CastFM
টেক্সট সাইজ
120%
মার্জিন
5%
লাইন স্পেসিং
1.5

দুর্গরহস্য

পূর্বখণ্ড

ব্যোমকেশের শরীর সারাইবার জন্য সাঁওতাল পরগণার যে শহরে হাওয়া বদলাইতে গিয়াছিলাম, বছর না ঘুরিতেই যে আবার সেখানে যাইতে হইবে, তাহা ভাবি নাই। এবার কিন্তু স্বাস্থ্যের অন্বেষণে নয়, পুরন্দর পাণ্ডে মহাশয় যে নূতন শিকারের সন্ধান দিয়াছিলেন তাঁহারই অন্বেষণে ব্যোমকেশ ও আমি বাহির হইয়াছিলাম।

প্ৰথমবার যখন এ শহরে যাই, তখন এখানকার অনেকগুলি বাঙালীর সহিত পরিচয় হইয়াছিল, কিন্তু শহরের বাহিরেও যে একটি ধনী বাঙালী পরিবার বাস করেন, তাহা কেহ বলে নাই। এই পরিবারটিকে লইয়া এই বিচিত্ৰ কাহিনী। সুতরাং তাহার কথাই সবাগ্রে বলিব। সব কথা অবশ্য একসঙ্গে জানিতে পারি নাই, ছাড়া-ছাড়া ভাবে কয়েকজনের মুখে শুনিলাম। পাঠকের সুবিধার জন্য আরম্ভেই সেগুলিকে ধারাবাহিকভাবে সাজাইয়া দিলাম।

শহরের দক্ষিণ দিকে অর্থাৎ জংশন হইতে বিপরীত মুখে প্রায় ছয় মাইল পর্যন্ত একটি রাস্তা গিয়াছে। রাস্তাটি বহু পুরাতন; বাদশাহী আমলের। বড় বড় চৌকাশ পাথর দিয়া আচ্ছাদিত; পাথরের ফাঁকে ফাঁকে ঘাস ও আগাছা জন্মিয়াছে, কিন্তু তবু রাস্তার উপর দিয়া মোটর চালানো যায়। দুই পাশের শিলাকৰ্কশ বন্ধুরতাকে দ্বিধা ভিন্ন করিয়া পথ এখনও নিজের কঠিন অস্তিত্ব বজায় রাখিয়াছে।

এই পথের সর্পিল গতি যেখানে গিয়া শেষ হইয়াছে সেখানে পাশাপাশি দুটি ক্ষুদ্র গিরিচূড়া। কালিদাসের বর্ণনা মনে পড়ে ‘মধ্যে শ্যামঃ স্তন ইব। ভুবঃ।” বেশি উঁচু নয়, কিন্তু দুটি চুড়ার মাঝখানে খাঁজ পড়িয়াছে। উপমা কালিদাসস্য বাদ দিলেও দৃশ্যটি লোভনীয়।

চুড়া দুটি নিরাভরণ নয়। একটির মাথায় প্রাচীন কালের এক দুর্গের ভগ্নাবশেষ; অন্যটির শীর্ষে আধুনিক কালের চুনকাম করা বাড়ি। বাড়ি এবং দুর্গের মালিক শ্রীরামকিশোর সিংহ সপরিবারে এই স্থানে বাস করেন।

এইখানে প্রাচীন দুর্গ ও তাহার আধুনিক মালিকের কিছু পরিচয় আবশ্যক। নবাব আলিবর্দীর আমলে জানকীরাম নামক জনৈক দক্ষিণ রাঢ়ী কায়স্থ নবাবের বিশেষ প্রিয়পাত্ৰ হইয়া উঠিয়াছিলেন। ইনি রাজা জানকীরাম খেতাব পাইয়া কিছুকাল সুবা বিহার শাসন করিয়াছিলেন এবং প্রভুত ধনসম্পত্তি অর্জন করিয়াছিলেন। কিন্তু দেশে তখন ক্রান্তিকাল আরম্ভ হইয়াছে; ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মোগল বাদশাহী ভাঙ্গিয়া পড়িতেছে; দুর্দম মারাঠা বর্গী বারম্বার বাঙলা বিহারে হানা দিয়া চারিদিক ছারখার করিয়া দিতেছে; ইংরেজ বণিক বাণিজ্যের খোলস ছাড়িয়া রাজদণ্ডের দিকে হাত বাড়াইতেছে। দেশজোড়া অশান্তি; রাজা প্ৰজা ধনী দরিদ্র কাহারও চিত্তে সুখ নাই। রাজা জানকীরাম কুশাগ্ৰবুদ্ধি লোক ছিলেন; তিনি এই দুৰ্গম গিরি-সঙ্কটের মধ্যে একটি ক্ষুদ্র দুৰ্গ তৈয়ার করাইয়া তাঁহার বিপুল ধনসম্পত্তি এবং পরিবারবর্গকে এইখানে রাখিলেন।

তারপর রাষ্ট্রবিপ্লবের প্রবল প্লাবনে অনেক কিছুই ভাসিয়া গেল। কিন্তু জানকীরামের এই নিভৃত দুর্গ নিরাপদে রহিল। তাঁহার বংশধরগণ পুরুষানুক্রমে এখানে বাস করিতে লাগিল।

পলাশীর যুদ্ধের পর আরও একশত বছর কাটিয়া গেল।

কোম্পানীর শাসনে দেশ অনেকটা ঠাণ্ডা হইয়াছে। জানকীরামের দুর্গে তাঁহার অধস্তন চতুর্থ ও পঞ্চম পুরুষ বিদ্যমান-রাজারাম ও তৎপুত্র জয়রাম। রাজারাম বয়স্থ ব্যক্তি, পুত্র জয়রাম যুবক। পিতৃপুরুষের সঞ্চিত অর্থ ও পারিপার্শ্বিক জমিদারীর আয় হইতে স্বচ্ছন্দে সংসারযাত্রা চলিতেছে। সঞ্চিত অর্থ এই কয় পুরুষে হ্রাসপ্রাপ্ত না হইয়া আরও বাড়িয়াছে। জানকীরামের বংশধরদের স্বভাব ছিল টাকা হাতে আসিলেই তাহা স্বর্ণে রূপান্তরিত করিয়া রাখা; এইভাবে রাশি রাশি মোহর আসরফি তৈজস সঞ্চিত হইয়া ছিল ! কাহারও কোনও প্রকার বদখেয়াল ছিল না। এই জঙ্গলের মধ্যে বিলাস-ব্যসনের অবকাশ কোথায়?

হঠাৎ দেশে আগুন জ্বলিয়া উঠিল। সিপাহী বিদ্রোহের আগুন কেবল নগরগুলির মধ্যেই আবদ্ধ রহিল না। দাবানলের মত বনে জঙ্গলেও প্রসারিত হইল।

রাজারাম সংসারের কর্তা, তিনি উদ্বিগ্ন হইলেন। চারিদিকে লুঠতরাজ; কোথাও ইংরেজ দলের সিপাহীরা লুঠ করিতেছে, কোথাও বিদ্রোহী সিপাহীরা লুঠ করিতেছে। রাজারাম খবর পাইলেন একদল সিপাহী এইদিকে আসিতেছে। তিনি সম্পত্তি রক্ষার জন্য প্ৰস্তুত হইলেন।

কিন্তু সম্পত্তি রক্ষা করিবেন কী উপায়ে? শতবর্ষের পুরাতন দুর্গটি সুশিক্ষিত আগ্নেয়াস্ত্ৰধারী শত্রুর আক্রমণ রোধ করিতে সমর্থনয়। দুর্গের জীৰ্ণ তোরণদ্বার একটি গোলার আঘাতেই উড়িয়া যাইবে। দুর্গে একটি বড় কামান আছে বটে, কিন্তু দীর্ঘকাল অব্যবহারের ফলে উহা মরিচা পড়িয়া অকৰ্মণ্য হইয়াছে, উহার গোড়ার দিকের লৌহকপাট এমন জাম হইয়া গিয়াছে যে খোলা যায় না। তাছাড়া যে-কয়টি গাদা বন্দুক আছে, তাহার দ্বারা জঙ্গলে হরিণ শিকার বা চোর তাড়ানো চলিতে পারে, লুণ্ঠন-লোলুপ সিপাহীর দলকে ঠেকাইয়া রাখা একেবারেই অসম্ভব।

রাজারাম উপযুক্ত পুত্রের সহিত পরামর্শ করিয়া পরিবারস্থ নারী ও শিশুদের স্থানান্তরিত করিবার ব্যবস্থা করিলেন। দুর্গ হইতে কয়েক ক্রোশ দূরে ঘন জঙ্গলের মধ্যে একটি সাঁওতাল পল্লী ছিল, স্ত্রী পুত্র-বধু ও দুই তিনটি নাতি-নাতিনীকে সেইখানে পঠাইয়া দিলেন। দুর্গের সমস্ত ভৃত্য ও কর্মচারী সেই সঙ্গে গেল; কেবল পুত্ৰ জয়রাম সহ রাজারাম দুর্গে রহিলেন। বিদায়কালে রাজারাম গৃহিণীর অঞ্চলে কয়েকটি মোহর বাঁধিয়া দিলেন। বেশি মোহর দিতে সাহস হইল না, কি জানি বেশি সোনার লোভে পরিচরেরাই যদি বেইমানি করে। তারপর তাহারা প্ৰস্থান করিলে পিতাপুত্র মিলিয়া সঞ্চিত সোনা লুকাইতে প্রবৃত্ত হইলেন।

তিন দিন পরে ফিরিঙ্গী নায়কের অধীনে একদল সিপাহী আসিয়া উপস্থিত হইল। রাজারামের বোধ হয় ইচ্ছা ছিল, সোনা দানা লুকাইয়া রাখিয়া নিজেও পুত্রকে লইয়া দুর্গ হইতে অন্তহিঁত হইবেন; কিন্তু তাঁহারা পলাইতে পারিলেন না। সিপাহীরা অতর্কিতে উপস্থিত হইয়া নির্বিবাদে দুর্গে প্রবেশ করিল।

তারপর দুর্গের মধ্যে কি হইল কেহ জানে না। দুই দিন পরে সিপাহীরা চলিয়া গেল। রাজারাম জয়রামকে কিন্তু ইহলোকে আর কেহ দেখিল না। শূন্য দুর্গ পড়িয়া রহিল।

ক্ৰমে দেশ শান্ত হইল। কয়েক মাস পরে রাজারামের পরিবার ও অনুচরগণ ফিরিয়া আসিয়া দেখিল দুর্গের পাথরগুলি ছাড়া আর কিছুই নাই; তুলিয়া লইয়া যাইবার মত যাহা কিছু ছিল সিপাহীরা লইয়া গিয়াছে। দুর্গের স্থানে স্থানে, এমন কি ঘরের মেঝেয় সিপাহীরা পাথর তুলিয়া গর্ত খুঁড়িয়াছে; বোধকরি ভূ-প্রোথিত ধনরত্নের সন্ধান করিয়াছে। কিছু পাইয়াছে কিনা অনুমান করা যায় না, কারণ রাজারাম কোথায় ধনরত্ন লুকাইয়া রাখিয়াছিলেন তাহা কেবল তিনি এবং জয়রাম জানিতেন। হয়তো সিপাহীরা সব কিছুই লুটিয়া লইয়া গিয়াছে; হয়তো কিছুই পায় নাই, তাই পিতাপুত্রকে হত্যা করিয়া চলিয়া গিয়াছে।

অসহায়া দুইটি নারী কয়েকটি শিশুকে লইয়া কিছুকাল দুর্গে রহিল, কিন্তু যে দুর্গ একদিন গৃহ ছিল তাহা এখন শ্মশান হইয়া উঠিয়াছে। ক্ৰমে ভৃত্য ও কর্মচারীরা একে একে খসিয়া পড়িতে লাগিল; কারণ সংসারযাত্রা নির্বাহের জন্য শুধু গৃহই যথেষ্ট নয়, অন্নবস্ত্রেরও প্রয়োজন। অবশেষে একদিন দুইটি বিধবা শিশুগুলির হাত ধরিয়া দুৰ্গ হইতে বাহির হইয়া পড়িল। তাহারা কোথায় গিয়া আশ্রয় পাইল তাহার কোনও ইতিহাস নাই। সম্ভবত বাংলা দেশে কোনও দূর আত্মীয়ের ঘরে আশ্রয় পাইল। পরিত্যক্ত দুর্গ শৃগালের বাসভূমি হইল।

অতঃপর প্রায় ষাট বছর এই বংশের ইতিহাস অন্ধকারে আচ্ছন্ন। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে বংশের দুইটি যুবক আবার মাথা তুলিলেন। রামবিনোদ ও রামকিশোর সিংহ দুই ভাই। দারিদ্র্যের মধ্যে তাঁহারা মানুষ হইয়াছিলেন, কিন্তু বংশের ঐতিহ্য ভোলেন নাই। দুই ভাই ব্যবসা আরম্ভ করিলেন, এতদিন পরে কমলা আবার তাঁহাদের প্রতি মুখ তুলিয়া চাহিলেন। প্রথমে ঘৃতের, পরে লোহার কারবার করিয়া তাঁহারা লক্ষ লক্ষ টাকা উপার্জন করিলেন।

বড় ভাই রামবিনোদ। কিন্তু বেশিদিন বাঁচিলেন না। যৌবন কালেই হঠাৎ রহস্যময়ভাবে তাঁহার মৃত্যু হইল। রামকিশোর একাই ব্যবসা চালাইলেন এবং আরও অর্থ অর্জন করিলেন।

দিন কাটিতে লাগিল। রামকিশোর বিবাহ করিলেন, তাঁহার পুত্রকন্যা জন্মিল। তারপর বিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকের শেষে রামকিশোর প্রাচীন কালের পৈতৃক সম্পত্তি পুনরায় ক্রয় করিয়া দুর্গের পাশের দ্বিতীয় চূড়ায় নূতন গৃহ নির্মাণ করাইলেন, আশেপাশে বহু জমিদারী কিনিলেন এবং সপরিবারে শৈল-গৃহে বাস করিতে লাগিলেন। দুর্গটিকেও পূর্ব গৌরবের স্মৃতিচিহ্নস্বরূপ অল্প-বিস্তর মেরামত করানো হইল; কিন্তু তাহা আগের মতই অব্যবহৃত পড়িয়া রহিল।


পাথরের পাটি বসানো সাবেক পথটি গিরিচূড়ার পদমূলে আসিয়া শেষ হয় নাই কিছুদূর চড়াই উঠিয়াছে। যেখানে চড়াই আরম্ভ হইয়াছে, সেখানে পাথরের ধারে একটি বৃহৎ কৃপ। কুপের সরসতায় পুষ্ট হইয়া কয়েকটি বড় বড় গাছ তাহার চারিপাশে ব্যুহরচনা করিয়াছে।

এখান হইতে রাস্তা প্রায় পঞ্চাশ গজ চড়াই উঠিয়া দেউড়ির সম্মুখে শেষ হইয়াছে। তারপর পাথর-বাঁধানো সিঁড়ি সর্পজিহ্বার মত দুই ভাগ হইয়া দুই দিকে গিয়াছে; একটি গিয়াছে দুর্গের তোরণদ্বার পর্যন্ত, অন্যটি রামকিশোরের বাসভবনে উপনীত হইয়াছে।

দেউড়িতে মোটর রাখিবার একটি লম্বা ঘর এবং চালকের বাসের জন্য ছোট ছোট দুটি কুঠুরি। এখানে রামকিশোরের সাবেক মোটর ও তাহার সাবেক চালক বুলাকিলাল থাকে।

এখান হইতে সিঁড়ির যে ধাপগুলি রামকিশোরের বাড়ির দিকে উঠিয়াছে, সেগুলি একেবারে খাড়া ওঠে নাই, একটু ঘুরিয়া পাহাড়ের অঙ্গ বেড়িয়া উঠিয়াছে। চওড়া সিঁড়িগুলি বাড়ির সদর পর্যন্ত পৌঁছিয়াছে।

পাহাড়ের মাথার উপর জমি চৌরস করিয়া তাহার মাঝখানে বৃহৎ বাড়ি। বাড়ি ঘিরিয়া ফল-ফুলের বাগান, বাগান ঘিরিয়া ফণি-মনসার বেড়া। এখানে দাঁড়াইলে পাশেই শত হস্ত দূরে সর্বোচ্চ শিখরে ধূম্ৰবৰ্ণ দুর্গ দেখা যায়, উত্তরদিকে ছয় মাইল দূরে শহরটি অস্পষ্টভাবে চোখে পড়ে। দক্ষিণে চড়াইয়ের মূলদেশ হইতে জঙ্গল আরম্ভ হইয়াছে; যতদূর দৃষ্টি যায় নিবিড় তরুশ্রেণী। এ জঙ্গলটিও রামকিশোরের সম্পত্তি। শাল সেগুন আবলুস কাঠ হইতে বিস্তর আয় হয়।

রামকিশোর যখন প্রথম এই গৃহে অধিষ্ঠিত হইলেন, তখন তাঁহার বয়স চল্লিশের নীচেই; শরীরও বেশ মজবুত এবং নীরোগ। তথাপি অর্থপার্জনের জন্য দৌড়াদৌড়ির আর প্রয়োজন নাই বলিয়াই বোধ করি তিনি স্বেচ্ছায় এই অজ্ঞাতবাস বরণ করিয়া লইলেন। তাঁহার সঙ্গে আসিলেন তাঁহার স্ত্রী, দুইটি পুত্র, একটি কন্যা, বহু চাকর-বাকর এবং প্রবীণ নায়েব চাঁদমোহন দত্ত।

ক্রমে রামকিশোরের আর একটি পুত্র ও কন্যা জম্মিল। তারপর তাঁহার স্ত্রী গত হইলেন। পাঁচটি পুত্ৰ-কন্যার লালন-পালনের ভার রামকিশোরের উপর পড়িল।

পুত্ৰ-কন্যারা বড় হইয়া উঠিতে লাগিল। রামকিশোর কিন্তু পারিবারিক জীবনে সুখী হইতে পারিলেন না। বড় হইয়া ওঠার সঙ্গে সঙ্গে পুত্ৰ-কন্যাগুলির স্বভাব প্রকটিত হইয়া উঠিতে লাগিল। এই বন্য স্থানে সকল সংসৰ্গ হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া থাকার ফলে হয়তো তাহদের চরিত্র বিকৃত হইয়াছিল। বড় ছেলে বংশীধর দুর্দান্ত ক্রোধী, রাগ হইলে তাহার আর কাণ্ডজ্ঞান থাকে না। সে স্থানীয় স্কুলে ম্যাট্রিক পাশ করিয়া বহরমপুর কলেজে পড়িতে গেল। কিন্তু কয়েক মাস পরেই সেখানে কি একটা অতি গৰ্হিত দুষ্কর্ম করার ফলে তাহাকে কলেজ ছাড়িতে হইল। কলেজের কর্তৃপক্ষ তাহার দুস্কৃতির স্বরূপ প্রকাশ করিলেন না; কলেজের একজন অধ্যাপক ছিলেন রামকিশোরের বাল্যবন্ধু, তিনি ব্যাপারটাকে চাপা দিলেন। এমন কি রামকিশোরও প্রকৃত ব্যাপার জানিতে পারিলেন না। তিনি জানিতে পারিলে হয়তো অনর্থ ঘটিত।

বংশীধর আবার বাড়িতে আসিয়া বসিল। বাপকে বলিল, সে আর লেখাপড়া করিবে না, এখন হইতে জমিদারী দেখাশুনা করিবে। রামকিশোর বিরক্ত হইয়া বকাবকি করিলেন, কিন্তু ছেলের ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করিলেন না। বংশীধর জমিদারী তত্ত্বাবধান করিতে লাগিল। নায়েব চাঁদমোহন দত্ত হাতে ধরিয়া তাহাকে কাজ শিখাইলেন।

যথাসময়ে রামকিশোর বংশীধরের বিবাহ দিলেন। কিন্তু বিবাহের কয়েক মাস পরেই বধূর অপঘাত মৃত্যু হইল। বংশীধর গৃহে ছিল না, জমিদারী পরিদর্শনে গিয়াছিল। একদিন সকালে বধুকে গৃহে পাওয়া গেল না। অনেক খোঁজাখুঁজির পর দুই চুড়ার মধ্যবর্তী খাঁজের মধ্যে তাহার মৃতদেহ পাওয়া গেল ! বধু বোধ করি রাত্রে কোনও কারণে নিজের ঘর হইতে বাহির হইয়া খাদের কিনারায় গিয়াছিল, তারপর পা ফস্কাইয়া নীচে পড়িয়াছে। মৃত্যু রহস্যজনক। বংশীধর ফিরিয়া আসিয়া বধূর মৃত্যুর সংবাদে একেবারে ফাটিয়া পড়িল; উন্মত্ত ক্রোধে ভাই বোন কাহাকেও সে দোষারোপ করিতে বিরত হইল না। ইহার পর হইতে তাহার ভীষণ প্রকৃতি যেন ভীষণতর হইয়া উঠিল।

রামকিশোরের দ্বিতীয় পুত্র মুরলীধর; বংশীধরের চেয়ে বছর দেড়েকের ছোট। গিরগিটির মত রোগা হাড়-বাহির করা চেহারা, ধুর্তামিভরা ছুচালো মুখ; চোখ এমন সাংঘাতিক ট্যারা যে, কখন কোন দিকে তাকাইয়া আছে বুঝিতে পারা যায় না। তার উপর মেরুদণ্ডের ন্যুব্জতা শীর্ণ দেহটাকে ধনুকের মত বাঁকাইয়া দিয়াছে। মুরলীধর জন্মাবধি বিকলাঙ্গ। তাহার চরিত্রও বংশীধরের বিপরীত; সে রাগী নয়, মিটমিটে শয়তান। কিশোর বয়সে দুই ভায়ে একবার ঝগড়া হইয়াছিল, বংশী মুরলীর গালে একটি চড় মারিয়াছিল। মুরলীর গায়ে জোর নাই। সে তখন চড় হজম করিয়াছিল; কিন্তু কয়েকদিন পরে বংশী হঠাৎ এমন ভেদবমি আরম্ভ করিল যে যায়—যায় অবস্থা। এ ব্যাপারে মুরলীর যে কোনও হাত আছে তাহা ধরা গেল না; কিন্তু তদবধি বংশী আর কোনও দিন তাহার গায়ে হাত তুলিতে সাহস করে নাই। তর্জন গর্জন করিয়াই ক্ষান্ত হইয়াছে।

মুরলীধর লেখাপড়া শেখে নাই, তার উপর ওই চেহারা; বাপ তাহার বিবাহ দিলেন না। সে আপন মনে থাকে এবং দিবারাত্ৰ পান-সুপারি চিবায়। তাহার একটি খাস চাকর আছে, নাম গণপৎ। গণপৎ মুরলীধরেরই সমবয়স্ক; বেঁটে নিরেট চেহারা, গোল মুখ, চক্ষু দুটিও গোল, ভ্রুযুগল অর্ধচন্দ্ৰাকৃতি। তাহার মুখ দেখিয়া মনে হয় সে সর্বদাই শিশুসুলভ বিস্ময়ে আবিষ্ট হইয়া আছে। অথচ তাহার মত দুষ্ট খুব কম দেখা যায়। এমন দুষ্কর্ম নাই যাহা গণপতের অসাধ্য; নারীহরণ হইতে গৃহদাহ পর্যন্ত, প্রভুর আদেশ পাইলে সে সব কিছুই করিতে পারে। প্রভু-ভৃত্যের অবিচ্ছেদ্য সম্বন্ধ। শোনা যায়, ইহারা দুইজনে মিলিয়া অনেক দুষ্কৃতি করিয়াছে, কিন্তু কখনও ধরা পড়ে নাই।

রামকিশোরের তৃতীয় সস্তানটি কন্যা, নাম হরিপ্রিয়া। সে মুরলীধর অপেক্ষা বছর চারেকের ছোট; দেখিতে শুনিতে ভালই, কোনও শারীরিক বিকলতা নাই। কিন্তু তাহার চোখের দৃষ্টি যেন বিষমাখানো। মনও ঈর্ষার বিষে ভরা। হরিপ্রিয়া নিজের ভাই-বোনদের দুচক্ষে দেখিতে পারিত না। সকলের ছিদ্রান্বেষণ, পান হইতে চুম খসিলে তীব্ৰ অসন্তোষ এবং তদুপযোগী বচন-বিন্যাস, এই ছিল হরিপ্রিয়ার স্বভাব। বংশীধরের বিবাহের পর যখন নববধূ ঘরে আসিল, তখন হরিপ্রিয়ার ঈর্ষার জ্বালা দ্বিগুণ বাড়িয়া গেল। বধুটি ভােলমানুষ ও ভীরু স্বভাব; হরিপ্রিয়া পদে পদে তাহার খুৎ ধরিয়া তাহাকে অপদস্থ করিয়া বাক্যবাণে জর্জর করিয়া তুলিল।

তারপর অকস্মাৎ বধুর মৃত্যু হইল। এই দুর্যোগ কাটিয়া যাইবার কয়েক মাস পরে রামকিশোর কন্যার বিবাহ দিলেন। শ্বশুর-ঘর করিতে পরিবে না বুঝিয়া তিনি দেখিয়া শুনিয়া একটি গরীব ছেলের সঙ্গে তাহার বিবাহ দিলেন। ছেলেটির নাম মণিলাল; লেখাপড়ায় ভাল, বি. এস-সি. পাস করিয়াছে; স্বাস্থ্যবান, শান্ত প্রকৃতি, বিবাহের পর মণিলাল শ্বশুর গৃহে আসিয়া অধিষ্ঠিত হইল।

হরিপ্রিয়া ও মণিলালের দাম্পত্য জীবন সুখের হইল কিনা বাহির হইতে বোঝা গেল না। মণিলাল একেই চাপা প্রকৃতির যুবক, তার উপর দরিদ্র ঘরজামাই; আ-সুখের কারণ ঘটিলেও সে নীরব রহিল। হরিপ্রিয়াও নিজের স্বামীকে অন্যের কাছে লঘু করিল না। বরং তাহার ভ্রাতারা মণিলালকে লইয়া ঠাট্টা-তামাসা করিলে সে ফোঁস করিয়া উঠিত।

একটি বিষয়ে নবদম্পতির মধ্যে প্রকাশ্য ঐক্য ছিল। মণিলাল বিবাহের পর শ্বশুরের বিশেষ অনুরক্ত হইয়া পড়িয়াছিল। শ্যালকদের সহিত তাহার সম্পর্ক ছিল সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত, কাহারও প্রতি অনুরাগ বিরাগ ছিল না; কিন্তু শ্বশুরের প্রতি যে তাহার অসীম শ্রদ্ধা-ভক্তি আছে তাহা তাহার প্রতি বাক্যে ও আচরণে প্রকাশ পাইত। হরিপ্রিয়াও পিতাকে ভালবাসিত; পিতাকে ছাড়া আর কাহাকেও বোধ হয় সে অন্তরের সহিত ভালবাসিত না। ভালবাসিবার শক্তি হরিপ্রিয়ার খুব বেশি ছিল না।

হরিপ্রিয়ার পর দুটি ভাই বোন; কিশোর বয়স্ক গদাধর এবং সর্বকনিষ্ঠা তুলসী। গদাধর একটু হাবলা গোছের, বয়সের অনুযায়ী বুদ্ধি পরিণত হয় নাই। কাছ কোঁচার ঠিক থাকে না, অকারণে হি হি করিয়া হাসে। লেখাপড়ায় তাহারও মন নাই; গুলতি লইয়া বনে পাখি শিকার করিয়া বেড়ানো তাহার একমাত্র কাজ।

এই কাজে ছোট বোন তুলসী তাহার নিত্য সঙ্গিনী। তুলসীর বুদ্ধি কিন্তু গদাধরের মত নয়, বরং বয়সের অনুপাতে একটু বেশি। ছিপছিপে শরীর, সুশ্ৰী পাৎলা মুখ, অত্যন্ত চঞ্চল প্রকৃতি। দুপুরবেলা জঙ্গলের মধ্যে পাখির বাসা বা খরগোশের গর্ত খুঁজিয়া বেড়ানো এবং সকল বিষয়ে গদাধরের অভিভাবকতা করা তাহার কাজ। বাড়িতে কে কোথায় কি করিতেছে কিছুই তুলসীর চক্ষু এড়ায় না। সে কখন কোথায় থাকে তাহাও নির্ণয় করা কাহারও সাধ্য নয়। তবু সব ভাইবোনের মধ্যে তুলসীকেই বোধ হয় অপেক্ষাকৃত সহজ ও প্রকৃতিস্থ বলা চলে।

রামকিশোরের সংসারে পুত্রকন্যা ছাড়া আর একটি পোষ্য ছিল যাহার পরিচয় আবশ্যক। ছেলেটির নাম রমাপতি। দুঃস্থ স্বজাতি দেখিয়া রামকিশোর তাহাকে আশ্রয় দিয়াছিলেন। রমাপতি ম্যাট্রিক পাস; সে গদাধর ও তুলসীকে পড়াইবে এই উদ্দেশ্যেই রামকিশোর তাহাকে গৃহে রাখিয়াছিলেন। রমাপতির চেষ্টার ক্রটি ছিল না, কিন্তু ছাত্রছাত্রীর সহিত মাস্টারের সাক্ষাৎকার বড় একটা ঘটিয়া উঠিত না। রমাপতি মুখচোরা ও লাজুক স্বভাবের ছেলে, ছাত্রছাত্রী তাহাকে অগ্রাহ্য করিত; বাড়ির অন্য সকলে তাহার অকিঞ্চিৎকর অস্তিত্ব লক্ষ্যই করিত না। এমনিভাবে দু'বেলা দুমুঠি অন্ন ও আশ্রয়ের জন্য রমাপতি বাড়ির এক কোণে পড়িয়া থাকিত।

নায়েব চাঁদমোহন দত্তের উল্লেখ পূর্বেই হইয়াছে। তিনি রামকিশোর অপেক্ষা পাঁচ-ছয় বছরের বড়; রামকিশোরের কর্ম-জীবনের আরম্ভ হইতে তাঁহার সঙ্গে আছেন। বংশীধর জমিদারী পরিচালনার ভার নিজ হস্তে গ্রহণ করিবার পর তাঁহার একপ্রকার ছুটি হইয়াছিল। কিন্তু তিনি কাজকর্মের দিকে সতর্কদৃষ্টি রাখিতেন; আয় ব্যয় হিসাব নিকাশ সমস্তই তাঁহার অনুমোদনের অপেক্ষা রাখিত। লোকটি অতিশয় হুঁশিয়ার ও বিষয়ক্তজ্ঞ; দীর্ঘকাল একত্ৰ থাকিয়া বাড়ির একজন হইয়া গিয়াছিলেন।

রামকিশোর পারিবারিক জীবনে সুখী হইতে পারেন নাই সত্য, কিন্তু স্নেহের বশে এবং বয়োধর্মে মানুষের সহনশীলতা বৃদ্ধি পায়। যৌবনকালে তাঁহার প্রকৃতি দুৰ্জয় ও অসহিষ্ণু ছিল, এখন অনেকটা নরম হইয়াছে। পূর্বে পুরুষকারকেই চূড়ান্ত বলিয়া মানিতেন, এখন অদৃষ্টকে একেবারে অস্বীকার করেন না। ধর্মকর্মের প্রতি অধিক আসক্তি না থাকিলেও ঠাকুরদেবতার প্রতি অশ্রদ্ধা প্ৰদৰ্শন করেন না। তাঁহার স্ত্রী ছিলেন গোঁড়া বৈষ্ণব বংশের মেয়ে, হয়তো তাঁহার প্রভাব রামকিশোরের জীবনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয় নাই। অন্তত পুত্রকন্যাদের নামকরণের মধ্যে সে প্রভাবের ছাপ রহিয়া গিয়াছে।

তবু, কদাচিৎ কোনও কারণে ধৈর্য্যুতি ঘটিলে তাঁহার প্রচণ্ড অন্তঃপ্রকৃতি বাহির হইয়া আসিত, কলসীর মধ্যে আবদ্ধ দৈত্যের মত কঠিন হিংস্ৰ ক্ৰোধ প্রকাশ হইয়া উঠিত। তখন তাঁহার সম্মুখে কেহ দাঁড়াইতে পারিত না, এমন কি বংশীধর পর্যন্ত ভয়ে পিছাইয়া যাইত। তাঁহার ক্ৰোধ কিন্তু বেশিক্ষণ স্থায়ী হইত না, দপি করিয়া জ্বলিয়া আবার দপ করিয়া নিভিয়া যাইত।

হরিপ্রিয়ার বিবাহের আট-নয় মাস পরে শীতের শেষে একদল বেদে-বেদেনী আসিয়া কুয়ার সন্নিকটে আস্তানা গাড়িল। তাঁহাদের সঙ্গে একপাল গাধা কুকুর মুরগী সাপ প্রভৃতি জন্তুজানোয়ার। তাহারা রাত্রে ধুনি জ্বালিয়া মদ্যপান করিয়া মেয়ে-মদ নাচগান হুল্লোড় করে, দিনের বেলা জঙ্গলে কাঠ কাটে, ফাঁদ পাতিয়া বনমোরগ খরগোশ ধরে, কুপের জল যথেচ্ছা ব্যবহার করে। বেদে জাতির নীতিজ্ঞান কোনও কালেই খুব প্রখর নয়।

রামকিশোর প্রথমটা কিছু বলেন না, কিন্তু ক্ৰমে উত্যক্ত হইয়া উঠিলেন। সবচেয়ে আশঙ্কার কথা, গদাধর ও তুলসী আহার নিদ্ৰা ত্যাগ করিয়া বেদের তাঁবুগুলির আশেপাশে ঘুরিয়া বেড়াইতে লাগিল, অনেক শাসন করিয়াও তাঁহাদের বিনিদ্র কৌতুহল দমন করা গেল না। বাড়ির বয়স্থ লোকেরা অবশ্য প্রকাশ্যে বেদে-পল্লীকে পরিহার করিয়া চলিল; কিন্তু রাত্রির অন্ধকারে বাড়ির চাকর-বাকর এবং মালিকদের মধ্যে কেহ কেহ যে সেখানে পদার্পণ করিত তাহা অনুমান করা যাইতে পারে। বেদেনী যুবতীদের রূপ যত না থাক মোহিনী শক্তি আছে।

হাপ্তাখানেক এইভাবে কাটিবার পর একদিন কয়েকজন বেদে-বেদেনী একেবারে রামকিশোরের সদরে আসিয়া উপস্থিত হইল এবং শিলাজিৎ, কিন্তুরী মৃগের নাভি, সাপের বিষ, গন্ধকমিশ্র সাবান প্রভৃতির পসরা খুলিয়া বসিল। বংশীধর উপস্থিত ছিল, সে মার-মার করিয়া তাহাদের তাড়াইয়া দিল। রামকিশোর হুকুম দিলেন, আজই যেন তাহারা এলাকা ছাড়িয়া চলিয়া যায়।

বেদেরা এই আদেশ পালন করিলা বটে, কিন্তু পুরাপুরি নয়। সন্ধ্যার সময় তাহারা ডেরাডাণ্ডা তুলিয়া দুই তিন শত গজ দূরে জঙ্গলের কিনারায় গিয়া আবার আস্তানা গাড়িল। পরদিন সকালে বংশীধর তাহা দেখিয়া একেবারে অগ্নিশর্মা হইয়া উঠিল। বন্দুক লইয়া সে তাঁবুতে উপস্থিত হইল, সঙ্গে কয়েকজন চাকর। বংশীধরের হুকুম পাইয়া চাকরেরা বেদেদের পিটাইতে আরম্ভ করিল, বংশীধর বন্দুকের ফাঁকা আওয়াজ করিল। এবার বেদেরা সত্যই এলাকা ছাড়িয়া পলায়ন করিল।

আপদ দূর হইল বটে, কিন্তু নায়েব চাঁদমোহন মাথা নাড়িয়া বলিলেন, কাজটা বোধহয় ভাল হল না। ব্যাটারা ভারি শয়তান, হয়তো অনিষ্ট করবার চেষ্টা করবে।

বংশীধর উদ্ধতভাবে বলিল, “কি অনিষ্ট করতে পারে ওরা?

চাঁদমোহন বলিলেন, তা কি বলা যায়। হয়তো কুয়োয় বিষ ফেলে দিয়ে যাবে, নয়তো জঙ্গলে আগুন লাগিয়ে দেবে--

কিছুদিন সকলে সতর্ক রহিলেন, কিন্তু কোনও বিপদাপদ ঘটিল না। বেদেরা কোনও প্রকার অনিষ্ট করিবার চেষ্টা করে নাই, কিম্বা করিলেও তাঁহা ফলপ্রসূ হয় নাই।

মাসখানেক পরে রামকিশোর পরিবারবর্গকে লইয়া জঙ্গলের মধ্যে বনভোজনে গেলেন। ইহা তাঁহার একটি বাৎসরিক অনুষ্ঠান। বনের মধ্যে চাঁদোয়া টাঙানো হয়; ভূত্যেরা পাঠ কাটিয়া রন্ধন করে; ছেলেরা বন্দুক লইয়া জঙ্গলের মধ্যে পশুপক্ষীর সন্ধানে ঘুরিয়া বেড়ায়। কত চাঁদােয়ার তলে বসিয়া চাঁদমোহনের সঙ্গে দুচার বাজি দাবা খেলেন। তারপর অপরাহুে সকলে গৃহে ফিরিয়া আসেন।

সকালবেলা দলবল লইয়া রামকিশোর উদ্দিষ্ট স্থানে উপস্থিত হইলেন। ঘন শালবনের মধ্যে একটি স্থান পরিষ্কৃত হইয়াছে; মাটির উপর শতরঞ্চি পাতা, মাথার উপর চন্দ্ৰাতপ। পাচক উনান জ্বলিতেছে, চাকর-বাকর রান্নার উদ্যোগ করিতেছে। মোটর চালক বুলাকিলাল একরাশ সিদ্ধির পাতা লইয়া হামানদিস্তায় কুটিতে বসিয়াছে, বৈকালে ভাঙের সরবৎ হইবে। আকাশে স্বর্ণাভ রৌদ্র, শালবনের ছায়ায় স্নিগ্ধ হইয়া বাতাস মৃদুমন্দ প্রবাহিত হইতেছে। কোথাও কোনও দুর্লক্ষিণের চিহ্নমাত্র নাই।

দুই বৃদ্ধ চন্দ্ৰাতপতলে বসিয়া দাবার ছক পাতিলেন; আর সকলে বনের মধ্যে এদিক ওদিক অদৃশ্য হইয়া গেল। বংশীধর বন্দুক কাঁধে ফেলিয়া এক দিকে গেল, মুরলীধর নিত্যসঙ্গী গণপৎকে লইয়া অন্য দিকে শিকার সন্ধানে গেল। দু’জনেই ভাল বন্দুক চালাইতে পারে। গদাধর ও তুলসী একসঙ্গে বাহির হইল; মাস্টার রমাপতি দূরে দূরে থাকিয়া তাহাদের অনুসরণ করিল। কারণ ঘন জঙ্গলের মধ্যে বালকবালিকাদের পথ হারানো অসম্ভব নয়। রামকিশোর বলিয়া দিয়াছিলেন, ওদের চোখে চোখে রেখো।

জামাই মণিলাল একখানা বই লইয়া আস্তানা হইতে কিছু দূরে একটা গাছের আড়ালে গিয়া বসিল। রামকিশোর তাহাকে তন্ত্র সম্বন্ধে একটি ইংরেজি বই দিয়াছিলেন, তাহাঁই সে মনোযোগের সহিত দাগ দিয়া পড়িতেছিল। তাহার শিকারের শখ নাই।

বাকি রহিল কেবল হরিপ্রিয়া। সে কিছুক্ষণ রান্নার আয়োজনের আশেপাশে ঘুরিয়া বেড়াইল, একবার স্বামীর গাছতলার দিকে গেল, তারপর একাকিনী বনের মধ্যে প্ৰবেশ করিল। আজ একদিনের জন্য সকলে স্বাধীন হইয়াছে; একই বাড়িতে এতগুলো লোক একসঙ্গে থাকিয়া যেন পরম্পরের সান্নিধ্যে হাঁপাইয়া উঠিয়াছিল, তাই বনের মধ্যে ছাড়া পাইয়া একটু নিঃসঙ্গতা উপভোগ করিয়া লইতেছে।

বেলা বাড়িতে লাগিল। দুই বৃদ্ধ খেলায় মগ্ন হইয়া গিয়াছেন, জঙ্গলের অভ্যন্তর হইতে থাকিয়া থাকিয়া বন্দুকের আওয়াজ ভাসিয়া আসিতেছে, রন্ধনের সুগন্ধ বাতাস আমোদিত করিয়া তুলিয়াছে। গাছের পাতার ফাঁকে ফাঁকে গিরিচুড়ার চুনকাম করা বাড়ি এবং ভাঙা দুর্গ দেখা যাইতাছে। বেশি দূর নয়, বড় জোর আধ মাইল। ভাঙা দুর্গের ছায়া মাঝের খাদ লঙ্ঘন করিয়া সাদা বাড়ির উপর পড়িয়াছে।

হঠাৎ একটা তীব্র একটানা চীৎকার অলস বনমর্মরকে ছিন্নভিন্ন করিয়া দিল। দাবা খেলোয়াড় দুইজন চমকিয়া চোখ তুলিলেন। গাছের তলায় মণিলাল বই ফেলিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল। দেখা গেল, তুলসী শালবনের আলোছায়ার ভিতর দিয়া উৰ্ধৰ্বশ্বাসে ছুটিয়া আসিতেছে এবং তারস্বরে চীৎকার করিতেছে।

তুলসী চাঁদোয়া পর্যন্ত পৌঁছবার পূর্বেই মণিলাল তাহাকে ধরিয়া ফেলিল, তাহার কাঁধে একটা প্রবল ঝাঁকানি দিয়া বলিল, এই তুলসী ! কি হয়েছে ! চেঁচাচ্ছিস কেন?

তুলসী পাগলের মত ঘোলাটে চোখ তুলিয়া ক্ষণেক চাহিয়া রহিল, তারপর আগের মতই চীৎকার করিয়া বলিল, দিদি ! গাছতলায় পড়ে আছে-বোধহয় মরে গেছে! শীগগির এসো-বাবা, জেঠামশাই, শীগগির এসো।

তুলসী যেদিক হইতে আসিয়াছিল। আবার সেই দিকে ছুটিয়া চলিল; মণিলালও তাহার সঙ্গে সঙ্গে ছুটিল। দুই বৃদ্ধ আলুথালুভাবে তাঁহাদের অনুসরণ করিলেন।

প্রায়-দুইশত গজ দূরে ঘন গাছের ঝোপ; তুলসী ঝোপের কাছে আসিয়া একটা গাছের নীচে অঙ্গুলি নির্দেশ করিল। হরিপ্রিয়া বাসন্তী রঙের শাড়ি পরিয়া আসিয়াছিল, দেখা গেল সে ছায়াঘন গাছের তলায় পড়িয়া আছে, আর, কে একটা লোক তাহার শরীরের উপর ঝুকিয়া নিরীক্ষণ করিতেছে।

পদশব্দ শুনিয়া রমাপতি উঠিয়া দাঁড়াইল। তাহার মুখ ভয়ে শীর্ণ, সে স্থলিত স্বরে বলিল, সাপ ! সাপে কামড়েছে।

মণিলাল তাহাকে ঠেলিয়া দূরে সরাইয়া দিল, তারপর দুই বাহু দ্বারা হরিপ্রিয়াকে তুলিয়া লইল। হরিপ্রিয়ার তখন জ্ঞান নাই। বাঁ পায়ের গোড়ালির উপর সাপের দাঁতের দাগ; পাশাপাশি দুটি রক্তবর্ণ চিহ্ন।

হরিপ্রিয়া বাঁচিল না, বাড়িতে লইয়া যাইতে যাইতে পথেই তাহার মৃত্যু হইল।

জঙ্গলে ইতিপূর্বে কেহ বিষধর সাপ দেখে নাই। এবারও সাপ চোখে দেখা গেল না বটে, কিন্তু সাপের অস্তিত্ব সম্বন্ধে সন্দেহ রহিল না; এবং ইহা যে বেদেদের কাজ, তাহারাই প্ৰতিহিংসা চরিতার্থকরিবার উদ্দেশ্যে জঙ্গলে সাপ কিম্বা সাপের ডিম ছাড়িয়া দিয়া গিয়াছে, তাহাও একপ্রকার স্বতঃসিদ্ধ হইয়া পড়িল। কিন্তু বেদের দল তখন বহুদূরে চলিয়া গিয়াছে, তাহাদের সন্ধান পাওয়া গেল না।

হরিপ্রিয়ার মৃত্যুর পর কিছুদিন রামকিশোরের বাড়ির উপর অভিশাপের মত একটা থমথমে ছায়া চাপিয়া রহিল। রামকিশোর তাঁহার সকল সন্তানদের মধ্যে হরিপ্রিয়াকেই বোধহয় সবচেয়ে বেশি ভালবাসিতেন; তিনি দারুণ আঘাত পাইলেন। মণিলাল অতিশয় সম্বৃতচরিত্র যুবক, কিন্তু সেও এই আকস্মিক বিপর্যয়ে কেমন যেন উদভ্ৰান্ত দিশহারা হইয়া গেল। অপ্রত্যাশিত ভূমিকম্পে তাহার নবগঠিত জীবনের ভিত্তি একেবারে ধ্বসিয়া গিয়াছিল।

আর একজন এই অনৰ্থপাতে গুরুতরভাবে অভিভূত হইয়াছিল, সে তুলসী। তুলসী যে তাহার দিদিকে খুব বেশি ভালবাসিত তা নয়, বরং দুই বোনের মধ্যে খিটিমিটি লাগিয়াই থাকিত। হরিপ্রিয়া সুযোগ পাইলেই তুলসীকে শাসন করিত, ঘরে বন্ধ করিয়া রাখিত। তবু, হরিপ্রিয়ার মৃত্যু চোখের সামনে দেখিয়া তুলসী কেমন যেন বুদ্ধিভ্রষ্ট হইয়া পড়িয়াছিল। সেদিন বনের মধ্যে বেড়াইতে বেড়াইতে সে অদূরে গাছতলায় হলুদবৰ্ণ শাড়ি দেখিয়া সেই দিকে গিয়াছিল; তারপর দিদিকে ঐভাবে পড়িয়া থাকিতে দেখিয়া ভীতভাবে ডাকাডাকি করিয়াছিল। হরিপ্রিয়া কেবল একবার চোখ মেলিয়া চাহিয়াছিল, কথা বলিবার চেষ্টা করিয়াছিল।

সেই হইতে তুলসীর ধন্দ লাগিয়া গিয়াছিল। ভূতগ্ৰস্তের মত শঙ্কিত চক্ষু মেলিয়া সে বাড়িময় ঘুরিয়া বেড়াইত; কেহ কিছু জিজ্ঞাসা করিলে ফ্যাল ফ্যাল করিয়া চাহিয়া থাকিত। তাহার অপরিণত স্নায়ুমণ্ডলীর উপর যে কঠিন আঘাত লাগিয়াছিল তাহাতে সন্দেহ নাই।

বংশীধর এবং মুরলীধরও ধাক্কা পাইয়াছিল। কিন্তু এতটা নয়। বংশীধর গুম হইয়া গিয়াছিল; মনে মনে সে হয়তো হরিপ্রিয়ার মৃত্যুর জন্য নিজেকে দোষী করিতেছিল; বেদেদের উপর অতটা জুলুম না করিলে বোধ হয় এ ব্যাপার ঘটিত না। মুরলীধরের বাহ্য চালচলনে কোনও পরিবর্তন দেখা যায় নাই বটে। কিন্তু সেও কচ্ছপের মত নিজেকে নিজের মধ্যে গুটাইয়া লইয়াছিল। দুই ভ্ৰাতার মধ্যে কেবল একটি বিষয়ে ঐক্য হইয়াছিল, দুইজনেই মণিলালকে বিষচক্ষে দেখিতে আরম্ভ করিয়াছিল। যেন হরিপ্রিয়ার মৃত্যুর জন্য মণিলালই দায়ী।

হরিপ্রিয়ার মৃত্যুর একমাস পরে মণিলাল রামকিশোরের কাছে গিয়া বিদায় চাহিল। এ সংসারের সহিত তাহার সম্পর্ক ঘুচিয়া গিয়াছে, এই কথার উল্লেখ করিয়া সে সজল চক্ষে বলিল, আপনার স্নেহ কখনও ভুলব না। কিন্তু এ পরিবারে আর তো আমার স্থান নেই।

রামকিশোরের চক্ষুও সজল হইল। তিনি বলিলেন, কোন স্থান নেই? যে গেছে সে তো গেছেই, আবার তোমাকেও হারাবো? তা হবে না। তুমি থাকো। যদি ভগবান করেন আবার হয়তো সম্পর্ক হবে।

বংশীধর ও মুরলীধর উপস্থিত ছিল। বংশীধর মুখ কালো করিয়া উঠিয়া গেল; মুরলীধরের ঠোঁটে অসন্তোষ বাঁকা হইয়া উঠিল। ইঙ্গিতটা কাহারও বুঝিতে বাকি রহিল না।

মণিলাল রহিয়া গেল। পূর্বাপেক্ষাও নিম্পৃহ এবং নির্লিপ্তভাবে ভূতপূর্ব শ্বশুরুগৃহে বাস করিতে লাগিল।

অতঃপর বছর দুই নিরুপদ্রবে কাটিয়া গিয়াছে। রামকিশোরের সংসার আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়া আসিয়াছে। কেবল তুলসী পূর্বের মত ঠিক প্রকৃতিস্থ হইল না। তাহার মনে এমন গুরুতর ধাক্কা লাগিয়াছিল, যাহার ফলে তাহার দৈহিক ও মানসিক বৃদ্ধি নিরুদ্ধ হইয়া গিয়াছিল। দশ বছর বয়সে তাহার দেহ-মন যেরূপ অপরিণত ছিল, তের বছরে পা দিয়াও তেমনি অপরিণত আছে। মোট কথা, যৌবনোদগমের স্বাভাবিক বয়সে উপনীত হইয়াও সে বালিকাই রহিয়া গিয়াছে।

উপরন্তু তাহার মনে আর একটি পরিবর্তন ঘটিয়াছে। যে-মাস্টারের প্রতি পূর্বে তাহার অবহেলার অন্ত ছিল না, অহেতুকভাবে সে সেই মাস্টারের অনুরক্ত হইয়া পড়িয়াছে। ইহাতে মাস্টার রমাপতি যতটা আনন্দিত হইয়াছে, তাহার অধিক সঙ্কোচ ও অশান্তি অনুভব করিতেছে। কারণ অবহেলায় যাহারা অভ্যস্ত, একটু সমাদর পাইলে তাহারা বিব্রত হইয়া ওঠে।

যাহোক, রামকিশোরের সংসার-যন্ত্র আবার সচল হইয়াছে এমন সময় বাড়িতে একজন অতিথি আসিলেন। ইনি রামকিশোরের যৌবনকালের বন্ধু। আসলে রামকিশোরের দাদা রামবিনোদের সহিত তাঁহার গাঢ় বন্ধুত্ব ছিল। রামবিনোদের অকালমৃত্যুর পর রামকিশোরের সহিত তাঁহার সখ্য-বন্ধন শিথিল হইয়াছিল বটে, কিন্তু প্রীতির সূত্র একেবারে ছিন্ন হয় নাই। ইনি কলেজের অধ্যাপক ছিলেন, সম্প্রতি অবসর লইয়াছেন। নাম ঈশানচন্দ্র মজুমদার। কয়েক বছর আগে বংশীধর যখন কলেজে দুস্কৃতি করার ফলে বিতাড়িত হইতেছিল, তখন ইনিই তাহাকে রক্ষা করিয়াছিলেন।

অধ্যাপক ঈশানচন্দ্রের চেহারা তপঃকৃশ সন্ন্যাসীর ন্যায় শুষ্কশীর্ণ প্রকৃতি ঈষৎ তিক্তর সাক্ত। অবসর গ্রহণ করিবার পর তাঁহার স্বাস্থ্য ভাঙ্গিয়াছিল, অর্থেরও বোধকরি অনটন ঘটিয়াছিল। তিনি পূর্ব ঘনিষ্ঠতা স্মরণ করিয়া রামকিশোরকে পত্র লিখিলেন; তোমাদের অনেকদিন দেখি নাই, কবে আছি কবে নাই, ওখানকার জলহাওয়া নাকি ভাল, ইত্যাদি। রামকিশোর উত্তরে অধ্যাপক মহাশয়কে সাদর আমন্ত্রণ জানাইয়া পত্র লিখিলেন, এখানকার স্বাস্থ্য খুবই ভাল, তুমি এস, দু’এক মাস থাকিলেই শরীর সারিয়া যাইবে।

যথাসময়ে ঈশানচন্দ্ৰ আসিলেন এবং বাড়িতে অধিষ্ঠিত হইলেন। বংশীধর কিছু জানিত না, সে খাস-আবাদী ধান কাটাইতে গিয়াছিল; বাড়ি ফিরিয়া ঈশানচন্দ্রের সঙ্গে তাহার মুখোমুখি দেখা হইয়া গেল। বংশীধর ভূত দেখার মত চমকিয়া উঠিল; তাহার মুখ সাদা হইয়া গিয়া আবার ধীরে ধীরে লাল হইয়া উঠিল। সে ঈশানচন্দ্রের কাছে আসিয়া চাপা গলায় বলিল, আপনি এখানে?

ঈশানচন্দ্ৰ কিছুক্ষণ একদৃষ্টি প্রাক্তন শিষ্যের পানে চাহিয়া থাকিয়া শুষ্কম্বরে বলিলেন, এসেছি। তোমার আপত্তি আছে নাকি?

বংশীধর তাঁহার হাত ধরিয়া টানিয়া বলিল, শুনে যান। একটা কথা আছে।

আড়ালে গিয়া গুরুশিষ্যের মধ্যে কি কথা হইল, তাহা কেহ জানিল না। কিন্তু বাক্যবিনিময় যে আনন্দদায়ক হয় নাই। তাহা প্ৰমাণ হইল যখন ঈশানচন্দ্র রামকিশোরকে গিয়া বলিলেন যে, তিনি আজই চলিয়া যাইতে চান। রামকিশোর তাঁহার অনেক সাধ্যসাধনা করিলেন; শেষ পর্যন্ত রফা হইল অধ্যাপক মহাশয় দুর্গে গিয়া থাকিবেন। দুর্গের দু’একটি ঘর বাসোপযোগী আছে; অধ্যাপক মহাশয়ের নির্জনবাসে আপত্তি নাই। তাঁহার খাদ্য দুর্গে পৌঁছাইয়া দেওয়া হইবে।

সেদিন সন্ধ্যায় ঈশানচন্দ্ৰকে দুর্গে প্রতিষ্ঠিত করিয়া রামকিশোর ফিরিয়া আসিলেন এবং বংশীধরকে ডাকিয়া পাঠাইলেন। পিতাপুত্রে সওয়াল জবাব চলিল। হঠাৎ রামকিশোর খড়ের আগুনের মত জ্বলিয়া উঠিলেন এবং উগ্ৰকণ্ঠে পুত্ৰকে ভৎসনা করিলেন। বংশীধর কিন্তু চেঁচামেচি করিল না, আরক্ত চক্ষে নিস্ফল ক্ৰোধ ভরিয়া তিরস্কার শুনিল।

যাহাকে, ঈশানচন্দ্ৰ দুর্গে বাস করিতে লাগিলেন। রাত্রে তিনি একাকী থাকেন। কিন্তু দিনের বেলা বংশীধর ও মুরলীধর ছাড়া বাড়ির আর সকলেই দুর্গে যাতায়াত করে। মুরলীধর অধ্যাপক মহাশয়ের উপর মর্মান্তিক চটিয়াছিল, কারণ তিনি দুর্গ অধিকার করিয়া তাহার গোপন কেলিকুঞ্জটি কাড়িয়া লইয়াছিলেন।

অতঃপর একপক্ষ নির্ঝঞ্ঝাটে কাটিয়া গেল। একদিন সন্ধ্যার সময় রামকিশোর ঈশানচন্দ্রের সহিত দেখা করিতে যাইতেছিলেন, দেউড়ি পর্যন্ত নামিয়া দুর্গের সিঁড়ি ধরিবেন, দেখিতে পাইলেন কুয়ার কাছে তরুগুচ্ছের ভিতর হইতে ধূঁয়া বাহির হইতেছে। কৌতুহলী হইয়া তিনি সেইদিকে গেলেন। দেখিলেন, বৃক্ষতলে এক সাধু ধুনি জ্বালিয়া বসিয়া আছেন।

সাধুর অঙ্গ বিভূতিভূষিত, মাথায় জটা, মুখে কাঁচা-পাকা দাড়ি-গোঁফ। রামকিশোর এবং সাধুবাবা অনেকক্ষণ স্থির নেত্রে পরস্পর নিরীক্ষণ করিলেন। তারপর সাধুবাবার কণ্ঠ হইতে খল খল হাস্য নিৰ্গত হইল।

রামকিশোরের দুর্গে যাওয়া হইল না। তিনি ফিরিয়া আসিয়া শয্যায় শয়ন করিলেন। কিছুক্ষণ পরে তাঁহার তাড়স দিয়া জ্বর আসিল। জ্বরের ঘোরে তিনি উচ্চকণ্ঠে প্ৰলাপ বকিতে লাগিলেন।

ডাক্তার আসিল। প্ৰলাপ বন্ধ হইল, জ্বরও ছাড়িল। রামকিশোর ক্রমে সুস্থ হইলেন। কিন্তু দেখা গেল তাঁহার হৃদয়ত্ব গুরুতরভাবে জখম ইয়াছে। পূর্বে তাঁহার হৃদযন্ত্র বেশ মজবুত আরও একপক্ষ কাটিল। ঈশানচন্দ্র পূর্ববৎ দুর্গে রহিলেন। সাধুবাবাকে বৃক্ষমূল হইতে কেহ তাড়াইবার চেষ্টা করিল না। ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখিলে ডরায়, বেদেদের লইয়া যে ব্যাপার ঘটিয়া গিয়াছে তাহার পুনরিভনয় বাঞ্ছনীয় নয়।

উত্তরখণ্ড

একদিন কার্তিক মাসের সকালবেলা ব্যোমকেশ ও আমি আমাদের হ্যারিসন রোডের বাসায় ডিম্ব সহযোগে চা-পান শেষ করিয়া খবরের কাগজ লইয়া বসিয়াছিলাম। সত্যবতী বাড়ির ভিতর গৃহকর্মে নিযুক্ত ছিল। পুঁটিরাম বাজারে গিয়াছিল।

ব্যোমকেশের বিবাহের পর আমি অন্য বাসা লইবার প্রস্তাব করিয়াছিলাম; কারণ নবদম্পতির জীবন নির্বিঘ্ন করা বন্ধুর কাজ। কিন্তু ব্যোমকেশ ও সত্যবতী আমাকে যাইতে দেয় নাই। সেই অবধি এই চার বছর আমরা একসঙ্গে বাস করিতেছি। ব্যোমকেশকে পাইয়া আমার ভ্রাতার অভাব দূর হইয়াছিল; সত্যবতীকে পাইয়াছি একাধারে ভগিনী ও ভ্রাতৃবধুরূপে। উপরন্তু সম্প্রতি ভ্রাতুষ্পপুত্র লাভের সম্ভাবনা আসন্ন হইয়াছে। আশাতীত সুখ ও শান্তির মধ্যে জীবনের দিনগুলা কাটিয়া যাইতেছে।

ভাগ করিয়া খবরের কাগজ পাঠ চলিতেছিল। সামনের পাতা আমি লইয়াছিলাম, ব্যোমকেশ। লইয়াছিল ভিতরের পাতা। সংবাদপত্রের সদরে মোটা অক্ষরে যেসব খবর ছাপা হয়, তাহার প্রতি ব্যোমকেশের আসক্তি নাই, সদরের চেয়ে অলিগলিতেই তাহার মনের যাতায়াত বেশি।

হঠাৎ কাগজ হইতে মুখ তুলিয়া ব্যোমকেশ বলিল, ঈশানচন্দ্র মজুমদারের নাম জানো?

চিন্তা করিয়া বলিলাম, নামটা চেনা-চেনা মনে হচ্ছে। কে তিনি?

ব্যোমকেশ বলিল, ইতিহাসের অধ্যাপক ছিলেন। বহরমপুরে আমি কিছুদিন তাঁর ছাত্র ছিলাম। ভদ্রলোক মারা গেছেন।

বলিলাম, তা তুমি যখন তাঁর ছাত্র, তখন তাঁর মরবার বয়স হয়েছিল বলতে হবে।

তা হয়তো হয়েছিল। কিন্তু তাঁর স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি। সর্পাঘাতে মারা গেছেন।

ও।

গতবছর আমরা যেখানে স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার করতে গিয়েছিলাম, তিনি এবছর সেখানে গিয়েছিলেন। সেখানেই মৃত্যু হয়েছে।

সাওঁতাল পরগণার সেই পাহাড়-ঘেরা শহরটি ! সেখানে কয় হপ্তা বড় আনন্দে ছিলাম, যাহাদের স্মৃতি ঝাপসা হইয়া আসিতেছিল, তাহাদের কথা মনে পড়িয়া গেল। মহীধর বাবু, পুরুন্দর পাণ্ডে, ডাক্তার ঘটক, রজনী—

বহিদ্বারের কড়া নড়িয়া উঠিল। দ্বার খুলিয়া দেখিলাম, ডাকপিওন। একখানা খামের চিঠি, ব্যোমকেশের নামে। আমাদের চিঠিপত্র বড় একটা আসে না। ব্যোমকেশকে চিঠি দিয়া উৎসুকভাবে তাহার পানে চাহিয়া রহিলাম।

চিঠি পড়িয়া সে সহাস্যে মুখ তুলিল, বলিল, কার চিঠি বল দেখি?

বলিলাম, তা কি করে জািনব? আমার তো রেডিও-চক্ষু নেই।

ডি. এস. পি, পুরন্দর পাণ্ডের চিঠি।

সবিস্ময়ে বলিলাম, বল কি ! এইমাত্র যে তাঁর কথা ভাবছিলাম।

ব্যোমকেশ ঘাড় নাড়িয়া বলিল, আমিও।. শুধু তাই নয়, অধ্যাপক মজুমদারের প্রসঙ্গও আছে।

আশ্চর্য!

ব্যোমকেশ বলিল, এরকম আশ্চর্য ব্যাপার মাঝে মাঝে ঘটে। অনেকদিন যার কথা ভাবিনি তাকে হঠাৎ মনে পড়ে গেল, তারপর সে সশরীরে এসে হাজির হল। -পণ্ডিতেরা বলেন, ‘কইনসিডেন্স’-সমাপতন। কিন্তু এর রহস্য আরও গভীর। কোথাও একটা যোগসূত্র আছে, আমরা দেখতে পাই না—?

সে যাক। পাণ্ডে লিখেছেন কি?

পড়ে দ্যাখো।

চিঠি পড়িলাম। পাণ্ডে যাহা লিখিয়াছেন তাহার সারমর্ম এই—

সম্প্রতি এখানে একটি রহস্যময় ব্যাপার ঘটিয়াছে। শহর হইতে কিছু দূরে পাহাড়ের উপর এক সমৃদ্ধ পরিবার বাস করেন; গৃহস্বামীর এক বৃদ্ধ বন্ধু ঈশান মজুমদার বায়ু পরিবর্তনের জন্য আসিয়াছিলেন। তিনি হঠাৎ মারা গিয়াছেন। মৃত্যুর কারণ সর্পাঘাত বলিয়াই প্রকাশ, কিন্তু এ বিষয়ে শব-ব্যবচ্ছেদক ডাক্তার এবং পুলিসের মনে সন্দেহ হইয়াছে। ... ব্যোমকেশবাবু রহস্য ভালবাসেন; তার উপর এখন শীতকাল, এখানকার জলবায়ু অতি মনোরম। তিনি যদি সবান্ধবে আসিয়া কিছু দিনের জন্য দীনের গরীবখানায় আতিথ্য গ্রহণ করেন, তাহা হইলে রথ-দেখা কলা-বেচা দুই-ই হইবে।

চিঠি পড়া শেষ হইলে ব্যোমকেশ বলিল, কি বল?

বলিলাম, মন্দ কি। এখানে তোমার কাজকর্মও তো কিছু দেখছি না। কিন্তু সত্যবতী—

ব্যোমকেশ বলিল, ওকে এ অবস্থায় কোথাও নিয়ে যাওয়া চলে না—

তা বটে। কিন্তু ও যদি যেতে চায়? কিম্বা যদি তোমাকে না ছাড়তে চায়? এ সময় মেয়েদের মন বড় অবুঝ হয়ে পড়ে, কখন কি চায় বোঝা যায় না- ভিতর দিকে পায়ের শব্দ শুনিয়া থামিয়া গেলাম।

সত্যবতী প্রবেশ করিল। অবস্থাবেশে তাহার মুখখানি শুকাইয়া গিয়াছে, দেহাকৃতি ডিম-ভরা কৈ মাছের মত। সে আসিয়া একটা চেয়ারে থাপ করিয়া বসিয়া পড়িল। আমরা নীরব রহিলাম। সত্যবতী তখন ক্লান্তিভরে বলিল, আমাকে দাদার কাছে পাঠিয়ে দাও। এখানে আর ভাল লাগছে না।

ব্যোমকেশের সহিত আমার চোখে চোখে বাত বিনিময় হইয়া গেল। সে বলিল, ভাল লাগছে না ! ভাল লাগছে না কেন?

সত্যবতী উত্তাপহীন স্বরে বলিল, তোমাদের আর সহ্য হচ্ছে না। দেখছি আর রাগ হচ্ছে।

ইহা নিশ্চয় এই সময়ের একটা লক্ষণ, নচেৎ আমাদের দেখিয়া রাগ হইবার কোনও কারণ নাই। ব্যোমকেশ একটা ব্যথিত নিশ্বাস ফেলিয়া বলিল, যাও তাহলে, আটকাব না। অজিত তোমাকে সুকুমারের ওখানে পৌঁছে দিয়ে আসুক। —আর আমরাও না হয় এই ফাঁকে কোথাও ঘুরে আসি।

টেলিগ্রাম পাইয়া পুরুন্দর পাণ্ডে মহাশয় স্টেশনে উপস্থিত ছিলেন, আমাদের নামাইয়া লইলেন। তাঁহার বাসায় পৌঁছিয়া অপব্যাপ্ত খাদ্যদ্রব্য নিঃশেষ করিতে করিতে পরিচিত ব্যক্তিদের খোঁজখবর লইলাম। সকলেই পূর্ববৎ আছেন। কেবল মালতী দেবী আর ইহলোকে নাই; প্রোফেসর সোম বাড়ি বিক্রি করিয়া চলিয়া গিয়াছেন।

অতঃপর কাজের কথা আরম্ভ হইল। পুরন্দর পাণ্ডে অধ্যাপক ঈশানচন্দ্র মজুমদারের মৃত্যুর হাল বয়ান করিলেন। সেই সঙ্গে রামকিশোরের পারিবারিক সংস্থাও অনেকখানি জানা গেল।

অধ্যাপক মজুমদারের মৃত্যুর বিবরণ এইরূপ —তিনি মাসখানেক দুর্গে অবস্থান করিতেছিলেন, শরীর বেশ সারিয়াছিল। কয়েকদিন আগে তিনি রাত্রির আহার সম্পন্ন করিয়া অভ্যাসমত দুর্গের প্রাঙ্গণে পায়চারি করিলেন; সে সময় মাস্টার রমাপতি তাঁহার সঙ্গে ছিল। আন্দাজ সাড়ে নয়টার সময় রমাপতি বাড়িতে ফিরিয়া গেল; অধ্যাপক মহাশয় একাকী রহিলেন। তারপর রাত্রিকালে দুৰ্গে কি ঘটিল কেহ জানে না। পরদিন প্ৰাতঃকালেই রমাপতি আবার দুর্গে গেল। গিয়া দেখিল, অধ্যাপক মহাশয় তাঁহার শয়নঘরের দ্বারের কাছে মরিয়া পড়িয়া আছেন। তাঁহার পায়ের গোড়ালিতে সর্পাঘাতের চিহ্ন, মাথার পিছন দিকে ঘাড়ের কাছে একটা কালশিরার দাগ এবং ডান হাতের মুঠির মধ্যে একটি বাদশাহী আমলের চকচকে মোহর।

সর্পাঘাতের চিহ্ন প্ৰথমে কাহারও চোখে পড়ে নাই। রামকিশোর সন্দেহ করিলেন, রাত্রে কোনও দুৰ্বত্ত আসিয়া ঈশানবাবুকে মারিয়া গিয়াছে; মস্তকের আঘাত-চিহ্ন এই অনুমান সমর্থন করিল। তিনি পুলিসে খবর পাঠাইলেন।

কিন্তু পুলিস আসিয়া পৌছবার পূর্বেই সর্পদংশনের দাগ আবিষ্কৃত হইল। তখন আর উপায় নাই। পুলিস আসিয়া শব-ব্যবচ্ছেদের জন্য লাস চালান দিল।

শব-ব্যবচ্ছেদের ফলে মৃতের রক্তে সাপের বিষ পাওয়া গিয়াছে, গোখুরা সাপের বিষ। সুতরাং সর্পাঘাতই যে মৃত্যুর কারণ তাঁহাতে সন্দেহ নাই। কিন্তু তবু পুরন্দর পাণ্ডে নিঃসংশয় হইতে পারেন নাই। তাঁহার বিশ্বাস ইহার মধ্যে একটা কারচুপি আছে।

সব শুনিয়া ব্যোমকেশ বলিল, সাপের বিষে মৃত্যু হয়েছে একথা যখন অস্বীকার করা যায় না, তখন সন্দেহ কিসের?

পাণ্ডে বলিলেন, সন্দেহের অনেকগুলো ছোট কারণ আছে। কোনোটাই স্বতন্ত্রভাবে খুব জোরালো নয় বটে, কিন্তু সবগুলো মিলিয়ে একটা কিছু পাওয়া যায়। প্রথমত দেখুন, ঈশানবাবু মারা গেছেন সর্পাঘাতে। তবে তাঁর মাথায় চোট লাগল কি করে?

ব্যোমকেশ বলিল, এমন হতে পারে, সাপে কামড়াবার পর তিনি ভয় পেয়ে পড়ে যান, মাথায় চোট লেগে অজ্ঞান হয়ে পড়েন। তারপর অজ্ঞান অবস্থাতেই তাঁর মৃত্যু হয়। সম্ভব নয় কি?

অসম্ভব নয়। কিন্তু আরও কথা আছে। সাপ এল কোত্থেকে? আমি তন্নতন্ন করে খোঁজ করিয়েছি, কোথাও বিষাক্ত সাপের চিহ্ন মাত্র পাওয়া যায়নি।

কিন্তু আপনি যে বললেন, দু’বছর আগে রামকিশোরবাবুর মেয়েও সর্পাঘাতে মারা গিয়েছিল।

তাকে সাপে কামড়েছিল জঙ্গলে। সেখানে সাপ থাকতেও পারে। কিন্তু দুর্গে সাপ উঠল কি করে? পাহাড়ের গা বেয়ে ওঠা অসম্ভব। সিঁড়ি বেয়ে উঠতেও পারে, কিন্তু ওঠবার কোনও কারণ নেই। দুর্গে ইঁদুর, ব্যাং কিছু নেই, তবে কিসের লোভে সাপ সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠবে?

তাহলে—

তবে যদি কেউ সাপ নিয়ে গিয়ে দুর্গে ছেড়ে দিয়ে থাকে, তাহলে হতে পারে।

ব্যোমকেশ চিন্তা করিতে করিতে বলিল, হুঁ, আর কিছু?

পাণ্ডে বলিলেন, আর, ভেবে দেখুন, অধ্যাপক মহাশয়ের মুঠির মধ্যে একটি স্বর্ণমুদ্রা ছিল। সেটি এল কোত্থেকে?

হয়তো তাঁর নিজের জিনিস।

অধ্যাপক মহাশয়ের আর্থিক অবস্থার যে পরিচয় সংগ্রহ করেছি, তাতে তিনি মোহর হাতে নিয়ে সর্বদা ঘুরে বেড়াতেন বলে মনে হয় না।

তবে-কি অনুমান করেন?

কিছুই অনুমান করতে পারছি না; তাতেই তো সন্দেহ আরও বেড়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে এটা মামুলি সর্পাঘাত নয়, এর মধ্যে রহস্য আছে।

কিয়ৎকাল নীরব থাকিয়া ব্যোমকেশ বলিল, ঈশানবাবুর আত্মীয় পরিজন কেউ নেই?

পাণ্ডে বলিলেন, এক বিবাহিতা মেয়ে আছে। জামাই নেপালে ডাক্তারি করে। খবর পেলাম, মেয়ে-জামাইয়ের সঙ্গে অধ্যাপক মহাশয়ের সদ্ভাব ছিল না।

ব্যোমকেশ নীরবে বসিয়া ভাবিতে লাগিল। পাঁচ মিনিট কাটিবার পর পাণ্ডে আবার কহিলেন, যেসব কথা শুনলেন সেগুলোকে ঠিক প্রমাণ বলা চলে না তা মানি, কিন্তু অবহেলা করাও যায় না। তা ছাড়া, আর একটা কথা আছে। রামকিশোরবাবুর বংশটা ভাল নয়।

ব্যোমকেশ চকিত হইয়া বলিল, সে কি রকম?

পাণ্ডে বলিলেন, বংশের একটা মানুষও সহজ নয়, স্বাভাবিক নয়। রামকিশোরবাবুকে আপাতদৃষ্টিতে ভােলমানুষ বলে মনে হয়, কিন্তু সেটা পোষ-মানা বাঘের নিরীহতা; সহজাত নয়, মেকি। তাঁর অতীত জীবনে বোধ হয় কোনও গুপ্তরহস্য আছে, নৈলে যৌবন পার না হতেই তিনি এই জঙ্গলে অজ্ঞাতবাস শুরু করলেন কেন তা বোঝা যায় না। তারপর, বড় ছেলে বংশীধর একটি আস্ত কাঠগোঁয়ার; সে যেভাবে জমিদারী শাসন করে, তাতে মনে হয় সে চেঙ্গিস খাঁর ভায়রাভাই। শুনেছি জমিদারীতে দু’একটা খুন-জখমও করেছে, কিন্তু সাক্ষী-সার্বুদ নেই—

ব্যোমকেশ জিজ্ঞাসা করিল, বয়স কত বংশীধরের? বিয়ে হয়েছে?

বয়স ছাব্বিশ-সাতাশ। বিয়ে হয়েছিল, কিন্তু দু’মাস যেতে না যেতেই বৌয়ের অপঘাত মৃত্যু হয়। দেখা যাচ্ছে, এ বংশে মাঝে মাঝে অপঘাত মৃত্যু লেগেই আছে।

এরও কি সর্পাঘাত?

না। দুপুর রাত্রে ওপর থেকে খাদে লাফিয়ে পড়েছিল কিম্বা কেউ ঠেলে ফেলে দিয়েছিল।

চমৎকার বংশটি তো ! তারপর বলুন।

মেজ ছেলে মুরলীধর আর একটি গুণধর। ট্যারা এবং কুঁজো; বাপ বিয়ে দেননি। বাপকে লুকিয়ে লোচ্চামি করে। একটা মজা দেখেছি, দুই ছেলেই বাপকে যমের মতন ভয় করে। বাপ যদি গো-বেচারি ভালমানুষ হতেন, তাহলে ছেলেরা তাঁকে অত বেশি ভয় করত না।

হুঁ-তারপর?

মুরলীধরের পরে এক মেয়ে ছিল, হরিপ্রিয়া। সে সর্পাঘাতে মারা গেছে। তার চরিত্র সম্বন্ধে বিশেষ কিছু জানি না। তবে জামাইটি সহজ মানুষ।

জামাই !

পাণ্ডে জামাই মণিলালের কথা বলিলেন। তারপর গদাধর ও তুলসীর পরিচয় দিয়া বিবরণ শেষ করিলেন, গদাধরটা ন্যালা-ক্যাবলা; তার যেটুকু বুদ্ধি সেটুকু দুষ্টু-বুদ্ধি। আর তুলসী-তুলসী মেয়েটা যে কী তা আমি বুঝে উঠতে পারিনি। নির্বোধ নয়, ন্যাকাবোকা নয়, ইচড়ে পাকাও নয়; তবু যেন কেমন একরকম।

ব্যোমকেশ ধীরে-সুস্থে একটি সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করিয়া বলিল, আপনি যেভাবে চরিত্রগুলিকে সমীক্ষণ করেছেন, তাতে মনে হয় আপনার বিশ্বাস। এদের মধ্যে কেউ পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে ঈশানবাবুর মৃত্যুর জন্য দায়ী।

পাণ্ডে একটু হাসিয়া বলিলেন, আমার সন্দেহ তাই, কিন্তু সন্দেহটা এখনও বিশ্বাসের পর্যায়ে পৌঁছয়নি। বৃদ্ধ অধ্যাপককে মেরে কার কি ইষ্টসিদ্ধি হল সেটা বুঝতে পারছি না। যা হোক, আপনার মন্তব্য এখন মুলতুবি থাক। আজ বিকেলবেলা দুর্গে যাওয়া যাবে; সেখানে সরেজমিন তজবিজ করে আপনার যা মনে হয় বলবেন।

পাণ্ডে অফিসের কাজ দেখিতে চলিয়া গেলেন। ব্যোমকেশ আমাকে জিজ্ঞাসা করিল, কি মনে হল?

বলিলাম, সবই যেন ধোঁয়া-ধোঁয়া।

ব্যোমকেশ বলিল, ধোঁয়া যখন দেখা যাচ্ছে, তখন আগুন আছে। শাস্ত্ৰে বলে, পর্বতে বহ্নিমান ধূমাৎ।

বৈকালে পুলিসের মোটর চড়িয়া তিনজনে বাহির হইলাম। ছয় মাইল পাথুরে পথ অতিক্রম করিতে আধা ঘন্টা লাগিল।

কুয়ার নিকট অবধি পৌঁছিয়া দেখা গেল সেখানে আর একটি মোটর দাঁড়াইয়া আছে। আমরাও এখানে গাড়ি হইতে নামিলাম; পাণ্ডে বলিলেন, ডাক্তার ঘটকের গাড়ি। আবার কারুর অসুখ নাকি?

প্রশ্ন করিয়া জানা গেল, আমাদের পরিচিত ডাক্তার অশ্বিনী ঘটক এ বাড়ির গৃহ-চিকিৎসক। বাড়ির দিকে অগ্রসর হইতেছি, দৃষ্টি পড়িল কুয়ার ওপারে তরুগুচ্ছ হইতে মৃদুমন্দ ধোঁয়া বাহির হইতেছে।

ব্যোমকেশ বলিল, ওটা কি? ওখানে ধোঁয়া কিসের?

পাণ্ডে বলিলেন, একটা সাধু ওখানে আড্ডা গেড়েছে।

সাধু ! এই জঙ্গলের মধ্যে সাধু ! এখানে তো ভিক্ষা পাবার কোনও আশা নেই।

তা নেই। কিন্তু রামকিশোরবাবুর বাড়ি থেকে বোধ হয় বাবাজীর সিধে আসে।

ও। কতদিন আছেন এখানে বাবাজী?

ঠিক জানি না। তবে অধ্যাপক মহাশয়ের মৃত্যুর আগে থেকেই আছেন।

তাই নাকি? চলুন, একবার সাধু দর্শন করা যাক।

একটি গাছের তলায় ধূনি জ্বলিয়া কৌপীনধারী বাবাজী বসিয়া আছেন। আমরা কাছে গিয়া দাঁড়াইলে তিনি জবারক্ত চক্ষু মেলিয়া চাহিলেন, কিছুক্ষণ অপলকনেত্রে আমাদের পানে চাহিয়া রহিলেন। তারপর শ্মশ্রুসমাকুল মুখে একটি বিচিত্র নীরব হাসি ফুটিয়া উঠিল। তিনি আবার চক্ষু মুদিত করিলেন।

কিছুক্ষণ অনিশ্চিতভাবে দাঁড়াইয়া থাকিয়া চলিয়া আসিলাম। পথেঘাটে যেসব ভিক্ষাজীবী সাধু-সন্ন্যাসী দেখা যায় ইনি ঠিক সেই জাতীয় নন। কোথায় যেন একটা তফাৎ আছে। কিন্তু তাহা আধ্যাত্মিক আভিজাত্য কিনা বুঝিতে পারিলাম না।

পাণ্ডে বলিলেন, এবার কোথায় যাবেন? আগে রামকিশোরবাবুর সঙ্গে দেখা করবেন, না। দুর্গ দেখবেন?

ব্যোমকেশ বলিল, দুৰ্গটাই আগে দেখা যাক।

দেউড়ির পাশ দিয়া দুর্গের সিঁড়ি ধরিব, মোটর চালক বুলাকিলাল তাহার কোটর হইতে বাহিরে আসিয়া ডি. এস. পি. সাহেবকে সেলাম করিয়া দাঁড়াইল। পাণ্ডে বলিলেন, বুলাকিলাল, ডাক্তার এসেছে কেন? কারুর কি অসুখ?

বুলাকিলাল বলিল, না। হুজুর, ডাক্তার সাহেব এসেছে, উকিল সাহেবও এসেছেন। কি জানি কি গুফত-গু হচ্ছে।

উকিল? হিমাংশুবাবু?

জী হুজুর। একসঙ্গে এসেছেন। এত্তালা দেব?

থাক, আমরা নিজেরাই যাব।

বুলাকিলাল তখন হাত জোড় করিয়া বলিল, হুজুর, ঠাণ্ডাই তৈরি করছি। যদি হুকুম হয়—

ঠাণ্ডাই-ভাঙ? বেশ তো, তুমি তৈরি কর, আমরা দুর্গ দেখে এখনই ফিরে আসছি।

জী সরকার।

বুড়ো বুলাকিলাল খাসা ভাঙ তৈরি করে। ঐ নিয়েই আছে।

পঁচাত্তরটি সিঁড়ি ভাঙ্গিয়া দুৰ্গতোরণে উপনীত হইলাম। তোরণের কবাট নাই, বহু পূর্বেই অন্তৰ্হিত হইয়াছে। কিন্তু পাথরের খিলান এখনও অটুট আছে। গতগতির বাধা নাই।

তোরণপথে প্রবেশ করিয়া সর্বাগ্রে যে বস্তুটি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করিল। তাহা একটি কামান। প্রথম দেখিয়া মনে হয় তাল গাছের একটা গুড়ি মুখ উঁচু করিয়া মাটিতে পড়িয়া আছে। দুই শতাব্দীর রৌদ্রবৃষ্টি অনাবৃত কামানের দশ হাত দীর্ঘ দেহটিকে মরিচা ধরাইয়া শঙ্কাবৃত করিয়া তুলিয়াছে। প্রায় নিরেট লৌহস্তম্ভটি জগদ্দল ভারি, বহুকাল কেহ তাহাকে নড়াচাড়া করে নাই। তাহার ভিতরের গোলা ছুঁড়িবার ছিদ্রটি বেশি ফাঁদালো নয়, কোনও ক্রমে একটি ছোবড়া-ছোড়ানো নারিকেল তাহাতে প্রবেশ করিতে পারে। তাহাও বর্তমানে ধূলামাটিকে ভরাট হইয়া গিয়াছে; মুখের দিকটায় একগুচ্ছ সজীব ঘাস মাথা বাহির করিয়া আছে। অতীতের সাক্ষী ক্ষয়িষ্ণু দুর্গটির তোরণমুখে ভূপতিত কামানটিকে দেখিয়া কেমন যেন মায়া হয়; মনে হয় যৌবনে সে বলদৃপ্ত যোদ্ধা ছিল, জরার বশে ধরাশায়ী হইয়া সে উর্ধ্বমুখে মৃত্যুর দিন শুনিতেছে।

কামান ছাড়া অতীতকালের অস্থাবর বস্তু দুৰ্গমধ্যে আর কিছু নাই। প্রাকার-ঘেরা দুৰ্গভুমি আয়তনে দুই বিঘার বেশি নয়; সমস্তটাই পাথরের পাটি দিয়া বাঁধানো। চক্রাকার প্রাকারের গায়ে ছোট ছোট কুঠুরি; বোধ হয় পূর্বকালে এগুলিতে দুৰ্গরক্ষক সিপাহীরা থাকিত। এগুলির অবস্থা ভগ্নপ্রায়; কোথাও পাথর ভাঙ্গিয়া পড়িয়াছে, কোথাও দ্বারের সম্মুখে কাঁটাগাছ জন্মিয়াছে। এই চক্রের মাঝখানে নাভির ন্যায় দুর্গের প্রধান ভবন। নাভি ও নেমির মধ্যে বিস্তৃত প্রাঙ্গণের অবকাশ।

গৃহটি চতুষ্কোণ এবং বাহির হইতে দেখিলে মজবুত বলিয়া মনে হয়। পাঁচ ছয়টি ছোট বড় ঘর লইয়া গৃহ; মামুলিভাবে মেরামত করা সত্ত্বেও সব ঘরগুলি বাসের উপযোগী নয়। কোনও ঘরের দেয়ালে ফাটল ধরিয়াছে, কোনও ঘরের ছাদ ফুটো হইয়া আকাশ দেখা যায়। কেবল পিছন দিকের একটি ছোট ঘর ভাল অবস্থায় আছে। যদিও চুন সুরকি খসিয়া স্থুল পাথরের গাঁথুনি প্রকট হইয়া পড়িয়াছে। তবু ঘরটিকে বাসোপযোগী করিবার জন্য তাহার প্রবেশ-পথে নূতন চৌকাঠ ও কবাট লাগানো হইয়াছে।

আমরা অন্যান্য ঘরগুলি দেখিয়া এই ঘরের সম্মুখে উপস্থিত হইলাম। পাণ্ডে চৌকাঠের দিকে আঙ্গুল দেখাইয়া বলিলেন, অধ্যাপক মহাশয়ের লাস ঐখানে পড়ে ছিল।

ব্যোমকেশ কিছুক্ষণ সেইদিকে তাকাইয়া থাকিয়া বলিল, সাপে কামড়বার পর তিনি যদি চৌকাঠে মাথা ঠুকে পড়ে গিয়ে থাকেন, তাহলে মাথায় চোট লাগা অসম্ভব নয়।

পাণ্ডে বলিলেন, না, অসম্ভব নয়। কিন্তু সারা বাড়িটা। আপনি দেখেছেন; ভাঙ্গা বটে। কিন্তু কোথাও এমন আবর্জনা নেই। যেখানে সাপ লুকিয়ে থাকতে পারে। অধ্যাপক মহাশয় বাস করতে আসার সময় এখানে ভাল করে কার্বলিক অ্যাসিডের জল ছড়ানো হয়েছিল, তারপরও তিনি বেঁচে থাকাকালে বার দুই ছড়ানো হয়েছে—

অধ্যাপক মহাশয় আসবার আগে এখানে কেউ বাস করত না?

পাণ্ডে মুখ টিপিয়া বলিলেন, কেউ কবুল করে না। কিন্তু মুরলীধর—

হুঁ-বুঝেছি। বলিয়া ব্যোমকেশ ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিল।

ঘরটি লম্বায় চওড়ায় আন্দাজ চৌদ্দ ফুট। মেঝে শান বাঁধানো। একপাশে একটি তক্তপোশ এবং একটি আরাম-কেদারা ছাড়া ঘরে অন্য কোনও আসবাব নাই। অধ্যাপক মহাশয়ের ব্যবহারের জন্য যে-সকল তৈজস ছিল তাহা স্থানান্তরিত হইয়াছে।

এই ঘরে একটি বিশেষত্ব লক্ষ্য করিলাম যাহা অন্য কোনও ঘরে নাই। তিনটি দেয়ালে মেঝে হইতে প্ৰায় এক হাত উর্ধ্বে সারি সারি লোহার গজাল ঠোকা রহিয়াছে, গজালগুলি দেয়াল হইতে দেড় হাত বাহির হইয়া আছে। সেগুলি আগে বোধ হয় শাবলের মত স্থুল ছিল, এখন মরিচা ধরিয়া যেরূপ ভঙ্গুর আকৃতি ধারণ করিয়াছে তাহাতে মনে হয় সেগুলি জানকীরামের সমসাময়িক।

ব্যোমকেশ বলিল, দেয়ালে গোঁজ। কেন?

পাণ্ডে বলিলেন, এ ঘরটা বোধহয় সেকালে দুর্গের দপ্তর কিম্বা খাজনাখানা ছিল। গোঁজের ওপর তক্তা পেতে দিলে বেশ তাক হয়, তাকের ওপর নানান জিনিসপত্র, বই খাতা, এমন কি টাকার সিন্দুক রাখা চলত। এখনও বিহারের অনেক সাবেক বাড়িতে এইরকম গোঁজ দেখা যায়৷।

ব্যোমকেশ ঘরের মেঝে ও দেয়ালের উপর চোখ বুলাইয়া দেখিতে লাগিল। এক সময় বলিল, অধ্যাপক মহাশয় নিশ্চয় বাক্স-বিছানা এনেছিলেন। সেগুলো কোথায়?

সেগুলো আমাদের অর্থাৎ পুলিসের জিন্মায় আছে।

বাক্সর মধ্যে কি আছে দেখেছেন?

গোটাকিয়েক জামা কাপড় আর খান-তিন-চার বই খাতা। একটা ন্যাকড়ায় বাঁধা তিনটে দশ টাকার নোট আর কিছু খুচরো টাকা পয়সা ছিল।

আর তাঁর মুঠির মধ্যে যে মোহর পাওয়া গিয়েছিল সেটা?

সেটাও আমাদের জিম্মায় আছে। এ মামলার একটা নিম্পত্তি হলে সব জিনিস তাঁর ওয়ারিসকে ফেরত দিতে হবে।

ব্যোমকেশ আরও কিছুক্ষণ ঘর পরীক্ষা করিল, কিন্তু উল্লেখযোগ্য কিছু পাওয়া গেল না। তখন সে নিশ্বাস ছাড়িয়া বলিল, চলুন। এখানকার দেখা শেষ হয়েছে।

দুর্গ প্রাঙ্গণে আসিয়া আমরা তোরণের দিকে অগ্রসর হইয়াছি, একটি ছোকরা তোরণ দিয়া প্রবেশ করিল। মাস্টার রমাপতিকে এই প্রথম দেখিলাম। ছিপছিপে গড়ন, ময়লা রঙ, চোখেমুখে বুদ্ধির ছাপ; কিন্তু সঙ্কুচিত ভাব। বয়স উনিশ-কুড়ি। তাহাকে দেখিয়া পাণ্ডে বলিলেন, কি মাস্টার, কি খবর?

রমাপতি একটু অপ্রতিভ হাসিয়া বলিল, বাড়িতে ডাক্তারবাবু আর উকিলবাবু এসেছেন। তাঁদের নিয়ে কর্তার ঘরে কি সব কাজের কথা হচ্ছে। বড়রা সবাই সেখানে আছেন। কিন্তু গদাই আর তুলসীকে দেখতে পেলাম না, তাই ভাবলাম হয়তো তারা এখানে এসেছে।

না, তাদের তো এখানে দেখিনি।

পাণ্ডে আমাদের সহিত রমাপতির পরিচয় করাইয়া দিলেন, এঁরা আমার বন্ধু, এখানে বেড়াতে এসেছেন।

রমাপতি একদৃষ্টি ব্যোমকেশের পানে চাহিয়া থাকিয়া সংহত স্বরে বলিল, আপনি কি-সত্যান্বেষী ব্যোমকেশবাবু?

ব্যোমকেশ হাসিয়া উঠিল, হুঁ! কিন্তু চিনলেন কি করে; আমার ছবি তো কোথাও বেরোয়নি।

রমাপতি সন্ত্রস্ত হইয়া উঠিল, স্থলিত স্বরে বলিল, আমি-না, ছবি দেখিনি-কিন্তু দেখে মনে হল-আপনার বই পড়েছি।--কদিন ধরে মনে হচ্ছিল-আপনি যদি আসতেন তাহলে নিশ্চয় এই ব্যাপারের মীমাংসা হত- সে থতামত খাইয়া চুপ করিল।

ব্যোমকেশ সদয় হাসিয়া বলিল, আসুন, আপনার সঙ্গে খানিক গল্প করা যাক।

নিকটেই কামান পড়িয়ছিল, ব্যোমকেশ রুমাল দিয়া ধূলা ঝাড়িয়া তাহার উপর বসিল, পাশের স্থান নির্দেশ করিয়া বলিল, ‘বসুন।’ রমাপতি সসঙ্কোচে তাহার পাশে বসিল।

ব্যোমকেশ বলিল, আপনি বললেন আমি এলে এ ব্যাপারের মীমাংসা হবে। ঈশানবাবু তো সাপের কামড়ে মারা গেছেন। এর মীমাংসা কী হবে?

রমাপতি উত্তর দিল না, শঙ্কিত নতমুখে অঙ্গুষ্ঠ দিয়া অঙ্গুষ্ঠের নখ খুঁটিতে লাগিল। ব্যোমকেশ তাহার আপাদমস্তক তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে দেখিয়া লইয়া সহজ স্বরে বলিল, যাক ও কথা। ঈশানবাবু যে-রাত্রে মারা যান সে-রাত্ৰে প্ৰায় সাড়ে ন’টা পর্যন্ত আপনি তাঁর সঙ্গে ছিলেন। কি কথা হচ্ছিল?

রমাপতি এবার সতর্কভাবে উত্তর দিল, বলিল, উনি আমাকে স্নেহ করতেন। আমি ওঁর কাছে এলে আমার সঙ্গে নানারকম গল্প করতেন। সে-রাত্রে—

সো-রাত্রে কোন গল্প বলছিলেন?

এই দুর্গের ইতিহাস বলছিলেন।

দুর্গের ইতিহাস! তাই নাকি ! কি ইতিহাস শুনলেন বলুন তো, আমরাও শুনি।

আমি আর পাণ্ডে গিয়া কামানের উপর বসিলাম। রমাপতি যে গল্প শুনিয়াছিল। তাহা বলিল। রাজা জানকীরাম হইতে আরম্ভ করিয়া সিপাহী বিদ্রোহের সময় রাজারাম ও জয়রাম পর্যন্ত কাহিনী বলিয়া গেল।

শুনিয়া ব্যোমকেশ বলিল, হুঁ, সত্যি ইতিহাস বলেই মনে হয়। কিন্তু এ ইতিহাস তো পাঠ্যপুস্তকে পাওয়া যায় না। ঈশানবাবু জানলেন কি করে?

রমাপতি বলিল, উনি সব জানতেন। কর্তার এক ভাই ছিলেন, কম বয়সে মারা যান, তাঁর নাম ছিল রামবিনোদ সিংহ, অধ্যাপক মশায় তাঁর প্রাণের বন্ধু ছিলেন। তাঁর মুখে উনি এসব কথা শুনেছিলেন; রামবিনোদবাবুর মৃত্যু পর্যন্ত বংশের সব ইতিহাস এর জানা ছিল। একটা খাতায় সব লিখে রেখেছিলেন।

খাতায় লিখে রেখেছিলেন? কোথায় খাতা? এখন খাতা কোথায় তা জানি না। কিন্তু আমি দেখেছি। বোধহয় ওঁর তেরঙ্গের মধ্যে আছে।

ব্যোমকেশ পাণ্ডের পানে তাকাইল। পাণ্ডে ঘাড় নাড়িয়া বলিলেন, পেন্সিলে লেখা একটা খাতা আছে, কিন্তু তাতে কি লেখা আছে তা জানি না। বাংলায় লেখা।

দেখতে হবে; যা হোক ব্যোমকেশ রমাপতির দিকে ফিরিয়া বলিল, “আপনার কাছে অনেক খবর পাওয়া গেল। —আচ্ছা, পরদিন সকালে সবার আগে আপনি আবার দুর্গে এসেছিলেন কেন, বলুন তো?’

রমাপতি বলিল, উনি আমাকে ডেকেছিলেন। বলেছিলেন, আজ এই পর্যন্ত থাক, কাল ভোরবেলা এসো, বাকি গল্পটা বলব !

বাকি গল্পটা মানে—?

তা কিছু খুলে বলেননি। তবে আমার মনে হয়েছিল যে সিপাহী যুদ্ধের পর থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত এ বংশের ইতিহাস আমাকে শোনাবেন।

কিন্তু কেন? আপনাকে এ ইতিহাস শোনাবার কোনও উদ্দেশ্য ছিল কি?

তা জানি না; তাঁর যখন যা মনে আসত আমাকে বলতেন, আমারও ভাল লাগত। তাই শুনতাম। মোগল-পাঠান আমলের অনেক গল্প বলতেন। একদিন বলেছিলেন, যে-বংশে একবার ভ্রাতৃহত্যার বিষ প্রবেশ করেছে সে-বংশের আর রক্ষা নেই; যতবড় বংশই হোক তার ধ্বংস অনিবাৰ্য। এই হচ্ছে ইতিহাসের সাক্ষ্য।

আমরা পরস্পর মুখের পানে চাহিলাম। পাণ্ডের ললাট ভ্রুকুটি-বন্ধুর হইয়া উঠিল। ব্যোমকেশ উঠিয়া দাঁড়াইয়া বলিল, সন্ধ্যে হয়ে আসছে। চলুন, এবার ওদিকে যাওয়া যাক।

খাদের ওপারে বাড়ির আড়ালে সূর্য তখন ঢাকা পড়িয়াছে।

দেউড়ি পর্যন্ত নামিয়া আসিয়া দেখিলাম, বুলাকিলাল দুইটি বৃহৎ পাত্রে ভাঙের সরবৎ। লইয়া ঢালাঢালি করিতেছে; গদাধর এবং তুলসী পরম আগ্রহভরে দাঁড়াইয়া প্রক্রিয়া দেখিতেছে।

আমাদের আগমনে গদাধর বিরাট হাঁ করিয়া তাকাইয়া রহিল; তুলসী সংশয়-সঙ্কুল চক্ষু আমাদের উপর স্থাপন করিয়া কোণাচে ভাবে সরিয়া গিয়া মাস্টার রমাপতির হাত চাপিয়া ধরিল। রমাপতি তিরস্কারের সুরে বলিল, কোথায় ছিলে তোমরা? আমি চারিদিকে তোমাদের খুঁজে বেড়াচ্ছি।

তুলসী জবাব দিল না, অপলক দৃষ্টিতে আমাদের পানে চাহিয়া রহিল। গদাধরের গলা হইতে একটি ঘড়ঘড় হাসির শব্দ বাহির হইল। সে বলিল, সাধুবাবা গাঁজা খাচ্ছিল তাই দেখছিলাম।

রমাপতি ধমক দিয়া বলিল, সাধুর কাছে যেতে তোমাদের মানা করা হয়নি?

গদাধর বলিল, কাছে তো যাইনি, দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম।

আচ্ছা, হয়েছে —এবার বাড়ি চল।

রমাপতি তাহাদের লইয়া বাড়ির দিকে চলিল। শুনিতে পাইলাম, কয়েক ধাপ উঠিবার পর তুলসী ব্যগ্ৰকণ্ঠে বলিতেছে, মাস্টারমশাই, ওরা সব কারা?

বুলাকিলাল গেলাস ভরিয়া আমাদের হাতে দিল। দধি গোলমরিচ শসার বীচি এবং আরও বহুবিধ বকাল সহযোগে প্ৰস্তুত উৎকৃষ্ট ভাঙের সরবৎ; এমন সরবৎ ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল ছাড়া আর কোথাও প্রস্তুত হয় না। পাণ্ডে তারিফ করিয়া বলিলেন, বাঃ, চমৎকার হয়েছে। কিন্তু বুলাকিলাল, তুমি এত ভাঙ তৈরি করেছ কার জন্যে? আমরা আসব তা তো জানতে না।

বুলাকিলাল বলিল, হুজুর, আমি আছি, সাধুবাবাও এক ঘটি চড়ান—

সাধুবাবার দেখছি কিছুতেই অরুচি নেই। আর—

আর-গণপৎ এক ঘটি নিয়ে যায়৷।

গণপৎ—মুরলীধরের খাস চাকর? নিজের জন্যে নিয়ে যায়, না মালিকের জন্যে?

তা জানি না হুজুর।

আচ্ছা বুলাকিলাল, তুমি তো এ বাড়ির পুরোনো চাকর, বাড়িতে কে কোন নেশা করে বলতে পারো?

বুলাকিলাল একটু চুপ করিয়া বলিল, বড়কর্তা সন্ধের পর আফিম খান। আর কারুর কথা জানি না ধর্মাবতার।

বোঝা গেল, জানিলেও বুলাকিলাল বলিবে না। আমরা সরবৎ শেষ করিয়া, আর এক প্রস্থ তারিফ করিয়া বাড়ির সিঁড়ি ধরিলাম।

এদিকেও সিঁড়ির সংখ্যা সত্তর-আশি। উপরে উঠিয়া দেখা গেল, সূর্য অস্ত গিয়াছে, কিন্তু এখনও বেশ আলো আছে। বাড়ির সদরে রমাপতি উপস্থিত ছিল, সে বলিল, কর্তার সঙ্গে দেখা করবেন? আসুন।

রমাপতি আমাদের যে ঘরটিতে লইয়া গেল সেটি বাড়ির বৈঠকখানা।

টেবিল চেয়ার ছাড়াও আর একটি ফরাস-ঢাকা বড় তক্তপোশ আছে। তক্তপোশের মধ্যস্থলে রামকিশোরবাবু আসীন; তাঁহার এক পাশে নায়েব চাঁদমোহন, অপর পাশে জামাই মণিলাল। দুই ছেলে বংশীধর ও মুরলীধর তক্তপোশের দুই কোণে বসিয়াছে। ডাক্তার ঘটক এবং উকিল হিমাংশুবাবু তক্তপোশের কিনারায় চেয়ার টানিয়া উপবিষ্ট আছেন। পশ্চিম দিকের খোলা জানালা দিয়া ঘরে আলো আসিতেছে; তবু ঘরের ভিতরটা ঘোর ঘোর হইয়া আসিয়াছে।

ঘরে প্রবেশ করিতে করিতে শুনিতে পাইলাম, মুরলীধর পেঁচালো সুরে বলিতেছে, যার ধন। তার ধন নয়, নেপোয় মারে দৈ! মণিলালকে দুর্গ দেওয়া হবে কেন? আমি কি ভেসে এসেছি? দুৰ্গ আমি নেব।

বংশীধর অমনি বলিয়া উঠিল, তুমি নেবে কেন? আমার দাবি আগে, দুৰ্গ আমি নেব। আমি ওটা মেরামত করিয়ে ওখানে বাস করব।

রামকিশোর বারুদের মত ফাটিয়া পড়িলেন, খবরদার ! আমার মুখের ওপর যে কথা বলবে জুতিয়ে তার মুখ ছিড়ে দেব। আমার সম্পত্তি আমি যাকে ইচ্ছে দিয়ে যাব। মণিলালকে আমি সর্বস্ব দিয়ে যাব, তোমাদের তাতে কি ! বেয়াদব কোথাকার।

মণিলাল শান্তস্বরে বলিল, আমি তো কিছুই চাইনি—।

মুরলীধর মুখের একটা ভঙ্গী করিয়া বলিল, না কিছুই চাওনি, কিন্তু ভেতরে ভেতরে বাবাকে বশ করেছ। মিট্‌মিটে ডান—

রামকিশোর আবার ফাটিয়া পড়িবার উপক্ৰম করিতেছিলেন, ডাক্তার ঘটক হাত তুলিয়া বলিল, রামকিশোরবাবু, আপনি বড় বেশি উত্তেজিত হয়ে উঠেছেন, আপনার শরীরের পক্ষে ওটা ভাল নয়। আজ বরং কথাবার্তা বন্ধ থাক, আর একদিন হবে।

রামকিশোরবাবু ঈষৎ সংযত হইয়া বলিলেন, না ডাক্তার, এ ব্যাপার টাঙিয়ে রাখা চলবে না। আজ আছি কাল নেই, আমি সব হাঙ্গামা চুকিয়ে রাখতে চাই। হিমাংশুবাবু, আমি আমার সম্পত্তির কি রকম ব্যবস্থা করতে চাই আপনি শুনেছেন; আর বেশি আলোচনার দরকার নেই। আপনি দলিলপত্র তৈরি করতে আরম্ভ করে দিন। যত শীগগির দলিল রেজিস্ট্রি হয়ে যায় ততই ভাল।

বেশ, তাই হবে। আজ তাহলে ওঠা যাক।

হিমাংশুবাবু গাত্ৰোত্থান করিলেন। এতক্ষণে সকলের নজর পড়িল যে আমরা তিনজন ন যযৌ ন তস্থৌ ভাবে দ্বারের নিকটে দাঁড়াইয়া আছি। রামকিশোর ভ্রু তুলিয়া বলিলেন, কে?

পাণ্ডে আগাইয়া গিয়া বলিলেন, আমি। আমার দুটি কলকাতার বন্ধু বেড়াতে এসেছেন, তাঁদের দুর্গ দেখাতে এনেছিলাম। বলিয়া বোমকেশের ও আমার নামোল্লেখ করিলেন।

রামকিশোর সমোদর সহকারে বলিলেন, আসুন, আসুন। বসতে আজ্ঞা হোক। কিন্তু তিনি ব্যোমকেশের নাম পূর্বে শুনিয়াছেন বলিয়া মনে হইল না।

বংশীধর ও মুরলীধর উঠিয়া গেল। ডাক্তার ঘটক আমাদের দেখিয়া একটু বিস্মিত ও অপ্ৰতিভ হইল, তারপর হাত তুলিয়া নমস্কার করিল। ডাক্তারের সঙ্গে দু'একটা কথা হইবার পর সে উকিল হিমাংশুবাবুকে লইয়া প্ৰস্থান করিল। ঘরের মধ্যে রহিয়া গেলাম আমরা তিনজন এবং ও-পক্ষে রামকিশোরবাবু, নায়েব চাঁদমোহন এবং জামাই মণিলাল।

রামকিশোর হাকিলেন, ওরে কে আছিস, আলো দিয়ে যা, চা তৈরি কর।

চাঁদমোহন বলিলেন, আমি দেখছি— তিনি উঠিয়া গেলেন। চাঁদমোহনের চেহারা কালো এবং চিমশে কিন্তু চোখের দৃষ্টিতে ধূৰ্ততা ভরা। তিনি যাইবার সময় ব্যোমকেশের প্রতি একটি দীর্ঘ-গভীর অপাঙ্গদৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া।

দুই চারিটি সৌজন্যমূলক বাক্যালাপ হইল। বাহিরের লোকের সহিত রামকিশোরের ব্যবহার বেশ মিষ্ট ও অমায়িক। তারপর ব্যোমকেশ বলিল, শুনলাম ঈশানবাবু এখানে এসে সর্পাঘাতে মারা গেছেন। আমি তাঁকে চিনতাম, একসময় তাঁর ছাত্র ছিলাম।

তাই নাকি ! রামকিশোর চকিত চক্ষে ব্যোমকেশের পানে চাহিলেন, আমার বড় ছেলেও—। কি বলে, ঈশান আমার প্রাণের বন্ধু ছিল, ছেলেবেলার বন্ধু। সে আমার বাড়িতে এসে অপঘাতে মারা গেল, এ লজ্জা আমি জীবনে ভুলব না। তাঁহার কথার ভাবে মনে হইল, সর্পাঘাতে মৃত্যু সম্বন্ধে যে সন্দেহ আছে তাহা তিনি জানেন না।

ব্যোমকেশ সহানুভূতি দেখাইয়া বলিল, বড়ই দুঃখের বিষয়। তিনি আপনার দাদারও বন্ধু ছিলেন?

রামকিশোর ক্ষণেক নীরব থাকিয়া যেন একটু বেশি ঝোঁক দিয়া বলিলেন, হ্যাঁ। কিন্তু দাদা প্ৰায় ত্ৰিশ বছর হল মারা গেছেন।

ও-তাহলে বর্তমানে আপনার সঙ্গেই তাঁর ঘনিষ্ঠতা ছিল। —আচ্ছা, তিনি এবার এখানে আসার আগে এ বাড়ির কে কে তাঁকে চিনতেন? আপনি চিনতেন। আর—?”

আর আমার নায়েব চাঁদমোহন চিনতেন।

আপনার ড্রাইভার তো পুরোনো লোক, সে চিনত না?

হ্যাঁ, বুলাকিলাল চিনত।

আর, আপনার বড় ছেলেও বোধহয় তাঁর ছাত্র ছিলেন?

গলাটা পরিষ্কার করিয়া রামকিশোর বলিলেন, হ্যাঁ।

এই বাক্যালাপ যখন চলিতেছিল তখন জামাই মণিলালকে লক্ষ্য করিলাম। ভোজনরত মানুষের পাতের কাছে বসিয়া পোষা বিড়াল যেমন একবার পাতের দিকে একবার মুখের দিকে পৰ্যায়ক্রমে চক্ষু সঞ্চালন করে, মণিলাল তেমনি কথা বলার পর্যয়ক্রমে ব্যোমকেশ ও রামকিশোরের দিকে দৃষ্টি ফিরাইতেছে। তাহার মুখের ভাব আধা-অন্ধকারে ভাল ধরা গেল না, কিন্তু সে যে একাগ্রমনে বাক্যালাপ শুনিতেছে তাহাতে সন্দেহ নাই।

ব্যোমকেশ বলিল, ঈশানবাবুর মুঠিতে একটি মোহর পাওয়া গিয়েছিল। সেটি কোথা থেকে এল বলতে পারেন?

রামকিশোর মাথা নাড়িয়া বলিলেন, না। ভারি আশ্চর্য ব্যাপার। ঈশানের আর্থিক অবস্থা তেমন ভাল ছিল না। অন্তত মোহর নিয়ে বেড়াবার মত ছিল না।

দুর্গে কোথাও কুড়িয়ে পাওয়া সম্ভব নয় কি?

রামকিশোর বিবেচনা করিয়া বলিলেন, সম্ভব। কারণ আমার পূর্বপুরুষদের অনেক সোনা-দানা ঐ দুর্গে সঞ্চিত ছিল। সিপাহীরা যখন লুঠ করতে আসে তখন এক-আধটা মোহর এদিকে ওদিকে ছিটকে পড়া বিচিত্র নয়। তা যদি হয় তাহলে ও মোহর আমার সম্পত্তি।

ব্যোমকেশ বলিল, আপনার সম্পত্তি হলে ঈশানবাবু মোহরটি আপনাকে ফেরত দিতেন না কি? আমি যতদূর জানি, পরের সম্পত্তি আত্মসাৎ করবার লোক তিনি ছিলেন না।

তা ঠিক। কিন্তু অভাবে মানুষের স্বভাব নষ্ট হয়। তা ছাড়া, মোহরটা কুড়িয়ে পাবার সময়েই হয়তো তাকে সাপে কামড়েছিল। বেচারা সময় পায়নি।

এই সময় একজন ভৃত্য কেরোসিনের ল্যাম্প আনিয়া টেবিলের উপর রাখিল, অন্য একজন ভৃত্য চা এবং জলখাবারের ট্ৰে লইয়া আমাদের সম্মুখে ধরল। আমরা সবিনয়ে জলখাবার প্রত্যাখ্যান করিয়া চায়ের পেয়ালা তুলিয়া লইলাম।

চায়ে চুমুক দিয়া ব্যোমকেশ বলিল, এখানে বিদ্যুৎ বাতির ব্যবস্থা নেই। ঈশানবাবুও নিশ্চয় রাত্রে কেরোসিনের লণ্ঠন ব্যাবহার করতেন?

রামকিশোর বলিলেন, হ্যাঁ। তবে মৃত্যুর হস্তাখানেক আগে সে একবার আমার কাছ থেকে একটা ইলেকট্রিক টর্চ চেয়ে নিয়ে গিয়েছিল। তার মৃত্যুর পর আর সব জিনিসই পাওয়া গেল কেবল ঐ টৰ্চটা পাওয়া যায়নি।

তাই নাকি ! কোথায় গেল টাৰ্চটা?

এতক্ষণে মণিলাল কথা কহিল, গভীর মুখে বলিল, আমার বিশ্বাস ঐ ঘটনার পরদিন সকালবেলা গোলমালে কেউ টৰ্চটা সরিয়েছে।

পাণ্ডে প্রশ্ন করিলেন, কে সরাতে পারে? কারুর ওপর সন্দেহ হয়?

মণিলাল উত্তর দিবার জন্য মুখ খুলিয়াছিল, রামকিশোর মাঝখানে বলিয়া উঠিলেন, না না, মণি, ও তোমার ভুল ধারণা। রমাপতি নেয়নি, নিলে স্বীকার করত।

মণিলাল আর কথা কহিল না, ঠোঁট চাপিয়া বসিয়া রহিল। বুঝিলাম, টর্চ হারানোর প্রসঙ্গ পূর্বে আলোচিত হইয়াছে এবং মণিলালের সন্দেহ মাস্টার রমাপতির উপর। একটা ক্ষুদ্র পরিবারিক মতান্তর ও অস্বাচ্ছন্দ্যের ইঙ্গিত পাওয়া গেল।

অতঃপর চা শেষ করিয়া আমরা উঠিলাম। ব্যোমকেশ বলিল, এই সূত্রে আপনার সঙ্গে পরিচয়ের সৌভাগ্য হল। বড় সুন্দর জায়গায় বাড়ি করেছেন। এখানে একবার এলে আর ফিরে যেতে ইচ্ছে করে না।

রামকিশোর আনন্দিত হইয়া বলিলেন, বেশ তো, দুদিন না হয় থেকে যান না। দুদিন পরে কিন্তু প্ৰাণ পালাই-পালাই করবে। আমাদের অভ্যোস হয়ে গেছে তাই থাকতে পারি।

ব্যোমকেশ বলিল, আপনার নিমন্ত্রণ মনে রাখব। কিন্তু যদি আসি, ঐ দুর্গে থাকতে দিতে হবে। ক্ষুধিত পাষাণের মত আপনার দুর্গটা আমাকে চেপে ধরেছে।

রামকিশোর বিরসমুখে বলিলেন, দুর্গে আর কাউকে থাকতে দিতে সাহস হয় না। যা হোক, যদি সত্যিই আসেন তখন দেখা যাবে।

দ্বারের দিকে অগ্রসর হইয়াছি, কালো পর্দার আড়ালে জ্বলজ্বলে দুটো চোখ দেখিয়া চমকিয়া উঠিলাম। তুলসী এতক্ষণ পর্দার কাছে দাঁড়াইয়া আমাদের কথা শুনিতেছিল, এখন সরীসৃপের মত সরিয়া গেল।

রাত্রে আহারাদির পর পাণ্ডেজির বাসার খোলা ছাদে তিনটি আরাম-কেদারায় আমরা তিনজনে অঙ্গ এলাইয়া দিয়াছিলাম। অন্ধকারে ধূমপান চলিতেছিল। এখানে কীর্তিক মাসের এই সময়টি বড় মধুর; দিনে একটু মোলায়েম গরম, রাত্রে মোলায়েম ঠাণ্ডা।

পাণ্ডে বলিলেন, এবার বলুন কি মনে হল।

ব্যোমকেশ সিগারেটে দু তিনটা টান দিয়া বলিল, আপনি ঠিক ধরেছেন, গলদ আছে। কিন্তু ওখানে গিয়ে যতক্ষণ না চেপে বসা যাচ্ছে ততক্ষণ গলদ ধরা যাবে না।

আপনি তো আজ তার গৌরচন্দ্ৰিক করে এসেছেন। কিন্তু নিতান্তই কি দরকার—?

দরকার। এতদূর থেকে সুবিধা হবে না। ওদের সঙ্গে ভাল করে মিশতে হবে তবে ওদের পেটের কথা জানা যাবে। আজ লক্ষ্য করলাম, কেউ মন খুলে কথা কইছে না, সকলেই কিছু-না-কিছু চেপে যাচ্ছে।

হুঁ। তাহলে আপনার বিশ্বাস হয়েছে যে ঈশানবাবুর মৃত্যুটা স্বাভাবিক সপঘিাতে মৃত্যু নয়?

অতটা বলবার এখনও সময় হয়নি। এইটুকু বলতে পারি, আপাতদৃষ্টিতে যা দেখা যাচ্ছে তা সত্যি নয়, ভেতরে একটা গুঢ় এবং চমকপ্রদ রহস্য রয়েছে। মোহর কোথা থেকে এল? টৰ্চটা কোথায় গেল? রমাপতি যে-গল্প শোনালে তা কি সত্যি? সবাই দুৰ্গটা চায় কেন? মণিলালকে কর্তা ছাড়া কেউ দেখতে পারে না কেন?

আমি বলিলাম, মণিলালও রমাপতিকে দেখতে পারে না।

ব্যোমকেশ বলিল, ওটা স্বাভাবিক। ওরা দু’জনেই রামকিশোরবাবুর আশ্রিত। রমাপতিও বোধহয় মণিলালকে দেখতে পারে না। বাড়ির কেউ কাউকে দেখতে পারে না। সেটা আমাদের পক্ষে সুবিধে। দগ্ধাবশিষ্ট সিগারেট ফেলিয়া দিয়া সে বলিল, আচ্ছা পাণ্ডেজি, বংশীধর কতদূর লেখাপড়া করেছে জানেন?

পাণ্ডে বলিলেন, ম্যাট্রিক পাশ করেছে জানি। তারপর বহরমপুরে পড়তে গিয়েছিল, কিন্তু মাস কয়েক পরেই পড়াশুনা বন্ধ করে ঘরে ফিরে আসে।

গোলমাল ঠেকছে। বহরমপুরে ঈশানবাবুর সঙ্গে বংশীধরের জানা-শোনা হয়েছিল—তারপর বংশীধর হঠাৎ লেখাপড়া ছেড়ে দিলে কেন?

পাণ্ডে বলিলেন, খোঁজ নিতে পারি। বেশি দিনের কথা নয়, যদি গোলমাল থাকে কলেজের সেরেস্তায় হদিস পাওয়া যাবে।

খবর নেবেন তো। —আর মুরলীধরের বিদ্যে কতদূর?

ওটা আকাট মুখখু।

হুঁ, বংশটাই চাষাড়ে হয়ে গেছে। তবে রামকিশোরবাবুর ব্যবহারে একটা সাবেক ভদ্রতা আছে।

কিন্তু বাল্যবন্ধুর মৃত্যুতে খুব বেশি শোক পেয়েছেন বলে মনে হল না; বরং মোহরটি বাগাবার মতলব!

ব্যোমকেশ হাসিয়া উঠিল, এ জগতে হায় সেই বেশি চায় আছে যার ভুরি ভুরি। —কাল সকালে ঈশানবাবুর জিনিসপত্রগুলো পরীক্ষা করতে হবে, খাতাটা পড়তে হবে। তাতে হয়তো কিছু পাওয়া যেতে পারে।

তারপর?

তারপর দুর্গে গিয়ে গ্যাঁট হয়ে বসব। আপনি ব্যবস্থা করুন।

ভাল। কিন্তু একটা কথা ওদের দেওয়া খাবার খাওয়া চলবে না। কি জানি কার মনে কি আছে—

হাঁ, ঠিক বলেছেন। আপনার ইকমিক কুকার আছে?

আছে।

ব্যস, তাহলেই চলবে।

কিছুক্ষণ নীরবে কাটিল। ব্যোমকেশ আর একটা সিগারেট ধরাইয়া বলিল, অজিত, রামকিশোরবাবুকে দেখে কিছু মনে হল?

কি মনে হবে?

আজি তাঁকে দেখেই মনে হল, আগে কোথায় দেখেছি। তোমার মনে হল না?

কৈ না !

আমার কিন্তু এক নজর দেখেই মনে হল চেনা লোক। কিন্তু কবে কোথায় দেখেছি মনে করতে পারছি না।

পাণ্ডে একটা হাই চাপিয়া বলিলেন, রামকিশোরবাবুকে আপনার দেখার সম্ভাবনা কম; গত পাঁচ বছরের মধ্যে তিনি লোকালয়ে পা বাড়িয়েছেন। কিনা সন্দেহ। আপনি হয়তো ওই ধরনের চেহারা অন্য কোথাও দেখে থাকবেন।

একটু চুপ করিয়া থাকিয়া ব্যোমকেশ বলিল, তাই হবে বোধ হয়।

পরদিন প্রাতরাশের সময় পাণ্ডে বলিলেন, দুর্গে গিয়ে থাকার সঙ্কল্প ঠিক আছে?

ব্যোমকেশ বলিল, হ্যাঁ, আপনি ব্যবস্থা করুন। বড় জোর দু-তিন দিন থাকব, বেশি নয়।

পাণ্ডে বলিলেন, আমার কিন্তু মন চাইছে না, কি জানি যদি সত্যিই সাপ থাকে।

ব্যোমকেশ হাসিয়া বলিল, থাকলেও আমাদের কিছু করতে পারবে না। আমরা সাপের রোজা।

বেশ, আমি তাহলে রামকিশোরবাবুর সঙ্গে দেখা করে সব ঠিকঠাক করে আসি। —আচ্ছা, দুর্গের বদলে যদি রামকিশোরবাবুর বাড়িতে থাকেন তাতে ক্ষতি কি?

অত ঘেঁষাঘেঁষি সুবিধা হবে না, পরিপ্রেক্ষিত পাব না। দুৰ্গই ভাল।

ভাল। আমি অফিসে বলে যাচ্ছি, আমার মুনশী আতাউল্লাকে খবর দিলে সে ঈশানবাবুর জিনিসপত্র আপনাদের দেখাবে। গুদাম ঘরের চাবি তার কাছে।

পাণ্ডেজি মোটর-বাইকে চড়িয়া প্ৰস্থান করিলেন। ঘড়িতে মাত্ৰ নটা বাজিয়াছে, পাণ্ডেজির অফিস তাঁহার বাড়িতেই; সুতরাং ঈশানবাবুর মালপত্র পরীক্ষার তাড়া নাই। আমরা সিগারেট ধরাইয়া সংবাদপত্রের পাতা উল্টাইয়া গড়িমসি করিতেছি, এমন সময় একটি ছোট মোটর আসিয়া দ্বারে দাঁড়াইল। ব্যোমকেশ জানালা দিয়া দেখিয়া বলিল, ডাক্তার ঘটক। ভালই হল।

ডাক্তার ঘটকের একটু অনুতপ্ত ভাব। আমরা যে তাহার গুপ্তকথা ফাঁস করিয়া দিই নাই এবং ভবিষ্যতে দিব না। তাহা সে বুঝিয়াছে। বলিল, কাল আপনাদের সঙ্গে ভাল করে কথা বলবার সুযোগ পেলাম না, তাই—

ব্যোমকেশ পরম সমাদরের সহিত তাহাকে বসাইয়া বলিল, আপনি না এলে আমরাই যেতম। কেমন আছেন বলুন। পুরোনো বন্ধুরা সব কেমন? মহীধরবাবু?

ডাক্তার বলিল, সবাই ভাল আছেন।

ব্যোমকেশ চক্ষু মিটমিট করিয়া মৃদুহাস্যে বলিল, আর রজনী দেবী?

ডাক্তারের কান দুটি রক্তাভ হইল, তারপর সে হাসিয়া ফেলিল। বলিল, ভাল আছে রজনী। আপনারা এসেছেন শুনে জানতে চাইল মিসেস বক্সী এসেছেন কি না।

‘সত্যবতী এবার আসেনি। সে—’ ব্যোমকেশ আমার পানে তাকাইল।

আমি সত্যবতীর অবস্থা জানাইয়া বলিলাম, সত্যবতী আমাদের কলকাতা থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। আমরাও প্রতিজ্ঞা করেছি, একটা সুখবর না পাওয়া পর্যন্ত ওমুখে হব না।

ডাক্তার হাসিয়া ব্যোমকেশকে অভিনন্দন জানাইল, কিন্তু তাহার মুখে হাসি ভাল ফুটিল না। ক্ষুধিত ব্যক্তি অন্যকে আহার করিতে দেখিলে হাসিতে পারে, কিন্তু সে হাসি আনন্দের নয়।

ব্যোমকেশ তাহার মুখের ভাব দেখিয়া মনের ভাব বুঝিল, পিঠ চাপড়াইয়া বলিল, বন্ধু, মনে ক্ষোভ রাখবেন না। আপনি যা পেয়েছেন তা কম লোকের ভাগেই জোটে। একসঙ্গে দাম্পত্য-জীবনের মাধুর্য আর পরকীয়াপ্রীতির তীক্ষ্ণ স্বাদ উপভোগ করে নিচ্ছেন।

আমি যোগ করিয়া দিলাম, ভেবে দেখুন, শেলী বলেছেন, হে পবন, শীত যদি আসে বসন্ত রহে কি কভু দূরে। ফুলের মরসুম শেষ হোক, ফল আপনি আসবে।

এবার ডাক্তারের মুখে সত্যকার হাসি ফুটিল। আরও কিছুক্ষণ হাসি-তামাসার পর ব্যোমকেশ বলিল, ডাক্তার ঘটক, কাল রামকিশোরবাবুর বাড়িতে বিষয়-ঘটিত আলোচনা খানিকটা শুনেছিলাম, বাকিটা শোনবার কৌতুহল আছে। যদি বাধা না থাকে আপনি বলুন।

ডাক্তার বলিল, বাধা কি? রামকিশোরবাবু তো লুকিয়ে কিছু করছেন না। মাসখানেক আগে ওঁর স্বাস্থ্য হঠাৎ ভেঙ্গে পড়ে; হৃদযন্ত্রের অবস্থা খুবই খারাপ হয়েছিল। এখন অনেকটা সামলেছেন; কিন্তু ওঁর ভয় হয়েছে হঠাৎ যদি মারা যান তাহলে বড় ছেলেরা মামলা-মোকদ্দমায় সম্পত্তি নষ্ট করবে। হয়তো নাবালক ছেলেমেয়েদের বঞ্চিত করবার চেষ্টা করবে। তাই বেঁচে থাকতে থাকতেই উনি সম্পত্তি ভাগ-বাঁটোয়ারা করে দিতে চান। সম্পত্তি সমান চার ভাগ হবে; দুভাগ বড় দুই ছেলে পাবে, বাকি দুভাগ রামকিশোরের অধিকারে থাকবে। তারপর ওঁর মৃত্যু হলে গদাই আর তুলসী ওয়ারিসান সূত্রে ওঁর সম্পত্তি পাবে, বড় দুই ছেলে আর কিছু পাবে না।

ব্যোমকেশ চিন্তা করিতে করিতে বলিল, বুঝেছি। দুর্গ নিয়ে কি ঝগড়া হচ্ছিল?

দুৰ্গটা রামকিশোরবাবু নিজের দখলে রেখেছেন। অথচ দুই ছেলেরই লোভ দুর্গের ওপর।

মণিলালকে দুর্গ দেবার কথা উঠল কেন?

ব্যাপার হচ্ছে এই—রামকিশোরবাবু স্থির করেছেন তুলসীর সঙ্গে মণিলালের বিয়ে দেবেন। মণিলাল ওঁর বড় মেয়েকে বিয়ে করেছিল, সে-মেয়ে মারা গেছে, জানেন বোধ হয়। কাল কথায় কথায় রামকিশোরবাবু বলেছিলেন, তাঁর মৃত্যুর পর বসতবাড়িটা পাবে গদাই, আর মণিলাল পাবে দুর্গ। মণিলাল মানেই তুলসী, মণিলালকে আলাদা কিছু দেওয়া হচ্ছে না। তাইতেই বংশী আর মুরলী ঝগড়া শুরু করে দিলে৷।

হুঁ। কিন্তু তুলসীর বিয়ের তো এখনও দেরি আছে। ওর কতই বা বয়স হবে।

আধুনিক মতে বিয়ের বয়স না হলেও নেহাৎ ছোট নয়, বছর তোর-চোদ্দ হবে। রামকিশোরবাবু বোধহয় শীগগিরই ওদের বিয়ে দেবেন। যদি হঠাৎ মারা যান, নাবালক ছেলেমেয়েদের একজন নির্ভরযোগ্য অভিভাবক চাই তো ! বড় দুই ছেলের ওপর ওঁর কিছুমাত্র আস্থা নেই।

যেটুকু দেখেছি তাতে আস্থা থাকার কথা নয়। মণিলাল মানুষটি কেমন?

মাথা-ঠাণ্ডা লোক। রামকিশোরবাবু তাই ওর ওপরেই ভরসা রাখেন বেশি। তবে যেভাবে শ্বশুরবাড়ি কামড়ে পড়ে আছে তাতে মনে হয় চক্ষুলজ্জা কম।

ব্যোমকেশ কিছুক্ষণ শূন্যে চাহিয়া থাকিয়া হঠাৎ বলিল, ডাক্তার ঘটক, আপনি রুগী সম্বন্ধে একটু সাবধান থাকবেন।

ডাক্তার চকিত হইয়া বলিল, রুগী ! কোন রুগী?

রামকিশোরবাবু। তাঁর হৃদযন্ত্র যদি দলিল রেজিস্ট্রি হবার আগেই হঠাৎ থেমে যায় তাহলে কারুর সুবিধা হতে পারে।

ডাক্তার চোখ বড় বড় করিয়া চাহিয়া রহিল।

বেলা দশটা নাগাদ ডাক্তার বিদায় লইলে আমরা মুনশী আতাউল্লাকে খবর পাঠাইলাম।

আতাউল্লা লোকটি অতিশয় কেতাদুরস্ত প্রৌঢ় মুসলমান, বোধহয় খানদানী ব্যক্তি। কৃশ দেহে ছিটের আচকান, দাড়িতে মেহেদির রঙ, চোখে সুর্মা, মুখে পান; তাহার চোস্ত জবানের সঙ্গে মুখ হইতে ফুলিঙ্গের ন্যায় পানের কুচি ছিটকাইয়া পড়িত। লোকটি সজ্জন।

আমাদের অভিপ্রায় জানিতে পারিয়া মুনশী আতাউল্লা দুইজন আরদালির সাহায্যে ঈশানবাবুর বিছানা ও তোরঙ্গ আনিয়া আমাদের খিদমতে পেশ করিলেন। বিছানাটা নামমাত্র। রঙ-ওঠা সতরঞ্চিতে জড়ানো জীৰ্ণ বাঁদিপোতার তোষক ও তেলচিটে বালিশ। তবু ব্যোমকেশ উহা ভাল করিয়া পরীক্ষা করিল। তোষকটি ঝাড়িয়া এবং বালিশটি টিপিয়া টুপিয়া দেখিল, কিন্তু তাঁহাদের মধ্যে গুপ্ত ধাতব পদার্থের অস্তিত্ব ধরা পড়িল না।

বিছানা স্থানাস্তরিত করিবার হুকুম দিয়া ব্যোমকেশ বলিল, মুন্‌শজি, একটা মোহর ছিল সেটা দেখতে পাওয়া যাবে কি?

বেশক, জনাব। আপনার যদি মরজি হয় তাই আমি মোহর সঙ্গে এনেছি।

আতাউল্লা আচুকানের পকেট হইতে একটি কাঠের কোটা বাহির করিলেন। কোটার গায়ে নানাপ্রকার সাঙ্কেতিক অক্ষর ও চিহ্ন অঙ্কিত রহিয়াছে। ভিতরে তুলার মোড়কের মধ্যে মোহর।

পাকা সোনার মোহর; আকারে আয়তনে বর্তমান কালের চাঁদির টাকার মত। ব্যোমকেশ উল্টাইয়া পাল্টাইয়া দেখিয়া বলিল, এতে উর্দুতে কি লেখা রয়েছে পড়তে পারেন?

আতাউল্লা ঈষৎ আহত-কণ্ঠে বলিলেন, উর্দু নয় জনাব, ফারসী। আসরফিতে উর্দু লেখার রেওয়াজ ছিল না। যদি ফরমাস করেন পড়ে দিতে পারি, ফারসী আমার খাস জবান।

ব্যোমকেশ অপ্ৰস্তুত হইয়া বলিল, তাই নাকি ! তাহলে পড়ে বলুন দেখি কবেকার মোহর।

আতাউল্লা চশমা আটিয়া মোহরের লেখা পড়িলেন, বলিলেন, তারিখ নেই। লেখা আছে। এই মোহর নবাব আলিবর্দি খাঁর আমলে ছাপা হয়েছিল।

ব্যোমকেশ বলিল, তাহলে জানকীরামের কালের মোহর, পরের নয়। —আচ্ছ মুনশীজি, আপনাকে বহুত বহুত ধন্যবাদ, আপনি অফিসে যান, যদি আবার দরকার হয় আপনাকে খবর পাঠাব।

‘মেহেরবানি’ বলিয়া আতাউল্লা প্ৰস্থান করিলেন।

ব্যোমকেশ তখন অধ্যাপক মহাশয়ের তোরঙ্গটি টানিয়া লইয়া বসিল। চটা-ওঠা টিনের তোরঙ্গটির মধ্যে কিন্তু এমন কিছুই পাওয়া গেল না যাহা তাঁহার মৃত্যুর কারণ-নির্দেশে সাহায্য করিতে পারে। বস্ত্ৰাদি নিত্যব্যবহার্য জিনিসগুলি দেখিলে মনে হয় অধ্যাপক মহাশয় অল্পবিত্ত ছিলেন কিম্বা অতিশয় মিতব্যয়ী ছিলেন। দুইখানি পুরাতন মলাট-ছেড়া বই; একটি শ্যামশাস্ত্রী-সম্পাদিত কৌটিলীয় অর্থশাস্ত্ৰ, অন্যটি শয়র-ই-মুতীক্ষরিনের ইংরেজি অনুবাদ। ইতিহাসের গণ্ডীর মধ্যে অধ্যাপক মহাশয়ের জ্ঞানের পরিধি কতখানি বিস্তৃত ছিল, এই বই দুখানি হইতে তাহার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

বই দুখানির সঙ্গে একখানি চামড়া-বাঁধানো প্রাচীন খাতা। খাতাখানি বোধ হয় ত্রিশ বছরের পুরাতন; মলাটা ঢলঢলে হইয়া গিয়াছে, বিবৰ্ণ পাতাগুলিও খসিয়া আসিতেছে। এই খাতায় অত্যন্ত অগোছালভাবে, কোথাও পেন্সিল দিয়া দু’চার পাতা, কোথাও কালি দিয়া দু’চার ছত্র লেখা রহিয়াছে। হস্তাক্ষর সুছাঁদ নয়, কিন্তু একই হাতের লেখা। যাহাদের লেখাপড়া লইয়া কাজ করিতে হয় তাহারা এইরূপ একখানি সর্বাংবহা খাতা হাতের কাছে রাখে; যখন যাহা ইচ্ছা ইহাতে টুকিয়া রাখা যায়।

খাতাখানি সযত্নে লইয়া আমরা টেবিলে বসিলাম ! ব্যোমকেশ একটি একটি করিয়া পাতা উল্টাইতে লাগিল।

প্রথম দুই-তিনটি পাতা খালি। তারপর একটি পাতায় লেখা আছে

ইতিহাসের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা

যদি মানুষের ভাষায় কথা বলিতে

পারিতেন তবে তিনি মহরমের

বাজনার ছন্দে বলিতেন

ধনানার্জয়ধ্বম! ধনানর্জয়ধ্বম!

ব্যোমকেশ ভ্রু তুলিয়া বলিল, মহরমের বাজনার মত শোনাচ্ছে বটে, কিন্তু মানে কি?

বলিলাম, মনে হচ্ছে, ধন উপার্জন করাহ, ধন উপার্জন করুহ। তোমার ঈশানবাবু দেখছি সিনিক ছিলেন।

ব্যোমকেশ লেখাটাকে আরও কিছুক্ষণ দেখিয়া পাতা উল্টাইল। পরপৃষ্ঠায় কেবল কয়েকটি তারিখ নোট করা হইয়াছে। ঐতিহাসিক তারিখ; কবে হিজরি অব্দ আরম্ভ হইয়াছিল, শশাঙ্ক দেবের মৃত্যুর তারিখ কি, এইসব। বোধ হয় ছাত্রদের ইতিহাস পড়াইবার জন্য নোট করিয়াছিলেন। এমনি আরও কয়েক পৃষ্ঠায় তারিখ লেখা আছে, সেগুলির উল্লেখ করিবার প্ৰয়োজন নাই।

ইহার পর আরও কয়েক পাতা শূন্য। তারপর সহসা এক দীর্ঘ রচনা শুরু হইয়াছে। তাহার আরম্ভটা এইরূপ—

রামবিনোদের কাছে তাহার বংশের ইতিহাস শুনিলাম। সিপাহী-যুদ্ধের সময় লুঠেরাগণ বোধ হয় সঞ্চিত ধনরত্ন লইয়া যাইতে পারে নাই; অন্তত রামবিনোদের তাঁহাই বিশ্বাস। সে দুর্গ দেখিয়া আসিয়াছে। তাহার উচ্চাশা, যদি কোনও দিন ধনী হয় তখন ঐ দুর্গ কিনিয়া তথায় গিয়া বাস করিবে।

অতঃপর জানকীরাম হইতে আরম্ভ করিয়া রাজারাম জয়রাম পর্যন্ত রমাপতির মুখে। যেমন শুনিয়াছিলাম ঠিক তেমনি লেখা আছে, একচুল এদিক ওদিক নাই। পাঠ শেষ হইলে আমি বলিলাম, যাক, একটা বিষয়ে নিশ্চিন্ত হওয়া গেল, রমাপতি মিথ্যে গল্প বলেনি।

ব্যোমকেশ বলিল, গল্পটা রমাপতি ঠিকই বলেছিল সন্দেহ নেই। কিন্তু গল্পটা ঈশানবাবুর মৃত্যুর রাত্রে শুনেছিল তার প্রমাণ কি? দুদিন আগেও শুনে থাকতে পারে।

তা—বটে। তাহলে—?

তাহলে কিছু না। আমি বলতে চাই যে, ও সম্ভাবনাটাকেও বাদ দেওয়া যায় না। অৰ্থাৎ রমাপতি সে-রাত্রে এই গল্পই শুনেছিল এবং পরদিন ভোরবেলা গল্পের বাকিটা শোনবার জন্যে ঈশানবাবুর কাছে গিয়েছিল তার কোনও প্রমাণ নেই।

আবার কিছুক্ষণ পাতা উল্টাইবার পর এমন একটি পৃষ্ঠায় আসিয়া পৌছিলাম, যেখানে তীব্র কাতরোক্তির মত কয়েকটি শব্দ লেখা রহিয়াছে

—রামবিনোদ বাঁচিয়া নাই। আমার

একমাত্র আকৃত্রিম বন্ধু চলিয়া গিয়াছে।

সে কি ভয়ঙ্কর মৃত্যু ! দুঃস্বপ্নের মত

সে-দৃশ্য আমার চোখে লাগিয়া আছে।

ব্যোমকেশ লেখাটার উপর কিছুক্ষণ দৃষ্টি স্থাপিত রাখিয়া বলিল, ভয়ঙ্কর মৃত্যু। স্বাভাবিক মৃত্যু বলে মনে হয় না। খোঁজ করা দরকার। আমার মুখে জিজ্ঞাসার চিহ্ন দেখিয়া মৃদুকণ্ঠে আবৃত্তি করিল, যেখানে দেখিবে ছাই উড়াইয়া দেখ ভাই, পাইলে পাইতে পার লুকানো রতন।

খাতার সামনের দিকের লেখা এইখানেই শেষ। মনে হয় রামবিনোদের মৃত্যুর পর খাতাটি দীর্ঘকাল অব্যবহৃত পড়িয়া ছিল, হয়তো হারাইয়া গিয়াছিল। তারপর আবার যখন লেখা আরম্ভ হইয়াছে, তখন খাতার উল্টা পিঠ হইতে।

প্রথম লেখাটি কালি-কলমের লেখা; পীতবর্ণ কাগজে কালি চুপসিয়া গিয়াছে। পাতার মাথার দিকে লেখা হইয়াছে—

রামকিশোরের বড় ছেলে বংশীধর কলেজে পড়িতে আসিয়াছে।

অনেকদিন পরে উহাদের সঙ্গে আবার সংযোগ ঘটিল। সেই

রামবিনোদের মৃত্যুর পর আর খোঁজ লই নাই।

পাতার নীচের দিকে লেখা আছে-বংশীধর এক মারাত্মক

কেলেঙ্কারি করিয়াছে। তাহাকে বাঁচাইবার চেষ্টা করিতেছি।

হাজার হোক রামবিনোদের ভ্রাতুষ্পপুত্ৰ।

ব্যোমকেশ বলিল, বংশীধরের কেলেঙ্কারির হদিস বোধ হয় দু’চার দিনের মধ্যেই পাওয়া যাবে। কিন্তু এ কি?

দেখা গেল বাকি পাতাগুলিতে যে লেখা আছে তাহার সবগুলিই লাল-নীল পেন্সিলে লেখা। ব্যোমকেশ পাতাগুলি কয়েকবার ওলট-পালট করিয়া বলিল, “অজিত, তেরঙ্গের তলায় দেখ তো লাল-নীল পেন্সিল আছে কি না।

বেশি খুঁজতে হইল না, একটি দুমুখো লাল-নীল পেন্সিল পাওয়া গেল।

ব্যোমকেশ বলিল, যাক, বোঝা গেল। এর পর যা কিছু লেখা আছে ঈশানবাবু দুর্গে আসার পর লিখেছেন। এগুলি তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়।

প্ৰথম লেখাটি এইরূপ

দুৰ্গে গুপ্তকক্ষ দেখিতে পাইলাম না।

ভারি আশ্চর্য ! দুর্গের সোনাদানা কোথায় রক্ষিত হইত?

প্ৰকাশ্য কক্ষে রক্ষিত হইত বিশ্বাস হয় না।

নিশ্চয় কোথাও গুপ্তকক্ষ আছে। কিন্তু কোথায়? সিপাহীরা

গুপ্তকক্ষের সন্ধান পাইয়া থাকিলে গুপ্তকক্ষ আর গুপ্ত

থাকিত না, তাহার দ্বারা ভাঙ্গিয়া রাখিয়া যাইত, তখন

উহা সকলেরই দৃষ্টিগোচর হইত। তবেই গুপ্তকক্ষের

সন্ধান সিপাহীরা পায় নাই।

ব্যোমকেশ বলিল, অধ্যাপক মহাশয়ের যুক্তিটা খুব বিচারসহ নয়। সিপাহীরা চলে যাবার পর রাজারামের পরিবারবর্গ ফিরে এসেছিল। তারা হয়তো ভাঙা তোষাখানা মেরামত করিয়েছিল, তাই এখন ধরা যাচ্ছে না।

পাতা উল্টাইয়া ব্যোমকেশ পড়িল—

কেহ আমাকে ভয় দেখাইয়া দুৰ্গ হইতে তাড়াইবার চেষ্টা

করিতেছে। বংশীধর? আমি কিন্তু সহজে দুর্গ ছাড়িব

না ! ধনানর্জয়ধ্বম! ধনানার্জয়ধ্বম!

জিজ্ঞাসা করিলাম, আবার মহরমের বাজনা কেন?

ব্যোমকেশ বলিল, মোহরের গন্ধ পেয়ে বোধ হয় তাঁর স্নায়ুমণ্ডলী উত্তেজিত হয়েছিল।

অতঃপর কয়েক পৃষ্ঠা পরে খাতার শেষ লেখা। আমরা অবাক হইয়া চাহিয়া রহিলাম। বাংলা ভাষায় লেখা নয়, উর্দু কিংবা ফারসীতে লেখা তিনটি পংক্তি। তাহার নীচে বাংলা অক্ষরে কেবল দুইটি শব্দ-মোহনলাল কে?

ব্যোমকেশ নিশ্বাস ফেলিয়া বলিল, সত্যিই তো, মোহনলাল কে? এ প্রশ্নের সদুত্তর দেওয়া আমাদের কর্ম নয়। ডাকো মুনশী আতাউল্লাকে।

আতাউল্লা আসিয়া লিপির পাঠোদ্ধার করলেন। বলিলেন, জনবা, মৃত ব্যক্তি ভাল ফরাসী জানতেন মনে হচ্ছে। তবে একটু সেকেলে ধরনের। তিনি লিখেছেন, যদি আমি বা জয়রাম বাঁচিয়া না থাকি আমাদের তামাম ধনসম্পত্তি সোনাদানা মোহনলালের জিন্মায় গচ্ছিত রহিল।

মোহনলালের জিম্মায়—!

জী জনাব, তাই লেখা আছে।

হুঁ। আচ্ছা, মুনশীজি, আপনি এবার জিনিসপত্র সব নিয়ে যান। কেবল এই খাতাটা আমার কাছে রইল।

দু’জনে সিগারেট ধরাইয়া আরাম-কেদারার কোলে অঙ্গ ছড়াইয়া দিলাম। নীরবে একটা সিগারেট শেষ করিয়া তাহারই চিতাগ্নি হইতে দ্বিতীয় সিগারেট ধরাইয়া বলিলাম, খাতা পড়ে কি মনে হচ্ছে?

ব্যোমকেশ কেদারায় দুই হাতলে তবলা বাজাইতে বলিল, মনে হচ্ছে, ধনানর্জয়ধ্বম। ধনানার্জয়ধ্বম।

ঠাট্টা নয়, কি বুঝলে বল না।

পরিষ্কারভাবে কিছুই বুঝিনি এখনও। তবে ঈশানবাবুকে যদি সত্যিই কেউ হত্যা করে থাকে তাহলে হত্যার মোটিভ দেখতে পাচ্ছি।

কি মোটিভ?

সেই চিরন্তন মোটিভ-টাকা।

আচ্ছা, ফারসী ভাষায় ঐ কথাগুলো লিখে রাখার তাৎপৰ্য কি?

ওটা উনি নিজে লেখেননি। অর্থাৎ হস্তাক্ষর ওঁরা, কিন্তু রচনা ওঁর নয়, রাজারামের। উনি লেখাটি দুর্গে কোথাও পেয়েছিলেন, তারপর খাতায় টুকে রেখেছিলেন।

তারপর?

তারপর মারা গেলেন।

পাণ্ডেজি ফিরিলেন বেলা বারোটার পর। হেলমেট খুলিয়া ফেলিয়া কপালের ঘাম মুছিয়া বলিলেন, “কাজ হল বটে কিন্তু বুড়ো গোড়ায় গোলমাল করেছিল।

ব্যোমকেশ বলিল, গোলমাল কিসের?

পাণ্ডে বলিলেন, বেলা হয়ে গেছে, খেতে বসে সব বলব। আপনি কিছু পেলেন?

খেতে বসে বলব।

আহারে বসিয়া ব্যোমকেশ বলিল, আপনি আগে বলুন। কাল তো রামকিশোরবাবু নিমরাজী ছিলেন, আজ হঠাৎ বেঁকে বসলেন কেন?

পাণ্ডে বলিলেন, কাল আমরা চলে আসবার পর কেউ ওঁকে বলেছে যে আপনি একজন বিখ্যাত ডিটেকটিভ। তাতেই উনি ঘাবড়ে গেছেন।

এতে ঘাবড়াবার কি আছে? ওঁর মনে যদি পাপ না থাকে—

সেই কথাই শেষ পর্যন্ত আমাকে বলতে হল। বললাম, হলই বা ব্যোমকেশবাবু ডিটেকটিভ, আপনার ভয়টা কিসের? আপনি কি কিছু লুকোবার চেষ্টা করেছেন?তখন বুড়ো তাড়াতাড়ি রাজী হয়ে গেল।

আমি বললাম, রামকিশোরবাবু তাহলে সত্যিই কিছু লুকোবার চেষ্টা করেছেন।

পাণ্ডে বলিলেন, আমার তাই সন্দেহ হল। কিন্তু ঈশানবাবুর মৃত্যুঘটিত কোনো কথা নয়। অন্য কিছু। যা হোক, আমি ঠিক করে এসেছি, আজই ওরা দুৰ্গটাকে আপনাদের বাসের উপযোগী করে রাখবে। আপনারা ইচ্ছে করলে আজ বিকেলে যেতে পারেন। কিম্বা কাল সকালে যেতে পারেন।

আজি বিকেলেই যাব।

তাই হবে। কিন্তু আমি আর একটা ব্যবস্থা করেছি। আমার খাস আরদালি সীতারাম আপনাদের সঙ্গে থাকবে।

না না, কি দরকার?

দরকার আছে। সীতারাম লাল পাগড়ি পরে যাবে না, সাধারণ চাকর সেজে যাবে। লোকটা খুব কুঁশিয়ার; তাছাড়া, ওর একটা মস্ত বিদ্যে আছে, ও সাপের রোজা। ও সঙ্গে থাকলে অনেক সুবিধে হবে। ভেবে দেখুন, আপনাদের জল তোলা কাপড় কাচা বাসন মাজার জন্যেও একজন লোক দরকার। ওদের লোক না নেওয়াই ভাল।

ব্যোমকেশ সম্মত হইল। পাণ্ডে তখন বলিলেন, এবার আপনার হাল বিয়ান করুন।

ব্যোমকেশ সবিস্তারে ঈশানবাবুর খাতার রহস্য উদঘাটিত করিল। শুনিয়া পাণ্ডে বলিলেন, হুঁ, মোহনলাল লোকটা কে ছিল আমারও জানতে ইচ্ছে হচ্ছে, কিন্তু একশো বছর পরে আর তার ঠিকানা বার করা সম্ভব হবে না। এদিকে হালের খবর ঈশানবাবু লিখছেন, তাঁকে কেউ ভয় দেখিয়ে দুর্গ থেকে তাড়াবার চেষ্টা করছে। তাঁর সন্দেহ বংশীধরের ওপর। কিন্তু সত্যি কথাটা কি? ভয়ই বা দেখালো কী ভাবে?

ব্যোমকেশ মাথা নাড়িয়া বলিল, এ সব প্রশ্নের উত্তর এখন পাওয়া যাবে না। দেখা যাক, দুর্গে গিয়ে যদি দুর্গের রহস্য ভেদ করা যায়।

অপরাহ্ণে পুলিস ভ্যানে চড়িয়া শৈল-দুর্গে উপস্থিত হইলাম। আমরা তিনজন এবং সীতারাম। পাণ্ডেজি আমাদের ঘর-বসতি করিয়া দিয়া ফিরিয়া যাইবেন, সীতারাম থাকিবে। সীতারামের বয়স পঁয়ত্ৰিশ, লিকলিকে লম্বা গড়ন, তামাটে ফর্সা রঙ, শিকারী বিড়ালের মত গোঁফভ তাহার চেহারার মাহাত্ম্য এই যে, সে ভাল কাপড়চোপড় পরিলে তাহাকে ভদ্রলোক বলিয়া মনে হয়, আবার নেংটি পরিয়া থাকিলে বাসন-মাজা ভূত্য মনে করিতে তিলমাত্র দ্বিধা হয় না। উপস্থিত তাহার পরিধানে হাঁটু পর্যন্ত কাপড় কাঁধে গামছা। অর্থাৎ, মোটা কাজের চাকর।

আমাদের সঙ্গে লটবহার কম ছিল না, বিছানা বাক্স, চাল ডাল আনাজ প্রভৃতি রসদ, ইকমিক কুকার এবং আরও কত কি। সীতারাম এবং বুলাকিলাল মালপত্র দুর্গে ঢোলাই করিতে আরম্ভ করিল। পাণ্ডে বলিলেন, চলুন, গৃহস্বামীর সঙ্গে দেখা করে আসবেন।

গৃহস্বামী বৃড়ির সদর বারান্দায় উপবিষ্ট ছিলেন, সঙ্গে জামাই মণিলাল, আমাদের সম্ভাষণ জানাইলেন; আমরা খাবার ব্যবস্থা নিজেরাই করিয়াছি বলিয়া অনুযোগ করিলেন; শহুরে মানুষ পাহাড়ে জঙ্গলে মন বসাইতে পারিব না বলিয়া রসিকতা করিলেন। কিন্তু তাঁহার চক্ষু সতর্ক ও সাবধান হইয়া রহিল।

মিষ্টালাপের সময় লক্ষ্য করিলাম, বাড়ির অন্যান্য অধিবাসীরা আমাদের শুভাগমনে বেশ চঞ্চল হইয়া উঠিয়াছে। বংশীধর এবং মুরলীধর চিলের মত চক্রাকারে আমাদের চারিদিকে পরিভ্রমণ করিতেছে, কিন্তু কাছে আসিতেছে না। রমাপতি একবার বাড়ির ভিতর হইতে গলা বাড়াইয়া আমাদের দেখিয়া নিঃশব্দে সরিয়া গেল। নায়েব চাঁদমোহন বারান্দার অন্য প্রান্তে থেলো ইঁহঁকোয় তামাক টানিতে টানিতে বক্র দৃষ্টিশলাকায় আমাদের বিদ্ধ করিতেছেন। তুলসী একটা জুই ঝাড়ের আড়াল হইতে কৌতুহলী কাঠবিড়ালীর মত আমাদের নিরীক্ষণ করিয়া ছুটিয়া চলিয়া গেল; কিছুক্ষণ পরে দেখিলাম একটা থামের আড়াল হইতে সে উঁকি মারিতেছে।

ব্যোমকেশ যে একজন খ্যাতনামা গোয়েন্দা এবং কোনও গভীর অভিসন্ধি লইয়া দুর্গে বাস করিতে আসিয়াছে তাহা ইহারা জানিতে পারিয়াছে এবং তদনুযায়ী উত্তেজিত হইয়া উঠিয়াছে। কেবল গদাধরের জড়বুদ্ধি বোধ হয় এতবড় ধাক্কাতেও সক্রিয় হইয়া ওঠে নাই; তাহাকে দেখিলাম না।

আমরা গাত্ৰোত্থান করিলে রামকিশোরবাবু বলিলেন, শুধু থাকার জন্যেই এসেছেন মনে করবেন না যেন। আপনারা আমার অতিথি, যখন যা দরকার হবে খবর পাঠাবেন।

নিশ্চয়, নিশ্চয়। আমরা গমনোদ্যত হইলাম। গৃহস্বামী ইশারা করিলেন, মণিলাল আমাদের সঙ্গে চলিল; উদ্দেশ্য দুর্গ পর্যন্ত আমাদের আগাইয়া দিয়া আসিবে।

সিঁড়ি দিয়া নামা ওঠার সময় মণিলালের সঙ্গে দুই-চারিটা কথা হইল। ব্যোমকেশ বলিল, আমি যে ডিটেকটিভ একথা রামকিশোরবাবু জানলেন কি করে?

মণিলাল বলিল, আমি বলেছিলাম। আপনার নাম আমার জানা ছিল; এর লেখা বই পড়েছি। শুনে কত খুব উত্তেজিত হয়ে উঠেছিলেন। তারপর আপনারা দুর্গে এসে থাকতে চান শুনে ঘাবড়ে গেলেন।

কেন?

এই সেদিন একটা দুর্ঘটনা হয়ে গেল—

তাই আপনাদের ভয় আমাদেরও সাপে খাবে। ভালো কথা, আপনার স্ত্রীও না। সর্পাঘাতে মারা গিয়েছিলেন?

আজ্ঞে হ্যাঁ।

এ অঞ্চলে দেখছি খুব সাপ আছে।

আছে নিশ্চয়। কিন্তু আমি কখনও চোখে দেখিনি।

দেউড়ি পর্যন্ত নামিয়া আমরা দুর্গের সিঁড়ি ধরিলাম। হঠাৎ মণিলাল জিজ্ঞাসা করিল, কিছু মনে করবেন না, আপনারা পুলিসের লোক, তাই জানতে কৌতুহল হচ্ছে—ঈশানবাবু ঠিক সাপের কামড়েই মারা গিয়েছিলেন তো?

ব্যোমকেশ ও পাণ্ডের মধ্যে একটা চকিত দৃষ্টি বিনিময় হইল। ব্যোমকেশ বলিল, কেন বলুন দেখি? এ বিষয়ে সন্দেহ আছে নাকি?

মণিলাল ইতস্তত করিয়া বলিল, না—তবে-কিছুই তো বলা যায় না—

পাণ্ডে বলিলেন, সাপ ছাড়া আর কি হতে পারে?

মণিলাল বলিল, সেটা আমিও বুঝতে পারছি না। ঈশানবাবুর পায়ে সাপের দাঁতের দাগ আমি নিজের চোখে দেখেছি। ঠিক যেমন আমার স্ত্রীর পায়ে ছিল। মণিলাল একটা নিশ্বাস ফেলিল।

দুর্গের তোরণে আসিয়া পৌছিলাম। মণিলাল বলিল, এবার আমি ফিরে যাব। কর্তার শরীর ভাল নয়, তাঁকে বেশিক্ষণ একলা রাখতে সাহস হয় না। কাল সকালেই আবার আসব।

মণিলাল নমস্কার করিয়া নামিয়া গেল। সূর্য অস্ত গিয়াছিল। রামকিশোরবাবুর বাড়ির মাথার উপর শুক্লা দ্বিতীয়ার কৃশাঙ্গী চন্দ্ৰকলা মুচকি হাসিয়া বাড়ির আড়ালে লুকাইয়া পড়িল। আমরাও তোরণ দিয়া দুর্গের অঙ্গনে প্রবেশ করিলাম। ব্যোমকেশ বলিল, আজ সকালে ডাক্তার ঘটককে তার রুগী সম্বন্ধে সাবধান করে দিয়েছিলাম; এখন দেখছি তার কোনও দরকার ছিল না। সম্পত্তি হস্তান্তরের দলিল রেজিস্ট্রি না হওয়া পর্যন্ত জামাই মণিলাল যক্ষের মত শ্বশুরকে আগলে থাকবে।

পাণ্ডে একটু হাসিলেন, হ্যাঁ—ঈশানবাবুর মৃত্যু সম্বন্ধে এদের খটকা লেগেছে দেখছি। কিন্তু এখন কিছু বলা হবে না।

না।

আমরা প্রাঙ্গণ অতিক্রম করিয়া বাড়ির দিকে চলিলাম। পাণ্ডেজির হাতে একটি মুষলাকৃতি লম্বা টর্চ ছিল; সেটির বৈদ্যুতিক আলো যেমন দূরপ্রসারী, প্রয়োজন হইলে সেটিকে মারাত্মক প্রহরণস্বরূপেও ব্যবহার করা চলে। পাণ্ডে টর্চ জ্বালিয়া তাহার আলো সম্মুখে নিক্ষেপ করিলেন, বলিলেন, এটা আপনাদের কাছে রেখে যাব, দরকার হতে পারে। চলুন, দেখি আপনাদের থাকার কি ব্যবস্থা হয়েছে।

দেখা গেল সেই গজল-কন্টকিত ঘরটিতেই থাকার বন্দোবস্ত হইয়াছে। দুইটি লোহার খাট, টেবিল চেয়ার প্রভৃতি আসবাব দেওয়ালের নিরাভরণ দৈন্য অনেকটা চাপা দিয়াছে। সীতারাম ইতিমধ্যে লণ্ঠন জ্বালিয়াছে, বিছানা পাতিয়াছে, ইকমিক্‌ কুকারে রান্না চড়াইয়াছে এবং স্টোভ জ্বলিয়া চায়ের জল গরম করিতেছে। তাহার কর্মতৎপরতা দেখিয়া চমৎকৃত হইলাম।

অচিরাৎ ধূমায়মান চা আসিয়া উপস্থিত হইল। চায়ে চুমুক দিয়া পাণ্ডে বলিলেন, সীতারাম, কেমন দেখলে?

সীতারাম বলিল, কিল্লা ঘুরে ফিরে দেখে নিয়েছি হুজুর। এখানে সাপ নেই।

নিঃসংশয় উক্তি। পাণ্ডে নিশ্বাস ছাড়িয়া বলিলেন, যাক, নিশ্চিন্ত হওয়া গেল।

আর কিছু?

আর, সিঁড়ি ছাড়া কিল্লায় ঢোকবার অন্য রাস্তা নেই। দেয়ালের বাইরে খাড়া পাহাড়।

ব্যোমকেশ পাণ্ডের দিকে ফিরিয়া বলিলেন, এর মানে বুঝতে পারছেন?

কি?

যদি কোনও আততায়ী দুৰ্গে ঢুকতে চায় তাকে সিঁড়ি দিয়ে আসতে হবে। অর্থাৎ, দেউড়ির পাশ দিয়ে আসতে হবে। বুলাকিলাল তাকে দেখে ফেলতে পারে।

হুঁ, ঠিক বলেছেন। বুলাকিলালকে জেরা করতে হবে। কিন্তু আজ দেরি হয়ে গেছে, আজ আর নয়। —সীতারাম, তোমাকে বেশি বলবার দরকার নেই। এদের দেখাশুনা করবে, আর চোখ কান খুলে রাখবে।

জী হুজুর।

পাণ্ডেজি উঠিলেন।

কাল কোনও সময়ে আসব। আপনারা সাবধানে থাকবেন।

পাণ্ডেজিকে দুৰ্গতোরণ পর্যন্ত পৌঁছাইয়া দিলাম। বোমকেশ টর্চ জ্বলিয়া সিঁড়ির উপর আলো ফেলিল, পাণ্ডেজি নামিয়া গেলেন। কিছুকাল পরে নীচে হইতে শব্দ পাইলাম পুলিস ভ্যান চলিয়া গেল। ওদিকে রামকিশোরবাবুর বাড়িতে তখন মিটমিটি আলো জ্বলিয়াছে।

আমরা আবার প্রাঙ্গণে আসিয়া দাঁড়াইলাম। আকাশে তারা ফুটিয়াছে, জঙ্গলের দিক হইতে মিষ্ট বাতাস দিতেছে। সীতারাম যেন আমাদের মনের অকথিত অভিলাষ জানিতে পারিয়া দুটি চেয়ার আনিয়া অঙ্গনে রাখিয়াছে। আমরা তৃপ্তির নিশ্বাস ফেলিয়া উপবেশন করিলাম।

এই নক্ষত্রবিদ্ধ অন্ধকারে বসিয়া আমার মন নানা বিচিত্র কল্পনায় পূর্ণ হইয়া উঠিল। আমরা যেন রূপকথার রাজ্যে উপস্থিত হইয়াছি। সেই যে রাজপুত্র কোঁটালপুত্র কি জানি কিসের সন্ধানে বাহির হইয়া ঘুমস্ত রাজকুমারীর মায়াপুরীতে উপনীত হইয়াছিল, আমাদের অবস্থা যেন সেইরূপ। অবশ্য ঘুমন্ত রাজকুমারী নাই, কিন্তু সাপের মাথায় মণি আছে কিনা কে বলিতে পারে? কোন অদৃশ্য রাক্ষস-রাক্ষসীরা তাহাকে পাহারা দিতেছে তাহাই বা কে জানে? শুক্তির অভ্যন্তরে মুক্তার ন্যায় কোন অপরূপ রহস্য এই প্রাচীন দুর্গের অস্থিপঞ্জরতলে লুক্কায়িত আছে?

ব্যোমকেশ ফস করিয়া দেশলাই জ্বলিয়া আমার রোমান্টিক স্বপ্নজাল ভাঙিয়া দিল। সিগারেট ধরাইয়া বলিল,“ঈশানবাবু ঠিক ধরেছিলেন, দুর্গে নিশ্চয় কোথাও গুপ্ত তোষাখানা আছে।

বলিলাম, কিন্তু কোথায়? এতবড় দুর্গের মাটি খুঁড়ে তার সন্ধান বার করা কি সহজ?

সহজ নয়। কিন্তু আমার বিশ্বাস ঈশানবাবু সন্ধান পেয়েছিলেন; তাঁর মুঠির মধ্যে মোহরের আর কোনও মানে হয় না।

কথাটা মনের মধ্যে নাড়াচাড়া করিয়া শেষে বলিলাম, তা যদি হয় তাহলে বুঝতে হবে সেখানে আরও অনেক মোহর আছে।

সম্ভব। এবং তার চেয়েও বড় কথা, ঈশানবাবু যখন খুঁজে বার করতে পেরেছেন তখন আমরাও পারব।

ব্যোমকেশ উঠিয়া অন্ধকারে পায়চারি করিতে লাগিল। কিছুক্ষণ পায়চারি করিবার পর সে হঠাৎ 'উ' বলিয়া পড়িয়া যাইতে যাইতে কোনক্রমে সামলাইয়া লইল। আমি লাফাইয়া উঠিলাম—কি হল !

কিছু নয়, সামান্য হোঁচট খেয়েছি। টৰ্চটা তাহার হাতেই ছিল, সে তাহা জ্বালিয়া মাটিতে আলো ফেলিল।

দিনের আলোতে যাহা চোখে পড়ে নাই, এখন তাহা সহজে চোখে পড়িল। একটা চৌকশ পাথর সম্প্রতি কেহ খুঁড়িয়া তুলিয়াছিল, আবার অপটু হস্তে যথাস্থনে বসাইয়া দিবার চেষ্টা করিয়াছে। পাথরটা সমানভাবে বসে নাই, একদিকের কোনা একটু উঁচু হইয়া আছে। ব্যোমকেশ অন্ধকারে ওই উঁচু কানায় পা লাগিয়া হোঁচট খাইয়াছিল।

আলগা পাথরটা দেখিয়া উত্তেজিত হইয়া উঠিলাম,—ব্যোমকেশ ! পাথরের তলায় তোষাখানার গর্ত নেই তো?

ব্যোমকেশ মাথা নাড়িল, উহু, পাথরটা বড় জোর চৌদ্দ ইঞ্চি চৌকশ। ওর তলায় যদি গর্ত থাকেও, তা দিয়ে মানুষ ঢুকতে পারবে না।

তবু—

না হে, যা ভাবিছ তা নয়। খোলা উঠোনে তোষাখানার গুপ্তদ্বার হতে পারে না। যা হোক, কাল সকালে পাথর তুলিয়ে দেখতে হবে।

ব্যোমকেশ টর্চ ঘুরাইয়া চারিদিকে আলো ফেলিল, কিন্তু অন্য কোথাও পাথরের পাটি নড়াচাড়া হইয়াছে বলিয়া মনে হইল না। অদূরে কামানটা পড়িয়া আছে, তাহার নীচে অনেক ধূলামটি জমিয়া কামানকে মেঝের সঙ্গে জাম করিয়া দিয়াছে; সেখানেও আলগা মাটি বা পাথর চোখে পড়িল না।

এই সময় সীতারাম আসিয়া জানাইল, আহার প্রস্তুত। হাতের ঘড়িতে দেখিলাম পৌনে দশটা। কখন যে নিঃসাড়ে সময় কাটিয়া গিয়াছে জানিতে পারি নাই।

ঘরে গিয়া আহারে বসিলাম। ইকমিক্‌ কুকারে রাঁধা খিচুড়ি এবং মাংস যে এমন অমৃততুল্য হইতে পারে তাহা জানা ছিল না। তার উপর সীতারাম অমলেট ভাজিয়াছে। গুরুভোজন হইয়া গেল।

আমাদের ভোজন শেষ হইলে সীতারাম বারান্দায় নিজের আহার সারিয়া লইল। দ্বারের কাছে আসিয়া বলিল, হুজুর, যদি হুকুম হয়, একটু এদিক ওদিক ঘুরে আসি।

ব্যোমকেশ বলিল, বেশ তো। তুমি শোবে কোথায়?

সীতারাম বলিল, সেজন্যে ভাববেন না হুজুর। আমি দোরের বাইরে বিছানা পেতে শুয়ে থাকিব।

সীতারাম চলিয়া গেল। আমরা আলো কমাইয়া দিয়া বিছানায় লম্বা হইলাম। দ্বার খোলাই রহিল; কারণ ঘরে জানালা নাই, দ্বার বন্ধ করিলে দম বন্ধ হইবার সম্ভাবনা।

শুইয়া শুইয়া বোধহয় তন্দ্ৰা আসিয়া গিয়াছিল, ব্যোমকেশের গলার আওয়াজে সচেতন হইয়া উঠিলাম, দ্যাখো, ঐ গজালগুলো আমার ভাল ঠেকছে না।

গজাল ! কোন গজাল?

দেয়ালে এত গজাল কেন? পাণ্ডেজি একটা কৈফিয়ত দিলেন বটে, কিন্তু সন্দেহ হচ্ছে।

এত রাত্রে গজালকে সন্দেহ করার কোনও মানে হয় না। ঘড়িতে দেখিলাম। এগারোটা বাজিয়া গিয়াছে। সীতারাম এখনও এদিক ওদিক দেখিয়া ফিরিয়া আসে নাই।

আজি ঘুমাও, কাল গজালের কথা ভেব। বলিয়া আমি পাশ ফিরিয়া শুইলাম

গভীর ঘুমাইয়া পড়িয়ছিলাম। হঠাৎ মাথার শিয়রে বোমা ফাটার মত শব্দে ধড়মড় করিয়া উঠিয়া বসিলাম। মুহুর্তের জন্য কোথায় আছি ঠাহর করিতে পারিলাম না।

স্থানকালের জ্ঞান ফিরিয়া আসিলে দেকিলাম ব্যোমকেশ দ্বারের বাহিরে টর্চের আলো ফেলিয়াছে, সেখানে কতকগুলো ভাঙা হাঁড়ি কলসীর মত খোলামকুচি পড়িয়া আছে। তারপর ব্যোমকেশ জ্বলন্ত টর্চ হাতে লইয়া তীরবেগে ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল। অজিত, এসো—

আমিও আলুথালুভাবে উঠিয়া তাহার অনুসরণ করিলাম; সে কাহারও পশ্চাদ্ধাবন করিতেছে কিম্বা বিপদের ক্ষেত্ৰ হইতে পলায়ন করিতেছে তাহা বুঝিতে পারিলাম না। তাহার হাতের আলোটা যেদিকে যাইতেছে, আমিও সেইদিকে ছুটিলাম।

তোরণের মুখে পৌঁছিয়া ব্যোমকেশ সিঁড়ির উপর আলো ফেলিল। আমি তাহার কাছে পৌঁছিয়া দেখিলাম, সিঁড়ি দিয়া একটা লোক ছুটিতে ছুটিতে উপরে আসিতেছে। কাছে আসিলে চিনিলাম-সীতারাম।

সীতারাম বলিল, জী হুজুর, আমি ওপরে আসছিলাম, হঠাৎ একটা লোকের সঙ্গে টক্কর লেগে গেল। আমি তাকে ধরবার চেষ্টা করলাম, কিন্তু লোকটা হাত ছাড়িয়ে পালাল।

তাকে চিনতে পারলে?

জী না, অন্ধকারে তার মুখ দেখতে পাইনি। কিন্তু টক্কর লাগবার সময় তার মুখ দিয়ে একটা বুরা জবান বেরিয়ে গিয়েছিল, তা শুনে মনে হল লোকটা ছোট জাতের হিন্দুস্থানী। —কিন্তু কী হয়েছে হুজুর?

তা এখনও ঠিক জানি না। দেখবে এস।

ফিরিয়া গেলাম। ঘরের সম্মুখে ভাঙা হাঁড়ির টুকরোগুলা পড়িয়া ছিল, ব্যোমকেশ বলিল, ঐ দ্যাখে। আমি জেগেছিলাম, বাইরে খুব হালকা পায়ের আওয়াজ শুনতে পেলাম। ভাবলাম, তুমি বুঝি ফিরে এলে। তারপরই দুম করে শব্দ—

সীতারাম ভাঙা সরার মত একটা টুকরো তুলিয়া আব্ৰাণ গ্রহণ করিল। বলিল, হুজুর, চট্ করে খাটের উপর উঠে বসুন।

কেন? কি ব্যাপার?

সাপ। কেউ সরা-ঢাকা হাঁড়িতে সাপ এনে এইখানে হাঁড়ি আছড়ে ভেঙ্গেছে। আমাকে টর্চ দিন, আমি খুঁজে দেখছি। সাপ কাছেই কোথাও আছে।

আমরা বিলম্ব না করিয়া খাটের উপর উঠিয়া বসিলাম, কারণ অন্ধকার রাত্রে সাপের সঙ্গে বীরত্ব চলে না। সীতারাম টর্চ লইয়া বাহিরে খুঁজিয়া দেখিতে লাগিল।

লন্ঠনটা উস্কাইয়া দিয়া ব্যোমকেশ বলিল, ঈশানবাবুকে কিসের ভয় দেখিয়ে তাড়াবার চেষ্টা হয়েছিল এখন বুঝতে পারছি।

কিন্তু লোকটা কে?

তা এখন বলা শক্ত। বুলাকিলাল হতে পারে, গণপৎ হতে পারে, এমন কি সন্নিসি ঠাকুরও হতে পারেন।

এই সময় সীতারামের আকস্মিক অট্টহাস্য শুনিতে পাইলাম। সীতারাম গলা চড়াইয়া ডাকিল, হুজুর, এদিকে দেখবেন আসুন। কোনও ভয় নেই।

সন্তপর্ণে নামিয়া সীতারামের কাছে গেলাম। বাড়ির একটা কোণ আশ্রয় করিয়া বাদামী রঙের সাপ কুণ্ডলী পাকিয়া কিলবিল করিতেছে। সাপটা আহত, তাই পলাইতে পারিতেছে না, তীব্র আলোর তলায় তাল পাকাইতেছে।

সীতারাম হাসিয়া বলিল, ঢামনা সাপ, হুজুর, বিষ নেই। মনে হচ্ছে কেউ আমাদের সঙ্গে দিললাগি করছে।

ব্যোমকেশ বলিল, দিললাগিই বটে। কিন্তু এখন সাপটািকে নিয়ে কি করা যাবে?

আমি ব্যবস্থা করছি। সীতারাম খাবার ঢাকা দিবার ছিন্দ্রযুক্ত পিতলের ঢাকনি আনিয়া সাপটকে চাপা দিল, বলিল, আজ এমনি থাক, কাল দেখা যাবে।

আমরা ঘরে ফিরিয়া আসিলাম। সীতারাম দ্বারের সম্মুখে নিজের বিছানা পাতিতেপ্রবৃত্ত হইল। রাত্রি ঠিক দ্বিপ্রহর।

ব্যোমকেশ বলিল, সীতারাম, তুমি এত রাত্রি পর্যন্ত কোথায় ছিলে, কি করছিলে, এবার বল দেখি।

সীতারাম বলিল, হুজুর, এখান থেকে নেমে দেউড়িতে গেলাম। গিয়ে দেখি, বুলাকিলাল ভাঙি খেয়ে নিজের কুঠুরির মধ্যে ঘুমুচ্ছে। তার কাছ থেকে কিছু খবর বার করবার ইচ্ছে ছিল, সন্ধ্যেবেলা তার সঙ্গে দোস্তি করে রেখেছিলাম। ঠেলাঠুলি দিলাম। কিন্তু বুলাকিলাল জাগল না। কি করি, ভাবলাম, যাই সাধুবাবার দর্শন করে আসি।

সাধুবাবা জেগে ছিলেন, আমাকে দেখে খুশি হলেন। আমাকে অনেক সওয়াল করলেন; আপনারা কে, কি জন্যে এসেছেন, এইসব জানতে চাইলেন। আমি বললাম, আপনারা হাওয়া বদল করতে এসেছেন।

ব্যোমকেশ বলিল, বেশ বেশ। আর কি কথা হল?

সীতারাম বলিল, অনেক আজে-বাজে কথা হল হুজুর। আমি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একেবারে প্রোফেসার সাহেবের মৃত্যুর কথা তুললাম, তাতে সাধুবাবা ভীষণ চটে উঠলেন। দেখলাম বাড়ির মালিক আর নায়েববাবুর ওপর ভারি রাগ। বার বার বলতে লাগলেন, ওদের সর্বনাশ হবে, ওদের সর্বনাশ হবে।

তাই নাকি ! ভারি অকৃতজ্ঞ সাধু দেখছি। তারপর?

তারপর সাধুবাবা এক ছিলিম গাঁজা চড়ালেন। আমাকে প্রসাদ দিলেন।

তুমি গাঁজা খেলে?

জী হুজুর। সাধুবাবার প্রসাদ তো ফেলে দেওয়া যায় না।

তা বটে। তারপর?

তারপর সাধুবাবা কম্বল বিছিয়ে শুয়ে পড়লেন। আমিও চলে এলাম। ফেরবার সময় সিঁড়িতে ঐ লোকটার সঙ্গে ধাক্কা লাগিল।

ব্যোমকেশ বলিল, আচ্ছা, একটা কথা বল তো সীতারাম। তুমি যখন ফিরে আসছিলে তখন বুলাকিলালকে দেখেছিলে?

সীতারাম বলিল, না। হুজুর, চোখে দেখিনি। কিন্তু দেউড়ির পাশ দিয়ে আসবার সময় কুঠুরি থেকে তার নাকড়াকার ঘড়ঘড় আওয়াজ শুনেছিলাম।

ব্যোমকেশ বলিল, যাক, তাহলে দেখা যাচ্ছে, সাপের হাঁড়ি নিয়ে যিনি এসেছিলেন তিনি আর যেই হোন, বুলাকিলাল কিম্বা সাধুবাবা নন। আশা করি, তিনি আজ আর দ্বিতীয়বার এদিকে আসবেন না-এবার ঘুমিয়ে পড়।

সকালে উঠিয়া দেখা গেল ঢাকনি-চাপা সাপটা রাত্রে মরিয়া গিয়াছে; বোধহয় হাঁড়ি ভাঙার সময় গুরুতর আঘাত পাইয়াছিল। সীতারাম সেটাকে লাঠির ডগায় তুলিয়া দুর্গপ্রাকারের বাহিরে ফেলিয়া দিল। আমরাও প্রাকারে উঠিয়া একটা চক্ৰ দিলাম। দেখা গেল, প্রাকার একেবারে অটুট নয় বটে কিন্তু তোরণদ্বার ছাড়া দুর্গে প্রবেশ করিবার অন্য কোনও চোরাপথ নাই। প্রাকারের নীচেই অগাধ গভীরতা।

বেলা আন্দাজ আটটার সময় সীতারামকে দুর্গে রাখিয়া ব্যোমকেশ ও আমি রামকিশোরবাবুর বাড়িতে গেলাম। রমাপতি সদর বারান্দায় আমাদের অভ্যর্থনা করিল। —আসুন। কর্তা এখনি বেরুচ্ছেন, শহরে যাবেন।

তাই নাকি! আমরা ইতস্তত করিতেছি এমন সময় রামকিশোরবাবু বাহির হইয়া আসিলেন। পরনে গরদের পাঞ্জাবি, গলায় কোঁচানো চাদর; আমাদের দেখিয়া বলিলেন ‘এই যে !—নতুন জায়গা কেমন লাগছে? রাত্রে বেশ আরামে ছিলেন? কোনও রকম অসুবিধে হয়নি?

ব্যোমকেশ বলিল, কোন অসুবিধে হয়নি, ভারি আরামে রাত কেটেছে। আপনি বেরুচ্ছেন?

হ্যাঁ, একবার উকিলের বাড়ি যাব, কিছু দলিলপত্তর রেজিস্ট্রি করাতে হবে। তা—আপনারা এসেছেন, আমি না হয় একটু দেরি করেই যাব—

ব্যোমকেশ বলিল, না না, আপনি কাজে বেরুচ্ছেন বেরিয়ে পড়ুন। আমরা এমনি বেড়াতে এসেছি, কোনও দরকার নেই।

তা-আচ্ছা। রমাপতি, এঁদের চা-টা দাও। আমাদের ফিরতে বিকেল হবে।

রামকিশোর বাহির হইয়া পড়িলেন; জামাই মণিলাল এক বস্তা কাগজপত্ৰ লইয়া সঙ্গে গেল। আমাদের পাশ দিয়া যাইবার সময় মণিলাল সহাস্যমুখে নমস্কার করিল।

ব্যোমকেশ রমাপতিকে বলিল, চায়ের দরকার নেই, আমরা চা খেয়ে বেরিয়েছি। আজই বুঝি সম্পত্তি বাঁটোয়ারার দলিল রেজিষ্টি হবে?

আজ্ঞে হ্যাঁ।

যাক, একটা দুভাবনা মিটল। —আচ্ছা, বলুন দেখি—

রমাপতি হাতজোড় করিয়া বলিল, আমাকে ‘আপনি’ বলবেন না, ‘তুমি’ বলুন।

ব্যোমকেশ হাসিয়া বলিল, বেশ, তোমার সঙ্গে আমার অনেক কথা আছে, কিন্তু সে পরে হবে। এখন বল দেখি গণপৎ কোথায়?

রমাপতি একটু বিস্মিত হইয়া বলিল, গণপৎ-মুরলীদার চাকর? বাড়িতেই আছে নিশ্চয়। আজ সকালে তাকে দেখিনি। ডেকে আনব?

এই সময় মুরলীধর বারান্দায় আসিয়া আমাদের দেখিয়া থতিমত খাইয়া দাঁড়াইল। তাহার ট্যারা চোখ আরও ট্যারা হইয়া গেল।

ব্যোমকেশ বলিল, আপনিই মুরলীধরবাবু? নমস্কার। আপনার চাকর গণপৎকে একবার ডেকে দেবেন? তার সঙ্গে একটু দরকার আছে।

মুরলীধরের মুখ ভয় ও বিদ্রোহের মিশ্রণে অপরূপ ভােব ধারণ করিল। সে চেরা গলায় বলিল, গণপতের সঙ্গে কি দরকার?

তাকে দু একটা কথা জিজ্ঞেস করব।

সে-তাকে ছুটি দিয়েছি। সে বাড়ি গেছে।

তাই নাকি ! কবে ছুটি দিয়েছেন?

কাল—কাল দুপুরে। মুরলীধর আর প্রশ্নোত্তরের অপেক্ষা না করিয়া দ্রুত বাড়ির মধ্যে ঢুকিয়া পড়িল।

আমরা পরস্পর মুখের পানে চাহিলাম। রমাপতির মুখে একটা ত্ৰস্ত উত্তেজনার ভাব দেখা গেল। সে ব্যোমকেশের কাছে সরিয়া আসিয়া খাটো গলায় বলিল, কাল দুপুরে— ! কিন্তু কাল সন্ধ্যের পরও আমি গণপৎকে বাড়িতে দেখেছি—

ঘাড় নাড়িয়া ব্যোমকেশ বলিল, খুব সম্ভব। কারণ, রাত বারোটা পর্যন্ত গণপৎ বাড়ি যায়নি। কিন্তু সে যাক। নায়েব চাঁদমোহনবাবু বাড়িতে আছেন নিশ্চয়। আমরা তাঁর সঙ্গে একবার দেখা করতে চাই।

রমাপতি বলিল, তিনি নিজের ঘরে আছেন—

বেশ, সেখানেই আমাদের নিয়ে চল।

বাড়ির এক কোণে চাঁদমোহনের ঘর। আমরা দ্বারের কাছে উপস্থিত হইয়া দেখিলাম, তিনি দেয়ালের দিকে মুখ করিয়া বসিয়া সারি সারি কলিকায় তামাক সাজিয়া রাখিতেছেন। বোধ করি সারাদিনের কাজ সকালেই সারিয়া লইতেছেন। বোমকেশ হাত নাড়িয়া রমাপতিকে বিদায় করিল। আমরা ঘরে প্রবেশ করিলাম, ব্যোমকেশ দরজা ভেজাইয়া দিল।

আমাদের অতর্কিত আবির্ভাবে চাঁদমোহন ত্ৰস্তভাবে উঠিয়া দাঁড়াইলেন, তাঁহার চতুর চোখে চকিত ভয়ের ছায়া পড়িল। তিনি বলিয়া উঠিলেন, কে? —ও-আপনারা— !

ব্যোমকেশ তক্তপোশের কোণে বসিয়া বলিল, চাঁদমোহনবাবু, আপনাকে কয়েকটা কথা জিজ্ঞেস করতে চাই। তাহার কণ্ঠস্বর খুব মোলায়েম শুনাইল না।

ত্রাসের প্রথম ধাক্কা সামলাইয়া লইয়া চাঁদমোহন গামছায় হাত মুছিতে মুছিতে বলিলেন, কি কথা?

অনেক দিনের পুরোনো কথা। রামবিনোদের মৃত্যু হয় কি করে?

চাঁদমোহনের মুখ শীর্ণ হইয়া গেল, তিনি ক্ষণেক নীরব থাকিয়া অৰ্ধস্ফুট স্বরে বলিলেন, আমি কিছু বলতে পারি না—আমি এ বাড়ির নায়েব—

ব্যোমকেশ গভীর স্বরে বলিল, ‘চাঁদমোহনবাবু, আপনি আমার নাম জানেন; আমার কাছে কোনও কথা লুকোবার চেষ্টা করলে তার ফল ভাল হয় না। রামবিনোদের মৃত্যুর সময় আপনি উপস্থিত ছিলেন তার প্রমাণ আছে। কি করে তাঁর মৃত্যু হল সব কথা খুলে বলুন।

একপাশে আসিয়া বসিলেন, শুষ্কস্বরে বলিলেন, আপনি যখন জোর করছেন তখন না বলে আমার উপায় নেই। আমি যতটুকু জানি বলছি।

ভিজা গামছায় মুখ মুছিয়া তিনি বলিতে আরম্ভ করিলেন—

১৯১১ সালের শীতকালে আমরা মুঙ্গেরে ছিলাম। রামবিনোদ আর রামকিশোরের তখন ঘিয়ের ব্যবসা ছিল, কলকাতায় ঘি চালান দিত। মস্ত ঘিয়ের আড়ৎ ছিল। আমি ছিলাম কর্মচারী, আড়তে বসতাম। ওরা দুই ভাই যাওয়া আসা করত।

হঠাৎ একদিন মুঙ্গেরে প্লেগ দেখা দিল। মানুষ মরে উড়কুড় উঠে যেতে লাগল, যারা বেঁচে রইল। তারা ঘর-দের ফেলে পালাতে লাগল। শহর শূন্য হয়ে গেল। রামবিনোদ আর রামকিশোর তখন মুঙ্গেরে, তারা বড় মুশকিলে পড়ল। আড়তে ষাট-সত্তর হাজার টাকার মাল রয়েছে, ফেলে পালানো যায় না; হয়তো সব চোরে নিয়ে যাবে। আমরা তিনজনে পরামর্শ করে স্থির করলাম, গঙ্গার বুকে নৌকো ভাড়া করে থাকিব, আর পালা করে রোজ একজন এসে আড়ৎ তদারক করে যাব। তারপর কপালে যা আছে তাই হবে। একটা সুবিধে ছিল, আড়ৎ গঙ্গা থেকে বেশি দূরে নয়।

রামবিনোদের এক ছেলেবেলার বন্ধু মুঙ্গেরে স্কুল মাস্টারি করত—ঈশান মজুমদার। ঈশান সেদিন সর্পাঘাতে মারা গেছে। সেও নৌকোয় এসে জুটল। মাঝি মাল্লা নেই, শুধু আমরা চারজন-নৌকোটা বেশ বড় ছিল; নৌকোতেই রান্নাবান্না, নৌকোতেই থাকা। গঙ্গার মাঝখানে চড়া পড়েছিল, কখনও সেখানে গিয়ে রাত কাটাতাম। শহরের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল কেবল দিনে একবার গিয়ে আড়ৎ দেখে আসা।

এইভাবে দশ বারো দিন কেটে গেল। তারপর একদিন রামবিনোদকে প্লেগে ধরল। শহরে গিয়েছিল জ্বর নিয়ে ফিরে এল। আমরা চড়ায় গিয়ে নৌকো লাগালাম, রামবিনোদকে চড়ায় নামালাম। একে তো প্লেগের কোনও চিকিৎসা নেই, তার ওপর মাঝ-গঙ্গায় কোথায় ওষুধ, কোথায় ডাক্তার। রামবিনোদ পরের দিনই মারা গেল।

ব্যোমকেশ প্রশ্ন করিল, তারপর আপনারা কি করলেন?

চাঁদমোহন বলিলেন, আর থাকতে সাহস হল না। আড়তের মায়া ত্যাগ করে নৌকো ভাসিয়ে ভাগলপুরে পালিয়ে এলাম।

রামবিনোদের দেহ সৎকার করেছিলেন?

চাঁদমোহন গামছায় মুখ মুছিয়া বলিলেন, দাহ করবার উপকরণ ছিল না; দেহ গঙ্গার জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

চল, এবার ফেরা যাক। এখানকার কাজ আপাতত শেষ হয়েছে।

সিঁড়ির দিকে যাইতে যাইতে আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, কি মনে হল? চাঁদমোহন সত্যি কথা বলেছে?

একটু মিথ্যে বলেছে। কিন্তু তাতে ক্ষতি নেই।

একাকিনী খেলায় এমন মগ্ন হইয়া গিয়াছে যে আমাদের লক্ষ্যই করিল না। ব্যোমকেশ কাছে গিয়া দাঁড়াইতে সে বিস্ফারিত চক্ষু তুলিয়া চাহিল। ব্যোমকেশ একটু সমেহ হাসিয়া বলিল, তোমার নাম তুলসী, না? কি মিষ্টি তোমার মুখখানি।

তুলসী তেমনি অপলক চক্ষে চাহিয়া রহিল। ব্যোমকেশ বলিল, আমরা দুর্গে আছি, তুমি আসনা কেন? এসো— অনেক গল্প বলব।

তুলসী তেমনি তাকাইয়া রহিল, উত্তর দিল না। আমরা চলিয়া আসিলাম।

দুর্গে ফিরিয়া কিছুক্ষণ সিঁড়ি ওঠা-নামার ক্লাস্তি দূর করিলাম। ব্যোমকেশ সিগারেট ধরাইয়া বলিল, রামকিশোরবাবু দলিল রেজিস্ট্রি করতে গেলেন। যদি হয়ে যায়, তাহলে ওদের বাড়িতে একটা নাড়াচাড়া তোলাপাড়া হবে; বংশী আর মুরলীধর হয়তো শহরে গিয়ে বাড়ি-ভাড়া করে থাকতে চাইবে। তার আগেই এ ব্যাপারের একটা হেস্তনেস্ত হয়ে যাওয়া দরকার।

প্রশ্ন করিলাম, ব্যোমকেশ, কিছু বুঝছ? আমি তো যতই দেখছি, ততই জট পাকিয়ে যাচ্ছে।

ব্যোমকেশ বলিল, একটা আবছায়া চলচ্চিত্রের ছবি মনের পর্দায় ফুটে উঠছে। ছবিটা ছোট নয়; অনেক মানুষ অনেক ঘটনা অনেক সংঘাত জড়িয়ে তার রূপ। একশ বছর আগে এই নাটকের অভিনয় শুরু হয়েছিল, এখনও শেষ হয়নি। —ভাল কথা, কাল রাত্রের আলগা পাথরটার কথা মনে ছিল না। চল, দেখি গিয়ে তার তলায় গর্ত আছে কি না।

চল।

পাথরটার উপর অল্প-অল্প চুন সুরকি জমাট হইয়া আছে, আশেপাশের পাথরগুলির মত মসৃণ নয়। ব্যোমকেশ দেখিয়া বলিল, মনে হচ্ছে পাথরটাকে তুলে আবার উল্টো করে বসানো হয়েছে। এসো, তুলে দেখা যাক।

আমরা আঙুল দিয়া তুলিবার চেষ্টা করিলাম, কিন্তু পাথর উঠিল না। তখন সীতারামকে ডাকা হইল। সীতারাম করিতর্কমা লোক, সে একটা খুন্তি আনিয়া চাড়া দিয়া পাথর তুলিয়া ফেলিল।

পাথরের নীচে গর্তটর্ত কিছু নাই, ভরাট চুন সুরকি। ব্যোমকেশ পাথরের উল্টা পিঠ পরীক্ষা করিয়া বলিল, ওহে, এই দ্যাখো, উর্দু-ফারসী লেখা রয়েছে!

দেখিলাম পাথরের উপর কয়েক পংক্তি বিজাতীয় লিপি খোদাই করা রহিয়াছে। খোদাই খুব গভীর নয়, উপরন্তু লেখার উপর ধূলাবালি জমিয়া প্রায় অলক্ষণীয় হইয়া পড়িয়াছে। ব্যোমকেশ হঠাৎ বলিল, আমার মনে হচ্ছে—। দাঁড়াও, ঈশানবাবুর খাতাটা নিয়ে আসি।

ঈশানবাবুর খাতা ব্যোমকেশ নিজের কাছে রাখিয়াছিল। সে তাহা আনিয়া যে-পাতায় ফারসী লেখা ছিল, তাহার সহিত পাথরের উৎকীর্ণ লেখাটা মিলাইয়া দেখিতে লাগিল। আমিও দেখিলাম। অর্থবোধ হইল না বটে, কিন্তু দুটি লেখার টান যে একই রকম তাহা সহজেই চোখে পড়ে।

ব্যোমকেশ বলিল, হয়েছে। এবার চল।

পাথরটি আবার যথাস্থানে সন্নিবেশিত করিয়া আমরা ঘরে আসিয়া বসিলাম। ব্যোমকেশ জিজ্ঞাসা করিল, ব্যাপার বুঝলে?

তুমি পরিষ্কার করে বল।

একশ বছর আগের কথা স্মরণ কর। সিপাহীরা আসছে শুনে রাজারাম তাঁর পরিবারবর্গকে সরিয়ে দিলেন, দুর্গে রইলেন কেবল তিনি আর জয়রাম। তারপর বাপবেটায় সমস্ত ধনরত্ন লুকিয়ে ফেললেন।

কিন্তু সোনাদানা লুকিয়ে রাখার পর রাজারামের ভয় হল, সিপাহীদের হাতে তাঁরা যদি মারা পড়েন, তাহলে তাঁদের স্ত্রী-পরিবার সম্পত্তি উদ্ধার করবে কি করে? তিনি পাথরের উপর সঙ্কেত-লিপি লিখলেন; এমন ভাষায় লিখলেন যা সকলের আয়ত্ত নয়। তারপর ধুলোকাদা দিয়ে লেখাটা অস্পষ্ট করে দিলেন, যাতে সহজে সিপাহীদের নজরে না পড়ে।

সিপাহীরা এসে কিছুই খুঁজে পেল না। রাগে তারা বাপবেটাকে হত্যা করে চলে গেল। তারপর রাজারামের পরিবারবর্গ যখন ফিরে এল, তারাও খুঁজে পেল না। রাজারাম কোথায় তাঁর ধনরত্ন লুকিয়ে রেখে গেছেন। পাথরের পাটিতে খোদাই করা ফারসী সঙ্কেত-লিপি কারুর চোখে পড়ল না।

বলিলাম, তাহলে তোমার বিশ্বাস, রাজারামের ধনরত্ন এখনও দুৰ্গে লুকোনো আছে।

তাই মনে হয়। তবে সিপাহীরা যদি রাজারাম আর জয়রামকে যন্ত্রণা দিয়ে গুপ্তস্থানের সন্ধান বার করে নিয়ে থাকে তাহলে কিছুই নেই।

তারপর বল।

তারপর একশ বছর পরে এলেন অধ্যাপক ঈশান মজুমদার। ইতিহাসের পণ্ডিত ফারসী-জানা লোক; তার ওপর বন্ধু রামবিনোদের কাছে দুর্গের ইতিবৃত্ত শুনেছিলেন। তিনি সন্ধান করতে আরম্ভ করলেন; প্রকাশ্যে নয়, গোপনে। তাঁর এই গুপ্ত অনুসন্ধান কতদূর এগিয়েছিল জানি না, কিন্তু একটা জিনিস তিনি পেয়েছিলেন-ঐ পাথরে খোদাই করা সঙ্কেত-লিপি। তিনি সযত্নে তার নকল খাতায় টুকে রেখেছিলেন, আর পাথরটাকে উল্টে বসিয়েছিলেন, যাতে আর কেউ না দেখতে পায়। তারপর-তারপর যে কী হল সেইটেই আমাদের আবিষ্কার করতে হবে।

ব্যোমকেশ খাটের উপর চিৎ হইয়া শুইয়া উর্ধ্বে চাহিয়া রহিল। আমিও আপন মনে এলোমেলো চিস্তা করিতে লাগিলাম। পাণ্ডেজি এবেলা বোধহয় আসিলেন না। ...কলিকাতায় সত্যবতীর খবর কি.ব্যোমকেশ হঠাৎ তুলসীর সহিত এমন সস্নেহে কথা বলিল কেন? মেয়েটার চৌদ্দ বছর বয়স, দেখিলে মনে হয় দশ বছরেরটি...

দ্বারের কাছে ছায়া পড়িল। ঘাড় ফিরাইয়া দেখি, তুলসী আর গদাধর। তুলসীর চোখে শঙ্কা ও আগ্রহ, বোধহয় একা আসিতে সাহস করে নাই, তাই গদাধরকে সঙ্গে আনিয়াছে। গদাধরের কিন্তু লেশমাত্র শঙ্কা-সঙ্কোচ নাই; তাহার হাতে লাটু, মুখে কান-এঁটো-করা হাসি। আমাকে দেখিয়া হাস্য সহকারে বলিল, হে হে জামাইবাবুর সঙ্গে তুলসীর বিয়ে হবে-হে হে হে—

তুলসী বিদ্যুদ্বেগে ফিরিয়া তাহার গালে একটি চড় বসাইয়া দিল। গদাধর ক্ষণেক গাল ফুলাইয়া দাঁড়াইয়া রহিল, তারপর গভীরমুখে লাটুতে লেক্তি পাকাইতে পাকাইতে প্ৰস্থান করিল। বুঝিলাম ছোট বোনের হাতে চড়-চাপড় খাইতে সে অভ্যস্ত।

তুলসীকে ব্যোমকেশ আদর করিয়া ঘরের মধ্যে আহ্বান করিল, তুলসী কিন্তু আসিতে চায় না, দ্বারের খুঁটি ধরিয়া দাঁড়াইয়া রহিল। ব্যোমকেশ তখন তাহাকে হাত ধরিয়া আনিয়া খাটের উপর বসাইয়া দিল।

তবু তুলসীর ভয় ভাঙে না, ব্যাধশঙ্কিত হরিণীর মত তার ভাবভঙ্গী। ব্যোমকেশ নরম সুরে সমবয়স্কের মত তাহার সহিত গল্প করিতে আরম্ভ করিল। দুটা হাসি তামাসার কথা, মেয়েদের খেলাধুলা পুতুলের বিয়ে প্রভৃতি মজার কাহিনী,—শুনিতে শুনিতে তুলসীর ভয় ভাঙিল। প্রথমে দু একবার হুঁ না, তারপর সহজভাবে কথা বলিতে আরম্ভ করিল।

মিনিট পনরোর মধ্যে তুলসীর সঙ্গে আমাদের সহজ বন্ধুত্বের সম্পর্ক স্থাপিত হইল। দেখিলাম তাহার মন সরল, বুদ্ধি সতেজ; কেবল তাহার স্নায়ু সুস্থ নয়; সামান্য কারণে স্নায়বিক প্রতিক্রিয়া সহজতর মাত্রা ছাড়াইয়া যায়। ব্যোমকেশ তাহার চরিত্র ঠিক ধরিয়াছিল। তাই সমেহ ব্যবহারে তাহাকে আকর্ষণ করিয়া লইয়াছে।

তুলসীর সহিত আমাদের যে সকল কথা হইল, তাহা আগাগোড়া পুনরাবৃত্তি করিবার প্রয়োজন নাই, তাহাদের পরিবার সম্বন্ধে এমন অনেক কথা জানা গেল যাহা পূর্বেই লিপিবদ্ধ হইয়াছে। বাকিগুলি লিপিবদ্ধ করিতেছি।

ব্যোমকেশ বলিল, এখানে এসে যিনি ছিলেন, তোমার বাবার বন্ধু ঈশানবাবু, তাঁর সঙ্গে তোমার ভাব হয়েছিল?

তুলসী বলিল, হ্যাঁ। তিনি আমাকে কত গল্প বলতেন। রাত্তিরে তাঁর ঘুম হত না; আমি অনেক বার দুপুর রাত্তিরে এসে তাঁর কাছে গল্প শুনেছি।

তাই নাকি ! তিনি যে-রাত্তিরে মারা যান সে-রাত্তিরে তুমি কোথায় ছিলে?

সে-রাত্তিরে আমাকে ঘরে বন্ধ করে রেখেছিল।

ঘরে বন্ধ করে রেখেছিল ! সে কি !

হ্যাঁ। আমি যখন-তখন যেখানে-সেখানে ঘুরে বেড়াই কিনা, তাই ওরা সুবিধে পেলেই আমাকে বন্ধ করে রাখে।

ওরা কারা?

সবাই। বাবা বড়দা মেজদা জামাইবাবু—

সে-রাত্তিরে কে তোমাকে ঘরে বন্ধ করে রেখেছিল?

বাবা।

হুঁ। আর কাল রাত্ৰে বুঝি মেজদা তোমাকে ঘরে বন্ধ করে রেখেছিল?

হ্যাঁ। তুমি কি করে জানলে?

আমি সব জানতে পারি। আচ্ছা, আর একটা কথা বল দেখি। তোমার বড়দার বিয়ে হয়েছিল, বৌদিদিকে মনে আছে?

কেন থাকবে না? বৌদিদি খুব সুন্দর ছিল। দিদি তাকে ভারি হিংসে করত।

তাই নাকি ! তা তোমার বৌদিদি আত্মহত্যা করল কেন?

তা জানি না। সে-রাত্তিরে দিদি আমাকে ঘরে বন্ধ করে রেখেছিল।

ও—

ব্যোমকেশ আমার সহিত একটা দৃষ্টি বিনিময় করিল। কিছুক্ষণ অন্য কথার পর ব্যোমকেশ বলিল, আচ্ছা তুলসী, বল দেখি বাড়ির মধ্যে তুমি কাকে সবচেয়ে বেশি ভালবাসো?

তুলসী নিঃসঙ্কোচে অলজ্জিত মুখে বলিল, মাস্টার মশাইকে। উনিও আমাকে খুব ভালবাসেন।

আর মণিলালকে তুমি ভালবাসো না?

তুলসীর চোখ দুটা যেন দপ করিয়া জ্বলিয়া উঠিল—না। ও কেন মাস্টার মশাইকে হিংসে করে ! ও কেন মাস্টার মশাইয়ের নামে বাবার কাছে লাগায়? ও যদি আমাকে বিয়ে করে আমি ওকে পাহাড় থেকে ঠেলে ফেলে দেব? বলিয়া তুলসী ছুটিয়া ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল।

আমরা দুই বন্ধু পরস্পর মুখের পানে চাহিয়া রহিলাম। শেষে ব্যোমকেশ একটা নিঃশ্বাস ফেলিয়া বলিল, বেচারি।

আধা ঘন্টা পরে স্নানের জন্য উঠি-উঠি করিতেছি, রমাপতি আসিয়া দ্বারে উকি মারিল, কুষ্ঠিত স্বরে বলিল, তুলসী এদিকে এসেছিল না কি?

ব্যোমকেশ বলিল, হ্যাঁ, এই খানিকক্ষণ হল চলে গেছে। এস-বোসো।

রমাপতি সঙ্কুচিতভাবে আসিয়া বসিল।

ব্যোমকেশ বলিল, রমাপতি, প্রথম যেদিন আমরা এখানে আসি, তুমি বলেছিলে এবার ঈশানবাবুর মৃত্যু-সমস্যার সমাধান হবে। অর্থাৎ, তুমি মনে কর ঈশানবাবুর মৃত্যুর একটা সমস্যা আছে। কেমন?

রমাপতি চুপ করিয়া রহিল। ব্যোমকেশ বলিল, ধরে নেওয়া যাক ঈশানবাবুর মৃত্যুটা রহস্যময়, কেউ তাকে খুন করেছে। এখন আমি তোমাকে কয়েকটা প্রশ্ন করব, তুমি তার সোজাসুজি উত্তর দাও। সঙ্কোচ কোরো না। মনে কর তুমি আদালতে হলফ নিয়ে সাক্ষী দিচ্ছ।

রমাপতি ক্ষীণ স্বরে বলিল,বলুন।

ব্যোমকেশ বলিল, বাড়ির সকলকেই তুমি ভাল করে চেনো। বল দেখি, ওদের মধ্যে এমন কে মানুষ আছে যে খুন করতে পারে?

রমাপতি সভয়ে কিয়াৎকাল। নীরব থাকিয়া কম্পিত কণ্ঠে বলিল, আমার বলা উচিত নয়, আমি ওঁদের আশ্রিত। কিন্তু অবস্থায় পড়লে বোধহয় সবাই মানুষ খুন করতে পারেন।

সবাই? রামকিশোরবাবু?

হ্যাঁ।

বংশীধর?

হ্যাঁ।

মুরলীধর?

হ্যাঁ। ওঁদের প্রকৃতি বড় উগ্র

নায়েব চাঁদমোহন?

বোধহয় না। তবে কর্তার হুকুম পেলে লোক লাগিয়ে খুন করাতে পারেন।

মণিলাল?

রমাপতির মুখ অন্ধকার হইল, সে দাঁতে দাঁত চাপিয়া বলিল, নিজের হাতে মানুষ খুন করবার সাহস ওঁর নেই। উনি কেবল চুকলি খেয়ে মানুষের অনিষ্ট করতে পারেন।

আর তুমি? তুমি মানুষ খুন করতে পার না?

আমি—

আচ্ছ, যাক। —তুমি টর্চ চুরি করেছিলে?

রমাপতি তিক্তমুখে বলিল, আমার বদনাম হয়েছে জানি। কে বদনাম দিয়েছে তাও জানি। কিন্তু আপনিই বলুন, যদি চুরিই করতে হয়, একটা সামান্য টর্চ চুরি করব।

অর্থাৎ চুরি করনি। —যাক, মণিলালের সঙ্গে তুলসীর বিয়ে ঠিক হয়ে আছে তুমি জানো?

রমাপতির মুখ কঠিন হইয়া উঠিল। কিন্তু সে সংযতভাবে বলিল, জানি। কর্তার তাই ইচ্ছে।

আর কারুর ইচ্ছে নয়?

না।

তোমারও ইচ্ছে নয়?

রমাপতি উঠিয়া দাঁড়াইল,—আমি একটা গলগ্ৰহ, আমার ইচ্ছে-অনিচ্ছেয় কী আসে যায়। কিন্তু এ বিয়ে যদি হয়, একটা বিশ্ৰী কাণ্ড হবে। বলিয়া আমাদের অনুমতির অপেক্ষা না করিয়া ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল।

ব্যোমকেশ কিছুক্ষণ দ্বারের দিকে চাহিয়া থাকিয়া বলিল, ছোকরার সাহস আছে!

বৈকালে সীতারাম চা লইয়া আসিলে ব্যোমকেশ তাহাকে বলিল, সীতারাম, তোমাকে একটা কাজ করতে হবে। বছর দুই আগে একদল বেদে এসে এখানে তাঁবু ফেলে ছিল। তোমাকে বুলাকিলালের কাছে খবর নিতে হবে, বাড়ির কে কে বেদের তাঁবুতে যাতায়াত করত—এ বিষয়ে যত খবর পাও যোগাড় করবে।

সীতারাম বলিল, জী হুজুর। বুলাকিলাল এখন বাবুদের নিয়ে শহরে গেছে, ফিরে এলে খোঁজ নেব।

সীতারাম প্রস্থান করিলে বলিলাম, বেদে সম্বন্ধে কৌতুহল কেন?

ব্যোমকেশ বলিল, বিষ ! সাপের বিষ কোত্থেকে এল খোঁজ নিতে হবে না?

এই সময় পাণ্ডেজি উপস্থিত হইলেন। তাঁহার কাঁধ হইতে চামড়ার ফিতায় বাইনাকুলার বুলিতেছে। ব্যোমকেশ বলিল, একি; দূরবীন কি হবে?

পাণ্ডেজি বলিলেন, আনিলাম। আপনার জন্যে, যদি কাজে লাগে। —সকলে আসতে পারিনি, কাজে আটকে পড়েছিলাম। তাই এবেলা সকাল-সকাল বেরিয়ে পড়লাম। রাস্তায় আসতে আসতে দেখি রামকিশোরবাবুও শহর থেকে ফিরছেন। তাঁদের ইঞ্জিন বিগড়েছে, বুলাকিলাল হুইল ধরে বসে আছে, রামকিশোরবাবু গাড়ির মধ্যে বসে আছেন, আর জামাই মণিলাল গাড়ি ঠেলছে।

তারপর?

দড়ি দিয়ে বেঁধে গাড়ি টেনে নিয়ে এলাম।

ওঁদের আদালতের কাজকর্ম চুকে গেল?

না, একটু বাকি আছে, কাল আবার যাবেন। —তারপর, নতুন খবর কিছু আছে নাকি?

অনেক নতুন খবর আছে।

খবর শুনিতে শুনিতে পাণ্ডেজি উত্তেজিত হইয়া উঠিলেন। বিবৃতি শেষ হইলে বলিলেন, আর সন্দেহ নেই। ঈশানবাবু তোষাখানা খুঁজে বার করেছিলেন, তাই তাঁকে কেউ খুন করেছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কে খুন করতে পারে?

ব্যোমকেশ বলিল, রামকিশোরবাবু থেকে সন্নিসি ঠাকুর পর্যন্ত সবাই খুন করতে পারে। কিন্তু এটাই একমাত্র প্রশ্ন নয়। আরও প্রশ্ন আছে।

যেমন?

যেমন, বিষ এল কোত্থেকে। সাপের বিষ তো যেখানে সেখানে পাওয়া যায় না। তারপর ধরুন, সাপের বিষ শরীরে ঢ়োকবার জন্যে এমন একটা যন্ত্র চাই যেটা ঠিক সাপের দাঁতের মত দাগ রেখে যায়।

হাইপোডারমিক সিরিঞ্জ—

ইনজেকশনের ছুঁচের দাগ খুব ছোট হয়, দু’চার মিনিটের মধ্যেই মিলিয়ে যায়। আপনি ঈশানবাবুর পায়ে দাগ দেখেছেন, ইনজেকশানের দাগ বলে মনে হয় কি?

উহুঁ। তাছাড়া, দুটো দাগ পাশাপাশি—

ওটা কিছু নয়। যেখানে রুগী অজ্ঞান হয়ে পড়েছে সেখানে পাশাপাশি দু’বার ছুচ ফোটানো শক্ত কি?

তা বটে। —আর কি প্রশ্ন?

আর, ঈশানবাবু যদি গুপ্ত তোষাখানা খুঁজে বার করে থাকেন তবে সে তোষাখানা কোথায়?

এই দুর্গের মধ্যেই নিশ্চয় আছে।

শুধু দুর্গের মধ্যেই নয়, এই বাড়ির মধ্যেই আছে। মুরলীধর যে সাপের ভয় দেখিয়ে আমাদের তাড়াবার চেষ্টা করছে, তার কারণ কি?

পাণ্ডেজি তীক্ষ্ণ চক্ষে চাহিলেন, মুরলীধর?

ব্যোমকেশ বলিল, তার অন্য উদ্দেশ্য থাকতে পারে। মোট কথা, ঈশানবাবু আসবার আগে তোষাখানার সন্ধান কেউ জানত না। তারপর ঈশানবাবু ছাড়া আর একজন জানতে পেরেছে এবং ঈশানবাবুকে খুন করেছে। তবে আমার বিশ্বাস, মাল সরাতে পারেনি।

কি করে বুঝলেন?

দেখুন, আমরা দুর্গে আছি, এটা কারুর পছন্দ নয়। এর অর্থ কি?

বুঝেছি। তাহলে আগে তোষাখানা খুঁজে বার করা দরকার। কোথায় তোষাখানা থাকতে পারে; আপনি কিছু ভেবে দেখেছেন কি?

ব্যোমকেশ একটু হাসিল, বলিল, কাল থেকে একটা সন্দেহ আমার মনের মধ্যে ঘুরছে—

আমি বলিলাম, গজাল?

এই সময় সীতারাম চায়ের পাত্রগুলি সরাইয়া লইতে আসিল। ব্যোমকেশ তাহার দিকে চাহিয়া বলিল, বুলাকিলাল ফিরে এসেছে।

সীতারাম মাথা ঝুঁকাইয়া পাত্রগুলি লইয়া চলিয়া গেল। পাণ্ডে জিজ্ঞাসা করিলেন, ওকে কোথাও পাঠালেন নাকি?

হ্যাঁ, বুলাকিলালের কাছে কিছু দরকার আছে।

যাক। এবার আপনার সন্দেহের কথা বলুন।

ব্যোমকেশ বলিল, ঐ গজালগুলো। কেবল সন্দেহ হচ্ছে ওদের প্রকাশ্য প্রয়োজনটাই একমাত্র প্রয়োজন নয়, যাকে বলে ধোঁকার টাটি, ওরা হচ্ছে তাই।

পাণ্ডে গজালগুলিকে নিরীক্ষণ করিতে করিতে বলিলেন, হুঁ। তা কি করা যেতে পারে।

আমার ইচ্ছে ওদের একটু নেড়েচেড়ে দেখা। আপনি এসেছেন, আপনার সামনেই যা কিছু করা ভাল। যদি তোষাখানা বেরোয়, আমরা তিনজনে জানিব, আর কাউকে আপাতত জানতে দেওয়া হবে না। —অজিত, দরজা বন্ধ কর।

দরজা বন্ধ করিলে ঘর অন্ধকার হইল। তখন লণ্ঠন জ্বালিয়া এবং টর্চের আলো ফেলিয়া আমরা অনুসন্ধান আরম্ভ করিলাম। সর্বসুদ্ধ পনরোটি গজাল। আমরা প্রত্যেকটি টানিয়া ঠেলিয়া উঁচু দিকে আকর্ষণ করিয়া দেখিতে লাগিলাম। গজালগুলি মরিচা-ধরা কিন্তু বজ্রের মত দৃঢ়, একচুলও নড়িল না।

হঠাৎ পাণ্ডে বলিয়া উঠিলেন, এই যে ! নড়ছে-একটু একটু নড়ছে— ! আমরা ছুটিয়া তাঁহার পাশে গিয়া দাঁড়াইলাম। দরজার সামনে যে দেয়াল, তাহার মাঝখানে একটা গজাল। পাণ্ডে গজাল ধরিয়া ভিতর দিকে ঠেলা দিতেছেন; নড়িতেছে কিনা আমরা বুঝিতে পারিলাম না। পাণ্ডে বলিলেন, আমার একার কর্ম নয়। ব্যোমকেশবাবু, আপনিও ঠেলুন।

ব্যোমকেশ হাঁটু গাড়িয়া দুই হাতে পাথরে ঠেলা দিতে শুরু করিল। চতুষ্কোণ পাথর ধীরে ধীরে পিছন দিকে সরিতে লাগিল। তাহার নীচে অন্ধকার গর্ত দেখা গেল।

আমি টর্চের আলো ফেলিলাম। গর্তটি লম্বা-চওড়ায় দুই হাত, ভিতরে একপ্রস্থ সরু সিঁড়ি নামিয়া গিয়াছে।

পাণ্ডে মহা উত্তেজিতভাবে কপালের ঘাম মুছিয়া বলিলেন, শাবাশ ! পাওয়া গেছে তোষাখানা। —ব্যোমকেশবাবু, আপনি আবিষ্কতা, আপনি আগে ঢুকুন।

টর্চ লইয়া ব্যোমকেশ আগে নামিল, তারপর পাণ্ডেজি, সর্বশেষে লণ্ঠন লইয়া আমি।

ঘরটি উপরের ঘরের মতই প্রশস্ত। একটি দেওয়ালের গা ঘেষিয়া সারি সারি মাটির কুণ্ডা। কুণ্ডার মুখ ছোট ছোট হাঁড়ি, হাঁড়ির মুখ সারা দিয়া ঢাকা। ঘরের অন্য কোণে একটি বড় উনান, তাহার সহিত একটি হাপরের নল সংযুক্ত রহিয়াছে। হাপরের চামড়া অবশ্য শুকাইয়া ঝরিয়া গিয়াছে, কিন্তু কাঠামো দেখিয়া হাপর বলিয়া চেনা যায়। ঘরে আর কিছু নাই।

আমাদের ঘন ঘন নিশ্বাস পড়িতেছিল, পেট মোটা কুণ্ডাগুলিতে না জানি কোন রাজার সম্পত্তি রহিয়াছে। কিন্তু আগে ঘরের অন্যান্য স্থান দেখা দরকার। এদিক-ওদিক আলো ফেলিতে এককোণে একটা চকচকে জিনিস চোখে পড়িল। ছুটিয়া কাছে গিয়া দেখি-একটি ছোট বৈদ্যুতিক টর্চ। তুলিয়া লইয়া জ্বালাইবার চেষ্টা করিলাম, কিন্তু টর্চ জ্বালাই ছিল, জ্বলিয়া জ্বলিয়া সেল ফুরাইয়া নিভিয়া গিয়াছে।

ব্যোমকেশ বলিল, ঈশানবাবু যে এ ঘরের সন্ধান পেয়েছিলেন, তার অকাট্য প্রমাণ।

তখন আমরা হাঁড়িগুলি খুলিয়া দেখিলাম। সব হাঁড়িই শূন্য, কেবল একটা হাঁড়ির তলায় নুনের মত খানিকটা গুড়া পড়িয়া আছে। ব্যোমকেশ একখামচা তুলিয়া লইয়া পরীক্ষা করিল, তারপর রুমালে বাঁধিয়া পকেটে রাখিল। বলিল, নুন হতে পারে, চুন হতে পারে, অন্য কিছুও হতে পারে।

অতঃপর কুণ্ডাগুলি একে একে পরীক্ষা করা হইল। কিন্তু হায় সাত রাজার ধন মিলিল না। সব কুণ্ডা খালি, কোথাও একটা কপর্দক পর্যন্ত নাই।

আমরা ফ্যাল ফ্যাল চক্ষে পরস্পরের পানে চাহিলাম। তারপর ঘরটিতে আঁতিপাঁতি করা হইল, কিন্তু কিছু মিলিল না।

উপরে ফিরিয়া আসিয়া প্ৰথমে গুপ্তদ্বার টানিয়া বন্ধ করা হইল। তারপর ঘরের দরজা খুলিলাম। বাহিরে অন্ধকার হইয়া গিয়াছে; সীতারাম দ্বারের বাহিরে ঘোরাঘুরি করিতেছে। ব্যোমকেশ ক্লাস্তিস্বরে বলিল, সীতারাম, আর একদফা চা তৈরি কর।

চেয়ার লইয়া তিনজনে বাহিরে বসিলাম। পাণ্ডে দমিয়া গিয়াছিলেন, বলিলেন, কি হল বলুন দেখি? মাল গেল কোথায়?

ব্যোমকেশ বলিল, তিনটে সম্ভাবনা রয়েছে। এক, সিপাহীরা সব লুটে নিয়ে গিয়েছে। দুই, ঈশানবাবুকে যে খুন করেছে, সে সেই রাত্রেই মাল সরিয়েছে। তিন, রাজারাম অন্য কোথাও মাল লুকিয়েছেন।

কোন সম্ভাবনাটা আপনার বেশি মনে লাগে?

ব্যোমকেশ হাত নাড়িয়া ‘বলাকা’ কবিতার শেষ পংক্তি আবৃত্তি করিল, হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোথা, অন্য কোনখানে।

চা পান করিতে করিতে ব্যোমকেশ সীতারামকে জিজ্ঞাসা করিল, বুলাকিলালের দেখা পেলে?

সীতারাম বলিল, জী। গাড়ির ইঞ্জিন মেরামত করছিল, দু-চারটে কথা হল।

কি বললে সে?

হুজুর, বুলাকিলাল একটা আস্ত বুদ্ধ। সন্ধ্যে হলেই ভাঙ খেয়ে বেদম ঘুমোয়, রাত্তিরের কোনও খবরই রাখে না। তবে দিনের বেলা বাড়ির সকলেই বেদের তাঁবুতে যাতায়াত করত। এমনকি, বুলাকিলােলও দু-চারবার গিয়েছিল।

বুলাকিলাল গিয়েছিল কেন?

হাত দেখাতে। বেদেনীরা নাকি ভাল হাত দেখতে জানে, ভূত-ভবিষ্যৎ সব বলে দিতে পারে। বুলাকিলালকে বলেছে ও শীগগির লাট সাহেবের মোটর ড্রাইভার হবে।

বাড়ির আর কে কে যেতো?

মালিক, মালিকের দুই বড় ছেলে, জামাইবাবু, নায়েববাবু, সবাই যেতো। আর ছোট ছেলেমেয়ে দুটো সর্বদাই ওখানে ঘোরাঘুরি করত।

হুঁ, আর কিছু? ‘আর কিছু নয় হুজুর।

রাত্রি হইতেছে দেখিয়া পাণ্ডেজি উঠিলেন। ব্যোমকেশ তাঁহাকে রুমালে বাঁধা পুঁটুলি দিয়া বলিল, এটার কেমিক্যাল অ্যানালিসিস করিয়ে দেখবেন। আমরা এ পর্যন্ত যতটুকু খবর সংগ্ৰহ করেছি। তাতে নিরাশ হবার কিছু নেই। অন্তত ঈশানবাবুকে যে হত্যা করা হয়েছে, এ বিষয়ে আমি নিঃসন্দেহ, বাকি খবর ক্রমে পাওয়া যাবে।

পাণ্ডেজি রুমালের পুঁটুলি পকেটে রাখিতে গিয়া বলিলেন, আরে, ডাকে আপনার একটা চিঠি এসেছিল, সেটা এতক্ষণ দিতেই ভুলে গেছি। এই নিন। —আচ্ছা, কাল আবার আসব।

পাণ্ডেজিকে সিঁড়ি পর্যন্ত পৌঁছাইয়া দিয়া ফিরিয়া আসিয়া বসিলাম। ব্যোমকেশ চিঠি খুলিয়া পড়িল, জিজ্ঞাসা করিলাম, সত্যবতীর চিঠি নাকি?

না, সুকুমারের চিঠি।

কি খবর?

নতুন খবর কিছু নেই। তবে সব ভাল।

রাত্রিটা নিরুপদ্রবে কাটিয়া গেল। পরদিন সকালে ব্যোমকেশ ঈশানবাবুর খাতা লইয়া বসিল। কখনও খাতাটা পড়িতেছে, কখনও উর্ধ্বপানে চোখ তুলিয়া নিঃশব্দে ঠোঁট নাড়িতেছে, কথাবার্তা বলিতেছে না।

বাইনাকুলার কাল পাণ্ডেজি রাখিয়া গিয়াছিলেন, সেটা লইয়া নাড়াচাড়া করিতে করিতে বলিলাম, কিসের গবেষণা হচ্ছে?

ব্যোমকেশ সংক্ষেপে বলিল, মোহনলাল।

মোহনলালের নামে আজ, কেন জানি না, বহুদিন পূর্বে পঠিত পলাশীর যুদ্ধ মনে পড়িয়া গেল। বলিলাম, আবার আবার সেই কামান গর্জন.কাঁপাইয়া গঙ্গাজল—

ব্যোমকেশ ভৎসনা-ভরা চক্ষু তুলিয়া আমার পানে চাহিল। আমি বলিলাম, দাঁড়ারে দাঁড়ারে ফিরে দাঁড়ারে যবন, গৰ্জিল মোহনলাল নিকট শমন।

ব্যোমকেশের চোখের ভৎসনা ক্রমে হিংস্র ভাব ধারণ করিতেছে দেখিয়া আমি ঘর ছাড়িয়া চলিয়া আসিলাম। কেহ যদি বীররসাত্মক কাব্য সহ্য করিতে না পারে, তাহার উপর জুলুম করা উচিত নয়।

বাহিরে স্বর্ণোজ্জ্বল হৈমন্ত প্রভাত। দূরবীনটা হাতেই ছিল, আমি সেটা লইয়া প্রাকারে উঠিলাম। চারিদিকের দৃশ্য অতি মনোরম। দূরের পর্বতচূড়া কাছে আসিয়াছে, বনানীর মাথার উপর আলোর ঢেউ খেলিতেছে। ঘুরিয়া ঘুরিয়া দেখিতে দেখিতে রামকিশোরবাবুর বাড়ির সম্মুখে আসিয়া পৌছিলাম। বাড়ির খুঁটিনাটি সমস্ত দেখিতে পাইতেছি। রামকিশোর শহরে যাইবার জন্য বাহির হইলেন, সঙ্গে দুই পুত্র এবং জামাই। তাঁহারা সিঁড়ি দিয়া নামিয়া গেলেন; কিছুক্ষণ পরে মোটর চলিয়া গেল। ...বাড়িতে রহিল মাস্টার রমাপতি, গদাধর আর তুলসী।

ঘরে ফিরিয়া দেখিলাম ব্যোমকেশ তখনও জলপানরত মুরগীর মতো একবার কোলের দিকে কুঁকিয়া খাতা পড়িতেছে, আবার উঁচু দিকে মুখ তুলিয়া আপন মনে বিজ বিজ করিতেছে। বলিলাম, ওহে, রামকিশোরবাবুরা শহরে চলে গেলেন।

ব্যোমকেশ আমার কথায় কৰ্ণপাত না করিয়া মুরগীর মত জল পান করিতে লাগিল। তারপর হঠাৎ বলিল, মোহনলাল মস্ত বীর ছিল—না?

সেই রকম তো শুনতে পাই।

ব্যোমকেশ আর কথা কহিল না। তাহার ভাবগতিক দেখিয়া মনে হইল, সে আজ খাতা ছাড়িয়া উঠিবে না। সকালবেলাটা নিষ্ক্রিয়ভাবে কাটিয়া যাইবে ভাবিয়া বলিলাম, চল না, সাধু-দৰ্শন করা যাক। তিনি হয়তো হাত গুনতে জানেন।

অন্যমনস্কভাবে চোখ তুলিয়া ব্যোমকেশ বলিল, এখন নয়, ওবেলা দেখা যাবে।

দুপুরবেলা শয্যায় শুইয়া তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় খানিকটা সময় কাটিয়া গেল। রামকিশোরবাবু ঠিক বলিয়ছিলেন; এই নির্জনে দুদিন বাস করিলে প্ৰাণ পালাই-পালাই করে।

পৌনে তিনটা পর্যন্ত বিছানায় এপাশি-ওপাশ করিয়া আর পারা গেল না, উঠিয়া পড়িলাম। দেখি, ব্যোমকেশ ঘরে নাই। বাহিরে আসিয়া দেখিলাম, সে প্রাকারের উপর উঠিয়া পায়চারি করিতেছে। রৌদ্র তেমন কড়া নয় বটে, কিন্তু এ সময় প্রাকারের উপর বায়ু সেবনের অর্থ হৃদয়ঙ্গম হইল না। তবু হয়তো নূতন কিছু আবিষ্কার করিয়াছে ভাবিয়া আমিও সেই দিকে, চলিলাম।

আমাকে দেখিয়া সে যেন নিজের মনের ভিতর হইতে উঠিয়া আসিল, যন্ত্রবৎ বলিল, একটা তুরপুন চাই।

তুরপুন! দেখিলাম, তাহার চোখে অধীর বিভ্রান্ত দৃষ্টি। এ-দৃষ্টি আমার অপরিচিত নয়, সে কিছু পাইয়াছে। বলিলাম, কি পেলে?

ব্যোমকেশ এবার সম্পূর্ণ সচেতন হইয়া আমাকে দেখিতে পাইল, ঈষৎ লজ্জিতভাবে বলিল, না না, কিছু না। তুমি দিব্যি ঘুমুচ্ছিলে, ভাবলাম এখানে এসে দূরবীনের সাহায্যে নিসর্গ-শোভা নিরীক্ষণ করি। তা দেখবার কিছু নেই। —এই নাও, তুমি দ্যাখো।

প্রাকারের আলিসার উপর দুরবীনটা রাখা ছিল, সেটা আমাকে ধরাইয়া দিয়া ব্যোমকেশ নামিয়া গেল। আমি একটু অবাক হইলাম। ব্যোমকেশের আজ এ কী ভাব !

চারিদিকে দৃষ্টি ফিরাইলাম। আতপ্ত বাতাসে বহিঃপ্রকৃতি ঝিম ঝিম করিতেছে। দূরবীন চোখে দিলাম; দূরবীন এদিক-ওদিক ঘুরিয়া রামকিশোরবাবুর বাড়ির উপর স্থির হইল।

দূরবীন দিয়া দেখার সহিত আড়ি পাতার একটা সাদৃশ্য আছে; এ যেন চোখ দিয়া আড়ি পাতা। রামকিশোরবাবুর বাড়িটা দূরবীনের ভিতর দিয়া আমার দশ হাতের মধ্যে আসিয়া গিয়াছে; বাড়ির সবই আমি দেখিতে পাইতেছি, অথচ আমাকে কেহ দেখিতে পাইতেছে না।

বাড়ির সদরে কেহ নাই, কিন্তু দরজা খোলা। দূরবীন উপরে উঠিল। হাঁটু পর্যন্ত আলিসা-ঘেরা ছাদ, সিঁড়ি পিছন দিকে। রমাপতি আলিসার উপর গালে হাত দিয়া বসিয়া আছে, তাহার পাশের ভাগ দেখিতে পাইতেছি। ছাদে আর কেহ নাই; রমাপতি কপাল কুঁচকাইয়া কি যেন ভাবিতেছে।

রমাপতি চমকিয়া মুখ তুলিল। সিঁড়ি দিয়া তুলসী উঠিয়া আসিল, তাহার মুখেচোখে গোপনতার উত্তেজনা। লঘু দ্রুতপদে রমাপতির কাছে আসিয়া সে আচলের ভিতর হইতে ডান হাত বাহির করিয়া দেখাইল। হাতে কি একটা রহিয়াছে, কালো রঙের পেন্সিল কিম্বা ফাউন্টেন পেন।

দূরবীনের ভিতর দিয়া দেখিতেছি, কিন্তু কিছু শুনিতে পাইতেছি না; যেন সে-কালের নির্বাক চলচ্চিত্র। রমাপতি উত্তেজিত হইয়া কি বলিতেছে, হাত নাড়িতেছে। তুলসী তাহার গলা জড়াইয়া অনুনয় করিতেছে, কালো জিনিসটা তাহার হাতে ধরাইয়া দিবার চেষ্টা করিতেছে।

এই সময় রঙ্গমঞ্চে আরও কয়েকটি অভিনেতার আবির্ভাব হইল। রামকিশোরবাবু সিঁড়ি দিয়া উঠিয়া আসিলেন, তাঁহার পিছনে বংশীধর ও মুরলীধর; সর্বশেষে মণিলাল।

সকলেই ক্রুদ্ধ; রমাপতি দাঁড়াইয়া উঠিয়া কাঠ হইয়া রহিল। বংশীধর বিকৃত মুখভঙ্গী করিয়া তুলসীকে তাড়না করিল এবং কালো জিনিসটা তাহার হাত হইতে কড়িয়া লইল। তুলসী কিছুক্ষণ সতেজ তর্ক করিল, তারপর কাঁদো-কাঁদো মুখে নামিয়া গেল। তখন রমাপতিকে ঘিরিয়া বাকি কয়জন তর্জন-গর্জন করিতে লাগিলেন, কেবল মণিলাল কটমটে চক্ষে চাহিয়া অধরোষ্ঠ সম্বদ্ধ করিয়া রাখিল।

বংশীধর সহসা রমাপতির গালে একটা চড় মারিল। রামকিশোর বাধা দিলেন, তারপর আদেশের ভঙ্গীতে সিঁড়ির দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করিলেন। সকলে সিঁড়ি দিয়া নামিয়া গেল।

এই বিচিত্র দৃশ্যের অর্থ কি, সংলাপের অভাবে তাহা নির্ধারণ করা অসম্ভব। আমি আরও দশ মিনিট অপেক্ষা করিলাম, কিন্তু নাটকীয় ব্যাপার আর কিছু দেখিতে পাইলাম না; যাহা কিছু ঘটিল। বাড়ির মধ্যে আমার চক্ষুর অন্তরালে ঘটিল।

নামিয়া আসিয়া ব্যোমকেশকে বলিলাম। সে গভীর মনোযোগের সহিত শুনিয়া বলিল, রামকিশোরবাবুরা তাহলে সদর থেকে ফিরে এসেছেন। —তুলসীর হাতে জিনিসটা চিনতে পারলে না?

মনে হল ফাউন্টেন পেন।

দেখা যাক, হয়তো শীগগিরই খবর পাওয়া যাবে। রমাপতি আসতে পারে।

রমাপতি আসিল না, আসিল তুলসী। ঝড়ের আগে শুষ্ক পাতার মত সে যেন উড়িতে উড়িতে আসিয়া আমাদের ঘরের চৌকাঠে আটকাইয়া গেল। তাহার মূর্তি পাগলিনীর মত, দুই চক্ষু রাঙা টিকটক করিতেছে। সে খাটের উপর ব্যোমকেশকে উপবিষ্ট দেখিয়া ছুটিয়া আসিয়া তাহার কোলের উপর আছড়াইয়া পড়িল, চীৎকার করিয়া কাঁদিয়া উঠিল, আমার মাস্টার মশাইকে তাড়িয়ে দিয়েছে।

তাড়িয়ে দিয়েছে?

তুলসীর কান্না থামানো সহজ হইল না। যা হোক, ব্যোমকেশের সস্নেহ সান্ত্বনায় কান্না ক্রমে ফোঁপানিতে নামিল, তখন প্রকৃত তথ্য জানা গেল।

জামাইবাবুর দুইটি ফাউন্টেন পেন আছে; একটি তাঁহার নিজের, অন্যটি তিনি বিবাহের সময় যৌতুক পাইয়াছিলেন. জামাইবাবু দুইটি কলম লইয়া কি করিবেন? তাই আজ তুলসী জামাইবাবুর অনুপস্থিতিতে তাঁহার দেরাজ হইতে কলম লইয়া মাস্টার মশাইকে দিতে গিয়াছিল-মাস্টার মশায়ের একটিও কলম নাই-মাস্টার মশাই কিন্তু লইতে চান নাই, রাগ করিয়া কলম যথাস্থানে রাখিয়া আসিতে হুকুম দিয়াছিলেন, এমন সময় বাড়ির সকলে আসিয়া উপস্থিত হইল এবং মাস্টার মশাইকে চোর বলিয়া ধরিল...তুলসী এত বলিল মাস্টার মশাই চুরি করেন নাই কিন্তু কেহ শুনিল না। শেষ পর্যন্ত মারধর করিয়া মাস্টার মশাইকে বাড়ি হইতে তাড়াইয়া দিয়াছে।

আমি দূরবীনের ভিতর দিয়া যে দৃশ্য দেখিয়াছিলাম তাহার সহিত তুলসীর কাহিনীর কোথাও গরমিল নাই। আমরা দুইজনে মিলিয়া তুলসীকে প্ৰবোধ দিতে লাগিলাম, মাস্টার আবার ফিরিয়া আসিবে, কোনও ভাবনা নাই; প্রয়োজন হইলে আমরা গিয়া তুলসীর বাবাকে বলিব।

দ্বারের কাছে গলা খাঁকারির শব্দ শুনিয়া চকিতে ফিরিয়া দেখি, জামাই মণিলাল দাঁড়াইয়া আছে। তুলসী তাঁহাকে দেখিয়া তীরের মত তাহার পাশ কাটাইয়া অদৃশ্য হইল।

ব্যোমকেশ বলিল, আসুন মণিবাবু।

মণিলাল ঘরে প্রবেশ করিয়া বলিল, কর্তা পাঠিয়েছিলেন তুলসীর খোঁজ নেবার জন্যে। ও ভারি দুরন্ত, আপনাদের বেশি বিরক্ত করে না তো?

ব্যোমকেশ বলিল, মোটেই বিরক্ত করে না। ওর মাস্টারকে নাকি তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, তাই বলতে এসেছিল।

মণিলাল একটু অপ্ৰস্তুত হইয়া পড়িল, বলিল, হ্যাঁ, রমাপতিকে কর্তা বিদেয় করে দিলেন। আমরা কেউ বাড়িতে ছিলাম না, পচাচাবি দিয়ে আমার দেরাজ খুলে একটা কলম চুরি করেছিল। দামী কলম—

ব্যোমকেশ হাত বাড়াইয়া বলিল, যে কলামটা আপনার বুক পকেটে রয়েছে ঐটে কি?

হ্যাঁ।

মণিলাল কলম ব্যোমকেশের হাতে দিল।

পার্কারের কলম, দামী জিনিস। ব্যোমকেশ কলম ভালবাসে, সে তাহার মাথার ক্যাপ খুলিয়া দেখিল, পিছন খুলিয়া কালি ভরিবার যন্ত্র দেখিল; তারপর কলম ফিরাইয়া দিয়া বলিল, ভাল কলম। চুরি করতে হলে এই রকম কলমই চুরি করা উচিত। বাড়িতে আর কার ফাউন্টেন পেন আছে?

মণিলাল বলিল, আর কারুর নেই। বাড়িতে পড়ালেখার বিশেষ রেওয়াজ নেই। কেবল কর্তা দোয়াত কলমে লেখেন।

হুঁ। তুলসী বলছে ও নিজেই আপনার দেরাজ থেকে কলম বার করেছিল—

মণিলাল দুঃখিতভাবে বলিল, তুলসী মিথ্যে কথা বলছে। রমাপতির ও দোষ বরাবরই আছে। এই সেদিন একটা ইলেকট্রিক টর্চ—

আমি বলিতে গেলাম, ইলেকট্রিক টর্চ তো—

কিন্তু আমি কথা শেষ করিবার পূর্বে ব্যোমকেশ বলিয়া উঠিল, ইলেকট্রিক টর্চ একটা তুচ্ছ জিনিস। রমাপতি হাজার হোক বুদ্ধিমান লোক, সে কি একটা টর্চ চুরি করে নিজের ভবিষ্যৎ নষ্ট করবে?

মণিলাল কিছুক্ষণ ব্যোমকেশের পানে চাহিয়া থাকিয়া বলিল, আপনার কথায় আমার ধোঁকা লাগছে, কি জানি যদি সে টর্চ না চুরি করে থাকে। কিন্তু আজ আমার কলমটা—। তবে কি তুলসী সত্যিই—

আমি জোর দিয়া বলিলাম, হ্যাঁ, তুলসী সত্যি কথা বলেছে। আমি—

ব্যোমকেশ আবার মুখে থাবা দিয়া বলিল, মণিলালবাবু, আপনাদের পারিবারিক ব্যাপারে আমাদের মাথা গলানো উচিত নয়। আমরা দুদিনের জন্যে বেড়াতে এসেছি, কি দরকার আমাদের ওসব কথায়! আপনারা যা ভাল বুঝেছেন করেছেন।

তাহলেও-কারুর নামে মিথ্যে বদনাম দেওয়া ভাল নয়—? বলিতে বলিতে মণিলাল দ্বারের দিকে পা বাড়াইল।

ব্যোমকেশ বলিল, আজ। আপনাদের সদরের কাজ হয়ে গেল?

হ্যাঁ, সকাল সকাল কাজ হয়ে গেল। কেবল দস্তখৎ করা বাকি ছিল।

যাক, এখন তাহলে নিশ্চিন্ত।

আজ্ঞে হ্যাঁ।

মণিলাল প্ৰস্থান করিলে ব্যোমকেশ দরজায় উঁকি মারিয়া আসিয়া বলিল, আর একটু হলেই দিয়েছিলে সব ফাঁসিয়ে।

সে কি ! কী ফাঁসিয়ে দিয়েছিলাম !

প্ৰথমে তুমি বলতে যাচ্ছিলে যে হারানো টর্চ পাওয়া গেছে।

হ্যাঁ।

তারপর বলতে যাচ্ছিলে যে দূরবীন দিয়ে ছাদের দৃশ্য দেখেছি!

হ্যাঁ, তাতে কী ক্ষতি হত?

মণিলালকে কোনও কথা বলা মানেই বাড়ির সকলকে বলা। গর্দভচমাবৃত যে সিংহটিকে আমরা খুঁজছি। সে জানতে পারত যে আমরা তোষাখানার সন্ধান পেয়েছি এবং দূরবীন দিয়ে ওদের ওপর অষ্টপ্রহর নজর রেখেছি। শিকার ভড়কে যেত না?

এ কথাটা ভাবিয়া দেখি নাই।

এই সময় সীতারাম চা লইয়া আসিল। কিছুক্ষণ পরে পাণ্ডেজি আসিলেন। তিনি আমাদের জন্য অনেক তাজা খাদ্যদ্রব্য আনিয়াছেন। সীতারাম সেগুলা মোটর হইতে আনিতে গেল। আমরা চা পান করিতে করিতে সংবাদের আদান-প্ৰদান করিলাম।

আমাদের সংবাদ শুনিয়া পাণ্ডেজি বলিলেন, জাল থেকে মাছ বেরিয়ে যাচ্ছে। আজ রমাপতি গিয়েছে, কাল বংশীধর আর মুরলীধর যাবে। তাড়াতাড়ি জাল গুটিয়ে ফেলা দরকার। —হ্যাঁ, বংশীধর কলেজ হোস্টেলে যে কুকীর্তি করেছিল তার খবর পাওয়া গেছে।

কি কুকীর্তি করেছিল?

একটি ছেলের সঙ্গে ওর ঝগড়া হয়, তারপর মিটমাট হয়ে যায়। বংশীধর কিন্তু মনে মনে রাগ পুষে রেখেছিল; দোলের দিন সিদ্ধির সঙ্গে ছেলেটাকে ধুতরোর বিচি খাইয়ে দিয়েছিল। ছেলেটা মরেই যেত, অতি কষ্টে বেঁচে গেল।

ব্যোমকেশ একটু চুপ করিয়া থাকিয়া বলিল, হুঁ। তাহলে বিষ প্রয়োগের অভ্যাস বংশীধরের আছে।

তা আছে। শুধু গোঁয়ার নয়, রাগ পুষে রাখে।

পাঁচটা বাজিল। ব্যোমকেশ বলিল, চলুন, আজ সন্ন্যাসী ঠাকুরের সঙ্গে একটু আলাপ করে আসা যাক।

১০

দেউড়ি পর্যন্ত নামিবার পর দেখিলাম বাড়ির দিকের সিঁড়ি দিয়া বংশীধর গটগাট করিয়া নামিয়া আসিতেছে। আমাদের দেখিতে পাইয়া তাহার সতেজ গতিভঙ্গী কেমন যেন এলোমেলো হইয়া গেল; কিন্তু সে থামিল না, যেন শহরের রাস্তা ধরিবে এমনিভাবে আমাদের পিছনে রাখিয়া আগাইয়া গেল।

ব্যোমকেশ চুপি চুপি বলিল, বংশীধর সাধুবাবার কাছে যাচ্ছিল, আমাদের দেখে ভড়কে গিয়ে অন্য পথ ধরেছে।

বংশীধর তখনও বেশি দূর যায় নাই, পাণ্ডেজি হাঁক দিলেন, বংশীধর বাবু।

বংশীধর ফিরিয়া ভ্রু নত করিয়া দাঁড়াইয়া রহিল। আমরা কাছে গেলাম, পাণ্ডেজি কৌতুকের সুরে বলিলেন, কোথায় চলেছেন হনাহনিয়ে?

বংশীধর রুক্ষ সংক্ষিপ্ত জবাব দিল, বেড়াতে যাচ্ছি।

পাণ্ডেজি হাসিয়া বলিলেন, এই তো শহর বেড়িয়ে এলেন। আরও বেড়াবেন?

বংশীধরের রাগের শিরা উঁচু হইয়া উঠিল, সে উদ্ধতম্বরে বলিল, হ্যাঁ, বেড়াবো। আপনি পুলিস হতে পারেন, কিন্তু আমার বেড়ানো রুকতে পারেন না।

পাণ্ডেজিরও মুখ কঠিন হইল। তিনি কড়া সুরে বলিলেন, হ্যাঁ, পারি। কলেজ হোস্টেলে আপনি একজনকে বিষ খাইয়েছিলেন, সে মামলার এখনও নিম্পত্তি হয়নি। ফৌজদারি মামলার তোমাদি হয় না। আপনাকে গ্রেপ্তার করতে পারি।

ভয়ে বংশীধরের মুখ নীল হইয়া গেল। উগ্রতা এত দ্রুত আতঙ্কে পরিবর্তিত হইতে পারে চোখে না দেখিলে বিশ্বাস হয় না। সে জালাবদ্ধ পশুর ন্যায় ক্ষিপ্ৰচক্ষে এদিক ওদিক চাহিল, তারপরে যে পথে আসিয়াছিল সেই সিঁড়ি দিয়া পলকের মধ্যে বাড়ির দিকে অদৃশ্য হইয়া গেল।

পাণ্ডেজি মৃদুকণ্ঠে হাসিলেন।

বংশীধরের বিক্রম বোঝা গেছে। —চলুন।

সাধুবাবার নিকট উপস্থিত হইলাম। চারিদিকের ঝাঁকড়া গাছ স্থানটিকে প্রায় অন্ধকার করিয়া তুলিয়াছে। জ্বলন্ত ধুনির সম্মুখে বাবাজী বসিয়া আছেন। আমাদের দেখিয়া নীরব অথচ ইঙ্গিতপূর্ণ হাস্যে তাঁহার মুখ ভরিয়া উঠিল, তিনি হাতের ইশারায় আমাদের বসিতে বলিলেন।

পাণ্ডেজি তাঁহার সহিত কথা আরম্ভ করিলেন। বলা বাহুল্য, হিন্দীতেই কথাবার্তা হইল। পাণ্ডেজির গায়ে পুলিসের খাকি কামিজ ছিল, সাধুবাবা তাঁহার সহিত সমধিক আগ্রহে কথা বলিতে লাগিলেন।

কিছুক্ষণ সাধারণভাবে কথা হইল। সন্ন্যাস জীবনের মাহাত্ম্য এবং গাৰ্হস্থ্য জীবনের পঙ্কিলতা সম্বন্ধে আমরা সকলেই একমত হইলাম। হৃষ্ট বাবাজী বুলি হইতে গাঁজা বাহির করিয়া সাজিবার উপক্ৰম করিলেন।

পাণ্ডেজি জিজ্ঞাসা করিলেন, এখানে গাঁজা কোথায় পান। বাবা?

বাবাজী উর্ধ্বে কটাক্ষপাত করিয়া বলিলেন, পরমাৎমা মিলিয়ে দেন বেটা।

চিমটা দিয়া ধুনি হইতে একখণ্ড অঙ্গার তুলিয়া বাবাজী কলিকার মাথায় রাখিলেন। এই সময়ে তাঁহার চিমটাটি ভাল করিয়া লক্ষ্য করিলাম। সাধুরা যে নিৰ্ভয়ে বনে-বাদাড়ে বাস করেন তাহা নিতান্ত নিরস্ত্রভাবে নয়। চিমটা ভালভাবে ব্যবহার করিতে জানিলে ইহার দ্বারা বোধ করি বাঘ মারা যায়। আবার তাহার সূচাগ্রতীক্ষ্ণ প্রান্ত দুটির সাহায্যে ক্ষুদ্র অঙ্গর খণ্ডও যে তুলিয়া লওয়া যায় তাহা তো স্বচক্ষেই দেখিলাম। সাধুরা এই একটি মাত্র লৌহাস্ত্ৰ দিয়া নানা কাৰ্য সাধন করিয়া থাকেন।

যা হোক, বাবাজী গাঁজার কলিকায় দম দিলেন। তাঁহার গ্ৰীবা এবং রাগের শিরা-উপশিরা ফুলিয়া উঠিল। দীর্ঘ একমিনিটব্যাপী দম দিয়া বাবাজী নিঃশেষিত কলিকাটি উপুড় করিয়া দিলেন।

তারপর ধোঁয়া ছাড়িবার পালা। এ কার্যটি বাবাজী প্ৰায় তিন মিনিট ধরিয়া করিলেন; দাড়ি-গোঁফের ভিতর হইতে মন্দ মন্দ ধূম বাহির হইয়া বাতাসকে সুরভিত করিয়া তুলিল।

বাবাজী বলিলেন, বম! বম শঙ্কর!

এই সময় পায়ের শব্দে পিছন ফিরিয়া দেখিলাম, একটি লোক আসিতেছে। লোকটি আমাদের দেখিতে পাইয়া থমকিয়া দাঁড়াইয়া পড়িল। তখন চিনিলাম, রামকিশোরবাবু! তিনি আমাদের চিনিতে পারিয়া স্থলিত স্বরে বলিলেন, ও-আপনারা—?

ব্যোমকেশ বলিল, আসুন।

রামকিশোর ঈষৎ নিরাশ কষ্ঠে বলিলেন, না, আপনারা সাধুজীর সঙ্গে কথা বলছেন বলুন। আমি কেবল দর্শন করতে এসেছিলাম। জোড়হস্তে সাধুকে প্ৰণাম করিয়া তিনি প্ৰস্থান করিলেন।

সাধুর দিকে ফিরিয়া দেখিলাম তাঁহার মুখে সেই বিচিত্ৰ হাসি। হাসিটিকে বিশ্লেষণ করিলে কতখানি আধ্যাত্মিকতা এবং কতখানি নষ্টামি পাওয়া যায় তাহা বলা শক্ত। সম্ভবত সমান সমান।

এইবার ব্যোমকেশ বলিল, সাধুবাবা, আপনি তো অনেকদিন এখানে আছেন। সেদিন একটি লোক এখানে সপঘিাতে মারা গেছে, জানেন কি?

সাধু বলিলেন, জানতা হ্যায়। হম ক্যা নাহি জনতা!

ব্যোমকেশ বলিল, আচ্ছা, সে রাত্রে কেউ দুর্গে গিয়েছিল কি না। আপনি দেখেছিলেন?

হ্যাঁ, দেখা।

বাবাজীর মুখে আবার সেই আধ্যাত্মিক নষ্টামিভরা হাসি দেখা গেল। ব্যোমকেশ সাগ্রহে আবার তাঁহাকে প্রশ্ন করিতে যাইতেছিল, আবার পিছন দিকে পায়ের শব্দ হইল। আমরা ঘাড় ফিরাইলাম, বাবাজীও প্রখর চক্ষে সেই দিকে চাহিলেন। কিন্তু আগন্তুক কেহ আসিল না; হয়তো আমাদের উপস্থিতি জানিতে পারিয়া দূর হইতেই ফিরিয়া গেল।

ব্যোমকেশ আবার বাবাজীকে প্রশ্ন করিতে উদ্যত হইলে তিনি ঠোঁটের উপর আঙুল রাখিয়া পরিষ্কার বাঙলায় বলিলেন, এখন নয়। রাত বারোটার সময় এস, তখন বলব।

আমি অবাক হইয়া চাহিলাম। ব্যোমকেশ কিন্তু চট করিয়া উঠিয়া পড়িল, বলিল, আচ্ছা বাবা, তাই আসিব। ওঠ অজিত।

বৃক্ষ-বাটিকার বাহিরে আসিয়া দেখিলাম রাত্রি হইয়া গিয়াছে। বোমকেশ ও পাণ্ডেজি চারিদিকে অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি প্রেরণ করিলেন, কিন্তু সন্দেহভাজন কাহাকেও দেখা গেল না।

পাণ্ডেজি বলিলেন, “আমি আজ এখান থেকেই ফিরি। রাত বারোটা পর্যন্ত থাকতে পারলে হত। কিন্তু উপায় নেই। কাল সকালেই আসব।

পাণ্ডেজি চলিয়া গেলেন। দুর্গে ফিরিতে ফিরিতে প্রশ্ন করিলাম, সাধুবাবা বাঙালী?

ব্যোমকেশ বলিল, সাক্ষাৎ বাঙালী।

দুৰ্গে ফিরিয়া ঘড়ি দেখিলাম, সাতটা বাজিয়াছে। মুক্ত আকাশের তলে চেয়ার পাতিয়া বসিলাম।

সাধুবাবা নিশ্চয় কিছু জানে। কী জানে? সে রাত্রে ঈশানবাবুর হত্যাকারীকে দুর্গে প্রবেশ করিতে দেখিয়ছিল? বৃক্ষ-বাটিকা হইতে দুর্গে উঠিবার সিঁড়ি দেখা যায় না; বিশেষত অন্ধকার রাত্রে। তবে কি সাধুবাবা গভীর রাত্রে সিঁড়ির আশেপাশে ঘুরিয়া বেড়ায়?...তাহার চিমটা কিন্তু সামান্য অস্ত্র নয়-ঐ চিমটার আগায় বিষ মাখাইয়া যদি—

ব্যোমকেশকে জিজ্ঞাসা করিলাম; সে কেবল গলার মধ্যে চাপা কাশির মত শব্দ করিল।

রাত্রি দশটার মধ্যে আহার সমাধা করিয়া আমরা আবার বাহিরে গিয়া বসিলাম। এখনও দুঘন্টা জাগিয়া থাকিতে হইবে। সীতারাম আহার সম্পন্ন করিয়া আড়ালে গেল; বোধ করি দু একটা বিড়ি টানবে। লণ্ঠনটা ঘরের কোণে কমানো আছে।

ঘড়ির কাঁটা এগারোটার দিকে চলিয়াছে। মনের উত্তেজনা সত্ত্বেও ক্রমাগত হাই উঠিতেছে—

ব্যোমকেশবাবু!

চাপা গলার শব্দে চমকিয়া জড়তা কাটিয়া গেল। দেখিলাম, অদূরে ছায়ার মত একটি মূর্তি দাঁড়াইয়া আছে। ব্যোমকেশ উঠিয়া বলিল, রমাপতি ! এস।

রমাপতিকে লইয়া আমরা ঘরের মধ্যে গেলাম। ব্যোমকেশ আলো বাড়াইয়া দিয়া তাহার আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করিল, “এবেলা কিছু খাওয়া হয়নি দেখছি। —সীতারাম !

সীতারাম পাঁচ মিনিটের মধ্যে কয়েকটা ডিম ভাজিয়া আনিয়া রমাপতির সম্মুখে রাখিল। রমাপতি দ্বিরুক্তি না করিয়া খাইতে আরম্ভ করিল। তাহার মুখ শুষ্ক, চোখ বসিয়া গিয়াছে; গায়ের হাফ-শার্ট স্থানে স্থানে ছিড়িয়া গিয়াছে, পায়ে জুতা নাই। খাইতে খাইতে বলিল, সব শুনেছেন তাহলে? কার কাছে শুনলেন?

তুলসীর কাছে। এতক্ষণ কোথায় ছিলে?

জঙ্গলে। তারপর দুর্গের পিছনে।

বেশি মারধর করেছে নাকি?

রমাপতি পিঠের কামিজ তুলিয়া দেখাইল, দাগড়া দাগড়া লাল দাগ ফুটিয়া আছে। ব্যোমকেশের মুখ শক্ত হইয়া উঠিল।

বংশীধর?

রমাপতি ঘাড় নাড়িল।

শহরে চলে গেলে না কেন?

রমাপতি উত্তর দিল না, নীরবে খাইতে লাগিল।

এখানে থেকে আর তোমার লাভ কি?

রমাপতি আস্ফুট স্বরে বলিল, তুলসী—

তুলসীকে তুমি ভালবাসো?

রমাপতি একটু চুপ করিয়া রহিল, তারপর আস্তে আস্তে বলিল, ওকে সবাই যন্ত্রণা দেয়, ঘরে বন্ধ করে রাখে, কেউ ভালবাসে না। আমি না থাকলে ও মরে যাবে।

আহার শেষ হইলে ব্যোমকেশ তাহাকে নিজের বিছানা দেখাইয়া বলিল, শোও।

রমাপতি ক্লান্ত নিশ্বাস ফেলিয়া শয়ন করিল। ব্যোমকেশ দীর্ঘকাল তাহার পানে চাহিয়া থাকিয়া হঠাৎ প্রশ্ন করিতে আরম্ভ করিল, রমাপতি, ঈশানবাবুকে কে খুন করেছে তুমি জানো?

না, কে খুন করেছে জানি না। তবে খুন করেছে।

হরিপ্রিয়াকে কে খুন করেছিল জানো?

না, দিদি বলবার চেষ্টা করেছিল—কিন্তু বলতে পারেনি।

বংশীধরের বৌ কোন পাহাড় থেকে লাফিয়ে পড়েছিল জানো?

একটু চুপ করিয়া থাকিয়া রমাপতি-বলিল, জানি না, কিন্তু সন্দেহ হয়েছিল। দিদি তাকে দেখতে পারত না, দিদির মনটা বড় কুচুটে ছিল। বোধ হয় মুখোশ পরে তাকে ভূতের ভয় দেখিয়েছিল—

মুখোশ?

দিদির একটা জাপানী মুখোশ ছিল। ঐ ঘটনার পরদিন মুখোশটা জঙ্গলের কিনারায় কুড়িয়ে পেলাম; বোধ হয়। হাওয়ায় উড়ে গিয়ে পড়েছিল। আমি সেটা এনে দিদিকে দেখলাম, দিদি। আমার হাত থেকে কেড়ে নিয়ে ছিড়ে ফেললে।

বংশীধর মুখোশের কথা জানে?

আমি কিছু বলিনি।

সাধুবাবাকে নিশ্চয় দেখেছি। কি মনে হয়?

আমার ভক্তি হয় না। কিন্তু কর্তা খুব মান্য করেন। বাড়ি থেকে সিধে যায়।

ঈশানবাবু কোনদিন সাধুবাবা সম্বন্ধে তোমাকে কিছু বলেছিলেন

না। দর্শন করতেও যাননি। উনি সাধু-সন্ন্যাসীর ওপর চটা ছিলেন।

ব্যোমকেশ ঘড়ি দেখিয়া বলিল, বারোটা বাজে। রমাপতি, তুমি ঘুমোও আমরা একটু বেরুচ্ছি।

চক্ষু বিস্ফারিত করিয়া রমাপতি বলিল, কোথায়?

বেশি দূর নয়, শীগগিরই ফিরব। এস অজিত।

বড় টৰ্চটা লইয়া আমরা বাহির হইলাম।

রামকিশোরবাবুর বাড়ি নিম্প্রদীপ। দেউড়ির পাশ দিয়া যাইতে যাইতে শুনিলাম বুলাকিলাল সগর্জনে নাক ডাকাইতেছে।

বৃক্ষ-বাটিকায় গাঢ় অন্ধকার, কেবল ভস্মাচ্ছাদিত ধুনি হইতে নিরুদ্ধ প্ৰভা বাহির হইতেছে। সাধুবাবা ধুনির পাশে শুইয়া আছেন; শয়নের ভঙ্গীটা ঠিক স্বাভাবিক নয়।

ব্যোমকেশ তাঁহার মুখের উপর তীব্র আলো ফেলিল, বাবাজী। কিন্তু জাগিলেন না। ব্যোমকেশ তখন তাঁহার গায়ে হাত দিয়া নাড়া দিল এবং সশব্দে নিশ্বাস টানিয়া বলিল, অ্যাঁ—!

টর্চের আলো বাবাজীর সবাঙ্গ লেহন করিয়া পায়ের উপর স্থির হইল। দেখা গেল গোড়ালির উপরিভাগে সাপের দাঁতের দুটি দাগ।

ব্যোমকেশ বলিল, যাক, এতদিনে রামবিনোদ সত্যি সত্যি দেহরক্ষা করলেন।

রামবিনোদ !

তুমি যে আকাশ থেকে পড়লে। বুঝতে পারনি? ধন্য তুমি।

ধুনিতে ইন্ধন নিক্ষেপ করিয়া বহ্নিমান করিয়া তোলা হইয়াছে। বাবাজীর শব তাহার পাশে শক্ত হইয়া পড়িয়া আছে। আমরা দুইজনে কিছুদূরে মুখোমুখি উপু হইয়া বসিয়া সিগারেট টানিতেছি।

ব্যোমকেশ বলিল, মনে আছে, প্রথম রামকিশোরবাবুকে দেখে চেনা-চেনা মনে হয়েছিল? আসলে তার কিছুক্ষণ আগে বাবাজীকে দেখেছিলাম। দুই ভায়ের চেহারায় সাদৃশ্য আছে; তখন ধরতে পারিনি। দ্বিতীয়বার রামকিশোরকে দেখে বুঝলাম।

কিন্তু রামবিনোদ যে প্লেগে মারা গিয়েছিল?

রামবিনোদের প্লেগ হয়েছিল, কিন্তু সে মরবার আগেই বাকি সকলে তাকে চড়ায় ফেলে পালিয়েছিল। চাঁদমোহনের কথা থেকে আমি তা বুঝতে পেরেছিলাম। তারপর রামবিনোদ বেঁচে গেল। এ যেন কতকটা ভাওয়াল সন্ন্যাসীর মামলার মত।

এতদিন কোথায় ছিল?

তা জানি না। বোধ হয় প্রথমটা বৈরাগ্য এসেছিল, সাধু-সন্ন্যাসীর দলে মিশে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। তারপর হঠাৎ রামকিশোরের সন্ধান পেয়ে এখানে এসে হাজির হয়েছিল। কিন্তু ওকথা যাক, এখন মড়া আগলাবার ব্যবস্থা করা দরকার। অজিত, আমি এখানে আছি, তুমি টর্চ নিয়ে যাও, সীতারামকে ডেকে নিয়ে এস। আর যদি পারো, বুলাকিলালের ঘুম ভাঙিয়ে তাকেও ডেকে আনো। ওরা দু’জনে মড়া পাহারা দিক।

বলিলাম, তুমি একলা এখানে থাকবে? সেটি হচ্ছে না। থাকতে হয় দু’জনে থাকিব, যেতে হয় দু’জনে যাব।

ভয় হচ্ছে আমাকেও সাপে ছোবলাবে ! এ তেমন সাপ নয় হে, জাগা মানুষকে ছোবলায় না। যা হোক, বলছি। যখন, চল দুজনেই যাই।

দেউড়িতে আসিয়া ব্যোমকেশ বলিল, দাঁড়াও, বুলাকিলালকে জাগানো যাক।

অনেক ঠেলাঠেলির পর বুলাকিলালের ঘুম ভাঙিল। তাহাকে বাবাজীর মৃত্যুসংবাদ দিয়া ব্যোমকেশ বলিল, আজ সাধুবাবা ভাঙি খেয়েছিলেন?

জী, এক ঘটি খেয়েছিলেন।

আর কে কে ভাঙি খেয়েছিল?

আর বাড়ি থেকে চাকর এসে এক ঘটি নিয়ে গিয়েছিল।

বেশ, এখন যাও, বাবাজীকে পাহারা দাও গিয়ে। আমি সীতারামকে পাঠিয়ে দিচ্ছি।

বুলাকিলাল ঝিমাইতে ঝিমাইতে চলিয়া গেল। মনে হইল, ঘুম ভাঙিলেও তাহার নেশার ঘোর কাটে নাই।

দুর্গে ফিরিয়া দেখিলাম সীতারাম জাগিয়া বসিয়া আছে। খবর শুনিয়া সে কেবল একবার চক্ষু বিস্ফারিত করিল, তারপর নিঃশব্দে নামিয়া গেল।

ঘরের মধ্যে রমাপতি ঘুমাইয়া পড়িয়াছে। তাহাকে জাগাইলাম না, বাহিরে আসিয়া বসিলাম। রাত্রি সাড়ে বারোটা।

ব্যোমকেশ বলিল, আজ আর ঘুমানো চলবে না। অন্তত একজনকে জেগে থাকতে হবে। অজিত, তুমি না হয় ঘণ্টা দুই ঘুমিয়ে নাও, তারপর তোমাকে তুলে দিয়ে আমি ঘুমবো।

উঠিতে মন সরিতেছিল না, মস্তিষ্ক উত্তেজিত হইয়াছিল। প্রশ্ন করিলাম, ব্যোমকেশ, বাবাজীকে মারলে কে?

ঈশানবাবুকে যে মেরেছে সে।

সে কে?

তুমিই বল না। আন্দাজ করতে পারো না?

এই কথাটাই মাথায় ঘুরিতেছিল। আস্তে আস্তে বলিলাম, বাবাজী যদি রামবিনোদ হন তাহলে কে তাঁকে মারতে পারে? এক আছেন রামকিশোরবাবু—

তিনি ভাইকে খুন করবেন?

তিনি মুমূর্ষ ভাইকে ফেলে পালিয়েছিলেন। সেই ভাই ফিরে এসেছে, হয়তো সম্পত্তির বখরা দাবি করেছে—

বেশ, ধরা যাক রামকিশোর ভাইকে খুন করেছেন। কিন্তু ঈশানবাবুকে খুন করলেন কেন?

ঈশানবাবু রামবিনোদের প্রাণের বন্ধু ছিলেন, সন্ন্যাসীকে দেখে চিনতে পেরেছিলেন। হয়তো রামকিশোরকে শাসিয়েছিলেন, ভালয় ভালয় সম্পত্তির ভাগ না দিলে সব ফাঁস করে দেবেন। সন্ন্যাসীকে রামবিনোদ বলে সনাক্ত করতে পারে দুজন-চাঁদমোহন আর ঈশানবাবু। চাঁদমোহন মালিকের মুঠোর মধ্যে, ঈশানবাবুকে সরাতে পারলে সব গোল মিটে যায়—

ব্যোমকেশ হঠাৎ আমার পিঠে চাপড় মারিয়া বলিল, অজিত ! ব্যাপার কি হে? তুমি যে ধারাবাহিক যুক্তিসঙ্গত কথা বলতে আরম্ভ করেছ ! তবে কি এতদিনে সত্যিই বোধোদয় হল ! কিন্তু আর নয়, শুয়ে পড় গিয়। ঠিক তিনটের সময় তোমাকে তুলে দেব।

আমি গমনোদ্যত হইলে সে খাটো গলায় কতকটা নিজ মনেই বলিল, রমাপতি ঘুমোচ্ছে—না মটকা মেরে পড়ে আছে?—যাক, ক্ষতি নেই, আমি জেগে আছি।

বেলা আটটা আন্দাজ পাণ্ডেজি আসিলেন। বাবাজীর মৃত্যুসংবাদ নীচেই পাইয়াছিলেন, বাকি খবরও পাইলেন। ব্যোমকেশ বলিল, আপনি লাস নিয়ে ফিরে যান। আবার আসবেন কিন্তু— আর শুনুন—

ব্যোমকেশ তাঁহাকে একটু দূরে লইয়া গিয়া মৃদুস্বরে কিছুক্ষণ কথা বলিল। পাণ্ডেজি বলিলেন, বেশ, আমি দশটার মধ্যেই ফিরব। রমাপতিকে ঘর থেকে বেরুতে দেবেন না।

তিনি চলিয়া গেলেন।

সাড়ে ন’টার সময় আমি আর ব্যোমকেশ রামকিশোরবাবুর বাড়িতে গেলাম। বৈঠকখানায় তক্তপোশের উপর রামকিশোর বসিয়া ছিলেন, পাশে মণিলাল। বংশীধর ও মুরলীধর তক্তপোশের সামনে পায়চারি করিতেছিল, আমাদের দেখিয়া নিমেষের মধ্যে কোথায় অন্তর্হিত হইল। বোধ হয় পারিবারিক মন্ত্রণা-সভা বসিয়াছিল, আমাদের আবির্ভাবে ছত্ৰভঙ্গ হইয়া গেল।

রামকিশোরের গাল বসিয়া গিয়াছে, চক্ষু কোটরগত। কিন্তু তিনি বাহিরে অবিচলিত আছেন। ক্ষীণ হাসিয়া বলিলেন, আসুন-বসুন।

তক্তপোশের ধারে চেয়ার টানিয়া বসিলাম। রামকিশোর একবার গলা ঝাড়া দিয়া স্বাভাবিক কণ্ঠে বলিলেন, সন্ন্যাসী ঠাকুরকেও সাপে কামড়েছে। ক্ৰমে দেখছি এখানে বাস করা অসম্ভব হয়ে উঠল। বংশী আর মুরলী দু'একদিনের মধ্যে চলে যাচ্ছে, আমরা বাকী ক'জন এখানেই থাকব ভেবেছিলাম। কিন্তু সাপের উৎপাত যদি এভাবে বাড়তেই থাকে—

ব্যোমকেশ বলিল, শীতকালে সাপের উৎপাত-আশ্চর্য!

রামকিশোর বলিলেন, তার ওপর বাড়িতে কাল রাত্রে আর এক উৎপাত। এ বাড়িতে আজ পর্যন্ত চোর ঢোকেনি—

মণিলাল বলিল, এ মামুলি চোর নয়।

ব্যোমকেশ বলিল, কি হয়েছিল?

রামকিশোর বলিলেন, আমার শরীর খারাপ হয়ে অবধি মণিলাল রাত্রে আমার ঘরে শোয়। কাল রাত্রে আন্দাজ বারোটার সময়—। মণিলাল, তুমিই বল। আমার যখন ঘুম ভাঙল চোর তখন পালিয়েছে।

মণিলাল বলিল, আমার খুব সজাগ ঘুম। কাল গভীর রাত্রে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল, মনে হল দরজার বাইরে পায়ের শব্দ। এ বাড়ির নিয়ম রাত্রে কেউ দোরে খিল দিয়ে শোয় না, এমন কি সদর দরজাও ভেজানো থাকে। আমার মনে হল আমাদের ঘরের দোর কেউ সন্তপর্ণে ঠেলে খোলবার চেষ্টা করছে। আমার খাট দরজা থেকে দূরে; আমি নিঃশব্দে উঠলাম, পা টিপে টিপে দোরের কাছে গোলাম।। ঘরে আলো থাকে না, অন্ধকারে দেখলাম দোরের কপাট আস্তে আস্তে খুলে যাচ্ছে। এই সময় আমি একটা বোকামি করে ফেললাম। আর একটু অপেক্ষা করলেই চোর ঘরে ঢুকতো, তখন তাকে ধরতে পারতাম। তা না করে আমি দরজা টেনে খুলতে গেলাম। চোর সতর্ক ছিল, সে দুড় দুড় করে পালাল।

রামকিশোর বলিলেন, এই সময় আমার ঘুম ভেঙে গেল।

ব্যোমকেশ বলিল, যাকে চোর মনে করছেন সে তুলসী নয় তো? তুলসীর শুনেছি। রাত্রে ঘুরে বেড়ানোর অভ্যোস আছে।

রামকিশোরের মুখের ভাব কড়া হইল, তিনি বলিলেন, না, তুলসী নয়। তাকে আমি কাল রাত্রে ঘরে বন্ধ করে রেখেছিলাম।

ব্যোমকেশ মণিলালকে জিজ্ঞাসা করিল, চোরকে আপনি চিনতে পারেননি?

না। কিন্তু—

আপনার বিশ্বাস চেনা লোক?

হ্যাঁ।

রামকিশোর বলিলেন, লুকোছাপার দরকার নেই। আপনারা তো জানেন রমাপতিকে কাল আমি তাড়িয়ে দিয়েছি। মণিলালের বিশ্বাস সেই কোন মতলবে এসেছিল।

ব্যোমকেশ বলিল, ঠিক ক’টার সময় এই ব্যাপার ঘটেছিল বলতে পারেন। কি?

রামকিশোর বলিলেন, ঠিক পৌনে বারোটার সময়। আমার বালিশের তলায় ঘড়ি থাকে, আমি দেখেছি।

ব্যোমকেশ আমার পানে সঙ্কেতপূর্ণ দৃষ্টিপাত করিল, আমি মুখ টিপিয়া রহিলাম। রমাপতি যে পৌনে বারোটার সময় ব্যোমকেশের খাটে শুইয়া ছিল তাহা বলিলাম না।

রামকিশোর বিষণ্ণ গভীর স্বরে বলিলেন, আজ সকালে আর একটা কথা জানা গেল। রমাপতি তার জিনিসপত্র নিয়ে যায়নি, তার ঘরেই পড়ে ছিল। আজ সকালে ঘর তল্লাস করালাম। তার টিনের ভাঙা তোরঙ্গ থেকে এই জিনিসটা পাওয়া গেল। পকেট হইতে একটি সোনার কাঁটা বাহির করিয়া তিনি ব্যোমকেশের হাতে দিলেন।

মেয়ের যে-ধরনের লোহার দুভাঁজ কাঁটা দিয়া চুল বাঁধেন সেই ধরনের সোনার কাঁটা। আকারে একটু বড় ও স্থুল, দুই প্রান্ত ছুঁচের মত তীক্ষ্ণ। সেটিকে নাড়িয়া চাড়িয়া ব্যোমকেশ সপ্রশ্নচক্ষে রামকিশোরের পানে চাহিল; তিনি বলিলেন, আমার বড় মেয়ে হরিপ্রিয়ার চুলের কাঁটা। তার মৃত্যুর পর হারিয়ে গিয়েছিল।

কাঁটা ফেরৎ দিয়া ব্যোমকেশ পূর্ণদৃষ্টিতে রামকিশোরের পানে চাহিয়া বলিল, রামকিশোরবাবু, এবার সোজাসুজি বোঝাপড়ার সময় হয়েছে।

রামকিশোর যেন হতবুদ্ধি হইয়া গেলেন, বোঝাপড়া !

হ্যাঁ। আপনার দাদা রামবিনোদবাবুর মৃত্যুর জন্য দায়ী কে সেটা পরিষ্কার হওয়া দরকার।

রামকিশোরের মুখ ফ্যাকাসে হইয়া গেল। তিনি কথা বলিবার জন্য মুখ খুলিলেন, কিন্তু মুখ দিয়া কথা বাহির হইল না। তারপর অতিকষ্টে নিজেকে আয়ত্ত করিতে করিতে অর্ধরুদ্ধ স্বরে বলিলেন, আমার দাদা— ! কার কথা বলছেন আপনি?

ব্যোমকেশ বলিল, কার কথা বলছি তা আপনি জানেন। মিথ্যে অভিনয় করে লাভ নেই। সর্পাঘাত যে সত্যিকার সর্পাঘাত নয় তাও আমরা জানি। আপনার দাদাকে কাল রাত্রে খুন করা হয়েছে।

মণিলাল বলিয়া উঠিল, খুন করা হয়েছে!

হ্যাঁ। আপনি জানেন কি, সন্ন্যাসীঠাকুর হচ্ছেন আপনার শ্বশুরের দাদা, রামবিনোদ সিংহ।

রামকিশোর এতক্ষণে অনেকটা সামলাইয়াছেন, তিনি তীব্ৰস্বরে বলিলেন, মিথ্যে কথা ! আমার দাদা অনেকদিন আগে প্লেগে মারা গেছেন। এসব রোমান্টিক গল্প কোথা থেকে তৈরি করে আনলেন? সন্ন্যাসী আমার দাদা প্ৰমাণ করতে পারেন। সাক্ষী আছে?

ব্যোমকেশ বলিল, একজন সাক্ষী ছিলেন ঈশানবাবু, তাঁকেও খুন করা হয়েছে।

রামকিশোর এবার ক্ৰোধে ফাটিয়া পড়িলেন, উর্ধ্বস্বরে বলিলেন, মিথ্যে কথা ! মিথ্যে ! এসব পুলিসের কারসাজি। যান আপনারা আমার বাড়ি থেকে, এই দণ্ডে দুর্গ থেকে বেরিয়ে যান। আমার এলাকায় পুলিসের গুপ্তচরের জায়গা নেই।

এই সময় বাহিরে জানালায় মুরলীধরের ভয়ার্ত মুখ দেখা গেল—বাবা ! পুলিস বাড়ি ঘেরাও করেছে। ’ বলিয়াই সে অপসৃত হইল।

চমকিয়া দ্বারের দিকে ফিরিয়া দেখি পায়ের বুট হইতে মাথার হেলমেট পর্যন্ত পুলিস পোষাক-পরা পাণ্ডেজি ঘরে প্রবেশ করিতেছেন, তাঁহার পিছনে ব্যাগ হাতে ডাঃ ঘটক !

পাণ্ডে বলিলেন, তল্লাসী পরোয়ানা আছে, আপনার বাড়ি খানাতল্লাস করব। ওয়ারেন্ট দেখতে চান?

রামকিশোর ভীত পাংশুমুখে চাহিয়া রহিলেন, তারপর ভাঙা গলায় বলিলেন, এর মানে?

পাণ্ডে বলিলেন, “আপনার এলাকায় দুটো খুন হয়েছে। পুলিসের বিশ্বাস অপরাধী এবং অপরাধের প্রমাণ এই বাড়িতেই আছে। আমরা সার্চ করে দেখতে চাই।

রামকিশোর আরও কিছুক্ষণ চাহিয়া থাকিয়া, বেশ, যা ইচ্ছে করুন—বলিয়া তাকিয়ার উপর এলাইয়া পড়িলেন।

ডাক্তার!

ডাক্তার ঘটক প্রস্তুত ছিল, দুই মিনিটের মধ্যে রামকিশোরকে ইনজেকশন দিল। তারপর নাড়ি টিপিয়া বলিল, ভয় নেই।

ইতিমধ্যে আমি জানালা দিয়া উঁকি মারিয়া দেখিলাম, বাহিরে পুলিস গিসগিস করিতেছে; সিঁড়ির মুখে অনেকগুলা কনস্টেবল দাঁড়াইয়া যাতায়াতের পথ বন্ধ করিয়া দিয়াছে।

ইন্সপেক্টর দুবে ঘরে আসিয়া স্যালুট করিয়া দাঁড়াইল, সকলে নিজের নজিরে ঘরে আছে বেরুতে মানা করে দিয়েছি।

পাণ্ডে বলিলেন, “বেশ। দুজন বে-সরকারী সাক্ষী চাই। অজিতবাবু, ব্যোমকেশবাবু, আপনার সাক্ষী থাকুন। পুলিস কোনও বে-আইনী কাজ করে কি না আপনারা লক্ষ্য রাখবেন।

মণিলাল এতক্ষণ আমাদের কাছে দাঁড়াইয়া ছিল, বলিল, আমিও কি নিজের ঘরে গিয়ে থাকিব?

পাণ্ডে তাহার দিকে ফিরিয়া বলিলেন, মণিলালবাবু! না চলুন, আপনার ঘরটাই আগে দেখা যাক।

আসুন।

পাণ্ডে, দুবে, ব্যোমকেশ ও আমি মণিলালের অনুসরণ করিয়া তাহার ঘরে প্রবেশ করিলাম। ঘরটি বেশ বড়, একপাশে খাট, তাছাড়া আলমারি দেরাজ প্রভৃতি আসবাব আছে।

মণিলাল বলিল, কি দেখবেন দেখুন।

ব্যোমকেশ বলিল, বেশি কিছু দেখবার নেই। আপনার দুটো ফাউন্টেন পেন আছে, সেই দুটো দেখলেই চলবে।

মণিলালের মুখ হইতে ক্ষণকালের জন্য যেন একটা মুখোশ সরিয়া গেল। সেই যে ব্যোমকেশ বলিয়াছিল, গর্দভচমাবৃত সিংহ, মনে হইল সেই হিংস্ৰ শ্বাপদটা নিরীহ চর্মাবরণ ছাড়িয়া বাহির হইল; একটা ভয়ঙ্কর মুখ পালকের জন্য দেখিতে পাইলাম। তারপর মণিলাল গিয়া দেরাজ খুলিল; দেরাজ হইতে পার্কারের কলমটি বাহির করিয়া দ্রুতহস্তে তাহার দুদিকের ঢাকনি খুলিয়া ফেলিল; কলামটাকে ছোরার মত মুঠিতে ধরিয়া ব্যোমকেশের পানে চোখ তুলিল। সে-চক্ষে যে কী ভীষণ হিংসা ও ক্ৰোধ ছিল তাহা বৰ্ণনা করা যায় না। মণিলাল শ্বদন্ত নিষ্ক্রান্ত করিয়া বলিল, এই যে কলম। নেবে? এস, নেবে এস।

আমরা জড়মূর্তির মত দাঁড়াইয়া রহিলাম। পাণ্ডে কোমর হইতে রিভলবার বাহির করিলেন। মণিলাল হায়েনার মত হাসিল। তারপর নিজের বামহাতের কত্তিজর উপর কলমের নিব বিঁধিয়া অঙ্গুষ্ঠ দ্বারা কালিভরা পিচকারিটা টিপিয়া ধরিল।

ব্যোমকেশ রামকিশোরবাবুকে বলিল, দুধ কলা খাইয়ে কালসাপ পুষেছিলেন। ভাগ্যে পুলিসের এই গুপ্তচরটা ছিল তাই বেঁচে গেলেন। কিন্তু এবার আমরা চললাম, আপনার আতিথ্যে আর আমাদের রুচি নেই। কেবল সাপের বিষের শিশিটা নিয়ে যাচ্ছি।

রামকিশোর বিহ্বল ব্যাকুল চক্ষে চারিদিকে চাহিতে লাগিলেন। ব্যোমকেশ দ্বার পর্যন্ত গিয়া ফিরিয়া দাঁড়াইল, বলিল, আর একটা কথা বলে যাই। আপনার পূর্বপুরুষেরা অনেক সোনা লুকিয়ে রেখে গিয়েছিলেন। সে সোনা কোথায় আছে আমি জানি। কিন্তু যে-জিনিস আমার নয় তা আমি ছুঁতেও চাই না। আপনার পৈতৃক সম্পত্তি আপনি ভোগ করুন। —চলুন পাণ্ডেজি। এস অজিত।

অপরাহুে পাণ্ডেজির বাসায় আরাম-কেন্দারায় অর্ধশয়ান হইয়া ব্যোমকেশ গল্প বলিতেছিল। শ্রোতা ছিলাম। আমি, পাণ্ডেজি এবং রমাপতি।

খুব সংক্ষেপে বলছি। যদি কিছু বাদ পড়ে যায়, প্রশ্ন কোরো।

পাণ্ডে বলিলেন, একটা কথা আগে বলে নিই। সেই যে সাদা গুড়ো পরীক্ষা করতে দিয়েছিলেন, কেমিস্টের রিপোর্ট এসেছে। এই দেখুন।

রিপোর্ট পড়িয়া ব্যোমকেশ ভ্রুকুঞ্চিত করিল— Sodium Tetra Borate—Borax, মানে সাধু সোহাগা কোন কাজে লাগে? এক তো জানি, সেনায় সোহাগা। আর কোনও কাজে লাগে নাকি?

পাণ্ডে বলিল, ঠিক জানি না। সেকালে হয়তো ওষুধ-বিষুধ তৈরির কাজে লাগত।

রিপোর্ট ফিরাইয়া দিয়া ব্যোমকেশ বলিল, যাক। এবার শোনো। মণিলাল বাইরে বেশ ভাল মানুষটি ছিল, কিন্তু তার স্বভাব রাক্ষসের মত; যেমন নিষ্ঠুর তেমনি লোভী। বিয়ের পর সে মনে মনে ঠিক করল শ্বশুরের গোটা সম্পত্তিটাই গ্ৰাস করবে। শালাদের কাছ থেকে সে সদাব্যবহার পায়নি, স্ত্রীকেও ভালবাসেনি। কেবল শ্বশুরকে নরম ব্যবহারে বশ করেছিল।

মণিলালের প্রথম সুযোগ হল যখন একদল বেদে এসে ওখানে তাঁবু ফেলল। সে গোপনে তাদের কাছ থেকে সাপের বিষ সংগ্ৰহ করল।

স্ত্রীকে সে প্রথমেই কেন খুন করল। আপাতদৃষ্টিতে তা ধরা যায় না। হয়তো দুর্বল মুহুর্তে স্ত্রীর কাছে নিজের মতলব ব্যক্ত করে ফেলেছিল, কিম্বা হয়তো হরিপ্রিয়াই কলমে সাপের বিষ ভরার প্রক্রিয়া দেখে ফেলেছিল। মোট কথা, প্রথমেই হরিপ্রিয়াকে সরানো দরকার হয়েছিল। কিন্তু তাতে একটা মস্ত অসুবিধে, শ্বশুরের সঙ্গে সম্পর্কই ঘুচে যায়। মণিলাল কিন্তু শ্বশুরকে এমন বশ করেছিল যে তার বিশ্বাস ছিল রামকিশোর তার সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়ে দেবেন না। তুলসীর দিকে তার নজর ছিল।

যা হোক, হরিপ্রিয়ার মৃত্যুর পর কোনও গণ্ডগোল হল না, তুলসীর সঙ্গে কথা পাকা হয়ে রইল। মণিলাল ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে লাগল, সম্পর্কটা একবার পাকা হয়ে গেলেই শালাগুলিকে একে একে সরাবে। দু’বছর কেটে গেল, তুলসী প্রায় বিয়ের যোগ্য হয়ে এসেছে, এমন সময় এলেন ঈশানবাবু; তার কিছুদিন পরে এসে জুটলেন সাধুবাবা। এঁদের দু'জনের মধ্যে অবশ্য কোনও সংযোগ ছিল না; দুজনে শেষ পর্যন্ত জানতে পারেননি যে বন্ধুর এত কাছে আছেন।

রামকিশোরবাবু ভাইকে মৃত্যুর মুখে ফেলে পালিয়েছেন এ গ্লানি তাঁর মনে ছিল। সন্ন্যাসীকে চিনতে পেরে তাঁর হৃদয়যন্ত্র খারাপ হয়ে গেল, যায়-যায় অবস্থা। একটু সামলে উঠে তিনি ভাইকে বললেন, যা হবার হয়েছে, কিন্তু এখন সত্যি প্রকাশ হলে আমার বড় কলঙ্ক হবে। তুমি কোনও তীৰ্থস্থানে গিয়ে মঠ তৈরি করে থাকো, যত খরচ লাগে আমি দেব। রামবিনোদ কিন্তু ভাইকে বাগে পেয়েছেন, তিনি নড়লেন না; গাছতলায় বসে ভাইকে অভিসম্পাত দিতে লাগলেন।

এটা আমার অনুমান। কিন্তু রামকিশোর যদি কখনও সত্যি কথা বলেন, দেখবে অনুমান মিথ্যে নয়। মণিলাল কিন্তু শ্বশুরের অসুখে বড় মুশকিলে পড়ে গেল; শ্বশুর যদি হঠাৎ পটল তোলে তার সব প্ল্যান ভেস্তে যাবে, শালারা তদণ্ডেই তাকে তাড়িয়ে দেবে। সে শ্বশুরকে মন্ত্রণা দিতে লাগল, বড় দুই ছেলেকে পৃথক করে দিতে। তাতে মণিলালের লাভ, রামকিশোর যদি হার্টফেল করে মরেও যান, নাবালকদের অভিভাবকরূপে অর্ধেক সম্পত্তি তার কিব্জায় আসবে।

তারপর তুলসীকে সে বিয়ে করবে, আর গদাধর সর্পাঘাতে মরবে।

মণিলালকে রামকিশোর অগাধ বিশ্বাস করতেন, তাছাড়া তাঁর নিজেরই ভয় ছিল তাঁর মৃত্যুর পর বড় দুই ছেলে নাবালক ভাইবোনকে বঞ্চিত করবে। তিনি রাজী হলেন; উকিলের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চলতে লাগিল।

ওদিকে দুর্গে আর একটি ঘটনা ঘটছিল; ঈশানবাবু গুপ্তধনের সন্ধানে লেগেছিলেন। প্রথমে তিনি পাটিতে খোদাই করা ফারসী লেখাটা পেলেন। লেখাটা তিনি সযত্নে খাতায় টুকে রাখলেন এবং অনুসন্ধান চালাতে লাগলেন। তারপর নিজের শোবার ঘরে গজাল নাড়তে নাড়তে দেখলেন, একটা পাথর আলগা। বুঝতে বাকি রইল না যে ঐ পাথরের তলায় দুর্গের তোষাখানা আছে।

কিন্তু পাথরটা জগদ্দল ভারী; ঈশানবাবু রুগ্ন বৃদ্ধ। পাথর সরিয়ে তোষাখানায় ঢুকবেন কি করে ঈশানবাবুর মনে পাপ ছিল, অভাবে তাঁর স্বভাব নষ্ট হয়েছিল। তিনি রামকিশোরকে খবর দিলেন না, একজন সহকারী খুঁজতে লাগলেন

দুজন পূৰ্ণবয়স্ক লোক তাঁর কাছে নিত্য যাতায়াত করত, রমাপতি আর মণিলাল। ঈশানবাবু মণিলালকে বেছে নিলেন। কারণ মণিলাল ষণ্ডা বেশি। আর সে শালাদের ওপর খুশি নয় তাও ঈশানবাবু বুঝেছিলেন।

বোধ হয় আধাআধি বখরা ঠিক হয়েছিল। মণিলাল কিন্তু মনে মনে ঠিক করলে সবটাই সে নেবে, শ্বশুরের জিনিস পরের হাতে যাবে কেন? নির্দিষ্ট রাত্রে দুজনে পাথর সরিয়ে তোষাখানায় নামলেন।

হাঁড়িকলসীগুলো তল্লাস করবার আগেই ঈশানবাবু মেঝের ওপর একটা মোহর কুড়িয়ে পেলেন। মণিলালের ধারণা হল হাঁড়িকলসীতে মোহর ভরা আছে। সে আর দেরি করল না, হাতের টর্চ দিয়ে ঈশানবাবুর ঘাড়ে মোরল এক ঘা। ঈশানবাবু অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন। তারপর তাঁর পায়ে কলমের খোঁচা দেওয়া শক্ত হল না।

কিন্তু খুনীর মনে সর্বদাই একটা ত্বরা জেগে থাকে। মণিলাল ঈশানবাবুর দেহ ওপরে নিয়ে এল। এই সময় আমার মনে হয়, বাইরে থেকে কোনও ব্যাঘাত এসেছিল। মুরলীধর ঈশানবাবুকে তাড়াবার জন্যে ভয় দেখাচ্ছিলই, হয়তো সেই সময় ইট-পাটকেল ফেলেছিল। মণিলাল ভয় পেয়ে গুপ্তদ্বার বন্ধ করে দিল। হাঁড়িগুলো দেখা হল না; টৰ্চটাও তোষাখানায় রয়ে গেল।

তোষাখানায় যে সোনাদানা কিছু নেই একথা বোধ হয় মণিলাল শেষ পর্যন্ত জানতে পারেনি। ঈশানবাবুর মৃত্যুর হাঙ্গামা জুড়োতে না জুড়োতে আমরা গিয়ে বসলাম; সে আর খোঁজ নিতে পারল না। কিন্তু তার ধৈর্যের অভাব ছিল না; সে অপেক্ষা করতে লাগল, আর শ্বশুরকে ভজাতে লাগল দুৰ্গটা যাতে তুলসীর ভাগে পড়ে।

আমরা স্রেফ হওয়া বদলাতে যাইনি, এ সন্দেহ তার মনে গোড়া থেকেই ধোঁয়াচ্ছিল, কিন্তু কিছু করবার ছিল না। তারপর কাল বিকেল থেকে এমন কয়েকটা ঘটনা ঘটল যে মণিলাল ভয় পেয়ে গেল। তুলসী তার কলম চুরি করে রমাপতিকে দিতে গেল। কলমে তখন বিষ ছিল কিনা বলা যায় না, কিন্তু কলম সম্বন্ধে তার দুর্বলতা স্বাভাবিক। রমাপতিকে সে দেখতে পারত। না-ভাবী পত্নীর প্রেমাম্পদকে কেই বা দেখতে পারে? এই ছুতো করে সে রমাপতিকে তাড়ালো। যা হোক, এ পর্যন্ত বিশেষ ক্ষতি হয়নি, কিন্তু সন্ধ্যেবেলা আর এক ব্যাপার ঘটল। আমরা যখন সাধুবাবার কাছে বসে তাঁর লম্বা লম্বা কথা শুনছি, ‘হ্যম ক্যা নাহি জনতা’ ইত্যাদি—সেই সময় মণিলাল বাবাজীর কাছে আসছিল; দূর থেকে তাঁর আস্ফালন শুনে ভাবল, বাবাজী নিশ্চয় তাকে ঈশানবাবুর মৃত্যুর রাত্রে দুর্গে যেতে দেখেছিলেন, সেই কথা তিনি দুপুর রাত্রে আমাদের কাছে ফাঁস করে দেবেন।

মণিলাল দেখল, সর্বনাশ ! তার খুনের সাক্ষী আছে। বাবাজী যে ঈশানবাবুর মৃত্যু সম্বন্ধে কিছুই জানেন না, তা সে ভাবতে পারল না; ঠিক করল রাত বারোটার আগেই বাবাজীকে সাবাড় করবে।

আমরা চলে আসার পর বাবাজী এক ঘটি সিদ্ধি চড়ালেন। তারপর বোধ হয়। মণিলাল গিয়ে আর এক ঘটি খাইয়ে এল। বাবাজী নিৰ্ভয়ে খেলেন, কারণ মণিলালের ওপর তাঁর সন্দেহ নেই। তারপর তিনি নেশায় বুদ হয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন; এবং যথাসময়ে মণিলাল এসে তাঁকে মহাসুষুপ্তির দেশে পাঠিয়ে দিলে৷

আমি বলিলাম, আচ্ছা, সন্ন্যাসী ঠাকুর যদি কিছু জানতেন না, তবে আমাদের রাত দুপুরে ডেকেছিলেন কেন?

ব্যোমকেশ বলিল, ডেকেছিলেন তাঁর নিজের কাহিনী শোনাবার জন্যে, নিজের আসল পরিচয় দেবার জন্যে।

আর একটা কথা। কাল রাত্রে যে রামকিশোরবাবুর ঘরে চোর ঢুকেছিল সে চোরটা কে?

কাল্পনিক চোর। মণিলাল সাধুবাবাকে খুন করে ফিরে আসবার সময় ঘরে ঢুকতে গিয়ে হোঁচটি খেয়েছিল, তাতে রামকিশোরবাবুর ঘুম ভেঙে যায়। তাই চোরের আবির্ভাব। রামকিশোরবাবু আফিম খান, আফিম-খোরের ঘুম সহজে ভাঙে না, তাই মণিলাল নিশ্চিন্তু ছিল; কিন্তু ঘুম যখন ভাঙল তখন মণিলাল চট করে একটা গল্প বানিয়ে ফেলল। তাতে রমাপতির ওপর একটা নতুন সন্দেহ জাগানো হল, নিজের ওপর থেকে সন্দেহ সরানো হল। রমাপতির তোরঙ্গতে হরিপ্রিয়ার সোনার কাঁটা লুকিয়ে রেখেও ঐ একই উদ্দেশ্য সিদ্ধ হল। যা শত্রু পরে পরে। যদি কোনও বিষয়ে কারুর ওপর সন্দেহ হয় রমাপতির ওপর সন্দেহ হবে।

ব্যোমকেশ সিগারেট ধরাইল। প্রশ্ন করিলাম, মণিলাল যে আসামী এটা বুঝলে কখন?

ব্যোমকেশ ধোঁয়া ছাড়িয়া বলিল, অস্ত্রটা কী তাই প্রথমে ধরতে পারছিলাম না। তুলসী প্রথম যখন ফাউন্টেন পেনের উল্লেখ করল, তখন সন্দেহ হল। তারপর মণিলাল যখন ফাউন্টেন পেন আমার হাতে দিলে তখন এক মুহুর্তে সব পরিষ্কার হয়ে গেল। মণিলাল নিজেই বললে বাড়িতে আর কারুর ফাউন্টেন পেন নেই। কেমন সহজ অস্ত্ৰ দেখ? সর্বদা পকেটে বাহার দিয়ে বেড়াও, কেউ সন্দেহ করবে না।

কিছুক্ষণ নীরবে কাটিবার পর পাণ্ডেজি বলিলেন,“গুপ্তধনের রহস্যটা কিন্তু এখনও চাপাই আছে।

ব্যোমকেশ মুচকি হাসিল।

বাড়ির সদরে একটা মোটর আসিয়া থামিল এবং হর্ন বাজাইল। জানালা দিয়া দেখিলাম, মোটর হইতে নামিলেন রামকিশোরবাবু ও ডাক্তার ঘটক।

ঘরে প্রবেশ করিয়া রামকিশোর জোড়হস্তে বলিলেন, আমাকে আপনারা ক্ষমা করুন। বুদ্ধির দোষে আমি সব ভুল বুঝেছিলাম। রমাপতি, তোকেই আমি সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিয়েছি। বাবা তুই আমার সঙ্গে ফিরে চল

রমাপতি সলজে তাঁহাকে প্ৰণাম করিলা।

রামকিশোরবাবুকে খাতির করিয়া বসানো হইল। পাণ্ডেজি বোধ করি চায়ের হুকুম দিবার জন্য বাহিরে গেলেন।

ডাক্তার ঘটক হাসিয়া বলিল, আমার রুগীর পক্ষে বেশি উত্তেজনা কিন্তু ভাল নয়। উনি জোর করলেন বলেই সঙ্গে নিয়ে এসেছি, নইলে ওঁর উচিত বিছানায় শুয়ে থাকা।

রামকিশোর গাঢ়স্বরে বলিলেন, আর উত্তেজনা ! আজি সকাল থেকে আমার ওপর দিয়ে যা গেছে তাতেও যখন বেঁচে আছি তখন আর ভয় নেই ডাক্তার।

ব্যোমকেশ বলিল, সত্যিই আর ভয় নেই। একে তো সব বিপদ কেটে গেছে, তার ওপর ডাক্তার পেয়েছেন। ডাক্তার ঘটক যে কত ভাল ডাক্তার তা আমি জানি কিনা। কিন্তু একটা কথা বলুন। সন্ন্যাসীকে দাদা বলতে কি আপনি এখনও রাজী নন?

রামকিশোর লজ্জায় নতমুখ হইলেন।

ব্যোমকেশবাবু, নিজের লজ্জাতে নিজেই মরে আছি, আপনি আর লজ্জা দেবেন না। দাদাকে হাতে পায়ে ধরেছিলাম, দাদা সংসারী হতে রাজী হননি। বলেছিলাম, আমি হরিদ্বারে ,মন্দির করে দিচ্ছি। সেখানে সেবায়েৎ হয়ে রাজার হালে থাকুন। দাদা শুনলেন না। শুনলে হয়তো অপঘাত মৃত্যু হত না। তিনি নিশ্বাস ফেলিলেন।

পাণ্ডেজি ফিরিয়া আসিলেন, তাঁহার হাতে আমাদের পূর্বদৃষ্ট মোহরটি। সেটি রামকিশোরকে দিয়া বলিলেন, আপনার জিনিস আপনি রাখুন।

রামকিশোর সাগ্রহে মোহরটি লইয়া দেখিলেন, কপালে ঠেকাইয়া বলিলেন, আমার পিতৃপুরুষের সম্পত্তি। তাঁরা সবই রেখে গিয়েছিলেন, আমাদের কপালের দােষে এতদিন পাইনি। ব্যোমকেশবাবু, সত্যিই কি সন্ধান পেয়েছেন?

পেয়েছি বলেই আমার বিশ্বাস। তবে চোখে দেখিনি।

তাহলে—তাহলে— ! রামকিশোরবাবু ঢোক গিলিলেন।

ব্যোমকেশ মৃদু হাসিল।

আপনার এলাকার মধ্যেই আছে। খুঁজে নিন না।

খোঁজবার কি ত্রুটি করেছি, ব্যোমকেশবাবু? কেল্লা কিনে অবধি তার আগাপাস্তলা তন্ন তন্ন করেছি। পাইনি; হতাশ হয়ে ভেবেছি সিপাহীরা লুটেপুটে নিয়ে গেছে। আপনি যদি জানেন, বলুন। আমি আপনাকে বঞ্চিত করব না, আপনিও বখরা পাবেন। এঁদের সালিশ মানছি, পাণ্ডেজি আর ডাক্তার ঘটক যা ন্যায্য বিবেচনা করবেন তাই দেব। আপনি আমার অশেষ উপকার করেছেন, যদি অর্ধেক বখরাও চান—

ব্যোমকেশ নীরস স্বরে বলিল, বখরা চাই না। কিন্তু দুটো শর্ত আছে।

শর্ত! কী শর্ত?

প্রথম শর্ত, রমাপতির সঙ্গে তুলসীর বিয়ে দিতে হবে। দ্বিতীয় শর্ত, বিয়ের যৌতুক হিসেবে আপনার দুর্গ রমাপতিকে লেখাপড়া করে দিতে হবে।

ব্যোমকেশ যে ভিতরে ভিতরে ঘটকালি করিতেছে তাহা সন্দেহ করি নাই। সকলে উচ্চকিত হইয়া উঠিলাম। রমাপতি লজ্জিত মুখে সরিয়া গেল।

রামকিশোর কয়েক মিনিট হেঁট মুখে চিন্তা করিয়া মুখ তুলিলেন। বলিলেন, তাই হবে। রমাপতিকে আমার অপছন্দ নয়। ওকে চিনি, ও ভাল ছেলে। অন্য কোথাও বিয়ে দিলে আবার হয়তো একটা ভূত-বাঁদর জুটবে। তার দরকার নেই।

আর দুর্গ?

দুর্গ লেখাপড়া করে দেব। আপনি চান পৈতৃক সোনাদানা তুলসী আর রমাপতি পাবে, এই তো? বেশ তাই হবে।

কথার নড়াচড় হবে না?

রামকিশোর একটু কড়া সুরে বলিলেন, আমি রাজা জানকীরামের সন্তান। কথার নড়াচড় কখনও করিনি।

বেশ। আজ তো সন্ধ্যে হয়ে গেছে। কাল সকালে আমরা যাব।

পরদিন প্ৰভাতে আমরা আবার দুর্গে উপস্থিত হইলাম। আমরা চারজন-আমি, ব্যোমকেশ, পাণ্ডেজি ও সীতারাম। অন্য পক্ষ হইতে কেবল রামকিশোর ও রমাপতি। বুলাকিলালকে হুকুম দেওয়া হইয়াছিল দুর্গে যেন আর কেহনা আসে। সে দেউড়িতে পাহারা দিতেছিল।

ব্যোমকেশ বলিল, আপনারা অনেক বছর ধরে খুঁজে খুঁজে যা পাননি ঈশানবাবু দুহাপ্তায় তা খুঁজে বার করেছিলেন। তার কারণ তিনি প্রত্নতত্ত্ববিৎ ছিলেন, কোথায় খুঁজতে হয় জানতেন। প্ৰথমে তিনি পেলেন একটা শিলালিপি, তাতে লেখা ছিল, যদি আমি বা জয়রাম বাঁচিয়া না থাকি আমাদের তামাম ধনসম্পত্তি সোনাদানা মোহনলালের জিম্মায় গচ্ছিত রহিল। এ লিপি রাজারামের লেখা। কিন্তু মোহনলাল কে? ঈশানবাবু বুঝতে পারলেন না। বুঝতে পারলে মনে হয় কোন গণ্ডগােলই হত না, তিনি চুরি করবার বৃথা চেষ্টা না করে সরাসরির রামকিশোরকে খবর দিতেন।

তারপর ঈশানবাবু পেলেন গুপ্ত তোষাখানার সন্ধান; ভাবলেন সব সোনাদােনা সেইখানেই আছে। আমরা জানি তোষাখানায় একটি গড়িয়ে পড়া মোহর ছাড়া আর কিছুই ছিল না; বাকি সব কিছু রাজারাম সরিয়ে ফেলেছিলেন। এইখানে বলে রাখি, সিপাহীরা তোষাখানা খুঁজে পায়নি; পেলে হাঁড়িকলসীগুলো আস্ত থাকত না।

সে যাক। প্রশ্ন হচ্ছে, মোহনলাল কে, যার জিন্মায় রাজারাম তামাম ধনসম্পত্তি গচ্ছিত রেখে গিয়েছিলেন? একটু ভেবে দেখলেই বোঝা যায় মোহনলাল মানুষ হতে পারে না। দুর্গে সে সময় রাজারাম আর জয়রাম ছাড়া আর কেউ ছিল না; রাজারাম সকলকে বিদেয় করে দিয়েছিলেন। তবে কার জিন্মায় সোনাদানা গচ্ছিত রাখলেন? মোহনলাল কেমন জীব?

আমিও প্রথমটা কিছু ধরতে পারছিলাম না। তারপর অজিত হঠাৎ একদিন পলাশীর যুদ্ধ আবৃত্তি করল—আবার আবার সেই কামান গর্জন-গৰ্জিল মোহনলাল...। কামান—মোহনলাল। সেকালে বড় বড় বীরের নামে কামানের নামকরণ হত। বিদ্যুতের মত মাথায় খেলে গেল মোহনলাল কে ! কার জিম্মায় সোনাদানা আছে। ঐ যে মোহনলাল। ব্যোমকেশ অঙ্গুলি দিয়া ভূমিশয়ান কামনটি দেখাইল

আমরা সকলেই উত্তেজিত হইয়াছিলাম; রামকিশোর অস্থির হইয়া বলিলেন, অ্যাঁ ! তাহলে কামানের নীচে সোনা পোঁতা আছে।

কামানের নীচে নয়। সেকালে সকলেই মাটিতে সোনা পুতে রাখত; রাজারাম অমন কাঁচা কাজ করেননি। তিনি কামানের নলের মধ্যে সোনা ঢেলে দিয়ে কামানের মুখ বন্ধ করে দিয়েছিলেন। ঐ যে দেখছেন কামানের মুখ থেকে শুকনো ঘাসের গোছা গলা বাড়িয়ে আছে, একশো বছর আগে সিপাহীরাও অমনি শুকনো ঘাস দেখেছিল; তারা ভাবতেও পারেনি যে ভাঙা অকমণ্য কামানের পেটের মধ্যে সোনা জমাট হয়ে আছে।

রামকিশোর অধীর কণ্ঠে বলিলেন, তবে আর দেরি কেন? আসুন, মাটি খুঁড়ে মোহর বের করা যাক।

ব্যোমকেশ বলিল, মোহর? মোহর কোথায়? মোহর আর নেই। রামকিশোরবাবু। রাজারাম এমন বুদ্ধি খেলিয়েছিলেন যে সিপাহীরা সন্ধান পেলেও সোনা তুলে নিয়ে যেতে পারত না।

মানে-মনে-কিছু বুঝতে পারছি না।

ব্যোমকেশ বলিল, পাণ্ডেজি, তোষাখানায় একটা উনন আর হাপর দেখেছিলেন মনে আছে? সোহাগাও একটা হাঁড়িতে ছিল। বুঝতে পারলেন? রাজারাম তাঁর সমস্ত মোহর গলিয়ে ঐ কামানের মুখে ঢেলে দিয়েছিলেন। ওর ভেতরে আছে জমাট সোনার একটা খাম।

তাহলে--তাহলে-

ওর মুখ থেকে মাটি খুঁড়ে সোনা দেখতে পাবেন হয়তো। কিন্তু বার করতে পারবেন না।

তবে উপায়?

উপায় পরে করবেন। কলকাতা থেকে আকসি-অ্যাসিটিলিন আনিয়ে কামান কাটতে হবে; তিন ইঞ্চি পুরু লোহা ছেনি বাটালি দিয়ে কাটা যাবে না। আপাতত মাটি খুঁড়ে দেখা যেতে পারে আমার অনুমান সত্যি কি না-সীতারাম।

সীতারামের হাতে লোহার তুরপুন প্রভৃতি যন্ত্রপাতি ছিল। আদেশ পাইয়া সে ঘোড়সওয়ারের মত কামানের পিঠে চড়িয়া বসিল। আমরা নীচে কামানের মুখের কাছে সমবেত হইলাম। সীতারাম মহা উৎসাহে মাটি খুঁড়িতে লাগিল।

প্রায় এক ফুট কাটিবার পর সীতারাম বলিল, হুজুর, আর কাটা যাচ্ছে না। শক্ত লাগছে!

পাণ্ডেজি বলিলেন, লাগাও তুরপুন !

সীতারাম তখন কামানের মুখের মধ্যে তুরপুন ঢুকাইয়া পাক দিতে আরম্ভ করিল। দু’চারবার ঘুরাইবার পর চাকলা চাকলা সোনার ফালি ছিটকাইয়া বাহিরে আসিয়া পড়িতে লাগিল। আমরা সকলে উত্তেজনায় দিশাহারা হইয়া কেবল অর্থহীন চীৎকার করিতে লাগিলাম।

ব্যোমকেশ হাত তুলিয়া বলিল, ব্যস, সীতারাম, এবার বন্ধ কর। আমার অনুমান যে মিথ্যা নয়। তার প্রমাণ পাওয়া গেছে। রামকিশোরবাবু, দুর্গের মুখে মজবুত দরজা বসান, পাহারা বসান; যতদিন না সব সোনা বেরোয় ততদিন আপনারা সপরিবারে এসে এখানে বাস করুন। এত সোনা আলগা ফেলে রাখবেন না।

সেদিন বাসায় ফিরিতে বেলা একটা বাজিয়া গেল। ফিরিয়া আসিয়া শুনিলাম ব্যোমকেশের নামে ‘তার’ আসিয়াছে। আমাদের মুখ শুকাইয়া গেল। হঠাৎ ‘তা’র কেন? কাহার ‘তার’?--সত্যবতী ভাল আছে তো !

তারের খাম ছিঁড়িতে ব্যোমকেশের হাত একটু কাঁপিয়া গেল। আমি অদূরে দাঁড়াইয়া অপলকচক্ষে তাহার পানে চাহিয়া রহিলাম।

‘তার’ পড়িতে পড়িতে তাহার মুখখানা কেমন এক রকম হইয়া গেল; তারপর সে মুখ তুলিল। গলা ঝাড়া দিয়া বলিল, ওদিকেও সোনা।

সোনা!

হ্যাঁ ছেলে হয়েছে।

ছয় মাস পরে বৈশাখের গোড়ার দিকে কলকাতা শহরে গরম পড়ি-পড়ি করিতেছিল। একদিন সকালবেলা আমি এবং ব্যোমকেশ ভাগাভাগি করিয়া খবরের কাগজ পড়িতেছি, সত্যবতী একবাটি দুধ ও ছেলে লইয়া মেঝেয় বসিয়াছে, দুধ খাওয়ানো উপলক্ষে মাতাপুত্ৰে মল্লযুদ্ধ চলিতেছিল, এমন সময় সদর দরজায় খটখট শব্দ হইল। সত্যবতী ছেলে লইয়া পলাইবার উপক্ৰম করিল। আমি দ্বার খুলিয়া দেখি রমাপতি ও তুলসী। রমাপতির হাতে একটি চৌকশ বাক্স, গায়ে সিঙ্কের পাঞ্জাবি, মুখে সলজ হাসি।

তুলসীকে দেখিয়া আর চেনা যায় না। এই কয় মাসে সে রীতিমত একটা যুবতী হইয়া উঠিয়াছে। অগ্রহায়ণ মাসে তাহাদের বিবাহ উপলক্ষে আমরা নিমন্ত্রিত হইয়াছিলাম, কিন্তু যাইতে পারি নাই। ছয় মাস পরে তাহদের দেখিলাম।

তুলসী ঘরে আসিয়াই একেবারে ঝড় বহাইয়া দিল। সত্যবতীর সহিত পরিচয় করাইয়া দিবার সঙ্গে সঙ্গে সে তাহার কোল থেকে খোকাকে তুলিয়া লইয়া তাহাকে চুম্বন করিতে করিতে ঘরময় ছুটাছুটি করিল; তারপর তাহাকে রমাপতির কোলে ফেলিয়া দিয়া সত্যবতীর আঁচল ধরিয়া টানিতে টানিতে পাশের ঘরে লইয়া গেল। তাহাদের কলকাকলি ও হাসিয়া শব্দ পদ ভেদ করিয়া আমাদের কানে আসিতে লাগিল।

তুলসীর চরিত্ৰ যেন পাথরের তলায় চাপা ছিল, এখন মুক্তি পাইয়াছে। নির্বারের স্বপ্নভঙ্গ। ঘর ঠাণ্ডা হইলে ব্যোমকেশ রমাপতিকে জিজ্ঞাসা করিল, বাক্স কিসের? গ্রামোফোন নাকি?

না। আমরা আপনার জন্যে একটা জিনিস তৈরি করিয়ে এনেছি,-বলিয়া রমাপতি বাক্স খুলিয়া যে জিনিসটি বাহির করিল। আমরা তাহার পানে মুগ্ধনেত্ৰে চাহিয়া রহিলাম। আগাগোড়া সোনায় গড়া দুর্গের একটি মডেল। ওজন প্রায় দুই সের, অপূর্ব কারুকার্য। আসল দুর্গের সহিত কোথাও এক তিল তফাত নাই; এমন কি কামানটি পর্যন্ত যথাস্থানে রহিয়াছে।

আমরা চমৎকৃত স্বরে বলিলাম, বাঃ !

তারপর খাওয়া-দাওয়া গল্পগাছা রঙ্গতামাসায় বেলা কাটিয়া গেল। রামকিশোরবাবুদের খবর জানা গেল, কর্তার শরীর ভালই যাইতেছে, বংশীধর নিজের জমিদারীতে বাড়ি তৈয়ারি করিয়াছে; মুরলীধর শহরে বাড়ি কিনিয়া বাস করিতেছে; গদাধর তুলসী ও রমাপতিকে লইয়া কতা শৈলগৃহেই আছেন; চাঁদমোহন আবার জমিদারী দেখাশুনা করিতেছেন। দুর্গটিকে সম্পূর্ণরূপে সংস্কার করানো হইতেছে। তুলসী ও রমাপতি সেখানে বাস করিবে।

অপরাহ্ণে তাহারা বিদায় লইল। বিদায়কালে ব্যোমকেশ বলিল, তুলসী, তোমার মাস্টার কেমন?

মাস্টারের দিকে কপট-কুটিল কটাক্ষপাত করিয়া তুলসী বলিল, বিচ্ছিরি।

ব্যোমকেশ বলিল, হুঁ। একদিন আমার কোলে বসে মাস্টারের জন্যে কেঁদেছিলে মনে আছে?

এবার তুলসীর লজ্জা হইল। মুখে আচল চাপা দিয়া সে বলিল, ধেৎ !

চিড়িয়াখানা

এক

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের অব্যবহিত পরের ঘটনা। গ্ৰীষ্মকাল। ব্যোমকেশের শ্যালক সুকুমার সত্যবতীকে ও খোকাকে লইয়া দাৰ্জিলিং গিয়াছে। ব্যোমকেশ ও আমি হ্যারিসন রোডের বাসায় পড়িয়া চিংড়িপোড়া হইতেছি।

ব্যোমকেশের কাজকর্মে মন্দা যাইতেছিল। ইহা তাহার পক্ষে এমন কিছু নূতন কথা নয়; কিন্তু এবার নৈষ্কর্মের দৈর্ঘ্য ও নিরবচ্ছিন্নতা এতই বেশি যে আমাদের অস্থির করিয়া তুলিয়াছিল। উপরন্তু খোকা ও সত্যবতী গৃহে নাই। মরিয়া হইয়া আমরা শেষ পর্যন্ত দাবা খেলিতে আরম্ভ করিয়াছিলাম।

আমি মোটামুটি দাবা খেলিতে জানিতাম, ব্যোমকেশকে শিখাইয়াছিলাম। প্রথম প্রথম সে সহজেই হারিয়া যাইত; ক্রমে তাহাকে মাত করা কঠিন হইল। অবশেষে একদিন আসিল যেদিন সে বড়ের কিস্তিতে আমাকে মাত করিয়া দিল।

পুত্ৰাৎ শিষ্যাৎ পরাজয়ে গৌরবের হানি হয় না জানি। কিন্তু যাহাকে মাত্র কয়েকদিন আগে হাতে ধরিয়া দাবার চাল দিতে শিখাইয়াছি, তাহার কাছে হারিয়া গেলে নিজের বুদ্ধিবৃত্তির উপর সন্দেহ হয়। আমার চিত্তে আর সুখ রহিল না।

তার উপর এবার গরমও পড়িয়াছে প্ৰচণ্ড। সেই যে চৈত্র মাসের মাঝামাঝি একদিন গলদঘর্ম হইয়া সকালে ঘুম ভাঙিয়াছিল, তারপর এই দেড় মাস ধরিয়া গরম উত্তরোত্তর বাড়িয়াই চলিয়াছে। মাঝে দু-এক পশলা বৃষ্টি যে হয় নাই এমন নয়, কিন্তু তাহা হবিষা কৃষ্ণবর্ত্মেব তাপের মাত্রা বর্ধিত করিয়াছিল। দিবারাত্র ফ্যান চালাইয়াও নিষ্কৃতি ছিল না, মনে হইতেছিল। সারা গায়ে রসগোল্লার রস মাখিয়া বসিয়া আছি।

দেহমনের এইরূপ নিরাশাজনক অবস্থা লইয়া একদিন পূবাঁহুে তক্তপোশের উপর দাবার ছক পাতিয়া বসিয়াছিলাম। ব্যোমকেশ আমাকে গজ-চক্ৰ করিবার ব্যবস্থা প্রায় পাকা করিয়া শুনিয়েছে, আমি অতিমাত্রায় বিচলিত হইয়া অনর্গল ঘৰ্মত্যাগ করতেছি, এমন সময় বাধা পড়িল।

দরজায় খুঁটু খুঁটু কড়া নাড়ার শব্দ। ডাকপিয়ন নয়, তাহার কড়া নাড়ার ভঙ্গীতে একটা বেপরোয়া উগ্ৰতা আছে। তবে কে? আমরা ব্যগ্র আগ্রহে পরস্পর মুখের পানে চাহিলাম। এতদিন পরে সত্যই কি নূতন রহস্যের শুভাগমন হইল।

ব্যোমকেশ টপ করিয়া পাঞ্জাবিটা গলাইয়া লইয়া দ্রুত গিয়া দ্বার খুলিল। আমি ইতিমধ্যে নিরাবরণ দেহে একটা উড়ানি চাদর জড়াইয়া ভদ্র হইয়া বসিলাম।

দ্বারের বাহিরে দাঁড়াইয়া আছেন মধ্যবয়স্ক একটি ভদ্রলোক। আকৃতি মধ্যম, একটু নিরেট গোছের, চাঁচা-ছোলা ধারালো মুখ, চোখে ফ্রেমহীন ধূমল কাচের চশমা। পরিধানে মরাল-শুভ্র প্যান্টুলুন ও সিন্ধের হাতকটা কামিজ। পায়ে মোজা নাই, কেবল বিননি-করা চামড়ার গ্ৰীসান স্যান্ডাল। ছিমছাম চেহারা।

মার্জিত কণ্ঠে বলিলেন,—‘ব্যোমকেশবাবু—?’

ব্যোমকেশ বলিল,—আমিই। —আসুন!

সে ভদ্রলোকটিকে আনিয়া চেয়ারে বসাইল, মাথার উপর পাখাটা জোর করিয়া দিল। ভদ্রলোক একটি কার্ড বাহির করিয়া ব্যোমকেশকে দিলেন।

কার্ডে ছাপা ছিল

নিশানাথ সেন

গোলাপ কলোনী

মোহনপুর, ২৪ পরগনা

বি. এ. আর

কার্ডের অন্য পিঠে টেলিগ্রামের ঠিকানা ‘গোলাপ’ এবং ফোন নম্বর। ব্যোমকেশ কার্ড হইতে চোখ তুলিয়া বলিল,—‘গোলাপ কলোনী। নামটা নতুন ধরনের মনে হচ্ছে।’

নিশানাথবাবুর মুখে একটু হাসির ভাব দেখা দিল, তিনি বলিলেন,—‘গোলাপ কলোনী আমার ফুলের বাগান। আমি ফুলের ব্যবসা করি। শাকসবজিও আছে, ডেয়ারি ফার্মও আছে। নাম দিয়েছি গোলাপ কলোনী।’

ব্যোমকেশ তাঁহাকে তীক্ষ্ণ চক্ষে নিরীক্ষণ করিয়া বলিল,—ও। -মোহনপুর কলকাতা থেকে কত দূর?

নিশানাথ বলিলেন,—শিয়ালদা থেকে ঘন্টাখানেকের পথ-তবে রেলওয়ে লাইনের ওপর পড়ে না। স্টেশন থেকে মাইল দুই দূরে।

নিশানাথবাবুর কথা বলিবার ভঙ্গীটি ত্বরাহীন, যেন আলস্যভরে কথা বলিতেছেন। কিন্তু এই মন্থরতা যে সত্যই আলস্য বা অবহেলা নয়, বরং তাঁহার সাবধানী মনের বাহ্য আবরণ মাত্র, তাহা তাঁহার সজাগ সতর্ক মুখ দেখিয়া বােঝা যায়। মনে হয় দীর্ঘকাল বাক-সংযমের ফলে তিনি এইরূপ বাচনভঙ্গীতে অভ্যস্ত হইয়াছেন।

ব্যোমকেশের বাকপ্ৰণালীও অতিথির প্রভাবে একটু চিন্তা-মন্থর হইয়া গিয়াছিল, সে ধীরে ধীরে বলিল,—‘আপনি বলছেন ব্যবসা করেন। আপনাকে কিন্তু ব্যবসাদার বলে মনে হয় না, এমন কি বিলিতি সওদাগরি অফিসের ব্যবসাদারও নয়। আপনি কতদিন এই ব্যবসা করছেন?’

নিশিনাথ বললেন-দশ বছরের কিছু বেশি। —আমাকে আপনার কী মনে হয়, বলুন দেখি?

মনে হয় আপনি সিভিলিয়ান ছিলেন। জজ কিম্বা ম্যাজিস্ট্রেট।

ধোঁয়াটে চশমার আড়ালে নিশানাথবাবুর চোখ দুটি একবার চঞ্চল হইয়া উঠিল। কিন্তু তিনি শান্ত-মন্থর কঠেই বলিলেন,—কি করে আন্দাজ করলেন জানি না। আমি সত্যিই বোম্বাই প্রদেশের বিচার বিভাগে ছিলাম, সেশন জজ পর্যন্ত হয়েছিলাম। তারপর অবসর নিয়ে এই দশ বছর ফুলের চাষ করছি।

ব্যোমকেশ বলিল,—মাফ করবেন, আপনার এখন বয়স কত?

সাতান্ন চলছে।

তার মানে সাতচল্লিশ বছর বয়সে রিটায়ার করেছেন। যতদূর জানি সরকারী চাকরির মেয়াদ পঞ্চান্ন বছর পর্যন্ত।

নিশানাথবাবু একটু চুপ করিয়া থাকিয়া বলিলেন,—আমার ব্লাড়-প্রেসার আছে। দশ বছর আগে তার সূত্রপাত হয়। ডাক্তারেরা বললেন মস্তিষ্কের কাজ বন্ধ করতে হবে, নইলে বাঁচব না। কাজ থেকে অবসর নিলাম। তারপর বাংলা দেশে এসে ফুলের ফসল ফলাচ্ছি। ভাবনা-চিন্তা কিছু নেই, কিন্তু রক্তের চাপ বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েই যাচ্ছে।

ব্যোমকেশ বলিল,—ভাবনা-চিন্তা কিছু নেই বলছেন। কিন্তু সম্প্রতি আপনার ভাবনার বিশেষ কারণ ঘটেছে। নইলে আমার কাছে আসতেন না।

নিশানাথ হাসিলেন; অধর প্রান্তে শুভ্র দন্তরেখা অল্প দেখা গেল। বলিলেন, —হ্যাঁ—! এটা অবশ্য অনুমান করা শক্ত নয়। কিছুদিন থেকে আমার কলোনীতে একটা ব্যাপার ঘটছে—’ তিনি থামিয়া গিয়া আমার দিকে চোখ ফিরাইলেন,—‘আপনি অজিতবাবু?’

ব্যোমকেশ বলিল,—হ্যাঁ, উনি আমার সহকারী। আমার কাছে যা বলবেন ওঁর কাছে তা গোপন থাকবে না।

নিশানাথ বলিলেন,—না না, আমার কথা গোপনীয় নয়। উনি সাহিত্যিক, তাই ওঁর কাছে একটা কথা জানবার ছিল। অজিতবাবু, blackmail শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ কি?

আকস্মিক প্রশ্নে অপ্ৰতিভ হইয়া পড়িলাম। বাংলা ভাষা লইয়া অনেকদিন নাড়াচাড়া করিতেছি, জানিতে বাকী নাই যে বঙ্গভারতী আধুনিক পাশ্চাত্ত্য সভ্যতার সহিত তাল রাখিয়া চলিতে পারেন নাই; অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিদেশী ভাবকে বিদেশী শব্দ দ্বারা প্ৰকাশ করিতে হয়। আমি আমতা-আমতা করিয়া বলিলাম,—Blackmail-গুপ্তকথা ফাঁস করে দেবার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করা। যতদূর জানি এককথায় এর বাংলা প্রতিশব্দ নেই।’

নিশানাথবাবু একটু অবজ্ঞার স্বরে বলিলেন,—‘আমিও তাই ভেবেছিলাম। যা হোক, ওটা অবান্তর কথা। এবার ঘটনাটা সংক্ষেপে বলি শুনুন।’

ব্যোমকেশ বলিল,—সংক্ষেপে বলবার দরকার নেই, বিস্তারিত করেই বলুন। তাতে আমাদের বোঝবার সুবিধে হবে।

নিশানাথ বলিলেন,—আমার গোলাপ কলোনীতে যারা আমার অধীনে কাজ করে, মালীদের বাদ দিলে তারা সকলেই ভদ্রশ্রেণীর মানুষ, কিন্তু সকলেই বিচিত্র ধরনের লোক। কাউকেই ঠিক সহজ সাধারণ মানুষ বলা যায় না। স্বাভাবিক পথে জীবিকা অর্জন তাদের পক্ষে সম্ভব নয়, তাই তারা আমার কাছে এসে জুটেছে। আমি তাদের থাকবার জায়গা দিয়েছি, খেতে পরতে দিই, মাসে মাসে কিছু হাতখরচ দিই। এই শর্তে তারা কলোনীর কাজ করে। অনেকটা মঠের মত ব্যবস্থা। খুব আরামের জীবন না হতে পারে, কিন্তু না খেয়ে মরবার ভয় নেই।

ব্যোমকেশ বলিল,—আর একটু পরিষ্কার করে বলুন। এদের পক্ষে স্বাভাবিক পথে জীবন নির্বাহ সম্ভব নয় কেন?

নিশানাথ বলিলেন,—এদের মধ্যে একদল আছে যারা শরীরের কোনও না কোনও খুঁতের জন্যে স্বাভাবিকভাবে জীবনযাত্রা নির্বাহ করতে পারে না। যেমন, পানুগোপাল। বেশ স্বাস্থ্যবান ছেলে, অথচ সে কানে ভাল শুনতে পায় না, কথা বলাও তার পক্ষে কষ্টকর। অ্যাডোনয়েডের দোষ আছে। লেখাপড়া শেখেনি। তাকে আমি গোশালার ভার দিয়েছি, সে গরু-মোষ নিয়ে আছে।

আর অন্য দল?

অন্য দলের অতীত জীবনে দাগ আছে। যেমন ধরুন, ভূজঙ্গধরবাবু। এমন তীক্ষ্ণবুদ্ধি লোক কম দেখা যায়। ডাক্তার ছিলেন, সার্জারিতে অসাধারণ হাত ছিল; এমন কি প্ল্যাস্টিক সাজারি পর্যন্ত জানতেন। কিন্তু তিনি এমন একটি দুনৈতিক কাজ করেছিলেন যে তাঁর ডাক্তারির লাইসেন্স কেড়ে নেওয়া হয়। তিনি এখন কলোনীর ডাক্তারখানার কম্পাউন্ডার হয়ে আছেন।

বুঝেছি। তারপর বলুন।

ব্যোমকেশ অতিথির সম্মুখে সিগারেটের টিন খুলিয়া ধরিল, কিন্তু তিনি সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করিয়া বলিলেন,—‘ব্লাড়-প্রেসার বাড়ার পর ছেড়ে দিয়েছি।’ তারপর তিনি ধীরে অত্বরিত কণ্ঠে বলিতে শুরু করিলেন,—‘কলোনীর দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় কোনও নূতনত্ব নেই, দিনের পর দিন একই কাজের পুনরাভিনয় হয়। ফুল ফোটে, শাকসবজি গজায়, মুরগি ডিম পাড়ে, দুধ থেকে ঘি মাখন তৈরি হয়। কলোনীর একটা ঘোড়া-টানা ভ্যান আছে, তাতে বোঝাই হয়ে রোজ সকালে মাল স্টেশনে যায়। সেখান থেকে ট্রেনে কলকাতায় আসে। ম্যুনিসিপাল মার্কেটে আমাদের দুটো স্টল আছে, একটাতে ফুল বিক্রি হয়, অন্যটাতে শাকসবজি। এই ব্যবসা থেকে যা আয় হয় তাতে ভালভাবেই চলে যায়।

এইভাবে চলছিল, হঠাৎ মাস ছয়েক আগে একটা ব্যাপার ঘটল। রাত্রে নিজের ঘরে ঘুমচ্ছিলাম, জানালার কাচ ভাঙার ঝনঝনি শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। উঠে আলো জ্বেলে দেখি মেঝের ওপর পড়ে আছে—মোটরের একটি স্পার্কিং প্লাগ।

আমি বলিয়া উঠিলাম,—স্পর্কিং প্লাগ!

নিশানাথ বলিলেন,—হ্যাঁ। বাইরে থেকে কেউ ওটা ছুড়ে মেরে জানালার কাচ ভেঙেছে। শীতের অন্ধকার রাত্রি, কে এই দুষ্কার্য করেছে জানা গেল না। ভাবলাম, বাইরের কোনও দুষ্ট লোক নিরর্থক বজ্জাতি করেছে। গোলাপ কলোনীর কম্পাউন্ডের মধ্যে আসা-যাওয়ার কোনও অসুবিধা নেই, গরু-ছাগল আটকাবার জন্যে ফটকে আগড় আছে বটে, কিন্তু মানুষের যাতায়াতের পক্ষে সেটা গুরুতর বাধা নয়।

এই ঘটনার পর দশ-বারো দিন নিরুপদ্রবে কেটে গেল। তারপর একদিন সকালবেলা সদর দরজা খুলে দেখি দরজার বাইরে একটা ভাঙা কারবুরেটার পড়ে রয়েছে। তার দু'হপ্তা পরে এল একটা মোটর হর্ন। তারপর ছেড়া মোটরের টায়ার। এইভাবে চলেছে।

ব্যোমকেশ বলিল,—মনে হচ্ছে টুকরো টুকরো ভাবে কেউ আপনাকে একখানি মোটর উপহার দেবার চেষ্টা করছে। এর মানে কি বুঝতে পেরেছেন?

এতক্ষণে নিশানাথবাবুর মুখে একটু দ্বিধার ভাব লক্ষ্য করিলাম। তিনি ক্ষণেক নীরব থাকিয়া বলিলেন,—পাগলের রসিকতা হতে পারে। —কিন্তু আমার এ অনুমান আমার নিজের কাছেও সন্তোষজনক নয়। তাই আপনার কাছে এসেছি।

ব্যোমকেশ কিয়াৎকাল উর্ধ্বমুখ হইয়া ঘুরন্তু পাখার দিকে চাহিয়া রহিল, তারপর প্রশ্ন করিল,—শেষবার মোটরের ভগ্নাংশ কবে পেয়েছেন?

কাল সকালে। তবে এবার ভগ্নাংশ নয়, একটি আস্ত ছেলেখেলার মোটর।

বাঃ! লোকটি সত্যিই রসিক মনে হচ্ছে। এ ব্যাপার অবশ্য কলোনীর সবাই জানে?

জানে। এটা একটা হাসির ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আচ্ছা, আপনার মোটর আছে?

না। আমাদের কোথাও যাতায়াত নেই, মেলামেশা নেই,—সামাজিক জীবন কলোনীর মধ্যেই আবদ্ধ। তাই ইচ্ছে করেই মোটর রাখিনি।

কলোনীতে এমন কেউ আছে যার কোনকালে মোটরের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল?

নিশানাথবাবুর অধরপ্রান্ত সম্মিত ব্যঙ্গভরে একটু প্রসারিত হইল,—আমাদের কোচম্যান মুস্কিল চিত্র আগে মোটর ড্রাইভার ছিল, বারবার র‌্যাশ ড্রাইভিং-এর জন্য তার লাইসেন্স কেড়ে নিয়েছে।

কি নাম বললেন, মুস্কিল মিঞা?

তার নাম নূরুদ্দিন কিম্বা ঐ রকম কিছু। সকলে ওকে মুস্কিল মিঞা বলে! মুস্কিল শব্দটা ওর কথার মাত্রা।

ও—আর কেউ?

আর আমার ভাইপো বিজয়ের একটা মোটর-বাইক ছিল, কখনও চলত, কখনও চলত না। গত বছর বিজয় সেটা বিক্রি করে দিয়েছে।

আপনার ভাইপো। তিনিও কলোনীতে থাকেন?

হ্যাঁ। ম্যুনিসিপাল মার্কেটের ফুলের স্টল সেই দেখে। আমার ছেলেপুলে নেই, বিজয়কেই আমার স্ত্রী পনরো বছর বয়স থেকে নিজের ছেলের মত মানুষ করেছেন।

ব্যোমকেশ আবার ফ্যানের দিকে চোখ তুলিয়া বসিয়া রহিল। তারপর বলিল,—মিস্টার সেন, আপনার জীবনে কখনও-দশ বছর আগে হোক বিশ বছর আগে হোক—এমন কোনও লোকের সংস্পর্শে এসেছিলেন কি যার মোটর ব্যবসার সঙ্গে সম্পর্ক আছে? ধরুন, মোটরের দালাল কিম্বা ঐরকম কিছু? মোটর মেকানিক—?

এবার নিশানাথবাবু অনেকক্ষণ চুপ করিয়া রহিলেন। তারপর যখন কথা কহিলেন তখন তাঁহার কণ্ঠস্বর আরও চাপা শুনাইল। বলিলেন,—বারো বছর আগে আমি যখন সেশন জজ ছিলাম, তখন লাল সিং নামে একজন পাঞ্জাবী খুনের দায়ে অভিযুক্ত হয়ে আমার এজলাসে এসেছিল। তার একটা ছোট মোটর মেরামতের কারখানা ছিল।

তারপর?

‘লাল সিং ভয়ানক ঝগড়াটে বদরাগী লোক ছিল, তার কারখানার একটা মিস্ক্রিকে মোটরের স্প্যানার দিয়ে নিষ্ঠুরভাবে খুন করেছিল। বিচারে আমি তাকে ফাঁসির হুকুম দিই।’ একটু হাসিয়া বলিলেন,—‘হুকুম শুনে লাল সিং আমাকে জুতো ছুড়ে মেরেছিল।’

তারপর?

তারপর আমার রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপীল হল। আপীলে আমার রায় বহাল রইল বটে, কিন্তু ফাঁসি মকুব হয়ে চৌদ্দ বছর জেল হল।

চৌদ্দ বছর জেল! তার মানে লাল সিং এখনও জেলে আছে।

নিশানাথবাবু বলিলেন,—জেলের কয়েদীরা শান্তশিষ্ট হয়ে থাকলে তাদের মেয়াদ কিছু মাফ হয়। লাল সিং হয়তো বেরিয়েছে।

খোঁজ নিয়েছেন? জেল-বিভাগের দপ্তরে খোঁজ নিলেই জানা যেতে পারে।

আমি খোঁজ নিইনি।

নিশানাথবাবু উঠিলেন। বলিলেন,—আর আপনাদের সময় নষ্ট করব না, আজ উঠি। আমার যা বলবার ছিল সবই বলেছি। দেখবেন যদি কিছু হদিস পান। কে এমন অনর্থক উৎপাত করছে। জানা দরকার।

ব্যোমকেশও দাঁড়াইয়া উঠিয়া বলিল,—অনৰ্থক উৎপাত নাও হতে পারে।

নিশানাথ বলিলেন,—তাহলে উৎপাতের অর্থ কি সেটা আরও বেশি জানা দরকার।

প্যান্টুলুনের পকেট হইতে এক গোছা নোট লইয়া কয়েকটা গণিয়া টেবিলের উপর রাখিলেন,—আপনার পারিশ্রমিক পঞ্চাশ টাকা আগাম দিয়ে গেলাম। যদি আরও লাগে পরে দেব। —আচ্ছা৷

নিশানাথবাবু দ্বারের দিকে চলিলেন। ব্যোমকেশ বলিল,—ধন্যবাদ।

দ্বার পর্যন্ত গিয়া নিশানাথবাবু দ্বিধাভরে ফিরিয়া দাঁড়াইলেন। বলিলেন,—আর একটা কথা মনে পড়ল। সামান্য কাজ, ভাবছি সে কাজ। আপনাকে করতে বলা উচিত হবে কিনা।

ব্যোমকেশ বলিল,—বলুন না।

নিশানাথ কয়েক পা ফিরিয়া আসিয়া বলিলেন,—একটি স্ত্রীলোকের সন্ধান করতে হবে। সিনেমার অভিনেত্রী ছিল, নাম সুনয়না। বছর দুই আগে কয়েকটা বাজে ছবিতে ছোট পার্ট করেছিল, তারপর হঠাৎ উধাও হয়ে যায়। যদি তার সন্ধান পান ভালই, নচেৎ তার সম্বন্ধে যত কিছু খবর সংগ্ৰহ করা যায় সংগ্ৰহ করতে হবে। আর যদি সম্ভব হয়, তার একটা ফটোগ্রাফ যোগাড় করতে হবে।

ব্যোমকেশ বলিল,—যখন সিনেমার অভিনেত্রী ছিল তখন ফটো যোগাড় করা শক্ত হবে না। দু'এক দিনের মধ্যেই আমি আপনাকে খবর দেব।

ধন্যবাদ।

নিশানাথবাবু প্ৰস্থান করিলে ব্যোমকেশ প্রথমেই পাঞ্জাবিটা খুলিয়া ফেলিল, তারপর নোটগুলি টেবিল হইতে তুলিয়া গণিয়া দেখিল। তাহার মুখে সকৌতুক হাসি ফুটিয়া উঠিল। নোটগুলি দেরাজের মধ্যে রাখিতে রাখিতে সে বলিল—নিশানাথবাবু কেতাদুরস্ত সিভিলিয়ান হতে পারেন। কিন্তু তিনি বিষয়ী লোক নন।

আমি উড়ানির খোলস ছাড়িয়ে দাবার ঘুঁটিগুলি কৌটোয় তুলিয়া রাখিতেচিরাম, প্রশ্ন করিলাম,—কোন?

সিগারেট ধরাইয়া ব্যোমকেশ তক্তপোশে আসিয়া বসিল, বলিল—পঞ্চাশ টাকা দিলাম বলে ষাট টাকার নোট রেখে গেছেন। লোকটি বুদ্ধিমান, কিন্তু টাকাকড়ি সম্বন্ধে ঢ়িলে প্রকৃতির।

আমি বলিলাম,—আচ্ছা ব্যোমকেশ, উনি যে সিভিলিয়ান ছিলেন, তুমি এত সহজে বুঝলে কি করে?

সে বলিল,—বোঝা সহজ বলেই সহজে বুঝলাম। উনি যে-বেশে এসেছিলেন, সাধারণ বাঙালী ভদ্রলোক ও-বেশে বেড়ায় না, নিজের পরিচয় দেবার জন্য কার্ডও বের করে না। ওটা বিশেষ ধরনের শিক্ষাদীক্ষার লক্ষণ। ওঁর কথা বলার ভঙ্গীতেও একটা হাকিমী মন্থরতা আছে। —কিন্তু ও কিছু নয়, আসল কথা হচ্ছে উনি কি জন্যে আমার কাছে এসেছিলেন।

তার মানে?

উনি দুটো সমস্যা নিয়ে এসেছিলেন; এক হচ্ছে মোটরের ভগ্নাংশ লাভ; আর দ্বিতীয়, চিত্রাভিনেত্রী সুনয়না। —কোনটা প্রধান?

আমার তো মনে হল মোটরের ব্যাপারটাই প্রধান---তোমার কি অন্যরকম মনে হচ্ছে?

বুঝতে পারছি না। নিশানাথবাবু চাপা স্বভাবের লোক, হয়তো আমার কাছেও ওঁর প্রকৃত উদ্বেগের কারণ প্ৰকাশ করতে চান না।

কথাটা ভাবিয়া দেখিয়া বলিলাম,—কিন্তু যে-বয়সে মানুষ চিত্রাভিনেত্রীর পশ্চাদ্ধাবন করে ওঁর সে বয়স নয়।

তার চেয়ে বড় কথা, ওঁর মনোবৃত্তি সে রকম নয়; নইলে বুড়ো লম্পট আমাদের দেশে দুষ্পপ্ৰাপ্য নয়। ওঁর পরিমার্জিত বাচনভঙ্গী থেকে মনোবৃত্তির যেটুকু ইঙ্গিত পেলাম তাতে মনে হয় উনি মনুষ্য জাতিকে শ্রদ্ধার চোখে দেখেন না। ঘৃণাও করেন না; একটু তিক্ত কৌতুকমিশ্রিত অবজ্ঞার ভাব। উচ্ছের সঙ্গে তেঁতুল মেশালে যা হয় তাই।

উচ্ছে ও তেঁতুলের কথায় মনে পড়িয়া গেল। আজ পুঁটিরামকে উক্ত দুইটি উপকরণ সহযোগে অম্বল রাঁধিবার ফরমাশ দিয়াছি। আমি স্নানাহারের জন্য উঠিয়া পড়িলাম। বলিলাম,—‘তুমি এখন কি করবে?’

সে বলিল,—মোটরের ব্যাপারে চিন্তা ছাড়া কিছু করবার নেই। আপাতত পলাতক অভিনেত্রী সুনয়নার পশ্চাদ্ধাবন করাই প্রধান কাজ।

ব্যোমকেশ কিছুক্ষণ নীরবে সিগারেট টানিল, ভাবিতে ভাবিতে বলিল,—Blackmaid কথাটা সম্বন্ধে নিশানাথবাবুর এত কৌতুহল কেন? বাংলা ভাষায় blackmail-এর প্রতিশব্দ আছে কিনা তা জেনে ওঁর কি লাভ?

আমি মাথায় তেল ঘষিতে ঘষিতে বলিলাম,—আমার বিশ্বাস ওটা অবচেতন মনের ক্রিয়া। হয়তো লাল সিং জেল থেকে বেরিয়েছে, সে-ই মোটরের টুকরো পাঠিয়ে ওঁকে ভয় দেখাবার চেষ্টা করছে।

লাল সিং যদি জেল থেকে বেরিয়েই থাকে, সে নিশানাথবাবুকে blackmail করবার চেষ্টা করবে। কে? উনি তো বে-আইনী কিছু করেননি; আসামীকে ফাঁসির হুকুম দেওয়া বে-আইনী কাজ নয়। তবে লাল সিং প্রতিশোধ নেবার চেষ্টা করতে পারে। হয়তো এই বারো বছর ধরে সে রাগ পুষে রেখেছে। কিন্তু নিশানাথবাবুর ভাব দেখে তা মনে হয় না। তিনি যদি লাল সিংকে সন্দেহ করতেন তাহলে অন্তত খোঁজ নিতেন সে জেল থেকে বেরিয়েছে কি না।

ব্যোমকেশ সিগারেটের দগ্ধাবশেষ ফেলিয়া দিয়া তক্তপোশের উপর চিৎ হইয়া শুইল। নিজ মনেই বলিল,—নিশানাথবাবুর স্মৃতিশক্তি বোধ হয় খুব প্রখর।

এটা জানলে কি করে?

তিনি হাকিম-জীবনে নিশ্চয় হাজার হাজার ফৌজদারী মোকদ্দমার বিচার করেছেন। সব আসামীর নাম মনে রাখা সম্ভব নয়। কিন্তু তিনি লাল সিংয়ের নাম ঠিক মনে করে রেখেছেন।

লাল সিং তাঁকে জুতো ছুড়ে মেরেছিল, হয়তো সেই কারণেই নামটা মনে আছে।

‘তা হতে পারে’ বলিয়া সে আবার সিগারেট ধরাইবার উপক্ৰম করিল।

আমি বলিলাম,—না না, আর সিগারেট নয়, ওঠে এবার। বেলা একটা বাজে৷

দুই

বৈকালে ব্যোমকেশ বলিল,—তোমাদের লব্ধপ্ৰতিষ্ঠ সাহিত্যিকেরা তো আজকাল সিনেমার দলে ভিড়ে পড়েছেন। তা তোমার চেনাশোনা কেউ ওদিকে আছেন নাকি?

অবস্থাগতিকে সাহিত্যিক মহলে আমার বিশেষ মেলামেশা নাই। যাঁহারা উন্নলাট সাহিত্যিক তাঁহারা আমাকে কলকে দেন না, কারণ আমি গোয়েন্দা কাহিনী লিখি; আর যাঁহারা সাহিত্য-খ্যাতি অর্জন করিবার পর শিং ভাঙিয়া বাছুরের দলে ঢুকিয়া পড়িয়াছেন তাঁহাদের সহিত ঘনিষ্ঠতা করিবার আগ্রহ আমার নাই। কেবল চিত্র-নাট্যকার ইন্দু রায়ের সহিত সদ্ভাব ছিল। তিনি সিনেমার সহিত সংশ্লিষ্ট থাকিয়াও সহজ মানুষের মত বাক্যালাপ ও আচার-ব্যবহার করিতেন।

ব্যোমকেশকে ইন্দু রায়ের নামোল্লেখ করিলে সে বলিল,—বেশ তো। ওঁর বোধ হয় টেলিফোন আছে, দেখ না। যদি সুনয়নার খবর পাও।

ডায়রেকটরি ঘাঁটিয়া ইন্দুবাবুর ফোন নম্বর েবাহির করিলাম। তিনি বাড়িতেই ছিলেন, আমার প্রশ্ন শুনিয়া বলিলেন,—সুনয়না! কৈ, নামটা চেনা-চেনা মনে হচ্ছে না তো। আমি অবশ্য ওদের বড় খবর রাখি না—

বলিলাম,—ওদের খবর রাখে এমন কারুর খবর দিতে পারেন?

ইন্দুবাবু ভাবিয়া বলিলেন,—এক কাজ করুন। রমেন মল্লিককে চেনেন?

না। কে তিনি? সিনেমার লোক?

সিনেমার লোক নয়। কিন্তু সিনেমার এনসাইক্লোপিডিয়া, চিত্রশিল্পের ক্ষেত্রে এমন লোক নেই যার নাড়িনক্ষত্ৰ জানেন না। ঠিকানা দিচ্ছি, তাঁর সঙ্গে গিয়ে দেখা করুন। অতি অমায়িক লোক, তার শিষ্টতায় মুগ্ধ হবেন।’ বলিয়া রমেন মল্লিকের ঠিকানা দিলেন।

সন্ধ্যার পর ব্যোমকেশ ও আমি মল্লিক মহাশয়ের ঠিকানায় উপস্থিত হইলাম। তিনি সাজগোজ করিয়া বাহির হইতেছিলেন, আমাদের লইয়া বৈঠকখানায় বসাইলেন। দেখিলাম, রমেনবাবু ধনী ও বিনয়ী, তাঁহার বয়স চল্লিশের আশেপাশে, হৃষ্টপুষ্ট দীর্ঘ আকৃতি; মুখখানি পেঁপে ফলের ন্যায় চোয়ালের দিকে ভারি, মাথার দিকে সঙ্কীর্ণ; গোঁফজোড়া সূক্ষ্ম ও যত্নলালিত; পরিধানে শৌখিন দেশী বেশ—কোঁচান। কাঁচি ধুতির উপর গিলে-করা স্বচ্ছ পাঞ্জাবি; পায়ে বার্নিশ পাম্প।

ব্যোমকেশের নাম শুনিয়া এবং আমরা ইন্দুবাবুর নির্দেশে আসিয়াছি জানিতে পারিয়া রমেনবাবু যেন স্বৰ্গ হাতে পাইলেন। তৎক্ষণাৎ বরফ দেওয়া ঘোলের সরবৎ ও সন্দেশ আসিয়া উপস্থিত হইল।

আদর-আপ্যায়নের ফাঁকে ব্যোমকেশ কাজের কথা পাড়িল, বলিল,—আপনি শুনলাম চলচ্চিত্রের বিশ্বকোষ, সিনেমা জগতে এমন মানুষ নেই। যার নাড়ির খবর জানেন না।

রমেনবাবু সলজ্জ বিনয়ে বলিলেন,—ওটা আমার একটা নেশা। কিছু নিয়ে থাকা চাই তো। তা বিশেষ কারুর কথা জানতে চান নাকি?

হ্যাঁ, সুনয়না নামে একটি মেয়ে বছর দুই আগে—

রমেনবাবু চকিত চক্ষে চাহিলেন,—সুনয়না। মানে-নেত্যকালী?

নেত্যকালী!

সুনয়নার আসন নাম নৃত্যকালী। তার সম্বন্ধে কোনও নতুন খবর পাওয়া গেছে নাকি?

ব্যোমকেশ বলিল,—সুনয়নার কথা আমরা কিছুই জানি না—নামটা ছাড়া। আপনার কাছে খবর পাব এই আশায় এসেছি।

রমেনবাবু বলিলেন,—ও-আমি ভেবেছিলাম। আপনি পুলিসের পক্ষ থেকে—। যা হোক, নেত্যকালীর অনেক খবরই আমি জানি, কেবল ল্যাজা মুড়োর খবর পাইনি।

সেটা কি রকম?

নেত্যকালী কোথা থেকে এসেছিল জানি না, আবার কোথায় লোপাট হয়ে গেল তাও জানি না।

ভারি রহস্যময় ব্যাপার দেখছি। এর মধ্যে পুলিসের গন্ধও আছে!—আপনি যা যা জানেন দয়া করে বলুন।

রমেনবাবু আমাদের সিগারেট দিলেন এবং দেশলাই জ্বালিয়া ধরাইয়া দিলেন। তারপর বলিতে আরম্ভ করিলেন,—ঘটনাচক্ৰে নেত্যকালীর সিনেমালীলা প্রস্তাবনা থেকেই তাকে দেখবার সুযোগ আমার হয়েছিল; আর যবনিকা পতন পর্যন্ত সেই লীলার খবর যে রেখেছিলাম তার কারণ মুরারি আমার বন্ধু ছিল। মুরারি দত্তর নাম বোধ হয় আপনারা জানেন না। তার কথা পরে আসবে।

আজ থেকে আন্দাজ আড়াই বছর আগে একদিন সকালের দিকে আমি গৌরাঙ্গ স্টুডিওর মালিক গৌরহরিবাবুর অফিসে বসে আড্ডা দিচ্ছিলাম। একটি নতুন মেয়ে দেখা করতে এল। গৌরহরিবাবু তখন ‘বিষবৃক্ষ’ ধরেছেন, প্রধান ভূমিকায় অ্যাকটর-অ্যাকট্রেস নেওয়া হয়ে গেছে, কেবল মাইনর পার্টের লোক বাকি।

সেই নেত্যকালীকে প্রথম দেখলাম। চেহারা এমন কিছু আহা-মারি নয়; তবে বয়স কম, চটক আছে। গৌরহরিবাবু ট্রাই নিতে রাজী হলেন।

ট্রাই নিতে গিয়ে গৌরহরিবাবুর তাক লেগে গেল। ভেবেছিলেন ঝি চাকরানীর পার্ট দেবেন, কিন্তু অভিনয় দেখার পর বললেন, তুমি কুন্দনন্দিনীর পার্ট কর। নেত্যকালী কিন্তু রাজী হল না, বললে, বিধবার পার্ট করবে না। গৌরহরিবাবু তখন তাকে কমলমণির পার্ট দিলেন। নেত্যকালী নাম সিনেমায় চলে না, তার নতুন নাম হল সুনয়না।

ব্যোমকেশ প্রশ্ন করিল,—বিধবার পার্ট করবে না কেন

রমেনবাবু বলিলেন,—কম বয়সী অভিনেত্রীরা বিধবার পার্ট করতে চায় না। তবে নেত্যকালী অন্য ওজর তুলেছিল; বলেছিল, সে সধবা, গোরস্ত ঘরের বৌ, টাকার জন্যে সিনেমায় নেমেছে, কিন্তু বিধবা সেজে স্বামীর অকল্যাণ করতে পারবে না। যাকে বলে নাচতে নেমে ঘোমটা।

আশ্চর্য বটে! তারপর?

গৌরহরিবাবু তাকে মাইনে দিয়ে রেখে দিলেন। শুটিং চলল। তারপর যথা সময় ছবি বেরুল। ছবি অবশ্য দাঁড়াল না, কিন্তু কমলমণির অভিনয় দেখে সবাই মুগ্ধ হয়ে গেল। সবচেয়ে আশ্চর্য তার মেক-আপ। সে নিজে নিজের মেক-আপ করত; এত চমৎকার মেক-আপ করেছিল যে পর্দায় তাকে দেখে নেত্যকালী বলে চেনাই গেল না।

তাই নাকি; আর অন্য যে সব ছবিতে কাজ করেছিল—?

অন্য আর একটা ছবিতেই সে কাজ করেছিল, তারক গাঙ্গুলির ‘স্বৰ্ণলতায়’। শ্যামা ঝি’র পার্ট করেছিল। সে কী অপূর্ব অভিনয়! আর শ্যামা ঝিঁকে দেখে কার সাধ্য বলে সে-ই বিষবৃক্ষের কমলমণি। একেবারে আলাদা মানুষ!—এখন মনে হয় নেত্যকালীর আসল চেহারাও হয়তো আসল চেহারা নয়, মেক-আপ।

তার আসল চেহারার ফটো বোধ হয় নেই?

না। থাকলে পুলিসের কাজে লাগত।

হুঁ। তারপর বলুন।

রমেনবাবু আর একবার আমাদের সিগারেট পরিবেশন করিয়া আরম্ভ করিলেন—

এই তো গেল সুনয়নার সিনেমা-জীবনের ইতিহাস। ভেতরে ভেতরে, আর একটা ব্যাপার ঘটতে শুরু করেছিল। সুনয়না সিনেমায় ঢোকবার মাস দুই পরে স্টুডিওতেই মুরারির সঙ্গে তার দেখা হল। মুরারিকে আপনারা চিনবেন না, কিন্তু দত্ত-দাস কোম্পানির নাম নিশ্চয় শুনেছেন-বিখ্যাত জহরতের কারবার; মুরারি হল গিয়ে দত্তদের বাড়ির ছেলে। অগাধ বড়মানুষ।

মুরারি আমার বন্ধু ছিল, এক গেলাসের ইয়ার বলতে পারেন। আমাদের মধ্যে, যাকে স্ত্রীদোষ বলে তা একটু আছে, ওটা তেমন দোষের নয়। মুরারিরও ছিল। পালে-পার্বণে একটু-আধটু আমোদ করা, বাঁধাবাঁধি কিছু নয়। কিন্তু মুরারি সুনয়নাকে দেখে একেবারে ঘাড় মুচড়ে পড়ল। সুনয়না এমন কিছু পরী-অন্সরী নয়, কিন্তু যার সঙ্গে যার মজে মন! মুরারি সকাল-বিকেল গৌরাঙ্গ স্টুডিওতে ধর্না দিয়ে পড়ল।

মুরারির বয়স হয়েছিল আমারই মতন। এ বয়সে সে যে এমন ছেলেমানুষী আরম্ভ করবে তা ভাবিনি। সুনয়না কিন্তু সহজে ধরা দেবার মেয়ে নয়। তার বাড়ি কোথায় কেউ জানত না, ট্রামে বাসে আসত, ট্রামে বাসে ফিরে যেত; কোনও দিন স্টুডিওর গাড়ি ব্যবহার করেনি। মুরারি অনেক চেষ্টা করেও খুঁজে বার করতে পারেনি তার বাসা কোথায়।

মুরারি আমাকে মনের কথা বলত। আমি তাকে বোঝাতাম, সুনয়না ভদ্রঘরের বৌ, ভয়ানক পতিব্ৰতা; ওদিকে তাকিও না। মুরারি কিন্তু বুঝত না। তাকে তখন কালে ধরেছে, সে বুঝবে কেন?

মাস ছয়-সাত কেটে গেল। সুনয়ন মুরারিকে আমল দিচ্ছে না, মুরারিও জোঁকের মত লেগে আছে। এইভাবেই চলছে।

স্বৰ্ণলতায় সুনয়নার কাজ শেষ হয়ে গেল। সে স্টুডিও থেকে দু’মাসের মাইনে আগাম নিয়ে কিছুদিনের ছুটিতে যাবে কাশ্মীর বেড়াতে, এমন সময় একদিন মুরারি এসে আমাকে বললে, সব ঠিক হয়ে গেছে। আশ্চর্য হলাম, আবার হলাম না। স্ত্রীজাতির চরিত্র, বুঝতেই পারছেন। সুনয়না যে অন্য মতলবে ধরা দেবার ভান করছে তা তখন জানব কি করে?

দত্ত-দাস কোম্পানির বাগবাজারের দোকানটা মুরারি দেখত। দোকানের পেছনদিকে একটা সাজানো ঘর ছিল। সেটা ছিল মুরারির আড়-ঘর, অনেক সময় সেখানেই রাত কাটাতো।

পরদিন সকালে হৈ হৈ কাণ্ড। মুরারি তার আড্ডা-ঘরে মরে পড়ে আছে। আর দোকানের শো-কেস থেকে বিশ হাজার টাকার হীরের গয়না গায়েব হয়ে গেছে।

পুলিস এল, লাস পরীক্ষার জন্যে চালান দিলে। কিন্তু কে মুরারিকে মেরেছে তার হদিস পেলে না। সে-রাত্রে মুরারির ঘরে কে এসেছিল তা বোধ হয় আমি ছাড়া আর কেউ জানত না। মুরারি আর কাউকে বলেনি।

আমি বড় মুস্কিলে পড়ে গেলাম। খুনের মামলায় জড়িয়ে পড়বার ইচ্ছে মোটেই ছিল না, অথচ না বললেও নয়। শেষ পর্যন্ত কর্তব্যের খাতিরে পুলিসকে গিয়ে বললাম।

পুলিস অন্ধকারে হাঁ করে বসে ছিল, এখন তুড়ে তল্লাস শুরু করে দিলে। সুনয়নার নামে ওয়ারেন্ট বেরুল। কিন্তু কোথায় সুনয়না! সে কার্পুরের মত উবে গেছে। তার যে সব ফটোগ্রাফ ছিল তা থেকে সনাক্ত করা অসম্ভব। তার আসল চেহারা স্টুডিওর সকলকারই চেনা ছিল, কিন্তু এই ব্যাপারের পর আর কেউ সুনয়নাকে চোখে দেখেনি।

তাই বলেছিলাম সুনয়নার ল্যাজা-মুড়ো দুই-ই আমাদের চোখের আড়ালে রয়ে গেছে। সে কোথা থেকে এসেছিল, কার মেয়ে কার বৌ কেউ জানে না; আবার ভোজবাজির মত কোথায় মিলিয়ে গেল তাও কেউ জানে না।

রমেনবাবু চুপ করিলেন। ব্যোমকেশও কিছুক্ষণ চিন্তামগ্ন হইয়া রহিল, তারপর বলিল,—মুরারিবাবুর মৃত্যুর কারণ জানা গিয়েছিল?

রমেনবাবু বলিলেন,—তার পেটে বিষ পাওয়া গিয়েছিল।

কোন বিষ জানেন?

ঐ যে কি বলে-নামটা মনে পড়ছে না—তামাকের বিষ।

তামাকের বিষ! নিকোটিন?

হ্যাঁ হ্যাঁ, নিকোটিন। তামাক থেকে যে এমন দুর্দান্ত বিষ তৈরি হয় তা কে জানত?—আসুন। বলিয়া সিগারেটের টিন খুলিয়া ধরিলেন।

ব্যোমকেশ হাস্যমুখে উঠিয়া দাঁড়াইয়া বলিল,—ধন্যবাদ, আর না। আপনার অনেক সময় নষ্ট করলাম। আপনি কোথাও বেরুচ্ছিলেন—

সে কি কথা! বেরুনো তো রোজই আছে, আপনাদের মতো সজ্জনদের সঙ্গ পাওয়া কি সহজ কথা —আমি যাচ্ছিলাম একটি মেয়ের গান শুনতে। নতুন এসেছে, খাসা গায়। তা এখনও তো রাত বেশি হয়নি, চলুন না। আপনারাও দুটো ঠুংরি শুনে আসবেন।

ব্যোমকেশ মুচকি হাসিয়া বলিল,—আমি তো গানের কিছুই বুঝি না, আমার যাওয়া বৃথা; আর অজিত ধ্রুপদ ছাড়া কোনও গান পছন্দই করে না। সুতরাং আজ থাক। আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আবার যদি খবরের দরকার হয়, আপনার শরণাপন্ন হব।

একশ’বার। —যখনই দরকার হবে তলব করবেন।

আচ্ছা, আসি তবে। নমস্কার।

নমস্কার। নমস্কার।

তিন

পরদিন সকালে ঘুম ভাঙিয়া শুনিতে পাইলাম, পাশের ঘরে ব্যোমকেশ কাহাকে ফোন করিতেছে। দুই চারিটা ছাড়াছাড়া কথা শুনিয়া বুঝিলাম সে নিশানাথবাবুকে সুনয়নার কাহিনী শুনাইতেছে।

নিশানাথবাবুর আগমনের পর হইতে আমাদের তাপদগ্ধ কর্মহীন জীবনে নূতন সজীবতার সঞ্চার হইয়াছিল। তাই ব্যোমকেশ যখন টেলিফোনের সংলাপ শেষ করিয়া আমার ঘরে আসিয়া চুকিল এবং বলিল,—ওহে ওঠে, মোহনপুর যেতে হবে—তখন তিলমাত্ৰ আলস্য না করিয়া সটান উঠিয়া বসিলাম।

কখন যেতে হবে?

এখনি। রমেনবাবুকেও নিয়ে যেতে হবে। নিশানাথবাবুর কথার ভাবে মনে হল তাঁর সন্দেহ ভূতপূর্ব অভিনেত্রী সুনয়না দেবী কাছাকাছি কোথাও বিরাজ করছেন। তাঁর সন্দেহ যদি সত্যি হয়, রমেনবাবু গিয়ে আসামীকে সনাক্ত করতে পারেন।

আটটার মধ্যেই রমেনবাবুর বাড়িতে পৌছিলাম। তিনি লুঙ্গি ও হাতকটা গেঞ্জি পরিয়া বৈঠকখানায় ‘আনন্দবাজার’ পড়িতেছিলেন, আমাদের সহৰ্ষে স্বাগত করিলেন।

ব্যোমকেশের প্রস্তাব শুনিয়া তিনি উল্লাসভরে উঠিয়া দাঁড়াইলেন, বলিলেন—যাব না? আলবৎ যাব। আপনারা দয়া করে পাঁচ মিনিট বসুন, আমি তৈরি হয়ে নিচ্ছি। বলিয়া তিনি অন্দরের দিকে অন্তধান করিলেন।

পাঁচ মিনিটের মধ্যে তিনি তৈয়ার হইয়া বাহির হইয়া আসিলেন। একেবারে ফিট্‌ফাট বাবু; যেমনটি কাল সন্ধ্যায় দেখিয়াছিলাম।

শিয়ালদা স্টেশনে পৌঁছিয়া তিনি আমাদের টিকিট কিনিতে দিলেন না, নিজেই তিনখানা প্রথম শ্রেণীর টিকিট কিনিয়া ট্রেনে অধিষ্ঠিত হইলেন। দেখিলাম আমাদের চেয়ে তাঁরই ব্যগ্রতা ও উৎসাহ বেশি।

ঘন্টাখানেক পরে উদ্দিষ্ট স্টেশনে পৌঁছান গেল। লোকজন বেশি নাই; বাহিরে আসিয়া দেখিলাম, পানের দোকানের সামনে দাঁড়াইয়া একটি লোক পান চিবাইতে চিবাইতে দোকানির সহিত রসালাপ করিতেছে। ব্যোমকেশ নিকটে গিয়া জিজ্ঞাসা করিল,—গোলাপ কলোনী কোন দিকে বলতে পারেন?

লোকটি এক চক্ষু মুদিত করিয়া আমাদের ভাল করিয়া দেখিয়া লইল, তারপর এড়ো গলায় বলিল,—চিড়িয়াখানা দেখতে যাবেন?

চিড়িয়াখানা!

ঐ যার নাম চিড়িয়াখানা তারই নাম গোলাপ কলোনী। আজব জায়গা-আজব মানুষগুলি। অমন চিড়িয়াখানা আলিপুরেও নেই। তা-যাবার আর কষ্ট কি? ঐ যে চিড়িয়াখানার রথ রয়েছে ওতে চড়ে বসুন, গড়গড় করে চলে যাবেন।

এতক্ষণ লক্ষ্য করি নাই, স্টেশন-প্রাঙ্গণের এক পাশে একটি জীর্ণকায় ঘোড়ার গাড়ি দাঁড়াইয়া আছে। মেয়েদের স্কুল-কলেজের গাড়ির মত লম্বা ধরনের গাড়ি। তাহার গায়ে এককালে সোনার জলে গোলাপ কলোনী লেখা ছিল, কিন্তু এখন তাহা প্ৰায় অবোধ্য হইয়া পড়িয়াছে। গাড়িতে লোকজন কেহ আছে বলিয়া বোধ হইল না, কেবল ঘোড়াটা একক দাঁড়াইয়া পা ছুড়িয়া মাছি তাড়াইতেছে।

কাছে গিয়া দেখিলাম গাড়ির পিছনের পা-দানে বসিয়া একটি লোক নিবিষ্টমনে বিড়ি টানিতেছে। লোকটি মুসলমান, বয়স হইয়াছে। দাড়ির প্রাচুর্য নাই, মুখময় ডুমো ডুমে ব্রণের ন্যায় মাংস উঁচু হইয়া আছে, চোখ দুটিতে ঘোলাটে অভিজ্ঞতা; পরনে ময়লা পায়জামার উপর ফতুয়া। আমাদের দেখিয়া সে বিড়ি ফেলিয়া উঠিয়া বলিল,—কলকাতা হতে আসতেছেন?

হ্যাঁ। গোলাপ কলোনী যাব।

আসেন। আপনাগোরে লইয়া যাইবার কথা বাবু কইছেন। কিন্তু মুস্কিল হইছে—

বুঝিলাম ইনিই মুস্কিল মিঞা। ব্যোমকেশ বলিল,—মুস্কিল কিসের?

মুস্কিল বলিল,—রসিকবাবুরাও এই টেরেনে আওনের কথা। তা তিনি আইলেন না। পরের টেরানের জৈন্য সবুর করতি হইব। তা বাবু মশায়রা গাড়ির মধ্যে বসেন।

জিজ্ঞাসা করিলাম,—রসিকবাবুটি কে?

মুস্কিল বলিল,—কলোনীর বাবু, রোজ দুবেলা রেলে আয়েন যায়েন, আজ কি কারণে দেরি হইছে। বসেন না, পরের গাড়ি এখনই আইব।

মুস্কিল গাড়ির দ্বার খুলিয়া দিল। ভিতরে মানুষ বসিবার স্থান তিন চারিটি আছে, কিন্তু অধিকাংশ স্থান স্তুপীকৃত শূন্য চ্যাঙারির দ্বারা পূর্ণ। অনুমান করা যায় প্রত্যহ প্রাতে এইসব চ্যাঙারিতে গোলাপ কলোনী হইতে ফুল শাকসবজি স্টেশনে আসে এবং কলিকাতার অভিমুখে রওনা হইয়া যায়; ওদিকে কলিকাতা হইতে পূর্বদিনের শূন্য চ্যাঙারিগুলি ফিরিয়া আসে। কমী মানুষগুলিরও যাতায়াত এই ভ্যানের সাহায্যেই সাধিত হয়।

রৌদ্রের তাপ বাড়িতেছিল। বাহিরে দাঁড়াইয়া থাকার চেয়ে গাড়ির ছায়াস্তরালে প্রবেশ করাই শ্ৰেয় বিবেচনা করিয়া আমরা গাড়িতে উঠিয়া বসিলাম।

মুস্কিল মিঞা গাল্পিক লোক, মানুষ পাইলে গল্প করিতে ভালবাসে। সে বলিল,—বাবু মশায়রা দুই-চারিদিন হেথায় থাকবেন তো?

ব্যোমকেশ বলিল,—আজই ফিরব। —তুমি মুস্কিল মিঞা?

মুস্কিল মুখ মচুকাইয়া বলিল,—নাম তো কর্তা সৈয়দ নুরুদ্দিন। কিন্তু মুস্কিল হৈছে বাবুরা আদর কৈরা মুস্কিল মিঞা ডাকেন।

এ আর মুস্কিল কি?—কতদিন আছো গোলাপ কলোনীতে?

আন্দাজ সাত আট বছর হৈতে চলল। তখন বোষ্টম ঠাকুর ছাড়া আর কোনও কতই দেখা দেন নাই। আমি পুরান লোক।

হুঁ। তোমার গাড়ি আর ঘোড়াও তো বেশ পুরান মনে হচ্ছে।

মুস্কিল আক্ষেপ করিয়া বলিল,—আর কন কেন কর্তা। ঘোড়াডার মরবার বয়স হইছে,নেহাৎ আদত পড়ে গেছে তাই গাড়ি টানে। বড়বিবিরে কতবার কইছি, ও দুটো গাড়ি ঘোড়ারে বাতিল কৈরা নূতন মটর-ভ্যান খরিদ কর। তা মুস্কিল হৈছে, বড়বিবি কয় টাকা নাই। ”

বড়বিবি কে? নিশানাথবাবুর স্ত্রী?

হ। ভারি লক্ষ্মীমন্তর মেইয়া।

তিনিই বুঝি কলোনী দেখাশোনা করেন?

দেখাশুনা কর্তাবাবুও করে। কিন্তু টাকাকড়ি হিসাব-নিকাশ বড়বিবির হাতে।

তা বড়বিবি টাকা নাই বলে কেন? কিলোনীর ব্যবসা কি ভাল চলে না?

মুস্কিল মিঞার ঘোলাটে চোখে একটা গভীর অর্থপূর্ণ ইঙ্গিত ফুটিয়া উঠিল। সে বলিল,—‘চলে তো ভালই। এত ফুল ফল ঘি মাখন আণ্ডা যায় কোথায়? তবে কি জানেন কর্তা, লাভের গুড় পিঁপড়া খাইয়া যায়।’ ইঙ্গিতপূর্ণ চক্ষে আমাদের তিনজনকে একে একে নিরীক্ষণ করিল।

মুস্কিল মিঞার নিকট হইতে ব্যোমকেশ হয়তো আরও আভ্যন্তরীণ তথ্য সংগ্ৰহ করিত, কিন্তু এই সময় দক্ষিণ হইতে একটি ট্রেন আসিয়া স্টেশনে থামিল। এবং অল্পকাল পরে একটি ক্ষিপ্রচারী ভদ্রলোক আসিয়া গাড়ির কাছে দাঁড়াইলেন। ইনি বোধ হয় রসিকবাবু।

ভদ্রলোকের বয়স আন্দাজ পঁয়ত্রিশ, কিন্তু আকৃতি ম্লান ও শুষ্ক। বৃষকাষ্ঠের মত দেহে লংক্লথের পাঞ্জাবি অত্যন্ত বেমানানভাবে ঝুলিয়া আছে, গাল-বসা খাপরা-ওঠা মুখ, জোড়া ভুরুর নিচে চোখদুটি ঘন-সন্নিবিষ্ট, মুখে খুঁৎখুঁতে অতৃপ্ত ভাব। গাড়ির মধ্যে আমাদের বসিয়া থাকিতে দেখিয়া তাঁহার মুখ আরও খুঁৎখুঁতে হইয়া উঠিল। তিনি বলিলেন,—আপনারা—?

ব্যোমকেশ নিজের পরিচয় দিয়া বলিল,—নিশানাথবাবু আমাদের ডেকে পাঠিয়েছেন—।

রসিকবাবুর ঘন-সন্নিবিষ্ট চোখে একটা ক্ষণস্থায়ী আশঙ্কা পালকের জন্য চমকিয়া উঠিল; মনে হইল তিনি ব্যোমকেশের নাম জানেন। তারপর তিনি চাটু করিয়া গাড়িতে উঠিয়া বলিলেন,—মুস্কিল, গাড়ি হাঁকাও। দেরি হয়ে গেছে।

মুস্কিল ইতিমধ্যে সামনে উঠিয়া বসিয়াছিল, ঘোড়ার নিতম্বে দু’চার ঘা খেজুর ছড়ি বসাইয়া গাড়ি ছাড়িয়া দিল।

রসিকবাবু তখন আত্ম-পরিচয় দিলেন। তাঁহার নাম রসিকলাল দে, গোলাপ কলোনীর বাসিন্দা, হগ সাহেবের বাজারে তরিতরকারির দোকানের ইন-চার্জ।

এই সময় তাঁহার ডান হাতের দিকে দৃষ্টি পড়িতে চমকিয়া উঠিলাম। হাতের অঙ্গুষ্ঠ ছাড়া বাকি আঙুলগুলা নাই, কে যেন ভোজালির এক কোপে কাটিয়া লইয়াছে।

ব্যোমকেশও হাত লক্ষ্য করিয়াছিল, সে শান্তস্বরে বলিল,—আপনি কি আগে কোনও কল-কারখানায় কাজ করতেন?

রসিকবাবু হাতখানি পকেটের মধ্যে লুকাইলেন, ম্লানকণ্ঠে বলিলেন,—কটন মিলের কারখানায় মিস্ত্রি ছিলাম, ভাল মাইনে পেতাম। তারপর করাত-মেসিনে আঙুলগুলো গেল; কিছু খেসারৎ পেলাম বটে, নাকের বদলে নরুন! কিন্তু আর কাজ জুটল না। বছর দুই থেকে নিশানাথবাবুর পিঁজরাপোলে আছি। ” তাঁহার মুখ আরও শীর্ণ ক্লিষ্ট হইয়া উঠিল।

আমরা নীরব রহিলাম। গাড়ি ক্ষুদ্র শহরের সঙ্কীর্ণ গণ্ডী পার হইয়া খোলা মাঠের রাস্তা ধরিল।

ভাবিতে লাগিলাম, গোলাপ কলোনীর দেখি অনেকগুলি নাম! কেহ বলে চিড়িয়াখানা, কেহ বলে পিজরাপোল। না জানি সেখানকার অন্য লোকগুলি কেমন! যে দুইটি নমুনা দেখিলাম তাহাতে মনে হয় চিড়িয়াখানা ও পিজরাপোল দুটি নামই সার্থক।

চার

রাস্তাটি ভাল; পাশ দিয়া টেলিফোনের খুঁটি চলিয়াছে। যুদ্ধের সময় মার্কিন পথিকৃৎ এই পথ ও টেলিফোনের সংযোগ নিজেদের প্রয়োজনে তৈয়ার করিয়াছিল, যুদ্ধের শেষে ফেলিয়া চলিয়া গিয়াছে।

পথের শেষে আরও যুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন চোখে পড়িল; একটা স্থানে অগণিত সামরিক মোটর গাড়ি। পাশাপাশি শ্রেণীবদ্ধভাবে গাড়িগুলি সাজানো; সর্বাঙ্গে মরিচা ধরিয়াছে, রঙ চটিয়া গিয়াছে, কিন্তু তাহাদের শ্রেণীবিন্যাস ভগ্ন হয় নাই। হঠাৎ দেখিলে মনে হয় এ যেন যান্ত্রিক সভ্যতার গোরস্থান।

এই সমাধিক্ষেত্র যেখানে শেষ হইয়াছে সেখান হইতে গোলাপ কলোনীর সীমানা আরম্ভ। আন্দাজ পনরো-কুড়ি বিঘা জমি কাঁটা-তার দিয়ে ঘেড়া, কাঁটা তারের ধারে ধারে ত্রিশিরা ফণিমনসার ঝাড়। ভিতরে বাগান, বাগানের ফাঁকে ফাঁকে লাল টালি ছাওয়া ছোট ছোট কুঠি। মালীরা রবারের নলে করিয়া বাগানে জল দিতেছে। চারিদিকের ঝলসানো পরিবেশের মাঝখানে গোলাপ কলোনী যেন একটি শ্যামল ওয়েসিস।

ক্ৰমে কলোনীর ফটকের সম্মুখে উপস্থিত হইলাম। ফটকে দ্বার নাই, কেবল আগড় লাগাইবার ব্যবস্থা আছে। দুইদিকের স্তম্ভ হইতে মাধবীলতা উঠিয়া মাথার উপর তোরণমাল্য রচনা করিয়াছে। গাড়ি ফটকের ভিতর প্রবেশ করিল।

ফটকে প্রবেশ করিয়া সম্মুখেই একটি বাড়ি। টালির ছাদ, বাংলো ধরনের বাড়ি; নিশানাথবাবু এখানে থাকেন। আমরা গাড়ির মধ্যে বসিয়া দেখিলাম বাড়ির সদর দরজার পাশে দাঁড়াইয়া একটি মহিলা ঝারিতে করিয়া গাছে জল দিতেছেন। গাড়ির শব্দে তিনি মুখ ফিরাইয়া চাহিলেন; ক্ষণেকের জন্য একটি সুন্দরী যুবতীর মুখ দেখিতে পাইলাম। তারপর তিনি ঝারি রাখিয়া দ্রুত বাড়ির মধ্যে প্ৰবেশ করিলেন।

আমরা তিনজনেই যুবতীকে দেখিয়াছিলাম। ব্যোমকেশ বক্ৰচক্ষে একবার রমেনবাবুর পানে চাহিল। রমেনবাবু অধরোষ্ঠ সঙ্কুচিত করিয়া অনিশ্চিতভাবে মাথা নাড়িলেন, কথা বলিলেন না। লক্ষ্য করিয়াছিলাম, কলিকাতার বাহিরে পা দিয়া রমেনবাবু কেমন যেন নির্বাক হইয়া গিয়াছিলেন। কলিকাতার যাঁহারা খাস বাসিন্দা তাঁহার কলিকাতার বাহিরে পদাৰ্পণ করিলে ডাঙায় তোলা মাছের মত একটু অস্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করেন।

গাড়ি আসিয়া দ্বারের সম্মুখে থামিলে আমরা একে একে অবতরণ করিলাম। নিশানাথবাবু দ্বারের কাছে আসিয়া আমাদের সম্ভাষণ করিলেন। পরিধানে ঢিলা পায়জামা ও লিনেনের কুর্তা। হাসিমুখে বলিলেন,—‘আসুন! রোদ্দুরে খুব কষ্ট হয়েছে নিশ্চয়।’—এই পর্যন্ত বলিয়া রসিক দে’র প্রতি তাঁহার দৃষ্টি পড়িল। রসিক দে আমাদের সঙ্গে গাড়ি হইতে নামিয়াছিল এবং অলক্ষিতে নিজের কুঠির দিকে চলিয়া যাইতেছিল। তাহাকে দেখিয়া নিশানাথবাবুর মুখের হাসি মিলাইয়া গেল, তিনি বলিলেন,—‘রসিক, তোমার হিসেব এনেছ?’

রসিক যেন কুঁচুকাইয়া গেল, ঠোঁট চাটিয়া বলিল,—আজ্ঞে, আজ হয়ে উঠল না। কাল-পরশুর মধ্যেই—

নিশানাথবাবু আর কিছু বলিলেন না, আমাদের লইয়া বসিবার ঘরে প্রবেশ করিলেন।

বসিবার ঘরটি মাঝারি আয়তনের; আসবাবের জাঁকজমক নাই। কিন্তু পারিপাট্য আছে। মাঝখানে একটি নিচু গোল টেবিল, তাহাকে ঘিরিয়া কয়েকটা গন্দিযুক্ত চেয়ার। দেয়ালের গায়ে বইয়ের আলমারি। এক কোণে টিপাইয়ের উপর টেলিফোন, তাহার পাশে রোল টপ টেবিল। বাহিরের দিকের দেয়ালে দুটি জানালা, উপস্থিত রৌদ্রের ঝাঁঝ নিবারণের জন্য গাঢ় সবুজ রঙের পদাৰ্থ দিয়া ঢাকা।

রমেনবাবুর পরিচয় দিয়া আমরা উপবিষ্ট হইলাম। নিশানাথবাবু বলিলেন,—‘তেতে পুড়ে এসেছেন, একটু জিরিয়ে নিন। তারপর বাগান দেখাব। এখানে যাঁরা আছেন তাঁদের সঙ্গেও পরিচয় হবে।’ তিনি সুইচ টিপিয়া বৈদ্যুতিক পাখা চালাইয়া দিলেন।

ব্যোমকেশ উর্ধ্বে দৃষ্টিপাত করিয়া বলিল,—আপনার বিদ্যুতের ব্যবস্থা আছে দেখছি।

নিশানাথবাবু বলিলেন,—হ্যাঁ, আমার নিজের ডায়নামো আছে। বাগানে জল দেবার জন্যে কুয়ো থেকে জল পাম্প করতে হয়। তাছাড়া আলো-বাতাসও পাওয়া যায়৷।

আমিও ছাদের দিকে দৃষ্টি তুলিয়া দেখিলাম টালির নিচে সমতল করিয়া তক্তা বসানো, তক্তা ভেদ করিয়া মোটা লোহার ডাণ্ডা বাহির হইয়া আছে, ডাণ্ডার বাঁকা হুক হইতে পাখা ঝুলিতেছে। অনুরূপ আর একটা ডাণ্ডার প্রান্তে আলোর বাল্ব।

পাখা চালু হইলে তাহার উপর হইতে কয়েকটি শুষ্ক ঘাসের টুকরা ঝরিয়া টেবিলের উপর পড়ল। নিশানাথ বললেন,—‘চড়ুই পাখি। কেবলই পাখার ওপর বাসা বাঁধবার চেষ্টা করছে। ক্লান্তি নেই, নৈরাশ্য নেই, যতবার ভেঙে দেওয়া হচ্ছে ততবার বাঁধছে।’ তিনি ঘাসের টুকরাগুলি কুড়াইয়া জানালার বাহিরে ফেলিয়া দিয়া আসিলেন।

ব্যোমকেশ হাসিয়া বলিল,—ভারি একওঁয়ে পাখি।

নিশানাথবাবুর মুখে একটু অম্লরসাক্ত হাসি দেখা দিল, তিনি বলিলেন,—এই একগুঁয়েমি যদি মানুষের থাকত!

ব্যোমকেশ বলিল,—মানুষের বুদ্ধি বেশি, তাই একগুয়েমি কম।

নিশানাথ বলিলেন,—তাই কি? আমার তো মনে হয় মানুষের চরিত্র দুর্বল, তাই একগুঁয়েমি কম।

ব্যোমকেশ তাঁহার পানে হাস্য-কুঞ্চিত চোখে চাহিয়া থাকিয়া বলিল,—আপনি দেখছি মানুষ জাতটাকে শ্রদ্ধা করেন না।

নিশানাথ ক্ষণেক নীরব থাকিয়া হাল্কা সুরে বলিলেন,—বর্তমান সভ্যতা কি শ্রদ্ধা হারানাের সভ্যতা নয়? যারা নিজের ওপর শ্রদ্ধা হারিয়েছে তারা আর কাকে শ্রদ্ধা করবে?

ব্যোমকেশ উত্তর দিবার জন্য মুখ খুলিয়াছিল এমন সময় ভিতর দিকের পদ নড়িয়া উঠিল। যে মহিলাটিকে পূর্বে গাছে জল দিতে দেখিয়াছিলাম তিনি বাহির হইয়া আসিলেন; তাঁহার হাতে একটি ট্রের উপর কয়েকটি সরবতের গেলাস।

মহিলাটিকে দূর হইতে দেখিয়া যতটা অল্পবয়স্ক মনে হইয়াছিল আসলে ততটা নয়। তবে বয়স ত্রিশ বছরের বেশিও নয়। সুগঠিত স্বাস্থ্যপূর্ণ দেহ, সুশ্ৰী মুখ, টকটকে রঙ; যৌবনের অপরপ্রান্তে আসিয়াও দেহ যৌবনের লালিত্য হারায় নাই। সবার উপর একটি সংযত আভিজাত্যের ভাব।

তিনি কে তাহা জানি না, তবু আমরা তিনজনেই সসম্ভ্রমে উঠিয়া দাঁড়াইলাম। নিশানাথবাবু নীরস কণ্ঠে পরিচয় দিলেন, —আমার স্ত্রী-দময়ন্তী।

নিশানাথবাবুর স্ত্রী!

প্ৰস্তুত ছিলাম না। স্বভাবতই ধারণা জন্মিয়ছিল নিশানাথবাবুর স্ত্রী বয়স্থ মহিলা; দ্বিতীয় পক্ষের কথা একেবারেই মনে আসে নাই। আমাদের মুখের বোকাটে বিস্ময় বোধ করি অসভ্যতাই প্ৰকাশ করিল। তারপর আমরা নমস্কার করিলাম। দময়ন্তী দেবী সরবতের ট্রে টেবিলে নামাইয়া রাখিয়া বুকের কাছে দুই হাত যুক্ত করিয়া প্রতিনমস্কার করিলেন। নিশানাথ বলিলেন,—এঁরা আজ এখানেই খাওয়া-দাওয়া করবেন।

দময়ন্তী দেবী একটু হাসিয়া ঘাড় ঝুঁকাইলেন, তারপর ধীরপদে ঘর হইতে বাহির হইয়া গেলেন।

আমরা আবার উপবেশন করিলাম। নিশানাথ আমাদের হাতে সরবতের গেলাস দিয়া কথাচ্ছলে বলিলেন,—এখানে চাকর-বাকর নেই, নিজেদের কাজ আমরা নিজেরাই করি।

ব্যোমকেশ ঈষৎ উৎকণ্ঠিত স্বরে বলিল,—সে তো খুব ভাল কথা। কিন্তু আমরা এসে মিসেস সেনের কাজ বাড়িয়ে দিলাম না তো? আমাদের জন্যে আবার নতুন করে রান্নাবান্না—

নিশানাথ বলিলেন,—আপনাদের আসার খবর আগেই দিয়েছি, কোনও অসুবিধা হবে না। মুকুল বলে একটি মেয়ে আছে, রান্নার ভার তারই; আমার স্ত্রী সাহায্য করেন। এখানে আলাদা রান্নাবান্নার ব্যবস্থা নেই; একটা রান্নাঘর আছে, সকলের রান্না একসঙ্গে হয়।

ব্যোমকেশ বলিল,—আপনার এখানকার ব্যবস্থা দেখে সত্যিকার আশ্রম বলে মনে হয়।

নিশানাথবাবু কেবল একটু অম্লরসাক্ত হাসিলেন। ব্যোমকেশ সরবতে চুমুক দিয়া বলিল,—বাঃ, চমৎকার ঠাণ্ডা সরবৎ, কিন্তু বরফ দেওয়া নয়। ফ্রিজিডেয়ার আছে!

নিশানাথ বলিলেন,—তা আছে। —এবার মোটরের টুকরোগুলো আপনাকে দেখাই। ফ্রিজিডেয়ারের অস্তিত্ব যেমন চট করে বলে দিলেন আমার অজ্ঞাত উপহারদাতার নামটাও তেমনি বলে দিন তবে বুঝব।

ব্যোমকেশ মৃদু হাসিয়া বলিল,—নিশানাথবাবু, পৃথিবীর সব রহস্য যদি আপনার ফ্রিজিডেয়ারের মত স্বয়ংসিদ্ধ হত তাহলে আমার মত যারা বুদ্ধিজীবী তাদের অন্ন জুটত না। —ভাল কথা, কাল আপনি আমাকে পঞ্চাশ টাকা না দিয়ে ষাট টাকা দিয়ে এসেছিলেন।

নিশানাথবাবু একটু অপ্রস্তুত হইয়া বলিলেন,—তই নাকি? ভাগ্যে কম টাকা দিইনি। তা ও টাকা আপনার কাছেই থাক, পরে না হয় হিসেব দেবেন।

হিসাব দেওয়া কিন্তু ঘটিয়া ওঠে নাই।

নিশানাথ রোল টপ টেবিল খুলিয়া কয়েকটা মোটরের ভাঙা টুকরা আমাদের সম্মুখে রাখিলেন। স্পার্কিং প্লাগ, ছেড়া রবারের মোটর-হর্নি, টিনের লাল রঙ-করা খেলনা মোটর, সবই রহিয়াছে; ব্যোমকেশ সেগুলিকে দেখিল, কিন্তু বিশেষ ঔৎসুক্য প্রকাশ করিল না। কেবল খেলনা মোটরটিকে সন্তৰ্পণে ধরিয়া ঘুরাইয়া ফিরাইয়া নিরীক্ষণ করিল। বলিল,—এতে কারুর আঙুলের টিপ দেখছি না, একেবারে ঝাড়া মোছা।

নিশানাথ বলিলেন,—আঙুলের ছাপ আমিও খুঁজেছিলাম। কিন্তু কিছু পাইনি। আমার উপহারদাতা খুব সাবধানী লোক।

ব্যোমকেশ বলিল,—হুঁ। মোটরের টুকরোগুলো অবশ্য দাতা মহাশয় পাশের মোটর-ভাগাড় থেকে সংগ্রহ করেছেন। এ থেকে একটা কথা আন্দাজ করা যায়৷।

কী আন্দাজ করা যায়?

দাতা মহাশয় কাছেপিঠের লোক। এখানে আশেপাশে কোনও বসতি আছে নাকি?

না। মাইলখানেক আরও এগিয়ে গেলে মোহনপুর গ্রাম পাওয়া যায়। আমার মালীরা সেখান থেকেই কাজ করতে আসে।

মোহনপুরে ভদ্রশ্রেণীর কেউ থাকে?

দু এক ঘর থাকতে পারে, কিন্তু বেশির ভাগই চাষাভুষো! তাদের কাউকে আমি চিনিও না। অবশ্য মালীদের ছাড়া।

সুতরাং সেদিক থেকে উপহার পাবার কোনও সম্ভাবনা নেই, কারণ যিনি উপহার পাঠাচ্ছেন তিনি ভদ্রশ্রেণীর লোক। চলুন এবার আপনারা, কলোনী পরিদর্শন করা যাক।

কলোনী পরিদর্শনের প্রকৃত উদ্দেশ্য যে কলোনীর মানুষগুলিকে, বিশেষ নারীগুলিকে চক্ষুষ করা, একথা আমরা সকলে মনে মনে জানিলেও মুখে কেহই তাহা প্রকাশ করিল না। নিশানাথবাবু আমাদের জন্য তিনটি ছাতা সংগ্ৰহ করিয়া রাখিয়াছিলেন, আমরা ছাতা মাথায় দিয়া বাহির হইলাম। তিনি নিজে একটি সোলা-হ্যাট পরিয়া লইলেন। কালো কাচের চশমা তাঁহার চোখেই ছিল।

Imageএইখানে, উদ্যান পরিক্রম আরম্ভ করিবার আগে, গোলাপ কলোনীর একটি নক্সা পাঠকদের সম্মুখে স্থাপন করিতে চাই। নক্সা থাকিলে দীর্ঘ বর্ণনার প্রয়োজন হইবে না। —

-----------------------------------------------------

১। নিশানাথ গৃহ; ২। বিজয়ের ঘর; ৩। বনলক্ষ্মীর ঘর; ৪। ভুজঙ্গধরের ঘর ও ঔষধালয়; ৫। ব্ৰজদাসের ঘর; ৬। রসিকের ঘর; ৭। কৃপা; ৮। আস্তাবল ও মুস্কিলের ঘর; ৯। গোশালা ও পানুর ঘর; ১০। মুকুল ও নেপালের ঘর; ১১। ভোজনকক্ষ ও পাকশালা; ১২। অব্যবহৃত হট-হাউস; ১৩। সামরিক মোটরের সমাধিক্ষেত্ৰ।

----------------------------------------------

বাড়ি হইতে বাহির হইয়া আমরা বাঁ দিকের পথ ধরিলাম। সুরকি-ঢাকা পথ সঙ্কীর্ণ কিন্তু পরিচ্ছন্ন, বাঁকিয়া বাঁকিয়া কলোনীর সমস্ত গৃহগুলিকে সংযুক্ত করিয়া রাখিয়াছে।

প্রথমেই পড়িল ফটকের পাশে লম্বা টানা একটা ঘর। মাথার উপর টালির ফাঁকে ফাঁকে কাচ বসানো, দেওয়ালেও বড় বড় কাচের জানালা! কিন্তু ঘরটি অনাদৃত, কাচগুলি অধিকাংশই ভাঙিয়া গিয়াছে; অন্ধের চক্ষুর মত ভাঙা ফোকরের ভিতর দিয়া কেবল অন্ধকার দেখা যায়।

ব্যোমকেশ জিজ্ঞাসা করিল,—এটা কি?

নিশানাথ বলিলেন,—হট-হাউস করেছিলাম, এখন পড়ে আছে। বেশি শীত বা গরম পড়লে কচি চারাগাছ এনে রাখা হয়।

পাশ দিয়া যাইবার সময় ভাঙা দরজা দিয়া উঁকি মারিয়া দেখিলাম, ভিতরে কয়েকটা ধূলিধূসর বেঞ্চি পড়িয়া আছে। মেঝের উপর কতকগুলি মাটিভরা চ্যাঙারি রহিয়াছে, তাহাতে নবাঙ্কুরিত গাছের চারা।

এখান হইতে সম্মুখের সীমানার সমান্তরাল খানিক দূর অগ্রসর হইবার পর গোহালের কাছে উপস্থিত হইলাম। চেঁচারির বেড়া দিয়া ঘেরা অনেকখানি জমি, তাহার পিছন দিকে লম্বা খড়ের চালা; চালার মধ্যে অনেকগুলি গরু-বাছুর বাঁধা রহিয়াছে। খোলা বাথানে খড়ের আটিঁ ডাঁই করা।

গোহালের ঠিক গায়ে একটি ক্ষুদ্র টালি-ছাওয়া কুঠি। আমরা গোহালের সম্মুখে উপস্থিত হইলে একটি লম্বা-চওড়া যুবক কুঠির ভিতর হইতে তাড়াতাড়ি বাহির হইয়া আসিল। গায়ে গেঞ্জি, হাঁটু পর্যন্ত কাপড়; দাঁত বাহির করিয়া হাসিতে হাসিতে আমাদের কাছে আসিয়া দাঁড়াইল।

যুবকের দেহ বেশ বলিষ্ঠ কিন্তু মুখখানি বোকাটে ধরনের। আমাদের কাছে আসিয়া সে দুই কানের ভিতর হইতে খানিকটা তুলা বাহির করিয়া ফেলিল এবং আমাদের পানে চাহিয়া হাবলার মত হাসিতে লাগিল। হাসি কিন্তু সম্পূর্ণ নীরব হাসি, গলা হইতে কোনও আওয়াজ বাহির হইতে শুনিলাম না।

নিশানাথ বলিলেন,—এর নাম পানু। গো-পালন করে তাই ওকে পানুগোপাল বলা হয়। কানে কম শোনে।

পানুগোপাল পূর্ববৎ হাসিতে লাগিল, সে নিশানাথবাবুর কথা শুনিতে পাইয়াছে বলিয়া মনে হইল না। নিশানাথবাবু একটু গলা চড়াইয়া বলিলেন,—পানুগোপাল, তোমার গরু-বাছুরের খবর কি? সব ভাল তো?

প্ৰত্যুত্তরে পানুগোপালের কণ্ঠ হইতে ছাগলের মত কম্পিত মিহি আওয়াজ বাহির হইল। চমকিয়া তাহার মুখের পানে চাহিয়া দেখিলাম সে প্ৰাণপণে কথা বলিবার চেষ্টা করিতেছে, কিন্তু মুখ দিয়া কথা বাহির হইতেছে না। নিশানাথবাবু হাত তুলিয়া তাহাকে নিরস্ত করিলেন, খাটো গলায় বলিলেন,—‘পানু যে একেবারে কথা বলতে পারে না তা নয়, কিন্তু একটু উত্তেজিত হলেই কথা আটকে যায়। ছেলেটা ভাল, কিন্তু ভগবান মেরেছেন।’

অতঃপর আমরা আবার অগ্রসর হইলাম, পানুগোপাল দাঁড়াইয়া রহিল। কিছু দূর গিয়া ঘাড় ফিরাইয়া দেখিলাম পানুগোপাল আবার কানে তুলা গুজিতেছে।

জিজ্ঞাসা করিলাম,—পানুগোপাল কানে তুলো গোঁজে কেন?

নিশানাথ বলিলেন,—কানে পুঁজ হয়।

কিছুদূর চলিবার পর বাঁ দিকে রাস্তার একটা শাখা গিয়াছে দেখিলাম; রাস্তাটি নিশানাথবাবুর বাড়ির পিছন দিক দিয়া গিয়াছে, মাঝে পাতা—বাহার ক্রোটন গাছে ভরা জমির ব্যবধান। এই রাস্তার মাঝামাঝি একটি লম্বাটে গোছের বাড়ি। নিশানাথবাবু সেই দিকে মোড় লইয়া বলিলেন,—‘চলুন, আমাদের রান্নাঘর খাবারঘর দেখবেন।’

পূর্বে শুনিয়াছি মুকুল নামে একটি মেয়ে কলোনীর রান্নাবান্না করে। অনুমান করিলাম মুকুলকে দেখাইবার জন্যই নিশানাথবাবু আমাদের এদিকে লইয়া যাইতেছেন।

ভোজনালয়ে উপস্থিত হইয়া দেখা গেল, একটি লম্বা ঘরকে তিন ভাগ করা হইয়াছে; একপাশে রান্নাঘর, মাঝখানে আহারের ঘর এবং অপর পাশে স্নানাদির ব্যবস্থা। রান্নাঘর হইতে ছ্যাকছোঁক শব্দ আসিতেছিল, নিশানাথবাবু সে দিকে চলিলেন।

আমাদের সাড়া পাইয়া দময়ন্তী দেবী রান্নাঘরের দ্বারে আসিয়া দাঁড়াইলেন; কোমরে আঁচল জড়ানো, হাতে খুন্তি। তাঁহাকে এই নূতন পরিবেশের মধ্যে দেখিয়া মনে হইল, আগে যাঁহাকে দেখিয়াছিলাম ইনি সে-মানুষ নন, সম্পূর্ণ আলাদা মানুষ। প্রথমে দূর হইতে দেখিয়া একরকম মনে হইয়াছিল, তারপর সরবতের ট্রে হাতে তাঁহার অন্যরূপ আকৃতি দেখিয়াছিলাম, এখন আবার আর এক রূপ। কিন্তু তিনটি রূপই প্ৰীতিকর।

দময়ন্তী দেবী একটু উৎকণ্ঠিতভাবে স্বামীর মুখের পানে চাহিলেন। নিশানাথ বলিলেন,—তুমি রান্না করছ? মুকুল কোথায়?

দময়ন্তী দেবী বলিলেন,—মুকুলের বড় মাথা ধরেছে, সে রান্না করতে পারবে না। শুয়ে আছে।

নিশানাথ ভ্রুকুঞ্চিত করিয়া বলিলেন,—তাহলে বনলক্ষ্মীকে ডেকে পাঠাওনি কেন? সে তোমাকে যোগান দিতে পারত।

দময়ন্তী বলিলেন,—দরকার নেই, আমি একলাই সামলে নেব।

নিশানাথের ভ্রুকুঞ্চিত হইয়া রহিল, তিনি আর কিছু না বলিয়া ফিরিলেন। এই সময় স্নানঘরের ভিতর হইতে একটি যুবক তোয়ালে দিয়া মাথা মুছতে মুছিতে বাহির হইয়া আসিল,—‘কাকিমা, শীগগির শীগগির—এখনি কলকাতা যেতে হবে—’ এই পর্যন্ত বলিবার পর সে তোয়ালে হইতে মুখ বাহির করিয়া আমাদের দেখিয়া থামিয়া গেল।

দময়ন্তী বলিলেন,—‘আসন, পেতে বোসো, ভাত দিচ্ছি। সব রান্না কিন্তু হয়নি এখনও।’ তিনি রান্নাঘরের মধ্যে অদৃশ্য হইলেন।

আমাদের সম্মুখে যুবক মানসিক্ত নগ্নদেহে বিশেষ অপ্ৰস্তুত হইয়া পড়িয়াছিল, সে তোয়ালে গায়ে জড়াইয়া আসন পাতিতে প্ৰবৃত্ত হইল। তাহার বয়স আন্দাজ ছাব্বিশ-সাতাশ, বলবান সুদৰ্শন চেহারা। নিশানাথ অপ্ৰসন্নভাবে তাঁহাকে নিরীক্ষণ করিয়া বলিলেন,—বিজয়, তুমি এখনও কাজে যাওনি?

বিজয় কাচুমাচু হইয়া বলিল,—আজ দেরি হয়ে গেছে কাকা। —হিসেবটা তৈরি করছিলাম—

নিশানাথ জিজ্ঞাসা করিলেন,—হিসেব কতদূর?

আর দু'তিন দিন লাগবে।

ওষ্ঠাধর দৃঢ়বদ্ধ করিয়া নিশানাথ দ্বারের দিকে চলিলেন, আমরা অনুবর্তী হইলাম। হিসাব লইয়া গোলাপ কলোনীতে একটা গোলযোগ পাকাইয়া উঠিতেছে মনে হইল।

দ্বারের নিকট হইতে পিছন ফিরিয়া দেখি, বিজয় বিস্ময়-কৌতুহলী চক্ষে আমাদের পানে তাকাইয়া আছে। আমার সহিত চোখাচোখি হইতে সে ঘাড় নিচু করিল।

বাহিরে আসিয়া ব্যোমকেশ নিশানাথবাবুকে জিজ্ঞাসা করিল,—আপনার ভাইপো? উনিই বুঝি ফুলের দোকান দেখেন?

হ্যাঁ।

পাঁচ

যেদিক দিয়া আসিয়াছিলাম সেই দিক দিয়াই ফিরিয়া চলিলাম। মোড় পর্যন্ত পৌঁছিবার আগেই দেখা গেল সম্মুখের রাস্তা দিয়া একটি যুবতী এক ঝাঁক পাতিহাস তাড়াইয়া লইয়া যাইতেছে।

যুবতী আমাদের দেখিতে পায় নাই। তাহার মাথার কাপড় খোলা, পরনে মোটা তাঁতের লুঙ্গি-ডুরে শাড়ি, দেহে ভরা যৌবন। অন্যমনস্কভাবে যাইতে যাইতে আমাদের দিকে চোখ ফিরাইয়া যুবতী লজ্জায় যেন শিহরিয়া উঠিল। ক্ষিপ্ৰহস্তে মাথার উপর ঘোমটা টানিয়া দিয়া সে তাড়াতাড়ি হাঁসগুলিকে পিছনে ফেলিয়া চলিয়া গেল। কলোনীর পিছন দিকে প্ৰকাণ্ড ইন্দারার পাশে কয়েকটা ঘর রহিয়াছে, সেইখানে অদৃশ্য হইয়া গেল।

নিশানাথ বলিলেন,—মুস্কিলের বৌ। কলোনীর হাঁস-মুরগীর ইন-চার্জ।

মনে আবার একটা বিস্ময়ের ধাক্কা লাগিল। এখানে কি প্রভু-ভৃত্য সকলেরই দ্বিতীয় পক্ষ? ব্যোমকেশ জিজ্ঞাসা করিল,—ওদিকে কোথায় গেল?

নিশানাথ বলিলেন,—ওদিকটা আস্তাবল। মুস্কিলও ওখানেই থাকে।

ব্যোমকেশ বলিল,—ভদ্রঘরের মেয়ে বলে মনে হয়।

ওদের মধ্যে কে ভদ্র, কে অভদ্র বলা শক্ত। জাতের কড়াকড়ি নেই কিনা।

কিন্তু পর্দার কড়াকড়ি আছে।

আছে, তবে খুব বেশি নয়। আমাদের দেখে নজর বিবি এখন আর লজ্জা করে না। আপনারা নতুন লোক, তাই বোধহয় লজ্জা পেয়েছে।

নজর বিবি! নামটা যেন সুনয়নার কাছ ঘেঁষিয়া যায়! চকিতে মাথায় আসিল, যে স্ত্রীলোক খুন করিয়া আত্মগোপন করিতে চায়, মুসলমান অন্তঃপুরের চেয়ে আত্মগোপনের প্রকৃষ্টতর স্থান সে কোথায় পাইবে? আমি রমেনবাবুর দিকে সরিয়া গিয়া চুপিচুপি জিজ্ঞাসা করিলাম,—কেমন দেখলেন?

রমেনবাবু দ্বিধাভরে মাথা চুলকাইয়া বলিলেন,—উহুঁ, নেত্যকালী নয় —কিন্তু—কিছু বলা যায় না—

বুঝিলাম, রমেনবাবু নেত্যকালীর মেক-আপ করিবার অসামান্য ক্ষমতার কথা ভাবিতেছেন। কিন্তু মুস্কিল মিঞার বৌ দিবারাত্ৰ মেক-আপ করিয়া থাকে ইহাই বা কি করিয়া সম্ভব?

ইতিমধ্যে আমরা আর একটি বাড়ির সম্মুখীন হইতেছিলাম। ভোজনালয় যে রাস্তার উপর তাহার পিছনে সমান্তরাল একটি রাস্তা গিয়াছে, এই রাস্তার মাঝামাঝি স্থানে একটি কুঠি। ব্যোমকেশ জিজ্ঞাসা করিল,—এখানে কে থাকে?

নিশানাথ বলিলেন,—এখানে থাকেন প্রফেসার নেপাল গুপ্ত আর তাঁর মেয়ে মুকুল।

ব্যোমকেশ বলিল,—নেপাল গুপ্ত-নামটা চেনা-চেনা ঠেকছে। বছর তিন-চার আগে এর নাম কাগজে দেখেছি মনে হচ্ছে।

নিশানাথ বলিলেন,—অসম্ভব নয়। নেপালবাবু এক কলেজে কেমিস্ট্রির অধ্যাপক ছিলেন। তিনি রাত্রে গিয়ে ল্যাবরেটরিতে কাজ করতেন। একদিন ল্যাবরেটরিতে বিরাট বিস্ফোরণ হল, নেপালবাবু গুরুতর আহত হলেন। কর্তৃপক্ষ সন্দেহ করলেন নেপালীবাবু লুকিয়ে লুকিয়ে বোমা তৈরি করছিলেন। চাকরি তো গেলই, পুলিসের নজরবন্দী হয়ে রইলেন। যুদ্ধের পর পুলিসের শুভদৃষ্টি থেকে মুক্তি পেলেন বটে। কিন্তু চাকরি আর জুটল না। বিস্ফোরণের ফলে তাঁর চেহারা এবং চরিত্র দুই-ই দাগী হয়ে গিয়েছে।

সত্যিই কি উনি বোমা তৈরি করছিলেন? উনি নিজে কি বলেন?

নিশানাথ মুখ টিপিয়া হাসিলেন,—উনি বলেন গাছের সার তৈরি করছিলেন।

আমরা হাসিয়া উঠিলাম। নিশানাথ বলিয়া চলিলেন,—‘এখানে এসেও সার তৈরি করা ছাড়েননি। বাড়িতে ল্যাবরেটরি করেছেন, অর্থাৎ গ্যাস-সিলিন্ডার, বুনসেন বানার, টেস্ট-টিউব, রেটর্ট ইত্যাদি যোগাড় করেছেন। একবার খানিকটা সার তৈরি করে আমাকে দিলেন, বললেন, পেঁপে গাছের গোড়ায় দিলে ইয়া ইয়া পেঁপে। ফলবে। আমার ইচ্ছে ছিল না, কিন্তু উনি শুনলেন না—

শেষ পর্যন্ত কি হল?

পোপে গাছগুলি সব মরে গেল।

নেপালবাবুর কুঠিতে প্রবেশ করিলাম। বাহিরের ঘরে তক্তপোশের উপর একটি অর্ধ-উলঙ্গ বৃদ্ধ থাবা গাড়িয়া বসিয়া আছেন, তাঁহার সম্মুখে দাবার ছক। ছকের উপর কয়েকটি ঘুটি সাজানো রহিয়াছে, বৃদ্ধ একাগ্র দৃষ্টিতে সেইদিকে চাহিয়া আছেন। সেই যে ইংরেজি খবরের কাগজে দাবা খেলার ধাঁধা বাহির হয়, সাদা ঘুটি প্রথমে চাল দিবে এবং তিন চালে মাত করিবে, বোধহয় সেই জাতীয় ধাঁধার সমাধান করিতেছেন। আমরা দ্বারের বাহিরে আসিয়া দাঁড়াইলাম; কিন্তু তিনি জানিতে পারিলেন না।

নিশানাথবাবু আমাদের দিকে চাহিয়া একটু হাসিলেন। বুঝিলাম ইনিই বোমারু অধ্যাপক নেপাল গুপ্ত।

নেপালবাবু বয়সে নিশানাথের সমসাময়িক, কিন্তু গুণ্ডার মত চেহারা। গায়ের রঙ তামাটে কালো, মুখের একটা পাশ পুড়িয়া ঝামার মত কৰ্কশ ও সচ্ছিদ্র হইয়া গিয়াছে, বোধকরি বোমা বিস্ফোরণের চিহ্ন। তাঁহার মুখখানা স্বাভাবিক অবস্থায় হয়তো এতটা ভয়াবহ ছিল না, কিন্তু এখন দেখিলে বুক গুরগুর করিয়া ওঠে।

নিশানাথ ডাকিলেন,—কি হচ্ছে প্রফেসর?

নেপালবাবু দাবার ছক হইতে চোখ তুলিলেন, তখন তাঁহার চোখ দেখিয়া আরও ভয় পাইয়া গেলাম। চোখ দুটো আকারে হাঁসের ডিমের মত এবং মণির চারিপাশে রক্ত যেন জমাট হইয়া আছে। দৃষ্টি বাঘের মত উগ্ৰ।

তিনি হেঁড়ে গলায় বলিলেন,—নিশানাথ! এস। সঙ্গে কারা?

দেখিলাম নেপালবাবু আশ্রয়দাতার সঙ্গে সমকক্ষের মত কথা বলেন, এমন কি কণ্ঠস্বরে একটু মুরুবিয়ানাও প্রকাশ পায়।

আমরা ঘরে প্রবেশ করিলাম। নেপালবাবু শিষ্টতার নিদর্শন স্বরূপ হাঁটু দুটির উপর কেবল একটু কাপড় টানিয়া দিলেন। নিশানাথ বলিলেন,—এঁরা কলকাতা থেকে বাগান দেখতে এসেছেন।

নেপালবাবুর গলায় অবজ্ঞাসূচক একটি শব্দ হইল, তিনি বলিলেন,—বাগানে দেখবার কি আছে তোমার? আমার সার যদি লাগাতে তাহলে বটে দেখবার মত হত।

নিশানাথ বলিলেন,—তোমার সার লাগালে আমার বাগান মরুভূমি হয়ে যেত।

নেপালবাবু। গরম স্বরে বলিলেন,—দেখ নিশানাথ, তুমি যা বোঝা না তা নিয়ে তর্ক কোরো না। সয়েল কেমিষ্ট্রর কী জানো তুমি? পেঁপেগাছগুলো মরে গেল তার কারণ সারের মাত্রা বেশি হয়েছিল—‘তোমার মালীগুলো সব উল্লুক।’ বলিয়া একটা আধাপোড়া বির্মা চুরুট তক্তপোশ হইতে তুলিয়া লইয়া বজ্র-দন্তে কামড়াইয়া ধরিলেন।

নিশানাথ বলিলেন,—সে যাক, এখন নতুন গবেষণা কি হচ্ছে?

নেপালবাবু চুরুট ধরাইতে ধরাইতে বলিলেন,—তামাক নিয়ে experiment আরম্ভ করেছি।

এবার কি মানুষ মারবে?

নেপালবাবু চোখ পাকাইয়া তাকাইলেন,—মানুষ মারব! নিশানাথ, তোমার বুদ্ধিটা একেবারে সেকেলে, জ্ঞান-বিজ্ঞানের ধার দিয়ে যায় না। বিজ্ঞানের কৌশলে বিষও অমৃত হয়, বুঝেছ?

ঠোঁটের কোণে গোপন হাসি লইয়া নিশানাথ বলিলেন,—তামাক থেকে যখন অমৃত বেরুবে তখন তোমাকে কিন্তু প্ৰথম চেখে দেখতে হবে। —এখন যাই, বেলা বাড়ছে, এঁদের বাকী বাগানটা দেখিয়ে বাড়ি ফিরব। হ্যাঁ, ভাল কথা, মুকুলের নাকি ভারি মাথা ধরেছে?

নেপালবাবু উত্তর দিবার পূর্বে ঘনঘন চুরুট টানিয়া ঘরে বাতাস কটু করিয়া তুলিলেন, শেষে চাহিয়া বলিলেন,—‘মুকুলের মাথা! কি জানি, ধরেছে বোধহয়।’ অবহেলাভরে এই তুচ্ছ প্রসঙ্গ শেষ করিয়া বলিলেন,—‘অবৈজ্ঞানিক লো-ম্যান হলেও তোমাদের জানা উচিত যে, নতুন ওষুধ প্ৰথমে ইত্যর প্রাণীর ওপর পরীক্ষা করে দেখতে হয়, যেমন ইঁদুর, গিনিপিগ। তাদের ওপর যখন ফল ভাল হয় তখন মানুষের ওপর পরীক্ষা করতে হয়।’

কিন্তু মানুষের ওপর ফল যদি মারাত্মক হয়?

এমন মানুষের ওপর পরীক্ষা করতে হয় যারা মরলেও ক্ষতি নেই। অনেক অপদার্থ লোক আছে যারা ম'লেই পৃথিবীর মঙ্গল।

‘তা আছে।’ অর্থপূর্ণভাবে এই কথা বলিয়া নিশানাথ দ্বারের দিকে চলিলেন। কিন্তু ব্যোমকেশের বোধহয় এত শীঘ্ৰ যাইবার ইচ্ছা ছিল না, সে নেপালবাবুকে জিজ্ঞাসা করিল,—আপনি বুঝি ভাল দাবা খেলেন?

এতক্ষণে নেপালবাবু ব্যোমকেশকে ভাল করিয়া লক্ষ্য করিলেন, ব্যাঘ্রচক্ষে চাহিয়া বলিলেন,—আপনি জানেন দাবা খেলতে?

ব্যোমকেশ সবিনয়ে বলিল,—সামান্য জানি।

নেপালবাবু ছকের উপর ঘুঁটি সাজাইতে সাজাইতে বলিলেন,—আসুন, তাহলে এক দান খেলা যাক।

নিশানাথ বলিলেন,—আরে না না, এখন দাবায় বসলে দুঘন্টাতেও খেলা শেষ হবে না।

নেপালবাবু বলিলেন,—দশ মিনিটেও শেষ হয়ে যেতে পারে। —আসুন।

ব্যোমকেশ আমাদের দিকে একবার চোখের ইশারা করিয়া খেলায় বসিয়া গেল। মুহূৰ্তমধ্যে দুজনের আর বাহ্যজ্ঞান রহিল না। নিশানাথ খাটো গলায় বলিলেন,—‘নেপাল খেলার লোক পায় না, আজ একজনকে পাকড়েছে, সহজে ছাড়বে না,—চলুন, আমরাই ঘুরে আসি।’ .

বাহির হইলাম। আমরা যে-উদ্দেশ্যে ঘুরিয়া বেড়াইতেছি। তাহাতে ব্যোমকেশের উপস্থিতি অত্যাবশ্যক নয়, রমেনবাবুর উপস্থিতিই আসল।

বাড়ির বাহিরে আসিয়া পিছন দিকে জানালা খোলার শব্দে আমরা তিনজনেই পিছু ফিরিয়া চাহিলাম। বাড়ির পাশের দিকে একটা জানালা খুলিয়া গিয়াছে এবং একটি উনিশ-কুড়ি বছরের মেয়ে রুক্ষ উৎকণ্ঠগভরা চক্ষে আমাদের দিকে চাহিয়া আছে। আমরা ফিরিতেই সে দ্রুত জানালা বন্ধ করিয়া দিল।

এক নজর দেখিয়া মনে হইল মেয়েটি দেখিতে ভাল; রঙ ফরসা, কোঁকড়া চুল, মুখের গড়ন একটু কঠিন গোছের। রমেনবাবু স্থাণুর মত দাঁড়াইয়া একদৃষ্টি বন্ধ জানালার দিকে তাকাইয়া ছিলেন, বলিলেন,—ও কে?

নিশানাথ বলিলেন,—মুকুল—নেপালবাবুর মেয়ে।

রমেনবাবু গভীর নিশ্বাস টানিয়া আবার সশব্দে ত্যাগ করিলেন,—ওকে আগে দেখেছি।-সিনেমার স্টুডিওতে দেখেছি—

নিশানাথ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করিয়া শেষে মৃদুস্বরে বলিলেন,—কিন্তু ও সুনয়না নয়?

রমেনবাবু ধীরে ধীরে মাথা নাড়িলেন,—না-বোধ হয়—সুনয়না নয়।

ছয়

রাস্তা দিয়া চলিতে চলিতে নিশানাথবাবুকে প্রশ্ন করিলাম,—আচ্ছা, নেপালবাবুরা কতদিন হল এখানে এসেছেন?

নিশানাথ বলিলেন,—প্রায় দু’বছর আগে। এক-আধ মাস কম হতে পারে।

মনে মনে নোট করিলাম, সুনয়না প্রায় ঐ সময় কলিকাতা হইতে নিরুদ্দেশ হইয়াছিল। জিজ্ঞাসা করিলাম,—ঠিক ঠিক সময়টা মনে নেই?

নিশানাথ চিন্তা করিয়া বলিলেন,—দু’বছর আগে, বােধহয় সেটা জুলাই মাস। মনে আছে, আমার স্ত্রী লেখাপড়া ছেড়ে দেবার দু-তিন দিন পরেই ওরা এসেছিল।

আপনার স্ত্রী-লেখাপড়া—

আমার স্ত্রীর মাঝে লেখাপড়া আর বিলিতি আদবাকায়দা শেখাবার শখ হয়েছিল। মাস আষ্টেক-দশ নিয়মিত কলকাতা যাতায়াত করেছিলেন, একটা, বিলিতি মেয়ে-স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পোষালো না। উনি স্কুল ছেড়ে দিয়ে বাড়ি এসে বসবার দু-তিন দিন পরে নেপালবাবু মুকুলকে নিয়ে উপস্থিত হলেন।

সংবাদটি হজম করিয়া পূর্ব-প্রসঙ্গে ফিরিয়া গেলাম,—নেপালীবাবু কলোনীর কোন কাজ করেন?

নিশানাথ অম্লতিক্ত হাসিলেন,—বৈজ্ঞানিক গবেষণা করেন, দাবা খেলেন, আর সব কাজে আমার খুঁত ধরেন।

আপনার খুঁত ধরেন?

হ্যাঁ, আমি যে-ভাবে কলোনীর কাজ চালাই ওঁর পছন্দ হয় না। ওঁর বিশ্বাস, ওঁর হাতে পরিচালনার ভার দিলে ঢ়ের ভাল চালাতে পারেন।

উনি তাহলে কোনও কাজই করেন না?

একটু নীরব থাকিয়া নিশানাথ বলিলেন,—মুকুল খুব কাজের মেয়ে।

মুকুল কাজের মেয়ে হইতে পারে; পিতার নৈষ্কর্ম সে নিজের পরিশ্রম দিয়া পুরাইয়া দেয়। কিন্তু আমরা আসিব শুনিয়া তাহার মাথা ধরিল কেন? এবং জানালা দিয়া লুকাইয়া আমাদের পর্যবেক্ষণ করিবারই বা তাৎপৰ্য কি?

মোড়ের কাছে আসিয়া পৌছিলাম। সামনে পিছনে রাস্তা চলিয়া গিয়াছে, রাস্তার ধারে দূরে দূরে কয়েকটি কুঠি (নক্সা পশ্য)। কুঠিগুলির ব্যবধানস্থল পূর্ণ করিয়া রাখিয়াছে গােলাপ ও অন্যান্য ফুলের গাছ। প্রচুর জলসিঞ্চন সত্ত্বেও ফুলগাছগুলি মুহ্যমান।

মোড়ের উপর দাঁড়াইয়া নিশানাথ পিছনের কুঠির দিকে আঙুল দেখাইয়া বলিলেন,—সবশেষের কুঠিতে রসিক থাকে। তার এদিকের কুঠি ব্ৰজদাসের। ঐ যে ব্ৰজদাস বারান্দায় বসে কি করছে।

তিনি সেইদিকে আগাইয়া গেলেন,—কি হে ব্ৰজদাস, কি হচ্ছে?

কুঠির বারান্দায় একটি প্রবীণ ব্যক্তি মাটিতে বসিয়া একটা হামানদিস্তা দুই পায়ে ধরিয়া কিছু কুটিতেছিলেন। বেঁটে গোলগাল লোকটি, মাথায় পাকা চুলের বাবরি, গলায় কন্ঠি, কপালে হরিচন্দনের তিলক। নিশানাথের গলা শুনিয়া তিনি সসম্ভ্রমে উঠিয়া দাঁড়াইলেন এবং হাস্যমুখে বলিলেন,—একটা গরু রুগিয়েছে, তার জন্যে জোলাপ তৈরি করছি—নিমের পাতা, তিলের খোল আর এন্ডির বিচি৷

বেশ বেশ। যদি পারো প্রফেসার গুপ্তকে একটু খাইয়ে দিও, উপকার হবে। বলিয়া নিশানাথ ফিরিয়া চলিলেন।

বৈষ্ণব ব্ৰজদাস মিটমিটি হাসিতে হাসিতে দাঁড়াইয়া রহিলেন। তাঁহার চক্ষু দুটি কিন্তু বৈষ্ণবোচিত ভাবাবেশে ঢুলু ঢুলু নয়, বেশ সজাগ এবং সতর্ক। দুইজন আগন্তুককে দেখিয়া তাঁহার চক্ষে যে জিজ্ঞাসা জাগিয়া উঠিল। তাহা তিনি মুখে প্রকাশ করিলেন না। নিশানাথও পরিচয় দিলেন না।

ফিরিয়া চলিতে চলিতে নিশানাথ বলিলেন,—ব্ৰজদাস চিরকাল বৈষ্ণব ছিল না। ও বৈষ্ণব হয়ে গরু-বাছুরগুলোর ভারী সুখ হয়েছে। বড় যত্ন করে, গো-বদ্যির কাজও শিখেছে। গো-সেবা বৈষ্ণবের ধর্ম কিনা৷

নিশানাথবাবুর কথার মধ্যে একটু শ্লেষের ছিটা ছিল। প্রশ্ন করিলাম,—উনি বৈষ্ণব হওয়ার আগে কী ছিলেন?

নিশানাথ বলিলেন,—জজ-সেরেস্তার কেরানি। ওকে অনেকদিন থেকে জানি। মাইনে বেশি পেত না কিন্তু গান-বাজনা ফুর্তির দিকে ঝোঁক ছিল। সেরেস্তার কেরানিরা উপরি টাকাটা সিকেটা নিয়েই থাকে। কিন্তু ব্ৰজদাস একবার একটা গুরুতর দুষ্কার্য করে বসল। ঘুষ নিয়ে দপ্তর থেকে একটা জরুরী দলিল সরিয়ে ফেলল৷

তারপর?

তারপর ধরা পড়ে গেল। ঘটনাচক্ৰে আমিই ওকে ধরে ফেললাম। আদালতে মামলা উঠল, আমাকে সাক্ষী দিতে হল। ছ’বছরের জন্যে ব্ৰজদাস শ্ৰীঘর গেল। ইতিমধ্যে আমি চাকরি ছেড়ে কলোনী নিয়ে পড়েছি, জেল থেকে বেরিয়ে ব্ৰজদাস সটান এখানে এসে উপস্থিত। দেখলাম, একেবারে বদলে গেছে; জেলের লাপসি খেয়ে খাঁটি বৈষ্ণব হয়ে উঠেছে। আমি সাক্ষী দিয়ে জেলে পাঠিয়েছিলাম। সেজন্যে আমার ওপর রাগ নেই। বরং কৃতজ্ঞতায় গদগদ। সেই থেকে আছে।

বলিলাম,—বৃদ্ধ বেশ্যা তপস্বিনী।

নিশানাথ একটু নীরব থাকিয়া বলিলেন,—ঠিক তাও নয়। ওর মনের একটা পরিবর্তন হয়েছে। আধ্যাত্মিক উন্নতির কথা বলছি না। তবে লক্ষ্য করেছি ও মিথ্যে কথা বলে না।

কথা বলিতে বলিতে আমরা আর একটা কুঠির সম্মুখে আসিয়া পৌঁছিয়াছিলাম, শুনিতে পাইলাম কুঠির ভিতর হইতে মৃদু সেতারের আওয়াজ আসিতেছে। আমার সপ্রশ্ন দৃষ্টির উত্তরে নিশানাথ বলিলেন,—ডাক্তার ভুজঙ্গাধর। ওর সেতারের শখ আছে।

রমেনবাবু একাগ্ৰ মনে শুনিয়া বলিলেন,—খাসা হাত। গৌড়-সারঙ বাজাচ্ছেন।

ডাক্তার ভূজঙ্গধর বোধহয় জানালা দিয়া আমাদের দেখিতে পাইয়াছিলেন, সেতারের বাজনা থামিয়া গেল। তিনি বারান্দায় আসিয়া দাঁড়াইলেন, বলিলেন,—একি মিস্টার সেন, রোদ্দুরে দাঁড়িয়ে কেন? রোদ লাগিয়ে ব্লাড়-প্রেসার বাড়াতে চান?

ডাক্তার ভুজঙ্গাধরের বয়স আন্দাজ চল্লিশ, দৃঢ় শরীর, ধারালো মুখ। মুখের ভাব একটু ব্যঙ্গ-বঙ্কিম; যেন বুদ্ধির ধার সিধা পথে যাইতে না পাইয়া বিদ্রুপের বাঁকা পথ ধরিয়াছে।

নিশানাথ বলিলেন,—এদের বাগান দেখাচ্ছি।

ডাক্তার বলিলেন,—বাগান দেখাবার এই সময় বটে। তিনজনেরই সর্দিগর্মি হবে তখন হ্যাপা সামলাতে হবে এই নাম-কাটা ডাক্তারকে।

না, আমরা এখনি ফিরব। কেবল বনলক্ষ্মীকে একবার দেখে যাব।

ডাক্তার বাঁকা হাসিয়া বলিলেন,—কোন বলুন দেখি? বনলক্ষ্মী বুঝি আপনার বাগানের একটি দর্শনীয় বস্তু, তাই এদের দেখাতে চান?

নিশানাথ সংক্ষেপে বলিলেন,—সেজন্যে নয়, অন্য দরকার আছে।

ও—তাই বলুন—তা ওকে ওর ঘরেই পাবেন বোধহয়। এত রোদ্দুরে সে বেরুবে না, ননীর অঙ্গ গলে যেতে পারে।

ডাক্তার, তুমি বনলক্ষ্মীকে দেখতে পার না কেন বল দেখি?

ডাক্তার একটু জোর করিয়া হাসিলেন,—আপনারা সকলেই তাকে দেখতে পারেন, আমি দেখতে না পারলেও তার ক্ষতি নেই। —সে। যাক, আপনার আবার রক্তদান করবার সময় হল।

এখনো দরকার বোধ করছি না। বলিয়া নিশানাথ চলিতে আরম্ভ করিলেন।

সাত

জিজ্ঞাসা করিলাম,—রক্তদানের কথা কি বললেন ডাক্তার?

নিশানাথ বলিলেন,—ব্লাড়-প্রেসারের জন্যে আমি ওষুধ-বিষুধ বিশেষ খাই না, চাপ বাড়লে ডাক্তার এসে সিরিঞ্জ দিয়ে খানিকটা রক্ত বার করে দেয়। সেই কথা বলছিলাম। প্রায় মাসখানেক রক্ত বার করা হয়নি।

এই সময় ব্যোমকেশ পিছন হইতে আসিয়া আমাদের সঙ্গে যোগ দিল। নিশানাথ অবাক হইয়া বলিলেন,—এ কি! এরি মধ্যে খেলা শেষ হয়ে গেল?

ব্যোমকেশের মুখ বিমর্ষ। সে বলিল,—নেপালবাবু লোকটি অতি ধূর্ত এবং ধড়িবাজ।

কী হয়েছে?

কোন দিক দিয়ে আক্রমণ করছে কিছু বুঝতেই দিল না। তারপর যখন বুঝলাম তখন উপায়। নেই। মাত হয়ে গেলাম।

আমরা হাসিলাম। ব্যোমকেশ বলিল,—হাসি নয়। নেপালাবাবুকে দেখে মনে হয় হোৎকা, কিন্তু আসলে একটি বিচ্ছু।

আমরা আবার হাসিলাম। ব্যোমকেশ তখন এই অরুচিকর প্রসঙ্গ পাল্টাইবার জন্য বলিল,—পিছনের কুঠির বারান্দায় যাঁকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম উনি কে?

উনি ভুতপূর্ব ডাক্তার ভুজঙ্গধর দাস।

উনি এখানে কদ্দিন আছেন?

প্ৰায় বছর চারেক হতে চলল।

বরাবর এইখানেই আছেন?

হ্যাঁ। মাঝে মাঝে দু’চার দিনের জন্যে ডুব মারেন, আবার ফিরে আসেন।

কোথায় যান?

তা জানি না। কখনও জিগ্যেস করিনি, উনিও বলেননি।

এতক্ষণে আমরা বনলক্ষ্মীর কুঠির সামনে উপস্থিত হইলাম। ইহার পর কলোনীর সম্মুখভাগে কেবল একটি কুঠি, সেটি বিজয়ের (নক্সা পশ্য)। আমাদের উদ্যান পরিক্রম প্রায় সম্পূর্ণ হইয়া আসিয়াছে।

নিশানাথবাবু বারান্দার দিকে পা বাড়াইয়া দাঁড়াইয়া পড়িলেন। ভিতর হইতে একটি মেয়ে বাহির হইয়া আসিতেছে; তাহার বাম বাহুর উপর কোঁচানো শাড়ি এবং গামছা, মাথার চুল খোলা। সহসা আমাদের দেখিয়া সে জড়সড়ভাবে দাঁড়াইল এবং ডান কাঁধের উপর কাপড় টানিয়া দিল। দেখিলে বুঝিতে বিলম্ব হয় না যে সে স্নান করিতে যাইতেছে।

নিশানাথবাবু একটু অপ্রতিভ হইয়া সেই কথাই বলিলেন,—বনলক্ষ্মী, তুমি স্নান করতে যাচ্ছ। আজ এত দেরি যে?

বনলক্ষ্মী মুখ নীচু করিয়া বলিল,—অনেক সেলাই বাকি পড়ে গিছিল কাকাবাবু। আজ সব শেষ করলুম।

নিশানাথ আমাদের বলিলেন,—বনলক্ষ্মী হচ্ছে আমাদের দাৰ্জিখানার পরিচালিকা, কলোনীর সব কাপড়-জামা ওই সেলাই করে। —আচ্ছা, আমরা যাচ্ছি বনলক্ষ্মী। তোমাকে শুধু বলতে এসেছিলাম, মুকুলের মাথা ধরেছে সে রাঁধতে পারবে না, দময়ন্তী একা রান্না নিয়ে হিমসিম খাচ্ছেন। তুমি সাহায্য করলে ভাল হত।

‘ওমা, এতক্ষণ জানতে পারিনি!' বনলক্ষ্মী কোনও দিকে ভ্রুক্ষেপ না করিয়া দ্রুত আমাদের সামনে দিয়া বাহির হইয়া রান্নাঘরের দিকে চলিয়া গেল।

বনলক্ষ্মী চলিয়া গেল। কিন্তু আমার মনে একটি রেশ রাখিয়া গেল। পল্লীগ্রামের শীতল তরুচ্ছায়া, পুকুরঘাটের টলমল জল-তাহাকে দেখিলে এই সব মনে পড়িয়া যায়। সে রূপসী নয়, কিন্তু তাহাকে দেখিতে ভাল লাগে; মুখখানিতে একটি কচি স্নিগ্ধতা আছে। বয়স উনিশ-কুড়ি, নিটোল স্বাস্থ্য-মসৃণ দেহ, কিন্তু দেহে যৌবনের উগ্রতা নাই। নিতান্ত ঘরোয়া আটপৌরে গৃহস্থঘরের মেয়ে।

বনলক্ষ্মী দৃষ্টি-বহির্ভূত হইয়া গেলে ব্যোমকেশ বলিল,—রমেনবাবু, কি বলেন?

রমেনবাবু একটি দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিলেন। নিশানাথ বলিলেন,—মিছে আপনাদের কষ্ট দিলাম। আমারই ভুল, সুনয়না এখানে নেই।

ব্যোমকেশ জিজ্ঞাসা করিল,—এখানে আর কোনও মহিলা নেই?

না। চলুন এবার ফেরা যাক। খাবার তৈরি হতে এখনও বোধহয় দেরি আছে। তৈরি হলেই দময়ন্তী খবর পাঠাবে।

সিধা পথে নিশানাথবাবুর বাড়িতে ফিরিয়া পাখার তলায় বসিলাম। রমেনবাবু হঠাৎ বলিলেন,—আচ্ছা, নেত্যকালী-মানে সুনয়না যে এখানে আছে। এ সন্দেহ আপনার হল কি করে? কেউ কি আপনাকে খবর দিয়েছিল?

নিশানাথ শুষ্কম্বরে বলিলেন,—এ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারব না। It is not my secret. অন্য কিছু জানতে চান তো বলুন।

ব্যোমকেশ বলিল,—একটা অবাস্তর প্রশ্ন করছি কিছু মনে করবেন না। কেউ কি আপনাকে blackmail করছে?

নিশানাথ দৃঢ়স্বরে বলিলেন,—না।

তারপর সাধারণ গল্পগুজবে প্রায় এক ঘণ্টা কাটিয়া গেল। পেটের মধ্যে একটু ক্ষুধার কামড় অনুৃভব করিতেছি এমন সময় ভিতর দিকের দরজার সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইল বনলক্ষ্মী। স্নানের পর বেশ পরিবর্তন করিয়াছে, পিঠে ভিজা চুল ছড়ানো। বলিল,—কাকাবাবু, খাবার দেওয়া হয়েছে।

নিশানাথ উঠিয়া বলিলেন,—কোথায়?

বনলক্ষ্মী বলিল,—এই পাশের ঘরে। আপনারা আবার কষ্ট করে অতদূরে যাবেন, তাই আমরা খাবার নিয়ে এসেছি।

নিশানাথ আমাদের বলিলেন,—চলুন। ওরাই যখন কষ্ট করেছে তখন আমাদের আর কষ্ট করতে হল না। —কিন্তু আর সকলের কি ব্যবস্থা হবে?

বনলক্ষ্মী বলিল,—গোঁসাইদ রান্নাঘরের ভার নিয়েছেন। —আসুন।

পাশের ঘরে টেবিলের উপর আহারের আয়োজন। তবে ছুরি-কাঁটা নাই, শুধু চামচ। আমরা বসিয়া গেলাম। রান্নার পদ অনেকগুলি: ঘি-ভাত, সোনামুগের ডাল, ইঁচড়ের ডালনা, চিংড়িমাছের কাটলেট, কচি আমের ঝোল, পায়স ও ছানার বরফি। উদৱ পূৰ্ণ করিয়া আহার করিলাম। দময়ন্তী দেবী ও বনলক্ষ্মীর নিপুণ পরিচর্যায় ভোজনপর্ব পরম পরিতৃপ্তির সহিত সম্পন্ন হইল; লক্ষ্য করিলাম, দময়ন্তী দেবী অতি সুদক্ষা গৃহিণী, তাঁহার চোখের ইঙ্গিতে বনলক্ষ্মী যন্ত্রের মত কাজ করিয়া গেল।

আহারাস্তে আবার বাহিরের ঘরে আসিয়া বসিলাম। পান ও সিগারেট লইয়া বনলক্ষ্মী আসিল, টেবিলের উপর রাখিয়া আমাদের প্রতি প্রচ্ছন্ন কৌতুহলের দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া চলিয়া গেল।

‘তোমরা এবার খেয়ে নাও’ বলিয়া নিশানাথও ভিতরে গেলেন।

বনলক্ষ্মীকে এতক্ষণ দেখিয়া তাহার চরিত্র সম্বন্ধে যেন একটা ধারণা করিতে পারিয়াছি। সে স্বভাবতই মুক্ত-প্ৰাণ extrovert প্রকৃতির মেয়ে, কিন্তু কোনও কারণে নিজেকে চাপিয়া রাখিয়াছে, কাহারও কাছে আপন প্রকৃত স্বভাব প্রকাশ করিতেছে না।

কিছুকাল ধরিয়া ধূমপান চলিল। নিশানাথ ভিতরে বাহিরে যাতায়াত করিতে লাগিলেন। শেষে বলিলেন,—আপনাদের ফিরে যাবার তাড়া নেই তো?

ব্যোমকেশ বলিল,—তাড়া থাকলেও অসমর্থ। মিসেস সেন যে-রকম খাইয়েছেন, নড়বার ক্ষমতা নেই। আপনি কি বলেন, রমেনবাবু?

রমেনবাবু একটি উদগার তুলিয়া বলিলেন,—খাওয়ার পর নড়াচড়া আমার গুরুর বারণ।

নিশানাথ হাসিলেন,—তবে আসুন, ওঘরে বিছানা পাতিয়ে রেখেছি, একটু গড়িয়ে নিন।

একটি বড় ঘর। তাহার মেঝেয় তিনজনের উপযোগী বিছানা পাতা হইয়াছে। ঘরের দেয়াল ঘেঁষিয়া একটি একানে খাট; খাটের পাশে টুলের উপর টেবিল-ফ্যান। অনুমান করিলাম নিশানাথবাবুর এটি শয়নকক্ষ। ঘরের জানালাগুলি বন্ধ, তাই ঘরটি স্নিগ্ধ ছায়াচ্ছন্ন। আমরা বিছানায় বসিলাম। নিশানাথবাবু টেবিল-ফ্যানটি মেঝোয় নামাইয়া চালাইয়া দিলেন। বলিলেন,—এ ঘরের সীলিং-ফ্যানটা সারাতে দিয়েছি। তাই টেবিল-ফ্যান চালাতে হচ্ছে। কষ্ট হবে না তো?

ব্যোমকেশ বলিল,—কিছু কষ্ট হবে না। আপনি এবার একটু বিশ্রাম করুন গিয়ে।

নিশানাথ বলিলেন,—দিনের বেলা শোয়া আমার অভ্যাস নেই।

তাহলে বসুন, খানিক গল্প করা যাক।

নিশানাথ বসিলেন। রমেনবাবু কিন্তু পাঞ্জাবি খুলিয়া লম্বা হইলেন। গুরুভক্ত লোক, গুরুর আদেশ অমান্য করেন না। আমরা তিনজনে বসিয়া নিম্নস্বরে আলাপ করিতে লাগিলাম।

ব্যোমকেশ বলিল,—বনলক্ষ্মী কি চলে গেছে?

নিশানাথ বলিলেন,—হ্যাঁ, এই চলে গেল। কেন বলুন দেখি?

ওর ইতিহাস শুনতে চাই। ও যখন গোলাপ কলোনীতে আশ্রয় পেয়েছে তখন ওর নিশ্চয় কোন দাগ আছে।'

তা আছে। ইতিহাস খুবই সাধারণ। ও পাড়াগাঁয়ের মেয়ে, এক লম্পট ওকে ভুলিয়ে কলকাতায় নিয়ে আসে, তারপর কিছুদিন পরে ফেলে পালায়। গাঁয়ে ফিরে যাবার মুখ নেই, কলকাতায় খেতে পাচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত কলোনীতে আশ্রয় পেয়েছে।

কতদিন আছে?

বছর দেড়েক।

ওর গল্প সত্যি কিনা যাচাই করেছিলেন?

না। ও নিজের গ্রামের নাম কিছুতেই বলল না।

হুঁ। গোলাপ কলোনীর সন্ধান ও পেল কি করে? এটা তো সরকারী অনাথ আশ্রম নয়।

নিশানাথ একটু মুখ গভীর করিলেন, বলিলেন,—ও নিজে আসেনি, বিজয় একদিন ওকে নিয়ে এল। কলকাতায় হগ মার্কেটের কাছে একটা রেস্তোরা আছে, বিজয় রোজ বিকেলে সেখানে চা খায়। একদিন দেখল একটি মেয়ে কোণের টেবিলে একলা বসে বসে কাঁদছে। বনলক্ষ্মীর তখন হাতে একটি পয়সা নেই, দুদিন খেতে পায়নি, স্রেফ চা খেয়ে আছে। ওর কাহিনী শুনে বিজয় ওকে নিয়ে এল।

ওর চাল-চলন আপনার কেমন মনে হয়?

‘ওর কোনও দোষ আমি কখনও দেখিনি। যদি ওর পদস্থলন হয়ে থাকে। সে ওর চরিত্রের দোষ নয়, অদৃষ্টের দোষ।’ এই বলিয়া নিশানাথ হঠাৎ উঠিয়া পড়িলেন। ‘এবার বিশ্রাম করুন’ বলিয়া দ্বার ভেজাইয়া দিয়া প্ৰস্থান করিলেন।

তাঁহার এই হঠাৎ উঠিয়া যাওয়া কেমন যেন বেখাপ্পা লাগিল। পাছে ব্যোমকেশের প্রশ্নের উত্তরে আরও কিছু বলিতে হয় তাই কি তাড়াতাড়ি উঠিয়া গেলেন?

আমরা শয়ন করিলাম। মাথার কাছে গুঞ্জনধ্বনি করিয়া পাখা ঘুরিতেছে। পাশে রমেনবাবু ঘুমাইয়া পড়িয়াছেন; তাঁহার নাক ডাকিতেছে না, চুপি চুপি জল্পনা করিতেছে। এতক্ষণ লক্ষ্য করি নাই, একটি চটক-দম্পতি কোন অদৃশ্য ছিদ্রপথে ঘরে প্রবেশ করিয়া ছাদের একটি লোহার আংটায় বাসা বাঁধিতেছে। চোরের মত কুটা মুখে করিয়া আসিতেছে, কুটা রাখিয়া আবার চলিয়া যাইতেছে। তাঁহাদের পাখার মৃদু শব্দ হইতেছে-ফরর ফরর—

চিৎ হইয়া শুইয়া তাঁহাদের নিভৃত গৃহ-নির্মাণ দেখিতে দেখিতে চক্ষু মুদিয়া আসিল।

আট

বৈকালে আবার বাহিরের ঘরে সমবেত হইলাম। দময়ন্তী দেবী চায়ের বদলে শীতল ঘোলের সরবৎ পরিবেশন করিয়া গেলেন। নিশানাথ বলিলেন,—রোদ একটু পডুক, তারপর বেরুবেন। সাড়ে পাঁচটার সময় মুস্কিল গাড়ি নিয়ে স্টেশনে যায়, সেই গাড়িতে গেলেই হবে। সঙ্গে সঙ্গে ট্রেন পাবেন।

সরবৎ পান করিতে করিতে আর এক দফা কলোনীর অধিবাসিবৃন্দের সহিত দেখা হইয়া গেল। প্রথমে আসিলেন প্রফেসর নেপাল গুপ্ত, সঙ্গে কন্যা মুকুল। মুকুল অন্দরের দিকে চলিয়া যাইতেছিল, নিশানাথ জিজ্ঞাসা করিলেন,—এবেলা তোমার মাথা কেমন?

মুকুল ক্ষণেকের জন্য দাঁড়াইয়া বলিল,—‘সেরে গেছে’—বলিয়া যেন একান্ত সম্ভ্রান্তভাবে ভিতরে ঢুকিয়া পড়িল। তাহার গলার স্বর ভাঙা-ভঙা, একটু খসখসে; সর্দি-কাশিতে স্বরযন্ত্র বিপন্ন হইলে যেমন আওয়াজ বাহির হয়। অনেকটা সেই রকম।

এবেলা তাহাকে ভাল করিয়া দেখিবার সুযোগ পাইলাম। সে যদি এত বেশি প্রসাধন না করিত তাহা হইলে বোধহয় তাহাকে আরও ভাল দেখাইত। কিন্তু মুখে পাউডার ও ঠোঁটে রক্তের মত লাল রঙ লাগাইয়া সে যেন তাহার সহজ লাবণ্যকে ঢাকা দিয়াছে। তার উপর চোখের দৃষ্টিতে একটা শুষ্ক কঠিনতা। অল্প বয়সে বারবার আঘাত পাইয়া যাহারা বাড়িয়া উঠিয়াছে তাহাদের চোখেমুখে এইরূপ অকাল কঠিনতা বোধহয় স্বাভাবিক।

এদিকে নেপালবাবুও যেন জাপানী মুখোশ দিয়া মুখের অর্ধেকটা ঢাকিয়া রাখিয়াছেন। ব্যোমকেশকে দেখিয়া তাঁহার চোখে কুটিল কৌতুক নৃত্য করিয়া উঠিল। তিনি বলিলেন,—কী, এবেলা আর এক দান হবে নাকি?

ব্যোমকেশ বলিল,—মাফ করবেন।

নেপালবাবু অট্টহাস্য করিয়া বলিলেন,—ভয় কি? না হয় আবার মাত হবেন। ভাল খেলোয়াড়ের সঙ্গে খেললে খেলা শিখতে পারবেন। কথায় বলে, লিখতে লিখতে সরে, আর—

ভাগ্যক্রমে প্রবাদবাক্য শেষ হইতে পাইল না, বৈষ্ণব ব্ৰজদাসকে প্ৰবেশ করিতে দেখিয়া নেপালবাবু তাঁহার দিকে ফিরিলেন—কি হে ব্ৰজদাস, তুমি নাকি গরুকে ওষুধ খাওয়াতে আরম্ভ করেছ? গো-চিকিৎসার কী জান তুমি?

ব্ৰজদাস মাথা চুলকাইয়া বলিলেন,—আজ্ঞে—

বেষ্টম হয়ে গো-হত্যা করতে চাও! নিশানাথ, তোমারই বা কেমন আক্কেল? হাজার বার বলেছি। একটা গো-বদ্যি যোগাড় কর, তা নয়, দুটো হেতুড়ের হাতে গরগুলোকে ছেড়ে দিয়েছ।

নিশানাথবাবু বিরক্ত হইয়াছেন বুঝিলাম, কিন্তু তিনি নীরব রহিলেন।

নেপালবাবু বলিলেন,—যার কর্ম তারে সাজে। আমার হাতে ছেড়ে দাও, দেখবে দুদিনে গরুগুলোর চেহারা ফিরিয়ে দেব। আমি শুধু কেমিস্ট নই, বায়াে-কেমিস্ট, বুঝলে? চল বোষ্টম, তোমার গরু দেখি।

ব্ৰজদাস কাতর চক্ষে নিশানাথের পানে চাহিলেন। নিশানাথ এবার একটু কড়া সুরে বলিলেন,—নেপাল, গরু যত ইচ্ছে দেখ, কিন্তু ওষুধ খাওয়াতে যেও না।

নেপালবাবু অধীর উপেক্ষাভরে বলিলেন,—তুমি কিছু বোঝে না, কেবল সর্দারি কর। আমি গরুর চিকিৎসা করব। দেখিয়ে দেব—

ছুরির মত তীক্ষ্ণ কণ্ঠে নিশানাথ বলিলেন,—নেপাল, আমার হুকুম ডিঙিয়ে যদি এ কাজ কর, তোমাকে কলোনী ছাড়তে হবে।

নেপালবাবু ফিরিয়া দাঁড়াইলেন, তাঁহার হাঁসের ডিমের মত চোখ হইতে রক্ত ফাটিয়া পড়িবার উপক্ৰম করিল। তিনি বিকৃত কষ্ঠে চীৎকার করিয়া উঠিলেন,—আমাকে অপমান করছ তুমি-আমাকে? এত বড় সাহস! ভেবেছ আমি কিছু জানি না?—ভাঙিব নাকি হাটে হাঁড়ি।

নিশানাথ শক্ত হইয়া উঠিয়া দাঁড়াইলেন। দেখিলাম তাঁহার রগের শিরা ফুলিয়া দপ দপ করিতেছে। তিনি রুদ্ধস্বরে বলিলেন,—নেপাল, তুমি যাও—এই দণ্ডে এখান থেকে বিদেয় হও—

নেপালবাবু হিংস্ৰ মুখবিকৃতি করিয়া আবার গর্জন করিতে যাইতেছিলেন, এমন সময় ভিতর দিক হইতে মুকুল ছুটিয়া আসিয়া তাঁহার মুখ চাপিয়া ধরিল। বাবা! কি করছ তুমি! চল, এক্ষুনি চল-বলিয়া নেপালবাবুকে টানিয়া ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল। মুকুলের ধমক খাইয়া নেপালবাবু নির্বিবাদে তাহার সঙ্গে গেলেন।

পরিণতবয়স্ক দুই ভদ্রলোকের মধ্যে সামান্য সূত্রে এই উগ্ৰ কলহ, আমরা যেন হতভম্ব হইয়া গিয়াছিলাম। এতক্ষণে লক্ষ্য করিলাম। ব্ৰজদাস বেগতিক দেখিয়া নিঃসাড়ে সরিয়া পড়িয়াছেন এবং ডাক্তার ভুজঙ্গধর কখন নিঃশব্দে আসিয়া দ্বারের কাছে দাঁড়াইয়া আছেন। নিশানাথবাবু শিথিল দেহে বসিয়া পড়িলে তিনি সশব্দে একটি নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া দুঃখিতভাবে মাথাটি নাড়িতে নাড়িতে আসিয়া নিশানাথের পাশের চেয়ারে বসিলেন। বলিলেন,—বেশি উত্তেজনা আপনার শরীরের পক্ষে ভাল নয় মিঃ সেন। যদি মাথার একটা ছোট্ট শিরা’জখম হয় তাহলে গুপ্তর কোন ক্ষতি নেই-কিন্তু- দেখি আপনার নাড়ি।

নিশানাথ বলিলেন,—দরকার নেই, আমি ঠিক আছি।

ডাক্তার আর একটি নিশ্বাস ফেলিয়া আমাদের দিকে ফিরিলেন, একে একে আমাদের নিরীক্ষণ করিয়া বলিলেন,—এদের সকালে দেখেছি, কিন্তু পরিচয় পাইনি।

নিশানাথ বলিলেন,—ঐরা বাগান দেখতে এসেছেন।

ডাক্তার মুখের একপেশে বাঁকা হাসিলেন,—তা মোটর রহস্যের কোনও কিনারা হল?

আমরা চমকিয়া চাহিলাম। নিশানাথ ভ্রুকুটি করিয়া বলিলেন,—ওঁরা কি জন্যে এসেছেন তুমি জানো?

‘জানি না। কিন্তু আন্দাজ করা কি এতই শক্ত? এই কাঠ-ফাটা গরমে কেউ বাগান দেখতে আসে না। তবে অন্য কী উদ্দেশ্যে আসতে পারে? কলোনীতে সম্প্রতি একটা রহস্যময় ব্যাপার ঘটছে। অতএব দুই আর দুয়ে চার।’ বলিয়া ব্যোমকেশের দিকে সহাস্য দৃষ্টি ফিরাইলেন,—আপনি ব্যোমকেশবাবু। কেমন, ঠিক ধরেছি। কিনা?

ব্যোমকেশ অলস কণ্ঠে বলিল,—ঠিকই ধরেছেন। এখন আপনাকে যদি দু-একটা প্রশ্ন করি উত্তর দেবেন। কি?

নিশ্চয় দেব। কিন্তু আমার কেচ্ছ আপনি বোধহয় সবই শুনেছেন।

সব শুনিনি।

বেশ, প্রশ্ন করুন।

ব্যোমকেশ সরবতের গেলাসে ছোট একটি চুমুক দিয়া বলিল,—আপনি বিবাহিত?

ডাক্তার প্রশ্নের জন্য প্ৰস্তুত ছিলেন না, তিনি অবাক হইয়া চাহিলেন। তারপর ঘাড় নাড়িয়া বলিলেন,—হ্যাঁ, বিবাহিত।

আপনার স্ত্রী কোথায়?

বিলতে।

বিলোতে?

ডাক্তার তাঁহার দাম্পত্য-জীবনের ইতিহাস হাসিমুখে প্রকাশ করিলেন,—ডাক্তারি পড়া উপলক্ষে তিন বছর বিলেতে ছিলাম, একটি শ্বেতাঙ্গিনীকে বিবাহ করেছিলাম। কিন্তু তিনি বেশি দিন কালা আদমিকে সহ্য করতে পারলেন না, একদিন আমাকে ত্যাগ করে চলে গেলেন। আমিও দেশের ছেলে দেশে ফিরে এলাম। তারপর থেকে দেখা সাক্ষাৎ হয়নি।

টেবিলের উপর হইতে সিগারেটের টিন লইয়া তিনি নির্বিকার মুখে সিগারেট ধরাইলেন। তাঁহার কথার ভাব-ভঙ্গীতে একটা মার্জিত নিলর্জ্জতা আছে, যাহা একসঙ্গে আকর্ষণ এবং বিকর্ষণ করে। ব্যোমকেশ বলিল,—আর একটা প্রশ্ন করব। —যে অপরাধের জন্যে আপনার ডাক্তারির লাইসেন্স খারিজ করা হয়েছিল। সে অপরাধটা কি?

ডাক্তার স্মিতমুখে ধোঁয়ার একটি সুদর্শনচক্ৰ ছাড়িয়া বলিলেন,—একটি কুমারীকে লোকলজ্জার হাত থেকে বাঁচবার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু ধরা পড়ে গেলাম। শ্রেয়াংসি বহুবিঘ্নানি।

নয়

মুস্কিল মিঞার ভ্যানে চড়িয়া আমরা স্টেশন যাত্ৰা করিলাম। নিশানাথবাবু ত্ৰিয়মাণভাবে আমাদের বিদায় দিলেন। নেপাল গুপ্তর সঙ্গে ওই ব্যাপার ঘটিয়া যাওয়ার পর তিনি যেন কচ্ছপের মত নিজেকে সংহরণ করিয়া লইয়াছিলেন।

ডাক্তার ভুজঙ্গধর আমাদের সঙ্গে গাড়িতে উঠিয়া বসিলেন, বলিলেন,—চলুন, খানিকদূর আপনাদের পৌঁছে দিয়ে আসি।

আপনার সব প্রশ্নের জবাব আমি দিয়েছি, কিন্তু আমার গোড়ার প্রশ্নের জবাব আপনি দিলেন না।

ব্যোমকেশ বলিল,—কোন প্রশ্ন?

মোটর রহস্যের কিনারা হল কি না।

ব্যোমকেশ বলিল,—না। কিছুই ধরা-ছোঁয়া যাচ্ছে না। এ বিষয়ে আপনার কোনও ধারণা আছে না কি?

ধারণা একটা আছে বৈ কি। কিন্তু বলতে সাহস হচ্ছে না। আমার ধারণা যদি ভুল হয়, মিথ্যে অপবাদ দেওয়া হবে।

তবু বলুন না শুনি।

আমার বিশ্বাস এ ওই ন্যাপলা বুড়োর কাজ। ও নিশানাথবাবুকে ভয় দেখাবার চেষ্টা করছে। লোকটা বাইরে যেমন দাম্ভিক, ভেতরে তেমনি পেঁচালো।

কিন্তু নিশানাথবাবুকে ভয় দেখিয়ে ওঁর লাভ কি?

তবে বলি শুনুন। নেপালবাবুর ইচ্ছে উনিই গোলাপ কলোনীর হর্তাকর্তা হয়ে বসেন। কিন্তু নিশানাথবাবু তা দেবেন কেন? তাই উনি নিশানাথবাবুর বিরুদ্ধে স্নায়ুযুদ্ধ লাগিয়েছেন, যাকে বলে war of nerves. নিশানাথবাবুর একে রক্তের চাপ বেশি, তার ওপর যদি স্নায়ুপীড়ায় অকৰ্মণ্য হয়ে পড়েন, তখন নেপালবাবুই কর্তা হবেন।

কিন্তু নিশিনাথবাবুর স্ত্রী রয়েছেন, ভাইপো রয়েছেন। তাঁরা থাকতে নেপালবাবু কর্তা হবেন করে?

অসম্ভব মনে হয় বটে, কিন্তু-অসম্ভব নয়।

কেন?

মিসেস সেন নেপালবাবুকে ভারি ভক্তি করেন।

কথাটা ভুজঙ্গধরবাবু এমন একটু শ্লেষ দিয়া বলিলেন যে, ব্যোমকেশ চট্‌ করিয়া বলিল,—তাই নাকি! ভক্তির কি বিশেষ কোনও কারণ আছে?

ভুজঙ্গধরবাবু একপেশে হাসি হাসিয়া বলিলেন,—ব্যোমকেশবাবু, আপনি বুদ্ধিমান লোক, আমিও একেবারে নির্বোধ নই, বেশি কথা বাড়িয়ে লাভ কি? হয়তো আমার ধারণা আগাগোড়াই ভুল। আপনি আমার মতামত জানতে চেয়েছিলেন, আমার যা ধারণা আমি বললাম। এর বেশি বলা আমার পক্ষে স্বাস্থ্যকর নয়—আচ্ছা, এবার আমি ফিরব। ওরে মুস্কিল, তোর পক্ষিরাজ একবার থামা!

ব্যোমকেশ বলিল,—একটা কথা। মুকুলও কি বাপের দলে?

ডাক্তার একটু ইতস্তত করিয়া বলিলেন,—তা ঠিক বলতে পারি না। তবে মুকুলেরও স্বার্থ আছে।

গাড়ি থামিয়াছিল, ডাক্তার নামিয়া পড়িলেন। মুচকি হাসিয়া বলিলেন,—‘আচ্ছা, নমস্কার। আবার দেখা হবে নিশ্চয়।’ বলিয়া পিছন ফিরিয়া চলিতে আরম্ভ করিলেন।

আমাদের গাড়ি আবার অগ্রসর হইল। ব্যোমকেশ গুম হইয়া রহিল।

ডাক্তার ভুজঙ্গাধরের আচরণ একটু রহস্যময়। তিনি নেপালীবাবুর বিরুদ্ধে অনেক কথা বলিলেন, কিন্তু মুকুল বা দময়ন্তী দেবী সম্বন্ধে প্রশ্ন এড়াইয়া গেলেন কেন?...কী উদ্দেশ্যে তিনি আমাদের সঙ্গে এতদূর আসিয়াছিলেন?...তাঁহার থিওরি কি সত্য , নেপালবাবু মোটরের টুকরো উপহার দিতেছেন। ...সুনয়না তো এখানে নাই। কিম্বা আছে, রমেনবাবু চিনিতে পারেন নাই। ...মোটরের টুকরো উপহারের সহিত সুনয়নার অজ্ঞাতবাসের কি কোনও সম্বন্ধ আছে?

স্টেশনে পৌঁছিয়া টিকিট কিনিতে গিয়া জানা গেল ট্রেন আগের স্টেশনে আটকাইয়া গিয়াছে, কতক্ষণে আসিবে ঠিক নাই। ব্যোমকেশ ফিরিয়া আসিয়া ভ্যানের পা-দানে বসিল, নিজে একটি সিগারেট ধরাইল এবং মুস্কিল মিঞাকে একটি সিগারেট দিয়া তাহার সহিত গল্প জুড়িয়া দিল।

কদ্দিন হল বিয়া করেছ মিঞা?

মুস্কিল সিগারেটকে গাঁজার কলিকার মত ধরিয়া তাহতে এক টান দিয়া বলিন—’কোন বিয়া?’

তুমি কি অনেকগুলি বিয়ে করেছ নাকি?

অনেকগুলি আর কৈ কর্তা। কেবল দুইটি।

তা শেষেরটিকে কবে বিয়ে করলে?

দ্যাড় বছর হৈল।

কোথায় বিয়ে করলে? দ্যাশে?

কলকাত্তায় বিয়া করছি কর্তা। গফুর শেখ চামড়াওয়ালা-কানপুরের লোক, কলকাত্তায় জুতার দোকান আছে—তার বিবির বুন হয়।

তবে তো বড় ঘরে বিয়ে করেছ।

হ। কিন্তু মুস্কিল হৈছে, উয়ারা সব পচ্চিমা খোট্টা-বাংলা বুঝে না; অনেক কষ্টে নজর জানেরে বাংলায় তালিম দিয়া লইছি।

বেশ বেশ। তা তোমার আগের বৌটি মারা গেছে বুঝি?

মারা আর গেল কৈ? বাঁজা মনিষ্যি ছিল, মানুষটা মন্দ ছিল না। কিন্তু নতুন বৌটারে যখন ঘরে আনলাম, কর্তাবাবু কইলেন, দুটা বৌ লৈয়া কলোনীতে থাকা চলব না। কি করা! দিলাম পুরান বৌটারে তালাক দিয়া।

এই সময় হুড়মুড় শব্দে ট্রেন আসিয়া পড়িল। মুস্কিল মিঞার সহিত রসালাপ অসমাপ্ত রাখিয়া আমরা ট্রেন ধরিলাম।

ট্রেনে উঠিয়া ব্যোমকেশ আর কথা বলিল না, অন্যমনস্কভাবে বাহিরের দিকে তাকাইয়া বসিয়া রহিল। কিন্তু রমেনবাবু, গাড়ি যতই কলিকাতার নিকটবর্তী হইতে লাগিল, ততই উৎফুল্প হইয়া উঠিলেন। আমরা দুজনে নানা গল্প করিতে করিতে চলিলাম। একবার সুনয়নার কথা উঠিল। তিনি বলিলেন,—আদালতে হলফ নিয়ে যদি বলতে হয়, তবে বলব সুনয়না ওখানে নেই। কিন্তু তবুও মনের খুৎখুতুনি যাচ্ছে না।

আমি বলিলাম,—কিন্তু সুনয়না ছদ্মবেশে ওখানে আছে এটাই বা কি করে হয়? রাতদিন মেক-আপ করে থাকা কি সম্ভব?

রমেনবাবু বলিলেন,—সুনয়না ছদ্মবেশে কলোনীতে আছে একথা আমিও বলছি না। ওখানে স্বাভাবিক বেশেই আছে। কিন্তু সে ছদ্মবেশ ধারণ করে সিনেমা করতে গিয়েছিল, আমি তাকে ছদ্মবেশে দেখেছি, এটা তো সম্ভব?

এই সময় ব্যোমকেশ বলিল,—ঝড় আসছে!

উৎসুকভাবে বাহিরের দিকে তাকাইলাম। কিন্তু কোথায় ঝড়! আকাশে মেঘের চিহ্নমাত্র নাই। সবিস্ময়ে ব্যোমকেশের দিকে ফিরিয়া দেখি সে চোখ বুজিয়া বসিয়া আছে। বলিলাম,—ঝড়ের স্বপ্ন দেখছি নাকি?

সে চোখ খুলিয়া বলিল,—এ ঝড় সে ঝড় নয়—গােলাপ কলোনীতে ঝড় আসছে। অনেক উত্তাপ জমা হয়েছে, এবার একটা কিছু ঘটবে।

কি ঘটবে?

‘তা যদি জানতাম তাহলে তার প্রতিকার করতে পারতাম।’ বলিয়া সে আবার চোখ বুজিল।

শিয়ালদা স্টেশনে যখন পৌঁছিলাম তখন রাস্তার আলো জ্বলিয়াছে। রমেনবাবুর সহিত ছাড়াছাড়ি হইবার পূর্বে ব্যোমকেশ বলিল,—আপনাকে আর একটু কষ্ট দেব। সুনয়নার দুটো স্টিল-ফটো যোগাড় করতে হবে। একটা কমলমণির ভূমিকায়, একটা শ্যামা-ঝি’র।

রমেনবাবু বলিলেন,—কালই পাবেন।

দশ

পরদিন সকালে সংবাদপত্র পাঠ শেষ হইলে ব্যোমকেশ নিজের ভাগের কাগজ সযত্নে পাট করিতে করিতে বলিল,—কাল চারটি স্ত্রীলোককে আমরা দেখেছি। তার মধ্যে কোনটিকে সবচেয়ে সুন্দরী বলে মনে হয়?

স্ত্রীলোকের রূপ লইয়া আলোচনা করা ব্যোমকেশের স্বভাব নয়; কিন্তু হয়তো তাহার কোনও উদ্দেশ্য আছে তাই বললাম—দময়ন্তী দেবীকেই সবচেয়ে সুন্দরী বলতে হয়—

কিন্তু—

চকিত হইয়া বলিলাম,—কিন্তু কি?

‘তোমার মনে কিন্তু আছে।’ ব্যোমকেশ সহসা আমার দিকে তর্জনী তুলিয়া বলিল,—কাল রাত্রে কাকে স্বপ্ন দেখেছ?

এবার সত্যিই ঘাবড়াইয়া গেলাম,—স্বপ্ন! কৈ না—

মিছে কথা বোলো না। কাকে স্বপ্ন দেখেছি?

তখন বলিতে হইল। স্বপ্ন দেখার উপর যদিও কাহারও হাত নাই, তবু লজ্জিতভাবেই বলিলাম,—বনলক্ষ্মীকে।

কি স্বপ্ন দেখলে?

দেখলাম, সে যেন হাতছানি দিয়ে আমায় ডাকছে, আর হাসছে। —কিন্তু একটা আশ্চর্য দেখলাম, তার দাঁতগুলো যেন ঠিক তার দাঁতের মত নয়। যতদূর মনে পড়ে তার সত্যিকারের দাঁত বেশ পাটি-মেলানো। কিন্তু স্বপ্নে দেখলাম, কেমন যেন এবড়ো খেবড়ো—

ব্যোমকেশ অবাক হইয়া আমার মুখের পানে চাহিয়া রহিল, তারপর বলিল—তোমার স্বপ্নেও দাঁত আছে!

তার মানে? তুমিও স্বপ্ন দেখেছি নাকি? কাকে?

সে হাসিয়া বলিল,—সত্যবতীকে। কিন্তু তার দাঁত নিজের মত নয়, অন্যরকম। তাকে জিগ্যেস করলাম, তোমার দাঁত অমন কেন? সত্যবতী জোরে হেসে উঠল, আর তার দাঁতাগুলো ঝরঝর করে পড়ে গেল।

আমিও জোরে হাসিয়া উঠিলাম, বলিলাম,—এসব মনঃসমীক্ষণের ব্যাপার। চল, গিরীন্দ্ৰশেখর বসুকে ধরা যাক, তিনি হয়তো স্বপ্ন-মঙ্গলের ব্যাখ্যা করতে পারবেন।

এই সময় দ্বারের কড়া নড়িল। ব্যোমকেশ দ্বার খুলিয়া দিলে ঘরে প্রবেশ করিল বিজয়। ঠোঁট চাটিয়া বলিল,—আমি নিশানাথবাবুর ভাইপো—

ব্যোমকেশ বলিল,—পরিচয় দিতে হবে না, বিজয়বাবু, কাল আপনাকে দেখেছি। তা কি খবর?

বিজয় বলিল,—কাকা চিঠি দিয়েছেন। আমাকে বললেন চিঠিখানা পৌঁছে দিতে।

সে পকেট হইতে একটা খাম বাহির করিয়া ব্যোমকেশকে দিল। বিজয়ের ভাবগতিক দেখিয়া মনে হয় তাহার মন খুব সুস্থ নয়। সে রুমাল দিয়া গলার ঘাম মুছিল, একটা কিছু বলিবার জন্য মুখ খুলিল, তারপর কিছু না বলিয়াই প্রস্থানোদ্যত হইল।

ব্যোমকেশ চিঠি পকেটে রাখিয়া বলিল,—বসুন।

বিজয় ক্ষণকাল ন যযৌ হইয়া রহিল, তারপর চেয়ারে বসিল। অপ্ৰতিভ হাসিয়া বলিল,—কাল আমিও আপনাকে দেখেছিলাম, কিন্তু তখন পরিচয় জানতাম না—

পরিচয় কার কাছে জানলেন?

কাল সন্ধের পর কলোনীতে ফিরে গিয়ে জানতে পারলাম। কাকা আপনাকে কোনও দরকারে ডেকেছিলেন বুঝি?

ব্যোমকেশ মৃদু হাসিয়া বলিল,—একথা আপনার কাকাকে জিগ্যেস করলেন না কেন?

বিজয়ের মুখ উত্তপ্ত হইয়া উঠিল। সে বলিল,—কাকা সব কথা আমাদের বলেন না। তবে ঐ মোটরের টুকরো নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন হয়েছেন তাই বোধহয়—

মোটরের টুকরো সম্বন্ধে আপনার কি ধারণা?

আমার তো মনে হয় একেবারে ছেলেমানুষী। মাইলখানেক দূরে গ্রাম আছে, গ্রামের ছোঁড়ারা প্রায়ই ঐ মোটরগুলোর মধ্যে এসে খেলা করে। আমার বিশ্বাস তারাই বজ্জাতি করে মোটরের টুকরো কলোনীতে ফেলে যায়।

ব্যোমকেশ বলিল,—হুঁ, আচ্ছা ওকথা যাক। প্রফেসর নেপাল গুপ্তর খবর কি?

বিজয়ের ভ্রু কুঞ্চিত হইল। সে বলিল,—কাল ফিরে গিয়ে শুনলাম নেপালবাবু কাকাকে অপমান করেছে। কাকা তাই সহ্য করলেন, আমি থাকলে—

নেপালবাবু কলোনীতে আছেন এখনও?

বিজয় অন্ধকার মুখে বলিল,—হ্যাঁ। মুকুল এসে কাকিমার হাতে পায়ে ধরেছে। কাকিম ভালমানুষ, গলে গেছেন, কাকাকে গিয়ে বলেছেন। কাকা কাকিমার কথা ঠেলতে পারেন না—

তাহলে নেপালবাবু রয়ে গেলেন। লোকটি ভাল নয়, গেলেই বোধহয় ভাল হত। আচ্ছা! বলুন দেখি, ওঁর মেয়েটি কেমন?

বিজয়ী থমকিয়া গেল। একবার বিস্ফারিত চক্ষে ব্যোমকেশের পানে চাহিয়া দ্রুতকণ্ঠে বলিল,—মুকুল! বাপের মত নয়—ভালই—তবে। —আচ্ছা, আজ উঠি, দেরি হয়ে গেল—দোকানো যেতে হবে। নমস্কার।

বিজয় ত্বরিতপদে প্রস্থান করিলে ব্যোমকেশ কিছুক্ষণ ভ্রু তুলিয়া দ্বারের পানে চাহিয়া রহিল, তারপর ফিরিয়া আসিয়া তক্তপোশে বসিল। ভাবিতে ভাবিতে বলিল,—বিজয় সুনয়নার ব্যাপার বোধহয় জানে না, কিন্তু মুকুলের কথায় অমন ভড়কে পালাল কেন?

আমি বলিলাম,—কাল ডাক্তার ভুজঙ্গধরও মুকুল সম্বন্ধে খোলসা কথা বললেন না—

হুঁ। এখন নিশানাথবাবু কি লিখেছেন দেখা যাক। কিন্তু তিনি চিঠি লিখলেন কেন? টেলিফোন করলেই পারতেন।

খাম ছিড়িয়া চিঠি পড়িতে পড়িতে ব্যোমকেশের মুখের ভাব ফ্যালফেলে হইয়া গেল। সে বলিল,—ও-এই জন্য চিঠি!

জিজ্ঞাসা করিলাম,—কি লিখেছেন নিশানাথবাবু?

'পড়ে দেখ’ বলিয়া সে আমার হাতে চিঠি দিল। ইংরেজি চিঠি, মাত্র কয়েক ছত্ৰ—

প্রিয় ব্যোমকেশবাবু,

আপনাকে যে কার্যে নিযুক্ত করিয়াছিলাম সে কার্যে আর অগ্রসর হইবার প্রয়োজন নাই। আপনাকে যে টাকা দিয়াছি আপনার পারিশ্রমিকরূপে আশা করি তাই যথেষ্ট হইবে। ইতি—

ভবদীয়

নিশানাথ সেন

চিঠি হইতে মুখ তুলিয়া নিরাশ কন্ঠে বলিলাম,—নিশানাথবাবু হঠাৎ মত বদলালেন কেন?

ব্যোমকেশ বলিল,—পাছে এই প্রশ্ন তুলি তাই তিনি টেলিফোন করেননি, চিঠিতে সব চুকিয়ে দিয়েছেন।

কিন্তু কেন?

বোধহয় তাঁর ভয় হয়েছে কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে পড়বে। নিশানাথবাবুর জীবনে একটা গুপ্ত রহস্য আছে। শুনলে না, কাল রাগের মাথায় নেপাল গুপ্ত বললেন—ভাঙব নাকি হাটে হাঁড়ি?

তাহলে নেপালীবাবু ওঁর গুপ্ত রহস্য জানেন?

জানেন বলেই মনে হয়। এবং হাটে হাঁড়ি ভাঙার ভয় দেখিয়ে ওঁকে blackmail করছেন।

কিন্তু—কাল নিশানাথবাবু তো বেশ জোর দিয়েই বললেন, কেউ তাঁকে blackmail করছে না।

হুঁ— বলিয়া বােমকেশ সিগারেট খাইল এবং ধূমপান করতে করতে চিন্তাচ্ছন্ন ইয়া সকালবেলাটা মন খারাপের মধ্যে দিয়া কাটিয়া গেল। একটা বিচিত্র রহস্যের সংস্পর্শে আসিয়াছিলাম, অনেকগুলা বিচিত্র প্রকৃতির মানুষের মানসিক ঘাত-প্ৰতিঘাতে একটা নাটকীয় সংস্থা চোখের সম্মুখে গড়িয়া উঠিতেছিল, নাটকের প্রথম অঙ্ক শেষ হইবার পূর্বেই কে যেন আমাদের প্রেক্ষাগৃহ হইতে ঠেলিয়া বাহির করিয়া দিল।

বৈকালে দিবানিদ্ৰা সারিয়া দেখিলাম, ব্যোমকেশ একান্তে বসিয়া গভীর মনোযোগের সহিত কিছু লিখিতেছে। আমি তাহার পিছন হইতে উঁকি মারিয়া দেখিলাম, ডায়েরির মত একটা ছোট খাতায় ক্ষুদি ক্ষুদি অক্ষরে লিখিতেছে। বলিলাম,—এত লিখছ কি?

লেখা শেষ করিয়া ব্যোমকেশ মুখ তুলিল,—গোলাপ কলোনীর পাত্র-পাত্রীদের চরিত্র-চিত্র তৈরি করেছি। খুব সংক্ষিপ্ত চিত্র-যাকে বলে। thumbnail portrait.

অবাক হইয়া বলিলাম,—কিন্তু গোলাপ কলোনীর সঙ্গে তোমার তো সম্বন্ধ ঘুচে গেছে। এখন চরিত্র-চিত্র এঁকে লাভ কি?

ব্যোমকেশ বলিল,—লাভ নেই। কেবল নিরাসক্ত কৌতুহল। এখন অবধান কর। যদি কিছু বলবার থাকে। পরে বোলো।

সে খাতা লইয়া পড়িতে আরম্ভ করিল—

নিশানাথ সেন: বয়স ৫৭। বোম্বাই প্রদেশে জজ ছিলেন, কাজ ছাড়িয়া দিয়া কলিকাতার উপকণ্ঠে গোলাপ বাগান করিয়াছেন। চাপা প্রকৃতির লোক। জীবনে কোনও গুপ্ত রহস্য আছে। সুনয়না নামে জনৈকা চিত্রাভিনেত্রী সম্বন্ধে জানিতে চান। সম্প্রতি কেহ তাঁহাকে মোটরের টুকরো উপহার দিতেছে। (কেন?)

দময়ন্তী সেন: বয়স আন্দাজ ৩০। এখনও সুন্দরী। বোধহয় নিশানাথের দ্বিতীয় পক্ষ। নিপুণা গৃহিণী। কলোনীর সমস্ত টাকা ও হিসাব তাঁহার হাতে। আচার-আচরণ সম্ভ্রম উৎপাদক। দুই বছর আগে বিদ্যাশিক্ষার জন্য নিয়মিত কলিকাতা যাতায়াত করিতেন।

বিজয়; বয়স ২৬-২৭। নিশানাথের পালিত ভ্রাতুষ্পপুত্র। ফুলের দোকানের ইন-চার্জ। দোকানের হিসাব দিতে বিলম্ব করিতেছে। আবেগপ্রবণ নার্ভাস প্রকৃতি। কাকাকে ভালবাসে, সম্ভবত ককিমাকেও। নেপালবাবুকে দেখিতে পারে না। মুকুল সম্বন্ধে মনে জট পাকানো আছে—একটা গুপ্ত রহস্যের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

পানুগোপাল: বয়স ২৪-২৫। কান ও স্বর্যযন্ত্র বিকল। লেখাপড়া জানে না। নিশানাথের একান্ত অনুগত। চরিত্র বিশেষত্বহীন।

নেপাল গুপ্ত: বয়স ৫৬-৫৭। কুটিল ও কটুভাষী। প্রচণ্ড দাম্ভিক। রসায়নের অধ্যাপক ছিলেন। এখনও এক্সপেরিমেন্ট করেন, ফলে কিন্তু বিপরীত হয়। নিশানাথকে ঈর্ষা করেন, বোধহয় নিশানাথের জীবনের কোনও লজ্জাকর গুপ্তকথা জানেন। দময়ন্তী দেবী তাঁহাকে ভক্তি করেন। (ভয়ে ভক্তি?)

মুকুল: বয়স ১৯-২০। সুন্দরী কিন্তু কণ্ঠস্বর স্বাভাবিক নয়, কৃত্রিম বলিয়া মনে হয়। রুজ পাউডারের সাহায্যে মুখসজ্জা করিতে অভ্যস্ত। বর্তমান অবস্থার জন্য মনে ক্ষোভ আছে কিন্তু পিতার মত হঠকারী নয়। প্রায় দুই বছর পিতার সহিত কলোনীতে বাস করিতেছে।

ব্ৰজদাস: বয়স ৬০। নিশানাথের সেরেস্তার কেরানি ছিল, চুরির জন্য নিশানাথ তাহার বিরুদ্ধে সাক্ষী দিয়া তাহাকে জেলে পাঠাইয়াছিলেন। জেল হইতে বাহির হইয়া ব্ৰজদাস কলোনীতে আশ্ৰয় লইয়াছে। সে নাকি এখন সদা সত্য কথা বলে। লোকটিকে দেখিয়া চতুর ব্যক্তি বলিয়া মনে হয়।

ভুজঙ্গধর দাস . বয়স ৩৯-৪০। অত্যন্ত বুদ্ধিমান, অবস্থার শোচনীয় অবনতি সত্ত্বেও মনের ফুর্তি নষ্ট হয় নাই। ধৰ্মজ্ঞান প্রবল নয়, লজ্জাকর দুনৈতিক কর্মে ধরা পড়িয়াও লজ্জা নাই। বনলক্ষ্মীর প্রতি তীব্র বিদ্বেষ। (কেন?) ভাল সেতার বাজাইতে পারেন। চার বছর কলোনীতে আছেন।

বনলক্ষ্মী: বয়স ২২-২৩। সিন্ধ যৌবনশ্রী; যৌন আবেদন আছে-(অজিত তাহাকে স্বপ্ন দেখিয়াছে) কিন্তু তাহাকে দেখিয়া মনে হয় না সে কুলত্যাগিনী। চঞ্চলা নয়, প্ৰগলভা নয়। কর্মকুশলা; একটু গ্ৰাম্য ভাব আছে। দেড় বছর আগে বিজয় তাহাকে কলোনীতে আনিয়াছে।

মুস্কিল মিঞা: বয়স ৫০। নেশাখোর (বোধহয় আফিম) কিন্তু হুঁশিয়ার লোক। কলোনীর সব খবর রাখে। তাহার বিশ্বাস কলিকাতার দোকানে চুরি হইতেছে। দেড় বছর আগে নূতন বিবি বিবাহ করিয়া ঘরে আনিয়াছে, পুরাতন বিবিকে তালাক দিয়াছে।

নজর বিবি: বয়স ২০-২১। পশ্চিমের মেয়ে, আগে বাংলা জানিত না, বিবাহের পর শিখিয়াছে। ভদ্রঘরের মেয়ে বলিয়া মনে হয়। কলোনীর অধিবাসীদের লজ্জা করে না, কিন্তু বাহিরের লোক দেখিলে ঘোমটা টানে।

রসিক দে; বয়স ৩৫। নিজের বর্তমান অবস্থায় তুষ্ট নয়। দোকানের হিসাব লইয়া নিশানাথের সহিত গণ্ডগোল চলিতেছে। চেহারা রুগ্ন, চরিত্র বৈশিষ্ট্যহীন। (কালো ঘোড়া?)

খাতা বন্ধ করিয়া ব্যোমকেশ বলিল,—কেমন?

ব্যোমকেশ আমাকে বনলক্ষ্মী সম্পর্কে খোঁচা দিয়াছে, আমিও তাহাকে খোঁচা দিবার লোভ সংবরণ করিতে পারিলাম না,—ঠিক আছে। কেবল একটা কথা বাদ গেছে। নেপালবাবু ভাল দাবা খেলেন উল্লেখ করা উচিত ছিল।

ব্যোমকেশ আমাকে একবার ভাল করিয়া নিরীক্ষণ করিল, তারপর হাসিয়া বলিল,—আচ্ছা, শোধ-বোধ।

সন্ধ্যার সময় রমেনবাবুর চাকর আসিয়া একটি খাম দিয়া গেল। খামের মধ্যে দুইটি ফটো। ফটো দুইটি আমরা পরম আগ্রহের সহিত দর্শন করিলাম। কমলমণি সত্যই বঙ্কিমচন্দ্রের কমলমণি, লাবণ্যে মাধুর্যে ঝলমল করিতেছে। আর শ্যামা ঝি সত্যই জবরদস্তু শ্যামা ঝি। দুইটি আকৃতির মধ্যে কোথাও সাদৃশ্য নাই। এবং গোলাপ কলোনীর কোনও মহিলার সঙ্গে ছবি দুইটির তিলমাত্র মিল নাই।

এগারো

পরদিন সকালে ঘুম ভাঙিল টেলিফোনের শব্দে।

টেলিফোনের সহিত যাঁহারা ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত তাঁহারা জানেন, টেলিফোনের কিড়িং কিড়িং শব্দ কখনও কখনও ভয়ঙ্কর ভবিতব্যতার আভাস বহন করিয়া আনে। যেন তারের অপর প্রাস্তে যে-ব্যক্তি টেলিফোন ধরিয়াছে, তাহার অব্যক্ত হৃদয়াবেগ বিদ্যুতের মাধ্যমে সংক্রামিত হয়।

বিছানায় উঠিয়া বসিয়া উৎকৰ্ণ হইয়া শুনিলাম, কিন্তু কিছু বুঝিতে পারিলাম না। দুই-তিন মিনিট পরে ব্যোমকেশ টেলিফোন রাখিয়া আমার ঘরে প্রবেশ করিল। তাহার মুখে-চোখে একটা অনভ্যস্ত ধাঁধা-লাগার আভাস; সে বলিল,—ঝড় এসে গেছে।

ঝড়!

নিশানাথবাবু মারা গেছেন। চল, এখনি বেরুতে হবে।

আমার মাথায় যেন অতর্কিতে লাঠির ঘা পড়িল! কিছুক্ষণ হতভম্ব থাকিয়া শেষে ক্ষীণকণ্ঠে বলিলাম,—নিশানাথবাবু মারা গেছেন! কি হয়েছিল?

সেটা এখনও বোঝা যায়নি। স্বাভাবিক মৃত্যু হতে পারে, আবার নাও হতে পারে।

কিন্তু এ যে বিশ্বাস হচ্ছে না। আজি মারা গেলেন?

কাল রাত্রে। ঘুমন্ত অবস্থায় হয়তো রক্তের চাপ বেড়েছিল, হার্টফেল করে মারা গেছেন।

কে ফোন করেছিল?

বিজয়। ওর সন্দেহ হয়েছে স্বাভাবিক মৃত্যু নয়। ভয় পেয়েছে মনে হল। —নাও, চটপট উঠে পড়। ট্রেনে গেলে দেরি হবে, ট্যাক্সিতে যাব।

ট্যাক্সিতে যখন গোলাপ কলোনীর ফটকের সম্মুখে পৌছিলাম, তখনও আটটা বাজে নাই, কিন্তু প্রখর সূর্যের তাপ কড়া হইতে আরম্ভ করিয়াছে। ট্যাক্সির ভাড়া চুকাইয়া দিয়া আমরা ভিতরে প্ৰবেশ করিলাম।

বাগান নির্ঝুম; মালীরা কাজ করিতেছে না। কুঠিগুলিও যেন শূন্য। চারিদিকে চাহিয়া দেখিলাম কোথাও জনমানব নাই।

আমরা নিশানাথবাবুর বাড়ির সম্মখীন হইলে বিজয় বাহির হইয়া আসিল। তাহার চুল এলোমেলো, গায়ে একটা চাদর, পা খালি, চোখ জবাফুলের মত লাল। ভাঙা গলায় বলিল,—আসুন।

বসিবার ঘরে প্রবেশ করিয়া ব্যোমকেশ বলিল,—চলুন, আগে একবার দেখি, তারপর সব কথা শুনিব।

বিজয় আমাদের পাশের ঘরে লইয়া গেল; যে-ঘরে সেদিন দুপুরবেলা আমরা শয়ন করিয়াছিলাম সেই ঘর। জানালা খোলা রহিয়াছে। ঘরের একপাশে খাট, খাটের উপর সাদা চাদর-ঢাকা মৃতদেহ।

আমরা খাটের পাশে গিয়া দাঁড়াইলাম। ব্যোমকেশ সন্তৰ্পণে চাদর তুলিয়া লইল। নিশানাথবাবু যেন ঘুমাইয়া আছেন। তাঁহার পরিধানে কেবল সিল্কের ঢ়িলা পায়জামা, গায়ে জামা নাই। তাঁহার মুখের ভাব একটু ফুলো ফুলো, যেন মুখে অধিক রক্ত সঞ্চার হইয়াছে। এ ছাড়া মৃত্যুর কোনও চিহ্ন শরীরে বিদ্যমান নাই।

নীরবে কিছুক্ষণ মৃতদেহ পর্যবেক্ষণ করিয়া ব্যোমকেশ হঠাৎ অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া বলিয়া উঠিল,—এ কি? পায়ে মোজা!

এতক্ষণ লক্ষ্য করি নাই—নিশানাথের পায়ের চেটো পায়জামার কাপড়ে প্রায় ঢাকা ছিল—এখন দেখিলাম সত্যই তাঁহার পায়ে মোজা। ব্যোমকেশ ঝুঁকিয়া দেখিয়া বলিল,—গরম মোজা! উনি কি মোজা পায়ে দিয়ে শুতেন?

বিজয় আচ্ছন্নের মত দাঁড়াইয়া ছিল, মাথা নাড়িয়া বলিল,—না।

অতঃপর ব্যোমকেশ মৃতদেহের উপর আবার চাদর ঢাকা দিয়া বলিল,—চলুন, দেখা হয়েছে। ডাক্তার ডাকতে পাঠিয়েছেন কি? ডাক্তারের সার্টিফিকেট তো দরকার হবে।

বিজয় বলিল,—মুস্কিল গাড়ি নিয়ে শহরে গেছে, ডাক্তার নগেন পাল এখানকার বড় ডাক্তার—। কি বুঝলেন, ব্যোমকেশবাবু?

ও কথা পরে হবে। —আপনার কাকিম কোথায়?

কাকিমা অজ্ঞান হয়ে আছেন।

বিজয় আমাদের পাশের ঘরের দ্বারের কাছে লইয়া গেল। পর্দা সরাইয়া দেখিলাম, ও ঘরটিও শয়নকক্ষ। খাটের উপর দময়ন্তী দেবী বিস্রস্তভাবে পড়িয়া আছেন, ডাক্তার ভুজঙ্গধর পাশে বসিয়া তাঁহার শুশ্রুষা করিতেছেন; মাথায় মুখে জল দিতেছেন, নাকের কাছে অ্যামোনিয়ার শিশি ধরিতেছেন।

আমাদের দেখিতে পাইয়া ভুজঙ্গধরবাবু লঘুপদে আমাদের কাছে আসিয়া দাঁড়াইলেন। তাঁহার মুখ বিষণ্নগম্ভীর; স্বভাবসিদ্ধ বেপরোয়া চটুলতা সাময়িকভাবে অস্তমিত হইয়াছে। তিনি খাটো গলায় বলিলেন,—এখনও জ্ঞান হয়নি, তবে বোধহয় শীগগিরই হবে।

ফিস ফিস করিয়া কথা হইতে লাগিল। বোমকেশ জিজ্ঞাসা করিল,—কতক্ষণ অজ্ঞান হয়ে আছেনে?

ভুজঙ্গধরবাবু বলিলেন,—প্রায় তিন ঘন্টা। উনিই প্ৰথমে জানতে পারেন। ঘুম ভাঙার পর বোধহয় স্বামীর ঘরে গিয়েছিলেন, দেখে চীৎকার করে অজ্ঞান হয়ে পড়েন। এখনও জ্ঞান হয়নি।

আপনার কি মনে হয়? স্বাভাবিক মৃত্যু?

ডাক্তার একবার চোখ বড় করিয়া ব্যোমকেশের পানে চাহিলেন, তারপর ধীরে ধীরে মাথা নাড়িয়া বলিলেন,—এ বিষয়ে আমার কিছু বলবার অধিকার নেই। পাকা ডাক্তার আসুন, তিনি যা হয় বলবেন। বলিয়া ভুজঙ্গধরবাবু আবার দময়ন্তী দেবীর খাটের পাশে গিয়া বসিলেন।

আমরা বাহিরের ঘরে ফিরিয়া গেলাম। ইতিমধ্যে বৈষ্ণব ব্ৰজদাস বাহিরের ঘরে আসিয়া দ্বারের কাছে দাঁড়াইয়াছিলেন, আমাদের দেখিয়া নত হইয়া নমস্কার করিলেন। তাঁহার মুখে শোকাহত ব্যাকুলতার সহিত তীক্ষ্ণ উৎকণ্ঠার চিহ্ন মুদ্রিত রহিয়াছে। তিনি ভগ্নস্বরে বলিলেন,—এ কি হল আমাদের! এতদিন পর্বতের আড়ালে ছিলাম, এখন কোথায় যাব?

আমরা উপবেশন করিলাম। ব্যোমকেশ বলিল,—কোথাও যাবার দরকার হবে না বোধহয়। কলোনী যেমন চলছে তেমনি চলবে। —বসুন।

ব্ৰজদাস বসিলেন না, দ্বিধাগ্রস্ত মুখে জানালায় পিঠি দিয়া দাঁড়াইলেন। ব্যোমকেশ প্রশ্ন করিল,—কাল নিশানাথবাবুকে আপনি শেষ কখন দেখেছিলেন?

বিকেলবেলা। তখন তো বেশ ভালই ছিলেন।

ব্লাড-প্রেসারের কথা কিছু বলেছিলেন?

কিচ্ছু না।

বাহিরে মুস্কিলের গাড়ি আসিয়া থামিল। বিজয় বাহিরে গিয়া ডাক্তার নগেন্দ্ৰ পালকে লইয়া ফিরিয়া আসিল। ডাক্তার পালের হাতে ব্যাগ, পকেটে স্টেথ'স্কোপ, লোকটি প্ৰবীণ কিন্তু বেশ চটপটে। মৃদু কন্ঠে আক্ষেপের বাঁধা বুলি আবৃত্তি করিতে করিতে বিজয়ের সঙ্গে পাশের ঘরে প্ৰবেশ করিলেন। তাঁহার কথার ভগ্নাংশ কানে আসিল,—সব রোগের ওষুধ আছে, মৃত্যু রোগের ওষুধ নেই…

তিনি পাশের ঘরে অন্তৰ্হিত হইলে ব্যোমকেশ ব্ৰজদাসকে জিজ্ঞাসা করিল,—ডাক্তার পাল প্রায়ই আসেন বুঝি?

ব্ৰজদাস বলিলেন,—মাসে দু মাসে একবার আসেন। কলোনীর বাঁধা ডাক্তার। অবশ্য ভুজঙ্গধরবাবুই এখানকার কাজ চালান। নেহাৎ দরকার হলে এঁকে ডাকা হয়।

পনেরো মিনিট পরে ডাক্তার পাল বাহিরে আসিলেন। মুখে একটু লৌকিক বিষন্নতা। তাঁহার পিছনে বিজয় ও ভুজঙ্গধরবাবুও আসিলেন। ডাক্তার পাল ব্যোমকেশের প্রতি একটি চকিত দৃষ্টি নিক্ষেপ করিলেন, মনে হইল তিনি বিজয়ের কাছে ব্যোমকেশের পরিচয় শুনিয়াছেন। তারপর চেয়ারে বসিয়া ব্যাগ হইতে শিরোনামা ছাপা কাগজের প্যাড় বাহির করিয়া লিখিবার উপক্রম করিলেন।

ব্যোমকেশ তাঁহার দিকে ঝুকিয়া বলিল,—মাফ করবেন, আপনি কি ডেথ সার্টিফিকেট লিখছেন?

ডাক্তার পাল ভ্রু তুলিয়া চাহিলেন, বলিলেন,—হ্যাঁ।

ব্যোমকেশ বলিল,—আপনি তাহলে মনে করেন স্বাভাবিক মৃত্যু?

ডাক্তার পাল ঠোঁটের কোণ তুলিয়া একটু হাসিলেন, বলিলেন,—স্বাভাবিক মৃত্যু বলে কিছু নেই, সব মৃত্যুই অস্বাভাবিক। শরীরের অবস্থা যখন অস্বাভাবিক হয়, তখনই মৃত্যু হতে পারে।

ব্যোমকেশ বলিল,—তা ঠিক। কিন্তু শরীরের অস্বাভাবিক অবস্থা আপনা থেকে ঘটতে পারে, আবার বাইরে থেকে ঘটানো যেতে পারে।

ডাক্তার পালের ভ্রু আর একটু উপরে উঠিল। তিনি বলিলেন,—আপনি ব্যোমকেশবাবু, না? আপনি কী বলতে চান আমি বুঝেছি। কিন্তু আমি নিশানাথবাবুর দেহ ভাল করে পরীক্ষা করেছি, কোথাও আঘাতের চিহ্ন নেই। মৃত্যুর সময় কাল রাত্রি দশটা থেকে এগারোটার মধ্যে। আমার বিচারে কাল রাত্রে ঘুমন্ত অবস্থায় ওঁর মাথার শিরা ছিড়ে যায়, তারপর ঘুমন্ত অবস্থাতেই মৃত্যু হয়েছে। যারা ব্লাড-প্রেসারের রুগী তাদের মৃত্যু সাধারণত এইভাবেই হয়ে থাকে।

ব্যোমকেশ বলিল,—কিন্তু ওঁর পায়ে মোজা ছিল লক্ষ্য করেছেন বোধহয়। এই দারুণ গ্ৰীষ্মে তিনি মোজা পরে শুয়েছিলেন একথা কি বিশ্বাসযোগ্য?

ডাক্তার পালের মুখে একটু দ্বিধার ভাব দেখা গেল। তিনি বলিলেন,—ওটা যদিও ডাক্তারি নিদানের এলাকায় পড়ে না, তবু ভাববার কথা। নিশানাথবাবু এই গরমে মোজা পায়ে দিয়ে শুয়েছিলেন বিশ্বাস হয় না। কিন্তু আর কেউ তাঁকে ঘুমন্ত অবস্থায় মোজা পরিয়ে দিয়েছে তাই বা কি করে বিশ্বাস করা যায়? কেউ সে-চেষ্টা করলে তিনি জেগে উঠতেন না? আপনার কি মনে হয়?

ব্যোমকেশ বলিল,—আগে একটা কথা বলুন। ব্লাড-প্রেসারের রুগী পায়ে মোজা পরলে ব্লাড-প্রেসার বেড়ে যাবার সম্ভাবনা আছে কি?”

ডাক্তার পাল বলিলেন,—তা আছে। কিন্তু মাথার শিরা ছিড়ে মারা যাবেই এমন কথা জোর দিয়ে বলা যায় না। বিশেষ ক্ষেত্রে মারা যেতে পারে।

ব্যোমকেশ বলিল,—ডাক্তারবাবু, আপনি স্বাভাবিক মৃত্যুর সার্টিফিকেট দেবেন না। নিশানাথবাবুর শরীরের মধ্যে কী ঘটেছে বাইরে থেকে হয়তো সব বোঝা যাচ্ছে না। পোস্ট-মর্টেম হওয়া উচিত৷।

ডাক্তার তীক্ষ্ণ চক্ষে কিছুক্ষণ ব্যোমকেশকে নিরীক্ষণ করিলেন, তারপর কলমের মাথা বন্ধ করিতে করিতে বলিলেন,—আপনি ধোঁকা লাগিয়ে দিলেন। ‘বেশ, তাই ভালো, ক্ষতি তো আর কিছু হবে না।’ ব্যাগ হাতে উঠিয়া দাঁড়াইয়া বলিলেন,—আমি চললাম। থানায় খবর পাঠাব, আর আটপ্সির ব্যবস্থা করব।

ডাক্তারকে বিদায় দিয়া বিজয় ফিরিয়া আসিল, ক্লান্তভাবে একটা চেয়ারে বসিয়া দুহাতে মুখ ঢাকিল।

ভুজঙ্গবাবু তখনও ভিতর দিকের দ্বারের কাছে দাঁড়াইয়া ছিলেন, সদয় কন্ঠে বলিলেন,—বিজয়বাবু, আপনি নিজের কুঠিতে গিয়ে শুয়ে থাকুন। আমি না হয় একটা সেডেটিভ দিচ্ছি। এ সময় ভেঙে পড়লে তো চলবে না।

বিজয় হাতের ভিতর হইতে মুখ তুলিল না, রুদ্ধস্বরে বলিল,—আমি ঠিক আছি।

ভুজঙ্গধরবাবুর মুখে একটু ক্ষুব্ধ অসন্তোষ ফুটিয়া উঠিল। তিনি বলিলেন,—নিশানাথবাবুও ঐ কথা বলতেন। শরীরে রোগ পুষে রেখেছিলেন, ওষুধ খেতেন না। আমি রক্ত বার করবার জন্য পীড়াপীড়ি করলে বলতেন, দরকার নেই, আমি ঠিক আছি। তার ফল দেখছেন তো?

ব্যোমকেশ চট করিয়া তাঁহার দিকে ঘাড় ফিরাইল,—তাহলে আপনিও বিশ্বাস করেন এটা স্বাভাবিক মৃত্যু?

ভুজঙ্গধরবাবু বলিলেন,—আমার বিশ্বাসের কোনও মূল্য নেই। আপনাদের সন্দেহ হয়েছে পরীক্ষা করিয়ে দেখুন। কিন্তু কিছু পাওয়া যাবে না।

পাওয়া যাবে না কি করে জানলেন?

ভুজঙ্গধরবাবু একটু মলিন হাসিলেন। ‘আমিও ডাক্তার ছিলাম একদিন।’ বলিয়া ধীরে ধীরে ভিতর দিকে প্ৰস্থান করিলেন।

ব্যোমকেশ বিজয়ের দিকে ফিরিয়া বলিল,—ভুজঙ্গধরবাবু ঠিক বলেছেন, আপনার বিশ্রাম দরকার—

বিজয় কাতর মুখ তুলিয়া বলিল,‘—আমি এখন শুয়ে থাকতে পারব না, ব্যোমকেশবাবু। কাকা—’ তাহার কণ্ঠরোধ হইয়া গেল।

তা বটে। আচ্ছা, তাহলে বলুন কাল থেকে কি কি ঘটেছে। কাল সকলে আপনি আমাকে চিঠি দিয়ে দোকানে গেলেন। ভাল কথা, আপনার কাকা আমাকে কি লিখেছিলেন। আপনি জানেন?

না। কি লিখেছিলেন?

লিখেছিলেন আমার সাহায্য আর তাঁর দরকার নেই। কিন্তু ওকথা যাক। আপনি কলকাতা থেকে ফিরলেন কখন?

পাঁচটার গাড়িতে।

কাকার সঙ্গে দেখা হয়েছিল?

কাকা বাগানে বেড়াচ্ছেন দেখেছিলাম। কথা হয়নি।

শেষ তাঁকে কখন দেখেছিলেন?

সেই শেষ, আর দেখিনি। সন্ধ্যের পর আমি এখানে আসছিলাম। কাকার সঙ্গে কথা বলবার জন্যে কিন্তু বাইরে থেকে শুনতে পেলাম রসিকাবাবুর সঙ্গে কাকার বাচসা হচ্ছে—

রসিকবাবু? যিনি শাকসবজির দোকান দেখেন? তাঁর সঙ্গে কী নিয়ে বাচসা হচ্ছিল?

সব কথা শুনতে পাইনি। কেবল কাকা বলছিলেন শুনতে পেলাম—তোমাকে পুলিসে দেব। আমি আর ভেতরে এলাম না, ফিরে গেলাম।

হুঁ। রাত্রে খাবার সময় কাকার সঙ্গে দেখা হয়নি?

না। আমি—সকাল সকাল খেয়ে আবার আটটার ট্রেনে কলকাতায় গিয়েছিলাম।

আবার কলকাতায় গিয়েছিলেন? ব্যোমকেশ স্থির নেত্ৰে বিজয়ের পানে চাহিয়া রহিল।

বিজয়ের শুষ্ক মুখ যেন আরও ক্লিষ্ট হইয়া উঠিল। সে একটু বিদ্রোহের সুরে বলিল,—হ্যাঁ। আমার দরকার ছিল।

কী দরকার ছিল এ প্রশ্ন ব্যোমকেশ করিল না। শান্তস্বরে বলিল,—কখন ফিরলেন?

বারোটার পর। নিজের কুঠিতে গিয়ে শুয়ে পড়েছিলাম। আজ সকালে মুকুল এসে—

মুকুল?

মুকুল ভোরবেলা এদিক দিয়ে যাচ্ছিল, কাকিমার চীৎকার শুনতে পেয়ে ছুটে এসে দেখল কাকিমা অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে আছেন আর কাকা মারা গেছেন। তখন মুকুল দৌড়ে গিয়ে আমাকে তুলল।

কিছুক্ষণ নীরবে কাটিল। ব্যোমকেশ অন্যমনস্কভাবে সিগারেট মুখে দিতে গিয়া থামিয়া গেল, সিগারেট আবার কোটায় রাখিতে রাখিতে বলিল,—রসিকবাবু কোথায়?

বিজয় বলিল,—রসিকবাবুকে আজ সকাল থেকে পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁর কুঠি খালি পড়ে আছে।

তাই নাকি?

এই সময় ব্ৰজদাস কথা বলিলেন। তিনি এতক্ষণ জানালায় ঠেস দিয়া নীরবে সমস্ত শুনিতেছিলেন, এখন গলা খাঁকারি দিয়া বলিলেন,—রসিকবাবু বোধহয় কাল রাত্রেই চলে গেছেন। ওঁর কুঠি আমার পাশেই রাত্রে ওঁর ঘরে আলো জ্বলতে দেখিনি।

বিজয় বলিল,—তা হবে। হয়তো কাকার সঙ্গে বকবকির পর—

ব্যোমকেশ বলিল,—হয়তো ফিরে আসবেন। কলোনীর আর সবাই যথাস্থানে আছে তো? নেপালবাবু—

আর সকলেই আছে।

আবার কিছুক্ষণ নীরবে কাটিল। তারপর ব্যোমকেশ বলিল,—বিজয়বাবু, এবার বলুন দেখি, নিশানাথবাবুর মৃত্যু যে স্বাভাবিক নয় এ সন্দেহ আপনার হল কেন?

বিজয় বলিল,—প্রথমে ওঁর পায়ে মোজা দেখে। কাকা শীতকালেও মোজা পরতেন না, মোজা তাঁর ছিলইনা। দ্বিতীয়ত, আমি ঘরে ঢুকে দেখলাম জানালা বন্ধ রয়েছে।

বন্ধ রয়েছে?

হ্যাঁ, ছিটিকিনি লাগানো। কাকা কখনই রাত্রে জানালা বন্ধ করে শোননি। তবে কে জানালা বন্ধ করলে?

তা বটে। —বিজয়বাবু, আপনাকে একটা ঘরের কথা জিগ্যেস করছি, কিছু মনে করবেন না। আপনার কাকার জীবনে কি কোনও গোপন কথা ছিল?

বিজয়ের চোখের মধ্যে যেন ভয়ের ছায়া পড়িল, সে অস্পষ্ট স্বরে বলিল,—গোপন কথা! না, আমি কিছু জানি না।

ব্যোমকেশ বলিল,—না জানা আশ্চর্য নয়। হয়তো তাঁর যৌবনকালে কিছু ঘটেছিল। কিন্তু কোনও দিন সন্দেহও কি হয়নি?

‘না।’ বলিয়া বিজয় ক্লান্তভাবে দুহাতে মুখ ঢাকিল।

এই সময় দেখিলাম। বৈষ্ণব ব্ৰজদাস কখন নিঃসাড়ে ঘর হইতে অন্তহিঁত হইয়াছেন। আমাদের মনোযোগ বিজয়ের দিকে আকৃষ্ট ছিল বলিয়াই বোধহয় তাঁহার নিষ্ক্রমণ লক্ষ্য করি নাই।

ভিতর দিকের দ্বারা দিয়া ভুজঙ্গধরবাবু আসিয়া আমাদের মধ্যে দাঁড়াইলেন, খাটো গলায় বলিলেন,—মিসেস সেনের জ্ঞান হয়েছে।

বিজয় ধড়মড় করিয়া উঠিয়া গমনোদ্যত হইল। ভুজঙ্গধরবাবু তাহাকে ক্ষণেকের জন্য আটকাইলেন, বলিলেন,—পোস্ট-মর্টেমের কথা এখন মিসেস সেনকে না বলাই ভাল।

বিজয় চলিয়া গেল। কয়েক সেকেন্ড পরেই দময়ন্তী দেবীর ঘর হইতে মর্মান্তিক কান্নার আওয়াজ আসিল।

কাকিমা—৷

বাবা বিজয়—।

ভুজঙ্গধরবাবু একটা অর্ধোচ্ছ্বসিত নিশ্বাস চাপিয়া যো-পথে আসিয়াছিলেন সেই পথে ফিরিয়া গেলেন। আমরা নেপথ্য হইতে দুইটি শোকার্ত মানুষের বিলাপ শুনিতে লাগিলাম।

বারো

হাতের ঘড়ি দেখিয়া ব্যোমকেশ বলিল, সাড়ে ন’টা। এখনও পুলিস আসতে অনেক দেরি। চল একটু ঘুরে আসা যাক।

কোথায় ঘুরবে?

কলোনীর মধ্যেই এদিক ওদিক। এস।

দুজনে বাহির হইলাম। দময়ন্তী দেবীর কান্নাকাটির শব্দ এখনও থামে নাই। বিজয় কাকিমার কাছেই আছে। ভুজঙ্গধরবাবুরাও বোধহয় উপস্থিত আছেন।

আমরা সদর দরজা দিয়া বাহির হইলাম। বাঁ-হাতি পথ ধরিয়াছি, কয়েক পা। যাইবার পর একটা দৃশ্য দেখিয়া থমকিয়া গেলাম। বাড়ির এ-পাশে কয়েকটা কামিনী ফুলের ঝাড় বাড়ির দুটি জানালাকে আংশিকভাবে আড়াল, করিয়া রাখিয়াছে। দুটি জানালার আগেরটি নিশানাথবাবুর ঘরের জানালা, পিছনটি দময়ন্তী দেবীর ঘরের। দেকিলাম, দময়ন্তী দেবীর জানালার ঠিক নীচে একটি স্ত্রীলোক সম্মুখদিকে ঝুঁকিয়া একাগ্ৰ ভঙ্গীতে দাঁড়াইয়া আছে। আমাদের দেখিয়া সে চকিতে মুখ তুলিল এবং সরীসৃপের মত ঝোপঝাড়ের ভিতর দিয়া বাড়ির পিছনে অদৃশ্য হইল।

মুস্কিলের বৌ নজর বিবি।

ব্যোমকেশ ভ্রুকুঞ্চিত করিয়া চাহিয়া ছিল। বলিলাম,—দেখলে?

ব্যোমকেশ আবার চলিতে আরম্ভ করিয়া বলিল,—জানালায় আড়ি পেতে শুনছিল।

কি মতলবে?

নিছক কৌতুহল হতে পারে। মেয়েমানুষ তো! নিশানাথবাবু মারা গেছেন। অথচ ওরা বিশেষ কোনও খবর পায়নি। সরাসরি জিজ্ঞেস করবারও সাহস নেই। তাই হয়তো—

আমার মনঃপূত হইল না। মেয়েরা কৌতুহলের বশে আড়ি পাতিয়া থাকে। কিন্তু এক্ষেত্রে কি শুধুই কৌতুহল?

গোহালের সম্মুখ দিয়া যাইবার সময় দেখিলাম পানুগোপাল নিজের কুঠির পৈঠায় বসিয়া হতাশা-ভরা চক্ষে আকাশের দিকে চাহিয়া আছে। আমাদের দেখিয়া সে উঠিয়া দাঁড়াইল, দু হাতে নিজের চুলের মুঠি ধরিয়া কিছু বলিতে চাহিল। তাহার ঠোঁট কাঁপিয়া উঠিল, কিন্তু গলা দিয়ে আওয়াজ বাহির হইল না। তারপর সে আবার বসিয়া পড়িল। এই অসহায় মানুষটি নিশানাথবাবুর মৃত্যুতে কতখানি কাতর হইয়াছে একটি কথা না বলিয়াও তাহা প্রকাশ করিল।

আমরা দাঁড়াইলাম না, আগাইয়া চলিলাম। সামনের একটা মোড় ছাড়িয়া দ্বিতীয় মোড় ঘুরিয়া নেপালবাবুর গৃহের সম্মুখে উপস্থিত হইলাম।

নেপালবাবু অর্ধোলঙ্গ অবস্থায় তক্তপোশে বসিয়া একটা বাঁধানো খাতায় কিছু লিখিতেছিলেন, আমাদের দেখিয়া দ্রুত খাতা বন্ধ করিয়া ফেলিলেন। চোখ পাকাইয়া আমাদের দিকে কিছুক্ষণ চাহিয়া থাকিয়া অপ্ৰসন্ন স্বরে বলিলেন,—আপনারা!

ব্যোমকেশ ঘরে প্রবেশ করিয়া তক্তপোশের পাশে বসিল, দুঃখিত মুখে মিথ্যা কথা বলিল,—নিশানাথবাবু চিঠি লিখে নেমন্তন্ন করেছিলেন। আজ এসে দেখি—এই ব্যাপার।

নেপালবাবু সতর্ক চক্ষে তাহাকে নিরীক্ষণ করিয়া গলার মধ্যে একটা শব্দ করিলেন এবং অর্ধদগ্ধ সিগার ধরাইতে প্ৰবৃত্ত হইলেন।

ব্যোমকেশ বলিল,—আমরা তো একেবারে ঘাবড়ে গেছি। নিশানাথবাবু এমন হঠাৎ মারা যাবেন ভাবতেই পারিনি।

নেপালবাবু ধোঁয়া ছাড়িয়া বলিলেন,—ব্লাডপ্রেসারের রুগী ঐভাবেই মরে। নিশানাথ বড় একগুঁয়ে ছিল, কারুর কথা শুনতো না। কতবার বলেছি—

আপনার সঙ্গে তো তাঁর খুবই সদ্ভাব ছিল?

নেপালবাবু একটু দাম লইয়া বলিলেন,—হ্যাঁ, সদ্ভাব ছিল বৈকি। তবে ওর একগুঁয়েমির জন্যে মাঝে মাঝে কথা কাটাকাটি হত।

কথা কাটাকাটির কথায় মনে পড়ল। সেদিন আমাদের সামনে আপনি ওঁকে বলেছিলেন, ভাঙব নাকি হাঁটে হাঁড়ি! তা থেকে আমার মনে হয়েছিল, আপনি ওঁর জীবনের কোনও গুপ্তকথা জানেন।

নেপালবাবুর এবার আর একটু ভাব-পরিবর্তন হইল, তিনি সৌহৃদ্যসূচক হাসিলেন। বলিলেন,—গুপ্তকথা! আরে না, ও আপনার কল্পনা। রাগের মাথায় যা মুখে এসেছিল বলেছিলাম, ওর কোনও মানে হয় না। —তা আপনারা এসেছেন, আজ তো এখানে খাওয়া-দাওয়ার কোন ব্যবস্থাই নেই, হবে বলেও মনে হয় না। মুকুল—আমার মেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছে।

ব্যোমকেশ বলিল,—হবারই কথা। উনিই তো প্রথম জানতে পারেন। খুবই শক লেগেছে। —আচ্ছা নেপালবাবু, কিছু মনে করবেন না, একটা প্রশ্ন করি। আপনার মেয়ের সঙ্গে কি বিজয়বাবুর কোনও রকম—

নেপালবাবুর সুর আবার কড়া হইয়া উঠিল,—কোনও রকম কী?

কোনও রকম ঘনিষ্ঠতা—?

‘কারুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা করবার মেয়ে আমার নয়। তবে-প্রথম এখানে আসার কয়েকমাস পরে বিজয়ের সঙ্গে মুকুলের বিয়ের কথা তুলেছিলাম। বিজয় প্রথমটা রাজী ছিল, তারপর উলটে গেল।’ কিছুক্ষণ গুম হইয়া থাকিয়া বলিলেন,—বিজয়টা ঘোর নির্লজ্জ।

ব্যোমকেশ সঙ্কুচিতভাবে প্রশ্ন করিল,—বিজয়বাবুর কি চরিত্রের দোষ আছে?

নেপালবাবু বলিলেন,—দোষ ছাড়া আর কি। স্বভাবের দোষ। ভাল মেয়ে ছেড়ে যারা নষ্ট-কুলটার পেছনে ঘুরে বেড়ায় তাদের কি সচ্চরিত্র বলব?

বিজয়-মুকুলঘটিত রহস্যটি পরিষ্কার হইবার উপক্রম করিতেছিল, কিন্তু বাধা পড়িল। ভুজঙ্গাধর বাবু প্ৰবেশ করিয়া বলিলেন,—মুকুল এখন কেমন আছে?

নেপালবাবু বলিলেন,—যেমন ছিল তেমনি। নেতিয়ে পড়েছে মেয়েটা। তুমি একবার দেখবে?

চলুন। কোথায় সে?

‘শুয়ে আছে।’ বলিয়া নেপালবাবু তক্তপোশ হইতে উঠিলেন।

ব্যোমকেশ বলিল,—আচ্ছা, আমরাও তাহলে উঠি!

নেপালবাবু উত্তর দিলেন না, ভুজঙ্গধরবাবুকে লইয়া ভিতরে প্রবেশ করিলেন।

খাতাটা তক্তপোশের উপর পড়িয়া ছিল। ব্যোমকেশ টপ করিয়া সেটা তুলিয়া লইয়া দ্রুত পাতা উল্টাইল, তারপর খাতা যথাস্থানে রাখিয়া দিয়া বলিল,—চল।

বাহিরে রাস্তায় আসিয়া জিজ্ঞাসা করিলাম,—খাতায় কী দেখলে?

ব্যোমকেশ বলিল,—বিশেষ কিছু নয়। কলোনীর সকলের নামের ফিরিস্তি। তার মধ্যে পানুগোপাল আর বনলক্ষ্মীর নামের পাশে ড্যারা।

তার মানে?

নেপালবাবু বোধহয় কালনেমির লঙ্কাভাগ শুরু করে দিয়েছেন। ওঁর ধারণা হয়েছে উনিই এবার কলোনীর শূন্য সিংহাসনে বসবেন। পানুগোপাল আর বনলক্ষ্মীকে কলোনী থেকে তাড়াবেন, তাই তাদের নামে ঢ্যারা পড়েছে। কিন্তু ওকথা যাক, মুকুল আর বিজয়ের ব্যাপার বুঝলে?

খুব স্পষ্টভাবে বুঝিনি। কী ব্যাপোর?

নেপালবাবুরা কলোনীতে আসার পর মুকুলের সঙ্গে বিজয়ের মাখামাখি হয়েছিল, বিয়ের সম্বন্ধ হয়েছিল। তারপর এল বনলক্ষ্মী। বনলক্ষ্মীকে দেখে বিজয় তার দিকে ঝুঁকল, মুকুলের সঙ্গে বিয়ে ভেঙে দিলে।

ও—তাই নষ্ট-কুলটার কথা। কিন্তু বিজয়ও তো বনলক্ষ্মীর ইতিহাস জানে। প্রেম হলেও বিয়ে হবে কি করে?

বিজয় যদি জেনেশুনে বিয়ে করতে চায় কে বাধা দেবে?

নিশানাথবাবু নিশ্চয় বাধা দিয়েছিলেন।

সম্ভব। তিনি বনলক্ষ্মীকে স্নেহ করতেন। কিন্তু তার সঙ্গে ভাইপোর বিয়ে দিতে বোধহয় প্ৰস্তুত ছিলেন না। —বড় জটিল ব্যাপার অজিত, যত দেখছি ততই বেশি জটিল মনে হচ্ছে। নিশানাথবাবুর মৃত্যুতে অনেকেরই সুবিধা হবে।

নিশানাথবাবুর মৃত্যু স্বাভাবিক নয়। এ বিষয়ে তুমি নিঃসংশয়?

নিঃসংশয়। তাঁর ব্লাড-প্রেসার তাঁকে পাহাড়ের কিনারায় এনে দাঁড় করিয়েছিল, তারপর পিছন থেকে কেউ ঠেলা দিয়েছে।

নিশানাথবাবুর বাড়িতে ফিরিয়া আসিলে বিজয় বলিল,—কাকিমাকে ভুজঙ্গধরবাবু, মরফিয়া ইনজেকশন দিয়েছেন। কাকিমা ঘুমিয়ে পড়েছেন।

ব্যোমকেশ বলিল,—ভাল। ঘুম ভাঙলে অনেকটা শাস্ত হবেন। ইতিমধ্যে মৃতদেহ স্থানান্তরিত করা যাবে।

তেরো

এগারোটার সময় পুলিস ভ্যান আসিল। তাঁহাতে কয়েকজন কনস্টেবল ও স্থানীয় থানার দারোগা প্ৰমোদ বরাট।

প্রমোদ বরাটের বয়স বেশি নয়। কালো রঙ, কাটালো মুখ, শালপ্রাংশু দেহ। পুলিসের ছাঁচে পড়িয়াও তাহার মনটা এখনও শক্ত হইয়া ওঠে নাই; মুখে একটু ছেলেমানুষী ভাব এখনও লাগিয়া আছে। করজোড়ে ব্যোমকেশকে নমস্কার করিয়া তদগত মুখে বলিল,—আপনিই ব্যোমকেশবাবু?

বুঝিলাম পুলিসের লোক হইলেও সে ব্যোমকেশের ভক্ত। ব্যোমকেশ হাসিমুখে তাহাকে একটু তফাতে লইয়া গিয়া নিশানাথবাবুর মৃত্যুর সন্দেহজনক হাল বয়ান করিল। প্রমোদ বরাট একাগ্রমনে শুনিল। তারপর ব্যোমকেশ তাঁহাকে লইয়া মৃতের কক্ষে প্রবেশ করিল। বিজয় ও আমি সঙ্গে গেলাম।

ঘরে প্রবেশ করিয়া বরাট দ্বারের কাছে দাঁড়াইয়া পড়িল এবং চারিদিকে চক্ষু ফিরাইয়া দেখিতে লাগিল। এই সময় মেঝের উপর একটা লঘু গোলক বাতাসে গড়াইতে গড়াইতে যাইতেছে দেখিয়া বরাট নত হইয়া সেটা কুড়াইয়া লইল। খড়, শুকনা ঘাস, শণের সুতো মিশ্রিত একটি গুচ্ছ। বরাট বলিল,—এটা কি? কোখেকে এল?

ব্যোমকেশ বলিল,—‘চড়াই পাখির বাসা। ঐ দেখুন, ওখান থেকে খসে পড়েছে।’ বলিয়া উর্ধ্বে পাখা ঝুলাইবার আংটার দিকে দেখাইল। দেখা গেল চড়াই পাখিরা নির্বিকার, শূন্য আংটায় আবার বাসা বাঁধতে আরম্ভ করিয়া দিয়াছে।

খড়ের গোলাটা ফেলিয়া দিয়া বরাট মৃতদেহের কাছে গিয়া দাঁড়াইল এবং চাদর সরাইয়া মৃতদেহের উপর চোখ বুলাইল। ব্যোমকেশ বলিল,—পায়ে মোজা দেখছেন? ঐটেই সন্দেহের মূল কারণ। আমি মৃতদেহ ছুঁইনি, পুলিসের আগে মৃতদেহ স্পর্শ করা অনুচিত হত। কিন্তু মোজার তলায় কী আঁছে, পায়ে কোনও চিহ্ন আছে কি না জানা দরকার।

বেশ তো, এখনই দেখা যেতে পারে বলিয়া বরাট মোজা খুলিয়া লইল। ব্যোমকেশ ঝুঁকিয়া পায়ের গোছ পর্যবেক্ষণ করিল। আপাতদৃষ্টিতে অস্বাভাবিক কিছু দেখা যায় না, কিন্তু ভাল করিয়া লক্ষ্য করিলে দেখা যায় পায়ের গোছের কাছে অল্প দাগ রহিয়াছে; মোজার উপর ইল্যাস্টিক গার্টার পরিলে যে-রকম দাগ হয়। সেই রকম।

দাগ দেখিয়া ব্যোমকেশের চোখ জ্বলজ্বল করিয়া জ্বলিয়া উঠিয়াছিল; সে বরাটকে বলিল,—দেখলেন?

বরাট বলিল,—হ্যাঁ। বাঁধনের দাগ মনে হয়। কিন্তু এ থেকে কী অনুমান করা যেতে পারে?

ব্যোমকেশ বলিল,—অন্তত এটুকু অনুমান করা যেতে পারে যে, নিশানাথবাবু মৃত্যুর পূর্বে নিজে মোজা পারেননি, আর কেউ পরিয়েছে।

বরাট বলিল,—কিন্তু কেন? এর থেকে কি মনে হয়? আপনি বুঝতে পেরেছেন?

বোধহয় পেরেছি। কিন্তু যতক্ষণ সব পরীক্ষা না হচ্ছে ততক্ষণ কিছু না বলাই ভাল। আপনি মৃতদেহ নিয়ে যান। ডাক্তারকে বিশেষভাবে লক্ষ্য করতে বলবেন গায়ে কোথাও হাইপোডারমিক সিরিঞ্জের চিহ্ন আছে কি না।

বেশ।

আমরা আবার বাহিরের ঘরে ফিরিয়া আসিলাম। বরাট কনস্টেবলদের ডাকিয়া মৃতদেহ ভ্যানে তুলিবার হুকুম দিল। বিজয় এতক্ষণ কোনও মতে নিজেকে শক্ত করিয়া রাখিয়াছিল, এখন মুখে হাত চাপা দিয়া কাঁদিতে লাগিল।

ব্যোমকেশ কোমল স্বরে বলিল,—আপনার আজ আর সঙ্গে গিয়ে কাজ নেই, আমরা যাচ্ছি। আপনি বরং কাল সকালে যাবেন। —কি বলেন, ইন্সপেক্টর বিরাট?

বরাট বলিল,—সেই ভাল। কাল সকালের আগে রিপোর্ট পাওয়া যাবে না। আমি সকালে ওঁকে নিয়ে আপনার বাসায় যাব।

বেশ। চলুন তাহলে। আপনার ভ্যানে আমাদের জায়গা হবে তো?

হবে। আসুন।

ব্যোমকেশ বিজয়ের পিঠে হাত রাখিয়া মৃদুস্বরে আশ্বাস দিল, তারপর আমরা দ্বারের দিকে পা বাড়াইলাম। এই সময় ভিতরের দরজার সম্মুখে বনলক্ষ্মী আসিয়া দাঁড়াইল। তাহার মুখ শুষ্ক শ্ৰীহীন, পরনের ময়লা শাড়ির আচিলে কালি ও হলুদের ছোপ। আমাদের সহিত চোখাচোখি হইতে সে বলিল,—রান্না হয়েছে। আপনারা খেয়ে যাবেন না?

ব্যোমকেশ বলিয়া উঠিল—রান্না! কে রাঁধলে?

বনলক্ষ্মী চোখ নামাইয়া সঙ্কুচিত স্বরে বলিল,—আমি।

তাহার আঁচলে কালি ও হলুদের দাগ, অনভ্যস্ত রন্ধনক্রিয়ার চিহ্ন। যাক, তবু কলোনীর একজন মাথা ঠাণ্ডা রাখিয়াছে, যত মর্মাস্তিক ঘটনাই ঘটুক এতগুলো লোকের আহার চাই তাহা সে ভোলে নাই। দেখিলাম, বিজয় মুখ তুলিয়া একদৃষ্টি বনলক্ষ্মীর পানে চাহিয়া আছে, যেন তাহাকে এই নূতন দেখিল।

ব্যোমকেশ বলিল,—‘আমরা এখন ফিরে যাচ্ছি। খাওয়া থাক। এমনিতেই আপনাদের কষ্টের শেষ নেই, আমরা আর হাঙ্গামা বাড়ব না। আপনি বরং এদের ব্যবস্থা করুন।’ বলিয়া বিজয়ের দিকে ইঙ্গিত করিল।

বনলক্ষ্মী বিজয়ের কাছে আসিয়া দাঁড়াইল, ভারী গলায় বলিল,—চলুন, স্নান করে নেবেন।

আমরা বাহির হইলাম।

পুলিস ভ্যান একটি শবদেহ ও কয়েকটি জীবন্ত মানুষ লইয়া কলিকাতার অভিমুখে চলিল। পথে বেশি কথা হইল না। এক সময় ব্যোমকেশ বলিল,—রসিক দে নামে একটি লোক কলোনীতে থাকত, কাল থেকে সে নিরুদ্দেশ। খুব সম্ভব দোকানের টাকা চুরি করেছে। তার খোঁজ নেবেন। তার হাতের আঙুল কাটা। খুঁজে বার করা কঠিন হবে না।

বরাট নোটবুকে লিখিয়া লইল।

ঘণ্টাখানেক পরে বাসার সম্মুখে আমাদের নামাইয়া দিয়া পুলিস ভ্যান চলিয়া গেল।

সমস্ত দিন মনটা বিভ্রান্ত হইয়া রহিল। নিশানাথবাবুর ছায়ামূর্তি মনের মধ্যে ঘুরিয়া বেড়াইতে লাগিল।

বিকালবেলা তিনটার সময় দেখিলাম ব্যোমকেশ ছাতা লইয়া বাহির হইতেছে। জিজ্ঞাসা করিলাম,—কোথায়?

সে বলিল,—একটু খোঁজ-খবর নিতে বেরুচ্ছি।

কার খোঁজ-খবর?

কারুর ওপর আমার পক্ষপাত নেই, কলোনীর অধিবাসীদের যার খবর পাব যোগাড় করব। আপাতত দেখি ডাক্তার ভুজঙ্গধর আর লাল সিং সম্বন্ধে কিছু সংগ্ৰহ করতে পারি কিনা।

লাল সিংকে ভোলোনি?

কাউকে ভুলিনি। বলিয়া ব্যোমকেশ নিস্ক্রান্ত হইল।

সে বাহির হইবার আধা ঘন্টা পরে টেলিফোন আসিল। বিজয় কলোনী হইতে টেলিফোন করিতেছে। ওদিকের খবর ভালই, দময়ন্তী দেবী এখনও জাগেন নাই। অন্য খবরের মধ্যে ব্ৰজদাস গোঁসাইকে পাওয়া যাইতেছে না, দ্বিপ্রহরে আহারের পূর্বেই তিনি অন্তর্ধান করিয়াছেন।

অভিনব সংবাদ। প্রথম রসিক দে, তারপর বৈষ্ণব বাবাজী! ইনিও কি কলোনীর টাকা হাত সাফাই করিতেছিলেন?

ব্যোমকেশ ফিরিলে সংবাদ দিব বলিয়া টেলিফোন ছাড়িয়া দিলাম।

সন্ধ্যার প্রাক্কালে ঝড়ের সঙ্গে বৃষ্টি নামিল। যেন অনেকদিন একজুরী ভোগ করিবার পর ঘাম দিয়া জ্বর ছাড়িল। ব্যোমকেশ রৌদ্রের জন্য ছাতা লইয়া বাহির হইয়াছে, বৃষ্টিতেও ছাতা কাজে আসিবে।

রাত্রি সাড়ে আটটার সময় ব্যোমকেশ ফিরিল। জামা ভিজিয়া গোবর হইয়াছে, ছাতাটার অবস্থা ঝোড়ো কাকের মত; সেই অবস্থায় চেয়ারে বসিয়া পরম তৃপ্তির একটি নিশ্বাস ফেলিল। তারপর গলা চড়াইয়া হাঁকিল,—পুটরাম, চা নিয়ে এস।

তাহাকে বিজয়ের বার্তা শুনাইলাম। সে কিছুক্ষণ অন্যমনে রহিল, শেষে বলিল,—একে একে নিভিছে দেউটি। এইভাবে যদি চলতে থাকে তাহলে শেষ পর্যন্ত মুস্কিল মিঞা ছাড়া আর কেউ থাকবে না। কিন্তু বাবাজী এত দেরিতে পালালেন কেন? পোস্ট-মর্টেমের নাম শুনে ঘাবড়ে গেছেন?

জিজ্ঞাসা করিলাম,—তারপর তোমার কি হল? ভুজঙ্গধরবাবুর খবর পেলে?

নতুন খবর বড় কিছু নেই। তিনি যা যা বলেছিলেন সবই সত্যি। চীনেপটিতে তাঁর ডিসপেন্সারি। আর নার্সিং হোম ছিল। অনেক রোজগার করতেন! তারপরই দুর্মতি হল।

আর লাল সিং?

ব্যোমকেশ ভিজা জামা খুলিয়া মাটিতে ফেলিল,—লাল সিং বছর দুই আগে জেলে মারা গেছে। তার স্ত্রীকে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু চিঠি ফিরে এসেছে। স্ত্রীর পাত্তা কেউ জানে না।

বাহিরে বৃষ্টি চলিতেছে; চারিদিক ঠাণ্ডা হইয়া গিয়াছে। পুঁটিরাম চা আনিয়া দিল। ব্যোমকেশ চায়ে একটি ক্ষুদ্র চুমুক দিয়া বলিল,—এই বৃষ্টিটা যদি কাল রাত্তিরে হত তাহলে নিশানাথবাবুর মোজা পরার একটা মানে পাওয়া যেত, মনে হত উনি নিজেই মোজা পরেছেন। অন্তত সম্ভাবনাটা বাদ দেওয়া যেত না। ভাগ্যিস কাল বৃষ্টি হয়নি।

চৌদ্দ

পরদিন সকালবেলা বরাট ও বিজয় আসিল। বিজয়ের পা খালি, অশোচের বেশ। ক্লান্তভাবে চেয়ারে বসিল।

ব্যোমকেশ বরাটের দিকে হাত বাড়াইয়া বলিল,—কৈ, পোস্ট-মর্টেম রিপোর্ট দেখি।

বোতাম-অ্যাটা পকেট খুলিতে খুলিতে বরাট বলিল,—পরিষ্কার রিপোর্ট; সন্দেহজনক কিছুই পাওয়া যায়নি। রক্তে কোনও বিষ বা ওষুধের চিহ্ন পর্যন্ত নেই। মাথার মধ্যে হেমারেজ হয়ে মারা গেছেন।

হাইপোডারমিক সিরিঞ্জের দাগ নেই?

কনুইয়ের কাছে শিরের ওপর ছুচ ফোটানোর কয়েকটা দাগ আছে কিন্তু সেগুলো দু'তিন মাসের পুরানো।

আর পায়ের দাগ?

ডাক্তার বলেন ও—দাগের সঙ্গে মৃত্যুর কোনও সম্বন্ধ নেই।

বরাট রিপোর্ট বাহির করিয়া দিল। ব্যোমকেশ পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে তাহা পড়িল। নিশ্বাস ফেলিয়া রিপোর্ট বরাটকে ফেরত দিয়া বলিল,—দেহে কিছু পাওয়া যাবে আমার মনে করাই অন্যায় হয়েছিল।

বরাট বলিল,—তাহলে কি সোজাসুজি ব্লাড-প্রেসার থেকে মৃত্যু বলেই ধরতে হবে?

কখনই না। হত্যাকারী ব্লাড়-প্রেসারের সুযোগ নিয়েছে, তাই হত্যার কোনও চিহ্ন পাওয়া যাচ্ছে না।

কিন্তু—কিভাবে সুযোগ নিয়েছে বুঝতে পারছি না। আমাকে যদি তদন্ত চালাতে হয় তাহলে ধরা-ছোঁয়া যায় এমন একটা কিছু চাই তো। আপনি কাল বলেছিলেন মোজা পরার কারণ বুঝতে পেরেছেন। কী বুঝতে পেরেছেন আমায় বলুন।

বিজয় এতক্ষণ আঙ্গুল দিয়া কপালের দুই পাশ টিপিয়া নির্জীবভাবে বসিয়াছিল, এখন চোখ তুলিয়া ব্যোমকেশের পানে চাহিল। ব্যোমকেশও তাহার পানে চাহিয়া একটু যেন ইতস্তত করিল। তারপর বলিল,—সব প্রমাণ আপনাদের চোখের সামনে রয়েছে। কিছু অনুমান করতে পারছেন না?

বরাট বলিল,—না, আপনি বলুন!

চড়াই পাখির বাসা মেঝোয় পড়েছিল, তা থেকে কিছু ধরতে পারলেন না?

না।

ব্যোমকেশ আবার একটু ইতস্তত করিল। বড় বীভৎস মৃত্যু বলিয়া সে বিজয়ের দিকে সসঙ্কোচে দৃষ্টিপাত করিল।

বিজয় চাপা গলায় বলিল,—তবু আপনি বলুন।

ব্যোমকেশ তখন ধীরে ধীরে বলিল,—আপনাদের বলছি, কিন্তু কথাটা যেন চাপা থাকে। —নিশানাথবাবুর পায়ে দড়ি বেঁধে কড়িকাঠের আংটা থেকে ঝুলিয়ে দিয়েছিল। ব্লাড-প্রেসার ছিলই, তার ওপর শরীরের সমস্ত রক্ত নেমে গিয়ে মাথায় চাপ দিয়েছিল। মাথার শিরা ছিড়ে পাঁচ মিনিটের মধ্যে মৃত্যু হল। তারপর তাঁকে নামিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিলে। কিন্তু আমাদের ভাগ্যবশে মোজা খুলে নিয়ে যেতে ভুলে গেল। চতুর অপরাধীরাও ভুল করে, নইলে তাদের ধরবার উপায় থাকত না।

আমরা স্তম্ভিত হতবাক হইয়া রহিলাম। বিজয়ের গলা দিয়া একটা বিকৃত আওয়াজ বাহির হইল। দেখিলাম, তাহার মুখ ছাইবৰ্ণ হইয়া গিয়াছে।

বরাট প্রথম কথা কহিল,—কী ভয়ানক! এখন বুঝতে পারছি, পাছে পায়ে দড়ির দাগ হয় তাই মোজা পরিয়েছিল। আংটায় দড়ি পরাবার সময় চড়াই পাখির বাসা খসে পড়েছিল—ঘরে একটা টুল আছে, তাতে উঠে আংটায় দড়ি পরাবার কোনই অসুবিধা নেই। কিন্তু ব্যোমকেশবাবু, একটা কথা এত ব্যাপারেও নিশানাথবাবুর ঘুম ভাঙল না?

ব্যোমকেশ বলিল,—নিশানাথবাবু বোধহয় জেগেই ছিলেন। রাত্রি দশটা থেকে এগারোটার মধ্যে এই ব্যাপার হয়েছিল। কাল ডাক্তার পাল তাই বলেছিলেন, রিপোর্ট থেকেও তাই পাওয়া যাচ্ছে।

তবে?

জানা লোক নিশানাথবাবুকে খুন করেছে এটা তো বোঝাই যাচ্ছে। আমি ভেবেছিলাম হত্যাকারী ইনজেকশন দিয়ে প্রথমে তাঁকে অজ্ঞান করে তারপর ঝুলিয়ে দিয়েছে। আজকাল এমন অনেক ইনজেকশন বেরিয়েছে যাতে দু মিনিটের মধ্যে অজ্ঞান হয়ে যায়। অথচ রক্তের মধ্যে ওষুধের কোনও চিহ্ন থাকে না-যেমন Sodium Pentiothal. কিন্তু শরীরে যখন ছুঁচ ফোটানোর দাগ পাওয়া যায়নি তখন বুঝতে হবে সাবেক প্রথা অনুসারেই নিশানাথবাবুকে অজ্ঞান করা হয়েছিল।

অর্থ্যাৎ

অথাৎ স্যান্ড ব্যাগ। ঘাড়ের উপর মোলায়েম হাতে এক ঘা দিলেই অজ্ঞান হয়ে যাবে, অথচ ঘাড়ে দাগ থাকবে না।

কিছুক্ষণ সকলে নীরব রহিলাম। তারপর বিজয় পাংশু মুখ তুলিয়া বলিল,—কিন্তু কে? কেন?

তাহার প্রশ্নের মমর্থ বুঝিয়া ব্যোমকেশ মাথা নাড়িল—তা এখনও জানি না। আর একটা কথা বুঝতে পারছি না, মিসেস সেন রাত্রি দশটা থেকে এগারোটার মধ্যে নিশ্চয় পাশের ঘরে ছিলেন। তিনি কিছু জানতে পারলেন না?

বিজয় নিজের অজ্ঞাতসারে উঠিয়া দাঁড়াইল, স্থলিতকণ্ঠে বলিল,—কাকিমা! না না, তিনি কিছু জানেন না-তিনি নিশ্চয় ঘুমিয়ে পড়েছিলেন—

আমরা অবাক হইয়া তাহার পানে চাহিয়া আছি দেখিয়া সে আবার বসিয়া পড়িল। ব্যোমকেশ বলিল,—ওকথা যাক। যথা-সময়ে সব প্রশ্নেরই জবাব পাওয়া যাবে। আপাতত একটা কথা বলুন তো, নিশানাথবাবুর উত্তরাধিকারী কে?

বিজয় উদভ্ৰান্তভাবে বলিল,—আমি আর কাকিম-সমান ভাগ।

ব্যোমকেশ ও বরাটের মধ্যে একবার দৃষ্টি বিনিময় হইল। বরাট উঠিবার উপক্ৰম করিয়া বলিল,—আজ তাহলে ওঠা যাক। বিজয়বাবুর এখনও অনেক কাজ, মৃতদেহ সৎকার করতে হবে—

সকলে উঠিলাম। ব্যোমকেশ বলিল,—ওবেলা আমরা একবার কলোনীতে যাব। ভাল কথা, রসিক দে’র খবর পাওয়া গেল?

বরাট বলিল,—আমি লোক লাগিয়েছি। এখনও কোনও খবর পাওয়া যায়নি।

ব্যোমকেশ বিজয়কে জিজ্ঞাসা করিল,—ব্ৰজদাস বাবাজী ফিরে আসেনি?

বিজয় মাথা নাড়িল।

ব্যোমকেশ বলিল,—ইন্সপেক্টর বরাট, আপনার একজন খদ্দের বাড়ল। ব্ৰজদাসেরও খোঁজ নেবেন।

বরাট লিখিয়া লইতে লইতে বলিল,—ওদিকে যখন যাবেন থানায় একবার আসবেন নাকি?

যাব।

তাহারা প্ৰস্থান করিলে ব্যোমকেশ প্ৰায় আধা ঘন্টা ঘাড় গুঁজিয়া চেয়ারে বসিয়া রহিল। আমি দুটা সিগারেট শেষ করিবার পর নীরবতার মৌন উৎপীড়ন আর সহ্য করিতে না পারিয়া বলিলাম,—বিজয়কে কী মনে হয়? অভিনয় করছে নাকি?

ব্যোমকেশ ঘাড় তুলিয়া বলিল,—এ যদি ওর অভিনয় হয়, তাহলে ওর মত অভিনেতা বাংলা দেশে নেই।

তাহলে কাকার মৃত্যুতে সত্যি শোক পেয়েছে। কাকিমাকেও ভালবাসে মনে হল।

হুঁ। এবং সেজন্যেই ওর ভয় হয়েছে।

কিছুক্ষণ কাটিবার পর আবার প্রশ্ন করিলাম,—আচ্ছা, মোটরের টুকরো পাঠানোর সঙ্গে নিশানাথবাবুর মৃত্যুর কি কোনও সম্বন্ধ আছে?

ব্যোমকেশ বলিল, থাকতেও পারে, না থাকতেও পারে।

লাল সিং তো দু' বছর আগে মরে গেছে। নিশানাথবাবুকে তবে মোটরের টুকরো পাঠাচ্ছিল কে?

তা জানি না। কিন্তু একটা ভুল কোরো না। মোটরের টুকরোগুলো যে নিশানাথবাবুর উদ্দেশ্যেই পাঠানো হচ্ছিল তার কোনও প্রমাণ নেই। তিনি নিজে তাই মনে করেছিলেন বটে, কিন্তু তা না হতেও পারে।

তবে কার উদ্দেশ্যে পাঠানো হচ্ছিল?

ব্যোমকেশ উত্তর দিল না। দুই-তিন মিনিট অপেক্ষা করিয়া যখন দেখিলাম উত্তর দিবে না, তখন অন্য প্রশ্ন করিলাম,—সুনয়না-উপাখ্যানের সঙ্গে নিশানাথবাবুর মৃত্যুর যোগাযোগ আছে নাকি?

ব্যোমকেশ বলিল, থাকলেও কিছু দেখতে পাচ্ছি না। মুরারি দত্তকে মেরেছিল সুনয়না নিকোটিন বিষ খাইয়ে। নিশানাথবাবুকে মেরেছে পুরুষ।

পুরুষ?

হ্যাঁ। নিশানাথবাবু লম্বা-চওড়া লোক ছিলেন না, তবু তাঁকে দড়ি দিয়ে কড়িকাঠ থেকে ঝুঁলিয়ে দেওয়া একজন স্ত্রীলোকের কর্ম নয়।

তা বটে। কিন্তু মোটিভ কি হতে পারে?

ব্যোমকেশ উঠিয়া আলস্য ভাঙিল।

‘আমাকে নিশানাথবাবু ডেকেছিলেন, এইটেই হয়তো সবচেয়ে বড় মোটিভ!’ বলিয়া সে সিগারেট ধরাইয়া স্নানঘরের দিকে চলিয়া গেল।

পনেরো

সায়াহ্নে মোহনপুরের স্টেশনে যখন পৌছিলাম তখনও গ্ৰীষ্মের বেলা অনেকখানি বাকি আছে। স্টেশনের প্রাঙ্গণে বাহির হইয়া দেখি কিলোনীর গাড়ি দাঁড়াইয়া আছে, মুস্কিল মিঞা পা-দানে বসিয়া বিড়ি টানিতেছে।

মুস্কিলকে এ কয়দিন দেখি নাই, সে যেন আর একটু বুড়ো হইয়া গিয়াছে, আরও ঝিমাইয়া পড়িয়াছে। সেলাম করিয়া বলিল,—বিজয়বাবু আপনাগোর জৈন্য গাড়ি পাঠাইছেন।

ব্যোমকেশ বলিল,—ওরা ঘাট থেকে ফিরেছে তাহলে?

মুস্কিল বলিল,—হ-ফিরছেন।

ব্যোমকেশ জিজ্ঞাসা করিল,—নতুন খবর কিছু আছে নাকি?

মুস্কিল নিশ্বাস ফেলিয়া বলিল,—আর নূতন খবর কী কর্তা। সব তো শেষ হইয়া গিছে।

তা বটে। চল—কিন্তু একবার থানা হয়ে যেতে হবে।

চলেন। —কর্তাবাবুর নাকি ময়না তদন্ত হৈছে?

হ্যাঁ। তুমি খবর পেলে কোত্থেকে?

শুন শুন কানে আইল। তা ময়না তদন্তে কী জানা গেল? সহজ মৃত্যু নয়?

ব্যোমকেশ প্রশ্নটা পাশ কাটাইয়া গেল। বলিল,—সে কথা ডাক্তার জানেন। মুস্কিল মিঞা, তুমি তো আফিম খেয়ে ঝিমোও, তুমি এত খবর পাও কি করে?

মুস্কিলের মুখে একটু ক্ষীণ হাসি দেখা দিল, সে বলিল—আমি ঝিমাইলে কি হৈব কর্তা, আমার বিবি জানাডার চারটা চোখ চারটা কান। তার চোখ কান এড়ায়া কিছু হৈবার যো নাই। আমি সব খবর পাই। একটা কিছু যে ঘটবো তা আগেই বুঝছিলাম।

কি করে বুঝলে?

মুস্কিল একটু চুপ করিয়া থাকিয়া হঠাৎ আক্ষেপভরে হস্তসঞ্চালন করিয়া বলিল,—মেইয়া মানুষ লইয়া লটখট। রাতের আঁধারে এ উয়ার ঘরে যায়, ও ইয়ার ঘরে যায়-ই সব নষ্টামিতে কি ভাল হয় কর্তা? হয় না।

বিস্মিতস্বরে ব্যোমকেশ বলিল,—কে কার ঘরে যায়?

কথাটা বলিয়া ফেলিয়া মুস্কিল একটু বিব্রত হইয়া পড়িয়াছিল, বলিল,—কারে বাদ দিমু কর্তা? মেইয়া লোকগুলাই দুষ্ট হয় বেশি, মরদের সর্বনাশের জৈন্যই তো খোদা উয়াদের বানাইছেন।

মানে...তুমি বলতে চাও রাত্রে কলোনীর মেয়েরা লুকিয়ে পুরুষদের ঘরে যায়। কে কার ঘরে যায় বলতে পাৱ?

তা কেমনে কৈব কর্তা? অাঁধারে কি কারো মুখ দেখা যায়। তবে ভিতর ভিতর নষ্টামি চলছে। এখন কর্তাবাবু নাই, বড়বিবিও সাদাসিন্দা মেইয়া, এখন তো হদ্দ বাড়াবাড়ি হৈব।

ব্যোমকেশ বলিল,—মেয়েরা কারা তা না হয় বলতে পারলে না, কিন্তু কার ঘরে যায় সেটা তো বলতে পার।

মুস্কিল একটু অধীরস্বরে বলিল,—কি মুস্কিল, সেটা আন্দাজ কৈরা লন না। মেইয়া লোক জোয়ান মরদের ঘরে যাইব না তো কি বুড়ার ঘরে যাইব?

মুস্কিল মিঞার জীবন-দর্শনে মার-প্যাচ নাই। মনে মনে হিসাব করিলাম, জোয়ান মরদের মধ্যে আছে বিজয়, রসিক, পানুগোপাল। ডাক্তার ভুজঙ্গাধরকেও ধরা যাইতে পারে।

ব্যোমকেশ আর প্রশ্ন করিল না, গাড়িতে উঠিয়া বসিয়া বলিল,—চল, এবার যাওয়া যাক। থানা কতদূর?

কাছেই, রাস্তায় পড়ে মুস্কিল চালকের আসনে উঠিয়া গাড়ি হাঁকাইয়া দিল। থানায় উপস্থিত হইলে প্রমোদ বরাট আমাদের খাতির করিয়া নিজের কুঠুরিতে বসাইল এবং সিগারেটের টিন খুলিয়া ধরিল। ব্যোমকেশ সিগারেট ধরাইয়া মৃদুহাস্যে বলিল,—নিশানাথবাবুকে কেউ খুন করেছে এ প্রত্যয় আপনার হয়েছে?

বরাট বলিল,—আমার হয়েছে, কিন্তু কর্তারা তানােনানা করছেন। তাঁরা বলেন, পোস্ট-মর্টেম রিপোর্টে যখন কিছু পাওয়া যায়নি তখন ঘাঁটাঘাঁটি করে কাজ কি! আমি কিন্তু ছাড়ছি না, লেগে থাকব। —আপনার কি কাউকে সন্দেহ হয়?

ব্যোমকেশ বলিল,—‘সন্দেহ এখনও কারুর ওপর পড়েনি। কিন্তু এই ঘটনার একটা পটভূমিকা আছে, সেটা আপনার জানা দরকার। বলি শুনুন।’ বলিয়া সুনয়না ও মোটরের টুকরো সংক্রান্ত সমস্ত কথা বিবৃত করিল।

শুনিয়া বিরাট উত্তেজিত হইয়া উঠিল, বলিল,—ঘোরালো ব্যাপার দেখছি। —আমাকে কী করতে হবে বলুন।

ব্যোমকেশ বলিল,—আপাতত দুটো কাজ করা দরকার। এক, কলোনীর সকলের হাতের টিপ নিতে হবে—

তাতে কী লাভ?

ওটা থাকা ভাল। কখন কি কাজে লাগবে বলা যায় না।

বরাট একটু ইতস্তত করিয়া বলিল,—কাজটা ঠিক আইনসঙ্গত হবে কিনা বলতে পারি না, তবু আমি করব। দ্বিতীয় কাজ কী?

দ্বিতীয় কাজ, আমরা কলোনীতে যাচ্ছি, আপনিও চলুন। আপনার সামনে আমি কলোনীর প্ৰত্যেককে প্রশ্ন করব, আপনি শুনবেন এবং দরকার হলে নোট করবেন।

‘কী ধরনের প্রশ্ন করবেন?

আমার প্রশ্নের উদ্দেশ্য হবে, সে-রাত্রে দশটা থেকে এগারোটার মধ্যে কে কোথায় ছিল, কার অ্যালিবাই আছে। কার নেই, এই নির্ণয় করা।

বেশ, চলুন তাহলে বেরিয়ে পড়া যাক, কাজ সেরে ফিরতে হবে।

টিপ লইবার সরঞ্জামসহ একজন হেড কনস্টেবল আমাদের সঙ্গে চলিল।

সন্ধ্যা হয়-হয় এমন সময় কলোনীতে পৌছিলাম। গত রাত্রির বর্ষণ এখানেও মাটি ভিজাইয়া দিয়া গিয়াছে। বাড়ির সম্মুখে দাঁড়াইয়া ভুজঙ্গধরবাবু বিজয়ের সহিত কথা বলিতেছিলেন। বিজয়ের মুখে এখনও শ্মশানবৈরাগ্যের ছায়া লাগিয়া আছে। ভুজঙ্গধরবাবুর মুখ কিন্তু প্ৰফুল্প, তাঁহার মুখে অমর সাক্ত একপেশে হাসি আবার ফিরিয়া আসিয়াছে।

আমাদের সঙ্গে প্রমোদ বরাট ও কনস্টেবলকে দেখিয়া বিজয়ের চোখে প্রশ্ন জাগিয়া উঠিল। ভুজঙ্গধরবাবু বলিলেন,—আসুন। বিজয়বাবুকে মোহমুদগর শোনাচ্ছি—কা। তব কন্তু-নিলিনীদলগত-জলমতিতরলং-”

তাঁহার লঘুতা সময়োচিত নয়; মনে হইল বিজয়ের মন প্রফুল্ল করিবার জন্য তিনি আধিক্য দেখাইতেছেন।

বরাট পুলিসী গাম্ভীর্যের সহিত বলিল,—আপনাদের সকলের হাতের টিপ দিতে হবে।

বিজয়ের চোখের প্রশ্ন আরও তীক্ষ্ণ হইয়া উঠিল, ভুজঙ্গধরবাবুও চকিতভাবে চাহিলেন। ব্যোমকেশ ব্যাখ্যাচ্ছিলে বলিল,—কলোনী থেকে যে-ভাবে একে একে লোক খসে পড়ছে, বাকিগুলি কতদিন টিকে থাকবে বলা যায় না। তাই সতর্কতা।

বিজয় বুঝিল,—‘বেশ তো-নিন।’ তাহার চোখের দৃষ্টি নীরবে প্রশ্ন করিতে লাগিল,—কেন? নতুন কিছু পাওয়া গেছে কি?

ব্যোমকেশ বলিল,—আশা করি কারুর আপত্তি হবে না। কারণ যিনি আপত্তি করবেন। স্বভাবতই তাঁর উপর সন্দেহ হবে। ভুজঙ্গধরবাবু, আপনার আপত্তি নেই তো?

বিন্দুমাত্র না। আসুন— বলিয়া তিনি অঙ্গুষ্ঠ বাড়াইয়া দিলেন। বরাট কনস্টেবলকে ইঙ্গিত করিল, কনস্টেবল অঙ্গুষ্ঠের ছাপ তুলিতে প্ৰবৃত্ত হইল। ভুজঙ্গধরববাবু বাঁকা হাসিতে হাসিতে বলিলেন,—দেখছি আমি ভুল করেছিলাম। আঙুলের ছাপ যখন নেওয়া হচ্ছে তখন লাস পরীক্ষায় কিছু পাওয়া গেছে।

তাঁহার এই অর্ধ-প্রশ্নের জবাব কেহ দিল না। কাগজের উপর তাঁহার ও বিজয়ের নাম ও ছাপ লিখিত হইলে ভুজঙ্গধরবাবু বলিলেন,-“আর কার কার ছাপ নিতে হবে বলুন, আমি কনস্টেবলকে সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি।

বরাট বলিল,—সকলের ছাপই নিতে হবে। মেয়ে পুরুষ কেউ বাদ যাবে না।

মিসেস সেনেরও?

হ্যাঁ মিসেস সেনেরও?

বেশ-আও সিপাহী।

ব্যোমকেশ বলিল,—আর একটা কথা। টিপ নেবার সময় সকলকে বলে দেবেন যেন আধ ঘন্টা পরে এই বাড়িতে আসেন। দু’চারটে প্রশ্ন করব।

ভুজঙ্গধরবাবু কনস্টেবলকে লইয়া চলিয়া গেলেন। আমরা বসিবার ঘরে প্রবেশ করিলাম। বিজয় আলো জ্বালিয়া দিল। ব্যোমকেশ বলিল,—এ ঘরটা হোক ওয়েটিং রুম—যাঁরা সাক্ষী দিতে আসবেন তাঁরা এ ঘরে বসবেন। আর পাশের ঘরে আমরা বসব, প্ৰত্যেককে আলাদা ডেকে প্রশ্ন করা হবে। কি বলেন ইন্সপেক্টর বিরাট?

বরাট বলিল,—সেই ঠিক হবে।

ব্যোমকেশ বলিল,—তাহলে বিজয়বাবু, ও ঘরে একটা টেবিল আর গোটকয়েক চেয়ার আনিয়ে দিন। আর কিছুর দরকার হবে না।

বিজয় চেয়ার টেবিলের ব্যবস্থা করিতে গেল। পনেরো মিনিট পরে ভুজঙ্গধরবাবু কনস্টেবলসহ ফিরিয়া আসিলেন, বলিলেন—‘এই নিন; টিপ সই হয়ে গেছে। ন্যাপলা একটু গোলমাল করবার তালে ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভয় পেয়ে গেল —সকলকে বলে দিয়েছি, আধ ঘন্টার মধ্যে আসবে। আমিও আসছি হাত-মুখ ধুয়ে।’ বলিয়া তিনি প্ৰস্থান করিলেন।

ষোল

নিশানাথ যে-কক্ষে শয়ন করিতেন সেই কক্ষে টেবিল পাতা হইয়াছে। টেবিলের দুই পাশে দুইটি চেয়ারে ব্যোমকেশ ও বিরাট, মাঝে একটি খালি চেয়ার। আমি দ্বারের কাছে টুল লইয়া বসিয়াছি, দুই ঘরের দিকেই আমার দৃষ্টি আছে। মাথার উপর উজ্জ্বল বিদ্যুৎবাতি জ্বলিতেছে।

প্রথমে দময়ন্তী দেবীকে ডাকা হইল। বিজয় তাঁহার হাত ধরিয়া ভিতরের ঘর হইতে লইয়া আসিল, তিনি শূন্য চেয়ারটিতে বসিলেন। বিধবার বেশ, দেহে অলঙ্কার নাই, মাথায় সিঁদুর নাই, সুন্দর মুখখানিতে মোমের মত ঈষদচ্ছ পাণ্ডুরতা। তিনি নতনেত্ৰে স্থির হইয়া রহিলেন।

বিজয় চেয়ারের পিছনে দাঁড়াইয়া তাঁহার দুই কাঁধের উপর হাত রাখিল, বলিল,—আমি যদি এখানে থাকি আপনাদের আপত্তি হবে কি?

ব্যোমকেশ একটু অনিচ্ছাভরে বলিল,—‘থাকুন।’ তারপর কোমলকণ্ঠে দময়ন্তী দেবীকে দুই-চারিটি সহানুভুতির কথা বলিয়া শেষে বলিল,—আমরা আপনাকে বেশি কষ্ট দেব না, শুধু দু’চারটে প্রশ্ন করব যার আপনি ছাড়া আর কেউ উত্তর দিতে পারবে না—আপনাদের বিয়ে হয়েছিল কতদিন আগে?

দময়ন্তী দেবীর নত চক্ষু ব্যোমকেশের মুখ পর্যন্ত উঠিয়া আবার নামিয়া পড়িল। করুণ মিনতিভরা দৃষ্টি, তবু যেন তাহার মধ্যে একটা সংকল্প রহিয়াছে। অতি মৃদুস্বরে বলিলেন,—দশ বছর আগে।

অতঃপর নিম্নরূপ সওয়াল জবাব হইল। দময়ন্তী দেবী আর দ্বিতীয়বার চক্ষু তুলিলেন না, নিম্নস্বরে সকল প্রশ্নের উত্তর দিলেন।

ব্যোমকেশ: আপনাদের যখন বিয়ে হয় নিশানাথবাবু তখন চাকরিতে ছিলেন?

দময়ন্তী; না, তার পরে।

ব্যোমকেশ; কিন্তু কলোনী তৈরি হবার আগে?

দময়ন্তী: হ্যাঁ।

ব্যোমকেশ: তাহলে বিয়ের সময় নিশানাথবাবুর বয়স ছিল সাতচল্লিশ বছর?

দময়ন্তী: হ্যাঁ।

ব্যোমকেশ; মাফ করবেন, আপনার এখন বয়স কত?

দময়ন্তী: উনত্রিশ।

ব্যোমকেশ: বিজয়বাবু কবে থেকে আপনাদের কাছে আছেন?

বিজয় এই প্রশ্নের জবাব দিল, বলিল,—আমার দশ বছর বয়সে মা-বাবা মারা যান, সেই থেকে আমি কাকার কাছে আছি।

ব্যোমকেশ: আপনার এখন বয়স কত?

বিজয়: পাঁচশ।

লক্ষ্য করিলাম বিজয়ের চোয়ালের হাড় কঠিন হইয়া উঠিয়াছে, তাহার হাত দুটাও দময়ন্তী দেবীর কাঁধের উপর আড়ষ্টভাবে শক্ত হইয়া আছে। সে যেন ভিতরে ভিতরে অত্যন্ত উত্তেজিত হইয়া উঠিয়াছে এবং প্ৰাণপণে চাপিবার চেষ্টা করিতেছে। ব্যোমকেশ নিশ্চয় তাহা লক্ষ্য করিয়াছিল। কিন্তু সে নির্লিপ্তভাবে আবার প্রশ্ন করিল।

ব্যোমকেশ: বছর দুই আগে আপনি কলকাতার একটি মেয়ে স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন। কি নাম স্কুলটির?

দময়ন্তী: সেন্ট মার্থা গার্লস স্কুল।

ব্যোমকেশ: হঠাৎ স্কুলে ভর্তি হবার কি কারণ?

দময়ন্তী; ইংরেজি শেখবার ইচ্ছে হয়েছিল।

ব্যোমকেশ: মাস আষ্টেক পরে ছেড়ে দিয়েছিলেন?

দময়ন্তী: হ্যাঁ, আর ভালো লাগল না।

বরাট এতক্ষণ খাতা পেন্সিল লইয়া মাঝে মাঝে নোট করিতেছিল। ব্যোমকেশ আবার আরম্ভ করিল—

ব্যোমকেশ; পরশু রাত্রে আপনি খাওয়া সেরে রান্নাঘর থেকে কখন ফিরে এসেছিলেন?

দময়ন্তী: প্রায় দশটা।

ব্যোমকেশ: নিশানাথবাবু তখন কোথায় ছিলেন?

দময়ন্তী: (একটু নীরব থাকিয়া) শুয়ে পড়েছিলেন।

ব্যোমকেশ: ঘর অন্ধকার ছিল?

দময়ন্তী: হ্যাঁ।

ব্যোমকেশ: জানালা খোলা ছিল?

দময়ন্তী: বোধহয় ছিল। লক্ষ্য করিনি।

ব্যোমকেশ: সদর দরজা তখন নিশ্চয় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল?

দময়ন্তী: (বিলম্বে) হ্যাঁ।

ব্যোমকেশ: আপনি বাড়িতে এলেন কি করে?

দময়ন্তী; পিছনের দরজা দিয়ে।

ব্যোমকেশ; সে-রাত্রে—তারপর আপনি কি করলেন?

দময়ন্তী: শুয়ে পড়লাম।

ব্যোমকেশ; নিশানাথবাবু তখন ঘুমোচ্ছিলেন? অর্থাৎ বেঁচে ছিলেন?

দময়ন্তী: (বিলম্বে) হ্যাঁ।

ব্যোমকেশ: আপনি তাঁর গায়ে হাত দিয়ে দেখেননি? কি করে বুঝলেন?

দময়ন্তী; নিশ্বাস পড়ছিল।

ব্যোমকেশ একটু চুপ করিয়া থাকিয়া হঠাৎ বলিল,—“সুনয়না নামের কোনও মেয়েকে আপনি চেনেন?

দময়ন্তী: না।

ব্যোমকেশ: কিছুদিন থেকে আপনার বাড়িতে কেউ মোটরের টুকরো ফেলে দিয়ে যায়—এ বিষয়ে কিছু জানেন?

দময়স্তী; যা সকলে জানে তাই জানি।

ব্যোমকেশ: আপনার জীবনে কোনও গুপ্তকথা আছে?

দময়ন্তী; না।

ব্যোমকেশ; নিশানাথবাবুর জীবনে কোনও গুপ্তকথা ছিল?

দময়ন্তী: জানি না।

ব্যোমকেশ একটু হাসিয়া বলিল,—উপস্থিত আর কোনও প্রশ্ন নেই। বিজয়বাবু, এবার ওঁকে নিয়ে যান।

বিজয় সশব্দে একটি নিশ্বাস ফেলিল, তারপর দময়ন্তী দেবীর হাত ধরিয়া তুলিয়া পাশের ঘরে লইয়া গেল। দেখিলাম তাঁহার পা কাঁপিতেছে। তাঁহার বর্তমান মানসিক অবস্থায় তীক্ষ্ণ প্রশ্নের আঘাত না করিলেই বোধহয় ভাল হইত।

ইতিমধ্যে বসিবার ঘরে জনসমাগম হইতেছিল, আমি দ্বারের কাছে বসিয়া দেখিতেছিলাম। প্রথমে আসিল পানুগোপাল, ঘরের এক কোণে গিয়া যথাসম্ভব অদৃশ্য হইয়া বসিল। তারপর আসিলেন সকন্যা নেপালবাবু; তাঁহারা সামনের চেয়ারে বসিলেন; নেপালবাবুর পোড়া মুখের দিকটা আমার দিকে রহিয়াছে তাই তাঁহার মুখভাব দেখিতে পাইলাম না, কিন্তু মুকুলের মুখে শঙ্কিত উদ্বেগ। সে একবার এদিক ওদিক চাহিল, তারপর নিম্নকণ্ঠে পিতাকে কিছু বলিল।

সর্বশেষে আসিল বনলক্ষ্মী। তাহার মুখ শুষ্ক, যেন চুপসিয়া গিয়াছে; রান্নার কাজ সম্ভবত তাহাকেই চালাইতে হইতেছে। তাহাকে দেখিয়া মুকুল গভীর বিতৃষ্ণাভরে ভ্রুকুটি করিয়া মুখ ফিরাইয়া লইল। বনলক্ষ্মী একবার একটু দ্বিধা করিল, তারপর ধীরপদে খোলা জানালার সম্মুখে গিয়া দাঁড়াইল, গরাদের উপর হাত রাখিয়া বাহিরের অন্ধকারের দিকে চাহিয়া রহিল।

এদিকে বিজয় ফিরিয়া আসিয়া দময়ন্তী দেবীর পরিত্যক্ত চেয়ারে বসিয়াছিল, চাদরে কপালের ঘাম মুছিয়া বলিল,—এবার আমার এজেহারও না হয় সেরে নিন।

ব্যোমকেশ বলিল,—বেশ তো। আপনাকে সামান্যই জিজ্ঞাসা করবার আছে।

লক্ষ্য করিলাম, দময়ন্তী দেবীকে জেরা করার সময় বিজয় যতটা তটস্থ হইয়াছিল, তাহার তুলনায় এখন অনেকটা সুস্থ। কিন্তু ব্যোমকেশের প্রথম প্রশ্নেই সে থতমত খাইয়া গেল।

ব্যোমকেশ: কিছুদিন আগে নেপালবাবুর মেয়ে মুকুলের সঙ্গে আপনার বিয়ের সম্বন্ধ হয়েছিল। আপনি প্ৰথমে রাজী ছিলেন। তারপর হঠাৎ মত বদলালেন কেন?

বিজয়: আমি-আমার-ওটা আমার ব্যক্তিগত কথা। ওর সঙ্গে কাকার মৃত্যুর কোনও সম্পর্ক নেই।

ব্যোমকেশ তাহাকে একটি নাতিদীর্ঘ নেত্রপাতে অভিষিক্ত করিয়া অন্য প্রশ্ন করিল। বলিল,—পরশু বিকেলবেলা আপনি কলকাতা থেকে ফিরে এসে রাত্রে আবার কলকাতা গিয়েছিলেন কেন?

বিজয়: আমার দরকার ছিল।

ব্যোমকেশ: কী দরকার বলতে চান না?

বিজয়: এটাও আমার ব্যক্তিগত কথা।

ব্যোমকেশ: বিজয়বাবু, আপনার ব্যক্তিগত কথা জানবার কৌতুহল আমার নেই। আপনার কাকার মৃত্যু সম্বন্ধে অনুসন্ধান করবার জন্যে আপনি আমাদের ডেকেছেন। এখন আপনিই যদি আমাদের কাছে কথা গোপন করেন তাহলে আমাদের অনুসন্ধান করে লাভ কি?

বিজয়; আমি বলছি। এর সঙ্গে কাকার মৃত্যুর কোনও সম্বন্ধ নেই।

ব্যোমকেশ; সে বিচার আমাদের হাতে ছেড়ে দিলে ভাল হয় না?

দেখিলাম বিজয়ের মনের মধ্যে একটা দ্বন্দ্ব চলিতেছে। তারপর সে পরাভব স্বীকার করিল। অপ্ৰসন্ন স্বরে বলিল,—বেশ শুনুন। পরশু বিকেলে কলকাতা থেকে ফিরে এসে একটা চিঠি পেলাম। বেনামী চিঠি। তাতে লেখা ছিল—আপনি ডুবে ডুবে জল খাচ্ছেন। যদি বিপদে পড়তে না চান আজ রাত্রি দশটার সময় হগ সাহেবের বাজারে চায়ের দোকানে থাকবেন, একজনের সম্বন্ধে অনেক কথা জানতে পারবেন। —এই চিঠি পেয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু যে চিঠি লিখেছিল। সে এল না। এগারোটা পর্যন্ত অপেক্ষা করে ফিরে এলাম।

ব্যোমকেশ চিঠি আপনার কাছে আছে?

বিজয়; না, ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছি।

ব্যোমকেশ: আপনি যে পরশু রাত্রে কলকাতায় গিয়েছিলেন তার কোনও সাক্ষী আছে?

বিজয়; না, সাক্ষী রেখে যাইনি, চুপি চুপি গিয়েছিলাম।

ব্যোমকেশ; স্টেশনে গেলেন। কিসে-পায়ে হেঁটে?

বিজয়; না, কলোনীর একটা সাইকেল আছে, তাইতে।

ব্যোমকেশ: যাক। —আপনি ডুবে ডুবে জল খাচ্ছেন, তার মানে কি?

বিজয়: জানি না।

ব্যোমকেশ: বেনামী চিঠিতে ছিল, একজনের সম্বন্ধে অনেক কথা জানতে পারবেন। এই একজনটি কে? কারুর নাম ছিল না?

বিজয়: (ঢোক গিলিয়া) নাম ছিল না। একজনটি কে তা জানি না।

ব্যোমকেশ: তবে গেলেন কেন?

বিজয়: কে বেনামী চিঠি লিখেছে দেখবার জন্যে।

ব্যোমকেশ: ও। —কিছু মনে করবেন না, আপনি যে-দোকান দেখাশুনা করেন। তার টাকার হিসেব কি গরমিল হয়েছে?

বিজয়: (একটু উদ্ধতভাবে) হ্যাঁ হয়েছে। আমার কাকার টাকা আমার টাকা। আমি নিয়েছি।

ব্যোমকেশ: কত টাকা?

বিজয়: হিসেব করে নিইনি। দুতিন হাজার হবে।

ব্যোমকেশ; টাকা নিয়ে কি করলেন?

বিজয়: টাকা নিয়ে মানুষ কী করে? মনে করুন রেস খেলে উড়িয়েছি।

ব্যোমকেশ তির্যক হাসিল, বলিল,—রেস খেলে ওড়ননি। যা হোক, আর কিছু জানবার নেই—আজিত, বনলক্ষ্মীকে আসতে বল। আর যদি ভুজঙ্গধরবাবু এসে থাকেন তাঁকেও।

ভুজঙ্গধরবাবু আসিয়াছেন। কিনা দেখি নাই। আমি উঠিয়া বাহিরের ঘরে গেলাম। সকলে উচ্চকিত হইয়া চাহিল। দেখিলাম, ভুজঙ্গধরবাবু আসিয়াছেন, দ্বারের বাহিরে দাঁড়াইয়া আছেন। তাঁহার মুখের ভাব স্বপ্নালু, আমাকে ফিক করিয়া হাসিয়া মৃদুকন্ঠে বলিলেন, —‘দস্তরুচি কৌমুদী।’

অবাক হইয়া বলিলাম,—সে আবার কি?

ভুজঙ্গধরবাবুর স্বপ্নালুতা কাটিয়া গেল, তিনি বলিলেন, —ওটা মোহমুদগরের অ্যান্টিডোট। —আমার ডাক পড়েছে? চলুন।

আসুন বলিয়া আমি বনলক্ষ্মীর দিকে ফিরিয়াছি। এমন সময় একটা ব্যাপার ঘটিল। বনলক্ষ্মী জানালার গরাদ ধরিয়া দাঁড়াইয়া ছিল, হঠাৎ চীৎকার করিয়া মাটিতে পড়িয়া গেল। আমি ছুটিয়া গেলাম, পাশের ঘর হইতে ব্যোমকেশ, বরাট ও বিজয় বাহির হইয়া আসিল।

বনলক্ষ্মীর কপালের ডানদিকে কাটিয়া গিয়া রক্ত পড়িতেছে। ব্যোমকেশ তাহাকে তুলিতে গিয়া ঘাড় তুলিয়া চাহিল।

ডাক্তার, আপনি আসুন। মুর্ছা গিয়েছে।

ভুজঙ্গধরবাবু আসিয়া পরীক্ষা করিলেন। তাঁহার মুখে বিরক্তি ফুটিয়া উঠিল। বলিলেন,—সামান্য জখম, মুর্ছা যাবার মত নয়।

কিন্তু জখম হল কি করে?

তা কি করে জািনব? বোধহয় জানালার বাইরে থেকে কেউ ইট পাটকেল ছুঁড়েছিল, তাই লেগেছে।

বরাট পকেট হইতে টর্চ লইয়া দ্রুত বাহির হইয়া গেল। ব্যোমকেশ ভুজঙ্গধরবাবুকে জিজ্ঞাসা করিল,—এখন একে নিয়ে কি করা যায়?

ভুজঙ্গধরবাবু একটা মুখভঙ্গী করিলেন, তারপর বনলক্ষ্মীকে দুই বাহুর দ্বারা তুলিয়া লইয়া বলিলেন,—আমি ওকে ওর কুঠিতে নিয়ে যাচ্ছি, বিছানায় শুইয়ে মুখে জলের ঝাপটা দিলেই জ্ঞান হবে। যেখানটা কেটে গেছে সেখানে টিথঞ্চার আয়োডিন দিয়ে বেঁধে দিলেই চলবে। আপনারা কাজ চালান, আমি পাঁচ মিনিটের মধ্যে আসছি।

বিজয় এতক্ষণ যেন মোহাচ্ছন্ন হইয়া ছিল, বলিল—চলুন, আমিও আপনার সঙ্গে যাই।

আসুন বলিয়া ভুজঙ্গধরবাবু বনলক্ষ্মীকে লইয়া অগ্রসর হইলেন। দ্বার দিয়া বাহির হইতে হইতে তিনি বিজয়কে বলিতেছেন শুনিতে পাইলাম—আপনি বরং এক কাজ করুন, আমার কুঠি থেকে টিঙ্কার আয়োডিনের শিশি আর ব্যাণ্ডেজ নিয়ে আসুন—

ব্যোমকেশ আর পাশের ঘরে ফিরিয়া না গিয়া এই ঘরেই বসিল, বলিল,—কি বিপত্তি! অজিত, তুমি তো উপস্থিত ছিলে, কি হয়েছিল বল দেখি?

যাহা যাহা ঘটিয়াছিল বলিলাম, দন্তরূচি কৌমুদীও বাদ দিলাম না। শুনিয়া ব্যোমকেশ ভ্রু কুঞ্চিত করিয়া রহিল।

বরাট ফিরিয়া আসিয়া বলিল,—কাউকে দেখতে পেলাম না। জানালার বাইরে মানুষের পায়ের দাগ রয়েছে কিন্তু কাঁচা দাগ বলে মনে হল না। ইট পাটকেল অবশ্য অনেক পড়ে রয়েছে।

যেখানে বনলক্ষ্মী অজ্ঞান হইয়া পড়িয়ছিল। সেখানে একটা বাঁকা কালো জিনিস আলোয় চিকমিক করিতেছিল। ব্যোমকেশ উঠিয়া গিয়া সেটা তুলিয়া লইল, আলোয় ধরিয়া বলিল,—ভাঙা কাচের চুড়ি। বোধহয় বনলক্ষ্মী পড়ে যাবার সময় চুড়ি ভেঙেছে।

ছুড়ির টুকরো বরাটকে দিয়া ব্যোমকেশ আবার আসিয়া বলিল, নেপারবাবুকে লক্ষ্য করিয়া বলিল,—আপনারা বোধহয় জানেন, পুলিসের সন্দেহ নিশানাথবাবুর মৃত্যু স্বাভাবিক নয়। তাই একটু খোঁজ খবর নিতে হচ্ছে। —নেপালবাবু, যে-রাত্ৰে নিশানাথবাবু মারা যান সে-রাত্রে দশটা থেকে এগারোটার মধ্যে আপনি কোথায় ছিলেন?

সোজাসুজি প্রশ্ন, প্রশ্নের অন্তর্নিহিত সন্দেহটিও খুব অস্পষ্ট নয়। নেপালবাবুর গলার শির উঁচু হইয়া উঠিল, কিন্তু তিনি বরাটের দিকে বক্র দৃষ্টিপাত করিয়া কষ্ট-সংযত কণ্ঠে বলিলেন,—দাবা খেলছিলাম।

এই সময় ঘরের কোণে পানুগোপালের উপর চোখ পড়িল। সে কানের তুলা খুলিয়া ফেলিয়া ঘাড় বাঁকাইয়া একাগ্রভাবে শুনিবার চেষ্টা করিতেছে।

ব্যোমকেশ: দাবা খেলছিলেন? কার সঙ্গে?

নেপাল: মুকুলের সঙ্গে।

ব্যোমকেশ: উনি দাবা খেলতে জানেন?

নেপাল: জানে কিনা একবার খেলে দেখুন না!

ব্যোমকেশ; না না, তার দরকার নেই। তা আপনারা যখন খেলছিলেন, সেখানে কেউ উপস্থিত ছিল?

নেপাল: কেউ না। নিশানাথ যে সেই সময় মারা যাবে তা জানতাম না, জানলে সাক্ষী যোগাড় করে রাখতাম।

ব্যোমকেশ: সে-রত্রে আপনারা এদিকে আসেননি?

নেপাল: এদিকে আসব কি জন্যে? গরমে রাত্রে ঘুম আসে না। তাই দাবা খেলছিলাম।

ব্যোমকেশ: তাহলে-সে-রাত্রে এ বাড়িতে কেউ এসেছিল। কিনা তা আপনারা বলতে পারেন না?

নেপাল: না।

এই সময় ঘরের কোণে পানুগোপাল হঠাৎ উঠিয়া দাঁড়াইল। তাহার মুখ লাল হইয়া উঠিয়াছে, চোখ দুটা জ্বলজ্বল করিতেছে। সে প্ৰাণপণে একটা কিছু বলিবার চেষ্টা করিল; কিন্তু মুখ দিয়া শব্দ বাহির হইল না। ব্যোমকেশ জিজ্ঞাসা করিল,—আপনি কি কিছু বলবেন? পানু সবেগে ঘাড় নাড়িয়া আবার কথা বলিবার চেষ্টা করিল; কিন্তু এবারও কৃতকাৰ্য হইল না। নেপালবাবু মুখ বিকৃত করিয়া বলিলেন,—‘যত সব হাবা কালার কাণ্ড।’ দ্বারের কাছে একটা শব্দ শুনিয়া ঘাড় ফিরাইয়া দেখিলাম ভুজঙ্গধরবাবু ফিরিয়া আসিয়াছেন এবং তীক্ষ্ণচক্ষে পানুগোপালকে দেখিতেছেন। তিনি অগ্রসর হইয়া আসিয়া বলিলেন,—পানু। বোধহয় কিছু বলবার চেষ্টা করছিল। কিন্তু ও এখন উত্তেজিত হয়েছে, কিছু বলতে পারবে না। পরে ঠাণ্ডা হলে হয়তো—

ব্যোমকেশ জিজ্ঞাসা করিল,—ওদিকের খবর কি?

বনলক্ষ্মীর জ্ঞান হয়েছে। কপাল ড্রেস করে দিয়েছি।

বিজয়বাবু কোথায়?

তিনি বনলক্ষ্মীর কাছে আছেন।

ভুজঙ্গধরবাবুর অধরপ্রান্ত একটু প্রসারিত হইল।

নেপালবাবু উঠিয়া দাঁড়াইলেন, কর্কশাস্বরে বলিলেন,—আপনাদের জেরা আশা করি শেষ হয়েছে। আমরা এবার যেতে পারি?

ব্যোমকেশ: একটু দাঁড়ান। (মুকুলকে) আপনি কখনও সিনেমায় অভিনয় করেছেন?

মুকুলের মুখ শুকাইয়া গেল, সে ত্ৰস্ত-চোখে চারিদিকে চাহিয়া স্খলিতস্বরে বলিল,—আমি-না, আমি কখনও সিনেমায় অভিনয় করিনি।

নেপালবাবু। গর্জন করিয়া উঠিলেন,—মিথ্যে কথা! কে বলে আমার মেয়ে সিনেমা করে! যত সব মিথ্যুক ছোটলোকের দল।

ব্যোমকেশ শাস্তস্বরে বলিল,—আপনার মেয়েকে সিনেমা স্টুডিওতে যাতায়াত করতে দেখেছে এমন সাক্ষীর অভাব নেই।

নেপাল আবার গর্জন ছাড়িতে উদ্যত হইয়াছিলেন, মুকুল পিতাকে থামাইয়া দিয়া বলিল,—‘সিনেমা স্টুডিওতে আমি কয়েকবার গিয়েছি সত্যি, কিন্তু অভিনয় করিনি। চল বাবা।’ বলিয়া মুকুল ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল। নেপালবাবু বাঘের মত এদিক ওদিক চাহিতে চাহিতে তাহার পশ্চাদ্বর্তী হইলেন।

ব্যোমকেশ বলিল,—রমেনবাবু ঠিকই ধরেছিলেন। যাক, ভূজঙ্গধরবাবু, আপনাকেও একটি মাত্র প্রশ্ন করব। সে-রাত্রে দশটা থেকে এগারোটার মধ্যে আপনি কোথায় ছিলেন?

ভুজঙ্গধরবাবু একপেশে হাসি হাসিয়া বলিলেন,—সে-রাত্রে খাওয়া-দাওয়ার পর আমি নিজের ঘরে আলো নিভিয়ে বসে অনেকক্ষণ সেতার বাজিয়েছিলাম। সাক্ষী সাবুদ আছে কিনা জানি না।

ব্যোমকেশ কিছুক্ষণ নীরবে নতমুখে বসিয়া রহিল, তারপর উঠিয়া বরাটকে বলিল, —বলুন বনলক্ষ্মীকে দেখে আসি।

সতের

বরাট, ব্যোমকেশ ও আমি বনলক্ষ্মীর কুঠিতে উপস্থিত হইলাম। ভিতরে প্রবেশ করিবার সময় পাশের খোলা জানালা দিয়া একটি নিভৃত দৃশ্য চোখে পড়িল। ঘরটি বোধহয় বনলক্ষ্মীর শয়নঘর; আলো জ্বলিতেছিল, কনলক্ষ্মী শয্যায় শুইয়া আছে, আর বিজয় শয্যার পাশে বসিয়া মৃদুস্বরে তাহার সহিত বাক্যালাপ করিতেছে।

আমাদের পদশব্দে বিজয় বাহির হইয়া আসিল। বলিল,—বনলক্ষ্মী এখনও বড় দুর্বল। মাথার চোট গুরুতর নয়, কিন্তু স্নায়ুতে শক লেগেছে। তাকে এখন জেরা করা ঠিক হবে কি?

ব্যোমকেশ স্নিগ্ধস্বরে বলিল,—জেরা করব না, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। আমরা শুধু তাকে দেখতে এসেছি, দেখেই চলে যাব।

তা—আসুন।

ব্যোমকেশ ঘনিষ্ঠভাবে বিজয়ের কাঁধে হাত রাখিয়া বলিল,—আপনাকে কিন্তু আর একটি কাজ করতে হবে বিজয়বাবু। একাজ আপনি ছাড়া আর কারুর দ্বারা হবে না।

কি করতে হবে বলুন।

পানুগোপাল কিছু জানে, আপনার কাকার মৃত্যুর রাত্রে বোধহয় কিছু দেখেছিল! কিন্তু সে উত্তেজিত হয়েছে, কিছু বলতে পারছে না। আপনি তাকে ঠাণ্ডা করে কথাটা বার করে নিতে পারেন? আমরা পারব না, আমাদের দেখলেই সে আবার উত্তেজিত হয়ে উঠবে।

বিজয় উৎসুক হইয়া বলিল,—‘আচ্ছা, দেখি চেষ্টা করে।’ বলিয়া সে চলিয়া গেল।

আমরা বনলক্ষ্মীর ঘরে প্রবেশ করিলাম। লোহার সরু খাটের উপর বিছানা। বনলক্ষ্মী খাটের ধারে উঠিয়া বসিয়াছে, তাহার কপালে পটি বাঁধা। আমাদের দেখিয়া উঠিবার উপক্ৰম করিল।

ব্যোমকেশ বলিল,—উঠবেন না, উঠবেন না, আপনি শুয়ে থাকুন।

বনলক্ষ্মী লজ্জিতমুখে ক্ষীণকণ্ঠে বলিল,—কোথায় যে বসতে দেব আপনাদের!

ব্যোমকেশ বলিল,—সে ভাবনা ভাবতে হবে না আপনাকে। আপনি শুয়ে পড়ুন তাে আগে।

বনলক্ষ্মী গুটিসুটি হইয়া শুইল। ব্যোমকেশ তখন খাটের পাশে বসিল, আমরা দুজনে খাটের পায়ের কাছে দাঁড়াইলাম। ক্ষুদ্র নিরাভরণ ঘর; লোহার খাটটি ছাড়া বলিতে গেলে আর কিছুই নাই।

ব্যোমকেশ হাল্কা গল্প করার ভঙ্গীতে বলিল,—কী হয়েছিল বলুন দেখি? বাইরে থেকে কেউ ঢিল ছুঁড়েছিল?

বনলক্ষ্মী দুর্বল কন্ঠে বলিল,—কিছু জানি না। জানালার গরদ ধরে দাঁড়িয়ে ছিলুম, তারপর আর কিছু মনে নেই। জ্ঞান হল ডাক্তারবাবুর টিক্কার আয়োডিনের জ্বলুনিতে।

কপালে ছাড়া আর কোথাও লেগেছে নাকি?

বনলক্ষ্মী ডান হাত তুলিয়া দেখাইল,—হাতে কাচের চুড়ি ছিল, ভেঙে গেছে। হাতে একটু অাঁচড় লেগেছে। বোধহয় হাতটা মাথার কাছে ছিল, একসঙ্গে লেগেছে—

‘তা হতে পারে।’ ব্যোমকেশ হাত পরীক্ষা করিয়া বলিল,—প্রথমে বোধহয় ইট আপনার হাতে লেগেছিল, তাই মাথায় বেশি চোট লাগেনি। আচ্ছা, কে ইট ছুঁড়তে পারে? কলোনীতে এমন কেউ আছে কি, যে আপনার প্রতি প্ৰসন্ন নয়?

বনলক্ষ্মী ব্যথিত স্বরে বলিল,—মুকুল আর নেপালবাবু আমাকে—পছন্দ করেন না। তা ছাড়া-তা ছাড়া—

তা ছাড়া ভুজঙ্গধরবাবুও আপনার ওপর সন্তুষ্ট নন।

বনলক্ষ্মী চুপ করিয়া রহিল।

ব্যোমকেশ বলিল,—ভুজঙ্গধরবাবু হয়তো আপনাকে দেখতে পারেন না, কিন্তু সেজন্য ওঁর কর্তব্যে ত্রুটি হয় না।

বনলক্ষ্মীর অধরে একটু তিক্ত হাসি ফুটিয়া উঠিল, সে বলিল,—না, তা হয় না। আমার কপালে খুব টিঙ্কার আয়োডিন ঢেলেছেন।

ব্যোমকেশ হাসিল,—যাক। —ব্ৰজদাস বাবাজী আর রসিকবাবুর সঙ্গে আপনার কোনও রকম অসদ্ভাব—

বনলক্ষ্মী বলিল,—ব্ৰিজদাস ঠাকুর খুব ভাল লোক ছিলেন, আমাকে স্নেহ করতেন। কেন যে কাউকে কিছু না বলে চলে গেলেন—

আর রসিকবাবু?

রসিকবাবুকে আমি দেখেছি, এই পর্যন্ত। কখনও কথা হয়নি। —তিনি মিশুকে লোক ছিলেন না, নিজের কাজ নিয়ে থাকতেন।

ওকথা যাক। আপনি এখন বেশ সুস্থ বোধ করছেন তো?

কনলক্ষ্মী একটু হাসিল,—হ্যাঁ।

ব্যোমকেশ বলিল,—তাহলে বাঁধা বুলিটা আউড়ে নিই। সে-রত্রে দশটা এগারোটার মধ্যে আপনি কোথায় ছিলেন?

বনলক্ষ্মীর চোখে অন্ধকার জমিয়া উঠিল। অতি অস্ফুট স্বরে সে বলিল,—ককাবাবুর মৃত্যু তাহলে—?

ব্যোমকেশ বলিল,—তাই মনে হচ্ছে।

বনলক্ষ্মী ক্ষণকাল চোখ বুজিয়া রহিল, তারপর বলিল,—সে-রাত্রে রান্নাঘর থেকে খাওয়া-দাওয়া সেরে ফিরে আসার পর আমি অনেকক্ষণ কলে সেলাই করেছিলুম।

বাহিরের ঘরে একটি পায়ে-চালানাে সেলাইয়ের মেশিন দেখিয়াছি; পূর্বে নিশানাথবাবু বনলক্ষ্মীকে দর্জিখানার পরিচারিকা বলিয়া উল্লেখ করিয়াছিলেন মনে পড়িল।

ব্যোমকেশ নরম সুরে বলিল,—আপনি তো কলোনীর সকলের জাম-কাপড় সেলাই করেন। অনেক কাজ জমা হয়ে গিয়েছিল বুঝি?

‘না, কাজ বেশি জমা হয়নি। কাকাবাবুর জন্যে সিস্কের একটা ড্রেসিং গাউন তৈরি করছিলুম।’ বনলক্ষ্মীর চক্ষু সহসা জলে ভরিয়া উঠিল।

ব্যোমকেশ একটু চুপ করিয়া থাকিয়া বলিল,—আচ্ছা বলুন দেখি, আপনি সে-রাত্রে যখন সেলাইয়ের কল চালাচ্ছিলেন, তখন ভুজঙ্গধরবাবুকে সেতার বাজাতে শুনেছিলেন? ওঁর কুঠি তো আপনার পাশেই?

বনলক্ষ্মী চোেখ মুছিয়া মাথা নাড়িল,—না, আমি কিছু শুনিনি। কনের কাছে কল চলছিল, শুনব কি করে? তাহার যেন একটু রাগ-রাগ ভাব।

ব্যোমকেশ মুখ টিপিয়া হাসিল,—শুধু যে ভুজঙ্গধরবাবু আপনাকে দেখতে পারেন না তা নয়, আপনিও তাঁকে দেখতে পারেন না। ভুজঙ্গধরবাবু সে-রfত্রে নিজের ঘরে বসে সেতার বাজাচ্ছিলেন, অন্তত তাই বললেন। আপনি যদি না শুনে থাকেন, তাহলে বলতে হবে উনি মিথ্যে কথা বলেছেন।

এবার বনলক্ষ্মীর মুখের ভাব সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হইল। লজ্জা ও অনুতাপভরা মুখে সে ব্যোমকেশের হাত ধরিয়া আবেগভরা কণ্ঠে বলিয়া উঠিল,—না! উনি সেতার বাজাচ্ছিলেন। আমি কল চালাবার ফাঁকে ফাঁকে শুনেছিলাম!

ব্যেমাকেশ তাহার হাতটি দুই হাতের মধ্যে লইয়া বলিল—তবে যে আগে বললেন শোনেননি!

বনলক্ষ্মীর অধর স্ফুরিত হইল, অনুতাপের সহিত অভিমান মিশ্রিত হইল। সে বলিল,—উনি আমার সঙ্গে যেরকম ব্যাভার করেন—

কিন্তু কোন ও রকম ব্যবহার করেন? কোনও কারণ আছে কি?

বনলক্ষ্মী হাত ছাড়াইয়া লইয়া একবার কপালের উপর আঙ্গুল বুলাইয়া অর্ধস্ফূট স্বরে বলিল,—সে আপনার শুনে কাজ নেই।

কিন্তু আমার যে জানা দরকার।

বনলক্ষ্মী চুপ করিয়া রহিল। ব্যোমকেশ আবার অনুরোধ করিল। তখন বনলক্ষ্মী লজ্জাজড়িত কণ্ঠে বলিতে আরম্ভ করিল—

আমার কথা বোধহয় শুনেছেন, নিজের দোষে ইহকাল পরকাল নষ্ট করেছি। কাকাবাবু আশ্রয় দিয়েছিলেন। তাই-নইলে—

আমি এখানে আশ্রয় পাবার পর ডাক্তারবাবু আমার সঙ্গে খুব সদয় ব্যাভার করেছিলেন। উনি খুব মিশুকে, ওঁকে আমার খুব ভাল লাগত। উনি চমৎকার সেতার বাজাতে পারেন। আমার ছেলেবেলা থেকে গান-বাজনার দিকে ঝোঁক, কিন্তু কিছু শিখতে পারিনি। একদিন ওঁর কাছে গিয়ে বললুম, আমি সেতার শিখব, আমাকে শেখাবেন?—

তারপর?

বনলক্ষ্মীর চোখ ঝাপসা হইয়া গেল,—উনি যে প্রস্তাব করলেন তাতে ছুটে পালিয়ে এলুম...আমি জীবনে একবার ভুল করেছি। তাই উনি মনে করেন। আমি— তাহার স্বর বুজিয়া গেল।

ব্যোমকেশ গভীর মুখে কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া বলিল,—ভুজঙ্গবাবু তো খাসা মানুষ। একথা কেউ জানে?

বনলক্ষ্মী জিভ কাটিল,—আমি কাউকে কিছু বলিনি। একথা কি বলবার? বললে কেউ বিশ্বাস করত না...যে-মেয়ের একবার বদনাম হয়েছে—

বাহিরে পায়ের শব্দ হইল। বনলক্ষ্মী চমকিয়া ত্ৰস্তস্বরে ফিস ফিস্ করিয়া বলিল,—উনি—বিজয়বাবু আসছেন! ওঁকে যেন কিছু বলবেন না। উনি রাগী মানুষ—

ভয় নেই বলিয়া ব্যোমকেশ উঠিয়া দাঁড়াইল। দ্বারের কাছে বিজয়ের সঙ্গে দেখা হইল। ব্যোমকেশ বলিল,—কি হল? পানুগোপালের কাছ থেকে কিছু বার করতে পারলেন?

বিজয় বিষন্ন বিরক্তির সহিত বলিল,—কিছু না। পানুটা ইডিয়ট: হয়তো ওর কিছুই বলবার নেই, যখন বলতে পারবে তখন দেখা যাবে অতি তুচ্ছ কথা। আপনাদের কোনই কাজে লাগবে না।

তা হতে পারে। তবু চেষ্টা করে দেখতে ক্ষতি নেই। কাজের কথাও বেরিয়ে পড়তে পারে।

কাল সকালে আর একবার চেষ্টা করে দেখব।

আচ্ছা। আজি চলি তাহলে।

আসুন। দরকার হলে কাল টেলিফোন করব।

বিজয় রহিয়া গেল, আমরা বাহিরে আসিলাম। কুঠি হইতে নামিবার স্থানটি অন্ধকার। বরাট টর্চ জ্বলিল।

পাশের যে জানােলা দিয়া বনলক্ষ্মীর শয়নঘর দেখা যায়, তাহার নীচে একটা কালো কাপড়-ঢাকা মূর্তি লুকাইয়া ছিল, টর্চের প্রভা সেদিকে পড়িতেই প্ৰেত-মূর্তির মত একটা ছায়া সট্‌ করিয়া সরিয়া গেল, তারপর গাছপালার মধ্যে অদৃশ্য হইল। ব্যোমকেশ বিদ্যুদ্বেগে বরাটের হাত হইতে টর্চ কাড়িয়া লইয়া ছুটিয়া চলিয়া গেল। আমরা বোকার মত ক্ষণকাল দাঁড়াইয়া রহিলাম, তারপর অন্ধকারে হোঁচট খাইতে খাইতে তাহার অনুসরণ করিলাম।

কিছুদূর যাইবার পর দেখা গেল ব্যোমকেশ ফিরিয়া আসিতেছে। জোরে জোরে নিশ্বাস ফেলিতে ফেলিতে বলিল,—ধরতে পারলাম না। নেপালবাবুর কুঠির পিছন পর্যন্ত গিয়ে হঠাৎ মিলিয়ে গেল।

বরাট বলিল,—লোকটা কে আন্দাজ করতে পারলেন?

উঁহু। তবে মেয়েমানুষ। দৌড়বার সময় মনে হল বাতাসে গােলাপী আতরের গন্ধ পেলাম। একবার চুড়ি কিম্বা চাবির আওয়াজও যেন কানে এল।

মেয়েমানুষ-কে হতে পারে?

মুকুল হতে পারে, মুস্কিলের বিবি হতে পারে, আবার দময়ন্তী দেবীও হতে পারেন। —চলুন, সাড়ে ন’টা বেজে গেছে।

বরাট স্টেশন পর্যন্ত আমাদের পৌছাইয়া দিতে আসিল-ট্রেন তখনও আসে নাই। প্ল্যাটফর্মে দাঁড়াইয়া ব্যোমকেশ বলিল,—আপনাকে আর একটা কাজ করতে হবে ইন্সপেক্টর বরাট, আপনি মনে করবেন না। আমি আপনার ওপর সর্দারি করছি। এ কাজে আমরা সহযোগী। আপনার পেছনে পুলিসের অফুরন্ত এক্তিয়ার রয়েছে, আপনি যে-কাজটা পাঁচ মিনিটে করতে পারবেন। আমি করতে গেলে সেটা পাঁচ দিন লাগবে। তাই আপনাকে অনুরোধ করছি।—

বরাট হাসিয়া বলিল,-“কি কাজ করতে হবে বলুন না।

ব্যোমকেশ বলিল,—গুপ্তচর লাগাতে হবে। কলোনী থেকে কে কখন কলকাতায় যাচ্ছে তার খবর আমার দরকার। যেই খবর পাবেন সঙ্গে সঙ্গে আমাকে টেলিফোন করবেন।

তাই হবে। কলোনীতে আর স্টেশনে লোক রাখব। —বনলক্ষ্মীর ভাঙা চুড়িটা আমায় দিয়েছিলেন, সেটা নিয়ে কী করা যাবে?

ওটা ফেলে দিতে পারেন। ভেবেছিলাম পরীক্ষা করাতে হবে, কিন্তু তার দরকার নেই।

আর কিছু?

আপাতত আর কিছু নয়। —আজ যা দেখলেন শুনলেন তা থেকে কি মনে হল? কাউকে সন্দেহ হচ্ছে?

দময়ন্তীকে সবচেয়ে বেশি সন্দেহ হচ্ছে।

কিন্তু এ স্ত্রীলোকের কাজ নয়।

স্ত্রীলোকের সহকারী থাকতে পারে তো।

ব্যোমকেশ চকিতে বরাটের পানে চোখ তুলিল।

সহকারী কে হতে পারে?

সেটা বলা শক্ত। যে-কেউ হতে পারে। বিজয় হতে বাধা কি? ও যেভাবে কাকীমাকে আগলে বেড়াচ্ছে দেখলাম—

হ্যাঁ-ভাববার কথা বটে। ওদিকে নেপালবাবুর সঙ্গেও দময়ন্তী দেবীর একটা প্রচ্ছন্ন সংযোগ রয়েছে।

আচ্ছা, দময়ন্তীর স্বভাব-চরিত্র সম্বন্ধে কিছু জানা গেছে?

দুর্নাম কিছু শুনিনি, বরং ভালই শুনেছি।

আপনার গাড়ি এসে পড়েছে। হ্যাঁ, রসিক দে’র সবজি-দোকানের হিসেব-পত্ৰ দেখবার ব্যবস্থা করেছি। যদি সত্যিই চুরি করে থাকে, ওর নামে ওয়ারেন্ট বের করব।

ট্রেনের শূন্য কামরায় ব্যোমকেশ একটা বেঞ্চিতে চিৎ হইয়া আলোর দিকে চাহিয়া অনেকক্ষণ স্বপ্নাচ্ছন্ন হইয়া রহিল। তারপর হঠাৎ উঠিয়া বসিয়া সিগারেট ধরাইতে ধরাইতে বলিল,—চিড়িয়াখানাই বটে।

উৎসুকভাবে জিজ্ঞাসা করিলাম,—হঠাৎ একথা কেন?

ব্যোমকেশ ধোঁয়া ছাড়িয়া বলিল,—চিড়িয়াখানা ছাড়া আর কি? নাম-কাটা ডাক্তার সংস্কৃত শ্লোক আওড়ায়, মুখপোড়া প্রফেসর রাত দুপুরে মেয়ের সঙ্গে দাবা খেলে, কর্তাকে দোর-বন্ধ বাড়িতে ঢুকে কেউ খুন করে যায়। কিন্তু পাশের ঘরে গৃহিণী কিছু জানতে পারেন না, কর্তার ভাইপো খুড়োর তহবিল ভাঙ্গে সগর্বে সেকথা প্রচার করে, বোষ্টম ফেরারী হয়, গাড়োয়ানের বৌ আড়ি পাতে—। চিড়িয়াখানা আর কাকে বলে?

জিজ্ঞাসা করিলাম,—আজকের অনুসন্ধানে কিছু পেলে?

এইটুকু পেলাম যে সবাই মিথ্যে কথা বলছে। নির্জলা মিথ্যে বলছে না। সত্যি-মিথ্যে মিশিয়ে এমনভাবে বলছে যে কোনটা সত্যি কোনটা মিথ্যে ধরা যায় না।

বনলক্ষ্মীও মিথ্যে বলছে?

অন্তত বলবার তালে ছিল। নেহাৎ বিবেকের দংশনে সত্যি কথা বলে ফেলল।

আচ্ছা, অ্যালিবাই সম্বন্ধে কি মনে হল?

কারুর অ্যালিবাই পাকা নয়। বিজয় বলছে, ঠিক যে-সময় খুন হয় সে-সময় সে কলকাতায় ছিল, অথচ তার কোনোও সাক্ষী-প্রমাণ নেই, বেনামী চিঠিখানা পর্যন্ত ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছে। নেপালবাবু মেয়ের সঙ্গে দাবা খেলছিলেন, কেউ তাঁদের খেলতে দেখেনি। ডাক্তার অন্ধকারে সেতার বাজাচ্ছিলেন, একজন কানে শুনেছে কিন্তু চোখে দেখেনি। বনলক্ষ্মী কলে সেলাই করছিল, সাক্ষী নেই। দময়ন্তীর কথা ছেড়েই দাও। এর নাম কি অ্যালিবাই?

ব্যোমকেশ খানিকক্ষণ বাহিরের অপসৃয়মান আলো-আঁধারের পানে চাহিয়া রহিল, তাহার ললাটে চিন্তার ভ্রুকুটি। সে বলিল,—বনলক্ষ্মী একবার আমার হাত ধরেছিল, লক্ষ্য করেছিলে?

বলিলাম,—লক্ষ্য আবার করিনি! তুমিও দুহাতে তার হাত ধরে কত আদর করলে দেখলাম।

ব্যোমকেশ ফিক হাসিল,—আদর করিনি, সহানুভূতি জানাচ্ছিলাম। —কিন্তু আশ্চর্য বনলক্ষ্মীর বাঁ হাতের তর্জনীর ডগায় কড়া পড়েছে।

বলিলাম,—এ আর আশ্চর্য কি? যারা সেলাই করে তাদের আঙুলে কড়া পড়েই থাকে।

ব্যোমকেশ চিন্তাক্রান্ত মুখে সিগারেটে একটা সুখ-টান দিয়া সেটা বাহিরে ফেলিয়া দিল। তারপর আবার লম্বা হইয়া শুইল।

সে-রাত্রে বাসায় ফিরিতে সাড়ে এগারোটা বাজিল। আর কোনও কথা হইল না, তাড়াতাড়ি আহার সারিয়া শুইয়া পড়িলাম।

আঠারো

ঘুম ভাঙিল। মাথার মধ্যে ঝন ঝন শব্দে। তখনও ভাল করিয়া ভোর হয় নাই, মনে হইল কানের কাছে কাঁসর-ঘণ্টা বাজিয়া উঠিল। কয়েকদিন আগে ঘুমের মধ্যে এমনি আর্ত আহ্বান আসিয়াছিল।

আজ আর বিছানায় থাকিতে পারিলাম না। তাড়াতাড়ি পাশের ঘরে গিয়া দেখিলাম। ব্যোমকেশ ইতিমধ্যে আসিয়া টেলিফোন ধরিয়াছে। আমি তক্তপোশের পাশে বসিয়া একতরফা সংলাপ শুনিলাম-হ্যালো..বিজয়বাবুকী? মারা গেছে। কখন?...কি হয়েছিল...আমি যেতে পারি, কিন্তু এখন গিয়ে লাভ কি?...আপনি বরং ইন্সপেক্টর বিরাটকে ফোন করুন, তিনি ব্যবস্থা করবেন...হ্যাঁ, পোস্ট-মর্টেম হওয়া চাই, আর ওষুধের শিশিটা পরীক্ষা হওয়া চাই..আচ্ছা—

টেলিফোন রাখিয়া ব্যোমকেশ একটা আরাম-চেয়ারে বসিল। আমার ঠোঁটের কাছে যে প্রশ্নটা ধড়ফড় করিতেছিল। তাহা বাহির হইয়া আসিল,—কে? কে গেল?

ব্যোমকেশের চোখে-মুখে যেন দুঃস্বপ্নের জড়তা লাগিয়া ছিল, সে মুখের উপর হাত চালাইয়া তাহা সরাইয়া দিবার চেষ্টা করিল। বলিল,—পানুগোপাল। কিছুক্ষণ আগে তার মৃতদেহ পাওয়া গেছে। বোধহয় কানে ওষুধ দিয়েছিল; ওষুধের শিশিটা ছিপিখোলা অবস্থায় পাওয়া গেছে। ওষুধে বিষ মেশানো ছিল, বিষের জ্বালায় সে ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে আসে, বারান্দা থেকে নীচে পড়ে যায়। সেইখানেই মৃত্যু হয়েছে। —আমার দোষ। আমার ভাবা উচিত ছিল, পানু যদি সত্যিই কোনও গুরুতর কথা জানতে পেরে থাকে, তাহলে তার প্রাণের আশঙ্কা আছে। কেন সাবধান হইনি! কেন তাকে সঙ্গে নিয়ে আসিনি। কিন্তু কাল বিজয় বললে, ওটা একটা ইডিয়ট, হয়তো কিছুই বলবার নেই। আমার মনও সেই কথায় ভিজে গেল—

ব্যোমকেশ হঠাৎ চুপ করিল। তাহার তীব্র আত্মগ্লানির মধ্যে আবার কোন নূতন সংশয় মাথা তুলিয়াছে, সে মুখের উপর একটা হাত ঢাকা দিয়া নীরব হইয়া রহিল।

তারপর সকাল হইল; পুঁটিরাম চা দিয়া গেল। ব্যোমকেশ কিন্তু চা স্পর্শ করিল না, একটা সিগারেট পর্যন্ত ধরাইল না, মোহগ্ৰস্তের মত মুখের উপর হাত চাপা দিয়া আরাম-চেয়ারে পড়িয়া রহিল।

আমার মনটা বিকল হইয়া গিয়াছিল। পানুগোপাল ছেলেটা প্রকৃতির কৃপণতায় অসুস্থ দেহ লাইয়া জন্মিয়ছিল, কিন্তু সে নির্বোধ ছিল না। তাহার হৃদয় ছিল, হৃদয়ে কৃতজ্ঞতা ছিল। নিশানাথবাবু তাহাকে ভালবাসিতেন, আমারও তাঁহাকে ভাল লাগিয়া গিয়াছিল। তাহার এই যন্ত্রণাময় মৃত্যুর সংবাদ কাঁটার মত মনের মধ্যে বিঁধিয়া রহিল।

বেলা বারোটার সময় ব্যোমকেশ নিঃশব্দে উঠিয়া স্নানাহার করিল, তারপর পাখা চালাইয়া শয্যায় শয়ন করিল। সে যে দিবানিদ্ৰা দিবার জন্য শয়ন করিল না তাহা বুঝিলাম। পানুগোপালের মৃত্যুর জন্য সে নিজেকে দোষী মনে করিতেছে, একান্ত নিভৃতে নিজের সঙ্গে বােঝাপড়া করিতে চায়। এবং যে অদৃশ্য নরঘাতক পর-পর দুইটি মানুষকে নিঃশব্দে পৃথিবী হইতে সরাইয়া দিল তাহার ছদ্মবেশ অপসারিত করিয়া তাহাকে ফাঁসিকাঠে লাটুকাইবার পন্থা আবিষ্কার করিতে চায়।

অপরাহ্নে দুইজনে নীরবে বসিয়া চা-পান করিলাম। ব্যোমকেশের মুখখানা শাণ দেওয়া ক্ষুরের মত হিংস্র এবং কঠিন হইয়া রহিল।

সন্ধ্যার সময় পোস্ট-মর্টেম রিপোর্ট লইয়া প্ৰমোদ বরাট আসিল। ব্যোমকেশের হাতে রিপোর্ট দিয়া বলিল,—নিকোটিন বিষে মৃত্যু হয়েছে। ওষুধের শিশিতেও নিকোটিন পাওয়া গেছে।

ব্যোমকেশ বরাটের সম্মুখে সিগারেটের টিন রাখিয়া পুঁটিরামকে আর এক দফা চায়ের হুকুম দিল; রিপোর্ট পড়িয়া কোনও মন্তব্য না করিয়া আমার হাতে দিল।

রাত্রি দশটা হইতে এগারোটার মধ্যে মৃত্যু হইয়াছে। পানুর কানের মধ্যে ক্ষত ছিল, রাত্রে শয়নের পূর্বে শিশির ঔষধে তুলা ভিজাইয়া কানে দিয়াছিল। ইহা তাহার প্রাত্যহিক কর্ম। কিন্তু কাল কেহ অলক্ষিতে তাহার ঔষধে বিষ মিশাইয়া দিয়া গিয়াছিল। বিষ রক্তের সহিত মিশিবার অল্পকাল মধ্যে মৃত্যু হইয়াছে। তাহার দেহে কোনও আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায় নাই। —পোস্ট-মর্টেম রিপোর্ট ও বরাটের মুখের কথা হইতে এই তথ্যগুলি প্রকাশ পাইল।

ব্যোমকেশ জিজ্ঞাসা করিল,—মৃতদেহ কে প্রথম আবিষ্কার করে?

বরাট বলিল,—নেপালবাবুর মেয়ে মুকুল।

ব্যোমকেশ কিছুক্ষণ বরাটের পানে চাহিয়া রহিল, তারপর বলিল,—এবারেও মুকুল!

বরাট বলিল,—যা শুনলাম, ভোর রাত্রে উঠে বাগানে ঘুরে বেড়ানো মেয়েটার অভ্যাস।

হুঁ।—আপনি খোঁজ-খবর নিয়েছিলেন?

সকলকেই সওয়াল করেছিলাম। কিন্তু কাজের কথা কিছু পেলাম না।

পানু যে-ওষুধ কানে দিত সেটা কি ভুজঙ্গধরবাবুর দেওয়া ওষুধ?

হ্যাঁ। ওষুধে ছিল স্রেফ গ্লিসারিন আর বোরিক পাউডার। ভুজঙ্গধরবাবু বললেন, তিনি মাসে এক শিশি পানুকে তৈরি করে দিতেন, পানু তাই কানে দিত। কাল রাত্রি দশটার আগে কোনও সময় হত্যাকারী এসে তার শিশিতে নিকোটিন মিশিয়ে দিয়ে গিয়েছিল। সম্ভবত পানু তখন খেতে গিয়েছিল।

কে কখন খেতে গিয়েছিল। খবর নিয়েছেন?

সকলে একসঙ্গে খেতে যায়নি, কেউ আগে কেউ পরে। পানু খেতে গিয়েছিল আন্দাজ পৌনে দশটার সময়, অর্থাৎ আমরা চলে আসবার পরই।

কাল রান্না করেছিল কে?

দময়ন্তী আর মুকুল। দুজনেই সারাক্ষণ রান্নাঘরে ছিল।

কিছুক্ষণ চুপচাপ। পুঁটিরাম চা ও জলখাবার দিয়া গেল।

ব্যোমকেশ বলিল,—নিকোটিন। অজিত, লক্ষ্য করেছ, দ্বিতীয়বার নিকোটিনের আবির্ভাব হল।

বলিলাম,—হ্যাঁ। তার মানে-সুনয়না

বরাট বলিল,—কিন্তু সুনয়না বা অন্য কোনও স্ত্রীলোক নিশানাথবাবুকে কড়িকাঠ থেকে ঝুলিয়ে দিতে পারে এ প্রস্তাব আমরা আগেই খারিজ করেছি। ধরে নিতে হবে সুনয়নার একজন সহকর্মী আছে।

ব্যোমকেশ বলিল,—সহকর্মী কিম্বা সহকর্মিণী। একজন স্ত্রীলোকের পক্ষে যে কাজ অসম্ভব, দু’জন স্ত্রীলোক মিলে সে কাজ সহজেই করতে পারে। কিন্তু আসল কথা নিকোটিন। এ বিষ এল কোত্থেকে? ইন্সপেক্টর বরাট, আপনি নিকোটিন সম্বন্ধে কিছু জানেন?

বরাট বলিল,—ওটা ভয়ঙ্কর বিষ এই জানি। আপনার মুখে সুনয়নার কথা শোনবার পর খোঁজখবর নিয়েছিলাম, দেখলাম ওষুধের দোকানে ও-মাল পাওয়া যায় না; কোথাও পাওয়া যায় কিনা সন্দেহ। এক যদি কোনও বড় ফ্যাক্টরিতে তৈরি হয় তো বলতে পারি না।

এক হতে পারে যে-ব্যক্তি বিষ ব্যবহার করেছে সে নিজে একজন কেমিস্ট কিংবা কোনও কেমিস্টকে দিয়ে বিষ তৈরি করিয়েছে।

তা হতে পারে। কেমিস্ট তো একজন হাতের কাছেই রয়েছে।—নেপাল গুপ্ত।

যদি নেপাল গুপ্ত হয়, সুনয়নার সঙ্গে তার সম্বন্ধ কি?

বাপ-বেটি হতে বাধা কি?

আমি বলিলাম,—নেপালবাবুর সঙ্গে দময়ন্তী দেবীরও যোগাযোগ আছে—তাঁরা দুজনে হতে পারেন।

ব্যোমকেশ ক্লিষ্ট হাসিয়া বলিল,—দময়ন্তী দেবী আর বিজয় হতে পারে, বিজয় আর বনলক্ষ্মী হতে পারে, বনলক্ষ্মী আর দময়ন্তী হতে পারে, দময়ন্তী আর ভুজঙ্গবাবু হতে পারে, বনলক্ষ্মী আর ব্ৰজদাস হতে পারে, এমন কি মুস্কিল মিঞা আর নজর বিবি হতে পারে। সম্ভাবনা অনেকগুলো রয়েছে, কিন্তু কেবল সম্ভাবনার কথা গবেষণা করে কোনও লাভ হবে না। পাকাপাকি জানতে হবে।

বরাট জলযোগ শেষ করিয়া মুখ মুছিতে মুছিতে বলিল,—বেশ তো, পাকাপাকি জানার একটা উপায় বলুন না। পুলিসের দিক থেকে আর কোনও বাধা নেই, পানুকে যে খুন করা হয়েছে—আমার কর্তারা তা স্বীকার করবেন; সুতরাং পুলিসের যা-কিছু কর্তব্য সবই আমি করতে পারি। এখন কি করতে হবে বলুন।

ব্যোমকেশ বলিল, —কে, কলোনীর সকলের কুঠি খানাতল্লাস করে দেখতে পারেন, কিন্তু নিকোটিন পাবেন না। আমার মনে হয়, রুটিন-মাফিক কাজে কোনও ফল হবে না। বরং আপাতত কিছুদিন বসে থাকা ভাল।

চুপচাপ হাত গুটিয়ে বসে থাকব?

একেবারে হাত গুটোবার দরকার নেই। ব্ৰজদাস আর রসিকের তল্লাস যেমন চলছে চলুক। রসিকের দোকানের খাতপত্র পরীক্ষা করুন। আর কলোনীতে গুপ্তচর বসান। কে কখন বাইরে যাচ্ছে সেটা জানা বিশেষ দরকার।

বরাট গাত্ৰোত্থান করিয়া বলিল,—আজ থেকেই লোক লাগাবো ঠিক করেছিলাম। কিন্তু পানুর ব্যাপারে সব গোলমাল হয়ে গেছে। কাল থেকে হবে। —কলোনীতে আর কারুর হঠাৎ মৃত্যুর যোগ নেই তো?

ব্যোমকেশ কিছুক্ষণ চোখ বুজিয়া রহিল, তারপর বলিল,—বোধহয় না। থাকলেও আমরা ঠেকাতে পারব না।

উনিশ

দুইদিন গোলাপ কলোনীর দিক থেকে কোনও সাড়াশব্দ আসিল না; প্রমোদ বরাটও খবর দিল না। মৃত্যু-ছায়াচ্ছন্ন কলোনীর কথা যেন সকলে ভুলিয়া গিয়াছে। ব্যোমকেশ টেলিফোনের দিকে চোখ রাখিয়া অতৃপ্ত প্রেতাত্মার মত ঘুরিয়া বেড়াইতে লাগিল। দু'একবার আমরা দাবার ছক সাজাইয়া বসিলাম। কিন্তু ব্যোমকেশ অন্যমনস্ক হইয়া রহিল, খেলা জমিল না।

তৃতীয় দিন বিকালবেলা চা-পানের পর ব্যোমকেশ বলিল,—আমি একটু বেরুব।

আমারও মন চঞ্চল হইয়া উঠিল, বলিলাম,—কোথায় যাবে?

সেন্ট মার্থার স্কুলে খোঁজ-খবর নেওয়া দরকার। তুমি কিন্তু বাড়িতেই থাকবে। যদি টেলিফোন আসে।

ব্যোমকেশ চলিয়া গেল। তারপর দুঘন্টা কড়িকাঠ গুনিয়া কাটাইয়া দিলাম। ছটা বাজিতে পাঁচ মিনিটে টেলিফোন বাজিল। বুকের ভিতরটা ছাৎ করিয়া উঠিল।

বরাট টেলিফোন করিতেছে। বলিল,—বেরিয়েছেন?—তাঁকে বলে দেবেন। ভুজঙ্গধরবাবু কোট-প্যান্ট পরে পৌনে ছ’টার ট্রেনে কলকাতা গেছেন। —আর একটা খবর আছে, রসিক দে’র খতাপত্র পরীক্ষা করে দেখা গেছে তিন হাজার টাকার গরমিল। রসিকের নামে ওয়ারেন্ট বার করেছি।

কলোনীর খবর কী?

নতুন খবর কিছু নেই।

বরাট টেলিফোন ছাড়িয়া দিবার পর মনটা আরও অস্থির হইয়া উঠিল। বুজঙ্গধরবাবু কলিকাতায় আসিতেছেন এ সংবাদের গুরুত্ব কতখানি কিছুই জানি না। ব্যোমকেশ কখন ফিরিবে?

ব্যোমকেশ ফিরিল সওয়া ছ’টার সময়। ভুজঙ্গধরবাবুর সংবাদ দিতেই তাহার মুখ উজ্জ্বল হইয়া উঠিল, সে হাতের ঘড়ি দেখিয়া বলিল,—‘ট্রেন এসে পৌঁছতে এখনও আধা ঘন্টা। অনেক সময় আছে।’ বলিয়া নিজের শয়নকক্ষে গিয়া দ্বার বন্ধ করিয়া দিল।

আমি দ্বারের নিকট হইতে বলিলাম,—রসিক দে দোকানের তিন হাজার টাকা মেরেছে।

ওপার হইতে আওয়াজ আসিল,—বেশ বেশ।

পাঁচ মিনিট পরে ঘর হইতে বাহির হইয়া আসিল একটি আধাবয়সী ফিরিঙ্গী। পরিধানে ময়লা জিনের প্যান্টুলুন ও রঙচটা আলপাকার কোট, মাথায় তেল-চিটে নাইট ক্যাপ, ছাঁটা গোঁফের ভিতর হইতে আধ-পোড়া একটা চুরুট বাহির হইয়া আছে।

বলিলাম,—এ কি গোয়াঞ্চি পিদ্রু সেজে কোথায় চললে?

সাহেব কড়া সুরে বলিল—“None of your business, young man.” বলিয়া পা ঘষিয়া বাহির হইয়া গেল।

তারপর সাড়ে দশটার আগে আর তাহার দেখা পাইলাম না। একেবারে স্নান সারিয়া গরম চায়ের পেয়ালা হাতে বাহিরের ঘরে আসিয়া বসিল।

আমি বলিলাম,—কোট-প্যান্টুলুনের আর একটা মহৎ গুণ, পরলেই মেজাজ। সপ্তমে চড়ে যায়। আশা করি মাথা ঠাণ্ডা হয়েছে।

ব্যোমকেশ বলিল,—কোট-প্যান্টুলুনের আর একটা মহৎ গুণ, বেশি ছদ্মবেশ দরকার হয় না। —তুমি বোধহয় খুবই উৎসুক হয়ে উঠেছ?

তা উঠেছি। এবার তোমার হৃদয়ভার লাঘব কর।

কোনটা আগে বলব? ভুজঙ্গধরবাবুর বৃত্তান্ত?

ব্যোমকেশ চায়ে চুমুক দিয়া বলিল,—বুঝতেই পেরেছ ফিরিঙ্গী সেজে শিয়ালদা স্টেশনে গিয়েছিলাম। উদ্দেশ্য ছিল ভুজঙ্গধরবাবু কোথায় যান দেখা। স্টেশনে তাঁকে আবিষ্কার করে তাঁর পিছু নিলাম। তখন সন্ধ্যে ঘনিয়ে এসেছে। তাঁকে অনুসরণ করা শক্ত হল না। তিনি ট্রামে চড়লেন, আমিও ট্রামে চড়লাম। মৌলালির মোড়ে এসে তিনি নামলেন, আমিও নামলাম। তারপর ধর্মতলা দিয়ে কিছুদূর গিয়ে তিনি একটা গলির মধ্যে ঢুকে পড়লেন। গলির পর গলি, তস্য গলি। দেখলাম ফিরিঙ্গী পাড়ায় এসে পৌঁছেছি। ভালই হল। পাড়ার সঙ্গে আমার ছদ্মবেশ খাপ খেয়ে গেল। কোট-প্যান্টুলুনের ওই মাহাত্ম্য, যে পাড়াতেই যাও বেমানান হয় না।

তারপর?

একটা এদোঁপড়া বাড়ির দরজার পাশে দুটো স্ত্রীলোক দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়েছিল। ভুজঙ্গধরবাবু গিয়ে তাদের সঙ্গে খাটো গলায় কথা বললেন, তারপর বাড়ির মধ্যে ঢুকে গেলেন। স্ত্রীলোক দুটো দাঁড়িয়ে রইল।

জিজ্ঞাসা করিলাম,—তাদের কি রকম মনে হল?

ব্যোমকেশের মুখে বিতৃষ্ণা ফুটিয়া উঠিল, সে বলিল

দেবতা ঘুমালে তাঁহাদের দিন

দেবতা জাগিলে তাদের রাতি

ধরার নরক সিংহদুয়ারে

জ্বালায় তাহারা সন্ধ্যাবাতি?

তারপর বল।

আমি বড় মুস্কিলে পড়ে গেলাম। ভুজঙ্গধরবাবুর চরিত্র আমরা যতটা জানতে পেরেছি। তাতে আশ্চর্য হবার কিছু ছিল না। কিন্তু এই এঁদোপড়া বাড়িটাই তাঁর একমাত্র গন্তব্যস্থল কিনা তা না জেনে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া যায় না। আমি বাড়ির সামনে দিয়ে একবার হেঁটে গেলাম, দেখে নিলাম বাড়ির নম্বর উনিশ। তারপর একটা অন্ধকার কোণে লুকিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম। মেয়ে দুটো দরজার পাশে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানতে লাগল।

প্ৰায় চল্লিশ মিনিট পরে ভুজঙ্গধরবাবু বেরুলেন। আশেপাশে দৃকপাত না করে যে-পথে এসেছিলেন। সেই পথে ফিরে চললেন। আমি চললাম। তারপর সটান শেয়ালদা স্টেশনে তাঁকে নটা পঞ্চান্নর গাড়িতে তুলে দিয়ে আসছি।

চায়ের পেয়ালা এক চুমুকে শেষ করিয়া ব্যোমকেশ সিগারেট ধরাইল। আমি বলিলাম, তাহলে ভুজঙ্গধরবাবুর কার্যকলাপ থেকে কিছু ধরা গেল না?

ব্যোমকেশ কিছুক্ষণ ভ্রুকুঞ্চিত করিয়া রহিল, তারপর বলিল,—কেমন যেন ধোঁকা লাগল। ভুজঙ্গধরবাবু যখন দরজা থেকে বেরুলেন তখন তাঁর পকেট থেকে কি একটা জিনিস মাটিতে পড়ল। ছিনিৎ করে শব্দ হল। তিনি দেশলাই জ্বেলে সেটা মাটি থেকে কুড়িয়ে নিলেন। দেখলাম একটা চাবির রিঙ, তাতে গোটা তিনেক বড়-বড় চাবি রয়েছে।

এতে ধোঁকা লাগাবার কি আছে?

হয়তো কিছু নেই, তবু ধোঁকা লাগছে।

কিছুক্ষণ নীরবে কাটিবার পর বলিলাম,—ওদিকে কী হল? সেন্ট মার্থা স্কুল?

ব্যোমকেশ বলিল,—দময়ন্তী দেবী মাস আষ্টেক স্কুলে যাতায়াত করেছিলেন। রোজ যেতেন না, ইংরেজি শেখার দিকেও খুব বেশি চাড় ছিল না। স্কুলে দু তিনটি পাঞ্জাবী মেয়ে পড়ত, তাদের সঙ্গে গল্প করতেন—

পাঞ্জাবী মেয়েদের সঙ্গে?

হ্যাঁ। দময়ন্তী দেবী পাঞ্জাবী ভাষা জানেন।

এই সময়ে টেলিফোন বাজিল। ব্যোমকেশ টপ করিয়া ফোন তুলিয়া লইল,—হ্যালো...ইন্সপেক্টর বিরাট! এত রাত্রে কী খবর?..রসিক দে ধরা পড়েছে! কোথায় ছিল...অ্যাঁ। শিয়ালদার কাছে ‘বঙ্গ বিলাসী’ হোটেলে! সঙ্গে টাকাকড়ি কিছু ছিল?...মাত্র ত্রিশ টাকা ...আজ তাকে আপনাদের লক-আপে রাখুন, কাল সকালেই আমি গিয়ে হাজির হব। ...আর কি! হ্যাঁ দেখুন, একটা ঠিকানা দিচ্ছি, আপনার একজন লোক পাঠিয়ে সেখানকার হালচাল সব সংগ্ৰহ করতে হবে...১৯ নম্বর মিজ লেন...হ্যাঁ, স্থানটা খুব পবিত্র নয়...কিন্তু সেখানে গিয়ে আলাপ জমাবার মতন লোক আপনাদের বিভাগে নিশ্চয় আছে...হাঃ হাঃ হাঃ...আচ্ছা, কাল সকালেই যাচ্ছি..নমস্কার।

ফোন রাখিয়া ব্যোমকেশ বলিল,—চল, আজ খেয়ে-দোয়ে শুয়ে পড়া যাক, কাল ভোরে উঠতে হবে।

কুড়ি

গোলাপ কলোনীর ঘটনাবলী ধাবমান মোটরের মত হঠাৎ বানচাল হইয়া রাস্তার মাঝখানে দাঁড়াইয়া পড়িয়াছিল, তিন দিন পরে মেরামত হইয়া আবার প্রচণ্ড বেগে ছুটিতে আরম্ভ করিল।

পরদিন সকালে আন্দাজ সাড়ে আটটার সময় মোহনপুরের স্টেশনে অবতীর্ণ হইলাম। আকাশে শেষরাত্রি হইতে মেঘ জমিতেছিল, সূর্য ছাই-ঢাকা আগুনের মত কেবল অস্তদাহ বিকীর্ণ করিতেছিলেন। আমরা পদব্রজে থানার দিকে চলিলাম।

থানার কাছাকাছি পৌঁছিয়াছি। এমন সময় নেপালবাবু বন্য বরাহের ন্যায় থানার ফটক দিয়া বাহির হইয়া আসিলেন। আমাদের দিকে মোড় ঘুরিয়া ছুটিয়া আসিতে আসিতে হঠাৎ আমাদের দেখিয়া থমকিয়া দাঁড়াইয়া পড়িলেন, তারপর আবার ঘোঁৎ ঘোঁৎ করিয়া ছুটিয়া চলিলেন।

ব্যোমকেশ ডাকিল,—নেপালবাবু, শুনুন-শুনুন।

নেপালবাবু যুযুৎসু ভঙ্গীতে ঘুরিয়া দাঁড়াইয়া চক্ষু ঘূর্ণিত করিতে লাগিলেন। বোমকেশ তাঁহার কাছে গিয়া বলিল,—এ কি, আপনি থানায় গিয়েছিলেন। কী হয়েছে?

নেপালবাবু ফাটিয়া পড়িলেন,—ঝকমারি হয়েছে! পুলিসকে সাহায্য করতে গিয়েছিলাম, আমার ঘাট হয়েছে। পুলিসের খুরে দণ্ডবৎ।’ বলিয়া আবার উল্টামুখে চলিতে আরম্ভ করিলেন।

ব্যোমকেশ আবার গিয়া তাঁহাকে ধরিয়া ফেলিল,—কিন্তু ব্যাপারটা কি? পুলিসকে কোন বিষয়ে সাহায্য করতে গিয়েছিলেন?

উর্ধ্বে হাত তুলিয়া নাড়িতে নাড়িতে নেপালবাবু বলিলেন,—না না, আর না, যথেষ্ট হয়েছে। কোন শালা আর পুলিসের কাজে মাথা গলায়। আমার দুর্বুদ্ধি হয়েছিল, তাই—!

ব্যোমকেশ বলিল,—কিন্তু আমাকে বলতে দোষ কি? আমি তো আর পুলিস নই।

নেপালবাবু, কিন্তু বাগ মানিতে চান না। অনেক কষ্টে পিঠে অনেক হাত বুলাইয়া ব্যোমকেশ তাঁহাকে কতকটা ঠাণ্ডা করিল। একটা গাছের তলায় দাঁড়াইয়া কথা হইল। নেপালবাবু বলিলেন,—কলোনীতে দুটো খুন হয়ে গেল, পুলিস চুপ করে বসে থাকতে পারে কিন্তু আমি চুপ করে থাকি কি করে? আমার তো একটা দায়িত্ব আছে! আমি জানি কে খুন করেছে, তাই পুলিসকে বলতে গিয়েছিলাম। তা পুলিস উল্টে আমার ওপরই চাপ দিতে লাগল। ভাল রে ভাল-যেন আমিই খুন করেছি।

ব্যোমকেশ বলিল,—আপনি জানেন কে খুন করেছে?

এর আর জানাজানি কি? কিলোনীর সবাই জানে, কিন্তু মুখ ফুটে বলবার সাহস কারুর নেই।

কে খুন করেছে?

বিজয়! বিজয়! আর কে খুন করবে? খুড়ীর সঙ্গে ষড় করে আগে খুড়োকে সরিয়েছে, তারপর পানুকে সরিয়েছে। পানুটাও দলে ছিল কিনা।

কিন্তু-পানু কিসে মারা গেছে আপনি জানেন?

নিকোটিন। আমি সব খবর রাখি।

কিন্তু বিজয় নিকোটিন পাবে কোথায়? নিকোটিন কি বাজারে পাওয়া যায়?

বাজারে সিগারেট তো পাওয়া যায়। যার ঘটে এতটুকু বুদ্ধি আছে সে এক প্যাকেট সিগারেট থেকে এত নিকোটিন বার করতে পারে যে কলোনী সুদ্ধ লোককে তা দিয়ে সাবাড় করা যায়৷।

তাই নাকি? নিকোটিন তৈরি করা এত সহজ?

সহজ নয় তো কী! একটা বকযন্ত্র যোগাড় করতে পারলেই হল।

এই পর্যন্ত বলিয়া নেপালবাবু হঠাৎ সচকিত হইয়া উঠিলেন, তারপর আর বাক্যব্যয় না করিয়া স্টেশনের দিকে পা চালাইলেন।

আমরাও সঙ্গে চলিলাম! ব্যোমকেশ বলিল,—আপনি বৈজ্ঞানিক, আপনার কথাই ঠিক। আমি জানতাম না নিকোটিন তৈরি করা এত সোজা। —তা আপনি এদিকে কোথায় চলেছেন? কলোনীতে ফিরবেন না?

‘কলকাতা যাচ্ছি একটা বাসা ঠিক করতে-কলোনীতে ভদ্দরলোক থাকে না—’ বলিয়া তিনি হনহন করিয়া চলিয়া গেলেন।

আমরা থানার দিকে ফিরিলাম। ব্যোমকেশের ঠোঁটের কোণে একটা বিচিত্ৰ হাসি খেলা করিতে লাগিল।

থানায় প্রমোদ বরাটের ঘরে আসন গ্ৰহণ করিয়া ব্যোমকেশ বলিল,—রাস্তায় নেপাল গুপ্তর সঙ্গে দেখা হল।

বরাট বলিল,—আর বলবেন না, লোকটা বদ্ধ পাগল। সকাল থেকে আমার হাড় জ্বালিয়ে খেয়েছে। ওর বিশ্বাস বিজয় খুন করেছে, কিন্তু সাক্ষী প্রমাণ কিছু নেই, শুধু আক্ৰোশ। আমি বললাম, আপনি যদি বিজয়ের নামে পুলিসে ডায়েরি করতে চান আমার আপত্তি নেই, কিন্তু পরে যদি বিজয় মানহানির মামলা করে তখন আপনি কি করবেন? এই শুনে নেপাল গুপ্ত উঠে পালাল। আসল কথা বিজয় ওকে নোটিস দিয়েছে; বলেছে চুপটি করে কলোনীতে থাকতে পারেন তো থাকুন, নইলে রাস্তা দেখুন, সর্দারি করা এখানে চলবে না। তাই এত রাগ।

ব্যোমকেশ বলিল,—আমারও তাই আন্দাজ হয়েছিল। —যাক, এবার আপনার রসিককে বার করুন।

রসিক আনীত হইল। হাজতে রাত্রিবাসের ফলে তাহার চেহারার শ্ৰীবৃদ্ধি হয় নাই। খুঁতখুঁতে মুখে নিপীড়িত একগুঁয়েমির ভাব। আমাদের দেখিয়া একবার ঢোক গিলিল, কণ্ঠার হাড় সবেগে নড়িয়া উঠিল।

কিন্তু তাহাকে জেরা করিয়া ব্যোমকেশ কোনও কথাই বাহির করিতে পারিল না। বস্তুত রসিক প্রায় সারাক্ষণই নিবাক হইয়া রহিল। সে চুরি করিয়াছে কি না এ প্রশ্নের জবাব নাই, টাকা লইয়া কী করিল। এ বিষয়েও নিরুত্তর। কেবল একবার সে কথা কহিল, তাহাও প্রায় অজ্ঞাতসারে।

ব্যোমকেশ জিজ্ঞাসা করিল,—যে-রাত্রে নিশানাথবাবু মারা যান সেদিন সন্ধ্যেবেলা তাঁর সঙ্গে আপনার ঝগড়া হয়েছিল?

রসিক চোখ মেলিয়া কিছুক্ষণ চাহিয়া রহিল, বলিল,—নিশানাথবাবু মারা গেছেন?

ব্যোমকেশ বলিল,—হ্যাঁ। পানুগোপালও মারা গেছে। আপনি জানেন না?

রসিক কেবল মাথা নাড়িল।

তারপর ব্যোমকেশ আরও প্রশ্ন করিল। কিন্তু উত্তর পাইল না। শেষে বলিল,—দেখুন, আপনি চুরির টাকা নষ্ট করেননি, কোথাও লুকিয়ে রেখেছেন। আপনি যদি আমাদের জানিয়ে দেন কোথায় টাকা রেখেছেন তাহলে আমি বিজয়বাবুকে বলে আপনার বিরুদ্ধে মামলা তুলিয়ে নেব, আপনাকে জেলে যেতে হবে না। —কোথায় কার কাছে টাকা রেখেছেন বলবেন কি?

রসিক পূর্ববৎ নির্বাক হইয়া রহিল। আরও কিছুক্ষণ চেষ্টার পর ব্যোমকেশ হাল ছাড়িয়া দিল। বলিল,—আপনি ভাল করলেন না। আপনি যে—কথা লুকোবার চেষ্টা করছেন তা আমরা শেষ পর্যন্ত জানতে পারবই। মাঝ থেকে আপনি পাঁচ বছর জেল খাটবেন।

রসিকের কণ্ঠার হাড় আর একবার নড়িয়া উঠিল, সে যেন কিছু বলিবার জন্য মুখ খুলিল। তারপর আবার দৃঢ়ভাবে ওষ্ঠাধর সম্বদ্ধ করিল।

রসিককে স্থানান্তরিত করিবার পর ব্যোমকেশ শুষ্কম্বরে বলিল,—এদিকে তো কিছু হল না-কিন্তু আর দেরি নয়, সব যেন জুড়িয়ে যাচ্ছে। একটা প্ল্যান আমার মাথায় এসেছে—

বরাট বলিল,—কী প্ল্যান?

প্ল্যান কিন্তু শোনা হইল না। এই সময় একটি বকাটে ছোকরা গোছের চেহারা দরজা দিয়া মুণ্ড বাড়াইয়া বলিল,—ব্ৰজদাস বোষ্টমকে পাকড়েছি স্যার।

বরাট বলিল,—বিকাশ! এস। কোথায় পাকড়ালে বোষ্টমকে?

বিকাশ ঘরে প্রবেশ করিয়া দন্তবিকাশ করিল,—নবদ্বীপের এক আখড়ায় বসে খঞ্জনি বাজাচ্ছিল। কোনও গোলমাল করেনি। যেই বললাম, আমার সঙ্গে ফিরে যেতে হবে, আমনি সুসসুড় করে চলে এল।

বাঃ বেশ। এই ঘরেই পাঠিয়ে দাও তাকে।

ব্ৰজদাস বৈষ্ণব ঘরে প্রবেশ করিলেন। গায়ে নামাবলী, মুখে কয়েক দিনের অক্ষৌরিত দাড়ি-গোঁফ মুখখানিকে ধুতরা-ফুলের মত কন্টকাকীর্ণ করিয়া তুলিয়াছে, চোখে লজ্জিত অপ্রস্তুত ভাব। তিনি বিনয়াবনত হইয়া জোড়হস্তে আমাদের নমস্কার করিলেন।

বরাট ব্যোমকেশকে চোখের ইশারা করিল, ব্যোমকেশ ব্রজদাসের দিকে মুচকি হাসিয়া বলিল,—বসুন।

ব্ৰজদাস যেন আরও লজ্জিত হইয়া একটি টুলের উপর বসিলেন। ব্যোমকেশ বলিল,—আপনি হঠাৎ ডুব মেরেছিলেন কেন বলুন তো? যতদূর জানি কলোনীর টাকাকড়ি কিছু আপনার কাছে ছিল না।

ব্ৰজদাস বলিলেন,—আজ্ঞে না।

তবে পালালেন কেন?

ব্ৰজদাস, কচুমাচু মুখে চুপ করিয়া রহিলেন। তাহার মুখের পানে চাহিয়া চাহিয়া আমার হঠাৎ মনে পড়িয়া গেল, নিশানাথ বলিয়াছিলেন ব্ৰজদাস মিথ্যা কথা বলে না। ইহাও কি সম্ভব? পাছে সত্য কথা বলিতে হয় এই ভয়ে তিনি পলায়ন করিয়াছিলেন। কিন্তু কী এমন মারাত্মক সত্য কথা?

ব্যোমকেশ বলিল,—আচ্ছা, ওকথা পরে হবে। এখন বলুন দেখি, নিশানাথবাবুর মৃত্যু সম্বন্ধে কিছু জানেন?

ব্ৰজদাস বলিলেন,—না, কিছু জানি না।

কাউকে সন্দেহ করেন?

আজ্ঞে না।

‘তবে—’ ব্যোমকেশ থামিয়া গিয়া বলিল,—নিশানাথবাবুর মৃত্যুর রাত্রে আপনি কলোনীতেই ছিলেন তো?

আজ্ঞে কলোনীতেই ছিলাম।

লক্ষ্য করিলাম ব্ৰজদাস এতক্ষণে যেন বেশ স্বচ্ছন্দ হইয়াছেন, কচুমাচু ভাব আর নাই। ব্যোমকেশ জিজ্ঞাসা করিল,—রাত্রে খাওয়া-দাওয়ার পর কোথায় ছিলেন, কি করছিলেন?

ব্ৰজদাস বলিলেন,—আমি আর ডাক্তারবাবু একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া সেরে ফিরে এলাম, উনি নিজের কুঠিতে গিয়ে সেতার বাজাতে লাগলেন, আমি নিজের দাওয়ায় শুয়ে তাঁর বাজনা শুনলাম!

ব্যোমকেশ কিছুক্ষণ চাহিয়া থাকিয়া বলিল,—ও।-ভুজঙ্গধরবাবু সেতার বাজাচ্ছিলেন?

আজ্ঞে হ্যাঁ, মালকোষের আলাপ করছিলেন।

কতক্ষণ আলাপ করেছিলেন?

তা প্ৰায় সাড়ে এগারোটা পর্যন্ত। চমৎকার হাত ওঁর।

হুঁ। একটানা আলাপ করেছিলেন? একবারও থামেননি?

“আজ্ঞে না, একবারও থামেননি। ”

পাঁচ মিনিটের জন্যেও নয়।

আজ্ঞে না। সেতারের কান মোচুড়াববার জন্য দু’একবার থেমেছিলেন, তা সে পাঁচ-দশ সেকেন্ডের জন্য, তার বেশি নয়।

কিন্তু আপনি তাঁকে বাজাতে দেখেননি?

দেখব কি করে? উনি অন্ধকারে বসে বাজাচ্ছিলেন। কিন্তু আমি ওঁর আলাপ চিনি, উনি ছাড়া আর কেউ নয়।

বোমকেশ কিছুক্ষণ বিফল হইয়া রহিল, তারপর নিশ্বাস ফেলিয়া অন্য প্রসঙ্গ আরম্ভ করিল—

আপনি কলোনীতে আসবার আগে থেকেই নিশানাথবাবুকে চিনতেন?

আবার ব্ৰজদাসের মুখ শুকাইল। তিনি উসখুসি করিয়া বলিলেন,—আজ্ঞে হ্যাঁ।

আপনি ওঁর সেরেস্তায় কাজ করতেন, উনি সাক্ষী দিয়ে আপনাকে জেলে পাঠিয়েছিলেন?

আজ্ঞে হ্যাঁ, আমি চুরি করেছিলাম।

বিজয় তখন নিশানাথবাবুর কাছে থাকত?

আঞ্জে হ্যাঁ।

দময়ন্তী দেবীর তখন বিয়ে হয়েছিল?

ব্ৰজদাসের মুখ কাঁদো-কাঁদো হইয়া উঠিল, তিনি ঘাড় হেঁট করিয়া রহিলেন।

ব্যোমকেশ বলিল,—উত্তর দিচ্ছেন না যে? দময়ন্তী দেবীকে তখন থেকেই চেনেন তো?

ব্ৰজদাস অস্পষ্টভাবে ‘হ্যাঁ’ বলিলেন।

ব্যোমকেশ বলিল,—তার মানে নিশানাথ আর দময়ন্তীর বিয়ে তার আগেই হয়েছিল—কেমন?

ব্ৰজদাস এবার ব্যাকুল স্বরে বলিয়া উঠিলেন,—‘এই জন্যেই আমি পালিয়েছিলাম। আমি জানতাম আপনারা এই কথা তুলবেন। দোহাই ব্যোমকেশবাবু, আমাকে ও প্রশ্ন করবেন না। আমি সাত বছ। ওঁদের অন্ন খেয়েছি। আমাকে নিমকহারামি করতে বলবেন না।’ বলিয়া তিনি কাতরভাবে হাত জোড় করিলেন।

ব্যোমকেশ সোজা হইয়া বসিল, তাহার চোখের দৃষ্টি বিস্ময়ে প্রখর হইয়া উঠিল। সে বলিল,—এ সব কী ব্যাপার?

ব্ৰজদাস ভগ্নস্বরে বলিলেন,—আমি জীবনে অনেক মিথ্যে কথা বলেছি, আর মিথ্যে কথা বলব না। জেল থেকে বেরিয়ে আমি বৈষ্ণব হয়েছি, কন্ঠি নিয়েছি; কিন্তু শুধু কন্ঠি নিলেই তো হয় না, প্ৰাণে ভক্তি কোথায়, প্ৰেম কোথায়? তাই প্ৰতিজ্ঞা করেছি। জীবনে আর মিথ্যে কথা বলব না, তাতে যদি ঠাকুরের কৃপা হয়। —আপনারা আমায় দয়া করুন, ওঁদের কথা জিগ্যেস করবেন না। ওঁরা আমার মা বাপ।

ব্যোমকেশ ধীরস্বরে বলিল,—আপনার কথা শুনে এইটুকু বুঝলাম যে আপনি মিথ্যে কথা বলেন না, কিন্তু নিশানাথ সম্বন্ধে সত্যি কথা বলতেও আপনার সঙ্কোচ হচ্ছে। মিথ্যে কথা না বলা খুবই প্রশংসার কথা, কিন্তু সত্যি কথা গোপন করায় কোনও পূণ্য নেই। ভেবে দেখুন, সত্যি কথা না জানলে আমরা নিশানাথবাবুর খুনের কিনারা করব কি করে? আপনি কি চান না যে নিশানাথবাবুর খুনের কিনারা হয়?

ব্ৰজদাস নতমুখে রহিলেন। তারপর আমরা সকলে মিলিয়া নির্বন্ধ করিলে তিনি অসহায়ভাবে বলিলেন,—কি জানতে চান বলুন।

ব্যোমকেশ বলিল,—নিশানাথ ও দময়ন্তীর বিয়ের ব্যাপারে কিছু গোলমাল আছে। কী গোলমাল?

ওঁদের বিয়ে হয়নি।

বোকার মত সকলে চাহিয়া রহিলাম।

ব্যোমকেশ প্ৰথমে সামলাইয়া লইল। তারপর ধীরে ধীরে একটি একটি প্রশ্ন করিয়া ব্ৰজদাস বাবাজীর নিকট হইতে যে কাহিনী উদ্ধার করিল। তাহা এই--

নিশানাথবাবু পুণায় জজ ছিলেন, ব্ৰজদাস ছিলেন তাঁর সেরেস্তার কেরানি। লাল সিং নামে একজন পাঞ্জাবী খুনের অপরাধে দায়রা-সোপর্দ হইয়া নিশানাথবাবুর আদালতে বিচারার্থ আসে। দময়ন্তী এই লাল সিং-এর স্ত্রী।

নিশানাথের কোর্টে যখন দায়রা মোকদ্দমা চলিতেছে তখন দময়ন্তী নিশানাথের বাংলোতে আসিয়া সকাল-সন্ধ্যা বসিয়া থাকিত, কান্নাকাটি করিত। নিশানাথ তাহাকে তাড়াইয়া দিতেন, সে আবার আসিত। বলিত, আমি অনাথা, আমার স্বামীর সাজা হইলে আমি কোথায় যাইব?

দময়ন্তীর বয়স তখন উনিশ-কুড়ি; অপরূপ সুন্দরী। বিজয়ের বয়স তখন তেরো-চোদ্দ, সে দময়ন্তীর অতিশয় অনুগত হইয়া পড়িল। কাকার কাছে দময়ন্তীর জন্য দরবার করিত। নিশানাথ কিন্তু প্রশ্ৰয় দিতেন না। বিজয় যে দময়ন্তীকে চুপি চুপি খাইতে দিতেছে এবং রাত্রে বাংলোতে লুকাইয়া রাখিতেছে তাহা তিনি জানিতে পারিতেন না।

লাল সিং-এর ফাঁসির হুকুম হইয়া যাইবার পর নিশানাথ জানিতে পারিলেন। খুব খানিকটা বকাবকি করিলেন এবং দময়ন্তীকে অনাথ আশ্রমে পাঠাইবার ব্যবস্থা করিলেন। দময়ন্তী, কিন্তু তাঁহার পা জড়াইয়া ধরিয়া কাঁদিতে লাগিল, বালক বিজয়ও চীৎকার করিয়া কাঁদিতে লাগিল। নিরুপায় হইয়া নিশানাথ দময়ন্তীকে বাংলোয় থাকিতে দিলেন। বাড়ির চাকর-বাকরের কাছে ব্ৰজদাস এই সকল সংবাদ পাইয়াছিলেন।

হাইকোর্টের আপীলে লাল সিং-এর ফাঁসির হুকুম রদ হইয়া যাবজীবন কারাবাস হইল। দময়ন্তী নিশানাথের আশ্রয়ে রহিয়া গেল। হাকিম-হুকুম মহলে এই লইয়া একটু কানাঘুষ হইল। কিন্তু নিশানাথের চরিত্র-খ্যাতি এতই মজবুত ছিল যে, প্রকাশ্যে কেহ তাঁহাকে অপবাদ দিতে সাহস করিল না।

ইহার দু'এক মাস পরে ব্ৰজদাসের চুরি ধরা পড়িল; নিশানাথ সাক্ষী দিয়া তাঁহাকে জেলে পাঠাইলেন। তারপর কয়েক বৎসর কী হইল ব্ৰজদাস তাহা জানেন না।

ব্ৰজদাস জেল হইতে বাহির হইয়া শুনিলেন নিশানাথ কর্ম হইতে অবসর লইয়াছেন, তিনি নিশানাথের সন্ধান লইতে লাগিলেন। জেলে থাকাকালে ব্ৰজদাসের মতিগতি পরিবর্তিত হইয়াছিল, তিনি বৈষ্ণব হইয়াছিলেন। সন্ধান করিতে করিতে তিনি গোলাপ কলোনীতে আসিয়া উপস্থিত হইলেন।

এখানে আসিয়া ব্ৰজদাস দেখিলেন নিশানাথ ও দময়ন্তী স্বামী-স্ত্রীরূপে বাস করিতেছেন। নিশানাথ তাঁহাকে কলোনীতে থাকিতে দিলেন, কিন্তু সাবধান করিয়া দিলেন, দময়ন্তীঘটিত কোনও কথা যেন প্রকাশ না পায়। দময়ন্তী ও বিজয় পূর্বে ব্ৰজদাসকে এক-আধবার দেখিয়াছিল, এতদিন পরে তাঁহাকে চিনিতে পারিল না! তদবধি ব্ৰজদাস কলোনীতে আছেন। নিশানাথ ও দময়ন্তীর মত মানুষ সংসারে দেখা যায় না। তাঁহারা যদি কোনও পাপ করিয়া থাকেন। ভগবান তাহার বিচার করিবেন।

ব্যোমকেশ সুদীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিয়া বলিল,—ইন্সপেক্টর বরাট, চলুন। একবার কলোনীতে যাওয়া যাক। অন্ধকার অনেকটা পরিষ্কার হয়ে আসছে।

ব্ৰজদাস করুণ স্বরে বলিলেন,—আমার এখন কী হবে?

ব্যোমকেশ বলিল,—আপনিও কলোনীতে চলুন। যেমন ছিলেন তেমনি থাকবেন।

একুশ

প্ৰমোদ বরাটের ঘর হইতে যখন বাহিরে আসিলাম বেলা তখন প্ৰায় বারোটা। পাশের ঘরে থানার কয়েকজন কর্মচারী খাতা-পত্র লইয়া কাজ করিতেছিল, বরাট বাহিরে আসিলে হেড-ক্লার্ক উঠিয়া আসিয়া নিম্নস্বরে বরাটকে কিছু বলিল।

বরাট ব্যোমকেশকে বলিল,—একটু অসুবিধা হয়েছে। আমাকে এখনি আর একটা কাজে বেরুতে হবে। তা আপনার না হয় এগোন, আমি বিকেলের দিকে কলোনীতে হাজির হব।

ব্যোমকেশ একটু চিস্তা করিয়া বলিল,—তার চেয়ে এক কাজ করা যাক, সন্ধ্যের সময় সকলে একসঙ্গে গেলেই চলবে। আপনি কাজে যান, সন্ধ্যে ছ’টার সময় স্টেশনে ওয়েটিং রুমে আমাদের খোঁজ করবেন।

বরাট বলিল,—বেশ, সেই ভাল।

ব্ৰজদাস বলিলেন,—কিন্তু আমি—

ব্যোমকেশ বলিল,—আপনি এখন কলোনীতে ফিরে যেতে পারেন, কিন্তু যে-সব কথা হল তা কাউকে বলবার দরকার নেই।

যে আজ্ঞে।

ব্ৰজদাস কলোনীর রাস্তা ধরিলেন, আমরা স্টেশনে ফিরিয়া চলিলাম। চলিতে চলিতে ব্যোমকেশ বলিল,—আমাদের চোখে ঠুলি আঁটা ছিল। দময়ন্তী নামটা প্রচলিত বাংলা নাম নয় এটাও চোখে পড়েনি। অমন রঙ এবং রূপ যে বাঙালীর ঘরে চোখে পড়ে না। এ কথাও একবার ভেবে দেখিনি। দময়ন্তী এবং নিশানাথের বয়সের পার্থক্য থেকে কেবল দ্বিতীয় পক্ষই আন্দাজ করলাম, অন্য সম্ভাবনা যে থাকতে পারে তা ভাবলাম না। দময়ন্তী স্কুলে গিয়ে পাঞ্জাবী মেয়েদের সঙ্গে গল্প করেন এ থেকেও কিছু সন্দেহ হল না। অথচ সন্দেহ হওয়া উচিত ছিল। নিশানাথবাবু বোম্বাই প্রদেশে সাতচল্লিশ বছর বয়সে একটি উনিশ-কুড়ি বছরের বাঙালী তরুণীকে বিয়ে করলেন এটা এক কথায় মেনে নেবার মত নয়। —অজিত, মাথার মধ্যে ধূসর পদার্থ ক্রমেই ফ্যাকাসে হয়ে আসছে, এবার অবসর নেওয়া উচিত। সত্যান্বেষণ ছেড়ে ছাগল চরানো কিম্বা অনুরূপ কোনও কাজ করার সময় উপস্থিত হয়েছে।

তাহার ক্ষোভ দেখিয়া হাসি আসিল। বলিলাম,—ছাগল না হয় পরে চরিও, আপাতত এ ব্যাপারের তো একটা নিম্পত্তি হওয়া দরকার। দময়ন্তী নিশানাথবাবুর স্ত্রী নয় এ থেকে কী বুঝলে?

ক্ষুব্ধ ব্যোমকেশ কিন্তু উত্তর দিল না। স্টেশনে ওয়েটিং রুমে তালা লাগানো ছিল, তালা খোলাইয়া ভিতরে গিয়া বসিলাম। একটা কুলিকে দিয়া বাজার হইতে কিছু হিঙের কচুরি ও মিষ্টান্ন আনাইয়া পিত্ত রক্ষা করা গেল।

আকাশে মেঘ। আরও ঘন হইয়াছে, মাঝে মাঝে চড়বড় করিয়া দু’চার ফোঁটা ছাগল-তাড়ানো বৃষ্টি ঝরিয়া পড়িতেছে। সন্ধ্যা নাগাদ বেশ চাপিয়া বৃষ্টি নামিবে মনে হইল।

দুইটি দীর্ঘবাহু আরাম-কেদারায় আমরা লম্বা হইলাম। বাহিরে থাকিয়া থাকিয়া ট্রেন আসিতেছে যাইতেছে। আমি মাঝে মাঝে ঝিমাইয়া পড়িতেছি, মনের মধ্যে সূক্ষ্ম চিন্তার ধারা বহিতেছে-দময়ন্তী দেবী নিশানাথের স্ত্রী নয়, লাল সিং-এর স্ত্রী.মানসিক অবস্থার কিরূপ বিবর্তনের ফলে একজন সচ্চরিত্র সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি এরূপ কর্ম করিতে পারেন?.দময়ন্তী প্রকৃতপক্ষে কিরূপ স্ত্রীলোক? স্বৈরিণী? কুহকিনী? কিন্তু তাঁহাকে দেখিয়া তাহা মনে হয় না…

সাড়ে পাঁচটার সময় পুলিস ভ্যান লইয়া বরাট আসিল। আকাশের তখন এমন অবস্থা হইয়াছে যে, মনে হয়। রাত্রি হইতে আর দেরি নাই। মেঘগুলা ভিজা ভোট-কম্বলের মত আকাশ আবৃত করিয়া দিনের আলো মুছিয়া দিয়াছে।

বরাট বলিল,—বিকাশকে আপনার উনিশ নম্বর মিজ লেনে পাঠিয়ে দিলাম। কাল খবর পাওয়া যাবে।

ব্যোমকেশ বলিল,—বিকাশ! ও-বেশ বেশ। ছোকরা কি আপনাদের দলের লোক, অর্থাৎ পুলিসে কাজ করে?

বরাট বলিল,—কাজ করে বটে। কিন্তু ইউনিফর্ম পরতে হয় না। ভারী খলিফা ছেলে। চলুন, এবার যাওয়া যাক৷

স্টেশনের স্টলে এক পেয়ালা করিয়া চা গলাধঃকরণ করিয়া আমরা বাহির হইতেছি, একটা ট্রেন কলিকাতার দিক হইতে আসিল। দেখিলাম নেপালবাবু গাড়ি হইতে নামিলেন, হনহন করিয়া বাহির হইয়া গেলেন। আমাদের দেখিতে পাইলেন না।

ব্যোমকেশ বলিল,—উনি এগিয়ে যান। আমরা আধা ঘন্টা পরে বেরুব।

আমরা আবার ওয়েটিং রুমে গিয়া বসিলাম। একথা-সেকথায় আধা ঘণ্টা কাটাইয়া মোটর ভ্যানে চড়িয়া বাহির হইয়া পড়িলাম।

কলোনীর ফটক পর্যন্ত পৌঁছবার পূর্বেই ব্যোমকেশ বলিল,—এখানেই গাড়ি থামাতে বলুন, গাড়ি ভেতরে নিয়ে গিয়ে কাজ নেই। অনর্থক সকলকে সচকিত করে তোলা হবে।

গাড়ি থামিল, আমরা নামিয়া পড়িলাম। অন্ধকার আরও গাঢ় হইয়াছে। আমরা কলোনীর ফটকের সম্মুখে উপস্থিত হইয়া দেখিলাম নিশানাথবাবুর ঘরের পাশের জানােলা দিয়া আলো আসিতেছে।

ব্যোমকেশ সদর দরজার কড়া নাড়িল। বিজয় দরজা খুলিয়া দিল এবং আমাদের দেখিয়া চমকিয়া বলিয়া উঠিল,—আপনারা।

ভিতরে দময়ন্তী চেয়ারে বসিয়া আছেন দেখা গেল। ব্যোমকেশ গভীর মুখে বলিল,—দিময়ন্তী দেবীকে কিছু জিজ্ঞাসা করবার আছে।

আমাদের ঘরে প্রবেশ করিতে দেখিয়া দময়ন্তী ত্ৰস্তভাবে উঠিয়া দাঁড়াইলেন, তাঁহার মুখ বিবর্ণ হইয়া গেল। ব্যোমকেশ বলিল,—উঠবেন না। বিজয়বাবু, আপনিও বসুন।

দময়ন্তী ধরে ধীরে আবার বসিয়া পড়িলেন। বিজয় চোখে শঙ্কিত সন্দেহ ভরিযা তাঁহার চেয়ারের পিছনে গিয়া দাঁড়াইল।

আমরা উপবিষ্ট হইলাম! ব্যোমকেশ জিজ্ঞাসা করিল,—বাড়িতে আর কেউ নেই?

বিজয় নীরবে মাথা নাড়িল। ব্যোমকেশ যেন তাহা লক্ষ্য না করিয়াই নিজের ডান হাতের নখগুলি নিরীক্ষণ করিতে করিতে বলিল,—দিময়ন্তী দেবী, সেদিন আপনাকে যখন প্রশ্ন করেছিলাম। তখন সব কথা আপনি বলেননি। এখন বলবেন কি?

দময়ন্তী ভয়ার্তা চোখ তুলিলেন,—কি কথা?

ব্যোমকেশ নির্লিপ্তভাবে বলিল,—সেদিন আপনি বলেছিলেন দশ বছর আগে আপনাদের বিয়ে হয়েছিল, কিন্তু আমরা জানতে পেরেছি বিয়ে হওয়া সম্ভব ছিল না। নিশানাথবাবু আপনার স্বামী নন—

মৃত্যুশরাহতের মত দময়ন্তী কাঁদিয়া উঠিলেন,—না না, উনিই আমার স্বামী-উনিই আমার স্বামী—? বলিয়া নিজের কোলের উপর ঝুকিয়া পড়িয়া মুখ ঢাকিলেন।

বিজয় গৰ্জিয়া উঠিল,—ব্যোমকেশবাবু!

বিজয়কে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করিয়া ব্যোমকেশ বলিয়া চলিল,—আপনার ব্যক্তিগত জীবনের গোপনীয় কথায় আমাদের দরকার ছিল না। অন্য সময় হয়তো চুপ করে থাকতাম, কিন্তু এখন তো চুপ করে থাকবার উপায় নেই। সব কথাই জানতে হবে—

বিজয় বিকৃত স্বরে বলিল,—আর কী কথা জানতে চান আপনি?

ব্যোমকেশ চকিতে বিজয়ের পানে চোখ তুলিয়া করাতের মত অমসৃণ কণ্ঠে বলিল,—আপনাকেও অনেক কৈফিয়ৎ দিতে হবে, বিজয়বাবু; অনেক মিছে কথা বলেছেন আপনি। কিন্তু সে পরের কথা। এখন দময়ন্তী দেবীর কাছ থেকে জানতে চাই, যে-রাত্রে নিশানাথবাবুর মৃত্যু হয় সে-রত্রে কী ঘটেছিল?

দময়ন্তী গুমরিয়া গুমরিয়া কাঁদিতে লাগিলেন। বিজয় তাঁহার পাশে নতজানু হইয়া বাষ্পরুদ্ধ স্বরে ডাকিতে লাগিল,—কাকিমা-ককিমা-!

প্রায় দশ মিনিট পরে দময়ন্তী অনেকটা শান্ত হইলেন, অশ্রুপ্লাবিত মুখ তুলিয়া আঁচলে চোখ মুছিলেন। ব্যোমকেশ শুষ্কস্বরে বলিল,—সত্য কথা গোপন করার অনেক বিপদ। হয়তো এই সত্য গোপনের ফলেই পানুগোপাল বেচারা মারা গেছে। এর পর আর মিথ্যে কথা বলে ব্যাপারটাকে আরও জটিল করে তুলবেন না।

দময়ন্তী ভগ্নস্বরে বলিলেন,—আমি মিথ্যে কথা বলিনি, সে-রাত্রির কথা যা জানি সব ব্যোমকেশ বলিল,—দেখুন, কী ভয়ঙ্করভাবে নিশানাথবাবুর মৃত্যু হয়েছিল তা বিজয়বাবু জানেন। আপনি পাশের ঘরে থেকেও কিছু জানতে পারেননি, এ অসম্ভব। হয় আপনি দশটা থেকে এগারোটার মধ্যে বাড়িতে ছিলেন না, কিংবা আপনার চোখের সামনে নিশানাথবাবুর মৃত্যু হয়েছে।

পূর্ণ এক মিনিট ঘর নিস্তব্ধ হইয়া রহিল। তারপর বিজয় ব্যগ্রস্বরে বলিল,—কাকিমা, আর লুকিয়ে রেখে লাভ কি। আমাকে যা বলেছ। এঁদেরও তা বল। হয় তো—

আরও খানিকক্ষণ মুক থাকিয়া দময়ন্তী অতি অস্পষ্ট স্বরে বলিলেন,—আমি বাড়িতে ছিলাম না।

কোথায় গিয়েছিলেন? কি জন্যে গিয়েছিলেন?

অতঃপর দময়ন্তী স্বলিতস্বরে এলোমেলোভাবে তাঁহার বাহিরে যাওয়ার ইতিহাস বলিলেন। দীর্ঘ আট মাসের ইতিহাস; তাঁহার ভাষায় বলিলে অনাবশ্যক জটিল ও জবড়াজং হইয়া পড়িবে। সংক্ষেপে তাহা এইরূপ—

আট নয় মাস পূর্বে দময়ন্তী ডাকে একটি চিঠি পাইলেন। লাল সিং-এর চিঠি। লাল সিং লিখিয়াছে-জেল হইতে বাহির হইয়া আমি তোমাদের সন্ধান পাইয়াছি। ছদ্মবেশে গোলাপ কলোনী দেখিয়া আসিয়াছি, তোমাদের সব কীর্তি জানিতে পারিয়াছি। আমি ভীষণ প্ৰতিহিংসা লইতে পারিতাম। কিন্তু তাহা লইব না। আমার টাকা চাই। কাল রাত্ৰি দশটা হইতে এগারোটার মধ্যে কলোনীর ফটকের পাশে যে কাচের ঘর আছে। সেই ঘরে বেঞ্চির উপর ৫০০ টাকা রাখিয়া আসিবে। কাহাকেও কিছু বলিবে না, বলিলে তোমাদের দু’জনকেই খুন করিব। এর পর আমি তোমাকে চিঠি লিখিব না। (জেলে বাংলা শিখিয়াছি কিন্তু লিখিতে চাই না), টাকার দরকার হইলে মোটরের একটি ভাঙা অংশ বাড়ির কাছে ফেলিয়া দিয়া যাইব। তুমি সেই রাত্ৰে নির্দিষ্ট সময়ে ৫০০ টাকা কাচের ঘরে রাখিয়া আসিবে। —

চিঠি পাইয়া দময়ন্তী ভয়ে দিশাহারা হইয়া গেলেন। কিন্তু নিশানাথকে কিছু বলিলেন না। রাত্রে ৫০০ টাকার নোট কাচের ঘরে রাখিয়া আসিলেন। কলোনীর টাকাকড়ি দময়ন্তীর হাতেই থাকিত। কেহ জানিতে পারিল না।

তারপর মাসের পর মাস শোষণ চলিতে লাগিল। মাসে দুই-তিন বার মোটরের ভগ্নাংশ আসে, দময়ন্তী কাচের ঘরে টাকা রাখিয়া আসেন। কলোনীর আয় ছিল মাসে প্রায় আড়াই হাজার তিন হাজার, কিন্তু এই সময় হইতে আয় কমিতে লাগিল। তাহার উপর এইভাবে দেড় হাজার টাকা বাহির হইয়া যায়। আগে অনেক টাকা উদ্ধৃত্তি হইত, এখন টায়ে টায়ে খরচ চলিতে লাগিল।

নিশানাথ টাকার হিসাব রাখিতেন না, কিন্তু তিনিও লক্ষ্য করিলেন। তিনি দময়ন্তীকে প্রশ্ন করিলেন, দময়ন্তী মিথ্যা বলিয়া তাঁহাকে স্তোক দিলেন; আয় কমিয়া যাওয়ার কথা বলিলেন, খরচ বাড়ার কথা বলিলেন না।

এইভাবে আট মাস কাটিয়াছে। নিশানাথের মৃত্যুর দিন সকালে দময়ন্তী আবার একখানি চিঠি পাইলেন। লাল সিং লিখিয়াছে-আমি এখান হইতে চলিয়া যাইতেছি, যাইবার আগে তোমার সঙ্গে দেখা করিয়া যাইতে চাই। তুমি রাত্রি দশটার সময় কাচের ঘরে আসিয়া আমার জন্য অপেক্ষা করিবে। যদি এগারোটার মধ্যে না যাইতে পারি। তখন ফিরিয়া যাইও। আমি তোমাকে ক্ষমা করিয়াছি কিন্তু কাহাকেও কিছু বলিলে কিম্বা আমাকে ধরিবার চেষ্টা করিলে খুন করিব।

সে-রাত্রে আহারের পর বাড়িতে ফিরিয়া আসিয়া দময়ন্তী দেখিলেন, নিশানাথ আলো নিভাইয়া শুইয়া পড়িয়াছেন। দময়ন্তী নিঃশব্দে পিছনের দরজা দিয়া বাহির হইয়া গেলেন। কিন্তু লাল সিং আসিল না। দময়ন্তী এগারোটা পর্যন্ত কাচের ঘরে অপেক্ষা করিয়া ফিরিয়া আসিলেন। দেখিলেন নিশানাথ পূর্ববৎ ঘুমাইতেছেন। তখন তিনিও নিজের ঘরে গিয়া শয়ন করিলেন।

পরদিন প্ৰাতঃকালে উঠিয়া নিশানাথের গায়ে হাত দিয়া দময়ন্তী দেখিলেন নিশানাথ বাঁচিয়া নাই। তিনি চীৎকার করিয়া অজ্ঞান হইয়া পড়িলেন।

ব্যোমকেশ নত মুখে সমস্ত শুনিল, তারপর বিজয়ের দিকে চোখ তুলিয়া বলিল,—বিজয়বাবু, আপনি এ কাহিনী কবে জানতে পারলেন?

বিজয় বলিল,—তিন-চার দিন আগে। আমি আগে জানতে পারলে—

ব্যোমকেশ কড়া সুরে বলিল,—অন্য কথাটা অর্থাৎ আপনার কাকার সঙ্গে দময়ন্তী দেবীর প্রকৃত সম্পর্কের কথা। আপনি গোড়া থেকেই জানেন। কোনও সময় কাউকে একথা বলেছেন?

বিজয় চমকিয়া উঠিল, তাহার মুখ ধীরে ধীরে রক্তাভ হইয়া উঠিল। সে বলিল,—না, কাউকে না।

ব্যোমকেশ উঠিয়া দাঁড়াইয়া বরাটকে বলিল,—চলুন, এবার যাওয়া যাক।

দ্বার পর্যন্ত গিয়া সে ফিরিয়া দাঁড়াইয়া বলিল,—একটা খবর দিয়ে যাই। লাল সিং দু’বছর আগে জেলে মারা গেছে।

বাইশ

পুলিস ভ্যানে ফিরিয়া যাইতে যাইতে ব্যোমকেশ বলিল,—দময়ন্তী দেবীর কথা সত্যি বলেই মনে হয় নিশানাথবাবুর সন্দেহ হয়েছিল। কেউ দময়ন্তীকে blackmail করছে; তাই যেদিন তিনি আমাদের সঙ্গে দেখা করতে যান সেদিন নিতান্ত অপ্রাসঙ্গিকভাবে কথাটা উচ্চারণ করেছিলেন। কথাটা তাঁর মনের মধ্যে ছিল তাই মুখ দিয়ে বেরিয়ে এসেছিল।

বরাট বলিল,—এখন কথা হচ্ছে, কে blackmail করছে? নিশ্চয় এমন লোক যে দময়ন্তীর গুপ্তকথা জানে।

ব্যোমকেশ বলিল, blackmail আমাদের জ্ঞানত তিনজন এই গুপ্তকথা জানেblackmail বিজয়, ব্ৰজদাস বাবাজী আর নেপালবাবু। নেপালবাবু জানলে মুকুল জানবে। সব মিলিয়ে চারজন; আরও কেউ কেউ থাকতে পারে, যাদের আমরা নাম জানি না। আর কিছু না হোক হত্যার একটা স্পষ্ট পরিষ্কার মোটিভ পাওয়া গেল।

জিজ্ঞাসা করিলাম, blackmail স্পষ্ট পরিষ্কার মোটিভটা কি?

ব্যোমকেশ বলিল,blackmail ধরা যাক নেপালবাবু blackmail করছিলেন। আট মাস ধরে তিনি বেশ কিছু দোহন করেছেন, আরও অনেক দিন পেন্সন ভোগ করবার ইচ্ছে আছে, এমন সময় দেখলেন নিশানাথবাবুর সন্দেহ হয়েছে, তিনি আমাকে ডেকে এনেছেন। নেপালবাবুর ভয় হল এমন লাভের ব্যবসাটা বুঝি ফেঁসে যায়। শুধু তাই নয়, তিনি যদি ধরা পড়েন তাহলে ইতিপূর্বে তাঁর কন্যার সাহায্যে যে হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়েছেন তাও প্রকাশ হয়ে পড়বে, তাঁর কন্যাটিও যে চিত্রাভিনেত্রী সুনয়না ওরফে নৃত্যকালী তাও আর গোপন থাকবে না। রমেন মল্লিককে আমাদের সঙ্গে দেখে তাঁর এ রকম সন্দেহ হওয়া স্বাভাবিক। তিনি তখন কী করবেন? নিশানাথকে মারতে গেলে সব সমস্যার মূলে কুঠারাঘাত করা হয়, নিৰ্ভয়ে blackmail চালানো যায়। কিন্তু নিশানাথের মৃত্যুটা স্বাভাবিক হওয়া চাই। সুতরাং নিশানাথ যথাসম্ভব স্বাভাবিকভাবে মারা গেলেন। কিন্তু তবু খুঁত রয়ে গেল। পুলিসের যাতায়াত শুরু হল। তার ওপর পানুগোপালটা কিছু দেখে ফেলেছিল। অতএব তাকেও সরানো দরকার হল। মোটামুটি এই মোটিভ।

বরাট বলিল,—তাহলে কর্তব্য কি?

ব্যোমকেশ বলিল,—একটা প্ল্যান আমার মাথায় ঘুরছে, কিন্তু সে বিষয়ে পরে ব্যবস্থা হবে। আজ রাত্রেই একটা কাজ করা দরকার, আবার আমাদের কলোনীতে ফিরে যেতে হবে। লুকিয়ে লুকিয়ে কলোনীর লোকগুলির ওপর নজর রাখতে হবে।

কী উদ্দেশ্য?

আজ মেঘৈর্মেদুরমম্বরং-অভিসারের উপযুক্ত রাত্রি। দেখতে হবে কেউ কারুর ঘরে যায় কিনা। আপনি রাজী?

নিশ্চয় রাজী। কিন্তু আগে চলুন আমার বাসায় খাওয়া-দাওয়া করবেন।

বরাটের বাসায় আহার শেষ করিয়া আমরা যখন বাহির হইলাম রাত্রি তখন সওয়া ন’টা। একটু আগে যাওয়া ভাল, পালা শেষ হইবার পর প্রেক্ষাগৃহে রাত জাগিয়া বসিয়া থাকার মানে হয় না। বরাট আমাদের জন্য দুইটা বির্ষাতি যোগাড় করিয়া লইল।

কলোনী হইতে আধ মাইল দূরে গাড়ি থামানো হইল। ড্রাইভারকে এইখানে গাড়ি রাখিতে বলিয়া আমরা পদব্রজে অগ্রসর হইলাম; আকাশ তেমনি থমথমে হইয়া আছে, প্রত্যাশিত বৃষ্টি নামে নাই। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাইতেছে বটে, কিন্তু তাহা অবগুষ্ঠিতা বধূর মুচকি হাসির মত লজ্জিত; তাহার পিছনে গুরু গুরু ডাকও নাই।

কলোনীতে প্রবেশ করিয়া দেখিলাম একটিও কুঠিতে আলো জ্বলিতেছে না, কেবল ভোজনগৃহে আলো। সকলেই আহার করিতে গিয়াছে। ব্যোমকেশ চুপি চুপি আমাদের নির্দেশ দিল,—অজিত, তুমি বিজয়ের কুঠির আনাচে কানাচে ঝোপঝাড়ের মধ্যে লুকিয়ে বোসো, বিজয় ছাড়া আর কেউ আসে কিনা লক্ষ্য করবে। —ইন্সপেক্টর বিরাট, আপনি দময়ন্তীর খিড়কি দরজার ওপর নজর রাখবেন।

আর আপনি?

আমি নেপালবাবুর সদর আর অন্দর দুদিকেই চোখ রাখব। একটা করবীর ঝাড় দেখে রেখেছি, সেখান থেকে দুদিকেই দৃষ্টি রাখা চলবে।

বরাট ও বোমকেশের বির্ষাতি-পরা মূর্তি অন্ধকারে মিলাইয়া গেল। আমি বিজয়ের কুঠির এক কোণে একটা ঝোপের মধ্যে আড্ডা গাড়িলাম।

পনরো-কুড়ি মিনিটের মধ্যে ভোজনকারীরা একে একে ফিরিতে আরম্ভ করিল। প্ৰথমে ডাক্তার ভুজঙ্গাধরের ঘরে আলো জ্বলিয়া উঠিল। তারপর বিজয়ের পায়ের শব্দ শুনিলাম; সে নিজের কুঠিতে প্রবেশ করিয়া আলো জ্বলিল। বনলক্ষ্মীর ঘর অন্ধকার, সে বোধহয় এখনও রান্নাঘরে আছে।

বসিয়া বসিয়া দময়ন্তী ও নিশানাথের চিন্তাই মনে আসিল; যে-কঙ্কালটুকু পাইয়াছিলাম তাহাতে কল্পনার রক্ত-মাংস সংযোগ করিয়া মানুষের মত করিয়া তুলিবার চেষ্টা করিলাম। —দময়ন্তী বোধহয় লাল সিং-এর মত দুর্দান্ত নিষ্ঠুর স্বামীকে ভালবাসিত না, কিন্তু স্বামী খুনের অপরাধে অভিযুক্ত হইলে অশিক্ষিত রমণীর স্বাভাবিক কর্তব্যবোধে বিচারকের করুণা-ভিক্ষা করিতে গিয়াছিল; তারপর বিজয় ও নিশানাথের প্রতি আকৃষ্ট হইয়া পড়িয়াছিল, দাম্পত্য জীবনের যে-কোমলতা পায় নাই তাহার আশায় লুব্ধ হইয়াছিল। নিশানাথও ক্রমশ নিজের বিবেকবুদ্ধির বিরুদ্ধে এই সুন্দরী অনাথার মায়াজালে আবদ্ধ হইয়াছিলেন। তাঁহার অন্তরে ঘাত-প্রতিঘাত আরম্ভ হইয়াছিল, বিচারকের আসনে অধিষ্ঠিত হইয়া তিনি নীতি লঙঘন করিতে পারেন নাই। চাকরি ছাড়িয়া দিয়া এই একান্ত অপরিচিত স্থানে আসিয়া দময়ন্তীর সহিত বাস করিতেছিলেন। ...দোষ কাহার, কে কাহাকে অধিক প্রলুব্ধ করিয়াছিল, এ প্রশ্নের অবতারণা এখন নিরর্থক; কিন্তু এ জগতে কর্মফলের হাত এড়ানো যায় না, বিনামূল্যে কিছু পাওয়া যায় না। নিশানাথ কঠিন মূল্য দিয়াছেন, দময়ন্তীও লজ্জা ভয় ও শোকের মাশুল দিয়া জীবনের ঋণ পরিশোধ করিতেছেন। যে ছিদ্রান্বেষী শক্ৰ তাহাদের দুর্বলতার ছিদ্রপথে প্রবেশ করিয়া কৃমিকীটের ন্যায় আত্মপুষ্টি করিতে চায় সে নিমিত্ত মাত্র। আবার তাহাকেও একদিন মাশুল দিতে হইবে—

বিজয়ের ঘরে আলো নিভিয়া গেল; পাশের কুঠিতে বনলক্ষ্মীর আলো জ্বলিল। কিছুক্ষণ পরে বনলক্ষ্মীর ওপাশের কুঠিতে ভুজঙ্গধরবাবুর সেতার বাজিয়া উঠিল! কী সুর ঠিক জানি না, কিন্তু দ্রুত তাহার ছন্দ তাল, অসন্দিগ্ধ তাহার ভঙ্গী; যেন বহিঃপ্রকৃতির রসালতায় নূতন উদ্দীপনা প্রয়োগ করিবার প্রয়াস পাইতেছে, বিরহী প্রিয়তমাকে আহ্বান করিতেছে—

কাজর রুচিহর রয়নী বিশালা,

তছুপর অভিসার করু নববালা—

দশ মিনিট পরে সেতার থামিল, ভুজঙ্গধরবাবু আলো নিভাইলেন। কয়েক মিনিট পরে বনলক্ষ্মীর আলোও নিভিয়া গেল। সব কুঠিগুলি অন্ধকার।

আপন আপনি নিভৃত কক্ষে ইহারা কি করিতেছে-কী ভাবিতেছে? এই কলোনীর তিমিরাবৃত বুকে কোন মানুষটির মনের মধ্যে কোন চিন্তার ক্রিয়া চলিতেছে? বনলক্ষ্মী এখন তাহার সঙ্কীর্ণ বিছানায় শুইয়া কি ভাবিতেছে? কাহার কথা ভাবিতেছে?—যদি অন্তর্যামী হাইতাম..

অলস ও অসংলগ্ন চিন্তায় বোধ করি ঘন্টাখানেক কাটিয়া গেল। হঠাৎ সচকিত হইয়া উঠিলাম পায়ের শব্দ। দ্রুত অথচ সতর্ক। আমি যে ঝোপে লুকাইয়া ছিলাম তাহার পাশ দিয়া বিজয়ের কুঠির দিকে যাইতেছে। অন্ধকারে কিছুই দেখিতে পাইলাম না।

যেখানে লুকাইয়া আছি সেখান হইতে বিজয়ের সদর দরজা দশ-বারো হাত দূরে। শুনিতে পাইলাম খুট খুট শব্দে দরজায় টোকা পড়িল; তারপর দ্বার খোলার শব্দ পাইলাম। তারপর নিস্তব্ধ।

এই সময় আকাশের অবগুষ্ঠিতা বধু একবার মুচকি হাসিল। আর আধ মিনিট আগে হাসিলে বিজয়ের নৈশ অতিথিকে দেখিতে পাইতাম।

পাঁচ মিনিট—দশ মিনিট। কুঠির আরও কাছে গেলে হয়তো কিছু শুনিতে পাইতাম, কিন্তু সাহসী হইল না। অন্ধকারে হোঁচট কিম্বা আছাড় খাইলে নিজেই ধরা পড়িয়া যাইব।

দ্বার খােলার মৃদু শব্দ! আবার আমার পাশ দিয়া অদৃশ্যচারী চলিয়া যাইতেছে। আকাশ-বধু হাসিল না। কাহাকেও দেখা গেল না, কেবল একটা চাপা কান্নার নিগৃহীত আওয়াজ কানে আসিল। কে?—কান্নার শব্দ হইতে চিনিতে পারিলাম না, কিন্তু যেই হোক সে স্ত্রীলোক!

তারপর আরও এক ঘন্টা হাত পা শক্ত করিয়া বসিয়া রহিলাম। কিন্তু আর কাহারও সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না। আর কতক্ষণ বসিয়া থাকিতে হইবে ভাবিতেছি, কানের কাছে ব্যোমকেশের ফিসফিস্ গলা শুনিলাম—চলে এস। যা দেখবার দেখা হয়েছে।

ফটকের বাহিরে আসিয়া দেখিলাম ছায়ামূর্তির মত বরাট দাঁড়াইয়া আছে। তিনজনে ফিরিয়া চলিলাম।

ব্যোমকেশ বলিল,—কে কি দেখলে বল। —অজিত, তুমি?

আমি যাহা শুনিয়াছিলাম বলিলাম। ব্যোমকেশ নিজের রিপোর্ট দিল,—আমি একজনকে নেপালবাবুর খিড়কি দিয়ে বেরুতে শুনেছি। নেপালবাবু নয়, কারণ পায়ের শব্দ হাল্কা। পনরো-কুড়ি মিনিট পরে তাকে আবার ফিরে আসতে শুনেছি। —ইন্সপেক্টর বিরাট, আপনি?

বরাট বলিল,—আমি দময়ন্তীর বাড়ি থেকে কাউকে বেরুতে শুনিনি। কিন্তু অন্য কিছু দেখেছি!

কী?

বনলক্ষ্মীকে তার ঘর থেকে বেরুতে দেখেছি। আমি ছিলাম দময়ন্তীর বাড়ির পিছনের কোণে; বনলক্ষ্মীর ঘরের আলো দেখতে পাচ্ছিলাম। তারপর আলো নিভে গেল, আমি সেই দিকেই তাকিয়ে রইলাম। একবার একটু বিদ্যুৎ চমকালো। দেখলাম বনলক্ষ্মী নিজের কুঠি থেকে বেরুচ্ছে।

কোন দিকে গেল?

তা জানি না। আর বিদ্যুৎ চমকায়নি।

কিছুক্ষণ নীরবে চলিবার পর ব্যোমকেশ একটা নিশ্বাস ফেলিয়া বলিল,—মুস্কিল মিঞার বৌ মিথ্যা বলেনি। এখন কথা হচ্ছে, বিজয়ের ঘরে যে গিয়েছিল সে কে? মুকুল, না বনলক্ষ্মী? যদি বনলক্ষ্মী বিজয়ের ঘরে গিয়ে থাকে। তবে মুকুল কোথায় গিয়েছিল?

তেইশ

শেষ রাত্রির দিকে কলকাতায় ফিরিয়া পরদিন সকালে ঘুম ভাঙিতে দেরি হইল। শয্যাত্যাগ করিয়া দেখিলাম আকাশ জলভারাক্রান্তু হইয়া আছে, আজও মেঘ কাটে নাই। বসিবার ঘরে গিয়া দেখি তক্তপোশের উপর ব্যোমকেশ ও আর একজন চায়ের পেয়ালা লইয়া বসিয়াছে। আমার আগমনে লোকটি ঘাড় ফিরাইয়া দন্ত বাহির করিল। দেখিলাম-বিকাশ।

আমিও তক্তপোশে গিয়া বসিলাম। বিকাশের মুখখানা বকাটে ধরনের কিন্তু তাহার দাঁত-খিঁচানো হাসিতে একটা আপন-করা ভাব আছে। তাহার বাচনভঙ্গীও অত্যন্ত সিধা ও বস্তুনিষ্ঠ। সে বলিল,—উনিশ নম্বরে গিয়ে জান কয়লা হয়ে গিয়েছে স্যার।

ব্যোমকেশ বলিল,—কী দেখলেন শুনলেন বলুন।

বিকাশ সক্ষোভে বলিল,—কি আর দেখব শুনব স্যার, একেবারে লঝঝড় মাল, নাইনটীন-ফিফটীন মডেল—

ব্যোমকেশ তাড়াতাড়ি বলিল,—হ্যাঁ হ্যাঁ। বুঝেছি। ওখানে কি কি খবর পেলেন। তাই বলুন।

বিকাশ বলিল,—খবর কিসসু নেই। ও বাড়িতে দুটো বস্তাপচা ইস্ত্রীলোক থাকে

‘দুটো।’ বোমকেশের স্বর উত্তেজিত হইয়া উঠিল।

আজ্ঞে। বাড়িতে তিনটে ঘর আছে, কিন্তু ইস্ত্রীলোক থাকে দুটোই।

ঠিক দেখেছেন, দুটোর বেশি নেই?

বিকাশের আত্মসম্মানে আঘাত লাগিল,—দুটোর জায়গায় যদি আড়াইটে বেরোয় স্যার, আমার কান কেটে নেবেন। অমন ভুল বিকাশ দত্ত করবে না।

না না, আপনি ঠিকই দেখেছেন। কিন্তু তৃতীয় ঘরে কি কেউ থাকে না, ঘরটা খোলা পড়ে থাকে?

খোলা পড়ে থাকবে কেন স্যার, বাড়িওয়ালা ও-ঘরটা নিজের দখলে রেখেছে। মাঝে মাঝে আসে, তখন থাকে৷

‘ও—’ ব্যোমকেশ আবার নিস্তেজ হইয়া পড়িল। তারপর বিকাশ আরও কয়েকটা খুচরা খবর দিল, কিন্তু তাহা নিতান্ত অপ্রাসঙ্গিক এবং ছাপার অযোগ্য বলিয়া উহ্য রাখিলাম।

বিকাশ চলিয়া যাইবার পর প্রায় পনরো মিনিট ব্যোমকেশ চুপ করিয়া বসিয়া রহিল, তারপর লাফাইয়া উঠিয়া বলিল,—ব্যস, প্ল্যান ঠিক করে ফেলেছি। অজিত, তুমি নীচের ডাক্তারখানা থেকে কিছু ব্যান্ডেজ, কিছু তুলো আর একশিশি টিঙ্কার আয়োডিন কিনে আনো দেখি।

অবাক হইয়া বলিলাম,—কি হবে ওসব?

দরকার আছে। যাও, আমি ইতিমধ্যে কলোনীতে টেলিফোন করি। ‘হ্যাঁ, গোটা দুই বেশ পুরু খাম মনিহারী দোকান থেকে কিনে এনো।’ বলিয়া সে টেলিফোন তুলিয়া লইল।

আমি জামা পরিতে পরিতে শুনিলাম সে বলিতেছে—হ্যালো...কে, বিজয়বাবু? একবার নেপালবাবুকে ফোনে ডেকে দেবেন? বিশেষ দরকার …

সওদা করিয়া ফিরিয়া দেখিলাম ব্যোমকেশ টেলিফোনে বাক্যালাপ শেষ করিয়াছে, টেবিলে ঝুঁকিয়া বসিয়া দুইটি ফটোগ্রাফ দেখিতেছে।

ফটোগ্রাফ দুইটি সুনয়নার, রমেনবাবু যাহা দিয়াছিলেন। আমাকে দেখিয়া সে বলিল,—এবার মন দিয়ে শোনো।—

দুটি খামে ফটো দুইটি পুরিয়া সযত্নে আঠা জুড়িতে জুড়িতে ব্যোমকেশ বলিল,—আমি কিছুদিন থেকে একটা দুর্দান্ত গুণ্ডাকে ধরবার চেষ্টা করছি। গুণ্ডা কাল রাত্রে বাদুড়বাগানের মোড়ে আমাকে ছুরি মেরে পালিয়েছে। আঘাত গুরুতর নয়, কিন্তু গুণ্ডা আমাকে ছাড়বে না, আবার চেষ্টা করবে। আমি তাকে আগে ধরব, কিম্বা সে আমাকে আগে মারবে, তা বলা যায় না। যদি সে আমাকে মারে তাহলে গোলাপ কলোনীর রহস্যটা রহস্যই থেকে যাবে। তাই আমি এক উপায় বার করেছি। এই দুটি খামে দুটি ফটো রেখে যাচ্ছি। একটি খাম নেপালবাবুকে দেব, অন্যটি ভুজঙ্গধরবাবুকে। আমি যদি দু’চার দিনের মধ্যে গুণ্ডার ছুরিতে মারা যাই তাহলে তাঁরা খাম খুলে দেখবেন আমি কাকে কলোনীর হত্যা সম্পর্কে সন্দেহ করি। আর যদি গুণ্ডাকে ধরতে পারি তখন আমার অপঘাত-মৃত্যুর সম্ভাবনা অনেক কমে যাবে; তখন আমি খাম দুটি ওঁদের কাছ থেকে ফেরত নেব এবং গোলাপ কলোনীর অনুসন্ধান যেমন চালাচ্ছি। তেমনি চালাতে থাকব। বুঝতে পারলে?

বলিলাম,—কিছু কিছু বুঝেছি। কিন্তু এই অভিনয়ের ফল কি হবে?

ব্যোমকেশ বলিল,—ফল কিছুই হবে কি না এখনও জানি না। মা ফলেষু। নেপালবাবু বারোটার আগেই আসছেন। তুমি এই বেলা আমার হাতে ব্যাণ্ডেজটা বেঁধে দাও। আর, তোমাকে কি করতে হবে শোনো।

আমি তাহার বাঁ হাতের প্রগণ্ডে ব্যাণ্ডেজ বাঁধিতে আরম্ভ করিলাম; টিক্কার আয়োডিনে তুলা ভিজাইয়া বেশ মোটা করিয়া তাগার মত পটি বাঁধিলাম; কমিজের আস্তিনে ব্যান্ডেজ ঢাকা দিয়া একফালি ন্যাকড়া দিয়া হাতটা গলা হইতে ঝুলাইয়া দিলাম। এই সঙ্গে ব্যোমকেশ আমার কর্তব্য সম্বন্ধে আমাকে উপদেশ দিল—

বেলা এগারোটার সময় দ্বারের কড়া নড়িল। আমি দ্বারের কাছে গিয়া সশঙ্ককণ্ঠে বলিলাম,—কে? আগে নাম বল তবে দোর খুলব।

ওপার হইতে আওয়াজ আসিল,—আমি নেপাল গুপ্ত।

সস্তপর্ণে দ্বার একটু খুলিলাম; নেপালবাবু প্ৰবেশ করিলে আবার হুড়কা লাগাইয়া দিলাম।

নেপালবাবুর মুখ ভয় ও সংশয়ে বিবৰ্ণ হইয়া গেল, তিনি বলিয়া উঠিলেন,—এ কি! মতলব কি আপনাদের?'

ব্যোমকেশ তক্তপোশের উপর বালিসে পিঠি দিয়া অর্ধশয়ান ছিল। ক্ষীণকণ্ঠে বলিল,—ভয় নেই, নেপালবাবু। এদিকে আসুন, সব বলছি।

নেপালবাবু দ্বিধাজড়িত পদে ব্যোমকেশের পাশে গিয়া দাঁড়াইলেন। ব্যোমকেশ ফ্যাকাসে হাসি হাসিয়া বলিল,—বসুন। টেলিফোনে সব কথা বলিনি, পাছে জানাজানি হয়। আমাকে গুণ্ডারা ছুরি মেরেছে- কাল্পনিক গুণ্ডার নামে অজস্র মিথ্যা কথা বলিয়া শেষে কহিল,—আপনিই কলোনীর মধ্যে একমাত্র লোক, যার বুদ্ধির প্রতি আমার শ্রদ্ধা আছে। যদি আমার ভালমন্দ কিছু হয়, তাই এই খামখানা আপনার কাছে রেখে যাচ্ছি। আমার মৃত্যু-সংবাদ যদি পান, তখন খামখানা খুলে দেখবেন, কার ওপর আমার সন্দেহ বুঝতে পারবেন। তারপর যদি অনুসন্ধান চালান, অপরাধীকে ধরা শক্ত হবে না। আমি পুলিসকে আমার সন্দেহ জানিয়ে যেতে পারতাম, কিন্তু পুলিসের ওপর আমার বিশ্বাস নেই। ওরা সব ভণ্ডুল করে ফেলবে।

শুনিতে শুনিতে নেপালবাবুর সংশয় শঙ্কা কাটিয়া গিয়াছিল, মুখে সদম্ভ প্রফুল্লতা ফুটিয়া উঠিয়াছিল। তিনি খামখানা সযত্নে পকেটে রাখিয়া বলিলেন,—ভাববেন না, যদি আপনি মারা যান, আমি আছি। পুলিসকে দেখিয়ে দেব বৈজ্ঞানিক প্রথায় অনুসন্ধান কাকে বলে।

দেখা গেল ইতিপূর্বে তিনি যে বিজয়কে আসামী বলিয়া সাব্যস্ত করিয়াছিলেন, তাহা আর তাঁহার মনে নাই। বোধহয় বিজয়ের সহিত একটা বোঝাপড়া হইয়া গিয়াছে। ব্যোমকেশ বলিল,—কিন্তু একটা কথা, আমার মৃত্যু-সংবাদ না পাওয়া পর্যন্ত খাম খুলবেন না। গুণ্ডাটাকে যদি জেলে পুরতে পারি, তাহলে আর আমার প্রাণহানির ভয় থাকবে না; তখন কিন্তু খামখানি যেমন আছে তেমনি অবস্থায় আমাকে ফেরত দিতে হবে।

নেপালবাবু একটু দুঃখিতভাবে শর্ত স্বীকার করিয়া লইলেন। তিনি প্ৰস্থান করিলে ব্যোমকেশ উঠিয়া বসিল, বলিল,—অজিত, পুঁটিরামকে বলে দাও এ বেলা কিছু খাব না।

খাবে না কেন?

ক্ষিদে নেই। বলিয়া সে একটু হাসিল।

আমি বেলা একটা নাগাদ আহারাদি শেষ করিয়া আসিলে ব্যোমকেশ বলিল,—এবার তুমি টেলিফোন কর।

আমি কলোনীতে টেলিফোন করিলাম। বিজয় ফোন ধরিল। বলিলাম,—ভুজঙ্গধরবাবুকে একবারটি ডেকে দেবেন?

ভুজঙ্গধরবাবু আসিলে বলিলাম,—ব্যোমকেশ অসুস্থ, আপনার সঙ্গে একবার দেখা করতে চায়। আপনি আসতে পারবেন?

মুহুর্তকাল নীরব থাকিয়া তিনি বলিলেন,—নিশ্চয়। কখন আসব বলুন।

চারটের সময় এলেই চলবে। কিন্তু কাউকে কোনও কথা বলবেন না। গোপনীয় ব্যাপার।

আচ্ছা।

চারটের কিছু আগেই ভুজঙ্গধরবাবু আসিলেন। দ্বারের সম্মুখে আগের মতই অভিনয় হইল। ভুজঙ্গধরবাবু চমকিত হইলেন, তারপর ব্যোমকেশের আহ্বানে তাহার পাশে গিয়া বসিলেন।

সমস্ত দিনের অনাহারে ব্যোমকেশের মুখ শুষ্ক। সে ভুজঙ্গধরবাবুকে গুণ্ডা কাহিনী শুনাইল। ভুজঙ্গধরবাবু তাহার নাড়ি দেখিলেন, বলিলেন,—একটু দুর্বল হয়েছেন। ও কিছু নয়।

ব্যোমকেশ কেন সমস্ত দিন উপবাস করিয়া আছে বুঝিলাম। ডাক্তারের চোখে ধরা পড়িতে চায় না।

ভুজঙ্গধরবাবু বলিলেন,—‘যাক, আসল কথাটা কি বলুন।’ আজ তাঁহার আচার আচরণে চপলতা নাই; একটু গম্ভীর।

ব্যোমকেশ আসল কথা বলিল। ভুজঙ্গধর সমস্ত শুনিয়া এবং খামখানি একটু সন্দিগ্ধভাবে পকেটে রাখিয়া বলিলেন,—এ সব দিকে আমার মাথা খালে না। যা হোক, যদি আপনার ভালমন্দ কিছু ঘটে-আশা করি সে রকম কিছু ঘটবে না।—তখন যথাসাধ্য চেষ্টা করব। আপনি বোধহয় এখনও নিঃসন্দেহ হতে পারেননি, তাই ঝেড়ে কাশছেন না। কেমন?

ব্যোমকেশ বলিল,—হ্যাঁ। নিঃসন্দেহ হতে পারলে আপনাকে কষ্ট দিতাম না, সটান পুলিসকে বলতাম-ঐ তোমার আসামী।

আরও কিছুক্ষণ কথাবার্তার পর চা ও সিগারেট সেবন করিয়া ভুজঙ্গধরবাবু বিদায় লইলেন।

ব্যোমকেশ এবার গা ঝাড়া দিয়া উঠিয়া বসিল, বলিল,—ম্যায় ভুখা হুঁ। —পুঁটিরাম?

চব্বিশ

ভুজঙ্গধরবাবু চলিয়া যাইবার ঘণ্টাখানেক পরে বৃষ্টি আরম্ভ হইল। প্রথমে রিমঝিম তারপর ঝমোঝম। দীর্ঘ আয়োজনের পর বেশ জুত করিয়া বৃষ্টি আরম্ভ হইয়াছে, শীঘ্ৰ থামিবে বলিয়া বোধ হয় না।

ব্যোমকেশের ভাবভঙ্গী হইতে অনুমান হইল, তাহার উদ্যোগ আয়ােজনও চরম পরিণতির মুখোমুখি আসিয়া দাঁড়াইয়াছে। সে ছটফট করিয়া বেড়াইতেছে, ক্রমাগত সিগারেট টানিতেছে। এ সব লক্ষণ আমি চিনি। জাল গুটিইয়া আসিতেছে।

মেঘের অন্তরপথে দিন শেষ হইয়া রাত্রি আসি। আটটার সময় ব্যোমকেশ প্রমোদ বরাটকে ফোন করিল; অনেকক্ষণ ধরিয়া ফোনের মধ্যে গুজগুজ করিল। তাহার সংলাপের ছিন্নাংশ হইতে এইটুকু শুধু বুঝিলাম যে, গোলাপ কলোনীর উপর কড়া পাহারা রাখা দরকার, কেহ না পালায়।

রাত্রে ঘুমের মধ্যেও অনুভব করিলাম, ব্যোমকেশ জাগিয়া আছে এবং বাড়িময় পায়চারি করিয়া বেড়াইতেছে।

সমস্ত রাত্রি বৃষ্টি হইল। সকালে দেখিলাম, মেঘগুলো ফ্যাকাসে হইয়া গিয়াছে; বৃষ্টির তেজ কমিয়াছে কিন্তু থামে নাই। এগারোটার সময় বৃষ্টি বন্ধ হইয়া পাঙাস সূর্যালোক দেখা দিল।

ব্যোমকেশ ছাতা লইয়া গুটি গুটি বাহির হইতেছে দেখিয়া বলিলাম,—এ কি! চললে কোথায়?

উত্তর না দিয়া সে বাহির হইয়া গেল। ফিরিল বিকাল সাড়ে তিনটার সময়। জিজ্ঞাসা করিলাম,—আজও কি একাদশী?

সে বলিল,-“উহুঁ, কাফে সাজাহানে খিচুড়ি আর ইলিশ মাছের ডিম দিয়ে দিব্যি চৰ্ব-চোষ্য হয়েছে।

যদি নেপাল গুপ্ত কিম্বা ভূজঙ্গ ডাক্তার দেখে ফেলত।

সে সম্ভাবনা কম। তাঁরা কেউ কলোনী থেকে বেরুবার চেষ্টা করলে গ্রেপ্তার হতেন।

যাক, ওদিকে তাহলে পাকা বন্দোবস্ত করেছ। এদিকের খবর কি, গিছলে কোথায়?

প্রথমত কপোরেশন অফিস। ১৯ নং মির্জা লেন বাড়িটির মালিক কে জািনবার কৌতুহল হয়েছিল।

মালিক কে—ভুজঙ্গধরবাবু?

ব্যোমকেশ মাথা নাড়িল,—না, একজন স্ত্রীলোক।

আর কোথায় গিছলে?

রমেনবাবুর কাছে। সুনয়নার আরও দুটো ফটো যোগাড় করেছি।

আর কি করলে?

আর, একবার চীনেপটিতে গিয়েছিলাম দাঁতের সন্ধানে।

দাঁতের সন্ধানে?

হ্যাঁ। চীনেরা খুব ভাল দাঁতের ডাক্তার হয় জানো? বলিয়া উত্তরের অপেক্ষা না করিয়া সে স্নান-ঘরের দিকে চলিয়া গেল! আমি বসিয়া ভাবিতে লাগিলাম—নাটকের পঞ্চম অঙ্কে যবনিকা পড়িতে আর দেরি নাই, অথচ নাটকের নায়ক-নায়িকাকে চিনিতে পারিতেছি না কেন?

কাগজ রাখিয়া বলিল,—আটটা বাজল। এস, এবার আমাকে কাটা সৈনিক সাজিয়ে দাও। কলোনীতে যেতে হবে।

একলা যাবে?

না, তুমিও যাবে। গুণ্ডা ধরা পড়েছে। কিন্তু তবু সাবধানের মার নেই। একজন সঙ্গী থাকা দরকার।

গুণ্ডা কবে ধরা পড়ল?

কাল রাত্তিরে।

আজি কলোনীতে যাওয়ার উদ্দেশ্য কি?

ছবির খাম ফেরত নিতে হবে। আজ এস্পার কি ওস্পার।

তাহার ব্যান্ডেজ বাঁধিয়া দিলাম। বাহির হইবার পূর্বে সে প্রমোদ বরাটকে ফোন করিল। আমি একটা মোটা লাঠি হাতে লইলাম।

মোহনপুরের স্টেশনে বরাট উপস্থিত ছিল। ব্যোমকেশের রূপসজ্জা দেখিয়া মুচকি মুচকি হাসিতে লাগিল।

ব্যোমকেশ বলিল,—হাসছেন কি, ভেক না হলে ভিক পাওয়া যায় না। আমার গুন্ডার নাম জানেন তো? সজ্জনদাস মিরজাপুরী। যদি দরকার হয়, মনে রাখবেন। আজ কাগজে ঐ নামটা পেয়েছি, কাল রাত্রে বেলগাছিয়া পুলিস তাকে ধরেছে।

বাঃ! জুতসই একটা গুণ্ডাও পেয়ে গেছেন।

অমন একটা-আধটা গুণ্ডার খবর প্রায় রোজই কাগজে থাকে!

কলোনীতে উপস্থিত হইলাম। ফটকের কাছে পুলিসের থানা বসিয়াছে, তাছাড়া তারের বেড়া ঘিরিয়া কয়েকজন পাহারাওয়ালা রোঁদ দিতেছে। বেশ একটা থমথমে ভাব।

ফটকের বাহিরে গাড়ি রাখিয়া আমরা প্ৰবেশ করিলাম। প্রথমেই চোখে পড়িল, নিশানাথবাবুর বারান্দায় বিজয় ও ভুজঙ্গধরবাবু বসিয়া আছেন। ভুজঙ্গধরবাবু খবরের কাগজ পড়িতেছিলেন, আমাদের দেখিয়া কাগজ মুড়িয়া রাখিলেন। বিজয় ভ্রুকুটি করিয়া চাহিল। আমরা নিকটস্থ হইলে সে রুক্ষস্বরে বলিয়া উঠিল,—এর মানে কি, ব্যোমকেশবাবু? অপরাধীকে ধরবার ক্ষমতা নেই, মাঝ থেকে কলোনীর ওপর চৌকি বসিয়ে দিয়েছেন। পরশু থেকে আমরা কলোনীর সীমানার মধ্যে বন্দী হয়ে আছি।

ব্যোমকেশ তাহার রুক্ষতা গায়ে মাখিল না, হাসিমুখে বলিল,—বাঘে ছুলে আঠারো ঘা। যেখানে খুন হয়েছে। সেখানে একটু-আধটু অসুবিধে হবে বৈকি। দেখুন না। আমার অবস্থা।

ভুজঙ্গধরবাবু বলিলেন,—আজ তো আপনি চাঙ্গা হয়ে উঠেছেন। গুণ্ডা কি ধরা পড়েছে?

হ্যাঁ, সজ্জনদাস ধরা পড়েছে।

সজ্জনদাস! নামটা যেন কোথায় দেখেছি। —ও-আজকের কাগজে আছে। তা-এই সজ্জনদাসই আপনার দুর্জনদাস?

হ্যাঁ, পুলিস কাল রাত্রে তাকে ধরেছে! তাই অনেকটা নিৰ্ভয়ে বেরুতে পেরেছি।

তাহলে—? ভুজঙ্গধরবাবু সপ্রশ্ন দৃষ্টিপাত করিলেন।

ব্যোমকেশ বলিল,—হ্যাঁ। আসুন, আপনার সঙ্গে কাজ আছে।

ভুজঙ্গধরবাবুকে লইয়া আমরা তাঁহার কুঠির দিকে চলিলাম।

ব্যোমকেশ বলিল,—খামখানা ফেরত নিতে এসেছি।

ভুজঙ্গধরবাবু বলিলেন,—বাঁচালেন মশাই, ঘাড় থেকে বোঝা নামল। ভয় হয়েছিল শেষ পর্যন্ত বুঝি আমাকেই গোয়েন্দাগিরি করতে হবে। —একটু দাঁড়ান।

নিজের কুঠিতে প্ৰবেশ করিয়া তিনি মিনিটখানেক পরে খাম হাতে বাহির হইয়া আসিলেন। ব্যোমকেশ খাম লইয়া বলিল,—খোলেননি তো?

না, খুলিনি। লোভ যে একেবারে হয়নি তা বলতে পারি না। কিন্তু সামলে নিলাম। হাজার হোক, কথা দিয়েছি। —আচ্ছা ব্যোমকেশবাবু, সত্যি কি কিছু জানতে পেরেছেন?

এইটুকু জানতে পেরেছি যে স্ত্রীলোকঘটিত ব্যাপার।

তাই নাকি? কৌতুহলী চক্ষে ব্যোমকেশকে নিরীক্ষণ করিতে করিতে তিনি মস্তকের পশ্চাৎভাগ চুলকাইতে লাগিলেন।

‘ধন্যবাদ। —আবার বোধহয় ওবেলা আসব।’ বলিয়া ব্যোমকেশ নেপালবাবুর কুঠির দিকে পা বাড়াইল।

ওদিকে কোথায় যাচ্ছেন? ভুজঙ্গধরবাবু প্রশ্ন করিলেন।

ব্যোমকেশ মুখ টিপিয়া হাসিয়া বলিল,—নেপালবাবুর সঙ্গে কিছু গোপনীয় কথা আছে।

ভুজঙ্গধরবাবুর চোখে বিদ্যুৎ খেলিয়া গেল। কিন্তু তিনি কিছু বলিলেন না, মুখে অর্ধ হাস্য লইয়া মস্তকের পশ্চাৎভাগে হাত বুলাইতে লাগিলেন।

নেপালবাবু নিজের ঘরে বসিয়া দাবার ধাঁধা ভাঙিতেছিলেন, ব্যোমকেশকে দেখিয়া এমন কঠোর দৃষ্টিতে চাহিয়া রহিলেন যে মনে হইল, জীবন্ত ব্যোমকেশকে চোখের সামনে দেখিয়া তিনি মোটেই প্ৰসন্ন হন নাই। তারপর যখন সে খামটি ফেরত চাহিল তখন তিনি নিঃশব্দে খাম আনিয়া ব্যোমকেশের সামনে ফেলিয়া দিয়া আবার দাবার ধাঁধায় মন দিলেন।

আমরা সুড়সুড়ি করিয়া বাহির হইয়া আসিলাম। নেপালবাবু আগে হইতেই পুলিসের উপর খড়্গহস্ত ছিলেন, তাহার উপর ব্যোমকেশের ব্যবহারে যে মর্মান্তিক চুটিয়াছে তাহাতে সন্দেহ রইল না।

পাঁচিশ

কলোনী হইতে আমরা সিধা থানায় ফিরিলাম। বরাটের ঘরে বসিয়া ব্যোমকেশ খাম দুটি সযত্নে পকেট হইতে বাহির করিল। বলিল,—এইবার প্রমাণ।

খাম দুটির উপরে কিছু লেখা ছিল না, দেখিতেও সম্পূর্ণ একপ্রকার। তবু কোনও দুর্লক্ষ্য চিহ্ন দেখিয়া সে একটি খাম বাছিয়া লইল; খামের আঠা লাগানো স্থানটা ভাল করিয়া দেখিয়া বলিল,—খোলা হয়নি বলেই মনে হচ্ছে।

অতঃপর খাম কাটিয়া সে ভিতর হইতে অতি সাবধানে ফটো বাহির করিল; ঝকঝকে পালিশ করা কাগজের উপর শ্যামা-ঝি’র ভূমিকায় সুনয়নার ছবি। বরাট এবং আমি ঝুঁকিয়া পড়িয়া ছবিটি পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে দেখিলাম, তারপর বিরাট নিশ্বাস ছাড়িয়া বলিল,—কৈ, কিছু তো দেখছি না।

ছবিটি খামে পুরিয়া ব্যোমকেশ সরাইয়া রাখিল। দ্বিতীয় খামটি লইয়া আগের মতই সমীক্ষার পর খাম খুলিতে খুলিতে বলিল,—এটিও মনে হচ্ছে গোয়ালিনী মাকৰ্ণ দুগ্ধের মত হস্তদ্বারা অস্পৃষ্ট।

খামের ভিতর হইতে ছবি বাহির করিয়া সে আলগোছে ছবির দুই পাশ ধরিয়া তুলিয়া ধরিল। তারপর লাফাইয়া উঠিয়া বলিল,—আছে-আছে? বাঘ ফাঁদে পা দিয়েছে।

বরাট ছবিখানা ব্যোমকেশের হাত হইতে প্রায় কাড়িয়া লইয়া একাগ্রচক্ষে রিরীক্ষণ করিল, তারপর দ্বিধাভরে বলিল,—আছে। কিন্তু—

ব্যোমকেশের মুখে চোখে উত্তেজনা ফাটিয়া পড়িতেছিল, সে একটু শান্ত হইবার চেষ্টা করিয়া বলিল,—আপনার ‘কিন্তু’র জবাব আমি দিতে পারব না, কিন্তু আমার বিশ্বাস বাঘ এবং বাঘিনীকে এক জায়গাতেই পাওয়া যাবে। —চলুন আর দেরি নয়, খাতাপত্র নিয়ে নিন। আপনাদের বিশেষজ্ঞদের অফিস বোধহয় কলকাতায়?

হ্যাঁ।চলুন।

বিশেষজ্ঞ মহাশয়ের মন্তব্য লইয়া আমরা যখন বাহির হইলাম তখন বেলা দুটা বাজিয়া গিয়াছে। ক্ষুধাতৃষ্ণার কথা কাহারও মনে ছিল না; ব্যোমকেশ বরাটের পিঠ চাপড়াইয়া বলিল,—আসুন, আমাদের বাসাতেই শাক-ভাত খাবেন।

বরাট বলিল,—কিন্তু-ও কাজটা যে এখনও বাকী—?

ব্যোমকেশ বলিল,—ও কাজটা পরে হবে। আগে খাওয়া, তারপর খানাতল্লাস—তারপর আবার গোলাপ কলোনী। গোলাপ কলোনীর বিয়োগাদ্য নাটকে আজই যবনিকা পতন হবে।

গোলাপ কলোনীতে নিশানাথবাবুর বহিঃকক্ষে সভা বসিয়াছিল। ঘরের মধ্যে ছিলাম আমরা তিনজন এবং দময়ন্তী দেবী ছাড়া কলোনীর সকলে। রসিক দে’কেও হাজত হইতে আনা হইয়াছিল। দময়ন্তী দেবীর প্রবল মাথা ধরিয়াছিল বলিয়া তাঁহাকে সভার অধিবেশন হইতে নিষ্কৃতি দেওয়া হইয়াছিল। দুইজন সশস্ত্ৰ পুলিস কর্মচারী দ্বারের কাছে পাহারা দিতেছিল।

রাত্ৰি প্ৰায় আটটা। মাথার উপর উজ্জ্বল আলো জ্বলিতেছিল। সামনের দেয়ালে নিশানাথবাবুর একটি বিশদীকৃত ফটোগ্রাফ টাঙানো হইয়াছিল। নিশানাথের ঠোঁটের কোণে একটু নৈর্ব্যক্তিক হাসি, তিনি যেন হাকিমের উচ্চ আসনে বসিয়া নিরাসক্তভাবে বিচার-সভার কার্যবিধি পরিচালনা করিতেছেন।

ব্যোমকেশের মুখে আতপ্ত চাপা উত্তেজনা। সে একে একে সকলের মুখের উপর চোখ বুলাইয়া ধীরকষ্ঠে বলিল,—আপনারা শুনে সুখী হবেন নিশানাথবাবু এবং পানুগোপালকে কারা হত্যা করেছিল তা আমরা জানতে পেরেছি।

কেহ কথা কহিল না। নেপালবাবু ফস করিয়া দেশলাই জ্বালাইয়া নির্বাপিত চুরুট ধরাইলেন। ব্যোমকেশ বলিল,—শুধু যে জানতে পেরেছি তা নয়, অকাট্য প্রমাণও পেয়েছি। অপরাধীরা এই ঘরেই আছে। অন্নদাতা নিশানাথবাবুকে যারা বীভৎসভাবে হত্যা করেছে, অসহায় নিরীহ পানুগোপালকে যারা বিষ দিয়ে নিষ্ঠুরভাবে মেরেছে, আইন তাদের ক্ষমা করবে না। তাদের প্ৰাণদণ্ড নিশ্চিত। তাই আমি আহ্বান করছি, মনুষ্যত্বের কণামাত্র যদি অপরাধীদের প্রাণে থাকে তারা অপরাধ স্বীকার করুক।

এবারও সকলে নীরব। ভুজঙ্গধরবাবুর মুখের মধ্যে যেন সুপারি-লবঙ্গের মত একটা কিছু ছিল, তিনি সেটা এ গাল হইতে ও গালে লইলেন। বিজয় একদৃষ্টি ব্যোমকেশের পানে চাহিয়া রহিল।

মুকুলকে দেখিয়া মনে হয়, সে যেন পাথরের মূর্তিতে পরিণত হইয়াছে। আজ তাহার মুখে রুজ পাউডার নাই; রক্তহীন সুন্দর মুখে অজানিতের বিভীষিকা।

ঘরের অন্য কোণে বনলক্ষ্মী চুপ করিয়া বসিয়া আছে, কিন্তু তাহার মুখে প্রবল উদ্বেগের ব্যঞ্জনা নাই। সে কোলের উপর হাত রাখিয়া আঙুলগুলা লইয়া খেলা করিতেছে, যেন অদৃশ্য কাঁটা দিয়া অদৃশ্য পশমের জামা বুনিতেছে।

আধ মিনিট পরে ব্যোমকেশ বলিল,—বেশ, তাহলে আমিই বলছি। —নেপালবাবু, আপনি নিশানাথবাবুর সম্বন্ধে একটা গুপ্তকথা জানেন। আমি যখন জানতে চেয়েছিলাম। তখন আপনি অস্বীকার করেছিলেন কেন?

নেপালবাবুর চোখের মধ্যে চকিত আশঙ্কার ছায়া পড়িল, তিনি স্থলিতস্বরে বলিলেন,—আমি-আমি—

ব্যোমকেশ বলিল,—‘যাক, কেন অস্বীকার করেছিলেন তার কৈফিয়ৎ দরকার নেই। কিন্তু কার কাছে এই গুপ্তকথা শুনেছিলেন? কে আপনাকে বলেছিল?—আপনার মেয়ে মুকুল?’ ব্যোমকেশের তর্জনী মুকুলের দিকে নির্দিষ্ট হইল।

নেপালবাবু ঘোর শব্দ করিয়া গলা পরিষ্কার করিলেন। বলিলেন,—হ্যাঁ-মানে—মুকুল জানতে পেরেছিল—

ব্যোমকেশ বলিল,—কার কাছে জানতে পেরেছিল?—আপনার কাছে? ব্যোমকেশের তর্জনী দিগদর্শন যন্ত্রের কাঁটার মত বিজয়ের দিকে ফিরিল।

বিজয়ের মুখ সাদা হইয়া গেল, সে মুখ তুলিতে পারিল না। অধোমুখে বলিল,—হ্যাঁ—আমি বলেছিলাম। কিন্তু—

ব্যোমকেশ তীক্ষ্ণ প্রশ্ন করিল,—আর কাউকে বলেছিলেন?

বিজয়ের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম ফুটিয়া উঠিল। সে ব্যাকুল চোখ তুলিয়া চারিদিকে চাহিল, তারপর আবার অধোবাদন হইল। উত্তর দিল না।

ব্যোমকেশ বলিল,—যাক, আর একটা কথা বলুন। আপনি দোকান থেকে যে টাকা সরিয়েছিলেন সে টাকা কার কাছে রেখেছেন?

বিজয় হেঁট মুখে নিরুত্তর রহিল।

‘বলবেন না?’ ব্যোমকেশ ঘরের অন্যদিকে যেখানে রসিক দে বৃষকাষ্ঠের মত শক্ত হইয়া বসিয়াছিল। সেইদিকে ফিরিল,—রসিকবাবু, আপনিও দোকানের টাকা চুরি করে একজনের কাছে রেখেছিলেন, তার নাম বলবেন না?

রসিকের কণ্ঠের হাড় একবার লাফাইয়া উঠিল, কিন্তু সে নীরব রহিল; আঙুলকাটা হাতটা একবার চোখের উপর বুলাইল।

ব্যোমকেশের অধরে শুষ্ক ব্যঙ্গ ফুটিয়া উঠিল। সে বলিল,—ধন্য আপনারা! ধন্য আপনাদের একনিষ্ঠা! কিন্তু একটা কথা বোধহয় আপনারা জানেন না। বিজয়বাবু, আপনি যার কাছে টাকা জমা রাখছেন, রসিকবাবুও ঠিক তার কাছেই টাকা গচ্ছিত রাখছিলেন। এবং দু’জনেই আশা করেছিলেন যে, একদিন শুভ মুহুর্তে বামাল সমেত গোলাপ কলোনী থেকে অদৃশ্য হয়ে কোথাও এক নিভৃত স্থানে রোমান্সের নন্দন-কানন রচনা করবেন। বলিহারি!

রসিক এবং বিজয় দু’জনেই একদৃষ্টি একজনের দিকে তাকাইয়া একসঙ্গে উঠিয়া দাঁড়াইল। ব্যোমকেশ হাত তুলিয়া বলিল,—বসুন, বসুন, আমি যা জানতে চাই তা জানতে পেরেছি, আর আপনাদের কিছু বলবার দরকার নেই। —ইন্সপেক্টর বিরাট, আপনাকে একটা কাজ করতে হবে। আপনি বনলক্ষ্মী দেবীর বাঁ হাতের আঙুলগুলো একবার পরীক্ষা করে দেখুন।

বরাট উঠিয়া গিয়া বনলক্ষ্মীর সম্মুখে দাঁড়াইল। বনলক্ষ্মী ক্ষণেক ফ্যাল ফ্যাল করিয়া তাকাইয়া থাকিয়া বাঁ হাতখানা সম্মুখে বাড়াইয়া ধরিল।

ভুজঙ্গধরবাবু এইবার কথা কহিলেন। একটু জড়াইয়া জড়াইয়া বলিলেন,—কী ধরনের অভিনয় হচ্ছে ঠিক বুঝতে পারছি না-নাটক, না প্ৰহসন, না কমিক অপেরা!

ব্যোমকেশ উত্তর দিবার পূর্বেই বরাট বলিল,—এঁর তর্জনীর আগায় কড়া পড়েছে, মনে হয় ইনি তারের যন্ত্র বাজাতে জানেন।

বরাট স্বস্থানে ফিরিয়া আসিয়া বসিল। ভুজঙ্গধরবাবু অস্ফুটম্বরে বলিলেন,—তাহলে কমিক অপেরা!

ব্যোমকেশ ভুজঙ্গধরবাবুকে হিম-কঠিন দৃষ্টি দ্বারা বিদ্ধ করিয়া বলিল,—এটা কমিক অপেরা নয় তা আপনি ভাল করেই জানেন; আপনি নিপুণ যন্ত্রী, সুদক্ষ অভিনেতা। —কিন্তু আপাতত আর্ট ছেড়ে বৈষয়িক প্রসঙ্গে আসা যাক। ভুজঙ্গধরবাবু, ১৯ নম্বর মিজ লেনের বাড়িটা বোধহয় আপনার, কারণ আপনি ভাড়া আদায় করেন। কেমন?

ভুজঙ্গাধর স্থির দৃষ্টিতে চাহিয়া রহিলেন। তাঁহার গলার একটা শির দপদপ করিতে লাগিল। ব্যোমকেশ পুনশ্চ বলিল,—কিন্তু কপোরেশের খাতায় দেখলাম বাড়িটা শ্ৰীমতী নৃত্যকালী দাসের নামে রয়েছে। নৃত্যকালী দাস কি আপনার স্ত্রীর নাম?

ভুজঙ্গধরবাবুর মুখের উপর দিয়া যেন একটা রোমাঞ্চকর নাটকের অভিনয় হইয়া গেল; মানুষের অন্তরে যতপ্রকার আবেগ উৎপন্ন হইতে পারে, সবগুলি দ্রুত পরম্পরায় তাঁহার মুখে প্রতিফলিত হইল। তারপর তিনি আত্মস্থ হইলেন। সহজ স্বরে বলিলেন,—হ্যাঁ, নৃত্যকালী আমার স্ত্রীর নাম, ১৯ নম্বর বাড়িটা আমার স্ত্রীর নামে।

কিন্তু-কিয়েকদিন আগে আপনি বলেছিলেন, বিলেতে থাকা কালে আপনি এক ইংরেজ মহিলাকে বিয়ে করেছিলেন।

হ্যাঁ। তাঁরই স্বদেশী নাম নৃত্যকালী-বিলিতি নাম ছিল নিটা।

ও। —নিটা-নৃত্যকালী-সুনয়না, আপনার স্ত্রীর দেখছি অনেক নাম। তা-তিনি এখন বিলতে আছেন?

হ্যাঁ। —যদি না জার্মান বোমায় মারা গিয়ে থাকেন।

ব্যোমকেশ দুঃখিতভাবে মাথা নাড়িয়া বলিল,—তিনি মারা যাননি। তিনি বিলিতি মেয়ে নন, খাঁটি দেশী মেয়ে; যদিও আপনাদের বিয়ে বিলেতেই হয়েছিল। আপনার স্ত্রী এই দেশেই আছেন, এমনকি এই ঘরেই আছেন।

ভারি আশ্চর্য কথা!

ভুজঙ্গধরবাবু, আর অভিনয় করে লাভ কি? আপনারা দু’জনেই উঁচুদরের আর্টিস্ট, আপনাদের অভিনয়ে এতটুকু খুঁত নেই। কিন্তু অভিনয় যতই উচ্চাঙ্গের হোক, শাক দিয়ে মাছ ঢাকা যায় না। অসতর্ক মুহুর্তে আপনি ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেছেন।

ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেছি। বুঝলাম না।

আপনি বুদ্ধিমান, কিন্তু ভয় পেয়ে একটু নিবুদ্ধিতা করে ফেলেছেন। খামটা আপনার খোলা উচিত হয়নি। খামের মধ্যে যে ছবিটা ছিল, সেটা আপনি নিজে দেখেছেন, স্ত্রীকেও দেখিয়েছেন, ছবির ওপর আপনাদের আঙুলের ছাপ পাওয়া গেছে। নৃত্যকালী ওরফে সুনয়না ওরফে বনলক্ষ্মী যে আপনার সহধর্মিণী এবং সহকর্মিণী তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।

ভুজঙ্গাধর চকিত বিস্ফারিত চক্ষে বনলক্ষ্মীর পানে চাহিলেন, বনলক্ষ্মীও বিস্ময়ে তাঁহার দৃষ্টি ফিরাইয়া দিল। ভুজঙ্গধর মৃদুকণ্ঠে হাসিয়া উঠিলেন।

ব্যোমকেশ বলিল,—আপনার হাসির অর্থ সুনয়নার সঙ্গে বনলক্ষ্মীর চেহারার একটুও মিল নেই, এই তো? কিন্তু যে-কথাটা সকলে ভুলে গেছে। আমি তা ভুলিনি, ডাক্তার দাস। আপনি বিলেতে গিয়ে প্ল্যাস্টিক সাজারি শিখেছিলেন। এবং বনলক্ষ্মীর মুখের ওপর শিল্পীর হাতের যে অস্ত্রোপচার হয়েছে একটু ভাল করে পরীক্ষা করলেই তা ধরা পড়বে। এবং তাঁর সব দাঁতগুলিও যে নিজস্ব নয়, তাও বেশি পরীক্ষার অপেক্ষা রাখে না।

বনলক্ষ্মীর মুখ-ভাবের কোনও পরিবর্তন হইল না, বিস্ময়বিমূঢ় ফ্যালফেলে মুখ লইয়া সে এদিক ওদিক চাহিতে লাগিল। ভুজঙ্গধর কয়েক মুহূর্ত নতনেত্ৰে চাহিয়া যখন চোখ তুলিলেন, তখন মনে হইল অপরিসীম ক্লান্তিতে তাঁহার মন ভরিয়া গিয়াছে। তবু তিনি শান্ত স্বরেই বলিলেন,—যদি ধরে নেওয়া যায় যে বনলক্ষ্মী আমার স্ত্রী, তাতে কী প্ৰমাণ হয়? আমি নিশানাথবাবুকে খুন করেছি। প্রমাণ হয় কি? যে-সময় নিশানাথবাবুর মৃত্যু হয়, সে-সময় আমি নিজের বারান্দায় বসে সেতার বাজাচ্ছিলাম। তার সাক্ষী আছে।

ব্যোমকেশ বলিল,—আপনি যে অ্যালিবাই তৈরি করেছিলেন, তা সত্যিই অদ্ভুত, কিন্তু ধোপে টিকলো না। সে রাত্রে রান্নাঘর থেকে ফিরে এসে আপনি মিনিট পাঁচেক সেতার বাজিয়েছিলেন বটে, কিন্তু বাকী সময়টা বাজিয়েছিলেন। আপনার স্ত্রী। বনলক্ষ্মী দেবী অস্বীকার করলেও তিনি সেতার বাজাতে জানেন, তাঁর আঙুলে কড়া আছে।

এটা কি প্ৰমাণ? না জোড়াতাড়ি দেওয়া একটা থিওরি!

বেশ, এটা থিওরি। আপনি নিশানাথবাবুকে খুন করেছেন এটা যদি আদালতে প্রমাণ নাও হয়, তবু আপনাদের নিষ্কৃতি নেই ডাক্তার। আপনার ১৯ নম্বর মিজ লেনের বাড়ি আজ বিকেলে পুলিস খানাতল্লাস করেছে; আপনার বন্ধ ঘরটিতে কি কি আছে আমরা জানতে পেরেছি। আছে একটি অপারেটিং টেবিল এবং একটি স্টিলের আলমারি। আলমারিও আমরা খুলে দেখেছি। তার মধ্যে পাওয়া গেছে।-অপারেশনের অস্ত্রশস্ত্ৰ, আপনাদের বিয়ের সাটিফিকেট, আন্দাজ বিশ হাজার টাকার নোট, তামাক থেকে নিকোটিন চোলাই করবার যন্ত্রপাতি, আর—

আর—

মনে করতে পারছেন না? আলমারির চোরা-কুঠুরির মধ্যে যে হীরের নেকলেসটি রেখেছিলেন তার কথা ভুলে গেছেন? মুরারি দত্তর মৃত্যুর সময় ওই নেকলেসটা দোকান থেকে লোপাট হয়ে যায়। —নিশানাথ এবং পানুকে খুন করার অপরাধে যদি বা নিষ্কৃতি পান, মুরারি দত্তকে বিষ খাওয়াবার দায় থেকে উদ্ধার পাবেন কি করে?

ভুজঙ্গধরবাবু উঠিয়া দাঁড়াইলেন। বরাট রিভলবার বাহির করিল। কিন্তু রিভলবার দরকার হইল না। ভুজঙ্গাধর বনলক্ষ্মীর কাছে গিয়া দাঁড়াইলেন। তারপর যে অভিনয় হইল। তাহা বাংলা দেশের মঞ্চাভিনয় নয়, হলিউডের সিনেমা। বনলক্ষ্মী উঠিয়া ভুজঙ্গাধরের কণ্ঠালগ্ন হইল। ভুজঙ্গাধর তাহাকে বিপুল আবেগে জড়াইয়া লইয়া তাহার উন্মুক্ত অধরে দীর্ঘ চুম্বন করিলেন। তারপর তাহার মুখখানি দুই হাতের মধ্যে লইয়া স্নেহক্ষরিত স্বরে বলিলেন,—চল, এবার যাওয়া যাক।

মৃত্যু আসিল অকস্মাৎ বজ্ৰপাতের মত। দুজনের মুখের মধ্যে কাচ চিবানোর মত একটা শব্দ হইল; দুজনে একসঙ্গে পড়িয়া গেল। যেখানে দেয়ালের গায়ে নিশানাথের ছবি বুলিতেছিল, তাহারই পদমূলে ভু-লুষ্ঠিত হইল।

আমরা ছুটিয়া গিয়া যখন তাহাদের পাশে উপস্থিত হইলাম, তখন তাঁহাদের দেহে প্ৰাণ নাই, কেবল মুখের কাছে একটু মৃদু বাদাম-তেলের গন্ধ লাগিয়া আছে।

বিজয় দাঁড়াইয়া দুঃস্বপ্নভরা চোখে চাহিয়া ছিল। তাহার চোয়ালের হাড় রোমন্থনের ভঙ্গীতে ধীরে ধীরে নড়িতেছিল। মুকুল তাহার পাশে আসিয়া দাঁড়াইল, চাপা গলায় বলিল,—এস—চলে এস এখান থেকে—

বিজয় দাঁড়াইয়া রহিল, বোধহয় শুনিতে পাইল না। মুকুল তখন তাহার হাত ধরিয়া টানিয়া ভিতরে লইয়া গেল।

ছব্বিশ

পরদিন সকালবেলা হ্যারিসন রোডের বাসায় বসিয়া ব্যোমকেশ গভীর মনঃসংযোগে হিসাব কষিতেছিল। হিসাব শেষ হইলে সে একটি দীর্ঘশ্বাস ছাড়িয়া বলিল,—জমা ষাট টাকা, খরচ উনষাট টাকা সাড়ে ছয় আনা। নিশানাথবাবু খরচ বাবদ যে ষাট টাকা দিয়েছিলেন, তা থেকে সাড়ে নয় আনা বেঁচেছে। —যথেষ্ট, কি বল?

আমি নীরবে ধূমপান করিতে লাগিলাম। ব্যোমকেশ বলিল,—সত্যান্বেষণের ব্যবসা যে রকম লাভের ব্যবসা হয়ে দাঁড়াচ্ছে তাতে শেষ পর্যন্ত আমাকেও গােলাপ কলােনীতে ঢুকে পড়তে হবে দেখছি।

বলিলাম,—ছাগল চরানোর প্রস্তাবটা ভুলো না।

সে বলিল,—খুব মনে করিয়ে দিয়েছ। ছাগলের ব্যবসায় পয়সা আছে। একটা ছাগলের ফার্ম খোলা যাক, নাম দেওয়া যাবে-ছাগল কলোনী। কেমন হবে?

চমৎকার। কিন্তু আমি ওর মধ্যে নেই।

নেই কেন? বিদ্যাসাগর মশাই থেকে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত যে-কাজ করতে পারেন, সে-কাজ তুমি পারবে না! তোমার এত গুমর কিসের?

বিপজ্জনক প্রসঙ্গ এড়াইয়া গিয়া বলিলাম,—ব্যোমকেশ, কাল সমস্ত রাত কেবল স্বপ্ন দেখেছি।

সে চকিত হইয়া বলিল,—কি স্বপ্ন দেখলে?

দেখলাম বনলক্ষ্মী দাঁত বার করে হাসছে। যতবার দেখলাম, ঐ এক স্বপ্ন।

ব্যোমকেশ একটু চুপ করিয়া থাকিয়া বলিল,—অজিত, মনে আছে আর একবার বনলক্ষ্মীকে স্বপ্ন দেখেছিলে। আমি সত্যবতীকে স্বপ্ন দেখেছিলাম, কিন্তু আসলে একই কথা। মনস্তত্ত্বের নিগুঢ় কথা। বনলক্ষ্মীর দাঁত যে বাঁধানাে তা আমাদের চর্মচক্ষে ধরা পড়েনি বটে, কিন্তু আমাদের অবচেতন মন জানতে পেরেছিল—তাই বারবার স্বপ্ন দেখিয়ে আমাদের জানাবার চেষ্টা করেছিল। এখন আমরা জানি বনলক্ষ্মীর ওপর পাটির দু’পাশের দুটি দাঁত বাঁধানো, তাতে তার মুখের গড়ন হাসি সব বদলে গেছে। সেদিন ভুজঙ্গধর “দস্তারুচি কৌমুদী’ বলেছিলেন তার ইঙ্গিত তখন হৃদয়ঙ্গম হয়নি।

দন্তরুচির মধ্যে ইঙ্গিত ছিল নাকি?

তা এখনও বোঝোনি? সেদিন সকলের সাক্ষী নেওয়া হচ্ছিল। বাইরের ঘরে বনলক্ষ্মী জানালার কাছে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল। যেই তার সাক্ষী দেবার ডাক পড়ল ঠিক সেই সময় ভুজঙ্গধরবাবু ঘরে ঢুকলেন। বনলক্ষ্মীকে এক নজর দেখেই বুঝলেন সে তাড়াতাড়িতে দাঁত পরে আসতে ভুলে গেছে। যারা বাঁধানো দাঁত পরে, তাদের এরকম ভুল মাঝে মাঝে হয়। ভুজঙ্গধরবাবু দেখলেন,—সর্বনাশ। বনলক্ষ্মী যদি বিরল—দন্ত অবস্থায় আমার সামনে আসে, তখনি আমার সন্দেহ হবে! তিনি ইশারা দিলেন-দস্তারুচি কৌমুদী। বনলক্ষ্মী সঙ্গে সঙ্গে নিজের ভুল বুঝতে পারল এবং তৎক্ষণাৎ নিজের কপালে চুড়ি-সুদ্ধ হাত ঠুকে দিলে। কাচের চুড়ি ভেঙে কপাল কেটে গেল, বনলক্ষ্মী অজ্ঞান হয়ে পড়ল। বনলক্ষ্মীকে তুলে নিয়ে ভুজঙ্গধর তার কুঠিতে চললেন। বিজয় যখন তার সঙ্গ নিলে তখন তিনি তাকে বললেন—ডাক্তারখানা থেকে টিক্কার আয়োডিন ইত্যাদি নিয়ে আসতে। যতক্ষণে বিজয় টিঙ্কার আয়োডিন নিয়ে বনলক্ষ্মীর ঘরে গিয়ে পৌঁছল, ততক্ষণ বনলক্ষ্মী দাঁত পরে নিয়েছে।

দ্বারে টোকা পড়িল।

ইন্সপেক্টর বরাট এবং বিজয়। বিজয়ের ভাবভঙ্গী ভিজা বিড়ালের মত। বরাট চেয়ারে বসিয়া দুই পা সম্মুখে ছড়াইয়া দিয়া বলিল,—ব্যোমকেশবাবু, চা খাওয়ান। কাল সমস্ত রাত ঘুমুতে পারিনি। তার ওপর সকাল হতে না হতে বিজয়বাবু এসে উপস্থিত, উনিও ঘুমোননি।

পুঁটিরামকে চায়ের হুকুম দেওয়া হইল। বরাট বলিল,—ব্যাপারটা সবই জানি, তবু মনে হচ্ছে মাঝে মাঝে ফাঁক রয়েছে। আপনি বলুন-আমরা শুনব।

ব্যোমকেশ বলিল,—বিজয়বাবু, আপনিও শুনবেন? গল্পটা আপনার পক্ষে খুব গৌরবজনক নয়।

বিজয় ম্রিয়মাণ স্বরে বলিল,—শুনব।

বেশ, তাহলে বলছি।

অতিথিদের সিগারেটের টিন বাড়াইয়া দিয়া ব্যোমকেশ আরম্ভ করিল,—যা বলব তাকে আপনারা গল্প বলেই মনে করবেন, কারণ তার মধ্যে খানিকটা অনুমান, খানিকটা কল্পনা আছে। গল্পের নায়ক নায়িকা অবশ্য ভুজঙ্গাধর ডাক্তার আর নৃত্যকালী।

ভুজঙ্গধর আর নৃত্যকালী স্বামী-স্ত্রী। বাঘ আর বাঘিনী যেমন পরস্পরকে ভালবাসে, কিন্তু বনের অন্য জন্তুদের ভালবাসে না, ওরাও ছিল তেমনি সমাজবিরোধী, জন্মদুষ্ট অপরাধী। পরম্পরের মধ্যে ওরা নিজেদের শ্রেষ্ঠ আদর্শের সন্ধান পেয়েছিল। ওদের ভালবাসা ছিল যেমন গাঢ় তেমনি তীব্র। বাঘ আর বাঘিনীর ভালবাসা।

লন্ডনের একটি রেজিষ্টি অফিসে ওদের বিয়ে হয়। ডাক্তার তখন প্ল্যাস্টিক সাজার্রি শিখতে বিলেত গিয়েছিল, নৃত্যকালী বোধহয় গিয়েছিল কোনও নৃত্য সম্প্রদায়ের সঙ্গে। দুজনের দেখা হল, রতনে রতন চিনে নিলে। ওদের প্রেমের মূল ভিত্তি বোধহয় ওদের অভিনয় এবং সঙ্গীতের প্রতিভা। দুজনেই অসামান্য আর্টিস্ট; সেতারে এমন হাত পাকিয়েছিল যে বাজনা শুনে ধরা যেত না কে বাজাচ্ছে, বড় বড় সমজদারেরা ধরতে পারত না।

দুজনে মিলে ওরা কত নীতিগর্হিত কাজ করেছিল তার হিসেব আমার জানা নেই—স্টিলের আলমারিতে যে ডায়েরিগুলো পাওয়া গেছে সেগুলো ভাল করে পড়লে হয়তো সন্ধান পাওয়া যাবে-কিন্তু ডাক্তারের বৈধ এবং অবৈধ ডাক্তারি থেকে বেশ আয় হচ্ছিল; অন্তত উনিশ নম্বর বাড়িটা কেনবার মত টাকা তারা সংগ্রহ করেছিল।

কিন্তু ও-ধাতুর লোক অল্পে সন্তুষ্ট থাকে না, অপরাধ করার দিকে ওদের একটা অহেতুক প্রবণতা আছে। বছর চারেক আগে ডাক্তার ধরা পড়ল, তার নাম কাটা গেল। ডাক্তার কলকাতার পরিচিত পরিবেশ থেকে ডুব মেরে গোলাপ কলোনীতে গিয়ে বাসা বাঁধল। নিজের সত্যিকার পরিচয় গোপন করল না। কলোনীতে একজন ডাক্তার থাকলে ভাল হয়, তা হোক নাম-কাটা। নিশানাথবাবু তাকে রেখে দিলেন।

নৃত্যকালী কলকাতায় রয়ে গেল। কোথায় থাকত জানি না, সম্ভবত ১৯ নম্বরে। বাড়ির ভাড়া আদায় করত, তাতেই চালাত। ডাক্তার মাসে একবার দু’বার যেত; হয়তো অবৈধ অপারেশন করত।

নৃত্যকালী সতীসাধ্বী একনিষ্ঠ স্ত্রীলোক ছিল। কিন্তু নিজের রূপ-যৌবন ছলাকলার ফাঁদ পেতে শিকার ধরা সম্বন্ধে তার মনে কোনও সঙ্কোচ ছিল না। ডাক্তারেরও অগাধ বিশ্বাস ছিল স্ত্রীর ওপর, সে জানত নৃত্যকালী চিরদিনের জন্য তারই, কখনও আর কারুর হতে পারে না।

বছর আড়াই আগে ওরা মতলব করল নৃত্যকালী সিনেমায় যোগ দেবে। সিনেমায় টাকা আছে, টাকাওয়ালা লোকও আছে। নৃত্যকালী সিনেমায় ঢুকাল। তার অভিনয় দেখে সকলে মুগ্ধ। নৃত্যকালী যদি সিধে পথে চলত, তাহলে সিনেমা থেকে অনেক পয়সা রোজগার করতে পারত। কিন্তু অবৈধ উপায়ে টাকা মারবার একটা সুযোগ যখন হাতের কাছে এসে গেল তখন নৃত্যকালী লোভ সামলাতে পারল না।

মুরারি দত্ত অতি সাধারণ লম্পট, কিন্তু সে জহরতের দোকানের মালিক। ডাক্তার আর নৃত্যকালী মতলব ঠিক করল। ডাক্তার নিকোটিন তৈরি করল। তারপর নির্দিষ্ট রাত্রে মুরারি দত্তর মৃত্যু হল; তার দোকান থেকে হীরের নেকলেস অদৃশ্য হয়ে গেল।

প্রথমটা পুলিস জানতে পারেনি সে রাত্রে মুরারির ঘরে কে এসেছিল। তারপর রমেনবাবু ফাঁস করে দিলেন। নৃত্যকালীর নামে ওয়ারেন্ট বেরুল।

‘নৃত্যকালীর আসল চেহারার ফটোগ্রাফ ছিল না বটে, কিন্তু সিনেমা স্টুডিওর সকলেই তাকে দেখেছিল। কোথায় কার চোখে পড়ে যাবে ঠিক নেই, নৃত্যকালীর বাইরে বেরুনো বন্ধ হল। কিন্তু এভাবে তো সারা জীবন চলে না। ডাক্তার নৃত্যকালীর মুখের ওপর প্ল্যাস্টিক অপারেশন করল। কিন্তু শুধু সাজারি যথেষ্ট নয়, দাঁত দেখে অনেক সময় মানুষ চেনা যায়। নৃত্যকালীর দুটো দাঁত তুলিয়ে ফেলে নকল দাঁত পরিয়ে দেওয়া হল। তার মুখের চেহারা একেবারে বদলে গেল। তখন কার সাধ্য তাকে চেনে।

তারপর ওরা ঠিক করল নৃত্যকালীরও কলোনীতে থাকা দরকার। স্বামী-স্ত্রীর এক জায়গায় থাকা হবে, তাছাড়া টোপ গেলবার মত মাছও এখানে আছে।

চায়ের দোকানে বিজয়বাবুর সঙ্গে নৃত্যকালীর দেখা হল; তার করুণ কাহিনী শুনে বিজয়বাবু গলে গেলেন। কিছুদিনের মধ্যে নৃত্যকালী কলোনীতে গিয়ে বসল। ডাক্তারের সঙ্গে নৃত্যকালীর পরিচয় আছে। কেউ জানল না, পরে যখন পরিচয় হল তখন পরিচয় ঝগড়ায় দাঁড়াল। সকলে জানল ডাক্তারের সঙ্গে নৃত্যকালীর আদায়-কাচকলায়।

নিশানাথ এবং দময়ন্তীর জীবনে গুপ্তকথা ছিল। প্রথমে সে কথা জানতেন বিজয়বাবু আর ব্ৰজদাস বাবাজী। কিন্তু নেপালবাবু তাঁর মেয়ে মুকুলকে নিয়ে কলোনীতে আসবার পর বিজয়বাবু মুকুলের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছিলেন। আবেগের মুখে তিনি একদিন পারিবারিক রহস্য মুকুলের কাছে প্রকাশ করে ফেলেলেন।—বিজয়বাবু, যদি ভুল করে থাকি, আমাকে সংশোধন করে দেবেন।

বিজয় নতমুখে নির্বাক রহিল।

ব্যোমকেশ আবার বলিতে লাগিল—

মুকুল ভাল মেয়ে। বাপ যতদিন চাকরি করতেন সে সুখে স্বচ্ছন্দে জীবন কাটিয়েছে, তারপর হঠাৎ ভাগ্য-বিপর্যয় হল; কচি বয়সে তাকে অন্ন-চিন্তা করতে হল। সে সিনেমায় কাজ যোগাড় করবার চেষ্টা করল, কিন্তু হল না। তার গলার আওয়াজ বোধহয় ‘মাইকে’ ভাল আসে না। তিক্ত মন নিয়ে শেষ পর্যন্ত সে কলোনীতে এল এবং বারোয়ারী রাঁধুনীর কাজ করতে লাগল।

তারপর জীবনে এল ক্ষণ-বসন্ত, বিজয়বাবুর ভালবাসা পেয়ে তার জীবনের রঙ বদলে গেল। বিয়ের কথাবার্তা অনেক দূর এগিয়েছে, হঠাৎ আবার ভাগ্য-বিপর্যয় হল। বনলক্ষ্মীকে দেখে বিজয়বাবু মুকুলের ভালবাসা ভুলে গেলেন। বনলক্ষ্মী মুকুলের মত রূপসী নয়, কিন্তু তার একটা দুনির্বার চৌম্বক শক্তি ছিল। বিজয়বাবু সেই চুম্বকের আকর্ষণে পড়ে গেলেন। মুকুলের সঙ্গে বিয়ের সম্বন্ধ ভেঙে দিলেন।

প্ৰাণের জ্বালায় মুকুল নিশানাথবাবুর গুপ্তকথা বাপকে বলল। নেপালবাবুর উচ্চাশা ছিল তিনি কলোনীর কর্ণধার হবেন, তিনি তড়পাতে লাগলেন। কিন্তু হাজার হলেও অন্তরে তিনি ভদ্রলোক, blackmail-এর চিন্তা তাঁর মনেও এল না।

এদিকে বিজয়বাবু বনলক্ষ্মীর প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছিলেন। তার অতীত জীবনের কলঙ্ক-কাহিনী জেনেও তাকে বিয়ে করবার জন্য বদ্ধপরিকর হলেন। নিশানাথ কিন্তু বেঁকে দাঁড়ালেন, কুলত্যাগিনীর সঙ্গে তিনি ভাইপোর বিয়ে দেবেন না। বংশে একটা কেলেঙ্কারিই যথেষ্ট।

কাকার হুকুম ডিঙিয়ে বিয়ে করবার সাহস বিজয়বাবুর ছিল না, কাকা যদি তাড়িয়ে দেন তাহলে না খেয়ে মরতে হবে। দুই প্রেমিক প্রেমিকা মিলে পরামর্শ হল; দোকান থেকে কিছু কিছু টাকা সরিয়ে বিজয়বাবু বনলক্ষ্মীর কাছে জমা করবেন, তারপর যথেষ্ট টাকা জমলে দু’জনে কলোনী ছেড়ে চলে যাবেন। ওদিকে রসিক দে’র সঙ্গে বনলক্ষ্মী ঠিক অনুরূপ ব্যবস্থা করেছিল। রসিক কপৰ্দকহীন যুবক, সেও বনলক্ষ্মীকে দেখে মজেছিল; বনলক্ষ্মীর কলঙ্ক ছিল বলেই বোধহয় তার দিকে হাত বাড়াতে সাহস করেছিল। বনলক্ষ্মীও তাকে নিরাশ করেনি, ভরসা দিয়েছিল কিছু টাকা জমাতে পারলেই দুজনে পালিয়ে গিয়ে কোথাও বাসা বাঁধবে। এইভাবে রসিক এবং বিজয়বাবুর টাকা ১৯ নম্বর মিজ লেনের লোহার আলমারিতে জমা হচ্ছিল।

তারপর একদিন বিজয়বাবু বনলক্ষ্মীর কাছেও পারিবারিক গুপ্তকথাটি বলে ফেললেন। ভাবপ্রবণ প্রকৃতির ঐ এক বিপদ, যখন আবেগ উপস্থিত হয় তখন অতিবড় গুপ্তকথাও চেপে রাখতে পারেন না।

গুপ্তকথা জানতে পেরে বনলক্ষ্মী সেই রাত্রেই ডাক্তারকে গিয়ে বলল; আনন্দে ডাক্তারের বুক নেচে উঠল। অতি যত্নে দুজনে ফাঁদ পাতল। নিশানাথকে হুমকি দিতে গেলে বিপরীত ফল ফলতে পারে, কিন্তু দময়ন্তী স্ত্রীলোক, কলঙ্কের ভয় তাঁরই বেশি। সুতরাং তিনি blackmail-এর উপযুক্ত পাত্রী।

দময়ন্তী দেবীর শোষণ শুরু হল; আট মাস ধরে চলতে লাগিল। কিন্তু শেষের দিকে নিশানাথবাবুর সন্দেহ হল, তিনি আমার কাছে এলেন।

সুনয়না কলোনীতে আছে। এ সন্দেহ নিশানাথের কেমন করে হয়েছিল তা আমি জানি না, অনুমান করাও কঠিন। মানুষের জীবনে অতর্কিতে অভাবিত ঘটনা ঘটে, তেমনি কোনও ঘটনার ফলে হয়তো নিশানাথের সন্দেহ হয়েছিল। কিন্তু এ বিষয়ে গবেষণা নিস্ফল।

নিশানাথের নিমন্ত্রণ পেয়ে আমরা রমেন মল্লিককে সঙ্গে নিয়ে কলোনীতে গেলাম। রমেনবাবুকে ডাক্তার চিনত না কিন্তু সুনয়না চিনত; স্টুডিওতে অনেকবার দেখেছে, মুরারি দত্তর বন্ধু। তাই রমেনবাবুকে দেখে সুনয়না ভয় পেয়ে গেল। বুঝতে বাকি রইল না, সুনয়নার খোঁজেই আমরা কলোনীতে এসেছি।

দাস-দম্পতি বড় দ্বিধায় পড়ল। এ অবস্থায় কী করা যেতে পারে? বনলক্ষ্মী যদি কিলোনী ছেড়ে পালায় তাহলে খুঁচিয়ে সন্দেহ জাগানো হবে, পুলিস বনলক্ষ্মীকে খুঁজতে আরম্ভ করবে। বনলক্ষ্মী যদি ধরা পড়ে, তার মুখে অপারেশনের সূক্ষ্ম চিহ্ন বিশেষজ্ঞের চোখে ধরা পড়ে যাবে, বনলক্ষ্মীই যে সুনয়না তা আর গোপন থাকবে না। তবে উপায়?

নিশানাথবাবু যত নষ্টের গোড়া, তিনিই ব্যোমকেশ বক্সীকে ডেকে এনেছেন। তাঁর যদি হঠাৎ মৃত্যু হয় তাহলে সুনয়নার তল্লাস বন্ধ হয়ে যাবে, নিষ্কণ্টকে দময়ন্তী দেবীর রুধির শোষণ করা চলবে।

কিন্তু নিশানাথবাবুর মৃত্যু স্বাভাবিক মৃত্যু বলে প্ৰতিপন্ন হওয়া চাই। তাঁর ব্লাড-প্রেসার আছে, ব্লাড-প্রেসারের রুগী বেশির ভাগই হঠাৎ মরে-হার্টফেল হয়। কিম্বা মাথার শিরা ছিড়ে যায়। সুতরাং কাজটা সাবধানে করতে পারলে কারুর সন্দেহ হবার কথা নয়।

ভুজঙ্গধর ডাক্তার খুব সহজেই নিশানাথকে মারতে পারত। সে প্রায়ই নিশানাথের রক্ত-মোক্ষণ করে দিত। এখন রক্ত-মোক্ষণ ছুতোয় যদি একটু হাওয়া তাঁর ধমনীতে ঢুকিয়ে দিতে পারত, তাহলে তিন মিনিটের মধ্যে তাঁর মৃত্যু হত। অ্যাড্রেনালিন ইনজেকশন দিলেও একই ফল হত; তাঁর পায়ে দড়ি বেঁধে কড়িকাঠে ঝোলাবার দরকার হত না। কিন্তু তাতে একটা বিপদ ছিল। ইনজেকশন দিলে চামড়ার ওপর দাগ থাক না থাক, শিরার ওপর দাগ থেকে যায়, পোস্ট-মর্টেম পরীক্ষায় ধরা পড়ে। নিশানাথের গায়ে ইনজেকশনের চিহ্ন পাওয়া গেলে প্রথমেই সন্দেহ হত। ডাক্তার ভুজঙ্গাধরের ওপর। সুতরাং ভুজঙ্গধর সে রাস্তা দিয়ে গেল না; অত্যন্ত স্থূল প্রথায় নিশানাথবাবুকে মারলে।

ব্যবস্থা খুব ভাল করেছিল। বেনামী চিঠি পেয়ে বিজয়বাবু কলকাতায় এলেন। ওদিকে লাল সিং-এর চিঠি পেয়ে রাত্রি দশটার সময় দময়ন্তী পিছনের দরজা দিয়ে কাচ-ঘরে চলে গেলেন। রাস্তা সাফ, ডাক্তার সেতার বাজাচ্ছিল, বনলক্ষ্মীর হাতে সেতার দিয়ে নিশানাথের ঘরে ঢুকাল। সম্ভবত নিশানাথ তখন জেগে ছিলেন। ডাক্তার আলো জ্বেলেই জানালা বন্ধ করে দিলে।

দুটো ভুল ডাক্তার করেছিল। কাজ শেষ করে জানালাটা খুলে দিতে ভুলে গিয়েছিল, আর তাড়াতাড়িতে মোজা জোড়া খুলে নিয়ে যায়নি। এ দুটো ভুল যদি সে না করত তাহলে নিশানাথবাবুর মৃত্যু অস্বাভাবিক বলে কারুর সন্দেহ হত না।

পানুগোপাল কিছু দেখেছিল। কী দেখেছিল তা চিরদিনের জন্যে অজ্ঞাত থেকে যাবে। আমার বিশ্বাস সে বাইরে থেকে ডাক্তারকে জানালা বন্ধ করতে দেখেছিল। নিশানাথের মৃত্যুটা যতক্ষণ স্বাভাবিক মৃত্যু মনে হয়েছিল ততক্ষণ সে কিছু বলেনি, কিন্তু যখন বুঝতে পারল মৃত্যু স্বাভাবিক নয়। তখন সে উত্তেজিত হয়ে যা দেখেছিল তা বলবার চেষ্টা করল। কিন্তু তার কপাল খারাপ, সে কিছু বলতে পারল না। ডাক্তার বুঝলে পানু কিছু দেখেছে। সে আর দেরি করল না, পানুর অবর্তমানে তার কানের ওষুধে নিকোটিন মিশিয়ে রেখে এল।

তারপর যা যা ঘটেছে সবই আপনাদের জানা, নতুন করে বলবার কিছু নেই। —কাল ডাক্তার আর বনলক্ষ্মীর আত্মহত্যা আপনাদের হয়তো আকস্মিক মনে হয়েছিল। আসলে ওরা তৈরি হয়ে এসেছিল।

বরাট বলিল,—কিন্তু সায়েনাইডের অ্যাম্পুল কখন মুখে দিলে জানতে পারিনি।

ব্যোমকেশ বলিল,—দুটো সায়েনাইডের অ্যাম্পৃল ডাক্তারের মুখে ছিল, মুখে করেই এসেছিল। আমি লক্ষ্য করেছিলাম তার কথা মাঝে মাঝে জড়িয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তখন প্রকৃত তাৎপর্য বুঝিনি। তারপর ডাক্তার যখন দেখল। আর নিস্তার নেই, তখন সে উঠে বনলক্ষ্মীকে চুমো খেল। এ শুধু প্রণয়ীদের বিদায় চুম্বন নয়, মৃত্যুচুম্বন। চুমু খাবার সময় ডাক্তার একটা অ্যাম্পুল স্ত্রীর মুখে দিয়েছিল।

দীর্ঘ নীরবতা ভঙ্গ করিয়া ব্যোমকেশই আবার কথা কহিল,—যাক, এবার আপনারা দু একটা খবর দিন। রসিকের কি ব্যবস্থা হল?

বরাট বলিল, রসিকের ওপর থেকে বিজয়বাবু অভিযোগ তুলে নিয়েছেন। তাকে ছেড়ে দিয়েচি।

ভাল। বিজয়বাবু, পরশু রাত্রে আন্দাজ এগারোটার সময় যে-মেয়েটি আপনার ঘরে গিয়েছিল সে কে? মুকুল?

বিজয় চমকিয়া মুখ তুলিল, লজ্জালাঞ্ছিত মুখে বলিল,—হ্যাঁ।

তাহলে বনলক্ষ্মী গিয়েছিল স্বামীর কাছে। ডাক্তার সেতার বাজিয়ে তাকে ডেকেছিল। মুকুল আপনার কাছে গিয়েছিল কেন? আপনি ওদের কলোনী থেকে চলে যাবার হুকুম দিয়েছিলেন, তাই সে আপনার কৃপা ভিক্ষা করতে গিয়েছিল?

বিজয় অধোবদনে রহিল।

ব্যোমকেশ উঠিয়া দাঁড়াইল, বলিল,—বিজয়বাবু, আশা করি আপনি মুকুলকে বিয়ে করবেন। সে আপনাকে ভালবাসে। এত ভালবাসা উপেক্ষার বস্তু নয়।

বিজয় মৌন রহিল, কিন্তু তাহার মুখের ভাব দেখিয়া বুঝিলাম, মৌনং সম্মতিলক্ষণম। মুকুলের সঙ্গে হয়তো ইতিমধ্যেই পুনর্মিলন হইয়া গিয়াছে।

বিদায়কালে বিজয় আমতা-আমতা করিয়া বলিল,—ব্যোমকেশবাবু, আপনি আমাদের যে উপকার করেছেন তা শোধ দেবার নয়। কিন্তু কাকিমা বলেছেন। আপনাকে আমাদের কাছ থেকে একটা উপহার নিতে হবে।

ব্যোমকেশ ভ্রু তুলিয়া বলিল,—কি উপহার?

বিজয় বলিল,—কাকার পাঁচ হাজার টাকার জীবনবীমা ছিল, দুচার দিনের মধ্যেই কাকিমা সে টাকা পাবেন। ওটা আপনাকে নিতে হবে।

ব্যোমকেশ আমার পানে কটাক্ষপাত করিয়া হাসিল। বলিল,—বেশ, নেব। আপনার কাকিমাকে আমার শ্রদ্ধাপূর্ণ ধন্যবাদ জানাবেন।

প্রশ্ন করিলাম,—ছাগল কলোনীর প্রস্তাব কি তাহলে মুলতুবি রইল?

ব্যোমকেশ বলিল,—তা বলা যায় না। এই মূলধন দিয়েই ছাগল কলোনীর পত্তন হতে পারে। বিজয়বাবু প্ৰস্তুত থাকবেন, গোলাপ কলোনীর পাশে হয়তো শীগগির ছাগল কলোনীর আবির্ভাব হবে।

আদিম রিপু

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় হইতে বাংলা দেশে‌, বিশেষত কলিকাতা শহরে‌, মানুষের জীবনের মূল্য খুবই কমিয়া গিয়াছে। পঞ্চাশের মন্বন্তরে আমরা জীবনমৃত্যুকে পায়ের ভৃত্য করিয়া ফেলিয়ছিলাম। তারপর জিন্না সাহেবের সম্মুখ সমর যখন আরম্ভ হইল‌, তখন আমরা মৃত্যু দেবতাকে একেবারে ভালবাসিয়া ফেলিলাম। জাতি হিসাবে আমরা যে টিকিয়া আছি‌, সে কেবল মৃত্যুর সঙ্গে সুখে স্বচ্ছন্দে ঘর করিতে পারি বলিয়াই। বাঘ ও সাপের সঙ্গে আমরা আবহমানকাল বাস করিতেছি‌, আমাদের মারে কে?

সম্মুখ সমরের প্রথম অনলোদগার প্রশমিত হইয়াছে; কিন্তু তলে তলে অঙ্গার জ্বলিতেছে‌, এখানে ওখানে হঠাৎ দপ করিয়া জ্বলিয়া আবার ভম্মের অন্তরালে লুকাইতেছে। কলিকাতার সাধারণ জীবনযাত্রায় কিন্তু কোনও প্ৰভেদ দেখা যায় না। রাস্তায় ট্রাম-বাস তেমনি চলিতেছে‌, মানুষের কর্মতৎপরতার বিরাম নাই। দুই সম্প্রদায়ের সীমান্ত ক্ষেত্রে মাঝে মাঝে হৈ হৈ দুমদাম শব্দ ওঠে‌, চকিতে দোকানপাট বন্ধ হইয়া যায়‌, রাস্তায় দুই চারিটা রক্তাক্ত মৃতদেহ পড়িয়া থাকে। সুরাবর্দি সাহেবের পুলিস আসিয়া হিন্দুদের শাসন করে‌, মৃতদেহের সংখ্যা দুই চারিটা বাড়িয়া যায়। কোথা হইতে মোটর ভ্যান আসিয়া মৃতদেহগুলিকে কুড়াইয়া লইয়া অন্তধান করে। তারপর আবার নগরীর জীবনযাত্রা পূর্ববৎ চলিতে থাকে।

ব্যোমকেশ ও আমি কলিকাতাতেই ছিলাম। আমাদের হ্যারিসন রোডের বাসাটা যদিও ঠিক সমর সীমানার উপর পড়ে না‌, তবু যথাসাধ্য সাবধানে ছিলাম। ভাগ্যক্রমে কয়েক মাস আগে ব্যোমকেশের শ্যালক সুকুমার খোকাকে ও সত্যবতীকে লইয়া পশ্চিমে বেড়াইতে গিয়াছিল‌, তাই সম্মুখ সমর যখন আরম্ভ হইল তখন ব্যোমকেশ তার করিয়া তাহাদের কলিকাতায় ফিরিতে বারণ করিয়া দিল। তদবধি তাহারা পাটনায় আছে। ইতিমধ্যে সত্যবতীর প্রবল পত্রাঘাতে আমরা বার দুই পাটনা ঘুরিয়া আসিয়াছি; কারণ আমরা যে বাঁচিয়া আছি‌, তাহা মাঝে মাঝে স্বচক্ষে না দেখিয়া সত্যবতী বিশ্বাস করিতে চাহে নাই।

যাহোক‌, খোকা ও সত্যবতী নিরাপদে আছে‌, ইহাতেই আমরা অনেকটা নিশ্চিন্তু ছিলাম। রাষ্ট্রবিপ্লবের সময় নিজের প্রাণ রক্ষার চেয়ে প্রিয়জনের নিরাপত্তাই অধিক বাঞ্ছনীয় হইয়া ওঠে।

যেদিনের ঘটনা লইয়া এই কাহিনীর সূত্রপাত সেদিনটা ছিল দুৰ্গাপূজা এবং কালীপূজার মাঝামাঝি একটা দিন। দুৰ্গাপূজা অন্যান্য বারের মত যথারীতি ধুমধামের সহিত সম্পন্ন হইয়াছে এবং কালীপূজাও যথাবিধি সম্পন্ন হইবে সন্দেহ নাই। আমরা দু’জনে সকালবেলা খবরের কাগজ লইয়া বসিয়াছিলাম‌, এমন সময় বাঁটুল সদর আসিল। তাহাকে সেলামী দিলাম। বাঁটুল এই এলাকার গুণ্ডার সদর; বেঁটে নিটোল চেহারা‌, তৈলাক্ত ললাটে সিঁদুরের ফোঁটা। সম্মুখ সমর আরম্ভ হইবার পর হইতে বাঁটুলের প্রতাপ বাড়িয়াছে‌, পাড়ার সজ্জনদের গুণ্ডার হাত হইতে রক্ষা করিবার ওজুহাতে সে সকলের নিকট সেলামী আদায় করে। সেলামী না দিলে হয়তো কোনদিন বাঁটুলের হাতেই প্ৰাণটা যাইবে এই ভয়ে সকলেই সেলামী দিত।

সেলামীর জুলুম সত্ত্বেও ব্যোমকেশের সহিত বাঁটুলের বিশেষ সম্ভাব জগিয়েছিল। আদায়তসিল উপলক্ষে বাঁটুল আসিয়া উপস্থিত হইলে ব্যোমকেশ তাহাকে চা সিগারেট দিত‌, তাহার সহিত গল্প জমাইত; শত্রুপক্ষ ও মিত্রপক্ষের কূটনীতি সম্বন্ধে অনেক খবর পাওয়া যাইত। বাঁটুল এই ফাঁকে ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসঙ্গ তুলিত। যুদ্ধের পর মার্কিন সৈনিকেরা অনেক আগ্নেয়াস্ত্ৰ জলের দরে বিক্রি করিয়া চলিয়া গিয়াছিল‌, বাঁটুল সেই অস্ত্ৰ কিছু সংগ্ৰহ করিয়া রাখিয়াছিল‌, এখন সে তাহা আমাদের বিক্রি করিবার চেষ্টা করিত। বলিত‌, ‘একটা রাইফেল কিনে ঘরে রাখুন কতা। আমরা তো আর সব সময় সব দিকে নজর রাখতে পারি না। ডামাডোলের সময় হাতে হাতিয়ার থাকা ভাল।’

আমি বলিতাম‌, না‌, বাঁটুল‌, রাইফেল দরকার নেই। অত বড় জিনিস লুকিয়ে রাখা যাবে না‌, কোন দিন পুলিস খবর পাবে আর হাতে দড়ি দিয়ে বেঁধে নিয়ে যাবে। তার চেয়ে একটা পিস্তল কি রিভলবার যদি যোগাড় করতে পার–’

বাঁটুল বলিত‌, ‘পিস্তল যোগাড় করাই শক্ত বাবু। আচ্ছা‌, চেষ্টা করে দেখব—’

বাঁটুল মাসে একবার আসিত।

সেদিন যথারীতি সেলামী লইয়া বাঁটুল আমাদের অভয় প্রদানপূর্বক প্রস্থান করিলে আমরা কিছুক্ষণ ত্ৰিয়মাণাভাবে সাময়িক পরিস্থিতির পযালোচনা করিলাম। এভাবে আর কতদিন চলিবে? মাথার উপর খাঁড়া ঝুলাইয়া কতকাল বসিয়া থাকা যায়? স্বাধীনতা হয়তো আসিতেছে‌, কিন্তু তাহা ভোগ করিবার জন্য বাঁচিয়া থাকিব কি? সম্মুখ সমরে যদি বা প্ৰাণ বাঁচে্‌্‌, কাঁকর ও তেঁতুল বিচির গুড়া খাইয়া কত দিন বাঁচিব? ব্যোমকেশের হাতে কাজকর্ম কোনও কালেই বেশি থাকে না‌, এখন একেবারে বন্ধ হইয়াছে। যেখানে প্ৰকাশ্য হত্যার পাইকারি কারবার চলিতেছে‌, সেখানে ব্যোমকেশের রহস্যভেদী বুদ্ধি কাহার কাজে লাগিবে?

আমি বলিলাম‌, ‘ভারতীরে ছেড়ে ধর এইবিলা লক্ষ্মীর উপাসনা।’

‘অর্থাৎ?’

‘অর্থাৎ রাত দুপুরে ছোরা বগলে নিয়ে বেরোও‌, যদি দু’চারটে কালাবাজারের মক্কেলকে সাবাড়। করতে পোর‌, তাহলে আর ভাবতে হবে না। যে সময়-কাল পড়েছে‌, বাঁটুল সদোরই আমাদের আদর্শ হওয়া উচিত।’

ব্যোমকেশ কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া বলিল‌, ‘কথাটা মন্দ বলোনি‌, যুগধর্মই ধর্ম। কিন্তু কি জানো‌, ও জিনিসটা রক্তে থাকা চাই। খুনই বল আর কালাবাজারই বল‌, পূর্বপুরুষদের রক্তের জোর না থাকলে হয় না। আমার বাবা ছিলেন স্কুল মাস্টার‌, স্কুলে অঙ্ক শেখাতেন আর বাড়িতে সাংখ্য পড়তেন। মা ছিলেন। বৈষ্ণব বংশের মেয়ে‌, নন্দগোপাল নিয়েই থাকতেন। সুতরাং ওসব আমার কম নয়।’

ব্যোমকেশের বাল্য ইতিহাস আমার জানা ছিল। তাহার যখন সতেরো বছর বয়স। তখন তাহার পিতার যক্ষ্মা হয়‌, মাতাও সেই রোগে মারা যান। আত্মীয়স্বজন কেহ উঁকি মারেন নাই। তারপর ব্যোমকেশ জলপানির জোরে বিশ্ববিদ্যা সমুদ্র পার হইয়াছে, নিজের চেষ্টায় নূতন জীবন-পথ গড়িয়া তুলিয়াছে। আত্মীয়স্বজন এখনও হয়তো আছেন‌, কিন্তু ব্যোমকেশ তাঁহাদের খোঁজ রাখে না।

কিছুক্ষণ বিমনাভাবে কাটিয়া গেল। আজ সত্যবতীর একখানা চিঠি আসিতে পারে‌, মনে মনে তাহারই প্ৰতীক্ষা করিতেছি।

খট্‌ খট্‌ খট্‌ খট্‌ কড়া নড়িয়া উঠিল। আমি উঠিয়া গিয়া দ্বার খুলিলাম।

ডাকপিওন নয়। তৎপরিবর্তে যিনি দ্বারের বাইরে দাঁড়াইয়া আছেন‌, বেশবাস দেখিয়া তাঁহাকে স্ত্রীলোকই বলিতে হয়। কিন্তু সে কী স্ত্রীলোক! পাঁচ হাত লম্বা‌, তদনুপাতে চওড়া‌, শালপ্ৰাংশু আকৃতি; পালিশ করা আবলুশ কাঠের মত গায়ের রঙ; ঘটোধ্নী‌, নিবিড়নিতম্বিনী‌, স্পষ্ট একজোড়া গোঁফ আছে; বয়স পঞ্চাশের ওপারে। তিনি আমার দিকে চাহিয়া হাস্য করিলেন; মনে হইল। হারমোনিয়ামের ঢাকনা খুলিয়া গেল।

তিনি রামায়ণ মহাভারত হইতে বিনিৰ্গতা কোনও অতি-মানবী। কিনা ভাবিতেছি। হারমোনিয়াম হইতে খাদের গভীর আওয়াজ বাহির হইল‌, ‘আপনি কি ব্যোমকেশবাবু?’

আমি অতি দ্রুত মাথা নাড়িয়া অস্বীকার করিলাম। ব্যোমকেশের সহিত মহিলাটির কি প্রয়োজন জানি না‌, কিন্তু আমি যে ব্যোমকেশ নই তাহা অকপটে ব্যক্ত করাই সমীচীন। ব্যোমকেশ ঘরের ভিতর হইতে মহিলাটিকে দেখিতে পায় নাই, আমার অবস্থা দেখিয়া উঠিয়া আসিল। সেও অভ্যাগতকে দেখিয়া ক্ষণেকের জন্য থতমত খাইয়া গেল‌, তারপর সৎসাহস দেখাইয়া বলিল‌, ‘আমি ব্যোমকেশ।’

মহিলাটি আবার হারমোনিয়ামের ঢাকনা খুলিলেন‌, বলিলেন‌, নমস্কার। আমার নাম মিস। ননীবালা রায়। আপনার সঙ্গে আমার একটু দরকার আছে।’

‘আসুন।’

খট্‌ খট্‌ জুতার শব্দ করিয়া মিসা ননীবালা রায় ঘরে প্রবেশ করিলেন; ব্যোমকেশ তাঁহাকে চেয়ারে বসাইল। আমি ভাবিতে লাগিলাম‌, এরূপ আকৃতি লইয়া ইনি কখনই ঘরের ঘরণী হইতে পারেন না‌, স্বামীপুত্র ঘরকন্না গৃহস্থলী ইহার জন্য নয়। বিশেষ নামের অগ্ৰে ‘মিস’ খেতাবটি দাম্পত্য সৌভাগ্যের বিপরীত সাক্ষ্য দিতেছে। তবে ইনি কি? জেনানা ফাটকের জমাদারণী? উহুঁ‌, অতটা নয়। শিক্ষয়িত্রী? বোধ হয় না। লেডি ডাক্তার? হইতেও পারে—

পরক্ষণেই ননীবালা নিজের পরিচয় দিলেন। দেখিলাম বেশি ভুল করি নাই। তিনি বলিলেন‌, ‘আমি পাটনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ধাত্রী ছিলাম‌, এখন রিটায়ার করে কলকাতায় আছি। একজনের কাছে আপনার নাম শুনলাম‌, ঠিকানাও পেলাম। তাই এসেছি।’

ব্যোমকেশ গম্ভীরমুখে বলিল‌, ‘কি দরকার বলুন।’

মিস ননীবালার চেহারা যেরূপ জবরদস্ত, আচার আচরণ কিন্তু সেরূপ নয়। তাঁহার হাতে একটা কালো রঙের হ্যান্ডব্যাগ ছিল‌, তিনি সেটা খুলিবার উপক্ৰম করিয়া বলিলেন‌, ‘আমি গরীব মানুষ‌, ব্যোমকেশবাবু। টাকাকড়ি বেশি আপনাকে দিতে পারব না—’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘টাকাকড়ির কথা পরে হবে। কি দরকার আগে বলুন।’

ননীবালা ব্যাগ বন্ধ করিলেন‌, তারপর সহসা কম্পিত স্বরে বলিয়া উঠিলেন‌, ‘আমার ছেলের বড় বিপদ‌, তাকে আপনি রক্ষে করুন‌, ব্যোমকেশবাবু।’

ব্যোমকেশ কিছুক্ষণ তাঁহার পানে চাহিয়া থাকিয়া বলিল‌, ‘আপনার—ছেলে!’

ননীবালা একটু অপ্ৰস্তুত হইলেন‌, বলিলেন‌, ‘আমার ছেলে-মানে-আমি মানুষ করেছি। অনাদিবাবু তাকে পুষ্যিপুকুর নিয়েছেন—‘

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘বড় পাঁচালো ব্যাপার দেখছি। আপনি গোড়া থেকে সব কথা বলুন।’ ননীবালা তখন নিজের কাহিনী বলিতে আরম্ভ করিলেন। তাঁহার গল্প বলার শৈলী ভাল নয়‌, কখনও দশ বছর পিছইয়া কখনও বিশ বছর আগাইয়া বহু অবান্তর প্রসঙ্গের অবতারণা করিয়া যাহা বলিলেন‌, তাহার জট ছাড়াইলে এইরূপ দাঁড়ায়–

বাইশ তেইশ বছর আগে মিসা ননীবালা রায় পাটনা হাসপাতালের ধাত্রী ছিলেন। একদিন একটি যুবতী হাসপাতালে ভর্তি হইল; অবস্থা খুবই খারাপ‌, ধুরিসির সহিত নানা উপর্সা‌, তার উপর পূর্ণগভর্ণ। যে পুরুষটি তাহাকে আনিয়াছিল‌, সে ভর্তি করিয়া দিয়াই অদৃশ্য হইল।

যুবতী হিন্দু নয়‌, বোধ হয় আদিম জাতীয় দেশী খ্ৰীষ্টান। দুই দিন পরে সে একটি পুত্র প্রসব করিয়া মারা গেল। পুরুষটা সেই যে উধাও হইয়াছিল‌, আর ফিরিয়া আসিল না।

এইরূপ অবস্থায় শিশুর লালন-পালনের ব্যবস্থা রাজ সরকার করেন। কিন্তু এক্ষেত্রে ননীবালা শিশুটির ভার লাইলেন। ননীবালা অবিবাহিতা‌, সন্তানাদি নাই‌, শিশুটি বড় হইয়া তাঁহার পুত্রের স্থান অধিকার করিবে এই আশায় তিনি শিশুকে পুত্ৰবৎ পালন করিতে লাগিলেন। শিশুর নাম হইল প্ৰভাত রায়।

প্রভাতের বয়স তখন তিন-চার, তখন ননীবালা হঠাৎ একটি ইন্সিওর চিঠি পাইলেন। চিঠির সঙ্গে দুই শত টাকার নোট। চিঠিতে লেখা আছে, আমি জানিতে পারিয়াছি আমার ছেলে তোমার কাছে আছে। তাহাকে পালন করিও। উপস্থিত কিছু টাকা পাঠাইলাম, সুবিধা হইলে আরও পাঠাইব।–চিঠিতে নাম দস্তখত নাই।

তারপর প্রভাতের বাপের আর কোনও সংবাদ পাওয়া যায় নাই। লোকটা সম্ভবত মরিয়া গিয়াছিল। ননীবালা বিশেষ দুঃখিত হইলেন না। বাপ কোনও দিন আসিয়া ছেলেকে লইয়া যাইবে এ আশঙ্কা তাঁহার ছিল। তিনি নিশ্চিন্ত হইলেন।

প্রভাত বড় হইয়া উঠিতে লাগিল। ননীবালা নিজের ডিউটি লইয়া থাকেন, ছেলের দেখাশুনা ভাল করিতে পারেন না; প্রভাত পাড়ার হিন্দুস্থানী ছেলেদের সঙ্গে রাস্তায় খেলা করিয়া বেড়ায়। তাহার লেখাপড়া হইল না।

পাড়ায় এক মুসলমান দপ্তরীর দোকান ছিল। প্ৰভাতের যখন ষোল-সতেরা বছর বয়স, তখন সে দপ্তরীর দোকানে কাজ করিতে আরম্ভ করিল। প্রভাত লেখাপড়া শেখে নাই বটে, কিন্তু বয়াটে উচ্ছঙ্খল হইয়া গেল না। মন দিয়া নিজের কাজ করিত, ধাত্রীমাতাকে গভীর ভক্তিশ্রদ্ধা করিত।

এইভাবে তিন চার বছর কাটিল। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শেষের দিকে অনাদি হালদার নামে এক ভদ্রলোক পাটনায় আসিলেন। অনাদিবাবু ধনী ব্যবসাদার। তাঁহার ব্যবসায়ের বহু খাতা বহি বাঁধাইবার প্রয়োজন হইয়াছিল, তিনি দপ্তরীকে ডাকিয়া পাঠাইলেন। দপ্তৱী প্ৰভাতকে তাঁহার বাসায় পাঠাইয়া দিল। অনেক খাতা পত্র, দপ্তরীর দোকানে সব বহন করিয়া লইয়া যাওয়া সুবিধাজনক নয়। প্রভাত নিজের যন্ত্রপাতি লইয়া অনাদিবাবুর বাসায় আসিল এবং কয়েক দিন ধরিয়া তাঁহার খাতা বহির মলাট বাঁধিয়া দিল।

অনাদিবাবু অকৃতদার ছিলেন। প্রভাতকে দেখিয়া বোধ হয় তাঁহার ভাল লাগিয়া গিয়াছিল, তিনি একদিন ননীবালার বাসায় আসিয়া প্রস্তাব করিলেন তিনি প্রভাতকে পোষ্যপুত্র গ্রহণ করিতে চান।

এতবড় ধনী ব্যক্তির পোষ্যপুত্র হওয়া ভাগ্যের কথা; কিন্তু ননীবালা এক কথায় প্রভাতকে ছাড়িয়া দিতে রাজী হইলেন না। প্ৰভাতও মাকে ছাড়িতে চাহিল না। তখন রফা হইল, প্ৰভাতের সঙ্গে ননীবালাও অনাদিবাবুর সংসারে থাকিবেন, নারীবর্জিত সংসারে ননীবালাই সংসার পরিচালনা করিবেন।

ননীবালা হাসপাতালের চাকরি হইতে অবসর লাইলেন। অনাদি হালদারও কর্মজীবন হইতে প্রায় অবসর লইয়াছিলেন, তিনজনে কলিকাতায় আসিলেন। সে আজ প্রায় দেড় বছর আগেকার কথা। সেই অবধি তাঁহারা বহুবাজারের একটি ভাড়াটে বাড়ির দ্বিতলে বাস করিতেছেন। যুদ্ধের বাজারে ভাল বাসা পাওয়া যায় না। কিন্তু অনাদিবাবু তাঁহার বাসার পাশেই একটি পুরাতন বাড়ি কিনিয়াছেন এবং তাহা ভাঙ্গিয়া নূতন বাড়ি তৈরি করাইতেছেন। বাড়ি তৈরি হইলেই তাঁহার নূতন বাড়িতে উঠিয়া যাইবেন।

অনাদিবাবুর এক বড় ভাই ছিলেন, তিনি কলিকাতায় সাবেক বাড়িতে বাস করিতেন। ভায়ের সহিত অনাদিবাবুর সদ্ভাব ছিল না, কোনও সম্পর্কই ছিল না। ভাই প্রায় দশ বছর পূর্বে মারা গিয়াছেন, কিন্তু তাঁহার দুই পুত্ৰ আছে—নিমাই ও নিতাই। অনাদিবাবু কলিকাতায় আসিয়া বাসা লাইলে তাহারা কোথা হইতে সন্ধান পাইল এবং তাঁহার কাছে যাতায়াত শুরু করিল।

ননীবালার মতে নিমাই ও নিতাই পাকা শয়তান, মিটমিটে ডান, ছেলে খাওয়ার রাক্ষস। কাকা পোষ্যপুত্ৰ লইলে কাকার অতুল সম্পত্তি বেহাত হইয়া যাইবে, তাই তাহারা কাকাকে বশ করিয়া দত্তক গ্ৰহণ নাকচ করাইতে চায়। অনাদিবাবু ভ্রাতুষ্পপুত্রদের মতলব বুঝিয়া কিছুদিন আমোদ অনুভব করিয়াছিলেন, কিন্তু ক্ৰমে তিনি উত্ত্যক্ত হইয়া উঠিলেন। মাস কয়েক আগে তিনি ভাইপোদের বলিয়া দিলেন তাহারা যেন তাঁহার গৃহে পদার্পণ না করে।

নিমাই ও নিতাই কাকার বাসায় আসা বন্ধ করিল বটে‌, কিন্তু আশা ছাড়িল না। অনাদিবাবু প্ৰভাতকে একটি বইয়ের দোকান করিয়া দিয়াছিলেন; কলেজ স্ট্রীটের এক কোণে ছোট্ট একটি দোকান। প্ৰভাত লেখাপড়া শেখে নাই বটে‌, কিন্তু সে বই ভালবাসে; এই দোকানটি তাহার প্ৰাণ। সে প্রত্যহ দোকানো যায়‌, নিজের হাতে বই বিক্রি করে। নিতাই ও নিমাই তাহার দোকানে যাতায়াত আরম্ভ করিল। বই কিনিত না‌, কেবল চক্ষু মেলিয়া প্ৰভাতের পানে চাহিয়া থাকিত; তারপর নীরবে দোকান হইতে বাহির হইয়া যাইত।

তাহাদের চোখের দৃষ্টি বাঘের দৃষ্টির মত ভয়ানক। তাহারা মুখে কিছু বলিত না‌, কিন্তু তাহাদের মনের অভিপ্রায় প্ৰভাতের জানিতে বাকী থাকিত না। প্ৰভাত ভােলমানুষ ছেলে‌, সে ভয় পাইয়া ননীবালাকে আসিয়া বলিল; ননীবালা অনাদিবাবুকে বলিলেন। অনাদিবাবু এক গুখা নিয়োগ করিলেন‌, যতক্ষণ দোকান খোলা থাকিবে ততক্ষণ গুর্খা কুকীরি লইয়া দোকান পাহারা দিবে।

ভ্রাতুষ্পপুত্র যুগলের দোকানে আসা বন্ধ হইল। কিন্তু তবু প্ৰভাত ও ননীবালার ভয় দূর হইল। না। সর্বদাই যেন দু’জোড়া অদৃশ্য চক্ষু তাঁহাদের উপর লক্ষ্য রাখিয়ছে‌, তাঁহাদের গতিবিধি অনুসরণ করিতেছে।

তা ছাড়া আর একটা ব্যাপার লইয়া বাড়িতে অশান্তি দেখা দিয়াছে। একটি মেয়েকে দেখিয়া প্ৰভাতের ভাল লাগিয়াছিল; মেয়েটি পূর্ববঙ্গ হইতে উদ্বাস্তু একটি পরিবারের মেয়ে‌, খুব ভাল গান বাজনা জানে‌, দেখিতে সুন্দরী। কোন এক সভায় প্রভাত মেয়েটিকে গান গাহিতে শুনিয়াছিল এবং তাহার কথা ননীবালাকে বলিয়াছিল। অনাদিবাবু প্ৰভাতের জন্য পাত্রী খুঁজিতেছিলেন‌, ননীবালার মুখে এই মেয়েটির কথা শুনিয়া বলিলেন‌, তিনি নিজে মেয়ে দেখিয়া আসিবেন এবং পছন্দ হইলে বিবাহ দিবেন।

অনাদিবাবু মেয়ে দেখিয়া আসিলেন এবং বলিলেন‌, এ মেয়ের সঙ্গে প্ৰভাতের বিবাহ হইতে পারে না। তিনি কোনও কারণ প্ৰদৰ্শন করিলেন না‌, কিন্তু ননীবালার বিশ্বাস এ ব্যাপারে নিমাই ও নিতাইয়ের হাত আছে। সে যাই হোক‌, ইহার পর হইতে ভিতরে ভিতরে যেন একটা নূতন গণ্ডগোল শুরু হইয়াছে। ননীবালা ভীত হইয়া উঠিয়াছেন। বর্তমান ডামাডোলের সময় প্রভাতের যদি কোনও দুর্ঘটনা হয়? যদি গুণ্ডা ছুরি মারে? নিমাই ও নিতাইয়ের অসাধ্য কাজ নাই। এখন ব্যোমকেশবাবু কোনও প্রকারে প্রভাতের জীবনরক্ষা করুন।

ব্যোমকেশ চোখ বুজিয়া ননীবালার অসংবদ্ধ বাক্যবহুল উপাখ্যান শুনিতেছিল‌, উপাখ্যান শেষ হইলে চোখ মেলিল। বিরক্তি চাপিয়া যথাসম্ভব শিষ্টভাবে বলিল‌, ‘মিস রায়‌, এ ধরনের ব্যাপারে। আমি কি করতে পারি? আপনার সন্দেহ যদি সত্যিও হয়‌, আমি তো আপনার ছেলের পেছনে সশস্ত্র প্রহরীর মত ঘুরে বেড়াতে পারি না। আমার মনে হয় এ অবস্থায় পুলিসের কাছে যাওয়াই ভালো।’

ননীবালা বলিলেন‌, ‘পুলিসের কথা অনাদিবাবুকে বলেছিলুম‌, তিনি ভীষণ রেগে উঠলেন; বললেন-এ নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটির দরকার নেই‌, তোমাদের যদি এতাই প্ৰাণের ভয় হয়ে থাকে। পাটনায় ফিরে যাও।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘তাহলে আর কি করা যেতে পারে আপনিই বলুন।’

ননীবালার স্বর কাদো-কাঁদো হইয়া উঠিল‌, ‘আমি কি বলব‌, ব্যোমকেশবাবু। আপনি একটা উপায় করুন। প্রভাত ছাড়া আমার আর কেউ নেই-আমি অবলা স্ত্রীলোক–’ বলিয়া আচল দিয়া চোখ মুছিতে লাগিলেন।

ননীবালার চেহারা দেখিয়া যদিও কেহই তাঁহাকে অবলা বলিয়া সন্দেহ করিবে না‌, তবু তাঁহার হৃদয়টি যে অসহায়া রমণীর হৃদয় তাহা স্বীকার করিতে হয়। পালিত পুত্রকে তিনি গর্ভের সন্তানের মতাই ভালবাসেন এবং তাহার অমঙ্গল আশঙ্কা করিয়া অতিমাত্রায় ভীত হইয়া পড়িয়াছেন। আশঙ্কা হয়তো অমূলক‌, কিন্তু তবু তাহা উপেক্ষা করা যায় না।

কিছুক্ষণ বিরাগপূর্ণ চক্ষে ননীবালার অশ্রু-বিসর্জন নিরীক্ষণ করিয়া ব্যোমকেশ হঠাৎ রুক্ষস্বরে বলিল‌, ‘ভাইপো দুটো থাকে কোথায়?

ননীবালা আচল হইতে আশান্বিত চোখ বাহির করিলেন‌, ‘তারা নেবুতলায় থাকে। আপনি কি–?’

‘ঠিকানা কি? কত নম্বর?’

‘তা তো আমি জানি না‌, প্ৰভাত জানে। আপনি কি তাদের কাছে যাবেন, ব্যোমকেশবাবু? যদি আপনি ওদের খুব করে ধমকে দেন তাহলে ওরা ভয় পাবে—’

‘আমি তাদের ধমকাতে গেলে তারাই হয়তো উল্টে আমাকে ধমকে দেবে। আমি তাদের একবার দেখব। দেখলে আন্দাজ করতে পারব তাদের মনে কিছু আছে কিনা। তাদের ঠিকানা প্রভাত জানে? প্ৰভাতের ঠিকানা‌, অর্থাৎ আপনাদের বাড়ির ঠিকানা কি?’

‘বাড়ির নম্বর ১৭২/২‌, বৌবাজার স্ট্রীট। কিন্তু সেখানে-বাড়িতে আপনি না গেলেই ভাল হয়। অনাদিবাবু—‘

‘অনাদিবাবু পছন্দ না করতে পারেন। বেশ‌, তাহলে। প্ৰভাতের দোকানের ঠিকানা বলুন।’

‘প্ৰভাতের দোকান–ঠিকানা জানি না–কিন্তু নাম জীবন-প্ৰভাত। ওই যে গোলদীঘির কাছে‌, দোরের ওপর মস্ত সাইনবোর্ড টাঙানো আছে—‘

ব্যোমকেশ উঠিয়া দাঁড়াইল‌, ক্লান্ত শুষ্ক স্বরে বলিল‌, ‘বুঝেছি। আপনি এখন আসুন তাহলে। যদি কিছু খবর থাকে জানতে পারবেন।’

ননীবালা বোধ করি একটু ক্ষুন্ন হইয়াই প্রস্থান করিলেন। ব্যোমকেশ একবার কড়িকাঠের দিকে চোখ তুলিয়া বলিল‌, ‘জগতের মাঝে কত বিচিত্ৰ তুমি হে‌, তুমি বিচিত্ররূপিণী।’

সেদিন সায়ংকালে ব্যোমকেশ একটি শারদীয়া পত্রিকা লইয়া নাড়াচাড়া করিতেছিল‌, হঠাৎ পত্রিকা ফেলিয়া বলিল‌, ‘চল‌, একটু বেড়িয়ে আসা যাক।’

সম্মুখ সমর আরম্ভ হইবার পর হইতে আমরা সন্ধ্যার পর বাড়ির বাহির হওয়া বন্ধ করিয়াছিলাম‌, নেহাৎ দায়ে না ঠেকিলে বাহির হইতাম না। জিজ্ঞাসা করিলাম‌, ‘কোথায় বেড়াতে যাবে?’

সে বলিল‌, ‘জীবন-প্ৰভাতের সন্ধানে।’

দু’টি মোটা লাঠি যোগাড় করিয়া রাখিয়ছিলাম‌, হাতে লইয়া দু’জনে বাহির হইলাম। ননীবালার উপর ব্যোমকেশের মন যতাই অপ্ৰসন্ন হোক তাঁহার কাহিনী ভিতরে ভিতরে তাহাকে আকর্ষণ করিয়াছে।

গোলদীঘি আমাদের বাসা হইতে বেশি দূর নয়‌, সেখানে পৌঁছিয়া ফুটপাথের উপর এক পাক দিতেই মস্ত সাইনবোর্ড চোখে পড়িল। দোকানটি কিন্তু সাইনবোর্ডের অনুপাতে ছোটই বলিতে হইবে‌, সাইনবোর্ডের তলায় প্রায় চাপা পড়িয়া গিয়াছে। রাস্তার ধারে একটি ঘর‌, তাহার পিছনে একটি কুঠুরি। সদরে দ্বারের পাশে বেঁটে এবং বঙ্কিমচক্ষু গুর্খা দণ্ডায়মান।

দোকানে প্রবেশ করিলাম; শুখা একবার তির্যক নেত্রপাত করিল‌, কিছু বলিল না‌, দেখিলাম ঘরের দেয়ালগুলি কড়িকাঠ পর্যন্ত বই দিয়া ঠাসা; তাহাতে ঘরের আয়তন আরও সঙ্কীর্ণ হইয়াছে। তাকের উপর একই বই দশ বারোটা করিয়া পাশাপাশি সাজানো। বিভিন্ন প্ৰকাশকের বই‌, নিজের প্রকাশন বোধ হয় কিছু নাই। আমার বইও দুই তিনখানা রহিয়াছে।

কিন্তু দোকানদারকে ঘরে দেখিতে পাইলাম না‌, কাউন্টারে কেহ নাই।

কাউন্টারের পিছনে কুঠুরির দরজা ঈষৎ ফাঁক হইয়া আছে। ফাঁক দিয়া যতটুকু দেখা যায় দেখিলাম, তাহার মধ্যে একটি ছোট তক্তপোশ পাতা রহিয়াছে এবং তক্তপোশের উপর বসিয়া একটি যুবক হেঁট মুখে বইয়ের মলাট বাঁধতেছে। মাথার উপর আবরণহীন বৈদ্যুতিক বালব‌, চারিদিকে কাগজ পিজবোর্ড লেইয়ের মালসা কাগজ কাটিবার ভীষণদর্শন ছোরা প্রভৃতি ছড়ানো। তাহার মধ্যে বসিয়া যুবক তন্ময়চিত্তে মলাট বাঁধিতেছে।

ব্যোমকেশ একটু জোরে গলা খাঁকারি দিল। যুবক ঘাড় তুলিল‌, ছেড়া ন্যাকড়ায় আঙুলের লেই মুছতে মুছতে আসিয়া কাউন্টারের পিছনে দাঁড়াইল; কোনও প্রশ্ন করিল না‌, জিজ্ঞাসু নেত্ৰে আমাদের পানে চাহিয়া রহিল।

এইবার তাহাকে ভাল করিয়া দেখিলাম। বাংলা দেশের শত সহস্ৰ সাধারণ যুবক হইতে তাহার চেহারায় বিশেষ কোন পার্থক্য নাই। দেহের দৈর্ঘ্য আন্দাজ সাড়ে পাঁচ ফুট‌, গায়ের রঙ তামাটে ময়লা; মুখ ও দেহের কাঠামো একটু শীর্ণ। ঠোঁটের উপর গোঁফের রেখা এখনও পুষ্ট হয় নাই; দাঁতগুলি দেখিতে ভাল কিন্তু তাহাদের গঠন যেন একটু বন্য ধরনের‌, হয়তো আদিম মাতৃরক্তের নিদর্শন। চোখের দৃষ্টিতে সামান্য একটু অন্যমনস্কতার আভাস‌, কিন্তু ইহা মনের অভিব্যক্তি নয়‌, চোখের একটা বিশেষ গঠনভঙ্গী। মাথার চুল ঈষৎ রুক্ষ ও ঝাঁকড়া‌, চুলের যত্ন নাই। পরিধানে গলার বোতামখোলা টিলা আস্তিনের পাঞ্জাবি। সব মিলিয়া যে চিত্রটি তৈয়ারি হইয়াছে তাহা নিতান্ত মামুলী এবং বিশেষত্বহীন।

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘আপনি জীবন-প্ৰভাতের মালিক প্রভাত কুমার রায়?’

যুবক বলিল‌, ‘আমার নাম প্রভাত হালদার।’

‘ও-হাঁ-ঠিক কথা। আপনি যখন অনাদিবাবুর—’ ব্যোমকেশ একটু ইতস্তত করিল।

‘পুষ্যিপুত্তুর।’ প্রভাত নির্লিপ্তকণ্ঠে ব্যোমকেশের অসমাপ্ত কথা পূরণ করিয়া দিল‌, তারপর ব্যোমকেশকে প্রশ্ন করিল‌, ‘আপনি কে?’

‘আমাৰ নাম ব্যোমকেশ বক্সী।’

প্রভাত এতক্ষণে একটু সজীব হইয়া ব্যোমকেশকে নিরীক্ষণ করিল‌, তারপর আমার দিকে দৃষ্টি ফিরাইল।

‘আপনি তাহলে অজিতবাবু?’

ব্যোমকেশকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করিয়া প্রভাত আমার সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইল‌, সসন্ত্ৰম আগ্রহে বলিল‌, নমস্কার। আমি আপনার কাছে একবার যাব।’

‘আমার কাছে?’

‘হ্যাঁ। আমার একটু দরকার আছে। আপনার ঠিকানা–?’

ঠিকানা দিয়া বলিলাম‌, ‘আসবেন। কিন্তু আমার সঙ্গে কী দরকার থাকতে পারে ভেবে পাচ্ছি না।ʼ

‘সে কথা তখন বলব।–তা এখন কি চাই বলুন। আমার কাছে নতুন বই ছাড়াও ভালো ভালো পুরনো বই আছে; পুরনো বই বাঁধিয়ে বিক্রি করি। সে সব বই অন্য দোকানে পাবেন না।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘আপাতত আপনার কাছে নিমাই আর নিতাইয়ের ঠিকানা নিতে এসেছি।’

প্রভাত ব্যোমকেশের দিকে ফিরিল, কয়েকবার চক্ষু মিটিমিটি করিয়া যেন এই নূতন প্রসঙ্গ হৃদয়ঙ্গম করিয়া লইল; তারপর বলিল‌, ‘নিমাই নিতাইয়ের ঠিকানা? তারা থাকে–’ প্ৰভাত ঠিকানা দিল‌, মধুবড়াল লেনের একটা নম্বর। কিন্তু আমরা কেন নিতাই ও নিমাইয়ের ঠিকানা চাই সে বিষয়ে কোনও কৌতুহল প্রকাশ করিল না।

‘ধন্যবাদ।’

‘আসুন। আমি কিন্তু একদিন যাব।’

‘আসবেন।’

দোকান হইতে বাহির হইলাম। তখনও বেশ বেলা আছে; শীতের সন্ধ্যা নারিকেল ছোবড়ার আগুনের মত ধীরে ধীরে জ্বলে‌, সহজে নেভে না। ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘চল‌, নিমাই নিতাইকে দেখে যাই। কাছেই তো।’ কিছুক্ষণ চলিবার পর বলিল‌, ‘প্ৰভাত নিজেই বই বাঁধে‌, পুরনো বিদ্যে ছাড়তে পারেনি। ছেলেটা কেমন যেন মেদামারা-কিছুতেই চাড় নেই।’

বলিলাম‌, ‘আমার সঙ্গে কী দরকার কে জানে?’

ব্যোমকেশ চোখ বাঁকাইয়া আমার পানে চাহিল‌, বলিল‌, ‘তা এখনও বোঝোনি? তোমার বই ছাপতে চায়। বোধ হয় প্রোথিতযশা কোন লেখক ওকে বই দেননি। এখন তুমি ভরসা।’

বলিলাম‌, ‘প্রেথিতযশা নয়-প্রথিতযশা।’

সে মুখ টিপিয়া হাসিল; বুঝিলাম ভুলটা ইচ্ছাকৃত। বলিলাম‌, যাহোক‌, তবু ওর বই ছাপার দিকে ঝোঁক আছে। লেখাপড়া না জানলেও সাহিত্যের কদর বোঝে। সেটা কম কথা নয়।’

ব্যোমকেশ খানিক চুপ করিয়া রহিল‌, তারপর যেন বিমনাভাবে বলিল‌, ‘প্যাঁচা কয় প্যাঁচানী‌, খাসা তোর চ্যাঁচানি।’

আজকাল ব্যোমকেশ আচমকা এমন অসংলগ্ন কথা বলে যে তাহার কোনও মানে হয় না।

মধু বড়ালের গলিতে উপস্থিত হইলাম। গলিটি আজকার নয়‌, বোধ করি জব চার্নকের সমসাময়িক। দু’ পাশের বাড়িগুলি ইষ্টক-দস্তুর‌, পরস্পরের গায়ে ঠেস দিয়া কোনওক্রমে খাড়া আছে।

একটি বাড়ির দরজার মাথায় নম্বর দেখিয়া বুঝিলাম। এই বাড়ি। জীৰ্ণ বটে। কিন্তু বাঁধানো-দাঁত চুলে-কলাপ-দেওয়া বৃদ্ধের মত বাহিরের ঠাট বজায় রাখিবার চেষ্টা আছে। সদর দরজা একটু ফাঁক হইয়া ছিল‌, তাহার ভিতর দিয়া সরু গলির মত একটা স্থান দেখা গেল। লোকজন কেহ নাই।

আমাকে অনুসরণ করিতে ইঙ্গিত করিয়া ব্যোমকেশ ভিতরে প্রবেশ করিল। সুড়ঙ্গের মত পথটি যেখানে গিয়া শেষ হইয়াছে সেখানে ডান দিকে একটি ঘরের দরজা। আমরা দরজার সামনে গিয়া দাঁড়াইয়া পড়িলাম।

আবছায়া একটি ঘর। তাহাতে অসংখ্য আসবাব ঠাসা‌, আলমারি টেবিল চেয়ার সোফা তক্তপোশ‌, নড়িবার ঠাঁই নাই। সমস্ত আসবাব পুরনো‌, একটিরও বয়স পঞ্চাশের কম নয়; দেখিলে মনে হয় ঘরটি পুরাতন আসবাবের গুদাম। তাহার মাঝখানে রঙ-চটা জাজিম-পাতা তক্তপোশের উপর বসিয়া দুইটি মানুষ বন্দুক পরিষ্কার করিতেছে। দুনলা ছররা বন্দুক‌, কুঁদার গায়ে নানাপ্রকার চিত্রবিচিত্র আঁকা দেখিয়া মনে হয় বন্দুকটিও সাবেক আমলের। একজন তাহার যন্ত্রে তেল লাগাইতেছে‌, অন্য ব্যক্তি নলের ভিতর গজ চালাইয়া পরিষ্কার করিতেছে।

মানুষ দু’টির চেহারা একরকম‌, বয়স একরকম‌, ভাবভঙ্গী একরকম; একজনের বর্ণনা করিলে দু’জনের বর্ণনা করা হইয়া যায়। বয়স ত্ৰিশের আশে পাশে‌, দোহারা ভারী গড়নের নাডুগোপাল চেহারা‌, মেটে মেটে রঙ‌, চোখের চারিপাশে চর্বির বেষ্টনী মুখে একটা মোঙ্গলীয় ভাব আনিয়া দিয়াছে‌, মাথার চুল ছোট এবং সমান করিয়া ছাঁটা। পরিধানে লুঙ্গি ও ফতুয়া। তফাত যে জুলাই তা নয়‌, কিন্তু যৎসামান্য। ইহরাই যে নিমাই নিতাই তাহাতে তিলমাত্র সন্দেহ রহিল না।

আমরা দ্বার পর্যন্ত পৌঁছিতেই তাহারা একসঙ্গে চোখ তুলিয়া চাহিল। দুই জোড়া ভয়ঙ্কর চোখের দৃষ্টি আমাদের যেন ধাক্কা দিয়া পিছনে ঠেলিয়া দিল। তারপর যুগপৎ প্রশ্ন হইল‌, ‘কি চাই?’

কড়া সুর‌, শিষ্টতার লেশমাত্র তাহাতে নাই। আমি অসহায়ভাবে ব্যোমকেশের মুখের পানে চাহিলাম। ব্যোমকেশ সহজ সৌজন্যের সহিত বলিল‌, ‘এটা কি অনাদি হালদারের বাড়ি?’

ক্ষণকালের জন্য দুই ভাই যেন বিমূঢ় হইয়া গেল। পরস্পরের প্রতি সপ্রশ্ন দৃষ্টিপাত করিয়া সমস্বরে বলিয়া উঠিল‌, ‘না।’

ব্যোমকেশ আবার প্রশ্ন করিল‌, ‘অনাদিবাবু এখানে থাকেন না?’

কড়া উত্তর—‘না।’

ব্যোমকেশ যেন লজ্জিত হইয়া বলিল‌, ‘দেখছি ভুল ঠিকানা পেয়েছি। এ বাড়িতে কি অনাদিবাবুর কোনও আত্মীয় থাকেন? আপনারা কি–’

দুই ভাই আবার দৃষ্টি বিনিময় করিল। একজন বলিল‌, ‘সে খবরে কী দরকার?’

‘দরকার এই যে‌, আপনারা যদি তাঁর আত্মীয় হন তাহলে তাঁর ঠিকানা দিতে পারবেন।’

উত্তর হইল‌, ‘এখানে কিছু হবে না। যেতে পারেন।’

ব্যোমকেশ কিছুক্ষণ স্থির নেত্রে তাঁহাদের পানে চাহিয়া রহিল‌, তারপর একটু বাঁকা সুরে বলিল‌, ‘আপনাদের বন্দুক আছে দেখছি। আশা করি লাইসেন্স আছে।’

আমরা ফিরিয়া চলিলাম। দুই ভ্রাতার নির্নিমেষ দৃষ্টি আমাদের অনুসরণ করিল।

বাহিরে আসিয়া হাফ ছাড়িলাম—’কি অসভ্য লোক দুটো।’

বাসার দিকে ফিরিয়া চলিতে চলিতে ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘অসভ্য নয়‌, সাবধানী। এখানে এক জাতের লোক আছে তারা কলকাতার পুরনো বাসিন্দা; আগে বড় মানুষ ছিল‌, এখন অবস্থা পড়ে গেছে; নিজেদের উপার্জনের ক্ষমতা নেই‌, পূর্বপুরুষেরা যা রেখে গিয়েছিল। তাই আঁকড়ে বেঁচে আছে। পচা বাড়ি ভাঙা আসবাব ছেড়া কাঁথা নিয়ে সাবেক চাল বজায় রাখবার চেষ্টা করছে। তাদের সাবধানতার অস্ত নেই; বাইরের লোকের সঙ্গে মেশে না‌, পাশে ছেড়া কাঁথাখানি কেউ ফাঁকি দিয়ে নেয়। দু-চারটি সাবেক বন্ধু ও আত্মীয় ছাড়া কারুর সঙ্গে ওরা সম্পর্ক রাখে না; কেউ যদি যেচে আলাপ করতে যায়‌, তাকে সন্দেহ করে‌, ভাবে বুঝি কোনও কু-মতলব আছে। তাই অপরিচিত লোকের প্রতি ওদের ব্যবহার স্বভাবতাই রূঢ়। ওরা একসঙ্গে ভীরু এবং কটুভাষী, লোভী এবং সংযমী। ওরা অদ্ভুত জীব।’

জিজ্ঞাসা করিলাম‌, ‘এ দু’টি ভাইকে কেমন দেখলে?’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ননীবালা দেবী মিথ্যা বলেননি। এক জোড়া বেড়াল; তবে শুকনো বেড়াল নয়‌, ভিজে বেড়াল।’

জিজ্ঞাসা করিলাম‌, ‘ওদের দ্বারা প্ৰভাতের অনিষ্ট হতে পারে তোমার মনে হয়?’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘ঘরের বেড়াল বনে গেলে বন-বেড়াল হয়। স্বার্থে ঘা লাগলে ওরাও নিজ মূর্তি ধারণ করতে পারে।’

সন্ধ্যা ঘন হইয়া আসিতেছে‌, রাস্তার আলো জ্বলিয়াছে। আমরা দ্রুত বাসার দিকে অগ্রসর হইলাম।

পরদিন সকালবেলা ব্যোমকেশ সংবাদপত্র পাঠ শেষ করিয়া কিছুক্ষণ ছটফট করিয়া বেড়াইল‌, তারপর বলিল‌, ‘নেই কাজ তো খৈ ভাজ। চল‌, অনাদি হালদারকে দর্শন করে আসা যাক। ভাইপোদের দর্শন পেলাম‌, আর খুড়োকে দর্শন করলাম না‌, সেটা ভাল দেখায় না।’

বলিলাম‌, ‘ভাইপোদের কাছে তো খুড়োর ঠিকনা চেয়েছিল। খুড়োর কাছে কি চাইবে?’

ব্যোমকেশ হাসিল‌, ‘একটা কিছু মাথায় এসেই যাবে।’

বেলা সাড়ে নটা নাগাদ বাহির হইলাম। বৌবাজারের নম্বরের ধারা কোনদিক হইতে কোনদিকে গিয়াছে জানা ছিল না‌, নম্বর দেখিতে দেখিতে শিয়ালদহের দিকে চলিয়াছি। কিছুদূর চলিবার পর ফুটপাথে বাঁটুল সর্দারের সঙ্গে দেখা হইয়া গেল। ব্যোমকেশ প্রশ্ন করিল‌, ‘কি বাঁটুল‌, এ পাড়াটাও কি তোমার এলাকা?’

বাঁটুল তৈলাক্ত মুখে কেবল হাসিল‌, তারপর পাল্টা প্রশ্ন করিল‌, ‘আপনারা এ পাড়ায় এলেন যে কর্তা? কিছু দরকার আছে নাকি?’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘হ্যাঁ। —১৭২/২ নম্বরটা কোনদিকে বলতে পার?’

বাঁটুলের চোখে চকিত সতর্কতা দেখা দিল। তারপর সে সামলাইয়া লইয়া বলিল‌, ‘১৭২/২ নম্বর? ওই যে নতুন বাড়িটা তৈরি হচ্ছে‌, ওর পাশেই।’

আমরা আবার চলিতে আরম্ভ করিলাম। কিছুদূর গিয়া ফিরিয়া দেখি বাঁটুল তখনও ফুটপাথে দাঁড়াইয়া একদৃষ্টি তাকাইয়া আছে‌, আমাকে ফিরিতে দেখিয়া সে উল্টা মুখে চলিতে আরম্ভ করিল।

আমি বলিলাম‌, ‘ওহে‌, ব্যোমকেশ‌, বাঁটুল–’

সে বলিল‌, ‘লক্ষ্য করেছি। বোধ হয়। ওদের চেনে।’

আরও খানিকদূর অগ্রসর হইবার পর নূতন বাড়ির সম্মুখীন হইলাম। চারিদিকে ভারা বাঁধা‌, মিস্ত্রীরা গাঁথুনির কাজ করিতেছে। একতলার ছাদ ঢালা হইয়া গিয়াছে‌, দোতলার দেয়াল গাঁথা হইতেছে। সম্মুখে কনট্রাকটরের নাম লেখা প্ৰকাণ্ড সাইনবোর্ড। কনট্রাকটরের নাম গুরুদত্ত সিং। সম্ভবত শিখ।

বাড়ি পার হইয়া একটি সঙ্কীর্ণ ইট-বাঁধানো গলি‌, গলির ওপারে ১৭২/২ নম্বর বাড়ি। দোতলা বাড়ি‌, সদর দরজার পাশে সরু এক ফালি দাওয়া; তাহার উপরে তাঁহারই অনুরূপ রেলিং-ঘেরা ব্যালকনি। নীচের দাওয়ায় বসিয়া এক জীর্ণকায় পালিতকেশ বৃদ্ধ থেলো অঁকায় তামাক টানিতেছেন। আমাদের দেখিয়া তিনি হাঁকা হইতে ওষ্ঠাধর বিমুক্ত না করিয়াই চোখ বাঁকাইয়া চাহিলেন।

ব্যোমকেশ জিজ্ঞাসা করিল‌, ‘এটা কি অনাদি হালদারের বাসা?’

বৃদ্ধ হুঁকার ছিদ্র হইতে অধর বিচ্ছিন্ন করিয়া খিঁচাইয়া উঠিলেন‌, ‘কে অনাদি হালদার আমি কি জানি! এ আমার বাসা-নীচের তলায় আমি থাকি।’

ব্যোমকেশ বিনীত স্বরে বলিল‌, ‘আর ওপরতলায়?’

বৃদ্ধ পূর্ববৎ খিঁচাইয়া বলিলেন‌, ‘আমি কি জানি! খুঁজে নাও গে। অনাদি হালদার! যত সব–’ বৃদ্ধ আবার হুঁকায় অধরোষ্ঠ জুড়িয়া দিলেন।

বৃদ্ধ হঠাৎ এমন তেরিয়া হইয়া উঠিলেন কেন বোঝা গেল না। আমরা আর বাক্যব্যয় না। করিয়া ভিতরে প্রবেশ করিলাম। লম্বাটে গোছের একটি ঘর‌, তাহার একপাশে একটি দরজা‌, বোধ হয় নীচের তলার প্রবেশদ্বার; অন্য দিকে এক প্রস্থ সিঁড়ি উপরে উঠিয়া গিয়াছে।

আমরা সিঁড়ি দিয়া উপরে উঠিব। কিনা ইতস্তত করিতেছি‌, এমন সময় সিঁড়িতে দুম দুম শব্দ শুনিয়া চোখ তুলিয়া দেখি‌, ইয়া-লম্বা-চওড়া এক সর্দারজী বাঁকের মোড় ঘুরিয়া নামিয়া আসিতেছেন। অনাদি হালদারের বাসা সম্বন্ধে অনেকটা নিশ্চিন্ত হওয়া গেল‌, কারণ ইনি নিশ্চয় কনট্রাকটর গুরুদত্ত সিং। তাঁহার পরিধানে মখমলী করুডুরয়ের পাৎলুন ও গ্যাবারডিনের কোট‌, দাড়ি বিনুনি করা‌, মাথায় কান-চাপা পাগড়ি। দুই বাহু মুগুরের মত ঘুরাইতে ঘুরাইতে তিনি নামিতেছেন‌, চক্ষু দু’টিও ঘুরিতেছে। আরও কাছে আসিলে তাঁহার দাড়ি-গোঁফে অবরুদ্ধ বাক্যগুলিও আমাদের কর্ণগোচর হইল। বাক্যগুলি বাঙলা নয়‌, কিন্তু তাহার ভাবাৰ্থ বুঝিতে কষ্ট হইল–’বাংগালী আমার টাকা দেবে না! দেখে নেব কত বড় অনাদি হালদার‌, গলা টিপে টাকা আদায় করব। আমিও পাঞ্জাবী‌, আমার সঙ্গে লারে-লাপপা চলবে না—’ সর্দারজী সবেগে নিষ্ক্রান্ত হইলেন।

ব্যোমকেশ আমার পানে চাহিয়া একটু হাসিল‌, নিম্নস্বরে বলিল‌, ‘অনাদিবাবু দেখছি জনপ্রিয় লোক নয়। এস‌, দেখা যাক।’

সিঁড়ির উর্ধপ্ৰান্তে একটি দরজা‌, ভিতর দিকে অৰ্গলবদ্ধ। ব্যোমকেশ কড়া নাড়িল।

অল্পকাল পরে দরজা একটু ফাঁক হইল‌, ফাঁকের ভিতর দিয়া একটি মুখ বাহির হইয়া আসিল। ভোটুকি মাছের মত মুখ‌, রাঙা রাঙা চোখ‌, চোখের নীচের পাতা শিথিল হইয়া ঝুলিয়া পড়িয়াছে। শিথিল অধরের ফাঁকে নীচের পাটির দাঁতগুলি দেখা যাইতেছে।

রাত্রিকালে এরূপ অবস্থায় এই মুখখানি দেখিলে কি করিতাম বলা যায় না‌, কিন্তু এখন একবার চমকিয়া স্থির হইলাম। ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘অনাদিবাবু-?’

মুখটিতে হাসি ফুটিল‌, চোয়ালের অসংখ্য দাঁত আরও প্রকটিত হইল। ভাঙা ভাঙা গলায় ভেন্টুকি মাছ বলিল‌, ‘না‌, আমি অনাদিবাবু নই‌, আমি কেষ্টবাবু। আপনারাও পাওনাদার নাকি?’

‘না‌, অনাদিবাবুর সঙ্গে আমাদের একটু কাজ আছে।’

এই সময় ভেটকি মাছের পশ্চাতে আর একটি দ্রুত কণ্ঠস্বর শোনা গেল,–’কেষ্টবাবু্‌, সরুন সরুন—’

কেষ্টবাবুর মুণ্ড অপসৃত হইল‌, তৎপরিবর্তে দ্বারের সম্মুখে একটি যুবককে দেখা গেল। ডিগডিগে রোগা চেহারা‌, লম্বা ভূঁচালো চিবুক‌, মাথার কড়া কোঁকড়া চুলগুলি মাথার দুই পাশে যেন পাখা মেলিয়া আছে। মুখে একটা চটপটে ভাব।

‘কি চান আপনারা?’

‘অনাদিবাবুর সঙ্গে দেখা করতে চাই।’

‘কিছু দরকার আছে কি? অনাদিবাবু বিনা দরকারে কারুর সঙ্গে দেখা করেন না।’

‘দরকার আছে বৈ কি! পাশে যে বাড়িটা তৈরি হচ্ছে সেটা বোধ হয় তাঁরই। ওই বাড়ি সম্বন্ধে কিছু জানিবার আছে। আপনি-?’

‘আমি অনাদিবাবুর সেক্রেটারি। আপনারা একটু বসুন‌, আমি খবর দিচ্ছি। এই যে‌, ভেতরে বসুন।’

আমরা সিঁড়ি হইতে উঠিয়া ঘরে প্রবেশ করিলাম। যুবক চলিয়া গেল।

ঘরটি নিরাভরণ‌, কেবল একটি কেঠো বেঞ্চি আছে। আমরা বেঞ্চিতে বসিয়া চারিদিকে চাহিলাম। সিঁড়ির দরজা ছাড়া ঘরে আরও গুটিতিনেক দরজা আছে‌, একটি দিয়া সদরের ব্যালকনি দেখা যাইতেছে‌, অন্য দুইটি ভিতর দিকে গিয়াছে।

কিছুক্ষণ অপেক্ষা করিবার পর দেখিলাম ভিতর দিকের একটি দরজা একটু ফাঁক করিয়া একটি স্ত্রীলোক উঁকি মারিল। চিনিতে কষ্ট হইল না-ননীবালা দেবী। তিনি বোধ হয় রান্না করিতেছিলেন, বাহিরে লোক আসার সাড়া পাইয়া খুন্তি হাতে তদারক করিতে আসিয়াছেন। আমাদের দেখিয়া তিনি সভয়ে চক্ষু বিস্ফারিত করিলেন। ব্যোমকেশ নিজের ঠোঁটের উপর আঙুল রাখিয়া তাঁহাকে অভয় দিল। ননীবালা ধীরে ধীরে সরিয়া গেলেন।

অন্য দরজা দিয়া যুবক বাহির হইয়া আসিল।

‘আসুন।’

যুবকের অনুগামী হইয়া আমরা ভিতরে প্রবেশ করিলাম। একটি ঘরের দরজা ঠেলিয়া যুবক বলিল‌, ‘এই ঘরে অনাদিবাবু আছেন‌, আপনারা ভিতরে যান।’

ঘরে ঢুকিয়া প্রথমটা কিছু ঠাহর হইল না। ঘরে আলো কম‌, আসবাব কিছু নাই‌, কেবল এক কোণে গদির উপর ফরাস পাতা। ফরাসের উপর তাকিয়া ঠেস দিয়া বসিয়া একটি লোক আমাদের দিকে তাকাইয়া আছে। আধা অন্ধকারে মনে হইল একটা ময়াল সাপ কুণ্ডলী পাকাইয়া অনিমেষ চক্ষে শিকারকে লক্ষ্য করিতেছে।

চক্ষু অভ্যস্ত হইলে বুঝিলাম‌, ইনিই অনাদি হালদার বটে; ভাইপোদের সঙ্গে চেহারার সাদৃশ্য খুবই স্পষ্ট। বয়স আন্দাজ পঞ্চাশ; বেঁটে মজবুত চেহারা‌, চোখে মেন্দমণ্ডিত মোঙ্গলীয় বক্রতা। গায়ে বেগুনি রঙের বাল্যাপোশ জড়ানো।

আমরা দ্বারের কাছে দাঁড়াইয়া রহিলাম। অনাদিবাবু স্তিমিত নেত্ৰে চাহিয়া রহিলেন। কিছুক্ষণ এইভাবে কাটিবার পর ব্যোমকেশ নিজেই কথা কহিল‌, ‘আমরা একটু কাজে এসেছি। ইনি অজিত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়‌, পূর্ববঙ্গ থেকে সম্প্রতি এসেছেন‌, কলকাতায় বাড়ি কিনে বাস করতে চান।’

অনাদিবাবু এবার কথা বলিলেন। আমাদের বসিতে বলিলেন না‌, স্বভাব-রুক্ষ স্বরে ব্যোমকেশকে প্রশ্ন করিলেন‌, ‘তুমি কে?’

ব্যোমকেশের চক্ষু প্রখর হইয়া উঠিল‌, কিন্তু সে সহজভাবে বলিল‌, ‘আমি এঁর এজেন্ট। জানতে পারলাম আপনি পাশেই বাড়ি তৈরি করাচ্ছেন‌, ভাবলাম হয়তো বিক্রি করতে পারেন। তাই—’

অনাদিবাবু বলিলেন, ‘আমি নিজে বাস করব বলে বাড়ি তৈরি করাচ্ছি, বিক্রি করবার জন্যে নয়।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘তা তো বটেই। তবে আপনি ব্যবসাদার লোক‌, ভেবেছিলাম লাভ পেলে ছেড়ে দিতে পারেন।’

‘আমি দালালের মারফতে ব্যবসা করি না।’

‘বেশ তো‌, আপনি অজিতবাবুর সঙ্গে কথা বলুন‌, আমি সরে যাচ্ছি।’

‘না‌, কারুর সঙ্গে বাড়ির আলোচনা করতে চাই না। আমি বাড়ি বিক্রি করব না। তোমরা যেতে পারো।’

অতঃপর আর দাঁড়াইয়া থাকা যায় না। এই অত্যন্ত অশিষ্ট লোকটার সঙ্গ আমার অসহ্য বোধ হইতেছিল‌, কিন্তু ব্যোমকেশ নির্বিকার মুখে বলিল‌, ‘কিছু মনে করবেন না‌, বাড়িটা তৈরি করাতে আপনার কত খরচ হবে বলতে বাধা আছে কি?’

অনাদিবাবুর রুক্ষ স্বর আরও কর্কশ হইয়া উঠিল‌, ‘বাধা আছে।–ন্যাপা! ন্যাপা! বিদেয় কর‌, এদের বিদেয় কর—’

সেক্রেটারি যুবকের নাম বোধ করি ন্যাপা‌, সে দ্বারের বাহিরেই দাঁড়াইয়া ছিল‌, মুণ্ড বাড়াইয়া ত্বরান্বিত স্বরে বলিল‌, ‘আসুন‌, চলে আসুন–’

মানসিক গলা-ধাক্কা খাইয়া আমরা বাহিরে আসিলাম। যুবক সিঁড়ির মুখ পর্যন্ত আমাদের আগাইয়া দিল‌, একটু লজ্জিত হ্রস্বকণ্ঠে বলিল‌, ‘কিছু মনে করবেন না‌, কর্তার আজ মেজাজ ভাল নেই।’

ব্যোমকেশ তাচ্ছিল্যুভরে বলিল‌, ‘কিছু না। —এস অজিত।’

রাস্তায় বাহির হইয়া আসিলাম। ব্যোমকেশ মুখে যতাই তাচ্ছিল্য দেখাক‌, ভিতরে ভিতরে উষ্ণ হইয়া উঠিয়াছে তাহা তাহার মুখ দেখিলেই বোঝা যায়। কিছুক্ষণ নীরবে চলিবার পর সে আমার দিকে চাহিয়া ক্লিষ্ট হাসিল‌, বলিল‌, ‘দুরকম ছোটলোক আছে-অসভ্য ছোটলোক আর বজাত ছোটলোক। যারা বজাত ছোটলোক তারা শুধু পরের অনিষ্ট করে; আর অসভ্য ছোটলোক নিজের অনিষ্ট করে।’

জিজ্ঞাসা করিলাম‌, ‘অনাদি হালদার কোন শ্রেণীর ছোটলোক?’

‘অসভ্য এবং বজ্জাত দুইই–।’

সেদিন দুপুরবেলা আহারাদির পর একটু দিবানিদ্ৰা দিব। কিনা ভাবিতেছি, দ্বারের কড়া নড়িয়া উঠিল। দ্বার খুলিয়া দেখি ননীবালা দেবী।

ননীবালা শঙ্কিত মুখ লইয়া ঘরে প্রবেশ করিলেন। ব্যোমকেশ ইজিচেয়ারে ঝিমাইতেছিল‌, উঠিয়া বসিল। ননীবালা বলিলেন‌, ‘আজ আপনাদের ও-বাড়িতে দেখে আমার বুকের রক্ত শুকিয়ে গেছল‌, অনাদিবাবু যদি জানতে পারেন যে আমি-’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘বসুন। অনাদিবাবুর জািনবার কোনও সম্ভাবনা নেই। আমরা গিয়েছিলাম তাঁর নতুন বাড়ির খরিদ্দার সেজে। সে যাক‌, আপনি এখন একটা কথা বলুন তো‌, অনাদি হালদার কি রকম লোক? সোজা স্পষ্ট কথা বলবেন‌, লুকোছাপার দরকার নেই।’

ননীবালা কিছুক্ষণ ড্যাবডেবে চোখে ব্যোমকেশের পানে চাহিয়া রহিলেন, তারপর বাঁধ-ভাঙ্গা বন্যার মত শব্দের স্রোত তাঁহার মুখ দিয়া বাহির হইয়া আসিল,–’কি বলব আপনাকে‌, ব্যোমকেশবাবু-চামার! চামার! চোখের চামড়া নেই, মুখের রাশ নেই। একটা মিষ্টি কথা ওর মুখ দিয়ে বেরোয় না‌, একটা পয়সা ওর ট্যাক থেকে বেরোয় না। টাকার আন্ডিল‌, কিন্তু আঙুল দিয়ে জল গলে না। এদিকে উন থেকে চুন খসলে আর রক্ষে নেই‌, দাঁতে ফেলে চিবোবে। আগে একটা বামুন ছিল‌, আমি আসবার পর সেটাকে ছাড়িয়ে দিয়েছে; এই দেড় বছর হাঁড়ি ঠেলে ঠেলে আমার গতরে আর কিছু নেই। কি কুক্ষণে যে প্রভাতকে ওর পুষ্যিপুভুর হতে দিয়েছিলুম! যদি উপায় থাকত হতচ্ছাড়া মিনিসের মুখে নুড়ো জ্বেলে দিয়ে পাটনায় ফিরে যৌতুম।’ এই পর্যন্ত বলিয়া ননীবালা রণক্লান্ত যোদ্ধার মত হাঁপাইতে লাগিলেন।

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘কতকটা এইরকমই আন্দাজ করেছিলাম। প্ৰভাতের সঙ্গে ওর ব্যবহার কেমন?’

ননীবালা একটু থমকিয়া বলিলেন‌, ‘প্ৰভাতকে বেশি ঘটায় না। তাছাড়া প্ৰভাত বাড়িতে থাকেই বা কতক্ষণ। সকাল আটটায় দোকানে বেরিয়ে যায়‌, দুপুরবেলা আধঘণ্টার জন্য একবারটি খেতে আসে‌, তারপর বাড়ি ফেরে একেবারে রাত নটায়। বুড়োর সঙ্গে প্রায় দেখাই হয় না।’

‘বুড়ো দোকানের হিসেবপত্র দেখতে চায় না?’

‘না‌, হিসেব চাইবার কি মুখ আছে‌, দোকান যে প্ৰভাতের নামে। বুড়ো প্ৰথম প্রথম খুব ভালমানুষী দেখিয়েছিল। প্রভাতকে জিজ্ঞেস করল—কী কাজ করবে? প্রভাত বলল—বইয়ের দোকান করব। বুড়ো অমনি পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে দোকান করে দিলে।’

‘হুঁ। ন্যাপা কে? বুড়োর সেক্রেটারি?’

ননীবালা মুখ বাঁকাইয়া বলিলেন‌, ‘সেক্রেটারি না। আরও কিছু-বাজার সরকার। ফাড়ফড় করে ইংরিজি বলতে পারে তাই বুড়ে ওকে রেখেছে। বুড়ো নিজে একবৰ্ণ ইংরিজি জানে না‌, ব্যবসার কথাবার্তা ওকে দিয়ে করায়‌, চিঠিপত্র লেখায়। তাছাড়া বাজার করায়‌, হাত-পা টেপায়। সব করে ন্যাপা।’

‘ভারি কাজের লোক দেখছি।’

‘ভারি ধূর্তু লোক‌, নিজের কাজ গুছিয়ে নিচ্ছে। দু’পাতা ইংরেজি পড়েছে কিনা।’

বুঝিলাম‌, প্রভাত ইংরেজি জানে না‌, ন্যাপা ইংরিজি জানে তাই ননীবালা তাহার প্রতি প্ৰসন্ন নয়।

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘আর কেষ্টবাবু? তিনি কে?’

‘তিনি কে তা কেউ জানে না। বুড়োর আত্মীয় কুটুম্ব নয়‌, জাত আলাদা। আমরা আসবার আগে থাকতে আছে। মাতাল‌, মদ খায়।’

‘তাই নাকি? নিজের পয়সাকড়ি আছে বুঝি?’

‘কিছু নেই। বুড়ো জুতো জামা দেয়। তবে পরে।’

‘তবে মন্দ পায় কোথা থেকে?’

‘মদের পয়সাও বুড়ো দেয়।’

‘আশ্চর্য! এদিকে বলছেন আঙুল দিয়ে জল গলে না–’

‘কি জানি‌, ব্যোমকেশবাবু্‌, আমি কিছু বুঝতে পারি না। মনে হয়। বুড়ো ভয় করে। কেষ্টবাবু মাঝে মাঝে মদ খেয়ে মেজাজ দেখায়‌, বুড়ো কিন্তু কিছু বলে না।’

‘বটে।’ ব্যোমকেশ চিন্তাচ্ছন্ন হইয়া পড়িবার উপক্ৰম করিল।

ননীবালা তখন সাগ্রহে বলিলেন‌, কিন্তু ওদিকের কি হল‌, ব্যোমকেশবাবু? নিমাই নিতাইকে দেখতে গিছলেন নাকি?’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘গিয়েছিলাম। ওরা লোক ভাল নয়। খুড়ো আর ভাইপোদের এ বলে আমায় দ্যাখ ও বলে আমায় দ্যাখ। উচ্ছের ঝাড়‌, ঝাড়ে মূলে তেতো।’

ননীবালা ভীতিকণ্ঠে বলিলেন‌, ‘তবে কি হবে? ওরা যদি প্ৰভাতকে–।’

ব্যোমকেশ ধীরস্বরে বলিল‌, ‘ওরা প্রভাতকে ভালবাসে না‌, তার অনিষ্ট চিন্তাও করতে পারে। কিন্তু আজকালকার এই অরাজকতার দিনেও একটা মানুষকে খুন করা সহজ কথা নয়‌, নেহাৎ মাথায় খুন না চাপলে কেউ খুন করে না। নিমাই আর নিতাইকে দেখে মনে হয় ওরা সাবধানী লোক‌, খুন করে ফাঁসির দড়ি গলায় জড়াবে এমন লোক তারা নয়। আর একটা কথা ভেবে দেখুন। অনাদি হালদার যদি পুষ্যিপুকুর নেবার জন্যে বদ্ধপরিকর হয়ে থাকে তাহলে একটা পুষ্যিপুত্তুরকে মেরে লাভ কি? একটা গেলে অনাদি হালদার আর একটা পুষ্যিপুত্তুর নিতে পারে‌, নিজের সম্পত্তি উইল করে বিলিয়ে দিতে পারে। এ অবস্থায় খুন-খারাপ করতে যাওয়া তো ঘোর বোকামি। বরং–’

ননীবালা বিস্ফারিত চক্ষে প্রশ্ন করিলেন‌, ‘বরং কী?’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘বরং অনাদিবাবুর ভালমন্দ কিছু হলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়।’

ননীবালা কিছুক্ষণ নীরবে চিন্তা করিলেন‌, মনে হইল। এই সম্ভাবনার কথা তিনি পূর্বে চিন্তা করেন নাই। তারপর তিনি উৎসুক মুখ তুলিয়া বলিলেন‌, ‘তাহলে প্ৰভাতের কোনও ভয় নেই?

‘আপনি নিশ্চিন্ত হতে পারেন‌, এ ধরনের বোকামি নিমাই নিতাই করবে না। তবু সাবধানের মার নেই। আমি একটা প্ল্যান ঠিক করেছি‌, এমনভাবে ওদের কড়কে দেব যে ইচ্ছে থাকলেও কিছু করতে সাহস করবে না।

‘কি-কি প্ল্যান ঠিক করেছেন‌, ব্যোমকেশবাবু?’

‘সে আপনার শুনে কি হবে। আপনি আজ বাড়ি যান। যদি বিশেষ খবর কিছু থাকে আমাকে জানাবেন।’

ননীবালা তখন গদগদ মুখে ব্যোমকেশকে প্রচুর ধন্যবাদ জানাইয়া প্ৰস্থান করিলেন। অনাদি হালদারের দ্বিপ্রহরে দিবানিদ্রা দিবার অভ্যাস আছে, সেই ফাঁকে ননীবালা বাড়ি হইতে বাহির হইয়াছেন; বুড়া যদি জাগিয়া উঠিয়া দেখে তিনি বহিৰ্গমন করিয়াছিলেন তাহা হইলে কৈফিয়তের ঠেলায় ননীবালাকে অন্ধকার দেখিতে হইবে।

অতঃপর আমি ব্যোমকেশকে জিজ্ঞাসা করিলাম‌, কী প্ল্যান ঠিক করেছ? আমাকে তো কিছু বলনি।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘বাড়িতে পোস্টকার্ড আছে?’

‘আছে।’

‘বেশ‌, পোস্টকার্ড নাও‌, একখানা চিঠি লেখ। শ্ৰীহরিঃ শরণং লিখতে হবে না‌, সম্বোধনেরও দরকার নেই। লেখ–’আমি তোমাদের উপর নজর রাখিয়াছি।’–ব্যাস‌, আর কিছু না। এবার নিমাই কিংবা নিতাই হালদারের ঠিকানা লিখে চিঠিখানা পাঠিয়ে দাও।’

কয়েকদিন কাটিয়া গিয়াছে।

ননীবালা আর আসেন নাই। প্রভাত ঘটিত ব্যাপার অঙ্কুরেই শুকাইয়া গিয়াছে মনে হয়। কেবল বাঁটুল সদরের সঙ্গে একবার দেখা হইয়াছিল। বাঁটুল আসিয়াছিল একটি রিভলবার আমাদের গছাইবার জন্য। উচিত মূল্যে পাইলে হয়তো কিনিতাম‌, কিন্তু ছয়শত টাকা দিয়া ফ্যাসাদ কিনিবার শখ আমাদের ছিল না। ব্যোমকেশ বাঁটুলকে সিগারেট দিয়া অন্য কথা পাড়িয়াছিল।

‘১৭২/২ বৌবাজার স্ত্রীটের কাউকে চেনো নাকি বাঁটুল?’

‘আজ্ঞে চিনি।’

‘অনাদি হালদারকে জানো?’

‘আজ্ঞে।’

‘সেও কি তোমার–মানে–খাতক নাকি?’

বাঁটুল একটু হাসিয়াছিল‌, অর্ধদগ্ধ সিগারেটটি নিভাইয়া সযত্নে পকেটে রাখিয়া একটু গম্ভীর স্বরে বলিয়াছিল‌, ‘অনাদি হালদার আগে চাঁদা দিত‌, কয়েক মাস থেকে বন্ধ করে দিয়েছে; এখন যদি ওর ভাল-মন্দ কিছু হয়। আমাদের দায়-দোষ নেই।–কিন্তু আপনারা ওকে চিনলেন কি করে? আগে থাকতে জানা শোনা আছে নাকি?’

না‌, সম্প্রতি পরিচয় হয়েছে।’

বাঁটুল অতঃপর আর কৌতুহল প্রকাশ করে নাই‌, কেবল অপ্রাসঙ্গিকভাবে একটি প্রবাদ-বাক্য আমাদের শুনাইয়া দিয়া ধীরে ধীরে প্রস্থান করিয়াছিল—’জলে বাস করে কুমীরের সঙ্গে বিবাদ করলে ভাল হয় না কর্তা।’



কালীপূজার দিন আসিয়া পড়িল। সকাল হইতেই চারিদিকে দুমদাম শব্দ শোনা যাইতেছে। সেগুলি উৎসবের বাদ্যোদ্যম কিংবা সম্মুখ সমরের রণদামামা তাহা নিঃসংশয়ে ঠাহর করিতে না পারিয়া আমরা বাড়িতেই রহিলাম।

সন্ধ্যার পর দীপমালায় নগর শোভিত হইল। রাস্তায় রাস্তায় গলিতে গলিতে বাজি পোড়ানো আরম্ভ হইল; তুবড়ি আতস বাজি ফানুস রঙমশাল‌, সঙ্গে সঙ্গে চীনে পটুক দোদমা। পথে পথে অসংখ্য মানুষ নগর পরিদর্শনে বাহির হইয়াছে; কেহ পদব্রজে‌, কেহ গাড়ি মোটরে। মাথার উপর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার খাঁড়া ঝুলিতেছে‌, কিন্তু কে তাহা গ্রাহ্য করে! হেসে নাও দুদিন বুইতো নয়।

আমরা বাড়ির বাহির হইলাম না‌, জানোলা দিয়া উৎসব শোভা নিরীক্ষণ করিলাম। এজন্য যদি কেহ আমাদের কাপুরুষ বলিয়া বিদ্রুপ করেন। আপত্তি করিব না‌, কিন্তু বলির ছাগশিশুর ন্যায় গলায় ফুলের মালা পরিয়া নিবেধি আনন্দে নৃত্য করিতে আমাদের ঘোর আপত্তি।

রাত্রি গভীর হইতে লাগিল। মধ্য-রাত্রে কালীপূজা‌, উৎসব পুরাদমে চলিয়াছে। আমরা যদিও শক্তির উপাসক নই‌, বুদ্ধির উপাসক‌, তবু মা কালীকে অসন্তুষ্ট করিবার অভিপ্ৰায় আমাদের ছিল না। রাত্রে পলান্ন সহযোগে মহাপ্ৰসাদ ভক্ষণ করিয়া শয়ন করিলাম।

রাত্রি শেষ হইবার পূর্বেই যে প্রভাত ঘটিত ব্যাপার সাপের মত আবার মাথা তুলিবে তাহা তখনও জানিতাম না।

একেবারে ঘুম ভাঙিল। রাত্রি সাড়ে তিনটার সময়। চারিদিক নিস্তব্ধ‌, জানোলা দিয়া বেশ ঠাণ্ডা আসিতেছে। আমি পায়ের তলা হইতে চাদরটা গায়ে জুত করিয়া জড়াইয়া আর এক ঘুম দিবার ব্যবস্থা করিতেছি এমন সময় উৎকট শব্দে ঘুমের নেশা ছুটিয়া গেল।

কে দুদ্দাড় শব্দে দরজা ঠেঙাইতেছে। শয্যায় উঠিয়া বসিয়া ভাবিলাম‌, সম্মুখ সমরের সীমানা আমাদের দরজা পর্যন্ত পৌঁছিয়াছে‌, আজ আর রক্ষা নাই। মোটা লাঠিটা ঘরের কোণে দণ্ডায়মান ছিল‌, সেটা দৃঢ়মুষ্টিতে ধরিয়া শয়নকক্ষ হইতে বাহির হইলাম। যদি মরিতেই হয় লড়িয়া মরিব।

ওদিকে ব্যোমকেশও লাঠি হাতে নিজের ঘর হইতে বাহির হইয়াছিল। সদর দরজা মজবুত বটে। কিন্তু আর বেশিক্ষণ নয়‌, এখনই ভাঙিয়া পড়িবে। আমরা দরজার দু’পাশে লাঠি বাগাইয়া দাঁড়াইলাম।

দুদ্দাড় শব্দ ক্ষণেকের জন্য একবার থামিল‌, সেই অবকাশে একটি ব্যগ্র কণ্ঠস্বর শুনিতে পাইলাম-ও ব্যোমকেশবাবু-একবারটি দরজা খুলুন–’

আমরা বিস্ফারিত চক্ষে পরস্পরের পানে চাহিলাম। পুরুষের গলা‌, কেমন যেন চেনা-চেনা। ব্যোমকেশ প্রশ্ন করিল‌, ‘কে তুমি? নাম বল।’

উত্তর হইল—’আমি–আমি কেষ্ট দাস–শীগগির দরজা খুলুন–’

কেষ্ট দাস! সহসা স্মরণ হইল না‌, তারপর মনে পড়িয়া গেল। অনাদি হালদারের বাড়ির কষ্টবাবু!

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘এত রাত্রে কী চান? সঙ্গে কে আছে?’

‘সঙ্গে কেউ নেই‌, আমি একা–।’

মাত্র একটা লোক এত শব্দ করিতেছিল। সন্দেহ দূর হইল না। ব্যোমকেশ আবার প্রশ্ন করিল ‘এত রাত্রে কী দরকার?

‘অনাদি হালদারকে কে খুন করেছে। দয়া করে দরজা খুলুন। আমার বড় বিপদ।’

হতভম্ব হইয়া আবার দৃষ্টি বিনিময় করিলাম। অনাদি হালদার—!

ব্যোমকেশ আর দ্বিধা করিল না‌, দ্বার খুলিয়া দিল। কেষ্টবাবু টলিতে টলিতে ঘরে প্রবেশ করিলেন। কেষ্টবাবুর চেহারা আলুথালু্‌, ভেটুকি মাছের মত মুখে ব্যাকুলতা। তদুপরি মুখ দিয়া তীব্ৰ মদের গন্ধ বাহির হইতেছে। তিনি থপি করিয়া একটি চেয়ারে বসিয়া পড়িয়া হাঁফাইতে হাঁফাইতে বলিলেন‌, ‘অনাদিকে কেউ গুলি করে মেরেছে। সত্যি বলছি আমি কিছু জানি না। আমি বাড়িতে ছিলাম না-’

ব্যোমকেশ হাত তুলিয়া বলিল‌, ‘ওকথা পরে হবে। আগে আমার একটা কথার জবাব দিন আমাকে আপনি চিনলেন কি করে? ঠিকানা পেলেন কোত্থেকে?’

কেষ্টবাবু কিছুক্ষণ জবুথবু হইয়া বসিয়া রহিলেন‌, তাঁহার ভাবভঙ্গীতে একটু ভিজা-বিড়াল ভাব প্রকাশ পাইল। অবশেষে তিনি জড়িত স্বরে বলিলেন‌, ‘সেদিন আপনারা আমাদের বাসায় গিছলেন‌, আপনাদের দেখে আমার সন্দেহ হয়েছিল। তাই আপনারা যখন‌, ফিরে চললেন তখন আমি আপনাদের পিছু নিয়েছিলাম। এখানে এসে নীচের হোটেলে আপনার পরিচয় পেলাম।’

ব্যোমকেশ কিছুক্ষণ স্থির নেত্রে তাঁহাকে নিরীক্ষণ করিয়া বলিল‌, ‘হুঁ, আপনি দেখছি ভারি হুঁশিয়ার লোক। অনাদি হালদারের কাঁধে চেপে থাকেন কেন?’

কেষ্টবাবু বলিলেন‌, ‘আমি অনাদির ছেলেবেলার বন্ধু–দুরবস্থায় পড়েছি—তাই–’

‘তাই অনাদি হালদার আপনাকে খেতে পরতে দিচ্ছিল‌, এমন কি মদের পয়সা পর্যন্ত যোগাচ্ছিল। খুব গাঢ় বন্ধুত্ব বলতে হবে। —যাক‌, এবার আজকের ঘটনা বলুন। গোড়া থেকে বলুন।’

কেষ্টবাবু অপালক চক্ষে ব্যোমকেশের পানে চাহিয়া রহিলেন‌, তারপর ঈষৎ করুণ স্বরে বলিলেন‌, ‘আপনি দেখছি সবই জানেন। কিন্তু সত্যি বলছি আমি অনাদিকে খুন করিনি। আজ বিকেলবেলা-মানে কাল বিকেলবেলা অনাদির সঙ্গে আমার ঝগড়া হয়েছিল। আমি বলেছিলুম‌, আজ কালীপুজো্‌্‌, আজ আমাকে পঞ্চাশ টাকা দিতে হবে। এই নিয়ে তুমুল ঝগড়া। অনাদি আমাকে দশটা টাকা দিয়ে বলেছিল–এই নিয়ে বেরিয়ে যাও‌, আর আমার বাড়িতে মাথা গলিও না।’

‘কে কে আপনাদের ঝগড়া শুনেছিল?’

‘বাড়িতে ননীবালা আর ন্যাপা ছিল। নীচের তলার ষষ্ঠীবাবুও ঝগড়া শুনেছিল। বারান্দায় বসে তামাক খাচ্ছিল‌, আমি নেমে আসতে আমাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলল-মাথার ওপর দিনরাত শুম্ভ-নিশুম্ভের যুদ্ধ চলেছে—কবে যে পাপ বিদেয় হবে জানি না।’

‘তারপর বলুন।’

‘তারপর রাত্ৰি আন্দাজ একটার সময় আমি ফিরে এলাম। এসে দেখি–’

‘রাত্রি একটা পর্যন্ত কোথায় ছিলেন?’

‘আপনার কাছে লুকোব না‌, শুড়ির দোকানে বসে মদ খেয়েছিলাম—জুয়ার আড্ডায় জুয়া খেলে তিরিশ টাকা জিতেছিলাম—তারপর একটু এদিক ওদিক—‘

‘হুঁ। বাসায় ফিরে কী দেখলেন?’

‘বাসায় ফিরে প্রথমেই দেখি নীচের তলায় ষষ্ঠীবাবুইকো হাতে সিঁড়ির ঘরে পায়চারি করছে। আমাকে দেখে বলে উঠল-ধম্মের কল বাতাসে নড়ে। কিছু বুঝতে পারলাম না। সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে দেখি-সিঁড়ির দরজা ভাঙা!

‘ঘরে ঢুকে দেখলাম বেঞ্চির ওপর প্রভাত আর ন্যাপা বসে আছে‌, ননীবালা দেয়ালে ঠেস দিয়ে মেঝোয় বসেছে। আমাকে দেখে তিনজনে চোখ মেলে তাকিয়ে রইল‌, যেন আগে কখনও দেখেনি। আমি তো অবাক। বললাম-একি‌, তোমরা বসে আছ কেন? কারুর মুখে কথা নেই। তারপর ন্যাপা হঠাৎ লাফিয়ে উঠে আমার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলে উঠল—কেষ্টবাবু্‌, এ আপনার কাজ। আপনি কর্তাকে খুন করেছেন।

‘খুন! আমার তো মাথা ঘুরে গেল। জিজ্ঞেস করলাম-কে? কোথায়? কেন? কেউ উত্তর দিল না। শেষে প্রভাত বলল-ঐ ব্যালকনিতে গিয়ে দেখুন।

‘রাস্তার ধারের ব্যালকনিতে উঁকি মারলাম। অনাদি পড়ে আছে‌, রক্তারক্তি কাণ্ড। বুকে বন্দুকের গুলি লেগেছে। দেখে আমার ভিমি যাওয়ার মত অবস্থা‌, মেঝোয় বসে পড়লাম। মাথার মধ্যে সব গুলিয়ে যেতে লাগল।

‘তারপর কতক্ষণ কেটে গেল জানি না। ওরা তিনজনে চাপা গলায় কথা কইছে‌, কি করা উচিত। তাই নিয়ে তর্ক করছে। ওদের কথা থেকে বুঝতে পারলাম‌, সন্ধ্যের পর ওরা কেউ বাড়ি ছিল না‌, এক অনাদি বাড়িতে ছিল। রাত্ৰি বারোটা নাগাদ ওরা ফিরে এসে দরজায় ধাক্কা দিয়ে সাড়া পেল না। অনেকক্ষণ ধাক্কাধাব্ধির পর ওদের ভয় হল‌, হয়তো কিছু ঘটেছে। ওরা তখন দরজা ভেঙে বাসায় ঢুকে দেখল ব্যালকনিতে অনাদি মরে পড়ে আছে।

‘আমার মাথাটা একটু পরিষ্কার হলে আমি বললাম-তোমরা আমাকে দোষ দিচ্ছ কেন-আমি অনাদিকে খুন করব কেন? অনাদি আমার অন্নদাতা বন্ধু—। ন্যাপা লাফিয়ে উঠে বলল—ন্যাকামি করবেন না। আমি যাচ্ছি পুলিসে খবর দিতে। এই বলে সে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল।

‘আমার ভয় হল। পুলিস এসে আমাকেই ধরবে। ওরা সাক্ষী দেবে আমার সঙ্গে অনাদির ঝগড়া হয়েছিল। আমি আর সেখানে থাকতে পারলাম না‌, উঠে পালিয়ে এলাম। কোথায় যাব। কিছুই জানি না; রাস্তায় নেমে আপনার কথা মনে পড়ল।’—

কিছুক্ষণ কথা হইল না‌, কেষ্টবাবু যেন বিমাইয়া পড়িলেন। কিন্তু লক্ষ্য করিলাম বিমানোর মধ্যে তাঁহার অর্ধনিমীলিত চক্ষু দু’টি বারবার ব্যোমকেশের মুখের উপর যাতায়াত করিতেছে।

ব্যোমকেশ হঠাৎ বলিল‌, ‘আপনি তাহলে অনাদি হালদারকে খুন করেননি।’

কেষ্টবাবু চমকিয়া চক্ষু বিস্ফারিত করিলেন‌, ‘অ্যাঁ! না‌, ব্যোমকেশবাবু্‌, আমি খুন করিনি। আপনিই ভেবে দেখুন‌, অন্যদিকে খুন করে আমার লাভ কি?’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘অনাদি হালদার আপনাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল।’

কেষ্টবাবু বলিলেন‌, ‘সে ওর মুখের কথা‌, রাগের মুখে বলেছিল। আমাকে সত্যি সত্যি তাড়িয়ে দেবার সাহস অনাদির ছিল না।’

‘সাহস ছিল না! অর্থাৎ আপনি অনাদি হালদারের জীবনের কোনও গুরুতর গুপ্তকথা জানেন।’

কেষ্টবাবু কিছুক্ষণ নীরব রহিলেন‌, তারপর ধীরে ধীরে বলিলেন‌, ‘অনাদির সব গুপ্তকথা আমি জানি‌, তাকে আমি ফাঁসিকাঠে লটকাতে পারতাম। কিন্তু ওকথা এখন থাক‌, যদি দরকার হয় পরে কলাব‌, ব্যোমকেশবাবু। এখন আমাকে পুলিসের হাত থেকে বাঁচাবার একটা ব্যবস্থা করুন।’

ব্যোমকেশ একটু চিন্তা করিয়া বলিল‌, ‘আপনাকে যদি বাঁচাতে হয় তাহলে কে সত্যি খুন করেছে সেটা জানা দরকার। ঘটনাস্থলে যেতে হবে।’

কেষ্টবাবু শঙ্কিত হইলেন‌, স্খলিতস্বরে বলিলেন‌, ‘আমাকেও যেতে হবে?’

‘তা যেতে হবে বৈকি। আপনি না গেলে আমি কোন সূত্রে যাব?’

‘কিন্তু‌, সেখানে পুলিস বোধহয় এতক্ষণ এসে পড়েছে—’

ব্যোমকেশ কড়া সুরে বলিল‌, ‘আপনি যদি খুন না করে থাকেন আপনার ভয়টা কিসের?–অজিত‌, তৈরি হয়ে নাও‌, আমরা তিনজনেই যাব।’

কেষ্টবাবু বিহ্বলভাবে বসিয়া রহিলেন‌, আমরা বেশবাস পরিধান করিয়া তৈয়ার হইলাম। বসিবার ঘরে ফিরিয়া আইলে কেষ্টবাবু চেয়ার হইতে কষ্টে উঠিয়া দাঁড়াইয়া বলিলেন, ‘ব্যোমকেশবাবু্‌, আপনার বাড়িতে একটু-হে হে‌, মদ পাওয়া যাবে? একটু হুইস্কি কিম্বা ব্র্যান্ডি‌, হাতে পায়ে যেন বল পাচ্ছি না।’

ব্যোমকেশ বিরক্ত হইয়া বলিল‌, ‘আমি বাড়িতে মদ রাখি না। আসুন।’

অনাদি হালদারের বাসায় যখন পৌঁছিলাম‌, তখন রাত্রি সাড়ে চারটা। কলিকাতা শহর দুপুর রাত্রি পর্যন্ত মাতামাতি করিয়া শেষ রাত্রির গভীর ঘুম ঘুমাইতেছে।

নীচের তলায় সদর দরজা খোলা। সিঁড়ির ঘরে কেহ নাই। ষষ্ঠীবাবু বোধ করি ক্লান্ত হইয়া শুইতে গিয়াছেন। সিঁড়ি দিয়া উপরে উঠিয়া দেখিলাম‌, দরজার হুড়ক ভাঙা; কবাট ভাঙে নাই‌, ভুঞ্জ ক্লডিয়া একদিকে ছিটকাইয়া পডিয়াছে। আমরা ব্যোমকেশকে অগ্ৰে লইয়া ঘরে প্রবেশ করিলাম।

আমরা প্রবেশ করিতেই ঘরে ঘোন একটা হুলস্থূল পড়িয়া গেল। ঘরে কিন্তু মাত্র তিনটি লোক ছিল; ননীবালা‌, প্ৰভাত ও ন্যাপা। তাহারা একসঙ্গে ধড়মড় করিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল। ন্যাপা বলিয়া উঠিল‌, ‘কে? কে? কি চাই? বলিয়াই আমাদের পশ্চাতে কেষ্টবাবুকে দেখিয়া থামিয়া গেল। ননীবালা থলথলে মুখে প্ৰকাণ্ড হ্যাঁ করিয়া নিজের অজ্ঞাতসারেই উচ্চকণ্ঠে স্বগতোক্তি করিলেন‌, ‘অ্যাঁ‌, ব্যোমকেশবাবু।’ তিনি আমাদের দেখিয়া বিশেষ আহ্বাদিত হইয়াছেন মনে হইল না। প্রভাত বুদ্ধিহীনের মত চাহিয়া রহিল।

ব্যোমকেশ ঘরের চারিদিকে একবার দৃষ্টি বুলাইয়া ননীবালার উদ্দেশে বলিল, ‘কেষ্টবাবু আমাকে ডেকে এনেছেন। পুলিস এখনও আসেনি?’

ননীবালা মাথা নাড়িলেন। ব্যোমকেশ ন্যাপার দিকে চক্ষু ফিরাইলে সে বিহ্বলভাবে বলিয়া উঠিল‌, ‘আপনি–ব্যোমকেশবাবু্‌, মানে–’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘হ্যাঁ। ইনি আমার বন্ধু অজিত বন্দ্যোপাধ্যায়। সেদিন আমরা এসেছিলাম মনে আছে বোধহয়। আপনি পুলিস ডাকতে গিয়েছিলেন না? কী হ’ল?’

ন্যাপা কেমন যেন বিমূঢ় হইয়া পড়িয়াছিল‌, চমকিয়া উঠিয়া বলিল‌, ‘পুলিস-হ্যাঁ‌, থানায় গিয়েছিলাম। থানায় কেউ ছিল না‌, একটা জমাদার টেবিলের ওপর পা তুলে দিয়ে ঘুমোচ্ছিল। আমার কথা শুনে রেগে উঠল‌, বললে‌, যাও যাও‌, একটা হিন্দু মরেছে তার আবার এত হৈ-চৈ কিসের। লাশ রাস্তায় ফেলে দাওগে। আমি চলে আসছিলাম‌, তখন আমাকে ডেকে বললে—ঠিকানা রেখে যাও‌, সকালবেলা দারোগা সাহেব এলে জানাবো। আমি অনাদিবাবুর নাম আর ঠিকানা দিয়ে চলে এলাম।’

ক্ষেত্রবিশেষে পুলিসের অবজ্ঞাপূর্ণ নির্লিপ্ততা এবং ক্ষেত্রান্তরে অতিরিক্ত কর্তব্যবোধ সম্বন্ধে কোনও নূতনত্ব ছিল না; বস্তুত অভ্যাসবিশেই আশা করিয়ছিলাম যে‌, পুলিস সংবাদ পাইবামাত্র ছুটিয়া আসিবে। ব্যোমকেশ ভ্রূ কুঞ্চিত করিয়া কিছুক্ষণ দাঁড়াইয়া রহিল‌, তারপর মুখ তুলিয়া বলিল‌, ‘কেষ্টবাবুকে আপনারা অনাদিবাবুর হত্যাকারী বলে সন্দেহ করেন। আমি তাঁর পক্ষ থেকে এই ব্যাপারের তদন্তু করতে চাই। কারুর আপত্তি আছে?’

কেহ উত্তর দিল না‌, ব্যোমকেশের চক্ষু এড়াইয়া এদিক ওদিক চাহিতে লাগিল। তখন ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘লাশ ব্যালকনিতে আছে‌, আপনারা কেউ ছুঁয়েছেন কি?’

সকলে মাথা নাড়িয়া অস্বীকার করিল।

আমরা তখন ব্যালকনিতে প্ৰবেশ করিলাম। দেয়ালের গায়ে বৈদ্যুতিক বাতি জ্বলিতেছিল, তাহার নির্নিমেষ আলোতে দেখিলাম অনাদি হালদারের মৃতদেহ কাত হইয়া মেঝের উপর পড়িয়া আছে‌, মুখ রাস্তার দিকে। গায়ে শাদা রঙের গরম গেঞ্জি‌, তাহার উপর বালাপোশ। বুকের উপর হইতে বালাপোশ সরিয়া গিয়েছে‌, গেঞ্জিতে একটি ছিদ্র; সেই ছিদ্রপথে গাঢ় রক্ত নিৰ্গত হইয়া মাটিতে গড়াইয়া পড়িয়াছে। মৃতের মুখের উপর পৈশাচিক হাসির মত একটা বিকৃতি জমাট বধিয়া গিয়াছে।

ব্যোমকেশ নত হইয়া পিঠের দিক হইতে বালাপোশ সরাইয়া দিল। দেখিলাম। এদিকেও গেঞ্জির উপর একটি সুগোল ছিদ্র। এদিকে রক্ত বেশি গড়ায় নাই‌, কেবল ছিদ্রের চারিদিকে ভিজিয়া উঠিয়াছে। বন্দুকের গুলি দেহ ভেদ করিয়া বাহির হইয়া গিয়াছে।

মৃতদেহ ছাড়িয়া ব্যোমকেশ উঠিয়া দাঁড়াইল, অন্যমনস্কভাবে বাহিরে রাস্তার দিকে তাকাইয়া রহিল। আমি হ্রস্বকণ্ঠে প্রশ্ন করিলাম‌, ‘কি মনে হচ্ছে?’

ব্যোমকেশ অন্যমনে বলিল, ‘এই লোকটাই সেদিন আমার সঙ্গে অসভ্যতা করেছিল, আশ্চর্য নয়?…মৃতদেহ শক্ত হতে আরম্ভ করেছে…..বোধহয় অনাদি হালদার রেলিং-এর ধারে দাঁড়িয়ে রাস্তায় বাজি পোড়ানো দেখছিল–’ ব্যোমকেশ রাস্তার পরপারে বড় বাড়িটার দিকে তাকাইল‌, ‘কিন্তু গুলিটা গেল কোথায়? শরীরের মধ্যে নেই‌, শরীর ফুড়ে বেরিয়ে গেছে—‘

ব্যোমকেশের অনুমান যদি সত্য হয় তাহা হইলে গুলিটা ব্যালকনির দেয়ালে বিঁধিয়া থাকিবার কথা। কিন্তু ব্যালকনির দেয়াল ছাদ মেঝে কোথাও গুলি বা গুলির দাগ দেখিতে পাইলাম না। বন্দুকের গুলি ভেদ করিয়া বাহির হইবার সময় কখনও কখনও তেরছা পথে বাহির হয়; কিম্বা অনাদি হালদার হয়তো তেরছাভাবে দাঁড়াইয়া ছিল‌, গুলি ব্যালকনির পাশের ফাঁক দিয়া বাহিরে। চলিয়া গিয়াছে। কিন্তু লাশ যেভাবে পড়িয়া আছে‌, তাহাতে মনে হয়‌, অনাদি হালদার রাস্তার দিকে সুমুখ করিয়া দাঁড়াইয়া ছিল‌, বুকে গুলি খাইয়া সেইখানেই বসিয়া পড়িয়াছে‌, তারপর পাশের দিকে ঢলিয়া পড়িয়াছে।

সামনে রাস্তার ওপারে ওই বাড়িটা। মাঝে ৭০/৮০ ফুটের ব্যবধান। হয়তো ওই বাড়ির দ্বিতল বা ত্রিতলের কোনও জানালা হইতে গুলি আসিয়াছে।

ব্যালকনিতে গুলির কোনও চিহ্ন না পাইয়া ব্যোমকেশ আর একবার নত হইয়া মৃতদেহ পরীক্ষা করিল। বালাপোশ সরাইয়া লইলে দেখিলাম‌, নিম্নাঙ্গে ধুতির কষি আলগা হইয়া গিয়াছে‌, কোমরে ঘুন্‌সির মত একটি মোটা কালো সুতা দেখা যাইতেছে। ঘুন্‌সিতে ফাঁস লাগানো একটি চাবি। ব্যোমকেশ চাবিটি নাড়াচাড়া করিয়া দেখিল‌, তারপর সন্তৰ্পণে খুলিয়া লইয়া মৃতদেহের উপর আবার বাল্যাপোশ ঢাকা দিয়া বলিল‌, ‘চল‌, দেখা হয়েছে।’

বাহিরে তখনও রাত্রির অন্ধকার কাটে নাই। রাস্তা দিয়া শাকসব্জি বোঝাই লরি চলিতে আরম্ভ করিয়াছে। কলিকাতা শহরের বিরাট ক্ষুধা মিটাইবার আয়োজন চলিতেছে।

ঘরে ফিরিয়া দেখিলাম‌, যে চারিজন লোক ঘরের মধ্যে ছিল তাহারা আগের মতাই দাঁড়াইয়া আছে‌, কেহ নড়ে নাই। ব্যোমকেশ হাতের চাবি দেখাইয়া বলিল‌, ‘মৃতদেহের কোমরে ছিল। কোথাকার চাবি?’

একে একে চারিজনের মুখ দেখিলাম। সকলেই একদৃষ্টি চাবির পানে চাহিয়া আছে‌, কেবল ন্যাপার মুখে ভয়ের ছায়া। অবশেষে ননীবালা বলিলেন‌, ‘অনাদিবাবুর শোবার ঘরে লোহার আলমারি আছে‌, তারই চাবি।’

‘লোহার আলমারিতে কি আছে? টাকাকড়ি?’



সকলেই মাথা নাড়িল‌, কেহ জানে না। ননীবালা বলিলেন‌, ‘কি করে জানব। অনাদিবাবুকি কাউকে আলমারি ছুঁতে দিত? কাছে গেলেই খ্যাঁক খ্যাঁক করে উঠত—’ প্ৰভাতের চোখের দিকে চাহিয়া ননীবালা থামিয়া গেলেন।

ন্যাপা অধর লেহন করিয়া বলিল‌, ‘আলমারিতে টাকাকড়ি বোধহয় থাকত না; কত ব্যাঙ্কে টুটক রাখতেন।’

ব্যোমকেশ চাবি পকেটে রাখিয়া বলিল‌, ‘আলমারিতে কি আছে। পরে দেখা যাবে। এখন আপনাদের কয়েকটা প্রশ্ন করতে চাই।–বাড়িতে ঢোকবার বেরুবার রাস্তা কটা?

সকলে ভাঙা দ্বারের দিকে নির্দেশ করিল‌, ‘মাত্র ওই একটা।’

‘অন্য দরজা নেই?’

না।

ব্যোমকেশ বেঞ্চির একপাশে বসিয়া বলিল‌, ‘বেশ। তার মানে অনাদিবাবুর যখন মৃত্যু হয়। তখন বাড়িতে কেহ ছিল না‌, বাইরে থেকে গুলি এসেছে। প্রভাতবাবু্‌, আপনি বলুন দেখি‌, আপনি কখন বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন?’

প্রভাত মাটির দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখিয়া কিছুক্ষণ তাহার অগোছালো চুলে হাত বুলাইল‌, তারপর চোখ তুলিয়া বলিল‌, ‘আমি মাকে নিয়ে বেরিয়েছিলাম আন্দাজ সাড়ে আটটার সময়।’

‘ও‌, আপনারা দু’জনে একসঙ্গে বেরিয়েছিলেন?’

‘হ্যাঁ, মা সিনেমা দেখতে গিয়েছিলেন।’

‘তাই নাকি?’ বলিয়া ব্যোমকেশ ননীবালার পানে চাহিল।

ননীবালা বলিলেন‌, ‘আমার তো আর সিনেমা দেখা হয়ে ওঠে না‌, নামাসে ছাঁ মাসে একবার। কাল ঐ যে কি বলে শেয়ালদার কাছে সিনেমা আছে সেখানে ‘জয় মা কালী’ দেখাচ্ছিল‌, তাই দেখতে গিছালুম। এ বাড়ির রাত্তিরের খাওয়া-দাওয়া আটটার মধ্যেই চুকে যায়‌, তাই রাত্তিরের শোতে গিয়েছিলুম। প্রভাত বলল—’

রূপে তাঁহাকে থামাইয়া দিয়া বলিল‌, আপনার যখন বেরিয়েছিলেন তখন বাড়িতে কে কে ছিল?’

প্রভাত বলিল‌, ‘কেবল অনাদিবাবু ছিলেন। নৃপেনবাবু আটটার পরই বেরিয়ে গিয়েছিলেন।’ ব্যোমকেশ ন্যাপার দিকে ফিরিল‌, কিন্তু কোথায় ন্যাপা। সে এতক্ষণ ভিতর দিকের একটা দরজার পাশে দাঁড়াইয়া ছিল‌, কখন অলক্ষিতে অন্তর্হিত হইয়াছে।

ব্যোমকেশ সবিস্ময়ে ননীবালার দিকে ফিরিয়া হাত উল্টাইয়া প্রশ্ন করিল‌, ননীবালা অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া নীরবে দেখাইয়া দিলেন-ন্যাপা ওই দ্বারা দিয়াই অন্তহিত হইয়াছে। ব্যোমকেশ তখন বিড়াল-পদক্ষেপে সেই দিকে চলিল; আমিও তাহার অনুসরণ করিলাম।

খানিকটা সরু গলির মত‌, তারপর একটা ঘর। আলো জ্বলিতেছে। আমরা উঁকি মারিয়া দেখিলাম‌, ঘরের এক কোণে একটা টেবিলের দেরাজ খুলিয়া ন্যাপা ভিতরে হাত ঢুকাইয়া দিয়াছে এবং অত্যন্ত ব্যগ্রভাবে কিছু খুঁজতেছে। আমাদের দ্বারের কাছে দেখিয়া সে তড়িদ্বেগে খাড়া হইল এবং দেরাজ বন্ধ করিয়া দিল।

আমরা প্ৰবেশ করিলাম। ব্যোমকেশ অপ্ৰসন্ন স্বরে বলিল‌, ‘এটা আপনার ঘর?’

ন্যাপা কিছুক্ষণ বোকার মত চাহিয়া থাকিয়া বলিল‌, ‘হ্যাঁ‌, আমার ঘর।’

‘আপনি না বলে চলে এলেন কেন? কি করছেন?’

ন্যাপা পাংশুমুখে হাসিবার চেষ্টা করিয়া বলিল‌, ‘কিছু না-এই-একটা সিগারেট খাব বলে ঘরে এসেছিলাম–তা খুঁজে পাচ্ছি না-?

খুঁজিয়া না পাওয়ার কথা নয়‌, সিগারেটের প্যাকেট টেবিলের এক কোণে রাখা রহিয়াছে। ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘ওটা কি? সিগারেটের প্যাকেট বলেই মনে হচ্ছে।’

ন্যাপা যেন অতিকাইয়া উঠিল–’অ্যাঁ–! ও-হাঁ-দেশলাই-দেশলাই খুঁজে পাচ্ছি না-’

ব্যোমকেশ একবার তাহকে ভাল করিয়া দেখিয়া লইয়া নিজের পকেট হইতে দেশলাই বাহির করিয়া দিলে–’এই নিন।’ ন্যাপা কম্পিত হস্তে দেশলাই জ্বালিয়া সিগারেট ধরাইল।

আমি ঘরের চারিদিকে একবার তাকাইলাম। ক্ষুদ্র ঘর‌, আসবাবের মধ্যে তক্তপোশের উপর বিছানা‌, একটি দেরাজযুক্ত টেবিল ও তৎসংলগ্ন চেয়ার। ঘরে একটি গরাদ লাগানো জানালা আছে।

জানালাটা খোলা রহিয়াছে। ব্যোমকেশ তাহার সামনে গিয়া দাঁড়াইল‌, আমিও গেলাম। আকাশ ফরসা হইয়া আসিতেছে। জানোলা দিয়া অর্ধ-সমাপ্ত নূতন বাড়িটা দেখা গেল। মাঝখানে গভীর খাদের মত গলি গিয়াছে।

‘নৃপেনবাবু্‌, আপনার বাড়ি কোথায়?’

ব্যোমকেশের এই আকস্মিক প্রশ্নে নৃপেন প্ৰায় লাফাইয়া উঠিল। সে টেবিলের কিনারায় ঠেস দিয়া সিগারেটে লম্বা টান দিতেছিল‌, বিস্ফারিত চক্ষে চাহিয়া বলিল‌, ‘বাড়ি-?’

‘হ্যাঁ‌, দেশ। নিবাস কোথায়? কোন জেলায়?’

নৃপেন ভ্যাবাচাকা খাইয়া বলিল‌, ‘নিবাস? চব্বিশ পরগণা‌, ডায়মন্ডহারবার লাইনের খেজুরহাটে।’

ব্যোমকেশ জানালার দিক হইতে ফিরিয়া নৃপেনের পানে চাহিয়া রহিল‌, বলিল‌, ‘খেজুরহাট! আপনি খেজুরহাটের রমেশ মল্লিককে চেনেন?’

নৃপেন দগ্ধাবশেষ সিগারেট ফেলিয়া যেন ধূমরুদ্ধ স্বরে বলিল‌, ‘চিনি। আমাদের পাড়ায় থাকেন।’

‘খেজুরহাটে আপনার কে আছেন?’

‘খুড়ো।’

‘বাপ নেই?

‘না।’

‘ভাল কথা‌, আপনার পুরো নামটা কী?

‘নূপেন দত্ত।’

ব্যোমকেশ নৃপেনের কাছে আসিয়া দাঁড়াইল‌, একটু ঘনিষ্ঠতার সুরে বলিল‌, ‘নৃপেনবাবু্‌, আপনাকে দেখে কাজের লোক বলে মনে হয়। আপনি কতদিন অনাদিবাবুর সেক্রেটারির কাজ করছেন?’

নৃপেন একটু ভাবিয়া বলিল‌, ‘প্রায় চার বছর।’

‘চার বছর? এতদিন টিকে ছিলেন?’

নৃপেন চুপ করিয়া রহিল।

‘অনাদিবাবুর কেউ শত্রু ছিল। কিনা। আপনি নিশ্চয় জানেন?

নৃপেন অসহায় মুখ তুলিল‌, ‘কার নাম করব? যার সঙ্গে কর্তার পরিচয় ছিল তার সঙ্গেই শক্ৰতা ছিল। ঝগড়া করা ছিল ওঁর স্বভাব।’

‘বাড়ির সকলের সঙ্গেই ঝগড়া চলত?

‘সকলকেই উনি গালমন্দ করতেন। কিন্তু আমরা ওঁর অধীন‌, আমাদের চুপ করে থাকতে হত। কেবল কেষ্টবাবু মাঝে মাঝে–’

‘প্ৰভাতকে অনাদিবাবু গালমন্দ করতেন?

‘ঠিক গালমন্দ নয়‌, সুবিধে পেলেই খোঁচা দিতেন। প্রভাতবাবু কিন্তু গায়ে মাখতেন না।’

‘আচ্ছা‌, ওকথা থাক। বলুন দেখি কাল রাত্রে আপনি কখন বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন?’

‘আটটার পরই বেরিয়েছিলাম।’

‘ফিরলেন। কখন?’

‘আন্দাজ একটায়। ফিরে দেখলাম‌, ননীবালা দেবী আর প্রভাতবাবু দোর ঠেলাঠেলি করছেন।’

‘আপনি আটটা থেকে একটা পর্যন্ত কোথায় ছিলেন?’

‘সিনেমা দেখতে গিয়েছিলাম।’

‘আপনিও ‘জয় মা কালী দেখতে গিয়েছিলেন?’

‘না‌, আমি একটা ইংরিজি ছবি দেখতে গিছলাম।’

‘ও! অত রাত্রে ফিরলেন কি করে?’

‘হেঁটে।’

লক্ষ্য করলাম ব্যোমকেশের প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে নৃপেন অনেকটা ধাতস্থ হইয়াছে‌, আগের মত ভীত বিচলিত ভাব আর নাই। ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘চলুন‌, এবার ওঘরে যাওয়া যাক।’

তিনজনে ওঘরে ফিরিয়া গিয়া দেখিলাম‌, কেষ্টবাবু এবং প্রভাত বেঞ্চির দুই কোণে উপবিষ্ট। কেষ্টবাবু হাই তুলিতেছেন এবং আড়চক্ষে প্রভাতকে নিরীক্ষণ করিতেছেন। প্রভাত করতলে চিবুক রাখিয়া চিন্তামগ্ন। ননীবালা মেঝোয় পা ছড়াইয়া দেয়ালে ঠেস দিয়া ঝিমাইয়া পড়িয়াছেন। আমাদের দেখিয়া সকলে সিধা হইলেন। প্রভাত বেঞ্চি ছাড়িয়া উঠিয়া অস্ফুটস্বরে বলিল‌, ‘বসুন।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘বসব না। ভোর হয়ে এল‌, এবার বাড়ি ফিরতে হবে। এখনি হয়তো পুলিস এসে পড়বে। আমাদের দেখলে পুলিসের মেজাজ খারাপ হয়ে যেতে পারে। আপনাদের একটা কথা বলে রাখি মনে রাখবেন। কারুর ঘাড়ে দোষ চাপাবার চেষ্টা করবেন না‌, তাতে নিজেরই অনিষ্ট হবে, পুলিস হয়তো সকলকেই ধরে নিয়ে গিয়ে হাজতে পুরবে।’

সকলে চুপ করিয়া রহিল।

‘প্রভাতবাবু্‌, এবার আপনার কথা বলুন। কাল আপনি আপনার মাকে সিনেমায় পৌঁছে দিয়েছিলেন‌, নিজে সিনেমা দেখেননি?’

প্ৰভাত বলিল‌, ‘না। আমি টিকিট কিনে মাকে সিনেমায় বসিয়ে দিয়ে নিজের দোকানে গিয়েছিলাম।’

‘ও। রাত্রি সাড়ে আটটার পর দোকানে গেলেন?’

‘হাঁ। দেয়ালির রাত্রে দোকান আলো দিয়ে সাজিয়েছিলাম।’

‘তারপর?

‘তারপর পেীনে বারোটার সময় দোকান বন্ধ করে আবার সিনেমায় গেলাম‌, সেখান থেকে মাকে নিয়ে ফিরে এলাম।’

মুছলমান্দাজ নটা থেকে পোনে বারোটা পর্যন্ত্র আপনি দোকানই ছিলেন। দোকানে আর কেউ ছিল?’

‘গুরুং ছিল‌, দোরের সামনে পাহারা দিচ্ছিল।’

‘গুরুং-মানে গুর্খা দরোয়ান। খদ্দের কেউ আসেননি?’

‘না।’

‘সারাক্ষণ দোকানে বসে কি করলেন?’

‘কিছু না। পিছনে কুঠরিতে বসে বই বাঁধলাম।’

‘আচ্ছা‌, ওকথা যাক।–অনাদিবাবুর সঙ্গে আপনার সদ্ভাব ছিল?’

প্রভাত ক্ষুব্ধ চোখ তুলিল‌, ‘না। উনি আমাকে পুষ্যিপুতুর নিয়েছিলেন‌, প্রথম প্রথম ভাল ব্যবহার করতেন। তারপর–ক্রমশ—’

‘ক্রমশ ওঁর মন বদলে গেল? আচ্ছা‌, উনি আপনাকে পুষ্যপুত্তুর নিয়েছিলেন কেন?’

‘তা জানি না।’

‘প্ৰথম প্ৰথম ভাল ব্যবহার করতেন‌, তারপর মন-মেজাজ বদলে গেল; এর কোনও কারণ হয়েছিল কি?’

‘হয়তো হয়েছিল। আমি জ্ঞানত কোনও দোষ করিনি।’

প্রভাত ক্লান্তভাবে আবার বেঞ্চিতে বসিল। ব্যোমকেশ তাহাকে সদয়-চক্ষে নিরীক্ষণ করিয়া বলিল‌, ‘আপনি বরং কিছুক্ষণ শুয়ে থাকুন গিয়ে। পুলিস একবার এসে পড়লে আর বিশ্রাম পাবেন কি না সন্দেহ।’

প্ৰভাত কিন্তু কেবল মাথা নাড়িল। ব্যোমকেশ তখন ননীবালার দিকে ফিরিয়া বলিল‌, ‘আপনার সঙ্গেও তো অনাদিবাবুর সদ্ভাব ছিল না।’

ননীবালা যুগপৎ মুখ এবং গো-চক্ষু ব্যাদিত করিয়া প্রায় কাঁদো-কাঁদো হইয়া উঠিলেন‌, ‘আপনাকে তো সবই বলেছি‌, ব্যোমকেশবাবু। আমি ছিলুম। বুড়োর চক্ষুশূল। প্রভাতকে বুড়ো ভালবাসত‌, কিন্তু আমাকে দু’চক্ষে দেখতে পারত না। রাতদিন ছুতো খুঁজে বেড়াতো; একটা কিছু পেলেই শুরু করে দিত দাঁতের বান্দ্যি। এমন নীচ অন্তঃকরণ–’ ননীবালা থামিয়া গেলেন। অনাদি হালদার মরিয়াছে বটে‌, কিন্তু তাহার মৃতদেহ অদূরেই পড়িয়া আছে‌, এই কথা সহসা স্মরণ করিয়াই বোধ করি আত্মসংবরণ করিলেন। অধিকন্তু অনাদিবাবুর সহিত তাঁহার অসদ্ভাবের প্রসঙ্গ অপ্ৰকাশ থাকাই বাঞ্ছনীয়‌, তাহা কিঞ্চিৎ বিলম্বে উপলব্ধি করিলেন।

কেষ্টবাবুও সেই ইঙ্গিত করিলেন‌, হেঁচ্‌কি তোলার মত একটা হাসির শব্দ করিয়া বলিলেন‌, ‘তাহলে শুধু আমার সঙ্গেই অনাদির ঝগড়া ছিল না!’

প্রভাত একবার ঘাড় ফিরাইয়া তাহার দিকে তাকাইল। ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘ও কথার কোনও মানে হয় না। দেখা যাচ্ছে সকলের সঙ্গেই অনাদি হালদারের ঝগড়া ছিল; তাতে কিছু প্ৰমাণ হয় না। খুন করতে হলে যেমন খুন করার ইচ্ছে থাকা চাই‌, তেমনি খুন করার সুযোগও দরকার।’ ব্যোমকেশ ননীবালার দিকে ফিরিয়া বলিল‌, ‘কাল সিনেমা কেমন দেখলেন?’

ননীবালা আবার হা করিয়া চাহিলেন।

‘অ্যাঁ–সিনেমা–!’

‘ছবিটা শেষ পর্যন্ত দেখেছিলেন?’

এতক্ষণে ননীবালা বোধহয় প্রশ্নের মমর্থ অনুধান করিলেন‌, বলিলেন‌, ‘ওমা‌, তা আবার দেখিনি! গোড়া থেকে শেষ অবধি দেখেছি‌, ছবি শেষ হয়েছে। তবে বাইরে এসেছি। আমিও বাইরে এসে দাঁড়ালাম‌, আর প্রভাত এল। ওর সঙ্গে বাসায় চলে এলুম। এসে দেখি—’

ব্যোমকেশ নিশ্বাস ফেলিয়া বলিল‌, ‘জানি। এবার চলুন‌, অনাদি হালদারের শোবার ঘরে যাওয়া যাক। লোহার আলমারিটা দেখা দরকার।’

আমরা ছয়জন একজোট হইয়া অনাদি হালদারের শয়নকক্ষের দিকে চলিলাম। কয়েকদিন আগে যে ঘরে অনাদি হালদারের সহিত দেখা হইয়াছিল‌, তাহারই পাশের ঘর। নৃপেন দ্বারের পাশে সুইচ টিপিয়া আলো জ্বলিয়া দিল।

ঘরটি আকারে প্রকারে নৃপেনের ঘরের মতই‌, তবে বাড়ির অন্য প্রান্তে। একটি গরাদযুক্ত জানালা খোলা রহিয়াছে। ঘরে একটি খাট এবং তাহার শিয়রে একটি স্টীলের আলমারি ছাড়া আর কিছু নাই।

আমরা সকলে ঘরে প্রবেশ করিলে ঘরে স্থানাভাব ঘটিল। ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘আপনাদের সকলকে এ-ঘরে দরকার নেই। কেষ্টবাবু্‌, আপনি বরং ও-ঘরে থাকুন গিয়ে। সিঁড়ির দরজা ভাঙা‌, এখুনি হয়তো পুলিস এসে পড়বে।’

আলমারির ভিতর কি আছে‌, তাহা জানিবার কৌতুহল অন্যান্য সকলের মত কেষ্টবাবুরও নিশ্চয় ছিল‌, কিন্তু তিনি বলিলেন‌, ‘কুছ পরোয়া নেই‌, আমিই মড়া আগলাবো। কিন্তু‌, এই সময় অন্তত এক পেয়ালা গরম চা পাওয়া যেত।’ বলিয়া তিনি সম্পৃহভাবে হাত ঘষিতে লাগিলেন।

ব্যোমকেশ বলিল‌, চা হলে মন্দ হত না‌, সে ননীবালার দিকে সপ্রশ্ন দৃষ্টি ফিরাইল।

ননীবালা অনিচ্ছাভরে বলিলেন‌, ‘চা আমি করতে পারি। কিন্তু দুধ নেই যে।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘দুধের বদলে লেবুর রস চলতে পারে।’

কেষ্টবাবু গাঢ়স্বরে বলিলেন‌, ‘আদা! আদা! আদার রস দিয়ে চা খান‌, শরীর চাঙ্গা হবে।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘আদার রসও চলবে।’

ননীবালা ও কোষ্ট্রবাবু প্ৰস্থান করিলে নৃপেন একটু ইতস্তত করিয়া বলিল‌, ‘আমাকে দরকার হবে কি?’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘আপনাকেই দরকার। প্রভাতবাবু বরং নিজের ঘরে গিয়ে বিশ্রাম করতে পারেন।’

প্রভাত একবার যেন দ্বিধা করিল‌, তারপর কোনও কথা না বলিয়া ধীরে ধীরে প্রস্থান করিল। ঘরে রহিলাম আমরা দু’জন ও নৃপেন।

ঘরে বিশেষ দ্রষ্টব্য কিছু নাই। খাটের উপর বিছানা পাতা; পরিষ্কার বিছানা‌, গত রাত্রে ব্যবহৃত হয় নাই। দেয়ালে আলনায় একটি কাচা ধুতি পাকানো রহিয়াছে। এক কোণে গেলাস-ঢাকা জলের কুঁজা। ব্যোমকেশ এদিকে ওদিকে দৃষ্টি বুলাইয়া পকেট হইতে চাবি বাহির করিল।

আলমারিটা নূতন। বার্নিশ করা কাঠের মত রঙ‌, লম্বা সরু আকৃতি‌, অত্যন্ত মজবুত। ব্যোমকেশ চাবি ঘুরাইয়া জোড়া কবাট খুলিয়া ফেলিল। আমি এবং নৃপেন সাগ্রহে ভিতরে উঁকি মারিলাম।

ভিতরে চারিটি থাক। সবেচি থাকের এক প্ৰান্ত হইতে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত এক সারি বই; মাঝে মাঝে ভাঙা দাঁতের মত ফাঁক পড়িয়াছে। কয়েকটি বইয়ের পিঠে সোনার জলে নাম লেখা,

অধিকাংশই বটতলার বই‌, কিন্তু বাঁধাই ভাল। হয়তো প্ৰভাত বাঁধিয়া দিয়াছে।

ব্যোমকেশ নৃপেনকে জিজ্ঞাসা করিল‌, ‘অনাদি হালদার কি খুব বই পড়ত?’

নৃপেন শুষ্কস্বরে বলিল‌, ‘কোন দিন পড়তে দেখিনি।’

‘বাড়িতে আর কেউ বই পড়ে?’

‘প্রভাতবাবু পড়েন। আমিও পেলে পড়ি। কিন্তু কর্তার আলমারিতে যে বই আছে‌, তা আমি কখনও চোখে দেখিনি।’

‘অথচ বইয়ের সারিতে ফাঁক দেখে মনে হচ্ছে কয়েকখানা বই বার করা হয়েছে। কোথায় গেল বইগুলো?’

নৃপেন ঘরের এদিক-ওদিক দৃষ্টিপাত করিয়া বলিল‌, ‘তা তো বলতে পারি না। এ-ঘরে দেখছি না। প্রভাতবাবুকে জিজ্ঞেস করব?

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘এখন থাক‌, এমন কিছু জরুরী কথা নয়।–আচ্ছা‌, বাইরে অনাদি হালদারের কোথায় বেশি যাতায়াত ছিল?’

নৃপেন বলিল‌, ‘কত বাড়ি থেকে বড় একটা বেরুতেন না। যখন বেরুতেন‌, হয় সলিসিটারের সঙ্গে দেখা করতে যেতেন‌, নয়তো ব্যাঙ্কে যেতেন। এ ছাড়া আর বড় কোথাও যাতায়াত ছিল না।’

ব্যোমকেশ দ্বিতীয় থাকের প্রতি দৃষ্টি নামাইল।

দ্বিতীয় থাকে অনেকগুলি শিশিী-বোতল রহিয়াছে। শিশিগুলি পেটেন্ট ঔষধের‌, বোতলগুলি বিলাতি মদ্যের। একটি বোতলের মদ্য প্রায় তলায় গিয়া ঠেকিয়াছে‌, অন্যগুলি সীল করা।

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘অনাদি হালদার মদ খেত?’

নৃপেন বলিল‌, ‘মাতাল ছিলেন না। তবে খেতেন। মাঝে মধ্যে গন্ধ পেয়েছি।’

ঔষধের শিশিগুলি পরীক্ষা করিয়া দেখা গেল অধিকাংশই টনিক জাতীয় ঔষধ্‌্‌, অতীত যৌবনকে পুনরুদ্ধার করিবার বিলাতি মুষ্টিযোগ। ব্যোমকেশ প্রশ্ন করিল‌, ‘সন্ধের পর বেড়াতে বেরুনোর অভ্যোস অনাদি হালদারের ছিল না?’

নৃপেন বলিল‌, ‘খুব বেশি নয়‌, মাসে দু’-তিন দিন বেরুতেন।’

‘বাঃ! অনাদি হালদারের গোটা চরিত্রটি বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। খাসা চরিত্র!’ ব্যোমকেশ আলমারির তৃতীয় থাকে মন দিল।

তৃতীয় থাকে অনেকগুলি মোটা মোটা খাতা এবং কয়েকটি ফাইল। খাতাগুলি কার্ডবোর্ড দিয়া মজবুত করিয়া বাঁধানো। খুলিয়া দেখা গেল ব্যবসা সংক্রান্ত হিসাবের খাতা। ব্যবসায়ের রীতি প্রকৃতি জানিতে হইলে খাতাগুলি ভাল করিয়া অধ্যয়ন করা প্রয়োজন; কিন্তু তাহার সময় নাই। ব্যোমকেশ নৃপেনকে জিজ্ঞাসা করিল‌, ‘অনাদি হালদার কিসের ব্যবসা করত। আপনি জানেন?’

নৃপেন বলিল‌, ‘আগে কি ব্যবসা করতেন জানি না‌, উনি নিজের কথা কাউকে বলতেন না। তবে যুদ্ধের গোড়ার দিকে জাপানী মাল কিনেছিলেন। কটন মিলে যেসব কলকন্তুজা লাগে‌, তাই। সস্তায় কিনেছিলেন–’

‘তারপর কালাবাজারের দরে বিক্রি করেছিলেন। বুঝেছি।’ ব্যোমকেশ একখানা ফাইল তুলিয়া লইয়া মলাট খুলিয়া ধরিল।

ফাইলে নানা জাতীয় দলিলপত্র রহিয়াছে। নূতন বাড়ির ইষ্টম্বর দস্তাবেজ‌, সলিসিটারের চিঠি‌, বাড়িভাড়ার রসিদ‌, ইত্যাদি। কাগজপত্রের উপর লঘুভাবে চোখ বুলাইতে বুলাইতে ব্যোমকেশ পাতা উল্টাইতে লাগিল‌, তারপর এক জায়গায় আসিয়া থামিল। একটি রুলটানা কাগজে কয়েক ছত্র লেখা‌, নীচে স্ট্যাম্পের উপর দস্তখত।

কাগজখানা ব্যোমকেশ ফাইল হইতে বাহির করিয়া লইল‌, মুখের কাছে তুলিয়া মনোযোগ সহকারে পড়িতে লাগিল। আমি গলা বাড়াইয়া দেখিলাম‌, একটি হ্যান্ডনেট। অনাদি হালদার হাতচিঠির উপর দয়ালহরি মজুমদার নামক এক ব্যক্তিকে পাঁচ হাজার টাকা ধার দিয়াছে।

ব্যোমকেশ হ্যান্ডনেট হইতে মুখ তুলিয়া বলিল‌, ‘দয়ালহরি মজুমদার কে?’

নৃপেন কিছুক্ষণ চাহিয়া থাকিয়া বলিল‌, ‘দয়ালহরি-ও‌, মনে পড়েছে–একটু কাছে সরিয়া আসিয়া খাটো গলায় বলিল‌, ‘দয়ালহরিবাবুর মেয়েকে প্রভাতবাবু বিয়ে করতে চেয়েছিলেন‌, তারপর কর্তা মেয়ে দেখে অপছন্দ করেন–’

‘মেয়ে বুঝি কুচ্ছিৎ?’

‘আমরা কেউ দেখিনি।’

‘কিন্তু পাঁচ হাজার টাকা ধার দেওয়ার মানে কি?’

‘জানি না; হয়তো ওই জন্যেই–’

‘ওই জন্যে কী?’

‘হয়তো‌, যাকে টাকা ধার দিয়েছেন‌, তার মেয়ের সঙ্গে কর্তা প্রভাতবাবুর বিয়ে দিতে চাননি।’

‘হতে পারে। অনাদি হালদার কি তেজারিতির কারবার করত?’

‘না। তাঁকে কখনও টাকা ধার দিতে দেখিনি।’

‘হ্যান্ডনোটে তারিখ দেখছি ১১/৯/১৯৪৬‌, অর্থাৎ মাসখানেক আগেকার। অনাদি হালদার মেয়ে দেখতে গিয়েছিল কবে?’

‘প্ৰায় ওই সময়। তারিখ মনে নেই।’

‘দয়ালহরি মজুমদার সম্বন্ধে আপনি কিছু জানেন?

‘কিছু না। বাইরে শুনেছি মেয়েটি নাকি খুব ভাল গাইতে পারে‌, এরি মধ্যে খুব নাম করেছে। ওরা পূর্ববঙ্গের লোক‌, সম্প্রতি কলকাতায় এসেছে।’

‘তাই নাকি! অজিত‌, দয়ালহরি মজুমদারের ঠিকানাটা মনে করে রাখ তো—’ হাতচিঠি দেখিয়া পড়িল–’১৩/৩‌, রামতনু লেন‌, শ্যামবাজার।’

মনে মনে ঠিকানাটা কয়েকবার আবৃত্তি করিয়া লইলাম। ব্যোমকেশ আলমারির নিম্নতম থাকটি তদারক করিতে আরম্ভ করিল।

নীচের থাকে কেবল একটি কাঠের হাত-বাক্স আছে‌, আর কিছু নাই। হাত-বাক্সের গায় চাবি লাগানো। ব্যোমকেশ চাবি ঘুরাইয়া ডালা তুলিল। ভিতরে একগোছা দশ টাকার নোট‌, কিছু খুচরা টাকা-পয়সা এবং একটি চেক বহি।

ব্যোমকেশ নোটগুলি গণিয়া দেখিল। দুইশত ষাট টাকা। চেক বহিখানি বেশ পুরু‌, একশত চেকের বহি; তাহার মধ্যে অর্ধেকের অধিক খরচ হইয়াছে। ব্যোমকেশ ব্যবহৃত চেকের অর্ধাংশগুলি উল্টাইয়া দেখিতে দেখিতে প্রশ্ন করিল‌, ‘ভারত ব্যাঙ্ক ছাড়া আর কোনও ব্যাঙ্কে অনাদি হালদার টাকা রাখত?’

নৃপেন বলিল‌, ‘তিনি কোন ব্যাঙ্কে টাকা রাখতেন তা আমি জানি না।’

‘আশ্চর্য! নতুন বাড়ি তৈরি হচ্ছে‌, কনট্রাকটরকে টাকা দিত কি করে?’

‘ক্যাশ দিতেন। আমি জানি‌, কারণ আমি রসিদের খসড়া তৈরি করে কনট্রকটরকে দিয়ে সই করিয়ে নিতাম। যেদিন টাকা দেবার কথা‌, সেদিন বেলা ন’টার সময় কত বেরিয়ে যেতেন‌, এগারটার সময় ফিরে আসতেন। তারপর কনট্রাকটরকে টাকা দিতেন।’

‘অর্থাৎ ব্যাঙ্ক থেকে টাকা আনতে যেতেন?’

‘আমার তাই মনে হয়।’

‘হুঁ। বাড়ির দরুন কনট্রাকটরকে কত টাকা দেওয়া হয়েছে‌, আপনি জানেন?’

নৃপেন মনে মনে হিসাব করিয়া বলিল‌, ‘প্রায় ত্ৰিশ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। রসিদগুলো বোধহয় ফাইলে আছে। যদি জানতে চান–’

ব্যোমকেশ চেক বহি রাখিয়া অর্ধ-স্বাগত বলিল‌, ‘ভারি আশ্চর্য!-না‌, চুলচেরা হিসেব দরকার নেই। চল অজিত‌, এ ঘরে দ্রষ্টব্য যা কিছু দেখা হয়েছে।’ বলিয়া সযত্নে আলমারি বন্ধ করিল।

এই সময় ননীবালা একটি বড় থালার উপর চার পেয়ালা চা লইয়া ঘরে প্রবেশ করিলেন‌, ‘এই নিন। —প্ৰভাত নিজের ঘরে শুয়ে আছে; তার চা দিয়ে এসেছি।’

নৃপেন আলো নিভাইয়া দিল। জানালা দিয়া দেখা গেল বাহিরে বেশ পরিষ্কার হইয়া গিয়াছে।

আমরা তিনজনে চায়ের পেয়ালা হাতে লইয়া বাহিরের ঘরে আসিলাম‌, কেষ্টবাবুর চায়ের পেয়ালা থালার উপর লইয়া ননীবালা আমাদের সঙ্গে আসিলেন।

বেঞ্চের উপর লম্বা হইয়া শুইয়া কেষ্টবাবু ঘুমাইতেছেন। ঘর্ঘর শব্দে তাঁহার নাক ডাকিতেছে।

ব্যালকনিতে উঁকি মারিয়া দেখিলাম‌, অনাদি হালদারের মৃত মুখের উপর সকালের আলো পড়িয়াছে। মাছিরা গন্ধ পাইয়া আসিয়া জুটিয়াছে।

চা শেষ করিয়া পেয়ালা নামাইয়া রাখিয়াছি‌, এমন সময় সিঁড়িতে পায়ের সমবেত শব্দ শোনা গেল। এতক্ষণে বুঝি পুলিস আসিতেছে।

কিন্তু আমার অনুমান ভুল‌, পুলিসের এখনও ঘুম ভাঙে নাই। যাঁহারা প্রবেশ করিলেন তাঁহারা সংখ্যায় তিনজন; একটি অপরিচিত প্রৌঢ় ভদ্রলোক‌, সঙ্গে নিমাই ও নিতাই। ভাগাড়ে মড়া পড়িলে বহু দূরে থাকিয়াও যেমন শকুনির টনক নড়ে‌, নিমাই ও নিতাই তেমনি খুল্লতাতের মহাপ্ৰস্থানের গন্ধ পাইয়াছে।

পায়ের শব্দে কেষ্টবাবুর ঘুম ভাঙিয়া গিয়াছিল‌, তিনি চোখ রাগড়াইয়া উঠিয়া বসিলেন। ভিতর দিক হইতে প্ৰভােতও প্ৰবেশ করিল।

প্রথমে দুই পক্ষ নিবর্কিভাবে দৃষ্টি বিনিময় করিলাম। নিমাই ও নিতাই প্রৌঢ় ভদ্রলোকের দুই পাশে দাঁড়াইয়া ছিল‌, তাহাদের চক্ষু একে একে আমাদের পর্যবেক্ষণ করিয়া ব্যোমকেশ পর্যন্ত শুক্রমিয়া গেল। দৃষ্টি সন্ধি হইয়া উঠিল। বোধহয় তাহার কোমস্পেকে চিনিতে পারিয়াছে।

প্ৰথমে ব্যোমকেশ কথা বলিল‌, ‘আপনারা কি চান?’

নিমাই ও নিতাই অমনি প্রৌঢ় ভদ্রলোকের দুই কানে ফুসফুস করিয়া কথা বলিল।

প্রৌঢ় ভদ্রলোকের অক্ষৌরিত মুখে কাঁচা-পাকা দাড়িগোঁফ কণ্টকিত হইয়াছিল; অসময়ে ঘুম ভাঙানোর ফলে মেজাজও বোধকরি প্রসন্ন ছিল না। তিনি কিছুক্ষণ বিরাগপূর্ণ চক্ষে ব্যোমকেশকে নিরীক্ষণ করিয়া বিকৃতস্বরে বলিলেন‌, ‘আপনি কে?’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘পারিবারিক বন্ধু বলতে পারেন। আমার নাম ব্যোমকেশ বক্সী।’

তিনজনের চোখেই চকিত সতর্কতা দেখা দিল। প্রৌঢ় ভদ্রলোক একটু দাম লইয়া প্রশ্ন করিলেন‌, ‘ডিটেকটিভ?’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘সত্যান্বেষী।’

প্রৌঢ় ভদ্রলোক গলার মধ্যে অবজ্ঞাসূচক শব্দ করিলেন‌, তারপর প্রভাতের দিকে চাহিয়া বলিলেন‌, ‘আমরা খবর পেয়েছি অনাদি হালদার মশায়ের মৃত্যু হয়েছে। এরা দুই ভাই নিমাই এবং নিতাই হালদার তাঁর ভ্রাতুষ্পপুত্র এবং উত্তরাধিকারী। এঁরা মৃতের সম্পত্তি দখল নিতে এসেছেন। এ বাড়ি আপনাদের ছেড়ে দিতে হবে।’

প্রভাত কিছুক্ষণ অবুঝের মত চাহিয়া থাকিয়া ব্যোমকেশের দিকে দৃষ্টি ফিরাইল। ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘তাই নাকি? বাড়ি ছেড়ে দিতে হবে! কিন্তু আপনি কে তা তো জানা গেল না।’

প্রৌঢ় ভদ্রলোক বলিলেন‌, ‘আমি এদের উকিল কামিনীকান্ত মুস্তফী।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘উকিল। তাহলে আপনার জানা উচিত যে অনাদি হালদারের ভাইপোরা তাঁর উত্তরাধিকারী নয়। তিনি পোষ্যপুত্র নিয়েছিলেন।’

উকিল কামিনীকান্ত নাকের মধ্যে একটি শব্দ করিলেন‌, ব্যোমকেশকে নিরতিশয় অবজ্ঞার সহিত নিরীক্ষণ করিয়া বলিলেন‌, ‘আপনি যখন পারিবারিক বন্ধু আপনার জানা উচিত যে অনাদি হালদার মশায় পোষ্যপুত্র নেননি। মুখের কথায় পোষ্যপুত্র নেওয়া যায় না। দলিল রেজিস্ট্রি করতে হয়‌, যাগযজ্ঞ করতে হয়। অনাদি হালদার মশায় এসব কিছুই করেননি। —আপনাদের এক বস্ত্ৰে এখোন থেকে বেরিয়ে যেতে হবে‌, একটা কুটা নিয়ে যেতে পাবেন না। এখানে যা-কিছু আছে সমস্ত আমার মক্কেলদের সম্পত্তি।’

ব্যোমকেশ ক্ষণকালের জন্য যেন হতভম্ব হইয়া প্ৰভাতের পানে তাকাইল; তারপর সে সামলাইয়া লইল। মুখে একটা বঙ্কিম হাসি আনিয়া বলিল‌, ‘বটে? ভেবেছেন হুমকি দিয়ে অনাদি হালদারের সম্পত্তিটা দখল করবেন। অত সহজে সম্পত্তি দখল করা যায়‌, না উকিলবাবু। পোষ্যপুত্র নেয়া যে আইনসঙ্গত নয় সেটা আদালতে প্রমাণ করতে হবে‌, সাকসেশন সার্টিফিকেট নিতে হবে‌, তবে দখল পাবেন। বুঝেছেন?’

উকিলবাবু বলিলেন‌, ‘আপনারা যদি এই দণ্ডে বাড়ি ছেড়ে না যান‌, আমি পুলিস ডাকব।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘পুলিস ডাকবার দরকার নেই‌, পুলিস নিজেই এল বলে। —ভাল কথা‌, অনাদিবাবু যে মারা গেছেন এটা আপনারা এত শীগগির জানলেন কি করে? এখনও দুঘন্টা হয়নি–’

হঠাৎ নিমাই নিতাইয়ের মধ্যে একজন বলিয়া উঠিল‌, দুঘণ্টা। কাকা মারা গেছেন রাত্তির এগারোটার সময়–’ বলিয়াই অর্ধপথে থামিয়া গেল।

ব্যোমকেশ মধুর স্বরে বলিল‌, ‘এগারোটার সময় মারা গেছেন। আপনি জানলেন কি করে? মৃত্যুকালে আপনি উপস্থিত ছিলেন বুঝি? হাতে বন্দুক ছিল?’

নিমাই নিতাই একেবারে নীল হইয়া গেল। উকিলবাবু নিমাই (কিম্বা নিতাই)-কে ধমক দিয়া বলিলেন‌, ‘তোমরা চুপ করে থাকে‌, বিলাকওয়া আমি করব। আপনারা তাহলে দখল ছাড়বেন। না। আচ্ছা‌, আদালত থেকেই ব্যবস্থা হবে।’ বলিয়া তিনি মক্কেলদের বাহু ধরিয়া সিড়ির দিকে ফিরিলেন।

ব্যোমকেশ বলিল‌, চললেন? আর একটু সবুর করবেন না? পুলিস এসে ভাইপোদের বয়ান নিশ্চয় শুনতে চাইবে। আপনারা কাল রাত্রি এগারোটার সময় কোথায় ছিলেন–’

ব্যোমকেশের কথা শেষ হইবার পূর্বেই ভ্রাতুষ্পপুত্রযুগল উকিলকে পিছনে ফেলিয়া দ্রুতপদে সিঁড়ি দিয়া অন্তহিঁত হইল। উকিল কামিনীকান্ত মুস্তকী ব্যোমকেশের প্রতি একটি গরল-ভরা দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া তাহাদের অনুগমন করিলেন।

তাহাদের পদশব্দ নীচে মিলাইয়া যাইবার পর ব্যোমকেশ প্রভাতের দিকে ফিরিয়া প্রশ্ন করিল, ‘আপনি যে আইনত অনাদিবাবুর পোষ্যপুত্তুর নন একথা আগে আমাকে বলেননি কেন?’

প্রভাত ক্ষুব্ধ মুখে দাঁড়াইয়া ঘাড় চুলকাইতে লাগিল। এইবার ননীবালা দেবী সম্মুখে অগ্রসর হইয়া আসিলেন। এতক্ষণ লক্ষ্য করি নাই‌, তাঁহার মুখ শুকাইয়া যেন চুপসিয়া গিয়াছে‌, চোখে ডাবড্যাবে ব্যাকুলত। তিনি বলিয়া উঠিলেন‌, ‘ব্যোমকেশবাবু্‌, ওরা যা বলে গেল তা কি সত্যি? প্রভাত অনাদিবাবুর পুষ্যিপুত্তুর নয়?

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘সেই কথাই তো জানতে চাইছি?—প্রভাতবাবু–?’

প্ৰভাত ঠোঁট চাটিয়া অস্পষ্টস্বরে বলিল‌, ‘আমি-আইন জানি না। প্ৰথমে কলকাতায় আসবার পর অনাদিবাবু আমাকে নিয়ে সলিসিটারের অফিসে গিয়েছিলেন। সেখানে শুনেছিলাম সুপ্রিশ্ন দিতে হলে দলিল রেজিষ্ট করতে হয়‌, হোম-যজ্ঞ করতে হয়। কিন্তু সে সব কিছু হয়নি।’

‘তাহলে আপনি জানতেন যে আপনি অনাদিবাবুর সম্পত্তির উত্তরাধিকারী নন?’

‘হ্যাঁ, জানতাম। কিন্তু ভেবেছিলাম–’

‘ভেবেছিলেন মৃত্যুর আগে অনাদিবাবু দলিল রেজিস্ট্রি করে আপনাকে পুষ্যিপুতুর করে যাবেন?’

‘হ্যাঁ।’

কিছুক্ষণ নীরব। তারপর ননীবালা দীর্ঘকম্পিত নিশ্বাস ফেলিয়া বলিলেন‌, ‘তাহলে— তাহলে-প্রভাত কিছুই পাবে না। সব ওই নিমাই নিতাই পাবে!’ ননীবালার বিপুল দেহ যেন সহসা শিথিল হইয়া গেল‌, তিনি মেঝোয় বসিয়া পড়িলেন।

প্রভাত তুরিতে গিয়া ননীবালার পাশে বসিল‌, গাঢ় হ্রস্ব স্বরে বলিল‌, ‘তুমি ভাবিছ কেন মা! দোকান তো আছে। তাতেই আমাদের দু’জনের চলে যাবে।’

ননীবালা প্ৰভাতের গলা জড়াইয়া ধরিয়া কাঁদিয়া উঠিলেন। যাহোক‌, তবু অনাদি হালদারের মৃত্যুর পর একজনকে কাঁদিতে দেখা গেল।

ব্যোমকেশ চক্ষু কুঞ্চিত করিয়া তাহদের নিরীক্ষণ করিল‌, তারপর ঘরের চারিদিকে দৃষ্টি ফিরাইয়া হঠাৎ প্রশ্ন করিল‌, ‘নৃপেনবাবু কোথায়?’

এতক্ষণ নৃপেনের দিকে কাহারও নজর ছিল না‌, সে আবার নিঃসাড়ে অদৃশ্য হইয়াছে।

ব্যোমকেশ আমাকে চোখের ইশারা করিল। আমি নৃপেনের ঘরের দিকে পা বাড়াইয়াছি। এমন সময় সে নিজেই ফিরিয়া আসিল। বলিল‌, ‘এই যে আমি।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘কোথায় গিয়েছিলেন?’

‘আমি—একবার ছাদে গিয়েছিলাম।’ নৃপেনের মুখ দেখিয়া মনে হয় সে কোনও কারণে নিশ্চিম্ভ হইয়াছে।

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘ছাদে! তেতিলার ছাদে?’

না‌, দোতলাতেই ছাদ আছে।’

‘তাই নাকি? চলুন তো‌, দেখি কেমন ছাদ।’

যে গলি দিয়া নৃপেনের ঘরে যাইবার রাস্তা তাহারই শেষ প্রান্তে একটি দ্বার; দ্বারের ওপারে ছাদ। আলিসা দিয়া ঘেরা দাবার ছকের মত একটু স্থান। পিছন দিকে অন্য একটি বাড়ির দেয়াল‌, পাশে গলির পরপারে অনাদি হালদারের নূতন বাড়ি।

ছাদে দাঁড়াইয়া নুতন বাড়ির কাঠামো স্পষ্ট দেখা যায়‌, এমন কি দীর্ঘলফের অভ্যাস থাকিলে এ-বাড়ি হইতে ও-বাড়িতে উত্তীর্ণ হওয়া যায়। নূতন বাড়ির দেয়াল দোতলার ছাদ পর্যন্ত উঠিয়াছে‌, সবঙ্গে ভারা বাঁধা।

আলিসার ধারে ঘুরিয়া দেখিতে দেখিতে ব্যোমকেশ বলিল, ‘ছাদের দরজা রাত্তিরে খোলা থাকে?’

নৃপেন বলিল‌, ‘খোলা থাকবার কথা নয়‌, কত রোজ রাত্রে শুতে যাবার আগে নিজের হাতে দরজা বন্ধ করতেন।’

‘কাল রাত্রে বন্ধ ছিল?’

‘তা জানি না।’

‘আপনি খানিক আগে যখন এসেছিলেন তখন খোলা ছিল‌, না‌, বন্ধ ছিল?’

নৃপেন আকাশের দিকে তাকাইয়া গলা চুলকাইয়, শেষে বলিল, ‘কি জানি, মনে করতে পারছি না। মনটা অন্যদিকে ছিল—’

‘হুঁ।’

আমরা ঘরে ফিরিয়া গেলাম। ননীবালা দেবী তখনও সর্বহারা ভঙ্গীতে মেঝোয় পা ছড়াইয়া বসিয়া আছেন‌, প্রভাত মৃদুকণ্ঠে তাঁহাকে সান্ত্বনা দিতেছে। কেষ্টবাবু বিলম্বিত চায়ের পেয়ালাটি নিঃশেষ করিয়া নামাইয়া রাখিতেছেন।

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘পুলিসের এখনও দেখা নেই। আমরা এবার যাই। —এস অজিত‌, যাবার আগে চাবিটা যথাস্থানে রেখে দেওয়া দরকার‌, নইলে পুলিস এসে হাঙ্গামা করতে পারে।’

ব্যালকনিতে গেলাম। মাছিরা দেহটাকে ছকিয়া ধরিয়াছে। ব্যোমকেশ নত হইয়া চাবিটা মৃতের কোমরে ঘুনসিতে পরাইয়া দিতে দিতে বলিল‌, ‘ওহে অজিত‌, দ্যাখো।’

আমি ঝুঁকিয়া দেখিলাম কোমরের সুতার কাছে একটা দাগ‌, আধুলির মত আয়তনের লালচে একটা দাগ‌, জিজ্ঞাসা করিলাম‌, ‘কিসের দাগ?’

ব্যোমকেশ দাগের উপর আঙুল বুলাইয়া-বলিল‌, রক্তের দাগ মনে হয়। কিন্তু রক্ত নয়। জড়ুল।’

মৃতদেহ ঢাকা দিয়া আমরা ফিরিয়া আসিলাম। ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘আমরা চললাম। পুলিস এসে যা-যা প্রশ্ন করবে। তার উত্তর দেবেন‌, বেশি কিছু বলতে যাবেন না। আমি যে আলমারি খুলে দেখেছি তা বলবার দরকার নেই। নিমাই নিতাই যদি আসে তাদের বাড়ি ঢুকতে দেবেন। না।–কেষ্টবাবু্‌, ওবেলা একবার আমাদের বাসায় যাবেন।’

কেষ্টবাবু ঘাড় কত করিয়া সম্মতি জানাইলেন। আমরা নীচে নামিয়া চলিলাম। সূর্য উঠিয়াছে‌, শহরের সোরগোল শুরু হইয়া গিয়াছে।

নীচে নামিয়া আসিয়া দেখিলাম সিঁড়ির ঘরে বৃদ্ধ ষষ্ঠীবাবু থেলো হুঁকা হাতে বিচরণ করিতেছেন‌, আমাদের দেখিয়া বঙ্কিম কটাক্ষপাত করিলেন। প্রথমদিন যে উগ্ৰমূৰ্তি দেখিয়াছিলাম এখন আর তাহা নাই‌, বরং বেশ একটু সাগ্ৰহ কৌতুহলের ব্যঞ্জনা তাঁহার তোবড়ানো মুখখানিকে প্রাণবন্ত করিয়া তুলিয়াছে।

ব্যোমকেশ থমকিয়া দাঁড়াইয়া প্রশ্ন করিল‌, ‘আপনার নাম ষষ্ঠীবাবু?

তিনি সতর্কভাবে ব্যোমকেশকে নিরীক্ষণ করিয়া শেষে বলিলেন‌, ‘হ্যাঁ। আপনি-আপনারা-?

ব্যোমকেশ আত্ম-পরিচয় দিল না‌, সংক্ষেপে বলিল‌, ‘আর বলবেন না মশায়। অনাদি হলদারের কাছে টাকা পাওনা ছিল‌, তা দেখছি টাকাটা ডুবল। লোকটা মারা গেছে শুনেছেন বোধহয়।’

ষষ্ঠীবাবুর সন্দিগ্ধ সতর্কতা দূর হইল। তিনি পরম তৃপ্তমুখে বলিলেন‌, ‘শুনেছি। কাল রাত্তির থেকেই শুনছি।–কিসে মারা গেল? শেষোক্ত প্রশ্ন তিনি গলা বাড়াইয়া প্ৰায় ব্যোমকেশের কানে কানে করিলেন।

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘শোনেননি? কেউ তাকে খুন করেছে। —আপনি তো কাল অনেক রাত্রি পর্যন্ত বারান্দায় বসে ছিলেন শুনলাম–’

মুখে বিরক্তিসূচক চুমকুড়ি দিয়ে ষষ্ঠীবাবু বলিলেন, ‘কি করি, পাড়ার ছোঁড়াগুলো ঠিক বাড়ির সামনেই বাজি পোড়াতে শুরু করল। ওই দেখুন না‌, কত তুবড়ির খোল পড়ে রয়েছে। শুধু কি তুবড়ি! চীনে পটকা দোদমার আওয়াজে কান ঝালাপালা। ভাবলাম ঘুম তো আর হবে না‌, বাজি পোড়ানোই দেখি।–তা কি করে খুন হল? ছোরা-ছুরি মেরেছে নকি?’

ব্যোমকেশ প্রশ্নটা এড়াইয়া গিয়া বলিল‌, তাহলে আপনি সন্ধের পর থেকে দুপুর রাত্রি পর্যন্ত বারান্দায় বসে ছিলেন। সে সময়ে কেউ অনাদি হালদারের কাছে এসেছিল?’

‘কেউ না। একেবারে রাত বারোটার পর ওই ছেলেটা আর তার মা এল‌, এসেই দ্বোর ঠ্যাঙাতে শুরু করল। তারপর এল ন্যাপা। তারপর কেষ্ট দাস।’

‘ইতিমধ্যে আর কেউ আসেনি?’

‘বাড়িতে কেউ ঢোকেনি। তবে-অনাদি হালদারের একটা ভাইপোকে একবার ওদিকে ফুটপাথের হোটেলের সামনে ঘুর-ঘুর করতে দেখেছি।’

‘তাই নাকি? তারপর?’

‘তারপর আর দেখিনি। অন্তত এ বাড়িতে ঢোকেনি।’

‘কাঁটার সময় তাকে দেখেছিলেন?’

‘তা কি খেয়াল করেছি। তবে গোড়ার দিকে তখনও হোটেলের দোতলায় বাবুরা জানলার ধারে বসে পাশা খেলছিল। দশটা কি সাড়ে দশটা হবে।–আচ্ছা‌, কে মেরেছে কিছু জানা গেছে নাকি?’

ব্যোমকেশ কিছুক্ষণ হেঁট মুখে চিন্তা করিল‌, তারপর হঠাৎ প্রশ্ন করিল‌, ‘অনাদি হালদারের সঙ্গে আপনার সদ্ভাব ছিল?’

ষষ্ঠীবাবু চমকিয়া উঠিলেন‌, ‘অ্যাঁ! সদ্ভাব‌, মানে‌, অসদ্ভাবও ছিল না।’

‘আপনি কাল রাত্রে ওপরে যাননি?’

‘আমি! আমি ওপরে যাব! বেশ লোক তো আপনি? মতলব কি আপনার? ষষ্ঠীবাবু ক্রমশ তেরিয়া হইয়া উঠিবার উদ্যোগ করিলেন।

‘অনাদি হালদারকে কে খুন করেছে আপনি জানেন না?’

‘আমি কি জানি! যে খুন করেছে। সে জানে‌, আমি কি জানি। আপনি তো সাংঘাতিক লোক মশাই! আমি বুড়ো মানুষ‌, কারুর সাতেও নেই পাঁচেও নেই‌, আমাকে ফাঁসাতে চান?’

ব্যোমকেশ হাসিয়া ফেলিল‌, ‘আমি আপনাকে ফাঁসাতে চাই না‌, আপনি নিজেই নিজেকে ফাঁসাচ্ছেন। অনাদি হালদারের মৃত্যুতে এত খুশি হয়েছেন যে চেপে রাখতে পারছেন না। —চল অজিত‌, ওই হোটেলটাতে গিয়ে আর এক পেয়ালা চা খাওয়া যাক।’

ষষ্ঠীবাবু্‌, থ হইয়া রহিলেন‌, আমরা ফুটপাথে নামিয়া আসিলাম। রাস্তার ওপারে হোটেলের মাথার উপর মস্ত পরিচয়-ফলক শ্ৰীকান্ত পান্থনিবাস। শ্ৰীকান্ত বোধহয় হোটেলের মালিকের নাম। নীচের তলায় রেস্তোরাঁয় চা-পিয়াসীর দল বসিয়া গিয়াছে‌, দ্বিতলে জানালার সারি‌, কয়েকটা খোলা। ব্যোমকেশ পথ পার হইবার জন্য পা বাড়াইয়া হঠাৎ থামিয়া গেল‌, বলিল‌, ‘দাঁড়াও‌, গলির মধ্যেটা একবার দেখে যাই।’

‘গলির মধ্যে কী দেখবো?’

‘এসই না।’

অনাদি হালদারের বাসা ও নুতন বাড়ির মাঝখান দিয়া গলিতে প্রবেশ করিলাম। একেই গলিটি অত্যন্ত অপ্রশস্ত‌, তার উপর নূতন বাড়ির স্বলিত বিক্ষিপ্ত ইটসুরকি এবং ভারা বাঁধার খুঁটি মিলিয়া তাহাকে আরও দুৰ্গম করিয়া তুলিয়াছে। ব্যোমকেশ মাটির দিকে নজর রাখিয়া ধীরে ধীরে অগ্রসর হইল।

গলিটি কানা গলি‌, বেশি দূর যায় নাই। তাহার শেষ পর্যন্ত গিয়া ব্যোমকেশ ফিরিল‌, আবার মাটিতে দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখিয়া চলিতে লাগিল। তারপর অনাদি হালদারের বাসার পাশে পৌঁছিয়া হঠাৎ অবনত হইয়া একটা কিছু তুলিয়া লইল।

জিজ্ঞাসা করিলাম‌, ‘কি পেলে?’

সে মুঠি খুলিয়া দেখাইল‌, একটি চকচকে নূতন চাবি। বলিলাম‌, চাবি! কোথাকার চাবি?’

ব্যোমকেশ একবার উর্ধে জানালার দিকে চাহিল‌, চাবিটি পকেটে রাখিয়া বলিল‌, ‘হলফ নিয়ে বলতে পারি না‌, তবে সন্দেহ হয় অনাদি হালদারের আলমারির চাবি।’

‘কিন্তু–’

‘আন্দাজ করেছিলাম গলির মধ্যে কিছু পাওয়া যাবে। এখন চল‌, চা খাওয়া যাক।’

‘কিন্তু‌, আলমারির চাবি তো—’

‘অনাদি হালদারের কোমরে আছে। তা আছে। কিন্তু আর একটা চাবি থাকতে বাধা কি?’

‘কিন্তু‌, গলিতে চাবি এল কি করে?’

‘জানিলা দিয়ে।–এস।’ ব্যোমকেশ আমার হাত ধরিয়া টানিয়া লইয়া চলিল।



শ্ৰীকান্ত পান্থনিবাসে প্রবেশ করিয়া একটি টেবিলে বসিলাম। ভৃত্য চা ও বিস্কুট দিয়া গেল। ভৃত্যকে প্রশ্ন করিয়া জানা গেল হোটেলের মালিক শ্ৰীকান্ত গোস্বামী পাশেই একটি ঘরে আছেন। চা বিস্কুট সমাপ্ত করিয়া আমরা নির্দিষ্ট ঘরে ঢুকিলাম।

ঘরটি শ্ৰীকান্তবাবুর অফিস; মাঝখানে টেবিল ও কয়েকটি চেয়ার। শ্ৰীকান্তবাবু মধ্যবয়স্ক ব্যক্তি‌, চেহারা গোলগাল‌, মুণ্ডিত মুখ; বৈষ্ণবোচিত প্রশান্ত ভাব। তিনি গত রাত্রির বাসি ফাউল কাটলেট সহযোগে চা খাইতেছিলেন‌, আমাদের আকস্মিক আবিভাবে একটু বিব্রত হইয়া পড়িলেন।

ব্যোমকেশ সবিনয়ে বলিল‌, ‘মাফ করবেন‌, আপনিই কি হোটেলের মালিক শ্ৰীকান্ত গোস্বামী মশায়?’

গোস্বামী মহাশয়ের মুখ ফাউল কাটলেটে ভরা ছিল‌, তিনি এক চুমুক চা খাইয়া কোনও মতে তাহা গলাধঃকরণ করিলেন‌, বলিলেন‌, ‘আসুন। আপনারা-?’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘একটু দরকারে এসেছি। সামনের বাড়িতে কাল রাত্রে খুন হয়ে গেছে শুনেছেন বোধহয়?’

‘খুন!’ শ্ৰীকান্তবাবু ফাউল কাটলেটের প্লেট পাশে সরাইয়া দিলেন‌, ‘কে খুন হয়েছে?’

‘১৭২/২ নম্বর বাড়িতে থাকত-অনাদি হালদার।’

শ্ৰীকান্তবাবু চোখ কপালে তুলিয়া বলিলেন‌, ‘অনাদি হালদার খুন হয়েছে! বলেন কি?’

‘তাকে আপনি চিনতেন?’

‘চিনতাম বৈকি। সামনের বাড়ির দোতলায় থাকত‌, নতুন বাড়ি তুলছিল। প্রায় আমার হোটেলে এসে চিপ কাটলেট খেত।–কাল রাত্তিরেও যে তাকে দেখেছি।’

‘তাই নাকি! কোথায় দেখলেন?’

‘ওর ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে রাস্তায় বাজি পোড়ানো দেখছিল। যখনই জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়েছি তখনই দেখেছি ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘কখন কোথা থেকে কি দেখলেন সব কথা। দয়া করে বলুন। আমি অনাদি হালদারের খুনের তদন্ত করছি। আমার নাম ব্যোমকেশ বক্সী।’

শ্ৰীকান্তবাবু বিস্ময়াপ্লুত চক্ষে তাহার পানে চাহিয়া থাকিয়া বলিলেন‌, ‘আপনি ব্যোমকেশবাবু! কি সৌভাগ্য।’ তিনি ভূত্য ডাকিয়া আমাদের জন্য চা ও ফাউল কাটলেট হুকুম দিলেন। আমর এইমাত্র চা বিস্কুট খাইয়াছি বলিয়াও পরিত্রাণ পাওয়া গেল না।

তারপর শ্ৰীকান্তবাবু বলিলেন‌, ‘আমার হোটেলের দোতলায় দুটো ঘর নিয়ে আমি থাকি‌, বাকি তিনটে ঘরে কয়েকজন ভদ্রলোক মেস করে আছেন। সবসুদ্ধ এগারজন। তার মধ্যে তিনজন কালীপুজোর ছুটিতে দেশে গেছেন‌, বাকি আটজন বাসাতেই আছেন। কাল সন্ধ্যের পর ১ নম্বর আর ৩ নম্বর ঘরের বাবুরা ঘরে তালা দিয়ে শহরে আলো দেখতে বেরুলেন। ২ নম্বর ঘরের যামিনীবাবুরা তিনজন বাসাতেই রইলেন। ওঁদের খুব পাশা খেলার শখ। আমিও খেলি। কাল সন্ধ্যে সাতটার পর ওঁরা আমাকে ডাকলেন‌, আমরা চারজন যামিনীবাবুর তক্তপোশে পাশা খেলতে বসলাম। যামিনীবাবুর তক্তপোশ ঠিক রাস্তার ধারে জানলার সামনে। সেখানে বসে খেলতে খেলতে যখনই বাইরের দিকে চোখ গেছে তখনই দেখেছি। অনাদি হালদার ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে বাজি পোড়ানো দেখছে। আমরা তিন দান খেলেছিলাম‌, প্ৰায় সাড়ে দশটা পর্যন্ত খেলা চলেছিল।’

‘তারপর আর অনাদি হালদারকে দেখেননি?’

‘না‌, তারপর আমরা খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়লাম‌, অনাদি হালদারকে আর দেখিনি।’

‘যে বাবুরা আলো দেখতে বেরিয়েছিলেন তাঁরা কখন ফিরলেন?’

‘তাঁদের মধ্যে দু’জন ফিরেছিলেন রাত বারোটার সময়‌, বাকি বাবুরা এখনও ফেরেননি।’

‘এখনও আলো দেখছেন।’

শ্ৰীকান্তবাবু অধরোষ্ঠ কুঞ্চিত করিয়া একটি ক্ষুদ্র নিশ্বাস ত্যাগ করিলেন; মনুষ্য জাতির ধাতুগত দুর্বলতা সম্বন্ধে বোধকরি নীরবে খেদ প্রকাশ করিলেন।

ব্যোমকেশ কিছুক্ষণ অন্যমনস্কভাবে কাটলেট চিবাইল‌, তারপর বলিল‌, ‘দেখুন‌, অনাদি হালদারের লাশ পাওয়া গেছে। ওই ব্যালকনিতেই‌, বুকে বন্দুকের গুলি লেগে পিঠ ফুড়ে বেরিয়ে গেছে। তা থেকে আন্দাজ করা যেতে পারে যে আপনার হোটেল থেকে কেউ বন্দুক ছুঁড়ে অনাদি হালদারকে মেরেছে—’

শ্ৰীকান্তবাবু আবার চক্ষু কপালে তুলিলেন–’আমার হোটেল থেকে! সে কি কথা! কে মারবে?’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘এটা আন্দাজ মাত্র। আপনি বলছেন সন্ধ্যে সাতটা থেকে আপনারা চারজন ছাড়া দোতলায় আর কেউ ছিল না। এ বিষয়ে নিঃসন্দেহ?’

শ্ৰীকান্তবাবু বলিলেন‌, ‘মেসের বাসিন্দা আর কেউ ছিল না। এ বিষয়ে আমি নিঃসন্দেহ। তবে–দাঁড়ান। একটা চাকর দোতলার কাজকর্ম করে‌, সে বলতে পারবে। হরিশ! ওরে কে আছিস হরিশকে ডেকে দে।’

কিছুক্ষণ পরে হরিশ আসিল‌, ছিটের ফতুয়া পরা আধ-বয়সী লোক। শ্ৰীকান্তবাবু বলিলেন‌, ‘কাল সন্ধ্যে থেকে তুই কোথায় ছিলি?’

হরিশ বলিল‌, ‘আজ্ঞে‌, ওপরেই তো ছিলুম। বাবু্‌, সারাক্ষণ সিঁড়ির গোড়ায় বসেছিলুম। আপনারা শতরঞ্চি খেলতে বসলেন–’

‘কতক্ষণ পর্যন্ত ছিলি?’

‘আজ্ঞে, রাত দুপুরে ধীরুবাবু আর মানিকবাবু ফিরলেন, তখন আমি সিঁড়ির পাশের কম্বল পেতে শুয়ে পড়লুম। কোথাও তো যাইনি বাবু।’

শ্রীকান্তবাবু ব্যোমকেশের দিকে তাকাইলেন, ব্যোমকেশ হরিশকে প্রশ্ন করিল, ‘বাবুরা পাশা খেলতে আরম্ভ করবার পর থেকে রাত্ৰি বারোটা পর্যন্ত তুমি সারাক্ষণ সিঁড়ির কাছে বসেছিলে‌, একবারও কোথাও যাওনি?’

হরিশ বলিল‌, ‘একবারটি পাঁচ মিনিটের জন্যে নীচে গেছলুম যামিনীরাবুর জন্যে দোক্তা আনতে।’

শ্ৰীকান্তবাবু বলিলেন‌, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ‌, যামিনীবাবু ওকে একবার দোক্তা আনতে পাঠিয়েছিলেন বটে।’

‘সে কখন? ক’টার সময়?’

‘আজ্ঞে‌, রাত্তির তখন নটা হবে।’

‘ছ। রাত্ৰি নটা থেকে দুপুর রাত্রি পর্যন্ত দোতলায় কেউ আসেনি?

‘দোতলায় কেউ আসেনি বাবু। দশটা নাগাদ তেতলার ভাড়াটে বাবু এসেছিলেন‌, কিন্তু তিনি দোতলায় দাঁড়াননি‌, সটান তেতলায় উঠে গেছলেন।’

ব্যোমকেশ চক্ষু বিস্ফারিত করিয়া শ্ৰীকান্তবাবুর পানে চাহিল। তিনি বলিলেন‌, ‘ওহো‌, তেতলার ভাড়াটের কথা বলা হয়নি। তেতিলায় একটা ছোট ঘর আছে‌, চিলেকোঠা বলতে পারেন। এক ভদ্রলোক ভাড়া নিয়েছেন। ঘরে পাকাপাকি থাকেন না‌, খাওয়া-দাওয়া করেন। না। তবে রোজ সকাল-বিকেল আসেন‌, ঘরের মধ্যে দোর বন্ধ করে কি করেন জানি না‌, তারপর আবার তালা লাগিয়ে চলে যান। একটু অদ্ভুত ধরনের লোক।’

‘নাম কি ভদ্রলোকের?’

‘নাম? দাঁড়ান বলছি–শ্ৰীকান্তবাবু একখানা বাঁধানো খাতা খুলিয়া দেখিলেন— নিত্যানন্দ ঘোষাল।’

‘নিত্যানন্দ ঘোষাল।’ ব্যোমকেশ একবার আড়চোখে আমার পানে চাহিল-‘রোজ দু’বেলা যখন আসেন তখন কলকাতার লোক বলেই মনে হচ্ছে। কতদিন আছেন। এখানে?’

‘প্রায় ছ’ মাস। নিয়মিত ভাড়া দেন‌, কোনও হাঙ্গামা নেই।’

‘কি রকম চেহারা বলুন তো?’

‘মোটাসোটা গোলগাল।’

ব্যোমকেশ আবার আমার পানে কটাক্ষপাত কুরিয়া মুচকি হাসিল—’চেনা-চেনা ঠেকছে—‘ ‘হরিশকে বলিল‌, ‘নিত্যানন্দবাবু দশটা নাগাদ এসেছিলেন? তোমার সঙ্গে কোনও কথা হয়েছিল?’

হরিশ বলিল‌, ‘আৰ্জেজ্ঞ না‌, উনি কথাবার্তা বলেন না। ব্যাগ হাতে সটান তেতলায় উঠে গেলেন।’

‘ব্যাগ!’

‘আজেজ্ঞ। উনি যখনই আসেন সঙ্গে চামড়ার ব্যাগ থাকে।’

‘তাই নাকি! কত বড় ব্যাগ?’

‘আজ্ঞে‌, লম্বা গোছের ব্যাগ; সানাই বাঁশী রাখার ব্যাগের মত।’

‘ক্ল্যারিওনেট রাখার ব্যাগের মত? ভদ্রলোক তেতলার ঘরে নিরিবিলি বাঁশী বাজানো অভ্যোস করতে আসেন নাকি?’

‘আজ্ঞে‌, কোনও দিন বাজাতে শুনিনি।’

ব্যোমকেশ কিছুক্ষণ গভীর চিন্তামগ্ন হইয়া রহিল। তারপর মুখ তুলিয়া প্রশ্ন করিল‌, ‘কাল রাত্রে উনি কখন ফিরে গেলেন?’

‘ঘণ্টাখানেক পরেই। খুব ব্যস্তসমস্তভাবে তরুতর করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেলেন।’

‘ও!— আচ্ছা‌, তুমি এবার যেতে পারো।’। হরিশ শূন্য পেয়ালা প্লেট প্রভৃতি লইয়া প্রস্থান করিলে ব্যোমকেশ শ্ৰীকান্তবাবুকে বলিল‌, ‘ওপরতলাগুলো একবার দেখতে ইচ্ছা হচ্ছে। আপত্তি আছে কি?’

‘বিলক্ষণ‌, আপত্তি কিসের? আসুন।’ শ্ৰীকস্তবাবু আমাদের উপরতলায় লইয়া চলিলেন।

দ্বিতলে পাশাপাশি পাঁচটি বড় বড় ঘর‌, সামনে টানা বারান্দা। সিঁড়ি দিয়া উঠিয়াই প্রথম দু’টি ঘর শ্ৰীকান্তবাবুর। দ্বারে তালা লাগানো ছিল। ব্যোমকেশ জিজ্ঞাসা করিল‌, ‘আপনি কি একলা থাকেন?’

শ্ৰীকান্তবাবু বলিলেন‌, ‘আপাতত একলা। স্ত্রীকে ছেলেপুলে নিয়ে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছি। যা দিনকাল।’

‘বেশ করেছেন।’

এক নম্বর ঘরে তালা লাগানো‌, বাবুরা এখনও ফেরেন নাই। দু’ নম্বর ঘরে তিনটি প্রৌঢ় ভদ্রলোক রহিয়াছেন। একজন মেঝোয় বসিয়া জুতা পালিশ করিতেছেন‌, দ্বিতীয় ব্যক্তি দাড়ি কামাইতেছেন‌, তৃতীয় ব্যক্তি খোলা জানালার ধারে বিছানায় কান্ত হইয়া খবরের কাগজ পড়িতেছেন। জানোলা দিয়া রাস্তার ওপারে অনাদি হালদারের বাসা সোজাসুজি দেখা যাইতেছে। ব্যালকনির ভিতর দৃষ্টি প্রেরণ করিবার চেষ্টা করিলাম‌, কিন্তু ঢালাই লোহার ঘন রেলিং-এর ভিতর দিয়া কিছু দেখা গেল না।

তিন নম্বর ঘরে ধীরুবাবু ও মানিকবাবু সবেমাত্র বিছানায় উঠিয়া বসিয়াছেন এবং তুড়ি দিয়া হাই তুলিতেছেন। শ্ৰীকান্তবাবু সহাস্যে বলিলেন‌, ‘কী‌, ঘুম ভাঙল?’

দু’জনে বাহু উর্ধে তুলিয়া আড়মোড়া ভাঙিলেন।

চলিল। একই সিঁড়ি ত্রিতলে গিয়াছে‌, তাহা দিয়া উপরে উঠিতে লাগিল। শ্ৰীকান্তবাবু ও আমি পিছনে রহিলাম।

ত্রিতলে একটি ঘর‌, বাকি ছাদ খোলা! ঘরের দরজায় তালা লাগানো।

ব্যোমকেশ শ্ৰীকান্তবাবুকে জিজ্ঞাসা করিল‌, ‘আপনার কাছে চাবি আছে নাকি?’

‘না। তবে—’ তিনি পকেট হইতে চাবির একটা গোছা বাহির করিয়া বলিলেন‌, ‘দেখুন। যদি কোন চাবি লাগে। ভাড়াটের অবর্তমানে তার ঘর খোলা বোধহয় উচিত নয়‌, কিন্তু বর্তমান অবস্থায়–’

চাবির গোছা লইয়া ব্যোমকেশ কয়েকটা চাবি লোগাইয়া দেখিল। সস্তা তালা‌, বেশি চেষ্টা করিতে হইল না‌, খুট করিয়া খুলিয়া গেল।

আমরা ঘরে প্রবেশ করিলাম।। ঘরের একটিমাত্র জানালা রাস্তার দিকে খোলা রহিয়াছে। আসবাবের মধ্যে একটি উলঙ্গ তক্তপোশ ও একটি লোহার চেয়ার। আর কিছু নাই।

ব্যোমকেশ কোনও দিকে দৃকপাত না করিয়া প্রথমেই জানালার সম্মুখে গিয়া দাঁড়াইল। নীচে প্রশস্ত রাস্তার উপর মানুষ ও যানবাহনের স্রোত বহিয়া চলিয়াছে। ওপারে অন্যান্য বাড়ির সারির মধ্যে অনাদি হালদারের ব্যালকনি।

ব্যোমকেশ সেই দিকে চাহিয়া কতকটা আপন মনেই বলিল‌, ‘কাল রাত্রি আন্দাজ এগারোটার সময়…রাস্তায় ছেলেরা বাজি পোড়াচ্ছে…চারিদিকে দুমদাম শব্দ-অনাদি হালদার ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে বাজি পোড়ানো দেখছে..সেই সময় জানলা থেকে তাকে গুলি করা কি খুব শক্ত? গুলির আওয়াজ শোনা গেলেও বোমা ফাটার আওয়াজ বলেই মনে হবে।’

শ্ৰীকান্তবাবু বললেন‌, তা বটে। কিন্তু হোটেলে এত লোকের চোখে ধুলো দিয়ে বলুক আনা কি সহজ?

‘আপনার ভাড়াটে হাতে ব্যাগ নিয়ে হোটেলে আসে। ব্যাগের মধ্যে একটা পিস্তল কিম্বা রিভলবার সহজেই আনা যায়।’

‘কিন্তু রাইফেল কিম্বা বন্দুক আনা যায় কি? আমাকে মাফ করবেন‌, আমি অদ্বৈত বংশের সন্তান‌, গোলাগুলি বন্দুক পিস্তলের ব্যাপার কিছুই বুঝি না। তবু মনে হয়‌, পিস্তল কিংবা রিভলবার দিয়ে এতদূর থেকে মানুষ মারা সহজ কাজ নয়।’

উত্তরে ব্যোমকেশ কেবল গলার মধ্যে একটা শব্দ করিল। তারপর নিরাভরণ ঘরের চারিদিকে একবার দৃষ্টি ফিরাইয়া বলিল‌, চলুন‌, যাওয়া যাক‌, আপনাকে অনেক কষ্ট দিলাম— বলিতে বলিতে থামিয়া গেল। দেখিলাম তাহার দৃষ্টি দেয়ালের একটা স্থানে আটকাইয়া গিয়াছে।

জানালার ঠিক উল্টা পিঠে দেয়ালের ছাদের কাছে খানিকটা চুন বালি খসিয়া গিয়াছে। তাহার নীচে মেঝের উপর খসিয়া-পড়া চুন বালি পড়িয়া আছে। ব্যোমকেশ ত্বরিতে গিয়া চুন বালি পরীক্ষা করিল‌, বলিল‌, ‘নতুন খসেছে মনে হচ্ছে। শ্ৰীকান্তবাবু্‌, এ ঘর রোজ ঝটপট দেওয়া হয়?’

শ্ৰীকান্তবাবু বলিলেন‌, ‘না। ঘর খোলা থাকে না—’

ব্যোমকেশ দু’ পা সরিয়া আসিয়া উর্ধমুখে চাহিয়া রহিল।

‘দেয়ালের এই চুন-বালি কবে খসেছে আপনি বলতে পারেন না?’

‘না। এইটুকু বলতে পারি ছ। মাস আগে যখন ঘর ভাড়া দিয়েছিলাম তখন প্ল্যাস্টার ঠিক ছিল। ‘

‘হুঁ। অজিত‌, চৌকিটা ধরতো‌, একবার দেখি–’

দু’জনে চৌকি ধরিয়া দেয়ালে ঘেষিয়া রাখিলাম; তাহার উপর লোহার চেয়ার রাখিয়া ব্যোমকেশ তদুপরি আরোহণ করিল। সেখান হইতে হাত বাড়াইয়া দেয়ালের ক্ষতস্থানটার নাগাল পাওয়া যায়। ব্যোমকেশ আঙুল দিয়া স্থানটা হাতড়াইল‌, তারপর একটি ক্ষুদ্র বস্তু হাতে লইয়া নামিয়া আসিল। পেন্সিলের ক্যাপের মত লম্বাটে আকৃতির একটি ধাতব পদার্থ্‌্‌, তাহার গায়ে রাইফেলের পেচানো রেখাচিহ্ন।

রাইফেলের টোটা। ব্যোমকেশ সেটি ঘুরাইয়া দেখিতে দেখিতে বলিল‌, ‘এ বস্তু এখানে এল কি করে? কবে এল?—ঘরের মধ্যে কেউ রাইফেল ছুড়েছিল? কিম্বা–’ ব্যোমকেশ জানালার দিকে চাহিল, ‘অনাদি হালদার যদি ব্যালকনি থেকে জানালা লক্ষ্য করে রাইফেল ছুঁড়ে থাকে তাহলে গুলিটা দেয়ালের ওই জায়গায় লাগা সম্ভব। অথবা–’

বাসায় ফিরিতে দেরি হইল। রাত্রি সাড়ে তিনটা হইতে বেলা সাড়ে আটটা পর্যন্ত কোন দিক দিয়া কাটিয়া গিয়াছে জানিতে পারি নাই।

ফিরিয়া আসিয়াই ব্যোমকেশ খবরের কাগজ লইয়া বসিয়া গেল। আমি কয়েকবার অনাদি-প্ৰসঙ্গ আলোচনার চেষ্টা করিলাম‌, কিন্তু সে গায়ে মাখিল না। একবার অন্যমনস্কভাবে চোখ তুলিয়া প্রশ্ন করিল‌, ‘আকাশের গায়ে নাকি টক টক গন্ধ?

আমি রাগ করিয়া নিরুত্তর হইলাম। কুক্ষণে খোকাকে একখানি আবোল-তাবোল কিনিয়া দিয়াছিলাম। ব্যোমকেশ বইখানি মুখস্থ করিয়া রাখিয়াছে এবং সময়ে অসময়ে আবৃত্তি করিয়া শুনাইতেছে।

গত রাত্রে নিদ্রায় ঘাটতি পড়িয়াছিল‌, দুপুরবেলা তাহা পূরণ করিয়া লইলাম। বৈকালের চা পান করিতে বসিয়া ব্যোমকেশ নিজেই কথা পাড়িল‌, ‘কেষ্টবাবুর এখনও দেখা নেই। মনে হচ্ছে সবাই গা এলিয়ে দিয়েছে।’

বলিলাম‌, ‘কেষ্টবাবুর যখন গলায় কাঁটা বিঁধেছিল‌, তখন ছুটে এসেছিল। এখন বোধহয় কাঁটা বেরিয়ে গেছে তাই গা-ঢাকা দিয়েছে।’

‘তাই হবে। কিন্তু ওরা যদি না আসে‌, আমিই বা কি করতে পারি। কেসটা বেশ রহস্যময়–’

‘কে খুন করেছে এখনও বুঝতে পারনি?’

‘উহু। কিন্তু যেই করুক‌, খুব ভেবেচিন্তে আটঘটি বেঁধে করেছে। কালীপুজোর রাত্তির‌, চতুর্দিকে বোমা ফাটার শব্দ‌, তার মধ্যে একটি বন্দুকের আওয়াজ। প্ল্যান করে খুন না করলে এমন যোগাযোগ হয় না।’

‘কে এমন গ্ল্যান করতে পারে?’

‘কে না করতে পারে। সকলেরই স্বার্থ রয়েছে‌, সকলেরই সুযোগ রয়েছে।’

‘সকলে কারা?’

‘একে একে ধর। প্রথমে ধর নিমাই নিতাই। খুড়ো পুষ্যিপুত্তুর নিলেই খুড়োর সম্পত্তি বেহাত হয়ে যায়‌, অতএব খুড়োকে পুষ্যিপুতুর নেবার আগেই সরানো দরকার। নিমাই নিতাইয়ের মধ্যে একজন শ্ৰীকান্ত হোটেলের চুড়োয় আড্ডা গাড়ল‌, বন্দুক নিয়ে ওৎ পেতে রইল। কালীপুজের রাত্রে দশটা থেকে এগারোটার মধ্যে বন্দুকের গুলি ছুটিল। খুড়ো কুপোকাৎ। কাম ফতে।’

‘তাহলে ভাইপোরাই খুন করেছে‌, অন্য কারুর ওপর সন্দেহের কারণ নেই।’

‘কারণ যথেষ্ট আছে। শ্ৰীকান্ত হোটেলের তেতলার ঘরে রাইফেলের গুলি এল কোথ’। থেকে? ওই ঘর থেকে বন্দুক ছোঁড়া হয়েছিল এটা একটা অনুমান বটে‌, কিন্তু অনিবার্য অনুমান নয়। ভেবে দেখ‌, অনাদি হালদার ব্যালকনিতে যেখানটায় দাঁড়িয়েছিল‌, ঠিক তার পেছনেই দরজা। পিছন থেকে গুড়ি মেরে এসে কেউ যদি তাকে গুলি করে‌, তাহলে গুলিটা তার শরীর কুঁড়ে শ্ৰীকান্ত হোটেলের তেতলার ঘরের জানলা দিয়ে ঘরে ঢুকবে এবং দেয়ালে আটকে যাবে।’

‘সম্ভব বটে। কিন্তু গোড়াতেই তো গলদ। অনাদি হালদারের বাসায় সে ছাড়া আর কেউ ছিল না‌, দরজা ভিতর দিক থেকে বন্ধ ছিল। তাছাড়া আর একটা কথা‌, গুলিটা অনাদি হালদারের বুকের দিক দিয়ে ঢুকে পিঠের দিক দিয়ে বেরিয়েছিল, না পিঠের দিক দিয়ে ঢুকে বুকের দিক দিয়ে বেরিয়েছিল?’

‘সেটা পোস্ট-মর্টেম না হওয়া পর্যন্ত জানা যাবে না। কিন্তু যেদিক দিয়েই গুলি ঢুকুক‌, ব্যালকনিতে গুলিটা পাওয়া যায়নি। তা থেকে অনুমান করা অন্যায় হবে না যে‌, বাসার ভিতর দিক থেকেই অনাদি হালদারকে গুলি করা হয়েছে।’

‘আচ্ছা‌, তর্কের খাতিরে মেনে নেওয়া যাক যে‌, বাসার ভিতর থেকেই কেউ গুলি চালিয়েছে। কিন্তু লোকটা কে?’

‘সেইটেই আসল প্রশ্ন। দেখা যাক কার স্বাৰ্থ আছে। কেষ্ট দাসের কোনও স্বার্থ আপাতদৃষ্টিতে চোখে পড়ে না। কিন্তু লোকটা অত্যন্ত ধূর্ত এবং পাজি‌, হয়তো দোষ কাটাবার জন্যেই শেষ রাত্রে আমার কাছে ছুটে এসেছিল। সুতরাং তাকেও বাদ দেওয়া যায় না। দ্বিতীয় হল ননীবালা দেবী। ‘

‘ননীবালা?’

‘ননীবালা দেবীটি জবরদস্ত মহিলা। পালিত পুত্রের প্রতি তাঁর স্নেহ খাঁটি মাতৃস্নেহের চেয়ে কোনও অংশে কম নয়। তিনি জানতেন না যে প্ৰভাতের পোষ্যপুত্র গ্রহণের ব্যাপারে আইনঘটিত খুঁত আছে। সুতরাং তিনি ভাবতে পারেন যে অনাদি হালদারকে সরাতে পারলেই প্রভাত সম্পত্তি পাবে। এবং তাকে মারবার চেষ্টা আর কেউ করবে না। তোমার মনে আছে কিনা জানি না‌, ননীবালা যেদিন দ্বিতীয়বার আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন‌, সেদিন আমি বলেছিলাম‌, অনাদি হালদারের মৃত্যুতে অনেকের সুবিধে হতে পারে। হয়তো সেই কথাটাই ননীবালার প্রাণে গেথে গিয়েছিল।’

‘কিন্তু–মেয়েমানুষ বন্দুক চালাবে?’

‘কোন চালাবে না? বন্দুক চালানোর মধ্যে শক্তটা কোনখানে? হারমোনিয়াম যেমন টিপলেই সুকুর‌, কৰ্ম্মক তেমনি টিপলেই গুলি বোঝায়। ওর চেয়ে কুমড়ো-ছেচকি রাঁধা ঢের বেশি কঠিন কাজ।’

‘কিন্তু ননীবালা তো ‘জয় মা কালী দেখছিলেন।’

‘তিনি ‘জয় মা কালী’ দেখতে গিয়েছিলেন‌, কিন্তু সারাক্ষণ প্রেক্ষাগৃহে ছিলেন‌, তার প্রমাণ কৈ? তাঁর সঙ্গে পরিচিত কেউ ছিল না‌, হয়তো ছবি আরম্ভ হবার পর তিনি অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহ থেকে বেরিয়েছিলেন‌, তারপর কাজকর্ম সেরে আবার গিয়ে বসেছিলেন।’

‘তিনি বন্দুক কোথায় পেলেন?’

‘হায় মুর্খ! বাঁটুল সদারের মত গণ্ডাগণ্ডা গুণ্ডা যেখানে চোরাই বন্দুক পাচার করবার জন্যে ছুটোছুটি করে বেড়াচ্ছে‌, সেখানে বন্দুকের অভাব? পাঁচ টাকা খরচ করলে বন্দুক ভাড়া পাওয়া যায়।’

‘হুঁ। তারপর?’

‘তারপর প্রভাত। প্ৰভাত অবশ্য জানত যে সে অনাদি হালদারের পুষ্যিপুত্তুর নয়‌, কিন্তু তার অন্য উদ্দেশ্য থাকতে পারে। তার নিজস্ব দোকান আছে‌, অনাদি হালদার মরে গেলেও তার মোটা ভাত-কাপড়ের অভাব হবে না। সে ভাবতে পারে অনাদি হালদারের মৃত্যুর পর তার ভাইপোরা আর তার কোনও অনিষ্ট করবার চেষ্টা করবে না। ভাইপোদের হাত থেকে নিজের প্ৰাণ বাঁচাবার জন্যেই হয়তো সে অনাদি হালদারকে মেরেছে।’

‘এটা খুব জোরালো মোটিভ তুমি মনে করা?’

‘খুব জোরালো মোটিভ না হতে পারে‌, কিন্তু তিল কুড়িয়ে তাল হয়। প্ৰভাত একটি মেয়েকে বিয়ে করতে চেয়েছিল‌, অনাদি হালদার সে সম্বন্ধ ভেঙে দেয়। এটাও সামান্য মোটিভ নয়।’

আমি হাসিলাম। ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘হেসো না। তোমার কাছে যা তুচ্ছ‌, অন্যের কাছে তা পর্বতপ্ৰমাণ হতে পারে। কখনও প্রেমে পড়নি‌, প্রেম কি বস্তু জান না। প্রেমের জন্যে মানুষ খুন করতে পারে, ফাঁসি যেতে পারে, সর্বস্ব খোয়াতে পারে—‘

‘আচ্ছা‌, আচ্ছা‌, মেনে নিলাম প্ৰভাতও খুন করতে পারে।’

‘তবে একটা কথা আছে। প্রভাত সারাক্ষণ তার দোকানে ছিল‌, দোকানের দরজায় গুর্খা দরোয়ান ছিল। তার এই অ্যালিবাই যদি পাকা হয়—‘

‘পাকা হওয়াই সম্ভব। প্ৰভাত এমন মিথ্যে কথা বলবে না। যা সহজেই ধরা যায়। তারপর বল। ‘

‘তারপর ন্যাপা।’ ব্যোমকেশ পকেট হইতে কুড়াইয়া পাওয়া চাবিটি বাহির করিয়া নাড়িয়া চাড়িয়া দেখিতে লাগিল‌, ‘দুটো খবর নিশ্চয়ভাবে জানা দরকার : এটা অনাদি হালদারের চাবি কিনা এবং এটা গলিতে কে ফেলেছিল।’

বলিলাম‌, ন্যাপার ওপরই তোমার সন্দেহ‌, কেমন? মনে করা যাক‌, এটা অনাদি হালদারের আলমারির চাবি এবং ন্যাপা এটা গলিতে ফেলেছিল। তাতে কী প্ৰমাণ হয়?’

‘প্ৰমাণ হয়তো কিছুই হয় না‌, কিন্তু ন্যাপার ওপর সন্দেহ হয়। আলমারিতে হয়তো অনেক নগদ টাকা ছিল–’

এ আবার এক নূতন সম্ভাবনা। প্রশ্ন করিলাম‌, ‘দাঁড়ালো কি? আসামী কে? নিমাই নিতাই? কেষ্টবাবু? ননীবালা? প্ৰভাত? ন্যাপা? না আর কেউ?’

‘আর একজন হতে পারে।’

‘আবার কে?’

‘বাঁটুল সর্দার।’

‘বাঁটুল! সে কেন অনাদি হালদারকে খুব করবে?’

‘প্রাণরক্ষার ওজুহাতে চাঁদা আদায় করা বাঁটুলের পেশা। অনাদি হালদার চাঁদা দেওয়া বন্ধ করেছিল। তার দেখাদেখি যদি অন্য সকলে চাঁদা দেওয়া বন্ধ করে? তাই অনাদি হালদারকে শাস্তি দেওয়া দরকার‌, তার পরিণাম দেখে আর সকলে শায়েস্তা থাকবে।’

পুঁটিরাম আসিয়া চায়ের পেয়ালা তুলিয়া লইয়া গেল। ব্যোমকেশ সিগারেট ধরাইতে ধরাইতে বলিল‌, ‘বাঁশি বনে ডোম কানা। শ্রীরাধিকে চন্দ্রাবলী করে রেখে করে ফেলি।’

দুইজনে নীরবে ধূমপান করিতে লাগিলাম। ঘড়িতে যখন সওয়া চারটে‌, তখন দ্বারের কড়া নড়িয়া উঠিল।

দ্বার খুলিয়া দেখিলাম কেষ্টবাবু। শেষ পর্যন্ত কেষ্টবাবু আসিয়াছেন। কিন্তু এ কেষ্টবাবু সকালবেলার ভয়বিমূঢ় মদ্যবিহ্বল কেষ্টবাবু নয়‌, চটপটে স্মার্ট কেষ্টবাবু। গায়ে ধোপদূরস্ত জামাকাপড়‌, দস্তুর মুখে আত্মপ্রসন্ন মৃদুমন্দ হাসি। মানুষটা যেন আগাগোড়া বদলাইয়া গিয়াছে।

তিনি ব্যোমকেশের সম্মুখের চেয়ারে উপবিষ্ট হইলেন। ব্যোমকেশ চাবিটি হাতে তুলিয়া ধরিয়া নিবিষ্ট মনে নিরীক্ষণ করিতেছিল‌, চোখ তুলিয়া বলিল‌, ‘খবর কি? পুলিস এসেছিল?’

কেষ্টবাবু চাবিটি দেখিলেন, কিন্তু তাঁহার মুখে-চোখে কোনও প্রতিক্রিয়াই প্রকাশ পাইল না। প্রশ্নের উত্তরে তিনি মুখে চটকার শব্দ করিয়া বলিলেন, ‘এগারোটার সময় এসেছিল। কী রামরাজত্বে বাস করছি আমরা।‘

চাবি পকেটে রাখিয়া ব্যোমকেশ বলিল, ‘তারপর কি হল?’

‘কি আর হবে। দারোগী সকলকে হুমকি দিলে, অনাদির আলমারিটা খুলে দেখলে, একগোছা নোট ছিল পকেটে পুরলে, তারপর লাশ তুলে নিয়ে চলে গেল।‘

ব্যোমকেশ কিছুক্ষণ গুম হইয়া বসিয়া থাকিয়া বলিল, ‘আপনাদের কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করলে না?’

‘কাল রাত্রে কে কোথায় ছিলাম জিজ্ঞেস করেছিল, আর কিছু নয়। একছত্র লিখেও নিলে না। দুম দুম করে এল, দুম দুম করে চলে গেল।‘

ব্যোমকেশ নিশ্বাস ফেলিয়া বলিল, ‘যাক, অনাদি হালদারের বেশ সদগতি হল। কে মেরেছে তা জানা যাবে না, পোস্ট-মর্টেম রিপোর্ট পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। ভালই হল, আপনাদের ভুগতে হবে না।‘

কেষ্টবাবু বলিলেন, ‘ভাল যাদের হবার তাদের হল, আমার আর কি ভাল হল, ব্যোমকেশবাবু? আমাকে বেশিদিন ওখানে টিকতে হবে না।’

‘কেন?’

‘ননীবালা পেছনে লেগেছে, আমাকে তাড়াতে চায়। এখন তো আর অনাদি নেই, মাগীর বিক্রম বেড়েছে। দেখুন না, বেরুবার সময় বললাম, এক পেয়ালা চা করে দেবে? তা মুখ-ঝামটা দিয়ে উঠল, চা-টা এখন হবে না, দোকানে গিয়ে চা খাওগে।‘

ক্ষণেক নীরব থাকিয়া ব্যোমকেশ বলিল, ‘তাহলে আপনি এখন কি করবেন মনে করেছেন?’

‘কিছু একটা ব্যবস্থা করতে হবে। কাজকর্ম তো আর এ-বয়সে পোষাবে না।’ বলিয়া কেষ্টবাবু দুই সারি দাঁত বাহির করিয়া হাসিলেন।

ব্যোমকেশ বলিল, ‘আপনার বয়স এমন কী বেশি হয়েছে।–কাজ করবার বয়স যায়নি।’

‘কাজ করার অভ্যোস ছেড়ে গেছে, ব্যোমকেশবাবু। হ্যা হ্যা, আচ্ছা, আজ উঠি তাহলে।‘ বলিয়া তিনি গাত্ৰোত্থান করিলেন।

‘বসুন, বসুন, চা খেয়ে যান।‘

কেষ্টবাবু আবার বসিয়া পড়লেন। ব্যোমকেশ পুঁটিরামকে ডাকিয়া চা ও জলখাবার আনিতে কেষ্টবাবু হৃষ্টমুখে বলিলেন, “আপনি ভদ্রলোক, তাই দরদ বুঝলেন। সবাই কি বোঝে? দুনিয়া স্বার্থপর, গলা টিপে না ধরলে কেউ কিছু দেয় না। অনাদি যে আমাকে একেবারে ডুবিয়ে দিয়ে গেছে—‘ তিনি ব্যোমকেশের পানে আড়নয়নে চাহিলেন, ‘চা খুবই ভাল জিনিস, তবে কি জানেন, আমার একটা বদঅভ্যোস হয়ে গেছে, বিকেলবেলার দিকে শুধু চায়ে আর মৌতাত জমে না।‘ বলিয়া হ্যা হ্যা করিয়া হাসিলেন।

ইঙ্গিতটা ব্যোমকেশ এড়াইয়া গেল। বলিল, ‘পুলিস ছাড়া আর কেউ এসেছিল নাকি? নিমাই নিতাই?’

কেষ্টবাবু বলিলেন, ‘নিমাই নিতাই আর আসেনি। তবে গুরুদত্ত সিং এসে খানিকটা চেঁচামেচি করে গেল।’

‘গুরুদত্ত সিং, কনট্রাকটর—‘

‘হ্যাঁ। পুলিস চলে যাবার পরই সে এসে হাজির। চেঁচাতে লাগল, আমি পঞ্চাশ হাজার টাকার কাজ করেছি, মোটে ত্ৰিশ হাজার পেয়েছি, আজ অনাদি হালদার দশ হাজার টাকা দেবে বলেছিল, সে মরে গেছে, এখন কে দেবে টাকা। আমি বললাম, বাপু, কে টাকা দেবে তা আমরা কি জানি। অনাদির ওয়ারিশের কাছে যাও, থানায় যাও, আদালতে যাও, এখান থেকে বিদেয় হও। যেতে কি চায়? অনেক কষ্টে বিদেয় করলাম।’

ব্যোমকেশ ভাবিতে ভাবিতে বলিল‌, ‘অনাদি হালদার কনট্রাকটরকে আজ দশ হাজার টাকা দেবে বলেছিল.কাল ছিল ব্যাঙ্ক-হলিডে‌, তার মানে পরশু ব্যাঙ্ক থেকে টাকা এনে রেখেছিল‌, অর্থাৎ–‘

কেষ্টবাবু বলিলেন‌, ‘ব্যাঙ্ক থেকে?’

‘হ্যাঁ‌, ব্যাঙ্ক থেকে ছাড়া অত টকা কোথা থেকে আসবে?’

কেষ্টবাবু সুর পাল্টাইয়া বলিলেন‌, ‘তা তো বটেই। আমি ওসব কিছু জানি না। আদার ব্যাপারী, হ্যা হ্যা—‘

ব্যোমকেশ তখন বলিল‌, ‘ওকথা থাক। আপনি ওদের ঘরের লোক‌, নাড়ির খবর রাখেন‌, কে খুন করেছে আন্দাজ করতে পারেন না?’

কেষ্টবাবু কিয়াৎকোল নতনেত্ৰে থাকিয়া চোখ তুলিলেন‌, ‘আপনাকে ধৰ্ম্মকথা বলব‌, বাড়ির কেউ এ-কাজ করেনি।’

‘কারুর ওপর আপনার সন্দেহ হয় না?’

‘সন্দেহ সকলের ওপরেই হয়‌, কিন্তু বিশ্বাস হয় না। এ ওই ভাইপো দুটোর কাজ। ভেবে দেখুন‌, বাড়ির লোকের অন্যদিকে মেরে লাভ কি? সকলেই ছিল অনাদির অন্নদাস। এখন এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে যে‌, দুদিন বাদে হাঁড়ি চড়বে না।’

‘হাঁড়ি চড়বে না কেন? নৃপেন মাইনের চাকর ছিল‌, সে অন্যত্র চাকরি খুঁজে নেবে। আর প্ৰভাত? তার তো দোকান রয়েছে।’

‘দোকান থাকবে কি? ভাইপোরা মোকদ্দমা করে কেড়ে নেবে।’

‘যদি কেড়েও নেয়‌, তবু ওদের অন্নাভাব হবে না। প্ৰভাত আর কিছু না পারুক‌, দপ্তরীর কাজ করে নিজের পেট চালাতে পারবে।’

‘দপ্তরীর কাজ।’ কেষ্টবাবু চকিতে চোখ তুলিয়া ব্যোমকেশের পানে চাহিয়া রহিলেন।

‘আপনি জানেন না? প্ৰভাত দপ্তরীর কাজ জানে‌, ছেলেবেলায় দপ্তরীর দোকানে কাজ শিখেছে।’

পুঁটিরাম চা ও জলখাবার লইয়া আসিল। কেষ্টবাবু জলখাবারের রেকবি তুলিয়া লইয়া আহারে মন দিলেন‌, কিন্তু তাঁহার চক্ষু দু’টি অন্তর্নিবিষ্ট হইয়া রহিল। একবার শুধু অস্ফুট স্বরে বলিলেন‌, ‘কি আশ্চর্য! আমি জানতাম না।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘না-জানা আর আশ্চর্য কী! দপ্তরীর কাজ এমন কিছু মহৎ কাজ নয় যে কেউ ঢাক পেটাবে।’

কেষ্টবাবু একবার ধূর্ত চক্ষু তুলিয়া বলিলেন‌, ‘তা বটে।’

পানাহার শেষ হইলে ব্যোমকেশ তাঁহাকে সিগারেট দিয়া বলিল‌, ‘আজ সকালে আপনি বলেছিলেন‌, অনাদি হালদারের সব গুপ্তকথা। আপনি জানেন‌, ইচ্ছে করলে তাঁকে ফাঁসিকাঠে লটকাতে পারেন—‘

কেষ্টবাবু ত্বরিতে উঠিয়া দাঁড়াইলেন‌, ‘গুপ্তকথা! না না‌, আমি অনাদির গুপ্তকথা কেখেকে জািনব? মদের মুখে কি বলেছিলাম তার কি কোনও মনে হয়? আচ্ছা‌, আজ চললাম‌, অসংখ্য ধন্যবাদ।’ তিনি দ্বারের দিকে অগ্রসর হইলেন।

ব্যোমকেশ হাসিয়া উঠিল‌, ‘শুনুন‌, কেষ্টবাবু-তিনি দ্বারের কাছে ফিরিয়া দাঁড়াইলেন‌, ‘গুপ্তকথা না বলতে চান না বলবেন‌, আমার বেশি আগ্রহ নেই। কিন্তু আজ রাত্তিরে এখানে খাওয়া-দাওয়া করতে তো দোষ নেই। ওখানে হয়তো আজ। আপনার খাওয়া-দাওয়ার অসুবিধে হবে—‘

কেষ্টবাবু সাগ্রহে দুই পা অগ্রসর হইয়া আসিলেন‌, ‘খাওয়া-দাওয়া—!’

‘হাঁ। আপনার খাতিরে আজ না-হয় একটু তরল পদার্থের ব্যবস্থা করা যাবে।’

‘সত্যি বলছেন। আপনারও। তাহলে অভ্যোস আছে। মোদ দিদিমণি না জানতে পারে‌, কেমন? হ্যা হ্যা। ক’টার সময় আসব বলুন।’

‘সন্ধ্যের পরই আসবেন। আমাকে বোধহয় একবার বেরুতে হবে। কিন্তু আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন‌, যদি ফিরতে দেরি হয় চাকরি আপনাকে বসাবে।’

‘বেশ বেশ‌, আমি সন্ধ্যার পরই আসিব।’ দ্ৰংষ্ট্রাবিকট হাস্য করিতে করিতে তিনি প্ৰস্থান করিলেন।

ব্যোমকেশ আমার প্রতি চোখ নাচাইয়া বলিল‌, ‘সাদা চোখে কেষ্ট দাস কিছু বলবে না। —অজিত‌, তুমি শুড়ি বাড়ি যাও‌, একটি পাঁট বোতল কিনে নিয়ে এস। নাসিক হুইস্কি হলেই চলবে। এদিকে আমি পুঁটিরামকে তালিম দিয়ে রাখছি।’

পাঁচটার সময় দুইজনে বাহির হইলাম।

পুঁটিরামকে তালিম দেওয়া হইয়াছে। বসিবার ঘরে টেবিলের উপর বোতল কর্ক-স্কু ও কাচের গেলাস রাখা হইয়াছে। বাহিরের দ্বারে কড়া নাড়িলে পুঁটিরাম আসিয়া দ্বার খুলিয়া দিবে এবং ভেট্‌কি মাছের মত মুখ দেখিলে বলিবে—’আসুন বাবু্‌, কর্তারা বেরিয়েছেন‌, এখুনি ফিরবেন।’ ভেট্‌কি মাছকে টেবিলের নিকট বসাইয়া পুঁটিরাম ডিম ভাজিয়া আনিয়া দিবে এবং নিজে গা-ঢাকা দিবে। তারপর—‘

ফুটপাথে নামিয়া জিজ্ঞাসা করিলাম‌, ‘কোথায় চলেছি আমরা?’

ব্যোমকেশ হাসিয়া বলিল‌, ‘কোনও নির্দিষ্ট গন্তব্যস্থান নেই। কেষ্ট দাস এসে বোতল সাবাড় করবে তারপর আমরা ফিরব।’

‘তা বুঝেছি। কিন্তু ততক্ষণ করব কী?’

‘ততক্ষণ চল গোলদীঘিতে বায়ু সেবন করা যাক।’

গোলদীঘিতে গিয়া পাক খাইতে লাগিলাম। বেশি কথাবার্তা হইল না; ব্যোমকেশ একবার বলিল‌, ‘কেষ্ট দাস গলিতে চাবি ফেলেনি।’

এক সময় চোখে পড়িল য়ুনিভারসিটি ইনস্টিট্যুটে অনেক লোক প্রবেশ করিতেছে‌, বোধহয় কোনও অনুষ্ঠান আছে। ঘুরপাক খাইয়া খাইয়া ক্লান্ত হইয়া পড়িয়াছিলাম, ব্যোমকেশকে বলিলাম, ‘চল না‌, দেখা যাক ওখানে কি হচ্ছে।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘চল। সম্ভবত কোনও বিখ্যাত লোকের মৃত্যু উপলক্ষে উৎসবসভা বসেছে।’

য়ুনিভারসিটি ইনস্টিট্যুটে প্রবেশ করিতে গিয়া ইন্দুবাবুর সহিত দেখা হইয়া গেল। তিনি সিনেমার লোক‌, তার উপর সঙ্গীতজ্ঞ‌, অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আসিয়াছেন। ব্যোমকেশের অনুমান মিথ্যা নয়‌, সিনেমার এক দিকপালের মৃত্যুবাসরে তাঁহার সহধর্মীরা নৃত্য গীত দ্বারা শোক প্রকাশ করিতেছেন। ইন্দুবাবুর সহিত ব্যোমকেশের পরিচয় করাইয়া দিলাম। তিনি আমাদের লইয়া গিয়া সামনের দিকের একটা সারিতে বসাইয়া দিলেন‌, নিজেও পাশে বসিলেন।

মঞ্চের উপর কয়েকটা পদায়-দেখা মুখ চোখে পড়িল‌, অন্য মুখও আছে। সভাপতি একজন পলিতকেশ চিত্রাভিনেতা।

মঞ্চস্থ লোকগুলির মধ্যে একটি মেয়ের মুখ বিশেষ করিয়া আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করিল। অপরিচিত মুখ; সুন্দর নয়‌, কিন্তু চিত্তাকর্ষক। তন্বী নয়‌, পূর্ণাঙ্গী‌, রঙ ফর্সা বলা চলে‌, একরাশ চুল ঘাড়ের কাছে কুণ্ডলিত হইয়া লুটাইতেছে। যাহাকে যৌন আবেদন বলা হয়‌, যুবতীর তাহা প্রচুর পরিমাণে আছে। একটি ষণ্ড গোছের যুবক তাহার গা ঘোষিয়া বসিয়া আছে এবং মাঝে মাঝে তাহার কানে কানে কথা বলিতেছে।

যে গানটা চলিতেছিল তাহা শেষ হইল। সভাপতি একটি চিরকুট হাতে উঠিয়া দাঁড়াইয়া বলিলেন‌, ‘এবার কুমারী শিউলী মজুমদার গাইবেন—কোথা যাও ফিরে চাও দূরের পথিক।’

যে যুবতীকে আমি লক্ষ্য করিয়াছিলাম তাঁহারই নাম শিউলী মজুমদার। সে সংযত মন্থরপদে সম্মুখে আসিয়া উপবেশন করিল‌, ষণ্ডা যুবক বাঁয়োতবলা লইয়া বসিল। গান আরম্ভ হইল।

গলাটি মিষ্ট‌, নিটোল‌, কুহক-কলিত। চোখ বুজিয়া শুনিতে লাগিলাম। তারপর ব্যোমকেশের কনুইয়ের গুঁতা খাইয়া চমক ভাঙিল। ব্যোমকেশ কানে কানে বলিল‌, ‘ওহে বাঁ দিকে তাকিয়ে দেখ।’

বাঁ দিকে সন্তৰ্পণে চক্ষু ফিরাইলাম। কয়েকখানা চেয়ার বাদে প্রথম সারিতে প্রভাত বসিয়া আছে। তন্ময় সমাহিত মুখের ভাব‌, একাগ্র দৃষ্টি গায়িকার উপর বিন্যস্ত। প্রভাত বোধহয় আমাদের দেখিতে পায় নাই‌, পাইলে এতটা একাগ্ৰ হইতে পারিত না। ব্যোমকেশের দিকে ঘাড় ফিরাইয়া দেখিলাম মুখে একটু বাঁকা হাসি লইয়া সে গান শুনিতেছে।

আমার মাথার মধ্য দিয়া বিদ্যুৎ চমকিয়া গেল। শিউলী মজুমদার‌, যাহাকে প্রভাত বিবাহ করিতে চাহিয়াছিল‌, এ কি সেই?…

শিউলী মজুমদারের গান শেষ হইল। তারপর আরও কয়েকজন গাহিলেন। লক্ষ্য করিলাম‌, শিউলী মজুমদারের গান শেষ হইবার পর প্রভাত অলক্ষিতে উঠিয়া গেল।

সভা শেষ হইবার পূর্বে আমরাও উঠিলাম। ইন্দুবাবু আমাদের সঙ্গে দ্বার পর্যন্ত আসিলেন।

ব্যোমকেশ তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিল‌, ‘ওই শিউলী মজুমদার নামে মেয়েটি-খাসা গায়। ও কি সিনেমার মেয়ে?’

ইন্দুবাবু বলিলেন‌, ‘না‌, এখনও ঢোকেনি। তবে গদানন্দ যখন জুটেছে তখন আর দেরি নেই।‘

‘গদানন্দ?’

‘ওই যে তবলা বাজাচ্ছিল। লোকটা সিনেমার দালাল। ভদ্রঘরের মেয়েদের গান বাজনা শেখানো ওর পেশা‌, কিন্তু জুৎসই মেয়ে পেলে সিনেমায় টেনে নিয়ে যায়।’

‘তাই নাকি! ওরা সত্যি নাম গদানন্দ?’

‘নাম জগদানন্দ। সিনেমায় সবাই গদানন্দ বলে। অনেক মেয়ের মাথা খেয়েছে।’

‘শিউলীর বাপের নাম আপনি জানেন?’

‘নামটি যেন শুনেছিলাম‌, হ্যাঁ‌, দয়ালহরি মজুমদার। সম্প্রতি পূর্ববঙ্গ থেকে এসেছে।’

বাসায় ফিরিলাম সাতটার সময়।

দরজা ভেজানো ছিল‌, প্রবেশ করিয়া দেখিলাম কেষ্টবাবু তক্তপোশের উপর হাঁটু গাড়িয়া বসিয়াছেন‌, ডান হাতের তর্জনীকে বন্দুকে পরিণত করিয়া ঘরের কোণে লক্ষ্য স্থির করিতেছেন। মদের বোতলটা শূন্য উদরে এক পাশে পড়িয়া আছে। কেষ্টবাবু আমাদের প্রবেশ জানিতে পরিলেন না‌, ঘরের উর্ধ কোণ তাক করিয়া বন্দুক ছুঁড়িলেন-গুডুম—ফিস।’

আওয়াজটা অবশ্য তিনি মুখেই উচ্চারণ করিলেন।

ব্যোমকেশ প্রশ্ন করিল‌, ‘কেষ্টবাবু্‌, কি হচ্ছে?’

কেষ্টবাবু বলিলেন‌, ‘চুপ‌, পাখি উড়ে যাবে। — গুডুম—ফিস।’

ব্যোমকেশ হো হো করিয়া হাসিয়া উঠিল‌, ‘ও‌, পাখি শিকার করছেন। তা কটা পাখি মারলেন?’

কেষ্টবাবু বন্দুক নামাইয়া সহজভাবে বলিলেন‌, ‘তিনটে হর্তেল ঘুঘু মেরেছি।’ তাঁহার শিথিল মুখমণ্ডলে একটু তৃপ্তির হাসি খেলিয়া গেল।

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘বেশ বেশ। কিন্তু গুডুম-ফিস্ কেন? গুড়ুম না হয় বুঝলাম‌, ফিস কী?’

কেষ্টবাবু বলিলেন‌, ‘ফিস বুঝলেন না? গুডুম করে বন্দুকের আওয়াজ হল‌, আর ফিস করে পাখির প্রাণ বেরিয়ে গেল।’

কেষ্টবাবু শয়ন করিলেন। দেখিলাম তিনি ঘুমাইয়া পড়িয়াছেন।

ঘণ্টা দেড়েক পরে তাঁহার ঘুম ভাঙাইলাম‌, তারপর আহার শেষ করিয়া আবার তক্তপোশে আসিয়া বসিলাম। কেষ্টবাবুর অবস্থা এখন অনেকটা ধাতস্থ, পক্ষী শিকারের আগ্রহ আর নাই।

কেষ্টবাবুকে সিগারেট দিয়া ব্যোমকেশ সিগারেট ধরাইল‌, ধোঁয়া ছাড়িতে ছাড়িতে বলিল‌, ‘কেষ্টবাবু্‌, আপনাকে দেখে মনে হয় বয়সকালে আপনি ভারি জোয়ান ছিলেন।’

কেষ্টবাবু মাথাটি নাড়িতে নাড়িতে বলিলেন‌, ‘কী শরীর যে ছিল ব্যোমকেশবাবু্‌, না দেখলে বিশ্বাস হয় না। ইয়া ছাতি‌, ইয়া হাতের গুলি; একটা আস্ত পাঁঠা একলা খেয়ে ফেলতে পারতাম। লোকে ডাকতো-ভীম কেষ্ট।’

‘নিশ্চয় খুব মারামারি করতেন? অনেক সায়েব ঠেঙিয়েছেন?’ ‘সায়েব কি বলছেন‌, জাহাজী গোরা পর্যন্ত ঠেঙিয়েছি। ব্যাটারা মদ খাবার জন্যে জাহাজ থেকে নামত। গলিখুঁজিতে ঘুরে বেড়াত। আমি ওৎ পেতে থাকতাম‌, কাউকে একলা পেলে দু’ চার ঘা দিয়েই লম্বা। হ্যা হ্যাঁ।’

‘আপনি দেখছি আমার মনের মতন মানুষ।–আচ্ছা‌, কখনও মানুষ খুন করেছেন?’ ব্যোমকেশ অন্তরঙ্গভাবে তাঁহার পাশ ঘোষিয়া বসিল।

‘মানুষ খুন–!’ কেষ্টবাবু ঈষৎ সন্দিগ্ধভাবে তাকাইলেন।

‘আরো মশাই‌, ভয় কিসের? ইয়ার বন্ধুর কাছে বলতে দোষ কি? এই তো আমি তিনটে মানুষ খুন করেছি। অজিত জানে‌, ওকে জিজ্ঞেস করুন।’

কেষ্টবাবু আশ্বস্তত হইলেম–ঠিক নিজের হাতে খুন করিনি‌, তবে দলে ছিলাম। ওই ‘অনাদিটা—‘

‘অনাদি হালদারের সঙ্গে বুঝি আপনার অনেক দিনের পরিচয়?’

‘ইস্কুল থেকে। অনাদিটা ছিল পগেয়া শয়তান। কিন্তু গায়ে জোর ছিল না‌, তাই আমাকে দলে টানত। আমি ইস্কুলে ভাল ছেলে ছিলাম মশাই‌, ওই অনাদির পাল্লায় পড়ে বিগড়ে গেলাম।’

‘তারপর?’

‘একটা ডেপুটির ছেলে সাইকেল চড়ে ইস্কুলে আসত। একদিন আমি আর অনাদি সাইকেল নিয়ে সটকান্‌ দিলাম‌, চোরাবাজারে দিলাম বেচে। কিন্তু ডেপুটির ছেলের সাইকেল‌, পুলিস লাগল। ধরা পড়ে গেলাম। হেডমাস্টার দু’জনকে রাস্টিকেট করে দিলে।’

‘ঐ তো। হেডমাস্টারগুলো বড় পাজি হয়। —তারপর কি হল?’

‘তারপর আর কি! নাম কাটা সেপাই! বছর দুই পরে প্রথম মহাযুদ্ধ আরম্ভ হল। আর আমাদের পায় কে? একেবারে মেসোপটেমিয়া। বাসরা…কুট্‌ এল-আমারা–ভারি ফুর্তিতে কেটেছিল কটা বছর।’

‘সেই সময় বুঝি রাইফেল চালাতে শিখেছিলেন?’

‘হ্যাঁ। অব্যৰ্থ টিপ ছিল। কুট্‌-এল্‌-আমরায় যখন আটকা পড়েছিলাম তখন আমাদের রসদে টান পড়েছিল‌, ঘোড়ার মাংস খেতে হয়েছিল। তখন আমি রাইফেল দিয়ে উড়ন্ত পাখি শিকার করতাম। ক্যাপ্টেন আমার নাম দিয়েছিল—উইলিয়াম টেল্‌! সে একদিন ছিল।’ নিশ্বাস ফেলিয়া বলিলেন‌, ‘যুদ্ধের পর দেশে ফিরে এলাম। আবার পুনর্মুষিক…তার কিছুদিন পরে অনাদি এক কাণ্ড করে বসল। বাপের সঙ্গে ঝগড়া করে ব্যাপকে ঠেঙিয়ে বাড়ি ছেড়ে পালাল। এমন ঠেঙিয়েছিল যে বাপটা পরের দিনই টেঁসে গেল। বাড়ির লোকেরা অবশ্য ব্যাপারটা চাপাচুপি দিয়ে দিল কিন্তু অনাদি সেই যে পালাল‌, পাঁচ বছর আর তার দেখা নেই।

‘পাঁচ বছর পরে একদিন গভীর রাত্রে অনাদি চুপিচুপি আমার কাছে এসে হাজির। বললে-ব্যবসা করবি তো চল আমার সঙ্গে‌, খুব লাভের ব্যবসা। আমি জিজ্ঞেস করলাম-কিসের ব্যবসা? কোথায় যেতে হবে? সে বললে-বেহারের একটা ছোট্ট শহরে। মারোয়াড়ীর সঙ্গে ব্যবসা। একলা সে ব্যবসা হয় না। তাই তোকে নিতে এসেছি। রাতারাতি বরাত ফিরে যাবে। যাবি তো চল। —আমার তখন সময়টা খারাপ যাচ্ছে‌, রাজী হয়ে গেলাম।

‘বেহারের নগণ্য একটা জায়গা‌, নাম লালনিয়া। সামনে দিয়ে রেলের লাইন গেছে। পিছন দিকে পাহাড় আর জঙ্গল। আমরা ইস্টিশানে নেমে শহরে গেলাম না‌, দিনের বেলায় জঙ্গলের মধ্যে লুকিয়ে রইলাম। সেখানে অনাদি আসল কথা খুলে বলল—শহরের একটরে জঙ্গলের গা ঘেঁষে এক মারোয়াড়ীর গদি আছে‌, বুড়ো মারোয়াড়ীটা রাত্তিরে একলা থাকে। বুড়োর অনেক টাকা‌, গদিতে ডাকাতি করতে হবে।

‘দুপুর রাত্রে মারোয়াড়ীর গদিতে গেলাম। আমার হাতে লোহার ডাণ্ডা; অনাদির হাতে ইলেকক্ট্রিক টর্চ, কোমরে ভোজালি। মারোয়াড়ীটা চোরাই মালের কারবার করত, রাত্রে চোরেরা তার কাছে আসত। অনাদি দরজায় টোকা দিতেই সে দরজা খুলে দিলে‌, আমি লাগালাম তার মাথায় এক ডাণ্ডা। বুড়োটা অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল।

‘গদি লুঠ করলাম। বেশি কিছু পাওয়া গেল না‌, হাজার তিনেক নগদ আর কিছু সোনার গয়না। তাই নিয়ে বেরুচ্ছি‌, মারোয়াড়ীটা দোরগোড়ায় পড়েছিল‌, হঠাৎ অনাদির ঠ্যাং জড়িয়ে ধরল। অনেক ধস্তাধস্তি করেও অনাদি ঠ্যাং ছাড়াতে পারল না‌, মারোয়াড়ী মরণকামড়ে কামড়ে ধরেছে। তখন সে কোমর থেকে ভোজলি বার করে মারল বুড়োর ঘাড়ে এক কোপ। বুড়োটা ক্যাঁক করে মরে গেল।

‘রক্তমাখা ভোজালি সেইখানে ফেলে আমরা পালালাম। শেষরাত্ৰে ইস্টিশানে গিয়ে ট্রেন ধরলাম; লুঠের মাল অনাদির কাছে ছিল; সে বলল-তুই এক গাড়িতে ওঠ‌, আমি অন্য গাড়িতে উঠি। দু’জনে এক কামরায় উঠলে কেউ সন্দেহ করতে পারে। উঠে পড়‌, উঠে পড়‌, পরের স্টেশনে আবার দেখা হবে। আমি একটা কামরায় উঠে পড়লাম, অনাদি পাশের কামরায়।

‘ব্যাস‌, সেই যে অনাদি লোপাট হল‌, বিশ বছরের মধ্যে আর তার টিকি দেখতে পেলাম না-বেইমান! বিশ্বাসঘাতক।’

পুরাতন টাকার শোকে কেষ্টবাবু ফুঁসিতে লাগিলেন। ব্যোমকেশ তাঁহাকে আর একটি সিগারেট দিয়া বলিল‌, ‘অনাদি হালদার বেইমান ছিল তাই তো তার আজ এই দুরবস্থা। কিন্তু আপনি যে বলেছিলেন। ইচ্ছে করলে অনাদিকে ফাঁসিকাঠে লটকাতে পারেন। তার মানে কি? তাকে ফাঁসাতে গেলে আপনি নিজেও যে ফেঁসে যেতেন।’

কেষ্টবাবু বলিলেন‌, ‘মারোয়াড়ী-খুনের ব্যাপারে খুব হৈ চৈ হয়েছিল‌, কাগজে লেখালেখি হয়েছিল। পুলিস ভোেজালির গায়ে অনাদির আঙুলের ছাপ পেয়েছিল। কিন্তু অনাদিকে তো তারা চেনে না‌, তাকে ধরবে কি করে? একমাত্র আমি জানতাম। আমি যদি পুলিসকে একটি বেনামী চিঠি ছাড়তাম-লালনিয়ার খুনীর নাম অনাদি হালদার‌, সে অমুক ঠিকানায় থাকে‌, আঙুলের ছাপ মিলিয়ে নাও—তাহলে কী হত?’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘বুঝেছি। তারপর আবার কবে অনাদি হালদারকে পেলেন?’

কেষ্টবাবু্‌, দন্তপংক্তি কোষমুক্ত করিলেন—’বছর দুই আগে‌, এই কলকাতা শহরে। ফুটপাথ দিয়ে যাচ্ছিলাম‌, দেখি অনাদি বৌবাজারের বাসায় ঢুকেছে। আর যাবে কোথায়? খোঁজখবর নিয়ে জানলাম অনাদি পয়সা করেছে‌, দুধে-ভাতে আছে। একবার ভাবলাম‌, দিই পুলিসকে বেনামী চিঠি। কিন্তু আমার সময়টা তখন খারাপ যাচ্ছে-একদিন গিয়ে দেখা করলাম। অনাদি ভূত দেখার মত আঁৎকে উঠল। আমি বললাম-আজ থেকে আমাকেও দুধে-ভাতে রাখতে হবে‌, নইলে লালনিয়ার মারোয়াড়ীকে কে খুন করেছে পুলিস জানতে পারবে। খুনের মামলা তামাদি হয় না।’

রাত হইয়া গিয়াছিল‌, কেষ্টবাবু আমাদের তক্তপোশেই রাত্রি কাটাইলেন।

পরদিন সকালে ঘুম ভাঙিতে দেরি হইল। তাড়াতাড়ি বসিবার ঘরে গিয়া দেখি‌, ব্যোমকেশ বসিয়া চিঠি লিখিতেছে‌, কেষ্টবাবু নাই। জিজ্ঞাসা করিলাম‌, ‘শিকারী কোথায়?’

ব্যোমকেশ সহাস্য চোখ তুলিয়া বলিল‌, ‘রাত না পোয়াতে কখন উঠে পালিয়েছে।’

কাল রাত্ৰে মদের মুখে যে-সব কথা প্রকাশ পাইয়াছে আজ সকালে তাহা স্মরণ করিয়াই বোধহয় কেষ্ট দাস সরিয়াছে।

তক্তপোশে বসিলাম–’সাত সকলে কাকে চিঠি লিখতে বসলে?’

ব্যোমকেশ চিঠিখানা আমার দিকে বাড়াইয়া দিয়া আর একখানা চিঠি লিখিতে আরম্ভ করিল! চিঠি পড়িয়া দেখিলাম–

ভাই রমেশ‌, এতদিন পরে আমাকে কি তোমার মনে আছে। একসঙ্গে বহরমপুরে পড়েছি। প্রফেসারেরা আমাকে bomb-case বলে ডাকতেন। মনে পড়ছে?

নৃপেন দত্ত নামে একজনের মুখে খবর পেলাম‌, তুমি তোমার গ্রামেই আছ। নৃপেনকে তুমি চেনো‌, তোমার পাড়ার ছেলে। তার সম্বন্ধে কিছু জানতে চাই।

কলকাতায় তোমার আসা যাওয়া নিশ্চয় আছে। একবার এসে না। আমার বাসায়। ঠিকানা দিলাম।

কবে আসছে? ভালবাসা নিও।

ইতি

তোমার পুরনো বন্ধু

ব্যোমকেশ বক্সী

দ্বিতীয় পত্ৰখানি নিমাই-নিতাইকে লেখা–

নিমাইবাবু্‌, নিতাইবাবু্‌, শ্ৰীকান্ত পান্থনিবাসের তেতলার ঘরের কথা জানিতে পারিয়াছি। আমার সঙ্গে অবিলম্বে আসিয়া দেখা করুন‌, নচেৎ খবরটি পুলিস জানিতে পারিবে।

ব্যোমকেশ বক্সী

আমাকে বলিল‌, ‘চল‌, আজ সকালেই বেরুতে হবে।’

‘কোথায়?’

‘দয়ালহরি মজুমদারের বাসার ঠিকানা মনে আছে তো?

‘১৩/৩‌, রামতনু লেন‌, শ্যামবাজার।’

আধা ঘণ্টা পরে আমরা বাহির হইলাম। শ্যামবাজারে গিয়া রামতনু লেন খুঁজিয়া বাহির করিতে সময় লাগিল। দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে গলিটি ক্ষুদ্র‌, দুই ধারের দুইটি বড় রাস্তার মধ্যে যোগসাধন করিয়াছে। আমরা একদিক হইতে নম্বর দেখিতে দেখিতে অগ্রসর হইলাম।

গলির প্রায় মাঝামাঝি পৌঁছিয়াছি হঠাৎ ও-প্রান্তের একটা বাড়ি হইতে একজন লোক বাহির হইয়া আসিল‌, ঝড়ের মত আমাদের দিকে অগ্রসর হইল। চিনিলাম প্ৰভাত। সে আমাদের পাশ দিয়া চলিয়া গেল‌, আমাদের দেখিতে পাইল না। উষ্কখুষ্ক চুল‌, আরক্ত মুখ-চোখ; আগুনের হল্কার মত সে আমাদের পাশ দিয়া বহিয়া গেল।

আমরা ভ্রূ তুলিয়া পরস্পর দৃষ্টি বিনিময় করিলাম‌, তারপর যে দ্বার দিয়া প্রভাত বাহির হইয়াছিল সেই দিকে চলিলাম। নম্বর খুঁজিবার আর প্রয়োজন নাই। ব্যোমকেশ মৃদুগুঞ্জনে বলিল‌, ‘অনাদি হালদার সম্বন্ধ ভেঙে দিয়েছিল…এখন সে নেই‌, তাই প্ৰভাত আবার এসেছিল…কিন্তু সুবিধে হল না।’

১৩/৩ নম্বর বাড়ির দরজা বন্ধ। আমরা ক্ষণেক দাঁড়াইয়া ইতস্তত করিতেছি‌, বাড়ির ভিতর হইতে মেয়েলী গলার গান আরম্ভ হইল। মিষ্ট নিটোল কুহক-কলিত কণ্ঠস্বর‌, সঙ্গে তবলার সঙ্গত।

ব্যোমকেশ দ্বারে ধাক্কা দিল। ভিতরে গান বন্ধ হইল। একটি প্রৌঢ় ব্যক্তি দ্বার খুললেন। একজোড়া কঠিন চক্ষু আমাদের আপাদমস্তক পরিদর্শন করিল।

‘কি চাই?’লোকটির আকৃতি যেমন বেউড় বাঁশের মত পাকানো‌, কণ্ঠস্বরও তেমনি শুষ্ক রুক্ষ। একটু পূর্ববঙ্গের টান আছে।

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘আপনার নাম কি দয়ালহরি মজুমদার?’

‘হাঁ। কি দরকার?’ ভিতরে প্রবেশ করিবার আহ্বান আসিল না‌, বরং গৃহস্বামী দুই কবাট ধরিয়া পথ আগলাইয়া দাঁড়াইলেন।

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘অনাদি হালদার মারা গেছে‌, শুনেছেন বোধহয়। তার সম্বন্ধে কিছু জানতে চাই—‘

‘কে অনাদি হালদার! আমি জানি না।’ দয়ালহরিবাবুর শুষ্ক স্বর উগ্ৰ হইয়া উঠিল।

‘জানেন না? তার আলমারিতে আপনার হ্যান্ডনেট পাওয়া গেছে। আপনি পাঁচ হাজার টাকা ধার নিয়েছেন।’

‘কে বলে আমি ধার নিয়েছি! মিথ্যা কথা। কারুর এক পয়সা আমি ধারি না।’

‘হ্যান্ডনেটে আপনার দস্তখত আমি নিজের চোখে দেখেছি।’

‘জাল দস্তখত।’ দড়াম শব্দে দরজা বন্ধ হইয়া গেল।

আমরা কিছুক্ষণ বন্ধ দরজার সম্মুখে দাঁড়াইয়া রহিলাম‌, তারপর ফিরিয়া চলিলাম। পিছনে গান ও সঙ্গত আবার আরম্ভ হইল। ভৈরবী একতালা।

ট্রামরাস্তার দিকে চলিতে চলিতে ব্যোমকেশ ক্লিষ্ট হাসিয়া বলিল, ‘দয়ালহরি মজুমদার লোকটি সামান্য লোক নয়। অনাদি হালদার মরেছে শুনে ভাবছে পাঁচ হাজার টাকা হজম করবে। হ্যান্ডনেটে যে দস্তখত করেছে সেটা হয়তো ওর আসল দস্তখত নয়‌, বেঁকিয়ে চুরিয়ে দস্তখত করেছে‌, মামলা যদি আদালতে যায়। তখন অস্বীকার করবে। কিন্তু সেটা আসল কথা নয়; প্রশ্ন হচ্ছে‌, অনাদি হালদার ওকে পাঁচ হাজার টাকা ধার দিলে কেন?’

বলিলাম‌, ‘অনাদি হালদারের তেজারাতির ব্যবসা ছিল হয়তো।’

‘তাই বলে বিনা জামিনে শুধু হাতে পাঁচ হাজার টাকা ধার দেবে! অনাদি হালদার কি এতাই কাঁচা ছেলে ছিল? বানরে সঙ্গীত গায় শিলা জলে ভেসে যায় দেখিলেও না হয় প্রত্যয়।’

‘তবে কি হতে পারে?’

‘জানি না। কিন্তু জানতে হবে।–আমার কি সন্দেহ হয় জানো?’

‘কী? বলিবার জন্য মুখ খুলিয়া ব্যোমকেশ থামিয়া গেল। তারপর আকাশের পানে চোখ তুলিয়া বলিল‌, ‘দাঁড়ে দাঁড়ে দ্রুম।’

অতঃপর আমি আর প্রশ্ন করিলাম না।

সেদিন বৈকালে আবার আমরা বাহির হইলাম। এবার গন্তব্যস্থান প্ৰভাতের দোকান।

দোকানের কাছাকাছি পৌঁছিয়াছি‌, দেখি আর পাঁচজন লোকের মধ্যে বাঁটুল সদার আমাদের আগে আগে চলিয়াছে। প্ৰভাতের দোকানের সামনে আসিয়া বাঁটুলের গতি হ্রাস হইল‌, মনে হইল সে দোকানে প্রবেশ করবে। কিন্তু প্রবেশ করিবার পূর্বে সে একবার ঘাড় ফিরাইয়া পিছন দিকে চাহিল। আমার সঙ্গে চোখাচোখি হইয়া গেল। অমনি বাঁটুল আবার সিধা পথে চলিতে আরম্ভ করল।

আমি আড়চোখে ব্যোমকেশের পানে তাকাইলাম। তাহার ভ্রূ কুঞ্চিত‌, চোয়ালের হাড় শক্ত হইয়া উঠিয়াছে। আমি মৃদুস্বরে বলিলাম‌, ‘বাঁটুল কি এবার প্রভাতকে খদ্দের পাকড়াতে চায় নাকি?’

ব্যোমকেশ গলার মধ্যে শুধু আওয়াজ করিল।

দোকানে প্ৰবেশ করিলাম।

খরিদ্দার নাই‌, কেবল প্ৰভাত কাউন্টারে কনুই রাখিয়া কপালে হাত দিয়া বসিয়া আছে‌, তাহার মুখ ভাল দেখা যাইতেছে না। আমাদের পদশব্দে সে চোখ তুলিল। চোখ দুইটি জবাফুলের মত লাল। ক্ষণকাল অচেনা চোখে চাহিয়া থাকিয়া সে ধড়মড় করিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল। বলিল‌, ‘আসুন।’

আমরা কাউন্টারের সামনে গিয়া দাঁড়াইলাম। পুস্তকালয়ের রাশি রাশি বই আমার মনে মোহ বিস্তার করে‌, আমি চারিদিকে ঘাড় ফিরাইয়া দেখিতে লাগিলাম। ব্যোমকেশের ওসব বালাই নাই। সে বলিল‌, ‘সামান্য একটা কাজে এসেছিলাম। দেখুন তো‌, এই চাবিটা চিনতে পারেন?’

প্রভাত ব্যোমকেশের হাত হইতে চাবি লইয়া ঘুরাইয়া ফিরাইয়া দেখিল। বলিল‌, না। কোথাকার চাবি?’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘তা আমি জানি না। আপনাদের বাসার পাশে গলিতে কুড়িয়ে পেয়েছিলাম।’

‘কি জানি‌, আমি কখনও দেখেছি বলে মনে হচ্ছে না। নতুন চাবি দেখছি। হয়তো রাস্তার কোনও লোকের পকেট থেকে পড়ে গিয়েছিল।’

প্রভাত চাবি ফেরত দিল। ব্যোমকেশ তাহ পকেটে রাখিয়া বলিল‌, ‘কেষ্টবাবুর খবর কি? তিনি আজ সকালবেলা আপনার বাসায় ফিরে গিয়েছিলেন।’

প্রভাত ক্ষীণ হাসিল—’হ্যাঁ। কাল রাত্রে কোথায় গিয়েছিলেন।’

কোথায় গিয়েছিলেন ব্যোমকেশ তাহা বলিল না‌, জিজ্ঞাসা করিল‌, ‘কেষ্টবাবু তাহলে আপনার স্কন্ধেই রইলেন?’

‘তাই তো মনে হচ্ছে। কি করা যায়? গলাধাক্কা তো দেয়া যায় না।’

‘তা বটে। নৃপেনবাবু কোথায়? চলে গেছেন?’

‘না‌, এখনও যায়নি। তার দু’মাসের মাইনে বাকি.গরীব মানুষ…ভাবছি। তাকে রেখে দেব। দোকানে একজন লোক রাখলে ভাল হয়‌, ওকেই রেখে দেব ভাবছি।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘মন্দ কি। আচ্ছা‌, নিমাই নিতাই বোধহয় আর আসেনি? আলমারি কি পুলিসের পক্ষ থেকে সীল করে দিয়ে গেছে?’

‘না‌, পুলিস আর আসেনি। তবে অনাদিবাবুর কোমরে যে চাবি ছিল সেটা তারা নিয়ে গেছে। আলমারির বোধহয় ঐ একটাই চাবি ছিল।’

‘তা হবে। আচ্ছা‌, আর একটা কথা জিজ্ঞাসা করি। দয়ালহরি মজুমদার নামে একজনকে অনাদি হালদার পাঁচ হাজার টাকা ধার দিয়েছিল। আপনি জানেন?’

প্রভাত কিছুক্ষণ অবিশ্বাস-ভরা বিহ্বল চক্ষে চাহিয়া রহিল–’পাঁচ হাজার টাকা! আপনি ঠিক জানেন?’

‘অনাদি হালদারের আলমারিতে আমি হ্যান্ডনেট দেখেছি। তাতে দয়ালহরি মজুমদারের সই আছে।’

প্রভাতের শীর্ণ মুখ যেন আরও শুষ্ক ক্লান্ত হইয়া উঠিল‌, সে অর্ধস্ফুট স্বরে বলিল‌, ‘আমি জানতাম না। কখনও শুনিনি।’ সে টুলের উপর বসিতে গিয়া স্থানভ্রষ্ট হইয়া পড়িয়া যাইবার উপক্ৰম করিল। ব্যোমকেশ হাত বাড়াইয়া টপ করিয়া তাহাকে ধরিয়া ফেলিল।

‘প্রভাতবাবু! আপনার জ্বর হয়েছে-গা গরম।’

‘জ্বর। না-ও কিছু নয়। ঠাণ্ডা লেগেছে—‘

‘হয়তো বুকে ঠাণ্ডা বসেছে। আপনি দোকানে এলেন কেন? যান‌, বাড়ি গিয়ে শুয়ে থাকুন। ডাক্তার দাকান—’

‘ডাক্তার’ প্রভাত সন্ত্রস্ত হইয়া উঠিল–’না না‌, ওসব হাঙ্গামায় দরকার নেই। আপনিই সেরে যাবে।’

‘আমার কথা শুনুন‌, কাছেই আমার চেনা একজন ডাক্তার আছেন‌, তাঁর কাছে চলুন। রোগকে অবহেলা করা ভাল নয়। আসুন।’



প্রভাত আরও কয়েকবার আপত্তি করিয়া শেষে রাজী হইল। দোকানে তালা লাগাইয়া বাহির হইবার সময় ব্যোমকেশ জিজ্ঞাসা করিল‌, ‘আপনার গুর্খা দরোয়ানটিকে দেখছি না। তাকে কি ছাড়িয়ে দিয়েছেন?’

প্রভাত বলিল‌, ‘হ্যাঁ। অনেকদিন দেশে যায়নি‌, কাজ ছেড়ে দিয়ে চলে গেল। আমারও আর পাহারাওলার দরকার নেই-–‘ বলিয়া ফিক হাসিল।

দুই তিন মিনিটে ডাক্তার তালুকদারের ডাক্তারখানায় পৌঁছিলাম। তিনি ডাক্তারখানায় উপস্থিত ছিলেন; ব্যোমকেশ তাঁহাকে আড়ালে লইয়া গিয়া কথাবার্তা বলিল। তারপর তিনি প্রভাতকে ঘরে লইয়া গিয়া টেবিলের উপর শোয়াইয়া পরীক্ষা আরম্ভ করিলেন। আমরা সরিয়া আসিলাম।

পরীক্ষার শেষে ডাক্তার আসিয়া বলিলেন‌, ‘বুকে পিঠে কিছু পেলাম না। তবে স্নায়ুতে গুরুতর শক লেগেছে। একটা ওষুধ দিচ্ছি‌, এক শিশি খেলেই ঠিক হয়ে যাবে।’

ডাক্তার প্রেসক্রিপশন লিখিতে গেলেন‌, ব্যোমকেশও তাঁহার সঙ্গে গেল। কিছুক্ষণ পরে ঔষধের শিশি হাতে ফিরিয়া আসিয়া বলিল‌, চলুন। ডাক্তারের প্রাপ্য আমি চুকিয়ে দিয়েছি।’

প্রভাত বিব্রত হইয়া বলিল‌, ‘সে কি‌, আপনি কেন দিলেন? আমার কাছে টাকা রয়েছে—‘

‘আচ্ছা‌, সে দেখা যাবে। এখন চলুন‌, আপনাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে আসি।’

প্ৰভাতের চক্ষু সজল হইয়া উঠিল—’আপনি আমার জন্যে এত কষ্ট করছেন—’

ব্যোমকেশ একটু হাসিয়া বলিল‌, ‘সংসারে থাকতে গেলে পরস্পরের জন্যে একটু কষ্ট করতে হয়। আসুন।’

ভাড়াটে গাড়িতে প্ৰভাতকে লইয়া আমরা তাহার বাসার উদ্দেশ্যে চলিলাম। ব্যোমকেশের এই পরহিতব্রতের অন্তরালে কোনও অভিসন্ধি আছে কিনা‌, এই প্রশ্নটা বার বার মনের মধ্যে খোঁচা দিতে লাগিল।

বাসায় পৌঁছিলে ননীবালা দেবী প্ৰভাতের জ্বরের সংবাদ শুনিয়া ব্যাকুল হইয়া পড়িলেন এবং তাহাকে লইয়া গিয়া বিছানায় শোয়াইয়া দিলেন। তিনি অভিজ্ঞ ধাত্রী। ঔষধ-পথ্য সম্বন্ধে তাঁহাকে কিছু বলিতে হইল না। আমরা বিদায় লইলাম।

বাহিরের ঘরে আসিয়া ব্যোমকেশ দাঁড়াইয়া পড়িল। ভাবগতিক দেখিয়া মনে হইল‌, তাহার যাইবার ইচ্ছা নাই। আমি ভ্রূ তুলিয়া প্রশ্ন করিলাম‌, উত্তরে সে বাম চক্ষু কুঞ্চিত করিল।

সিঁড়িতে পায়ের শব্দ। নৃপেন প্রবেশ করিল; আমাদের দেখিয়া থমকিয়া দাঁড়াইল‌, ‘আপনারা?’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘প্রভাতবাবুর শরীর খারাপ হয়েছিল‌, তাই তাঁকে পৌঁছে দিতে এসেছি।’

‘প্রভাতবাবুর শরীর খারাপ’ নৃপেন ভিতর দিকে পা বাড়াইল।

‘একটা কথা‌, ব্যোমকেশ চাবি বাহির করিয়া তাহার সম্মুখে ধরিল‌, ‘এ চাবিটা চিনতে পারেন?’

নৃপেনের চোখের চাহনি এতক্ষণ সহজ ও সিধা ছিল‌, মুহুর্তে তাহা চোরা চাহনিতে পরিণত হইল। একবার ঢোক গিলিয়া সে স্বর্যযন্ত্র সংযত করিয়া লইল‌, তারপর বলিল‌, ‘চাবি? কার চাবি আমি কি করে চিনিব? মাফ করবেন‌, প্রভাতবাবুর জ্বর’–কথা শেষ না করিয়াই সে প্ৰভাতের ঘরের দিকে চলিয়া গেল।

ক্ষণেক দাঁড়াইয়া থাকিয়া ব্যোমকেশ আমার কানে কানে বলিল, ‘অজিত, তুমি দাঁড়াও, আমি এখনি আসছি।’ সে লঘুপদে অনাদি হালদারের ঘরের দিকে চলিয়া গেল।

একলা দাঁড়াইয়া আছি; ভাবিতেছি কেহ যদি আসিয়া পড়ে এবং ব্যোমকেশ সম্বন্ধে সওয়াল আরম্ভ করে‌, তখন কি বলিব! কিন্তু মিনিটখানেক পরে ব্যোমকেশ ফিরিয়া আসিল‌, বলিল‌, ‘চল, এবার যাওয়া যাক।’

নীচে দাওয়ায় বসিয়া ষষ্ঠীবাবু হুঁকা চুষিতেছিলেন‌, আমাদের পানে কট্‌মট করিয়া তাকাইলেন রাস্তায় আলো জ্বলিয়াছে। আমরা দ্রুত বাসার দিকে পা চালাইলাম। চলিতে চলিতে ব্যোমকেশ। বলিল‌, ‘অনাদি হালদারের আলমারির চাবিই বটে এবং কে গলিতে ফেলেছিল‌, সে বিষয়েও কোন সন্দেহ নেই।’

হাপ্তাখানেক কাটিয়া গেল। কোনও দিক হইতে আর কোনও সাড়া শব্দ নাই নিমাই-নিতাইকে ব্যোমকেশ অবিলম্বে আসিয়া দেখা করিতে বলিয়াছিল‌, তাহারাও নিশ্চুপ। আবার যেন সব ঝিমাইয়া পড়িয়াছে। ইস্টিশন হইতে ট্রেন ছাড়িয়া গেলে যেমন হয়‌, এ যেন অনেকটা সেইরকম অবস্থা।

তারপর ট্রেন আসিল। একটার পর একটা ট্রেন আসিতে লাগিল। শেষ পর্যন্ত এত ট্রেন আসিল যে নিশ্বাস ফেলিবার সময় রহিল না।

সকালবেলা ডাকে দু’টি চিঠি আসিল। একটি চিঠি সত্যবতীর। সে দীর্ঘকাল আমাদের না। দেখিয়া আমাদের বাঁচিয়া থাকা সম্বন্ধে সন্দিহান হইয়া উঠিয়াছে‌, অবিলম্বে দর্শন চায়। দ্বিতীয় চিঠিখানি খেজুরহাটের রমেশ মল্লিকের। তিনি লিখিয়াছেন—

ভাই ব্যোমকেশ‌, তুমি তাহলে আমাকে ভোলনি? তোমার চিঠি পেয়ে কী আনন্দ যে হল বলতে পারি না। সেই পুরনো ভুলে যাওয়া কলেজ-জীবনের কথা আবার মনে পড়ে যাচ্ছে।

ভাই, আমি তোমার সঙ্গে নিশ্চয় দেখা করতে যেতাম, কিন্তু কিছুদিন থেকে বাতে শয্যাশায়ী হয়ে আছি‌, নড়বার ক্ষমতা নেই। তোমার কীর্তিকলাপ বইয়ে পড়েছি‌, তুমি কলকাতায় থাকো তাও জানি। কিন্তু ঠিকানা জানা ছিল না বলে এতদিন যেতে পারিনি। এবার সেরে উঠেই যাব।

তুমি যার কথা জানতে চেয়েছ তার সম্বন্ধে অনেক কথাই জানি‌, দেখা হলে সব বলব। ভারি গুণী লোক। একবার জেল খেটেছে। ওর প্রধান এবং সর্বশ্রেষ্ঠ গুণ হচ্ছে‌, যে-কোনও তালার চাবি একবার দেখলে অবিকল নকল চাবি তৈরি করতে পারে। গুণধর ছেলে‌, খুড়ো বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। খুড়োর সিন্দুকের চাবি তৈরি করেছিল‌, মাঝে মাঝে পোশ দশ টাকা সরাতো। খুড়ো তাড়িয়ে দেবার পর কলকাতায় গিয়ে চাকরি করত‌, সেখানেও ক্যাশ-বাক্সর চাবি তৈরি করেছিল। ধরা পড়ে জেলে গেল। সে আজ চার পাঁচ বছরের কথা। তুমি কোন সূত্রে তার সম্পর্কে এসেছ জানি না‌, কিন্তু সাবধানে থেকো।

তোমাকে দেখার জন্যে মন ছট্‌ফটু করছে। আজ এই পর্যন্ত। ভালবাসা নিও। ইতি-তোমার রমেশ।

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘গুণী লোক তাতে সন্দেহ কি। এমন গুণী লোক পৃথিবীতে অল্পই আছে। যাহোক‌, ন্যাপার কার্য-পদ্ধতি এবার বেশ বোঝা যাচ্ছে। অনাদি হালদার আলমারির চাবি কোমরে রাখত‌, দেখার সুবিধে ছিল না। কোনও সময় ন্যাপী একবার চাবিটা দেখে ফেলেছিল‌, সে চাবি তৈরি করল। আলমারিতে মাল আছে সে জানত‌, সুযোগের অপেক্ষা করতে লাগল। তারপর কালীপুজোর রাত্ৰে— বলিয়া ব্যোমকেশ থামিল।

‘কালীপুজোর রাত্রে কী?’

ব্যোমকেশ উত্তর দিবার পূবেই দ্বারের কড়া নড়িয়া উঠিল। দ্বার খুলিয়া দেখি‌, অপূর্ব দৃশ্য। উকিল কামিনীকান্ত মুস্তকী দুই পাশে দুই মক্কেল লইয়া দাঁড়াইয়া আছেন। কামিনীকান্তর মুখে সুধাবিগলিত হাসি। নিমাই ও নিতাইকে দেখিয়া মানুষ বলিয়া চেনা যায় না‌, সত্য সত্যই দু’টি ভিজা বিড়াল। খালি পা‌, গায়ে গরদের দোছোট‌, মুখে অক্ষৌরিত দাড়ি‌, অশৌচের বেশ।

তিনজনে ঘরে প্রবেশ করিলেন। ব্যোমকেশ আরাম-কেদারা হইতে একবার ঘাড় ফিরাইয়া দেখিল‌, তাহার মুখের তাচ্ছিল্য-ভাব ক্ৰমে ব্যঙ্গহাস্যে পরিণত হইল। সে বলিল‌, ‘আপনারা শেষ পর্যন্ত এলেন তাহলে?—বসুন।’

তিনজনে তক্তপোশের কিনারায় বসিলেন। কামিনীকান্ত বলিলেন‌, ‘একটু দেরি হয়ে গেল। আপনি চিঠিতে যে-রকম ভয় দেখিয়ে দিয়েছিলেন‌, ওরা একলা আসতে সাহস করেনি‌, আমার কাছে ছুটে গিয়েছিল। তা আমি হলাম গিয়ে উকিল‌, একটু খোঁজ-খবর না নিয়ে তো আসতে পারি না। তাই—‘

‘কোথায় খোঁজ-খবর নিলেন? শ্ৰীকান্ত পান্থনিবাসে? সেখানে বুঝি সুবিধে হল না? সাক্ষী ভাঙাতে পারলেন না? শ্ৰীকান্তবাবু সত্যের অপলাপ করতে রাজী হলেন না?’

কামিনীকান্তবাবু আহত স্বরে বলিলেন‌, ‘ছি ছি‌, এ আপনি কি বলছেন‌, ব্যোমকেশবাবু! সাক্ষী ভাঙানো আমার পেশা নয়‌, মক্কেলের পক্ষ থেকে সত্য আবিষ্কার করাই আমার কাজ।’

‘সত্য আবিষ্কার করবার জন্যে শ্রীকান্ত হোটেলে যাবার দরকার ছিল না, মক্কেল দুটিকে জিজ্ঞেস করলেই জানতে পারতেন।’

‘ওরা ছেলেমানুষ‌, তার ওপর অশৌচ চলছে। যাহোক‌, আপনি কি জানতে চান বলুন‌, কোনও কথাই ওরা আপনার কাছে লুকোবে না। ওদের বয়ান শুনলে আপনি বুঝতে পারবেন যে‌, ওরা সম্পূর্ণনিদেৰ্য।’

ব্যোমকেশ নিতাই ও নিমাইকে পযায়িক্রমে নিরীক্ষণ করিয়া বলিল‌, ‘এদের মধ্যে শ্ৰীকান্ত হোটেলে যাতায়াত করতেন কে?’

কামিনীকান্ত বলিলেন‌, ‘ওরা দু’জনেই যেত। তবে ওদের চেহারা অনেকটা একরকম‌, তাই বোধহয় হোটেলের লোকেরা বুঝতে পারেনি।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘হুঁ। শ্ৰীকান্ত হোটেলের তেতলার ঘর ভাড়া নেবার উদ্দেশ্য কি?’

কামিনীকান্ত বলিলেন‌, ‘তাহলে গোড়া থেকেই সব খুলে বলি–’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘ওঁদের কথা ওঁরা নিজের মুখে বললেই ভাল হত না?’

‘হেঁ হেঁ‌, সে তো ঠিক কথা। তবে কি জানেন‌, ওরা ছেলেমানুষ‌, তার ওপর ব্যাপারস্যাপার দেখে খুবই নাভাস হয়ে পড়েছে। হয়তো বলতে গিয়ে গোলমাল করে ফেলবে-আপনি সন্দেহ করবেন ওরা মিছে কথা বলছে—’

নিশ্বাস ফেলিয়া ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘বেশ আপনিই বলুন তাহলে। বুঝতে পারছি আপনার বলা আর ওদের বলায় কোনও তফাৎ হবে না। মিছে সময় নষ্ট করে লাভ কি?’

ছেলেমানুষ দু’টি বাঙ্‌নিষ্পত্তি করিল না‌, কামিনীকান্ত তাদের জবানীতে কাহিনী বিবৃত করিলেন। মোটামুটি কাহিনীটি এই—

বছর দুই আগে অনাদি হালদার মহাশয় যখন কলিকাতায় বসবাস আরম্ভ করেন তখন নিমাই নিতাই খবর পাইয়া কাকার কাছে ছুটিয়া আসে। তাহারা পিতৃহীন‌, কাকাই তাঁহাদের একমাত্র অভিভাবক‌, কাকাকে তাহারা সাবেক বাড়িতে লইয়া যাইবার জন্য নির্বন্ধ করে।

অনাদি হালদার অতিশয় সজ্জন এবং ভালো মানুষ ছিলেন‌, ভাইপোদের প্রতি তাঁহার মেহের সীমা ছিল না। কিন্তু একদল দুষ্ট লোক তাঁহার ভালমানুষীর সুযোগ লইয়া ঘাড়ে চাপিয়া বসিয়াছিল‌, তাঁহার কানে কুমন্ত্রণা দিতে লাগিল‌, ভাইপোদের উপর তাঁহার মন বিরূপ করিয়া তুলিল। তিনি নিতাই-নিমাইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করিয়া দিলেন।

নিমাই নিতাই ন্যায়তঃ ধৰ্মতঃ অনাদিবাবুর উত্তরাধিকারী। তাঁহাদের ভয় হইল‌, এই দুষ্ট লোকগুলো কাকাকে ঠকাইয়া সমস্ত সম্পত্তি আত্মসাৎ করিবে‌, হয়তো তাঁহাকে খুন করিতেও পারে। নিমাই নিতাই তখন নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করিয়া শ্ৰীকান্ত হোটেলে ঘর ভাড়া করিল। এবং জানোলা দিয়া অনাদিবাবুর বাসার উপর নজর রাখিতে লাগিল। তাঁহাদের বাড়িতে একটাশ পুরনো আমলের দূরবীন আছে‌, সেই দূরবীন চোখে লাগাইয়া অনাদিবাবুর বাসার ভিতরকার কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করিবার চেষ্টা করিত। এই দেখুন সেই দূরবীন।

—নিমাইনিতাইয়ের একজন চাদরের ভিতর হইতে দূরবীন বাহির করিয়া দেখাইল। চামড়ার খাপের মধ্যে চোঙের মত দূরবীন‌, টানিলে লম্বা হয়; ব্যোমকেশ নাড়িয়া চাড়িয়া ফেরত দিল। কামিনীকান্ত আবার আরম্ভ করিলেন। —

নিমাই নিতাই পালা করিয়া হোটেলে যাইত এবং চোখে দূরবীন লাগাইয়া জানালার কাছে বসিয়া থাকিত। অবশ্য ইহা নিতান্তাই ছেলেমানুষী কাণ্ড। কামিনীকান্ত কিছু জানিতেন না‌, জানিলে এমন হাস্যকর ব্যাপার ঘটিতে দিতেন না। যাহোক‌, এইভাবে কয়েকমাস কাটিবার পর কালীপূজার রাত্ৰি আসিয়া উপস্থিত হইল।

রাত্রি দশটা আন্দাজ নিমাই হোটেলে গিয়া দূরবীন লাগাইয়া বসিল। অনাদিবাবু ব্যালকনিতে দাঁড়াইয়া বাজি পোড়ানো দেখিতেছিলেন। এগারোটার সময় এক ব্যাপার ঘটিল। অনাদিবাবু হঠাৎ পিছনের দরজার দিকে ফিরিলেন‌, যেন পিছনে কাহারও সাড়া পাইয়াছেন। সঙ্গে সঙ্গে বন্দুকের আওয়াজ হইল এবং বন্দুকের গুলি নিমাইয়ের কানের পাশ দিয়া চলিয়া গেল। ওদিকে ব্যালকনিতে অনাদিবাবু ধরাশায়ী হইলেন। কিন্তু ঘরের অন্ধকার হইতে কে গুলি চালাইয়াছে নিমাই তাহা দেখিতে পাইল না।

নিমাই ব্যাপার বুঝিতে পারিল। বন্দুকের গুলি অনাদিবাবুর শরীর ভেদ করিয়া আর একটু হইলে নিমাইকেও বধ করিত; ভাগ্যক্রমে গুলিটা তাহার রগ ঘোষিয়া চলিয়া গিয়াছে। সে তৎক্ষণাৎ বাড়ি ফিরিয়া গেল এবং দুই ভাইয়ে পরামর্শ করিয়া সেই রাত্রেই কামিনীকান্তর কাছে উপস্থিত হইল। তারপর যাহা যাহা ঘটিয়াছে ব্যোমকেশবাবু তাহা ভালভাবেই জানেন।

ইহাই সত্য পরিস্থিতি‌, ইহাতে বিন্দুমাত্র মিথ্যা নাই। ব্যোমকেশবাবু বিবেচক ব্যক্তি‌, তিনি নিশ্চয় বুঝিয়াছেন যে পূজ্যপাদ খুল্লতাতকে বধ করা কোনও ভদ্রলোকের ছেলের পক্ষে সম্ভব নয়। অতএব তিনি যেন পুলিসে খবর না দেন। পুলিস-বিশেষত বর্তমানকালের পুলিস-যদি এমন একটা ছুতা পায় তাহা হইলে নিতাই-নিমাইকে নাস্তানাবুদ করিয়া ছাড়িবে‌, নিরাপরাধের প্রতি জুলুম করিবে। ইহা কদাচ বাঞ্ছনীয় নয়। একেই তো অবিচার অত্যাচারে দেশ ছাইয়া গিয়াছে।

কামিনীকান্ত শেষ করিলে ব্যোমকেশ আড়মোড়া ভাঙিয়া হাই তুলিল‌, অলসকণ্ঠে বলিল‌, ‘এঁরা succession certificate-এর জন্য দরখাস্ত করেছেন নিশ্চয়? তার কি হল?’

কামিনীকান্ত বলিলেন‌, ‘দরখাস্ত করা হয়েছে। তবে আদালতের ব্যাপার‌, সময় লাগবে।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘আমার বিশ্বাস প্রভাত কোনও আপত্তি তুলবে না। তবে বইয়ের দোকানটা তার নিজের নামে; আপনারা যদি সেদিকে হাত বাড়ন তাহলে সে লড়বে।’

‘না না‌, অনাদিবাবু যা দান করে গেছেন তার ওপর ওদের লোভ নেই। —তাহলে ব্যোমকেশবাবু্‌, আপনি শ্ৰীকান্ত হোটেলের কথাটা প্ৰকাশ করবেন না। আশা করতে পারি কি?’

‘এ বিষয়ে আমি বিবেচনা করে দেখব। নিমাইবাবু নিতাইবাবু যদি নির্দোষ হন তাহলে নিৰ্ভয়ে থাকতে পারেন। আচ্ছা‌, আজ আসুন তাহলে।’

তিনজনে গাত্ৰোত্থান করিয়া পরস্পর দৃষ্টি বিনিময় করিলেন‌, চোখে চোখে কথা হইল। তারপর কামিনীকান্ত একটু আমতা আমতা করিয়া বলিলেন‌, ‘আজ আমরা আপনার অনেক সময় নষ্ট করলাম। ক্ষতিপূরণস্বরূপ সামান্য কিছু— বলিয়া পকেট হইতে পাঁচটি একশত টাকার নোট বাহির করিয়া বাড়াইয়া ধরিলেন।

ব্যোমকেশের অধর ব্যঙ্গ-বঙ্কিম হইয়া উঠিল—’আমার সময়ের দাম অত বেশি নয়। তাছাড়া‌, আমি ঘুষ নিই না।’

কামিনীকান্ত তাড়াতাড়ি বলিলেন‌, ‘না না‌, সে কি কথা। আপনি অনাদিবাবুর মৃত্যু সম্বন্ধে তদন্তু করছেন‌, তার তো একটা খরচ আছে। সে খরচ এদেরই দেবার কথা। আচ্ছা‌, আর আপনার সময় নষ্ট করব না। নমস্কার।’ নোটগুলি টেবিলে রাখিয়া তিনি মক্কেল সহ ক্ষিপ্ৰবেগে নিষ্ক্রান্ত হইলেন।

ব্যোমকেশ নোটগুলি উল্টাইয়া পাল্টাইয়া পকেটে রাখিতে রাখিতে বলিল‌, ‘ঘুষ কি করে দিতে হয় শিখলাম।’ তারপর ভ্রূ বাঁকাইয়া আমার পানে চাহিল—’কেমন গল্প শুনলে?’

বলিলাম‌, ‘আমার তো নেহাৎ অসম্ভব মনে হল না।’

‘এরকম গল্প তুমি লিখতে পারো? সাহস আছে?’

‘এমন অনেক সত্য ঘটনা আছে যা গল্পের আকারে লেখা যায় না‌, লিখলে বিশ্বাসযোগ্য হয় না। তবু যা সত্য তা সত্যই। Truth is stranger than fiction.’

তর্ক বেশ জমিয়া উঠিবার উপক্ৰম করিতেছে এমন সময় দ্বারে আবার অতিথি সমাগম হইল। দরজা ভেজানো ছিল; একজন দরজার ফাঁকে মুণ্ড প্রবিষ্ট করাইয়া বলিল, ‘আসতে পারি স্যার?’ বলিয়া দাঁত খিঁচাইয়া হাসিল।

অবাক হইয়া দেখিলাম‌, বিকাশ দত্ত! বছরখানেক আগে চিড়িয়াখানা প্রসঙ্গে তাহার সহিত পরিচয় ঘটিয়াছিল। তাহার হাসিটি অটুট আছে। কিন্তু বেশভূষা দেখিয়া মনে হয় ধন-ভাগ্যে ভাঙন ধরিয়াছে।

ব্যোমকেশ সমাদর করিয়া বিকাশকে বসাইল‌, হাসিয়া বলিল‌, ‘তারপর‌, খবর কি?’

বিকাশ বলিল‌, ‘খবর ভাল নয়। স্যার। চাকরি গেছে‌, এখন ফ্যা ফ্যা করে বেড়াচ্ছি।’

ব্যোমকেশের মুখ গভীর হইল–’চাকরি গেল কোন অপরাধে?’

বিকাশ বলিল‌, ‘অপরাধ করলে তো ফাঁসি যেতম স্যার। অপরাধ করিনি। তাই চাকরি গেছে।’

‘হুঁ। তা এখন কি করছেন?’

‘কাজের চেষ্টায় ঘুরে বেড়াচ্ছি। আপনার হাতে যদি কিছু থাকে তাই খবর নিতে এলাম।’

ব্যোমকেশ একটু ভাবিয়া বলিল‌, ‘কাজ-? আচ্ছা‌, কাজের কথা পরে হবে‌, আজ বেলা হয়ে গেছে‌, এখানেই খাওয়া-দাওয়া করুন।’

বিকাশের মুখে কৃতজ্ঞতার একটি ক্লিষ্ট হাসি ফুটিয়া উঠিল—’না স্যার‌, আমাকে দুপুরবেলা বাসায় ফিরতে হবে। যদি কিছু কাজ থাকে‌, ওবেলা আবার আসব।’

বিকাশের মুখ দেখিয়া মনে হইল তাহার বাসায় কোনও অভুক্ত প্রিয়জন তাহার পথ চাহিয়া আছে।

ব্যোমকেশ আবার একটু ভাবিয়া বলিল‌, ‘আমার হাতে একটা কাজ আছে সে কাজে আপনার মতন কুঁশিয়ার লোক চাই। একটি লোকের হাঁড়ির খবর যোগাড় করতে হবে?

বিকাশ পকেট হইতে ডায়েরির মত একটা খাতা ও পেন্সিল বাহির করিল—‘নাম?’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘শিউলী মজুমদারের নাম শুনেছেন?’

‘শিউলী মজুমদার? গান গায়?’

‘হ্যাঁ। তার বাপের নাম দয়ালহরি মজুমদার‌, ঠিকানা ১৩/৩‌, রামতনু লেন‌, শ্যামবাজার। এদের বাড়ির সব খবর সংগ্ৰহ করতে হবে।’

লিখিয়া লইয়া বিকাশ বলিল‌, ‘কবে খবর চান?’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘একদিনের কাজ নয়। অনেকদিন ধরে একটু একটু করে খবর যোগাড় করতে হবে। অতীতের খবর‌, বর্তমানের খবর‌, বাড়িতে কারা আসে যায়‌, কী কথা বলে সব খবর চাই। অনাদি হালদার আর প্রভাত-এই দুটো নাম মনে রাখবেন। যখনই কিছু খবর পাবেন আমাকে এসে জানাবেন।’

‘বেশ‌, আজ তাহলে উঠি।’ খাতা পেন্সিল পকেটে পুরিয়া বিকাশ উঠিয়া দাঁড়াইল।

ব্যোমকেশ একটি একশত টাকার নোট তাহার হাতে দিয়া বলিল‌, ‘আজ একশো টাকা রাখুন। কাজ হয়ে গেলে আরও পাবেন।’

নোট হাতে লইয়া বিকাশ কিছুক্ষণ অপলক চক্ষে সেইদিকে চাহিয়া রহিল‌, তারপর চোখ তুলিয়া বলিল‌, ‘ব্যোমকেশবাবু্‌, পেটে ভাত না থাকলে মুখ দেখে ধরা যায়-না? আপনি ঠিক ধরেছেন?’ খপ করিয়া ব্যোমকেশের পায়ের ধূলা লইয়া বিকাশ দ্রুতপদে প্রস্থান করিল।

ব্যোমকেশ দ্বার বন্ধ করিয়া দিয়া খামখেয়ালী গোছের হাসিল–’কিছু টাকার সদগতি হল। চল‌, আর দেরি নয়‌, নেয়ে খেয়ে নেওয়া যাক। নৈলে এখনি হয়তো আবার নতুন অতিথি এসে হাজির হবে।’

অপরাহ্নে পুঁটিরাম যখন চা লইয়া আসিল তখন লক্ষ্য করিলাম‌, তাহার মুখখানা শীর্ণ ও কেন্দনাক্লিষ্ট। জিজ্ঞাসা করিলাম‌, ‘কি রে‌, কি হয়েছে?’

পুঁটিরাম বলিল‌, ‘আবার অম্বলের ব্যথা ধরেছে বাবু।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘আমি ওষুধ দিচ্ছি‌, তুই শুয়ে থাকগে যা। এ বেলা আর তোকে রাঁধতে হবে না।’

কিছুদিন হইতে পুঁটিরামকে অম্লশূলে ধরিয়াছে; বিশুদ্ধ কাঁকর এবং তেঁতুল বিচির গুড়া তাহার সহ্য হইতেছে না। ব্যোমকেশ তাহাকে যোয়ানের জল দিয়া ফিরিয়া আসিলে বলিলাম‌, নীচে খবর পাঠাই‌, মেসেই আজ আমাদের খাওয়ার ব্যবস্থা হোক।’

ব্যোমকেশ একটু ভাবিয়া বলিল‌, ‘না‌, চল আজ কোনও হোটেলে খেয়ে আসি। আজ পাঁচশো টাকা হাতে এসেছে‌, বর্বরস্য ধনক্ষয়ং হওয়া দরকার।’

আমি তাহার এই লঘুতায় সায় দিতে পারিলাম না‌, বলিলাম‌, ‘ব্যোমকেশ‌, কিছু মনে করো না। ওই পাঁচশো টাকা যে ঘুষ যখন বুঝতে পেরেছ তখন ও টাকা নেওয়া কি তোমার উচিত হয়েছে?’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘এ প্রশ্নের উত্তরে অনেক যুক্তিতর্কের অবতারণা করতে পারি। কিন্তু তা করব না। টাকা আমার চাই তাই নিয়েছি‌, ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে পারব না।’

‘কিন্তু ধরো-যদি শেষ পর্যন্ত জানা যায় যে‌, নিমাই নিতাই খুন করেছে‌, তখন কি করবে? ঘুষ খেয়ে কথাটা চেপে যাবে?’

‘না‌, চেপে যাব না‌, ওদেরই ধরিয়ে দেব। অবশ্য যদি পুলিস ধরতে চায়। মনে রেখো‌, অনাদি হালদারের খুনের তদন্তু করবার জন্যই ওরা আমাকে টাকা দিয়েছে‌, ঘুষ বলে দেয়নি।’

‘তা যদি হয় তাহলে স্বতন্ত্র কথা।’

‘তোমার ভয় নেই‌, ঘুষ খেয়ে আমি অধৰ্ম করব না। অধৰ্ম করার মতলব যদি থাকত তাহলে পাঁচশো টাকা নিয়ে সন্তুষ্ট হতাম না‌, রীতিমত আখেরের রেস্ত করে নিতাম।’ বলিয়া ব্যোমকেশ হাসিল।

চা শেষ করিয়া সিগারেট ধরাইলাম। এ বেলা বোধহয় আর অতিথি অভ্যাগতের শুভাগমন হইবে না ভাবিতেছি‌, প্রভাত আসিয়া উপস্থিত। তাহার হাতে একটি বৌচুকা‌, চেহারা দেখিয়া বোঝা যায়‌, সম্প্রতি রোগ হইতে উঠিয়াছে‌, চোখের মধ্যে দুর্বলতার চিহ্ন এখনও লুপ্ত হয় নাই। ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘আসুন। এখন শরীর কেমন?’

লজিত হাসিয়া প্ৰভাত বলিল‌, ‘সেরে গেছে। সেদিন অনেক কষ্ট দিলাম। আপনাদের।’

‘কিছু না। হাতে ওটা কি?’

‘একটু মিষ্টি। ভীম নাগের দোকানের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম‌, ভাবলাম কিছু নিয়ে যাই।’

বোঁচ্‌কা খুলিলে দেখা গেল‌, মিষ্টি অল্প নয়‌, প্রায় কুড়ি পঁচিশ টাকার কড়া পাকের সন্দেশ। সেদিন ব্যোমকেশ তাহার উপকার করিয়াছিল‌, ডাক্তার গাড়ি-ভাড়া প্রভৃতির খরচ লয় নাই‌, তাই প্রভাত অত্যন্ত শিষ্টভাবে তাহা প্রত্যাৰ্পণ করিতে চায়। ব্যোমকেশ উল্লসিত হইয়া বলিল‌, ‘আরে আরে‌, এ যে স্বর্গীয় ব্যাপার। অজিত‌, আজ কার মুখ দেখে উঠেছিলাম বল তো?’

বলিলাম‌, যতদূর মনে পড়ে তুমি আমার মুখ দেখেছিলে এবং আমি তোমার মুখ দেখেছিলাম।’

‘তবেই বোঝে‌, আমাদের মুখ দুটো সামান্য নয়। যাহোক‌, খাবারগুলো সরিয়ে রাখা ভাল‌, বাইরে ফেলে রাখা কিছু নয়।’ ব্যোমকেশ সন্দেশগুলি ভিতরে রাখিয়া আসিয়া বলিল‌, ‘প্রভাতবাবু্‌, চা খাবেন নাকি?’

‘আজ্ঞে না‌, আমি চ খেয়ে এসেছি।’ সে ঘরের এদিক ওদিক চাহিয়া বলিল‌, ‘এখানে কেবল আপনারা দু’জনে থাকেন বুঝি?’।

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘উপস্থিত দু’জনেই আছি। আমার স্ত্রী এবং ছেলে এখন পাটনায়।’

প্রভাতের চোখ দুইটি যেন নৃত্য করিয়া উঠিল—’পাটনায়!’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘হ্যাঁ‌, যা হাঙ্গামা চলেছে‌, তাদের বাইরে রেখেছি। আপনি বুঝি পাটনা এখনও ভুলতে পারেননি।’

‘পাটনা ভুলব!’ প্ৰভাতের স্বর গাঢ় হইয়া উঠিল—’জন্মে অব্দি পাটনাতেই কাটিয়েছি। কত বন্ধু আছে সেখানে। ইশাক সাহেব আছেন।’

‘ইশাক সাহেব?’

‘আমার ওস্তাদ। তাঁর দোকানে চাকরি করতাম‌, তিনি হাতে ধরে আমাকে দপ্তরীর কাজ শিখিয়েছিলেন। এমন ভাল লোক হয় না‌, দেবতুল্য লোক। এখন বুড়ো হয়েছেন.কে তাঁর দোকানে কাজ করছে কে জানে…হয়তো তিনি একই কাজ করেছেন।’ প্ৰভাত নিশ্বাস ফেলিল।

ব্যোমকেশ জিজ্ঞাসা করিল‌, ‘পাটনায় কোন পাড়ায় থাকেন তিনি?’

‘সিটিতে থাকেন। সেখানে সকলেই তাঁকে চেনে। আমার আর ওদিকে যাওয়া হয়নি‌, সেই যে পাটনা থেকে এসেছি‌, আর যাইনি। ব্যোমকেশবাবু্‌, আপনি নিশ্চয় মাঝে মাঝে পাটনা যান? এবার যখন যাবেন ইশাক সাহেবকে দেখে আসবেন? কেমন আছেন তিনি-বড় দেখতে ইচ্ছে করে।’

‘নিশ্চয় দেখা করব। তারপর এদিকের খবর কি? কেষ্টবাবু কেমন আছেন?’

প্রভাত বলিল‌, ‘কেষ্টবাবু চলে গেছেন।’

চলে গেছেন?’

‘হ্যাঁ। আমার বাসায় ওঁর পোষাল না। মা’র সঙ্গে দিনরাত খিটিমিটি লাগত। তারপর একদিন নিজেই চলে গেলেন।’

‘যাক‌, আপনার ঘাড় থেকে একটা বোঝা নামল। আর নৃপেনবাবু? তিনি কি আপনার দোকানে কাজ করছেন?’

‘হ্যাঁ।’

‘কি কাজ করেন?’

‘বইয়ের দেকানে অনেক ছুটোছুটির কাজ আছে। অন্য দোকান থেকে বই আনতে হয়‌, ভি পি পাঠাবার জন্যে পোস্ট অফিসে যেতে হয়। এসব কাজ আগে আমাকেই করতে হত। এখন নৃপেনবাবু করেন।’

‘ভাল।’

প্রভাত এতক্ষণ বোমকেশের সঙ্গে কথা বলিতেছিল‌, মাঝে মাঝে আমার দিকে তাকাইতেছিল; এখন সে আমার দিকে ফিরিয়া বসিয়া বলিল‌, ‘অজিতবাবু্‌, আমি আপনার কাছে আসব বলেছিলাম মনে আছে বোধহয়। এইসব গণ্ডগোলে আসতে পারিনি। আপনার কাছে আমার একটি অনুরোধ আছে।’

‘কি অনুরোধ বলুন।’

‘আপনার একখানি উপন্যাস আমাকে দিতে হবে। আমি গরীব প্রকাশক‌, নতুন দোকান করেছি। তবু অন্য প্রকাশকের কাছ থেকে আপনি যা পান আমিও তাই দেব।’

নূতন প্রকাশককে বই দেওয়ায় বিপদ আছে‌, কখন লালবাতি জ্বালিবে বলা যায় না। একবার এক অবচিীনকে বই দিয়া ঠকিয়াছি। আমি ইতস্তত করিয়া বলিলাম‌, ‘তা‌, এখন তো আমার হাতে কিছু নেই-’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘কেন‌, যে উপন্যাসটা ধরেছ সেটা দিতে পারো। প্রভাতবাবু্‌, আপনি ভাববেন না‌, অজিতের বই আপনি পাবেন।’

প্রভাত উৎসাহিত হইয়া বলিল‌, ‘যখন আপনার বই শেষ হবে তখন দেবেন। এখন আমার দোকান ভাল চলছে না‌, পরের বই কমিশনে বিক্রি করে কতটুকুই বা লাভ থাকে। আপনাদের আশীবাদ পেলে আমি দোকান বড় করে তুলব।; প্ৰাণপণে খাটব‌, কিছুঁতেই নষ্ট হতে দেব না।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘এই তো চাই। আপনাদের বয়সে কাজে উৎসাহ থাকা চাই। তবে উন্নতি করতে পারবেন।’

প্রভাত গদগদ মুখে পকেট হইতে মনিব্যাগ বাহির করিয়া তাহা হইতে দুইটি নোট লইয়া আমার সম্মুখে রাখিল। দেখিলাম দুইশত টাকা। সত্যই আজ কাহার মুখ দেখিয়া উঠিয়াছিলাম!

প্ৰভাত বলিল‌, ‘অগ্রিম প্ৰণামী দিলাম। বই লেখা শেষ হলেই বাকি টাকা দিয়ে যাব।’ সে উঠিয়া দাঁড়াইল।

বলিলাম‌, ‘রসিদ নিয়ে যান।’

সে বলিল‌, ‘না‌, না‌, এখন রসিদ থাক‌, সব টাকা দিয়ে রসিদ নেব। আজ যাই‌, সন্ধ্যে হয়ে গেল‌, এখনও দোকান খোলা হয়নি।’

প্রভাত প্ৰস্থান করিলে আমরা কিছুক্ষণ বিস্ময়-পুলকিত নেত্রে পরস্পর চাহিয়া রহিলাম। তারপর নোট দু’টি সস্নেহে পকেটে রাখিয়া বলিলাম‌, ‘কাণ্ডখোনা কি! এ যে শ্রাবণের ধারার মত ক্ৰমাগত একশো টাকার নোট বৃষ্টি হচ্ছে!’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘হুঁ। এত সুখ সইলে হয়।’

এই সময় দ্বারদেশে বাঁটুলের আবির্ভাব হইল। তাহার আবার চাঁদা আদায়ের সময় হইয়াছে। সে ভক্তিভারে আমাদের প্রণাম করিয়া বিলল‌, ‘চাঁদটিা নিতে এলাম কর্তা।’

ব্যোমকেশ আমার দিকে চাহিয়া হাসিয়া উঠিল। তাহার হাসির অর্থ; জীবন-ব্যবসায়ে শুধু আমদানি নয়‌, রপ্তানিও আছে।

বাঁটুলকে বসাইয়া ব্যোমকেশ টাকা আনিতে গেল। কামিনীকান্তর দেওয়া নোটগুলি হইতে একটি আনিয়া বাঁটুলকে দিল–’ভাঙনি আছে বাঁটুল?’

‘আজ্ঞে‌, আছে।’

বাঁটুল কোমর হইতে গেজে বাহির করিল। বেশ পরিপুষ্ট গেজে; তাহাতে খুচরা রেজাগি হইতে নানা অঙ্কের নোট পর্যন্ত রহিয়াছে। কয়েকটি একশত টাকার নোটও চোখে পড়িল। বাঁটুল হিসাব করিয়া ভাঙনি ফেরত দিল‌, তারপর গেজে। আবার কোমরে বাঁধিল। বাঁটুলের ব্যবসা যে লাভের ব্যবসা তাহাতে সন্দেহ নাই।

ব্যোমকেশ বাঁটুলকে সিগারেট দিল—’বাঁটুল‌, অনাদি হালদার মারা গেছে শুনেছ বোধহয়?’

বাঁটুল চোখ তুলিল না‌, সযত্নে সিগারেট ধরাইতে ধরাইতে বলিল‌, ‘আজ্ঞে‌, শুনেছি।’

‘কেউ তাকে গুলি করে মেরেছে।’

‘আজ্ঞে‌, হ্যাঁ। তাই তো গুজব।’

‘তুমি তো অনেক খবর-টাবর রাখো‌, কে মেরেছে আন্দাজ করতে পারো না?’

‘কলকাতায় লাখ লাখ লোক আছে‌, কত‌, তার মধ্যে কে মেরেছে কি করে আন্দাজ করব। তবে এ কথাও বলতে হয়‌, উনি চুলকে ঘা করলেন। আমার চাঁদা বন্ধ না করলে বেঘোরে প্রাণটা যেত না। আমি রক্ষে করতাম।’

‘বটেই তো! জলে বাস করে কুমীরের সঙ্গে বিবাদ করা কি উচিত! অনাদি হালদারের দুবুদ্ধি হয়েছিল। সে যাক। বাঁটুল‌, তোমরা রাইফেল ভাড়া দাও?’

‘আজ্ঞে‌, দিই।’

‘কি রকম শর্তে ভাড়া দাও?’

‘আজ্ঞে‌, ভাড়া একদিনের জন্যে কুল্লে পাঁচিশ টাকা; রাইফেল আর দু’টি টোটা পাবেন। তবে ভাড়া নেবার সময় তিনশো টাকা জমা দিতে হয়, রাইফেল ফেরত দিলে ভাড়া কেটে নিয়ে টাকা ফেরত দিই। আপনাদের চাই নাকি কর্তা?’

‘না‌, উপস্থিত দরকার নেই‌, দরটা জেনে রাখলাম। আচ্ছা বাঁটুল‌, যে-রাত্রে অনাদি হালদার খুন হয় সে-রাত্রে কাউকে রাইফেল ভাড়া দিয়েছিলে?’

বাঁটুল উঠিয়া দাঁড়াইল‌, ‘আজ্ঞে কতা‌, সে কথা বলতে পারব না। একজন খদ্দেরের কথা আর একজনকে বললে বেইমানী হয়‌, আমাদের ব্যবসা চলে না। আচ্ছা‌, আজ আসি। পোন্নাম হই।’

বাঁটুল চলিয়া গেল‌, তখন সন্ধ্যা হয় হয়। ব্যোমকেশ আরাম-কেন্দারায় লম্বা হইয়া বোধকরি ঝিমাইয়া পড়িল। আমার মনটা এদিক ওদিক ঘুরিয়া দুইশত টাকার কাছে ফিরিয়া ফিরিয়া আসিতে লাগিল। টাকা যখন লইয়াছি তখন উপন্যাসটা তাড়াতাড়ি শেষ করিতে হইবে। অথচ তাড়াহুড়া করিয়া আমার লেখা হয় না; মনটা যখন নিশ্চিন্তু নিস্তরঙ্গ হয় তখনই কলম চলে। উপন্যাসের কথাই ভাবিতে লাগিলাম; তাহার মধ্যে নিমাই নিতাই প্রভাত বাঁটুল সকলেই মাঝে মাঝে উকিঝুকি মারিতে লাগিল।

ঘণ্টা দুই পরে পেটে ক্ষুধার উদয় হইলে বলিলাম‌, ‘চল‌, এবার বেরুনো যাক। হোটেলের খরচ আজ না হয়। আমিই দেব।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘সাধু সাধু।’

আমাদের বাসার অনতিদূরে একটি হোটেল আছে। দোতলার উপর হোটেল‌, সরু সিঁড়ি দিয়া উঠিতে হয়; সিঁড়ির মাথায় স্থূলকায় ম্যানেজার টেবিলের উপর ক্যাশ-বাক্স লইয়া বসিয়া থাকেন। আশেপাশে ছোট ছোট কুঠুরিতে টেবিল পাতা। বিশেষ জাঁকজমক নাই‌, কিন্তু রান্না ভাল।

হোটেলে উপস্থিত হইলে ম্যানেজার বলিলেন‌, ‘পাঁচ নম্বর।’ অমনি একজন ভৃত্য আসিয়া আমাদের পাঁচ নম্বর কুঠুরির দিকে লইয়া চলিল। একটি গলির দুই পাশে সারি সারি কুঠুরি; যাইতে যাইতে একটি কুঠুরির সম্মুখে গিয়া পা আপনি থামিয়া গেল। আমি ব্যোমকেশের গা টিপিলাম। পদার ফাঁক দিয়া দেখা যাইতেছে‌, কেষ্টবাবু একাকী বসিয়া আহার করিতেছেন। তাঁহার গায়ে সিঙ্কের পাঞ্জাবির উপর পাট করা শাল‌, মুখে ধনগর্বের গান্তীর্য। তাঁহার সামনে শ্বেতবস্ত্রাবৃত টেবিলের উপর অনেকগুলি প্লেটে রাজসিক খাদ্যদ্রব্য সাজানো; একটি প্লেটে আস্ত রোস্ট মুরগি উত্তানপাদ অবস্থায় বিরাজ করিতেছে। পাশে একটি বোতল।

কেষ্টবাবু পানাহারে মগ্ন‌, দরজার বাহিরে আমাদের লক্ষ্য করিলেন না। আমরা পাশের প্রকোষ্ঠে গিয়া বসিলাম।

ভৃত্যকে অডার দিলে সে খাবার লইয়া আসিল; আমরা খাইতে আরম্ভ করিলাম। কিন্তু লক্ষ্য করিলাম ব্যোমকেশের প্রাক্তন প্ৰসন্নতা আর নাই‌, সে যেন ভাল ভাল খাদ্যগুলি উপভোগ করিতেছে না।

আধা ঘণ্টা পরে ভোজন শেষ করিয়া কোটির হইতে নিৰ্গত হইলাম! ম্যানেজারের টেবিলের সম্মুখে দাঁড়াইয়া কেষ্টবাবু হোটেলের ঋণ শোধ করিতেছেন। রাজকীয় ভঙ্গীতে পকেট হইতে একশত টাকার নোট লইয়া টেবিলের উপর ফেলিয়া দিলেন।

এই লইয়া আজ চারবার একশত টাকার নোট দেখিলাম। দেশটা সম্ভবত রাতারাতি বড়মানুষ হইয়া উঠিয়াছে‌, ইংরেজ বিদায় লইবার পূর্বেই আমাদের কপাল ফিরিয়াছে। স্বাধীনতা লাভের আর দেরি নাই।

ম্যানেজার ভাঙনি ফেরত দিলেন‌, কেষ্টবাবু তাহা অবজ্ঞাভরে পকেটে ফেলিয়া পিছন ফিরিলেন। আমরা পিছনেই ছিলাম।

চোখাচোখি হইল। কেষ্টবাবুর চোয়াল বুলিয়া পড়িল। তারপর তিনি পাকশািট খাইয়া ঝটিতি সিঁড়ি দিয়া নামিয়া গেলেন।

আমরা যখন হোটেলের প্রাপ্য চুকাইয়া পথে নামিলাম কেষ্টবাবু তখন অদৃশ্য হইয়াছেন।

বাসার দিকে চলিতে চলিতে বলিলাম‌, আজকের দিনটা ঘটনাবহুল বলা চলে‌, এমন কি টাকাবহুল বললেও অত্যুক্তি হয় না। এ যেন চারিদিকে একশো টাকার নোটের হরির লুট হচ্ছে।’

ব্যোমকেশ উত্তর দিল না।

আরও খানিক দূর চলিবার পর বলিলাম‌, ‘কী ভাবছ এত?’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘চল অজিত‌, পাটনা যাই। সকালে একটা ট্রেন আছে।’

আমি ফুটপাথের মাঝখানে দাঁড়াইয়া পড়িলাম–’পাটনা যাবে! আর এদিকে?’

‘এদিকে আর কিছু করবার নেই।’

‘তার মানে অনাদি হালদারকে কে খুন করেছে তা বুঝতে পেরেছ।’

‘বোধহয় পেরেছি। কিন্তু তাকে ধরবার উপায় নেই।’

আবার চলিতে আরম্ভ করিলাম—’কে খুন করেছে?’

ব্যোমকেশ আকাশের দিকে চোখ তুলিল; বুঝিলাম আবোল-তাবোল আবৃত্তি করিবার উদ্যোগ করিতেছে। বলিলাম‌, ‘বলতে না চাও বোলো না। কিন্তু বিকাশ দত্তকে খবর সংগ্ৰহ করবার জন্যে টাকা দিয়েছ তার কি হবে?’

‘বিকাশ ওস্তাদ ছেলে‌, জানাবার মত খবর থাকলে সে ঠিক আমাকে জানাবে।’

‘কিন্তু আসল খবর যখন জানতেই পেরেছ তখন আর খবরে দরকার কি?’

‘দরকার হয়তো নেই‌, কিন্তু অধিকন্তু ন দোষায়। সুন্দরী যুবতীরা প্রসাধন করেন কেন? বন্ধল পরে থাকলেই পারেন। থাকেন না। তার কারণ‌, অধিকন্তু ন দোষায়।’

‘তুমি কি সুন্দরী যুবতী?’

‘না‌, আমি সুন্দর যুবক। আমার জন্যে আমার বউয়ের মন কেমন করছে। সুতরাং আর দেরি নয়। কাল সকালেই-পাটনা।’

আমাদের পাটনা যাত্রার পর হইতে স্বাধীনতা দিবস পর্যন্ত এই কয় মাস আমাদের জীবনের ধারাবাহিকতা অনেকটা নষ্ট হইয়া গিয়াছিল। নানা বিচিত্ৰ ঘটনার মধ্যে পড়িয়া অনাদি হালদার ঘটিত ব্যাপারের খেই হারাইয়া গিয়াছিল। এই কাহিনীতে সে সকল অবাস্তর ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবৃতি অনাবশ্যক‌, কেবল সংক্ষেপে এই আট-নয় মাস কি করিয়া কাটিল তাহার আন্দাজ দিয়া নির্দিষ্ট বিষয়ে ফিরিয়া যাইব।

পাটনায় পৌঁছিয়া দশ-বারো দিন বেশ নিরুপদ্রবে। কাটিল; তারপর একদিন পুরন্দর পাণ্ডের সঙ্গে দেখা হইয়া গেল। পাণ্ডেজি বছরখানেক হইল বদলি হইয়া পাটনায় আসিয়াছেন। সেই যে দুৰ্গরহস্য সম্পর্কে তাঁহার সংস্পর্শে আসিয়াছিলাম‌, তারপর দেখা হয় নাই। পাণ্ডেজি খুশি হইলেন‌, আমরাও কম খুশি হইলাম না। পাণ্ডেজি মৃত্যু-রহস্যের অগ্রদূত। আমাদের সহিত দেখা হইবার দু। একদিন পরেই একটি রহস্যময় মৃত্যু আসিয়া উপস্থিত হইল এবং শেষ পর্যন্ত ব্যোমকেশকেই সে রহস্য ভেদ করিতে হইল। একদিন সে কাহিনী বলিবার ইচ্ছা রহিল।

শুধু যে আমাদের ক্ষুদ্র জীবনে বিচিত্ৰ ঘটনার সমাবেশ হইতেছিল তাঁহা নয়‌, সারা ভারতবর্ষের জীবনে এক মহা সন্ধিক্ষণ দ্রুত অগ্রসর হইয়া আসিতেছিল। স্বাধীনতা আসিতেছে‌, রক্তাক্ত দেহে বিক্ষত চরণে দুর্লঙ্ঘ্য বাধা ভেদ করিয়া আসিতেছে। স্বাধীনতা যখন আসিবে হয়তো মুমূর্ষ রক্তহীন দেহে আসিয়া উপস্থিত হইবে। তাহাকে বাঁচাইয়া তুলিতে প্রত্যেক ভারতবাসীকে হৃদয়রক্ত নিঙড়াইয়া দিতে হইবে। তবু স্বাধীনতা আসিতেছে; স্বাৰ্থ-নিষ্ঠুর বিদেশী শাসকের খড়ের্গ দ্বিখণ্ডিত হইয়াও হয়তো বাঁচিয়া থাকিবে। আশা আশঙ্কায় কম্পমান সেই দিনগুলির কথা স্মরণ হইলে আজও গায়ে কাঁটা দেয়।

একদিন বৈকালে ময়দানে বেড়াইতে বেড়াইতে কৈশোরের এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা হইয়া গেল। পরিধানে শেরওয়ানী পায়জামা সত্ত্বেও চিনিতে পারিলাম—স্কুলে যাহার সহিত প্ৰাণের বন্ধুত্ব ছিল সেই ফজলুর রহমান। দু’জনে প্রায় একসঙ্গেই পরস্পরকে চিনিতে পারিলাম এবং সবেগে অলিঙ্গনবদ্ধ হইলাম।

‘ফজলু!’

‘অজিত!’

কিছুক্ষণ পরে বাহুবন্ধন হইতে মুক্ত হইয়া আমি দুই পা পিছাইয়া আসিলাম‌, ফজলুর দিকে গলা বাড়াইয়া দিয়া বলিলাম‌, ‘নে ফজলু্‌, ছুরি বার করা। এই গলা বাড়িয়ে রয়েছি।’

ফজলু নিজের হাতের মোটা লাঠিটা আমার হাতে ধরাইয়া দিয়া বলিল, ‘এই নে লাঠি, বসিয়ে দে আমার মাথায়। তোদের অসাধ্য কাজ নেই।’

তারপর আমরা ঘাসের উপর বসিলাম‌, ব্যোমকেশের সহিত ফজলুর পরিচয় করাইয়া দিলাম। ফজলু এখন পাটনা হাইকোর্টে ওকালতি করিতেছে‌, প্রচণ্ড পাকিস্তানী। সুতরাং তুমুল তর্ক বাধিয়া উঠিল‌, কেহই কাহাকেও রেয়াৎ করিলাম না। শেষে ফজলু বলিল‌, ‘ব্যোমকেশবাবু্‌, অজিতের সঙ্গে তর্ক করা বৃথা‌, ওর ঘটে কিছু নেই। কিন্তু আপনি তো বুদ্ধিজীবী মানুষ‌, আপনি বলুন দেখি দোষ কার–হিন্দুর‌, না‌, মুসলমানের?’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘এক ভস্ম আর ছার‌, দোষ গুণ কবি কার।’

সেদিন বেড়াইয়া ফিরিতে দেরি হইয়া গেল। তারপর আরও কয়েকদিন ফজলুর সহিত দেখা হইয়াছিল। সে নিমন্ত্রণ করিয়া আমাদের খাওয়াইয়াছিল। তারপর–

উন্মত্ত হিংসার পিশাচ-নৃত্য আবার শুরু হইয়া গেল। প্রথমে নোয়াখালি‌, তারপর বিহার। এ লইয়া বাক-বিস্তারের প্রয়োজন নাই। ফজলু এই হিংসা-যজ্ঞে প্ৰাণ দিল। সে সত্যনিষ্ঠ সাহসী পুরুষ ছিল‌, যাহা বিশ্বাস করিত তাহা গলা ছাড়িয়া প্রচার করিত; তাই বোধহয় তাহাকে প্রাণ দিতে হইল। কিছুদিন পরে বাতাস একটু ঠাণ্ডা হইলে আমরা পাটনা সিটিতে ইশাক সাহেবের খোঁজ লাইতে গিয়াছিলাম। তিনিও গিয়াছেন; কেবল তাঁহার দোকানটা অর্ধদগ্ধ অবস্থায় পড়িয়া আছে। এক ভস্ম আর ছার‌, দোষ গুণ কবি কর।

কিন্তু যাক। এবার ব্যক্তিগত ক্ষুদ্রতর প্রসঙ্গে ফিরিয়া যাই। ইতিমধ্যে কলিকাতা হইতে বিকাশ দত্তর চিঠি আসিয়াছিল; বিকাশ লিখিয়াছিল–

‘প্ৰণাম শতকোটি‌, পুঁটিরামের কাছে আপনার ঠিকানা যোগাড় করে চিঠি লিখছি। আশা করি আপনি শীঘ্রই ফিরবেন।

আমি এখন মাস্টারি করছি। দয়ালহরি মজুমদারের একটা আট-নয় বছরের অকালপক্ক ছেলে আছে‌, তাকে পড়াই। মাইনে পাঁচ টাকা‌, সকাল বিকেল পড়াতে যাই। ছেলেটা হাড় বজাত; এমন ইচড়ে পাকা মিটুমিটে শয়তান আমিও আজ পর্যন্ত দেখিনি। বাড়িতে কে কি করছে‌, কোথায় কি ঘটছে‌, সব খবর সে রাখে।

দয়ালহরি মজুমদার ঢাকার লোক; সেখানে বীমার দালালি এবং আরও কি কি করত। বছরখানেক আগে রাজনৈতিক গণ্ডগোলের আঁচ পেয়ে আগে ভাগেই কলকাতা পালিয়ে এসেছিল। মেয়ে এবং ছেলে ছাড়া আর কেউ নেই। লোকটা সন্দিগ্ধ এবং ধড়িবাজ।

মেয়ে শিউলী শান্ত এবং ভালমানুষ গোছের। বাইরে থেকে মনে হয় বিদ্যোধরী‌, কিন্তু আসলে তা নয়। ভাল গাইতে পারে‌, রাতদিন গান বাজনা নিয়ে আছে। গ্রামোফোনে গান দিয়েছে‌, তা ছাড়া টাকা নিয়ে সভাসমিতিতে গাইতে যায়। শিউলীর উপার্জন থেকে বোধহয় সংসার চলে। বুড়োটা কিছু কাজকর্ম করে না।

আপনি অনাদি হালদার আর প্রভাত-এই দুটো নাম মনে রাখতে বলেছিলেন। অনাদি হালদারের খবর পাইনি‌, প্ৰভাতের খবর পেয়েছি। কয়েক মাস আগে প্ৰভাতের সঙ্গে শিউলীর বিয়ের সম্বন্ধ হয়েছিল‌, তারপর সম্বন্ধ ভেঙে যায়। কোন ভেঙে যায় তা জানতে পারিনি‌, তবে সন্দেহ হয় কোনও গুপ্তকথা আছে। বিয়ে ভেঙে যাবার আগে প্ৰভাত ঘন ঘন আসত‌, বিয়ে ভেঙে যাবার পরও একবার এসেছিল। দয়ালহরি মজুমদার তাকে অপমান করে তাড়িয়ে দেয়।

উপস্থিত বাড়িতে একজন লোকের খুব যাতায়াত আছে‌, তার নাম জগদানন্দ অধিকারী। শিউলীকে গান শেখাবার ছুতো করে আসে। লোকটার মতলব ভাল নয়। গান শেখানো ছাড়া অন্যভাবে ঘনিষ্ঠতা করতে চায়।

আপাতত এই পর্যন্ত। নতুন খবর পেলে জানাবো। আপনি কবে ফিরবেন? আমার ঠিকানা নীচে দিলাম।

প্ৰণামান্তে বিকাশ দত্ত।’

বিকাশের চিঠিতে নূতন কথা বিশেষ কিছু নাই। আমাদের জানা কথাই পরিকীর্ণ হইয়াছে।

এদিকে পাটনায় আমাদের অনেকদিন হইয়া গেল। কলিকাতায় ফিরিবার উপক্রম করিতেছি। এমন সময় দিল্লী হইতে ব্যোমকেশের নামে ‘তারা আসিল। সদর বল্লভভাই প্যাটেল তাহার সহিত দেখা করিতে চান।

সর্দার বল্লবভাই কি করিয়া ব্যোমকেশের নাম জানিলেন‌, কেন তাহার সাক্ষাৎ চান‌, কিছুই জানা গেল না। রাজনৈতিক আকাশে তখন ঘনঘটা‌, অন্ধকারের ফাঁকে ফাঁকে বজ্ৰবিদ্যুৎ। ব্যোমকেশ আমাকে পাটনায় ফেলিয়া একাকী দিল্লী চলিয়া গেল।

দিল্লী গিয়া ব্যোমকেশ কি করিয়াছিল তাহা পুরোপুরি জানা আমার পক্ষে সম্ভব হয় নাই। সে ফিরিয়া আসিবার পর ইশারা ইঙ্গিতে যাহা জানিতে পারিয়াছিলাম। তাহা প্রকাশ করার এ স্থান নয়। দেশ তখনও নিজের হাতে আসে নাই‌, ইহারই মধ্যে গুপ্ত ঘরভেদীরা ষড়যন্ত্র আরম্ভ করিয়া দিয়াছিল‌, কে দেশের শত্রু কে মিত্ৰ নিশ্চয়ভাবে জানার প্রয়োজন হইয়াছিল।

ব্যোমকেশ চলিয়া গেলে আমি একলা পড়িয়া গেলাম। দূরে রণবাদ্য শুনিয়া আস্তাবলে বাঁধা লড়য়ে-ঘোড়ার যে অবস্থা হয় আমার অবস্থাও কতকটা সেই রকম দাঁড়াইল। এইভাবে পাটনায় যখন আর মন টিকিল না। তখন কলিকাতায় ফিরিয়া আসিলাম।

কিন্তু কলিকাতার বাসা শূন্য। ভাবিয়াছিলাম‌, নিরিবিলিতে উপন্যাসে মন বসাইতে পারিব‌, কিন্তু মন বসিতে চাহিল না। প্ৰভাতের নিকট হইতে টাকা লইয়াছি‌, একটা কিছু করা দরকার‌, এই সঙ্কল্পটাই মনের মধ্যে পাক খাইতে লাগিল।

একদিন প্ৰভাতের দোকানে গেলাম। আমাকে দেখিয়া সে গলা উচু করিয়া বলিল‌, ‘পাটনা থেকে কবে ফিরলেন? আমি মাঝে আপনাদের বাসায় গিয়েছিলাম। ইশাক সাহেবের খবর নিয়েছিলেন?’

ইশাক সাহেবের খবর বলিলাম। প্ৰভাত কিছুক্ষণ অচল হইয়া বসিয়া রহিল‌, তারপর কোঁচার খুঁটে চোখ মুছিতে লাগিল। আমি সান্ত্বনা দিবার চেষ্টা করিলাম না‌, আবার দেখা হইবে বলিয়া চলিয়া আসিলাম।

পরদিন প্ৰভাতের চিঠি লইয়া নৃপেন আসিল। চিঠিতে দু’ ছত্র লেখা—

মাননীয়েষু‌, কাল কোনও কথা হইল না‌, সেজন্য লজ্জিত। ব্যোমকেশবাবুকি ফিরিয়াছেন?

উপন্যাসের কথা স্মরণ করাইয়া দিতেছি। আশা করি অগ্রসর হইতেছে। ইতি নিবেদক প্রভাত রায়।

নৃপেনকে বলিলাম‌, ‘ব্যোমকেশ এখনও ফেরেনি।–আপনি এখনও প্রভাতবাবুর দোকানেই কাজ করছেন?’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ।’

‘আছেন কোথায়?’

‘পুরানো বাসাতেই আছি। প্রভাতবাবু থাকতে দিয়েছেন।’

‘ননীবালা দেবীর সঙ্গে বেশ বনিবনাও হচ্ছে?’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ‌, উনি আমাকে খুব স্নেহ করেন।’

‘ওদিকের খবর কি? নিমাই নিতাই?’

‘ওরা আদালতের হুকুম পেয়েছে। আমাদের বাসায় অনাদিবাবুর যেসব জিনিস ছিল সব তুলে নিয়ে গেছে। আলমারিও নিয়ে গেছে।’

‘পুলিসের দিক থেকে কোনও সাড়াশব্দ পেয়েছেন?’

‘কিছু না।’

‘কেষ্টবাবুর খবর কি?’।

‘জানি না। সেই যে বাসা ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন তারপর আর দেখিনি।’

নৃপেন চলিয়া গেল।

উপন্যাস লইয়া বসিলাম। কিন্তু মন বিক্ষিপ্ত‌, তাহাকে কলমের ডগায় ফিরাইয়া আনিতে পারিলাম না। আরও কয়েকদিন ছটফট করিয়া পাটনায় ফিরিয়া গেলাম।

ব্যোমকেশ দিল্লী হইতে ফিরে নাই। গোটা দুই অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত পোস্টকার্ড আসিয়াছে‌, ভাল আছি‌, ভাবনা করিও না। কবে ফিরিব স্থিরতা নাই।

এদিকে স্বাধীনতা দিবস অগ্রসর হইয়া আসিতেছে। সমস্ত দেশ অভাবনীয় সম্ভাবনার আশায় যেন দিশাহারা হইয়া গিয়াছে।

আগস্ট মাসের দশ তারিখে হঠাৎ ব্যোমকেশ ফিরিয়া আসিল।

রোগ হইয়া গিয়াছে‌, কিন্তু শুষ্ক মুখে বিজয়ীর হাসি। বলিল‌, ‘আর না‌, চল‌, কলকাতায় ফেরা যাক। পুঁটিরামকে একখানা পোস্টকার্ড লিখে দাও।’

ইচ্ছা ছিল সত্যবতী ও খোকাকে লইয়া একসঙ্গে কলিকাতায় ফিরিব‌, সত্যবতীও এতদিন বাহিরে বাহিরে থাকিয়া ঘরে ফিরিবার জন্য দড়িাছেড়া হইয়াছিল‌, কিন্তু তাহা সম্ভব হইল না। পাটনায় দীর্ঘকাল থাকার ফলে বেশ একটি সংসার গড়িয়া উঠিয়াছিল‌, তাহা গুটিাইয়া লইবার ভার এক সুকুমারের ঘাড়ে চাপাইয়া চলিয়া যাইতে পারিলাম না। কথা হইল হগুপ্তাখানেক পরে সুকুমার সুন্টু ইয়া ফিরিবে‌, আমরা আগে গিয়া বাসাটা সাজাইয়া গুছইয়া সত্যবতীর উপযোগী করিয়া রাখিব।

১৩ আগস্ট প্রত্যুষে আমি ও ব্যোমকেশ কলিকাতায় পৌঁছিলাম।

তখনও সুযোদয় হয় নাই। বাসার সম্মুখে ট্যাক্সি হইতে নামিয়া দেখি আমাদের সদর দরজার সামনে ভিড় জমিয়াছে। ভিড়ের মধ্যে পুঁটিরামকে দেখা গেল। ব্যাপার কি। আমরা ভিড় ঠেলিয়া ভিতরে প্রবেশ করিলাম। একটি মৃতদেহ ফুটপাথে পড়িয়া আছে‌, পিঠের বাঁ দিকে রক্তের দাগ শুকাইয়া জমাট বাঁধিয়া গিয়াছে। দৃষ্টিহীন চক্ষু বিস্ফারিত হইয়া খোলা।

চিনিতে কষ্ট হইল না‌, কেষ্টবাবু।

এখনও পুলিস আসিয়া পৌঁছে নাই। আমরা ভিড়ের বাহিরে আসিলাম‌, পুঁটিরামকে ডাকিয়া লইয়া উপরে চলিলাম। ব্যোমকেশের মুখ লোহার মত শক্ত হইয়া উঠিয়াছে‌, চোখে চাপা আগুন।

নিজেদের বসিবার ঘরে গিয়া দু’জনে উপবিষ্ট হইলাম। কেষ্টবাবুর হঠাৎ ভাগ্যোন্নতি যে এইরূপ পরিণতি লাভ করিবে তাহা কে ভাবিয়ছিল। আমি বলিলাম‌, ‘আমার ধারণা হয়েছিল কলকাতায় সম্মুখ-সমর বন্ধ হয়েছে।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘এটা সম্মুখ-সমর নয়‌, কেষ্ট দাসকে পিছন থেকে ছুরি মেরেছে। পুঁটিরাম‌, তুই চিনতে পারলি?’

পুঁটিরাম বলিল‌, ‘আজ্ঞে চিনেছি‌, উনি সেই ভেটুকিমাছবাবু। কাল সন্ধ্যেবেলা এসেছিলেন‌, আপনার কথা জিজ্ঞেস করলেন।’

‘কাল সন্ধ্যেবেলা এসেছিল?’

‘আজ্ঞে। আমি বললাম‌, চিঠি পেয়েছি‌, বাবুরা কাল সকালে আসবেন। তখন তিনি চলে গেলেন। ‘

‘হুঁ। আচ্ছা পুঁটিরাম‌, তুই চা তৈরি কর গিয়ে।’

ব্যোমকেশ আরাম-কেন্দারায় পা ছড়াইয়া কড়িকাঠের দিকে ভ্রূকুটি করিয়া রহিল। আমি জানালায় গিয়া উঁকি মারিয়া দেখিলাম ফুটপাথে পুলিসের আবির্ভাব হইয়াছে‌, ভিড় সরিয়া গিয়াছে। কেষ্টবাবুকে একটা মোটর ভ্যানে তুলিবার চেষ্টা হইতেছে। পুলিস কেষ্টরাবুর নাম ধাম জানিতে পারিল কিনা বোঝা গেল না। তাহারা লাশ লইয়া চলিয়া গেল।

চা আসিল। ব্যোমকেশ চায়ে চুমুক দিয়া বলিল‌, ‘লাশ দেখে মনে হয় শেষরাত্রির দিকে-রাত্রি তিনটে-চারটের সময়‌, কেষ্ট দাস খুন হয়েছে। প্রথম যেদিন কেষ্টবাবু আমার কাছে আসে সেও রাত্রি তিনটে-চারটের সময়। কিন্তু তখন একটা কারণ ছিল‌, আজ এতরাত্রে কি জন্যে আসছিল?’

বলিলাম‌, ‘তোমার কাছেই আসছিল তার প্রমাণ কি? মাতাল দাঁতাল মানুষ-হয়তো এই দিক দিয়ে যাচ্ছিল‌, গুণ্ডা ছুরি মেরেছে—’

না‌, এতবড় সমাপতন সম্ভব নয়‌, কেষ্ট দাস আমার কাছেই আসছিল। কাল সন্ধ্যেবেলা এসেছিল‌, আমি নেই শুনে ফিরে গিয়েছিল। তারপর রাত্রে এমন কিছু ঘটল যে সে সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারল না–ব্যোমকেশ হঠাৎ উঠিয়া বসিয়া বলিল‌, ‘ভেবেছিলাম অনাদি হালদারের ব্যাপারটা ভুলে যাব‌, কিন্তু এরা ভুলতে দিলে না।’

‘অনাদি হালদারের সঙ্গে কেষ্টবাবুর মৃত্যুর সম্বন্ধ আছে নাকি?’

ব্যোমকেশ আমার প্রতি একটি কৃপাপূর্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করিল‌, তারপর আরাম-কেদারায় লম্বা হইল।

বেলা আটটা নাগাদ বিকাশ দত্ত আসিল। তাহার আর সেই অন্তঃশূন্য চুপিসানো ভাব নাই; আমাদের দেখিয়া দাঁত খিঁচাইয়া বলিল‌, ‘এই যে আপনারা এসে গেছেন স্যার। আমি পাটনায় চিঠি লিখতে যাচ্ছিলাম‌, ভাবলাম একবার দেখে যাই। কিছু নতুন খবর আছে।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘বসুন‌, খবর শুনব। নিজের কথা আগে বলুন। আট-নয় মাস বাইরে ছিলাম‌, আপনার অসুবিধে হয়নি তো?’

বিকাশ বলিল‌, ‘অসুবিধে হয়েছিল স্যার। কিন্তু সে কিছু নয়। এখন সামলে নিয়েছি। তিন মাইল ঘাস কিনেছি‌, তাতেই চলে যাচ্ছে।’

‘তিন মাইল ঘাস!’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ স্যার।’

বিকাশ তিন মাইল ঘাসের রহস্য প্রকাশ করিল। রেল লাইনের দু’ধারে যে ঘাস জন্মায়‌, রেলের কর্তৃপক্ষ নাকি তাহা প্রতি বৎসর জমা দিয়া থাকেন। বিকাশ তিন মাইল ঘাস জমা লইয়াছে এবং গোয়ালাদের সেই ঘাস বিক্রয় করিতেছে। বিকাশের কোন কষ্ট নাই‌, গোয়ালারা অগ্রিম পয়সা দিয়া গরু মোষ চরায়; বিকাশের কিছু লাভ থাকে।

বিকাশ বলিল‌, ‘তাছাড়া চাকরিটা বোধহয় এবার ফিরে পাব স্যার।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘বেশ বেশ‌, এবার কি নতুন খবর আছে বলুন। আপনার ছাত্রকে আজ সকালে পড়াতে যাননি?’

বিকাশ বলিল‌, ‘পড়াব কাকে স্যার? পাখি উড়েছে।’

‘সে কি?’

‘সেই খবরই তো দিতে এলাম। গোড়ার দিক থেকে বলব‌, না শেষের দিক থেকে?’

‘গোড়ার দিক থেকে বলুন।’

আপনাকে যে সব খবর দিয়েছিলাম তারপর আর নতুন খবর কিছু পাওয়া যাচ্ছিল না। টিমে-তে তালায় চলছিল‌, তবু লেগে রইলাম। বসে না থাকি বেগার খাটি। মাসখানে আগে জানতে পারলাম দয়ালহরি মজুমদারের নামে একজন পাঁচ হাজার টাকার মামলা ঠুকে দিয়েছে। দয়ালহরি বুড়োর ভাবগতিক দেখে মনে হল সে কেটে পড়বার মতলবে আছে। দিন কয়েক পরে হঠাৎ একদিন প্ৰভাত এসে উপস্থিত। প্ৰভাতকে আগে দেখিনি‌, এই প্রথম দেখলাম। বুড়ো তাকে ঢুকতেই দিচ্ছিল না‌, তারপর ঘরে এনে বসালো। দোর বন্ধ করে কথাবাতা হল‌, আমি জানলায় কান লাগিয়ে শুনলাম। প্ৰভাত বলছে‌, আমি আপনাকে পাঁচ হাজার টাকা দিচ্ছি‌, দোকান বাঁধা রেখে যেখান থেকে হোক পাঁচ হাজার টাকা যোগাড় করব‌, আপনি হ্যান্ডনোটের টাকা শোধ করে দিন। বুড়ো পাঁচ হাজার টাকার বদলে প্ৰভাতের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিতে রাজী হল।

‘এদিকে গদানন্দর সঙ্গে—ভাল কথা‌, জগদানন্দ অধিকারীর ডাক-নাম গদানন্দ-শিউলীর ভেতরে ভেতরে কিছু চলছিল। গদানন্দ সম্বন্ধে যা জানতে পেরেছি‌, মেয়ে ধরা ওর পেশা‌, বেটা দালাল। সে যাহোক‌, হস্তাখানেক পরে প্রভাত একটা ছোট্ট অ্যাটাচি-কেস হাতে নিয়ে এল; বুঝলাম টাকা এনেছে। তারপর জানালায় কান লাগিয়ে শুনলাম‌, বুড়ো বলছে‌, তুমি ভাল ছেলে‌, অনাদি হালদার তোমার নামে মিছে কথা বলেছিল। আমি তোমার সঙ্গে শিউলীর বিয়ে দেব। কিন্তু শ্রাবণ মাসে আর বিয়ের দিন নেই‌, অস্ত্ৰাণ মাসে বিয়ে হবে। প্রভাত খুশি হয়ে চলে গেল।

‘তারপর কি ব্যাপার হল জানি না‌, গত ৭ই আগস্ট পড়াতে গিয়ে শুনলাম গদানন্দ শিউলীকে নিয়ে উধাও হয়েছে। বুড়োর সাজিশ ছিল। কিনা বলতে পারি না‌, আমার বিশ্বাস বুড়েই নাটের গুরু। যাহোক‌, সেদিন সন্ধ্যেবেলা প্রভাত এল। খুব খানিকটা চেঁচামেচি হল। প্রভাত টাকা ফেরত চাইল‌, বুড়ো হাত উল্টে বলল‌, টাকা কোথায় পাব‌, শিউলী আর গদানন্দ টাকা নিয়ে পালিয়েছে। প্রভাত রাগে ধুকতে ধুকতে ফিরে গেল। বেচারার জাতও গেল পেটও ভরল না।

‘কাল সকালবেলা পড়াতে গিয়ে দেখি বাড়ির দরজা খোলা‌, বাড়িতে কেউ নেই। বুড়ো ছেলেটাকে নিয়ে কেটে পড়েছে।’

গল্প শেষ করিয়া বিকাশ একটা বিড়ি ধরাইয়া ফেলিল‌, বলিল‌, ‘এসব খবর আপনার কাজে লাগবে কিনা জানি না। স্যার‌, কিন্তু এর বেশি আর কিছু যোগাড় করা গেল না।’

‘সব খবর কাজের খবর?–ব্যোমকেশ কিছুক্ষণ চোখ বুজিয়া রহিল‌, তারপর চোখ খুলিয়া বলিল‌, ‘গদানন্দ শিউলীকে নিয়ে কোথায় গেছে আপনি জানেন না বোধহয়?’

‘না। যদি বলেন খুঁজে বার করতে পারি।’

ব্যোমকেশ একটু মৌন থাকিয়া বলিল‌, ‘আর একটা কোজ আপনাকে করতে হবে।’

এই সময় দরজায় টোকা পড়িল।

দ্বার খুলিয়া দেখি প্রভাত। তাহার চুল উল্কখুষ্ক‌, মুখ শীর্ণ‌, চেখভরা ক্লান্তি। তাহাকে দেখিয়া ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘আসুন‌, প্রভাতবাবু্‌, আমরা ফিরেছি। খবর পেলেন কোত্থেকে?’

প্রভাত চেয়ারে বসিল। বিকাশকে সে লক্ষ্যই করিল না; বিকাশও তক্তপোশের এক কোণে এমনভাবে গুটিসুটি হইয়া বসিল যে প্রায় অদৃশ্য হইয়া গেল। প্রভাত বলিল‌, ‘খবর পাইনি‌, দেখতে এলাম। যদি এসে থাকেন।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘বেশ। কেষ্টবাবু মারা গেছেন। আপনি শোনেননি বোধহয়।’

প্রভাত কিছুক্ষণ নির্লিপ্ত চক্ষে ব্যোমকেশের পানে চাহিয়া রহিল‌, যেন কেষ্টবাবুর মরা-বাঁচা সম্বন্ধে তাহার তিলমাত্র কৌতুহল নাই।

‘না‌, শুনিনি। কি হয়েছিল?’

‘কাল রাত্রে কেউ তাকে ছুরি মেরেছিল।’

উদাসীনকণ্ঠে প্ৰভাত বলিল‌, ‘ও–’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘যাক ওকথা। দয়ালহরিবাবুর নামে নিমাই নিতাই পাঁচ হাজার টাকার হ্যান্ডনোটের উপর নালিশ করেছে জানেন নিশ্চয়।’

প্ৰভাতের মুখ বিতৃষ্ণায় ভরিয়া উঠিল। সে বলিল‌, ‘জানি। কিন্তু ওকথাও যেতে দিন‌, ব্যোমকেশবাবু। মানুষের অ-মনুষ্যত্ব দেখে দেখে আমার মন বিষিয়ে গেছে। আমি আপনাকে জানাতে এসেছিলাম যে‌, আর আমার এখানে মন টিকছে না‌, আমি শীগগিরই চলে যাব।’

‘সে কি‌, কোথায় যাবেন?’

‘তা এখনও ঠিক করিনি। পাটনায় ফিরে যেতে পারি। যেখানেই যাই দু’ মুঠো জুটে যাবে। কলকাতায় আর নয়।’

‘কিন্তু–আপনার দোকান?’

‘দোকান বিক্রি করে দেব–’ প্ৰভাতের মুখ ক্লিষ্ট হইয়া উঠিল‌, সে আমার দিকে ফিরিয়া বলিল‌, ‘অজিতবাবু্‌, আপনার জানাশোনা কেউ আছে‌, যে বইয়ের দোকান কিনতে পারে? বেশি দাম আমি চাই না। তিন হাজার-আড়াই হাজার পেলেও আমি বিক্রি করে দেব।’

ভাবিতে লাগিলাম‌, জানাশোনার মধ্যে এমন কে আছে যে‌, বইয়ের দোকান কিনিতে পারে! হঠাৎ ব্যোমকেশ এক অদ্ভুত কথা বলিয়া বসিল‌, ‘আমরা কিনতে পারি। আমি আর অজিত কিছুদিন থেকে পরামর্শ করছি একটা বইয়ের দোকান খুলব। অজিত নিজে লেখক‌, ও চালাতে পারবে। আপনার দোকানটা যদি পাওয়া যায় তাহলে তো ভালোই হয়।’

প্রভাতের মুখে একটু সজীবতা দেখা দিল‌, সে বলিল‌, ‘আপনারা নেবেন? তার চেয়ে ভালো আর কি হতে পারে? আপনার নিলে দোকান বিক্রি করেও আমার দুঃখ হবে না। তাহলে–’

ব্যোমকেশ জিজ্ঞাসা করিল‌, ‘কত টাকার বই আছে আপনার দোকানে?’

প্রভাত বলিল‌, ‘হিসেব না দেখে কিছু বলতে পারি না‌, কিন্তু চার হাজার টাকার কম হবে না।’

‘বেশ‌, কাল সকালে গিয়ে আমরা আপনার হিসেবপত্র দেখব। দোকানের ওপর মর্টগেজ নেই তো।’

‘আজ্ঞে না।’

‘তাহলে কথা রইল‌, কাল আমরা আপনার কাগজপত্র দেখব‌, স্টক মিলিয়ে নেব। যা ন্যায্য দাম তাই আপনি পাবেন। কিন্তু একটা কথা। ১৫ই আগস্ট সকালে আমাদের দখল দিতে হবে। স্বাধীনতার প্রথম প্ৰভাতে ব্যবসা আরম্ভ করতে চাই।’

‘তাই হবে। যখন দখল চাইবেন তখনই দেব। আজ উঠি‌, হিসেবের কাগজপত্র ঠিক করে রাখতে হবে।’

‘আচ্ছা। ভাল কথা‌, নৃপেনবাবু এখনও আছেন?’

‘আছেন। তাঁকে অবশ্য বলে দিয়েছি যে আমি দোকান রাখব না। তিনি অন্য চাকরি খুঁজছেন‌, পেলেই চলে যাবেন।–আপনারা কি তাঁকে রাখবেন?’

‘রাখতেও পারি। তাকে একবার এখানে পাঠিয়ে দেবেন।’

‘দোকানে গিয়েই পাঠিয়ে দেব। আচ্ছা‌, নমস্কার।’

প্রভাত দ্বারের বাহিরে যাইবামাত্র ব্যোমকেশ এক লাফ দিয়া বিকাশকে ধরিল‌, দ্রুত-হ্রস্ব কণ্ঠে তাহার কানে কানে কথা বলিয়া তাহার হাতে কয়েকটা নোটি গুজিয়া দিল। আমি কেবল তাহার কািল শুনতে পাইলাম মনে থাকে যেন কাল হৰি বাটো পর্যন্ত একটি আপনার নেই।’

বিকাশ একবার দৃঢ়ভাবে ঘাড় নাড়িল‌, তারপর জ্যা-মুক্ত তীরের মত সাঁ করিয়া বাহির হইয়া গেল।

ঘর খালি হইয়া গেলে জিজ্ঞাসা করিলাম‌, ‘কাণ্ডকারখানা কি?’

ব্যোমকেশ সিগারেট ধরাইয়া চেয়ারে অঙ্গ প্রসারিত করিল‌, ধোঁয়া ছাড়িয়া বলিল‌, ‘একটা মস্ত সুযোগ হাতে এসেছে‌, অজিত‌, এ সুযোগ ছাড়া উচিত নয়।’

‘কোন সুযোগের কথা বলছ?’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘এই ধরে বইয়ের দোকানটা। যদি পাওয়া যায়‌, ছাড়া উচিত কি? বইয়ের ব্যবসা খুব লাভের ব্যবসা; তুমিও মনের মত একটা কাজ পাবে। শুধু বই লিখে আজকাল কিছু হয় না। দেখছ তো‌, তোমাদের মধ্যে যাঁরা বুদ্ধিমান সাহিত্যিক তাঁরা গুটি গুটি ব্যবসায়ে ঢুকে পড়েছেন এবং বেশ দুধে-ভাতে আছেন।’

কথাটা সত্য। বইয়ের ব্যবসায় পয়সা আছে‌, বিশেষত যদি স্কুল-পাঠ্য পুস্তকের বাজার কোণ-ঠাসা করা যায়। তবু মৌখিক আপত্তি তুলিয়া বলিলাম‌, কিন্তু এই দুঃসময়ে হঠাৎ এতগুলো টাকা বার করা কি ভাল?’

সে বলিল‌, দু’জনে ভাগাভাগি করে দিলে গায়ে লাগবে না। তুমি হবে খাটিয়ে অংশীদার‌, আর আমি-ঘুমন্ত অংশীদার।’

আধা ঘণ্টা পরে নৃপেন আসিল। বলিল‌, ‘প্রভাতবাবু পাঠালেন। আপনি আমায় ডেকেছেন?’

‘হ্যাঁ‌, বসুন। ঐ চেয়ারে।’ ব্যোমকেশ কঠিন চক্ষে কিয়ৎকাল তাহাকে নিরীক্ষণ করিয়া বলিল‌, ‘আপনার সব কীর্তিই আমি জানতে পেরেছি। রমেশ মল্লিক। আমার বন্ধু।’

ন্যাপা চমকিয়া কাষ্ঠমূর্তিতে পরিণত হইল। ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘অনাদি হালদারের আলমারির চাবি আপনি তৈরি করেছিলেন। আলমারিতে অনেক টাকা ছিল‌, সে টাকা কোথায় গেল? আমি যদি পুলিসকে খবর দিই তারা জানতে চাইবে। আপনি কী উত্তর দেবেন?

ন্যাপা অধর লেহন করিল। ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘আমি কথাটা পুলিসের কানে না তুলতে পারি‌, যদি আপনি আমার একটা কাজ করেন।’

ন্যাপার কণ্ঠ হইতে ভাঙা-ভাঙা আওয়াজ বাহির হইল‌, ‘কি কাজ?’

‘আর একটা চাবি তৈরি করে দিতে হবে।’

কবি হেমচন্দ্ৰ লিখিয়াছিলেন‌, পোহায় আগস্ট নিশি একত্রিশা বাসরে। তারপর কতকাল কাটিয়া গিয়াছে‌, প্রথম পৌর স্বয়ংপ্ৰভুতার সেই দিনটিকে স্মরণ করিয়া রাখে। এমন কেহ বাঁচিয়া নাই। আবার আর একটি আগস্ট নিশি পোহাইল। এবারও পর্ব ঘরে ঘরে‌, এবারও বাসাড়ে বাসিন্দা বেওয়া বেশ্যা করে সোর। কেবল পটভূমিকা আরও বিস্তৃত হইয়াছে‌, আসমুদ্র হিমাচল ভারতবর্ষে ছড়াইয়া পড়িয়াছে।

সকালে ঘুম ভাঙিয়া চিন্তা করিতে বসিলাম। এই যে ভারতবর্ষ স্বাধীন হইল ইহাতে আমার কৃতিত্ব কতটুকু? একটা পতাকা নাড়িয়াও তো সাহায্য করি নাই। (ব্যোমকেশ দিল্লীতে গিয়া সাত মাস ধরিয়া কিছু কাজ করিয়াছে। ) আমার মত শত সহস্ৰ মানুষ আছে যাহারা কিছুই করে নাই‌, অথচ তাহারা স্বাধীনতার ফল উপভোগ করিবে। একজন নীেকার দড়ি টানে‌, দশজন নদী পার হয়। ইহাই যদি সংসারের রীতি‌, তবে কর্ম ও কর্মফলের যোগাযোগ কোথায়?

ব্যোমকেশকে আমার আধ্যাত্মিক সমস্যার কথা বলিলাম। সে বলিল‌, ‘স্বাধীনতা পরের চেষ্টায় পেয়েছি‌, কিন্তু নিজের চেষ্টায় তাকে সার্থক করে তুলতে হবে। কাজ এখনও শেষ হয়নি।’

বেলা সাড়ে ন’টার সময় ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘চল‌, এবার বেরুনো যাক। প্ৰভাতের বাসা হয়ে তার দোকানে যাব।’

জিজ্ঞাসা করিলাম‌, ‘প্ৰভাতের বাসায় কী দরকার?’

মৃদু হাসিয়া ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘ননীবালা দেবীকে বড় দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে।’

বৌবাজারের বাসার নিম্নতলে অনিবাৰ্য ষষ্ঠীবাবু হুঁকা-হাতে বিরাজমান। আমাদের দেখিয়া চকিতভাবে হুঁকা হইতে মুখ সরাইলেন। ব্যোমকেশ মিষ্টস্বরে জিজ্ঞাসা করিল‌, ‘ওপরতলার সঙ্গে এখন আর কোনও গণ্ডগোল নেই তো?’

ষষ্ঠীবাবু উদ্বেগপূর্ণ চক্ষে চাহিয়া বলিলেন‌, ‘না-হ্যাঁ-না‌, গণ্ডগোল আমার কোনও কালেই ছিল না‌, আমি বুড়ো মানুষ‌, কারুর সাতেও নেই‌, পাঁচেও নেই-’

ব্যোমকেশ হাসিল‌, আমরা সিঁড়ি দিয়া উপরে উঠিয়া গেলাম।

সিঁড়ির দরজা খুলিয়া দিল একটি দাসী। অপরিচিত দু’জন লোক দেখিয়া সে সরিয়া গেল‌, আমরা প্রবেশ করিলাম। যে ঘরটিতে পূর্বে একটি কেঠো বেঞ্চি ছাড়া আর কিছুই ছিল না‌, সেই ঘরটিকে কয়েকটি আরামপ্রদ চেয়ার দিয়া সাজানো হইয়াছে‌, দেয়ালে রবি বমরি ছবি। ননীবালা দেবী বৃহৎ একটি চেয়ারে বসিয়া চোখে চশমা আটিয়া একটি প্রখ্যাত ইংরেজি সাপ্তাহিক পত্রিকা দেখিতেছেন; তাঁহার হাতে পেন্সিল।

ননীবালা দেবীর বেশভূষা দেখিয়া তাক লাগিয়া যায়। চকচকে পাটের শাড়ির উপর লতা-পাত কাটা ব্লাউজ‌, দুই বাহুতে মোটা মোটা তাগা ও চুড়ি; সোনার হইতে পারে‌, গিলটি হওয়াও অসম্ভব নয়। মুখে গৃহিণী-সুলভ গাম্ভীর্য। ননীবালা যে অনাদি হালদারের রাহু গ্রাস হইতে মুক্ত হইয়া নিজ মূর্তি ধারণ করিয়াছেন তাহাতে সন্দেহ নাই।

ননীবালা আমাদের দেখিয়া একটু থাতমত হইলেন‌, তারপর হারমোনিয়ামের ঢাকনি খুলিয়া সম্ভাষণ করিলেন‌, ‘আসুন আসুন। কেমন আছেন?—ওরে চিনিবাস‌, দু’ পেয়ালা চা নিয়ে আয়। ব্যোমকেশবাবু্‌, একটু মিষ্টিমুখ-?’

‘না না‌, ওসব কিছু দরকার নেই। আমরা প্রভাতবাবুর খোঁজে এসেছিলাম।’

‘প্ৰভাত! সে তো আটটার সময় দোকানে চলে গেছে। —একটু বসবেন না?’

চেয়ারে নিতম্ব ঠেকাইয়া বসিলাম। শুধু ঝি নয়‌, চিনিবাস নামধারী ভৃত্যও আছে‌, সম্ভবত রাঁধুনীও নিযুক্ত হইয়াছে। শুক্রের মহাদশা না পড়িলে হঠাৎ এতটা বাড়-বাড়ন্ত দেখা যায় না।

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘ওটা কি করছেন?’

ননীবালা বলিলেন‌, ‘ক্রসওয়ার্ড পাজল ভাঙছি। জানেন‌, আমি ফার্স্ট প্রাইজ পেয়েছি‌, একুশ হাজার টাকা।’ তাঁহার কণ্ঠে হারমোনিয়ামের সপ্তসুর গিটকিরি খেলিয়া গেল।

গয়নাগুলা। তবে গিলটির নয়। আমরাও কিছুদিন ক্রসওয়ার্ডের ধাঁধা ভাঙিবার চেষ্টা করিতেছিলাম; কিন্তু আমাদের ভাঙা কপাল‌, ধাঁধা ভাঙিতে পারি নাই।

অভিনন্দন জানাইয়া ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘আজ তাহলে উঠি। নৃপেনবাবুও কি দোকানে গেছেন?’

ননীবালা অপ্ৰসন্ন স্বরে বলিলেন‌, না। কাল থেকে ওর কি হয়েছে‌, ঘরে দোর বন্ধ করে আছে। কী যে করছে ওই জানে‌, খাওয়া-দাওয়ার সময় নেই‌, দোকানে যাওয়া নেই-ওকে দিয়ে আর দেখছি আমাদের চলবে না।’

আমরা বিদায় লইলাম। পথে যাইতে যাইতে ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘প্ৰভাত যে দোকান বিক্রি করে দিচ্ছে এ খবর বোধহয় ননীবালা জানেন না।’

দোকানের সম্মুখে উপস্থিত হইয়া ব্যোমকেশ একবার এদিক ওদিক চাহিল তারপর বলিল‌, ‘তুমি দোকানে যাও‌, আমি আসছি। জুতোয় একটা পেরেক উঠেছে।’

দোকানের সামনা-সামনি রাস্তার অপর পারে গোলদীঘির দেয়াল ঘেঁষিয়া এক ছোকরা জুতা মেরামত করার সরঞ্জাম লইয়া বসিয়াছিল, ব্যোমকেশ তাহার কাছে গিয়া জুতা মেরামত করাইতে লাগিল। আমি দোকানে প্ৰবেশ করিলাম।

প্রভাত হিসাবের খাতাপত্ৰ লইয়া নাড়াচাড়া করিতেছিল‌, বলিল‌, ‘এই যে! ব্যোমকেশবাবু এলেন না?’

‘আসছে। আপনার হিসেব তৈরি?’

‘হাঁ। এই দেখুন না।’

আমি হিসাবে দেখিতে বসিলাম। কিছুক্ষণ পরে ব্যোমকেশ আসিয়া যোগ দিল; হিসাব পরীক্ষা শেষ করিতে বেলা দুপুর হইয়া গেল। আমরা উঠিলাম। ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘আমরা তিন হাজার টাকাই দেব। কাল সকাল আটটার সময় চেক পাবেন এবং সঙ্গে সঙ্গে দখল দিতে হবে।’

‘যে আজ্ঞে।’

সেদিন অপরাহ্নে ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘ইন্দুবাবুকে টেলিফোন কর না‌, গদানন্দর সাম্প্রতিক খবর যদি কিছু পাওয়া যায়।’

বলিলাম‌, ‘গদানন্দ তো পালিয়েছে‌, তাকে ইন্দুবাবু কোথায় পাবেন?’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘গদানন্দ শিউলীকে নিয়ে পালিয়েছে‌, কিন্তু ফেরারী হয়নি। শিউলী সাবালিকা‌, সে যদি কারুর সঙ্গে বাপের বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়ে থাকে‌, তাতে ফৌজদারি হয় না। গদানন্দ খুব সম্ভব তাকে নিজের বাসায় তুলেছে।’

‘আচ্ছা‌, দেখি—‘



ইন্দুবাবুকে ফোন করিলাম। তিনি আমার প্রশ্ন শুনিয়া বলিলেন‌, ‘গদানন্দর খবর জানি বৈকি। তাকে নিয়ে সিনেমা-মহল এখন সরগরম। সেদিন আপনাদের বলেছিলাম। কিনা। গদানন্দ শিউলীকে নিয়ে ভেগেছে‌, তারপর তাকে রেজিস্ট্রি অফিসে বিয়ে করেছে। এই নিয়ে গদানন্দর তিনবার হল।’

‘তিনবার। তিনবার কী?

‘তিনবার বিয়ে।’

‘বলেন কি‌, আরও দুটো বউ আছে?’

‘এখন আর নেই। প্রথম বিউটা দেখতে খুব সুন্দরী ছিল‌, কিন্তু সিনেমায় সুবিধে হল না; ক্যামেরায় তার চেহারা ভাল এল না। সে হঠাৎ একদিন হার্ট ফেল করে মারা গেল। তারপর গদানন্দ আর একটা মেয়েকে ফুসলে এনে বিয়ে করল। এ মেয়েটা অভিনয় ভালই করত। কিন্তু personality ছিল না‌, দেখা গেল তাকে দিয়ে হিরোইনের পার্ট চলবে না। সেটাও বেশিদিন টিকল না।’

‘কি সর্বনাশ! আপনার কি মনে হয় গদানন্দ বৌ দুটোকে-অ্যাঁ!’

‘ভগবান জানেন। শিউলীর অবশ্য মাইকের গলা ভাল। এই যা ভরসা।’

ব্যোমকেশকে বাতা শুনাইলাম। সে আপন মনে মৃদু মৃদু হাসিতে লাগিল‌, তারপর বলিল‌, ‘গদানন্দের বংশপরিচয় জানতে ইচ্ছে করে। এক পুরুষে এতটা হয় না।’

ক্ৰমে সন্ধ্যা হইল। নগর দীপাবলীতে সজ্জিত হইয়া আর একটি দীপান্বিতা রাত্রিকে স্মরণ করাইয়া দিল। ঘরে ঘরে দোকানে দোকানে রেডিওর জলদমন্দ্র স্বর অন্য সব শব্দকে ডুবাইয়া দিল। সকলেরই কান পড়িয়া আছে দিল্লীর পানে। আর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সেখানে স্বাধীনতার উদ্বোধন হইবে।

সাতটার সময় চকিতের ন্যায় নৃপেন আসিল‌, দ্বারের নিকট হইতে ব্যোমকেশের হাতে একটি চকচকে চাবি দিয়া আলাদীনের জিনের মত অদৃশ্য হইল।

দশটার সময় আমরা আহার শেষ করিলাম।

সাড়ে এগারটার সময় ব্যোমকেশ পুঁটিরামকে বলিল‌, ‘আমরা এখনি বেরুব‌, কখন ফিরব ঠিক নেই। তুই জেগে থাকিস। আর একটা আংটায় কাঠকয়লা দিয়ে আগুন করবার যোগাড় করে রাখিস। আমরা ফিরে এলে আগুন জ্বালবি।’

পুঁটিরাম ‘যে আজ্ঞে’ বলিয়া প্ৰস্থান করিলে আমি জিজ্ঞাসা করিলাম‌, কাঠকয়লার আগুন কি হবে?’

সে বলিল‌, ‘অতীতকে ভস্মীভূত করে ফেলতে হবে।’

মধ্যরাত্রির কিছু আগে আমরা বাহির হইলাম। ঘরে ঘরে শঙ্খ বাজিতেছে—

গোলদীঘির চারি পাশের দোকানগুলি কিন্তু বন্ধ। দোকানদারেরা বোধকরি নিজ নিজ ঘরে গিয়া রেডিও যন্ত্র আঁকড়াইয়া বসিয়া আছেন। এত রাত্রে এদিকের রাস্তাগুলিও জনবিরল হইয়া’ আসিয়াছে।

একটি ল্যাম্পপোস্টের ছায়াতলে একজন লোক দাঁড়াইয়া বিড়ি টানিতেছিল, আমরা নিকটবর্তী হইলে বাহির হইয়া আসিল। দেখিলাম বিকাশ।

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘কিছু খবর আছে নাকি?’

বিকাশ বলিল‌, ‘না। প্রভাতবাবু সাড়ে ন’টার সময় দোকান বন্ধ করে চলে গেছেন।’

‘হাতে কিছু ছিল?’

‘না।‘

‘তারপর আর কেউ আসেনি?’

‘না।‘

‘আচ্ছা‌, আসুন তাহলে।’

তিনজনে রাস্তা পার হইয়া প্ৰভাতের দোকানের সম্মুখে উপস্থিত হইলাম। ব্যোমকেশ চাবি দিয়া দ্বারের তালা খুলিল; বেশ অনায়াসে তালা খুলিয়া গেল। তারপর চাবি বিকাশের হাতে দিয়া ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘আমরা দু’জনে ভেতরে যাচ্ছি‌, আপনি তালা বন্ধ করে দিন। কতক্ষশ অপেক্ষা করতে হবে বলা যায় না। আপনি যেমন ছিলেন তেমনি থাকবেন। যদি কেউ দোর খুলে ভেতরে ঢোকে‌, আপনার কিছু করবার দরকার নেই।’

‘আচ্ছা‌, স্যার।’

আমরা অন্ধকার দোকানে প্রবেশ করিলাম। ব্যোমকেশের পকেটে বৈদ্যুতিক টর্চ ছিল‌, সে তাহা জ্বলিয়া ঘরের চারিদিকে ফিরাইল। সারি সারি বইগুলা যেন দাঁত বাহির করিয়া নীরবে: হাসিল। আমরা পিছনের কুঠুরিতে প্রবেশ করিয়া তক্তপোশের কিনারায় বসিলাম‌, মাঝের দরজা একপাট খোলা রহিল। ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘এ ঘরে বই নেই‌, এ ঘরে বোধহয় আসবে না।’

আমি বললাম‌, ‘ব্যোমকেশ রক্তপুরে আমরা প্ৰভাতের দোকানে কি করছি জানতে পারি কি?’

ব্যোমকেশ আমার কানে কানে বলিল‌, ‘গুড় গুড় গুড় গুড়িয়ে হামা‌, খাপ পেতেছেন গোষ্টমামা।’

বইয়ের দোকানের একটা গন্ধ আছে‌, নূতন বইয়ের গন্ধ। এই গন্ধ সাধারণত টের পাওয়া যায় না‌, কিন্তু গভীর রাত্ৰে দোকানের মধ্যে বন্ধ থাকিলে ধীরে ধীরে অনুভব হয়। একটু ঝাঁজালো‌, নাক সুড় সুড় করে‌, হাঁচি আসে।

তার উপর নিজেদের নিশ্বাসের কার্বন-ডায়কসাইড আছে। ঘণ্টাখানেক প্রতীক্ষ্ণ করিবার পর অনুভব করিলাম‌, ঘরের বাতাস ভারী হইয়া আসিতেছে। গরমে প্ৰাণ আনচান করিয়া উঠিল। বলিলাম‌, ‘ব্যোমকেশ—‘

ব্যোমকেশ বজ্রমুষ্টিতে আমার হাত চাপিয়া ধরিল‌, তাহার গলা হইতে চাপা শীৎকার বাহির‌ হইল ‘স, স্‌ স্‌–।’

আর একটি শব্দ কানে আসিল‌, কেহ চাবি দিয়া দ্বারের তালা খুলিতেছে। দরজা একটু ফাঁক হইল‌, বাহিরের আলো আচ্ছাভ পদার মত ধীরে ধীরে প্রসারিত হইল। একটি ছায়ামূর্তি প্রবেশ করিয়া দ্বার বন্ধ করিয়া দিল। আমরা রুদ্ধশ্বাসে কুঠুরির ভিতর হইতে দেখিতে লাগিলাম।

হঠাৎ দোকানঘরের মাঝখানে দপ করিয়া টর্চের আলো জ্বলিয়া উঠিল। আলোর দৃষ্টি ঊর্ধ্ব দিকে‌, সার্চ-লাইটের মত দেয়ালের উপর দিকে পড়িয়াছে। টর্চের পিছনে মানুষটিকে দেখা গেল না।

টর্চ হাতে লইয়া মানুষটি কাউন্টারের উপর লাফাইয়া উঠিল। আমরা পা টিপিয়া টিপিয়া কুঠুরির দ্বারের নিকট হইতে উঁকি মারিলাম। টর্চের আলো বইয়ের সর্বোচ্চ তাকের উপর পড়িয়াছে। মানুষটি হাত বাড়াইয়া একটি বই বাহির করিয়া লইল; আকারে আয়তনে অনেকটা ‘চিলন্তিকা’র মত। তারপর আর একটি বই বাহির করিল‌, তারপর আর একটি। এমনিভাবে পাঁচখানি বই লইয়া মানুষটি লাফাইয়া নীচে নামিল; কাউন্টারের উপর জ্বলন্ত টর্চ রাখিয়া একটি বাজার-করা থলিতে বইগুলি ভরিতে লাগিল।

থলিতে বইগুলি ভরা হইয়াছে‌, এমন সময় ব্যোমকেশ গিয়া মানুষটির কাঁধে হাত রাখিল‌, বলিল‌, ‘থলিটা আমায় দিন।’

মানুষটির গলায় করাতের মত দ্রুত নিশ্বাস টানার শব্দ হইল। তারপর ব্যোমকেশ তাহার মুখের উপর নিজের টর্চের আলো ফেলিল।

মুখখানা ভয়ে ও বিস্ময়ে বিকৃত হইলেও চেনা শক্ত নয়‌, প্ৰভাতের মুখ। তাহার চোখের শাদা অংশই অধিক দেখা যাইতেছে। সে মিনিটখানেক চাহিয়া থাকিয়া অভিভূত স্বরে বলিল‌, ‘ব্যোমকেশবাবু!’

‘হ্যাঁ‌, আমি আর অজিত। থলিটা দিন।’

প্রভাত একটু ইতস্তত করিল‌, তারপর থলি ব্যোমকেশের হাতে দিল। ব্যোমকেশ থলিটা আমার হাতে দিয়া বলিল‌, ‘অজিত‌, এটা রাখা। বইগুলো ভারি দামী।–প্রভাতবাবু্‌, এবার চলুন।’

প্ৰভাত আরও কিছুক্ষণ চাহিয়া থাকিয়া বলিল‌, ‘কোথায় যেতে হবে? থানায়?’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘না‌, আপাতত আমার বাসায়। আগে বইগুলোর ব্যবস্থা করতে হবে।’

তিনজনে দোকানের বাহিরে আসিলাম। ব্যোমকেশের ইঙ্গিতে প্ৰভাত দ্বারে তালা লাগাইল। ফিরিয়া দেখি বিকাশ অলক্ষিতে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে। ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘বিকাশবাবু্‌, অসংখ্য ধন্যবাদ। এবার আপনার ছুটি। কাল সকালে একবার বাসায় আসবেন।’

‘যে আজ্ঞে‌, স্যার–’ বিকাশ অন্তর্হিত হইল। আমি ও ব্যোমকেশ প্ৰভাতকে মাঝখানে লইয়া বাসার দিকে চলিলাম।

তিনজনে আসিয়া আমাদের বসিবার ঘরে উপবিষ্ট হইয়াছি। প্রভাত ও আমি দুইটি চেয়ারে বসিয়াছি‌, ব্যোমকেশ তক্তপোশের উপর বইয়ের থলিটি লইয়া বসিয়াছে। রাত্রি প্রায় দুইটা; বাহিরে নগর-গুঞ্জন শান্ত হইয়াছে।

ব্যোমকেশের মুখ গভীর‌, একটু বিষন্ন। সে চোখ তুলিয়া একবার প্রভাতের পানে ভর্ৎসনাপূর্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করিল; প্রভাতের মুখে কিন্তু অপরাধের গ্লানি নাই‌, ধরা পড়বার সময় যে চকিত ভয় ও বিস্ময় তাহাকে অভিভূত করিয়াছিল‌, তাহা তিরোহিত হইয়াছে। সে এখন সম্পূর্ণরূপে আত্মস্থ, সকল প্রকার সম্ভাবনার জন্য প্ৰস্তুত।

ব্যোমকেশ একে একে বইগুলি থলি হইতে বাহির করিল। বোর্ডে বাঁধাই বাদামী রঙের বইগুলি‌, বাহির হইতে দৃষ্টি-আকর্ষক নয়। কিন্তু ব্যোমকেশ যখন তাহাদের পাতা মেলিয়া ধরিল‌, তখন উত্তেজনায় হঠাৎ দম আটকাইবার উপক্রম হইল। প্ৰত্যেক বইয়ের প্রত্যেকটি পাতা এক একটি একশত টাকার নোট।

ব্যোমকেশ বইগুলি একে একে পর্যবেক্ষণ করিয়া পাশে রাখিল‌, প্ৰভাতকে জিজ্ঞাসা করিল, ‘সবসুদ্ধ কত আছে বইগুলোতে?’

প্রভাত বলিল‌, ‘প্রায় দু’ লাখ। কিছু আমি খরচ করেছি।’

‘দয়ালহরি মজুমদারকে যে টাকা দিয়েছেন তা ছাড়া আর কিছু খরচ হয়েছে?’

প্ৰভাতের চোখের দৃষ্টি চকিত হইল; ব্যোমকেশ এত কথা কোথা হইতে জানিল এই প্রশ্নটাই যেন তাহার চক্ষু হইতে উঁকি মারিল। কিন্তু সে কোনও প্রশ্ন না করিয়া বলিল‌, ‘আরও কিছু খরচ হয়েছে‌, সব মিলিয়ে চোঁদ পনেরো হাজার।’

ব্যোমকেশ তখন বইগুলির উপর হাত রাখিয়া শাস্তকণ্ঠে বলিল‌, ‘প্রভাতবাবু্‌, এইগুলোর জন্যেই কি আপনি অনাদি হালদারকে খুন করেছিলেন?’

প্রভাত দৃঢ়ভাবে মাথা নাড়িল‌, ‘না‌, ব্যোমকেশবাবু।’

‘তবে কি জন্যে একাজ করলেন বলবেন কি?’

প্রভাত একবার যেন বলিবার জন্য মুখ খুলিল‌, তারপর কিছু না বলিয়া মুখ বন্ধ করিল।

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘আপনি যদি না বলেন‌, আমিই বলছি।–শিউলীর সঙ্গে আপনার বিয়ের সম্বন্ধ ভেঙে দিয়ে অনাদি হালদার নিজে তাকে বিয়ে করতে চেয়েছিল। এইজন্যে–কেমন?’

প্রভাত কিছুক্ষণ বুকে ঘাড় গুজিয়া যখন মুখ তুলিল‌, তখন তাহার রগের শিরাগুলো উচু হইয়া উঠিয়াছে। তাহার দাঁতের গড়নে যে হিংস্ৰতা আগে লক্ষ্য করিয়াছিলাম‌, কথা বলিবার সময় তাহা স্পষ্ট হইয়া উঠিল; সে অবরুদ্ধ স্বরে বলিল‌, ‘হ্যাঁ। অনাদি হালদার শিউলীর বোপকে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে রাজী করিয়েছিল–’ এই পর্যন্ত বলিয়া সে থামিয়া গেল‌, নীরবে বসিয়া যেন অন্তরের আগুনে ফুলিতে লাগিল।

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘ঠিকই আন্দাজ করেছিলাম তাহলে।–কিন্তু আপনি কেষ্টবাবুকে মারতে গেলেন কেন?’

ক্ৰোধ ভুলিয়া প্রভাত সবিস্ময়ে ব্যোমকেশের পানে চোখ তুলিল। বলিল‌, ‘সে কি! কেষ্টবাবুর কথা আমি তো কিছু জানি না।’

ব্যোমকেশ সন্দেহ-কণ্টকিত দৃষ্টিতে প্ৰভাতকে বিদ্ধ করিল—’আপনি কেষ্ট দাসকে খুন করেননি?’

প্রভাত বলিল‌, ‘না‌, ব্যোমকেশবাবু। কেষ্টবাবু গত আট মাসে আমার কাছ থেকে আট হাজার টাকা নিয়েছে। তার মরার খবর পেয়ে আমি খুশি হয়েছিলাম; কিন্তু আমি তাকে খুন করিনি। বিশ্বাস করুন‌, আমি যদি খুন করতাম‌, আজ আপনার কাছে অস্বীকার করতাম না।’

ব্যোমকেশের মুখখানা ধীরে ধীরে প্রফুল্ল হইয়া উঠিতে লাগিল‌, যে বিষন্নতা কুয়াশার মত তাহার মনকে আচ্ছন্ন করিয়া রাখিয়াছিল‌, তাহা যেন কাটিয়া গেল। সে বলিল‌, ‘কিন্তু‌, কেষ্ট দাসকে তাহলে খুন করলে কে?’

‘তা জানি না। তবে—‘ প্ৰভাত ইতস্তত করিল।

‘তবে? প্রভাত একটু সঙ্কুচিতভাবে বলিল‌, ‘দশ-বারো দিন আগে বাঁটুল সর্দার আমার কাছে এসেছিল। বাঁটুলকে আপনারা বোধহয় চেনেন না।–’

‘খুব চিনি। এমন কি আপনার সঙ্গে তার কী সম্বন্ধ তাও জানি। তারপর বলুন।’

‘বাঁটুল আমাকে কেষ্টবাবুর কথা জিজ্ঞেস করতে লাগল; কেষ্টবাবু কে‌, অনাদিবাবুর মৃত্যু সম্বন্ধে কী জানে‌, এই সব। আমি বাঁটুলকে সব কথাই বললাম। তারপর—‘

ব্যোমকেশ হাসিয়া উঠিল‌, বলিল‌, ‘যাক‌, এবার বুঝেছি। আপনাকে ব্ল্যাকমেল করে কেষ্ট দাসের টাকার ক্ষিদে মেটেনি‌, সে গিয়েছিল বাঁটুলকে ব্ল্যাকমেল করতে। অতিলোভে তাঁতী নষ্ট।’—ব্যোমকেশ হাঁক দিল‌, ‘পুঁটিরাম!’

পুঁটিরাম ভিতর দিকের দ্বারের কাছে আসিয়া দাঁড়াইল। ব্যোমকেশ বলিল, ‘পুঁটিরাম, তিন পেয়ালা চা হবে?’

পুঁটিরাম বলিল‌, ‘আজ্ঞে‌, দুধ নেই বাবু।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘কুছ পরোয়া নেই‌, আদা দিয়ে চা তৈরি কর। আর কয়লার আংটা ঠিক করে রেখেছ?’

‘আজ্ঞে।’

‘বেশ‌, এবার তাতে আগুন দিতে পার।’

পুঁটিরাম প্রস্থান করিলে ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘প্রভাতবাবু্‌, আপনার মা-ননীবালা দেবী বোধহয় কিছু জানেন না?’

‘আজ্ঞে না।’ প্ৰভাত কিছুক্ষণ বিস্ময়-সন্ত্রমভরা চোখে ব্যোমকেশের পানে চাহিয়া থাকিয়া বলিল‌, ‘আপনি কি সবই জানতে পেরেছেন‌, ব্যোমকেশবাবু?’

ব্যোমকেশ একটু চুপ করিয়া থাকিয়া বলিল‌, ‘বোধহয় পেরেছি। তবে বলা যায় না‌, কিছু ভুলচুক থাকতে পারে। যেমন কেষ্ট দাসের মৃত্যুটা আপনার ঘাড়ে চাপিয়েছিলাম। আমার বোঝা উচিত ছিল‌, ছুরি আপনার অস্ত্র নয়।’

আমি বলিলাম‌, ‘ব্যোমকেশ‌, কি করে সব বুঝলে বল না‌, আমি তো এখনও কিছু বুঝিনি।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘বেশ‌, বলছি। অনাদি হালদারকে কে খুন করেছে‌, তা আমি পাটনা যাবার আগেই বুঝতে পেরেছিলাম। কিন্তু তখন ভেবেছিলাম অনাদি হালদারের মৃত্যু সম্বন্ধে কারুরই যখন কোনও গরজ নেই‌, তখন আমারই বা কিসের মাথা ব্যথা। কিন্তু ফিরে এসে যখন দেখলাম। কেষ্ট দাসও খুন হয়েছে‌, তখন আর চুপ করে থাকতে পারলাম না। যে লোক মানুষ খুন করে নিজের জীবনের সমস্ত সমস্যার সমাধান করতে চায়‌, তাকে শাসন করা দরকার। যাহোক‌, এখন দেখছি। আমি ভুল করেছিলাম‌, প্রভাতবাবু কেষ্ট দাসকে খুন করেননি। আমি একটা কঠোর কর্তব্যের হাত থেকে মুক্তি পেলাম।–এবার গল্পটা শোনো। প্রভাতবাবু্‌, যদি কোথাও ভুলচুক হয়। আপনি বলে দেবেন।’

ব্যোমকেশ অনাদি হালদারের কাহিনী বলিতে আরম্ভ করিল। বিস্ময়ের সহিত অনুভব করিলাম‌, আজকার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নূতন। ব্যোমকেশ হত্যাকারীকে বন্ধুর মত ঘরে বসাইয়া হত্যার কাহিনী শুনাইতেছে‌, এরূপ ঘটনা পূর্বে কখনও ঘটে নাই।

-‘অনাদি হালদার গত যুদ্ধের সময় কালাবাজারে অনেক টাকা রোজগার করেছিল। বোধহয় আড়াই লাখ কি তিন লাখ। প্রভাতবাবু্‌, আপনি ক’খানা বই বেঁধেছিলেন?’

প্ৰভাত বলিল‌, ‘ছ’খানা। প্রত্যেকটাতে চারশো নোট ছিল।’

‘অর্থাৎ দু’ লাখ চল্লিশ হাজার।–বেশ‌, ধরা যাক অনাদি হালদার পৌঁনে তিন লাখ কালো টাকা রোজগার করেছিল। প্রশ্ন উঠল‌, এ টাকা সে রাখবে কোথায়? ব্যাঙ্কে রাখা চলবে না‌, তাহলে ইনকাম ট্যাক্সের ডালকুত্তারা এসে টুটি টিপে ধরবে। অনাদি হালদার এক মতলব বার করল।

‘অনাদি হালদার যেমন পাজি ছিল‌, তেমনি ছিল তার কুচুটে বুদ্ধি। আজ পর্যন্ত ইনকাম ট্যাক্সের পেয়াদাকে ফাঁকি দেবার অনেক ফন্দি-ফিকির বেরিয়েছে‌, সব আমার জানা নেই। কিন্তু অনাদি হালদার যে ফন্দি বার করল‌, সেটাও মন্দ নয়; প্রথমে সে টাকাগুলো একশো টাকার নোটে পরিণত করল। সব এক জায়গায় করল না; কিছু কলকাতায়‌, কিছু দিল্লীতে‌, কিছু পাটনায়; যাতে কারুর মনে সন্দেহ না হয়।

‘পাটনায় যাবার হয়তো অন্য কোনও উদ্দেশ্যও ছিল। যাহোক‌, সেখানে সে দপ্তরীর খোঁজ নিল; প্রভাতবাবু তার বাসায় এলেন বই বাঁধতে। বিদেশে বাঙালীর ছেলে প্রভাতবাবুকে দেখে অনাদি হালদারের পছন্দ হল। এই ধরনের দপ্তরী সে খুঁজছিল‌, সে প্রভাতবাবুকে আসল কথা বলল; এও বলল যে‌, সে তাঁকে পুষ্যিপুত্তুর নিতে চায়। পুষ্যিপুত্তুর নেবার কারণ‌, এত বড় শুপ্তকথা জানবার পর প্রভাতবাবু চোখের আড়াল না হয়ে যান।

‘প্রভাতবাবু বই বেঁধে দিলেন। পুষ্যিপুত্তুর নেবার প্রস্তাব পাকাপাকি হল। অনাদি হালদার প্ৰভাতকে আর ননীবালা দেবীকে নিয়ে কলকাতায় এল। নোটের বইগুলো অন্যান্য বইয়ের সঙ্গে আলমারিতে উঠল। স্টীলের আলমারি‌, তার একমাত্ৰ চাবি থাকে অনাদি হালদারের কোমরে। সুতরাং কেউ যে আলমারি খুলবে‌, সে সম্ভাবনা নেই। যদি-বা কোনও উপায়ে কেউ আলমারি খোলে‌, সে কী দেখবে? কতকগুলো বই রয়েছে‌, মহাভারত‌, রামায়ণ ইত্যাদি। টাকাকড়ি সামান্যই আছে। বই খুলে বইয়ের পাতা পরীক্ষা করার কথা কারুর মনে আসবে না। এছাড়া বাইরের লোকের চোখে ধুলো দেবার জন্যে ব্যাঙ্কেও কয়েক হাজার টাকা রইল।

‘অনাদি হালদারের কলকাতার বাসায় আরও দু’জন লোক ছিল-কেষ্ট দাস আর নৃপেন। নৃপেন ছিল তার সেক্রেটারি। অনাদি হালদার ভাল লেখাপড়া জানত না‌, তাই ব্যবসার কাজ চালাবার জন্যে নৃপেনকে রেখেছিল। আর কেষ্ট দাস জোর করে তার ঘাড়ে চেপে বসেছিল। কেষ্ট দাস ছিল অনাদি হালদারের ছেলেবেলার বন্ধু, অনাদির অনেক কুকীর্তির খবর জানত, নিজেও তার অনেক কুকীর্তির সঙ্গী ছিল।

‘অনাদি হালদার সতেরো-আঠারো বছর বয়সে নিজের ব্যাপকে এমন প্রহার করেছিল যে‌, পরদিনই বাপটা মরে গেল। পিতৃহত্যার বীজ ছিল অনাদির রক্তে। জীবজগতে বাপ আর ছেলের সম্পর্ক হচ্ছে আদিম শত্রুতার সম্পর্ক; সেই আদিম পাশবিকতার বীজ ছিল অনাদি হালদারের রক্তে। বাপকে খুন করে সে নিরুদ্দেশ হল। আত্মীয়স্বজনেরা অবশ্য কেলেঙ্কারির ভয়ে ব্যাপারটা চাপা দিয়ে দিলে।

‘অনেকদিন পরে অনাদির সঙ্গে কেষ্ট দাসের আবার দেখা; দু’জনে মিলে এক মারোয়াড়ীর ঘরে ডাকাতি করতে গেল। অনাদি মারোয়াড়ীকে খুন করে টাকাকড়ি নিয়ে ফেরারী হল‌, কেষ্ট দাস লুটের বাখরা কিছুই পেল না।

‘এবার কুড়ি বছর পরে অনাদির সঙ্গে আবার কেষ্ট দাসের কথা। অনাদি তখন বৌবাজারের বাসা নিয়ে বসেছে; কেষ্ট দাস তাকে বলল‌, তুমি খুন করেছ‌, যদি আমাকে ভরণপোষণ না কর‌, তোমাকে পুলিসে ধরিয়ে দেব। নিরুপায় হয়ে অনাদি কেষ্ট দাসকে ভরণপোষণ করতে লািগল।

‘এদিকে অনাদি হালদারের দুই ভাইপো নিমাই আর নিতাই খবর পেয়েছিল যে‌, খুড়ো অনেক টাকার মালিক হয়ে কলকাতায় এসে বসেছে। তারা অনাদির কাছে যাতায়াত শুরু করল। অনাদি ভারি ধূর্ত‌, সে তাদের মতলব বুঝে কিছুদিন তাদের ল্যাজে খেলালো‌, তারপর একদিন তাড়িয়ে দিলে। নিমাই নিতাই দেখল‌, খুড়োর সম্পত্তি বেহাত হয়ে যায়‌, তারা খুড়োর ভাবী পুষ্যিপুত্তুরকে ভয় দেখিয়ে তাড়াবার চেষ্টা করল। কিন্তু তাতেও কোনও ফল হল না। গুখাঁ দরোয়ান দেখে তারা প্রভাতবাবুর দোকানে যাওয়া বন্ধ করল।

‘কিন্তু এত টাকার লোভ তারা ছাড়তে পারছিল না। কোনও দিকে কিছু না পেয়ে তারা অনাদি হালদারের বাসার সামনে হোটেলে ঘর ভাড়া করল‌, অষ্টপ্রহর বাড়ির ওপর নজর রাখতে লািগল। এতে অবশ্য কোনও লাভ ছিল না‌, কিন্তু মানুষ যখন কোনও দিকেই রাস্তা খুঁজে না পায়‌, তখন যা হোক একটা করেই মনকে ঠাণ্ডা। রাখে। নিমাই নিতাই পালা করে হোটেলে আসত‌, আর চোখে দূরবীন লাগিয়ে জানালায় বসে থাকত। অজিত‌, তোমার মনে আছে বোধহয়‌, ননীবালা যেদিন প্রথম এসেছিলেন‌, তিনি বলেছিলেন‌, সর্বদাই যেন অদৃশ্য চক্ষু তাঁদের লক্ষ্য করছে। সে অদৃশ্য চক্ষু নিমাই-নিতাইয়ের।

‘যাহোক‌, দিন কাটছে। অনাদি হালদার জমি কিনে বাড়ি ফেদেছে। প্রভাতবাবুকে সে পুষ্যিপুকুর নেবার আশ্বাস দিয়ে এনেছিল‌, প্রথমটা তাঁর সঙ্গে ভাল ব্যবহারই করল। তাঁকে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে দোকান করে দিলে; অ্যাটনীর কাছে গিয়ে পুষ্যিপুতুর নেবার বিধি-বিধান জেনে এল। কিন্তু বাঁধা-বাঁধির মধ্যে পড়বার খুব বেশি আগ্রহ তার ছিল না‌, সে পাকাপাকি লেখাপড়া করতে দেরি করতে লাগল। প্রভাতবাবু দোকান নিয়ে নিশ্চিন্ত আছেন‌, ননীবালা দেবী জানেন না যে পুষ্যিপুত্তুর নিতে হলে লেখাপড়ার দরকার। তাই এ নিয়ে কেউ উচ্চবাচ্য করল না।

‘তারপর এক ব্যাপার ঘটল। প্রভাতবাবু শিউলী মজুমদারকে দেখে এবং তার গান শুনে মুগ্ধ হলেন। তিনি শিউলীদের বাড়িতে যাতায়াত শুরু করলেন। দয়ালহরি মজুমদার ঘুঘু লোক, সে খোঁজ-খবর নিয়ে জানতে পারল যে প্রভাতবাবু বড়লোকের পুষ্যিপুতুর; প্রভাতবাবুর সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিতে তার আপত্তি হল না। দয়ালহরি মজুমদারের চালচুলো নেই, সে ভােবল ফাঁকতালে যদি মেয়ের বিয়েটা হয়ে যায়, মন্দ কি!

‘প্রভাতবাবু ননীবালা দেবীকে শিউলীর কথা বললেন। ননীবালা অনাদি হালদারকে বললেন। প্রভাতবাবুর বিয়ে দিতে অনাদি হালদারের আপত্তি ছিল না, সে বলল, মেয়ে দেখে যদি পছন্দ হয় তো বিয়ে দেব।

‘তখন পর্যন্ত অনাদি হালদারের মনে কোনও বদ-মতলব ছিল না, নেহাৎ বরকতা সেজেই সে মেয়ে দেখতে গিয়েছিল। কিন্তু শিউলীকে দেখে সে মাথা ঠিক রাখতে পারল না। মানুষের চরিত্রে যতরকম দোষ থাকতে পারে, কোনটাই অনাদি হালদারের বাদ ছিল না। সে ঠিক করল, শিউলীকে নিজে বিয়ে করবে।

‘বাসায় ফিরে এসে সে বলল, মেয়ে পছন্দ হয়নি। তারপর তলে তলে নিজে ঘটকালি আরম্ভ করল। দয়ালহরি মজুমদার দেখল, দাঁও মারবার এই সুযোগ; সে ঝোপ বুঝে কোপ মারল। অনাদি হালদারকে বলল, তুমি বুড়ো, তোমার সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেব কেন? তবে যদি তুমি দশ হাজার টাকা দাও—

‘এইভাবে কিছুদিন দর-কষাকষি চলল, তারপর রফা হল, অনাদি হালদার পাঁচ হাজার টাকা হ্যান্ডনেটের ওপর ধার দেবে। বিয়ের পর হ্যান্ডনোট ছিড়ে ফেলা হবে।

বিয়ের ব্যবস্থা পাকা করে নিয়ে অনাদি হালদার ভাবতে বসল, কি করে প্রভাতবাবুকে তাড়ানো যায়। পুষ্যিপুত্তুর নেবার আগ্রহ কোনওকালেই তার বেশি ছিল না, এখন তো তার পক্ষে প্রভাতবাবুকে বাড়িতে রাখাই অসম্ভব। প্রভাতবাবুর প্রতি তার ব্যবহার রূঢ় হয়ে উঠল। কিন্তু হঠাৎ সে তাঁকে তাড়িয়ে দিতেও পারল না। প্রভাতবাবু বইবাঁধানো নোটের কথা যদি পুলিসের কাছে ফাঁস করে দেন, অনাদি হালদারকে ইনকাম ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়ার অপরাধে জেলে যেতে হবে।

‘প্রভাতবাবু ভিতরের কথা কিছুই জানতেন না। সম্বন্ধ ভেঙে যাওয়াতে তিনি খুবই মুষড়ে পড়লেন, তারপর ঠিক করলেন অনাদিবাবুর অমতেই শিউলীকে বিয়ে করবেন, যা হবার হবে। তিনি দয়ালহরির বাসায় গেলেন। দয়ালহরি তাঁকে অপমান করে তাড়িয়ে দিলে এবং জানিয়ে দিলে যে, অনাদি হালদারের সঙ্গে শিউলীর বিয়ে ঠিক হয়েছে।’

এই পর্যন্ত বলিয়া ব্যোমকেশ থামিল। টিন হইতে সিগারেট বাহির করিতে করিতে বলিল, ‘এই হচ্ছে অনাদি হালদারের মৃত্যুর পটভূমিকা। এর মধ্যে খানিকটা অনুমান আছে, কিন্তু ভুল বোধহয় নেই। প্রভাতবাবুকি বলেন?’

প্রভাত বলিল, ‘ভুল নেই। অন্তত যতটুকু আমার জ্ঞানের মধ্যে, তাতে ভুল নেই।’ পুটরাম চা লইয়া প্রবেশ করিল।

তিনজনে নীরবে বসিয়া আদা-গন্ধী চা সেবন করিলাম। রাত্ৰি শেষ হইয়া আসিতেছে।

ব্যোমকেশ সিগারেট ধরাইয়া আবার বলিতে আরম্ভ করিল, ননীবালা দেবী যখন প্রথম আমার কাছে এলেন তখন সমস্ত ব্যাপারটা আমি উল্টো দিক থেকে দেখলাম। প্রভাতবাবুর জীবনের কোনও আশঙ্কা আছে কিনা এইটেই হল প্রশ্ন। ননীবালা যা বললেন তা থেকে ভয়ের কারণ আমি কিছু দেখতে পেলাম না। তবু বলা যায় না। দিনকাল খারাপ, নরহত্যা সম্বন্ধে মানুষের মন থেকে অনেক দ্বিধা সঙ্কোচ সরে গেছে; একটা আদিম বর্বরতার মনোভাব আমাদের চেপে ধরেছে। আমি তদারক করতে বেরুলাম।

‘প্রভাতবাবুকে দেখলাম; নিমাই নিতাই‌, অনাদি হালদার‌, নৃপেন‌, কেষ্ট দাস‌, সকলকেই দেখলাম। ননীবালা আবার এলেন‌, তাঁকে বললাম‌, প্রভাতবাবুকে মেরে কারুর কোনও লাভ নেই‌, বরং অনাদি হালদারকে মেরে লাভ আছে। তারপর কালীপুজোর রাত্রে সত্যিই অনাদি হালদার খুন হল।

‘শেষ রাত্রে কেষ্ট দাস এসে আমাকে নিয়ে গেল। সকলের বিশ্বাস কেষ্ট দাসই খুন করেছে। আমি গিয়ে সব দেখেশুনে বুঝলাম‌, এ রাগের মাথায় খুন নয়‌, প্ল্যান করে খুন; কেষ্ট দাস যদি খুন করত তাহলে খুন করবার আগেই অনাদি হালদারের সঙ্গে ঝগড়া করত না। তাছাড়া‌, যত ঝগড়াই হোক‌, যে-হংস স্বর্ণডিম্ব প্রসব করে তাকে খুন করবে। এমন আহাম্মক কেষ্ট দাস নয়।

‘তবে একটা কথা আছে। কেষ্ট দাস যদি অনাদি হালদারকে খুন করে একসঙ্গে মোটা টাকা হাততে পারে তাহলে সে খুন করবে। কিন্তু এ যুক্তি বাড়ির অন্য লোকগুলির সম্বন্ধেও খাটে। এ যুক্তি মেনে নিলে স্বীকার করতে হয় যে অনাদি হালদারের বাড়িতে অনেক নগদ টাকা ছিল।

সর্বদা তার কোমরে থাকত। আমি যখন আলমারি খুললাম তখন তাতে মাত্ৰ শ আড়াই টাকা পাওয়া গেল। তবে কি এই সামান্য টাকা রাখবার জন্যে অনাদি হালদার স্টীলের আলমারি কিনেছিল?

‘আলমারিতে টাকা পাওয়া গেল না বটে কিন্তু দেখা গেল বইয়ের থাকা থেকে কয়েকটা বই অদৃশ্য হয়েছে। বাকি বইগুলো রামায়ণ মহাভারত জাতীয়। প্রশ্ন : স্টীলের আলমারিতে এই জাতীয় নিতান্ত সাধারণ বই রাখার মানে কি?

‘আলমারিতে ব্যাঙ্কের চেক বই ছিল‌, তা থেকে জানা গেল যে ব্যাঙ্ক থেকে যে-পরিমাণ টাকা বার করা হয়েছে তার চেয়ে বেশি টাকা অনাদি হালদার তার নতুন বাড়ির কনট্রাকটর গুরুদত্ত সিংকে দিয়েছে। বাকি টাকা এল কোথা থেকে? অনাদি হালদার নিশ্চয় কালো টাকা রোজগার করেছিল এবং তা আলমারিতে রেখেছিল। বর্তমানে টাকা যখন আলমারিতে নেই তখন হত্যাকারীই তা সরিয়েছে।

‘হত্যার মোটিভ পাওয়া গেল। কিন্তু হত্যাকারী লোকটা কে? এবং কেমন করে সে বাড়িতে দুল্ল মৃত্যুর সময় অনাদি হালদার বাড়িতে একলা ছিল এবং বাড়ির দরজা ভিতর থেকে বন্ধ ‘অনাদি হালদার গুলি খেয়েছিল সদরের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে। শ্ৰীকান্ত হোটেলের জানলা থেকে তাকে সহজেই গুলি করে মারা যায়। কিন্তু তার আলমারি থেকে টাকা সরানো যায় না। সুতরাং শ্ৰীকান্ত হোটেল থেকে মেরে কোনও লাভ নেই।

‘নিমাই নিতাই যখন উকিল নিয়ে হাজির হল এবং দাবি করল যে তারাই অনাদি হালদারের ওয়ারিশ‌, প্রভাতবাবু আইনত পুষ্যিপুত্তুর নয়‌, তখন আর একটা মোটিভ পাওয়া গেল। অনাদি হালদার পাকাপাকি পুষ্যি নেবার আগে যদি তাকে সরানো যায় তাহলে সব সম্পত্তি ভাইপোদের আশাবে। অনাদি হালদার নিশ্চয় উইল করেনি। এ দেশের অশিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত লোকেরা উইল করে না।

‘নিমাই নিতাইয়ের পক্ষে খুড়োর গঙ্গাযাত্রার ব্যবস্থা করা নেহাৎ অবিশ্বাস্য নয়। এখন দেখা যাক তাদের কার্যকলাপ। হত্যার ছমাস আগে তারা শ্ৰীকান্ত হোটেলের ঘর ভাড়া নিয়েছিল এবং নিয়মিত সেখানে যাতায়াত করত। হোটেলের চাকরদের সঙ্গে তাদের মুখ চেনাচেনি হয়েছিল। যারা খুড়োকে খুন করতে উদ্যত হয়েছে তাদের পক্ষে এতটা খোলাখুলি ভাব কি স্বাভাবিক? আগেই বলেছি‌, এ গ্ল্যান করে খুন; খুনী ঠিক করেছিল‌, কালীপুজোর রাত্রে খুন করবে‌, বাজি পোড়ানোর শব্দে যাতে বন্দুকের আওয়াজ চাপা পড়ে যায়! তাই যদি হয় তবে ছ। মাস আগে থেকে ঘর ভাড়া নেবার অর্থ কি? তাছাড়া কালীপুজোর রাত্রে খুড়ো যে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াবে তার নিশ্চয়তা কি? এ রকম অনিশ্চিতের ওপর নির্ভর করে কেউ প্ল্যান করে না। আবার গুলিটা অনাদি হালদারের শরীর ভেদ করে গিয়েছিল‌, অথচ সেটা ব্যালকনিতে পাওয়া গেল না। এও ভাববার কথা।

‘সুতরাং শ্ৰীকান্ত হোটেলের জানলা থেকে নিমাই নিতাই খুড়োকে মেরেছিল এ প্রস্তাব টেকসই নয়। যেই মারুক বাড়ির ভেতর থেকে মেরেছে। দেখা যাক‌, বাড়ির ভেতর থেকে মারা সম্ভব কিনা।

‘সদর দরজা বন্ধ ছিল। কিন্তু বাড়ির পিছন দিকে ছাদে যাবার দরজাটা খোলা থাকত‌, অনাদি হালদার রাত্রে শুতে যাবার আগে নিজের হাতে সেটা বন্ধ করত। তাছাড়া দরজার ছিটুকিনি খুব শক্ত ছিল না‌, দু’ চারবার দরজায় নাড়া দিলে ছিটুকিনি খুলে পড়ত। মনে করা যাক‌, সেদিন রাত্রি আন্দাজ এগারোটার সময় একজন চুপিচুপি এসে অনাদি হালদারের নতুন বাড়িতে ঢুকল। নতুন বাড়ির একতলার ছাদ পর্যন্ত তৈরি হয়েছে‌, চারিদিকে ভারা বাঁধা। হত্যাকারী ছাদে উঠল; দুই বাড়ির মাঝখানে সরু গলি আছে‌, হত্যাকারী ভারা থেকে একটা লম্বা তক্তা নিয়ে দুই বাড়ির মাঝখানে পুল বাঁধল‌, তারপর সেই পুল দিয়ে পুরনো বাড়িতে পেরিয়ে এল। ছাদের দরজা খোলা থাকবার কথা‌, কারণ অনাদি হালদার তখনও শুতে যায়নি।



‘দেখা যাচ্ছে‌, একজন চটপটে লোকের পক্ষে বাড়িতে ঢোকা কঠিন কাজ নয়। কিন্তু কে সেই চট্টপটে লোকটি? নিমাই নিতাই নয়‌, কারণ আলমারিতে অনেক কালো টাকা আছে একথা তাদের জানবার কথা নয়; একথা কেবল বাড়ির লোকই জানতে পারে কিম্বা আন্দাজ করতে পারে।

‘বাড়িতে চারজন লোক আছে-ননীবালা‌, কেষ্ট দাস‌, নৃপেন আর প্রভাতবাবু। এদের মধ্যেই কেউ অনাদি হালদারকে খুন করেছে। যদি বল‌, নিমাই নিতাই বাড়িতে ঢুকে খুন করেছে এবং আলমারি থেকে মাল নিয়ে সাটুকেছে‌, তাহলে প্রশ্ন ওঠে‌, তারা সাত-সকালে এসে বাড়ি দখল করতে চেয়েছিল কেন? চুপ করে বসে থাকাই তো তাদের পক্ষে স্বাভাবিক। যথাসময়ে আদালতের মারফত দখল তারা পেতই। তারা খুন করেনি বলেই তাড়াতাড়ি এসে বাসার দখল নিতে চেয়েছিল‌, যাতে আলমারির জিনিসপত্র এরা সরিয়ে ফেলতে না পারে।

‘যাহোক‌, রইল বাড়ির চারজন। এরা সকলেই অবশ্য বাইরে ছিল‌, কিন্তু কারুর পাকা অ্যালিবাই নেই। ননীবালা দেবীকে বাদ দেওয়া যেতে পারে‌, কারণ তিনি মোটা মানুষ‌, তাঁকে চট্টপটেও বলা চলে না। তক্তার ওপর দিয়ে গলি পার হওয়া তাঁর সাধ্য নয়।

‘বাকি রইল কেষ্ট দাস প্রভাতবাবু আর নৃপেন। গোড়ার দিকে নৃপেনের ওপরেই সবচেয়ে বেশি সন্দেহ হয়‌, চালচলন খুবই সন্দেহজনক। আলমারিতে যে অনেক টাকা আছে। এটা তার পক্ষে জানা সবচেয়ে বেশি সম্ভব‌, কারণ সে অনাদি হালদারের সেক্রেটারি‌, টাকাকড়ির হিসেব রাখে। কিন্তু যখন জানতে পারলাম। সে আলমারির চাবি তৈরি করেছিল তখন তাকেও বাদ দিতে হল। অনাদি হালদারকে খুন করবার মতলব যদি তার থাকত। তবে সে চাবি তৈরি করতে যাবে কেন? অনাদি হালদারের কোমরেই তো চাবি রয়েছে।

‘ভেবে দেখা। নৃপেনের স্বভাবটা ছিচকে চোরের মত। সে চাবি তৈরি করেছিল‌, মতলব ছিল অনাদি হালদার যখন বাড়ি থাকবে না। তখন আলমারি খুলে দুচার টাকা সরাবে। কিন্তু সরাবার সুযোগ বোধহয় তার হয়নি। চাবিটা তার টেবিলের দেরাজে রেখেছিল। সে-রাত্রে সিনেমা থেকে ফিরে এসে যখন দেখল অনাদি হালদার খুন হয়েছে তখন সে চাবির কথা সাফ ভুলে গেল। তারপর আমি অনাদি হালদারের কোমর থেকে চাবি নিয়ে সবাইকে দেখলাম‌, তখন নৃপেনের মনে পড়ে গেল। সর্বনাশ! পুলিস এসে যদি তার দেরাজে চাবি পায় তাহলে তাকেই খুনী বলে ধরবে। সে কোনও মতে চাবিটাকে বিদেয় করবার চেষ্টা করতে লাগল এবং শেষ পৰ্যন্ত এক ফাঁকে চাবিটা জানিলা দিয়ে গলিতে ফেলে দিলে।

‘চাবিটা আমি সকালবেলা গলিতে কুড়িয়ে পেয়েছিলাম। তখনই বুঝেছিলাম নৃপেন খুন করেনি। তারপর আমার বন্ধু রমেশ মল্লিকের চিঠি পেয়ে সব পরিষ্কার হয়ে গেল। নৃপেন ছিঁচকে চোর‌, মানুষ খুন করবার সাহস তার নেই।

‘বাকি রইল কেষ্ট দাস আর প্রভাতবাবু।

‘সেদিন সন্ধ্যেবেলা কেষ্ট দাস এখানে এল। রাত্রে তাকে মদ খাইয়ে অনাদি হালদারের পুরনো ইতিহাস জেনে নিলাম। কেষ্ট দাসও সেদিন আমার কাছে একটা কথা জানতে পেরেছিল। আমি তাকে কথায় কথায় বলেছিলাম যে প্রভাতবাবু দপ্তরীর কাজ জানেন। কথাটা সে আগে জানত না।

‘যাহোক‌, তারপর কয়েকদিন কেটে গেল। দেখলাম নৃপেন আর কেষ্ট দাস পুরনো বাসাতেই রয়েছে। তারা যদি টাকা মেরে থাকে তাহলে পুরনো বাসা কামড়ে পড়ে আছে কেন? তাদের চলে যাবার যথেষ্ট ওজুহাত রয়েছে‌, অনাদি হালদার মরে যাবার পর ওদের বাড়িতে থাকার আর কোনও ছুতো নেই। টাকাগুলোই বা রাখল কোথায়? ব্যাঙ্কে নিশ্চয় রাখবে না‌, অন্য কোনও লোকের হাতেও দেবে না। তবে?

‘কলকাতায় ওদের অন্য কোনও আস্তানা নেই‌, যেখানে টাকা লুকিয়ে রাখতে পারে। কিন্তু প্রভাতবাবুর একটা আস্তানা আছে-দোকান। তিনি যদি খুন করে টাকা সরিয়ে থাকেন তাহলে টাকা লুকিয়ে রাখার কোনও অসুবিধা নেই।

‘দোকান-বইয়ের দোকান। বিদ্যুৎ চমকের মত সমস্ত ব্যাপারটা আমার মাথার মধ্যে জ্বলজ্বল করে উঠল‌, প্রভাতবাবু পাটনায় হিসেবের খাতা বাঁধেননি‌, বেঁধেছিলেন একশো টাকার নোট-অনাদি হালদার তাঁর বাঁধানো বইগুলোকে রামায়ণ মহাভারতের সঙ্গে মিশিয়ে আলমারিতে রেখেছিল-প্রভাতবাবু অনাদি হালদারকে মারবার পর তার কোমর থেকে চাবি নিয়ে আলমারি থেকে নোটের বইগুলো বার করে নিজের দোকানে এনেছিলেন-দোকানের হাজারখানা বইয়ের মধ্যে নোটের বইগুলো প্ৰকাশ্যে সাজানো আছে-বাইরে থেকে বই দেখে কেউ সন্দেহ করতে পারবে না

‘আগাগোড়া প্লাটা চোখের সামনে ভেসে উঠল।

‘কিন্তু–

‘প্রভাতবাবু টাকার লোভে এমন কাজ করবেন? প্রভাতবাবুর চরিত্র যতখানি বুঝেছিলাম তাতে তাঁকে অর্থলোভী বলে মনে হয়নি। উপরন্তু অনাদি হালদারের মৃত্যুতে প্রভাতবাবুর ক্ষতির সম্ভাবনাই বেশি; সে বেঁচে থাকলে তাঁকে পুষ্যিপুত্তুর নেবে‌, সমস্ত সম্পত্তি পাবার সম্ভাবনা। নগদ টাকার লোভে সেই সম্ভাবনা তিনি নষ্ট করবেন?

‘তবে কি টাকাটা গৌণ‌, তার চেয়ে বড় কারণ কিছু ছিল? অনাদি হালদার শিউলীর সঙ্গে প্রভাতবাবুর বিয়ে ভেঙে দিয়েছিল; কিন্তু সেটা কি এতবড় অপরাধ যে তাকে খুন করতে হবে? এ প্রশ্নের উত্তর দেরিতে পেয়েছিলাম। দয়ালহরি মজুমদারের বাসা থেকে ফেরবার সময় হঠাৎ আসল কথাটা মাথায় খেলে গিয়েছিল।

‘অনাদি হালদার এমন কাজ করেছিল যাতে নিতান্ত নিরীহ লোকেরও মাথায় খুন চেপে যায়। সে দয়ালহরিকে পাঁচ হাজার টাকা ঘুষ দিয়ে নিজে শিউলীকে বিয়ে করতে চেয়েছিল। প্রভাতবাবুর রক্তে আগুন ধরে গেল। আগুন ধরা বিচিত্র নয়‌, আগুনের ফুলকি তাঁর রক্তের মধ্যেই ছিল।

‘আবার একটা বরফের মত ঠাণ্ডা কূট বুদ্ধি তাঁর ছিল‌, সেটাও তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন। তিনি অনাদি হালদারকে ধনেপ্ৰাণে মারবার প্ল্যান ঠিক করলেন। বাঁটুল সর্দারকে তিনি আগে থাকতেই চিনতেন‌, রাইফেল ভাড়া করা কঠিন হল না। কালীপুজোর রাত্রে বুড়ো পাঠাকে বলি দেবার ব্যবস্থা হল।

‘সে-রাত্রে প্রভাতবাবু ননীবালা দেবীকে সিনেমায় পৌঁছে দিয়ে দোকানে গেলেন। দোকান আলো দিয়ে সাজিয়ে সাড়ে দশটার সময় আবার বেরুলেন‌, এবার একটা কাপড়ের থলি পকেটে নিলেন। দোকান খোলাই রইল‌, গুখা দরোয়ান দরজায় পাহারায় রইল।

‘বাসার কাছে এসে প্রভাতবাবু দেখলেন বাসার সামনে বাজি পোড়ানো হচ্ছে। কেউ তাঁকে লক্ষ্য করল না‌, তিনি নতুন বাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়লেন। নতুন বাড়ির মধ্যে বাঁটুল সদর রাইফেল নিয়ে অপেক্ষা করছিল। বাঁটুল অনাদি হালদারের ওপর সন্তুষ্ট ছিল না‌, সুতরাং তার এ ব্যাপারে উৎসাহ থাকাই স্বাভাবিক।

‘ছাদের ওপর তক্তা ফেলে প্রভাতবাবু বাসায় ঢুকলেন। ছাদের দরজা সম্ভবত খোলাই ছিল; না থাকলেও ক্ষতি নেই‌, তিনি দু’চারবার দরজায় নাড়া দিয়ে ছিটুকিনি খুলে ফেললেন। ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে অনাদি হালদার বাজি পোড়ানো দেখছিল‌, পিছন দিকে শব্দ শুনে সে ফিরে দাঁড়াল। প্রভাতবাবু সঙ্গে সঙ্গে গুলি করলেন। গুলিটা অনাদি হালদারের শরীর ভেদ করে রাস্তার ওপারে শ্ৰীকান্ত হোটেলের জানলা দিয়ে ঢুকে দেয়ালে আটকালো। হাই ভেলসিটি মিলিটারি রাইফেল‌, তার গুলি যদি নিমাই কিম্বা নিতাইকে সামনে পেতো তাকেও ফুটো করে যেত।|

‘তারপর প্রভাতবাবু মৃতের কোমর থেকে চাবি নিয়ে আলমারি খুললেন। নোটের বইগুলো থলিতে পুরে‌, চাবি আবার যথাস্থানে রেখে যে পথে এসেছিলেন সেই পথে ফিরে গেলেন। বাঁটুল অপেক্ষা করছিল‌, রাইফেল নিয়ে অদৃশ্য হল। প্রভাতবাবু দোকানে ফিরে গিয়ে বইগুলো উঁচু একটা তাকে সাজিয়ে রেখে দিলেন। তারপর যথাসময়ে সিনেমায় গিয়ে মা’কে সঙ্গে নিয়ে বাসায় ফিরলেন।

‘গুর্খা দরোয়ানটা জানত যে প্রভাতবাবু সে-রত্রে সারাক্ষণ দোকানে ছিলেন না। আমি যখন গুর্খা খোঁজ নিলাম তখন সে কাজ ছেড়ে দিয়ে দেশে চলে গেছে।

‘সেদিন আমি আর অজিত প্রভাতবাবুর দোকানে যাচ্ছিলাম‌, দেখলাম বাঁটুল আমাদের আগে আগে যাচ্ছে। সে প্রভাতবাবুর দোকানে ঢুকতে গিয়ে পিছনে আমাদের দেখে দোকানে ঢুকল না‌, সোজা চলে গেল। আমরা দোকানে গিয়ে দেখলাম প্রভাতবাবুর জ্বর হয়েছে‌, তাড়সের জ্বর। তাঁকে নিয়ে আমার জানা এক ডাক্তারের কাছে গেলাম। ডাক্তার প্রভাতবাবুকে পরীক্ষা করলেন এবং পরীক্ষার ফল আমাকে আড়ালে জানালেন। তখন আর সন্দেহ রইল না।

‘প্রভাতবাবু যে অনাদি হালদারকে খুন করেছেন একথা আমার আগে আর একজন বুঝতে পেরেছিল-সে কেষ্ট দাস। সাপের হাঁচি বেদেয় চেনে‌, কেষ্ট দাস জানত যে অনাদি হালদারের আলমারিতে কালো টাকা আছে; তাই সে যখন আমার মুখে শুনল যে প্রভাতবাবু দপ্তরীর কাজ জানেন তখন চট্ট করে সমস্ত ব্যাপারটা আন্দাজ করে নিলে। সে প্রভাতবাবুকে শোষণ করতে আরম্ভ করল। অজিত‌, তোমার মনে আছে কি‌, একদিন ক্রমাগত একশো টাকার নোট দেখে দেখে আমাদের চোখ ঠিকরে গিয়েছিল? এমন কি রাত্রে হোটেলে খেতে গিয়েও নিস্তার ছিল না‌, সেখানে কেষ্ট দাস একশো টাকার নোট বার করল। সেই নোটগুলির বেশির ভাগই এসেছিল অনাদি হালদারের বাঁধানো নোটের বই থেকে।

যাহোক‌, পাটনা যাবার আগে অনাদি হালদার ঘটিত ব্যাপার মন থেকে একরকম মুছে ফেলেই চলে গেলাম। কেবল বিকাশ দত্তকে বলে গেলাম দয়ালহরি মজুমদার সম্বন্ধে খবর সংগ্ৰহ করতে।

‘তারপর পাটনা থেকে ফিরে এসে দেখি-এক নতুন পরিস্থিতি। কেষ্ট দাস খুন হয়েছে। কেষ্ট দাস প্রভাতবাবুকে দোহন করছিল‌, তাই বিশ্বাস হল তিনিই তাকে খুন করছেন। তখন আবার আসামীকে ধরবার জন্যে প্রস্তুত হলাম। কিন্তু শুধু অপরাধীকে ধরলেই চলবে না‌, টাকাগুলোও উদ্ধার করা চাই।

‘টাকাগুলো সহজে উদ্ধার করবার জন্যে একটু চাতুরীর আশ্রয় নিতে হল‌, নইলে সারা দোকান হাতড়ে নোটের বইগুলো বার করা কষ্টকর হত। হয়তো প্রভাতবাবু তল্লাশী করতে দিতেন না‌, পুলিস ডাকতে হত; আমার হাত থেকে সব বেরিয়ে যেত। তাই প্রভাতবাবু যখন দোকান বিক্রি করার কথা বললেন তখন ভারি সুবিধে হয়ে গেল। আমি বললাম‌, আমরা দোকান কিনব। সঙ্গে সঙ্গে বিকাশকে পাঠালাম নজর রাখবার জন্যে‌, প্রভাতবাবু দোকান থেকে কোনও জিনিস সরান কিনা।

‘দোকান কেনার ব্যবস্থা পাকা হল‌, স্বাধীনতা দিবসের সকালে দখল দিতে হবে। জানতাম দখল দেবার আগে কোনও সময় বইগুলো প্রভাতবাবু সরাবেন। বিকাশ খবর দিলে‌, দিনের বেলা তিনি কিছু সরাননি। রাত্রে আমরা দোকানে ঢুকে প্রতীক্ষা করে রইলাম। ন্যাপা চাবি তৈরি করে দিয়েছিল—’

হঠাৎ বাহির হইতে বিপুল শব্দতরঙ্গ আমাদের কৰ্ণপাটহে আঘাত করিল-রেডিও যন্ত্রের ঘুম ভাঙার আওয়াজ। আমরা চমকিয়া জানালার দিকে তাকাইলাম। বাহিরে দিনের আলো ফুটিতে আরম্ভ করিয়াছে।

ব্যোমকেশ নড়িয়া চড়িয়া বসিল।

পুঁটিরাম!

পুঁটিরাম দরজা দিয়া মুণ্ড বাড়াইল।

‘আগুনের আংটা নিয়ে এস।’

আমি বলিলাম‌, অনেকক্ষণ ধরে আংটার কথা শুনছি‌, কিন্তু আংটা কি হবে এখনও জানতে পারিনি।–হোম-টোম করবে নাকি?’

‘ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘হ্যাঁ‌, হোম করব। এই নোটগুলো আগুনে আহুতি দেব?

‘মানে?’

‘মানে নোটগুলো পুড়িয়ে ফেলব।’

আর্তনাদ করিয়া উঠিলাম–’অ্যাঁ! দু’ লাখ টাকা পুড়িয়ে ফেলবে!’

‘হ্যাঁ। এই নোটগুলো কালো টাকা‌, অভিশপ্ত টাকা; এর ন্যায্য মালিক কেউ নেই। আজকের পুণ্য দিনে দেশমাতৃকার চরণে এই হবে আমাদের অঞ্জলি।’

‘কিন্তু–কিন্তু‌, পুড়িয়ে ফেললে দেশমাতৃকা পাবেন কি? তার চেয়ে যদি ওই টাকা আমাদের নতুন গভর্নমেণ্টকে দেওয়া যায়—’

‘একই কথা‌, অজিত। পুড়িয়ে ফেললেও রাষ্ট্রকেই দেওয়া হবে। ভেবে দেখ‌, নোটগুলো তো সত্যিকারের টাকা নয়‌, গভর্নমেন্টের হ্যান্ডনোট মাত্র। হ্যান্ডনোট পুড়িয়ে ফেললে গভর্নমেন্টকে আর টাকা শোধ দিতে হবে না‌, দু’ লাখ টাকা তার লাভ হবে। কিন্তু এখন যদি নোটগুলো ফেরত দিতে যাও‌, অনেক হাঙ্গামা বাধবে। গভর্নমেন্ট জানতে চাইবে কোথা থেকে টাকা এল‌, তখন কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে পড়বে। তার দরকার কি! এই ভাল‌, আগুনে যা আহুতি দেব তা দেবতার কাছে পৌঁছবে। —প্রভাতবাবু্‌, আপনি কি বলেন?’

প্রভাত বুদ্ধি-ভ্ৰষ্ট্রের মত ফ্যালফ্যাল চক্ষে চাহিয়া বসিয়া ছিল‌, কষ্টে আত্মসম্বরণ করিয়া বলিল‌, ‘আমার কিছু বলবার নেই‌, আপনি যা ভাল বোঝেন তাই করুন।’

পুঁটিরাম গানগনে আগুনের আংটা আনিয়া ব্যোমকেশের সম্মুখে রাখিল। ব্যোমকেশ তাঁহাকে বলিল‌, ‘তুই এবার ঘুমোগে যা।’

পুঁটিরাম চলিয়া গেল। ব্যোমকেশ আমাদের মুখের পানে চাহিয়া হাসিল। তারপর বইয়ের পাতা ছিঁড়িয়া আগুনে ফেলিতে লাগিল। মন্দ্রস্বরে বলিল‌, ‘স্বাহা‌, স্বাহা‌, স্বাহা—‘

আমি আর বসিয়া দেখিতে পারিলাম না‌, উঠিয়া গিয়া জানালার সম্মুখে দাঁড়াইলাম। ব্যোমকেশ আমার বন্ধু‌, তাহাকে আমি ভালবাসি‌, শ্রদ্ধা করি; কিন্তু আজ তাহার চরিত্রের একটা নূতন দিক দেখিতে পাইলাম। সে যাহা করিল। আমি তাহা পারিতাম না‌, নিজের হাতে দুই লক্ষ টাকা পুড়াইয়া ফেলিতে পারিতাম না।

‘স্বাহা‌, স্বাহা–’

ঘণ্টাখানেক পরে ব্যোমকেশ ও প্রভাত আমার পাশে আসিয়া দাঁড়াইল। সূর্য উঠিয়াছে‌, চারিদিকে মঙ্গলবাদ্য বাজিতেছে। পিছন ফিরিয়া দেখিলাম আংটার চারিপাশে কাগজ-পোড়া ছাই স্তুপীভূত হইয়াছে। কালো টাকার কালো ছাই।

তিনজনে জানালার ধারে কিয়াৎকাল দাঁড়াইয়া রহিলাম। প্ৰভাত প্ৰথমে কথা কহিল‌, কম্পিত স্বরে বলিল‌, ‘ব্যোমকেশবাবু্‌, আমি-আমার সম্বন্ধে-আপনি যদি আমাকে খুনের অপরাধে ধরিয়ে দেন। আমি অস্বীকার করব না।’

না। সব সভ্য দেশেই প্ৰথা আছে পর্ব দিনে বন্দীরা মুক্তি পায়‌, আপনিও মুক্তি পেলেন। আপনার দোকান আমরা কিনব বলেছিলাম‌, যদি আপনি বিক্রি করে চলে যেতে চান আমরা দোকান নেব। কিম্বা যদি আমাদের কাছে দোকানের অর্ধাংশ বিক্রি করে অংশীদার করে নিতে চান তাতেও আপত্তি নেই।’

প্রভাত ঝরঝর করিয়া কাঁদিয়া ফেলিল। শেষে চোখ মুছিতে মুছিতে বলিল‌, ‘ব্যোমকেশবাবু্‌, এ আমার কল্পনার অতীত।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘আমরা যে কালে বাস করছি সেটাই যে কল্পনার অতীত। আমরা বেঁচে থেকে ভারতের স্বাধীনতা দেখে যাব এ কি কেউ কল্পনা করেছিল? কিন্তু ওকথা যাক। আপনি প্ৰাণদণ্ড থেকে মুক্তি পেলেন বটে। কিন্তু একেবারে মুক্তি পাবেন না। কিছু দণ্ড আপনাকে ভোগ করতে হবে। এ সংসারে কর্মফল একেবারে এড়ানো যায় না।’

প্রভাত বলিল‌, ‘কি দণ্ড বলুন‌, আপনি যে দণ্ড দেবেন। আমি মাথা পেতে নেব।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘আপনাকে নিজের পরিচয় জানতে হবে।’

প্রভাত চক্ষু বিস্ফারিত করিল–’নিজের পরিচয়।’

‘হ্যাঁ। নিজের পরিচয় আপনি জানেন কি?-পিতৃনাম?’

প্ৰভাত মাথা নাড়িয়া বলিল‌, ‘না। মা’র কাছে শুনেছি‌, হাসপাতালে আমার জন্ম হয়েছিল। আর কিছু জানি না।’

‘আমি জানি। আপনার পিতৃনাম‌, অনাদি হালদার।’

প্ৰভাতের উপর এই সংবাদের প্রতিক্রিয়া বৰ্ণনা করিবার চেষ্টা করিব না, কারণ আমি নিজেই হতভম্ব হইয়া গিয়াছিলাম। অবশেষে আত্মসংবরণ করিয়া বলিলাম‌, ‘ব্যোমকেশ। এ কী বলছ তুমি! এর কোনও প্রমাণ আছে?’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘আছে বৈকি। প্রভাতবাবুর গায়েই প্রমাণ আছে।’

‘গায়ে!’

‘হ্যাঁ। প্রভাতবাবুর কোমরে একটা আধুলির মত লাল জডুল আছে। প্রভাতবাবু্‌, জডুলটা দেখতে পারি কি?’

যন্ত্রের মত প্রভাত কামিজ তুলিল। ডান দিকে কাপড়ের কষির কাছে জড়ুল দেখা গেল। ব্যোমকেশ আমাকে বলিল‌, ‘ঠিক এইরকম আর কোথায় দেখেছি মনে আছে বোধহয়।’

মনে ছিল। মৃত অনাদি হালদারের কোমরে চাবি পরাইবার সময় ব্যোমকেশ দেখাইয়াছিল। কিন্তু বিস্ময় ঘুচিল না‌, অভিভূতভাবে জিজ্ঞাসা করিলাম, কিন্তু তুমি জানলে কি করে যে প্রভাতবাবুর কোমরে জডুল আছে?

‘প্রভাতবাবুকে যেদিন ডাক্তার তালুকদারের কাছে নিয়ে যাই সেদিন ডাক্তারকে ওঁর কোমরটা দেখতে বলেছিলাম।’

তবু মন দ্বিধাক্ৰান্ত হইয়া রহিল। বলিলাম‌, কিন্তু‌, একে কি প্রমাণ বলা চলে?’ ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘প্রমাণ না বলতে চাও বলো না‌, কিন্তু যুক্তিসঙ্গত অনুমান, legitimate inference বলতেই হবে। অনাদি হালদার খামকা পাটনায় গিয়েছিল। কেন? দপ্তরীর সহকারীকে পুষ্যিপুতুর নিতে গেল কেন? প্রভাতবাবুকে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে দোকান করে দেবার কি দরকার ছিল? সব মিলিয়ে দেখো‌, সন্দেহ থাকবে না।’

প্রভাত টলিতে টলিতে গিয়া আরাম-কেদারায় শুইয়া পড়িল‌, অনেকক্ষণ দুই হাতে মুখ ঢাকিয়া পড়িয়া রহিল।

আমি ভাবিতে লাগিলাম‌, সমস্তই ঠিক-ঠিক মিলিয়া যাইতেছে বটে। অনাদি হালদার জানিত প্রভাত তাহার ছেলে‌, ননীবালা তাহাকে প্রতিপালন করিয়াছেন। কালাবাজারে অনেক টাকা রোজগার করিয়া সে গোপনে ছেলেকে দেখিতে গিয়াছিল। যখন দেখিল ছেলে দপ্তরীর কাজ করে তখনই হয়তো নোটগুলোকে বই বাঁধাইয়া রাখিবার আইডিয়া তাহার মাথায় আসে ছেলেকে ছেলে বলিয়া স্বীকার করার চেয়ে পোষ্যপুত্র নেওয়াই অনাদি হালদারের কুটিল বুদ্ধিতে বেশি সমীচীন মনে হইয়াছিল। …তাহার দুরন্তু প্রবৃত্তি মাঝখানে পড়িয়া সমস্ত ছারখার না করিয়া দিলে প্ৰভাতের জন্ম রহস্য হয়তো চিরদিন অজ্ঞাত থাকিয়া যাইত।—

প্রভাত মড়ার মত মুখ তুলিয়া উঠিয়া বসিল‌, ভগ্নস্বরে বলিল‌, ‘ব্যোমকেশবাবু্‌, এর চেয়ে আমার ফাঁসি দিলেন না কেন? রক্তের এ কলঙ্কের চেয়ে সে যে ঢের ভাল ছিল।’

ব্যোমকেশ তাহার কাঁধে হাত রাখিয়া দৃঢ়স্বরে বলিল‌, ‘সাহস আনুন‌, প্রভাতবাবু। রক্তের কলঙ্ক কার নেই? ভুলে যাবেন না যে মানুষ জাতটার দেহে পশুর রক্ত রয়েছে। মানুষ দীর্ঘ তপস্যার ফলে তার রক্তের বাঁদরামি কতকটা কাটিয়ে উঠেছে; সভ্য হয়েছে‌, ভদ্র হয়েছে‌, মানুষ হয়েছে! চেষ্টা করলে রক্তের প্রভাব জয় করা অসাধ্য কাজ নয়। অতীত ভুলে যান‌, অতীতের বন্ধন ছিঁড়ে গেছে। আজ নতুন ভারতবর্ষের নতুন মানুষ আপনি‌, অন্তরে বাহিরে আপনি স্বাধীন।’

প্ৰভাত অন্ধভাবে হাত বাড়াইয়া ব্যোমকেশের পদম্পর্শ করিল–’আশীর্বাদ করুন।’

বহ্নি-পতঙ্গ

‘পাটনায় পৌঁছিয়া দশ-বারো দিন বেশ নিরুপদ্রবে। কাটিল। তারপর একদিন পুরন্দর পাণ্ডের সহিত দেখা হইয়া গেল। পাণ্ডেজি বছরখানেক হইল বদলি হইয়া পাটনায় আসিয়াছেন। সেই যে দুর্গরহস্য সম্পর্কে তাঁহার সংস্পর্শে আসিয়াছিলাম‌, তারপর আর দেখা হয় নাই। পাণ্ডেজি খুশি হইলেন‌, আমরাও কম খুশি হইলাম না। পাণ্ডেজি মৃত্যু-রহস্যের অগ্রদূত‌, আমাদের সহিত দেখা হইবার দু’ একদিন পরেই একটি রহস্যময় মৃত্যু আসিয়া উপস্থিত হইল এবং—’

আদিম রিপুতে যে মৃত্যু-রহস্যের উল্লেখ করিয়াছিলাম তাঁহাই এখন সবিস্তারে লিপিবদ্ধ করিতেছি।–-

একদিন সন্ধ্যার পর পাণ্ডেজির বাসায় আড্ডা বসিয়াছিল। বাহিরের লোক কেহ ছিল না‌, কেবল ব্যোমকেশ‌, পাণ্ডেজি ও আমি। চা‌, কাবুলী মটরের ঘুগনি‌, মনেরোর লাড়ু এবং গয়ার তামাক—এই চতুৰ্বর্গের সহযোগে পুরাতন স্মৃতিকথার রোমন্থন চলিতেছিল। ভূত্য মাঝে মাঝে আসিয়া গড়গড়ার কলিকা বদলাইয়া দিয়া যাইতেছিল।

পাণ্ডেজির সহিত সাক্ষাৎ হইবার পর হইতে প্ৰায় রোজই আমাদের আডডা জমিতেছে‌, কখনও আমাদের বাসায়‌, কখনও পাণ্ডেজির বাসায়। আজ পাণ্ডেজির বাসায় আডডা জমিয়াছে। তিনি আগামীকল্য আমাদের নৈশ ভোজনের নিমন্ত্বণ করিয়াছেন‌, মুগীর কাশ্মীরী কোমা খাওয়াইবেন। আমাদের কর্মহীন পাটনা প্রবাস মধুময় হইয়া উঠিয়াছে।

নাই। মহাযুদ্ধের চিতা নিভিলেও আকাশ বাতাস চিতাভস্মে আচ্ছন্ন‌, তদুপরি স্বাধীনতার প্রসব যন্ত্রণা। আমাদের স্মৃতি-রোমন্থন ঐতিহাসিক রীতিতে বর্তমান কালে নামিয়া আসিল। পাণ্ডেজি সাম্প্রতিক কয়েকটি লোমহর্ষণ সত্যঘটনা আমাদের শুনাইলেন। অবশেষে বলিলেন,–

‘এই মহাযুদ্ধের সময় থেকে পৃথিবীতে ঠগ-জোচ্চোর-খুন-বদমায়েসের সংখ্যা বেড়ে গেছে‌, সঙ্গে সঙ্গে পুলিসেরও কাজ বেড়েছে। আগে যে-সব অপরাধ আমরা কল্পনা করতাম না সেইসব অপরাধ নিত্য-নিয়ত ঘটছে। বিদেশী সিপাহীরা এসে নানা রকম বিজাতীয় বজ্জাতি শিখিয়ে গেছে। কত রকম নেশার জিনিস‌, কত রকম বিষ যে দেশে ঢুকেছে তার ঠিক-ঠিকানা নেই। এই সেদিন পাটনার এক অতি সাধারণ ছিচকে চোরের কাছ থেকে এক শিশি ওষুধ বেরুল‌, পরীক্ষা করে দেখা গেল সেটা একটা সাংঘাতিক বিষ‌, দক্ষিণ আমেরিকায় তার জন্মস্থান।’

ব্যোমকেশ গড়গড়ার নল মুখের নিকট হইতে সরাইয়া অলস কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিল‌, ‘কী বিষ? কিউরারি?’

‘হ্যাঁ। আপনি নাম জানেন দেখছি। এমন সাংঘাতিক বিষ যে রক্তের সঙ্গে এক বিন্দু মিশলে ভৎক্ষণাৎ মৃত্যু। যে শিশিটা পাওয়া গেছে তা দিয়ে সমস্ত পাটনা শহরটাকে শেষ করে দেওয়া যাবে। ভেবে দেখুন এই রকম কত শিশি আমদানি হয়েছে।’

ব্যোমকেশ জিজ্ঞাসা করিল‌, ‘ও বিষটা কোথাও ব্যবহার হয়েছে তার প্রমাণ পেয়েছেন নাকি?’

পাণ্ডেজি বলিলেন‌, ‘ব্যোমকেশবাবু্‌, আমাদের দেশে কোথায় কাকে বিষ খাইয়ে মারা হচ্ছে সব খবর কি পুলিসের কানে পৌঁছয়? মড়া পোড়াবার জন্য একটা ডাক্তারের সার্টিফিকেট পর্যন্ত দরকার হয় না। নেহাৎ যারা গণ্যমান্য লোক তাদের বিষ খাওয়ালে হয়তো হৈ-চৈ হয়। তাণ্ড আত্মীয়-স্বজনের চাপা দিয়ে দেয়। অথচ আমার বিশ্বাস এ দেশে বিষ খাইয়ে মারার সংখ্যা খুব কম নয়।’

ব্যোমকেশ নিবিষ্ট মনে কিছুক্ষণ গড়গড়া টানিয়া বলিল‌, ‘আচ্ছা‌, আপনারা যে এই সব বিষ আর মাদক দ্রব্য উদ্ধার করেন কোথায় যায় বলুন তো?’

পাণ্ডেজি বলিলেন‌, ‘কোথায় আর যাবে? কিছুদিন আমাদের কাছে থাকে‌, তারপর হেড অফিসে পাঠিয়ে দেওয়া হয়‌, তাঁরা ব্যবস্থা করেন। কিন্তু সে কতটুকু? বেশির ভাগই তো চোরাবাজারে চারিয়ে আছে। যার দরকার সে কিনে ব্যবহার করছে।’ পাণ্ডেজি একটা নিশ্বাস ফেলিলেন-‘যুদ্ধ আর রাষ্ট্রবিপ্লব সভ্য মানুষকে অসভ্য করে তোলে। তখন বিবেক বুদ্ধির মুখোশ পড়ে খসে‌, কাঁচা-খেকো জানোয়ারটি বেরিয়ে আসে। কী ঠুনকে আমাদের সভ্যতা! আসলে আমরা বর্বর।’

ব্যোমকেশ কথাটা যেন একটু তলাইয়া দেখিয়া বলিল‌, ‘আসলে আমরা বর্বরই বটে। কিন্তু যখন সভ্যতা থেকে বর্বরতায় ফিরে যাই তখন সভ্যতার একটা গুণ সঙ্গে নিয়ে যাই। মুখোশ অত সহজে খসে না পাণ্ডেজি‌, কাঁচা-খেকো জন্তুটিকে খুঁজে বার করতে সময় লাগে। বাইরে শান্ত শিষ্ট নিরীহ জীব আর ভিতরে তীক্ষু নখ দস্তু–এইটেই সবচেয়ে ভয়াবহ।’

ঘড়িতে আটটা বাজিল। শীতের রাত্রি‌, কিন্তু আমাদের গৃহে ফিরিবার বিশেষ তাড়া ছিল না। তাই পাণ্ডেজি যখন আর এক কিস্তি চায়ের প্রস্তাব করিলেন তখন আমরা আপত্তি করিলাম না। এই সময় ভূত্য প্রবেশ করিয়া বলিল‌, ইন্সপেক্টর চৌধুরী এসেছেন।’

পাণ্ডেজি বলিলেন‌, ‘কে রতিকান্ত? নিয়ে এস।–আর চার পেয়ালা চা তৈরি কর।’

ভৃত্য চলিয়া গেল। ক্ষণেক পরে পুলিসের পোশাক পরা একটি যুবক প্রবেশ করিল। দীর্ঘ দৃঢ় আকৃতি‌, টকটকে রঙ‌, কাটালো মুখ‌, নীল চোখ‌, হঠাৎ সাহেব বলিয়া ভ্বম হয়। বয়স ত্ৰিশের কাছাকাছি। সে আসিয়া স্যালুটের ভঙ্গীতে ডান হাতটা একবার তুলিয়া পাণ্ডেজির পাশে আসিয়া দাঁড়াইল।

পাণ্ডেজি বলিলেন‌, ‘কি খবর‌, রতিকান্ত?’

রতিকান্ত বলিল‌, ‘হুজুর‌, একটা নেমন্তন্ন চিঠি আছে।’ বলিয়া ওভারকেটের পকেট হইতে একটি খাম বাহির করল। রতিকান্তর ভাষা উত্তর ভারতের বিশুদ্ধ হিন্দী ভাষা‌, বিহারের ভেজাল হিন্দি নয়।

পাণ্ডেজি স্মিতমুখে বলিলেন‌, ‘কিসের নেমন্তয়? তোমার বিয়ে নাকি?’

রতিকান্ত করুণ মুখভঙ্গী করিয়া বলিল‌, ‘আমার বিয়ে কে দেবে হুজুর? দীপনারায়ণ সিং নেমন্তন্ন করেছেন।’

পাণ্ডেজি খামখানা খুলিতে খুলিতে বলিলেন‌, ‘কিন্তু দীপনারায়ণ সিং-এর নেমন্তন্ন চিঠি তুমি নিয়ে এলে যে?’

রতিকান্ত কৌতুকচ্ছলে মুখ কাঁচুমাচু করিয়া বলিল, কি করি স্যার, বড়মানুষ কুটুম্ব, কোনদিন মিনিস্টার হয়ে যাবেন‌, তাই খাতির রাখতে হয়। মাঝে মাঝে যাই সেলাম বাজাতে। আজ গিয়েছিলাম‌, তা পুলিস অফিসারদের নেমন্তন্ন চিঠিগুলো আমাকেই বিলি করতে দিলেন।’

পাণ্ডেজি খাম হইতে সোনালী জলে ছাপা তকতকে কার্ড বাহির করিয়া পড়িলেন‌, বলিলেন‌, ‘হুঁ, গুরুতর ব্যাপার দেখছি। রীতিমত ডিনার।–কিন্তু উপলক্ষটা কি?’

রতিকান্ত বলিল‌, ‘অনেকদিন রোগভোগ করে সেরে উঠেছেন তাই বন্ধুবান্ধবদের খাওয়াচ্ছেন। শহরের গণ্যমান্য সকলকেই নেমন্তন্ন করেছেন।’

পাণ্ডেজি কার্ডাখানা আবার খামে পুরিতে পুরিতে বলিলেন‌, ‘কাল রাত্তিরে নেমন্তন্ন। কিন্তু আমি তো যেতে পারব না‌, রতিকান্ত।’

‘কোন স্যার‌, কাল কি আপনি ইনসাপেকশনে বেরুচ্ছেন?’

‘না। আমার এই বন্ধুদু’টি কলকাতা থেকে এসেছেন‌, কাল রাত্তিরে ওঁদের খেতে বলেছি।’

ব্যোমকেশ মৃদুকণ্ঠে বলিল‌, ‘মুগীর কাশ্মীরী কোর্মা।’

রতিকান্ত চকিত হাস্যে আমাদের পানে চাহিল। এতক্ষণ সে থাকিয়া থাকিয়া আমাদের পানে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিতেছিল; আমরা তাহার অপরিচিত অথচ পাণ্ডেজির সহিত বসিয়া গড়গড়া টানিতেছি দেখিয়া বোধহয় কৌতুহলী হইয়াছিল, কিন্তু কৌতুহল প্রকাশ করে নাই। এখন হাসিমুখে ডান হাতখানা কপালের কাছে লইয়া গিয়া স্যালুট করিল। তারপর পাণ্ডেজিকে বলিল‌, ‘হুজুর‌, কাশ্মীরী কোমার খবর আগে জানলে আমিও কাল এসে আপনার বাড়িতে আড্ডা গাড়তাম। কিন্তু এখন আর উপায় নেই। আচ্ছা‌, আজ চলি।’

পাণ্ডেজি বলিলেন‌, ‘বোসো‌, চা খেয়ে যাও।’

রতিকান্ত বলিল‌, ‘চা আর একদিন হবে হুজুর। আর‌, যদি কাশ্মীরী কোমা খাওয়ান তাহলে তো কথাই নেই। কিন্তু আজ আর বসতে পারব না। এখনও দু’তিনখানা চিঠি বিলি করতে বাকি আছে। তাছাড়া দীপনারায়ণজিকে গিয়ে রিপোর্ট দিতে হবে। নিমন্ত্রণাপত্রে আর এস ভি পি লেখা আছে দেখেছেন তো।’

‘আচ্ছা‌, তাহলে এস।’

রতিকান্ত স্মিতমুখে আমাদের সকলকে একসঙ্গে স্যালুট করিয়া চলিয়া গেল।

ব্যোমকেশ বলিয়া উঠিল‌, ‘বাঃ‌, খাসা চেহারা ছোকরার! যেন রাজপুতুর!’

পাণ্ডেজি কহিলেন‌, ‘নেহাৎ মিথ্যে বলেননি। ওর পূর্বপুরুষেরা প্রতাপগড়ের মস্ত তালুকদার ছিল। প্রায় রাজারাজড়ার সামিল। এখন অবস্থা একেবারে পড়ে গেছে‌, তাই রতিকান্তকে চাকরি নিতে হয়েছে। ভারি বুদ্ধিমান ছেলে; নিজের চেষ্টায় লেখাপড়া শিখেছে‌, বি. এস-সি পাস করেছে।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘আজকাল বড় ঘরের ছেলেরা পুলিসে ঢুকছে এটা সুলক্ষণ বলতে হবে।’ মুসলি। কিছুক্ষণ অন্যান্য প্রসঙ্গ আলোচনার পর ব্যোমকেশ জিজ্ঞাসা করিল‌, দীপনারায়ণ সিং কে?’

পাণ্ডেজি বলিলেন‌, ‘দীপনারায়ণ সিং-এর নাম শোনেননি? বিহারের একজন প্রচণ্ড জমিদার‌, সালিয়ানা আয় দশ লাখ টাকা‌, তার ওপর তেজারাতির কারবার আছে। লোকটি কিন্তু ভাল। রাজনৈতিক আন্দোলনে টাকা দিয়ে সাহায্য করেছিলেন। এখন বয়স হয়েছে‌, পঞ্চাশের কাছাকাছি—’ গড়গড়ায় কয়েকটি টান দিয়া বলিলেন, ‘বুড়ো বয়সে একটি ভুল করে ফেলেছেন তরুণী ভার্যা গ্বহণ করেছেন।’

‘সাবেক গৃহিণী বিদ্যমান?’

‘না‌, অতটা নয়। সাবেক গৃহিণী বছর কয়েক হল গত হয়েছেন‌, তারপর তরুণী ভাষাটি এসেছেন। ভদ্রলোককে বিশেষ দোষ দেওয়া যায় না‌, ছেলেপুলে নেই‌, এক ভাইপো আছে জমিদারীর শরিক‌, কিন্তু সেটা ঘোর অপদার্থ। এই রাজ-ঐশ্বৰ্য ভোগ করবার একটা লোক চাই তো।

‘তাহলে দীপনারায়ণ সিং আবার বিয়ে করে ভুলটা কী করেছেন? বংশরক্ষা তো হবে।’

বিংশ রক্ষা এখনও হয়নি। কিন্তু সেটা আসল কথা নয়। আসল কথা দীপনারায়ণ সিং রূপে মুগ্ধ হয়ে জাতের বাইরে বিয়ে করেছেন। সিভিল ম্যারেজ।’

‘তরুণীটি বুঝি সুন্দরী?’

‘সুন্দরী এবং বিদুষী। কলানিপুণা‌, নাচতে গাইতে জানেন‌, ছবি আঁকতে জানেন‌, তার ওপর এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের তেজস্বিনী ছাত্রী‌, বি. এ-তে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট।’

‘দীপনারায়ণ সিং দেখছি ভাগ্যবান এবং প্রগতিশীলও বটে।’

‘আগে এতটা প্রগতিশীল ছিলেন না। এতদিন ওঁর বাড়িতে মেয়েদের পর্দা ছিল। এখন একেবারে পদ ফাঁক।’

‘ভালই তো। তাতে দোষটা কি?’

‘দোষ নেই। কিন্তু অনভ্যাসের ফোঁটা‌, কপাল চড় চড় করে। বিহারের লোক এখনও মন থেকে পদ প্রথা ত্যাগ করতে পারেনি‌, তাই মেয়েদের একটু স্বাধীনতা দেখলেই কানাঘুষো করে‌, চোখ ঠারাঠারি করে–’’

অতঃপর আমাদের আলোচনা স্ত্রী-স্বাধীনতার পথ ধরিয়া রাজনীতির ক্ষেত্রে উপনীত হইল। ঘড়ির কাঁটাও ক্রমশ ন’টার দিকে যাইতেছে। রাত্রে বাড়ি ফিরিতে বেশি দেরি করিলে সত্যবতী হাঙ্গামা করে। তাই আমরা অনিচ্ছাভরে উঠিবার উপক্বম করিলাম।

পাণ্ডেজি বলিলেন‌, চলুন‌, আপনাদের মোটরে করে পৌঁছে দিয়ে আসি।।’ পাণ্ডেজির আগে মোটর সাইকেল ছিল‌, এখন একটি ছোট মোটর কিনিয়াছেন।

আমরা উঠিয়া দাঁড়াইয়াছি‌, এমন সময় ঘরের কোণে টেলিফোন বাজিয়া উঠিল। পাণ্ডেজি গিয়া ফোন ধরিলেন— ‘হ্যালো…হ্যাঁ‌, আমি পুরন্দর পাণ্ডে.দীপনারায়ণ সিং কথা বলতে চান?… নমস্তে নমস্তে… আপনার পার্টিতে যাবার খুবই ইচ্ছে ছিল, কিন্তু…বন্ধুদেরও নিয়ে যাব?…তা-ওঁরা এখনও এখানেই আছেন‌, ওঁদের জিগ্যেস করে বলছি-?’

টেলিফোনের মুখে হাত চাপা দিয়া পাণ্ডেজি আমাদের দিকে ফিরিলেন‌, ‘দীপনারায়ণ সিং আপনাদেরও পার্টিতে নিয়ে যেতে বলছেন। কি বলেন?’

ব্যোমকেশ একবার আমার দিকে তাকাইল‌, বলিল‌, ‘মন্দ কি! একটা নূতনত্ব হবে। আপনার কাশ্মীরী কোমা না হয়। আপাতত ধামাচাপা রইল।’

পাণ্ডেজি হাসিয়া টেলিফোনের মধ্যে বলিলেন‌, ‘বেশ‌, ওঁরা যাবেন…ওঁদের কার্ড আমার কাছেই পাঠিয়ে দেবেন…আচ্ছা‌, কাল আবার দেখা হবে। নমস্তে।’

পাণ্ডেজি টেলিফোন রাখিয়া বলিলেন‌, ‘চলুন‌, এবার আপনাদের পৌঁছে দিয়ে আসি।’

পরদিন সন্ধ্যা আন্দাজ সাতটার সময় পাণ্ডেজি আসিয়া আমাদের মোটরে তুলিয়া দীপনারায়ণ সিং-এর বাড়িতে লইয়া গেলেন।

দীপনারায়ণ সিং-এর বাড়ি শহরের প্রাচীন অংশে। সাবেক কালের বিরাট দ্বিতল বাড়ি‌, জেলখানার মত উচু প্রাচীর দিয়া ঘেরা। আমরা উপস্থিত হইয়া দেখিলাম বাড়ি ও বাগানে জাপানী ফানুসের ঝাড় জ্বলিতেছে‌, অতি মৃদু শান্নাই বাজিতেছে‌, বহু অতিথির সমাগম হইয়াছে। একতলার বড় হল-ঘরটিতেই সমাগম বেশি‌, আশেপাশের ঘরগুলিতেও অতিথিরা বসিয়াছেন। কোনও ঘরে ব্রিজের আড্ডা বসিয়াছে‌, কোনও ঘরে বয়স্থ হাকিম শ্রেণীর অতিথিরা নিজেদের মধ্যে একটু স্বতন্ত্র গণ্ডী রচনা করিয়া গল্পগুজব করিতেছেন। তকমা আটা ভূত্যেরা চা‌, কফি ও বলবত্তর পানীয় লইয়া ঘোরাঘুরি করিতেছে।

হল-ঘরটি বৃহৎ‌, বিলাতি প্রথায় স্থানে স্থানে সোফা-সেট দিয়া সজ্জিত। প্রত্যেক সোফা-সেটে একটি দল বসিয়াছে। ঘরের মধ্যস্থলে সদর দরজার সম্মুখে একটি পালঙ্কের মত আসন। তাহার উপর তাকিয়া ঠেস দিয়া বসিয়া আছেন একটি মধ্যবয়স্ক ব্যক্তি‌, ইনিই গৃহস্বামী দীপনারায়ণ সিং। গায়ে লম্বা গরম কোট‌, গলায় পশমের গলাবন্ধ। চেহারা ভাল‌, পঞ্চাশ বছর বয়সে এমন কিছু স্থবির হইয়া পড়েন নাই‌, কিন্তু মুখের পাণ্ডুর শীর্ণত হইতে অনুমান করা যায় দীর্ঘ রোগ-ভোগ করিয়া সম্প্রতি আরোগ্যের পথে পদার্পণ করিয়াছেন। পরম সমাদরে দুই হাতে আমাদের করমর্দন করিলেন।

পাণ্ডেজি বলিলেন‌, ‘আপনার রোগমুক্তির জন্য অভিনন্দন জানাই।’

দীপনারায়ণ শীর্ণ মুখে মিষ্ট হাসিলেন‌, ‘বহুৎ ধন্যবাদ। বাঁচবার আশা ছিল না পাণ্ডেজি‌, নেহাৎ ডাক্তার পালিত ছিলেন তাই এ যাত্রা বেঁচে গেছি।’ বলিয়া ঘরের কোণের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করিলেন।

ঘরের কোণে একটি সোফায় কোট-প্যান্ট পরা এক ভদ্রলোক একাকী বসিয়া ছিলেন; দোহারা গড়ন‌, বেশভুষার বিশেষ পারিপাট্য নাই‌, বয়স আন্দাজ পঞ্চাশ। অঙ্গুলি নির্দেশ লক্ষ্য করিয়া তিনি আমাদের কাছে আসিয়া দাঁড়াইলেন। পরিচয় হইল। দীপনারায়ণ সিং বলিলেন‌, ‘এঁরই গুণে আমার পুনর্জন্ম হয়েছে।’

ডাক্তার পালিত যেন একটু অপ্রস্তুত হইয়া পড়িলেন। তিনি গভীর প্রকৃতির লোক‌, একটু চুপ করিয়া থাকিয়া বলিলেন‌, ‘ডাক্তারের যা কর্তব্য তার বেশি তো কিছুই করিনি।–তাছাড়া‌, চিকিৎসা আমি করলেও শহরের বড় বড় ডাক্তার সকলেই দেখেছেন। ত্রিদিববাবু—’

পাণ্ডেজি প্রশ্ন করিলেন‌, ‘রোগটা কি হয়েছিল?’

ডাক্তার পালিত বিলাতি নিদানশাস্ত্র সম্মত রোগের যে সকল লক্ষণ বলিলেন তাহা হইতে অনুমান করিলাম‌, নানা জাতীয় দুষ্ট বীজাণু লিভারের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করিয়া রক্তাল্পতা ঘটাইয়াছিল এবং হৃদপিণ্ডকে জখম করিবার তালে ছিল‌, ইনজেকশন প্রভৃতি আসুরিক চিকিৎসার দ্বারা তাহাদের বশে আনিতে হইয়াছে। এখন অবশ্য রোগীর অবস্থা খুবই ভাল‌, তবু তাঁহার প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখিতে হইয়াছে।

এই সময় পিছন দিকে নাক ঝাড়ার মত একটা শব্দ শুনিয়া চমকিয়া ফিরিয়া দেখি‌, একটি যুবক আসিয়া দাঁড়াইয়াছে এবং নাকের মধ্যে শব্দ করিয়া বোধকরি উপেক্ষা জ্ঞাপন করিতেছে। যুবকের চেহারা কৃকলাসের মত‌, অঙ্গে ফ্যাশন-দূরস্ত বিলাতি সাজপোশাক‌, মুখে ব্যঙ্গ দম্ভ। দীপনারায়ণ পরিচয় করাইয়া দিলেন-ইনি ডাক্তার জগন্নাথ প্রসাদ‌, একজন নবীন বিহারী ডাক্তার।’ ডাক্তার অবজ্ঞােভরে আমাদের দিকে ঘাড় নাড়িলেন এবং যে কয়টি কথা বলিলেন তাহা হইতে স্পষ্টই বোঝা গেল যে‌, প্রবীণ ডাক্তারদের প্রতি তাঁহার অশ্রদ্ধার অন্ত নাই‌, বিশেষত যদি তাঁহারা বাঙালী ডাক্তার হন। দীপনারায়ণ সিং-এর চিকিৎসার ভার কয়েকজন বুড়া বাঙালী ডাক্তারকে না দিয়া তাঁহার হাতে অৰ্পণ করিলে তিনি পাঁচ দিনে রোগ আরাম করিয়া দিতেন। তাঁহার কথা শুনিয়া দীপনারায়ণ সিং মুখ বাঁকাইয়া মৃদু মৃদু হাসিতে লাগিলেন। ডাক্তার পালিত বিরক্ত হইয়া আবার পূর্বস্থানে গিয়া বসিলেন। ডাক্তার জগন্নাথ আরও কিছুক্ষণ বক্তৃতা দিয়া‌, অদূরে পানীয়বাহী একজন ভৃত্যকে দেখিয়া হেষাধবনি করিতে করিতে সেইদিকে ধাবিত হইলেন।

দীপনারায়ণ সিং লজ্জা ও ক্ষোভ মিশ্রিত স্বরে বলিলেন‌, ‘এরাই হচ্ছে নতুন যুগের বিহারী। এদের কাছে গুণের আদর নেই‌, সাম্প্রদায়িকতার ধুয়া তুলে এরা শুধু নিজের সুবিধা করে নিতে চায়। আজ বিহারে বাঙালীর কদর কমে যাচ্ছে‌, এরাই তার জন্যে দায়ী।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘হয়তো বাঙালীরও দোষ আছে।’

দীপনারায়ণ বলিলেন‌, ‘হয়তো আছে। কিন্তু পরিহাস এই যে‌, এরা যখন রোগে পড়ে‌, যখন প্ৰাণ নিয়ে টানাটানি পড়ে যায়‌, তখন এরাই ছুটে যায় বাঙালী ডাক্তারের কাছে।’

এই অপ্রীতিকর প্রাদেশিক প্রসঙ্গ উঠিয়া পড়ায় আমরা একটু অপ্রতিভ হইয়া পড়িতেছিলাম‌, কিন্তু পাণ্ডেজি তাহা সরল করিয়া দিলেন‌, দুই চারিটা অন্য কথা বলিয়া আমাদের লইয়া গিয়া যেখানে ডাক্তার পালিত বসিয়া ছিলেন। সেইখানে বসাইলেন।

আমরা উপবিষ্ট হইলে ডাক্তার পালিত একটু অল্প হাসিয়া বলিলেন‌, ‘ঘোড়া জগন্নাথ আর কি কি বলল?’

পাণ্ডেজি হাসিয়া উঠিলেন‌, ‘ওর নাম বুঝি ঘোড়া জগন্নাথ? খাসা নাম‌, ভারি লগ-সৈ হয়েছে। কিন্তু ওদের কথায় আপনি কান দেবেন না ডাক্তার। ওদের কথা কে গ্রাহ্য করে?’

পালিত বলিলেন‌, ‘কান না দিয়ে উপায় কি? ওরা যে দল বেঁধে প্রচার কার্য করে বেড়াচ্ছে। যারা বুদ্ধিমান তারা হয়তো গ্রাহ্য করে না‌, কিন্তু সাধারণ লোকে ওদের কথাই শোনে।’

আমাদের আলোচনা হয়তো আর কিছুক্ষণ চলিত কিন্তু হঠাৎ পাশের দিকে একটা অদ্ভুত ধরনের হাসির শব্দে তাহাতে বাধা পড়িল। ঘাড় ফিরাইয়া দেখি‌, অদূরে অন্য একটি সোফা-সেটে তিনটি লোক আসিয়া বসিয়াছে; তাহাদের মধ্যে যে ব্যক্তি উচ্চকণ্ঠে হাস্য করিতেছে তাহার দেহায়তন এতাই বিপুল যে সে একই সমস্ত সোফাটি জুড়িয়া বসিয়াছে। বুঢ়োরস্ক গজস্কন্ধ যুবক‌, চিবুক হইতে নিতম্ব পর্যন্ত থরে থরে চর্বির তরঙ্গ নামিয়াছে। তাহার কণ্ঠ হইতে যে বিচিত্র হাস্যধ্বনি নিৰ্গত হইতেছে তাহা যে একই কালে একই মানুষের কণ্ঠ হইতে বাহির হইতে পারে তাহা প্রত্যক্ষ না করিলে বিশ্বাস করা কঠিন। একসঙ্গে যদি গোটা দশেক শৃগাল হুক্কাহুয়া করিয়া ডাকিয়া ওঠে এবং সেই সঙ্গে কয়েকটা পেচোয় পাওয়া আতুড়ে ছেলে কান্না জুড়িয়া দেয় তাহ হইলে বোধহয় এই শব্দ-সংগ্রামের কিছুটা আন্দাজ পাওয়া যায়।

অন্য লোক দু’টি নীরবে বসিয়া মুচকি হাসিতেছিল। আশ্চর্য এই যে মোটা যুবকটি যে-পরিমাণে মোটা‌, তাহার সঙ্গী দু’টি ঠিক সেই পরিমাণে রোগা। ইহাদের তিনজনের দেহের মেদ মাংস সমানভাবে বাঁটিয়া দিলে বোধকরি তিনটি হৃষ্টপুষ্ট সাধারণ মানুষ পাওয়া যায়।

বলা বাহুল্য হাসির এই অট্টরোলে ঘরসুদ্ধ লোকের সচকিত দৃষ্টি সেইদিকে ফিরিয়াছিল। একটি রেশমী পাগড়ি-পরা কৃশকায় বৃদ্ধ কোথা হইতে আবির্ভূত হইয়া দ্রুত সেইদিকে অগ্রসর হইলেন।

ব্যোমকেশ ডাক্তার পালিতকে চুপি চুপি জিজ্ঞাসা করিল‌, ‘গজকচ্ছপটি কে?’

ডাক্তার পালিত মুখ টিপিয়া বলিলেন‌, ‘দীপনারায়ণবাবুর ভাইপো দেবনারায়ণ। একটি আস্ত—’ কথাটা ডাক্তার শেষ করিলেন না‌, কিন্তু তাঁহার অনুচ্চারিত বিশেষ্যটি স্পষ্টই বোঝা গেল। ইহাকেই উদ্দেশ্য করিয়া কাল পাণ্ডেজি বলিয়াছিলেন-ঘোর অপদার্থ। শুধু অপদার্থই নয়‌, বুদ্ধিসুদ্ধিও শরীরের অনুরূপ। পাগড়ি-পরা বৃদ্ধটি আসিয়া রোগা যুবক দু’টিকে কানে কানে কিছু বলিলেন‌, মনে হইল তিনি তাঁহাদের মৃদু ভর্ৎসনা করিলেন। রোগা লোক দু’টিও যেন অত্যন্ত অনুতপ্ত হইয়াছে এইভাবে ভিজা বিড়ালের মত চক্ষু নত করিয়া রহিল। গজকচ্ছপের হাসি তখনও থামে নাই‌, তবে মন্দীভূত হইয়া আসিয়াছে। বৃদ্ধ তাহার পিছনে গিয়া দাঁড়াইলেন এবং কানের কাছে নত হইয়া কিছু বলিলেন। হঠাৎ ব্রেককষা গাড়ির মত গজকচ্ছপের হাসি হেঁচকা দিয়া থামিয়া গেল।

ব্যোমকেশ পূর্ববৎ ডাক্তার পালিতকে জিজ্ঞাসা করিল‌, ‘রোগ লোক দু’টি কে?’

পালিত বলিলেন‌, ‘ওই যেটির কোঁকড়া চুল কাঁকড়া গোঁফ ও হচ্ছে দেবনারায়ণের বিদূষক‌, মানে ইয়ার। নাম বেণীপ্রসাদ। অন্যটির নাম লীলাধর বংশী-দীপনারায়ণবাবুর স্টেটের অ্যাসিসট্যান্ট ম্যানেজার এবং দেবনারায়ণের অ্যাসিসট্যান্ট বিদূষক।’

‘আর বৃদ্ধটি?’

‘বৃদ্ধটি লীলাধরের বাবা গঙ্গাধর বংশী‌, স্টেটের বড় কর্তা‌, অৰ্থাৎ ম্যানেজার। গভীর জলের মাছ।’

গভীর জলের মাছটি একবার চক্ষু তুলিয়া আমাদের পানে চাহিলেন এবং মন্দমধুর হাস্যে আমাদের অভিসিঞ্চিত করিয়া অন্যত্ব প্রস্থান করিলেন। দেবনারায়ণ নিজ ঝকমকে শার্কস্কিনের গলাবন্ধ কোটের পকেট হইতে একটি সুবৃহৎ পানের ডিবা বাহির করিয়া কয়েকটা পান গালে পুরিয়া গুরু গম্ভীর মুখে চিবাইতে লাগিল। এই লোকটাই কিছুক্ষণ পূর্বে হট্টগোল করিয়া হাসিতেছিল। তাহা আর বোঝা যায় না।

ব্যোমকেশ জিজ্ঞাসা করিল‌, ‘হাসির কারণটা কী কিছু বুঝতে পারলেন?’

পালিত বলিলেন‌, ‘বোধহয় বিদূষকেরা রসের কথা কিছু বলেছিল তাই এত হাসি।’

একজন ভৃত্য রূপার থালায় সোনালী তবক মোড়া পান ও সিগারেট লইয়া উপস্থিত হইল। আমরা সিগারেট ধরাইলাম। ব্যোমকেশ এদিকে ওদিকে চাহিয়া পাণ্ডেজিকে বলিল‌, ‘ইন্সপেক্টর রতিকান্তকে দেখছি না।’

পাণ্ডেজি বলিলেন‌, ‘হয়তো অন্য ঘরে আছে। কিম্বা হয়তো থানায় আটকে গেছে। আসবে। নিশ্চয়। আপনারা বসুন‌, আমি একবার কমিশনার সাহেবের সঙ্গে দুটো কথা বলে আসি।’

পাণ্ডেজি উঠিয়া গেলেন। আমরা তিনজনে বসিয়া সিগারেট টানিতে টানিতে ঘরের ইতস্তত বিক্ষিপ্ত অতিথিগুলিকে দর্শন করিতে লাগিলাম। অতিথিদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যাই বেশি‌, দু’ একটি স্ত্রীলোক আছেন।

এই সময় ঘরের অন্য প্ৰান্তের একটি দ্বারা দিয়া এক মহিলা প্রবেশ করিলেন। ঘরে বেশ উজ্জ্বল আলো ছিল‌, এখন মনে হইল কেবলমাত্র এই মহিলাটির আবিভাবে ঘরটি উজ্জ্বলতর হইয়া উঠিল। তিনি কোন রঙের শাড়ি পরিয়াছেন‌, কী কী গহনা পরিয়াছেন কিছুই চোখে পড়িল না‌, কেবল দেখিলাম‌, আলোকের একটি সঞ্চরমাণ উৎস ধীরে ধীরে আমাদের দিকে অগ্রসর হইয়া আসিতেছে। ঘরের মধ্যে যাঁহারা ছিলেন সকলেই সচকিত হইয়া উঠিলেন‌, কেহ কেহ উঠিয়া দাঁড়াইয়া নমস্কার করিলেন। মহিলাটি হাসিমুখে লীলায়িত ভঙ্গিমায় সকলকে অভ্যর্থনা করিতে করিতে আমাদের দিকেই আসিতে লাগিলেন।

ডাক্তার পালিত অ্যাশ-ট্রের উপর সিগারেট ঘসিয়া নিভাইলেন‌, মৃদুস্বরে বলিলেন‌, ‘মিসেস দীপনারায়ণ–শকুন্তলা।’

রূপসী বটে। বয়স চব্বিশ-পঁচিশের কম হইবে না‌, কিন্তু সবাঙ্গে পরিপূর্ণ যৌবনের মদৌদ্ধত লাবণ্য যেন ফাটিয়া‌, পড়িতেছে। আমাদের দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে এইরূপ লাবণ্যবতী। তপ্তকাঞ্চনবর্ণ রমণী হয়তো দুই চারিটি দেখা যায়‌, কিন্তু এদিকে বেশি দেখা যায় না। শকুন্তলা নামটিও যেন রূপের সঙ্গে ছন্দ রক্ষা করিয়াছে। শকুন্তলা–অন্সর কন্যা শকুন্তলা-যাহাকে দেখিয়া দুষ্মন্ত ভুলিয়াছিলেন। দীপনারায়ণ সিং প্রৌঢ় বয়সে কোন অসবর্ণ বিবাহ করিয়াছেন তাহা বুঝিতে কষ্ট হইল না।

শকুন্তলা আমাদের সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইলেন‌, আমরা সসম্রামে গাত্ৰোত্থান করিলাম। ডাক্তার পালিত পরিচয় করাইয়া দিলেন। শকুন্তলা অতি মিষ্ট স্বরে দুই চারিটি সাদর সম্ভাষণের কথা বলিলেন‌, তাহাতে তাঁহার গৃহিণীসুলভ সৌজন্য এবং তরুণীসুলভ শালীনতা দুইই প্রকাশ পাইল। তারপর তিনি অন্যদিকে ফিরিলেন।

এই সময় লক্ষ্য করিলাম শকুন্তলা একা নয়‌, তাঁহার পিছনে আর একটি যুবতী রহিয়াছেন। সূর্যের প্রভায় যেমন শুকতারা ঢাকা পড়িয়া যায়‌, এতক্ষণ এই যুবতী তেমনি ঢাকা পড়িয়া ছিলেন; এখন দেখিলাম তাঁহার কোলে একটি বছর দেড়েকের ছেলে। বস্তুত এই ছেলেটি হঠাৎ ট্যাঁ‌, করিয়া কাঁদিয়া উঠিয়াই যুবতীর প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করিল। যুবতী শকুন্তলার চেয়ে বোধহয় দু’ এক বছরের ছোটই হইবেন; সুশ্ৰী গৌরাঙ্গী‌, মোটাসোটা টিলাঢালা গড়ন‌, মহাৰ্ঘ বস্ত্ব ও গহনার ভারে যেন নড়িতে পারিতেছেন না। তাঁহার বেশবাসের মধ্যে প্রাচুর্য আছে। কিন্তু নিপুণতা নাই। তাছাড়া মনে হয় প্রকাশ্যভাবে পাঁচজন পুরুষের সঙ্গে মেলামেশা করিতে তিনি অভ্যস্ত নন‌, পদার ঘোর এখনও কাটে নাই।

শিশু কাঁদিয়া উঠিতেই শকুন্তলা পিছু ফিরিয়া চাহিলেন। তাঁহার মুখে একটু অপ্রসন্নতার ছায়া পড়িল‌, তিনি বলিলেন‌, ‘চাঁদনী‌, খোকাকে এখানে এনেছ কেন? যাও‌, ওকে নার্সের কাছে রেখে এস।‘

প্রভুভক্ত কুকুর প্রভুর ধমক খাইয়া যেভাবে তাকায়, যুবতীও সেইভাবে শকুন্তলার মুখের পানে চাহিলেন‌, তারপর নম্রভাবে ঘাড় হেলাইয়া শিশুকে লইয়া যে পথে আসিয়াছিলেন। সেই পথে ফিরিয়া চলিলেন।

দীপনারায়ণ দূর হইতে স্ত্রীকে আহ্বান করিলেন— ‘শকুন্তলা? কয়েকজন হোমরাচোমরা অতিথি আসিয়াছেন।’

শকুন্তলা সেই দিকে গেলেন। পাশের দিকে কটাক্ষপাত করিয়া দেখিলাম‌, দেবনারায়ণ কোলা ব্যাঙের মত ড্যাবডেবে চোখ মেলিয়া শকুন্তলার পানে চাহিয়া আছে।

আমরা আবার সিগারেট ধরাইলাম। ব্যোমকেশ প্রশ্ন করিল‌, ‘দ্বিতীয় মহিলাটি কে?’

ডাক্তার পালিত অন্যমনস্কভাবে বলিলেন‌, ‘দেবনারায়ণের স্ত্রী। ছেলেটিও দেবনারায়ণের।’

লক্ষ্য করিলাম ডাক্তার পালিতের কপালে একটু ভ্রূকুটির চিহ্ন। তাঁহার চক্ষুও শকুন্তলাকে অনুসরণ করতেছে।

সাড়ে আটটার সময় আহারের আহ্বান আসিল।

অন্য একটি হল-ঘরে টেবিল পাতিয়া আহারের ব্যবস্থা। রাজকীয় আয়োজন। কলিকাতার কোন বিলাতি হোটেল হইতে পাচক ও পারিবেশক আসিয়াছে। আহার শেষ করিয়া উঠিতে পৌঁনে দশটা বাজিল।

বাহিরের হল-ঘরে আসিয়া পান সিগারেট সেবনে যত্নবান হইলাম। ডাক্তার পালিত একটি পরিতৃপ্ত উদগীর তুলিয়া বলিলেন‌, ‘মন্দ হল না। —আচ্ছা‌, আজ চলি‌, রাত্তিরে বোধহয় একবার রুগী দেখতে বেরুতে হবে। আবার কাল সকালেই দীপনারায়ণবাবুকে ইনজেকশন দিতে আসিব।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘এখনও ইনজেকশন চলছে নাকি?’

পালিত বলিলেন‌, ‘হ্যাঁ‌, এখনও হস্তায় একটা করে লিভার দিচ্ছি। আর গোটা দুই দিয়ে বন্ধ করে দেব। আচ্ছা-নমস্কার। আপনারা তো এখনও আছেন‌, দেখা হবে নিশ্চয়–

তিনি প্রস্থানের জন্য পা বাড়াইয়াছেন এমন সময় দেখিলাম সদর দরজা দিয়া ইন্সপেক্টর রতিকান্ত চৌধুরী প্রবেশ করিতেছে। তাহার পরিধানে পুলিসের বেশ‌, কেবল মাথায় টুপি নাই। একটু ব্যস্তসমস্ত ভাব। দ্বারের কাছে দাঁড়াইয়া সে একবার ঘরের চারিদিকে চক্ষু ফিরাইল‌, তারপর ডাক্তার পালিতকে দেখিতে পাইয়া দ্রুত আমাদের কাছে আসিয়া দাঁড়াইল।

‘ডাক্তার পালিত‌, একটা খারাপ খবর আছে। আপনার ডিসপেনসারিতে চুরি হয়েছে।’

‘চুরি!’

রতিকান্ত বলিল‌, ‘হ্যাঁ। আন্দাজ ন’টার সময় আমি থানা থেকে বেরিয়ে এখানে আসছিলাম‌, পথে নজর পড়ল ডিসপেনসারির দরজা খোলা রয়েছে। কাছে গিয়ে দেখি দরজার তালা ভাঙা। ভেতরে গিয়ে দেখলাম। আপনার টেবিলের দেরাজ খোলা‌, চোর দেরাজ ভেঙে টাকাকড়ি নিয়ে। আমি একজন কনস্টেবলকে বসিয়ে এসেছি। আপনি যান। দেরাজে কি টাকা ছিল?’

পালিত হতবুদ্ধি ইয়া বললেন‌, ‘টাকা। রাত্রে বেশি টাকা তো থাকে না‌, বড় জোর দু’চার টাকা ছিল।

‘তবু আপনি যান। টাকা ছাড়া যদি আর কিছু চুরি গিয়ে থাকে আপনি বুঝতে পারবেন।’

‘আমি এখনি যাচ্ছি।’

‘আর‌, টাকা ছাড়া যদি অন্য কিছু চুরি গিয়ে থাকে আজ রাত্রেই থানায় এত্তালা পাঠিয়ে দেবেন।‘

শকুন্তলা ও পাণ্ডেজি দূরে দাঁড়াইয়া বাক্যালাপ করিতেছিলেন‌, আমাদের মধ্যে চাঞ্চল্য লক্ষ্য করিয়া কাছে আসিয়া দাঁড়াইলেন। পাণ্ডেজি প্রশ্ন করিলেন‌, ‘কি হয়েছে?’

ডাক্তার পালিত দাঁড়াইলেন না‌, তাড়াতাড়ি চলিয়া গেলেন। রতিকান্ত চুরির কথা বলিল। তারপর শকুন্তলার দিকে ফিরিয়া বলিল‌, ‘আমার বড় দেরি হয়ে গেল-খেতে পাবো তো?’

শকুন্তলা একটু হাসিয়া বলিলেন‌, ‘পাবেন। আসুন আমার সঙ্গে।’

গৃহস্বামী পূর্বেই বিশ্রামের জন্য প্রস্থান করিয়াছিলেন‌, আমরা শকুন্তলার নিকট বিদায় লইয়া গৃহে ফিরিলাম।

পরদিন সকাল আন্দাজ ন’টার সময় একখানা মোটর আসিয়া আমাদের বাসার থামিল। ব্যোমকেশ খবরের কাগজ হইতে মুখ তুলিয়া ভ্রূ কুঞ্চিত করিল‌, ‘পাণ্ডেজি—এত সকালে।’

পরীক্ষণেই পাণ্ডেজি আমাদের বসিবার ঘরে প্রবেশ করিলেন। পরিধানে পুলিস ইউনিফর্ম‌, মুখ গভীর। ব্যোমকেশের সপ্রশ্ন দৃষ্টির উত্তরে বলিলেন‌, ‘দীপনারায়ণ সিং মারা গেছেন।’

আমরা ফ্যালফ্যাল করিয়া চাহিয়া রহিলাম‌, কথাটা ঠিক যেন হৃদয়ঙ্গম হইল না।

‘মারা গেছেন।’

‘এইমাত্র রতিকান্ত টেলিফোন করেছিল। সকালবেলা ডাক্তার পালিত এসেছিলেন। দীপনারায়ণ সিংকে ইনজেকশন দিতে। ইনজেকশন দেবার সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু হয়েছে। আমি সেখানেই যাচ্ছি। আপনারা যাবেন?’

ব্যোমকেশ দ্বিরুক্তি না করিয়া আলোয়ানাখানা কাঁধে ফেলিল। আমিও উঠিলাম।

‘চলুন।’

মোটরে যাইতে যাইতে কাল রাত্রির দৃশ্যগুলি মনে পড়িতে লাগিল। দীপনারায়ণ সিংকে একবারই দেখিয়াছি‌, কিন্তু তাঁহাকে ভাল লাগিয়াছিল; শিষ্ট সহাস্য ভদ্রলোক‌, রোগ হইতে সারিয়া উঠিতেছিলেন। হঠাৎ কী হইল?’ আর শকুন্তলা–

শকুন্তলা বিধবা হইয়াছেন.অন্তর হইতে যেন এই নিষ্ঠুর সত্য স্বীকার করিতে পারিতেছি না।

গন্তব্য স্থানে পৌঁছিলাম। ফটকের কাছে গোটা তিনেক মোটর দাঁড়াইয়া আছে। পাণ্ডেজি গাড়ি থামাইয়া অবতরণ করিলেন। দেউড়ি পার হইয়া আমরা বাড়ির সদর দরজায় উপস্থিত হইলাম। বাগানে কেহ নাই‌, চারিদিক যেন থমথম করিতেছে।

সদর দরজার সম্মুখে ইন্সপেক্টর রতিকান্ত গম্ভীর মুখে পাণ্ডেজিকে স্যালুট করিল। আমাদের দেখিয়া তাহার ভ্রূ ঈষৎ উত্থিত হইল‌, কিন্তু সে কিছু না বলিয়া সকলকে সঙ্গে লইয়া ভিতরে প্রবেশ করিল।

হল-ঘরের দ্বারের সম্মুখে পালঙ্কের মত আসনটি পূর্ববৎ রহিয়াছে‌, তাহার উপর দীপনারায়ণ সিং-এর মৃতদেহ। মৃতদেহের পাশে বসিয়া ডাক্তার পালিত এক দৃষ্টি মৃতের মুখের পানে চাহিয়া আছেন। ঘরে আর কেহ নাই‌, কেবল আসবাবগুলি গত রাত্রির মতাই সাজানো রহিয়াছে।

আমরা পা টিপিয়া টিপিয়া পালঙ্কের পাশে গিয়া দাঁড়াইলাম। দীপনারায়ণ সিংকে কাল রাত্রে যেমন দেখিয়ছিলাম‌, আজ মৃত্যুর স্পর্শে তাঁহার আকৃতির কোনও পরিবর্তন হয় নাই। চক্ষু মুদিত‌, মুখের স্নায়ু পেশী শিথিল; যেন ঘুমাইয়া পড়িয়াছেন।

ডাক্তার পালিত এমন তন্ময় হইয়া মৃতের মুখের পানে চাহিয়া ছিলেন যে আমাদের আগমন বোধহয় জানিতে পারেন নাই। পাণ্ডেজির লঘু করুস্পর্শে তাঁহার চমক ভাঙিল। তিনি উঠিয়া দাঁড়াইয়া একে একে আমাদের মুখের পানে চাহিলেন‌, তারপর বলিলেন‌, ‘পোস্ট-মর্টেম হওয়া দরকার। আর-এই শিশিটা রাখুন।’ তাঁহার হাতের কাছে একটি রবারের স্টপার দেওয়া ক্ষুদ্র বাদামী রঙের শিশি ছিল‌, সেটি পাণ্ডেজিকে দিলেন। পাণ্ডেজি শিশি চোখের সামনে তুলিয়া ধরিয়া দেখিলেন তখনও তাহতে প্ৰায় আধ শিশি তরল পদার্থ রহিয়াছে। তিনি শিশিটি রতিকান্তের হাতে দিয়া শান্তকণ্ঠে ডাক্তারকে বলিলেন‌, ‘আসুন‌, ওদিকে গিয়ে বসা যাক।’

ডাক্তার পালিত তাঁহার হ্যান্ডব্যাগটি পালঙ্কের উপর হইতে তুলিয়া লইলেন। আমরা সকলে অদূরে একটি সোফা-সেটে গিয়া বসিলাম। রতিকান্ত দাঁড়াইয়া রহিল। পাণ্ডেজি জিজ্ঞাসা করিলেন। ‘বাড়ির আর সকলে কোথায়?’

রতিকান্ত বলিল‌, ‘তাদের সব ওপরে পাঠিয়ে দিয়েছি। মিস মান্না শকুন্তলা দেবীর কাছে আছেন।’

‘মিস মান্না কে? লেডি ডাক্তার?’

পালিত বলিলেন‌, ‘হ্যাঁ। তিনিও এ বাড়ির বাঁধা ডাক্তার। শকুন্তলার অবস্থা দেখে তাঁকে টেলিফোন করে আনিয়ে নিয়েছি।’

‘বেশ করেছেন। দেবনারায়ণের খবর কি?’

‘দেবনারায়ণটা ইডিয়ট-ছেলেমানুষের মত হাউ হাউ করে কাঁদছে। দেওয়ান গঙ্গাধর বংশী তার কাছে আছে। বেচারী চাঁদনীরই বিপদ‌, নিজে কাঁদছে‌, একবার স্বামীর কাছে ছুটে আসছে‌, একবার শকুন্তলার কাছে ছুটে যাচ্ছে।’ তিনি নিশ্বাস ফেলিলেন।

পাণ্ডেজি কিছুক্ষণ চুপ করিয়া রহিলেন‌, তারপর বলিলেন‌, ‘ডাক্তার পালিত‌, এবার গোড়া থেকে সব কথা বলুন।’

ডাক্তার তাঁহার ব্যাগটি কোলের উপর হইতে নামাইয়া রাখিয়া বলিলেন‌, ‘বলবার বেশি কিছু নেই। আন্দাজ আটটার সময় আমি এসে দেখলাম দীপনারায়ণবাবু ওই পালঙ্কে বসে অপেক্ষা করছেন। আমাকে দেখে হেসে বললেন—এই শীতে আপনি এত শীগগির আসবেন ভাবিনি‌, চা খান। আমি বললাম— আচ্ছা‌, আগে ইনজেকশনটা দিই। চাঁদনী উপস্থিত ছিলেন‌, শকুন্তলা আজ উপস্থিত ছিলেন না। আমি দীপনারায়ণবাবুর নাড়ি দেখলাম‌, নাড়ি বেশ ভাল। তখন সিরিঞ্জে লিভার এক্সট্র্যাক্ট ভরে তাঁর বাহুতে ইনজেকশন দিলাম। ইনট্রামান্ধুলার ইনজেকশন‌, হাঙ্গামা কিছু নেই‌, কিন্তু দীপনারায়ণবাবু আস্তে আস্তে শুয়ে পড়লেন। দেখলাম তাঁর চোখের পাতা ভারী হয়ে বুজে আসছে; তিনি কথা বলার চেষ্টা করলেন। কিন্তু বলতে পারলেন না। আমি তখনই তাঁকে এড্রেনালিন দিলাম‌, তারপর আর্টিফিসিয়াল রেসপিরিশন দিতে লাগলাম। কিন্তু কোনও ফল হল না‌, তিন-চার মিনিটের মধ্যে তাঁর ফুসফুসের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে গেল।’

ডাক্তার একবার নিজের বুকের উপর আঙুল বুলাইয়া নীরব রহিলেন। তিনি প্রবীণ ডাক্তার‌, আকস্মিক মৃত্যু তাঁহার কাছে নূতন নয়। কিন্তু তিনি যে ভিতরে ভিতরে কত বড় ধাক্কা খাইয়াছেন তাহা তাঁহার কঠিন সংযম ভেদ করিয়া ফুটিয়া উঠিল।

পাণ্ডেজি বলিলেন‌, ‘মৃত্যুর কারণ কী তা আপনি বুঝতে পারেননি?’

ডাক্তার বলিলেন‌, ‘লক্ষণ দেখে মনে হয়েছিল–এনাফিলেকটিক শক। কিন্তু এখন দেখছি তা নয়।‘

‘তবে কী হতে পারে?’

‘ঠিক বুঝতে পারছি না। হয়তো কোনও বিষ।’

পাণ্ডেজি ব্যোমকেশের দিকে দৃষ্টি ফিরাইলেন, ব্যোমকেশ বলিল, ‘কিউরারি বিষ হতে পারে কি?’

ডাক্তার চক্ষু বিস্ফারিত করিয়া কিছুক্ষণ চাহিয়া রহিলেন‌, তারপর কতকটা নিজ মনেই বলিলেন‌, ‘কিউরারি। হতে পারে। তবে পোস্ট-মর্টেম না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চয় বলা যায় না।’

‘যদি কিউরারি বিষে মৃত্যু হয়ে থাকে পোস্ট-মর্টেমে কিউরারি পাওয়া যাবে?’

‘যাবে। কিডনীতে পাওয়া যাবে।’



ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘ডাক্তারবাবু্‌, আপনি যে শিশিটা এখনি পাণ্ডেজিকে দিলেন ওটা কি?’

ডাক্তার বলিলেন‌, ‘ওটা লিভার এক্সট্র্যাক্টের ভায়াল। ওতে দশ শিশি ওষুধ থাকে‌, ভায়ালের মুখ রবার দিয়ে সীল করা থাকে। সিরিঞ্জের ছুঁচ রবারে ঢুকিয়ে ভায়াল থেকে দরকার মতো ওষুধ বের করে নেওয়া যায়। আজ আমি ওই ভয়াল থেকেই ওষুধ বের করে ইনজেকশন দিয়েছিলাম।’

ব্যোমকেশ বলিল, ‘ইনজেকশন দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে যখন মৃত্যু হয়েছে তখন অনুমান করা যেতে পারে যে ইনজেকশনই মৃত্যুর কারণ। তাহলে ওই ভায়ালে বিষ আছে?’

ডাক্তার বলিলেন‌, ‘তাছাড়া আর কি হতে পারে? অথচ-কাল সন্ধ্যেবেলা ওই ভায়াল থেকেই একজন রুগীকে ইনজেকশন দিয়েছি‌, সে দিব্যি বেঁচে আছে।’

‘ভায়ালটা আপনার ব্যাগের মধ্যেই থাকে?’

‘হ্যাঁ। ফুরিয়ে গেলে একটা নতুন ভায়াল রাখি।’

‘আচ্ছা‌, বলুন দেখি‌, কাল রাত্তিরে আপনার ব্যাগ কোথায় ছিল?’

‘ডিসপেনসারিতে ছিল।’

‘রাত্তিরে যখন কল আসে তখন কি করেন‌, ডিসপেনসারি থেকে ব্যাগ নিয়ে রুগী দেখতে যান?’

‘না‌, আমার বাড়িতে আর একটা ব্যাগ থাকে‌, রাত্তিরে কল এলে সেটা নিয়ে বেরুই।’

‘বুঝেছি। কাল রাত্তিরে যখন আপনার ডিসপেনসারিতে চোর ঢুকেছিল তখন এ ব্যাগটা সেখানেই ছিল?’

‘হ্যাঁ।’ ডাক্তার চকিত হইয়া উঠিলেন— ‘কাল রাত্ৰি আন্দাজ সাতটার সময় আমি রুগী দেখে ডিসপেনসারিতে ফিরে আসি। তখন আর বাড়ি ফেরবার সময় ছিল না‌, ব্যাগ রেখে কম্পাউণ্ডারকে বন্ধ করতে বলে সটান এখানে চলে এসেছিলাম।’

‘ও’—ব্যোমকেশ একটু চিন্তা করিল‌, ‘কম্পাউণ্ডার কখন ডিসপেনসারি বন্ধ করে চলে গিয়েছিল আপনি জানেন?’

‘জানি বৈকি। কাল রাত্রে চুরির খবর পেয়ে এখান থেকে ফিরে গিয়ে আমি কম্পাউণ্ডারকে ডেকে পাঠিয়েছিলাম। সে বলল‌, সাতটার পরই সে ডাক্তারখানা বন্ধ করে নিজের বাড়ি চলে গিয়েছিল।’

‘ভাল কথা‌, ডিসপেনসারি থেকে আর কিছু চুরি গিয়েছিল। কিনা জানতে পেরেছেন?’

‘আর কিছু চুরি যায়নি। শুধু টেবিলের দেরাজ থেকে কয়েকটা টাকা আর সিকি আধুলি গিয়েছিল।’

ব্যোমকেশ পাণ্ডেজির দিক হইতে রতিকান্তের দিকে চক্ষু ফিরাইয়া শান্ত কণ্ঠে বলিল‌, ‘তাহলে চুরির আসল উদ্দেশ্য বোঝা গেল।’

রতিকান্ত এতক্ষণ চক্ষু কুঞ্চিত করিয়া ব্যোমকেশের সওয়াল জবাব শুনিতেছিল। যে প্রশ্ন পুলিসের করা উচিত তাহা একজন বাহিরের লোক করিতেছে ইহা বোধহয় তাহার ভাল লাগে নাই। কিন্তু ব্যোমকেশ পাণ্ডেজির বন্ধু‌, তাই সে নীরব ছিল। এখন সে একটু নীরস স্বরে বলিল‌, ‘কী বোঝা গেল?’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘বুঝতে পারলেন না? চোর টাকা চুরি করতে আসেনি। সে লিভার এক্সট্র্যাক্টের ভায়ালটা বদলে দিয়ে গেছে।’

পাণ্ডেজি বলিলেন‌, ‘বদলে দিয়ে গেছে?’

‘কিম্বা ডাক্তারবাবুর ভায়ালে কয়েক ফোঁটা তরল কিউরারি সিরিঞ্জের সাহায্যে ঢুকিয়ে দিয়ে গেছে। ফল একই। চোর জানত আজ সকালবেলা দীপনারায়ণ সিংকে ইনজেকশন দেওয়া হবে।–এবার ব্যাপারটা বুঝেছেন?’

কিছুক্ষণ সকলে স্তব্ধ হইয়া রহিলাম। তারপর পাণ্ডেজি বলিলেন‌, ‘আজ সকালে ইনজেকশন দেওয়া হবে কে কে জানত?’

ডাক্তার বলিলেন‌, ‘বাড়ির সকলেই জানত রবিবার সকালে ইনজেকশন দেওয়া হয়‌, আমি প্রথমে ওঁকে ইনজেকশন দিয়ে তারপর রুগী দেখতে বেরুই।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘কাল রাত্তিরে আমিও জানতে পেরেছিলাম‌, ডাক্তারবাবু বলেছিলেন। সুতরাং ওদিক থেকে কাউকে ধরা যাবে না।’

ইন্সপেক্টর রীতিকান্ত কথা বলিল‌, পিছন হইতে পাণ্ডেজির চেয়ারের উপর কুকিয়া বলিল‌, ‘স্যার, আমি প্রথমে ভেবেছিলাম হয়তো অপঘাত মৃত্যু‌, ডাক্তার পালিত ভুল করে অন্য ওষুধ ইনজেকশন দিয়েছেন। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে–। আমি এ কেসের চার্জ নিতে চাই।’

পাণ্ডেজি বলিলেন‌, ‘নিশ্চয়‌, তোমারই তো এলাকা। তুমি চার্জ নাও। এখনি লাশ পোস্ট-মর্টেমের জন্য পাঠাও। আর ওই ওষুধের ভায়ালটা পরীক্ষার জন্যে ল্যাবরেটরিতে পাঠিয়ে দাও। এ ব্যাপারের নিম্পত্তি হওয়া চাই।’

রতিকাস্তের মুখ কঠিন হইয়া উঠিল‌, ‘আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন স্যার‌, নিস্পত্তি আমি করব? দীপনারায়ণবাবু আমার মুরুব্বি ছিলেন‌, কুটুম্ব ছিলেন‌, তাঁকে যে খুন করেছে। সে আমার হাতে ছাড়া পাবে না।‘

তাহার কথাগুলা একটু নাটুকে ধরনের হইলেও ভিতরে খাঁটি হৃদয়াবেগ ছিল। সে স্যালুট করিয়া চলিয়া যাইতেছিল, পাণ্ডেজি বলিলেন, রতিকান্ত, আমার বন্ধু ব্যোমকেশ বক্সীকে তুমি বোধহয় চেনো না। উনি বিখ্যাত ব্যক্তি‌, আমাদের লাইনের লোক। উনিও তোমাকে সাহায্য করবেন।’

রতিকান্ত ব্যোমকেশের পানে চাহিল। ব্যোমকেশ সম্বন্ধে তাহার মনে খানিকটা বিস্ময়ের ভাব ছিল‌, এখন সত্য পরিচয় পাইয়া সে সুখী হইতে পারে নাই তাহা স্পষ্টই প্রতীয়মান হইল। সে ধীরে ধীরে বলিল‌, ‘আপনি বিখ্যাত ব্যোমকেশ বক্সী? আপনার কয়েকটি কাহিনী আমি পড়েছি‌, হিন্দীতে অনুবাদ হয়েছে। তা আপনি যদি অনুসন্ধানের ভার নেন–’

ব্যোমকেশ তাড়াতাড়ি বলিল‌, ‘না না‌, তদন্ত আপনি করবেন। আমার পরামর্শ যদি দরকার হয় আমি সাধ্যমত সাহায্য করব—এর বেশি কিছু নয়।’

রতিকান্ত বলিল‌, ‘ধন্যবাদ। আপনার সাহায্য পাওয়া তো ভাগ্যের কথা।–আচ্ছা স্যার‌, আমি এবার যাই‌, লাশের ব্যবস্থা করতে হবে।’ স্যালুট করিয়া রতিকান্ত চলিয়া গেল।

আমরাও উঠিলাম। এখানে বসিয়া থাকিয়া আর লাভ নাই। ডাক্তার পালিত ইতস্তত করিয়া বলিলেন‌, ‘আমি শকুন্তলাকে একবার দেখে যাই। অবশ্য‌, তার কাছে মিস মান্না আছেন—’

এই সময় বাড়ির ভিতর দিক হইতে একটি মহিলা প্রবেশ করিলেন। দীর্ঘাঙ্গী‌, আঁট-সাঁট শাড়ি পরা, চোখে চশমা, বয়স চল্লিশের কাছাকাছি, ভাবভঙ্গীতে চরিত্রের দৃঢ়তা পরিস্ফুট। তাঁহাকে দেখিয়া ডাক্তার পালিত সেই দিকে অগ্রসর হইয়া গেলেন। দুইজনে নিম্ন স্বরে কথা হইতে লাগিল।

ব্যোমকেশ পাণ্ডেজির পানে চাহিয়া ভ্রূ তুলিল‌, পাণ্ডেজি হ্রস্বকণ্ঠে বলিলেন‌, ‘মিস মান্না।’

মিস মান্না কিছুক্ষণ কথা বলিয়া আবার ভিতর দিকে চলিয়া গেলেন‌, ডাক্তার পালিত আমাদের কাছে ফিরিয়া আসিলেন। দেখিলাম তাঁহার কপালে গভীর ভ্রূকুটি।

পাণ্ডেজি বলিলেন‌, ‘নতুন খবর কিছু আছে নাকি?’

ডাক্তার বলিলেন‌, ‘খবর আছে‌, কিন্তু নতুন নয়। কাল রাত্রেই সন্দেহ করেছিলাম।’

‘কি সন্দেহ করেছিলেন?’

ক্ষণেক নীরব থাকিয়া ডাক্তার বলিলেন‌, ‘শকুন্তলা অন্তঃসত্ত্বা।’

বাড়ি হইতে বাহির হইয়া ফটকের দিকে যাইতে যাইতে গত রাত্রির কথা মনে পড়িল। ডাক্তার পালিতের উদ্বিগ্ন অনুসন্ধিৎসু চক্ষু শকুন্তলাকে অনুসরণ করিয়াছিল। তিনি অভিজ্ঞ ডাক্তার‌, অন্যের কাছে যাহা লক্ষণীয় নয়‌, তিনি তাহা লক্ষ্য করিয়াছিলেন। কিন্তু তাঁহার চোখে উদ্বেগ ও সংশয়ের ছায়া দেখিলাম কেন? কিসের উদ্বেগ?

ফটকের বাহিরে আসিয়া ডাক্তার নিজের মোটরে উঠিবার উপক্রম করলেন‌, তারপর কি ভাবিয়া আমাদের কাছে ফিরিয়া আসিয়া পাণ্ডেজিকে বলিলেন, ‘আমার হাতেই দীপনারায়ণবাবুর মৃত্যু হয়েছে। আমাকে যদি আপনারা অ্যারেস্ট করতে চান আমার কিছু বলবার নেই। এখন আমি রুগী দেখতে চললাম। যখনই তলব করবেন থানায় হাজির হব।’

পাণ্ডেজি কিছু বলিলেন না‌, কেবল একটু হাসিলেন। ডাক্তার নড় করিয়া মোটরে উঠিলেন এবং মোটর হাঁকাইয়া প্রস্থান করিলেন।

পাণ্ডেজি হাতের ঘড়ি দেখিয়া বলিলেন‌, ‘এখনও সাড়ে দশটা বাজেনি। চলুন আমার বাসায়।’

আমরা মোটরে উঠিতে যাইতেছি এমন সময় আর একটি মোটর আসিয়া থামিল। পুরানো হাড়-নড়বড়ে মরিস গাড়ি‌, তাহা হইতে অবতরণ করিল নবীন ডাক্তার জগন্নাথ প্রসাদ। আমাদের দেখিয়া সে নাক-ঝাড়ার শব্দ করিল‌, তারপর পাণ্ডেজির দিকে ভূভঙ্গ করিয়া বলিল‌, ‘সকালবেলা আপনি এখানে?’

জগন্নাথকে দেখিয়া পাণ্ডেজির মুখ গম্ভীর হইয়ছিল‌, তিনি পালটা প্রশ্ন করিলেন‌, ‘আপনি এখানে?’

জগন্নাথ হাল্কা সুরে বলিল‌, ‘এদিক দিয়ে রুগী দেখতে যাচ্ছিলাম‌, ভাবলাম দীপনারায়ণজিকে দেখে যাই। কেমন আছেন তিনি?’

পাণ্ডেজি হিম-কঠিন কণ্ঠে বলিলেন‌, ‘কেমন আছেন তিনি তা আপনি ভালভাবেই জানেন। ন্যাকামি করবার দরকার কি?’

ক্ষণেকের জন্য জগন্নাথ ডাক্তার থতিমত খাইয়া গেল‌, তারপর অসভের মত দাঁত বাহির করিয়া বলিল‌, ‘তাহলে যা শুনেছি তা সত্যি-পান্নালাল পালিত দীপবাবুকে ইনজেকশন দিয়ে মেরেছে।’

পাণ্ডেজি অতি কষ্টে ধৈর্য রক্ষা করিয়া ধীর স্বরে কহিলেন‌, ‘দীপনারায়ণবাবু মারা গেছেন। কী করে মারা গেছেন তা আপনার জানিবার দরকার নেই‌, আপনি এ বাড়ির ডাক্তার নন। এ বাড়ি এখন পুলিসের দখলে‌, আপনি ইন্সপেক্টর রতিকান্ত চৌধুরীর অনুমতি না নিয়ে ভিতরে ঢোকবার চেষ্টা করবেন না।’

জগন্নাথ একবার আমাদের দিকে ধৃষ্ট নেত্রপাত করিল‌, বলিল‌, ‘আপনিও দেখছি বাঙালীদের দলে ভিড়েছেন। তা ভিড়ুন‌, কিন্তু অসুখে পড়লে বাঙালী ডাক্তারের কাছে যাবেন না। দীপবাবুর দৃষ্টান্তটা মনে রাখবেন।’

পাণ্ডেজি উত্তর দিবার আগেই জগন্নাথ নিজের মোটরে গিয়া উঠিল এবং ঝড়ঝড় শব্দ করিতে করিতে প্রস্থান করিল।

পাণ্ডেজিকে আগে কখনও রাগিতে দেখি নাই‌, এখন দেখিলাম তাঁহার গৌরবর্ণ মুখ রাগে রক্তাভ হইয়া উঠিয়াছে। তিনি গলার মধ্যে একটা অবরুদ্ধ শব্দ করিয়া গাড়িতে উঠিলেন। আমরাও উঠিলাম।

মিনিট দিশেকের মধ্যে পাণ্ডেজির বাসায় পৌঁছানো গেল। পাণ্ডেজি চায়ের হুকুম দিলেন‌, কারণ পশ্চিমের শীতে চা-পানের কোনও নির্ধারিত সময় নাই। তারপর আমরা বসিবার ঘরে গিয়া অধিষ্ঠিত হইলাম। পাণ্ডেজি প্রশ্ন করিলেন‌, ‘কী মনে হল?’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘খুনই বটে‌, আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়। যিনি এই কার্যটি করেছেন তিনি অতি কৌশলী ব্যক্তি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে‌, দীপনারায়ণ সিংকে খুন করে কার লাভ?

পাণ্ডেজি বলিলেন‌, ‘লাভ একমাত্র দেবনারায়ণের। দীপনারায়ণ অপুত্বক মারা গেছেন‌, সুতরাং সব সম্পত্তিই এখন তার।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘অপুত্বক কিনা এখনও ঠিক বলা যায় না‌, শকুন্তলা দেবীর ছেলে হতে পারে। কিন্তু দেবনারায়ণ হয়তো খবরটা জানত না।’

পাণ্ডেজি বলিলেন‌, ‘না জানাই সম্ভব। মৃত্যুর পূর্বে কেবল দীপনারায়ণ সিং বোধহয় খবরটা জানতে পেরেছিলেন।’

ব্যোমকেশ মাথা নাড়িয়া বলিল‌, ‘তিনি জানতে পারলে কি চুপ করে থাকতেন? যাহোক‌, ধরা যাক তিনি জানতেন না‌, শকুন্তলা স্বামীকে বলেননি। তাহলে কথাটা দাঁড়াচ্ছে কী? দেবনারায়ণ সমস্ত সম্পত্তির লোভে খুড়োকে খুন করিয়েছে। নিজের হাতে এ কাজ করেনি‌, করবার মত বুদ্ধি তার নেই।’

পাণ্ডেজি বলিলেন‌, ‘কাল রাত্রি সওয়া সাতটার সময় আমরা যখন দীপনারায়ণের বাড়িতে গিয়েছি তখন দেবনারায়ণ বাড়িতেই ছিল।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘অত বড় হাতির শরীর নিয়ে সে নিজে ডাক্তারখানায় যায়নি নিশ্চয়। কিন্তু অন্য কেউ যেতে পারে‌, কর্তার ইচ্ছায় কর্ম। তার মোসাহেবরা

চা আসিল। ব্যোমকেশ পেয়ালায় একটি ক্ষুদ্র চুমুক দিয়া সিগারেট ধরাইল‌, কতকটা মানসিক জল্পনার সুরে বলিল‌, ‘কিন্তু দেবনারায়ণ যদি খুড়োর গঙ্গাযাত্ৰা না করিয়ে থাকে‌, তাহলে আর কে করতে পারে? কার লাভ?’

পাণ্ডেজি বলিলেন‌, ‘আর কারুর লাভ আছে বলে তো মনে হয় না। তবে ওই ব্যাটা ঘোড়া জগন্নাথের অসাধ্য কাজ নেই। বাঙালী ডাক্তারদের অপদস্থ করবার জন্যে। ওরা সব পারে।’

ব্যোমকেশ হাসিল‌, ‘ঘোড়া জগন্নাথের ওপর আপনি ভীষণ চটে গেছেন। ওরা সব কুঁচো-প্যাঁচা‌, খুন করার সাহস ওদের নেই। যে খুন করেছে তার চরিত্র অন্য রকম; সে মহা দুঃসাহসী অথচ কুটবুদ্ধি‌, শিক্ষিত অথচ নৃশংস; বিজ্ঞান জানে‌, ডাক্তারি বিদ্যেও আছে—’

পাণ্ডেজি বলিলেন‌, ‘ঘোড়া জগন্নাথের সঙ্গে আপনার বর্ণনা খাসা মিলে যাচ্ছে।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘ঘোড়া জগন্নাথের মোটিভ খুব জোরালো নয়। অবশ্য তার যদি অন্য কোনও মোটিভ থাকে তাহলে আলাদা কথা। আচ্ছা‌, একটা কথা জিগ্যেস করি কিছু মনে করবেন না। শকুন্তলা দেবী সুন্দরী এবং আধুনিকা‌, পাটনা শহরে তাঁর অনুরাগী এডমায়ারার নিশ্চয় আছে?’

পাণ্ডেজি বলিলেন‌, ‘তা আছে। শুনেছি রোজ সন্ধ্যেবেলা দু’চারজন পয়সাওয়ালা আধুনিক ছোকরা দীপনারায়ণের বাড়িতে আড্ডা জমাতো। ব্রিজ খেলা‌, চা-কেক খাওয়া‌, হাসি গল্প গান–এই সব চলত। ঘোড়া জগন্নাথ বড়মানুষের সঙ্গে মিশতে ভালবাসে‌, সেও ওদের দলে থাকত। তবে মাস ছয়েক আগে দীপনারায়ণ যখন অসুখে পড়লেন তখন ওদের আড্ডা ভেঙে গেল। দু’এক জন মাঝে মাঝে খোঁজ-খবর নিতে যেত। নর্মদাশঙ্কর—’

‘নর্মদাশঙ্কর কে?’

‘বড়মানুষের অকালকুষ্মাণ্ড ছেলে। এলাহাবাদের লোক। বিহারে জমিদারী আছে। শুধু অকালকুম্মাণ্ড নয়–পাজি। পুলিসের খাতায় নাম আছে। একবার শিকার করতে গিয়ে একটা দেহাতি মেয়েকে নিয়ে লোপাট হয়েছিল। ব্যাপার খুব ঘোরালো হয়ে উঠেছিল‌, তারপর মেয়ের বাপকে টাকাকড়ি দিয়ে মোকদ্দমা ফাঁসিয়ে দিলে–’

‘নর্মদাশঙ্কর দীপনারায়ণ সিং-এর বাড়িতে যাতায়াত করত?’

‘হ্যাঁ‌, নর্মদাশঙ্কর বাইরে খুব চোস্ত কেতা-দুরস্ত লোক‌, চেহারা ভাল‌, মিষ্টি কথা। কিন্তু আসলে পাজির পাঝাড়া।’–পাণ্ডেজি মুখের অরুচি-সূচক একটা ভঙ্গী করিলেন— ‘স্ত্রী-স্বাধীনতা খুবই বাঞ্ছনীয় বস্তু‌, অসুবিধা এই যে ভদ্রবেশী লুচ্চাদের ঠেকিয়ে রাখা যায় না।’

‘হুঁ। শকুন্তলা দেবী কি এদের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠতা করতেন?’

‘তা করতেন। কিন্তু তাঁর সত্যিকার বদনাম কখনও শুনিনি। যারা অতি উচুতে নাগাল পেত না তারা নিজেদের মধ্যে হাসি-মস্কার করত‌, টিটকিরি দিত—এই পর্যন্ত।’

‘ওটা আমাদের স্বভাব—দ্রাক্ষাফল অতি বিস্বাদ ও অমরসে পরিপূর্ণ।’ ব্যোমকেশ চায়ের পেয়ালা নিঃশেষ করিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল–’এখন তাহলে ওঠা যাক। আপনি কি আর ওদিকে যাবেন?’

‘বিকেলবেলা যাব। আপনারাও যদি আসেন–’

‘নিশ্চয় যাব। বাড়ির লোকগুলিকে একটু নেড়ে-চেড়ে দেখা দরকার।’

বৈকাল চারটি বাজিবার পূর্বেই পাণ্ডেজি গাড়ি লইয়া উপস্থিত হইলেন। বলিলেন‌, চলুন‌, একবার থানা হয়ে যাব। হয়তো পোস্ট-মর্টেম রিপোর্ট এসেছে।’

তিনজনে থানায় উপস্থিত হইলাম। শহরের মাঝখানে থানা। রতিকান্ত উপস্থিত ছিল‌, আমাদের সসন্ত্রমে লইয়া গিয়া নিজের অফিস ঘরে বসাইল। বলিল‌, ‘এইমাত্র পোস্ট-মর্টেম রিপোর্ট পেলাম‌, কিউরারি পাওয়া গেছে। মৃত্যুর কারণ সম্বন্ধে কোনও সন্দেহ নেই।’

পাণ্ডেজি রিপোর্টের উপর একবার চোখ বুলাইয়া বলিলেন‌, ‘আর ওষুধ পরীক্ষার রিপোর্ট?’

‘সেটা এখনও আসেনি। আমি জরুরী তাগাদা দিয়ে এসেছি। বোধহয় আজ রাত্রেই পাওয়া যাবে। ওষুধের রিপোর্ট না পাওয়া পর্যন্ত ভালভাবে তদন্ত আরম্ভ করা যাচ্ছে না। তবে লোক লাগিয়েছি, কিউরারি নিয়ে কেউ চোরাকারবার করে কিনা খবর নিতে।‘

পাণ্ডেজি ঘাড় নাড়িয়া বলিলেন‌, ‘ঠিক করেছ। যে চোরটার কাছে কিউরারির শিশি পাওয়া গিয়েছিল। সে তো এখন জেলেই আছে। তাকে দম দিলে হয়তো খবর পাওয়া যেতে পারে কারা কিউরারির চোরাকারবার করে।‘

‘আজ্ঞে হ্যাঁ। খবর নিয়েছি সে কয়েদীটো এখন পাটনা জেলে নেই‌, বক্সার জেলে আছে। তার সঙ্গে মুলাকাতের ব্যবস্থা করছি। ইতিধ্যে ডাক্তার পালিতের কম্পাউণ্ডারকে জেরা করেছি।’

‘কিছু পেলে?’

‘কিছু না।–ওদিকে দীপনারায়ণজির বাড়ির সকলকে বাড়িতেই থাকতে বলেছি। বাইরের লোকের বাড়িতে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি‌, কেবল ম্যানেজার গঙ্গাধর আর তার ছেলে লীলাধর ছাড়া।’

পাণ্ডেজি বলিলেন‌, ‘আমরা এখন সেখানেই যাচ্ছি। তুমি আসবে নাকি?’

রতিকান্ত একটু ইতস্তত করিয়া বলিল‌, ‘আপনারা এগোন‌, আমি একটা জরুরী কাজ সেরে যাচ্ছি।’ তারপর হাসিয়া ব্যোমকেশকে বলিল,–’আপনি কিছু ঠাহর করতে পারলেন?’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘উহু। কিন্তু মনে হচ্ছে বাড়ির কাউকেই সন্দেহ থেকে বাদ দেওয়া যায় না।‘

রতিকান্ত বলিল‌, ‘শুধু বাড়ির লোক নয় স্টেটের কর্মচারীদেরও বাদ দেওয়া যায় না। সকলকেই অনুবীক্ষণ যন্ত্রের তলায় ফেলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে।’

ব্যোমকেশ মৃদুস্বরে বলিল‌, ‘ডাক্তার পালিতকে আপনার কেমন মনে হয়?’

রতিকান্ত চকিতে ব্যোমকেশের পানে চাহিল‌, ‘ডাক্তার পালিত! কিন্তু তিনি-যদি তাঁর কোনও মোটিভ থাকত‌, তিনি নিজের হাতে একাজ করতেন কি?’

ব্যোমকেশ মুচকি হাসিল‌, ‘তিনি নিজের হাতে একাজ করেছেন বলেই তাঁর ওপর সন্দেহ কম হবে।—’

মোটরে ফিরিয়া গিয়া বসিলাম। ব্যোমকেশ জিজ্ঞাসা করিল, ‘ডাক্তার পালিতের ডিস্‌পেনসারি কি কাছেই?’

পাণ্ডেজি বলিলেন‌, ‘এই তো খানিক দূর‌, রাস্তাতেই পড়বে। যাবেন নাকি সেখানে?’

‘চলুন‌, আসল অকুস্থলটা দেখে যাওয়া যাক।’

দুতিন মিনিটের মধ্যে ডাক্তার পালিতের ডাক্তারখানায় পৌঁছিলাম। এটিও বড় রাস্তার উপর‌, চারিদিকে দোকানপাট‌, বসতবাড়ি নেই। শীতের রাত্রে আটটার মধ্যে দোকানপাট বন্ধ হইয়া যায়‌, তখন চোরের তালা ভাঙিয়া ভিতরে প্রবেশ করিবার কোনই অসুবিধা নাই।

ডাক্তারখানাটি নিতান্তাই মামুলী। সামনে পিছনে দু’টি ঘর‌, সামনের ঘরে রুগী আসিয়া বসে‌, ভিতরের ঘরে ডাক্তার বসেন। কম্পাউণ্ডার ভিতরের ঘরেই ঔষধ তৈয়ার করে।

কম্পাউণ্ডার ও ডাক্তার উপস্থিত ছিলেন‌, বাহিরের ঘরে কয়েকটি রুগীও বসিয়াছিল। আমরা গিয়া দেখিলাম‌, ভিতরের ঘরে ডাক্তার একটি রুগীকে লম্বা সরু টেবিলের উপর শোয়াইয়া তাহার পেট টিপিতেছেন। ঘাড় ফিরাইয়া আমাদের দেখিয়া একটু হাসিলেন‌, ‘কী‌, অ্যারেস্ট করতে এসেছেন নাকি?’

পাণ্ডেজি বলিলেন‌, ‘না না‌, দেখতে এলাম।’

‘বসুন।’

আমরা ডাক্তারের টেবিল ঘিরিয়া বসিলাম। ডাক্তার রুগীর পরীক্ষা শেষ করিয়া টেবিলে আসিয়া বসিলেন‌, ব্যবস্থাপত্ব লিখিয়া কম্পাউণ্ডারকে দিলেন। ইতিমধ্যে আমরা কম্পাউণ্ডারটিকে দেখিলাম। রোগা গাল-বসা বিহারী ছোকরা‌, নাম যদিও খুবলাল‌, কিন্তু গায়ের রঙ খুব কালো। ইউনিফর্ম পরা পাণ্ডেজিকে দেখিয়া তাহার মুখের কৃষ্ণতা আরও গাঢ় হইয়াছে।

ডাক্তার বলিলেন‌, ‘কি দেখবেন বলুন।’

পাণ্ডেজি ব্যোমকেশের দিকে চাহিলেন‌, ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘যে তালা ভেঙে চোর ঢুকেছিল সেটা কোথায়?’

ডাক্তার বলিলেন‌, ‘খুবলাল‌, তালা নিয়ে এস।’

খুবলাল ঘরের একপ্রান্তে শিশি-বোতল-ভরা শেলফের সম্মুখে দাঁড়াইয়া ঔষধ তৈয়ার করিতেছিল‌, আমরা তাহার পশ্চাদভাগ দেখিতে পাইতেছিলাম। কিন্তু মুখ দেখিতে না পাইলেও সে যে উৎকৰ্ণ হইয়া আমাদের কথা শুনিতেছে তাহা তাহার দেহের ভঙ্গী হইতে ধরা যাইতেছিল। ডাক্তারের আদেশে সে আসিয়া কম্পিত-হস্তে তালাটা টেবিলের উপর রাখিয়া আবার ফিরিয়া গিয়া ঔষধ তৈয়ার করিতে লাগিল।

তালাটা সস্তা এবং মামুলী‌, তাহাতে একটা লোহার শিক চুকাইয়া মোচড় দিলে তৎক্ষণাৎ ভাঙিয়া যাইবে‌, বেশি গায়ের জোরের দরকার নাই। হইয়াছেও তাই‌, তালার কিন্তুজোটা ছিঁড়িয়া বাহির হইয়া গিয়াছে। ব্যোমকেশ তালা ঘুরাইয়া ফিরাইয়া দেখিল‌, তারপর রাখিয়া দিল।

‘আপনার দেরাজের চাবিও তো ভেঙেছে।’

‘দেরাজ ভাঙবার দরকার হয়নি‌, ওটা খোলাই থাকে। চাবি অনেকদিন হারিয়ে গেছে।’

পালিত দেরাজ খুলিয়া দেখাইলেন‌, তাহাতে দুই চারিটা কাগজপত্র ছাড়া কিছুই নাই। পালিত বলিলেন‌, ‘চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে। সাবধান হয়েছি‌, আজ থেকে একজন লোক রাত্তিরে এখানে শোবে। পুরনো ওষুধগুলো সব ফেলে দিয়ে নতুন ওষুধ আনিয়েছি। বলা তো যায় না।’

পাণ্ডেজি অনুমোদনসূচক ঘাড় নাড়িলেন। ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘আপনার খুবলালকে দু’ একটা প্রশ্ন করতে পারি?’

ডাক্তার বলিলেন‌, ‘করুন না। ওর অবশ্য একবার হয়ে গেছে‌, ইন্সপেক্টর চৌধুরী এক দফা জেরা করেছেন। খুবলাল!’

খুবলাল নিকটে আসিয়া দাঁড়াইল। অধর লেহন করিয়া ভাঙা গলায় বলিল‌, ‘হুজুর‌, আমার কোনও কসুর নেই।’

ব্যোমকেশ আশ্বাসের সুরে বলিল‌, ‘তুমি ভয় পাচ্ছ কেন? যদি দোষ না করে থাকো ভয় কিসের? কেউ তোমার অনিষ্ট করবে না।’

খুবলাল বলিল‌, ‘জি‌, আমি গরীব মানুষব্যোমকেশ বলিল‌, ‘তুমি কত টাকা মাইনে পাও?’ খুবলাল ডাক্তারের দিকে চোরা চাহনি নিক্ষেপ করিয়া বলিল‌, ‘জি‌, ষাট টাকা। আর দশ টাকা ভাতা।’

‘উপরি কিছু নেই?

খুবলাল সভয়ে চক্ষু বিস্ফারিত করিল‌, ‘জি-না।’

‘তোমার বাড়িতে কে কে আছে?’

‘স্ত্রী আর একটা বাচ্ছা।’

‘কত টাকা বাড়িভাড়া দাও?’

‘সাড়ে বারো টাকা।’

‘সত্তর টাকায় তোমার চলে?’

খুবলাল আবার ডাক্তারের পানে গুপ্তদৃষ্টি নিক্ষেপ করিল–’পেট চলে যায় হুজুর। ডাক্তারবাবু বলেছেন জানুয়ারি মাস থেকে পাঁচ টাকা বাড়িয়ে দেবেন।’

ব্যোমকেশ ডাক্তারের পানে চাহিল‌, ডাক্তার ঘাড় নাড়িলেন। ব্যোমকেশ তখন বলিল‌, ‘আচ্ছা‌, ও-কথা থাক। কাল রাত্রে কাঁটার সময় তুমি ডাক্তারখানা বন্ধ করেছিলে?’

‘জি‌, ঘড়ি দেখিনি। ডাক্তারবাবু রুগী দেখে ফিরে এলেন‌, ব্যাগ রেখে তখনি বেরিয়ে গেলেন। তখন বোধহয় সাতটা। তার পাঁচ-দশ মিনিট পরে আমিও ডাক্তারখানা বন্ধ করে বাড়ি Ç।।?

‘তখন এখানে কোনও রুগী ছিল?

না হুজুর ‘

‘আচ্ছা‌, কাল রাত্রে দেরাজে কত টাকা পয়সা ছিল তুমি জানো?’

খুবলালের মুখে আবার আশঙ্কার ছায়া পড়িল। সে বলিল‌, ‘গুনিনি হুজুর‌, বোধহয় তিন টাকা কয়েক আনা ছিল। ডাক্তারবাবুর অনুপস্থিতিতে কয়েকটা পুরনো প্রেসক্রিপশন নিয়ে রুগী এসেছিল‌, তাদের ওষুধ দিয়েছিলাম আর পয়সা নিয়ে দেরাজে রেখেছিলাম।’

‘দোর বেশ ভাল করে বন্ধ করেছিলে?’

‘জি‌, হাঁ।’

‘রাত্রে চাবি তোমার কাছে থাকে?’

‘জি‌, হাঁ। সকালে আমি আগে এসে ডাক্তারখানা খুলি।’

‘তুমি ডাক্তার জগন্নাথ প্রসাদকে চেনো?’

খুবলাল থতমত খাইয়া গেল‌, শেষে ক্ষীণকণ্ঠে বলিল‌, ‘জি।’

ব্যোমকেশ কিছুক্ষণ ভ্রূ তুলিয়া তাহার পানে চাহিয়া রহিল‌, ‘জগন্নাথের সঙ্গে তোমার ঘনিষ্ঠতা ছিল?’

গুরুকুল হইয়া বলিল, ‘জি‌, না। আমি গরীব মানুষ‌, তিনি ডাক্তার। তবে—তবে—’

‘তবে কি?’

‘তিনি কিছুদিন আগে আমাকে তাঁর বাসায় ডেকে পাঠিয়েছিলেন–’

‘তারপর?’

‘তিনি-তিনি আমাকে এখানকার চাকরি ছেড়ে দিতে বললেন।’

ডাক্তার বিস্মিতভাবে বলিলেন‌, ‘এটা তো নতুন শুনছি। —তুমি আমাকে বলনি কেন?’

খুবলাল অপরাধীর মত চুপ করিয়া রহিল।

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘তা তুমি চাকরি ছাড়লে না কেন? জগন্নাথ ডাক্তার তোমাকে অন্য চাকরি দিত।’‌,

খুবলাল বলিল‌, ‘তিনি আমাকে অন্য চাকরি দেবেন বলেননি‌, খালি এ চাকরি ছেড়ে দেবার কথা বলেছিলেন। আমি রাজী হলাম না‌, তখন আমাকে ধমক-চমক করলেন‌, বললেন—চাকরি না ছাড়লে বিপদে পড়বে।’

‘তবু তুমি চাকরি ছাড়লে না?’

খুবলাল ছলছল চক্ষে অবরুদ্ধ স্বরে বলিল‌, ‘হুজুর‌, ডাক্তার পালিত আমার মা-বাপ‌, উনি যতদিন আমায় রাখবেন ততদিন আমি ওঁকে ছাড়ব না। ওঁর মত দয়ালু লোক—’ খুবলাল চোখ মুছিতে লাগিল। ব্যোমকেশ সদয় কষ্ঠে বলিল‌, ‘আচ্ছা‌, এবার তুমি যাও‌, কাজ কর গিয়ে।’

আমরা উঠিলাম। ডাক্তার পালিত আমাদের সঙ্গে মোটর পর্যন্ত আসিলেন‌, বলিতে বলিতে আসিলেন‌, ‘খুবলাল ছেলেটা ভাল। তবে-মাঝে মাঝে দু’চার পয়সা চুরি করে‌, দুটো ভিটামিনের বড়ি কি দুপুরিয়া কুইনিন পকেটে পুরে বাড়ি নিয়ে যায়; ওটা ধর্তব্য নয়‌, সব কম্পাউণ্ডারই করে। এসব গুরুতর ব্যাপারে ও আছে বলে মনে হয় না।’

ব্যোমকেশ গাড়িতে বসিয়া হঠাৎ গলা বাড়াইয়া বলিল‌, ‘ডাক্তারবাবু্‌, শকুন্তলা দেবী ক’মাস অন্তঃসত্ত্বা?’

ডাক্তার পালিত পূর্ণদৃষ্টিতে ব্যোমকেশের পানে চাহিয়া বলিলেন‌, ‘তিন মোস।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘আপনি খুবই আশ্চর্য হয়েছেন।’

‘আশ্চর্য হবারই কথা।’–বলিয়া তিনি ফিরিয়া চলিলেন।

ডাক্তারখানা হইতে দীপনারায়ণ সিং-এর বাড়ি মোটরে পাঁচ মিনিটের রাস্তা। এই পাঁচ মিনিট আমাদের মধ্যে একটিও কথা হইল না। সকলেই অন্তনিবিষ্ট হইয়া রহিলাম।

ফটকের বাহিরে গাড়ি থামাইয়া অবতরণ করিলাম। দেউড়িতে টুলের উপর একটা কনস্টেবল বসিয়া ছিল‌, তড়াক করিয়া উঠিয়া পাণ্ডেজিকে স্যালুট করিল।

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘আসুন‌, কম্পাউণ্ডের বাইরেটা ঘুরে দেখা যাক।’ পূর্বে বলিয়াছি বাড়ির চারিদিকে জেলখানার মত উচু পাঁচল। আমরা পাঁচিলে ধার ঘেষিয়া একবার প্রদক্ষিণ করিলাম। সামনের দিকে সদর রাস্তা; দুই পাশে ও পিছনে আম-কাঁঠালের বাগান। এই অঞ্চলে আম-কাঁঠালের বাগানই বেশি এবং সব বাগানই দীপনারায়ণের সম্পত্তি। পূর্বকালে এদিকে বোধহয় লোকবসতি ছিল‌, কিন্তু দীপনারায়ণের পূর্বপুরুষেরা সমস্ত পাড়াটা ক্রমে ক্বমে আত্মসাৎ করিয়া ফলের বাগানে পরিণত করিয়াছেন। পাড়ায় এখন একমাত্র বাড়ি দীপনারায়ণের বাড়ি। তবু আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত সুখ-সুবিধার ত্রুটি নাই; ইলেকট্রিক ও টেলিফোনের তার পাঁচিল ডিঙাইয়া বাড়িতে প্রবেশ করিয়াছে। এমন কি একটি ডাক-বাক্স লাল কুতা-পরা সিপাহীর মত পাঁচিলের এক কোণে দাঁড়াইয়া পাহারা দিতেছে। চিঠিপত্র ডাকে দিতে হইলে বেশি দূরে যাইতে হইবে না।

প্রাচীর প্রদক্ষিণ করিয়া ব্যোমকেশ কী দেখিল জানি না; দ্রষ্টব্য বস্তু কিছুই নাই। পাশে ও পিছনে আম-কাঁঠালের গাছ দেয়াল পর্যন্ত ভিড় করিয়া আসিয়াছে, দেয়াল ঘেঁষিয়া মাঠের উপর একটি পায়ে-হাঁটা সরু রাস্তা। ডাক-বাক্সের দিক হইতে পাশের দিকে যাইলে একটি খিড়কি দরজা পড়ে‌, বোধকরি চাকর-বাকিরদের যাতায়াতের পথ। এটি ছাড়া পাশের বা পিছনের দেয়ালে যাতায়াতের অন্য পথ নাই।

খিড়কি দরজা খোলা ছিল‌, আমরা সেই পথেই ভিতরে প্রবেশ করিলাম। ব্যোমকেশ প্রবেশ করিবার সময় দরজাটিকে একবার ভাল করিয়া দেখিয়া লইল। সেকেল ধরনের খর্বকায় মজবুত কবাট‌, কবাটের পুরু তক্তার উপর মোটা মোটা পেরেক দিয়া গুল বসানো; কিন্তু তা সত্ত্বেও কবাট দু’টি নড়বড়ে হইয়া গিয়াছে। কাবাটের মাথার কাছে শিকল বুলিতেছে‌, বোধহয় রাত্রিকালে শিকল লাগাইয়া দ্বার বন্ধ করা হয়।

খিড়কি দরজা সম্বন্ধে ব্যোমকেশের অনুসন্ধিৎসা একটু আশ্চর্য মনে হইল; তাহার মন কোন পথে চলিয়াছে ঠিক ধরিতে পারিতেছি না। যাহোক‌, ভিতরে প্রবেশ করিয়া পাশেই পাঁচিলের লাগীও একসারি ঘর চোখে পড়িল। ঘরগুলি দপ্তরখানা‌, জমিদারীর কেরানিরা এখানে বসিয়া সেরেস্তার কাজকর্ম করে। আমাদের দেখিতে পাইয়া একটি লোক সেখান হইতে বাহির হইয়া আসিলেন। লোকটিকে কাল রাত্রে দেখিয়াছি‌, মাথায় পাগড়ি-বাঁধা ম্যানেজার গঙ্গাধর বংশী।

তিনি ত্বরিতে অগ্রসর হইয়া আসিলেন‌, খিড়কি দরজার কাছে দাঁড়াইয়া আলাপ হইল। পাণ্ডেজি বলিলেন‌, ‘জায়গাটা ঘুরে ফিরে দেখাচ্ছি।’

ম্যানেজারের অভিজ্ঞ চোখে প্রশ্ন জাগিয়া উঠিলেও তিনি মুখে বলিলেন‌, ‘বেশ তো‌, বেশ তো‌, আসুন না। আমি দেখাচ্ছি।’

ব্যোমকেশ খিড়কি দরজার দিকে আঙুল দেখাইয়া জিজ্ঞাসা করিল‌, ‘আচ্ছা‌, এ দরজাটা কি সব সময়েই খোলা থাকে?’

ম্যানেজার একটু অপ্রস্তুত হইয়া পড়িলেন‌, ঘাড় চুলকাইয়া বলিলেন‌, ‘এঁ—ঠিক বলতে পারছি না‌, বোধহয় রাত্রে বন্ধ থাকে। কেন বলুন দেখি?’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘নিছক কৌতুহল।’



এই সময় একজন ভৃত্যকে বাড়ির পিছন দিকে দেখা গেল। ম্যানেজার হাত তুলিয়া তাহাকে ডাকিলেন। ভূত্য আসিলে বলিলেন‌, ‘বিষুণ‌, রাত্রে খিড়কি দরজা বন্ধ থাকে?’

বিষুণও ঘাড় চুলকাইল‌, ‘তা তো ঠিক জানি না হুজুর। বোধহয় শিকল তোলা থাকে। চৌকিদার বলতে পারবে।’

‘ডাক চৌকিদারকে।’ বিষুণ চৌকিদারকে ডাকিতে গেল।

ব্যোমকেশ প্রশ্ন করিল‌, ‘রাত্রে চৌকিদার বাড়ি পাহারা দেয়?’

ম্যানেজার বলিলেন‌, ‘আজ্ঞে হ্যাঁ। দেউড়িতে দারোয়ান থাকে‌, আর দু’জন চৌকিদার পালা করে পাহারা দেয়।’

অল্পক্ষণ মধ্যে বিষুণ একটি চৌকিদারকে আনিয়া উপস্থিত করিল। চৌকিদার দেখিতে তালপাতার সেপাই‌, কিন্তু বিপুল গোঁফ ও গালপোট্টার দ্বারা কঙ্কালসার মুখে চৌকিদার সুলভ ভীষণতা আরোপ করিবার চেষ্টা আছে‌, চোখ দু’টি রাত্ৰিজাগরণ কিম্বা গঞ্জিকার প্রসাদে করমচার মত লাল। ম্যানেজার তাহাকে প্রশ্ন করিলেন‌, ‘গজাধর সিং‌, রাত্রে খিড়কির দরজা খোলা থাকে‌, না বন্ধ থাকে?’

গজাধর ভাঙা গলায় বলিল‌, ‘ধমন্বিতার‌, কখনও খোলা থাকে‌, কখনও জিঞ্জির লাগানো থাকে।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘তালা লাগানো থাকে না?’

গজাধর বলিল‌, ‘না। হুজুর‌, অনেকদিন আগে তালা ছিল‌, এখন ভুৎলা গিয়া। কিন্তু তাতে ভয়ের কিছু নেই‌, আমরা দুভাই এমন পাহার দিই যে‌, একটা চুহা পর্যন্ত হাতায় ঢুকতে পারে না।’

‘বটে! কি ভাবে পাহারা দাও?’

‘রাত্রি দশটা থেকে পাহারা শুরু হয় হুজুর। দশটা থেকে দুটো পর্যন্ত একজন পাহারা দিই‌, আর দুটো থেকে ছটা পর্যন্ত আর একজন। দেউড়িতে ঘণ্টা বাজে আর আমরা উঠে একবার চক্কর দিই‌, আবার ঘণ্টা বাজে আবার চক্কর দিই। এইভাবে সারা রাত চক্কর লাগাই‌, ধর্মাবতার।’

‘তাহলে ঘণ্টা বাজার মাঝখানে কেউ যদি ভিতর থেকে বাইরে যায়। কিম্বা বাইরে থেকে ভিতরে আসে তোমরা জানতে পার না?’

‘বাইরে থেকে কে আসবে হুজুর‌, কার ঘাড়ে দশটা মাথা?’

‘বুঝেছি। তুমি এখন যেতে পার।’

গজাধর প্রস্থান করিলে ম্যানেজার গঙ্গাধর বংশী সাফাইয়ের সুরে বলিলেন‌, ‘এ বাড়িতে খুব কড়া পাহারার দরকার হয় না; চোর-ছ্যাচাড়েরা জানে। এখানে দারোয়ান চৌকিদার আছে‌, ধরা পড়লে আর রক্ষে নেই। তাই তারা এদিকে আসে না। আমি আঠারো বছর এই এস্টেটে আছি‌, কখনো একটা কুটো চুরি যায়নি।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘আমি চুরির কথা ভাবছিলাম না। যাহোক‌, আসুন এবার ওদিকটা দেখা যাক।’

অতঃপর গঙ্গাধর বংশী আমাদের লইয়া চারিদিক ঘুরিয়া দেখাইলেন। দেখানোর ফাঁকে ফাঁকে মৃত প্রভুর উদ্দেশে শোক প্রকাশ করিলেন; প্রশ্ন না করিয়া মৃত্যুর কারণ জানিবার চেষ্টা করিলেন। কিন্তু আমরা তাঁহার কৌতুহলের প্রশ্রয় দিলাম না‌, গভীর মনঃসংযোগে সরেজমিনে তদারক করিলাম।

বাড়ির সামনের দিকে ফুলের বাগান‌, পিছনে শাকসব্জীর ক্ষেত। বাড়িটি দ্বিতল এবং চক-মেলানো‌, প্রায় সাত-আট কাঠা জমির উপর প্রতিষ্ঠিত। বাড়ির দুই পাশে দ্বিতলে উঠিবার দুইটি লোহার পাকানো সিঁড়ি আছে। এই পথে মেথর ঝাড়ুদার উপরতলা পরিষ্কার রাখে‌, কারণ পাটনায় এখনও ড্রেনের প্রতিষ্ঠা হয় নাই।

পরিদর্শন শেষ করিয়া সদরে ফিরিয়া আসিয়া দেখিলাম ইতিমধ্যে ইন্সপেক্টর রতিকান্ত আসিয়া উপস্থিত হইয়াছে। ব্যোমকেশের পানে একটু হাসিয়া প্রশ্ন করিল‌, ‘বাগানে কী দেখছিলেন? কিছু পেলেন নাকি?’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘বিশেষ কিছু না। কেবল এইটুকু জানা গেল যে রাত্তিরে বাড়ির যে-কেউ খিড়কির দরজা খুলে বাইরের লোককে ভিতরে আনতে পারে।’

রতিকান্ত কিছুক্ষণ চাহিয়া রহিল‌, ‘কিন্তু–বর্তমান ব্যাপারের সঙ্গে তার কোনও সম্পর্ক আছে কি?’

‘থাকতেও পারে আবার নাও থাকতে পারে। চলুন‌, এবার বাড়ির লোকগুলির সঙ্গে আলাপ করা যাক—’

বাড়িতে প্রবেশ করিবার উপক্বম করিতেছি‌, ফট্‌ফটু শব্দে ঘাড় ফিরাইয়া দেখি ফটকের দিক হইতে একটি মোটর বাইক আসিতেছে। আরূঢ় ব্যক্তিটি অপরিচিত; চেহারাটা সুশ্রী‌, বয়সী। আন্দাজ পয়ত্ৰিশ। পরিধানে সাদা ফ্ল্যানেলের প্যান্ট‌, গাঢ় নীল রঙের গরম ক্রিকেট কোট‌, গলায় লাল পশমের মাফলার‌, মাথায় রঙচটা ক্রিকেট ক্যাপ। পুরাদস্তুর খেলোয়াড়ের সাজ‌, দেখিলে মনে হয়। এই মাত্র ক্রিকেটের মাঠ হইতে ফিরিতেছেন।

করিলেন। পাণ্ডেজি ও রতিকাস্তের ললাটে গভীর ভ্রূকুটি দেখিয়া অনুমান করিলাম‌, ইনি যতবড় খেলোয়াড়ই হোন‌, পুলিসের প্রতিভাজন নন। পরীক্ষণেই পাণ্ডেজির সম্ভাষণ শুনিয়া বুঝিতে বাকি রহিল না যে এই ব্যক্তিই কুখ্যাত নারীহরণকারী নর্মদাশঙ্কর।

পাণ্ডেজি বলিলেন‌, নর্মদাশঙ্করবাবু্‌, আপনার এখানে কী দরকার?’

নর্মদাশঙ্কর সবিনয়ে নমস্কার করিয়া বলিল, ‘ক্রিকেটের মাঠে খবর পেলাম দীপনারায়ণবাবু হঠাৎ মারা গেছেন। শুনলাম নাকি স্বাভাবিক মৃত্যু নয়। শুনে আর থাকতে পারলাম না। ছুটে এলাম। কী হয়েছিল‌, মিঃ পাণ্ডে?’

পান্ডেজি নীরস কণ্ঠে বলিলেন‌, ‘মাফ করবেন‌, এ বিষয়ে আপনার সঙ্গে কোন আলোচনা হতে পারে না। কিন্তু আপনার কি দরকার তা তো বললেন না?’

নর্মদাশঙ্কর মুখখানিকে বিষগ্ন করিয়া বলিল‌, ‘দরকার আর কি‌, বন্ধুর বিপদে আপদে খোঁজ-খবর নিতে হয়। শকুন্তলা যে কী দারুণ শোক পেয়েছেন তা তো বুঝতেই পারছি। কাল রাত্রে তাঁকে দেখেছিলাম আনন্দের প্রতিমূর্তি! তখন কে ভেবেছিল যে—তাঁর সঙ্গে একবার দেখা হবে কি?’

‘দেখা করতে চান কেন?’

‘তাঁকে সহানুভূতি জানানো‌, দুটো সত্ত্বনার কথা বলা‌, এছাড়া আর কি? আপনারা নিশ্চয় জানেন শকুন্তলার সঙ্গে আমার যথেষ্ট ঘনিষ্ঠতা আছে।’ শকুন্তলার নামোল্লেখের সঙ্গে সঙ্গে নর্মদাশঙ্করের চোখে যে ঝিলিক খেলিয়া যাইতে লাগিল তাহা কাহারও দৃষ্টি এড়াইল না।

পাণ্ডেজি চাপা বিরক্তির স্বরে বলিলেন‌, ‘মাফ করবেন‌, শকুন্তলা দেবীর সঙ্গে কারুর দেখা সাক্ষাৎ হবে না‌, এখন ওসব লৌকিকতার সময় নয়।–রতিকান্ত‌, ফটকের কনস্টেবলকে বলে দাও‌, আমাদের অনুমতি না নিয়ে যেন কাউকে ভেতরে আসতে না দেয়।’

পাণ্ডেজির ইঙ্গিতটা এতাই স্পষ্ট যে নর্মদাশঙ্করের চোখে আর এক ধরনের ঝিলিক খেলিয়া গেল‌, কুটিল ক্রোধের ঝিলিক। কিন্তু সে বিনীতভাবেই বলিল‌, ‘বেশ‌, আপনারাই তাহলে শকুন্তলাকে আমার সমবেদনা জানিয়ে দেবেন। আচ্ছা‌, আজ চলি। নমস্তে।’

নর্মদাশঙ্করের মোটর বাইক ফট্‌ফট্‌ করিয়া চলিয়া গেল। রতিকান্ত তাহার বিলীয়মান পৃষ্ঠের দিকে বিরাগপূর্ণ নেত্ৰে চাহিয়া গলার মধ্যে বলিল— ‘মিটমিটে শয়তান!’ তারপর ফটকের কনস্টেবলকে হুকুম দিতে গেল।

ব্যোমকেশ ম্যানেজারকে জিজ্ঞাসা করিল‌, ‘কাল রাত্রে নর্মদাশঙ্করবাবু কখন নেমন্তন্ন খেতে এসেছিলেন। আপনি লক্ষ্য করেছিলেন কি?’

ম্যানেজার বলিলেন‌, ‘উনি কখন এসেছিলেন তা ঠিক বলতে পারি না‌, কিন্তু সাড়ে ছাঁটার সময় এসে দেখলাম‌, উনি শকুন্তলা দেবীর সঙ্গে বসে গল্প করছেন। তখনও অন্য কোনও অতিথি আসেননি।’

‘মাফ করবেন‌, আপনি কোথায় থাকেন?’

ম্যানেজার সম্মুখে রাস্তার ওপারে আঙুল দেখাইয়া বলিলেন‌, ‘ওই আমবাগানের মধ্যে একটা বাড়ি আছে‌, এস্টেটের বাড়ি‌, আমি তাতেই থাকি।’

‘আজ্ঞে না। এ তল্লাটে আর বাড়ি নেই।’

‘আচ্ছা‌, আজ সকালে মৃত্যুর পূর্বে দীপনারায়ণবাবুকে আপনি দেখেছিলেন কি?’

ম্যানেজার গঙ্গাধর বংশী ক্ষুব্ধভাবে মাথা নাড়িলেন— ‘আজ্ঞে না‌, ডাক্তারবাবু আমার আগেই এসেছিলেন। রবিবারে সেরেস্তা বন্ধ থাকে‌, আমি একটু দেরি করে আসি। এসে দেখি সব শেষ হয়ে গেছে।’

রতিকান্ত ফিরিয়া আসিলে আমরা সকলে মিলিয়া বাড়িতে প্রবেশ করিলাম। হল-ঘরের মধ্যে ছায়ান্ধকার‌, মানুষ কেহ নাই। আমরা পাঁচজনে প্রবেশ করিয়া পরস্পর মুখের পানে চাহিলাম।

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘ম্যানেজারবাবু্‌, আপনাকে আমরা অনেকক্ষণ আটকে রেখেছি। আপনার নিশ্চয় অন্য কাজ আছে—’

ম্যানেজার মাথা নাড়িয়া বলিলেন‌, ‘আমার আজ কোনই কাজ নেই। আজ রবিবার‌, সেরেস্তা বন্ধ। নেহাৎ অভ্যাসবিশেই এসেছিলাম।’

বোঝা গেল। তিনি আমাদের সঙ্গ ছাড়িবেন না। তিনি গভীর মনঃসংযোগে আমাদের কথা শুনিতেছেন এবং তাহার তাৎপর্য অনুধাবনের চেষ্টা করিতেছেন। তাঁহার চক্ষু দু’টি মধুসঞ্চয়ী ভ্রমরের মত আমাদের মুখের উপর পরিভ্রমণ করিতেছে। কিন্তু তিনি নিজে বাক্যব্যয় করিতেছেন না। গভীর জলের মাছ।

পান্ডেজি ব্যোমকেশের পানে একটি কটাক্ষ নিক্ষেপ করিয়া বলিলেন‌, ‘ভাল কথা বংশীজি‌, আপনার সেরেস্তায় টাকাকড়ির হিসেব সব ঠিক আছে তো? হয়তো আমাদের পরীক্ষা করে দেখবার দরকার হতে পারে।’

বংশীজি তৎক্ষণাৎ বলিলেন‌, ‘সব হিসেব ঠিক আছে‌, আপনারা যখন ইচ্ছে দেখতে পারেন।’ তারপর একটু ইতস্তত করিয়া বলিলেন‌, ‘কেবল একটা হিসেবের চুক্তি হয়নি—’

‘কোন হিসেব?’

ম্যানেজার বলিলেন‌, ‘আট-দশ দিন আগে দীপনারায়ণজি আমাকে ডেকে হুকুম দিয়েছিলেন। ভাক্তার পালিতকে বারো হাজার টাকা দিতে। টাকাটা ডাক্তারবাবুকে দেওয়া হয়েছে কিন্তু রসিদ নেওয়া হয়নি।’

‘রসিদ নেওয়া হয়নি কেন?’

‘ডাক্তারবাবু টাকাটা ধার হিসাবেই চেয়েছিলেন, কিন্তু দীপনারায়ণজি ঠিক করেছিলেন টাকাটা ডাক্তারবাবুকে পুরস্কার দেবেন‌, তাই রসিদ নিতে মানা করেছিলেন।’

‘ও—’ ব্যোমকেশ কিছুক্ষণ ভ্রূ কুঞ্চিত করিয়া নীরব রহিল‌, তারপর রতিকান্তকে বলিল‌, ‘এবার তাহলে বাড়ির সকলকে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করা যাক। তাঁরা কোথায়?

রতিকান্ত বলিল‌, ‘তাঁরা সবাই উপরিতলায়। শোবার ঘর সব ওপরে। আপনারা বসুন‌, আমি একে একে ওঁদের ডেকে নিয়ে আসি। কাকে আগে ডাকব-শকুন্তলা দেবীকে?’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘শকুন্তলা দেবীকে কষ্ট দেবার দরকার নেই‌, আমরাই ওপরে যাচ্ছি। দুচারটে মামুলী কথা জিজ্ঞাসা করা বৈ তো নয়। দেবনারায়ণবাবুও বোধহয় ওপরে আছেন?’

‘হ্যাঁ। চাঁদনী দেবীও আছেন।’

‘তবে চলুন।’ পাশের একটি ছোট ঘর হইতে উপরে উঠিবার সিঁড়ি। আমরা সিঁড়ি দিয়া উপরে উঠিয়া গেলাম।

সিঁড়ির উপরে একটি ঘর‌, তাহার দুইদিকে দুইটি দরজা। উপরতলাটি দুই ভাগে বিভক্ত। আমরা উপরে উঠিলে রতিকান্ত বলিল‌, ‘কোনদিকে যাবেন? এদিকটা দেবনারায়ণবাবুর মহল‌, ওদিকটা দীপনারায়ণবাবুর।’

ব্যোমকেশ কোনদিকে যাইবে ইতস্তত করিতেছে এমন সময় দেবনারায়ণের দিকের দ্বারা দিয়া চাঁদনী বাহির হইয়া আসিল। তাহার হাতে এক বাটি দুধ্‌্‌, কাঁদিয়া কাঁদিয়া চোেখ মুখ ফুলিয়া উঠিয়াছে। আমাদের দেখিয়া সে সসঙ্কোচে দাঁড়াইয়া পড়িল‌, স্বভাব্যবশত মাথার কাপড় টানিতে গেল‌, তারপর বাড়ির সাম্প্রতিক কায়দা স্মরণ করিয়া থামিয়া গেল। আমাদের মধ্যে ম্যানেজার গঙ্গাধর বংশীকে দেখিতে পাইয়া তাঁহাকে লক্ষ্য করিয়া জড়িতস্বরে বলিল‌, ‘চাচিজি আজ সারাদিন এক ফোঁটা জল মুখে দেননি.তাই যাচ্ছি। আর একবার চেষ্টা করতে যদি একটু দুধ খাওয়াতে পারি। চাচাজি তো গেছেন‌, উনিও যদি না খেয়ে প্রাণটা দেন কি হবে বলুন দেখি? বলিয়া ঝরঝর করিয়া কাঁদিয়া ফেলিল।

আমরা থাতমত খাইয়া গেলাম। এই একান্ত ঘরোয়া সেবার মূর্তিটিকে দেখিবার জন্য কেহই যেন প্রস্তুত ছিলাম না। গঙ্গাধর বংশী বিচলিতভাবে গলা ঝাড়া দিয়া বলিলেন‌, ‘যাও বেটি‌, ওঁকে আগে কিছু খাওয়াবার চেষ্টা কর। কিছু না খেলে কি করে চলবে।’

চাঁদনী দুধ লইয়া চোখ মুছিতে মুছতে চলিয়া গেল। ব্যোমকেশ বলিল‌, চলুন‌, দেবনারায়ণবাবুর কাছে আগে যাওয়া যাক।’

আমরা দেবনারায়ণের মহলে প্রবেশ করিলাম, ম্যানেজার আমাদের পথ দেখাইয়া লইয়া চলিলেন।

ঘরের পর ঘর‌, সবগুলিই দেশী বিদেশী আসবাবে ঠাসা; কিন্তু কিছুরই তেমন ছিরি-ছাঁদ নাই‌, সবই এলোমেলো বিশৃঙ্খল। অবশেষে বাড়ির শেষ প্রান্তে একটি পদৰ্ণ ঢাকা দরজার সম্মুখীন হইলাম।

ঘরের ভিতর কে আছে তখনও দেখি নাই‌, আমাদের সমবেত পদশব্দে আকৃষ্ট হইয়া একটি লোক পদার্থ সরাইয়া উঁকি মারিল‌, তারপর চিকিতে অন্তহিঁত হইয়া গেল। আমরা ঘরে প্রবেশ করিলাম। ঘরটি বেশ বড়‌, তিনদিকে জানোলা। মেঝের অর্ধেক জুড়িয়া পুরু গদির উপর ফরাস পাতা‌, তাহার উপর কয়েকটা মোটা মোটা তাকিয়া। দেবনারায়ণ মাঝখানে তাকিয়া পরিবৃত হইয়া বসিয়া আছে‌, তাহার পাশে একটু পিছনে কোঁকড়া-চুল কোঁকড়া-গোঁফ বিদূষক বেণীপ্রসাদ। আমাদের দেখিয়া বেণীপ্রসাদ উঠিয়া দাঁড়াইল।

ম্যানেজার দেবনারায়ণকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন‌, ‘এঁরা আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন।’ দেবনারায়ণ কোনও কথা না বলিয়া কিংকর্তব্যবিমূঢ় ব্যাঙের মত চাহিয়া রহিল।

ম্যানেজার আমাদের বসিতে বলিলেন। আমি ও ব্যোমকেশ বিছানার পাশে বসিলাম। আর সকলে দাঁড়াইয়া রহিলেন।

ব্যোমকেশ এদিক ওদিক চাহিয়া বলিল‌, ‘ঘরে আর একজন ছিলেন-যিনি পদাৰ্থ ফাঁক করে উঁকি মেরেছিলেন–তিনি কোথায় গেলেন?’

বেণীপ্রসাদ অত্যন্ত অপ্রস্তুত হইয়া পড়িল‌, ‘তিনি-মানে লীলাধর’–ম্যানেজারের দিকে একটি ক্ষিপ্ত চিকিত চাহনি হানিয়া সে কথা শেষ করিল–’সে পাশের ঘরে গেছে।’

ব্যোমকেশ ভাল মানুষের মত জিজ্ঞাসা করিল‌, ‘পাশের ঘরে কী আছে?’

বেণীপ্রসাদ বলিল‌, ‘মানে–গোসলখানা।’

ব্যোমকেশ ফিক করিয়া হাসিল‌, ‘বুঝেছি। গোসলখানার লোগাও পাকানো লোহার সিঁড়ি আছে‌, লীলাধরবাবু সেই দিক দিয়ে বাড়ি গেছেন। কেমন?

বেণীপ্রসাদ উত্তর দিল না‌, নিতম্ব চুলকাইতে চুলকাইতে ম্যানেজারের দিকে আড় চোখে চাহিতে লাগিল।

লীলাধর যে ম্যানেজার গঙ্গাধর বংশীর পুত্র এবং দেবনারায়ণের সহকারী বিদূষক তাহা আমরা কাল রাত্রে জানিতে পারিয়াছিলাম। দেখিলাম‌, গঙ্গাধর বংশীর মুখ কালো হইয়া উঠিয়াছে। কিন্তু তিনি উদগত হৃদয়াবেগ যথাসাধ্য সংযত করিয়া বেণীপ্রসাদকে প্রশ্ন করিলেন‌, ‘তোমরা এখানে কি করছি?’

নিতম্ব ছাড়িয়া বেণীপ্রসাদ এক হাত তুলিয়া বগল চুলকাইতে আরম্ভ করিল‌, বলিল‌, আজ্ঞো-ছোট-মালিকের মন খারাপ হয়েছে তাই আমরা ওঁকে একটু—’

মন খারাপের উল্লেখে দেবনারায়ণের বোধহয় খুড়ার মৃত্যুর কথা মনে পড়িয়া গেল‌, সে হঠাৎ চীৎকার করিয়া কাঁদিয়া উঠিল। আকাশ-পাতাল হ্যাঁ করিয়া হাতির মত লোকটা কাঁদিতে লাগিল।

কাল দেবনারায়ণের হাসি শুনিয়াছিলাম‌, আজ কান্না শুনিলাম। আওয়াজ প্ৰায় একই রকম‌, যেন এক পাল শেয়াল ডাকিতেছে।

পাঁচ মিনিট চলিবার পর হঠাৎ কান্না আপনিই থামিয়া গেল। দেবনারায়ণ রুমালে চোখ মুছিয়া পানের ডাবা হইতে এক খামচা পান মুখে পুরিয়া চিবাইতে লাগিল। ব্যোমকেশ এতক্ষণ নির্বিকারভাবে দেয়ালে টাঙানো রবি বামার ছবি দেখিতেছিল‌, কান্না থামিলে সহজ স্বরে বলিল‌, ‘দেবনারায়ণবাবু্‌, আপনি মদ খান?

দেবনারায়ণবাবু বলিল‌, ‘নাঃ। আমি ভাঙ‌, খাই।’

‘তবে তাকিয়ার তলায় ওটা কি? বলিয়া ব্যোমকেশ অঙ্গুলি নির্দেশ করিল।

বেণীপ্রসাদ ইতিমধ্যে তেরছাভাবে গোসলখানার দ্বারের দিকে যাইতেছিল‌, এখন সুট করিয়া অন্তহিঁত হইল। আমি নির্দিষ্ট তাকিয়া উল্টাইয়া দেখিলাম‌, তলায় একটি ছিপি-আটা বোতল রহিয়াছে; বোতলের মধ্যে শ্বেতবর্ণ তরল দ্রব্য।

দেবনারায়ণ বোকাটে মুখে বোতলের দিকে একবার দৃষ্টি ফিরাইয়া বলিল‌, ‘ও তো তাড়ি। লীলাধর আর বেণীপ্রসাদ খাচ্ছিল।’

বোতলে তাড়ি! এই প্রথম দেখিলাম। ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘ও—আপনার মন প্রফুল্ল করবার জন্য ওঁরা তাড়ি খাচ্ছিলেন। তা সে যাক। বলুন তো‌, আপনি ভাঙা ছাড়া আর কি কি নেশা করেন?’

দেবনারায়ণ খানিকটা জব্দ মুখে দিয়া বলিল‌, ‘আর কিছু না।’

‘কোকেন?’

‘বুকনি? নাঃ।’

‘গাঁজা?

‘নাঃ। গাজাধির গাঁজা খায়।’

‘আচ্ছা‌, যেতে দিন। —আপনার বোধহয় অনেক বন্ধু আছে?’

‘বন্ধু-আছে। লাখো লাখো বন্ধু আছে।’

‘তাই নাকি? তাদের দু’চারটে নাম করুন তো।’

‘নাম? লীলাধর।–বেণীপ্রসাদ-গজাধির সিং–’

‘কোন গজাধর সিং?’

‘চৌকিদার। খুব ভাল ভাঙ খুঁটতে পারে।’

‘আর কে?’

‘আর বদ্রিলাল। রোজ আমার পা টিপে দেয়।’

দেবনারায়ণের বন্ধুরা কোন শ্রেণীর লোক তাহা বুঝিতে বাকি রহিল না।

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘বুঝলাম। ডাক্তার পালিতের সঙ্গে আপনার বন্ধুত্ব নেই?

দেবনারায়ণের বিপুল শরীর একবার ঝাঁকানি দিয়া উঠিল; সে বিহুলকণ্ঠে বলিল‌, ‘ডাক্তার পালিত। ওকে আমি রাখব না‌, তাড়িয়ে দেব। চাচাকে ও খুন করেছে।’

ব্যোমকেশ কিছুক্ষণ ভ্রূ কুঁচকাইয়া মুদিত চক্ষে বসিয়া রহিল‌, তারপর চোখ খুলিয়া বলিল‌, ‘আপনার কাকার মৃত্যুর পর আপনি ষোল আনা সম্পত্তির মালিক হয়েছেন। এখন কি করবেন?’

‘কি করব?—দেবনারায়ণ যেন পূর্বে একথা চিন্তাই করে নাই এমনিভাবে ইতি-উতি তাকাইতে লাগিল। আমি বিস্মিত হইয়া ভাবিলাম‌, দেবনারায়ণ কি সত্যই এতবড় গবেট?

ব্যোমকেশ উঠিয়া পড়িল‌, বলিল‌, চলুন‌, এর কাছে আর কিছু জানবার নেই।’

দরজার দিকে ফিরিতেই দেখিলাম, চাঁদনী কখন পর্দার পাশে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে, তাহার মুখে উদ্বেগ ও আশঙ্কার ব্যঞ্জনা। আমাদের দৃষ্টি তাহার উপর পাড়িতেই সে চকিতে সরিয়া গেল।

আমরা পরস্পর দৃষ্টি বিনিময় করিলাম। রতিকান্ত পাণ্ডেজিকে নিম্নস্বরে প্রশ্ন করিল‌, ‘চাঁদনী দেবীকে সওয়াল করা হবে নাকি?’

পাণ্ডেজি ব্যোমকেশের দিকে চাহিলেন। ব্যোমকেশ একটু ভাবিয়া বলিল‌, ‘পরে দেখা যাবে। এখন চলুন‌, শকুন্তলা দেবীর মহলে।’

দেবনারায়ণের মহল হইতে শকুন্তলার মহলে যাইবার পথে ম্যানেজার গঙ্গাধর বংশী হঠাৎ আমাদের নিকট বিদায় লইলেন। পুত্র লীলাধর সম্পর্কে তাঁহার মন বোধহয় বিক্ষিপ্ত হইয়াছিল‌, নহিলে এত সহজে আমাদের ছাড়িয়া যাইতেন না। বলিলেন‌, ‘আমার সন্ধ্যা আহিকের সময় হল‌, আমি এবার যাই। আপনারা কাজ করুন।’

তিনি সিঁড়ি দিয়া নামিয়া গেলেন। আমরা শকুন্তলা দেবীর মহলে প্রবেশ করিলাম। সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনীভূত হইতে আরম্ভ করিয়াছে‌, রতিকান্ত সুইচ টিপিয়া আলো জ্বলিতে জ্বলিতে আমাদের আগে আগে চলিল।

প্রথমে একটি মাঝারি গোছের ঘর। দেশী প্রথায় চৌকির উপর ফরাসের বিছানা‌, কয়েকটি গদি-মোড়া নীচু কেদারা‌, ঘরের কোণে উঁচু টিপাইয়ের মাথায় রূপার পাত্রে ফুল সাজানো। দেয়ালে যামিনী রায়ের আঁকা একটি ছবি। এখানে বাড়ির লোকেরা বসিয়া গল্প-গুজবে সন্ধ্যা কাটাইতে পারে‌, আবার অন্তরঙ্গ বন্ধুবান্ধব আসিলেও বসানো যায়।

ঘরে কেহ নাই। আমরা এ-ঘর উত্তীর্ণ হইয়া পাশের ঘরে প্রবেশ করিলাম। এটি বেশ বড় ঘর‌, দু’টি পালঙ্ক দু’পাশের দেয়ালে সংলগ্ন হইয়া আছে। একটি বড় ওআর্ডরোিব রহিয়াছে‌, একটি আয়না-দার টেবিলে কয়েকটি ওষুধের শিশি। মনে হয়। এটি দীপনারায়ণের শয়নকক্ষ ছিল। বর্তমানে শয্যা দু’টির উপর সুজনি ঢাকা রহিয়াছে। এ ঘরটিও শূন্য। ব্যোমকেশ মৃদুকণ্ঠে বলিল,–’এটি বোধ হচ্ছে দীপনারায়ণবাবুর শোবার ঘর ছিল। দুটো খাট কেন?

রতিকান্ত একটু ইতস্তত করিয়া বলিল-দীপনারায়ণজির অসুখের যখন খুব বাড়াবাড়ি যাচ্ছিল তখন একজন নার্স রাত্রে থাকত।’

‘ঠিক ঠিক‌, আমার বোঝা উচিত ছিল।’

অতঃপর আমরা তৃতীয় কক্ষে প্রবেশ করিলাম এবং চারিদিকে চাহিয়া চমৎকৃত হইয়া গেলাম। এ ঘরটি আরও বড় এবং নীলাভ নিওন-লাইট দ্বারা আলোকিত। পিছনের দিকের দেয়ালে সম-ব্যবধানে তিনটি জানালা‌, জানালার ব্যবধানস্থলে সুচিত্রিত মহার্ঘ মিশরী গালিচা বুলিতেছে। ঘরের এক পাশে একটি অগনি এবং তাহার আশেপাশে দেয়ালে টাঙানো নানাবিধ বাদ্যযন্ত্র। ঘরের অপর পাশে ছবি আঁকার বিবিধ সরঞ্জাম‌, দেয়ালের গায়ে আঁকা একটি প্রশস্ত তৈলচিত্র। মেঝের উপর পুরু মখমলের আস্তরণ বিছানো‌, তাহার মাঝখানে গুরু নিতস্বিনী রাজকন্যার মত একটি তানপুরা শুইয়া আছে। বুঝিতে বিলম্ব হয় না। কলা-কুশলী শকুন্তলার এটি শিল্পনিকেতন। দেখিলে চোখ জুড়াইয়া যায়। একই বাড়ির দুই অংশে রুচিনৈপুণ্য ও সৌন্দৰ্য-বোধের কতখানি তফাৎ‌, চোখে না দেখিলে বিশ্বাস হয় না।

ব্যোমকেশের দৃষ্টি প্রথমেই দেয়ালে আকা তৈলচিত্রটির প্রতি আকৃষ্ট হইয়াছিল। সে কোনও দিকে না চাহিয়া ছবির সম্মুখে গিয়া দাঁড়াইল। ছবিটির খাড়াই তিন ফুট‌, পাশাপাশি পাঁচ ফুট। বিষয়বস্তু নূতন নয়‌, বন্ধলধারিণী শকুন্তলা তরুআলবালে জল-সেচন করিতেছে এবং দুষ্মন্ত পিছনের একটি বৃক্ষকাণ্ডের আড়াল হইতে চুরি করিয়া শকুন্তলাকে দেখিতেছেন। ছবিখানির অঙ্কন-শৈলী ভাল‌, শকুন্তলার হাত পা খ্যাংরা কাটির মত নয়‌, দুষ্মন্তকে দেখিয়াও যাত্ৰাদলের দুঃশাসন বলিয়া ভ্বম হয় না। চিত্রের বাতাবরণ পুরাতন‌, কিন্তু মানুষ দু’টি সর্বকালের। ছবি দেখিয়া মন তৃপ্ত হয়।

ব্যোমকেশের দিকে চোখ ফিরাইয়া দেখিলাম। সে তন্ময় হইয়া ছবি দেখিতেছে। তাহার দেখাদেখি রতিকান্ত ও পাণ্ডেজি আমাদের পাশে আসিয়া দাঁড়াইলেন। ব্যোমকেশ তখন তাঁহাদের দিকে ফিরিয়া উৎসাহ ভরে বলিল‌, ‘চমৎকার ছবি। কে এঁকেছে?’

পাণ্ডেজি রতিকান্তের দিকে চাহিলেন‌, রতিকান্ত দ্বিধাভরে বলিল‌, ‘বোধহয় শকুন্তলা দেবীর আঁকা। ঠিক বলতে পারি না।’

ব্যোমকেশ আবার ছবির দিকে ফিরিয়া বলিল‌, ‘তাই হবে। একালের শকুন্তলা সেকালের শকুন্তলার ছবি এঁকেছেন। দেখেছি অজিত‌, তপোবনকন্যা শকুন্তলার মুখে কী শান্ত সরলতা‌, দুষ্মস্তের চোখে কী মোহাচ্ছন্ন অনুরাগ‌, সহকার তরুগুলির কী সজীব শ্যামলতা। সব মিলিয়ে সংসার ও আশ্রমের একটি অপূর্ব সমন্বয় হয়েছে। —যদি সম্ভব হত ছবিটি তুলে নিয়ে যেতাম।’

একটু অবাক হইলাম। ব্যোমকেশের মনে শিল্পরস বোধ থাকিতে পারে। কিন্তু তাহা কোনও কালেই উচ্ছসিত হইয়া উঠিতে দেখি নাই। আমি চক্ষু বিস্ফারিত করিয়া তাহার পানে তাকাইয়া আছি দেখিয়া সে সামলাইয়া লইল; ছবির দিক হইতে মুখ ফিরাইয়া ঘরের চারিদিকে চোখ কুলাইল। শকুন্তলা দেবীর বর্তমান অবস্থা স্মরণ করিয়া একটু ব্যথিত স্বরে বলিল‌, ‘এটা দেখছি শকুন্তলা দেবীর গান-বাজনা ছবি-আঁকার ঘর.সাজানো বাগান…ভুলে থাকার উপকরণ—’ একটা নিশ্বাস ফেলিয়া বলিল‌, চলুন।’

অতঃপর আমরা আরও একটা শূন্য ঘর এবং একটা বারান্দা পার হইয়া শকুন্তলার শয়নকক্ষের সম্মুখে উপস্থিত হইলাম। দরজা ভেজানো ছিল‌, রতিকান্ত টোকা দিলে একটি মধ্যবয়স্ক দাসী দ্বার খুলিয়া দিল। রতিকান্ত ঘরের ভিতর গলা বাড়াইয়া কুষ্ঠিত স্বরে বলিল‌, ‘আমরা পুলিসের পক্ষ থেকে কিছু জিজ্ঞাসা করতে এসেছি।’

কিছুক্ষণ পরে ঘরের ভিতর হইতে অস্ফুট আওয়াজ আসিল— ‘আসুন।’

আমরা সসঙ্কোচে ঘরে প্রবেশ করিলাম। রতিকান্ত দাসীকে মাথা নাড়িয়া ইঙ্গিত করিল‌, দাসী বাহিরে গেল।

শকুন্তলা দেবীর শয়নকক্ষের বর্ণনা দিব না। অনবদ্য রুচির সহিত অপরিমিত অর্থবল সংযুক্ত হইলে যাহা সৃষ্টি হয় এ ঘরটি তাহাই। শকুন্তলা পালঙ্কের উপর বসিয়া ছিলেন‌, আমরা প্রবেশ করিলে একটি ক্রীম রঙের কাশ্মীরী শাল গায়ে জড়াইয়া লইলেন। কেবল তাঁহার মুখখানি খোলা রহিল। মোমের মত আচ্ছাভ বর্ণ‌, চোখের কোলে কালি পড়িয়াছে। চুলগুলি শিথিল ও অবিন্যস্ত। যেন হিম-ক্লিন্ন করা শেফালি।

‘বসুন-শকুন্তলা ক্লান্তি-বিনীত চক্ষু দু’টি একবার আমাদের পানে তুলিলেন।

ঘরে কয়েকটি চামড়ার গদি-মোড়া নীচু চৌকি ছিল‌, আমি ও ব্যোমকেশ দু’টি চৌকি খাটের কাছে টানিয়া লইয়া বসিলাম। রতিকান্ত ও পাণ্ডেজি খাটের বাজু ধরিয়া দাঁড়াইয়া রহিলেন।

ব্যোমকেশ পাণ্ডেজির দিকে দৃষ্টি তুলিয়া নীরবে অনুমতি চাহিল‌, পাণ্ডেজি একটু ঘাড় নাড়িলেন। ব্যোমকেশ তখন অত্যন্ত মোলামেয় স্বরে শকুন্তলাকে বলিল‌, ‘আপনাকে এ সময়ে বিরক্ত করতে এসেছি‌, আমাদের ক্ষমা করবেন। মানুষের জীবনে কখন যে কী দুৰ্দৈব ঘটবে কেউ জানে না‌, তাই আগে থাকতে প্রস্তুত থাকবার উপায় নেই। আপনার স্বামীকে আমি একবার মাত্র দেখেছি‌, কিন্তু তিনি যে কি রকম সজ্জন ছিলেন তা জানতে বাকি নেই। তাঁর মৃত্যুর জন্যে যে দায়ী সে নিস্কৃতি পাবে না। এ আশ্বাস আপনাকে আমরা দিচ্ছি।’ শকুন্তলা উত্তর দিলেন না‌, কাতর চোখ দু’টি তুলিয়া নীরবে ব্যোমকেশকে ধন্যবাদ জানাইলেন।

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘আপনাকে দুএকটা প্রশ্ন করব। নেহাত প্রয়োজন বলেই করব‌, আপনাকে উত্যক্ত করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়।–কিন্তু আসল প্রশ্ন করার আগে একটা অবান্তর কথা জেনে নিই‌, ও ঘরের দেয়ালে দুষ্মন্ত-শকুন্তলার ছবিটি কি আপনার আঁকা?’

শকুন্তলার চোখে চকিত বিস্ময় ফুটিয়া উঠিল‌, তিনি কেবল ঘাড় হেলাইয়া জানাইলেন-হ্যাঁ‌, ছবি তাঁহারই রচনা।

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘চমৎকার ছবি‌, আপনার সত্যিকার শিল্পপ্রতিভা আছে। কিন্তু ওকথা যাক। দীপনারায়ণবাবু উইল করে গেছেন। কিনা। আপনি জানেন?’

এবার শকুন্তলা অবুঝের মত চক্ষু তুলিয়া কিছুক্ষণ চাহিয়া রহিলেন‌, তারপর স্তিমিত স্বরে বলিলেন‌, ‘এসব আমি কিছু জানি না। উনি আমার কাছে বিষয় সম্পত্তির কথা কখনও বলতেন না!’

‘আপনার নিজস্ব কোনও সম্পত্তি আছে কি?’

‘তাও জানি না। তবে–’

‘তবে কি?’

‘বিয়ের পর আমার স্বামী আমার নামে পাঁচ লাখ টাকা ব্যাঙ্কে জমা করে দিয়েছিলেন।’

‘তাই নাকি! সে টাকা এখন কোথায়?’

‘ব্যাঙ্কেই আছে। আমি কোনও দিন সে টাকায় হাত দিইনি।’

ব্যোমকেশ কিছুক্ষণ চুপ করিয়া ভাবিল।

‘তাহলে এই পাঁচ লাখ টাকা আপনার নিজস্ব স্ত্রীধন। তারপর যদি আপনার পুত্রসন্তান জন্মায় তাহলে সে এজমালি সম্পত্তির অর্ধেক ভাগ পাবে।’

শকুন্তলা চোখ তুলিলেন না‌, নতনেত্রে রহিলেন। মনে হইল তাঁহার মুখখানা আরও পাণ্ডুর রক্তহীন হইয়া গিয়াছে।

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘ভাল কথা‌, আপনি যে সন্তান-সম্ভব একথা আপনার স্বামী জানতেন?’

নতনয়না শকুন্তলার ঠোঁট দু’টি একটু নড়িল‌, ‘জানতেন। কাল রাত্রে তাঁকে বলেছিলাম।’

‘কাল রাত্রে। খাওয়া-দাওয়ার আগে‌, না পরে?’

‘পরে। উনি তখন শুয়ে পড়েছিলেন।’

‘খবর শুনে উনি নিশ্চয় খুব খুশি হয়েছিলেন।’

‘খুব খুশি হয়েছিলেন‌, আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়েছিলেন–’

এই পর্যন্ত বলিয়া শকুন্তলার ভাব হঠাৎ পরিবর্তিত হইল। এতক্ষণ তিনি ক্লান্ত ত্ৰিয়মাণাভাবে কথা বলিতেছিলেন‌, এখন ভয়ার্ত বিহ্বলতায় একে একে আমাদের মুখের পানে চাহিলেন‌, তারপর একটি অবরুদ্ধ কাতরোক্তি করিয়া মুৰ্ছিত হইয়া পড়িলেন।

আমরা ক্ষণকালের জন্য বিমূঢ় হইয়া গেলাম। এতক্ষণ লক্ষ্য করি নাই‌, দ্বারের কাছে চাঁদনী কখন আসিয়া দাঁড়াইয়াছিল। এখন সে ছুটিয়া আসিয়া শকুন্তলার মাথা কোলে লইয়া বসিল‌, আমাদের দিকে ক্রুদ্ধ দৃষ্টিপাত করিয়া বলিল‌, ‘আপনারা কি রকম মানুষ‌, মেরে ফেলতে চান ওঁকে? যান‌, শীগগির যান এ ঘর থেকে। শরীরে একটু দয়ামায়া কি নেই। আপনাদের? এখুনি মিস মান্নাকে খবর পাঠান।’

আমরা পালাইবার পথ পাইলাম না। নীচে নামিতে নামিতে শুনিতে পাইলাম চাঁদনী উচ্চকণ্ঠে দাসীকে ডাকিতেছে— ‘সোমরিয়া‌, কোথায় গেলি তুই-শীগগির জল আন—’

নীচে নামিয়া পাণ্ডেজি প্রথমেই মিস মান্নাকে টেলিফোন করিলেন— ‘শীগগির চলে আসুন‌, আপনি না। আসা পর্যন্ত আমরা এখানে অপেক্ষা করছি।’

তারপর আমরা হল-ঘরে বসিয়া অপেক্ষা করিতে লাগিলাম। রাত্রি হইয়া গিয়াছে‌, ঘড়িতে সাতটা বাজিয়া গেল।

পাণ্ডেজি বিললেন‌, ‘রতিকান্ত‌, দেখে এস শকুন্তলা দেবীর জ্ঞান হল কিনা।’

রতিকান্ত চলিয়া গেল। ব্যোমকেশ বিমর্ষ মুখে বসিয়াছিল‌, চোখ তুলিয়া বলিল‌, ‘পাণ্ডেজি‌, মিস মান্নাকে এখন কিছুদিন শকুন্তলা দেবীর কাছে রাখা দরকার‌, তার ব্যবস্থা করুন। তিনি সর্বদা শকুন্তলার কাছে থাকবেন‌, একদণ্ডও তাঁর কাছ-ছাড়া হবেন না।’

‘বেশ।’

ম্যানেজার গঙ্গাধর এই সময় ফিরিয়া আসিলেন এবং শকুন্তলার মুছার কথা শুনিয়া উদ্বেগ প্রকাশ করিলেন। পাণ্ডেজি বলিলেন‌, ‘মিস মান্নাকে এখানে কিছুদিন রাখার ব্যবস্থা করুন। শকুন্তলা দেবী অন্তঃসত্ত্বা্‌্‌, তার ওপর এই দুৰ্দৈব। ওঁর কাছে অষ্টপ্রহর ডাক্তার থাকা দরকার।’

ম্যানেজারের মুখখানা কেমন একরকম হইয়া গেল। তারপর তিনি সামলাইয়া লইয়া বলিলেন‌, ‘নিশ্চয় নিশ্চয়।’

মিস মান্না আসিলেন‌, হাতে ওষুধের ব্যাগ। তাঁহাকে সংক্ষেপে সব কথা বলা হইলে তিনি বলিলেন‌, ‘বেশ‌, আমি থাকব। আমার কিছু জিনিসপত্র আনিয়ে নিলেই হবে।’

তিনি দ্রুতপদে উপরে চলিয়া গেলেন।

দশ মিনিট পরে রতিকান্ত নামিয়া আসিয়া বলিল‌, ‘জ্ঞান হয়েছে। ডাক্তার মান্না বললেন ভয়ের কোনও কারণ নেই।’

পাণ্ডেজি গাত্ৰোত্থান করিলেন।

‘আমরা এখন উঠলাম। রতিকান্ত‌, তুমি এখানকার কাজ সেরে একবার আমার বাসায় যেও।’ আমাদের দিকে ফিরিয়া বলিলেন‌, চলুন‌, আমার ওখানে চা খাবেন।’

মোটরে যাইতে যাইতে শকুন্তলার শয়নকক্ষের দৃশ্যটাই চোখের সামনে ভাসিতে লাগিল। মনে হইল যেন একটি মর্মস্পশী নাটকের নিগূঢ় দৃশ্যাভিনয় প্রত্যক্ষ করিলাম। শকুন্তলা যদি মূৰ্ছিত হইয়া না পড়িতেন এবং চাঁদনী আসিয়া যদি রাসভঙ্গ না করিত–

শকুন্তলা হঠাৎ মূৰ্ছিত হইলেন কেন? অবশ্য এরূপ অবস্থায় যে-কোনও মুহুর্তে মুছাঁ যাওয়া বিচিত্র নয়‌, তবু শোকের প্রাবল্যই কি তাহার একমাত্র কারণ?

ব্যোমকেশের দিকে চাহিয়া দেখিলাম। সে চিন্তার অতলে তলাইয়া গিয়াছে। জিজ্ঞাসা করিলাম, ‘শকুন্তলার মূর্ছার কথা ভাবিছ নাকি?’

সে সচেতন হইয়া বলিল‌, ‘মুর্ছা! না–আমি ভাবছিলাম ডাক-বাক্সর কথা।’

অবাক হইয়া বলিলাম‌, ‘ডাক-বোক্সর কথা ভাবছিলে?’

সে বলিল‌, ‘হ্যাঁ‌, দীপনারায়ণের বাড়ির কোণে যে ডাক-বাক্স আছে তারই কথা। ভারি লাগসৈ জায়গায় সেটা আছে। দেখলে মনে হয় লাল কুতা-পরা গোলগাল একটি সেপাই রাস্তার কোণে দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছে। কিন্তু আসলে তা নয়।’

‘আসলে তবে কি?’

‘আসলে শ্রীরাধিকার দূতী।’

‘বুঝলাম না। ব্যাসকুট ছেড়ে সিধে কথা বল।’

ব্যোমকেশ কিন্তু সিধা কথা বলিল না‌, মুখে একটা একপেশে হাসি আনিয়া কতকটা নিজ মনেই বলিল, ‘অভিসারের আইডিয়াটি ভারি মিষ্টি, অবশ্য যদি অভিসারিকা পরস্ত্রী হয়। নিজের স্ত্রী অভিসার করলে বোধহয় তত মিষ্টি লাগে না।’

‘অর্থাৎ?’

‘অর্থাৎ ‘রতিসুখসারে গতমভিসারে মদনমনোহরবেশম।’

‘কি আবোল-তাবোল বকছ!’

ব্যোমকেশ গম্ভীর মুখে বলিল‌, ‘আবোল-তাবোল নয়‌, এটা গীতগোবিন্দ। যদি আবোল-তাবোল শুনতে চাও শোনাতে পারি‌, ছন্দ একই। বাবুরাম সাপুড়ে কোথা যাস বাপুরে—’

পাণ্ডেজি মোটর চালাইতে চালাইতে হাসিয়া উঠিলেন। আমি হতাশ হইয়া। আপাতত আমার কৌতুহল সম্বরণ করিলাম।

পাণ্ডেজির বাসায় পৌঁছিয়া দেখা গেল চা প্রস্তুত। তার সঙ্গে গরম গরম বেগুনি‌, পকৌড়ি‌, ডালের ঝালবড়া। ব্যোমকেশ দ্বিরুক্তি না করিয়া বসিয়া গেল। আমরাও যোগ দিলাম।

বেশ খানিকটা রসদ আত্মসাৎ করিবার পর ব্যোমকেশ তৃপ্তস্বরে বলিল‌, ‘এতক্ষণ বুঝতে পারিনি‌, আমার অন্তরাত্মা এই জিনিসগুলির পথ চেয়ে ছিল।’

পাণ্ডেজি হাসিয়া বলিলেন‌, ‘এখন তো পথ চাওয়া শেষ হল‌, এবার বলুন কি দেখলেন শুনলেন।’

ব্যোমকেশ চায়ের পেয়ালায় লম্বা একটি চুমুক দিয়া সযত্নে পেয়ালা নামাইয়া রাখিল‌, গড়গড়ার নলে কয়েকটা বুনিয়াদি টান দিল‌, তারপর চিন্তা-মন্থর কণ্ঠে বলিল‌, ‘দেখলাম শুনলাম অনেক কিছু‌, কিন্তু এখনও শেষ দেখা যাচ্ছে না।’

পাণ্ডেজি বলিলেন‌, ‘তবু? ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘দুটো মোটিভ পাওয়া যাচ্ছে। এক-টাকা‌, দুই—ম্মরগরল। কোনদিকের পাল্লা ভারী এখনও বুঝতে পারছি না। হতে পারে‌, দুটো মোটিভ জড়াজড়ি হয়ে গেছে।’

আমি বলিলাম‌, ‘মোটিভ যেমনই হোক‌, লোকটা কে?’

ব্যোমকেশ একটু অধীরভাবে বলিল‌, ‘তা কি করে বলব? যে-ব্যক্তি ওষুধের সঙ্গে বিষ মিশিয়েছিল সে ভাড়াটে লোক হতে পারে। যে তাকে নিয়োগ করেছিল তাকেই আমরা খুঁজছি।’

পাণ্ডেজি বলিলেন‌, ‘আমরা যাদের চিনি তাদের মধ্যে এমন কে আছে যে নিয়োগ করতে পারে। এক আছে দেবনারায়ণ। কিন্তু সে কি–’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘বেশ‌, প্রথমে দেবনারায়ণকে ধরুন। দেবারায়ণকে দেখলে মনে হয় নিরেট আহাম্মক; কিন্তু এটা তার ছদ্মবেশ হতে পারে। সেই হয়তো লোক লাগিয়ে খুড়োকে মেরেছে। তার আজ্ঞাবহ মোসাহেবের অভাব নেই‌, লীলাধর বংশী বা বেণীপ্রসাদ যে-কেউ পুরস্কারের আশ্বাস পেলে খুন করবে। এখানে মোটিভ হল‌, সম্পত্তির একাধিপত্য।’

আমি বলিলাম‌, ‘কিন্তু—’

ব্যোমকেশ হাত তুলিয়া আমাকে নিবারণ করিল–’তারপর ধরা যাক-চাঁদনী।’

‘চাঁদনী!’

‘হ্যাঁ‌, চাঁদনী। শকুন্তলার প্রতি তার এত দরদ স্বাভাবিক মনে হয় না‌, যেন একটু বাড়াবাড়ি। সে হয়তো মনে মনে তাঁকে হিংসে করে‌, তাঁর প্রাধান্য খর্ব করতে চায়। দীপনারায়ণের মৃত্যুর পর শকুন্তলা আর সংসারের কত্রী থাকবেন না‌, কত্রী হবে চাঁদনী। দেবনারায়ণ যদি সত্যি সত্যিই ন্যালা-ক্যাবলা হয়‌, সে চাঁদনীর মুঠোর মধ্যে থাকবে‌, চাঁদনী হবে বিপুল সম্পত্তির একচ্ছত্র অধীশ্বরী–‘

‘কিন্তু–’

ব্যোমকেশ আবার হাত তুলিয়া আমাকে নিবৃত্ত করিল।

‘তারপর ধরুন-ম্যানেজার গঙ্গাধর বংশী। ডাক্তার পালিতের মতে ইনি গভীর জলের মাছ। সেটা এমন কিছু আশ্চর্য নয়‌, গভীর জলের মাছ না হলে এতবড় স্টেটের ম্যানেজার হওয়া যায় না। কিন্তু উনি যদি কুমীর হন তবেই ভাবনার কথা। ভেবে দেখুন। দীপনারায়ণ সিং বুদ্ধিমান লোক ছিলেন‌, বিষয় সম্পত্তির ওপর নজর রাখতেন। তিনি বেঁচে থাকতে পুকুর চুরি সম্ভব নয়‌, অল্পসল্প চুরি হয়তো চলে। কিন্তু তিনি যদি মারা যান তাহলে সমস্ত সম্পত্তি অশাবে দেবানারায়ণকে। তখন দুহাতে চুরি করা চলবে। সুতরাং ম্যানেজার গঙ্গাধর বংশীরও মোটিভ স্বীকার করতে হবে।’

ব্যোমকেশ কিছুক্ষণ গড়গড়া টানিল‌, আমরা নীরব রহিলাম। তারপর সে গড়গড়ার নল আমার হাতে দিয়া বলিল, ‘সর্বশেষে ধরুন—শকুন্তলা দেবী।‘

এইটুকু বলিয়া সে চুপ করিল। আমরা প্রতীক্ষ্ণ করিয়া রহিলাম। সে একবার নড়িয়া চড়িয়া বসিল, তারপর ধীরে ধীরে বলিতে আরম্ভ করিল, ‘কোনও মহিলার চরিত্র নিয়ে আলোচনা করা ভদ্রলোকের কাজ নয়‌, কিন্তু যেখানে একটা খুন হয়ে গেছে‌, সেখানে আলোচনা না করেও উপায়। নেই। শকুন্তলা দেবী তিন মাস অন্তঃস্বত্ত্বা, অথচ তিন মাস আগে দীপনারায়ণ সিং শয্যাগত ছিলেন‌, সে সময়ে তাঁর দীর্ঘ রোগের একটা ক্রাইসিস যাচ্ছিল। …শকুন্তলা আজ আমাদের বললেন‌, কাল রাত্রে তিনি স্বামীকে সন্তান সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন‌, শুনে দীপনারায়ণ সিং আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়েছিলেন। … কথাটা বোধহয় সত্যি নয়।’

প্রশ্ন করিলাম‌, ‘সত্যি নয় কেন?’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘দীপনারায়ণ সিং যদি আনন্দে আত্মহারা হয়েই পড়েছিলেন তবে এই মহা আনন্দের সংবাদ কাউকে দিলেন না কেন? রাত্রে না হোক‌, সকালবেলা ডাক্তার পালিতকে তো বলতে পারতেন‌, শুভসংবাদ পাকা কিনা জািনবার জন্য মিস মান্নাকে ডাকতে পারতেন। …শকুন্তলা স্বামীকে বলেননি‌, কারণ স্বামীকে বলবার মত কথা নয়। দীপনারায়ণ সিং জানতে পারলে শকুন্তলাকে খুন করতেন‌, নচেৎ বাড়ি থেকে দূর করে দিতেন। তাই জানাজানি হবার আগেই দীপনারায়ণ সিংকে সরানো দরকার হয়েছিল।’

বলিলাম‌, কিন্তু ধরো‌, ডাক্তার পালিত যদি ভুল করে থাকেন?’

ব্যোমকেশ শুষ্ক স্বরে বলিল‌, ‘ডাক্তার পালিত এবং মিস মান্না দু’জনেই যদি ভুল করে থাকেন‌, যদি শকুন্তলা নিষ্কলঙ্ক হন‌, তাহলে দীপনারায়ণকে খুন করার তাঁর কোনও মোটিভ নেই। কিন্তু ডাক্তার পালিত বা মিস মান্না দায়িত্বহীন ছেলেমানুষ নয়‌, তাঁরা ভুল করেননি। ইচ্ছে করেও মিছে কথাও বলেননি‌, যে মিছে কথা সঙ্গে সঙ্গে ধরা পড়ে যাবে তেমন মিথ্যে কথা বলবার লোক ওঁরা নন।‘

বলিলাম‌, ‘আমি ওকথা বলছি না। শকুন্তলা যে অন্তঃস্বত্ত্বা সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু দীপনারায়ণ যে–’

‘তুমি যা বলতে চাও আমি বুঝেছি। কিন্তু সে দিকেও বাড়িসুদ্ধ লোক সাক্ষী আছে‌, ডাক্তার পালিত মিছে কথা বলে পোর পাবেন না।’ ব্যোমকেশ আমার হাত হইতে গড়গড়ার নল লইয়। আবার টানিতে লাগিল।

আমি বলিলাম‌, ‘বেশ‌, তর্কের খাতিরে মেনে নেওয়া যাক যে শকুন্তলার একটি দুষ্মন্ত আছে। কিন্তু সে লোকটা কে?’

ব্যোমকেশ একটু চকিতভাবে আমার পানে চাহিল‌, অর্ধব্যক্ত স্বরে বলিল‌, ‘শকুন্তলার দুষ্মন্ত! বেশ বলেছ। —ওই দুষ্মন্তকেই আমরা খুঁজছি। ডাক্তার পালিতের ব্যাগে যে ওষুধের বদলে বিষ রেখে গিয়েছিল সে ওই দুষ্মন্ত ছাড়া আর কে হতে পারে?’

‘দুষ্মন্তটি তবে কে?’

‘সেটা শকুন্তলার রুচির ওপর নির্ভর করে। তিনি মার্জিত রুচির আধুনিক মহিলা‌, সুতরাং দুষ্মন্তও আধুনিক শিক্ষিত লোক হওয়া সম্ভব। নর্মদাশঙ্কর বা তাদের দলের কেউ হতে পারে। আবার এমন লোক হতে পারে যার প্রকাশ্যভাবে ও বাড়িতে যাতায়াত নেই।’

পাণ্ডেজি কিছুক্ষণ গালে হাত দিয়া চিন্তা করিলেন‌, বলিলেন‌, ‘কিম্বা মনে করুন‌, যদি এমন কেউ হয় যে শকুন্তলাকে বিপদে ফেলে সরে পড়েছে।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘দুষ্মন্তদের পক্ষে সেটা খুবই স্বাভাবিক। তখন শকুন্তলাকে অন্য চেষ্টা করতে হবে‌, অর্থাৎ অন্য সহকারী যোগাড় করতে হবে।’

‘সে-রকম সহকারী তিনি পাবেন কোথায়?’

‘কেন সহকারীর অভাব কিসের? স্বয়ং গঙ্গাধর বংশী রয়েছেন‌, তস্য পুত্ব লীলাধর আছে‌, বেণীপ্রসাদ আছে‌, উপযুক্ত দক্ষিণা পেলে সকলেই রাজী হবে। এমন কি ডাক্তার পালিত আর মিস মান্নাকেও বাদ দেওয়া যায় না। ঠিক বাছতে গাঁ উজোড়।’ আমরা নিবাক হইয়া রহিলাম। কিছুক্ষণ ব্যোমকেশের গড়গড়ার আওয়াজ ছাড়া আর কোনও শব্দ নাই। তারপর সে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিকভাবে বলিল‌, ‘দেয়ালে আঁকা ছবিটার কথা বার বার মনে পড়ছে। মনে হচ্ছে‌, ওটা শুধু ছবি নয়‌, ওর মধ্যে শিল্পীর অন্তরতম কথাটি লুকিয়ে আছে। ছবিটি দিনের আলোয় আর একবার ভাল করে দেখতে হবে।’

ভৃত্য আসিয়া জানাইল‌, ইন্সপেক্টর চৌধুরী আসিয়াছেন।

রতিকান্ত ঘরে প্রবেশ করিয়া বলিল‌, ‘এই মাত্র কেমিক্যাল অ্যানালিসিসের রিপোর্ট দিয়ে গেল। ওষুধে বিষ পাওয়া যায়নি।’

আমরা হয় করিয়া চাহিয়া রহিলাম। লিভারের ভায়ালে কিউরারি পাওয়া যাইবে এ বিষয়ে আমরা এতাই নিশ্চিন্তু ছিলাম যে কথাটা হঠাৎ বোধগম্য হইল না।

‘বিষ পাওয়া যায়নি?’

‘না। এই দেখুন রিপোর্ট।’ রতিকান্ত ব্যোমকেশের হাতে এক টুকরা কাগজ দিল।

রিপোর্টে কোন বিষের নামগন্ধ নাই‌, নিতান্ত সহজ স্বাভাবিক লিভারের আরক। ব্যোমকেশ কুঞ্চিতচক্ষে পাণ্ডেজি ও রতিকান্তের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিল।

‘ভারি আশ্চর্য।’

রতিকান্ত একবার গলা ঝাড়া দিয়া বলিল‌, ‘ব্যোমকেশবাবু্‌, এ থেকে আপনার কি মনে হয়?’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘আগে আপনি বলুন আপনার কি মনে হয়?’

বোধ হইল রতিকান্ত মনে মনে খুশি হইয়াছে। সে একটি চেয়ারের কিনারায় বসিল‌, কিছুক্ষণ একাগ্রভাবে একদিকে চাহিয়া রহিল, তারপর ধীরে ধীরে বলিল, ‘দীপনারায়ণজি কিউরারি বিষে মারা গেছেন তাতে সন্দেহ নেই। পোস্ট-মর্টেমে বিষ পাওয়া গেছে। তাঁর শরীরে বিষ প্রবেশ করল। কি করে? ইনজেকশন ছাড়া অন্য উপায়ে প্রবেশ করতে পারে না। অথচ যে ভায়াল থেকে ইনজেকশন দেওয়া হয়েছিল তাতে বিষ পাওয়া গেল না–’ রীতিকান্ত একটু ইতস্তত করিল–’এ থেকে একমাত্র অনুমান করা যায়‌, ডাক্তার পালিত যে ভায়াল থেকে ইনজেকশন দিয়েছিলেন সে ভায়াল আমাদের দেননি‌, অন্য ভায়াল দিয়েছিলেন।’

পাণ্ডেজি বলিলেন‌, ‘কিন্তু কেন? তাতে ওঁর লাভ কি?’

রতিকান্ত একটু উদ্বিগ্নভাবে বলিল‌, ‘লাভ এই হতে পারে যে‌, আমরা মনে করব ইনজেকশনের জন্য মৃত্যু হয়নি।’

‘ডাক্তার ছাড়া আর কেউ হতে পারে না কি? দীপনারায়ণের মৃত্যুর পর ঘরে অনেক লোক এসেছিল‌, গোলমালের মধ্যে হয়তো কেউ ভায়ালটা সরিয়েছে।’

‘অসম্ভব নয়‌, কিন্তু–’



ব্যোমকেশ আস্তে আস্তে বলিল‌, ‘আপনি মনে করেন ডাক্তার পালিতাই প্রকৃত অপরাধী?

রতিকান্ত একটু চুপ করিয়া রহিল‌, তারপর বলিল‌, ‘আজ থানায় আপনি ডাক্তার পালিত সম্বন্ধে যে ইঙ্গিত করলেন সেটা আমার মাথায় ঘুরছিল‌, তারপর অ্যানালিসিসের রিপোর্ট পেয়ে মনে হল ডাক্তার পালিত যদি নির্দোষ হন তবে সিধা পথে চলছেন না কেন? এ অবস্থায় তাঁর ওপর সন্দেহ হওয়া স্বাভাবিক। অবশ্য দীপনারায়ণজির মৃত্যুতে ওঁর ব্যক্তিগত কোনও লাভ নেই। কিন্তু যাদের লাভ আছে তারা ওঁকে টাকা খাইয়ে নিজেদের কাজ উদ্ধার করিয়ে নিতে পারে। হয়তো ওঁকে পঞ্চাশ হাজার কি এক লাখ টাকা খাইয়েছে। টাকার জন্যে মানুষ কি না করে।’

ব্যোমকেশ ধীরে ধীরে ঘাড় নাড়িল‌, ‘ঠিক কথা‌, টাকার জন্যে মানুষ কি না করে। ডাক্তার পালিত যদি টাকা খেয়ে একাজ করে থাকেন তাহলে শুধু ডাক্তার পালিতকে ধরলেই চলবে না‌, যে টাকা খাইয়েছে তাকেও ধরতে হবে। কে তাঁকে টাকা খাইয়েছে আপনি কিছু আন্দাজ করেছেন?’

আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় দেবানারায়ণ ছাড়া আর কে হতে পারে।’

‘আপাতত তাই মনে হয় বটে‌, কিন্তু প্রমাণ কৈ? প্রমাণ কিছু পাওয়া গেছে কি?’

‘প্রমাণ এখনও কিছু পাওয়া যায়নি।’

রতিকান্ত পাণ্ডেজির দিকে তাকাইয়া বলিল‌, ‘আজ রাত্রি একটার ট্রেনে আমি বক্সার যাচ্ছি। কয়েদীটোকে জেরা করে যদি জানতে পারা যায় যে ডাক্তার পালিত কিউরারি কিনেছেন—’

পাণ্ডেজি বলিলেন‌, ‘তাহলে অনেকটা সুরাহা হতে পারে। তুমি ফিরবে। কবে?’

‘কাল সন্ধ্যে নাগাদ ফিরতে পারব বোধহয়।–সাব-ইন্সপেক্টর তিওয়ারীকে থানার চার্জে রেখে যাচ্ছি।’

‘বেশ।–এদিকের কি ব্যবস্থা করলে?’

‘দীপনারায়ণজির বাড়িতে একজন হেড কনস্টেবলের অধীনে চারজন কনস্টেবল বসিয়ে যাচ্ছি‌, তারা চব্বিশ ঘণ্টা পাহারায় থাকবে। আপনি তো মিস মান্নাকে শকুন্তলা দেবীর কাছে রাত্রে থাকতে বলে এসেছেন।’

পাণ্ডেজি বলিলেন‌, ‘হ্যাঁ‌, মিস মান্না এখন কিছুদিন শকুন্তলার কাছেই থাকবেন। তুমি তো শুনেছি শকুন্তলা অন্তঃস্বত্ত্বা।’

কিছুক্ষণ নীরব থাকিয়া রতিকান্ত ঈষৎ গাঢ়স্বরে বলিল‌, ‘শুনেছি। দীপনারায়ণজি সন্তানের জন্যে বড় ব্যাকুল হয়েছিলেন। তিনি দেখে যেতে পেলেন না।’

ঘড়িতে ঠং ঠেং করিয়া আটটা বাজিল। রতিকান্ত উঠিয়া পড়িল‌, ‘যাই‌, আমাকে আবার তৈরি হতে হবে। আপনারা এদিকে একটু নজর রাখবেন।’ হাসিমুখে স্যালুট করিয়া রতিকান্ত চলিয়া গেল।

দেখিলাম রতিকান্তের ব্যবহার এবেলা অনেকটা সহজ ও স্বাভাবিক হইয়াছে। সে প্রথমটা একটু আড়ষ্ট হইয়াছিল। তাহার এলাকার মধ্যে ব্যোমকেশের আবির্ভাব মনে মনে পছন্দ করে নাই; এখন বোধহয় সে বুঝিয়াছে ব্যোমকেশ তাহার কৃতিত্বে ভাগ বসাইতে চায় না‌, তাই নিশ্চিন্ত হইয়াছে।

ব্যোমকেশ কিছুক্ষণ চক্ষু মুদিয়া বসিয়া রহিল‌, তারপর বলিল‌, ‘সব গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। ডাক্তার পালিতের ব্যবহারে সঙ্গতি পাওয়া যাচ্ছে না। তিনিই প্রথম বলেছিলেন‌, মৃত্যুর কারণ কিউরারি এবং তাঁর ইনজেকশনের ফলেই মৃত্যু হয়েছে। তবে আবার তিনি ওষুধের ভয়াল বদলে দিলেন কেন? ব্যোমকেশ আবার চক্ষু মুদিত করিল।

বাহিরে মোটরের শব্দ‌, হইল। ভূত্য আসিয়া বলিল‌, ডাক্তার পালিত আসিয়াছেন। ব্যোমকেশের চট্‌ করিয়া সমাধিভঙ্গ হইল‌, সে মৃদুকণ্ঠে পাণ্ডেজিকে বলিল‌, ‘ডাক্তারকে এসব বলে কোজ নেই।’

ডাক্তার পালিত আসিলে পাণ্ডেজি তাঁহাকে সমুচিত শিষ্টতা সহকারে বসাইলেন।

ডাক্তার ক্লান্তভাবে বলিলেন, ‘প্রাণে শান্তি নেই, পাণ্ডেজি। ডিসপেনসারি বন্ধ করবার পর ভাবলাম খোঁজ নিয়ে যাই যদি কিছু খবর থাকে।’

পাণ্ডেজি ব্যোমকেশের পানে কটাক্ষপাত করিলেন। ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘খবর তো আমরাও খুঁজে বেড়াচ্ছি‌, ডাক্তারবাবু্‌, কিন্তু পাচ্ছি কৈ? আপনি শকুন্তলা দেবী সম্বন্ধে যে-সব কথা বলেছিলেন তা যদি সত্য হয়—’

ডাক্তারের মুখ একটু অপ্রসন্ন হইল‌, ‘সত্যি কিনা অন্য যে-কোেনও ডাক্তার শকুন্তলাকে পরীক্ষা করলেই জানতে পারবেন।’

ব্যোমকেশ তাড়াতাড়ি বলিল‌, ‘না না‌, সেকথা আমি বলছি না‌, সেকথা শকুন্তলা নিজেই স্বীকার করেছেন। আমরা ভাবছি দীপনারায়ণ সিং সে সময়ে মরণাপন্ন ছিলেন–’

ডাক্তার বলিলেন‌, ‘তারও যথেষ্ট প্রমাণ আছে। তিন মাস আগে দীপনারায়ণ সিং-এর অবস্থা খুবই খারাপ হয়েছিল‌, শহরের অনেক ডাক্তার তাঁকে দেখেছিলেন‌, তাঁরা বলতে পারবেন। তাছাড়া একজন নার্স তখন অষ্টপ্রহর তাঁর কাছে থাকত। সে বলতে পারবে।’

‘তাই নাকি! কি নাম নার্সের?’

‘মিস ল্যাম্বার্ট। মেডিকেল কলেজের কাছে থাকে।’

ব্যোমকেশ পাণ্ডেজিকে জিজ্ঞাসা করিল‌, ‘আপনি চেনেন?’

পাণ্ডেজি বলিলেন‌, ‘চিনি না‌, কিন্তু বাসাটা দেখেছি।’

ব্যোমকেশ কিছুক্ষণ বসিয়া বসিয়া কি ভাবিল‌, তারপর ডাক্তার পালিতের দিকে ফিরিয়া বলিল‌, ‘ডাক্তারবাবু্‌, এবার আপনাকে একটা ব্যক্তিগত প্রশ্ন করি‌, কিছু মনে করবেন না। আপনি দীপনারায়ণ সিং-এর স্টেট থেকে বারো হাজার টাকা ধার নিয়েছেন কেন?

ডাক্তার পালিত আকাশ হইতে পড়িলেন‌, চক্ষু কপালে তুলিয়া কহিলেন‌, ‘টাকা ধার নিয়েছি।! সে কি‌, কে বললে আপনাকে?’

‘ম্যানেজার গঙ্গাধর বংশীর মুখে শুনলাম। তবে কি একথা সত্যি নয়?’

‘সর্বৈব মিথ্যে। বারো হাজার টাকা! গঙ্গাধর বংশী তো দেখছি সাংঘাতিক লোক। দীপনারায়ণবাবু মারা গেছেন এই ফাঁকে বারো হাজার টাকা হজম করতে চায়। দাঁড়ান ব্যাটাকে আমি দেখাচ্ছি‌, এখনি গিয়ে টুটি টিপে ধরব। আমার নামে মিথ্যে অপবাদ দেবে‌, এত বড় আস্পর্ধা।’

ডাক্তার পালিত উঠিবার উপক্রম করিতেই ব্যোমকেশ বলিল, ‘বসুন, বসুন, ম্যানেজারের সঙ্গে বোঝাপড়া পরে করবেন।–কিন্তু কিছু সত্যি যদি না থাকে একথা উঠলো কি করে?’

ডাক্তার একটু চিস্তা করিয়া বলিলেন‌, ‘কি করে উঠলো তা বুঝতে পেরেছি। হাপ্ত দুই আগে একদিন সকালে দীপনারায়ণবাবুকে ইনজেকশন দিতে গেছি‌, তিনি আমার মোটর দেখে বললেন-ডাক্তার‌, তোমার গাড়িটা ঝড়ঝড়ে হয়ে গেছে‌, ওটা বদলে ফ্যালো। আমি বললাম‌, আজকাল নতুন গাড়ি কিনতে গেলে দশ-বারো হাজার টাকা খরচ‌, অত টাকা আমি কোথায় পাব! আমি এক পয়সা বাঁচাতে পারিনি‌, যা রোজগার করি সব খেয়ে ফেলি। শূনে তিনি আর কিছু বললেন না‌, একটু হাসলেন। আমার বিশ্বাস তিনি ওই টাকাটা আমায় দেবেন ঠিক করেছিলেন‌, হয়তো ম্যানেজারকে বলেও ছিলেন। তারপর তিনি যখন হঠাৎ মারা গেলেন তখন ম্যানেজারের মাথায় বুদ্ধি খেলে গেল‌, বারো হাজার টাকা পকেটস্থ করার এই সুযোগ। দাঁড়ান না। আমি ওর ভুতুড়ি বার করে ছেড়ে দেব‌, আমার সঙ্গে চালাকি।’

ডাক্তার পালিত শাস্তশিষ্ট গভীর প্রকৃতির মানুষ‌, কিন্তু দেখিলাম। তিনি চটিয়া আগুন হইয়া গিয়াছেন। তাঁহাকে আর বেশিক্ষণ ধরিয়া রাখা গেল না; তিনি উঠিয়া পড়িলেন এবং আজ রাত্রেই একটা হেস্তনেস্ত করিবেন বলিয়া প্রস্থান করিলেন। ব্যোমকেশ কান পাতিয়া শুনিল‌, ডাক্তার পালিতের মোটর চলিয়া গেল। তখন সে লাফাইয়া উঠিয়া পাণ্ডেজিকে বলিল‌, চলুন‌, এখনি মিস ল্যাম্বার্টের সঙ্গে দেখা করতে হবে।’

বিস্মিত পাণ্ডেজি বলিলেন‌, ‘এখন-এই রাত্ৰে!’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘যেতে হলে আজ রাত্রেই যেতে হয়। ডাক্তার পালিত যে-রকম তাড়াতাড়ি চলে গেলেন‌, মিস ল্যাম্বার্টকে তালিম দিতে গেলেন। কিনা বুঝতে পারছি না। চলুন।’

পাণ্ডেজি বলিলেন‌, ‘চলুন।’

মিস ল্যাম্বার্ট ইঙ্গ-ভারতীয় মহিলা। বয়স হইয়াছে। তাঁহার চেহারায় ইঙ্গ ভাবই প্রবল‌, চোখ কটা‌, রঙ ফসর্ণ। কিন্তু মনটি বোধহয় ভারতীয়। ডিনারের পর পান খাইয়া ঠোঁট দু’টি লাল করিয়া বসিয়া রেডিও শুনিতেছিলেন‌, আমাদের পরিচয় পাইয়া সমাদর সহকারে ড্রয়িং রুমে বসাইলেন। ছোট্ট বাড়ির ছোট্ট ড্রয়িংরুম‌, বেশ ছিমছাম। মানুষটিও ছিমছাম। ডাক্তার পালিত এদিকে আসিয়াছিলেন বলিয়া মনে হইল না।

মিস ল্যাম্বার্ট হাসিয়া বলিলেন‌, ‘এত রাত্রে আপনাদের কি দিয়ে অতিথি সৎকার করব? পান খান।’ বলিয়া পানের বাটা আমাদের সামনে খুলিয়া ধরিলেন। আমরা পান লইলাম। পাণ্ডেজি বলিলেন‌, ‘আপনার রাত্রে কোথাও যাবার নেই তো?’

মিস ল্যাম্বার্ট বলিলেন‌, ‘না‌, আজ আমি ফ্ৰী আছি।’

পাণ্ডেজি বলিলেন‌, ‘আমরা আপনার কাছ থেকে একটা কথা জানতে এসেছি। দীপনারায়ণ সিং মারা গেছেন শুনেছেন কি?’

মিস ল্যাম্বাটের মুখ গভীর হইল‌, ‘শুনেছি। ডক্টর পালিতের হাতে এরকম ব্যাপার ঘটবে কল্পনা করাও যায় না।’

‘আপনি কার কাছে শুনলেন?’

‘ডক্টর জগন্নাথ প্রসাদের কাছে। তারপর অন্য ডক্টরদের মুখেও শুনলাম। সে স্যাড। বলুন আমি কি করতে পারি।’

পাণ্ডেজি তখন আমাদের জ্ঞাতব্য বিয়ষটি প্রাঞ্জল করিয়া বলিলেন। মিস ল্যাম্বার্ট গভীর মনোযোগের সহিত শুনিয়া দৃঢ়ভাবে মাথা নাড়িলেন‌, ‘ইমপসিবল। আমি দেড় মাস মিস্টার দীপনারায়ণের শুশ্রূষা করেছিলাম‌, তার মধ্যে কখনও দশ মিনিটের জন্যেও রুগীকে চোখের আড়াল করিনি।’

‘আপনি একাই তাঁর শুশ্রূষা করতেন?’

‘না‌, আমার একজন সহকারিণী ছিলেন-মিস দস্তুর। তিনি দিনের বেলা থাকতেন‌, আর রাত্ৰিতে আমি। আমাদের অনুপস্থিতি কালে কাউকে রুগীর কাছে যেতে দেওয়া হত না‌, এমন কি ঝি চাকরকে পর্যন্ত না।’

‘হুঁ। কবে থেকে কবে পর্যন্ত আপনারা শুশ্রূষা করেছিলেন?’

‘এক মিনিট‌, আমার ডায়েরি আপনাকে দেখাচ্ছি।’

মিস ল্যাম্বার্ট পাশের ঘর হইতে ডায়েরি আনিয়া পাণ্ডেজির হাতে দিলেন। ডায়েরিতে দিনের পর দিন মিস ল্যাম্বার্টের কর্মসূচী লিপিবদ্ধ হইয়াছে। যে দেড় মাস দীপনারায়ণ সিং-এর জীবন লইয়া যমে মানুষে টানাটানি চলিয়াছিল তাহার ব্বিরণ রহিয়াছে।

রোগীর অবস্থার বর্ণনা পড়িয়া সন্দেহ থাকে না যে ওই দেড় মাস অবস্থা অত্যন্ত সঙ্কটাপন্ন ছিল। তাঁহার জীবন-শক্তি এতাই হ্রাস হইয়াছিল যে বিছানায় উঠিয়া বসিবার শক্তি তাঁহার ছিল না। তারিখ মিলাইয়া দেখা গেল‌, মিস ল্যাম্বার্টের শুশ্রূষার কোল চার মাস আগে আরম্ভ হইয়া আজ হইতে আড়াই মাস আগে শেষ হইয়াছে। তার পরেও দীপনারায়ণ সিং অসুস্থ ছিলেন। কিন্তু জীবনের আশঙ্কা তখন আর ছিল না।

ডায়েরি মিস ল্যাম্বার্টকে ফেরত দিয়া এবং তাঁহাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাইয়া আমরা বিদায় লইলাম।

রাত্রি সাড়ে ন’টা বাজিয়া গিয়াছে। বাজারের দোকানপাট বন্ধ। আজ বাড়ি ফিরিয়া সত্যবতীর কাছে বকুনি খাইতে হইবে ভাবিতে ভাবিতে বাড়ি ফিরিলাম। পাণ্ডেজি আমাদের নামাইয়া দিয়া গেলেন।

পরদিন সকালে নিদ্রাভঙ্গ হইলে জানা গেল‌, রাত্রে বৃষ্টি হইয়া গিয়াছে‌, আকাশ কুয়াশায় আচ্ছন্ন; সূর্যদেব কম্বল মুড়ি দিয়া ওইয়া আছে। সুতরাং আমাদেরও শয্যাত্যাগ করিয়া লাভ নাই।

সাড়ে আটটার সময় সত্যবতী চা দিতে আসিয়া বলিল‌, ‘আজ আবার অমাবস্যা। আজ কেউ বাড়ির বার হতে পাবে না।’

এমন দিনে কে বাহির হইতে চায়? কিন্তু পাণ্ডেজি শুনলেন না‌, ঠিক নাটার সময় পুলিস-বেশে সজ্জিত হইয়া উপস্থিত হইলেন। আমরা কম্পিত কলেবরে লেপের ভিতর হইতে নিৰ্গত হইলাম। পাণ্ডেজি আমাদের অবস্থা দেখিয়া হাসিলেন। বলিলেন‌, ‘কাল রাত্রে একটা ব্যাপার ঘটেছে।’

কি ব্যাপার ঘটিয়াছে ব্যোমকেশ জানিতে চাহিল‌, পাণ্ডেজি সংক্ষেপে ঘটনা বলিলেন—

কাল রাত্ৰি বারোটা হইতে আকাশে কুয়াশা জমিতে আরম্ভ করিয়াছিল‌, তারপর টিপটিপ বৃষ্টি শুরু হয়। পাণ্ডেজির দেরিতে ঘুমানো অভ্যাস; রাত্রি প্রায় দেড়টার সময় তিনি শয়নের উপক্রম করিতেছিলেন এমন সময় টেলিফোন বাজিয়া উঠিল। দীপনারায়ণের বাড়ি হইতে টেলিফোন‌, যে জমাদারকে রতিকান্ত চারজন কনস্টেবল সঙ্গে পাহারায় রাখিয়াছিল। সে টেলিফোন করিতেছে। জমাদার জানাইল-কিছুক্ষণ আগে দুইজন লোক খিড়কির দরজা দিয়া হাতায় প্রবেশ করিবার চেষ্টা করিয়াছিল; কিন্তু সিপাহীরা সতর্ক ছিল‌, তাই প্রবেশ করিতে গিয়া সিপাহীদের দেখিয়া পলায়ন করিয়াছে। একজন সিপাহী দূর হইতে তাহাদের উপর টর্চের আলো ফেলিয়াছিল‌, দু’জনেই কোট-প্যান্ট পরা ভদ্রশ্রেণীর লোক‌, কিন্তু তাহাদের সনাক্ত করা যায় নাই। মনে হয় তাহারা মোটর বাইকে চড়িয়া আসিয়াছিল, কারণ কিছুক্ষণ পরে দূরে মোটর বাইকের ফট্‌ ফট্‌ শব্দ শুনা গিয়াছিল।

পাণ্ডেজি রাত্রে আর কিছু করেন নাই‌, জমাদারকে সতর্কভাবে পাহারা দিবার উপদেশ দিয়া টেলিফোন ছাড়িয়া দিয়াছিলেন। তারপর আজ সকালে খোঁজ লইয়া জানিয়াছেন যে রাত্রে আর কোনও উপদ্রব হয় নাই।

ব্যোমিকশে ভ্রূ তুলিয়া কিছুক্ষণ পাণ্ডেজির পানে চাহিয়া রহিল। আমি বলিলাম‌, নর্মদাশঙ্কর।’

ব্যোমকেশ আমার দিকে ঘাড় ফিরাইয়া বলিল‌, ‘আমি ভাবছি। অন্য লোকটা কে? নর্মদাশঙ্করই যদি দুষ্মন্ত হয় তাহলে সে কি একজন বয়স্যকে সঙ্গে নিয়ে শকুন্তলার কুঞ্জে যাবে?—পাণ্ডেজি‌, আপনার কি মনে হয়?’

পাণ্ডেজি বলিলেন‌, ‘কিছু বুঝতে পারছি না। আমি দুটো ওয়ারেন্ট নিয়ে এসেছি‌, ওয়ারেন্টে আসামীর নাম নেই‌, দরকার হলে বসিয়ে দেওয়া যাবে।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘তাহলে চলুন‌, নর্মদাশঙ্করের বাড়িতে হানা দেওয়া যাক। হঠাৎ আমাদের দেখলে ঘাবড়ে গিয়ে সত্যি কথা বলে ফেলতে পারে।’

পাঁচ মিনিটের মধ্যে আমরা তৈরি হইয়া বাহির হইলাম। সত্যবতী কিছু বলিল না‌, কেবল কটমট করিয়া তাকাইল।

মোটরে উঠতে গিয়া দেখিলাম ভিতরে একজন পুষ্টকায় সাব-ইন্সপেক্টর বসিয়া আছে। পাণ্ডেজি পরিচয় করাইয়া দিলেন–সাব-ইন্সপেক্টর তিওয়ারী।

তিওয়ারীর চেহারা সাবেক আমলের দারোগার মত। সে পোকা-ধরা দাঁত বাহির করিয়া স্যালুট করিল। বুঝিলাম রতিকান্ত তাহাকেই থানার চার্জে রাখিয়া গিয়াছে।

এদিকে আকাশের অশ্রুবাষ্প ক্রমশ অপসৃত হইতে আরম্ভ করিয়াছিল‌, সদ্য-জাগ্বত সূর্যদেব শাণিত খড়গ দিয়া তাহাকে খণ্ড খণ্ড করিয়া ফেলিতেছিলেন। এতক্ষণ যাহা ভারী মেঘের মত আকাশের বুকে চাপিয়া ছিল তাহা ধুমকুণ্ডলীর মত মিলাইয়া যাইতে লাগিল। আমরা নর্মদাশঙ্করের বাড়িতে পৌঁছিতে পৌঁছিতে কাঁচা সোনালী রৌদ্রে চারিদিক ঝলমল করিয়া উঠিল।

নর্মদাশঙ্করের বাড়ি শহরের নূতন অংশে। ঢালাই লোহার রেলিং দিয়া ঘেরা‌, সামনে টেনিস কোর্ট। আমরা বাহিরে মোটর রাখিয়া যথাসম্ভব নিঃশব্দে প্রবেশ করিলাম। ভাবগতিক দেখিয়া মনে হইল এখনও এ বাড়ির ভাল করিয়া ঘুম ভাঙে নাই। সম্মুখের বারান্দায় পা ছড়াইয়া বসিয়া একটা নিদ্ৰালু চাকর কয়েক জোড়া জুতা বুরুশ করিতেছে। আমাদের দেখিয়া কিছুক্ষণ মুখ-ব্যাদান করিয়া রহিল।

ব্যোমকেশ তাহার কাছে গিয়া টপ করিয়া এক জোড়া জুতা তুলিয়া লইল এবং উল্টাইয়া দেখিল। চাকরকে প্রশ্ন করিল‌, ‘এ জুতো কার?’

চাকরিটা হাঁ-করা অবস্থায় বলিল‌, ‘মালিকের।’

ব্যোমকেশ জুতা জোড়ার তলদেশ আমাদের দেখাইল। তলায় কাদা লাগিয়া আছে। রাত্রি বারোটার পর যে এই জুতা ব্যবহার হইয়াছে তাহাতে সন্দেহ নাই।

এই সময় বাড়ির ভিতর হইতে একজন উচ্চশ্রেণীর উর্দিপরা বেয়ারা বাহির হইয়া আসিল। সেও দু’জন পুলিস অফিসারকে দেখিয়া থতমত খাইয়া গেল। পাণ্ডেজি কড়া সুরে তাহাকে বলিলেন‌, নর্মদাশঙ্করবাবু কোথায়?’

বেয়ারা ভয়ে পাইয়া বলিল, ‘আজ্ঞে, তিনি বাড়িতেই আছেন।‘

‘নিয়ে চল আমাদের তাঁর কাছে।’

বেয়ারা একবার একটু ইতস্তত করিল‌, তারপর পথ দেখাইয়া আমাদের লইয়া চলিল। বাড়ির অভ্যন্তর যতদূর দেখিলাম সুরুচির সহিত সজ্জিত। বেয়ারা আমাদের একটি দরজার সম্মুখে আনিয়া পদ সরাইয়া দাঁড়াইল। আমরা ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিলাম।

ঘরের জানালা দরজা বন্ধ‌, বৈদ্যুতিক আলো জ্বলিতেছে। ঘরটিকে শিকারের ঘর বলা চলে। মেঝোয় বাঘ ও হরিণের চামড়া ছড়ানো‌, দেয়ালে বাঘ ও হরিণের মুণ্ড। একটি কাচের আলমারিতে রাইফেল বন্দুক পিস্তল প্রভৃতি সাজানো রহিয়াছে। ঘরের মাঝখানে একটি গোল টেবিল‌, তাহাকে ঘিরিয়া কয়েকটি গদি-মোড়া আরাম-কেদারা।

আমরা প্রবেশ করিয়া দেখিলাম‌, দু’টি লোক মুখোমুখি দু’টি কেদারায় বসিয়া আছে; তাহাদের হাতে কাচের গেলাসে রঙীন তরল পদার্থ। পাশের টেবিলে সোডা ও হুইস্কির বোতল। সুতরাং গেলাসের তরল পদার্থ যে কী বস্তু তাহা অনুমান করা কঠিন নয়। বোধহয় মধ্য রাত্রে যে সোমযাগ আরম্ভ হইয়াছিল। তাহা এখনও চলিতেছে।

আমাদের দিকে মুখ করিয়া যে লোকটি বসিয়া ছিল সে ঘোড়া জগন্নাথ। ঘোলাটে চোখে আমাদের দেখিতে পাইয়া তাহার সমস্ত শরীর বিদ্যুৎপৃষ্ট্রের মত ঝাঁকানি দিয়া উঠিল; হাতের গেলাস হইতে তরল পদার্থ চলাকাইয়া পড়িল। তখন নর্মদাশঙ্কর ঘাড় ফিরাইয়া দেখিল। তাহার আরক্ত মুখে ভ্রূকুটি দেখা দিল। সে রূঢ় স্বরে বলিল‌, ‘কি চাই?

মদের বিচিত্র প্রভাব; পেটে মদ পড়িলে মানুষের চরিত্র বদলাইয়া যায়। কেহ কাঁদে্‌্‌, কেহ গান গায়‌, কেহ বা যুযুৎসু হইয়া ওঠে। নর্মদাশঙ্করের বিনীত বশংবদ ভাব আর নাই‌, সে উগ্র সম্পধিত চক্ষে আমাদের পানে চাহিয়া রহিল।

পাণ্ডেজি তাহাদের কাছে গিয়া দাঁড়াইলেন‌, তাঁহার কণ্ঠস্বরে পুলিসী কঠোরতা ফুটিয়া উঠিল‌, ‘আপনাদের দু’জনের নামে ওয়ারেন্ট আছে।’

নর্মদাশঙ্কর মদের গেলাস হাতে উঠিয়া দাঁড়াইল‌, উদ্ধত বিস্ময়ে বলিল‌, ‘ওয়ারেন্ট! আমার নামে? কিসের ওয়ারেন্ট?’

পাণ্ডেজি বলিলেন‌, ‘আপনারা দু’জনে কাল রাত্রি একটার সময় দীপনারায়ণ সিং-এর বাড়িতে ট্রেসপাস করেছিলেন।’

‘প্রমাণ আছে?’

পাণ্ডেজি অবিচলিত কণ্ঠে বলিলেন‌, ‘আছে। পুলিসের লোকে আপনাকে দেখেছে।’

নর্মদাশঙ্করের রক্ত–রাঙা চোখে কুটিল বজ্জাতি খেলিয়া গেল‌, সে ঠোঁটের একটা তেরছা ভঙ্গী করিয়া বলিল‌, ‘যদি বলি শকুন্তলা আমাকে ডেকেছিল তাহলেও কি ট্রেসম্পাস হবে?

‘সেকথা আদালতে বলবেন।–সাব-ইন্সপেক্টর তিওয়ারী–’ পাণ্ডেজি তিওয়ারীকে ইঙ্গিত করিলেন, তিওয়ারী পকেট হইতে দুই জোড়া হাতকড়া বাহির করিল।

হাতকড়া দেখিয়া ঘোড়া জগন্নাথ হাউমাউ করিয়া উঠিল। এতক্ষণ সে চুপটি করিয়া ছিল‌, নাক ঝাড়ার শব্দ পর্যন্ত করে নাই। এখন মদের গেলাস টেবিলে রাখিয়া দুহাতে পাণ্ডেজির হাত চাপিয়া ধরিল‌, ব্যগ্র মিনতির কণ্ঠে বলিল‌, ‘পাণ্ডেজি‌, দোহাই আপনার‌, হাতে হাতকড়া পরাবেন না। আমরা সত্যিকারের দোষ কিছু করিনি‌, আপনাকে সব কথা বলছি-না না‌, নর্মদাশঙ্কর‌, তুমি চুপ কর‌, গোঁয়াতুমি কোরো না—এসব কেচ্ছা জারি হয়ে পড়লে শহরে আর মুখ দেখানো যাবে না। পাণ্ডেজি‌, আমার বয়ান শুনুন–’

পাণ্ডেজি বলিলেন‌, ‘আপনি যদি সত্যি কথা বলেন শুনতে রাজী আছি।’

‘সত্যি কথা বলব‌, কোনও কথা লুকোব না।’

‘বেশ‌, শুনে যদি মনে হয় আপনাদের কোনও মন্দ অভিপ্ৰায় ছিল না‌, তাহলে অ্যারেস্ট নাও করতে পারি। —নর্মদাশঙ্করবাবু্‌, আপনি যান‌, অনেক মদ খেয়েছেন‌, বিছানায় শুয়ে থাকুন গিয়ে। দরকার হলে ডাকব।’

এতক্ষণে নর্মদাশঙ্করেরও কতকটা কুঁশি হইয়াছিল; সে আমাদের দিকে একটি ব্যর্থ ক্রোধের জ্বলন্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া মদের বোতলটা তুলিয়া লইয়া প্রস্থান করিল।

আমরা তখন উপবেশন করিলাম। ঘোড়া জগন্নাথ কোঁৎ কোৎ করিয়া গেলাসের বাকি মদ গলাধঃকরণ করিয়া যে ঘটনা বিবৃত করিল। তাহার মমর্থ এইরূপ–

নর্মদাশঙ্করের সঙ্গে ঘোড়া জগন্নাথের বন্ধুত্ব খুব গাঢ় নয়; তবে নর্মদাশঙ্করের বাড়িতে আসিলে বিনা পয়সায় বিলাতি মন্দ পাওয়া যায়‌, তাই জগন্নাথ তাহার সহিত একটা বাহ্যিক সৌহৃদ্য রাখিয়াছে। কাল রাত্রে জগন্নাথ আরও কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে এখানে আসিয়াছিল‌, তারপর এখানেই আহারাদি সম্পন্ন করে। অন্যান্য বন্ধুরা প্রস্থান করিলে জগন্নাথ ও নর্মদাশঙ্কর এই ঘরে আসিয়া মদ্য পান করিতে আরম্ভ করে। নর্মদাশঙ্করকে কাল সন্ধ্যাকালে পুলিস শকুন্তলার সহিত সাক্ষাৎ করিতে দেয় নাই‌, সেজন্য তাহার মনে গভীর ক্ষোভ ছিল; মদ খাইতে খাইতে এই প্রসঙ্গই আলোচনা হয়। ক্রমে রাত্রি দ্বিপ্রহর হইল‌, বৃষ্টি পড়িতে আরম্ভ করিল। হঠাৎ নর্মদাশঙ্কর বলিল‌, আজ রাত্রে যেমন করিয়া হোক শকুন্তলার সহিত দেখা করিবে। জগন্নাথ তাহাকে নিবৃত্ত করিবার চেষ্টা করিয়াছিল‌, কিন্তু সে শুনিল না। তখন দুইজনে মোটর বাইকে চড়িয়া বাহির হইল‌, জগন্নাথ মোটর বাইকের পিছনের আসনে বসিল। দীপনারায়ণের বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছিয়া তাহারা আমবাগানের মধ্যে মোটর বাইক লুকাইয়া রাখিল‌, তারপর খিড়কির দরজা দিয়া ভিতরে প্রবেশ করিল। কিন্তু পুলিস পাহারায় ছিল‌, খিড়কির দরজা পার হইতে না হইতে তাহারা বৈদ্যুতিক টর্চের আলো ফেলিয়া আগন্তুক দু’টিকে দেখিতে পাইল। দু’জনে তখন আর কালবিলম্ব না করিয়া পলায়ন করিল এবং মোটর বাইকে চাপিয়া ফিরিয়া আসিল। তারপর হইতে বর্তমান কাল পর্যন্ত তাহারা এখানে বসিয়া মদ্য পান করিয়াছে। তাহাদের কোনও বে-আইনী অভিসন্ধি ছিল না‌, মদের ঝোঁকে একটা নিবুদ্ধিতার কাজ করিয়া ফেলিয়াছে। এখন এই সব বিবেচনা করিয়া পাণ্ডেজি নিজ গুণে তাহদের ক্ষমা করুন।

ঘোড়া জগন্নাথের অনুনয়ান্ত বিবৃতি শেষ হইবার পর পাণ্ডেজি ব্যোমকেশের দিকে ভূভঙ্গ করিলেন। ব্যোমকেশ প্রশ্ন করিল‌, ‘শকুন্তলা দেবীর সঙ্গে নর্মদাশঙ্করবাবুর সম্বন্ধটা ঠিক কোন ধরনের?

জগন্নাথ সন্ত্রস্ত হইয়া বলিল‌, ‘দেখুন‌, ওসব কথা আমাকে জিজ্ঞাসা করিবেন না। মানে–’

‘মানে-আপনি বলবেন না?’

জগন্নাথ আরও সন্ত্রস্ত হইয়া উঠিল‌, ‘না না‌, বলব না কেন? তবে ওসব কথায় আমি থাকি না—আমি একজন রেসপেক্টবল ডাক্তার-কাজ কি আমার পরের হাঁড়িতে কাঠি দিয়ে।’

‘বটে! আপনি পরের হাঁড়িতে কাঠি দেন না! কেবল ডাক্তার পালিতের কম্পাউন্ডার খুবলালকে চাকরি ছেড়ে দেবার জন্য ভয় দেখিয়েছিলেন।’

খুবলালের উল্লেখে ঘোড়া জগন্নাথ একবারে কেঁচো হইয়া গেল–’আমি-মানে আমি—’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘ওকথা যাক। শকুন্তলার সঙ্গে নর্মদাশঙ্করের ঘনিষ্ঠতা কতদূর গড়িয়েছে তা আপনি জানেন না?’

‘সত্যি বলছি নাটঘটের কথা আমি কিছু জানি না।’

‘কাল রাত্রে নর্মদাশঙ্কর কিছু বলেনি?’

নর্মদাশঙ্কর ভারি মিথ্যেবাদী। ও মনে করে দুনিয়ার সব মেয়ে ওর প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে। ওর কথা বিশ্বাস করা যায় না।’

‘অর্থাৎ বলেছিল। কী বলেছিল?’

‘বলেছিল শকুন্তলার সঙ্গে অনেক দিন ধরে ওর প্রেম চলছে। এলাহাবাদে ওরা এক কলেজে পড়ত‌, তখন থেকে প্ৰেম।’

ব্যোমকেশ ধীরে ধীরে উঠিয়া দাঁড়াইল‌, নীরসকণ্ঠে বলিল‌, ‘হঁ! আজ আপনি ছাড়া পেলেন। কিন্তু পরে হয়তো আদালতে সাক্ষী দিতে হবে। শহর ছেড়ে পালাবার চেষ্টা করবেন না‌, তাহলেই হাতে হাতকড়া পড়বে। চলুন‌, পাণ্ডেজি।’



দীপনারায়ণ সিং-এর বাড়িতে পৌঁছিয়া পাণ্ডেজি তিওয়ারীকে বলিলেন‌, ‘তুমি এবার থানায় ফিরে যাও‌, তোমাকে এখানে আর দরকার নেই।’ তিওয়ারী প্রস্থান করিলে তিনি ব্যোমকেশকে প্রশ্ন করিলেন‌, ‘অতঃ কিম?

ব্যোমকেশ মুচকি হাসিয়া বলিল‌, ‘আসুন‌, সেরেস্তার দিকে যাওয়া যাক। মনে হল যেন। ম্যানেজার গঙ্গাধর বংশী দূর থেকে আমাদের দেখতে পেয়ে সুট করে দপ্তরখানায় ঢুকে পড়লেন।’

ফটিক অতিক্বম করিয়া আমরা সেরেস্তার দিকে চলিলাম। পথে জমাদারের সঙ্গে দেখা হইল; সে পাণ্ডেজিকে স্যালুট করিয়া জানাইল‌, সব ঠিক আছে।

সেরেস্তার ঘরগুলি কাল আমরা বাহির হইতে দেখিয়াছিলাম। এক সারিতে গুটি তিনেক ঘর; প্রত্যেক ঘরে তক্তপোশের উপর জাজিম পাতা। কয়েকজন কেরানি বসিয়া কাজ করিতেছে। ম্যানেজার গঙ্গাধর যখন দেখিলেন আমাদের এড়াইতে পারিকেন না‌, তখন তিনি সেরেস্তা হইতে বাহির হইয়া আসিলেন। তাঁহার হাতে এক তাড়া বহিগামী চিঠি। আমাদের যেন এই মাত্র দেখিতে পাইয়াছেন এমনিভাবে মুখে একটি সচেষ্ট হাসি আনিয়া বলিলেন‌, ‘এই যে!’

ব্যোমকেশ চিঠিগুলি লক্ষ্য করিয়া বলিল‌, ‘দেওয়ানজি‌, আপনার সেরেস্তা থেকে রোজ কত চিঠি ডাকে যায়?’

দেওয়ানজি চিঠিগুলি একজন পিওনের হাতে দিলেন‌, পিওন সেগুলি লইয়া খিড়কির দরজা দিয়া বাহির হইয়া গেল; বাড়ির কোণে যে ডাক-বাক্স আছে তাহাতেই ফেলিতে গেল সন্দেহ নাই। দেওয়ানজি বলিলেন‌, ‘তা কুড়ি-পঁচিশখানা যায়। অনেক লোককে চিঠি দিতে হয়–উকিল মোক্তার খাতক প্রজা—’

ব্যোমকেশ বলিলবাড়ির কোণে যে ডাক-বাক্সটা আছে তাতেই সব চিঠিপত্র ফেলা হয়?’

গঙ্গাধর বলিলেন‌, ‘আজ্ঞে হ্যাঁ! ও ডাক-বাক্সটা আমরা ডাক বিভাগের সঙ্গে লেখালেখি করে ওখানে বসিয়েছি। হাতের কাছে একটা ডাক-বাক্স থাকলে সুবিধা হয়।’

‘তা তো বটেই। কবার ক্লিয়ারেন্স হয়?’

‘একবার ভোর সাতটায়‌, একবার বিকেল চারটেয়। কিন্তু কেন বলুন দেখি? ডাক-বাক্সের সঙ্গে আপনাদের তদন্তের কোনও সম্পর্ক আছে নকি?’

‘থাকতেও পারে। দেওয়ানজি‌, আমাদের ভাষায় এক বয়েৎ আছে-যেখানে দেখিবে ছাঁই‌, উড়াইয়া দেখ তাই‌, পাইলে পাইতে পার লুকানো রতন। কিন্তু যাক ওকথা। এদিকের খবর কি?’

গঙ্গাধর হাত উল্টাইয়া বলিলেন‌, ‘খবর আমি তো কিছুই জানি না। এমন কি মালিকের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ পর্যন্ত এখনও জানতে পারিনি। সত্যিই কি ইনজেকশনে বিষ ছিল?’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘ডাক্তারেরা তো তাই বলেছেন। ভাল কথা‌, ডাক্তার পালিতের সঙ্গে আপনার দেখা হয়েছিল?’

গঙ্গাধর বংশীর মুখখানি হঠাৎ যেন চুপসিয়া গেল‌, চক্ষু দু’টি কোটরের মধ্যে অন্তৰ্হিত হইল। তিনি ক্ষণেক নীরব থাকিয়া ঈষৎ স্বলিত স্বরে বলিলেন‌, ‘দেখা হয়েছিল। তিনি টাকা নেওয়ার কথা অস্বীকার করছেন।’

‘আপনি কি নিজের হাতে টাকা দিয়েছিলেন?’

গঙ্গাধর আবার কিছুক্ষণ চুপ করিয়া রহিলেন‌, শেষে বলিলেন‌, ‘না‌, অ্যাসিট্যান্ট ম্যানেজার টাকা দিয়েছিল।’

‘অ্যাসিসট্যান্ট ম্যানেজার মানে—আপনার ছেলে লীলাধর বংশী?’

গঙ্গাধর বুজিয়া যাওয়া কণ্ঠস্বর পরিষ্কার করিয়া বলিলেন‌, ‘হ্যাঁ। মুশকিল হয়েছে‌, রসিদ নেওয়া হয়নি। ডাক্তার পালিত যে এ রকম করবেন–’

‘সত্যিই তো-ভাবাও যায় না।–তা লীলাধরবাবু এখন কোথায়?’

‘সে-সে শ্বশুরবাড়ি গিয়েছে।’

‘তাই নাকি! কাল সন্ধ্যে পর্যন্ত এখানে ছিলেন‌, দেবনারায়ণের ঘরে বসে তাড়ি খাচ্ছিলেন‌, আজ একেবারে শ্বশুরবাড়ি।’

গঙ্গাধর অস্পষ্ট জড়িতস্বরে বলিলেন‌, ‘তার স্ত্রীর অসুখ. হঠাৎ খবর পেয়ে চলে গেছে।’

‘হুঁ-ব্যোমকেশের চোখে দুষ্ট-বুদ্ধি নাচিয়া উঠিল‌, সে তখন চিন্তা-মন্থর ভঙ্গীতে বলিল‌, ‘টাকা তো কম নয়-বারো হাজার। স্টেটের এতগুলো টাকা মারা যাবে‌, দেওয়ানজি‌, আপনার উচিত পুলিসে এত্তেলা দেওয়া। রসিদ না দিলেও টাকা যে ডাক্তার পালিত নিয়েছেন তা পুলিস। অনুসন্ধান করে বার করতে পারবে।–কি বলেন পাণ্ডেজি?’

পাণ্ডেজি দৃঢ়স্বরে বলিলেন‌, ‘নিশ্চয়। ম্যানেজার সাহেব বলুন‌, আমরা এখনি তদন্ত আরম্ভ করছি। দপ্তরের সমস্ত কাগজপত্র আমরা পরীক্ষা করে দেখব; যদি কোথাও গরমিল থাকে ধরা পড়বেই। ডাক্তার পালিত এবং লীলাধরকেও জেরা করব‌, তাঁদের তল্লাসী নেব–’

ব্যোমকেশ ও পাণ্ডেজি মিলিয়া ম্যানেজার সাহেবকে কোন অতট প্রপাতের কিনারায় ঠেলিয়া লইয়া যাইতেছেন তাহা অনুমান করা তাঁহার মত গভীর জলের মাছের পক্ষে কঠিন নয়। তিনি উদাসভাবে মাথা নাড়িয়া বলিলেন‌, ‘না‌, ডাক্তার পালিত যখন অস্বীকার করছেন তখন আমিই ও-টাকা পুরিয়ে দেব। আমার লোকসানের বরাত‌, গচ্ছা দিতে দিতেই জন্ম কেটে গেল।’ বলিয়া গভীর দীর্ঘশ্বাস মোচন করিলেন।

ব্যোমকেশ মুখ টিপিয়া হাসিল। পাণ্ডেজি গলার মধ্যে একটা আওয়াজ করিলেন‌, কিন্তু আওয়াজটা সহানুভূতিসূচক নয়।

দেওয়ানজিকে সেরেস্তায় রাখিয়া আমরা বাড়ির সদরে উপস্থিত হইলাম। বাহিরের হল-ঘরে একজন সিপাহী পাহারায় ছিল; তাহাকে জিজ্ঞাসা করিয়া জানা গেল‌, বাড়ির সবাই উপরিতলায় আছে। আমরা সিঁড়ি দিয়া উপরে উঠিলাম।

সিঁড়ির মাথায় দাঁড়াইয়া আছে চাঁদনী; চক্ষু দু’টি রক্তবর্ণ‌, মাথার চুল এলোমেলো। তাহার চেহারা যদি স্বভাবতাই মিষ্ট এবং নরম না হইত। তাহা হইলে বলিতাম‌, রণরঙ্গিনী মূর্তি। সে আমাদের দেখিবামাত্র কোনও প্রকার ভূমিকা না করিয়া আরম্ভ করিল‌, ‘আপনারা নাকি চাচিজির কাছে আমার যাওয়া বারণ করে দিয়েছেন! কী ভেবেছেন আপনারা? আমি চাচিজিকে বিষ খাওয়াব?’

অতর্কিত আক্রমণে আমরা বিমূঢ় হইয়া পড়িলাম। ব্যোমকেশ অসহায়ভাবে পাণ্ডেজির পানে চাহিল‌, পাণ্ডেজি মাথা চুলকাইয়া অপ্রস্তুতভাবে বলিলেন‌, ‘দেখুন‌, শুধু আপনাকেই বারণ করা হয়নি‌, ওঁর কাছে এখন কারুরই যাওয়া বাঞ্ছনীয় নয়। আর দু’চার দিনের মধ্যেই আমাদের কাজ শেষ হয়ে যাবে‌, তখন আবার আপনারা ওঁর কাছে যেতে পারবেন।’

চাঁদনী আবেগভরে বলিল‌, ‘কিন্তু কেন? আমি ওঁর। যেমন সেবা করতে পারব। আর কেউ কি তেমন পারবে? তবে কেন আমাকে ওঁর কাছে যেতে দেওয়া হবে না? উনি অসুস্থ, এতবড় শোক পেয়েছেন–’

চাঁদনীর চোখ দিয়া দরদীর ধারায় জল পড়িতে লাগিল। এবার পাণ্ডেজি অসহায়ভাবে ব্যোমকেশের পানে চাহিলেন।

ব্যোমকেশ এতক্ষণে সামলাইয়া লইয়াছে‌, সে শাস্তকণ্ঠে বলিল‌, ‘আপনি বোধহয় জানেন না‌, শকুন্তলা দেবী অন্তঃসত্ত্বা। তার ওপর এতবড় আঘাত পেয়েছেন। ওঁর শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ‌, তাই মিস মান্নাকে ওঁর কাছে রাখা হয়েছে। আপনারা ওঁর নিজের লোক‌, আপনারা ওঁর কাছে বেশি যাওয়া-আসা করলে ওঁর মন আরও বিক্ষিপ্ত হবে‌, তাতে ওঁর শরীরের অনিষ্ট হতে পারে। তাই ওঁর কাছ থেকে কিছুদিন আপনাদের দূরে থাকাই ভাল।’

ব্যোমকেশ কথা বলিতে আরম্ভ করার সঙ্গে সঙ্গে চাঁদনী সম্মোহিতের ন্যায় স্থির চক্ষু হইয়া গিয়াছিল। ব্যোমকেশ থামিলে সে তন্দ্রাহতের মত অস্ফুট স্বরে বলিল‌, ‘অন্তঃসত্ত্বা—/ তারপর তেমনই মোহাচ্ছন্নভাবে নিজের মহলের দিকে ফিরিল।

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘শুনুন। আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করবার আছে–চাঁদনী ফিরিয়া দাঁড়াইল— ‘দীপনারায়ণবাবুকে যখন ইনজেকশন দেওয়া হয় তখন আপনি উপস্থিত ছিলেন?

প্রশ্নটা চাঁদনী পুরা শুনিতে পাইল কিনা বলা যায় না‌, অস্পষ্টভাবে বলিল, ‘ছিলাম।’

‘সেখানে আর কেউ ছিল?’

‘জানি না। লক্ষ্য করিনি।’

‘মন দিয়ে আমার প্রশ্ন শুনুন। ডাক্তারবাবুকি কি করলেন মনে করবার চেষ্টা করুন।’

‘ডাক্তারবাবু ইনজেকশন দিতেই চাচাজি এলিয়ে পড়লেন। তখন ডাক্তারবাবু তাড়াতাড়ি আর একটা ইনজেকশন দিলেন। আমি ছুটে গেলাম চাচিজিকে খবর দিতে। ফিরে এসে দেখি সব শেষ হয়ে গেছে।’

‘ফিরে এসে সেখানে আর কাউকে দেখেছিলেন?’

‘মনে নেই। বোধহয় দেওয়ানজি ছিলেন‌, আর কাউকে লক্ষ্য করিনি।’–চাঁদনী আর প্রশ্নের অপেক্ষা না করিয়া নিজের মহলে চলিয়া গেল।

ব্যোমকেশ মাটির দিকে তাকাইয়া কিছুক্ষণ দাঁড়াইয়া রহিল‌, শেষে মুখ তুলিয়া বলিল‌, চলুন‌, এবার শকুন্তলা দেবীর ঘরে যাওয়া যাক।।’

আগে আগে ব্যোমকেশ‌, পিছনে আমরা চলিলাম। বসিবার ঘর শূন্য‌, আসবাবগুলির উপর সূক্ষ্ম ধূলার আস্তরণ পড়িয়াছে। পরের ঘরটিও তাই। তৃতীয় কক্ষে্‌্‌, অর্থাৎ শকুন্তলার গানবাজনার ঘরের সম্মুখে আসিয়া ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘দাঁড়ান‌, ছবিটা আর একবার দেখে নিই।’

ব্যোমকেশ ঘরে প্রবেশ করিল। আমরা দ্বারের কাছে দাঁড়াইয়া রহিলাম‌, ছবি দেখিবার বিশেষ আগ্রহ আমাদের ছিল না।

যে দেয়ালে দুষ্মন্ত শকুন্তলার পূর্বরাগ চিত্রটি আঁকা ছিল ব্যোমকেশ সেইদিকে অদৃশ্য হইয়া গেল। পাঁচ মিনিট আর তাহার দেখা নাই। আমি দরজা দিয়া গলা বাড়াইয়া দেখিলাম সে মগ্ন-সমাহিত হইয়া ছবি দেখিতেছে। আমি একটু শ্লেষ করিয়া বলিলাম‌, ‘কি হে‌, একেবারে তন্ময় হয়ে গেলে যে! কী দেখছ এত?’

ব্যোমকেশ ধীরে ধীরে ফিরিল। দেখিলাম তাহার চোখের দৃষ্টি কেমন একরকম হইয়া গিয়াছে‌, যেন একটা অভিভূত বিস্ময়াহত ভাব। সে আমার কথার উত্তর দিল না‌, মখমলের বিছানায় আসিয়া বসিল‌, উত্থিত হাঁটু দুটাকে বাহু দিয়া জড়াইয়া শূন্য পানে চাহিয়া রহিল।

তাহার ভাবভঙ্গী দেখিয়া পাণ্ডেজি ও আমি ঘরে প্রবেশ করিলাম। পাণ্ডেজি‌, ঈষৎ উদ্বিগ্নভাবে বলিলেন‌, ‘ব্যোমকেশবাবু্‌, কি হয়েছে? ছবিতে কি দেখলেন?’ ব্যোমকেশ এবারও উত্তর দিল না; পকেট হইতে সিগারেট বাহির করিয়া অতি যত্নে ধরাইল‌, তারপর সুদীর্ঘ টান দিয়া আস্তে আস্তে ধোঁয়া ছাড়িতে লাগিল।

আমি পাণ্ডেজির সহিত দৃষ্টি বিনিময় করিলাম‌, তারপর দু’জনে একসঙ্গে গিয়া ছবির সম্মুখে দাঁড়াইলাম। ছবি কাল যেমন দেখিয়াছিলাম‌, আজ দিনের আলোয় তাহার কোনও তফাৎ দেখিলাম না। শকুন্তলা তেমনি তরু-আলবালে জল সেচন করিতেছেন‌, দুষ্মন্ত তেমনি গাছের আড়াল হইতে উঁকি মারিতেছেন। তবে ব্যোমকেশ হঠাৎ এমন বোবা হইয়া গেল কেন?

আমরা ফিরিয়া গিয়া ব্যোমকেশের সম্মুখে বসিলাম এবং একদৃষ্টি তাহার পানে চাহিয়া অপেক্ষা করিয়া রহিলাম। সে সিগারেট সম্পূর্ণ শেষ করিয়া জানোলা গলাইয়া ফেলিয়া দিল‌, তারপর পাণ্ডেজির হাত ধরিয়া গাঢ় স্বরে বলিল‌, ‘একটি অনুরোধ রাখতে হবে।’

‘কি অনুরোধ?’

‘আমি একা শকুন্তলার ঘরে গিয়ে তাঁকে জেরা করব‌, সেখানে আর কেউ থাকবে না।’

‘বেশ তো। কিন্তু কী পেলেন?’

ব্যোমকেশ উঠিয়া দাঁড়াইল‌, ‘সব পেয়েছি। আপনারাও তো ছবি দেখলেন‌, কিছু পেলেন না?’

পাণ্ডেজি ক্ষুব্ধভাবে মাথা নাড়িয়া বলিলেন‌, ‘কৈ আর পেলাম। কাল রাত্রেও ছবি দেখেছি‌, আজও দেখলাম‌, কিন্তু রহস্যের চাবি তো পেলাম না।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘কাল রাত্রে নিওন-লাইটের নীল আলোতে দেখেছিলেন‌, কিন্তু আজ দিনের আলোয় দেখেছেন। আজ দেখতে না পাওয়ার কোনও কারণ নেই। যাহোক‌, আপনারা সামনের ঘরে গিয়ে বসুন‌, আমি আধঘণ্টার মধ্যে আসছি।’

ব্যোমকেশ গিয়া শকুন্তলার দ্বারে টোকা দিল‌, দ্বার খুলিয়া মিস মান্না বাহিরে আসিলেন। ব্যোমকেশ নিম্নস্বরে তাঁহাকে কিছু বলিল‌, তিনি ঘাড় নাড়িয়া আমাদের কাছে চলিয়া আসিলেন। ব্যোমকেশ শকুন্তলার ঘরে প্রবেশ করিয়া দ্বার বন্ধ করিয়া দিল।

আমরা তিনজনে সামনের ঘরে গিয়া বসিলাম। মিস মান্না উৎসুক চোখে আমাদের পানে চাহিলেন। আমরা আর কী বলিব‌, নিজেরাই কিছু জানি না‌, মুখ ফিরাইয়া যামিনী রায়ের ছবি দেখিতে লাগিলাম।

পঁচিশ মিনিট পরে ব্যোমকেশ আসিল। তাহার মুখে চোখে কঠিন ক্লান্তি‌, যেন বুদ্ধির যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত হইয়া অতি কষ্টে জয়ী হইয়াছে। সে মিস মান্নার পাশে বসিয়া নিম্ন কণ্ঠে তাঁহাকে নির্দেশ দিল। নির্দেশের মমর্থি; আজ রাত্রি সওয়া দশটা পর্যন্ত এক লহমার জন্য তিনি শকুন্তলাকে চোখের আড়াল করিবেন না‌, বা অন্য কাহারও সহিত জানাস্তিকে কথা বলিতে দিবেন। না। সওয়া দশটার পর মিস মান্নার ছুটি‌, তিনি তখন নিজের বাসায় ফিরিয়া যাইবেন। মিস মান্না নির্দেশ শুনিয়া পাণ্ডেজির প্রতি সপ্রশ্ন দৃষ্টি নিক্ষেপ করিলেন‌, প্রত্যুত্তরে পাণ্ডেজি ঘােড় হেলাইয়া সায় দিলেন। মিস মান্না তখন শকুন্তলার ঘরে চলিয়া গেলেন।

ব্যোমকেশ পর্যায়ক্রমে আমার ও পাণ্ডেজির মুখের পানে চাহিয়া শুষ্ক হাসিল‌, ‘চলুন‌, এবার যাওয়া যাক।‘

পাণ্ডেজি বলিলেন‌, ‘কিন্তু—’

ব্যোমকেশ হাত তুলিয়া বলিল‌, ‘এখানে নয়। বাড়ি যেতে যেতে সব বলব।’

সেদিন সন্ধ্যার প্রাক্কালে বাড়ি হইতে বাহির হইবার পূর্বে জলযোগ করিতে করিতে ব্যোমকেশ আড় চোখে সত্যবতীর পানে চাহিয়া বলিল‌, ‘আজ আমাদের ফিরতে একটু দেরি হবে।’

সত্যবতী মুখ ভার করিয়া বলিল‌, ‘তা তো হবেই। আজ অমাবস্যা‌, তার ওপর আমি বেরুতে মানা করেছি‌, আজ দেরি হবে না তো কবে হবে।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘আজ অমাবস্যা নাকি! আরে‌, খুব লাগসৈ হয়েছে তো।’

সত্যবতী বলিল‌, ‘হয়েছে বুঝি? ভাল।’ ব্যোমকেশ বলিল ‘অজিত কবি মানুষ‌, ওকে জিগ্যেস কর‌, অভিসার করবার জন্যে অমাবস্যার রাত্রিই প্রশস্ত।’

‘তা সারা রাত্রি ধরেই কি অভিসার চলবে?’

‘আরো না না‌, বারোটা-একটার মধ্যেই ফিরব।’

সত্যবতী চকিত উদ্বেগ ভরে চাহিল‌, ‘বারোটা-একটা?’

ব্যোমকেশ উঠিয়া মুখ মুছিতে মুছিতে লঘুস্বরে বলিল‌, ‘তুমি ভেবো না। ফিরে এসে তোমাকে দুষ্মন্ত-শকুন্তলার উপাখ্যান শোনাব। —চল‌, অজিত।’

সত্যবতী শঙ্কিত মুখে দাঁড়াইয়া রহিল‌, আমরা বাহির হইলাম।

আমরা পাণ্ডেজির বাসায় না গিয়া সটান দীপনারায়ণের বাড়িতে গেলাম; সেই রূপই কথা ছিল। পাণ্ডেজি বাহিরের হল-ঘরে গদি-মোড়া চেয়ারে বসিয়া দুই পা সম্মুখ দিকে প্রসারিত করিয়া দিয়াছিলেন‌, আমাদের দেখিয়া খাড়া হইয়া বসিলেন। ব্যোমকেশ জিজ্ঞাসা করিল‌, ‘রতিকান্ত বক্সার থেকে এখনও ফেরেননি?’

পাণ্ডেজি বলিলেন‌, না। থানায় খবর দেওয়া আছে। ফিরেই এখানে আসবে।’



‘অতঃপর আমরা তিনজনে বসিয়া নীরবে সিগারেট টানিতে লাগিলাম। অন্ধকার হইলে পাণ্ডেজি উঠিয়া একটা আলো জ্বালিয়া দিলেন, তাহাতে ঘরের কিয়ংদশ আলোকিত হইল মাত্র। …ম্যানেজার গঙ্গাধর বংশী একবার বাহির হইতে উঁকি মারিয়া নিঃসাড়ে অপসৃত হইলেন। চাঁদনী নীচে নামিয়া আসিয়া আমাদের দেখিয়া চুপি চুপি আবার উপরে উঠিয়া গেল। কিছুক্ষণ পরে একটা চাকর আসিয়া তিন পেয়ালা চা দিয়া গেল। আমরা চা পান করিলাম। …বাড়িটা যেন ভূতুড়ে বাড়ি; শব্দ নাই‌, ঘরের আনাচে কানাচে অস্পষ্ট ছায়ামূর্তি ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। আমরা তিনটি প্রতীক্ষ্ণমান প্ৰেতাত্মার মত বসিয়া আছি; কেন বসিয়া আছি তাহা গভীর রহস্যে আবৃত।

পৌঁনে আটটার সময় রতিকান্ত আসিল। পরিধানে আগাগোড়া পুলিস বেশ‌, চোখে চাপা উত্তেজনা। সে পাণ্ডেজিকে স্যালুট করিয়া তাঁহার পাশের চেয়ারের কিনারায় বসিল‌, পাণ্ডেজির দিকে ঝুকিয়া বলিল‌, ‘প্রমাণ পেয়েছি-ডাক্তার পালিতের কাজ।’

পাণ্ডেজি তীক্ষ্ণ নোত্রে রতিকাস্তের পানে চাহিয়া রহিলেন‌, বলিলেন‌, ‘প্রমাণ পেয়েছ? কি প্রমাণ—’

রতিকান্ত বলিল‌, কয়েদীটো স্বীকার করেছে। প্রথমে কিছুই বলতে চায় না‌, অনেক জেরা করার পর স্বীকার করল যে‌, পালিত তার কাছে কিউরারি কিনেছে।’

‘তাই নাকি?’ পাণ্ডেজি যেন আত্ম-সমহিত হইয়া পড়িলেন।

রতিকান্ত উৎসুকভাবে বলিল‌, ‘তাহলে এবার বোধহয় পালিতকে অ্যারেস্ট করা যেতে পারে? ‘দাঁড়াও‌, অত তাড়াতাড়ি নয়। একটা ছিচকে চোরের সাক্ষীর ওপর ডাক্তার পালিতের মত লোককে অ্যারেস্ট করা নিরাপদ নয়। এদিকে আমরাও কিছু খবর সংগ্রহ করেছি-? বলিয়া পাণ্ডেজি ব্যোমকেশের পানে অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে চাহিলেন। রতিকান্ত উচ্চকিত হইয়া ব্যোমকেশের পানে চোখে ফিরাইল‌, ‘কি খবর?’

বলছি—ব্যোমকেশ একবার সতর্কভাবে বৃহৎ কক্ষের চারিদিকে দৃষ্টি প্রেরণ করিল‌, তারপর চেয়ার টানিয়া রতিকান্তের কাছে ঘেষিয়া বসিল। আবছায়া আলোয় চারিটি মাথা একত্ৰিত হইল। চুপি চুপি কথা হইতে লাগিল।

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘আজ সকালবেলা শকুন্তলা দেবীকে জেরা করেছিলাম। প্রথমটা তিনি চোখে ধুলো দেবার চেষ্টা করেছিলেন; কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভেঙে পড়লেন। তিনি স্বীকার করেছেন যে অপরাধীকে তিনি চেনেন‌, অপরাধী তাঁর—গুপ্ত-প্রণয়ী। …’ ব্যোমকেশ চুপ করিল। রতিকান্ত নিনিমেষ চক্ষে তাহার পানে চাহিয়া রহিল।

ব্যোমকেশ একটা নিশ্বাস ফেলিল‌, ‘কিন্তু মুশকিল হয়েছে‌, কিছুতেই অপরাধীর নাম বলছেন না।’

রতিকান্ত বলিয়া উঠিল‌, ‘নাম বলছেন না।’

ব্যোমকেশ মাথা নাড়িল‌, ‘না। শকুন্তলা স্ত্রীলোক‌, তাঁর লজ্জা সঙ্কোচ আছে‌, কলঙ্কের ভয় আছে‌, তাই তাঁকে বিশেষ দোষ দেওয়া যায় না। অনেক চেষ্টা করেও অপরাধীর নাম তাঁর মুখ থেকে বার করতে পারলাম না।’

রতিকান্ত সোজা হইয়া বসিল‌, ক্ষণেক চিন্তা করিয়া বলিল‌, ‘আমি একবার চেষ্টা করে দেখব? আমি যদি একলা গিয়ে তাঁকে জেরা করি‌, তিনি হয়তো নামটা বলতে পারেন।’

পাণ্ডেজি মাথা নাড়িয়া বলিলেন‌, ‘এখন আর হবে না‌, তিনি মুখ ফুটে কিছু বলবেন না। তবে অন্য একটা উপায় হয়েছে–’

‘কি উপায় হয়েছে? রতিকান্ত পাণ্ডেজির দিক হইতে ব্যোমকেশের দিকে চক্ষু ফিরাইল।

ব্যোমকেশ গলা আরও খাটো করিয়া বলিল‌, ‘অনেক ধ্বস্তাধবস্তির পর শকুন্তলা রাজী হয়েছেন‌, চিঠি লিখে পাণ্ডেজিকে অপরাধীর নাম জানাবেন। ব্যবস্থা হয়েছে‌, এখানে যে-সব পুলিস মোতায়েন আছে তাদের সরিয়ে নেওয়া হবে। শকুন্তলার কাছে থাকবেন শুধু মিস মান্না। আর কাউকে তাঁর কাছে যেতে দেওয়া হবে না। রাত্রি সওয়া দশটার মধ্যে মিস মান্না শকুন্তলাকে একলা রেখে নিজের বাসায় ফিরে যাকেন। তখন শকুন্তলা চিঠি লিখে নিজের হাতে ডাক-বাক্সে ফেলে আসবেন। লোকাল চিঠি‌, কাল বেলা দশটা—এগারোটার সময় আমরা সে চিঠি পাব।’

কিছুক্ষণ কোনও কথা হইল না‌, চারটি মুণ্ড একত্রিত হইয়া রহিল। শেষে রতিকান্ত বলিল‌, ‘তাহলে আপনাদের মতে ডাক্তার পালিত অপরাধী নয়?’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘ডাক্তার পালিতও হতে পারে‌, এখনও কিছু বলা যায় না। আবার নর্মদাশঙ্করও হতে পারে। কাল নিশ্চয় জানা যাবে।’ বলিয়া সকালবেলা নর্মদাশঙ্করের বাড়িতে যাহা যাহা ঘটিয়াছিল তাহা বিবৃত করিল।

শুনিয়া রতিকান্ত চুপ করিয়া রহিল। পাণ্ডেজি হাতের ঘড়ি দেখিয়া বলিলেন‌, ‘আজ তাহলে ওঠা যাক। ব্যোমকেশবাবু্‌, আপনারাও চলুন আমার বাসায়। রতিকান্ত‌, তুমিও চল‌, সবাই মিলে কেসটা আলোচনা করা যাবে। তুমি আজ সারাদিন ছিলে না‌, ইতিমধ্যে অনেক ব্যাপার ঘটেছে।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘আমরা কিন্তু আজ সকাল সকাল বাড়ি ফিরব। গিয়ী ভীষণ রেগে আছেন।’

আমরা বাহিরে আসিলাম। রতিকান্ত জমাদারকে ডাকিয়া পাহারা তুলিয়া লইতে বলিল।

বহ্নি ও পতঙ্গের কাহিনী শেষ হইয়া আসিতেছে। ভাবিয়া দেখিতে গেলে‌, এ কাহিনীর শেষ নাই‌, সারা সংসার জুড়িয়া আবহমান কাল এই কাহিনীর পুনরাবৃত্তি চলিতেছে। কখনও পতঙ্গ তিল তিল করিয়া পুড়িয়া মরে‌, কখনও মুহুর্তমধ্যে ভস্মীভূত হইয়া যায়।

বাক্ষ্যমান বহ্নি ও পতঙ্গের খেলা শেষ হইয়া যাইবার পর আমি ব্যোমকেশকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম‌, ‘আচ্ছা ব্যোমকেশ‌, এখানে পতঙ্গ কে? বহিস্থই বা কে?’

ব্যোমকেশ বলিয়াছিল‌, ‘দু’জনেই বহ্নি‌, দু’জনেই পতঙ্গ।’

কিন্তু থাক। পরের কথা আগে বলিয়া রাসভঙ্গ করিব না। সে-রাত্রে আটটা বাজিতেই ব্যোমকেশ ও আমি পাণ্ডেজির বাড়ি হইতে বাহির হইলাম; পাণ্ডেজি ও রতিকান্ত বসিয়া কেস সম্বন্ধে আলোচনা করিতে লাগিলেন। বক্সার হইতে রতিকান্ত কয়েদীর যে জবানবন্দী লিখিয়া আনিয়াছিল। তাহারই আলোচনা।

বাহিরে ঘুটফুটে অন্ধকার। রাস্তার ধারে আলো দু’ একটা আছে বটে। কিন্তু তাহা রাত্রির তিমির হরিবার পক্ষে যথেষ্ট নয়। পাটনার পথঘাট ভাল চিনি না‌, এই অমাবস্যার রাত্রে চেষ্টা করিয়া কোনও নির্দিষ্ট গন্তব্য স্থানে পৌঁছিতে পারিব এ আশা সুদূরপরাহত। আমরা মনে মনে একটা দিক আন্দাজ করিয়া লইয়া হোচট খাইতে খাইতে চলিলাম। মনের এমন অগোছালো অবস্থা যে একটা বৈদ্যুতিক টর্চ আনিবার কাথাও মনে ছিল না। ভাগ্যক্রমে কিছুদূর যাইতে না যাইতে ঠুনঠুন ঝুনঝুন আওয়াজ শুনিতে পাইলাম। একটা ধোঁয়াটে আলো মন্থর গতিতে আমাদের দিকে অগ্রসর হইয়া আসিতেছে। কাছে আসিলে একটি এক্কার আকৃতি অস্পষ্টভাবে রূপ পরিগ্রহ করিল। ব্যোমকেশ হাত তুলিয়া হাঁকিল-‘দাঁড়া। ভাড়া যাবি?’

এক্কা দাঁড়াইল। আপাদমস্তক কম্বলে মোড়া এক্কাওয়ালার কণ্ঠস্বর শুনিতে পাইলাম‌, না বাবু্‌, আমার ঘোড়া থকে আছে।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘বেশি দূর নয়‌, দীপনারায়ণ সিং-এর বাড়ি। যাবি তো চল‌, বকশিস পাবি।’

এক্কাওয়ালা বলিল‌, ‘আসুন বাবু্‌, আমার আস্তাবল ওই দিকেই।’

আমরা একার দুই পাশে পা ঝুলাইয়া বসিলাম। এক্কাওয়ালা চাবুক ঘুরাইয়া মুখে টকাস টকাস শব্দ করিল। ঘোড়া ঝন ঝন শব্দ করিয়া চলিতে আরম্ভ করিল।

দশ মিনিট পরে ব্যোমকেশ এক্কা থামাইতে বলিল। আমি এক্কা হইতে নামিয়া ধোঁয়াটে আলোয় ঠাহর করিয়া দেখিলাম‌, দীপনারায়ণ সিং-এর বাড়ির কোণে ডাক-বাক্সের নিকটে উপস্থিত হইয়াছি। ব্যোমকেশ এক্কাওয়ালাকে ভাড়া ও বিকশিস দিল।

‘সালাম বাবুজি।’

অন্ধকার-সমুদ্রে ভাসমান ধোঁয়াটে আলোর একটা বুদ্বুদ ঝুনঝুন শব্দ করিতে করিতে দূরে মিশাইয়া গেল। আমরা যে তিমিরে ছিলাম। সেই তিমিরে নিমজিত হইলাম।

‘এবার কী? দেশলাই জ্বালব?’

ব্যোমকেশ উত্তর দিবার পূর্বেই চোখের উপর তীব্র আলো জ্বলিয়া উঠিল; হাত দিয়া চোখ আড়াল করিলাম। ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘কে-সাব-ইন্সপেক্টর তিওয়ারী?

‘জি।’ তিওয়ারী টর্চের আলো মাটির দিকে নামাইয়া আমাদের কাছে আসিয়া দাঁড়াইল। মাটি হইতে উত্থিত আলোর ক্ষীণ প্রতিভাস আমাদের তিনজনের মুখে পড়িল। সকলের.গায়ে কালো পোশাক‌, তিওয়ারীর কালো কোটের পিত্তলের বোতামগুলি চিকমিক করিতেছে।

‘আপনার সঙ্গে ক’জন আছে?’

‘দু’জন।’ বলিয়া তিওয়ারী আলো একটু পিছন দিকে ফিরাইল। দুইটি লিকলিকে প্রেত্যকৃতি পুলিস জমাদার তাহার পিছনে দাঁড়াইয়া আছে।

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘বেশ‌, দু’জনই যথেষ্ট! কি করতে হবে ওদের বলে দিয়েছেন?’

‘জি।’

‘তাহলে এবার একে একে গাছে ওঠা যাক। অজিত‌, তুমি সামনের গাছটাতে ওঠে। চুপটি করে গাছের ডালে বসে থাকবে‌, সিগারেট খাবে না। বাঁশীর আওয়াজ যতক্ষণ না শুনতে পাও ততক্ষণ গাছ থেকে নামবে না। —তিওয়ারীজি‌, টর্চটা আমাকে দিন।’

টর্চ লইয়া ব্যোমকেশ একটা আম গাছের উপর আলো ফেলিল। ডাক-বাক্স হইতে পাঁচ-ছয় হাত দূরে বেশ বড় আম গাছ‌, গুড়ির স্কন্ধ হইতে মোটা ডাল বাহির হইয়াছে। গাছে পিপড়ের বাসা আছে কিনা জল্পনা করিতে করিতে আমি গাছে উঠিয়া পড়িলাম।

‘ব্যস‌, আর উচুতে উঠে না।’ আমি দুইটা ডালের সন্ধিস্থলে সাবধানে বসিলাম। গাছে চড়িয়া লাফালাফি করার বয়স অনেক দিন চলিয়া গিয়াছে‌, একটু ভয়-ভয় করিতে লাগিল।

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘আচ্ছা। সব কথা মনে আছে তো?’

‘আছে। বাঁশী শুনলেই বিরহিণী রাধার মত ছুটব।’

ব্যোমকেশ তখন অন্য তিনজনকে লইয়া পাঁচিলের সমান্তরালে ভিতর দিকে চলিল। দুই তিনটা গাছ বাদ দিয়া আর একটা গাছে একজন জমাদার উঠিল। তারপর তাহারা আরও দূরে চলিয়া গেল‌, কে কোন গাছে উঠিল।’ দেখিতে পাইলাম না। ঘন পত্রান্তরাল হইতে কেবল সঞ্চরমান বৈদ্যুতিক টর্চের প্রভা চোখের সামনে খেলা করিতে লাগিল।

তারপর বৈদ্যুতিক টর্চও নিভিয়া গেল।

হাতের ঘড়ি চোখের কাছে আনিয়া রেডিয়াম-নির্দেশ লক্ষ্য করিলাম-নাটা বাজিয়া দশ মিনিট। অন্তত এক ঘণ্টার আগে কিছু ঘটিবে বলিয়া মনে হয় না।

বসিয়া আছি। ভাগ্যে বাতাস নাই‌, শীতের দাঁত তাই মমস্তিক কামড় দিতে পারিতেছে না। তবু থাকিয়া থাকিয়া হাড়-পাঁজরা কাঁপিয়া উঠিতেছে‌, দাঁতে দাঁতে ঠোকাঠুকি হইয়া যাইতেছে।

আমবাগান সম্পূর্ণ নিঃশব্দ নয়। গাছের পাতাগুলো যেন উসখুসি করিতেছে‌, ফিসফিস করিয়া কথা বলিতেছে‌, অন্ধকারে শ্রবণ শক্তি তীক্ষ্ণ হইয়াছে তাই শুনিতে পাইতেছি। একবার মাথার উপর একটা পাখি-বোধহয় প্যাঁচা-চ্যাঁ চ্যাঁ শব্দ করিয়া উড়িয়া গেল‌, সম্ভবত গাছের মধ্যে আমাকে দেখিতে পাইয়াছে। চকিতে চোখ তুলিয়া দেখি গাছপালার ফাঁক দিয়া দুই চারিটি তারা দেখা যাইতেছে।

বসিয়া আছি। পৌঁনে দশটা বাজিল। সহসা সমস্ত ইন্দ্ৰিয় সজাগ হইয়া উঠিল। চোখে কিছু দেখিলাম না‌, কানেও কোনও শব্দ আসিল না‌, কেবল অনুভব করিলাম‌, আমার গাছের পাশ দিয়া কে যেন ভিতর দিকে চলিয়া গেল। কে চলিয়া গেল! পাণ্ডেজি! কিম্বা–!

একটা ভিজা-ভজা বাতাস আসিয়া মুখে লাগিল। ঊর্ধ্বে চাহিয়া দেখিলাম‌, তারাগুলি নিষ্প্রভ হইয়া আবার উজ্জ্বল হইল। বোধহয় কাল রাত্রির মত আকাশে কুয়াশা জমিতে আরম্ভ করিয়াছে।

হ্যাঁ‌, কুয়াশাই বটে। তারাগুলিকে আর দেখা যাইতেছে না। গাছের পাতায় কুয়াশা জমিয়া জল হইয়া নীচে টোপাইতেছে—চারিদিক হইতে মৃদু শব্দ উঠিল-টপ টপ টপ টপ!

প্রবল ইচ্ছা হইল। ধূমপান করি। দাঁতে দাঁত চাপিয়া ইচ্ছা দমন করিলাম…

ঘড়িতে সওয়া দশটা। আমি গাছের ডালের উপর খাড়া হইয়া বসিলাম। দীপনারায়ণের হাতার ভিতর যেন একটা গুঞ্জনধ্বনি শোনা গেল। তারপর একটা মোটর হাতা হইতে বাহির হইয়া বিপরীত দিকে চলিয়া গেল। গাড়ির হেডলাইটের ছটা কুয়াশার গায়ে ক্ষণেক তাল পাকাইল‌, তারপর আবার অন্ধকার।

বোধহয় মিস মান্না নিজের বাসায় ফিরিয়া গেলেন।

এইবার! দশ মিনিট স্নায়ু-পেশী শক্ত করিয়া বসিয়া রহিলাম‌, কিছুই ঘটিল না। তারপর হঠাৎ—খিড়কির দরজার দিকে দপ করিয়া আলো জ্বলিয়া উঠিল। এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত পরস্পরায় তিন-চারবার পিস্তলের আওয়াজ হইল। পিস্তলের আওয়াজের জন্য প্রস্তুত ছিলাম না‌, আমি মুহুর্তকাল নিশ্চল নিষ্পন্দ হইয়া গেলাম।

চমক ভাঙিল পুলিস হুইসলের তীব্র শব্দে। আমি গাছের ডাল হইতে নীচে লাফাইয়া পড়িলাম। মাটি কত দূরে তাহা ঠাহর করিতে পারি নাই‌, সারা গায়ে প্রবল ঝাঁকানি লাগিল। উঠিয়া দাঁড়াইয়া দেখিলাম খিড়কির কাছে গোটা ঠিকেই বলিয়া উঠিয়াছে। আমি সেই দিকে ছুটিলাম।

ছুটিতে ছুটিতে আর একবার পিস্তলের আওয়াজ শুনিতে পাইলাম। তারপর পায়ে শিকড় লাগিয়া আছাড় খাইলাম। উঠিয়া আবার ছুটিলাম। হাত-পা অক্ষত আছে কিনা অনুভব করিবার সময় নাই। যেখানে আর সকলেই দাঁড়াইয়াছিল হুড়মুড় করিয়া সেখানে উপস্থিত হইলাম।

খিড়কি দরজার কাছে একটা স্থান ঘিরিয়া পাঁচজন দাঁড়াইয়া রহিয়াছে। পাণ্ডেজির হাতে রিভলবার‌, তিওয়ারী ও দুইজন জমাদারের হাতে টর্চ, ব্যোমকেশ কোমরে হাত দিয়া দাঁড়াইয়া। তিনটি টর্চের আলো একই স্থানে পড়িয়াছে। পাঁচ জোড়া চক্ষুও সেই স্থানে নিবদ্ধ।

দুইটি মৃতদেহ মাটিতে পড়িয়া রহিয়াছে; একজন স্ত্রীলোক‌, অন্যটি পুরুষ। স্ত্রীলোকটি শকুন্তলা‌, আর পুরুষ–রতিকান্ত।

রতিকান্তের নীল চক্ষু দুটা বিস্ময় বিস্ফারিত; ডান হাতের কাছে একটা পিস্তল পড়িয়া আছে‌, বাঁ হাতের আঙুলগুলা একটা সাদা রঙের খাম আঁকড়াইয়া আছে। শকুন্তলার মুখ ভাল দেখা যাইতেছে না। গায়ে কালো রঙের শাল জড়ানো। বুকের কাছে থোলো থোলো রক্ত-করবীর মত কাঁচা রক্ত।

ব্যোমকেশ নত হইয়া রতিকাস্তের আঙুলের ভিতর হইতে খামটা বাহির করিয়া লইয়া নিজের পকেটে পুরিল।

পাণ্ডেজির বাড়িতে নৈশ ভোজনের নিমন্ত্রণ। অতিথির সংখ্যা বাড়িয়াছে; ডাক্তার পালিত‌, মিস মান্না‌, ব্যোমকেশ ও আমি। টেবিল ঘিরিয়া খাইতে বসিয়াছি। আহার্য দ্রব্যের মধ্যে প্রধান–মুর্গীর কাশ্মীরী কোর্মা।

ব্যোমকেশ এক টুকরা মাংস মুখে দিয়া অর্ধ-নিমীলিত চক্ষে আস্বাদ গ্রহণ করিল‌, তারপর

পাণ্ডেজি হাসিমুখে ভ্রূ তুলিলেন‌, ‘কী চুরি করবেন?’

‘আপনার বাবুর্চিকে।’

পাণ্ডেজি হাসিতে লাগিলেন‌, বলিলেন‌, ‘অসম্ভব।’

‘অসম্ভব কেন?’

পাণ্ডেজি বলিলেন‌, ‘আমার বাবুর্চি আমি নিজেই।’

‘অ্যাঁ—এই অমৃত আপনি রেধেছেন। তবে আর আপনার পুলিসের চাকরি করার কি দরকার? একটি হোটেল খুলে বসুন‌, তিন দিনে লাল হয়ে যাবেন।’

কিছুক্ষণ হাস্য-পরিহাস চলিবার পর মিস মান্না বলিলেন‌, ‘ব্যোমকেশবাবু্‌, আমাকে কিন্তু আপনারা ফাঁকি দিয়েছেন। সে হবে না‌, সব কথা আগাগোড়া বলতে হবে। কি করে কি হল সব বলুন‌, আমি শুনব।’

ডাক্তার পালিত বলিলেন‌, ‘আমিও শুনব। এ ক’দিন আমি আসামী। কিনা। এই ভাবনাতেই আধমরা হয়ে ছিলাম। এবার বলুন।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘এখন মুখ চলছে। খাওয়ার পর বলব।’

আকণ্ঠ আহার করিয়া আমরা বাহিরে আসিয়া বসিলাম। ব্যোমকেশ গড়গড়ার নল হাতে লইল‌, ডাক্তার পালিত একটি মোটা চুরুট ধরাইলেন।

মিস মান্না জব্দ মুখে দিয়া হাসিমুখে বলিলেন‌, ‘এবার আরম্ভ করুন।’

ব্যোমকেশ গড়গড়ার নিলে কয়েকটি মন্দ-মন্থর টান দিয়া ধীরে ধীরে বলিতে আরম্ভ করিল।

‘এই ঘরেই রতিকান্তকে প্রথম দেখেছিলাম। পাণ্ডেজিকে নেমন্তন্ন করতে এসেছিল। সুন্দর চেহারা‌, নীল চোখ। দীপনারায়ণ সিং-এর উদ্দেশ্যে হাল্কা ব্যঙ্গ করে বলেছিল-বড় মানুষ কুটুম্ব। তখন জানতাম না। ওই হাল্কা ব্যঙ্গের আড়ালে কতখানি রিষ লুকিয়ে আছে। তখন কিছুই জানতাম না‌, তাই ‘কুটুম্ব’ কথাটাও কানে খোঁচা দিয়ে যায়নি। এখন অবশ্য জানতে পেরেছি শকুন্তলা আর রতিকান্তের মধ্যে একটা দূর সম্পর্ক ছিল; দু’জনেরই বাড়ি প্রতাপগড়ে‌, দু’জনেই পড়ে-যাওয়া ঘরানা ঘরের ছেলে মেয়ে‌, দু’জনে বাল্য প্রণয়ী।

‘রতিকান্ত সে-রাত্রে আমার পরিচয় জানতে পারেনি‌, পাণ্ডেজি কেবল বলেছিলেন,–আমার কলকাতার বন্ধু। তাতে তার মনে কোনও সন্দেহ হয়নি। যদি সে-রত্রে সে জানতে পারত যে অধমের নাম ব্যোমকেশ বক্সী তাহলে সে কি করত বলা যায় না‌, হয়তো প্ল্যান বদলে ফেলত। কিন্তু তার পক্ষে মুশকিল হয়েছিল। এই যে‌, পৌঁছুবার আর সময় ছিল না‌, একেবারে শিরে সংক্রান্তি এসে পড়েছিল।

‘শকুন্তলা আর রতিকান্তর গুপ্ত-প্রণয়ের অতীত ইতিহাস যত দূর আন্দাজ করা যায় তা এই। ওদের বিয়ের পথে সামাজিক বাধা ছিল‌, তাই ওদের দুরন্ত প্রবৃত্তি সমাজের চোখে ধুলো দিয়ে গুপ্ত-প্রণয়ে লিপ্ত হয়েছিল; ওদের উগ্ব অসংযত মন আধুনিক স্বৈরাচারের সুযোগ নিয়েছিল পূর্ণ মাত্রায়। কিন্তু তবু সবই চুপি চুপি। নৈতিক লজ্জা না থাক‌, লোকলজ্জার ভয় ছিল; তার উপর ‘চোরি পিরিতি লাখগুণ রঙ্গ’। লুকিয়ে প্রেম করার মধ্যে একটা তীব্র মাধুর্য আছে।

‘তারপর একদিন দীপনারায়ণ শকুন্তলাকে দেখে তার রূপ-যৌবনের ফাঁদে পড়ে গেলেন। শকুন্তলা দীপনারায়ণের বিপুল ঐশ্বর্য দেখল‌, সে লোভ সামলাতে পারল না। তাঁকে বিয়ে করল। কিন্তু রতিকান্তকেও ছাড়ল না। রতিকান্তর বিয়েতে মত ছিল কিনা আমরা জানি না। হয়তো পুরোপুরি ছিল না‌, কিন্তু শকুন্তলাকে ত্যাগ করাও তার অসাধ্য। শকুন্তলা বিয়ের পর যখন পাটনায় এল তখন রতিকান্তও যোগাড়যন্ত্র করে পাটনায় এসে বসল‌, বোধহয় মোহান্ধ দীপনারায়ণ সাহায্য করেছিলেন। ফলে ভিতরে ভিতরে আবার রতিকান্তর আর শকুন্তলার আগের সম্বন্ধ বজায় রইল। বিয়েটা হয়ে রইল ধোঁকার টাটি।’

‘কুটুম্ব হিসাবে রতিকান্ত দীপনারায়ণের বাড়িতে যাতায়াত করত‌, কিন্তু প্রকাশ্যে শকুন্তলার সঙ্গে বেশি ঘনিষ্ঠতা দেখাত না। তাদের সত্যিকারের দেখা সাক্ষাৎ হত সকলের চোখের আড়ালে। শকুন্তলা চিঠি লিখে গভীর রাত্রে নিজের হাতে ডাক-বাক্সে ফেলে আসত; রতিকান্ত নির্দিষ্ট রাত্রে আসত‌, খিড়কির দরজা দিয়ে হাতায় ঢুকত‌, তারপর লোহার সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে যেত। শকুন্তলা দোর খুলে প্রতীক্ষা করে থাকত–

‘এইভাবে চলছিল‌, হঠাৎ প্রকৃতিদেবী বাদ সাধলেন। দীপনারায়াণের যখন গুরুতর অসুখ ঠিক সেই সময় শকুন্তলা জানতে পারল সে অন্তঃসত্ত্বা। এখন উপায়? অন্য সকলের চোখে যদি বা ধুলো দেওয়া যায়‌, দীপনারায়ণের চোখে ধুলো দেওয়া যায় না। দু’জনে মিলে পরামর্শ করল তাড়াতাড়ি দীপনারায়ণকে সরাতে হবে; নইলে মান-ইজ্জত রাজ-ঐশ্বৰ্য কিছুই থাকবে না‌, গালে চুন কালি মেখে ভদ্রসমাজ থেকে বিদায় নিতে হবে।

‘মৃত্যু ঘটাবার এই চোস্ত ফন্দিটা রতিকাস্তের মাথা থেকে বেরিয়েছিল সন্দেহ নেই। দৈব যোগাযোগও ছিল; এক শিশি কিউরারি একটা ছিচকে চোরের কাছে পাওয়া গিয়েছিল। সেটা যখন রতিকান্তর হাতে এল‌, রতিকান্ত প্রথমেই খানিকটা কিউরারি সরিয়ে ফেলল। তারপর যথাসময়-রতিকান্ত নিজেই ডাক্তারবাবুর ডিসপেনসারির তালা ভেঙে লিভারের ভায়াল বদলে রেখে এল‌, তারপর নিমন্ত্রণ-বাড়িতে গিয়ে খবর দিলে। সকলেই ভাবলে ছিচকে চোরের কাজ।

‘সেই রাত্রেই রতিকান্ত আমার নাম জানতে পারল। অনুবাদের কল্যাণে হিন্দী শিক্ষিত সমাজে আমার নামটা অপরিচিত নয়। রতিকান্ত ঘাবড়ে গেল। কিন্তু তখন আর উপায় নেই‌, হাত থেকে তীর বেরিয়ে গেছে।

‘পরদিন সকালে ডাক্তারবাবু ইনজেকশন দিলেন‌, দীপনারায়ণের মৃত্যু হল। রতিকান্ত ভেবেছিল‌, কিউরারি বিষের কথা কারুর মনে আসবে না‌, সবাই ভাববে লিভার ইনজেকশনের শকে মৃত্যু হয়েছে। ডাক্তারবাবুও প্রথমে তাই ভেবেছিলেন‌, কিন্তু যখন কিউরারির কথা উঠল। তখন তাঁর খটকা লাগিল। তিনি বললেন,–হতেও পারে।

‘রতিকান্ত আগে থাকতে ঘাবড়ে ছিল‌, এখন সে আরও ঘাবড়ে গিয়ে একটা ভুল করে ফেললে। এই বোধহয় তার একমাত্র ভুল। সে ভাবল‌, দীপনারায়ণের শরীরে নিশ্চয় কিউরারি পাওয়া যাবে; এখন যদি লিভারের ভায়ালে কিউরারি না পাওয়া যায় তাহলে আমাদের সন্দেহ হবে ডাক্তার পালিতাই ভায়াল বদলে দিয়েছেন। রতিকাম্ভের কাছে একটা নির্বিষ লিভারের ভায়াল ছিল‌, যেটা সে ডাক্তার পালিতের ব্যাগ থেকে বদলে নিয়েছিল। সে অ্যানালিসিসের জন্যে সেই নির্বিষ ভায়ালটা পাঠিয়ে দিলে।

‘যখন জানা গেল ভায়ালে বিষ নেই তখন ভারি ধোঁকা লাগল। শরীরে বিষ পাওয়া গেছে অথচ ওষুধে বিষ পাওয়া গেল না‌, এ কি রকম? দীপনারায়ণের মৃত্যুর পর কেবল তিনজনের হাতে ভায়ালটা গিয়েছিল-ডাক্তার পালিত‌, পাণ্ডেজি আর রতিকান্ত। পাণ্ডেজি আর রীতিকান্ত পুলিসের লোক; সুতরাং ডাক্তারবাবুরই কাজ‌, তিনি এই রকম একটা গোলমেলে পরিস্থিতির সৃষ্টি করে পুলিসের মাথা গুলিয়ে দিতে চান। কিন্তু ডাক্তার পালিতের মোটিভ কি?

‘ইতিমধ্যে দুটো মোটিভ পাওয়া গিয়েছিল-টাকা আর গুপ্ত-প্রেম। গুপ্ত-প্রেমের সন্দেহটা ডাক্তার পালিতাই আমাদের মনে ধরিয়ে দিয়েছিলেন। যদি গুপ্ত-প্ৰেমই আসল মোটিভ হয়। তাহলে প্রশ্ন ওঠে‌, শকুন্তলার দুষ্মন্ত কে? আর যদি টাকা মোটিভ হয় তাহলে তিনজনের ওপর সন্দেহ-দেবনারায়ণ‌, চাঁদনী আর গঙ্গাধর বংশী। শকুন্তলাও কলঙ্ক এড়াবার জন্যে লোক লাগিয়ে স্বামীকে খুন করতে পারে। এদের মধ্যে যে-কেউ ডাক্তার পালিতকে মোটা টাকা খাইয়ে নিজের কাজ হাসিল করে থাকতে পারে। একুনে সন্দেহভাজনের সংখ্যা খুব কম হল না; দেবনারায়ণ থেকে নর্মদাশঙ্কর‌, ঘোড়া জগন্নাথ সকলেরই কিছু না কিছু স্বাৰ্থ আছে।

‘রতিকান্ত কিন্তু উঠে-পড়ে লেগেছিল দোষটা ডাক্তার পালিতের ঘাড়ে চাপাবে। সে বক্সারে গিয়ে কয়েদীর কাছ থেকে জবানবন্দী লিখিয়ে নিয়ে এল। আমরা জানি এ-ধরনের কয়েদীকে হুমকি দিয়ে বা লোভ দেখিয়ে পুলিস যে-কোনও জবানবন্দী আদায় করতে পারে। তাই আমরা কুলগুলির মতলব বলে মেন মনে হাসলাম। রফিকাই যে অপরাধী তা আমরা তখন জানতে পেরেছি।

‘অন্যদিকে ছোটখাটো দু’ একটা ব্যাপার ঘটছিল। পিতা-পুত্র গঙ্গাধর আর লীলাধর মিলে বারো হাজার টাকা হজম করবার তালে ছিল। ওদিকে নর্মদাশঙ্কর দীপনারায়ণের মৃত্যুতে উল্লসিত হয়ে উঠেছিল‌, ভেবেছিল শকুন্তলার হৃদয়ের শূন্য সিংহাসন সেই এবার দখল করবে। সে জানত না যে শকুন্তলার হৃদয়-সিংহাসন কোনওকালেই শূন্য হয়নি।

‘হঠাৎ সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেল‌, শকুন্তলার দুষ্মন্ত কে তা জানতে পারলাম। শকুন্তলা দেয়ালে একটা ছবি এঁকেছিল। সেকালে শকুন্তলার পূর্বরাগের ছবি। প্রথম যে-রাত্রে ছবিটা দেখি সে-রত্রে কিছু বুঝতে পারিনি‌, নীল আলোয় ছবির নীল-রঙ চাপা পড়ে গিয়েছিল। পরদিন দিনের আলোয় যখন ছবিটা দেখলাম এক মুহুর্তে সব পরিষ্কার হয়ে গেল। যেন কুয়াশায় মুক্তি ঝাপসা হয়ে ছিল‌, হঠাৎ কুয়াশ খুঁড়ে সূর্ব বেরিয়ে এল। ছবিতে দুষ্মন্তের চোখের মণি নীল।

‘প্ৰেম বড় মারাত্মক জিনিস। প্রেমের স্বভাব হচ্ছে নিজেকে প্রকাশ করা‌, ব্যক্ত করা‌, সকলকে ডেকে জানানো-আমি ওকে ভালবাসি। অবৈধ প্ৰেম তাই আরও মারাত্মক! যেখানে পাঁচজনের কাছে প্ৰেম ব্যক্ত করবার উপায় নেই। সেখানে মনের কথা বিচিত্র ছদ্মবেশে আত্মপ্রকাশ করে।‘শকুন্তলা ছবি এঁকে নিজের প্রেমকে ব্যক্ত করতে চেয়েছিল। ছবিতে দুষ্মন্তের চেহারা মোটেই রতিকান্তের মত নয়‌, কিন্তু তার চোখের মণি নীল। ‘বুঝ লোক যে জান সন্ধান!’ অজিত আর পাণ্ডেজিও ছবি দেখেছিলেন‌, কিন্তু তাঁরা নীলচোখের ইশারা ধরতে পারেননি।

‘এই ব্যাপারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যত লোক আছে তাদের মধ্যে কেবল রতিকান্তরই নীল চোখ। সুতরাং রতিকান্তাই শকুন্তলার প্রচ্ছন্ন প্রেমিক। মোটিভ এবং সুযোগ‌, বুদ্ধি এবং কর্মতৎপরতা সব দিক দিয়েই সে ছাড়া আর কেউ দীপনারায়ণের মৃত্যুর জন্যে দায়ী নয়।

‘কিন্তু তাকে ধরব কি করে? শুধু নীল-চোখের প্রমাণ যথেষ্ট নয়। একমাত্র উপায়‌, যদি ওরা নিভৃতে পরস্পর দেখা করে‌, যদি ওদের এমন অবস্থায় ধরতে পারি যে অস্বীকার করবার পথ না থাকে।

‘ফাঁদ পাতলাম। আমি একা শকুন্তলার সঙ্গে দেখা করে স্পষ্ট ভাষায় বললাম-তোমার দুষ্মন্ত কে তা আমি জানতে পেরেছি এবং সে কি করে দীপনারায়ণকে খুন করেছে তাও প্রমাণ দিতে পারি। কিন্তু আমি পুলিস নয়; তুমি যদি আমাকে এক লাখ টাকা দাও। তাহলে আমি তোমাদের পুলিসে ধরিয়ে দেব না। আর যদি না দাও পুলিসে সব কথা জানতে পারবে। বিচারে তোমাদের দু’জনেরই ফাঁসি হবে। শকুন্তলা কিছুঁতেই স্বীকার করে না। কিন্তু দেখলাম ভয় পেয়েছে। তখন বললাম-তোমাকে আজকের দিনটা ভেবে দেখবার সময় দিলাম। যদি এক লাখ টাকা দিয়ে আমার মুখ বন্ধু করতে রাজী থাকে‌, তাহলে আজ রাত্রে আমার নামে একটা চিঠি লিখে‌, নিজের হাতে ডাক-বাক্সে দিয়ে আসবে। চিঠিতে স্রেফ একটি কথা লেখা থাকবে-হাঁ। রাত্রি দশটার পর মিস মান্নাকে এখান থেকে সরিয়ে নেবার ব্যবস্থা আমি করব‌, রাত্ৰে হাতায় পুলিস পুহারাও থাকবে না। যদি কাল তোমার চিঠি না পাই‌, আমার সমস্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ পাণ্ডেজির হাতে সমর্পণ করব।

‘ভয়-ব্বিৰ্ণ শকুন্তলাকে রেখে আমি চলে এলাম‌, মিস মান্না তার ভার নিলেন। এখন শুধু নজর রাখতে হবে শকুন্তলা আড়ালে রতিকান্তের সঙ্গে কথা বলবার সুযোগ না পায়। তারপর আমি পাণ্ডেজির সঙ্গে পরামর্শ করে বাকি ব্যবস্থা ঠিক করলাম। রাত্রে রতিকান্ত বক্সার থেকে ফিরলে তাকে এক নতুন গল্প শোনালাম‌, তারপর তাকে সঙ্গে নিয়ে পাণ্ডেজির এখানে এলাম।

‘আমি আর অজিত সকাল সকাল এখান থেকে বেরিয়ে দীপনারায়ণের বাড়ির পাশে আমবাগানে গেলাম; তিওয়ারী দু’জন লোক নিয়ে উপস্থিত ছিল‌, সবাই আম গাছে উঠে লুকিয়ে রইলাম। এদিকে পাণ্ডেজি রাত্রি সাড়ে নটা পর্যন্ত রতিকান্তকে আটকে রেখে ছেড়ে দিলেন‌, আর নিজে এসে আমাদের সঙ্গে যোগ দিলেন। অন্ধকারে গাছের ডালে বসে শিকারের প্রতীক্ষ্ণ আরম্ভ হল।

‘আমি ছিলাম। খিড়কির দরজার কাছেই একটা গাছে। পাণ্ডেজি এসে আমার পাশের গাছে উঠেছিলেন। নিঃশব্দ অন্ধকারে ছয়টি প্রাণী বসে আছি। দশটা বাজল। আকাশে কুয়াশা জমতে আরম্ভ করেছিল; গাছের পাতা থেকে টপ টপ শব্দে জল পড়তে লাগল। তারপর মিস। মান্না মোটরে বাড়ি চলে গেলেন।

‘রতিকান্ত কখন এসেছিল। আমরা জানতে পারিনি। সে বোধ হয় একটু দেরি করে এসেছিল; পাণ্ডেজির কাছ থেকে ছাড়া পেয়ে সে নিজের বাসায় গিয়েছিল‌, সেখান থেকে পিস্তল নিয়ে আমবাগানে এসেছিল।

‘রতিকান্তের চরিত্র আমরা একটু ভুল বুঝেছিলাম—যেখানেই দেখা যায় দু’জন বা পাঁচজন একজোট হয়ে কাজ করছে সেখানেই একজন সদর থাকে‌, বাকি সকলে তার সহকারী। বর্তমান ক্ষেত্রে আমরা ভেবেছিলাম শকুন্তলাই নাটের গুরু‌, রতিকান্ত সহকারী। আসলে কিন্তু ঠিক তার উল্টো। রতিকান্তের মনটা ছিল হিংস্ব শ্বাপদের মত‌, নিজের প্রয়োজনের সামনে কোনও বাধাই সে মানত না। সে যখন শুনল যে শকুন্তলা চিঠি লিখে অপরাধীর নাম প্রকাশ করে দিতে রাজী হয়েছে তখনই সে স্থির করল শকুন্তলাকে শেষ করবে। তার কাছে নিজের প্রাণের চেয়ে প্রেম বড় নয়।

‘আমরা ভেবেছিলাম রতিকান্ত শকুন্তলাকে বোঝাতে আসবে যে শকুন্তলা যদি অপরাধীর নাম প্রকাশ না করে তাহলে কেউ তাদের ধরতে পারবে না‌, শাস্তি দিতেও পারবে না। আমাদের প্ল্যান ছিল‌, যে-সময় ওরা এই সব কথা বলাবলি করবে। ঠিক সেই সময় ওদের ধরব।

‘রতিকান্ত কিন্তু সে—ধার দিয়ে গেল না। সে মনে মনে সঙ্কল্প করেছিল অনিষ্ট্রের জড় রাখবে না‌, সমুলে নির্মূল করে দেবে।

শকুন্তলা কখন চিঠি হাতে নিয়ে খিড়কি দরজা দিয়ে বেরুল আমরা জানতে পারিনি, চারিদিকের টপ টপ শব্দের মধ্যে তার পায়ের আওয়াজ ডুবে গিয়েছিল। কিন্তু রতিকান্ত বোধহয় দোরের পাশেই ওৎ পেতে ছিল‌, সে ঠিক শুনতে পেয়েছিল। হঠাৎ আমাদের চোখের সামনে দপ করে টর্চ জ্বলে উঠল‌, সেই আলোতে শকুন্তলার ভয়ার্তা মুখ দেখতে পেলাম। ওদের মধ্যে কথা হল না‌, কেবল কয়েকবার পিস্তলের আওয়াজ হল। শকুন্তলা মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।

‘আমার কাছে পুলিস হুইসল ছিল‌, আমি সেটা সজোরে বাজিয়ে গাছ থেকে লাফিয়ে পড়লাম। পাণ্ডেজিও গাছ থেকে লাফিয়ে নামলেন। তাঁর বাঁ হাতে টর্চ‌, ডান হাতে রিভলবার।

‘রতিকান্ত নিজের টর্চ নিভিয়ে দিয়েছিল। পাণ্ডেজির টর্চের আলো যখন তার গায়ে পড়ল তখন সে পিস্তল পকেটে রেখে হাঁটু গেড়ে শকুন্তলার হাত থেকে চিঠিখানা নিচ্ছে। আহত বাঘের মত সে ফিরে তোকাল‌, তারপর বিদ্যুৎবেগে পকেট থেকে পিস্তল বার করল।

‘কিন্তু পিস্তল ফায়ার করবার অবকাশ তার হল না; পাণ্ডেজির রিভলবারে একবার আওয়াজ হল—’

ব্যোমকেশ থামিলে ঘর কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ হইয়া রহিল। ডাক্তার পালিতের চুরুট নিভিয়া গিয়াছিল‌, তিনি সেটা আবার ধরাইলেন। মিস মান্না একটা কম্পিত নিশ্বাস ফেলিলেন।

‘শকুন্তলা ভাল মেয়ে ছিল না। কিন্তু—’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘হ্যাঁ। সে সম্মোহন মন্ত্র জানত।–চাঁদনী এখনও বিশ্বাস করে না যে শকুন্তলা দোষী। —’

আমি বলিলাম‌, ‘ওদের জীবিত ধরতে পারলেই বোধহয় ভাল হত–’

পাণ্ডেজি মাথা নাড়িলেন‌, ‘না‌, এই ভাল।’

রক্তের দাগ

স্বাধীনতা প্ৰাপ্তির পর প্রথম বসন্তঋতু আসিয়াছে। দক্ষিণ হইতে বিরবির বাতাস দিতে আরম্ভ করিয়াছে‌, কলিকাতা শহরের এখানে-ওখানে যে দুই চারিটা শহুরে গাছ আছে তাহাদের অঙ্গেও আরক্তিম নব-কিশলয়ের রোমাঞ্চ ফুটিয়াছে। শুনিয়াছি। এই সময় মনুষ্যদেহের গ্রন্থিগুলিতেও নূতন করিয়া রসসঞ্চার হয়।

ব্যোমকেশ তক্তপোশের উপর কান্ত হইয়া শুইয়া কবিতার বই পড়িতেছিল। আমি ভাবিতেছিলাম‌, ওরে কবি সন্ধ্যা হয়ে এল। আজকাল বসন্তকালের সমাগম হইলেই মনটা কেমন উদাস হইয়া যায়। বয়স বাড়িতেছে।

সন্ধ্যার মুখে সত্যবতী আমাদের বসিবার ঘরে প্রবেশ করিল। দেখিলাম। সে চুল বাঁধিয়াছে‌, খোঁপায় বেলফুলের মালা জড়াইয়াছে‌, পরনে বাসন্তী রঙের হাল্কা শাড়ি। অনেক দিন তাহাকে সাজগোজ করিতে দেখি নাই। সে তক্তপোশের পাশে বসিয়া হাসি-হাসি মুখে ব্যোমকেশকে বলিল‌, ‘কী রাতদিন বই মুখে করে পড়ে আছ। চল না কোথাও বেড়িয়ে আসি গিয়ে।’

ব্যোমকেশ সাড়া দিল না। আমি প্রশ্ন করিলাম‌, ‘কোথায় বেড়াতে যাবে? গড়ের মাঠে?’

সত্যবতী বলিল‌, ‘না না‌, কলকাতার বাইরে। এই ধরো-কাশ্মীর-কিম্বা–’

ব্যোমকেশ বই মুড়িয়া আস্তে-আস্তে উঠিয়া বসিল‌, থিয়েটারী ভঙ্গীতে ডান হাত প্রসারিত করিয়া বিশুদ্ধ মন্দাক্রান্তা ছন্দে আবৃত্তি করিল–

‘ইচ্ছা সম্যক ভ্বমণ গমনে

কিন্তু পাথেয় নাস্তি

পায়ে শিকলি মন উডুউডু

একি দৈবের শাস্তি।’

সবিস্ময়ে প্রশ্ন করিলাম‌, ‘এটা কোথেকে পেলে?’

‘হুঁ হুঁ-বলব কেন?’ ব্যোমকেশ আবার কাত হইয়া বই খুলিল।

হাতে কাজ না থাকিলে লোকে জ্যাঠার গঙ্গাযাত্রা করে‌, ব্যোমকেশ বাংলা সাহিত্যের পুরানো কবিদের লইয়া পড়িয়ছিল; ভারতচন্দ্ব হইতে আরম্ভ করিয়া সমস্ত কবিকে একে একে শেষ করিতেছিল। ভয় দেখাইয়াছিল‌, অতি আধুনিক কবিদেরও সে ছাড়িবে না। আমি সন্ত্রস্ত হইয়া উঠিয়ছিলাম‌, কোন দিন হয়তো নিজেই কবিতা লিখিতে শুরু করিয়া দিবে। আজকাল ছন্দ ও মিলের বালাই ঘুচিয়া যাওয়ায় কবিতা লেখার আর কোনও অন্তরায় নেই। কিন্তু সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ কবিতা লিখিলে তাহা যে কিরূপ মারাত্মক বস্তু দাঁড়াইবে ভাবিতেও শরীর কন্টকিত হয়। সেই যে খোকাকে একখানা আবোল তাবোলাঁ কিনিয়া দিয়াছিলাম‌, ব্যোমকেশের কাব্যিক প্রেরণার মূল সেইখানে। তারপর বইয়ের দোকানের অংশীদার হইয়া গোদের উপর বিষফোঁড়া হইয়াছে।

সত্যবতী ব্যোমকেশের পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠে একটি মোচড় দিয়া বলিল‌, ‘ওঠ না। আবার শুলে কেন?’

ব্যোমকেশ ধড়মড় করিয়া উঠিয়া বসিয়া বলিল, ‘কাশ্মীর যেতে কত খরচ জান?’

‘কত?’

‘অন্তত এক হাজার টাকা। অত টাকা পাব কোথায়?’

সত্যবতী রাগ করিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল‌, বলিল‌, ‘জানি না। আমি ওসব। যাবে কি না বল।’

‘বললাম তো টাকা নেই।’

এই সময় বহিদ্বারে টোকা পড়িল। বেশ একটি উপভোগ্য দাম্পত্য কলহের সূত্রপাত হইতেছিল‌, বাধা পড়িয়া গেল। সত্যবতী ব্যোমকেশকে কোপ-কটাক্ষে আধাপোড়া করিয়া দিয়া ভিতরের দিকে চলিয়া গেল।

ঘরের আলো জ্বালিয়া দ্বার খুলিলাম। যে লোকটি দ্বারের বাহিরে দাঁড়াইয়া আছে‌, তাহাকে দেখিয়া সহসা কিশোরবয়স্ক মনে হয়। বেশি লম্বা নয়‌, ছিপছিপে পাতলা গড়ন‌, গৌরবর্ণ সুশ্ৰী মুখে অল্প গোঁফের রেখা। বেশবাস পরিপাটি‌, পায়ে হরিণের চামড়ার জুতা হইতে গায়ে স্বচ্ছ মলমলের পাঞ্জাবি সমস্তাই অনবদ্য।

‘কাকে চান?’

‘সত্যান্বেষী ব্যোমকেশবাবুকে।’

‘আসুন।’ দ্বার ছাড়িয়া সরিয়া দাঁড়াইলাম।

লোকটি ঘরে প্রবেশ করিয়া উজ্জ্বল বৈদ্যুতিক আলোর সম্মুখে দাঁড়াইলে তাহার চেহারাখানা ভাল করিয়া দেখিলাম। যতটা কিশোর মনে করিয়াছিলাম ততটা নয়; বর্ণচোরা আম। চোখের দৃষ্টিতে দুনিয়াদারির ছাপ পড়িয়াছে‌, চোখের কোলে সূক্ষ্ম কালির আচড়‌, মুখের বাহ্য সৌকুমার্যের অন্তরালে হাড়ে পাক ধরিয়াছে। তবু বয়স বোধ করি পচিশের বেশি নয়।

ব্যোমকেশ তক্তপোশের পাশে বসিয়া আগন্তুককে নিরীক্ষণ করিতেছিল‌, উঠিয়া আসিয়া চেয়ারে বসিল। সামনের চেয়ারের দিকে ইঙ্গিত করিয়া বলিল‌, ‘বসুন। কী দরকার আমার সঙ্গে?’

লোকটি তৎক্ষণাৎ উত্তর দিল না‌, চেয়ারে বসিয়া কিছুক্ষণ অভিনিবেশ সহকারে পর্যবেক্ষণ করিয়া শেষে বলিল‌, ‘আপনাকে দিয়ে আমার কাজ চলবে।’

ব্যোমকেশ ভ্রূ তুলিল‌, ‘তাই নাকি! কাজটা কী?

যুবক পাশের পকেট হইতে এক তাড়া নোট বাহির করিল‌, ব্যোমকেশের সম্মুখে অবহেলাভরে সেগুলি ফেলিয়া দিয়া বলিল‌, ‘আমার যদি হঠাৎ মৃত্যু হয়‌, আপনি আমার মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান করবেন। এই কাজ। পরে আপনার পারিশ্রমিক দেওয়া সম্ভব হবে না‌, তাই আগাম দিয়ে যাচ্ছি। এক হাজার টাকা গুনে নিন।’

ব্যোমকেশ কিছুক্ষণ কুঞ্চিত চক্ষে যুবকের পানে চাহিয়া রহিল‌, তারপর নোটের তাড়া শুনিয়া দেখিল। একশত টাকার দশ কেতা নোট। নোটগুলিকে টেবিলের এক পাশে রাখিয়া ব্যোমকেশ। অলসভাবে একবার আমার পানে চোখ তুলিল; তাহার চোখের মধ্যে একটু হাসির ঝিলিক খেলিয়া গেল। তারপর সে যুবকের মুখের উপর গভীর দৃষ্টি স্থাপন করিয়া বলিল‌, ‘আপনাকে কয়েকটা প্রশ্ন করতে চাই। আপনার কোজ নেব। কিনা তা নির্ভর করবে আপনার উত্তরের ওপর।’

যুবক সোনার সিগারেট কেস খুলিয়া ব্যোমকেশের সম্মুখে ধরিল‌, ব্যোমকেশ মাথা নাড়িয়া প্রত্যাখ্যান করিল। যুবক তখন নিজে সিগারেট ধরাইয়া ধোঁয়া ছাড়িতে ছাড়িতে বলিল‌, ‘প্রশ্ন করুন। কিন্তু সব প্রশ্নের উত্তর না দিতেও পারি।’

ব্যোমকেশ একটু নীরব রহিল‌, তারপর অলসকণ্ঠে প্রশ্ন করিল‌, ‘আপনার নাম কী?’

যুবকের মুখে চকিত হাসি খেলিয়া গেল। হাসিটি বেশ চিত্তাকর্ষক। সে বলিল‌, ‘নামটা এখনও বলা হয়নি। আমার নাম সত্যকাম দাস।’

‘সত্যকাম?’

‘হ্যাঁ! আপনি যেমন সত্যান্বেষী‌, আমি তেমনি সত্যকাম।’

‘এ-নাম আগে শুনিনি। সত্যকাম ছদ্মনাম নয় তো?’

‘না‌, আসল নাম।’

‘হুঁ। আপনি কোথায় থাকেন? ঠিকানা কি?’

‘কলকাতায় থাকি।। ৩৩/৩৪ আমহার্স্ট স্ট্রীট।’

‘কী কাজ করেন।’

‘কাজ? বিশেষ কিছু করি না। দাস-চৌধুরী কোম্পানির সুচিত্রা এম্পেরিয়মের নাম শুনেছেন?’

‘শুনেছি। ধর্মতলা স্ত্রীটের বড় মনিহারী দোকান।’

‘আমি সুচিত্রা এম্পেরিয়মের অংশীদার।’

‘অংশীদার।–অন্য অংশীদার কে?’

সত্যকাম একবার দাম লইয়া বলিল‌, ‘আমার বাবা–ঊষাপতি দাস।’

ব্যোমকেশ সপ্রশ্ন নেত্ৰে চাহিয়া রহিল। সত্যকাম তখন ক্ষণেকের জন্য ইতস্তত করিয়া

তাঁর পার্টনার হন। এখন দাদামশাই মারা গেছেন‌, তাঁর অংশ আমাকে দিয়ে গেছেন। আমার মা দাদামশায়ের একমাত্র সন্তান। আমিও মায়ের একমাত্র সন্তান।’

‘বুঝেছি।’ ব্যোমকেশ ক্ষণকাল যেন অন্যমনস্ক হইয়া রহিল‌, তারপর নির্লিপ্ত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিল‌, ‘আপনি মদ খান?’

কিছুমাত্র অপ্রস্তুত না হইয়া সত্যকাম বলিল‌, ‘খাই। গন্ধ পেলেন বুঝি?’

‘আপনার বয়স কত?’

‘জন্ম-তারিখ জানতে চান? ৭ই জুলাই‌, ১৯২৭।’ সত্যকাম ব্যঙ্গবঙ্কিম হাসিল।

‘কতদিন মদ খাচ্ছেন?’

‘চৌদ্দ বছর বয়সে মদ ধরেছি।’। সত্যকাম নিঃশেষিত সিগারেটের প্রান্ত হইতে নূতন সিগারেট ধরাইল।

‘সব সময় মদ খান?’

‘যখন ইচ্ছে হয় তখনই খাই।’ বলিয়া সে পকেট হইতে চার আউন্সের একটি ফ্ল্যাস্‌ক বাহির করিয়া দেখাইল।

ব্যোমকেশ কিছুক্ষণ গালে হাত দিয়া বসিয়া রহিল। আমিও নিবকিভাবে এই একুশ বছরের ছোকরাকে দেখিতে লাগিলাম। যাহারা সর্বাং লজ্জাং পরিত্যজ্য ত্ৰিভুবন বিজয়ী হইতে চায়‌, তাহারা বোধকরি খুব অল্প বয়স হইতেই সাধনা আরম্ভ করে।

ব্যোমকেশ মুখ তুলিয়া পূর্ববৎ নির্বিকার স্বরে বলিল‌, ‘আপনার আনুষঙ্গিক দোষও আছে?’

সত্যকাম মুচকি হাসিল‌, ‘দোষ কেন বলছেন‌, ব্যোমকেশবাবু? এমন সর্বজনীন কাজ কি দোষের হতে পারে?’

আমার গা রি-রি করিয়া উঠিল। ব্যোমকেশ কিন্তু নির্বিকার মুখেই বলিল‌, ‘দার্শনিক আলোচনা থাক। ভদ্রঘরের মেয়েদের উপরেও নজর দিয়েছেন?’

‘তা দিয়েছি।’ সত্যকামের কণ্ঠস্বরে বেশ একটু তৃপ্তির আভাস পাওয়া গেল।

‘কত মেয়ের সর্বনাশ করেছেন?’

‘হিসাব রাখিনি‌, ব্যোমকেশবাবু।’ বলিয়া সত্যকাম নির্লজ্জ হাসিল।

ব্যোমকেশ মুখের একটা অরুচিসূচক ভঙ্গী করিল‌, ‘আপনি বলছেন। হঠাৎ আপনার মৃত্যু হতে পারে। কেউ আপনাকে খুন করবে‌, এই কি আপনার আশঙ্কা?’

‘হ্যাঁ।’

‘কে খুন করতে পারে? যে-মেয়েদের অনিষ্ট করেছেন তাদেরই আত্মীয়স্বজন? কাউকে সন্দেহ

করেন?’

‘সন্দেহ করি। কিন্তু কারুর নাম করব না।’

‘প্ৰাণ বাঁচাবার চেষ্টাও করবেন না?’

সত্যকাম মুখের একটা বিমর্ষ ভঙ্গী করিয়া উঠিবার উপক্রম করিল, ‘চেষ্টা করে লাভ নেই, ব্যোমকেশবাবু। আচ্ছা আজ উঠি‌, আর বোধহয় আপনার কোন প্রশ্ন নেই। রাত্তিরে আমার একটা অ্যাপয়েণ্টমেণ্ট আছে।’

এই অ্যাপয়েণ্টমেন্ট যে ব্যবসায়ঘটিত নয় তাহা তাহার বাঁকা হাসি হইতে প্রমাণ হইল।

সে দ্বারের কাছে পৌঁছিলে ব্যোমকেশ পিছন হইতে জিজ্ঞাসা করিল‌, ‘আপনাকে যদি কেউ খুন করে আমি জানব কী করে?’

সত্যকাম ফিরিয়া দাঁড়াইয়া বলিল‌, ‘খবরের কাগজে পাবেন। তা ছাড়া আপনি খোঁজ খবর নিতে পারেন। বেশি দিন বোধ হয় অপেক্ষা করতে হবে না।’

সত্যকাম প্রস্থান করিলে আমি দরজা বন্ধ করিয়া তক্তপোশে আসিয়া বসিলাম। সত্যবতী। হাসি-ভরা মুখে পুনঃপ্রবেশ করিল। মনে হইল সে দরজার আড়ালেই ছিল। ‘এক হাজার টাকার জন্যে ভাবছিলো‌, পেলে তো এক হাজার টাকা।’ ব্যোমকেশ বিরস মুখে নোটগুলি সত্যবতীর দিকে বাড়াইয়া দিয়া বলিল‌, ‘পিপীলিকা খায় চিনি‌, চিনি যোগান চিন্তামণি। আর কি‌, এবার কাশ্মীর যাত্রার উদ্যোগ আয়োজন শুরু করে দাও।’ আমাকে বলিল‌, ‘কেমন দেখলে ছোকরাকে?’

বলিলাম‌, ‘এত কম বয়সে এমন দু-কানকাটা বেহায়া আগে দেখিনি।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘আমিও না। কিন্তু আশ্চৰ্য‌, নিজের প্রাণ বাঁচাতে চায় না‌, মরার পর অনুসন্ধান করাতে চায়!’

পরদিন সকালবেলা সত্যবতী বলিল‌, ‘কাশ্মীর যে যাবে‌, লেপ বিছানা কৈ?’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘কেন‌, গত বছর পাটনায় তো ছিল।’

সত্যবতী বলিল‌, ‘সে তো সব দাদার। আমাদের কি কিছু আছে! নেহাত কলকাতার শীত‌, তাই চলে যায়। কাশ্মীর যেতে হলে অন্তত দুটো বিলিতি কম্বল চাই। আর আমার জন্যে একটা বীভার-কোট।’

‘হুঁ। চল অজিত‌, বেরুনো যাক।’

প্রশ্ন করিলাম‌, ‘কোথায় যাবে?’

সে বলিল‌, ‘চল‌, সুচিত্রা এম্পেরিয়মে যাই। রথ দেখা কলা বেচা দুইই হবে।’

বলিলাম‌, ‘সত্যবতীও চলুক না‌, নিজে পছন্দ করে কেনাকাটা করতে পারবে।’

ব্যোমকেশ সত্যবতীর পানে তাকাইল‌, সত্যবতী করুণ স্বরে বলিল‌, ‘যেতে তো ইচ্ছে করছে‌, কিন্তু যাই কী করে? খোকার ইস্কুলের গাড়ি আসবে যে।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘তোমার যাবার দরকার নেই। আমি তোমার জিনিস পছন্দ করে নিয়ে আসব। দেখো‌, অপছন্দ হবে না।’

সত্যবতী ব্যোমকেশের পানে সহাস্য কটাক্ষপাত করিয়ে ভিতরে চলিয়া গেল, ব্যোমকেশের পছন্দের উপর তাহার যে অটল বিশ্বাস আছে তাহাই জানাইয়া গেল। সত্যবতীর শৌখিন জিনিসের কেনাকাটা অবশ্য চিরকাল আমিই করিয়া থাকি। কিন্তু এখন বসন্তকাল পড়িয়াছে‌, ফাল্গুন মাস চলিতেছে–

দু’জনে বাহির হইলাম। সাড়ে ন’টার সময় ধর্মতলা স্ট্রীটে পৌঁছিয়া দেখিলাম এম্পেরিয়মে দ্বার খুলিয়াছে‌, প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড আস্ত কাচের জানালা হইতে পদ সরিয়া গিয়াছে। ভিতরে প্রবেশ করিলাম। বিশাল ঘর‌, মোজেয়িক মেঝের উপর ইতস্তত নানা শৌখিন পণ্যের শো-কেস সাজানো রহিয়াছে। দুই চারিজন গ্ৰাহক ইতিমধ্যেই আসিয়া উপস্থিত হইয়াছেন‌, তাঁহারা অধিকাংশই উচ্চবিত্ত শ্রেণীর মহিলা। কর্মচারীরা নিজ নিজ স্থানে দাঁড়াইয়া ক্রেতাদের মন যোগাইতেছে। একটি প্রৌঢ়াগোছের ভদ্রলোক ঘরের এ-প্ৰান্ত হইতে ও-প্রাস্ত পদচারণ করিতে করিতে সর্বত্র নজর রাখিয়াছেন।

‘আসতে আজ্ঞা হোক। কী চাই বলুন?’

ব্যোমকেশ ঘরের এদিক ওদিক তাকাইয়া কুষ্ঠিতম্বরে বলিল‌, ‘সামান্য জিনিস–গোটা দুই বিলিতি কম্বল। পাওয়া যাবে কি?’

‘নিশ্চয়। আসুন আমার সঙ্গে।’ ভদ্রলোক আমাদের একদিকে লইয়া চলিলেন‌, ‘আর কিছু?’

‘আর একটা মেয়েদের বীভার-কোট।’

‘পাবেন। এই যে লিফট—ওপরে কম্বল বীভার-কোট দুইই পাবেন।’

ঘরের কোণে একটি ছোট লিফট ওঠা-নামা করিতেছে‌, আমরা তাহার সামনে গিয়া দাঁড়াইতেই পিছন হইতে কে বলিল‌, ‘আমি এঁদের দেখছি।’

পরিচিত কণ্ঠস্বরে পিছু ফিরিয়া দেখিলাম–সত্যকাম। সিল্কের স্যুট পরা ছিমছাম চেহারা‌, এতক্ষণ সে বোধহয় এই ঘরেই ছিল‌, বিজাতীয় পোশাকের জন্য লক্ষ্য করি নাই। প্রৌঢ় ভদ্রলোকটি তাহাকে দেখিয়া বলিলেন‌, ‘ও-আচ্ছা। তুমি এঁদের ওপরে নিয়ে যাও‌, এঁরা বিলিতি কম্বল আর বীভার-কোট কিনবেন।’ বলিয়া আমাদের দিকে একটু হাসিয়া অন্যত্র চলিয়া গেল।

ব্যোমকেশ চকিতে একবার সত্যকমের দিকে একবার প্রৌঢ় ভদ্রলোকের দিকে চাহিয়া মৃদুকণ্ঠে বলিল‌, ‘ইনি আপনার—’

সত্যকাম মুখ টিপিয়া হাসিল‌, ‘পার্টনার।’

‘অর্থাৎ–বাবা?’

সত্যকাম ঘাড় নাড়িয়া সায় দিল। এতক্ষণ প্রৌঢ় ভদ্রলোককে দেখিয়াও লক্ষ্য করি নাই‌, এখন ভাল করিয়া দেখিলাম। তিনি অদূরে দাঁড়াইয়া অন্য একজন গ্রাহকের সঙ্গে কথা বলিতেছিলেন এবং মাঝে মাঝে অস্বচ্ছন্দভাবে আমাদের দিকে দৃষ্টি ফিরাইতেছিলেন। শ্যামবর্ণ দীর্ঘাকৃতি চওড়া কাঠামোর মানুষ‌, চিবুকের হাড় দৃঢ়। বয়স আন্দাজ পায়তাল্লিশ‌, রাগের চুলে ঈষৎ পাক ধরিয়াছে। দোকানদারির লৌকিক শিষ্টতা সত্ত্বেও মুখে একটা তপঃকৃশ রুক্ষতার ভাব। দোকানদারির অবকাশে ভদ্রলোকের মেজাজ বোধ করি একটু কড়া।

এই সময় লিফট নামিয়া আসিল‌, আমরা খাঁচার মধ্যে ঢুকিয়া দ্বিতলে উপস্থিত হইলাম।

সত্যকাম ব্যোমকেশের দিকে চটুল ভূভঙ্গী করিয়া বলিল‌, ‘সত্যি কিছু কিনবেন? না সরেজমিন তদারকে বেরিয়েছেন?’

‘সত্যি কিনব।’

উপরিতলাটি নীচের মত সাজান নয়‌, অনেকটা গুদামের মত। তবু এখানেও গুটিকয়েক ক্রেতা ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। সত্যকাম আমাদের যে-দিকে লইয়া গেল সে-দিকটা গরম কাপড়-চোপড়ের বিভাগ। সত্যকমের ইঙ্গিতে কর্মচারী অনেক রকম বিলিতি কম্বল বাহির করিয়া দেখাইল। এ-সব ব্যাপারে ব্যোমকেশ চিটা ও চিনির প্রভেদ বোঝে না‌, আমিই দুইটি কম্বল বাছিয়া লইলাম। দাম বিলক্ষণ চড়া, কিন্তু জিনিস ভাল।

অতঃপর বীভার-কোট। নানা রঙের–নানা মাপের কোট–সবগুলিই অগ্নিমূল্য। আমরা সেগুলি লইয়া নাড়াচাড়া করিতেছি দেখিয়া সত্যকাম বলিল‌, ‘মাপের কথা ভাবছেন? বীভার-কোট একটু ঢিলেঢালা হলেও ক্ষতি হয় না। যেটা পছন্দ হয় আপনার নিয়ে যান‌, যদি নেহাত বেমানান হয় বদলে দেব।’

একটি গাঢ় বেগুনি রঙের কোট আমার পছন্দ হইল‌, কিন্তু দামের টিকিট দেখিয়া ইতস্তত করিতে লাগিলাম। সত্যকাম অবস্থা বুঝিয়া বলিল‌, ‘দামের জন্যে ভাববেন না। ওটা সাধারণ খরিদ্দারের জন্যে। আপনারা খরিদ দামে পাবেন। —আসুন।’

আমাদের ক্যাশিয়ারের কাছে লইয়া গিয়া সত্যকাম বলিল‌, ‘এই জিনিসগুলো খরিদ দরে দেওয়া হচ্ছে। ক্যাশমেমো কেটে দিন।’

‘যে আজ্ঞা।’ বলিয়া বৃদ্ধ ক্যাশিয়ার ক্যাশমেমো লিখিয়া দিল। দেখিলাম টিকিটের দামের চেয়ে প্রায় পঞ্চাশ টাকা কম হইয়াছে। মন খুশি হইয়া উঠিল; গত রাত্রে সত্যকাম সম্বন্ধে যে ধারণা জন্মিয়াছিল তাহাও বেশ খানিকটা পরিবর্তিত হইল। নাঃ‌, আর যাই হোক‌, ছোকরা একেবারে চুষুণ্ডি চামার নয়।

এই সময় উপরিতলায় একটি তরুণীর আবির্ভাব হইল। বরবর্ণিনী যুবতী‌, সাজ পোশাকে লীলা-লালিত্যের পরিচয় আছে। সত্যকাম একবার ঘাড় ফিরাইয়া তরুণীকে দেখিল; তাহার মুখের চেহারা বদলাইয়া গেল। সে এক চক্ষু কুঞ্চিত করিয়া আমাদের বলিল‌, ‘আপনাদের বোধহয় আর কিছু কেনার নেই? আমি তাহলে—নতুন গ্রাহক এসেছে–আচ্ছা নমস্কার।’

মধুগন্ধে আকৃষ্ট মৌমাছির মত সত্যকাম সিধা যুবতীর দিকে উড়িয়া গেল। আমরা জিনিসপত্র প্যাক করাইয়া যখন নীচে নামিবার উপক্রম করিতেছি‌, দেখিলাম সত্যকাম যুবতীকে সম্পূর্ণ মন্ত্রমুগ্ধ করিয়া ফেলিয়াছে, যুবতী সত্যকামের বচানামৃত পান করিতে করিতে তাহার সঙ্গে সঙ্গে ঘুরিতেছে।

বাসায় ফিরিয়া সত্যবতীকে আমাদের খরিদ দেখাইলাম। সত্যবতী খুবই আহ্বাদিত হইল এবং নিবাচন-নৈপুণ্যের সমস্ত প্রশংসা নির্বিচারে ব্যোমকেশকে অর্পণ করিল। বসন্তকালের এমনই शशिभ!

আমি যখন জিনিসগুলির মূল্য হ্রাসের কথা বলিলাম তখন সত্যবতী বিগলিত হইয়া বলিল‌, ‘অ্যাঁ–সত্যি। ভারী ভাল ছেলে তো সত্যকাম।’

ব্যোমকেশ ঊর্ধ্বদিকে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়িয়া বলিল‌, ‘ভারী ভাল ছেলে! সোনার চাঁদ ছেলে! যদি কেউ ওকে খুন না করে‌, দোকান শীগ্‌গিরই লাটে উঠবে।’

সন্ধ্যাবেলা ব্যোমকেশ আমাকে লইয়া বেড়াইতে বাহির হইল। এবার গতি আমহার্স্ট স্ট্রীটের দিকে। ৩৩/৩৪ নম্বর বাড়ির সম্মুখে যখন পৌঁছিলাম তখন ঘোর ঘোর হইয়া আসিয়াছে। প্রদোষের এই সময়টিতে কলিকাতার ফুটপাথেও ক্ষণকালের জন্য লোক-চলাচল কমিয়া যায়‌, বোধ করি রাস্তার আলো জ্বলার প্রতীক্ষ্ণ করে। আমরা উদ্দিষ্ট বাড়ির সম্মুখে গিয়া দাঁড়াইলাম। বেশি পথিক নাই, কেবল গায়ে চাদর-জড়ানো একটি লোক ফুটপাথে ঘোরাফেরা করতেছিল, আমাদের দেখিয়া একটু দূরে সরিয়া গেল।

৩৩/৩৪ নম্বর বাড়ি একেবারে ফুটপাথের উপর নয়। প্রথমে একটি ছোট লোহার ফটক‌, ফটক হইতে গলির মত সরু ইট-বাঁধানো রাস্তা কুড়ি-পঁচিশ ফুট। গিয়া বাড়ির সদরে ঠেকিয়ছে। দোতলা বাড়ি‌, সম্মুখ হইতে খুব বড় মনে হয় না। সদর দরজার দুই পাশে দুইটি জানালা‌, জানালার মাথার উপর দোতলায় দুইটি গোলাকৃতি ব্যালকনি। বাড়ির ভিতরে এখনও আলো জ্বলে নাই। ফুটপাথে দাঁড়াইয়া মনে হইল একটি স্ত্রীলোক দোতলার একটি ব্যালকনিতে বসিয়া বই পড়িতেছে কিংবা সেলাই করিতেছে। ব্যালকনির ঢালাই লোহার রেলিঙের ভিতর দিয়া অস্পষ্টভাবে দেখা গেল।

‘ব্যোমকেশবাবু!’

ছন হইতে অতর্কিত আহ্বানে দু’জনেই ফিরিলাম। গায়ে চাদর-জড়ানো যে লোকটিকে ঘোরাফেরা করিতে দেখিয়ছিলাম‌, সে আমাদের পিছনে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে। পুষ্টকায় যুবক, মাথায় চুল ছোট করিয়া ছাঁটা‌, মুখখানা যেন চেনা-চেনা মনে হইল। ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘কে?’

যুবক বলিল‌, ‘আমাকে চিনতে পারলেন না। স্যার? সেদিন সরস্বতী পুজোর চাঁদা নিতে গিয়েছিলাম। আমার নাম নন্দ ঘোষ‌, আপনার পাড়াতেই থাকি।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘মনে পড়েছে। তা তুমি ও-পাড়ার ছেলে‌, ভর সন্ধ্যেবেলা এখানে ঘোরাঘুরি করছ‌, কেন?’

‘আজ্ঞে–নন্দ ঘোষের একটা হাত চাদরের ভিতর হইতে বাহির হইয়া আসিয়া আবার তৎক্ষণাৎ চাদরের মধ্যে লুকাইল। তবু দেখিয়া ফেলিলাম‌, হাতে একটি ভিন্দিপাল। অর্থাৎ দেড় হেতে খেঁটে। বস্তুটি আকারে ক্ষুদ্র হইলেও বলবান ব্যক্তির হাতে মারাত্মক অস্ত্র। ব্যোমকেশ সন্দিগ্ধ নেত্ৰে নন্দ ঘোষকে নিরীক্ষণ করিয়া বলিল‌, ‘কী মতলব বল দেখি?’

‘মতলব-আজ্ঞে নন্দ একটু কাছে ঘেঁষিয়া নিম্নস্বরে বলিল‌, ‘আপনাকে বলছি স্যার‌, এ-বাড়িতে একটা ছোঁড়া থাকে‌, তাকে ঠ্যাঙাব।’

‘তাই নাকি! ঠ্যাঙাবে কেন?’

‘কারণ আছে স্যার। কিন্তু আপনারা এখানে কী করছেন? এ-বাড়ির কাউকে চেনেন নাকি?’

‘সত্যকামকে চিনি। তাকেই ঠ্যাঙাতে চাও-কেমন?’

‘আজ্ঞে—’ নন্দ একটু বিচলিত হইয়া পড়িল‌, ‘আপনার সঙ্গে কি ওর খুব ঘনিষ্ঠতা আছে নাকি?’

‘ঘনিষ্ঠতা নেই। কিন্তু জানতে চাই ওকে কেন ঠ্যাঙাতে চাও। ও কি তোমার কোনও অনিষ্ট করেছে?’

‘অনিষ্ট–সে অনেক কথা স্যার। যদি শুনতে চান‌, আমার সঙ্গে আসুন; কাছেই ভুতেশ্বরের আখড়া‌, সেখানে সব শুনবেন।’

‘ভূতেশ্বরের আখড়া! ‘

‘আজ্ঞে আমাদের ব্যায়াম সমিতি। কাছেই গলির মধ্যে। চলুন।’

‘চল।’

ইতিমধ্যে রাস্তার আলো জ্বলিয়াছে। আমরা নন্দকে অনুসরণ করিয়া একটি গলির মধ্যে প্রবেশ করিলাম‌, কিছু দূর গিয়া একটি পাঁচলঘেরা উঠানের মত স্থানে পৌঁছিলাম। উঠানের পাশে গোটা দুই নোনাধরা জীৰ্ণ ঘরে আলো জ্বলিতেছে। উঠান প্রায় অন্ধকার‌, সেখানে কয়েকজন কপনিপরা যুবক ডন-বৈঠক দিতেছে‌, মুগুর ঘুরাইতেছে এবং আরও নানা প্রকারে দেহযন্ত্রকে মজবুত করিতেছে। নন্দ পাশ কাটাইয়া আমাদের ঘরে লইয়া গেল।

ঘরের মেঝোয় সতরঞ্চি পাতা; একটি অতিকায় ব্যক্তি বসিয়া আছেন। নন্দ পরিচয় করাইয়া দিল‌, ইনি ব্যায়াম সমিতির ওস্তাদ‌, নাম ভূতেশ্বর বাগ। সার্থকনামা ব্যক্তি‌, কারণ তাঁহার গায়ের রঙ ভূতের মতন এবং মুখখানা বাঘের মতন; উপরন্তু দেহায়তন হাতির মতন। মাথায় একগাছিও চুল নাই‌, বয়স ষাটের কাছাকাছি। ইনি বোধহয় যৌবনকালে গুণ্ডা ছিলেন অথবা কুস্তিগির ছিলেন‌, বয়োগতে ব্যায়াম সমিতি খুলিয়া বসিয়াছেন।

নন্দ বলিল‌, ‘ভুতেশ্বরদা‌, ব্যোমকেশবাবু মস্ত ডিটেকটিভ‌, সত্যকামকে চেনেন।’

ভুতেশ্বর ব্যোমকেশের দিকে বাঘা চোখ ফিরাইয়া বলিলেন‌, ‘আপনি পুলিসের লোক? ঐ ছোঁড়ার মুরুব্বি?’

ব্যোমকেশ সবিনয়ে জানাইল‌, সে পুলিসের লোক নয়‌, সত্যকামের সহিত তাহার আলাপও মাত্র একদিনের। সত্যকামকে প্রহার করিবার প্রয়োজন কেন হইয়াছে তাঁহাই শুধু জানিতে চায়‌, অন্য কোনও দুরভিসন্ধি নাই। ভুতেশ্বর একটু নরম হইয়া বলিলেন‌, ‘ছোঁড়া পগেয়া পাজি। পাড়ার কয়েকজন ভদ্রলোক আমাদের কাছে নালিশ করেছেন। ছোঁড়া মেয়েদের বিরক্ত করে। এটা ভদরলোকের পাড়া‌, এ-পাড়ায় ও-সব চলবে না।’

এই সময় আরও কয়েকজন গলদঘর্ম মল্লবীর ঘরে প্রবেশ করিল এবং আমাদের ঘিরিয়া বসিয় কটমট চক্ষে আমাদের নিরীক্ষণ করিতে লাগিল। স্পষ্টই বোঝা গেল‌, সত্যকামকে ঠ্যাঙইবার সঙ্কল্প একজনের নয়‌, সমস্ত ব্যায়াম সমিতির অনুমোদন ইহার পশ্চাতে আছে। নিজেদের নিরাপত্তা সম্বন্ধে শঙ্কিত হইয়া উঠিলাম। গতিক সুবিধার নয়‌, সত্যকামের ফাঁড়াটা আমাদের উপর দিয়া বুঝি যায়।

ব্যোমকেশ কিন্তু সামলাইয়া লইল। শান্তস্বরে বলিল‌, ‘পাড়ার কোনও লোক যদি বজ্জাতি করে তাকে শাসন করা পাড়ার লোকেরই কাজ‌, এ-কাজ অন্য কাউকে দিয়ে হয় না। আপনারা সত্যকামকে শায়েস্তা করতে চান তাতে আমার কোনই আপত্তি নেই। তাকে যতটুকু জানি দু’ ঘা পিঠে পড়লে তার উপকারই হবে। শুধু একটা কথা‌, খুনোখুনি করবেন না। আর‌, কাজটা সাবধানে করবেন‌, যাতে ধরা না পড়েন।’



নন্দ এক মুখ হাসিয়া বলিল‌, ‘সেইজনেই তো কাজটা আমি হাতে নিয়েছি স্যার। দু-চার ঘা দিয়ে কেটে পড়ব। আমি এ-পাড়ার ছেলে নই‌, চিনতে পারলেও সনাক্ত করতে পারবে না।’

ব্যোমকেশ হাসিয়া গাত্ৰোত্থান করিল‌, ‘তবু্‌, যদি কোনও গণ্ডগোল বাধে আমাকে খবর দিও। আজ তাহলে উঠি। নমস্কার‌, ভূতেশ্বরবাবু।’

বড় রাস্তায় আমাদের পৌঁছাইয়া দিয়া নন্দ আখড়ায় ফিরিয়া গেল। ব্যোমকেশ নিশ্বাস ছাড়িয়া বলিল‌, ‘বাপ‌, একেবারে বাঘের গুহায় গলা বাড়িয়েছিলাম!’

আমি বলিলাম‌, ‘কিন্তু সত্যকামকে মারধর করার উৎসাহ দেওয়া কি তোমার উচিত? তুমি ওর টাকা নিয়েছ।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘দু-চার ঘা খেয়ে যদি ওর প্রাণটা বেঁচে যায় সেটা কি ভাল নয়?’

যদিও আমি কোনও দিন অফিস-কাছারি করি নাই‌, তবু কেন জানি না। রবিবার সকালে ঘুম ভাঙিতে বিলম্ব হয়। পূর্বপুরুষেরা চাকুরে ছিলেন‌, রক্তের মধ্যে বোধ হয় দাসত্বের দাগ রহিয়া গিয়াছে।

পরদিনটা রবিবার ছিল‌, বেলা সাড়ে সাতটার সময় চোখ মুছিতে মুছিতে বাহিরের ঘরে আসিয়া দেখি ব্যোমকেশ দুহাতে খবরের কাগজটা খুলিয়া ধরিয়া একদৃষ্টি তাকাইয়া আছে। আমার আগমনে সে চক্ষু ফিরাইল না‌, সংবাদপত্রটাকেই যেন সম্বোধন করিয়া বলিল‌, ‘নিশার স্বপন সম তোর এ বারতা রে দূত!’

তাহার ভাবগতিক ভাল ঠেকিল না‌, জিজ্ঞাসা করিলাম‌, ‘কী হয়েছে?’

সে কাগজ নামাইয়া রাখিয়া বলিল‌, ‘সত্যকাম কাল রাত্রে মারা গেছে।’

‘অ্যাঁ! কিসে মারা গেল?’

‘তা জানি না।–তৈরি হয়ে নাও‌, আধা ঘণ্টার মধ্যে বেরুতে হবে।’

আমি কাগজখানা তুলিয়া লইলাম। মধ্য পৃষ্ঠার তলার দিকে পাঁচ লাইনের খবর—

–অদ্য শেষ রাত্রে ধর্মতলার প্রসিদ্ধ সুচিত্রা এম্পেরিয়মের মালিক সত্যকাম দাসের সন্দেহজনক অবস্থায় মৃত্যু ঘটিয়াছে। পুলিস তদন্তের ভার লইয়াছে।

সত্যকাম তবে ঠিকই বুঝিয়াছিল‌, মৃত্যুর পূবাভাস পাইয়াছিল। কিন্তু এত শীঘ্র! প্রথমেই স্মরণ হইল‌, কাল সন্ধ্যার সময় নন্দ ঘোষ চাদরের মধ্যে খেটে লুকাইয়া বাড়ির সামনে ঘোরাঘুরি করিতেছিল–

বেলা সাড়ে আটটার সময় ব্যোমকেশ ও আমি আমহার্স্ট স্ট্রীটে উপস্থিত হইলাম। ফটকের বাহিরে ফুটপাথের উপর একজন কনস্টেবল দাঁড়াইয়া আছে; একটু খুঁতখুঁত করিয়া আমাদের ভিতরে যাইবার অনুমতি দিল।

ইট-বাঁধানো রাস্তা দিয়া সদরে উপস্থিত হইলাম। সদর দরজা খোলা রহিয়াছে‌, কিন্তু সেখানে কেহ নাই। বাড়ির ভিতর হইতে কান্নাকাটির আওয়াজও পাওয়া যাইতেছে না। ব্যোমকেশ দরজার সম্মুখে পৌঁছিয়া থমকিয়া দাঁড়াইয়া পড়িল‌, নীরবে মাটির দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করিল। দেখিলাম দরজার ঠিক সামনে ইট-বাঁধানো রাস্তা যেখানে শেষ হইয়াছে সেখানে খানিকটা রক্তের দাগ। কাঁচা রক্ত নয়‌, বিঘাতপ্রমাণ স্থানের রক্ত শুকাইয়া চাপড়া বাঁধিয়া গিয়াছে।

আমরা একবার দৃষ্টি বিনিময় করিলাম; ব্যোমকেশ ঘাড় নাড়িল। তারপর আমরা রক্ত-লিপ্ত স্থানটাকে পাশ কাটাইয়া ভিতরে প্রবেশ করিলাম।

একটি চওড়া বারান্দা‌, তাহার দুই পাশে দুইটি দরজা। একটি দরজায় তালা লাগানো‌, অন্যটি খোলা; খোলা দরজা দিয়া মাঝারি। আয়তনের অফিস-ঘর দেখা যাইতেছে। ঘরের মাঝখানে একটি বড় টেবিল‌, টেবিলের সম্মুখে ঊষাপতিবাবু একাকী বসিয়া আছেন।

ঊষাপতিবাবু টেবিলের উপর দুই কনুই রাখিয়া দুই করতলের মধ্যে চিবুক আবদ্ধ করিয়া বসিয়া মুম্ন আমরা প্রবেশ করলে দুখািভরা চোখ তুলিয়া চাহিলন‌, শুষ্ক নিষ্প্রাণ স্বরে বললেন, ‘কী চাই?’

ব্যোমকেশ টেবিলের পাশে গিয়া দাঁড়াইল‌, সহানুভূতিপূর্ণ স্বরে বলিল‌, ‘এ-সময় আপনাকে বিরক্ত করতে এলাম‌, মাফ করবেন। আমার নাম ব্যোমকেশ বক্সী—’

ঊষাপতিবাবু ঈষৎ সজাগ হইয়া পর্যায়ক্রমে আমাদের দিকে চোখ ফিরাইলেন‌, তারপর বলিলেন‌, ‘আপনাদের আগে কোথায় দেখেছি। বোধহয় সুচিত্রায়।–কী নাম বললেন?’

‘ব্যোমকেশ বক্সী। ইনি অজিত বন্দ্যোপাধ্যায়।–কাল আমরা আপনার দোকানে গিয়েছিলাম—’

ঊষাপতিবাবু আমাদের নাম পূর্বে শুনিয়াছেন বলিয়া মনে হইল না‌, কিন্তু খদ্দেরের প্রতি দোকানদারের স্বাভাবিক শিষ্টতা বোধ হয় তাঁহার অস্থিমজ্জাগত‌, তাই কোনও প্রকার অধীরতা প্রকাশ না করিয়া বলিলেন‌, ‘কিছু দরকার আছে কি? আমি আজ একটু–বাড়িতে একটা দুর্ঘটনা হয়ে গেছে—’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘জানি। সেই জন্যেই এসেছি। সত্যকামবাবু–’

‘আপনি সত্যকামকে চিনতেন?’

‘মাত্র পরশু দিন তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছে। তিনি আমার কাছে একটা প্রস্তাব নিয়ে এসেছিলেন–’

‘কী প্রস্তাব?’

‘তিনি প্রস্তাব করেছিলেন যে‌, হঠাৎ যদি তাঁর মৃত্যু হয় তাহলে আমি তাঁর মৃত্যু সম্বন্ধে অনুসন্ধান করব।’

ঊষাপতিবাবু এবার খাড়া হইয়া বসিলেন‌, কিছুক্ষণ নির্নিমেষ চক্ষে চাহিয়া থাকিয়া যেন প্রবল হৃদয়াবেগ দমন করিয়া লইলেন‌, তারপর সংযত স্বরে বলিলেন‌, ‘আপনারা বসুন। —সত্যকাম তাহলে বুঝতে পেরেছিল। কিন্তু মাফ করবেন‌, আপনার কাছে সত্যকাম কেন গিয়েছিল বুঝতে পারছি না। আপনি—আপনার পরিচয়-মানে আপনি কি পুলিসের লোক? কিন্তু পুলিস তো কাল রাত্রেই এসেছিল‌, তারা—’

‘না‌, আমি পুলিসের লোক নই। আমি সত্যান্বেষী। বেসরকারী ডিটেকটিভ বলতে পারেন।’

‘ও—’ ঊষাপতিবাবু অনেকক্ষণ চুপ করিয়া রহিলেন‌, তারপর বলিলেন‌, ‘সত্যকাম কাকে সন্দেহ করে‌, আপনাকে বলেছিল কি?’

‘না, কারুর নাম করেননি।–এখন আপনি যদি অনুমতি করেন। আমি অনুসন্ধান করতে পারি।‘

‘কিন্তু–পুলিস তো অনুসন্ধানের ভার নিয়েছে‌, তার চেয়ে বেশি আপনি কী করতে পারবেন?’

‘কিছু করতে পারব। কিনা তা এখনও জানি না। তবে চেষ্টা করতে পারি।’

এত বড় শোকের মধ্যেও ঊষাপতিবাবু যে বিষয়বুদ্ধি হারান নাই। তাই তাহার পরিচয় এবার পাইলাম।

তিনি বলিলেন‌, ‘আপনি প্রাইভেট ডিটেকটিভ‌, আপনাকে কত পারিশ্রমিক দিতে হবে?’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘কিছুই দিতে হবে না। আমার পারিশ্রমিক সত্যকামবাবু দিয়ে গেছেন।’

ঊষাপতিবাবু প্রখর চক্ষে ব্যোমকেশের পানে চাহিলেন‌, তারপর চোখ নামাইয়া বলিলেন‌, ‘ও। তা আপনি অনুসন্ধান করতে চান করুন। কিন্তু কোনও লাভ নেই‌, ব্যোমকেশবাবু।’

‘লাভ নেই কেন?’

‘সত্যকাম তো আর ফিরে আসবে না‌, শুধু জল ঘোলা করে লাভ কী?’

ব্যোমকেশ কিছুক্ষণ স্থির নেত্ৰে ঊষাপতিবাবুর পানে চাহিয়া থাকিয়া ধীরস্বরে বলিল‌, ‘আপনার মনের ভাব আমি বুঝেছি। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন‌, জল ঘোলা হতে আমি দেব না। আমার উদ্দেশ্য শুধু সত্য আবিষ্কার করা।’

ঊষাপতিবাবু একটি ক্লান্ত নিশ্বাস ফেলিলেন‌, ‘বেশ। আমাকে কী করতে হবে বলুন।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘কাল কখন কীভাবে সত্যকামবাবুর মৃত্যু হয়েছিল আমি কিছুই জানি না। আপনি বলতে পারবেন কি?’

ঊষাপতিবাবুর মুখখানা যেন আরও ক্লিষ্ট হইয়া উঠিল‌, তিনি বুকের উপর একবার হাত বুলাইয়া বলিলেন‌, ‘আমিই বলি—আর কে বলবে? কাল রাত্রি একটার সময় আমি নিজের ঘরে ঘুমোচ্ছিলাম‌, হঠাৎ একটা আওয়াজ শুনে ঘুম ভেঙে গেল। দুম করে একটা আওয়াজ। মনে হল যেন সদরের দিক থেকে এল–’

‘মাফ করবেন‌, আপনার শোবার ঘর কোথায়?’

ঊষাপতিবাবু ছাদের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া বলিলেন‌, ‘এর ওপরের ঘর। আমি একই শুই‌, পাশের ঘরে স্ত্রী শোন।’

‘আর সত্যকামবাবু কোন ঘরে শুতেন?’

‘সত্যকাম নীচে শুত। ঐ যে বারান্দার ওপারে ঘরের দোরে তালা লাগানো রয়েছে ওটা তার শোবার ঘর ছিল। আমার স্ত্রীর শোবার ঘর ওর ওপরে।’

‘সত্যকামবাবু নীচে শুতেন কেন?’

ঊষাপতিবাবু উত্তর দিলেন না‌, উদাসচক্ষে বাহিরের জানালার দিকে তাকাইয়া রহিলেন। তাঁহার ভাবভঙ্গী হইতে স্পষ্টই বোঝা গেল যে‌, রাত্রিকালে নির্বিঘ্নে বহিৰ্গমন ও প্রত্যাবর্তনের সুবিধার জন্যই সত্যকাম নীচের ঘরে শয়ন করিত। তাহার রাত্রে বাড়ি ফিরিবার সময়েরও ঠিক ছিল না।

এই সময় ভিতর দিকের দরজার পদ সরাইয়া একটি মেয়ে হাতে সরবতের গেলাস লইয়া প্রবেশ করিল এবং আমাদের দেখিয়া থমকিয়া গেল‌, অনিশ্চিত স্বরে একবার ‘মামা-? বলিয়া ন যযৌ ন তস্থৌ হইয়া রহিল। মেয়েটির বয়স সতেরো-আঠারো, সুন্দরী নয় কিন্তু পুরন্ত গড়ন, চটক আছে। বর্তমানে তাহার মুখে-চোখে শঙ্কার কালো ছায়া পড়িয়াছে।

ঊষাপতিবাবু তাহার দিকে মুখ ফিরাইয়া বলিলেন‌, ‘দরকার নেই।’ মেয়েটি চলিয়া গেল।

ব্যোমকেশ জিজ্ঞাসা করিল‌, ‘আপনার বাড়িতে কে কে থাকে?’

ঊষাপতিবাবু বলিলেন‌, ‘আমরা ছাড়া আমার দুই ভাগনে ভাগনী থাকে।

‘এটি আপনার ভাগনী?

‘হ্যাঁ।’

‘কতদিন এরা আপনার কাছে আছে?’

‘বছরখানেক আগে ওদের বাপ মারা যায়। মা আগেই গিয়েছিল। সেই থেকে আমি ওদের প্রতিপালন করছি। বাড়িতে আমরা ক’জন ছাড়া আর কেউ নেই।’

‘চাকর-বাকর?’

‘পুরনো চাকর সহদেব বাড়িতেই থাকে। সে ছাড়া ঝি আর বামনী আছে‌, তারা রাত্রে থাকে না।’

‘বুঝেছি। তারপর কাল রাত্রির ঘটনা বলুন।’

ঊষাপতিবাবু চোখের উপর দিয়া একবার করতল চালাইয়া বলিলেন‌, ‘হ্যাঁ। আওয়াজ শুনে আমি ব্যালকনির দরজা খুলে বাইরে গিয়ে দাঁড়ালাম। নীচে অন্ধকার‌, কিছু দেখতে পেলাম না। তারপরই সদর দরজার কাছ থেকে সহদেব চীৎকার করে উঠল…ছুটতে ছুটতে নীচে নেমে এলাম‌, দেখি সহদেব দরজা খুলেছে‌, আর–সত্যকাম দরজার সামনে পড়ে আছে। প্ৰাণ নেই‌, পিঠের দিক থেকে গুলি ঢুকেছে।’

‘গুলি! বন্দুকের গুলি?’

‘হ্যাঁ। সত্যকাম রোজই দেরি করে বাড়ি ফিরত। সহদেব বরান্দায় শুয়ে থাকত‌, দরজায় টোকা পড়লে উঠে দোর খুলে দিত। কাল সে টোকা শুনে দোর খোলবার আগেই কেউ পিছন দিক থেকে সত্যকামকে গুলি করেছে।’

‘গুলি। আমি ভেবেছিলাম—’ ব্যোমকেশ থামিয়া বলিল‌, ‘তারপর বলুন।’

ঊষাপতিবাবু একটা চাপা নিশ্বাস ফেলিলেন‌, ‘তারপর আর কী? পুলিসে টেলিফোন করলাম।’

ব্যোমকেশ কিছুক্ষণ নতমুখে চিন্তা করিল‌, তারপর মুখ তুলিয়া বলিল‌, ‘সত্যকামবাবুর ঘরে তালা কে লাগিয়েছে?’

ঊষাপতি বলিলেন‌, ‘সত্যকাম যখনই বাড়ি বেরুত‌, নিজের ঘরে তালা দিয়ে যেত। কালও বোধহয় তালা দিয়েই বেরিয়েছিল‌, তারপর–’

‘বুঝেছি। ঘরের চাবি তাহলে পুলিসের কাছে?

‘খুব সম্ভব।’

‘পুলিস ঘর খুলে দেখেনি?

‘না।’

‘যাক‌, আপনার কাছে আর বিশেষ কিছু জানবার নেই। এবার বাড়ির অন্য সকলকে দু’ একটা কথা জিজ্ঞাসা করতে চাই।’

‘কাকে ডাকব বলুন।’

‘সহদেব বাড়িতে আছে?’

‘আছে নিশ্চয়। ডাকছি।’

আসিয়া বসিলেন।

সহদেব প্রবেশ করিল। জরাজীর্ণ বৃদ্ধ‌, শরীরে কেবল হাড় ক’খানা আছে। মাথায় ঝাঁকড়া পাকা চুল‌, ভ্রূ পাকা‌, এমন কি চোখের মণি পর্যন্ত ফ্যাকাসে হইয়া গিয়াছে। লোলচর্ম শিথিলপেশী মুখে হাবলার মত ভাব।

ব্যোমকেশ জিজ্ঞাসা করিল‌, ‘তোমার নাম সহদেব? তুমি কত বছর এ-বাড়িতে কাজ করছ?’

সহদেব উত্তর দিল না‌, ফ্যালফ্যাল করিয়া একবার আমাদের দিকে একবার ঊষাপতিবাবুর দিকে তাকাইতে লাগিল। ঊষাপতিবাবু বলিলেন‌, ‘ও আমার শ্বশুরের সময় থেকে এ-বাড়িতে আছে–প্ৰায় পঁয়ত্ৰিশ বছর।’

ব্যোমকেশ সহদেবকে বলিল‌, ‘তুমি কাল রাত্ৰে–‘

ব্যোমকেশ কথা শেষ করিবার আগেই সহদেব হাত জোড় করিয়া বলিল‌, ‘আমি কিছু জানিনে বাবু।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘আমার কথাটা শুনে উত্তর দাও। কাল রাত্রে সত্যকামবাবু যখন দোরে টোকা দিয়েছিলেন তখন তুমি জেগে ছিলে?’

সহদেব পূর্ববৎ জোড়হস্তে বলিল‌, ‘আমি কিছু জানিনে বাবু।’

ব্যোমকেশ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাহাকে বিদ্ধ করিয়া বলিল‌, ‘মনে করবার চেষ্টা কর। সে-সময় দুম্‌ করে একটা আওয়াজ শুনেছিলে?’

‘আমি কিচ্ছু জানিনে বাবু।’

অতঃপর ব্যোমকেশ যত প্রশ্ন করিল সহদেব তাহার একটিমাত্র উত্তর দিল-আমি কিছু জানিনে বাবু। এই সবাঙ্গীন অজ্ঞতা কতখানি সত্য অনুমান করা কঠিন; মোট কথা সহদেব কিছু জানিলেও বলিবে না। ব্যোমকেশ বিরক্ত হইয়া বলিল‌, ‘তুমি যেতে পোর। ঊষাপতিবাবু্‌, এবার আপনার ভাগনীকে ডেকে পাঠান।’

ঊষাপতিবাবু সহদেবকে বলিলেন‌, ‘চুমকিকে ডেকে দে।’

সহদেব চলিয়া গেল। কিছুক্ষণ পরে চুমকি প্রবেশ করিল‌, চেষ্টাকৃত দৃঢ়তার সহিত টেবিলের পাশে আসিয়া দাঁড়াইল। দেখিলাম তাহার মুখে আশঙ্কার ছায়া আরও গাঢ় হইয়াছে‌, আমাদের দিকে চোখ তুলিয়াই আবার নত করিল।

ব্যোমকেশ সহজ সুরে বলিল‌, ‘তোমার মামার কাছে শুনলাম তুমি বছরখানেক হল এ-বাড়িতে এসেছ। আগে কোথায় থাকতে?

চুমকি ধরা-ধরা গলায় বলিল‌, ‘মানিকতলায়।’

‘লেখাপড়া করে?’

‘কলেজে পড়ি।’

‘আর তোমার ভাই?’

‘দাদাও কলেজে পড়ে।’

‘আচ্ছা‌, কাল রাত্তিরে তুমি কখন জানতে পারলে?’

চুমকি একটু দাম লইয়া আস্তে আস্তে বলিল‌, ‘আমি ঘুমোচ্ছিলুম। দাদা এসে দোরে ধাক্কা দিয়ে ডাকতে লাগল‌, তখন ঘুম ভাঙল।’

‘ও—তুমি রাত্তিরে ঘরের দরজা বন্ধ করে শোও?’

চুমকি যেন থতমত খাইয়া গেল‌, বলিল‌, ‘হ্যাঁ।’

‘তোমার শোবার ঘর নীচে না ওপরে?’

নীচে পিছন দিকে। আমার ঘরের পাশে দাদার ঘর।’

‘তাহলে বন্দুকের আওয়াজ তুমি শুনতে পাওনি?’

‘না।’

‘ঘুম ভাঙার পর তুমি কী করলে?’

‘দাদা আর আমি এই ঘরে এলুম। মামা পুলিসকে ফোন করেছিলেন।’

‘আর তোমার মামীমা?’

‘তাঁকে তখন দেখিনি। এখান থেকে ওপরে গিয়ে দেখলুম। তিনি নিজের ঘরের মেঝোয় অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছেন।’ চুমকির চোখ জলে ভরিয়া উঠিল।

ব্যোমকেশ সদয় কষ্ঠে বলিল‌, ‘আচ্ছা‌, তুমি এখন যাও। তোমার দাদাকে পাঠিয়ে দিও।’

চুমকি ঘরের বাহিরে যাইতে না যাইতে তাহার দাদা ঘরে প্রবেশ করিল; মনে হইল সে দ্বারের বাহিরে অপেক্ষা করিয়া ছিল। ভাই বোনের চেহারায় খানিকটা সাদৃশ্য আছে। কিন্তু ছেলেটির চোখের দৃষ্টি একটু অদ্ভুত ধরনের। প্যাঁচার চোখের মত তাহার চোখেও একটা নির্নিমেষ আচঞ্চল একাগ্রতা। সে অত্যন্ত সংযতভাবে টেবিলের পাশে আসিয়া দাঁড়াইল এবং নিম্পলেক চক্ষে ব্যোমকেশের পানে চাহিয়া রহিল।

সওয়াল জবাব আরম্ভ হইল।

‘তোমার নাম কী?’

‘শীতাংশু দত্ত।’

‘বয়স কত?’

‘কুড়ি।’

‘কাল রাত্ৰে তুমি জেগে ছিলে?’

‘হাঁ।’

‘কী করছিলে?’

‘পড়ছিলাম।’

‘কী পড়ছিলে? পরীক্ষার পড়া?’

‘না। গোর্কির ‘লোয়ার ডেপথস পড়ছিলাম। রাত্রে পড়া আমার অভ্যাস।’

‘ও…বিন্দুকের আওয়াজ শুনতে পেয়েছিলে?’

‘পেয়েছিলাম। কিন্তু বন্দুকের আওয়াজ বলে বুঝতে পারিনি।’

‘তারপর?’

সহদেবের চীৎকার শুনে গিয়ে দেখলাম।’

‘তারপর ফিরে এসে তোমার বোনকে জাগালে?’

‘হ্যাঁ।’

ব্যোমকেশ কিছুক্ষণ চিবুকের তলায় করতল রাখিয়া বসিয়া রহিল। দেখিলাম ঊষাপতিবাবুও নির্লিপ্তভাবে বসিয়া আছেন‌, প্রশ্নোত্তরের সব কথা তাঁহার কানে যাইতেছে কিনা সন্দেহ। মনের অন্ধকার অতলে তিনি ডুবিয়া গিয়াছেন।

ব্যোমকেশ আবার সওয়াল আরম্ভ করিল।

‘তুমি রাত্রে শোবার সময় দরজা বন্ধ করে শোও?’

না‌, খোলা থাকে।’

‘চুমকির দোর বন্ধ থাকে?’

‘হ্যাঁ।। ও মেয়ে‌, তাই।’

‘যাক।–কাল রাত্ৰে সকলে শুয়ে পড়বার পর তুমি বাড়ির বাইরে গিয়েছিলে?’

‘না।’

‘সদর দরজা ছাড়া বাড়ি থেকে বেরুবার অন্য কোনও রাস্তা আছে?’

‘আছে। খিড়কির দরজা।’

‘না। বেরুলে আমি জানতে পারতাম। খিড়কির দরজা আমার ঘরের পাশেই। দোর খুললে ক্যাঁচ-কাঁচ শব্দ হয়। তাছাড়া রাত্রে খিড়কির দরজায় তালা লাগানো থাকে।’

‘তাই নাকি! তার চাবি কার কাছে থাকে?’

‘সহদেবের কাছে।’

‘হুঁ। সত্যকামবাবু রাত্ৰে দেরি করে বাড়ি ফিরতেন তুমি জান?’

‘জানি।’

‘রোজ জানতে পারতে কখন তিনি বাড়ি ফেরেন?’

‘রোজ নয়‌, মাঝে মাঝে পারতাম।’

‘আচ্ছা‌, তুমি এখন যেতে পার।’

শীতাংশু আরও কিছুক্ষণ বোমকেশের পানে নিষ্পলক চাহিয়া থাকিয়া ধীরে ধীরে চলিয়া গেল।

ব্যোমকেশ ঊষাপতিবাবুর দিকে ফিরিয়া ঈষৎ সঙ্কুচিত স্বরে বলিল‌, ‘ঊষাপতিবাবু্‌, এবার আপনার স্ত্রীর সঙ্গে একবার দেখা হতে পারে কি?’

ঊষাপতিবাবু চমকিয়া উঠিলেন‌, ‘আমার স্ত্রী! কিন্তু তিনি—তাঁর অবস্থা—’

‘তাঁর অবস্থা আমি বুঝতে পারছি। তাঁকে এখানে আসতে হবে না‌, আমিই তাঁর ঘরে গিয়ে

‘দু’-একটা কথা—’

ব্যোমকেশের কথা শেষ হইল না‌, একটি মহিলা অধীর হস্তে পদ সরাইয়া ঘরে প্রবেশ করিলেন। তিনি যে ঊষাপতিবাবুর স্ত্রী‌, তাহাতে সন্দেহ রহিল না। ব্যোমকেশকে লক্ষ্য করিয়া তিনি তীব্র স্বরে বলিলেন‌, ‘কেন আপনি আমার স্বামীকে এমনভাবে বিরক্ত করছেন? কী চান আপনি? কেন এখানে এসেছেন?’

আমরা তাড়াতাড়ি উঠিয়া দাঁড়াইলাম। মহিলাটির বয়স বোধকরি চল্লিশের কাছাকাছি কিন্তু চেহারা দেখিয়া আরও কম বয়স মনে হয়। রঙ ফরসা‌, মুখে সৌন্দর্যের চিহ্ন একেবারে লুপ্ত হয় নাই। বর্তমানে-তাঁহার মুখে পুত্রশোক অপেক্ষা ক্রোধই অধিক ফুটিয়াছে। ব্যোমকেশ অত্যন্ত মোলায়েম সুরে বলিল‌, ‘আমাকে মাফ করবেন‌, নেহাত কর্তব্যের দায়ে আপনাদের বিরক্ত করতে এসেছি–’

মহিলাটি বলিলেন‌, ‘কে ডেকেছে। আপনাকে? এখানে আপনার কোনও কর্তব্য নেই। যান আপনি‌, আমাদের বিরক্ত করবেন না।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘আপনি কি চান না যে সত্যকামবাবুর মৃত্যুর একটা কিনারা হয়?’

‘না‌, চাই না। যা হবার হয়েছে। আপনি যান‌, আমাদের রেহাই দিন।’

‘আচ্ছা‌, আমি যাচ্ছি।’

আমরা ঊষাপতিবাবুর পানে চাহিলাম। তিনি বিস্ময়াহতভাবে স্ত্রীর পানে চাহিয়া আছেন‌, যেন নিজের চক্ষুকৰ্ণকে বিশ্বাস করিতে পারিতেছেন না। মহিলাটিও একবার স্বামীর প্রতি দৃষ্টি ফিরাইলেন‌, তারপর দ্রুতপদে ঘর হইতে বাহির হইয়া গেলেন।

আমরা সদর দরজার বাহিরে আসিয়া দাঁড়াইলাম। ঊষাপতিবাবুও আমাদের পিছন পিছন আসিয়াছিলেন‌, তাঁহার মুখের বিস্ময়াহত ভাব সম্পূর্ণ কাটে নাই। তিনি দ্বার বন্ধ করিয়া দিবার উপক্রম করিয়া বলিলেন‌, ‘আমাদের মানসিক অবস্থা বুঝে ক্ষমা করবেন। নমস্কার।’

দরজা প্ৰায় বন্ধ হইয়া আসিয়াছে‌, এমন সময় ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘ওটা কী?’

আসিবার সময় চোখে পড়ে নাই, কবাটের

উচুতে একটি সোনালী চাকতি চকচক করিতেছে। ঊষাপতিবাবু দ্বার বন্ধ করিতে গিয়া থামিয়া গেলেন। চাকতিটা আয়তনে চাঁদির টাকার চেয়ে কিছু বড়। ব্যোমকেশ নত হইয়া সেটা দেখিল‌, আঙুল দিয়া সেটা পরীক্ষা করিল। বলিল‌, ‘রাংতার চাকতি‌, গদ দিয়ে কবাটে জোড়া রয়েছে।’ সে সোজা হইয়া ঊষাপতিবাবুকে জিজ্ঞাসা করিল‌, ‘এটা কী?’

ঊষাপতিবাবু দ্বিধাভরে বলিলেন‌, ‘কী জানি‌, আগে লক্ষ্য করেছি বলে মনে হচ্ছে না।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘সম্প্রতি কেউ সেঁটেছে। বাড়িতে ছোট ছেলেপিলে থাকলে বোঝা যেত। কিন্তু–আপনি একবার খোঁজ নেবেন?’

ঊষাপতিবাবু সহদেবকে ডাকিলেন‌, সে যথারীতি বলিল‌, ‘আমি কিছু জানিনে বাবু।’চুমকিও কিছু বলিতে পারিল না। শীতাংশু বলিল‌, ‘আমি কাল সন্ধের সময় যখন বাড়ি এসেছি তখন ওটা ছিল না।’

আমার মাথায় নানা চিন্তা আসিতে লাগিল। সত্যকামকে যে খুন করিয়াছে সে কি নিজের পরিচয়ের ইঙ্গিত এইভাবে রাখিয়া গিয়াছে? হরতনের টেক্কা! লোমহর্ষণ উপন্যাসে এই ধরনের জিনিস দেখা যায় বটে। কিন্তু–

কোনও হদিস পাওয়া গেল না। আমরা চলিয়া আসিলাম।

রাস্তায় বাহির হইয়া ব্যোমকেশ হাতের ঘড়ি দেখিয়া বলিল‌, ‘এখনও দশটা বাজেনি। চল, থানাটা ঘুরে যাওয়া যাক।’

থানার দিকে চলিতে চলিতে ব্যোমকেশ এক সময় জিজ্ঞাসা করিল‌, ‘বাড়ির লোকের এজেহার শুনলে। কী মনে হল?’

এই কথাটাই আমার মনের মধ্যে ঘুরপাক খাইতেছিল। বলিলাম‌, ‘কাউকেই খুব বেশি শোকার্ত মনে হল না।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘প্রবাদ আছে‌, অল্প শোকে কাতর‌, বেশি শোকে পাথর।’

বলিলাম‌, ‘প্রবাদ থাকতে পারে‌, কিন্তু ঊষাপতিবাবু এবং তাঁর স্ত্রীর আচরণ খুব স্বাভাবিক নয়। সত্যকাম ভাল ছেলে ছিল না‌, নিজের উচ্ছঙ্খলতায় বাপমা’কে অতিষ্ঠা করে তুলেছিল‌, সবই সতি্যু হতে পারে। তবু ছেলে তো। একমাত্র ছেলে। আমার বিশ্বাস এই পরিবারের মধ্যে কোথাও একটা মস্ত গলদ আছে।’

‘অবশ্য। সত্যকামই তো একটা মস্ত গলদ। সে যাক‌, দরজায় রাংতার চাকতির অর্থ কিছু বুঝলে?’

‘না। তুমি বুঝেছি?’

‘সম্পূর্ণ আকস্মিক হতে পারে। কিন্তু তা যদি না হয়—’

থানায় পৌঁছিয়া দেখিলাম‌, দারোগা ভবানীবাবু আমাদের পরিচিত লোক। বয়স্থ ব্যক্তি; ক্বশ-বেল্ট টেবিলের উপর খুলিয়া রাখিয়া কাজ করিতেছেন। আমাদের দেখিয়া খুব খুশি হইয়াছেন মনে হইল না। তবু যথোচিত শিষ্টতা দেখাইয়া শেষে খাটো গলায় বলিলেন‌, ‘আপনি আবার এর মধ্যে কেন?’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘পকেচক্ৰে জড়িয়ে পড়েছি।’

ভবানীবাবু পূর্ববৎ নিম্নস্বরে বলিলেন‌, ‘ছোঁড়া পাকা শয়তান ছিল। যে তাকে খুন করেছে সে সংসারের উপকার করেছে। এমন লোককে মেডেল দেওয়া উচিত।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘তা বটে। আপনারা যা করছেন করুন‌, আমি তার মধ্যে নাক গলাতে চাই না। আমি শুধু জানতে চাই–’

ভবানীবাবু তাহাকে দৃষ্টি-শিলাকায় বিদ্ধ করিয়া বলিলেন‌, ‘সত্যান্বেষণ? কী জানতে চান বলুন।’

‘পোস্ট-মর্টেম রিপোর্ট এখনও বোধহয় আসেনি?’

‘না। সন্ধ্যে নাগাদ পাওয়া যেতে পারে।’

‘সন্ধ্যোর পর আমি আপনাকে ফোন করব-বন্দুকের গুলিতেই মৃত্যু হয়েছে?’

‘বড় বন্দুক নয়‌, পিস্তল কিম্বা রিভলবার। গুলিটা পিঠের বা দিকে ঢুকেছে‌, সামনে কিন্তু বেরোয়নি। শরীরের ভিতরেই আছে। পিঠে যে ফুটো হয়েছে সেটা খুব ছোট‌, তাই মনে হয় পিস্তল কিম্বা রিভলবার।’

‘পিঠের দিকে ফুটো হয়েছে‌, তার মানে যে গুলি করেছে সে সত্যকমের পিছনে ছিল।’

‘হ্যাঁ। হয়তো ফটকের ভিতর দিকে ঝোপঝাড়ের মধ্যে লুকিয়ে বসে ছিল‌, যেই সত্যকাম সদর দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে অমনি গুলি করেছে‌, তারপর ফটক দিয়ে বেরিয়ে গেছে।’

‘হুঁ। এ-পাড়ায় একটা ব্যায়াম সমিতি আছে আপনি জানেন? ‘জানি। তাদের কাজ নয়। তারা দু-চার ঘা প্রহার দিতে পারে‌, খুন করবে না‌, সবাই ভদ্রলোকের ছেলে।’



ভদ্রলোকের ছেলে খুন করে না‌, পুলিসের মুখে একথা নুতন বটে। কিন্তু ব্যোমকেশ সেদিক দিয়া গেল না‌, বলিল ‘ভদ্রলোকের ছেলের কথায় মনে পড়ল। সত্যকমের এক পিসতুতো ভাই বাড়িতে থাকে‌, তাকে দেখেছেন?’

ভবানীবাবু একটু হাসিলেন‌, ‘দেখেছি। পুলিসে তার নাম আছে।’

‘তাই নাকি! কী করেছে। সে?’

‘ছেলেটা ভালই ছিল‌, তারপর গত দাঙ্গার সময় ওর বোপকে মুসলমানেরা খুন করে। সেই থেকে ওর স্বভাব বদলে গেছে। আমাদের সন্দেহ ও কম-সে-কম গোটা তিনেক খুন করেছে। অবশ্য পাকা প্রমাণ কিছু নেই।’

‘ওর চোখের চাউনি দেখে আমারও সেই রকম সন্দেহ হয়েছিল। আপনার কি মনে হয় এ-ব্যাপারে তার হাত আছে?’

‘কিছুই বলা যায় না‌, ব্যোমকেশবাবু। সত্যকমের মত পাঁঠা যেখানে আছে সেখানে সবই সম্ভব। তবে যতদূর জানতে পারলাম যখন খুন হয় তখন সে বাড়ির মধ্যে ছিল। সহদেবের চীৎকার শুনে ওর মামা আর ও একসঙ্গে সদর দরজায় পৌঁচেছিল। সত্যকামকে পিছন থেকে যে গুলি করেছে তার পক্ষে সেটা সম্ভব নয়।’

ব্যোমকেশ প্রশ্ন করিল‌, ‘ছাতের ওপর থেকে গুলি করা কি সম্ভব?’

ভবানীবাবু বলিলেন‌, ‘ছাতের ওপর গুলি করলে গুলিটা শরীরের ওপর দিক থেকে নীচের দিকে যেত। গুলিটা গেছে। পিছন দিক থেকে সামনের দিকে। সুতরাং—’

এই সময় টেলিফোন বাজিল। ভবানীবাবু টেলিফোনের মধ্যে দু’চার কথা বলিয়া আমাদের কহিলেন‌, ‘আমাকে এখনি বেরুতে হবে। জোর তলব–’

‘আমরাও উঠি।’ ব্যোমকেশ উঠিয়া দাঁড়াইয়া বলিল‌, ‘ভাল কথা‌, মৃত্যুকালে সত্যকমের সঙ্গে কী কী জিনিস ছিল–’

‘ঐ যে পাশের ঘরে রয়েছে‌, দেখুন না গিয়ে।’ বলিয়া ভবানীবাবু কোমরে কেল্ট বাঁধিতে লাগিলেন।

পাশের ঘরে একটি টেবিলের উপর কয়েকটি জিনিস রাখা রহিয়াছে। সোনার সিগারেট-কেসটি দেখিয়াই চিনিতে পারিলাম। তাছাড়া হুইস্কির ফ্ল্যাসিক‌, চামড়ার মনিব্যাগ‌, একটি ছোট বৈদ্যুতিক টর্চ প্রভৃতি রহিয়াছে। ব্যোমকেশ সেগুলির উপর একবার চোখ বুলাইয়া ফিরিয়া আসিল। ভবানীবাবু এতক্ষণে কেল্ট বাঁধা শেষ করিয়াছেন‌, দেরাজ হইতে পিস্তল লইয়া কোমরের খাপে পুরিতেছেন। বলিলেন‌, ‘দেখলেন? আর কিছু দেখবার নেই তো? আচ্ছা‌, চলি।’

ভবানীবাবু চলিয়া গেলেন। তাঁহার ভাবগতিক দেখিয়া মনে হইল‌, তিনি আসামীকে ধরিবার কোনও চেষ্টাই করিবেন না। শেষ পর্যন্ত সত্যকমের মৃত্যু-রহস্য অমীমাংসিত থাকিয়া যাইবে।

আমরাও বাহির হইলাম। ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘এতদূর যখন এসেছি‌, চল বাগের আখড়া দেখে যাই।’

‘এখন কি কারুর দেখা পাবে?’

‘দেখাই যাক না। আর কেউ না থাক বাগ মশাই নিশ্চয় গুহায় আছেন।’

বাঘ কিন্তু গুহায় নাই। গিয়া দেখিলাম দরজায় তালা লাগানো। একজন ভৃত্য শ্রেণীর লোক দাওয়ায় বসিয়া বিড়ি টানিতেছিল‌, সে বলিল‌, ‘ভূতু সর্দারকে খুঁজতেছেন? আজ্ঞে তিনি আজ সকালের গাড়িতে কাশী গেছেন।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘বল কি! একেবারে কাশী!-তুমি কে?’

লোকটি বলিল‌, ‘আজ্ঞে আমি তেনার চাকর। ঘর ঝাঁট দি‌, কাপড় কাচি‌, কলসীতে জল ভরি। আজ সকালে ঘর ঝাঁট দিতে এসে দেখনু সদার খবরের কাগজ পড়তেছেন। কলসীতে জল ভরে নিয়ে এনু‌, সদর সেজোগুজে তৈরি। কইলেন‌, আমি কাশী চক্ষু‌, সন্ধ্যেবেলা ছেলেরা এলে কয়ে দিও।’

বুঝিতে বাকী রহিল না‌, ভূতেশ্বর বাগ খবরের কাগজের সংবাদ পড়িয়াছেন এবং বিলম্ব না। করিয়া অন্তর্হিত হইয়াছেন।

বাসায় ফিরিলাম প্ৰায় সওয়া এগারোটায়। দেখি বন্ধ দরজার সামনে নন্দ ঘোষ প্রতীক্ষ্ণমাণভাবে পায়চারি করিতেছে। তাহার মুখ শুষ্ক‌, চোখে শঙ্কিত অস্বচ্ছন্দ্য। ব্যোমকেশ দ্বারের কড়া নাড়িয়া স্মিতমুখে নন্দকে জিজ্ঞাসা করিল‌, ‘কী খবর?’

‘আজ্ঞে স্যার…’ বলিয়া নন্দ ঠোঁট চাটিতে লাগিল।

পুঁটিরাম আসিয়া দরজা খুলিয়া দিল, আমরা নন্দকে লইয়া ভিতরে আসিয়া বসিলাম। নন্দ আরও দু’চার বার ঠোঁট চাটিয়া বলিল‌, ‘সত্যকমের খবর শুনেছেন?’

ব্যোমকেশ সিগারেট ধরাইতে ধরাইতে বলিল‌, ‘শুনেছি। তুমি কোথায় শুনলে?’

নন্দ বলিল‌, ‘সকালবেলায় ও-পাড়ায় এক বন্ধুর বাড়িতে গিয়েছিলাম‌, খবর পেলাম কাল রাত্তিরে কেউ সত্যকামকে গুলি করে মেরেছে। আমি কিন্তু কিছু জানি না। স্যার। কাল সন্ধ্যেবেলা সেই যে আপনার আখড়া থেকে চলে এলেন‌, তারপর আমি আরও ওদিকে যাইনি।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘বোস‌, তোমাকে দু-চারটে কথা জিজ্ঞেস করি। ও-পাড়ায় তোমার জানাশোনার মধ্যে কারুর পিস্তল কিম্বা রিভলবার আছে?’

‘না স্যার। থাকলেও আমি জানি না।’

‘তোমাদের আখড়ায় কারুর নেই?’

‘জানি না। তবে একটা লোক ভূতেশ্বরের কাছে চোরাই পিস্তল বিক্রি করতে এসেছিল।’

‘চোরাই পিস্তল?’

‘হ্যাঁ স্যার। শুনেছি। যুদ্ধের পর অনেক চোরাই পিস্তল কিনতে পাওয়া যেত।’

‘ভুতেশ্বর কিনেছিল?’

‘তা জানি না। আমাদের সামনে কেনেনি।’

‘আচ্ছা‌, ও-কথা যাক।–সত্যকাম ভদ্রঘরের মেয়েদের পিছনে লাগত। কীভাবে পিছনে লগত বলতে পার?’

নন্দ কিয়ৎকাল চুপ করিয়া রহিল‌, তারপর বলিল‌, ‘স্যার‌, সত্যকাম জাদুমন্ত্র জানত‌, দুটো কথা বলেই মেয়েগুলোকে বশ করে ফেলত। তারপর নিজের দোকানে নিয়ে যেত‌, ভাল ভাল জিনিস উপহার দিত‌, হোটেলে নিয়ে গিয়ে খাওয়াত—’ কুষ্ঠিতভাবে সে চুপ করিল।

‘বুঝেছি। মেয়েরাও নেহাত নির্দোষ নয়।’ গম্ভীর মুখে কিছুক্ষণ সিগারেট টানিয়া ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘স্ত্রী-স্বাধীনতাও বিনামূল্যে পাওয়া যায় না। যাক‌, কোন কোন ভদ্রলোকের মেয়ের সঙ্গে সত্যকমের ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল‌, তুমি বলতে পোর?

নন্দ আরও কুষ্ঠিত হইয়া পড়িল‌, ‘সকলের কথা জানি না। স্যার‌, তবে ৭৩ নম্বরের অখিলবাবু আমাদের ব্যায়াম সমিতিতে নালিশ করেছিলেন‌, তাঁর মেয়ে শোভনা–। তারপর রামেশ্বরবাবুর নাতনী–সেও কিছু দিন সত্যকমের ফাঁদে পড়েছিল‌, ভীষণ কেলেঙ্কারি হবার যোগাড় হয়েছিল। যাহোক‌, তার বিয়ে হয়ে গেছে—’

‘আর কেউ?’

‘আর–ভবানীবাবুর মেয়ে সলিলা–’

‘কোন ভবানীবাবু?’

‘ও-পাড়ার থানার দারোগা ভবানীবাবু। তিনি মেয়েকে ঘরে বন্ধ করে রেখেছিলেন। তারপর এখন মামার বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছেন।’

ব্যোমকেশের সহিত আমার একবার চকিত দৃষ্টি-বিনিময় হইল। সে উঠিয়া দাঁড়াইয়া আড়মোড়া ভাঙিল‌, নন্দকে বলিল‌, ‘আচ্ছা নন্দ‌, তুমি আজ এস। অন্য সময় তোমার সঙ্গে আবার কথা হবে। ভাল কথা‌, তোমাদের ওস্তাদ পালিয়েছে। তুমি এখন কিছুদিন আর ওদিকে যেও না।’

নন্দ আবার ঠোঁট চাটিয়া বলিল‌, ‘আচ্ছা স্যার।’

সমস্ত দিন ব্যোমকেশ অন্যমনস্ক হইয়া রহিল। বৈকালে সত্যবতী দু-একবার কাশ্মীর যাত্রার প্রসঙ্গ আলোচনা করিবার চেষ্টা করিল‌, কিন্তু ব্যোমকেশ শুনিতে পাইল না‌, ইজি-চেয়ারে শুইয়া কড়িকাঠের পানে তাকাইয়া রহিল।

আমি বলিলাম‌, ‘তাড়া কিসের? এ-ব্যাপারের আগে নিম্পত্তি হোক।’

সত্যবতী বলিল‌, ‘নিস্পত্তি হতে বেশি দেরি নেই। মুখ দেখে বুঝতে পারছি না।’

ব্যোমকেশ সত্যবতীর কথা শুনিতে পাইল কিনা বলা যায় না‌, আপন মনে ‘রাংতার চাকতি বলিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলিল।

সত্যবতী আমার পানে অর্থপূর্ণ ঘাড় নাড়িয়া মুচকি হাসিল।

সন্ধ্যার পর থানায় ফোন করিবার কথা। আমি স্মরণ করাইয়া দিলে ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘তুমিই ফোন করা অজিত।’

থানার নম্বর বাহির করিয়া ফোন করিলাম। ভবানীবাবু উপস্থিত ছিলেন, বলিলেন, ‘এইমাত্র রিপোর্ট এসেছে‌, মৃত্যুর সময় রাত্রি বারটা থেকে দুটোর মধ্যে। গুলিটা .৪৫ রিভলবারের‌, বাঁ দিকে স্ক্যাপিউলার নীচে দিয়ে ঢুকে হৃদযন্ত্র ভেদ করে ডান দিকের তৃতীয় পঞ্জরে আটকেছে। গুলির গতি নীচের দিক থেকে একটু ওপর দিকে‌, পাশের দিক থেকে মাঝের দিকে। —অন্য কোনও আঘাতের চিহ্ন নেই। —আর কি! পেটের মধ্যে খানিকটা মদ পাওয়া গেছে।’

ব্যোমকেশকে বলিলাম। সে কিছুক্ষণ অবাক হইয়া আমার পানে চাহিয়া রহিল‌, ‘গুলির গতি-কী বললে?’

‘নীচের দিক থেকে একটু ওপর দিকে‌, পাশের দিক থেকে মাঝের দিকে। অর্থাৎ যে গুলি করেছে সে রাস্তার বাঁদিকে ঝোপের মধ্যে বসেছিল‌, বসে বসেই গুলি করেছে।’

ব্যোমকেশ আরও কিছুক্ষণ তাকাইয়া রহিল‌, ‘উবু হয়ে বসে গুলি করেছে! কেন?’

‘তা জানি না। আমার সঙ্গে পরামর্শ করে গুলি করেনি।’

ধীরে বলিল‌, ‘ব্যাপারটা ভেবে দেখা। তোমাদের ধারণা আততায়ী আগে থেকে ফটকের ভিতর দিক লুকিয়ে ছিল, সত্যকাম ফটক দিয়ে ঢুকে কুড়ি-পঁচিশ ফুট রাস্তা পার হয়ে সদর দরজার সামনে এসে কড়া নাড়ল‌, তখন আততায়ী তাকে গুলি করল। আমার প্রশ্ন হচ্ছে–কেন? সত্যকাম যেই ফটক দিয়ে ঢুকল আততায়ী তখনই তাকে গুলি করল না কেন। তাতেই তো তার সুবিধে‌, গুলি করেই চটু করে ফটক দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারত। গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হবার ভয়ও থাকত না।’

‘প্রশ্নের উত্তর কী–তুমিই বল।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘প্রশ্নের উত্তর সম্ভবত এই যে‌, আততায়ী ওদিক থেকে গুলি করেনি। কিন্তু তার চেয়েও ভাবনার কথা‌, রাংতার চাকতিটা কে লাগিয়েছিল‌, কখন লাগিয়েছিল‌, এবং কেন লাগিয়েছিল।’

জিজ্ঞাসা করিলাম‌, ‘ওটা তাহলে আকস্মিক নয়?’

‘যতাই ভাবছি ততাই মনে হচ্ছে ওটা আকস্মিক নয়‌, তার একটা গূঢ় অর্থ আছে। সেই অর্থ জানতে পারলেই সমস্যার সমাধান হবে।’

আমি বসিয়া ভাবিতে লাগিলাম রাংতার চাকতির তাৎপৰ্য্য কী? যদি ধরা যায় আততায়ী ওটা লাগাইয়াছিল। তবে তাহার উদ্দেশ্য কী ছিল? যদি আততায়ী না লাগাইয়া থাকে। তবে কে লাগাইল? বাড়ির কেহ যদি না হয় তবে কে? সত্যকাম কি? কিন্তু কেন?

ব্যোমকেশ হঠাৎ ধড়মড় করিয়া উঠিয়া বসিল‌, ‘অজিত‌, সত্যকামের সঙ্গে কী কী জিনিস ছিল–থানায় টেবিলের ওপর দেখেছিলে–মনে আছে?’

বলিলাম‌, ‘সিগারেট-কেস ছিল‌, রিস্টওয়াচ ছিল‌, মনিবাগ ছিল‌, মদের ফ্ল্যাস্‌ক ছিল আর-একটা ইলেকট্রিক টর্চ ছিল।’

ব্যোমকেশ আবার আস্তে আস্তে শুইয়া পড়িল‌, ইলেকট্রিক টর্চ–! কলকাতায় পথ চলাবার জন্যে ইলেকট্রিক টর্চ দরকার হয় না।’

‘না। কিন্তু ফটক থেকে সদর দরজা পর্যন্ত যেতে হলে দরকার হয়।’

ব্যোমকেশ একটু হাসিল‌, ‘তাহলে সত্যকাম টর্চের আলোয় আততায়ীকে দেখতে পায়নি কেন?’

সহসা এ-প্রশ্নের উত্তর যোগাইল না। কিছুক্ষণ কাটিয়া গেল‌, তারপর ব্যোমকেশ অপ্রাসঙ্গিকভাবে বলিল‌, ‘কাল সকালে শীতাংশুর সঙ্গে নিভৃতে কথা বলা দরকার।’

আমি উচ্চকিতভাবে তাহার দিকে তাকাইয়া রহিলাম‌, কিন্তু সে আর কিছু বলিল না; বোধ করি কড়িকাঠ গুনিতে লাগিল। কিন্তু লক্ষ্য করিলাম‌, তাহার মুখের বিরস অন্যমনস্কতা আর নাই‌, যেন সে ভিতরে ভিতরে উত্তেজিত হইয়া উঠিয়াছে।

পরদিন সকালে ঘুম ভাঙিয়া উঠিয়া দেখি ব্যোমকেশ কাহাকে ফোন করিতেছে। আমি চায়ের পেয়ালা লইয়া বাহিরের ঘরে আসিয়া বসিলে সেও আসিয়া বসিল। তাহার মুখ গম্ভীর।

জিজ্ঞাসা করিলাম‌, ‘কাকে ফোন করছিলে?’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘ঊষাপতিবাবুকে।’

‘হঠাৎ ঊষাপতিবাবুকে?’

‘শীতাংশুকে পাঠিয়ে দিতে বললাম।’

‘ও।–ওদের বাড়ির খবর কী?’

‘খবর-পুলিস কাল সন্ধ্যেবেলা লাশ ফেরত দিয়েছিল–ওঁরা শেষ রাত্রে শ্মশান থেকে ফিরেছেন।’ ক্ষণেক চুপ করিয়া থাকিয়া ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘কাল যদি পুলিস খানাতল্লাসি করত। তাহলে রিভলভারটা বোধ হয় বাড়িতেই পাওয়া যেত। এখন আর পাওয়া যাবে না।’

‘তার মানে বাড়ির লোকের কাজ।’

ব্যোমকেশ উত্তর দিল না।

আধ ঘণ্টা পরে শীতাংশু আসিল। ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘এস-বোস। কাল তোমার মামার সামনে সব কথা জিজ্ঞাসা করতে পারিনি।’

শীতাংশু ব্যোমকেশের সামনের চেয়ারে বসিল এবং অপলক নেত্ৰে তাহার পানে চাহিয়া রহিল।

ব্যোমকেশ আরম্ভ করিল‌, ‘কাল থানায় খবর পেলুম তুমি নাকি দাঙ্গার সময় গোটা দুত্তিন খুন করেছ। কথাটা সত্যি?’

শীতাংশু উত্তর দিল না‌, কিন্তু ভয় পাইয়াছে বলিয়াও মনে হইল না; নির্ভীক একাগ্র চোখে চাহিয়া রহিল।

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘আমাকে স্বচ্ছন্দে বলতে পোর‌, আমি পুলিসের লোক নই।’

শীতাংশুর গলাটা যেন ফুলিয়া উঠিল‌, সে চাপা গলায় বলিল‌, ‘হ্যাঁ। ওরা আমার বাবাকে–’

ব্যোমকেশ হাত তুলিয়া বলিল‌, ‘জানি। কী দিয়ে খুন করেছিলে?’

‘ছোরা দিয়ে।’

‘তুমি কখনও রিভলভার ব্যবহার করেছ?’

‘না।’

‘সত্যকমের রিভলভার ছিল?’

‘জানি না। বোধহয় ছিল না।’

‘বাড়িতে কোনও আগ্নেয়াস্ত্র ছিল কিনা জান?’

‘জানি না।’

‘সত্যকমের সঙ্গে তোমার সদ্ভাব ছিল?’

‘না। দু’জনে দু’জনকে এড়িয়ে চলতাম।’

‘সত্যকাম লম্পট ছিল তুমি জানতে?

‘জানতাম।’

‘তোমার বাবাকে তুমি ভালবাসতে। তোমার বোন চুমকিকেও নিশ্চয় ভালবাস?’

শীতাংশু উত্তর দিল না‌, কেবল চাহিয়া রহিল। ব্যোমকেশ হঠাৎ প্রশ্ন করিল‌, ‘সত্যকামকে খুন করবার ইচ্ছে তোমার কোনদিন হয়েছিল?’

শীতাংশু এবারও উত্তর দিল না‌, কিন্তু তাহার নীরবতার অর্থ স্পষ্টই বোঝা গেল। ব্যোমকেশ মৃদু হাসিয়া বলিল বলতে হবে না‌, আমি বুঝেছি। সত্যকামকে তুমি বোধহয় শাসিয়ে দিয়েছিলে?’

শীতাংশু সহজভাবে বলিল‌, ‘হ্যাঁ। তাকে বলে দিয়েছিলাম‌, বাড়িতে বেচাল দেখলেই খুন করব।’

ব্যোমকেশ অনেকক্ষণ তাহার পানে চাহিয়া রহিল; তীক্ষ্ণ চক্ষে নয়‌, যেন একটু অন্যমনস্কভাবে। তারপর বলিল‌, ‘সে-রাত্রে সহদেবের চীৎকার শুনে তুমি সদরে গিয়ে কি দেখলে?’

‘দেখলাম সত্যকাম দরজার বাইরে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে।’

‘কী করে দেখলে? সেখানে আলো ছিল?’

‘সত্যকমের হাতে একটা জ্বলন্ত টর্চ ছিল‌, তারই আলোতে দেখলাম। তারপর মামা এসে সদরের আলো জ্বেলে দিলেন।’

ব্যোমকেশ সিগারেট ধরাইল। দুই-তিনটা লম্বা টান দিয়া বলিল‌, ‘ও-কথা যাক। সত্যকামকে নিয়ে তোমার মামা আর মামীর মধ্যে খুবই অশান্তি ছিল বোধহয়?’

‘অশান্তি–?’

‘হ্যাঁ। ঝগড়া বকবকি–এ-রকম অবস্থায় যা হয়ে থাকে।’

শীতাংশু একটু চুপ করিয়া থাকিয়া বলিল‌, ‘না‌, ঝগড়া বকাবিকি হত না।’

‘একেবারেই না?’

‘না। মামা আর মামীমার মধ্যে কথা নেই।’

ব্যোমকেশ ভ্রূ তুলিল‌, ‘কথা নেই! তার মানে?’

‘মামা মামীমার সঙ্গে-কথা বলেন না‌, মামীমাও মামার সঙ্গে কথা বলেন না।’

‘সে কি‌, কবে থেকে?’

‘আমি যবে থেকে দেখছি। আগে যখন মানিকতলায় ছিলাম‌, প্রায়ই মামার বাড়ি আসতাম। তখনও মামা-মামীমাকে কথা বলতে শুনিনি।’

‘তোমার মামীম কেমন মানুষ? ঝগড়াটে?’

‘মোটেই না। খুব ভাল মানুষ।’

ব্যোমকেশ আর প্রশ্ন করিল না‌, চোখ বুজিয়া যেন ধ্যানস্থ হইয়া পড়িল। আমার মনে পড়িয়া গেল‌, কাল সকালবেলা ঊষাপতিবাবুর স্ত্রী সহসা ঘরে প্রবেশ করিলে তিনি বিস্ময়াহত চক্ষে তাহার পানে চাহিয়া ছিলেন। তখন তাঁহার সেই চাহনির অর্থ বুঝিতে পারি নাই। …স্বামী-স্ত্রীর দীর্ঘ মনান্তর কি পুত্রের মৃত্যুতে জোড়া লাগিয়াছে?

শীতাংশু চলিয়া যাইবার পরও ব্যোমকেশ অনেকক্ষণ চক্ষু মুদিয়া বসিয়া রহিল‌, তারপর নিশ্বাস ফেলিয়া চোখ মেলিল‌, ‘বড় ট্র্যাজিক ব্যাপার। —শীতাংশুকে কেমন মনে হল?’

‘মনে হল সত্যি কথা বলছে।’

‘ছেলেটা বুদ্ধিমান–ভারী বুদ্ধিমান।’ বলিয়া সে আবার ধ্যানস্থ হইয়া পড়িল।

আধা ঘণ্টা পরে তাহার ধ্যান ভাঙিল; বহিদ্বারের কড়া নাড়ার শব্দে। আমি উঠিয়া গিয়া দ্বার খুলিলাম। দেখি-ঊষাপতিবাবু।

ব্যোমকেশের আহ্বানে ঊষাপতিবাবু চেয়ারে আসিয়া বসিলেন। ক্লান্ত অবসন্ন মূর্তি‌, চক্ষু দু’টি ঈষৎ রক্তাভ; শরীর যেন ভাঙিয়া পড়িবার উপক্রম করিতেছে।

ব্যোমকেশ সিগারেটের কীেটা তাঁহার দিকে বাড়াইয়া দিল। দুইজনে কিছুক্ষণ অনুসন্ধিৎসু চক্ষে পরস্পরের প্রতি চাহিয়া রহিলেন‌, তারপর ঊষাপতিবাবু বলিলেন‌, ‘থাক‌, আমি এখনি উঠিব। আপনার ফোন পাবার পর থানায় গিয়েছিলাম‌, তা ওরা তো কোনও খবরই রাখে না। তাই ভাবলাম দেখি যদি আপনি কোনও খবর পেয়ে থাকেন।’

ঊষাপতিবাবুর কথায় যে প্রচ্ছন্ন প্রশ্ন ছিল ব্যোমকেশ সরাসরি তাহার উত্তর দিল না‌, বলিল‌, ‘একদিনের কাজ নয়‌, সময় লাগবে। আপনার ওপর দিয়ে খুবই ধকল যাচ্ছে‌, আপনি আজ বাড়ি থেকে না বেরুলেই পারতেন। আপনার স্ত্রীকেও দেখা শোনা করা দরকার।’

ঊষাপতিবাবুর মুখ লক্ষ্য করিলাম‌, স্ত্রীর প্রসঙ্গে তাঁহার মুখের কোনও ভাবান্তর হইল না; স্ত্রীর সহিত তাঁহার যে দীর্ঘকালের বিপ্রয়োগ তাহার চিহ্নমাত্র দেখা গেল না। বলিলেন‌, ‘আমার স্ত্রীর জন্যেই ভাবনা। তিনি একেবারে ভেঙে পড়েছেন। ‘ একটু থামিয়া বলিলেন‌, ‘ভাবছি কিছুদিনের জন্যে ওঁকে নিয়ে বাইরে ঘুরে এলে কেমন হয়। কলকাতার বাইরে গেলে হয়তে ওঁর মনটা—’

‘তা ঠিক। কোথায় যাবেন কিছু ঠিক করেছেন?’

‘না। কলকাতা ছেড়ে যেখানে হোক গেলেই বোধহয় কাজ হবে। কাশী বৃন্দাবন আগ্রা দিল্লী–। কিন্তু পুলিস আপত্তি করবে না তো?’

‘পুলিসকে বলে যাবেন। আমার বোধ হয় আপত্তি করবে না।’

‘যদি আপত্তি না করে‌, কাল পরশুর মধ্যেই বেরিয়ে পড়ব। কলকাতা যেন বিষবৎ মনে হচ্ছে। —আচ্ছা নমস্কার।’ বলিয়া ঊষাপতিবাবু উঠিয়া দাঁড়াইলেন।

ব্যোমকেশ জিজ্ঞাসা করিল‌, ‘আপনার দোকান কি বন্ধ রাখবেন?’

‘দোকান-সুচিত্রা? না‌, বন্ধ রাখব কেন? দোকানের পুরনো খাজাঞ্চি ধনঞ্জয়বাবু আছেন। বিশ্বাসী লোক; তিনি চালাকেন। আমার ভাগনে শীতুকেও ভাবছি দোকানে ঢুকিয়ে নেব‌, পড়াশুনো করে আর কী হবে‌, দোকানটাই দেখুক! আর তো আমার কেউ নেই। ‘ নিশ্বাস ফেলিয়া তিনি দ্বারের পানে চলিলেন।

‘আপনি কি এখন দোকানের দিকে যাচ্ছেন?’

‘না‌, দোকানে এখন আর যাব না। ধনঞ্জয়বাবুকে ফোন করে জানিয়ে দিয়েছি।’

‘আসুন তাহলে—নমস্কার।’

ঊষাপতিবাবু প্রস্থান করিলেন। ব্যোমকেশ পর পর তিনটা সিগারেট নিঃশেষে ভস্মীভূত করিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল‌, ‘আমি একবার বেরুচ্ছি। তুমি বাড়িতেই থাক।’

‘কোথায় যাচ্ছ?’

‘সুচিত্রা এম্পেরিয়মে। খাজাঞ্চি ধনঞ্জয়বাবুর সঙ্গে আলাপ করা দরকার।’

ব্যোমকেশ যখন ফিরিল তখন দেড়টা বাজিয়া গিয়াছে। আমি স্নান সারিয়া অপেক্ষা করিতেছি‌, সত্যবতী অস্থিরভাবে ভিতর-বাহির করিতেছে। ব্যোমকেশ পাঞ্জাবিটা খুলিয়া ফেলিল‌, পাখা চালাইয়া দিয়া তক্তপোশের উপর লম্বা হইল। বসন্তকাল হইলেও দুপুরবেলার রৌদ্র বেশ কড়া।

বলিলাম‌, ‘খাজাঞ্চি মশায়ের সঙ্গে আলাপ বেশ জমে উঠেছিল দেখছি।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘হুঁ। লোকটি কে জান? পরশু সুচিত্রার দোতলায় যে ক্যাশিয়ার আমাদের ক্যালমেমো কেটেছিল সেই।’

‘তাই নাকি? তা কী পেলে তার কাছ থেকে?’

‘পেলাম—’ ব্যোমকেশ ঘুরন্ত পাখার পানে চাহিয়া হাসিল‌, ‘একটা প্রীতি-উপহার।’

‘প্রীতি-উপহার!’

‘হ্যাঁ। কুড়ি পঁচিশ বছর আগে বিয়ের সময় প্রীতি-উপহার ছাপার খুব চলন ছিল‌, এখন কমে গেছে। ঘুড়ির কাগজের মত পিতপিতে কাগজের রুমালে লাল কালিতে ছাপা কবিতা‌, মাথার ওপর ডানা-মেলে-দেওয়া প্রজাপতির ছবি। দেখেছি নিশ্চয়।’

‘দেখেছি। খাজাঞ্চি মশায় এই প্ৰীতি-উপহার তোমাকে দিয়েছেন?’

‘হাঁ! ওই যে পাঞ্জাবির পকেটে রয়েছে‌, বার করে দেখ না।’

‘কিন্তু–কার বিয়ের প্রীতি-উপহার?’

‘পড়েই দেখ না।’

পাঞ্জাবির পকেট হইতে প্ৰীতি-উপহার বাহির করিলাম। পিতপিতে কাগজে লাল কালিতে ছাপা কবিতা‌, উপরে মুক্তপক্ষ প্রজাপতি‌, এবং তাহাকে ঘিরিয়া রামধনুর আকারে লেখা আছে–কুমারী সুচিত্রার সঙ্গে ঊষাপতির শুভ পরিণয়। তারপর কবিতা। এ-কবিতা পড়িয়া মানে বুঝিতে পারে এমন দিগ্‌গজ পণ্ডিত পৃথিবীতে নাই। সর্বশেষে কাব্য-রচয়িতার নাম‌, শ্ৰীধনঞ্জয় মণ্ডল ও সুচিত্রা এম্পেরিয়মের কর্মিবৃন্দ।

বলিলাম‌, এই কবিতার ঐতিহাসিক মূল্য থাকতে পারে। এ ছাড়া আর কিছু পেলে না?’

‘আর কিছুর দরকার নেই। এই প্রীতি-উপহারের মধ্যে সব কিছু আছে।’

‘কি আছে? আমি তো কিছু দেখছি না।’

‘হায় অন্ধ! ভাল করে দেখ।’

কবিতা আবার পড়িলাম। পড়িতে খুবই কষ্ট হইল‌, তবু পড়িলাম। তারপর বলিলাম‌, ‘এ-কবিতার মধ্যে যদি কোনও ইশারা ইঙ্গিত থাকে তার মানে বোঝা আমার কৰ্ম্ম নয়। সুচিত্রা নিশ্চয় ঊষাপতিবাবুর স্ত্রীর নাম‌, তার সঙ্গে ঊষাপতিবাবুর বিয়ে হওয়াতে ধনঞ্জয় মণ্ডল এবং সুচিত্রা এম্পেরিয়মের কর্মিবৃন্দ খুব আহ্বাদিত হয়েছিলেন‌, এইটুকুই আন্দাজ করছি।’

‘কবিতা নয়‌, তারিখ-তারিখ! বিয়ের তারিখটা দেখ।’

নীচের দিকে বাঁ কোণে লেখা ছিল:

কলিকাতা‌, ১৩ই ফেব্রুয়ারি‌, ১৯২৭।

বলিলাম‌, ‘তারিখ দেখলাম‌, কিন্তু অজ্ঞানমসী দূর হল না।’

ব্যোমকেশ উঠিয়া বসিল‌, সত্যকাম তার জন্ম-তারিখ বলেছিল‌, মনে আছে?’

‘বলেছিল মনে আছে‌, কিন্তু তারিখটা মনে নেই।’

‘আমার মনে আছে।’

অধীর হইয়া উঠিলাম‌, ‘এ-সব সন-তারিখের মানে কী? সত্যকমের খুনের সঙ্গেই বা তার সম্পর্ক কী?

‘ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে‌, ভেবে দেখ।’

‘ভেবে দেখতে পারি না। তুমি যদি বুঝে থাক কে খুন করেছে। পক্টাপষ্টি বল।’

‘তুমি বুঝতে পারছি না?’

না। কে খুন করেছে সত্যকামকে?’

‘ঊষাপতিবাবু।’

‘বাপ ছেলেকে খুন করেছে?’

‘করলেও অন্যায় হত না‌, কিন্তু সত্যকম ঊষাপতিবাবুর ছেলে নয়।’

মাথা গুলাইয়া গেল‌, কিছুক্ষণ জবুথবু হইয়া রহিলাম। তারপর সত্যবতী ভিতরের দরজা হইতে গলা বাড়াইয়া বলিল‌, ‘হ্যাঁগা‌, আজ কি তোমাদের উপোস?’

অপরাহ্নে চোরটের সময় আবার ঊষাপতিবাবু আসিলেন। এবারও অনাহূত আসিয়াছেন। সকালবেলার ক্লান্ত বিষন্নতা আর নাই‌, চক্ষে সতর্ক তীক্ষ্ণতা। তিনি আসিয়া ব্যোমকেশের সম্মুখে বসিলেন‌, কিছুক্ষণ শেনদৃষ্টিতে তাহাকে বিদ্ধ করিয়া বলিলেন‌, ‘আপনি ধনঞ্জয়বাবুর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন?’

‘ব্যোমকেশ শান্তস্বরে বলিল‌, ‘হ্যাঁ‌, গিয়েছিলাম।’

‘কী জানতে গিয়েছিলেন?’

‘যা জানতে গিয়েছিলাম তা জানতে পেরেছি।’

‘কী জানতে গিয়েছিলেন?’

‘সবই জানতে পেরেছি‌, ঊষাপতিবাবু। এমন কি দোরে আট রাংতার চাকতির তত্ত্বও অজানা নেই।’

ঊষাপতিবাবুর প্রশ্নের তীব্রতা যেন ধাক্কা খাইয়া থামিয়া গেল। তিনি আবার খানিকক্ষণ ব্যোমকেশের মুখের পানে চাহিয়া রহিলেন‌, তারপর সংবৃত স্বরে বলিলেন‌, ‘যা জানতে পেরেছেন তা আদালতে প্রমাণ করতে পারবেন?’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘আপনার বিয়ের তারিখ আর সত্যকমের জন্মের তারিখ ছাড়া আর কিছু প্রমাণ করা যাবে কিনা সন্দেহ। কিন্তু আমি কিছুই প্রমাণ করতে চাইনি‌, ঊষাপতিবাবু। আমি শুধু জানতে চেয়েছিলাম। সত্যকাম আমাকে বলেছিল তাঁর মৃত্যু সম্বন্ধে অনুসন্ধান করতে‌, আসামীকে পুলিসে ধরিয়ে দেবার কোনও দায়িত্ব আমার নেই।’

ঊষাপতিবাবু স্থিরনেত্রে ব্যোমকেশের পানে চাহিয়া রহিলেন, ধীরে ধীরে তাঁহার মুখভাবের পরিবর্তন হইল। এতক্ষণ তিনি যে যুদ্ধ করিবার জন্য উদ্যত হইয়াছিলেন‌, এখন সহসা অস্ত্র নামাইলেন। অবিশ্বাস-মিশ্ৰিত স্বরে বলিলেন‌, ‘আপনি যা জানতে পেরেছেন পুলিসকে তা বলবেন না?’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘না‌, পুলিস আমার সাহায্য চায় না‌, আমি কেন গায়ে পড়ে তাদের সাহায্য করতে যাব?’

ঊষাপতিবাবু পকেট হইতে রুমাল বাহির করিয়া দুই হাতে রুমাল দিয়া মুখ ঢাকিলেন। তাঁহার শরীর দুই তিনবার অবরুদ্ধ আবেগে ঝাঁকানি দিয়া উঠিল। তারপর তিনি যখন মুখ খুললেন‌, তখন দেখিলাম তাঁহার মুখের চেহারা একেবারে বদলাইয়া গিয়াছে। দীর্ঘকাল রোগভোগের পর মরণাপন্ন রোগী প্রথম আরোগ্যের আশ্বাস পাইলে তাহার মুখে যে ভাব ফুটিয়া ওঠে ঊষাপতিবাবুর মুখেও সেই ভাব ফুটিয়া উঠিয়াছে। তিনি আরও কিছুক্ষণ নীরবে বসিয়া নিজেকে সামলাইয়া লইলেন‌, তারপর ভাঙা ভাঙা স্বরে বলিলেন‌, ‘ব্যোমকেশবাবু্‌, সত্যকামের মৃত্যু কেন দরকার হয়েছিল। আপনি শুনবেন?’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘শুনব। আপনি সব কথা বলুন।’

ঊষাপতিবাবু একবার কাতর চক্ষে আমার পানে চাহিলেন। তাঁহার চাহনির অর্থ: ব্যোমকেশের কাছে তিনি নিজের মর্ম কথা বলিতে রাজী থাকিলেও আর কাহারও সম্মুখে বলিতে অনিচ্ছুক। ব্যোমকেশ তাঁহার মনোভাব বুঝিয়া আমাকে বলিল‌, ‘অজিত‌, তুমি একবার হাওড়া স্টেশনে যাও‌, এনকোয়ারি অফিস থেকে জেনে এস কাশ্মীর যাওয়ার ব্যবস্থা কী রকম। কাশ্মীরে গণ্ডগোল চলছে‌, আগে থাকতে খবরাখবর নিয়ে রাখা ভাল।’

মনে মনে একটু নিরাশ হইলাম‌, তারপর জামা কাপড় বদলাইয়া বাহির হইয়া পড়িলাম।

হাওড়া স্টেশনের কাজ সারিয়া যখন ফিরিলাম। তখন সন্ধ্যা হয়-হয়। সদর দরজা ভেজানো ছিল‌, প্রবেশ করিয়া দেখিলাম ঊষাপতিবাবু চলিয়া গিয়াছেন‌, ছায়াচ্ছন্ন ঘরের অপর প্রান্তে জানালার সামনে চেয়ার টানিয়া সত্যবতী ও ব্যোমকেশ ঘেঁষাঘেঁধি বসিয়া আছে। জানালা দিয়া ফুরফুরে দক্ষিণা বাতাস আসিতেছে। আমাকে দেখিয়া সত্যবতী একটু সরিয়া বসিল।

আমি কাছে আসিয়া বলিলাম‌, ‘বেশ তো কপোত-কপোতীর মত বসে মলয় মারুত সেবন করছ।–খোকা কোথায়?’

সত্যবতী একটু লজ্জিত হইয়া বলিল‌, ‘পুঁটিরাম খোকাকে পার্কে বেড়াতে নিয়ে গেছে।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘দেখ অজিত‌, কবিদের কথা মিছে নয়। তাঁরা যে বসন্তঋতুর সমাগমে ক্ষেপে ওঠেন‌, তার যথেষ্ট কারণ আছে। মলয় মারুতে যুবক যুবতীরাই বেশি ঘায়েল হয় বটে কিন্তু বয়স্থ ব্যক্তিরাও বাদ পড়েন না। আমার বিশ্বাস‌, এটা যদি বসন্তকাল না হত তাহলে ঊষাপতিবাবু সত্যকামকে খুন করতেন কিনা সন্দেহ।’

বলিলাম‌, ‘বল কি! বসন্তকালের এমন মারাত্মক শক্তির কথা কবিরা তো কিছু লেখেননি।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘পষ্ট না লিখলেও ইশারায় বলেছেন। শক্তিমাত্রেই মারাত্মক; যে আগুন আলো দেয় সেই আগুনই পুড়িয়ে ছারখার করে দিতে পারে।–কিন্তু যাক‌, কাশ্মীরের খবর কী বল।’

বলিলাম‌, ‘কাশ্মীরে লড়াই বেধেছে‌, সাধারণ লোককে যেতে দিচ্ছে না। যেতে হলে ভারত সরকারের পারমিট চাই।’

আমি একটা চেয়ার আনিয়া ব্যোমকেশের অন্য পাশে বসিলাম। ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘পারমিট যোগাড় করা শক্ত হবে না। ভারত সরকারের সঙ্গে এখন আমার গভীর প্রণয়‌, অন্তত যতদিন বল্লভভাই প্যাটেল বেঁচে আছেন। কিন্তু কথা হচ্ছে‌, সবাই মিলে কাশ্মীর যাওয়া কি ঠিক হবে? খোকা সবেমাত্র স্কুলে ঢুকেছে‌, গরমের ছুটিরও দেরি আছে। ওকে স্কুল কামাই করিয়ে নিয়ে যাওয়া আমার উচিত মনে হচ্ছে না।’

সত্যবতী বলিল‌, ‘খোকা যাবে কেন? খোকা বাড়িতে থাকবে। ঠাকুরপো‌, তুমি খোকার দেখাশুনা করতে পারবে না?

আমি কিছুক্ষণ সত্যবতীর পানে চাহিয়া থাকিয়া বলিলাম‌, ‘ও—এই মতলব। তোমরা দু’টিতে হংস-মিথুনের মত কাশ্মীরে উড়ে যাবে‌, আর আমি খোকাকে নিয়ে বাসায় পড়ে–থাকব। ভাই ব্যোমকেশ‌, তুমি ঠিক বলেছ‌, বসন্তঋতু বড় মারাত্মক ঋতু। কিন্তু কুছ পরোয়া নেই। যাও তোমরা টো টো করে বেড়াও গে‌, আমি খোকাকে নিয়ে মনের আনন্দে থাকব। সত্যি কথা বলতে কি‌, কাশ্মীর যাবার ইচ্ছে আমার একটুও ছিল না। বাংলাদেশই আমার ভূ-স্বৰ্গ-জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী।’ বলিয়া একটা সিগারেট ধরাইয়া ফেলিলাম।

সত্যবতী ঠোঁটের উপর আঁচল চাপা দিয়া হাসি গোপন করিল। ব্যোমকেশ মৃদু গুঞ্জনে কবিতা আবৃত্তি করিল‌, ‘যৌবন মধুর কাল‌, আও বিনাশিবে কাল‌, কালে পিও প্ৰেম-মধু করিয়া যতন। —একটা সিগারেট দাও।’

সিগারেট দিয়া বলিলাম‌, ‘কবিতা পড়ে পড়ে তোমার চরিত্র খারাপ হয়ে গেছে। কিন্তু ও-কথা এখন থাক‌, ঊষাপতি যে নিজের চরিতামৃত শুনিয়ে গেলেন তা বলতে বাধা আছে কি?’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘কিছুমাত্র না। তোমার জন্যেই অপেক্ষা করেছিলাম। তোমাদের দু’জনকেই শোনাতে চাই। বড় মর্মান্তিক কাহিনী।’

সিগারেট ধরাইয়া ব্যোমকেশ বলিতে আরম্ভ করিল—

‘সত্যকাম আমার কাছে এসেছিল এক আশ্চর্য প্রস্তাব নিয়ে—আমার যদি হঠাৎ মৃত্যু হয় আপনি অনুসন্ধান করবেন। সে জানত কে তাকে খুন করতে চায়‌, কিন্তু তার নাম আমাকে বলল না। তখনই আমার মনে প্রশ্ন জাগল–নাম বলতে চায় না কেন? এখন জানতে পেরেছি‌, নাম না বলার গুরুতর কারণ ছিল‌, পারিবারিক কেচ্ছা বেরিয়ে পড়ত। সে যে জারজ‌, তার মা যে কলঙ্কিনী‌, এ-কথা সে প্রকাশ করতে পারেনি; নিজের মুখে নিজের কলঙ্ক-কথা কটা লোক প্রকাশ করতে পারে? সবাই তো আর সত্যযুগের সত্যকাম নয়।

‘তবু একটা ইঙ্গিত সে আমাকে দিয়ে গিয়েছিল—তার জন্ম-তারিখ। কিন্তু এমনভাবে দিয়েছিল যে‌, একবারও সন্দেহ হয়নি তার জন্ম-তারিখের মধ্যেই তাঁর মৃত্যু-রহস্যের চাবি আছে। সে জানত‌, আমি যদি অনুসন্ধান আরম্ভ করি তাহলে জন্ম-তারিখটা আমার কাজে লাগবে। সত্যকাম বিবেকহীন লম্পট ছিল‌, কিন্তু তার বুদ্ধির অভাব ছিল না।

‘এবার গোড়া থেকে গল্পটা বলি। সত্যকমের জন্মের আগে থেকে সে-গল্পের সূত্রপাত। ঊষাপতিবাবুর মুখেই এ-গল্পের বেশির ভাগ শুনেছি‌, তবু গল্পটা যে সত্যি তাতে সন্দেহ নেই। তিনি নিজেকে রেয়াত করেননি‌, নিজের দোষ দুর্বলতা অকপটে ব্যক্ত করেছেন।

‘বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে রমাকান্ত চৌধুরী সুচিত্রা এম্পেরিয়মের প্রতিষ্ঠা করেন। রমাকান্ত চৌধুরীর একমাত্র মেয়ের নাম সুচিত্রা‌, মেয়ের নামেই দোকানের নাম। চৌধুরী মশায় ভারী চতুর ব্যবসাদার ছিলেন‌, দু-চার বছরের মধ্যেই তাঁর দোকান ফেঁপে উঠল। ধর্মতলায় নতুন বাড়ি তৈরি হল‌, জমজমাট ব্যাপার। চৌধুরী মশায়ের সুচিত্রা এম্পেরিয়ম বিলাতি দোকানের সঙ্গে টেক্কা দিতে লাগল।

‘ঊষাপতি দাস ১৯২৫ সনে সামান্য শপ-অ্যাসিসট্যান্টের চাকরি নিয়ে সুচিত্রা এম্পেরিয়মে ঢোকেন। তখন তাঁর বয়স একুশ বাইশ; গরীবের ঘরের বাপ-মা-মরা ছেলে‌, লেখাপড়া বেশি শেখেননি। কিন্তু চেহারা ভাল‌, বুদ্ধিসুদ্ধি আছে। দু-চার দিনের মধ্যেই তিনি দোকানের মাল বিক্রি করার কায়দাকানুন শিখে নিলেন‌, খদ্দেরকে কী করে খুশি রাখতে হয় তার কৌশল আয়ত্ত করে ফেললেন। সহকর্মীদের মধ্যে তিনি খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন। ক্রমে স্বয়ং কর্তার সুনজর পড়ল তাঁর ওপর। দু-চার টাকা করে মাইনে বাড়তে লাগল।

‘দু-বছর কেটে গেল। তারপর হঠাৎ একদিন ঊষাপতিবাবুর চরম ভাগ্যোদয় হল। রমাকান্ত চৌধুরী তাঁকে নিজের অফিস-ঘরে ডেকে বললেন‌, ‘তোমার সঙ্গে আমার মেয়ের বিয়ে দিতে চাই।’ এ-প্রস্তাব ঊষাপতির কল্পনার অতীত‌, তিনি যেন চাঁদ হাতে পেলেন। সেই যে রূপকথা আছে‌, পথের ভিখিরির সঙ্গে রাজকন্যের বিয়ে‌, এ যেন তাই। সুচিত্রাকে ঊষাপতি আগে অনেকবার দেখেছেন‌, সুচিত্রা প্রায়ই দোকানে আসতেন। ভারী মিষ্টি নরম চেহারা। ঊষাপতির মন রোমান্সের গন্ধে ভরে উঠল।

‘মাসখানেকের মধ্যে বিয়ে হয়ে গেল। খুব ধুমধাম হল। ঊষাপতির সহকর্মীরা প্ৰীতি-উপহার ছেপে বন্ধুকে অভিনন্দন জানালেন। ঊষাপতিবাবু এতদিন তাঁর বিবাহিতা বোনের বাড়িতে থাকতেন‌, এখন শ্বশুরবাড়িতে তাঁর থাকার ব্যবস্থা হল। শ্বশুরবাড়ি অর্থাৎ আমহার্স্ট স্ট্রীটের বাড়ি। রমাকান্ত চৌধুরী বড়মানুষ‌, তায় বিপত্নীক; তিনি মেয়েকে কাছ-ছাড়া করতে চান না।

‘টোপের মধ্যে বঁড়শি আছে। ঊষাপতি তা টের পেলেন ফুলশয্যার রাত্রে। রূপকথার স্বপ্ন-ইমারত ভেঙে পড়ল; বুঝতে পারলেন সুচিত্রা এম্পেরিয়মের কর্তা কেন দীনদরিদ্র কর্মচারীর সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। ফুলের বিছানায় শয়ন করা হল না‌, ঊষাপতিবাবু সারা রাত্রি একটা চেয়ারে বসে কাটিয়ে দিলেন। সকালবেলা শ্বশুরকে গিয়ে বললেন-আপনার উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়েছে‌, এবার আমাকে বিদায় দিন।

‘রম্যাকান্ত চৌধুরী ঘাড়েল ব্যবসাদার‌, তিনি বোধহয় প্রস্তুত ছিলেন; মোলায়েম সুরে জামাইকে বোঝাতে আরম্ভ করলেন-সুচিত্রা ছেলেমানুষ‌, মা-মরা মেয়ে; তার ওপর আজকাল দেশে যে হাওয়া বইতে শুরু করেছে তাতে মেয়েদের সামলে রাখাই দায়। সুচিত্রা খুবই ভাল মেয়ে‌, কেবল বর্তমান আবহাওয়ার দোষে একটু ভুল করে ফেলেছে। আজকাল ঘরে ঘরে এই ব্যাপার হচ্ছে‌, ঠগ বাছতে গাঁ উজোড়‌, কিন্তু বাইরের লোক কি জানতে পারে? সবাই বৌ নিয়ে মনের সুখ ঘরকন্না করে। এ নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে গেলে নিজের মুখেই চুন-কালি পড়বে। অতএব—

‘ঊষাপতি কিন্তু কথায় ভুললেন না‌, বললেন‌, ‘আমায় মাপ করুন‌, আমি গরীব বটে। কিন্তু সদ্‌বংশের ছেলে। আমি পারব না।’

‘কথায় চিড়ে ভিজল না দেখে রমাকান্ত চৌধুরী ব্বহ্মাস্ত্র ছাড়লেন। দেরাজ থেকে ইস্টাম্বরি কাগজে লেখা দলিল বার করে বললেন‌, ‘আজ থেকে সুচিত্রা এম্পেরিয়মের তুমি আট আনা অংশীদার। এই দেখ দলিল। আমি মরে গেলে আমার যা কিছু সব তোমরাই পাবে‌, আমার তো আর কেউ নেই। কিন্তু আজ থেকে তুমি আমার পার্টনার হলে। দোকানে আমার হুকুম যেমন চলে তোমার হুকুমও তেমনি চলবে।’

‘ঊষাপতির মাথা ঘুরে গেল। রাজকন্যাটি দাগী বটে। কিন্তু হাতে হাতে অর্ধেক রাজত্ব। মোট কথা ঊষাপতি শেষ পর্যন্ত রাজী হয়ে গেলেন‌, সদ্য সদ্য অত টাকার লোভ সামলাতে পারলেন না। তিনি শ্বশুরবাড়িতে থাকতে রাজী হলেন। কিন্তু স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর কোন সম্পর্ক রইল না। সেই যে ফুলশয্যার রাত্রে দু-চারটে কথা হয়েছিল‌, তারপর থেকে কথা বন্ধ; শোবার ব্যবস্থাও আলাদা। বাইরের লোকে অবশ্য কিছু জানল না‌, ধোঁকার টাটি বজায় রইল।

‘রমাকান্ত যে বলেছিলেন সুচিত্রা ভাল মেয়ে‌, সে-কথা নেহাত মিথ্যে নয়। প্রথম মহাযুদ্ধের পর বাঁধন ভাঙার একটা ঢেউ এসেছিল‌, উচ্চবিত্ত সমাজের অবাধ মেলা-মেশা সমাজের সকল স্তরে ছড়িয়ে পড়েছিল। সুচিত্ৰা আলোর নেশায় বিভ্রান্ত হয়ে একটু বেশি মাতামতি করেছিলেন। অভিভাবিকার অভাবে গণ্ডীর বাইরে যে পা দিচ্ছেন তা বুঝতে পারেননি। কিন্তু প্রচণ্ড ধাক্কা খেয়ে তাঁর হুঁশ হল। বিয়ের পর তিনি বাইরে যাওয়া বন্ধ করে দিলেন‌, শান্ত সংযতভাবে বাড়িতে রইলেন। রমাকান্তের বাড়িতে লোক কম‌, আত্মীয়স্বজন কেউ নেই‌, কেবল রমাকান্ত‌, সুচিত্রা আর ঊষাপতি। স্থায়ী চাকরের মধ্যে সহদেব‌, আর বাকী বিপ্ন-চাকর শুকো। সহদেব চাকরিটার বুদ্ধিসুদ্ধি বেশি নেই‌, কিন্তু অটল তার প্রভু-পরিবারের প্রতি ভক্তি। তাই ঘরের কথা বাইরে চাউর হতে পেল না।

‘বিয়ের মাস দেড়েক পরে রমাকান্ত মেয়েকে নিয়ে বিলেত গেলেন। ওজুহাত দেখালেন‌, মেয়ের শরীর খারাপ‌, তাই চিকিৎসার জন্যে বিলেতে নিয়ে যাচ্ছেন। ঊষাপতি দোকানের সর্বময় কর্তা হয়ে কাজ চালাতে লাগলেন।

‘প্রায় এক বছর পরে রমাকান্ত বিলেত থেকে ফিরলেন। সুচিত্রার কোলে ছেলে। ছেলে দেখে বোঝা যায় না। তার বয়স দু-মাস কি পাঁচ মাস…

‘তারপর আমহার্স্ট স্ত্রীটের বাড়িতে ঊষাপতিবাবুর নীরস প্রাণহীন জীবনযাত্রা আরম্ভ হল। স্ত্রীর সঙ্গে সম্বন্ধ নেই‌, শ্বশুরের সঙ্গে কাজের সম্বন্ধ। দোকানটিকে ঊষাপতি প্ৰাণ দিয়ে ভালবাসলেন। তবু দুধের স্বাদ কি ঘোলে মেটে? অন্তরের মধ্যে ক্ষুধিত যৌবন হাহাকার করতে লাগল। ওদিকে সুচিত্রা সঙ্কুচিত হয়ে নিজেকে নিজের মধ্যে সংহরণ করে নিয়েছেন। মাঝে মাঝে ঊষাপতি তাঁকে দেখতে পান‌, মনে হয় সুচিত্রা যেন কঠোর তপস্বিনী। তাঁর মনটা কোমল হয়ে আসে‌, তিনি জোর করে নিজেকে শক্ত রাখেন।

‘একটি একটি করে বছর কাটতে থাকে। সত্যকাম বড় হয়ে উঠতে লাগল। লম্পট বাপের উচ্ছৃঙ্খল রক্ত তার শরীরে‌, তার যত বয়স বাড়তে লাগল রক্তের দাগও তত ফুটে উঠতে লাগল। সব রকম রক্তের দাগ মুছে যায়‌, এ-রক্তের দাগ কখনও মোছে না। সত্যকাম কারুর শাসন মানে না‌, নিজের যা ইচ্ছে তাই করে; কিন্তু ভয়ানক ধূর্ত সে‌, কুটিল তার বুদ্ধি। দাদামশায়কে সে এমন বশ করেছে যে সব জেনেশুনেও তিনি কিছু বলতে পারেন না। সুচিত্রা শাসন করবার ব্যর্থ চেষ্টা করে হাল ছেড়ে দিয়েছেন। ঊষাপতি সত্যকমের কোনও কথায় থাকেন না‌, সব সময় নিজেকে আলাদা করে রাখেন…স্ত্রীর কানীন পুত্রকে কোনও পুরুষই স্নেহের চক্ষে দেখতে পারে না। সত্যকামের স্বভাব চরিত্র যদি ভাল হত তাহলে ঊষাপতি হয়তো তাকে সহ্য করতে পারতেন‌, কিন্তু এখন তাঁর মন একেবারে বিষিয়ে গেল। সুচিত্রার সঙ্গে ঊষাপতির একটা ব্যবহারিকশ সংযোগের যদি বা কোনও সম্ভাবনা থাকত তা একেবারে লুপ্ত হয়ে গেল। ঊষাপতি আর সুচিত্রার মাঝখানে সত্যকাম ফণি-মনসার কাঁটা-বেড়ার মত দাঁড়িয়ে রইল।

‘সত্যকামের যখন উনিশ বছর বয়স‌, তখন রমাকান্ত মারা গেলেন‌, সত্যকামকে নিজের অংশ উইল করে দিয়ে গেলেন। এই সময় সত্যকাম নিজের জন্ম-রহস্য জানতে পারল। বিলেতে তার জন্ম হয়েছিল‌, সুতরাং বার্থ-সার্টিফিকেট ছিল। দাদামশায়ের কাগজপত্রের মধ্যে সেই বাৰ্থ-সার্টিফিকেট বোধহয় সে পেয়েছিল‌, তারপর পারিবারিক পরিস্থিতি দেখে আসল ব্যাপার বুঝে নিয়েছিল। সে বাইরে ভারী কেতাদুরস্ত ছেলে‌, কিন্তু ভিতরে ভিতরে ভীষণ কুটিল আর হিংসুক। ঊষাপতি আর সুচিত্রার প্রতি তার ব্যবহার হিংস্র হয়ে উঠল। একদিন সে নিজের মাকে স্পষ্টই বলল‌, ‘তুমি আমাকে শাসন করতে আস কোন লজ্জায়! আমি সব জানি।’ ঊষাপতিকে বলল‌, ‘আপনি আমার বাপ নন‌, আপনাকে খাতির করব কিসের জন্যে?’

‘বাড়িতে ঊষাপতি আর সুচিত্রার জীবন দুৰ্বহ হয়ে উঠল। ওদিকে দোকানে গিয়ে সত্যকাম আর-একরকম খেলা দেখাতে আরম্ভ করল। সে এখন দোকানের অংশীদার‌, ঊষাপতির সঙ্গে তার অধিকার সমান। সে নিজের অধিকার পুরোদস্তুর জারি করতে শুরু করল। সুচিত্রার মত শৌখিন দোকানে পুরুষের চেয়ে মেয়ে খদ্দেরেরই ভিড় বেশি; সত্যকাম তাদের মধ্যে থেকে কমবয়সী সুন্দর মেয়ে বেছে নিত, তাদের সঙ্গে ভাব করত, দোকানের দামী জিনিস সস্তায় তাদের বিক্রি করত‌, হোটেলে নিয়ে গিয়ে তাদের খাওয়াত। দোকানের তহবিল থেকে যখন যত টাকা ইচ্ছে বার করে দু-হাতে ওড়াত। মদ‌, ঘোড়দৌড়‌, বড় বড় ক্লাবে গিয়ে জুয়া খেলা তার নিত্যনৈমিত্তিক ব্যবসা হয়ে উঠল।

‘রমাকান্তর মৃত্যুর পর বছরখানেক যেতে না যেতেই দেখা গেল দোকানের অবস্থা খারাপ হয়ে আসছে‌, আর বেশি দিন এভাবে চলবে না। ঊষাপতিবাবু বাধা দিতে গেলে সত্যকাম বলে‌, ‘আমার টাকা আমি ওড়াচ্ছি‌, আপনার কী?’ উপরন্তু দোকানের একটা বদনাম রটে গেল‌, মেয়েদের ও-দোকানে যাওয়া নিরাপদ নয়। খদ্দের কমে যেতে লাগল। বিভ্রান্ত ঊষাপতিবাবু কী করবেন ভেবে পেলেন না।

‘পরিস্থিতি যখন অত্যন্ত ভয়াবহ হয়ে উঠেছে‌, তখন একটি ব্যাপার ঘটল। একদিন সন্ধ্যার পর কী একটা কাজে ঊষাপতি বাড়িতে এসেছেন‌, ওপরে নিজের ঘরে ঢুকতে গিয়ে শুনতে পেলেন পাশের ঘর থেকে একটা অবরুদ্ধ কাতরানি আসছে। পাশের ঘরটা তাঁর স্ত্রীর ঘর। পা টিপে টিপে ঊষাপতি দোরের কাছে গেলেন। দেখলেন‌, তাঁর স্ত্রী একলা মেঝেয় মাথা কুটছেন। আর বলছেন‌, ‘এখনো কি আমার প্রায়শ্চিত্ত শেষ হয়নি? আর যে আমি পারি না?’

‘ঊষাপতি চুপি চুপি নীচে নেমে গেলেন। সহদেবকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলেন‌, সন্ধ্যার আগে পাড়ার একটি বর্ষীয়সী ভদ্রমহিলা এসেছিলেন‌, তিনি সুচিত্রাকে যাচ্ছেতাই অপমান করে গেছেন। মহিলাটির মেয়েকে নাকি সত্যকাম সিনেমা দেখাচ্ছে আর বিলিতি হোটেলে নিয়ে গিয়ে খাওয়াচ্ছে।

‘সেই দিন ঊষাপতি সংকল্প করলেন‌, সত্যকামকে সরাতে হবে। তাকে খুন না করলে কোনও দিক দিয়েই নিস্তার নেই। এভাবে বেঁচে থাকার কোনও মানে হয় না।

‘ঊষাপতি তৈরি হলেন। তাঁর একটা সুবিধে ছিল‌, সত্যকাম যদি খুন হয় তাঁকে কেউ সন্দেহ করবে না। বাইরে সবাই জানে সত্যকাম তাঁর ছেলে‌, বাপ ছেলেকে খুন করেছে। এ-কথা কেউ বিশ্বাস করবে না। সত্যকমের অনেক শত্ৰু‌, সন্দেহটা তাদের উপর পড়বে। তবু এমনভাবে কাজ করা দরকার‌, যাতে কোনও মতেই তাঁর পানে দৃষ্টি আকৃষ্ট না হয়।

‘ঊষাপতি একটি চমৎকার মতলব বার করলেন। একজন চেনা গুণ্ডার কাছ থেকে একটি রিভলভার যোগাড় করলেন। ছেলেবেলায় কিছুদিন তিনি সস্ত্ৰাসবাদীদের দলে মিশেছিলেন‌, রিভলভার চালানোর অভ্যাস ছিল; তিনি কয়েকবার বেলঘরিয়ার একটা আম-বাগানে গিয়ে অভ্যাসটা ঝালিয়ে নিলেন। তারপর সুযোগের অপেক্ষা করতে লাগলেন।

‘সত্যকাম ঝানু ছেলে‌, সে ঊষাপতির মতলব বুঝতে পারল; কিন্তু নিজেকে বাঁচাবার কোনও উপায় খুঁজে পেল না। পুলিসের কাছে গেলে নিজের জন্ম-রহস্য ফাঁস হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত সে হতাশ হয়ে আমার কাছে এসেছিল। ঊষাপতিবাবু অবশ্য সে-খবর জানতেন না।

‘যে-রাত্রে সত্যকাম খুন হয়‌, সে-রাত্রিটা ছিল শনিবার। শনিবারে সত্যকাম অন্য রাত্রির চেয়ে দেরি করে বাড়ি ফেরে‌, সুতরাং শনিবারই প্রশস্ত। ঊষাপতিবাবু একটি রাংতার চাকতি তৈরি করে রেখেছিলেন; রাত্রি সাড়ে দশটার সময় যখন সহদেব রান্নাঘরে খেতে গিয়েছে‌, তখন তিনি চুপি চুপি নেমে এসে সেটি দরজার কপাটে জুড়ে দিয়ে আবার নিঃশব্দে উপরে উঠে গেলেন। সদর দরজা যেমন বন্ধ ছিল তেমনি বন্ধ রইল‌, বাহিরে যে রাংতার চাকতি সাঁটা হয়েছে তা কেউ জানতে পারল না। শুকো ঝি আর রাঁধুনি তার অনেক আগেই বাড়ি চলে গেছে।

‘সহদেব খাওয়া-দাওয়া শেষ করে খিড়কির দরজায় তালা লাগাল‌, তারপর সদর বারান্দায় গিয়ে বিছানা পেতে শুল। ওপরে ঊষাপতিবাবু নিজের ঘরে আলো নিভিয়ে অপেক্ষা করে রইলেন, সামনের দিকের ব্যালকনির দরজা খুলে রাখলেন।

‘দু-ঘণ্টা অপেক্ষা করার পর ফটকের কাছে শব্দ হল‌, সত্যকাম আসছে। ঊষাপতি ব্যালকনিতে বেরিয়ে এসে ঘাপটি মেরে রইলেন। ফটিক থেকে সদর দরজা পর্যন্ত রাস্তা অন্ধকার‌, সত্যকাম টর্চ জ্বেলে দেখতে দেখতে এগিয়ে আসছে। সদর দরজায় টোকা মেরে হঠাৎ তার নজরে পড়ল দরজার নীচের দিকে টাকার মত একটা চাকতি টর্চের আলোয় চকচক করছে। সে সামনের দিকে ঝুকে সেটা দেখতে গেল। অমনি ঊষাপতিবাবু ব্যালকনি থেকে ঝুঁকে গুলি করলেন। রিভলভারের গুলি সত্যকামের পিঠ ফুটো করে বুকের হাড়ে গিয়ে আটকাল। সত্যকাম সেইখানেই মুখ থুবড়ে পড়ল‌, হাতের জ্বলন্ত টর্চটা জ্বলতেই রইল।

‘এই হল সত্যকমের মৃত্যুর প্রকৃত ইতিহাস। ঊষাপতিবাবু এমন কৌশল করেছিলেন যে‌, লাশ পরীক্ষা করে মনে হবে পিছন দিক থেকে কেউ তাকে গুলি করেছে‌, ওপর দিক থেকে গুলি করা হয়েছে তা কিছুতেই বোঝা যাবে না। রাংতার চাকতিটা যদি না থাকত আমিও বুঝতে পারতাম না।’

ব্যোমকেশ চুপ করিল। আমরাও অনেকক্ষণ নীরব রহিলাম। তারপর একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিয়া সত্যবতী বলিল‌, ‘তুমি প্রথম কখন ঊষাপতিবাবুকে সন্দেহ করলে?’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘গোড়া থেকেই আমার সন্দেহ হয়েছিল‌, বাড়ির লোকের কাজ। যদি বাইরের লোকের কাজ হবে‌, তাহলে সত্যকাম হত্যাকারীর নাম বলবে না কেন? তখনই আমার মনে হয়েছিল। এই সংকল্পিত হত্যার পিছনে এক অতি গুহ্য পারিবারিক কলঙ্ক-কাহিনী লুকিয়ে আছে।

‘তারপর জানতে পারলাম, ঊষাপতি আর সুচিত্রার দাম্পত্য জীবন স্বাভাবিক নয়। দীর্ঘকাল ধরে তাঁদের মধ্যে বাক্যালাপ বন্ধ‌, শোবার ঘরও আলাদা। মনে খটকা লাগল। খাজাঞ্চি মশায়ের সঙ্গে আলাপ জমালাম। লোকটি ঊষাপতিবাবুর দরদী বন্ধু; তিনিই একুশ বছর আগে বন্ধুর বিয়েতে প্রীতি-উপহার লিখেছিলেন। প্ৰীতি-উপহারটি খাজাঞ্চি মশাই খুব যত্ন করে রেখে দিয়েছিলেন‌, কারণ এটি তাঁর প্রথম এবং একমাত্র কবি-কীর্তি। আমি যখন প্রীতি-উপহারটি হাতে পেলাম‌, তখন আর কোনও সংশয় রইল না। সত্যকমের জন্ম-তারিখ মনে ছিল-৭ই জুলাই‌, ১৯২৭)। আর বিয়ের তারিখ ১৩ই ফেব্রুয়ারি‌, ১৯২৭। অর্থাৎ বিয়ের পর পাঁচ পাস পূর্ণ হবার আগেই ছেলে হয়েছে। ধূর্ত রমাকান্ত কেন দরিদ্র কর্মচারীর সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন বুঝতে কষ্ট হয় না।

‘সত্যকাম ঊষাপতির ছেলে নয়‌, সুতরাং তাকে খুন করার পক্ষে ঊষাপতির কোনও বাধা নেই। কিন্তু তিনি খুন করলেন কী করে? যখন জানতে পারলাম মৃত্যুকালে সত্যকামের হাতে জ্বলন্ত টর্চ ছিল‌, তখন এক মুহুর্তে রাংতার চাকতির উদ্দেশ্য পরিষ্কার হয়ে গেল। সত্যকমের টর্চের আলো দোরের ওপর পড়েছিল‌, রাংতার চাকতিটা চকমক করে উঠেছিল‌, সত্যকাম সামনে ঝুঁকে দেখতে গিয়েছিল ওটা কি চকমক করছে। ব্যস—!’

আবার কিছুক্ষণ নীরবতা। আমি ব্যোমকেশকে সিগারেট দিয়া নিজে একটা লইলাম‌, দু’জনে টানিতে লাগিলাম। ঘর সম্পূর্ণ অন্ধকার হইয়া গিয়াছে‌, দখিনা বাতাস চুপি চুপি আমাদের ঘিরিয়া খেলা করিতেছে।

হঠাৎ ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘আজ ঊষাপতিবাবু যাবার সময় আমার হাত ধরে বললেন‌, ‘ব্যোমকেশবাবু্‌, আমি আর আমার স্ত্রী জীবনে বড় দুঃখ পেয়েছি‌, একুশ বছর ধরে শ্মশানে বাস করেছি। আজ আমরা অতীতকে ভুলে গিয়ে নতুন করে জীবন আরম্ভ করতে চাই‌, একটু সুখী হতে চাই। আপনি আর জল ঘোলা করবেন না।’ আমি ঊষাপতিবাবুকে কথা দিয়েছি‌, জল ঘোলা করব না। কাজটা হয়তো আইনসঙ্গত হচ্ছে না। কিন্তু আইনের চেয়েও বড় জিনিস আছে–ন্যায়ধর্ম। তোমাদের কী মনে হয়? আমি অন্যায় করেছি?’

সত্যবতী ও আমি সমস্বরে বলিলাম‌, ‘না।’

মণিমণ্ডন

প্রসিদ্ধ মণিকার রসময় সরকারের বাড়ি হইতে একটি বহুমূল্য জড়োয়ার নেকলেস চুরি গিয়াছে। সকালবেলা খবরের কাগজ পড়িবার সময় বিলম্বিত সংবাদের স্তম্ভে খবরটা দেখিয়াছিলাম। বেলা আন্দাজ আটটার সময় টেলিফোন আসিল।

অপরিচিত ব্যগ্র কণ্ঠস্বর‌, ‘হ্যালো। ব্যোমকেশবাবু?’

বলিলাম‌, ‘না‌, আমি অজিত। আপনি কে?’

টেলিফোন বলিল‌, ‘আমার নাম রসময় সরকার। ব্যোমকেশবাবুকে একবার ডেকে দেবেন?’

নাম শুনিয়া বুঝিতে বাকি রহিল না যে‌, চোর ধরিবার জন্য ব্যোমকেশের ডাক আসিয়াছে। বলিলাম‌, ‘সে বাথরুমে গিয়েছে‌, বেরুতে দেরি হবে। কাগজে দেখলাম। আপনার দোকান থেকে নেকলেস চুরি গেছে।’

উত্তর হইল‌, ‘দোকান থেকে নয়‌, বাড়ি থেকে।–আপনি অজিত বন্দ্যোপাধ্যায়‌, ব্যোমকেশবাবুর বন্ধু?’

বলিলাম‌, হ্যাঁ। ব্যোমকেশকে যা বলতে চান‌, আমাকে বলতে পারেন।’

ক্ষণেক নীরব থাকিয়া রসময় বলিলেন‌, ‘দেখুন‌, যে নেকলেসটা চুরি গেছে‌, তার দাম সাতান্ন হাজার টাকা। সন্দেহ হচ্ছে বাড়ির একটা চাকর চুরি করেছে‌, কিন্তু কোনও প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না। পুলিসে অবশ্য খবর দিয়েছি‌, কিন্তু আমি ব্যোমকেশবাবুকে চাই। তিনি ছাড়া নেকলেস কেউ উদ্ধার করতে পারবে না।’

বলিলাম‌, ‘বেশ তো‌, আপনি আসুন না। আপনি আসতে আসতে ব্যোমকেশও বাথরুম থেকে বেরুবে।’

রসময় একটু কাতরভাবে বলিলেন, ‘দেখুন, আমি বেতো রুগী, বেশি নড়াচড়া করতে পারি না। তার চেয়ে যদি আপনারা আসেন তো বড় ভাল হয়।’

যাহারা বিপদে পড়ে তাহারাই ব্যোমকেশের কাছে আসে‌, সে আগে কাহারও কাছে যায় না। আমি বলিলাম‌, ‘বেশ‌, ব্যোমকেশকে বলব।’

রসময়ের মিনতি আরও নির্বন্ধপূর্ণ হইয়া উঠিল‌, ‘না না‌, বলাবলি নয়‌, নিশ্চয় আসবেন। আমি গাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছি‌, আপনাদের কোনও অসুবিধা হবে না।’

‘বেশ।’

‘ধন্যবাদ‌, ধন্যবাদ। এখনি গাড়ি পাঠাচ্ছি।’

মিনিট কয়েক পর একটি ক্যাডিলাক গাড়ি আসিয়া দ্বারে দাঁড়াইল। ব্যোমকেশ বাথরুম হইতে বাহির হইলে সকল কথা বলিলাম এবং জানোলা দিয়া গাড়ি দেখাইলাম। দেখিয়া শুনিয়া সে আপত্তি করিল না। আমরা ক্যাডিলাকে চড়িয়া যাত্ৰা করিলাম।

কলিকাতা শহরের বিভিন্ন অঞ্চলে রসময় সরকারের গোটা পাঁচেক সোনাদোনা হীরা-জহরতের দোকান আছে‌, কিন্তু তাঁর বসতবাড়ি বৌবাজারে। অল্পকাল মধ্যে গাড়ি তাঁহার দ্বারে গিয়া দাঁড়াইল।

রসময় সরকারের বাড়িটি সাবেক ধরনের‌, একেবারে ফুটপাথের কিনারা হইতে তিনতলা উঠিয়া গিয়াছে। মাঝখানে উপরিতলায় উঠিবার দ্বারমুক্ত সিঁড়ি‌, দুই পাশে দোকানের সারি। গৃহস্বামী উপরের দুইতলা লইয়া থাকেন।

সিঁড়ির দরজা ভিতর হইতে বন্ধ ছিল‌, গাড়ি গিয়া থামিতেই দ্বার খুলিয়া একটি যুবক বাহির হইয়া আসিল। শৌখিন সুদৰ্শন চেহারা‌, বয়স সাতাশ আটাশ! নমস্কার করিয়া বলিল‌, ‘আমার নাম মণিময় সরকার। বাবা ওপরে আপনাদের জন্য অপেক্ষা করছেন। আসুন।’ .

আমরা সিঁড়ি দিয়া উপরে উঠিতে লাগিলাম। দ্বিতলে আছে রান্নাঘর‌, ভাঁড়ার ঘর‌, চাকরদের থাকিবার স্থান এবং তক্তপোশাপাতা একটি বসিবার ঘর। আমরা দ্বিতল ছাড়াইয়া ত্রিতলে উঠিয়া গেলাম। এই ত্রিতলে গৃহস্বামী সপরিবারে বাস করেন।

তৃতীয় তলে উঠিলে গৃহস্বামীর বিত্তবত্তার পরিচয় পাওয়া যায়। বিলাতি তালা লাগানো ভারী দরজায় রেশমী পর্দা, মেঝেয় পুরু গালিচা; ড্রইংরুমটি দামী আসবাব দিয়া সাজানো, গদি-মোড়া দেয়ালে পারসিক ছবি-আঁকা ট্যাপেস্ট্রি ইত্যাদি। উপস্থিত ঘরটি একটু অবিন্যস্ত। মণিময় আমাদের ঘরে লইয়া গিয়া বলিল‌, ‘বাবা‌, ব্যোমকেশবাবু এসেছেন।’

দেখিলাম রসময় সরকার একটি চেয়ারে বসিয়া ডান পা সম্মুখদিকে প্রসারিত করিয়া দিয়াছেন এবং একটি বিবাহিতা যুবতী তাঁহার পায়ের কাছে বসিয়া তাঁহার আঙ্গুলে সেঁক দিতেছে। রসময়বাবুর বয়স অনুমান পঞ্চাশ‌, ভারী গড়নের শরীর‌, মাংসল মুখ এখনও বেশ দৃঢ় আছে। আমাদের দেখিয়া তিনি তাড়াতাড়ি উঠবার চেষ্টা করিয়া আবার বসিয়া পড়িলেন‌, আমার ও ব্যোমকেশের পানে পর্যায়ক্রমে চক্ষু ফিরাইয়া দুই করতল যুক্ত করিয়া ব্যোমকেশকে বলিলেন‌, ‘আসুন ব্যোমকেশবাবু। আমি সব দিক দিয়েই বড় কাবু হয়ে পড়েছি। আপনি-আপনারা এসেছেন‌, আমি বাঁচলাম। বসুন‌, বসুন অজিতবাবু।’

আমাদের মধ্যে কে ব্যোমকেশ তাহা প্রশ্ন না করিয়াও তিনি বুঝিয়াছেন। রসময় সরকার বিষয়বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তি তাহাতে সন্দেহ নাই।

আমরা সোফায় পাশাপাশি বসিলাম। ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘পায়ে বাত ধরেছে দেখছি। বাত রোগটা মারাত্মক নয়‌, কিন্তু বড় কষ্টদায়ক।’

রসময় বলিলেন‌, ‘আর বলবেন না। আমার শরীর বেশ ভালই‌, কিন্তু এই বাতে আমাকে পঙ্গু করে ফেলেছে। ছেলেবেলায় ফুটবল খেলতাম‌, ডান পায়ের বুড়ো আঙুলটা ভেঙে গিয়েছিল। এখন এমন দাঁড়িয়েছে‌, আকাশের এক কোণে রুমালের মত একটি টুকরো মেঘ উঠলে বুড়ো আঙুলে চিড়িক মারতে থাকে।–কিন্তু সে যাক‌, বৌমা এঁদের জন্যে চা নিয়ে এস।’

বধূটি এতক্ষণ হেঁট মুখে বসিয়া শ্বশুরের পায়ে সেঁক দিতেছিল। সুন্দরী মেয়ে‌, কিন্তু তাঁহার মুখে পারিবারিক বিপদের ছায়া পড়িয়াছে। সে উঠিবার উপক্রম করিতেই ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘না না‌, চায়ের দরকার নেই‌, আমি চা খেয়ে বেরিয়েছি। উনি শ্বশুরের পদসেবা করছেন করুন।’

রসময় একটু হাসিলেন‌, বধূ আবার বসিয়া পড়িল। রসময় বলিলেন‌, ‘আচ্ছা‌, তবে থাক। মণি‌, সিগারেট নিয়ে এস।’

মণিময় এতক্ষণ একটা চেয়ারের পিছনে দাঁড়াইয়া ছিল‌, সে চলিয়া গেলে রসময় বধূর পানে সস্নেহ দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া বলিলেন‌, ‘বড় লক্ষ্মী বৌমা আমার। গিন্নী ছোট ছেলেকে নিয়ে তীর্থদর্শনে বেরিয়েছেন‌, এখন ওর হাতেই সংসার। অবশ্য ওকে দিয়ে পদেসেবা আমি করাই না‌, কিন্তু চাকরটা–’

এই বলিয়া রসময় থামিয়া গেলেন, তারপর গলার স্বর পাল্টাইয়া বলিলেন, ‘বাজে কথা থাক‌, কাজের কথা বলি। আপনি অনুগ্রহ করে এসেছেন‌, আপনার অমূল্য সময় নষ্ট করব না। ব্যোমকেশবাবু্‌, কাল রাত্রে আমার বাড়িতে অঘটন ঘটে গেছে‌, যা কখনও হয়নি তাই হয়েছে। একটা হীরের নেকলেস—’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘সব গোড়া থেকে বলুন। সংক্ষেপ করবেন না। মনে করুন আমি কিছু জানি না।’

মণিময় একটি ৫৫৫ মার্কা সিগারেটের টিন ঢাকনি ঘুরাইয়া খুলিতে খুলিতে ঘরে প্রবেশ করিল‌, টিন আমাদের সম্মুখে রাখিয়া জানালার সম্মুখে গিয়া দাঁড়াইল। আমরা সিগারেট ধরাইলাম।

রসময় বলিতে আরম্ভ করিলেন—

‘কলকাতা শহরে আমার পাঁচটা জুয়েলারির দোকান আছে। বড় কারবার‌, বছরে প্রায় ত্রিশ লক্ষ টাকার কেনা-বেচা। অনেক বিশ্বাসী প্রবীণ কর্মচারী আছেন। আমার যখন শরীর ভাল থাকে। আমি দেখাশোনা করি। দু’বছর থেকে মণিও যাতায়াত শুরু করেছে।

‘কলকাতার বাইরে, ভারতবর্ষের সর্বত্র আমাদের কাজ কারবার আছে। বোম্বাই মাদ্রাজ নয়াদিল্লী, যেখানে যত বড় জহুরী‌, সকলের সঙ্গে আমাদের লেন-দেন। কখনও আমাদের কাছ থেকে তারা হীরে জহরত কেনে‌, কখনও আমরা তাদের কাছ থেকে কিনি। জহুরী ছাড়া সাধারণ খরিদ্দার তো আছেই। রাজারাজড়া থেকে ছাপোষা গৃহস্থ, সবই আমাদের খদ্দের।

‘মাসখানেক আগে দিল্লী থেকে রামদাস চোকসী নামে একজন বড় জহুরী আমার কাছে এল। রাজস্থানের কোন রাজবাড়িতে মেয়ের বিয়ে‌, দশ লাখ টাকার গয়নার ফরমাশ পেয়েছে। কিন্তু সব গয়না সে নিজে গড়তে পারবে না‌, আমাকে দিয়ে একটা হীরের নেকলেস গড়িয়ে নিতে চায়। ডিজাইন দেখে‌, হীরে বাছাই করে দাম কষা হল। সাতান্ন হাজার টাকা। এক মাসের মধ্যে গয়না গড়ে দিল্লীতে রামদাসের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।

‘গয়না তৈরি হল। আমার ইচ্ছে ছিল আমি নিজেই গিয়ে গয়নাটা দিল্লীতে পৌঁছে দিয়ে আসব‌, কিন্তু গত মঙ্গলবার থেকে আমার বাতের ব্যথা চাগাড় দিল। কী উপায়! অত দামী গয়না। কর্মচারীদের হাতে পাঠাতে সাহস হয় না। শেষ পর্যন্ত ঠিক হল মণিময় যাবে আমার বদলে। আজ ওরা যাবার কথা।

‘আমি এ ক’দিন বাড়ি থেকে বেরুতে পারিনি‌, মণিই কাজকর্ম দেখছে। নেকলেসটা তৈরি হবার পর বড় দোকানের সিন্দুকে রাখা ছিল‌, কাল বিকেলবেলা মণি সেটা বাড়িতে নিয়ে এল।

‘এখন আমার বাড়ির কথা বলি। আমার স্ত্রী ছোট ছেলে হিরন্ময়কে নিয়ে তীর্থ করতে বেরিয়েছেন‌, অর্থাৎ দক্ষিণাত্য বেড়াতে গেছেন। বাড়িতে আছি আমি‌, মণিময় আর বৌমা। দোতলায় থাকে দু’জন চাকর, বামুন, ড্রাইভার, আর আমার খাস চাকর ভোলা। এই ক’জন নিয়ে বর্তমানে আমার সংসার।

‘কাল বিকেলে মণি যখন নিকলেস নিয়ে বাড়ি এল, আমি তখন এই চেয়ারে বসে ছিলাম, আমার খাস চাকর ভোলা পায়ে মালিশ করে দিচ্ছিল। মণি নেকলেসের কেস্‌ আমার হাতে দিয়ে বলল‌, ‘এই নাও বাবা।’

‘আমি ভোলাকে ছুটি দিলাম‌, সে চলে গেল। তখন আমি কেস খুলে গয়নাটা পরীক্ষা করলাম। সব ঠিক আছে। তারপর বৌমাকে ডেকে বললাম‌, ‘বৌমা‌, কাপড় দিয়ে এটাকে বেশ ভাল করে সেলাই করে দাও।’ বৌমা এক টুকরো কাপড় এনে এখানে বসে বসে ছুঁচ-সুতো দিয়ে সেলাই করে দিলেন।’

ব্যোমকেশ এতক্ষণ মনোযোগ দিয়া শুনিতেছিল‌, এখন মুখ তুলিয়া বলিল‌, ‘মাফ করবেন‌, গয়নার বাক্সটা আকারে আয়তনে কত বড়?’

রসময়বাবু দ্বিধাভরে এদিক ওদিক চাহিয়া বলিলেন‌, ‘কত বড়? মোটেই বড় নয়। এই ধরুন—’

পিতা ইতস্তত করিতেছেন দেখিয়া মণিময় বইয়ের শেলফ হইতে একটি বই আনিয়া ব্যোমকেশের হাতে দিল‌, বলিল‌, ‘এই সাইজের বাক্স।’

রসময় বলিলেন‌, ‘হ্যাঁ‌, ঠিক ওই সাইজের। অবশ্য বাক্সটা কুমিরের চামড়ার‌, তার ভেতরে মখমলের খাঁজ-কাটা ঘর।’

বইখানা ষোলপেজী ক্রাউন সাইজের‌, পৃষ্ঠা-সংখ্যা আন্দাজ তিনশত। ব্যোমকেশ বইখানা মণিময়কে ফিরাইয়া দিয়া বলিল‌, ‘বুঝেছি‌, তারপর বলুন।’

রসময় আবার বলিতে আরম্ভ করিলেন—

‘তারপর মণি চা খেয়ে ক্লাবে চলে গেল। আমি গয়নার কেসটা হাতে করে আবার অফিস-ঘরে গেলাম। পাশেই আমার অফিস-ঘর। বাড়িতে বসে কাজকর্ম করার দরকার হলে ওখানে বসেই করি। একটা সেক্রেটারিয়েটু টেবিল আছে‌, তার দেরাজ্যে দরকারী কাগজপত্র থাকে। আমি গয়নার কেস দেরাজে রেখে দিলাম। বাড়িতে একটা লোহার সিন্দুক আছে বটে‌, কিন্তু গিন্নী তার চাবি নিয়ে চলে গেছেন।

‘আমার অন্যায় হয়েছিল‌, অত বেশি দামী জিনিস খোলা–দেরাজে রাখা উচিত হয়নি। কিন্তু আমার বাড়ির যে-রকম ব্যবস্থা‌, তাতে আশঙ্কার কোনও কারণ ছিল না। চাকর-বাকির দোতলায় থাকে‌, ডেকে না পাঠালে ওপরে আসে না; অন্য লোকেরও যাতায়াত নেই। তাই এখান থেকে গয়না চুরি যেতে পারে। এ-সম্ভাবনা মনেই আসেনি।

‘রাত্ৰি আন্দাজ ন’টার সময় আমি খাওয়া-দাওয়া সেরে নিলাম। আমাদের খাওয়ার ব্যবস্থা অবশ্য দোতলায়‌, কিন্তু এই বাতের ব্যথাটা হয়ে অবধি বৌমা ওপরেই আমার খাবার এনে দেন। খাওয়া সেরে আমি একটা বই নিয়ে বসলাম‌, বৌমাও খেয়ে নিলেন। মণির ক্লাব থেকে ফিরতে প্রায়ই দেরি হয়‌, তাই তার খাবার বৌমা শোবার ঘরে ঢাকা দিয়ে রাখলেন।

‘দশটার সময় আমি ভোলাকে ডাকবার জন্যে ঘণ্টি বাজালাম‌, তারপর শুতে গেলাম। আমার বেতো শরীর‌, শোবার পর হাত-পা টিপে না দিলে ঘুম আসে না। ভোলাই রোজ টিপে দেয়‌, তারপর আমি ঘুমিয়ে পড়লে চলে যায়।

‘ভোলা খুব কাজের চাকর। বছর দেড়েক আমার কাছে আছে; জুতো বুরুশ করা‌, কাপড়-জামা গিলে করা‌, ফাই-ফরমাশ খাটা‌, হাত-পা টেপা‌, সব কাজ ও করে। কাল বৌমা সদর দোর খুলে দিলেন‌, ভোলা এসে আমার হাত-পা টিপে দিতে লাগল। আমি ক্রমে ঘুমিয়ে পড়লাম। তারপর সে কখন চলে গেছে জানতে পারিনি।

‘হঠাৎ ঘুম ভাঙল মণির ডাকে। ও আমার বিছানার ওপর ঝুকে ডাকছে‌, ‘বাবা! বাবা? আমি ধড়মড়িয়ে উঠে বললাম‌, ‘কী রে? মণি বলল‌, ‘নেকলেসটা কোথায় রেখেছেন?’ আমি বললাম‌, ‘টেবিলের দেরাজে। কেন?’ ও বলল‌, ‘কই‌, সেখানে তো নেই।’

‘আমি ছুটে গিয়ে দেরাজ খুললাম। নেকলেসের বাক্স নেই। সব দেরাজ হাঁটকালাম। কোথাও নেই। মনের অবস্থা বুঝতেই পারছেন। মণিকে জিজ্ঞেস করলাম‌, ‘তুই এত রাত্রে কী করে জানলি?’ সে বলল–’

ব্যোমকেশ হাত তুলিয়া রসময়কে নিবারণ করিল‌, মণিময়ের দিকে চাহিয়া প্রশ্ন করিল‌, ‘রাত্রি তখন ক’টা?’

মণিময় অত্যন্ত সঙ্কুচিত হইয়া বলিল‌, ‘প্রায় বারটা। বারটা বাজতে পাঁচ মিনিট কি দশ মিনিট হবে।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘রাত বারটার সময় কোনও কারণে আপনার সন্দেহ হয়েছিল যে‌, নেকলেস চুরি গেছে। কী করে সন্দেহ হল সব কথা খুলে বলুন।’

মণিময় যেন আরও সঙ্কুচিত হইয়া পড়িল‌, পিতার প্রতি একটি গুপ্ত কটাক্ষপাত করিয়া ঈষৎ স্বলিত স্বরে বলিতে আরম্ভ করিল‌, ‘কাল আমার ক্লাব থেকে ফিরতে একটু বেশি দেরি হয়ে গিয়েছিল। ক্লাবে ব্রিজ-ড্রাইভ চলছে‌, আমি-’

ব্যোমকেশ জিজ্ঞাসা করিল‌, ‘কোথায় ক্লাব? নাম কী?’

‘ক্লাবের নাম-খেলাধুলো। খুব কাছেই‌, আমাদের বাড়ি থেকে পাঁচ মিনিটের রাস্তা। সব রকম ঘরোয়া খেলার ব্যবস্থা আছে‌, তাস পাশা পিংপং বিলিয়ার্ড। কাল ব্রিজ-ড্রাইভ শেষ হতে রাত হয়ে গেল–’

‘আপনি হেঁটে ক্লাবে যান?’

‘আজেজ্ঞ হ্যাঁ‌, খুব কাছে‌, তাই হেঁটেই যাই। কাল যখন ক্লাব থেকে বেরুলাম তখন পোনে বারটা। রাত নিযুতি। আমাদের বাড়ির সদর দরজার ঠিক সামনে একটা ল্যাম্পপোস্ট আছে। আমি যখন বাড়ির প্রায় ত্রিশ-চল্লিশ গজের মধ্যে এসেছি তখন দেখলাম‌, আশেপাশের দোকান সব বন্ধ হয়ে গেছে‌, কিন্তু একটা লোক ঠিক আমাদের দোরের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। লোকটা বোধ হয় আমার পায়ের শব্দ শুনতে পেয়েছিল‌, ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল‌, তারপর চট্ট করে বাড়িতে ঢুকে পড়ল।

‘দূর থেকে দেখে মনে হল‌, ভোলা চাকর। কাছে এসে দেখলাম দরজা ভেজানো রয়েছে। অন্যদিন আমি দশটা সাড়ে দশটার মধ্যে বাড়ি ফিরি‌, কিন্তু সদর দরজা তার আগেই বন্ধ হয়ে যায়। আজ খোলা রয়েছে। আমার খটকা লাগল। সদর দরজায় হুড়কো লাগিয়ে ওপরে উঠে গেলাম। দোতলায় চাকরেরা ঘুমোচ্ছে‌, কারুর সাড়া শব্দ নেই।

‘তোতলায় উঠতেই স্ত্রী এসে দরজা খুলে দিলেন। আপনি বোধ হয় লক্ষ্য করেছেন‌, তেতলার দরজায় বিলাতি গা-তালা লাগানো; ভিতর থেকে বন্ধ করে দিলে বিনা চাবিতে বাইরে থেকে খোলা যায় না। আমি স্ত্রীকে বললাম‌, বাড়ির সামনে একটা লোক দাঁড়িয়ে ছিল। উনি বললেন‌, উনিও দেখেছেন—’

‘উনিও দেখেছেন?’ ব্যোমকেশ বধূর পানে চোখ ফিরাইল।

বধূ লজ্জা পাইল‌, তাহার মুখ উত্তপ্ত হইয়া উঠিল। রসময় তাহাকে উৎসাহ দিয়া বলিলেন‌, ‘লজ্জা কী বোমা? যা দেখেছ ব্যোমকেশকে বল।’

বধূ তখন লজ-স্তিমিত কণ্ঠে থামিয়া থামিয়া বলিল‌, ‘কাল রাত্তিরে—আমি—ওঁর ক্লাব থেকে ফিরতে দেরি হচ্ছিল—আমি জানালার কাছে দাঁড়িয়ে ছিলুম। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর—হঠাৎ দেখলুম‌, ঠিক আমাদের দরজার সামনে ফুটপাথের ওপর কে একজন দাঁড়িয়ে রয়েছে। আমি বুকে দেখবার চেষ্টা করলুম‌, কিন্তু ভাল দেখতে পেলুম না। তারপরেই লোকটা অদৃশ্য হয়ে গেল। মনে হল দরজায় ঢুকে পড়ল। সেই সময় দেখতে পেলুম উনি আসছেন‌, লোকটা যেন ওঁকে দেখেই ভেতরে ঢুকে পড়ল। তারপর আমি গিয়ে তেতলার দরজা খুলে দিলুম। উনি এলেন।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘লোকটাকে চিনতে পেরেছিলেন?’

বধূ মাথা নাড়িল‌, ‘না‌, ওপর থেকে তার মুখ দেখা যাচ্ছিল না। তবে মনে হয়েছিল‌, চাকরদের মধ্যেই কেউ হবে।’

‘হুঁ, ব্যোমকেশ মণিময়কে বলিল‌, ‘তারপর কী হল?’

মণিময় বলিল‌, ‘স্ত্রীর কথা শুনে সন্দেহ আরও বেড়ে গেল। নেকলেসটা বিকেলবেলা এনেছি‌, সেটা বাবা নিশ্চয় টেবিলের দেরাজে রেখেছেন‌, কারণ সিন্দুকের চাবি নিয়ে মা চলে গেছেন। আমি চুপি চুপি বাবার অফিস-ঘরে গেলাম। আলো জ্বেলে দেরাজগুলো খুলে দেখলাম। নেকলেসের কেস নেই। আরও যেখানে যেখানে রাখা সম্ভব সব জায়গায় খুঁজলাম। কোথাও নেই। ভীষণ ভয় হল। তখন বাবাকে ডেকে তুললাম।’

মণিময় চুপ করিলে ব্যোমকেশ নিবিষ্ট মনে আর একটি সিগারেট ধরাইল‌, তারপর সপ্রশ্ন চক্ষে রসময়ের পানে চাহিল। রসময় আবার কাহিনীর সূত্র তুলিয়া লইলেন–

‘যখন নিঃসংশয়ে বুঝলাম নেকলেস চুরি গেছে তখন সব সন্দেহ পড়ল ভোলার ওপর। ভেবে দেখুন‌, আমার তেতলার সদর দরজায় ইয়েল লক লাগানো; ভেতর থেকে বাইরে যাওয়া সহজ‌, কিন্তু বাইরে থেকে ভেতরে আসা সহজ নয়। রাত্রি দশটার পর চাকরীদের মধ্যে একমাত্র ভোলাই ভেতরে ছিল। আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম‌, ভোলা কখন উঠে গেছে জানি না। হয়তো সে পৌঁনে বারটার সময় উঠে গেছে‌, দেরাজ থেকে নেকলেস নিয়ে চুপি চুপি বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেছে। নিচে হয়তো তার ষাড়ের লোক ছিল-‘

ব্যোমকেশ মণিময়কে জিজ্ঞাসা করিল‌, ‘আপনি একটা লোকই দেখেছিলেন?’

মণিময় বলিল‌, ‘হ্যাঁ। দ্বিতীয় জনপ্ৰাণী সেখানে ছিল না।’

ব্যোমকেশ বধূর দিকে ফিরিয়া বলিল‌, ‘আপনি?’

বধূ বলিল‌, ‘আমিও একজনকেই দেখেছিলুম। আমি সারাক্ষণ নিচের দিকেই তাকিয়ে ছিলুম‌, আর কেউ থাকলে দেখতে পেতুম।’

ব্যোমকেশ কিয়াৎকাল সিগারেট টানিল‌, শেষে রসময়কে বলিল‌, ‘তারপর আপনি কী করলেন?’

রসময় বলিলেন‌, তখন বারটা বেজে গেছে। বাপ-বেটীয় পরামর্শ করে থানায় টেলিফোন করলাম। মণি নিচে নেমে গিয়ে সদর দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রইল‌, যাতে বাড়ি থেকে কেউ বেরুতে না পারে। থানার বড় দারোগা অমরেশবাবুর সঙ্গে আমার পরিচয় আছে‌, বিশিষ্ট ভদ্রলোক। ভাগ্যক্রমে তিনি থানায় উপস্থিত ছিলেন‌, ফোন পেয়ে তক্ষুনি তিন-চারজন লোক নিয়ে এসে পড়লেন।

‘প্রথমে দোতলার ঘরগুলো খানাতল্লাশ হল। চাকরেরা সকলেই ঘুমোচ্ছিল ভোলাও ছিল। পুলিস তন্নতন্ন করে তল্লাশ করল‌, কিন্তু নেকলেস পাওয়া গেল না।

‘অমরেশবাবু তখন তেতলা খানাতল্লাশ করলেন। বলা যায় না‌, চোর হয়তো নেকলেস চুরি করে এখানেই কোথাও লুকিয়ে রেখেছে। পরে তাক বুঝে সরাবে। কিন্তু এখানেও নেকলেস পাওয়া গেল না।

‘অমরেশবাবু তারপর ভোলাকে জেরা আরম্ভ করলেন। ভোলা স্বীকার করল‌, সে নিচে নেমে গিয়েছিল। সে বলল‌, আন্দাজ এগারটার সময় আমি ঘুমিয়ে পড়েছি দেখে সে দোতলায় নেমে যায়। অন্য চাকরেরা তখন ঘুমিয়ে পড়েছিল। ভোলাও শুয়ে পড়ল‌, কিন্তু তার ঘুম এল না। তখন সে খোলা হাওয়ার খোঁজে নিচে গিয়ে ফুটপাথে দাঁড়াল। মণিময় যে ক্লাব থেকে ফেরেনি তা সে জানত না। সে ফুটপাথে গিয়ে দাঁড়াবার সঙ্গে সঙ্গে দেখতে পেল মণি আসছে। তখন সে তাড়াতাড়ি ফিরে এসে আবার শুয়ে পড়ল কারণ রাত্তিরে চাকর-বাকরের বাইরে যাওয়ার কড়া বারণ আছে। এই তার বয়ান। নেকলেসের কথা সে জানে না।

‘অমরেশবাবুর জেরায় আরও জানা গেল‌, ভোলার দুই ভাই কলকাতায় থাকে‌, মেছুয়াবাজারে তাদের বাসা। ভায়েদের সঙ্গে ভোলার বিশেষ দহরম-মহরম নেই‌, তবে হাতে কাজ না থাকলে মাঝে মাঝে তাদের বাসায় দেখা করতে যায়।

‘অমরেশবাবু যতক্ষণ ভোলাকে সওয়াল জবাব করছিলেন ততক্ষণ তাঁর সঙ্গীরা রাস্তার দু’ পাশে তল্লাশ করছিল; আনোচ কানাচ ডাস্টবিন সব খুঁজে দেখছিল। মণিও তাদের সঙ্গে ছিল। কিন্তু কিছুই পাওয়া গেল না। এইসব ব্যাপারে ভোর হয়ে গেল‌, অমরেশবাবু দোতলায় একজন লোক রেখে চলে গেলেন। ভোলাকে বলে গেলেন‌, এ-বাড়ি থেকে বেরুবার চেষ্টা করলেই গ্রেপ্তার করা হবে।

‘তারপর–তারপর যত বেলা বাড়তে লাগল ততাই আমার মন অস্থির হয়ে উঠল। অমরেশবাবু কাজের লোক‌, চেষ্টার ত্রুটি করবেন না। কিন্তু আমি আর স্থির থাকতে পারলাম না ব্যোমকেশবাবু। আপনাকে ফোন করলাম। আপনি আমার নেকলেস উদ্ধার করে দিন। আপনি ছাড়া এ-কাজ আর কেউ পারবে না।’

ব্যোমকেশ একটু হাসিল‌, ‘আমার ওপর আপনার এত বিশ্বাস‌, আশা করি বিশ্বাসের মর্যাদা রাখতে পারব! —ভোলা চাকর তো বাড়িতেই আছে?’

‘হ্যাঁ‌, দোতলার ঘরে আছে।’

‘তাকে একবার ডেকে পাঠালে দু-চারটে প্রশ্ন করে দেখতাম।’

‘বেশ তো।’ রসময় পুত্রের দিকে চাহিলেন।

মণিময় চলিয়া গেল এবং কিছুক্ষণ পরে ভোলাকে লইয়া ফিরিয়া আসিল।

ভোলা চাকরের চেহারা সাধারণ ভৃত্য শ্রেণীর লোকের চেহারা হইতে পৃথক নয়। একজাতীয় মুখ আছে যাহা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শীর্ণ ও অস্থিসার হইয়া পড়ে‌, উচু নাক ও ছুচলো চিবুক প্রাধান্য লাভ করে। ভোলার মুখ সেই জাতীয়। দেহও বেউড় বাঁশের মত পাকানো; বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। তাহার চোখের দৃষ্টিতে ভয়ের চিহ্ন নাই‌, কিন্তু সংযত সতর্কতা আছে।

ব্যোমকেশ তাহাকে আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করিয়া বলিল‌, ‘তোমাকে দু-একটা প্রশ্ন করতে চাই।’

ভোলা সহজভাবে বলিল‌, ‘আজ্ঞে।’

‘নাম কী?’

‘ভোলানাথ দাস।’

‘দেশ কোথায়?

‘মেদিনীপুর জেলায়।’

‘কলকাতায় কতদিন আছ?’

‘তা পনর বছর হবে।’

‘তোমার দুই ভাই কলকাতায় থাকে?’

‘আজোব হ্যাঁ‌, মেছোবাজারে বাসা নিয়ে একসঙ্গে থাকে।’

‘তুমি ভায়েদের সঙ্গে থাক না?’

‘আজ্ঞে‌, আমি যেখানে চাকরি করি সেখানেই থাকি।’

‘ভায়েদের সঙ্গে বনিবনাও আছে?’

‘আজ্ঞে‌, বে-বনিবনাও নেই। তবে দাদারা লেখাপড়া জানা লোক। আমি মুখখু

‘তোমার দাদারা কী কাজ করে?’

‘বড়দা পোস্ট-অফিসে কাজ করে‌, মেজদা কপোরেশনের জমাদার।’

‘তুমি বিয়ে করনি?’

‘করেছিলাম‌, বৌ মরে গেছে।’

‘এ-বাড়িতে কতদিন কাজ করছি?’

‘দেড় বছর।’

‘তার আগে কোথায় কাজ করেছ?’

‘অনেক জায়গায় কাজ করেছি।’

‘কী কাজ?

‘আজেরি‌, পা-টেপ চাকরের কাজ। অন্য কাজ করবার বিদ্যে আমার নেই।’

বিদ্যা না থাক‌, বুদ্ধি যথেষ্ট আছে সে-বিষয়ে সন্দেহ নাই। যে-বুদ্ধি নিজেকে প্রচ্ছন্ন করিয়া রাখিতে পারে‌, সেই বুদ্ধি। ব্যোমকেশ আবার আরম্ভ করিল‌, ‘সকলে সন্দেহ করেন তুমিই হীরের নেকলেস চুরি করেছ।’

‘কাল যখন মণিময়বাবু নেকলেসের বাক্স এনে রসময়বাবুকে দেন‌, তখন তুমি তাঁর পায়ে মালিশ করে দিচ্ছিলে।’

‘একটা বাক্স এনে দিয়েছিলেন। বাক্সে কী আছে আমি জানতাম না।’

‘কিছু আন্দাজ করতে পারনি? রসময়বাবু যখন বাক্স খোলবার আগে তোমাকে চলে যেতে বললেন তখনও কিছু আন্দাজ করনি?’

‘আজ্ঞে না।’

ব্যোমকেশ ক্ষণেক ভ্রূকুটি করিয়া নীরব রহিল‌, তারপর সহসা চক্ষু তুলিয়া বলিল‌, ‘কাল সন্ধ্যের পর তুমি বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলে?’

এতক্ষণে ভোলার চোখে একটু উদ্বেগের চিহ্ন দেখা দিল‌, কিন্তু সে সহজ সুরেই বলিল‌, ‘আজ্ঞে‌, বেরিয়েছিলাম। একটা গামছা কেনবার ছিল‌, তাই বৌদিদির কাছে ছুটি নিয়ে বেরিয়েছিলাম।’

ব্যোমকেশ বধূর দিকে চাহিল‌, বধূ ঘাড় হেলাইয়া সায় দিল। রসময়বাবুর মুখ দেখিয়া মনে হইল‌, তিনি এ-খবর জানিতেন না। মণিময়ও জানিত না‌, কারণ সে তৎপূর্বেই ক্লাবে চলিয়া গিয়াছিল। কিন্তু ব্যোমকেশ জানিল কী করিয়া? অন্ধকারে ঢিল ছুঁড়িয়াছে?

সে ভোলাকে জিজ্ঞাসা করিল‌, ‘কতক্ষণ বাইরে ছিলে?’

‘ঘণ্টাখানেক।’

‘গামছা কিনতে এক ঘণ্টা লাগল?’

‘আজ্ঞে‌, গামছা কিনে খানিক এদিক ওদিক ঘুরে বেড়িয়েছিলাম।’

‘কারুর সঙ্গে দেখা করনি?’

‘আজ্ঞে‌, না।’

‘তোমার বন্ধুবান্ধব কেউ নেই?

‘চেনাশোনা দু-চারজন আছে‌, বন্ধু নেই।’

‘যাক।–কাল রাত্রে খাওয়া-দাওয়ার পর তুমি রসময়বাবুর পা টিপে দিয়েছিলে?’

‘আজ্ঞে। রোজ টিপে দিই।’

‘কাল ক’টা অবধি পা টিপে দিয়েছিলে?’

‘ঘড়ি দেখিনি। আন্দাজ এগারটা হবে।’

‘তুমি যখন দোতলায় নেমে গেলে‌, অন্য চাকরেরা জেগে ছিল?’

‘আজ্ঞে না‌, ঘুমিয়ে পড়েছিল।’

‘কেউ জেগে ছিল না?’

‘কেউ না।’

‘ভারী আশ্চর্য। যাহোক‌, তুমি তারপর কী করলে? শুয়ে পড়লে?’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ।’

‘তবে রাত বারটার সময় রাস্তায় বেরিয়েছিলে কেন?’

‘অনেকক্ষণ শুয়ে শুয়ে ঘুম এল না‌, তখন নিচে নেমে গেলাম। ভেবেছিলাম‌, খোলা জায়গায় খানিক দাঁড়ালে ঘুম আসবে।’

‘কতক্ষণ ফুটপাথে দাঁড়িয়ে ছিলে?

‘দু-তিন মিনিটের বেশি নয়। দাদাবাবু যে কেলাব থেকে ফেরেননি তা জানতাম না। দেখলাম। তিনি আসছেন‌, তাই তাড়াতাড়ি চলে এলাম।’

‘সিঁড়ির দরজা বন্ধ করেছিলে?’

‘আজ্ঞে‌, দাদাবাবু আসছেন‌, তাই বন্ধ করিনি।’

ব্যোমকেশ আর একবার ভোলার আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করিল‌, বোধ করি মনে মনে তাহার স্থিরবুদ্ধির প্রশংসা করিল‌, তারপর শুষ্কম্বরে বলিল‌, ‘আচ্ছা‌, তুমি এখন যেতে পার।’

ভোলা চলিয়া গেল। সদর দরজা বন্ধ করার আওয়াজ আসিলে রসময় জিজ্ঞাসুনেত্রে ব্যোমকেশের পানে চাহিলেন‌, ‘কী মনে হল?’

ব্যোমকেশ বিমৰ্ষভাবে বলিল‌, ‘ভারী হুঁশিয়ার লোক। তবে কাল সন্ধ্যেবেলা যে বেরিয়েছিল‌, তা স্বীকার করেছে।’

‘তাতে কী প্রমাণ হয়?’

‘প্রমাণ কিছুই হয় না। তবে ওর যদি কেউ ষাড়ের লোক থাকে‌, চুরির আগে তার সঙ্গে নিশ্চয় দেশৃঙ্খল। নইলে নেকলেসটা লোপাট হয়ে গেল কী করে?’

‘তা বটে।’

ভোলা সম্বন্ধে আর বেশি আলোচনা হইতে পাইল না‌, দ্বারে টোকা পড়ায় মণিময় চলিয়া গেল। এবং অবিলম্বে পুলিস দারোগার পোশাক-পরা এক ভদ্রলোককে লইয়া উপস্থিত হইল। লম্বা চওড়া চেহারা‌, ব্যক্তিত্রবান পুরুষ। দারোগা অমরেশবাবু সন্দেহ নাই।

রসময় উঠিবার উপক্রম করিয়া সবিনয়ে বলিলেন‌, ‘এ কী অমরেশবাবু্‌, কী খবর! আপনি আবার এলেন যে!’

ভায়েদের বাসা খানাতল্লাশ করতে। কিন্তু–’ এই সময় আমাদের উপর নজর পড়ায় তিনি থামিয়া গেলেন।

রসময়বাবু অপ্রতিভভাবে পরিচয় করাইয়া দিলেন‌, ‘ইন্সপেক্টর মণ্ডল‌, ইনি— ইয়েব্যোমকেশ বক্সী। বোধ হয় নাম শুনেছেন।’

অমরেশবাবু খাড়া হইয়া বসিলেন‌, বিস্ময়োৎফুল্প স্বরে বলিলেন‌, ‘বিলক্ষণ! ব্যোমকেশ বক্সীর নাম কে না শুনেছে? আপনিই! আপনার নাম প্রমোদ বরাটের কাছেও শুনেছি‌, মশাই। প্রমোদকে মনে আছে? গোলাপ কলোনীর ব্যাপারে তদন্ত করেছিল। প্রমোদ আমার বন্ধু।’

ব্যোমকেশ হাসিয়া বলিল‌, ‘প্রমোদীবাবুকে খুব মনে আছে। ভারী বুদ্ধিমান লোক।’

অমরেশবাবু বলিলেন‌, ‘সে আপনার পরম ভক্ত। তার আছে আপনার অদ্ভূত ক্ষমতার গল্প শুনেছি।–তা আপনিও এই নেকলেস চুরির ব্যাপারে আছেন নাকি? বেশ বেশ‌, আপনাকে পাওয়া তো ভাগ্যের কথা; প্রমোদের মুখে শুনেছি আপনার খ্যাতির লোভ নেই‌, কেবল সত্যান্বেষণ করেই আপনি সন্তুষ্ট। হা হা।’

ব্যোমকেশ মুখ টিপিয়া হাসিল‌, ইন্সপেক্টর মণ্ডল‌, যার যা আছে সে তা চায় না‌, এই প্রকৃতির নিয়ম। এ-ব্যাপারে খ্যাতি যদি কিছু প্রাপ্য হয় আপনিই পাবেন। আমি মজুরি পেলেই সন্তুষ্ট হব।’

রসময়বাবু গাঢ়স্বরে বলিলেন‌, ‘মজুরি বলবেন না‌, ব্যোমকেশবাবু্‌, সম্মান-দক্ষিণা। যদি আমার নেকলেস ফিরে পাই‌, আপনার সম্মান রাখতে আমি ত্রুটি করব না।’

‘সে যাক‌, ব্যোমকেশ আমরেশবাবুর দিকে ফিরিল‌, ‘আপনি ভোলার ভায়েদের বাসা সার্চ করেছেন‌, কিন্তু কিছু পেলেন না?’

অমরেশবাবু বলিলেন‌, ‘কিছু পেলাম না। ওর ভায়েরা কাজে বেরিয়েছিল। দুই বৌ ঘরে ছিল। কিন্তু অতিপতি করে খুঁজেও কিছু পাওয়া পাওয়া গেল না।’

ব্যোমকেশ কিছুক্ষণ তাঁহার পানে চাহিয়া বলিল‌, ‘তাহলে আপনার সন্দেহ ভোলা তার ভায়েদের সঙ্গে ষড় করে একাজ করেছে।’

নইলে নেকলেসটা লোপাট হয়ে গেল কী করে?

‘মণিময়বাবু এবং তাঁর স্ত্রী কিন্তু অন্য লোক দেখেননি।’

‘ওঁরা যখন ভোলাকে দেখেছেন‌, তার আগেই হয়তো ষাঁড়ের লোক মাল নিয়ে সরে পড়েছে।’

‘মণিময়বাবুর স্ত্রী অনেকক্ষণ ধরে জানালায় দাঁড়িয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। ষাড়ের লোক এলে উনি তাকে দেখতে পেতেন না কি?’

দুইজনে কিছুক্ষণ পরস্পরের পানে চাহিয়া রহিলেন‌, তারপর অমরেশবাবু দ্বিধাভরে প্রশ্ন করিলেন‌, ‘আপনার কি মনে হয় ভোলার কাজ নয়?’

‘এখন কিছু মনে হচ্ছে না। তত্ত্বতল্লাশ যা করবার সবই আপনি করেছেন‌, কিছুই বাকী রাখেননি। এখন শুধু ভেবে দেখতে হবে।’ সে উঠিয়া দাঁড়াইল‌, ‘এখন উঠি। যদি ভেবে কিছু পাওয়া যায় আপনাদের জানাব।’

বাসায় ফিরিয়া জিজ্ঞাসা করিলাম‌, ‘তোমার সন্দেহটা কার ওপর?’

ব্যোমকেশ পাঞ্জাবি খুলিতে খুলিতে বলিল‌, ‘তিনজনের ওপর।’

চমকিয়া বলিলাম‌, ‘তিনজন করা?’

‘ভোলা‌, মণিময় এবং মণিময়ের স্ত্রী–’ বলিয়া ব্যোমকেশ স্নান করিতে চলিয়া গেল।

বসিয়া ভাবিতে লাগিলাম। সুযোগের দিক দিয়া তিনজনকেই সন্দেহ করা যায়। রসময়ের দেরাজ হইতে নেকলেস সরানো তিনজনের পক্ষেই সম্ভব। আর মোটিভ? বড়মানুষের ছেলেদের সর্বদাই টাকার দরকার। মণিময় ক্লাবে গিয়া তাস-পাশা খেলে‌, নিশ্চয় বাজি রাখিয়া খেলে। হয়তো অনেক টাকা দেনা হইয়াছে‌, ভয়ে বাপের কাছে বলিতে পারিতেছে না।–’

আর মণিময়ের স্ত্রী? মেয়েটি দেখিতে শান্ত শিষ্ট‌, কিন্তু তাহার মুখের উদ্বেগের ব্যঞ্জনা প্রচ্ছন্ন রহিয়াছে। গহনার প্রতি স্ত্রীজাতির লোভ অবস্থা বিশেষে দুৰ্নিবার হইয়া উঠিতে পারে।

কিন্তু যে-ই চুরি করুক‌, চোরাই মাল বেমালুম সরাইয়া ফেলিল কী করিয়া? সেদিন দুপুরবেলা ব্যোমকেশ আরাম-কেদারায় লম্বা হইয়া সারাক্ষণ কড়িকাঠের শোভা নিরীক্ষণ করিল‌, কথাবার্তা বলিল না। আপারান্ত্রিক চা পানের পর হঠাৎ বলিল‌, ‘চল‌, একবার ঘুরে আসা যাক।’

‘কোথায় ঘুরবে?’

‘রসময়বাবুর বাড়ির সামনে ফুটপাথে! জায়গাটা ভাল করে দেখা হয়নি।’

পদব্রজে আমাদের বাসা হইতে রসময়বাবুর বাড়ির সামনে ফুটপাথে পৌঁছিতে কুড়ি মিনিট লাগিল। কাছাকাছি গিয়া ব্যোমকেশ এদিক ওদিক চাহিতে লাগিল। বাড়ির দরজার দুই পাশে দোকানগুলি খোলা রহিয়াছে। একটি হোমিওপ্যাথি ওষুধের দোকান‌, একটি ঘড়ির দোকান‌, দুইটি বস্ত্ৰালয়। সব দোকানেই খরিদ্দারের যাতায়াত। ফুটপাথে পথচারীর ভিড়।

রসময়ের বাড়ির তেতলায় গোটা চারেক জানালা; উহাদেরই একটা হইতে মণিময়ের বৌ পথের পানে চাহিয়া ছিল। চোখ নামাইয়া দেখিলাম‌, ব্যোমকেশ হঠাৎ থামিয়া গিয়াছে এবং একদৃষ্ট্রে রসময়ের সদর দরজার দিকে চাহিয়া আছে। তাহার দৃষ্টি অনুসরণ করিয়া দেখিলাম‌, দরজা খুলিয়া মণিময় বাহির হইয়া আসিল। তাহার পরিধানে ধুতি‌, গেঞ্জি‌, হাতে একখানা খামের চিঠি। সে দরজার বাহিরে আসিয়াই পাশে দেয়ালে-গাঁথা পোস্ট-বক্সে চিঠি ফেলিয়া দিয়া আবার ফিরিয়া যাইবার উপক্রম করিল।

‘এই যে মণিময়বাবু! কাকে চিঠি লিখলেন?’

ব্যোমকেশের কণ্ঠস্বরে মণিময় চমকিয়া চাহিল। আমাদের দেখিয়া সবিনয়ে বলিল‌, ‘এ কী‌, আপনারা! কিছু খবর আছে নাকি?’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘আমার খবর পরে দেব। আপনি কাকে চিঠি লিখলেন?’

মণিময় একটু বিষগ্ন স্বরে বলিল‌, ‘মাকে খবরটা দিলাম। তাড়াতাড়ি ফিরে আসতে লিখলাম‌, কিন্তু আজ আর চিঠিখানা যাবে না‌, ডাক বেরিয়ে গেছে। সেই কাল ভোরের ক্লিয়ারেন্সে যাবে।–কিন্তু আপনি নিশ্চয় কিছু ভাল খবর পেয়েছেন। সত্যি বলুন না।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘বাড়ি থেকে যখন বেরিয়েছিলাম তখনও কিছু খবর পাইনি‌, কিন্তু এখন পেয়েছি।’

‘কী খবর? নেকলেসের সন্ধান পেয়েছেন?’

‘পেয়েছি। সব কথা পরে বলব‌, এখন আমাকে একটা জরুরী কাজে যেতে হবে।’

‘একবারটি ওপরে আসবেন না? বাবা আপনার কাছ থেকে খবর পাবার জন্যে অস্থির হয়ে রয়েছেন।’

ক্ষণেক চিন্তা করিয়া ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘না‌, জরুরী কাজটা আগে সারতে হবে। অজিত‌, তুমি বরঞ্চ ওপরে যাও। রসময়বাবুকে আমার পক্ষ থেকে বলে দিও‌, কাল সকালে তিনি নেকলেস ফিরে পাবেন।’ বলিয়া সে হনহন করিয়া চলিয়া গেল।

আমি মণিময়ের সঙ্গে উপরে গেলাম। রসময়বাবু বিলক্ষণ। হতাশ হইয়া পড়িয়াছিলেন‌, ব্যোমকেশের বাত শুনিয়া বার বার উদ্বেগভরে আমাকে জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলেন‌, ‘সত্যি পাব তো? ঠিক পাব তো?’

আমি বলিলাম, ‘ব্যোমকেশকে কখনও মিথ্যে আশ্বাস দিতে শুনিনি। সে যখন বলেছে পাবেন। তখন নিশ্চয় পাবেন।’ অতঃপর চা, কেক ও ৫৫৫ নম্বর সিগারেট সেবন করিয়া ক্যাডিল্যাকে চড়িয়া গৃহে ফরিলাম।

সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হইয়া গিয়াছিল, কিন্তু ব্যোমকেশ তখনও ফেরে নাই। আরও ঘণ্টাখানেক পরে ফিরিল। জিজ্ঞাসা করিলাম, ‘গিয়েছিলে কোথায়?’

সে বলিল, ‘থানায়। দারোগা অমরেশবাবুর সঙ্গে দরকার ছিল।’

‘কী দরকার?’

‘ভীষণ দরকার। তুমি তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পড়, কাল সকাল সকাল উঠতে হবে।’

আমার কৌতুহল চরিতার্থ করিবার ইচ্ছা তাহার নাই দেখিয়া আমি উঠিয়া পড়িলাম। আহারে বসিলে সত্যবতী আমার মুখ লক্ষ্য করিয়া বলিল, ‘মুখ গোমড়া কেন?’

বলিলাম, ‘তোমার পতিদেবতাটি একটি কচ্ছপ।’

সত্যবতী মুখ টিপিয়া হসিল, ‘এত জন্তু থাকতে কচ্ছপ কেন?’

‘কচ্ছপ কথা কয় না।’

ব্যাপার বুঝিয়া সত্যবতীর মুখ সহানুভূতিতে পূর্ণ হইয়া উঠিল, সে বলিল, ‘সত্যি বাপু। কী রাগ যে হয়। আচ্ছা, আমাদের না হয় বুদ্ধি একটু কম। তাই বলে কৌতুহল তো কম নয়।’

তাড়াতাড়ি খাওয়া সারিয়া শুইয়া পড়িলাম। ঘুম ভাঙিল রাত্রিশেষে, ব্যোমকেশ ঠেলা দিয়া ঘুম ভাঙাইয়া দিল, ‘অজিত, ওঠ ওঠ, এখনি বেরুতে হবে।’

চা প্ৰস্তুত ছিল, তাড়াতাড়ি গলাধঃকরণ করিয়া ব্যোমকেশের সহিত বাহির হইলাম। রাস্তার আলো তখনও নেভে নাই, ঘুমন্ত নগরকে সহস্ৰচক্ষু মেলিয়া পাহারা দিতেছে।

কোথায় চলিয়াছি তখনও জানি না; কিছুদূর অগ্রসর হইবার পর বুঝিলাম, রসময়বাবুর বাড়ির দিকে যাইতেছি। জিজ্ঞাসা করিলাম, ‘শেষরাত্রে রসময়বাবুর সঙ্গে কী দরকার?’

সে বলিল, ‘রসময়বাবুর সঙ্গে দরকার নেই।’

‘তবে? শেষরাত্রে বেরুবার দরকার ছিল কী?’

‘ছিল। জানই তো, ওস্তাদের মার শেষরাত্ৰে?’

‘সোজা কথা বলবে, না কেবল হেঁয়ালি করবে?’

ব্যোমকেশ মুচকি হাসিয়া বলিয়া, ‘রসময়বাবুর বাড়ির দেয়ালে যে ডাক-বাক্স আছে, তার প্রথম ক্লিয়ারেন্সের সময় হচ্ছে পাঁচটা। আজ যখন ডাক-বাক্স খোলা হবে তখন সেখানে উপস্থিত থাকতে চাই।’

মাথার মধ্যে দপদপ করিয়া কয়েকটা বাতি জ্বলিয়া উঠিল, কিন্তু অন্ধকার সম্পূর্ণ দূর হইল না। বলিলাম, তাহলে—?’

ব্যোমকেশ হাত তুলিয়া বলিল, ‘ধৈর্য মানো, সখা, ধৈর্য মানো।’

কয়েকটা গলিখুঁজির ভিতর দিয়া চলিবার পর রসময়বাবুর বাড়ির সম্মুখীন হইলাম। গলি যেখানে বড় রাস্তায় মিলিয়াছে সেখানে দুটা লোক প্রচ্ছন্নভাবে দাঁড়াইয়া আছে। ব্যোমকেশ তাহাদের সহিত ফিসফিস করিয়া কথা বলিল। তারপর আমরাও গলির মুখে প্রচ্ছন্ন হইয়া দাঁড়াইলাম।

হাতঘড়িতে দেখিলাম, পাঁচটা বাজিতে দশ মিনিট। এখনও রাস্তায় লোক চলাচল আরম্ভ হয় নাই, মাঝে মাঝে সক্তি-বোঝাই ট্রাক গুরুগম্ভীর শব্দে চলিয়া যাইতেছে। রসময়বাবুর বাড়ির অভ্যন্তর অন্ধকার, সম্মুখস্থ ল্যাম্পপোস্ট বন্ধ সদর-দরজার উপর আলো ফেলিয়াছে। দরজার পাশে দেয়ালে-গাঁথা ডাক-বোক্সর লাল রঙ অসংখ্য ইস্তাহারে চাপা পড়িয়া গিয়াছে। ওটা যে ডাক-বাক্স, তাহা সহজে নজরে পড়ে না।

একটি একটি করিয়া মিনিট কাটিতেছে। সঞ্চরমাণ মিনিটগুলির লঘু পদধ্বনি নিজের বক্ষ-স্পন্দনে শুনিতে পাইতেছি। …পাঁচটা বাজিল; শরীরের স্নায়ুপেশী শক্ত হইয়া উঠিল।

লোকটা কখন নিঃশব্দে ডাক-বাক্সের সামনে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে। যেন ভৌতিক আবির্ভাব। গায়ে খাকি পোশাক‌, কাঁধে দুটা বড় বড় ঝোলা! ঝোলা দুটা ফুটপাথে নামাইয়া সে পকেট হইতে চাবির গোছা বাহির করিল‌, তারপর ডাক-বাক্সের তালা খুলিতে প্রবৃত্ত হইল।

ব্যোমকেশ হাত নাড়িয়া ইশারা করিল‌, আমরা শিকারীর মত অগ্রসর হইলাম। গলির মুখ হইতে বাহির হইয়া দেখিলাম, রাস্তার দুই দিক হইতে আরও দুই জোড়া লোক আমাদেরই মত ডাক-বাক্সের দিকে অগ্রসর হইতেছে। নিঃসন্দেহে পুলিসের লোক‌, কিন্তু গায়ে ইউনিফর্ম নাই।

লোকটা ডাক-বাক্সের কবাট খুলিয়াছে‌, আমরা গিয়া তাহাকে ঘিরিয়া ধরিলাম। সে খোলা কবাট পিঠ দিয়া আড়াল করিয়া স্খলিত স্বরে বলিল‌, ‘কে‌, কী চাই?’

ব্যোমকেশ কড়া সুরে বলিল‌, ‘তোমার নাম ভূতনাথ দাস। তুমি ভোলার বড় ভাই!’

ভূতনাথ দাসের মুখখানা ভয়ে শীর্ণ-বিকৃত হইয়া গেল‌, চক্ষু দুটা ঠিকরাইয়া বাহির হইবার উপক্রম করিল। সে থারথার কম্পিত কণ্ঠে বলিল‌, ‘কে-কে আপনারা?’

অমরেশবাবু হুঙ্কার দিয়া বলিলেন‌, ‘আমরা পুলিস।’

অমরেশবাবু যে দলের মধ্যে আছেন তাহা প্রথম লক্ষ্য করিলাম। তিনি সামনে আসিয়া দৃঢ়ভাবে ভূতনাথের কাঁধে হাত রাখিলেন। অনুভব করিলাম‌, একটু নাটকীয় ভঙ্গীতে ভূতনাথকে ভয় পাওয়াইবার চেষ্টা হইতেছে। চেষ্টা ফলপ্রসূ হইল। ভূতনাথ একেবারে দিশহারা হইয়া গেল‌, হঠাৎ উগ্র তারস্বরে কাঁদিয়া উঠিল‌, ‘ওরে ভোলা‌, তুই আমার এ কী সর্বনাশ করলি রে! আমার চাকরি যাবে-আমি যে জেলে যাব রে।’

সে থামিতেই অমরেশবাবু তাহার কাঁধে একটা ঝাঁকানি দিয়া বলিলেন‌, ‘কোথায় রেখেছ চোরাই মাল‌, বের কর।’

ভূতনাথ অমরেশবাবুর পায়ের উপর উপুড় হইয়া পড়িল‌, ‘হুজুর‌, ও পাপ জিনিস। আমি ছুঁইনি। ডাক-বোক্সর মধ্যেই আছে।’

ক্ষণকাল স্তব্ধ হইয়া রহিলাম। পরশু মধ্যরাত্রি হইতে আজ সকাল পর্যন্ত নেকলেস রসময়বাবুর বাড়ির দেয়ালে-গাঁথা ডাক-বাক্সের মধ্যেই আছে।

অমরেশবাবু বলিলেন‌, ‘বের কর।’

ভূতনাথ উঠিয়া ডাক-বাক্সের দিকে ফিরিল। ডাক-বাক্সে অনেক চিঠি জমা হইয়াছিল‌, তাহার হাত ঢুকাইয়া বাক্সের পিছন দিকের কোণ হইতে একটি পার্সেল বাহির করিয়া আনিল। সাদা কাপড়ে সেলাই করা ব্ৰাউন ষোলপেজী বইয়ের মত আকার আয়তন। ভূতনাথ সেটি অমরেশবাবুর হাতে দিয়া কাতরস্বরে বলিল‌, ‘এই নিন বাবু। ধর্ম জানে এর ভেতর কী আছে‌, আমি চোখে দেখিনি।’

এই সময় রসময়ের সদর দরজা খুলিয়া গেল! লাঠিতে ভর দিয়া রসময় এবং তাঁহার পিছনে মণিময় ও বধূ। সকলের সদ্য-যুম-ভাঙা চোখে সবিস্ময় উদ্বেগ। রসময় বলিলেন‌, ‘অমরেশবাবু! ব্যোমকেশবাবু? কী হয়েছে? আমার নেকলেস–?’

ব্যোমকেশ অমরেশবাবুর হাত হইতে প্যাকেট লইয়া রসময়ের হাতে দিল, ‘এই নিন আপনার নেকলেস। খুলে দেখুন।’

বেলা আন্দাজ সাড়ে ন’টার সময় আমরা দু’জনে আমাদের বসিবার ঘরে চৌকির উপর মুখোমুখি উপবিষ্ট ছিলাম। সত্যবতীকে আর এক প্রস্থ চায়ের ফরমাশ দেওয়া হইয়াছে। নেকলেস-পর্বের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া চলিতেছে।

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘অনর্থক হয়রানি। ডাক-বাক্সটা দোরের পাশেই আছে। এটা যদি প্রথমে নজরে পড়ত তাহলে পাঁচ মিনিটের মধ্যে সব নিস্পত্তি হয়ে যেত। কলকাতা শহরে দেয়ালে-গাঁথা অসংখ্য ডাক-বাক্স আছে‌, কিন্তু হঠাৎ চোখে পড়ে না। ডাক-বাক্সের রাঙা গায়ে ইস্তাহারের কাগজ জুড়ে তাকে প্রায় অদৃশ্য করে তুলেছে। যারা জানে তাদের কোনও অসুবিধা নেই। কিন্তু যারা জানে না তাদের পক্ষে খুঁজে বার করা মুশকিল।

‘প্রথম যখন নেকলেস চুরির বয়ান শুনলাম‌, তখন তিনজনের ওপর সন্দেহ হল। ভোলা‌, মণিময় এবং মণিময়ের স্ত্রী‌, এদের মধ্যে একজন চোর। কিংবা এমনও হতে পারে যে‌, এই তিনজনের মধ্যে দু’জন ষড় করে চুরি করেছে। মণিময় এবং ভোলার মধ্যে ষড় থাকতে পারে‌, আবার স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ষড় থাকতে পারে। ভোলা এবং মণিময়ের স্ত্রীর মধ্যে সাজশ থাকার সম্ভাবনাটা বাদ দেওয়া যায়।

‘কিন্তু চুরি যে-ই করুক‌, চোরাই মাল গেল কোথায়? চুরি জানাজানি হবার একঘন্টার মধ্যে পুলিস এসে বাড়ির দোতলা তেতলা খানাতল্লাশ করেছিল‌, কিন্তু বাড়িতে মাল পাওয়া গেল না। একমাত্র ভোলাই দুপুর রাত্রে রাস্তায় নেমেছিল। কিন্তু সে বাড়ির সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল‌, দূরে যায়নি। অন্য কোনও লোকের সঙ্গে তার দেখাও হয়নি। ভোলা যদি চুরি করে থাকে‌, তবে সে নেকলেস নিয়ে করল। কী? মণিময় এবং তার স্ত্রীর সম্বন্ধে ওই একই প্রশ্ন-তারা গয়নাটা কোথায় লুকিয়ে রাখল?

‘তিনজনের ওপর সন্দেহ হলেও প্রধান সন্দেহভাজন ব্যক্তি অবশ্য ভোলা। মণিময় যখন নেকলেস এনে বাবাকে দিল তখন সে উপস্থিত ছিল। কেসের মধ্যে দামী গয়না আছে তা অনুমান করা তার পক্ষে শক্ত নয়। সন্ধ্যের সময় সে গামছা কেনার ছুতো করে বাইরে গিয়েছিল; এইটেই তার সবচেয়ে সন্দেহজনক কাজ। সে যদি বাইরের লোকের সঙ্গে সাজশ করে চুরির মতলব করে থাকে। তবে সহকারীকে খবর দিতে যাওয়া তার পক্ষে স্বাভাবিক। কিন্তু সে গয়না। চুরি করে সহকারীকে দিল কী করে?

‘তারপর ধর মণিময়ের কথা। মনে কর‌, মণিময় আর তার স্ত্রীর মধ্যে সাজশ ছিল। মনে কর‌, রাত্রি এগারটার সময় মণিময় ক্লাব থেকে বাড়ি এসেছিল‌, বাপের দেরাজ থেকে গয়না চুরি করে আবার বেরিয়ে গিয়েছিল; তারপর গয়নাটা কোথাও লুকিয়ে রেখে পৌঁনে বারটার সময় বাড়ি ফিরে এসেছিল। অসম্ভব নয়; কিন্তু তা যদি হয়‌, তাহলে ভোলা কি জানতে পারত না? জানতে পারলে সে কি চুপ করে থাকত?

এই সময় সত্যবতী চা লইয়া প্রবেশ করিল এবং আমাদের সামনে পেয়ালা রাখিয়া হাসি-হাসি মুখে বলিল‌, ‘এই যে‌, কচ্ছপের মুখে বুলি ফুটেছে দেখছি।’

ব্যোমকেশ কটমট করিয়া চাহিল। কিন্তু সত্যবতী তাহার রোষদৃষ্টি সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করিয়া বলিল‌, ‘বলছ বল‌, এখন আমার হাত জোড়া। পরে কিন্তু আবার বলতে হবে।’ বলিয়া সে চলিয়া গেল।

আমরা কিছুক্ষণ নীরবে বসিয়া চা পান করিলাম। কচ্ছপের উপমাটা ব্যোমকেশের পছন্দ হয় নাই‌, তাহা বুঝিতে কষ্ট হইল না। মনে আমোদ অনুভব করিলাম। এবার সুবিধা পাইলেই তাহাকে কচ্ছপ বলিব।

যাহোক‌, কিছুক্ষণ পরে সে আবার বলিতে আরম্ভ করিল‌, ‘মণিময় আর বৌয়ের ওপর যে সন্দেহ হয়েছিল‌, সেটা স্রেফ সুযোগের কথা ভেবে। মোটিভের কথা তখনও ভাবিনি। মণিময়ের মোটা টাকার দরকার হতে পারে‌, তার বৌয়ের গয়নার প্রতি লোভ থাকতে পারে; কিন্তু ওদের পারিবারিক জীবন যতটা দেখলাম তাতে চুরি করার দরকার আছে বলে মনে হয় না। রসময়বাবু স্নেহময় পিতা‌, স্নেহময় শ্বশুর। ছেলে এবং পুত্রবধূকে তাঁর অদেয় কিছুই নেই। যা চাইলেই পাওয়া যায় তা কেউ চুরি করে না।

‘ভোলার কথা কিন্তু সম্পূর্ণ আলাদা। সুযোগ এবং মোটিভ‌, দুই-ই তার পুরোমাত্রায় আছে। লোকটা ভারী ধূর্ত আর স্থিরবুদ্ধি। হয়তো চাকরিতে ঢুকে অবধি সে চুরির মতলব আঁটছিল এবং মনে মনে প্ল্যান ঠিক করে রেখেছিল। কাল বিকালবেলা মস্ত দাঁও মারবার সুযোগ জুটে গেল। বাড়িতে দামী গয়না এসেছে‌, কিন্তু গিন্নী সিন্দুকের চাবি নিয়ে তীর্থ করতে চলে গেছেন।

‘ভোলার সাজশ ছিল তার বড় ভাই ভূতনাথের সঙ্গে। ভেবে দেখ‌, কেমন যোগাযোগ। ভূতনাথ পোস্ট-অফিসে কাজ করে; তার কাজ হচ্ছে রাস্তার ধারের ডাক-বাক্স থেকে চিঠি নিয়ে ঝোলায় ভরে পোস্ট-অফিসে পৌঁছে দেওয়া। হালফিল বৌবাজার এলাকায় তার কোজ; সকাল বিকেল দুপুরে তিনবার এসে সে ডাক-বাক্স পরিষ্কার করে নিয়ে যায়।

‘ভোলা গামছা কেনার ছুতো করে ভূতনাথের কাছে গেল। তাকে বলে এল‌, সকালবেলা ডাক পরিষ্কার করতে গিয়ে সে ওই ডাক-বাক্সটার মধ্যে একটা প্যাকেট পাবে‌, সেটা যেন সে নিয়ে না যায়‌, ডাক-বাক্সতেই রেখে দেয়। তারপর পুলিসের হাঙ্গামা কেটে যাবার পর সেটা বাড়ি নিয়ে যাবে। সাধারণ ডাক-বাক্সে প্যাকেট কেউ ফেলে না‌, তাই প্যাকেট চিনতে কোনও কষ্ট নেই। বিশেষত এই প্যাকেটে সম্ভবত ঠিকানা লেখা থাকবে না।

‘ভূতনাথ লোকটা ভালমানুষ গোছের। কিন্তু সে লোভে পড়ে গেল। লোভে পাপ‌, পাপে মৃত্যু। চাকরি তো যাবেই‌, সম্ভবত শ্ৰীঘর বাসও হবে।

‘কাল বিকেল পর্যন্ত আমি অন্ধকারে হাতড়াচ্ছিলাম। তারপর যেই দেখলাম মণিময় ডাক-বাক্সে চিঠি ফেলছে অমনি সব পরিষ্কার হয়ে গেল। ভোলা বলেছিল তার এক ভাই পোস্ট-অফিসে চাকরি করে। কে চোর‌, কী চুরি করেছে‌, চোরাই মাল কোথায় আছে‌, কিছু অজানা রইল না। ভোলা সিঁড়ি দিয়ে নেমে টুক করে প্যাকেটটা ডাক-বাক্সে ফেলে আবার উপরে উঠে গিয়েছিল। হয়তো দরজার সামনে মিনিটখানেক দাঁড়িয়েছিল হাঁফ নেবার জন্যে। মণিময় যে ক্লাব থেকে ফেরেনি এবং মণিময়ের বৌ যে জানালায় দাঁড়িয়ে স্বামীর পথ চেয়ে আছে তা সে জানত না।

‘আমি যখন ব্যাপার বুঝতে পারলাম‌, তখন সটান অমরেশবাবুর কাছে গেলাম। ভোলার দাদা ভূতনাথ কী কাজ করে‌, পোস্ট-অফিসে খবর নিয়ে জানা গেল। তখন বাকী রইল। শুধু আসামীদের ফাঁদ পেতে ধরা এবং স্বীকারোক্তি আদায় করা।’

দরজায় ঠক্‌ ঠহ্‌ শব্দ শুনিয়া দ্বার খুলিলাম। মণিময় দাঁড়াইয়া আছে। হাসিমুখে বলিল‌, ‘বাবা পাঠালেন।’

ব্যোমকেশ ভিতর হইতে বলিল‌, ‘আসুন মণিময়বাবু।’

মণিময় ভিতরে আসিয়া বসিল‌, পকেট হইতে একটি ছোট্ট নীল মখমলের কোঁটা লইয়া ব্যোমকেশের সম্মুখে রাখিল‌, ‘বাবা এটি আপনার জন্যে পাঠালেন। তিনি নিজেই আসতেন‌, কিন্তু তাঁর পা—’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘না না‌, উপযুক্ত ছেলে থাকতে তিনি বুড়োমানুষ আসবেন কেন? তা–নেকলেস পেয়ে তিনি খুশি হয়েছেন?’

মণিময় হাসিয়া ঘাড় নাড়িল‌, ‘সে আর বলতে! তিনি আমাকে বলতে বলেছেন‌, এই সামান্য জিনিসটা আপনার প্রতিভার উপযুক্ত নয়‌, তবু আপনাকে নিতে হবে।’

‘কী সামান্য জিনিস?’ ব্যোমকেশ কোঁটা লইয়া খুলিল; একটা মটরের মত হীরা ঝকঝক করিয়া উঠিল। হীরার আংটি? ব্যোমকেশ আংটিটা সসন্ত্রম চক্ষে নিরীক্ষণ করিয়া বলিল‌, ‘ধন্যবাদ। আপনার বাবাকে বলবেন আংটি আমি নিলাম। এটাকে দেখে মনে হচ্ছে। আমি এর উপযুক্ত নই। চললেন না কি? চা খেয়ে যাবেন না?’

মণিময় বলিল‌, ‘আজ একটু তাড়া আছে। দুপুরের প্লেনে দিল্লী যেতে হবে। ফিরে এসে আর একদিন আসব‌, তখন চা খাব।’

মণিময় চলিয়া গেল। প্ৰায় সঙ্গে সঙ্গে ভিতর দিক হইতে সত্যবতী প্রবেশ করিল। বোধ হয়। পর্দার আড়ালে ছিল। ললিতকণ্ঠে বলিল‌, ‘দেখি দেখি‌, কী পেলে?’

ব্যোমকেশ আংটির কোঁটা লুকাইয়া ফেলিবার তালে ছিল‌, আমি কাড়িয়া লইয়া সত্যবতীকে দিলাম। বলিলাম‌, ‘এই নাও। এটা ব্যোমকেশের প্রতিভার উপযুক্ত নয়‌, এবং ব্যোমকেশ এর উপযুক্ত নয়। সুতরাং এটা তোমার।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘আরো আরে‌, এ কী?’

আংটি দেখিয়া সত্যবতীর চক্ষু আনন্দে বিস্ফারিত হইল‌, ‘ও মা‌, হীরের আংটি‌, ভীষণ দামী আংটি! হীরেটারই দাম হাজার খানেক।’ আংটি নিজের আঙুলে পরিয়া সত্যবতী ঘুরাইয়া ফিরাইয়া দেখিল‌, ‘কেমন মানিয়েছে বল দেখি!-ঐ যাঃ‌, মাছের ঝোল চড়িয়ে এসেছি‌, এতক্ষণে বোধহয় পুড়ে ঝুড়ে শেষ হয়ে গেল।’ সত্যবতী আংটি পরিয়া চকিতে অন্তৰ্হিত হইল।

ব্যোমকেশ তক্তপোশে এলাইয়া পড়িয়া গভীর নিশ্বাস মোচন করিল‌, বলিল‌, ‘গহনা কৰ্মণো গতিঃ।

বলিলাম‌, ঠিক কথা। এবং গহনার গতি গৃহিণীর দিকে।’

অমৃতের মৃত্যু

গ্রামের নাম বাঘমারি। রেল-লাইনের ধারেই গ্রাম‌, কিন্তু গ্ৰাম হইতে স্টেশনে যাইতে হইলে মাইলখানেক হাঁটিতে হয়। মাঝখানে ঘন জঙ্গল। গ্রামের লোক স্টেশন যাইবার সময় বড় একটা জঙ্গলের ভিতর দিয়া যায় না‌, রেল-লাইনের তারের বেড়া। টপকাইয়া লাইনের ধার দিয়া যায়।

স্টেশনের নাম সান্তালগোলা। বেশ বড় স্টেশন‌, স্টেশন ঘিরিয়া একটি গঞ্জ গড়িয়া উঠিয়াছে। অঞ্চলটা ধান্য-প্রধান। এখান হইতে ধান-চাল রপ্তানি হয়। গোটা দুই চালের কলও আছে।

যুদ্ধের সময় একদল মার্কিন সৈন্য সান্তালগোলা ও বাঘমারির মধ্যস্থিত জঙ্গলের মধ্যে কিছুকাল ছিল; তাহারা খালি গায়ে প্যান্ট পরিয়া ঘুরিয়া বেড়াইত‌, চাষীদের সঙ্গে বসিয়া ডাবা-হুঁকায় তামাক খাইত। তারপর যুদ্ধের শেষে তাহারা স্বদেশে ফিরিয়া গেল‌, রাখিয়া গেল কিছু অবৈধ সন্তানসন্ততি এবং কিছু ক্ষুদ্রায়তন অস্ত্রশস্ত্র।

ব্যোমকেশ ও আমি যে-কর্ম উপলক্ষে সান্তালগোলায় গিয়া কিছুকাল ছিলাম তাহার সহিত উক্ত অস্ত্রশস্ত্রের সম্পর্ক আছে‌, তাহার বিশদ উল্লেখ যথাসময়ে করিব। উপস্থিত যে কাহিনী লিখিতেছি। তাহার ঘটনাকেন্দ্র ছিল বাঘমারি গ্রাম‌, এবং যাহাদের মুখে কাহিনীর গোড়ার দিকটা শুনিয়াছিলাম। তাহারা এই গ্রামেরই ছেলে। বাকবাহুল্য বর্জনের জন্য তাঁহাদের মুখের কথাগুলি সংহত আকারে লিখিতেছি।

বাঘমারি গ্রামে যে কয়টি কোঠাবাড়ি আছে তন্মধ্যে সদানন্দ সুরের বাড়িটা সবচেয়ে পুরাতন। গুটিতিনেক ঘর‌, সামনে শান-বাঁধানো চাতাল‌, পিছনে পাঁচিল—ঘেরা উঠান। বাড়ির ঠিক পিছন হইতে জঙ্গল আরম্ভ হইয়াছে।

সদানন্দ সুর বয়স্থ ব্যক্তি‌, কিন্তু তাঁহার জ্ঞাতি-গোষ্ঠী স্ত্রী-পুত্র কেহ নাই‌, একলাই পৈতৃক ভিটায় থাকেন। তাঁহার একটি বিবাহিতা ভগিনী আছে বটে‌, স্বামী রেলের চাকরি করে‌, কিন্তু তাহারা

সম্পর্ক খুব গাঢ় নয়‌, কাহারও সহিত অসদ্ভাব না থাকিলেও বেশি মাখামাখিও নাই। বেশির ভাগ দিন সকালবেলা উঠিয়া তিনি স্টেশনের গঞ্জে চলিয়া যান‌, সন্ধ্যার সময় গ্রামে ফিরিয়া আসেন। তিনি কী কাজ করেন। সে সম্বন্ধে কাহারও মনে খুব স্পষ্ট ধারণা নাই। কেহ বলে ধান-চালের দালালি করেন; কেহ বলে বন্ধকী কারবার আছে। মোটের উপর লোকটি অত্যন্ত সংবৃতমন্ত্র ও মিতব্যয়ী‌, ইহার অধিক তাঁহার বিষয়ে বড় কেহ কিছু জানে না।

একদিন চৈত্র মাসের ভোরবেলা সদানন্দ বাড়ি হইতে বাহির হইলেন; একটি মাঝারি আয়তনের ট্রাঙ্ক ও একটি ক্যাম্বিসের ব্যাগ বাহিরে রাখিয়া দরজায় তালা লাগাইলেন। তারপর ব্যাগ ও ট্রাঙ্ক দুই হাতে ঝুলাইয়া যাত্রা করিলেন।

বাড়ির সামনে মাঠের মতো খানিকটা খোলা জায়গা। সদানন্দ মাঠ পার হইয়া রেল-লাইনের দিকে চলিয়াছেন‌, গ্রামের বৃদ্ধ হীরু মোড়লের সঙ্গে দেখা হইয়া গেল। হীরু বলিল‌, ‘কী গো কত্তা‌, সকালবেলা বাক্স-প্যাটরা লিয়ে কোথায় চলেছেন?’

সদানন্দ থামিলেন‌, ‘দিন কয়েকের জন্য বাইরে যাচ্ছি।’

হীরু বলিল‌, ‘অ। তিত্থিধৰ্ম্ম করতে চললেন নাকি?’

সদানন্দ শুধু হাসিলেন। হীরু বলিল‌, ইরির মধ্যে তিত্থিধৰ্ম্ম? বয়স কত হল কত্তা?’

‘পঁয়তাল্লিশ।।’ সদানন্দ আবার চলিলেন।

‘দিন ছ’সাতের মধ্যেই ফিরব।’

সদানন্দ চলিয়া গেলেন।

তাঁহার আকস্মিক তীর্থযাত্ৰা লইয়া গ্রামে একটু আলোচনা হইল। তাঁহার প্রাণে যে ধর্মকর্মের প্রতি আসক্তি আছে। এ সন্দেহ কাহারও ছিল না। গত দশ বৎসরের মধ্যে এক রাত্রির জন্যও তিনি বাহিরে থাকেন নাই। সকলে আন্দাজ করিল নীরব-কমা সদানন্দ সুর কোনও মতলবে বাহিরে গিয়াছেন।

ইহার দিন তিন চার পরে সদানন্দের বাড়ির সামনের মাঠে গ্রামের ছেলে-ছোকরারা বসিয়া জটলা করিতেছিল। গ্রামে পঁচিশ-ত্রিশ ঘরে ভদ্রশ্রেণীর লোক বাস করে; সন্ধ্যার পর তরুণ-বয়স্কেরা এই মাঠে আসিয়া বসে‌, গল্প গুজব করে‌, কেহ গান গায়‌, কেহ বিড়ি-সিগারেট টানে। শীত এবং বর্ষাকাল ছাড়া এই স্থানটাই তাঁহাদের আড্ডাঘর।

আজ অমৃত নামধারী জনৈক যুবককে সকলে মিলিয়া ক্ষেপাইতেছিল। অমৃত গাঁয়ের একটি ভদ্রলোকের অনাথ ভাগিনেয়‌, একটু আধ-পাগলা গোছের ছেলে। রোগা তালপাতার সেপাইয়ের মত চেহারা‌, তড়বড় করিয়া কথা বলে‌, নিজের সাহস ও বুদ্ধিমত্তা প্রমাণের জন্য সর্বদাই সচেষ্ট। তাই সুযোগ পাইলে সকলেই তাঁহাকে লইয়া একটু রঙ্গ-তামাশা করে।

সকালের দিকে একটা ব্যাপার ঘটিয়াছিল।–নাদু নামক এক যুবকের সম্প্রতি বিবাহ হইয়াছে; তাহার বৌয়ের নাম পাপিয়া। বৌটি সকালবেলা কলসী লইয়া পুকুরে জল আনিতে যাইতেছিল‌, ঘাটে অন্য মেয়েরাও ছিল। অমৃত পুকুরপাড়ে বসিয়া খোলামকুচি দিয়া জলের উপর ব্যাঙ-লাফানো খেলিতেছিল; নাদুর বৌকে দেখিয়া তাহার কি মনে হইল‌, সে পাপিয়ার স্বর অনুসরণ করিয়া ডাকিয়া উঠিল—’পিউ পিউ-পিয়া পিয়া পাপিয়া—’

মেয়েরা হাসিয়া উঠিল। বৌটি অপমান বোধ করিয়া তখনই গৃহে ফিরিয়া গেল এবং স্বামীকে জানাইল। নাদু অগ্নিশম্য হইয়া লাঠি হাতে ছুটিয়া আসিল। তাহাকে‌, দেখিয়া অমৃত পুকুরপাড়ের একটা নারিকেল গাছে উঠিয়া পড়িল। তারপর গাঁয়ের মাতব্রর ব্যক্তিরা আসিয়া শান্তিরক্ষা করিলেন। অমৃতের মনে যে কু-অভিপ্ৰায় ছিল না। তাহা সকলেই জানিত‌, গোঁয়ার-গোবিন্দ নাদুও বুঝিল। ব্যাপার বেশিদূর গড়াইতে পাইল না।

কিন্তু অমৃত তাহার সমবয়স্কদের শ্লেষ-বিদ্রুপ হইতে নিস্তার পাইল না। সন্ধ্যার সময় সে মাঠের আড়ায় উপস্থিত হইলেই সকলে তাহাকে ছাঁকিয়া ধরিলা।

পটল বলিল‌, ‘হ্যাঁরে অমর্ত‌, তুই এতবড় বীর‌, নাদুর সঙ্গে লড়ে যেতে পারলি না? নারকেল গাছে উঠলি।’

অমৃত বলিল‌, ‘আিৰ্হঃ‌, আমি তো ডাব পড়তে উঠেছিলাম। নেদোকে আমি ডরাই না‌, ওর হাতে যদি লাঠি না থাকত। অ্যায়সা লেঙ্গি মারতাম যে বাছাধনকে বিছানায় পড়ে কো-কোঁ করতে হত!’

গোপাল বলিল‌, ‘শাবাশ! বাড়ি গিয়ে মামার কাছে খুব ঠেঙানি খেয়েছিলি তো?’

অমৃত হাত মুখ নাড়িয়া বলিল‌, ‘মামা মারেনি‌, মামা আমাকে ভালবাসে। শুধু মামী কান মলে দিয়ে বলেছিল—তুই একটা গো-ভূত।’

সকলে হি-হি করিয়া হাসিল। পটল বলিল ছিছি‌, তুই এমন কাপুরুষ! মেয়েমানুষের হাতের কানমলা খেলি?’

অমৃত বলিল‌, ‘মামী গুরুজন‌, তাই বেঁচে গেল‌, নইলে দেখে নিতাম। আমার সঙ্গে চালাকি নয়।’

দাশু‌ বলিল, ’আচ্ছা অম্‌রা‌, তুই তো মানুষকে ভয় করিস না। সত্যি বল দেখি‌, ভূত দেখলে কি করিস?’

একজন নিম্নস্বরে বলিল‌, ‘কাপড়ে-চোপড়ে–’

অমৃত চোখ পাকাইয়া বলিল‌, ‘ভূত আমি দেখেছি। কিন্তু মোটেই ভয় পাইনি।’।

সকলে কলরব করিয়া উঠিল‌, ‘ভূত দেখেছিস? কবে দেখলি? কোথায় দেখলি?’

অমৃত সগর্বে জঙ্গলের দিকে শীর্ণ বাহু প্রসারিত করিয়া বলিল‌, ‘ঐখানে।’

‘কবে দেখেছিস? কী দেখেছিস?’

অমৃত গম্ভীর স্বরে বলিল‌, ‘ঘোড়া-ভূত দেখেছি।’

দু’একজন হাসিল। গোপাল বলিল‌, ‘তুই গো-ভূত কিনা‌, তাই ঘোড়া-ভূত দেখেছিস। কবে দেখলি?’

‘পরশু রাত্তিরে।’ অমৃত পরশু রাত্রের ঘটনা বলিল, ‘আমাদের কৈলে বাছুরটা দড়ি খুলে গোয়ালঘর থেকে পালিয়েছিল। মামা বললে‌, যা আমরা‌, জঙ্গলের ধারে দেখে আয়। রাত্তির তখন দশটা; কিন্তু আমার তো ভয়-ডর নেই‌, গেলাম জঙ্গলে। এদিক ওদিক খুঁজলাম‌, কিন্তু কোথায় বাছুর। চাঁদের আলোয় জঙ্গলের ভেতরটা হিলি-বিলি দেখাচ্ছে–হঠাৎ দেখি একটা ঘোড়া। খুরের শব্দ শুনে ভেবেছিলাম বুঝি বাছুরটা; ঘাড় ফিরিয়ে দেখি একটা ঘোড়া বনের ভেতর দিয়ে সাঁ করে চলে গেল। কালো কুচকুচে ঘোড়া‌, নাক দিয়ে আগুন বেরুচ্ছে। আমি রামনাম করতে করতে ফিরে এলাম। রামনাম জপলে ভূত আর কিছু বলতে পারে না।’

দাশু জিজ্ঞাসা করিল‌, ‘কোন দিক থেকে কোন দিকে গেল ঘোড়া-ভূত?’

‘গায়ের দিক থেকে ইস্টিশানের দিকে।’

‘ঘোড়ার পিঠে সওয়ার ছিল?’

‘অত দেখিনি।’

সকলে কিছুক্ষণ চুপ করিয়া রহিল। ভূতের গল্প বানাইয়া বলিতে পারে এত কল্পনাশক্তি অমৃতের নাই। নিশ্চয় সে জ্যান্ত ঘোড়া দেখিয়াছিল। কিন্তু জঙ্গলে ঘোড়া আসিল কোথা হইতে? গ্রামে কাহারও ঘোড়া নাই। যুদ্ধের সময় যে মার্কিন সৈন্য জঙ্গলে ছিল তাহদের সঙ্গেও ঘোড়া ছিল না। ইস্টিশনের গঞ্জে দুই-চারিটা ছ্যাকড়া-গাড়ির ঘোড়া আছে বটে। কিন্তু ছ্যাকড়া-গাড়ির ঘোড়া রাত্ৰিবেলা জঙ্গলে ছুটাছুটি করিবে কেন? তবে কি অমৃত পলাতক বাছুরটাকেই ঘোড়া বলিয়া ভুল করিয়াছিল?

অবশেষে পটল বলিল‌, ‘বুঝেছি‌, তুই বাছুর দেখে ঘোড়া-ভূত ভেবেছিলি।’

অমৃত সজোরে মাথা ঝাঁকাইয়া বলিল‌, ‘না না‌, ঘোড়া। জলজ্যান্ত ঘোড়া-ভূত আমি দেখেছি।’

‘তুই বলতে চাস ঘোড়া-ভূত দেখেও তোর দাঁত-কপাটি লাগেনি?’

‘দাঁত-কপাটি লাগবে কেন? আমি রামনাম করেছিলাম।’

‘রামনাম করেছিলি বেশ করেছিলি। কিন্তু ভয় পেয়েছিলি বলেই না। রামনাম করেছিলি?’

‘মোটেই না‌, মোটেই না’-অমৃত আস্ফালন করিতে লাগিল‌, ‘কে বলে আমি ভয় পেয়েছিলাম! ভয় পাবার ছেলে আমি নয়।’

দাশু বলিল‌, ‘দ্যাখ আমরা‌, বেশি বড়াই করিাসনি। তুই এখন জঙ্গলে যেতে পারিস?’

‘কোন পারব না’ অমৃত ঈষৎ শঙ্কিতভাবে জঙ্গলের দিকে তাকাইল। ইতিমধ্যে সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হইয়া চাঁদের আলো ফুটিয়াছে‌, জঙ্গলের গাছগুলা ঘনকৃষ্ণ ছায়া রচনা করিয়াছে; অমৃত একটু মুড়ি দিয়া বলিল‌, ইচ্ছে করলেই যেতে পারি‌, কিন্তু বাব কেন? এখন তো আর বাছুর হারায়নি।’

গোপাল বলিল‌, ‘বাছুর না হয় হারায়নি। কিন্তু তুই গুল মারছিস কিনা বুঝব কি করে?’

অমৃত লাফাইয়া উঠিল‌, ‘গুল মারছি! আমি গুল মারছি! দ্যাখ গোপালা‌, তুই আমাকে চিনিস না—’

‘বেশ তো‌, চিনিয়ে দে। যা দেখি একলা জঙ্গলের মধ্যে। তবে বুঝব তুই বাহাদুর।’

অমৃত আর পারিল না‌, সদৰ্পে বলিল‌, ‘যাচ্ছি—এক্ষুনি যাচ্ছি। আমি কি ভয় করি নাকি?’ সে জঙ্গলের দিকে পা বাড়াইল।

পটল তাহাকে ডাকিয়া বলিল‌, ‘শোন‌, এই খড়ি নে। বেশি দূর তোকে যেতে হবে না‌, সদানন্দদার বাড়ির পিছনে যে বড় শিমুলগাছটা আছে তার গায়ে খড়ি দিয়ে ঢারা মেরে আসবি। তবে বুঝব তুই সত্যি গিয়েছিলি।’

খড়ি লইয়া ঈষৎ কম্পিত্যকণ্ঠে অমৃত বলিল‌, ‘তোরা এখানে থাকিবি তো?’

‘থাকব।’

অমৃত জঙ্গলের দিকে পা বাড়াইল। যতাই অগ্রসর হইল ততাই তাহার গতিবেগ হ্রাস হইতে লাগিল। তবু শেষ পর্যন্ত সে সদানন্দ সুরের বাড়ির আড়ালে অদৃশ্য হইয়া গেল।

মাঠে উপবিষ্ট ছোকরার দল পাণ্ডুর জ্যোৎসার ভিতর দিয়া নীরবে জঙ্গলের দিকে চাহিয়া রহিল। একজন বিড়ি ধরাইল। একজন হাসিল‌, ‘আমরা হয়তো সদানন্দদার বাড়ির পাশে ঘাপটি মেরে বসে আছে।’

কিছুক্ষণ কাটিয়া গেল। সকলের দৃষ্টি জঙ্গলের দিকে।

হঠাৎ জঙ্গল হইতে চড়াৎ করিয়া একটা শব্দ আসিল। শুকনো গাছের ডাল ভাঙ্গিলে যেরূপ শব্দ হয়। অনেকটা সেইরূপ। সকলে চকিত হইয়া পরস্পরের পানে চাহিল।

আরও কিছুক্ষণ কাটিয়া গেল। কিন্তু অমৃত ফিরিয়া আসিল না। অমৃত যেখানে গিয়াছে‌, ছোকরাদের দল হইতে সেই শিমুলগাছ বড়জোর পঞ্চাশ-ষাট গজ। তবে সে ফিরিতে এত দেরি করিতেছে কেন!

আরও তিন-চার মিনিট অপেক্ষা করিবার পর পটল উঠিয়া দাঁড়াইয়া বলিল‌, ‘চল দেখি গিয়ে। এত দেরি করছে কেন অম্‌রা!

সকলে দল বাঁধিয়া যে-পথে অমৃত গিয়াছিল সেই পথে চলিল। একজন রহস্য করিয়া বলিল‌, ‘আমরা ঘোড়া-ভূতের পিঠে চড়ে পালাল নাকি?’

আমরা কিন্তু পালায় নাই। সদানন্দ সুরের বাড়ির খিড়কি হইতে বিশ-পাঁচশ গজ দূরে শিমুলগাছ। সেখানে জ্যোৎস্না-বিদ্ধ অন্ধকারে সাদা রঙের কি একটা পড়িয়া আছে। সকলে কাছে গিয়া দেখিল-অমৃত।

একজন দেশলাই জ্বালিল। অমৃত চিৎ হইয়া পড়িয়া আছে‌, তাহার বুকের জামা রক্তে ভিজিয়া উঠিয়াছে।

অমৃত ভূতের ভয়ে মরে নাই‌, বন্দুকের গুলিতে তাহার মৃত্যু হইয়াছে।

ব্যোমকেশ আমাকে লইয়া সান্তালগোলায় আসিয়াছিল একটা সরকারী তদন্ত উপলক্ষে। সরকারের বেতনভুক পুলিস-কর্মচারীরা ব্যোমকেশকে মেহের চোখে দেখেন না বটে‌, কিন্তু মন্ত্রিমহলে তাহার খাতির আছে। পুলিসের জবাব দেওয়া কেস মাঝে মাঝে তাহার ঘাড়ে আসিয়া পড়ে।

গত মহাযুদ্ধের সময় অনেক বিদেশী সৈন্য আসিয়া এদেশের নানা স্থানে ঘাঁটি গাড়িয়া বসিয়াছিল; তারপর যুদ্ধের শেষে বিদেশীরা চলিয়া গেল‌, দেশে স্বদেশী শাসনতন্ত্র প্রবর্তিত হইল। স্বাধীনতার রক্ত-স্নান শেষ করিয়া দেশ যখন মাথা তুলিল তখন দেখিল হ্রদের উপরিভস্ট শান্ত হইয়াছে বটে‌, কিন্তু তলদেশে হিংসুক নক্বকুল ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। বিদেশী সৈন্যদলের ফেলিয়া-যাওয়া অস্ত্রশস্ত্র হইয়া দাঁড়াইয়াছে এই নক্বকুলের নখদন্ত। রেলের দুর্ঘটনা‌, আকস্মিক বোমা বিস্ফোরণ‌, সশস্ত্র ডাকাতি-নূতন শাসনতন্ত্রকে উদব্যস্ত করিয়া তুলিল।

পুলিস তদন্তে দু’চারজন দুৰ্বত্ত ধরা পড়িলেও‌, বোমা পিস্তল প্রভৃতি আগ্নেয়াস্ত্র কোথা হইতে সরবরাহ হইতেছে তাহার হদিস মিলিল না। বিদেশী সিপাহীরা যেখানে ঘাঁটি‌, গাড়িয়াছিল‌, অস্ত্রগুলি যে তাহার কাছেপিঠেই সঞ্চিত হইয়াছে তাহা অনুমান করা শক্ত নয়; কিন্তু আসল সমস্যা দাঁড়াইয়াছিল অস্ত্র-সরবরাহকারী লোকগুলাকে ধরা। যাহারা অবৈধ আগ্নেয়াস্ক্রের কালাবাজার চালাইতেছে তাহাদের ধরিতে না পারিলে এ উৎপাতের মুলোচ্ছেদ হইবে না।

সরকারী দপ্তরের সহিত পরামর্শ করিয়া ব্যোমকেশ প্রথমে সন্তালগোলায় আসিয়াছে। স্থানটি ছোট‌, কোন অবস্থাতেই তাহাকে শহর বলা চলে না। স্টেশনের কাছে রোল-কর্মচারীদের একসারি কোয়ার্টার। একটা পাকা রাস্তা স্টেশনকে স্পর্শ করিয়া দুই দিকে মোড় ঘুরিয়া গিয়াছে এবং কুক্তি পাঁচশ বিঘা জমিকে বেষ্টন করিয়া ধরিয়াছে; এই স্থানটুকুর মধ্যে কয়েকটা বড় বড় আড়ত‌, পুলিস থানা‌, পোস্ট-অফিস‌, কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্ক‌, সরকারী বিশ্রান্তি গৃহ ইত্যাদি আছে। যে দু’টি চাল-কলের উল্লেখ পূর্বে করিয়াছি সে দু’টি এই রাস্তা-ঘেরা স্থানের দুই প্রান্তে অবস্থিত। স্থানীয়–লোক অধিকাংশ বাঙালী হইলেও‌, মাড়োয়ারী ও হিন্দুস্থানী যথেষ্ট আছে।

আমরা সরকারী বিশ্রান্তিগুহে আড্ডা গাড়িয়াছিলাম। ব্যোমকেশের এখানে আত্মপরিচয় দিবার ইচ্ছা ছিল না‌, এ ধরনের তদন্তে যতটা প্রচ্ছন্ন থাকা যায় ততাই সুবিধা; কিন্তু আসিয়া দেখিলাম ব্যোমকেশের পরিচয় ও আগমনের উদ্দেশ্য কাহারও অবিদিত নাই। স্থানীয় পুলিসের দারোগ’ সুখময় সামন্ত পুলিস বিভাগ হইতে ব্যোমকেশ সম্বন্ধে পূর্ব হইতেই ওয়াকিবহাল ছিলেন‌, তাঁহার কৃপায় ব্যোমকেশের খ্যাতি দিকে দিকে ব্যাপ্ত হইয়াছে।

দারোগা সুখময়বাবুর মুখ ভারি মিষ্ট‌, কিন্তু মস্তিষ্কটি দুষ্টবুদ্ধিতে ভরা। তিনি প্রকাশ্যে ব্যোমকেশকে সাহায্য করিতেছিলেন এবং অপ্রকাশ্যে যত ভাবে সম্ভব বাগড়া দিতেছিলেন পুলিস যেখানে ব্যর্থ হইয়াছে‌, একজন বাহিরের লোক আসিয়া সেখানে কৃতকার্য হইবে‌, ইহা বোধ হয় তাঁহার মনঃপুত হয় নাই।

যাহোক‌, বাধাবিঘ্ন সত্ত্বেও ব্যোমকেশ কাজ আরম্ভ করিল। পরিচয় গোপন রাখা সম্ভব নয়। দেখিয়া প্রকাশ্যভাবেই অনুসন্ধান শুরু করিল। খোলাখুলি থানায় গিয়া দারোগা সুখময়বাবুর নিকট হইতে স্থানীয় প্রধান প্রধান ব্যক্তির নামের তালিকা সংগ্রহ করিল। স্টেশনে গিয়া মাস্টার‌, মালবাবু্‌, টিকিট-বাবু্‌, চেকার প্রভৃতির সহিত ভাব জমাইল; কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্কে গিয়া ম্যানেজারের নিকট হইতে স্থানীয় বিত্তবান ব্যক্তিদের খোঁজখবর লইল। সকলেই জানিতে পারিয়াছিল ব্যোমকেশ কি জন্য আসিয়াছে‌, তাই সকলে সহযোগিতা করিলেও বিশেষ কোনও ফল হইল না।

চার পাঁচ দিন বৃথা ঘোরাঘুরির পর ব্যোমকেশ এক মতলব বাহির করিল। স্থানীয় যে-কয়জন বর্ধিষ্ণু লোককে সন্দেহ করা যাইতে পারে তাহাদের বেনামী চিঠি লিখিল। চিঠির মর্ম : আমি তোমার গোপন কার্যকলাপ জানিতে পারিয়াছি‌, শীঘ্রই দেখা হইবে। —চিঠিগুলি আমি দুই-তিন স্টেশন দূরে জংশনে গিয়া ডাকে দিয়া আসিলাম।

চার ফেলিয়া বসিয়া আছি‌, কিন্তু মাছের দেখা নাই। এইভাবে আরও দুই তিন দিন কাটিয়া গেল। নিষ্কমার মতো দিন রাত্রে ঘুমাইয়া ও সকাল সন্ধ্যা ভ্বমণ করিয়া স্বাস্থ্যের বেশ উন্নতি হইতে লাগিল। কিন্তু কাজের সুরাহা হইল না।

তারপর একদিন সকালবেলা বাঘমারি গ্রাম হইতে তিনটি ছেলে আসিয়া উপস্থিত হইল।

বেলা আন্দাজ আটটার সময় গরম জিলাপী সহযোগে গরম দুদ্ধ সেবন করিয়া অভ্যন্তরভাগে বেশ একটি তৃপ্তিকর পরিপূর্ণতা অনুভব করিতেছি‌, এমন সময় দ্বারের কাছে কয়েকটি মুণ্ড উঁকিঝুঁকি মারিতেছে দেখিয়া ব্যোমকেশ বাহিরে আসিল‌, ‘কি চাই?’

বিশ্রান্তিগুহে পাশাপাশি দু’টি ঘর‌, সামনে ঢাকা বারান্দা। তিনটি যুবক বারান্দায় উঠিয়া ইতস্তত করিতেছিল‌, ব্যোমকেশকে দেখিয়া যুগপৎ দস্তবিকাশ করিল। একজন সসন্ত্রমে জিজ্ঞাসা করিল‌, ‘আপনিই ব্যোমকেশবাবু?’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘হ্যাঁ।’

যুবকদের দন্তবিকাশ কর্ণচুম্বী হইয়া উঠিল। একজন বলিল‌, ‘আমরা বাঘমারি গ্রাম থেকে আসছি।’

‘বাঘমারি গ্রাম! সে কোথায়?’

‘আজ্ঞে‌, বেশি দূর নয়‌, এখান থেকে মাইলখানেক।’

‘আসুন’—বলিয়া ব্যোমকেশ তাহাদের ঘরে লইয়া আসিল। বিশ্রান্তিগুহের বাঁধা বরাদ্দ আসবাব-একটি চেয়ার‌, একটি টেবিল‌, একটি আরাম-কেদারা‌, দু’টি খাট‌, মেঝেয় নারিকেল-ছোবড়ার চাটাই পাতা। যুবকেরা দু’জন মেঝোয় বসিল‌, একজন টেবিলে উঠিয়া বসিল। ব্যোমকেশ আরাম-কেদারায় অর্ধশয়ান হইয়া বলিল‌, ‘কী ব্যাপার বলুন দেখি?

যে ছোকরা অগ্রণী হইয়া কথা বলিতেছিল তাহার নাম পটল। অন্য দু’জনের নাম দাশু ও গোপাল। পটল বলিল‌, ‘আপনি শোনেননি! আমাদের গ্রামে একটা ভীষণ হত্যাকাণ্ড হয়ে গেছে।’

‘বলেন কি! কবে? ব্যোমকেশ আরাম-কেন্দারায় উঠিয়া বসিল।

দাশু ও গোপাল একসঙ্গে বলিয়া উঠিল‌, ‘পরশু সন্ধ্যের পর।’

পটল বলিল‌, ‘পুলিসে তক্ষুনি খবর দেওয়া হয়েছিল। কাল সকালবেলা নাটার সময় দারোগা সুখময় সামন্ত গিয়েছিল। লাশ নিয়ে চলে এসেছিল‌, তারপর আর কোনও খবর নেই। আজ আমরা আপনার কাছে আসবার আগে থানায় গিয়েছিলাম‌, সুখময় দারোগা আমাদের হাঁকিয়ে দিলে। লাশ নাকি সদরে পাঠানো হয়েছে‌, হাসপাতালে চেরা-ফাঁড়া হবে। আপনি এসব কিছুই জানেন না? তবে যে শুনেছিলাম। আপনি পুলিসকে সাহায্য করবার জন্য এখানে এসেছেন।’

ব্যোমকেশ শুষ্কস্বরে বলিল‌, ‘দারোগাবাবু বোধ হয় এ খবর আমাকে দেওয়া দরকার মনে করেননি। সে যাক। কে কাকে খুন করেছে? কী দিয়ে খুন করেছে?’

পটল বলিল‌, ‘বন্দুক দিয়ে। খুন হয়েছে আমাদের এক বন্ধু—অমৃত। কে খুন করেছে তা কেউ জানে না। ব্যোমকেশবাবু্‌, আমরার মৃত্যুর জন্য আমরাও খানিকটা দায়ী‌, ঠাট্টা-তামাশা করতে গিয়ে এই সর্বনাশ হয়েছে। তাই আমরা আপনার কাছে এসেছি। সুখময় দারোগার দ্বারা কিছু হবে না‌, আপনি দয়া করে খুঁজে বার করুন কে খুন করেছে। আমরা আপনার কাছে চিরঋণী। হয়ে থাকব।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘বন্দুক দিয়ে খুন হয়েছে। আশ্চর্য!—সব কথা খুলে বলুন।’

অতঃপর পটল‌, দাশু ও গোপাল মিলিয়া কখনও একসঙ্গে কখনও পর্যায়ক্রমে যে কাহিনী বলিল তাহা পূর্বে বিবৃত হইয়াছে। অমৃতের মৃত্যুতে তাহারা খুব কাতর হইয়াছে এমন মনে হইল না‌, কিন্তু অমৃতের রহস্যময় মৃত্যু তাঁহাদের উত্তেজিত করিয়া তুলিয়াছে। এবং ব্যোমকেশকে হাতের কাছে পাইয়া এই উত্তেজনা নাটকীয় রূপ ধারণ করিয়াছে।

অমৃতের মৃত্যু-ব্বিরণ শেষ হইতে আন্দাজ দুঘণ্টা লাগিল; ব্যোমকেশ মাঝে মাঝে প্রশ্ন করিয়া অস্পষ্ট স্থান পরিষ্কার করিয়া লইল। শেষে বলিল‌, ‘ঘটনা রহস্যময় বটে‌, তার ওপর বন্দুক।–কিন্তু শুধু গল্প শুনলে কাজ হবে না‌, জায়গাটা দেখতে হবে।’

তিনজনেই উৎসাহিত হইয়া উঠিল। পটল বলিল‌, ‘বেশ তো‌, এখুনি চলুন না‌, ব্যোমকেশবাবু। আপনি আমাদের গ্রামে যাবেন সে তো ভাগ্যের কথা।’

ব্যোমকেশ হাতের ঘড়ি দেখিয়া বলিল‌, ‘এ-বেলা থাক। দুদিন যখন কেটে গেছে তখন একবেলায় বিশেষ ক্ষতি হবে না। আমরা ও-বেলা পাঁচটা নাগাদ যাব।’

‘বেশ‌, আমরা এসে আপনাকে নিয়ে যাব।’

তাহারা চলিয়া গেল।

কিছুক্ষণ পরে দারোগা সুখময়বাবু আসিলেন। চেয়ারে নিজের সুবিপুল বপুখানি ঠাসিয়া দিয়া বলিলেন‌, ‘বাঘমারির ছোঁড়াগুলো এসেছিল তো? আমার কাছেও গিয়েছিল। বাঙালীর ছেলে‌, একটা হুজুগ পেয়েছে‌, আর কি রক্ষে আছে! আপনি ওদের আমল দেবেন না মশাই‌, আপনার প্রাণ অতিষ্ঠা করে তুলবে।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘না না‌, আমল দেব কেন? আপনি তো ওদের আগে থাকতেই চেনেন‌, কেমন ছেলে ওরা?’

সুখময়বাবু বলিলেন‌, ‘পাড়াগাঁয়ের বকাটে নিষ্কমা ছেলে আর কি। বাপের দুবিঘে ধান-জমি আছে‌, কি তিনটে নারকেল গাছ আছে‌, বাস‌, ঘরে বসে-বসে বাপের অন্ন ধ্বংস করছে।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘যে ছেলেটা মারা গেছে সেও তো ওদেরই দলেরই ছেলে।’

‘হ্যাঁ‌, সে ছিল আবার এককাটি বাড়া। মামার ভাতে ছিল‌, বিকামি করে বেড়াতো।’

‘বন্দুকের গুলিতে মরেছে শুনলাম।’

‘তাই মনে হয়‌, তবে তদন্ত না হওয়া পর্যন্ত কিছুই বলা যায় না।’

‘হুঁ। কে মেরেছে কিছু সন্দেহ করেন?’

‘কি করে সন্দেহ করব বলুন দেখি? কেউ কিছু দেখেনি‌, সবাই একজোট হয়ে মাঠে আড্ডা দিচ্ছিল। তবে একটা ব্যাপারের জন্যে একজনের ওপর সন্দেহ হচ্ছে। সেদিন সকালবেলা অমৃত নাদুর বেঁকে অপমান করেছিল। নাদু একরোখা গোঁয়ার মানুষ‌, লাঠি নিয়ে অমৃতকে মারতে ছুটেছিল। সন্ধ্যেবেলা মাঠের আড্ডাতেও সে ছিল না। তাকে একবার থানায় আনিয়ে ভালো করে নেড়ে-চেড়ে দেখতে হবে। —কিন্তু এসব বাজে কথা এখন থাক। একটা জরুরী খবর আপনাকে দিতে এলাম।’ সহসা গলা খাটো করিয়া বলিলেন‌, ‘যমুনাদাস গঙ্গারামের নাম জানেন তো‌, এখানকার মস্ত।বড় আড়তদার। সে একটা বেনামী চিঠি পেয়েছে।’

ব্যোমকেশ গাঢ় ঔৎসুক্য দেখাইয়া বলিল‌, ‘বেনামী চিঠি! কি আছে তাতে?’

সুখময়বাবু বলিলেন‌, ‘যমুনাদাস চুপিচুপি আমাকে চিঠি দেখিয়ে গেছে। খামের চিঠি‌, তাতে স্রেফ লেখা আছে; আমি সব জানতে পেরেছি‌, শীগগিরই দেখা হবে।’

‘তাই নাকি! তাহলে তো যমুনাদাসের ওপর নজর রাখতে হয়।’

‘সে-কথা আর বলতে! আমি একজন লোক লাগিয়ে দিয়েছি। যমুনাদাসের পেছনে। সে অষ্টপ্রহর যমুনাদাসের ওপর নজর রেখেছে।’

‘ভালো‌, ভালো! আপনি পাকা লোক‌, ঠিক কাজই করেছেন। এবার হয়তো একটা সুরাহা হবে।’

সুখময়বাবুর মুখে একটু বিনীত আত্মপ্রসন্নতা খেলিয়া গেল‌, ‘হে-হে—এই কাজ করে চুল পেকে গেল‌, ব্যোমকেশবাবু। তা সে যাক। এখন আপনার কি খবর বলুন। কিছু পেলেন?’

ব্যোমকেশ হতাশ স্বরে বলিল‌, ‘কৈ আর পেলাম! যতদূর চাই‌, নাই নাই সে-পথিক নাই।’

সুখময়বাবু উদ্ধৃতিটা ধরিতে পারিলেন না‌, কিন্তু যেন বুঝিয়াছেন এমনিভাবে হো-হে করিলেন। তিনি চেয়ারে একেবারে জাম হইয়া বসিয়াছিলেন‌, এখন টানা-হেঁচড়া করিয়া নিজেকে চেয়ারের বাহুমুক্ত করিলেন। বলিলেন‌, ‘আজ উঠি‌, থানায় অনেক কাজ পড়ে আছে।’

ব্যোমকেশও উঠিয়া দাঁড়াইল‌, ‘ভালো কথা‌, অমৃতের পোস্ট-মর্টেম রিপোর্ট পেয়েছেন নাকি?’ সুখময়বাবু একটু ভ্রূ তুলিয়া বলিলেন‌, ‘এখনও পাইনি। কাল পরশু পাব বোধ হয়। কেন বলুন দেখি?

‘পেলে এবার আমাকে দেখাবেন।’

সুখময়বাবু একটু গভীর হইয়া বলিলেন‌, ‘দেখতে চান‌, দেখাব। কিন্তু ব্যোমকেশবাবু্‌, আপনি রুই-কাতলা ধরতে এসেছেন‌, আপনি যদি চুনোপুটির দিকে নজর দেন তাহলে আমরা বাঁচি কি করে?’

‘না না‌, নজর দিইনি। নিতান্তাই অহেতুক কৌতুহল। কথায় বলে-নেই কাজ তো খই ভাজ।’

সুখময়বাবুর মুখে আবার হাসি ফুটিল‌, তিনি দ্বারের দিকে যাইতে যাইতে প্রথম আমাকে লক্ষ্য করিলেন; বলিলেন‌, ‘এই যে অজিতবাবু্‌, কেমন আছেন? গল্প-টল্প লেখা হচ্ছে? আপনার আজগুবি গল্পগুলো পড়তে মন্দ লাগে না-হো-হে। তবে রবার্ট ব্লেকের মতো নয়। আচ্ছা‌, আসি।’

তিনি শ্রুতিবহির্ভূত হইয়া গেলে ব্যোমকেশ আমার দিকে ফিরিয়া চোখ টিপিল; বলিল‌, ‘হে হে’

বৈকালবেলা ছেলেরা আসিয়া আমাদের গ্রামে লইয়া গেল। রেল-লাইনের ধার দিয়া যখন গ্রামের নিকট উপস্থিত হইলাম তখন গ্রামের সমস্ত পুরুষ অধিবাসী আমাদের অভ্যর্থনা করিবার জন্য লাইনের ধারে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে‌, ছেলে-বুড়া কেহ বাদ যায় নাই। সকলের চোখেবিস্ফারিত কৌতুহল। ব্যোমকেশ বক্সী কীদৃশ জীব তাহার স্বচক্ষে দেখিতে চায়।

মিছিল করিয়া আমরা গ্রামে প্রবেশ করিলাম। পটল অগ্রবর্তী হইয়া আমাদের একটি বাড়িতে লইয়া গেল। কাঁচা-পাকা বাড়ি‌, সামনের দিকে দু’টি পাকা-ঘর‌, পিছনে খড়ের চাল। মৃত অমৃতের মামার বাড়ি।

অমৃতের মামা বলরামবাবু বাড়ির সামনের চাতালে টেবিল-চেয়ার পাতিয়া চায়ের আয়োজন করিয়াছিলেন‌, জোড়হস্তে আমাদের সংবর্ধনা করিলেন। লোকটিকে ভালোমানুষ বলিয়া মনে হয়‌, কথাবলার ভঙ্গীতে সঙ্কুচিত জড়তা। তিনি ভাগিনার মৃত্যুতে খুব বেশি শোকাভিভূত না হইলেও একটু যেন দিশাহারা হইয়া পড়িয়াছেন।

চায়ের সরঞ্জাম দেখিয়া ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘এসব আবার কেন?’

বলরামবাবু অপ্রতিভভাবে জড়াইয়া জড়াইয়া বলিলেন‌, ‘একটু চা-সামান্য—’

পটল বলিল‌, ‘ব্যোমকেশবাবু্‌, আপনি আমাদের গ্রামের পায়ের ধুলো দিয়েছেন আমাদের ভাগ্যি। চা খেতেই হবে।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘আচ্ছা‌, সে পরে হবে‌, আগে জঙ্গলটা দেখে আসি।’

‘চলুন।’

পটল আবার আমাদের লইয়া চলিল। আরও কয়েকজন ছোকরা সঙ্গে চলিল। বলরামবাবুর বাড়ির সম্মুখ দিয়া যে কাঁচা-রাস্তাটি গিয়াছে তাঁহাই গ্রামের প্রধান রাস্তা। এই রাস্তা একটি অসমতল শিলাকঙ্করপূর্ণ আগাছাভিরা মাঠের কিনারায় আসিয়া শেষ হইয়াছে। মাঠের পরপারে একটিমাত্র পাকা বাড়ি; সদানন্দ সুরের বাড়ি। তাহার পিছনে জঙ্গলের গাছপালা। আমরা মাঠে অবতরণ করিলাম। ব্যোমকেশ জিজ্ঞাসা করিল‌, ‘এই মাঠে বসে তোমরা সেদিন গল্প করছিলে?’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ।’

‘ঠিক কোন জায়গায় বসেছিলে?’

‘এই যে–’ আরও কিছুদূর গিয়া পটল দেখাইয়া বলিল‌, ‘এইখানে।’

স্থানটি অপেক্ষাকৃত পরিচ্ছন্ন‌, আগাছা নাই। ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘এখান থেকে অমৃত যো-পথে জঙ্গলের দিকে গিয়েছিল। সেই পথে নিয়ে চল।’

‘আসুন।’

সদানন্দ সুরের দরজায় তালা ঝুলিতেছে‌, জানালাগুলি বন্ধ। আমরা বাড়ির পাশ দিয়া পিছ= দিকে চলিলাম। পিছনে পাঁচল-ঘেরা উঠান‌, পাঁচিল প্ৰায় এক মানুষ উঁচু‌, তাহার গায়ে একটি খিড়কি-দরজা। জঙ্গলের গাছপালা খিড়কি-দরজা পর্যন্ত ভিড় করিয়া আসিয়াছে।

বাড়ি অতিক্রম করিয়া জঙ্গলে প্রবেশ করিলাম। জঙ্গলে পাতা-ঝরা আরম্ভ হইয়াছে‌, গাছগুলি পত্রবিরল‌, মাটিতে স্বয়ংবিশীর্ণ পীতপত্রের আস্তরণ। বাড়ির খিড়কি হইতে পাঁচিশ-ত্রিশ গজ দূরে একটা প্রকাণ্ড শিমুলগাছ‌, স্তম্ভের মতো স্থূল গুড়ি দশ-বারো হাত উঁচুতে উঠিয়া শাখা-প্রশাখাত্ত বিভক্ত হইয়া গিয়াছে। পটল আমাদের শিমুলতলায় লইয়া গিয়া একটা স্থান নির্দেশ করিয়া’ বলিল‌, ‘এইখানে অমৃত মরে পড়ে ছিল।’

স্থানটি ঝরা-পাতা ও শিমুল-ফুলে আকীর্ণ‌, অপঘাত মৃত্যুর কোনও চিহ্ন নাই। তবু ব্যোমকেশ। স্থানটি ভালো করিয়া খুঁজিয়া দেখিল। কঠিন মাটির উপর কোনও দাগ নাই‌, কেবল শুকনা পাতার নিচে একখণ্ড খড়ি পাওয়া গেল। ব্যোমকেশ খড়িটি তুলিয়া ধরিয়া বলিল‌, ‘এই খড়ি দিয়ে অমৃত গাছের গায়ে ঢেরা কাটতে এসেছিল। কিন্তু গাছের গায়ে খড়ির দাগ নেই। সুতরাং–’

পটল বলিল‌, ‘আজ্ঞে হ্যাঁ‌, দাগ কাটবার আগেই–’

এখানে দ্রষ্টব্য আর কিছু ছিল না। আমরা ফিরিয়া চলিলাম। ফিরিবার পথে ব্যোমকেশ। বলিল‌, ‘সদানন্দ সুরের খিড়কির দরজা বন্ধ আছে কিনা একবার দেখে যাই।’

খিড়কির দরজা ঠেলিয়া দেখা গেল ভিতর হইতে হুড়কা লাগানো। প্ৰাচীন দরজার তক্তায় ছিদ্র আছে‌, তাহাতে চোখ লাগাইয়া দেখিলাম‌, উঠানের মাঝখানে একটি তুলসী-মঞ্চ‌, বাকী উঠান সুপ্রিয় ভরা। একটা পেয়ারাগাছ এককোণে পাঁচিলের পাশে দাঁড়াইয়া আছে‌, আর কিছু চোখে পড়িল না।

অতঃপর ব্যোমকেশ পাঁচিলের ধার দিয়া ফিরিয়া চলিল। তাহার দৃষ্টি মাটির দিকে। পাঁচিলের কোণ পর্যন্ত আসিয়া সে হঠাৎ আঙুল দেখাইয়া বলিল‌, ‘ও কি?’

অনাবৃত শুষ্ক মাটির উপর পরিষ্কার অর্ধচন্দ্ৰাকৃতি চিহ্ন; তাহার আশেপাশে আরও কয়েকটা অস্পষ্ট আকাবাঁকা চিহ্ন রহিয়াছে। ব্যোমকেশ ঝুকিয়া চিহ্নটা পরীক্ষা করিল‌, আমরাও দেখিলাম। তারপর সে ঘাড় তুলিয়া দেখিল পাঁচিলের পরপারে পেয়ারাগাছের ডালপালা দেখা যাইতেছে।

বলিলাম‌, ‘কি দেখছি? কিসের চিহ্ন ওগুলো?’

ব্যোমকেশ পটলের দিকে চাহিয়া বলিল‌, ‘কি মনে হয়?’

পটলের মুখ শুকাইয়া গিয়াছে; সে ওষ্ঠ লেহন করিয়া বলিল‌, ‘ঘোড়ার খুরের দাগ মনে হচ্ছে।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘হুঁ‌, ঘোড়া-ভূতের খুরের দাগ। অমৃত তাহলে মিছেকথা বলেনি।’

ফিরিয়া চলিলাম। ব্যোমকেশের ভূ সংশয়ভরে কুঞ্চিত হইয়া রহিল। তাহার মনে ধোঁকা লাগিয়াছে‌, ঘোড়ার খুরের তাৎপর্য সে পরিষ্কার বুঝিতে পারে নাই। চলিতে চলিতে মাত্র দুএকটা কথা হইল। ব্যোমর্কেশ প্রশ্ন করিল‌, ‘সদানন্দ সুর কতদিন হল বাইরে গেছেন?’

পটল বলিল‌, ‘সাত-আট দিন হল।’

‘কবে ফিরবেন বলে যাননি?’

‘না।’

‘কোথায় গেছেন তাও কেউ জানে না?’

‘না।’

বলরামবাবুর বাড়িতে পৌঁছিয়া চেয়ারে বসিলাম। দর্শকের ভিড় কমিয়া গিয়াছে‌, তবু দু’চারজন অতি-উৎসাহী ব্যক্তি ব্যোমকেশকে দেখিবার আশায় আনাচে কানাচে ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। বলরামবাবু আমাদের চা ও জলখাবার আনিয়া দিলেন। পটল দাশু গোপাল প্রভৃতি ছোকরা কাছে দাঁড়াইয়া আমাদের তত্ত্বাবধান করিতে লাগিল।

চা পান করিতে করিতে ব্যোমকেশ বলরামবাবুকে সওয়াল আরম্ভ করিল

‘অমৃত আপনার আপন ভাগনে ছিল?

‘আজ্ঞে হ্যাঁ।’

‘ওর মা-বাপ কেউ ছিল না?’

‘না। আমার বোন অমর্তকে কোলে নিয়ে বিধবা হয়েছিল। আমার কাছে থাকত। তারপর সেও মারা গেল। অমর্তর বয়স তখন পাঁচ বছর।’

‘আপনার নিজের ছেলে।পুলে নেই?

‘একটি মেয়ে আছে। তার বিয়ে হয়ে গেছে।’

‘অমৃতের কত বয়স হয়েছিল?’

‘একুশ।’

‘তার বিয়ে দেননি?’

না। বুদ্ধিসুদ্ধি তেমন ছিল না‌, ন্যালাক্ষ্যাপা ছিল‌, তাই বিয়ে দিইনি।’

‘কাজকর্ম কিছু করত?

‘মাঝে মাঝে করত‌, কিন্তু বেশিদিন চাকরি রাখতে পারত না। সান্তালগোলার বড় আড়তদার ভগবতীবাবুর গদিতে ঢুকিয়ে দিয়েছিলাম‌, কিছুদিন কাজ করেছিল। তারপর বদ্রিদাস মাড়োয়ারীর চালের কলে মাসখানেক ছিল‌, তা বদ্রিদাসও রাখল না। কিছুদিন থেকে বিশু মল্লিকের চালের কলে ঘোরাঘুরি করছিল‌, কিন্তু কাজ পায়নি।’

ব্যোমকেশ কিয়ৎকাল নীরবে নারিকেল-লাড়ু চিবাইল‌, তারপর এক ঢোক চা খাইয়া হঠাৎ প্রশ্ন করিল, ‘গ্রামে কারুর ঘোড়া আছে?’

বলরামবাবু চক্ষু বিস্ফারিত করিলেন,–ছোকরারাও মুখ তাকাতাকি করিতে লাগিল। শেষে বলরামবাবু বলিলেন, ‘গাঁয়ে তো কারুর ঘোড়া নেই।’

‘কারুর বন্দুকের লাইসেন্স আছে?’

‘আজ্ঞে না।’

নাদু নামে এক ছোকরার কথা শুনেছি‌, তার ভালো নাম জানি না। তাকে পেলে দুএকটা প্রশ্ন করতাম।’

বলরামবাবু ছোকরাদের পানে তাকাইলেন‌, তাহারা আর একবার মুখ চাওয়া-চাওয়ি করিল; তারপর পটল বিলল‌, ‘নাদু কাল বৌকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি চলে গেছে।’

‘শ্বশুরবাড়ি কোথায়?’

কৈলোসপুরে। ট্রেনে যেতে হয়‌, সান্তালগোলা থেকে তিন-চার স্টেশন দূরে।’

ব্যোমকেশ ভাবিতে ভাবিতে চায়ের পেয়ালা শেষ করিল। নাদু হয়তো নিরপরাধ‌, কিন্তু সে পলাইবে কেন? ভয় পাইয়াছে? আশ্চর্য নয়; এরূপ একটা খুনের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট হইয়া পড়িলে কে না শঙ্কিত হয়?

এই সময়ে একটি ছোকরা বলিয়া উঠিল‌, ‘ওই সদানন্দদা আসছে?’

সকলে একসঙ্গে ঘাড় ফিরাইলাম। রাস্তা দিয়া একটি ভদ্রলোক আসিতেছেন। চেহারা গ্ৰাম্য হইলেও সাজ-পোশাক গ্ৰাম্য নয়; গায়ে আদির পাঞ্জাবি এবং গরদের চাদর‌, পায়ে কালো বার্নিশ অ্যালবার্ট‌, হাতে একটি ক্যাম্বিসের ব্যাগ।

একটি ছোকরা চুপিচুপি অন্য এক ছোকরাকে বলিল‌, ‘সদানন্দদার জামাকাপড়ের বাহার দেখেছিস! নিশ্চয় কলকাতায় গেছিল।’

সদানন্দবাবু সামনা-সামনি আসিলে পটল হাঁক দিয়া বলিল, ‘সদানন্দদা, গাঁয়ের খবর শুনেছেন?’

সদানন্দবাবু দাঁড়াইলেন‌, আমাকে এবং ব্যোমকেশকে লক্ষ্য করিলেন‌, তারপর বলিলেন‌, ‘কী খবর?’

পটল বলিল‌, ‘আমরা মারা গেছে।’

সদানন্দবাবুর চোখে অকপট বিস্ময় ফুটিয়া উঠিল‌, ‘মারা গেছে! কী হয়েছিল?’

পটল বলিল‌, ‘হয়নি কিছু। বন্দুকের গুলিতে মারা গেছে। কে মেরেছে। কেউ জানে না।’

সদানন্দবাবুর মুখখানা ধীরে ধীরে পাথরের মত নিশ্চল হইয়া গেল‌, তিনি নিষ্পলক নেৱে চাহিয়া রহিলেন। পটল বলিল‌, ‘আপনি এই এলেন‌, এখন বাড়ি যান। পরে সব শুনবেন।’

সদানন্দবাবু ক্ষণেক দ্বিধা করিলেন‌, তারপর ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে প্রস্থান করিলেন।

তিনি দৃষ্টিবহির্ভূত হইয়া যাইবার পর ব্যোমকেশ পটলকে জিজ্ঞাসা করিল, ‘সদানন্দবাবু যখন গ্রাম থেকে গিয়েছিলেন তখন তাঁর হাতে ক্যাম্বিসের ব্যাগ আর স্টীলের ট্রাঙ্ক ছিল না?’

পটল বলিল‌, ‘ঠিক তো‌, হীরু মোড়ল তাই বলেছিল বটে। সদানন্দদা তোরঙ্গ কোথায় রেখে এলেন!’

এ প্রশ্নের সদুত্তর কাহারও জানা ছিল না। ব্যোমকেশ এদিক ওদিক চাহিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল; বলিল‌, ‘সন্ধ্যে হয়ে এল‌, আজ উঠি। সদানন্দবাবুর সঙ্গে দু’ একটা কথা বলতে পারলে ভালো হত। কিন্তু তিনি এইমাত্র ফিরেছেন–’

ব্যোমকেশের কথা শেষ হইতে পাইল না‌, বিরাট বিস্ফোরণের শব্দে আমরা ক্ষণকালের জন্য হতচকিত হইয়া গেলাম। তারপর ব্যোমকেশ একলাফে রাস্তায় নামিয়া সদানন্দ সুরের বাড়ির দিকে দৌড়াইতে আরম্ভ করিল। আমরা তাহার পিছনে ছুটিলাম। শব্দটা ওই দিক হইতেই আসিয়াছে।

সদানন্দ সুরের বাড়ির সম্মুখে পৌঁছিয়া দেখিলাম, বাড়ির সদর দরজার কবাট সামনের চাতালের উপর ভাঙ্গিয়া পড়িয়াছে‌, সদানন্দ সুর রক্তাক্ত দেহে তাহার মধ্যে পড়িয়া আছেন। খানিকটা কটুগন্ধ ধূম সন্ধ্যার বাতাস লাগিয়া ইতস্তত ছড়াইয়া পড়িতেছে।

ব্যোমকেশ ও আমি চাতালের উপর উঠিলাম‌, আর যাহারা আমাদের পিছনে আসিয়াছিল। তাহার চাতালের কিনারায় দাঁড়াইয়া নিঃশব্দে চক্ষু গোল করিয়া দেখিতে লাগিল।

সদানন্দ সুর যে বাঁচিয়া নাই তাহা একবার দেখিয়াই বোঝা যায়। তাহার শরীর অপেক্ষাকৃত অক্ষত বটে; ডান হাতে তালা ও বাঁ হাতে চাবি দৃঢ়ভাবে ধরা রহিয়াছে; কিন্তু মাথাটা প্রায় ধড় হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া উল্টা দিকে ঘুরিয়া গিয়াছে‌, রক্ত ও মগজ মাখামাখি হইয়া চুৰ্ণ খুলি হইতে গড়াইয়া পড়িতেছে; মুখের একপাশটা নাই। বীভৎস দৃশ্য। তিন মিনিট আগে যে-লোকটাকে জলজ্যান্ত দেখিয়াছি‌, তাহাকে এই অবস্থায় দেখিলে স্নায়ুবিক ত্ৰাসে শরীর কাঁপিয়া ওঠে‌, হাত-পা ঠাণ্ডা হইয়া যায়।

গ্রামবাসীদের এতক্ষণ বাকরোধ হইয়া গিয়াছিল। পটল প্রথম কণ্ঠস্বর ফিরিয়া পাইল; কম্পিত্যস্বরে বলিল‌, ‘ব্যোমকেশবাবু্‌, এসব কী হচ্ছে আমাদের গ্রামে।’

ব্যোমকেশ ভাঙা দরজার নিকট হইতে ঢালাই লোহার একটা টুকরা কুড়াইয়া লইয়া পরীক্ষা করিতেছিল‌, পটলের কথা বোধ হয় শুনতে পাইল না। লোহার টুকরা ফেলিয়া দিয়া বলিল‌, ‘হ্যান্ড-গ্রিনেড! ক্যাম্বিসের ব্যাগটা কোথায় গেল?’

ব্যাগটা ছিন্নভিন্ন অবস্থায় একপাশে ছিটকাইয়া পড়িয়া ছিল। ব্যোমকেশ গিয়া সেটার অভ্যন্তরভাগে পরীক্ষা করিল। নূতন ও পুরাতন কয়েকটা জামাকাপড় রহিয়াছে। একটা নূতন টাইম-পীস ঘড়ি বিস্ফোরণের ধাক্কায় চ্যাপ্টা হইয়া গিয়াছে‌, একটা কেশতৈলের বোতল ভাঙিয়া কাপড়-চোপড় ভিজিয়া গিয়াছে। আর কিছু নাই।

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘অজিত‌, তুমি বাইরে থাকো‌, আমি চট্ট করে বাড়ির ভিতরটা দেখে আসি।’

শুধু যে দরজার কবাট ভাঙিয়া পড়িয়াছিল তাঁহাই নয়‌, দরজার উপরের খিলান খানিকটা উড়িয়া গিয়াছিল‌, কয়েকটা ইট বিপজ্জনকভাবে ঝুলিয়া ছিল। ব্যোমকেশ যখন লঘুপদে এই রন্ধ পার হইয়া ভিতরে প্রবেশ করিল। তখন আমি আর স্থির থাকিতে পারিলাম না। এই অভিশপ্ত বাড়ির মধ্যে কোথায় কোন ভয়াবহ মৃত্যু ওৎ পাতিয়া আছে কে জানে!–ব্যোমকেশের যদি কিছু ঘটে‌, সত্যবতীর সামনে গিয়া দাঁড়াইব কোন মুখে?

‘দাঁড়াও‌, আমিও আসছি—বলিয়া আমি প্রাণ হাতে করিয়া বাড়িতে ঢুকিয়া পড়িলাম।

ব্যোমকেশ ঘাড় ফিরাইয়া একটু হাসিল; বলিল‌, ‘ভায়ের কিছু নেই। বিপদ যা ছিল তা সদানন্দ সুরের ওপর দিয়েই কেটে গিয়েছে।’

এদিকে সন্ধ্যা হইয়া আসিতেছে‌, বাড়ির ভিতরে আলো অতি অল্প। বলিলাম‌, ‘কি দেখবে চটপট দেখে নাও। দিনের আলো ফুরিয়ে আসছে।’

বাড়ির সামনের দিকে দু’টি ঘর‌, পিছনে রান্নাঘর। কোনও ঘরেই লোভনীয় কিছু নাই। যে ঘরের দরজা ভাঙিয়াছিল সে-ঘরে কেবল একটি কোমর-ভাঙা তক্তপোশ আছে; পাশের ঘরে আর একটি তক্তপোশের উপর বালিশ-বিছানা দেখিয়া বোঝা যায় ইহা গৃহস্বামীর শয়নকক্ষ। একটা খোলা দেওয়াল-আলমারিতে কয়েকটা ময়লা জামাকাপড় ছাড়া আর কিছুই নাই।

রান্নাঘরও তথৈবচ। খানকয়েক থালা-বাটি‌, ঘটি-কলসী‌, হাঁড়িকুড়ি। উনুনটা অপরিষ্কার‌, তাহার গর্ভে ছাই জমিয়া আছে। সব দেখিয়া শুনিয়া বলিলাম‌, সদানন্দ সুরের অবস্থা ভালো ছিল না মনে হয়।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘হুঁ। ওই দরজাটা দেখেছি? বলিয়া দ্বারের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করিল। কাছে গিয়া দেখিলাম। রান্নাঘরের এই দরজা দিয়া উঠানে যাইবার পথ। দরজা ভেজানো রহিয়াছে‌, টান দিতেই খুলিয়া গেল। বলিলাম‌, ‘একি? দরজা খোলা ছিল।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘সদানন্দ সুর খুলে রেখে যাননি। হুড়কো লাগিয়ে গিয়েছিলেন। ভালো করে দ্যাখো।’

ভালো করিয়া দেখিলাম, দ্বারের পাশে হুড়কো ঝুলিতেছে, কিন্তু তাহার দৈর্ঘ্য বড়জোর হাতখানেক। বলিলাম‌, ‘একি‌, এতটুকু হুড়কো।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘বুঝতে পারলে না? হুড়কোটা প্রমাণ মাপেরই ছিল এবং লাগানো ছিল। তারপর কেউ বাইরে থেকে দরজার ফাঁক দিয়ে করাত ঢুকিয়ে ওটাকে কেটেছে‌, তারপর ঘরে ঢুকেছে। ওই দ্যাখো হুড়কের বাকী অংশটা।’ ব্যোমকেশ দেখাইল‌, উনানের পাশে জ্বালানী কাঠের সঙ্গে হুড়কের বাকী অংশটা পড়িয়া আছে।

ব্যাপার কতক আন্দাজ করিতে পারিলেও সমগ্র পরিস্থিতি ধোঁয়াটে হইয়া রহিল। সদানন্দ সুরের কোনও শত্ৰু তাঁহার অনুপস্থিতিকালে হুড়কো কাটিয়া বাড়িতে প্রবেশ করিয়াছিল। তারপর? আজ বোমা ফাটিল কি করিয়া? কে বোমা ফাটাইল?

খোলা দরজা দিয়া আমরা উঠানে নামিলাম। পাঁচলা-ঘেরা উঠানের এককোণে কুয়া‌, অন্য কোণে পেয়ারাগাছ। ব্যোমকেশ সিধা পেয়ারাগাছের কাছে গিয়া মাটি দেখিল। মাটিতে যে অস্পষ্ট দাগ রহিয়াছে তাহা হইতে আমি কিছু অনুমান করিতে পারিলাম না‌, কিন্তু ব্যোমকেশ ঘাড় নাড়িয়া বলিল‌, ‘হুঁ, যা সন্দেহ করেছিলাম। তাই। যিনি এসেছিলেন তিনি এইখানেই পাঁচিল টপকেছিলেন।’

বলিলাম‌, ‘তাই নাকি! কিন্তু পাঁচল টপকাবার কী দরকার ছিল? করাত দিয়ে খিড়কি-দোরের হুড়কে কাটল না কেন?’

ব্যোমকেশ বলিল, ‘খিড়কির হুড়কো করাত দিয়ে কাটলে খিড়কি-দরজা খোলা থাকত, কারুর চোখে পড়তে পারত। তাতে আগন্তুক মহাশয়ের অসুবিধা ছিল। আমি গোড়াতেই ভুল বুঝেছিলাম‌, নইলে সদানন্দ সুর মরতেন না।’

‘কী ভুল বুঝেছিলে?’

‘আমি সন্দেহ করেছিলাম‌, যাঁকে ধরতে এখানে এসেছি তিনি সদানন্দ সুর। কিন্তু তা নয়।–চল‌, এখন যাওয়া যাক। বাঘমারি গ্রামে আর কিছু দেখবার নেই।’

রান্নাঘরের ভিতর দিয়া আবার সদরে ফিরিয়া আসিলাম। ইতিমধ্যে গ্রামের সমস্ত লোক আসিয়া জড়ো হইয়াছে এবং চাতালের নিচে ঘনসন্নিবিষ্ট হইয়া দাঁড়াইয়া একদৃষ্টি মৃতদেহের পানে চাহিয়া আছে। মৃত্যু সম্বন্ধে মানুষের কৌতুহলের অন্ত নাই।

ভিড়ের মধ্য হইতে পটল বলিয়া উঠিল‌, ‘ব্যোমকেশবাবু্‌, বাড়ির মধ্যে কী দেখলেন? কাউকে পেলেন?’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘না। পুলিসে খবর পাঠিয়েছ?

পটল বলিল‌, ‘না। আপনি আছেন তাই—’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘আমি কেউ নয়‌, পুলিসকে খবর দিতে হবে। আচ্ছা‌, তোমাদের যেতে হবে। না; আমরা তো যাচ্ছি‌, সুখময়বাবুকে খবর দিয়ে যাব।’

‘আপনারা যাচ্ছেন?’

‘হ্যাঁ। যতক্ষণ পুলিস না আসে ততক্ষণ তোমরা কয়েকজন। এখানে থেকে।’

‘পুলিস কি আজ রাত্রে আসবে?

‘আসবে।’

আমরা আবার রেল-লাইনের ধার দিয়া চলিয়াছি। সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হইয়া চাঁদের আলো ফুটি-ফুটি করিতেছে। একটা মালগাড়ি দীর্ঘ দেহভার টানিয়া হাঁফাইতে হাঁফাইতে চলিয়া গেল।।

আমি বলিলাম‌, ‘ব্যোমকেশ‌, তুমি এ-ব্যাপারের কিছু কিছু বুঝেছি মনে হচ্ছে। আমি কিন্তু কিছুই বুঝতে পারিনি।’

ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ আছে এটা নিশ্চয় বুঝতে পেরেছ?’

‘সম্বন্ধ আছে নাকি? কী সম্বন্ধ?’

ব্যোমকেশ একটা নিশ্বাস ফেলিয়া বলিল‌, ‘অমৃত বেচারা বেঘোরে মারা গেল। সে-রাত্রে যদি সে জঙ্গলে না যেত তাহলে মরত না। যে তাকে মেরেছে সে তাকে মারতে আসেনি।’

‘তবে কাকে মারতে এসেছিল?’

‘সদানন্দ সুরকে।’

‘কিন্তু–সদানন্দ সুর তো তখন বাড়ি ছিলেন না।’

‘ছিলেন না বলেই আততায়ী এসেছিল তাঁকে মারতে।’

‘বড্ড বেশি রহস্যময় শোনাচ্ছে। অনেকটা কালিদাসের হেঁয়ালির মত-নেই তাই খাচ্ছ তুমি‌, থাকলে কোথায় পেতে!-কিন্তু যাক‌, আজ বোমা ফাটল কি করে?’

ব্যোমকেশ সিগারেট ধরাইল‌, ধোঁয়া ছাড়িয়া বলিল‌, ‘বুবি-ট্র্যাপ কাকে বলে জানো?’

বলিলাম‌, ‘কথাটা শুনেছি। ফাঁদ পাতা?’

‘হ্যাঁ। সদানন্দ সুরকে একজন মারতে চেয়েছিল। সে যখন জানতে পারল সদানন্দ সুর বাইরে গেছেন‌, তখন একদিন সন্ধ্যের পর এসে পাঁচিল ডিঙিয়ে উঠোনে ঢুকাল‌, দরজার হুড়কে করাত দিয়ে কেটে বাড়িতে ঢুকল‌, তারপর বন্ধ সদর-দরজার মাথায় এমনভাবে একটা বোমা সাজিয়ে রেখে গেল যে‌, দরজা খুললেই বোমা ফাটবে। আজ সদানন্দ সুর ফিরে এসে দরজা খুললেন‌, অমনি বোমা ফাটল। এবার বুঝতে পেরেছ?’

‘বুঝেছি। কিন্তু লোকটা কে?’

‘এখনও নাম জানি না। কিন্তু তিনি অস্ত্রশস্ত্রের চোরাকারবার করেন এবং কালো ঘোড়ার পিঠে চড়ে রাত্ৰিবেলা যুদ্ধযাত্রা করেন। লোকটির নামধাম জািনবার জন্যে আমার মনটাও বড় ব্যগ্র হয়েছে।’

সান্তালগোলায় পৌঁছিয়া দেখিলাম দিনের কর্ম-কোলাহল শান্ত হইয়াছে‌, বেশির ভাগ দোকানপাট বন্ধ। থানা খোলা আছে‌, সুখময়বাবু টেবিলে বসিয়া কাগজপত্র দেখিতেছেন। আমাদের পদশব্দে তিনি চোখ তুলিলেন‌, ‘কী খবর?’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘খবর গুরুতর। বাঘমারিতে আর একটা খুন হয়েছে।’

‘খুন!’ সুখময়বাবু চেয়ার ছাড়িয়া উঠিয়া দাঁড়াইলেন।

‘হ্যাঁ। সদানন্দ সুরকে আপনি চেনেন?’

সুখময়বাবু ভ্রূকুটি করিয়া মাথা নাড়িলেন‌, ‘হয়তো দেখেছি‌, মনে পড়ছে না। সদানন্দ সুর খুন হয়েছে? কিন্তু আপনি সকলের আগে এ-খবর পেলেন কোথা থেকে?’

‘আমি বাঘমারিতে ছিলাম।’

সুখময়বাবুর মুখ হইতে ক্ষণেকের জন্য মিষ্টতার মুখোশ খসিয়া পড়ল, তিনি রূঢ়চক্ষে চাহিয়া বলিলেন‌, ‘আপনি বাঘমারিতে গিয়েছিলেন। আমি মানা করা সত্ত্বেও গিয়েছিলেন।’

ব্যোমকেশের দৃষ্টিও প্রখর হইয়া উঠিল‌, ‘আপনি আমাকে মানা করবার কে?’

সুখময়বাবু কড়া সুরে বলিলেন‌, ‘আমি এ এলাকার বড় দারোগা‌, পুলিসের কর্তা।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘আপনি পুলিসের হত্যকতা বিধাতা হতে পারেন‌, কিন্তু আমাকে হুকুম দেবার মালিক আপনি নন। ইন্সপেক্টর সামন্ত‌, আমি সরকারের কাজে এখানে এসেছি। আপনার ওপর হুকুম আছে সবরকমে আমাকে সাহায্য করবেন। কিন্তু সাহায্য করা দূরের কথা‌, আপনি পদে পদে বাগড়া দেবার চেষ্টা করছেন। আমি আপনাকে সাবধান করে দিচ্ছি‌, ফের যদি আপনার এতটুকু বেচাল দেখি‌, আপনাকে এ-এলাকা ছাড়তে হবে। এমন কি চাকরি ছাড়াও বিচিত্র নয়।’

সুখময়বাবু বোধ করি ব্যোমকেশকে গোবেচারী মনে করিয়া এতটা দাপট দেখাইয়াছিলেন‌, এখন তাহাকে নিজমূর্তি ধারণ করিতে দেখিয়া একেবারে কেঁচো হইয়া গেলেন। তাঁহার মিষ্টতার মুখোশ পালকের মধ্যে আবার মুখে ফিরিয়া আসিল। তিনি কণ্ঠস্বরে বশংবদ দীনতা ঢালিয়া দিয়া বলিলেন‌, ‘আমি কি-যে বলছি তার ঠিক নেই! আমাকে মাপ করুন‌, ব্যোমকেশবাবু। আজ বিকেল থেকে পেটে একটা ব্যথা ধরেছে‌, তাই মাথার ঠিক নেই। আপনাকে হুকুম করব আমি! ছি-ছি‌, কী বলেন। আপনি! আমি আপনার হুকুমের গোলাম। হো-হে। —ত সদানন্দ সুর খুন হয়েছে?’

ব্যোমকেশের তখনও মেজাজ ঠাণ্ডা হয় নাই; সে বলিল‌, ‘অমৃতের মৃত্যুর খবর পেয়ে আপনি সে-রত্রে তদন্ত করতে যাননি‌, পরদিন সকালবেলা গিয়েছিলেন। এ খবরটা আপনার ওপরওয়ালার কানে পৌঁছুলে তিনি কি করবেন তা বোধ হয় আপনার জানা আছে?’

সুখময়বাবু কাকুতিপূর্ণ স্বরে বলিলেন‌, ‘কি বলব ব্যোমকেশবাবু্‌, সেদিনও কলিকের ব্যথা ধরেছিল‌, হো-হে‌, একেবারে পেড়ে ফেলেছিল। নইলে খুনের খবর পেয়ে যাব না‌, এ কি সম্ভব! তা যাকগে ও-কথা। এখন এই সদানন্দ সুর—। আমি এখনি বেরুচ্ছি। এই জমাদার‌, জলদি ইধার আও! হামারা ঘোড়াপর জিন চড়ানে বোলো। তুম ভি তৈয়ার হো লেও। ভারী খুন হুয়া হ্যায়। আভি যানা পড়েগা।’

অতঃপর সুখময়বাবু রণসাজে সজ্জিত হইয়া অশ্বারোহণে যাত্ৰা করিবার উপক্রম করিতেছেন দেখিয়া আমরা চলিয়া আসিলাম। পাড়াগাঁয়ে পুলিসকে তদন্ত উপলক্ষে পথহীন মাঠে-ঘাটে ঘুরিয়া বেড়াইতে হয়‌, তাই বোধ করি তাহাদের ঘোড়ার ব্যবস্থা।

পরদিন সকালবেলা প্ৰাতরাশের পর ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘চল‌, স্টেশনে বেড়িয়ে আসা যাক।’ সকাল সাতটায় একটা ট্রেন চলিয়া গিয়াছে‌, আর একটা ট্রেন আসিবে ঘণ্টা দুই পরে। স্টেশনে ভিড় নাই‌, প্রবেশদ্বারে টিকিট-চোকার নাই। স্টেশনমাস্টার হরিবিলাসবাবু ছাড়া আর সকলেই বোধ করি এই অবকাশে নিজ নিজ কোয়াটারে চা খাইতে গিয়াছে।

হরিবিলাসবাবুর সহিত আমাদের পরিচয় হইয়াছিল। অত্যন্ত গভীর প্রকৃতির লোক‌, অজীৰ্ণ-জীর্ণ শরীর। ওজন করিয়া কথা বলেন‌, একটি কথা বলিবার আগে পাঁচবার অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা করেন। আমাদের সহিত পরিচয় হইলেও অধিক বাক্য-বিনিময় হয় নাই। আমরা আসিয়া যখন শূন্য প্ল্যাটফর্মের উপর অলসভাবে পায়চারি করিতে লাগিলাম‌, তখন তিনি অফিস-ঘর হইতে চশমার উপর দিয়া আমাদের লক্ষ্য করিলেন‌, কিন্তু উচ্চবাচ্য করিলেন না।

ব্যোমকেশ অবশ্য প্ল্যাটফর্মে পায়চারি করিবার জন্য আসে নাই‌, সংবাদ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে আসিয়াছিল; কিন্তু সে হরিবিলাসবাবুর কাছে গেল না। তাঁহার নিকট হইতে সংবাদ সংগ্রহ করা এবং খনির গর্ভ হইতে মণিমাণিক্য আহরণ সমান শ্রমসাপেক্ষ। তার চেয়ে অন্য কেহ যদি আসিয়া পড়ে–

বেশিক্ষণ অপেক্ষা করিতে হইল না‌, টিকিট-চোকার মনোতোষ বোধ হয় নিজের কোয়ার্টার হইতে আমাদের দেখিতে পাইয়াছিল‌, মুখ মুছিতে মুছিতে আসিয়া উপস্থিত হইল। ভারি তোখড় ছেলে‌, কথাবাতায় চটপটে। বলিল‌, ‘কী কাণ্ড‌, দাদা! আপনার চোখের সামনে এই ব্যাপার হল—অ্যাঁ।‘

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘খবর পৌঁছে গেছে দেখছি!’

মনোতোষ বলিল‌, ‘খবর পৌঁছবে না! কাল রাত্রে দশটা সতরোর প্যাসেঞ্জার তখনও ইন হয়নি‌, খবর এসে হাজির। তা কী দেখলেন‌, দাদা! দুম করে আপনার চোখের সামনে বোমা ফাটল?’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘ঠিক চোখের সামনে বোমা ফাটেনি‌, তবে কানের সামনে বটে। আপনি সদানন্দ সুরকে চিনতেন?

‘চিনতাম না! চারটে তিপান্নর গাড়ি থেকে নামলেন‌, আমাকে টিকিট দিয়ে ব্যাগ হাতে করে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন‌, আমি শুধোলাম–কি দাদা‌, কলকাতা গেছলেন দেখছি‌, কেমন বেড়ালেন। চেড়ালেন? উনি হেসে বললেন-কলকাতা কি বেড়াবার জায়গা‌, সেখানে গিয়ে চেড়ালাম। এই বলে হাসতে হাসতে চলে গেলেন। তখন কে জানতো আধঘণ্টাও কাটিবে না।’

আপনি তাঁকে দেখেছিলেন?’

মনোতোষ বলিল‌, ‘দেখিনি? আমার চোখ এড়িয়ে এ-ইস্টিশন থেকে কি কারুর বেরুবার জো আছে‌, দাদা। দিন আষ্ট্রেক-দশ আগেকার কথা; সকালবেলা আমাকে টিকিট দেখিয়ে ইস্টিশানে ঢুকলেন‌, সাতটা তিনের ডাউন প্যাসেঞ্জারে চলে গেলেন।’

‘কলকাতার টিকিট ছিল?’

‘অ্যাঁ-তা তো ঠিক মনে পড়ছে না‌, দাদা। তবে কলকাতা ছাড়া আর কি হতে পারে।’

‘কলকাতার দিকে অন্য স্টেশন হতে পারে।–সে যাক। তাঁর সঙ্গে কী কী মাল ছিল বলুন তো।’

‘মোল ‘—মনোতোষ একটু মাথা চুলকাইয়া বলিল‌, ‘যতদূর মনে পড়ছে‌, এক হাতে ক্যান্বিসের ব্যাগ‌, অন্য হাতে স্টীল-ট্রাঙ্ক ছিল। কেন বলুন তো?’

‘স্টীল-ট্রাঙ্কটা সদানন্দবাবু ফিরিয়ে আনেননি। তার মানে কোথাও রেখে এসেছিলেন। যাক‌, আপনি তো দেখছি লোকটিকে ভালোভাবেই চিনতেন। কেমন মানুষ ছিলেন তিনি?’

‘ঐটি বলতে পারব না‌, দাদা। পরচিত্ত অন্ধকার। তবে কথাবাতায় ভালো ছিলেন। কারুর সাতে-পাঁচে থাকতেন না‌, নিজের ধান্দায় ঘুরতেন। মাসখানেক আগে আমাদের মাস্টারমশায়ের কাছে খুব যাতায়াত ছিল।’—বলিয়া স্টেশনমাস্টারের ঘরের দিকে আঙুল দেখাইল।

‘তাই নাকি! কিসের জন্যে যাতায়াত?’

‘তা জানিনে‌, দাদা। দু’জনে মুখোমুখি বসে কী গুজ-গুজ ফুস্‌-ফুস্‌ করতেন ওঁরাই জানেন।

আপনি মাস্টারমশাইকে শুধোন না।’

‘হুঁ, তাই করি।’

হরবিলাশবাবুর ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়াইলাম। ব্যোমকেশ বলিল, ‘মাস্টারমশাই, আসতে পারি?’

হরিবিলাসবাবু এমনভাবে ভ্রূ তুলিয়া চাহিলেন যেন আমাদের চিনিতেই পারেন নাই। তারপর‌, কাজে বিঘ্ন করার জন্য বিরক্ত হইয়াছেন এমনিভাবে হাতের কলম রাখিয়া বলিলেন‌, ‘আসুন।’

আমরা ঘরে গিয়া বসিলাম। বহু খাতাপত্রে ভারাক্রান্ত প্রকাণ্ড টেবিলের ওপারে তিনি‌, এপারে আমরা। ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘সদানন্দ সুর মারা গেছেন শুনেছেন বোধ হয়?’

হরিবিলাসবাবু প্রশ্নটাকে অত্যন্ত সন্দিগ্ধভাবে পরীক্ষা করিয়া বলিলেন‌, ‘শুনেছি।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘তাঁর সঙ্গে আপনার জানাশোনা ছিল?’

যেন এই কথার উত্তরের উপর জীবন-মরণ নির্ভর করিতেছে এমনিভাবে গভীর বিবেচনার পর হরিবিলাসবাবু বলিলেন‌, ‘সামান্য জানাশোনা ছিল।’

ব্যোমকেশ ঈষৎ অধীর কণ্ঠে বলিল‌, ‘দেখুন‌, আপনি মনে করবেন না‌, নাহক কৌতুহলের বশেই আপনাকে প্রশ্ন করছি। অত্যন্ত ভয়াবহভাবে সদানন্দবাবুর মৃত্যু হয়েছে‌, আমি পুলিসের পক্ষ থেকে তারই তদন্ত করতে এসেছি। —এখন বলুন‌, কোন সূত্রে সদানন্দবাবুর সঙ্গে আপনার পরিচয় হয়েছিল।’

হরিবিলাসবাবুর চোপ্রসানো মুখ যেন আরও চুপসিয়া গেল। তিনি দু’চার বার গলা-ঝাড়া দিয়া অত্যন্ত দ্বিধাসকুল কণ্ঠে বলিতে আরম্ভ করিলেন,–’সদানন্দ সুরের ভগিনীপতি প্রাণকেষ্ট পাল রেলের লাইন-ইন্সপেক্টর‌, তাঁর সঙ্গে আমার আগে থাকতে পরিচয় আছে। মাসিকয়েক হল প্রাণকেষ্টবাবু এ-লাইনে এসেছেন; রামডিহি জংশনে তাঁর হেড-কোয়ার্টার। ট্রলিতে চড়ে রেলের লাইন পরিদর্শন করে বেড়ানো তাঁর কাজ। কাজের উপলক্ষে সান্তালগোলা দিয়ে তিনি প্ৰায় যাতায়াত করেন‌, আমার সঙ্গে দেখা হয়। একদিন প্রাণকেষ্টবাবু এসেছেন‌, আমি তাঁর সঙ্গে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে কথা কইছি‌, এমন সময় সদানন্দবাবু প্ল্যাটফর্মে এলেন। প্ৰাণকেষ্টবাবু পরিচয় করিয়ে দিলেন; বললেন-আমার সম্বন্ধী। সেই থেকে আমি সদানন্দবাবুকে চিনি।’

শুনিতে শুনিতে ব্যোমকেশের দৃষ্টি প্রখর হইয়া উঠিয়ছিল; সে বলিল‌, ‘কতদিন আগের কথা?’

‘দু-তিন মাস হবে।’

‘প্রাণকেষ্টবাবু প্রায়ই এ-লাইনে যাতায়াত করেন! শেষ কবে এসেছিলেন?’

‘চার-পাঁচ দিন আগে। স্টেশনে বেশিক্ষণ ছিলেন না‌, ট্রলিতে চড়ে লাইন দেখতে চলে গেলেন।’

‘শালা-ভগিনীপতির মধ্যে বেশ সত্ত্বাব ছিল?’

‘ভেতরে কি ছিল জানি না‌, বাইরে সদ্ভাব ছিল।’

‘যাক। তারপর থেকে সদানন্দ সুর আপনার কাছে যাতায়াত করতেন? কী উপলক্ষে যাতায়তা করতেন?’

হরবিলাসবাবু আবার কিছুক্ষণ নীরবে চিত্তা মন্থন করিয়া বলিলেন, ‘সদানন্দবাবু দালাল ছিলেন, ছোটখাট জিনিসের দালালি করতেন। আমার ডিস্‌পেপসিয়া আছে দেখে তিনি আমাকে কবিরাজী চিকিৎসা করাবার জন্য ভজচ্ছিলেন। দু’এক শিশি গছিয়েছিলেন; হত্তুকী আর বিটনুন। তাতে কিছু হল না।’

হরি হরি‌, শেষে‌, হরীতকী আর বিটলুন! ব্যোমকেশ তবু প্রশ্ন করিল‌, ‘এ ছাড়া সদানন্দ সুরের সঙ্গে আপনার আর কোনও সম্বন্ধ ছিল না?’

‘না।’

নিশ্বাস ছাড়িয়া ব্যোমকেশ উঠিয়া পড়িল‌, ‘আপনাকে অনর্থক কষ্ট দিলাম। প্রাণকেষ্টবাবু এখন রামডিহি জংশনেই আছেন?’

‘হ্যাঁ।’

‘নমস্কার।–চল‌, অজিত।’

স্টেশনের বাহিরে আসিয়া বলিলাম‌, ‘এবার কী?’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘ওবেলা রামডিহিতে গিয়ে প্রাণকেষ্ট পাল মহাশয়কে দর্শন করে আসতে হবে। তিনি শ্যালকের মৃত্যু-সংবাদ যদি বা এখনও না পেয়ে থাকেন‌, বিকেল নাগাদ নিশ্চয় পাবেন।–হরিবিলাসবাবুকে কেমন মনে হল?’

বলিলাম‌, ‘আকার-সদৃশী প্রজ্ঞা। যেমন ঘুণ-ধরা চেহারা‌, তেমনি মরচে-ধরা বুদ্ধি। শূন্য সিন্দুকে ডবল তালা। তুমি যদি সন্দেহ করে থাকো যে উনি লুকিয়ে লুকিয়ে গোলা-বারুদের কালাবাজার করছেন‌, তাহলে ও-সন্দেহ ত্যাগ করতে পার। হরিবিলাসবাবুর একমাত্র গোলা হচ্ছে হরীতকী-খণ্ড‌, আর বারুদ-বিটলুন।’

ব্যোমকেশ হাসিল; বলিল‌, ‘চল‌, বাজারটা ঘুরে আসা যাক।’

‘বাজারে কী দরকার?’

‘এসই না।’

গঞ্জের কর্মব্যস্ততা আরম্ভ হইয়া গিয়াছে। প্রত্যেক আড়াতের সামনে মুক্তস্থানে বহু গরুর গাড়ির ঠেলাঠেলি‌, দুই-চারিটা ঘোড়ায়-টানা খোলা ট্রাক-জাতীয় গাড়িও আছে। প্রত্যেক গোলা হইতে ‘রামে রাম দুইয়ে দুই শব্দ উঠিতেছে। ডাই-করা কাঁচা-মাল পাঁচসেরি বাটখারায় ওজন হইতেছে।

একটি গোলায় এক বাঙালী যুবক দাঁড়াইয়া কাজকর্ম তদারক করিতেছিলেন‌, ব্যোমকেশ গিয়া তাহাকে জিজ্ঞাসা করিল‌, ‘এটা নফার কুণ্ডু মশায়ের গোলা না?’

ছোকরা বোধ হয় ব্যোমকেশের মুখ চিনিত‌, সসম্রামে বলিল‌, ‘আজ্ঞে হ্যাঁ। আমি তাঁর ভাইপো।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘বেশ বেশ। কুণ্ডুমশাই কোথায়?’

ছোকরা বলিল‌, ‘আজ্ঞে‌, কাকা এখানে নেই‌, বাইরে গেছেন। কিছু দরকার আছে কি?’

‘দরকার এমন কিছু নয়। কোথায় গেছেন?’

‘আজ্ঞে‌, তা কিছু বলে যাননি।’

‘তাই নাকি! কবে গেছেন?’

‘গত মঙ্গলবার বিকেলবেলা।’

ব্যোমকেশ আড়চোখে আমার পানে চাহিল। আমার মনে পড়িয়া গেল‌, গত সোমবারে আমি রামডিহি স্টেশনে গিয়া বেনামী চিঠি ডাকে দিয়া আসিয়াছিলাম। স্বাভাবিক নিয়মে চিঠি মঙ্গলবারে এখানে পৌঁছিয়াছে। নফর কুণ্ডুর নামেও একটি বেনামী চিঠি ছিল। তবে কি চিঠি পাইয়া পাখি উড়িয়াছে? নফর কুণ্ডুই আমাদের অচিন পাখি? কিন্তু সে যাই হোক‌, ভাইপো ছোকরা কিছু জানে বলিয়া মনে হয় না; সরলভাবে সব কথার উত্তর দিতেছে।

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘তিনি কবে ফিরবেন তাও বোধ হয় জানা নেই?’

‘আজ্ঞে না‌, কিছু বলে যাননি।’

ব্যোমকেশ একটু চিন্তা করিয়া বলিল‌, ‘আচ্ছা‌, যেদিন নফরবাবু চলে যান সেদিন সকালে কি কোনও চিঠিপত্র পেয়েছিলেন?’

ছোকরা বলিল‌, ‘চিঠি রোজই দু’চারখানা আসে‌, সেদিনও এসেছিল।’

‘হুঁ।’

প্রস্থনোদ্যত হইয়া ব্যোমকেশ আবার ঘুরিয়া দাঁড়াইল‌, ‘তোমাদের কোটা ঘোড়া আছে?’

ছোকরা অবাক হইয়া চাহিল‌, ‘ঘোড়া!’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ‌, ঘোড়া। ওই যে ট্রাক টানে।’ ব্যোমকেশ আঙ্গুল দিয়া পাশের গোলা দেখাইল।

যুবক বুঝিয়া বলিল‌, ‘ও-না‌, আমাদের ঘোড়া-টানা ট্রাক নেই‌, গরুর গাড়িতে চলে যায়।’ এই সময় এক ইউনিফর্ম-পরা কনস্টেবল আসিয়া জোড়পায়ে দাঁড়াইয়া ব্যোমকেশকে স্যালুট করিল, ‘হুজুর, দারোগাসাহেব সেলাম দিয়া হ্যায়।’

ব্যোমকেশ ভ্রূকুঞ্চিত করিয়া চাহিল; বলিল‌, ‘চল‌, যাচ্ছি।’

কাছেই থানা। সেই দিকে যাইতে যাইতে ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘সুখময় দারোগা কি রকম ফিচেল দেখেছ? হাটের মাঝখানে কনস্টেবল পাঠিয়েছে‌, যাতে কারুর জানতে বাকি না থাকে যে পুলিসের সঙ্গে আমার ভারি দহরম মহরম।’

‘হুঁ। কিন্তু তলব কিসের জন্যে?’

‘বোধ হয় অমৃতের পোস্ট-মর্টেম রিপোর্ট এসেছে।’

থানায় পদাৰ্পণ করিতেই সুখময় দারোগা মুখে মধুর রসের ফোয়ারা ছুটাইয়া দিলেন‌, ‘আসুন‌, আসুন ব্যোমকেশবাবু্‌, আসুন অজিতবাবু্‌, বসুন বসুন। ব্যোমকেশবাবু্‌, আপনি এই চেয়ারটাতে বসুন। আমি আপনার কাছেই যাচ্ছিলাম‌, হঠাৎ নজরে পড়ল আপনারা এদিকে আসছেন। হে-হে‌, এই নিন অমৃতের পোস্ট-মর্টেম রিপোর্ট। বুদ্ধি বটে আপনার; ঠিক ধরেছিলেন‌, বন্দুকের গুলিতেই মরেছে।’ বলিয়া ডাক্তারের রিপোর্ট ব্যোমকেশের হাতে দিলেন।

বিচিত্র জীব এই সুখময়বাবু। এইরূপ চরিত্র আমরা সকলেই দেখিয়াছি এবং মনে মনে সহিংস তারিফ করিয়াছি। কিন্তু ভালবাসিতে পারি নাই। ইহারা কেবল পুলিস-বিভাগে নয়‌, জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রেই ছড়াইয়া আছেন।

রিপোর্ট পড়িয়া ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘গুলিটা শরীরের মধ্যেই পাওয়া গিয়েছে দেখছি। কোথায় সেটা?’

‘এই যে!’ একটা নম্বর-আঁটা টিনের কোটা হইতে মাষকলাইয়ের মত একটি সীসার টুকরা লইয়া সুখময়বাবু তাহার হাতে দিলেন।

করতলে গুলিটি রাখিয়া ব্যোমকেশ কিছুক্ষণ সেটিকে সমীক্ষণ করিল‌, তারপর সুখময়বাবুকে জিজ্ঞাসা করিল‌, ‘এ থেকে কিছু বুঝলেন?’

সুখময়বাবু বলিলেন‌, ‘আজ্ঞে‌, গুলি দেখে বোঝা যাচ্ছে পিস্তল কিংবা রিভলবারের গুলি। এ ছাড়া বোঝবার আর কিছু আছে কি?’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘আছে বৈকি। গুলি থেকে বোঝা যাচ্ছে–.৩৮ অটোম্যাটিক থেকে গুলি বেরিয়েছে‌, যে .৩৮ অটোম্যাটিক যুদ্ধের সময় মার্কিন সৈন্য ব্যবহার করত। অৰ্থাৎ–’ ব্যোমকেশ থামিল।

সুখময়বাবু বলিলেন‌, ‘অৰ্থাৎ অমৃতকে যে খুন করেছে এবং আপনি যাকে খুঁজতে এসেছেন তাদের মধ্যে যোগাযোগ আছে‌, এমন কি তারা একই লোক হতে পারে। কেমন?’

ব্যোমকেশ গুলিটি তাঁহাকে ফেরত দিয়া বলিল‌, ‘এ বিষয়ে আমার কিছু না বলাই ভালো। আপনার কাজ অমৃতের হত্যাকারীকে ধরা‌, সে-কাজ আপনি করবেন। আমার কাজ অন্য।’

‘তা তো বটেই‌, তা তো বটেই। হ্যাঁ ভালো কথা‌, সদানন্দ সুরের লাশ হাসপাতালে পাঠিয়ে দিয়েছি‌, রিপোর্ট এলেই আপনাকে দেখাব।’

‘আমাকে সদানন্দ সুরের রিপোর্ট দেখানোর দরকার নেই। এটাও আপনারই কেস‌, আমি হস্তক্ষেপ করতে চাই না। আমি রুই-কাতলা ধরতে এসেছি‌, চুনাপুটিতে আমার দরকার কি বলুন।’

সুখময়বাবুর চক্ষু দু’টি ধূর্ত কৌতুকে ভরিয়া উঠিল‌, তিনি বলিলেন‌, ‘সে-কথা একশো বার। কিন্তু ব্যোমকেশবাবু্‌, আপনার জালে যখন রুই-কাতলা উঠবে তখন আমার চুনাপুটিও সেই জালেই উঠবে; আমাকে আলাদা জাল ফেলতে হবে না। হে হে হে হে। চললেন নাকি? আচ্ছা‌, নমস্কার।’

বাহিরে আসিলাম। ব্যোমকেশ আমার পানে চাহিয়া হাসিয়া ফেলিল। লোকটার দুষ্টবুদ্ধির শেষ নাই‌, অথচ তাহার কার্যকলাপে না হাসিয়াও থাকা যায় না। ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘এখনও রোদ চড়েনি‌, চলো চালের কল দুটো দেখে যাই।’

রাস্তা দিয়া ঘুরিয়া বিশ্বনাথ রাইস মিল-এর সম্মুখে উপস্থিত হইতে পাঁচ মিনিট লাগিল। বেশ বড় চালের কল‌, পাঁচ-ছয় বিঘা জমির উপর প্রসারিত; কাঁটা-তারের বেড়া দিয়া ঘেরা। গুখািরক্ষিত ফটক দিয়া প্রবেশ করিলে প্রথমেই সামনে প্রকাণ্ড শান-বাঁধানো চাতাল চোখে পড়ে। চাতালের ওপারে একটি পুকুর‌, বাঁ পাশে ইঞ্জিন-ঘর ও ধান-ভানার করোগেটের ছাউনি; ডান পাশে গুদাম‌, দপ্তর ও মালিকের থাকিবার জন্য একসারি কক্ষ। সকালবেলা কাজ চালু আছে, সধান-ভানার ছাউনী হইতে ছড়্‌ ছড়্‌ ছর্‌ছর্‌ শব্দ আসিতেছে। কুলি-মজুরেরা কাজে ব্যস্ত, গরুর গাড়ি ও ঘোড়ার ট্রাক হইতে বস্তা ওঠা-নমা হইতেছে।

চাল কলের মালিকের নাম বিশ্বনাথ মল্লিক। থানা হইতে তাঁহার নাম সংগ্রহ করিলেও এবং বেনামী চিঠি পাঠাইলেও চাক্ষুষ পরিচয় এখনও হয় নাই। আমরা গুখ্যার মারফত এত্তালা পাঠাইয়া মিল-এ প্রবেশ করিলাম। দপ্তরে উপস্থিত হইয়া দেখিলাম বিশ্বনাথবাবু সেখানে নাই‌, একজন মুহুরী গোছের লোক গদিতে বসিয়া খাতপত্র লিখিতেছে।

‘কী চান?’

‘বিশ্বনাথবাবু আছেন? আমরা পুলিসের পক্ষ থেকে আসছি।’

লোকটি তটস্থ হইয়া উঠিল‌, ‘আসুন আসুন‌, বসতে আজ্ঞা হোক। কত মিল-এর কাজ তদারক করতে গেছেন‌, এখনি আসবেন। তাঁকে খবর পাঠাব কি?’

ঘরের অর্ধেক মেঝে জুড়িয়া গদির বিছানা‌, আমরা গদির উপর উপবেশন করিলাম। সত্য কথা বলিতে কি‌, আধুনিক চেয়ার-সোফার চেয়ে সাবেক গন্দি-ফরাশ ঢের বেশি আরামের।‌্‌, ব্যোমকেশ একটি সুপুষ্ট তাকিয়া কোলের কাছে টানিয়া লইয়া বলিল‌, ‘না না‌, তাঁকে ডেকে পাঠানোর দরকার নেই। সামান্য দু-চারটে কথা জিজ্ঞেস করার আছে‌, তা সে আপনিই বলতে পারবেন। আপনি বুঝি মিল-এর হিসেব রাখেন?’

লোকটি সবিনয়ে হস্তঘর্ষণ করিয়া বলিল‌, ‘আজ্ঞে‌, আমি মিল-এর নায়েব-সরকার। অধীনের নাম নীলকণ্ঠ অধিকারী। আপনি কি ব্যোমকেশ বক্সী মশাই?’

ব্যোমকেশ হাসিয়া ঘাড় নাড়িল। নীলকণ্ঠ অধিকারী ভক্তি-তদগত চক্ষে তাহার পানে চাহিয়া রহিল। এমন লোক আছে পুলিসের নাম শুনিলে যাহাদের হৃদয় বিগলিত হয়। উপরন্তু তাহারা যদি ব্যোমকেশ বক্সীর নাম শুনিতে পায় তাহা হইলে তাঁহাদের হৃদয়াবেগ বাঁধ-ভাঙা বন্যার মত দু’কুল ছাপাইয়া প্রবাহিত হইতে থাকে‌, তখন আর তাহাদের ঠেকাইয়া রাখা যায় না। নীলকণ্ঠ অধিকারী সেই জাতীয় লোক। তাহার মুখ দেখিয়া বুঝিলাম‌, ব্যোমকেশকে আদেয় তাহার কিছুই নাই; প্রশ্নের উত্তর সে দিবেই‌, এমন কি‌, প্রশ্ন না করিলেও সে উত্তর দিবে।

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘আপনাকে দেখে কাজের লোক মনে হচ্ছে। মিল-এর সব কাজ আপনিই দেখেন?’

নীলকণ্ঠ সহৰ্ষে হস্তঘর্ষণ করিল‌, ‘আজ্ঞে‌, কতাও দেখেন। উনি যখন থাকেন না। তখন আমার ওপরেই সব ভার পড়ে।’

‘কর্তা-মানে বিশ্বনাথবাবু-এখানে থাকেন না?’

‘আজ্ঞে‌, এখানেই থাকেন। তবে মিল-এর কাজকর্ম যখন কম থাকে তখন দু’চার দিনের জন্য কলকাতা যান। কলকাতায় কর্তার ফ্যামিলি থাকেন।’

‘বুঝেছি। তা কর্তা কতদিন কলকাতা যাননি?’

‘মাসখানেক হবে। এখন কাজের চাপ বেশি—’

‘আচ্ছা‌, ও-কথা থাক। অমৃত নামে বাঘমারি গ্রামের একটি ছোকরা সম্প্রতি মারা গেছে তাকে আপনি চিনতেন?’

নীলকণ্ঠ উৎসুক স্বরে বলিল‌, ‘চিনতাম বৈকি। অমৃত প্রায়ই কর্তার কাছে চাকরির জন্য দরবার করতে আসত। কিন্তু

‘সদানন্দ সুরকেও আপনি চিনতেন?

নীলকণ্ঠ সংহত স্বরে বলিল‌, ‘সদানন্দবাবু কাল রাত্রে বোমা ফেটে মারা গেছেন‌, আজ সকালে খবর পেয়েছি। সদানন্দবাবুকে ভালোরকম চিনতাম। আমাদের এখানে তাঁর খুব যাতায়াত छिब्ल। ‘

‘কী উপলক্ষে যাতায়াত ছিল?’

‘উপলক্ষ-কর্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ছিল। মাঝে মাঝে গদিতে এসে বসতেন‌, তামাক খেতেন‌, কর্তার সঙ্গে দুদণ্ড বসে গল্পগাছা করতেন। এর বেশি উপলক্ষ কিছু ছিল না। তবে—’ বলিয়া নীলকণ্ঠ থামিল।

‘অর্থাৎ মোসায়েবি করতেন। তবে কি?’

‘দিন দশেক আগে তিনি কর্তার কাছ থেকে কিছু টাকা ধার করেছিলেন।’

‘তাই নাকি! কত টাকা?’

‘পাঁচশো।’

‘হ্যান্ডনোট লিখে টাকা ধার নিয়েছিলেন?’

‘আজ্ঞে না। কত সদানন্দবাবুকে বিশ্বাস করতেন‌, বহিখাতায় সদানন্দবাবুর নামে পাঁচশো টাকা কৰ্ম্ম লিখে টাকা দেওয়া হয়েছিল। টাকাটা বোধহয় ডুবল।’ বলিয়া নীলকণ্ঠ দুঃখিতভাবে মাথা নাড়িল।

ব্যোমকেশ গালে হাত দিয়া ভাবিতে লাগিল। কি ভাবিল জানি না‌, কিন্তু খানিক পরে বাহির হইতে ঘোড়ার চিহি-চিহি শব্দ শুনিয়া তাহার চমক ভাঙিল। সে মুখ তুলিয়া বলিল‌, ‘ভালো কথা‌, অনেকগুলো ঘোড়া দেখলাম। সবগুলোই কি আপনাদের?

নীলকণ্ঠ সোৎসাহে বলিল‌, ‘আজ্ঞে‌, সব আমাদের। কর্তার খুব ঘোড়ার শখ। নটা ঘোড়া আছে।’

‘তাই নাকি! এতগুলো ঘোড়া কি করে? ট্রাক টানে?’

‘ট্রাক তো টানেই। তা ছাড়া কর্তা নিজে ঘোড়ায় চড়তে ভালবাসেন। উনি কমবয়সে জকি ছিলেন। কিনা—‘

‘নীলকণ্ঠ!—‘

শব্দটা আমাদের পিছন দিক হইতে চাবুকের মত আসিয়া নীলকণ্ঠের মুখে পড়িল। নীলকণ্ঠ ভীতমুখে চুপ করিল‌, আমরা একসঙ্গে পিছনে ঘাড় ফিরাইলাম।

দ্বারের সম্মুখে একটি লোক দাঁড়াইয়া আছে। বয়স আন্দাজ চল্লিশ‌, ক্ষীণ-খর্ব চেহারা‌, অস্থিসার মুখে বড় বড় চোখ‌, হাফ-প্যান্ট ও হাফ-শার্ট পরা শরীরে বিকলতা কিছু না থাকিলেও‌, জঙ্ঘার হাড়-দু’টি ধনুকের মতো বাঁকা। ইনিই যে মিল-এর মালিক ভূতপূর্ব জকি বিশ্বনাথ মল্লিক তাহা নিঃসংশয়ে বুঝিতে পারিলাম।

বিশ্বনাথ মল্লিক নীলকণ্ঠের দিকেই চাহিয়া ছিলেন‌, পলকের জন্যও আমাদের দিকে চক্ষু ফিরান নাই। এখন তিনি ঘরের মধ্যে দুই পা অগ্রসর হইয়া আগের মতাই শাণিত কণ্ঠে নীলকণ্ঠকে বলিলেন‌, ‘ইস্টিশানে মাল চালান যাচ্ছে‌, তুমি তদারক করো গিয়ে।’

নীলকণ্ঠ কশাহত ঘোড়ার মত ছুটিয়া ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল।

এইবার বিশ্বনাথ মল্লিক আমাদের দিকে চক্ষু ফিরাইলেন। তাঁহার মুখ হইতে মালিক-সুলভ কঠোরতা অপগত হইয়া একটু হাসির আভাস দেখা দিল। তিনি সহজ সুরে বলিলেন‌, ‘নীলকণ্ঠ বড় বেশি কথা কয়। আমি আগে জকি ছিলাম‌, সেই খবর আপনাদের শোনাচ্ছিল বুঝি?’

ব্যোমকেশ একটু অপ্রস্তুত হইয়া বলিল‌, ‘ঘোড়ার কথা থেকে জকির কথা উঠে পড়ল।’

বিশ্বনাথবাবু মুখে সহাস্য ভঙ্গী করিলেন‌, ‘নিজের লজ্জাকর অতীতের কথা সবাই চাপা দিতে চায়‌, আমার কিন্তু লজ্জা নেই। ববং দুঃখ আছে‌, যদি জকির কাজ ছেড়ে না দিতাম‌, এতদিনে হয়তো খীম সিং কি খাদে হয়ে দাঁড়াতাম। কিন্তু ও-কথা যাক। আপনি ব্যোমকেশবাবু—না? সদানন্দ সুরের মৃত্যু সম্বন্ধে খোঁজখবর নিতে এসেছেন? আসুন‌, আমার বসবার ঘরে যাওয়া যাক।’

বিশু মল্লিকের খাস কামরাটি আধুনিক প্রথায় টেবিল চেয়ার দিয়া সাজানো‌, বেশ ফিটফাট। আমরা উপবেশন করিলে তিনি টেবিলের দেরাজ হইতে সিগারেটের টিন বাহির করিয়া দিলেন।

বিশু মল্লিকের চেহারাটি অকিঞ্চিৎকর বটে‌, কিন্তু তাঁহার আচার-ব্যবহারে বেশ একটি আত্মপ্রত্যয়শীল ব্যক্তিত্বের পরিচয় পাওয়া যায়‌, চোখ দু’টির অন্তরালে সজাগ শক্তিশালী মস্তিষ্কের ক্রিয়া চলিতেছে তাহাও বুঝিতে কষ্ট হয় না। আমাদের সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করিয়া তিনি নিজে সিগারেট ধরাইলেন। টেবিলের সামনের দিকে বসিয়া বলিলেন‌, ‘ব্যোমকেশবাবু্‌, আপনি কি জন্যে সান্তালগোলায় এসেছেন তা আমি জানি। বোধহয় এখানকার সকলেই জানে। এখন বলুন আমি কিভাবে আপনাকে সাহায্য করতে পারি। অবশ্য নীলকণ্ঠের কাছে আমার সম্বন্ধে সব কথাই শুনেছেন। যদি আমাকেই গোলাবারুদের আসামী বলে সন্দেহ করেন তাহলে আমার মিল খুঁজে দেখতে পারেন‌, আমার কোনও আপত্তি নেই।’

ব্যোমকেশ হাসিয়া বলিল‌, ‘খোঁজাখুঁজির কথা পরে হবে। এখন আমার একটি ব্যক্তিগত কৌতুহল চরিতার্থকরুন। জকির কাজ ছেড়ে চালের কল করলেন কেন? যতদূর জানি জকির কাজে পয়সা আছে।’

বিশুবাবু বলিলেন‌, ‘পয়সা অবশ্য আছে কিন্তু বড় কড়াকড়ির জীবন‌, ব্যোমকেশবাবু। কখন ওজন বেড়ে যাবে এই ভয়ে আধ-পেটা খেয়ে জীবন কাটাতে হয়। আরও অনেক বায়নাক্কা আছে। আমার পোষাল না। কিছু টাকা জমিয়েছিলাম‌, তাই দিয়ে যুদ্ধের আগে এই মিল খুলে বসলাম। তা‌, বলতে নেই‌, মন্দ চলছে না।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘কিন্তু ঘোড়ার মোহ ছাড়তে পারলেন না। এখানেও অনেকগুলি ঘোড়া পুষেছেন দেখলাম।’

বিশুবাবু ঈষৎ গাঢ়স্বরে বলিলেন‌, ‘হ্যাঁ। আমি ঘোড়া ভালবাসি। অমন বুদ্ধিমান প্রভুভক্ত জানোয়ার আর নেই। মানুষের প্রকৃত বন্ধু যদি কেউ থাকে সে কুকুর নয়‌, ঘোড়া।’

‘তা বটে।’ ব্যোমকেশ চিন্তা করিতে করিতে বলিল‌, ‘আমারও কুকুরের চেয়ে ঘোড়া ভাল লাগে। কত রঙের ঘোড়াই আছে; লাল সাদা কালো। তবে এদেশে লাল ঘোড়াই বেশি দেখা যায়‌, সাদা কালো তত বেশি নয়। এই দেখুন না‌, সান্তালগোলাতেই কত ঘোড়া চোখে পড়ল‌, কিন্তু সাদা বা কালো ঘোড়া একটাও দেখলাম না।’

বিশুবাবু বলিলেন‌, ‘আপনি ঠিক বলেছেন। সাদা ঘোড়া এখানে একটাও নেই। তবে একটা কালো ঘোড়া আছে। বদ্রিদাস মাড়োয়ারীর।’

‘বদ্রিদাস-সে কে?’

‘এখানে আর-একটা চালের কল আছে‌, তার মালিক বদ্রিদাস গিরধরলাল। তার কয়েকটা ঘোড়া আছে‌, তাদের মধ্যে একটা ঘোড়া কালো।’

ব্যোমকেশ সিগারেটের শেষাংশ অ্যাশ-ট্রেতে ঘসিয়া নিভাইয়া দিল। ঘোড়া সম্বন্ধে তাহার কৌতুহল নিবৃত্ত হইয়াছে এমনি নিরুৎসুক স্বরে বলিল‌, ‘কালো ঘোড়া আছে তাহলে। —যাক‌, এবার কাজের কথা বলি। আপনার কর্মচারীর কাছে কিছু খবর পেয়েছি‌, সে-সব কথা আবার জিজ্ঞেস করে সময় নষ্ট করব না। সদানন্দ সুরের মৃত্যু-সংবাদ আপনি পেয়েছেন। ঘটনাক্রমে আমি তখন বাঘমারি গ্রামে ছিলাম। ভয়াবহ মৃত্যু।’

বিশুবাবু বলিলেন‌, ‘শুনেছি বোমা ফেটে মৃত্যু হয়েছে। আপনি দেখেছিলেন?’

ব্যোমকেশ সংক্ষেপে মৃত্যুর বিবরণ দিয়া বলিল‌, ‘এখন শুধু সদানন্দ সুরের মৃত্যুর কিনারা নয়‌, বোমারও কিনারা করতে হবে। আপনি বুদ্ধিমান লোক‌, এবিষয়ে আমাকে যথেষ্ট সাহায্য করতে পারেন।’

‘কিভাবে সাহায্য করতে পারি বলুন।’

‘আপনি এখানে অনেক দিন আছেন‌, এখানকার ঘাঁৎঘোঁৎ জানা আছে। মার্কিন সিপাহীর দল যখন এখানে ছিল‌, তখন আপনিও ছিলেন। আপনি বলতে পারেন। কারা মার্কিন সিপাহীদের ছাউনিতে যাতায়াত করত?’

বিশুবাবু কিছুক্ষণ নতনেত্ৰে চিন্তা করিয়া বলিলেন‌, ‘মার্কিন সিপাহীদের ছাউনিতে কারুর যাতায়াত ছিল। কিনা আমি বলতে পারি না‌, কিন্তু তাদের সর্বত্র যাতায়াত ছিল। ভারি মিশুক লোক ছিল তারা‌, আমার মিল-এও অনেকবার এসেছে।’

‘হুঁ। তারা আপনার কাছে অস্ত্রশস্ত্র বিক্রি করবার চেষ্টা করেছিল কি?’

বিশুবাবু একটু গভীর হাসিলেন‌, ‘করেছিল। একজন সার্জেণ্ট একটা পিস্তল বিক্রি করবার চেষ্টা করেছিল। আমি কিনিনি।’

‘আপনি কেনেননি‌, আর কেউ কিনেছিল। প্রশ্ন হচ্ছে‌, লোকটা কে। আপনি কিছু আন্দাজ করতে পারেন?’

‘কিছু না। আন্দাজ করতে পারলে অনেক আগেই আপনাদের খবর দিতাম‌, ব্যোমকেশবাবু।’

ব্যোমকেশ আর একটা সিগারেট ধরাইয়া কিছুক্ষণ নীরবে টানিল‌, ‘আচ্ছা‌, আর একটা কথা। সান্তালগোলা ছোট জায়গা‌, এখানে মারণাস্ত্রগুলো যদি কেউ লুকিয়ে রাখতে চায় তাহলে কোথায় লুকিয়ে রাখবে আপনি অনুমান করতে পারেন?’

বিশুবাবু আবার কিছুক্ষণ চক্ষু নত করিয়া চিন্তা করিলেন‌, শেষে বলিলেন‌, ‘আপনার বিশ্বাস মারণাস্ত্রগুলো সান্তালগোলাতেই আছে। কিন্তু তা নাও হতে পারে।’

‘মনে করুন। সান্তালগোলাতেই আছে।’

‘বেশ‌, মনে করলাম। কিন্তু অস্ত্রগুলোর আয়তন কতখানি‌, কাঁটা বন্দুক কটা বোমা‌, এসব তো কিছুই জানি না। কি করে আনুমান করব? আমার মনে হয় পুলিস যদি সান্তালগোলার সমস্ত বাড়ি‌, সমস্ত গোলা আর চালের কল একসঙ্গে খানাতল্লাশ করে তাহলে হয়তো অস্ত্রগুলো বেরুতে পারে।’

ব্যোমকেশ মাথা নাড়িল‌, ‘তা কি সম্ভব! আর যদি সম্ভব হত তাহলেও একটা কথা ভেবে দেখুন। যে-ব্যক্তি এই কাজ করছে সে নিবেধি নয়‌, সে কি এমন জায়গায় মাল রাখবে যেখানে পুলিস সহজেই খুঁজে বার করতে পারে? আমার তা মনে হয় না। লোকটি যদি এত নিবোধ হত তাহলে অনেক আগেই ধরা পড়ে যেত।’

বিশুবাবু উৎসুক স্বরে বলিলেন‌, ‘তাহলে আপনার কী মনে হয়? কোথায় লুকিয়ে রাখতে পারে?’

ব্যোমকেশ খানিক চুপ করিয়া থাকিয়া ধীরে ধীরে বলিল‌, ‘এমন জায়গায় রেখেছে যেখানে কারুর যেতে মানা নেই‌, অথচ কেউ যায় না‌, যেখানে দৈবাৎ মাল পাওয়া গেলেও প্রমাণ করা যাবে না কে রেখেছে?’

বিশুবাবু চক্ষু বিস্ফারিত করিয়া বলিলেন‌, ‘অৰ্থাৎ—?’

ব্যোমকেশ পিছনের খোলা জানলা দিয়া অঙ্গুলি নির্দেশ করিল‌, ‘অৰ্থাৎ ওই জঙ্গল। ওখানে ঝোপঝাড়ের মধ্যে কয়েকটা পিস্তল আর হ্যান্ড-গ্রিনেড পুতে রাখা খুব শক্ত কাজ নয়‌, কিন্তু খুঁজে বার করা অসম্ভব। যদি বা খুঁজে বার করলেন‌, কে পুতেছে কি করে প্রমাণ করবেন?’

বিশুবাবু উৎসাহভরে বলিয়া উঠিলেন‌, ‘ঠিক‌, ঠিক। জঙ্গলের কথাটা আমার মাথায় আসেনি। নিশ্চয় জঙ্গলে কোথাও পোঁতা আছে।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘অবশ্য আমার ভুলও হতে পারে। কিন্তু ভুল হয়েছে কিনা সেটা পরীক্ষা করে দেখা দরকার।’

বিশুবাবু বলিলেন‌, ‘না ব্যোমকেশবাবু্‌, আপনি ঠিকই ধরেছেন। আমার বিশ্বাস আর দেরি না করে জঙ্গলটা খুঁজে দেখা দরকার।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘তাই করতে হবে। তবে জঙ্গল তো একটুখানি জায়গা নয়‌, খুঁজতে সময় লাগবে। অনেক লোকও লাগবে। আজ আর হবে না‌, কাল—’

এই পর্যন্ত বলিয়া ব্যোমকেশ থামিয়া গেল। এতক্ষণ সে অসতর্কভাবে কথা বলিতেছিল‌, এখন যেন রাশ টানিয়া নিজেকে সংযত করিল; বিশুবাবুর পানে তীক্ষ্ণভাবে ক্ষণকাল চাহিয়া থাকিয়া বলিল‌, ‘বিশ্বনাথবাবু্‌, আজ। আপনাকে বিশ্বাস করে এমন কথা কিছু বললাম। যা বাইরের লোকের কাছে বক্তব্য নয়। আপনি বিশ্বাসযোগ্য লোক বলেই বলেছি। আশা করি আমার বিশ্বাসের মর্যাদা রাখবেন।’

বিশ্বনাথবাবু বলিলেন‌, ‘আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন‌, আমার মুখ থেকে কোনো কথা বেরুবে না। উঠছেন নাকি?’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘হ্যাঁ‌, আজ উঠি। একবার ঐ মাড়োয়ারী-কি নাম?-বদ্রিদাসের মিল-এ যাব। দেখি যদি ওর কাছে কিছু খবর পাওয়া যায়। বিকেলে আবার রামডিহি যেতে হবে‌, সেখানে সদানন্দ সুরের ভগিনীপতি থাকেন। —আচ্ছা‌, সদানন্দবাবু যে আপনার কাছে পাঁচশো টাকা ধার নিয়েছিলেন‌, কি জন্যে ধার চান কিছু বলেছিলেন কি?’

বিশুবাবু বলিলেন‌, ‘তাঁর ইচ্ছে ছিল এখানে কবিরাজী ওষুধের একটা দোকান খোলা। কিন্তু তাঁর মূলধন ছিল না‌, আমার কাছে ধার চেয়েছিলেন। লোকটি গরীব হলেও সজ্জন ছিলেন‌, আমি টাকা দিয়েছিলাম। তিনি বেঁচে থাকলে নিশ্চয় টাকা শোধ দিতেন‌, কিন্তু–! যাকগে‌, ও-কটা টাকার জন্যে আমার দুঃখ নেই। আমি শুধু ভাবছি‌, সদানন্দবাবুর মতো নিরীহ লোককে কে খুন করল? কেন খুন করল? তবে কি তাঁর একটা প্রচ্ছন্ন জীবন ছিল? বাইরে থেকে যা দেখা যেত সেটা তাঁর প্রকৃত স্বরূপ নয়?’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘হয়তো তাই। এখনো ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। আজ বিকেলে তাঁর ভগিনীপতির সঙ্গে দেখা হলে হয়তো তাঁর প্রকৃত চরিত্র বোঝা যাবে। আচ্ছা‌, আজ চলি‌, আবার দেখা হবে।’

দ্বার পর্যন্ত আসিয়া ব্যোমকেশ ফিরিয়া গেল‌, বিশুবাবুর পাশে দাঁড়াইয়া হ্রস্বকণ্ঠে বলিল‌, ‘একটা কথা জিগ্যেস করা হয়নি। আপনি কি সম্প্রতি কোনো বেনামী চিঠি পেয়েছেন?’

বিশুবাবু চকিতে মুখ তুলিলেন‌, ‘পেয়েছি। আপনি কি করে জানলেন?’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘আরও দু’একজন পেয়েছে‌, তাই মনে হল হয়তো আপনিও পেয়েছেন। কী আছে বেনামী চিঠিতে? ভয় দেখানো?’

‘এই—যে দেখুন না-বলিয়া বিশুবাবু দেরাজ হইতে আমাদেরই লেখা চিঠি বাহির করিয়া দিলেন।’

ব্যোমকেশ মনোযোগ দিয়া চিঠি পড়িল‌, তারপর চিঠি ফেরত দিয়া বলিল‌, ‘হুঁ। কে লিখেছে কিছু আন্দাজ করতে পারেন না?’

বিশুবাবু বলিলেন‌, ‘কিছু না। আমার জীবনে এমন কোনও গুপ্তকথা নেই। যা ভাঙিয়ে কেউ লাভ করতে পারে?’

‘আপনার শত্রু কেউ আছে?–

‘অনেক। ব্যবসাদারের সবাই শত্ৰু।’

‘তাহলে তারাই কেউ হয়তো নিছক mischief করবার জন্যে চিঠি দিয়েছে।–চলি এবার। আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ।’

বিশুবাবু হাসিয়া বলিলেন‌, ‘আমার মিল তাহলে সার্চ করছেন না?’

ব্যোমকেশও হাসিল‌, ‘অনর্থক পণ্ডশ্রম করে লাভ কি‌, বিশ্বনাথবাবু?’

‘আর জঙ্গল?’

‘সেটাও আজ নয়-জঙ্গল আপাদমস্তক খুঁজতে অনেক কাঠ-খড়ি চাই। এস অজিত‌, রোদ ক্রমেই কড়া হচ্ছে। বদ্রিদাস মাড়োয়ারীর সঙ্গে দুটো কথা বলে চট্বপট আস্তানায় ফিরতে হবে।’

বদ্রিদাস মাড়োয়ারীর সঙ্গে আলাপ করিয়া কিন্তু সুখ হইল না।

মাড়োয়ারীদের মধ্যে প্রধানত দুই শ্রেণীর চেহারা দেখা যায়; এক‌, পাতিহাসের মত মোটা আর বেঁটে; দুই‌, বকের মত সরু আর লম্বা। বদ্রিদাসের আকৃতি দ্বিতীয় শ্রেণীর। তাঁহার চালের কলটি আকারে প্রকারে বিশুবাবুর মিল-এর অনুরূপ; সেই ধান শুকাইবার মেঝে‌, সেই পুকুর‌, সেই ইঞ্জিন-ঘর‌, সেই ফটকের সামনে গুখ দারোয়ান। পৃথিবীর সমস্ত চাল কলের মধ্যে বোধ করি আকৃতিগত ভ্রাতৃসম্বন্ধ আছে।

বদ্রিদাসের বয়স পয়ত্ৰিশ হইতে চল্লিশের মধ্যে। নিজের গদিতে বসিয়া খবরের কাগজ হইতে তেজি-মন্দার হাল জানিতেছিলেন‌, আমাদের দেখিয়া এবং পরিচয় শুনিয়া তাঁহার চক্ষু দুইটি অতিমাত্রায় চঞ্চল হইয়া উঠিল। তিনি গলা উচু করিয়া ঘরের আনাচে-কানাচে চকিত ক্ষিপ্র নেত্রপাত করিতে লাগিলেন‌, কিন্তু আমাদের সঙ্গে পলকের তরেও দৃষ্টি বিনিময় করিলেন না। ব্যোমকেশের প্রশ্নের উত্তরে তিনি যাহা বলিলেন তাহাও নিতান্ত সংক্ষিপ্ত এবং নেতিবাচক। পুরা সওয়াল জবাব উদ্ধৃত করার প্রয়োজন নাই‌, নমুনাস্বরূপ কয়েকটির উল্লেখ করিলেই যথেষ্ট হইবে।–

‘আপনি অমৃতকে চিনতেন?’

‘নেহি।’

সদানন্দ সুরকে চিনতেন?’

‘নেহি।’

‘বেনামী চিঠি পেয়েছেন?’

‘নেহি।’

‘আপনার কলো রঙের ঘোড়া আছে?’

‘নেহি।’

আরও কিছুক্ষণ প্রশ্নোত্তরের পর ব্যোমকেশ উঠিয়া পড়িল‌, কঠিন দৃষ্টিতে বদ্রিদাসকে বিদ্ধ করিয়া বলিল‌, ‘আজ চললাম‌, কিন্তু আবার আসব। এবার ওয়ারেন্ট নিয়ে আসব‌, আপনার মিল সার্চ করব।’

বদ্রিদাস এককথার মানুষ‌, দুরকম কথা বলেন না। বলিলেন‌, ‘নেহি‌, নেহি।’

উত্ত্যক্ত হইয়া চলিয়া আসিলাম। ফটকের বাহিরে পা দিয়াছি‌, একটি শীর্ণকায় বাঙালী আসিয়া আমাদের ধরিয়া ফেলিল; পানের রসে আরক্ত দন্ত নিষ্ক্রান্ত করিয়া বলিল‌, ‘আপনি ব্যোমকেশবাবু? বদ্রিদাসকে সওয়াল করছিলেন?’

ব্যোমকেশ ভ্রূ তুলিয়া বলিল‌, ‘আপনি জানলেন কি করে? ঘরে তো কেউ ছিল না।’

রক্তদন্ত আরও প্রকট করিয়া লোকটি বলিল‌, ‘আমি আড়াল থেকে সব শুনেছি। বদ্রিদাস আগাগোড়া মিছে কথা বলেছে। সে অমৃতকে চিনত‌, সদানন্দ সুরকে চিনত‌, বেনামী চিঠি পেয়েছে‌, ওর কালো রঙের একটা ঘোড়া আছে। ভারি ধূর্ত মাড়োয়ারী‌, পেটেপেটে শয়তানি।’

ব্যোমকেশ লোকটিকে কিছুক্ষণ শান্তচক্ষে নিরীক্ষণ করিয়া বলিল‌, ‘আপনি কে?’

‘আমার নাম রাখাল দাস। মাড়োয়ারীর গদিতে কাজ করি।’

‘আপনার চাকরি যাবার ভয় নেই?’

‘চাকরি গিয়েছে। বদ্রিদাস লুটিস দিয়েছে‌, এই মাসের শেষেই চাকরি খালাস।’

‘নোটিস দিয়েছে কেন?’

‘মুলুক থেকে ওর জাতভাই এসেছে‌, তাকেই আমার জায়গায় বসাবে। বাঙালী রাখবে না।’ আমরা চলিতে আরম্ভ করিলাম। লোকটা আমাদের পিছন পিছন আসিতে লাগিল‌, ‘মনে রাখবেন ব্যোমকেশবাবু্‌, পাজির পা-ঝাড়া ওই বদ্রিদাস। ওর অসাধ্যি কৰ্ম্ম নেই। জাল জুচ্চুরি কালাবাজার–‘

ব্যোমকেশ পিছন ফিরিয়া চাহিল না‌, হাত নাড়িয়া তাহাকে বিদায় করিল।

বিশ্রান্তিগুহে ফিরিয়া ব্যোমকেশ আরাম-কেদারায় লম্বা হইল‌, ঊর্ধ্বে চাহিয়া বোধকরি ভগবানের উদ্দেশে বলিল‌, ‘কত অজানারে জানাইলে তুমি?

আমি জামা খুলিয়া বিছানার পাশে বসিলাম; বলিলাম, ব্যোমকেশ, অনেক লোকের সঙ্গেই তোতো মুলাকাৎ করলে। কিছু বুঝলে?’

সে বলিল‌, ‘বুঝেছি। সবই। কিন্তু লোকটিকে যতক্ষণ নিঃসংশয়ে চিনতে না পারছি ততক্ষণ বোঝাবুঝির কোনও মানে হয় না।’

‘কালো ঘোড়ার ব্যাপারটা কি? বদ্রিদাসের যদি কালো ঘোড়া থাকেই তাতে কী?’

ব্যোমকেশ কতক নিজ মনে বলিল‌, ‘খাট্‌কা লাগছে। বদ্রিদাসের কালো ঘোড়া-খট্‌কা লাগছে!’

‘তোমার ধারণা হত্যাকারী কালো ঘোড়ায় চড়ে সদানন্দ সুরকে খুন করতে গিয়েছিল। কিন্তু কেন? ঘোড়ায় চড়ে গিয়ে লাভ কি?’

‘লাভ আছে‌, কিন্তু লোকসানও আছে। তাই ভাবছি—। যাক।’ সে আমার দিকে ঘাড় ফিরাইয়া বলিল‌, ‘বিশ্বনাথ মল্লিককে কেমন দেখলে?’

বলিলাম‌, ‘জিকি ছিলেন‌, কুকুরের চেয়ে ঘোড়া ভালবাসেন; এ থেকে ভালোমন্দ কিছু বুঝলাম না। কিন্তু ওঁকে হাঁড়ির খবর দেওয়া কি উচিত হয়েছে? মনে করো‌, জঙ্গল সার্চ করার কথাটা যদি বেরিয়ে যায়! আসামী সাবধান হবে না?’

ব্যোমকেশ একটু বিমনাভাবে বলিল‌, ‘হুঁ। কিন্তু আমি তাঁকে চেতিয়ে দিয়েছি‌, আমার বিশ্বাস তিনি কাউকে বলবেন না।’

‘কিন্তু যদি মুখ ফসকে বেরিয়ে যায়!’

‘তাহলে ভাবনার কথা বটে।–যাক‌, নীলকণ্ঠ অধিকারীকেও বেশ সরল প্রকৃতির লোক বলে মনে হয়। ভারি প্রভুভক্ত‌, কী বলো?’

‘হ্যাঁ। কিন্তু রাখাল দাস?’

‘ও একটা খুঁচো। বদ্রিদাস তাড়িয়ে দিয়েছে‌, তাই গায়ের ঝাল মেটাতে এসেছিল।’

‘কিন্তু ওর কথাগুলো কি মিথ্যে?’

‘না‌, সব সত্যি।’

দুপুরবেলা আহারাদির পর একটু বিশ্রাম করিয়া লইলাম। ব্যোমকেশের মুখখানা সারাক্ষণ চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন হইয়া রহিল। উদ্বেগের হেতুটা কিন্তু ঠিক ধরিতে পারিলাম না।

বেলা সাড়ে চারটের সময় রামডিহি যাইবার জন্য প্রস্তুত হইয়া বাহির হইলাম। পৌঁনে-পাঁচটায় গাড়ি‌, পাঁচটা বাজিয়া দশ মিনিটে রামডিহি পৌঁছিবে। প্রাণকেষ্ট পালের সহিত সদালাপ করিয়া ফিরিতে বেশি রাত হইবে না।

টিকিট কিনিয়া প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করিলাম। ফটকে মনোতোষ টিকিট চেক করিয়া মিটমিটি হাসিল‌, ‘ফিরছেন কখন?’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘নটা-দশটা হবে।’

প্ল্যাটফর্মে কিছু যাত্রী সমাগম হইয়াছে। ট্রেন আসিতে মিনিট পাঁচেক দেরি আছে। এদিক ওদিক দৃষ্টি ফিরাইতে চোখে পড়িল ক্ষীণাঙ্গ স্টেশনমাস্টার হরিবিলাসবাবুর অফিসের সামনে পীনাঙ্গ দারোগা সুখময়বাবু তাঁহার সহিত সতর্কভাবে কথা বলিতেছেন। সুখময়বাবু আমাদের দেখিতে পাইয়া হাত নাড়িলেন এবং অল্পক্ষণ পরেই আসিয়া হাজির হইলেন। তাঁহার চোখে অনুসন্ধিৎসার ঝিলিক।

‘কোথাও যাচ্ছেন নাকি?’

‘রামডিহি যাব‌, একটু কাজ আছে। আপনি?’

সুখময়বাবু বলিলেন‌, ‘আমি কোথাও যাব না। একজনকে এগিয়ে নিতে এসেছি। এই ট্রেনেই তিনি আসছেন। হো-হে।’ বলিয়া ভ্রূ নাচাইলেন।

ব্যোমকেশ একটু বিস্মিতম্বরে বলিল‌, ‘কে তিনি?’

সুখময়বাবু বলিলেন‌, ‘তাঁর নাম নফর কুণ্ডু। তাঁর কয়েক বস্তা চাল রেলে চালান যাচ্ছিল‌, একটা বস্তা ট্রেনের ঝাঁকানিতে ফেটে গিয়ে ভেতর থেকে দু’সের আফিম বেরিয়েছে। নফর কুণ্ডুও ধরা পড়েছেন। এই ট্রেনে তিনি আসছেন।’ বলিয়া ভ্রূ নাচাইতে নাচাইতে স্টেশনমাস্টারের ঘরের দিকে প্রস্থান করিলেন।

ব্যোমকেশ ললাট কুঞ্চিত করিয়া চৌকা-পাথর-ঢাকা প্ল্যাটফর্মের দিকে চাহিয়া রহিল। আমি বলিলাম‌, ‘ওহে‌, বদ্রিদাস মাড়োয়ারীও এসেছেন।’

ব্যোমকেশ চকিতে চোখ তুলিল। মালগুদামের দিক হইতে বকের মত পা ফেলিয়া শনৈঃ শনৈঃ বদ্রিদাস আসিতেছেন। তাঁহার ভাবভঙ্গী হইতে স্পষ্টই বোঝা যায় তিনি আমাদের দেখিতে পাইয়াছেন। কিন্তু তিনি আমাদের দিকে চক্ষু ফিরাইলেন না‌, ধীর মন্থর পদে প্ল্যাটফর্ম হইতে বাহির হইয়া গেলেন।

ব্যোমকেশের ভূ-কুঞ্চন আরও গভীর হইল।

মিনিটখানেক পরে আমি বলিলাম‌, ‘ওহে‌, বিশুবাবুও উপস্থিত। কী ব্যাপার বলে দেখি?

যোধপুরী ব্রিচেস পরা বিশুবাবু ফটক দিয়া প্রবেশ করিলেন‌, আমাদের দেখিতে পাইয়া স্মিতমুখে আগাইয়া আসিলেন।

নমস্কার। কোথাও যাচ্ছেন?’

‘রামডিহি যাচ্ছি।’

‘ওহো-সদানন্দ সুরের ভগিনীপতি।’

‘হ্যাঁ। দশটার মধ্যেই ফিরব। আপনি?’

‘একটা চালান আসবার কথা আছে‌, তারই খোঁজ নিতে এসেছি। দেখি যদি এসে থাকে।’ অস্থিসার মুখে একটু হাসিয়া তিনি মাল-অফিসের দিকে চলিয়া গেলেন।

ইতিমধ্যে ট্রেনের ধোঁয়া দেখা দিয়াছিল। অবিলম্বে প্যাসেঞ্জার গাড়ি আসিয়া পড়িল। গাড়িতে উঠিবার আগে লক্ষ্য করিলাম‌, একটি তৃতীয় শ্রেণীর কামরা হইতে পুলিস-পরিবৃত একটি মধ্যবয়স্ক ব্যক্তি অবতরণ করিলেন। অনুমান করিলাম ইনি আফিম-বিলাসী নফর কুণ্ডু। মনে পাপ ছিল বলিয়াই বোধহয় বেনামী চিঠি পাইয়া গা-ঢাকা দিয়াছিলেন।

দুই তিন মিনিট পরে গাড়ি ছাড়িয়া দিল। ব্যোমকেশের মুখে সংশয়ের ভ্রূকুটি গাঢ়তার হইয়াছে‌, যেন সে হঠাৎ কঠিন সমস্যার সম্মুখীন হইয়া মানস্থির করিতে পারিতেছে না। জিজ্ঞাসা করিলাম‌, ‘হল কি? ঠেকায় পড়েছি মনে হচ্ছে।’

সে উত্তর দিবার আগেই ঘ্যাঁচ করিয়া গাড়ি থামিয়া গেল। জানোলা দিয়া গলা বাড়াইয়া দেখিলাম ডিস্টান্ট সিগনাল না পাইয়া গাড়ি থামিয়াছে। তারের বেড়ার ওপারে বাঘমারি গ্রাম দেখা যাইতেছে।

যেন সমস্ত সমস্যার সমাধান হইয়াছে এমনিভাবে লাফাইয়া উঠিয়া ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘ভালোই হল। অজিত‌, আমি এখানে নেমে যাচ্ছি‌, তুমি একই রামডিহি যাও। প্রাণকেষ্টবাবুকে সব কথা জিগ্যেস করবে। সদানন্দবাবু তাঁর কাছে তোরঙ্গ রেখে গিয়েছিলেন। কিনা এ-কথাটা জানতে ভুলো না।–আচ্ছা।’

গাড়ি সিটি মারিয়া আবার গুটিগুটি চলিতে আরম্ভ করিয়াছিল‌, ব্যোমকেশ নামিয়া পড়িল। আমি হতবুদ্ধি হইয়া জানালার বাহিরে চাহিয়া রহিলাম। সে তারের বেড়া পার হইয়া আমার উদ্দেশে একবার হাত নাড়িল‌, তারপর বাঘমারি গ্রামের দিকে চলিল।

ইতিপূর্বে ব্যোমকেশ কখনও আমাকে এমনভাবে ফেলিয়া পালায় নাই। মাথায় আকাশ ভাঙিয়া পড়িল। প্রাণকেষ্টবাবুকে কী জেরা করিব? ব্যোমকেশ যখন জেরা করে তখন তাহার প্রয়োগনৈপুণ্য উপভোগ করিতে পারি‌, কিন্তু নিজে এ-কাজ কখনও করি নাই। শেষে কি ধাষ্টামো করিয়া বসিব! ব্যোমকেশ আমাকে একি আতান্তরে ফেলিয়া গেল!

প্যাসেঞ্জার গাড়ি দুলকি চালে চলিয়াছে; দু’তিন মাইল অন্তর ছোট ছোট স্টেশন‌, তবু অবিলম্বে গাড়ি রামডিহি পৌঁছিবে। সুতরাং এইবেলা মাথা ঠাণ্ডা করিয়া ভাবিয়া লওয়া দরকার। প্রথমেই ভাবিতে হইবে‌, প্রাণকেষ্টবাবুকে ব্যোমকেশ জেরা করিতে চায় কেন? প্রাণকেষ্টবাবু সদানন্দ সুরের ভগিনীপতি‌, সম্ভবত প্ৰাণকেষ্টবাবুর স্ত্রী সদানন্দবাবুর উত্তরাধিকারিণী‌, কারণ সদানন্দবাবুর নিকট আত্মীয় আর কেহ নাই। …সদানন্দবাবু কলিকাতা যাইবার পথে কি ভগিনীপতির কাছে লোহার তোরঙ্গ রাখিয়া গিয়াছিলেন? তেরঙ্গে কি কোনও মহামূল্য দ্রব্য ছিল? প্রাণকেষ্টবাবু কর্মসূত্রে এই পথ দিয়া ট্রলি চড়িয়া যাতায়াত করিতেন; তাঁহার পক্ষে ট্রলি হইতে নামিয়া বাঘমারি গ্রামে উপস্থিত হওয়া মোটেই শক্ত নয়। তবে কি বোমকেশের সন্দেহ প্রাণকেষ্টবাবুই শ্যালককে সংহার করিয়াছেন?…

রামডিহি জংশনে পৌঁছিয়া প্ৰাণকেষ্ট পালের ঠিকানা পাইতে বিলম্ব হইল না। স্টেশনের সন্নিকটে তারের বেড়া দিয়া ঘেরা কয়েকটি ছোট ছোট কুঠি‌, তাহারই একটাতে প্ৰাণকেষ্টবাবু বাস করেন। কুঠির সামনে ছোট্ট বাগান; প্যান্টুলুন ও হাত-কটা গেঞ্জি পরা একটি পুষ্টকায় ব্যক্তি মুক্ত দি ইয়া বাগানের পরিচর্য করতেছিলেন‌, আমাকে দেখিয়া ফ্যালকাল চক্ষে চাহিয়া রহিলেন।

জিজ্ঞাসা করিলাম‌, ‘আপনিই কি প্ৰাণকেষ্ট পাল?’

তাঁহার হাত হইতে খুরপি পড়িয়া গেল। তিনি কিছুক্ষণ হ্যাঁ করিয়া থাকিয়া বিহুলভাবে সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়িলেন। বলিলাম‌, ‘আমি পুলিসের পক্ষ থেকে আসছি। খবর পেয়েছেন। বোধহয় আপনার শালা সদানন্দ সুর মারা গেছেন।’

এই প্রশ্নে ভদ্রলোক এমন স্তম্ভিত হইয়া গেলেন যে‌, মনে হইল তাঁহার প্যান্টুলুন। এখনি খসিয়া পড়িবে। তারপর তিনি চমকিয়া উঠিয়া ‘সুশীলা! সুশীলা? বলিয়া ডাকিতে ডাকিতে বাড়ির মধ্যে ঢুকিয়া পড়িলেন।

আমিও কম স্তম্ভিত হই নাই। মনে-মনে যাহাকে দুদন্তি শ্যালক-হস্তা বলিয়া আঁচ করিয়াছি‌, তাঁহার এইরূপ আচার-আচরণ! পুলিসের নাম শুনিয়াই শিথিলাঙ্গ হইয়া পড়িলেন! কিংবা-এটা একটা ভান মাত্র। ঘাগী অপরাধীরা পুলিসের চোখে ধূলা দিবার জন্য নানাপ্রকার ছলচাতুরি অবলম্বন করে-প্রাণকেষ্টবাবু কি তাহাই করিতেছেন? সুশীলাই বা কে? তাঁহার স্ত্রী?

পাঁচ মিনিট কাটিয়া গেল‌, বাড়ির ভিতর হইতে সাড়াশব্দ নাই। অতঃপর কি করিব‌, ডাকাডাকি করিব কি ফিরিয়া যাইব‌, এইসব ভাবিতেছি‌, এমন সময় দ্বারের কাছে প্ৰাণকেষ্টবাবুকে দেখা গেল। তিনি যেন কতকটা ধাতস্থ হইয়াছেন‌, প্যান্টুলুন যথাস্থানে আছে বটে‌, কিন্তু হাত-কটা গেঞ্জির উপর বুশ–কোটি চড়াইয়াছেন। মুখে মুমূর্ষ হাসি আনিয়া বলিলেন‌, ‘আসুন।’

সামনের বসিবার ঘরে প্রবেশ করিলাম।। ঘরটি ছোট‌, কয়েকটি সস্তা বেতের চেয়ার ও টেবিল দিয়া সাজানো‌, অন্দরে যাইবার দরজায় পদাৰ্ণ; বিলিতি অনুকৃতির মধ্যেও একটু পরিচ্ছন্নতা আছে। আমি অন্দরে যাইবার দরজার দিকে পিছন করিয়া বসিলাম‌, প্ৰাণকেষ্টবাবু আমার মুখোমুখি বসিলেন।

শুরু করিলাম‌, ‘আপনার শালা সদানন্দবাবুর মৃত্যু-সংবাদ পেয়েছেন তাহলে?’

প্ৰাণকেষ্ট চমকিয়া বলিলেন‌, ‘অ্যাঁ-হাঁ।’

‘কখন খবর পেলেন?’

‘অ্যাঁ-সকালবেলা।’

‘কার মুখে খবর পেলেন?’

‘অ্যাঁ -সন্তালগোলা থেকে হরিবিলাসবাবু টেলিফোন করেছিলেন।’

‘মাফ করবেন‌, আপনার স্ত্রী‌, মানে সদানন্দবাবুর ভগ্নী কি এখানে আছেন?’

দেখিলাম আমার প্রশ্নের উত্তর দিবার আগে প্রাণকেষ্টবাবুর চক্ষু দু’টি আমার মুখ ছাড়িয়া আমার পিছন দিকে চলিয়া গেল এবং তৎক্ষণাৎ ফিরিয়া আসিল।

‘হ্যাঁ–আছেন।’

আমি পিছনে ঘাড় ফিরাইলাম। অন্দরের পর্দা একটু ফাঁক হইয়া ছিল‌, চকিতে যথাস্থানে সন্নিবিষ্ট হইল। বুঝিতে বাকি রহিল না‌, পর্দার আড়ালে আছেন পত্নী সুশীলা এবং নেপথ্য হইতে প্রাণকেষ্টবাবুকে পরিচালিত করিতেছেন।

‘আপনার স্ত্রী নিশ্চয় খুব শোক পেয়েছেন?’

আবার প্রাণকেষ্টবাবুর চকিতচক্ষু পিছন দিকে গিয়া ফিরিয়া আসিল।

‘হ্যাঁ‌, হ্যাঁ‌, নিশ্চয়‌, খুব শোক পেয়েছেন।’

‘আপনার স্ত্রী সদানন্দবাবুর উত্তরাধিকারিণী?

‘তা–তা তো জানি না। মানে–’

‘সদানন্দবাবুর সঙ্গে আপনার সদ্ভাব ছিল?’

‘হ্যাঁ‌, হ্যাঁ‌, খুব সদ্ভাব ছিল।’

‘যাওয়া-আসা ছিল?’

‘তা ছিল বৈকি! মানে–’

তাঁহার চক্ষু আবার পদার পানে ধাবিত হইল‌, ‘অ্যা-মানে—বেশি যাওয়া-আসা ছিল না। কালেভদ্ৰে—’

‘শেষ কবে দেখা হয়েছে?’

‘শেষ? অ্যাঁ–ঠিক মনে পড়ছে না–’

‘দশ-বারো দিন আগে তিনি আপনার বাসায় আসেননি?’

প্রাণকেষ্টবাবুর চক্ষু দু’টি ভয়ার্ত হইয়া উঠিল‌, ‘কৈ না তো! ‘

‘তিনি কলকাতা যাবার আগে আপনার কাছে একটা স্টীলের ট্রাঙ্ক রেখে যাননি?

প্রাণকেষ্টবাবুর দেহ কাঁপিয়া উঠিল‌, ‘না‌, না‌, স্টীলের ট্রাঙ্ক-না না‌, কৈ আমি তো কিছু—’

আমি কড়া সুরে বলিলাম‌, আপনি এত নার্ভাস হয়ে পড়েছেন কেন?

‘নার্ভাস! না না।–’

পর্দা সরাইয়া প্রাণকেষ্টবাবুর স্ত্রী প্রবেশ করিলেন। স্বামীর চেয়ারের পিছনে দাঁড়াইয়া দৃঢ়স্বরে বলিলেন, ‘আমার স্বামী নার্ভাস প্রকৃতির মানুষ, অচেনা লোক দেখলে আরও নার্ভাস হয়ে পড়েন। আপনি কি জানতে চান আমাকে বলুন।’

মহিলাকে দেখিলাম। বয়স আন্দাজ পঁয়ত্রিশ, দৃঢ়গঠিত দেহ, চোয়ালের হাড় মজবুত, চোখের দৃষ্টি প্রখর। মুখমণ্ডলে ভ্ৰাতৃশোকের কোনও চিহ্নই নাই। তিনি যে অতি জবরদস্ত মহিলা তাহা বুঝিতে তিলার্ধ বিলম্ব হইল না। আমি উঠিয়া পড়িলাম‌, ‘আমার যা জানবার ছিল জেনেছি‌, আর কিছু জানবার নেই। নমস্কার।’ শ্ৰীমতী সুশীলাকে জেরা করা আমার কর্ম নয়।

স্টেশনে গিয়া জানিতে পারিলাম‌, ন’টার আগে ফিরিবার ট্রেন নাই। দীর্ঘ আড়াই ঘণ্টা কাটাইবার জন্য স্টেশনের স্টলে চা খাইলাম‌, অসংখ্য সিগারেট পোড়াইয়া প্ল্যাটফর্মে পাদচারণ করিলাম‌, এবং সস্ত্রীক প্রাণকেষ্টবাবুর কথা চিন্তা করিলাম।

প্ৰাণকেষ্ট পাল নার্ভাস প্রকৃতির মানুষ হইতে পারেন; কিন্তু তিনি যে আমাকে দেখিয়া এত বেশি নার্ভাস হইয়া পড়িয়াছিলেন তাহা কেবল ধাতুগত স্নায়ুবিক দুর্বলতা নয়‌, অন্য কারণও আছে। কী সে কারণ? প্ৰাণকেষ্ট পত্নীর ইশারায় আমার কাছে অনেকগুলা মিথ্যাকথা বলিয়াছিলেন। কী সে মিথ্যাকথা? সদানন্দ সুরের সহিত বেশি সম্প্ৰীতি না থাক‌, সদানন্দ সুর তাঁহার বাড়িতে যাতায়াত করিতেন। দশ-বারো দিন আগে কলিকাতায় যাইবার মুখে তিনি স্টীলের ট্রাঙ্কটি নিশ্চয় ভগিনীপতির গৃহে রাখিয়া গিয়াছিলেন। ট্রাঙ্কে নিশ্চয় কোনও মূল্যবান দ্রব্য ছিল। কী মূল্যবান দ্রব্য ছিল? টাকাকড়ি? গহনা? বোমাবারুদ? আন্দাজ করা শক্ত। কিন্তু শ্ৰীমতী সুশীলা বাক্সে কী আছে জানিবার কৌতুহল সংবরণ করিতে পারেন নাই‌, হয়তো তালা ভাঙিয়াছিলেন। তাঁহার মত জবরদস্ত মহিলার পক্ষে কিছুই অসম্ভব নয়। কিন্তু তারপর? তারপর হয়তো ট্রাঙ্কে এমন কিছু পাওয়া গেল যে সদানন্দ সুরকে খুন করা প্রয়োজন হইল। হয়তো ট্রাঙ্কে হ্যান্ড-গ্রিনেড ছিল‌, সেই হ্যান্ড-গ্রিনেড দিয়াই সদানন্দকে–

কিন্তু না। শ্ৰীমতী সুশীলা যত দুর্ধর্ষ মহিলাই হোন‌, নিজের জ্যেষ্ঠভ্রাতাকে খুন করিবেন? আর প্রাণকেষ্ট পালের পক্ষে এরূপ দুঃসাহসিক কার্যে লিপ্ত হওয়া একেবারেই অসম্ভব। …কিন্তু স্টেশনমাস্টার হরিবিলাসবাবু বন্ধুকে অশুভ সংবাদটা সাত-তাড়াতাড়ি দিতে গেলেন কেন? বন্ধুসুলভ সহানুভূতি?…

সাড়ে ন’টার সময় সান্তালগোলায় ফিরিলাম। আকাশে চাঁদ আছে‌, শহর-বাজার নিযুতি হইয়া গিয়াছে। ভাবিয়ছিলাম বিশ্রান্তি গৃহে আসিয়া দেখিব ব্যোমকেশ ফিরিয়াছে। কিন্তু তাহার দেখা নাই। কোথায় গেল সে?

বিশ্রান্তিগৃহের চাকরটা রন্ধন শেষ করিয়া বারান্দায় বসিয়া ঢুলিতেছিল‌, তাহাকে খাবার ঢাকা দিয়া গৃহে ফিরিয়া যাইতে বলিলাম। সে চলিয়া গেল।

কেরোসিনের বাতি কমাইয়া দিয়া বিছানায় অঙ্গ প্রসারিত করিলাম। পিছনের জানোলা দিয়া চাঁদের আলো আসিতেছে। …কোথায় গেল ব্যোমকেশ? বলা নাই কহা নাই ট্রেন হইতে নামিয়া চলিয়া গেল। বাঘামারি গ্রামে তার কী কাজ? এতক্ষণ সেখানে কী করিতেছে?

ঘুমাইয়া পড়িয়ছিলাম; ঘুম ভাঙিল। কানের কাছে ব্যোমকেশের ফিসফিস গলার শব্দে‌, ‘অজিত‌, ওঠে‌, একটা জিনিস দেখবে এস।’

ধড়মড় করিয়া উঠিয়া বসিলাম‌, ‘কী-?’

‘চুপ! আস্তে!’ ব্যোমকেশ হাত ধরিয়া আমাকে বিছানা হইতে নামাইল‌, তারপর পিছনের জানালার দিকে টানিয়া লইয়া গেল; বাহিরের দিকে আঙুল দেখাইয়া বলিল‌, ‘দেখছ?’

ঘুমের ঘোর তখনও ভালো করিয়া কাটে নাই‌, ব্যোমকেশের ভাবভঙ্গী দেখিয়া মনে হইয়াছিল না জানি কী দেখিব! কিন্তু যাহা দেখিলাম তাহাতে বোকার মত চাহিয়া রহিলাম। জানালা হইতে পনেরো-কুড়ি হাত দূরে ঝোপঝাড় আগাছার মাঝখানে খানিকটা মুক্ত স্থান‌, সেইখানে ছয়-সাতটা কৃষ্ণবৰ্ণ জন্তু অর্ধবৃত্তাকারে বসিয়া ঘাড় উচু করিয়া চাঁদের পানে চাহিয়া আছে। প্রথম দর্শনে মনে হইল কৃষ্ণকায় কয়েকটা কুকুর। বলিলাম‌, ‘কালো কুকুর।’ কিন্তু পরীক্ষণেই যখন তাহারা সমস্বরে হুক্কা-হুয়া করিয়া উঠিল‌, তখন আর সংশয় রহিল না। স্থানীয় শৃগালের দল চন্দ্রালোকে সঙ্গীত-সভা আহ্বান করিয়াছে।

আমার মুখের ভাব দেখিয়া ব্যোমকেশ হো-হো শব্দে অট্টহাস্য করিয়া উঠিল। শৃগালের দল চমকিয়া পলায়ন করিল। আমি বলিলাম‌, ‘এর মানে? দুপুর রাত্রে আমাকে শেয়াল দেখাবার কী দরকার ছিল?’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘আগে কখনও চাঁদের আলোয় শেয়াল দেখেছ?’

‘চাঁদের আলোয় শেয়াল দেখলে কী হয়?’

‘পুণ্য হয়‌, অজ্ঞান তিমির নাশ হয়! আমার মনে যেটুকু সংশয় ছিল তা এবার দূর হয়েছে। চলো এখন খাওয়া যাক‌, পেট চুঁই-চুঁই করছে।’

আলো বাড়াইয়া দিয়া টেবিলে খাইতে বসিলাম। লক্ষ্য করিলাম‌, ব্যোমকেশ ক্ষুধার্তভাবে অন্নগ্ৰাস মুখে পুরিতেছে বটে‌, কিন্তু তাহার মুখ হযোৎফুল্ল। জিজ্ঞাসা করিলাম‌, ‘এত ফুর্তি কিসের? দুপুর রাত পর্যন্ত ছিলে কোথায়? বাঘমারিতে?

সে বলিল‌, ‘বাঘমারির কাজ ন’টার মধ্যেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। তারপর–’

‘বাঘমারিতে কী কাজ ছিল?’

‘পটল‌, দাশু আর গোপালের সঙ্গে কাজ ছিল।’

‘হুঁ, কী কাজ ছিল বলবে না। যাক‌, তারপর?’

‘তারপর সান্তালগোলায় ফিরে এসে সুখময় দারোগার কাছে গেলাম। সেখানে একঘণ্টা কাটল। তারপর গেলাম স্টেশনে। হরিবিলাসবাবু ছিলেন না‌, তাঁকে বিছানা থেকে ধরে নিয়ে এলাম। লম্বা টেলিফোন করতে হল। এখানকার থানায় পাঁচটি বৈ লোক নেই। কাল সকালে বাইরে থেকে দশজন আসবে। সব ব্যবস্থা করে ফিরে এলাম।’

জিজ্ঞাসা করিলাম‌, ‘প্ৰাণকেষ্ট পালের কথা জানিবার দরকার নেই তাহলে?’

‘আছে বৈকি। কি হল সেখানে?’

সব কথা মাছিমারা ভাবে বয়ান করিলাম। সে মন দিয়া শুনিল‌, কিন্তু বিশেষ আগ্রহ দেখাইল না। আহারান্তে মুখ ধুইতে ধুইতে বলিল‌, ‘জোড়ার একটা যদি হয় গবেট‌, অন্যটা হয় বিছু। প্রকৃতির এই বিধান।’

অতঃপর সিগারেট ধরানো হইলে বলিলাম‌, ‘তোমার পকেটে ওটা কি?’

ব্যোমকেশ একটু চকিত হইল‌, একটু লজ্জিত হইল। বলিল‌, ‘বন্দুক-মানে‌, পিস্তল।’

‘কোথায় পেলে?’

‘থানায়। সুখময় দারোগার পিস্তল।’

‘হুঁ। কোনও কথাই পষ্ট করে বলতে চাও না। বেশ‌, তাহলে এবার শুয়ে পড়া যাক।’

‘তুমি শুয়ে পড়‌, আমাকে রাতটা জেগেই কাটাতে হবে।’

‘কেন?’

‘যাঁর হাতে হ্যান্ড-গ্রিনেড আছে তিনি যদি ভয় পেয়ে থাকেন তাহলে সাবধান থাকা ভালো।’

‘তবে আমিও জেগে থাকি।’

রাত্রিটা জাগিয়া কাটিল। সুখের বিষয় কোনও উৎপাত হয় নাই। শেষরাত্রে চা পান করিতে করিতে ব্যোমকেশ মুখের বন্ধন একটু আলগা করিল‌, আমাদের অচিন পাখির নাম জানিতে পারিলাম।

সকাল সাতটার সময় দুইজনে বাহির হইলাম। ব্যোমকেশ গায়ে একটা উড়ানিচাদর জড়াইয়া লইল‌, যাহাতে পকেটের পিস্তলটা দৃষ্টি আকর্ষণ না করে।

গঞ্জ-গোলার কর্মতৎপরতা এখনও পুরাদমে আরম্ভ হয় নাই‌, দুই-চারিটা গরুর গাড়ি ও ঘোড়ার ট্রাক চলিতে শুরু করিয়াছে। আমরা বদ্রিদাস মাড়োয়ারীর মিল-এ প্রবেশ করিলাম।

বদ্রিদাস দাওয়ায় উবু হইয়া বসিয়া দাঁতন করিতেছিলেন‌, পাশে জলভরা ঘটি। আমাদের প্রথমটা দেখিতে পান নাই‌, একেবারে কাছে পৌঁছিলে দেখিতে পাইয়া তাঁহার চক্ষু দু’টি খাঁচার পাখির মত ঝটুপট করিয়া এদিক ওদিক ছুটাছুটি করিতে লাগিল‌, হাত হইতে দাঁতন পড়িয়া গেল।

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘শেঠজি‌, আপনাকে একবার আমাদের সঙ্গে যেতে হবে।’

বদ্রিদাস উবু অবস্থা হইতে অধোখিত হইয়া আবার বসিয়া পড়িলেন‌, ‘ক্যা—ক্যা!’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘আমরা এক জায়গায় খানাতল্লাশ করতে যাচ্ছি‌, আপনি এখানকার গণ্যমান্য লোক‌, আপনাকে সাক্ষী মানতে চাই।’

‘নেহি‌, নেহি–বলিতে বলিতে তিনি জলভরা ঘটিটা তুলিয়া লইয়া দ্রুতপদে বিশেষ একটি স্থানের উদ্দেশে প্রস্থান করিলেন।

আমরা আবার বাহির হইলাম। বিশ্বনাথ মল্লিকের মিল-এ পৌঁছিতে পাঁচ মিনিট লাগিল।

ফটকের কাছে নায়েব-সরকার নীলকণ্ঠ অধিকারীর সঙ্গে দেখা হইল। নীলকণ্ঠ ভক্তিভরে যুক্তকর কপালে ঠেকাইয়া বলিল‌, ‘এত সকলে?’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘আপনার কত কোথায়?’

‘নিজের ঘরে আছেন। চা খাচ্ছেন।’

‘চলুন‌, তাঁর সঙ্গে দেখা করে আসি।’

‘আসুন।’

বিশ্বনাথ মল্লিক নিজের ঘরে টেবিলে বসিয়া পাউরুটি‌, মাখন ও অৰ্ধসিদ্ধ ডিম্ব সহযোগে প্রাতরাশ সম্পন্ন করিতেছিলেন‌, আমাদের দেখিয়া তাঁহার চোয়ালের চর্বণক্রিয়া বন্ধ হইল। গলা হইতে অস্বাভাবিক স্বর নির্গত হইল‌, ‘ব্যোমকেশবাবু!’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘সকালবেলাই আসতে হল। কিন্তু তাড়া নেই‌, আপনি খাওয়া শেষ করে নিন।’

বিশুবাবু ডিমের প্লেট সরাইয়া দিয়া জড়িতস্বরে বলিলেন‌, ‘কি দরকার?’ দেখিলাম তাঁহার অস্থিসার মুখখানা ধীরে ধীরে বিবৰ্ণ হইয়া যাইতেছে।

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘কাল ভেবেছিলাম। আপনার মিল খানাতল্লাশ করে কোনও লাভ নেই। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে লাভ থাকতেও পারে।’

বিশুবাবুর রাগের শিরা ফুলিয়া উচু হইয়া উঠিল‌, মনে হইল তিনি বিস্ফোরকের মত ফাটিয়া পড়িবেন। কিন্তু তিনি অতি যত্নে নিজেকে সংবরণ করিলেন‌, তাঁহার ঠোঁটে হাসির মত একটা ভঙ্গিমা দেখা দিল। তিনি বলিলেন‌, ‘হঠাৎ মত বদলে ফেললেন কেন?’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘কারণ ঘটেছে। কাল বিকেলে আমি রামডিহি যাইনি‌, আপনাদের ওই জঙ্গলে শিমুলগাছের কাছে লুকিয়ে ছিলাম। আমার সঙ্গে গাঁয়ের তিনটি ছেলে ছিল। আমরা কাল রাত্রে যা দেখেছি তার ফলে মত বদলাতে হয়েছে‌, বিশ্বনাথবাবু।’

বিশ্বনাথবাবুর চোখদুটা একবার জ্বলিয়া উঠিয়াই নিভিয়া গেল। তিনি কম্পিতহস্তে একটা সিগারেট ধরাইলেন‌, অলসভাবে বুক-পকেট হইতে একটা চাবির রিঙ বাহির করিয়া আঙুলে ঘুরাইতে ঘুরাইতে বলিলেন‌, ‘আমি যদি আমার মিল খানাতল্লাশ করতে না দিই?’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘আপনার ইচ্ছের ওপর কিছুই নির্ভর করছে না। আমি তল্লাশী পরোয়ানা এনেছি।’

‘কৈ‌, দেখি পরোয়ানা।’ ব্যোমকেশ পকেটে হাত দিল‌, বিশুবাবু বিদ্যুৎবেগে চাবি দিয়া দেরাজ খুলিবার উপক্রম করিলেন। ব্যোমকেশ পকেট হইতে হাত বাহির করিল‌, হাতে পিস্তল। সে বলিল‌, ‘দেরাজ খুলবেন না।’

কোণ-ঠাসা বনবিড়ালের মত বিশু মল্লিক ঘাড় ফিরাইলেন; ব্যোমকেশের হাতে পিস্তল দেখিয়া তিনি দেরাজ খোলার চেষ্টা ত্যাগ করিলেন‌, তাঁহার মুখ দিয়া শীৎকারের মত একটা তর্জন-শ্বাস বাহির হইল।

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘অজিত‌, বাঁশী বাজাও।’

পুলিসের বাঁশী পকেটে লইয়া আমি প্রস্তুত ছিলাম‌, এখন সবেগে তাহাতে ফুৎকার দিলাম। মিনিটখানেকের মধ্যে দারোগা সুখময় সামন্ত ও তাঁহার অনুচরবর্গে ঘর ভরিয়া গেল। ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘ইন্সপেক্টর সামন্ত‌, বিশ্বনাথ মল্লিককে অ্যারেস্ট করুন‌, হাতে হাতকড়া পরান। ওঁর হাতে চাবি আছে‌, চাবি দিয়ে দেরাজ খুলুন। সাবধানে খুলবেন‌, অস্ত্রগুলো দেরাজের মধ্যেই আছে।’

বিশ্বনাথ মল্লিককে সহজে গ্রেপ্তার করা গেল না‌, তিনি বনবিড়ালের মতাই আঁচড়াইয়া কামড়াইয়া লড়াই করিলেন। অবশেষে পাঁচ-ছয় জন মিলিয়া তাঁহাকে চাপিয়া ধরিয়া হাতে হাতকড়া পরাইল। তারপর টেবিলের দেরাজ খুলিয়া দেখা গেল তাহাতে ছাব্বিশটি .৩৮ অটোম্যাটিক‌, অসংখ্য কার্তুজ এবং চৌদ্দটি হ্যান্ড-গ্রিনেড আছে। কালাবাজারে এগুলির দাম অন্তত বিশ হাজার টাকা।

বিশ্বনাথ মল্লিক পুলিস পরিবৃত হইয়া দাঁড়াইয়া নিষ্ফল ক্ৰোধে ফুলিতেছিলেন‌, হঠাৎ উগ্রকণ্ঠে বলিয়া উঠিলেন‌, ‘বেশ‌, আমি চোরা-হাতিয়ারের কারবার করি। কিন্তু অমৃতকে আর সদানন্দ সুরকে খুন করেছি। তার কোনো প্রমাণ আছে?’

ব্যোমকেশ শান্তকণ্ঠে বলিল‌, ‘প্রমাণ আছে কিনা সে-বিচার আদালত করবেন। কিন্তু মোটিভ যথেষ্ট ছিল। আর আপনি যে-পিস্তল দিয়ে অমৃতকে মেরেছিলেন সে-পিস্তলটা এর মধ্যেই আছে। গুলিটা অমৃতের শরীরের মধ্যে পাওয়া গেছে। Ballistic পরীক্ষায় সেটা প্রমাণ করা শক্ত হবে না।’

বিশ্বনাথ মল্লিকের চোখদুটা ঘোলা হইয়া গেল‌, তিনি হাতকড়াসুদ্ধ দুই হাত দিয়া নিজের কপালে সজোরে আঘাত করিয়া এলাইয়া পড়িলেন।

সেদিন বেলা তৃতীয় প্রহরে মধ্যাহ্ন-ভোজন সম্পন্ন করিয়া আমরা বিশ্রান্তিগৃহের দুইটি খাটে লম্বমান হইয়াছিলাম। পটল‌, দাশু ও গোপাল বারংবার ব্যোমকেশের পদধূলি গ্রহণ করিয়া প্রস্থান করিয়াছে। দারোগা সুখময় সামন্ত আসামীকে সদরে চালান দিয়া স্তুপীকৃত হাঁসের ডিমের বড়া খাইতে খাইতে থানার অন্যান্য কর্মচারীদের নিকট ইহাই প্রতিপন্ন করিবার চেষ্টা করিতেছেন যে‌, আসামীর গ্রেপ্তারের ব্যাপারে তাঁহার কৃতিত্রও কম নয়। গঞ্জের কর্মতৎপরতা ক্ষণকালের জন্য মন্দীভূত হইলেও আবার পুরাদমে চালু হইয়াছে : রামে রাম দুয়ে দুই। অমৃত এবং সদানন্দ সুর নামক দু’টি অখ্যাত ব্যক্তির অকালমৃত্যু ঘটিয়াছে বটে‌, কিন্তু তাহাতে জীবনের নিত্যস্রোত ব্যাহত হয় নাই। এবং তাঁহাদের আততায়ী ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলিলেও ব্যাহত হইবে না। রামে রাম দুয়ে দুই। …রাম নাম সত্য হ্যায়। …

ব্যোমকেশ ঊর্ধ্বদিকে চাহিয়া একটা নিশ্বাস ফেলিল; বলিল‌, ‘সদানন্দ সুরের মৃত্যুতে আমার দুঃখ নেই। কিন্তু অমৃত ছেলেটা নেহাত অকারণেই মারা গেল।’

আমি একটা নূতন সিগারেট ধরাইয়া বলিলাম‌, ‘গোড়া থেকে বলো।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘এ কাহিনীর গোড়া হচ্ছেন্ন সদানন্দ সুর। তিনি না থাকলে আমরা চোরাকারবারী আসামীকে ধরতে পারতাম না। তাঁকে দিয়েই কাহিনী শুরু করা যেতে পারে।

সদানন্দ সুরের চরিত্র যতটুকু বুঝেছি‌, তিনি ছিলেন কৃপণ এবং সংবৃতিমন্ত্র। নিজের হাঁড়ির খবর কাউকে দিতে ভালবাসতেন না। অবস্থাও ছিল অত্যন্ত সাধারণ। বোনের বিয়ে দিয়েছিলেন‌, কিন্তু নিজে বিয়ে করেননি। পৈতৃক ভিটে এবং দু’চার বিঘে জমি; সান্তালগোলার বাজারে দু’চার মণ ধান-চালের দালালি; কবিরাজী ওষুধ বিক্রি করে দু’চার পয়সা লাভ;—এই ছিল তাঁর অবলম্বন। একলা মানুষ‌, তাই কোনও রকমে চলে যেত।

কিন্তু তাঁর মনে ভোগকৃষ্ণা ছিল। কৃপণের গাঁটের পয়সা খরচা করে ভোগভৃতৃষ্ণা মেটাতে চায় না বটে‌, তাই বলে তাদের ভোগকৃষ্ণা নেই। এ-কথা কেউ বলবে না। সদানন্দবাবুর সাধ ছিল‌, সাধ্য ছিল না। হয়তো তিনি তাঁর ক্ষুদ্র রোজগার থেকে দু’চার পয়সা বাঁচাতেন‌, কিন্তু তা নিয়ে ফুর্তি করার মত চরিত্র তাঁর নয়। এইভাবে জীবন কাটছিল। বয়স বাড়ছে‌, শক্তি-সামর্থ্য ফুরিয়ে আসছে। হয়তো এমনি বুভুক্ষু অবস্থাতেই তাঁর জীবন শেষ হত। হঠাৎ পয়তাল্লিশ বছর বয়সে একটা মস্ত সুযোগ জুটে গেল।

বিশ্বনাথ মল্লিকের কাছে সদানন্দবাবুর যাতায়াত ছিল। বিশ্বনাথ মল্লিকের দেরাজে কবিরাজী মোদকের শিশি পাওয়া গেছে‌, নিশ্চয় সদানন্দবাবু যোগান দিতেন। এই সূত্রেই ঘনিষ্ঠতা। তারপর হঠাৎ একদিন সদানন্দবাবু বিশু মল্লিকের জীবনের গোপনতম কথাটি জানতে পারলেন। বিশু মল্লিক চোরা-অস্ত্রশস্ত্রের কারবারী। কি করে জানতে পারলেন বলা যায় না‌, সম্ভবত তিনি সন্ধান পেয়েছিলেন কোথায় বিশু মল্লিক। তার অন্ত্রশস্ত্র লুকিয়ে রাখে। শিমুলগাছটা তাঁর বাড়ি থেকে বেশি দূরে নয়‌, হয়তো হঠাৎ বিশু মল্লিককে সেখানে দেখে ফেলেছিলেন।

সদানন্দবাবু গুপ্তস্থান থেকে বোমা-বন্দুক চুরি করতে পারতেন‌, কিন্তু তিনি সে-পথ দিয়ে গেলেন না। বোমা-বন্দুক কি করে কালাবাজারে চালাতে হয়‌, পাড়া গেয়ে মানুষ সদানন্দ সুর তা জানতেন না। তিনি অন্য রাস্তা ধরলেন। বিশু মল্লিককে বললেন‌, টাকা দাও‌, নইলে সব ফাঁস করে দেব। অর্থাৎ সোজাসুজি ব্ল্যাকমেল।

বিশু মল্লিক নিরুপায়। পাঁচশো টাকা বার করতে হল। সেই টাকা নিয়ে সদানন্দবাবু বাড়ি ফিরে এলেন। ফুর্তির বয়স শেষ হয়ে আসছে‌, আর দেরি করা চলে না। তিনি স্থির করলেন কলকাতা যাবেন।

কিন্তু তিনি ভারি হিসেবী লোক‌, সব টাকা নিয়ে কলকাতা যাওয়া তাঁর মনোমত নয়। অথচ বাঘমারির শূন্যবাড়িতে টাকা রেখে গেলেও ভয় আছে‌, চোর এসে সর্বস্ব নিয়ে যেতে পারে। তিনি একটি কাজ করলেন।

আমি তোমাকে যে বলছি অধিকাংশই আন্দাজ‌, কিন্তু এলোমেলো আন্দাজ নয়। সদানন্দ সুর একটি স্টীলের ট্রাঙ্কে বেশির ভাগ টাকা রাখলেন‌, সঞ্চিত যা ছিল তা রাখলেন‌, হয়তো সাবেক কালের কিছু গয়নাগীটি ছিল তাও রাখলেন। তারপর একহাতে স্টীল-ট্রাঙ্ক এবং অন্যহাতে নিজের ব্যবহারের ক্যাম্বিস-ব্যাগ নিয়ে যাত্রা করলেন। রামডিহি স্টেশনে তাঁর বোন-ভগিনীপতি আছে‌, তাদের জিন্মায় ট্রাঙ্ক রেখে কলকাতায় যাবেন ফুর্তি করতে।

সদানন্দ সুর তো চলে গেলেন‌, এদিকে ফাঁপরে পড়েছে বিশু মল্লিক। এতদিন সে বেশ নিরুপদ্রবেই ব্যবসা চালাচ্ছিল‌, এখন দেখল। সে বিষম ফাঁদে ধরা পড়েছে। সদানন্দ সুর যতদিন বেঁচে থাকবে ততদিন তার উদ্ধার নেই‌, সদানন্দ সুর তাকে শোষণ করবে। সে ঠিক করল সদানন্দ সুরকে সরাতে হবে; তার মাথায় বুদ্ধি আছে‌, হাতে আছে মারাত্মক অস্ত্র! সদানন্দকে সরানো শক্ত কাজ নয়।

সদানন্দ ভগিনীপতির বাসায় তোরঙ্গ রেখে কলকাতায় গিয়ে বোধহয় ফূর্তিই করছেন, এদিকে বিশু মল্লিক একদিন সন্ধ্যের পর ঘোড়ায় চড়ে জঙ্গলে ঢুকল‌, শিমুলগাছ থেকে একটি হ্যান্ড-গ্রিনেড নিয়ে সদানন্দর বাড়িতে বুবি-ট্র্যাপ পেতে এল। সদানন্দ কলকাতা থেকে যেই বাড়িতে ঢুকতে যাবেন অমনি বোমা ফাটবে।

কিন্তু সদানন্দ সুর কলকাতা থেকে ফিরে আসবার আগেই কিছু কিছু ব্যাপার ঘটতে আরম্ভ করেছিল। বিশু মল্লিকের যখনই অস্ত্র-শস্ত্র বিক্রি করবার দরকার হত তখনই সে ঘোড়ায় চড়ে জঙ্গলে যেত। একদিন রাত্রি দশটার সময় অমৃত বাছুর খুঁজতে এসে ঘোড়াটাকে দেখে ফেলল। সে ভাবল ঘোড়া-ভূত। তারপর যখন সে বন্ধুদের খোঁচায় আবার জঙ্গলে ঢুকল তখন শুধু ঘোড়া নয়‌, শিমুলতলায় ঘোড়ার সওয়ারের সঙ্গেও তার দেখা হয়ে গেল।

বিশু মল্লিক সেদিন বোধহয় সদানন্দ সুরের বুবি-ট্র্যাপ পেতে ফিরে যাচ্ছিল। দু’জনেই দু’জনকে চেনে; অমৃত চাকরির জন্য বিশু মল্লিকের কাছে দরবার করছিল। বিশু মল্লিক দেখল‌, এর পর যখন বুবি-ট্র্যাপ ফাটবে তখন অমৃত সাক্ষী দেবে যে‌, সে বিশু মল্লিককে রাত্তিরে সদানন্দ সুরের বাড়ির পিছনে দেখেছে; হয়তো বিশু মল্লিক যখন সদানন্দ সুরের পাঁচিল টপকে বেরুচ্ছিল তখন দেখেছে। অতএব অমৃতের বেঁচে থাকা নিরাপদ নয়। বিশু মল্লিকের কাছে অটোম্যাটিক পিস্তল ছিল‌, সে অমৃতকে খুন করে ঘোড়ার পিঠে অদৃশ্য হয়ে গেল।

আমি যখন প্রথম অকুস্থলে এসে তদন্ত আরম্ভ করলাম তখন সবচেয়ে আশ্চর্য মনে হল-ঘোড়া। অমৃত ঘোড়া-ভূত দেখেছিল‌, আমি দেখলাম জলজ্যান্ত ঘোড়ার খুরের দাগ। একটা ঘোড়া এই মামলার সঙ্গে জড়িত আছে। তখনও আমরা আসামীকে চিনি না‌, কিন্তু সে যেই হোক‌, ঘোড়ায় চড়ে জঙ্গলে আসে। কেন?

ঘোড়ায় চড়ে শীগগির যাতায়াত করা যায়‌, কিন্তু আবার সহজেই লোকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। যে-লোক দুষ্কার্য করতে বেরিয়েছে সে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চায় না; তবে এ-ব্যক্তি ঘোড়ায় চড়ে জঙ্গলে আসে কেন? নিশ্চয় কোনও বিশেষ সুবিধে আছে। কী সুবিধে? সদানন্দ সুরের পাঁচল টপকানো? ঘোড়ার পিঠ থেকে পাঁচিল টপকানোর সুবিধে হয়‌, ওদিকে নামবার জন্যে পেয়ারাগাছ আছে। কিন্তু শুধু কি এই? না‌, অন্য কিছুও আছে? এ প্রশ্নের উত্তর পেয়েছিলাম কাল রাত্রে। কিন্তু সে পরের কথা।

যথাসময়ে সদানন্দ সুর ফিরে এলেন। তোরঙ্গটা তিনি ফিরিয়ে আনেননি‌, বোধহয় ইচ্ছে ছিল বাড়িতে দুদিন বিশ্রাম করে ভগিনীপতির বাসা থেকে তোরঙ্গ নিয়ে আসবেন। কিন্তু তাঁর ইচ্ছা! পূর্ণ হল না। নিজের বাড়িতে ঢুকতে গিয়ে প্রায় আমাদের চোখের সামনে তিনি মারা গেলেন।

সদানন্দ সুরের মৃত্যুর পর কিছুই বুঝতে বাকি রইল না। আমি যাকে ধরতে এসেছি সেই মেরেছে অমৃত আর সদানন্দ সুরকে। যারা আগ্নেয়াস্ত্র কেনে তারা বাইরের লোক‌, হত্যাকারী বাইরের লোক নয়; অমৃত আর সদানন্দ সুরের চেনা লোক। অমৃত তাকে দেখে ফেলেছিল এবং সদানন্দ সুর তাকে দোহন করতে শুরু করেছিল। কেবল দুটো কথা তখনও অজ্ঞাত ছিল-লোকটা কে? এবং কালো ঘোড়ায় চড়ে আসে কেন?

অমৃত বলেছিল‌, কালো ঘোড়া-ভূত‌, নাক দিয়ে আগুন বেরুচ্ছে। সবটাই তার উত্তপ্ত কল্পনা হতে পারে। আবার খানিকটা সত্যি হতে পারে। সুতরাং কালো ঘোড়ার খোঁজ নেওয়া দরকার।

খোঁজ নিয়ে জানা গেল সান্তালগোলায় কেবল একটি কালো ঘোড়া আছে‌, তার মালিক বদ্রিদাস মাড়োয়ারী। তবে কি বদ্রিদাস-ই আমার আসামী? বদ্রিদাস লোকটি পাঁকাল মাছের মত পিছল; তিনি ধান-চালে প্রচুর কাঁকর মেশাতে পারেন‌, স্বজ্জাতির প্রতি তাঁর অসীম পক্ষপাত থাকতে পারে; কিন্তু তিনি দু-দুটো মানুষকে খুন করতে পারেন এত সাহস নেই। তাছাড়া তাঁকে ঘোড়সওয়ার রূপে কল্পনা করা আমার পক্ষে একেবারেই অসম্ভব।

আমি বেনামী চিঠি পাঠানোর ফলে একটা কাজ হয়েছিল‌, সন্দেহভাজনদের দল থেকে জনকতক লোককে বাদ দেওয়া গিয়েছিল। যমুনাদাস গঙ্গারাম বেনামী চিঠি পুলিসকে দেখিয়েছিল‌, সুতরাং সে নয়। নফর কুণ্ডুর ওপর প্রথমে সন্দেহ হয়েছিল‌, কিন্তু দেখা গেল তার ঘোড়া নেই। পরের ঘোড়া ধার করে কেউ খুন করতে যায় না। প্রাণকেষ্ট পালকে অবশ্য আমি গোড়া থেকে বাদ দিয়েছিলাম। ট্রলিতে চড়ে বাঘমারি গ্রামের কাছাকাছি যাওয়া যায় বটে‌, কিন্তু ট্রলিতে কুলি থাকে‌, তাদের চোখ এড়িয়ে খুন করার সুবিধে নেই। আমার শুধু জানবার কৌতুহল ছিল‌, সদানন্দ সুরের ট্রাঙ্কে কী আছে।

যাহোক, সন্দেহভাজনের দলকে ছাঁটাই করে মাত্র তিনজন দাঁড়াল—বদ্রিদাস মাড়োয়ারী, বিশু মল্লিক। আর সুখময় দারোগা। সুখময় দারোগাকে বাদ দিতে পারিনি; তার একটা ঘোড়া আছে‌, যদিও সেটা কালো নয়। এবং তার পক্ষে এইজাতীয় কারবার চালানো যত সহজ এমন আর কারুর পক্ষে নয়। প্রদীপের নিচেই অন্ধকার বেশি।

অবশ্যি যখন জানতে পারলাম বিশু মল্লিক একসময় জকি ছিল‌, তখন সব সন্দেহই তার ওপর গিয়ে পড়ল। উপরন্তু জানা গেল‌, বিশু মল্লিক সদানন্দ সুরকে পাঁচশো টাকা ধার দিয়েছে। আসলে ওটা ধার নয়-ঘুষ। সদানন্দ সুরের মত নিঃস্ব লোককে কোনও ব্যবসাদার শুধু হাতে ধরা দেবে না।

আমি বিশু মল্লিকের জন্যে টোপ ফেললাম‌, আমার মনের প্রাণের কথা সব তাকে বলে ফেললাম। জঙ্গলে যে অস্ত্রগুলো লুকিয়ে রাখা সম্ভব এ-চিন্তা আমার গোড়া থেকেই ছিল। আমি ভেবেছিলাম শিমুলগাছের কাছাকাছি কোথাও মাটিতে পোঁতা আছে। বিশু মল্লিক। যখন শুনল আমরা জঙ্গল খানাতল্লাশ করবার মতলব করেছি‌, তখন সে দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল। অস্ত্রগুলো অবশ্য খুবই যত্ন করে লুকিয়ে রাখা হয়েছে; কিন্তু বলা যায় না‌, পুলিস খুঁজে বার করতে পারে। তখন বিশু মল্লিককে অবশ্য ধরা যাবে না‌, কিন্তু অনেক টাকার মাল বাজেয়াপ্ত হয়ে যাবে। বিশু মল্লিক লোভে পড়ে গেল।

কাল বিকেলে আমি যখন রামডিহি যাবার জন্যে ট্রেনে চড়লাম। তখন বিশু মল্লিক এসে দেখে গেল। আমি সত্যি যাচ্ছি। কিনা। আমার অবশ্য রামডিহি পৰ্যন্ত যাবার প্ল্যান ছিল না‌, স্থির করেছিলাম। পরের স্টেশনে নেমে বাঘমারিতে ফিরে আসব। কিন্তু দৈব অনুকুল‌, ঠিক বাঘমারি গ্রামের গায়ে ট্রেন থেমে গেল।

গ্রামে গিয়ে পটল‌, দাশু আর গোপালকে যোগাড় করলাম; তাদের নিয়ে জঙ্গলে গেলাম। সারা জঙ্গল তল্লাশ করা অসম্ভব; কিন্তু সদানন্দ সুরের পাঁচিলের পাশে যেখানে ঘোড়ার খুরের দাগ পাওয়া গিয়েছিল। সেখান থেকে শিমুলগাছের গোড়া পর্যন্ত খুঁজে দেখলাম‌, যদি কোথাও সদ্য-খোঁড়া মাটি দেখতে পাই। কিন্তু সেরকম কিছুই চোখে পড়ল না।

এখন কি করা যায়! সূৰ্য্যস্তের বেশি দেরি নেই। জঙ্গলে বসে সিগারেট টানতে টানতে মতলব ঠিক করে নিলাম। পটলদের বললাম‌, চলো‌, সান্তালগোলার দিকে যাওয়া যাক।’

জঙ্গলের ভিতর দিয়ে সান্তালগোলার কিনারায় পৌঁছলাম। এখানে জঙ্গল প্রায় দেড়শো গজ চওড়া; একপ্রান্তে স্টেশন‌, অন্যপ্ৰান্তে কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্ক‌, মাঝামাঝি বিশু মল্লিকের মিল। মিল-এর এটা পিছন দিক, কাঁটা-তারের বেড়ায় ছোট খিড়কির ফটক আছে। আমি পটলদের আমার প্ল্যান বুঝিয়ে দিলাম। তারা জঙ্গলের কিনারায় সম-ব্যবধানে গাছে উঠে লুকিয়ে থাকবে। এবং লক্ষ্য করবে ঘোড়ায় চড়ে কিংবা পায়ে হেঁটে কেউ জঙ্গলে ঢোকে। কিনা। লোকটাকে চেনবার চেষ্টা করবে‌, কিন্তু কোনও অবস্থাতেই ধরবার চেষ্টা করবে না।

পটল উঠল বিশু মল্লিকের মিল-এর সরাসরি একটা গাছে দাশু গেল স্টেশনের দিকে‌, আর গোপাল ব্যাঙ্কের দিকে। আকাশে আজও চাঁদ আছে; রাত হলেও‌, এদের চোখ এড়িয়ে কেউ জঙ্গলে ঢুকতে পারবে না।

ওদের গাছে তুলে দিয়ে আমি ফিরে চললাম। শিমুলগাছের কাছে। ওই গাছটা আমার মনে ঘোর সন্দেহ জাগিয়ে তুলেছিল। অমৃতের মৃত্যু হয় ঐ গাছের তলায়। এ-রহস্যের চাবিকাঠি যদি জঙ্গলের মধ্যে থাকে। তবে নিশ্চয় ঐ শিমুলগাছের কাছাকাছি কোথাও আছে।

যখন শিমুলতলায় ফিরে এলাম তখন সন্ধ্যে পেরিয়ে গেছে‌, চাঁদের আলো ফুটেছে। শিমুলগাছ থেকে বিশ-পঁচিশ হাত দূরে একটা ঝাঁকড়া গোছের গাছ ছিল‌, আমি তাতে উঠে পড়লাম। এইখানে বসে বাঘ-শিকারীর মত অপেক্ষা করব। আমার সঙ্গে অস্ত্র নেই‌, আমি এসেছি শুধু ব্যাঘ্র-মশাইকে দেখতে। তিনি আসবেন কিনা জানি না‌, কিন্তু যদি আসেন‌, নটর আগেই আসবেন।

শিমুলগাছের সব পাতাই প্ৰায় ঝরে গেছে‌, গাছের তলায় ছায়া নেই। চাঁদ যত উচুতে উঠছে। আলো তত পরিষ্কার হচ্ছে। হঠাৎ কাছের একটা গাছ থেকে কোকিল ডেকে উঠল। বিচিত্র পরিস্থিতি। আমি বসে আছি। একটা নৃশংস নরহস্তাকে দেখব বলে‌, আর—কোকিল ডাকছে! আজব দুনিয়া!

বেশ খানিকক্ষণ কেটে গেল। চোখের কাছে হাত এনে ঘড়ি দেখলাম‌, পৌঁনে আটটা। সঙ্গে সঙ্গে দূর থেকে একটা আওয়াজ কানে এল‌, শুকনো পাতার ওপর পায়ের মচমচ শব্দ। ঘাড় ফিরিয়ে দেখি‌, ঘন ছায়ার ভিতর থেকে ধীর-মস্থর গমনে একটা ঘোড়া বেরিয়ে আসছে। কালো ঘোড়া। তার পিঠে বসে আছে কালো-পোশাক পরা একটা মানুষ। মানুষটার মুখ দেখতে পাচ্ছি। না‌, কিন্তু সে জাকির মত সামনে ঝুকে বসেছে আর সতর্কভাবে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে।

ঘোড়াটা সোজা গিয়ে শিমুলগাছের বিরাট গুড়ির গা ঘেঁষে দাঁড়াল‌, পাথরের মূর্তির মত দাঁড়িয়ে রইল। তারপর যা দেখলাম তা একেবারে সার্কাসের খেলা। ঘোড়ার সওয়ার টপ করে ঘোড়ার পিঠে উঠে দাঁড়াল। তারপর হাত বাড়িয়ে শিমুলগাছের গুড়িতে একটা ফোকরের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে দিলে। মাটি থেকে দশ হাত উঁচুতে যেখানে ডালপালা বেরিয়েছে সেখানে একটা খোপের মত ফুটো আছে। অচিন পাখির বাসা!

ঘোড়ার পিঠে আসামী কেন জঙ্গলে আসে এখন বুঝতে পারছি? অস্ত্রগুলো মাটিতে পোঁতা নেই‌, আছে গাছের ফোকরের মধ্যে‌, মাটি থেকে দশ হাত উচুতে। শিমুলগাছের গায়ে শক্ত-শক্ত মোটা মোটা কাঁটা থাকে; শিমুলগাছে মানুষ ওঠে না‌, এমন কি কাঠবেরালি পর্যন্ত ওঠে না। এমন নিরাপদ গুপ্তস্থান আর নেই। অবশ্য মই লাগিয়ে ওঠা যায়। কিন্তু কে মই লাগবে? আর যিনি জানেন তিনি যদি মই ঘাড়ে করে জঙ্গলে আসেন তাহলে লোকের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। তার চেয়ে ঘোড়া ঢ়ের নিরাপদ; বিশেষত যদি জকির হাতের শিক্ষিত ঘোড়া হয়।

যাহোক‌, ঘোড়সওয়ারের বাঁ হাতে একটা থলি আছে; সে খোপের মধ্যে ডান হাত ঢুকিয়ে একটি একটি করে অস্ত্রগুলি বার করছে আর থলিতে রাখছে। এতক্ষণে ঘোড়সওয়ারকে চিনতে পেরেছি-বিশু মল্লিক। মুখ চিনতে না পারলেও‌, ঐ রোগা বেঁটে শরীর আর ধনুকের মত বাঁকা ঠ্যাং ভুল হবার নয়। আমি ঠিকই আন্দাজ করেছিলাম। কিন্তু একটা ধোঁকা তখনও কাটেনি; বিশু মল্লিক কালো ঘোড়া পেল কোথেকে? সে ভরি ইঁশিয়ার লোক‌, তার যদি কালো ঘোড়া থাকত সে কখনই আমার কাছে মিথ্যেকথা বলত না। আসলে আমি যখন তাকে কালো ঘোড়া সম্বন্ধে প্রশ্ন করেছিলাম তখন সে আমার প্রশ্নের তাৎপর্য বুঝতে পারেনি। এ-মামলার সঙ্গে কালো ঘোড়ার যে কোনও সম্বন্ধ আছে তা সে কল্পনা করতেই পারেনি। আমি কালো ঘোড়ার রহস্য বুঝলাম কাল দুপুর-রাত্রে‌, বাসায় ফিরে এসে।

সে যাক‌, বিশু মল্লিক থলি ভরে নিয়ে ঘোড়ার পিঠে নেমে বসিল‌, তারপর মন্দমন্থর চালে ফিরে চলল। সে জঙ্গলের ছায়ায় অদৃশ্য হয়ে যাবার পর আমি গাছ থেকে থেকে নোমলাম। ঘড়িতে তখন সওয়া আটটা। আমি আবার পটলদের উদ্দেশে ফিরে চললাম। আমার প্ল্যান ঠিকই ফলেছে; পুলিস কাল জঙ্গল তল্লাশ করবে‌, তাই আজ বিশু মল্লিক অস্ত্রগুলো জঙ্গল থেকে সরিয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে‌, অস্ত্রগুলোকে সে রাখবে কোথায়? কারণ‌, কেবল মানুঘটাকে ধরলে চলবে না‌, অস্ত্রগুলোও চাই। বস্তুত‌, অস্ত্রগুলো না পেলে মানুষটাকে ধরে কোনও লাভ নেই।

আমি যখন জঙ্গলের কিনারায় পৌঁছলাম তখনও পটলেরা গাছ থেকে নামেনি‌, আমাকে দেখে নেমে এল। তিনজনেই ভীষণ উত্তেজিত; তারা ঘোড়সওয়ারকে জঙ্গলে ঢুকতে দেখেছে এবং চিনতে পেরেছে। বিশু মল্লিক তার রাইস মিল-এর খিড়কি-ফটক দিয়ে ঘোড়ার পিঠে চড়ে বেরিয়ে এল‌, পটলের গাছের প্রায় পাশ দিয়ে জঙ্গলে ঢুকাল। চল্লিশ মিনিট পরে আবার ফিরে ফটিক দিয়ে মিল-এ চলে গেল।

আমি জিগ্যেস করলাম‌, ‘ঠিক দেখেছি নিজের ফটকে ঢুকেছে? অন্য কোথাও যায়নি?’

পটল বলল‌, ‘আজ্ঞে না‌, অন্য কোথাও যায়নি।’

আমি নিশ্চিন্ত হলাম। অস্ত্রগুলো বিশু মল্লিক মিলেই রাখবে‌, অন্তত যতদিন না পুলিস জঙ্গল-তল্লাশ শেষ করে। আমি সকালবেলা তাকে বলেছিলাম মিল খানাতল্লাশ করব না‌, আমার কথায় সে বিশ্বাস করেছে। আমাকে বিশু মল্লিক বোধ হয় খুবই সরলপ্রকৃতির লোক বলে মনে করেছিল।

আমি তখন পটল‌, দাশু আর গোপালের পিঠ ঠুকে দিয়ে বললাম‌, ‘তোমাদের জন্যে অমৃতের মৃত্যুর কিনারা করতে পারলাম। কিন্তু আজ আর বেশি কৌতুহল প্রকাশ কোরো না; কাল সকাল ন’টার সময় এসো‌, তখন সব জানতে পারবে। কিন্তু সাবধান‌, কাউকে একটি কথা বলবে না।’

তারা গ্রামে ফিরে গেল। আমি থানায় গেলাম। সুখময় দারোগার কাছে পিস্তলটা যোগাড় করে স্টেশনে গেলাম। স্টেশন থেকে কাজকর্ম সেরে যখন ফিরে এলাম তখন রাত দুপুর‌, তুমি নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছ।

তোমাকে জাগালাম না‌, পিছনের জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। দেখি‌, জানালার বাইরে কয়েকটা জন্তু বসে আছে। প্রথমটা আমিও ভেবেছিলাম কালো কুকুর‌, তারপর লক্ষ্য করে দেখলাম‌, কুকুর নয়—শেয়াল। ব্যস‌, সঙ্গে সঙ্গে কালো ঘোড়ার রহস্য ভেদ হয়ে গেল। বুঝতে পারলে না? অত্যন্ত সহজ‌, এমন কি‌, হাস্যকর। কেন যে কথাটা মাথায় আসেনি জানি না।—শেয়ালের গায়ের রঙ কালো নয়‌, পাটকিলে। অথচ আমরা দেখলাম কালো। ঘোড়াটাও কালো ছিল না‌, ছিল গাঢ় বাদামী রঙের; ইংরেজিতে যাকে বলে চেস্টনাট। চাঁদের আলোয় সব গাঢ় রঙই দূর থেকে কালো দেখায়। তাই অমৃত কালো ঘোড়া-ভূত দেখেছিল‌, আমিও কালো ঘোড়া দেখেছিলাম। এই হল কালো ঘোড়ার রহস্য। রহস্য না বলে যদি পরিহাস বলতে চাও তাতেও আপত্তি নেই।

রাত্রে খেতে বসে তুমি সস্ত্রীক প্রাণকেষ্ট পালের উপাখ্যান বললে। ওদের গলদ কোথায় বুঝতে বেশি কষ্ট হয় না। প্রাণকেষ্ট পাল নিজের কাজে বেশ দক্ষ‌, কিন্তু ঘরে জারিজুরি চলে না‌, স্ত্রীর কাছে কেঁছো। সদানন্দ সুর বোনের কাছে তোরঙ্গ রেখে গিয়েছিলেন ঠিকই। তোরঙ্গ গোড়ায় ভাঙ্গা হয়নি; কিন্তু যখন তাঁর মৃত্যু-সংবাদ এল‌, তখন ভগিনী সুশীলা আর দ্বিধা করলেন না‌, তেরঙ্গের তালা ভাঙলেন এবং যা পেলেন আত্মসাৎ করলেন। হয়তো দাদার বিষয়সম্পত্তি সবই তিনি শেষ পর্যন্ত পাবেন‌, কিন্তু আইনের কথা কিছু বলা যায় না। হাতে যা পাওয়া গেছে তা হজম করাই বুদ্ধিমানের কাজ। এই হচ্ছে ভগিনী সুশীলার মনস্তত্ত্ব। প্রাণকেষ্ট পাল কিন্তু পুরুষমানুষ, হ্রস্ব-দীর্ঘ জ্ঞান আছে, তাই তোমাকে দেখে তিনি বেজায় নার্ভাস হয়ে পড়েছিলেন।–

তারপর আর কি? এবার বেদব্যাসের বিশ্রাম। এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে বিশু মল্লিকের মত আরও কত মহাজন নীরবে তপস্যা করছেন কে তার খবর রাখে।’

ব্যোমকেশ প্রকাণ্ড হাই তুলিয়া পাশ ফিরিল; বলিল‌, ‘জাগি পোহাল বিভাবরী। এইবেলা একটুকু ঘুমিয়ে নাও‌, আজ রাত্রেই কলকাতা ফিরব। হে হে।’

শৈল রহস্য

সহ্যাদ্রি হোটেল

মহাবলেশ্বর—পুণা

৩রা জানুআরি

ভাই অজিত,

বোম্বাই এসে অবধি তোমাদের চিঠি দিতে পারিনি। আমার পক্ষে চিঠি লেখা কি রকম কষ্টকর কাজ তা তোমরা জানো। বাঙালীর ছেলে চিঠি লিখতে শেখে বিয়ের পর। কিন্তু আমি বিয়ের পর দুদিনের জন্যেও বৌ ছেড়ে রইলাম না, চিঠি লিখতে শিখব কোত্থেকে? তুমি সাহিত্যিক মানুষ‌, বিয়ে না করেও লম্বা চিঠি লিখতে পার। কিন্তু তোমার কল্পনাশক্তি আমি কোথায় পাব ভাই। কাঠখোট্টা মানুষ‌, স্রেফ সত্য নিয়ে কারবার করি।

তবু আজ তোমাকে এই লম্বা চিঠি লিখতে বসেছি। কেন লিখতে বসেছি তা চিঠি শেষ পর্যন্ত পড়লেই বুঝতে পারবে। মহাবলেশ্বর নামক শৈলপুরীর সহ্যাদ্রি হোটেলে রাত্রি দশটার পর মোমবাতি জ্বেলে এই চিঠি লিখছি। বাইরে শীতজর্জর অন্ধকার; আমি ঘরের দোর-জানালা বন্ধ করে লিখছি‌, তবু শীত আর অন্ধকারকে ঠেকিয়ে রাখা যাচ্ছে না। মোমবাতির শিখাটি থেকে থেকে নড়ে উঠছে; দেয়ালের গায়ে নিঃশব্দ ছায়া পা টিপে টিপে আনাগোনা করছে। ভৌতিক পারিবেশ। আমি অতিপ্রাকৃতকে সারা জীবন দূরে সরিয়ে রাখতে চেয়েছি‌, কিন্তু–

অনেক দিন আগে একবার মুঙ্গেরে গিয়ে বরদাবাবু নামক একটি ভূতজ্ঞ ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল মনে আছে? আমি তাঁকে বলেছিলাম—ভূত প্রেত থাকে থাক‌, আমি তাদের হিসেবের বাইরে রাখতে চাই। এখানে এসে কিন্তু মুশকিলে পড়ে গেছি‌, ওদের আর হিসেবের বাইরে রাখা যাচ্ছে না।

কিন্তু থাক। গল্প বলার আর্ট জানা নেই বলেই বোধ হয়। পরের কথা আগে বলে ফেললাম। এবার গোড়া থেকে শুরু করি।–

যে-কাজে বোম্বাই এসেছিলাম। সে কাজটা শেষ করতে দিন চারেক লাগিল। ভেবেছিলাম কাজ সেরেই ফিরব‌, কিন্তু ফেরা হল না। কর্মসূত্রে একজন উচ্চ পুলিস কর্মচারীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয়েছে‌, মারাঠী ভদ্রলোক‌, নাম বিষ্ণু বিনায়ক আপ্টে। তিনি বললেন‌, ‘বম্বে এসেছেন‌, পুণা না দেখেই ফিরে যাবেন?’

প্রশ্ন করলাম‌, ‘পুণায় দেখবার কী আছে?’

তিনি বললেন‌, ‘পুণা শিবাজী মহারাজের পীঠস্থান‌, সেখানে দেখবার জিনিসের অভাব? সিংহগড়‌, শনিবার দুর্গ, ভবানী মন্দির—

ভাবলাম এদিকে আর কখনও আসব কি না কে জানে‌, এ সুযোগ ছাড়া উচিত নয়। বললাম‌, ‘বেশ‌, যাব।’

আপ্টের মোটরে চড়ে বেরুলাম। বোম্বাই থেকে পুণা যাবার পাকা মোটর-রাস্তা আছে‌, সহ্যাদ্রির গিরিসঙ্কটের ভিতর দিয়ে পাক খেয়ে খেয়ে গিয়েছে। এখানকার নৈসৰ্গিক দৃশ্য বৰ্ণনা করা আমার কর্ম নয়। এক পাশে উদ্ভুঙ্গ শিখর‌, অন্য পাশে অতলস্পর্শ খাদের কোলে সবুজ উপত্যকা। তুমি যদি দেখতে‌, একটা চম্পূকাব্য লিখে ফেলতে।

পুণায় আপ্টের বাড়িতে উঠলাম। সাহেবী কাণ্ডকারখানা‌, আদর যত্নের সীমা নেই। আমাকে আপ্টে যে এত খাতির করছেন তার পিছনে আপ্টের স্বাভাবিক সহৃদয়ত তো আছেই‌, বোধ হয়। বোম্বাই প্রাদেশিক সরকারের ইশারাও আছে। সে যাক। পুণায় বোম্বাই-এর চেয়ে বেশি ঠাণ্ডা; কারণ বোম্বাই শহর সমুদ্রের সমতলে‌, আর পুণা সমুদ্র থেকে প্রায় দু’হাজার ফুট উচুতে। পুণার ঠাণ্ডায় কিন্তু বেশ একটি চনমনে ভাব আছে; শরীর-মনকে চাঙ্গা করে তোলে‌, জড়ভরত করে ফেলে না।

পুণায় তিন দিন থেকে দর্শনীয় যা-কিছু আছে সব দেখলাম। তারপর আপ্টে বললেন‌, ‘পুণায় এসে মহাবলেশ্বর না দেখে চলে যাবেন?

আমি বললাম‌, ‘মহাবলেশ্বর! সে কাকে বলে?’

আপ্টে হেসে বললেন‌, ‘একটা জায়গার নাম। বম্বে প্রদেশের সেরা হিল-স্টেশন। আপনাদের যেমন দাৰ্জিলিং আমাদের তেমনি মহাবলেশ্বর। পুণা থেকে আরও দু’হাজার ফুট উঁচু। গরমের সময় বম্বের সবাই মহাবলেশ্বর যায়।’

‘কিন্তু শীতকালে তো যায় না। এখন ঠাণ্ডা কেমন?’

‘একেবারে হোম ওয়েদার। চলুন চলুন‌, মজা পাবেন।’

অতএব মহাবলেশ্বরে এসেছি এবং বেশ মজা টের পাচ্ছি।

পুণা থেকে মহাবলেশ্বর বাহাত্তর মাইল; মোটরে আসতে হয়। আমরা পুণা থেকে বেরুলাম দুপুরবেলা খাওয়া-দাওয়ার পর‌, মহাবলেশ্বরে পৌঁছুলাম আন্দাজ চারটের সময়। পৌঁছে দেখি শহর। শূন্য‌, দু’চারজন স্থায়ী বাসিন্দা ছাড়া সবাই পালিয়েছে। সত্যিই হোম ওয়েদার; দিনের বেলায় হি হি কম্প‌, রাত্রে হি হি কম্প। ভাগ্যিস আপ্টে আমার জন্যে একটা মোটা ওভারকেট এনেছিলেন‌, নইলে শীত ভাঙতো না।

শহরের বর্ণনা দেব না‌, মনে কর দাৰ্জিলিঙের ছোট ভাই। আপ্টে আমাকে নিয়ে সহ্যাদ্রি হোটেলে উঠলেন। হোটেলে একটিও অতিথি নেই‌, কেবল হোটেলের মালিক দু’তিন জন চাকর নিয়ে বাস করছেন।

হোটেলের মালিক জাতে পাসী‌, নাম সোরাব হোমাজি। আপ্টের পুরনো বন্ধু। বয়স্ক লোক‌, মোটাসোটা‌, টকটকে রঙ। বিষয়বুদ্ধি নিশ্চয় আছে‌, নইলে হোটেল চালানো যায় না; কিন্তু ভারি অমায়িক প্রকৃতি। আপ্টে আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন; তিনি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকে একবার তাকিয়ে খুব সমাদর করে নিজের বসবার ঘরে নিয়ে গেলেন। অবিলম্বে কফি এসে পড়ল‌, তার সঙ্গে নানারকম প্যাষ্ট্রি। ভাল কথা‌, তুমি বোধ হয় জান না‌, গোঁড়া পাসীরা ধূমপান করে না‌, কিন্তু মদ খায়। মদ না খেলে তাদের ধর্মবিশ্বাসে আঘাত লাগে।

কফি-পর্ব শেষ না হতে হতে সূৰ্য্যস্ত হয়ে গেল। অতঃপর আপ্টে আমাকে হোটেলে রেখে মোটর নিয়ে বেরুলেন; এখানে তাঁর কে একজন আত্মীয় আছে তার সঙ্গে দেখা করে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ফিরবেন। তিনি চলে যাবার পর হোমজি মৃদু হেসে বললেন‌, ‘আপনি বাঙ্গালী। শুনে আশ্চর্য হবেন‌, মাস দেড়েক আগে পর্যন্ত এই হোটেলের মালিক ছিলেন একজন বাঙালী।’

আশ্চর্য হলাম। বললাম‌, ‘বলেন কি! বাঙালী এতদূরে এসে হোটেল খুলে বসেছিল।’

হোমজি বললেন‌, ‘হ্যাঁ। তবে একলা নয়। তাঁর একজন গুজরাতী অংশীদার ছিল।’

এই সময় একটা চাকর এসে অবোধ্য ভাষায় তাঁকে কি বলল‌, তিনি আমাকে জিগ্যেস করলেন‌, ‘আপনি কি-স্নান করবেন? যদি করেন‌, গরম জল তৈরি আছে।’

বললাম‌, রক্ষে করুন‌, এই শীতে স্নান! একেবারে বোম্বাই গিয়ে মান করব।’ চাকর চুলে গেল। তখন আমি হোমজিকে প্রশ্ন করলাম‌, ‘আচ্ছা‌, আপনি তো বম্বের লোক? তাহলে এই শীতে এখানে রয়েছেন কেন? এখানে তো কাজকর্ম এখন কিছু নেই।’

হোমজি বললেন‌, ‘কাজকর্ম আছে বৈকি। মার্চ মাস থেকে হোটেল খুলবে‌, অতিথিরা আসতে শুরু করবে। তার আগেই বাড়িটাকে সাজিয়ে গুছিয়ে ফিট্‌ফাট করে তুলতে হবে। তাছাড়া বাড়ির পিছন দিকে গোলাপের বাগান করেছি। চলুন না দেখবেন। এখনও দিনের আলো আছে।’

বাড়ির পিছন দিকে গিয়ে বাগান দেখলাম। বাগান এখনও তৈরি হয়নি‌, তবে মাসখানেকের মধ্যে ফুল ফুটতে আরম্ভ করবে। হোমজির ভারি বাগানের শখ।

এইখানে সহ্যাদ্রি হোটেলের একটা বৰ্ণনা দিয়ে রাখি। চুনকাম করা পাথরের দোতলা বাড়ি‌, সবসুদ্ধ বারো-চৌদ্দটা বড় বড় ঘর আছে। সামনে দিয়ে গেরুমটি ঢাকা রাস্তা গিয়েছে; পিছন দিকে গোলাপ বাগানের জমি‌, লম্বায় চওড়ায় কাঠা চারেক হবে। তারপরই গভীর খাদ; শুধু গভীর নয়‌, খাড়া নেমে গিয়েছে। পাথরের মোটা আলসের উপর ঝুঁকে উঁকি মারলে দেখা যায়‌, অনেক নিচে ঘন ঝোপঝাড়ের ভিতর দিয়ে একটা সরু ঝরনার ধারা বয়ে গেছে।

আমরা বাগান দেখে ফিরছি এমন সময় খাদের নিচে থেকে একটা গভীর আওয়াজ উঠে এল। অনেকটা মোষের ডাকের মত। নিচে তখন ঘুটঘুটে অন্ধকার‌, ওপরে একটু আলো আছে; আমি জিগ্যেস করলাম‌, ‘ও কিসের আওয়াজ?’

হোমজি বললেন‌, ‘বাঘের ডাক। আসুন‌, ভেতরে যাওয়া যাক।’ ঘরে বিদ্যুৎবাতি জ্বলছে; চাকর একটা গানগনে কয়লার আংটা মেঝের উপর রেখে গেছে। আমরা আংটার কাছে চেয়ার টেনে বসলাম। ঠাণ্ড আঙুলগুলোকে আগুনের দিকে ছড়িয়ে দিয়ে বললাম‌, ‘এদিকে বড় বাঘ আছে?’

হোমজি বললেন‌, ‘আছে। তাছাড়া চিতা আছে‌, হায়েনা আছে‌, নেকড়ে আছে। যে বাঘটার ডাক আজ শুনলেন সেটা মানুষের রক্তের স্বাদ পেয়েছে কিনা‌, তাই এ তল্লাট ছেড়ে যেতে পারছে না।’

‘মানুষখেকো বাঘ! কত মানুষ খেয়েছে?’

‘আমি একটার কথাই জানি। ভারি লোমহর্ষণ কাণ্ড! শুনবেন?’

এই সময় আপ্টে ফিরে এলেন‌, লোমহর্ষণ কাণ্ড চাপা পড়ে গেল। আপ্টে বললেন‌, তাঁর আত্মীয় ছাড়ছেন না‌, আজ রাত্রে তাঁকে সেখানেই ভোজন এবং শয়ন করতে হবে। কিছুক্ষণ গল্পসল্প করে তিনি উঠলেন‌, আমাকে বললেন‌, ‘কাল সকাল ন’টার মধ্যে আমি আসব! আপনি ব্রেকফার্স্ট খেয়ে তৈরি হয়ে থাকবেন‌, দু’জনে বেরুবা। এখানে অনেক দেখবার জায়গা আছে; বম্বে পয়েন্ট‌, আর্থার্স সীট‌, প্রতাপগড় দুর্গ–’

তিনি চলে গেলেন। আমরা আরও খানিকক্ষণ বসে এটা-সেটা গল্প করলাম। এখানে এখন শাকসব্জি-দুধ-ডিমা-মুগী খুব সস্তা‌, আবার গরমের সময় দাম চড়বে।

কথায় কথায় হোমজি বললেন‌, ‘আপনার ভূতের ভয় নেই তো?’

আমি হেসে উঠলাম। তিনি বললেন‌, ‘কারুর কারুর থাকে। একলা ঘরে ঘুমোতে পারে না। তাহলে আপনার শোবার ব্যবস্থা যদি দোতলায় করি আপনার অসুবিধা হবে না?’

বললাম‌, ‘বিন্দুমাত্র না। আপনি কোথায় শোন?’

তিনি বললেন‌, ‘আমি নিচেয় শুই। আমার বসবার ঘরের পাশে শোবার ঘর। আপনাকে ওপরে দিচ্ছি। তার কারণ‌, এখন সব ঘরের বিছানাপত্র তুলে গুদামে রাখা হয়েছে। অতিথি তো নেই। কেবল দোতলার একটা ঘর সাজানো আছে। তাতে হোটেলের ভূতপূর্ব মালিক সস্ত্রীক থাকতেন। ঘরটা যেমন ছিল তেমনি আছে।’

বললাম‌, ‘বেশ তো‌, সেই ঘরেই শোব।’

হোমজি চাকরকে ডেকে হুকুম দিলেন‌, চাকর চলে গেল‌, তারপর আটটা বাজলে আমরা খেতে বসলাম। এরি মধ্যে মনে হল যেন কত রাত হয়ে গেছে‌, চারদিক নিযুতি। বাড়িতে যদি ডাকাত পড়ে‌, মা বলতেও নেই‌, বাপ বলতেও নেই। গল্প শোনার এই উপযুক্ত সময়। বললাম‌, ‘আপনার লোমহর্ষণ কাণ্ড কৈ বললেন না?’

হোমজি বললেন‌, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ‌, ভারি রোমাঞ্চকর ব্যাপার। এই বাড়িতেই ঘটেছিল আগেকার দুই মালিকের মধ্যে। বলি শুনুন।’

হোমজি বলতে আরম্ভ করলেন। খাওয়া এবং গল্প একসঙ্গে চলতে লাগিল। হোমজি বেশ রাসিয়ে রসিয়ে গল্প বলতে পারেন‌, তাড়াহুড়ো নেই। তাঁর মাতৃভাষা অবশ্য গুজরাতী‌, কিন্তু ইংরেজিতেই বরাবর কথাবার্তা চলছিল। গল্পটাও ইংরেজিতেই বললেন। আমি তোমার জন্যে বাংলায় সংক্ষিপ্ত অনুবাদ করে দিলাম।–

বছর ছয়েক আগে মানেক ভাই মেহতা নামে একজন গুজরাতী আর বিজয় বিশ্বাস নামে একজন বাঙালী মহাবলেশ্বরে এই সহ্যাদ্রি হোটেল খুলেছিল। দু’জনে সমান অংশীদার; মেহতার টাকা আর বিজয় বিশ্বাসের মেহনত। এই নিয়ে হোটেল আরম্ভ হয়।

মানেক মেহতার অনেক কাজ-করবার‌, সে মহাবলেশ্বরে থাকত না; তবে মাঝে মাঝে আসত। বিজয় বিশ্বাসই হোটেলের সর্বেসবা ছিলেন। কিন্তু আসলে হোটেলের দেখাশোনা করতেন বিজয় বিশ্বাসের স্ত্রী হৈমবতী। বিজয় বিশ্বাস কেবল ঘরে বসে সিগারেট টানতেন। আর হিসেবা-নিকেশ করতেন।

মানেক মেহতা লোকটা ছিল প্রচণ্ড পাজি। অবশ্য তখন তার সম্বন্ধে কেউ কিছু জানত না‌, তাকে ভাল করে কেউ চোখে দেখেনি। পরে সব জানা গেল। তার তিনটে বৌ ছিল‌, একটা গোয়ায়‌, একটা বম্বেতে‌, আর একটা আমেদাবাদে। এই তিন জায়গায় বেশির ভাগ সময় সে থাকত। যত রকম বে-আইনী দুষ্কার্য করাই ছিল তার পেশা। বোম্বাই প্রদেশে মদ্যপান নিষিদ্ধ‌, লোকটি বুটুলেগিং করত। বিদেশ থেকে লুকিয়ে সোনা আমদানি করত। অনেকবার তার মাল বাজেয়াপ্ত হয়েছে। কিন্তু লোকটাকে কেউ ধরতে পারেনি।

বিজয় বিশ্বাসের সঙ্গে মানেক মেহতার জেটপাট কি করে হল বলা যায় না। বিজয় বিশ্বাস লোকটি ও রকম ছিলেন না। যতদূর জানা যায়‌, বিজয় বিশ্বাস আগে থেকেই হোটেল চালানোর কাজ জানতেন; হয়তো পুণায় কিম্বা বোম্বাই-এ কিংবা আমেদাবাদে ছোটখাটো হোটেল চালাতেন। তারপর তিনি মানেক মেহতার নজরে পড়ে যান। মানেক মেহতা যে ধরনের ব্যবসা করে তাতে কখনও হাতে অঢেল পয়সা‌, কখনও ভাঁড়ে মা ভবানী। সে বোধ হয় মতলব করেছিল হোটেল কিনে কিছু টাকা আলাদা করে রাখবে‌, যাতে সঙ্কটকালে হাতে একটা রেস্ত থাকে। বিজয় বিশ্বাস তার প্রকৃত চরিত্র জানতেন না‌, সরল মনেই তার অংশীদার হয়েছিলেন।

বিজয় বিশ্বাস আর তাঁর স্ত্রীর ম্যানেজমেণ্টে সহ্যাদ্রি হোটেল অল্পকালের মধ্যেই বেশ জাঁকিয়ে উঠল। মহাবলেশ্বরে হোটেলের মরশুম হচ্ছে আড়াই মাস‌, টেনেন্টুনে তিন মাস। কিন্তু এই কয় মাসের মধ্যেই হোটেলের আয় হয় চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকা; খরচ-খরচা বাদ দিয়ে বিশ পাঁচিশ হাজার টাকা লাভ থাকে; মানেক মেহতা মরশুমের শেষে এসে কখনও নিজের ভাগের টাকা নিয়ে যেত‌, কখনও বা টাকা ব্যাঙ্কেই জমা থাকত।

সোরাব হোমজি প্রতি বছরই গরমের সময় মহাবলেশ্বরে আসতেন এবং সহ্যাদ্রি হোটেলে উঠতেন। হোটেলটি তাঁর খুব পছন্দ। মনে মনে ইচ্ছে ছিল এই রকম একটি হোটেল পেলে নিজে চালাকেন। তিনি পয়সাওয়ালা লোক‌, জীবিকার জন্য কাজ করবার দরকার নেই। কিন্তু ব্যবসা করার প্রবৃত্তি পাসীদের মজ্জাগত।

গত বছর মে মাসে হোমজি যথারীতি এসেছেন। পুরনো খদের হিসেবে হোটেলে তাঁর খুব খাতির‌, স্বয়ং হৈমবতী তাঁর সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের তত্ত্বাবধান করতেন। হোমজিও হৈমবতীর নিপুণ গৃহস্থালীর জন্যে তাঁকে খুব সম্মান করতেন। একদিন হৈমবতী বিমৰ্ষভাবে হোমজিকে বললেন‌, ‘শেঠজি‌, আসছে। বছর আপনি যখন আসবেন তখন আমাদের আর দেখতে পাবেন না।’

হোমজি আশ্চর্য হয়ে বললেন‌, ‘সে কি‌, দেখতে পাব না কেন?’

হৈমবতী বললেন‌, ‘হোটেল বিক্রি করার কথা হচ্ছে। যিনি আমাদের পার্টনার তিনি হোটেল রাখবেন না। আমরাও চলে যাব। আমার স্বামীর এত ঠাণ্ডা সহ্য হচ্ছে না‌, আমরা দেশে ফিরে যাব।’

‘আপনারা নাকি হোটেল বিক্রি করছেন?’

বিজয় বিশ্বাসের বয়স আন্দাজ পায়তাল্লিশ‌, স্ত্রীর চেয়ে অনেক বড়। একটু কাহিল গোছের চেহারা; আপাদমস্তক গরম জামাকাপড় পরে‌, গলায় গলাবন্ধ জড়িয়ে বসে সিগারেট টোনছিলেন‌, হোমজিকে খাতির করে বসলেন। বললেন‌, ‘হ্যাঁ শেঠজি! আপনি কিনবেন?’

হোমজি বললেন‌, ‘ভাল দীর পেলে কিনতে পারি। আপনার পাটনার কোথায়?’ বিশ্বাস বললেন‌, ‘আমার পার্টনার এখন বিদেশে আছেন‌, তাই আমাকে আমমোক্তারনামা দিয়েছেন। এই দেখুন।’ তিনি দেরাজ থেকে পাওয়ার অফ অ্যাটনিবার করে দেখালেন।

তারপর দর-কষাকষি আরম্ভ হল; বিজয় বিশ্বাস হাঁকলেন দেড় লাখ‌, হোমজি বললেন‌, পঞ্চাশ হাজার। শেষ পর্যন্ত চুরাশি হাজারে রফা হল। কিন্তু স্থাবর সম্পত্তি কেনা তো দু’চার দিনের কাজ নয়; দলিল দস্তাবেজ তদারক করা‌, উকিল‌, অ্যাটনির সঙ্গে পরামর্শ করা‌, রেজিস্ট্রি অফিসে খোঁজ খবর নেওয়া; এইসব করতে কয়েক মাস কেটে গেল। নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি হোমজি আর বিজয় বিশ্বাস পুণায় গেলেন; রেজিস্ট্রারের সামনে হোমজি নগদ টাকা দিয়ে রেজিস্ট্রি করালেন। কথা হল‌, পয়লা ডিসেম্বর তিনি হোটেলের দখল নেবেন। তারপর হোমজি বোম্বাই গেলেন‌, বিজয় বিশ্বাস মহাবলেশ্বরে ফিরে এলেন।

হোটেলে তখন অতিথি নেই‌, একটা চাকরানী ছাড়া চাকরিবোকরও বিদেয় হয়েছে। তাই এরপর যেসব ঘটনা ঘটেছিল‌, তা কেবল হৈমবতীর জবানবন্দী থেকেই জানা যায়। মানেক মেহতা নিশ্চয় নিজে আড়ালে থাকবার মতলব করেই বিজয় বিশ্বাসকে মোক্তারনামা দিয়েছিল। যেদিন কবালা রেজিস্ট্রি হল‌, তার পরদিন রাত্ৰি ন’টার সময় সে সহ্যাত্ৰি হোটেলে এসে হাজির। পরে পুলিশের তদন্তে জানা গিয়েছিল মানেক মেহতা মহাবলেশ্বরের বাইরে দু’মাইল দূরে মোটর রেখে পায়ে হেঁটে মহাবলেশ্বরে ঢুকেছিল।

সে যখন পৌঁছল তখন বিজয় বিশ্বাস আর হৈমবতী রাত্রির খাওয়া-দাওয়া সেরে অফিস-ঘরে বসে নিজেদের ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে জল্পনা-কল্পনা করছিলেন। চাকরানীটা শুতে গিয়েছিল। তখন বেশ শীত পড়ে গেছে। মানেক মেহতার গায়ে মোটা ওভারকোট‌, মাথায় পশমের মঙ্কি-ক্যাপ। তার ব্যবহার বরাবরই খুব মিষ্টি। সে এসে বলল‌, ‘হৈমাবেন‌, আমি আজ রাত্রে এখানেই থাকিব‌, আর খাব। সামান্য কিছু হলেই চলবে।’

হৈমবতী খাবারের ব্যবস্থা করতে রান্নাঘরে চলে গেলেন‌, চাকরানীকে আর জাগালেন না। মানেক মেহতা আর বিজয় বিশ্বাস কাজকর্মের কথা শুরু করলেন। অফিস-ঘরে একটা মজবুত লোহার সিন্দুক ছিল‌, হোটেল বিক্রির টাকা এবং ব্যাঙ্কের জমা টাকা‌, সব এই সিন্দুকেই রাখা হয়েছিল। বিজয় বিশ্বাস জানতেন দু’এক দিনের মধ্যেই মেহতা টাকা নিতে আসবে।

হৈমবতী রান্নাঘরে গিয়ে স্টেভ জ্বেলে ভাজাভুজি তৈরি করতে লাগলেন‌, কিন্তু তাঁর কান পড়ে রইল অফিস-ঘরের দিকে। রান্নাঘর অফিস-ঘর থেকে বেশি দূর নয়‌, তার ওপর নিস্তব্ধ রাত্ৰি। কিছুক্ষণ পরে তিনি শুনতে পেলেন‌, ওঁরা দু’জন অফিস-ঘর থেকে বেরিয়ে কথা বলতে বলতে হোটেলের পিছন দিকের জমিতে চলে গেলেন। হৈমবতীর একটু আশ্চর্য লাগল; কারণ তাঁর স্বামী শীত-কাতুরে মানুষ‌, এত শীতে খোলা হাওয়ায় যাওয়া তাঁর স্বভাববিরুদ্ধ। কিন্তু হৈমবতীর মনে কোনও আশঙ্কাই ছিল না‌, তিনি রান্নাঘর থেকে বেরুলেন না‌, যেমন রান্না করছিলেন করতে লাগলেন।

তারপর হোটেলের পিছন দিক থেকে একটা চাপা চীৎকারের শব্দ শুনে তিনি একেবারে কাঠ হয়ে গেলেন। তাঁর স্বামীর গলার চীৎকার। ক্ষণকাল স্তম্ভিত অবস্থায় থেকে তিনি ছুটে গেলেন হোটেলের পিছন দিকে। পিছনের জমিতে যাবার একটা দরজা আছে‌, হৈমবতী দরজার কাছে পৌঁচেছেন‌, এমন সময় মানেক মেহতা। ওদিক থেকে ঝড়ের মত এসে ঢুকল। হৈমন্বতীকে সজোরে এক পাশে সরিয়ে দিয়ে সদরের দিকে চলে গেল।

‘কি হল! কি হল!’ বলে হৈমবতী পিছনের জমিতে ছুটে গেলেন। সেখানে কেউ নেই। হৈমবতী তখন স্বামীর খোঁজে অফিস-ঘরের দিকে ছুটলেন। সেখানে দেখলেন লোহার সিন্দুকের কবাট খোলা রয়েছে‌, তার ভিতর থেকে নোটের বাণ্ডিল সব অন্তর্হিত হয়েছে। প্ৰায় দেড় লাখ টাকার নোট।

এতক্ষণে হৈমবতী প্রকৃত ব্যাপার বুঝতে পারলেন; মানেক মেহতা তাঁর স্বামীকে ঠেলে খাদের মধ্যে ফেলে দিয়েছে আর সমস্ত টাকা নিয়ে পালিয়েছে! তিনি চীৎকার করে অজ্ঞান হয়ে পড়লেন।–

ভাই অজিত‌, আজ এইখানেই থামতে হল। ঘরের মধ্যে অশরীরীর উৎপাত আরম্ভ হয়েছে। কাল বাকি চিঠি শেষ করব।

৪ঠা জানুয়ারি। কাল চিঠি শেষ করতে পারিনি‌, আজ রাত্রি দশটার পর মোমবাতি জ্বলিয়ে আবার আরম্ভ করেছি। হোমজি খেতে বসে গল্প বলছিলেন। গল্প শেষ হবার আগেই খাওয়া শেষ হল‌, আমরা বসবার ঘরে উঠে গেলাম। চাকর কফি দিয়ে গেল।

হোমজি আবার বলতে শুরু করলেন। আমি আজ আরও সংক্ষেপে তার পুনরাবৃত্তি করছি।–

হৈমাবতীর যখন জ্ঞান হল তখন দশটা বেজে গেছে‌, ইলেকট্রিক বাতি নিভে গিয়ে চারিদিক অন্ধকার‌্‌, হৈমবতী চাকরানীকে জাগালেন‌, কিন্তু সে রাত্রে বাইরে থেকে কোনও সাহায্যই পাওয়া গেল না। পুলিস এল পরদিন সকালে।

পুলিসের অনুসন্ধানে বোঝা গেল হৈমবতীর অনুমান ঠিক। হোটেলের পিছনে খাদের ধারে মানুষের ধস্তাধস্তির চিহ্ন রয়েছে। দুচার দিন অনুসন্ধান চালাবার পর আরও অনেক খবর বেরুল। মানেক মেহতা ডুব মেরেছে। সে পাকিস্তান থেকে তিন লক্ষ টাকার সোনা আমদানি করেছিল‌, কাস্টমসের কাছে ধরা পড়ে যায়। মানেক মেহতা ধরা না পড়লেও একেবারে নিঃস্ব হয়ে পড়েছিল। তাই অংশীদারকে খুন করে সে প্রায় দেড় লাখ টাকা হাতিয়েছে।

এদিকে খাদের তলা থেকে বিজয় বিশ্বাসের লাশ উদ্ধার করা দরকার। কিন্তু এমন দুৰ্গম এই খাদ্য যে‌, সেখানে পৌঁছুনো অতি কষ্টকর ব্যাপার। উপরন্তু সম্প্রতি একজোড়া বাঘ এসে খাদের মধ্যে আডা গেড়েছে। গভীর রাত্রে তাদের হকার শোনা যায়। যাহোক‌, কয়েকজন পাহাড়ীকে নিয়ে তিনদিন পরে পুলিস খাদে নেমে দেখল বিজয় বিশ্বাসের দেহের বিশেষ কিছু অবশিষ্ট নেই; কয়েকটা হাড়গোড় আর রক্তমাখা কাপড়জামা‌, গলাবন্ধ ইত্যাদি নিয়ে তারা ফিরে এল। পুলিসের মনে আর কোনও সংশয় রইল না‌, মানেক মেহতার নামে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা এবং হুলিয়া জারি করল।

ক্রমে ১লা ডিসেম্বর এসে পড়ল। নিঃস্ব বিধবার অবস্থা বুঝতেই পারছে। হোমজি দয়ালু। লোক‌, হৈমবতীকে কিছু টাকা দিলেন। হৈমবতী চোখের জল মুছতে মুছতে মহাবলেশ্বর থেকে চিরবিদায় নিলেন।

তারপর মাসখানেক কেটে গেছে। পুলিস এখনও মানেক মেহতার সন্ধান পায়নি। বাঘ আর বাঘিনী। কিন্তু এখনও খাদের তলায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। মানুষের রক্তের স্বাদ তারা পেয়েছে‌, এ স্থান ছেড়ে যেতে পারছে না।

হোমজির গল্প শুনে মনটা একটু খারাপ হল। বাঙালীর সন্তান সুদূর বিদেশে এসে কিছু অর্থ সঞ্চয় করেছিলেন‌, তা কপালে সইল না। হৈমবতীর অবস্থা আরও শোচনীয়। মানেক মেহতাকে পুলিস ধরতে পারবে কিনা কে জানে; ভারতবর্ষের বিশাল জনসমুদ্র থেকে একটি পুঁটিমাছকে ধরা সহজ নয়।

এই সব ভাবছি। এমন সময় ইলেকট্রিক বাতি নিভে গেল। বললাম‌, ‘এ কি?’

হোমজি বললেন‌, ‘দশটা বেজেছে। এখানে রাত্রি দশটার সময় ইলেকট্রিক বন্ধ হয়ে যায়‌, আবার শেষ রাত্রে কিছুক্ষণের জন্যে জ্বলে!-চলুন‌, আপনাকে আপনার শোবার ঘরে পৌঁছে দিই।‘

হোমিজির একটা লম্বা গদার মত ইলেকট্রিক টর্চ আছে‌, সেটা হাতে নিয়ে তিনি আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চললেন। দোতলায় এক সারি ঘর‌, সামনে টানা বারান্দা। সব ঘরের দরজায় তালা ঝুলছে‌, কেবল কোণের ঘরের দরজা খোলা। চাকর ঘরে মোমবাতি জ্বেলে রেখে গেছে। (ভাল কথা‌, এদেশে মোমবাতিকে মেমবাতি বলে; ভারি কবিত্রপূর্ণ নাম‌, নয়?)

বেশ বড় ঘর; সামনে বারান্দা‌, পাশে ব্যালকনি। ঘরের দু’পাশে দু’টো খোট রয়েছে; একটাতে বিছানা পাতা‌, অন্যটা উলঙ্গ পড়ে আছে। ঘরের মাঝখানে একটা বড় টেবিল আর দু’টো চেয়ার‌, দেয়ালের গায়ে ঠেকানো ওয়ার্ডরোব। টেবিলের উপর একটি অ্যালার্ম টাইমপীস। এক বাণ্ডিল মোমবাতি‌, দেশলাই‌, একটা থার্মোফ্লাক্সে গরম কফি; রাত্রে যদি তেষ্টা পায়‌, খাব। হোমজি অতিথি সৎকারের ক্রটি রাখেননি।

হোমজি বললেন‌, ‘এই ঘরে বিজয় বিশ্বাস স্ত্রীকে নিয়ে থাকতেন। হৈমবতী চলে যাবার পর ঘরটা যেমন ছিল তেমনি আছে। আপনার কোনও অসুবিধে হবে না তো?’

বললাম‌, অসুবিধে কিসের। খুব আরামে থাকব। আপনি যান‌, এবার শুয়ে পড়ুন গিয়ে। এখানে বোধ হয় সকাল সকাল ঘুমিয়ে পড়াই রেওয়াজ।’

হোমজি হেসে বললেন‌, ‘শীতকালে তাই বটে। কিন্তু সকাল আটটা ন’টার আগে কেউ বিছানা ছাড়ে না। আপনি যদি আগে উঠতে চান‌, ঘড়িতে অ্যালার্ম দিয়ে রাখবেন। এই টৰ্চটা রাখুন‌, রাত্রে যদি দরকার হয়।’

‘ধন্যবাদ।’

হোমজি নেমে গেলেন। আমি দরজা বন্ধ করে দিলাম। মোমবাতির আলোয় ঘরটা অবছায়া দেখাচ্ছে। আমি টর্চটা জ্বলিয়ে ঘরময় একবার ঘুরে বেড়ালাম। আমার সুটকেস চাকর ওয়ার্ডরোবের পাশে রেখে গেছে। ওয়ার্ডরোব খুলে দেখলাম সেটা খালি। এসেন্স-কপুর-ন্যাপথলিন মেশা একটা গন্ধ নাকে এল। হৈমবতী এই ওয়ার্ডরোবেই নিজের কাপড়-চোপড় রাখতেন। ঘরের পিছন দিকে একটা সরু দরজা রয়েছে‌, খুলে দেখলাম গোসলখানা। আবার বন্ধ করে দিলাম। তারপর চেয়ারে এসে বসে সিগারেট ধরলাম।

ঘরের দরজা-জানোলা সবই বন্ধ‌, তবু যেন একটা বরফজমানো ঠাণ্ডা হাওয়া ঘরের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বেশিক্ষণ বসে থাকা চলবে না; তাড়াতাড়ি সিগারেট শেষ করে ঘড়িতে অ্যালাম দিলাম‌, সাড়ে সাতটার সময় ঘুম ভাঙলেই যথেষ্ট। আপ্টে আসবেন নাটার সময়।

টািৰ্চটা বালিশের পাশে নিয়ে মোমবাতি নিভিয়ে বিছানায় ঢুকলাম। বিছানায় দুটো মোটা মোটা গদি‌, গোটা চারেক বিলিতি কম্বল; একেবারে রাজশয্যা। ক্রমশ কম্বলের মধ্যে শরীর গরম হতে লাগল। কখন ঘুমিয়ে পড়লাম।

আশ্চর্য এই যে‌, প্রথম রাত্রে ঘুমোবার আগে পর্যন্ত অতিপ্ৰাকৃত কোনও ইশারা-ইঙ্গিত পাইনি।

ঘুম ভাঙল ঝনঝনি অ্যালামের শব্দে। ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসলাম।। ঘর অন্ধকার; কোথায় আছি মনে করতে কয়েক সেকেন্ড কেটে গেল। তারপর মনে পড়ল। কিন্তু–এত শীগগির সাড়ে সাতটা বেজে গেল! কৈ জানালার শার্সি দিয়ে দিনের আলো দেখা যাচ্ছে না। তো!

টর্চ জ্বেলে ঘড়ির উপর আলো ফেললাম। চোখে ঘুমের জড়তা রয়েছে‌, মনে হল ঘড়িতে দুটো বেজেছে। কিন্তু অ্যালার্ম ঝনঝন শব্দে বেজে চলেছে।

কি রকম হল! আমি কম্বল ছেড়ে উঠলাম‌, টেবিলের কাছে গিয়ে ঘড়ির উপর আলো ফেলে দেখলাম-সত্যি দুটো। তবে অ্যালার্ম বাজল কি করে? অ্যালার্মের কাঁটা ঘোরাতে কি ভুল করেছি?

ঘড়িটা হাতে তুলে নিতেই বাজনা থেমে গেল। দেখলাম অ্যালার্মের কাঁটা ঠিকই সাড়ে সাতটার উপর আছে।

হয়তো ঘড়িটাতে গলদ আছে‌, অসময়ে অ্যালার্ম বাজে। আমি ঘড়ি রেখে আবার বিছানায় ঢুকলাম। অনেকক্ষণ ঘুম এল না। তারপর আবার কখন ঘুমিয়ে পড়েছি।

এই হল প্রথম রাত্রির ঘটনা।

পরদিন সকালে ব্রেকফার্স্ট খেতে বসে হোমজিকে জিগ্যেস করলাম‌, ‘আপনার টাইমপীসে কি অসময়ে অ্যালাম বাজে?’

তিনি ভুরু তুলে বলেন‌, ‘কৈ না! কেন বলুন তো?’

বললাম। তিনি শুনে উদ্বিগ্ন মুখে একটু চুপ করে রইলেন; তারপর বললেন‌, ‘হয়তো সম্প্রতি খারাপ হয়েছে। আমার অন্য একটা অ্যালাম ঘড়ি আছে‌, সেটা আজ রাত্রে আপনাকে দেব।’

আমি আপত্তি করতে যাচ্ছিলাম‌, এমন সময় চাকর একটি চিঠি এনে আমার হাতে দিল।

আপ্টের চিঠি। তিনি লিখেছেন‌, কাল রাত্রে হঠাৎ পা পিছলে গিয়ে তাঁর পায়ের গোছ মাচুকে গেছে‌, নড়ার ক্ষমতা নেই; আমরা যদি দয়া করে আসি।

চিঠি হোমজিকে দেখলাম। তিনি মুখে চুকচুক শব্দ করে বলেন‌, ‘চলুন‌, দেখে আসি।’

জিগ্যেস করলাম‌, ‘কতদূর?’

‘মাইল দুই হবে। বাজারের মধ্যে। এখানে মহারাষ্ট্র ব্যাঙ্কের একটা ব্ৰাঞ্চ আছে‌, আপ্টের আত্মীয় তার ম্যানেজার। ব্যাঙ্কের উপরতলায় থাকেন।’

ব্রেকফার্স্ট সেরে বেরুলাম। হোমজির একটি ছোটখাটো স্ট্যান্ডার্ড মোটর আছে‌, তাইতে চড়ে গেলাম; ব্যাঙ্কের বাড়িটা দোতলা‌, বাড়ির পাশ থেকে খোলা সিঁড়ি ওপরে উঠেছে। আমরা ওপরে উঠে গেলাম।

আপ্টে বালিশের ওপর ব্যাণ্ডেজ-বাঁধা পা তুলে দিয়ে খাটে শুয়ে আছেন‌, আমাদের দেখে দুহাত বাড়িয়ে বললেন‌, ‘কী কাণ্ড দেখুন দেখি! কোথায় আপনাকে নিয়ে ঘুরে বেড়ােব‌, তা নয় একেবারে শয্যাশায়ী।’

আমার খাটের পাশে চেয়ার বসলাম, ‘কি হয়েছিল?’

আপ্টে বললেন‌, ‘রাত্রে ঘুম ভেঙে শুনলাম‌, দরজায় কে খুটুখুটু করে টোকা মারছে। বিছানা ছেড়ে উঠলাম‌, কিন্তু দোর খুলে দেখি কেউ নেই। আবার দোর বন্ধ করে ফিরছি‌, পা মুচড়ে পড়ে গেলাম। বাঁ পা-টা স্তেপ্রন হয়ে গেল।’

‘আর কোথাও লাগেনি তো?’

‘না‌, আর কোথাও লাগেনি। কিন্তু–’ আপ্টে একটু চুপ করে থেকে বললেন‌, ‘আশ্চর্য! আমি ইিঞ্জাইন‌, পায়ে কাপড়ও জড়িয়ে যায়নি। ঠিক মনে হল কেউ আমাকে পিছন থেকে ঠেলে দিলে।’

আমার কি মনে হল‌, জিগ্যেস করলাম‌, ‘রাত্রি তখন কটা?’

‘ঠিক দুটো।’

এ বিষয়ে আর কথা হল না‌, গৃহস্বামী এসে পড়লেন। ব্যাঙ্কের ম্যানেজার হলেও অনস্তারাও দেশপাণ্ডে বেশ ফুর্তিবাজ লোক। আজকাল ব্যাঙ্কের কাজকর্ম নেই বললেই হয়। তিনি আমাদের সঙ্গে আড্ডা জমালেন। আপ্টের পা ভাঙা নিয়ে খানিকটা ঠাট্টা-তামাশা হল‌, গরম গরম চিড়েভাজা আর পেট্যাটো-চিপস দিয়ে আর এক প্রস্থ কফি হল। তারপর আমরা উঠলাম। আন্টে কাতরভাবে বললেন‌, ‘ভেবেছিলাম মিস্টার বক্সীকে মহাবলেশ্বর ঘুরিয়ে দেখোব‌, তা আর হল না। দুতিন দিন মাটিতে পা রাখতেই পারব না।’

হোমজি বললেন‌, ‘তাতে কি হয়েছে‌, আমি ওঁকে মহাবলেশ্বর দেখিয়ে দেব। আমার তো এখন ছুটি।’

কাল আবার আসব বলে আমরা চলে এলাম। দুপুরবেলা লাঞ্চ খেয়ে হোমজির সঙ্গে বেরুলাম। কাছাকাছি। কয়েকটা দর্শনীয় স্থান আছে। একটি হ্রদ আছে‌, তাতে মোটর-লিঞ্চ চড়ে বেড়ালাম। মহাবলেশ্বরের মধু বিখ্যাত‌, কয়েকটি মধুর কারখানা দেখলাম; মৌমাছি মধু তৈরি করছে আর মানুষ তাই বিক্রি করে পয়সা রোজগার করছে। মৌমাছিদের খেতে দিতে হয় না‌, মজুরি দিতে হয় না‌, একটি ফুলের বাগান থাকলেই হল।

কিন্তু যাক‌, বাজে কথা লিখে চিঠি বড় করব না। এখনও আসল কথা সবই বাকি। হোমজির কাছ থেকে একটা চিঠির প্যাড় যোগাড় করেছি‌, তা প্রায় ফুরিয়ে এল।

সে রাত্রে দশটা বাজবার পাঁচ মিনিট আগে শুতে গেলাম। চাকর সব ঠিকঠাক করে রেখে গিয়েছে। দেখলাম পুরনো ঘড়ির বদলে একটা নতুন অ্যালার্ম ঘড়ি রেখে গেছে। আমি এতে আর দম দিলাম না‌, অ্যালার্মের চাবিটা এঁটে বন্ধ করে দিলাম। অ্যালামের দরকার নেই‌, যখন ঘুম ভাঙবে তখন উঠব।

আলো নেভার আগেই শুয়ে পড়লাম।

এতক্ষণ লক্ষ্য করিনি‌, শুয়ে শুয়ে দেখছি। একটা চামচিকে ঘরে ঢুকেছে। দরজা-জানালা সব বন্ধ‌, তাই পালাতে পারেছ না‌, নিঃশব্দ পাখায় ঘরের এ কোণ থেকে ও কোণে যাচ্ছে‌, আবার ফিরে আসছে। দরজা খুলে তাকে তাড়ানো যায়। কিনা ভাবছি‌, এমন সময় ইলেকট্রিক বাতি নিভে গেল। আর উপায় নেই। জন্তুটা সারারাত্রি পালাবার রাস্তা খুঁজে উড়ে বেড়াবে‌, হয়তো ক্লান্ত হয়ে ঘরের কোণে পড়ে থাকবে।–

অন্ধকারে শুয়ে শুয়ে ভাবছি‌, ঘুম আসছে না। কাল রাত্রি দুটোর সময় আমার ঘরে অকারণে অ্যালার্ম ঘড়ি বাজল‌, আর ঠিক সেই সময় দু’মাইল দূরে আপ্টের পা মচুকালো‌, দুটো ঘটনার মধ্যে নৈসৰ্গিক সম্পর্ক কিছুই নেই। সমাপতন ছাড়া আর কি হতে পারে? অথচ‌, আপ্টের পা যদি না মাচকাতো‌, তিনি আজ এই ঘরে অন্য খাটে শুতেন। —চামচিকেটা কি এখনও উড়ে বেড়াচ্ছে? আমার গায়ে এসে পড়বে না তো! পড়ে পড়ুক। ইতর প্রাণীকে আমার ভয় নেই। সত্যবতী।

ঘুমিয়ে পড়েছিলাম‌, ক্যানের কাছে কড় কড় শব্দে কাড়ানাকাড়া বেজে উঠল। কম্বলের মধ্যে লাফিয়ে উঠলাম। নতুন ঘড়ির অ্যালাম বাজছে। এর আওয়াজ আরও উগ্র। কিন্তু অ্যালার্ম বাজার তো কথা নয়‌, আমি দম দিইনি‌, চাবি বন্ধ করে দিয়েছি। তবে?

টর্চ জ্বেলে বিছানা থেকে উঠলাম। ঘড়িতে দুটো বেজেছে। (অ্যালার্মের চাবি যেমন বন্ধ ছিল তেমনি বন্ধ‌, তবু বাজনা বেজে চলেছে। )

ঘড়ি হাতে তুলে নিতেই বাজনা থেমে গেল। যেমন ঘড়ি তেমনি ঘড়ি‌, অত্যন্ত সহজ এবং স্বভাবিক।

অজিত‌, তুমি জানো‌, আমি রহস্য ভালবাসি না; রহস্য দেখলেই আমার মন তাকে ভেঙে চুরে তার অন্তনিহিত সত্যটি আবিষ্কার করতে লেগে যায়। কিন্তু এ কী রকম রহস্য? অলৌকিক ঘটনার প্রতি আমার বুদ্ধি স্বভাবতাই বিমুখ‌, যা প্রমাণ কথা যায় না তা বিশ্বাস করতে আমার বিবেকে বাধে। কিন্তু এ কী? চক্ষু কৰ্ণ দিয়ে যাকে প্রত্যক্ষ করছি তার সঙ্গে ঐহিক কিছুরই কোনও সংস্রব নেই। অমূলক কারণহীন ঘটনা চোখের সামনে ঘটে যাচ্ছে।

এর মূল পর্যন্ত অনুসন্ধান করে দেখতে হবে। মোমবাতি জ্বাললাম। তোমাকে আগে লিখেছি ঘরে দুটো চেয়ার আছে। তার মধ্যে একটা সাধারণ খাড়া চেয়ার‌, অন্যটা দোলনা চেয়ার। আমি গায়ে একটা কম্বল জড়িয়ে নিয়ে দোলনা চেয়ারে বসলাম, সিগারেট ধরিয়ে মৃদু মৃদু দোল খেতে লাগলাম।

দোরের দিকে মুখ করে বসেছি। ডান পাশে টেবিল‌, বাঁ পাশে দেয়ালে লাগানো ওয়ার্ডরোবি‌, পিছনে আমার খাট। আমি সিগারেট টানতে টানতে দুলছি আর ভাবছি। চামচিকেটা কোথায় ছিল জানি না‌, বাতি জ্বলতে দেখে আবার উড়তে আরম্ভ করেছে; আমার মাথা ঘিরে চক্কর দিচ্ছে। পাখার শব্দ নেই‌, কেবল এক টুকরো জমাট অন্ধকার শূন্যে ঘুরপাক খাচ্ছে।

সিগারেট শেষ করে চোখ বুজে আছি‌, ভাবছি কী হতে পারে? দু’টো ঘড়িতেই বেতালা অ্যালাম বাজে? তবে কি হোমজি আমার সঙ্গে practical joke করছেন। আমি কাল ভূতের কথায় হেসেছিলাম‌, তাই তিনি আমাকে ভয় দেখাচ্ছেন। তা যদি হয় তাহলে ঘড়িটার যন্ত্রপাতি খুলে পরীক্ষা করলেই ধরা যাবে। কিন্তু হোমজি বয়স্থ ব্যক্তি‌, এমন বাঁদুরে রসিকতা করবেন?

কতক্ষণ চোখ বুজে বসে দোল খাচ্ছিলাম বলতে পারি না‌, মিনিট পনরোর বেশি নয়; চোখ খুলে চমকে গেলাম। দোলনা চেয়ারটা দুলতে দুলতে ঘুরে গেছে; আমি দরজার দিকে মুখ করে বসেছিলাম‌, এখন ওয়ার্ডরোবের দিকে মুখ করে বসে আছি। শুধু তাই নয়‌, ওয়ার্ডরোবের খুব থাছে এসে পড়েছি।

চেয়ার ঘুরে যাওয়ার একটা স্বাভাবিক ব্যাখ্যা থাকতে পারে। কিন্তু রাত দু’টোরু সময় একলা ঘরে এরকম ব্যাপার ঘটলে স্নায়ুমণ্ডলে ধাক্কা লাগে। আমারও লেগেছিল। তার ওপর ঘড়িটা আবার পিছন দিক থেকে ঝন ঝন শব্দে বেজে উঠল। আমি লাফিয়ে উঠে ঘড়িটা বন্ধ করতে গেলাম‌, মোমবাতি নিভে গেল।

বোঝে ব্যাপার। আমার স্নায়ু যদি দুর্বল হত‌, তাহলে কি করতাম বলা যায় না। কিন্তু আমি দেহটাকে শক্ত করে স্বায়ুর উৎকণ্ঠা‌, দমন করলাম। আমার গায়ের কম্বলের বাতাস লেগে হয়তো মোমবাতি নিভেছে। আমি আবার মোমবাতি জ্বাললাম। ঘড়িটা হাতে নিতেই তার বাজনা থেমে গেল।

কিন্তু ঘড়িকে আর বিশ্বাস নেই। আমি সেটাকে হাতে নিয়ে ওয়ার্ডরোবের কাছে গেলাম। ওয়ার্ডরোবে আমার কাপড়-চোপড় রেখেছি‌, তার মধ্যে ঘড়ি চাপা দিয়ে রাখব। তারপর ঘড়ি যত বাজে বাজুক।

ওয়ার্ডরোবের কপাট খুলতেই সেন্ট-কপুর-ন্যাপথলিন মেশা গন্ধটা নাকে এল। আমি ঘড়িটাকে আমার জামা-কাপড়ের তলায় গুজে দিয়ে কপাট বন্ধ করে দিলাম।

আড়াইটে বেজেছে‌, এখনও অর্ধেক রাত বাকি। আমি আবার কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লাম।

মস্তিষ্ক গরম হয়েছে; তন্দ্ৰা আসছে‌, আবার ছুটে যাচ্ছে। ঘড়িটা ওআর্ডরোবের মধ্যে বাজছে কিনা শুনতে পাচ্ছি না। তারপর ক্রমে বোধ হয় ঘুম এসে গিয়েছিল। —

বিকট চীৎকার করে জেগে উঠলাম। কম্বলের মধ্যে আমার পেটের কাছে একটা কিছু কিলবিল করছে। টিকটিকি কিংবা ব্যাঙ কিংবা চামচিকে। একটানে কম্বল সরিয়ে বিছানা থেকে লাফিয়ে নোমলাম; টর্চ জ্বাললাম‌, মোমবাতি জ্বাললাম। বিছানায় কোনও জন্তু-জানোয়ার নেই। চামচিকেটাও কোথায় অদৃশ্য হয়েছে। হাতঘড়িতে দেখলাম রাত্রি সাড়ে তিনটে।

বাকি রাত্রিটা টেবিলের সামনের খাড়া চেয়ারে বসে কাটিয়ে দিলাম। আর ঘমোবার চেষ্টা বৃথা।

চিঠি ভীষণ লম্বা হয়ে যাচ্ছে। ভৌতিক অভিজ্ঞতার ব্বিরণ দেয়া আমার উদ্দেশ্য নয়। এবার চটপট শেষ করব।

পাঁচটার সময় ইলেকট্রিক আলো জ্বলে উঠলো।

আমি ওয়ার্ডরোব খুলে ঘড়ি বার করলাম। ঘড়ির সঙ্গে একটা বাদামী কাগজের চিলতে বেরিয়ে এল। তাতে বাংলা হরফে একটা ঠিকানা লেখা আছে। কলকাতার দক্ষিণ সীমানার একটা ঠিকানা। ঠিকানাটা নকল করে পাঠালাম‌, তোমার দরকার হবে।

আমার স্কাউট-ছুরি দিয়ে ঘড়িটা খুললাম‌্‌, যন্ত্রপাতির কোনও গণ্ডগোল নেই। সহজ ঘড়ি।

আমি সত্যান্বেষী। সত্যকে স্বীকার করতে আমি বাধ্য‌, তা সে লৌকিক সত্যই হোক‌, আর অলৌকিক সত্যই হোক। কায়াহীনকে সম্বোধন করে বললাম‌, ‘তুমি কী চাও?’

উত্তর এলো না, কেবল টেবিলটা নড়ে উঠল। আমি টেবিলের ওপর হাত রেখে বসেছিলাম।

বললাম, ‘তুমি কি চীও আমি তোমার মৃত্যুর তদন্তু করি?’

এবার টেবিল তো নড়লই, আমি যে চেয়ারে বসেছিলাম তার পিছনে পায়াদুটো উঁচু হয়ে উঠল; আমি প্রায় টেবিলের ওপর হুমাড়ি খেয়ে পড়লাম।

বললাম, ‘বুঝেছি। কিন্তু পুলিস তো তদন্ত করছেই! আমি করলে কী সুবিধে হবে? আমি কোথায় তদন্ত করব?’

ঘড়িটি চড়াং করে একবার বেজেই থেমে গেল! ঠিকানা লেখা বাদামী কাগজের চিলতেটা টেবিলের একপাশে রাখা ছিল, সেটা যেন হাওয়া লেগে আমার সামনে সরে এল।

আমার মাথায় একটু আইডিয়া এল; মানেক মেহতা কি বাংলাদেশে গিয়ে লুকিয়ে আছে ? আশ্চর্য নয়। একলা লুকিয়ে আছে? কিংবা–

বললাম, ‘হুঁ, আচ্ছা, চেষ্টা করব।‘

এই সময় ইলেক্ট্রিক বাতি নিভে গেল; দেখলাম জানালায় শার্সি দিয়ে দিনের আলো দেখা যাচ্ছে।

হোমাজিকে কিছু বললাম না। ন’টার সময় দুজনে আপ্টেকে দেখতে গেলাম। মোটরে যেতে যেতে হোমাজিকে জিগ্যেস করলাম, ‘হৈমাবতীর চেহারা কেমন?’

হোমজি আমার দিকে মুখ ফিরিয়ে একটু হাসলেন, বললেন, ‘ভাল চেহারা। রঙ খুব ফরাসা নয়, কিন্তু ভারি চটকদার চেহারা।‘

‘বয়স?’

‘হয়তে ত্রিশের কিছু বেশি; কিন্তু দীৰ্ঘযৌবনা, শরীরের বাঁধুনি ছিলে হয়নি।’—

আপ্টের পা কালকের চেয়ে ভাল, কিন্তু এখনও হাঁটতে পারেন না। গৃহস্বামী অনন্তরাও দেশপাণ্ডের সঙ্গেও দেখা হল । তাঁকে কয়েকটা প্রশ্ন করলাম।–

‘অপনি বিজয় বিশ্বাসকে চিনতেন?’

‘চিনতাম বৈকি! সহ্যাদ্রি হোটেলের সব টাকাই আমার ব্যাঙ্কে ছিল!’

‘কত টাকা?’

‘সীজনের শেষে প্রায় পঁয়তাল্লিশ হাজার দাঁড়িয়েছিল।’

‘বিজয় বিশ্বাসের নিজের আলাদা কোনও অ্যাকাউন্ট ছিল?’

‘ছিল। আন্দাজ দু’হাজার টাকা। কিন্তু মৃত্যুর কয়েকদিন আগে তিনি প্রায় সব টাকা বার করে নিয়েছিলেন। শখানেক টাকা পড়ে আছে।’

‘তাঁর স্ত্রী যাবার আগে সে টাকা বার করে নেননি?’

‘স্ত্রী যতক্ষণ কোর্ট থেকে ওয়ারিশ সাব্যস্ত না হচ্ছেন, ততক্ষণ তো তাঁকে টাকা দিতে পারি না।’

‘হৈমন্ধতী এখন কোথায়? তাঁর ঠিকানা জানেন?’

‘না।’

‘আর কেউ জানে?’

হোমজি বললেন, ‘বোধ হয় না। যাবার সময় তিনি নিজেই জানতেন না কোথায় যাবেন।’

আমি আপ্টেকে জিগ্যেস করলাম, ‘আপনি নিশ্চয় এ মামলার খবর রাখেন। মানেক মেহতার কোনও সন্ধান পাওয়া গেছে?’

তিনি বললেন, ‘না। সন্ধান পাওয়া গেলে আমি জানতে পারতাম।’

‘মানেক মেহতার ফটোগ্ৰাফ আছে?’

‘একটা গ্রুপ-ফটোগ্রাফ ছিল। সহ্যাদ্রি হোটেল যখন আরম্ভ হয় তখন মানেক মেহতা, বিজয় বিশ্বাস আর হৈমবতী একসঙ্গে ছবি তুলিয়েছিল। কিন্তু সেটা পাওয়া যায়নি।’

হোটেলে ফিরে এসে দুপুরবেলা খুব ঘুমোলাম । রাত্রে তোমাকে চিঠি লিখতে বসেছিলাম, কিন্তু বার বার বাধা পেয়ে শেষ করতে পারিনি। বিদেহাত্মা আমার এই চিঠি লেখাতে সস্তুষ্ট নয়‌, অথচ সে কী চায় বোঝাতে পারছে না। যাহোক‌, আজ চিঠি শেষ করব।

এতখানি ভণিতার কারণ বোধ হয় বুঝতে পেরেছ। তোমাকে একটা কাজ করতে হবে। কলকাতার দক্ষিণ প্রাস্তের যে ঠিকানা দিলাম তুমি সেখানে যাবে। যদি সেখানে হৈমবতী বিশ্বাসের দেখা না পাও তাহলে কিছু করবার নেই। কিন্তু যদি দেখা পাও‌, তাহলে তাঁকে কয়েকটা প্রশ্ন করবে; মানেক মেহতার সঙ্গে তাঁদের যে গ্রুপ-ফটো তোলা হয়েছিল সেটা কোথায়? মানেক মেহতার সঙ্গে হৈমবতীর বেশি ঘনিষ্ঠতা ছিল। কিনা জানিবার চেষ্টা করবে। কবে কোথায় বিশ্বাসদের সঙ্গে মেহতার পরিচয় হয়েছিল? হৈমবতীর আর্থিক অবস্থা এখন কেমন? বাড়িতে কে কে আছে—সব খবর নেবে। যে প্রশ্নই তোমার মনে আসুক জিগ্যেস করবে। তারপর সব কথা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে আমাকে লিখে জানাবে; কোনও কথা তুচ্ছ বলে বাদ দেবে না। যদি সন্দেহজনক কিছু চোখে পড়ে টেলিগ্রাম করে আমাকে জানাবে।

তোমার চিঠির অপেক্ষায় থাকব। এখানে এই দারুণ শীতে বেশিদিন থাকার ইচ্ছে নেই‌, কিন্তু এ ব্যাপারের নিম্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত যেতেও পারছি না।

আশা করি খোকা ও সত্যবতী ভাল আছে এবং তুমি ইনফ্লুয়েঞ্জা ঝেড়ে ফেলে আবার চাঙ্গা হয়ে উঠেছ।

ভালবাসা নিও।

–তোমার ব্যোমকেশ

কলিকাতা

৮ই জানুআরি

ভাই ব্যোমকেশ

তোমার চিঠি আজ সকালে পেয়েছি‌, এবং রাত্রে বসে জবাব লিখছি। হায় নাস্তিক‌, তুমি শেষে ভূতের খপ্পরে পড়ে গেলে। সত্যবতী জানতে চাইছে‌, ভূত বটে তো? পেত্নী নয়? ওদিকের পেত্নীরা নাকি ভারি জাঁহাবাজ হয়।

যাক‌, বাজে কথা লিখে পুঁথি বাড়ব না। তোমার নির্দেশ অনুযায়ী আজ বেলা তিনটে নাগাদ বাসা থেকে বেরুচ্ছি‌, বিকাশ দত্ত এল। আমি কোথায় যাচ্ছি শুনে সে বলল‌, ‘আরো সর্বনাশ‌, সে যে ধাদ্ধাড়া গোবিন্দপুর। পথ চিনে যেতে পারবেন?

কলাম‌, তুমি চল না।’ বিকাশ রাজী হল। তাকে সব বললাম না‌, মোটামুটি একটা আন্দাজ দিলাম।

দু’জনে চললাম। সত্যি ধাদ্ধাড়া গোবিন্দপুর। ট্রামে বাসে কলকাতার দক্ষিণ সীমানা ছাড়িয়ে যেখানে গিয়ে পৌঁছুলাম সেখানে কেবল একটি লম্বা রাস্তা চলে গিয়েছে। রাস্তায় দু’তিন শো গজ অস্তর একটা বাড়ি। শেষ পর্যন্ত বেলা আন্দাজ সাড়ে চারটের সময় নির্দিষ্ট ঠিকানায় উপস্থিত হলাম। রাস্তা থেকে খানিক পিছিয়ে ছোট একতলা বাড়ি; চারিদিকে খোলা মাঠ। বিকাশকে বললাম‌, ‘তুমি রাস্তার ধারে গাছতলায় বসে বিড়ি খাও। আমি এখনি ফিরতে পারি‌, আবার ঘণ্টাখানেক দেরি হতে পারে।’

বাড়ির সদর দরজা বন্ধ‌, আমি গিয়ে কড়া নাড়লাম। একটা চাকর এসে দরজা খুলে দাঁড়াল। বলল‌, ‘কাকে চান?’

বললাম‌, ‘শ্ৰীমতী হৈমবতী বিশ্বাসের সঙ্গে দেখা করতে চাই।’

‘আপনার নাম?’

‘অজিত বন্দ্যোপাধ্যায়।’

‘কী দরকার? ‘সেটা শ্ৰীমতী বিশ্বাসকেই বলব। তুমি তাঁকে বলো মহাবলেশ্বর থেকে চিঠি পেয়ে এসেছি।’

‘আজ্ঞে। একটু দাঁড়ান।’ বলে চাকরিটা দরজা বন্ধ করে দিল।

দশ মিনিট দাঁড়িয়ে আছি; সাড়াশব্দ নেই। তারপর দরজা খুলল। চাকরিটা বলল‌, ‘আসুন।’

বাড়িতে ঢুকেই ঘর। আসবাবপত্র বেশি কিছু নেই‌, দু’টো চেয়ার‌, একটা টেবিল। চাকর বলল‌, ‘আজ্ঞে বসুন। গিন্নী ঠাকরুন চান করছেন‌, এখনি আসবেন।’

একটা চেয়ারে বসলাম। বসে আছি তো বসেই আছি। চাকরটা এদিক-ওদিক ঘুরঘুর করছে‌, বোধহয় আমাকে বিশ্বাস করতে পারছে না। আজকাল কলকাতার যা ব্যাপার দাঁড়িয়েছে‌, অচেনা লোককে বাড়িতে ঢুকতে দিতে ভয় হয়। চোর-ডাকাত-গুণ্ডা যা-কিছু হতে পারে।

বসে বসে ভাবলাম‌, গিন্নী ঠাকরুনের স্নান যতক্ষণ না শেষ হচ্ছে ততক্ষণ চাকরিটাকে নিয়েই একটু নাড়াচাড়া করি। বললাম‌, ‘তুমি কতদিন এখানে কাজ করছ?’

চাকরটা অন্দরের দোরের সামনে দাঁড়িয়ে বলল‌, ‘আজ্ঞে‌, এই তো একমাসও এখনও হয়নি।’

দেখলাম লোকটির কথায় একটু পূর্ববঙ্গের টান আছে।

‘তোমার দেশ কোথায়?’

‘ফরিদপুর জেলায়–বলে সে চৌকাঠের ওপর উবু হয়ে বসল। আধবয়সী লোক‌, মাথায় কদমছাঁট চুল‌, গায়ে একটা ছেড়া ময়লা রঙের সোয়েটার।

‘কিতদিন কলকাতায় আছ?’

‘তা তিন বছর হতে চলল।’

‘এখানে-মানে এই বাড়িতে-ক’জন মানুষ থাকে?’

‘গিন্নী ঠাকরুন একলা থাকেন।’

‘স্ত্রীলোক-একলা থাকেন। পুরুষ কেউ নেই?

‘আজ্ঞে না। আমি বুড়োমানুষ‌, দেখাশুনা করি।’

‘এখানে কারুর যাওয়া-আসা আছে?’

‘আজ্ঞে না‌, আপনিই পেরথম এলেন।’

এই সময় হৈমবতীকে দোরের কাছে দেখা গেল। চাকরটা উঠে দাঁড়াল‌, আমিও দাঁড়ালাম। ইতিমধ্যে ঘরের মধ্যে দিনের আলো কমে গিয়েছিল‌, তিনি চাকরকে বললেন‌, ‘মহেশ‌, আলো জ্বেলে নিয়ে এস।’

চাকর চলে গেল। অল্প আলোতেও মহিলাটিকে দেখার অসুবিধা ছিল না। দীঘল চেহারা‌, সুশ্ৰী মুখ‌, পাসীদের চোখে খুব ফরসা না লাগলেও আমার চোখে বেশ ফরসা। মুখে একটি চিত্তাকর্ষক সৌকুমাৰ্য আছে। যৌবনের চৌকাঠ পার হতে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছেন। পরনে সাদা থান‌, গায়ে একটিও অলঙ্কার নেই। কবিত্র করছি না‌, কিন্তু তাঁর সদ্যস্নাত চেহারাটি দেখে বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যার রজনীগন্ধার কথা মনে পড়ে যায়।

আমি হাতজোড় করে নমস্কার করলাম; তিনি প্রতিনমস্কার করে বললেন। ‘আপনি মহাবলেশ্বর থেকে আসছেন?’

আমি বললাম‌, ‘না‌, আমার বন্ধু ব্যোমকেশ বক্সী মহাবলেশ্বরে আছেন‌, তাঁর চিঠি পেয়ে আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।’

‘তবে কি মানেক মেহতা ধরা পড়েছে?’ তাঁর কণ্ঠস্বরে আগ্রহ ফুটে উঠল।

বললাম‌, ‘না‌, এখনও ধরা পড়েনি।’

হৈমবতী আস্তে আস্তে চেয়ারে বসলেন‌, নিরাশ স্বরে বললেন‌, ‘বসুন। আমার কাছে এসেছেন কেন?’

আমি বসলাম‌, বললাম‌, ‘আমার বন্ধু ব্যোমকেশ বক্সী–’

তিনি বললেন‌, ‘ব্যোমকেশ বক্সী কে? পুলিসের লোক?’

‘না। ব্যোমকেশ বক্সীর নাম শোনেননি’—এই বলে তোমার পরিচয় দিলাম। তাঁর মুখ নিরুৎসুক হয়ে রইল। দেখা যাচ্ছে তুমি নিজেকে যতটা বিখ্যাত মনে কর‌, ততটা বিখ্যাত নও। সব শুনে হৈমবতী বললেন‌, ‘আমি জানতুম না। সারা জীবন বিদেশে কেটেছে-’

এই সময় মহেশ চাকর একটা লণ্ঠন এনে টেবিলের ওপর রেখে চলে গেল। বলা বাহুল্য‌, বাড়িতে বৈদ্যুতিক সংযোগ নেই।

লণ্ঠনের আলোয় হৈমবতীর মুখ আরও স্পষ্টভাবে দেখলাম। ব্যথিত আশাহত মুখ ক্লান্তিভরে থমথম করছে‌, দু’একগাছি ভিজে চুল কপালে গালে জুড়ে রয়েছে। আমার মন লজ্জিত হয়ে উঠল; এই শোক-নিষিক্তা মহিলাকে বেশি কষ্ট দেওয়া উচিত নয়‌, তাড়াতাড়ি প্রশ্নগুলো শেষ করে চলে যাওয়াই কর্তব্য। বললাম‌, ‘আমাকে মাফ করবেন। মানেক মেহতাকে ধরবার উদ্দেশ্যেই ব্যোমকেশ আপনাকে কয়েকটা প্রশ্ন করে পাঠিয়েছে।–মানেক মেহতার সঙ্গে আপনাদের প্রথম পরিচয় কবে হয়?’

হৈমবতী বললেন‌, ছয় বছর আগে। আমাদের তখন আমেদাবাদে ছোট্ট একটি হোটেল ছিল। কি কুক্ষণেই যে তার সঙ্গে দেখা হয়েছিল।’

‘মানেক মেহতার সঙ্গে আপনার বেশ ঘনিষ্ঠ পরিচয় হয়েছিল?’

‘আমার সঙ্গে তার সর্বসাকুল্যে পাঁচ-ছয় বারের বেশি দেখা হয়নি। বছরের মধ্যে একবার কি দুবার আসত; চুপিচুপি আসত‌, নিজের ভাগের টাকা নিয়ে চুপিচুপি যেত।’

‘তাঁর এই চুপিচুপি আসা-যাওয়া দেখে তার চরিত্র সম্বন্ধে আপনাদের কোন সন্দেহ হয়নি?’

‘না। আমরা ভাবতাম তার স্বভাবই ওই রকম‌, নিজেকে জাহির করতে চায় না।’

‘তার কোনও ফটোগ্রাফ আছে কি?’

‘একটা গ্রুপ-ফটো ছিল‌, সহ্যাদ্রি হোটেলের অফিসে টাঙানো থাকত। সে রাত্রে আমি মুর্ছা ভেঙে দেখলুম দেয়ালে ছবিটা নেই।’

‘সে রাত্রে হোটেলের লোহার সিন্দুকে কত টাকা ছিল?’

‘ঠিক জানি না। আন্দাজ দেড় লাখ!’

অতঃপর আর কি প্রশ্ন করব ভেবে পেলাম না। আমি উঠি-উঠি করছি‌, হৈমবতী আমাকে প্রশ্ন করলেন‌, ‘আমি এখানে আছি আপনার বন্ধু জানলেন কি করে? আমি তো কাউকে জানাইনি।’

উত্তর দিতে গিয়ে থেমে গেলাম। মহিলাটির বর্তমান মানসিক অবস্থায় ভূতপ্রেতের অবতারণা না করাই ভাল। বললাম‌, ‘তা জানি না‌, ব্যোমকেশ কিছু লেখেনি। আপনি উপস্থিত এখানেই আছেন তো?’

হৈমবতী বললেন‌, ‘বোধ হয় আছি। আমার স্বামীর এক বন্ধু তাঁর এই বাড়িতে দয়া করে থাকতে দিয়েছেন। —আসুন‌, নমস্কার।’

বাইরে এসে দেখলাম অন্ধকার হয়ে গেছে। রাস্তার ধারে গাছের তলায় বিড়ির মুখে আগুন জ্বলছে‌, তাই দেখে বিকাশের কাছে গেলাম। তারপর দু’জনে ফিরে চললাম। ভাগ্যক্রমে খানিক দূর যাবার পর একটা ট্যাক্সি পাওয়া গেল।

ট্যাক্সিতে যেতে যেতে বিকাশ বলল‌, ‘কাজ হল?’

এই কথা আমিও ভাবছিলাম। হৈমবতীর দেখা পেয়েছি বটে‌, তাঁকে প্রশ্নও করেছি; কিন্তু কাজ হল কি? মানেক মেহতা এখন কোথায় তার কিছুমাত্র ইঙ্গিত পাওয়া গেল কি? বললাম‌, ‘কতকটা হল।’

বিকাশ খানিক চুপ করে থেকে বলল‌, ‘আপনি যখন ব্যোমকেশবাবুকে চিঠি লিখবেন‌, তখন তাঁকে জানাবেন যে‌, শোবার ঘরে দুটো খাট আছে।’

অবাক হয়ে বললাম‌, ‘তুমি জানলে কি করে?’

বিকাশ বলল‌, ‘আপনি যখন মহিলাটির সঙ্গে কথা বলছিলেন। আমি তখন বাড়ির সব জানালা দিয়ে উঁকি মেরে দেখেছি।’

‘তাই নাকি! আর কি দেখলে?’

‘যা কিছু দেখলাম‌, শোবার ঘরেই দেখলাম। অন্য ঘরে কিছু নেই।’

‘কী দেখলে?’

‘একটা মাঝারি গোছের লোহার সিন্দুক আছে। আমি যখন কাচের ভেতর দিয়ে উঁকি মারলাম, তখন চাকরটা সিন্দুকের হাত ধরে ঘোরাবার চেষ্টা করছিল।’

‘চাকরিটা! ঠিক দেখেছ?’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ। সে যখন সদর দরজা খুলেছিল তখন আমি তাকে দেখেছিলাম। সে ছাড়া বাড়িতে অন্য পুরুষ নেই।’—

তারপর লেকের কাছাকাছি এসে ট্যাক্সি ছেড়ে দিলাম। বিকাশ নিজের রাস্তা ধরল‌, আমি বাসায় ফিরে এলাম। রাত্রে বসে চিঠি লিখছি‌, কাল সকালে ডাকে দেব।

তুমি কেমন আছ? সত্যবতী আর খোকা ভাল আছে। আমি আবার চাঙ্গা হয়ে উঠেছি।

–তোমার অজিত

আমি অজিত বন্দ্যোপাধ্যায়। এই কাহিনীর শেষাংশ লিখিতেছি। ব্যোমকেশের নামে সহ্যাদ্রি হোটেলের ঠিকানায় চিঠি লিখিয়া ডাকে দিয়াছিলাম ৯ তারিখের সকালে। ১২ তারিখের বিকালবেলা অনুমান তিনটার সময় ব্যোমকেশ আসিয়া উপস্থিত। সবিস্ময়ে বলিলাম‌, ‘একি! আমার চিঠি পেয়েছিলে?’

‘চিঠি পেয়েই এলাম। প্লেনে এসেছি। —তুমি চটপট তৈরি হয়ে নাও‌, এখুনি বেরুতে হবে।’–বলিয়া ব্যোমকেশ ভিতর দিকে চলিয়া গেল।

আধঘণ্টার মধ্যে বাড়ি হইতে বাহির হইলাম। রাস্তায় বাড়ির সামনে পুলিসের ভ্যান দাঁড়াইয়া আছে‌, তাহাতে একজন ইন্সপেক্টর ও কয়েকজন কনস্টেবল। আমরাও ভ্যানে উঠিয়া বসিলাম।

কয়েকদিন আগে যে সময় হৈমবতীর নির্জন গৃহের সম্মুখে উপস্থিত হইয়াছিলাম‌, প্রায় সেই সময় আবার গিয়া পৌঁছিলাম। আজ কিন্তু ভৃত্য মহেশ দরজা খুলিয়া দিতে আসিল না। দরজা খোলাই ছিল। আমরা সদলবলে প্রবেশ করিলাম।

বাড়িতে কেহ নাই; হৈমবতী নাই‌, মহেশ নাই। কেবল আসবাবগুলি পড়িয়া আছে; বাহিরের ঘরে চেয়ার-টেবিল‌, শয়নকক্ষে দু’টি খাট ও লোহার সিন্দুক‌, রান্নাঘরে হাঁড়ি কলসী। লোহার সিন্দুকের কপাট খোলা, তাহার অভ্যন্তর শূন্য। ব্যোমকেশ করুণ হাসিয়া ইন্সপেক্টরের পানে চাহিল,–‘চিড়িয়া উড়েছে।’–

সে রাত্রে নৈশ ভোজন সম্পন্ন করিয়া ব্যোমকেশ ও আমি তক্তপোশের উপর গায়ে আলোয়ান জড়াইয়া বসিয়াছিলাম। সত্যবতী খোকাকে ঘুম পাড়াইয়া আসিয়া ব্যোমকেশের গা ঘেঁষিয়া বসিল। একটা শীতের হাওয়া উঠিয়াছে‌, হাওয়ার জোর ক্রমেই বাড়িতেছে। আমাদের ঘরের দরজা জানোলা সব বন্ধ‌, তবু কোন অদৃশ্য ছিদ্রপথে খুঁচের মত বাতাস প্রবেশ করিয়া গায়ে বিঁধিতেছে।

বলিলাম‌, ‘মহাবলেশ্বরের শীত তুমি খানিকটা সঙ্গে এনেছ দেখছি। আশা করি বিজয় বিশ্বাসের প্রেতটিকেও সঙ্গে আনোনি।’

সত্যবতী ব্যোমকেশের কাছে আর একটু ঘেঁষিয়া বসিল। ব্যোমকেশ আমার পানে একটি সকৌতুক দৃষ্টি হানিয়া বলিল‌, ‘প্ৰেত সম্বন্ধে তোমার ভুল ধারণা এখনও যায়নি।’

বলিলাম‌, ‘প্ৰেত সম্বন্ধে আমার ভুল ধারণা থাকা বিচিত্র নয়‌, কারণ প্রেতের সঙ্গে আমি কখনও রাত্রিবাস করিনি। আচ্ছা ব্যোমকেশ‌, সত্যিই তুমি ভুত বিশ্বাস করা?’

‘যা প্রত্যক্ষ করেছি তা বিশ্বাস করা-না-করার কোনও প্রশ্নই ওঠে না। তুমি ব্যোমকেশ বক্সীর অস্তিত্বে বিশ্বাস কর?’

‘ব্যোমকেশ বক্সীর অস্তিত্বে বিশ্বাস করি। কারণ তাকে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু ভূত তো চোখে দেখিনি‌, বিশ্বাস করি কি করে?’

‘আমি তোমাকে বিশ্বাস করতে বলছি না। কিন্তু আমি যদি বিশ্বাস করি‌, তুমি আপত্তি করবে কেন?’

কিছুক্ষণ নীরবে ধূমপান করিলাম। ‘আচ্ছা‌, ওকথা যাক। বিশ্বাসে মিলায় কৃষ্ণ‌, তর্কে বহু দূর। কিন্তু তোমার ভূতের এত চেষ্টা সত্ত্বেও কার্যসিদ্ধি হল না।’

‘কে বলে কার্যসিদ্ধি হয়নি? ভূত চেয়েছিল মস্ত একটা ধোঁকার টাটি ভেঙে দিতে। তা সে দিয়েছে।’

‘তার মানে?’

‘মানে কি এখনও কিছুই বোঝোনি?’

‘কেন বুঝব না? প্রথমে অবশ্য আমি হৈমবতীর চরিত্র ভুল বুঝেছিলাম। কিন্তু এখন বুঝেছি হৈমবতী আর মানেক মেহতা মিলে বিজয় বিশ্বাসকে খুন করেছিল। হৈমবতী একটি সাংঘাতিক মেয়েমানুষ।’

‘হৈমবতীর চরিত্র ঠিকই বুঝেছ। কিন্তু ভুতকে এখনও চেনোনি। ভূতের রহস্য আরও সাংঘাতিক।’

সত্যবতী ব্যোমকেশের আরও কাছে সরিয়া গেল‌, হঠাৎ কাঁপিয়া উঠিয়া বলিল‌, ‘আমার শীত করছে।’

‘শীত করছে‌, না ভয় করছে।’ ব্যোমকেশ হাসিয়া নিজের আলোয়ানের অর্ধেকটা তাহার গায়ে জড়াইয়া দিল।

বলিলাম‌, ‘এস এস বঁধু এস‌, আধা আঁচরে বসো। বুড়ো বয়সে লজ্জা করে না!’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘তোমাকে আবার লজ্জা কি! তুমি তো অবোধ শিশু।’

সত্যবতী সায় দিয়া বলিল‌, ‘নয়তো কি! যার বিয়ে হয়নি সে তো দুধের ছেলে।’

বলিলাম‌, ‘আচ্ছা আচ্ছা‌, এখন ভূতের কথা হোক। আমি কিছুই বুঝিনি‌, তুমি সব খোলসা করে বল।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘আগে তোমাকে দু’ একটা প্রশ্ন করি। মানেক মেহতা বিজয় বিশ্বাসকে খুন করবার জন্যে খাদের ধারে নিয়ে গেল কেন? বিজয় বিশ্বাস বা গেল কেন?’

চিন্তা করিয়া বলিলাম‌, ‘জানি না।’

‘দ্বিতীয় প্রশ্ন। বিজয় বিশ্বাসের নামে ব্যাঙ্কে হাজার দুই টাকা ছিল। হোটেল বিক্রি হবার আগেই সে টাকা বার করে নিয়েছিল কেন?’

‘জানি না।’

‘তৃতীয় প্রশ্ন। তুমি যখন হৈমবতীর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলে‌, তখন শীতের সন্ধ্যে হয়-হয়। চাকর যখন বলল হৈমবতী স্নান করছেন‌, তখন তোমার খাটকা লাগল না?’

না। মানে-খেয়াল করিনি।’

‘চতুর্থ প্রশ্ন। চাকরটাকে সন্দেহ হয়নি?’

‘না। চাকরটাকে সন্দেহ করার কোনও কারণ হয়নি। সে পূর্ববঙ্গের লোক‌, মাত্র কয়েকদিন হৈমবতীর চাকরিতে ঢুকেছিল। অবশ্য একথা যদি সত্যিই হয় যে সে লোহার সিন্দুক খোলবার চেষ্টা করছিল—‘

‘অজিত‌, তোমার সরলতা সত্যিই মর্মস্পশী। চাকরটা সিন্দুক খোলবার উদ্যোগ করেছিল বটে‌, কিন্তু চুরি করবার জন্যে নয়। —মহাবলেশ্বরে দু’জন লোক খুন করবার ষড়যন্ত্র করেছিল‌, তার মধ্যে একজন হচ্ছে হৈমবতী। অন্য লোকটি কে?’

‘মানেক মেহতা ছাড়া আর কে হতে পারে?’

ব্যোমকেশ কুটিল হাসিয়া বলিল‌, ‘ঐখানেই ধাপ্পা-প্রচণ্ড ধাপ্পা! হৈমবতী ষড়যন্ত্র করেছিল তার স্বামীর সঙ্গে‌, মানেক মেহতার সঙ্গে নয়। হৈমবতীর আর যে দোষই থাক‌, সে পতিব্রতা নারী‌, তাতে সন্দেহ নেই।’

হতবুদ্ধি হইয়া বলিলাম‌, ‘কী বলছ তুমি’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘যা বলছি মন দিয়ে শোনো।–হোমজি যখন আমাকে গল্পটা বললেন তখন আমার মনে বিশেষ দাগ কাটেনি। তবু একটা খটকা লেগেছিল; মানেক মেহতা বিজয় বিশ্বাসকে খুন করবার জন্যে খাদের ধারে নিয়ে গেল কেন? বিজয় শীত-কাতুরে লোক ছিল‌, সে-ই বা গেল কেন?

‘তারপর ভূতের উৎপাত শুরু হল। দায়ে পড়ে অনুসন্ধান শুরু করলাম। খটকা ক্রমে সন্দেহে পরিণত হতে লাগল। তারপর ওয়ার্ডরোবের মধ্যে পেলাম একটুকরো বাদামী কাগজে একটা ঠিকানা; বাংলা অক্ষরে লেখা কলকাতার উপকণ্ঠের একটা ঠিকানা। আমার মনের অন্ধকার একটু একটু করে দূর হতে লাগল।

‘তোমাকে লম্বা চিঠি লিখলাম। তারপর তোমার উত্তর যখন পেলাম তখন আর কোনও সংশয় রইল না। আপ্টে সাহেবকে সব কথা বললাম। তিনি তখনও ঠ্যাং নিয়ে পড়ে আছেন‌, কিন্তু তখনই কলকাতার পুলিসকে টেলিগ্রাম করলেন এবং আমার প্লেনে আসার ব্যবস্থা করে

‘হৈমবতী আর বিজয় বিশ্বাসকে ধরা গেল না বটে‌, কিন্তু প্রেতের উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়েছে‌, আসল অপরাধী কারা তা জানা গেছে। বলা বাহুল্য‌, যে প্ৰেতটা নাছোড়বান্দা হয়ে আমাকে ধরেছিল। সে মানেক মেহতা।’

সত্যবতী বলিল‌, ‘সত্যি কি হয়েছিল বল না গো!’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘সত্যি কি হয়েছিল তা জানে কেবল হৈমবতী আর বিজয় বিশ্বাস। আমি মোটামুটি যা আন্দাজ করেছি‌, তাই তোমাদের বলছি।’

সিগারেট ধরাইয়া ব্যোমকেশ বলিতে আরম্ভ করিল।–’মানেক মেহতা ছিল নামকটা বদমাশ‌, আর বিজয় বিশ্বাস ছিল ভিজে বেড়াল। একদা কি করিয়া মিলন হল দোঁহে। দু’জনে মিলে হোটেল খুলল। মেহতার টাকা‌, বিশ্বাসদের মেহনত।

‘স্ত্রী-পুরুষে হোটেল চালাচ্ছে‌, হোটেল বেশ জাঁকিয়ে উঠল। প্রতি বছর ত্রিশ চল্লিশ হাজার টাকা লাভ হয়। মেহতা মাঝে মাঝে এসে নিজের ভাগের টাকা নিয়ে যায়। বিজয় বিশ্বাস নিজের ভাগের টাকা মহাবলেশ্বরের ব্যাঙ্কে বেশি রাখে না‌, বোধ হয় স্ত্রীর নামে অন্য কোথাও রাখে। হয়তো কলকাতারই কোনও ব্যাঙ্কে হৈমবতীর নামে পঞ্চাশ-ষাট হাজার টাকা জমা আছে‌, ওরা দু’জনে ছাড়া আর কেউ তার সন্ধান জানে না।

‘এইভাবে বেশ চলছিল‌, গত বছর মানেক মেহতা বিপদে পড়ে গেল। তার বে-আইনী সোনার চালান ধরা পড়ে গেল। তাকে পুলিস জড়াতে পারল না বটে‌, কিন্তু অত সোনা মারা যাওয়ায় সে একেবারে সর্বস্বাস্ত হয়েছিল। তখন তার একমাত্র মূলধন-হোটেল; মানেক মেহতা ঠিক করল সে হোটেল বিক্রি করবে। তার নগদ টাকা চাই।

‘এখন প্রশ্ন হচ্ছে‌, হোটেল বিক্রির টাকা কে পাবে। একলা মেহতা পাবে‌, না‌, বিজয় বিশ্বাসেরও বখরা আছে? ওদের পার্টনারশিপের দলিল আমি দেখিনি। অনুমান করা যেতে পারে যে মানেক মেহতা যখন হোটেল কেনার টাকা দিয়েছিল‌, তখন হোটেল বিক্রির টাকাটাও পুরোপুরি তারই প্ৰাপ্য। আমার বিশ্বাস‌, মেহতা সব টাকাই দাবি করেছিল।

‘হৈমবতী আর বিজয় বিশ্বাস ঠিক করল। সব টাকা ওরাই নেবে। ওদের পূর্ব ইতিহাস কিছু জানা যায় না‌, কিন্তু ওদের প্রকৃতি যে স্বভাবতাই অপরাধপ্রবণ তাতে আর সন্দেহ নেই। দু’জনে মিলে পরামর্শ করল। মানেক মেহতা পুলিসের নজরলাগা দাগী লোক‌, তার ঘাড়ে অপরাধের ভার চাপিয়ে দেওয়া সহজ। স্বামী-স্ত্রী মিলে নিপুণভাবে প্ল্যান গড়ে তুলল।

‘কলকাতার উপকণ্ঠে তখন কি ভাবে ওরা বাসা ঠিক করেছিল‌, আমি জানি না। হয়তো কলকাতার কোনও পরিচিত লোকের মারফত বাসা ঠিক করেছিল। হৈমবতী বাসার ঠিকানা কাগজে লিখে ওয়ার্ডরোবের মধ্যে ওঁজে রেখেছিল‌, পাছে ঠিকানা ভুলে যায়। পরে অবশ্য ঠিকানা তাদের মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল‌, তাই হৈমবতী যাবার সময় বাদামী কাগজের টুকরোটা ওয়ার্ডরোবেই ফেলে যায়। কাঠের ওয়ার্ডরোবে বাদামী কাগজের টুকরোটা বোধহয় চোখে পড়েনি। ঐ একটি মারাত্মক ভুল হৈমবতী করেছিল।

‘যাহোক‌, নির্দিষ্ট রাত্রে মানেক মেহতা চুপিচুপি এসে হাজির। হোটেলে একটিও অতিথি নেই। চাকরানীটাকে হৈমবতী নিশ্চয় ঘুমের ওষুধ খাইয়েছিল। হোটেলে ছিল কেবল হৈমবতী আর বিজয় বিশ্বাস।

‘মানেক মেহতাকে ওরা হোটেলের অফিস-ঘরেই খুন করেছিল। এমনভাবে খুন করেছিল যাতে রক্তপাত না হয়। তারপর ছদ্মবেশ ধারণের পালা। বিজয় বিশ্বাস মানেক মেহতার গা থেকে জামা কাপড় খুলে নিজে পরিল‌, নিজের জামা কাপড় গলাবন্ধ মানেক মেহতাকে পরিয়ে দিল। তারপর দু’জনে লাশ নিয়ে গিয়ে খাদের মধ্যে ফেলে দিল। কিছুদিন থেকে এক ব্যাঘ্র-দম্পতি এসে খাদে বাসা নিয়েছিল‌, সুতরাং লাশের যে কিছুই থাকবে না তা বিশ্বাস-দম্পতি জানত। ব্যাঘ্র-দম্পতির কথা বিবেচনা করেই তারা প্ল্যান করেছিল।

‘আসল কাজ শেষ হলে বিজয় বিশ্বাস সমস্ত টাকাকড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। নিষুতি শীতের রাত্রি‌, কেউ তাকে দেখল না। মানেক মেহতা শহরের বাইরে রাস্তার ধারে মোটর রেখে এসেছিল‌, সেই মোটরে চড়ে বিজয় বিশ্বাস উধাও হয়ে গেল।

‘হৈমবতী ঘাঁটি আগলে রইল। বুকের পটা আছে। ওই মেয়েমানুষটির। তারপর যা যা ঘটেছিল সবই প্রকাশ্য ব্যাপার। একমাত্র সাক্ষী হৈমবতী‌, সে যা বলল পুলিস তাই বিশ্বাস করল। বিশ্বাস না করার কোনও ছিল না‌, মানেক মেহতার চরিত্র পুলিস জানত।

‘কয়েকদিন পরে সহ্যাদ্রি হোটেল হোমজির হাতে তুলে দিয়ে শোকসন্তপ্তা বিধবা হৈমবতী মহাবলেশ্বর থেকে চলে গেল। ইতিমধ্যে বিজয় বিশ্বাস কলকাতার বাসায় এসে আড্ডা গেড়েছিল‌, হৈমবতীও এসে জুটল।

‘কিন্তু তারা ভারি হুঁশিয়ার লোক‌, একেবারে নিশ্চিন্ত হয়নি‌, সাবধানে ছিল; তাই মহাবলেশ্বরের চিঠি পেয়ে অজিত যখন দেখা করতে গেল। তখন হৈমবতী চমকে উঠল বটে। কিন্তু ঘাবড়ালো না। হৈমবতীর তখন বোধ হয় বিধবার সাজ ছিল না‌, সে বিধবা সাজতে গেল। চাকর অজিতকে বাইরের ঘরে বসাল। অজিত যদি এত সরল না হত‌, তাহলে ওর খটকা লাগত; শীতের সন্ধ্যাবেলা মেয়েরা গা ধুতে পারে‌, চুল ভিজিয়ে স্নান করে না।

‘যাহোক‌, হৈমবতী যখন এল তখন তার সদ্যস্নাত চেহারা দেখে অজিত মুগ্ধ হয়ে গেল। সে হৈমন্বতীকে আমার নাম বলল; হৈমবতীর ব্যাপার বুঝতে তিলার্ধ দেরি হল না। অজিত আমার নামটাকে যতখানি অখ্যাত মনে করে‌, ততখানি অখ্যাত নয়। আমার নাম‌, অজিতের কল্যাণেই নামটা সকলের জানা হয়ে গেছে। কিন্তু সে যাক। বিকাশ ওদিকে জানোলা দিয়ে শোবার ঘরে দুটো খাট আর লোহার সিন্দুক দেখে নিয়েছিল। অজিতের চিঠিতে ওটাই ছিল সবচেয়ে জরুরী কথা। চিঠি পড়ে কিছুই আর জানতে বাকি রইল না।

‘কিন্তু ওদের ধরা গেল না। সে রাত্রে অজিত পিছন ফিরবার সঙ্গে সঙ্গেই বোধ হয় হৈমবতী লোহার সিন্দুক থেকে টাকাকড়ি নিয়ে অদৃশ্য হয়েছিল। এখন তারা কোথায়‌, কোন ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়াচ্ছে কে বলতে পারে। হয়তো তারা কোনও দিনই ধরা পড়বে না‌, হয়তো ধরা পড়বে। না পড়ার সম্ভাবনাই বেশি। পঁয়ত্ৰিশ কোটি নর-নারীর বাসভূমি এই ভারতবর্ষ—’

কিছুক্ষণ তিনজনে চুপ করিয়া বসিয়া রহিলাম। বাহিরে যে হাওয়া উঠিয়াছিল তাহা থামিয়া গিয়াছে। ঘড়িতে দশটা বাজিল।

রআমি বলিলাম‌, ‘সব সমস্যার তো সমাধান হল‌, কিন্তু একটা কথা বুঝলুম না। বিজয় বিশ্বাস ও বাড়িতে থাকতো না কেন? কোথায় থাকত? চাকরাটা ওদের সম্বন্ধে কি কিছুই সন্দেহ করেনি?’

ব্যোমকেশ গভীর নিশ্বাস ফেলিয়া বলিল‌, ‘হা ভগবান‌, তাও বোঝোনি? চাকরটাই বিজয় বিশ্বাস।’

অচিন পাখি

ব্যোমকেশ ও আমি গত ফাল্লুন মাসে বীরেনবাবুর কন্যার বিবাহ উপলক্ষে দু’দিনের জন্য কলিকাতার বাহিরে গিয়াছিলাম। শহরটি প্রাচীন এবং নোংরা। কলিকাতা হইতে মাত্র তিন ঘণ্টার পথ। ট্রেন বদল করিতে না হইলে আরও কম সময়ে যাওয়া যাইত।

বিরেনবাবুর সহিত আমাদের দীর্ঘকাল ঘনিষ্ঠতা। তিনি কলিকাতায় পুলিশ কর্মচারী ছিলেন। বহুবার বহু সূত্রে তাঁহার সংস্পর্শে আসিয়াছি। অতিশয় সজ্জন ব্যক্তি। বছর দুই আগে অবসর লইয়া এই শহরে বাস্তুভিটায় বাস করিতেছেন। কন্যার বিবাহে আমাদের সনির্বন্ধ নিমন্ত্রণ জানাইয়াছিলেন। ব্যোমকেশেরও হাতে কাজ ছিল না। তাই বিবাহের দিন পূর্বাহ্ণে আমরা বীরেনবাবুর গৃহে অবতীর্ণ হইলাম।

বিয়ে-বাড়িতে যথাবিহিত কর্মতৎপরতা ও হৈ হৈ চলিতেছে, সানাই বাজিতেছে। বীরেনবাবু ছুটিয়া আসিয়া আমাদের সম্বর্ধনা করিলেন এবং একটি ঘরে লইয়া গিয়া বসাইলেন। ঘরের মেঝোয় ফরাস পাতা; বরযাত্রীদের জন্য যথারীতি সাজানো। কিন্তু বর ও বরযাত্রীরা স্থানীয় ব্যক্তি, তাহারা সন্ধ্যার পর আসিবে। উপস্থিত ঘরটি খালি রহিয়াছে।

আমরা তাকিয়া ঠেস দিয়া বসিলাম। চা জলখাবার আসিল। বীরেনবাবু আমাদের সঙ্গে আলাপ করিতে করিতে একটু উসখুস করিতে লাগিলেন। তাহা দেখিয়া ব্যোমকেশ বলিল, আপনি কন্যাকার্তা, আজকের দিনে আপনি বসে আড্ডা মারলে চলবে কি করে? যান, কাজকর্ম করুন গিয়ে।

বীরেনবাবু একটু অপ্রতিভভাবে এদিক ওদিক চাহিতেছেন এমন সময় ঘরের বাহিরে কণ্ঠস্বর শোনা গেল, কই হে বীরেন, মেয়ের বিয়ের কি ব্যবস্থা করলে দেখতে এলাম।

এই যে দাদা! বীরেনবাবু তাড়াতাড়ি গিয়া একটি বৃদ্ধ ভদ্রলোককে ঘরের মধ্যে লইয়া আসিলেন--‘ভালই হল আপনি এসে পড়েছেন। এঁরা আমার দুই বন্ধু, কলকাতা থেকে এসেছেন। নাম জানেন নিশ্চয়, আমাদেরই দলের লোক। ইনি হলেন স্বনামধন্য ব্যোমকেশ বক্সী, আর উনি সুলেখক অজিত বন্দ্যোপাধ্যায়।’

নাম শুনেছি বৈকি। বলিয়া ভদ্রলোক আমাদের প্রতি তীক্ষ্নায়ত দৃষ্টিপাত করিলেন।

বীরেনবাবু বলিলেন, ইনি হচ্ছেন নীলমণি মজুমদার। পুলিসের নামজাদা অফিসার ছিলেন, এখন রিটায়ার করেছেন।

আমরাও ভদ্রলোককে দেখিলাম। গৌরবর্ণ লম্বা চেহারা; বয়স বোধ করি ষাটের উর্ধ্বে কিন্তু শরীর বেশ দৃঢ় আছে; পিঠের শিরদাঁড়া তাঁহার হাতের লাঠির মতই শক্ত এবং ঋজু। মুখ দেখিয়া মনে হয় জবরদস্ত রাশভারী লোক। গলার স্বর গভীর।

ব্যোমকেশ বলিল, বসতে আজ্ঞা হােক।

নীলমণি মজুমদার লাঠিসুদ্ধ হাত তুলিয়া নমস্কার করিলেন এবং আমাদের মুখোমুখি হইয়া উপবিষ্ট হইলেন। বীরেনবাবু বলিলেন, নীলমণিদা, আপনারা তাহলে গল্পসল্প করুন, আমি একটু—

ব্যোমকেশ বলিল, হ্যাঁ, হ্যাঁ, আপনি প্রস্থান করুন। কেবল চাকরকে বলে দেবেন যেন তামাক দিয়ে যায়। গড়গড়া দুটো নিষ্কর্মার মত হাত-পা গুটিয়ে বসে আছে।

বীরেনবাবু প্ৰস্থান করিলে ব্যোমকেশ নীলমণিবাবুকে জিজ্ঞাসা করিল, আপনারও কি আদি নিবাস এই শহরে?

নীলমণিবাবু মাথা নাড়িয়া বলিলেন, না। আদি নিবাস ছিল পূর্ববঙ্গে। কিন্তু সে-সব গেছে! রিটায়ার করে বুড়ো বয়সে কোথায় যােব, তাই এখানেই আছি।

ব্যোমকেশ বলিল, এখানে আপনার আত্মীয়-স্বজন আছেন বুঝি?

নীলমণিমাবু বলিলেন, আত্মীয়-স্বজন আমার কেউ নেই। বিবাহ করিনি, সারা জীবন কেবল কাজই করেছি। পুলিসের কাজে একটা মোহ আছে; আমি আমার কাজে সমস্ত মনপ্রাণ ঢেলে দিয়েছিলাম। তারপর যখন রিটায়ার করলাম, তখন এই শহরেই রয়ে গেলাম। এই শহরটার সঙ্গে আমার একটা নাড়ির যোগ আছে; প্রথম যখন সাব-ইন্সপেক্টর হয়ে পুলিসে ঢুকেছিলাম, তখন এই শহরেই পোস্টেড হয়েছিলাম। আবার রিটায়ার করলাম। এই শহর থেকেই।

ব্যোমকেশ হাসিয়া বলিল, শহরটার ওপর মায়া পড়ে গেছে আর কি। কতদিন রিটায়ার করেছেন?

সাত বছর।

এই সময় ভৃত্য আসিয়া দুই ছিলিম তামাক দুটি গড়গড়ার মাথার উপর বসাইয়া দিয়া চলিয়া গেল।

নীলমণিবাবু একটি গড়গড়ার নল হাতে লইলেন, অন্যটি লইল ব্যোমকেশ। কিছুক্ষণ নীরবে: ধূমপান চলিল। উৎকৃষ্ট তামাক; ধূম-গন্ধে ঘর আমোদিত হইয়া উঠিল।

ব্যোমকেশকে প্রথমে দেখিয়া এবং তাহার পরিচয় পাইয়া অনেকেই তাহাকে পরম কৌতুহলের সহিত নিরীক্ষণ করিয়া থাকে। নীলমণিবাবুও তামাক টানিতে টানিতে তাহাকে নিরীক্ষণ করিতেছিলেন, কিন্তু তাঁহার নিরীক্ষণের মধ্যে একটু বিশেষত্ব ছিল। ভক্ত-সুলভ পুলক-বিহ্বলতা একেবারেই ছিল না; বরং তিনি যেন চক্ষু দিয়া ব্যোমকেশকে তৌল করিতেছিলেন, ব্যোমকেশের খ্যাতি ও ব্যক্তিত্বের মধ্যে কতটা সামঞ্জস্য আছে তাহাই ওজন করিবার চেষ্টা করিতেছিলেন। নীলমণিবাবু বুদ্ধিজীবী পুলিশ কর্মচারী ছিলেন, স্বচক্ষে দেখিয়া মানুষের চরিত্র নির্ণয় করা তাঁহার কাজ ছিল; পরের মুখে ঝাল খাইবার লোক তিনি নন। তাই ব্যোমকেশকে তিনি নিজের বুদ্ধির নিকষে যাচাই করিয়া লইতে চান।

অবশেষে গড়গড়ার নলটি মুখ হইতে সরাইয়া তিনি যখন কথা বলিলেন, তখন তাঁহার কথার মধ্যেও এই প্রচ্ছন্ন অনুসন্ধিৎসা বক্রভাবে প্রকাশ পাইল। তিনি বলিলেন, ব্যোমকেশবাবু, আপনাকে নিয়ে লেখা রহস্য কাহিনীগুলি সবই আমি পড়েছি। লক্ষ্য করেছি, সব সমস্যাই আপনি সমাধান করেছেন। তাই জানতে ইচ্ছে হয়, আপনি কি কখনো কোনো রহস্যের মর্মোদঘাটনে অকৃতকার্য হননি? কখনো কি ভুল করেননি?

ব্যোমকেশ গড়গড়ার নল আমার হাতে দিয়া সবিনয়ে হাসিল। বলিল, কখনো ভুল করিনি এত বড় কথা বলার স্পর্ধা আমার নেই। নীলমণিবাবু, আমি সত্যান্বেষী। ভুল-ভ্ৰান্তি অনেক করেছি; এমনও অনেকবার হয়েছে যে অপরাধীকে ধরতে পারিনি। কিন্তু সত্যের সন্ধান পাইনি এমন বোধ হয় কখনো হয়নি। অবশ্য বলতে পারেন। আমি কটা রহস্যই বা পেয়েছি। আমার চেয়ে হাজার গুণ বেশি রহস্য ঘটনা নিয়ে কাজ করেছেন আপনি। আপনি যতদিন চাকরিতে ছিলেন প্রত্যহ দুচারটে ছোট-বড় কেস নিয়ে নাড়াচাড়া করতে হয়েছে। আমাকে যদি তাই করতে হত, আমারও অসংখ্য কেস অমীমাংসিত থেকে যেত সন্দেহ নেই।

ব্যোমকেশের উত্তর শুনিয়া নীলমণিবাবু মনে মনে সন্তুষ্ট হইয়াছেন মনে হইল। তিনি যখন আবার কথা বললেন তখন তাঁহার কণ্ঠস্বরে একটু ঘনিষ্ঠতার সুর ধ্বনিত হইল। তিনি বলিলেন, দেখুন ব্যোমকেশবাবু, পুলিসের কাজে অনেক ঝামেলা। চুনোপুটির কারবারই বেশি, রুই-কাৎলা কদাচিৎ মেলে। আবার মজা জানেন, ওই চুনোপুটিগুলোকেই ধরতে প্ৰাণ বেরিয়ে যায়, রুই-কাৎলা ধরা খুব শক্ত নয়।

ব্যোমকেশ বলিল, তা বটে। ডাক্তারেরা বলেন শক্ত রোগের ওষুধ আছে, সর্দি-কাশি সারানোই কঠিন। তা-আপনার চারে যে-কাটি রুই-কাৎলা এসেছে তাদের সকলকেই আপনি খেলিয়ে ডাঙায় তুলেছেন নিশ্চয়।

নীলমণিবাবু কিছুক্ষণ উত্তর দিলেন না। ভ্রূকুঞ্চিত করিয়া হাতের নলটি লইয়া নাড়াচাড়া করিতে লাগিলেন। তারপর ব্যোমকেশের দিকে একটি সুতীক্ষ্ন কটাক্ষ হানিয়া বলিলেন, সব মাছই ডাঙায় তুলেছি ব্যোমকেশবাবু, কেবল একটি বাদে। আমার পুলিস-জীবনের শেষ বড় কেস। এই শহরেই ব্যাপারটা ঘটেছিল। কিন্তু কিনারা করতে পারলাম না।

ব্যোমকেশ প্রশ্ন করিল, আসামী কে তা জানতে পেরেছিলেন, কিন্তু প্ৰমাণ পেলেন না?

নীলমণিবাবু ঈষৎ দ্বিধাভরে বলিলেন, একটা লোককে পাকা রকম সন্দেহ করেছিলাম, কিন্তু কিছুতেই তার অ্যালিবাই ভাঙতে পারলাম না। তারপর এমন একটা ঘটনা ঘটল যে সব ওলট-পালট হয়ে গেল। সত্যিকার আসামী যে কে সে সম্বন্ধে ধোঁকা আর কাটল না।

‘হুঁ’ বলিয়া ব্যোমকেশ আমার হাত হইতে নল লইল এবং তাকিয়ায় ঠেস দিয়া টানিতে লাগিল। নীলমণিবাবু ব্যোমকেশের উপর চক্ষু স্থির রাখিয়া গড়গড়ায় একটি লম্বা টান দিলেন, তারপর নল রাখিয়া দিয়া বলিলেন, আপনি গল্পটা শুনবেন?

ব্যোমকেশ উঠিয়া বসিল, বলিল, বেশ তো, বলুন না। ভারি চমকপ্রদ গল্প হবে মনে হচ্ছে।

চমকপ্ৰদ। কিনা। আপনি বিচার করবেন। আমি যা-যা জানি সব আপনাকে বলছি। হয়তো আপনি আসামীকে সনাক্ত করতে পারবেন। বলিয়া নীলমণিবাবু একটু হাসিলেন।

ইহা শুধু গল্প শুনাইবার প্রস্তাব নয়, ইহার অন্তরালে একটি চ্যালেঞ্জ রহিয়াছে। নীলমণিবাবু যেন ব্যোমকেশকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান করিয়া বলিতেছেন—এস দেখি, তোমার কত বুদ্ধি প্রমাণ কর।

ব্যোমকেশ কিন্তু রণাহ্বান গায়ে মাখিল না, হাসিয়া বলিল, আরে না না, আপনার মত অভিজ্ঞ পুলিস কর্মচারী যার কিনারা করতে পারেনি, আমার দ্বারা কি তা হবে? তবে গল্প শোনার কৌতুহল আছে। আপনি বলুন।

আমরা নীলমণিবাবুর কাছে সরিয়া আসিয়া বসিলাম। তিনি পকেট হইতে একটা কোটা বাহির করিয়া এক চিমটি জর্দা মুখে দিলেন। পান নয়, শুধু জর্দাঁ। ইহাই বোধ হয় তাঁহার আসল নেশা।

তিনি গলা ঝাড়া দিয়া গল্প আরম্ভ করিবার উপক্ৰম করিতেছেন, বীরেনবাবু ঘরে প্রবেশ করিয়া বলিলেন, আর এক দফা চা হবে নাকি? মধ্যাহ্ন ভোজনের এখনো বিস্তর দেরি। বিয়ে-বাড়ির ব্যাপার—

ব্যোমকেশ বলিল, আসুক চা। এবং সেই সঙ্গে আর এক প্রস্থ তামাক।

সম্মুখে চায়ের পেয়ালা এবং বাঁ হাতে গড়গড়ার নল লইয়া আমরা বসিলাম। নীলমণি মজুমদার তাঁহার স্বাভাবিক গভীর গলায় গল্প বলিতে আরম্ভ করিলেন। —

রিটায়ার করিবার বছর তিনেক আগে নীলমণিবাবু এই জেলার সদর থানার কর্তা হইয়া আসেন। তাঁহার তিনটি প্রধান গুণ ছিল; যে-বুদ্ধি থাকিলে তদন্তকর্মে কৃতকার্য হওয়া যায় সে-বুদ্ধি তাঁহার প্রচুর পরিমাণে ছিল; তিনি অতিশয় কর্মঠ ছিলেন; এবং তিনি ঘুষ লইতেন না। শহরটা পুলিস সেরেস্তায় দাগী শহর বলিয়া পরিচিত ছিল; খুন-জখম এবং আরও নানা প্রকার অবৈধ ক্রিয়াকলাপ এখানে লাগিয়া থাকিত। নীলমণিবাবু পূর্ব হইতে এ শহরের সহিত পরিচিত ছিলেন, শহরের ধাত জানিতেন। তিনি আসিয়া দৃঢ় হস্তে শাসনের ভার তুলিয়া লইলেন।

বছর দেড়েক কাটিয়া গেল। নীলমণিবাবুর সতর্ক শাসনে শহর অনেকটা শান্ত-শিষ্ট ভাবে আছে। নীলমণিবাবুর অভ্যাস ছিল হস্তায় দু’একবার কাহাকেও কিছু না বলিয়া গভীর রাত্রে সাইকেলে চড়িয়া বাহির হইয়া পড়িতেন। শহরের একটা অংশ ছিল বিশেষভাবে অপরাধপ্রবণ; তাহারই অন্ধকার অলিগলিতে তিনি ঘুরিয়া বেড়াইতেন; পাহারাওয়ালারা নিয়মিত রোঁদ দিতেছে কিনা লক্ষ্য করিতেন। তাঁহার সাইকেলে আলো থাকিত না; সঙ্গে থাকিত পিস্তল এবং একটি বৈদ্যুতিক টর্চ। প্রয়োজন হইলে টর্চ জ্বালিতেন।

যে-রাত্রির ঘটনাটা লইয়া এই কাহিনীর আরম্ভ সে-রাত্রে নীলমণিবাবু সাইকেল চড়িয়া যথারীতি বাহির হইয়াছেন। নিষুতি রাত, কোথাও জনমানব নাই, রাস্তার আলোগুলো দূরে দূরে মিটমিট করিয়া জ্বলিতেছে। ভদ্র পাড়া যেখানে অভদ্র পাড়ার সঙ্গে মিশিয়াছে সেইখানে আম-কাঁঠালের বাগান-ঘেরা কয়েকটা পুরাতন বাড়ি আছে। বাড়িগুলি জীর্ণ, আম-কাঁঠালের গাছগুলি বৰ্ষীয়ান। পূর্বে বােধ হয় এই স্থান ভদ্রপল্লীর অন্তর্ভুক্ত ছিল, এখন ভদ্রপল্লী ঘৃণাভরে দূরে সরিয়া গিয়াছে; ক্ষয়িষ্ণু বাড়িগুলি দুই পক্ষের মাঝখানে সীমানা রক্ষা করিতেছে। এখানে যাহারা বাস করে তাহাদের সামাজিক অবস্থাও ত্রিশঙ্কুর মত স্বৰ্গ ও মর্তের মধ্যবর্তী।

মন্থর গতিতে সাইকেল চালাইয়া এই পড়ার ভিতর দিয়া যাইতে যাইতে নীলমণিবাবু দেখলেন, সম্মুখে প্রায় পঞ্চাশ গজ দূরে কয়েকজন লোক একটি মাচার মত বস্তু কাঁধে লইয়া একটি বাড়ির ফটক হইতে বাহির হইয়া আসিতেছে। তাহদের ভাবভঙ্গী সন্দেহজনক।

নীলমণিবাবু জোরে সাইকেল চালাইলেন; কাছাকাছি আসিয়া বৈদ্যুতিক টর্চ জ্বালিয়া লোকগুলার মুখে ফেলিলেন, উচ্চকণ্ঠে হুকুম দিলেন, দাঁড়াও।

চারজন লোক ছিল; তাহার একসঙ্গে কাঁধ হইতে মাচা ফেলিয়া পলায়ন করিল, মুহূৰ্তমধ্যে অন্ধকারে অদৃশ্য হইয়া গেল। কিন্তু অদৃশ্য হইবার পূর্বে একজনের মুখ নীলমণিবাবু অস্পষ্টভাবে দেখিতে পাইয়াছিলেন; সে ওই বাড়ির মালিক সুরেশ্বর ঘোষ।

পলাতকেরা বিভিন্ন দিকে গিয়াছে, নীলমণিবাবু তাহাদের ধরিবার চেষ্টা করিলেন না। তিনি মাচার নিকট গিয়া সাইকেল হইতে নামিলেন, এবং মাচার উপর টর্চের আলো ফেলিলেন।

মাচা নয়, মড়া বহিবার চালি। তাহাতে বাঁধা-ছাঁদা অবস্থায় পড়িয়া আছে একটি স্ত্রীলোকের দেহ। স্বাস্থ্যবতী সধবা যুবতী, দেহে কোথাও আঘাতের চিহ্ন নাই; কিন্তু মৃত।

নীলমণিবাবু হুইসল বাজাইলেন। একজন পাহারাওয়ালা কনস্টেবল কাছেপিঠে ছিল, দৌড়াইতে দৌড়াইতে আসিল। প্রতিবেশীরাও ঘুম ভাঙিয়া নিজ নিজ গৃহ হইতে বাহির হইল।

প্রতিবেশীরা সকলেই মৃতদেহ সনাক্ত করিল; সুরেশ্বরের স্ত্রী হাসি। বাড়িতে অন্য কেহ থাকে না, কেবল সুরেশ্বর ও তাহার স্ত্রী হাসি।

নীলমণিবাবু কনস্টেবলকে থানায় রওনা করিয়া দিলেন, তারপর দুজন প্রতিবেশীকে লইয়া বাড়ি অনুসন্ধান করিলেন। বাড়িটি একতলা হইলেও আকারে ছোট নয়, ছয়খানি ঘর। কিন্তু অধিকাংশ ঘরই ব্যবহার হয় না। দুইটি ঘরে ব্যবহারের চিহ্ন পাওয়া যায়; তন্মধ্যে একটি শয়নের ঘর। এই ঘরটি বেশ বড়, তাহার দুই পাশে দুইটি খাট। দুইটি খাটেই বিছানা পাতা; একটিতে কেহ শয়ন করে নাই, অপরটি দেখিয়া মনে হয় ব্যবহৃত হইয়াছে। কিন্তু বাড়িতে কেহ নাই।

বাগানেও কেহ নাই; বড় বড় আম-কাঁঠালের গাছগুলা সারি দিয়া দাঁড়াইয়া আছে। নীলমণিবাবু প্রতিবেশীদের জিজ্ঞাসা করিলেন, মেয়েটির অসুখ করেছিল কিনা আপনারা জানেন?

একজন প্রতিবেশী বলিল, অসুখ করেনি। আজই বিকেলবেলা ফটকের কাছে দাঁড়িয়ে বিনোদবাবুর সঙ্গে কথা বলছিল

তাই নাকি! বিনোদবাবু কে?

বিনোদ সরকার, সোনারূপোর দোকান আছে।

ফটকের কাছে ফিরিয়া আসিয়া নীলমণিবাবু দেখিলেন, থানা হইতে দুইজন সাব-ইন্সপেক্টর ও কয়েকজন জমাদার কনস্টেবল প্রভৃতি আসিয়া উপস্থিত হইয়াছে। তিনি অল্প কথায় ব্যাপার বুঝাইয়া দিয়া একজন সাব-ইন্সপেক্টরের সঙ্গে মৃতদেহ হাসপাতালে রওনা করিয়া দিলেন, চারজন কনস্টেবল চালি বহিয়া লইয়া গেল।

প্রতিবেশীরা তখনও কেহ চলিয়া যায় নাই, নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করিয়া জল্পনা করিতেছিল। নীলমণিবাবু জিজ্ঞাসা করিলেন, মেয়েটির স্বামীর পুরো নাম কি?

একজন বলিল, সুরেশ্বর ঘোষ।

সে কোথায়?

প্রতিবেশীরা কিছু বলিতে চায় না; শেষে একজন অনিচ্ছাভরে বলিল, সুরেশ্বর সন্ধ্যের পর খেয়ে-দেয়ে বেরিয়ে যায়, রাত্রি একটা-দেড়টার আগে বাড়ি ফেরে না।

কোথায় যায়?

শুনেছি কালীকিঙ্কর দাসের দোকানে তাসের আড্ডা বসে, সেখানে যায়৷

কালীকিঙ্কর দাসের দোকান কোথায়?

প্রতিবেশীরা ঠিকানা দিল। নীলমণিবাবু তখন জমাদারকে অকুস্থলে বসাইয়া সাব-ইন্সপেক্টরকে সঙ্গে লইয়া কালীকিঙ্কর দাসের দোকানের উদ্দেশ্যে চলিলেন। প্রতিবেশীদের বলিয়া গেলেন, কাল সকালে আসব, আপনাদের এজেহার নেব।

কালীকিঙ্করের দােকান সুরেশ্বরের বাড়ি হইতে আধ মাইল দূরে, শহরের নিকৃষ্ট অংশ পার হইয়া যেখানে বাজার-হাট আরম্ভ হইয়াছে সেইখানে। লোহা-লক্কড়ের দোকান। বাজারের এই অংশটির নাম লোহাপটি।

নিষুতি বাজারের ভিতর দিয়া নীলমণিবাবু কালীকিঙ্করের দােকানের সম্মুখে উপস্থিত হইলেন। দোকানের সামনে রাস্তার পাশে ভারী ভারী লোহার ছড় গুচ্ছাকারে পড়িয়া আছে। কিন্তু দোকানের দ্বার বন্ধ। নীলমণিবাবু নিঃশব্দ পদে এদিক-ওদিক ঘুরিয়া দেখিলেন, পাশের একটি জানালার ফুটা দিয়া শীর্ণ আলোকরশ্মি বাহিরে আসিতেছে। তিনি সন্তৰ্পণে জানালার কাছে গিয়া ফুটার মধ্যে চক্ষু নিবিষ্ট করিলেন।

তক্তপোশের উপর ফরাস পাতা; চারজন লোক বসিয়া নিবিষ্টমনে তাস খেলিতেছে। তাহাদের মাঝখানে ফরাসের উপর কিছু টাকা ও নোট জমা হইয়াছে। বাজি রাখিয়া খেলা চলিতেছে। তিনি তাসের খেলা।

সাব-ইন্সপেক্টর সাইকেল লইয়া রাস্তায় দাঁড়াইয়া ছিল। নীলমণিবাবু হাত নাড়িয়া তাহাকে ইশারা করিলেন, সে সাইকেল রাস্তায় শোয়াইয়া দিয়া দ্বারের সামনে গিয়া দাঁড়াইল। নীলমণিবাবু তখন জানালায় টোকা দিলেন।

চারজন খেলোয়াড় একসঙ্গে জানালার দিকে ঘাড় ফিরাইল, চারজোড়া চোখ শঙ্কিত উৎকণ্ঠায় চাহিয়া রহিল; তারপর একজন এক খামচায় সম্মুখের টাকাকড়ি তুলিয়া লইয়া পকেটে পুরিল।

নীলমণিবাবু কড়া সুরে বলিলেন, দোর খোল।

চারজন মুখ তাকাতাকি করিল, তারপর একজন গলা উঁচু করিয়া বলিল, কে?

নীলমণিবাবু বলিলেন, পুলিস। দোর খোল।

আবার খেলোয়াড়দের মধ্যে মুখ তাকাতাকি। তারপর একজন, বোধ হয় দোকানের মালিক কালীকিঙ্কর দাস, উঠিয়া গেল। নীলমণিবাবু জানালা হইতে সরিয়া দ্বারের সম্মুখে দাঁড়াইলেন। দ্বার খুলিল। রোগা অস্থিসার লোকটা দুইজন ইউনিফর্ম পরা পুলিস কর্মচারীকে দেখিয়া এক পা পিছাইয়া গেল, কে! কি চাই?

নীলমণিবাবু বলিলেন, তুমি কালীকিঙ্কর দাস?

হাঁ। কি চাই?

এখানে আর কে কে আছে?

কালীকিঙ্কর ঢোক গিলিয়া বলিল, আমার তিনজন বন্ধু আছে।

নীলমণিবাবু আর বাক্যব্যয় করিলেন না, ইন্সপেক্টরকে সঙ্গে লইয়া দোকানে প্রবেশ করিলেন। পাশে অফিস-ঘরের দরজা; অফিস-ঘরে গিয়া তিনি দেখিলেন, তিনজন খেলোয়াড়। তখনও ফরাসের উপর বসিয়া আছে, একজন তাস ভাঁজিতেছে। তিনি কিছুক্ষণ দাঁড়াইয়া সকলকে নিরীক্ষণ করিলেন। সকলেরই বয়স পঁয়ত্ৰিশ হইতে চল্লিশের মধ্যে, চেহারায় কোনও বৈশিষ্ট্য নাই। কেবল এক ব্যক্তি, যে-ব্যক্তি তাস ভাঁজিতেছিল, হাড়ে-মাসে মজবুত গোছের লোক। দেখিয়া মনে হয় এই লোকটাই পালের গোদা।

নীলমণিবাবু প্রশ্ন করিলেন, সুরেশ্বর ঘোষ কর নাম?

মজবুত লোকটি ভুরু তুলিয়া চাহিল, তারপর তাস রাখিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল, আমি সুরেশ্বর ঘোষ। কি দরকার? তার স্বর শান্ত ও সংযত।

নীলমণিবাবু একে একে চারজনের দিকে চক্ষু ফিরাইয়া বলিলেন, তোমরা দুপুর রাত্রে মড়া নিয়ে ঘাটে পোড়াতে যাচ্ছিলে। ভেবেছিলে একবার পুড়িয়ে ফেলতে পারলে আর কোনো ভয় নেই।

চারজনের মুখেই অকৃত্রিম বিস্ময় ফুটিয়া উঠিল। সুরেশ্বর বলিল, মড়া! কি বলছেন। কার মড়া?

নীলমণিবাবু বলিলেন, ন্যাকামি করে পর পাবে না। আমি দেখেছি তোমাকে। যে-চারজন মড়া নিয়ে যাচ্ছিল, তুমি তাদের একজন।

সুরেশ্বর বলিল, কবেকার কথা বলছেন?

আজকের কথা বলছি। আজ রাত্ৰি বারোটার কথা।

বাজে কথা বলছেন। আজ রাত্রি সাড়ে আটটার সময় আমরা এখানে তাস খেলতে বসেছি, এক মিনিটের জন্যে কেউ বাইরে যাইনি।

বটে! সারাক্ষণ তাস খেলেছ! জুয়া?

তিনজনে ঘাড় চুলকাইতে লাগিল। সুরেশ্বর কিন্তু তিলমাত্র অপ্রতিভ না হইয়া বলিল, হ্যাঁ, জুয়া খেলছিলাম। আমরা চার বন্ধু মিলে মাঝে মাঝে খেলি।

নীলমণিবাবু দেখিলেন। এখানে ইহাদের কাবু করা যাইবে না, থানায় লইয়া যাইতে হইবে। বলিলেন, আপাতত জুয়া খেলার অপরাধে আমি তোমাদের অ্যারেস্ট করছি। থানায় চল।

অতঃপর কিছুক্ষণ কথা-কাটাকাটি চলিল, শেষ পর্যন্ত তাহারা থানায় যাইতে রাজী হইল। নীলমণিবাবু বলিলেন, যদি জামিন যোগাড় করতে পার, আজ রাত্তিরেই ছেড়ে দেব।

রাস্তায় কিছুদূর যাইবার পর সুরেশ্বর বলিল, মড়ার কথা কী বলছিলেন? কার মড়া?

নীলমণিবাবু বলিলেন, তোমার স্ত্রীর।

সুরেশ্বর রাস্তার মাঝখানে দাঁড়াইয়া পড়িল, অ্যাঁ! আমার স্ত্রী! কি বলছেন আপনি?

বলছি, তোমার স্ত্রী খুন হয়েছে।

না না! এসব কি রকম কথা! আমি বিশ্বাস করি না। হাসি!—না, আমি বাড়ি চললাম।

বাড়ি গিয়ে কোন লাভ নেই। মৃতদেহ হাসপাতালে চালান দেওয়া হয়েছে।

থানায় পৌঁছিয়া নীলমণিবাবু চারজনকে হাজতে পুরিলেন। তারপর অফিসে বসিয়া একে একে তাহাদের জেরা আরম্ভ করিলেন। প্রথমে ডাকিলেন সুরেশ্বরকে। সে টেবিলের পাশের একটি চেয়ারে উপবিষ্ট হইলে জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি কি কাজ কর?

সুরেশ্বর বলিল, অনেক রকম ব্যবসা আছে। পাইকিরি ব্যবসা। আমি পয়সাওয়ালা লোক, পুঁচকে দোকানদার নই।

বাড়িটা তোমার?

হাঁ।

কিতদিন কিনেছ?

পাঁচ-ছয় বছর হবে। উনিশ হাজার টাকায় কিনেছিলাম।

নীলমণিবাবুকে টাকার কথা শুনাইয়া লাভ হইল না, তিনি অটলভাবে প্রশ্ন করিয়া চলিলেন, কতদিন আগে বিয়ে করেছিলে?

সাত বছর আগে।

শ্বশুরবাড়ি কোথায়?

এই শহরে।

শ্বশুরের নাম কি

দিনমণি হালদার।

সে এখন কোথায়?

জানি না। সম্ভবত জেলে।

জেলে?

হ্যাঁ। জেলা আমার শ্বশুরের ঘর-বাড়ি।

হুঁ। শ্বশুরের সঙ্গে তোমার সদ্ভাব আছে?

মুখ দেখাদেখি নেই।

নীলমণিবাবু কিছুক্ষণ চক্ষু কুঞ্চিত করিয়া রহিলেন। শেষে বলিলেন, বৌয়ের সঙ্গে তোমার সদ্ভাব ছিল?

একটু দ্বিধা করিয়া সুরেশ্বর বলিল, বিয়ের সাত বছর পরে যতটা সম্ভাব থাকা সম্ভব ততটা ছিল।

ছেলে-পিলে নেই?

না। বৌ বাঁজা।

নীলমণিবাবু আঙুল তুলিয়া বলিলেন, আজ রাত্ৰি বারোটার সময় তুমি আর তোমার বন্ধুরা মিলে তোমার স্ত্রীর মৃতদেহ বাড়ি থেকে বার করে নিয়ে যাচ্ছিলে, আমি টর্চের আলো ফেলে তোমাকে দেখেছি।

সুরেশ্বর নিরুত্তাপ কষ্ঠে বলিল, আপনি ভুল দেখেছেন। রাত্ৰি বারোটার সময় আমি আর আমার বন্ধুরা কালীকিঙ্করের দোকানে বসে তাস খেলছিলাম।

হুঁ। তোমার স্ত্রীর স্বভাব-চরিত্র কেমন ছিল?

মেয়েমানুষের স্বভাব-চরিত্রের কথা কে বলতে পারে? তবে পাড়া-পড়াশীরা বদনাম দিত।

কি বদনাম দিত?

আমি রাত্রি করে বাড়ি ফিরি। কয়েক মাস থেকে কে একজন নাকি বাগানে এসে হাসির সঙ্গে দেখা করত।

স্ত্রীকে এ বিষয়ে কিছু জিগ্যেস করেছিলে?

করেছিলাম। সে বলেছিল সব মিথ্যে কথা।

আর কিছু?

আর কি! একবার হাসির আলমারি খুলে তার মধ্যে এমন কয়েকটা গয়না দেখেছিলাম যা আমি তাকে দিইনি।

কোথা থেকে গয়না এল বৌয়ের কাছে খোঁজ নিয়েছিলে?

কি হবে খোঁজ নিয়ে? মেয়েমানুষ যদি নষ্ট হতে চায় কেউ তাকে আটকাতে পারে না।

কিন্তু খুন করতে পারে।

আমি হাসিকে খুন করিনি।

নীলমণিবাবু আরও অনেকক্ষণ নানাভাবে জেরা করিলেন, কিন্তু সুরেশ্বরকে টলাইতে পারিলেন না। বরং তাহার ঠোঁট-কাটা স্পষ্টবাদিত দেখিয়া মনে হয় সে সত্য কথা বলিতেছে।

সুরেশ্বরকে হাজতে ফেরৎ পাঠাইয়া নীলমণিবাবু কালীকিঙ্করকে ডাকিয়া আনিলেন। কালীকিঙ্করীরের হাড়-বাহির-করা শরীরের মধ্যে লৌহ-কঠিন একটি মন ছিল, নীলমণি অনেক চেষ্টা করিয়াও তাহা বাঁকাইতে পারিলেন না। চার বন্ধু রাত্রি সাড়ে আটটার সময় তাহার দোকানে তাস খেলিতে বসিয়াছিল, নীলমণিবাবু আসা পর্যন্ত এক মুহুর্তের জন্যও কেহ বাহিরে যায় নাই, এ কথার নড়চড় হইল না।

অন্যান্য বিষয়ে কিন্তু কালীকিঙ্কর সোজাসুজি উত্তর দিল। সুরেশ্বর তাহার আজীবনের বন্ধু, তাহার ঘরের খবর সবই কালীকিঙ্কর জানে। সুরেশ্বরের অবস্থা আগে ভাল ছিল না, যুদ্ধের বাজারে সে পয়সা করিয়াছে। হাসিকে সে বিবাহ করিয়াছিল গরীব অবস্থায়। হাসির ব্যাপটা ছিল একাধারে চাের এবং বোকা; চুরি করিয়া ধরা পড়িয়া যাইত এবং জেলে যাইত। হাসির মায়েরও বদনাম ছিল। বস্তিতে বাস করিলে ভদ্রলোকের মেয়েরও চালচলন খারাপ হইয়া যায়; যেমন দেখিবে তেমনি তো শিখিবে। হাসির বাপ যখন জেলে থাকিত তখন নাকি হাসির মায়ের ঘরে লোক আসিত। সুরেশ্বর যখন হাসিকে বিবাহ করিতে উদ্যত হয়, তখন বন্ধুরা সকলেই মানা করিয়াছিল; কিন্তু সুরেশ্বর কাহারও কথা শুনিল না। তারপর যুদ্ধের বাজারে সুরেশ্বর টাকা করিয়াছে, বাড়ি কিনিয়াছে; কিন্তু স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তেমন বনিবনাও নাই। সুরেশ্বর বাড়িতে বেশি থাকে না, বাহিরে বাহিরে দিন কটায়। কিন্তু তাই বলিয়া সে স্ত্রীকে খুন করিয়াছে একথা একেবারেই সত্য নয়। সুরেশ্বর তেমন লোকই নয়। সে ভদ্র সস্তান; জীবনের আরম্ভে অনেক দুঃখ-কষ্ট পাইয়া বস্তিতে থাকিয়া বড় হইয়াছে বটে, কিন্তু তার মনটা খুব উঁচু।

কালকিঙ্করের বন্ধু-প্রশস্তি শেষ হিইলে নীলমণিবাবু জিজ্ঞেস করিলেন, সুরেশ্বরের শ্বশুর দিনমণি হালদার এখন কোথায়?

কালীকিঙ্কর বলিল, “বছর দুই আগে দিনু হালদার জেল থেকে বেরিয়ে এখানে এসেছিল। হাসির মা তখন মরে গেছে। দিনু হালদার দু'তিন দিন মেয়ে-জামাইয়ের কাছে ছিল। একদিন সুরেশ্বরের সঙ্গে ঝগড়া হয়ে গেল। দিনু হালদার কোথায় চলে গেল। তারপর থেকে আর তাকে দেখিনি। বয়স হয়েছিল, জেল খেটে শরীরও ভেঙে পড়েছিল। হয়তো মরে গেছে।

অতঃপর নীলমণিবাবু কালীকিঙ্করকে ফেরৎ পাঠাইয়া দেবু মণ্ডলকে আনাইলেন। দেবু মণ্ডল কয়লা ও জ্বালানি কাঠের ব্যবসা করে; বিত্তবান ব্যক্তি। সুরেশ্বরের বাল্যবন্ধু, সুখে-দুঃখে নিত্য-সহচর। সুরেশ্বরের স্ত্রীকে খুন করিয়া তাহারা পোড়াইতে লইয়া যাইতেছিল একথা সর্বৈব মিথ্যা। তাহারা তাস খেলিতেছিল। বন্ধু-পত্নীর চরিত্র সম্বন্ধে মতামত প্ৰকাশ করিতে সে অক্ষম; তবে হাসি সদ্যবংশের মেয়ে ছিল না একথা যথার্থ।

দেবু মণ্ডলকে নীলমণিবাবু ভাঙিতে পারিলেন না, নূতন কোনও তথ্যও আবিষ্কৃত হইল না। তিনি অবশেষে বলিলেন, শ্মশান ঘাটে তোমার কাঠের আড়ৎ আছে?

দেবু মণ্ডল থতমত খাইয়া বলিল, আছে। শহরে দুটো আড়ৎ আছে, আর শ্মশানে একটা।

নীলমণিবাবু কুঞ্চিত চক্ষে কিছুক্ষণ তাহার পানে চাহিয়া থাকিয়া বলিলেন, এবার সত্যি কথা বলবে?

দেবু মণ্ডল বলিল, সত্যি কথাই বলছি।

চতুর্থ ব্যক্তির নাম বিলাস দত্ত। ঠিকাদারদের কাজ করে, বিলডিং কনট্র্যাক্টর; অতিশয় মিষ্টভাষী ও রসিক। নীলমণিবাবুকে একটি অশ্লীল রসিকতা শুনাইয়া ঘাড় নিচু করিয়া জিভ কাটিল। তাঁস খেলার ব্যাপার সম্বন্ধে কিন্তু তাহার মনে লেশমাত্ৰ সংশয় নাই। নীলমণিবাবু দেখিলেন বিলাস দত্ত যে শ্রেণীর লোক, সে অজস্র মিথ্যা কথা বলিবে কিন্তু কাজের কথা একটিও বলিবে না। তিনি হতাশ হইয়া বলিলেন, তুমি ঠিকাদার, তোমার অনেক বাঁশ আছে?

বিলাস দত্ত বলিল, বাঁশ! আছে বৈকি, এস্তার বাঁশ আছে। ভারা বাঁধবার জন্যে দরকার হয় কিনা।

নীলমণিবাবু বলিলেন, হুঁ, মড়ার চালি বাঁধবার জন্যেও দরকার হয়।

বন্ধু চতুষ্টয়ের জেরা শেষ করিতে রাত কাবার হইয়া গেল।

পরদিন কিন্তু তাহদের আর হাজতে আটকাইয়া রাখা গেল না। তাহদের উকিল জামিন দিয়া তাহদের খালাস করিয়া লইয়া গেলেন। নীলমণিবাবুর মনে অভ্রান্ত বিশ্বাস জন্মিয়ছিল যে, সুরেশ্বর ঘোষ স্ত্রীকে খুন করিয়াছে এবং বাকি তিনজন এই ব্যাপারে লিপ্ত আছে। কিন্তু প্রমাণ নাই; তিনি যাহা চোখে দেখিয়াছেন তাহার কোন সমর্থক নাই; তাঁহার সাক্ষ্য উকিলের জেরায় উড়িয়া যাইবে। তাই বর্তমানে তিনি তাহাদের নামে খুনের অভিযোগ আনিতে পারিলেন না। কেবল জুয়া খেলার অভিযোগেই তাঁহাকে সন্তুষ্ট থাকিতে হইল।

তিনি কিন্তু খুনের তদন্তে বিরতি দিলেন না। তিনি দুইজন সহকারী লইয়া সুরেশ্বরের প্রতিবেশীদের সঙ্গে দেখা করিলেন, তাহদের বয়ন শুনিলেন। শেষে বেলা প্ৰায়, একটার সময় সুরেশ্বরের বাড়িতে গেলেন। ফটকে একজন কনস্টেবল পাহারায় ছিল, সে বলিল, সুরেশ্বর বেলা এগারোটা নাগাদ ফিরিয়া আসিয়াছে এবং বাড়িতে আছে।

নীলমণিবাবু গৃহে প্রবেশ করিয়া দেখিলেন, সুরেশ্বর শয়নকক্ষের একটা খাটে শুইয়া ঘুমাইতেছে। পুলিসের জুতার শব্দে সে রক্তবর্ণ চক্ষু মেলিয়া উঠিয়া বসিল, জড়িত স্বরে বলিল, আবার কী চাই?

নীলমণিবাবু বলিলেন, আমরা বাড়ি তল্লাশ করতে এসেছি।

করুন তল্লাশ। যা ইচ্ছে করুন। বলিয়া সে আবার শয়নের উপক্ৰম করিল। তাহার বোধ হয় বেলা পর্যন্ত ঘুমানো অভ্যাস, তার উপর কাল সারা রাত্রি জাগরণে গিয়াছে, আজ বোধ হয় সারা দিন ঘুমাইবে। কিন্তু-স্ত্রীর মৃত্যুতে তাহার মনে কি একটুও দাগ পড়ে নাই? খুন করুক বা না করুক, এমন নিশ্চিন্ত ভাবে ঘুমাইতেছে কি করিয়া!

যাহােক, নীলমণিবাবু তাহাকে ঘুমাইতে দিলেন না। বলিলেন, তোমার স্ত্রীর গয়নাগুলো দেখতে চাই।

সুরেশ্বর বিরক্ত মুখে উঠিয়া একটা দেয়াল-আলমারির কপাট খুলিল, তাহার একটা তাকে কাপড়-চোপড়ের পেছন হইতে এক থাবা সোনার গহনা বাহির করিল। আটপৌরে গহনা কিছু আছে, তাছাড়া তোলা গহনা। নীলমণিবাবু বলিলেন, এর মধ্যে কোন গয়না তুমি দাওনি?

সুরেশ্বর একটা আংটি, এক জোড়া কানের দুল, একটা চুলের কাঁটা বাছিয়া তাঁহার হাতে দিল। এ গহনাগুলি নূতন, ব্যবহৃত হয় নাই।

নীলমণিবাবু সেগুলি নিজের পকেটে রাখিয়া বলিলেন, এগুলো আমি রাখছি। পরে ফেরৎ দেব৷

তারপর তাহার সমস্ত বাড়ি ও বাগান তন্ন তন্ন করিলেন, কিন্তু এমন কিছুই পাওয়া গেল না। যাহা হইতে হাসির মৃত্যুর কোন হদিস পাওয়া যায়।

বৈকালে সাড়ে তিনটার সময় নীলমণিবাবু সুরেশ্বরের বাড়ির তদন্ত শেষ করিলেন এবং সহকারীদের ফেরৎ পাঠাইয়া নিজে বিনোদ সরকারের দোকানের দিকে চলিলেন। বাজারের মধ্যে বিনোদ সরকারের সোনা-রূপার দোকানটা তাঁহার দেখা ছিল, বেশ বড় দোকান, দোকানের মধ্যে কারিগরদের কাজ করিবার কারখানা।

বিনোদবাবু দোকানে ছিলেন, একটি সুসজ্জিত কক্ষে টেবিলের সামনে বসিয়া গড়গড়ায় তামাক টানিতেছিলেন। লোকটির বয়স অনুমান পঞ্চাশ, কিন্তু ভারি শৌখিন মানুষ। গায়ে তসরের পাঞ্জাবি, গিলে করা ফরাসডাঙার ধুতি, গোঁফের উপর-নিচে কামাইয়া অত্যন্ত সূক্ষ্ম করিয়া তোলা হইয়াছে, মাথার সম্মুখ ভাগে এক গোছা চুল তিনদিক হইতে টাকের আক্রমণ কোনমতে ঠেকাইয়া রাখিয়াছে। আকৃতি একটু খর্ব, কিন্তু তদনুপাতে বেশ গোলগাল।

পুলিস দেখিয়া তিনি একটু বিব্রত হইলেন, বলিলেন, কি ব্যাপার বলুন তো? আমার দোকানে কি কোন গণ্ডগোল হয়েছে?

নীলমণিবাবু সামনের চেয়ারে বসিলেন, বলিলেন, না। আপনার কাছে কিছু খবর জানতে এসেছি।

বিনোদবাবু ধাতস্থ হইলেন, নীলমণিৰাবুর দিকে পানের ডিবা ও জর্দার কোটা বাড়াইয়া দিয়া বলিলেন, কি খবর?

নীলমণিবাবু পান লইলেন না, জদার কোটা হইতে এক চিমটি জাদা লইয়া মুখে দিলেন, ধীরে ধীরে বলিলেন, সুরেশ্বর ঘোষের স্ত্রী মারা গেছে আপনি জানেন?

বিনোদবাবু চেয়ার হইতে প্রায় লাফাইয়া উঠিলেন, হাসি মারা গেছে! সে কি! কাল বিকেলে যে আমি তাকে দেখেছি।

কাল রাত্রে মারা গেছে।

রাত্ৰে! কিন্তু বিকেলবেলা সে তো ভালই ছিল। কিসে মারা গেল? কী হয়েছিল তার?

আমার বিশ্বাস কাল রাত্রে তাকে খুন করা হয়েছে।

খুন! বিনোদবাবু আস্তে আস্তে চেয়ারে বসিলেন, কিছুক্ষণ শূন্য দৃষ্টিতে তাকাইয়া থাকিয়া হঠাৎ টেবিলের উপর প্রচণ্ড চাপড় মারিয়া বলিলেন, সুরেশ্বর খুন করেছে। ও ছাড়া আর কেউ নয়।

সুরেশ্বরের কিন্তু অকাট্য অ্যালিবাই আছে।

থাক, অ্যালিবাই, এ সুরেশ্বরের কাজ। সুরেশ্বর আর ওর ওই তিনটে বন্ধু মহা ধূর্ত আর পাজি। ওদের অসাধ্য কােজ নেই।

নীলমণিবাবু বলিলেন, আপনি হাসিকে অনেক দিন থেকে চেনেন?

ওকে তিন-চার বছর বয়স থেকে দেখে আসছি।

তিনি নলটি মুখ হইতে লইয়া কিছুক্ষণ তাহার অগ্রভাগ পরিদর্শন করিলেন, একবার নীলমণিবাবুর দিকে চকিত কটাক্ষ নিক্ষেপ করিলেন; তারপর হ্রস্ব স্বরে বলিলেন, আপনি পুলিস, আপনার কাছে লুকোব না, কম বয়সে আমি একটু-ইয়ে-হাসির মায়ের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা ছিল। সে আজ বিশ-বাইশ বছর আগেকার কথা। হাসির বাপটা ছিল হতভাগা চোর, নেশাখের, জালিয়াৎ। স্ত্রী-কন্যাকে খেতে দিতে পারত না। হাসির মা পেটের দায়ে-কিন্তু সে যাক। বছর কয়েক আগে হাসির মা মারা গেল। মৃত্যুকালে আমাকে ডেকে মিনতি করে বলে গিয়েছিল, হাসিকে তুমি দেখো, জামাইয়ের মন ভাল নয়। --তার মৃত্যু-শয্যার অনুরোধ আমি এড়াতে পারিনি; হাসিকে মাঝে মাঝে গিয়ে দেখে আসতাম। হাসির মা সতীসাধ্বী ছিল না, কিন্তু তার প্রকৃতি ছিল বড় মধুর।

কিছুক্ষণ আর কোন কথা হইল না। তারপর নীলমণিবাবু বলিলেন, তাহলে আপনার সন্দেহ সুরেশ্বরবাবু হাসিকে খুন করেছে?

বিনোদবাুব যেন স্মৃতি-সমুদ্রের তলদেশ হইতে উঠিয়া আসিলেন, অ্যাঁ! হাঁ, আমার তাই বিশ্বাস।

কিন্তু কেন? মোটিভ কি?

দেখুন, সুরেশ্বর যখন হাসিকে বিয়ে করেছিল, তখন তার চালচুলো কিছু ছিল না। তারপর যুদ্ধের বাজারে সে বড়লোক হল। তখন তার উচ্চাশা হল সে ভদ্রসমাজে মিশবে, দশজনের একজন বলে গণ্য হবে। কিন্তু হাসি বেঁচে থাকতে সে-সম্ভাবনা নেই; হাসির মা-বাপের কেচ্ছা! শহরে কে না জানে? তাই সুরেশ্বর হাসিকে মেরেছে। এবার নতুন বিয়ে করে ভদ্রলোক হয়ে বসবে৷

হাসির স্বভাব-চরিত্র কেমন ছিল?

হেলাগােলা মেয়ে ছিল, মনে ছল-কপট ছিল না। একটু হয়তো পুরুষ-ঘেঁষা ছিল, ফটকের কাছে দাঁড়িয়ে থাকত, রাস্তা দিয়ে লোক গেলে ডেকে কথা কইত। কিন্তু তাতেও তাকে দোষ দেওয়া যায় না। পাড়ার মেয়েরা ওর সঙ্গে ভাল করে কথা বলত না, কেউ বা বাঁকা কথা বলত। হাসিও তো মানুষ, তারও তো কথা কইবার দুটো লোক দরকার। আমি জোর করে বলতে পারি, অন্য দোষ তার যতই থাক, মন্দ সে ছিল না।

নীলমণিবাবু কৌটা হইতে আর এক টিপ জর্দা মুখে দিলেন, তারপর পকেট হইতে গহনাগুলি বাহির করিয়া বিনোদবাবুর সম্মুখে রাখিলেন, দেখুন তো, এগুলো চিনতে পারেন?

হাসির গয়না নাকি? বলিয়া বিনোদবাবু সেগুলি হাতে তুলিয়া লইলেন, তারপর মাথা নাড়িয়া বলিলেন, এ গয়না। আমি হাসিকে কখনো পরতে দেখিনি।

আপনি কখনো তাকে গয়না উপহার দেননি?

বিনোদবাবু মাথা নাড়িলেন, না। আমি তাকে পুজো আর দোলের সময় একখানা করে শাড়ি দিতাম। গয়না কখনো দিইনি।

নীলমণিবাবু বলিলেন, এ গয়না কি আপনার দোকানে তৈরি?

বিনােদবাবু ভ্রূকুঞ্চিত করিয়া গহনাগুলি আবার পরীক্ষা করিলেন, বলিলেন, না, এ গয়না আমার কারিগরের তৈরি নয়। কিন্তু, দাঁড়ান—’ তিনি ঘণ্টি টিপিয়া চাকরকে ডাকিলেন—রামদয়ালকে পাঠিয়ে দাও।

চশমা চোখে বয়স্ক কারিগর রামদয়াল আসিল, তাহার হাতে গহনাগুলি দিয়া বলিলেন, দেখ তো, এ গয়না কি আমাদের তৈরি?

রামদয়াল ভাল করিয়া দেখিয়া বলিল, আজ্ঞে না, এ গয়না। কলকাতার কারিগরের তৈরি।

আচ্ছা, যাও।

নীলমণিবাবুও উঠিলেন, গহনাগুলি পকেটে রাখিয়া বলিলেন, আজ তবে উঠি, যদি দরকার হয় আবার আসিব।

যখন ইচ্ছে আসবেন।

সেদিন সন্ধ্যাকালে নীলমণিবাবু সিভিল সার্জন মেজর বর্মণের বাংলোতে গেলেন। বাংলোতেই অফিস। মেজর বর্মণ দিনের কাজ শেষ করিয়া উঠি-উঠি করিতেছেন, নীলমণিবাবু বলিলেন, খবর নিতে এলাম

মেজর বর্মণ বলিলেন, বসুন। পি এম করেছি। রিপোর্ট কাল পাবেন।

কি দেখলেন? মৃত্যুর সময়?

আন্দাজ রাত্রি দশটা।

মৃত্যুর কারণ?

যতদূর দেখেছি গায়ে আঘাতের চিহ্ন ছিল না।

বিষ-টিষ নাকি?

মেজর বর্মণ একটি সিগার ধরাইয়া তাহাতে মন্দ-মন্থর টান দিলেন, বিষ নয়। বড় আশ্চর্ষ উপায়ে মেরেছে। আপনার সন্দেহভাজনের মধ্যে মিলিটারি-ম্যান কেউ আছে নাকি?

নীলমণিবাবু বলিলেন, মিলিটারি-ম্যান কেউ নেই। কিন্তু মেয়েটির স্বামী যুদ্ধের সময় মিলিটারি কষ্ট্র্যাক্টর ছিল, গোরাদের সংস্পর্শে এসেছে। কী ব্যাপার বলুন?

মেজর বর্মণ বলিলেন, মেয়েটির গায়ে আঘাতের চিহ্ন বাইরে থেকে দেখা যায় না, কিন্তু তার গলার তরুণাস্থি, যাকে thyroid cartillage বলে, সেটা একেবারে চুর্ণ হয়ে গেছে।

নীলমণিবাবু স্থির দৃষ্টিতে চাহিয়া বলিলেন, মানে গলা টিপে মেরেছে।

না। গলা টিপে মারলে চামড়ার ওপর আঙুলের দাগ থাকত। আর, গলা টিপে মারার মধ্যে বৈচিত্র্য কিছু নেই।

তবে?

মেজর বর্মণ কয়েকবার সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়িয়া বলিলেন, গত মহাযুদ্ধে সৈনিকদের অস্ত্ৰহীন যুদ্ধের কৌশল শেখানো হয়েছিল, আপনি জানেন?

না। সে কি রকম?

মনে করুন বনে-জঙ্গলে যুদ্ধ হচ্ছে। আপনি নিরস্ত্র অবস্থায় একজন সশস্ত্ৰ শত্রুর হাতে ধরা পড়লেন। পালাবার উপায় নেই, পালাবার চেষ্টা করলে সে আপনাকে গুলি করে মারবে। এ অবস্থায় আত্মরক্ষার উপায় কি?—আপনি কৌশলে শত্রুর ডান পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন, তারপর হঠাৎ তার দিকে ঘুরে ডান হাতের পোঁচা দিয়ে সজোরে মারলেন তার গলায়। Thyroid cartillage ভেঙে গেল, তৎক্ষণাৎ মৃত্যু হল।

তৎক্ষণাৎ মৃত্যু?

হ্যাঁ। গলা টিপে মারতে গেলে আক্রান্ত ব্যক্তি যুদ্ধ করে মুক্ত হবার চেষ্টা করে। এতে ওসব বালাই নেই, সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু।

নীলমণিবাবু কিছুক্ষণ নীরব থাকিয়া বলিলেন, আশ্চর্য! মেয়েটির মৃত্যু এইভাবে হয়েছে এতে আপনার সন্দেহ নেই?

কোন সন্দেহ নেই।

আচ্ছা, আজ উঠি। কাল সকালে লোক পাঠাব রিপোর্টের জন্যে।

নীলমণিবাবু থানায় ফিরিয়া আসিলেন। সুরেশ্বর যে হাসিকে খুন করিয়াছে ইহাতে তাঁহার বিন্দুমাত্ৰ সন্দেহ নাই। কিন্তু একটা ধোঁকা রহিয়াছে। যে লোকটা রাত্রে আসিয়া হাসির সঙ্গে দেখা করিত, সে কে? সে-ই কি হাসিকে গহনাগুলো উপহার দিয়াছিল? হাসির সহিত লোকটার কিরূপ সম্বন্ধ? সে যদি হাসির ‘বন্ধু হয় তবে হাসিকে খুন করিবে কেন?

সে-রাত্রে আর কিছু হইল না। পরদিন সকালে একজন সাব-ইন্সপেক্টর ও একজন রাইটার জমাদারকে সঙ্গে লইয়া নীলমণিবাবু আবার সুরেশ্বরের বাড়িতে গেলেন। আজ যেমন করিয়া হােক সুরেশ্বরের নিকট হইতে তিনি স্বীকারোক্তি আদায় করিবেন।

সুরেশ্বরের বাড়ির সদর দরজা খোলা, বাড়িতে কেহ আছে বলিয়া মনে হইল না। দুচার বার ডাকাডাকি করিয়া নীলমণিবাবু সঙ্গীদের লইয়া ভিতরে প্রবেশ করিলেন। শয়নকক্ষের খোলা দরজার সামনে গিয়া তাঁহাদের গতি রুদ্ধ হইল। মেঝের উপর সুরেশ্বর মরিয়া পড়িয়া আছে।

গত রাত্রে সুরেশ্বর যথা-নিয়ত কালীকিঙ্করের দোকানে তাস খেলিতে গিয়াছিল। রাত্রি আন্দাজ বারোটার সময় গৃহে ফিরিয়া আসে। তারপর কি হইয়াছে কেহ জানে না।

সিভিল সার্জেন মেজর বর্মণ সুরেশ্বরের মৃতদেহ ব্যবচ্ছেদ করিয়া রিপোর্ট দিলেন, গলার thyroid cartillage ভাঙিয়া তাহার মৃত্যু হইয়াছে। অর্থাৎ যে উপায়ে হাসির মৃত্যু হইয়াছিল ঠিক সেই উপায়ে সুরেশ্বরেরও মৃত্যু হইয়াছে।

গল্প শেষ করিয়া নীলমণিবাবু কিছুক্ষণ হেঁট মুখে বসিয়া রহিলেন, তারপর মুখ তুলিয়া বলিলেন, এই হচ্ছে ঘটনা। তদন্তের সূত্রে আমি যা-যা জানতে পেরেছিলাম সব আপনাকে বলেছি। আমি প্রথমে সুরেশ্বরকে সন্দেহ করেছিলাম, পরে দেখলাম, হাসি আর সুরেশ্বরকে একই লোক একই উপায়ে খুন করেছে। আমি আসামীকে ধরতে পারিনি, আসামী কে তাও জানতে পারিনি। আপনি বলতে পারেন কে আসামী?

ব্যোমকেশ গালে হাত দিয়া শুনিতেছিল, বলিল, আরো কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর দেবেন?

নীলমণিবাবু বলিলেন, উত্তর যদি জানা থাকে নিশ্চয় দেব।

ব্যোমকেশ বলিল, সুরেশ্বরের ওয়ারিস কে?

সুরেশ্বরের এক খুড়তুতো বোন। সুরেশ্বর উইল করেনি। খুড়তুতো বোনটি অনাথা বিধবা, কলকাতায় কোথায় রাঁধুনি-বৃত্তি করত; সেই সব পেয়েছে।

যাক। —যে-রাত্রে সুরেশ্বরের মৃত্যু হয়, সে-রাত্রে ওর তিন বন্ধু কালীকিঙ্কর, দেবু মণ্ডল আর বিলাস দত্ত কোথায় ছিল?

সুরেশ্বরের বাড়ি যাবার পর ওরা তিনজন প্রায় সারা রাত কালীকিঙ্করের দোকানে বসে তাস খেলেছিল। আমি ওদের প্রত্যেকের পিছনে চর লাগিয়েছিলাম, তাদের কাছেই খবর পেয়েছি। ওরা সুরেশ্বরকে খুন করেনি।

হুঁ। বিনোদ সরকারের পিছনে চর লাগিয়েছিলেন?

না। বিনোদ সরকারের ওপর আমার সন্দেহ হয়নি। তার কোনো মোটিভ ছিল না। সুরেশ্বরকে হয়তো মারতে পারতো, কিন্তু হাসিকে মারবে কেন?

তা বটে। দিনমণি হালদার তখন কোথায় ছিল। খোঁজ নিয়েছিলেন?

নিয়েছিলাম। সে তখন পঞ্চাশ মাইল দূরে একটা গ্রামে ছিল। আমাশায় ভুগছিল। নড়বার ক্ষমতা ছিল না। তাছাড়া ওভাবে খুন করবার কৌশল সে জানবে কোত্থেকে?

হুঁ। আচ্ছা, একটা কথা বলুন। আপনার কি মনে হয় হাসির স্বভাব-চরিত্র মন্দ ছিল?

না। আমার বিশ্বাস সে ভাল মেয়ে ছিল।

ব্যোমকেশ নতমুখে ভাবিতে ভাবিতে বলিল, কিন্তু তার রক্তে দোষ ছিল। তার মা-কি নাম হাসির মায়ের?

অমলা।

ব্যোমকেশ চোখ তুলিয়া নীলমণিবাবুর পানে চাহিল; তিনিও প্রখর চক্ষে তাহার পানে চাহিয়া রহিলেন। তাঁহার শরীর ক্রমশ কঠিন হইয়া উঠিতে লাগিল। কিছুক্ষণ দুইজনের চােখে চােখ আবদ্ধ হইয়া রহিল; তারপর ব্যোমকেশ তাকিয়া ঠেস দিয়া বসিল, নির্বাপিত গড়গড়ার নলটা হাতে তুলিয়া লইল।

নীলমণিবাবু আত্মসংবরণ করিয়া ধীরস্বরে বলিলেন, আর কিছু জানতে চান?

ব্যোমকেশ নিরুৎসুকভাবে মাথা নাড়িল, আর কিছু জানিবার নেই।

নীলমণিবাবু একটু বাঁকা সুরে বলিলেন, কিছু বুঝলেন?

ব্যোমকেশ বলিল, সবই বুঝেছি, নীলমণিবাবু।

নীলমণিবাবু কিছুক্ষণ স্থির হইয়া রহিলেন, শেষে বলিলেন, সবই বুঝেছেন! হাসিকে কে খুন করেছিল। আপনি বুঝেছেন

বুঝেছি বৈকি। হাসিকে খুন করেছিল সুরেশ্বর।

তাই নাকি! তাহলে সুরেশ্বরকে মারল কে?

সুরেশ্বরকে মেরেছিল-হাসির বাপ।

হাসির বাপ! কিন্তু দিনমণি হালদার সে-সময় পঞ্চাশ মাইল দূরে ছিল—

আমি দিনমণি হালদারের কথা বলিনি, হাসির বাপের কথা বলেছি। হাসির জন্মদাতা পিতা।

নীলমণিবাবু নিস্তব্ধ হইয়া বসিয়া রহিলেন। দেখিতে লাগিলাম। তাঁহার মুখ হইতে পরতে পরতে রক্ত নামিয়া যাইতেছে। অবশেষে তিনি যখন কথা বলিলেন তখন তাঁহার কণ্ঠস্বরের গাম্ভীৰ্য আর নাই, ক্ষীণ স্বলিত স্বরে বলিলেন, জন্মদাতা পিতা-কার কথা বলছেন?

ব্যোমকেশ দুঃখিতভাবে মাথা নাড়িয়া বলিল, কার কথা বলছি আপনি জানেন, নীলমণিবাবু। গল্পটা আমাকে না বললেই ভাল করতেন।

অতঃপর নীলমণিবাবু কী বলিতেন তাহা আর শোনা হইল না। বীরেনবাবু প্ৰবেশ করিয়া বলিলেন, ব্যোমকেশবাবু, রান্না তৈরি। আপনারা স্নান করে নিন। নীলমণিদা, আপনিও মধ্যাহ্ন ভোজনটা এখানেই সেরে নিন না?

নীলমণিবাবু ধড়মড় করিয়া উঠিয়া দাঁড়াইলেন।

না না, আমি চললাম। অনেক দেরি হয়ে গেল। বলিয়া তিনি দ্রুত প্ৰস্থান করিলেন। আমাদের প্রতি দৃকপাত করিলেন না।

আহারাদি সম্পন্ন করিয়া দুইজনে তাকিয়া মাথায় দিয়া লম্বা হইয়াছিলাম। গড়াগড়া চলিতেছিল।

বলিলাম, কি করে বুঝলে বল।

ব্যোমকেশ বলিল, নীলমণিবাবুর গল্প শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল হাসির প্রতি তাঁর পক্ষপাত আছে। অথচ তাঁর গল্প অনুযায়ী, হাসিকে জীবিত অবস্থায় তিনি দেখেননি। তার চরিত্র সম্বন্ধে যে সাক্ষী প্ৰমাণ পাওয়া যায়, তাতে তাকে পতিগতপ্ৰাণা সতীসাধবী মনে করবার কারণ নেই। সে প্ৰগলভা ছিল, তার স্বামী তাকে সন্দেহ করত, একজন অজ্ঞাত লোক রাত্রে তার সঙ্গে দেখা করত। তবে তার প্রতি নীলমণিবাবুর পক্ষপাত কেন?

হাসির মা অমলাও সীতা-সাবিত্রী ছিল না। অমলার স্বামী দিনমণি হালদার জেলখানার পোষা পাখি হয়ে দাঁড়িয়েছিল; মাঝে মাঝে ছাড়া পেত, আবার জেলে গিয়ে ঢুকত। দিনমণি হালদার হাসির বাপ নাও হতে পারে।

বিনোদ সরকারও হাসির বাপ নয়। হাসির মায়ের সঙ্গে যখন তাঁর ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল, তখন হাসির বয়স তিন-চার বছর। তবে কে?

নীলমণিবাবু গল্প বলবার আগে কথাপ্রসঙ্গে বলেছিলেন, পুলিসের চাকরিতে ঢুকে প্রথম তিনি এই শহরে পোস্টেড হয়েছিলেন। দিনমণি পেশাদার চোর, তাকে ধরতে কিংবা তার ঘর-দোর খানাতল্লাশ করবার জন্যে হয়তো নীলমণিবাবু গিয়েছিলেন। তিনি তখন যুবক, হয়তো দিনমণির কুহকময়ী স্ত্রীর ফাঁদে পড়ে গিয়েছিলেন; দিনমণি জেলে যাবার পর গোপনে দুজনের মেলামেশা হয়েছিল।

দু-তিন বছর পরে নীলমণিবাবু এ জেলা থেকে বদলি হয়ে গেলেন; যাবার আগে জেনে গেলেন তাঁর একটি মেয়ে আছে। মেয়ের নাম হাসি। দূরে গিয়েও তিনি হাসি ও হাসির মায়ের খবর রাখতেন। তিনি বিয়ে করেননি, তাই সংসারের বন্ধন হাসিকে ভুলিয়ে দিতে পারেনি। সংসারে হাসিই তাঁর একমাত্র রক্তের বন্ধন।

কর্মজীবনের শেষের দিকে তিনি আবার এই শহরে ফিরে এলেন। হাসির মা তখন মরে গেছে, হাসির বিয়ে হয়েছে। নীলমণিবাবুর অভ্যাস ছিল তিনি গভীর রাত্রে সাইকেল চড়ে শহর তদারক করতে বেরুতেন। সেই সময় তিনি হাসির সঙ্গে দেকা করতেন, তাকে ছোটখাটো দু-একখানা গয়না উপহার দিতেন। হাসিকে নিজের পরিচয় দিয়েছিলেন কিনা বলা যায় না। তবে হাসি হয়তো আন্দাজ করেছিল।

‘যে-রাত্রে সুরেশ্বর হাসিকে খুন করে সে-রাত্রে নীলমণিবাবু হাসির সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছিলেন। তারপর যা-যা হয়েছিল সবই আমরা নীলমণিবাবুর মুখে শুনেছি। আমার বিশ্বাস সুরেশ্বর তাস খেলতে খেলতে উঠে এসে হাসিকে খুন করেছিল, তারপর ফিরে গিয়ে বন্ধুদের বলেছিল—বৌকে খুন করেছি, এখন তোরা আমাকে বাঁচা। চারজনের মধ্যে অটুট বন্ধুত্ব। তারা পরামর্শ করে স্থির করল, মড়া পুড়িয়ে ফেলা যাক, তারপর রটিয়ে দিলেই হবে, হাসি কুলত্যাগ করেছে।

নীলমণিবাবু চার বন্ধুকে থানায় ধরে আনলেন, কিন্তু তাদের অ্যালিবাই ভাঙতে পারলেন না। তিনি যখন দেখলেন তাঁর মেয়ের হত্যাকারীকে ফাঁসিকাঠে লটকাতে পারবেন না। তখন ঠিক করলেন নিজেই তাঁকে খুন করবেন। তিনি আর বিলম্ব করলেন না, হাসির মৃত্যুর চব্বিশ ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই সুরেশ্বরকে খুন করলেন।

কিন্তু ভেবে দেখ, আমি যেভাবে গল্পটাকে খাড়া করেছি, তার আগাগোড়াই অনুমান। এই অনুমান কেবল তখনি সত্যে পরিণত হতে পারে যদি নিশ্চয়ভাবে জানা যায় যে, নীলমণিবাবু হাসির বাপ! আমি তাঁর জন্যে ফাঁদ পাতলাম, আচমকা জিগ্যেস করলাম-হাসির মায়ের নাম কি? তিনি না ভেবেচিন্তে বলে ফেললেন-অমলা!

হাসির মায়ের নাম তিনি জানলেন কি করে? দশ বছর আগে সে মরে গেছে, এই মামলায় তার নাম একবারও কেউ উচ্চারণ করেনি। তবে নীলমণিবাবু জানলেন কি করে? আর সন্দেহ রইল না।

আমার সামনেই হাসির মায়ের নাম উচ্চারণ করেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, অসাবধানে তিনি ফাঁদে পা দিয়েছেন, আমিও তাঁর মুখ দেখে বুঝতে পেরেছিলাম আমার ফাঁদ পাতা ব্যর্থ হয়নি। নীলমণিবাবুর অজানা আসামী স্বয়ং নীলমণিবাবু।

ব্যোমকেশের যুক্তিজালে ছিদ্ৰ পাইলাম না। বলিলাম, নীলমণিবাবু তাহলে নিরস্ত্র যুদ্ধের কায়দা আগে থাকতে জানতেন।

ব্যোমকেশ বলিল, না। বিদ্যেটা তিনি সিভিল সার্জন মেজর বর্মণের কথা শুনে শিখে নিয়েছিলেন।

কহেন কবি কালিদাস

যে শহরে আমি ও ব্যোমকেশ হপ্তাখানেকের জন্য প্রবাসযাত্ৰা করিয়াছিলাম তাহাকে কয়লা-শহর বলিলে অন্যায় হইবে না। শহরকে কেন্দ্ৰ করিয়া তিন-চার মাইল দূরে দূরে গোটা চারেক কয়লার খনি। শহরটি যেন মাকড়সার মত জাল পাতিয়া মাঝখানে বসিয়া আছে, চারিদিক হইতে কয়লা আসিয়া রেলওয়ে স্টেশনে জমা হইতেছে এবং মালগাড়িতে চড়িয়া দিগবিদিকে যাত্ৰা করিতেছে। কর্মব্যস্ত সমৃদ্ধ শহর; ধনী ব্যবসায়ীরা এখানে আসিয়া আড্ডা গাড়িয়াছে, কয়েকটি বড় বড় ব্যাঙ্ক আছে, উকিল ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার দালাল মহাজনের ছড়াছড়ি। পথে মোটর ট্যাক্সি বাস ট্রাকের ছুটাছুটি। কাঁচা মালের সহিত কাঁচা পয়সার অবিরাম বিনিময়। শহরটিকে নিয়ন্ত্রিত করিতেছে-কয়লা। চারিদিকে কয়লার কীর্তন, কয়লার কলকোলাহল। শহরটি মোটেই প্রাচীন নয়, কিন্তু দেখিয়া মনে হয় অদৃশ্য কয়লার গুঁড়া ইহার সর্বাঙ্গে অকালবার্ধক্যের ছায়া ফেলিয়াছে।

যাঁহার আহ্বানে আমরা এই শহরে আসিয়াছি তিনি ফুলঝুরি নামক একটি কয়লাখনির মালিক, নাম মণীশ চক্রবর্তী। কয়েক মাস যাবৎ তাঁহার খনিতে নানা প্রকার প্রচ্ছন্ন উৎপাত আরম্ভ হইয়াছিল। খনির গর্ভে আগুন লাগা, মূল্যবান যন্ত্রপাতি ভাঙ্গিয়া নষ্ট হওয়া ইত্যাদি দুর্ঘটনা ঘটিতেছিল; কুলি-কাবাড়িদের মধ্যেও অহেতুক অসন্তোষ দেখা দিয়াছিল। একদল লোক তাঁহার অনিষ্ট করিবার চেষ্টা করিতেছে তাহাতে সন্দেহ নাই; এরূপ অবস্থায় যাহা মনে করা স্বাভাবিক তাহাই মনে করিয়া মণীশবাবু পুলিস ডাকিয়াছিলেন। অনেক নূতন লোককে বরখাস্ত করিয়াছিলেন। কিন্তু কোনও ফল হয় নাই। শেষ পর্যন্ত গোপনে ব্যোমকেশকে আহ্বান করিয়াছিলেন।

একটি চৈত্রের সন্ধ্যায় আমরা মণীশবাবুর গৃহে উপনীত হইলাম। শহরের অভিজাত অঞ্চলে প্রশস্ত বাগান-ঘেরা দোতলা বাড়ি। মণীশবাবু সবেমাত্র খনি হইতে ফিরিয়াছেন, আমাদের সাদর সম্ভাষণ করিলেন। মণীশবাবুর বয়স আন্দাজ পঞ্চাশ, গৌরবর্ণ সুপুরুষ, এখনও শরীর বেশ সমর্থ আছে। চোয়ালের হাড়ের কঠিনতা দেখিয়া মনে হয় একটু কড়া মেজাজের লোক।

ড্রয়িং-রুমে বসিয়া কিছুক্ষণ কথাবার্তার পর মণীশবাবু বলিলেন, ব্যোমকেশবাবু, এখানে কিন্তু আপনাদের ছদ্মনামে থাকতে হবে। আপনার নাম গগনবাবু, আর অজিতবাবুর নাম সুজিতবাবু। আমার আসল নাম শুনলে সকলেই বুঝতে পারবে আপনার কী উদ্দেশে এসেছে। সেটা বাঞ্ছনীয় নয়।

ব্যোমকেশ হাসিয়া বলিল, বেশ তো, এখানে যতদিন থাকব গগনবাবু সেজেই থাকব। অজিতেরও সুজিত সাজতে আপত্তি নেই।

দ্বারের কাছে একটি যুবক দাঁড়াইয়া অস্বচ্ছন্দভাবে ছট্‌ফট করিতেছিল, বোধহয় ব্যোমকেশের সহিত পরিচিত হইবার জন্য প্রতীক্ষা করিতেছিল। মণীশবাবু ডাকিলেন, ফণী।

যুবক উদগ্ৰীবিভাবে ঘরে প্রবেশ করিল। মণীশবাবু আমাদের দিকে চাহিয়া বলিলেন, আমার ছেলে ফণীশ। —ফণী, তুমি জানো এরা কে, কিন্তু বাড়ির বাইরে আর কেউ যেন জানতে না পারে।

ফণীশ বলিল, আত্তে না।

তুমি এবার এদের গেস্ট-রুমে নিয়ে যাও। দেখো যেন ওঁদের কোনো অসুবিধা না হয়। —আপনারা হাত-মুখ ধুয়ে আসুন, চা তৈরি হচ্ছে।

ড্রয়িং-রুমের লাগাও গেস্ট-রুম। বড় ঘর, দুটি খাট। টেবিল, চেয়ার ইত্যাদি উপযোগী আসবাবে সাজানো, সংলগ্ন বাথরুম। ফণীশ আমাদের ঘরে পৌঁছাইয়া দিয়া দ্বারের কাছে দাঁড়াইয়া রহিল।

ছেলেটিকে বেশ শান্তশিষ্ট এবং ভালমানুষ বলিয়া মনে হয়। বাপের মতই সুপুরুষ, কিন্তু দেহ-মনের পূর্ণ পরিণতি ঘটিতে এখনও বিলম্ব আছে; ভাবভঙ্গীতে একটু ছেলেমানুষীর রেশ রহিয়া গিয়াছে। বয়স আন্দাজ তেইশ-চব্বিশ।

বেশবাস পরিবর্তন করিতে করিতে দুই-চারিটা কথা হইল; ফণীশ লাজুকভাবে ব্যোমকেশের প্রশ্নের উত্তর দিল। সে পিতার একমাত্র সন্তান, এক বছর আগে তাহার বিবাহ হইয়াছে। সে প্রত্যহ পিতার সঙ্গে কয়লাখনিতে গিয়া কাজকর্ম দেখাশুনা করে। লক্ষ্য করিলাম, ব্যোমকেশের কথার উত্তর দিতে দিতে সে যেন একটা অন্য কথা বলিবার চেষ্টা করিতেছে, কিন্তু বলিতে গিয়া সংকোচবশে থামিয়া যাইতেছে।

ফণীশ কী বলিতে চায় শোনা হইল না, আমরা বসিবার ঘরে ফিরিয়া আসিলাম। ইতিমধ্যে চা ও জলখাবার উপস্থিত হইয়াছে; আমরা বসিয়া গেলাম।

চায়ের আসরে কিন্তু মেয়েদের দেখিলাম না, কেবল আমরা চারজন। অথচ বাড়িতে অন্তত দুইটি স্ত্রীলোক নিশ্চয় আছেন। মণীশবাবু বোধকরি পুরাপুরি স্বদেশীবর্জন করেন নাই। তা আজকালকার সাড়ে-বত্রিশ-ভাজার যুগে একটু অন্তরাল থাকা মন্দ কি?

পানাহার শেষ করিয়া সিগারেট ধরাইয়াছি, একটি প্ৰকাণ্ড গাড়ি আসিয়া বাড়ির সামনে থামিল। গাড়ি হইতে অবতরণ করিলেন একটি মধ্যবয়স্ক ব্যক্তি। গেরিলার মত চেহারা, কালিমাবেষ্টিত চোখ দুটিতে মন্থর কুটিলতা। মুখ দেখিয়া চরিত্র অধ্যয়ন যদি সম্ভব হইত বলিতাম লোকটি মহাপাপিষ্ঠ।

মণীশবাবু খুব খাতির করিয়া আগন্তুককে ঘরে আনিলেন, আমাদের সহিত পরিচয় করাইয়া দিলেন, ‘ইনি শ্ৰীগোবিন্দ হালদার, এখানকার একটি কয়লাখনির মালিক। আর এঁরা হচ্ছেন শ্ৰীগগন মিত্র এবং সুজিত বন্দ্যোপাধ্যায়; আমার বন্ধু, কলকাতায় থাকেন। বেড়াতে এসেছেন।

গোবিন্দবাবু তাঁহার শনৈশ্চর চক্ষু দিয়া আমাদের সমীক্ষণ করিতে করিতে মণীশবাবুকে বলিলেন, খবর নিতে এলাম। খনিতে আর কোনো গণ্ডগোল হয়েছে নাকি?

মণীশবাবু গভীর মুখে বলিলেন, গণ্ডগোল তো লেগেই আছে। পরশু রাত্রে এক কাণ্ড। হঠাৎ পাঁচ নম্বর পিটু-এর পাম্প বন্ধ হয়ে গেল। ভাগ্যে পাহারাওয়ালারা সজাগ ছিল তাই বিশেষ অনিষ্ট হয়নি। নইলে—

গোবিন্দবাবু মুখে চুকচুক শব্দ করিলেন। মণীশবাবু বলিলেন, আপনারা তো বেশ আছেন, যত উৎপাত আমার খনিতে। কেন যে হতভাগাদের আমার দিকেই নজর তা বুঝতে পারি না।

গোবিন্দবাবু বলিলেন, আমার খনিতেও মাস ছয়েক আগে গোলমাল শুরু হয়েছিল। আমি জানি পুলিসের দ্বারা কিছু হবে না, আমি সরাসরি চর লাগালাম। আটজন লোককে গুপ্তচর লাগিয়েছিলাম, দিন আষ্টেকের মধ্যে তারা খবর এনে দিল কারা শয়তানি করছে। পাঁচটা লোক ছিল পালের গোদা, তাদের একদিন ধরে এনে আচ্ছা করে পিটিয়ে দিলাম। তাদের বরখাস্ত করতে হল না, নিজে থেকেই পালিয়ে গেল। সেই থেকে সব ঠাণ্ডা আছে।’ বলিয়া তিনি দন্তুর গেরিলা-হাস্য হাসিলেন।

মণীশবাবু বলিলেন, ‘আমিও গুপ্তচর লাগিয়েছিলাম। কিন্তু কিছু হল না। যাকগে—’ তিনি অন্য কথা পাড়িলেন। সাধারণভাবে কথাবার্তা চলিতে লাগিল। গোবিন্দবাবুর জন্য চা-জলখাবার আসিল, তিনি তাহা সেবন করিলেন। তাঁহার চক্ষু দুইটি কিন্তু আমাদের আশেপাশেই ঘুরিতে লাগিল। আমরা নিছক বেড়ানোর উদ্দেশ্যে এখানে আসিয়াছি একথা বোধহয় তিনি বিশ্বাস করেন নাই।

ঘণ্টাখানেক পরে তিনি উঠিলেন। মণীশবাবু তাঁর সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি-বারান্দা পর্যন্ত গেলেন, আমরাও গেলাম। ড্রাইভার মোটরের দরজা খুলিয়া দিল। গোবিন্দবাবু মোটরে উঠিবার উপক্রম করিয়া ব্যোমকেশের দিকে ঘাড় ফিরাইয়া হাসি-হাসি বলিলেন, ‘দেখুন চেষ্টা করে।’

তিনি মোটরে উঠিয়া বসিলেন, মোটর চলিয়া গেল।

মণীশবাবু এবং আমরা কিছুক্ষণ দৃষ্টি-বিনিময় করিলাম, তারপর তিনি বিষণ্ন সুরে বলিলেন, গোবিন্দ হালদার লোকটা ভারি সেয়ানা, ওর চোখে ধুলো দেওয়া সহজ নয়।

রাত্রির খাওয়া-দাওয়া সারিয়া শয়ন করিতে এগারোটা বাজিল। শরীরে ট্রেনের ক্লান্তি ছিল, মাথার উপর পাখা চালাইয়া দিয়া শয়ন করিবার সঙ্গে সঙ্গে গভীর ঘুমে ডুবিয়া গেলাম।

পরদিন যখন ঘুম ভাঙ্গিল তখন বেলা আটটা বাজিয়া গিয়াছে। একজন ভৃত্য জানাইল, বড়কর্তা এবং ছোটকর্তা ভোরবেলা কোলিয়ারিতে চলিয়া গিয়াছেন। আমরা তাড়াতাড়ি প্রাতঃকৃত্য সমাপন করিয়া বাহিরের ঘরে আসিয়া দেখি আমাদের চা ও জলখাবার টেবিলের উপর সাজাইয়া একটি যুবতী দাঁড়াইয়া আছে।

ইতিপূর্বে বাড়ির মেয়েদের দেখি নাই, আমরা একটু থতমত খাইয়া গেলাম। ব্যোমকেশের সুস্মিত সপ্রশ্ন দৃষ্টির উত্তরে মেয়েটি নীচু হইয়া ঈষৎ জড়িতম্বরে বলিল, আমি ইন্দিরা, এবাড়ির বৌ। আপনারা খেতে বসুন।

ফণীশের বৌ। শ্যামবৰ্ণ, অনুদীর্ঘাঙ্গী মেয়ে, মুখখানি তরতরে; বয়স আঠারো-উনিশ। দেখিলেই বোঝা যায় ইন্দিরা লাজুক মেয়ে, অপরিচিত বয়স্থ ব্যক্তির সহিত সহজভাবে আলাপ করার অভ্যাসও তাহার নাই। নেহাত বাড়িতে পুরুষ নাই, তাই বেচারী বাধ্য হইয়া অতিথি সৎকার করিতে আসিয়াছে।

আমরা আহারে বসিলাম। ব্যোমকেশ বলিল, বোসো না, দাঁড়িয়ে রইলে কেন?

ইন্দিরা একটি সোফার কিনারায় বসিল।

ব্যোমকেশ চায়ের পেয়ালায় একটু চুমুক দিয়া গলা ভিজাইয়া লইল, তারপর জলখাবারের রেকাবি টানিয়া লইল, আজ আমাদের উঠতে দেরি হয়ে গেল। কর্তা কি ভোরবেলাই কাজে বেরিয়ে যান?

হ্যাঁ, বাবা সাতটার সময় বেরিয়ে যান।

আর তোমার কর্তা?

ইন্দিরার ঘাড় অমনি নত হইয়া পড়িল। সে চোখ না তুলিয়াই অস্ফুটস্বরে বলিল, ‘উনিও। তারপর জোর করিয়া লজ্জা সরাইয়া বলিল, ‘ওঁরা বারোটার সময় ফিরে খাওয়া-দাওয়া করেন, আবার তিনটের সময় যান।’

ব্যোমকেশ তাহার পানে চাহিয়া মিটমিটি হাসিল, আর কিছু বলিল না। আহার করিতে করিতে আমি ইন্দিরাকে লক্ষ্য করিলাম। সে চুপটি করিয়া বসিয়া আছে এবং মাঝে মাঝে ব্যোমকেশের প্রতি চকিত কটাক্ষপাত করিতেছে। মনে হইল অতিথি সৎকার ছাড়াও অন্য কোনও অভিসন্ধি আছে। ব্যোমকেশ কে তাহা সে জানে, ফণীশ স্ত্রীকে নিশ্চয় বলিয়াছে, তাই ব্যোমকেশকে কিছু বলিতে চায়। সে মনে মনে কিছু সংকল্প করিয়াছে কিন্তু সংকোচবশত বলিতে পারিতেছে না। কাল রাত্রে ফণীশের মুখেও এইরূপ দ্বিধার ভাব দেখিয়ছিলাম।

প্রাতরাশ শেষ করিয়া চায়ের পেয়ালায় শেষ চুমুক দিয়া ব্যোমকেশ রুমালে মুখ মুছিল, তারপর প্ৰসন্নস্বরে বলিল, কি বলবে এবার বল।

আমি ইন্দিরার মুখে সংকল্প ও সংকোচের টানাটানি লক্ষ্য করিতেছিলাম, দেখিলাম সে চমকিয়া উঠিল, বিস্ফোরিত চোখে চাহিয়া নিজের অজ্ঞাতসারেই উঠিয়া দাঁড়াইল। তারপর তাহার সব উদ্বেগ এক নিশ্বাসে বাহির হইয়া আসিল, ব্যোমকেশবাবু, আমার স্বামীকে রক্ষে করুন। তাঁর বড় বিপদ।

বোসো। কি বিপদ তোমার স্বামীর আমাকে বলো।

ইন্দিরা তেরছাভাবে সোফার কিনারায় বসিল, শীর্ণ সংহত স্বরে বলিল, আমি-আমি সব কথা গুছিয়ে বলতে পারব না। আপনি যদি সাহায্য করেন, উনি নিজেই বলবেন।

ব্যোমকেশ প্রশ্ন করিল, খনি সম্বন্ধে কোনো কথা কি?

ইন্দিরা বলিল, না, অন্য কথা। আপনারা বাবাকে যেন কিছু বলবেন না। বাবা কিছু জানেন না।

ব্যোমকেশ শান্ত আশ্বাসের সুরে বলিল, আমি কাউকে কিছু বলব না, তুমি ভয় পেও না।

ওঁকে সাহায্য করবেন?

কি হয়েছে কিছুই জানি না। তবু তোমার স্বামী যদি নির্দোষ হন নিশ্চয় সাহায্য করব।

আমার স্বামী নির্দোষ।

তবে নিৰ্ভয়ে থাকো।

বাড়ির পাশের দিকে বাগানের কিনারায় একসারি ঘর। ইন্দিরার মুখে হাসি ফুটিবার পর আমরা সিগারেট টানিতে টানিতে সেইদিকে গেলাম।

সামনের ঘর হইতে একটি মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক বাহির হইয়া আসিলেন। পরিধানে ফরাসডাঙ্গার ধুতি ও আদ্দির পাঞ্জাবি, ফিটফাট চেহারা। চুলে নিশ্চয় কলপ লাগাইয়া থাকেন, কালো চুলের নীচে শ্বেতবর্ণ অঙ্কুর মাথা তুলিয়াছে।

ব্যোমকেশ বলিল, আমার নাম গগন মিত্র, ইনি সুজিত বন্দ্যোপাধ্যায়। মণীশবাবুর অতিথি।

ভদ্রলোক ব্যস্তসমস্ত হইয়া আমাদের সংবর্ধনা করিলেন, আসুন, আসুন। আপনারা আসবেন কর্তার মুখে শুনেছিলাম। আমি সুরপতি ঘটক, এই অফিসের দেখাশোনা করি।

সুরপতিবাবু আমাদের প্রকৃত নাম জানেন না। ব্যোমকেশ বলিল, এটা বুঝি কয়লাখনির অফিস। আপনি অফিস-মাস্টার।

সুরপতিবাবু বলিলেন, আজ্ঞে। কয়লাখনিতে একটা ছোট অফিস আছে, এটা বড় অফিস। আসুন না দেখবেন।

ঘরগুলি একে একে দেখিলাম। বিভিন্ন ঘরে কেরানিরা খাতাপত্ৰ লইয়া কাজ করিতেছে, টাইপরাইটারের খটখট শব্দ হইতেছে, দর্শনীয় কিছু নাই। ঘুরিয়া ফিরিয়া শেষে আমরা সুরপতিবাবুর অফিসে বসিলাম।

সাধারণভাবে কিছুক্ষণ বাক্যালাপ চালাইবার পর ব্যোমকেশ একটু ইতস্তত করিয়া বলিল, আপনাকে বলি, আমরা দুই বন্ধু মিলে একটা ছােটখাটো কয়লাখনি কেনবার মতলব করেছি। এখানে নয়, অন্য জেলায়। সস্তায় পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু কি করে কয়লাখনি চালাতে হয় আমরা কিছুই জানি না; তাই মণীশবাবুর খনি দেখতে এসেছি। অফিসের কাজ, খনির কাজ, সব বিষয়ে কিছু অভিজ্ঞতা অর্জন করতে চাই।

সুরপতিবাবু মহা উৎসাহে বলিলেন,“নিশ্চয়, নিশ্চয়। এ আর বেশি কথা কি? অফিসের কাজ দুদিনে শিখে যাবেন; আর খনির কাজও এমন কিছু শক্ত নয়। তাছাড়া যদি দরকার হয় আমি আপনাকে খুব ভাল লোক দিতে পারি।

ব্যোমকেশ জিজ্ঞাসা করিল, কি রকম লোক?

সুরপতিবাবু বলিলেন, অফিসের কাজ জানে, কোলিয়ারির কাজ জানে এমন লোক। আমার নিজের হাতে তৈরি করা লোক।

ব্যোমকেশ আগ্রহ দেখাইয়া বলিল, তাই নাকি! তা কাজ-জানা ভাল লোক পেলে আমরা নেব। এ বিষয়ে আপনার সঙ্গে কথা হবে। অফিসের কাজকর্মও দেখব। আমরা এখন কিছুদিন আছি।

অফিস হইতে ফিরিয়া আসিলাম।

বারোটার সময় ফণীশ ও মণীশবাবু খনি হইতে ফিরিলেন। স্নানাহার সারিতে একটা বাজিয়া গেল। তারপর খানিকক্ষণ বিশ্রাম করিয়া আমরা চারজন মোটরে চড়িয়া কয়লাখনিতে চলিলাম।

মস্ত বড় মোটর। ফণীশ চালাইয়া লইয়া চলিল, আমরা তিনজন পিছনে বসিলাম।

মোটর শহর ছাড়াইয়া নির্জন রাস্তা ধরিল। মাইল তিনেক দূরে কয়লাখনি। ব্যোমকেশ বলিল, সকলে সুরপতিবাবুর সঙ্গে আলাপ হল। উনি কতদিন আপনার কাজ করছেন?

মণীশবাবু বলিলেন, প্রায় কুড়ি বছর। পাকা লোক।

ব্যোমকেশ কহিল, ওঁকে বলেছি আমরা একটা কয়লাখনি কিনব। তাই খোঁজ খবর নিতে এসেছি। আমাদের সত্যিকার পরিচয় দিইনি।

মণীশবাবু বলিলেন, ভালই করেছেন। সুরপতি অবশ্য বিশ্বাসী লোক, দোষের মধ্যে বছর দুই আগে দ্বিতীয় পক্ষে বিবাহ করেছে।

সুরপতিবাবুর চুলের কলপ এবং শৌখিন জাম-কাপড়ের অর্থ পাওয়া গেল। প্রৌঢ় বয়সে তরুণী ভাৰ্য্যর চোখে যৌবনের বিভ্ৰম সৃষ্টি করার চেষ্টা স্বাভাবিক।

কিছুক্ষণ নীরবে কাটিবার পর ব্যোমকেশ প্রশ্ন করিল, সম্প্রতি কেউ আপনার খনি কেনবার প্ৰস্তাব করেছিল?

মণীশবাবু বলিলেন, সম্প্রতি নয়, কয়েক বছর আগে। একজন মাড়োয়ারী। ভাল দাম দিতে চেয়েছিল, আমি বেচিনি।

ব্যোমকেশ দ্বিতীয় প্রশ্ন করিল, এখানে অন্য যেসব খনির মালিক আছেন তাঁদের সঙ্গে আপনার সদ্ভাব আছে?

মণীশবাবু বলিলেন, গাঢ় প্রণয় আছে এমন কথা বলতে পারি না, তবে মুখোমুখি ঝগড়া কারুর সঙ্গে নেই।

এমন কেউ আছেন যিনি বাইরে ভদ্রতার মুখোশ পরে ভিতরে ভিতরে আপনার অনিষ্ট চিন্তা করছেন?

থাকতে পারে, কিন্তু তাকে চিনিব কি করে?

তা বটে। কাল রাত্রে যিনি এসেছিলেন-গোবিন্দ হালদার-তিনি কি রকম লোক?

মণীশবাবু চিন্তা-মন্থর কণ্ঠে বলিলেন, গোবিন্দ হালদারকে চেনা শক্ত। পাঁকাল মাছের মত চরিত্র, ধরা-ছোঁয়া যায় না। তবে গোবিন্দবাবুর ছোট ভাই এবং অংশীদার অরবিন্দ অতি বদ লোক। মাতাল, জুয়াড়ী, দুশ্চরিত্র। বছর কয়েক আগে স্ত্রীটা আত্মহত্যা করে জ্বালা জুড়িয়েছে। তারপর থেকে অরবিন্দ একেবারে নামকাটা সেপাই হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আর কোনও কথা হইল না, আমরা কয়লাখনির এলাকায় প্ৰবেশ করিলাম। কয়লাখনির বিস্তারিত বর্ণনা দিবার ইচ্ছা নাই। যাঁহারা স্বচক্ষে কয়লাখনি দেখেন নাই তাঁহারা নিশ্চয় রঙ্গমঞ্চে বা চিত্রপটে দেখিয়াছেন, এমন কিছু নয়নাভিরাম দৃশ্য নয়। বিশেষত এই কাহিনীতে কয়লাখনির স্থান খুবই অল্প; কয়লাখনিকে এই কাহিনীর কালো পশ্চাৎপট বলাই সঙ্গত। পশ্চাৎপট না থাকিলে কাহিনী উলঙ্গ হইয়া পড়ে, তাই রাখিতে হইয়াছে।

কয়লা! যাহার জোরে যন্ত্ৰ চলিতেছে তাহাকে যন্ত্রের সাহায্যে মৃত্তিকার গভীর গর্ভ হইতে টানিয়া আনা হইতেছে; সভ্যতার চাকা ঘুরিতেছে। নমো যন্ত্র। তব খনি-খনিত্ৰ নখ-বিদীর্ণ ক্ষিতি বিকীর্ণ অস্ত্ৰ! নমো যন্ত্র। অলমিতি।

খনির ম্যানেজার তারাপদবাবুর সঙ্গে পরিচয় হইল। বয়স্ক লোক, খনির সীমানার মধ্যে তাঁহার বাসস্থান; রাশভারী জবরদস্ত লোক বলিয়া মনে হয়। তিনি আমাদের লইয়া খনির বিভিন্ন অংশের কার্যকলাপ দেখাইলেন। খনির গর্ভে অবতরণ করিবার প্রস্তাবও করিয়াছিলেন, কিন্তু আমরা রাজী হইলাম না। সীতা পাতাল প্রবেশ করিয়াছিলেন তাহার যথেষ্ট কারণ ছিল; আমাদের সেরূপ কোনও কারণ নাই।

অপরাহ্ণে আমরা তারাপদবাবুর অফিসে চা খাইলাম। সেখানে খনির ডাক্তার যতীন্দ্র ঘোষ ও অন্যান্য উচ্চ কর্মচারীদের সঙ্গে দেখা হইল। কাজের কথা কিছু হইল না, সাধারণভাবে আলাপ-আলোচনা চলিতে লাগিল। বলা বাহুল্য, আমরা ছদ্মনামেই রহিলাম। এক সময় লক্ষ্য করিলাম ব্যোমকেশ ডাক্তার ঘোষের সঙ্গে বেশ ভাব জমাইয়া ফেলিয়াছে, ঘরের এক কোণে বসিয়া নিবিষ্ট মনে তাঁহার সহিত গল্প করিতেছে। ডাক্তার ঘোষ আমাদের সমবয়স্ক, তিনিও খনিতেই ডাক্তারখানা ও হাসপাতাল লইয়া থাকেন। তাঁহার কোট-প্যান্টুলুন-পরা চেহারায় জীবন-ক্লান্তির একটু আভাস পাওয়া যায়।

তারপর সন্ধ্যা হইলে আমরা আবার মোটরে চড়িয়া বাড়ির দিকে যাত্ৰা করিলাম।

রাত্রে আহারাদির পর মণীশবাবু উপরে শয়ন করিতে গেলেন, আমরা নিজের ঘরে আসিলাম। ফণীশ আমাদের সঙ্গে আসিল।

ব্যোমকেশ পাখা চালাইয়া দিয়া নিজের শয্যায় লম্বা হইল, সিগারেট ধরাইয়া ফণীশকে বলিল, বোসো। কী কাণ্ড বাধিয়েছ? বীেমাকে এত উদ্বিগ্ন করে তুলেছ কেন?

ফণীশ চেয়ারে বসিয়া হাত কচুলাইতে লাগিল, তারপর কুষ্ঠিত স্বরে বলিল, ইন্দিরাকে রাজী করিয়েছিলাম। আপনাকে বলতে, নিজে বলতে সাহস হয়নি—

কিন্তু কথাটা কী? তোমাদের ভাবগতিক দেখে মনে হচ্ছে ভারি গুরুতর ব্যাপার।

আজ্ঞে হ্যাঁ, গুরুতর ব্যাপার। একটা খুনের মামলায় জড়িয়ে পড়েছি ঘটনাচক্ৰে। বাবা যদি জানতে পারেন—

ব্যোমকেশ বিছানায় উঠিয়া বসিল, খুনের মামলা।

ফণীশ শীর্ণকণ্ঠে বলিল, আজ্ঞে, বিশ্ৰী ব্যাপার। পুলিস তদন্ত শুরু করেছে, তারা জানতে পেরেছে যে আমরা—

কি হয়েছিল সব কথা গুছিয়ে বল।

ফণীশ অবশ্য সব কথা গুছাইয়া বলিতে পারিল না। তাহার জট-পাকানো কাহিনীকে আমি যথাসম্ভব সিধা করিয়া লিখিতেছি।—

এই শহরে একটি ক্লাব আছে। কৌতুকবশে তাহার নামকরণ হইয়াছে-কয়লা ক্লাব। ক্লাবের চাঁদার হার খুব উঁচু, তাই বড় মানুষ ছাড়া অন্য কেহ ইহার সভ্য হইতে পারে না। ফণীশ এই ক্লাবের সভ্য। আরও অনেক গণ্যমান্য সভ্য আছে; তন্মধ্যে উলুডাঙ্গা কয়লাখনির মালিক মৃগেন্দ্ৰ মৌলিক, ধুবিপোতা খনির মধুময় সুর এবং শিমুলিয়া খনির অরবিন্দ ও গোবিন্দ হালদার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

ক্লাবে অপরাহ্ণে টেনিস খেলা, ব্যাডমিণ্টন খেলা হয়; সন্ধ্যার পর বিলিয়ার্ড, পিংপং, তাস-পাশা চলে। বাজি রাখিয়া তাস খেলা হয়। কিন্তু ক্লাবের নিয়মানুযায়ী বেশি টাকা বাজি রাখা যায় না; তাই যাহাদের রক্তে জুয়ার নেশা আছে তাহাদের মন ভরে না। অরবিন্দ হালদার এই অতৃপ্ত ব্যক্তিদের মধ্যে একজন। কিন্তু উপায় কি? শহরে ভদ্রভাবে জুয়া খেলার অন্য কোনও আস্তানা নাই।

বছরখানেক আগে এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক ক্লাবের সভ্য হইয়াছিলেন। পয়সাওয়ালা লোক, মহাজনী কারবার খুলিয়াছিলেন, শহরে নবাগত। বাজার অঞ্চলে একটি ক্ষুদ্র অফিস আছে, কিন্তু থাকেন শহরের বাহিরে নির্জন রাস্তার ধারে এক বাড়িতে। শকুনি-মার্কা চেহারা, নাম প্রাণহরি পোদ্দার।

পোদ্দার মহাশয় ক্লাবে আসিয়া বসিয়া থাকেন। তাঁহার সমবয়স্ক বৃদ্ধ ক্লাবে কেহ নাই, বেশির ভাগই ছেলে-ছোকরা, দুচারজন মধ্যবয়স্ক আছেন। ক্রমে দু’একজনের সঙ্গে পরিচয় হইল। কিন্তু বয়সের পার্থক্যবশত কাহারও সহিত বিশেষ ঘনিষ্ঠত হইল না।

ফণীশ, মৃগেন মৌলিক, মধুময় সুর এবং অরবিন্দ হালদার এই চারজন মিলিয়া ক্লাবে একটি গোষ্ঠী রচনা করিয়াছিল। ফণীশ ছিল এই চারজনের মধ্যে সবচেয়ে বয়সে ছোট, আর অরবিন্দ হলুদ ছিল সবচেয়ে বয়সে বড়। তাহার বয়স আন্দাজ পয়ত্ৰিশ; দলের মধ্যে সে-ই ছিল অগ্রণী।

একদিন সন্ধ্যার পর ইহারা ক্লাবের একটা ঘরে বসিয়া ব্রিজ খেলিতেছিল, পোদ্দার মহাশয় আসিয়া তাহাদের খেলা দেখিতে লাগিলেন। টেবিলের চারিপাশে ঘুরিয়া ঘুরিয়া কে কেমন হাত পাইয়াছে দেখিলেন। অরবিন্দ অলসকণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিল, আপনি কন্ট্রাক্ট ব্রিজ জানেন?

বৃদ্ধ একটু হাসিয়া বলিলেন, জানি।

খেলবেন?

খেলিব। কি রকম বাজি?

এক টাকা পয়েণ্ট। চলবে?

চলবে।

যে রাবার খেলা হইতেছিল তাহা শেষ হইলে তাস কাটিয়া খেলোয়াড়দের মধ্যে একজন বাহির হইয়া গেল। প্ৰাণহরি পোদ্দার খেলিতে বসিলেন।

দেখা গেল পোদ্দার মহাশয় অতি নিপুণ খেলোয়াড়। কিন্তু সেদিন তাঁহার ভাগ্য সুপ্ৰসন্ন ছিল না, ভাল হাত পাইলেন না। খেলার শেষে হিসাব করিয়া দেখা গেল। তিনি একুশ টাকা হরিয়াছেন। তিনি টাকা শোধ করিয়া দিলেন।

তারপর হইতে প্ৰাণহারিবাবু প্ৰায় প্রত্যহই ফণীশদের দলে খেলিতে বসেন। কখনও হারেন, কখনও জেতেন; সকল অবস্থাতেই তিনি নির্বিকার। এইভাবে তিনি ফণীশদের দলের অন্তর্ভুক্ত হইয়া গেলেন।

কয়েকমাস এইভাবে কাটিল।

গত ফাল্গুন মাসে একদিন খেলিতে বসিয়া প্ৰাণহারিবাবু বলিলেন, আপনারা ব্রিজ ছাড়া অন্য কোনো খেলা খেলেন না?

মধুময় সুর প্রশ্ন করিল, কি রকম খেলা?

প্ৰাণহরি বলিলেন, এই ধরুন, পোকার কিংবা রানিং ফ্লাশ।

মৃগেন মৌলিক বলিল, আমরা সব খেলাই খেলতে জানি। কিন্তু ক্লাবে জুয়া খেলার নিয়ম নেই। ব্রিজ তো আর জুয়া নয়, ‘game of skill.’ বলিয়া নাকের মধ্যে ব্যঙ্গ-হাস্য করিল।

প্রাণহরি তখন কিছু বলিলেন না। খেলা শেষ হইলে বলিলেন, একদিন আসুন না। আমার বাসায়, নতুন খেলা খেলবেন।

কাহারও আপত্তি হইল না। অরবিন্দ বলিল, মন্দ কি। আপনি কোথায় থাকেন?

প্রাণহরি বলিলেন, শহরের বাইরে উলুডাঙা খনির রাস্তায় আমার বাসা। একলা থাকি, আপনারা যদি আসেন বেশ জমজমাট হবে। কালই আসুন না।

সকলে রাজী হইল। প্ৰাণহারি ট্যাক্সি ধরিয়া চলিয়া গেলেন। তাঁহার নিজের গাড়ি নাই, ট্যাক্সির সহিত বাঁধা ব্যবস্থা আছে, ট্যাক্সিতেই যাতায়াত করেন।

পরদিন সন্ধ্যার পর চারজন অরবিন্দের মোটরে চড়িয়া প্রাণহোরর গৃহে উপস্থিত হইল। শহরের সীমানা হইতে মাইল দেড়েক দূরে নির্জন রাস্তার উপর দােতলা বাড়ি, আশেপাশে দু-তিনশত গজের মধ্যে অন্য বাড়ি নাই।

প্ৰাণহারিবাবু পরম সমাদরের সহিত তাহাদের অভ্যর্থনা করিলেন, নীচের তলার একটি সুসজ্জিত ঘরে লইয়া গিয়া বসাইলেন। কিছুক্ষণ সাধারণভাবে বাক্যালাপ হইল। প্রাণহারিবাবু বিপত্নীক ও নিঃসন্তান; পূর্বে তিনি উড়িষ্যার কটক শহরে থাকিতেন। কিন্তু সেখানে মন টিকিল না। তাই এখানে চলিয়া আসিয়াছেন। সঙ্গে একটি দাসী আছে, সেই তাঁহার রন্ধন ও পরিচর্যা করে।

এই সময় দাসী চায়ের ট্রে হাতে লইয়া প্ৰবেশ করিল, ট্রে টেবিলের উপর নামাইয়া রাখিয়া চলিয়া গেল, আবার এক থালা কাটলেট লইয়া ফিরিয়া আসিল। দিব্য-গঠন যুবতী। বয়স কুড়ি-বাইশ; রং ময়লা, কিন্তু মুখখানি সুন্দর, হরিণের মত চোখ দুটিতে কুহক ভরা। দেখিলে ঝি-চাকরানী শ্রেণীর মেয়ে বলিয়া মনে হয় না। সে অতিথিদের মধ্যে কাহারও কাহারও মনে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করিয়া চলিয়া গেল।

গরম গরম কাটলেট সহযোগে চা পান করিতে করিতে অরবিন্দ বলিল, খাসা কাটলেট ভেজেছে। এটি আপনার ঝি?

প্রাণহারিবাবু বলিলেন, হ্যাঁ। মোহিনীকে উড়িষ্যা থেকে এনেছি। রান্না ভাল করে।

পানাহারের পর খেলা বসিল। সর্বসম্মতিক্রমে তিন তাসের খেলা রানিং ফ্লাশ আরম্ভ হইল। সকলেই বেশি করিয়া টাকা আনিয়াছিল, প্রাণহরিবাবু পাঁচশো টাকা লইয়া দেখিতে বসিলেন।

দুই ঘণ্টা খেলা হইল। বেশি হার-জিত কিন্তু হইল না; কেহ পঞ্চাশ টাকা জিতিল, কেহ। একশো টাকা হারিল। প্রাণহারিবাবু মোটের উপর হারিয়া রহিলেন। স্থির হইল তিন দিন পরে আবার এখানে খেলা বসিবে।

ফণীশের মনে কিন্তু সুখ নাই। সে তাঁস খেলিতে ভালবাসে বটে, কিন্তু জুয়াড়ী নয়। তাহার মাথার উপর কড়া প্রকৃতির বাপ আছেন, টাকাকড়ি সম্বন্ধে সে সম্পূর্ণ স্বাধীন নয়। দলে পড়িয়া তাহাকে এই জুয়ার ব্যাপারে জড়াইয়া পড়িতে হইয়াছে, কিন্তু দল ছাড়িবার চেষ্টা করিলে তাহাকে হাস্যাম্পদ হইতে হইবে। ফণীশ নিতান্ত অনিচ্ছাভরে জুয়ার দলে সংযুক্ত হইয়া রহিল।

দ্বিতীয় দিন খেলা খুব জমিয়া গেল। মোহিনী মুগীর ফ্রাই তৈরি করিয়াছিল। চা সহযোগে তাহাই খাইতে খাইতে খেলা আরম্ভ হইল; তারপর মধ্যপথে প্ৰাণহারিবাবু বিলাতি হুইস্কির একটি বোতল বাহির করিলেন। ফণীশের মদ সহ্য হয় না, খাইলেই বমি আসে, সে খাইল না। অন্য সকলে খাইল। অরবিন্দ সবচেয়ে বেশি খাইল। খেলার বাজি উত্তরোত্তর চড়িতে লাগিল। সকলেই উত্তেজিত, কেবল প্রাণহারিবাবু নির্বিকার।

খেলার শেষে হিসাব হইল; অরবিন্দ প্রায় হাজার টাকা জিতিয়াছে, আর সকলে হারিয়াছে। প্রাণহারিবাবু দুইশত টাকা জিতিয়াছেন।

অতঃপর প্রতি হগুপ্তায় একদিন-দুইদিন খেলা বসে। খেলায় কোনও দিন একজন হারে, কোনও দিন অন্য কেহ হারে, বাকি সকলে জেতে। প্রাণহারিবাবু কোনও দিনই বেশি হারেন না, মোটের উপর লাভ থাকে।

খেলার সঙ্গে সঙ্গে আর একটি পার্শ্বাভিনয় আরম্ভ হইয়াছিল; তাহা মোহিনীকে লইয়া। মধুময় এবং মৃগেন্দ্ৰ হয়তো ভিতরে ভিতরে মোহিনীর প্রতি আকৃষ্ট হইয়াছিল, কিন্তু অরবিন্দ একেবারে নির্লজ্জভাবে তাহার পিছনে লাগিল। খেলার দিন সে সকলের আগে প্ৰাণহারিবাবুর বাড়িতে যাইত এবং রান্নাঘরের দ্বারের কাছে দাঁড়াইয়া মোহিনীর সহিত রসালাপ করিত। এমন কি দিনের বেলা প্রাণহরিবাবুর অনুপস্থিতি কালে সে তাঁহার বাড়িতে যাইত এরূপ অনুমানও করা যাইতে পারে। মোহিনীর সহিত অরবিন্দের ঘনিষ্ঠতা কতদূর হইয়াছিল। বলা যায় না, তবে মোহিনী যে স্তরের মেয়ে তাহাতে সে বড়মানুষের কৃপাদৃষ্টি উপেক্ষা করিবে এরূপ মনে করিবার কারণ নাই।

যাহোক, এইভাবে পাঁচ-ছয় হপ্তা কাটিল। ফণীশের মনে শান্তি নাই, সে বন্ধুদের এড়াইবার চেষ্টা করে। কিন্তু এড়াইতে পারে না; অরবিন্দ তাহাকে ধরিয়া লইয়া যায়। তারপর একদিন সকলের জ্ঞানচক্ষু উল্মীলিত হইল। তাহারা জানিতে পারিল প্রাণহরিবাবু পাকা জুয়াচোর, তাক সুপ্রিয় মৃত সাফাই করেন। খুব খানিকটা বচসা হইল, তারপর অতিথিরা খেলা ছাড়িয়া চলিয়া আসিল।

হিসাবে জানা গেল অতিথিরা প্রত্যেকেই তিন-চার হাজার টাকা হারিয়াছে এবং সব টাকাই প্ৰাণহরির গর্ভে গিয়াছে। সবচেয়ে বেশি হারিয়াছে অরবিন্দ; প্রায় পাঁচ হাজার টাকা।

অরবিন্দ ক্লাবে বসিয়া আফসাইতে লাগিল, ‘আসুক না হাড়গিলে বুড়ো, ঠেঙিয়ে হাড় গুড়ো করব।’ মধুময়, মৃগেন্দ্র মুখে কিছু বলিল না, কিন্তু তাহাদের ভাবভঙ্গী দেখিয়া মনে হইল। প্ৰাণহারিকে হাতে পাইলে তাহারাও ছাড়িয়া দিবে না।

প্রাণহারিবাবু কিন্তু হুঁশিয়ার লোক, তিনি আর ক্লাবে মাথা গলাইলেন না। দিন সাতেক পরে অরবিন্দ বলিল, ‘ব্যাটা গা-ঢাকা দিয়েছে। চল, ওর বাড়িতে গিয়ে উত্তম-মধ্যম দিয়ে আসি।’

ফণীশ আপত্তি করিল, কি দরকার। টাকা যা যাবার সে তো গেছেই—

অরবিন্দ বলিল, টাকা আমাদের হাতের ময়লা। কিন্তু ব্যাটা ঠকিয়ে দিয়ে যাবে? তুমি কি বলে মৃগেন?

মৃগেন বলিল, শিক্ষা দেওয়া দরকার।

মধুময় বলিল, ওর বাড়িতে একটা মেয়েলোক ছাড়া আর কেউ থাকে না, ভয়ের কিছু নেই।

একটা ট্যাক্সি ভাড়া করিয়া প্ৰাণহারির বাড়ির দিকে চলিল। নিজেদের মোটরে যাওয়া বাঞ্ছনীয় নয়; ঐ রাস্তাটা নির্জন হইলেও, রাত্রিকালে উলুডাঙা কোলিয়ারি হইতে বহু যানবাহন যাতায়াত করে। তাহারা প্ৰাণহারির বাড়ির কাছে চেনা মোটর দেখিতে পাইবে; তাছাড়া অভিযাত্রীদের মোটর-চালকেরা মুক-বধির নয়, তাহারা গল্প করিবে। কাহাকেও উত্তম-মধ্যম দিতে হইলে সাক্ষীসাবুদ যথাসম্ভব কম থাকিলেই ভাল।

প্রাণহরির বাড়ি হইতে একশো গজ দূরে ট্যাক্সি থামাইয়া চারজনে অবতরণ করিল। রাস্তা নিরালোক, মধুময়ের হাতে একটা বড় বৈদ্যুতিক টর্চ ছিল, তাহাই মাঝে মাঝে জ্বালিয়া জ্বালিয়া তাহারা বাড়ির দিকে অগ্রসর হইল, ট্যাক্সি-ড্রাইভারকে গাড়ি ঘুরাইয়া অপেক্ষা করিতে বলিয়া গেল।

দ্বিতলের ঘরে আলো জ্বলিতেছে। নীচে সদর দরজা খোলা। রান্নাঘর হইতে ছ্যাঁক-ছোঁক শব্দ আসিতেছে, মোহিনী রান্না করিতেছে। সকলে শিকারীর মত নিঃশব্দে প্ৰবেশ করিল।

সদরে একটা লম্বা গোছের ঘর, তাহার বাঁ পাশ দিয়া দোতলায় উঠিবার সিঁড়ি। এইখানে দাঁড়াইয়া চারজনে নিম্নস্বরে পরামর্শ করিল, তারপর অরবিন্দ মধুময়ের হাত হইতে টর্চ লইয়া পা টিপিয়া টিপিয়া উপরে উঠিয়া গেল। কিছুক্ষণ পরে ফিরিয়া আসিয়া বলিল, সিঁড়ির মাথায় দরজা আছে, মজবুত দরজা। ভিতর থেকে বন্ধ কি বাইরে থেকে বন্ধ বোঝা গেল না। ইয়েল-লক লাগানো।

আমরা পরামর্শ করিয়া স্থির হইল, নীচের তলাটা ভাল করিয়া খুঁজিয়া দেখা দরকার। বুড়ো ভারি ধূর্ত হয়তো উপরের ঘরে আলো জ্বালিয়া নীচে অন্ধকারে কোথাও লুকাইয়া আছে। অরবিন্দ রান্নাঘরের দ্বারে উঁকি মারিয়া আসিল, সেখানে মোহিনী দ্বারের দিকে পিছন ফিরিয়া একা রান্না করিতেছে, অন্য কেহ নাই।

অতঃপর চারজন পৃথকভাবে বাড়ির ঘরগুলি ও পিছনের খোলা জমি তল্লাশ করিতে বাহির হইল।

পনেরো মিনিট পরে সকলে সিঁড়ির নীচে ফিরিয়া আসিল। কেহই প্রাণহারিকে খুঁজিয়া পায় নাই। সুতরাং বুড়ো নিশ্চয় উপরেই আছে। অরবিন্দ বলিল, চল, আর একবার দোর ঠেলে দেখা যাক।

এবার চারজনেই সিঁড়ি দিয়া উপরে উঠিল। বন্ধ কপাটে চাপ দিতেই কপাট খুলিয়া গেল। ঘরের ভিতর আলো জ্বলিতেছে। ঘরের মাঝখানে মেঝের উপর প্রাণহরি পোদ্দার কাত হইয়া পড়িয়া আছেন। তাঁহার বিরলকেশ মাথার ডান পাশে লম্বা রক্তাক্ত একটা দাগ, তিনি যেন মাথার ডান দিকে সিঁথি কাটিয়া সিঁথির উপর সিঁদুর পরিয়াছেন। মুখ বিকৃত, দন্ত নিষ্ক্রান্ত; প্রাণহারি অন্তিম শয্যায় শয়ন করিয়া দর্শকদের উদ্দেশ্যে ভেংচি কাটিতেছেন।

ক্ষণকাল স্তম্ভিত থাকিয়া চারজনে হুড়মুড় করিয়া সিঁড়ি দিয়া নামিয়া আসিল। তারপর একেবারে রাস্তায়।

ট্যাক্সির কাছে গিয়া দেখিল ট্যাক্সি-ড্রাইভার স্টীয়ারিং হুইলের উপর মাথা রাখিয়া ঘুমাইতেছে। সকলে ঠোঁটের উপর আঙুল রাখিয়া পরস্পরকে সাবধান করিয়া দিল, তারপর গাড়িতে উঠিয়া বসিল। ড্রাইভার জাগিয়া উঠিয়া গাড়ি চালাইয়া দিল।

চারজনে যখন ক্লাবে ফিরিল তখন মাত্ৰ নটা বাজিয়াছে। তাহারা একান্তে বসিয়া পরমার্শ করিল, কাহাকেও কিছু বলিবার প্রয়োজন নাই। প্রাণহরিরর অপঘাত মৃত্যুর সংবাদ অবশ্য প্রকাশ পাইবে, কিন্তু তাহারা চারজন যে প্রাণহারির বাড়িতে গিয়াছিল তাহার কোনও প্রমাণ নাই। ট্যাক্সি-ড্রাইভারটা একশো গজ দূরে ছিল। সে তাঁহাদের প্রাণহরির বাড়িতে প্রবেশ করিতে দেখে নাই। সুতরাং অভিযানের কথা বেবাক চাপিয়া যাওয়াই বুদ্ধির কাজ।

সেদিন সাড়ে দশটা পর্যন্ত ক্লাবে তাস খেলিয়া তাহারা গৃহে ফিরিল। যেন কিছুই হয় নাই।

পরদিন প্রাণহারির মৃত্যু-সংবাদ শহরে রাষ্ট্র হইল বটে, কিন্তু ইহাদের চারজনের নাম হত্যার সহিত জড়িত হইল না। তৃতীয় দিন পুলিস অরবিন্দের বাড়িতে হানা দিল। পুলিস কেমন করিয়া জানিতে পারিয়াছে।

কিন্তু ইহারা চারজনই শহরের মহাপরাক্রান্ত ব্যক্তি, তাই এখনও কাহারও হাতে দড়ি পড়ে নাই। বাহিরেও জানাজানি হয় নাই। পুলিস জোর তদন্ত চালাইয়াছে, সকলকেই একবার করিয়া ছুঁইয়া গিয়াছে। কখন কী ঘটে বলা যায় না। ফণীশের অবস্থা শোচনীয়। একদিকে খুনের দায়, অন্যদিকে কড়া-প্রকৃতি পিতৃদেব যদি জানিতে পারেন সে জুয়া খেলিতেছে এবং খুনের মামলায় জড়াইয়া পড়িয়াছে তাহা হইলে তিনি যে কী করবেন ইত্যাদি ইত্যাদি।

ফণীশের কাহিনী শেষ হইতে বারোটা বাজিয়া গেল। তাহাকে আশ্বাস দিয়া ব্যোমকেশ বলিল, বৌমাকে বোলো ভাবনার কিছু নেই, আমি সত্য উদঘাটনের ভার নিলাম। কাল আমরা শহরে বেড়াতে যাব, একটা গাড়ি চাই।

ফণীশ বলিল, ড্রাইভারকে বলে দেব ছোট গাড়িটা আপনাদের জন্যেই মোতায়েন থাকবে।

ফণীশ চলিয়া গেল। আমরা আলো নিভাইয়া শয়ন করিলাম। নিজের খাটে শুইয়া ব্যোমকেশ সিগারেট ধরাইল, মৃদুমন্দ টানিতে লাগিল।

জিজ্ঞাসা করিলাম, কি বুঝলে?

ব্যোমকেশ বলিল, পাঁচজন আসামীর মধ্যে মাত্র একজনকে দেখেছি। বাকি চারজনকে না। দেখা পর্যন্ত কিছু বলা শক্ত।

পাঁচজন আসামী!

হাঁ। চাকরানীটাকে বাদ দেওয়া যায় না।

আর কথা হইল না। প্ৰাণহরি পোদ্দারের জীবন-লীলার বিচিত্র পরিসমাপ্তির কথা ভাবিতে ভাবিতে ঘুমাইয়া পড়িলাম।

সকালে ঘুম ভাঙিয়া দেখি ব্যোমকেশ টেবিলে বসিয়া পরম মনোযোগের সহিত চিঠি লিখিতেছে। গা ঝাড়া দিয়া উঠিয়া বসিলাম, আড়মোড়া ভাঙিয়া বলিলাম, কাকে চিঠি লিখছ? সত্যবতীকে? দুদিন যেতে না যেতেই বিরহ চাগাড় দিল নাকি?

ব্যোমকেশ লিখিতে লিখিতে বলিল, বিরহ নয়-বিকাশ।

বিকাশ।

বিকাশ দত্ত।

ও-বিকাশ। তাকে চিঠি লিখছ কেন?

বিকাশের জন্যে একটা চাকরি যোগাড় করেছি। কয়লাখনির ডাক্তারখানায় আর্দালির চাকরি। তাই তাকে আসতে লিখছি।

বুঝেছি।

ব্যোমকেশ আবার চিঠি লেখায় মন দিল। সে বিকাশকে আনিয়া কয়লাখনিতে বসাইতে চায়, নিজে দূরে থাকিয়া কয়লাখনির তত্ত্ব সংগ্ৰহ করিবে। আপনি রইলেন ডরপানিতে পোলারে পাঠাইলেন চর।

প্রাতরাশের সময় লক্ষ্য করিলাম আজ ইন্দিরার মুখ অনেকটা প্ৰফুল্ল; দ্বিধা সংশয়ের মেঘ ফুড়িয়া সূর্যের আলো ঝিকমিক করিতেছে। ফণীশ তাহাকে বোমকেশের আশ্বাসের কথা বলিয়াছে।

আজও আমরা দুজনে প্রাতরাশ গ্রহণ করিতেছি, দুই কর্তা বহু পূর্বেই কর্মস্থলে চলিয়া গিয়াছেন। ব্যোমকেশ টোস্ট চিবাইতে চিবাইতে ইন্দিরার প্রতি কটাক্ষপাত করিয়া বলিল, তোমার কতটি একেবারে ছেলেমানুষ।

ইন্দিরা লজ্জিতভাবে চক্ষু নত করিল; তারপর তাহার চোখে আবার উদ্বেগ ও শঙ্কা ফিরিয়া আসিল। এই মেয়েটির মনে স্বামী সম্বন্ধে আশঙ্কার অন্ত নাই; ব্যোমকেশ তাহাকে ভরসা দিয়া বলিল, ভাবনা নেই, সব ঠিক হয়ে যাবে। আমরা এখন বেরুচ্ছি।

ইন্দিরা চোখ তুলিয়া বলিল, কোথায় যাবেন?

ব্যোমকেশ বলিল, এই এদিক ওদিক। ফিরতে বোধ হয় দুপুর হবে। কর্তা যদি জিগ্যোস করেন, বোলো শহর দেখতে বেরিয়েছি।

যাহার শেষ হইলে আমরা উঠিলাম। মোটর-ড্রাইভার আসিয়া জানাইল, দুয়ারে প্রস্তুত গাড়ি।

গাড়িতে উঠিয়া ব্যোমকেশ ড্রাইভারকে হুকুম দিল.আগে পোস্ট-অফিসে চল।

পোস্ট-অফিসে গিয়া চিঠিখানাতে এক্সপ্রেস ডেলিভারি টিকিট সাঁটিয়া ডাকে দিল, তারপর ফিরিয়া আসিয়া ড্রাইভারকে বলিল, এবার থানায় চল। সদর থানা।

থানার সিংহদ্বারে কনস্টেবলের পাহারা। ব্যোমকেশ বড় দারোগীবাবুর সাক্ষাৎ প্রার্থনা করিলে সে একখণ্ড কাগজ বাহির করিয়া বলিল, নাম আর দরকার লিখে দিন-এত্তালা পাঠাচ্ছি।

ব্যোমকেশ কাগজে লিখিল, গগন মিত্র। মণীশ চক্রবর্তীর কয়লাখনি সম্পর্কে।

অল্পক্ষণ পরে কনস্টেবল ফিরিয়া আসিয়া বলিল, আসুন।

প্রবেশ করিলে মুখ তুলিলেন, তারপর লাফাইয়া আসিয়া ব্যোমকেশের হাত চাপিয়া ধরিয়া বলিলেন, এ কি কাণ্ড! আপনি গগন মিত্র হলেন কবে থেকে।

গলার স্বর শুনিয়া চিনিতে পারিলাম—প্ৰমোদ বরাট। কয়েক বছর আগে গোলাপ কলোনী ঘুরিতে এই শহরের সদর থানার দারোগীবাবু হইয়া আসিয়াছেন। নিকষকৃষ্ণ চেহারা এই কয় বছরে একটু ভারী হইয়াছে; মুখের ধার কিন্তু লেশমাত্র ভোঁতা হয় নাই।

সমাদর করিয়া আমাদের বসাইলেন। কিছুক্ষণ অতীত-চর্বণ চলিল, তারপর ব্যোমকেশ আমাদের এই শহরে আসার কারণ বলির। শুনিয়া প্রমোদবাবু বলিলেন, হুঁ, ফুলছুরি কয়লাখনির কেসটা আমাদের ফাইলে আছে, কিন্তু কিছু করা গেল না। এসব কাজ পুলিসের দ্বারা ভাল হয় না; আমাদের অনেক লোক নিয়ে কাজ করতে হয়, মন্ত্রগুপ্তি থাকে না। আপনি পারবেন।

ব্যোমকেশ বলিল, বিকাশ দত্তকে মনে আছে? তাকে ডেকে পাঠালাম, সে কয়লাখনিতে থেকে সুলুক-সন্ধান নেবে।

প্রমোদবাবু বলিলেন, বিকাশকে খুব মনে আছে। চৌকশ ছেলে। তা আমাকে দিয়ে যদি কোনো কাজ হয়—

ব্যোমকেশ বলিল, আপনার কাছে। ও-কাজের জন্যে আমি আসিনি, প্রমোদবাবু। সম্প্রতি এখানে একটা খুন হয়েছে, প্ৰাণহরি পোদ্দার নামে এক বৃদ্ধ—

আপনি তার খবরও পেয়েছেন?

না পেয়ে উপায় কি! আমরা যাঁর বাড়িতে অতিথি তাঁর ছেলেই তো আপনার একজন আসামী।

প্রমোদ বরাট মুখের একটি করুণ ভঙ্গী করিয়া বলিলেন, বড় মুশকিলে পড়েছি, ব্যোমকেশবাবু। যে চারজনের ওপর সন্দেহ তারা সবাই এ শহরের হর্তাকর্তা, প্ৰচণ্ড দাপট। তাই ভারি সাবধানে পা ফেলতে হচ্ছে। সাক্ষী-সার্বুদ নেই, সবই circumstantial evidence, এদের কাউকে যদি ভুল করে গ্রেপ্তার করি, আমারই গর্দান যাবে।

ব্যোমকেশ জিজ্ঞাসা করিল, এই চারজনের মধ্যে কার ওপর আপনার সন্দেহ?

প্রমোদবাবু ভাবিতে ভাবিতে বলিলেন, চারজনেরই মোটিভ সমান, চারজনেরই সুযোগ সমান। তবু মনে হয় এ অরবিন্দ হালদারের কাজ।

চারজনে এক জোট হয়ে খুন করতে গিয়েছিল এমন মনে হয় না?

না।

বাড়িতে একটা দাসী ছিল, তার কথা ভেবে দেখেছেন?

দেখেছি। তার সুযোগ ছিল সবচেয়ে বেশি কিন্তু মোটিভ খুঁজে পাইনি।

হুঁ। আপনি যা জানেন সব আমাকে বলুন, হয়তো আমি আপনাকে সাহায্য করতে পারি।

সাহায্য করবেন আপনি? ধন্যবাদ। আপনার সাহায্য পাওয়া তো ভাগ্যের কথা, ব্যোমকেশবাবু।

অতঃপর প্রমোদ বরাট যাহা বলিলেন তাহার মর্মার্থ এই—যে-রাত্রে প্রাণহরি পোদ্দার মারা যান সে-রত্রে দশটার সময় উলুডাঙা কোলিয়ারির দিক হইতে একটা ট্রাক আসিতেছিল। ট্রাক-ড্রাইভার হঠাৎ গাড়ি থামাইল, কারণ একটা স্ত্রীলোক রাস্তার মাঝখানে দাঁড়াইয়া হাত নাড়িয়া তাহাকে থামিতে বলিতেছে। গাড়ি থামিলে স্ত্রীলোকটা ছুটিয়া আসিয়া বলিল, শীগগির পুলিসে খবর দাও, এ বাড়ির মালিককে কারা খুন করেছে।

ট্রাক-ড্রাইভার আসিয়া থানায় খবর দিল। আধঘণ্টার মধ্যে ইন্সপেক্টর বিরাট সাঙ্গোপাঙ্গ লইয়া অকুস্থলে উপস্থিত হইলেন। মেয়েটা তখনও ব্যাকুল চক্ষে রাস্তার ধারে দাঁড়াইয়া আছে। তাহার নাম মোহিনী, প্রাণহরির গৃহে সেই একমাত্ৰ দাসী, অন্য কোনও ভৃত্য নাই।

ইন্সপেক্টর বরাট বাড়ির দ্বিতলে উঠিয়া লাশ দেখিলেন; তাঁহার অনুচরেরা বাড়ি খানাতল্লাশ করিল। বাড়িতে অন্য কোনও লোক নাই। মোহিনীকে প্রশ্ন করিয়া জানা গেল সে নীচের তলায় রান্নাঘরের পাশে একটি কুঠুরিতে শয়ন করে; কর্তাবাবু শয়ন করেন উপরের ঘরে। আজ সন্ধ্যার সময় শহর হইতে ফিরিয়া তিনি নীচের ঘরে বসিয়া চা পান করিয়াছিলেন, তারপর উপরে উঠিয়া গিয়াছিলেন। মোহিনী রান্না আরম্ভ করিয়াছিল। বাবু নটার পর নীচে নামিয়া আসিয়া আহার করেন, আজ কিন্তু তিনি নামিলেন না। আধঘণ্টা পরে মোহিনী উপরে ডাকিতে গিয়া দেখিল ঘরের মেঝোয় কর্তাবাবু মরিয়া পড়িয়া আছেন।

লাশ চালান দিয়া বরাট মোহিনীকে আবার জেরা করিলেন। জেরার উত্তরে সে বলিল, সন্ধ্যার পর বাড়িতে কেহ আসে না; কিছুদিন যাবৎ চারজন বাবু রাত্রে তাস খেলিতে আসিতেন; যেদিন তাঁহাদের আসিবার কথা সেদিন বাবু শহর হইতে মাছ মাংস কিমা ইত্যাদি কিনিয়া আনিতেন, মোহিনী তাহা রাঁধিয়া বাবুদের খাইতে দিত। আজ বাবুরা আসেন নাই, রন্ধনের আয়োজন ছিল না। বাবুরা চারজনই যুবপুরুষ, কর্তাবাবুর মত বুড়ো নয়। তাঁহারা মোটরে চড়িয়া আসিতেন; সাজপোশাক হইতে তাঁহাদের ধনী বলিয়া মনে হয়। মোহিনী তাঁহাদের নাম জানে না। আজ সে যখন রান্না করিতেছিল তখন কেহ বাড়িতে আসিয়াছিল। কিনা তাহা সে বলিতে পারে না। বাড়িতে লোক আসিলে প্ৰাণহরি নীচের তলায় তাহদের সঙ্গে দেখা করিতেন, উপরের ঘরে কাহাকেও লইয়া যাইতেন না। কর্তাবাবু আজ নীচে নামেন নাই, নামিলে মোহিনী কথাবার্তার আওয়াজ শুনিতে পাইত।

জেরা শেষ করিয়া বরাট বলিলেন, তুমি এখন কি করবে? শহরে তোমার জানাশোনা লোক আছে?

মোহিনী বলিল, না, এখানে আমি কাউকে চিনি না।

বরাট বলিলেন, তাহলে তুমি আমার সঙ্গে চল, রাত্তিরটা থানায় থাকবে, কাল একটা ব্যবস্থা করা যাবে। তুমি মেয়েমানুষ, একলা এ বাড়িতে থাকতে পারবে কেন?

মোহিনী বলিল, আমি পারব। নিজের ঘরে দোর বন্ধ করে থাকব। আমার ভয় করবে না।

সেইরূপ ব্যবস্থা হইল। বরাট একজন কনস্টেবলকে পাহারায় রাখিয়া প্ৰস্থান করিলেন। প্রাণহরি সম্বন্ধে অনুসন্ধান করিয়া প্রমোদবাবু জানিতে পারিলেন, প্রাণহরি কয়লা ক্লাবের মেম্বর ছিলেন। সেখানে গিয়া খবর পাইলেন, প্ৰাণহরি চারজন মেম্বরের সঙ্গে নিয়মিত তাস খেলিতেন। ব্যাপার খানিকটা পরিষ্কার হইল; এই চারজন যে প্ৰাণহারির বাড়িতে তাস খেলিতে যাইতেন তাহা অনুমান করা গেল।

প্রমোদবাবু চারজনকে পৃথকভাবে জেরা করিলেন। তাহারা স্বীকার করিল যে মাঝে মাঝে প্রাণহোরর বাড়িতে তাস খেলিতে যাইত, কিন্তু প্ৰাণহরির মৃত্যুর রাত্রে তাহার বাড়িতে গিয়াছিল। একথা দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করিল।

তাহাদের চারজন মোটর-ড্রাইভারকে প্রমোদ বরাট প্রশ্ন করিলেন। তিনজন ড্রাইভার বলিল, সে-রাত্রে বাবুরা মোটরে চড়িয়া প্রাণহারির বাড়িতে যান নাই। কেবল একজন বলিল, বাবুরা রাত্রি আন্দাজ আটটার সময় একসঙ্গে ক্লাব হইতে বাহির হইয়াছিলেন, কিন্তু মোটরে না গিয়া পদব্ৰজে গিয়াছিলেন, এবং ঘণ্টাখানেক পরে ফিরিয়া আসিয়াছিলেন। তাঁহারা একসঙ্গে কোথায় গিয়াছিলেন তাহা সে জানে না।

বরাট তখন ট্যাক্সি-ড্রাইভারদের মধ্যে খোঁজ-খবর লইলেন, শহরে গোটা পঞ্চাশ ট্যাক্সি আছে। শেষ পর্যন্ত একজন ড্রাইভার অন্য একজন ড্রাইভারকে দেখাইয়া বলিল-ও সে-রাত্রে ভাড়ায় গিয়াছিল, ওকে জিজ্ঞাসা করুন। দ্বিতীয় ড্রাইভার তখন বলিল—উক্ত রাত্রে চারজন আরোহী লইয়া সে উলুডাঙা কয়লাখনির রাস্তায় গিয়াছিল। বরাট ড্রাইভারকে কয়লা ক্লাবে আনিয়া চুপিচুপি চারজনকে দেখাইলেন। ড্রাইভার চারজনকে সনাক্ত করিল।

তারপর বিরাট চারজনকে বার বার জেরা করিয়াছেন। কিন্তু তাহারা অটলভাবে সমস্ত কথা অস্বীকার করিয়াছে। পরিস্থিতি দাঁড়াইয়াছে এই যে, একটা ট্যাক্সি-ড্রাইভার ছাড়া অন্য সাক্ষী নাই; এ অবস্থায় শহরের চারজন গণ্যমান্য লোককে খুনের দায়ে গ্রেপ্তার করা যায় না।

বয়ান শেষ করিয়া বরাট বলিলেন, আমি যতটুকু জানতে পেরেছি আপনাকে জানালাম। তবে একটা অবান্তর কথা বোধ হয় আপনাকে জানিয়ে রাখা ভাল। অন্যতম আসামীর দাদা গোবিন্দ হালদার আমাকে পাঁচ হাজার টাকা ঘুষ দিতে এসেছিলেন।

তাই নাকি?

হ্যাঁ। ভারী কৌশলী লোক। আমাকে আড়ালে ডেকে ইশারায় জানিয়েছিলেন যে, কেসটা যদি চাপা দিই তাহলে পাঁচ হাজার টাকা বিকশিশ পাব

ঘড়িতে দেখিলাম বেলা সাড়ে নটা।

ব্যোমকেশ বলিল, আপনার এখন কোনো জরুরী কাজ আছে কি? অকুস্থলটা দেখবার ইচ্ছে আছে।

বরাট বলিলেন, বেশ তো, চলুন না।

ব্যোমকেশ জিজ্ঞাসা করিল, মেয়েটা এখনো ওখানেই আছে নাকি?

বরাট বলিলেন, আছে বৈকি। তার কোথাও যাবার নেই, ঐ বাড়িতেই পড়ে আছে।

তিনজনে বাহির হইলাম; প্রমোদবাবু আমাদের গাড়িতেই আসিলেন। গাড়ি চলিতে আরম্ভ করিলে ব্যোমকেশ ড্রাইভারকে বলল, যে বাড়িতে বাবুরা তাস খেলতে যেতেন সেই বাড়িতে নিয়ে চল।

ড্রাইভারের নির্বিকার মুখে ভাবান্তর দেখা গেল না, সে নির্দেশ মত গাড়ি চালাইল। দশ মিনিট পরে প্রাণহরি পোদ্দারের বাড়ির সামনে মোটর থামিল। বাড়ির সদরে কেহ নাই। বাড়িটা দেখিতে একটু উলঙ্গ গোছের; চারিপাশে পাঁচিলের বেড়া নাই, রাস্তা হইতে কয়েক হাত পিছাইয়া আব্রুহীনভাবে দাঁড়াইয়া আছে। সদর দরজা খোলা।

বরাট ভ্রূ কুঞ্চিত করিলেন, এদিক ওদিক চাহিয়া বলিলেন, হতভাগা কনস্টেবলটা গেল কোথায়?

বরাট আগে আগে, আমরা তাঁহার পিছনে বাড়ির মধ্যে প্রবেশ করিলাম। রান্নাঘরের দিক হইতে হেঁড়ে গলার আওয়াজ আসিতেছে। সেইদিকে অগ্রসর হইয়া দেখিলাম উর্দি-পরা পাহারাওলা গোঁফে চাড়া দিতে দিতে রান্নাঘরের দ্বারের সামনে দাঁড়াইয়া অন্তর্বর্তিনীর সহিত রসালাপ করিতেছে। আমাদের দেখিয়া একেবারে কাঠ হইয়া গেল।

বরাট আরক্ত চক্ষে তাহার পানে চাহিলেন, সে কলের পুতুলের মত স্যালুট করিল। বিরাট বলিলেন, বাইরে যাও। সদর দরজা খোলা রেখে তুমি এখানে কি করছ?

বরাটের প্রশ্নটা সম্পূর্ণ আলঙ্কারিক। অতি বড় নিরেট ব্যক্তিও বুঝিতে পারে পাহারাওলা এখানে কি করিতেছিল। মক্ষিকা মধু ভাণ্ডের কাছে কী করে?

পাহারাওলা আবার স্যালুট করিয়া চলিয়া গেল। বরাট তখন রান্নাঘরের ভিতরে সন্দিগ্ধ দৃষ্টি প্রেরণ করিলেন। মোহিনী মেঝোয় বসিয়া তরকারি কুটিতেছিল, তুরিতে উঠিয়া বরাটের পানে সপ্ৰশ্ননেত্ৰে চাহিল।

কালো মেয়েটার সারা গায়ে—মুখে চোখে অঙ্গসঞ্চালনে—কুহকভরা ইন্দ্ৰজাল, ভরা যৌবনের দার্নিবার আকর্ষণ। যদি রঙ ফর্সা হইত তাহাকে অপূর্ব সুন্দরী বলা চলিত। তবু, তাহার কালো রঙের মধ্যেও এমন একটি নিশীথ-শীতল মাদকতা আছে যে মনকে আবিষ্ট করিয়া ফেলে।

কিন্তু প্রমোদ বরাট কাঠখোট্টা মানুষ, তিনি বলিলেন, তুমি তাজা তরকারি পেলে কোথায়?

মোহিনী বলিল, পাহারাওলাবাবু এনে দিয়েছেন। উনি নিজের সিধে তরিতরকারি আমাকে এনে দেন, আমি রোধে দিই। আমারও হয়ে যায়৷

বরাট গলার মধ্যে শব্দ করিয়া বলিলেন, হুঁ, ভারি দয়ার শরীর দেখছি পাহারাওলাবাবুর।

মোহিনী বক্রোক্তি বুঝিল কিনা বলা যায় না, প্রশ্ন করিল, আমাকে কি দরকার আছে, দারোগাবাবু?

প্রমোদীবাবু বলিলেন, তুমি এখানেই থাকো। আমরা খানিক পরে তোমাকে ডাকব।

আচ্ছা।

আমরা সদর দরজার দিকে ফিরিয়া চলিলাম। চলিতে চলিতে ব্যোমকেশ স্মিতমুখে বলিল, আপনি একটু ভুল করেছেন, ইন্সপেক্টর বরাট। আপনার উচিত ছিল একজন বুড়ো পাহারাওলাকে এখানে বসানো।

বরাট বলিলেন, ব্যোমকেশবাবু, আপনি ওদের চেনেন না। পাহারাওলারা যত বুড়ো হয় তাদের রস তত বাড়ে।

ব্যোমকেশ হাসিতে হাসিতে বলিল, আর সুদখোর মহাজনেরা?

বরাট চকিতে ব্যোমকেশের পানে চাহিলেন, তারপর নিম্নস্বরে বলিলেন, সেটা ঠিক বুঝতে পারছি না, ব্যোমকেশবাবু। কিন্তু পরিস্থিতি সন্দেহজনক। আপনি মেয়েটাকে জেরা করে দেখুন না, বুড়োর সঙ্গে ওর কোনো রকম ইয়ে ছিল কিনা।

দেখব।

সদর দরজার পাশে উপরে উঠিবার সিঁড়ি দিয়া আমরা উপরে উঠিলাম। সিঁড়ির মাথায় মজবুত ভারী দরজা, তাহাতে ইয়েল-লক লাগানো। বাড়ির অন্যান্য দরজার তুলনায় এ দরজা নূতন বলিয়া মনে হয়। হয়তো প্রাণহরি পোদ্দার বাড়ি ভাড়া লইবার পর এই ঘরে নূতন দরজা লাগাইয়াছিলেন।

বরাট পকেট হইতে চাবি বাহির করিয়া দ্বার খুলিলেন। আমরা অন্ধকার ঘরে প্রবেশ করিলাম। তারপর বিরাট একটা জানালা খুলিয়া দিতেই রৌদ্রোজ্জ্বল আলো ঘরে প্রবেশ করিল।

ঘরে দুটি জানালা দুটি দ্বার। একটি দ্বার সিঁড়ির মুখে, অন্যটি পিছনের দেয়ালে। ঘরটি লম্বায় চওড়ায় আন্দাজ পনেরো ফুট চৌকশ। ঘরে আসবাব বিশেষ কিছু নাই; একটা তক্তপোশের উপর বিছানা, তাহার শিয়রের দিকে দেয়াল ঘেঁষিয়া একটি জগদ্দল লোহার সিন্দুক। একটা দেয়াল-আলনা হইতে প্ৰাণহরির ব্যবহৃত জামা কাপড় ঝুলিতেছে। প্রাণহরির টাকার অভাব ছিল না, কিন্তু জীবন যাপনের পদ্ধতি ছিল নিতান্ত মামুলী। মাথার কাছে লোহার সিন্দুক লইয়া দরজায় ইয়েল-লক লাগাইয়া তিনি তক্তপোশের মলিন শয্যায় শয়ন করিতেন।

বোমকেশ ঘরের চারিদিকে অনুসন্ধিৎসু চক্ষু বুলাইয়া জিজ্ঞাসা করিল, লাশ কোথায় ছিল?

সিঁড়ির দরজা হইতে হাত চারেক দূরে মেঝের দিকে আঙুল দেখাইয়া বরাট বলিলেন, এইখানে।

ব্যোমকেশ নত হইয়া স্থানটা পরীক্ষা করিল, বলিল, রিক্তের দাগ তো বিশেষ দেখছি না। সামান্য ছিটেফোঁটা।

বরাট বলিলেন, বুড়োর গায়ে কি রক্ত ছিল! চেহারাটা ছিল বেউড় বাঁশের মত।

ব্যোমকেশ বলিল, অবশ্য মাথার খুলি ভাঙলে বেশি রক্তপাত হয় না। —মারণাস্ত্রটা পাওয়া গেছে?

না। ঘরে কোন অস্ত্র ছিল না। বাড়িতেও এমন কিছু পাওয়া যায়নি যাকে মারণাস্ত্ৰ মনে করা যেতে পারে। বাড়ির চারপাশে বহু দূর পর্যন্ত খুঁজে দেখা হয়েছে, মারণাস্ত্রের সন্ধান পাওয়া যায়নি।

যাক। সিন্দুক খুলে দেখেছিলেন নিশ্চয়। কি পেলেন?

সিন্দুকের চাবি পোদ্দারের কোমরে ছিল। সিন্দুক খুলে পেলাম হিসেবের খেরো-বাঁধানো খাতা আর নগদ দশ হাজার টাকা।

দশ হাজার টাকা!

হ্যাঁ। বুড়োর মহাজনী কারবার ছিল তাই বোধহয় নগদ টাকা কাছে রাখতো।

হুঁ। ব্যাঙ্কে টাকা ছিল?

ছিল এবং এখনো আছে। কে পাবে জানি না। টাকা কম নয়, প্ৰায় দেড় লাখ।

তাই নাকি! আত্মীয়-স্বজনরা খবর পেয়েছে?

বোধহয় কেউ নেই। থাকলে শকুনির পালের মত এসে জুটত।

শহরে বুড়োর একটা অফিস ছিল শুনেছি। সেখানে তল্লাশ করে কিছু পেয়েছিলেন?

অফিস মানে চোর-কুটুরির মত একটা ঘর। —দু' চারটে খাতাপত্তর ছিল, তা থেকে মনে হয় মহাজনী কারবার ভাল চলত না।

ব্যোমকেশ চিন্তা করিতে করিতে কতকটা নিজমনেই বলিল, মহাজনী কারবার ভাল চলত না, অথচ ব্যাঙ্কে দেড় লাখ এবং সিন্দুকে দশ হাজার—চিন্তা হইতে জাগিয়া উঠিয়া সে বলিল, ওই অন্য দরজাটার বাইরে কি আছে?

বরাট বলিলেন, স্নানের ঘর ইত্যাদি।

এ দরজাটাও নূতন মজবুত দরজা। প্রাণহরি পোদ্দার ঘরটিকে দুর্গের মত সুরক্ষিত করিয়াছিলেন, কারণ সিন্দুকে মাল আছে।

ব্যোমকেশ দরজা খুলিল। সঙ্কীর্ণ ঘরে পিছনের দেয়ালে একটি ঘুলঘুলি দিয়া আলো আসিতেছে, ঘুলঘুলির নীচে সরু একটি দরজা। ঘরে একটি শূন্য বালতি ও টিনের মগ ছাড়া আর কিছু নাই।

সরু দরজার উপরে-নীচে ছিটকিনি লাগানো। ব্যোমকেশ ছিটকিনি খুলিয়া কপাট ফাঁক করিল। উঁকি মারিয়া দেখিলাম, দ্বারের মুখ হইতে শীর্ণ লোহার মই মাটি পর্যন্ত গিয়াছে। মেথরখাটা রাস্তা; প্রাণহরির দুর্গে প্রবেশ করিবার দ্বিতীয় পথ।

ব্যোমকেশ বরাটকে জিজ্ঞাসা করিল, আপনি সে-রাত্রে যখন প্রথম এসেছিলেন, এ দরজা দুটো বন্ধ ছিল?

বরাট বলিলেন, হ্যাঁ, দুটোই বন্ধ ছিল। কেবল সামনে সিঁড়ির দরজা খোলা ছিল।

ব্যোমকেশ বলিল, চলুন, এবার নীচে যাওয়া যাক। মেয়েটাকে দুচারটে প্রশ্ন করে দেখি।

ড্রয়িং-রুমের মত সাজানো নীচের তলার যে-ঘরটাতে তাস খেলা হইত। সেই ঘরে আমরা বসিয়াছি। মোহিনী একটা চেয়ারের পিঠে হাত রাখিয়া আমাদের সামনে দাঁড়াইয়া আছে, তাহার মুখে ভয় বা উদ্বেগের চিহ্ন নাই, ভাবভঙ্গী বেশ সংযত এবং সংবৃত।

মনে মনে প্রাণহারির নিরাভরণ শয়নকক্ষের সহিত সুসজ্জিত ড্রয়িং-রুমের তুলনা করিতেছি, ব্যোমকেশ মোহিনীকে প্রশ্ন করিল, তুমি প্রাণহরিবাবুর কাছে কতদিন চাকরি করছ?

মোহিনী বলিল, দুবছরের বেশি।

প্রাণহারিবাবু যখন কটকে ছিলেন তখন থেকে তুমি ওঁর কাছে আছ?

আজ্ঞে হ্যাঁ।

প্রাণহারিবাবুর আত্মীয়-স্বজন কেউ আছে?

জানি না। কখনো দেখিনি।

তুমি কত মাইনে পাও?

কটকে ছিল দশ টাকা মাইনে আর খাওয়া-পরা। এখানে আসার পর পাঁচ টাকা মাইনে বাড়িয়ে দিয়েছিলেন।

প্রাণহরিবাবু কেমন লোক ছিলেন?

একটু চুপ করিয়া থাকিয়া মোহিনী বলিল, ‘তিনি আমার মালিক ছিলেন, ভাল লোকই ছিলেন।’ অর্থাৎ, তিনি আমার মালিক ছিলেন তাঁহার নিন্দা করিব না, তোমরা বুঝিয়া লাও।

ব্যোমকেশ বলিল, তিনি কৃপণ ছিলেন?

মোহিনী চুপ করিয়া রহিল। ব্যোমকেশ স্থিরনেত্রে তাহার পানে চাহিয়া বলিল, তোমার সঙ্গে তাঁর সম্বন্ধ কি রকম ছিল?

মোহিনী একটু বিস্ময়ভরে ব্যোমকেশের পানে চোখ তুলিল, তাহার ঠোঁটের কোণে যেন একটু চটুলতার ঝিলিক খেলিয়া গেল। তারপর সে শান্তস্বরে বলিল, ভালই ছিল। তিনি আমাকে স্নেহ করতেন।

ব্যোমকেশ বলিল, হুঁ। তাঁর স্ত্রীলোক-ঘটিত কোনো দোষ ছিল?

আজ্ঞে না। বুড়োমানুষ ছিলেন, ওসব দোষ ছিল না। কেবল তাস খেলার নেশা ছিল।

যাক। তুমি এখন নিজের কথা বল। প্রাণহারিবাবু খুন হয়েছেন, তা সত্ত্বেও তুমি একলা এ বাড়িতে পড়ে আছ কেন?

কোথায় যাব? এ শহরে তো আমার কেউ নেই।

দেশে ফিরে যােচ্ছ না কেন?

তাই যাব। কিন্তু দরোগাবাবু হুকুম দিয়েছেন যতদিন না খুনের কিনারা হয় ততদিন কোথাও যেতে পাব না।

দেশে তোমার কে আছে।

বুড়ো মা-বাপ আছে।

আর স্বামী?

মোহিনী চকিতে চোখ তুলিয়া আবার চোেখ নীচু করিয়া ফেলিল, প্রশ্নের উত্তর দিল না।

বিয়ে হয়েছে নিশ্চয়?

মোহিনী নীরবে ঘাড় নাড়িল।

স্বামী কোথায়?

মোহিনী ঘাড় তুলিয়াই ধীরে ধীরে উত্তর দিল, স্বামী ঘর ছেড়ে চলে গিয়েছে, আর ফিরে আসেনি৷

ব্যোমকেশ তাহার উপর দৃষ্টি নিবন্ধ রাখিয়া সিগারেট ধরাইল, কতদিন হল স্বামী ঘরছাড়া হয়েছে?

তিন বছর।

স্বামী কী কাজ করত?

কল-কারখানায় কাজ করত।

বিবাগী হয়ে গেল কেন?

মোহিনীর অধরোষ্ঠ একটু প্রসারিত হইল, সে ব্যোমকেশের প্রতি একটি চকিত চপল কটাক্ষ হানিয়া বলিল, জানি না।

ইহাদের প্রশ্নোত্তর শুনিতে শুনিতে এবং মোহিনীকে দেখিতে দেখিতে ভাবিতেছি, মেয়েটার স্বভাব-চরিত্র কেমন? সচ্চরিত্রা, না স্বৈরিণী? সে যে-শ্রেণীর মেয়ে তাহদের মধ্যে একনিষ্ঠা ও পতিব্ৰত্যের স্থান খুব উচ্চ নয়। ঐহিক প্রয়োজনের তাড়নায় তাহাদের জীবন বিপথে-কুপথে সঞ্চরণ করে। অথচ মোহিনীকে দেখিয়া ঠিক সেই জাতীয় সাধারণ বি-চাকরানী শ্রেণীর মেয়ে বলিয়া মনে হয় না। কোথায় যেন একটু তফাৎ আছে। তাহার যৌবন-সুলভ চপলতা চটুলতার সঙ্গে চরিত্রের দৃঢ়তা ও সাহস আছে। এ মেয়ে যদি নষ্ট-দুষ্ট হয়, সজ্ঞানে জানিয়া বুঝিয়া নষ্ট-দুষ্ট হইবে, বাহ্য প্রয়োজনের তাগিদে নয়।

ব্যোমকেশ সিগারেটে দুটা লম্বা টান দিয়া বলিল, যে চারজন বাবু এখানে তাস খেলতে আসতেন তাঁদের তুমি কয়েকবার দেখেছ—কেমন?

মোহিনীর চক্ষু দুটি একবার দক্ষিণে-বামে সঞ্চরণ করিল, অধরোষ্ঠ ক্ষণকাল বিভক্ত হইয়া রহিল, যেন সে হাসিতে গিয়া থামিয়া গেল। তারপর বলিল, ‘হ্যাঁ, কয়েকবার দেখেছি।’ সে বুঝিয়াছে ব্যোমকেশের প্রশ্ন কোন দিকে যাইতেছে।

ব্যোমকেশ জিজ্ঞাসা করিল, ওদের মধ্যে কে কেমন লোক তুমি বলতে পার?

অব্যক্ত হাসি এবার পরিস্ফুট হইয়া উঠিল। মোহিনী একটু ঘাড় বাঁকাইয়া বলিল, কে কেমন মানুষ তা কি মুখ দেখে বলা যায় বাবু? তবে একজন ছিলেন সবচেয়ে ছেলেমানুষ আর সবচেয়ে ভালোমানুষ। বাকি তিনজন—’ সে থামিয়া গেল।

ব্যোমকেশ বলিল, হ্যাঁ, বাকি তিনজন কেমন লোক?

হাসিমুখে জিভ কাটিয়া মোহিনী বলিল, আমি জানি না বাবু।

মোহিনীর একটা ক্ষমতা আছে, সে ‘জানি না’ বলিয়া অনেক কথা জানাইয়া দিতে পারে।

ব্যোমকেশ সিগারেটের দগ্ধাংশ জানালার বাহিরে ফেলিয়া দিয়া বলিল, এঁরা তাস খেলার সময় ছাড়াও অন্য সময়ে আসতেন কি?

মোহিনী কড়িকাঠের দিকে চোখ তুলিয়া বলিল, একজন আসতেন। কর্তাবাবু সকালবেলা আপিস চলে যাবার পর আসতেন।

কে তিনি?

নাম জানি না বাবু। কালো মোটা মত চেহারা, খুব ছেঁদো কথা বলতে পারেন।

বরাট অস্ফুটস্বরে বলিলেন, অরবিন্দ হালদার।

ব্যোমকেশ মোহিনীকে বলিল, তাহলে তোমার সঙ্গেই তিনি দেখা করতে আসতেন?

মোহিনী কেবল ঘাড় নাড়িল।

ব্যোমকেশ বলিল, কোনো প্ৰস্তাব করেছিলেন?

মোহিনীর দৃষ্টি হঠাৎ কঠিন হইয়া উঠিল, সে তীক্ষ্ণ স্বরে বলিল, সোনার আংটি দিতে এসেছিলেন, সিল্কের শাড়ি দিতে এসেছিলেন।

তুমি নিয়েছিলে?

না। আমার ইজ্জৎ অত সস্তা নয়।

ব্যোমকেশ কিছুক্ষণ তাহাকে নিবিষ্টচক্ষে নিরীক্ষণ করিল, তারপর বলিল, আচ্ছা, আজ এই পর্যন্ত। পরে যদি দরকার হয় আবার সওয়াল করব। —তুমি উড়িষ্যার মেয়ে, কিন্তু পরিষ্কার বাংলা বলতে পারো দেখছি।

মোহিনীর সুর এবার নরম হইল। সে বলিল, বাবু, আমি ছেলেবেলা থেকে বাঙালীর বাড়িতে কাজ করেছি।

ফিরিবার পথে ভাবিতে লাগিলাম, মোহিনী-বর্ণিত ছেলেমানুষ এবং ভালোমানুষ লোকটি অবশ্য ফণীশ। অন্য তিনজনের মধ্যে অরবিন্দ হালদার দু’কান-কাঁটা লম্পট। আর বাকি দুজন? বোধ হয় অতটা বেহায়া নয়, কিন্তু মনে লোভ আছে; ডুবিয়া ডুবিয়া জল পান করেন। মোহিনী বলিয়াছিল, তাহার ইজ্জৎ অত সস্তা নয়। তাহার ইজ্জতের দাম কত? রূপযৌবনের অনুপাতেই কি ইজ্জতের দাম বাড়ে এবং কমে? কিংবা অন্য কোনও নিরিখ আছে? এ প্রশ্নের উত্তর একমাত্র বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিই দিতে পারেন।

থানার সামনে বিরাট নামিয়া গেলেন।

ব্যোমকেশ বলিল, ওবেলা আবার আসব। সিভিল সার্জন-যিনি আটপ্সি করেছেন—তাঁর সঙ্গে দেখা করতে হবে।

বরাট বলিলেন, আসবেন। আমি সিভিল সার্জনের সঙ্গে সময় ঠিক করে রাখব। পি এম রিপোর্ট অবশ্য তৈরি আছে।

ব্যোমকেশ বলিল, পি এম রিপোর্টও দেখব।

বরাট বলিলেন, আচ্ছা। চারটে থেকে সাড়ে চারটের মধ্যে অ্যাপিয়েন্টমেন্ট করে রাখব।

বাড়ি ফিরিলাম তখন বারোটা বাজিয়াছে। কিয়ৎকাল পরে মণীশবাবুরা ফিরিলেন। মণীশবাবু ভ্রূ তুলিয়া ব্যোমকেশের পানে চাহিলে সে বলিল, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, যা করবার আমি করছি। পুলিসের সঙ্গে দেখা করেছি। একটা ব্যবস্থা হয়েছে, পরে আপনাকে সব জানাবো।

মণীশবাবু সন্তুষ্ট হইয়া স্নান করিতে চলিয়া গেলেন। ফণীশ উৎসুকভাবে আমাদের আশেপাশে ঘুর ঘুর করিতে লাগিল। ব্যোমকেশ হাসিয়া বলিল,“তুমিও নিশ্চিন্ত থাকো, কাজ খানিকটা এগিয়েছে। বিকেলে আবার বেরুব।

বেলা তিনটের সময় পিতাপুত্র আবার কাজে বাহির হইলেন। আমরা সুরপতি ঘটকের দপ্তরে গেলাম। সুরপতিবাবু আমাদের অফিস-ঘরে বসাইয়া কয়লাখনি চালানো সম্বন্ধে নানা তথ্য শুনাইতে লাগিলেন। তারপর দ্বারদেশে দুইটি যুবকের আবির্ভাব ঘটিল। খদ্দর-পরা শান্তশিষ্ট চেহারা, মুখে বুদ্ধিমত্তার সহিত বিনীত ভাব। সুরপতিবাবু বলিলেন, এই যে তোমরা এসেছ! গগনবাবু, এদেরই কথা আপনাকে বলেছিলাম। ওরা দুই ভাই, নাম বিশ্বনাথ আর জগন্নাথ। ওদের আমি নিজের হাতে কাজ শিখিয়েছি। বয়স কম বটে, কিন্তু কাজকর্মে একেবারে পোক্ত।

ব্যোমকেশ বলিল, বেশ বেশ। এখানকার কাজ ছেড়ে অন্য জায়গায় যেতে আপনাদের আপত্তি নেই তো?

বিশ্বনাথ ও জগন্নাথ মাথা নাড়িয়া জানাইল, আপত্তি নাই।

সুরপতিবাবু বলিলেন, ওদের দুজনকে কিন্তু একসঙ্গে ছাড়তে পারব না, তাহলে আমার কাজের ক্ষতি হবে। ওদের মধ্যে একজনকে আপনারা নিন, যাকে আপনাদের পছন্দ।

তাই সই বলিয়া ব্যোমকেশ পকেট হইতে নোটবুক বাহির করিয়া দুজনের নাম-ধাম লিখিয়া লইল, বলিল, যথাসময় আমি আপনাকে চিঠি দেব।

বিশ্বনাথ ও জগন্নাথ নমস্কার করিয়া চলিয়া গেল। ব্যোমকেশ সুরপতিবাবুকে বলিল, দু’জনকেই আমার পছন্দ হয়েছে। আপনি যাকে দিতে চান তাকেই নেব।

সুরপতি খুশি হইয়া বললেন, ওরা দুই ভাই সমান কাজের লােক, আপনার যাকেই দিন ঠকবেন না।

চারটে বাজিতে আর দেরি নাই দেখিয়া আমরা উঠিলাম।

বরাট অফিসে ছিলেন, বলিলেন, সিভিল সার্জন সাড়ে চারটার সময় দেখা করবেন। এই নিন পোস্ট-মর্টেম রিপোর্ট।

ব্যোমকেশ রিপোর্টে চোখ বুলাইয়া ফেরৎ দিল। তারপর আমরা হাসপাতালের দিকে রওনা হইলাম। সিভিল সার্জন মহাশয়ের অফিস হাসপাতালে।

সিভিল সার্জন বিরাজমোহন ঘোষাল অফিসে বসিয়া গড়গড়ায় তামাক টানিতেছিলেন। বয়স্থ ব্যক্তি, স্থূল গৌরবর্ণ সুদৰ্শন চেহারা, আমাদের দেখিয়া অট্টহাস্য করিয়া উঠিলেন। বলিলেন, ‘আপনার আসল নাম আমি জেনে ফেলেছি, ব্যোমকেশবাবু। ইন্সপেক্টর বরাট ধাপ্পা দেবার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু ধাপ্পা টিকল না।’ বলিয়া আবার অট্টহাস্য করিলেন।

ব্যোমকেশ বিনীতভাবে বলিল, বে-কায়দায় পড়ে পঞ্চ পাণ্ডবকে ছদ্মনাম গ্রহণ করতে হয়েছিল, আমি তো সামান্য লোক। একটা গোপনীয় কাজে এখানে এসেছি, তাই গা-ঢাকা দিয়ে থাকতে হয়েছে।

ভয় নেই, আমার পেট থেকে কথা বেরুবে না। বসুন।

কিছুক্ষণ সাধারণভাবে আলাপ-আলোচনা হাস্য-পরিহাস চলিল। ডাক্তার ঘোষাল আনন্দময় পুরুষ, সারাজীবন মড়া ঘাঁটয়াও তাঁহার স্বতস্ফূর্ত অট্টহাস্য প্রশমিত হয় নাই।

অবশেষে কাজের কথা আরম্ভ হইল। ব্যোমকেশ বলিল, ‘প্ৰাণহরি পোদ্দারের পোস্ট-মর্টেম রিপোর্ট আমি দেখেছি। আপনার মুখে অতিরিক্ত কিছু শুনতে চাই। লোকটি বুড়ো হয়েছিল, রোগা-পাটকা ছিল, তার দৈহিক শক্তি কি কিছুই অবশিষ্ট ছিল না?’

বিরাজ বাবু বলিলেন, দৈহিক শক্তি—

মানে—যৌবন। পুরুষের যৌবন অনেক বয়স পর্যন্ত থাকতে পারে; একশো বছর বয়সে ছেলের বাপ হয়েছে এমন নজিরও পাওয়া সক্ষম ছিল?

বিরাজবাবু আবার অট্টহাস্য করিয়া বলিলেন, ও-এই কথা জানতে চান? তা ডাক্তারের কাছে এত লজ্জা কিসের? না, প্রাণহরি পোদ্দারের শরীরে রস-কষ কিছু ছিল না, একেবারে শুষ্কং ’কাষ্ঠং।’ দু’বার গড়গড়ায় টান দিয়া বলিলেন, আমি লক্ষ্য করেছি। যারা রাতদিন টাকার ভাবনা ভাবে তাদের ওসব বেশি দিন থাকে না। প্রাণহরি পোদ্দার তো সুদখোর মহাজন ছিল।

মনে হইল ব্যোমকেশ একটু নিরাশ হইয়াছে। ক্ষণেক ভ্রূকুঞ্চিত করিয়া থাকিয়া সে বলিল, আচ্ছা, ওকথা যাক। এখন মারণাস্ত্রের কথা বলুন। খুলির ওপর ওই একটা চোট্‌ ছাড়া আর কোথাও আঘাতের দাগ ছিল না?

না।

মাথাতেই মৃত্যু ঘটেছিল?

হ্যাঁ।

অস্ত্রটা কী ধরনের ছিল?

বিরাজবাবু কিছুক্ষণ গড়গড়া টানিলেন, কী রকম অস্ত্র ছিল বলা শক্ত। অস্ত্রটা লম্বা গোছের, লম্বা এবং ভারী। কাটারির মত ধারালো নয়, আবার পুলিসের রুলের মত ভোঁতাও নয়—

ব্যোমকেশ বলিল, ইলেকট্রিক টর্চ হতে পারে কি?

‘ইলেকট্রিক টর্চ!’ বিরাজবাবু মাথা নাড়িলেন, ‘না, তাতে এমন পরিষ্কার কাটা দাগ হবে না। এই ধরুন, কাটারির ফলার উল্টো পিঠ দিয়ে, অৰ্থাৎ শিরদাঁড়ার দিক দিয়ে যদি সজোরে মাথায় মারা যায় তাহলে ওইভাবে খুলির হাড় ভাঙতে পারে।

রান্নাঘরের হাতা বেড়ি খুন্তি—?

না, তার চেয়ে ভারী জিনিস।

ব্যোমকেশ কিছুক্ষণ গালে হাত দিয়া বসিয়া রহিল, তারপর বলিল, অস্ত্রটাই ভাবিয়ে তুলেছে। যাদের ওপর সন্দেহ তারা দা-কাটারি জাতীয় অস্ত্ৰ নিয়ে খুন করতে গিয়েছিল ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না। তবে একেবারে অসম্ভব নয়। আচ্ছা, আর একটা প্রশ্নের উত্তর দিন। আততায়ী সামনের দিক থেকে অস্ত্ৰ চালিয়েছিল, না পিছন দিক থেকে?

বিরাজবাবু তৎক্ষণাৎ বলিলেন, সামনের দিক থেকে। কপাল থেকে মাথার মাঝখান পর্যন্ত হাড় ভেঙেছে, পিছন দিকের হাড় ভাঙেনি।

পিছন দিক থেকে মারা একেবারেই সম্ভব নয়?

বিরাজবাবু ভাবিয়া বলিলেন, পোদ্দার যদি চেয়ারে বসে থাকত তাহলে ওভাবে মারা সম্ভব হত, দাঁড়িয়ে থাকলে সম্ভব নয়। তবে যদি আততায়ী দশ ফুট লম্বা হয়—

ব্যোমকেশ হাসিতে হাসিতে উঠিয়া দাঁড়াইল, দশ ফুট দ্রাঘিমার লোক এখানে থাকলে নজরে পড়ত। আচ্ছা, আজ চলি। নমস্কার।

থানায় ফিরিয়া বরাট বলিলেন, অতঃপর? বাকি তিনজন আসামীকে দর্শন করতে চান?

ব্যোমকেশ বলিল, চাই বৈকি। এখন তাদের বাড়িতে পাওয়া যাবে?

বরাট বলিলেন, না, এসময় তারা খেলাধুলো করতে ক্লাবে আসে।

তাহলে এখন থাক। আপনার সঙ্গে ক্লাবে গেলে শিকার ভড়কে যাবে! ভাল কথা, পোদ্দারের হিসেবের খাতাটা দিতে পারেন? ওটা নেড়েচেড়ে দেখতে চাই, যদি কিছু পাওয়া যায়।

অফিসেই আছে, নিয়ে যান। আর কিছু?

আর—একটা কাজ করলে ভাল হয়। প্ৰাণহরি পোদ্দারের অতীত সম্বন্ধে কিছুই জানা দুই দেড়েক আগে বুড়ো কটকে ছিল। কটকের পুলিস দপ্তর থেকে কিছু খবর পাওয়া যায় না-কি?

বরাট বলিলেন, কটকের পুলিস দপ্তরে খোঁজ নিয়েছিলাম, প্রাণহরি পোদ্দারের পুলিস-রেকর্ড নেই। তবে তার সম্বন্ধে সাধারণভাবে যদি জানতে চান, আমার একজন চেনা অফিসার কয়েক বছর কটকে আছেন—ইন্সপেক্টর পট্টনায়ক। তাঁকে লিখতে পারি।

তাই করুন। ইন্সপেক্টর পট্টনায়ককে টেলিগ্রাম করে দিন, যত শীগগির খবর পাওয়া যায়। আজ উঠলাম, কাল সকালেই আবার আসছি।

নৈশ ভোজনের পর মণীশবাবু উপরে চলিয়া গেলেন, আমরা নিজেদের ঘরে আসিলাম। মাথার উপর পাখা খুলিয়া দিয়া আমি শয়নের উপক্ৰম করিলাম, ব্যোমকেশ কিন্তু শুইল না, প্রাণহরির হিসাবের খাতা লইয়া টেবিলের সামনে বসিল। খেরো-বাঁধানো দুভাঁজ করা লম্বা খাতা, তাহাতে দেশী পদ্ধতিতে হিসাব লেখা।

ব্যোমকেশ হিসাবের খাতার গোড়া হইতে ধীরে ধীরে উল্টাইতেছে, আমি খাটের ধারে বসিয়া সিগারেট প্ৰায় শেষ করিয়া আনিয়াছি, এমন সময় ফণীশ আসিয়া দ্বারের কাছে দাঁড়াইল। ব্যোমকেশ মুখ তুলিয়া তাহাকে দেখিল, তারপর এক অদ্ভুত কাজ করিল। তাহার সামনে টেবিলের উপর একটি কাচের কাগজ-চাপা গোলক ছিল, সে চকিতে তাহা তুলিয়া লইয়া ফণীশের দিকে ছুঁড়িয়া দিল।

ফণীশ টপ করিয়া সেটা ধরিয়া ফেলিল, নচেৎ মেঝেয় পড়িয়া চুৰ্ণ হইয়া যাইত। ব্যোমকেশ হাসিয়া ডাকিল, এস ফণীশ।

ফণীশ বিস্মিত হতবুদ্ধি মুখ লইয়া কাছে আসিল, ব্যোমকেশ কাচের গোলাটা তাহার হাত হইতে লইয়া বলিল, অবাক হয়ে গেছ দেখছি। ও কিছু নয়, তোমার রিফ্লেক্স পরীক্ষা করছিলাম। বোসো, কয়েকটা প্রশ্ন করব।

ফণীশ সামনের চেয়ারে বসিল। ব্যোমকেশ বলিল, তুমি আজকাল ক্লাবে যাও না?

ফণীশ বলিল, ওই ব্যাপারের পর আর যাইনি।

ব্যোমকেশ বলিল, যাওনি কেন? হঠাৎ যাওয়া বন্ধ করলে লোকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

ফণীশ বলিল, আচ্ছা, কাল থেকে যাব।

আমরাও যাব। অতিথি নিয়ে যেতে বাধা নেই তো?

না। কিন্তু—ক্লাবে আপনার কিছু দরকার আছে কি?

তোমার তিন বন্ধুকে আড়াল থেকে দেখতে চাই। —আচ্ছা, একটা কথা বল দেখি, সেদিন তোমরা যে প্রাণহরি পোদ্দারকে ঠেঙাতে গিয়েছিলে তোমাদের হাতে অস্ত্রশস্ত্ৰ কিছু ছিল?

অন্ত্র ছিল না। তবে মধুময়বাবুর হাতে একটা লম্বা টর্চ ছিল, মুণ্ডুওয়ালা টর্চ। আর মৃগাঙ্কবাবুর হাতে ছিল বেতের ছড়ি।

কি রকম ছড়ি? মোটা, না লচপচে?

লচপাচে। যাকে swagger came বলে।

হুঁ, তোমার হাতে কিছু ছিল না?

না।

অরবিন্দ হালদারের হাতে?

না।

কাপড়-চোপড়ের মধ্যে লোহার ডাণ্ডা কি ঐরকম কিছু লুকিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল?

না। গরমের সময়, সকলের গায়েই হাল্কা ড্রাম-কাপড় ছিল, ধুতি আর পাঞ্জাবি। কারুর সঙ্গে ওরকম কিছু থাকলে নজরে পড়ত।

হুঁ—ব্যোমকেশ সিগারেট ধরাইয়া কিছুক্ষণ টানিল, শেষে বলিল, কোথা দিশা খুঁজে পাই না। তুমি যাও, শুয়ে পড়ো গিয়ে। —কবিতা আওড়াতে পারো? বৌমাকে বোলো—নিশিদিন ভরসা রাখিস ওরে মন হবেই হবে।

ফণীশ লজ্জিত মুখে চলিয়া গেল। আমি শয়ন করিলাম। ব্যোমকেশ আরও কিছুক্ষণ খাতা দেখিল, তারপর আলো নিভাইয়া শুইয়া পড়িল।

অন্ধকারে প্রশ্ন করিলাম, খুব তো কবিতা আওড়াচ্ছ, আজ সারাদিনে কিছু পেলে?

উত্তর আসিল, তিনটি তত্ত্ব আবিষ্কার করেছি। এক-প্রাণহরি পোদ্দারকে যিনি খুন করেছেন তাঁর টাকার লোভ নেই; দুই-তিনি সব্যসাচী; তিন—মোহিনীর মত মেয়ের জন্য যে-কেউ খুন করতে পারে। —এবার ঘুমিয়ে পড়।

সকালে ঘুম ভাঙিয়া দেখিলাম ব্যোমকেশ আবার হিসেবের খাতা লইয়া বসিয়াছে।

তারপর যথাসময়ে প্রাতরাশ গ্ৰহণ করিয়া বাহির হইলাম। ব্যোমকেশ হিসাবের খাতটি সঙ্গে লইল।

থানায় পৌঁছিলে ইন্সপেক্টর বিরাট হাসিয়া বলিলেন, এরই মধ্যে হিসেবের খাতা শেষ করে ফেললেন?

ব্যোমকেশ বলিল, এ খাতায় মাত্র দেড় বছরের হিসেব আছে, অর্থাৎ এখানে আসার পর প্রাণহরি নতুন খাতা আরম্ভ করেছিল।

বরাট জিজ্ঞাসা করিলেন, কিছু পেলেন?

ব্যোমকেশ বলিল, খুনের ওপর আলোকপাত করে এমন কিছু পাইনি। কিন্তু একটা সামান্য বিষয়ে খটকা লেগেছে।

কী বিষয়?

একজন ট্যাক্সি-ড্রাইভারের সঙ্গে প্রাণহরির ব্যবস্থা ছিল, সে রোজ তাকে ট্যাক্সিতে বাড়ি থেকে নিয়ে আসত, আবার বাড়ি পৌঁছে দিত। মাসিক ভাড়া দেবার ব্যবস্থা ছিল নিশ্চয়। কিন্তু হিসেবের খাতায় দেখছি ঠিক উল্টো। এই দেখুন খাতা।’ ব্যোমকেশ খাতা খুলিয়া দেখাইল। খাতার প্রতি পৃষ্ঠায় পাশাপাশি জমা ও খরচের স্তম্ভ। খরচের স্তম্ভে এক পয়সা দুই পয়সার খরচ পর্যন্ত লেখা আছে, কিন্তু জমার স্তম্ভ। অধিকাংশ দিনই শূন্য। মাঝে মাঝে কোনও খাতক সুদ জমা দিয়াছে তাহার উল্লেখ আছে। ব্যোমকেশ আঙুল দিয়া দেখাইল, ‘এই দেখুন, ৩রা মাঘ জমার কলমে লেখা আছে, ট্যাক্সি-ড্রাইভার ৩৫ টাকা। এমনি প্রত্যেক মাসেই আছে। কিন্তু খরচের কলমে ট্যাক্সি বাবদ কোনো খরচের উল্লেখ নেই।’

হয়তো ভুল করে খরচটা জমার কলমে লেখা হয়েছিল।

প্রত্যেক মাসেই কি ভুল হবে?

হুঁ। আপনার কি মনে হয়?

বুঝতে পারছি না। খাতায় জুয়া খেলার লাভ-লোকসানের হিসেবও নেই। একটু রহস্যময় মনে হয় না কি?

তা মনে হয় বৈকি। এ বিষয়ে কি করা যেতে পারে?

ব্যোমকেশ ভাবিয়া বলিল, প্ৰাণহরি যার ট্যাক্সিতে যাতায়াত করত তাকে পেলে সওয়াল জবাব করা যায়। তাকে চেনেন নাকি?

বরাট বলিলেন, না, তার খোঁজ করা দরকার মনে হয়নি। এক কাজ করা যাক, ভুবন দাসকে ডেকে পাঠাই, সে নিশ্চয় সন্ধান দিতে পারবে।

ভুবন দাস?—

সে-রাত্রে ওদের চারজনকে যে ট্যাক্সি-ড্রাইভার প্রাণহরির বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিল তার নাম ভুবনেশ্বর দাস।

ও-তাকে কি পাওয়া যাবে?

কাছেই ট্যাক্সি-স্ট্যান্ড। আমি ডেকে পাঠাচ্ছি।

পনেরো মিনিট পরে ভুবনেশ্বর দাস আসিয়া স্যালুট করিয়া দাঁড়াইল। দোহারা চেহারা, খাঁকি প্যান্টুলুন ও শার্ট, মাথায় গার্ডসাহেবের মত টুপি। বয়স আন্দাজ ত্রিশ-বত্ৰিশ, চোখ দুটি অরুণাভ, মুখ গভীর। সন্দেহ হইল লোকটি নেশাভাঙ করিয়া থাকে।

বরাট ঘাড় নাড়িয়া ব্যোমকেশকে ইঙ্গিত করিলেন, ব্যোমকেশ ভুবন দাসকে একবার আগাপাস্তলা দেখিয়া লইয়া প্রশ্ন আরম্ভ করিল, তোমার নাম ভুবন দাস। মিলিটারিতে ছিলে?

ভুবন দাস বলিল, আজ্ঞে।

সিপাহী ছিলে?

আজ্ঞে না, ট্রাক-ড্রাইভার৷

ট্যাক্সি চালাচ্ছ কত দিন?

তিন-চার বছর।

তিন-চার বছর এখানেই ট্যাক্সি চালাচ্ছ?

আজ্ঞে না, এখানে বছর দেড়েক আছি, তার আগে কলকাতায় ছিলাম।

বাড়ি কোথায়?

মেদিনীপুর জেলা, ভগবানপুর গ্রাম।

তুমি সেদিন চারজনকে নিয়ে প্রাণহরি পোদ্দারের বাড়িতে গিয়েছিলে?

আজ্ঞে বাড়িতে নয়, বাড়ি থেকে খানিকটা দূরে।

বেশ। তোমার ট্যাক্সিতে যেতে যেতে ওরা নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলেছিল?

ভুবন দাস একটু নীরব থাকিয়া বলিল, বলেছিল। আমি সব কথায় কান করিনি।

ব্যোমকেশ বলিল, কিছু মনে আছে?

ভুবন দাস আবার কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া বলিল, বোধ হয় কোনো মেয়েলোকের সম্বন্ধে কথা হচ্ছিল। চাপা গলায় কথা হচ্ছিল, ভাল শুনতে পাইনি।

ব্যোমকেশ বলিল, আচ্ছা যাক। বল দেখি, তোমার চারজন যাত্রীর কারুর হাতে কোনো অস্ত্ৰ ছিল?

একজনের হাতে ছড়ি ছিল।

আর কারুর হাতে কিছু ছিল না?

লক্ষ্য করিনি।

তুমি নেশা কর?

আজ্ঞে না বলিয়া ভুবন দাস ইন্সপেক্টর বরাটের দিকে বক্ৰ কটাক্ষপাত করিল।

শহরে তোমার বাসা কোথায়?

বাসা নেই। রাত্তিরে গাড়িতেই শুয়ে থাকি।

গাড়ি তোমার নিজের?

আজ্ঞে হ্যাঁ।

শহরের অন্য ট্যাক্সি-ড্রাইভারের সঙ্গে তোমার নিশ্চয় জানাশোনা আছে।

জানাশোনা আছে, বেশি মেলামেশা নেই।

বলতে পারো, কার ট্যাক্সিতে চড়ে প্ৰাণহরি পোদ্দার শহরে যাওয়া-আসা করতেন?

মনে হইল। ভুবন দাসের রক্তাভ চোখে একটু কৌতুকের ঝিলিক খেলিয়া গেল। সে কিন্তু গম্ভীর স্বরেই বলিল, আজ্ঞে স্যার, আমার ট্যাক্সিতে।

আমরা অবাক হইয়া চাহিয়া রহিলাম। তারপর বিরাট কড়া সুরে বলিলেন, একথা আগে আমাকে বলনি কেন?

ভুবন বলিল, আপনি তো সুধোননি স্যার।

ব্যোমকেশ হাসি চাপিয়া পকেট হইতে সিগারেট বাহির করিল। ট্যাক্সি-ড্রাইভার সম্প্রদায় অকারণে বাক্য ব্যয় করে না। অবশ্য ভাড়া লইয়া ঝগড়া বাধিলে স্বতন্ত্র কথা।

ব্যোমকেশ বলিল, তুমি তাহলে প্ৰাণহরি পোদ্দারকে আগে থাকতেই চিনতে?

ভুবন বলিল, আজ্ঞে।

তিনি কি রকম লোক ছিলেন?

ভাল লোক ছিলেন স্যার, কখনো ভাড়ার টাকা ফেলে রাখতেন না। ভুবনের কাছে ইহাই সাধুতার চরম নিদর্শন।

রোজ নগদ ভাড়া দিতেন?

আজ্ঞে না, মাস-মাইনের ব্যবস্থা ছিল।

কত টাকা মাস-মাইনে?

পঁয়ত্ৰিশ টাকা।

বরাটের সহিত ব্যোমকেশ মুখ-তাকাত কি করিল, তারপর ভুবনকে বলিল, প্রাণহরি পোদ্দারের সম্বন্ধে তুমি কী জানো সব আমায় বল।

ভুবন বলিল, বেশি কিছু জানি না। স্যার। শহরে ওঁর একটা অফিস আছে। বছরখানেক আগে উনি আমাকে ডেকে পাঠিয়ে মাস-মাইনেতে ট্যাক্সি ভাড়া করার কথা তোলেন, আমি রাজী হই। তারপর থেকে আমি ওঁকে সকালে বাড়ি থেকে নিয়ে আসতাম, আবার বিকেলবেলা পৌঁছে দিতাম। বাংলা মাসের গোড়ার দিকে উনি আমাকে অফিসে ডেকে ভাড়া চুকিয়ে দিতেন। এর বেশি ওঁর বিষয়ে আমি কিছু জানি না।

তুমি মাত্র পঁয়ত্ৰিশ টাকা মাস-মাইনেতে রাজী হয়েছিলে? লাভ থাকতো?

সামান্য লাভ থাকতো। বাঁধা ভাড়াটে তাই রাজী হয়েছিলাম।

ব্যোমকেশ খানিক চোখ বুজিয়া বসিয়া রহিল, তারপর প্রশ্ন করিল, অন্য কোনো ট্যাক্সি-ড্রাইভারের সঙ্গে প্রাণহরিবাবুর কারবার ছিল কিনা জানো?

ভুবন বলিল, আজ্ঞে, আমি জানি না।

ব্যোমকেশ নিশ্বাস ফেলিয়া বলিল, আচ্ছা, তুমি এখন যাও। যদি প্রাণহরি সম্বন্ধে কোনো কথা মনে পড়ে দারোগাবাবুকে জানিও।

আজ্ঞে।

ভুবন দাস স্যালুট করিয়া চলিয়া গেল। তিনজনে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসিয়া রহিলাম। তারপর বরাট বলিলেন, কিছুই তো পাওয়া গেল না। হিসেবের খাতায় হয়তো ভুল করেই খরচের জায়গায় জমা লেখা হয়েছে।

ব্যোমকেশ বলিল, কিংবা সাংকেতিক জমা-খরচ।

ভ্রূ তুলিয়া বরাট বলিলেন, সাংকেতিক জমা-খরচ কি রকম?

ব্যোমকেশ বলিল, মনে করুন প্রাণহরি পোদ্দার কাউকে ব্ল্যাকমেল করছিল। ভুবন দাস তাকে যত ভাল লোকই মনে করুক আমরা জানি সে প্যাঁচালো লোক ছিল। মনে করুন। সে মাসিক সত্তর টাকা হিসেবে ব্ল্যাকমেল আদায় করছে, কিন্তু সে-টাকা তো সে হিসেবের খাতায় দেখাতে পারে না। এদিকে ট্যাক্সি-ড্রাইভারকে দিতে হয় মাসে পঁয়ত্ৰিশ টাকা। প্রাণহরি খাতায় সাংকেতিক হিসেব লিখল, সত্তর টাকা থেকে পঁয়ত্ৰিশ টাকা বাদ দিয়ে পঁয়ত্ৰিশ টাকা জমা করল। যাকে ব্ল্যাকমেল করছে তার নাম লিখতে পারে না, তাই ট্যাক্সি-ড্রাইভারের নাম লিখল। বুঝেছেন?

বরাট বলিলেন, বুঝেছি। অসম্ভব নয়। প্রাণহারির মনটা খুবই প্যাঁচালো ছিল, কিন্তু আপনার মন আরো প্যাঁচালো।

ব্যোমকেশ হাসিতে হাসিতে উঠিয়া দাঁড়াইল, আচ্ছা, আজ উঠি। প্রাণহরি কাকে ব্ল্যাকমেল করছিল জানতে পারলে হয়তো খুনের একটা সূত্র পাওয়া যেত। কিন্তু ওর দলিল-পত্রে ওরকম কিছু বোধহয় পাওয়া যায়নি?

না। যে দু’চারটে কাগজপত্র পাওয়া গেছে তাতে বে-আইনী কার্যকলাপের কোনো ইঙ্গিত নেই। —আজ ওবেলা আসছেন নাকি?

লোমকেশ বলি, ওবেলা আপনাকে আর বিরক্ত করব না। ফণীশের সঙ্গে কয়লা ক্লাবে যাচ্ছি।

কয়লা ক্লাবের বাড়িটি সুবিস্তৃত ভূমিখণ্ড দ্বারা পরিবেষ্টিত। সামনে বাগান ও মোটর রাখিবার পার্কিং লন, দুই পাশে ব্যাডমিণ্টন টেনিস প্রভৃতি খেলিবার স্থান। বাড়িটি একতলা হইলেও অনেকগুলি বড় বড় ঘর আছে। মাঝখানের হলঘরে বিলিয়ার্ড খেলার টেবিল; অন্য ঘরের কোনোটিতে পিংপং টেবিল, কোনোটিতে চার পাঁচটা তাস খেলার টেবিল ও চেয়ার। আবার একটা ঘরের মেঝোয় ফরাস পাতা, এখানে দাবা ও পাশা খেলার আসর। বাড়ির পিছন ভাগে দুইটি অপেক্ষাকৃত ছোট ঘর; একটিতে ম্যানেজারের অফিস, অন্যটিতে পানাহারের ব্যবস্থা, টুকিটাকি খাবার, নরম ও গরম নানা জাতীয় পানীয় এখানে সভ্যদের জন্য প্রস্তুত থাকে।

আমরা যখন ক্লাবে গিয়া পৌছিলাম তখনও যথেষ্ট দিনের আলো আছে। অনেক সভ্য সমবেত হইয়াছেন। বাহিরে টেনিস কোর্টে খেলা চলিতেছে; চারজন খেলিতেছে, বাকি সকলে কোর্টের পাশে চেয়ার পাতিয়া বসিয়া খেলা দেখিতেছেন। ফণীশ আমাদের সেই দিকে লইয়া চলিল।

কিছুক্ষণ দাঁড়াইয়া খেলা দেখিবার পর ব্যোমকেশ ফণীশের কানে কানে বলিল, তোমার বন্ধুদের মধ্যে কেউ আছে নাকি?

ফণীশ বলিল, ঐ যে খেলছেন, তোয়ালের নীল গেঞ্জি আর শাদা প্যান্টুলুন, উনি মৃগেন মৌলিক।

একটু রোগা ধরনের শরীর হইলেও মৃগেন মৌলিকের চেহারা বেশ খেলোয়াড়ের মত। খেলার ভঙ্গীতে একটু চালিয়াতি ভাব আছে, কিন্তু সে ভালই টেনিস খেলে। ব্যাকহ্যান্ড বেশ জোরালো; নেটের খেলাও ভাল।

ব্যোমকেশ খেলা দেখিতে দেখিতে বলিল, বাকি দু’জন। এখানে নেই?

ফণীশ বলিল, না। চলুন, ভেতরে যাওয়া যাক।

এই সময় পিছন হইতে কণ্ঠস্বর শোনা গেল, ব্যোমকেশবাবু—থুড়ি—গগনবাবু যে!

ফিরিয়া দেখিলাম, আমাদের পূর্ব-পরিচিত গোবিন্দ হালদার ব্যোমকেশের পানে চাহিয়া মধুর গেরিলা-হাস্য হাসিতেছেন।

ব্যোমকেশ কিন্তু হাসিল না, স্থির-দৃষ্টিতে গোবিন্দবাবুকে নিরীক্ষণ করিয়া বলিল, আসল নামটা জানতে পেরেছেন দেখছি। কি করে জানলেন?

গোবিন্দবাবু বলিলেন, প্রথম দেখেই সন্দেহ হয়েছিল। তারপর দুই আর দুয়ে মিলিয়ে দেখলাম ঠিক মিলে গেল। গগন—ব্যোমকেশ, সুজিত—অজিত।

ব্যোমকেশ বলিল, আমাদের নামকরণ ভাল হয়নি, কাঁচা কাজ হয়েছিল। কিন্তু আসল নামের বহুল প্রচার কি বাঞ্ছনীয়?

গোবিন্দবাবু বলিলেন, আমি প্রচার করছি না। নামটা আলটপকা মুখ দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল। যা হোক, আমাদের ক্লাবে পদার্পণ করেছেন খুবই আনন্দের কথা। উদ্দেশ্য কিছু আছে নাকি?

ব্যোমকেশ বলিল, আপনার কি মনে হয়?

গোবিন্দবাবুর মন্থর চক্ষু দুটি একবার ফণীশের দিকে গিয়া আবার ব্যোমকেশের মুখে ফিরিয়া আসিল, আপনি কাজের লোক, অকারণে আমোদ করে বেড়াবেন বিশ্বাস হয় না। কাজেই এসেছেন। কিন্তু কোন কাজ? কয়লাখনির রহস্য উদঘাটন?

ব্যোমকেশ আবার বলিল, আপনার কি মনে হয়?

গোবিন্দবাবুর চক্ষু দুটি কুঞ্চিত হইয়া ক্ৰমে দুইটি ক্ষুদ্র বিন্দুতে পরিণত হইল, তাহলে ঠিকই আন্দাজ করেছি। দেখুন, আপনি হুঁশিয়ার লোক, তবু সাবধান করে দিচ্ছি। কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ বের করবেন না।’ তাঁহার কুঞ্চিত চক্ষুযুগল একবার ফণীশের দিকে সঞ্চারিত হইল, তারপর তিনি টেনিস কোর্টের কিনারায় গিয়া চেয়ারে বসিলেন।

ফণীশের মুখে শঙ্কার ছায়া পড়িয়ছিল, সে স্বলিত স্বরে বলিল, গোবিন্দবাবু অরবিন্দবাবুর বড় ভাই। উনি যদি বাবাকে বলে দেন—

ব্যোমকেশ বলিল, ভয় নেই, গোবিন্দবাবু কাউকে কিছু বলবেন না। উনি নিজের দুৰ্বৃত্ত ছোট ভাইটিকে ভালবাসেন।—চল, ভিতরে যাই।

বাড়ির সামনের বারান্দায় একটি টেবিলে দৈনিক সংবাদপত্র সাপ্তাহিক প্রভৃতি সাজানো রহিয়াছে, আমরা সেইখানে গিয়া বসিলাম। ফণীশ একজন তকমাধারী ভৃত্যকে ডাকিয়া তিন গেলাস ঘোলের সরবৎ হুকুম করিল।

বরফ-শীতল সরবৎ চাখিতে চাখিতে দেখিতেছি, ঘোর ঘোর হইয়া আসিতেছে। বাহিরে টেনিস খেলা শেষ হইল। সভ্যেরা ভিতরে আসিতেছেন, নানা কথার ছিন্নাংশ কানে আসিতেছে। বাড়ির ভিতরে ঘরে ঘরে উজ্জ্বল বিদ্যুৎবাতি জ্বলিয়া উঠিয়াছে। টেবিল-টেনিসের ঘর হইতে খটখট শব্দ আসিতেছে। হঠাৎ কোনও সভ্য উচ্চকণ্ঠে হাঁকিতেছেন—এই বেয়ারা!

সম্ভ্রান্ত সমৃদ্ধ জীবনযাত্রার একটি চলমান চিত্র। সরবৎ নিঃশেষ হইলে আমরা সিগারেট ধরাইয়া বাড়ির অভ্যন্তরে প্রবেশ করিলাম। মাঝের হলঘরে দুইজন নিঃশব্দ খেলোয়াড় নিরুদ্বেগ মন্থরতায় বিলিয়ার্ড খেলিতেছেন; প্ৰকাণ্ড টেবিলের উপর তিনটা বল তিনটি শিশুর মত লুকোচুরি খেলিতেছে। —এখানে আমাদের দ্রষ্টব্য কেহ নাই। এখান হইতে টেবিল-টেনিসের ঘরে গেলাম; দ্বারের কাছে দাঁড়াইয়া দেখিলাম, হাফ-ভলির খেলা চলিতেছে; খটাখট শব্দে বল টেবিলের এপার হইতে ওপারে ছুটাছুটি করিতেছে; ব্যস্ত-সমস্ত একটি শুভ্র বুদ্বুদ। এ ঘরেও আমাদের দর্শনীয় কেহ নাই।

ফরাস-পাত ঘর হইতে মাঝে মাঝে হাল্লার আওয়াজ আসিতেছিল। সেখানে পাশা বসিয়াছে, চারজন খেলোয়াড় ছক ঘিরিয়া চতুষ্কোণভাবে বসিয়াছেন। একজন দুহাতে হাড় ঘষিতে ঘষিতে আদূরে সুরে পাশাকে সম্বোধন করিয়া বলিতেছেন, ‘পাশা! বারো-পাঞ্জা-সতেরো! একবারটি বারো-পাঞ্জা সতেরো দেখাও! এমন মার মারব, পেটের ছানা বেরিয়ে যাবে।’ তিনি পাশা ফেলিলেন। বিরুদ্ধ পক্ষ হইতে বিপুল হর্ষধ্বনি উঠিল—‘তিনি কড়া! তিনি কড়া।’

আমরা দ্বারের নিকট হইতে অপসৃত হইয়া তাসের ঘরে উপনীত হইলাম। তাসের ঘরে সব টেবিল এখনও ভর্তি হয় নাই; কোনও টেবিলে একজন বসিয়া পেশেন্স খেলিতেছেন, কোনও টেবিলে তিনজন খেলোয়াড় চতুর্থ ব্যক্তির অভাবে গলা-কাটা খেলা খেলিয়া সময় কাটাইতেছেন। একটি টেবিলে চতুরঙ্গ খেলা বসিয়াছে; চারজন খেলোয়াড় গভীর মনঃসংযোগে নিজ নিজ তাস দেখিতেছেন। একজন বলিলেন, ‘থ্রি হার্টস।’ কন্ট্রাক্ট খেলা।

ফণীশ ফিসফিস করিয়া বলিল, যিনি ডাক দিলেন মধুময় সুর, আর তাঁর পার্টনার অরবিন্দ হালদার।

ব্যোমকেশ টেবিলের কাছে গেল না, দূর হইতে সেইদিক পানে চাহিয়া রহিল। অরবিন্দ হালদার যে গোবিন্দ হালদারের ছোট ভাই, তাহা পরিচয় না দিলেও বোঝা যায়। সেই গেরিলাগঞ্জন রূপ, কেবল বয়স কম। মধুময় সুর ফিট্‌ফট শৌখিন লোক, চেহারায় ব্যক্তিত্বের অভাব গিলে-করা পাঞ্জাবি ও হীরার বোতাম প্রভৃতি দিয়া পূর্ণ করিবার চেষ্টা দেখা যায়।

খেলা আরম্ভ হইয়াছে, ডামি হইয়াছেন বিপক্ষ দলের একজন। স্লামের খেলা, কাহারও অন্য দিকে মন নাই।

পাঁচ মিনিট খেলা দেখিয়া ব্যোমকেশ ইশারা করিল, আমরা বাহিরে আসিলাম। সে সম্ভাব্য আসামীদের দেখিয়া সন্তুষ্ট হইতে পারে নাই, শুষ্ক স্বরে বলিল, যা দেখবার দেখা হয়েছে, চল এবার বাড়ি ফেরা যাক।

ব্যোমকেশ বলিল, তিনটে মানুষকে দেখলাম, তাদের পরিবেশ দেখলাম, হাত-পা নাড়া দেখলাম। —ফণীশ, কাল সকালে আমরা ওদের বাড়িতে যাব। আলাপ-পরিচয় করা দরকার। আজ যা পেয়েছি তার চেয়ে বেশি কিছু পাব আশা করি না, তবু—

আজ কিছু পেয়েছ তাহলে?

পেয়েছি। যদিও সেটা নেতিবাচক।

পরদিন সকালে ফণীশ বাপের সঙ্গে কয়লাখনিতে গেল না, মণীশবাবু একাই গেলেন। ফণীশ আমাদের গাড়ি চালাইয়া লইয়া চলিল। গাড়িতে স্টার্ট দিয়া বলিল, আগে কোথায় যাবেন?

ব্যোমকেশ বলিল, আমার কারুর প্রতি পক্ষপাত নেই, যার বাড়ি কাছে তার বাড়িতে আগে চল।

তাহলে মৃগেনবাবুর বাড়িতে চলুন।

মৃগেন মৌলিকের বাড়িটি অতিশয় সুশ্ৰী, গৃহস্বামীর শৌখিন রুচির পরিচয় দিতেছে। আমাদের মোটর বাগান পার হইয়া গাড়ি-বারান্দায় উপস্থিত হইলে দেখিলাম মৃগেন মৌলিক বাড়ির সম্মুখে ইজি-চেয়ারে হেলান দিয়া খবরের কাগজ পড়িতেছে, তাহার পরিধানে চিলা পায়জামা ও সিঙ্কের ড্রেসিং গাউন। আমরা গাড়ি হইতে নামিলে সে কাগজ মুড়িয়া আমাদের পানে চোখ তুলিল। স্বাগত সম্ভাষণের হাসি তাহার মুখে ফুটিল না, বরঞ্চ মুখ অন্ধকার হইল। আমরা তাহার নিকটবর্তী হইলে সে রূঢ় স্বরে বলিল, কি চাই?

আমরা থমকিয়া দাঁড়াইয়া পড়িলাম। ফণীশ বলিল, মৃগেনবাবু, এঁরা আমার বাবার বন্ধু, কলকাতা থেকে এসেছেন—

ফণীশের প্রতি তীব্র ঘৃণার দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া মৃগেন বলিল, জানি। ব্যোমকেশ বক্সী কার নাম।

ফণীশ থাতমত খাইয়া গেল। ব্যোমকেশ বলিল, আমি ব্যোমকেশ বক্সী। আপনার সঙ্গে দুটো কথা ছিল।

মৃগেন মুখ বিকৃত করিয়া অসীম অবজ্ঞার স্বরে বলিল, ‘এখানে কিছু হবে না, আপনারা যেতে পারেন।’ বলিয়া নিজেই কাগজখানা বগলে লইয়া বাড়ির মধ্যে চলিয়া গেল।

আমরা পরস্পর মুখের পানে চাহিলাম। ফণীশের মুখ অপমানে সিন্দুরবর্ণ ধারণ করিয়াছে, ব্যোমকেশের অধরে লাঞ্ছিত হাসি। সে বলিল, গোবিন্দ হালদার দেখছি আসামীদের সতর্ক করে দিয়েছেন।

ফণীশ বলিল, চলুন, বাড়ি ফিরে যাই।

ব্যোমকেশ মাথা নাড়িয়া বলিল, না, যখন বেরিয়েছি তখন কাজ সেরে বাড়ি ফিরব। ফণীশ, তুমি লজ্জা পেও না। সত্যান্বেষণ যাদের কাজ তাদের লজ্জা, ঘৃণা, ভয় ত্যাগ করতে হয়; চল, এবার মধুময় সুরের বাড়িতে।

মোটরে যাইতে যাইতে আমি বলিলাম, কিন্তু কেন? এরকম ব্যবহারের মানে কি? মৃগেন মৌলিক যদি নির্দোষ হয় তাহলে তার ভয় কিসের?

ব্যোমকেশ বলিল, ওদের ধারণা হয়েছে। আমি ফণীশের দলের লোক, ফণীশকে বাঁচিয়ে ওদের ফাঁসিয়ে দিতে চাই।

মধুময় সুরের বাড়িটি সেকেলে ধরনের, বাগানের কোনও শোভা নাই। বাড়ির সদর বারান্দায় মধুময় সুর গামছা পরিয়া মাদুরের উপর শুইয়া ছিল এবং একটা মুস্কো জোয়ান চাকর তৈল দিয়া তাহার দেহ ডলাই-মলাই করিতেছিল। মধুময়ের শরীর খুব মাংসল নয়, কিন্তু একটি নিরেট গোছের ক্ষুদ্র ভূড়ি আছে! আমাদের দেখিয়া সে উঠিয়া বসিল।

ফণীশ ক্ষীণ কুষ্ঠিত স্বরে আরম্ভ করিল, মধুময়বাবু, মাফ করবেন, এটা আপনার স্নানের সময়—

মধুময় তাহার কথায় কৰ্ণপাত না করিয়া আমাদের দিকে কয়েকবার চক্ষু মিটমিটি করিল, তারপর পাখি-পড়া সুরে বলিল, আপনারা আমার কাছে কেন এসেছেন, আমি প্রাণহরি পোদ্দারের মৃত্যু সম্বন্ধে কিছু জানি না। যদি কেউ বলে থাকে আমি তার মৃত্যুর রাত্রে তার বাড়িতে গিয়েছিলাম। তবে তা মিথ্যে কথা। অন্য কেউ গিয়েছিল কিনা আমি জানি না, আমি যাইনি।’ বলিয়া মধুময় সুর আবার শয়নের উপক্ৰম করিল।

ব্যোমকেশ বলিল, ট্যাক্সি-ড্রাইভার কিন্তু আপনাকে সনাক্ত করেছে।

মধুময় বলিল, ট্যাক্সি-ড্রাইভার মিথ্যাবাদী। —আসুন, নমস্কার।

ব্যোমকেশ চট্‌ করিয়া প্রশ্ন করিল, আপনার একটা টর্চ আছে?

মধুময় বলিল, আমার পাঁচটা টাৰ্চ আছে। আসুন, নমস্কার।

মধুময় শয়ন করিল, ভূত্য আবার তেল-মৰ্দন আরম্ভ করিল। আমরা চলিয়া আসিলাম। অরবিন্দ হালদারের বাড়ির দিকে যাইতে যাইতে ব্যোমকেশ বলিল, আমরা আসব মধুময় জানতো, আমাদের কী বলবে মুখস্থ করে রেখেছিল। যাই বল, মৃগেন মৌলিকের চেয়ে মধুময় সুর ভদ্র। কেমন মিষ্টি সুরে বলল—আসুন, নমস্কার। নিমচাঁদ দত্তের ভাষায়—ছেলেটি বে-তরিবৎ নয়।

অরবিন্দ হালদার ও গোবিন্দ হালদার একই বাড়িতে বাস করেন, কিন্তু মহল আলাদা। অরবিন্দ নিজের বৈঠকখানায় ফরাস-ঢাকা তক্তপোশের উপর মোটা তাকিয়া মাথায় দিয়া শুইয়া সিগারেট টানিতেছিল, আমাদের দেখিয়া কনুই-এ ভর দিয়া উঠিল। তাহার চক্ষু রক্তবর্ণ, কালো মুখে দাড়ির কর্কশতা। সে আমাদের পর্যায়ক্রমে নিরীক্ষণ করিয়া শেষে বলিল, এস ফণীশ।

ফণীশ পাংশুমুখে বলিল, এঁরা—

অরবিন্দ বলিল, ‘জানি। বসুন আপনারা।’ বলিয়া সিগারেটের কোটা আগাইয়া দিল।

শিষ্টতার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না, তাই একটু থতমত হইলাম। ব্যোমকেশ তক্তপোশের কিনারায় বসিল, আমরাও বসিলাম। অরবিন্দ সহজ সুরে বলিল, ‘কাল রাত্রে মাত্রা বেশি হয়ে গিয়েছিল। এখনো খোঁয়ারি ভাঙেনি। —ওরে গদাধর।

একটি ভূত্য কাচের গেলাসে পানীয় আনিয়া দিল, অরবিন্দ এক চুমুকে তাহা নিঃশেষ করিয়া গেলাস ফেরৎ দিয়া বলিল, আপনাদের জন্যে কী আনাব বলুন। চা? সরবৎ? বীয়ার?

ব্যোমকেশ বিনীত কণ্ঠে বলিল, ধন্যবাদ। ওসব কিছু চাই না, অরবিন্দবাবু; আপনার সঙ্গে দুটো কথা বলবার সুযোগ পেলেই কৃতাৰ্থ হয়ে যাব।

অরবিন্দ বলিল, বিলক্ষণ! কি বলবেন বলুন। তবে একটা কথা গোড়ায় জানিয়ে রাখি। ফণীশ আপনাকে কী বলেছে জানি না, কিন্তু প্রাণহরি পোদ্দারের মৃত্যুর রাত্রে আমি তার বাড়িতে যাইনি।

ব্যোমকেশ একটু নীরব থাকিয়া বলিল, অরবিন্দবাবু, আমার কোনো কু-মতলব নেই। নির্দোষ ব্যক্তিকে খুনের মামলায় ফাঁসানো আমার কাজ নয়, আমি সত্যান্বেষী। অবশ্য আপনি যদি অপরাধী হন—

অরবিন্দ বলিল, আমি নিরপরাধ। প্রাণহরির মৃত্যুর রাত্রে আমি তার বাড়ির ত্ৰিসীমানায় যাইনি। এই কথাটা বুঝে নিয়ে যা প্রশ্ন করবেন করুন।

ব্যোমকেশ বলিল, বেশ, ও প্রসঙ্গ না হয় বাদ দেওয়া গেল। কিন্তু প্ৰাণহারির মৃত্যুর আগে আপনি কয়েকবার তার বাড়িতে গিয়েছিলেন।

অরবিন্দ বলিল, হ্যাঁ, গিয়েছিলাম। আমরা চারজনে জুয়া খেলতে যেতাম।

ব্যোমকেশ বলিল, জুয়া খেলার সময় ছাড়াও আপনি কয়েকবার একলা তার বাড়িতে গিয়েছিলেন।

অরবিন্দের মুখে একটা বিশ্রী লুচ্চামির হাসি খেলিয়া গেল, সে বলিল, তা গিয়েছিলাম।

কি জন্যে গিয়েছিলেন?

নির্লজভাবে দন্ত বিকাশ করিয়া অরবিন্দ বলিল, মোহিনীকে দেখতে। তার সঙ্গে ভাব জমাতে।

ব্যোমকেশ বাঁকা সুরে বলিল, কিন্তু সুবিধে হল না?

অরবিন্দের মুখের হাসি মিলাইয়া গেল, সে বড় বড় চোখে ব্যোমকেশের পানে চাহিল, সুবিধে হল না—তার মানে?

ব্যোমকেশ বলিল, মানে বুঝতেই পারছেন। আপনি কি বলতে চান যে?

অরবিন্দ হঠাৎ উচ্চকণ্ঠে হাসিয়া উঠিল, তারপর হাসি থামাইয়া বলিল, ব্যোমকেশবাবু, আপনি মস্ত একজন ডিটেকটিভ হতে পারেন। কিন্তু দুনিয়াদারির কিছুই জানেন না। মোহিনী তো তুচ্ছ মেয়েমানুষ, দাসীবাদী। টাকা ফেললে এমন জিনিস নেই যা পাওয়া যায় না।

ব্যোমকেশ বলিল, কত টাকা ফেলেছিলেন?

অরবিন্দ দুই আঙুল তুলিয়া বলিল, দু'হাজার টাকা।

মোহিনীকে দু'হাজার টাকা দিয়েছিলেন? দাসীবাদীর পক্ষে দাম একটু বেশি নয় কি?

মোহিনীকে দিইনি। মোহিনীর দালালকে দিয়েছিলাম। প্ৰাণহরি পোদ্দারকে। অরবিন্দের কথাগুলো বিষমাখানো।

ব্যোমকেশ কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া বলিল, আচ্ছা, ও কথা যাক। প্রাণহরি পোদ্দার লোকটা কেমন ছিল?

অরবিন্দ নীরসকণ্ঠে বলিল, চামার ছিল, অর্থ-পিশাচ ছিল। সাধারণ মানুষ যেমন হয় তেমনি ছিল।

সাধারণ মানুষ সম্বন্ধে অরবিন্দের ধারণা খুব উচ্চ নয়। ব্যোমকেশ বলিল, জুয়াতে প্রাণহরি পোদ্দার আপনাদের অনেক টাকা ঠকিয়েছিল?

অরবিন্দ তাচ্ছিলভরে বলি, সে জিতেছিল। আমরা হেরেছিলাম। ঠকিয়েছিল কিনা বলতে পারি না।

তবে তাকে ঠেঙাতে গিয়েছিলেন কেন?

অরবিন্দ উত্তর দিবার জন্য মুখ খুলিয়া থামিয়া গেল, ব্যোমকেশকে একবার ভালভাবে নিরীক্ষণ করিয়া বলিল, কে বললে ঠেঙাতে গিয়েছিলাম? যারা গিয়েছিল তারা নিজের কথা বলুক, আমি কাউকে ঠেঙাতে যাইনি।

আমি ফণীশের দিকে অপাঙ্গ-দৃষ্টি নিক্ষেপ করিলাম। সে হেঁট মুখে শুনিতেছিল, একবার চোখ তুলিয়া অরবিন্দের পানে চাহিল, তারপর আবার মাথা হেঁট করিল।

ব্যোমকেশ নিশ্বাস ছাড়িয়া উঠিয়া দাঁড়াইল, ধীরে ধীরে বলিল, আপনি যেটুকু বললেন, তাতেও গরমিল আছে, মোহিনীর কথার সঙ্গে আপনার কথা মিলছে না। হয়তো আপনার কথাই সত্যি। আচ্ছা, নমস্কার। আপনার দাদাকে বলবেন, পুলিসকে ঘুষ দিতে যাওয়া নিরাপদ নয়, তাতে সন্দেহ আরো বেড়ে যায়। সব পুলিস অফিসার ঘুষখোর নয়।

অতঃপর তিনদিন আমরা প্রায় নিষ্কমার মত কাটাইয়া দিলাম, প্রাণহরি পোদ্দারের মৃত্যুরহস্য ত্রিশঙ্কুর মত শূন্যে ঝুলিয়া রহিল। নূতন তথ্য আর কিছু পাওয়া যায় নাই, পূর্বে সামান্য যেটুকু পাওয়া গিয়াছিল তাঁহাই সম্বল। কটক হইতে ইন্সপেক্টর বরাটের বন্ধু পট্টনায়ক প্রাণহরির অতীত সম্বন্ধে যে পত্ৰ দিয়াছিলেন তাহার দ্বারাও খুনের উপর আলোকপাত হয় নাই। প্রাণহরি পোদ্দার পেশাদার জুয়াড়ী ছিল, কিন্তু কোনও দিন পুলিসের হাতে পড়ে নাই। সে বছর-দুই কটকে ছিল, কোথা হইতে কটকে আসিয়াছিল তাহা জানা যায় না। তাহার পোষ্য কেহ ছিল না, কাজকর্মও ছিল না। নিজের বাড়িতে কয়েকজন বড়মানুষের অর্বাচীন পুত্ৰকে লইয়া জুয়ার আড্ডা বসাইত। ক্ৰমে অর্বাচীনেরা বুঝিল প্ৰাণহরি জুয়াচুরি করিয়া তাঁহাদের রুধির শোষণ করিতেছে, তখন তাহারা প্রাণহরিকে উত্তম-মধ্যম দিবার পরামর্শ করিল। কিন্তু পরামর্শ কার্যে পরিণত করিবার পূর্বেই একদিন প্রাণহরি পোদ্দার নিরুদ্দেশ্য হইল। তাহার বাড়িতে একটি যুবতী দাসী কাজ করিত, সেও লোপাট হইল। অনুমান হয় বৃদ্ধ প্রাণহরির সহিত দাসীটার অবৈধ ঘনিষ্ঠতা ছিল।

ব্যোমকেশের চিত্তে সুখ নাই। ইন্দিরার চোখে অবার উদ্বেগ ও আশঙ্কা ঘনীভূত হইতেছে। ফণীশ ছট্‌ফট করিতেছে। মণীশবাবু গভীর প্রকৃতির লোক, কিন্তু তিনিও যেন একটু অধীর হইয়া উঠিতেছেন। কয়লাখনির অনামা দুৰ্বত্তেরা এখনও ধরা পড়ে নাই।

বিকাশ দত্ত আসিয়াছে এবং কয়লাখনির হাসপাতালে যোগ দিয়াছে। আমরা একদিন বিকালে মণীশবাবুর সঙ্গে কয়লাখনিতে গিয়াছিলাম, ব্যোমকেশ হাসপাতাল পরিদর্শনের ছুতায় বিকাশের সঙ্গে দেখা করিয়াছে এবং উপদেশ দিয়া আসিয়াছে।

এই তিন দিনের মধ্যে কেবল একটিমাত্র বিশিষ্ট ঘটনা ঘটিয়াছে যাহার উল্লেখ করা যায়। ব্যোমকেশ ক্রমান্বয়ে বিছানায় শুইয়া, ঘরে পায়চারি করিয়া অতিষ্ঠ হইয়া উঠিয়াছিল। তাই কাল সন্ধ্যার পর আমাকে বলিল, চল, রাস্তায় একটু বেড়ানাে যাক।

রাস্তাটা নির্জন, আলো খুব উজ্জ্বল নয়, বাতাস বেশ ঠাণ্ডা। মাঝে মাঝে দু একজন পদচারী, দুই একটি মোটর যাতায়াত করিতেছে। ব্যোমকেশ হঠাৎ বলিল, প্রাণহরি পোদ্দারের মত একটা থার্ড ক্লাস লোকের হত্যারহস্য তদন্ত করার কী দরকার? যে মেরেছে বেশ করেছে, তাকে সোনার মেডেল দেওয়া উচিত৷।

বলিলাম, সোনার মেডেল দিতে হলেও তো লোকটাকে চেনা দরকার।

আর কিছুক্ষণ পায়চারি করিয়া ব্যোমকেশ বলিল, মোহিনীর কাছে আর একবার যেতে হবে। তাকে একটা কথা জিগ্যেস করা হয়নি।

এই সময় বাইসাইকেল প্রথম লক্ষ্য করিলাম। আমরা রাস্তার একটু পাশ ঘেষিয়া পায়চারি করিতেছিলাম, দেখিলাম সামনের দিকে আন্দাজ পঞ্চাশ গজ দূরে একটা সাইকেল আসিতেছে। সাইকেলে আলো নাই, রাস্তার আলোতে আরোহীকে অস্পষ্টভাবে দেখা যায়; তাহার মাথায় সোলার টুপি মুখখানাকে আড়াল করিয়া রাখিয়াছে। দেখিতে দেখিতে সাইকেল আমাদের কাছে আসিয়া পড়িল, তারপর আরোহী আমাদের পায়ের কাছে একটা সাদাগোছের বস্তু ফেলিয়া দিয়া দ্রুত পেডাল ঘুরাইয়া অদৃশ্য হইল।

ব্যোমকেশ বিদ্যুদ্বেগে আমাকে হাত ধরিয়া টানিয়া লইল। দশ হাত দূরে গিয়া ফিরিয়া দাঁড়াইয়া একদৃষ্টি শ্বেতাভ বস্তুটার দিকে চাহিয়া রহিল। কিন্তু কিছু ঘটিল না, টেনিস বলের মত বস্তুটা জড়বৎ পড়িয়া রহিল। উহা যে বোমা হইতে পারে একথা আমার মাথায় আসে নাই; তখন ব্যোমকেশের ভাবভঙ্গী দেখিয়া আমার বুক ঢিবঢিব করিতে লাগিল।

ব্যোমকেশ বলিল, অজিত, চাট করে বাড়ি থেকে একটা টর্চ নিয়ে এস তো।

সে দাঁড়াইয়া রহিল, আমি পিছু হটিয়া বাড়িতে গেলাম। ফণীশ ও মণীশবাবু দুজনেই খবর শুনিয়া আমার সঙ্গে আসিলেন।

কি ব্যাপার?

ব্যোমকেশ বলিল, কাছে আসবেন না। হয়তো কিছুই নয়, তবু সাবধান হওয়া ভাল। অজিত, টর্চ আমাকে দাও।

টর্চ লইয়া সে ভূ-পতিত বস্তুটার উপর আলো ফেলিল। আমি গলা বাড়াইয়া দেখিলাম, কাগজের একটা মোড়ক ধীরে ধীরে খুলিয়া যাইতেছে। ব্যোমকেশ কাছে গিয়া আরও কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করিয়া বস্তুটা তুলিয়া লইল। হাসিয়া বলিল, কাগজে মোড়া এক টুকরো পাথুরে কয়লা।

মণীশবাবু বলিলেন, কয়লা—!

ব্যোমকেশ বলিল, কয়লা মুখ্য নয়, কাগজটাই আসল। চলুন, বাড়িতে গিয়ে দেখা যাক।

ড্রয়িং-রুমে উজ্জ্বল আলোর নীচে দাঁড়াইয়া ব্যোমকেশ সস্তপর্ণে মোড়ক খুলিল। পাথুরে কয়লার টুকরো টেবিলে রাখিয়া কুঞ্চিত কাগজটির দুই পাশ ধরিয়া আলোর দিকে তুলিয়া ধরিল। কাগজটা আকারে সাধারণ চিঠির কাগজের মত, তাহাতে কালি দিয়া বড় বড় অক্ষরে দু'ছত্ৰ লেখা—‘ব্যোমকেশ বক্সী, যদি অবিলম্বে শহর ছাড়িয়া না যাও তোমাকে আর ফিরিয়া যাইতে হইবে না।’

‘কী ভয়ানক, আপনার নাম জানতে পেরেছে।’ মণীশবাবু হাত বাড়াইয়া বলিলেন, ‘দেখি কাগজখানা।

ব্যোমকেশ মাথা নাড়িয়া বলিল, না, আপনার ছুঁয়ে কাজ নেই। কাগজে হয়তো আঙুলের ছাপ আছে।

কাগজখানি সাবধানে ধরিয়া ব্যোমকেশ শয়নকক্ষে আসিল। আমিও সঙ্গে আসিলাম। টেবিলের উপর একটি সচিত্র বিলাতি মাসিকপত্র ছিল, তাহার পাতা খুলিয়া সে কাগজখানি সযত্নে তাহার মধ্যে রাখিয়া দিল। আমি বলিলাম, কোন পক্ষের চিঠি। অবশ্য কয়লা দেখে মনে হয়। কয়লাখনির আসামীরা জানতে পেরেছে।

ব্যোমকেশ বলিল, ওটা ধাপ্পা হতে পারে। গোবিন্দ হালদার জানেন আমি কয়লাখনি সম্পর্কে এখানে এসেছি।

ড্রয়িং-রুমে ফিরিয়া গিয়া দেখিলাম অফিসের বড়বাবু সুরপতি ঘটক আসিয়াছেন, কর্তার সঙ্গে বোধকরি অফিসঘটিত কোনও পরামর্শ করিতেছেন। আমাদের দেখিয়া সবিনয়ে নমস্কার করিলেন।

তিনি বাক্যালাপ করিয়া প্ৰস্থান করিলে ব্যোমকেশ মণীশবাবুকে বলিল, আপনি সুরপতিবাবুকে কিছু বলেননি তো?

মণীশবাবু বলিলেন, না। —পাজি ব্যাটারা কিন্তু ভয় পেয়েছে।

ব্যেমাকেশ বলিল, ভয় না পেলে আমাকে ভয় দেখাতো না।

মণীশবাবু খুশি হইয়া বলিলেন, আপনি তলে তলে কি করছেন আমি জানি না। কিন্তু নিশ্চয় কিছু করছেন, যাতে পাজি ব্যাটারা ঘাবড়ে গেছে। —যাহোক, চিঠি পেয়ে আপনি ভয় পাননি তো?

ব্যোমকেশ মৃদু হাসিয়া বলিল, ভয় বেশি পাইনি। তবু আজ রাত্তিরে দোর বন্ধ করে শোব।

সকালবেল ফণীশ আমাদের থানায় নামাইয়া দিয়া বলিল, আমাকে একবার বাজারে যেতে হবে, ইন্দিরার একটা জিনিস চাই। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই ফিরব। অসুবিধা হবে না তো?

না। আমরা এখানে ঘণ্টাখানেক আছি।

ফণীশ মোটর লইয়া চলিয়া গেল, আমরা থানায় প্রবেশ করিলাম।

প্রমোদবাবু টেবিলের সামনে বসিয়া কাগজপত্ৰ লইয়া ব্যস্ত ছিলেন, ব্যোমকেশ সচিত্ৰ বিলাতি মাসিকপত্রটি তাঁহার সম্মুখে রাখিয়া বলিল, এর মধ্যে এক টুকরো কাগজ আছে, তাতে আঙুলের ছাপ থাকতে পারে। আপনার finger-print expert আছে?

পত্রিকার পাতা তুলিয়া দেখিয়া বরাট বলিলেন, আছে বৈকি। কি ব্যাপার?

ব্যোমকেশ গত রাত্রির ঘটনা বলিল। শুনিয়া বরাট বলিলেন, কিয়লাখনির ব্যাপার বলেই মনে হচ্ছে। এখনি ব্যবস্থা করছি। আজ বিকেলবেলাই রিপোর্ট পাবেন।

তিনি লোক ডাকিয়া পত্রিকাসমেত কাগজখানা করাঙ্ক বিশেষজ্ঞগণের কাছে পঠাইয়া দিলেন, তারপর বলিলেন, তিনদিন আপনি আসেননি, ওদিকের খবর কি?

ব্যোমকেশ বলিল, যথা পূর্বং তথা পরং, নতুন কোনাে খবর নেই। কিন্তু একটা খট্‌কা লাগছে?

কিসের খাটকা?

মোহিনীকে প্রাণহরি পরে টাকা মাইন দিত। হিসেবের খাতা কিন্তু মোহিনীর মাইনের উল্লেখ নেই।

বরাট চিন্তা করিয়া বলিলেন, হুঁ। প্রাণহারির হিসেবের খাতায় দেখছি বিস্তর গলদ। এখন কি করবেন?

ব্যোমকেশ বলিল, মোহিনীকে প্রশ্ন করে দেখতাম। সে এখনো আছে তো?

বরাট বলিলেন, দিব্যি আছে, নড়বার নামটি নেই। আমিও ছাড়তে পারছি না, যতক্ষণ না এ মামলার একটা হেস্তনেস্ত হয়—

তাহলে আমরা একবার ঘুরে আসি।

চলুন।

না না, আপনার অন্য কাজ রয়েছে, আপনি থাকুন। আমি আর অজিত যাচ্ছি। আপনার সেই তরুণ কনস্টেবলটিকে সেখানে পাব তো?

বরাট হাসিলেন, আলবৎ পাবেন।

থানার অনতিদূরে রাস্তার ধারে একটি বিপুল পাকুড় গাছের ছায়ায় ট্যাক্সি দাঁড়াইবার স্থান। সেইদিকে যাইতে যাইতে আমি বলিলাম, ব্যোমকেশ, প্ৰাণহারির সঙ্গে কয়লাখনির ব্যাপারের কি কোনো সম্বন্ধ আছে?

সে বলিল, কিছু না। একমাত্র আমি হচ্ছি যোগসূত্র।

ট্যাক্সি-স্ট্যান্ডের কাছাকাছি গিয়া দেখিলাম। গাছতলায় মাত্র একটি ট্যাক্সি আছে এবং রাস্তার ধার ঘেঁষিয়া একটা প্ৰকাণ্ড কালো রঙের মোটর আমাদের দিকে পিছন করিয়া দাঁড়াইয়া রহিয়াছে। ট্যাক্সি-ড্রাইভার ভুবন দাস কালো মোটরের জানালার কাছে দাঁড়াইয়া চালকের সহিত কথা বলিতেছে। আমরা আর একটু নিকটবর্তী হইতেই কালো মােটরটা চলিয়া গেল। ভুবন দাস নিজের ট্যাক্সির কাছে ফিরিয়া চলিল।

ব্যোমকেশ গভীর ভ্রূকুটি করিয়া বলিল, কার মোটর চিনতে পারলে? গোবিন্দ হলদারের মোটর। প্রথমদিন নম্বরটা দেখেছিলাম।

গোবিন্দ হালদার ট্যাক্সিওয়ালার কাছে কী চায়?

বোধ হয় সাক্ষী ভাঙাতে চায়। এস দেখি।

আমরা যখন ট্যাক্সির কাছে পৌঁছলাম তখন ভুবন গাড়ির বুট্‌ হইতে জ্যাক্‌ বাহির করিয়া চাকার নীচে বসাইবার উদ্যোগ করিতেছে। আমাদের দেখিয়া স্যালুট করিল, বলিল, ট্যাক্সি চাই স্যার?

ব্যোমকেশ বলিল, হ্যাঁ, একবার প্রাণহরিবাবুর বাড়িতে যেতে হবে। সেখানে একজন মেয়েলোক থাকে তার সঙ্গে দরকার আছে।

ভুবন আড়চোখে ব্যোমকেশের পানে চাহিল, মাথা চুলকাইয়া বলিল, আমার তো একটু দেরি হবে স্যার। টায়ার পাঞ্চার হয়েছে, চাকাটা বদলাতে হবে।

ব্যোমকেশ অতর্কিতে প্রশ্ন করিল, গোবিন্দ হালদার তোমার সঙ্গে কী কথা বলছিলেন?

ভুবন চমকিয়া উঠিল, আজ্ঞে?—উনি—উনি আমাকে চেনেন, তাই দাঁড়িয়ে দুটো কথা বলছিলেন। ভারি ভাল লোক।’ বলিয়া জ্যাকের যন্ত্র প্রবলবেগে ঘুরাইয়া গাড়ির চাকা শূন্যে তুলিতে লাগিল।

ব্যোমকেশের মুখের দিকে চোখ তুলিয়া দেখি সে তন্দ্রাহতের মত দাঁড়াইয়া আছে, তাহার চক্ষু, ভুবনের উপর নিবদ্ধ কিন্তু সে মনশ্চক্ষে অন্য কিছু দেখিতেছে। আমি ডাকিলাম, ব্যোমকেশ!

সে আমার দিকে ঘাড় ফিরাইয়া বিড়বিড় করিয়া বলিল, অজিত, পনরোর সঙ্গে পঁয়ত্রিশ যোগ দিলে কত হয়।

বলিলাম, পঞ্চাশ। কী আবোল-তাবোল বকছ?

সে বলিল, ‘এস।’ বলিয়া থানার দিকে ফিরিয়া চলিল। কিছুদূর গিয়া আমি ফিরিয়া চাহিলাম, ভুবন একাগ্র দৃষ্টিতে আমাদের পানে তাকাইয়া আছে।

থানায় উপস্থিত হইলে বরাট মুখ তুলিয়া বলিলেন, এ কি, গেলেন না?

ব্যোমকেশ বলিল, প্রমোদবাবু, আপনার থানায় কোনও নিরিবিলি জায়গা আছে? আমি নির্জনে বসে একটু ভাবতে চাই।

সাপের হাঁচি বেদেয় চেনে। বরাট তৎক্ষণাৎ উঠিয়া বলিলেন, আসুন আমার সঙ্গে।

থানার পিছন দিকে একটি ঢাকা বারান্দা, লোকজন নেই, কয়েকটা চেয়ার পড়িয়া আছে। ব্যোমকেশ একটি ইজি-চেয়ারে লম্বা হইয়া সিগারেট ধরাইল। বরাট মৃদু হাসিয়া প্রস্থান করিলেন।

আধা ঘণ্টার মধ্যে গোটা পাঁচেক সিগারেট নিঃশেষ করিয়া ব্যোমকেশ বলিল, চল, হয়েছে।

জিজ্ঞাসা করিলাম, কী হয়েছে?

সে বলিল, দিব্যচক্ষু উল্মীলিত হয়েছে, সত্যদর্শন হয়েছে। এস।

বরাটের ঘরে গিয়া তাঁহার টেবিলের পাশে দাঁড়াইতেই তিনি উৎসুক মুখ তুলিলেন। ব্যোমকেশ বলিল, প্রমোদবাবু, কোন ব্যাঙ্কে প্রাণহরির টাকা আছে?

বরাট বলিলেন, সেন্ট্রাল ব্যাঙ্কে। কেন?

ব্যোমকেশ বলিল, সেখানে সেফ-ডিপজিট ভল্ট আছে কিনা জানেন?

আছে বোধ হয়।

হাতের ঘড়ি দেখিয়া ব্যোমকেশ বলিল, এতক্ষণ ব্যাঙ্ক খুলেছে। —চলুন।

বরাট আর প্রশ্ন না করিয়া উঠিয়া পড়িলেন। বাহিরে আসিয়া দেখিলাম ফণীশ ফিরিয়াছে এবং গাড়ি হইতে নামিবার উপক্ৰম করিতেছে। ব্যোমকেশ বলিল, নেমো না, আমাদের সেন্ট্রাল ব্যাঙ্কে পৌঁছে দিতে হবে।

ব্যোমকেশ ফণীশকে বলিল, ফণীশ, তুমি বাড়ি যাও, আমাদের ফিরতে একটু দেরি হবে।— ভালো কথা, বৌমার বাপের বাড়ি কোথায়>

ফণীশ সবিস্ময়ে ঘাড় ফিরাইয়া বলিল, নবদ্বীপে।

ব্যোমকেশ বলিল, হুঁ। তাহলে নিশ্চয় মালপো তৈরি করতে জানেন। তাঁকে বলে দিও আজ বিকেলে আমরা মালপো খাব।

আমরা নামিয়া গেলাম, ফণীশ একটু নিরাশভাবে গাড়ি লইয়া চলিয়া গেল। সে বুঝিয়াছিল, প্রাণহরির মৃত্যুরহস্য সমাধানের উপান্তে আসিয়া পৌঁছিয়াছে।

বরাট আমাদের ব্যাঙ্ক ম্যানেজারের ঘরে লইয়া গেলেন; ম্যানেজারের সঙ্গে তাঁহার আগে হইতেই আলাপ ছিল। বলিলেন, প্ৰাণহরি পোদ্দারের ব্যাপারে এসেছি। আপনার ব্যাঙ্কে সেফ-ডিপজিট ভল্ট আছে?

ম্যানেজার বলিলেন, আছে।

বরাট ব্যোমকেশের পানে চাহিলেন, ব্যোমকেশ বলিল, প্ৰাণহরি পোদ্দার ভল্ট ভাড়া নিয়েছিলেন নাকি?

ম্যানেজার একজন কর্মচারীকে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, সে বলিল, হ্যাঁ, নিয়েছিলেন।

ব্যোমকেশ বলিল, তার সেফ-ডিপজিট কী আছে আমরা দেখতে চাই।

ম্যানেজার কুন্ঠিত হইয়া বলিলেন, কিন্তু ব্যাঙ্কের নিয়ম নেই। অবশ্য যদি পরোয়ানা থাকে—

বরাট বলিলেন, প্রাণহরি পোদ্দারকে খুন করা হয়েছে। তার সমস্ত দলিল-দস্তাবেজ, কাগজপত্র অনুসন্ধান করবার পরোয়ানা পুলিসের আছে।

অনেক্ষণেক চিন্তা করিয়া বলিলেন, বেশ। চাবি এনেছেন?

সেফ-ডিপজিটের প্রত্যেকটি বাক্সের দুটো চাবি; একটা থাকে যিনি ভাড়া নিয়েছেন তাঁর কাছে, অন্যটা থাকে ব্যাঙ্কের জিন্মায়। দুটো চাবি না পেলে বাক্স খোলা যায় না।

ব্যোমকেশ বরাটের সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় করিল। বিরাট বলিলেন, ডুপ্লিকেট চাবি নিশ্চয় আছে?

ম্যানেজার বলিলেন, আছে। কিন্তু ব্যাঙ্কের ডিরেকটারদের হুকুম না পেলে আপনাদের দিতে পারি না। হুকুম পেতে চার-পাঁচ দিন সময় লাগবে।

ব্যোমকেশ বরাটকে বলিল, চলুন, আর একবার প্রাণহরির সিন্দুক খুঁজে দেখা যাক। নিশ্চয় ওই ঘরেই কোথাও আছে।

বরাট উঠিলেন, ম্যানেজারকে বলিলেন, আমরা আবার আসছি। যদি চাবি খুঁজে না পাই, দরখাস্ত করব।

আমরা থানায় ফিরিয়া গেলাম, সেখান হইতে আরও দুইজন লোক লইয়া পুলিস-কারে প্ৰাণহরির বাড়িতে উপনীত হইলাম।

আজ তরুণ কনস্টেবলটি বাড়ির সামনে টুল পাতিয়া বসিয়া আছি, আমাদের দেখিয়া সাড়স্বরে স্যালুট করিল।

দ্বারের সামনে দাঁড়াইয়া ব্যোমকেশ বরাটকে বলিল, আমি মোহিনীকে দু-একটা প্রশ্ন করি, ততক্ষণ আপনারা ওপরের ঘর তল্লাশ করুন গিয়ে। আমার বিশ্বাস চাবি খুঁজে বার করা শক্ত হবে না। হয়তো সিন্দুকেই আছে, আপনারা লুকোনো জিনিস খোঁজেননি, তাই পাননি। তখন তো আপনারা জানতেন না যে প্ৰাণহারির সেফ-ডিপজিট আছে।

পুলিসের দল সিঁড়ি দিয়া উপরে উঠিয়া গেল। ব্যোমকেশ ও আমি রান্নাঘরের সম্মুখে গিয়া দাঁড়াইলাম।

মোহিনী দ্বারের দিকে পিছন ফিরিয়া রান্না করিতেছিল, আমাদের পদশব্দে ঘাড় ফিরাইয়া চাহিল। আমাদের দেখিয়া চকিত ত্ৰাসে তাহার চক্ষু একবার বিস্ফারিত হইল, তারপর সে উনান হইতে কড়া নামাইয়া আঁচলে হাত মুছিতে মুছিতে দ্বারের কাছে আসিয়া দাঁড়াইল।

কিছু দরকার আছে বাবু? তাহার ক্ষণিক ত্ৰাস কাটিয়া গিয়াছে।

ব্যোমকেশ বলিল, তুমি এখনো আছ দেখছি। দেশে ফিরে যাচ্ছ না কেন?

মোহিনী বলিল, কি করব বাবু, পুলিস ছেড়ে না দিলে যাই কি করে?

ব্যোমকেশ বলিল, তোমার বাপ-মাকে কিংবা স্বামীকে খবর দিয়েছ?

মোহিনী ক্ষণকাল চক্ষু নত করিয়া রহিল, তারপর বলিল, স্বামী কোথায় জানি না। বাপ-মাকে খবর দিইনি। তারা বুড়ো মানুষ, কি হবে তাদের খবর দিয়ে?

ব্যোমকেশ বলিল, তা বটে। আচ্ছা, একটা কথা বল দেখি, যে-রাত্রে প্রাণহারিবাবু খুন হয়েছিলেন, সে-রাত্রে তিনি যখন খেতে নামলেন না, তখন তুমি তাঁর ঘরে গিয়েছিলে?

মোহিনী সায় দিয়া বলিল, হ্যাঁ বাবু।

ঘরে আলো জ্বলছিল?

হাঁ বাবু।

ঘরের পিছন দিকের দরজা, অর্থাৎ স্নানের ঘরের দরজা খোলা দেখেছিলে?

না বাবু। মোহিনীর চোখে উদ্বেগের ছায়া পড়িল।

দরজা বন্ধ ছিল?

পলকের জন্য মোহিনী দ্বিধা করিল, তারপর বলিল, আমি কিছুই দেখিনি বাবু। কর্তাবাবু মরে পড়ে আছেন দেখে ছুটে পালিয়ে এসেছিলুম।

তুমি স্নানের ঘরের দরজা বন্ধ করে দাওনি?

আজ্ঞে না।

হুঁ। ব্যোমকেশএকটু ভ্রূ কুঞ্চিত করিয়া রহিল, প্রাণহরিবাবু তােমাকে পনরো টাকা মাইনে দিতেন?

আজ্ঞে হ্যাঁ।

প্ৰতি মাসে ঠিক সময়ে মাইনে দিতেন?

মানুষ যখন মনে মনে এক কথা ভাবে এবং মুখে অন্য কথা বলে তখন তাহার মুখ দেখিয়া বোঝা যায়, তেমনি অন্যমনস্কভাবে মোহিনী বলিল, আমার মাইনে কর্তাবাবুর কাছে জমা থাকত, দরকার হলে দুএক টাকা চেয়ে নিতুম।

ব্যোমকেশের পানে কটাক্ষপাত করিয়া দেখিলাম সে মৃদু হাসিতেছে। সে বলিল, তোমার মাইনের টাকা বোধহয় মারা গেল। আচ্ছা, এবার আমার শেষ প্রশ্ন: তুমি কোনো ন্যাটা লোককে চেন?

মোহিনী অবাক হইয়া বলিল, ন্যাটা লোক! সে কাকে বলে?

ব্যোমকেশ বলিল, ন্যাটা জান না? যে ডান হাতের চেয়ে বাঁ হাত বেশি চালায় তাকে ন্যাটা বলে।

মোহিনী সহসা বুকের উপর হাত রাখিয়া বলিল, না বাবু, সে রকম কাউকে আমি চিনি না।

মোহিনী দাঁড়াইয়া রহিল, আমরা উপরে প্রাণহারির শয়নকক্ষে উঠিয়া গেলাম।

চাবি পাওয়া গিয়াছে। বেশি খোঁজাখুঁজি করিতে হয় নাই; সিন্দুক ও দেয়ালের মাঝখানে যে স্বল্প-পরিসর স্থান ছিল সেই স্থানে সিন্দুকের পিঠে চাবিটা মোম দিয়া আটকানো ছিল। বরাট বলিল, এই নিন।

নম্বর খোদাই করা লম্বা একটি চাবি। ব্যোমকেশ তাহা পরিদর্শন করিয়া বলিল, চলুন আবার ব্যাঙ্কে।

ব্যাঙ্কে গিয়া ম্যানেজারের নিকট চাবি পেশ করা হইল। তিনি এবার আর দ্বিরুক্তি করিলেন না, স্বয়ং উঠিয়া আমাদের ভল্টে লইয়া গেলেন। ব্যাঙ্কের বাড়ির নীচে মাটির তলায় ঘর, তাহার তিনটি দেয়াল জুড়িয়া কাতারে কাতারে দ্বারযুক্ত স্টীলের খোপ শোভা পাইতেছে।

দুইটি চাবি মিলাইয়া প্রাণহারির খোপের কবাট খোলা হইল। খোপের মধ্যে টাকাকড়ি, গয়নাগটি কিছু নাই, কেবল কয়েকটি পুরাতন চিঠি এবং এক বাণ্ডিল বন্ধকী তমসুক।

চিঠিগুলি প্রাণহরিকে লেখা নয়, প্রাণহারির দ্বারাও লিখিত নয়। অজ্ঞাতনামা পুরুষ বা নারীর দ্বারা অজ্ঞাতনামা লোকের নামে লেখা। সম্ভবত এই পত্রগুলিকে অস্ত্ৰ করিয়া প্ৰাণহরি লেখক ও লেখিকাদের রুধির শোষণ করিতেন।

চিঠিগুলিতে ব্যোমকেশের প্রয়োজন ছিল না, সে তমসুকগুলি লইয়া উপরে উঠিয়া আসিল। ম্যানেজারের ঘরে বসিয়া সে একে একে তমসুকগুলিতে চোখ বুলাইল। তারপর একটি তমসুক তুলিয়া ধরিয়া বরাটকে বলিল, এই নিন। আপনার আসামী।

তমসুকে আইনসঙ্গত ভাষায় লেখা ছিল, মহাজন প্রাণহরি পোদ্দার ভগবানপুর নিবাসী ভুবনেশ্বর দাসকে ক্ৰেতব্য মটরগাড়ি বন্ধক রাখিয়া আড়াই হাজার টাকা কার্জ দিয়াছেন। কীভাবে ভুবনেশ্বর দাস এই ঋণ শোধ করিবে তাহার শর্তও দলিলে লেখা আছে : পঞ্চাশ টাকা নগদ; প্রাণহরি মোটর ব্যবহার করিবেন তাহার মাসিক ভাড়া পঁচিশ টাকা; একুনে পঁচাত্তর টাকা হিসাবে মাসে শোধ হইবে।

বরাট ভ্রূ তুলিয়া বোমকেশের পানে চাহিলেন। ব্যোমকেশ বলিল, আমার কাজ শেষ হয়েছে, এবার যা করবার আপনি করবেন।

বরাট বলিলেন, কিন্তু খুনের প্রমাণ?

প্ৰমাণ আছে। তবে আদালতে দাঁড়াবে কিনা বলতে পারি না। এবার আমরা বাড়ি ফিরব, বেলা দেড়টা বেজে গেছে।

চলুন, আপনাদের পৌঁছে দিয়ে আসি।

পুলিস-কারে যাইতে যাইতে বেশি কথা হইল না। একবার বিরাট বলিলেন, ভুবনকে অ্যারেস্ট করি। তাহলে?

ব্যোমকেশ বলিল, করুন। সে যদি স্বীকার করে তাহলে সব ন্যাটা চুকে যাবে।

বাড়ির ফটকের সামনে আমাদের নামাইয়া দিয়া গাড়ি চলিয়া গেল, বরাট বলিয়া গেলেন, বিকেলবেলা আসিব।

অপরাহ্ণে আন্দাজ পাঁচটার সময় আমরা ক্ষরের মালপোয়া লইয়া বসিয়াছি এমন সময় প্রমোদ বরাট আসিলেন।

মণীশবাবু কয়লাখনিতে গিয়াছেন, ফণীশ বাড়িতে আছে। ইন্দিরা এতক্ষণ আমাদের কাছেই ছিল, এখন বিরাটকে দেখিয়া ভিতরে গিয়াছে। আসামী কে তাহা শুনিবার পর আমার মাথাটা হিজিবিজি হইয়া গিয়াছিল, এখন কতকটা ধাতে আসিয়াছে।

ইন্সপেক্টর বরাটের মুখখানা শুষ্ক, মন বিক্ষিপ্ত; সকালবেলা যে ইউনিফর্ম পরিয়া ছিলেন, এখনও তাঁহাই পরিয়া আছেন মনে হয়। তিনি আসিয়া হাস্যহীন মুখে পকেট হইতে একটি খাম বাহির করিয়া ব্যোমকেশের হাতে দিলেন; বলিলেন, এই নিন। আঙুলের ছাপের ফটো আর রিপোর্ট। তিনজনের আঙুলের ছাপ পাওয়া গেছে।

ব্যোমকেশ খামটি না খুলিয়াই পকেটে রাখিল, বরাটের মুখের পানে চাহিয়া বলিল, আজি দুপুরে আপনার খাওয়া হয়নি দেখছি।

বরাট মাথা নাড়িয়া বলিলেন, খাওয়া হবে কেত্থেকে। আপনার আসামী পালিয়েছে।

ব্যোমকেশ এমনভাবে ঘাড় নাড়িল যেন ইহার জন্য সে প্রস্তুত ছিল। তারপর বরাটকে বসিতে বলিয়া সে ফণীশের পানে চাহিল। ফণীশ দ্রুত অন্দরের দিকে চলিয়া গেল। বিরাট হেলান দিয়া ক্লান্ত স্বরে বলিলেন, ‘শুধু আসামী নয়, মোহিনীও পালিয়েছে। দুজনে ট্যাক্সিতে চড়ে হাওয়া হয়েছে। কনস্টেবলটা প্ৰাণহরির বাড়িতে পাহারায় ছিল, কিন্তু মোহিনীকে আটক করবার হুকুম তার ছিল না। ভুবন দাস ট্যাক্সিতে এসে রাস্তা থেকে হর্ন বাজালো, মোহিনী বেরিয়ে এসে ট্যাক্সিতে চড়ে বসল। দু’জনে চলে গেল।’

ফণীশ এক থালা খাবার আনিয়া বরাটের সম্মুখে রাখিল, বরাট বিমৰ্ষভাবে আহার করিতে লাগিলেন। আমরাও মালপোয়াতে মন দিলাম। নীরবে আহার চলিতে লাগিল।

বৈষ্ণবীয় জলযোগ সমাধা করিয়া সিগারেট ধরাইবার উপক্ৰম করিতেছি, বাহিরের দিক হইতে আর্দালি জাতীয় একটি লোক ঘরে প্রবেশ করিল। মাথায় গান্ধী-টুপি, পরিধানে খদ্দরের চাপকন ও পায়জামা; তাই হঠাৎ তাহাকে চিনিতে পারি নাই। সে মাথার টুপি খুলিয়া মেঝোয় আছাড় মারিল। তারপর বলিষ্ঠ কণ্ঠে বলিল, শালাদের ধরেছি। স্যার।

বিকাশ দত্ত। টুপি খুলিতেই তাহার স্বরূপ প্রকাশ হইয়াছে। ব্যোমকেশ সমাদর করিয়া বলিল, এস এস বিকাশ। কাজ সেরে ফেলেছিতাহলে?

‘সেরেছি স্যার। আমার মাথা ফাটাবার তালে ছিল, তাতেই ধরা পড়ে গেল।’ বিকাশ হাত-পা ছড়াইয়া একটা সোফায় বসিয়া দৃঢ়স্বরে বলিল, দু’জনেই শালা।

দু’জনেই শালা—কাদের কথা বলছ?

বিকাশ উত্তর দিবার পূর্বেই সুরপতি ঘটক প্রবেশ করিলেন। শৌখিন বেশবাস সত্ত্বেও একটু ভিজাবিড়াল ভাব, চোখে সতর্ক বিড়ালদৃষ্টি। তিনি ঘরের পরিস্থিতি ক্ষিপ্ৰ-মসৃণ চক্ষে দেখিয়া লইয়া বিনীত স্বরে বলিলেন, কর্তা আছেন কি? তাঁর সঙ্গে—

ব্যোমকেশ বলিল, আসুন সুরপতিবাবু।

বিকাশ সহসা খাড়া হইয়া বসিল, একাগ্র চক্ষে সুরপতিবাবুকে নিরীক্ষণ করিয়া বলিল, এঁর নাম সুরপতি ঘটক? বড় অফিসের বড়বাবু?

ব্যোমকেশ বলিল, হ্যাঁ। কেন বল দেখি?

বিকাশ সুরপতিবাবুর দিকে তর্জনী নির্দেশ করিয়া বলিল, এঁর দুই শালার কথা বলছিলাম স্যার। বিশ্বনাথ আর জগন্নাথ রায়। তারাই কয়লাখনিতে বজ্জাতি করছে।

সুরপতির চোখে ভয় উছলিয়া উঠিল, তিনি শীর্ণকণ্ঠে বলিলেন, কী? কী? আমি তো কিছু—

বরাট তাঁহার দিকে ধীরে ধীরে চক্ষু ফিরাইয়া নির্নিমেষ চক্ষে চাহিয়া রহিলেন। ব্যোমকেশ বলিল, সুরপতিবাবু, যে দুটি ছােকরাকে আপনি আমাদের ঘাড়ে চাপাবার চেষ্টায় ছিলেন, তারা আপনার শালা?

সুরপতিবাবু বলিলেন, মানে—তাতে কি হয়েছে?

ব্যোমকেশ বলিল, হয়নি কিছু। কাল রাত্রে আমি একটা চিঠি পেয়েছি, তাতে তিনজনের আঙুলের ছাপ পাওয়া গেছে। আমরা মিলিয়ে দেখতে চাই, তিনজনের মধ্যে আপনি আছেন। কিনা—ইন্সপেক্টর বরাট, আপনি সুরপতিবাবুর আঙুলের ছাপ নিন। মিলিয়ে দেখলেই বোঝা যাবে উনি এই ষড়যন্ত্রে কতদূর আছেন। ফণীশ, বাড়িতে রবারস্ট্যাম্প-কালির প্যাড আছে?

সুরপতিবাবু এক-পা এক-পা করিয়া পিছু হটতেছিলেন, দ্বারের কাছাকাছি গিয়া তিনি পাক খাইয়া পালাইবার চেষ্টা করিলেন। ঘটনাক্রমে এই সময় মণীশবাবু ঘরে প্রবেশ করিতেছিলেন, দু’জনেই পড়িতে পড়িতে তাল সামলাইয়া লইলেন, তারপর সুরপতি ঘটক তুরঙ্গ গতিতে পলায়ন করিলেন।

মণীশবাবু এইমাত্র কয়লাখনি হইতে ফিরিয়াছেন, ঘরে প্রবেশ করিয়া বিস্মমব্যাকুল চক্ষে চারিদিকে চাহিলেন। আমরা উঠিয়া দাঁড়াইলাম। তিনি বলিলেন, কী হচ্ছে এখানে?—ইন্সপেক্টর বরাট—সুরপতি অমন লাফ মেরে পালালো কেন?

বরাট বলিলেন, আপনি বসুন। আপনার খনিতে যারা অনিষ্ট করছিল তারা ধরা পড়েছে।

মণীশবাবু বলিলেন, ধরা পড়েছে!

ব্যোমকেশ বলিল, আজ্ঞে হ্যাঁ। এই ছেলেটির নাম বিকাশ দত্ত, ও আমার সহকারী। ইন্সপেক্টর বরাটের সঙ্গে পরামর্শ করে বিকাশকে হাসপাতালের আর্দালি সাজিয়ে খনিতে পাঠিয়েছিলাম , ও ধরেছে।

মণীশবাবু বলিলেন, কে—কারা—?

ব্যোমকেশ বলিল, সুরপতি ঘটক ও তার দুই শালা।

‘অ্যাঁ! সুরপতি!’ মণীশবাবু চেয়ারে বসিয়া পড়িলেন, ‘কিন্তু-সুরপতি! সে যে আমার অফিসে বিশ বছর কাজ করছে। তার এই কাজ।’

আমরা আবার উপবেশন করিলাম। ব্যোমকেশ বলিল, মণীশবাবু, দ্বিতীয় পক্ষে বিয়ে করলে মানুষ স্ত্রীর বশীভূত হয়, সুরপতিবাবু শালদের বশীভূত হয়েছেন। খুব বেশি তফাৎ নেই।

মনীশবাবু বলিলেন, কিন্তু কেন? ওরা আমার অনিষ্ট করতে চায় কেন?

ব্যোমকেশ বলিল, সেটা এখনো আবিষ্কার করা যায়নি। তবে আবিষ্কার করা শক্ত হবে না। আমার মনে হয়, যে মাড়োয়ারি আপনার খনি কিনতে চেয়েছিল। সেই আড়ালে থেকে কলকাঠি নাড়ছে। কিংবা অন্য কেউ হতে পারে। সুরপতিবাবুকে চাপ দিলেই বেরিয়ে পড়বে।

কিন্তু-সুরপতির বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ প্রমাণ কিছু পেয়েছেন?

এখনো পাইনি। কিন্তু আঙুলের ছাপ নেবার নামে উনি যেরকম লাফ মেরে পালালেন, ওঁর মনে পাপ আছে।

মণীশবাবু নিশ্বাস ফেলিয়া উঠিয়া দাঁড়াইলেন। মনে হইল, তিনি যত না বিস্মিত হইয়াছেন, ততোধিক দুঃখ পাইয়াছেন। তিনি বলিলেন, আপনারা বসুন। ফণী, তুমি আমার সঙ্গে এস। অফিসের একটা ব্যবস্থা করতে হবে। আর সুরপতির— তিনি সপ্রশ্ন নেত্রে বরাটের পানে চাহিলেন।

বরাট বলিলেন, সুরপতির ব্যবস্থা আমি করব।

মণীশবাবু পুত্রকে লইয়া অফিসের দিকে চলিয়া গেলেন।

আমরা চারজন কিছুক্ষণ বসিয়া রহিলাম। শেষে ব্যোমকেশ অলসকণ্ঠে বলিল, ভুবনের নামে হুলিয়া জারি করেছেন নিশ্চয়?

বরাট বলিলেন, সারাদিন তাতেই কেটেছে।

ব্যোমকেশ বলিল, আশাপ্ৰদ কোনো খবর নেই?

বরাট বলিলেন, চল্লিশ মাইল দূরে একটা রেলওয়ে স্টেশন থেকে খবর পেয়েছি, একটা চালকহীন নম্বরহীন ট্যাক্সি সেখানে পড়ে আছে। লোক পাঠিয়েছি। হয়তো ভুবনের ট্যাক্সি, সে ওখানে ট্যাক্সি ছেড়ে ট্রেন ধরেছে।

বোম্বাই গেছে কি মাদ্রাজ গেছে কে জানে।

হুঁ। আজ উঠি।

আচ্ছা, আসুন। আসামীকে ধরা আপনার কর্তব্য, আপনি যথাসাধ্য চেষ্টা করবেন জানি। তবু, যদি ওদের ধরতে না পারেন। আমি খুশি হব।

ইন্সপেক্টর বিরাট একটু হাসিলেন।

নৈশ আহারের পর মণীশবাবু শয়ন করিতে গিয়াছিলেন; ফণীশ চুপি চুপি আসিয়া আমাদের ঘরে ঢুকিল। আজ আমাদের ঘরে তিনজনের শয়নের ব্যবস্থা, বিকাশের জন্য একটি ক্যাম্প খাট পাতা হইয়াছে।

ঘরে তিনজনেই উপস্থিত ছিলাম, বিছানায় শুইয়া সিগারেট টানিতেছিলাম; বিকাশ কি করিয়া শালাদের ধরিল তাঁহারই গল্প বলিতেছিল। ফণীশকে দেখিয়া ব্যোমকেশ বালিশে কনুই দিয়া উঁচু হইয়া বসিল।

এস ফণীশ।

ফণীশ ব্যোমকেশের খাটের পাশে চেয়ার টানিয়া বসিল, অনুযোগের সুরে বলিল, কালই চলে যাবেন?

ব্যোমকেশ বলিল, হ্যাঁ, শালাবাবুরা যে রকম শাসিয়েছে তাড়াতাড়ি কেটে পড়াই ভাল। তুমি যদি বৌমাকে নিয়ে কলকাতায় আসো নিশ্চয় আমাদের সঙ্গে দেখা করবে। বৌমাকে সত্যবতীর খুব পছন্দ হবে।’ বলিয়া যেন পুরাতন কথা স্মরণ করিয়া একটু হাসিল।

ব্যোমকেশ বিছানার উপর উঠিয়া বসিল, মাথার বালিশটা কোলের উপর টানিয়া লইয়া বলিল, গল্প শুনবে-প্রাণহরির গল্প? বেশ, বলছি; কিন্তু গল্পটা গল্পই হবে, আগাগোড়া সত্য ঘটনা হবে না। অনেকটা ঐতিহাসিক উপন্যাসের মত।

ফণীশ ভ্রূ তুলিয়া প্রশ্ন করিল। ব্যোমকেশ বলিল, বুঝলে না? যাঁরা ঐতিহাসিক উপন্যাস লেখেন তাঁরা সরাসরি ইতিহাস লেখেন না, ইতিহাস থেকে গোটা-কয়েক চরিত্র এবং ঘটনা তুলে নিয়ে সেই কাঠামোর ওপর নিজের গল্প গড়ে তোলেন। আমি তোমাকে যে গল্প বলব সেটাও অনেকটা সেই ধরনের হবে। সব ঘটনা জানি না, যেটুকু জানি তা থেকে পুরো গল্পটা গড়ে তুলেছি; কল্পনা আর সত্য এ গল্পে সমান অংশীদার। —শুনতে চাও?

ফণীশ বলিল, বলুন।

ব্যোমকেশ নূতন সিগারেট ধরাইয়া গল্প আরম্ভ করিল—।

ভুবনেশ্বর দাসকে দিয়েই গল্প আরম্ভ করি। তার নাম শূনেও আমার সন্দেহ হয়নি যে সে বাঙালী নয়, ওড়িয়া। বাংলাদেশ আর উড়িষ্যার সঙ্গমস্থলে যারা থাকে তারা দুটো ভাষাই পরিষ্কার বলতে পারে, বোঝবার উপায় নেই বাঙালী কি ওড়িয়া। যদি বুঝতে পারতাম, সমস্যাটা অনেক আগেই সমাধান হয়ে যেত। কারণ মোহিনী উড়িষ্যার মেয়ে। দুই আর দুয়ে চার।

মোহিনী ভুবনেশ্বরের বৌ। যারা মেয়ে-মরদে গতর খাটিয়ে জীবিকা অর্জন করে ওরা সেই শ্রেণীর লোক। ভুবন কাজ করত কটকের একটা মোটর মেরামতির কারখানায়। মোহিনী বাঙালী গৃহস্থের বাড়িতে দাসীবৃত্তি করত। আর দু’জনে দু’জনকে প্রাণ দিয়ে ভালবাসতো। এই ভালবাসাই হচ্ছে এ গল্পের মূল সূত্র।

ভুবনের মনে উচ্চাশা ছিল, মোহিনীর দাসীবৃত্তি তার পছন্দ ছিল না। মোটর কারখানায় কাজ করতে করতে মিলিটারিতে ট্রাক-ড্রাইভারের চাকরি যোগাড় করে সে চলে গেল; মোহিনীকে বলে গে—-টাকা রোজগার করে ট্যাক্সি কিনব, তোকে আর চাকরি করতে হবে না।

বছর দুই ভুবনের আর দেখা নেই। ইতিমধ্যে মোহিনী কটকে প্রাণহরি পোদ্দারের বাড়িতে চাকরি করছে; দিনের বেলা কাজকর্ম করে, রাত্তিরে বাপ-মায়ের কাছে ফিরে যায়।

প্রাণহরি লোকটা অতিবড় অর্থপিশাচ। যেমন কৃপণ তেমনি লোভী। সারা জীবন টাকাটাকা করে বুড়ো হয়ে গেছে, জুচ্চুরি দাগাবাজি ব্ল্যাকমেল করে অনেক টাকা জমা করেছে, তবু তার টাকার ক্ষিদে মেটেনি। স্ত্রীলোক সম্বন্ধে তার মনে লোভ নেই, কিংবা বুড়ো বয়সে সে লোভ কেটে গিয়েছিল। কিন্তু মোহিনী যখন তার বাড়িতে চাকরি করতে এল তখন তাকে দেখে প্রাণহরির মাথায় এক কুবুদ্ধি গজালো, সে টাকা রোজগারের নতুন একটা রাস্তা দেখতে পেল। বড় মানুষের উদ্ধৃঙ্খল ছেলেরা তার বাড়িতে জুয়া খেলতে আসে, তাদের চোখের সামনে মোহিনীর মত মেয়েকে যদি ধরা যায়—

মোহিনীর দেহে যে প্ৰচণ্ড যৌন আকর্ষণ আছে তাই দেখে তার চরিত্র সম্বন্ধে প্ৰাণহরির মনে ভুল ধারণা জন্মেছিল। সে বড়মানুষের ছেলেদের ধাপ্পা দিয়ে মোহিনীর নাম করে টাকা নিত। কিন্তু মোহিনী ধরা-ছোঁয়া দিত না। কিছুদিন এইভাবে চলাবার পর বড়মানুষের ছেলেরা বিগড়ে গেল, তারা টাকা ঢেলেছে, ছাড়বে কেন? তারা প্ৰাণহারিকে প্রহার দেবার মতলব করল।

প্রাণহরি দেখল কটক থেকে কেটে না পড়লে মার খেতে হবে। কিন্তু মোহিনীকেও তার দরকার, এমন মুখরোচক টোপ সে আর কোথায় পাবে? সে মোহিনীর কাছে প্ৰস্তাব করল তাকে সঙ্গে নিয়ে যাবে। মোহিনীর আপত্তি নেই; তার স্বামী বিদেশে, তাকে দাসীবৃত্তি করে খেতে হবে, তার কাছে কটকও যা অন্য জায়গাও তাই। সে দেড়া মাইনেতে প্ৰাণহারির সঙ্গে যেতে রাজী হল।

কিন্তু তারা কটক ছাড়বার আগেই ভুবন ফিরে এল। ভুবন চাকরি করে কিছু টাকা সঞ্চয় করেছে, কিন্তু ট্যাক্সি কেনার পক্ষে তা যথেষ্ট নয়। স্বামী-স্ত্রী মিলে পরামর্শ করল, তারপর ভুবন প্ৰাণহরির কাছে গেল।

ভুবন প্রাণহরিকে টাকার কথা বলল; তার কিছু টাকা আছে, আরও আড়াই হাজার টাকা পেলেই সে নিজের ট্যাক্সি কিনতে পারবে। প্রাণহরি ভেবে দেখল, টাকা ধার দিলে ভুবন আর মোহিনী দু’জনেই তার মুঠোর মধ্যে থাকবে; মোহিনীকে তখন হুকুম মেনে চলবে হবে। সে রাজী হল। রেজিস্ট্রি দলিল তৈরি হল, তাতে ধার-শোধের শর্ত রইল-মোহিনীর মাইনের পনরো টাকা কাটা যাবে, ভুবন তার ট্যাক্সির রোজগার থেকে মাসে পঁয়ত্ৰিশ টাকা দেবে, আর প্রাণহারি নিজের দরকারে ট্যাক্সি ব্যবহার করবে তার জন্য পঁচিশ টাকা দেবে।; এইভাবে প্রতিমাসে পঁচাত্তর টাকা শোধ হবে।

সকলেই খুশি। ভুবন ট্যাক্সি কিনল। তিনজনে কয়লা শহরে এল। তারপর প্রাণহরি শহরের হালচাল বুঝে নিয়ে তার অভ্যস্ত লীলাখেলা আরম্ভ করল।

কয়লা ক্লাব হচ্ছে বড়লোকের আস্তানা, প্ৰাণহরি সেখানে গিয়ে ছিপ ফেলল। চারটি বড় বড় রুই-কাৎলা তার ছিপে উঠল। সে তাদের বাড়ি নিয়ে গেল।

জুয়া খেলার সময় মোহিনীকেও সকলে দেখল। বিশেষভাবে একজনের নজর পড়ল তার ওপর; অরবিন্দ হালদার চরিত্রহীন লম্পট, সে লোভে উন্মত্ত হয়ে উঠল। প্রাণহারি জুয়ায় চারজনকেই শোষণ করছিল, অরবিন্দ হালদারকে বেশি করে শোষণ করতে লাগল। অরবিন্দকে সে জানিয়ে দিয়েছিল যে ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাওয়া যায় না।

প্রাণহারির কাছে ছাড়পত্র পেয়ে অরবিন্দ হালদার সময়ে অসময়ে মোহিনীর কাছে আসতে লাগল। কিন্তু মোহিনী শক্ত মেয়ে, তাকে চোখে দেখে যা মনে হয় সে তা নয়। অরবিন্দের মতলব সে বুঝেছে, কিন্তু স্পষ্ট কথা বলে তাকে তাড়িয়ে দেয় না। সে তার সঙ্গে খাতির করে কথা বলে, হয়তো হাসি-মস্করাতেও যোগ দেয়, কিন্তু তার দেওয়া উপহার নেয় না। প্রাণহারি মোহিনীকে বোধ হয় ইশারা দিয়েছিল; ইশারায় যতখানি স্বীকার করা সম্ভব মোহিনী ততখানি স্বীকার করে চলত। প্রাণহরি ঘুঘু লোক, স্পষ্টভাবে মোহিনীকে কিছু বলেনি; ভেবেছিল ইশারাতেই কাজ হবে। হাজার হোক, মোহিনী নিম্নশ্রেণীর মেয়ে।

কিছুদিন চেষ্টা-চরিত্র করে অরবিন্দ বুঝল, এ বড় কঠিন ঠাঁই। ওদিকে জুয়াতেও তারা অনেক টাকা হেরেছে। তারপর একদিন প্রাণহরির বেইমানি ধরা পড়ে গেল। জুয়া খেলা বন্ধ হল।

জুয়াতে যারা হেরেছিল তাদের সকলেরই রাগ হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু অরবিন্দের রাগ হয়েছিল সবচেয়ে বেশি। কারণ সে জুয়াতেই ঠকেনি, অন্য বিষয়েও ঠেকেছিল। ঠকেছিল এবং অপমানিত হয়েছিল। তাই সে একদিন তার তিন সঙ্গীকে নিয়ে প্রাণহারিকে ঠেঙাতে গেল।

দৈবক্রমে যে ট্যাক্সিতে চড়ে তারা প্রাণহারিকে ঠেঙাতে গেল সে ট্যাক্সিটা ভুবন দাসের। ট্যাক্সিতে যেতে যেতে অরবিন্দ বোধ হয় মোহিনীর সম্বন্ধে তার মনের আফসানি প্রকাশ করেছিল, ভুবন তার কথা শুনে বুঝল, প্রাণহরি দু'হাজার টাকা নিয়ে তার বৌকে বিক্রি করেছে।

কয়লা শহরে ভুবনের বাসা ছিল না; প্রাণহরিও তার বাড়িতে ভুবনকে থাকতে দেয়নি। কিন্তু আমার বিশ্বাস ভুবন ফুরসৎ পেলেই চুপিচুপি এসে মোহিনীর কাছে রাত কাটিয়ে যেত। স্বামী-স্ত্রীতে কথা হত; হয়তো মোহিনী স্বামীকে ইশারা দিয়েছিল—বুড়োটা লোক ভাল নয়। ভুবন মনে মনে প্ৰাণহারিকে ঘৃণা করত। খাতকের সঙ্গে মহাজনের ভালবাসা বড়ই বিরল। কিন্তু ভুবন সাবধানী লোক, সে বলত-ধারটা শোধ হলে ট্যাক্সি পুরোপুরি তার নিজের হয়ে যাবে, তখন তারা গাড়ি নিয়ে চলে যাবে, বুড়োর সঙ্গে তাদের আর কোনো সম্পর্ক থাকবে না।

প্রাণহরি যে এতবড় শয়তান তা ভুবন কল্পনা করতে পারেনি। কিন্তু যখন সে শুনল যে প্রাণহরি দু'হাজার টাকা নিয়ে তার বৌকে বিক্রি করেছে তখন তার মাথায় খুন চেপে গেল। দুনিয়ায় পয়সাওয়ালা লম্পট অনেক আছে পরস্ত্রীর ওপর তারা নজর দেয়; তাদের ওপর ভুবনের রাগ নেই। কিন্তু ওই বুড়ো শয়তানটাকে সে খুন করবে।

খুন করবার সুযোগও হাতে হাতে এসে গেল। প্রাণহরির বাড়ির কাছাকাছি এসে চারজন আরোহী নেমে গেল। ভুবন ট্যাক্সির মুখ ঘুরিয়ে রাখল; তারপর সেও বেরুলো। তার হাতে মোটরের স্প্যানার।

ভুবন প্রাণহারির বাড়িতে প্ৰত্যহ দিনে রাত্রে দু’বার তিনবার এসেছে, সে জানতো বাড়ির পিছন দিকে ওপরে ওঠবার মেথরখাটা সিঁড়ি আছে। সে অন্ধকারে গা-ঢাকা দিয়ে বাড়ির পিছন দিকে গেল, সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে দোরে টোকা মারল।

দুদিকের দোর বন্ধ করে প্রাণহরি নিজের ঘরে ছিল; সে বোধহয় জানতে পারেনি যে, তাকে চারজনে ঠেঙাতে এসেছে। কিন্তু সে হুঁশিয়ার লোক; টোকা শুনে স্নানের ঘরে গেল। তারপর যখন জানতে পারল যে ভুবন এসেছে তখন সে দোর খুলে দিল। কারণ ভুবনের ওপর তার কোনো সন্দেহ নেই।

দুজনে শোবার ঘরে গিয়ে মুখোমুখি দাঁড়াল। তাদের মধ্যে কোনো কথা হয়েছিল কিনা জানি না। ভুবনের বাঁ হাতে ছিল স্প্যানার, সে আচমকা স্প্যানার তুলে মারলো প্রাণহরির মাথায় এক কোপ। প্রাণহরি মুখ খোলবার সময় পেল না; তৎক্ষণাৎ পতন ও মৃত্যু।

সাড়াশব্দ না পেলে সামনের সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাবে, পিছনের দরজা বন্ধ থাকবে। কিন্তু সামনে বোধহয় তখন এরা চারজন সিঁড়ির নীচে দাঁড়িয়ে পরামর্শ করছিল। তাই ভুবন সামনের দরজা ভেজিয়ে দিয়ে যে-পথে এসেছিল। সেই পথে ফিরে গেল। স্প্যানারটা সঙ্গে নিয়ে গেল। এখন পরিস্থিতি দাঁড়াল, সামনের দরজাও খোলা, পিছনের দরজাও খোলা। প্রাণহিরর আততায়ী কোন দিক দিয়ে ঢুকেছে অনুমান করা শক্ত।

অরবিন্দ প্ৰথম বার প্রাণহোরর দরজা বন্ধ পেয়েছিল; দ্বিতীয় বার চারজনে উঠে দেখল। দরজা খোলা এবং প্রাণহরি পোদ্দার ইহলীলা সম্বরণ করেছে। তারা দুদ্দাড় শব্দে পালালো। ট্যাক্সির কাছে ফিরে গিয়ে দেখল ট্যাক্সি-ড্রাইভার স্টিয়ারিং হুইলে মাথা রেখে ঘুমোচ্ছে। তারা ড্রাইভারকে জাগিয়ে শহরে ফিরে গেল।

ওদিকে মােহিনী রান্না করছিল, সে কিছুই জানতে পারেনি। রান্নার ছ্যাঁছোঁক শব্দে দুরের শব্দ চাপা পড়ে গিয়েছিল। রান্না শেষ হবার পর সে যখন দেখল। বুড়ো খেতে নামছে না, তখন সে ওপরে গেল। সে দেখল প্ৰাণহরি মারে পড়ে আছে, সামনের এবং পিছনের দরজা খোলা। অরবিন্দের কথা তার মনে এল না। তার মনে এল ভুবনের কথা। যেখানে ভালোবাসা সেখানেই শঙ্কা। ভুবনকে সে ইশারা দিয়েছিল, বুড়ো লোক ভাল নয়। ভুবন বাইরে বেশ ঠাণ্ডা প্রকৃতির মানুষ, কিন্তু তার ভিতরে আছে প্রচ্ছন্ন অহঙ্কারের উগ্ৰতা। স্ত্রীর অমর্যাদা সে সহ্য করবে না।

মোহিনী মেয়েটা ভারি বুদ্ধিমতী। মড়া দেখেও তার মাথা খারাপ হল না, সে চট্‌ করে কর্তব্য স্থির করে ফেলল। খুন যেই করুক, তাকে যেন পুলিস ধরতে না পারে। হত্যাকারী স্নানঘরের দোর দিয়ে ঢুকেছে এবং সেই দিক দিয়েই বেরিয়ে গিয়েছে, মোহিনীর তাতে সন্দেহ নেই। সে পিছন দিকের দরজা দুটো ভিতর থেকে বন্ধ করে দিল, তারপর ট্রাক-ড্রাইভার মারফত পুলিসে খবর পাঠালো। কী সাংঘাতিক মেয়ে দ্যাখো, একটুকু বাড়াবাড়ি করেনি। পুলিসকে ভুল রাস্তায় চালাবার জন্য যতটুকু দরকার ঠিক ততটুকু করেছে।

মোহিনী আমাদের আছে অনেক মিথ্যে কথা বলেছে, কিন্তু কখনো অনাবশ্যক। মিথ্যে কথা বলেনি। ভুবনও তাই। আমার বিশ্বাস যে-রাত্রে খুন হয় সেই রাত্রেই কোনো সময় ভুবন ফিয়ে গিয়ে মোহিনীকে সব কথা বলেছিল এবং তারপর থেকে প্রায়ই গিয়ে দেখা করত। এই জন্যেই মোহিনী খুনের পর বাড়ি ছেড়ে যেতে চায়নি। ভুবনের সঙ্গে তার যোগাযোগ রাখা নিতান্ত দরকার।

যাহোক, আমি যখন রঙ্গমঞ্চে প্রবেশ করলাম তখন পুলিশের সন্দিগ্ধ দৃষ্টি পড়েছে চারজন আসামীর ওপর। মোটিভ এবং সুযোগ এদের পুরোদস্তুর বিদ্যমান। হয় এরা চারজনে একজোট হয়ে খুন করেছে, নয়তো ওদের মধ্যে একজন খুন করেছে। অন্যদের চোখে ধুলো দিয়ে।

পুলিসের সঙ্গে আমার মতভেদের কোনো কারণ ছিল না; তবু একজোট হয়ে খুন করার প্রস্তাবটা হজম করা শক্ত। সন্দেহভাজন ব্যক্তিরা মধ্যভারতের ডাকাত নয়, তারা সমাজবাসী তথাকথিত সভ্য মানুষ। তারা দল বেঁধে খুন করবে না।

কিন্তু ওদের মধ্যে একজন অন্য তিনজনের চোখে ধুলো দিয়ে খুন করে থাকতে পারে। প্রশ্ন হচ্ছে, লোকটা কে? সবচেয়ে বেশি সন্দেহ অরবিন্দ হালদারের ওপর। সে শুধু জুয়াতেই ঠকেনি, আর এক বিষয়ে ঠিকেছে; যার জন্যে তার লজার অবধি নেই; যে কথা সে কারুর কাছে স্বীকার করতে পারে না। লম্পটের লজ্জা এক বিচিত্র বস্তু; সে কেবল তখনি লজ্জা পায় যখন দুহাজার টাকা খরচ করেও সে তার নির্লজ্জ কামনার বস্তু পায় না।

অনুসন্ধান আরম্ভ করে আমার খটকা লাগল। প্রথমেই যে প্রশ্নটি আমার মনে মাথা তুলল। সেটি হচ্ছে-মারণাস্ত্রটা গেল কোথায়? ডাক্তার ঘোষাল যে ধরনের বর্ণনা দিলেন সে রকম কোনো অস্ত্ৰ পাওয়া যায়নি; অরবিন্দের দলের কেউ যদি অস্ত্ৰ আনতো তাহলে ফণীশ আর ভুবনের চোখ এড়াতে পারতো না। সুতরাং ওরা অস্ত্রটা আনেনি, নিয়েও যায়নি। তবে সেটা এল কোত্থেকে এবং গেল কোথায়?

দ্বিতীয় কথা, ডাক্তার ঘোষালের বিবৃতি থেকে স্পষ্ট বুঝতে পারলাম যে, হত্যাকারী লোকটা ন্যাটা। ভেবে দ্যাখো, প্রাণহরির শোবার ঘরে একটা চেয়ার পর্যন্ত নেই; সে আততায়ীর দিকে পিছন ফিরে তক্তপোশের কিনারায় বসেছিল একথা বিশ্বাসযোগ্য নয়। সামনাসামনি দাঁড়িয়ে আততায়ী তাকে মেরেছে, আঘাত লেগেছে মাথার ডানদিকে সিঁথির মত। সুতরাং আততায়ী ন্যাটা, তার বাঁ হাত বেশি চলে।

চারজন আসামীয় মধ্যে কে ন্যাটা খোঁজ করলাম। কয়লা ক্লাবে গিয়ে দেখলাম, মৃগেন মৌলিক ডান হাতে টেনিস খেলছে, মধুময় সুর আর অরবিন্দ হালদার ডান হাতে তাস ভেঁজে তাস বাঁটছে এবং খেলছে। তখন ফণীশের দিকে কাচের কাগজ চাপা গোলা ফেলে দেখলাম। সেও ডান হাতে গোলা ধরল। ওরা কেউ ন্যাটা নয়।

কিন্তু ন্যাটা না হোক, ওদের মধ্যে কেউ সব্যসাচী হতে পারে। কাজেই ওদের একেবারে তাগ করতে পারলাম না। ওরা ছাড়া সন্দেহভাজন আর কেউ নেই। মোহিনী খুন করেনি, তার খুন করবার ইচ্ছে থাকলে সে প্রাণহরিকে বিষ খাওয়াতো; তার মোটিভও কিছু নেই।

আমি কোনো দিকে দিশা খুঁজে পাচ্ছি না, এমন সময় এক মুহুর্তে সব পরিষ্কার হয়ে গেল; যেন মেঘে ঢাকা অন্ধকার রাত্রে বিদ্যুৎ চমকালো। দেখলাম ভুবন তার ট্যাক্সির চাকার তলায় জ্যাক বসিয়ে বাঁ হাতে ঘোরাচ্ছে!

খুনের রাত্রে ট্যাক্সি-ড্রাইভার ভুবনেশ্বর দাস যে অকুস্থলে উপস্থিত ছিল তা আমরা সকলেই জানতাম, অথচ তার কথা একবারও মনে আসেনি। একেই জি. কে. চেস্টারটন বলেছেন, অদৃশ্য মানুষ —Invisible Man.

অন্ত্রের সমস্যা এক মুহুর্তে সমাধান হয়ে গেল। স্প্যানার দিয়ে ভুবন প্ৰাণহরিকে মেরেছিল; ডাক্তার ঘোষাল মারণাস্ত্রের যে বৰ্ণনা দিয়েছিলেন তার সঙ্গে অবিকল মিলে যাচ্ছে।

ভুবন বৌকে নিয়ে পালিয়েছে। ভারি বুদ্ধিমান লোক, আমি তাকে চিনেছি তা বুঝতে পেরেছিল। কোথায় গিয়ে তারা আস্তানা গাড়বে জানি না; মাদ্রাজ বোম্বাই কত জায়গা আছে। আশা করি প্রমোদবাবু ভুবনকে খুঁজে পাবেন না। কারণ, যদি খুঁজে পান নিশ্চয় তাকে সোনার মেডেল দেবেন না।

আর কিছু বলবার নেই। যদি কোনো কথা বাদ পড়ে থাকে তোমরা আন্দাজ করে নিতে পারবে। ভুবন আর মোহিনী চিরজীবন ফেরারী হয়ে থাকবে, যদি না ধরা পড়ে। প্রাণহরি পোদ্দারের নিষ্ঠুর লোভ দুটো মানুষের জীবন নষ্ট করে দিল, এ কাহিনীর মধ্যে এইটেই সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।

অদৃশ্য ত্রিকোণ

গল্পটি শুনিয়াছিলাম পুলিস ইন্সপেক্টর রমণীমোহন সান্যালের মুখে। ব্যোমকেশ, এবং আমি পশ্চিমের একটি বড় শহরে গিয়াছিলাম গোপনীয় সরকারী কাজে, সেখানে রমণীবাবুর সহিত পরিচয় হইয়াছিল। সরকারী কাজে লাল ফিতার জট ছাড়াইতে বিলম্ব হইতেছিল, তাই আমরাও নিষ্কর্মার মত ডাকবাংলোতে বসিয়া ছিলাম। রমণীবাবু প্ৰায় প্রত্যহ সন্ধ্যার পর আমাদের আস্তানায় আসিতেন, গল্পসল্প হইত। তাঁহার চেহারাটাও ছিল রমণীমোহন গোছের, ভারি মিষ্ট এবং কমনীয়। কিন্তু সেটা তাঁহার ছদ্মবেশ। আসলে তিনি পুলিস বিভাগের একজন অতি চতুর এবং বিচক্ষণ কর্মচারী। তাঁহার বয়স আমাদের চেয়ে কমই ছিল, বছর চল্লিশের বেশি নয়। কিন্তু প্রকৃতিগত সমধর্মিতার জন্য তিনি আসিলে আডা বেশ জমিয়া উঠিত।

আমাদের কাছে তাঁর ঘন ঘন যাতায়াত যে নিঃস্বার্থ সহৃদয়তা না হইতে পারে একথা অবশ্যই আমাদের মনে উদয় হইয়াছিল; উদ্দেশ্যটা যথাসময়ে প্রকাশ পাইবে এই আশায় প্রতীক্ষা করিতেছিলাম।

তারপর একদিন তিনি আমাদের গল্পটি শুনাইলেন। ঠিক গল্প নয়, একটি খুনের মামলার কয়েকটি ঘটনার পরম্পরা। কিন্তু এই বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলিকে জোড়া দিয়া একটি সুসংবদ্ধ গল্প খাড়া করা যায়।

বিবৃতি শেষ করিয়া রমণীবাবু বলিলেন, ব্যোমকেশবাবু, কে খুন করেছে আমি জানি, কেন খুন করেছে জানি; কিন্তু তবু লোকটাকে ফাঁসি-কাঠে ঝোলাতে পারছি না। প্রমাণ নেই। একমাত্র উপায় কনফেশান, আসামীকে নিজের মুখে অপরাধ স্বীকার করানো। আপনার মাথায় অনেক ফন্দি-ফিকির আসে, লোকটাকে ফাঁদে ফেলবার একটা মতলব বার করতে পারেন না?

ব্যোমকেশ হাসিয়া বলিল, ভেবে দেখব।

গল্পটি আমাকে আকৃষ্ট করিয়াছিল; বোধ হয় ব্যোমকেশের মনেও রেখাপাত করিয়া থাকিবে। সে-রাত্রে রমণীবাবু প্ৰস্থান করিবার পর ব্যোমকেশ বলিল, রমণীবাবু যে মালমসলা দিয়ে গেলেন তা দিয়ে তুমি একটা গল্প লিখতে পার না?

বলিলাম, পারি। মালমসলা ভাল। কেবল চরিত্রগুলির মনস্তত্ত্ব জুড়ে দিতে পারলেই গল্প হবে।

ব্যোমকেশ বলিল, তবে লেখ। কিন্তু একটা শর্ত আছে; গল্প জমাবার অছিলায় ঘটনা বদলাতে পারবে না।

বদলাবার দরকার হবে না।

গল্প লিখিতে দুদিন লাগিল। লেখা শেষ করিয়া বোমকেশকে দিলাম, সে পড়িয়া বলিল,ঠিকই হয়েছে মনে হচ্ছে। রমণীবাবুকে পড়িয়ে দেখা যাক, তিনি কি বলেন।

রাত্রে রমণীবাবু আসিলে তাঁহাকে গল্প পড়িতে দিলাম। তিনি পড়িয়া উৎফুল্ল চক্ষে আমার পানে চাহিলেন—‘এই তো! ঘটনার সঙ্গে মনস্তত্ত্ব বেমালুম জোড় খেয়ে গেছে। কিন্তু—

গল্পটি নিম্নে দিলাম—

শিবপ্রসাদ সরকার এই শহরে মদের ব্যবসা করিয়া বড়মানুষ হইয়াছিলেন। টাকার প্রতি তাঁহার যথার্থ অনুরাগ ছিল, তাই প্ৰকাণ্ড বাড়ি, দামী মোটর ছাড়াও তিনি প্রচুর টাকা জমা করিয়াছিলেন। লোকে তাঁহাকে কৃপণ বলিত, তিনি নিজেকে বলিতেন হিসাবী। এই দুই মনোভাবের মধ্যে সীমারেখা অতিশয় সূক্ষ্ম, আমরা তাহা নির্ধারণ করিবার চেষ্টা করিব না।

কিন্তু প্ৰকৃতির রাজ্যে একটা ভারসাম্য আছে। শিবপ্রসাদ সরকারের একমাত্র মাতৃহীন পুত্ৰ যখন সাবালক হইয়া উঠিল, তখন দেখা গেল তাহার চরিত্র পিতার ঠিক বিপরীত। সে অকৃপণ এবং বেহিসাবী, টাকার প্রতি তাহার বিন্দুমাত্র অনুরাগ নাই; কিন্তু টাকার বিনিময়ে যে সকল বৈধ এবং অবৈধ ভোগ্যবস্তু পাওয়া যায় তাহার প্রতি গভীর অনুরাগ আছে। সে দুহাতে টাকা উড়াইতে আরম্ভ করিল।

পিতা শিবপ্রসাদ ধৃতরাষ্ট্র ছিলেন না বটে, কিন্তু তাঁহার অন্তরে যথেষ্ট অপত্যস্নেহ ছিল। পুত্রের চালচলন লক্ষ্য করিয়া তিনি একটি সুন্দরী কন্যার সহিত তাহার বিবাহ দিলেন। কিন্তু তাহাতে স্থায়ী ফল হইল না। সুনীল কিছুকাল স্ত্রীর প্রতি অনুরক্ত হইয়া রহিল, তারপর আবার নিজ মূর্তি ধারণ করল।

বধূর নাম রেবা; সে সুন্দরী হইলেও বুদ্ধিমতী, অস্তুত তাহার সংসারবুদ্ধি যথেষ্ট পরিমাণে ছিল। উপরন্তু সে শিক্ষিতা এবং কালধৰ্মে আধুনিকাও বটে। সে স্বামীর স্বৈরাচার অগ্রাহ্য করিয়া একান্তমনে বৃদ্ধ শ্বশুরের সেবায় নিযুক্ত হইল। শিবপ্রসাদ বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত নিজেই ব্যবসাঘটিত কাজ-কর্ম দেখিতেন; কারণ পুত্র অপদাৰ্থ এবং কর্মচারীদের শিবপ্রসাদ বিশ্বাস করিতেন না। রেবা তাঁহার অধিকাংশ কাজের ভার নিজের হাতে তুলিয়া লইল। মোটর চালাইয়া শ্বশুরকে কর্মস্থলে লইয়া যাইত, সেখানে নানাভাবে তাঁহাকে সাহায্য করিত, তারপর আবার মোটর চালাইয়া তাঁহাকে গৃহে ফিরাইয়া আনিত। এইভাবে রেবা শিবপ্রসাদের পুত্রের স্থান অধিকার করিয়া লইয়াছিল।

তারপর, রেবা ও সুনীলের বিবাহের চার বছর পরে শিবপ্রসাদের মৃত্যু হইল। তাঁহার মৃত্যুর পর প্রকাশ পাইল তিনি সমস্ত সম্পত্তি পুত্রবধূর নামে উইল করিয়া গিয়াছেন।

সম্পত্তি হাতে পাইয়া রেবা প্রথমেই মদের দোকানের বারো আনা অংশ বিক্রয় করিয়া দিল, চার আনা হাতে রাখিল। বড় বাড়িটা বিক্রয় করিয়া শহরের নির্জন প্রান্তে একটি সুদৃশ্য ছোট বাড়ি কিনিল, বড় মোটর বদল করিয়া একটি ছোট্ট ফিয়েট গাড়ি লইল। স্বামীকে বলিল, তুমি মাসে তিনশো টাকা হাত-খরচ পাবে। যদি বাজারে ধার করে তার জন্য আমি দায়ী হব না। খবরের কাগজে ইস্তাহার ছাপিয়ে দিয়েছি।

তারপর তাহারা ছোট বাড়িতে উঠিয়া গিয়া বাস করিতে লাগিল। তাহদের সন্তান-সন্ততি জন্মে নাই।

এই গেল গল্পের ভূমিকা।

সুনীলের বয়স আন্দাজ ত্রিশ বছর, আঁটসাঁট মোটা শরীর, গোল মুখখানা প্যাঁচার মুখের মত থ্যাবড়া, মুখ দেখিয়া মনে হয় না বুদ্ধিসুদ্ধি কিছু আছে। বস্তুত যাহারা বাপের পয়সা উড়াইয়া ফুর্তি করে, তাহাদের বুদ্ধির চেয়ে প্রবৃত্তিরই জোর বেশি, ইহা একপ্রকার স্বতঃসিদ্ধ, প্রমাণের অপেক্ষা রাখে না। সুনীলকেও সকলে অমিতাচারী অপরিণামদর্শী নির্বোধ বলিয়া জানিত।

সুনীল কিন্তু নির্বোধ ছিল না। সদবুদ্ধি না থাক, দুষ্টবুদ্ধি তাহার যথেষ্ট পরিমাণে ছিল। পিতার মৃত্যুর পর সে যখন দেখিল সম্পত্তি বেহাত হইয়া গিয়াছে তখন সে স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া করিল না, টাকার জন্য হন্বিতম্বি করিল না, কেমন যেন জবুথবু হইয়া গেল। শিবপ্রসাদ যতদিন জীবিত ছিলেন সুনীলের বাজার-দেনা তিনিই শোধ করিতেন। কিন্তু রেবা খবরের কাগজে ইস্তাহার ছাপিয়া দিয়াছে, এখন বাজারে কেহ তাহাকে ধার দিবে না। দৈনিক দশ টাকায় কত ফুর্তি করা যায়? মুতরাং সুনীল সুবোধ বালকের ন্যায় ঘরেই দিন যাপন করিতে লাগিল। হপ্তায় একদিন কি দুইদিন বৈকালে বাহির হইত, বাকি দিনগুলি বাড়িতে রোমাঞ্চকর বিলাতি উপন্যাস পড়িয়া কাটাইত। রেবার সহিত তাহার সম্পর্কটা নিতান্তই ব্যবহারিক সম্পর্ক হইয়া দাঁড়াইল; বাহ্যত এক বাড়িতে থাকার ঘনিষ্ঠতা, অন্তরে দুর্লঙ্ঘ্য দূরত্ব। তাঁহাদের শয়নের ব্যবস্থাও পৃথক ঘরে।

রেবা সকালবেলা মোটর চালাইয়া বাহির হয়; মদের ব্যবসায় সে চার-আনা অংশীদার, প্রত্যহ নিজে হিসেব পরীক্ষা করে; সেখান হইতে দুপুরবেলা ফিরিয়া আসে। অপরাহ্ণে আবার বাহির হয়। এবার কিন্তু ব্যবসা নয়; মেয়েদের একটা ক্ষুদ্র ক্লাব আছে, সেখানে গিয়া গল্পগুজব খেলাধূলা করে, কখনও সিনেমা দেখিতে যায়; তারপর গৃহে ফিরিয়া আসে। সুনীল সারাক্ষণ বাড়িতেই থাকে।

একটা বুড়ি গোছের ঝি আছে, তাহার নাম আন্না; বাড়ির কাজ, রান্নাবান্না সব সে-ই করে, অন্য চাকর নাই। রেবা সব দিক দিয়া খরচ কমাইয়াছে।

একদিন সন্ধ্যার পর সুনীল বসিবার ঘরে রহস্য উপন্যাস পড়িতেছিল, রাত্রি আর্টর সময় রেবা ফিরিয়া আসিল। গাড়ি গ্যারাজে বন্ধ করিয়া বেশবাস পরিবর্তন করিয়া একখানা বাংলা বই হাতে লইয়া বসিবার ঘরে একটি সোফায় আসিয়া বসিল। স্বামী স্ত্রীর মধ্যে কোনও কথা হইল না। নৈশ আহারের বিলম্ব আছে; রেবা বই খুলিয়া পড়িতে আরম্ভ করিল। বইখানার নাম-ব্যোমকেশের কাহিনী।

সুনীলের ভোঁতা মুখ ভাবলেশহীন। সে একবার চোখ তুলিয়া রেবার পানে চাহিল, আবার পুস্তকে চক্ষু ন্যস্ত করিল, তারপর একটু গলা খাঁকারি দিল।

রেবা—

রেবা ভ্রূ তুলিয়া চাহিল। সুনীল ইতস্তত করিয়া বলিল, তুমি কোন দিন বাড়ির সামনে একটা লোককে ঘোরাঘুরি করতে দেখেছ?

রেবা বই মুড়িয়া কিছুক্ষণ সুনীলের পানে চাহিয়া রহিল, শেষে বলিল, না। কেন?

সুনীল ধীরে ধীরে বলিল, কয়েকদিন থেকে লক্ষ্য করছি, সন্ধ্যের পর একটা লোক বাড়ির দিকে তাকাতে তাকাতে রাস্তা দিয়ে যায়, আবার খানিক পরে তাকাতে তাকাতে ফিরে যায়৷

রেবা কিয়ৎকাল চিন্তা করিয়া বলিল, কি রকম চেহারা লোকটার?

সুনীল বলিল, গুণ্ডার মত চেহারা। কালো মুস্কো জোয়ান, মাথায় পাগড়ি।

অনেকক্ষণ আর কথা হইল না; তারপর রেবা মনস্থির করিয়া বলিল, কাল সকালে তুমি থানায় গিয়ে এত্তেলা দিয়ে এস। নির্জন জায়গা, যদি সত্যিই চোর-ছাঁচড় হয় পুলিসকে জানিয়ে রাখা ভাল।

সুনীল কিছুক্ষণ থতমত হইয়া রহিল, শেষে সঙ্কুচিত স্বরে বলিল, তুমি বাড়ির মালিক, তুমি পুলিসে খবর দিলেই ভাল হত না?

রেবা বলিল, কিন্তু আমি তো মুস্কো জোয়ান লোকটাকে দেখিনি। —তা না হয় দুজনেই যাব ৷

পরদিন সকালে তাহারা থানায় গেল; নিজেদের এলাকার ছোট থানায় না গিয়া একেবারে সদর থানায় উপস্থিত হইল। সেখানে বড় দারোগা রমণীবাবু বাঙালী, তাঁহার সহিত সামান্য জানাশোনা আছে।

রমণীবাবু তাঁহাদের খাতির করিয়া বসাইলেন। সুনীলের বাক্যালাপের ভঙ্গীটা একটু মন্থর ও এলোমেলো, তাই রেবাই ঘটনা বিবৃত করিল। এত্তেলা লিখিত হইবার পর রমণীবাবু বলিলেন, আপনাদের বাড়িটা একেবারে শহরের এক টেরে। যাহোক, ভয় পাবেন না। আমি ব্যবস্থা করছি, রাত্রে টহলদার পাহারাওলা বাড়ির ওপর নজর রাখবে।

থানা হইতে রেবা কাজে চলিয়া গেল, সুনীল পদব্রজে বাড়ি ফিরিয়া আসিল। সেদিন বৈকালে রেবা বলিল, এ-বেলা আমি বেরুব না, শরীরটা তেমন ভাল ঠেকছে না।

সুনীল বই ফেলিয়া উঠিয়া পড়িল, বলিল, তাহলে আমি একটু ঘুৱে আসি।

রেবার মুখে অসন্তোষ ফুটিয়া উঠিল, তুমি বেরুবে। কিন্তু দেরি কোরো না বেশি, সকাল সকাল ফিরে এস; না হয় গাড়িটা নিয়ে যাও—

সুনীল বলিল, দরকার নেই, হেঁটেই যাব। মাঝে মাঝে হাঁটলে শরীর ভাল থাকে।

উৎকণ্ঠার মধ্যেও রেবার মন একটু প্ৰসন্ন হইল। নিজের ছোট্ট গাড়িখানাকে সে ভালবাসে, নিজের হাতে তাহার পরিচর্যা করে; সুনীলের হাতে গাড়ি ছাড়িয়া দিতে তাহার মন সরে না।

সুনীল গায়ে একটা ধূসর রঙের শাল জড়াইয়া লইয়া বাহির হইয়া গেল। শীতের আরম্ভ, পাঁচটা বাজিতে না বাজিতে সন্ধ্যা হইয়া যায়।

সুনীল শহরের কেন্দ্ৰস্থিত গলিঘুঁজির মধ্যে যখন পৌঁছিল তখন ঘোর-ঘোর হইয়া আসিয়াছে। সে একটা জীর্ণ বাড়ির দরজায় টোকা মারিল; একজন মুস্কো জোয়ান লোক বাহির হইয়া আসিল। সুনীল খাটো গলায় বলিল, হুকুম সিং, তোমাকে দরকার আছে।

হুকুম সিং সেলাম করিল। মুকুন্দ সিং এবং হুকুম সিং দুই ভাই শহরের নামকরা পালোয়ান ও গুণ্ডা; সুনীলের সঙ্গে তাঁহাদের অনেক দিনের পরিচয়। বড় মানুষের উচ্ছৃঙ্খল ছেলে এবং গুণ্ডাদের মধ্যে এমন একটি আত্মিক যোগ আছে যে, আপনা হইতেই হৃদ্যতা জমিয়া ওঠে।

সুনীল দ্রুত-হ্রস্ব কণ্ঠে হুকুম সিংকে কিছু উপদেশ দিল, তারপর তাহার হাতে কয়েকটা নোট গুজিয়া দিয়া তাড়াতাড়ি গলি হইতে বাহির হইয়া গেল। সন্ধ্যার আবছায়া আলোতে ধূসর শাল গায়ে লোকটিকে কেহ লক্ষ্য করিল না; লক্ষ্য করলেও সুনীল সরকার বলিয়া চিনিতে পারিত না। এই বস্তিতে সুনীলকে চিনিবে এমন লোক কটাই বা আছে!

সুনীল বাড়ি ফিরিতেই রেবা বলিল, এলে? এত দেরি হল যে!

সুনীল ফিরিয়া আসায় সে মনে স্বস্তি পাইয়াছে তাহা বেশ বোঝা যায়। রেবার মনে সুনীলের প্রতি তিলমাত্র স্নেহ নাই, স্বামীকে ভালবাসিতেই হইবে এরূপ সংস্কারও নাই; তাহার হৃদয় এখন সম্পূর্ণ স্বায়ত্ত ও স্বাধীন। কিন্তু মেয়েমানুষ যতই স্বাধীন হোক, পুরুষের বাহুবলের ভরসা তাহারা ছাড়িতে পারে না।

সুনীল ঘড়ি দেখিয়া বলিল, এখনো এক ঘণ্টা হয়নি। খানিকটা ঘুরে বেড়িয়েছি বৈ তো নয়।

আর কোনও কথা হইল না। চা পান করিয়া দুজনে বই লইয়া বসিল।

রেবা কিন্তু স্থির হইতে পারিল না। সদর দরজা বন্ধ ছিল, সে মাঝে মাঝে উঠিয়া গিয়া জানালা দিয়া রাস্তায় উঁকি মারিতে লাগিল। রাস্তাটা শহরের দিক হইতে আসিয়া রেবার বাড়ি অতিক্রম করিয়া কিছুদূর যাইবার পর মােঠ-ময়দান ও ঝোপ-ঝাড়ের মধ্যে অদৃশ্য হইয়াছে। রাস্তার শেষ দীপস্তম্ভটা বাড়ির প্রায় সামনাসামনি দাঁড়াইয়া ত্ৰিয়মাণ আলো বিতরণ করিতেছে।

একবার জানালায় উঁকি মারিয়া আসিয়া রেবা সোফায় বসিল, হাতের বইখানা খুলিয়া তাহার পানে চাহিয়া রহিল; তারপর যেন নিরাসক্ত কৌতুহলবশেই প্রশ্ন করিল, পুলিসের টহলদার রাত্রে কখন রোঁদ দিতে বেরোয়?

সুনীল বই হইতে বোকাটে মুখ তুলিয়া খানিকক্ষণ চাহিয়া রহিল, শেষে বলিল, তা তো জানি না। রাত্রি দশটা এগারোটা হবে বোধ হয় ৷

রেবা বিরক্তিসূচক মুখভঙ্গী করিল, আর কিছু বলিল না। দুজনে নিজ নিজ পাঠে মন দিল। রাত্রি ঠিক আটটার সময় রেবা চমকিয়া মুখ তুলিল। রাস্ত হইতে যেন একটা শব্দ আসিল। রেবা উঠিয়া গিয়া আবার জানালার পদ সরাইয়া উঁকি মারিল। শহরের দিক হইতে একটা লোক আসিতেছে। রাস্তার নিস্তেজ আলোয় তাহাকে অস্পষ্ট দেখা গেল; গাঁট্টা-গোট্টা চেহারা, মাথায় বৃহৎ পাগড়ি মুখের উপর ছায়া ফেলিয়াছে, হাতে লম্বা লাঠি। লোকটা বাড়ির দিকে ঘাড় ফিরাইয়া চাহিতে চাহিতে চলিয়া গেল।

রেবা সশব্দে নিশ্বাস টানিল। সুনীল সেই দিকে ফিরিয়া দেখিল রেবার মুখ পাংশু হইয়া গিয়াছে; সে নীরবে হাতছানি দিয়া তাহাকে ডাকিতেছে। সুনীল উঠিয়া গিয়া রেবার পাশে দাঁড়াইল।

রেবা ফিসফিস করিয়া বলিল, বোধ হয় সেই লোকটা, তুমি যাকে দেখেছিলে।

সুনীল ঘাড় নাড়িল। দুজনে পাশাপাশি জানালার কাছে দাঁড়াইয়া রহিল। কিছুক্ষণ পরে আবার নাগরা জুতার আওয়াজ শোনা গেল; লোকটা ফিরিয়া আসিতেছে। রেবা নিশ্বাস রোধ করিয়া রহিল।

লোকটা বাড়ির পানে চাহিতে চাহিতে শহরের দিকে ফিরিয়া গেল। তাহার পদধ্বনি মিলাইয়া যাইবার পর রেবা প্রশ্ন-বিস্ফারিত চক্ষে সুনীলের পানে চাহিল। সুনীলের মনে নিগুঢ় সন্তোষ, কিন্তু সে মুখে দ্বিধার ভাব আনিয়া বলিল, সেই লোকটাই মনে হচ্ছে।

দুজনে ফিরিয়া আসিয়া বসিল। রেবার মুখ শঙ্কাবিশীৰ্ণ হইয়া রহিল। সুনীল তাহার প্রতি একটা চোরা কটাক্ষ হানিয়া বই খুলিল।

ঝি আসিয়া প্রশ্ন করিল—খাবার দিবে কি না। অতঃপর দু’জনে খাইতে গেল।

আহার করিতে করিতে সুনীল বলিল, বোধ হয় ভয়ের কিছু নেই। পুলিস যখন দেখাশোনা করবে বলেছে—

প্রত্যুত্তরে রেবার অন্তরের উষ্মা ঝন ঝন শব্দে বাহির হইয়া আসিল, পুলিস তো আর সারা রাত্রি বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে পাহারা দেবে না, মাঝে মাঝে টহল দিয়ে যাবে। তার ফাঁকে যদি পাঁচটা ডাকাত দোর ভেঙে বাড়িতে ঢোকে, তখন কি করব!

সুনীল মুখ হেঁট করিয়া আহার করিতে লাগিল, শেষে বলিল, বাড়িতে লাঠি-সোঁটা কিছু আছে?

রেবা গভীর বিরক্তিভরে স্বামীর পানে একবার চাহিল, এই বালকোচিত প্রশ্নের উত্তর দেওয়া প্রয়োজন বোধ করিল না। লাঠি-সোঁটা থাকিলেও চালাইবে কে?

রাত্রে রেবা নিজ শয়নকক্ষের দ্বারে উপরে-নীচে ছিটকিনি লাগাইয়া শয়ন করিল। এত সতর্কতার অবশ্য প্রয়োজন ছিল না, রমণীবাবু তাহার বাড়ি পাহারার ভাল ব্যবস্থাই করিয়াছিলেন। কিন্তু রেবার মনের অশান্তি দূর হইল না; বিছানায় শুইয়া সে অনেকক্ষণ জাগিয়া রহিল।

শহরের একান্তে বাড়িটা না কিনিলেই হইত...কিন্তু তখন কে জানিত? এখন চোর-ছ্যাঁচড়ের ভয়ে বাড়ি ছাড়িয়া গেলে মান থাকিবে না...স্বামী বিষয়বুদ্ধিহীন অপদাৰ্থ...কি করা যায়? দুটো শক্ত-সমর্থ গোছের চাকর রাখিবে? কিন্তু চাকরের উপর ভরসা কি? যে রক্ষক সেই ভক্ষক হইয়া উঠিতে পারে। ডাকাতেরা ঘুষ খাওয়াইয়া যদি চাকরদের বশ করে, তাহারাই রাত্রে দ্বার খুলিয়া ডাকাতদের ঘরে ডাকিয়া আনিবে… তার চেয়ে বুড়ি আন্না ভাল… শয়নঘরের লোহার সিন্দুকে দামী গহনা আছে, কিন্তু আত্মরক্ষার একটা অস্ত্ৰ নাই।

হঠাৎ একটা কথা মনে হওয়ায় রেবা উত্তেজিতভাবে বিছানায় উঠিয়া বসিল। তাহার শ্বশুরের একটা পিস্তল ছিল। ছয় মাস পূর্বে তিনি যখন মারা যান, তখন পিস্তলটা থানায় জমা দেওয়া হইয়াছিল। সেই পিস্তলটিা কি ফেরত পাওয়া যায় না? কাল সকালেই সে থানায় গিয়া রমণীবাবুর সঙ্গে দেখা করিবে। একটা পিস্তল বাড়িতে থাকিলে আর ভয় কি?

অনেকটা নিশ্চিন্ত হইয়া রেবা ঘুমাইয়া পড়িল। পরদিন সকালে রেবা সুনীলকে লইয়া আবার থানায় চলিল। পথে সুনীলের অনুচ্চারিত প্রশ্নের উত্তরে রেবা বলিল, ‘বাবার পিস্তলটি থানায় জমা আছে, সেটা ফেরত নিলে ভাল হয় না?’ যেন কথাটা সুনীলের মাথায় আসে নাই, এমনিভাবে চোখ বড় করিয়া সে কিছুক্ষণ চিন্তা করিল, তারপর ঘাড় নাড়িতে নাড়িতে বলিল, ‘ভাল হবে।’

থানায় রমণীবাবু প্ৰস্তাব শুনিয়া বলিলেন, বেশ তো, একটা দরখাস্ত করে দিন, হয়ে যাবে। কার নামে লাইসেন্স নেবেন?’

এ কথাটা রেবা চিন্তা করে নাই। সে স্ত্রীলোক, পূর্বে কখনও পিস্তল ছোঁড়ে নাই; আগ্নেয়াস্ত্ৰ সম্বন্ধে তাহার মনে একটা সন্ত্রস্ত শঙ্কার ভাব আছে। কিন্তু সে তাহা প্ৰকাশ করিতে চায় না, চট্‌ করিয়া বলিল, কেন, এঁর নামে ৷

রমণীবাবু বলিলেন, তাই হবে। আপনি এখনি দরখাস্ত করে দিন; আমি একবার আপনাদের বাড়িতে গিয়ে নিয়ম-রক্ষা রকমের তদারক করে আসব। কালই পিস্তল পেয়ে যাবেন।

রেবা দরখাস্ত লিখিল, সুনীল তাহাতে সহি করিল। রমণীবাবু জিজ্ঞাসা করিলেন, সুনীলবাবু, আপনি আগে কখনো বন্দুক-পিস্তল ছুঁড়েছেন?

সুনীল আমতা আমতা ভাবে বলিল, ‘এঁ—না—হ্যাঁ—অনেক দিন আগে লুকিয়ে বাবার পিস্তল নিয়ে কয়েকবার ছুড়েছিলাম—তখন ছেলেমানুষ ছিলাম—এঁ—

রমণীবাবু হাসিয়া বলিলেন, কাজটা বে-আইনী হয়েছিল। যার নামে লাইসেন্স সে ছাড়া আর কারুর আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করার হুকুম নেই। অবশ্য আতুরে নিয়মো নাস্তি, বিপদে পড়লে সকলেই সব রকম অস্ত্ৰ ব্যবহার করতে পারে।

সেদিন বৈকালে রমণীবাবু এনকোয়ারি করিতে আসিলেন এবং চা-জলখাবার খাইয়া ঘণ্টাখানেক গল্প করিয়া প্ৰস্থান করিলেন। তাঁহার ধারণা জন্মিল সুনীল হাবাগোবা জড়-প্রকৃতির লোক, রেবা তাহাকে নাকে দড়ি দিয়া ঘুরাইতেছে। হাবাগোবা লোকেরা হাতে টাকা পাইলে উচ্ছৃঙ্খল হয়, সুনীলও তাঁহাই হইয়াছিল, এখন শুধরাইয়া গিয়াছে। সুনীলের প্রকৃত স্বরূপ তিনি তখনও চেনেন নাই।

পরদিন সুনীল গিয়া থানা হইতে লাইসেন্স ও পিস্তল লইয়া আসিল। বন্দুকের দোকান হইতে এক বাক্স কার্তুজও কিনিয়া আনিল।

দুপুরবেলা রেবা বাড়ি ফিরিলে সুনীল পিস্তল ও কার্তুজের বাক্স তাহার সামনে টেবিলের উপর রাখিয়া বলিল, এই নাও।

রেবা সশঙ্ক চক্ষে আগ্নেয়ন্ত্র নিরীক্ষণ করিয়া বলিল, আমি কি করব? তুমি রাখো, দরকার হলে তুমিই তো ব্যবহার করবে।

সুনীল ইহাই প্রত্যাশা করিয়াছিল, সে পিস্তল ও কার্তুজ লইয়া নিজের ঘরে রাখিয়া আসিল। ইহার দুইদিন পরে পাগড়িধারী দুৰ্বত্তটাকে আর একবার রাস্তা দিয়া যাইতে দেখা গেল। তারপর তাহার যাতায়াত বন্ধ হইল।

এক হপ্তা নিরুপদ্রবে, কাটিয়া যাইবার পর রেবা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলিয়া বলিল, ওরা বোধ হয় জানতে পেরেছে বাড়িতে বন্দুক আছে, তাই আশা ছেড়ে দিয়েছে।

সুনীল বিজ্ঞের মত মাথাটি নাড়িতে নাড়িতে বলিল, হুঁ।

তারপর যত দিন কাটিতে লাগিল, রেবার মন ততই নিরুদ্বেগ হইতে লাগিল। সংসারে স্বাভাবিক অবস্থা আবার ফিরিয়া আসিল। রেবা সকালে কাজে বাহির হয়, বিকালে বেড়াইতে যায়। সুনীল বাড়িতে বসিয়া রহস্য-রোমাঞ্চ পড়ে; কদাচিৎ সন্ধ্যার সময় ঘণ্টাখানেকের জন্য বাড়ি হইতে বাহির হয়। তাহার বন্ধুবান্ধব নাই; সে কখনও রেলওয়ে স্টেশনে গিয়া বইয়ের স্টল হইতে বই কেনে; কখনও শহরের এঁদোপড়া গলিতে হুকুম সিং-এর সঙ্গে দেখা করে। হুকুম সিং-এর সঙ্গে তাহার কাজ এখনও শেষ হয় নাই।

এইভাবে দুই মাস কাটিয়া গেল, শীত শেষ হইয়া আসিল। রেবার মন হইতে গুণ্ডার সম্ভাবিত আক্রমণের কথা সম্পূর্ণ মুছিয়া গেল।

একদিন সন্ধ্যাকালে রেবার দুটি বান্ধবী বাড়িতে আসিয়াছিল; রেবা তাহাদের লইয়া খাওয়াদাওয়া হাসিগল্পে ব্যস্ত ছিল। রেবার বান্ধবীরা বাড়িতে আসিলে সুনীলকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করিয়া চলে, চাকরের মর্যাদাও সে তাঁহাদের কাছে পায় না। তাই তাহারা কেহ আসিলে সুনীল নিজের ঘরে বসিয়া থাকে কিংবা বেড়াইতে যায়। আজও সে নিজের ঘরে চলিয়া গেল, তারপর চুপি চুপি পিছনের দরজা দিয়া বাড়ি হইতে বাহির হইল। অনেক দিন হইতে সে এই সুযোগের প্ৰতীক্ষা করিতেছিল।

সুনীল শহরে গিয়া গলির মধ্যে হুকুম সিং-এর সঙ্গে দেখা করিল। দশ মিনিট ধরিয়া হুকুম সিং তাহার নির্দেশ শুনিয়া শেষে বলিল, “বর পেয়েছি বাড়িতে পিস্তল আছে।

সুনীল পকেট হইতে পিস্তল বাহির করিয়া দেখাইল, পিস্তল খুলিয়া দেখাইল, তাহার মধ্যে টোটা নাই। বলিল, তুমি নিৰ্ভয়ে বাড়িতে ঢুকতে পার।

হুকুম সিং হাত পাতিয়া বলিল, আমার ইনাম?

সুনীল দুই মাসে ছয়শত টাকা জমাইয়াছিল। তাঁহাই হুকুম সিং-এর হাতে দিয়া বলিল, এই নাও। এর বেশি এখন আমার কাছে নেই। তুমি কাজ সেরে ওর গায়ের গয়নাগুলো নিও। তারপর সম্পত্তি যখন আমার হাতে আসবে তুমি দশ হাজার টাকা পাবে। আমি এখন রেলওয়ে স্টেশনে যাচ্ছি, রাত্রি আটটার পর বাড়ি ফিরব।

হুকুম সিং বলিল, বহুৎ খুব।

যা যা বলেছি মনে থাকবে?

জি। আপনি বে-ফিকির থাকুন, আমি সাজসজ্জা করে এখুনি বেরুচ্ছি।

হুকুম সিং কালিকুলি মাখিয়া ছদ্মবেশ ধারণের জন্য নিজের কোটরে প্রবেশ করিল। সুনীল স্টেশনে গেল না, দ্রুতপদে গৃহের পানে ফিরিয়া চলিল।

অন্ধকার হইয়া গিয়াছে। বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছিয়া সুনীল দেখিল বান্ধবীরা এখনও আছে। সে আশ্বস্ত হইয়া রাস্তার ধারে একটা বড় গাছের পিছনে লুকাইয়া রহিল। সেখানে দাঁড়াইয়া পকেট হইতে পিস্তল বাহির কলিল; অন্য পকেট কার্তুজ ছিল, তাহা পিস্তল ভরিয়া প্রস্তুত হইয়া রহিল।

কিছুক্ষণ পরে রেবার বান্ধবীর চলিয়া গেল। রেবা ভিতর হইতে সদর দরজা বন্ধ করিয়া রাত্রি সাড়ে সাতটা। রেবা আন্নাকে ডাকিয়া প্রশ্ন করিল, বাবু কোথায় রে?

আন্না বলিল, বাবু বেরিয়েছেন। সদর দিয়ে তোমার ওনারা এলেন, বাবু খিড়কি দিয়ে বেরিয়ে গেল।

ও। আচ্ছা, তুই রান্না চড়াগে যা।

রেবা উদ্বিগ্ন হইল না। চোর-ডাকাতের ভয় আর তাহার নাই। সে অন্য কথা ভাবিয়া পরিতৃপ্তির নিশ্বাস ফেলিল। এইভাবে যদি জীবন চলিতে থাকে, মন্দ কি?

বাহিরে গাছের আড়ালে সুনীল ওৎ পাতিয়া বসিয়া আছে। শহরের দিক হইতে হুকুম সিংকে আসিতে দেখা গেল। সে নিঃশব্দে আসিতেছে, নাগরা জুতার আওয়াজ নাই।

দ্বারের সামনাসামনি আসিয়া সে আগে পিছে তাকাইল, তারপর দ্বারে মৃদু টোকা দিল।

সুনীল আসিয়াছে মনে করিয়া রেবা দ্বার খুলিয়া দিল। সঙ্গে সঙ্গে হুড়মুড় করিয়া হুকুম সিং ভিতর ঢুকিয়া পড়িল এবং দুহাতে রেবার গলা টিপিয়া ধরিল।

একটি অধোচ্চারিত চীৎকার রেবার কণ্ঠ হইতে বাহির হইল, তারপর আর শব্দ নাই। আন্না রান্নাঘর হইতে চীৎকার শুনিতে পাইয়াছিল, সবিস্ময়ে বাহিরের ঘরে উঁকি মারিয়া দেখিল যখের মত কালো দুর্দান্ত একটা লোক রেবার গলা টিপিতেছে। আন্না বাঙনিস্পত্তি করিল না, রান্নাঘরে ফিরিয়া গিয়া দ্বারে হুড়কা আটিয়া দিল।

হুকুম সিং যখন দেখিল রেবার দেহে প্ৰাণ নাই তখন সে তাহাকে মেঝোয় শোয়াইয়া দিল; রেবার হাতের কানের গলার গহনাগুলা খুলিয়া লইয়া নিজের পকেটে রাখিল, তারপর সদর দরজা দিয়া বাহির হইল।

গাছের আড়ালে সুনীল এই মুহুর্তটির প্রতীক্ষা করিতেছিল। ‘কে? কে?’ বলিয়া সে ছুটিয়া বাহির হইয়া আসিল। হুকুম সিং হতভম্ব হইয়া দাঁড়াইয়া পড়িয়ছিল, সুনীল ছুটিয়া আসিয়া পিস্তল তুলিল, হুকুম সিং-এর বুক লক্ষ্য করিয়া পিস্তলের সমস্ত কর্তুজ উজাড় করিয়া দিল। হুকুম সিং মুখ থুবড়াইয়া সেইখানেই পড়িল, আর নড়িল না।

সুনীল তখন চীৎকার করিতে করিতে গৃহে প্রবেশ করিল—‘কী হয়েছে! অ্যাঁ—রেবা—!

রান্নাঘরে আন্না সুনীলের কণ্ঠস্বর শুনিতে পাইয়া কাঁপিতে কাঁপিতে বাহির হইয়া আসিল। সুনীল ব্যাকুলম্বরে বলিল, ‘আন্না, এ কী হল! রেবা মরে গেছে। গুণ্ডাটা রেবাকে মেরে ফেলেছে। কিন্তু আমিও গুণ্ডাকে মেরেছি!’ সে লাফাইয়া উঠিল—‘পুলিস! আমি পুলিসে খবর দিতে যাচ্ছি।’ বলিয়া ছুটিয়া বাহির হইয়া গেল।

যথাসময়ে স্থানীয় থানা হইতে পুলিস আসিল। আন্না যাহা দেখিয়াছিল পুলিসকে বলিল।

খবর পাইয়া রমণীবাবু আসিলেন। সনীল হাবলার মত তাঁহার পানে চাহিয়া বলিল, আমি বেড়াতে বেরিয়েছিলাম, ফিরে এসে বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছুতেই একটা চীৎকার শুনতে পেলাম। ছুটে এসে দেখি ওই লোকটা বাড়ি থেকে বেরুচ্ছে। আমার মাথা গোলমাল হয়ে গেল। আমি পিস্তল দিয়ে ওকে মেরেছি। তারপর ঘরে ঢুকে দেখি— তাহার ব্যায়ত চক্ষু রেবার মৃতদেহের দিকে ফিরিল; সে দুহাতে মুখ ঢাকিল।

রমণীবাবু ক্ষণেক নীরব থাকিয়া প্রশ্ন করিলেন, আপনি পিস্তল নিয়ে বেড়াতে বেরিয়েছিলেন?

সুনীল মুখ খুলিল, ঘাড় নাডিয়া বলি, হাঁ। আমার নামে পিস্তল, আমি সর্বদা পিস্তল আমার কাছে রাখি।

রমণীবাবু বলিলেন, পিস্তল দিন। ওটা আমি বাজেয়াপ্ত করলাম।

সুনীল বিনা আপত্তিতে পিস্তল রমণীবাবু হাতে সমর্পণ করিল। পিস্তলে আর তাহার প্রয়োজন ছিল না।

ব্যোমকেশ বলিল, সুনীল সরকার বোকা বটে, কিন্তু বুদ্ধি আছে।

রমণীবাবু করুণ হাসিয়া বলিলেন, ব্যোমকেশবাবু, আমার ধারণা ছিল আমি বুদ্ধিমান, কিন্তু সুনীল সরকার আমাকে বোকা বানিয়ে দিয়েছে। তার মতলব কিছু বুঝতে পারিনি। হুকুম সিংকে খুন করার অপরাধে তাকে যে ধরব সে উপায় নেই। স্পষ্টতই হুকুম সিং তার বাড়িতে ঢুকে তার স্ত্রীকে খুন করে গায়ের গয়না কেড়ে নিয়েছিল, সুতরাং তাকে খুন করার অধিকার সুনীলের ছিল। সে এক ঢিলে দুই পাখি মেরেছে; পৈতৃক সম্পত্তি উদ্ধার করেছে এবং নিজের দুষ্কৃতির একমাত্র শরিককে সরিয়েছে! স্ত্রীর মৃত্যুর পর সে-ই এখন সম্পত্তির উত্তরাধিকারী, কারণ সেই নিকটতম আত্মীয়। রেবার উইল ছিল না, সুনীল আদালতের হুকুম নিয়ে গদীয়ান হয়ে বসেছে।

হুঁ বলিয়া ব্যোমকেশ চিন্তাচ্ছন্ন হইয়া পড়িল।

রমণীবাবু বলিলেন, একটা রাস্তা বার করুন, ব্যোমকেশবাবু। যখন ভাবি একজন অতি বড় শয়তান আইনকে কলা দেখিয়ে চিরজীবন মজা লুটবে তখন অসহ্য মনে হয়।

ব্যোমকেশ মুখ তুলিয়া বলিল, রেবা অজিতের লেখা বইগুলো ভালবাসতো?

রমণীবাবু বলিলেন, হ্যাঁ, ব্যোমকেশবাবু। ওদের বাড়ি আমি আগাপাস্তলা সার্চ করেছিলাম; আমার কাজে লাগে এমন তথ্য কিছু পাইনি, কিন্তু দেখলাম অজিতবাবুর লেখা আপনার কীর্তিকাহিনী সবগুলিই আছে, সবগুলিতে রেবার নাম লেখা। তা থেকে মনে হয় রেবা আপনার গল্প পড়তে ভালবাসতো।

ব্যোমকেশ আবার চিন্তামগ্ন হইয়া পড়িল। আমরা সিগারেট ধরাইয়া অপেক্ষা করিয়া রহিলাম। দেখা যাক ব্যোমকেশের মস্তিষ্ক-রূপ গন্ধমাদন হইতে কোন বিশল্যকরণী দাবাই বাহির হয়।

দশ মিনিট পরে ব্যোমকেশ নড়িয়া-চড়িয়া বসিল। আমরা সাগ্রহে তাহার মুখের পানে চাহিলাম।

সে বলিল, রমণীবাবু, রেবার হাতের লেখা যোগাড় করতে পারেন?

হাতের লেখা! রমণীবাবু ভ্রূ তুলিলেন।

ব্যোমকেশ বলিল, ধরুন, তার হিসেবের খাতা, কিংবা চিঠির ছেঁড়া টুকরো। যাতে বাংলা লেখার ছাঁদটা পাওয়া যায়৷ ৷

রমণীবাবু গালে হাত দিয়া চিন্তা করিলেন, শেষে বলিলেন, চেষ্টা করতে পারি। কিন্তু মতলবটা কি?

ব্যোমকেশ বলিল, মতলবিটা এই।—রেবা আমার রহস্য-কাহিনী পড়তে ভালবাসতো। সুতরাং অটোগ্রাফের জন্যে আমাকে চিঠি লেখা তার পক্ষে অসম্ভব নয়। মেয়েদের যে ও দুর্বলতা আছে তার পরিচয় আমরা হামেশাই পেয়ে থাকি। মনে করুন। ছ'মাস আগে রেবা আমাকে চিঠি লিখেছিল; আমার অটোগ্রাফ চেয়েছিল, তারপর আমাকে জানিয়ে দিয়েছিল যে, তার স্বামী তাকে খুন করবার ফন্দি আঁটছে, আমি যদি তার অপঘাত মৃত্যুর খবর পাই তাহলে যেন তদন্তু করি।

সেই চিঠি সুনীলকে দেখিয়ে তার কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায় করবেন?

ব্যোমকেশ বলিল, স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করব। সুনীল যদি ভয় পেয়ে সত্য কথা বলে ফেলে তবেই তাকে ধরা যেতে পারে।

রমণীবাবু বলিলেন, আমি রেবার হাতের লেখার নমুনা যোগাড় করব। আর কিছু?

ব্যোমকেশ প্রশ্ন করিল, রেবার নাম—ছাপা চিঠির কাগজ ছিল কি?

ছিল। তাও পাবেন। আর কিছু?

আর-একটা টেপ রেকর্ডিং মেশিন। যদি সুনীল কনফেস করে, তার পাকাপাকি রেকর্ড থাকা ভাল।

বেশ। কাল সকালেই আমি আবার আসব। বলিয়া রমণীবাবু বিশেষ উত্তেজিতভাবে বিদায় লইলেন।

পরদিন সকালে আমরা সবেমাত্ৰ শয্যাত্যাগ করিয়াছি, রমণীবাবু আসিয়া উপস্থিত। তাঁহার হাতে একটি চামড়ার স্যাচেল। হাসিয়া বলিলেন, যোগাড় করেছি।

ব্যোমকেশ তাঁহাকে সিগারেট দিয়া বলিল, কি কি যোগাড় করলেন?

রমণীবাবু স্যাচেল খুলিয়া সন্তৰ্পণে একটি কাগজের টুকরা বাহির করিয়া আমাদের সামনে ধরিলেন, বলিলেন, এই নিন রেবার হাতের লেখা।

চিঠির কাগজের ছিন্নাংশ, তাহাতে বাংলায় কয়েক ছত্র লেখা আছে—‘...স্ত্রীর প্রতি স্বামীর যদি কর্তব্য না থাকে, স্বামীর প্রতি স্ত্রীর কর্তব্য থাকবে কেন? আমরা আধুনিক যুগের মানুষ, সেকেলে সংস্কার আঁকড়ে থাকার মানে হয় না...’

ব্যোমকেশ প্রশ্ন করিল, “এই রেবার হাতের লেখা! দস্তখত নেই দেখছি। কোথায় পেলেন?

রমণীবাবু স্যাচেল হইতে এক তা সাদা চিঠির কাগজ লইয়া বলিলেন, আর এই নিন। রেবার নাম-ছাপা সাদা চিঠির কাগজ। কাল রাত্রে এখান থেকে বেরিয়ে সটান সুনীলের বাড়িতে গিয়েছিলাম; তাকে সোজাসুজি বললাম, তোমার বাড়ি আর একবার খুঁজে দেখব। সে আপত্তি করল না। —কেমন, যা যোগাড় করেছি। তাতে চলবে তো?

লেখা নকল করা শক্ত হবে না। যারা রবীন্দ্রীয় ছাঁদের নকল করে তাদের লেখা নকল করা সহজ। —টেপ-রেকর্ডার পেয়েছেন?

রমণীবাবু বলিলেন, পেয়েছি। যখন বলবেন তখনই এনে হাজির করব। —তাহলে শুভকর্মের দিন স্থির কবে করছেন?

ব্যোমকেশ একটু ভাবিয়া বলিল, আজই হোক না, শুভস্য শীঘ্রম। আমি সুনীলকে একটা চিঠি দিচ্ছি, সেটা আপনি কারুর হাতে পাঠিয়ে দেবেন।

একটা সাধারণ প্যাডের কাগজে ব্যোমকেশ চিঠি লিখিল—

শ্ৰীসুনীল সরকার বরাবরেষু—

আপনার স্ত্রীর সহিত পত্ৰযোগে আমার পরিচয় হইয়াছিল; তিনি মৎ-সংক্রান্ত কাহিনী পড়িতে ভালবাসিতেন। শুনিলাম তাঁহার মৃত্যু হইয়াছে। শুনিয়া দুঃখিত হইয়াছি।

আমি কয়েকদিন যাবৎ এখানে আসিয়া ডাকবাংলোতে আছি। আপনি যদি আজ সন্ধ্যা সাতটার সময় ডাকবাংলোতে আসিয়া আমার সঙ্গে দেখা করেন, আপনার স্ত্রী আমাকে যে শেষ চিঠিখনি লিখিয়াছিলেন, তাহা আপনাকে দেখাইতে পারি। চিঠিখনি আপনার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ।

নিবেদন ইতি-ব্যোমকেশ বক্সী।

চিঠি খামে ভরিয়া ব্যোমকেশ রমণীবাবুর হাতে দিল। তিনি বলিলেন, আচ্ছা, এখন উঠি। চিঠিখানি এমনভাবে পাঠাব যাতে সুনীল বুঝতে না পারে যে, পুলিসের সঙ্গে আপনার কোনো সম্পর্ক আছে। দুপুরবেলা টেপ-রেকর্ডার নিয়ে আসছি।

তিনি প্রস্থান করিলে ব্যোমকেশ রেবার চিঠি লাইয়া বসিল; নানাভাবে তাহার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিতে লাগিল; আলোর সামনে তুলিয়া ধরিয়া কাগজ দেখিল, ছিন্ন অংশের কিনারা পর্যবেক্ষণ করিল। তারপর সিগারেট ধরাইয়া টানিতে লাগিল।

বলিলাম, কি দেখলে?

ব্যোমকেশ উর্ধ্বদিকে ধোঁয়া ছাড়িয়া বলিল, চিঠিখানা আস্ত ছিল, সম্প্রতি ছেড়া হয়েছে। চিঠির ল্যাজা-মুড়ো কোথায় গেল। তাই ভাবছি।

আমিও ভাবিলাম। তারপর বলিলাম, রেবা হয়তো নিজের কোন বান্ধবীকে চিঠিখানা লিখেছিল, রমণীবাবু তার কাছ থেকে আদায় করেছেন। বান্ধবী হয়তো নিজের নাম গোপন রাখতে চায়—

হতে পারে, অসম্ভব নয়। রেবার বান্ধবী হয়তো রমণীবাবুকে শর্ত করিয়ে নিয়েছে যে, তার নাম প্রকাশ পাবে না। তাই রমণীবাবু আমার প্রশ্ন এড়িয়ে গেলেন—যাক, এবার জালিয়াতির হাতে-খড়ি হোক। অজিত, কাগজ-কলম দাও।

অতঃপর দুঘণ্টা ধরিয়া ব্যোমকেশ রেবার হাতের লেখা মক্স করিল। শেষে আসল ও নকল আমাকে দিয়া বলিল, দেখ দেখি কেমন হয়েছে। অবশ্য নাম-দস্তখতটা আন্দাজে করতে হল, একটা নমুনা পেলে ভাল হত। কিন্তু এতেই চলবে বোধ হয়।

রেবার চিঠি ও ব্যোমকেশের খসড়া পাশাপাশি রাখিয়া দেখিলাম, লেখার ছাঁদে তফাত নাই; সাধারণ লোকের কাছে ব্যোমকেশের লেখা স্বচ্ছন্দে রেবার লেখা বলিয়া চালানো যায়। বলিলাম, চলবে।

ব্যোমকেশ তখন সযত্নে চিঠি লিখিতে বসিল। রেবার নাম-ছাপা কাগজে ধীরে ধীরে অনেকক্ষণ ধরিয়া লিখিল। চিঠি এইরূপ—

মাননীয়েষু,

ব্যোমকেশবাবু, আপনার চিঠি আর অটোগ্রাফ পেয়ে কত আনন্দ হয়েছে বলতে পারি না। আমার মত গুণগ্ৰাহী পাঠক আপনার অনেক আছে, নিশ্চয় আপনাকে অটোগ্রাফের জন্য বিরক্ত করে। তবু আপনি যে আমাকে দু ছত্ৰ চিঠিও লিখেছেন সেজন্যে অশেষ ধন্যবাদ। আপনার অটোগ্রাফ আমি সযত্নে আমার খাতায় গেঁথে রাখলুম।

আপনার সহৃদয়তায় সাহস পেয়ে আমি নিজের কথা কিছু লিখছি। —আমার স্বামী বিষয়বুদ্ধিহীন এবং মন্দ চরিত্রের লোক, তাই আমার শ্বশুর মৃত্যুকালে তাঁর বিষয়সম্পত্তি সমস্ত আমার নামে উইল করে গিয়েছেন। সম্পত্তি প্রচুর, এবং আমি তাতে আমার স্বামীকে হাত দিতে দিই না। আমার সন্দেহ হয় আমার স্বামী আমাকে খুন করবার মতলব অাঁটছেন; বোধ হয় গুণ্ডা লাগিয়েছেন। কি হবে জানি না। কিন্তু আপনি যদি হঠাৎ আমার অপঘাত মৃত্যুর সংবাদ পান তাহলে দয়া করে একটু খোঁজখবর নেবেন। আপনি সত্যান্বেষী, অসহায়া নারীর মৃত্যুতে কখনই চুপ করে থাকতে পারবেন না।

আপনার প্রণাম নেবেন।

ইতি—বিনীতা

রেবা সরকার

চিঠিখানি ভাঁজ করিয়া ব্যোমকেশ একটি পুরানো খামের মধ্যে ভরিয়া রাখিল। বেলা তিনটার সময় রমণীবাবু আসিলেন, সঙ্গে একজন ছোকরা পুলিস। সে রেডিও মিস্ত্রী; তাহার হাতে টেপ-রেকর্ডারের বাক্স এবং মাইক ইত্যাদি যন্ত্রপাতি।

রমণীবাবু ব্যোমকেশের সঙ্গে পরামর্শ করিয়া মিস্ত্রীকে বলিলেন, বীরেন, তাহলে তুমি লেগে যাও।

‘আজ্ঞে স্যার’ বলিয়া বীরেন লাগিয়া গেল। বসিবার ঘরে টেবিলের মাথায় যে ঝোলানো বৈদ্যুতিক আলোটা ছিল তাহার তারে মাইক লাগানো হইল, টেপ-রেকর্ডার যন্ত্রটা বসানো হইল ব্যোমকেশের শয়ন ঘরে। রেকর্ডার চালু হইলে একটু শব্দ হয়, যন্ত্রটা অন্য ঘরে থাকিলে যন্ত্রের শব্দ বসিবার ঘরে শোনা যাইবে না।

সব ঠিকঠাক হইলে বীরেন পাশের ঘরে গিয়া দ্বার বন্ধ করিল। আমরা বসিবার ঘরে টেবিলের পাশে বসিয়া সহজ গলায় কথাবার্তা বলিলাম; তারপর পাশের ঘরে গেলাম। বীরেন যন্ত্রের ফিতা উল্টাদিকে ঘুরাইয়া আবার চালু করিল, তখন আমরা নিজেদের কণ্ঠস্বর শুনিতে পাইলাম। বেশ স্পষ্ট আওয়াজ, কোনটা কাহার গলা চিনিতে কষ্ট হয় না।

ব্যোমকেশ সস্তুষ্ট হইয়া বলিল, চলবে। —চিঠি পাঠিয়ে দিয়েছেন?

রমণীবাবু বলিলেন, দিয়েছি। আসবে নিশ্চয়। যার মনে পাপ আছে, ও চিঠি পাবার পর তাকে আসতেই হবে। আপনি তাকে ব্ল্যাকমেল করতে চান কিনা সেটা সে জানতে চাইবে। আচ্ছা, আমরা এখন যাই, আবার সন্ধের পর আসব।

ঠিক ছ’টার সময় বীরেনকে লইয়া রমণীবাবু আসিলেন; পুলিসের গাড়ি তাঁহাদের নামাইয়া দিয়া চলিয়া গেল।

রমণীবাবু বলিলেন, একটু আগেই এলাম। কি জানি সুনীল যদি সাতটার আগে এসে উপস্থিত হয়।

ব্যোমকেশ বলিল, বেশ করেছেন। প্রথমে আপনারা পাশের ঘরে থাকবেন, যাতে সুনীল জানতে না পারে যে, পুলিসের সঙ্গে আমার যোগ আছে। আমি আর অজিত বসবার ঘরে থাকব; সুনীল আসার পর আপনি তাক বুঝে আমাদের সঙ্গে যোগ দেবেন।

‘সে ভাল কথা।’ রমণীবাবু বীরেনকে লইয়া পাশের ঘরে গেলেন এবং দরজা ভেজাইয়া দিলেন। আমরা দুজনে আসার সাজাইয়া অপেক্ষা করিয়া রহিলাম।

ক্ৰমে অন্ধকার হইল। আমি আলো জ্বালিয়া দিয়া বসিলাম। ব্যোমকেশ সকালবেলার সংবাদপত্রটা তুলিয়া লইয়া চোখ বুলাইতে লাগিল। আমি সিগারেট ধরাইলাম। কান দুটা অতিমাত্রায় সচেতন হইয়া রহিল।

সাতটা বাজিবার কয়েক মিনিট আগেই ডাকবাংলোর সদরে একটি মোটর আসিয়া থামার শব্দ শোনা গেল; আমরা দৃষ্টি বিনিময় করিলাম। মিনিট দুই-তিন পরে সুনীল সরকার দ্বারের সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইল।

রমণীবাবু যে বৰ্ণনা দিয়াছিলেন তাহার সহিত বিশেষ গরমিল নাই; উপরন্তু লক্ষ্য করিলাম, তাহার বিভক্ত ওষ্ঠ্যাধরের ফাঁকে দাঁতগুলা কুমীরের দাঁতের মত হিংস্ৰ। ভোঁতা মুখে ধারালো দাঁত। সব মিলাইয়া চেহারাটি নয়নরঞ্জন নয়। তার উপর দুশ্চরিত্র। পতিভক্তিতে রেবা হয়তো সীতা-সাবিত্রীর সমতুল্য ছিল না, কিন্তু সেজন্য তাঁহাকে দোষ দেওয়া যায় না। সুনীল সরকার স্পষ্টতই রাম কিংবা সত্যবানের সমকক্ষ নয়।

সুনীল বোকার মত কিছুক্ষণ দ্বারের কাছে দাঁড়াইয়া রহিল, শেষে ভাঙা ভাঙা গলায় বলিল, ব্যোমকেশবাবু—

ব্যোমকেশ খবরের কাগজের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করিয়া বসিয়াছিল, ঘাড় ফিরাইয়া বলিল, সুনীলবাবু? আসুন।

ন্যালা-ক্যাবলার মত ফ্যালফেলে মুখের ভাব লইয়া সুনীল টেবিলের কাছে আসিয়া দাঁড়াইল; কে বলিবে তাহার ঘটে গোবর ছাড়া আর কিছু আছে! ব্যোমকেশ শুষ্ক কঠিন দৃষ্টিতে তাহাকে আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করিয়া বলিল, আপনার অভিনয় ভালই হচ্ছে, কিন্তু যতটা অভিনয় করছেন ততটা নির্বোধ আপনি নন। —বসুন।

সুনীল থাপ করিয়া চেয়ারে বসিয়া পড়িল, সুবর্তূল চক্ষে ব্যোমকেশকে পরিদর্শন করিয়া স্বলিত স্বরে বলিল, কী— কী বলছেন?

ব্যোমকেশ বলিল, কিছু না। আপনি যখন বোকামির অভিনয় করবেনই তখন ও আলোচনায় লাভ নেই। —সুনীলবাবু, পৈতৃক সম্পত্তি ফিরে পাবার জন্যে আপনি দুটো মানুষকে খুন করেছেন; এক, আপনার স্ত্রী; দুই, হুকুম সিং। এখানে এসে আমি সব খবর নিয়েছি। আপনি হুকুম সিংকে দিয়ে স্ত্রীকে খুন করিয়েছিলেন, তারপর নিজের হাতে হুকুম সিংকে মেরেছিলেন। হুকুম সিং ছিল আপনার ষড়যন্ত্রের অংশীদার, তাই তাকে সরানো দরকার ছিল; সে বেঁচে থাকলে সারা জীবন ধরে আপনাকে দোহন করত। আপনি এক ঢিলে দুই পাখি মেরেছেন।

সুনীল হাঁ করিয়া শুনিতেছিল, হাউমাউ করিয়া উঠিল, এ কি বলছেন। আপনি! রেবাকে আমি মেরেছি! এ কি বলছেন! একটা গুণ্ডা—যার নাম হুকুম সিং-সে। আমার স্ত্রীকে গলা টিপে মেরেছিল। আন্না দেখেছে—আন্না নিজের চোখে দেখেছে। হুকুম সিং রেবাকে গলা টিপে মারছে—

ব্যোমকেশ বলিল, হুকুম সিং ভাড়াটে গুণ্ডা, তাকে আপনি টাকা খাইয়েছিলেন।

না না, এসব মিথ্যে কথা। রেবাকে আমি খুন করাইনি; সে আমার স্ত্রী, আমি তাকে ভালবাসতাম—

আপনি রোবাকে কি রকম ভালবাসতেন, তার প্রমাণ আমার পকেটে আছে— বলিয়া ব্যোমকেশ নিজের বুক-পকেটে আঙুলের টোকা মারিল।

কী? রেবার চিঠি? দেখি কি চিঠি রেবা আপনাকে লিখেছিল!

ব্যোমকেশ চিঠি বাহির করিয়া সুনীলের হাতে দিতে দিতে বলিল, চিঠি ছিঁড়বেন না। ওর ফটো-স্ট্যাট নকল আছে।

সুনীল তাহার সতর্কবাণী শুনিতে পাইল না, চিঠি খুলিয়া দুহাতে ধরিয়া একাগ্ৰচক্ষে পড়তে এই সময় নিঃশব্দে দ্বার খুলিয়া রমণীবাবু ব্যোমকেশের চেয়ারের পাশে আসিয়া দাঁড়াইলেন। দুজনের দৃষ্টি বিনিময় হইল; ব্যোমকেশ ঘাড় নাড়িল।

চিঠি পড়া শেষ করিয়া সুনীল যখন চোখ তুলিল তখন প্রথমেই তাহার দৃষ্টি পড়িল রমণীবাবুর উপর। পলকের মধ্যে তাহার মুখ হইতে নিবুদ্ধিতার মুখোস খসিয়া পড়িল। ভোঁতা মুখে। ধারালো দাঁত নিস্ক্রান্ত করিয়া সে উঠিয়া দাঁড়াইল, ‘ও-এই ব্যাপার। পুলিসের ষড়যন্ত্ৰ! আমাকে ফাঁসাবার চেষ্টা।—ব্যোমকেশবাবু, রেবার মৃত্যুর জন্যে দায়ী কে জানেন? ঐ রমণী দারোগা।’ বলিয়া রমণীবাবুর দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করিল।

আমরা সুনীলের দিক হইতে পাল্টা আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিলাম না, ব্যোমকেশ সবিস্ময়ে ভ্রূ তুলিয়া বলিল, রমণীবাবু দায়ী! তার মানে?

সুনীল বলিল, মানে বুঝলেন না? রমণী দারোগা রেবার প্রাণের বন্ধু ছিল, যাকে বলে বঁধু। তাই তো আমার ওপর রমণী দারোগার এত আক্ৰোশ।

ঘর কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ হইয়া রহিল। আমি রমণীবাবুর মুখের পানে তাকাইলাম। তিনি একদৃষ্টি সুনীলের পানে চাহিয়া আছেন; মনে হয় তাহার সমস্ত দেহ তপ্ত লোহার মত রক্তবর্ণ হইয়া উঠিয়াছে। ভয় হইল এখনি বুঝি একটা অগ্নিকাণ্ড হইয়া যাইবে।

ব্যোমকেশ শান্ত স্বরে বলিল, তাহলে এই কারণেই আপনি স্ত্রীকে খুন করিয়েছেন?

সুনীল বলিল, আমি খুন করাইনি। এই জাল চিঠি দিয়ে আমাকে ধরবেন ভেবেছিলেন! সুনীল চিঠিখানা মুঠির মধ্যে গোলা পাকাইয়া টেবিলের উপর ফেলিয়া দিল—‘সুনীল সরকারকে ধরা অত সহজ নয়। চললাম। যদি ক্ষমতা থাকে আমাকে গ্রেপ্তার করুন, তারপর আমি দেখে নেব।

আমরা নির্বাক বসিয়া রহিলাম, সুনীল ময়াল সাপের মত সর্পিল গতিতে ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল।

এই কয়েক মুহুর্তে সুনীলের চরিত্ৰ যেন চোখের সামনে মূর্তি ধরিয়া দাঁড়াইল। সাপের মত খল কপট নৃশংস, হঠাৎ ফণা তুলিয়া ছোবল মারে, আবার গর্তের মধ্যে অদৃশ্য হইয়া যায়। সাংঘাতিক মানুষ।

রমণীবাবু একটা অতিদীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিয়া চেয়ারে বসিয়া পড়িলেন। ব্যোমকেশ কতকটা নিজমনেই বলিল, ধরা গেল না।

সহসা বাহির হইতে একটা চাপা গোঙানির আওয়াজ আসিল। সকলে চমকিয়া উঠিলাম। সবাগ্রে ব্যোমকেশ উঠিয়া দ্বারের পানে চলিল, আমরা তাহার পিছন পিছন চলিলাম।

ডাকবাংলোর সামনে সুনীলের মোটর দাঁড়াইয়া আছে এবং তাহার সামনের চাকার পাশে মাটির উপর যে মূর্তিটা পড়িয়া আছে তাহা সুনীলের। তাহার পিঠের উপর হইতে একটা ছুরির মুঠ উঁচু হইয়া আছে।

মৃত্যুযন্ত্রণায় সুনীল কাৎ হইবার চেষ্টা করিল; আমি ও ব্যোমকেশ তাহাকে সাহায্য করিলাম বটে, কিন্তু অন্তিমকালে আমাদের সাহায্য কোনও কাজে আসিল না। সুনীল একবার চোখ মেলিল; আমাদের চিনিতে পারিল কিনা বলা যায় না, কেবল অস্ফুট স্বরে বলিল, ‘মুকুন্দ সিং—’

তারপর তাহার হৃৎস্পন্দন থামিয়া গেল। পথের সামনে ও পিছন দিকে তাকাইলাম, কিন্তু কাহাকেও দেখিতে পাইলাম না; পথ জনশূন্য। আমার বিবশ মস্তিষ্কে একটা প্রশ্ন ঘুরিতে লাগিল—মুকুন্দ সিং কে? নামটা চেনা-চেনা। তারপর মনে পড়িয়া গেল, হুকুম সিং-এর ভাইয়ের নাম মুকুন্দ সিং। মুকুন্দ সিং ভ্ৰাতৃহত্যার প্রতিশোধ লইয়াছে।

লাশ চালান দেওয়া এবং আইনঘটিত অন্যান্য কর্তব্য শেষ করিতে সাড়ে নটা বাজিয়া গেল। আমরা ফিরিয়া আসিয়া বসিলাম। রমণীবাবুও ক্লান্তমুখে আসিয়া আমাদের সঙ্গে বসিলেন। বীরেন তখনও পাশের ঘরে যন্ত্র লইয়া অপেক্ষা করিতেছিল, রমণীবাবু তাহাকে ডাকিয়া বলিলেন, তুমি যাও, যন্ত্রটা থাক। আমি নিয়ে যাব৷

বীরেন চলিয়া গেল।

কিছুক্ষণ তিনজনে সিগারেট টানিলাম। তারপর ব্যোমকেশ বলিল, সুনীল আইনকে ফাঁকি দিয়েছিল বটে কিন্তু নিয়তির হাত এড়াতে পারল না। আশ্চর্য! মাঝে মাঝে গুণ্ডারাও অনেক নৈতিক সমস্যার সমাধান করে দিতে পারে!

রমণীবাবু বলিলেন, একটা সমস্যার সমাধান হল, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে আর একটা সমস্যা তৈরি হল। এখন মুকুন্দ সিংকে ধরতে হবে। আমার কাজ শেষ হল না, ব্যোমকেশবাবু।

কিছুক্ষণ নীরবে সিগারেট টানিবার পর ব্যোমকেশ বলিল, সুনীলের অভিযোগ সত্যি—কেমন?

রমণীবাবু নিশ্বাস ফেলিয়া বলিলেন, হ্যাঁ। আমার আর রেবার বাড়ি এক শহরে, এক পাড়ায়। ওকে ছেলেবেলা থেকে চিনতাম, কিন্তু ভালবাসা-বাসি ছিল না...তারপর রেবার যখন ওই রাক্ষসটার সঙ্গে বিয়ে হল তখন এই শহরেই ওর সঙ্গে আবার দেখা হল...রেবা মন্দ ছিল না, কিন্তু কি জানি কেমন করে কী হয়ে গেল...সুনীল যে জানতে পেরেছে তা একবারও সন্দেহ হয়নি...সুনীলকে আহাম্মক ভেবেছিলাম, তারপর রেবা যখন মারা গেল তখন বুঝলাম সুনীল কেউটে সাপ...তারপর ফাঁসাবার চেষ্টা করেছিলাম....শেষে আপনি এলেন, আপনার সাহায্যে শেষ চেষ্টা করলাম—

ব্যোমকেশ বলিল, যে চিঠির ছেড়া অংশটা আপনি আমাকে দিয়েছিলেন সেটা রেবা আপনাকে লিখেছিল?

রমণীবাবু বলিলেন, হ্যাঁ। আমাদের দেখাশোনা বেশি হত না। রেবা আমাকে চিঠি লিখত, মনের-প্ৰাণের কথা লিখত। অনেক চিঠি লিখেছিল৷ —কিন্তু রেবার কথা আর নয়, ব্যোমকেশবাবু। এখন বলুন টেপ-রেকর্ডের কী হবে?

ব্যোমকেশ বলিল, কি আর হবে, ওটা মুছে ফেলা যাক। —আসুন।

পাশের ঘরে গিয়া আমরা রেকর্ডার চালাইলাম। সদ্যমৃত সুনীলের জীবন্ত কণ্ঠস্বর শুনিলাম। তারপর ফিতা মুছিয়া ফেলা হইল।