস প্রবেশ করল। দু’জনে দু’জনের মুখের পানে তাকাল কিন্তু তাদের মুখে হাসি ফুটল না। এদের জীবনে হাসি সুলভ নয়। দীপা নিরুৎসুক সুরে বলল—’জলখাবার তৈরি আছে।’
দেবাশিস কণ্ঠস্বরে শিষ্টতার প্রলেপ মাখিয়ে বলল–’বেশ, বেশ, আমি জামাকাপড় বদলে এখনই আসছি।’
সে তরতার করে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে গেল। দীপা মন্থর পদে খাবার ঘরে গিয়ে টেবিলের এক পাশে বসিল।
লম্বাটে ধরনের খাবার টেবিল; চারজনের মত জায়গা, গাদাগাদি করে ছ’জন বসা চলে। দীপা এক প্রান্তে বসে দেখতে লাগল, নকুল দু’টি প্লেটে খাবার সাজাচ্ছে; লুচিভাজা, আলুর দম, বাড়িতে তৈরি সন্দেশ। নকুল মানুষটি বেঁটে-খাটো, মাথার চুল পেকেছে, কিন্তু শরীর বেশ নিটোল। বেশি কথা কয় না, কিন্তু চোখ দু’টি সতর্ক এবং জিজ্ঞাসু। দীপা তার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ভাবতে লাগল-নকুল নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছে। তবু নকুলের সামনে ধোঁকার টাটি সুড় রাখতে হয়। শুধু নকুল কেন, পৃথিবীসুদ্ধ লোকের সামনে। বিচিত্র তাদের বিবাহিত ধুতি পাঞ্জাবি পরে দেবাশিস নেমে এল। একহারা দীঘল চেহারা, ফস সুশ্ৰী মুখ; বয়স সাতাশ কি আটাশ। সে টেবিলের অন্য প্রান্তে এসে বসতেই নকুল খাবারের প্লেট এনে তার সামনে রাখল, দীপার দিকে ঘাড় ফিরিয়ে বলল–’তোমাকেও দেব নাকি বউদি?
দীপা মাথা নেড়ে বলল–’না, আমি পরে খাব।’ দেবাশিসের সঙ্গে একসঙ্গে খাওয়া এখনো তার অভ্যাস হয়নি; তার বাপের বাড়িতে অন্য রকম রেওয়াজ, পুরুষদের খাওয়া শেষ হলে তবে মেয়েরা খেতে বসে। দীপা সহজে অভ্যাস ছাড়তে পারে না; তবু রাত্রির আহারটা দু’জনে টেবিলের দু’ প্রান্তে বসে সম্পন্ন করে। নইলে নকুলের চোখেও বড় বিসদৃশ দেখাবে।
কিছুক্ষণ কোনো কথাবার্তা নেই; দেবাশিস একমনে লুচি, আলুর দাম খাচ্ছে; দীপা যা-হোক একটা কোনো কথা বলতে চাইছে কিন্তু কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না। পিছন থেকে নকুলের সতর্ক চক্ষু তাদের লক্ষ্য করছে।
শেষ পর্যন্ত দেবাশিসই প্রথম কথা কইল, সোজা হয়ে বসে দীপার পানে চেয়ে একটু হেসে বলল–’আজ একটা নতুন ক্রিম তৈরি করেছি।’
দেবাশিসের কাজকর্ম সম্বন্ধে দীপা কখনো ঔৎসুক্য প্রকাশ করেনি। কিন্তু এখন সে আগ্রহ দেখিয়ে বলল–’তাই নাকি? কিসের ক্রিম?’
দেবাশিস বলল–’মুখে মাখার ক্রিম।’
‘ও মা, সত্যি? কেমন গন্ধ?’
‘তা আমি কি করে বলব। যারা মাখবে তারা বলতে পারবে।’
‘তা বাড়িতে একটু যদি আনো, আমি মেখে দেখতে পারি।’
দেবাশিস হাসিমুখে মাথা নাড়ল–’তোমার এখন মাখা চলবে না, অন্য লোকের মুখে মাখিয়ে দেখতে হবে মুখে ঘা বেরোয় কিনা। পরীক্ষা না করে বলা যায় না।’
‘কার মুখে মাখিয়ে পরীক্ষা করবে?’
‘ফ্যাক্টরির দারোয়ান ফৌজদার সিং-এর মুখে মাখিয়ে দেখব। তার গালের চামড়া হাতির চামড়ার মত।’
দীপার মুখে হাসি ফুটল; সে যে নকুলের সামনে অভিনয় করছে তা ক্ষণকালের জন্যে বিস্মরণ হয়েছিল, দেবাশিসের মুখের হাসি তার মুখে সংক্রামিত হয়েছিল।
আহার শেষ করে দেবাশিস উঠল। দু’জনে খাবার ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ির নীচে এসে দাঁড়াল। দেবাশিস হঠাৎ আগ্রহভরে বলল–’দীপা, আজ উৎপলা সিনেমাতে একটা ভাল ছবি দেখাচ্ছে। দেখতে যাবে?
দেবাশিস আগে কখনো দীপকে সিনেমায় নিয়ে যাবার প্রস্তাব করেনি; দীপার শরীরের ভিতর দিয়ে একটা বৈদ্যুতিক শিহরণ বয়ে গেল। তারপরই তার মন শক্ত হয়ে উঠল। সে অন্য দিকে তাকিয়ে বলল-না, আমি যাব না।’
দেবাশিসের মুখ স্নান হয়ে গেল, তারপর গভীর হয়ে উঠল। সে কিছুক্ষণ দীপার। পানে চেয়ে থেকে বলল–’ভয় নেই, সিনেমা-ঘরের অন্ধকারে আমি তোমার গায়ে হাত দেব না।’
আবার দীপার শরীর কেঁপে উঠল, কিন্তু সে আরো শক্ত হয়ে বলল—’না, সিনেমা আমার ভাল লাগে না।’ এই বলে সে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে লাগল। দেবাশিস ওপর দিকে তাকিয়ে শুকনো গলায় বলল–’আমি নৃপতিদার বাড়িতে যাচ্ছি, ফিরতে সাড়ে আটটা হবে।’
সদর দরজা খুলে দেবাশিস বাইরে এল, দোরের সামনে তার ফিয়েট গাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে; কাজ থেকে ফিরে এসে সে গাড়িটা দোরের সামনে দাঁড় করিয়ে রেখেছিল। ভেবেছিল, সিনেমা দেখতে যাবার প্রস্তাব করলে দীপা অমত করবে না। তার মন সহজে তিক্ত হয় না, আজ কিন্তু তার মন তিক্ত হয়ে উঠল। এতটুকু বিশ্বাস দীপা তাকে করতে পারে না! এই দু’ মাস দীপ তার বাড়িতে আছে, কোনো দিন কোনো ছুতোয় সে দীপার গায়ে হাত দেয়নি, নিজের দাম্পত্য অধিকার জারি করেনি। তবে আজ দীপা তাকে এমনভাবে অপমান করল কেন?
দেবাশিস গাড়ির চালকের আসনে বসে গাড়িতে স্টার্ট দিল। বাড়ির পিছন দিকে গাড়ি রাখার ঘর, সেখানে গাড়ি রেখে সে পায়ে হেঁটে বেরুল। নৃপতি লাহার বাড়ি পাঁচ মিনিটের রাস্তা। নৃপতির বৈঠকখানায় রোজ সন্ধ্যার পর আড্ডা বসে, দেবাশিস প্রায়ই সেখানে যায়।
দীপা ওপর এসে আবার আরাম-কেন্দারায় এলিয়ে পড়ল। তার মনের মধ্যে দশদিক তোলপাড় করে ঝড় বইছে, সারা গায়ে অসহ্য ছট্ফটানি। অভ্যাসবিশেই সে হাত বাড়িয়ে রেডিওগ্রাম চালিয়ে দিল; কোনো একটি মহিলা ইনিয়ে-বিনিয়ে আধুনিক গান গাইছেন। কিছুক্ষণ শোনার পর সে রেডিও বন্ধ করে দিয়ে চোখ বুজে। চুপ করে রইল। কিন্তু বুকের মধ্যে ঝড়ের আফসানি কমল না। তখন সে উঠে অশান্তভাবে ঘরময় ঘুরে বেড়াতে লাগল, অস্ফুট স্বরে নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করল–’এভাবে আর কত দিন চলবে?’
দীপা যদি হালকা চরিত্রের মেয়ে হত, তাহলে তার জীবনে বোধ হয় কোনো ঝড়-ঝাপটাই আসত না।
দীপা বনেদী বংশের মেয়ে। একসময় খুব বোলবোলাও ছিল, তালুক-মুলুক ছিল, এখন অনেক কমে গেছে; তবু মরা হাতি লাখ টাকা। বোলবোলাও কমলেও বংশের মর্যাদাবোধ আর গোঁড়ামি তিলমাত্র কমেনি। দীপার ঠাকুরদা উদয়মাধব মুখুজে এখনো বেঁচে আছেন, তিনিই সংসারের কতা। এক সময় একটি বিখ্যাত কলেজের প্রিন্সিপ্যাল ছিলেন, হঠাৎ পঙ্গু হয়ে পড়ার ফলে অবসর নিতে হয়েছে। বাড়িতেই থাকেন এবং নিজের শয়নকক্ষ থেকে প্রচণ্ড দাপটে বাড়ি শাসন করেন।
ঠাকুরদা ছাড়া বাড়িতে আছেন দীপার বাবা-মা এবং দাদা। বাবা নীলমাধব বয়স্ক লোক, কলেজে অধ্যাপনা করেন। মা গোবেচারি ভালমানুষ, কারুর কথায় থাকেন না, নীরবে সংসারের কাজ করে যান। দাদা বিজয়মাধব দীপার চেয়ে চার-পাঁচ বছরের বড়, সে সংস্কৃত ভাষায় এম-এ পাস করে কলেজে অধ্যাপনার কাজে ঢোকবার চেষ্টা করছে। দীপার বাবা এবং দাদা দু’জনেই তেজস্বী পুরুষ। কিন্তু তাঁরা বাড়িতে উদয়মাধবের হুকুম বেদবাক্য মনে করেন এবং বাইরে বংশ-গৌরবের ধ্বজ তুলে বেড়ান। বংশটা একাধারে সম্রােন্ত, উচ্চশিক্ষিত এবং প্রাচীনপন্থী।
এই বংশের একমাত্র মেয়ে দীপা। তাকে মেয়ে-স্কুল থেকে সীনিয়র কেমব্রিজ পাস করানো হয়েছিল। তারপর তার পড়াশুনো বন্ধ হল; তার জন্যে পালটি ঘরের ভাল পাত্র খোঁজা আরম্ভ হল। কাল ধর্মে তাকে পদার মধ্যে আবদ্ধ রাখা গেল না বটে, কিন্তু একলা বাইরে যাবার হুকুম নেই। বাইরে যেতে হলে বাপ কিংবা ভাই সঙ্গে থাকবে।
দীপা বাড়িতেই থাকে, গৃহকর্মে রান্নাঘরে মাকে সাহায্য করে; অবসর সময়ে গল্প উপন্যাস পড়ে, রেডিওতে গান শোনে। কিন্তু মন তার বিদ্রোহে ভরা। তার মনের একটা স্বাধীন সত্তা আছে, নিজস্ব মতামত আছে; সে মুখ বুজে বাড়ির শাসন সহ্য করে বটে, কিন্তু তার মনে সুখ নেই। মেয়ে হয়ে বাংলা দেশে জন্মেছে বলে কি তার কোনো স্বাধীনতা নেই! অন্য দেশের মেয়েদের তো আছে।
ঠাকুরদা উদীয়মাধব, পঙ্গুতার জন্যেই বোধ হয়, বাড়িতে বন্ধুসমাগম পছন্দ করতেন, লোকজনকে খাওয়াতে ভালবাসতেন। একটা কোনো উপলক্ষ পেলেই নিজের প্রবীণ বন্ধুদের নিমন্ত্রণ করতেন; নীলমাধব এবং বিজয়মাধবের বন্ধুরাও নিমন্ত্রিত হতেন। বৃদ্ধের তিনতলায় সমবেত হতেন, প্রৌঢ় অধ্যাপকেরা বসতেন দোতলায় এবং একতলায় বৈঠকখানায় বসে ছেলে-ছোকরার দল গানবাজনা হইহুল্লোড় করত। মাসে দু’মাসে এইরকম অনুষ্ঠান লেগেই থাকত।
দীপা অতিথিদের সকলের সামনে বেরুত, কোনো বারণ ছিল না। ঠাকুরদার বন্ধুরা নাতনী সম্পর্কে তার সঙ্গে সেকেলে রসিকতা করতেন, বাপের বন্ধুরা তাকে স্নেহ করতেন, আর দাদার বন্ধুরা তাকে নিজেদের সমান মর্যাদা দিত, মেয়ে বলে অবহেলা করত না। সে প্রয়োজন হলে তাদের সঙ্গে দু’টি-চারটি কথাও বলত। তাদের মধ্যে যখন গানবাজনা হত তখন সে দোরের কাছে দাঁড়িয়ে শুনত। এইসব ক্রিয়াকর্মে তার মন ভারি উৎফুল্ল হয়ে উঠত, যদিও বাইরে তার বিকাশ খুব অল্পই চোখে পড়ত। দীপা ভারি চাপা প্রকৃতির মেয়ে।
এইভাবে চলছিল, তারপর একদিন দীপার মানসলোকে একটি ব্যাপার ঘটল, নবযৌবনের স্বভাবধর্মে সে প্রেমে পড়ল। যার সঙ্গে প্রেমে পড়ল সেও তার অনুরাগী। কিন্তু মাঝখানে দুর্লঙ্ঘ্য বাধা, প্রেমিকের জাত আলাদা।
দুপুরবেলা যখন বাড়ি নিষুতি হয়ে যায়। তখন দীপা নীচের বসবার ঘরে দোর ভেজিয়ে দিয়ে টেলিফোনের সামনে বসে, চোখে প্রতীক্ষ্ণ নিয়ে বসে থাকে। টেলিফোন বাজিলেই সে যন্ত্র তুলে নেয়। সাবধানে দু’টি-চারটি কথা হয়, তারপর সে টেলিফোন রেখে দেয়। কেউ জানতে পারে না।
সন্ধ্যেবেলা দীপা জানলার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে; সামনের ফুটপাথ দিয়ে তার প্রেমিক চলে যায়, তার পানে চাইতে চাইতে যায়। এইভাবে তাদের দেখা হয়। কিন্তু কাছে এসে দেখা করার সুযোগ নেই, সকলে জানতে পারবে।
এদিকে দীপার জন্যে পাত্রের সন্ধান শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু পালটি ঘর যদি পাওয়া যায় তো পাত্র পছন্দ হয় না, পাত্র যদি পছন্দ হয় তো ঠিকুজি কোষ্ঠীর মিল হয় না। বিয়ের কথা মোটেই এগুচ্ছে না।
পৌষ মাসের শেষের দিকে একদিন দুপুরবেলা দীপা টেলিফোনে তার প্রেমিকের সঙ্গে চুপি চুপি পরামর্শ করল, তারপর কোমরে। আচল জড়িয়ে তেতলায় ঠাকুরদার সঙ্গে দেখা করতে গেল।
দীপা সাহসিনী মেয়ে, কিন্তু তার সাহসের সঙ্গে খানিকটা একওঁয়েমি মেশানো আছে। ঠাকুরদার সঙ্গে তার সম্বন্ধ বড় বিচিত্র; সে ঠাকুরদাকে যত ভালবাসে, বাড়িতে আর কাউকে এত ভালবাসে না। কিন্তু সেই সঙ্গে সে ঠাকুরদাকে ভয়ও করে। তিনি তার কোনো কাজে অসন্তুষ্ট হবেন। এ কথা ভাবতেই সে ভয়ে কাটা হয়ে যায়। তাই সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে উঠতে তার উরু আর হটু অল্প কাঁপতে লাগল।
উদয়মাধব মুখুজে একদিন বুড়ো বয়সে সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে পা পিছলে পড়ে যান, তাঁর মেরুদণ্ডে গুরুতর আঘাত লাগে। এই আঘাতের ফলে তাঁর নিম্নাঙ্গ পক্ষাঘাতে পঙ্গু হয়ে যায়, চলে ফিরে বেড়াবার ক্ষমতা আর থাকে না। এ ছাড়া তাঁর স্বাস্থ্য বেশ ভালই। দোহারা গড়নের শরীর, মুখের চওড়া চোয়ালে প্রবল ব্যক্তিত্বের ছাপ। সত্তর বছর বয়সেও মানসিক শক্তি বিন্দুমাত্র কমেনি। যে দাপট নিয়ে তিনি কলেজের অধ্যক্ষতা করতেন। সেই দাপট পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান আছে। তাঁর চিরদিনের অভ্যাস হুঙ্কার দিয়ে কথা বলা। এখনো তিনি হুঙ্কার দিয়েই কথা বলেন।
দীপা তেতলায় দাদুর ঘরে ঢুকে দেখল তিনি বিছানায় আধ-শোয়া হয়ে খবরের কাগজ পড়ছেন। তিনি প্রত্যহ দু’টি খবরের কাগজ পড়েন; সকালবেলা ইংরেজি কাগজ আর দুপুরে দিবানিদ্রার পর বাংলা।
দীপাকে দেখে উদয়মাধব কাগজ নামালেন, হুঙ্কার দিয়ে বললেন–’এই যে দীপঙ্করী। আজকাল তোমাকে দেখতে পাই না কেন? কোথায় থাকো?’
দীপার নাম শুধুই দীপা, কিন্তু উদয়মাধব তাকে দীপঙ্করী বলেন। ঠাকুরদার চিরপরিচিত সম্ভাষণ শুনে তাঁর ভয় অনেকটা কমল, সে খাটের পায়ের দিকে বসে বলল–’আজ সকালেই তো দেখেছেন দাদু! আমি আপনার চা আর ওষুধ নিয়ে এলুম না?
উদয়মাধব বললেন–’ওহে, তাই নাকি! আমি লক্ষ্য করিনি। তা এখন কী মতলব?’
দীপা হঠাৎ উত্তর দিতে পারল না, মাথা হেঁট করে বসে রইল। যে কথা বলতে এসেছে তা সহজে বলা যায় না।
উদয়মাধব কিছুক্ষণ তার পানে চেয়ে অপেক্ষা করলেন। তারপর স্বভাবসিদ্ধ হুঙ্কার ছাড়লেন–’কী হয়েছে?’
দীপা তার মনের সমস্ত সাহস একত্র করে দাদুর দিকে ফিরল, তাঁর চোখে চোখ রেখে ধীরস্বরে বলল—’দাদু, আমি একজনকে বিয়ে করতে চাই, কিন্তু তার জাত আলাদা। আপনার আপত্তি আছে?’
উদয়মাধব ক্ষণেকের জন্যে যেন হতবুদ্ধি হয়ে গেলেন, তারপর ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসে হুঙ্কার দিলেন–’কি বললে, একজনকে বিয়ে করতে চাও! এসব আজকাল হচ্ছে কি? নিজের ইচ্ছেয় বিয়ে করবে! তুমি কি স্লেচ্ছ বংশের মেয়ে?’
দীপা নতমুখে চুপ করে বসে রইল। উদীয়মাধব হুঙ্কারের পর হুঙ্কার দিয়ে বক্তৃতা চালাতে লাগলেন। একটানা হুঙ্কার শুনে নীচে থেকে দীপার মা আর দাদা বিজয়ামাধব ছুটে এল, দু-একটা ঝি-চাকরও দোরের কাছ থেকে উঁকি ঝুকি মারতে লাগল। দীপা কাঠ হয়ে বসে রইল।
আধা ঘণ্টা পরে লেকচার শেষ করে উদয়মাধব বললেন—’আর যেন কোনো দিন তোমার মুখে এ কথা শুনতে না পাই। তুমি এ বংশের মেয়ে, আমার নাতনী, আমি দেখেশুনে যার সঙ্গে তোমার বিয়ে দেব তাকেই তুমি বিয়ে করবে। যাও।’
দীপা নীচে নেমে এল; বিজয়ও তার সঙ্গে সঙ্গে এল। দীপা নিজের শোবার ঘরে ঢুকতে যাচ্ছে, বিজয় কটমট তাকিয়ে কড়া সুরে বলল—‘এই শোন। কাকে বিয়ে করতে চাস?’
জ্বলজ্বলে চোখে দীপা ফিরে দাঁড়াল, তীব্র চাপা স্বরে বলল–’বলব না। মরে গেলেও বলব না।’ এই বলে নিজের ঘরে ঢুকে দড়াম করে দোর বন্ধ করে দিল।
অতঃপর দীপা বাড়িতে প্রায় নজরবন্দী হয়ে রইল। আগে যদি-বা দু-একবার নিজের সখীদের কাছে যাবার জন্য বাড়ির বাইরে যেতে পেত, এখন আর তাও নয়। সর্বদা বাড়ির সবাই যেন শতচক্ষু হয়ে তার ওপর নজর রেখেছে। কেবল দুপুরবেলা ঘণ্টাখানেকের জন্যে সে দৃষ্টিবন্ধন থেকে মুক্তি পায়। তার মা নিজের ঘরে গিয়ে একটু চোখ বোজেন, তার দাদা বিজয় কাজের তদবিরে বেরোয়। বাবা নীলমাধব দশটার আগেই কলেজে চলে যান, ঠাকুরদা তেতলায় নিজের ঘরে আবদ্ধ থাকেন। সুতরাং দীপকে কেউ আগলাতে পারে না। দীপাও বিদ্রোহের কোনো লক্ষণ প্রকাশ করে না।
বস্তুত বাড়ির লোকের ধারণা হয়েছিল, পিতামহের লেকচার শুনে দীপার দিব্যজ্ঞান হয়েছে, সে আর কোনো গোলমাল করবে না। দুপুরবেলা যে টেলিফোন সক্রিয় হয়ে ওঠে, তা কেউ জানে না।
তারপর একদিন—
ঘটনাচক্ৰে বিজয় দুপুরবেলা সকাল সকাল বাড়ি ফিরছিল। সে আজ যার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল তার দেখা পায়নি, তাই তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরছে। বাড়ির কাছাকাছি এসে সে দেখতে পেল, দীপা বাড়ি থেকে বেরিয়ে সোজা বালিগঞ্জ রেল স্টেশনের দিকে যাচ্ছে। বিজয়ের চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে উঠল। একলা দীপা কোথায় যাচ্ছে! দীপার বান্ধবী শুভ্রার বাড়িতে? কিন্তু শুভ্ৰার বাড়ি তো এদিকে নয়, ঠিক উল্টো দিকে; অন্য কোনো বান্ধবীও এদিকে থাকে না। বিজয় সজোরে পা চালিয়ে দীপাকে ধরবার উদ্দেশ্যে চলল।
‘এই, কোথায় যাচ্ছিস?’
তীরবিদ্ধের মত দীপা ফিরে দাঁড়াল। সামনেই দাদা। বিজয় কড়া সুরে বলল—’একলা কোথায় যাচ্ছিস?’
দীপার মুখে কথা নেই; সে একবার ঢোক গিলল। বিজয় গলা আরো চড়িয়ে বলল—’কার হুকুমে একলা বাড়ি থেকে বেরিয়েছিস? চল, ফিরে চল।’
এবার দীপার মুখ থেকে কথা বেরল–’যাব না।’
রাস্তায় বেশি লোক চলাচল ছিল না, যারা ছিল তারা ঘাড় ফিরিয়ে তাকাতে লাগল। দীপা দাঁড়িয়ে আছে দেখে বিজয় বলল–’ভাল কথায় যাবি, না চুলের মুঠি ধরে টেনে নিয়ে যাব?
দীপার বুক ফেটে কান্না এল। রাস্তার মাঝখানে এ কি কেলেঙ্কারি! এখনি হয়তো চেনা লোক কেউ দেখতে পাবে। দীপা কোনো মতে দুরন্ত কান্না চেপে বঁড়শির মাছের মত বাড়ির দিকে ফিরে চলল।
বিজয় বাড়িতে ঢুকে ‘মা মা’ বলে দু’বার ডাক দিয়ে বসবার ঘরে গিয়ে ঢুকাল; দীপা আর দাঁড়াল না, দোতলায় উঠে নিজের ঘরে দোর বন্ধ করল।
বিজয় বসবার ঘরে ঢুকতেই তার নজরে পড়ল টেলিফোন যন্ত্রের নীচে এক টুকরো সাদা কাগজ চাপা রয়েছে। কাছে গিয়ে কাগজের টুকরোটা তুলে নিয়ে পড়ল, তাতে লেখা রয়েছে–‘আমি যাকে বিয়ে করতে চাই তার সঙ্গে চলে যাচ্ছি। তোমরা আমার খোঁজ করো না।—দীপা।
এতটা বিজয়ও ভাবতে পারেনি। সে চিঠি নিয়ে সটান ঠাকুরদার কাছে গেল। বাবা-মাও জানতে পারলেন। কিন্তু ঝি-চাকরের কাছে কথাটা লুকিয়ে রাখতে হল। উদীয়মাধব গুম হয়ে রইলেন, হুঙ্কার দিয়ে বক্তৃতা করলেন না। ভিতরে ভিতরে দীপার ওপর পীড়ন চলতে লাগল-যার সঙ্গে পালিয়ে যাচ্ছিল, সে কে? নাম কি? দীপা কিন্তু মুখ টিপে রইল, নাম বলল না।
নিভৃত পারিবারিক মন্ত্রণায় স্থির হল, সবাগ্রে দীপার বিয়ে দেওয়া দরকার; যেখান থেকে হোক পালটি ঘরের সৎ পাত্র চাই। আর দেরি নয়।
বাড়ির মধ্যে সকলের চেয়ে বিজয়ের দুশ্চিন্তা বেশি। তার স্বভাব একটু তীব্র গোছের। তার বোন কোনো অজানা লোকের সঙ্গে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল এ লিজা যেন তারই সবচেয়ে মমন্তিক। সে উঠে পড়ে লেগে গেল পাত্র খুঁজতে।
পাড়ার নৃপতি লাহার বাড়িতে কয়েকটি যুবকের আড়া বসত, আগে বলা হয়েছে। বিজয় এই আড্ডায় আসত, এখানে অন্য যারা আসত তাদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা ছিল, নৃপতি লাহার সঙ্গে বিশেষ অন্তরঙ্গতা ছিল।
নৃপতি লাহারা সাত পুরুষে বড়মানুষ, কিন্তু বর্তমানে সে ছাড়া বংশে আর কেউ নেই। তার বয়স এখন আন্দাজ পঁয়ত্ৰিশ বছর, নিঃসন্তান অবস্থায় বিপত্নীক হবার পর আর বিয়ে করেনি। সে উচ্চশিক্ষিত, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাধিধারী, সারা দিন লেখাপড়া নিয়ে থাকে, সন্ধ্যের পর আড্ডা জমায়।
বিজয়ামাধব একদিন বিকেলবেলা নৃপতির কাছে এল। তখনো আডা জমার সময় হয়নি, নৃপতি বাড়ির নীচের তলার বৈঠকখানায় বসে একখানা বই পড়ছিল। এই ঘরটিতেই রোজ আড্ডা বসে।
ঘরটি প্রকাণ্ড, সভাঘরের মত। সাবেক কালে এই ঘরে বাবুদের নাচগানের মুজরো বসন্ত, একালে ঘরটি সোফা চেয়ার প্রভৃতি দিয়ে সাজিয়ে ড্রয়িংরুমে পরিণত করা হয়েছে বটে, কিন্তু সেকালের গদিন-মোড়া তক্তপোশ এখনো আসর জাঁকিয়ে বসে আছে। তা ছাড়া টেবিল-হারমোনিয়াম আছে, পিয়ানো আছে, রেডিওগ্ৰাম আছে। আর আছে তাস পাশা ক্যারাম প্রভৃতি খেলার সরঞ্জাম।
বিজয় ঘরে ঢুকে দেখল নৃপতি একলা আছে, বলল–’নৃপতিদা, তোমার সঙ্গে আড়ালে একটা পরামর্শ আছে, তাই আগেভাগে এলাম।’
নৃপতি বই মুড়ে বিজয়কে একটু ভাল করে দেখল, তারপর সোফায় নিজের পাশে হাত চাপড়ে বলল—‘এস, বসো।’
বিজয় তার পাশে বসে কথা বলতে ইতস্তত করছে দেখে নৃপতি বলল—’কিসের পরামর্শ?’
বিজয় তখন বলল–’নৃপতিদা, দীপার জন্যে পাত্র খোঁজ হচ্ছে কিন্তু মনের মত পাত্র কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। তুমি তো অনেক খবর রাখো। একটা ভাল পাত্রের সন্ধান দাও না।’
নৃপতি হাত বাড়িয়ে নিকটস্থ টেবিল থেকে সিগারেটের টিন নিল, একটি সিগারেট ঠোঁটে ধরে বলল-ই। দীপার এখন বয়স কত?
‘সতেরো। আমাদের বংশে—‘
নৃপতি দেশলাই জ্বালাবার উপক্রম করে বলল–’তোমাদের বংশের কথা জানি। গৌরীদান করতে পারলেই ভাল হয়। তা কি রকম পাত্র চাও? বিদ্বান হবে, পয়সাকড়ি থাকবে, চেহারা ভালো হবে, এই তো?’
বিজয় বলল—’হ্যাঁ। কিন্তু তুমি আসল কথাটাই বললে না। পালটি ঘর হওয়া চাই।’
সিগারেট ধরিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে নৃপতির ঠোঁটের কোণে একটু ব্যঙ্গহাসি খেলে গেল। সে বলল–’তাও তো বটে। বংশের ধারা বজায় রাখতে হবে বইকি। তা তোমরা হলে গিয়ে মুখুজ্জে, সুতরাং চাটুজ্জে বাড়ুজ্জে গাঙ্গুলি কিংবা ঘোষাল চাই। বারেন্দ্র চলবে না?
‘না, নৃপতিদা, জানোই তো আমরা আজ পর্যন্ত সাবেক চাল বজায় রেখে চলেছি।’
‘জানি বইকি! তোমরা হচ্ছে আরশোলা গোষ্ঠীর জীব।’
‘আরশোলা গোষ্ঠীর জীব মানে?’
‘আরশোলা অতি প্ৰাচীন জীব, কোটি কোটি বছর আগে জন্মেছিল; তারপর জীবজগতে অনেক ব্বির্তন ঘটেছে, কিন্তু আরশোলা আরশোলাই রয়ে গেছে। তাই আজকাল আর তাদের বেশি কদর নেই।’
‘সে যাই বল, বণাশ্রম ধর্ম আমি মেনে চলি। গীতায় শ্ৰীভগবান বলেছেন, চাতুর্বর্ণ্যং—’ নৃ
পতি অন্যমনস্ক হয়ে পড়ল; সিগারেট টানতে টানতে সে বোধ করি মনে মনে উপযুক্ত পাত্রের সন্ধান করছিল। সিগারেট শেষ করে সে বলল—’একটি ছেলে আছে, কিন্তু তোমাদের পালটি ঘর কিনা খোঁজ নিতে হবে। তুমি আজ বাড়ি যাও, কাল খবর পাবে।’
‘আচ্ছা, বলে বিজয় চলে গেল। নৃপতি কব্জির ঘড়িতে দেখল পাঁচটা বেজেছে। সিগারেটের টিন পকেটে নিয়ে সে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ল। তার গন্তব্যস্থল বেশি দূর নয়, পাঁচ মিনিটের রাস্তা।
দেবাশিসের সদর দরজার ঘণ্টি টিপতেই নকুল এসে দোর খুলল। নৃপতি বলল–’দেবাশিসবাবু আছেন?’
নকুল বলল–’আজ্ঞে, তিনি এইমাত্র ফেক্টরি থেকে বাড়ি ফিরেছেন–’
এই সময় দেখা গেল দেবাশিস সিড়ি দিয়ে নেমে আসছে। সে সদর দোরের কাছে এলে নৃপতি একটু হেসে বলল—’আমাকে আপনি চিনবেন না, আপনার বাবা শুভাশিসবাবুর সঙ্গে আমার সামান্য পরিচয় ছিল। আমার নাম নৃপতি লাহা।’
দেবাশিসের মুখেও হাসি ফুটল—’আপনাকে চিনি না বটে, কিন্তু নাম জানি। আপনার বাড়িও দেখেছি। আসুন।’ সে নৃপতিকে বসবার ঘরের দিকে নিয়ে যেতে যেতে থমকে ফিরে দাঁড়িয়ে বলল–’বসবার ঘরে না গিয়ে চলুন খাবার ঘরে যাই। চায়ের সময় হয়েছে।’
নৃপতি বলল—’বেশ তো।’
দু’জনে খাবার ঘরে গিয়ে টেবিলে বসল। দেবাশিস বলল—‘নকুল, আমাদের চা জলখাবার দাও।’
নৃপতি বলল–’আমার চা হলেই চলবে।’
খেতে খেতে দু’জনের কথা হতে লাগল। বছর ছয়-সাত আগে দেবাশিসের বাবার সঙ্গে নৃপতির পরিচয় হয়েছিল; দেবাশিস তখন কলকাতায় থাকত না, দিল্লীতে পড়াশুনো করতে গিয়েছিল। শুভাশিসবাবু একদিন নৃপতির বাড়ির সামনে ফুটপাথের ওপর পা পিছলে পড়ে যান, নৃপতি তাঁকে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে ফার্স্ট এড় দিয়েছিল। তারপর শুভাশিসবাবু তাঁর ফ্যাক্টরিতে তৈরি প্রচুর কেশতৈল সাবান কোন্ড ক্রিম প্রভৃতি তাকে উপহার দিয়েছিলেন। মাঝে মাঝে তার বাড়িতে এসে তত্ত্ব-তল্লাশ নিতেন। বছর দুই পরে তিনি যখন মারা গেলেন তখন নৃপতি খবর পেল না, একেবারে খবর পেল মাস তিনেক পরে। এমনি কলকাতা শহর। শুভাশিসবাবুর মৃত্যু-সংবাদ নৃপতিকে জানাবে এমন লোক কেউ ছিল না।
দেবাশিস দিল্লীতে তার বাবার এক বন্ধুর বাড়িতে থেকে কলেজে পড়াশুনো করছিল। বাল্যকালেই তার মা মারা গিয়েছিলেন। বাবার বন্ধুটি ছিলেন দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ের নামজাদা বিজ্ঞান-অধ্যাপক। দেবাশিস এম. এস-সি. পাস করে দিল্লী থেকে চলে এল। তার মাসখানেক পরেই তার বাবা মারা গেলেন।
নৃপতি প্রশ্ন করল–’আপনার বাড়িতে আর কে আছে?’
দেবাশিস বলল–’আর কেউ নেই, আমি একা। কিংবা আমি আর নকুল বলতে পারেন। নকুল এ বাড়িতে আমি জন্মাবার আগে থেকে আছে।’
‘বিয়ে করেননি?’
লেখাপড়া শেষ করে ফিরে আসার পরই বাবা মারা গেলেন, তারপর আর হয়ে ওঠেনি।’
‘হুঁ। ভাল কথা, আপনার উপাধি যখন ভট্ট তখন নিশ্চয় ব্ৰাহ্মণ। গোত্র জানা আছে কি?’
‘যখন পাইতে হয় শুনেছিলাম শাণ্ডিল্য গোত্র। বাড়ুজে।’
‘বাঃ, বেশ। আচ্ছা, আমি যদি ঘটকালি করি, আপনার আপত্তি হবে কি?’
দেবাশিস মুখে টিপে একটু হাসল, উত্তর দিল না। নকুল এতক্ষণ ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে কথাবার্তা শুনছিল, এখন এগিয়ে এসে বলল-’হ্যাঁ বাবু্, আপনি করুন। ঘরে একটি বউ দরকার। আমি বুড়ো মানুষ আর কত দিন সংসার চালাব।’
‘তাই হবে।’ নৃপতি চা শেষ করে উঠে দাঁড়াল। —’আজ চলি। আমার বাড়িতে রোজ সন্ধ্যেবেলা আড্ডা বসে, পাড়ার ছেলেরা আসে। আপনিও আসেন না কেন?’
‘আচ্ছা, যাব।’
‘আজই চলুন না!’ দেবাশিস একটু ইতস্তত করে বলল—’আজই? বেশ, চলুন।’
দু’জনে বেরুল। তখন সন্ধ্যে হয়ে এসেছে। নৃপতির বাড়ির সামনে এসে তারা শুনতে পেল বৈঠকখানায় কেউ লঘু আঙুলের স্পর্শে পিয়ানো বাজাচ্ছে।
বৈঠকখানা ঘরে তিনটে উজ্জ্বল আলো জ্বলছে। কেবল একটি মানুষ ঘরে আছে, দেয়াল-ঘেঁষা পিয়ানোর সামনে বসে আপন মনে বাজিয়ে চলেছে।
নৃপতি দেবাশিসকে নিয়ে ঘরে ঢুকল, বলল–’ওহে প্রবাল, দ্যাখো, আমাদের আডায় একটি নতুন সভ্য পাওয়া গেছে। এঁর নাম দেবাশিস ভট্ট।’
প্রবাল নামধারী যুবক পিয়ানো থেকে উঠে এল। নিরুৎসুক স্বরে বলল—’পরিচয় দেবার দরকার নেই।’
নৃপতি বলল–’আগে থাকতেই পরিচয় আছে নাকি?’
প্রবাল বলল–’সামান্য। গরীবের সঙ্গে বড়মানুষের যতটুকু পরিচয় থাকা সম্ভব ততটুকুই।’
প্রবাল আবার পিয়ানোর সামনে গিয়ে বসল। টুং-টাং করে একটা সুর বাজাতে লাগল। তার ভাবভঙ্গী দেখে বেশ বোঝা যায় দেবাশিসকে দেখে খুশি হয়নি। সে বয়সে দেবাশিসের চেয়ে দু’এক বছরের বড়, মাঝারি দৈর্ঘ্যের বলিষ্ঠ চেহারা, মুখের গড়নে বৈশিষ্ট্য না থাকলেও জৈব আকর্ষণ আছে; চোখের দৃষ্টি অপ্রসন্ন। কিন্তু তার চেহারা যেমনই হোক সে ইতিমধ্যে গায়ক হিসেবে বেশ নাম করেছে। তার কয়েকটা গ্রামোফোন রেকর্ড খুব জনপ্রিয় হয়েছে; রেডিও থেকেও মাঝে মাঝে ডাক পায়।
প্রবালের সঙ্গে দেবাশিসের অনেকদিন দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি। এক সময় তারা একসঙ্গে স্কুলে পড়ত, ভাবসাব ছিল; তারপর দেবাশিস স্কুল থেকে পাস করে দিল্লীতে পড়তে চলে গেল। কয়েক বছর পরে এই প্রথম দেখা। এই কয় বছরের মধ্যে দেবাশিসের বাবা ‘প্রজাপতি প্রসাধন নামে শৌখিন টয়লেট দ্রব্যের কারখানা খুলে বড়মানুষ হয়েছেন। আর প্রবালের বাবা হঠাৎ হার্ট ফেল করে মারা যাওয়ার ফলে তাদের সম্পন্ন অবস্থার খুবই অধোগতি হয়েছে। প্রবাল গান গেয়ে কোনো মতে টিকে আছে।
প্রবালের কথা বলার ভঙ্গীতে দেবাশিস বেশ অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছিল, নৃপতি তাকে ঘরের এক কোণে নিয়ে গিয়ে সোফায় পাশাপাশি বসে গল্প করতে লাগিল। বলল–’আমার আড়ডায় পাঁচ-ছয়জন আসে। কিন্তু সবাই রোজ আসে না। আজ আরো দু-তিনজন আসবে।’
নৃপতি দেবাশিসের সামনে সিগারেটের টিন খুলে ধরল, দেবাশিস মাথা নেড়ে বলল–’ধন্যবাদ। আমি খাই না।’
নিজে একটা সিগারেট ধরিয়ে নৃপতি খাটো গলায় বলল–’প্রবাল গুপ্ত গাইয়ে-বাজিয়ে লোক, একটু বেশি সেনসিটিভ, আপনি কিছু মনে করবেন না। ক্রমে সব ঠিক হয়ে যাবে।’
এই সময় বাইরে থেকে একটি যুবক সদর দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। সিঙ্কের লম্বা প্যান্ট ও বুশ-কোট পরা সুগঠিত সুদৰ্শন চেহারা, ধারালো মুখে আভিজাত্যের ছাপ, বেশ দৃঢ় চরিত্রের ছেলে বলে মনে হয়, বয়স চব্বিশ-পাঁচিশ। তাকে দেখে নৃপতি বলল—‘এই যে কপিল। এস পরিচয় করিয়ে দিই। কপিল বোস-দেবাশিস ভট্ট।’
নমস্কার প্রতিনমস্কারের পর কপিল বলল—’নৃপতিদা, তোমার টেলিফোন একবার ব্যবহার করব। রাস্তায় আসতে আসতে একটা জরুরী কথা মনে পড়ে গেল।’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ, নিশ্চয়।’
কপিল পাশের ঘরে চলে গেলে নৃপতি বলল—‘কপিল ছেলেটা ভাল, বাপ অগাধ বড়মানুষ, কিন্তু ওর কোনো বদখেয়াল নেই। লেখাপড়া শিখেছে, টেনিস বিলিয়ার্ড খেলে দিন কটায়, রাত্তিরে দূরবীন লাগিয়ে আকাশের তারা গোনে। কেবল একটি দোষ, বিয়ে করতে চায় না।’
প্রবাল হঠাৎ পিয়ানো ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। নৃপতির দিকে তাকিয়ে বলল–’আজ চললাম নৃপতিদা।’ দেবাশিসকে সে লক্ষ্যই করল না।
নৃপতি বলল—’চললে? এত সকাল সকাল? রেডিওতে গাইতে হবে বুঝি? কাগজে যেন দেখেছিলাম আজ রাত্রে তোমার প্রোগ্রাম আছে।’
প্রবাল বলল–’প্রোগ্রাম আছে। কিন্তু গান আগেই রেকর্ড হয়ে গেছে, আমাকে স্টুডিও যেতে হবে না। আমি বাসায় যাচ্ছি।’
নৃপতি বলল–’বাসায় যাচ্ছ। তোমার বউ-এর খবর ভাল তো?’
প্রবাল উদাস স্বরে বলল—’তোমাদের বলিনি নৃপতিদা, বউ মাসখানেক আগে মারা গেছে। হার্টের রোগ নিয়ে জন্মেছিল; ডাক্তারেরা বলে বারো-চৌদ্দ বছর বয়সের মধ্যে অপারেশন না করালে এ রোগে কেউ একুশ-বাইশ বছরের বেশি বাঁচে না। আমার শ্বশুর রোগ লুকিয়ে মেয়ের বিয়ে দিয়েছিল।–আচ্ছা, চললাম।’
নৃপতি ও দেবাশিস স্তব্ধ হয়ে রইল। স্ত্রী মারা গেছে। অথচ আড্ডার কাউকে কিছু বলেনি; আপন মনে পিয়ানো বাজায় আর চলে যায়। নৃপতি জানত প্রবালের স্ত্রীর মরণােস্তক রোগ, কিন্তু খবর শুনে হঠাৎ তার মুখে কথা যোগালো না।
এই সময় কপিল পাশের ঘর থেকে ফিরে এসে তাদের কাছে দাঁড়াল। সে প্রবালের কথাগুলো শুনতে পায়নি, তার দিকে তাকিয়ে বলল–’বেশ তো পিয়ানো বাজাচ্ছিলে, চললে নাকি? একটা গান শোনাও না।’
প্রবাল তীব্র বিদ্বেষভরা চোখে তার পানে চেয়ে রুদ্ধস্বরে বলল—’আমার গান বিনা পয়সায় শোনা যায় না। পয়সা খরচ করতে হয়।’
কপিল এরকম কড়া জবাবের জন্যে প্রস্তুত ছিল না, সে একটু হকচকিয়ে গেল। তারপর সামলে নিয়ে হেসে উঠল। বলল–’পিয়সা খরচ করেই যদি গান শুনতে হয় তাহলে তোমার গান শুনব কেন? তোমার চেয়ে অনেক ভাল গাইয়ে আছে।’
প্রবাল আর দাঁড়াল না, হনহন করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। কপিল একটা চেয়ারে বসে সিগারেট ধরাল, নৃপতি অপ্রতিভা মুখে বলল–’আজ প্রবালের মেজাজটা ভাল নেই।’
কপিল বলল—’প্রবালের মেজাজ সর্বদাই সপ্তমে চড়ে থাকে। ধাতুগত বিকার।’
‘ওর স্ত্রী মারা গেছে।’
কপিল চিকিত হয়ে বলল–’তাই নাকি! আমি জানতাম না। ছিঃ ছি, অসভ্যতা করে ফেলেছি।’
নৃপতি বলল—’যাক গে। তুমি কেমন আছ বলে। কয়েকদিন তোমাকে দেখিনি।’
কপিল বলল–’গ্ল্যান করেছিলাম বাঙ্গালোরে বেড়াতে যাব, কিন্তু প্ল্যান ভেস্তে গেল।‘
‘ভেস্তে গেলি কেন?’
‘আমার সঙ্গে যার যাবার কথা ছিল সে যেতে পারল না। একলা বেড়িয়ে সুখ নেই।’
‘তা বটে। কিন্তু তুমি বিয়ে করছ না কেন? বিয়ে করলে তো একটি চিরস্থায়ী সহযাত্রী পাবে।’
কপিল হেসে উঠল, থিয়েটারী কায়দায় বাহু প্রসারিত করে বলল-কিবি বলেছেন, হব না। তাপস নিশ্চয় যদি না মেলে তপস্বিনী। আমিও কবির দলে।’
নৃপতি বলল–’কিন্তু শুনেছি তোমার বাবা তপস্বিনী জোটাবার ক্রুটি করেননি, গোটা পঞ্চাশেক সুন্দরী তপস্বিনী দেখেছেন। একটিও তোমার পছন্দ হল না?
কপিল একটু গভীর হয়ে বলল—’সুন্দরী মেয়ে অনেক আছে নৃপতিদা, কিন্তু শুধু সুন্দরী হলেই তো চলে না। আমি এমন বউ চাই যার মন হবে আমার মনের সমান্তরাল, অর্থাৎ সমানধম।–কথাটা বুঝেছেন?’
‘বুঝেছি। তুমি হুঁশিয়ার লোক। তা নিজে পছন্দ করে বিয়ে কর না কেন? তোমার বাবা নিশ্চয় অমত করবেন না।’
কপিল হেসে বলল–’সেই চেষ্টাতেই আছি।’
তারপর সাধারণভাবে কথা হতে লাগিল। দেবাশিস এতক্ষণ কেবল নিশ্চেষ্ট শ্রোতা ছিল, এখন সেও কথাবার্তায় যোগ দিল। দেবাশিসের পূর্ণতর পরিচয় শুনে কপিল বলল—’আরে তাই নাকি! আপনিই প্রজাপতি প্রসাধন প্রডাক্টস? আমরা যে বাড়িসুদ্ধ আপনার তেল সাবান মো ক্রিম ব্যবহার করি। তা অ্যাদ্দিন আপনি ছিলেন কোথায়?’
দেবাশিস বলল–’এখানেই ছিলাম, কিন্তু নৃপতিবাবুর সঙ্গে আলাপ ছিল না।’
আরো খানিকক্ষণ গল্পসল্প হল। চাকর এসে ছোট ছোট পেয়ালায় কফি দিয়ে গেল। ক্রমে আটটা বাজল। নৃপতি বলল—’আজ বোধ হয়। আর কেউ আসবে না।’
দেবাশিস বলল–’আজ উঠি।’
কপিল বলল–’এরি মধ্যে! আমাদের আড্ডা। নটা সাড়ে ন’টা পর্যন্ত চলে।’
দেবাশিস হেসে বলল–’আবার আসব।’
নৃপতি জিজ্ঞেস করল—’কাল আসতে পারবেন?’
দেবাশিস বলল–’আচ্ছা, কাল আসব।’—
পরদিন দেবাশিস একটু দেরি করে এল। ইচ্ছে ছিল সাড়ে আটটা নটা পর্যন্ত থেকে গল্পগুজব করবে। বাড়িতে রোজ সন্ধ্যেবেলা একলা বিজ্ঞানের বই আর সাময়িক পত্র পড়ে কাটে, এখানে নতুন লোকের সঙ্গ পাওয়া যাবে। প্রবালের অসামাজিক ব্যবহার সত্ত্বেও নৃপতির আড্ডাটি তার ভাল লেগে গিয়েছিল।
সাড়ে ছাঁটার সময় নৃপতির বৈঠকখানায় গিয়ে দেবাশিস দেখল প্রবাল পিয়ানোর সামনে বসে চাবির ওপর আঙুল বুলোচ্ছে, কপিল এবং আর একটি ছেলে তক্তপোশের পাশে বসে পাঞ্জা লড়ছে; নৃপতি এবং অন্য একটি যুবক পাশাপাশি বসে গল্প করছে। নৃপতি তাকে হাত তুলে ডাকল।
দেবাশিস কাছে গেলে নৃপতি বলল-‘বসুন। এখানে। পরিচয় করিয়ে দিই। দেবাশিস ভট্ট-বিজয়ামাধব মুখুজে। বিজয় হচ্ছে অধ্যাপক বংশের ছেলে, সম্প্রতি সংস্কৃতে এম.এ. পাস করে অধ্যাপনার কাজ খুঁজে বেড়াচ্ছে।’ দেবাশিসের পূর্ণ পরিচয় নৃপতি আগেই বিজয়কে দিয়েছিল, আর পুনরাবৃত্তি করল না।
বিজয় উৎসুক চোখে দেবাশিসকে দেখতে লাগল। নৃপতি তাদের মাঝখান থেকে উঠে পড়ল, বলল–’তোমরা গল্প কর, আমি আসছি।’
বিজয় দেবাশিসের দিকে একটু ঘেঁষে বসল। বলল—’এক পাড়াতে থাকি, অ্যাদ্দিন আলাপ-পরিচয় হয়নি, কি আশ্চর্য বলুন দেখি।’ চেহারা দেখেই দেবাশিসকে তার পছন্দ হয়েছিল; দীপার উপযুক্ত বর।
যদিও কলকাতা শহরে পাশাপাশি বাস করেও আলাপ-পরিচয় না হওয়াতে আশ্চর্য কিছু নেই, তবু দেবাশিস হাসিমুখে বলল—’আশ্চর্য বইকি।’
ওদিকে কপিল আর অন্য ছেলেটির পাঞ্জা লড়া শেষ হয়েছিল, নৃপতি তাদের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল–’কি হে খড়্গ বাহাদুর, তোমার দেশে যাবার কথা ছিল না?
খড়্গ বাহাদুর প্রফুল্ল স্বরে বলল—’কথা তো ছিল নৃপতিদা, কিন্তু যাওয়া হল না।’
খড়্গ বাহাদুর নেপালী যুবক। তার মা বাঙালী। তাই তার মাতৃভাষাও বাংলা। চমৎকার চেহারা, যেমন পীতাভ সোনালী রঙ তেমনি লম্বা ছিপছিপে গড়ন। তার মুখে চোখে মঙ্গোলীয় রক্তের ছাপ। এত অল্প যে ধরা যায় না। বর্তমানে সে বাংলাদেশের একজন শ্রেষ্ঠ ফুটবল খেলোয়াড়; পায়ের কাছে বল পেলে সে যাদুকর বনে যায়। কলকাতার সবচেয়ে নামজাদা ফুটবল ক্লাবের সে খেলোয়াড়। তার খেলা দেখবার জন্যে লক্ষ লক্ষ দর্শক মাঠে জমা হয়। তার চরিত্রে বিন্দুমাত্র চালিয়াত নেই। উচ্চবংশের ছিল, কিন্তু ভারি কিয়ী। বয়স তেইশ কি চব্বিশ।
নৃপতি বলল–’কেন, যাওয়া হল না কেন?’
খড়্গ বাহাদুর বলল—’কাঠমাণ্ডুতে বিয়ের সব ঠিকঠাক হয়েছিল, হঠাৎ তার পেলাম কীসব গণ্ডগোল হয়েছে, বিয়ে পেছিয়ে গেছে।’
নৃপতি বলল–’তার মানে এক বছরের ধাক্কা। ফুটবল সীজন এসে পড়ল, এরপর তুমি তো আর নেপালে গিয়ে বসে থাকতে পারবে না।’
খড়্গ বাহাদুর চোখে কৌতুক এবং মুখে বিষণ্ণতা নিয়ে মাথা নাড়ল।
চাকর বড় একটি ট্রের ওপর কয়েক পেয়ালা কফি নিয়ে এল, সকলেই এক এক পেয়ালা তুলে নিল। এই সময় সদর দরজার কাছ থেকে আওয়াজ এল–’ওহে, আমিও আছি, আমার জন্যে এক পেয়ালা রেখো।‘
একটি যুবক প্রবেশ করল। রজতগৌর বর্ণ, মুখের ছাঁচ কেষ্টনগরের পুতুলকেও হার মানায়; চোখ দু’টি উজ্জ্বল, ক্ষৌরিত মুখে একটা হাসি লেগে আছে। বয়স সাতাশ-আটাশ।
নৃপতি বলল—‘এস সুজন।’
সুজন মিত্র একজন উদীয়মান চিত্রনক্ষত্র; দু’ তিনখানা ছবি করেই বেশ নাম করেছে। যেমন গভীর ভূমিকায় অভিনয় করতে পারে, তেমনি হাস্যরস সৃষ্টির ক্ষমতাও আছে। সবচেয়ে বড় কথা, হঠাৎ খ্যাতি ও অর্থ লাভ করেও তার মেজাজ বিগড়ে যায়নি। নিজের কথা সাত কাহিন করে বলতে সে ভালবাসে না। বস্তুত তার সম্বন্ধে কেউ বড় কিছু জানে না। স্ত্রীজাতির প্রতি তার আসক্তির কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। এমন কি সে বিবাহিত কি অবিবাহিত তাই কেউ জানে না। দক্ষিণ কলকাতার একান্তে একটি ছোট বাড়িতে একলা থাকে, বেশির ভাগ সময়ই হোটেলে খায়। অত্যন্ত অনাড়ম্বর এবং অপ্রকট তার জীবন।
সুজন ট্রে থেকে টপ করে একটা পেয়ালা তুলে নিয়ে বলল–’ঠিক সময়ে এসেছি, আর একটু হলে ফাঁকি পড়তাম।’
কফিতে একটি চুমুক দিয়ে সে তার উজ্জ্বল অভিনেতার চোখ দু’টি ঘরের চারিদিকে ফেরাল, তারপর দেবাশিসকে দেখে হ্রস্ব কণ্ঠে বলল–’নৃপতিদা, নতুন অতিথির সমাগম হয়েছে দেখছি!’
নৃপতি বলল—’হ্যাঁ, এস তোমাদের পরিচয় করিয়ে দিই। খড়গ, তুমিও এস।’
পরিচয় বিনিময়ের পর সুজন মিটমিটি হেসে বলল—’দেবাশিসবাবু্, এখন বলুন দেখি আপনি ফুটবল খেলা দেখতে ভালবাসেন, না সিনেমা দেখতে ভালবাসেন?’
দেবাশিস বলল–’দুই-ই ভালবাসি। খেলার মাঠে এবং রূপালী পদায় আপনাদের দু’জনকে অনেকবার দেখেছি।’
তারপর সকলে মিলে খানিকক্ষণ হাসিগল্প চালাল। প্রবাল কিন্তু তাদের সঙ্গে যোগ দিল না, নিজের মনে টুং-টাং করে পিয়ানো বাজিয়ে চলল।
রাত আন্দাজ ন’টার সময় সভা ভঙ্গ হল। দেবাশিস বেশ প্রফুল্ল মনে বাড়ি ফিরে এল।
এইভাবে কয়েকদিন কাটাবার পর এক রবিবার সকালবেলা বিজয়, তার বাবা নীলমাধব এবং নৃপতি দেবাশিসের বাড়িতে দেখা করতে এল। দেবাশিস তাদের খাতির করে নীচের তলায় বসবার ঘরে নিয়ে গিয়ে বসালো এবং নকুলকে চায়ের হুকুম দিল।
নীলমাধব মুখুজে অতিশয় গভীর প্রকৃতির লোক। তিনি আগে বিজয়ের মুখে দেবাশিস সম্বন্ধে সব কথা শুনেছিলেন এবং তত্ত্ব-তল্লাশও নিয়েছিলেন। পাত্রটিকে সৎপাত্র মনে হওয়ায় তিনি এখন স্বচক্ষে দেখতে এসেছেন। তিনি দেবাশিসকে উত্তমরূপে নিরীক্ষণ করলেন এবং নৃপতির দিকে ঘাড় নেড়ে সন্তোষ জ্ঞাপন করলেন।
ইতিমধ্যে চা এসে পড়েছে। নৃপতি চা খেতে খেতে নিপুণভাবে বিয়ের প্রস্তাব তুলল। নৃপতির ঘটকালির দিকে বিশেষ দক্ষতা আছে।
আধা ঘন্টার মধ্যে বিয়ের ব্যবস্থা পাকাপাকি হয়ে গেল। দেবাশিসের ঠিকুজি কোষ্ঠী ছিল না। তাই জ্যোতিষের যোটক বাদ দিতে হল। নৃপতি বলল—’দেবাশিস, দীপকে তোমার অপছন্দ হবে না জানি, তবু একবার দেখা দরকার। আজ বিকেলে আমি এসে তোমাকে এঁদের বাড়িতে নিয়ে যাব। কেমন?
দেবাশিস সম্মত হল। বলা বাহুল্য, এই কদিনে নৃপতি ও দেবাশিসের ঘনিষ্ঠত ‘তুমি ও ‘নৃপতিদার পর্যয়ে নেমেছে।
সেদিন অপরাহ্নে নৃপতি এসে দেবাশিসকে দীপাদের বাড়িতে নিয়ে গেল। বৈঠকখানা ঘরে আসর হয়েছিল; আড়ম্বর কিছু নয়, টেবিলের মাঝখানে ফুলদানিতে এক গুচ্ছ ফুল, তক্তপোশের ওপর মখমলের আস্তরণ এবং মোটা তাকিয়া। বিজয় তাদের নিয়ে গিয়ে ঘরে বসালো, তারপর নীলমাধব এসে দেবাশিসকে তেতলার ঘরে নিয়ে গেলেন। উদীয়মাধব তার সঙ্গে দুচারটে কথা বললেন; তাঁর মুখ দেখে বোঝা গেল ভাবী নাতজামাই দেখে তিনি সন্তুষ্ট হয়েছেন।
তারপর নীলমাধব দেবাশিসকে নিয়ে আবার নীচে নেমে এলেন। পাঁচ মিনিট পরে বিজয় গিয়ে দীপকে নিয়ে এল, দীপা এসে টেবিলের কাছে দাঁড়াল। পরনে আটপৌরে শাড়ি ব্লাউজ, কানে ছোট ছোট দু’টি সোনার আংটি, গলায় সরু হার, হাতে তিনগাছি করে চুড়ি। কনে দেখানো উপলক্ষে তাকে সাজগোজ করানো হয়নি, কিংবা সে নিজেই সাজগোজ করেনি। তার সারা দেহে প্রচ্ছন্ন বিদ্রোহ। একবার সে পলকের জন্য চোখ তুলে দেবাশিসের দিকে চেয়ে আবার চোখ নীচু করল। ক্রূর ঋজু রেখার নীচে চোখের দৃষ্টি খর।
দেবাশিসের কিন্তু দীপাকে খুব ভালো লেগে গেল। স্ত্রীজাতি সম্বন্ধে তার অভিজ্ঞতা শূন্য সুকুম গুরু দীপকে দেখে তার মান মার্থের সঙ্গর হল মন হল একে ঐরূপে পেলে সে সুখী হবে।
দুমিনিট পরে বিজয় বলল–’দীপা, তুমি এবারে যাও। দেখা হয়েছে।’
দীপা চলে গেল। তারপর মিষ্টিমুখ করে দেবাশিস সলজ্জ সম্মতি জানাল।
দুহাপ্তার মধ্যে সব ঠিকঠাক, বিয়ে হয়ে গেল। এই দুহস্তার মধ্যে দীপা যে তার প্রেমিকের সঙ্গে চুপিচুপি টেলিফোন মারফত বাক্যালাপ করেছে সতর্ক পাহারা সত্ত্বেও কেউ তা জানতে পারল না।’
বিয়ের রাত্রে কনের বাড়িতে নিমন্ত্রিতদের মধ্যে নৃপতির বাড়ির আড়াধারীরাও এল, কারণ তারা বিজয়ের বন্ধু। আবার বউভাতের রাত্রে যারা দেবাশিসের বাড়িতে নিমন্ত্রণ খেতে এল তাদের মধ্যে প্রজাপতি ফ্যাক্টরির সাহাকারীদের সঙ্গে নৃপতির দলও এল, কারণ তারা দেবাশিসের বন্ধু। যাকে বলে, বরের ঘরের মাসি কনের ঘরের পিসি।
দেবাশিসের বাড়িতে স্ত্রীলোক নেই, দীপার কয়েকটি প্রতিবেশিনী সখী এসে ফুলশয্যা সাজিয়ে দিয়ে গেল। অনেক রাত্রি পর্যন্ত খাওয়া-দাওয়া আমোদ-আহ্লাদ চলল। নৃপতির দলই আসর জমিয়ে রাখল। সুজন শুধুই চিত্রাভিনেতা নয়, সে নানারকম ম্যাজিক দেখাল। প্রবাল আজ আর কোনো অশিষ্টতা করল না, নিজে থেকেই গান গেয়ে শোনাল। সকলেই নববধূকে নানা রকম উপহার দিল। নৃপতি দিল সোনার রিস্টওয়াচ, কপিল দিল দামী একটা ঝরনা কলম, খড়্গ বাহাদুর দিল নেপালে তৈরি ঝকঝকে ধারালো কুকরি ছোরা, প্রবাল দিল তার নিজের গাওয়া কয়েকটা গানের রেকর্ড, সুজন দিল একটি রূপোর সরস্বতী মূর্তি। দেবাশিসের ফ্যাক্টরির বন্ধুরাও যথাযোগ্য উপহার দিলেন।
বউভাতের উৎসব শেষে অতিথির দল যখন বিদায় নিল তখন রাত বারোটা বেজে গেছে। বুলি নীচের তলায় রইল। ভূত নকুল, আর দোতলায় দেবাশিস এবং দীপা। প্রথম মিলন শেষ রাত্রি।
অতিথিকে বিদায় দিয়ে দেবাশিস ওপরতলায় গিয়ে দেখল, সব ঘরে বড় বড় আলো জ্বলছে; বসবার ঘরের একটা চেয়ারে দীপা শক্ত হয়ে বসে আছে। দেবাশিস তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দেবাশিসের স্বভাব, যা সম্ভাব্য তাই তার মন স্বীকার করে নেয়, বিলক্ষণতার দিকে সহজে তার দৃষ্টি পড়ে না। সে দীপার দিকে দু’ হাত বাড়িয়ে স্নিগ্ধ হেসে বলল–’এস।’
দীপা চকিতে একবার চোখ তুলল; তার চোখে ভয়ের ছায়া। দেবাশিস ভাবল, কুমারী মনের স্বাভাবিক লজ্জা। সে দীপর পাশের চেয়ারে বসে তার হাতের ওপর হাত রাখল, বলল–’বারোটা বেজে গেছে, আর কতক্ষণ বসে থাকবে। চল, শোবার সময় হল।’
দীপা হাত সরিয়ে নিল। তার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে, তবু যা বলবার তা বলতে হবে, আর দেরি করা চলবে না। সে জড়িয়ে জড়িয়ে বলল–’আমি-আমি আলাদা শোব।’
দেবাশিসের মনে কৌতুকের সঙ্গে একটু বিস্ময় মিশল। কথাগুলো যেন একটু বেসুরো, ঠিক লজ্জার মত নয়। তবু সে হাসিমুখেই বলল—’তুমি আলাদা শুলে ফুলশয্যা হবে কি করে?
দীপার শরীর কেঁপে উঠল; সে শরীরের সমস্ত স্নায়ু পেশী শক্ত করে বলল–না–নাআমি আপনাকে একটা কথা বলতে চাই। আমি-?
এবার দেবাশিসের মন থেকে কৌতুকের ভাব একেবারে লুপ্ত হয়ে গেল। সে কিছুক্ষণ স্থির চোখে দীপার। পানে চেয়ে থেকে বলল–’কি কথা বলতে চাও?’
দীপার ঘন ঘন নিশ্বাস পড়তে লাগল, সে কোনোমতে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল–’আপনি আমাকে ক্ষমা করুন, আমি অন্য একজনকে ভালবাসি।’
কথাটার ভাবাৰ্থ দেবাশিসের মস্তিষ্কে প্রবেশ করতে বেশ খানিকক্ষণ সময় লাগল, তারপর তার মনে যে দীপ জ্বলেছিল, তা আস্তে আস্তে নিবে গেল; তার মনে হল, ঘরের উজ্জ্বল বৈদ্যুতিক আলোটাও যেন কমে কমে পিদিমির চেয়েও নিষ্প্রভ হয়ে গেছে। সে দীপার। পাশ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে শুষ্ক প্রশ্ন করল—’তবে আমাকে বিয়ে করলে কেন?’
দীপা ঘাড় গুজে বসে রইল, কেবল তার অন্তরের ব্যাকুলত কণ্ঠস্বরে ব্যক্ত হ’ল–’আমি দোষ করেছি, কিন্তু আমার উপায় ছিল না। বাড়ির লোক জোর করে আমার বিয়ে দিয়েছে।’
‘যাকে ভালবাস তাকে বিয়ে করলেই পারতে।’
‘জাত আলাদা, তাই–’
‘জাত।’ একটা কঠিন হাসি দেবাশিসের মনের মধ্যে হিল্লোলিত হয়ে স্থির হল–’তা এখন কি করা যেতে পারে?’
দীপা হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে ব্যগ্র মিনতির কণ্ঠে বলল–’আমাকে আপনার বাড়িতে থাকতে দিন, আমি আপনাকে বিরক্ত করব না, আপনার সামনে আসব না—‘তার গলা কান্নায় বুজে এল।
ক্লান্ত নিশ্বাস ফেলে দেবাশিস নিজের চুলের মধ্যে আঙুল চালাল, বলল–’এর জন্যে প্রস্তুত ছিলাম না। সব কথা ভেবে দেখতে হবে। তুমি যাও, শোও গিয়ে।’ সে ফুল দিয়ে সাজানো শয়নঘরের দিকে আঙুল দেখোল–’আমি অন্য কোথাও শোব।’
দীপা আর দাঁড়াল না, দ্রুত ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। তার চুলে তখনো ফুলের মালা জড়ানো, গলায় হাতে ফুলের গয়না। সেই অবস্থাতেই সে ফুল-ঢাকা বিছানার ওপর আছড়ে পড়ে ফুপিয়ে কেঁদে উঠল। এত সহজে পরিত্ৰাণ পাবে তা সে আশা করেনি।
দোতলায় আর একটি শয়নকক্ষ ছিল, দেবাশিসের বাবা যে ঘরে শুতেন; নকুল সে ঘরও পরিষ্কার করেছিল, খাটের ওপর বিছানা পেতে সুজনি ঢাকা দিয়ে রেখেছিল। বিয়ের শুভদিনে বাড়িতে কোথাও সে অপরিচ্ছন্নতা রাখেনি। দেবাশিস দীর্ঘকাল অব্যবহৃত এই ঘরে ঢুকে কিছুক্ষণ খাটের পাশে বসে রইল। মাথাটা গরম হয়ে উঠেছে, সে কক্ষসংলগ্ন বাথরুমে গিয়ে কল খুলে মাথাটা কলের তলায় রাখল। তারপর ভিজে মাথায় ফিরে এসে আলো নিভিয়ে বিছানার সুজনির ওপরেই শুয়ে পড়ল।
রেল গাড়ি প্রচণ্ড বেগে ছুটতে ছুটতে হঠাৎ যখন লাইনের বাইরে লাফিয়ে পড়ে তখন কাউকে নোটিস দেয় না; দেবাশিসের জীবনে তেমনি আজ এই মহাদুর্যোগ এসেছে অপ্রত্যাশিতভাবে; দু’ মিনিট আগেও এই দুযোগের কোনো আভাস সে পায়নি। কিন্তু আত্মহারা হয়ে বিপথে কুপথে ছুটোছুটি করলে চলবে না, মাথা ঠাণ্ডা রেখে ভেবে-চিন্তে সুবুদ্ধির পথ বেছে নিতে হবে।
দেবাশিস জটিল চিন্তার মধ্যে ডুবে গেল। সে শান্ত ধীর প্রকৃতির মানুষ, অন্য কেউ হলে আজ রাত্রেই একটা কাণ্ড করে বসত।
দীপা অন্য একজনকে ভালবাসে, এইটেই হচ্ছে মূল কথা। দীপা কাকে ভালবাসে, সে লোকটা কে, তা জানিবার আগ্রহ দেবাশিসের নেই; সে যেই হোক না কেন, দীপা তাকে ভালবাসে। তবু দীপা পারিবারিক চাপে পড়ে দেবাশিসকে বিয়ে করেছে। কিন্তু এই বিয়েকে সে স্বামী-স্ত্রীর স্বাভাবিক সম্পর্কে পরিণত করতে চায় না। . প্ৰেমাস্পদের সঙ্গে দীপার ঘনিষ্ঠতা কত দূর অগ্রসর হয়েছিল? জল্পনা নিষ্ফল।
দীপার বাড়ির সকলেই অবশ্য দীপার অসবৰ্ণ প্রণয়ের কথা জানে, বিজয়মাধব জানে। জেনে-শুিনে তারা এই কাজ করেছে। হয়তো ভেবেছে, বিয়ের পর দীপা ক্রমে তার প্রণয়ীকে ভুলে যাবে। কিন্তু দীপা ভুলবে বলে মনে হয় না, প্রণয়ীর প্রতি তার একনিষ্ঠা আছে। …নৃপতি কি জানে? বোধ হয় জানে না, জানলে দেবাশিসের এমন অনিষ্ট করত না; নৃপতিকে সজ্জন বলেই মনে হয়। …কিন্তু যা হবার তা তো হয়েছে, এখন এই জট ছাড়াবার উপায় কি? ডিভোর্স? একটা বেজে গেল, দুটো বেজে গেল। এতক্ষণ পরে দেবাশিস লক্ষ্য করল, বসবার ঘরে তীব্র শক্তির আলোটা জ্বলেই চলেছে। সে উঠে আলোটা নেবাতে গেল। দীপার ঘরের দরজা বন্ধ; দরজার পাশ দিয়ে যাবার সময় সে একটু থেমে কান পেতে শুনল, কিন্তু ঘরের ভিতর থেকে কোনো শব্দ এল না; দীপা হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে। সে বসবার ঘরের আলো নিবিয়ে ফিরে এসে আবার শুয়ে পড়ল।
ঝাঁ ঝাঁ রাত্রি। কলকাতা শহর নিঝুম হয়ে আছে। দূরে একটা রেলের ইঞ্জিন একটানা বাঁশী বাজাতে বাজাতে আরো দূরে গিয়ে মিলিয়ে গেল। দেবাশিস অন্ধকারে চোখ মেলে শুধু ভাবছে–
তিনটে বেজে গেল। দেবাশিসের মনে হল, নীরন্ধ অন্ধকারের মধ্যে এক বিন্দু জোনাকি আলো জ্বলছে আর নিবছে.একটা অর্ধ-পরিণত সংকল্প.তার বেশি আজ রাত্রে আর কিছু সম্ভব নয়…
দেবাশিস আবার বাথরুমে গিয়ে মাথায় জল ঢালল, তারপর ফিরে এসে বিছানায় শোবার। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ল।
কিন্তু বেশিক্ষণ ঘুমোতে পারল না, শরীরের ক্লান্তি কেটে যাবার পর ভোরের আলো ফুটতে-নো-ফুটতেই তার ঘুম ভেঙে গেল। সে মুখ ধুয়ে নীচে নেমে গেল। নকুল তখনো ওঠেনি, কাল রাত্রের খাটাখাটুনির পর আজ বোধ হয় একটু বেশি ঘুমিয়ে পড়েছে। দেবাশিস নিঃশব্দে সদর দরজা খুলে খোলা জায়গায় বেরিয়ে এল। শুকনো বাগানে ফুল নেই, কিন্তু ভোরের বাতাসটি বেশ মিঠে। সে সদর দরজা থেকে ফটক পর্যন্ত পায়চারি করতে লাগল।
একটু একটু করে দিনের আলো ফুটছে, কিন্তু এ রাস্তায় এখনো লোক চলাচল আরম্ভ হয়নি। দেবাশিস পায়চারি করতে করতে এক সময় ফটকের কাছে এসে দাঁড়াল। বন্ধ ফটকের উপর কনুই রেখে রাস্তার দিকে তাকিয়ে দেখল, বাঁ দিক থেকে একজন লোক হন।হন করে আসছে। কাছে এলে সে চিনতে পারল-বিজয়মাধব।
বিজয়মাধবের সঙ্গে এই কয় দিনে দেবাশিসের বেশ ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল, উপরন্তু সে এখন তার শ্যালক। কিন্তু বিজয়কে আসতে দেখে তার মনটা গরম হয়ে উঠল। তাই বিজয় যখন মুখে হাসি ফুটিয়ে ফটকের ওপারে এসে দাঁড়াল তখন দেবাশিসের মুখে সে হাসির প্রতিবিম্ব পড়ল না, সে গম্ভীর চোখে বিজয়ের পানে চেয়ে বলল–’আবার কি জন্যে এসেছেন? কৰ্তব্যকর্ম কি এখনো শেষ হয়নি?’
বিজয়ের হাসি মিলিয়ে গেল, সে থতমত খেয়ে বলে উঠল—’দীপা কিছু বলেছে নাকি?’
দেবাশিস নীরস কণ্ঠে বল–’সবই বলেছে। সে অন্তত আমায় ঠকায়নি।’
বিজয় কিছুক্ষণ হতবুদ্ধির মত চেয়ে থেকে হঠাৎ ফাটক খুলে ভিতরে এল, তারপর দেবাশিসের হাত চেপে ধরে ব্যগ্র মিনতির স্বরে বলল–’ভাই দেবাশিস, তুমি দীপার স্বামী, তুমি আমার পরমাত্মীয়, আমার ছোট ভাইয়ের সমান। আমি একটা কথা বলব, শুনবে?’
‘কি বলবেন বলুন।’
‘দীপা একেবারে ছেলেমানুষ, সবে সতেরো পেরিয়ে আঠারোয় পা দিয়েছে, ওর মনে কল্পনা-বিলাস ছাড়া আর কিছু নেই। ওইটুকু মেয়ের বুদ্ধিই বা কতখানি? তুমি ভাই ওর কথায় কান দিও না। দুচার দিন ঘর করলেই আগের কথা সব ভুলে যাবে। কম বয়সের একটা খেয়াল বই তো নয়?’
‘ওর কথা শুনে তা তো মনে হয় না।’
‘মেয়েমানুষের কথার কি কোনো দাম আছে? ওরা আধুনিক কায়দায় বড় বড় কথা বলে, ভিতরে কিন্তু ফঙ্কিকার। দীপা স্কুলে পড়েছে, স্কুলের মেয়েদের সঙ্গে মিশে পাকামি শিখেছে। ওর মনটা ভাবপ্রবণ; সিনেমা-থিয়েটার নাচগানের দিকে টান আছে, যদিও আমরা তাকে কোনোদিন আশকার দিইনি। আমি জোর গলায় বলছি, আমাদের বংশের মেয়ে কখনো বিপথে কুপথে যাবে না।’
দেবাশিস শান্ত গলায় বলল–’আপনার ভয় নেই, এ নিয়ে আমি ঝোঁকের মাথায় কোনো কেলেঙ্কারি কাণ্ড করব না, যা করবার ভেবে-চিন্তে করব। এ কথা বাড়ির বাইরে আর কেউ জানে?’
‘না।’ বিজয় আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল, এমন সময় বাড়ির দোরের কাছে নকুলকে দেখা গেল। নকুল এগিয়ে এসে বলল-‘দাদাবাবু্, চা তৈরি হয়েছে।’
বিজয় খাটো গলায় তাড়াতাড়ি বলল—’আচ্ছা ভাই, আজ আমি যাই। শীগগির আবার আসব।’ বলে সে দ্রুতপদে চলে গেল।
দেবাশিস বাড়ির দিকে ফিরে যেতে যেতে বলল–’নকুল, তুই আমাদের চা ওপরের ঘরে দিয়ে আয়।’
নকুল মুচকি হেসে বলল—’তাই দিয়েছি দাদাবাবু!’ দেবাশিস দোতলায় উঠে গেল। দেখল, বসবার ঘরে নীচু টেবিলের ওপর চায়ের সরঞ্জাম সাজানো রয়েছে আর দীপা তক্তপোশের পাশে চুপটি করে বসে আছে—কাল রাত্রে যেমন বসে ছিল। অবশ্য কাল রাত্রের বাসি জামাকাপড়, ফুলের গয়না আর নেই, তার বদলে পাট-ভাঙ্গা শাড়ি ব্লাউজ। দেবাশিস আসতেই দীপা একটু আড়ষ্টভাবে উঠে দাঁড়াল।
দেবাশিস দোর বন্ধ করে দিয়ে দোরের সামনে ফিরে দাঁড়িয়ে দীপার। পানে তাকাল। খোলা জানালা দিয়ে সকালের নরম আলো দীপার ওপর পড়েছে। বিজয় যা বলেছিল তা মিথ্যে নয়, দীপার ছিপছিপে শরীরে কীেমার্যের কোমলতা এখনো লেগে আছে, ভারি ছেলেমানুষ মনে হয়। কিন্তু তার মুখে পরিণত মনের দৃঢ়তা, মুখের লাবণ্য যেন দৃঢ়তার উপাদানে তৈরি।
দেবাশিস কাছে এসে চায়ের সরঞ্জামের দিকে দৃষ্টি নামালো; টি-পটে চা, দু’টি পেয়ালা, গরম দুধ, চিনির কিউব, প্লেটে স্তুপীকৃত টোস্ট, মাখনের পাত্রে মাখন, অন্য একটি পাত্রে মারমালেড় এবং চারটি সিদ্ধ ডিম। নকুল দু’জনের জন্য প্রচুর প্রাতরাশ করেছে, একলা দেবাশিসের জন্য এত করে না।
দেবাশিস দীপার দিকে চোখ তুলে সহজ গলায় বলল–’তুমি চা ঢালবে?’
দীপাদের বাড়িতে সাবেক রেওয়াজ, পেয়ালায় চা ঢালা হয়ে সকলের কাছে যায়; প্রাতরাশ খাওয়ার কোনো বিধিবদ্ধ রীতি নেই। সে একটু ইতস্তত করল। তাই দেখে দেবাশিস বলল–’আচ্ছা, আমিই চা ঢালছি।’
দু’টি পেয়ালায় চা ঢেলে সে একটি পেয়ালা দীপার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল—’বসো। তোমার সঙ্গে কথা আছে, চা খেতে খেতে কথা হবে।’
দীপা সঙ্কুচিতভাবে চেয়ারে বসল। তার সঙ্কোচ মনের জড়ত্র নয়, অপরিচিত এবং অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সঙ্কোচ। তার জীবনে অভাবনীয় ওলট-পালট আরম্ভ হয়েছে।
দেবাশিস নিজের চায়ে একটি ছোট চুমুক দিয়ে পেয়ালা নামিয়ে রাখল, বলল–’তোমার দাদা বিজয়মাধব আজ ভোর হতে না হতে এসেছিল।’
দীপা চকিত চোখ তুলে আবার চোখ নত করল। দেবাশিস এক টুকরো টোস্টে মাখন লাগাতে লাগাতে বলল–’তার কথা শুনে মনে হল তোমার গুপ্তকথা বাড়ির সবাই জানে। বাইরের কেউ জানে নাকি?’
দীপা মাথায় একটা ঝাঁকনি দিয়ে বলল-‘না-না–।’ আর কোনো কথা তার শুকনো গলা দিয়ে বেরুল না।
দেবাশিস বলল–’তা সে যাই হোক, সব কথা বিবেচনা করা দরকার। একটা ব্যাপার ঘটেছে, আমার জীবনে হঠাৎ একটা বেয়াড়া সমস্যা এসে হাজির হয়েছে। যথাসাধ্য কেলেঙ্কারি বাঁচিয়ে তার নিম্পত্তি করতে হবে। আমার কথা বুঝতে পারছ?’
দীপা ঘাড় নাড়ল, অস্ফুট স্বরে বলল–’পারছি।’ সে কিন্তু দেবাশিসের ধরনধারন কিছুই বুঝতে পারছে না। এরকম অবস্থায় মানুষ কি এমনিভাবে কথা বলে?
দেবাশিস টেস্টে কামড় দিয়ে বলল–’তোমার চা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে।’
দীপা তাড়াতাড়ি চায়ের পেয়ালা হাতে তুলে নিল, কিন্তু হাতের পেয়ালা হাতেই রইল, ঠোঁট পর্যন্ত উঠল না।
দেবাশিস শান্তভাবে বলল—’সমস্যার সোজাসুজি নিষ্পত্তি আছে-ডিভোর্স।’
দীপার হাতের পেয়ালা কেঁপে উঠল। আর একটু হলেই পড়ে যেত। সে সামলে নিয়ে রুদ্ধস্বরে বলল—’না।’
দেবাশিস ভুরু তুলে বলল–’না কেন? তোমার বাড়ির লোক ভালবাসার পাত্রের সঙ্গে তোমার বিয়ে না দিয়ে অন্যায় করেছেন, সে অন্যায় সংশোধন করা উচিত।’
দীপা নত চোখে বলল—’আমার দাদু-তিনি তাহলে বাঁচবেন না।’
দেবাশিস কিছুক্ষণ কথা কইল না, কতকটা যেন অন্যমনস্কভাবে দীপার পানে চেয়ে রইল। তারপর নিজের ঈষদুষ্ণ পেয়ালাটা তুলে নিয়ে এক চুমুকে নিঃশেষ করে আবার রেখে দিল।
উদয়মাধবকে দেবাশিস দেখেছে, বৃদ্ধের চারিত্রিক প্রবলতা অনুভব করেছে, নাতনী ডিভোর্স-কোর্টে গিয়েছে শুনলে তিনি হয়তো আত্মহত্যা করবেন না, কিন্তু নাতনীকে খুন করতে পারেন।
‘ডিভোর্স যদি সম্ভব না হয় তাহলে দ্বিতীয় উপায় হচ্ছে—তুমি বাপের বাড়ি ফিরে যাও, সেখানে যেমন ছিলে তেমনি থাকে।’
‘না, ওরা আবার আমায় ফেরত পাঠিয়ে দেবে। মাঝ থেকে জানাজানি হবে।’
‘তাহলে তৃতীয় পন্থা হচ্ছে এখানেই থাকা। আলাদাই থাকবে, আমি তোমার কাছে যাব না। কিন্তু আমারও তো লোকলজ্জা আছে। বাইরের লোকের কাছে ভণ্ডামি করতে হবে। তুমি পারবে?’
দীপা ঘাড় নেড়ে জানাল, সে পারবে।
দেবাশিস বলল–’বাড়ির চাকরীও বাইরের লোক। তার সামনেও ধোঁকার টাটি খাড়া রাখতে হবে।’
দীপা আবার ঘাড় নেড়ে সায় দিল।
দেবাশিস নিশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াল–’বেশ। কিন্তু এভাবে কত দিন চলবে?’
দীপা চুপ করে রইল, এ প্রশ্নের উত্তর সে নিজেই জানে না। দেবাশিস আস্তে আস্তে ঘর ছেড়ে চলে গেল। স্ত্রীজাতি সম্বন্ধে তার অভিজ্ঞতা খুবই অল্প; কিন্তু তার মনে হল, এরা বড় স্বার্থপর, নিজের স্বার্থই বোঝে, আর কারুর কথা ভাবে না।
কাল দেবাশিস ভেবেছিল, এখন দু’তিন দিন সে ফ্যাক্টরিতে যাবে না, সারা দিন বাড়িতে থেকে বউয়ের সঙ্গে ভাব করবে। কিন্তু সব ভণ্ডুল হয়ে গেল। সে খানিকক্ষণ বিমনাভাবে ঘুরে বেড়ালো, কাল রাত্রে যে বিছানায় শুয়েছিল সেটা ঝেড়েকুড়ে ঠিক করে রাখল, নকুল না। সন্দেহ করে যে, তারা আলাদা শুয়েছে। তারপর রান্নাঘরে গিয়ে বলল–’নকুল, আমার খাবার তৈরি কর, আমি ন’টার সময় ফ্যাক্টরি যাব।’
স্নান করতে গিয়ে দেবাশিসের একটা কথা মনে এল। সে দেখল, দীপা তখনো বসবার ঘরে আড়ষ্ট হয়ে বসে আছে, সে তার কাছে গিয়ে বলল–’নকুলের চোখে যদি ধুলো দিতে হয় তাহলে তোমার ঘরের লাগোয়া বাথরুমে আমাকে স্নান করতে হবে। অন্য বাথরুমে আমার ভিজে কাপড় দেখলে নকুলের মনে সন্দেহ হবে। আমি তোমার বাথরুমে স্নান করতে পারি?
দীপার মনে হল দেবাশিস তাকে ব্যঙ্গ করছে। সে চোখ তুলে চাইল, কিন্তু দেবাশিসের মুখে ব্যঙ্গবিদ্রূপের চিহ্নমাত্র দেখতে পেল না। সে তখন একটু ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল।
দেবাশিস মানাহার করে ন’টার সময় কাজে চলে গেল।
অতঃপর সংসারের সব ভার পড়ল নকুলের ওপর। নতুন বউকে বাড়ির কাজকর্ম শেখাতে হবে, বউয়ের খাওয়া-দাওয়ার ওপর নজর রাখতে হবে। বাড়িতে দ্বিতীয় স্ত্রীলোক নেই; সাময়িকভাবে নকুল হয়ে উঠল বাড়ির গিন্নী।
দুপুরবেলা দীপকে ভাত খাইয়ে নকুল ওপরে পাঠিয়ে দিল, বলল–’যাও, একটু ঘুমিয়ে নাও গিয়ে।’
কিন্তু দীপার দিনের বেলা ঘুমোনো অভ্যোস নেই। সে ঘুরে ঘুরে ওপরতলাটা দেখতে লাগল।…এই ঘরে কাল রাত্রে দেবাশিস। শুয়েছিল…নকুল যেন জানতে না পারে, সে ওপরে আসবার আগেই রোজ বিছানা ঝেড়ে ঠিকঠাক করে রাখতে হবে.বাড়ির পাশের ব্যালকনি থেকে বাগানটা দেখা যায়। বাগানের ছিরি নেই, যেন কত কাল কেউ বাগানের দিকে তাকায়নি। দেবাশিসের বাগানের শখ নেই। দীপার খুব বাগানের শখ আছে। সে বাপের বাড়ির খোলা ছাদে টবের বাগান করেছিল।
ঘণ্টাখানেক ঘুরে ফিরে সে বসবার ঘরে এল। রেডিওগ্রামের ওপর নজর পড়ল। দীপা রেডিও শুনতে ভালবাসে. বাপের বাড়িতে তার একটি ট্রানজিস্টার ছিল, সে বিছানায় শুয়ে শুয়ে গান শুনত, ফুটবলের কমেন্টারি শুনাত, নাট্যাভিনয় শুনত। ট্রানজিস্টারটা আনা হয়নি। তার অনেক নিজস্ব জিনিস বাপের বাড়িতে পড়ে আছে।
দীপা রেডিওগ্রামের কপাট সরিয়ে কলকব্জা নাড়াচাড়া করতে করতে গানের সুর বেজে উঠল। দুপুরবেলার শান্ত ত্ররাহীন প্রোগ্রাম। সে রেডিওর পাশে একটা গদি-মোড়া আরাম-চেয়ারে বসে শুনতে লাগল।
কাল রাত্রে দীপা অল্পই ঘুমিয়েছে, যেটুকু ঘুমিয়েছে তাও যেন আড়ষ্ট হয়ে। এখন রেডিওর মৃদু গুঞ্জন শুনতে শুনতে তার চোখ বুজে এল।
হঠাৎ তার চমক ভাঙল টেলিফোনের শব্দে। সে চোখ মেলে দেখল, ঘরের কোণে ছোট টেবিলের ওপর টেলিফোন বাজছে। দীপা রেডিও বন্ধ করে দিল। নিশ্চয় দেবাশিসের টেলিফোন। একটু ইতস্তত করে সে উঠে গিয়ে ফোন তুলে নিল।
‘হ্যালো।‘
অপর প্রান্ত থেকে আওয়াজ এল—’দীপা, আমার গলা চিনতে পারছ?’
দীপার বুক ধড়ফড় করে উঠল, সে অবরুদ্ধ স্বরে বলল–’পারছি।’
‘ঘরে কেউ আছে?’
না, আমি একা।’
‘বেশ। তোমার স্বামীকে বলেছ?’
‘বলেছি।’
‘তারপর?’
‘তারপর আর কিছু না।’
‘রাত্রে তোমাকে বিরক্ত করেনি?
‘না।‘
‘তুমি একলা শুয়েছিলে?’
‘হ্যাঁ।’
‘বেশ। এইভাবে চালিয়ে যাও।’
‘কত দিন?
‘একটু সময় লাগবে। তুমি ভেবো না। সব ঠিক হয়ে যাবে। শপথ মনে আছে তো?’
‘হ্যাঁ।‘
‘শপথ করেছ, আমার নাম কাউকে বলবে না। মা কালীর নামে শপথ করেছ, মনে আছে?’
‘আছে।’
‘তোমার স্বামী হয়তো নাম জানবার জন্যে পীড়ন করতে পারে।’
‘নাম জানতে চাননি। চাইলেও আমি বলব না।’
‘বেশ। আমি মাঝে মাঝে তোমাকে ফোন করব। দুপুরবেলা তোমার স্বামী যখন বাড়িতে থাকবে না। তখন ফোন করব।’
‘আচ্ছা।’
সে ফোন রেখে দিয়ে আবার চেয়ারে এসে বসল। মনে হল তার শরীরের সমস্ত জোর ফুরিয়ে গেছে।
বিকেল পাঁচটার সময় দেবাশিস ফ্যাক্টরি থেকে ফিরে এল। নকুল দোর খুলে দিল। দীপা ওপর থেকে ঘন্টির আওয়াজ শুনতে পেয়েছিল, সে উৎকৰ্ণ হয়ে রইল।
দেবাশিস ওপরে উঠে এসে দেখল, দীপা নীরব রেডিওগ্রামের সামনে বসে আছে। সে ঢুকতেই দীপা চকিতে একবার তার দিকে চেয়ে উঠে দাঁড়াল। দেবাশিস দ্বিধামন্থর পায়ে তার সামনে এল। কারুর মুখে কথা নেই। কিন্তু শুধু মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা কতক্ষণ চলে! শেষে দেবাশিস বলল—’নকুল তোমার দেখাশুনো করেছিল তো?’
দীপা ঘাড় নেড়ে বলল–’হ্যাঁ।’
দেবাশিস প্রশ্ন করল–’চা খেয়েছ?’
দীপা মাথা নাড়ল–’না।’
অতঃপর আর কি বলা যেতে পারে, দেবাশিস ভেবে পেল না। ওদিকে দীপা প্ৰাণপণে চেষ্টা করছে সহজভাবে যা হোক একটা কিছু বলতে। কিন্তু কী বলবে? বক্তব্য কী আছে? শেষ পর্যন্ত একটা কথা মনে এল, সে ঘাড় তুলে বলল—’আপনি দুপুরবেলা কোথায় খাওয়া-দাওয়া করেন?’
দেবাশিস বলল—’আমার ফ্যাক্টরিতে খাওয়ার ভাল ব্যবস্থা আছে। ফ্যাক্টরিতে যারা কাজ করে সকলেই দুপুরবেলা ক্যানটিনে খায়। আমিও খাই।’
দীপা শুধু বলল–’ও।’
দেবাশিস বলল–’আচ্ছা, আমি কাপড়-চোপড় বদলে নিই, তারপর নীচে গিয়ে চা খাওয়া যাবে।’
সংশয়স্খলিত স্বরে দীপা বলল–’আচ্ছা।’
দেবাশিস দীপার ঘরের দিকে যেতে যেতে বলল–’আমি তাহলে তোমার বাথরুমেই ব্যবহার করছি।’
দোর পর্যন্ত গিয়ে দেবাশিস থমকে দাঁড়াল, তারপর আস্তে আস্তে দীপার সামনে ফিরে এসে গলা খাটো করে বলল—‘একটা কথা। তুমি আমাকে ‘আপনি বললে ভাল শোনায় না। অবশ্য আড়ালে তা বলতে পোর, কিন্তু নকুল কিংবা অন্য কারুর সামনে ‘তুমি বলাই স্বাভাবিক। নইলে ওদের খটকা লাগতে পারে।’
দীপা মুখ নীচু করে নীরব রইল।
দেবাশিস প্রশ্ন করল–’কি বলো?’
দীপা অনিচ্ছাভিরা ক্ষীণ স্বরে বলল–’আচ্ছা।’
দেবাশিস বাথরুমে চলে গেল। দীপা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগল, প্রকাশ্যে ‘তুমি বলা এবং আড়ালে ‘আপনি বলা কি খুব সহজ কাজ? রঙ্গালয়ের নটনটীরা বোধহয় পারে। তার মনে হল সে আস্তে আস্তে অতলস্পর্শ চোরাবালির মধ্যে তলিয়ে যাচ্ছে।
দশ মিনিট পরে দেবাশিস পাঞ্জাবির বোতাম লাগাতে লাগাতে বেরিয়ে এল, বলল–’চল, নীচে যাই।’
দেবাশিসের পিছু পিছু দীপা নীচে নেমে গেল, দু’জনে টেবিলের দু’প্রান্তে বসল। নকুল তাদের সামনে রেকাবি-ভরা লুচি তরকারি রাখল। দেবাশিস খেতে আরম্ভ করল। কিন্তু দীপা হাত গুটিয়ে বসে রইল।
নকুল জিজ্ঞেস করল-‘দাদাবাবু্, ডিম ভেজে দেব?’
দেবাশিস দীপার পানে চাইল। দীপা একটু মাথা নাড়ল; বাপের বাড়িতে তার ডিম খাওয়া বারণ ছিল। আইবুড়ো মেয়েদের ডিম খেতে নেই।
দেবাশিস বলল–’থাক, দরকার নেই।’
চায়ের পেয়ালা টেবিলে রাখতে এসে নকুল বলল–’ও কি বউদি, তুমি খাচ্ছ না?’
দীপা মাথা হেঁট করল, তারপর কাতর দৃষ্টিতে দেবাশিসের পানে তাকাল। দেবাশিস বুঝতে পারল দীপার সংকোচের কারণ কি। সে একটু হেসে বলল—’নকুল, ওর বোধহয় পুরুষের সামনে খাওয়া অভ্যোস নেই।’
দেবাশিস তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করে উঠে পড়ল। সে ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার পর নকুল দীপার কাছে এসে বলল–’বউদি, এ সংসারে মেয়ে-পুরুষ সবাই একসঙ্গে খায়, কতর্বিাবুর আমল থেকে এই রেওয়াজ দেখে আসছি। তুমি যখন এ বাড়ির বউ হয়ে এসেছি তখন তোমাকেও তোক এ বাড়ির রেওয়াজ মেনে চলতে হবে। ভাবনা নেই, আস্তে আস্তে অভ্যোস হয়ে যাবে। নাও, খেতে আরম্ভ কর। তোমার বাপের বাড়িতে কি ডিমের চলন নেই?
দীপা বলল—’পুরুষেরা হাঁসের ডিম খান। মুরগির ডিমের চলন নেই।‘
নকুল বিজ্ঞের মত মাথা নেড়ে বলল-’হাঁসের ডিমও যা মুরগির ডিমও তাই, সব ডিমই সমান।’
দীপা নকুলের তদারকিতে চা-জলখাবার খেয়ে ঘরের বাইরে এসে দেখল, দেবাশিস সিঁড়ির হাতলের ওপর কনুই রেখে দাঁড়িয়ে আছে। দীপকে দেখে সে বলল–’বেড়াতে যাবে? সারা দিন তো বাড়িতে বন্ধ আছে, চল না মোটরে খানিক বেড়িয়ে আসবে।’
অভিনয় চলছে চলুক, কিন্তু কোথাও একটা সীমারেখা টানা দরকার। দীপা সোজা দৃষ্টিতে দেবাশিসের পানে চেয়ে দৃঢ় স্বরে বলল—’না।’
দেবাশিসের মুখ দেখে মনে হল না যে সে মনঃক্ষুন্ন হয়েছে, সে সহজভাবে বলল—’আচ্ছা, আমি তাহলে একটু ঘুরে আসি। বেশিদূর নয়, নৃপতিদার আড্ডা পর্যন্ত।’
সে বেরিয়ে পড়ল। অর্ধেক পথ গিয়েছে, দেখল কপিল বোস পায়ে হেঁটে তার দিকেই আসছে। কপিলের একটি ছোট মোটর আছে, বেশির ভাগ তাতেই সে ঘুরে বেড়ায়। মুখোমুখি হলে দেবাশিস বলল–’এদিকে কোথায় চলেছেন?’
কপিল একটু অপ্রতিভ হয়ে পড়ল—’আপনার দিকেই যাচ্ছিলাম।’
মনে মনে বিস্মিত হলেও দেবাশিস মুখে বলল–’আমার দিকে? তা—চলুন, ফেরা যাক।’
কপিল তাড়াতাড়ি বলল—’না না, তার দরকার নেই। আপনি আড়ায় যাচ্ছেন তো? চলুন, আমারও শেষ গন্তব্যস্থান সেখানেই। আপনার কাছে যাচ্ছিলাম একটা জিনিসের খোঁজে।’
দু’জনে নৃপতির বাড়ির দিকে চলল। দেবাশিস জিজ্ঞেস করল–’কিসের খোঁজে?’
কপিল দ্বিধাভরে বলল–’আমার সিগারেট-কেসটা আজ সকাল থেকে খুঁজে পাচ্ছি না। যতদূর মনে পড়ে কাল বিকেল পর্যন্ত ছিল; তারপর আপনার বাড়িতে গিয়ে আপনার সিগারেটই খেয়েছি, আমার পকেটে সিগারেট-কেস আছে কিনা খেয়াল করিনি। আজ সকালবেলা দেখি নেই। বাড়িতে খুঁজলাম, পাওয়া গেল না। তা ভাবলাম, খোঁজ নিয়ে আসি আপনার বাড়িতেই পকেট থেকে পড়ে গেছে কিনা।’
দেবাশিস বলল—’আমার বাড়িতে যদি পড়ে থাকে এবং কেউ তুলে না নিয়ে থাকে তাহলে নকুল নিশ্চয় সরিয়ে রেখেছে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করব। কিসের সিগারেট-কেস–সোনার?’
কপিল তাড়াতাড়ি বলল-‘হ্যাঁ। কিন্তু আপনি ভাববেন না, আমি প্রায়ই জিনিস হারিয়ে ফেলি, তবে বেশির ভাগ সময়েই পাওয়া যায়। হয়তো বাড়িতেই আছে, কিংবা নৃপতিদার আড্ডায়।’
নৃপতির আডাঘরে তখন আলো জ্বলছে; ঘরে কেবল নৃপতি আর প্রবাল বসে গল্প করছে। এরা ঘরে ঢুকলে নৃপতি সমাদ্দারের সুরে বলে উঠল—’আরে, এস এস।’
দু’জনে নৃপতির কাছে বসল। নৃপতি দেবাশিসকে নিবিষ্ট চোখে দেখতে দেখতে চাপা কৌতুকের সুরে বলল–’আমি তো ভেবেছিলাম, এখন কিছু দিন তুমি বাড়ি থেকে বেরুবেই না। যাহোক, দাম্পত্য-জীবন কেমন লাগছে?’
প্রশ্নের জন্যে দেবাশিস তৈরি ছিল না, একটু দম নিয়ে মুখে সলজ্জ হাসি এনে বলল–’মন্দ কি, ভালই লাগছে।’
প্রবালের গলার মধ্যে হাসির মত একটা শব্দ হল, সে বলল–’প্রথম প্রথম ভালই লাগে। তারপর–সে উঠে গিয়ে পিয়ানোর সামনে বসিল, টুং টাং শব্দে একটা বিষাদের সুর বাজতে লাগল।
কপিল ভ্রূকুটি করে কিছুক্ষণ তার পানে চেয়ে রইল, তারপর বিস্বাদসূচক মুখভঙ্গী করে দেবাশিসকে বলল–’এক জাতের লোক আছে তারা শুধু চাঁদের কলঙ্কই দেখে, চাঁদ দেখতে পায় না। নৃপতিদা, একটা সিগারেট দিন, আমার সিগারেট-কেসটা হারিয়ে ফেলেছি।’
কপিল সিগারেট ধরিয়েছে এমন সময় চিত্রনক্ষত্র সুজন মিত্র প্রবেশ করল। বোধহয় সোজা ফিল্ম স্টুডিও থেকে আসছে, পরনে করতুরয়ের লম্বা প্যান্ট এবং টকটকে লাল রঙের সিল্কের শার্ট। দেবাশিসকে দেখে চোখ বড় করে কৌতুকের ভঙ্গীতে হাসল, তারপর বলল–’নৃপতিদা, আজ কাগজে খবর দেখেছেন?’
সকলেই উৎসুক চোখে তার পানে চাইল, প্রবালের পিয়ানো বন্ধ হল। নৃপতি বলল–’কি খবর? কাগজ। অবশ্য পড়েছি, কিন্তু গুরুতর কোনো খবর দেখেছি বলে মনে পড়ছে না।’
সুজন পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে বলল—’গুরুতর খবর না হতে পারে। কিন্তু ঘরোয়া খবর। আমাদের পাড়ার খবর। খবরের কাগজের এক কোণে ছোট্ট একটি খবর। গোল পার্কের কাছে কাল ভোরবেলা একজন ভিখিরি মারা গেছে।’ এই বলে সুজন নাটকীয় ভঙ্গীতে চুপ করল। সবাই অবাক হয়ে তার মুখের পানে চেয়ে রইল।
সুজন তখন আবার আরম্ভ করল–’ভাবছেন, একটা ভিখিরির মৃত্যু এমন কী চাঞ্চল্যকর খবর। কিন্তু ভিখিরির মৃত্যু স্বাভাবিক মৃত্যু নয়, কোনো অজ্ঞাত ঘাতক তাকে খুন করেছে। এবং তার চেয়েও বিস্ময়কর খবর, অজ্ঞাত আততায়ী ভিখিরির পিঠের দিক থেকে তার বুকের মধ্যে একটা শজারুর কাঁটা ঢুকিয়ে দিয়ে তাকে বধ করেছে।’
সুজনের বক্তৃতার মাঝখানে প্রবালও পিয়ানো থেকে উঠে কাছে এসে বসেছিল। শ্রোতারা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। শেষে নৃপতি বলল–’ছোট খবর বলেই বোধহয় চোখে পড়েনি। তোমরা কেউ পড়েছ?’
কেউ পড়েনি। দেবাশিস এবং প্রবাল খবরের কাগজ পড়ে না। নতুন খবরের প্রতি তাদের আসক্তি নেই। কপিল কেবল খেলাধুলোর পাতাটা পড়ে।
প্রবাল বলল–’শজারুর কাঁটা কি মানুষের শরীরে বিঁধিয়ে দেওয়া যায়-ভেঙে যাবে না?’
নৃপতি পণ্ডিত ব্যক্তি, সে বলল—’না, ভাঙবে না। নরম কাঁটা হলে দুমড়ে যেতে পারে। কিন্তু ভাঙবে না। শক্ত কাঁটা লোহার শলার মত সটান মাংসের মধ্যে ঢুকে যাবে।’
প্রবাল জিজ্ঞেস করল–’শজারুর কাঁটা কোথায় পাওয়া যায়? বাজারে বিক্রি হয় নাকি?’
নৃপতি বলল—সব জায়গায় পাওয়া যায় না। শুনেছি নিউ মার্কেটে দুএকটা দোকানে পাওয়া যায়। তাছাড়া বেদেরা গড়ের মাঠে বিক্রি করতে আসে।’
দেবাশিস বলল–’কিন্তু ছোরাজুরি থাকতে শজারুর কাঁটা দিয়ে মানুষ খুন করবার মানে কি?’
কেউ সদুত্তর দিতে পারল না। কপিল নতুন প্রশ্ন করল—’কিন্তু ভিখিরিকে কে খুন করবে? কেন খুন করবে?’
নৃপতি একটু ভেবে বলল–’ভিখিরিদের মধ্যেও কৃপণ ও সঞ্চয়ী লোক থাকে। এমন শোনা গেছে, ভিখিরি মারা যাবার পর তার কাঁথা-কানির ভেতর থেকে দু’শো চারশো টাকা বেরিয়েছে। এই লোকটিও হয়তো সঞ্চয়ী ছিল, তার টাকার লোভে কেউ তাকে খুন করেছে।’
কপিল বলল–’আমার মনে হয় এ একটা উন্মাদ পাগলের কাজ। নইলে শজারুর কাঁটার কোনো মানে হয় না।’
সুজন বলল—’তা বটে, প্রকৃতিস্থ মানুষ শজারুর কাঁটা দিয়ে খুন করবে। কেন? প্রবাল, তোমার কি মনে হয়?’
প্রবাল অবহেলাভরে বলল—’যে-ই খুন করুক সে সাধু ব্যক্তি, ভিখিরি মেরে সমাজের উপকার করেছে। যারা কাজ করে না তাদের বেঁচে থাকার অধিকার নেই।’ সে উঠে গিয়ে আবার পিয়ানোর সামনে বসিল।
তারপর খড়্গ বাহাদুর এল। তার আজ মাঠে খেলা ছিল; সে খেলার কথা তুলল, আলোচনার প্রসঙ্গ বিষয়াস্তরে সঞ্চারিত হল। কিছুক্ষণ পরে কফি এল। কফি খেয়ে আরো কিছুক্ষণ গল্পগুজবের পর দেবাশিস বাড়ি ফিরল।
দেবাশিসের জীবনযাত্ৰা বিয়ের আগে যেমন ছিল বিয়ের পরেও প্ৰায় তেমনি রয়ে গেল। বাড়িতে একজন লোক বেড়েছে এই যা। কেবল নকুল এবং বাইরের অন্যান্যদের সামনে ভণ্ডামি করতে হয়। দেবাশিসের ভাল লাগে না!
আড়ালে দীপার সঙ্গে দেবাশিসের সম্পর্ক বড় বিচিত্র। ঘনিষ্ঠত না করে যতটা সহজভাবে একসঙ্গে বাস করা যায় দু’জনে সেই চেষ্টা করছে। কিন্তু কাজটি সহজ নয়। দীপার মনের নিভৃত আতঙ্ক তার চোখের চাউনিতে হঠাৎ প্রকাশ হয়ে পড়ে। দেবাশিসের মন অশান্ত; সে জানে দীপা অন্যকে ভালবাসে, তবু দীপা তার মনকে দুৰ্নিবার বেগে আকর্ষণ করছে। বিজয় বলেছিল, দীপা ছেলেমানুষ, দুচার দিন স্বামীর ঘর করলেই আগের কথা ভুলে যাবে। কিন্তু দীপার ভাবভঙ্গী দেখে তা মনে হয় না। দীপা আর যাই হোক, তার মন চঞ্চল নয়।
এইরকম শঙ্কা-দ্বিধার মধ্য দিয়ে কিছুদিন কেটে যায়। একদিন বিকেলবেলা ফ্যাক্টরি থেকে ফিরে এসে দেবাশিস দীপকে বলল–’একটা কথা আছে। ফ্যাক্টরিতে যারা কাজ করে তাদের ইচ্ছে, তুমি একদিন ফ্যাক্টরিতে যাও, ওরা তোমাকে পার্টি দিতে চায়। যাবে?’
দীপার মন উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল, এ আবার কি নতুন ঝঞ্ঝাট? সে একটু চুপ করে থেকে বলল-না গেলেই কি নয়?’
দেবাশিস বলল—’তুমি যদি না যেতে চাও আমি জোর করতে পারি না। তবে না গেলে খারাপ দেখায়।’
শুকনো মুখে দীপা বলল–’তাহলে যাব।’
দু’তিন দিন পরে দেবাশিস একটু সকাল সকাল বাড়ি ফিরল, তারপর কোট প্যান্ট ছেড়ে ধুতি পাঞ্জাবি পরে দীপাকে নিয়ে ফ্যাক্টরিতে ফিরে গেল।
প্রজাপতি প্রসাধন ফ্যাক্টরির কারখানাটি ব্যারাকের মত লম্বা্্, তাতে অসংখ্য ঘর, দু’ পাশে চওড়া বারান্দা। বাড়ির চার ধারে অনেকখানি খোলা জমিও আছে। কেমিস্ট এবং কমী মিলিয়ে আন্দাজ ষাটজন লোক এখানে কাজ করে। ফ্যাক্টরি হিসাবে বড় প্রতিষ্ঠান বলা যায় না; কিন্তু এখান থেকে যে শিল্পদ্রব্য তৈরি হয়ে বেরোয় তার চাহিদা সর্বত্র।
আজ ফ্যাক্টরির পুরোভূমিতে একটি ছোট মণ্ডপ তৈরি হয়েছে। দেবাশিসের মোটর মণ্ডপের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই ফ্যাক্টরির প্রবীণ কেমিস্ট ডক্টর রামপ্রসাদ দত্ত এসে দীপাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে নিলেন। ডক্টর দত্তর পিছনে আরো কয়েকজন কমী ছিল, সকলে হাসিমুখে দীপাকে অভ্যর্থনা করল।
ডক্টর দত্ত দীপাকে বললেন–’চল, আগে তোমাকে তোমার ফ্যাক্টরি দেখাই।’
ডক্টর দত্ত বয়সে দীপার পিতৃতুল্য, তাঁর সমেহ ঘনিষ্ঠ সম্বোধনে দীপার মনের আড়ষ্টতা অনেকটা কেটে গেল। দেবাশিস তাদের সঙ্গে গেল না; সে জানতো, সে সঙ্গে না থাকলে দীপা বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করবে।
ফ্যাক্টরির কাজের বেলা উত্তীর্ণ হয়ে গেছে, তবু কয়েকটা ঘরে কয়েকজন লোক তখনো কাজ করছে। কোথাও সারি সারি জালার মত কাচের পাত্রে কেশতৈল রাখা রয়েছে, কোনো ঘরে মো ক্রিম, কোনো ঘরে ল্যাভেন্ডার অডিকলোন প্রভৃতি নানা জাতের তরল গন্ধদ্রব্য। সব মিশিয়ে একটি চমৎকার সুগন্ধে বাড়ি ম-ম করছে।
ডক্টর দত্ত ঘুরে ঘুরে দেখাতে লাগলেন। দেখতে দেখতে নিজের অজ্ঞাতসারেই দীপার মন প্রফুল্ল হয়ে উঠল। এটা কি, ওটা কেমন করে তৈরি হয়, ক্রিম স্নো ইত্যাদিতে কি কি উপকরণ লাগে এইসব প্রশ্নের উত্তর শুনতে শুনতে সে যেন একটা নতুন রাজ্যে প্রবেশ করল। নতুন তথ্য আবিষ্কারের একটা উত্তেজনা আছে, কৌতূহলী মন সহজেই মেতে ওঠে।
ফ্যাক্টরি পরিদর্শন শেষ করে ডক্টর দত্ত দীপাকে মণ্ডপে নিয়ে গেলেন। মণ্ডপের একপাশে অনুচ্চ মঞ্চ, তার ওপর কয়েকটি চেয়ার; মঞ্চের সামনে দর্শকদের চেয়ারের সারি। ফ্যাক্টরিতে যারা কাজ করে সকলেই মণ্ডপে উপস্থিত। ডক্টর দত্ত দীপাকে মঞ্চের ওপর একটি চেয়ারে বসালেন, দেবাশিস তার পাশে বসিল। ফাংশন আরম্ভ হল।
ফ্যাক্টরির কর্মীরা শুধু কাজই করে না, তাদের মধ্যে শিল্পী রসিক গুণিজনও আছে। একটি কোট-প্যান্ট পরা ছোকরা প্রেক্ষাভূমি থেকে উঠে এসে রবীন্দ্রনাথের গান ধরল–তোমরা সবাই ভাল, আমাদের এই আঁধার ঘরে সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বলো। ছোকরার গলা ভাল; গান শুনতে শুনতে শ্ৰোতাদের দন্ত বিকশিত হয়ে রইল। দীপার মুখেও একটি অরুণাভ হাসি আনাগোনা করতে লাগল। সে একবার আড়চোখে দেবাশিসের পানে তাকাল; দেখল, তার ঠোঁটে লোক-দেখানো নকল হাসি। দীপা এখন দেবাশিসের হাসি দেখে বুঝতে পারে আসল হাসি কি নকল হাসি। তার মন হোঁচটি খেয়ে শক্ত হয়ে বসল।
গানের পালা শেষ হলে আর একটি যুবক এসে গম্ভীর মুখে একটি হাসির গল্প শোনাল। সকলে খুব খানিকটা হাসল। তারপর ডক্টর দত্ত উঠে ছোট্ট একটি বক্তৃতা দিলেন। চা কেক দিয়ে সভা শেষ হল।
দেবাশিস দীপাকে নিয়ে নিজের মোটরের কাছে এসে দেখল, মোটরের পিছনের সীট একরাশ গোলাপফুল এবং আরো অনেক উপহারদ্রব্যে ভরা। দেবাশিস স্নিগ্ধকণ্ঠে সকলকে ধন্যবাদ দিল, তারপর দীপকে পাশে বসিয়ে মোটর চালিয়ে চলে গেল। সন্ধ্যে তখন উত্তীর্ণ হয়ে গেছে।
সাবধানে গাড়ি চালাতে চালাতে দেবাশিস বলল—’কেমন লাগল?’
পাশের আলো-আঁধারি থেকে দীপা বলল—’ভাল।’
গাড়ির দু’পাশের ফুটপাথ দিয়ে স্রোতের মত লোক চলেছে, তারা যেন অন্য জগতের মানুষ। গাড়ি চলতে চলতে কখনো চৌমাথার সামনে থামছে, আবার চলছে; এদিক ওদিক মোড় ঘুরে বাড়ির দিকে এগিয়ে চলেছে।
‘ডক্টর দত্তকে কেমন মনে হল?’
এবার দীপার মনে একটু আলো ফুটল–’খুব ভালো লোক, এত চমৎকার কথা বলেন। উনি কি অনেক দিন। এখানে, মানে ফ্যাক্টরিতে আছেন?’
দেবাশিস বলল–’বাবা যখন ফ্যাক্টরি পত্তন করেন তখন থেকে উনি আছেন। আমি ফ্যাক্টরির মালিক বটে, কিন্তু উনিই কর্তা।’
গাড়ির অভ্যন্তর গোলাপের গন্ধে পূর্ণ হয়ে আছে। দীপা দীর্ঘ আন্ত্রাণ নিয়ে বলল—’ফ্যাক্টরির অন্য সব লোকেরাও ভাল।’
দেবাশিস মনে মনে ভাবল, ফ্যাক্টরির সবাই ভাল, কেবল মালিক ছাড়া। মুখে বলল—‘ওরা সবাই আমাকে ভালবাসে।’ একটু থেমে বলল–’ফ্যাক্টরি থেকে বার্ষিক যে লাভ হয় তার থেকে আমি নিজের জন্যে বারো হাজারা টাকা রেখে বাকি সব টাকা কর্মীদের মধ্যে মাইনের অনুপাতে ভাগ করে দিই।’
‘ও—’ দীপার মনে একটা কৌতূহল উঁকি মারল, সে একবার একটু দ্বিধা করে শেষে প্রশ্ন করল–’ফ্যাক্টরি থেকে কত লাভ হয়?’
দেবাশিস উৎসুকভাবে একবার দীপার পানে চাইল, তারপর বলল–’খরচ-খরচা বাদ দিয়ে ইনকাম ট্যাক্স শোধ করে এ বছর আন্দাজ দেড় লাখ টাকা বেঁচেছে। আশা হচ্ছে, আসছে বছর আরো বেশি লাভ হবে।’
আর কোনো কথা হবার আগেই মোটর বাড়ির ফটকে প্রবেশ করল। বাড়ির সদরে মোটর দাঁড় করিয়ে দেবাশিস বলল-‘গোলাপফুলগুলোর একটা ব্যবস্থা করা দরকার।’
দীপা বলল–’আমি করছি।’
নকুল এসে দাঁড়িয়েছিল, দীপা তাকে প্রশ্ন করল–’নকুল, বাড়িতে ফুলদানি আছে?’
নকুল বলল–’আছে। বইকি বউদি, ওপরের বসবার ঘরে দেয়াল-আলমারিতে আছে। চাবি তো তোমারই কাছে।’
‘আচ্ছা। আমি ওপরে যাচ্ছি, তুমি গাড়ি থেকে ফুল আর যা যা আছে নিয়ে এস।’ দীপা ওপরে চলে গেল।
ওপরের বসবার ঘরে কাবার্ডে অনেক শৌখিন বাসন-কোসন ছিল, তার মধ্যে কয়েকটা রূপের ফুলদানি। কিন্তু বহুকাল অব্যবহারে রূপোর গায়ে কলঙ্ক ধরেছে। দীপা ফুলদানিগুলোকে বের করে টেবিলের ওপর রাখল। তারপর নকুল এক বোঝা গোলাপ নিয়ে উপস্থিত হলে তাকে প্রশ্ন করল-নকুল, ব্ৰাসো আছে?’
নকুল বলল–’বাসন পরিষ্কার করার মলম? না বউদি, ছিল, শেষ হয়ে গেছে। কে আর রূপের বাসন মাজাঘষা করছে! আমি তেঁতুল দিয়েই কাজ চালিয়ে নিই।’
দীপা বলল—’তেঁতুল হলেও চলবে। এখন চল, ফুলগুলোকে বাথরুমের টবে রেখে ফুলদানি পরিষ্কার করতে হবে।’
দীপার শয়নঘরের সংলগ্ন বাথরুমে জলভরা টবে লম্বা ডাঁটিসুদ্ধ গোলাপ ফুলগুলোকে আপাতত রেখে দীপা তেঁতুল দিয়ে ফুলদানি সাফ করতে বসল। এতদিন পরে সে একটা কাজ পেয়েছে যাতে অন্তত কিছুক্ষণের জন্যেও ভুলে থাকা যায়।
দেবাশিস একবার নিঃশব্দে ওপরে এসে দেখল, দীপা ভারি ব্যস্ত। আচলটা গাছ-কোেমর করে। জড়িয়েছে, মাথার চুল একটু এলোমেলো হয়েছে; ভারি সুন্দর দেখাচ্ছে তাকে। দেবাশিস দোরের কাছে দাঁড়িয়ে নিবিষ্ট চোখে দেখল, কিন্তু দীপা তাকে লক্ষ্যই করল না। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে দেবাশিস আস্তে আস্তে নীচে নামল, তারপর নৃপতির বাড়িতে চলে গেল।
কিন্তু আজ আর তার আড্ডায় মন বসল না! ঘণ্টাখানেক সেখানে কাটিয়ে সে বাড়ি ফিরে এল। ওপরের বসবার ঘরে দীপা রেডিও চালিয়ে বসে ছিল, দেবাশিসকে দেখে তার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে রেডিও নিবিয়ে উঠে দাঁড়াল, বলল–’ফুলগুলোকে ফুলদানিতে সাজিয়ে ঘরে ঘরে রেখেছি। দেখবে?’
দেবাশিসের মনের ভিতর দিয়ে বিস্ময়ানন্দের বিদ্যুৎ খেলে গেল। দীপা এতদিন তাকে প্রকাশ্যে ‘তুমি এবং জনাস্তিকে ‘আপনি বলেছে, আজ হঠাৎ নিজের অজান্তে জনান্তিকেও ‘তুমি বলে ফেলেছে।
দেবাশিস মুচকি হেসে বলল–’চল, দেখি।’
দীপা তার হাসি লক্ষ্য করল; হাসিটা যেন গোপন অর্থবহ। সে কিছু বুঝতে পারল না, বলল—‘এস।‘
নিজের শোবার ঘরে নিয়ে গিয়ে আলো জ্বেলে দীপা দেবাশিসের মুখের পানে চাইল; দেবাশিস দেখল, ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে ঝকঝকে রূপের ফুলদানিতে দীৰ্ঘবৃন্ত একগুচ্ছ গোলাপ শোভা পাচ্ছে। লাল, গোলাপী এবং সাদা, তিন রঙের গোলাপ, তার সঙ্গে মেডেন হেয়ার ফানের জালিদার পাতা।
ফুলদানিতে ফুল সাজানোর কলাকৌশল আছে, যেমন-তেমন করে সাজালেই হয় না। দেবাশিস খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে বলে উঠল–’বাঃ, ভারি চমৎকার সাজিয়েছ! মনে হচ্ছে যেন ফুলের ফোয়ারা।’
ঘর থেকে বেরিয়ে বসবার ঘরে এসে দেবাশিসের নজর পড়ল রেডিওগ্রামের ওপরে একটা ফুলদানিতে গোলাপ সাজানো রয়েছে। এর সাজ অন্য রকম; চরকি ফুলঝুরির মত ফুলগুলি গোল হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। সেদিকে আঙুল দেখিয়ে দেবাশিস বলল–’এটাও ভারি সুন্দর। আগে চোখে পড়েনি।’
এই সময় নকুল নীচে থেকে হাঁক দিল—’বউদিদি, তোমরা এস; ভাত বেড়েছি।’
দু’জনে নীচে নেমে গেল। রান্নাঘরের টেবিলেও গোলাপগুচ্ছ। দেবাশিস দীপার পানে প্রশংসাপূর্ণ চোখে চেয়ে একটু হাসল।
সে-রাত্রে নিজের ঘরে শুতে গিয়ে দেবাশিস দেখল, তার ড্রেসিং টেবিলের ওপরেও আলাপের ফেয়ার। দীপা তার ঘরে ফুল রাখতে ভোলেনি। দেবাশিসের মন মাধুৰ্যপূর্ণ হয়ে দীপা নিজের ঘরে গিয়ে নৈশদীপ জ্বেলে শুয়েছিল। কিন্তু ঘুম সহজে এল না। মনের মধ্যে একটি আলোর চারপাশে বাদলা পোকার মত অনেকগুলো ছোট ছোট চিস্তার টুকরো ঘুরে বেড়াচ্ছে। আলোটি স্নিগ্ধ তৃপ্তির আলো। আজকের দিনটা যেন গোলাপ-জলের ছড়া দিয়ে এসেছিল…ফ্যাক্টরিতে অনুষ্ঠান.ডক্টর দত্ত্্, সভামণ্ডপে গান…তোমরা সবাই ভাল…ফ্যাক্টরির সবাই যেন প্ৰাণপণে চেষ্টা করেছে তাকে খুশি করতে…রাশি রাশি গোলাপফুল…ঘরে সাজিয়ে রাখতে কী ভালই লাগে…দেবাশিসের ভাল লেগেছে.সে অমন মুখ টিপে হাসল কেন?…যেন হাসির আড়ালে কিছু মানে ছিল-ওঃ!
শুয়ে শুয়ে দীপার মুখ উত্তপ্ত হয়ে উঠল। সে মনের ভুলে দেবাশিসকে আড়ালে ‘তুমি বলে ফেলেছিল, তখন বুঝতে পারেনি। দেবাশিস তাই শুনে হেসেছিল।
দীপা বিছানা থেকে উঠে খোলা জানলার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সামনে দিয়ে ডাইনে বাঁয়ে রাস্তা চলে গেছে; রাস্তার ওপারের তিন চারটে বাড়ির সদর এই জানলা থেকে দেখা যায়। বাড়িগুলির আলো নিবে গেছে। রাস্তায় দুসারি আলো নিষ্পলক জ্বলছে। রাস্তা দিয়ে দু’একটি লোক কদাচিৎ চলে যাচ্ছে, পঁচিশ গজ দূর থেকে তাদের জুতোর খট্খটু শব্দ শোনা যাচ্ছে। আধ-ঘুমন্ত রাত্রি।
ভণ্ডামি করা, মিথ্যে অভিনয় করে মানুষকে ঠকানো, এসব দীপার প্রকৃতিবিরুদ্ধ। তবু ঘটনাচক্রে সে দেবাশিসের সঙ্গে লোক ঠকানোর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে পড়েছে। অবশ্য ষড়যন্ত্রকারীদের মধ্যে খানিকটা মানসিক ঘনিষ্ঠতা অনিবার্য। সেজন্য দেবাশিসের কোনো দোষ নেই; সে স্বভাব-ভদ্রলোক, তার প্রকৃতি মধুর। কিন্তু সান্নিধ্য যতাই ঘনিষ্ঠ হোক, দীপা তাকে ভালবাসে না, অন্য একজনকে ভালবাসে। কতকগুলো অভাবনীয় ঘটনা-সমাবেশের ফলে দীপা আর দেবাশিস একত্র নিক্ষিপ্ত হয়েছে। এ অবস্থায় দীপা যদি দেবাশিসের সঙ্গে সহজ সম্বন্ধে বাস করে তাতে দোষ কি? তাকে আড়ালে ‘তুমি বললে অন্যায় হবে কেন? কাউকে ‘তুমি বললেই কি তার সঙ্গে ভালবাসার সম্বন্ধ বোঝায়?
মনের অস্বস্তি অনেকটা কমলো। সে আবার গিয়ে বিছানায় শুল এবং অল্পক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ল। সে লক্ষ্য করেনি যে, যতক্ষণ সে জানলায় দাঁড়িয়ে ছিল ততক্ষণ একটি লোক রাস্তার ল্যাম্প-পোস্টে ঠেস দিয়ে একদৃষ্টি তার পানে তাকিয়ে ছিল। লক্ষ্য করলে এত সহজে ঘুম আসত না।
পরদিন সকালবেলা ওপরের বসবার ঘরে চা খেতে খেতে দেবাশিস বলল–’তুমি সারাদিন একলা থাকে, সময় কাটে কি করে?
দীপা চুপ করে রইল। সময় কাটবার তাই কাটে, সময়ের যদি দাঁড়িয়ে পড়বার উপায় থাকত তাহলে বোধহয় দীপার সময় দাঁড়িয়েই পড়ত।
দেবাশিস বলল–’তোমার বই পড়ার শখ নেই; বাড়িতে কিছু বই আছে কিন্তু সেগুলো বিজ্ঞানের বই। তুমি যদি চাও বইয়ের দোকান থেকে গল্প-উপন্যাসের বই এনে দিতে পারি। মাসিক সাপ্তাহিক কাগজের গ্রাহক হওয়া যায়।’
দীপা এবারও চুপ করে রইল। বই পড়তে সে ভালবাসে, ভাল লেখকের ভাল গল্প-উপন্যাস পেলে পড়ে, কিন্তু বই মুখে দিয়ে তো সারা দিন-রাত কাটে না।
‘কিংবা তোমাকে বইয়ের দোকানে নিয়ে যেতে পারি, তুমি নিজের পছন্দ মত বই কিনো।’ দীপা সংশয় জড়িত স্বরে বলল–’আচ্ছা।’
দেবাশিস বুঝল, বই সম্বন্ধে দীপার বেশি আগ্রহ নেই। তখন সে বলল—’তোমার বান্ধবীদের বাড়িতে ডাকো না কেন? তাদের সঙ্গে গল্প করেও দুদণ্ড সময় কাটবে।’
দীপা বলল–’আচ্ছা, ডাকব।’
চা শেষ করে দেবাশিস জানলার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। নীচে অনাদৃত বাগানের পানে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে ঘরের দিকে ফিরে বলল–’তুমি ফুল ভালবাস। বাগান করার শখ আছে কি?’
‘আছে।’ দীপা সাগ্রহে উঠে দাঁড়াল, এক পা এক পা করে দেবাশিসের কাছে এসে বলল-‘বাপের বাড়িতে ছাদের ওপর বাগান করেছিলুম, টবের বাগান।’
দেবাশিস হেসে বলল–’ব্যস, তবে আর কি, এখানে মাটিতে বাগান কর। বাবা মারা যাবার পর বাগানের যত্ন নেওয়া হয়নি। আমি আজই ব্যবস্থা করছি। আগে একটা মালী দরকার, তুমি একলা পারবে না।’
পরদিন মালী এল, গাড়ি গাড়ি সার এল, কোদাল খন্তা খুরপি গাছকটা কাঁচি এল, নাসরি থেকে মৌসুমী ফুলের বীজ, গোলাপের কলম, বারোমেসে গাছের চারা এল, ছোট ছোট সুপুরিগাছ এল। মহা আড়ম্বরে দীপার জীবনের উদ্যান পর্ব আরম্ভ হয়ে গেল।
তারপর কয়েকদিন প্রবল উত্তেজনার মধ্যে কাটল। প্রৌঢ় মালী পদ্মলোচন অতিশয় বিজ্ঞ ব্যক্তি, তার সঙ্গে পরামর্শ করে কোথায় মৌসুমী ফুলের বীজ পোঁতা হবে, কোথায় গোলাপের কলম বসবে, কীভাবে সুপুরি আর ঝাউ-এর সারি বসিয়ে বীথিপথ তৈরি হবে, দীপা তারই প্ল্যান করছে। ঘুমে জাগরণে বাগান ছাড়া তার অন্য চিস্তা নেই।
দেবাশিস নির্লিপ্তভাবে সব লক্ষ্য করে, কিন্তু দীপার কোনো কাজে হস্তক্ষেপ করে না, এমন কি তাকে বাগান সম্বন্ধে পরামর্শ দিতেও যায় না। দীপা যা করছে। কারুক, তার যাতে মন ভাল থাকে। তাই ভাল।
দিন কাটছে।
একদিন দুপুরবেলা দীপা রেডিওর মৃদু গুঞ্জন শুনতে শুনতে ভাবছিল, আরোকোরিয়া পাইন-এর চারাটি বাগানের কোন জায়গায় বসালে ভাল হয়, এমন সময় ঘরের কোণে টেলিফোন বেজে উঠল। দীপা চকিতে সেই দিকে চাইল, তারপরে উঠে গিয়ে ফোন তুলে নিল—’হ্যালো।‘
টেলিফোনে আওয়াজ এল–’আমি। গলা চিনতে পারছ?’
দীপার বুকের মধ্যে দু’বার ধকধক করে উঠল। সে যেন ধাক্কা খেয়ে স্বপ্নলোক থেকে বাস্তব জগতে ফিরে এল। একটু দম নিয়ে একটু হাঁপিয়ে বলল—’হ্যাঁ।’
‘খবর সব ভাল?’
‘হাঁ।’
‘কোনো গোলমাল হয়নি?’
‘না।‘
‘তোমার স্বামী মানুষটা কেমন?
‘মন্দ মানুষ নয়।’
‘তোমার ওপর জোর-জুলুম করছে না?
‘না।‘
‘একেবারেই না?’
‘না।‘
‘হুঁ। আরো কিছুদিন এইভাবে চালাতে হবে।’
‘আর কত দিন?’
‘সময়ে জানতে পারবে। আচ্ছা।’
ফোন রেখে দিয়ে দীপা আবার আরাম-চেয়ারে এসে বসল, পিছনে মাথা হেলান দিয়ে চোখ বুজে রইল। রেডিওর মৃদু গুঞ্জন চলছে। দুমিনিট আগে দীপা বাগানের কথা ভাবছিল, এখন মনে হল বাগানটা বহু দূরে চলে গেছে।
বিকেলবেলা আন্দাজ সাড়ে তিনটের সময় নীচে সদর দোরের ঘন্টি বেজে উঠল। দীপা চোখ খুলে উঠে বসল। কেউ এসেছে। দেবাশিস কি আজ তাড়াতাড়ি ফিরে এল? কিন্তু আজ তো শনিবার নয়–
দীপা উঠে গিয়ে সিঁড়ির মাথায় দাঁড়াল। নকুল দোর খুলছে। তারপরই মেয়েলি গলা শোনা গেল—’আমি দীপার বন্ধু, সে বাড়িতে আছে তো?
নকুল উত্তর দেবার আগেই দীপা ওপর থেকে ডাকল–’শুভ্রা, আয়, ওপরে চলে আয়।’
শুভ্ৰা ওপরে এসে সিঁড়ির মাথায় দীপকে জড়িয়ে ধরল, বলল—’সেই ফুলশয্যের রাত্রে তোকে সাজিয়ে দিয়ে গিয়েছিলুম। তারপর আসিনি, তোকে হনিমুন করবার সময় দিলুম। আজ ভাবলুম, দীপা আর কনে-বাউ নেই, এত দিনে পাকা গিনী হয়েছে, যাই দেখে আসি। হ্যাঁ ভাই, তোর বর বাড়িতে নেই তো?’
‘না। আয়, ঘরে আয়।’
শুভ্রা মেয়েটি দীপার চেয়ে বছর দেড়েকের বড়, বছরখানেক আগে বিয়ে হয়েছে। তার চেহারা গোলগাল, প্রকৃতি রঙ্গপ্রিয়, গান গাইতে পারে। প্রকৃতি বিপরীত বলেই হয়তো দীপার সঙ্গে তার মনের সান্নিধ্য বেশি।
বসবার ঘরে গিয়ে তারা পশ্চিমের খোলা জানলার সামনে দাঁড়াল। শুভ্ৰা দীপাকে ভাল করে দেখে নিয়ে মৃদু হাসল, বলল—‘বিয়ের জল গায়ে লাগেনি, বিয়ের আগে যেমন ছিলি এখনো তেমনি আছিস। কিন্তু গায়ে গয়না নেই কেন? হাতে দু’গাছি চুড়ি, কানে ফুল আর গলায় সরু হার; কনে-বউকে কি এতে মানায়।’
দীপা চোখ নামাল, তারপর আবার চোখ তুলে বলল—’তুই তো এখনই বললি আমি আর কনে-বউ নই।’
শুভ্ৰা বলল–’গয়না পরার জন্য তুই এখনও কনে-বাউ। কিন্তু আসল কথাটা কী? ‘আভরণ সৌতিনি মান’?’
‘সে আবার কি?’
‘তা জানিস না! কবি গোবিন্দদাস বলেছেন, সময়বিশেষে গয়না সতীন হয়ে দাঁড়ায়।’ এই বলে দীপার কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে গাইল–
‘সখি, কি ফল বেশ বনান
কানু পরশমণি পরাশক বাধন
আভরণ সৌতিনি মান।’
দীপার মুখের ওপর যেন এক মুঠো আবির ছড়িয়ে পড়ল। সে অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল–’যাঃ, তুই বড় ফাজিল।’
শুভ্ৰা খিলখিল করে হেসে বলল—’তুইও এবার ফাজিল হয়ে যাবি, আর গাম্ভীৰ্য চলবে না। বিয়ে হলেই মেয়েরা ফাজিল হয়ে যায়।’
দীপা কি উত্তর দেবে ভেবে পেল না। কিন্তু যেমন করে হোক সত্যি কথা লুকিয়ে রাখতে হবে, মিথ্যে কথা বলে শুভ্রার চোখে ধুলো দিতে হবে। শুভ্রা যেন জানতে না পারে।
দীপা আকাশ-পাতাল ভাবছে শুভ্রার ঠাট্টার কি উত্তর দেবে, এমন সময় দোরের কাছে থেকে নকুলের গলা এল—’বউদি, চা জলখাবার আনি?’
দীপা যেন বেঁচে গেল। বলল—’হ্যাঁ নকুল, নিয়ে এস।’
নকুল নেমে গেল। দীপা বলল—’আয় ভাই, বসি। তারপর হিমানী সুপ্রিয়া কেমন আছে বল। মনে হচ্ছে যেন কতদিন তাদের দেখিনি!’
শুভ্ৰা চেয়ারে বসে বলল—’হিমানী সুপ্রিয়ার কথা পরে বলব, আগে তুই নিজের কথা বল। বরের সঙ্গে কেমন ভাব হল?’
দীপা ঘাড় হেঁট করে অর্ধস্ফুট স্বরে বলল–’ভাল।’
শুভ্রা বলল—’তোর বরটি ভাই দেখতে বেশ। কিন্তু দেখতে ভাল হলেই মানুষ ভাল হয় না। মানুষটি কেমন?’
দীপাবলল–’ভাল।’
শুভ্ৰা বিরক্ত হয়ে বলল–’ভাল আর ভাল, কেবল এক কথা! তুই কি কোনো দিন মন খুলে কিছু বলবি না?’
‘বললুম তো, আর কি বলব?’
‘এইটুকু বললেই বলা হল? আমার যখন বিয়ে হয়েছিল। আমি ছুটে ছুটে আসতুম তোর কাছে, সব কথা না বললে প্রাণ ঠাণ্ডা হত না। আর তুই মুখ সেলাই করে বসে আছিস। গা জ্বলে যায়।’
দীপা তার হাত ধরে মিনতির স্বরে বলল–’রাগ করিাসনি ভাই! জানিস তো, আমি কথা বলতে গেলেই গলায় কথা আটকে যায়। মনে মনে বুঝে নে না। সবই তো জানিস।’
শুভ্রা বলল—’সবায়ের কি এক রকম হয়? তাই জানতে ইচ্ছে করে। যাক গে, তুই যখন বলবি না। তখন মনে মনেই বুঝে নেব। আচ্ছা, আজ উঠি, তোর বিয়ে পুরনো হোক তখন আবার একদিন আসব।’
দীপা কিন্তু শক্ত করে তার হাত ধরে রইল, বলল–’না, তুই রাগ করে চলে যেতে পাবি না।’
শুভ্রার রাগ অমনি পড়ে গেল, সে হেসে বলল–’তুই হদ্দ করলি। বরের কাছেও যদি এমনি মুখ বুজে থাকিস বর ভুল বুঝবে। ওরা ভুল-বোঝা মানুষ।’
নকল চায়ের ট্রে নিয়ে এল, সঙ্গে স্তুপাকৃতি প্যাসট্রি। দীপা চা ঢেলে শুভ্রাকে দিল, নিজে নিল; দু’জনে চা আর প্যাসট্রি খেতে খেতে সাধারণভাবে গল্প করতে লাগল। শাড়ি ব্লাউজ, গয়নার নতুন ফ্যাশন, সেন্ট স্নো পাউডার-এর দুমূল্যতা, এই সব নিয়ে গল্প। শুভ্ৰাই বেশি কথা বলল, দীপা সায় উত্তর দিল।
আধা ঘণ্টা পরে চা খাওয়া শেষ হলে নকুল এসে ট্রে তুলে নিয়ে গেল, দীপা তখন বলল–’শুভ্রা, তুই এবার একটা গান গা, অনেক দিন তোর গান শুনিনি।’
শুভ্রা বলল—’কেন, এই তো কানে কানে গান শুনলি। আর কী শুনিবি? মম যৌবননিকুঞ্জে গাহে পাখি, সখি জাগো?
‘না না, ওসব নয়। আধুনিক গান।’
‘আধুনিক গানের কথায় মনে পড়ল, পরশু গ্রামোফোনের দোকানে গিয়েছিলুম, প্রবাল গুপ্তর একটা নতুন রেকর্ড শুনলাম। ভারি সুন্দর গেয়েছে। রেকর্ডখানা কিনেছি। তুই শুনেছিস?
দীপা অলসভাবে বলল–’শুনেছি। রেডিওতে প্রায়ই বাজায়। সিনেমার গানের কোনো নতুন রেকর্ড বেরিয়েছে নাকি?’
শুভ্রা বলল—’শুনিনি। কিন্তু একটা নতুন ছবি বেরিয়েছে, ‘দীপ্তি’ সিনেমায় দেখাচ্ছে; ছবিটা নাকি খুব ভাল হয়েছে। সুজন হিরো, জোনাকি রায় হিরোইন।’
দীপা একটু নড়েচড়ে বসল, কিছু বলল না। শুভ্রা বলল–’দীপা, ঘরে বসে কি করবি, চল ছবি দেখে আসি। আমার সঙ্গে যদি ছবি দেখতে যাস, তোর বর নিশ্চয় রাগ করবে না।’ কব্জির ঘড়ি দেখে বলল—’সওয়া চারটে বেজেছে। তোর বির কাজ থেকে ফেরে। কখন?’
‘পাঁচটার সময়।’
‘তবে তো ঠিকই হয়েছে। তুই সেজেগুজে তৈরি হতে হতে তোর বর এসে পড়বে, তখন তাকে জানিয়ে আমরা ছবি দেখতে চলে যাব। আর তোর বর। যদি সঙ্গে যেতে চায় তাহলে তো আরো ভাল।’
দীপার ইচ্ছে হল শুভ্রার সঙ্গে ছবি দেখতে যায়। দেবাশিস কোনো আপত্তি তুলবে না। তাও সে জানে। তবু তার মনের একটা অংশ তার ইচ্ছাকে পিছন থেকে টেনে ধরে রইল, তাকে যেতে দেবে না। সে কাচুমাচু হয়ে বলল–’আজ থাক ভাই, আর একদিন যাব।’
শুভ্ৰা আরো কিছুক্ষণ পীড়াপীড়ি করল, কিন্তু দীপা রাজী হল না। শুভ্রা তখন বলল—’বুঝেছি, তুই বর-হাংলা হয়েছিস, বরকে ছেড়ে নড়তে পারিস না। বিয়ের পর কিছু দিন আমারও হয়েছিল।’ সে নিজের বর-হ্যাংলামির গল্প বলতে লাগল। তারপর হঠাৎ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল–’পাঁচটা বাজে, আমি পালাই, এখনই তোর বর এসে পড়বে। আমি থাকলে তোদের অসুবিধে হবে। আবার একদিন আসব।’ শুভ্ব হাসতে হাসতে চলে গেল।
তাকে সদর দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে দীপা ভাবতে লাগল, কি আশ্চর্য মনের কথা মুখ ফুটে না বললে কি কেউ বুঝতে পারে না! সবাই ভাবে, যা গতানুগতিক তাই সত্যি!
তারপর দিন কাটছে।
একদিন বেশ গরম পড়েছে। গুমোট গরম, বাতাস নেই; তাই মনে হয়। শীগগিরই ঝড়-বৃষ্টি নামবে। দেবাশিস বিকেলবেলা ফ্যাক্টরি থেকে ফিরে এসে দেখল, দীপা আর পদ্মলোচন দড়ি ধরে বাগান মাপজোক করছে। দেবাশিসকে দেখে দীপা দড়ি ফেলে তাড়াতাড়ি তার গাড়ির কাছে এল, বেশ উত্তেজিতভাবে বলল–’ঈস্টার লিলিতে কুঁড়ি ধরেছে। দেখবে?
দেবাশিস গাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে বলল–’তাই নাকি! কোথায় ঈস্টার লিলি?’
‘এস, দেখাচ্ছি।’
বাগানের এক ধারে দীপা আঙুল দেখাল। দেবাশিস দেখল, ভূমিলগ্ন ঝাড়ের মাঝখান থেকে ধ্বজার মত ডাঁটি বেরিয়েছে, তার মাথায় তিন-চারটি কুঁড়ির পতাকা। স্নিগ্ধ হেসে দেবাশিস দীপর পানে চাইল–’তোমার বাগানের প্রথম ফুল।’
হাসতে গিয়ে দীপা থেমে গেল। ‘তোমার বাগানের–’, বাগান কি দীপার? হঠাৎ তার মনটা বিকল হয়ে গেল, প্রথম মুকুলোদগম দেখে যে আনন্দ হয়েছিল তা নিবে গেল।
সন্ধ্যের পর নৃপতির আড্ডায় গিয়ে দেবাশিস দেখল আড্ডাধারীরা প্ৰায় সকলেই উপস্থিত, বেশ উত্তেজিতভাবে আলোচনা চলছে। তাকে দেখে সকলে কলরব করে উঠল–’ওহে, শুনেছি?’
সুজন থিয়েটারী পোজ দিয়ে বলল–’আবার শজারুর কাঁটা।’
নৃপতি বলল–’এস, বলছি। তুমি কাগজ পড় না, তাই জান না। মাসখানেক আগে একটা ভিখিরিকে কেউ শজারুর কাঁটা ফুটিয়ে মেরেছিল মনে আছে?
দেবাশিস বলল—’হ্যাঁ, মনে আছে।’
‘পরশু রাত্রে একটা মজুর লেকের ধারে বেঞ্চিতে শুয়ে ঘুমোচ্ছিল, তার হৃদযন্ত্রে শজারুর কাঁটা ঢুকিয়ে দিয়ে কেউ তাকে খুন করেছে।’
দেবাশিস বলল–’কে খুন করেছে, জানা যায়নি?’
নৃপতি একটু হেসে বলল–’না, পুলিস তদন্ত করছে।’
কপিল বলল—’পুলিস অনন্তকাল ধরে তদন্ত করলেও আসামী ধরা পড়বে না। অবশ্য স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে, ভিখিরি এবং মজুরের হত্যাকারী একই লোক। এ ছাড়া আর কেউ কিছু বুঝতে পেরেছ কি?’
খড়্গ বাহাদুর বলল—’দুটো খুনই আমাদের পাড়ায় হয়েছে, সুতরাং অনুমান করা যেতে পারে। যে হত্যাকারী আমাদের পাড়ার লোক।’
নৃপতি বলল–’তা নাও হতে পারে। হত্যাকারী হয়তো টালার লোক।’
এই সময় কফি এল। প্রবাল এতক্ষণ পিয়ানোর সামনে মুখ গোমড়া করে বসে ছিল, আলোচনার হল্লায় বাজাতে পারছিল না; এখন উঠে এসে এক পেয়ালা কফি তুলে নিল। কপিল তাকে প্রশ্ন করল–’কি হে মিঞা তানসেন, তোমার কি মনে হয়?’
প্রবাল কফির পেয়ালায় একবার ঠোঁট ঠেকিয়ে বলল–’আমার মনে হয় হত্যাকারী উম্মাদ এবং তোমরাও বদ্ধ পাগল!’
সবাই হইচই করে উঠল–’আমরা পাগল কেন?’
প্রবাল বলল—’তোমরা হয় পাগল নয়। ভণ্ড। একটা কুলিকে যদি কেউ খুন করে থাকে তোমাদের এত মাথাব্যথা কিসের? কুলির শোকে তোমাদের বুক ফেটে যাচ্ছে এই কথা বোঝাতে চাও?՚
অতঃপর তর্ক উদাম এবং উত্তাল হয়ে উঠল।
দেবাশিস তর্কাতর্কি বাগযুদ্ধ ভালবাসে না। সে কফি শেষ করে চুপিচুপি পালাবার চেষ্টায় ছিল, নৃপতি তা লক্ষ্য করে বলল–’কি হে দেবাশিস, চললে নাকি?’
দেবাশিস বলল—’হ্যাঁ, আজ যাই নৃপতিদা।’
‘নৃপতি বলল—’আচ্ছা, এস। সাবধানে পথ চলবে। দক্ষিণ কলকাতার পথেঘাটে এখন দলে দলে পাগল ঘুরে বেড়াচ্ছে।’
এক ধমক হাসির উচ্ছাসের সঙ্গে দেবাশিস বেরিয়ে এল। সে দু’চার পা চলেছে, এমন সময় শুনতে পেল দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে গোঁ গোঁ মড়মড় আওয়াজ আসছে। চকিতে আকাশের দিকে চোখ তুলে সে দেখল মেঘ ছুটে আসছে; গুমোট ফেটে ঝড় বেরিয়ে এসেছে। দেখতে দেখতে একঝাঁক জেট বিমানের মত ঝড় এসে পড়ল; বাতাসের প্রচণ্ড দাপটে চারদিক এলোমেলো হয়ে গেল।
দেবাশিস হাওয়ার ধাক্কায় টাল খেতে খেতে একবার ভাবল, ফিরে যাই, নৃপতিদার বাড়ি বরং কাছে; তারপর ভাবলা, ঝড় যখন উঠেছে তখন নিশ্চয় বৃষ্টি নামবে, কতক্ষণ ঝড়-বৃষ্টি চলবে ঠিক নেই; সুতরাং বাড়ির দিকে যাওয়াই ভাল, হয়তো বৃষ্টি নামার আগেই বাড়ি পৌঁছে যাব।
দেবাশিস ঝড়ের প্রতিকূলে মাথা ঝুকিয়ে চলতে লাগল। কিন্তু বেশি দূর চলতে হল না, বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল; বরফের মত ঠাণ্ডা জলের ঝাপটা তার সবঙ্গে ভিজিয়ে দিল।
বাড়িতে ফিরে দেবাশিস সটান ওপরে চলে গেল। দীপা নিজের ঘরে ছিল, বন্ধ জানলার কাচের ভিতর দিয়ে বৃষ্টি দেখছিল; দেবাশিস জোরে টোকা দিয়ে ঘরে ঢুকতেই সে ফিরে দাঁড়িয়ে দেবাশিসের সিক্ত মূর্তি দেখে সশঙ্ক নিশ্বাস টেনে চক্ষু বিস্ফারিত করল। দেবাশিস লজ্জিতভাবে ‘ভিজে গেছি বলে বাথরুমে ঢুকে পড়ল।
দশ মিনিট পরে শুকনো জামাকাপড় পরে সে বেরিয়ে এল, তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে দেখল, দীপা যেমন ছিল তেমনি দাঁড়িয়ে আছে। সে বলল—’নৃপতিবার বাড়ি থেকে বেরিয়েছি আর ঝড়-বৃষ্টি আরম্ভ হয়ে গেল। চল, খাবার সময় হয়েছে।’
পরদিন সকালে গায়ে দারুণ ব্যথা নিয়ে দেবাশিস ঘুম থেকে উঠল। বৃষ্টিতে ভেজার ফল, সন্দেহ নেই; হয়তো ইনফ্লুয়েঞ্জায় দাঁড়াবে। দেবাশিস ভাবল আজ আর কাজে যাবে না। কিন্তু সারা দিন বাড়িতে থাকলে বার বার দীপার সংস্পর্শে আসতে হবে, নিরর্থক কথা বলতে হবে; সে লক্ষ্য করেছে। রবিবারে দীপা যেন শঙ্কিত আড়ষ্ট হয়ে থাকে। কী দরকার? সে গায়ের ব্যথার কথা কাউকে বলল না, যথারীতি খাওয়া-দাওয়া করে ফ্যাক্টরি চলে গেল।
বিকেলবেলা সে গায়ে জ্বর নিয়ে বাড়ি ফিরল। জলখাবার খেতে বসে সে নকুলকে বলল–’নকুল, আমার একটু ঠাণ্ডা লেগেছে, রাত্তিরে ভাত খাবো না।’
নকুল বলল—’কাল রাত্তিরে যা ভেজাটা ভিজেছ, ঠাণ্ডা তো লাগবেই। তা ডাক্তারবাবুকে খবর দেব? ‘
দেবাশিস বলল—’আরে না না, তেমন কিছু নয়। গোটা দুই অ্যাসপিরিন খেলেই ঠিক হয়ে যাবে।’
রাত্রে সে খেতে নামল না। খাবার সময় হলে দীপা নীচে গিয়ে নকুলকে বলল–’নকুল, ওর খাবার তৈরি হয়ে থাকে তো আমাকে দাও, আমি নিয়ে যাই।’
নকুল একটা ট্রে-র উপর সুপের বাটি, টোস্ট এবং স্যালাড সাজিয়ে রাখছিল, বলল–’সে কি বউদি, তুমি দাদাবাবুর খাবার নিয়ে যাবে! আমি তাহলে রয়েছি কি কত্তে? নাও, চল।’
ট্রে নিয়ে নকুল আগে আগে চলল, তার পিছনে দীপা। দীপার মন ধুকপুক করছে। ওপরে উঠে নকুল যখন দীপার ঘরের দিকে চলল, সে তখন ক্ষীণ কুষ্ঠিত স্বরে বলল—‘ওদিকে নয় নকুল, এই ঘরে।’
নকুল ফিরে দাঁড়িয়ে দীপার পানে তীক্ষ্ণ চোখে চাইল, তারপর অন্য ঘরে গিয়ে দেখল দেবাশিস বিছানায় শুয়ে বই পড়ছে। নকুল খাটের পাশে গিয়ে সন্দেহভরা গলায় বলল—’তুমি এ ঘরে শুয়েছ যে, দাদাবাবু!’
ইনফ্লুয়েঞ্জা ধরেছে তাই আলাদা শুয়েছি। ছোঁয়াচে রোগ, শেষে দীপাকেও ধরবে।’
সন্তোষজনক কৈফিয়ত। দীপা নিশ্বাস ফেলে বাঁচল। নকুলও আর কিছু বলল না, কিন্তু তার চোখ সন্দিগ্ধ হয়ে রইল। সে যেন বুঝেছে, যেমনটি হওয়া উচিত ঠিক তেমনটি হচ্ছে না, কোথাও একটু গলদ রয়েছে।
ঘণ্টা তিনেক পরে দীপা নিজের ঘরে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল, দোরে ঠকঠক শব্দ শুনে তার ঘুম ভেঙে গেল। ঘুম-চোখে উঠে দোর খুলেই সে প্রায় অতিকে উঠল। দেবাশিস বিছানার চাদর গায়ে জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তার শরীর ঠকঠক করে কাঁপছে। সে জড়িয়ে জড়িয়ে বলল—’বুকে দারুণ ব্যথা, জ্বরও বেড়েছে…ডাক্তারকে খবর দিতে হবে।’ এই বলে সে টলতে টলতে নিজের ঘরে ফিরে গেল।
আকস্মিক বিপৎপাত মানুষের মন ক্ষণকালের জন্য অসাড় হয়ে যায়। তারপর সংবিৎ ফিরে আসে। দীপা স্বস্থ হয়ে ভাবল, ডাক্তার ডাকতে হবে; কিন্তু এ বাড়ির বাঁধা। ডাক্তার কে তা সে জানে না, তাঁকে ডাকতে হলে নকুলকে পাঠাতে হবে; তাতে অনেক দেরি হবে। তার চেয়ে যদি সোনকাকাকে ডাকা যায়–
দীপা ডাক্তার সুহৃৎ সেনকে টেলিফোন করল। ডাক্তার সেন দীপার বাপের বাড়ির পারিবারিক ডাক্তার।
একটি নিদ্ৰালু স্বর শোনা গেল-‘হ্যালো।’
দীপা বলল–’সোনকাকা! আমি দীপা।’
‘দীপা! কী ব্যাপার?’
‘আমি-আমার-? দীপা ঢোক গিলল—’আমার স্বামী হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, এখনই ডাক্তার চাই। আমি জানি না। এঁদের ডাক্তার কে, তাই আপনাকে ডাকছি। আপনি এক্ষুনি আসুন সেনকাকা।’
‘এক্ষুনি যাচ্ছি। কিন্তু অসুখের লক্ষণ কি?
‘বৃষ্টিতে ভিজে ঠাণ্ডা লেগেছিল–তারপর–’
‘আচ্ছা, আমি আসছি।’
‘বাড়ি চিনে আসতে পারবেন তো?’
‘খুব পারব! এই তো সেদিন তোমার বউভাতের নেমন্তন্ন খেয়েছি।’
মিনিট কুড়ির মধ্যে ডাক্তার সেন এলেন, ওপরে গিয়ে দেবাশিসের পরীক্ষা শুরু করলেন। দীপা দোরের চৌকাঠে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল।
প্রথমে কয়েকটা প্রশ্ন করে ডাক্তার রোগীর নাড়ি দেখলেন, টেম্পরেচার নিলেন, তারপর স্টেথস্কোপ কানে লাগিয়ে বুক পরীক্ষা করতে লাগলেন। পরীক্ষা করতে করতে তাঁর চোখ হঠাৎ বিস্ফারিত হল, তিনি বলে উঠলেন–’এ কি?’
দেবাশিস ক্লিষ্ট স্বরে বলল—’হ্যাঁ ডাক্তারবাবু্, আমার সবই উল্টে।’
দীপা সচকিত হয়ে উঠল, কিন্তু দেবাশিস আর কিছু বলল না। ডাক্তার কেবল ঘাড় নাড়লেন।
পরীক্ষা শেষ করে ডাক্তার বললেন–‘বুকে বেশ সর্দি জমেছে। আমি ইঞ্জেকশন দিচ্ছি, তাতেই কাজ হবে। আবার কাল সকালে আমি আসব, যদি দরকার মনে হয় তখন রীতিমত চিকিৎসা আরম্ভ করা যাবে।’
ইঞ্জেকশন দিয়ে দেবাশিসের মাথায় হাত বুলিয়ে ডাক্তার সস্নেহে বললেন–‘ভয়ের কিছু নেই, দু’ চার দিনের মধ্যেই সেরে উঠবে। আচ্ছা, আজ ঘুমিয়ে পড় বাবাজি, কাল ন’টার সময় আবার আমি আসব। তোমার বাড়ির ডাক্তারকেও খবর দিও।’
ডাক্তার ঘর থেকে বেরুলেন, দীপা তাঁর সঙ্গে সঙ্গে গেল। সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে ডাক্তার সেন দীপাকে বললেন–‘একটা বড় আশ্চর্য ব্যাপার দেখলাম–’
‘কি দেখলেন?’
ডাক্তার যা দেখেছেন দীপাকে বললেন।
দিন দশেকের মধ্যে দেবাশিস আবার চাঙ্গা হয়ে উঠল। এই দশটা দিন অসুখের সময় হলেও দেবাশিসের পক্ষে বড় সুখের সময়। দীপা ঘুরে ফিরে তার কাছে আসে, খাটের কিনারায় বসে তার সঙ্গে কথা বলে; তার খাবার সময় হলে নীচে গিয়ে নিজের হাতে খাবার নিয়ে আসে, নকুলকে আনতে দেয় না। রাত্রে ঘুম থেকে উঠে চুপিচুপি এসে তাকে দেখে যায়; আধ-জাগা আধ-ঘুমন্ত অবস্থায় দেবাশিস জানতে পারে।
একদিন, দেবাশিস তখন বেশ সেরে উঠেছে, বিকেলবেলা পিঠের নীচে বালিশ দিয়ে বিছানায় আধ-বসা হয়ে একটা বইয়ের পাতা ওল্টাচ্ছে, দীপা দুধ-কোকোর পেয়ালা নিয়ে ঘরে ঢুকল। দেবাশিস হেসে তার হাত থেকে পেয়ালা নিল, দীপা খাটের পায়ের দিকে গিয়ে বসল। বলল-‘দাদা ফোন করেছিল, সন্ধ্যের পর আসবে।’
দেবাশিস উত্তর দিল না, কোকোর কাপে ছোট ছোট চুমুক দিতে দিতে দীপার। পানে চেয়ে রইল। বলা বাহুল্য, গত দশ দিনে দীপার বাপের বাড়ি থেকে রোজই কেউ না কেউ এসে তত্ত্ব-তল্লাশ নিয়ে গেছে। দীপার মা গোড়ার দিকে দু’ রাত্রি এসে এখানে ছিলেন। কিন্তু দীপা তার মা’র। এখানে থাকা মনে মনে পছন্দ করেনি।
দেবাশিস কাপে চুমুক দিচ্ছে আর চেয়ে আছে, দীপা একটু অস্বস্তি বোধ করতে লাগল। একটা কিছু বলবার জন্যে সে বলল—‘বাগানে বোধ হয় আরো কিছু ক্রোটন দরকার হবে।’
এবারও দেবাশিস তার কথায় কান দিল না। খিন্ন-মধুর স্বরে বলল–’দীপা, তুমি আমাকে ভালবাস না, কিন্তু আমি তোমাকে ভালবেসে ফেলেছি।’
নির্মেঘ আকাশ থেকে বজ্বপাতের মত অপ্রত্যাশিত কথা। দীপার মুখ রাঙা হয়ে উঠল, তারপরই ফ্যাকাসে হয়ে গেল। সে দোরের দিকে পা বাড়িয়ে স্খলিত স্বরে বলল–’বোধ হয় মালী এসেছে, যাই, দেখি সে কি করছে।’
পিছন থেকে দেবাশিস ডাকলা–’দীপা, শোনো।’
দীপা দুরুদুরু বুকে ফিরে এসে দাঁড়াল। দেবাশিসের মুখের সেই খিন্না-করুণ ভাব আর নেই, সে খালি পেয়ালা দীপকে দিয়ে সহজ সুরে বল—’আমার কয়েকজন বন্ধুকে চায়ের নেমন্তন্ন করতে চাই। চার-পাঁচ জনের বেশি নয়।’
দীপা মস্ত একটা নিশ্বাস ফেলে বলল–’কবে?’
‘তাড়া নেই। আজ রবিবার, ধরো আসছে রবিবারে যদি করা যায়?’
‘আচ্ছা।’
‘বাজারের খাবার কিন্তু একটুও থাকবে না। সব খাবার তুমি আর নকুল তৈরি করবে।’
‘আচ্ছা।’
তারপর দিন কাটছে। দেবাশিস আবার ফ্যাক্টরি যেতে আরম্ভ করল। শনিবার সন্ধ্যায়। নৃপতির আড়ায় গেল। অনেক দিন পরে তাকে দেখে সবাই খুশি। এমন কি প্রবাল পিয়ানোয় বসে একটা হাল্কা হাসির গৎ বাজাতে লাগল। নৃপতি বলল–’একটু রোগা হয়ে গেছ।’
খড়্গ বাহাদুর বলল–’ভাই দেবু্, ঠেসে শিককাবাব খাও, দু’ দিনে ইয়া লাশ হয়ে যাবে।’
কপিল বলল–’খড়গ, তুই খাম! তুই তো দিনে দেড় কিলো শিককাবাব খাস, তবে গায়ে গত্তি লাগে না কেন?’
খড়্গ বলল–’আমি যে ফুটবল খেলি, যারা ফুটবল খেলে তারা কখনো মোটা হয় না। মোটা ফুটবল খেলোয়াড় দেখেছিস?’
সুজন বলল—’কুস্তিগীর পালোয়ানেরা কিন্তু মোটা হয়। শুনেছি তারা হরদম পেস্তা আর বেদোনর রস খায়।’
এই সময় বিজয়মাধব এল। দেবাশিসকে দেখে তার কাছে এসে বলল–’অসুখের পর এই প্রথম এলে, না?’
দেবাশিস বলল–’হ্যাঁ।’
‘এখন তাহলে একেবারে ঠিক হয়ে গেছে?’
‘হ্যাঁ।’
দেবাশিসের কাছে কথা বলার বিশেষ উৎসাহ না পেয়ে বিজয় বিরস মুখে তক্তপোশের ধারে গিয়ে বসল। দেবাশিস তখন সকলের দিকে চোখ ফিরিয়ে বলল–’তোমাদের চায়ের নেমন্তন্ন করতে এসেছি। কাল রবিবার সাড়ে পাঁচটার পর যখন ইচ্ছে আসবে। কেমন, কারুর অসুবিধে নেই তো?’
কারুর অসুবিধে নেই। সবাই সানন্দে রাজী। কেবল খড়্গ বাহাদুর বলল—’কাল আমার খেলা আছে। তবু আমি যত শীগগির পারি যাব। চায়ের সঙ্গে শিককাবাব খাওয়াবে তো?’
কপিল বলল—’তুই জ্বালালি। চায়ের সঙ্গে কেউ শিককাবাব খায়? শিককাবাবের অনুপান হচ্ছে বোতল।’
দেবাশিস প্রবালের দিকে চেয়ে বলল—’তুমি আসবে তো?’
প্রবাল বলল—’যাব। বড়মানুষের বাড়িতে নেমন্তন্ন আমি কখনো উপেক্ষা করি না। কিন্তু উপলক্ষটা কি? রোগমুক্তির উৎসব?
দেবাশিস বলল–’আমার বউয়ের হাতের তৈরি খাবার তোমাদের খাওয়াব। বিজয়, তুমিও a
‘যাব।’
পরদিন সন্ধ্যেবেলা দেবাশিসের বাড়িতে অতিথিরা একে একে এসে উপস্থিত হল। এমন কি খড়্গ বাহাদুরও ঠিক সময়ে এল, বলল–’খেলা হল না, ওয়াকওভার পেয়ে গেলাম।’
নীচের তলার বসবার ঘরে আড়া জমল। সকলে উপস্থিত হলে দেবাশিস এক ফাঁকে রান্নাঘরে গিয়ে দেখল, দীপা খাবারের প্লেট সাজাচ্ছে আর নকুল দুটো বড় বড় টি-পটে চা তৈরি করছে। দেবাশিস দীপাকে বলল-‘ওরা সবাই এসে গেছে। দশ মিনিট পরে চা জলখাবার নিয়ে তুমি আর নকুল যেও।’
‘আচ্ছা।’ দীপা জানত না। কারা নিমন্ত্রিত হয়েছে, তার মনে কোনো ঔৎসুক্য ছিল না। অস্পষ্টভাবে ভেবেছিল, হয়তো ফ্যাক্টরির সহকর্মী বন্ধু।
বসবার ঘরে আলোচনা শুরু হয়েছে, আজকের কাগজে নতুন শজারুর কাঁটা হত্যার খবর বেরিয়েছে তাই নিয়ে। এবার শিকার হয়েছে এক দোকানদার, গুণময় দাস। এবারও অকুস্থল দক্ষিণ কলকাতা।
আলোচনায় নতুনত্র বিশেষ নেই। হত্যাকারী হয় পাগল, নয়। পাকিস্তানী, নয়। চীনেম্যান। সুজন বলল–’একটা জিনিস লক্ষ্য করেছ? প্রথমে ভিখিরি, তারপর মজুর, তারপর দোকানদার। হত্যাকারী স্তরে স্তরে উঁচু দিকে উঠছে। এর পরের বারে কে শিকার হবে ভাবতে পার?’
প্রবাল গলার মধ্যে অবজ্ঞাসূচক শব্দ করল। কপিল বলল—’সম্ভবত নামজাদা ফুটবল খেলোয়াড়।’
খড়্গ বাহাদুর বলল—’কিংবা নামজাদা সিনেমা অ্যাক্টর।’
সুজন বলল–’কিংবা নাম-করা গাইয়ে।’
প্রবাল বলল-নাম-করা লোককেই মারবে এমন কী কথা আছে? পয়সাওয়ালা লোককেও মারতে পারে। যেমন নৃপতিদা কিংবা কপিল কিংবা-’
এই সময় দীপা খাবারের টুে হাতে দোরের সামনে এসে দাঁড়াল। প্রবালের কথা শেষ হল না, সবাই হাসিমুখে উঠে। দীপকে মহিলার সম্মান দেখাল। দীপা একবার ত্রাস-বিস্ফারিত চোখ সকলের দিকে ফেরাল, তার মুখ সাদা হয়ে গেল। প্রবল চেষ্টায় সে নিজের দেহটাকে সামনে চালিত করে টেবিলের ওপর খাবারের ট্রে রাখল।
কপিল মৃদু ঠাট্টার সুরে বলল—’নমস্কার, মিসেস ভট্ট।’
দীপা বোধ হয় শুনতে পেল না, সে ট্রে রেখেই পিছু ফিরল। তার পিছনে চায়ের সরঞ্জাম নিয়ে নকুল ছিল, তাকে পাশ কাটিয়ে দীপা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
দেবাশিস অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। সে আশা করেছিল, দীপা সকলকে চা ঢেলে দেবে, সকলেই বিয়ের আগে থেকে পরিচিত, তাদের সঙ্গে বসে কথাবার্তা বলবে, তাদের খাওয়ার তদারক করবে। কিন্তু দীপা কিছুই করল না। দেবাশিস নিজেই সকলকে চা ঢেলে দিল। ট্রের ওপর থেকে খাবারের প্লেট নামিয়ে তাদের সামনে রাখল। দীপা আজ নকুলের সাহায্যে অনেক রকম খাবার তৈরি করেছিল; চিংড়ি মাছের কাটলেট, হিঙের কচুরি, ডালের ঝালবড়া, রাঙালুর পুলি, জমাট ক্ষীরের বিরফি ইত্যাদি। অতিথিরা খেতে খেতে আবার তর্কবিতর্কে মশগুল হয়ে উঠল। দীপার ব্যবহারে সামান্য অস্বাভাবিকতা কেউ লক্ষ্যও করল। কিনা বলা যায় না।
আলোচনা যখন বেশ জমে উঠেছে তখন দেবাশিস অতিথিদের দৃষ্টি এড়িয়ে রান্নাঘরে গেল। দেখল, দীপা টেবিলের ওপর কনুই রেখে আঙুল দিয়ে দুই রাগ টিপে বসে আছে। দেবাশিস তার কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই সে হতাশ চোখ তুলে বলল-বিড় মাথা ধরেছে।’
দেবাশিসের মন মুহুর্তমধ্যে হাল্কা হয়ে গেল। সে সহানুভূতির সুরে বলল–’ও—আগুনের তাতে মাথা ধরেছে। তুমি আর এখানে থেকে না, নিজের ঘরে চলে যাও, মাথায় অডিকলোন দিয়ে শুয়ে থাকো গিয়ে। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে মাথা ধরা সেরে যাবে।’
দীপা উঠে দাঁড়িয়ে ক্ষীণস্বরে বলল—’আচ্ছা।’
দেবাশিস বসবার ঘরে ফিরে গিয়ে বলল–’দীপার খুব মাথা ধরেছে। আমি তাকে মাথায় অডিকেলন দিয়ে শুয়ে থাকতে বলেছি। আজ সারা দুপুর উনুনের সামনে বসে খাবার তৈরি করেছে।’
সকলেই সহানুভুতিসূচক শব্দ উচ্চারণ করল। বিজয় উঠে দাঁড়িয়ে বলল–’আমি যাই, দীপাকে একবার দেখে আসি।’
দেবাশিস বলল—’যাও-না, সোজা ওপরে চলে যাও।’
বিজয় দোতলায় গিয়ে এদিক-ওদিক তাকিয়ে দীপার শোবার ঘরের দোরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দীপা চোখ বুজে শুয়ে ছিল, সাড়া পেয়ে ঘাড় তুলে বিজয়কে দেখল, তারপর আবার বালিশে মাথা রেখে চোখ বুজল।
বিজয় খাটের পাশে এসে দাঁড়াল, কটমট করে দীপার পানে চেয়ে থেকে চাপা তর্জনে বলল–’আমার সঙ্গে চালাকি করিসনে, তোর মাথাধরার কারণ আমি বুঝেছি।’
দীপা উত্তর দিল না, চোখ বুজে পড়ে রইল। বিজয় তর্জনী তুলে বলল—’আজ যারা এসেছে তাদের মধ্যে একজনের সঙ্গে তোর ইয়ে—।’
দীপার কাছ থেকে সাড়াশব্দ নেই।
‘তার নাম কি, বল।’
দীপার মুখে কথা নেই, সে যেন কালা হয়ে গেছে।
‘বলবি না?’
এইবার দীপা ঝাঁকানি দিয়ে উঠে বসল, তীব্র দৃষ্টিতে বিজয়ের পানে চেয়ে বলল—’না, বলব না।’ এই বলে সে বিজয়ের দিকে পিছন ফিরে আবার শুয়ে পড়ল।
দাঁতে দাঁত চেপে বিজয় বলল-‘বলবিনে! আচ্ছা, আমিও দেখে নেব। যেদিন ধরব তাকে, চৌ-রাস্তার ওপর টেনে এনে জুতো পেটা করব।’
বিজয় নীচে নেমে গেল। ভাই-বোনের ঝগড়ার মূলে যথেষ্ট গুরুত্ব ছিল। কিন্তু ব্যাপারটা কেমন যেন হাস্যকর হয়ে দাঁড়াল–
তারপর আবার দিন কাটছে।
প্রত্যেক মানুষের দুটো চরিত্র থাকে; একটা তার দিনের বেলার চরিত্র, অন্যটা রাত্রির। বেরালের চোখের মত; দিনে একরকম, রাত্রে অন্যরকম।
এই কাহিনীতে যে ক’টি চরিত্র আছে তাদের মধ্যে পাঁচজনের নৈশ জীবন সম্বন্ধে অনুসন্ধান করা যেতে পারে। হয়তো অপ্রত্যাশিত নতুন তথ্য জানা যাবে।
একটি রাত্রির কথা :
সাড়ে দশটা বেজে গেছে। নৃপতি নৈশাহার শেষ করে নিজের শোবার ঘরে বিছানায় শুয়ে বই পড়ছিল। জোড়া-খাটের ওপর চওড়া বিছানা; তার বিবাহিত জীবনের খাট-বিছানা। এখন সে একাই শোয়। শুয়ে বই পড়ে, বই পড়তে পড়তে ঘুম এলে বই বন্ধ করে আলো নিবিয়ে দেয়।
আজ কিন্তু বই পড়তে পড়তে তার মন ছটফট করছে, পড়ায় মন বসছে না। প্ৰায় আধা ঘণ্টা বইয়ে মন বসাবার বৃথা চেষ্টা করে সে উঠে পড়ল, আলো নিবিয়ে জানলার নীচে আরাম-চেয়ারে এসে বসল। আকাশে চাঁদ আছে, বাইরে জ্যোৎস্নার প্লাবন। সে সিগারেট ধরাল।
আজ কোন তিথি? পূর্ণিমা নাকি? হগুপ্ত দুই আগে নৃপতি যখন গভীর রাত্রে বেরিয়েছিল তখন কৃষ্ণপক্ষ ছিল, বোধ হয় অমাবস্যা। মানুষের মনের সঙ্গে তিথির কি কোনো সম্পর্ক আছে? একাদশী অমাবস্যা পূর্ণিমাতে বাতের ব্যথা বাড়ে, একথা আধুনিক ডাক্তারেরাও স্বীকার করেন। নৃপতি গলার মধ্যে মৃদু হাসল। বাতের ব্যথাই বটে।
‘বাবু!’
নৃপতির খাস চাকর দীননাথ তার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। নৃপতি পাশের দিকে ঘাড় ফেরাল। দিনু বলল–’আপনার ঘুম আসছে না, এক কাপ ওভালটিন তৈরি করে দেব?
নৃপতি একটু ভেবে বলল-না, থাক। আমি বেরুবা, তুই শেষ রাত্রে দোর খুলে রাখিস।’
‘আচ্ছা, বাবু।’
দিনু প্রভুভক্ত চাকর; সে জানে নৃপতি মাঝে মাঝে নিশাভিসারে বেরোয়, কিন্তু কাউকে বলে না। বাড়ির অন্য চাকর-বাকর ঘৃণাক্ষরেও জানতে পারে না।
দিনু চলে যাবার পর নৃপতি উঠে আলো জ্বালল, ওয়ার্ডরোব থেকে এক সেট ধূসর রঙের বিলিতি পোশাক বের করে পরল, পায়ে রবার-সোল জুতো পরল; স্টিলের কাবার্ড থেকে একটা চশমার খাপের মত লম্বাটে পার্স নিয়ে বুকপকেটের ভিতর দিকে রাখল। তারপর ছফুট লম্বা আয়নায় নিজের চেহারা একবার দেখে নিয়ে আলো নিবিয়ে দিল। বাড়ির পিছন দিকে চাকরদের যাতায়াতের জন্যে ঘোরানো লোহার সিড়ি, সেই সিঁড়ি দিয়ে নিঃশব্দে নীচে নেমে গেল।
নৃপতি কোথায় যায়? সে বিপত্নীক, তার কি কোনো গুপ্ত প্রণয়িনী আছে?
আর একটি রাত্রির কথা :
গোল পার্ক থেকে যে কটা সরু রাস্তা বেরিয়েছে তারই একটা দিয়ে কিছুদূর গেলে একটা পুরনো দোতলা বাড়ি চোখে পড়ে; এই বাড়ির একতলায় গোটা তিনেক ঘর নিয়ে প্রবাল গুপ্ত থাকে। পুরনো বাড়ির পুরনো ভাড়াটে; ভাড়া কম দিতে হয়।
বাসাটি মন্দ নয়। কিন্তু প্রবালের প্রকৃতি একটু অগোছালো, তাই তার স্ত্রী মারা যাবার পর বাসাটি শ্ৰীহীন হয়ে পড়েছে। সদরের বসবার ঘরে মেঝের ওপর শতরঞ্জি পাতা। দেয়াল ঘেঁষে এক জোড়া বাঁয়োতবলা, হারমোনিয়াম এবং তাল রাখার একটা ছোট যন্ত্র। প্রবাল যে সঙ্গীতশিল্পী্্, বাসায় এ ছাড়া তার অন্য কোনো নিদর্শন নেই।
রাত্রি সাড়ে আটটার সময় প্রবাল সদর দরজা ভিতর থেকে বন্ধ করে হারমোনিয়াম নিয়ে বসেছিল। আজ সে নৃপতির আড্ডায় যায়নি। একটা গানে সুর লাগিয়ে তৈরি করছিল, আসছে হাপ্তায় দমদমে গিয়ে সেটা রেকর্ড করতে হবে। সে নিজেই গানে সুর দেয়; আজ গানটাকে ঠিক রেকর্ডের মাপে তৈরি করছিল। তিন মিনিট কুড়ি সেকেণ্ডের মধ্যে গান গেয়ে শেষ করতে হবে।
তালের যন্ত্রটাতে দম দিয়ে সে চালু করে দিল, যন্ত্রটা ঘড়ির দোলকের মত কটকটু শব্দ করে দুলতে লাগল। প্রবাল পকেট থেকে স্টপ-ওয়াচ বের করে হারমোনিয়ামের ওপর রাখল, তারপর স্টপ-ওয়াচের মাথা টিপে চালিয়ে দিয়ে মৃদুকণ্ঠে গাইতে আরম্ভ করল, তার আঙুল খুব লঘু স্পর্শে হরমোনিয়ামের চাবির ওপর খেলে বেড়াতে লাগল।
গান শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে সে স্টপ-ওয়াচ বন্ধ করল, দেখল তিন মিনিট একত্রিশ সেকেন্ড হয়েছে। সে তখন তালের যন্ত্রটাকে চাবি ঘুরিয়ে একটু দ্রুত করে দিয়ে আবার স্টপ-ওয়াচ ধরে গাইতে শুরু করল।
এইভাবে প্ৰায় আধা ঘণ্টা চলল। নিঃসঙ্গ গায়ক আপন মনে গেয়ে চলেছে।
দোরে খট্খট্ করে টোকা পড়ল। প্রবাল উঠে গিয়ে দোর খুলে দিল; একটা চাকর এক থালা অন্ন-ব্যঞ্জন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রবালের বাসায় রান্নাবান্নার কোনো ব্যবস্থা নেই; কাছেই একটা হোটেল আছে, সেখান থেকে দু’ বেলা তার খাবার দিয়ে যায়।
চাকরটি শতরঞ্জির এক কোণে থালা রেখে চলে গেল। প্রবাল দোর বন্ধ করে সেখানেই খেতে বসল। এমনিভাবে সে যেন দিনগত পাপক্ষয় করে চলেছে। হয়তো দূর ভবিষ্যতের ওপর দৃষ্টি রেখে সে চলেছে, তাই বর্তমান সম্বন্ধে তার মন সম্পূর্ণ উদাসীন।
নৈশাহার শেষ করে প্রবাল বাসায় তালা লাগিয়ে বেরুল। মোড়ের মাথায় একটা পানের দোকান আছে, সেখানে গিয়ে পান। কিনে মুখে দিল, একটা গোল্ড ফ্লেন্ক সিগারেট ধরাল। প্রবাল নিজের কাছে সিগারেট রাখে না, পাছে বেশি খাওয়া হয়ে যায়; প্রত্যহ রাত্রে দোকান থেকে একটি সিগারেট কিনে খায়। যারা পেশাদার গাইয়ে, গলা সম্বন্ধে তাদের সতর্কতার অন্ত নেই। বেশি। ধূমপান করলে নাকি গলা খারাপ হয়ে যায়।
পানের দোকানো একটি ছোট্ট ট্রানজিস্টার গুনগুন করে গান গেয়ে চলেছে। প্রবাল শুনল, তারই গাওয়া একটি গানের রেকর্ড বাজছে। সে ভুরু কুঁচকে কিছুক্ষণ নিজের গাওয়া গান শুনল, তারপর সিগারেট টানতে টানতে এগিয়ে চলল।
সাদার্ন অ্যাভেনু তখন জনবিরল হয়ে এসেছে। প্রবাল রবীন্দ্র সরোবরের রেলিং-এর ধার দিয়ে দক্ষিণ দিকে চলল। তার মগজের মধ্যে কখনও গানের কলি গুঞ্জন তুলছে..প্রেমের সাগর দুলে দুলে ওঠে সখি…। কখনও একটা ক্রুদ্ধ ভোমরা ঝঙ্কার দিয়ে উঠছে.দুনিয়ায় যার টাকা নেই সে কিসের লোভে বেঁচে থাকে?…
রবীন্দ্র সরোবরের রেলিং অনেক দূর এসে যেখানে পুব দিকে মোড় ঘুরেছে তার কাছাকাছি একটা খিড়কির ফটক আছে। প্রবাল সেই ফটক দিয়ে লেকের বেষ্টনীর মধ্যে প্রবেশ করল।
ঝিলিমিলি আবছা আলোয় কিছুদূর যাবার পর একটা গাছের তলায় শূন্য বেঞ্চি চোখে পড়ল। প্রবাল বেঞ্চিতে গিয়ে বসল, তারপর লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল। তার গলার মধ্যে অবরুদ্ধ হাসির মত শব্দ হল। …
সেরাত্রে প্রবাল যখন বাসায় ফিরল। তখন বারোটা বাজতে বেশি দেরি নেই। কলকাতা শহরের চোখ তন্দ্ৰায় ঢুলু ঢুলু।
আর একটি রাত্রির কথা :
খড়্গ বাহাদুর আজ আড্ডায় যায়নি; তার কারণ তার বাড়িতেই আজ আড্ডা বসবে। অবশ্য অন্যরকম আড্ডা; অতিথিরাও অন্য। এইরকম আডা মাসে দু’ তিন বার বসে।
খড়্গ বাহাদুর একটি ছোট ফ্ল্যাটে থাকে। ছোট হলেও ফ্ল্যাটটি তার পক্ষে যথেষ্ট। সে একলা থাকে, সঙ্গী একমাত্র স্বদেশী সেবক রতন সিং। রতন সিং একাধারে তাঁর ভৃত্য এবং পাচক, ভাল শিককাবাব তৈরি করতে পারে।
সামনের ঘরটি পরিপাটিভাবে সাজানো, দেখলেই বোঝা যায় অবস্থাপন্ন লোকের বাড়ি। মাঝখানে একটি তাঁস খেলার টেবিল ঘিরে গোটা চারেক গদি-মোড়া চেয়ার, মাথার ওপর একশো ওয়াটের দুটো বালব জ্বলছে। এই টেবিলের সামনে একলা বসে খড়্গ বাহাদুর এক প্যাক তাস নিয়ে ভাঁজিছিল। আরো দুটো নতুন তাসের সীল-করা প্যাক পাশে রাখা রয়েছে। খড়্গ বাহাদুর অলসভাবে তাস ভাঁজছিল, কিন্তু তার মুখের ভাব কড়া এবং রুক্ষ। নৃপতির আড্ডায় তার যেমন হাসিখুশি মিশুক ভাব দেখা যায়, বাড়িতে ঠিক তেমন নয়। বাড়িতে সে প্রভু। মধ্যযুগীয় প্রভু।
পৌঁনে আটটা বাজলে খড়্গ বাহাদুর ডাকল—’রতন সিং!’
রতন সিং রান্নাঘরে ছিল, বেরিয়ে এসে প্রভুর সামনে দাঁড়াল। বেঁটেখাটো মানুষ, খাঁটি নেপালী চেহারা; ভাবলেশহীন। তির্যক চোখে চেয়ে বলল—’জি।’
খড়্গ বাহাদুর বলল—’আটটার পরেই অতিথিরা আসবে। শিককাবাব কত দূর?
রতন সিং বলল–’জি, আধা তৈরি হয়েছে, আধা তৈরি হচ্ছে।’
খড়্গ বলল–’তিনজন অতিথি আসবে। তারা সকলে এলে প্রথম দফা শিককাবাব দিয়ে যাবে, এক ঘণ্টা পরে দ্বিতীয় দফা দেবে। যাও।’
রতন সিং-এর মুখ দেখে নিঃসংশয়ে কিছু বোঝা যায় না; তবু সন্দেহ হয়, মালিকের অতিথিদের সে পছন্দ করে না। সে রান্নাঘরে ফিরে গিয়ে আবার শিককাবাব রচনায় মন দিল। মালিক যা করেন। তাই অভ্রান্ত বলে মেনে নিতে হয়, কিন্তু জুয়া খেলে টাকা ওড়ানো ভাল কাজ নয়। দেশ থেকে প্রতিমাসে এক হাজার টাকা আসে, অথচ মাসের শেষে এক পয়সাও বাঁচে না।
বাইরের ঘরে তাস ভাঁজতে ভাঁজতে খড়্গ বাহাদুর ভাবছিল—আজ যদি হেরে যাই, রক্তদর্শন করব।
গত কয়েকবার সে ক্রমাগত হেরে আসছে।
আটটার সময় একে একে তিনটি অতিথি এল। তিনজনেই যুবক, সাজপোশাক দেখে বোঝা যায়, তিনজনেই বড়মানুষের ছেলে। একজন সিন্ধী, দ্বিতীয়টি পাঞ্জাবী, তৃতীয়টি পার্সী।
সংক্ষিপ্ত সম্ভাষণের পর সকলে টেবিল ঘিরে বসল। রতন সিং চারটি প্লেটে প্রায় সেরখানেক শিককাবাব এনে রাখল; সঙ্গে রাই-বাটা এবং ছুরি-কাঁটা।
কথাবার্তা বেশি হল না, চারজন প্লেট টেনে নিয়ে ছুরি-কাঁটার সাহায্যে খেতে আরম্ভ করল। রতন সিং-এর শিককাবাব অতি উপাদেয়। অল্পক্ষণের মধ্যেই চারটি প্লেট শূন্য হয়ে গেল। সকলে রুমালে মুখ মুছে সিগারেট ধরাল। পাসী যুবকও সিগারেট খায়, আধুনিক যুবকেরা ধর্মের নিষেধ মানে না।
তারপর সাড়ে আটটার সময় তাসের নতুন প্যাক খুলে খেলা আরম্ভ হল। তিন তাসের খেলা, জোকার নেই। নিম্নতম বাজি পাঁচ টাকা, ঊর্ধ্বতম বাজি কুড়ি টাকা।
চারজনই পাকা খেলোয়াড়। কিন্তু রানিং ফ্লাশ খেলায় ক্রীড়ানৈপুণ্যের বিশেষ অবকাশ নেই, ভাগ্যই বলবান। কদাচিৎ ব্লাফ দিয়ে দু’এক দান জেতা যায়। আসলে হাতের জোরের ওপরেই খেলার হার-জিত।
সাড়ে দশটার সময় আর এক দফা শিককাবাব এল। এবার মাত্ৰা কিছু কম। সঙ্গে কফি। পনেরো মিনিটের মধ্যে খাওয়া শেষ করে আবার নতুন তাসের প্যাক খুলে খেলা আরম্ভ হল।
খেলা শেষ হল রাত্রি সাড়ে বারোটার সময়। হিসেবনিকেশ করে দেখা গেল, অতিথিরা তিনজনেই জিতেছে, খড়্গ বাহাদুর হেরেছে প্রায় সাত শো টাকা!
অতিথিরা হাসিমুখে সহানুভূতি জানিয়ে চলে গেল! খড়্গ বাহাদুর অন্ধকার মুখে অনেকক্ষণ একলা টেবিলের সামনে বসে রইল, তারপর হঠাৎ উঠে শোবার ঘরে গেল। বেশ পরিবর্তন করে মাথায় একটা কাউ-বয় টুপি পরে বেরিয়ে এল। রতন সিংকে বলল—’আমি বেরুচ্ছি। যতক্ষণ না ফিরি, তুমি দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে জেগে থাকবে।’
রতন সিং বলল–’জি।’
খড়্গ বাহাদুর বেরিয়ে গেল। রতন সিং-এর মঙ্গোলীয় মুখ নির্বিকার রইল বটে, কিন্তু তার ছোট ছোট চোখ দু’টি উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল। মালিক আজও হেরেছেন। তাঁস খেলায় হেরে মালিক কোথায় যান? ফিরে আসেন। সেই শেষ রাত্রে। কখনও আটটার আগেই বেরিয়ে যান, ফিরতে রাত হয়। কোথায় থাকেন? রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ান? কিংবা—
আর একটি রাত্রির কথা :
কপিলের বাড়িতে নৈশ আহার শেষ হয়েছিল। কর্তা নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়েছিলেন, কপিলের ছোট দুই ভাইবোনও নিজের নিজের ঘরে চলে গিয়েছিল। ড্রয়িংরুমে এসে বসেছিল কপিল, তার দাদা আর বউদিদি এবং তার দিদি ও জামাইবাবু। কর্তা বিপত্নীক, পুত্রবধূই বাড়ির গিন্নি। মেয়ে-জামাই দাৰ্জিলিঙে থাকে, জামাইয়ের চায়ের বাগান আছে; আজ সকালে কয়েক দিনের জন্যে তারা কলকাতায় এসেছে।
কপিলদের বাড়িটা তিনতলা। নীচের তলায় একটা বড় ব্যাঙ্কের শাখা, উপরের দু’টি তলায় কপিলেরা থাকে। সবার উপরে প্রশস্ত খোলা ছাদ।
ড্রয়িং রুমে যাঁরা সমবেত হয়েছেন তাঁদের মধ্যে কপিলের দাদা গৌতমদেব বয়সে বড়। পৈতৃক সলিসিটার অফিসের তিনি এখন কতা। অত্যন্ত নির্লিপ্ত প্রকৃতির লোক; বাড়িতে কারুর সাতে-পাঁচে থাকেন না। তাঁর স্ত্রী রমলার প্রকৃতি কিন্তু অন্যরকম। তার বয়স ত্ৰিশের বেশি নয়, কিন্তু সে বুদ্ধিমতী, গৃহকর্মে নিপুণা, সংসারের কোনো ব্যাপারেই নির্লিপ্ত নয়। উপরন্তু তার বুদ্ধিতে একটু অন্নারস মেশানো আছে, যার ফলে সকলেই তার কাছে একটু সতর্ক হয়ে থাকে।
কপিলের দিদি অশোকার বয়সও আন্দাজ ত্রিশ। তার সাত বছরের একটিমাত্র ছেলে স্কুলের বোর্ডি-এ থাকে। অশোকার চরিত্র সম্বন্ধে এইটুকু বললেই যথেষ্ট হবে যে, সে বড়মানুষের মেয়ে, বড়মানুষের বউ। পৃথিবীর অধিকাংশ জীবকেই সে করুণার চক্ষে দেখে, কারুর সঙ্গে বেশি কথাবার্তা বলে না। তার স্বামী শৈলেনবাবু কিন্তু মজলিসী লোক; আসার জমিয়ে গল্প করতে ভালবাসেন, তর্ক করার দিকে ঝোঁক আছে এবং সুযোগ পেলে অযাচিত উপদেশও দিয়ে থাকেন।
তিনি প্রকাণ্ড জিজ্ঞাসা-চিহ্নের মত একটি পাইপের মুণ্ড মুঠিতে ধরে ধূমপান করছেন। গৌতমদেব একটি মোটা সিগারেট ধরিয়েছেন। কপিলের নাকে তামাকের সুগন্ধ ধোঁয়া আসছে; কিন্তু সে গুরুজনদের সামনে ধূমপান করে না, তাই নীরবে বসে উসখুসি করছে। বাড়ির নিয়ম, নৈশাহারের পর সকলে অন্তত পনেরো মিনিটের জন্যে একত্র হবে। আগে কিতাও এসে বসতেন; এখন তাঁর বয়স বেড়েছে, খাওয়ার পরই শুয়ে পড়েন। বাড়ির অন্য সকলের জন্য কিন্তু নিয়ম জারি আছে।
জামাই শৈলেনবাবু পাইপের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে ধোঁয়ার ভিতর দিয়ে কপিলকে নিরীক্ষণ করছিলেন, গম্ভীর মুখে প্রশ্ন করলেন–‘কপিল, তুমি কি নাম-মাহান্ত্র্যে সাধু সন্নিসি হয়ে যাবার মতলব করেছ?’
কপিল সমান গাম্ভীর্যের সঙ্গে উত্তর দিলে–’আপাতত সে রকম কোনো মতলব নেই।’
শৈলেনবাবু্, বললেন—’তবে বিয়ে করছ না কেন? সংসার-ধর্ম করতে গেলে বিয়ে করা দরকার। তোমার বিয়ে করার উপযোগী বুদ্ধি না থাকতে পারে। কিন্তু বয়স তো হয়েছে।’
কপিল ভ্রূ একটু তুলে বলল–’বিয়ে করার জন্যে কি খুব বেশি বুদ্ধি দরকার?’
রমলা হেসে উঠল। কপিল ও শৈলেনবাবুর মধ্যে গভীর্য ঢাকা গৃঢ় পরিহাসের সঙ্গে বাড়ির সকলেই পরিচিত। রমলা বলল–’বিয়ে করার জন্যে যদি বেশি বুদ্ধির দরকার হত তাহলে বাংলাদেশে কারুর বিয়ে হত না। আসলে ঠিক উলটো। ঠাকুরপোর বড় বেশি বুদ্ধি, তাই বিয়ে হচ্ছে না।’
‘তাই নাকি!’ শৈলেনবাবু অবিশ্বাস-ভরা চক্ষু বিস্ফারিত করে কপিলের পানে চাইলেন—’এত বুদ্ধি কপিলের! কিন্তু আর একটু পরিষ্কার করে না বললে কথাটা হৃদয়ঙ্গম হচ্ছে না।’
রমলা বলল–’ওকেই জিজ্ঞেস করুন না। আমাদের চেষ্টার ত্রুটি নেই, তবুও বিয়ে করে না। কেন?’
শৈলেনবাবু প্রতিধ্বনি করলেন–’কেন?’
কপিল পকেটে হাত দিল, সিগারেটের কেস হাতে ঠেকাল, কেসটা অজ্ঞাতসারে বার করে আবার সে পকেটে রেখে দিল।
গৌতমদেব উঠে পড়লেন—’আমি উঠলাম, কাল ভোরেই আবার আমাকে–’ কথা অসমাপ্ত রেখে তিনি প্রস্থান করলেন। নিজের উপস্থিতি দ্বারা কারুর অসুবিধা ঘটাতে তিনি চান না।
কপিল জামাইবাবুকে লক্ষ্য করে বলল–’বিয়ে করা একটা সিরিয়াস কাজ এ কথা। আপনি মানেন?’
শৈলেনবাবু নিজের গৃহিণীর প্রতি অপোঙ্গ দৃষ্টিপাত করে বললেন—’মানি বইকি। খুব সিরিয়াস কাজ।’
অশোকা সূক্ষ্ম হাস্যরস বোঝে না, কিন্তু খোঁচা দিয়ে কথা বললে যত সূক্ষ্ম খোঁচাই হোক ঠিক বুঝতে পারে। সে স্বামীর দিকে বিরক্তিসূচক কটাক্ষ হেনে বলল–’আমি শুতে চললুম। বাজে কথার কাচকচি শুনতে ভাল লাগে না।’
অশোকা চলে যাবার পর কপিল পকেট থেকে সিগারেট বার করে রমলাকে বলল–’বিউদি, সিগারেট খেতে পারি।’
রমলা বলল–’আহা, ন্যাকামি দেখে বাঁচি না। আমার সামনে যেন সিগারেট খাও না!’
কপিল বলল—’খাই, কিন্তু অনুমতি নিয়ে খাই।’
রমলা বলল–’আচ্ছা, অনুমতি দিলুম, খাও।’
কপিল সিগারেট ধরাল। তারপর শালা-ভগিনীপতির তর্ক আবার আরম্ভ হয়ে গেল। রমলা ঠোঁটের কোণে কৌতুক-হাসি নিয়ে শুনতে লাগল।
কপিল বলল–’বিয়ে করা যখন সিরিয়াস ব্যাপার তখন খুব বিবেচনা করে বিয়ে করা উচিত।’
শৈলেনবাবু বললেন—’অবশ্য, অবশ্য। কিন্তু কী বিবেচনা করবে?’
‘বিবেচনা করতে হবে, আমি কি চাই।’
‘কী চাও তুমি? রূপ? গুণ? বিদ্যা? বুদ্ধি?’
‘রূপ গুণ বিদ্যা বুদ্ধি থাকে ভাল, না থাকলেও আপত্তি নেই। আসলে চাই-মিনের মিল।’
‘হুঁ, মনের মিল। কিন্তু বিয়ে না হলে বুঝবে কি করে মনের মিল হবে কিনা।’
‘ওইখানেই তো সমস্যা। তবে আজকাল স্ত্রী-স্বাধীনতার যুগে মেয়েদের মন বুঝতে বেশি দেরি হয় না।’
রমলা বলল—’তুমি তাহলে মেয়েদের মন বুঝে নিয়েছ?’
কপিল বলল—’তা বুঝে নিয়েছি। কিন্তু বুঝলেই যে পছন্দ হবে তার কোনো মানে নেই।’
রমলা বলল–’তা তো দেখতেই পাচ্ছি।’
শৈলেনবাবু বললেন–তাহলে যতদিন মনের মত মন না পাওয়া যাচ্ছে ততদিন অনুসন্ধান চলবে?’
কপিল মুচকি হাসল, উত্তর দিল না।
শৈলেনবাবু সন্দিগ্ধস্বরে বললেন—’আসল কথাটা কি? ডুবে ডুবে জল খোচ্ছ না তো?’
‘তার মানে?’
‘মানে কোনো সধবা কিংবা বিধবা যুবতীর প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়নি তো?’
কপিল চকিত চোখে চাইল, তারপর উচ্চকণ্ঠে হেসে উঠল, বলল–’বউদি, জামাইবাবুর মাথা গরম হয়েছে। ঠাণ্ডা দেশ থেকে গরম দেশে এসেছেন, হবারই কথা। তুমি ওঁর জন্যে আইস-ব্যাগের ব্যবস্থা কর, আমি শুতে চললাম।’
হাসি-মস্করার মধ্যে রাত্রির মত সভা ভঙ্গ হল। কপিল নিজের ঘরে গিয়ে দোর বন্ধ করল।
কপিলের ঘরটি বেশ বড়, লম্বাটে ধরনের। এক পাশে খাট-বিছানা, অন্য পাশে টেবিল-চেয়ার। কাচে ঢাকা টেবিলের ওপর কাচের নীচে আকাশের একটি মানচিত্র; নীল জমির ওপর সাদা নক্ষত্রপুঞ্জ ফুটে আছে। কপিল রাত্রিবাস পরল, টিলা পা-জামা আর হাত-কটা ফতুয়া। তারপর একটা বই নিয়ে টেবিলের সামনে পড়তে বসল।
ইংরেজি গণিত জ্যোতিষের বই, লেখকের নাম ফ্রেড় হয়েল। পড়তে পড়তে কপিল ঘড়ি দেখছে, আবার পড়ছে। বিশ্ব-রহস্য উদঘাটক জ্যোতিষগ্রন্থের প্রতি তার গভীর অনুরাগ; কিন্তু আজ তার মন ঠিক বইয়ের মধ্যে নেই, যেন সে সময় কাটাবার জন্যেই বই পড়ছে।
কন্ডিজর ঘড়িতে সাড়ে এগারোটা বাজল। কপিল বই বন্ধ করে উঠল, দেয়ালের একটা আলমারির কপাট খুলে একটি দূরবীন যন্ত্র বার করল। যন্ত্রটি আকারে দীর্ঘ নয়, কিন্তু তিন পায়ার ওপর ক্যামেরার মত দাঁড় করানো যায়, আবার ইচ্ছামত পায়া গুটিয়ে নেওয়া যায়। কপিল দূরবীনটি বগলে নিয়ে ঘরের আলো নেবালো, তারপর সন্তৰ্পণে বাইরে এল।
ঘর থেকে বেরিয়ে কয়েক পা গেলেই ছাদে ওঠবার সিঁড়ি। কপিল পা টিপে টিপে সিঁড়ির গোড়া পর্যন্ত গিয়েছে এমন সময় সামনের একটা দরজা খুলে রমলা বেরিয়ে এল। তার মুখে খরশান ব্যঙ্গের হাসি। কপিল তাকে দেখে থতমত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। রমলা বলল–’কী ঠাকুরপো, এত রাত্রে দূরবীন নিয়ে কোথায় চলেছ?’
কপিল চাপা গলায় বলল—’আস্তে বউদি, বাবার ঘুম ভেঙে যাবে।’
রমলা গলা নীচু করল–’তোমার মতলব ভাল ঠেকছে না ঠাকুরপো।’
কপিল বলল–’কি মুশকিল। আমি তো প্রায়ই আকাশের তারা দেখবার জন্যে ছাদে উঠি। তুমি জান না?’
রমলা বলল—’জানি। কিন্তু সে তো সন্ধ্যের পর। আজ রাত দুপুরে কোন তারা দেখবে বলে ছাদে উঠিছ?’
কপিল বলল–’আজ রাত্রি পৌঁনে বারোটার সময় মঙ্গলগ্রহ ঠিক মাথার ওপর উঠবে। মঙ্গলগ্রহ এখন পৃথিবীর খুব কাছে এসেছে, তাই তাকে ভাল করে দেখবার জন্যে ছাদে যাচ্ছি।’
রমলা মুখ গভীর করে বলল—’হঁ, মঙ্গলগ্রহ। কোন গ্রহ-তারা তোমার ঘাড়ে চেপেছে তুমিই জান। কিন্তু একটা কথা বলে দিচ্ছি, আমাদের বাড়ির চার পাশে যাদের বাড়ি তারা গরমের সময় জানলা খুলে শুয়েছে, তুমি যেন তাদের জানলা দিয়ে গ্রহ-তারা দেখতে যেও না।’
কপিল মুখের ওপর হাত চাপা দিয়ে হাসল, বলল–’বউদি, তোমার মনটা ভারি সন্দিগ্ধ। কিন্তু একটা কথা জিজ্ঞেস করি, তুমি এত রাত্রি পর্যন্ত ঘুমোওনি কেন?’
রমলা বলল–’তোমার দাদা বিছানায় শুয়ে আইনের বই পড়ছেন, হঠাৎ তাঁর কফি খাবার শখ হল। তাই কফি তৈরি করতে চলেছি। তুমি খাবে?
‘আমার সময় নেই।’ কপিল চুপি চুপি সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে গেল।
হয়তো মঙ্গলগ্রহই দেখবে।
আর একটি রাত্রির কথা :
সিনেমার শিল্পক্ষেত্রে যারা কাজ করে তারা সাধারণত দল বেঁধে থাকে, নিজেদের শিল্পীগোষ্ঠী নিয়ে একটা সমাজ তৈরি করে নিয়েছে, বাইরের লোকের সঙ্গে বড় একটা সম্পর্ক রাখে না। সুজন মিত্র কিন্তু দলে থেকেও ঠিক দলের পাখি নয়। যতক্ষণ সে স্টুডিওর সীমানার মধ্যে থাকে ততক্ষণ সকল শ্রেণীর সহকর্মী ও সহকর্মিণীর সঙ্গে অবাধে মেলামেশা করে। তরুণী অভিনেত্রীদের মধ্যে অনেকেই এই সুদৰ্শন নবেদিত অভিনেতাটির প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল, কিন্তু সুজন কারুর কাছে ধরা দেয়নি। পাঁকাল মাছের মত হাত পিছলে বেরিয়ে যাবার কৌশল তার জানা ছিল।
সিনেমার গণ্ডীর বাইরে তার প্রধান বন্ধুগোষ্ঠী ছিল নৃপতির আড়ার ছেলেরা; এখানে এসে সে যেন সমভূমিতে পদার্পণ করত। তার বংশপরিচয় কেউ জানে না, তার জ্ঞাতিগোষ্ঠী কেউ আছে কিনা সে পরিচয়ও কেউ কোনো দিন পায়নি, কিন্তু তার বন্ধু-নিবাঁচন থেকে অনুমান করা যায় যে তার বংশপরিচয় যেমনই হোক, সে নিজে উচ্চ-মধ্যম ত্ৰৈণীর শিক্ষিত মার্জিত চরিত্রের মানুষ।
একদিন স্টুডিওতে তার শুটিং ছিল, কাজ শেষ হতে সন্ধ্যে পেরিয়ে গেল। তারপর নিজের ঘরে গিয়ে মুখের রঙ পরিষ্কার করে বেরুতে আরো ঘণ্টাখানেক কাটল। সুজনের একটি ছোট মোটর আছে, তাইতে চড়ে সে যখন স্টুডিও থেকে বেরুল তখন রাত্রি হয়ে গেছে।
মাইল দেড়েক চলাবার পর মোটর একটি হোটেলের সামনে এসে থামল। সুজন হোটেলেই। খায়। তার বাসায় রান্নার আয়োজন নেই। কিন্তু রোজ একই হোটেলে খায় না। যখন যা খাবার ইচ্ছে হয় তখন সেই রকম হোটেলে যায়, কখনো বা মিষ্টান্নের দোকানে গিয়ে দই-সন্দেশ খেয়ে পেট ভরায়। যেদিন শুটিং থাকে সেদিন দুপুরে স্টুডিওর ক্যান্টিনে খায়।
হোটেলের পাশে গাড়ি পার্ক করে সে যখন হোটেলে ঢুকাল তখন তার নাকের নীচে একজোড়া শৌখিন গোঁফ শোভা পাচ্ছে। গোঁফ জোড়া অকৃত্রিম নয়, সুজন কোনো প্রকাশ্য স্থানে গেলেই মুখে গোঁফ লাগিয়ে ছদ্মবেশ পরিধান করে। তার মুখখানা সিনেমার প্রসাদে জনসাধারণের খুবই পরিচিত, তাকে সশরীরে দেখলে সিনেমা-পাগল লোকেরা বিরক্ত করবে। এই আশঙ্কাতেই হয়তো সে গোঁফের আড়ালে স্বরূপ লুকিয়ে রাখে।
হোটেলে আহার শেষ করে সুজন মোটর চালিয়ে নিজের বাসার দিকে চলল। বাসাটি পাড়ার এক প্রান্তে একটি সরু রাস্তার ওপর; ছোট বাড়ি কিন্তু গাড়ি রাখার আস্তাবল আছে।
গ্যারেজে গাড়ি রেখে সুজন চাবি দিয়ে দরজা খুলে বাড়িতে ঢুকল, ভিতর থেকে দরজা বন্ধ করে শোবার ঘরে গিয়ে আলো জ্বালল। একসঙ্গে গোটা তিনেক দ্যুতিমান বালব জ্বলে উঠল।
চৌকশ ঘরটি বেশ বড়। তাতে খাট-বিছানা আছে, টেবিল-চেয়ার আলমারি আছে, এমন কি স্টেভি, চায়ের সরঞ্জাম প্রভৃতিও আছে। মনে হয়, সুজন এই একটি ঘরের মধ্যে তার একক জীবনযাত্রার সমস্ত উপকরণ সঞ্চয় করে রেখেছে।
একটি লম্বা আরাম-কেদারায় অঙ্গ ছড়িয়ে দিয়ে সে পকেট থেকে সিগারেট বার করল, সিগারেট ধরিয়ে পিছনে মাথা হেলিয়ে দিয়ে উজ্জ্বল একটা বালবের দিকে দৃষ্টি রেখে মৃদ-মন্দ টান দিতে লাগল। এখন আর তার মুখে গোঁফ নেই, নগ্ন মুখখান ছুরির মত ধরাল।
সিগারেট শেষ করে সুজন কব্জির ঘড়ি দেখল-নাটা বেজে কুড়ি মিনিট। সে উঠে ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল; সাড়ে ছফুট উঁচু আয়নায় তার পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। সে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে নিজের দেহ মুখ পরীক্ষা করল; একবার হাসল, একবার ভ্রূকুটি করল, তারপর আড়মোড়া ভেঙে আলমারির কাছে গেল।
আলমারি থেকে সে দু’টি জিনিস বার করল; একটি হুইস্কির বোতল এবং বড় চৌকো। আকারের একটি পুরু। লাল কাগজের খাম। প্রথমে সে গেলাসে ছোট পেগ মাপের হুইস্কি ঢেলে তাতে জল মেশালো, তারপর গেলাস আর খাম নিয়ে আবার চেয়ারে এসে বসল। গেলাসে ছোট একটি চুমুক দিয়ে চেয়ারের হাতার ওপর রেখে আগফার খাম থেকে একটি ফটো বার করল।
ক্যাবিনেট আয়তনের ফটো, একটি যুবতীর আ-কটি প্রতিকৃতি, যুবতী হাসি-হাসি মুখে দর্শকের পানে চেয়ে আছে। মনে হয়, সে সিনেমার অভিনেত্রী নয়, মুখে বা দেহভঙ্গীতে কৃত্রিমতা নেই। কিন্তু সে কুমারী কি বিবাহিতা, ফটো থেকে বোঝা যায় না।
সুজন থেকে থেকে গেলাসে চুমুক দিতে দিতে ছবিটি দেখতে লাগল। চোখে তার প্রগাঢ় তন্ময়ত, পলকের তরেও ছবি থেকে চোখ সরাতে পারছে না। এক ঘণ্টা কেটে গেল, গোলাসের পানীয় নিঃশেষ হল; কিন্তু সুজনের চিত্রদর্শন-পিপাসা মিটাল না। সে ছবির দিকে তাকিয়ে থেকে আবার সিগারেট ধরল। তার ঠোঁট নড়তে লাগল, যেন চুপি চুপি ছবির সঙ্গে কথা কইছে। তারপর ছবিটি নিজের গালের ওপর চেপে ধরে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল।
পৌঁনে এগারোটার সময় সে ছবিটি আবার খামে পুরে আলমারিতে তুলে রাখল, আয়নার সামনে কিছুক্ষণ শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে দাঁড়িয়ে রইল, তারপর আলো নিবিয়ে আবার বাড়ি থেকে বেরুল। মোটর নিয়ে প্রায় আধা ঘণ্টা দক্ষিণ কলকাতার নগরগুঞ্জনক্ষান্ত পথে পথে ঘুরে বেড়িয়ে শেষে রবীন্দ্র সরোবরের ঘেরার মধ্যে রাস্তার পাশে ঘাসের ওপর গাড়ি দাঁড় করল। গাড়ি থেকে যখন নামল, দেখা গেল নকল গোঁফ তার নাকের নীচে ফিরে এসেছে। গাড়ি লক করে সে লেক থেকে বেরুল, বড় রাস্তা পার হয়ে একটা সরু রাস্তা দিয়ে চলতে লাগল।
রাস্তার দু’ পাশে বাড়ির আলো নিবে গেছে। সুজন একটি ল্যাম্প-পোস্টের নীচে এসে দাঁড়াল। রাস্তার ওপারে একটা বাড়ি, তার দোতলার একটা জানলা দিয়ে নৈশদীপের অস্ফুট আলো আসছে। সুজন সেই দিকে একদৃষ্টি তাকিয়ে ল্যাম্প-পেস্টের তলায় দাঁড়িয়ে রইল। ল্যাম্প-পোস্টের নীচে দাঁড়ালে মাথার ওপর আলো পড়ে, মানুষটাকে দেখা যায় বটে, কিন্তু মুখ চেনা যায় না।
কিন্তু অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পরও জানলায় কাউকে দেখা গেল না। সুজন যাকে চোখের দেখা দেখতে চায় সে হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে কিংবা অন্য একজনের বাহুবন্ধনের মধ্যে শুয়ে জেগে আছে।
স্ক্রিয়াশ্চরিত্রম। সুজন আগুনের হালকার মত তপ্ত নিশ্বাস ফেলল, তারপর ফিরে চলল।
আর একটি রাত্রির কথা :
দেবাশিস আর দীপা একসঙ্গে টেবিলে বসে রাত্রির আহার সম্পন্ন করল। নকুলকে শুনিয়ে দীপা বাগানের কথা বলল; মালী পদ্মলোচন বুগেনভিলিয়া লতাকে বাইগনবিল্লি বলে শুনে দেবাশিস খানিকটা হাসল, তারপর ফ্যাক্টরির একটা মজার ঘটনা বলল। বাইরের ঠাট বজায় রইল। খাওয়া শেষ হলে দু’জনে ওপরে গিয়ে নিজের নিজের ঘরে ঢুকল। তৃতীয় ব্যক্তির সামনে স্বামী-স্ত্রীর অভিনয় করতে তারা বেশ অভ্যস্ত হয়েছে; কিন্তু যখন তৃতীয় ব্যক্তি কেউ থাকে না, যখন অভিনয় করার দরকার নেই, তখনই বিপদ।
দীপা ঘরে গিয়ে নৈশদীপ জ্বেলে খানিকক্ষণ খোলা জানলার সামনে দাঁড়িয়ে রইল। আজ বাইরে হাওয়া নেই, গ্ৰীষ্মের রাত্ৰি যেন নিশ্বাস রোধ করে আছে। দীপা পাখা চালিয়ে দিয়ে ব্লাউজ খুলে শুয়ে পড়ল। ঘুম কখন আসবে তার ঠিক নেই। কিন্তু যথাসময়ে বিছানায় আশ্রয় নেওয়া ছাড়া আর তো কোনো কাজও নেই। শুয়ে শুয়ে সে মাথার মধ্যে দেবাশিসের একটা কথা প্রতিধ্বনির মত শুনতে লাগল-দীপা, তুমি আমাকে ভালবাস না, কিন্তু আমি তোমাকে ভালবেসে ফেলেছি।
দেবাশিস নিজের ঘরে খাটের পাশে পড়ার আলো জ্বেলে একখানা ইংরেজি বিজ্ঞানের বই নিয়ে শুয়েছিল। তার গায়ে জামা নেই, পাখাটা ছাদ থেকে বনবান করে ঘুরছে। দেবাশিস বইয়ে মন বসাতে পারছিল না, মনটা যেন তপ্ত বাস্প হয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছিল। মাথায় ঠাণ্ডা জল থাবড়ে দিয়েও অবস্থার বিশেষ উন্নতি হল না। আধা ঘণ্টা পরে সে বই রেখে আলো নিবিয়ে দিল। উজ্জ্বল আলোটাই যেন ঘরের বাতাসকে আরো গরম করে তুলেছে।
অন্ধকার ঘরে দেবাশিস চোখ বুজে বিছানায় শুয়ে আছে। পাখার হাওয়া সত্ত্বেও বিছানাটা যেন রুটি-সেঁকা তাওয়ার মত তপ্ত। এ-পাশ ও-পাশ করেও নিষ্কৃতি নেই, বালিশের ওপর মাথাটা গরম হয়ে উঠছে।
সঙ্গে সঙ্গে মনও গরম হচ্ছে, কিন্তু সেটা অগোচরে। শেষে হঠাৎ গভীর রাত্রে এই মানসিক উত্মা মাটি ফুড়ে আগ্নেয়গিরির মত উৎসারিত হল। দেবাশিস ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসে চাপা গর্জনে বলল–‘Goddamn it, she is my wife!’
অন্ধকারে দেবাশিস কিছুক্ষণ স্নায়ুপেশী শক্ত করে বসে রইল, তারপর বিছানা থেকে নেমে ঘর থেকে বেরুল। বসবার ঘরের আলো জ্বালতেই সুইচে কটাস করে শব্দ হল, মনে হল ঘরটা যেন চমকে উঠল। দেবাশিসও একটু চমকালো, হঠাৎ জ্বলে-ওঠা আলোর দীপ্তি চোখে আঘাত করল। সে একটু থমকে দাঁড়িয়ে দীপার বন্ধ দোরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
দরজায় খিল দেওয়া কি শুধুই ভেজানো, বাইরে থেকে বোঝা যায় না। হয়তো একটু ঠেললেই খুলে যাবে। দীপা নিশ্চয় ঘুমিয়ে পড়েছে। দেবাশিস কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে দরজায় টোকা দেবার জন্যে হাত তুলল, ঘুমন্ত দীপার ঘরে অনাহূত দোর ঠেলে প্রবেশ করতে পারল না। তারপর টোকা দিতেও পারল না, তার উদ্যত হাত নেমে পড়ল। ‘কাপুরুষ!’ মনের গভীরে নিজেকে কঠোর ধিক্কার দিয়ে সে নিজের ঘরে ফিরে গেল।
দীপা তখনো ঘুমোয়নি, জেগেই ছিল। কিন্তু সে কিছু জানতে পারল না।
দেবাশিস আর দীপার বিয়ের পর দু’মাস কেটে গেল। যেদিনের ঘটনা নিয়ে কাহিনী আরম্ভ হয়েছিল, সেই যেদিন দেবাশিস ফ্যাক্টরি থেকে ফিরে এসে দীপকে সিনেমায় নিয়ে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু দীপা যায়নি, দীর্ঘ পশ্চাদ্দৃষ্টির পর আমরা সেইখানে ফিরে এলাম।
দেবাশিস পায়ে হেঁটে নৃপতির বাড়ির দিকে যেতে যেতে মাঝ-রাস্তায় থমকে দাঁড়াল। তার মনটা তিক্ত হয়েই ছিল, এখন নৃপতির বাড়িতে গিয়ে হালকা ঠাট্টা-তামাশা উদ্দেশ্যহীন গল্পগুজব করতে হবে, প্রবালের পিয়ানো বাজনা শুনতে হবে ভাবতেই তার মন বিমুখ হয়ে উঠল। অনেক দিন পড়াশুনো করা হয়নি, অথচ তার যে কাজ তাতে রসায়ন ও পদার্থবিদ্যা সম্বন্ধে পৃথিবীর কোথায় কি কাজ হচ্ছে সে বিষয়ে ওয়াকিবহাল থাকতে হয়। তার কাছে কয়েকটা বিলিতি বিজ্ঞান-পত্রিকা নিয়মিত আসে, কিন্তু গত দু’মাস তাদের মোড়ক পর্যন্ত খোলা হয়নি। দেবাশিস আবার বাড়ি ফিরে চলল। আজ আর আড্ডা নয়, আগের মত সন্ধ্যেটা পড়াশুনো করেই কাটাকে।
দীপা রেডিও চালিয়ে দিয়ে চোখ বুজে। আরাম-চেয়ারে বসে ছিল, দেবাশিসকে ফিরে আসতে দেখে রেডিও বন্ধ করে উঠে দাঁড়াল, উদ্বিগ্ন প্রশ্নভরা চোখে তার পানে চাইল। দেবাশিস যথাসম্ভব সহজ গলায় বলল—’ফিরে এলাম। অনেক দিন পড়াশুনো হয়নি, আজ একটু পড়ব।’
টেলিফোন টেবিলের নীচের থাকে বিলিতি পত্রিকাগুলো জমা হয়েছিল দেবাশিস সেগুলো নিয়ে নিজের ঘরে চলে গেল; সেখানে পত্রিকার মোড়ক খুলে তারিখ অনুযায়ী সাজাল, তারপর বিছানায় শুয়ে পিঠের নীচে বালিশ দিয়ে পড়তে আরম্ভ করল।
ওঘরে দীপা আস্তে আস্তে জানলার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। গ্ৰীষ্মের সন্ধ্যা দ্রুত নিবিড় হয়ে আসছে। পদ্মলোচন বাগানে জল দিচ্ছে। আজ দীপা বাগানে যায়নি। বিকেলবেলা সে সিনেমায় যাবার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পর দেবাশিস আহত লাঞ্ছিত মুখে চলে গেল, দীপার মনটাও কেমন একরকম হয়ে গেল। যত দিন যাচ্ছে তার জীবনটা এমন জট পাকিয়ে যাচ্ছে যে, মনে হয় কোনো দিনই এ জট ছাড়ানো যাবে না। মনের মধ্যে একটা নতুন সমস্যা জন্ম নিয়েছে, তার কোনো সমাধান নেই।
বাইরে অন্ধকার হয়ে গেছে, পদ্মলোচন বাগানের কাজ শেষ করে চলে গেল। দীপা তখন জানলা থেকে ফিরে নিঃশব্দে দেবাশিসের ঘরের দিকে গেল। দেবাশিস তখন আলো জ্বেলেছে, বিছানায় বালিশ ঠেসান দিয়ে পড়ায় নিমগ্ন। দীপা কিছুক্ষণ দোরের কাছে দাঁড়িয়ে থেকে আস্তে আস্তে ঘরে ঢুকাল; কিন্তু দেবাশিস তাকে দেখতে পেল না। দীপা তখন একেবারে খাটের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। দেবাশিস চমকে চোখ তুলল।
দীপা বলল–’চা খাবে?’
দেবাশিস একটু হাসল। দীপা বিকেলবেলার রূঢ়তার জন্যে অনুতপ্ত হয়েছে। সে বলল—’তুমি যদি খাও আমিও খাব।’
‘এক্ষুনি আনছি।’ দীপা হরিণীর মত ছুটে চলে গেল। দেবাশিস কিছুক্ষণ দোরের দিকে চেয়ে থেকে আবার পড়ায় মন দিল।
দীপ রান্নাঘরে গিয়ে দেখল, নকুল রান্না চড়িয়েছে। সে বলল—’নকুল, তুমি সরো, আমি চা তৈরি করব।
নকুল বলল—’চা তৈরি করবে? দাদাবাবু খাবেন বুঝি? তা তুমি কেন করবে বউদি, আমি করে দিচ্ছি।’
‘না, আমি করব। তুমি সরো।’
নকুল মনে মনে খুশি হল—’আচ্ছা বউদি, তুমিই কর।’
নকুলের ছায়াচ্ছন্ন মন অনেকটা পরিষ্কার হল। এই দু’মাস দেখেশুনে তার ধারণা জন্মেছিল, গোড়াতে কোনো কারণে এদের মনের মিল হয়নি, এখন আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে আসছে। ঘি আর আগুন। একসঙ্গে কত দিন ঠাণ্ডা থাকবে!
দীপা চা তৈরি করে ট্রে-র ওপর টি-পাট, দু’টি পেয়ালা প্রভৃতি বসিয়ে ওপরে উঠে গেল, বসবার ঘরে ট্রে রেখে দেবাশিসের দোরের কাছে এসে বলল–’চা এনেছি।’
দেবাশিস তৎক্ষণাৎ উঠে এসে চায়ের টেবিলে বসিল। দীপা চা পেয়ালায় ঢেলে একটি পেয়ালা দেবাশিসের দিকে এগিয়ে দিল, নিজের পেয়ালাটি হাতে তুলতে গিয়ে খানিকটা চা চলকে পিরিচে পড়ল।
আজ দেবাশিস হঠাৎ ফিরে আসার পর দীপার শরীরটাও যেন শাসনের বাইরে চলে গেছে। থেকে থেকে বুকের মধ্যে আনচান করে উঠছে, মাথার মধ্যে যেন গোলমাল হয়ে যাচ্ছে, কান্নায় গলা বুজে আসছে। সে কাঁদুনে মেয়ে নয়, এত দিনের দীর্ঘ পরীক্ষায় সে পরম দৃঢ়তার সঙ্গে উত্তীৰ্ণ হয়েছে। তবে আজ তার এ কী হ’ল?
এক চুমুক চা খেয়ে দেবাশিস বলল—’আঃ! খাসা চা হয়েছে। কে করল-নকুল?’
‘না—আমি।’ দীপার গলাটা কেঁপে গেল, মনে হল শরীরের অস্থিমাংস নরম হয়ে গেছে। সে আস্তে আস্তে বসে পড়ল।
দেবাশিস আর কিছু বলল না, কেবল একটু প্রশংসাসূচক হাসল। দীপা দু’ চুমুক চা খেয়ে নিজেকে একটু চাঙ্গা করে নিল, তারপর যেন গুনে গুনে কথা বলছে এমনিভাবে বলল—’কাল তুমি আমাকে সিনেমা দেখাতে নিয়ে যাবে?’
দেবাশিস চকিত চোখে তার পানে চাইল, ক্ষণেক নীরব থেকে বলল–’তোমার যদি ইচ্ছে না। থাকে, আমার মন রাখার জন্যে সিনেমা দেখার দরকার নেই।’
‘না, আমি দেখতে চাই।’ চায়ের পেয়ালা শেষ করে দেবাশিস উঠে দাঁড়াল–’বেশ, তাহলে নিয়ে যাব।’ দেবাশিস নিজের ঘরে যাবার জন্যে পা বাড়িয়েছে এমন সময় ঘরের কোণে টেলিফোন বাজল।
দীপার বুক আশঙ্কায় ধকধক করে উঠল। কার টেলিফোন!
দেবাশিস গিয়ে টেলিফোন ধরল–’হ্যালো।’
অন্য দিক থেকে কে কথা বলছে, কী কথা বলছে, দীপা শুনতে পেল না, কেবল দেবাশিসের কথা একাগ্র হয়ে শুনতে লাগল, ‘ও…কী খবর?…না, আজ বাড়িতেই আছি…না, শরীর ভাল আছে…এখন?…ও বুঝেছি, আচ্ছা, আমি যাচ্ছি…না না, কষ্ট কিসের…আচ্ছা—‘
টেলিফোন নামিয়ে রেখে দেবাশিস কব্জির ঘড়ির দিকে তাকালো, আটটা বেজে গেছে। ‘আমাকে একবার বেরুতে হবে। হেঁটেই যাব। আধা ঘণ্টার মধ্যে ফিরে আসব।’
সে বেরিয়ে গেল। দীপা কোনো প্রশ্ন করল না; সে জানতে পারল না, দেবাশিস কোথায় যাচ্ছে। একলা বসে বসে ভাবতে লাগল, কে দেবাশিসকে টেলিফোন করেছিল?
দেবাশিস আধা ঘণ্টার মধ্যে ফিরল না। তারপর আরো কিছুক্ষণ কেটে গেল। নকুল নীচে থেকে এসে বলল–’হ্যাঁ বউদি, দাদাবাবু কোথায় গেল? কখন ফিরবে?’
দীপা বলল—’তা তো জানি না নকুল। কোথায় গেছেন বলে যাননি, শুধু বললেন আধ ঘন্টার মধ্যে ফিরবেন।’
নকুল বলল–’আধা ঘণ্টা তো কখন কেটে গেছে। খাবার সময় হল। কখনো তো এমন দেরি করে না।’ নকুল চিন্তিতভাবে বিজবিজ করতে করতে নীচে নেমে গেল।
একজনের উদ্বেগ অন্যের মনে সঞ্চারিত হয়। দীপার মনও উৎকণ্ঠায় ভরে উঠল; নানারকম বাস্তব-অবাস্তব সম্ভাবনা তার মাথার মধ্যে উকিঝুঁকি মারতে লাগল।
নটা বেজে পাঁচ মিনিটে টেলিফোন বেজে উঠতেই দীপা চমকে উঠে দাঁড়াল, ভয়ে ভয়ে গিয়ে টেলিফোন তুলে কানো ধরল, ক্ষীণস্বরে বলল—’হ্যালো।’
অপর প্রাস্ত থেকে স্বর এল–’আমি। গলা শুনে চিনতে পারছ?’
দীপার গলার আওয়াজ আরো ক্ষীণ হয়ে গেল–’হ্যাঁ।’
‘তোমার স্বামী বাড়িতে আছে?’
‘না।‘
‘খবর সব ভাল?’
‘হ্যাঁ।’
‘তোমার স্বামী কোনো গোলমাল করেনি?’
‘না।‘
‘তুমি যেমন ছিলে তেমনি আছ?’
‘হাঁ।’
‘আমার নাম কাউকে বলনি?’
‘না।‘
‘মা কালীর নামে দিব্যি করেছ, মনে আছে?’
‘আছে।’
‘আচ্ছা, আজ এই পর্যন্ত। সাবধানে থেকে। আবার টেলিফোন করব।’
দীপার মুখ দিয়ে আর কথা বেরুল না, সে টেলিফোন রেখে আবার এসে বসল; মনে হল, তার দেহের সমস্ত প্রাণশক্তি ফুরিয়ে গেছে। দুহাতে মুখ ঢেকে সে চেয়ারে পড়ে রইল।
সাড়ে ন’টার সময় নকুল আকার এসে বলল—বউদি, দাদাবাবু এখনো এল না, আমার ভাল ঠেকছে না—‘
এই সময় তৃতীয় বার টেলিফোন বাজল। দীপার মুখ সাদা হয়ে গেল; সে সমস্ত শরীর শক্ত করে উঠে গিয়ে ফোন ধরল। মেয়েলী গলার আওয়াজ শুনল–’হ্যালো, এটা কি দেবাশিস ভট্টের বাড়ি?’
দীপার বুক ধড়ফড় করে উঠল, সে কোনো মতে উচ্চারণ করল—’হ্যাঁ।’
‘আপনি কি তাঁর স্ত্রী?’
‘হ্যাঁ।’
‘দেখুন, আমি হাসপাতাল থেকে বলছি। আপনি একবার আসতে পারবেন?’
‘কেন? কী হয়েছে?’
‘ইয়ে-আপনার স্বামীর একটা অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে, তাঁকে হাসপাতালে আনা হয়েছে। আপনি চট্ করে আসুন।’
দীপার মুখ থেকে বুক-ফাটা প্রশ্ন বেরিয়ে এল—’বেঁচে আছেন?’
‘হ্যাঁ। এই কিছুক্ষণ আগে জ্ঞান হয়েছে।’
‘আমি এক্ষুনি যাচ্ছি। কোন হাসপাতাল?’
‘রাসবিহারী হাসপাতাল, এমারজেন্সি ওয়ার্ড।’
ফোন রেখে দিয়ে দীপা ফিরল; দেখল, নকুল তাঁর পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে। নকুল ব্যাকুল চোখে চেয়ে বলল–’বউদি?
নকুলের শঙ্কা-বিবশ মুখ দেখে দীপা হঠাৎ নিজের হৃদয়টাও দেখতে পেল। আজকের দীপা আর দু’ মাস আগের দীপা নেই, সব ওলট-পালট হয়ে গেছে। তার মাথাটা একবার ঘুরে উঠল। তারপর সে দৃঢ়ভাবে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল—’তোমার দাদাবাবুর অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে, তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে গেছে।’
নকুল আস্তে আস্তে মেঝের ওপর বসে পড়ল। দীপা বলল—’না নকুল, এ সময় ভেঙে পড়লে চলবে না। চল, এক্ষুনি হাসপাতালে যেতে হবে।’
দীপা নকুলকে হাতে ধরে টেনে দাঁড় করালো।
অনুক্রম
ব্যোমকেশকে নিয়ে রাখালবাবু যখন হাসপাতালে পৌঁছুলেন তখন রাত্রি দশটা। হাসপাতালের দর দালানে লোক কমে গেছে। এক পাশে এক বেঞ্চিতে একটি যুবতী শরীর শক্ত করে বসে। আছে, তার পায়ের কাছে জবুথবু হয়ে বসে আছে একটি বুড়ে চাকর। যুবতীর চোখে বিভীষিকাময় সম্ভাবনার আতঙ্ক।
একটি নার্স ব্যোমকেশকে দেখে এগিয়ে এল। রাখালবাবু বললেন—’থানা থেকে আসছি।’
‘আসুন।’ নার্স তাঁদের ভিতরে নিয়ে গিয়ে একটি ঘরে বসাল। বলল—‘একটু বসুন, ডাক্তার গুপ্ত আপনাদেরই জন্য অপেক্ষা করছেন।’
নার্স চলে গেল। অল্পক্ষণ পরে ডাক্তার গুপ্ত এলেন। মধ্যবয়স্ক মধ্যমাকৃতি মানুষ, বিশ বছর ধরে মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধ করেও ক্লান্ত হননি, বরং প্রাণশক্তি আরো বেড়েছে। রাখালবাবু নিজের এবং ব্যোমকেশের পরিচয় দিলে ডাক্তার হেসে বললেন—’আরে মশাই, আজ দেখছি অসাধারণ ঘটনা ঘটার দিন। ব্যোমকেশবাবুর সঙ্গেও পরিচয় হল। বসুন, বসুন।’
তিনজন বসলেন। রাখালবাবু বললেন—’ব্যাপার কি বলুন দেখি।’
ডাক্তার গুপ্ত বললেন–’আরো মশাই, আশ্চর্য ব্যাপার, অভাবনীয় ব্যাপার। আমি বিশ বছর। ডাক্তারি করছি, এমন প্রকৃতিবিরুদ্ধ ব্যাপার দেখিনি। অবশ্য ডাক্তারি কেতবে দু-চারটে উদাহরণ পাওয়া যায়। কিন্তু স্বচক্ষে দেখা-কোটিকে গুটিক মিলে।’
ব্যোমকেশ হেসে বলল–’রহস্য নিয়েই আমার কারবার, আপনি আমাকেও অবাক করে দিয়েছেন। মনে হচ্ছে, একটা মনের মত রহস্য এতদিনে পাওয়া গেছে। আপনি গোড়া থেকে সব কথা বলুন।’
ডাক্তার বললেন–’বেশ, তাই বলছি। আজ রাত্রি সাড়ে আটটার সময় তিনটি ছোকরা একজন অজ্ঞান লোককে ট্যাক্সিতে নিয়ে এখানে এল। তারা রবীন্দ্র সরোবরে বেড়াতে গিয়েছিল, দেখল একটা গাছের তলায় বেঞ্চির পাশে মানুষ পড়ে আছে। দেশলাই জ্বেলে মানুষটাকে দেখল, তার পিঠের বাঁ দিকে শজারুর কাঁটা বিঁধে আছে। লোকটা কিন্তু মরেনি, অজ্ঞান হয়ে পড়েছে। ওদের মধ্যে একজন লোকটিকে চিনতে পারল, তাদের ফ্যাক্টরির মালিক দেবাশিস ভট্ট। তখন তারা তাকে হাসপাতালে নিয়ে এল।
‘ছোকরাকে টেবিলে শুইয়ে পরীক্ষা করলাম। শজারুর কাঁটা দিয়ে হত্যা করার কথা সবাই জানে; আমি ভাবলাম এ ক্ষেত্রে কাঁটা বোধ হয়। হার্ট পর্যন্ত পৌঁছয়নি। কিন্তু হার্ট পরীক্ষা করতে গিয়ে দেখি–অবাক কাণ্ড। হার্ট নেই! তারপর বুকের ডান দিকে হার্ট খুঁজে পেলাম। প্রকৃতির খেয়ালে ছোকরা ডান দিকে হার্ট নিয়ে জন্মেছে।
‘শজারুর কাঁটা হার্টকে বিধতে পারেনি বটে, কিন্তু বাঁ দিকের ফুসফুসে বিঁধেছে। সেটাও কম সিরিয়াস নয়। যতক্ষণ কাঁটা বিধে আছে, ততক্ষণ রক্ত ক্ষরণ হচ্ছে না, কিন্তু কাঁটা বার করলেই ফুসফুসের মধ্যে রক্তপাত হয়ে মৃত্যু হতে পারে।
‘যাহোক, খুব সাবধানে পিঠ থেকে কাঁটা বার করলাম। ছ’ ইঞ্চি লম্বা কাঁটা, তার দুইঞ্চি বাইরে বেরিয়ে ছিল, বাকিটা সোজা ফুসফুসের মধ্যে ঢুকেছিল। এই দেখুন সেই কাঁটা।’
ডাক্তার পকেট থেকে একটি শজারুর কাঁটা বার করে ব্যোমকেশের হাতে দিলেন। শজারুর কাঁটা অনেকেই দেখেছেন, সবিস্তারে বর্ণনার প্রয়োজন নেই। এই কাঁটাটি নিরুনের মত সরু, কাচের কাঠির মত অনমনীয় এবং ডাক্তারি শল্যের মত তীক্ষ্ণগ্র। মারাত্মক অস্ত্রটি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে ব্যোমকেশ রাখালবাবুর হাতে দিল, বলল—’তারপর বলুন।’
ডাক্তার বললেন–’কাঁটা বার করলাম। ছোকরার বরাত ভাল ফুসফুসের মধ্যে রক্তপাত হল না। কিছুক্ষণ পরে জ্ঞান হল, নিজের ঠিকানা ও ফোন নম্বর দিয়ে স্ত্রীর কাছে খবর পাঠাতে বলল। তারপর তাকে ওষুধ দিয়ে ঘুম পাড়ালাম। ওর স্ত্রী যখন এল তখন ও ঘুমুচ্ছে।’
ব্যোমকেশ বলল–’বাইরে একটি মেয়ে বসে আছে, সেই কি-?’
ডাক্তার বললেন-’হ্যাঁ, দেবাশিসের স্ত্রী। ও স্বামীর কাছে থাকতে চায়, কিন্তু এখন তো তা সম্ভব নয়। ওকে বললাম, বাড়ি ফিরে যাও; কিন্তু ও যাবে না।’
‘ওকে স্বামীর কাছে যেতে দেওয়া হয়েছিল?’
‘একবার ঘরে গিয়ে স্বামীকে দেখে এসেছে। আমরা আশ্বাস দিয়েছি, আশঙ্কার বিশেষ কারণ নেই, তুমি বাড়ি যাও, কাল সকালে আবার এস। কিন্তু ও কিছুতেই যাবে না।’
ব্যোমকেশ উঠবার উপক্রম করে বলল–’আচ্ছা, আমি একবার চেষ্টা করে দেখি।’
ডাক্তার বললেন–বেশ তো, দেখুন না। কিন্তু একটা কথা। ওর স্বামীকে কেউ খুন করবার চেষ্টা করেছিল একথা ওকে বলা হয়নি, বলা হয়েছে অ্যাকসিডেন্টে বুকে চোট লেগেছে। আপনারাও তাই বলবেন। মেয়েটি এমনিতেই শক্ পেয়েছে, ওকথা শুনলে আরো বেশি শক পাবে।’
‘না, বলব না।’
রাখালবাবু বললেন-‘শজারুর কাঁটা আমি রাখলাম। এই নিয়ে চারটি হল।’
দীপা বেঞ্চির ওপর ঠিক আগের মতাই সোজা হয়ে বসে ছিল, ব্যোমকেশ আর রাখালবাবু তার কাছে যেতেই সে উঠে দাঁড়াল। রাখালবাবু বললেন—’আমি পুলিসের লোক। ইনি শ্ৰীব্যোমকেশ বক্সী।’
ব্যোমকেশের নাম দীপার মনে কোনো দাগ কাটল না। তার শঙ্কাভরা চোখ একবার এর মুখে একবার ওর মুখে যাতায়াত করতে লাগল।
ব্যোমকেশ নরম সুরে বলল–’আপনি ভয় পাবেন না। আপনার স্বামীর গুরুতর আঘাত লেগেছিল বটে, কিন্তু জীবনের আশঙ্কা আর নেই।’
দীপা দাঁত দিয়ে ঠোঁট চেপে বোধ করি নিজেকে সংযত করল। তারপর ভাঙা-ভাঙা গলায় বলল–’আমাকে ওঘরে থাকতে দিচ্ছে না কেন?’
ব্যোমকেশ বলল–’দেখুন, আপনার স্বামীকে ওষুধ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে, এ সময় আপনি তাঁর কাছে থেকে কী করবেন? তার চেয়ে–’
দীপা বলল–’না, আমাকে যদি ওর কাছে থাকতে না দেওয়া হয়, আমি সারা রাত্রি এখানে বসে থাকব।’
ব্যোমকেশ বলল–’কিন্তু রুগীর ঘরে ডাক্তার আর নার্স ছাড়া এসময় অন্য কারুর থাকা নিষেধ।’
দীপা বলল—’আমি কিছু করব না, খাটের একপাশে চুপটি করে বসে থাকব।’
ব্যোমকেশ আরো কিছুক্ষণ দীপাকে বোঝাবার চেষ্টা করল, কিন্তু তাকে টলাতে পারল না। তখন সে মাথা চুলকে বলল—’আচ্ছা, ডাক্তারবাবুকে বলে দেখি। দেবাশিসবাবুর কি অন্য কোনো আত্মীয় এখানে নেই?’
‘না, ওঁর অন্য কোনো আত্মীয় নেই।’
‘আপনার নিশ্চয় আত্মীয়স্বজন আছেন। তাঁরা কোথায় থাকেন, তাঁদের খবর দেওয়া হয়েছে?’
দীপা বলল—’তাঁরা কাছেই থাকেন, কিন্তু তাঁদের খবর দিতে ভুল হয়ে গেছে।’
ব্যোমকেশ বলল–’ঠিকানা দিন, আমরা তাঁদের খবর দিচ্ছি।’
দীপা ঠিকানা ও টেলিফোন নম্বর দিল। ব্যোমকেশ তখন ডাক্তার গুপ্তর কাছে ফিরে গিয়ে বলল—’ডাক্তারবাবু্, বউটিকে স্বামীর কাছে থাকতে দিন। ও বুদ্ধিমতী বলেই মনে হল, কিন্তু বড় ভয় পেয়েছে।‘
ডাক্তারবাবু দু’ একবার আপত্তি করলেন, স্ত্রীজাতি বড় ভাবপ্রবণ, আবেগের বশে যদি স্বামীকে আঁকড়ে ধরে, ইত্যাদি। শেষ পর্যন্ত তিনি রাজী হলেন। ব্যোমকেশ দীপাকে ডেকে এনে যে ঘরে দেবাশিস ছিল সেই ঘরে নিয়ে গেল। দীপা পা টিপে টিপে গিয়ে খাটের পাশে দাঁড়াল, সামনের দিকে ঝুকে ব্যগ্র চোখে দেবাশিসের মুখ দেখল। দেবাশিস পাশ ফিরে শুয়ে ঘুমোচ্ছে, তার মুখের ভাব শান্ত প্রসন্ন। দীপা তার মুখের ওপর চোখ, রেখে অতি সন্তৰ্পণে খাটের পাশে বসল। একজন নার্সও সঙ্গে এসেছিল, সে ঠোঁটে আঙুল রেখে দীপাকে সতর্ক করে দিল।
রাত্রি এগারোটার সময় হাসপাতাল থেকে বেরুবার পথে রাখালবাবু ব্যোমকেশের পানে চাইলেন–’বউটির বাপের বাড়িতে টেলিফোন করতে হবে।’
ব্যোমকেশ বলল–’না, সশরীরে সেখানে উপস্থিত হওয়া দরকার। আজ রাত্রে তোমার বিশ্রাম নেই।’
রাখালবাবু বললেন–’আমি বিশ্রামের জন্যে ব্যস্ত নই।’
পুলিসের গাড়িতে দীপার বাপের বাড়িতে পৌঁছুঁতে পাঁচ মিনিটও লাগল না। রাস্তা নিরালা, বাড়ির সদর দোর বন্ধ। রাখালবাবু সজোরে কড়া নাড়লেন।
কিছুক্ষণ পরে বিজয় ঘুম-চোখে দরজা একটু ফাঁক করে বলল—’কে? কি চাই?’
রাখালবাবু বলল—’ভয় নেই, দোর খুলুন। আমরা পুলিসের লোক।’
ইতিমধ্যে নীলমাধব উপস্থিত হয়েছেন। বিজয় দোর খুলে দিল, রাখালবাবু ব্যোমকেশকে নিয়ে ভিতরে এসে প্রশ্ন করলেন–’দেবাশিস ভট্ট আপনাদের কে?’
নীলমাধব বললেন—’আমার জামাই। কি হয়েছে?’
রাখালবাবু বললেন—’একটা অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে, আপনার জামাই বুকে আঘাত পেয়ে হাসপাতালে আছেন। আপনার মেয়েও খবর পেয়ে সেখানে গিয়েছেন।’
নীলমাধব বললেন—’অ্যাঁ! কোন হাসপাতালে?’
‘রাসবিহারী হাসপাতালে। ভয় পাবেন না আঘাত গুরুতর হলেও জীবনের আশঙ্কা নেই।’
‘আমরা এখনি যাচ্ছি। বিজয়, তুমি এদের বসাও, আমি তোমার মাকে নিয়ে যাচ্ছি।’
তিনি ছুটে বাড়ির ভিতর চলে গেলেন। ব্যোমকেশ বিজয়কে প্রশ্ন করল—’দেবাশিসবাবু আপনার ভগিনীপতি?
‘হ্যাঁ। আমিও হাসপাতালে যাব।’
‘না আপনার সঙ্গে আমাদের একটু আলোচনা আছে।’
খানিক পরে নীলমাধব আধ-ঘোমটা টানা স্ত্রীকে নিয়ে বেরিয়ে এলেন। রাখালবাবু বললেন—’আপনারা পুলিসের গাড়িতেই যান। গাড়ি আপনাদের পৌঁছে দিয়ে ফিরে আসবে। ততক্ষণ আমরা এখানেই আছি।’
তাঁদের রওনা করে দিয়ে তিনজনে বৈঠকখানায় এসে বসলেন। ব্যোমকেশ বিজয়কে প্রশ্ন করল–’আপনার বোনের কত দিন বিয়ে হয়েছে?’
বিজয় বলল-‘দু’মাসের কিছু বেশি।’
‘আপনার ভগিনীপতি কি কাজ করেন?’
বিজয় ‘প্রজাপতি প্রসাধন ফ্যাক্টরির কথা বলল।
‘তাঁর আত্মীয়স্বজন কেউ নেই?’
‘যতদূর জানি, কেউ নেই!’
‘বন্ধুবান্ধব?’
‘অন্য বন্ধুবান্ধবের কথা জানি না, কিন্তু নৃপতিদার আড্ডায় যারা যায়। তাদের সঙ্গে দেবাশিসের ঘনিষ্ঠতা আছে।’ নৃপতি লাহার আডার পরিচয় দিয়ে বিজয় বলল—’কিন্তু এসব প্রশ্ন কেন?’
ব্যোমকেশ একবার রাখালবাবুর সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় করে বলল—’আপনাকে বলছি, আপনি উপস্থিত অন্য কাউকে বলবেন না, দেবাশিসবাবুকে কেউ খুন করবার চেষ্টা করেছিল।’
বিজয়ের চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল, সে উত্তেজিত হয়ে বলল–’আমি জানতাম।’
ব্যোমকেশের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল—’কী জানতেন?
‘জানতাম যে, এই ঘটবে।’
‘জানতেন এই ঘটবে! কী জানতেন সব কথা বলুন।’
উত্তেজনার ঝোঁকে কথাটা বলে ফেলেই বিজয় থমকে গেল। আর কিছু বলতে চায় না, এ-কথা সে-কথা বলে আসল কথাটা চাপা দিতে চায়। ব্যোমকেশ তখন গম্ভীরভাবে বলল–’দেখুন, দেবাশিসবাবুর শত্ৰু তাঁকে খুন করবার চেষ্টা করেছিল, দৈবক্রমে তাঁর প্রাণ বেঁচে গেছে। আপনি যদি আসামীকে আড়াল করবার চেষ্টা করেন তাহলে সে আবার চেষ্টা করবে। আপনি কি চান, আপনার বোন বিধবা হন?’
তখন বিজয় বলল–’আমি যা জানি বলছি। কিন্তু কে আসামী, আমি জানি না।’
বিজয় দীপার প্ৰেম কাহিনী শোনাল। শুনে ব্যোমকেশ একটু চুপ করে রইল, তারপর বলল–’মনে হয়, আপনার বোনের ছেলেমানুষী ভালবাসার নেশা কেটে গেছে। আচ্ছা, আজ আমরা উঠলাম। কাল বিকেলবেলা আমরা নৃপতিবাবুর বাড়িতে যাব। আপনিও উপস্থিত থাকবেন।’
ইতিমধ্যে পুলিসের গাড়ি ফিরে এসেছিল। ব্যোমকেশ গাড়িতে উঠে রাখালবাবুকে বলল–’আজ এই পর্যন্ত। কাল সকালে আবার হাসপাতালে যাব।’
হাসপাতালে রাত্রি আড়াইটের সময় দেবাশিসের ঘুম ভাঙল। চোখ চেয়ে দেখল, একটি মুখ তার মুখের পানে ঝুঁকে অপলক চেয়ে আছে। ভারি মিষ্টি মুখখানি। দেবাশিস আস্তে আস্তে বলল–’দীপা, কখন এলে?’
দীপা উত্তর দিতে পারল না, দেবাশিসের কপালে কপাল রেখে চুপ করে রইল।
‘দীপা।‘
‘উঁ।‘
‘ক্ষিদে পেয়েছে।’
দীপা ত্ররিত মাথা তুলল। ঘাড় ফিরিয়ে দেখল, নার্স ঘরে প্রবেশ করেছে। নার্স ইতিপূর্বে আরো কয়েকবার ঘরে এসে রুগীকে দেখে গেছে। বলল–’কি খবর? ঘুম ভেঙেছে?’
দীপা বলল—’হ্যাঁ। বলছেন, ক্ষিদে পেয়েছে।’
নার্স হেসে বলল–’বেশ। আমি ওভালটিন তৈরি করে রেখেছি, এখনি আনছি। আগে একবার নাড়িটা দেখি।’ নাড়ি দেখে নার্স বলল–’চমৎকার। আমি এই এলুম বলে।’
নার্সের সঙ্গে সঙ্গে দীপা দোর পর্যন্ত গেল। নকুল তখনো দোরের পাশে বসেছিল, উঠে দাঁড়াল। বলল—’বউদি, দাদাবাবু খেতে চাইছে?’
দীপা বলল—’হ্যাঁ।’
‘জয় জগদীশ্বর! তাহলে আর ভয় নেই। বউদি, তুমিও তো কিছু খাওনি। তোমার ক্ষিদে পায়নি?’
দীপা একটু চুপ করে থেকে বলল–’পেয়েছে। নকুল, তুমি বাড়ি যাও। নিজে খেয়ো, আর আমার জন্যে কিছু নিয়ে এস।’
‘আচ্ছা বউদি।‘
নকুল চলে গেল। নার্স ফীডিং কাপে ওভালটিন এনে দেবাশিসকে খাওয়াল। তারপর দেবাশিস তৃপ্তির নিশ্বাস ফেলে দীপার একটি হাত মুঠির মধ্যে নিয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়ল।
ভোর হলে দীপার মা বাবা বিজয় সকলে আবার এলেন। দেবাশিস তখন ঘুমোচ্ছে। দীপার মা দীপাকে বললেন–’দীপা, আমরা এখানে আছি, তুই বাড়ি যা, সেখানে স্নান করে একটু কিছু মুখে দিয়ে আবার আসিস।’
নেড়ে বলল—’না। নকুল আমার জন্যে খাবার এনেছিল, আমি খেয়েছি।‘
বেলা আন্দাজ দশটার সময় ব্যোমকেশকে নিয়ে রাখালবাবু হাসপাতালে এলেন। ডাক্তার গুপ্ত একগাল হেসে বললেন–’ভাল খবর। ছোকরা এ যাত্রা বেঁচে গেল। সকালে বেশ চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। তবু এখনো অন্তত দুতিন দিন হাসপাতালে থাকতে হবে।’
রাখালবাবু বললেন–’ভাল। আমরা তাহলে তার সঙ্গে দেখা করতে পারি?’
ডাক্তার বললেন–’পারেন। কিন্তু দশ মিনিটের বেশি নয়।’
ব্যোমকেশ বলল–’আপাতত দশ মিনিটই যথেষ্ট।’
দেবাশিস তখন পাশ ফিরে বিছানায়, শুয়ে ছিল, আর দীপা তার মুখের কাছে ঝুকে চুপি চুপি কথা বলছিল। ব্যোমকেশ আর রাখালবাবুকে আসতে দেখে লজ্জিতভাবে উঠে দাঁড়াল।
ব্যোমকেশ স্মিতমুখে দীপাকে বলল—’আপনি কাল থেকে এখানে আছেন, এবার অন্তত ঘণ্টাখানেকের জন্যে যেতে হবে। আমরা ততক্ষণ দেবাশিসবাবুর কাছে আছি।’
দেবাশিস ক্ষীণকণ্ঠে বলল–’আমিও তো সেই কথাই বলছি।’
দীপা একটু ইতস্তত করল, তারপর অনিচ্ছাভরে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল! বলে গেল–’আমি আধা ঘণ্টার মধ্যেই আসব।’
নিজেদের পরিচয় দিয়ে বললেন—’আমরা আপনাকে দু’চারটি প্রশ্ন করব।’
দেবাশিস বলল–’বেশ তো, করুন।’
অতঃপর প্রশ্নোত্তর আরম্ভ হল। ‘আপনি কাল সন্ধ্যের পর লেকে বেড়াতে গিয়েছিলেন?’
‘ঠিক বেড়াতে যাইনি, তবে গিয়েছিলাম।’
‘কেন গিয়েছিলেন?’
‘একজন বন্ধু টেলিফোন করে ডেকেছিল।’
‘কে বন্ধু? নাম কি?’
‘খড়্গ বাহাদুর।’
‘খড়্গ বাহাদুর! নেপালী নাকি?’
‘হ্যাঁ। নামকরা ফুটবল খেলোয়াড়।’
‘ও সেই! তা লেকের ধারে ডেকেছিল কেন?’
‘ব্যক্তিগত কারণ। যদি না বললে চলে–’
‘চলবে না। বলুন।’
‘ওর কিছু টাকার দরকার হয়েছিল, তাই আমার কাছে ধার চাইবার জন্য ডেকেছিল।’
‘আপনার বাড়িতে আসেনি কেন?’
‘তা জানি না। বোধ হয় বাড়িতে আসতে সঙ্কোচ হয়েছিল, যদি কেউ জানতে পারে।’
‘হুঁ। কত টাকা চেয়েছিল?’
‘এক হাজার।’
‘আপনি টাকা নিয়ে গিয়েছিলেন?’
‘না না, খড়্গ টেলিফোনে টাকার কথা বলেনি। শুধু বলেছিল জরুরী দরকার আছে।’
‘তারপর?
‘গিয়ে দেখলাম, সে বড় ফটকের কাছে দাঁড়িয়ে আছে; দু’জনে গিয়ে একটা বেঞ্চিতে বসলাম। খড়্গ টাকার কথা বলল; আমি রাজী হলাম। কিছুক্ষণ কথাবার্তার পর খড়্গ চলে গেল, তার অন্য একজনের সঙ্গে দেখা করবার ছিল। আমি একলা বসে রইলাম। হঠাৎ পিঠে দারুণ যন্ত্রণা হল। তারপর আর মনে নেই।’
‘পিছন দিকে কাউকে দেখতে পেয়েছিলেন?’
‘না।‘
রাখালবাবু ব্যোমকেশের পানে তাকালেন। ব্যোমকেশ প্রশ্ন করল–’আপনার হৃৎপিণ্ড যে শরীরের ডান দিকে একথা আপনার স্ত্রী নিশ্চয় জানেন?’
দেবাশিস চোখ বুজে একটু চুপ করে রইল, শেষে বলল-‘না, ও বোধহয় জানে না।’
‘আপনার বন্ধুরা জানেন?’
‘না, আমার বন্ধু বড় কেউ নেই, সহকর্মী আছে। সম্প্রতি মাস দুয়েক থেকে আমি নৃপতিদার বাড়িতে যাই, সেখানে কয়েকজনের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছে।’
‘নৃপতিবাবুর বাড়ির বন্ধুরা কেউ জানে?’
‘না।‘
‘কেউ জানে না?’
‘বাবা জানতেন আর ডাক্তারবাবুরা জানেন।’
‘এমন কেউ আছে আপনার মৃত্যুতে যার লাভ হবে?’
‘কেউ না।’
‘আচ্ছা, আজ আর আপনাকে বেশি প্রশ্ন করব না। আপনি সেরে উঠন, তারপর যদি দরকার হয় তখন দেখা যাবে।’
সন্ধ্যের পর নৃপতির ঘরে আড্ডাধারীরা সকলেই উপস্থিত হয়েছিল। বিজয়ও ছিল। সকলের মুখেই উদ্বেগের গাম্ভীর্য। আজ প্রবাল পিয়ানো বাজাচ্ছে না, তক্তপোশের ওপর গালে হাত দিয়ে বসে আছে। বিজয়ের মুখে দেবাশিসের কথা শোনার পর সকলেই মুহ্যমান। খবরের কাগজের দুঃসংবাদ হঠাৎ নিজের বাড়ির দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে।
প্রবাল মুখ তুলে প্রশ্ন করল–’ব্যোমকেশ বক্সী কে?’
কপিল মুখের একটা ব্যঙ্গ-বঙ্কিম ভঙ্গী করল। বিজয় উত্তর দেবার জন্যে মুখ খুলল। কিন্তু উত্তর দেবার দরকার হল না, সদর দরজার বাইরে জুতোর শব্দ শোনা গেল। পরীক্ষণেই ব্যোমকেশকে নিয়ে রাখালবাবু প্রবেশ করলেন।
সকলে উঠে দাঁড়াল। নৃপতি এগিয়ে গিয়ে বলল–’আসুন, আমরা আপনাদের জন্যেই অপেক্ষা করছি। আমার নাম নৃপতি লাহা। এঁরা— নৃপতি একে একে কপিল, প্রবাল, সুজন ও খড়্গ বাহাদুরের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল, তারপর চেয়ারে বসিয়ে সিগারেট দিল—’বিজয়ের মুখে আমরা সবই শুনেছি।’
ব্যোমকেশ একটু ভর্ৎসনার চোখে বিজয়ের পানে চাইল, বিজয় কুষ্ঠিতভাবে বলল—’হ্যাঁ ব্যোমকেশবাবু্, এরা ছাড়ল না, শজারুর কাঁটার কথা এদের বলেছি।’
খড়্গ বাহাদুর বলল—’আচ্ছা ব্যোমকেশবাবু্, এই যে শজারুর কাঁটা নিয়ে ব্যাপার, এটা কী? আপনার কি মনে হয়। এসব একটা পাগলের কাজ?’
ব্যোমকেশ বলল–’পাগলের কাজ হতে পারে, আবার পাগল সাজার চেষ্টাও হতে পারে।’
সুজন বলল–’সেটা কি রকম?’
ব্যোমকেশ বলল—‘পাগল সাজলে অনেক সময় খুনের দায়ে নিষ্কৃতি পাওয়া যায়। বড় জোর পাগলা গারদে বন্ধ করে রাখে, ফাঁসি হয় না, এই আর কি। আপনারা দেবাশিসবাবুর বন্ধু, তাঁর জীবন সম্বন্ধে নিশ্চয় অনেক কিছু জানেন।’
নৃপতি বলল–’দেবাশিসের সঙ্গে আমাদের পরিচয় বেশি দিনের নয়। আমাদের মধ্যে কেবল প্রবাল তাকে আগে থেকে চিনত।’ বলে প্রবালের দিকে আঙুল দেখাল।
ব্যোমকেশ প্রবালের দিকে চাইল। প্রবাল গলা পরিষ্কার করে বলল–’স্কুলে দেবাশিসের সঙ্গে এক ক্লাসে পড়েছিলাম। তার সঙ্গে পরিচয় ছিল। কিন্তু বন্ধুত্ব ছিল না।’
‘বন্ধুত্ব ছিল না!’
‘বন্ধুত্ব ছিল না, অসদ্ভাবও ছিল না। তারপর ও পাস করে দিল্লী চলে গেল, অনেক দিন দেখাসাক্ষাৎ হয়নি। মাস দু-এক আগে এই ঘরে তাকে আবার দেখলাম।’
‘ও’—ব্যোমকেশ সিগারেটে দু’তিনটে টান দিয়ে খড়্গ বাহাদুরের দিকে চোখ ফেরাল। বলল—’কাল রাত্রে আন্দাজ আটটার সময় আপনি দেবাশিসবাবুকে টেলিফোন করেছিলেন?’
খড়্গ বাহাদুর বোধহয় প্রশ্নটা প্রতীক্ষ্ণ করছিল, সংযত স্বরে বলল—’হ্যাঁ।’
‘কোথা থেকে টেলিফোন করেছিলেন?’
‘এখান থেকে। নৃপতিদার টেলিফোন আছে। আমার সকলেই দরকার হলে ব্যবহার করি। কাল আমরা সকলেই এখানে ছিলাম, দেবাশিস ছাড়া। তার আশায় অনেকক্ষণ এখানে অপেক্ষা করলাম। কিন্তু সে যখন এল না। তখন তাকে টেলিফোন করেছিলাম।’
‘তারপর লেকে দেখা হয়েছিল। এখন একটা কথা বলুন দেখি, আপনি যখন দেবাশিসবাবুকে ছেড়ে চলে আসেন তখন আশেপাশে কাউকে দেখেছিলেন?’
‘দেখে থাকলেও লক্ষ্য করিনি। আমরা একটা গাছের তলায় বেঞ্চিতে বসেছিলাম। অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল, লোকজন বেশি ছিল না।’
ব্যোমকেশ তখন নৃপতিকে বলল–’আপনাকে একটি কাজ করতে হবে। আমরা আপনাদের পৃথকভাবে প্রশ্ন করতে চাই। আমরা একটা ঘরে গিয়ে বসব, আর আপনারা একে একে আসবেন। ছোট একটা ঘর পাওয়া যাবে কি?’
নৃপতি বলল–’পাশেই ছোট ঘর আছে, আসুন দেখাচ্ছি।’
পরদা-ঢাকা দরজা দিয়ে নৃপতি তাদের পাশের ঘরে নিয়ে গেল। ঘরটি ছোট, কয়েকটি চেয়ারের মাঝখানে একটি গোল টেবিল, টেবিলের ওপর টেলিফোন যন্ত্র।
ব্যোমকেশ বলল–’এই তো ঠিক যেমনটি চেয়েছিলাম। রাখাল, তুমি সভাপতির আসন অলঙ্কৃত কর। নৃপতিবাবু্, আপনি বাকি সকলকে বসতে বলে আসুন। আগে আপনার জেরা শেষ করে একে একে ওঁদের ডাকব।’
ছোট্ট ঘরটিতে এজলাস বসল। প্রশ্নোত্তর চলল। চাকর কফি দিয়ে গেল। একে একে সকলে সাক্ষী দিল। সকলের শেষে ঐল বিজয়। ব্যোমকেশ তাকে বলল, ‘বিজয়বাবু্, আপনার বোনের আইবুড়ো বেলার বই-খাতা জিনিসপত্র নিশ্চয় এখনো আপনাদের বাড়িতে আছে? বেশ। কাল আমরা যাব, একটু নেড়েচেড়ে দেখব। যদি দরকারী কিছু পাওয়া যায়।’
বিজয় বলল, ‘আচ্ছা।’
অতঃপর সভা ভঙ্গ হল। দশটা বাজতে তখন বেশি দেরি নেই।
পরদিন সকাল আটটার সময় বিজয় নিজেদের বাড়িতে অপেক্ষা করছিল, ব্যোমকেশ আর রাখালবাবু আসতেই তাঁদের দোতলায় দীপার ঘরে নিয়ে গেল। বলল–’এইটে দীপার ঘর। এই ঘরেই তার যা কিছু আছে, বিশেষ কিছু নিয়ে যায়নি।’
বেশ বড় ঘর। জানলার পাশে খাট বিছানা, অন্য পাশে টেবিল চেয়ার বই-এর আলমারি। পিছনের দেয়ালে একটি এস্রাজ বুলছে। টেবিলের মাঝখানে ছোট্ট একটি জাপানী ট্রানজিস্টার রাখা আছে। ব্যোমকেশ ঘরের চারদিকে একবার সন্ধানী চোখ ফিরিয়ে বলল–’দীপা দেবীর দেখছি গানবাজনার শখ আছে।’
বিজয় বলল—’হ্যাঁ, একটু-আধটু এস্রাজ বাজাতেও জানে। নিজের চেষ্টাতে শিখেছে।’
‘লেখাপড়া কত দূর শিখেছেন?’
‘স্কুলের পড়া শেষ পর্যন্ত পড়েছে। কলেজে দেওয়া হয়নি।’
‘আপনার বাবা বাড়িতে আছেন?’
‘না। বাবা মা হাসপাতালে গেছেন।’
‘দেবাশিসবাবু ভাল আছেন। আমি টেলিফোনে খবর নিয়েছিলাম। বোধহয় দু-তিন দিনের মধ্যেই ছেড়ে দেবে।’
‘হ্যাঁ। আপনারা চা খাবেন?’
ব্যোমকেশ রাখালবাবুর দিকে একবার তাকিয়ে বলল–’আপত্তি কি? একবার হয়েছে, কিন্তু অধিকন্তু ন দোষায়।‘
‘আচ্ছা, আমি চা নিয়ে আসছি, আপনারা দেখুন। বই-এর আলমারির চাবি খুলে দিয়েছি। খাটের তলায় দুটো ট্রাঙ্ক আছে, তার চাবিও খোলা।’
বিজয় বেরিয়ে যাবার পর ব্যোমকেশ রাখালবাবুকে বলল–’ঘরে তল্লাশ করার মত বিশেষ কিছু নেই দেখছি। আমি বই-এর আলমারিটা দেখি, তুমি ততক্ষণ ট্রাঙ্ক দুটো হাঁটকাও।’
রাখালবাবু খাটের তলা থেকে ট্রাঙ্ক দুটো টেনে বার করলেন, ব্যোমকেশ আলমারি খুলে বই দেখতে লাগিল। বইগুলি বেশ পরিচ্ছন্নভাবে সাজানো; প্রথম সারিতে কবিতা আর গানের বই; সঞ্চয়িতা গীতবিতান দ্বিজেন্দ্রগীতি নজরুলগীতিকা প্রভৃতি। দ্বিতীয় থাকে। বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথের কয়েক ভলুম গ্রন্থাবলী। নীচের থাকে স্কুল-পাঠ্য বই। দীপা স্কুলে পড়ার সময় যে বইগুলি পড়েছিল সেগুলি যত্ন করে সাজিয়ে রেখেছে।
ব্যোমকেশ বইগুলি একে একে খুলে দেখল, কিন্তু কোথাও এমন কিছু পেল না। যা থেকে কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়। আধুনিক কোনো লেখকের বই আলমারিতে নেই, এমন কি শরৎচন্দ্রের বইও না; এ থেকে পারিবারিক গোঁড়ামির পরিচয় পাওয়া যায়, দীপার মানসিক প্রবণতার কোনো ইশারা তাতে নেই।
‘ব্যোমকেশদা, একবার এদিকে আসুন।’
ব্যোমকেশ রাখালবাবুর পাশে গিয়ে দাঁড়াল। তিনি একটা খোলা ট্রাঙ্কের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে আছেন, সামনে মেয়েলী জামাকাপড়ের স্তুপ, হাতে পোস্টকার্ড আয়তনের একটি সুদৃশ্য বাঁধানো খাতা। খাতাটি ব্যোমকেশের দিকে এগিয়ে দিয়ে রাখালবাবু বললেন-‘কাপড়-চোপড়ের তলায় ছিল। পড়ে দেখুন।’
অটোগ্রাফের খাতা। বেশির ভাগ পাতাই খালি, সামনের কয়েকটি পাতায় উদয়মাধব প্রভৃতি বাড়ির কয়েকজনের হস্তাক্ষর, দু-একটি মেয়েলী কাঁচা হাতের নাম দস্তখত। তারপর একটি পাতায় একজনের স্বাক্ষরের ওপর একটি কবিতার ভগ্নাংশ-তোমার চোখের বিজলী-উজল আলোকে, পরাণে আমার ঝঞ্ঝার মেঘ ঝলকে।–তারপর আর সব পৃষ্ঠা শূন্য।
অটোগ্রাফের খাতাটি যে দীপার তাতে সন্দেহ নেই। কারণ, মলাটের ওপরেই তার নাম লেখা রয়েছে।
যিনি রবীন্দ্রনাথের কবিতা একটু মোচড় দিয়ে উদ্ধৃত করেছেন তাঁর নামটি অপরিচিত নয়, তিনি বিশেষ একটি আড্ডার নিয়মিত সভ্য।
ব্যোমকেশ খাটো গলায় বলল–’হুঁ! আমাদের সন্দেহ তাহলে মিথ্যে নয়।’
বাইরে পায়ের শব্দ শোনা গেল। ব্যোমকেশ চট্ট করে অটোগ্রাফের খাতাটি পকেটে পুরে রাখালবাবুকে চোখের ইশারা করল।
বিজয় দুহাতে দু’ পেয়ালা চা নিয়ে এসে টেবিলের ওপর রাখল, বলল—’আসুন। কিছু পেলেন?’
রাখালবাবু কেবল গলার মধ্যে শব্দ করলেন, ব্যোমকেশ চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিয়ে বলল—’সত্যান্বেষণের পথ বড় দুৰ্গম। কোথায় কোন কানা গলির মধ্যে সত্য লুকিয়ে আছে, কে বলতে পারে! যাহোক, নিরাশ হবেন না, দু-চার দিনের মধ্যেই আসামী ধরা পড়বে।’
তারপর দু’জনে চা খেয়ে বেরিয়ে পড়ল। রাস্তায় যেতে যেতে রাখালবাবু বললেন–তাহলে এখন বাকি রইল শুধু আসামীকে গ্রেপ্তার করা। অবশ্য পাকা রকম সাক্ষীসাবুদ না পাওয়া পর্যন্ত তাকে পাকড়ানো যাবে না।’
ব্যোমকেশ বলল-না, তাকে পাকড়াবার একটা ফন্দি বার করতে হবে। কিন্তু তার আগে নিঃসংশয়ভাবে জানা দরকার, দেবাশিসের স্ত্রী এ ব্যাপারে কতখানি লিপ্ত আছে।’
হাসপাতালে ডাক্তার গুপ্ত ব্যবস্থা করে দিলেন। একটি নিভৃত ঘরে দীপার সঙ্গে ব্যোমকেশ ও রাখালবাবুর কথা হল। ব্যোমকেশ বলল–’আমরা আপনাকে কয়েকটা প্রশ্ন করতে চাই। কেন প্রশ্ন করতে চাই এখন জানতে চাইবেন না, পরে আপনিই জানতে পারবেন।’
দীপা সহজভাবে বলল—’কি জানতে চান, বলুন।’ তার মুখে আতঙ্কের ভাব আর নেই, সে তার স্বাভাবিক সাহস অনেকটা ফিরে পেয়েছে।
সওয়াল জবাব আরম্ভ হল। রাখালবাবু অচঞ্চল চোখে দীপার মুখের পানে চেয়ে রইলেন।
ব্যোমকেশ বলল–’নৃপতি লাহা নামে একটি ভদ্রলোকের বাড়িতে যাঁদের নিয়মিত আড্ডা বসে তাঁদের আপনি চেনেন?
দীপার চোখের দৃষ্টি সতর্ক হল, সে বলল—’হ্যাঁ, চিনি। ওঁরা সবাই আমার দাদার বন্ধু।’
‘ওঁরা আপনার বাপের বাড়িতে যাতায়াত করেন?’
‘বাড়িতে কাজকর্ম থাকলে আসেন।’
‘এঁদের নাম নৃপতি লাহা, সুজন মিত্র, কপিল বসু প্রবাল গুপ্ত, খড়্গ বাহাদুর। এঁদের ছাড়া আর কাউকে চেনেন?’
‘না, কেবল এদেরই চিনি।’
‘আচ্ছা, নৃপতি লোহা বিপত্নীক আপনি জানেন?’
‘…যেন শুনেছিলাম।’
‘এঁদের মধ্যে আর কারুর বিয়ে হয়েছে কিনা জানেন?’
‘বোধহয়… আর কারুর বিয়ে হয়নি।’
‘প্রবাল গুপ্ত কি বিবাহিত?’
‘ঠিক জানি না…বোধ হয় বিবাহিত নয়।’
‘প্রবাল গুপ্ত বিবাহিত…সম্প্রতি স্ত্রী-বিয়োগ হয়েছে।’
‘…আমি জানতাম না।’
‘যাক। কপিল বসু লোকটিকে আপনার কেমন লাগে?
‘ভালই তো।’
‘ওর সম্বন্ধে কোনো কুৎসা শুনেছেন?’
‘না।’
‘আর সুজন মিত্র? সে সিনেমার আর্টিস্ট, তার সম্বন্ধে কিছু শোনেননি?’
‘না, ও-সব আমি কিছু শুনিনি।’
‘আপনি সিনেমা দেখতে ভালবাসেন?’
‘হ্যাঁ।’
‘সুজন মিত্রের অভিনয় কেমন লাগে?
‘খুব ভাল।’
‘উনি কেমন লোক?’
‘দাদার বন্ধু, ভালই হবেন। দাদা মন্দ লোকের সঙ্গে বন্ধুত্ব করেন না।’
‘তা বটে। আপনি ফুটবল খেলা দেখেছেন?’
‘ছেলেবেলায় দেখেছি, যখন স্কুলে পড়তুম।’
‘খড়্গ বাহাদুরের খেলা দেখেছেন?’
‘না… রেডিওতে খেলার কমেন্টারি শুনেছি।’
‘এবার শেষ প্রশ্ন। —আপনার স্বামীর হৃদযন্ত্র বুকের ডান দিকে আপনি জানেন?’
ব্যোমকেশ ভ্রূ তুলে চাইল-‘জানেন?’
‘হ্যাঁ, কিছুদিন আগে দুপুর রাত্রে আমার স্বামীর কম্প দিয়ে জ্বর এসেছিল। আমাকে ডাক্তার ডাকতে বললেন। আমি জানতুম না ওঁদের পারিবারিক ডাক্তার কে, তাই আমার বাপের বাড়ির ডাক্তারকে ফোন করলাম। সেনকাকা এসে ওঁকে পরীক্ষা করলেন, তারপর যাবার সময় আমাকে আড়ালে বলে গেলেন যে, ওঁর হৃদযন্ত্র উল্টে দিকে। এরকম নাকি খুব বেশি দেখা যায় না।’
প্রকাণ্ড হাফ-ছাড়া নিশ্বাস ফেলে ব্যোমকেশ উঠে দাঁড়াল, বলল—’আমার বুক থেকে একটা বোঝা নেমে গেল। আর কিছু জানবার নেই, আপনি স্বামীর কাছে যান। — চলো রাখাল।’
হাসপাতালের বাইরে এসে ব্যোমকেশ রাখালবাবুকে প্রশ্ন করল—’কি দেখলে? কি বুঝলে?’ রাখালবাবু বললেন–কোনো ভুল নেই, মেয়েটি নির্দোষ। প্রতিক্রিয়া যখন যেমনটি আশা করা গিয়েছিল, ঠিক তেমনটি পাওয়া গেছে। এখন কিং কর্তব্য?’
ব্যোমকেশ বলল—‘এখন তুমি থানায় যাও, আমি বাড়ি যাই। ভাল কথা, একটা বুলেট-প্রুফ গেঞ্জি যোগাড় করতে পার?’
‘পারি। কী হবে?’
‘একটা আইডিয়া মাথায় এসেছে। আজ রাত্রে গেঞ্জি নিয়ে আমার বাড়িতে এস, তখন বলব?’
সন্ধ্যের পর ব্যোমকেশ একা নৃপতির আড্ডায় গেল। সকলেই উপস্থিত ছিল, ব্যোমকেশকে ছেঁকে ধরল। নৃপতি তার সামনে সিগারেটের কৌটো খুলে ধরে বলল—’খবর নিয়েছি। দু-এক দিনের মধ্যেই দেবাশিসকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেবে। ওর বিপন্মুক্তি উপলক্ষে আমি পার্টি দেব, আপনাকে আসতে হবে।’
ব্যোমকেশ বলল–’নিশ্চয় আসব।’
কপিল ব্যোমকেশের গা ঘেঁষে বসে আবদারের সুরে বলল–’আপনার সত্যান্বেষণ কত দূর অগ্রসর হল, বলুন না ব্যোমকেশবাবু।’
ব্যোমকেশ হেসে বলল—’দিল্লী দূরস্ত। শজারুর কাঁটার ওস্তাদটি কে তা এখনো জানা যায়নি। তবে একটা থিওরি খাড়া করেছি।’
সুজন গলা বাড়িয়ে বলল—’কি রকম থিওরি?’
ব্যোমকেশ সিগারেটে কয়েকটা ধীর মন্থর টান দিয়ে বলতে আরম্ভ করল—’ব্যাপারটা হচ্ছে এই। কোনো একজন অজ্ঞাত লোক শজারুর কাঁটা দিয়ে প্রথমে একটা ভিখিরিকে খুন করল, তারপর এক মজুরকে খুন করল, তারপর আবার খুন করল এক দোকানদারকে। এবং সর্বশেষে দেবাশিসবাবুকে খুন করবার চেষ্টা করল। চার বারই অস্ত্র হচ্ছে শজারুর কাঁটা। অর্থাৎ হত্যাকারী জানাতে চায় যে চারটি হত্যাকার্য একই লোকের কাজ।
‘এখন হত্যাকারী যদি পাগল হয় তাহলে কিছুই করবার নেই। পাগল অনেক রকম হয়; এক ধরনের পাগল আছে যাদের পাগল বলে চেনা যায় না; তারা অত্যন্ত ধূর্ত, তাদের খুন করার কোনো যুক্তিসঙ্গত মোটিভ থাকে না। এই ধরনের পাগলকে ধরা বড় কঠিন।
‘কিন্তু যদি পাগল না হয়? যদি পুলিসের চোখে ধুলো দেবার জন্যে কেউ পাগল সেজে শজারুর কাঁটার ফন্দি বার করে থাকে? মনে করুন, দেবাশিসবাবুর এমন কোনো গুপ্ত শত্ৰু আছে। যে তাঁকে খুন করতে চায়। সরাসরি খুন করলে ধরা পড়ার ভয় বেশি, তাই সে ভিখিরি খুন করে কাজ আরম্ভ করল; তারপর মজুর, তারপর দোকানদার, তারপর দেবাশিসবাবু। স্বভাবতাই মনে হবে দেবাশিসবাবু হত্যাকারীর প্রধান লক্ষ্য নয়, একটা বিকৃতমস্তিষ্ক লোক যখন যাকে সুবিধে পাচ্ছে খুন করে যাচ্ছে। হত্যাকারী যে দেবাশিসবাবুকেই খুন করবার জন্যে এত ভণিতা করেছে। তা কেউ বুঝতে পারবে না। —এই আমার থিওরি।’
কিছুক্ষণ ঘর নিস্তব্ধ হয়ে রইল, তারপর নৃপতি বলল—’কিন্তু মনে করুন। এর পর আবার একটা খুন হল শজারুর কাঁটা দিয়ে! তখন তো বলা চলবে না যে দেবাশিসই হত্যাকারীর আসল লক্ষ্য।’
ব্যোমকেশ বলল–’না। তখন আবার নতুন রাস্তা ধরতে হবে।’
কপিল বলল–’খুনীকে কি ধরা যাবে?
ব্যোমকেশ বলল–’চেষ্টার ত্রুটি হবে না।’
এমন সময় কফি এল। প্রবাল উঠে গিয়ে পিয়ানোতে মৃদু টুং-টাং আরস্তু করল। ব্যোমকেশ কফি শেষ করে আরো কিছুক্ষণ গল্পসল্প করে বাড়ি ফিরে চলল।
ব্যোমকেশ বাড়ি ফিরে আসার কয়েক মিনিট পরে পৌনে ন’টার সময় রাখালবাবু এলেন। তাঁর হাতে একটি মোড়ক। ব্যোমকেশ বলল–’এনেছ?’
রাখালবাবু মোড়ক খুলে দেখালেন; ব্রোকেডের মত কাপড় দিয়ে তৈরি একটি ফতুয়া, কিন্তু সোনালী বা রূপালী জরির ব্রোকোড নয়, স্টীলের জরি দিয়ে তৈরি। ঘন-পিনদ্ধ লৌহ-জালিক। জামার ভিতরে পরলে বাইরে থেকে বোঝা যায় না, কিন্তু এই কঠিন বর্ম ভেদ করা ছোরাছুরি তো দূরের কথা, পিস্তল রিভলবারেরও অসাধ্য।
ব্যোমকেশ জামাটি নিয়ে নেড়েচেড়ে পাশে রাখল, বলল—’আমার গায়ে ঠিক হবে। এখন আর একটা কথা বলি; আমাদের শজারুর পিছনে লেজুড় লাগাবার ব্যবস্থা করেছ?’
রাখালবাবু বললেন–সব ব্যবস্থা হয়েছে। আজ রাত্ৰি সাতটা থেকে লেজুড় লেগেছে, এক লহমার জন্যে তাকে চোখের আড়াল করা হবে না। দিনের বেলাও তার পিছনে লেজুড় থাকবে।’
ব্যোমকেশ বলল–’বেশ। এখন এস পরামর্শ করি। আমি পুকুরে চার ফেলে এসেছি–’
খাটো গলায় দু’জনের মধ্যে অনেকক্ষণ পরামর্শ হল। তারপর সাড়ে ন’টা বাজলে রাখালবাবু ওঠবার উপক্রম করছেন, এমন সময় টেলিফোন বেজে উঠল।
ব্যোমকেশ ফোন তুলে নিয়ে বলল—’হ্যালো।’
অপর প্রাস্ত থেকে চেনা গলা শোনা গেল–’ব্যোমকেশবাবু? আপনি একলা আছেন?’
ব্যোমকেশ রাখালবাবুর দিকে সঙ্কেত-ভরা দৃষ্টিপাত করে বলল—’হ্যাঁ, একলা আছি। আপনি–’
‘গলা শুনে চিনতে পারছেন না?’
‘না। আপনার নাম?’
‘যখন গলা চিনতে পারেননি। তখন নাম না জানলেও চলবে। আজ সন্ধ্যের পর আপনি যেখানে গিয়েছিলেন সেখানে আমি ছিলাম। একটা গোপন খবর আপনাকে দিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু সকলের সামনে বলতে পারলাম না।’
‘গোপন খবর! শজারুর কাঁটা সম্বন্ধে?’
‘হ্যাঁ। আপনি যদি আজ রবীন্দ্র সরোবরের বড় ফটকের কাছে আসেন আপনাকে বলতে পারি।‘
‘বেশ তো, বেশ তো। কখন আসব বলুন।’
‘যত শীগগির সম্ভব। আমি অপেক্ষা করব। একলা আসবেন কিন্তু। অন্য কারুর সামনে আমি কিছু বলব না।’
‘বেশ। আমি পাঁচ মিনিটের মধ্যে বেরুচ্ছি।’
টেলিফোন রেখে ব্যোমকেশ যখন রাখালবাবুর দিকে তাকাল তার চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে। পাঞ্জাবির বোতাম খুলতে খুলতে সে বলল, ‘টোপ ফেলার সঙ্গে সঙ্গে মাছ টোপ গিলেছে। এত শীগগির ওষুধ ধরবে ভাবিনি। রাখাল, তুমি—’
ব্যোমকেশ পাঞ্জাবি খুলে ফেলল, রাখালবাবু তাকে বুলেট-প্রুফ ফতুয়া পরাতে পরাতে বললেন—’আমার জন্যে ভাববেন না, আমি ঠিক যথাস্থানে থাকব। শজারুর পিছনে লেজুড় আছে, তিনজনে মিলে শজারুকে কাবু করা শক্ত হবে না।’
‘বেশ।’
ব্যোমকেশ ফতুয়ার ওপর আবার পাঞ্জাবি পরিল, তারপর রাখালবাবুর দিকে একবার অর্থপূর্ণ ঘাড় নেড়ে বেরিয়ে গেল। রাখালবাবু কব্জিতে ঘড়ি দেখলেন, দশটা বাজতে কুড়ি মিনিট। তিনিও বেরিয়ে পড়লেন। প্রচ্ছন্নভাবে যথাস্থানে যথাসময়ে উপস্থিত থাকতে হবে।
রবীন্দ্র সরোবরের সদর ফটকের সামনে লোক চলাচল নেই; কদাচিৎ একটা বাস কিংবা মোটর হুস করে সাদার্ন অ্যাভেনু দিয়ে চলে যাচ্ছে।
ব্যোমকেশ দ্রুতপদে সাদার্ন অ্যাভেনু রাস্তা পেরিয়ে ফটকের সামনে গিয়ে দাঁড়াল; এদিক-ওদিক তাকাল কিন্তু কাউকে দেখতে পেল না। রবীন্দ্র সরোবরের ভিতরে আলো-আঁধারিতে জনমানব চোখে পড়ে না।
ব্যোমকেশ ফটকের মাঝখানে দাঁড়িয়ে খানিক ইতস্তত করল, তারপর ভিতর দিকে অগ্রসর হল। দু-চার পা এগিয়েছে, একটি লোক অদূরের গাছের ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে দাঁড়াল, হাত তুলে ব্যোমকেশকে ইশারা করে ডাকল। ব্যোমকেশ তার কাছে গেল, লোকটি বলল, চলুন, ওই বেঞ্চিতে বসা যাক।।’
জলের ধারে গাছের তলায় বেঞ্চি পাতা। ব্যোমকেশ গিয়ে বেঞ্চিতে ডানদিকের কিনারায় বসল। চারিদিকের ঝিকিমিকি আলোতে অস্পষ্টভাবে মুখ দেখা যায়, তার বেশি নয়। ব্যোমকেশ বলল—‘এবার বলুন, আপনি কি জানেন।’
লোকটি বলল–’বলছি। দেখুন, যার কথা বলতে চাই সে আমার ঘনিষ্ঠ লোক, তাই বলতে সঙ্কোচ হচ্ছে। সিগারেট আছে?’
ব্যোমকেশ সিগারেটের প্যাকেট বার করে দিল; লোকটি সিগারেট নিয়ে প্যাকেট ব্যোমকেশকে ফেরত দিল, নিজের পকেট থেকে বোধকরি দেশলাই বার করতে করতে হঠাৎ বলে উঠল—’দেখুন, দেখুন কে আসছে।’ তার দৃষ্টি ব্যোমকেশকে পেরিয়ে পাশের দিকে প্রসারিত, যেন ব্যোমকেশের দিক থেকে কেউ আসছে।
ব্যোমকেশ সেই দিকে ঘুরে বসল। সে প্রস্তুত ছিল, অনুভব করল তার পিঠের বাঁ দিকে বুলেট-প্রুফ আবরণের ওপর চাপ পড়ছে। ব্যোমকেশ বিদ্যুদ্বেগে পিছু ফিরল। লোকটি তার পিঠে শজারুর কাঁটা বিঁধিয়ে দেবার চেষ্টা করছিল, পলকের জন্যে হতবুদ্ধির মত চাইল, তারপর দ্রুত উঠে পালাবার চেষ্টা করল। কিন্তু ব্যোমকেশের বজ্রমুষ্টি লোহার মুগুরের মত তার চোয়ালে লেগে তাকে ধরাশায়ী করল।
ইতিমধ্যে আরো দু’টি মানুষ আলাদিনের জিনের মত আবির্ভূত হয়েছিল, তারা ধরাশায়ী লোকটির দু’হাত ধরে টেনে দাঁড় করাল। রাখালবাবু তার হাত থেকে শজারুর কাঁটা ছিনিয়ে নিয়ে বললেন–’প্রবাল গুপ্ত, তুমি তিনজনকে খুন করেছ এবং দু’জনকে খুন করবার ব্যর্থ চেষ্টা করেছ। চল, এবার থানায় যেতে হবে।’
হাপ্ত দুই পরে একদিন মেঘাচ্ছন্ন সকালবেলা ব্যোমকেশের বসবার ঘরে পারিবারিক চায়ের আসর বসেছিল। অজিত ছিল, সত্যবতীও ছিল। গত রাত্রি থেকে বর্ষণ আরম্ভ হয়েছে, মাঝে মাঝে থামছে, আবার আরম্ভ হচ্ছে। গ্রীষ্মের রক্তিম ক্ৰোধ মেহে বিগলিত হয়ে গেছে।
অজিত বলল–’এমন একটা গাইয়ে লোককে তুমি পুলিসে ধরিয়ে দিলে! লোকটা বড় ভাল গায়।–সত্যিই এতগুলো খুন করেছে?’
সত্যবতী বলল—’লোকটা নিশ্চয় পাগল।’
ব্যোমকেশ বলল—’প্রবাল গুপ্ত পাগল নয়; কিন্তু একেবারে প্রকৃতিস্থ মানুষও নয়। অবস্থাপন্ন ঘরের ছেলে ছিল, হঠাৎ দৈব-দুর্বিপাকে গরীব হয়ে গেল; দারিদ্র্যের তিক্ত রসে ওর মনটা বিষিয়ে উঠল। ওর চরিত্রে ষড়রিপুর মধ্যে দুটো বলবান-লোভ আর ঈর্ষা। দারিদ্র্যের আবহাওয়ায় এই দুটো রিপু তাকে প্রকৃতিস্থ থাকতে দেয়নি।’
সত্যবতী বলল–’সব কথা পরিষ্কার করে বল। তুমি বুঝলে কি করে যে প্রবাল গুপ্তই আসামী?’
ব্যোমকেশ পেয়ালায় দ্বিতীয়বার চা ঢেলে সিগারেট ধরাল। আস্তে-আস্তে ধোঁয়া ছেড়ে অলস কণ্ঠে বলতে শুরু করল—
‘এই রহস্যর চাবি হচ্ছে শজারুর কাঁটা। আততায়ী যদি পাগল হয় তাহলে আমরা অসহায়, বুদ্ধির দ্বারা তাকে ধরা যাবে না। কিন্তু যদি পাগল না হয় তখন ভেবে দেখতে হবে, সে ছোরা-ছুরি ছেড়ে শজারুর কাঁটা দিয়ে খুন করে কেন? নিশ্চয় কোনো উদ্দেশ্য আছে। কী সেই উদ্দেশ্য?
দেখা যাচ্ছে, প্রত্যেকবার আততায়ী শজারুর কাঁটা মৃতদেহে বিঁধে রেখে দিয়ে যায়, অৰ্থাৎ সে জানাতে চায় যে, এই খুনগুলো একই লোকের কাজ। যে ভিখিরিকে খুন করেছে, সেই মজুরকে খুন করেছে এবং দোকানদারকেও খুন করেছে। প্রশ্ন হচ্ছে—কেন?
আমার কাছে এ প্রশ্নের একমাত্র উত্তর-ভিখিরি থেকে দোকানদার পর্যন্ত কেউ হত্যাকারীর আসল লক্ষ্য নয়, আসল লক্ষ্য অন্য লোক। কেবল পুলিসের চোখে ধুলো দেবার জন্যে হত্যাকারী এলোপাথাড়ি তিনটে খুন করেছে, যাতে পুলিস কোনো মোটিভ খুঁজে না পায়।
তারপর চেষ্টা হল শজারুর কাঁটা দিয়ে দেবাশিসকে খুন করবার। দেবাশিস দৈব কৃপায় বেঁচে গেল, কিন্তু আততায়ী কে তা জানা গেল না।
আমার সত্যান্বেষণ আরম্ভ হল এইখান থেকে। দেবাশিসই যে হত্যাকারীর চরম লক্ষ্য তা এখনো নিঃসংশয়ে বলা যায় না, কিন্তু মনে হয় তার ওপরে আর কেউ নেই। ভিখিরি থেকে শিল্পপতি, তার চেয়ে উঁচুতে আর কেউ না থাকাই সম্ভব। যাহোক, তদারক করে দেখা যেতে পারে।
অনুসন্ধানের ফলে দেখা গেল, নৃপতির আড্ডায় যারা যাতায়াত করে তারা ছাড়া আর কারুর সঙ্গে দেবাশিসের বিশেষ ঘনিষ্টতা নেই; ফ্যাক্টরির লোকেরা তাকে ভালবাসে, ফ্যাক্টরিতে আজ পর্যন্ত একবারও স্ট্রাইক হয়নি। আর একটা তথ্য জানা গেল, বিয়ের আগে দীপা একজনের প্রেমে পড়েছিল, তার সঙ্গে পালাতে গিয়ে সে ধরা পড়ে গিয়েছিল। তারপরে দেবাশিসের সঙ্গে দীপার বিয়ে হয়।
দীপার গুপ্ত প্রণয়ী কে ছিল দীপা ছাড়া কেউ তা জানে না। কে হতে পারে? দীপার বাপের বাড়িতে গোঁড়া সাবেকী চাল, অনাত্মীয় পুরুষের সঙ্গে স্বাধীনভাবে মেলামেশার অধিকার দীপার নেই, কেবল দাদার বন্ধুরা যখন বাড়িতে আসে তখন তাদের সঙ্গে সামান্য মেলামেশার সুযোগ পায়। সুতরাং তার প্রেমিক সম্ভবত তার দাদারই এক বন্ধু, অর্থাৎ নৃপতি কিংবা তার আড্ডার একজন।
এই সঙ্গে একটা মোটিভও পাওয়া যাচ্ছে। দীপার ব্যর্থ প্রেমিক তার স্বামীকে খুন করবার চেষ্টা করতে পারে যদি সে নৃশংস এবং বিবেকহীন হয়। যে-লোক শজারুর কাঁটা দিয়ে তিনটে খুন করেছে সে যে নৃশংস এবং বিবেকহীন তা বলাই বাহুল্য। নৃপতির আড্ডায় যারা আসত তাদের সঙ্গে দেবাশিসের আলাপ মাত্র দু’মাসের। কেবল একজনের সঙ্গে তার স্কুল থেকে চেনাশোনা ছিল, সে প্রবাল গুপ্ত। চেনাশোনা ছিল কিন্তু সম্প্রীতি ছিল না। প্রবাল গুপ্ত যদি দীপার প্ৰেমাস্পদ হয়–
বাকি ক’জনকেও আমি নেড়েচেড়ে দেখেছি। নৃপতির একটি স্ত্রীলোক আছে, তার কাছে সে মাঝে মাঝে গভীর রাত্রে অভিসারে যায়। সুজন মিত্র ব্যর্থ প্রেমিক, সে যাকে ভালবাসে বছরখানেক আগে তার বিয়ে হয়ে গেছে। খড়্গ বাহাদুর এবং কপিলের জীবনে নারী-ঘটিত কোনো জটিলতা নেই। খড়্গ বাহাদুর শুধু ফুটবলই খেলে না, জুয়াও খেলে। কপিল আদর্শবাদী ছেলে, পৃথিবীর চেয়ে আকাশেই তার মন বেশি বিচরণ করে।
কিন্তু আর বিস্তারিত ব্যাখ্যা দরকার নেই, সাঁটে বলছি। দীপার বাপের বাড়িতে তার ঘর তল্লাশ করে পাওয়া গেল একটি অটোগ্রাফের খাতা; তাতে নৃপতির আড্ডার কেবল একটি লোকের হস্তাক্ষর আছে, সে প্রবাল গুপ্ত। প্রবাল লিখেছে-তোমার চোখের বিজলি-উজিল আলোকে, পরাণে আমার ঝঞ্ঝার মেঘ ঝলকে। তার কথায় কোনো অস্পষ্টতা নেই। আরো জানা গেল দীপা গান ভালবাসে, কিন্তু প্রবাল যে বিবাহিত তা সে জানে না। সুতরাং কে গানের ফাঁদ পেতে দীপাকে ধরেছে তা জানতে বাকি রইল না।
তারপর আর একটি কথা লক্ষ্য করতে হবে। যেদিন ভোরবেলা ভিখিরিকে শজারুর কাঁটা দিয়ে মারা হয় সেইদিন রাত্রে দীপার ফুলশয্যা। সমাপতনটা আকস্মিক নয়।
এবার প্রবালের দিক থেকে গল্পটা শোন।
যারা জন্মাবধি গরীব, দারিদ্র্যে তাদের লজ্জা নেই; কিন্তু যারা একদিন বড়মানুষ ছিল, পরে গরীব হয়ে গেছে, তাদের মনঃক্লেশ বড় দুঃসহ। প্রবালের হয়েছিল সেই অবস্থা। বাপ মারা যাবার পর সে অভাবের দারুণ দুঃখ ভোগ করেছিল, তার লোভী ঈর্ষালু প্রকৃতি দারিদ্র্যের চাপে বিকৃত হয়ে চতুর্গুণ লোভী এবং ঈর্ষালু হয়ে উঠেছিল। গান গেয়ে সে মোটামুটি গ্রাসাচ্ছাদন সংগ্রহ করতে পেরেছিল বটে, কিন্তু তার প্রাণে সুখ ছিল না। একটা রুগ্ন মরণাপন্ন মেয়েকে বিয়ে করার ফলে তার জীবন আরো দুৰ্বহ হয়ে উঠেছিল।
কিছুদিন আগে ওর বউ মারা গেল। বউ মরার আগে থাকতেই বোধহয় ও দীপার জন্যে ফাঁদ পেতেছিল; ও ভেবেছিল বড় ঘরের একমাত্র মেয়েকে যদি বিয়ে করতে পারে, ওর অবস্থা আপনা থেকেই শুধরে যাবে। দীপার চরিত্র যতাই দৃঢ় হোক, সে গানের মোহে প্রবালের দিকে আকৃষ্ট হল। মুখোমুখি দেখাসাক্ষাতের সুযোগ বেশি ছিল না। টেলিফোনে তাদের যোগাযোগ চলতে লাগল।
পালিয়ে গিয়ে দীপকে বিয়ে করার মতলব প্রবালের গোড়া থেকেই ছিল; দীপা যে ঠাকুরদার অনুমতি চাইতে গিয়েছিল সেটা নিতান্তাই লোক-দেখানো ব্যাপার। প্রবাল জানত বুড়ে রাজী হবে না। কিন্তু পালিয়ে গিয়ে একবার বিয়েটা হয়ে গেলে আর ভয় নেই, দীপাকে তার বাপ-ঠাকুরদা ফেলতে পারবে না।
দীপা বাড়ি থেকে পালাতে গিয়ে ধরা পড়ে গেল। তারপর তাড়াতাড়ি দেবাশিসের সঙ্গে তার বিয়ে দেওয়া হল।
প্রবালের মনের অবস্থাটা ভেবে দেখ। অন্য কারুর সঙ্গে দীপার বিয়ে হলে সে বোধহয় এমন ক্ষেপে উঠত না। কিন্তু দেবাশিস! হিংসেয় রাগে তার বুকের মধ্যে আগুন জ্বলতে লাগল।
বিয়ের সম্বন্ধ যখন স্থির হয়ে গেল তখন সে ঠিক করল দেবাশিসকে খুন করে তার বিধবাকে বিয়ে করবে। দীপা তখন স্বাধীন হবে, বাপের বাড়িয় শাসন আর থাকবে না। দীপাকে বিয়ে করলে দেবাশিসের সম্পত্তি তার হাতে থাকবে। একসঙ্গে রাজকন্যে এবং রাজত্ব। দেবাশিসের আর কেউ নেই প্রবাল তা জানত।
কিন্তু প্রথমেই দেবাশিসকে খুন করা চলবে না। তাহলে সে যখন দীপাকে বিয়ে করবে তখন সকলের সন্দেহ তার ওপর পড়বে। ক্রূর এবং নৃশংস প্রকৃতির প্রবাল এমন এক ফন্দি বার করল যে, কেউ তাকে সন্দেহ করতে পারবে না। শজারুর কাঁটার নাটকীয় খেলা আরম্ভ হল। তিনটি মানুষ বেঘোরে প্রাণ দিল।
যাহোক, প্রবাল দেবাশিসকে মারবার সুযোগ খুঁজছে। আমার বিশ্বাস সে সর্বদাই একটা শজারুর কাঁটা পকেটে নিয়ে বেড়াত; কখন সুযোগ এসে যায় বলা যায় না। একদিন হঠাৎ সুযোগ এসে গেল।
নৃপতির আড্ডাঘরের পাশের ঘরে টেলিফোন আছে। দোরের পাশে পিয়ানো, প্রবাল সেখানে বসে ছিল; শুনতে পেল খড়্গ বাহাদুর দেবাশিসকে টেলিফোন করছে, জানতে পারল ওরা রবীন্দ্র সরোবরের এক জায়গায় দেখা করবে। প্রবাল দেখল এই সুযোগ। শজারুর কাঁটা তার পকেটেই ছিল, সে যথাস্থানে গিয়ে গাছের আড়ালে লুকিয়ে রইল। তারপর–
প্রবাল জানত না যে প্রকৃতির দুর্জেয় খামখেয়ালির ফলে দেবাশিসের হৃৎপিণ্ডটা বুকের ডান পাশে আছে। দীপা অবশ্য জানত। কিন্তু প্রবাল যে দেবাশিসকে খুন করে তাকে হস্তগত করার মতলব করেছে তা সে বুঝতে পারেনি। হাজার হোক মেয়েমানুষের বুদ্ধি; বঙ্কিমচন্দ্র লিখেছেন, ‘কখনো অর্ধেক বৈ পুরা দেখিলাম না।’
এই হল গল্প। আর কিছু জানবার আছে?’
অজিত প্রশ্ন করল–’তোমাকে মারতে গিয়েছিল কেন?’
ব্যোমকেশ বলল–’আমি সেদিন ওদের আড়ায় গিয়ে বলে এসেছিলাম যে শজারুর কাঁটা দিয়ে যদি আর খুন না হয়, তাহলে বুঝতে হবে দেবাশিসই আততায়ীর প্রধান লক্ষ্য। তাই প্রবাল ঠিক করল আমাকে খুন করেই প্রমাণ করবে যে, দেবাশিস আততায়ীর প্রধান লক্ষ্য নয়; সাপও মরবে লাঠিও ভাঙবে না। আমি যে তাকে ধরবার জন্যেই ফাঁদ পেতেছিলাম তা সে বুঝতে পারেনি।’
সত্যবতী গভীর নিশ্বাস ফেলে বলল–’বাব্বা! কী রাক্কুসে মানুষ! দীপার কিন্তু কোনো দোষ নেই। একটা সহজ স্বাভাবিক মেয়েকে খাঁচার পাখির মত বন্ধ করে রাখলে সে উড়ে পালাবার চেষ্টা করবে না?’
খুটি খুঁট করে সদর দরজায় টোকা পড়ল। ব্যোমকেশ উঠে গিয়ে দোর খুলল–’আরে দেবাশিসবাবু যে! আসুন আসুন।’
দেবাশিস সঙ্কুচিতভাবে ঘরে প্রবেশ করল। সত্যবতী উঠে দাঁড়িয়েছিল, দেবাশিসের নাম শুনে পরম আগ্রহে তার পানে চাইল। দেবাশিসের চেহারা আবার আগের মত হয়েছে, দেখলে মনে হয় না সে সম্প্রতি যমের মুখ থেকে ফিরে এসেছে। সে হাত জোড় করে বলল–’আজ রাত্রে আমার বাড়িতে সামান্য খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন করেছি, আপনাদের সকলকে যেতে হবে।’
ব্যোমকেশ বলল—’বেশ, বেশ। বসুন। তা উপলক্ষটা কী?
দেবাশিস রুদ্ধ কণ্ঠে বলল–’ব্যোমকেশদা, আজ আমাদের সত্যিকার ফুলশয্যা। দীপাকে আমার সঙ্গে আনতে চেয়েছিলাম, কিন্তু সে লজ্জায় আধমরা হয়ে আছে, এল না। বউদি, আপনি নিশ্চয় আসবেন, নইলে দীপার লজ্জা ভাঙবে না।’
বেণীসংহার
এক
সকালবেলা ব্যোমকেশ তার কেয়াতলার বাড়িতে চায়ের পেয়ালা এবং খবরের কাগজ নিয়ে বসেছিল। শীতের সকাল, বেলা আন্দাজ আটটা। অজিত ইতিমধ্যেই তাড়াতাড়ি চা খেয়ে বেরিয়ে গেছে, একজন প্রখ্যাত লেখকের বাড়িতে গিয়ে দেখা করতে হবে। লেখক মহাশয় একটি নতুন বই দেবেন প্রতিশ্রুত হয়েছেন, কিন্তু প্রখ্যাত লেখকদের অনেক উমেদার, বইটা আগেভাগে হস্তগত করা দরকার।
খবরের কাগজে বিজ্ঞাপনের পাতাগুলি শেষ করে ব্যোমকেশ চায়ের পেয়ালা তুলে নিল। পেয়ালার অবশিষ্ট চা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে, সে এক চুমুকে পেয়ালা নিঃশেষ করে আবার কাগজ তুলে নিল। এবার খবর পড়তে হবে।
আজকাল খবরের কাগজ পড়লেই বোঝা যায় পৃথিবীর অবস্থা প্রকৃতিস্থ নয়। ভূমিকম্প জলোচ্ছাস অতিবৃষ্টি অনাবৃষ্টি তো আছেই, তা ছাড়া মানুষগুলোও যেন ক্ষেপে গেছে। যুদ্ধ বিপ্লব অন্তর্বিবাদ ধর্মঘট ঘেরাও বোমা কাঁদানে গ্যাস লাঠালাঠি। পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা এত বেড়ে গেছে বলেই বোধহয় কারুর প্রাণে শান্তি নেই। যেখানে এত গাদাগাদি ঠাসাঠাসি সেখানে শান্তি কোথা থেকে আসবে?
কাগজের পাতা ওল্টাতে হলো না। প্রথম পৃষ্ঠাতেই দেখা গেল এক ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের ব্বিরণ। পরশু রাত্রে খুন হয়েছে, কাল সকালে জনাজানি হয়, আজ কাগজে বেরিয়েছে। দক্ষিণ কলকাতার ঘটনা, ব্যোমকেশের বাড়ি থেকে বেশি দূর নয়; সদর রাস্তায় বেরিয়ে দক্ষিণে কিছু দূর গেলেই তিনতলা প্রকাণ্ড বাড়িটা চোখে পড়ে, তার কপালের ওপর বড় বড় অক্ষরে লেখা-বেণীমাধব। ব্যোমকেশ অনেকবার বাড়ির সামনে দিয়ে যাতায়াত করেছে। কিন্তু বাড়ির অধিবাসীদের সঙ্গে আলাপ ছিল না। কাগজ থেকে জানা গেল বাড়ির মালিক বৃদ্ধ বেণীমাধব চক্রবর্তী এবং তাঁর দেহরক্ষীকে কেউ নৃশংসভাবে হত্যা করেছে।
ব্যোমকেশ নিবিষ্ট মনে হত্যার ব্বিরণ পড়ল, তারপর অন্যমনস্কভাবে সিগারেট ধরাল। পরশু। রাত্রে পাড়াতে এমন একটা লোমহর্ষণ খুন হয়ে গেছে, অথচ সে খবর পায়নি। রাখাল এই এলাকার দারোগা, সে নিশ্চয় তদন্তের ভার নিয়েছে; কিন্তু ব্যোমকেশকে কিছু জানায়নি। হয়তো সোজাসুজি ব্যাপার, রহস্য বা জটিলতা কিছু নেই, তাই রাখাল আসেনি। আজকাল জটিল রহস্যও বড়ই দুর্লভ হয়ে পড়েছে—
টেলিফোন বেজে উঠল। ব্যোমকেশ হাত বাড়িয়ে ফোন কানের কাছে ধরতেই ওপার থেকে আওয়াজ এল–’ব্যোমকেশদা? আমি রাখাল। আজকের কাগজ পড়েছেন?’
ব্যোমকেশ বলল–’পড়েছি। বেণীসংহার?’
‘কি বললেন-বেণীসংহার? ওঃ হ্যাঁ হ্যাঁ, বেণীসংহারই বটে, তার সঙ্গে মেঘরাজ বধ। আমি অকুস্থল থেকে কথা বলছি।’
‘কি ব্যাপার?’
‘ব্যাপার একটু প্যাঁচালো ঠেকছে। কাল সকাল থেকে তদন্ত শুরু করেছি। এখনো কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। আপনি কি খুব ব্যস্ত আছেন?’
‘না।‘
‘তাহলে একবারটি এদিকে আসবেন? আপনার বাড়ি থেকে বেশি দূর নয়, পাঁচ মিনিটের রাস্তা। বাড়ির নাম বেণীমাধব।’
‘জানি।’
‘কখন আসছেন?’
‘অবিলম্বে।’
দুই
বেণীমাধব চক্রবর্তী সরকারি সামরিক বিভাগে কন্ট্রাক্টবি কাজ করে বিপুল অর্থ উপার্জন করেছিলেন। দক্ষিণ কলকাতায় সদর রাস্তার ওপর তাঁর প্রকাণ্ড তিনতলা বাড়িটা সেই অর্থের যৎকিঞ্চিৎ নিদর্শন।
বেণীমাধব সতর্কবুদ্ধির মানুষ ছিলেন। দীর্ঘকাল ঠিকেদারি করার ফলে মনুষ্য জাতির সততায় তিনি বিশ্বাস হারিয়েছিলেন। কিন্তু সেজন্যে তাঁর হৃদয়ধর্ম সংকুচিত হয়নি। সংসারের এবং সেইসঙ্গে নিজের দোষত্রুটি তিনি হাসিমুখে গ্রহণ করেছিলেন।
বেণীমাধবের পোষ্য বেশি ছিল না। যৌবন উত্তীর্ণ হবার পরই তিনি বিপত্নীক হয়েছিলেন; পত্নী রেখে যান একটি পুত্র ও একটি কন্যা। তারা বড় হলে বেণীমাধব তাদের বিয়ে দিলেন। ছেলে অজয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল একটি আস্ত অকর্মার ধাড়ি; ব্যবসা-বাণিজ্যের চেষ্টা করে বাপের কিছু টাকা নষ্ট করে পিতৃস্কন্ধে আরোহণ করেছিল; বেণীমাধব আর তাকে কাজে নিযুক্ত করবার চেষ্টা করেননি। তিনি বেশির ভাগ সময় বাইরে বাইরে থাকতেন, বাড়ির দ্বিতলে অজয় বাস করত তার স্ত্রী আরতি এবং পুত্রকন্যা মকরন্দ ও লাবণিকে নিয়ে। বেণীমাধব তার সংসারের খরচ দিতেন।
মেয়ের বিয়ে বেণীমাধব ভালই দিয়েছিলেন; জামাই গঙ্গাধরের পৈতৃক বিষয়-সম্পত্তি ছিল। কিন্তু বড়মানুষ শ্বশুর পেয়ে তার মেজাজ চড়ে গেল, সে রেস খেলে যথাসর্বস্ব উড়িয়ে দিল। মেয়ে গায়ত্রী বাপের কাছে এসে কেঁদে পড়ল। বেণীমাধব মেয়ে জামাই এবং দৌহিত্রী ঝিল্পীকে নিজের বাড়িতে তুললেন; ছেলেকে যেমন মাসহারা দিচ্ছেন মেয়ের জন্যেও তেমনি মাসহারা বরাদ্দ হলো।
বেণীমাধবের বাড়িটা তিনতলা, আগেই বলেছি। তেতলায় মাত্র তিনটি ঘর, বাকি জায়গায় বিস্তীর্ণ ছাদ। এই তেতলাটা বেণীমাধব নিজের জন্যে রেখেছিলেন, তিনি না থাকলে তেতিলা তালাবন্ধ থাকত। দোতলায় আটটি ঘর, সামনে টানা বারান্দা; এই তলায় বেণীমাধব তাঁর ছেলে অজয় ও মেয়ে গায়ত্রীকে পাশাপাশি থাকবার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। তাদের হাঁড়ি হেঁশেল অবশ্য আলাদা। দুই সংসারে মনের মিল ছিল না; কিন্তু প্রকাশ্যে ঝগড়া করবার সাহসও কারুর ছিল না। ছেলেমেয়ের প্রতি বেণীমাধবের স্নেহ ছিল; কিন্তু তিনি রাশভারী লোক ছিলেন, কড়া হতে জানতেন।
নীচের তলায় প্রকাণ্ড একটা হলঘর বিলিতি আসবাব দিয়ে ড্রয়িং-ক্লামের মত সাজানো; মাঝখানে নীচু গোল টেবিল, তাকে ঘিরে দুটো সোফা এবং গোটা কয়েক গদি-মোড়া ভারী চেয়ার, তাছাড়া আরো কয়েকটি কেঠো চেয়ার দেওয়ালের গায়ে সারি দিয়ে রাখা। কিন্তু ঘরটি বড় একটা ব্যবহার হয় না, কদাচিৎ কেউ দেখা করতে এলে অতিথিকে বসানো হয়। বাকি পাঁচখানা ঘর আগন্তুক অভ্যাগতদের জন্যে নির্দিষ্ট থাকলেও অধিকাংশ সময় তালাবন্ধ থাকত।
কিন্তু বেশি দিন তালাবন্ধ রইল না। বেণীমাধবের দুই মামাতো ছোট বোন ছিল, বহুদিন মারা গেছে; তাদের দুই ছেলে সনৎ গাঙ্গুলি ও নিখিল হালদার-পরম্পর মাসতুতো ভাই-কলকাতায় চাকরি করত; তাদের ভাল বাসা ছিল না, তাই বেণীমাধব তাদের নিজের বাড়িতে এনে রাখলেন। নীচের দু’টি ঘর নিয়ে তারা রইল।
দেখা যাচ্ছে, বেণীমাধবের ছেলে মেয়ে নাতি নাতনী এবং দুই ভাগনে মিলে সাতজন পোষ্য। বাড়িতে চাকর নেই, দুটো দাসী দিনের বেলা কাজ করে দিয়ে সন্ধ্যের সময় চলে যায়।
নিতান্তাই বৈচিত্র্যহীন পারিবেশ। শালা-ভগিনীপতির বয়স প্রায় সমান, তেতাল্লিশ চুয়াল্লিশ; কিন্তু তাদের মধ্যে মানসিক ঘনিষ্ঠতা নেই, দু’জনের আকৃতি প্রকৃতি দুরকম। অজয় সুশ্ৰী ও শৌখিন গোছের মানুষ, গিলে-করা ধুতি-পাঞ্জাবি ও পালিশ-করা পাম্প-শু ছাড়া সে বাড়ির বার হয় না। রোজ সকালে গড়িয়াহাটে বাজার করতে যাওয়াতে তার ঘোর আপত্তি্্, অধিকাংশ দিন তার স্ত্রী আরতিই বাজারে যায়। অজয় সন্ধ্যের পর ক্লাবে যায়; শখের থিয়েটারের প্রতি তার গাঢ় অনুরাগ। অভিনয় ভালই লাগে। ক্লাবটা শখের থিয়েটারেরই ক্লাব, প্রতি বছর তারা চার-পাঁচখানা নাটক অভিনয় করে।
গঙ্গাধরের চেহারাটা কাপালিক ধরনের; মুখে এবং দেহে মাংস কম, হাড় বেশি। চোখের দৃষ্টি খর। নিজের বিষয়সম্পত্তি উড়িয়ে দিয়ে শ্বশুরের স্কন্ধে আরোহণ করার পর সে অত্যন্ত গম্ভীর এবং মিতভাষী হয়ে উঠেছে। সারা দিন বাড়ি থেকে বেরোয় না, সন্ধ্যের পর লাঠি হাতে নিয়ে বেড়াতে বেরোয়। ঘন্টা দেড়েক পরে যখন ফিরে আসে তখন তার মুখ থেকে ভ্রূর ভুর করে মদের গন্ধ বের হয়।
ননন্দ-ভাজের মধ্যে প্রকাশ্যত সদ্ভাব ছিল, যাওয়া-আসা গল্পগুজবও চলত; কিন্তু সুবিধে পেলে কেউ কাউকে চিমটি কাটতে ছাড়িত না। গায়ত্রী হয়তো পাশের ফ্ল্যাটে গিয়ে বলল–’বৌদি, আজাকি রান্নাবান্না করলে?’
আরতি রান্নার ফর্দ দিয়ে বলত—’তুমি কি রাঁধলে ভাই?’
গায়ত্রী বলল–’রান্না আর হলো কই। ভাতের ফ্যান গেলে মাংস চড়াতে গিয়ে দেখি গরম মশলা নেই! জানো তো তোমার নন্দাই শাক-ভাত খেতে পারেন না! ওঁর মাছ না হলেও চলে কিন্তু রোজ মাংস চাই। তাই খোঁজ নিতে এলুম তোমার ভাঁড়ারে গরম মশলা আছে কিনা। নইলে আবার বিকে বাজারে পাঠাতে হবে।’
আরতি বলল–’আছে বৈকি, এই যে দিচ্ছি।’
গরম মশলা এনে দিয়ে আরতি হাসি-হাসি মুখে বলল–’নন্দাই মাংস ভালবাসেন তাতে দোষ নেই, কিন্তু ভাই, ও জিনিসটা না খেলেই পারেন।’
গায়ত্রীর দৃষ্টি অমনি কড়া হয়ে উঠল—’কোন জিনিস?’
আরতি ভালমানুষের মত মুখ করে বলল–’তোমার দাদা বলছিলেন সেদিন সন্ধ্যের পর নন্দাই-এর মুখোমুখি দেখা হয়েছিল, তা নন্দাই-এর মুখ থেকে ভক করে মদের গন্ধ বেরুল। নন্দাই-এর বোধহয় পুরনো অভ্যোস, ছাড়তে পারেন না, কিন্তু কথাটা যদি বাবার কানে ওঠে—‘
গায়ত্রীর কঠিন দৃষ্টি কুটিল হয়ে উঠল, সে মুখে একটা বাঁকা হাসি টেনে এনে বলল–’বাবার কানে যদি কথা ওঠে তাহলে তোমরাই তুলবে বৌদি। কিন্তু সেটা কি ভাল হবে? তোমার মেয়ের জন্য নাচের মাস্টার রেখেছ তাতে দোষ নেই কিন্তু লাবনি রাত দুপুর পর্যন্ত মাস্টারের সঙ্গে সিনেমা দেখে বাড়ি ফেরে সেটা কি ভাল? লাব্রণি কচি খুকি নয়, যদি একটা কেলেঙ্কারি করে বসে তাতে কি বাবা খুশি হবেন? গায়ত্রী আচল ঘুরিয়ে চলে গেল।
সেয়ানে সেয়ানে কোলাকুলি।
লাবণি মেয়েটি দেখতে ভাল; ছিপছিপে লম্বা গড়ন, নাচের উপযোগী চেহারা। একটু চপল প্রকৃতি, লেখাপড়া স্কুলের সীমানা পার হবার আগেই শেষ হয়েছে; নৃত্যকলার প্রতি তার দুরন্ত অক্টেরাগ। অজয় মেয়ের মনের প্রবণতা দেখে তার জন্যে নাচের মাস্টার রেখেছিল। মাস্টারটি বয়সে তরুণ, সম্পন্ন ঘরের ছেলে, নাম পরাগ লাহা; হাপ্তায় দুদিন লাবণিকে নাচ শেখাতে আসত। বাপ-মায়ের চোখের সামনে লাব্রণি নাচের মহলা দিত। কদাচিৎ পরাগ বলত—’একটা নাচ-গানের বিলিতি ছবি এসেছে, দুটো টিকিট কিনেছি। রাত্রির শোতে। লাবণিকে নিয়ে যাব? ছবিটা দেখলে ও অনেক শিখতে পারবে।’
গোড়ার দিকে আরতি রাজী হতো না। পরাগ বলত–’থাক, আমি অন্য কোনো ছাত্রীকে নিয়ে যাব।’
ক্রমে আপত্তি শিথিল হয়ে আসে, লাব্রণি পর্যাগের সঙ্গে ছবি দেখতে যায়; দুপুর রাত্রে পরাগ লাবণিকে বাড়ি পৌঁছে দেয়।
কালধৰ্মে সবই গা-সওয়া হয়ে যায়।
লাবণির দাদা মকরন্দ কলেজে পড়ে। কিন্তু পড়া নামমাত্র; কলেজে নাম লেখানো আছে। এই পর্যন্ত। তার মনের দিগন্ত জুড়ে আছে রাজনৈতিক দলাদলি, দলগত প্রয়োজনে যদি কলেজে যাওয়া প্রয়োজন হয় তবেই কলেজে যায়। তার চেহারা ভাল, কিন্তু মুখে চোখে একটা উগ্র ক্ষুধিত অসন্তোষ। সে বাড়িতে বেশি থাকে না; বাড়ির সঙ্গে কেবল খাওয়া আর শোয়ার সম্পর্ক। মাঝে মাঝে আরতির সংসার-খরচের টাকা অদৃশ্য হয়; আরতি বুঝতে পারে কে টাকা নিয়েছে, কিন্তু অশান্তির ভয়ে চুপ করে থাকে। মকরুন্দ তার থিয়েটার-বিলাসী বাপকে বিদ্বেষ করে, অজয়ও ছেলের চালচলন পছন্দ করে না; দু’জনে পরস্পরকে এড়িয়ে চলে। মকরন্দ যেন তার বাপ-মায়ের সংসারে অবাঞ্ছিত অতিথি।
পাশের ফ্ল্যাটে সংসার ছোট; কেবল একটি মেয়ে ঝিল্লী। ঝিল্লী লাবণির সমবয়সী, লাবণর মত সুন্দরী নয়, কিন্তু পড়াশোনায় ভাল। চাপা প্রকৃতির মেয়ে, কলেজে ভর্তি হয়েছে, নিয়মিত কলেজে যায়, লেখাপড়া করে, অবসর পেলে মাকে সংসারের কাজে সাহায্য করে। তার শান্ত মুখ দেখে মনের খবর পাওয়া যায় না।
এই গেল দোতলার মোটামুটি খবর।
নীচের তলার দু’টি ঘরে সনৎ আর নিখিল থাকে। সনতের বয়স ত্ৰিশের ওপর, নিখিলের ত্ৰিশের নীচে। চেহারার দিক থেকে দু’জনকেই সুপুরুষ বলা চলে। কিন্তু চরিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। সনৎ সংবৃতিচিত্ত ও মিতবাক, বিবেচনা না করে কথা বলে না। নিখিলের মুখে খৈ ফোটে, সে চটুল ও রঙ্গপ্রিয়। দু’জনেই সাংবাদিকের কাজ করে। সনৎ প্রেস-ফটোগ্রাফার। নিখিল খবরের কাগজের সংবাদ সম্পাদন বিভাগে নিম্নতর নিউজ এডিটর-এর কাজ করে। সে নিশাচর প্রাণী। —দেবতা ঘুমালে আমাদের দিন, দেবতা জাগিলে মোদের রাতি। ঋষ্যশৃঙ্গকে যারা প্রলুব্ধ করেছিল তাদেরই সমগোত্রীয়।
এরা কেউ বিয়ে করেনি। নিখিলের বিয়ে না করার কারণ, সে যা উপার্জন করে তাতে সংসার পাতা চলে না; কিন্তু সনতের সেরকম কোনো কারণ নেই। সে ভাল উপার্জন করে; মাতুলগৃহে তার বাস করার কারণ অর্থাভাব নয়, ভাল বাসার অভাব। তার বিবাহে অরুচির মূল অনুসন্ধান করতে হলে তার একটি গোপনীয় অ্যালবামের শরণ নিতে হয়। অ্যালবামে অনেকগুলি কুহকিনী যুবতীর সরস ফটো আছে। ফটোগুলি দেখে সন্দেহ করা যেতে পারে যে, সনৎ অবিবাহিত হলেও ব্রহ্মচারী নয়। কিন্তু সে অত্যন্ত সাবধানী লোক। সে যদি বিবাহের বদলে মধুকরবৃত্তি অবলম্বন করে থাকে, তাহলে তা সকলের অজান্তে।
এই সাতটি মানুষ বাড়ির স্থায়ী বাসিন্দা। বেণীমাধব নামাসে ছ’মাসে আসেন, দুদিন থেকে আবার দিল্লী চলে যান। দিল্পীই তাঁর কর্মক্ষেত্রের কেন্দ্রবিন্দু।
হঠাৎ সাতষট্টি বছর বয়সে বেণীমাধবের স্বাস্থ্যভঙ্গ হলো। তাঁর শরীর বেশ ভালই ছিল। অসম্ভব পরিশ্রম করতে পারতেন। কিন্তু তাঁর প্রিয় ভূত্য এবং দীর্ঘদিনের অনুচর রামভজনের মৃত্যুর পর তিনি আর বেশি দিন খাড়া থাকতে পারলেন না। তিন মাসের মধ্যে তিনি ব্যবসা গুটিয়ে ফেললেন। তাঁর টাকার দরকার ছিল না, বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত কাজের ঝোঁকেই কাজ করে যাচ্ছিলেন। এখন দিল্লীর অফিস তুলে দিয়ে তিনি কলকাতায় ফিরে এলেন। সঙ্গে এল নতুন চাকর মেঘরাজ।
রামভজনের মৃত্যুর পর বেণীমাধব মেঘরাজকে খাস চাকর রেখেছিলেন। মেঘরাজ ভারতীয় সেনাদলের একজন সিপাহী ছিল; চীন-ভারত যুদ্ধে আহত হয়ে তার একটা পা হাঁটু পর্যন্ত কাটা যায়। ভারতীয় সেনাবিভাগের পক্ষ থেকে তাকে কৃত্রিম পা দেওয়া হয়েছিল এবং সামান্য পেনসন দিয়ে বিদায় করা হয়েছিল। সে বেণীমাধবের দিল্লীর অফিসে দরোয়ানের কাজ পেয়ে গ্রাসাচ্ছাদনের ব্যবস্থা করেছিল; রামভজনের মৃত্যুর পর বেণীমাধব তাকে খাস চাকরের কাজ দিলেন। মেঘরাজ অত্যন্ত বিশ্বাসী এবং কড়া প্রকৃতির মানুষ; সে বেণীমাধবের একক সংসারের সমস্ত কাজ নিজের হাতে তুলে নিল; তাঁর দাড়ি কামানো থেকে জুতো বুরুশ পর্যন্ত সব কাজ করে। তার বয়স আন্দাজ চল্লিশ; বলিষ্ঠ চেহারা। কৃত্রিম পায়ের জন্য একটু খুঁড়িয়ে চলে।
যাহোক, বেণীমাধব এসে কলকাতার বাড়িতে অধিষ্ঠিত হলেন। তেতলার অংশে নিত্য ব্যবহারের সব ব্যবস্থাই ছিল, কেবল ফ্রিজ আর টেলিফোন ছিল না। দুচার দিনের মধ্যে ফ্রিজ এবং টেলিফোনের সংযোগ স্থাপিত হলো। ইতিমধ্যে মেয়ে গায়ত্রী এসে আবদার ধরেছিল–’বাবা, এবার আমি তোমার খাবার ব্যবস্থা করব। আগে তুমি যখনই আসতে দাদার কাছে খেতে। আমরা কি কেউ নই?’
বেণীমাধব বলেছিলেন—’আমি তো একলা নাই, মেঘরাজ আছে।’
‘মেঘরাজ বুঝি নতুন চাকরের নাম? আহা, বুড়ো রামভজন মরে গেল। তা মেঘরাজকেও আমি খাওয়াব।’
বেণীমাধব বিবেচনা করে বললেন–’বেশ, কিন্তু তাতে তোমার খরচ বাড়বে। আমি তোমার মাসিক বরাদ্দ আরো দেড়শো টাকা বাড়িয়ে দিলাম।’
গায়ত্রী হেসে বলল–’সে তোমার যেমন ইচ্ছে।’ তার বোধহয় মনে মনে এই মতলবই ছিল; সে মাসে সাড়ে সাতশো টাকা পেত, এখন না শো টাকায় দাঁড়াল।
কলকাতায় এসেই বেণীমাধব তার পুরনো বন্ধু ডাক্তার অবিনাশ সেনকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। ডাক্তার অবিনাশ সেন নামকরা ডাক্তার, বয়সে বেণীমাধবের চেয়ে কয়েক বছরের ছোট। তিনি একদিন বেণীমাধবকে নিজের ক্লিনিকে নিয়ে গিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করলেন; এক্স-রে, ই সি জি প্রভৃতি যান্ত্রিক পরীক্ষা হলো। তারপর ডাক্তার সেন বললেন—’দেখুন, আপনার শরীরে সিরিয়াস কোনো ব্যাধি নেই, যা হয়েছে তা হলো বার্ধক্যের স্বাভাবিক সবাঙ্গীন অবক্ষয়। আমি আপনাকে ওষুধ-বিষুধ কিছু দেব না, কেবল শরীরের গ্রন্থিগুলোকে তাজা রাখবার জন্যে মাসে একটা করে ইনজেকশন দেব। আসলে আপনি বয়সের তুলনায় বড় বেশি পরিশ্রম করেছিলেন। এখন থেকে পরিপূর্ণ বিশ্রাম; বই পড়ুন, রেডিও শুনুন, রোজ বিকেলে একটু বেড়ান। এখনো অনেক দিন বাঁচবেন।’
বেণীমাধব ইনজেকশন নিয়ে সানন্দে বাড়ি ফিরে এলেন।
তারপর দিন কাটতে লাগল। গায়ত্রী নিজের হাতে থালা সাজিয়ে এনে ব্যাপকে খাইয়ে যায়। অন্য সকলে আসা-যাওয়া করে। মকরুন্দ বড় একটা আসে না, এলেও দু’ মিনিট থেকে চলে যায়। নাতনীরা থাকে, বেণীমাধবের সঙ্গে গল্প করে। ঝিল্লী পড়াশুনায় ভালো জেনে বৃদ্ধ সুখী হন; লাব্রণি নাচ শিখছে শুনেও তিনি অপ্রীত হন না। তিনি বয়সে প্রবীণ হলেও প্রাচীনপন্থী নন। সব মেয়েই যখন নাচছে তখন তাঁর নাতনী নাচবে না কেন?
দিন কুড়ি-পঁচিশ কাটবার পর হঠাৎ একদিন বেণীমাধবের শরীর খারাপ হলো; উদরাময়, পেটের যন্ত্রণা। ডাক্তার সেন এলেন, পরীক্ষা করে বললেন–খাওয়ার অত্যাচার হয়েছে, খাওয়া সম্বন্ধে ধরা-বাঁধার মধ্যে থাকতে হবে।’
বাড়ির সকলেই উপস্থিত ছিল। গায়ন্ত্রী শুকনো মুখে বলল–’কিন্তু ডাক্তারবাবু্, আমি তো বাবাকে এমন কিছু খেতে দিইনি। যাতে ওঁর শরীর খারাপ হতে পারে।’
ডাক্তার কোনো কথা বললেন না, ওষুধের প্রেসক্রিপশন ও পথ্যের নির্দেশ দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন–’কেমন থাকেন আমি টেলিফোন করে খবর নেব।’
ডাক্তার চলে যাবার পর বেণীমাধব, আরতির পানে চেয়ে বললেন—’বৌমা, আমার পথ্য তৈরি করার ভার তোমার ওপর রইল।’
আরতি বিজয়োল্লাস চেপে বলল–’হ্যাঁ বাবা।’
তিন চার দিনের মধ্যে বেণীমাধব সেরে উঠলেন, তাঁর পেট ধাতস্থ হলো। পথ্য ছেড়ে তিনি স্বাভাবিক খাদ্য খেতে লাগলেন। আরতিই তাঁর জন্যে রান্না করে চলল।
কিন্তু বেণীমাধবের মন শান্ত নয়। চিরদিন নানা লোকের সঙ্গে নানা কাজে দিন কাটিয়েছেন, এখন তাঁর জীবন বৈচিত্র্যহীন। সকালে মেঘরাজ তাঁর দাড়ি কামিয়ে দেয়, তিনি স্নানাদি করে চা খেয়ে খবরের কাগজ নিয়ে বসেন। তাতে ঘন্টাখানেক কাটে। তারপর রেডিও চালিয়ে খানিকক্ষণ গান শোনেন। গান বেশিক্ষণ ভাল লাগে না, রেডিও বন্ধ করে বই এবং সাময়িক পত্রিকার পাতা ওলটান।
একদিন কলকাতার পুরনো বন্ধুদের কথা মনে পড়ে যায়। টেলিফোন ডিরেকটরি খুঁজে তাঁদের নাম বার করেন, টেলিফোন করে কাউকে পান না কাউকে পান; কিছুক্ষণ পুরনো কালের গল্প হয়। এগারোটার পর আরতি ভাতের থালা নিয়ে আসে। আহারের পর তিনি ঘন্টাখানেক বিছানায় শুয়ে দিবানিদ্রায় কাটান।
বিকেলবেলা ঝিল্লী কিংবা লাব্রণি আসে, তাদের সঙ্গে খানিক গল্প করেন। লাবণিকে বলেন–’কেমন নাচতে শিখেছিস দেখা।’
লাবনি বলে—’আমি এখনো ভাল শিখিনি দাদু, ভাল শিখলে তোমাকে দেখাব।’
বেণীমাধব বলেন–’তোর মাস্টার ভাল শেখাতে পারে?’
লাবণি গদগদ হয়ে বলে—’খুব ভাল শেখাতে পারেন। এত ভাল যে—? লজ্জা পেয়ে সে অর্ধপথে থেমে যায়।
বেণীমাধব প্রশ্ন করলেন–’কত বয়স মাস্টারের?’
‘তা কি জানি! হবে ছব্বিশ সাতাশ। যাই, মা ডাকছে।’ লাবনি তাড়াতাড়ি চলে যায়। সূৰ্য্যস্তের পর বেণীমাধব খোলা ছাদে অনেকক্ষণ পায়চারি করেন। ইচ্ছে হয় রবীন্দ্র সরোবরে গিয়ে লোকজনের মধ্যে খানিক বেড়িয়ে আসেন; কিন্তু তিনতলা সিঁড়ি ভাঙা তাঁর পক্ষে কষ্টকর, তাই ছাদে বেড়িয়েই তাঁর ব্যায়াম সম্পন্ন হয়।
রাত্ৰি ন’টার সময় আহার সমাপন করে তিনি শয়ন করেন। এই তাঁর দিনচযা। মেঘরাজ হামোহাল তাঁর কাছে হাজির থাকে; কখনো ঘরের মধ্যে কখনো দোরের বাইরে। তিনি শয়ন করলে মেঘরাজ নীচে গিয়ে আহার সেরে আসে; বেণীমাধবের দরজা ভেজিয়ে দিয়ে দরজার বাইরে আগড় হয়ে বিছানা পেতে শোয়।
এইভাবে দিন কাটছে। একদিন এক অধ্যাপক বন্ধুকে টেলিফোন করে বেণীমাধবের মুখ গভীর হলো। টেলিফোন রেখে তিনি কিছুক্ষণ চিন্তা করলেন, তারপর মেঘরাজকে ডেকে বললেন—’তুমি নীচে গিয়ে মকরন্দকে ডেকে আনো।’
কয়েক মিনিট পরে মকরন্দ এসে দাঁড়াল। চাকরের মুখে তলব পেয়ে সে খুশি হয়নি, অপ্রসন্ন মুখে প্রশ্ন নিয়ে পিতামহের মুখের পানে চাইল। বেণীমাধব কিছুক্ষণ তার উষ্ণখুষ্ক চেহারার পানে তাকিয়ে রইলেন, তারপর জিজ্ঞেস করলেন–’তুমি কলেজে ঢুকেছ, লেখাপড়া কেমন হচ্ছে?’
মকরুন্দর মুখ ভ্রূকুটি-গভীর হলো—’হচ্ছে এক রকম।’
বেণীমাধব বললেন—’শুনলাম তুমি ক্লাসে যাও না, দল পাকিয়ে পলিটিক্স করে বেড়াও, এ কথা সত্যি?’
উদ্ধত স্বরে মকরন্দা বলল-‘কে বলেছে?’
মাধব কড়া সুরে বললেন-কে বলেছে সে কথায় তোমার দরকার নেই। কথাটা সত্যি কিনা?
‘হ্যাঁ সত্যি।’ মকরন্দ চোখ লাল করে ঠাকুরদার পানে চেয়ে রইল।
‘বটে!’ বেণীমাধবের চোখেও রাগের ফুলকি ছিটকে পড়ল–’তুমি বেয়াদবি করতে শিখেছি।–মেঘরাজ!’
মেঘরাজ দোরের বাইরে ছিল, ঘরে ঢুকল। বেণীমাধবী আঙুল দেখিয়ে বললেন—’এই ছোঁড়ার কান ধরে গালে একটা থাবড়া মারো, তারপর ঘাড় ধরে বার করে দাও।’
মেঘরাজ সিপাহী ছিল, সে হুকুমের চাকর। যথারীতি মকরন্দর কান ধরে গালে চড় মারল। মকরন্দর মনে যতই ধৃষ্টতা থাক, মেঘরাজের সঙ্গে হাতাহাতি করবার সাহস বা দৈহিক শক্তি তার নেই, সে ধাক্কা খেতে খেতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
কথাটা আর চাপা রইল না। অজয় আর আরতি ছুটে এসে বেণীমাধবের কাছে ক্ষমা চাইল। বেণীমাধব গভীর হয়ে রইলেন, শেষে বললেন–‘বংশে একটা মাত্র ছেলে, সে বেল্লিক বেয়াদব হয়ে উঠেছে। দোষ তোমাদের, তোমারা ছেলে শাসন করতে জানো না।’
ব্যাপারটা আর বেশিদূর গড়াল না।
তারপর একদিন বিকেলবেলা সনৎ এল মামার সঙ্গে দেখা করতে। সনৎ আর নিখিল মাঝে মাঝে এসে মামার কাছে বসে, সসন্ত্রমে মামার কুশল প্রশ্ন করে চলে যায়। আজ সনৎ তার ক্যামেরা নিয়ে এসেছে, বলল–’মামা, আপনার একটা ছবি তুলব।’
বেণীমাধব হেসে বললেন—’আমি বুড়ো মানুষ, আমার ছবি তুলে কি হবে।’
সনৎ বলল–’আমার অ্যালবামে রাখব।’
‘কিন্তু এখন আলো কমে গেছে, এ আলোতে ছবি তোলা যাবে?’
‘যাবে। আমি ফ্ল্যাশ বালব এনেছি।’
‘বেশ, তোলো।’ বেণীমাধব একটি হেলান দেওয়া চেয়ারে বসলেন।
সনৎ ছবি তোলার উপক্রম করছে এমন সময় নিখিল এসে দাঁড়াল। সনৎ এদিক ওদিক ঘুরে শেষে একটা বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে ছবি তুলল; বালবটা একবার জ্বলে উঠেই নিভে গেল। নিখিল বলল-সনৎদা, ছবি তৈরি হলে আমাকে একখানা দিও, আমি কাগজে ছাপাব। মামা কাজ থেকে অবসর নিয়েছেন, কলকাতায় এসে স্থায়ীভাবে আছেন, খবরটা প্রকাশ করা দরকার।’
বেণীমাধব মনে মনে ভাগনেদের ওপর খুশি হলেন।
পরদিন সনৎ ছবি এনে বেণীমাধবকে দেখাল। ছবিটি ভাল হয়েছে; বেণীমাধবের জরাক্রান্ত মুখ শিল্পীর নৈপুণ্যে শান্ত কোমল ভােব ধারণ করেছে। সনৎ যে কৌশলী শিল্পী তাতে সন্দেহ নেই।
বেণীমাধব বললেন—’বেশ হয়েছে। এটাকে বাঁধিয়ে কোথাও টাঙিয়ে রাখলেই হবে।’
সনৎ বলল–’আমি এনলার্জ করে ফ্রেমে বাঁধিয়ে এনে দেব। নিখিলকে এক কপি দিয়েছি, সে কাগজে ছাপবে।’
অতঃপর বেণীমাধবের কর্মহীন মন্থর দিনগুলি কাটছে। সনৎ বড় ছবি ফ্রেমে বাঁধিয়ে ঘরের দেয়ালে টাঙিয়ে দিয়ে গেছে। কাগজে তাঁর ছবি ও সংক্ষিপ্ত পরিচয় বেরিয়েছে। এরকম অবস্থায় বৃদ্ধ বয়সে মানুষ শান্তি ও স্বচ্ছন্দতা লাভ করে। কিন্তু বেণীমাধবের মনে শান্তি স্বচ্ছন্দতা আসছে না। ছেলে ও মেয়ের পরিবারের সঙ্গে একটানা সান্নিধ্য তিনি উপভোগ করতে পারছেন। না। পারিবারিক জীবনের স্বাদ ভুলে গিয়ে যাঁরা দীর্ঘকাল একলা পথে চলেছে তাঁদের বোধহয় এমনিই হয়।
ওদিকে ছেলে এবং মেয়ের পরিবারেও সুখ নেই; গায়ত্রীর মেজাজ সর্বদাই তিরিক্ষি হয়ে থাকে। গঙ্গাধর সারা দিন বসে একা একা তাস খেলে, সলিটেয়ার খেলা; সন্ধ্যের সময় চুপি চুপি বেরিয়ে যায়, আবার বেশি রাত্রি হবার আগেই ফিরে আসে। অজয় ক্লাবে গিয়ে অনেক রাত্রি পর্যন্ত আডা জমাত কিংবা রিহাসেল দিতা; এটা ছিল তার জীবনের প্রধান বিলাস। এখন তাকে রাত্রি ন’টার মধ্যে বাড়ি ফিরতে হয়, কারণ কর্তার হুকুম-নাটার পর সদর দরজা খোলা থাকবে না। ন’টার পর বাড়ি ফিরে দোর ঠেলাঠেলি করলে তেতলায় শব্দ যাবে, সেটা বাঞ্ছনীয় নয়। সকলেরই একটা চোখ এবং একটা কান তেতলার দিকে সতর্ক হয়ে থাকে। আরতি যদিও সর্বদাই শ্বশুরকে খুশি করবার চেষ্টা করছে, তবু নিশ্চিন্ত হতে পারছে না।
নিশ্চিন্ত আছে কেবল দোতলায় দু’টি মেয়ে, লাব্রণি আর ঝিল্লী্্, এবং নীচের তলায় সনৎ ও নিখিল। ঝিল্লী আর লাবণির বয়স মাত্র আঠারো, বিষয়বুদ্ধি এখানো পরিপক্ক হয়নি। সনৎ আর নিখিলের বেলায় পরিস্থিতি অন্যরকম; মামা তাদের বাড়িতে থাকতে দিয়েছেন বট, কিন্তু তারা মামার কাছে অর্থ-প্রত্যাশী নয়। সনতের গোপন নৈশাভিসারের কথা বেণীমাধব জানতে পারবেন। এমন কোনো সম্ভাবনা নেই। নিখিলের ওসব দোষ নেই, উপরন্তু কয়েক মাস থেকে সে এক নতুন ব্যাপারে মশগুল হয়ে আছে।
বেণীমাধব কলকাতায় এসে বসবার আগে একদিন নিখিল হঠাৎ ডাকে একটা চিঠি পেল, খামের চিঠি। তাকে চিঠি লেখবার লোক কেউ নেই, সে একটু আশ্চর্য হয়ে চিঠি খুলল। এক পাতা কাগজের ওর দু’ছত্র লেখা আছে—
আমি একটি মেয়ে। তোমাকে ভালবাসি।–
চিঠির নীচে লেখিকার নাম নেই।
নিখিল কিছুক্ষণ বোকার মত চেয়ে রইল। তারপর তার মুখে গদগদ হাসি ফুটে উঠল। একটা মেয়ে তাকে ভালবাসে! বা রে! ভারি মজা তো!
কিন্তু কে মেয়েটা?
নিখিল খামের ওপর পোস্ট অফিসের সীলমোহর পরীক্ষা করল; সীলমোহরের ছাপ জেবড়ে গেছে, তবু কলকাতায় চিঠি ডাকে দেওয়া হয়েছে এটুকু বোঝা যায়। কলকাতার মেয়ে। কে হতে পারে? চিঠিই বা লিখলি কেন? ভালবাসা জানাবার আরো তো অনেক সোজা উপায় আছে। মুখে বলতে লজ্জা হয়েছে তাই চিঠি! কিন্তু নিজের নাম লেখেনি কেন?
নিখিল অনেক মেয়েকে চেনে। তার অফিসেই তো গোটা দশেক আইবুড়ো মেয়ে কাজ করে। তাছাড়া বন্ধুবান্ধবের বোনেরা আছে। মেয়েরা তার চটুল রঙ্গপ্রিয় স্বভাবের জন্যে তার প্রতি অনুরক্ত, তাকে দেখলেই তাদের মুখে হাসি ফোটে। কিন্তু কেউ তাকে চুপিচুপি ভালবাসে বলেও তো মনে হয় না। আর এত লজ্জাবতীও কেউ নয়।
হাতে চিঠি নিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিখিল এইসব ভাবছে এমন সময় পিছন দিক থেকে লাবণর গলা শুনতে পেল–’কি নিখিল কাকা, কার চিঠি পড়ছ?’
নিখিল ফিরে দাঁড়াল। ঝিল্লী আর লাব্রণি কখন দোতলা থেকে নেমে এসেছে; তাদের হাতে কয়েকখানা বই। তারা একসঙ্গে লাইব্রেরিতে যায় বই বদল করতে।
নিখিল হাত উঁচুতে তুলে নাড়তে নাড়তে বলল—’কার চিঠি! একটি যুবতী আমাকে চিঠি লিখেছে।’ বলে বুক ফুলিয়ে দাঁড়াল।
লাবনি বলল—’যুবতী লিখেছে! কী লিখেছে?’
নিখিল বলল—’হুঁ হুঁ, দারুণ ব্যাপার, গুরুতর ব্যাপার। লিখেছে সে আমাকে ভালবাসে।’
লাবণি আর ঝিল্লী অবাক হয়ে পরস্পরের পানে তাকাল, তারপর হেসে উঠল। লাবণি বলল–’কোন গুল মারছ নিখিল কাকা। তোমাকে আবার কোন যুবতী ভালবাসবে?’
নিখিল চোখ পাকিয়ে বলল–’কেন, আমাকে কোনো যুবতী ভালবাসতে পারে না! দেখেছিস আমার চেহারাখানা।’
‘দেখেছি। এখন বলো কার চিঠি।’
‘বললাম না যুবতীর চিঠি!’
ঝিল্লী প্রশ্ন করল–’যুবতীর নাম কি?’
নিখিল মাথা চুলকে বলল–’নাম! জানি না। চিঠিতে নাম নেই।’
বিল্লী আর লাব্রণি আবার হেসে উঠল। লাব্রণি বলল–’তোমার একটা কথাও আমরা বিশ্বাস করি না। নিশ্চয় পাওনাদারের চিঠি।’
‘পাওনাদারের চিঠি! তবে এই দ্যাখ।।’ নিখিল চিঠিখানা তাদের নাকের সামনে ধরল।
দু’জনে চিঠি পড়ল। লাব্রণি বলল—’হঁ। কিন্তু চিঠি পড়েও বিশ্বাস হচ্ছে না যে, একটা মেয়ে তোমাকে প্রেম নিবেদন করেছে। আমার মনে হয়। কেউ তোমার ঠ্যাং ধরে টেনেছে, মানে লেগ-পুলিং।’
নিখিল একটু গরম হয়ে বলল–’যা যা, তোরা এসব কী বুঝবি! এসব গভীর ব্যাপার। প্রেমের ফাঁদ পাতা ভুবনে, শুনেছিস কখনো?’
‘শুনেছি।’ ঝিল্লী আর লাব্রণি মুখ টিপে হাসতে হাসতে চলে গেল।
এর পর থেকে যখনি কোনো মেয়ের সঙ্গে দেখা হয় নিখিল উৎসুক চোখে তার পানে তাকায় কিন্তু কোনো সাড়া পায় না। তার মন আরো ব্যগ্র হয়ে ওঠে। কে মেয়েটা? নিশ্চয় তার পরিচিত। তবে এমন লুকোচুরি খেলছে। কেন?
মাসখানেক পরে দ্বিতীয় চিঠি এল। এবার একটু বড়—
আমি একটি মেয়ে। তোমাকে ভালবাসি। আমাকে চিনতে পারলে না?
চিঠি পেয়ে নিখিলের মন উদ্দীপ্ত হয়ে উঠল। লাব্রণি আর ঝিল্লী হাতের কাছে নেই, কিন্তু কাউকে না বলেও থাকা যায় না, তাই সে ঝোঁকের মাথায় সনতের ঘরে গেল।
সনতের ঘরটি বেশ বড়; এই একটি ঘরের মধ্যে তার একক জীবনের সমস্ত প্রয়োজনীয় সামগ্ৰী সঞ্চিত আছে। এক পাশে খাটের ওপর পুরু গদির বিছানা পাতা; খাটের শিথানের কাঠের ওপর বিচিত্র জাফরির কারুকার্য। ঘরের অন) পাশে জানালার সামনে দেরাজযুক্ত টেবিল, তার ওপর ফটোগ্রাফির নানা সরঞ্জাম সাজানো; তিনটি হাতে-তোলা ক্যামেরা, তার মধ্যে একটি সিনো-ক্যামেরা। ঘরে একটি আয়নার ব্লকবাটযুও আলমারিও আছে। ঘরটি ছিমছাম ফিটফাঁট, দেখে বোঝা যায়। সনৎ গোছালো এবং শৌখিন মানুষ।
নিখিল যখন ঘরে ঢুকাল তখন সনৎ টেবিলের সামনে চেয়ারে বসে একটা ক্যামেরার যন্ত্রপাতি খুলে পরীক্ষা করছিল, চোখ তুলে চেয়ে আবার কাজে মন দিল। নিখিল গম্ভীর মুখে বলল–’সনৎদা, গুরুতর ব্যাপার।’
সনৎ একবার চকিতে চোখ তুলাল, বলল–’তোমার জীবনে গুরুতর ব্যাপার কী ঘটতে পারে! আমাশা হয়েছে?’
নিখিল বলল–’আমাশা নয়, একটা মেয়ে আমার প্রেমে পড়েছে।’
এবার সনৎ বেশ কিছুক্ষণ চেয়ে রইল। শেষে বলল–’আমাশা নয়, দেখছি তোমার মাথার ব্যারাম হয়েছে। বাংলা দেশে এমন মেয়ে নেই যে তোমার প্রেমে পড়বে।’
নিখিল বলল–’বিশ্বাস হচ্ছে না? এই দেখা চিঠি। মাসখানেক আগে আর একটা পেয়েছি।’
চিঠি নিয়ে সনৎ একবার চোখ বুলিয়ে ফেরত দিল, প্রশ্ন করল—’মেয়েটাকে চেনো না?’
‘না, সেই তো হয়েছে মুশকিল।’
সনৎ একটু চুপ করে রইল, তারপর বলল—’বুঝেছি! তোমার চেনা-শোনার মধ্যে কোনো কালো কুচ্ছিত মেয়ে আছে?’
নিখিল হেসে বলল—’বেশির ভাগই কালো কুচ্ছিত সনৎদা।’
সনৎ বলল–’তাহলে ওই কালো কুচ্ছিত মেয়েদের মধ্যেই একজন বেনামী চিঠি লিখে রহস্য সৃষ্টি করছে। তোমাকে তাতাবার চেষ্টা করছে। তোমার ঘটে যদি বুদ্ধি থাকে ওদের এড়িয়ে চলবে।’
কিন্তু এড়িয়ে চলার ক্ষমতা নিখিলের নেই। তাছাড়া কালো কুচ্ছিত মেয়ের প্রতি তার বিরাগ নেই। তার বিশ্বাস কালো কুচ্ছিত মেয়েরা ভালো বৌ হয়। সে চতুৰ্থণ আগ্রহে অনামা প্রেমিকাকে খুঁজে বেড়াতে লাগল।
তারপর বেণীমাধব এলেন, বাড়ির আবহাওয়া বদলে গেল। কিন্তু নিখিলের কাছে নিয়মিত চিঠি আসতে লাগল। তৃতীয় চিঠিতে লেখা হয়েছে—
আমি তোমাকে ভালবাসি। আমাকে চিনতে পারলে না? আমি কিন্তু সুন্দর মেয়ে নই।
নিখিল ভাবল, সনৎদা ঠিক ধরেছে। কিন্তু সে দমল না। তার জীবনে এক অভাবিত রোমান্স এসেছে; একে তুচ্ছ করার সাধ্য তার নেই।
ওদিকে বেণীমাধব হগুপ্ত তিনেক পুত্রবধূর হাতের রান্না খেয়ে বেশ ভালই রইলেন। তারপর একদা গভীর রাত্রে ওঁর ঘুম ভেঙ্গে গেল; পেটে দারুণ যন্ত্রণা। যাতনায় ছটফট করতে করতে মেঘরাজকে ডাকলেন। বেণীমাধব দুহাতে পেট চেপে ধরে বসেছিলেন, বললেন—’মেঘরাজ, শীগগির ডাক্তার সেনকে ফোন করো, বলো আমি পেটের যন্ত্রণায় মরে যাচ্ছি, এখনি যেন আসেন।’
মেঘরাজ ফোন করল, আধা ঘণ্টার মধ্যে ডাক্তার সেন এলেন। জিজ্ঞাসাবাদ করে চিকিৎসা আরম্ভ করলেন। পেটের প্রদাহ। কিন্তু সহজে উপশম হলো না; রাত্ৰি পাঁচটা পর্যন্ত ধস্তাধস্তির পর ব্যথা শান্ত হলো। বেণীমাধব নিজীব দেহে বিছানায় শুয়ে বিস্ফারিত চোখে ডাক্তারের পানে চাইলেন—’ডাক্তার, কেন এমন হলো বলতে পার?’
ডাক্তার গম্ভীর মুখে ক্ষণেক চুপ মেরে রইলেন, তারপর অনিচ্ছাভরে বললেন-‘নিঃসংশয়ে কলামুক্ত। অ্যালারজি হতে পারে, শূল ব্যথা হতে পারে, কিংবা-’
‘কিংবা-?’
‘কিংবা বিষের ক্রিয়া। —আমি বলি কি, আপনি কিছুদিন আমার নার্সিং হোমে থাকবেন। চলুন। চিকিৎসা পথ্য দুইই হবে।’
বেণীমাধবের কিন্তু নার্সিং হোমে বিশ্বাস নেই; তাঁর ধারণা যারা একবার নার্সিং হোমে ঢুকেছে। তারা আর ফিরে আসে না। তিনি যথাসম্ভব দৃঢ়স্বরে বললেন—’না ডাক্তার, আমি বাড়িতেই থাকব।’
ডাক্তার উঠলেন–’আচ্ছা, এখন চলি। যদি আবার কোনো গণ্ডগোল হয় তৎক্ষণাৎ খবর দেবেন। কাল আর পরশু স্রেফ দই খেয়ে থাকবেন।’
মেঘরাজ ডাক্তারের সঙ্গে নীচে পর্যন্ত গিয়ে সদর দরজা খুলে দিল, ডাক্তার চলে গেলেন। মেঘরাজ দরজা বন্ধ করে আবার ওপরে উঠে এল। বাড়ির অন্য মানুষগুলো তখনো ঘুমোচ্ছে, ডাক্তারের আসা-যাওয়া জানতে পারল না।
বিছানায় শুয়ে বেণীমাধব তখন শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে চিন্তা করছিলেন। দুরূহ দুৰ্গম চিন্তা। পুত্ৰাদপি ধনভাজাং ভীতি। একবার নয়, দু-দু’বার এই ব্যাপার হলো…ছেলে আর মেয়ে অপেক্ষা করে আছে। আমি কবে মরব…আমি মরছি না দেখে অধীর হয়ে উঠেছে! কিন্তু ছেলে মেয়ে জামাই পুত্রবধূ এমন কাজ করতে পারে? কেন করবে না, সংসারে টাকাই খাঁটি জিনিস, আর যা-কিছু সব ভুয়ো। ডাক্তারের মনেও সন্দেহ ঢুকেছে..
সকাল সাতটার সময় বেণীমাধব বিছানায় উঠে বসলেন, মেঘরাজ তাঁর দাড়ি কামিয়ে দিল। তারপর তিনি তার হাতে টাকা দিয়ে বললেন-যাও, বাজার থেকে দই কিনে নিয়ে এসো। এক সের ভাল দই।‘
টাকা নিয়ে মেঘরাজ চলে গেল। সে সৈনিক, হুকুম তামিল করে, কথা বলে না। তার মুখ দেখেও কিছু বোঝা যায় না।
সাড়ে সাতটার সময় আরতি এল, তার সঙ্গে বিগ্ন ট্রের ওপর চা ও প্রাতরাশ নিয়ে এসেছে। ঘরে ঢুকেই আরতি চমকে উঠল; বেণীমাধব বিছানায় বসে একদৃষ্টি তার পানে চেয়ে আছেন। সে ক্ষীণ কণ্ঠে বলল—’বাবা–’
বেণীমাধব ধীর স্বরে বললেন–বৌমা, খাবার ফিরিয়ে নিয়ে যাও; আজ থেকে আমার খাবার ব্যবস্থা আমি নিজেই করব।’
আরতির মুখে ভয়ের ছায়া পড়ল—’কোন বাবা?
বেণীমাধব গত রাত্রির ঘটনা বললেন। আরতি শুনে মুখ কালি করে চলে গেল।
কথাটা ঝিয়ের মুখে অচিরাৎ প্রচারিত হলো। শুনে গায়ত্রী ছুটতে ছুটতে বাপের কাছে এল—’বাবা, বৌদির রান্না তোমার সহ্য হবে না। আমি জানতুম। আজ থেকে আমি আবার রাঁধব।’
বেণীমাধব মেয়েকে আপাদমস্তক দেখে কড়া সুরে বললেন—’না-’
বেলা তিনটের সময় তিনি কর্তব্য স্থির করে বিছানায় উঠে বসে ডাকলেন-‘মেঘরাজ!’
মেঘরাজ এসে দাঁড়াল–’জি।’
বেণীমাধব প্রশ্ন করলেন—’তোমার বৌ আছে?’
মেঘরাজ ভ্রূ তুলে খানিক চেয়ে রইল, যেন প্রশ্নের তাৎপর্য বোঝবার চেষ্টা করছে-‘জি, আছে।’
‘ছেলেপুলে?’
‘জি, না। ‘
‘স্ত্রী নিশ্চয় রসুই করতে জানে?’
‘জি, জানে।’
‘বেশ। এখন আমার প্রস্তাব শোনো। তুমি দেশে গিয়ে তোমার ঔরৎকে নিয়ে এসো। নীচের তলায় খালি ঘর আছে, তার একটাতে তোমরা থাকবে। তোমার ঔরৎ আমার রসুই করবে। আমি তোমার মাইনে ডবল করে দিলাম। তুমি কাল সকালে প্লেনে দিল্লী চলে যাও, বৌকে নিয়ে যত শীগগির পর ফিরে আসবে; প্লেনের ভাড়া ইত্যাদি সব খরচ আমি দেবো। কেমন?’
‘জি’
‘বেশ; নিশ্চিন্ত হলাম। কিন্তু তুমি যতদিন ফিরে না। আসছ ততদিনের জন্যে আমার রসদ দরকার। এই নাও টাকা, বাজারে গিয়ে আরো সের দুই দই, কড়া পাকের সন্দেশ, গোটা দুই বড় পাউরুটি, মাখন, মারমালোড, টিনের দুধ, আঙুর, আপেল-এই সব কিনে নিয়ে এসো, ফ্রিজে থাকবে। তুমি বাজারে যাও, আমি ইতিমধ্যে টেলিফোনে তোমার এয়ার-টিকিটের ব্যবস্থা করছি।‘–
পরদিন মেঘরাজ চলে গেল। বেণীমাধব একলা রইলেন। দই এবং অন্যান্য সাত্ত্বিক আহারের ফলে দু-তিন দিনের মধ্যেই তাঁর পেট সুস্থ হলো। তিনি অবসর বিনোদনের জন্য ডাক্তার সেন ও অন্যান্য বন্ধুদের সঙ্গে টেলিফোনে গল্প করেন। ঘরের মধ্যে কারুর যাওয়া-আসা নেই। দরজা সর্বদা বন্ধ থাকে।
চতুর্থ দিন মেঘরাজ ফিরে এল। সঙ্গে বৌ।
বৌ-এর পরনে রঙিন শাড়ি, মুখে ঘোমটা। মেঘরাজ বেণীমাধবের ঘরে গিয়ে বৌ-এর মুখ থেকে ঘোমটা সরিয়ে দিল। বেণীমাধব দেখলেন, একটি মিষ্টি হাসি-হাসি মুখ। রঙ ময়লা, কাজল-পরা চোখে যৌবনের মাদকতা। মেঘরাজের অনুপাতে বয়স অনেক কম, কুড়ি-বাইশের বেশি নয়। বৌ দু’হাত দিয়ে বেণীমাধবের পা ছুঁয়ে নিজের মাথায় ঠেকাল।
বেণীমাধব প্রসন্ন হয়ে বললেন–বেশ বেশ। কি নাম তোমার?’
বৌ বলল-‘মেদিনী।’
অতঃপর বেণীমাধবের স্বাধীন সংসারযাত্রা আরম্ভ হয়ে গেল। নীচের তলায় কোণের একটা ঘরে মেঘরাজ ও মেদিনীর বাসস্থান নির্দিষ্ট হলো। তেতিলায় একটা ঘর রান্নাঘরে পরিণত হয়েছে, বাসন-কোসন এসেছে; সকালবেলা মেদিনী নীচের ঘর থেকে ওপরে উঠে এসে বেণীমাধবের চা টেস্ট তৈরি করে দেয়। ইতিমধ্যে মেঘরাজ গড়িয়াহাট থেকে বাজার করে আনে। রান্না আরম্ভ হয়; তিনজনের রান্না। খাওয়াদাওয়া শেষ হলে মেদিনী নীচে নিজের ঘরে চলে যায়, মেঘরাজ ওপরে পাহারায় থাকে। বিকেলবেলা থেকে আবার চা ও রান্নার পর্ব আরম্ভ হয়; রাত্রি আটটার সময় সকলের নৈশাহার শেষ হলে মেদিনী রাত্রির মত নীচে চলে যায়; বেণীমাধব তুষ্ট মনে শয্যা
এই হলো তাদের দিনচর্যা।
মেদিনীর দুপুরবেলা কোনো কোজ নেই, সেই অবসরে সে বাড়ির অন্য সকলের সঙ্গে পরিচিত হয়েছে। সকলেই তার প্রতি আকৃষ্ট; বিশেষত পুরুষেরা। তার আচরণে শালীনতা আছে সংকোচ নেই; তার কথায় সরসতা আছে প্রগলভতা নেই। সকলেই তার কাছে স্বচ্ছন্দতা অনুভব করে। সে আসার পর থেকে বাড়িতে যেন নতুন সজীবতা দেখা দিয়েছে। গায়ত্রী এবং আরতির মন আগে থাকতে মেদিনীর প্রতি বিমুখ ছিল, কিন্তু ক্রমশ তাদের বিমুখতা অনেকটা দূর হয়েছে। কেবল মকরন্দ মেদিনীর সম্বন্ধে সম্পূর্ণ অচেতন; মেদিনীর যখন অবসর মকরন্দ তখন বাড়িতে থাকে না।
বাড়িতে আস্তে আস্তে সহজ ভাব ফিরে এল। বেণীমাধব এখন নিজেকে অনেকটা নিরাপদ বোধ করছেন। তবু তাঁর মনের ওপর যে ধাক্কা লেগেছে তার জের এখনো কাটেনি। গভীর রাত্রে তাঁর ঘুম ভেঙে যায়। অন্ধকারে শুয়ে শুয়ে তিনি ভাবেন-আমার নিজের ছেলে নিজের মেয়ে আমার মৃত্যু কামনা করে। এ কি সম্ভব, না। আমার অলীক সন্দেহ? অনেকক্ষণ জেগে থেকে তিনি নিঃশব্দে বিছানা ছেড়ে ওঠেন, নিঃশব্দে ভেজানো দরজা একটু ফাঁক করে দেখেন, বাইরে মেঘরাজ দরজা আগলে ঘুমোচ্ছে। আশ্বস্ত মনে তিনি বিছানায় ফিরে যান।
মেদিনী আসার পর আর একটা সুবিধা হয়েছে। কলকাতার রেওয়াজ অনুযায়ী সদর দরজা সব সময়েই বন্ধ থাকে, কেবল যাতায়াতের সময় খোলা হয়। আগে বাইরে থেকে কেউ এলে দোর-ঠেলা ঠেলি হাঁকা হাঁকি করতে হতো, এখন তা করতে হয় না। মেদিনীর ঘর সদর দরজার ঠিক পাশেই, রাত্ৰিবেলা বাইরে থেকে কেউ দরজায় টোকা দিলেই মেদিনী এসে দরজা খুলে দেয়।
মহাকবি কালিদাস লিখেছেন-হ্রদের প্রসন্ন উপরিভাগ দেখে বোঝা যায় না। তার গভীর তলদেশে হিংস্ব জলজন্তু ঘুরে বেড়াচ্ছে।
মাসখানেক কাটল। ইতিমধ্যে বাড়িতে ছোটখাটো কয়েকটা ঘটনা ঘটেছিল যা উল্লেখযোগ্য—
নিখিল আবার অদৃশ্য নায়িকার চিঠি পেয়েছে—আমি তোমাকে ভালবাসি। তুমি হাসতে জানো, হাসাতে জানো। আমাদের বাড়িতে কেউ হাসে না। তুমি আমাকে বিয়ে করবে?
চিঠি পেয়ে নিখিল আহ্বাদে প্রায় দড়ি-ছেড়া হয়ে উঠল; চিঠি হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ নিজের ঘরে পাগলের মত দাপাদাপি করল, তারপর সনতের ঘরে গেল। নিখিলের ঘরটা আকারে-প্রকারে সনতের অনুরূপ, কিন্তু অত্যন্ত অগোছালো। তক্তপোশের ওপর বিছানাটা তাল পাকিয়ে আছে, টেবিলের ওপর ধুলোর পুরু প্রলেপ। দেখে বোঝা যায়—এ ঘরে গৃহিণীর করম্পর্শের প্রয়োজন আছে।
সনৎ তখন ক্যামেরা নিয়ে বেরুচ্ছিল। নিখিল বলল–’এ কি সনৎদা, সাজিত-গুজ্জিত হয়ে চলেছ কোথায়?’
সনৎ বলল–’গ্র্যান্ড হোটেলে পার্টি আছে। হাতে ওটা কি?’
নিখিল চিঠি তুলে ধরে বলল–’আবার চিঠি পেয়েছি, পড়ে দেখ। এ মেয়ে কালো কুচ্ছিত হোক, কানা খোঁড়া হোক, একেই আমি বিয়ে করব।’
সনৎ চিঠি পড়ে বলল–’হুঁ, কানা-খোঁড়াই মনে হচ্ছে। তা বিয়ে করতে চাও কর না, কে তোমাকে আটকাচ্ছে। কিন্তু তার আগে মেয়েটাকে খুঁজে বার করতে হবে তো।’
সনৎ নিজের ঘরে তালা বন্ধ করল। মেঘরাজের ঘরের সামনে দিয়ে যাবার সময় দেখল মেদিনী ঘরে রয়েছে। সনৎ একবার দাঁড়িয়ে বলল–’মেদিনী, আজ আমার ফিরতে দেরি হবে। একটা পার্টিতে ফটো তুলতে যাব, কখন ফিরব ঠিক নেই। আমি দোরে টোকা দিলে দোর খুলে দিও।‘
মেদিনী নিজের দোরের কাছে এসে দাঁড়িয়েছিল। সে এখন বাংলা ভাষা বেশ বুঝতে পারে, কিন্তু বলতে পারে না। চোখ নীচু করে সে নম্রস্বরে বলল—’জি।’
সনৎ বেরিয়ে যাওয়ার পর নিখিল মেদিনীর কাছে এসে দাঁড়াল, বলল—’মেদিনী, তুম জানতা হ্যায়, একঠো লেড়কি হামকে ভালবাসামে গির গিয়া। হাম উসকে শান্দি করেগা।’
মেদিনীর চোখে কৌতুক নেচে উঠল, সে আচল দিয়ে হাসি চাপা দিতে দিতে দোর ভেজিয়ে দিল।
মেদিনী আসার পর থেকে গঙ্গাধরের চিত্ত চঞ্চল হয়েছে। বয়সটা খারাপ; যৌবন বিদায় নেবার আগে মরণ-কামড় দিয়ে যাচ্ছে। গঙ্গাধর যখন বিকেলবেলা বাইরে যায় তখন মেদিনীর দোরের দিকে তাকাতে তাকাতে যায়, কদাচ মেদিনীর সঙ্গে চোখাচৌখি হলে চোখ সরিয়ে নেয় না, একদৃষ্টি চেয়ে থাকে; মেদিনী চৌকাঠে ঠেস দিয়ে চোখ নীচু করে তার দৃষ্টিপ্রসাদ গ্রহণ করে। পুরুষের লুব্ধ দৃষ্টিতে সে অভ্যস্ত।
অজয়ের ভাবভঙ্গী একটু অন্যরকম। সে যেন মেদিনীকে দেখে বাৎসল্য স্নেহ অনুভব করে; তার সঙ্গে পাটিচটি গল্প করে, তার দেশের খবর নেয়। মেদিনী সরলভাবে কথা বলে, মনে মনে হাসে।
মকরন্দ প্রথমদিকে কিছুদিন মেদিনীকে দেখেনি। একবার তিন-চারদিন সে বাড়ি ফিরল না; জানা গেল পুলিস ভ্যান লক্ষ্য করে ইট ছোঁড়ার জন্যে পুলিসে ধরে নিয়ে গেছে। চতুর্থ দিন সে মুক্তি পেয়ে রাত্রি সাড়ে দশটার সময় এসে বাড়ির সদর দরজায় ধাক্কা দিল। মেদিনী গিয়ে দোর খুলল। মকরন্দর চেহারা শুকনো, জামা ছেড়া, চুল উষ্ণখুষ্ক; সে তীব্র দৃষ্টিতে মেদিনীর পানে চেয়ে রুক্ষ স্বরে প্রশ্ন করল—’তুমি কে?’
‘আমি মেদিনী।’
‘অ-মেঘরাজের বৌ।’ কুটিলভাবে মুখ বিকৃত করে সে মেদিনীকে আপাদমস্তক দেখল, তারপর সিঁড়ি দিয়ে ওপরে চলে গেল। মেদিনী জানত মকরুন্দ কে, সে মুখ টিপে হেসে নিজের ঘরে ফিরে গেল।–
তিন মাস কেটে যাবার পরও যখন বেণীমাধবের পেটের আর কোনো গণ্ডগোল হলো না তখন তিনি নিঃসংশয়ে বুঝলেন তাঁর পেটের কোনো দোষ নেই, হজম করার শক্তি অক্ষুন্ন আছে। পুত্রবধূ এবং মেয়ের প্রতি তাঁর সন্দেহ নিশ্চয়তায় পরিণত হলো। তারপর একদা গভীর রাত্রে বিভীষিকাময় স্বপ্ন দেখে তাঁর ঘুম ভেঙ্গে গেল। কে যেন ছুরি দিয়ে পেঁচিয়ে পেচিয়ে তার গলা কাটছে।
তারপর তিনি আর ঘুমোতে পারলেন না। বাকি রাত্রিটা চিন্তা করে কাটালেন। মৃত্যুভয়ে জড়িত। ঐহিক চিন্তা।
পরদিন বেলা সাড়ে দশটার সময় তিনি তাঁর সলিসিটারকে টেলিফোন করলেন—’সুধাংশুবাবু্, আমি উইল করতে চাই। বেশি নড়াচড়ার ক্ষমতা নেই, আপনি একবার আসবেন?
বেণীমাধব পুরনো মক্কেল, মালদার লোক। সুধাংশুবাবু বললেন—’বিকেলবেলা যাব।’
বিকেলবেলা সুধাংশুবাবু এলেন। দোর বন্ধ করে দু’জনে প্রায় দেড় ঘন্ট উইলের শতাদি আলোচনা করলেন; সুধাংশুবাবু অনেক নোট করলেন। শেষে বললেন—‘পরশু আমি উইল তৈরি করে নিয়ে আসব, আপনি উইল পড়ে দস্তখত করে দেবেন। দু’জন সাক্ষীও আমি সঙ্গে আনব।’–
সন্ধ্যের পর সনৎ আর নিখিল বেণীমাধবের কাছে এসে বসল, কুশল প্রশ্ন করল। মেদিনী পাশের ঘরে রান্না করছিল; বেণীমাধব ভাগনেদের চা ও আলুভাজা খাওয়ালেন।
ওরা চলে যাবার পর বেণীমাধব মেঘরাজকে ডেকে বললেন-‘‘দোতলা থেকে সকলকে ডেকে নিয়ে এসে।’
দোতলায় মকরন্দ ছাড়া আর সকলেই ছিল, সমান পেয়ে ছুটে এল। ঝিল্লী আর লাবণিও এল। বেণীমাধব খাটের ধারে বসেছিলেন, দুই নাতনীকে ডেকে নিজের দু’ পাশে বসলেন, তারপর ছেলে-বৌ মেয়ে-জামাই-এর পানে চেয়ে গম্ভীর গলায় বললেন–’আমি উইল করতে দিয়েছি। উইলের ব্যবস্থা আগে থাকতে তোমাদের জানিয়ে দিতে চাই।’
সকলে সশঙ্ক মুখে চেয়ে রইল। বেণীমাধব ধীরে ধীরে বলতে লাগলেন—’আমার মৃত্যুর পর আমার নগদ সম্পত্তি তোমরা হতে পাবে না। অ্যানুইটির ব্যবস্থা করেছি; তোমরা এখন যেমন মাসহারা পাচ্ছ তেমনি পাবে। কোনো অবস্থাতেই যাতে তোমাদের অর্থকষ্ট না হয় সেদিকে দৃষ্টি রেখে মাসহারার টাকার অঙ্ক ধার্য করেছি। বাড়িটা যতদিন তোমরা বেঁচে থাকবে ততদিন সমান ভাগ করে ভোগ করবে, বিক্রি করতে পারবে না।’
চারজনে মুখ অন্ধকার করে দাঁড়িয়ে রইল। বেণীমাধব দুই নাতনীর কাঁধে হাত রেখে বললেন–’ঝিল্লী আর লাবণির জন্যে আমি আগে থেকেই মেয়াদী বীমা করে রেখেছি, একুশ বছর বয়স পূর্ণ হলে ওরা প্রত্যেকে পঞ্চাশ হাজার টাকা পাবে। তাছাড়া আমি ঠিক করেছি। ওদের বিয়ে দিয়ে যাব। তোমাদের মেয়ের বিয়ের ভাবনা ভাবতে হবে না। লাবণির জন্যে একটি ভাল পাত্র আছে; ছেলেটি মিলিটারিতে লেফটেনেন্ট! ঝিল্লীর জন্যে মনের মত পাত্র এখনো পাইনি, পেলেই একসঙ্গে দু’জনের বিয়ে দেব।’ তাঁর মুখে একটু প্রসন্নতার ভাব এসেছিল, আবার তা মুছে গেল; তিনি ভ্রূকুটি করে বললেন—’মকরুন্দকেও আলাদা পঞ্চাশ হাজার টাকা দিয়ে যাব ভেবেছিলাম, কিন্তু সে বড় অসভ্য বেয়াদব হয়ে দাঁড়িয়েছে, তাকে কিছু দেব না।’
বেণীমাধব চুপ করলেন, তাঁর শ্রোতারাও চুপ করে রইল; কারুর মুখে কথা নেই। শেষে গঙ্গাধর একটু কেশে অস্পষ্টভাবে বলল—’আপনার সম্পত্তি আপনি যেমন ইচ্ছে ব্যবস্থা করুন, আমাদের বলবার কিছু নেই। তবে টাকার দর, আজ এক রকম কাল এক রকম–’
গায়ত্রী স্বামীর কথায় বাধা দিয়ে ভারী গলায় বলল–’বাবা, তুমি যা দেবে তাই মাথা পেতে নেব। উইল কি সই হয়ে গেছে?’
বেণীমাধব কারুর দিকে তাকালেন না, অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন–উকিলকে উইল তৈরি করতে দিয়েছি, কাল পরশু সই দস্তখত হবে। হ্যাঁ, একটা শর্তের কথা তোমাদের বলা হয়নি। উইলের শর্ত থাকবে, যদি আমার অপঘাত মৃত্যু হয় তাহলে তোমরা কেউ আমার এক পয়সা পাবে না, সব সম্পত্তি পাবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়।’
এই কথা শুনে সকলে কিছুক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে রইল, তারপর আস্তে আস্তে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
রাত্রি হলো। যথাসময়ে বেণীমাধব নৈশাহার সম্পন্ন করে শয্যা নিলেন। মেঘরাজ ও মেদিনী পাশের ঘরে খাওয়াদাওয়া করল; মেঘরাজ সামনের দরজা ভেজিয়ে দরজা আগলে বিছানা পাতল, মেদিনী নিজের ঘরে গেল।
ওদিকে দোতলায়। থমথমে ভাব। লাবণির নাচের মাস্টার এসেছিল, কিন্তু বাড়িতে কারুর নাচের প্রতি রুচি নেই। পরাগ আর লাব্রণি আড়ালে কথা বলল, তারপর চুপিচুপি নিঃশব্দে সিনেমা দেখতে চলে গেল। কেউ তাদের যাওয়া লক্ষ্য করল। কিনা সন্দেহ।
নিখিল সন্ধ্যের পরই কাজে চলে গিয়েছিল; সে নিশাচর মানুষ, সারা রাত কাজ করে, সকালবেলা ফিরে আসে।
রাত্রি আন্দাজ ন’টার সময় সনৎ ক্যামেরা নিয়ে বেরুল, মেদিনীর দোরের সামনে দাঁড়িয়ে বলল—’মেদিনী, আমি বর্ধমানে যাচ্ছি, কাল সকালে সেখানে একটা নাচগানের মজলিশ আছে। কাল বিকেলের দিকে কোনো সময় ফিরব। আমার জন্যে আজ রাত্রে তোমাকে দোর খুলতে হবে না।’ বলে একটু হাসল।
মেদিনী ক্ষণকাল তার চোখে চোখ রেখে বলল–’জি।’
সনৎ চলে গেল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে বাইরে থেকে মকরন্দ এল, মেদিনীকে কড়া সুরে বলল–’দোর বন্ধ করে দাও। রাত্রে কেউ যদি বাইরে থেকে এসে আমার খোঁজ করে, বলবে আমি বাড়ি নেই।’ উত্তরের অপেক্ষা না করে সে ওপরে চলে গেল। মেদিনী সদর দরজায় খিল লাগাল।
তারপর বাড়ির ওপর রাত্রির রহস্যময় যবনিকা নেমে এল।
পরদিন ভোরবেলা মেদিনী সদর দরজা খুলতে গিয়ে দেখল, কবাট ভেজানো আছে কিন্তু খিল খোলা। সে ভুরু কুঁচকে একটু ভাবল, তারপর কবাট একটু ফাঁক করল; বাইরে নিখিলকে দেখা গেল, সে কাজ শেষ করে ফিরছে। মেদিনীর সঙ্গে চোখাচে্যুখি হতেই সে হেসে বলল–’তোমরা কাম শুরু হুয়া হামারা কাম শেষ হুয়া। এবার খুব ঘুমায়গা।’
নিখিল নিজের ঘরে চলে গেল। মেদিনী দরজা ফাঁক করে রাখল, কারণ দোতলায় বি কাজ করতে আসবে। তারপর সে কর্তার চা তৈরি করার জন্যে সিঁড়ি ভেঙে তেতলায় চলল।
মিনিটখানেক কাটতে না কাটতে তিনতলা থেকে স্ত্রীকণ্ঠের তীব্র আর্তনাদ এল, তারপর ধাপ করে শব্দ। নিখিল তার ঘরে গায়ের জামা খুলে গেঞ্জি খোলবার উপক্রম করছিল, তীব্র চীৎকার শুনে সেই অবস্থাতেই ওপরে ছুটিল। দোতলা থেকেও সকলে বেরিয়ে এসেছিল, সকলে প্ৰায় একসঙ্গে তেতলায় গিয়ে পৌঁছল। তারপর বেণীমাধবের দোরের সামনে ভয়াবহ দৃশ্য দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল।
মেঘরাজ বিছানার ওপর ঊর্ধ্বমুখে পড়ে আছে, তার গলা এদিক থেকে ওদিক পর্যন্ত কাঁটা; বালিশ এবং বিছানার ওপর পুরু হয়ে রক্ত জমেছে। মেদিনী তার পায়ের দিকে অজ্ঞান হয়ে লুটিয়ে পড়েছে।
কিছুক্ষণ কারুর মুখ দিয়ে কথা সরল না, তারপর নিখিল চেচিয়ে উঠল–’মামা-মামা বেঁচে আছেন তো?’
গায়ত্রী, আরতি এবং ঝিল্লী কেঁদে উঠল, অজয় এবং গঙ্গাধর মূর্তির মত দাঁড়িয়ে রইল; কারুর যেন নড়বার শক্তি নেই। নিখিল তখন মেঘরাজকে ডিঙিয়ে বন্ধ দোরে ঠেলা দিল। দোর খুলে গেল; খোলা দোর দিয়ে দেখা গেল, বেণীমাধব খাটের ওপর শুয়ে আছেন, তাঁর গলায় নীচে গাঢ় রক্তের চাপ জমা হয়ে আছে। মেঘরাজকে যেভাবে যে-অস্ত্র দিয়ে গলা কাটা হয়েছে বেণীমাধবকে ঠিক সেইভাবে সেই অস্ত্র দিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
কান্নার একটা কলরোল উঠল। নিখিল ক্ষণিকের জন্য জড়বৎ দাঁড়িয়ে থেকে ঘরের মধ্যে ছুটে গিয়ে টেলিফোন তুলে নিল। প্রথমে নিজের সংবাদপত্রের অপিসে ফোন করল, তারপর থানায়।
তিন
ব্যোমকেশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেখল, সদর দরজায় পুলিস পাহারা। কনস্টেবল ব্যোমকেশকে দেখে স্যালুট করল, বলল–’ইন্সপেক্টর সাহেব নীচের তলায় বসবার ঘরে আছেন।’
প্রশস্ত ড্রয়িং রুমে ইন্সপেক্টর রাখাল সরকার এবং দু’জন সাব-ইন্সপেক্টর উপস্থিত ছিলেন; মধ্য টেবিল ঘিরে একটা ফাইল নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। ব্যোমকেশ প্রবেশ করতেই রাখালবাবু তার কাছে এসে দাঁড়ালেন, করুণ হেসে বললেন—’জড়িয়ে পড়েছি ব্যোমকেশদা। বেণীসংহার নামটা আপনি ঠিকই দিয়েছেন। বেণীসংহার শব্দের আসল মানে শুনেছি খোঁপা বাঁধা; মেয়েরা প্রথমে চুলের বিনুনি করে, তারপর বিনুনি জড়িয়ে খোঁপা বাঁধে। এ ব্যাপারও অনেকটা সেই রকম; এমন জটিল কুটিল তার বাঁধুনি যে বেণীসংহার উন্মোচন করা দুষ্কর হয়ে দাঁড়িয়েছে। খুনের মোটিভ পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, সন্দেহভাজন লোকের সংখ্যাও পাঁচজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ; তবু ঠিক কোন লোকটি এ কাজ করেছে তা ধরা যাচ্ছে না।’
‘এসো, বসা যাক।।’ দু’জনে দুটো চেয়ারে ঘেঁষাৰ্ঘেষি হয়ে বসলেন-‘এবার বলে।’
রাখালবাবু কাল থেকে যেসব তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন তা ব্যোমকেশকে শোনালেন, প্রশ্নোত্তরের ভিতর দিয়েও কয়েকটি তথ্য প্রকাশ পেল। ব্যোমকেশ বলল–’মোটিভ কি?’
‘বুড়োর অগাধ টাকা। ছেলে এবং মেয়েকে মাসহারা দিত, কিন্তু তাতে তাদের মন উঠত না। ডাক্তার অবিনাশ সেন সন্দেহ করেন, মেয়ে এবং পুত্রবধূ বিষাক্ত খাবার খাইয়ে বুড়োকে মারবার চেষ্টা করছিল। তা যদি হয় তাহলে ছেলে এবং জামাইয়ের মধ্যে ষড় আছে। যা দিনকাল পড়েছে কিছুই অসম্ভব নয়।’
‘মেঘরাজকে মারবার উদ্দেশ্য কি?’
‘মেঘরাজ রাত্রে বেণীমাধবের দোরের সামনে বিছানা পেতে শুতো। দোর ভেজানো থাকত, যাতে বেণীমাধব ডাকলেই সে ঘরে ঢুকতে পারে। সুতরাং তাকে বধ না করে ঘরে ঢোকা যায় না। তাকে ডিঙিয়ে ঘরে ঢুকতে গেলে সে জেগে উঠবে। তাই তাকে আগে মারা দরকার হয়েছিল।’
‘মারণাস্ত্রটা পাওয়া যায়নি?’
‘না। তবে ময়না তদন্ত থেকে জানা গেছে যে, অস্ত্রটা খুব ধারালো ছিল। একই অস্ত্র দিয়ে দু’জনকে মেরেছে। অস্ত্রের এক টানে গলা দুফাঁকি হয়ে গেছে।’
‘হত্যার সময়টা জানা গেছে?’
‘স্কুলভাবে রাত্ৰি বারোটা থেকে তিনটের মধ্যে। ‘
‘হুঁ। সন্দেহভাজন পাঁচজন কারা?’
‘অজয় ও তার স্ত্রী আরতি, গায়ত্রী ও তার স্বামী গঙ্গাধর। এবং অজয়ের ছেলে মকরন্দ। মকরন্দকে মেঘরাজ একদিন বেণীমাধবের হুকুমে চড় মেরেছিল। ঝিল্লীকে বাদ দেওয়া যায়, সে ছেলেমানুষ, তার কোনো মোটিভ নেই।’
‘মকরন্দ ছেলেটা করে কি?’
‘পলিটিক্সের হুজুগ করে। কলেজে নাম লেখানো আছে, এই পর্যন্ত। সে-রত্রে আন্দাজ ন’টার সময় বাড়িতে এসেছিল, তারপর রাত্রেই কখন বেরিয়ে গেছে। কেউ জানে না। সেই যে পালিয়েছে আর ফিরে আসেনি। তার নামে হুলিয়া জারি করেছি।’
‘বাড়িতে এখন কে কে আছে?’
‘অজয় আরতি গঙ্গাধর গায়ত্রী ঝিল্লী নিখিল রায় সনৎ গাঙ্গুলী আর মেঘরাজের বিধবা মেদিনী। অজয়ের মেয়ে লাব্রণি সে-রাত্রে তার নাচের মাস্টারের সঙ্গে সিনেমা দেখতে গিয়েছিল, আর ফিরে আসেনি। নিখিল আর সনৎ রাত্রে কাজে বেরিয়েছিল, তারা পরদিন ফিরে এসেছে। যারা বাড়িতে আছে তাদের বাইরে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি।’
‘সকলের আঙুলের ছাপ নিয়েছ নিশ্চয়।’
‘তা নিয়েছি।’
‘খানাতল্লাশ করে কিছু পেলে?’
‘সন্দেহজনক কিছু পাইনি।’
‘বেশ; এবার জবানবন্দীর নথিটা দেখি।’
‘এই যে!’ রাখালবাবু টেবিল থেকে ফাইল তুলে নিয়ে ব্যোমকেশকে দিলেন। এই সময় সদর দরজায় কনস্টেবল এসে জানাল যে, সলিসিটার সুধাংশু বাগচী নামে এক ভদ্রলোক দেখা করতে চান। রাখালবাবু বললেন—’নিয়ে এসো।’
সুধাংশুবাবু ঘরে প্রবেশ করলেন, হাতে পাট করা খবরের কাগজ। রাখালবাবুর পানে চেয়ে বললেন—’আমি বেণীমাধববাবুর সলিসিটার। আজ খবরের কাগজ খুলেই দেখলাম—‘
‘বসুন।’
সুধাংশুবাবু একটি চেয়ারে বসলেন। রাখালবাবু তাঁর সামনে দাঁড়ালেন, ব্যোমকেশও এগিয়ে এসে দাঁড়াল।
রাখালবাবু প্রশ্ন করলেন–’বেণীমাধববাবুর সঙ্গে কবে আপনার শেষ দেখা হয়েছিল?’
সুধাংশুবাবু বললেন-‘পরশু। আমরা অনেকদিন ধরে তাঁর বৈষয়িক কাজকর্ম দেখাশোনা করে আসছি। পরশু তিনি আমাকে ফোন করে জানালেন যে, তিনি উইল করতে চান। আমি বিকেলবেলা এসে তাঁর সঙ্গে দেখা করেছিলাম। উইলে কি কি শর্ত থাকবে তিনি আমাকে জানিয়েছিলেন। আমি উইল তৈরি করে আজ তাঁকে দলিল দেখিয়ে সহি-দস্তখত করিয়ে নেব বলে সব ঠিক করে রেখেছিলাম, তারপর আজ সকালে কাগজ খুলে এই সংবাদ পেলাম।’
রাখালবাবু চকিতে একবার ব্যোমকেশের পানে চেয়ে বললেন–’উইলে কি কি শর্ত আছে আমাদের বলতে বাধা আছে কি?’
সুধাংশুবাবু বললেন—’অন্য সময় বাধা নিশ্চয় থাকত, কিন্তু বর্তমান অবস্থায় বাধা নেই। বরং আপনাদের সুবিধা হতে পারে।’
তিনি উইলের শর্তগুলি শোনালেন; অপঘাতে মৃত্যু হলে সমস্ত সম্পত্তি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় পাবে সে কথাও উল্লেখ করলেন।
বেলা এগারটা নাগাদ তিনি উঠলেন, বলে গেলেন—’যদি আমার কাছ থেকে আরো কিছু জানতে চান কিংবা উইল পড়ে দেখতে চান, আমার অফিসে খবর দেবেন।’
তিনি চলে যাবার পর রাখালবাবু বললেন—’মোটিভ আরো পাকা হলো। বুড়োকে আর দুদিন বাঁচতে দিলেই এত বড় সম্পত্তিটা বেহাত হয়ে যেত।’
ব্যোমকেশ বলল-’হুঁ। আমি এবার উঠিব। কিন্তু আগে বেণীমাধবের ঘরটা দেখে যেতে চাই?
‘চলুন।’
দোতলার সিঁড়ির মাথায় একজন কনস্টেবল। তেতলায় বেণীমাধবের দরজায় তালা লাগানো, উপরন্তু একজন কনস্টেবল টুলে বসে পাহারাদিচ্ছে। মেঘরাজের রক্তাক্ত বিছানা পরীক্ষার জন্য স্থানান্তরিত হয়েছে।
রাখালবাবু পকেট থেকে চাবি বের করে তালা খুললেন, দু’জনে ঘরে প্রবেশ করলেন। ঘরের মাঝখানে খাটের ওপর বিছানা নেই, আর সব যেমন ছিল তেমনি আছে। ব্যোমকেশ দোরের কাছে দাঁড়িয়ে একবার চারিদিকে চোখ ফেরাল, তারপর অস্ফুট স্বরে বলল—’তোমরা অবশ্য সবই দেখেছ, তবু—‘
রাখালবাবু ঘাড় নাড়লেন–’অধিকন্তু ন দোষায়।’
‘লোহার সিন্দুকের গায়ে লাগানো ছিল।‘
সিন্দুকের মধ্যে তিনখানা একশো টাকার নোট ছিল, পাঁচ টাকা দশ টাকার নোট বা খুচরো টাকা পয়সা একটাও ছিল না। মনে হয় খুনী সিন্দুক খুলে টাকা পয়সা নিয়েছে কিন্তু ধরা পড়ার ভয়ে নম্বরী নোট নেয়নি।’
‘হুঁ। সিন্দুকে আর কী ছিল?’
‘কিছু দলিলপত্র, কিছু রসিদ, ব্যাঙ্কের খাতা ও চেকবুক। দুটো ব্যাঙ্কে টাকা আছে, সাকুল্যে প্রায় চল্লিশ হাজার। তাছাড়া শেয়ার সার্টিফিকেট ও fixed deposit আছে আন্দাজ এগারো লাখ টাকার। মালদার লোক ছিলেন। ছেলে আর মেয়েকে সাড়ে সাত শো টাকা হিসেবে মাস হারা দিতেন। তাঁর নিজের খরচ ছিল সাত শো টাকা, মেঘরাজকে মাইনে দিতেন আড়াই শো টাকা। চেকবুকের counter foil থেকে এইসব খবর জানা যায়।’
‘সিন্দুকের ভিতরে কি বাইরে বেণীমাধব ছাড়া অন্য কারুর আঙুলের ছাপ আছে?’
‘কারুর আঙুলের ছাপ নেই, একেবারে লেপা-পোছা।’
‘হ্যাঁ, আততায়ী লোকটি হাঁশিয়ার।’ ব্যোমকেশ সিন্দুক খুলল না, ফ্রিজের সামনে গিয়ে দাঁড়াল–’ফ্রিজে কারুর আঙুলের ছাপ ছিল?’
‘ছিল। বেণীমাধব, মেঘরাজ এবং মেদিনী-তিনজনের আঙুলের ছাপ ছিল। আর কারুর ছাপ পাওয়া যায়নি।’
হাতল ধরে ব্যোমকেশ ফ্রিজ খুলল, ভিতরে আলো জ্বলে উঠল; ফ্রিজ চালু আছে। ভিতরে নানা জাতের ফলমূল। সারি সারি ডিম, মাছ, মাংস, দুধের বোতল রয়েছে। ব্যোমকেশ আবার দোর বন্ধ করে দিল।
ঘরের পিছন দিকের দেয়ালে একটা লম্বা ধরনের আয়না। টাঙানো ছিল, তার নীচে তাকের ওপর চিরুনী বুরুশ চুলের তেল ও দাড়ি কামাবার সরঞ্জাম। দাড়ি কামাবার সরঞ্জামের বিশেষত্র এই যে, ক্ষুরটি সেফটি রেজর নয়, সাবেক কালের ভাঁজ-করা লম্বা ক্ষুর। ব্যোমকেশ সন্তৰ্পণে খাপসুদ্ধ ক্ষুর তুলে নিয়ে বলল—’ক্ষুরটা বের করে দেখেছি নাকি?’
রাখালবাবু চক্ষু একটু বিস্ফারিত করলেন, বললেন—’না। বেণীমাধব নিজের হাতে দাড়ি কামাতেন না, মেঘরাজ রোজ সকালে দাড়ি কামিয়ে দিত।’
ব্যোমকেশ সাবধানে ক্ষুরটি খাপ থেকে বের করে দু’ আঙুলে ধরে জানালার কাছে নিয়ে গিয়ে উলট-পালটে দেখতে লাগল। তারপর বিস্মিত স্বরে বলল—’আশ্চর্য!’
ব্যোমকেশ ক্ষুরটি তাঁর হাতে দিয়ে বলল—’দেখ, কোথাও আঙুলের ছাপ নেই।’
ক্ষুর নিয়ে রাখালবাবু পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা করলেন, তারপর ক্ষুর ব্যোমকেশকে ফেরত দিয়ে তার মুখের পানে চাইলেন; দু’জনের চোখ বেশ কিছুক্ষণ পরস্পর আবদ্ধ হয়ে রইল। তারপর ব্যোমকেশ ক্ষুরটি খাপের মধ্যে পুরে নিজের পকেটে রাখল, বলল—’এটা আমি নিয়ে যাচ্ছি।’
‘কি করবেন?’
‘দাড়ি কামাব।’
তেতলার অন্য ঘর দু’টিতে দর্শনীয় কিছু ছিল না। তবু ব্যোমকেশ ঘর দু’টিতে ঘুরে ফিরে দেখল; তারপর নীচের তলায় নেমে এসে রাখালবাবুকে বলল–’আমি এখন চললাম। বিকেলবেলা আবার আসব। জবানবন্দীর ফাইলটা দাও, বাড়ি গিয়ে পড়ব।’
রাখালবাবু বললেন—’আমাকে একবার থানায় যেতে হবে, চলুন আপনাকে নামিয়ে দিয়ে যাই। কি রকম মনে হচ্ছে?’
ব্যোমকেশ মুচকি হেসে বলল–’ক্ষুরস্য ধারা নিশিতা দুরত্যয়া—’
রাখালবাবু জবানবন্দীর ফাইল ব্যোমকেশকে দিলেন, তাকে নিয়ে পুলিস ভ্যানে চলে গেলেন। দু’জন সাব-ইন্সপেক্টর, এবং কয়েকজন নিম্নতর কর্মচারী বাড়িতে মোতায়েন রইল।
বিকেল তিনটের সময় ব্যোমকেশ ফিরে এল। রাখালবাবু আগেই ফিরেছিলেন, তাঁকে ক্ষুর আর জবানবন্দীর নথি ফেরত দিয়ে ব্যোমকেশ একটা চেয়ারে বসল। রাখালবাবু প্রশ্ন করলেন–কেমন দাড়ি কামালেন?’’
ব্যোমকেশ মাথা নেড়ে বলল–’ভাল নয়।’
‘আর জবানবন্দী?’
‘মেদিনীর জবানবন্দী সবচেয়ে তথ্যপূর্ণ। তাকে আরো কিছু প্রশ্ন করতে চাই।’
‘বেশ তো, তাকে ডেকে পাঠাচ্ছি। সে নিজের ঘরেই আছে।’
কিন্তু মেদিনীকে ডেকে পাঠাবার আগেই দু’জন সাদা পোশাকের পুলিস কর্মচারী মকরন্দকে নিয়ে ঘরে ঢুকাল। মকরন্দর কাপড়-জামা ছিঁড়ে গেছে, গায়ে মুখে ধুলোবালি, চোখ জবাফুলের মত লাল। বেশ বোঝা যায় সে স্বেচ্ছায় বিনা যুদ্ধে পুলিসের হাতে ধরা দেয়নি। একজন সাদা পুলিস বলল–’মকরন্দ চক্রবতীকে ধরেছি। স্যার।’
রাখালবাবু মকরন্দর আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করে বললেন-ইনিই মকরন্দ চক্রবর্তী! কোথায় ধরলে?’
‘ঘোড়দৌড়ের মাঠে। রেস খেলছিল স্যার। পকেটে অনেক টাকা ছিল। এই যে।’
এক তাড়া পাঁচ টাকা ও দশ টাকার নোট। রাখালবাবু গুনে দেখলেন, পৌঁনে দু’ শো টাকা। তিনি মকরুন্দকে জিজ্ঞাসাবাদ আরম্ভ করলেন–তোমার নাম মকরন্দ চক্রবর্তী?’
মকরুন্দ রক্তরাঙা চোখে চেয়ে রইল, উত্তর দিল না। রাখালবাবু আবার প্রশ্ন করলেন—’তুমি পৌঁনে দু’ শো টাকা কোথায় পেলে?’
উদ্ধত উত্তর হলো–’বলব না।’
‘যে-রাত্রে তোমার ঠাকুরদা খুন হন সে-রাত্রে ন’টার সময় তুমি বাড়ি এসেছিলে, তারপর শেষরাত্রে চুপিচুপি দোর খুলে বেরিয়ে গিয়েছিলে–’
‘মিছে কথা। মেদিনী মিছে কথা বলেছে।’
‘মেদিনী বলেছে জানলে কি করে?’
মকরন্দ, অধর দংশন করল, উত্তর দিল না। রাখালবাবু আবার প্রশ্ন করলেন–’কত রাত্রে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলে?’
‘বলব না।’
‘তারপর আর বাড়ি ফিরে আসনি কেন?’
রাখালবাবু তার খুব কাছে এসে বললেন—’একদিন বেণীমাধববাবুর হুকুমে মেঘরাজ তোমার কান ধরে গালে চড় মেরেছিল, গলাধাক্কা দিয়ে ঘর থেকে বার করে দিয়েছিল।’
‘মিছে কথা।’
‘বাড়িসুদ্ধ লোক মিছে কথা বলছে?
‘হ্যাঁ।‘
রাখালবাবু ফিরে এসে ব্যোমকেশের পাশে বসলেন, গলা খাটো করে বললেন–এটাকে নিয়ে কী করা যায় বলুন দেখি?’
ব্যোমকেশও নীচু গলায় বলল—’যুগধর্মের নমুনা। ওকে বাড়িতেই আটক রাখ।’
‘তাই করি।’ রাখালবাবু উঠে গিয়ে মকরন্দকে কড়া সুড়ে বললেন—’যাও, দোতলায় নিজের ঘরে থাকো গিয়ে। বাড়ি থেকে বেরুবার চেষ্টা কোরো না, চেষ্টা করলে হাজতে গিয়ে লাপসি খেতে হবে। যাও।’
সাদা পোশাকের পুলিস দু’জন মকরন্দকে দোতলায় পৌঁছে দিয়ে চলে গেল। রাখালবাবু বললেন–’মেদিনীকে ডেকে পাঠাই?’
ব্যোমকেশ উঠে দাঁড়িয়ে বলল-না, চল আমরাই তার ঘরে যাই। এখানে অনেক বাধাবিঘ্ন।’
মেদিনীর দোরে টোকা দিয়ে ঘরে ঢুকতেই দেখা গেল মেদিনী মেঝেয় মাদুর পেতে শুয়ে আছে। ব্যোমকেশ ও রাখালবাবুকে দেখে সে উঠে বসল। তার পরনে ধূসর রঙের একটা শাড়ি, কপালে সিঁদুর নেই, হাতে গলায় কানে গয়না নেই। মুখের ভাব একটু ফুলো ফুলো; শোকের চিহ্ন এখনো মুখ থেকে মুছে যায়নি, কিন্তু শোকের অধীরতা দূর হয়েছে। সে আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়িয়ে প্রশ্নভরা চোখে দু’জনের পানে চাইল।
রাখালবাবু সদয় কণ্ঠে বললেন—’মেদিনী, ইনি আমার বন্ধু। আমি তোমাকে যেসব প্রশ্ন করেছি। তার ওপর ইনি আরো দু-চারটে সওয়াল করতে চান।’
মেদিনী ভাঙ্গা-ভাঙ্গা গলায় বলল—’জি।’
ব্যোমকেশ একদৃষ্টে মেদিনীর মুখের পানে চেয়ে ছিল, আরো কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে বলল–’কতদিন আগে মেঘরাজের সঙ্গে তোমার বিয়ে হয়েছিল?’
মেদিনী অস্ফুট কণ্ঠে বলল–’পাঁচ বছর আগে।’
‘তুমিই তার প্রথম স্ত্রী?’
‘জি, না। আগে একজন ছিল, সে মারা গেছে।’
‘হুঁ।’ ব্যোমকেশ ঘরের চারিদিকে চাইল। ঘরে ফার্নিচারের মধ্যে একটা তক্তপোশ, একটা কাঠের আলমারি এবং একটা খাড়া আলনা। তক্তপোশের তলায় গোটা দুই বড় তোরঙ্গ দেখা যাচ্ছে। বাইরের দিকের জানালার পটার ওপর একটা কাঠের চ্যাপটা বাক্স। পশ্চিমা মেয়েরা প্রসাধনের জন্যে এই ধরনের বাক্স ব্যবহার করে; বাক্সের মধ্যে সিঁদুর কোটো চিরুনী তেল কাজল প্রভৃতি থাকে, ডালা খুললে ডালার গায়ে আয়না বেরিয়ে পড়ে। সব মিলিয়ে নিতান্ত মামুলি পারিবেশ।
ব্যোমকেশ এদিক-ওদিক তাকাতে তাকাতে জিজ্ঞেস করল—’বাড়ির সকলকেই তুমি চেন। কে কেমন মানুষ বলতে পার?
মেদিনী একটু চুপ করে থেকে হাতের নখ খুঁটিতে খুঁটিতে বলল—’বুঢ়া বাবা বড় ভাল আদমি ছিলেন, দিলদার লোক ছিলেন। তাঁর ছেলে আর দোমাদও ভাল লোক। মেয়ে আর পুতন্থ আমাকে পছন্দ করেন না। ঝিল্লী দিদি আর লাব্রণি দিদি ভারি ভাল মেয়ে।’
‘আর মকরন্দ?
মেদিনী চকিতে চোখ তুলেই আবার নীচু করল—’উনি আমাকে দেখতে পারেন না। ভারি কড়া জবান।’
‘মেঘরাজ তাকে চড় মেরেছিল তুমি জানো?’
‘জি হ্যাঁ, আমি তখন পাশের ঘরে ছিলুম।’
‘নিখিল আর সনৎ?’
‘নিখিলবাবু মজাদার লোক, খুব ঠাট্টা তামাসা করেন। আর সনৎবাবু গভীর মেজাজের মানুষ। কিন্তু দু’জনেই খুব ভদ্র।’
‘আচ্ছা, ওকথা থাক। মেঘরাজ সৈন্যদলের সিপাহী ছিল, তার সিপাহী-জীবন সংক্রান্ত কাগজপত্র নিশ্চয় তোমার কাছে আছে?’
‘জি আছে, তার বাক্সের মধ্যে আছে।’
‘আমি একবার কাগজপত্রগুলো দেখতে চাই।’
‘এই যে বার করে দিচ্ছি।’
সে গিয়ে তক্তপোশের তলা থেকে একটা ট্রাঙ্ক টেনে বার করল, আচল থেকে চাবি নিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে ট্রাঙ্ক খুলতে লাগল। ব্যোমকেশ ইতিমধ্যে ঘরের এদিক-ওদিক তাকাতে তাকাতে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। জানলার ওপর প্রসাধনের বাক্সটা রাখা আছে। ব্যোমকেশ একটু ইতস্তত করে বাক্সের ডালা তুলল। বাক্সের মধ্যে মেয়েলি প্রসাধনের দ্রব্য ও টুকিটুকি; আয়নার এক কোণে মেদিনীর একটি ছবি আটা রয়েছে। পোস্টকার্ড আধখানা করলে যত বড় হয় তত বড় ছবি; মেদিনী খাটের ধারে বসে রয়েছে। নিতান্তাই ঘরোয়া ছবি, মেদিনীর মুখের প্রাণখোলা হাসিটি ব্যোমকেশের গায়ে কাঁটার মত বিধল। মেদিনীর বর্তমান চেহারা দেখে ভাবা যায় না। সে এমনভাবে হাসতে পারে। ব্যোমকেশ নিঃশব্দে বাক্স বন্ধ করল।
মেদিনী ট্রাঙ্ক থেকে কাগজপত্র নিয়ে যখন ফিরে এল তখন ব্যোমকেশ রাখালবাবুর কাছে ফিরে এসে নিম্নস্বরে কথা বলছে, মেদিনীর হাত থেকে কাগজপত্র নিয়ে সে মন দিয়ে পড়ল। রাখালবাবুও সঙ্গে সঙ্গে পড়লেন। তারপর কাগজ মেদিনীকে ফেরত দিয়ে ব্যোমকেশ মেদিনীকে বলল–’এগুলো যত্ন করে রেখে দাও, হয়তো পরে দরকার হবে। চল রাখাল।’
ঘর থেকে বেরিয়ে এসে রাখালবাবু ব্যোমকেশের দিকে চোখ বেঁকিয়ে তাকালেন—’কি মনে হলো?’
ব্যোমকেশ বলল—’খুব ভাল। এবার বাড়ির বাকি লোকগুলিকেও একে একে দেখতে চাই। সবাই বাড়িতে আছে তো?’
‘সবাই আছে, কেবল অজয়ের মেয়ে লাব্রণি ছাড়া। যে-রাত্রে খুন হয়, লাব্রণি সেদিন সন্ধ্যের সময় তার নাচের মাস্টারের সঙ্গে পালিয়েছে, এখনো তার সন্ধান পাইনি। অন্য যারা আছে তাদের মধ্যে আগে কাকে দেখতে চান?
‘আমার কোনো পক্ষপাত নেই। নীচের তলা থেকেই আরম্ভ করা যাক।’
নিখিলের দোরে রাখালবাবু টোকা দিলেন, নিখিল এসে দোর খুলে দাঁড়াল। তার গালে সাবানের ফেনা, হাতে সেফটি রেজর; সে ফেনায়িত হাসি হাসল–’আসুন দারোগাবাবু।’
রাখালবাবু ব্যোমকেশকে নিয়ে ঘরে প্রবেশ করলেন, প্রশ্ন করলেন-বিকেলবেলা দাড়ি কামাচ্ছেন?’
নিখিল বলল–’আমি নিশাচর। কিনা তাই বিকেলবেলা দাড়ি কামাই। যারা দিনের বেলা কাজ করে তারা সকালবেলা দাড়ি কামায়।’ তারপর সে ব্যগ্রস্বরে বলল–’দারোগাবাবু্, এক ঘন্টার জন্য আমাকে ছেড়ে দিন, একবারটি অফিস ঘুরে আসি। মাইরি বলছি পালাব না। বিশ্বাস না হয় দু’জন পেয়াদা আমার সঙ্গে দিন।’
রাখালবাবু হেসে বললেন–’অফিসে যাবার জন্যে এত ব্যস্ত কেন? বেশ তো আছেন।’
নিখিল বলল–’না দারোগাবাবু্, বেশ নেই। কাজের নেশা আমাকে অফিসের দিকে টানছে, রাত্তিরে ঘুমোতে পারি না। তা ছাড়া—’
‘তা ছাড়া আবার কি?’
নিখিল একটু সলজ্জভাবে বলল–’অফিসে অনেকগুলো আইবুড়ো মেয়ে কাজ করে, তাদের মধ্যে একটাকে আমি খুঁজছি, পেলেই তাকে বিয়ে করব।’
‘ব্যাপারটা কেমন যেন রহস্যময় ঠেকছে।’
‘ঠেকবেই তো। ঘোর রহস্যময় ব্যাপার।’
‘ঘোর রহস্যময় যদি হয় তাহলে এঁর শরণাপন্ন হোন। ইনিই হলেন শ্ৰীব্যোমকেশ বক্সী।’
নিখিলের গালে সাবানের ফেনা শুকিয়ে ঝরে ঝরে পড়ছিল, সে প্রকাণ্ড হ্যাঁ করে ব্যোমকেশের পানে তাকাল–’অ্যাঁ, আপনি সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ বক্সী! এতক্ষণ লক্ষ্যই করিনি।’ সেফটি রেজরাসুদ্ধ হাত জোড় করে বলল—’আমার রহস্যটা আপনাকে ভেদ করতেই হবে ব্যোমকেশবাবু। নইলে আমার প্রাণের আশা নেই।’
‘সব কথা খুলে বলুন।’
নিখিল তড়বড় করে এক নিশ্বাসে তার রহস্য শোনাল। শুনে ব্যোমকেশ বলল—’চিঠিগুলো দেখি।‘
নিখিল বিছানার কাছে গিয়ে বালিশের তলা থেকে কয়েকখানা খাম এনে ব্যোমকেশকে দিল। ব্যোমকেশ খামগুলি খুলে একে একে চিঠি বার করে পড়ল, তারপর আবার খামের মধ্যে পুরে নিজের পকেটে রাখল–’এগুলো আমি রাখলাম। দেখি যদি সন্ধান পাই। আপনি আপাতত এই বাড়িতেই থাকুন, আমি আপনার অফিসে খোঁজখবর নেব। —ভাল কথা, আপনার বিষতি আছে?’
বর্ষাতি-ওয়াটারপ্রুফ? আছে একটা। কেন বলুন তো?’
‘দেখি একবার।’
নিখিল সংলগ্ন বাথরুমে গিয়ে একটা পুরনো খাকি রঙের বিষতি নিয়ে এল। ব্যোমকেশ সেটা রাখালবাবুর হাতে দিয়ে বলল–’এটাও আমরা নিয়ে চললাম। এটা আপনি শেষবার কবে ব্যবহার করেছেন?’
নিখিল কিছুই বুঝতে পারেনি এমনিভাবে মাথা চুলকে বলল–’গত বিষাকালে, মানে পাঁচ ছয় মাস আগে। আপনি যে ভেলকি লাগিয়ে দিলেন, ওয়াটারপ্রফ থেকে আমার-মানে মেয়েটার ঠিকানা বার করবেন নাকি?’
ব্যোমকেশ কেবল মুখ টিপে হাসল, বলল—’আপনি দেখছি সেফটি রেজর দিয়ে দাড়ি কামান।‘
‘তবে কি দিয়ে দাড়ি কামাব?’
‘ঠিক কথা। আপনি যখন দাড়ি কামাতে আরম্ভ করেছেন তখন সাবেক ক্ষুরের রেওয়াজ উঠে গেছে!–আচ্ছা।’
ঘর থেকে বেরিয়ে ব্যোমকেশ রাখালবাবুর পানে বক্র কটাক্ষপাত করল। রাখালবাবু অপ্রতিভভাবে বললেন–’খেয়াল হয়নি। হওয়া উচিত ছিল। যে-লোক ছুরি কিংবা ক্ষুর দিয়ে গলা কাটতে যাচ্ছে, সে জানে গলা কাটলে চারদিকে রক্ত উথলে পড়বে, ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটিবে। তার নিজের গায়েও রক্ত লাগবে। তাই সে বিষতি কিংবা ওই রকম একটা কিছু গায়ে দিয়ে খুন করতে যাবে, যাতে সহজে রক্ত ধুয়ে ফেলা যায়।’
এই সময় সদর দোরের কনস্টেবল এসে একখানা পোস্টকার্ড রাখালবাবুর হাতে দিয়ে বলল–’পিওন দিয়ে গেল।’
রাখালবাবু নিদ্বিধায় পোস্টকার্ড পড়লেন। অজয় চক্রবর্তীর নামে চিঠি, তারিখ আজ সকালের, ঠিকনা টালিগঞ্জ। চিঠিতে কয়েক ছত্র লেখা আছে–
শ্ৰীচরণেষু মা,
কাল রাত্তিরে আমাদের বিয়ে হয়েছে। তোমরা রাগ কোরো না। আমার শ্বশুর শাশুড়ি খুব ভালো লোক। পরশু রাত্রে আমি শাশুড়ির কাছে শুয়েছিলাম। দাদু অন্য একজনের সঙ্গে বিয়ে ঠিক করেছিলেন তাই আমরা লুকিয়ে বিয়ে করেছি।
চিঠিতে চোখ বুলিয়ে রাখালবাবু ব্যোমকেশের হাতে চিঠি দিলেন, ব্যোমকেশ সেটা পড়ে ফেরত দিল। বলল–’বোধহয় ঠাকুরদার মৃত্যু-সংবাদ পায়নি। যাক, বিয়ে করেছে ভালই করেছে, নইলে–’
চিঠি পকেটে রেখে রাখালবাবু একজন সাব-ইন্সপেক্টরকে ডাকলেন—’এই বিষতিটা রাখো। আরো বোধহয় জুটবে; সবগুলো জড় হলে পরীক্ষার জন্যে পাঠাতে হবে। এটাতে টিকিট সেঁটে রাখ-নিখিল হালদার।’
তারপর তিনি সন্নতের দোরে টোকা দিলেন। সনৎ এসে দোর খুলল; তার হাতে একটা ইংরেজি রহস্য উপন্যাস পাতা ওলটানো অবস্থায় রয়েছে। রাখালবাবুকে দেখে বলল–’ইন্সপেক্টরবাবু্, আমার সিগারেট ফুরিয়ে গেছে, এক টিন আনিয়ে দেবেন? গোল্ড ফ্লোক।’
‘নিশ্চয়। টাকা দিন আনিয়ে দিচ্ছি।’
সনৎ একটা দশ টাকার নোট পকেট থেকে বার করে দিল। রাখালবাবু টাকা সাব-ইন্সপেক্টরের হাতে দিয়ে বললেন—’এক টিন গোল্ড ফ্রেক সিগারেট সামনের দোকান থেকে আনিয়ে দাও।’
তিনি ব্যোমকেশকে নিয়ে ঘরে প্রবেশ করলেন। সনৎ বলল–’আর কতদিন ঘরে বন্ধ করে। রাখবেন? কাজকর্ম আটকে রয়েছে। তা ছাড়া মামা মারা যাবার পর তাঁর উত্তরাধিকারী এখানে আর থাকতে দেবে না, মাথা গোঁজবার একটা জায়গা খুঁজতে হবে তো।’
‘থাকতে দেবে না কি করে জানলেন?’
‘আজ দুপুরবেলা গায়ত্রীর স্বামী গঙ্গাধর এসেছিল, বলল-এবার পাতাতাড়ি গোটাতে হবে।’
‘তাই নাকি!–বেশি দিন আপনাদের কষ্ট দেব না, দু’এক দিনের মধ্যে ছাড়া পাবেন। ইনি ব্যোমকেশ বক্সী, প্রখ্যাত সত্যান্বেষী।’
সনৎ নির্লিপ্ত চোখে ব্যোমকেশের পানে চাইল, নীরস স্বরে বলল–’নাম শুনেছি, বই পড়িনি। বাংলা রহস্য কাহিনী আমি পড়ি না। —বসুন।’
ব্যোমকেশের চোখ ঘরের চারিদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছিল, সে অলসভাবে বলল—’আপনার বিষতি আছে?’
সনৎ ভ্রূ তুলে একটু বিস্ময় প্রকাশ করল—’আছে। এটা বিষাকাল নয়। তাই তুলে রেখেছি। দেখতে চান?’
‘হ্যাঁ।‘
সনৎ আলমারি খুলে একটা প্ল্যাস্টিকের মোড়ক বার করল। মোড়কের মধ্যে একটি শৌখিন স্বচ্ছ বিষতি পাট করা রয়েছে। রাখালবাবু সেটি নিয়ে মোড়ক থেকে বার করলেন, তারপর লম্বা করে ঝুলিয়ে দেখলেন। দামী বিষতি, প্রায় নতুন। তিনি সেটিকে পাট করে আবার মোড়কের মধ্যে রেখে বললেন—’এটা আমি নিয়ে যাচ্ছি, দু’ দিন পরে ফেরত পাবেন। রসিদ দিচ্ছি।’
সনৎ অপ্রসন্ন উদাস কণ্ঠে বলল–’রসিদ কি হবে! আপনাদেরই রাজত্ব, যা ইচ্ছে করুন।’
ব্যোমকেশ হঠাৎ প্রশ্ন করল—’আপনার জবানবন্দীতে দেখলাম যে-রাত্ৰে বেণীমাধববাবু খুন হন সে-রত্রে আপনি বর্ধমানে গিয়েছিলেন। কোন ট্রেনে গিয়েছিলেন?’
সনৎ বলল–’রাত্রি সাড়ে দশটার ট্রেনে।’
‘পরদিন ভোরের ট্রেনে না গিয়ে রাত্রির ট্রেনে গেলেন কেন?’
‘ভোরের ট্রেনে গেলে ঠিক সময়ে পৌছুঁতে পারতাম না। সকালবেলা মজলিশ ছিল।’
‘বর্ধমানে আপনার কোনো আস্তানা আছে?’
‘না, স্টেশনের বেঞ্চিতে বসে রাত কাটিয়েছি।’
‘চায়ের স্টলে গিয়ে চা খেয়েছিলেন নিশ্চয়?’
‘চা আমি খাই না।’
‘তাহলে আপনি যে সাড়ে দশটার গাড়িতে বর্ধমান গিয়েছিলেন তার কোনো সাক্ষী-সার্বুদ নেই?’
সনতের ভুরু আবার উঁচু হলো—’সাক্ষী-সাবুদের কী দরকার? আপনাদের কি সন্দেহ আমি মামাকে খুন করেছি?’
ব্যোমকেশ একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল—’তা নয়। কিন্তু সকলের সম্বন্ধেই আমাদের নিঃসংশয় হওয়া দরকার।’
সনৎ শুকনো গলায় বলল–’মামাকে খুন করে যাদের লাভ আছে তাদের অ্যালিবাই খুঁজুন গিয়ে। তাতে কাজ হবে।’
‘তা বটে। চল রাখাল, এবার দোতলায় যাওয়া যাক।’
প্রথমে ড্রয়িংরুমে গিয়ে রাখালবাবু সনতের বিষতি সাব-ইন্সপেক্টরকে সমৰ্পণ করে বললেন-টিকিট মারো-সনৎ গাঙ্গুলি।’ তারপর ব্যোমকেশকে নিয়ে দোতলায় উঠলেন।
অজয় সামনের ঘরে বসে সায়হ্নিক চা জলখাবার খাচ্ছিল, সশঙ্ক মুখে উঠে দাঁড়াল। তার মুক্তকচ্ছ অশৌচের বেশ, মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি গজিয়েছে। রাখালবাবু গম্ভীর মুখে আম-আপনার একখান চিঠি এসেছে।’ তিনি পোস্টকার্ড পকেট থেকে নিয়ে অজয়কে দিলেন।
ব্যোমকেশ নিবিষ্ট চোখে অজয়ের পানে চেয়ে ছিল; সে দেখল চিঠি পড়তে পড়তে অজয়ের মুখের ওপর দিয়ে দ্রুত পরম্পরায় বিচিত্র ভাবের অভিব্যক্তি খেলে গেল : আশঙ্কা-বিস্ময়-স্বস্তি-উৎফুল্লতা। তার মধ্যে স্বস্তির আরামই বেশি। অজয়ের মত প্রকৃতির লোকের পক্ষে এটাই বোধহয় স্বাভাবিক; বিনা খরচে বিনা ঝঞ্ঝাটে যদি মেয়ের বিয়ে হয়ে যায় তাহলে আনন্দ হবারই কথা।
কিন্তু সে যখন মুখ তুলল। তখন তার মুখে একটি বিষণ্ণ করুণ ভাব, তাতে রঙ্গমঞ্চের আভাস পাওয়া যায়। সে একটি গভীর দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করল–’মেয়ে! দারোগাবাবু্, আমার একমাত্র মেয়ে পালিয়ে গিয়ে একজনকে বিয়ে করেছে। আজকালকার ছেলেমেয়েরা বড় নিষ্ঠুর, বড় স্বার্থপর, তারা বাপ-মায়ের কথা ভাবে না। যাক, যা করেছে ভালই করেছে। তবু যদি জাতের মধ্যে বিয়ে করত। যাক, ভাল হলেই ভাল।’ সে আবার নাটকীয় দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
রাখালবাবু বোধকরি অভিনয়ের পালা শেষ করার জন্যেই বললেন-ইনি ব্যোমকেশ বক্সী। বোধহয় নাম শুনেছেন।’
অজয় তড়াক করে উঠে দাঁড়িয়ে চোখ বিস্ফারিত করে চেয়ে রইল; তার ভাবভঙ্গীতে ভয় কিংবা বিস্ময় কিংবা আনন্দ কোনটা প্রকাশিত হলো ঠিক বোঝা গেল না। তারপর সে গদগদ স্বরে বলে উঠল—’নাম শুনিনি! বলেন কি আপনি, নাম শুনিনি। আসুন আসুন, কি সৌভাগ্য আমার। ব্যোমকেশবাবু এসেছেন, এবার বাবার মৃত্যু রহস্যের একটা কিনারা হবে।’ সে অন্দরের দরজার দিকে ফিরে গলা চড়িয়ে বলল–’ওগো শুনছ, শীগগির দু’ পেয়ালা চা নিয়ে এসো। —বসুন বসুন, আমি নিজেই দেখছি।’ সে দ্রুত অন্দরের দিকে অন্তর্হিত হলো।
সমাদ্দারের আতিশয্য দেখে ব্যোমকেশ রাখালবাবুর পানে মুখ টিপে হাসল; দু’জনে পাশাপাশি চেয়ারে উপবিষ্ট হলেন।
কিছুক্ষণ পরে অজয় ফিরে এল, তার পিছনে মাথায় আধ-ঘোমটা দিয়ে আরতি; আরতির হাতে থালার ওপর দু’ পেয়ালা চা এবং বিস্কুট। তার মুখ ভয়ে শীর্ণ হয়ে গেছে, সে থালাটি ব্যোমকেশের সামনে রেখেই ফিরে যাচ্ছিল, অজয় বলল,–’ওকি, চলে যােচ্ছ কেন? ব্যোমকেশবাবুর সঙ্গে কথা কও।’
আরতি থমকে দাঁড়িয়ে ব্যোমকেশের দিকে ফিরল, কিন্তু তার মুখ দিয়ে কথা বেরুল না। ব্যোমকেশ তার অবস্থা লক্ষ্য করে সদয় কণ্ঠে বলল–’না না, উনি কাজকর্ম করুন গিয়ে, ওঁকে আমার কিছু জিজ্ঞেস করার নেই।’
আরতি চলে গেল। অজয় আমতা-আমতা করে বলল—’আমার স্ত্রী বড় লাজুক, কিন্তু আমরা দু’জনেই আপনার ভক্ত—’ অজয় আরো অনেক কিছু বলতে যাচ্ছিল, ব্যোমকেশ বাধা দিয়ে বলল–’আপনার ছেলে মকরুন্দ বাড়িতেই আছে তো?’
অজয় চকিত হয়ে বলল–’আছে বৈকি। তাকে ডাকব?’
ব্যোমকেশ বলল–’ডাকবার বোধহয় দরকার হবে না। সে কলেজে পড়ে, বিষাকালে নিশ্চয় তার বিষতি দরকার হয়। তার বিষতিটা একবার দেখতে চাই।’
অজয় একটু চিন্তা করে বলল–’বছর দেড়েক আগে তাকে একটা ওয়াটারপ্রুফ কিনে দিয়েছিলাম। আছে নিশ্চয়, আমি দেখছি।’
অজয় অন্দরের দিকে চলে গেল। ব্যোমকেশ ও রাখালবাবু চায়ের পেয়ালা তুলে নিলেন। মিনিট পাঁচেক পরে অজয় ফিরে এসে বিমর্ষ মুখে বলল—’ওয়াটারপ্রুফটা খুঁজে পেলাম না। মকরন্দকে জিজ্ঞেস করলাম, সে বলল—জানি না।’
ব্যোমকেশ চায়ের পেয়ালা রেখে মুখ মুছতে মুছতে বলল–’আপনার নিজের ওয়াটারগুফ আছে?’
‘আছে। এনে দেব?’
‘আপনার স্ত্রীর এবং মেয়ের ওয়াটারপ্রফ?’
‘মেয়েদের জন্যে একটাই মেয়েলি ওয়াটারপ্রুফ আছে।’
‘দয়া করে ও দুটো এনে দিন, আমরা নিয়ে যাব। দু’চার দিনের মধ্যেই ফেরত পাবেন।’
‘নিয়ে যাবেন, বেশ তো, তা এনে দিচ্ছি।’
অজয় অন্দরে গিয়ে দুহাতে দু’টি ওয়াটারগুফ ঝুলিয়ে নিয়ে ফিরে এল। রাখালবাবু সে দু’টি পাট করে বগলে নিলেন, বললেন—’আচ্ছা, আজ উঠি। চায়ের জন্যে ধন্যবাদ।’
অজয় কচুমাচু হয়ে ব্যোমকেশকে বলল–’চললেন? একটা অনুরোধ ছিল সাহস করে বলতে পারছি না
‘কি অনুরোধ?’
‘আপনার একটা ফটো তুলব। আমার ক্যামেরা আছে, যদি অনুমতি করেন একটা তুলে নিই। আপনার ছবি এনলার্জ করে ঘরে টাঙিয়ে রাখব।’
ব্যোমকেশ হেসে উঠল—’ফটো তুলবেন। তা-আপত্তি কি। আমার ছবি এনলার্জ করে ঘরে টাঙিয়ে রাখার আগ্রহ আজ পর্যন্ত কারো দেখা যায়নি।’
অজয় দ্রুত গিয়ে ক্যামেরা নিয়ে এল। সাধারণ বক্স-ক্যামেরা। সে বললে–’এখনো যথেষ্ট আলো আছে। আপনি জানালার কাছে দাঁড়ান, আমি ছবি তুলে নিচ্ছি।’
ব্যোমকেশ জানলার পাশে পড়ন্ত আলোয় দাঁড়াল। ক্যামেরায় ক্লিক করে শব্দ হলো।
‘ধন্যবাদ! ধন্যবাদ! অশেষ ধন্যবাদ!’ শুনতে শুনতে ব্যোমকেশ রাখালবাবুকে নিয়ে বাইরে এসে দাঁড়াল।
বাইরে এসে দু’জনের কিছুক্ষণ নিম্নস্বরে কথা হলো; তারপর ব্যোমকেশ বিষতি দুটো নিয়ে নীচে নেমে গেল, রাখালবাবু তেতলায় উঠে গেলেন। ওপরে কনস্টেবল টুলের ওপর বসেছিল, উঠে দাঁড়াল।
চাবি দিয়ে ঘরের দোর খুলে রাখালবাবু ঘরে প্রবেশ করলেন, কয়েকবার এদিক ওদিক ঘুরলেন। তারপর দোরের বাইরে ফিরে এসে দেখলেন, মেদিনী ক্লান্তভাবে সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসছে। তিনি এগিয়ে গিয়ে বলল্লেন—’মেদিনী, তোমাকে কয়েকটা কথা জিজ্ঞেস করা হয়নি তাই ডেকেছি।’
মেদিনী ব্যায়ত বিহ্বল চোখে চাইল, তারপর চোখের ওপর আচল চাপা দিল। রাখালবাবু বললেন-বিলো দেখি সেদিন সকালে তুমি যখন তোমার স্বামীর মৃতদেহ প্রথম দেখলে তখন সে কি চিৎ হয়ে শুয়েছিল?’
অবরুদ্ধ উত্তর এল–’জি, হাঁ।’
রাখালবাবু তাড়াতাড়ি বললেন—’আচ্ছা আচ্ছা, ও কথা থাক। এবার একবার ঘরের মধ্যে এসো।’
মেদিনী চোখের জল মুছে থমথমে মুখ নিয়ে ঘরের মধ্যে এল। রাখালবাবু চারিদিকে হাত ঘুরিয়ে বললেন-‘ঘরটা ভাল করে দেখা। তুমি আগে অনেকবার দেখেছি। কোথাও কোনো তফাত বুঝতে পারছ?’
মেদিনী বলল–’খাটের ওপর বিছানা নেই।’
‘তাছাড়া আর কিছু?’
মেদিনী চারিদিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে মাথা নাড়ল—’আর কোনো তফাত বুঝতে পারছি না।’
‘হুঁ। আচ্ছা হয়েছে, এবার নীচে চল।’
মেদিনীকে নিয়ে রাখালবাবু নীচে নেমে গেলেন। মেদিনী নিজের ঘরে চলে গেল। রাখালবাবু ড্রয়িং রুমে প্রবেশ করে দেখলেন ব্যোমকেশ একটা চেয়ারে অঙ্গ এলিয়ে দিয়ে সিগারেট টানছে। দু’জনের চোখাচোখি হলো। ব্যোমকেশ বাঁকা হেসে ঊর্ধ্বদিকে ধোঁয়া ছাড়ল, তারপর খাড়া হয়ে বসে বলল–’শুভকাৰ্য সুচারুরূপে সম্পন্ন হয়েছে। রাখাল, এবার আমি বাড়ি ফিরব। তোমার কতদূর?’
রাখাল বললেন–‘গঙ্গাধর ঘোষালকে দর্শন করবেন না?’
‘ওহো তাই তো, গঙ্গাধরকে দর্শন করা হলো না। আজ থাক, সন্ধ্যে হয়ে গেছে, তিনি হয়তো ভুমানন্দে আছেন। কাল সকালে তাঁকে দর্শন করা যাবে।’ ব্যোমকেশ উঠে দাঁড়াল, পকেট থেকে নিখিলের চিঠিগুলি নিয়ে রাখালবাবুর হাতে দিয়ে বলল–’এগুলোতে মেয়েলি আঙুলের ছাপ আছে কিনা পরীক্ষা করে দেখো। আজ চলি।’
‘চলুন, আমিও যাই। বিষতিগুলো পরীক্ষা করতে হবে।’
পরদিন বেলা ন’টার সময় ব্যোমকেশ বেণীমাধবের বাড়িতে গিয়ে দেখল, রাখালবাবু সদর বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিখিল এবং সানতের সঙ্গে কথা বলছেন। ব্যোমকেশ যেতেই তিনি বললেন—’শুনেছেন ব্যোমকেশদা, মেদিনীর ঘর থেকে একটা বাক্স চুরি গেছে, টয়লেটের বাক্স।’
ব্যোমকেশ ভুরু উঁচু করে বলল-টয়লেট-বক্স। সে কি, কি করে চুরি গেল?’
‘তা ঠিক বলতে পারছি না। তবে কাল সন্ধ্যেবেলা মেদিনীকে আমি তেতলায় ডেকেছিলাম, ওর ঘর খোলা ছিল, সেই সময় হয়তো কেউ সরিয়েছে। তাই এদের জিজ্ঞেস করছিলাম। এরা কিছু জানেন কিনা। ’
সনৎ বলল—’আমি কি করে জানব বলুন। মেদিনীর ঘরের মধ্যে কখনো পদার্পণ করিনি, কোথায় কী আছে কোখেকে জানব?
নিখিল বলল—’দোহাই দারোগীবাবু, আমি টয়লেট-বক্স চুরি করিনি। আমার ঘরে চুল বেঁধে টিপ পরার মানুষ নেই।’
ব্যোমকেশ রাখালবাবুকে প্রশ্ন করল—’মকরন্দকে জেরা করেছিলে?’
‘করেছিলাম। তাদের ফ্ল্যাট আবার খানাতল্লাশ করেছিলাম, কিন্তু কিছু পাওয়া গেল না।’
‘এদের ঘর?’
‘এইবার করব।’ রাখালবাবু একজন জমাদারকে এবং সাব-ইন্সপেক্টরদের ডেকে বললেন—’তোমরা এঁদের ঘর দুটো আবার ভাল করে খানাতল্লাশ কর, মেদিনীর চুল বাঁধার বাক্সটা পাও কিনা দেখা। আমরা দোতলায় গঙ্গাধর বাবুর ফ্ল্যাটে যাচ্ছি।’
সনৎ অপ্ৰসন্ন মুখে বলল-‘করুন করুন, যত ইচ্ছে খানাতল্লাশ করুন, কিন্তু আমার দামী ক্যামেরাগুলো ভাঙবেন না। ‘
ব্যোমকেশকে নিয়ে রাখালবাবু ওপরে উঠে গেলেন।
দোতলায় উঠে তাঁরা দেখলেন বারান্দার অপর প্রান্তে গঙ্গাধরের ফ্ল্যাটে সদর দরজা খুলে তার মেয়ে ঝিল্লী বেরিয়ে এল, দরজা ভেজিয়ে দিয়ে দু’পা এসে তাদের দেখে সংকুচিতভাবে দাঁড়িয়ে পড়ল। রাখালবাবু তার কাছে এসে ব্যোমকেশকে বললেন—’এর নাম ঝিল্লী, গঙ্গাধরবাবুর মেয়ে। —তুমি কোথায় যাচ্ছিলে?’
ঝিল্লী সলজ্জ অস্ফুটম্বরে বলল—’মামীমা ডেকে পাঠিয়েছেন।’
ব্যোমকেশ ঝিল্লীর সংকোচনম্র কমনীয় মুখের পানে চেয়ে হাসল—’আমাদের দেখে এত লজ্জা কিসের? আমরা বাঘ-ভালুক নয়, কামড়ে দেব না।’
ঝিল্লী একটু হেসে চোখ তুলল। ব্যোমকেশ দেখল চোখ দুটি সুন্দর এবং বুদ্ধিদীপ্ত। রাখালবাবু পরিচয় দিলেন—’ইনিই বোমকেশ বক্সী।’
ঝিল্লীর চোখে উৎসুক আলো ফুটে উঠল, তারপর আস্তে আস্তে তার মুখের ওপর অরুণাভা ছড়িয়ে পড়ল। সে পাশ কাটিয়ে চলে যাবার চেষ্টা করছে দেখে ব্যোমকেশ বলল—’ঝিল্লী, একটু দাঁড়াও, তোমার কাছে কিছু জানবার আছে।’
ঝিল্লী দাঁড়াল, কিন্তু ব্যোমকেশের দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে রইল। ব্যোমকেশ প্রশ্ন করল—‘লাবণির সঙ্গে তোমার খুব ভাব ছিল?
একটু দ্বিধার পর ঝিল্লী ঘাড় নাড়ল। ‘সে তোমাকে নিজের মনের কথা বলত, তুমি তাকে নিজের মনের কথা বলতে। কেমন?’
ঝিল্লী উত্তর দিল না, সতর্কভাবে অপেক্ষা করে রইল।
‘লাব্বণি নিশ্চয় তোমাকে বলেছিল। সে তার নাচের মাস্টার পরাগ লাহাকে ভালবাসে।’ ঝিল্লী ঘাড় নীচু করে আস্ফুটস্বরে বলল—’বলেছিল।’
‘সে পালিয়ে গিয়ে পরাগকে বিয়ে করবে বলেছিল? ঝিল্লী উৎফুল্ল চোখ তুলল—‘লাবণি ওকে বিয়ে করেছে!’
‘হ্যাঁ। তুমি দেখছি জানতে না।’
‘না।‘
‘কিন্তু জানতে পেরে খুব খুশি হয়েছ।’
ঝিল্লী হেসে ফেলল।
ঝিল্লীকে ছেড়ে গঙ্গাধরের দোরের দিকে যেতে যেতে রাখালবাবু খাটো গলায় বললেন—’আপনার মন বিচিত্র কুটিল পথে চলেছে, কিন্তু আমি বুঝতে পেরেছি।’
ব্যোমকেশ মৃদু হাসল। রাখালবাবু গঙ্গাধরের দোরে টোকা দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে ভিতর থেকে কড়া আওয়াজ এল—’কে? ভেতরে এসো।’
দু’জনে ঘরে প্রবেশ করলেন। ঘরের মাঝখানে গোল টেবিল, তার সামনে চেয়ারে বসে গঙ্গাধর তাস নিয়ে সলিটেয়ার খেলছিল, রাখালবাবুর দিকে বিরক্ত চোখে চেয়ে বলল—’আবার কি চাই?’
গঙ্গাধরের ভাবভঙ্গী এখন অন্যরকম। নিজের টাকাকড়ি উড়িয়ে শ্বশুরের গলগ্রহ হবার পর সে কচ্ছপের মত হাত-পা গুটিয়ে নিয়েছিল, কিন্তু শ্বশুরের মৃত্যুর পর হালের আইন অনুযায়ী সে অর্ধেক রাজত্র পাবে এই অনিবাৰ্য সম্ভাবনার ফলে সে আবার নিজ মূর্তি ধারণ করেছে, তার আচার-আচরণে বনেদী বড় মানুষের মজ্জাগত আত্মম্ভরিতা আবার ফুটে উঠেছে।
তার কথা বলার ভঙ্গীতে ব্যোমকেশের মুখ শক্ত হয়ে উঠেছিল, তারপর রাখালবাবু যখন বললেন-ইনি আমার সহকারী শ্ৰীব্যোমকেশ বক্সী। তখন গঙ্গাধর উদ্ধতকণ্ঠে বলে উঠল—’তাতে কী হয়েছে? So what?’
ব্যোমকেশের দৃষ্টি প্রখর হয়ে উঠল, সে গঙ্গাধরের মুখোমুখি চেয়ারে বসে বলল–’আপনার নাম গঙ্গাধর ঘোষাল, কয়েক বছর আগে আপনি রেস-কোর্সের এক জকিকে ঘুষ খাওয়াবার চেষ্টা করার জন্যে আইনের হাতে পড়েছিলেন?’
গঙ্গাধর আরক্ত চোখে গর্জে উঠল–’তাতে আপনার কি?’
ব্যোমকেশ আঙুল তুলে বলল–’আপনি দাগী আসামী, আপনাকে খুনের সন্দেহে গ্রেপ্তার করা যায়। আপনার শ্বশুর উইল দস্তখত করার আগে রাত্রে নৃশংসভাবে খুন হয়েছেন। কে তাঁকে খুন করেছে?’
বেগবান ঘোড়া হোঁচট লেগে যেন ডিগবাজি খেয়ে পড়ল। গঙ্গাধরের দম্ভস্ফীত মুখ তুবড়ে গেল, সে ভীতস্বরে বলল–’আমি কি জানি! আমি কি জানি।’
ব্যোমকেশ এবার একটু ঠাণ্ডা হলো, বলল–’বেণীমাধববাবুকে খুন করার স্বাৰ্থ আপনারও আছে, অজয়বাবুরও আছে; কিন্তু আপনি জামাতা, দশম গ্রহ।’
উত্তরে গঙ্গাধর দু’বার কথা বলবার জন্যে মুখ খুলল, কিন্তু তার মুখ দিয়ে কথা বেরুল না। ব্যোমকেশ তখন সহজ সুরে বলল–’আপনার মাথার ওপর খাঁড়া ঝুলছে, বেশি তেজ দেখাবেন না।‘
এই সময় গায়ত্রী ভিতর দিক থেকে ঘরে প্রবেশ করল। আচলটা কোমরে জড়ানো, চোখে তীব্র দৃষ্টি, যুদ্ধং দেহি ভাব। সে একটা চেয়ারে বসে ব্যোমকেশকে কড়া সুরে বলল–’কি জানতে চান আমাকে বলুন।’
ব্যোমকেশ গায়ত্রীকে কিছুক্ষণ নিরীক্ষণ করে বলল—’আপনি বেণীমাধবাবুর মেয়ে গায়ত্রী দেবী। আপনাকেও কিছু প্রশ্ন আছে।–আপনার বাবা উইল সই করবার আগেই কেউ তাঁকে খুন করেছে। কিন্তু তাঁর আগের কোনো উইল আছে কিনা। আপনি জানেন?’
এতক্ষণে গঙ্গাধর কতকটা ধাতস্থ হয়েছে, সে বলে উঠল—’আমার শ্বশুর ইনটেসটেটু মারা গেছেন।‘
গায়ত্রী অমনি ধমক দিয়ে উঠল—’তুমি চুপ করো। —আমার বাবার অন্য কোনো উইল নেই। তিনি যা রেখে গেছেন নতুন আইনের জোরে তার অর্ধেক আমি পাব।’
‘বেণীমাধববাবু বিষয়ী লোক ছিলেন, এই বয়স পর্যন্ত তিনি উইল করেননি এ কি সম্ভব? হয়তো পুরনো উইল বেরুবে, যাতে তিনি অন্য কাউকে যথাসর্বস্ব দিয়ে গেছেন। হয়তো আপনার জন্য মাসহারা বরাদ্দ করে বাকি সব টাকা অজয়বাবুকে দিয়ে গেছেন।’
ক্রুদ্ধ উত্তেজনায় চেয়ার থেকে লাফিয়ে গায়ত্রী প্রায় চীৎকার করে উঠল—’না না না, বাবা কখনো আমাকে বঞ্চিত করবেন না। তিনি দাদার চেয়ে আমাকে ঢের বেশি ভালবাসতেন।’
‘বসুন বসুন। আমি বলছি না যে, বেণীমাধববাবুর অন্য উইল আছেই। কিন্তু তিনি ভাগনেদেরও ভালবাসতেন, বাড়িতে এনে রেখেছিলেন; তাদের কি কিছুই দিয়ে যাননি?’
গায়ত্রী আবার চেয়ারে বসে বলল—‘ওরা বাবার আসল ভাগনে নয়, মাসতুত বোনের ছেলে। সনতের বাপ দুশ্চরিত্র ছিল, স্ত্রীকে খুন করে ফাঁসি যায়; নিখিলের বাপ সার্কাসের পেশাদার ক্লাউন ছিল। ওদের কেন বাবা টাকা দিয়ে যাবেন?’
‘আচ্ছা, ও কথা যাক। বলুন দেখি আপনার বাড়িতে কটা বর্ষাতি আছে।’
গায়ত্রী হঠাৎ যেন হতবুদ্ধি হয়ে গেল, কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে বলল-দুটো আছে। একটা ওঁরা, একটা ঝিল্লীর।’
‘ও দুটো বার করে দিন, আমরা নিয়ে যাব।’
‘নিয়ে যাবেন! কেন?’
‘দরকার আছে। দুচার দিন পরে ফেরত পাবেন।’
গায়ত্রী আবার কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে হঠাৎ উঠে চলে গেল, বলল–’কি দরকার জানি না। এনে দিচ্ছি।’
নীচে নেমে এসে রাখালবাবু ব্যোমকেশকে প্রশ্ন করলেন–‘এবার?’
ব্যোমকেশ বলল—’চল আমার বাড়ি। নিভৃতে পরামর্শ করা যাক। একটা প্ল্যান মাথায় এসেছে।‘
‘চলুন।’
বাড়িতে এসে ব্যোমকেশ চায়ের ফরমাস দিল। সত্যবতী চা এবং আলুর চাপ রেখে গেল। অতঃপর পানাহার এবং সিগারেট সহযোগে পরামর্শ শুরু হলো।
এক ঘন্টা পরে রাখালবাবু বললেন—’বেশ, এই কথা রইল। পুলিস ডিপার্টমেন্ট থেকে আপনার রাহা খরচ ইত্যাদি দেওয়া হবে, আমি তার ব্যবস্থা করব। আজ বিকেলে পাকা খবর পাবেন।’
রাখালবাবু চলে যাবার পর সত্যবতী। ঘরে ঢুকল, ব্যোমকেশের চেয়ারের পাশে দাঁড়িয়ে উৎসুক স্বরে বলল-‘হ্যাঁ গা, কী তোমাদের এত ষড়যন্ত্র হচ্ছে?’
ব্যোমকেশ উঠে দাঁড়িয়ে আলস্য ভাঙল।–’আমাকে বোধহয় কয়েক দিনের জন্যে বাইরে যেতে হবে।’
‘কোথায় যাবে?’
‘তা কি জানি?’
‘তুমি জানো না তা কি কখনো হয়। নিশ্চয় জানো।’
ব্যোমকেশ সত্যবতীর কাঁধে হাত রেখে মৃদু হেসে বলল—’বেশ, জানি কিন্তু বলব না।’
সত্যবতী রাগ করে ঘর ছেড়ে চলে গেল।
বিকেল চারটের সময় রাখালবাবুর ফোন এল–’সব ঠিক। আপনি একটা সুটকেস নিয়ে সটান থানায় চলে আসুন।’
ব্যোমকেশের অনুপস্থিতিকালে বেণীমাধবের বাড়ির কর্মসূচী আগের মতাই বলবৎ রইল। কারুর বাইরে যাবার হুকুম নেই। একজন সাব-ইন্সপেক্টর, একজন জমাদার এবং চারজন কনস্টেবল হামোহাল মোতায়েন রইল। রাখালবাবু দুবেলা এসে পরিদর্শন করে যেতে লাগলেন। বেণীমাধবের মৃত্যু সম্বন্ধে নতুন কোনো তথ্য আবিষ্কৃত হলো না। মেদিনীর সাজের বাক্সটা অদৃশ্য হয়েছিল, অদৃশ্যই রয়ে গেল।
একদিন লাব্রণি তার স্বামীকে নিয়ে বাপ-মা’র সঙ্গে দেখা করতে এল। রাখালবাবু তাদের দেখা করতে দিলেন। বন্ধ দরজার অন্তরালে অজয়-পরিবার কীভাবে মেয়ে-জামাইয়ের সংবর্ধনা করল তা জানা গেল না। লাবণিরা যখন বেরিয়ে এল তখন লাবণির মুখে হাসি চোখে জল। বারান্দায় ঝিল্লীর সঙ্গে লাবণির দেখা হলো; দুই বোন পরস্পর গলা জড়িয়ে চুমু খেল, তারপর হাত ধরাধরি করে নীচে নেমে এল। নীচের বারান্দায় নিখিল ছিল, সে নব দম্পতিকে দেখে হো হো করে হেসে বলল,–’এই যে পলাতক আর পলাতক! দু’জনে মিলে খুব নাচছ তো?’
পরাগ কপট বিষণ্ণতায় ত্ৰিয়মাণ মুখভঙ্গী করে বলল—’দু’জনে মিলে নাচা আর হচ্ছে কই? এখন আমি নাচছি, লাবণি নাচাচ্ছে।’
লাবণিরা চলে যাবার পর নিখিল ঝিল্লীকে বলল—‘কী, তুমি আর দেরি করছ, কেন? একজন তো নাচিয়েকে নিয়ে কেটে পড়ল, এবার তুমি একটা গাইয়েকে নিয়ে কেটে পড়।’
ঝিল্লী ভুরু বেঁকিয়ে নিখিলের পানে তাকাল–’আমি কেটে পড়ব না। কিন্তু তোমার খবর কি? যে তোমাকে চিঠি লেখে তাকে ধরতে পারলে?’
নিখিল বলল—’ধরিনি এখনো কিন্তু আর বেশি দেরি নেই। ব্যোমকেশবাবু বলেছেন। শীগগির ধরে দেবেন। যেই ধরব অমনি পটাস করে বিয়ে করে ফেলব। আমার সঙ্গে চালাকি নয়।’
‘গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল।’ মুচকি হেসে ঝিল্লী ওপরে চলে গেল।
পাঁচ দিন পরে ব্যোমকেশ ফিরে এল, তার সঙ্গে একটি মানুষ। নিম্নশ্রেণীর পশ্চিমা যুবক। ব্যোমকেশ যুবককে নিয়ে সোজা থানায় উপস্থিত হলো, রাখালবাবুর সঙ্গে কথা বলল। তারপর যুবককে রাখালবাবুর জিন্মায় রেখে বাড়ি গেল–রাখালবাবুকে বলে গেল–’আজ বিকেল চারটের সময় বেণীমাধবের ড্রয়িং রুমে থিয়েটার বসবে, তুমি হবে তার স্টেজ ম্যানেজার।’
বিকেল চারটের সময় ব্যোমকেশ বেণীমাধবের বাড়িতে উপস্থিত হয়ে দেখল, ড্রয়িং রুমে বাড়ির নজন লোক উপস্থিত আছে; অজয় আরতি মকরন্দ্র একটা সোফায় বসেছে, অন্য সোফায় বসেছে গঙ্গাধর গায়ত্রী আর ঝিল্লী। সনৎ আর নিখিল দুটো চেয়ারে দূরে দূরে বসেছে; আর মেদিনী মেঝের ওপর দেয়ালে ঠেস দিয়ে উদাসভাবে বসে আছে। সকলের মুখেই বিরক্তি ও অবসাদের ব্যঞ্জনা। ড্রয়িংরুমের দোরে ও বারান্দায় পুলিস গিজগিজ করছে। রাখালবাবু একটা ছোট সুটকেস হাতে নিয়ে অধীরভাবে বারান্দায় পায়চারি করছেন।
ব্যোমকেশ পৌঁছুঁতেই রাখালবাবু তাকে বললেন—’সব তৈরি, এবার তবে আরম্ভ করা যাক।’
ব্যোমকেশ প্রশ্ন করল–’হিম্মৎলাল?’
রাখালবাবু বললেন–‘তাকে লুকিয়ে রেখেছি। যথাসময়ে সে রঙ্গমঞ্চে প্রবেশ করবে।’
‘বেশ, এসো তাহলে। তোমার হাতে ওটা–? ও বুঝেছি।’
রাখালবাবু ব্যোমকেশকে নিয়ে ড্রয়িং রুমে প্রবেশ করলেন। সকলে নড়েচড়ে বসল, মকরন্দর মুখের ভ্রূকুটি গভীরতর হলো। রাখালবাবু মাঝখানের নীচু টেবিলটাকে এক পাশে টেনে এনে দুটো হাল্কা চেয়ার তার সামনে রাখলেন; হাতের সুটকেস টেবিলের ওপর রেখে ব্যোমকেশকে বললেন–‘বসুন।’ নিজে সতর্কভাবে দাঁড়িয়ে রইলেন।
ব্যোমকেশ হাসিমুখে একবার সকলের মুখের দিকে তাকাল, বলল—’আপনারা শুনে সুখী হবেন বেণীমাধববাবুর হত্যাকারী কে তা আমরা জানতে পেরেছি, আততায়ীর বিরুদ্ধে অকাট্য প্রমাণও পেয়েছি। আসামী এই ঘরেই আছে, এখনি তার পরিচয় পাবেন।’
সকলে সন্দেহভরা চোখে পরস্পর তাকাতে লাগল; বেশি দৃষ্টি পড়ল গঙ্গাধরের ওপর। ব্যোমকেশ শান্ত স্বরে বলে চলল—’আমরা গোড়াতেই একটা ভুল করেছিলাম, ভেবেছিলাম বেণীমাধববাবুই আসামীর প্রধান লক্ষ্য। ভুলটা অস্বাভাবিক নয়; বেণীমাধববাবু বড় মানুষ ছিলেন, তিনি এমন উইল করতে যাচ্ছিলেন যাতে তাঁর উত্তরাধিকারীদের বঞ্চিত হবার সম্ভাবনা ছিল; মেঘরাজ ছিল বেণীমাধবের দ্বাররক্ষী, বেণীমাধবকে যে ব্যক্তি মারতে চায় সে মেঘরাজকে না মেরে ঘরে ঢুকতে পারবে না। তাই তাকে মেরেছে। মেঘরাজের মত লোক যে হত্যাকারীর প্রধান লক্ষ্য হতে পারে তা ভাবাই যায় না।
‘আমি একদিন বেণীমাধববাবুর ঘরে অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখলাম তাঁর ক্ষুর রয়েছে; সাবেক কালের লম্বা ক্ষুর, যে-খুর দিয়ে মেঘরাজ তাঁর দাড়ি কামিয়ে দিত। ক্ষুরটা খাপ থেকে বের করে পরীক্ষা করলাম, তাতে কোথাও একটিও আঙুলের ছাপ নেই; কে যেন খুব সাবধানে ক্ষুরটি মুছে খাপের মধ্যে রেখেছে। কিন্তু কেন? স্বাভাবিক অবস্থায় অন্তত মেঘরাজের আঙুলের ছাপ তাতে থাকা উচিত।
‘সন্দেহ হলো। সেই ক্ষুর দিয়ে আমি নিজে দাড়ি কামাতে গিয়ে দেখলাম ক্ষুর একেবারে ভোঁতা, তা দিয়ে দাড়ি কামানো দূরের কথা, পেন্সিল কাটাও যায় না। তখন আর সন্দেহ রইল না। যে, এই ক্ষুর দিয়েই দু’জন লোকের গলা কাটা হয়েছে এবং তার ফলেই ক্ষুদ্রটি ভোঁতা হয়ে গেছে। ডাক্তারি পরীক্ষাতেও প্রমাণ হলো যে, ওই ক্ষুর দিয়েই দু’জনের গলা কাটা হয়েছিল।
‘কিন্তু ক্ষুর ছিল ঘরের মধ্যে, আসামী এসেছিল বাইরে থেকে; ঘরে ঢোকবার আগেই সে ক্ষুর পেল কোথা থেকে? নিশ্চয় কেউ ক্ষুরটি আগেই ঘর থেকে সরিয়েছিল।
‘কে সরাতে পারে? সেদিন সকালে মেঘরাজ ওই ক্ষুর দিয়ে বেণীমাধবের দাড়ি কামিয়ে দিয়েছিল; তারপর সারা দিনে তাঁর ঘরে যারা এসেছিল তারা কেউ ক্ষুরের কাছে যায়নি। ও ঘরে নিত্য আসে যায় কেবল দু’জন; মেঘরাজ ও মেদিনী। মেঘরাজ নিজের গলা কাটবার জন্যে ক্ষুর চুরি করবে না। তাহলে বাকি রইল কে?’
সকলের দৃষ্টি মেদিনীর ওপর গিয়ে পড়ল। মেদিনী দেয়ালে ঠেস দিয়ে আগের মতাই বসে আছে, মাথার ওপরকার আচলটা দু’ হাতে একটু তুলে ধরে নির্নিমেষ চোখে ব্যোমকেশের পানে তাকিয়ে আছে।
হঠাৎ সনৎ কথা বলল–’একটা কথা বুঝতে পারছি না। হত্যাকারী মামার ক্ষুর দিয়ে গলা কাটতে গেল কেন? অন্য অস্ত্র কি ছিল না?’
ব্যোমকেশ বলল—’আসামী লোকটা ভারি ধূর্ত। সে জানে যে-অস্ত্র দিয়ে খুন করা হয় সে-অস্ত্রকে বেবাক লোপাট করে দেওয়া সহজ নয়। তাই সে মতলব করেছিল, বেণীমাধবের ক্ষুর দিয়ে গলা কাটবার পর ক্ষুরটি ভাল করে মুছে যথাস্থানে রেখে দেবে, ওই ক্ষুর দিয়ে যে খুন হয়েছে একথা কারুর মনেই আসবে না, পুলিস অন্ধকারে হাতড়ে বেড়াবে। বুঝতে পেরেছেন?’
‘পেরেছি। এবার আপনার বক্তৃতা শেষ করুন।’
ব্যোমকেশ আবার নির্লিপ্ত স্বরে বলতে আরম্ভ করল—‘মেদিনী ছোট ঘরের মেয়ে, কিন্তু পুরুষের চোখ দিয়ে যারা ওর পানে তাকিয়েছে তারাই জানে কী প্রচণ্ড ওর দেহের চৌম্বক শক্তি। সে সুচরিত্রা মেয়ে কিনা তা আমরা জানি না। যদি কুচরিত্রা হয় তাহলে মনে রাখতে হবে যে, মেঘরাজ ও বৃদ্ধ বেণীমাধব ছাড়া বাড়িতে আরো পাঁচজন সমর্থ পুরুষ আছে। স্ত্রী-পুরুষের অবৈধ আসক্তির ফলে অসংখ্য ট্র্যাজেডি ঘটেছে, আশ্চর্য হবার কিছু নেই।
থেকে তার দিল্লীর ঠিকানা সংগ্রহ করলাম। তারপর একটা অপ্রত্যাশিত জিনিস পেলাম। মেদিনীর একটি চুল-বাঁধার কাঠের বাক্স ছিল, তার ডালা খুলে দেখলাম আয়নার ওপর একটা ফটো আটা রয়েছে। মেদিনীর ফটো্্, সাম্প্রতিক ছবি। সে খাটের ধারে বসে হাসছে। আমি আবার বাক্সের ডালা বন্ধ করে দিলাম, মেদিনী কিছু জানতে পারল না। পরদিন শুনলাম বাক্সটা চুরি গিয়েছে। ‘ ব্যোমকেশ ঘাড় তুলে রাখালবাবুর পানে চাইল।
রাখালবাবু টেবিলের ওপরে সুটকেসটা খুলতে খুলতে অবিচলিত মুখে বললেন-চুরি গিয়েছিল, আমরা খুঁজে বার করেছি।’ তিনি সুটকেস থেকে প্রসাধনের বাক্সটা বার করে টেবিলের ওপর রাখলেন।
ব্যোমকেশ বলল–’ছবিটা আছে নিশ্চয়।’
রাখালবাবু ডালা খুলে বললেন—’আছে। ‘ কে চুরি করেছিল, কোথায় পাওয়া গেল এ সম্বন্ধে তিনি নীরব রইলেন। মনে হয়-চুরির ব্যাপারটা নিছক ধোঁকার টাঁটি।
ব্যোমকেশ বলল–’বেশ। তারপর আমরা বাড়ির অন্য বাসিন্দাদের সঙ্গে একে একে দেখা করলাম। বাড়িতে যতগুলো বিষতি ছিল সংগ্রহ করলাম; কেবল মকরন্দর বিষতি পাওয়া গেল না। মকরন্দ সম্বন্ধে একটা কথা মনে রাখা দরকার।–বেণীমাধবের হুকুমে মেঘরাজ তার গালে চড় মেরেছিল; অর্থাৎ দু’জনেরই ওপর তার গভীর আক্রোশ। সে-রাত্রে ন’টার সময় সে বাড়িতে এসেছিল, তারপর গভীর রাত্রে কখন চুপিচুপি বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। কেউ জানে না। সে যখন রেস-কোর্সে ধরা পড়ল তখন তার পকেটে পৌঁনে দুশো টাকা ছিল। কোথা থেকে সে এত টাকা পেল তা বলতে চায় না।
‘যাহোক, বিষতি কোন সংগ্রহ করলাম সেই কথা বলি। যারা মতলব এঁটে ঘুমন্ত লোকের গলা কাটতে যায়। তারা জানে এই উপায়ে নিঃশব্দে খুন করা যায় বটে, কিন্তু আততায়ীর নিজের কাপড়-চোপড়ে প্রচুর রক্ত লাগার সম্ভাবনা। কাপড়-চোপড়ে রক্ত লাগলে সহজে ধোয়া যায় না, রক্তের দাগ থেকে যায়। তাই পাশ্চাত্ত্য দেশে খুন করবার সময় খুনী গায়ে বিষতি চড়িয়ে নেয়; বিষতির তেলা গায়ে যেটুকু রক্ত লাগে তা সহজেই ধুয়ে ফেলা যায়। পাশ্চাত্ত্য রহস্য রোমাঞ্চের বই যাঁরা পড়েছেন তাঁরাই একথা জানেন। আমরা বিষতিগুলোকে মালিকের নামের টিকিট মেরে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার জন্যে ল্যাবরেটরিতে পাঠিয়ে দিলাম।
‘তারপর আমি গেলাম দিল্লী। এতক্ষণে আমরা বুঝতে পেরেছিলাম আসামী কে, কিন্তু আরো পাকা প্রমাণের দরকার ছিল। দিল্লীতে গিয়ে যে-বস্তিতে মেঘরাজ থাকত, সেখানে খোঁজখবর নিতেই অনেক কথা বেরিয়ে পড়ল। মেদিনী মেঘরাজের স্ত্রী নয়। মেঘরাজ বিপত্নীক ছিল; বেণীমাধব যখন তাকে বললেন, স্ত্রীকে নিয়ে এসো, তখন সে দিল্পী গিয়ে মেদিনীকে স্ত্রী সাজিয়ে নিয়ে এল। মেদিনীর স্বামী আছে, কিন্তু তার চরিত্র ভাল নয়; মেঘরাজের সঙ্গে আগে থাকতেই তার ঘনিষ্ঠতা ছিল; সে মেঘরাজের সঙ্গে পালিয়ে এল। বুঝে দেখুন মেদিনী কি রকম মেয়েমানুষ।’
মেদিনীর চোখ আতঙ্কে ভরে উঠেছিল, সে হঠাৎ চীৎকার করে উঠল—’না না, ঝুট বাত।’
ব্যোমকেশ রাখালবাবুর পানে চোখ তুলল, তিনি দোরের দিকে চেয়ে হাঁক দিলেন—’হিন্মৎলাল!’
যে পশ্চিমা যুবককে ব্যোমকেশ দিল্লী থেকে সঙ্গে এনেছিল সে ঘরে প্রবেশ করল; চুড়িদার পায়জামা ও শেরোয়ানি পরা ক্ষীণকায় যুবক। ব্যোমকেশ তার দিকে আঙুল দেখিয়ে মেদিনীকে জিজ্ঞেস করল–’একে চিনতে পার?’
মেদিনী তড়িৎপৃষ্টের মত উঠে দাঁড়িয়েছিল, ভয়ার্তা চোখে হিম্মৎলালের দিকে একবার চেয়ে আবার মাটিতে আছড়ে পড়ল, মাটিতে মুখ গুজে পড়ে রইল।
‘হিস্মৎলাল, মেদিনী তোমার কে?’
‘জি, মেদিনী আমার বিয়াহী ঔরৎ, আমাকে ছেড়ে মেঘরাজের সঙ্গে পালিয়ে এসেছিল।’
‘আচ্ছা, তুমি এখন বাইরে যাও।’
হিম্মৎলাল মেদিনীর পানে বিষদৃষ্টি হেনে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
ব্যোমকেশ ঘরের চারিদিকে চোখ বুলিয়ে আবার বলতে আরম্ভ করল—’দেখা যাচ্ছে মেদিনীই যত নষ্টের গোড়া। সে স্বামীকে ছেড়ে মেঘরাজের সঙ্গে পালিয়ে এসেছিল, তারপর এখানে এসে আর একজন উচ্চতর বর্গের মানুষকে তার মোহময় কুহকজালে জড়িয়ে ফেলল। কিন্তু মেঘরাজ কড়া প্রকৃতির লোক, সে জানতে পারলে মেদিনীর উচ্চাশা ধূলিসাৎ হবে; তাই তাকে সরানো দরকার হয়ে পড়ল। কিন্তু একলা মেঘরাজকে খুন করলে ধরা পড়ার ভয় আছে, তাই মেঘরাজের সঙ্গে বেণীমাধবকেও খুন করে পুলিসের চোখে ধুলো দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। বেণীমাধবের সঙ্গে তাঁর ছেলেমেয়েদের বিরোধ যে বেশ ঘনিয়ে উঠেছে তা মেদিনীর অজানা ছিল না।
‘কিন্তু সত্যিই কি মেদিনী নিজের হাতে দু’জনের গলা কেটেছে? ছোরা ছুরি ক্ষুর মেয়েদের অস্ত্র নয়, মেয়েদের অস্ত্র বিষ; বিষ খাওয়াবার সুযোগ থাকলে তারা ছোরা ছুরি ব্যবহার করে না। মেদিনীর বিষ খাওয়াবার যথেষ্ট সুযোগ ছিল, সে বেণীমাধব ও মেঘরাজের খাবার নিজের হাতে রান্না করত।
‘দেখা যাক, মেদিনীর সহকারী কে?–মেদিনী, তোমার চুল বাঁধার বাক্সে আয়নার গায়ে একটা ফটো লাগানো আছে। কে ফটো তুলেছিল?’
মেদিনী উত্তর দিল না, মাটিতে মুখ গুজে পড়ে রইল। ব্যোমকেশ তখন সনতের দিকে ফিরে বলল–’সনৎবাবু্, আপনি ফটোগ্রাফির বিশেষজ্ঞ, দেখুন তো একবার ছবিটা।’
সনৎ ব্যোমকেশের পানে সন্দেহভরা ভ্রূকুটি করল, তারপর অনিচ্ছাভরে উঠে এল। রাখালবাবু বাক্সের ডগলা খুলে ধরলেন। সনৎ সামনে ঝুকে ছবিটা দেখল; তার মুখ আরক্ত হয়ে উঠল। সে অবরুদ্ধ স্বরে বলল—’মেদিনীর ছবি।’
ব্যোমকেশ বলল–’কে ছবি তুলেছে বলতে পারেন?’
‘তা কি করে বলব!’
‘ভাল করে দেখুন। মেদিনীকে খাটে বসিয়ে ছবি তোলা হয়েছে, মেদিনীর পেছনে খাটের মাথায় কারুকার্য দেখা যাচ্ছে। কার খাট চিনতে পারছেন না?’
সনতের চোখ টকটকে লাল হয়ে উঠেছে। সে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল–’কি বলতে চান আপনি?’
ব্যোমকেশ বলল–’আপনি নিজের ঘরে রাত্তির বেলা ফ্ল্যাশ-লাইট দিয়ে মেদিনীর ছবি তুলেছিলেন। আপনি মেদিনীর গুপ্ত-প্রণয়ী। মেঘরাজ যখন বেণীমাধবের দোরের সামনে শুয়ে ঘুমোত তখন মেদিনী আপনার ঘরে যেত।’
সনৎ কিছুক্ষণ জবাফুলের মত লাল চোখে চেয়ে রইল, শেষে বিকৃত গলায় বলল—’তাতে কি প্রমাণ হয় আমি মামকে খুন করেছি?’
‘সনৎবাবু্, আপনি মেদিনীর মোহে পড়ে দিগবিদিক জ্ঞান হারিয়েছিলেন, মেঘরাজকে খুন করে মেদিনীর ওপর একাধিপত্য স্থাপন করতে চেয়েছিলেন। আপনার বোধহয় প্ল্যান ছিল খুনের মামলা মিটে গেলে মেদিনীকে নিয়ে অন্য কোথাও বাসা বাঁধবেন।’
‘আমি খুন করিনি।’
‘আপনার দেহে খুনীর রক্ত আছে, আপনার বাবা আপনার মাকে খুন করে ফাঁসি গিয়েছিলেন।’
‘আমি খুন করিনি। খুন করেছে-ওই মেদিনী।’
মেদিনী ধড়মড়িয়ে হাঁটুর ওপর উঠে দাঁড়িয়ে চীৎকার করে উঠল-‘নেহি নেহি নেহি–’
ব্যোমকেশ বলল—’ঠিক কথা। মেদিনী নিজের হাতে খুন করেনি। খুন করেছেন। আপনি।’
‘প্রমাণ আছে?’
‘ছোট্ট একটা প্রমাণ আছে। খুন করার পর আপনি বষতিটাকে খুব ভাল করেই ধুয়েছিলেন, কিন্তু পকেটের মধ্যে কয়েক ফোঁটা রক্ত রয়ে গিয়েছিল। পরীক্ষা করে দেখা গেছে, রক্তটা বেণীমাধববাবুর ব্লাড-গ্রুপের রক্ত।’
মেদিনী বলে উঠল—’হ্যাঁ হ্যাঁ, সনৎবাবু খুন করেছে, আমি কিছু জানি না, আমি বে-কসুর।’
হঠাৎ সনৎ বুনো মোষের মত ঘাড় নীচু করে চাপা গর্জন করতে করতে মেদিনীর দিকে অগ্রসর হলো। কিন্তু দু’জন সাব-ইন্সপেক্টর ইতিমধ্যে সনতের দু’পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁরা সনতকে ধরে ফেললেন। রাখালবাবু তার হাতে হাতকড়া পর্যালেন। সনতের ক্ষিপ্র উন্মত্ততা হঠাৎ ঠাণ্ডা হয়ে গেল। দুই প্রহরীর মাঝখানে সে নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
মেদিনী আবার বলে উঠল—’আমি কিছু জানি না, আমি বে-কসুর।’
ব্যোমকেশ মাথা নেড়ে বলল—’না মেদিনী, তুমি বে-কসুর নও। বেণীমাধববাবুর ক্ষুর চুরি করে তুমিই সনৎবাবুকে দিয়েছিলে। তারপর সে যখন গভীর রাত্রে ফিরে এসে সদর দোরে টোকা দিয়েছিল তখন তুমি দোর খুলে তাকে ভিতরে এনেছিলে; সে কাজ সেরে চলে যাবার পর তুমি দোর বন্ধ করে দিয়েছিলে। তোমরা দু’জন সমান অপরাধী।’
মেদিনী আবার মেঝের ওপর আছড়ে পড়ল।
ঘণ্টাখানেক কেটে গেছে। আসামী দু’জনকে চালান করে দিয়ে রাখালবাবু বাড়ির ওপর থেকে অবরোধ তুলে নিয়েছেন। বাইরে ঘনায়মান সন্ধ্যা। রাখালবাবুসনতের ঘরে গিয়ে তার আলমারি খুলে অ্যালবামের সারি থেকে একটি একটি অ্যালবাম খুলে পাতা উল্টে দেখছিলেন। ব্যোমকেশ অন্যমনস্কভাবে সিগারেট টানতে টানতে ঘরময় ঘুরে বেড়াচ্ছিল।
রাখালবাবু অবশেষে একটি অ্যালবাম হাতে নিয়ে টেবিলের সামনে গিয়ে বসলেন, নিবিষ্ট মনে অ্যালবামের ছবিগুলি দেখতে লাগলেন। প্রতি পৃষ্ঠায় একটি শিথিলবসনা তরুণীর ছবি। শিকারী যেমন বাঘ শিকার করে তার চামড়া দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখে, সনৎ যেন প্রকারান্তরে তাই করেছে।
অ্যালবাম শেষ করে রাখালবাবু একটি নিশ্বাস ফেললেন, সিগারেট ধরিয়ে বললেন–সনৎ গাঙ্গুলির রক্তে পাগলামির বীজ আছে, কিন্তু সে যে একটি রসিক চূড়ামণি তাতে সন্দেহ নেই।’
ব্যোমকেশ কাছে এসে অ্যালবামের পাতা উলটে দেখল, তারপর বলল—’শ্রীমৎ শঙ্করাচার্য বলেছেন, নারী নরকের দ্বার। সনৎ নরকের অনেকগুলো দ্বার খুলেছিল, তাই শেষ পর্যন্ত তার নরক-প্রবেশ অনিবাৰ্য হয়ে পড়ল।’
‘কিন্তু সনৎ মেদিনীর মত মেয়ের জন্য এমন ভয়ঙ্কর কাজ করল ভাবতে আশ্চর্য লাগে।’
‘রাখাল, মেদিনীর মত মেয়েকে তুচ্ছ জ্ঞান কোরো না। যুগে যুগে এই জাতের মেয়েরা জন্মগ্রহণ করেছে-কখনো ধনীর ঘরে কখনো দরিদ্রের ঘরে-পুরুষের সর্বনাশ করার জন্যে। দ্ৰৌপদী। এই জাতের মহিলা ছিলেন-কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের মূলে আছে দ্রৌপদী। ইলিয়ডের হেলেনও তাই। এ যুগেও এই জাতের মেয়ের অভাব নেই। ওরা সকলেই যে চরিত্রহীনা তা নয়, কিন্তু ওদের এমন একটা কিছু আছে যা পুরুষকে-বিশেষত সন্নতের মত দুশ্চরিত্র পুরুষকে-ক্ষেপিয়ে দিতে পারে, কাণ্ডজ্ঞানহীন উন্মত্ত করে তুলতে পারে। জ্যেষ্ঠ আলেকজান্ডার দুমা একটা বড় দামী কথা বলেছিলেন–cherchez la femme: যেখানে এই ধরনের ব্যাপার ঘটে সেখানে মেয়েমানুষ খুঁজবে, মূলে মেয়েমানুষ আছে।’
‘তা বটে।’ রাখালবাবু। উঠলেন-দেখা যাচ্ছে বেণীমাধবের মেয়ে এবং পুত্রবধূ তাঁকে বিষ খাওয়াবার চেষ্টা করেনি, বৃদ্ধের জীর্ণ পাকযন্ত্রই দায়ী।–চলুন, এবার যাওয়া যাক। সন্ধ্যে হয়ে গেছে, এক পেয়ালা গরম চায়ের জন্যে প্ৰাণ কাঁদছে।’
‘চল আমার বাড়িতে, তরিবৎ করে চা খাওয়া যাবে।’
‘উত্তম প্রস্তাব।’
ঘরের বাইরে এসে রাখালবাবু দোরে তালা লাগালেন, তারপর সদর দরজার দিকে যেতে যেতে থমকে দাঁড়ালেন। দেখলেন। ঝিল্লী সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসছে, তার পিছনে প্রকাণ্ড ট্রের ওপর চায়ের সরঞ্জাম এবং কচুরি-নিমকির প্লেট নিয়ে দাসী আসছে। ব্যোমকেশ বলল—’রাখাল, তোমার প্রাণের কান্না ভগবান শুনতে পেয়েছেন। চল, ড্রয়িং রুমে গিয়ে বসা যাক।’
রাখালবাবু সাবধানী লোক, বললেন–‘দাঁড়ান, না আঁচলে বিশ্বাস নেই।’
কী তাদের কাছে এসে সলজ স্বরে বলল—’মা আপনাদেরর জন্যে চা জলখাবার পাঠিয়ে দিলেন।‘
‘দেখলে তো?’ সকলে ড্রয়িং রুমে গেল। ঝি টেবিলের ওপর ট্রে রেখে চলে গেল; ঝিল্লীও তার অনুগমন করছিল, ব্যোমকেশ বলল—’ঝিল্লী, আমরা বড় ক্লান্ত; তুমি আমাদের চা ঢেলে দাও, আমরা বসে বসে খাই।’
ঝিল্লী ফিরে এসে টি-পট থেকে তাদের চা ঢেলে দিল, জলখাবারের প্লেট তাদের সামনে রাখল। ব্যোমকেশ অর্ধমুদিত চোখে কচুরি চিবোতে চিবোতে দেখল, ঝিল্লী গুটি গুটি দোরের দিকে যাচ্ছে।
‘ঝিল্লী, শোনো, চলে যেও না। তোমার সঙ্গে কথা আছে।’
ঝিল্পী থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল, তারপর আস্তে আস্তে ফিরে এসে ব্যোমকেশের পাশে দাঁড়াল। ব্যোমকেশ সংকেত।ভরা চোখে রাখালবাবুর পানে তাকাল; রাখালবাবু অলসভাবে চায়ের পেয়ালা শেষ করে একটি গানের কলি গুঞ্জন করতে করতে ঘরের বাইরে চলে গেলেন।
ঝিল্লী ব্যোমকেশের পাশে দাঁড়িয়ে রইল। তার যে বুক চিবচিব করছে তা তার মুখ দেখে বোঝা যায় না। ব্যোমকেশ খাটো গলায় একটু হাসল, বলল–’সম্পর্কে নিখিল তোমার মামা হয় বটে, কিন্তু অনেক দূরের সম্পর্ক। আইনত বিয়ে আটকায় না।’
ঘরের ছায়া-ছায়া অন্ধকারে দেখা গেল না-ঝিল্লীর মুখ রাঙা হয়ে উঠেছে। তারপর তার ক্ষীণস্বর শোনা গেল–’কি করে জানলেন?’
ব্যোমকেশ বলল—’বোকা মেয়ে! সবগুলো চিঠিতেই তোমার আঙুলের ছাপ পাওয়া গেছে।–আচ্ছা, তুমি এখন কোণের চেয়ারে গিয়ে বোসো। আরো কথা আছে।’
ঝিল্লী নেংটি ইদুরের মত ঘরের অন্ধকার কোণে অদৃশ্য হয়ে গেল। ঘরে যেন ব্যোমকেশ ছাড়া আর কেউ নেই।
বাইরে দুজোড়া জুতোর শব্দ শোনা গেল। রাখালবাবু নিখিলকে নিয়ে ফিরে এলেন।
‘রাখাল, আলোটা জ্বেলে দাও।’
দোরের পাশে সুইচ। রাখালবাবু সুইচ টিপলেন, কয়েকটা উজ্জ্বল বালব জ্বলে উঠল। নিখিল কোনোদিকে না তাকিয়ে ব্যোমকেশের পাশে গিয়ে বসল, অনুরাগপূর্ণ চোখে তার পানে চেয়ে বলল—’ব্যোমকেশদা, আপনি ভেলকি জানেন। সনৎদা আমার মাসতুত ভাই, তাকে সারা জীবন দেখছি, কিন্তু সে যে এমন মানুষ তা ভাবতেও পারিনি।’
ব্যোমকেশ বলল–’নিখিল, মুখ দেখে যদি মানুষের মনের কথা জানা যেত, তাহলে আইন, আদালত, পুলিস, সত্যান্বেষী কিছুই দরকার হতো না; তুমিও মুখ দেখেই বুঝতে পারতে কোন মেয়েটি তোমাকে বেনামী চিঠি লেখে।’
‘তা তো বটেই, তা তো বটেই।’ নিখিল ব্যোমকেশের আর একটু কাছে ঘেঁষে বসিল, ষড়যন্ত্রকারীর মত ফিসফিস করে বলল–’আপনি কিছু বুঝতে পেরেছেন নাকি?’
ব্যোমকেশ হাসল–’আগে তুমি বলে দেখি মেয়েটির সন্ধান যদি পাওয়া যায় তুমি কি করবে?’
নিখিলের চোখ উদ্দীপনায় জ্বলজ্বল করে উঠল–’কী করব? বিয়ে করব। কানা হোক, খোঁড়া হোক, কাফ্রি হোক, হাবসি হোক, তাকে বিয়ে করব।’
ব্যোমকেশ বলল–’তাহলে সন্ধান পাওয়া গেছে।–ঝিল্লী, এদিকে এসো।’
নিখিল চকিত হয়ে দোরের দিকে চাইল। ওদিকে ঘরের কোণে ঝিল্লীর সাড়াশব্দ নেই, সে চেয়ারের পিছনে লুকিয়েছে। নিখিল ব্যোমকেশের দিকে ফিরে উত্তেজিত স্বরে বলল—‘কাকে ডাকলেন?’
‘এই যে দেখাচ্ছি–ব্যোমকেশ উঠে গিয়ে ঝিল্লীর হাত ধরে টেনে দাঁড় করাল, তাকে হাত ধরে নিখিলের কাছে এনে বলল–’এই নাও তোমার বিবি পোকা। বিবি পোকাকে চোখে দেখা যায় না, কেবল ঝংকার শোনা যায়। আমরা কিন্তু ধরেছি।’
নিখিলের মাথার চুল খাড়া হয়ে উঠল, চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসার উপক্রম করল। সে দু’ হাত তুলে চীৎকার করল–’অ্যাঁ! ঝিল্লী-ঝিল্লী আমাকে চিঠি লেখে! ঝিল্লী আমাকে ভালবাসে! কিন্তু–কিন্তু ও যে আমার ভাগনী!’
ব্যোমকেশ হেসে বলল–’ভয় নেই, ভয় নেই। ঝিল্লী ভরি সেয়ানা মেয়ে, অপাত্রে হৃদয় সমৰ্পণ করেনি। তোমাদের যা সম্পর্কে তাতে বিয়ে আটকায় না।’
ঝিল্লীর মুখ অবনত, ঠোঁটের কোণে ভীরু হাসির যাতায়াত। নিখিলের মুখে ক্রমে ক্রমে একটি প্রকাণ্ড হাসি ফুটে উঠল, সে বলল—’উঃ, কী সাংঘাতিক আজকালকার মেয়ে দেখেছেন ব্যোমকেশদা, আমাকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাচ্ছিল। আচ্ছা, আমিও দেখে নেব। বিয়েটা হয়ে যাক—’
এই সময় দোরের সামনে গঙ্গাধরকে দেখা গেল। লাঠি হাতে সে বোধহয় সায়াট্রিক নিত্যকর্ম করতে বেরুচ্ছিল। ঘরের মধ্যে গলার আওয়াজ শুনে ঘরে ঢুকেছে। এই অল্পক্ষণের মধ্যেই তার মেজাজ আবার সপ্তমে চড়ে গিয়েছে, সে রাখালবাবুকে লক্ষ্য করে কড়া সুরে বলল–’এখানে আপনার কাজ শেষ হয়েছে, এখনো এখানে রয়েছেন কেন?’ রাখালবাবু উত্তর দেবার আগেই তার চোখ পড়ল ঝিল্লীর ওপর, অমনি ভয়ঙ্কর ভ্রূকুটি করে সে বলল-ঝিল্লী! তুই এখানে পুরুষদের মধ্যে কি করছিস?’
বোপকে দেখে ঝিল্লী একেবারে কাঠ হয়ে গিয়েছিল, এখন চমকে উঠে ব্যোমকেশের পিছনে লুকোবার চেষ্টা করল। গঙ্গাধর বলল–’ধিঙ্গি মেয়ে! পুরুষ-ঘেঁষা স্বভাব হয়েছে। চাবকে লাল করে দেব।’
নিখিল হঠাৎ যেন ক্ষেপে গেল, এক লাফে গঙ্গাধরের সামনে গিয়ে বলল—’মুখ সামলে কথা বলুন। ঝিল্পীকে আমি বিয়ে করব।’
গঙ্গাধর প্রথমটা থতমত খেয়ে গেল, তারপর তারস্বরে চিকুর ছাড়ল—‘কী, আমার মেয়েকে বিয়ে করবি তুই, হতভাগা ছাপাখানার ভূত! ঠেঙিয়ে তোর হাড় ভেঙে দেব না।’ সে লাঠি আস্ফালন করতে লাগল।
এই গায়ত্রী ঘরে ঢুকল, উন্ন দৃষ্টিতে চারিদিকে তাকিয়ে বলল–’কি হয়েছে, এত চেঁচামেচি কিসের?’
গঙ্গাধর কৰ্ণপাত করল না, চেচিয়ে বলল–’বেরিয়ে যা আমার বাড়ি থেকে। ছোট মুখে বড় কথা। আমার মেয়েকে তুই বিয়ে করবি।’
ঝিল্লী ছুটে গিয়ে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরলা, কানে কানে বলল–’মা, তুমি যদি অমত কর আমি বিষ খেয়ে মরব।’ চরম অবস্থার সম্মুখীন হয়ে ঝিল্লীর মুখে কথা ফুটেছে।
গায়ত্রী একবার নিখিলকে ভাল করে দেখল, যেন আগে কখনো দেখেনি। নিখিল গিয়ে তার পায়ের ধুলো নিল। বলল–’দিদি, ঝিল্লীকে আমি-মানে আমাকে ঝিল্লী বিয়ে করতে চায়। ব্যোমকেশদা বলেছেন সম্পর্কে বাধে না।’
গায়ত্রী ব্যোমকেশকে প্রশ্ন করল—’সত্যি সম্পর্কে বাধে না?’
ব্যোমকেশ বলল—’না, ওরা first cousin নয়, সম্পর্কে বাধে না।’
গঙ্গাধর আরো গলা চড়িয়ে চীৎকার করল—’শুনতে চাই না, কোনো কথা শুনতে চাই না। বেরিয়ে যাও তোমরা আমার বাড়ি থেকে, এই দণ্ডে বেরিয়ে যাও—’
গায়ত্রী ধমক দিয়ে উঠল—’থামো তুমি। বাড়ি তোমার নয়, বাড়ি আমার। আমি সুধাংশুবাবুর সঙ্গে কথা বলেছি; বাবা উইল করার আগেই মারা গেছেন, আইনত তাঁর সমস্ত সম্পত্তির অর্ধেক আমার, এ বাড়িরও অর্ধেক আমার।–তুমি বাইরে যেখানে যাচ্ছিলে যাও না। যা করার আমি করব।’
গঙ্গাধর পিন ফোটানো খেলনার বেলুনের মত চুপসে গেল, তারপর ঘাড় হেঁট করে ঘর থেকে নিষ্ক্রান্ত হলো।
গায়ত্রী ঝিল্লীর বাহুবন্ধন থেকে গলা ছাড়িয়ে তার হাত ধরে সোফায় বসল, নিখিলের দিকে চেয়ে হাকিমের মত হুকুম করল–’কি কাণ্ড তোমরা বাধিয়েছ এবার বলো শুনি।’
নিখিল বলল–’আমি কিছু জানি না দিদি, ওই ওকে জিজ্ঞেস করো। ব্যোমকেশদা, চিঠিগুলো কোথায়?’
ব্যোমকেশ পকেট থেকে চিঠি বের করে দিয়ে বলল–’রাখাল, চল এবার আমাদের যাবার সময় হয়েছে। গায়ত্রী দেবী, চায়ের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। নিখিল, তুমি যে বৌ পেলে অনেক ভাগ্যে এমন বৌ পাওয়া যায়। ঝিল্লী, তুমিও কম সৌভাগ্যবতী নাও। জীবনে যে-জিনিস সবচেয়ে দুর্লভ, সেই দুর্লভ হাসি তুমি পেলে। তোমাদের জীবনে হাসির ঢেউ খেলতে থাকুক।–এসো রাখাল।’
লোহার বিস্কুট
কমলবাবু বললেন, ‘আমি পাড়াতেই থাকি, হিন্দুস্থান পার্কের কিনারায়। আপনাকে অনেকবার দেখেছি, আলাপ করবার ইচ্ছে হয়েছে কিন্তু সাহস হয়নি। আজ একটা সূত্র পেয়েছি, তাই ভাবলাম এই ছুতোয় আলাপটা করে নিই। আমার জীবনে একটা ছোট্ট সমস্যা এসেছে–‘
‘সমস্যা!’ ব্যোমকেশ সিগারেটের কৌটো এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘বলুন বলুন, অনেকদিন ও বস্তুর মুখদর্শন করিনি।’
গ্রীষ্মের একটি রবিবার সকালে ব্যোমকেশের কেয়াতলার বাড়িতে বসে কথা হচ্ছিল। কমলবাবুর চেহারাটি নাড়ুগোপালের মত, কিন্তু মুখের ভাব চটপটে বুদ্ধিসমৃদ্ধ। তিনি হাসিমুখে একটি সিগারেট নিয়ে ধরালেন, তারপর গল্প আরম্ভ করলেন, ‘আমার নাম কমলকৃষ্ণ দাস, কাছেই ভারত কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের শাখা আছে, আমি সেখানকার ক্যাশিয়ার। বছর দেড়েক আছে পুরুলিয়া থেকে বদলি হয়ে এখানে এসেছি।
‘কলকাতায় এসেই মুশকিলে পড়ে গেলাম; কোথাও বাসা খুঁজে পাই না। শেষ পর্যন্ত একটি লোক তার বাড়ির নীচের তলায় একটি ঘর ছেড়ে দিল। ফ্যামিলি আনা হল না, স্ত্রী আর মেয়েকে পুরুলিয়ায় রেখে একলা বাসায় উঠলাম।
‘বাড়িওয়ালার নাম অক্ষয় মণ্ডল। বাড়িটি দোতলা; নীচের তলায় দু’টি ঘর, ওপরে দু’টি; যাতায়াতের রাস্তা আলাদা। অক্ষয় মণ্ডল দোতলায় একলা থাকে, কিন্তু তার কাছে লোকজনের যাতায়াত আছে। মিষ্টভাষী লোক, কিন্তু কী কাজ করে বুঝতে পারলাম না। মাঝে মাঝে আমার ঘরে এসে গল্পসল্প করত, কিন্তু আমাকে কোনদিন দোতলায় ডাকত না পড়শীদের সঙ্গেও যাতায়াত ছিল না। আমাদের ব্যাঙ্কে ওর একটা চালু খাতা ছিল।
‘যাহোক, এইভাবে মাস তিনেক কাটার পর একদিন একটা ছুটির দিনে আমার অফিসের একজন সহকর্মী বন্ধুর বাড়িতে রাত্রে নেমন্তন্ন ছিল। ফিরতে রাত হয়ে গেল। বাসায় ফিরে দেখি অক্ষয় মণ্ডল দোতলা থেকে নেমে এসে সিঁড়ির দরজায় তালা লাগাচ্ছে, তার পায়ের দু’পাশে দু’টি সুটকেশ। বললাম, “একি, এত রাত্রে কোথায় চললেন?”
‘আমায় দেখে অক্ষয় মণ্ডল কেমন হকচকিয়ে গেল; তারপর সুটকেশ দুটো দু’হাতে নিয়ে আমার কাছে এসে দাঁড়াল, একটু গাঢ় গলায় বলল, “কমলবাবু, আমাকে হঠাৎ বাইরে যেতে হচ্ছে। কবে ফিরব কিছু ঠিক নেই।”
‘দেখলাম তার চোখ দুটো লাল হয়ে রয়েছে। বললাম, ‘সে কি, কোথায় যাচ্ছেন?”
‘তার মুখে হাসির মত একটা ভাব ফুটে উঠল। সে বলল, “অনেক দূর। আচ্ছা, চলি।”
‘আমি অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। সে কয়েক পা গিয়ে থমকে দাঁড়াল, তারপর ফিরে এসে বলল, “কমলবাবু, আপনি সজ্জন, ব্যাঙ্কে চাকরি করে; আপনাকে একটা কথা বলে যাই। সাত দিনের মধ্যে আমি যদি ফিরে না আসি, আপনি আমার পুরো বাড়িটা দখল করবেন। আপনাদের ব্যাঙ্কে আমার অ্যাকাউণ্ট আছে, মাসে মাসে দেড়শো টাকা ভাড়া আমার খাতায় জমা দেবেন।–আচ্ছা।”
‘অক্ষয় মণ্ডল চলে গেল। আমি স্তম্ভিত হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম। তারপর বিস্ময়ের চটকা ভেঙে খেয়াল হল, অক্ষয় মণ্ডল তার দোরের চাবি আমাকে দিয়ে যায়নি।
‘সে যাহোক, আস্ত বাড়িটা পাওয়া যেতে পারে এই আশায় মন উৎফুল্ল হয়ে উঠল। মনে হল অক্ষয় মণ্ডল অগস্ত্য যাত্রা করেছে, আর শীগ্গির ফিরবে না।
‘পরদিন সকালে স্ত্রীকে চিঠি লিখে দিলাম–সংসার গুটিয়ে তৈরী থাকো, বাসা পাওয়ার সম্ভাবনা আছে।
‘আশায় আশায় দুটো দিন কেটে গেল। তিনি দিনের দিন গন্ধ বেরুতে আরম্ভ করল। বিকট গন্ধ, মড়া-পচা গন্ধ। গরমের দিনে মাছ মাংস পচে গিয়ে যে-রকম গন্ধ বেরোয় সেই রকম গন্ধ আসছে।
‘সন্দেহ হল, পুলিসে খবর দিলাম। পুলিস এসে তালা ভেঙে ওপরে উঠল। আমিও সঙ্গে সঙ্গে গেলাম। গিয়ে দেখি বীভৎস কাণ্ড। ঘরের মেঝের ওপর একটা মড়া হাত-পা ছড়িয়ে পড়ে আছে, তার কপালে একটা ফুটো। সে-রাত্রে আমি যখন নেমন্তন্ন খেতে গিয়েছিলাম, সেই সময় অক্ষয় মণ্ডল লোকটাকে গুলি করেছে, তারপর দামী জিনিসপত্র টাকাকড়ি সুটকেশে পুরে নিয়ে কেটে পড়েছে।
‘দেখতে দেখতে একপাল পুলিস এসে বাড়ি ঘিরে ফেলল। লাশ ময়না তদন্তের জন্যে পাঠানো হল। দারোগাবাবু আমাকে জেরা করলেন। তারপর খানাতল্লাশ আরম্ভ হল। নিরপেক্ষ সাক্ষী হিসাবে পাড়ার একটি ভদ্রলোক এবং আমি সঙ্গে রইলাম।
‘খানাতল্লাশে কিন্তু বিশেষ কিছু পাওয়া গেল না। কেবল একটা দেরাজের মধ্যে কয়েকটা লোহার পাত দিয়ে তৈরী কৌটোর মত জিনিস পাওয়া গেল; সিগারেটের প্যাকেটে রুপোলি তবকের মধ্যে যেমন সিগারেট মোড়া থাকে, অনেকটা সেই রকম লম্বাটে ধরনের তবক, খুব পাতলা লোহা দিয়ে তৈরী, কিন্তু অভ্যন্তর ভাগ শূন্য। দারোগাবাবু সেগুলো নিয়ে চিন্তিতভাবে নাড়াচাড়া করলেন, কিন্তু হালকা লোহার মোড়ক কোন্ কাজে লাগে বোঝা গেল না।
‘যাহোক, সেদিনকার মত তদন্ত শেষ হল, পুলিস চলে গেল। আমার মনে কিন্তু অস্বস্তি লেগে রইল। তিন-চার দিন পরে থানায় গেলাম। সেখানে গিয়ে খবর পেলাম মৃত ব্যক্তির পরিচয় জানা গেছে; আঙুলের ছাপ ও অন্যান্য দৈহিক চিহ্ন থেকে প্রকাশ পেয়েছে যে মৃত ব্যক্তির নাম হরিহর সিং; দাগী আসামী ছিল, মাদকদ্রব্য এবং সোনা-রূপোর চোরাকারবার করত। অক্ষয় মণ্ডলের সঙ্গে কোন্ সূত্রে তার যাতায়াত ছিল, তা জানা যায়নি। অক্ষয় মণ্ডলের নামে হুলিয়া জারী হয়েছে; কিন্তু সে এখনো ধরা পড়েনি, কর্পূরের মত উবে গেছে।
‘থানা থেকে ফেরার সময় ভয়ে ভয়ে প্রশ্ন করলাম, “পুরো বাড়িটা তাহলে আমি দখল করতে পারি?”
‘দারোগাবাবু বললেন, “স্বচ্ছন্দে। আসামী যখন ফেরার হবার আগে আপনাকে তার বাড়ির হেপাজতে রেখে গেছে, তখন আপনি থাকবেন বৈকি। তবে একটা কথা, যদি আসামীর সাড়াশব্দ পান, তৎক্ষণাৎ থানায় খবর দেবেন”
‘তারপর প্রায় বছরখানেক ভারি আরামে কেটেছে। স্ত্রী আর মেয়েকে নিয়ে এলাম, সারা বাড়িটা দখল করে দিব্যি হাত-পা ছড়িয়ে বাস করছি। বাড়ির ভাড়া মাসে মাসে অক্ষয় মণ্ডলের খাতায় জমা করে দিই। তার টেবিল চেয়ার ইত্যাদি ব্যবহার করি বটে কিন্তু আলমারি বাক্স কাবার্ডে হাত দিই না, পুলিস খানাতল্লাশ করার পর যেমনটি ছিল তেমনি আছে।
‘হঠাৎ মাস দুই আগে এক ফ্যাসাদ উপস্থিত হল। সকালবেলা নীচের ঘরে বসে কাগজ পড়ছি, একজন অপরিচিত লোক এল, তার সঙ্গে একটি স্ত্রীলোক। ভদ্রশ্রেণীর মধ্যবয়স্ক পুরুষ, স্ত্রীলোকটি সধবা। পুরুষ স্ত্রীলোকটির দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, “এ হচ্ছে অক্ষয় মণ্ডলের স্ত্রী, আমি ওর বড় ভাই। এতদিন আমি ওকে পুষেছি, কিন্তু আর আমার পোষবার ক্ষমতা নেই। এবার ও স্বামীর বাড়িতে থাকবে। আপনাকে বাড়ি ছেড়ে দিতে হবে।”
‘মাথায় বজ্রপাত। ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলাম। তারপর বুদ্ধি গজালো, বললাম, “অক্ষয়বাবুর স্ত্রী আছেন, তা কোনদিন শুনিনি। যদি আপনাদের কথা সত্যি হয়, আপনি আদালতে গিয়ে নিজের দাবি প্রমাণ করুন, তারপর দেখা যাবে।”
‘কিছুক্ষণ বকাবকি কথা-কাটাকাটির পর তারা চলে গেল। আমার সন্দেহ হল এরা দাগাবাজ জোচ্চোর, ছলছুতো করে বাড়িটা দখল করে বসতে চায়। আজকাল বাসাবাড়ির যে রকম ভাড়া দাঁড়িয়েছে, ফোকটে বাসা পেলে কে ছাড়ে!
‘থানায় গিয়ে খবরটা জানিয়ে এলাম। দারোগাবাবু বললেন, “অক্ষয় মণ্ডলের স্ত্রী আছে কিনা আমাদের জানা নেই। যাহোক, আমার যদি আসে, ছলছুতো করে থানায় নিয়ে আসবেন। আমরাও বাড়ির ওপর নজর রাখব।”
‘আমার পিস্তল আছে, তাছাড়া একটা কুকুর পুষেছি। হিংস্র পাহাড়ী কুকুর, নাম ভুটো; আমার হাতে ছাড়া কারুর হাতে খায় না। আমি ব্যাঙ্কে যাবার সময় তার শেকল খুলে দিই, রাত্তিরে তাকে ছেড়ে দিই, সে বাড়ি পাহাড়া দেয়। ভুটো ছাড়া থাকতে বাড়িতে চোর-ছাঁচড় ঢোকার ভয় নেই, ভুটো তাকে চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে। তবু এই ঘটনার পর মনে একটা অস্বস্তি লেগে রইল। অক্ষয় মণ্ডল লোক ভাল নয়, হয়তো নিজে আড়ালে থেকে কোনো কুটিল খেলা খেলছে।
‘দিন দশেক পরে একখানা বেনামী চিঠি পেলাম, “পাড়া ছেড়ে চলে যাও, নইলে বিপদে পড়বে।”–পাড়া মানেই বাড়ি। থানায় গিয়ে চিঠি দেখালাম। দারোগাবাবু বললেন, “চেপে বসে থাকুন, বড়বেন না। আপনার বাসার ওপর পাহারা বাড়িয়ে দিচ্ছি।”
‘তারপর থেকে এই দেড় মাস আর কেউ আসেনি, উড়ো চিঠিও পাঠায়নি। এখন বেশ নিরাপদ বোধ করছি। কিন্তু একটি সমস্যার উদয় হয়েছে। এই সমস্যা সমাধানের জন্যই আপনার কাছে আসা। দারোগাবাবুর কাছে যেতে পারতাম, কিন্তু তিনি হয়তো এমন উপদেশ দিতেন যা আমাদের পছন্দ হত না।
‘ব্যাপারটা এই : ব্যাঙ্ক থেকে আমার এক মাসের ছুটি পাওয়া হয়েছে। আমার স্ত্রীর অনেক দিন থেকে তীর্থে যাবার ইচ্ছে। হরিদ্বার, হৃষিকেশ এইসব। ব্যাঙ্কের একটি সহকর্মীও আমার সঙ্গেই ছুটি নিয়ে কুণ্ডু স্পেশালে বেড়াতে বেরুচ্ছেন, আমাকেও তিনি সঙ্গে যাবার জন্য চাপাচাপি করছেন। দল বেঁধে গেলে অনেক সুবিধে হয়। আমার স্ত্রী খুব উৎসাহিত হয়ে উঠেছেন। আমার উৎসাহও কম নয়। কিন্তু–
‘যেতে হলে বাড়িতে তালা বন্ধ করে যেতে হবে। ভুটোকেও মাসখানেকের জন্যে একটা কেনেলে ভর্তি করে দিতে হবে। বাড়ি অরক্ষিত থাকবে। মনে করুন, এই ফাঁকে অক্ষয় মণ্ডলের বৌ–মানে, ওই স্ত্রীলোকটা যদি তালা ভেঙে বাড়িতে ঢুকে বাড়ি দখল করে বসে, তখন আমি কি করব? অক্ষয় মণ্ডলের মৌখিক অনুমতি ছাড়া আমার তো কোনো হক নেই। তবে আমি দখলে আছি, আমাকে বেদখল করতে হলে ওদের আদালতে যেতে হবে। কিন্তু ওরা যদি দখল নিয়ে বসে, তখন আমি কোথায় যাব?
‘এই আমার সমস্যা। নিতান্তই ঘরোয়া সমস্যা। আপনার নিরীক্ষার উপযুক্ত নয়। তবু রথ-দেখা কলা-বেচা দুই-ই হবে, এই মতলবে আপনার কাছে এসেছি। এখন বলুন, বাড়িখানি রেখে আমাদের তীর্থযাত্রা করা উচিত হবে কিনা।”
ব্যোমকেশ খানিকক্ষণ গালে হাত দিয়ে বসে রইল, শেষ বলল, “আপনাদের তীর্থযাত্রায় বাধা দিলে পাপ হবে, আবার বাড়ি বেহাত হয়ে যাওয়াও বাঞ্ছনীয় নয়। আপনার জানাশোনার মধ্যে এমন মজবুত লোক কি কেউ নেই, যাকে বাড়িতে বসিয়ে তীর্থযাত্রা করতে পারেন?”
‘কই, সে রকম কাউকে দেখছি না। সকলেরই বাসা আছে। যাদের নেই তাদের বসাতে সাহস হয় না, শেষে খাল কেটে কুমীর আনব।’
‘তাহলে চলুন, আপনার বাসাটা দেখে আসি।’ ব্যোমকেশ উঠে দাঁড়াল।
কমলবাবু উৎফুল্ল চোখে চাইলেন, ‘যাবেন! কী সৌভাগ্য! চলুন চলুন, বেশি দূর নয়–‘
‘একটু বসুন। বেশি দূর না হলেও রোদ বেশ কড়া। একটা ছাতা নিয়ে আসি।’
ব্যোমকেশ ভিতরে গিয়ে ছাতা নিয়ে এল। ছাতাটি ব্যোমকেশের প্রিয় ছাতা; অতিশয় জীর্ণ, লোহার বাঁট এবং কামানিতে মরচে ধরেছে, কাপড় বিবর্ণ এবং বহু ছিদ্রযুক্ত। এই ছাতা মাথায় দিয়ে রাস্তায় বেরুলে নিজে অদৃশ্য থেকে সন্দেহভাজন ব্যক্তির অনুসরণ করা যায়; ফুটো ফিয়ে বাইরের লোককে দেখা যায়, কিন্তু বাইরের লোক ছাতাধারীর মুখ দেখতে পায় না। সত্যান্বেষীর উপযুক্ত ছাড়া।
‘চলুন।’
কমলবাবুর বাসা ব্যোমকেশের বাড়ি থেকে মিনিট পাঁচেকের রাস্তা। মাঝে মাঝে এ পথ দিয়ে যাবার সময় বাড়িটি ব্যোমকেশের চোখে পড়েছে; ছোট দোতলা বাড়ি; কিন্তু একটি বিশেষত্বের জন্য দৃষ্টি আকর্ষণ করে; সমস্ত ছাদ লোহার ডাণ্ডা-ছত্রী দিয়ে ঢাকা, যেন প্রকাণ্ড একটা লোহার খাঁচা। বাইরে থেকে কোনো মতেই ছাদের ওঠা সম্ভব নয়।
‘আসুন।’
ছাতা মুড়ে ব্যোমকেশ বাড়িতে ঢুকল। কমলবাবু প্রথমে তাকে নীচের তলায় বসবার ঘরে নিয়ে গেলেন। সেখানে একটি শতরঞ্জি-ঢাকা তক্তপোশ ও দু’টি ক্যাম্বিসের চেয়ার ছাড়া আর বিশেষ কিছু নেই। ব্যোমকেশ ঘরের চারিদিকে চোখ ফেরাল। সে যেন একটা সূত্র খুঁজছে, কিন্তু এই নগ্নপ্রায় ঘরে কোনো অঙ্গুলিনির্দেশ পাওয়া গেল না। সে বলল, ‘নীচের তলায় আর একটা ঘর আছে, না?’
‘আছে। ঘরটা অক্ষয় মণ্ডলের আমলে ব্যবহার হত না, আমি ওটাকে রান্নাঘর করেছি। দেখবেন?’
‘দরকার নেই। আপনার স্ত্রী বোধ হয় এখন রান্নাবান্না করছেন। চলুন, ওপরতলাটা দেখা যাক।’
‘চলুন।’
ঘরের লাগাও একটা সরু বারান্দার শেষে ওপরে ওঠার সিঁড়ি, সিঁড়ির মাথায় দরজা।
দরজার মাথায় ওপরকার দেয়ালে ঘোড়ার ক্ষুরের নালের মত লোহার একটা জিনিস তিনটে পেরেকের মাঝখানে আটকানো রয়েছে। ব্যোমকেশ সেই দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ছাতা তুলে সেই দিকে নির্দেশ করে বলল, ‘ওটা কি?’
‘ওটা ঘোড়ার নাল। বিলিতি কুসংস্কার অনুযায়ী দোরের মাথায় ঘোড়ার নাল টাঙিয়ে রাখলে নাকি অনেক টাকা হয়।’
ব্যোমকেশের ছাতার ডগা ঘোড়ার নালে আটকে গিয়েছিল, সে টেনে সেটা ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, ‘এটা কি আপনি লাগিয়েছেন নাকি?’
‘না, অক্ষয় মণ্ডলের আমল থেকে আছে।’
ব্যোমকেশ ঘোড়ার নালের দিকে তাকিয়ে কেমন যেন স্বপ্নাচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। কমলবাবু ডাকলেন, ‘ভেতরে আসুন।’
ঘরের ভিতর কমলবাবুর দশ বছরের মেয়ে মেঝেয় মাদুর পেতে বসে লেখাপড়া করছিল, তার কাছে মাদুরের বাইরে একটা ভীষণদর্ষন কুকুর থাবা পেতে বসেছিল, ব্যোমকেশের পানে মণিহীন নীলাভ চোখ তুলে চাইল। কমলবাবু বললেন, ‘খুকু, যাও তোমার মাকে চা তৈরি করতে বল, আর কিছু ভাজাভুজি।’
ব্যোমকেশ একটু আপত্তি করল, কিন্তু কমলবাবু শুনলেন না। খুকু নীচে চলে গেল, ভূটো সঙ্গে সঙ্গে গেল।
অতঃপর ব্যোমকেশ ঘরটি চক্ষু দিয়ে সমীক্ষা করল। বলল, ‘এ ঘরে অক্ষয় মণ্ডলের কোনো আসবাবপত্র আছে?’
কমলবাবু বললেন, ‘ছিল, আমি পাশের ঘরে নিয়ে গেছি। খাট এবং দেরাজওয়ালা টেবিল। এই যে।’
পাশের ঘরটি অপেক্ষাকৃত বড়; জানলার দিকে খাট, অন্য কোণে টেবিল। ব্যোমকেশ টেবিলের কাছে গিয়ে বলল, ‘সেই যে পুলিসের খানাতল্লাশে লোহার মোড়ক পাওয়া গিয়েছিল, সেগুলো কি পুলিস নিয়ে গিয়েছে?’
‘একটা মোড়ক পুলিস নিয়ে গিয়েছিল, বাকিগুলো দেরাজে আছে।’ কমলবাবু নীচের দিকের একটা দেরাজ খুলে বললেন, ‘এই যে!’
দেরাজের পিছন দিকে কয়েকটা মোড়ক পড়ে ছিল, ব্যোমকেশ একটা বের করে নেড়েচেড়ে দেখল। আকৃতি-প্রকৃতি সিগারেট প্যাকেটের অভ্যন্তরস্থ তবকের মতই বটে। সেটা রেখে দিয়ে সে হাসিমুখে বলল, ‘ভারি মজার জিনিস তো! এর ভেতর গোটা দুই বিস্কুট রেখে সুতো দিয়ে বেঁধে দিলে নিশ্চিন্দি। চলুন, এবার ছাদটা দেখে আসা যাক।’
‘ছাদে কিন্তু কিছু নেই!’
‘তা হোক। শূন্যতাই হয়তো অর্থবহ হয়ে উঠতে পারে।’
‘তাহলে আসুন।’
ছাদে সত্যই কিছু নেই। লোহার ঘেরাটোপ ঢাকা ছাদটা বাঘের শূন্য খাঁচার মত দাঁড়িয়ে আছে। এক কোণে উঁচু পাদপীঠের ওপর লাল রঙের লোহার চৌবাচ্চা; এই চৌবাচ্চা থেকে বাড়িতে কলের জল সরবরাহ হয়। ব্যোমকেশ ছাদের চারিদিক সন্ধিৎসুভাবে পরিক্রমণ করে বলল, ‘ছাদটা আপনারা ব্যবহার করেন না?’
কমলবাবু বললেন, ‘বেশি গরম পড়লে ছাদে এসে শুই। বেশ নিরাপদ জায়গা, চর ঢুকবে সে উপায় নেই।’
‘হুঁ। চলুন, আমার দেখা শেষ হয়েছে।’
নীচে নেমে এলে পর খুকু এসে বলল, ‘বাবা, বসবার ঘরে চা দিয়েছি।’
নীচের তলার ঘরে পাঁপড় ভাজা ও গরম বেগুনি সহযোগে চা পান করতে করতে ব্যোমকেশ বলল, ‘থানার যে দারোগাবাবুর কাছে আপনার যাওয়া-আসা, তাঁর নাম কি?’
কমলবাবু বললেন, ‘তাঁর নামে রাখাল সরকার।’
ব্যোমকেশ মুচকি হাসল। চা শেষ করে সে ছাতা নিয়ে উঠে দাঁড়াল, ‘আচ্ছা, আজ তাহলে উঠি।’
কমলবাবু বললেন, ‘কিন্তু আমাদের তীর্থযাত্রার কি হবে, যাওয়া উচিত হবে কি না, কিছু বললেন না তো।’
‘নিশ্চয় তীর্থযাত্রা করবেন। কবে থেকে আপনার ছুটি?’
‘সামনের শনিবার থেকে।’
‘তাহলে আর দেরি করবেন না, টিকিট কিনে ফেলুন। কোনো ভয় নেই, আপনার বাসা বেদখল হবে না, আমি জামিন রইলাম।–আচ্ছা, চলি।’
‘অ্যাঁ–তাই নাই! ধন্যবাদ ব্যোমকেশবাবু। চলুন, আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসি।’
ব্যোমকেশ বলল, ‘তার দরকার নেই, আমি এখন থানায় যাব। রাখালের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করতে হবে।’
শনিবার সকালবেলা কমলবাবুর বাসা থেকে পুলিসের পাহারা তুলে নেওয়া হল।
কমলবাবু ভুটোকে একটা কেনেলে রেখে এলেন। পুলিস ছাড়াও অন্য একটি পক্ষ বাসার ওপর নজর রেখেছিল, তারা সব লক্ষ্য করল।
বিকেলবেলা কমলবাবু তাঁর স্ত্রী মেয়ে এবং পোঁটলা-পুঁটলি নিয়ে বাসায় চাবি দিয়ে চলে গেলেন, যাবার পথে থানায় রাখালবাবুকে চাবি দিয়ে বলে গেলেন, ‘খিড়কির দোর ভেজিয়ে রেখে এসেছি। এখন আমার বরাত আর আপনাদের হাতযশ।’
সারা দিন বাড়িটা শূন্য পড়ে রইল।
রাত্রি আন্দাজ সাড়ে আটটার সময় ব্যোমকেশকে নিয়ে রাখালবাবু কমলবাবুর বাসার দিকে গেলেন। দু’জনের পকেটেই পিস্তল এবং বৈদ্যুতিক টর্চ।
সরজমিন আগে থাকতেই দেখা ছিল, পাশের বাড়ির পাঁচিল ডিঙিয়ে দু’জনে কমলবাবুর খিড়কি দিয়ে বাড়িতে ঢুকলেন, খিড়কির দরজা বন্ধ করে দিয়ে পা টিপে টিপে সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠলেন। কান পেতে শুনলেন, বাড়ি নিস্তব্ধ।
রাখালবাবু পলকের জন্য দোরের মাথায় টর্চের আলো ফেলে দেখলেন, ঘোড়ার ক্ষুর যথাস্থানে আছে। তিনি তখন ফিসফিস করে বললেন, ‘চলুন, ছাদে দিয়ে অপেক্ষা করলেই বোধহয় ভাল হবে।’
ব্যোমকেশ তাঁর কানে কানে বলল, ‘না। আমি ছাদে যাচ্ছি, তুমি এই ঘরে লুকিয়ে থাকো। দু’জনেই ছাদে গেলে ছাদের দোর এদিক থেকে বন্ধ করা যাবে না, আসামীর সন্দেহ হবে।’
‘বেশ, আপনি ছাদে গিয়ে লুকিয়ে থাকুন, আমি দোর বন্ধ করে দিচ্ছি।’
ব্যোমকেশ ছাদে উঠে গেল, রাখালবাবু দরজার হুড়কো লাগিয়ে নেমে এলেন। কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে ঠিক নেই, এমন কি আসামী আজ নাও আসতে পারে। তিনি দোতলার ঘরের ভিতর ঢুকে দোরের পাশে লুকিয়ে রইলেন।
ছাদের ওপর ব্যোমকেশ এদিক ওদিক ঘুরে জলের চৌবাচ্চা থেকে দূরের একটা আল্সের পাশে গিয়ে বসল। আকাশে চাঁদ নেই, কেবল তারাগুলো ঝিকমিক করছে। ব্যোমকেশ অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
দীর্ঘ প্রতীক্ষা। বনের মধ্যে ছাগল বা বাছুর বেঁধে মাচার ওপর বসে বাঘের প্রতীক্ষা করার মত। রাত্রি দুটো বাজতে যখন আর দেরি নেই, তখন রাখালবাবুর মন বদ্ধ ঘরের মধ্যে অতিষ্ঠ হয়ে উঠল : আজ আর শিকার আসবে না। ঠিক এই সময় তিনি দোরের বাইরে মৃদু শব্দ শুনতে পেলেন; মুহূর্তে তাঁর স্নায়ুপেশী শক্ত হয়ে উঠল। তিনি নিঃশব্দে পকেট থেকে পিস্তল বার করলেন।
যে মানুষটি নিঃসাড়ে বাড়িতে প্রবেশ করে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে এসেছিল, তার বাঁ হাতে ছিল একটি ক্যাম্বিসের থলি, আর ডান হাতে ছিল লোহা-বাঁধানো একটি ছড়ি। ছড়ির গায়ে তিনি হাত লম্বা মুগার সুতো জড়ানো, মাছ-ধরা ছিপের গায়ে যেমন সুতো জড়ানো থাকে সেই রকম।
লোকটি দোরের মাথার দিকে লাঠি বাড়িয়ে ঘোড়ার ক্ষুরটি নামিয়ে আনল, তারপর মুগার সুতোর ডগায় সেটি বেঁধে নিয়ে তেতলার সিঁড়ি দিয়ে ছাদে উঠে গেল। দু’টি মানুষ যে বাড়ির দু’ জায়গায় ওৎ পেতে আছে, তা সে জানতে পারল না।
ছাদের দরজায় একটু শব্দ শুনে ব্যোমকেশ সতর্ক হয়ে বসল। নক্ষত্র আলোয় একটি ছায়ামূর্তি বেরিয়ে এল, সোজা ট্যাঙ্কের কাছে গিয়ে আল্সের ওপর উঠে ট্যাঙ্কের মাথায় চড়ল। ধাতব শব্দ শোনা গেল। সে ট্যাঙ্কের ঢাকনি খুলে সরিয়ে রাখল, তারপর লাঠির আগায় সুতো-বাঁধা ঘোড়ার নাল জলের মধ্যে ডুবিয়ে দিল।
লোকটা যেন আবছা অন্ধকারে বসে ছিপ ফেলে চুনো মাছ ধরছে। ছিপ ডোবাচ্ছে আর তুলছে। মাছগুলি ব্যাগের মধ্যে পিরে আবার ছিপ ফেলছে।
কুড়ি মিনিট পরে লোকটি মাছ ধরা শেষ করে ট্যাঙ্ক থেকে নামল। এক হাতে ব্যাগ অন্য হাতে ছিপ নিয়ে যেই পা বাড়িয়েছে, অমনি তার মুখের উপর দপ করে টর্চ জ্বলে উঠল, ব্যোমকেশের ব্যঙ্গ-স্বর শোনা গেল, ‘অক্ষয় মণ্ডল, কেমন মাছ ধরলে?’
অক্ষয় মণ্ডলের পরনে খালি প্যান্ট ও হাফ-সার্ট, কালো মুস্কো চেহারা। সে বিস্ফোরিত চোখে চেয়ে আস্তে আস্তে থলিটি নামিয়ে রেখে ক্ষিপ্রবেগে পকেটে হাত দিল। সঙ্গে সঙ্গে ব্যোমকেশের টর্চ গদার মত তার চোয়ালে লাগল, অক্ষয় মণ্ডল ছাদের ওপর চিতিয়ে পড়ল।
রাখালবাবু নীচে থেকে উঠে এসেছিলেন, তিনি অক্ষয় মণ্ডলের বুকের ওপর বসে বললেন, ‘ব্যোমকেশদা, এর পকেটে পিস্তল আছে, বের করে নিন।’
ব্যোমকেশ অক্ষয় মণ্ডলের পকেট থেকে পিস্তল বার করে নিজের পকেটে রাখল। রাখালবাবু আসামীর হাতে হাতকড়া পরিয়ে বললেন, ‘অক্ষয় মণ্ডল, হরিহর সিংকে খুন করার অপরাধে তোমাকে গ্রেপ্তার করলাম।’
ব্যোমকেশ অক্ষয় মণ্ডলের থলি থেকে কয়েকটা ভিজে লোহার প্যাকেট বার করে তার ওপর টর্চের আলো ফেলল। ‘বাঃ! এই যে, যা ভেবেছিলাম তাই। লোহার মোড়কের মধ্যে চকচকে বিদেশী সোনার বিস্কুট।’
পরদিন সকালবেলা সত্যবতী ব্যোমকেশকে বলল, ‘ভাল চাও তো বল, কোথায় রাত কাটালে?’
ব্যোমকেশ কাতর স্বরে বলল, ‘দোহার ধর্মাবতার, রাখাল সাক্ষী–আমি কোনো কুকার্য করিনি।’
‘শুঁড়ির সাক্ষী মাতাল। গল্পটা বলবে?’
‘বলব, বলব। কিন্তু আগে আর এক পেয়ালা চা দিতে হবে। এক পেয়ালা চা খেয়ে রাত জাগার গ্লানি কাটেনি।’
সত্যবতী আর এক পেয়ালা কড়া চা এনে ব্যোমকেশের সামনের চেয়ারে বসল, ‘এবার বল, টর্চটা ভাঙলে কি করে? মারামারি করেছিলে?’
ব্যোমকেশ বলল, ‘মারামারি নয়, শুধু মারা।’ চায়ে একটি চুমুক দিয়ে সে বলতে আরম্ভ করল:
‘অক্ষয় মণ্ডল সোনার চোরাকারবার করে অনেক টাকা করেছিল। নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী ভদ্র পাড়ায় একটি বাড়ি করেছিল, বাড়ির ছাদ লোহার ডাণ্ডা-ছত্রী দিয়ে এমনভাবে মুড়ে রেখেছিল যে ওদিক দিয়ে বাড়িতে চোর ঢোকার উপায় ছিল না। ছাদটাকে নিরাপদ করা তার বিশেষ দরকার ছিল।
‘অক্ষয় মণ্ডলের পেশা ভারতবর্ষের বাইরে থেকে যেসব চোরাই সোনা আসে তাই সংগ্রহ করা এবং সুযোগ মত বাজারে ছাড়া। সে বাড়িতেই সোনা রাখত, কিন্তু লোহার সিন্দুকে নয়। সোনা লুকিয়ে রাখার এক বিচিত্র কৌশল সে বার করেছিল।
‘অক্ষয় মণ্ডল বাড়িতে একলা থাকত; তার স্ত্রী আছে কিনা তা এখনো জানা যায়নি। সে পাড়ার লোকের সঙ্গে বেশি মেলামেশা করত না, কিন্তু পাছে পড়শীরা কিছু সন্দেহ করে, তাই কমল দাস নামে একটা ভদ্রলোককে নীচের তলায় একটি ঘর ভাড়া দিয়েছিল। বাজারে সোনা ছাড়বার জন্য সে কয়েকজন লোক রেখেছিল, তাদের মধ্যে একজনের নাম হরিহর সিং।
‘হরিহর সিং বোধহয় অক্ষয় মণ্ডলকে ফাঁকি দিচ্ছিল। একদিন দু’জনের ঝগড়া হল, রাগের মাথায় অক্ষয় মণ্ডল হরিহর সিংকে খুন করল। তারপর মাথা ঠাণ্ডা হলে তার ভাবনা হল, মড়াটা নিয়ে সে কি করবে। একলা মানুষ, ভদ্র পাড়া থেকে মড়া পাচার করা সহজ নয়। সে স্থির করল, মড়া থাক, বাড়িতে যা সোনা আছে, তাই নিয়ে সে নিজে ডুব মারবে।
‘কিন্তু সব সোনা সে নিয়ে যেতে পারল না। সোনা ধাতুটাও বিলক্ষণ ভারি, লোহার চেয়েও ভারি। তোমরা স্ত্রী-জাতি সারা গায়ে সোনার গয়না বয়ে বেড়াও, কিন্তু সোনার ভার কত বুঝতে পারো না। দশ হাত কাপড়ে কাছে নেই।’
সত্যবতী বলল, ‘আচ্ছা, আচ্ছা, তারপর বল।’
‘অক্ষয় মণ্ডল ডুব মারবার কয়েকদিন পরে লাশ বেরুল; পুলিস এল, কিন্তু খুনের কিনারা হল না। অক্ষয় মণ্ডল খুন করেছে তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু সে নিরুদ্দেশ। কমলবাবু সারা বাড়িটা দখল করে বসলেন।
‘অক্ষয় মণ্ডল নিশ্চয় কলকাতাতেই কোথাও লুকিয়ে ছিল, কয়েক মাস চুপচাপ রইল। কিন্তু বাড়িতে যে-সোনা লুকোনো আছে–যেগুলো সে সরাতে পারেনি, সেগুলো উদ্ধার করতে হবে। কাজটি সহজ নয়। কমলবাবুর স্ত্রী এবং মেয়ে সর্বদা বাড়িতে থাকে, তাছাড়া একটি ভয়ঙ্কর হিংস্র কুকুর আছে। অক্ষয় মণ্ডল ভেবে-চিন্তে এক ফন্দি বার করল।
‘একটি স্ত্রীলোককে বউ সাজিয়ে এবং একটা পেটোয়া লোককে তার ভাই সাজিয়ে অক্ষয় মণ্ডল কমলবাবুর কাছে পাঠাল। বউকে বাড়ি ছেড়ে দিতে হবে। অক্ষয় মণ্ডল ফেরারী খুনী হতে পারে, কিন্তু তার বউ তো কোনো অপরাধ করেনি। কমলবাবু কিন্তু শুনলেন না, তাদের হাঁকিয়ে দিলেন। অক্ষয় মণ্ডল তখন বেনামে চিঠি লিখে ভয় দেখাল, কিন্তু তাতেও কোনো ফল হল না। কমলবাবু নড়লেন না।
‘অক্ষয় মণ্ডল তখন অন্য রাস্তা ধরল।
‘আমার বিশ্বাস ব্যাঙ্কের যে সহকর্মিটি কমলবাবুকে তীর্থে যাবার জন্য ভজাচ্ছিলেন, তার সঙ্গে অক্ষয় মণ্ডলের যোগাযোগ আছে। দু’-চার দিনের জন্যও যদি কমলবাবুকে সপরিবারে বাড়ি থেকে তফাৎ করা যায়, তাহলেই অক্ষয় মণ্ডলের কার্যসিদ্ধি। কাজটা সে বেশ গুছিয়ে এনেছিল, কিন্তু একটা কারণে কমলবাবুর মনে খটকা লাগল; বাড়ি যদি বেদখল হয়ে যায়! তিনি আমার কাছে পরামর্শ নিতে এলেন।
‘তার গল্প শুনে আমার সন্দেহ হল বাড়িটা ওপর, আমি বাড়ি দেখতে গেলাম। দেখাই যাক না। অকুস্থলে গেলে অনেক ইশারা-ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
‘গেলাম বাড়িতে। কড়া রোদ ছিল, তাই ছাতা নিয়ে গিয়েছিলাম। দোতলায় উঠে দেখলাম, দোরের মাথায় ঘোড়ার নাল তিনটে পেরেকের মাঝখানে আলগাভাবে আটকানো রয়েছে। ঘোড়ার নালটা এক নজর দেখলে ঘোড়ার নাল বলেই মনে হয় বটে, কিন্তু ঠিক যেন ঘোড়ার নাল নয়। আমি ছাতাটা সেইদিকে বাড়িয়ে দিলাম, অমনি ছাতাটা আপনা থেকেই গিয়ে ঘোড়ার নালে জুড়ে গেল।
‘বুঝলাম, ঠিকই সন্দেহ করেছিলাম, ঘোড়ার নাল নয়, একটি বেশ শক্তিমান চুম্বক–ছাতার লোহার বাঁট পেয়ে টেনে নিয়েছে। প্রশ্ন করে জানলাম চুম্বকটা অক্ষয় মণ্ডলের। মাথার মধ্যে চিন্তা ঘুরপাক খেতে লাগল–কেন? অক্ষয় মণ্ডল চুম্বক নিয়ে কি করে? দোরের মাথায় টাঙিয়েই বা রেখেছে কেন, যাতে মনে হয় ওটা ঘোড়ার নাল? মনে পড়ে গেল, পুলিসের খানাতল্লাশে দেরাজের মধ্যে কয়েকটা লোহার মোড়ক পাওয়া গিয়েছিল। রহস্যটা ক্রমশ পরিষ্কার হতে লাগল।
‘তারপর যখন ঘেরাটোপ লাগানো ছাদে গিয়ে জলের ট্যাঙ্ক দেখলাম, তখন আর কিছুই বুঝতে বাকি রইল না। চুম্বক যত জোরালোই হোক, সোনাকে টানবার ক্ষমতা তার নেই। তাই সে সোনার বিস্কুট লোহার প্যাকেটে মুড়ে ট্যাঙ্কের জলে ফেলে দেয়। তারপর যেমন যেমন দরকার হয়, ট্যাঙ্কে চুম্বকের ছিপ ফেলে জল থেকে তুলে আনে। হরিহর সিংকে খুন করে পালাবার সময় সে সমস্ত সোনা নিয়ে যেতে পারেনি। এখন বাকি সোনা উদ্ধার করতে চায়। পালাবার সময় যে ভাবেনি যে ব্যাপারটা এত জটিল হয়ে উঠবে।
‘যাহোক, সোনার সন্ধান পেলাম; সমুদ্রের তলায় শুক্তির মধ্যে যেমন মুক্তো থাকে, ট্যাঙ্কের তলায় তেমনি লোহার পাতে মোড়া সোনা আছে। কিন্তু কেবল উদ্ধার করলেই তো চলবে না, খুনী আসামীকে ধরতে হবে। আমি কমলবাবুকে বললাম, আপনি সপরিবারে তীর্থযাত্রা করুন। তারপর রাখালের সঙ্গে পরামর্শ করে ফাঁদ পাতার ব্যবস্থা করলাম।
‘কাল সকালে কমলবাবুরা তীর্থযাত্রা করলেন। বাড়ির ওপর অক্ষয় মণ্ডল নজর রেখেছিল, সে জানতে পারল, রাস্তা সাফ।
‘কাল সন্ধ্যের পর রাখাল আর আমি বাড়িতে গিয়ে আড্ডা গাড়লাম। কালই যে অক্ষয় মণ্ডল আসবে এতটা আশা করিনি, তবু পাহারা দিতে হবে। বলা তো যায় না। রাত্রি দুটোর সময় শিকার ফাঁদে পা দিল। তারপর আর কি! টর্চের একটি ঘায়ে ধরাশায়ী।’
সত্যবতী ক্ষীণকণ্ঠে প্রশ্ন করল, ‘কত সোনা পাওয়া গেল?’
সিগারেট ধরিয়ে ব্যোমকেশ বলল, ‘সাতান্নটি লোহার মোড়ক, প্রত্যেকটি মোড়কের মধ্যে দু’টি করে সোনার বিস্কুট, প্রত্যেকটি বিস্কুটের ওজন পঞ্চাশ গ্রাম। কত দাম হয় হিসেব করে দেখ।’
সত্যবতী কেবল একটি নিশ্বাস ফেলল।
বিশুপাল বধ
কালীচরণ দাসকে পাড়ার লোকে আড়ালে শালীচরণ দাস বলে উল্লেখ করত। শুধু হাস্যরস সৃষ্টি করাই উদ্দেশ্য ছিল না, উদ্দেশ্য গভীরতর। নামের আদ্যাক্ষর বদল করে কোনো রসিক ব্যক্তি কালীচরণ দাসের প্রকৃতি উদঘাটনের চেষ্টা করেছিলেন। আমরা এই কাহিনীতে তাকে শালীচরণ দাস বলেই উল্লেখ করব।
চৌদ্দ বছর আগে শালীচরণ কলকাতার দক্ষিণাংশে বাস করত এবং সামান্য কাজকর্ম করত। বাড়িটি ছোট হলেও দোতলা, শালীচরণ ওপরতলাটা একজনকে ভাড়া দিয়েছিল, নীচের তলায় নিজে সস্ত্রীক থাকত। তার স্ত্রী ছিল বন্ধ্যা। সংসারে আর কেউ ছিল না। তারপর হঠাৎ একদিন বৌ মরে গেল।
কিন্তু সংসার করতে হলে ঘরে একটি স্ত্রীলোক দরকার। শালীচরণের বয়স তখন ত্ৰিশ বছর, কিন্তু সে আর বিয়ে করল না; ভেবে-চিন্তে একটি বিধবা এবং অনাথ শালীকে এনে ঘরে বসাল। দূর সম্পর্কের শালী, নাম মালতী, বয়স কম, মাঝারি রকমের সুন্দরী, স্বভাব একটু চপল-চটুল; কিন্তু সংসারের কাজকর্মেনিপুণ।
মাসখানেক যেতে না যেতেই পাড়ায় কানায়ুষো আরম্ভ হয়ে গেল। শালীচরণের বৌ যতদিন বেঁচে ছিল নিজে গড়িয়াহাটে গিয়ে বাজার করত, পাড়াপড়শীর বাড়িতে যাতায়াত করত, কিন্তু শালী করে না কেন? শালীচরণ শালীকে ঘরের বাইরে যেতে দেয় না, নিজে বাজার করে কেন? বৌ-এর চেয়ে শালীর আদর কখন বেশি হয়?
তার ওপর শালীচরণের বাড়ির দোতলায় যে ভাড়াটে ছিল তাদের বাড়ির মেয়েরা একটা নতুন খবর বিতরণ করল। নীচের তলায় তাদের যাতায়াত ছিল। তারা বলল, শালী যখন প্রথম আসে। তখন দুটো ঘরে দুটো আলাদা খাট বিছানা ছিল, এখন কেবল একটা ঘরে একটা বিছানা। ব্যাস, আর যায় কোথায়! কালীচরণ দাস শালীচরণ দাসে পরিণত হল।
কিন্তু অপবাদ যে ভিত্তিহীন নয় তা চূড়ান্তভাবে প্রমাণ হল মাস ছয়েক পরে। শালীচরণের বাড়ির পাশের বাড়িতে একটা মেস ছিল, সেখানে বিশ্বনাথ পাল নামে এক যুবক থাকত। তার চেহারা যেমন বলবান তেমনি লাবণ্যময়, শালীচরণের মত বৈশিষ্ট্যহীন নয়। বিশ্বনাথ পাল ভাল অভিনয় করত, যাত্রা এবং সখের থিয়েটার দলে যোগ দিয়েছিল। তার সঙ্গে শালীচরণের শালীর নাম সংযুক্ত হয়ে নতুন করে কানাযুষো আরম্ভ হল। দুপুরবেল পুরুষেরা যখন কাজে বেরিয়ে যায় এবং মেয়েরা খাওয়া-দাওয়ার পর দিবানিদ্রায় নিমগ্ন হয় তখন নাকি বিশ্বনাথ পাল খিড়কির দোর দিয়ে শালীচরণের বাড়িতে যায়। এইভাবে কিছুদিন দিবাভিসার চলল। শালীচরণের বোধহয় সন্দেহ হয়েছিল, কিম্বা পাড়ার চ্যাংড়া ছোঁড়ারা হয়তো ব্যঙ্গ-বিদ্যুপপূর্ণ ইশারা করেছিল। সে একদিন দুপুরবেলা আচমকা খিড়কি দিয়ে বাড়ি ফিরে এল।
অতঃপর যে দৃশ্য উদঘাটিত হল তা উহ্য রাখাই ভাল। মোট কথা আদিরস ও রুদ্ররস মিলে নাইট্রোগ্লিসারিনের মত বিস্ফোরক পরিস্থিতিতে পরিণত হল। শালীচরণ মেঘগর্জনের মত শব্দ করে অপরাধীদের আক্রমণ করল। কিন্তু বিশ্বনাথ পালের শরীরে অনেক বেশি শক্তি থাকা সত্ত্বেও তার মনে পাপ ছিল, সে পদাহিত পথ-কুকুরের মত পালিয়ে গেল। বাকি রইল শুধু মালতী। শালীচরণ তখন বিকট চীৎকার করে মালতীর ঘাড়ে লাফিয়ে পড়ে তার গলা টিপে ধরাল।
হুড়োহুড়ি চেঁচামেচিতে দোতলা থেকে লোক ছুটে এল, অল্পবয়স্ক বালক বালিকা ও স্ত্রীলোক। দৃশ্য দেখে তারা চীৎকার করে রাস্তার লোক ডাকল। রাস্তা থেকে দু’চার জন লোক এসে অতি কষ্টে শালীচরণের হাত থেকে মালতীর গলা ছাড়ালো। কিন্তু মালতী, তখন দম বন্ধ হয়ে মরে গেছে।…
আদালতে শালীচরণের বিচার হল। সে অপরাধ অস্বীকার করল না। শালীর সঙ্গে অবৈধ সহবাসের অভিযোগও মেনে নিল। হাকিম বিজ্ঞ ব্যক্তি ছিলেন, মানুষের হৃদয়ের খবর রাখতেন। শালীচরণের ফাঁসি হল না, গুরুতর আকস্মিক প্ররোচনা বিধায় চৌদ্দ বছরের কারাদণ্ড হল।
শান্তভাবে শালীচরণ জেলে গেল। জেলে যাবার আগে ব্যবস্থা করে গেল : তার বাড়ির দোতলার ভাড়া সলিসিটার আদায় করে ব্যাঙ্কে রাখবেন; একতলা বন্ধ থাকবে। শালীচরণের বিষয়সম্পত্তি স্থাবর অস্থাবর আর কিছু ছিল না।
বিশ্বনাথ পাল সেই যে পালিয়েছিল, কিছুদিন গা-ঢাকা দিয়ে রইল। শালীচরণ জেলে চলে যাবার পর সে আবার আত্মপ্রকাশ করল। তার চেহারা ভাল, উপরন্তু যথেষ্ট অভিনয় নৈপুণ্য থাকায় সে অল্পকালের মধ্যেই চলচ্চিত্র ও রঙ্গমঞ্চের নামজাদা অভিনেতা হয়ে দাঁড়াল। চিত্রপটের চেয়ে রঙ্গালয়ের দিকেই তার ঝোঁক বেশি; সে দল গঠন করে একটি রঙ্গমঞ্চের অধিকারী হয়ে বসল।
ওদিকে শালীচরণ জেল খাটছিল, যথাকলে মেয়াদ পূর্ণ হলে মুক্তি পেয়ে বেরুল। জেলখানায় সুবোধ বালক হয়ে থাকলে কিছু রেয়াৎ পাওয়া যায়। শালীচরণ চৌদ্দ বছর পূর্ণ হবার আগেই বেরুল। এই কয় বছরে তার বয়স যেমন বেড়েছে তেমনি চেহারারও পরিবর্তন ঘটেছে; আগে সে ছিল রোগা-পাটুকা, এখন বেশ চাকন-চিকন হয়েছে। সবচেয়ে পরিবর্তন হয়েছে তার মনে। মুক্তি পেয়েই সে সটান নবদ্বীপে চলে গেল, সেখান মাথা মুড়িয়ে কঠি ধারণা করে মালা জপ করতে করতে বাড়ি এল।
ইতিমধ্যে পাড়ার পুরোনো বাসিন্দারা অনেকে পাড়া ছেড়ে চলে গেছে, দোতলার ভাড়াটেও বদল হয়েছে, তাই শালীচরণ জেল থেকে ফেরার পর বিশেষ হৈ চৈ হল না। সেও কারুর সঙ্গে মেলামেশার চেষ্টা করল না। একলা থাকে, স্বপাক নিরামিষ খায় আর মালা জপ করে। মাঝে মাঝে সন্ধ্যের পর বেড়াতে বেরোয়। তার অর্থ উপার্জনের দরকার নেই। বারো বছর ধরে যে বাড়িভাড়া জমেছে তাই তার পক্ষে যথেষ্ট। উপরন্তু মাসে মাসে দোতলা থেকে ভাড়া আসে।
একটা শনিবার বিকেলে ব্যোমকেশ প্রতুলবাবুর বাড়িতে উপস্থিত হয়ে বলল, ‘সত্যবতী দাদার কাছে গিয়েছে, অজিত নিরুদেশ, আমার হাতে কাজ নেই, তাই নিরুপায় হয়ে আপনাকে বিরক্ত করতে এলাম।’
প্রতুলবাবু বললেন, ‘শ্ৰীমতী সত্যবতীর দাদার কাছে যাওয়া বুঝলাম, মেয়েদের মাঝে মাঝে বাপের বাড়ি যাওয়ার বাসনা দুৰ্দমনীয় হয়ে ওঠে। কিন্তু অজিতবাবু নিরুদ্দেশ হলেন কেন?’
ব্যোমকেশ একটু বিমনাভাবে বলল, ‘কি জানি। কিছুদিন থেকে লক্ষ্য করছি ভোর হতে না হতে অজিত বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়, ফিরে আসে রাত ন’টার পর। প্রশ্ন করলে উত্তর দেয় না, মিটমিটি হাসে।’
‘প্রেমে পড়েননি তো?’
‘অজিতের হৃদয়ে প্ৰেম নেই, আছে কেবল অর্থলিন্সা। তাছাড়া প্রেমে পড়ার বয়স পেরিয়ে গেছে।’
‘তা বটে। চলুন, তাহলে থিয়েটার দেখে আসি।
‘থিয়েটার?’
‘হ্যাঁ। কয়েক মাস থেকে একটা নতুন নাটক চলছে। বিশু পালের দল করছে। খুব ভাল রিপোর্ট পাচ্ছি। চলুন না, দেখে আসা যাক।।’
‘মন্দ কথা নয়। বোধহয় ত্ৰিশ বছর থিয়েটার দেখিনি। নাটকের নাম কি?’
‘কীচক বধ।’
‘অ্যাঁ-পৌরাণিক নাটক!’
‘না না, আপনি যা ভাবছেন তা নয়। নামটা কীচক বধ বটে। কিন্তু পরিস্থিতি আধুনিক; একজন নবীন নাট্যকার লিখেছেন। বর্তমান যুগেও যে কীচকের অভাব নেই, বরং এ যুগের কীচকেরা সে-যুগের কীচকের কান কেটে নিতে পারে এই হচ্ছে প্রতিভাবান নাট্যকারের প্রতিপাদ্য। স্বয়ং বিশু পাল কীচকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন।’
‘বিশু পাল কে?’
‘নটকেশরী বিশু পালের নাম জানেন না! দুর্ধর্ষ অ্যাকটর। চলুন চলুন, দেখে আসবেন।’
‘নিতান্তাই যদি আপনার রোখি চেপে থাকে-চলুন! নেই কাজ তো খাই ভাজ।’
‘আচ্ছা, আমি তাহলে টেলিফোনে দুটো সিট রিজার্ভ করে আসি।।’ প্রতুলবাবু পাশের ঘরে গেলেন।
ব্যোমকেশ কেয়াতলার বাড়িতে আসার পর প্রতুলবাবুর সঙ্গে আলাপ হয়েছে। দু’জনেই বুদ্ধিজীবী; উপরন্তু প্রতুলবাবু হৃদয়বান পুরুষ, সত্যবতীকে একটি মোটর কিনিয়ে দেবার জন্যে ব্যোমকেশের পিছনে লেগেছিলেন। সত্যবতীর বয়স বাড়ছে, এখন তার পক্ষে পায়ে হেঁটে বাজার করা কিম্বা সিনেমা দেখতে যাওয়া কষ্টকর, এই সব যুক্তি দেখিয়ে তিনি ব্যোমকেশের মন গলাবার চেষ্টা করেছিলেন। ফলে তিনি সত্যবতীর হৃদয় জয় করে নিয়েছিলেন। কিন্তু ব্যোমকেশকে বিগলিত করতে পারেননি। ব্যোমকেশের আপত্তি, মোটর কেনার টাকা না হয়। কষ্টেসূষ্টে যোগাড় করা যায়, ছয় সাত হাজার টাকায় একটা সেকেন্ড-হ্যান্ড গাড়ি পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু তারপর? গাড়ি চালাবে কে? একটা ড্রাইভার রাখতে গেলে মাসে দেড়শো দুশো টাকা খরচ। ঢাকের দায়ে মনসা বিকিয়ে যাবে। মধ্যবিত্ত গৃহস্থের পক্ষে বেশি বাড়াবাড়ি ভাল নয়। মাথায় চুল নেই। লম্বা দাড়ি অত্যন্ত অশোভন।
‘সিট পাওয়া গেছে। চলুন, বেরিয়ে পড়া যাক।’ প্রতুলবাবু নিজের মোটরে ব্যোমকেশকে নিয়ে যাত্রা করলেন। অনেক দূর যেতে হবে, শহরের অন্য প্রান্তে। প্রতুলবাবু প্রচণ্ড পণ্ডিত হলে কি হয়, সেই সঙ্গে প্রগাঢ় থিয়েটার প্রেমিক।
ঐরা যখন রঙ্গালয়ের দিকে যাচ্ছিলেন। সেই সময় কলেজ স্কোয়ারের এক কোণে গাছের তলায় একটি ভদ্রশ্রেণীর লোক দাঁড়িয়ে কারুর প্রতীক্ষ্ণ করছিল। তার হাতে একটি ছোট ব্যাগ, ব্যাগের মধ্যে এক সেট জামা-কাপড়। লোকটি অধীরভাবে ঘন ঘন কন্ডিজর ঘড়ি দেখছিল। যদিও এ পাড়ায় তার চেনা লোকের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাতের সম্ভাবনা কম, তবু লোকটি রুমাল দিয়ে মুখের নিম্নাৰ্ধ ঢাকা দিয়ে রেখেছিল। এই সময় এখানে ছাত্রদের ভীড় হয়, ছাত্ররা জলভ্বমির মত পুকুরের চারপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে, তন্ময় হয়ে নিজেদের মধ্যে গল্প করছে। তবু বলা যায় না, পরিচিত কোনো ছাত্র তাকে দেখে চিনে ফেলতে পারে।
গলা খাঁকারির শব্দে চমকে উঠে লোকটি ঘাড় ফেরাল, দেখল। অলক্ষিতে কখন একটা লোক সুপ্রিল এসে দাঁড়িয়েছে। মুখে অর্জন দাঁড়ি গোঁফ্্, হাতে একটা মোটা লাঠি। লোকটি বলল, ‘এনেছি।‘
প্রথম ব্যক্তি বলল, ‘কোথায়?’
দ্বিতীয় ব্যক্তি পাশের পকেট থেকে একটি রুমালের মত ন্যাকড় বার করল। ন্যাকড়ার এক কোণে গিট বাঁধা, যেন সুপুরির মত একটা কিছু বাঁধা রয়েছে। প্রথম ব্যক্তি সেটি ভালভাবে দেখে বলল, ‘এতে কাজ হবে?’
দ্বিতীয় ব্যক্তি বলল, ‘হবে। খুব পাতলা কাচের অ্যামপুল। একটু ঠোকা পেলেই ফেটে যাবে।’
আর কোনো কথা হল না,। প্রথম ব্যক্তি ব্যাগ থেকে কয়েকটা নোট বার করে দ্বিতীয় ব্যক্তিকে দিল, দ্বিতীয় ব্যক্তি টাকা পকেটে রেখে অ্যামপুলটি ভাল করে ন্যাকড়ায় জড়িয়ে প্রথম ব্যক্তিকে দিল। প্রথম ব্যক্তি সেটি সযত্নে জামা-কাপড়ের মধ্যে রেখে দিয়ে দ্বিতীয় ব্যক্তির পানে চাইল। দ্বিতীয় ব্যক্তির ঝাঁকড়া গোঁফের আড়াল থেকে এক ঝলক হাসি বেরিয়ে এল। সে বলল, ‘শুভমস্ত্র।’
তারপর দু’জনে ভিন্ন দিকে চলে গেল।
প্রতুলবাবু ব্যোমকেশকে পাশে নিয়ে প্রেক্ষাগৃহের প্রথম সারিতে বসেছিলেন। আশেপাশে কয়েকটি সিট খালি ছিল, কিন্তু পিছন দিক একেবারে ভরাট।
সাহেববেশী একটি লোক সামনের সারিতে এসে বসল। তার হাতে একটি ব্যাগ। বসবার পর সে দেখতে পেল পাশেই প্রতুলবাবু; অপ্রস্তুতভাবে একটু হেসে বলল, ‘কেমন আছেন?’
প্রতুলবাবু বললেন, ‘ভাল। আপনি কেমন?’ দু’ এক মিনিট শিষ্টতা বিনিময়ের পর লোকটি উঠে পড়ল, বলল, ‘যাই। এদিকে একটা কেসে এসেছিলাম, ভাবলাম দাদাকে দেখে যাই।–আচ্ছা।’
লোকটি ব্যাগ হাতে চলে যাবার পর প্রতুলবাবু বললেন, ‘বিশু পালের ছোট ভাই। ডাক্তারি করে।’
ব্যোমকেশ বলল, ‘কিন্তু পসার ভাল নয়।’
‘না, কষ্টেসৃষ্ট চালায়। কি করে বুঝলেন?’
‘ভাবভঙ্গী পোশাক পরিচ্ছদ দেখে বোঝা যায়।’
ঠিক সাড়ে ছাঁটার সময় পদাঁ উঠল, নাটক আরম্ভ হল। সাড়ে ন’টা পর্যন্ত চলবে। মাত্র তিনটি অঙ্ক!
গল্পটি মহাভারতের বিরাট পর্ব থেকে অপহৃত হলেও একেবারে মাছিমারা অনুকরণ নয়, যথেষ্ট মৌলিকতা আছে। বস্তুত নাটকের শেষ অঙ্কে ঠিক উল্টো ব্যাপার ঘটেছে, অর্থাৎ বর্তমান কালের কীচক বর্তমান কালের ভীমকে বধ করে দ্রৌপদীকে দখল করেছে। নাটকের চরিত্রগুলির অবশ্য আধুনিক নাম আছে, পাঠকের সুবিধার জন্যে পৌরাণিক নামই রাখা হল।
নাটকের অভিনয় হয়েছে উৎকৃষ্ট। ক্রূর নায়ক কীচকের ভূমিকায় বিশু পালের অভিনয় অতুলনীয়। দ্ৰৌপদীর চরিত্রে সুলোচনা নামী যশস্বিনী অভিনেত্রী চমৎকার অভিনয় করেছে; তাছাড়া ভীম অর্জুন সুদেষ্ণা উত্তরা প্রভৃতির চরিত্রও ভাল অভিনীত হয়েছে। সব মিলিয়ে এই নাটকটিতে চিরন্তন মনুষ্য সমাজের বিচিত্র আলেখ্য যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ধমোপদেশ বা নীতিকথা শোনাবার চেষ্টা নেই।
প্রতুলবাবু পরমানন্দে থিয়েটার দেখছেন, ব্যোমকেশও আকৃষ্ট হয়ে পড়েছে। নাটক ক্রমশ তৃতীয় অঙ্কে এসে পৌঁছল। এবার চরম পরিণতি।
শেষ দৃশ্যটি হচ্ছে একটি শয়নকক্ষ। কক্ষে আসবাব কিছু নেই, কেবল একটি পালঙ্ক। এটি দ্ৰৌপদীর শয়নকক্ষ। ভীম পালঙ্কের ওপর চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে, কীচক আসবে।
ইতিপূর্বে ভীমের সঙ্গে দ্রৌপদীর পরামর্শ হয়েছে, দ্ৰৌপদী কীচককে তার ঘরে ডেকেছে। ভীম দ্ৰৌপদীর বদলে বিছানায় শুয়ে আছে, কীচক এলেই ক্যাঁক করে ধরবে।
নাটকের পরিসমাপ্তি এই রকম; ভীমের সঙ্গে কীচকের মল্লযুদ্ধ হবে; কীচক পরাজিত হয়ে মৃত্যুর ভান করে পালঙ্কের পায়ের কাছে পড়ে যাবে, ভীম তখন দ্ৰৌপদীকে ডাকতে যাবে। মিনিটখানেকের জন্যে মঞ্চ অন্ধকার হয়ে যাবে। তারপর অস্পষ্ট সবুজ আলো জ্বলবে। আস্তে আস্তে আলো উজ্জ্বল হবে। দ্ৰৌপদীকে নিয়ে ভীম ফিরে আসবে; কীচক ছুরি নিয়ে পিছন থেকে ভীমকে আক্রমণ করবে। ছুরিকাহত ভীম মরে যাবে। কীচক তখন পৈশাচিক হাস্য করতে করতে দ্ৰৌপদীকে পালঙ্কের দিকে টেনে নিয়ে যাবে। যবনিকা।
এবার দৃশ্যের আরম্ভের দিকে ফিরে যাওয়া যাক। ভীম পালঙ্কে চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে; ঘরের আলো খুব উজ্জ্বল নয়, তবে অন্ধকারও নয়। কীচক পা টিপে টিপে প্রবেশ করল, পা টিপে টিপে পালঙ্কের কাছে গেল। তারপর এক ঝটিকায় চাদর সরিয়ে ফেলল। সঙ্গে সঙ্গে ঘরের আলো আরো উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
যিনি ভীম সেজেছেন তাঁর বপুটিও কম নয়, শালপ্ৰাংশু মহাভুজ। কীচক পরম কমনীয়া যুবতীর পরিবর্তে এই ষণ্ডামার্কা পালোয়ানকে দেখে ক্ষণকালের জন্যে স্তম্ভিত হয়ে গেল, সেই ফাঁকে ভীম দাঁত কড়মড় করে তাকে আক্রমণ করল। কীচকের পকেটে ছুরি ছিল (পরস্ত্রী লোলুপ লম্পটেরা নিরস্ত্রভাবে অভিসারে যায় না) কিন্তু সে তা বের করবার অবকাশ পেল না। দু’জনে ঘোর মল্লযুদ্ধ বেধে গেল।
স্টেজের ওপর এই মরণাস্তক কুস্তি সত্যিই প্রেক্ষণীয় দৃশ্য। মনে হয় না এটা অভিনয়। যেন দুটো ক্ষ্যাপা মোষ শিং-এ শিং আটকে যুদ্ধ করছে; একবার এ ওকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে, একবার ও একে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। লোমহর্ষণ লড়াই। শুধু এই লড়াই দেখবার জন্যেই অনেক দর্শক আসে।
শেষ পর্যন্ত কীচকের পরাজয় হল, ভীম তাকে পালঙ্কের পাশে মাটিতে ফেলে বুকে চেপে বসে তার গলা টিপতে শুরু করল। কীচকের হাত-পা এলিয়ে পড়ল, জিভ বেরিয়ে এল, তারপর সে মরে গেল।
ভীম তার বুক থেকে নেমে চোখ পাকিয়ে ঘন ঘন নিশ্বাস ফেলল, ঘাড় চুলকে ভাবল, শেষে স্টেজ থেকে বেরিয়ে দ্রৌপদীকে খবর দিতে গেল।
ভীম নিষ্ক্রান্ত হবার সঙ্গে সঙ্গে স্টেজ ও প্রেক্ষাগৃহ অন্ধকার হয়ে গেল। এই নাটকে আলোর কৌশলে গল্পের নাটকীয়তা বাড়িয়ে দেবার নৈপুণ্য ভারি চমকপ্রদ। শেষ অঙ্কের চরম মুহুর্তে মূল সম্পূর্ণ ভিয়ে দিয়ে পরিচালক বিত্ত পাল দর্শকের মান উৎকণ্ঠ ও আগ্রহ বাড়িয়ে দিয়েছে।
মিনিটখানেক পরে দপ করে আবার সব আলো জ্বলে উঠল। দেখা গেল কীচক পূর্ববৎ খাটের খুরোর কাছে পড়ে আছে।
দ্ৰৌপদীকে নিয়ে ভীম প্রবেশ করল। ভীমের ভাবভঙ্গীতে উদ্ধত বিজয়োল্লাস, দ্ৰৌপদীর মুখে উদ্বেগ। তাদের মধ্যে হ্রস্বকণ্ঠে যে সংলাপ হল তা সংক্ষেপে এই রকম–
দ্ৰৌপদী : এখন মড়া নিয়ে কী করবে?
ভীম : কিছু ভেবো না, শেষ রাত্রে মড়া রাস্তায় ফেলে দিয়ে আসব। নাটকের নির্দেশ, এই সময় কীচক মাটি থেকে চুপি চুপি উঠে। ভীমের পিঠে ছুরি মারবে। কিন্তু কীচক যেমন পড়েছিল তেমনি পড়ে রইল, নড়ন চড়ন নেই। ছুরি মারার শুভলগ্ন অতিক্রম হয়ে যাবার পর ভীম উসখুসি করতে লাগল, দুচারটে সংলাপ বানিয়ে বলল, কিন্তু কোনো ফল হল না। ভয়ানক সত্য আবিষ্কার করল প্রথমে দ্ৰৌপদী। শঙ্কিত মুখে কীচকের কাছে গিয়ে সে চীৎকার করে কেঁদে উঠল, ‘অ্যাঁ-একি! একি–!’
কীচক অর্থাৎ বিশু পাল সত্যি সত্যিই মরে গেছে।
নাটক শেষ হবার পাঁচ মিনিট আগে যবনিকা পড়ে গেল। যেসব দর্শকেরা আগে নাটক দেখেছিল তারা বিস্মিত হল, যারা দেখেনি তারা ভাবল এ আবার কি! কিন্তু কেউ কোনো গোলমাল না করে যে যার বাড়ি চলে গেল।
থিয়েটারের অন্দর মহলে তখন কয়েকজন মানুষ স্টেজের ওপর, কেউ বসে কেউ দাঁড়িয়ে ছিল। কেবল দ্রৌপদী অর্থাৎ সূলোচনা নামী অভিনেত্রী মূৰ্ছিত হয়ে কীচকের পায়ের কাছে পড়ে ছিল। দারোয়ান প্রভুনারায়ণ সিং দরজা ছেড়ে স্টেজের উইংসে দাঁড়িয়ে অনিমেষ চোখে মৃত কীচকের পানে চেয়ে ছিল।
স্টেজের দরজা অরক্ষিত পেয়ে ব্যোমকেশ প্রতুলবাবুকে নিয়ে ঢুকে পড়েছিল। পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়, গুরুতর কিছু ঘটেছে সন্দেহ নেই; সুতরাং অনুসন্ধান দরকার।
স্টেজ থেকে তীব্র আলো আসছে। একটি লোক ব্যাগ হাতে বেরিয়ে দোরের দিকে যাচ্ছিল, প্রতুলবাবু তাকে থামিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘কী হয়েছে, ডাক্তার পাল?’
অমল পাল, যে প্লে আরম্ভ হবার আগে তাদের পাশে গিয়ে বসেছিল, উদভ্ৰান্তভাবে বলল, ‘দাদা নেই, দাদা মারা গেছেন।’
‘মারা গেছেন? কী হয়েছিল?’
‘জানি না, বুঝতে পারছি না। আমি পুলিসে খবর দিতে যাচ্ছি।’ অমল পাল দোরের দিকে পা বাড়াল।
এবার ব্যোমকেশ কথা কইল, ‘কিন্তু—আপনি বাইরে যাচ্ছেন কেন? যতদূর জানি এখানে টেলিফোন আছে।’
অমল পাল থমকে ব্যোমকেশের পানে চাইল, ধন্ধলাগাভাবে বলল, ‘টেলিফোন! ইহ্যাঁ হ্যাঁ, আছে বটে অফিস ঘরে—’
এই সময় দারোয়ান প্রভুনারায়ণ সিং এসে দাঁড়াল। লম্বা চওড়া মধ্যবয়স্ক লোক, থিয়েটারের পিছন দিকে কয়েকটা কুঠুরিতে সপরিবারে থাকে আর থিয়েটার বাড়ি পাহারা দেয়। সে অমল পালের পানে চেয়ে ভারী গলায় বলল, ‘সাব, মালিক তো গুজর গিয়ে। আব্র ক্যা করন হ্যায়?’
অমল পাল একটা ঢোক গিলে প্রবল বাম্পোচ্ছাস দমন করল, কোনো উত্তর না দিয়ে টেলিফোনের উদ্দেশ্যে অফিস ঘরের দিকে চলে গেল। প্রভু সিং ব্যোমকেশের পানে চাইল, ব্যোমকেশ বলল, ‘তুমি দারোয়ান? বেশ, দোরে পাহারা দাও। পুলিস যতক্ষণ না আসে কাউকে ঢুকতে বা বেরুতে দিও না।’
প্রভু সিং চলে গেল। সে সচ্চরিত্র প্রভুভক্ত লোক; তার সংসারে স্ত্রী আর একটি বিধবা বোন ছাড়া আর কেউ নেই। বস্তুত থিয়েটারই তার সংসার। বিশেষত অভিনেত্রী জাতীয়া স্ত্রীলোকদের সে একটু বেশি স্নেহ করে। এই তার চরিত্রের একটি দুর্বলতা; কিন্তু নিঃস্বার্থ দুর্বলতা।
ব্যোমকেশ ও প্রতুলবাবু যখন মঞ্চে গিয়ে দাঁড়ালেন তখন তিনজন পুরুষ দ্রৌপদীকে অর্থাৎ অভিনেত্রী সুলোচনাকে ধরাধরি করে তুলে নিয়ে গ্ৰীনরুমে যাচ্ছে। তারা চলে গেলে স্টেজে রয়ে গেল দু’টি লোক : একটি ছেলেমানুষ গোছের মেয়ে, সে উত্তরার ভূমিকায় অভিনয় করেছিল; সে পালঙ্কের পায়ের দিকে দাঁড়িয়ে বিভীষিকা-ভরা চোখে মৃত বিশু পালের মুখের পানে চেয়ে ছিল। সে এখনো উত্তরার সাজ-পোশাক পরে আছে, তার মোহাচ্ছন্ন অবস্থা দেখে মনে হয়। সে আগে কখনো অপঘাত মৃত্যু দেখেনি। তার নাম মালবিকা।
দ্বিতীয় ব্যক্তিটি যুবাপুরুষ, সে পালঙ্কের শিয়রের দিকে দাঁড়িয়ে ছিল এবং ক্রমান্বয়ে একবার মৃতের মুখের দিকে একবার মেয়েটির মুখের পানে চোখ ফেরাচ্ছিল। তার খেলোয়াড়ের মত দৃঢ় সাবলীল শরীর এবং সংযত নিরুদ্বেগ ভাব দেখে মনে হয় না যে সে এই থিয়েটারে আলোকশিল্পী। তার নাম মণীশ, বয়স আন্দাজ ত্ৰিশ।
ব্যোমকেশ ও প্রতুলবাবু স্টেজে প্রবেশ করে পালঙ্কের কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। মৃতের মুখে তীব্র আলো পড়েছে। মুখে মৃত্যু যন্ত্রণার ভান সত্যিকার মৃত্যু যন্ত্রণায় পরিণত হয়েছে। কিম্বা–
‘মুখের কাছে ওটা কী?’ প্রতুলবাবু মৃতের মুখের দিকে আঙুল দেখিয়ে খাটো গলায় প্রশ্ন করলেন।
ব্যোমকেশ সামনের দিকে ঝুকে দেখল, রুমালের মত এক টুকরো কাপড় বিশু পালের চোয়ালের কাছে পড়ে আছে। সে বলল, ‘ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। রুমাল নয়। যখন লড়াই হচ্ছিল তখন ওটা চোখে পড়েনি।’
‘আমারও না।’
ব্যোমকেশ সোজা হয়ে বলল, ‘কোনো গন্ধ পাচ্ছেন?’
‘গন্ধ? প্রতুলবাবু দু’বার আত্মাণ নিয়ে বললেন, ‘সেন্ট-পাউডার, ম্যাকস ফ্যাকটর, সিগারেটের ধোঁয়ার গন্ধ। আর তো কিছু পাচ্ছি না।’
পাচ্ছেন না? এইদিকে ঝুকে একটু ওঁকে দেখুন তো। ‘ ব্যোমকেশ মৃতদেহের দিকে আঙুল দেখাল।
প্রতুলবাবু সামনে ঝুকে কয়েকবার নিশ্বাস নিলেন, তারপর খাড়া হয়ে ব্যোমকেশের সঙ্গে মুখোমুখি হলেন, ঘাড় নেড়ে বললেন, ‘আপনি ঠিক ধরেছেন। বাদাম তেলের ক্ষীণ গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। তার মানে—‘
যারা সুলোচনাকে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল তারা ফিরে এল। তাদের মধ্যে একজন হচ্ছে ব্রজদুলাল, অর্থাৎ ভীম; দ্বিতীয় ব্যক্তিটি থিয়েটারের প্রমপটার, নাম কালীকিঙ্কর; তৃতীয় ব্যক্তির নাম দাশরথি, সে কমিক অভিনেতা, নাটকে বিরাটরাজার পার্ট করেছে।
তিনজনে অস্বস্তিপূর্ণভাবে খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল; মাঝে মাঝে মৃতদেহের পানে তাকাচ্ছে। এ অবস্থায় কি করা উচিত বুঝতে পারছে না। ভীমের হাতে তার ব্যাগ ছিল (পরে দেখা গেল অভিনেতা অভিনেত্রীরা সকলেই বাড়তি কাপড়-চোপড় এবং প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে অভিনয় করতে আসে)। ভীম ব্যাগটি স্টেজের ওপর রেখে নিজে সেখানে বসল; ব্যাগ খুলে আস্ত একটা হুইস্কির বোতল ও গেলাস বার করল, একবার সকলের দিকে চোখ তুলে গম্ভীর স্বরে বলল, ‘কেউ খাবে?
কেউ সাড়া দিল না। ভীম তখন গেলাসে খানিকটা মদ ঢেলে মালবিকার পানে চাইল। মালবিকার মুখ পাংশু, মনে হয় যেন তার শরীর অল্প অল্প টলছে। স্নায়ুর অবসাদ এসেছে, এখনি হয়তো মূৰ্ছিত হয়ে পড়বে। ভীম মণীশকে বলল, ‘মণীশ, মালবিকার অবস্থা ভাল নয়, এই নাও, একটু জল মিশিয়ে খাইয়ে দাও। নইলে ও যদি আবার অজ্ঞান হয়ে পড়ে, নতুন ঝামেলা শুরু হবে—‘
মণীশ তার হাত থেকে গেলাস নিয়ে বলল, ‘সুলোচনাদিদির জ্ঞান হয়েছে?’ ভীম বলল, ‘এখনো হয়নি। নন্দিতাকে বসিয়ে এসেছি। মণীশ, তুমি মালবিকাকে ওঘরে নিয়ে যাও। ওষুধটা জল মিশিয়ে খাইয়ে দিও, তারপর খানিকক্ষণ শুইয়ে রেখো। দশ মিনিট শুয়ে থাকলেই ঠিক হয়ে যাবে।’
মণীশ এক হাতে মালবিকার পিঠ জড়িয়ে অন্য হাতে হুইস্কির গেলাস নিয়ে গ্ৰীনিরুমের দিকে চলে গেল! ভীম তখন নিজের পুরুন্টু গোঁফজোড়া ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে হুইস্কির বোতলের গলায় ঠোঁট জুড়ে চুমুক মারল।
আমাদের দেশের যাত্ৰা থিয়েটারে ভীমের ইয়া গোঁফ ও গালাপাট্টা দেখা যায়; যদিও মহাভারতে বেদব্যাস। ভীমকে তূরব বলেছেন। অর্থাৎ ভীম মাকুন্দ ছিল। অবশ্য বর্তমান নাটকে ভীম মাকুন্দ না হলেও ক্ষতি নেই; এ-ভীম সে-ভীম নয়, তার অর্বাচীন বিকৃত ছায়ামাত্র।
লম্বা এক চুমুকে প্রায় আধাআধি বোতল শেষ করে ভীম বোতল নামিয়ে রাখল, প্যাঁচার মত মুখ করে কিছুক্ষণ বোতলের পানে চেয়ে রইল। তার গোঁফ-বৰ্জিত মুখখানা অন্য রকম দেখাচ্ছে, ন্যাড়া হাড়গিলের মত। সে কতকটা নিজের মনেই বলল, ‘ভীম-কীচকের লড়াই-এর পর আমার রোজই এক গেলাস দরকার হয়, নইলে গায়ের ব্যথা মরে না। আজ এক বোতলেও শানাবে না।’
ব্যোমকেশ এতক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল, শুনছিল। এখন শান্ত স্বরে প্রশ্ন করল, ‘বিশু পাল মদ খেতেন?’
বলল, না। ওরা দরকার হত না। লোহার শরীর ছিল। কিসে যে মারা গেল।–1 ডাক্তার অমলকে দেখেছিলাম, সে কোথায় গেল?’
ব্যোমকেশ বলল, ‘তিনি পুলিসকে টেলিফোন করতে অফিসে গেছেন। পুলিস এখনি এসে পড়বে। তার আগে আমি আপনাদের দু’ একটা প্রশ্ন করতে পারি?
ভীম বোতলে আর এক চুমুক দিয়ে বলল, ‘করুন প্রশ্ন। আপনি কে জানি না, কিন্তু প্রশ্ন করার হক সকলেরই আছে।’
প্রতুলবাবু পরিচয় করিয়ে দিলেন, ‘ইনি সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ বক্সী। থিয়েটার দেখতে এসেছিলাম একসঙ্গে, তারপর এই দুর্ঘটনা।’
ভীমের চোখের দৃষ্টি একটু সতর্ক হল, অন্য দু’জন ঘাড় ফিরিয়ে চাইল। ব্যোমকেশ বলল, ‘আজ আপনারা এখানে ক’জন উপস্থিত আছেন?’।
ভীম বলল, ‘শেষ দৃশ্য অভিনয় হচ্ছিল। সাধাণরত শেষ দৃশ্যে যাদের কোজ নেই তারা বাড়ি চলে যায়। আজ বিশু সুলোচনা আর আমি ছিলাম। আর কারা ছিল না ছিল খবর রাখি না।’
কমিক অভিনেতা দাশরথি বলল, ‘আমি আর আমার স্ত্রী নন্দিতা ছিলাম।’
ব্যোমকেশ সপ্রশ্ন নেত্রে চাইল। দাশরথির এখন কমিক ভাব নেই, চোখে উদ্বিগ্ন দৃষ্টি। সে ইতস্তত করে বলল, ‘বিশুবাবুর সঙ্গে আমার কিছু কথা ছিল, তাই নাটক শেষ হবার অপেক্ষায় ছিলাম। তৃতীয় অঙ্কে আমার প্রবেশ নেই।’
‘আর কেউ ছিল?’
‘আর মালবিকা ছিল। টেকনিশিয়ানদের মধ্যে মণীশ আর তার সহকারী কাঞ্চনজঙ্ঘা ছিল–’
‘কাঞ্চনজঙ্ঘা!’
‘তার নাম কাঞ্চন সিংহ, সবাই কাঞ্চনজঙ্ঘা বলে।’
‘ও, তিনি কোথায়?’
দাশরথি এদিক ওদিক চেয়ে বলল, ‘দেখছি না। কোথাও পড়ে ঘুম দিচ্ছে বোধহয়।’
‘আর কেউ?’ এতক্ষণে তৃতীয় ব্যক্তি কথা বলল, ‘আর আমি ছিলাম। আমি প্রমপটার, শেষ পর্যন্ত নিজের জায়গায় ছিলাম।’
‘আপনার জায়গা কোথায়?’
প্রমপটার কালীকিঙ্কর দাস। আঙুল দেখিয়ে বলল, ‘ওই যে উইংসের খাঁজের মধ্যে টুল পাতা রয়েছে, ঐখানে।’
স্টেজের ওপর যে ঘরের সেট তৈরি হয়েছিল তার প্রবেশদ্বার মাত্র দু’টি : একটি পিছনের দেয়ালে, অন্যটি বাঁ পাশে; কিন্তু প্রসিনিয়ামের দু’পাশে থেকে এবং আরো কয়েকটি উইংসের প্রচ্ছন্ন পথে যাতায়াত করা যায়। প্রমপটার যেখানে দাঁড়ায় সেখানে যাওয়া আসার সঙ্কীর্ণ পথ আছে; বিপরীত দিকে আলোর কলকব্জা ও সুইচ বোর্ড যেখানে দেয়ালের সারা গায়ে বিছিয়ে আছে সেদিক থেকে স্টেজে প্রবেশের সোজা রাস্তা। আলোকশিল্পীকে সর্বদা স্টেজের ওপর চোখ রাখতে হয়, মাঝখানে আড়াল থাকলে চলে না।
এই সময় পিছনের দরজা দিয়ে মণীশ মালবিকার বাহু ধরে স্টেজে প্রবেশ করল। মালবিকার ফ্যাকাসে মুখে একটু সজীবতা ফিরে এসেছে। ওরা মৃতদেহের দিকে চোখ ফেরাল না। মণীশ বলল, ‘ব্রজদুলালদা, এই নিন। আপনার গেলাস। মালবিকা এখন অনেকটা সামলেছে, ওকে এবার বাড়ি নিয়ে যাই?’
ভীম বলল, ‘এখনি যাবে কোথায়! এখনো পুলিস আসেনি।’
মণীশ সপ্রশ্ন চোখে ব্যোমকেশ ও প্রতুলবাবুর পানে চাইল। ব্যোমকেশ মাথা নাড়ল, ‘আমরা পুলিস নই। কিন্তু আপনাকে তো অভিনয় করতে দেখিনি—’
ভীম বলল, ‘ও অভিনয় করে না। ও আমাদের আলোকশিল্পী। মণীশ ভদ্র’র নাম শুনেছেন নিশ্চয়-বিখ্যাত সাঁতারু।’
মণীশ বলল, ‘আপনিও কম বিখ্যাত নন, ব্রজদুলালদা। এক সময় ভারতবর্ষের চ্যাম্পিয়ন মিড়ল-ওয়েট মুষ্টিযোদ্ধা ছিলেন।’
ভীম গোলাসে মদ ঢালতে ঢালতে বলল, ‘সে-সব দিন গেছে ভায়া। বোসো বোসো, আজ রাত দুপুরের আগে কেউ ছাড়া পাচ্ছে না।’
মণীশ বলল, ‘কিন্তু কেন? পুলিস আসবে কেন? বিশুবাবুর মৃত্যু কি স্বাভাবিক মৃত্যু নয়? আমার তো মনে হয় ওঁর হার্ট ভেতরে ভেতরে দুর্বল হয়েছিল, লড়াই-এর ধকল সহ্য করতে পারেননি, হার্ট ফেল করে গেছে।’
ভীম বলল, ‘যদি তাই হয় তবু পুলিস তদন্ত করবে।’
মণীশ আর মালবিক পাশাপাশি স্টেজের ওপর বসল। কিছুক্ষণ কোনো কথা হল না। কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে ঠিক নেই; কমিক অভিনেতা দাশরথি ওরফে বিরাটরাজ পকেট থেকে সিগারেট বার করে মৃতদেহের পানে কটাক্ষপাত করে সিগারেট আবার পকেটে পুরল।
ব্যোমকেশ বলল, ‘আচ্ছা, একটা কথা। মণীশবাবু এবং শ্ৰীমতী মালবিকা হলেন স্বামী-স্ত্রী-কেমন? ওঁরা একসঙ্গে এই থিয়েটারে কাজ করেন। এই রকম স্বামী-স্ত্রী এ থিয়েটারে আরো আছেন নাকি?’
ভীম গেলাসে এক চুমুক দিয়ে বলল, ‘দেখুন, আমাদের এই থিয়েটার হচ্ছে একটি ঘরোয়া কারবার। যারা এখানে কাজ করে, মেয়ে-মদ কাজ করে। যেমন মণীশ আর মালবিকা, বিশু আর সুলোচনা, দাশরথি আর নন্দিতা। আমি অ্যাকটিং করি, আমার স্ত্রী শান্তি মিউজিক মাস্টার-গানে সুর বসায়। শাস্তির কাজ শেষ হয়েছে, সে রোজ আসে না। আজ আসেনি। এমনি ব্যবস্থা। ছুট্ লোক বড় কেউ নেই।’
ব্যোমকেশ বলল, ‘বুঝলাম। এখন বলুন দেখি, বিশুবাবু মানুষটি কেমন ছিলেন?’
ভীম মদের গেলাস মুখে তুলল। দাশরথি উত্তেজিত হয়ে বলল, ‘সাধু ব্যক্তি ছিলেন। উদার প্রকৃতির মানুষ ছিলেন, মুক্তহস্ত পুরুষ ছিলেন। তিনি যেমন অগাধ টাকা রোজগার করতেন তেমনি দুহাতে টাকা খরচ করতেন। মণীশকে নতুন মোটর কিনে দিয়েছিলেন, আমাদের সকলের নামে লাইফ ইনসিওর করেছিলেন। নিজে প্রিমিয়াম দিতেন। এ রকম মানুষ পৃথিবীতে কটা পাওয়া যায়?’
ব্যোমকেশ গম্ভীর মুখে বলল, ‘তাহলে বিশুবাবুর মৃত্যুতে আপনাদের সকলেরই লাভ হয়েছে।’ একথার উত্তরে হঠাৎ কেউ কিছু বলতে পারল না, মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগল। শেষে ভীম বলল, ‘তা বটে। বিশু নিজের নামে জীবনবীমা করেছিল, কিন্তু উত্তরাধিকারী করেছিল আমাদের। তার মৃত্যুতে বীমার টাকা আমরাই পাব। কিন্তু সামান্য কাটা টাকার জন্যে বিশুকে খুন করবে। এমন পাষণ্ড এখানে কেউ নেই।’
‘তাহলে বিশুবাবুর শত্ৰু কেউ ছিল না?’
কেউ উত্তর দেবার আগেই বাঁ দিকের দোর দিয়ে ডাক্তার অমল পাল প্রবেশ করল। তার পিছনে একটি হিপি-জাতীয় ছোকরা। মাথার চুলে কপোল ঢাকা, দাড়ি গোঁফে মুখের বাকি অংশ সমাচ্ছন্ন; আসলে মুখখানা কেমন বাইরে থেকে আন্দাজ করা যায় না। সে মৃতদেহের দিকে একটি বঙ্কিম কটাক্ষ নিক্ষেপ করে চুপিচুপি মণীশদের পাশে গিয়ে বসল।
দাশরথি বলল, ‘এই যে কাঞ্চনজঙ্ঘা! কোথায় ছিলে হে তুমি?’
কাঞ্চনজঙ্ঘা যেন শুনতে পায়নি এমনিভাবে মণীশকে খাটো গলায় বলল, ‘ভীষণ মাথা ধরেছিল, মণীশদা। থার্ড অ্যাকটে আমার বিশেষ কোজ নেই, তাই সিন ওঠার পর আমি কলঘরে গিয়ে মাথায় খুব খানিকটা জল ঢালিলাম। তারপর অফিস ঘরে গিয়ে পাখাটা জোরে চালিয়ে দিয়ে টেবিলে মাথা রেখে একটু চোখ বুজেছিলাম। অফিসে কেউ ছিল না, তাই বোধহয় একটু ঝিমকিনি এসে গিয়েছিল—’
মণীশ বিরক্ত চোখে তার পানে চাইল। দাশরথি বলল, ‘এত কাণ্ড হয়ে গেল কিছুই জানতে পারলে না।
এবারও কাঞ্চনজঙ্ঘা কোনো কথায় কৰ্ণপাত না করে মণীশের কাছে আরো খাটো গলায় বোধকরি নিজের কার্যকলাপের কৈফিয়ৎ দিতে লাগল।
ব্যোমকেশ হঠাৎ গলা চড়িয়ে তাকে প্রশ্ন করল, ‘আপনার জন্যে বিশুবাবু কত টাকার বীমা করে গেছেন?’
কাঞ্চনজঙ্ঘা চকিতভাবে মুখ তুলল, ‘আমাকে বলছেন? বীমা! কই, আমার জন্যে তো বিশুবাবু জীবনবীমা করেননি।’
ব্যোমকেশ বলল, ‘করেননি? তবে যে শুনলাম–’
ভীম বলল, ‘ওর চাকরির এক বছর পূর্ণ হয়নি, প্ৰেবেশনে কাজ করছে, কাঁচা চাকরি—তাই—‘
কাছেই প্রতুলবাবু ও অমল পাল দাঁড়িয়ে নিম্নস্বরে কথা বলছিলেন, ব্যোমকেশ কাঞ্চনজঙ্ঘাকে আর কোনো প্রশ্ন না করে সেইদিকে ফিরল। অমল পাল অস্বস্তিভরা গলায় বলছিল, ‘দাদার সঙ্গে সুলোচনার ঠিক—মনে—ওরা অনেকদিন স্বামী-স্ত্রীর মতাই ছিল—’
ব্যোমকেশ প্রশ্ন করল, ‘বিশুবাবু বিয়ে করেননি?’
‘করেছিলেন বিয়ে। কিন্তু অল্পকাল পরেই বৌদি মারা যান। সে আজ দশ বারো বছরের কথা। ছেলেপুলে নেই।’
স্টেজের দোরের বাইরে মোটর হর্ন শোনা গেল। একটা পুলিস ভ্যান ও অ্যাম্বুলেন্স এসে দাঁড়িয়েছে। আট দশজন পোষাকী পুলিস ভ্যান থেকে নেমে প্রভু সিং-এর সঙ্গে কথা বলল। তারপর পিলপিল করে স্টেজে ঢুকল। একজন অফিসার ব্যোমকেশদের দিকে এগিয়ে এসে বললেন, ‘আমি ইন্সপেক্টর মাধব মিত্ৰ, থানা থেকে আসছি। কে টেলিফোন করেছিলেন?’
‘আমি-ডক্টর অমল পাল। আমার দাদা—’
‘কি ব্যাপার সংক্ষেপে বলুন।’
অমল পাল স্খলিত স্বরে আজকের ঘটনা বলতে আরম্ভ করলেন, ইন্সপেক্টর মাধব মিত্র ঘাড় একটু কাত করে শুনতে শুনতে স্টেজের চারিদিকে চোখ ফেরাতে লাগলেন; মৃতদেহ থেকে প্রত্যেক মানুষটি তাঁর দৃষ্টি প্রসাদে অভিষিক্ত হল। বিশেষত তাঁর অনুসন্ধিৎসু চক্ষু প্রতুলবাবু ও ব্যোমকেশের পাশে বারবার ফিরে আসতে লাগল। মাধব মিত্রের চেহারা ভাল, মুণ্ডিত মুখে চতুর্য ও সতর্কতার আভাস পাওয়া যায়; তিনি কেবলমাত্র তাঁর উপস্থিতির দ্বারা যেন সমস্ত দায়িত্বের ভার নিজের স্কন্ধে তুলে নিয়েছেন।
ডাক্তার পালের বিবৃতি শেষ হলে ইন্সপেক্টর বললেন, ‘মৃতদেহ সরানো হয়নি?’
ব্যোমকেশ বলল, ‘না। কাউকে কিছুতে হাত দিতে দেওয়া হয়নি। যাঁরা ঘটনাকালে মঞ্চে ছিলেন তাঁরাও সকলেই উপস্থিত আছেন।’
ইন্সপেক্টর ব্যোমকেশের পানে চেয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘আপনারা-?’ তিনি বোধহয় অনুভব করেছিলেন যে এঁরা দু’জন থিয়েটার সম্পর্কিত লোক নন।
প্রতুলবাবু ব্যোমকেশের পরিচয় দিলেন, সহজাত বিনয়বশত নিজের পরিচয় উহ্য রাখলেন। মাধব মিত্রের মুখ এতক্ষণ হাস্যহীন ছিল, এখন ধীরে ধীরে তাঁর অধর-প্রান্তে একটু মোলায়েম হাসি দেখা দিল। তিনি বললেন, ‘আপনি সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ বক্সী! আপনার যে থিয়েটার দেখার শখ আছে তা জানতাম না।’
ব্যোমকেশ বলল, ‘আর বলেন কেন, পণ্ডিত ব্যক্তির পাল্লায় পড়ে এই বিপত্তি। ইনি হলেন–’
ব্যোমকেশ প্রতুলবাবুর পরিচয় দিল। তারপর বলল, ‘মাধববাবু্, আমরা মৃতদেহের কাছে একটা গন্ধ পেয়েছি। এই বেলা আপনি সেটা শুকে নিলে ভাল হয়। গন্ধটা বোধহয় স্থায়ী গন্ধ নয়?
মাধববাবু তুরিতে ফিরে মৃতদেহের কাছে গেলেন, একবার তার আপাদমস্তক দেখে নিয়ে পাশে নতজানু হয়ে সামনের দিকে ঝুকে মৃতের মুখের কাছে মুখ নিয়ে গেলেন।
‘বিশ্বাস, শীগগির ডাক্তার ডেকে নিয়ে এস।’–মাধব মিত্র উঠে দাঁড়িয়ে ব্যোমকেশের দিকে ফিরলেন। তরুণ সাব-ইন্সপেক্টর বিশ্বাস প্রায় দৌড়তে দৌড়তে বাইরে চলে গেল। পুলিসের ডাক্তার পুলিস ভ্যানে অপেক্ষা করছিলেন।
‘আপনারা ঠিক ধরেছেন, গন্ধটা সন্দেহজনক।–এই যে ডাক্তার, একবার এদিকে আসুন তো—‘
ব্যাগ হাতে প্রৌঢ় ডাক্তার মৃতের কাছে গেলেন, মাধবাবু ক্ষিপ্রস্বরে তাঁকে ব্যাপার বুঝিয়ে দিয়েন।
পাঁচ মিনিট পরে শিব পরীক্ষা শেষ করে ডাক্তার উঠে দাঁড়ালেন।
‘খুব ক্ষীণ গন্ধ, কিন্তু সায়ানাইড সন্দেহ নেই। এখনি মর্গে নিয়ে গিয়ে ওটপ্সি করতে হবে, নইলে সায়ানাইডের সব লক্ষণই লুপ্ত হয়ে যাবে।’
‘সায়ানাইড কি করে প্রয়োগ করা হল, ডাক্তার?’
ডাক্তার মৃতের কাছ থেকে ন্যাকড়ার ফালিটা তুলে ধরে বললেন, ‘এই কাপড়ের এক কোণে গিট বাঁধা রয়েছে দেখছেন? ওর মধ্যে কাচের একটা অ্যামপুল ছিল, তার মধ্যে তরল সায়ানাইড ছিল। যখন স্টেজ অন্ধকার হয়ে যায়। সেই সময় আততায়ী স্টেজে ঢুকে ন্যাকড়ার খুঁট ধরে মাটিতে আছাড় মারে, অ্যামপুল ভেঙ্গে যায়। তারপর-বুঝেছেন? হায়ড্রোসায়নিক অ্যাসিড খুব ভোলাটাইল-মানে–’
‘বুঝেছি। —মাধব মিত্র হাত নেড়ে পরিচরদের হুকুম দিলেন। তারা কীচকের মরদেহ ধরাধরি করে বাইরে নিয়ে গেল। ডাক্তার ন্যাকড়ার ফালি ব্যাগে পুরে কীচকের অনুগামী হলেন।
অমল পালের গলার মধ্যে একটা চাপা শব্দ হল, যেন সে প্রবল কান্নার বেগ রোধ করবার চেষ্টা করছে।
মাধব মিত্র একবার চারিদিকে তাকালেন, ভীম প্রমুখ কয়েকটি লোক স্টেজের মধ্যে প্রস্তর পুত্তলিকার মত বসে আছে। ভীমের বোতল ব্যাগের মধ্যে অস্তহিঁত হয়েছে। মালবিকার চোখে মোহাচ্ছন্ন দৃষ্টি। মাধব মিত্র ব্যোমকেশের দিকে এগিয়ে গিয়ে বললেন, ‘আজ বোধহয় এজাহার নিতে রাত কাবার হয়ে যাবে। আপনাদের অতক্ষণ আটকে রাখব না। কী দেখেছেন বলুন।’
ব্যোমকেশ বলল, ‘দেখলাম। আর কই। যা কিছু ঘটেছে অন্ধকারে ঘটেছে।’
প্রতুলবাবু বললেন, ‘যেমন তেমন অন্ধকার নয়, সূচীভেদ্য অন্ধকার। আমরা চোখ থাকতেও অন্ধ ছিলাম।’
মাধববাবু নিশ্বাস ফেলে বললেন, ‘তাহলে আপনাদের আটকে রেখে লাভ নেই। আজ আসুন তবে। যদি কোনো দরকারী কথা মনে পড়ে। দয়া করে আমাকে স্মরণ করবেন। আচ্ছা, নমস্কার।
ব্যোমকেশের ইচ্ছে ছিল আরো কিছুক্ষণ থেকে পরিস্থিতির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে, কিন্তু এ রকম বিদায় সম্ভাষণের পর আর থাকা যায় না। দু’জনে দ্বারের অভিমুখে অগ্রসর হলেন। ব্যোমকেশ যেতে যেতে একবার ঘাড় ফিরিয়ে দেখল ইন্সপেক্টর অমল পালের সঙ্গে কথা কইছেন।
দোরের কাছে প্রভু সিং দাঁড়িয়েছিল। ব্যোমকেশ লক্ষ্য করল, দোরের বাইরে থেকে একটি মেয়ে ব্যগ্র চক্ষে স্টেজের দিকে উঁকি মারছে। যুবতী মেয়ে, মুখশ্ৰী ভাল, শাড়ি পরার ভঙ্গী ঠিক বাঙালী মেয়ের মত নয়। ব্যোমকেশদের আসতে দেখে সে সুন্টু করে অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে গেল।
ব্যোমকেশ প্রভু সিং-এর কাছে গিয়ে দাঁড়াল, বলল, ‘ও মেয়েটি কে?’
প্রভু সিং একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল, ‘জি-ও আমার ছোট বোন সোমরিয়া। আমার কাছেই থাকে, থিয়েটারের কাজকর্ম করে, ঝটপট ঝাড়পৌঁছ-এই সব। মালিক ওকে খুব স্নেহ করতেন—
‘হুঁ, সধবা মেয়ে মনে হল। তোমার কাছে থাকে কেন?’
প্রভু সিং বিব্রত হয়ে বলল, ‘জি, ওর মরদের সঙ্গে বনিবনাও নেই, তাই আমি নিজের কাছে এনে রেখেছি।’
‘তোমার সংসারে আর কেউ আছে?’
‘জি, ঔরৎ আছে, বাচ্চা মেয়ে আছে। থিয়েটারের হাতার মধ্যেই আমরা থাকি।’
প্রতুলবাবুর মোটর রাস্তার ধারে পার্ক করা ছিল। সেইদিকে যেতে যেতে ব্যোমকেশ দেখল থিয়েটারের হাতার মধ্যে পুলিসের ভ্যান ছাড়াও আরো দু’টি মোটর দাঁড়িয়ে আছে। একটি সম্ভবত বিশু পালের গাড়ি, আকারে বেশ বড় বিলিতি গাড়ি, খুব নতুন নয়; অন্য গাড়িটি কার অনুমান করা শক্ত। ভীমের হতে পারে, যদি ভীমের গাড়ি থাকে; আমল পাল ডাক্তার, তার গাড়ি হতে পারে; কিম্বা মণীশ ভদ্র’র হতে পারে। বিশু পাল মণীশকে গাড়ি কিনে দিয়েছিল
এই সব চিন্তার মধ্যে ব্যোমকেশ অনুভব করল সে প্রতুলবাবুর গাড়িতে চড়ে বাড়ির দিকে ফিরে চলেছে। সে অন্যমনস্কভাবে একটা সিগারেট ধরিয়েছে, পাশের অন্ধকার থেকে প্রতুলবাবু বললেন, ‘আমি অন্ধকারের মধ্যে স্টেজের ওপর কিছু দেখিনি সত্য, কিন্তু মনে হয় কিছু শুনেছি।’
‘কি শুনেছেন?’ ব্যোমকেশ তাঁর দিকে ঘাড় ফেরাল।
‘একটা মিহি শব্দ।’
‘কি রকম মিহি শব্দ?
‘ঠিক বর্ণনা করে বোঝানো শক্ত। এই ধরুন মেয়ের হাত ঝাড়লে যেমন চুড়ির আওয়াজ হয়, সেই রকম।’
‘কাচের চুড়ি, না সোনার চুড়ি?’
‘তা বলতে পারি না। আপনি কিছু শুনতে পাননি?’
‘আমার কান ওদিকে ছিল না।’
পথে আর কোনো কথা হল না।
পরদিন সকাল আন্দাজ সাড়ে সাতটার সময় ব্যোমকেশ বসবার ঘরে খবরের কাগজটা মুখের সামনে উঁচু করে ধরে গত রাত্রের থিয়েটারের খুনের বিবরণ পড়ছিল। সত্যবতী সকালে বাড়ি ফিরেছে, ব্যোমকেশকে এক পেয়ালা চা খাইয়ে গড়িয়াহাটে বাজার করতে গেছে, ফিরে এসে ব্যোমকেশকে আর এক পেয়ালা চা ও প্রাতরাশ দেবে। বাড়িতে কেবল অজিত আছে।
অন্দরের দিকের দরজা থেকে অজিত উঁকি মোরল, দেখল ব্যোমকেশ মুখের সামনে কাগজের পদ তুলে দিয়ে খবর পড়ছে। অজিত নিঃশব্দে ঘরে ঢুকে গুটি গুটি সদর দোরের দিকে অগ্রসর হল। সে প্রায় দোর পর্যন্ত পৌঁচেছে পিছন থেকে শব্দ হল, ‘সাত সকালে চলেছ কোথায়?’
ধরা পড়ে গিয়ে অজিত দাঁড়াল, ভারিক্কিভাবে বলল, ‘দরকারী কাজে বেরুচ্ছি, টুকে দিলে তো?’
ব্যোমকেশ কাগজ নামিয়ে বলল, ‘বই-এর দোকানের কাজ?’
গাম্ভীর্যবর্জন করে অজিত মুখ টিপে হাসল।
ব্যোমকেশ বলল, ‘তোমার কার্য-কলাপ গতিবিধি ক্রমেই সন্দেহজনক হয়ে উঠছে। বিকাশকে ডেকে তোমার পিছনে টিকটিকি লাগাতে হবে দেখছি।’
‘সাত দিন ধৈর্য ধরে থাকে, তারপর আমি নিজেই সব বলব।’ অজিত বেরিয়ে গেল।
ব্যোমকেশ আবার কাগজ তুলে নিল। থিয়েটারে পুলিস প্রায় দেড়টা পর্যন্ত ছিল, থিয়েটারের আগাপস্তলা তন্ন তন্ন করেছে; থিয়েটার সংশ্লিষ্ট যাবতীয় স্ত্রী পুরুষের জবানবন্দী নেওয়া হয়েছে। কেবল খ্যাতনামা অভিনেত্রী সুলোচনা শোকাভিভুত থাকার জন্য এজাহার দিতে পারেননি। লাশ রাত্রেই ব্যবচ্ছেদ করা হয়েছিল, লাশ-পরীক্ষক ডাক্তার বলেন, মৃতের শ্বাসনালী ও ফুসফুসের মধ্যে সাইনোজেন গ্যাসের অস্তিত্র পাওয়া গিয়েছে, ওই ভয়ঙ্কর বিষই মৃত্যুর কারণ। মামলার পুলিস ইন-চার্জ ইন্সপেক্টর মাধব মিত্র মনে করেন, বিশু পালের মৃত্যু স্বাভাবিক মৃত্যু নয়, কেউ তাকে খুন করেছে। কিন্তু চিন্তার কারণ নেই, পুলিস তৎপর আছে, শীঘ্রই আসামী ধরা পড়বে। ওকুস্থিলে অর্থাৎ প্রেক্ষাগৃহে ব্যোমকেশ ও প্রতুলবাবু উপস্থিত ছিলেন। কাগজে সে কথারও উল্লেখ আছে।
বাইরে সত্যবতীর কণ্ঠস্বর শোনা গেল, সে বাজার করে ফিরেছে। তার পিছনে প্রতুলবাবু দুহাতে দু’টি পরিপুষ্ট থলে নিয়ে আসছেন, মুখে একটু অপ্রতিভ হাসি। সত্যবতী ঘরে ঢুকে বলল, ‘ওগো, দ্যাখো কে এসেছেন। উনিও গড়িয়াহাটে বাজার করতে গিয়েছিলেন-ধরে নিয়ে এলুম।’
ব্যোমকেশ হেসে উঠে দাঁড়াল, বলল, ‘বাঃ, বেশ। —সত্যবতী ঝাঁকামুটের কাজটা আপনাকে দিয়েই করিয়ে নিয়েছে দেখছি।’
‘যাঃ, তা কেন? উনি নিজেই আমার হাত থেকে থলি কেড়ে নিলেন।–আপনারা বসে গল্প করুন, আমি চা তৈরি করে আনছি।’ নিজের থলি প্রতুলবাবুর হাত থেকে নিয়ে সত্যবতী ভেতরে চলে গেল।
প্রতুলবাবু নিজের থলিটি নামিয়ে রেখে ব্যোমকেশের সামনের চেয়ারে বসলেন, বললেন, ‘কাগজে কালকের কীচক বধের খবর পড়ছেন দেখছি। আমিও পড়েছি।–আচ্ছা, কাল থিয়েটার থেকে ফিরতে ফিরতে আপনাকে একটা কথা বলেছিলাম মনে আছে?’
‘কি কথা, চুড়ির ঝনৎকার?’
‘হ্যাঁ, কাল থেকে চিন্তাটা মনের পিছনে লেগে আছে, পুলিসকে একথা জানানো উচিত কিনা।’
ব্যোমকেশ একটু নীরব থেকে প্রশ্ন করল, ‘ঝনাৎকার শব্দ স্টেজ থেকে এসেছিল এ বিষয়ে আপনি ষোল আনা নিঃসংশয়?’
প্রতুলবাবু বললেন, ‘দেখুন, অন্ধকারে বসে থাকলে কোন দিক থেকে আওয়াজ আসছে সব সময় ধরা যায় না। তবু্, স্টেজ থেকে যে আওয়াজটা এসেছিল এ বিষয়ে আমি বারো আনা নিঃসংশয়।’
‘তাহলে পুলিসকে বলা উচিত। ওরা যদি তা থেকে কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হয়–‘
এই সময় সদর দোরের কাছ থেকে আওয়াজ এল, ‘আসতে পারি?’
ব্যোমকেশ মুখ তুলে বলল, ‘এস এস, রাখাল। তোমাদের কথাই হচ্ছিল।’
ব্যোমকেশ বলল, ‘বসো। তোমার কি কাজকর্ম নেই, সকালবেলাই থানা ছেড়ে বেরিয়েছ যে!’
রাখালবাবু বললেন, ‘কাজকর্ম টিমে। কাগজে আপনাদের দু’জনের নাম দেখলাম। আপনারা আমার এলাকার লোক, তাই ভাবলাম তদারক করে আসি।’
সত্যবতী ট্রের ওপর দু’ পেয়ালা চা ও রাশীকৃত চিড়ে ভাজা নিয়ে এল। রাখালবাবু বললেন, ‘বৌদি, আমিও আছি। আর এক পেয়ালা চাই।’
আর এক পেয়ালা চা এল। তিনজনে চায়ের অনুপনি সহযোগে চিড়ে ভাজা খেতে খেতে গত রাত্রির থিয়েটারী হত্যাকাণ্ডের আলোচনা করতে লাগলেন।
চিড়ে ভাজা নিঃশেষ হলে রাখালবাবু চায়ের পেয়ালায় অন্তিম চুমুক দিয়ে রুমালে মুখ মুছতে মুছতে বললেন, ‘ব্যোমকেশদা, এ পাড়ায় শালীচরণ দাস নামে কাউকে চেনেন?
ব্যোমকেশ বলল, ‘শালীচরণ দাস! নামের একটা মহিমা আছে বটে। কিন্তু আমি চিনি না। কে তিনি?’
রাখালবাবু বললেন, ‘বছর বারো আগে আমি এই থানাতেই সাব-ইন্সপেক্টর ছিলাম। তখন শালীচরণকে নিয়ে বেশ কিছুদিন হৈ চৈ চলেছিল।’
‘হৈ চৈ কিসের? কী করেছিলেন। তিনি?’
‘শালীকে খুন করেছিল।’
‘শালীচরণ শালীকে খুন করেছিল!’
‘এবং বিশু পালের সঙ্গে এই ঘটনার কিছু যোগাযোগ আছে।’
‘তাই নাকি! বল বল, শুনি। —প্রতুলবাবু্, আপনার গল্প শুনতে আপত্তি নেই তো?’
প্রতুলবাবু বললেন, ‘গল্প শুনতে কার আপত্তি হতে পারে? আমি এ পাড়ার পুরনো বাসিন্দা, শালীচরণ নামটা যেন চেনা-চেনা মনে হচ্ছে। আজ রবিবার, ভেবেছিলাম সকালবেলা একটু লেখাপড়া করব। তা গল্পই শোনা যাক।’
অতঃপর রাখালবাবু শালীচরণের অতীত কাহিনী বললেন। গল্প শুনে ব্যোমকেশ বলল, ‘শালীচরণ এখন কোথায়? জেল থেকে বেরিয়েছে?’
রাখালবাবু বললেন, ‘মাসখানেক হল। জেলখাটা কয়েদীদের খবরাখবর আমাদের রাখতে হয়—’
‘কোথায় আছে?’
‘নিজের বাড়ির একতলায় উঠেছিল। আজ কোথায় আছে জানি না। খোঁজ নিতে পারি।’
ব্যোমকেশ প্রতুলবাবুর দিকে কটাক্ষ নিক্ষেপ করে বলল, ‘আজ ছুটির দিন, একটু সত্যান্বেষণে বেরুলে কেমন হয়? শালীচরণ আমার মনোহরণ করেছে। যাবেন তার বাড়িতে তত্ত্ব-তল্লাশ নিতে?’
প্রতুলবাবু বললেন, ‘বেশ তো, চলুন না। আমি কখনো খুনী আসামী দেখিনি, একটা নতুন অভিজ্ঞতা হবে। উঠুন তাহলে। আমার গাড়ি রয়েছে, তাতেই যাওয়া যাক।’
তিনজনে গিয়ে গাড়িতে উঠলেন। রাখালবাবু ড্রাইভারকে পথ নির্দেশ করার জন্যে সামনের সিটে বসলেন।
যেতে যেতে ব্যোমকেশ প্রশ্ন করল, ‘আচ্ছা, রাখাল, মাধব মিত্তিরকে তুমি চেন?’
রাখালবাবু ঘাড় ফিরিয়ে বললেন, ‘চিনি। ওঁর সঙ্গে কিছুদিন একসঙ্গে কাজ করেছি।’
‘লোকটি কেমন বল তো?’
রাখালবাবু একটু চুপ করে থেকে বললেন, ‘খুব হাঁশিয়ার কাজের লোক, আর ভারি মুখমিষ্টি। কিন্তু নিজের এলাকায় কাউকে নাক গলাতে দেন না।’
‘হুঁ।’ ব্যোমকেশ প্রতুলবাবুর পানে চেয়ে একটু হাসল।
পাঁচ মিনিট পরে রাখালবাবুর নির্দেশ অনুসরণ করে মোটর একটি বাড়ির সামনে থামল। অপেক্ষাকৃত সরু রাস্তার ওপর ছোট দোতলা বাড়ি; বাড়ির গায়ে জীৰ্ণতার ছাপ পড়েছে। তিনজনে মোটর থেকে অবতীর্ণ হয়ে বাড়ির সদরে এসে দেখলেন দরজায় তালা ঝুলছে।
তিনজনে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলেন। বাড়িতে তালা লাগিয়ে শালীচরণ কোথায় গেল? বাজারে?
সদর দোরের মাথায় দোতলায় একটি অর্ধচন্দ্ৰাকৃতি ব্যালকনি ছিল, এক ভদ্রলোক সেখান থেকে নীচে উঁকি মারলেন, ‘কাকে চান?’
নীচে তিনজন ঊর্ধ্বমুখ হলেন। রাখালবাবু বললেন, ‘শালী-মানে কালীচরণ দাস আছেন?’
ত্ৰিশঙ্কুর মত ভদ্রলোক বললেন, ‘না, তিনি বাইরে গেছেন।’
‘কোথায় গেছেন?’
দাঁড়ান, আমি আসছি।’ ত্রিশঙ্কু ব্যালকনি থেকে অদৃশ্য হলেন।
অল্পক্ষণ পরে বাড়ির পাশের দিক থেকে ভদ্রলোক এসে দাঁড়ালেন। মধ্যবয়স্ক লোক, কিন্তু ভাবভঙ্গীতে চটুলতার আভাস বয়সের অনুকুল নয়। বললেন, ‘আমি কালীচরণবাবুর ভাড়াটে। ওপরতলায় থাকি। আপনারা কি তাঁর বন্ধু?
ব্যোমকেশ হেসে বলল, ‘অন্তত শক্র নয়; দর্শনার্থী বলতে পারেন। তিনি কোথায়?’
ভদ্রলোক হাসি-হাসি মুখে বললেন, ‘তিনি বোষ্ট্রমীকে নিয়ে বৃন্দাবন গেছেন।’
ব্যোমকেশ ভ্রূ তুলে বলল, ‘বৃন্দাবন! বোষ্টমী!’
ভদ্রলোকের মুখের হাসি আর একটু প্রকট হল, ‘আজ্ঞে। আমার বাসায় একটি কমবয়সী ঝি কাজ করত, দেখতে শুনতে ভাল, বোধহয় বিধবা। কাজকর্ম ভালই করছিল, তারপর কালীচরণবাবু জেল থেকে ফিরে এলেন। একলা মানুষ হলেও তাঁর একজন ঝি দরকার, চপল-মানে আমার ঝি তাঁর কাজও করতে লাগল। কিছুদিন যেতে না যেতেই চপলা আমার কাজ ছেড়ে দিল, কেবল কালীচরণবাবুর কাজ করে। তারপর দেখলাম চপলা গলায় কঠি পরে বৈষ্ণবী হয়েছে। ক্রমে সন্ধ্যার পর নীচের তলা থেকে খঞ্জনির আওয়াজ আসে; যুগল-কণ্ঠে গান শোনা যায়—হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে–
‘দিন দশেক আগে একদিন সন্ধ্যেবেলা কালীচরণবাবু এক থালা মালপো আর পরমান্ন নিয়ে দোতলায় এলেন, সলজ্জভাবে জানালেন চপলা বোষ্ট্রমীকে তিনি কঠি-বদল করে বিয়ে করেছেন।’
নিঃশব্দ হাসিতে ভদ্রলোকের মুখ ভরে গেল।
ব্যোমকেশ চুলের মধ্যে দিয়ে আঙুল চালিয়ে বলল, ‘তাই তো। কবে বাইরে গেলেন?’
‘কাল সকালে।’
‘সকলে?’
‘আজ্ঞে। ভোরবেলা ওপরতলায় এসে আমাকে নীচের তলার চাবি দিয়ে বললেন, আমরা বৃন্দাবন যাচ্ছি। বেলা দশটার ট্রেনে, হাপ্ত দুই পরে ফিরব। এই বলে বোষ্টমীকে ট্যাক্সিতে তুলে চলে গেলেন। বৃন্দাবনে নাকি কোন আখড়ায় মোচ্ছব আছে।’
ব্যোমকেশ রাখালবাবুর সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় করল, প্রতুলবাবু বললেন, ‘এটা বোধহয় বৈষ্ণবীয় হনিমুন।’
তারপর রসিক ভদ্রলোকটিকে ধন্যবাদ ও নমস্কার জানিয়ে তিনজনে গাড়িতে এসে উঠলেন। প্রতুলবাবু দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘খুনী আসামী দেখা আমার ভাগ্যে নেই।’
পাঁচ-ছয় দিন বিশুপাল বধ সম্বন্ধে আর কোনো নতুন খবর পাওয়া গেল না; সংবাদপত্রে খবরটি প্রথম পৃষ্ঠা ছেড়ে অন্দরমহলে গা-ঢাকা দিয়েছে। মাধব মিত্রের সাড়াশব্দ নেই। ভাবগতিক দেখে মনে হয় তিনি মামলার কোনো কিনারা করতে পারেননি, আসামী এখনো অজ্ঞাত।
ব্যোমকেশের হাতে অন্য কোনো কাজ ছিল না, তাই তার মনটা থিয়েটারী হত্যার দিকে পড়ে থাকত। শনিবার বিকেলবেলা সে প্রতুলবাবুকে ফোন করবে। মনস্থ করেছে এমন সময় ফোন বেজে উঠল। স্বয়ং প্রতুলবাবু ফোন করছেন। তিনি বললেন, ‘এইমাত্র ইন্সপেক্টর মাধব মিত্রের পরোয়ানা এসেছে। তিনি আমার বাসায় আসছেন। আপনাকেও হাজির থাকতে হবে। বোধহয় হালে পানি পাচ্ছেন না।’
ব্যোমকেশ বলল, ‘হুঁ। আপনি তাকে কঙ্কণ ঝনৎকারের কথা বলেছেন নাকি?’
না। তিনি এলে বলব।’
‘আর শালীচরণ দাসের রোমান্স?’
‘না, দরকার বোধ করেন। আপনি বলবেন।’
‘আচ্ছা, আমি এখনি বেরুচ্ছি।’
‘গাড়ি পাঠাব?
‘না না, দরকার নেই। দশ মিনিটের তো রাস্তা।’
‘গাড়ি থাকলে দু’ মিনিটে আসা যেত।’
ব্যোমকেশ হেসে বলল, ‘হুঁ। বুঝেছি আপনার ইঙ্গিত।’
পনেরো মিনিট পরে ব্যোমকেশ প্রতুলবাবুর বাড়িতে দোতলার বারান্দায় গিয়ে বসতে না বসতেই মাধব মিত্র উপস্থিত হলেন। তাঁর হাতে চামড়ার মোটা ফাইল। টেবিলের ওপর ফাইল রেখে তিনি বিনীত হাস্য করলেন, ‘বিরক্ত করতে এলাম। ভেবেছিলাম। আপনাদের কষ্ট দেব না, কিন্তু গরজ বড় বালাই। আপনারা সে-রত্রে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন; যদিও চোখে কিছু দেখেননি, তবু আপনাদের উপস্থিতিই আমার কাছে মূল্যবান। আপনারা জ্ঞানী গুণী ব্যক্তি, পরম পণ্ডিত। আপনাদের মানসিক সহযোগিতা পেলেই আমরা কৃতাৰ্থ হয়ে যাব।’
লোকটির মিষ্টি কথা বলবার ক্ষমতা আছে বটে; কিন্তু ব্যোমকেশও হার মানবার পাত্র নয়। সে বলল, ‘সে কি কথা! পুলিসকে সাহায্য করা তো প্রত্যেক নাগরিকের কর্তব্য। তাছাড়া আপনি যে রকম মিষ্টভাষী সজন ব্যক্তি আপনাকে সাহায্য করা তো গৌরবের কথা। আমরা কি করতে পারি বলুন। সে-রত্রে থিয়েটার থেকে চলে আসার পর কী ঘটেছিল। আমরা কিছুই জানি না; খবরের কাগজে যা পড়েছি তা ধর্তব্য নয়। এইটুকু শুধু জানি যে অজ্ঞাত আসামী এখনো সনাক্ত হয়নি।’
প্রতুলবাবু ইতিমধ্যে চা ফরমাস করেছিলেন, সঙ্গে এক প্লেট প্যাস্ট্রি। মাধববাবু এক চুমুক চা খেয়ে প্যাস্ট্রিতে কামড় দিলেন, চিবোতে চিবোতে বললেন, ‘না, সনাক্ত হয়নি। তবে জাল খানিকটা গুটিয়ে এনেছি। ঘটনাকালে যে দশজন মঞ্চে উপস্থিত ছিল তাদের মধ্যে ছাঁটাই করে গুটি তিনেক লোককে দাঁড় করানো গেছে। মুশকিল কি হয়েছে জানেন, ওদের সকলেরই একটা না একটা মোটিভ আছে। তাহলে গোড়া থেকে বলি শুনুন–
‘আপনারা চলে আসবার পর থিয়েটারের মঞ্চ স্ত্রীনিরুম অডিটোরিয়াম, তারপর হাতার মধ্যে প্রভুনারায়ণের কোয়ার্টার-সব খানাতল্লাশ করলাম; স্টেজের দোরের কাছে দুটো মোটর ছিল—একটা বিশু পালের, দ্বিতীয়টা মণীশ ভদ্র’র-সে দুটোও খুঁজে দেখলাম, কিন্তু সন্দেহজনক কিছু পাওয়া গেল না। আর্টিস্টরা সবাই ব্যাগ হাতে করে অভিনয় করতে আসে, তাদের ব্যাগের মধ্যেও সাধারণ কাপড়-চোপড় পাউডার লিপস্টিক ছাড়া বিশেষ কিছু নেই। কেবল মালবিকার ব্যাগে একটা নিরুনের মত ধারালো ছুরি। আর ব্রজদুলালের ব্যাগে এক বোতল হুইস্কি পাওয়া গেল। তারপর নিষ্ফল বডি সার্চ।’
মাধব মিত্র চায়ের পেয়ালা শেষ করে রুমালে মুখ মুছলেন, বললেন, ‘অতঃপর সাক্ষীদের জবানবন্দী নিতে শুরু করলাম। প্রথমে বিশু পালের ভাই অমল পাল–’
ব্যোমকেশ হাত তুলে বলল, ‘জবানবন্দী মুখে বলতে গেলে অনেক কথা বাদ পড়ে যাবে। তার চেয়ে যদি জবানবন্দীর নথি আপনার কাছে থাকে—‘
মাধববাবু ফাইলের ওপর হাত রেখে একটু দ্বিধাভরে বললেন, ‘আছে। একটা কপি সর্বদাই সঙ্গে থাকে। কিন্তু–মুশকিল কি জানেন, ফাইল হাতছাড়া করার নিয়ম নেই। যাহোক, এক কাজ করা যেতে পারে, আমি বসছি, আপনি ফাইলে চোখ বুলিয়ে নিন। আপনার পড়াও হবে, নিয়ম রক্ষেও হবে। কি বলেন?’
ব্যোমকেশ নিম্পূহ স্বরে বলল, ‘দেখুন, আমার কোনো আগ্রহ নেই। আপনার যদি আগ্রহ থাকে। তবেই জবানবন্দী পড়ব।’
মাধববাবু ব্যস্ত হয়ে বললেন, ‘না না, সে কি কথা! আমার আগ্রহ আছে বলেই না আপনার কাছে এসেছি।’ তিনি ফাইল থেকে টাইপ করা ফুলস্ক্যাপ কাগজের একটা নথি বার করে ব্যোমকেশের দিকে এগিয়ে দিলেন, ‘এই নিন। আপনি পড়ুন, আমি না হয় ততক্ষণ প্রতুলবাবুর সঙ্গে পাশের ঘরে বসে গল্প করি।’
ব্যোমকেশ নথি টেনে নিয়ে বলল, ‘মন্দ কথা নয়। প্রতুলবাবু আপনাকে কিছু নতুন খবর দিতে পারবেন। আমিও একটা খবর দেব। আগে জবানবন্দী পড়ি। ডাক্তারের ময়না তদন্তের রিপোর্ট নথিতে আছে নাকি?’
‘আছে। তিনি ডাক্তারি পরিভাষার কচুকচি রিপোর্টে যথাসম্ভব সরল করে দিয়েছেন।’
ব্যোমকেশ সিগারেট ধরিয়ে জবানবন্দীর নথির পাতা খুলে পড়তে আরম্ভ করল।
থিয়েটারের অফিস ঘরে বসে মাধব মিত্র একের পর এক সাক্ষী ডেকে তাদের এজাহার নিয়েছিলেন। একজনের এজাহার নেবার সময় অন্য কোনো সাক্ষী উপস্থিত ছিল না।
অমল পাল। বয়স-৩৯। জীবিকা-ডাক্তারি। ঠিকানা–** গোলাম মহম্মদ রোড, দক্ষিণ কলিকাতা।
মৃত বিশ্বনাথ পাল আমার দাদা ছিলেন। আমরা দুই ভাই; আমি কনিষ্ঠ। দাদা আমার পড়ার খরচ দিয়ে ডাক্তারি পড়িয়েছিলেন। আমি দক্ষিণ কলকাতায় প্র্যাকটিস করি, দাদা থিয়েটারের কাছে থাকার জন্যে শ্যামবাজারে থাকতেন। তিনি বিপত্নীক ও নিঃসন্তান ছিলেন। শ্যামবাজারের বাসায় অভিনেত্রী সুলোচনা তাঁর সঙ্গে থাকত। আমার সুযোগ হলে আমি থিয়েটারে এসে কিম্বা শ্যামবাজারের বাসায় গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করতাম। তাঁর সঙ্গে আমার পরিপূর্ণ সদ্ভাব ছিল, তিলমাত্র মনোমালিন্য কোনো দিন হয়নি।
দাদা উদার চরিত্রের মানুষ ছিলেন, পরোপকারী ছিলেন। তিনি পনেরো হাজার টাকার লাইফ ইনসিওর করে আমাকে তার ওয়ারিশ করেছিলেন। শুনেছি থিয়েটারের আরো অনেক লোককে লাইফ ইনসিওরের ওয়ারিশ করেছিলেন। কাউকে দশ হাজার, কাউকে পাঁচ হাজার। তিনি অজস্র টাকা রোজগার করতেন, কোনো বদখেয়াল ছিল না; যাদের ভালবাসতেন তাদের দু’হাত ভরে দিতেন।
নৈতিক চরিত্র? তিনি আমার গুরুজন ছিলেন, তাঁর নৈতিক চরিত্র সম্বন্ধে কোনো কথা বলবার অধিকার আমার নেই। সুলোচনার সঙ্গে ওঁর বিবাহিত সম্বন্ধ না থাকলেও ওঁরা স্বামী-স্ত্রীর মতই থাকতেন।
দাদার শত্ৰু? শত্ৰু কেউ ছিল বলে তো মনে হয় না। সকলেই তাঁর অনুগৃহীত, শত্ৰুতা কে করবে?
আমি আজ এ পাড়ায় একটা ‘কল’এ এসেছিলাম, ভাবলাম দাদার সঙ্গে দুটো কথা বলে যাই; তাই থিয়েটারে এসেছিলাম। আমার ডাক্তারি প্র্যাকটিস মোটের ওপর মন্দ নয়। আমি বিবাহিত; তিনটি মেয়ে দু’টি ছেলে।
আজ নাটক শেষ হবার ঠিক আগে যখন এক মিনিটের জন্যে আলো নিভিয়ে দেওয়া হল তখন আমি স্টেজের পিছন দিকে একটা টুলের ওপর বসে সিগারেট টানছিলাম। তখন কে কোথায় ছিল, নিজের জায়গা থেকে নড়েছিল। কিনা। আমি লক্ষ্য করিনি। আলো জ্বলার পরে আবার অভিনয় আরম্ভ হল, কিছুক্ষণ পরে চীৎকার কান্না হৈ হৈ্্, ড্রপিসিন পড়ে গেল। তখন আমি স্টেজে এসে দেখলাম–
আমি ডাক্তার, কিন্তু দাদার মৃত্যুর কারণ আমি বুঝতে পারিনি। এত অল্প সময়ের মধ্যে মৃত্যু-হার্ট ফেলিওর হতে পারে। কিন্তু দাদার হার্ট দুর্বল ছিল না, কয়েক দিন আগে আমি পরীক্ষা করেছি। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ পোস্ট-মর্টেমে জানা যাবে। এ যেন বিনা মেঘে বজ্বপাত, এখনো ঠিক ধারণা করতে পারছি না।
দাদা যদি উইল করে গিয়ে থাকেন তাহলে কে তাঁর উত্তরাধিকারী আমি জানি না, সলিসিটার সিংহ-রায়ের অফিসে খোঁজ নিয়ে জানা যাবে। যদি উইল না থাকে তাহলে সম্ভবত আমিই তাঁর উত্তরাধিকারী। তাঁর স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি কী আছে আমি জানি না।
ব্রজদুলাল ঘোষ। বয়স-৪২। জীবিকা-নাট্যাভিনয়। ঠিকানা—** শ্যামপুকুর লেন। ইন্সপেক্টরবাবু্, আপনি সুলোচনাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সে এখনো সম্পূর্ণ প্রকৃতিস্থ হয়নি। আপনি আগে আমাকে প্রশ্ন করুন। আমার এজাহার শেষ হলে সুলোচনা আসবে।
প্রশ্ন : আপনি এই নাটকে ভীমের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন?
উত্তর : হ্যাঁ। বিশু যতগুলি নাটক মঞ্চস্থ করেছিল সব নাটকেই আমি অভিনয় করেছি।
প্রশ্ন : কতদিন তাঁর সঙ্গে আছেন?
উত্তর : তা প্ৰায় দশ বছর। বিশু যখন নিজের দল তৈরি করে আসরে নামল তখন থেকে আমি ওর সঙ্গে আছি।
প্রশ্ন : আপনার মত আর কেউ গোড়া থেকে আছে?
উত্তর : গোড়া থেকে–। আছে। কমিক অভিনেতা দাশরথি চক্কোত্তি আর তার বৌ নন্দিতা। অন্য যারা ছিল তারা এদিক ওদিক ছড়িয়ে পড়েছে।
প্রশ্ন : আপনাদের কারুর সঙ্গে বিশু পালের অসদ্ভাব ছিল?
উত্তর : দেখুন, কুমীরের সঙ্গে বিবাদ করে জলে বাস করা যায় না। কার মনে কি আছে জানি না, কিন্তু বাইরে কোনো অসদ্ভাব ছিল না। বিশু ছিল দিলাদরিয়া মেজাজের লোক, দলের লোককে সে ঘরের লোক বলে মনে করত। এমন অমায়িক চরিত্র দেখা যায় না।।
প্রশ্ন : বিশু পালের চরিত্রে কোনো দোষ ছিল না?
উত্তর : একটু আধটু দোষ কার না থাকে? ঠিক বাছতে গাঁ উজোড়। বিশু মরে গেছে, কিন্তু আমি গলা ছেড়ে বলতে পারি সে উঁচু মেজাজের সজ্জন ব্যক্তি ছিল। যারা তার দলে কাজ করেছে তারা সপরিবারে কাজ করেছে। সমস্ত থিয়েটারটাই একটা পারিবারিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেন আমাদের সকলের এজমালি থিয়েটার। এখন সে মরে গেছে, এরপর কী হবে জানি না।
প্রশ্ন : আচ্ছা, এবার আপনার ঘরের কথা কিছু জিজ্ঞেস করি। আপনার পরিবারে কে কে আছে?
উত্তর : বুড়ি পিসি আছেন। আমার স্ত্রী শান্তি আছে আর একটি মেয়ে আছে। মেয়ে স্কুলে পড়ে। শান্তি আমাদের থিয়েটারে গান-বাজনা শেখায়।
প্রশ্ন : তিনি আজ আসেননি?
উত্তর; না। নতুন নাটকের যখন মহড়া আরম্ভ হয় তখন সে আসে, নাচ-গান শেখায়; নাটক একবার চালু হলে তার কাজ থাকে না, তখন আর বড় একটা আসে না। বাড়িতে একটা নাচ-গানের কোচিং ক্লাস খুলেছে, তাইতে শেখায়।
প্রশ্ন : আপনি থিয়েটারে যোগ দেবার আগে কোনো কাজ করতেন কি?
উত্তর : হ্যাঁ, আমি মুষ্টিযোদ্ধা ছিলাম। একবার ভারতের মিড়ল-ওয়েট চ্যাম্পিয়ান হয়েছিলাম। একটি জিমনেসিয়ামে বক্সিং শেখাতাম। কিন্তু থিয়েটারের শখ বরাবরই ছিল, একটা সুযোগ পেয়ে চলে এলাম।
প্রশ্ন : আজ স্টেজের ওপর বিশু পালের সঙ্গে আপনার মল্লযুদ্ধ হয়েছিল; তখন আপনি বিশু পালের শরীরে কোনো দুর্বলতা লক্ষ্য করেছিলেন?
উত্তর : না। ঠিক অন্য দিনের মত।
প্রশ্ন : কখন জানতে পারলেন বিশু পালের মৃত্যু হয়েছে?
উত্তর; আমি জানতে পারিনি। লাইট অফু হয়ে যাবার পর আমি আর সুলোচনা পিছন দিকের দোরের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলাম, আলো জ্বললে স্টেজে এসে অ্যাকটিং আরম্ভ করলাম। এই সময় বিশুর মাটি থেকে উঠে আমার পিঠে ছুরি মারবার কথা; কিন্তু বিশু উঠল না। তারপরই সুলোচনা চীৎকার করে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তখন আমি বুঝতে পারলাম।
প্রশ্ন : এর বেশি আপনি কিছু জানেন না? আচ্ছা, আজ আপনি বাড়ি যান। যদি নতুন কিছু মনে পড়ে জানাবেন।
সুলোচনা। বয়স-৩৫। জীবিকা-নাট্যাভিনয়। ঠিকানা—** শ্যামবাজার, উত্তর কলিকাতা।
সুলোচনা মুখের রঙ অনেকটা পরিষ্কার করেছে, তবু কানে ও গলায় কিছু পেন্ট লেগে আছে। তার গায়ের রঙ ফরসা, শরীরের গড়ন ভাল; কিন্তু আকস্মিক বিপর্যয়ে একেবারে যেন ভেঙে পড়েছে। অফিস ঘরে এসে মাধব মিত্রের সামনের চেয়ারে সে বসে পড়ল, আর্তম্বরে নিজেই প্রথমে প্রশ্ন করল, ‘কে একাজ করল, দারোগাবাবু?’
উত্তরে দারোগা প্রশ্ন করলেন, ‘কোন কাজ? সুলোচনার চোখ দারোগার মুখের ওপর স্থির হল, গলার স্বরে তীক্ষ্ণতা এল। সে বলল, ‘আপনি জানেন না কোন কাজ? ওঁর শরীরে কোনো রোগ ছিল না, ওঁর মৃত্যু স্বাভাবিক নয়। কেউ ওঁকে খুন করেছে।’
প্রশ্ন : এ বিষয়ে এখনো ডাক্তারের রিপোর্ট পাওয়া যায়নি, তবে আপনার অনুমান সত্যিও হতে পারে। যদি সত্যি হয়, কে খুন করেছে আপনি বলতে পারেন?
উত্তর : তা কি করে বলব। কিন্তু ওঁর কোনো শত্রু ছিল না।
প্রশ্ন; শত্ৰু না থাকলেও বিশু পালের মৃত্যুতে অনেকের লাভ ছিল। যাদের উদ্দেশ্যে উনি লাইফ ইনসিওর করেছিলেন তাঁর মৃত্যুতে তাদের সকলেরই লাভ। নয় কি?
উত্তর : তা সত্যি কিন্তু এমন কে আছে কয়েকটা টাকার জন্যে চিরজীবনের উপকারী বন্ধুকে খুন করবে!
প্রশ্ন : আপনি কাউকে সন্দেহ করেন না?
উত্তর : না।
প্রশ্ন : বাইরের কেউ হতে পারে না?
উত্তর : বাইরের লোক! তা জানি না। তিনি থিয়েটারের বাইরের অনেক লোককে চিনতেন, কার মনে কী আছে কেমন করে জানিব?
প্রশ্ন : আচ্ছা যাক। আপনার সঙ্গে বিশুবাবুর কতদিনের পরিচয়?
উত্তর : প্ৰায় পাঁচ বছর।
প্রশ্ন : কোথায় পরিচয় হয়েছিল? কে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল? উত্তর; এই থিয়েটারে পরিচয় হয়েছিল। ব্রজদুলালবাবু আগে থাকতে আমাকে চিনতেন, তিনিই পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন।
প্রশ্ন : আগেও থিয়েটার করতেন নাকি? উত্তর : নিয়মিত নয়, মাঝে মাঝে করতাম।
প্রশ্ন : আপনার পারিবারিক পরিস্থিতি কিছু জানতে চাই। উত্তর; মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে। কম বয়সে বিধবা হয়েছিলুম। থিয়েটারের দিকে ঝোঁক ছিল। সুযোগ পেয়ে চলে এলুম।
প্রশ্ন : এ থিয়েটারে আসার পর থেকে বিশুবাবুর সঙ্গে আছেন?
উত্তর; হ্যাঁ। বিয়ে হয়নি, কিন্তু উনিই আমার স্বামী।
প্রশ্ন : বাপের বাড়ির সঙ্গে আর আপনার কোনো সম্বন্ধ নেই?
উত্তর : না। আমার মা বাবা নেই, দাদা খবর রাখেন না।
প্রশ্ন : ডাক্তার অমল পালের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কেমন?
উত্তর : ভাল। সে তার দাদাকে শ্রদ্ধা করত। বাড়িতে বড় একটা আসত না, দরকার হলে এখানে এসে দাদার সঙ্গে দেখা করত।
প্রশ্ন : কিসের দরকার-টাকার?
উত্তর : হ্যাঁ। বেশির ভাগই টাকা। ওর ডাক্তারি ভাল চলে না। অনেকগুলি ছেলেমেয়ে–
প্রশ্ন : বিশু পালের স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি এখন কে পাবে আপনি জানেন?
উত্তর : যতদূর জানি উনি উইল করে যাননি। স্থারর সম্পত্তির কথাও কখনো শুনিনি। ব্যাঙ্কে কিছু টাকা আছে, আর মোটর গাড়িটা আছে। ব্যাঙ্কের টাকা কে পাবে তা জানি না, তবে গাড়িটা আমার নামে আছে, সম্ভবত আমার নামেই থাকবে।
প্রশ্ন : এবার শেষ প্রশ্ন। আজ অভিনয়ের সময় কিছু দেখেছেন কিম্বা শুনেছেন কি যা আমাদের কাজে লাগতে পারে?
সুলোচনা একটু চিন্তা করে বলল, ‘সন্দেহজনক কিছু নয়, তবে সোমরিয়াকে উইংসের বাইরে এক কোণে লুকিয়ে বসে থাকতে দেখেছি। সে মাঝে মাঝে ভিতরে এসে থিয়েটার দেখে।’
প্রশ্ন : সোমরিয়া কে?
উত্তর : দারোয়ান প্রভু সিং-এর বোন।
ইন্সপেক্টর : আচ্ছা, আজ এই পর্যন্ত।
মণীশ ভদ্র। বয়স-২৯। জীবিকা-থিয়েটারের আলোকযন্ত্র পরিচালনা। ঠিকানা’’ আমহার্স্ট স্ট্রট।
মণীশ ঘরে ঢুকে একবার কজির ঘড়ির দিকে তাকালো। রেডিয়াম লাগানো ঘড়ি, অন্ধকারেও সময় দেখা যায়। সে চেয়ারে বসে বলল, ‘পৌঁনে এগারটা। দারোগাবাবু্, বড় রাত হয়ে গেছে, একটু তাড়াতাড়ি ছেড়ে দেবেন? হোটেল সব বন্ধ হয়ে গেছে, আজ আর বোধহয় কিছু জুটবে না—‘
মাধববাবু বললেন, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, আপনার এজাহার পাঁচ মিনিটের বেশি লাগবে না।’
মণীশ বলল, ‘আমি একলা নয়, বৌও আছে। —দু’জনের এজাহার একসঙ্গে নিলে হয় না?’
মাধববাবু বললেন, ‘না, তা হয় না। আপনারা দু’জন দু’ জায়গায় ছিলেন। —আচ্ছা, বলুন দেখি, আলো নেভাবার পর আপনি কী করলেন?’
উত্তর : সুইচের ওপর হাত রেখে ঘড়ির পানে তাকিয়ে রইলাম, পীয়তাল্লিশ সেকেন্ড। পরে সুইচ টিপে আলো জ্বাললাম।
প্রশ্ন : আপনার বোর্ডে অনেকগুলি সুইচ, কোনটা কোথাকার সুইচ সব আপনার নখদর্পণে?
উত্তর : হ্যাঁ, তবু সাবধান থাকা ভাল, তাই এই দৃশ্যে সুইচে হাত রাখি।
প্রশ্ন : ঠিক পয়তাল্লিশ সেকেন্ড কেন?
উত্তর : বিশুবাবু সময় ধার্য করে দিয়েছিলেন, পয়তাল্লিশ সেকেন্ড হাউস অন্ধকার থাকবে।
প্রশ্ন : আপনার একজন সহকারী আছে না?
উত্তর : আছে। কাঞ্চন সিংহ। সে আমার সঙ্গে সুইচ বোর্ডে ছিল না। তার মাথা ধরেছিল—
প্রশ্ন : তার প্রায়ই মাথা ধরে?
মণীশ চুপ করে রইল।
প্রশ্ন : সে কোথায় ছিল আপনি জানেন?
উত্তর : পরে শুনেছি সে অফিস ঘরে ঘুমোচ্ছিল।
প্রশ্ন; কার মুখে শুনলেন?
উত্তর : তার নিজের মুখে।
প্রশ্ন : ও। বিশুবাবুর সঙ্গে আপনি কতদিন কাজ করছেন?
উত্তর : প্ৰায় চার বছর।
প্রশ্ন : আপনার স্ত্রীও?
উত্তর : না, তখন আমার বিয়ে হয়নি। মালবিক থিয়েটারে যোগ দিয়েছে। বছরখানেক, এই নাটক ধরবার পর থেকে। বিশুবাবু উত্তরার পার্ট করার জন্যে কমবয়সী মেয়ে খুঁজছিলেন; শেষ পর্যন্ত মালবিকাকে রাখেন।
প্রশ্ন : আপনার নামে বিশুবাবু জীবনবীমা করেননি?
উত্তর : না। আমি বলেছিলাম জীবনবীমা চাই না, মাইনে বাড়িয়ে দিন। তা তিনি জীবনবীমাও করলেন না, মাইনেও বাড়ালেন না। সাতশো টাকা ছিল, সাতশো টাকাই রইল।
প্রশ্ন : তার বদলে বিশ হাজার টাকা দিয়ে একটা স্ট্যাণ্ডার্ড হেরাল্ড গাড়ি কিনে দিলেন?
উত্তর : গাড়ির একটা ইতিহাস আছে। বিশুবাবু যখন মাইনে বাড়িয়ে দিলেন না তখন আমি বাইরে কাজ খুঁজতে লাগলাম। এই নাটক আরম্ভ হবার কয়েকদিন আগে আমি মাদ্রাজ থেকে একটা ভাল অফার পেলাম। একটা বিখ্যাত সিনেমা কোম্পানি আলোকশিল্পী চায়; মাইনে দেড় হাজার, তাছাড়া বাড়িভাড়া ইত্যাদি। বিশুবাবুকে গিয়ে চিঠি দেখলাম। তিনি বে-কায়দায় পড়ে গেলেন, কিন্তু তবু নিজের জিদ ছাড়লেন না। আমাকে গাড়ি কিনে দিলেন। আর মালবিকাকে যে একশো টাকা হাতখরচ হিসেবে দিতেন তা বাড়িয়ে দু’শো টাকা করে দিলেন। তখন আমি মাদ্রাজের অফারটা ছেড়ে দিলাম। দেশ ছেড়ে কে বিদেশে যেতে চায়?
দারোগাবাবু বললেন, ‘তা বটে। তাহলে আপনি বিশু পালের মৃত্যু সম্বন্ধে কোনো হদিস দিতে পারেন না? আচ্ছা, এবার তাহলে আপনার স্ত্রীকে পাঠিয়ে দিন।’
মালবিকা ভদ্র। বয়স-২০। জীবিকা-নাট্যাভিনয়। ঠিকানা ** আমহার্স্ট স্ট্রট।
নোট : বিশু পালের আকস্মিক মৃত্যুতে সাক্ষী প্রথমটা খুব শক খেয়েছিল, এখন সুস্থ হয়েছে। বয়স কম, দেখতেও সুন্দরী; কিন্তু চোখের ঋজু দৃষ্টি ও চিবুকের মজবুত গড়ন থেকে চরিত্রের দৃঢ়তা অনুমান করা যায়।
প্রশ্ন : নাটকে আপনি উত্তরার ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। নাটকের শেষ দৃশ্য পর্যন্ত আপনার অভিনয় আছে?
উত্তর : না। দ্বিতীয় অঙ্কের শেষে আমার অভিনয় শেষ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমার স্বামীকে থাকতে হয়, তাই আমিও থাকি।
প্রশ্ন : আজ যখন শেষ অঙ্কে আলো নিভিয়ে দেওয়া হয় তখন আপনি কোথায় ছিলেন?
উত্তর; সাধারণ অভিনেত্রী মেয়েদের জন্যে একটা আলাদা সাজঘর আছে। আমি সেই সাজঘরে গায়ের মুখের রঙ সবেমাত্র তুলতে আরম্ভ করেছিলুম।
প্রশ্ন : সেখানে আর কেউ ছিল?
উত্তর : লক্ষ্য করিনি। একবার বোধহয় নন্দিতাদিদি ঘরে এসেছিল।
প্রশ্ন : আপনি কবে থেকে অভিনয় করছেন?
উত্তর : এই নাটকের আরম্ভ থেকে। প্রায় বছর ঘুরতে চলল।
প্রশ্ন : অভিনয়ের দিকে আপনার ঝোঁক আছে।
উত্তর : খুব বেশি নয়। আমার স্বামী চেয়েছিলেন, কিছু টাকাও আসছিল, তাই থিয়েটারে যোগ দিয়েছিলুম।
প্রশ্ন : আপনি বোম্বাই কিম্বা মাদ্রাজে গিয়ে সিনেমায় অভিনয় করলে অনেক টাকা উপার্জন করতে পারতেন। করেননি কেন?
উত্তর : বাংলা দেশের বাইরে যেতে ইচ্ছে করে না। তাছাড়া আমি গোরস্থ ঘরের মেয়ে, ঘরকন্ন করতেই ভালবাসি। আমার মা সহমৃতা হয়েছিলেন।
প্রশ্ন : সহমৃতা! আজকালিকার দিনে–!
উত্তর : বাবা মারা যাবার এক ঘন্টা পরে মা হার্টফেল করে মারা যান।
প্রশ্ন : ও-বুঝেছি। আচ্ছা, বিশু পাল কেমন লোক ছিলেন?
উত্তর : খুব মিশুকে লোক ছিলেন। দরাজ হাত ছিল। সকলের সঙ্গে সমান ব্যবহার করতেন।
প্রশ্ন : মেয়েদের সঙ্গেও?
উত্তর : হ্যাঁ। কিন্তু কখনো কোনো রকম বেচাল দেখিনি।
ইন্সপেক্টর : আচ্ছা, এবার আপনি বাড়ি যান।
কাঞ্চন সিংহ। বয়স-২৬। জীবিকা—থিয়েটারের আলোকশিল্পীর সহকারী। ঠিকানা-মানিকতলা স্ট্রীটের একটি মেস।
নোট : লোকটির ভাবভঙ্গী একটু খ্যাপাটে গোছের; মাঝে মাঝে আবোল তাবোল এলোমেলো কথা বলে। কতখানি খাঁটি কতখানি অভিনয় বলা যায় না।
প্রশ্ন : আপনি হিপি, না বিটুলে, না অবধূত?
উত্তর : আজ্ঞে, আমি বাঙালী। দি আপনার সাজপোশাক বাঙালীর মত নয়। দাড়ি গোঁফও প্রচুর। কোনো কারণ আছে
উত্তর : আমার ভাল লাগে। তাছাড়া থিয়েটার করার সময় পরচুলো পরতে হয় না।
প্রশ্ন : আপনি এখানে আসার আগে কী কাজ করতেন?
উত্তর : বাউণ্ডুলে ছিলাম। বাপ কিছু টাকা রেখে গিয়েছিল, মেসে থাকতাম আর শখের থিয়েটার করতাম।
প্রশ্ন : তাহলে চাকরিতে ঢুকলেন কেন?
উত্তর : বাপের পয়সায় শাক-চচ্চড়ি খাওয়া চলে, রসগোল্লা খাওয়া চলে না।
প্রশ্ন : তাহলে রসগোল্লা খাওয়ার জন্যেই চাকরিতে ঢুকেছিলেন?
উত্তর : শুধু রসগোল্লা নয়, অন্য মতলবও ছিল। জানেন, আমি খুব ভাল অ্যাক্ট করতে পারি। শিবাজির পার্ট, ঔরঙ্গজেবের পার্ট প্লে করেছি। বিশুবাবু আমার চেহারা দেখে চাকরিতে নিলেন, কিন্তু কাজ দিলেন আলো জ্বালা আর আলো নেভানোর। যদি অভিনয় করতে দিতেন, আগুন ছুটিয়ে দিতাম।
প্রশ্ন : তা বটে। এখন বলুন দেখি, আলো নেভানোর সময় আপনি সুইচের কাছে ছিলেন না কোন?
উত্তর : আলো নেভানোর সময় সুইচবোর্ডে একজন লোকেরই দরকার হয়। মণীশদা ছিলেন, তাই আমি
প্রশ্ন : কোথায় ছিলেন?
উত্তর; মাথা ধরেছিল, তাই আমি অফিস ঘরে গিয়ে টেবিলে মাথা রেখে একটু বসে ছিলাম।
প্রশ্ন : স্টেজের ওপর খুন হল। অসময়ে প্লে বন্ধ হয়ে গেল, এসব কিছুই জানতে পারেননি?
উত্তর : এ-একটু ঝিমকিনি এসে গিয়েছিল।
প্রশ্ন : আপনি নেশাভাঙ করেন?
উত্তর : নেশাভাঙ! নাঃ, পয়সা কোথায় পাব!
প্রশ্ন : কোন নেশা করেন?
উত্তর; এঁ-নেশা করি না-মাঝে মাঝে ভাঙি খাই। মানে—
প্রশ্ন : মানে মারিওয়ানা সিগারেট খান। কে যোগান দেয়? পান কোথায়?
উত্তর : যেখানে সেখানে পাওয়া যায়। ঠেলাগাড়িতে পানের দোকানে। আপনার চাই?
ইন্সপেক্টর : আপনি এখন যেতে পারেন। মেস ছেড়ে কোথাও যাবেন না। কলকাতাতেই থাকবেন।
দাশরথি চক্রবর্তী। বয়স-৪৫। জীবিকা-নাট্যাভিনয়। ঠিকানা-বেহালা। ভাল মানুষের মত ভাবভঙ্গী, কিন্তু কথা বলার ধরন সোজা নয়। সরলভাবে চোখ মিটমিট করে তাকায়, কিন্তু চোখের গভীরে প্রচ্ছন্ন দুষ্টতার ইঙ্গিত। লোকটি কমিক অ্যাকটর, খোঁচা দিয়ে কথা বলতে পারে। কিন্তু খোঁচা বুঝতে একটু সময় লাগে।
প্রশ্ন : আপনি গোড়া থেকে বিশুবাবুর সঙ্গে ছিলেন?
উত্তর : ছিলাম। বিশুর সঙ্গে যথেষ্ট সদ্ভাবও ছিল। তাই বুঝতে পারছি না যাবার সময় সে আমাকে এমনভাবে দিয়ে মজিয়ে গেল কেন?
প্রশ্ন : সেটা কি রকম?
উত্তর : ট্রাম-বাস বন্ধ হয়ে গেছে। এত রাত্রে যদি ট্যাক্সি না পাই, পেটে কিল মেরে এখানেই শুয়ে থাকতে হবে।
ইন্সপেক্টর : আপনি বেহালায় থাকেন তো? কিছু ভাববেন না, আমি পুলিস ভ্যানে আপনাকে আর আপনার স্ত্রীকে বাড়ি পাঠিয়ে দেব।
দাশরথি : ধন্যবাদ। এবার যত ইচ্ছে হয় প্রশ্ন করুন।
প্রশ্ন : বিশু পালের সঙ্গে আপনার সদ্ভাব ছিল?
উত্তর : কারুর সঙ্গে আমার অসদ্ভাব নেই। জলে বাস করে কুমীরের সঙ্গে বিবাদ করা যায় না।
প্রশ্ন : বিশু পালের কোনো শত্রু ছিল?
উত্তর : শত্রুর কথা শুনিনি। তবে কি জানেন, যেখানে মেয়েমানুষ সেখানেই গণ্ডগোল।
প্রশ্ন : তার মানে? সুলোচনার কথা বলছেন?
উত্তর : (ক্ষণেক নীরব থাকার পর) সুলোচনা খুব ভাল অভিনয় করে, কিন্তু সে খানদানি অ্যাকট্রেস নয়, গোরস্তঘরের মেয়ে। ব্রজদুলাল প্রথম ওকে-মানে-থিয়েটারে নিয়ে আসে। তারপর বিশুর সঙ্গে সুলোচনার জেটপাট হয়ে গেল
প্রশ্ন : ও-বুঝেছি। তা নিয়ে বিশুবাবুর সঙ্গে ব্রজদুলালবাবুর কোনো মনোমালিন্য হয়নি?
উত্তর : অমান হেরফের হামেশাই হয়ে থাকে, কেউ গায়ে মাখে না। কে যাবে কেউটে সাপের লেজ মাড়াতে।
প্রশ্ন : হুঁ। অন্য কোনো স্ত্রীলোকের সঙ্গে বিশু পালের ঘনিষ্ঠতা ছিল?
উত্তর : তা কি করে জানিব। কেউ তো ঢাক পিটিয়ে এসব কাজ করে না। অবশ্য থিয়েটারে নানা রকম মেয়ের যাতায়াত আছে, কোন অ্যাকটরের কখন কোন মেয়ের ওপর নজর পড়বে কে বলতে পারে। এই যে দারোয়ান প্রভুনারায়ণের একটা বোন আছে—সোমরিয়া, উচকা বয়স, রূপও আছে। সে থিয়েটারে চাকরানীর কাজ করে; কারুর নজর এড়িয়ে চলা তার স্বভাব নয়। বিশুও সকাল বিকেল নিয়ম করে থিয়েটার তদারক করতে আসত–
প্রশ্ন : অৰ্থাৎ, সোমরিয়ার সঙ্গে বিশু পালেরি–?
উত্তর : ভগবান জানেন। তবে সুযোগ সুবিধে সবই ছিল।
প্রশ্ন : আচ্ছা, ওকথা যাক।–বিশু পালের সঙ্গে বাইরের কোনো লোকের শক্রতা ছিল?
উত্তর : এক থিয়েটারের অধিকারীর সঙ্গে অন্য থিয়েটারের অধিকারীর রেষারেষি থাকে। বিশুর থিয়েটার খুব ভাল চলছিল, অনেকের চোখ টাটিয়েছিল। একে যদি শক্রতা বলেন, বলতে পারেন।
প্রশ্ন : এবার নিজের কথা বলুন।
উত্তর : নিজের কথা আর কি বলব? ছেলেবেলা থেকে থিয়েটারে ঢুকেছি, অনেক ঘাটের জল খেয়েছি। স্ত্রীকে নিয়ে বেহালায় থাকি, ছেলে।পুলে নেই। বেশি উচ্চাশাও নেই। যেমনভাবে দিন কাটছিল তেমনিভাবে কেটে গেলেই খুশি থাকতাম। কিন্তু বিশু মরে গেল, ওর দল টিকবে কিনা কে জানে। হয়তো ভেঙে যাবে, তখন আবার অন্য দলে গিয়ে ভিড়তে হবে।
প্রশ্ন; আজ দ্বিতীয় অঙ্কে আপনার আর আপনার স্ত্রীর অভিনয় শেষ হয়ে গিয়েছিল, বাড়ি যাননি কেন?
উত্তর : দ্বিতীয় অঙ্কের পর বাড়ি যাব বলে বেরুচ্ছি, বিশু বলল, ‘একটু থেকে যাও, তোমার সঙ্গে কথা আছে। নাটক শেষ হলে বলব।’
প্রশ্ন : কি কথা?
উত্তর : তা জানি না, বিশু বলেনি।
প্রশ্ন : সেখানে অন্য কেউ উপস্থিত ছিল?
উত্তর : না, আমরা একলা ছিলাম। বিশুর ড্রেসিংরুমে কথা হয়েছিল।
ইন্সপেক্টর : হুঁ। আজ এই পর্যন্ত। আপনার স্ত্রীকে পাঠিয়ে দিন।
নন্দিতা চক্রবর্তী। বয়স-৪৪। জীবিকা-নাট্যাভিনয়। ঠিকানা-বেহালা।
নোট : মহিষমৰ্দিনী চেহারা, দাশরথির চেয়ে মুঠিখানেক মাথায় উঁচু। লালচে চোখ, বড় বড় দাঁত, কিন্তু গলার স্বর মিষ্টি। আচরণ শিষ্ট ও শালীন।
প্রশ্ন : আপনার স্বামী নামকরা কমিক অ্যাকটর, আপনিও কি কমিক অ্যাকটিং করেন?
উত্তর : ও মা, অ্যাকটিং-এর আমি কি জানি। আগে আমি থিয়েটারের পোশাক আশাকের ইন-চার্জ ছিলুম। একদিন বিশুবাবু আমাকে একটা ছোট পার্ট নামিয়ে দিলেন। সেই থেকে (হেসে) আমার চেহারার মানানসই পার্ট থাকলে আমি করি।
প্রশ্ন : বিশুবাবু কেমন লোক ছিলেন?
উত্তর দিলাদরিয়া লোক ছিলেন। টাকা তাঁর হাতের ময়লা ছিল, যেমন রোজগার করতেন তেমনি খরচ করতেন। কিন্তু মদ খেতেন না, বদখেয়ালি ছিল না।
প্রশ্ন : প্রভুনারায়ণের বোনের সঙ্গে কিছু ছিল?
উত্তর : ওসব বাজে। গুজব, আমি বিশ্বাস করি না।
প্রশ্ন : সুলোচনা কেমন মানুষ?
উত্তর : (একটু থেমে) সুলোচনা ভাল অভিনয় করে, মেয়েও ভাল, কিন্তু মনের কথা কাউকে বলে না। ভারি চাপা প্রকৃতির মেয়ে।
প্রশ্ন; আর মালবিক?
উত্তর : মালবিকা ছেলেমানুষ, কিন্তু মনে ছুই-ছুৎ আছে। ভালভাবে কারুর সঙ্গে মেশে না, একটু দূরত্র রেখে চলে। তবে মেয়ে ভাল।
প্রশ্ন : আর ওর স্বামী?’
উত্তর : মণীশ? একটু গভীর প্রকৃতি, কিন্তু ভাল ছেলে। আর ওর কাজের তুলনা নেই, আলো ফেলে নাটকের চেহারা বদলে দিতে পারে। আগে সাঁতারু ছিল, কিন্তু সাঁতারে তো পয়সা নেই, তাই থিয়েটারে ঢুকেছে।
প্রশ্ন : আর ব্রজদুলালবাবু?
উত্তর : মদ-টদ খান বটে। কিন্তু ভারি বিজ্ঞ লোক। এক সময় মুষ্টিযোদ্ধা ছিলেন, এখনো গায়ে অসুরের শক্তি। ওঁর স্ত্রী শাস্তিও ভারি গুণের মেয়ে; নাচতে জানে, গাইতে জানে, গানে সুর দিতে জানে। এখানকার মিউজিক মাস্টার।
প্রশ্ন : স্বামী-স্ত্রীতে সদ্ভাব আছে?
উত্তর : তা আছে বই কি। তবে যে-যার নিজের কাজে থাকে, কেউ কারুর বড় একটা খবর রাখে না।
প্রশ্ন : আজ যখন আলো নেভানো হয় আপনি কোথায় ছিলেন?
উত্তর : আমার স্বামী আর আমি স্টেজের পিছন দিকে একটা বেঞ্চিতে বসেছিলুম।
ইন্সপেক্টর একজন জমাদারকে ডেকে বললেন, ইনি বেহালায় থাকেন। এঁকে আর এর স্বামীকে পুলিসের গাড়িতে বাড়ি পৌঁছে দাও।’
কালীকিঙ্কর দাস। বয়স-৪০। জীবিকা-থিয়েটারের প্রমপটার। ঠিকানা’’ কৈলাস বোস লেন।
(অসমাপ্ত)