রত্নমঞ্জরী প্রথম পুত্তলিকা
কহিল, মহারাজ, আমি এক উপাখ্যান বলি শ্রবণ কর। আপনার গুণ আপনি প্রকাশ করিলে গুণবান, পুরুষকেও নিগুণ বলিয়া ব্যাখ্যা যায়, ইন্দ্রও আপন গুণ আপনি কহিলে লঘু হয়েন, অন্য লোকে যে প্রশংসা করে সেই প্রশংসাই যথার্থ। তুমি বাস্তবিক গুণবান, ও মর্যাদাবান, বট এবং যাহা কহিলে তাহাও যথার্থ বটে, কিন্তু এতাদৃশ অহঙ্কার করা উচিত নহে। এই পৃথিবী অতি বিস্তৃত, পরমেশ্বর এই পৃথিবীকে রত্নগত্তা করিয়াছেন, এই পৃথিবীতে নানা গুণের মনুষ্য আছে, তুমি যে মহামোহান্ধকারে রহিয়াছ, তাহা কিছুই জানিতেছ না। হে অজ্ঞান তোমার ন্যায় কোটি কোটি মনুষ্য এই পৃথিবীতে জন্মিয়াছে। যে রাজা এই সিংহাসনের স্বামী ছিলেন তোমার ন্যায় তাহার যে কত শত ক্ষুদ্র ভূত ছিল তাহার সঙ্খা নাই, অতএব তুমি কিসের অহঙ্কার করিতেছ।
এই কথায় রাজা জ্বলদগ্নিপ্রায় ক্রুদ্ধ হইয়া পুত্তলিকাকে কহিলেন তোমার বড় আস্পর্ধা দেখিতেছি, থাক, আমি এই সিংহাসন এখনি ভগ্ন করিয়া ফেলিতেছি। বররুচি পুরোহিত কহিলেন মহারাজ ইহা সদ্বিবেচনার কর্ম্ম নহে। প্রথমতঃ পুত্তলীর বাক্য শ্রবণ করুন, তাহার পর যাহা কত্তব্য করিবেন। এই বাক্যে রাজা ক্রোধ সম্বরণ পূর্ব্বক অন্তঃক্রদ্ধ হইয়া পুত্তলীকে বলিলেন কি বৃত্তান্ত বলিতে চাহ বল। পুত্তলিকা কহিল মহারাজ তুমি তাহা না শুনিয়াই ক্রোধে অন্ধপ্রায় হইয়াছ, শুনিলে না জানি কি করিবে, ফলতঃ তাহা শুনিলে তুমি আরো লজ্জিত এবং লোকসমাজে উপহাস্য হইবে, অতএব বলা অপেক্ষা না বলাই ভাল, রাজা বিক্রমদিত্যের সহিত আমাদের যে দিবসাবধি বিচ্ছেদ হইয়াছে সেই অবধি আমাদের কপাল ভাঙ্গিয়াছে, এবং উপযুক্ত ব্যক্তির অভাবে সিংহাসনও ভাঙ্গিয়া ফেলিবার যোগ্য হইয়াছে, অতএব এখন সিংহাসন ভাঙ্গিবার আর কি ভয়।
পুত্তলীর এই বাক্য শুনিয়া রাজমন্ত্রী তাহাকে বলিলেন তুমি কি জন্য আক্ষেপ করিতেছ, তোমার রাজার বৃত্তান্ত বল। পুত্তলিকা বলিল শকাদিত্য রাজা অম্বাবতী নগরে রাজ্য করিতেন। ঐ রাজা অত্যন্ত প্রতাপ যুক্ত, দেবভক্ত এবং দাতা ছিলেন, অতএব প্রথমতঃ তাহার বৃত্তান্ত কহি শ্রবণ কর।
অম্বাবতী নগরে শ্যামস্বয়ম্বর নামে এক ব্রাহ্মণ রাজা ছিলেন। তিনি প্রথমতঃ সামান্য ভাবে রাজ্য করিতেন, পরে তাহার রাজ্যের সমৃদ্ধি ও যশোবৃদ্ধি হইলে তিনি গন্ধর্ব্বসেন নামে বিখ্যাত হইলেন। এই রাজার চারি বর্ণের অর্থাৎ ব্রাহ্মণী ক্ষত্রিয়া বৈশ্য ও শূদ্রা চারি ধর্ম্মপত্নী ছিল। ব্রাহ্মণী অতি সুন্দরী ও সুশীল ছিলেন, তাহার এক পুত্র হইয়া ছিল, তাহার নাম ব্রহ্মনীত। ব্রহ্মনীত সকল শাস্ত্রে অদ্বিতীয় পণ্ডিত ছিলেন,বিশেষতঃ জ্যোতিষ বিদ্যাতে তাহার এমত অসাধারণ ব্যুৎপত্তি জন্মিয়াছিল যে কোন দিনে কোন, ক্ষণে কোন ব্যক্তির মৃত্যু হইবে তিনি তাহা গণনা করিয়া বলিতে পারিতেন। ক্ষত্রিয়ার গর্ভে তিন পুত্র হইয়াছিল, প্রথম শঙ্কু, দ্বিতীয় বিক্রম, তৃতীয় ভর্তৃহরি। ইহারা ক্ষত্রিয় ধর্মাবলম্বী ও অতি বলবান, এবং বীর পুরুষ ছিলেন, এই জন্য তাহাদের নাম সর্বত্র সুপ্রকাশিত হইয়াছিল। তাহাদিগের বদান্যতাগুণে পৃথিবীস্থ তাবৎ লোকে তাহাদিগকে কল্পবৃক্ষ কহিতেন। বৈশ্যা রাণীর গর্ভে যে পুত্র হইয়াছিল তাহার নাম চন্দ্ররক্ষা, তিনি অতিসুখী ও দয়ালু ছিলেন। শূদ্রা রাণীর গভর্জাত পুত্রের নাম ধন্বন্তরি, তিনি বৈদ্য-শাস্ত্রে অতি পণ্ডিত ছিলেন। এই প্রকার গন্ধর্ব্বসেন রাজার ছয় পুত্র ছিল। তাহারা প্রত্যেকেই এক এক গুণে বিখ্যাত ছিলেন।
ব্রাহ্মণীর গভজাত পুত্র রাজমন্ত্রী হইয়াছিলেন, কিন্তু কোন অপরাধ জন্য রাজা তাহাকে কর্ম্মচ্যুত করেন, তাহাতে তিনি তথা হইতে ধারা নগরে প্রস্থান করিলেন। ঐ নগরে তোমার পূর্ব পুরুষেরা বাস করিতেন, এবং তৎকালে তোমার পিতা ঐ স্থানের রাজা ছিলেন, তিনি ব্রহ্মনীতকে অতিশয় সম্মান করিলেন। কিন্তু কিছু কাল পরে ব্রহ্মনীত তাহাকে সংহার করিয়া তাহার রাজ্যপহরণ করিলেন। তদনন্তর উজ্জয়িনী নগরে আসিয়া লোকান্তরগত হইলেন। তাহার পর ক্ষত্রিয়া-গভজাত পুত্র শঙ্কু তৎপদে অভিষিক্ত হইয়। অম্বাবতী নগরে রাজত্ব করিতে লাগিলেন।
শঙ্কু রাজা হইলে পর এক দিবস সভাপণ্ডিতগণ তাহাকে কহিলেন মহারাজ পৃথিবীতে আপনার এক শত্রু জন্ম গ্রহণ করিয়াছেন। রাজা শঙ্কু এই কথায় সন্ধুচিত হইলেন। পরে পণ্ডিতেরা কহিলেন আমরা গণনা দ্বারা যাহা দেখিলাম তাহাই নিবেদন করিলাম, কিন্তু আর এক কথা আছে তাহা সহসা বলিতে সাহস হয় না। রাজা কহিলেন যখন তোমরা এ কথা বলিলে তখন তাহাও বলিবার বাধা কি। পণ্ডিতেরা কহিলেন আমাদিগের গণনায় এই স্থির হইতেছে রাজা বিক্রমাদিত্য আপনাকে নষ্ট করিয়া রাজ্য লইবেন। শঙ্কু হাস্য করিয়া আর আর সভাসদগণকে বলিলেন এই সকল পণ্ডিতেরা উন্মত্ত, ইহাদের কোন জ্ঞান নাই, এজন্য এমত কথা কহিলেন। ইহা কহিয়া রাজা তাহাদিগের কথায় মনোযোগ করিলেন না। পণ্ডিতেরা বুঝিলেন রাজা শাস্ত্রকে মিথ্যা জানিয়াছেন এবং আমাদিগকে ক্ষিপ্ত জ্ঞান করিয়াছেন। সুতরাং লজ্জিত হইয়া প্রস্থান করিলেন।
কিয়দিদবস পরে পণ্ডিতেরা পুনৰ্বার জ্যোতি গণনা করিলেন এবং গণনান্তে এক জন কহিলেন আমার বোধ হইতেছে রাজা বিক্রমাদিত্য অতি নিকটে আসিয়াছেন। দ্বিতীয় জন বলিলেন আমার বোধ হয় তিনি নিকটস্থ কোন বনে আছেন। তৃতীয় জন কহিলেন তিনি অমুক বনে সরোবর তটে কুটীর নির্মাণ করিয়া আছেন। তদনন্তর তাহাদিগের এক জন অরণ্যে গমন পূর্ব্বক দেখিলেন যথার্থই রাজা বিক্রমাদিত্য বনমধ্যে সরসী-তীরে বসিয়া পার্থিব শিবলিঙ্গ নির্মাণ করিয়া দেবাধিদেব মহাদেবের আরাধনা করিতেছেন। এতদবলোকনে তিনি আর আর পণ্ডিত গণের নিকট আসিয়া তাহা বিজ্ঞাপন করিলেন এবং সকলে রাজসদনে উপস্থিত হইয়া রাজাকে বলিলেন মহারাজ আপনি আমাদিগের শাস্ত্র মিথ্যা জ্ঞান করিয়াছিলেন,কিন্তু এইক্ষণে আমরা প্রত্যক্ষ দেখিয়া আসিলাম রাজ। বিক্রমাদিত্য অমুক বনে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছেন।
রাজা শঙ্কু এই কথা শুনিয়া তখন কোন উত্তর করিলেন না, পরদিবস প্রত্যুষে স্বয়ং সভাপণ্ডিত গণ সমভি ব্যাহারে বিপিন প্রবেশ করিয়া দূরবর্তী থাকিয়া দেখিলেন যথার্থই বিক্রমাদিত্য যোগাসন হইতে গাত্রোত্থান করিয়া সরোবরে অবগাহন করিলেন, তাহার পর পুনব্বার যোগাসনে উপবেশন করিয়া মহাদেবের উপাসনা করিতে লাগিলেন। এতদবলোকনে শঙ্কু বিক্রমাদিত্যের সম্মুখে উপস্থিত হইলেন। বিক্রমাদিত্য একমনে মহাদেবের অর্চনা করিতে লাগিলেন। অর্চনা সমাপন হইলে শঙ্কু মহাদেবের মস্তকে মূত্র ত্যাগ করিয়া দিলেন। ইহা দেখিয়া তাহার সমভিব্যাহারী পণ্ডিতগণ বিস্মিত হইয়া বলিতে লাগিলেন, কি, পূজিত শিবলিঙ্গের মস্তকে মূত্র ত্যাগ করিল, অতএব এ ব্যক্তির বুদ্ধি লোপ হইয়াছে। পরে তাহাদিগের এক জন রাজাকে কহিলেন মহারাজ এ কি করিলেন। দেবতা ব্রাহ্মণের দর্শন মাত্রে পূজা প্রণামাদি করিতে হয়, তাহা না করিয়া এ কি বিপরীত কর্ম্ম করিলেন। রাজা উত্তর করিলেন আমি দেবতা ব্রাহ্মণের পূজা করিব, মৃত্তিকার পূজা কি জন্য করিব। ব্রাহ্মণ কহিলেন মহারাজ তোমার আসন্নকাল উপস্থিত দেখিতেছি, কেননা আসমুকালে বুদ্ধির বৈলক্ষণ্য জন্মিয়া থাকে। রাজা কহিলেন ভগবান অদৃষ্টে যাহা লিখিয়াছেন তাহা কেহই খণ্ডন করিতে পারে না। পণ্ডিতগণ বলিতে লাগিলেন। বাজা যেরূপ কদর্য্য কার্য করিলেন ইহার আর ভদ্রস্থত নাই।
অনন্তর শঙ্কু, বিক্রমাদিত্যের বিনাশ বাসনায়, একখান অঙ্গার লইয়া ভূমিতে সাতটা রেখা অঙ্কিত করিলেন, তাহার অভিপ্রায় এই যে, বিক্রমাদিত্য তাহাতে পাদ বিক্ষেপ করিলে তৎক্ষণাৎ জ্ঞানশূন্য ও মরণাপন্ন হইবেন, কিন্তু পাছে রেখা দেখিয়া পাদ বিক্ষেপ না করেন এজন্য তাহা মৃত্তিকা দ্বারা আচ্ছাদিত করিয়া রাখিলেন। তৎপরে একটা সশা ও এক খান ছুরিকা আনাইয়া তাহা এরূপ মন্ত্রপূত করিলেন যে, যে ব্যক্তিঐ ছুরিকা দ্বারা সশ কাটিবে তৎক্ষণাৎ তাহার নিজ মুণ্ড দেন হইবে। সভাসদ গণ বিক্রমাদিত্যের বিনাশের এই সকল কুচক্র দেখিয়া মনে মনে অনেক বিলাপ করিতে লাগিলেন। ক্ষত্রিয়গণ কহিলেন এই প্রকার কুচক্র দ্বারা মহাপ্রাণী বধ করা ক্ষত্রিয়-ধর্ম্ম-বিরুদ্ধ। অনন্তর শঙ্কু বিক্রমাদিত্যকে আহ্বান করিয়া বলিলেন আইস আমরা একত্রে বসিয়া সশা ভক্ষণ করি। বিক্রমাদিত্য সর্ব্বশাস্ত্রে সুপণ্ডিত, যোগ দ্বারা শঙ্কুর চক্রান্ত বুঝিয়া রেখাতে পাদক্ষেপ না করিয়া সাবধানে তাহার নিকটে আসিলেন এবং দক্ষিণ হস্তে ছুরিকা ও বাম হস্তে সশা গ্রহণ করিলেন। পরে শঙ্কু যেমন অন্যমনস্ক হইয়াছেন সেই সময় ঐ ছুরিকা দ্বারা তাহাকে এমত আঘাত করিলেন যে তাহাতে একবারে তাহার প্রাণান্ত হইল এবং চক্রান্ত ও বিপরীত-ফল-জনক হইল।
এতাৰদৰ্শন করিয়া রত্নমঞ্জরী পুত্তলী ভোজরাজকে কহিল মহারাজ পরমেশ্বর ইচ্ছা করিলে তৃণকে পর্ব্বত ও পর্ব্বতকে তৃণ করিতে পারেন। আর শাস্ত্রের লিখন কখন অলীক হয় না। মাতৃগর্ভে মনুষ্যের জন্ম গ্রহণ কালে তাহার ভবিষ্যৎ সুখ দুঃখ ও শুভাশুভ নির্দিষ্ট হয়, তদনুসারে তাহার সুখ দুঃখ ও শুভাশুভ প্রাপ্তি হইয়া থাকে। অতএব রাজা বিক্রমাদিত্যের অদৃষ্টে যাহা ছিল তাহাই ঘটিল। তিনি তাকে সংহার করিয়া তাহার শোণিতে তিলক করিয়া অস্বাবতী নগরের ভূপতি হইলেন। শঙ্কু রাজার পত্নী পতি-বিয়োগে পতির সহিত সহমৃত হইলেন। রাজা বিক্রমাদিত্য রাজ্য বত্রিশ সিংহাসন। প্রাপ্ত হইয়া রাজ-নিয়মানুসারে রাজত্ব করিতে লাগি- লেন। এবং করস্থ নৃপতিগণ তাহার রাজ্য লাভে সুখী হইয়া সকল সময়ে সভায় উপস্থিত থাকিয়া সভার শােভা বৃদ্ধি করিতে লাগিলেন।
অনন্তর এক দিবস রাজা বিক্রমাদিত্য মহা সমারােহ পূর্ব্বক মৃগয়ায় গমন করিলেন। এবং অরণ্য মধ্যে এক সনােহর মৃগ দেখিয়া তাহার পশ্চাৎ ধাবমান হইলেন, কোন সঙ্গী তাঁহার সঙ্গে যাইতে পারিল না। রাজা একাকী এক নিবিড় কাননে প্রবেশ করিয়া চিন্তা করিতে লাগিলেন হায় আমি কোথায় আসিলাম, সঙ্গী গণ কোথায় রহিল, এবং এই ক্ষণে কোথায় যাই। এই চিন্তা করিতে করিতে এক বৃহৎ মহীরুহে আরােহণ করিয়া দেখিলেন সকল দিক অরণ্যময়, কেবল এক দিকে এক নগর মাত্র আছে। তাহা দেখিয়া মনে মনে সাহস হইল। পরে নগরের শােভা ও তন্নিকটে কপােত ও চিল উড়ডীয়মান ও অট্টালিকার উপরিস্থিত কলসের চাকচক্য অবলােকন করিয়া কহিলেন এ এক নূতন নগর দেখিলাম, ইহা গ্রহণ করিতে হইবে।
রাজা যখন এই সকল কথা বলিতেছেন তখন লুতবরণ নামক ঐ দেশের রাজমন্ত্রী কাকবেশে ঐ অরণ্যাভিমুখে আসিতেছিলেন। তিনি রাজার পূৰ্বোক্ত বাক্যে কুপিত হইয়া তাহার মুখে মল ত্যাগ করিয়া দিলেন। রাজা তাহাতে অত্যন্ত ক্রোধযুক্ত হইলেন। ইত্যবসরে তাহার সঙ্গী লােক তথায় আসিল। তখন রাজা মন্ত্রীকে আজ্ঞা করিলেন যেখানে যত কাক আছে সকলকে আমার নিকটে ধরিয়া আন। এই আজ্ঞাক্রমে মন্ত্রী ব্যাধ গণকে ডাকাইয়া কাক ধারণাথ চতুদ্দিকে প্রেরণ করিলেন। তাহারা যাবতীয় কাক পিঞ্জরে বদ্ধ করিয়া রাজার নিকটে আনিল। রাজা ঐ কাক গণকে কহিলেন অরে চণ্ডালেরা তােমাদের মধ্যে কোন কাক এই কর্ম্ম করিয়াছে তাহা যদি সত্য করিয়া বল তবে আমি সকলকে মুক্তি দি, নতুবা সকলের প্রাণদণ্ড করি। বায়স গণ কহিল আমরা পৃথিবীস্থ তাবৎ কাক এই স্থানে ধৃত আছি, কিন্তু ইহার মধ্যে কোন কাক ঐ কর্ম্ম করে নাই। রাজা এই কথায় অবাে কুপিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন তােমাদিগের মধ্যে কে প্রধান, সে অবশ্যই এই কর্ম্ম করিয়াছে। কাকেরা কহিল মহারাজ যদি সত্য বৃত্তান্ত জানিতে ইচ্ছা করেন তবে শুনুন। বাহুবল গ্রামে অতি-পরাক্রমশালী এক রাজা আছেন। লুতরণ নামা উহার এক অতি বিচক্ষণ ও বিদ্বান, মন্ত্রী আছেন, তিনি প্রায়ই সর্ব্বদা বায়স-বেশে থাকেন, এই কর্ম্ম তাহার হইলে হইতে পারে, কেননা কাকের মধ্যে কেবল তিনি ধূত হয়েন নাই। রাজা কহিলেন তাহাকে কি প্রকারে আনয়ন করা যায় তাহা বিবেচনা করিয়া আমাকে বল, এবং তােমাদের মধ্যে দুই কাককে দূত স্বরূপে প্রেরণ কর, তাহারা মন্ত্রিকে লইয়া আইসে।
ইহা শুনিয়া দুইটা কাক তখনি, কাকবেশী মন্ত্রির নিকটে গমন করিল। মন্ত্রী তাহাদিগকে অতিশয় সমাদর করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন তােমরা এখানে কি জন্য আসিয়াছ। তাহারা কহিল মহাশয় তােমার জন্য আমরা তাবৎ কাক মারা যাইতেছি, যদি তুমি রাজা বিক্রমাদিত্যের নিকট গমন কর তবে আমাদের প্রাণ রক্ষা হয়। লুতবরণ বলিলেন ধন্য, তােমরা আপন অর্থ-সিদ্ধির জন্য আমার নিকটে আসিয়াছ, অতএব আমার দ্বারা যাহা হইবেক আমি তাহা অবশ্য করিব। ইহা বলিয়া, মন্ত্রী আপন রাজার অনুমতি লইয়া কাক দ্বয় সমভিব্যাহারে রাজা বিক্রমাদিত্যের সভায় যাত্রা করিলেন। পরে যখন তথায় উপনীত হইলেন তখন আর আর কাক গণ তাহাকে দেখিয়া রাজাকে বলিল মহারাজ যাহার নাম করিতে ছিলাম তিনি এই আসিতেছেন।
রাজা কাকবেশী মন্ত্রিকে সমাদর পূর্বক আপন সিংহাসনে বসাইয়া কুশলাদি জিজ্ঞাসা করিলেন। মন্ত্রী রাজাকে আশীর্ব্বাদ করিলেন, এবং জিজ্ঞাসা করিলেন মহারাজ আমাকে কি জন্য স্মরণ করিয়াছেন, আর কিজন্যই বা এই সকল কাককে বন্দীবেশে রাখিয়াছেন। রাজা উত্তর করিলেন আমি এক দিবস, মৃগয়াতে গিয়াছিলাম, অকস্মাৎ নিবিড় বন মধ্যে প্রবেশ করিয়া পথভ্রান্তি প্রযুক্ত এক বৃক্ষারােহণ করিয়া চতুদিকে দৃষ্টি করিতে ছিলাম, এমত সময়ে একটা কাক আমার গাত্রে মল ত্যাগ করিয়া দিল, এই জন্য আমি সকল কাককে ধরিয়া রাখিয়াছি। যে পর্যন্ত ইহারা প্রথম পুত্তলিকা। সত্য না কহিবে সে পর্যন্ত আমি কাহাকে ছাড়িব না, বরঞ্চ প্রাণ দণ্ড করিব। লুতবরণ কহিলেন এ কর্ম্ম আমার দ্বারা হইয়াছে, আমি তােমার অহঙ্কার দেখিয়া ক্রোধ সম্বরণ করিতে না পারিয়া জ্ঞানশূন্যতা প্রযুক্ত এই কর্ম্ম করিয়াছিলাম। রাজা এই বাক্যে হাস্য করিয়া বলিলেন আমি ভূস্বামী, এবং যােদ্ধা, আমি কোন বিষয়ে অক্ষম নহি, অতএব আমার অহঙ্কার কেন না, হইবে।
লুতবরণ কহিলেন তুমি যে নগর দর্শন করিয়াছ তাহার বিবরণ শ্রবণ কর। রাজা বাহুবল ঐ রাজ্যের পুরাতন নৃপতি, তােমার পিতা গন্ধর্ব্বসেন তাহার মন্ত্রী ছিলেন, পরে মন্ত্রীর প্রতি অবিশ্বাস হওয়াতে রাজা তাহাকে কর্ম্মচ্যুত করেন, তাহাতে তিনি অম্বাবতী নগরে আসিয়া রাজা হইয়া ছিলেন। তুমি বিক্রমাদিত্য, ঐ গন্ধর্ব্বসেনের পুত্র। তুমি এক্ষণে জগদ্বিখ্যাত হইয়াছ, কিন্তু বাহুবল রাজা যে পর্যন্ত তােমাকে রাজ-তিলক না দিবেন সে পর্যন্ত তােমার অচলা লক্ষ্মী হইবেক না। পরন্তু ঐ রাজা তােমার এরূপ অবস্থার সংবাদ পাইলে তােমাকে ভস্মসাৎ করিবেন। অতএব, তোমাকে এক সৎপরামর্শ কহি, তুমি ঐ রাজার। নিকটে গিয়া তাহাকে প্রণয় দ্বারা প্রীত করিয়া, তাহার নিকটে রাজ-তিলক গ্রহণ কর, তাহা হইলে তােমার অচলা, রাজলক্ষ্মী হইবেক।
রাজা বিক্রমাদিত্য অত্যন্ত বুদ্ধিমান ছিলেন, অতএব এই বাক্যে রুষ্ট না হইয়া প্রত্যুত সহাস্যবদনে তৎসমুদায় অবধান করিয়া শুনিলেন। পরে লুতবরণ তাঁহাকে কহিলেন যদি তােমার বাহুবল রাজার নিকটে যাওয়া পরামর্শ সিদ্ধ হয় তবে শুভক্ষণ দেখিয়া আমার সমভিব্যাহারে আইস।
রাজা বিক্রমাদিত্য লুতবরণ মন্ত্রীর পরামর্শানুসারে পরদিবস তাহার সমভিব্যাহারে বাহুবল রাজার নগরে যাত্রা করিলেন। তথায় উপনীত হইলে লুতবরণ বিক্রমাদিত্যকে বলিলেন তুমি এইখানে অবস্থিতি কর, আমি অগ্রে রাজার নিকট তােমার আগমন সংবাদ বিজ্ঞাপন করি, তাহার পর সাক্ষাৎ হইবে। ইহা বলিয়া লুতবরণ স্বীয় নৃপতি সমীপে উপস্থিত হইয়া তাহাকে তাবৎ বৃত্তান্ত বিজ্ঞাপন পূর্ব্বক কহিলেন মহারাজ গন্ধর্ব্বসেনের পুত্র রাজা বিক্রমাদিত্য আপনকার দর্শনার্থ আগমন করিয়াছেন। ইহা শুনিয়া বাহুবল রাজা তাহাকে তৎক্ষণাৎ আনয়ন করিতে আজ্ঞা দিলেন। মন্ত্রী তাহাকে আনয়ন করিলে রাজা গাত্রোখান পূর্ব্বক আলিঙ্গন করিয়া আপন সিংহাসনের এক পাশে উপবেশন করাইয়া কুশলাদি জিজ্ঞাসা করিলেন। তদনন্তর রাজা তাঁহার বাসার জন্য স্থান নিরূপণ করিয়া দিলেন।
রাজা বিক্রমাদিত্য কিয়দিবস তথায় অবস্থিতি করিয়া মন্ত্রীকে কহিলেন আমি স্বদেশে গমন করিব, অতএব রাজার নিকট হইতে আমাকে বিদায় করাইয়া দাও। মন্ত্রী কহিলেন আমাদিগের রাজার এমত রীতি নাই, যে কোন ব্যক্তি সাক্ষাৎ করিবার অভিলাষে আসিলে তাহাকে আপনি যাইতে বলেন। অতএব তুমি স্বয়ং বিদায় প্রার্থনা কর, আর যে মনােবাঞ্ছা থাকে তাহাও প্রকাশ করিয়া বল, তাহাতে কোন শঙ্কা করিও। বিক্রমাদিত্য বলিলেন আমার কোন অভিলাষ নাই, বরঞ্চ অন্য কোন ব্যক্তির যদি কোন প্রার্থনা থাকে তাহা আমাকে বলুক। মন্ত্রী বলিলেন মহারাজ আমার কথা শ্রবণ কর, এই রাজার গৃহে এক অপূর্ব্ব সিংহাসন আছে, পূর্ব্বকালে ঐ সিংহাসন দেবদিদেব মহাদেব দেবরাজ ইন্দ্রকে দিয়াছিলেন, পরে ইন্দ্র তাহা বাহুবল রাজাকে দিয়াছেন। ঐ সিংহাসনের অতি চমৎকার গুণ, যে ব্যক্তি তাহাতে উপবেশন করেন তিনি সপ্তদ্বীপ পৃথিবীর অজেয় রাজা হয়েন। ঐ সিংহাসন নানাবিধ রত্নে খচিত এবং অমর্ত্য নির্মিতা অতি অপূৰ্বরূপ বত্রিশ পুত্তলিকা তাহা ধারণ করিয়া আছে। তুমি বিদায় কালে রাজার স্থানে ঐ সিংহাসন প্রার্থনা করিও, তাহা হইলে চিরকাল অখণ্ড সাম্রাজ্য ভােগ করিতে পারিবে।
এই পরামর্শ প্রদানের পর মন্ত্রী পরদিবস ত্যুষে রাজ-সভায় উপস্থিত হইয়া বলিলেন মহারাজ রাজা বিক্রমাদিত্য বিদায়নিমিত্ত আপনকার দ্বারে দণ্ডায়মান আছেন। এই সংবাদে বাহুবল রাজা তখনি দ্বারের নিকটে আসিলে, বিক্রমাদিত্য নতশিরা হইয়া তাহাকে প্রণাম করিলেন। বাহুবল রাজা বলিলেন তােমার যাহা অভিলাষ থাকে কহ, আমি তাহা পূর্ণ করিব। বিক্রমাদিত্য কহিলেন মহারাজ যদি আমার প্রতি প্রসন্ন হইয়া থাকেন তবে আমি এই প্রার্থনা করি দেবরাজ আপনাকে যে সিংহাসন দিয়াছিলেন আপনি সানুগ্রহ হইয়া আমাকে তাহা দান করুন। রাজা বাহুবল বলিলেন এই সিংহাসনের কথা তুমি কি প্রকারে জানিতে পারিলে, বােধ করি, মন্ত্রির স্থানে শুনিয়া থাকিবে। যাহা হউক আমি তােমাকে সেই সিংহাসন দিলাম। ইহা বলিয়া সেই সিংহাসন আনয়ন করাইয়া বিক্রমাদিত্যকে রাজ-তিলক প্রদান পূর্ব্বক তদুপরি উপবেশন করাইলেন, এবং বলিলেন তুমি অদ্বিতীয় ও অজেয় রাজা হইলে, কোন বিষয়ে অন্তঃ করণে ক্ষোভ করিও না, গন্ধর্ব্বসেন আমার পরম বন্ধ, ছিলেন, তুমি তাহার বংশের তিলক হইবে। এই প্রকার আশীৰ্বাদ পূর্ব্বক রাজা বিক্রমাদিত্যকে বিদায় করিলেন।
রাজা বিক্রমাদিত্য অত্যন্ত আহলাদিত হইয়া তথা হইতে গৃহে প্রত্যাগমন করিলেন। রাজ্যস্থ তাবৎ প্রজা তাহার সৌভাগ্য শুনিয়া আনন্দ সাগরে মগ্ন হইল। শত্রুগণ ভয়ে কম্পানৃিতকলেবর হইল। এবং নানা দ্বীপ দ্বীপান্তর হইতে সুহৃৎ রাজা সকল তাঁহার সহিত শুভ সাক্ষাৎ করিতে আসিলেন। তদবধি সকল রাজা তাহাকে আরাে মান্য করিতে লাগিলেন। যাহারা তাহা না করিলেন, বা, কোন প্রকার অহঙ্কার প্রকাশ করিয়া তাহার প্রতি বিদ্বেষাচরণ করিলেন রাজা বিক্রমাদিত্য তাহাদিগকে রাজ্যচ্যুত করিয়া ঐ সকল রাজ্য স্বয়ং শাসন করিতে লাগিলেন। এই প্রকারে পৃথিবীর পূৰ্বাবধি পশ্চিম প্রান্ত পর্যন্ত তাহার রাজ্য বিস্তৃত হইল, এবং তাবৎ প্রজা সুখে কাল যাপন করিতে লাগিল। দুৰ্বত্ত দস্যগণ তাহার প্রতাপের বশীভূত হইয়া দস্যুবৃত্তি হইতে একবারে নিবৃত্ত হইল। ভ্রমণ কারীগণ অকুতােভয়ে দেশ ভ্রমণ করিতে লাগিলেন, যিনি যেখানে যাইতেন সেই খানেই রাজা বিক্রমাদিত্যের যশােবাদ ও গুণানুবাদ শ্রবণ করিতেন। এবং প্রজাদিগের গৃহ ধন ধান্যে ও আনন্দ রসে পরিপূর্ণ দেখিতেন। কেহ কাহার প্রতি অন্যায় অত্যাচার করিআছে বিক্রমাদিত্যের রাজ্যে এমত কথা কে কখন শ্রবণ করেন নাই।
এই রূপ রাজ্য বিস্তার করিয়া এক দিবস রাজা বিক্রমাদিত্য সভায় বসিয়া পণ্ডিত গণকে জিজ্ঞাসা করিলেন, আমার ইচ্ছা, আমার নামে অব্দ প্রচলিত হয়, অতএব তােমরা বিবেচনা করিয়া বল, আমি ইহার যােগ্য কি না। পণ্ডিত গণ বলিলেন মহারাজ আপনার প্রতাপে ত্রিভুবন সশঙ্কিত এবং আপনার শত্রু অথবা তুল্য রাজা কুত্রাপি নাই, অতএব আপনি সর্ব্ব মতে তাহার যােগ্য। রাজা জিজ্ঞাসা করিলেন অব্দ প্রচলিত করুণার্থ কি কর্ত্তব্য। পণ্ডিতেরা বলিলেন প্রথমতঃ দেশ বিদেশীয় ভূম্যধিকারী ও রাজা ও তাবৎ জাতীয় লােককে নিমন্ত্রণ করিয়া আনিতে হইবে, তৎপরে এক লক্ষ পঞ্চবিংশতি সহস্র কন্যা ও এক লক্ষ পঞ্চবিংশতি সহস্র গাভী ব্রাহ্মণকে দান করিবেন। এবং রাজ্যস্থ তাবৎ ব্রাহ্মণদিগের জীবিকা নির্বাহার্থে এক এক নিস্কর ভূম্যধিকার নির্দিষ্ট করিয়া দিবেন। ইহা ভিন্ন এক বৎসর কোন ভূম্যধিকারীর স্থানে কর গ্রহণ করিবেন না, এবং এক বৎসরের মধ্যে যত ক্ষুধাতুর আতুর দীন দরিদ্র নিকটে আসিবে তাহাদিগের চিরকালের নিমিত্ত জীবনােপয় করিয়া দিবেন। এই সকল কর্ম্ম করিলে পর আপনার নামে চিরকাল। সংবৎ চলিবে।
রাজা পণ্ডিতের বিধানানুসারে এক বৎসর পর্যন্ত কন্যা দান ও গাে দান এবং আর আর ধর্ম্ম কর্ম্মাদি করিলেন। তাহার পর সংবৎ সৃষ্টি হইল। সেই সংবৎ অদ্যাপি তাহার নামে চলিয়া আসিতেছে।
বসুমঞ্জরী রাজা বিক্রমাদিত্যের এই সকল গুণানুবাদ করিয়া কহিল হে ভােজরাজ, রাজা বিক্রমাদিত্য এই প্রকার মনুষ্য ছিলেন। তুমি যদি তাহার ভুল হইতে পার তবে সিংহাসনারােহণ কর। ভােজরাজ বলিলেন তুমি যে সকল কথা কহিলে তাহা প্রকৃত ও আমার মনােনীত বটে। তদনন্তর সভাসদ গণকে বলিলেন আমিও সংবৎ সৃষ্টি করিব, তােমরা সকলে তাহার উদ্যোগ কর। এই মন্ত্রণায় সেই দিবস গত হইল। পর দিবস রাজা প্রাতঃকালে গাত্রোখান করিয়া পুনর্ব্বার সিংহাসনােপবেশনে ব্যগ্রচিত্ত হইয়া মন্ত্রীকে অবিলম্বে সভা করিতে আজ্ঞা দিলেন। মন্ত্রী কহিলেন মহারাজ এত ব্যস্ত হইয়াছেন কেন, বােধ হয় সিংহাসনের প্রত্যেক পুত্তলিকা এক এক প্রবন্ধ কহিবে, অতএব তাহা শুনিয়া যাহা কর্ত্ত হয় করিবেন। রাজা সে বাক্যে কর্ণপাত না করিয়া সিংহাসনারূঢ় হইবার জন্য পদ প্রসারণ করিলেন। তখন
চিত্ররেখা দ্বিতীয় পুত্তলিকা
বলিল হে রাজন, তুমি এই সিংহাসনােপবেশনের যােগ্য পাত্র নহ। তুমি যেরূপ নীতি-বিরুদ্ধ কর্ম্ম করিতে উদ্যত হইয়াছ এমত কেহ কখন করে না। যিনি রাজা বিক্রমাদিত্যের তুল্য সর্ব্ব-গুলিস্কৃত তিনি এই সিংহাসনে বসিবার যােগ্য। রাজা কহিলেন বিক্রমাদিত্যের কি গুণ ছিল। পুত্তলিকা বলিতে লাগিল।
রাজা বিক্রমাদিত্য তাবৎ জম্বুদ্বীপের অধিপতি হইয়া মনে মনে বিবেচনা করিলেন পৃথিবীস্থ প্রজাবর্গ। কি অবস্থায় অবস্থিতি করিতেছে একবার স্বচক্ষে দেখা উচিত, অতএব তিনি দেশ ভ্রমণে প্রবৃত্ত হইলেন। এস্থলে ইহাও কথিত আছে এক যােগী তাহাকে যােগ সাধনের পরামর্শ দিয়া দেশ-ভ্রমণে প্রবৃত্ত করেন। যাহা হউক, রাজা বিক্রমাদিত্য স্বীয় অনুজ ভর্তৃহরির প্রতি রাজ্য সমপর্ণ করিয়া অতুল ঐশ্বর্য্য পরিত্যাগ পূর্ব্বক কৌপীন ধারণ ও অঙ্গে ভস্ম লেপন করিয়া সন্ন্যাসীর বেশে দেশে দেশে ভ্রমণ করিতে লাগিলেন।
উজ্জয়িনী নগরে এক ব্রাহ্মণ ক্ষুধা তৃষ্ণা পরিত্যাগ করিয়া ধূমপান পূর্ব্বক বহুকাল ঘােরতর তপস্যা করিতে ছিলেন। তাহাতে উপাস্য দেবতা তাহার প্রতি প্রসন্ন হইয়া তাহাকে বর প্রার্থনা করিতে বলিলেন। কিন্তু ব্রাহ্মণ প্রথমতঃ বর গ্রহণে অসম্মত হইলেন। পরে দৈববাণী হইল যে, অমৃত গ্রহণ কর। তদনন্তর ঐ দেবতা মনুষ্যাকারে তৎসমীপে আবির্ভূত হইয়া তাহাকে একটী ফল সমপর্ণ পূর্ব্বক বলিলেন ইহা ভক্ষণ করিলে নর অমর হয়। ব্রাহ্মণ ফল পাইয়া পুলকিত-চিত্তে স্বগৃহে প্রত্যাগমন পূর্ব্বক ব্রাহ্মণীকে ডাকিয়া তাহার হস্তে ঐ ফল প্রদান করিয়া বলিলেন হে ব্রাহ্মণি দেবতা আমার প্রতি প্রসন্ন হইয়া এই ফল দিয়াছেন এবং কহিয়াছেন যে নর ইহা ভক্ষণ করিবে সে অমর হইবেক। বিপ্রকান্তা ইহা শুনিয়া বিলাপ করিতে করিতে কহিলেন পূর্ব্ব জন্মে আমরা কি পাপ করিয়াছিলাম, তাহাতে এজন্মে অন্নাভাবে অস্থি চর্ম্ম সার হইয়াছে, এবং এই অবস্থায় চিরজীবী হইলে কত ক্লেশ ভােগ করিতে হইবে বলাযায় না, এক্ষণে আমাদের চিরজীবী হওয়া অপেক্ষা মরণ মঙ্গল, অতএব এ ফলে আমাদিগের কিছুই প্রয়ােজন নাই, তুমি রাজাকে এই ফল দিয়া তাঁহার নিকট হইতে কিঞ্চিৎ অর্থ লইয়া আইস, তাহা হইলে জঠরজ্বালা নিবারণের উপায় হইবেক।
সহধর্মিণীর এই বাক্য শুনিয়া ব্রাহ্মণ মনে মনে বিবেচনা করিলেন একথা প্রকৃত, আমাদের পক্ষে সংসার কেবল যন্ত্রণা মাত্র হইয়াছে, অতএব এ ফল ভক্ষণ করিয়া চিরজীবী হইলে বিপরীত ফলই হইবে। ইহা ভাবিয়া ব্রাহ্মণ রাজা ভর্তৃহরির সমীপে গমন করিলেন, এবং রাজদ্বারে উপস্থিত হইয়া দ্বারবানকে কহিলেন রাজাকে বল, এক ব্রাহ্মণ এক ফল লইয়া আসিয়াছেন। দ্বারপাল রাজার নিকটে সংবাদ করিলে তিনি তৎক্ষণাৎ ব্রাহ্মণকে সভাতে আনয়ন করিতে অজ্ঞা দিলেন। ব্রাহ্মণ রাজসভায় উপনীত হইয়া ধর্ম্ম লাভ হউক বলিয়া রাজাকে আশীৰ্বাদ করিলেন, এবং রাজার হস্তে ঐ ফল প্রদান করিলেন। রাজা তাহা লইয়া ব্রাহ্মণকে জিজ্ঞাসা করিলেন এই ফলের কি গুণ। ব্রাহ্মণ কহিলেন মহারাজ আমি বহুকাল তপস্যা করিয়াছিলাম, দেবতা তুষ্ট হইয়া বর স্বরূপ এই ফল আমাকে দিয়াছেন, ইহার নাম অমর ফল, ইহা ভক্ষণ করিলে যমদণ্ড হইতে নিষ্কতি হয়। কিন্তু আমি চির-দুঃখী, আমার অমর হওয়া বিড়ম্বনা মাত্র। তুমি লক্ষ লক্ষ জীবের প্রতিপালন করিতেছ, অতএব তােমাকে এই ফল দিলাম, ভক্ষণ করিয়া চিরকাল সুখে রাজ্যভােগ কর এবং চিরকাল প্রজাগণ তােমার অধীনে থাকিয়া সুখভােগ করুক। রাজা ফললাভে অপরিসীম পরিতােষ প্রাপ্ত হইয়া ব্রাহ্মণকে এক লক্ষ মুদ্রা ও একখান গ্রাম পারিতােষিক প্রদান করিয়া বিদায় করিলেন।
রাজা মহিষীকে অত্যন্ত স্নেহ করিতেন, সুতরাং স্ত্রৈণ বশতঃ বিবেচনা করিলেন আমি পুরুষ, হঠাৎ দুৰ্বল হইব না, কিন্তু রাজ্ঞী আমার জীবন-সর্ব্ব, তিনি খাইয়া চিরযৌবনা হইলে আমি সুখী হইব। ইহা ভাবিয়া অন্তঃপুরে গমন করিয়া রাণীকে ফল প্রদান করিলেন। রাণী সহাস্য বদনে জিজ্ঞাসিলেন মহারাজ এই ফল এত যত্ন করিয়া আনিয়াছেন, ইহার গুণ কি? রাজা কহিলেন সুন্দরি তুমি যদি এই ফল ভক্ষণ কর তবে সদা যৌবনবতী থাকিবে, আর দিন দিন তােমার রূপ লাবণ্য বৃদ্ধি হইবে, এবং যমের অধিকার হইতে মুক্ত হইবে। রাণী কহিলেন তবে আমি এই ফল ভক্ষণ করিব। তাহা শুনিয়া রাজা রাজসভায় প্রত্যাগমন করিলেন।
নগর পালের সহিত রাণীর প্রসক্তি ছিল, অতএব তিনি তাহাকে ডাকাইয়া তাহার হস্তে ফল দিয়া বলিলেন রাজা আমাকে এই ফল দিয়াছেন, যে ইহা ভক্ষণ করিবে সে অমর হইবেক, অতএব তােমাকে না দিয়া আমি এই ফল ভক্ষণ করিতে পারিনা, কেন না তুমি আমার প্রাণাধিক, তুমি যদি ইহা ভক্ষণ করিয়া অমর হও তবে অতিশয় আহলাদের বিষয়। ইহা শুনিয়া নগরপাল ফল গ্রহণ পূর্ব্বক স্বগৃহে প্রত্যা গমন করিল। এক বেশ্যা নগরপালের উপপত্নী ছিল, নগরপাল তাহাকে ঐ ফল দিয়া কহিল আমি তােমার জন্য অমর ফল আনিয়াছি, তুমি ভক্ষণ কর। এই বাক্যে বারবনিতা তাহার হস্ত হইতে ফল লইয়া তাহাকে বিদায় করিয়া দিল। পরে মনে মনে এই চিন্তা করিতে লাগিল আমি পূর্ব্ব জন্মে কত পাপ করিয়া ছিলাম, তাহাতে বারবধূ হইয়া চিরকাল পাপ কর্ম্মে দিন যাপন করিতেছি, যদি আমি অমর হই তবে আরাে কত কাল কত পাপ করিতে, হইবে। অতএব এই ফল রাজাকে দেওয়াই উচিত, তিনি চিরজীবী হইলে দেশের অতিশয় মঙ্গল হইবে,তাহাতে আমার পুণ্য হইয়া পূর্ব্বকৃত পাপ ধ্বংস হইতে পারিবে, এবং রাজা চিরকাল আমার প্রত্যুপকার স্বীকার করিবেন।
এই কল্পনা করিয়া বারাঙ্গনা রাজসভায় গিয়া রাজার হস্তে ঐ ফল সমপর্ণ করিল। রাজা ফল দর্শনে চমৎকৃত হইয়া মনে মনে ভাবিতে লাগিলেন আমি এই ফল রাণীকে দিয়াছিলাম, এই বেশ্যা ইহা কিরূপে প্রাপ্ত হইল। কিন্তু মনের কথা ব্যক্ত না করিয়া হাস্থ্য করিতে করিতে বারকান্তাকে জিজ্ঞাসা করিলেন তােমাকে এ ফল কে দিয়াছে। বারাঙ্গনা কহিল আমি এই ফল নগরপালের নিকট প্রাপ্ত হইয়াছি। ইহা শুনিয়া রাজা তাহাকে কিঞ্চিৎ অর্থ দিয়া বিদায় করিলেন। পরে মনে মনে চিন্তা করিতে লাগিলেন হায় আমি যে রাণীকে পরম স্নেহাপদ জানিয়া আপন মন সমপর্ণ করিয়াছিলাম তাহার এই চরিত্র, রাণী আমাকে বঞ্চনা করিয়া নগররক্ষকের সহিত প্রণয় করিয়াছে। অতএব এরূপ সংসর্গে অবস্থান অপেক্ষা আমার পক্ষে নির্জন বন প্রয়াণ শ্রেয়স্কর। বারম্বার এই আক্ষেপ করিয়া রাজা বলিতে লাগিলেন আমার বুদ্ধিকে ধিক, আমি যদি আর রাজ্য করি তাহাকেও ধিক্, রাণীকেও ধিক্, কোটালকেও ধিক, বেশ্যাকেও ধিক, কামদেব যিনি এই সংসারের লােককে এরূপ দুর্ম্মতিতে মুগ্ধ করিয়া রাখিয়াছেন সেই কামদেবকেও ধিক।
তদনন্তর ঐ ফুল হস্তে লইয়া রাজা মনে মনে বিচার করিতে লাগিলেন এ সংসারে তাবৎ বস্তুই অচিরস্থায়ী ও ক্ষণভঙ্গর, কালে কালে সকলেই লয় প্রাপ্ত হইবে। জন্ম গ্রহণ মাত্র সকলেই কাল গ্রাসে পতিত হইয়া রাছিয়াছে, এবং পরিণামে কিছুই সঙ্গী হয় না, তথাপি লােকে ভ্রান্তি প্রযুক্ত আমার আমার করিয়া বৃথা কাল ক্ষেপণ করে। এবং সকলেই সুখের ভাগী হইতে চাহে, দুঃখের ভাগী কেহই নহে। এই সংসার সমুদ্ররূপ, মায়া তাহার জল এবং লিসা তাহার মৎস্য, কিন্তু এই মৎস্য ধাৰণার্থ ধীবর কেহই নাই।
এই প্রকার চিন্তায় ব্যাকুলিত হইয়া রাজা ভর্তৃ-হরি অন্তঃপুরে প্রবেশ করিয়া রাণীকে ক্রোধাভাসে জিজ্ঞাসা করিলেন আমি তােমাকে যে ফল দিয়াছিলাম তাহা কি করিয়াছ। রাণী বলিলেন মহারাজ আমি| তাহা ভক্ষণ করিয়াছি। তখন রাজা তাহাকে ঐ ফল দেখাইলেন। রাণী ভয়ে বিবর্ণা ও কম্পান্বিতা হইলেন। তদনন্তর রাজা ঐ ফল হস্তে অন্তঃপুর হইতে বাহিরে আসিয়া তাহা ধৌত করিয়া আপনি ভক্ষণ করিলেন এবং রাণীর আচরণে মনে মনে অনেক অনুতাপ করিয়া অবশেষে রাজ্যপাঠ ও রাণীর প্রেমশ পরিত্যাগ করিয়া, কাহাকেও কিছু না বলিয়া, অর্থাদি না লইয়া, এক কালে মমতা- 1-শূন্য হইয়া সন্ন্যাসীবেশে বাটীর বাহির হইলেন।
এই সংবাদ দেশে দেশে এবং নগরে নগরে সর্বত্র। প্রচারিত হইল, এবং ক্রমে ক্রমে ইন্দ্রের কর্ণগােচর হইল। তাহাতে তিনি দেবগণের সহিত পরামর্শ করিয়া ভর্তৃহরির রাজ্য-রক্ষার্থ এবং প্রজার প্রতি কেহ অত্যাচার করিতে না পারে এই জন্য এক যক্ষকে প্রেরণ করিলেন। ঐ যক্ষ আসিয়া রাজ্যের প্রহরী স্বরূপ হইয়া থাকিল।
কিয়দিবস পরে রাজা বিক্রমাদিত্য যােগ-সাধন বা দেশ-ভ্রমণ সমাধা হইলে মনে করিলেন কনিষ্ঠ ভ্রাতাকে রাজ্য দিয়া আসিয়াছি, দেখি গিয়া, তিনি কিরূপ রাজ্য করিতেছেন। এই চিন্তা করিয়া রাত্রিকালে আপন নগরের নিকট উপস্থিত হইলেন। তাহাতে রাজ্য-রক্ষক যক্ষ জিজ্ঞাসা করিল, তুমি কে এত রাত্রে নগরে যাইতেছ, তােমার নাম বল, নতুবা তােমাকে এখনি শমন-ভবনে প্রেরণ করিব। বিক্রমাদিত্য কহিলেন অমি রাজা বিক্রমাদিত্য, তুই কে আমাকে জিজ্ঞাসা করিতেছিস। যক্ষ কহিল ভর্তৃহরির রাজ্য রক্ষার্থ দেবরাজ আমাকে এখানে প্রেরণ করিয়াছেন,আমি এই রাজ্যের প্রহরী। রাজা জিজ্ঞাসিলেন ভ্তৃহরির কি হইয়াছে। যক্ষ কহিল কেহ তাহাকে ছলনা করিয়া এখান হইতে লইয়া গিয়াছে। রাজা হাস্য করিয়া কহিলেন তিনি আমার কনিষ্ঠ ভ্রাতা, আমার নাম বিক্রমাদিত্য। যক্ষ বলিল আমি তােমাকে চিনি না, যদি তুমি এ রাজ্যের অধিপতি রাজা বিক্রমাদিত্য হও তবে আমার সঙ্গে যুদ্ধ করিয়া আমাকে পরাস্ত কর, তাহা হইলে নগরে প্রবেশ করিতে দিব, নতুবা দিব না। রাজা বলিলেন, আমি তােমাকে শঙ্কা করি না, যদি যুদ্ধ করিতে চাহ প্রস্তুত হও।
এই প্রকার উত্তর প্রত্যুত্তরের পর যুদ্ধারম্ভ হইল। রাজা যক্ষকে পরাভব করিয়া তাহার বক্ষঃস্থলে বসিলেন। যক্ষ কহিল রাজন, তুমি বর প্রার্থনা কর, আমি তােমার প্রাণ দান করিতেছি। রাজা এই বাক্যে হাস্য করিয়া বলিলেন আমি তােকে ভূমে নিক্ষেপ করিয়াছি, এবং মনে করিলে এখনি সংহার করিতে পারি, অতএব তুই আমাকে কি রূপে প্রাণ দান দিবি। যক্ষ কহিল তুমি আমাকে পরিত্যাগ কর, আমি যে প্রকারে তােমার প্রাণ রক্ষা করিব তাহা কহিতেছি। এই কথায় রাজা তাহাকে পরিত্যাগ করিলেন। যক্ষ কহিল তাবৎ পৃথিবীতে তােমর প্রতাপ ব্যাপ্ত হইয়াছে, এবং সকল রাজা তােমাকে শঙ্কা করে। কিন্তু তােমার রাজ্যে এক তৈলকার ও এক কুম্ভকার আছে, তাহারা তােমার প্রাণনাশের মন্ত্রণা করিয়াছে। তাহারা দুজন এবং তুমি এই তিনের মধ্যে যে ব্যক্তি দুই জনকে সংহার করিতে পারিবেক সেই ব্যক্তি নিৰ্বিঘে রাজ্য-ভােগ করিবেক। কুম্ভকার যােগী হইয়া অরণ্যে যােগ সাধন করিতেছে। তৈলকার পাতালে রাজ্য করিতেছিল এবং মনে মনে স্থির করিয়াছিল তােমাকে আর যােগীকে বিনাশ করিয়া ত্রিলােকের অধীশ্বর হইবেক। কিন্তু যােগী তাহাকে সংহার করিয়া তাহার শব শিরীষ বৃক্ষে লম্বমান করিয়া রাখিয়াছে। এক্ষণে মনে মনে এই স্থির করিয়াছে তােমাকে নষ্ট করিয়া তৈলকটাহে নিক্ষেপ পূর্ব্বক মহাদেবীর নিকট বলি দিয়া নিশ্চিন্ত রাজ্য ভােগ করিবেক। তুমি এ সকল বৃত্তান্ত কিছুই অবগত নহ, অতএব আমি তােমাকে সতর্ক করিলাম, ইহাতেই তােমাকে প্রাণদান দেওয়া হইল। তুমি এই দুই শত্রু হইতে আপনাকে সতত রক্ষা করি ও। সম্প্রতি তােমাকে আমি এক উপদেশ দিতেছি, ঐ যােগী তােমাকে ছলনাখ নিমন্ত্রণ করিয়া লইয়া যাইবেক। নিমন্ত্রণ করিলে তুমি অবশ্যই যাইবে। কিন্তু যখন ঐ যােগী তােমাকে দেবীর সম্মুখে দণ্ডবৎ হইয়া প্রণাম করিতে বলিবেক তখন তুমি তাহা না করিয়া তাহাকে কহিও, আমি পৃথিবীর দণ্ডধর, কাহাকে কখন দণ্ডবৎ প্রণাম করি নাই, অতএব কি প্রকারে দণ্ডবৎ হইয়া প্রণাম করিতে হয় আমাকে দেখাইয়া দাও, আমি সেই প্রকার প্রণাম করিতেছি। ইহাতে যখন ঐ যােগী নতমস্তক হইয়া প্রণাম করিবেক তখন তুমি খজ দ্বারা তাহার মস্তকচ্ছেদন, করিও, আর দেবীর সম্মুখে প্রজ্বলিত অগ্নির উপর যে উত্তপ্ত তৈল-কটাহ আছে তাহাতে ঐ যােগীর শব এবং বৃক্ষ হইতে তৈলকারের শব আনিয়া উভয়কে নিক্ষেপ করিও।
এবংবিধ উপদেশ প্রদান পূর্ব্বকযক্ষ অন্তর্হিত হইল। রাজা আপন ভবনে আসিলেন। রাত্রি প্রভাত হইলে নগরে সংবাদ হইল রাজা বিক্রমাদিত্য স্বদেশে প্রত্যাগত হইয়াছেন। মন্ত্রী প্রভূতি তাবৎ কর্ম্মকারক আনন্দিত হইয়া রাজার সহিত সাক্ষাৎ করিতে আসিল। তাবৎ নগরে ও প্রত্যেক আলয়ে মঙ্গলাচরণ এবং রাজবাটীতে মহােৎসব ও বাদ্যোদ্যম হইতে লাগিল। এইরূপে কিয়ৎকাল অতীত হইলে এক দিবস এক যােগী রাজসভায় উপস্থিত হইয়া রাজাকে আশীৰ্বাদ পর্ব্বক তাহার হস্তে এক ফল প্রদান করিল। রাজা তাহা সহাস্য বদনে গ্রহণ করিলে, যােগী কহিল আমার কুটীরে যজ্ঞ হইতেছে, আমি আপনাকে নিমন্ত্রণ করিতে আসিয়াছি। রাজা নিমন্ত্রণ স্বীকার পূর্বক কহিলেন আমি সন্ধ্যার সময় তােমার আলয়ে উপস্থিত হইব, তােমার আশ্রম কোথায় বল। অনন্তর যােগী আপন বাসস্থানের পরিচয় দিয়া প্রস্থান করিল।
দিবাবসানে রাজা কাহাকেও কোন কথা না বলিয়া খ্ড়গ চর্ম লইয়া একাকী যােগীর যাগ-ভূমিতে গমন করিলেন। যােগী তাহাকে দেখিয়া অভ্যর্থনা করিয়া কহিল মহারাজ দণ্ডবৎ হইয়া দেবীকে প্রণাম করুন। ভূপতি কহিলেন আমি রাজা, কখন কাহাকে দণ্ডবৎ হইয়া প্রণাম করি নাই, অতএব কি প্রকারে দণ্ডবৎ প্রণাম করিতে হয় আমাকে দেখাইয়া দাও। যােগী তাহা দেখাইবার জন্য সাষ্টাঙ্গে ভূমিষ্ঠ হইল। রাজা ঐ সময়ে যক্ষের উপদেশানুসারে খঙ্গ নিষ্কোষিত করিয়া তাহার শিরচ্ছেদন করিলেন। পরে বৃক্ষ হইতে তৈলকারের শব আনয়ন পূর্ব্বক ঐ শব ও যােগীর শব এই উভয়কে উত্তপ্ত-তৈলকটাহে নিক্ষেপ করিলেন। তাহা দেখিয়া দেবী কহিলেন বিক্রমাদিত্য তােমার সাহস ধন্য, এবং তুমি যে মাতা পিতার ঔরসে জন্ম গ্রহণ করিয়াছ তাহারাও ধন্য, আমি তােমার প্রতি প্রসন্ন হইলাম তুমি বর প্রার্থনা কর।
দেবী এই কথা বলিলে পর, তাল ও বেতাল নামে দুই মহাবীর উপস্থিত হইয়া রাজাকে কহিল মহারাজ আমরা আপনকার সেবার্থ আসিয়াছি, আমরা সৰ্বত্রগামী, জল স্থল আকাশ পাতালে বায়ুবেগে গমন করিতে পারি, অতএব যে মনস্কামনা থাকে বলুন, আমরা তাহা পূর্ণ করি। রাজা বলিলেন সম্প্রতি আমার কোন কামনা নাই, যদি তােমরা অঙ্গীকার কর এবং সেই অঙ্গীকার পালন কর, তবে আমি মহাদেবীর নিকট হইতে তােমাদিগকে চাহিয়া লই। তাল বেতাল কহিল যে আজ্ঞা মহারাজ। পরে রাজা দেবীর নিকট এই প্রার্থনা করিলেন যে, এই দুই বীরকে আমাকে দেউন। দেবী তৎক্ষণাৎ তাহাদিগকে দিলেন। পরে রাজা তাহা দিগকে কহিলেন, আমি যখন যে স্থানে তােমাদিগকে স্মরণ করিব তৎক্ষণাৎ তােমরা তথায় উপস্থিত হইও॥ তাল বেতাল কহিল যে আজ্ঞা মহারাজ, আমরা তৎক্ষণাৎ উপস্থিত হইব। তদনন্তর রাজা। গৃহে প্রত্যাগমন করিলেন।
চিত্ররেখা বলিল রাজা বিক্রমাদিত্যের এই রূপ সাহস ও এইরূপ কর্ম্ম ছিল, তাল বেতাল উভয়ে তাহার। আজ্ঞাকারী ছিল, এবং রাজা তাহাদিগকে যখন যেখানে স্মরণ করিতেন তখনি সেইখানে তাহারা উপস্থিত হইত। হে ভােজরাজ তুমি কদাচিৎ তাহার তুল্য নহ। যদি কোন ব্যক্তি তাহার ন্যায় কর্ম্ম করে তবেই সে সিংহাসনারূঢ় হইতে পারে। তুমি বলের অহঙ্কার করিওনা, তােমার তুল্য পৃথিবীতে কোটি কোটি মনুষ্য আছে।
এই কথা কহিতে কহিতে সে দিবস গত হইল। অতএব সে দিবসেও সিংহাসনােপবেশন করা হইল না। পর দিবস ভােজরাজ পুনর্ব্বার সিংহাসনারােহণার্থ পদ প্রসারণ করিলে
রবিবামা তৃতীয় পুত্তলিকা
বলিল মহারাজ এই সিংহাসনােপবেশন করা তােমার উচিত নহে। তুমি প্রথমতঃ আমার স্থানে রাজা বিক্রমাদিত্যের এক গুণের কথা শ্রবণ কর। অবন্তী নগরে এক বিচক্ষণ রাজপুরােহিত ছিলেন। তাহার এক পুত্র ছিল, সে বিদ্যাভ্যাস করিত না, দিবারাত্র কেবল সুখাভিলাষে মত্ত থাকিত, তাহাতে ব্রাহ্মণ সতত অসুখী থাকিতেন। এক দিবস তিনি পুত্রকে নিকটে ডাকিয়া কহিতে লাগিলেন, হে পুত্র মনুষ্য হইলে মনুষ্যের উপকার করিতে হয়, পরমেশ্বর এই জন্য মনুষ্যকে জ্ঞান দান করিয়াছেন, এই জ্ঞানের নিমিত্তই মনুষ্যজাতি পশুজাতি অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ, এই জ্ঞান বিদ্যা দ্বারা উজ্জ্বল হয়। বিদ্যা না থাকিলে মনুষ্যে ও বন্য পশুতে কিছুমাত্র প্রভেদ থাকে না। বিদ্যা মনুষ্যের ভূষণ, বিদ্বান ব্যক্তি রাজা অপেক্ষাও অধিক সমাদর ও সম্মানের পাত্র, কেননা রাজা কেবল স্বদেশে পূজনীয়, বিদ্বান কি স্বদেশে কি বিদেশে সর্বত্রই পূজনীয়। বিদ্যা অর্থ অপেক্ষাও উৎকৃষ্ট পদার্থ, যেহেতু অর্থের অরি আছে, তাহা তস্কর কর্তৃক অপহৃত ও অগ্নি দ্বারা নষ্ট হইতে পারে। বিদ্যা সেপ্রকার নষ্ট হইতে পারেনা, বিদ্যা অক্ষয় ধন, বিতরণে বৃদ্ধি হয়। অপর ধন চিরস্থায়ী ও একত্র-স্থায়ী নহে, কিন্তু বিদ্যাধন কখন স্থান-ভ্রষ্ট হয় না। বিদ্যা সকল ভূষণ হইতে অধিক শােভাকর। রত্নাদি ভূষণ শৈশব ও যৌবন কালে শােভা-কারী বটে, কিন্তু বৃদ্ধাবস্থায় শােভা-জনক নহে। বিদ্যা সকল অবস্থায় সমান শােভাকারী, বিশেষতঃ বৃদ্ধাবস্থায় আরাে সুখ-দায়ক হয়, এবং সকল সময়ে পরম বন্ধুর কর্ম্ম করে। বিদ্যার তুল্য অমূল্য রত্ন পৃথি-
8
এই সকল ভৎসনায় ব্রাহ্মণ-কুমারের অন্তঃকরণে অতিশয় ঘৃণা জন্মিল। অতএব তিনি দেশত্যাগী হইয়া এই প্রতিজ্ঞা করিলেন যে, যে পর্যন্ত বিদ্যা শিক্ষা করিতে না পারিব সে পর্যন্ত আর গৃহে আসিব না। এই সংকল্প করিয়া ব্রাহ্মণ-তনয় বিদ্যা উপার্জন জন্য নানা দেশে ভ্রমণ করিতে লাগিলেন। পরিশেষে কাশ্মীর দেশে উপস্থিত হইয়া সর্ব্বশাস্ত্র-বিশারদ এক ব্রাহ্মণের নিকটে বিদ্যাভ্যাস করিতে লাগিলেন। ঐ ব্রাহ্মণ তাহার ভক্তি ও মনােযােগ দেখিয়া তাহার প্রতি সদয় হইয়া তাহাকে বিদ্যা শিক্ষা করাইতে লাগিলেন। বিপ্র-তনয় অতি অল্প কালের মধ্যে সকল শাস্ত্রে অতি বিচক্ষণ হইয়া উঠিলেন।
ব্রাহ্মণ-তনয় বিদ্যাভ্যাস করণানন্তর গুরুস্থানে বিদায় লইয়া কাঞ্চীপুর নগরে আসিলেন। ঐ স্থানে এক নরক্ষক নরমােহিনী নামী এক ভুবনমােহিনী কামিনীকে আনিয়া রাখিয়াছিল, যে ব্যক্তি তাহার অলৌকিক রূপ লাবণ্য দর্শনে মােহিত হইয়া প্রণয়- কাঙ্ক্ষা, অথবা তাহাকে স্থানান্তরে লইয়া যাইবার বাসনা, করিত নরভক্ষক তৎক্ষণাৎ তাহাকে ধরিয়া ভক্ষণ করিত। এই প্রকারে সহস্র সহস্র লােক তাহার উদরে গিয়াছিল। বিএ-নন্দন এই বৃত্তান্ত শুনিয়া স্বদেশে প্রত্যাগমন পূর্ব্বক প্রথমতঃ রাজা বিক্রমাদিত্যের সভায় উপস্থিত হইলেন এবং রাজাকে সেই বিবরণ বলিলেন, পরে ইহাও প্রকাশ করিলেন যদি তিনি ঐ নরমােহিনীকে নরভক্ষকের হস্ত হইতে উদ্ধার করিয়া তাহার কামিনী করিয়া দেন তবে তিনি চির-কৃতার্থ হয়েন। রাজা তাহাতে সম্মত হইয়া তাহার সমভিব্যাহারে কাঞ্চীপুরে যাত্রা করিলেন।
তথায় উপনীত হইয়া যখন রাজা ঐ নরমােহিনীকে দর্শন করিলেন তখন তাহার মনােহর রূপ লাবণ্যে একবারে বিমােহিত হইলেন, এবং যদিও তিনি জ্ঞান দ্বারা সকল ইন্দ্রিয় জয় করিয়া ছিলেন তথাপি, কর্পের প্রখর শরাঘাতে ক্ষণেক কাল তাহার হৃদয় বিদীর্ণ হইল। অনন্তর রজনী আগত হইলে নরক্ষক আসিয়া রাজাকে দেখিয়া অতিশয় কুপিত হইল, এবং তাঁহার সংহার চেষ্টা করিতে লাগিল। তাহাতে ঘােরতর সংগ্রাম উপস্থিত হইল। পরিশেষে বীর বিক্রমাদিত্য তাহাকে বিনাশ করিলেন। তখন নরমােহিনী রাজার সম্মুখে গললগ্নবসনা হইয়া কহিল মহারাজ আপনকার বল-প্রভাবে আমি এই দুরন্ত দস্ত হস্ত হইতে পরিত্রাণ পাইলাম, ইহা না হইলে আমি এই প্রকারচির-বন্দিনী থাকিতাম, অতএব আমি মদীয় শরীর ভবদীয় চরণে সমর্পণ করিলাম, আপনকার যাহা বাসনা করুন। রাজা বলিলেন যদি তুমি আপন ইচ্ছায় পাণি-দান স্বীকার করিলে তবে আমার এই বাসনা তুমি এই ব্রাহ্মণ-কুমারকে পাণিদান কর। ইনি যদিও ধনবান্, নহেন, কিন্তু অতি বিদ্বান এবং আপন গুণে আমার পরম প্রিয় পাত্র হইয়াছেন। বিশেষতঃ ইনিই ভােমার পরিত্রাণের মূল, কেননা ইহার স্থানে সংবাদ পাইয়া আমি তােমাকে উদ্ধার করিতে আসিয়াছি। নরমােহিনী এই কথা শুনিয়া তখনি ব্রাহ্মণ-কুমারকে পাণিদান করিতে সম্মতা হইল। তৎপরে রাজা বিপ্রকুমারের সহিত তাহার বিবাহ দিয়া রাজধানীতে আসিলেন। ব্রাহ্মণনন্দন সস্ত্রীক মহা আনন্দে বৃদ্ধ পিতার সদনে উপস্থিত হইলেন। তাহার পিতা তাহার সৌভাগ্যে অতিশয় আনন্দিত হইলেন। পুত্তলিকা কহিল হে ভােজরাজ দেখ, রাজা বিক্রমাদিত্য কেমন পরােপকারী ছিলেন। যে প্রাণকে সতত রক্ষা করা কত্ত সে প্রাণের কিছু মাত্র আশঙ্কা করিয়া তিনি কেবল পরের উপকার জন্য আপনাকে দৈত্যের মুখে দিয়াছিলেন। আর দেখ তাহার কেমন জিতেন্দ্রিয়তা, যে নারীর প্রেমে তাহার চিত্ত ক্ষণ কালের নিমিত্ত বিচলিত হইয়াছিল তাহাকে পাইয়াও অনায়াসে ত্যাগ করিলেন। হে ভােজরাজ যদি তােমার এমত গুণ থাকে তবে সিংহাসনে উপবেশন কর, নতুবা এ দুরাশা পরিত্যাগ করাই সৎপরামর্শ।
ইহা শুনিয়া ভােজরাজ সে দিবস সিংহাসনে আরােহণ করিলেন না। পর দিবস পুনর্ব্বার সিংহাসনের নিকটে আসিলে,
চন্দ্রকলা চতুর্থ পুত্তলিকা
কহিতে লাগিল হে রাজন, তুমি কেন এত ত্বরিতাঃ- করণ হইয়াছ, কিঞ্চিৎ কাল ধৈর্য্যাবলম্বন পূর্ব্বক শ্রবণ কর, আমি তােমাকে রাজা বিক্রমাদিত্যের বদান্যতার এক বিবরণ বলি।
এক দিবস রাজা বিক্রমাদিত্য সভায় বসিয়া আছেন এমত সময়ে এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ আসিয়া বলিল মহা- রাজ আমি যেরূপ উপদেশ দিতেছি তদনুসারে যদি কেহ নূতন আলয় নির্মাণ করিয়া তাহাতে বাস করে তাহা হইলে অতিশয় সুখী ও যশস্বী হইতে পারে। রাজা জিজ্ঞাসা করিলেন কিরূপ বল দেখি। বিপ্র কহিল ভুল লগ্নে গৃহ গ্রন্থন আরম্ভ করাইতে হইবে, এবং যে কাল পর্যন্ত ঐ লগ্নের স্থিতি সে কাল পর্যন্ত কর্ম্মকারকেরা কর্ম্ম করিবে, তুলা লগ্ন অতীত হইলে কর্মে ক্ষান্ত দিবেক, পুনৰ্বার ঐ লগ্ন উপস্থিত হইলে কর্ম্ম করিবে। এই প্রকার কেবল তুলা লগ্নে গৃহ নির্মিত হইলে গৃহস্থের ভাণ্ডার ধনে পরিপূর্ণ হয় এবং তাহার আলয়ে লক্ষ্মী সদা বিরাজমান থাকেন।
রাজা বিক্রমাদিত্য এই কথায় মহাহৃষ্ট হইয়া তখনি মন্ত্রীকে আজ্ঞা করিলেন উত্তম স্থান দেখিয়া তুলা লগ্নে এক অট্টালিকা নিৰ্মাণ কর। মন্ত্রী রাজানুসারে নদীর সম্ম,খস্থিত এক ভূখণ্ড মনােনীত করিয়া তুলা লগ্নে গৃহের ভিত্তি খনন করাইলেন। পরে নানা দেশ হইতে নানা জাতীয় শিল্প নৈপুণ্য দক্ষ মনুষ্য আনিয়া যে যে শিল্প বিদ্যায় পারগ। তাহাকে সেই কর্মে নিযুক্ত করিলেন। তাহারা অশেষ গুণ প্রকাশ পূর্ব্বক কেহ রজত কেহ স্বর্ণ কেহ লোহ ও কেহ কাষ্ঠের কর্ম করিয়া এক অপূৰ্ব অট্টালিকা নির্মাণ করিল, এবং তাহার স্থানে স্থানে অমূল্য রত্ন সংযোগ করিল, তদ্ভিন্ন দ্বারা সকলের শোভা বর্ধনাথ প্রত্যেক দ্বারে দুই দুই নীলকান্ত মণি সংলগ্ন করিল। সুতরাং অট্টালিকা এমত মনােহর সুন্দর ও সুদৃশ্য হইল যে তৎসদৃশ কখন কাহার নেত্র-গােচর হয় নাই। অট্টালিকা প্রস্তুত হইলে মন্ত্রী রাজার নিকটে সংবাদ দিলে না রাজা গৃহ দর্শনার্থ গমন করিলেন, এবং তৎসমভিব্যাহারে এক অতি দীন ব্রাহ্মণও চলিল। অনন্তর যখন রাজা অট্টালিকা অবলােকন করেন তখন ঐ ব্রাহ্মণ কৌতুক ভাবে হাস্য করিতে করিতে কহিল যদি আমি এই অট্টালিকা পাই তবে এখানে থাকিয়া সদানন্দে কাল যাপন করি, আর কুটীরে কখন যাই না। এই কথা শ্রবণ মাত্র রাজা কোন চিন্তা না করিয়া তৎক্ষণাৎ গঙ্গাজল ও তুলসী-পত্র আনাইয়া ঐ অট্টালিকা ব্রাহ্মএকে উৎসর্গ করিয়া দিলেন। ব্রাহ্মণ, সুধাপানে তৃপ্ত চকোরের ন্যায় অট্টালিকা পাইয়া আনন্দ-সাগরে মগ্ন। হইল, এবং আপন ভিক্ষাধার ও বস্ত্রাদি আনিয়। সে রাত্রি ঐ অট্টালিকাতে বাস করিল।
অনন্তর ব্রাহ্মণ সায়ং সন্ধ্যাদি করিয়া প্রথম প্রহর রাত্রে পরমানন্দে পর্য্যঙ্কে শয়ন করিয়াছে এমত সময়ে রাজলক্ষ্মী তাহার সম্মুখে আসিয়া হাস্য মুখে বলিলেন বৎস তুমি বল, আমি তােমার গৃহ মণি মুক্তাদি বিবিধ রত্নে পরিপূর্ণ করি। ব্রাহ্মণ লক্ষ্মীদেবীকে উপদেবী জ্ঞান করিয়া আতঙ্কে মৃতকল্প হইয়া রহিল, কমলা তখন চলিয়া গেলেন। পরে দ্বিতীয় প্রহর রজনীতে পুনর্ব্বার আসিয়া বলিলেন অরে অজ্ঞান ব্রাহ্মণ আমাকে বল আমি কোথায় রত্ন বর্ষণ করি। ব্রাহ্মণ তখনও কোন উত্তর করিল না, এবং ভয় ও চিন্তাতে সমস্ত রাত্রি অজ্ঞানাভিভূত থাকিল, প্রত্যুষে গাত্রোত্থান করিয়া মলিন বদনে রাজ সদনে গমন করিল। রাজা তাহার অপ্রসন্ন বদন দর্শনে হাস্য করিতেলাগিলেন, এবং জিজ্ঞাসা করিলেন কল্য তােমাকে প্রফুল দেখিয়া ছিলাম, অদ্য এমত হইয়াছ কেন। ব্রাহ্মণ কহিল মহারাজ আমার দুঃখের কথা কি নিবেদন করিব, আপনি পরােপকারী ও পর-হিতৈযী, এবং পূর্ব্বকালে কর্ণ যেরূপ দাতা ছিলেন এ কালে আপনিও সেইরূপ আমার প্রতি যথেষ্ট দাতৃত্ব প্রকাশ করিয়া ছিলেন। কিন্তু ঐ অট্টালিকাতে প্রেতিনী বা পিশাচী বাস করে, সে আমাকে সমস্ত রাত্রির মধ্যে একবার নয়ন মুদিত করিতে দেয় নাই। আপনকার প্রতাপেই হউক বা আমার সন্তানের ভাগ্যেই হউক কোন প্রকারে প্রাণে প্রাণে বাঁচিয়া আসিয়াছি, বরঞ্চ ভিক্ষা করিয়া উদর ভরণ করিব সেও সহস্র গুণে সুখকর, কিন্তু প্রান্তেও আর তথায় যাইবনা। রাজা এ কথা শুনিয়া হাস্য করিতে লাগিলেন, পরে মন্ত্রীকে আজ্ঞা করিলেন অট্টালিকা নির্মাণে যত টাকা ব্যয় হইয়াছে ইহার মূল্য স্বরূপ তত টাকা ব্রাহ্মণকে দাও। রাজাজ্ঞায় মন্ত্রী গণনা করিয়া তত টাকা ব্রাহ্মণকে দিলেন। ব্রাহ্মণ তাহা শকটপূর্ণ করিয়া লইয়া গেল।
অনন্তর রাজা বিক্রমাদিত্য এক দিবস ঐ ভবনে শুভ ক্ষণে গমন করিয়া সন্ধ্যার সময় একাকী বসিয়া কোন বিষয় চিন্তা করিতেছেন এমত সময়ে রাজলক্ষ্মী তথায় আগমন পূর্বক তাহার সম্মুখে দণ্ডায়মান হইয়া কহিলেন হে নর-শ্রেষ্ঠ তােমার ধর্মকে ধন্যবাদ করি। ইহা বলিয়া কমলা অন্তর্হিত হইলেন। তদনন্তর রাজা শয়ন করিলেন। পরে তৃতীয় প্রহর রাত্রির সময় রাজলক্ষ্মী পুনর্ব্বার আসিয়া রাজার সম্মুখে দণ্ডায়মান হইয়া কহিলেন মহারাজ আমি কোথায় বর্ষণ করিব। রাজা কহিলেন আমার শয়নের পালঙ্ক ত্যাগ করিয়া যথা ইচ্ছা বর্ষণ কর। তদনন্তর তাবগরে স্বর্ণবৃষ্টি হইল। পরদিবস রাজা শয্যা হইতে গাত্রোথান করিয়া দেখিলেন চতুর্দিকে স্বর্ণ বৃষ্টি হইয়াছে। তাহাতে মনে মনে বিবেচনা করিলেন প্রজাদিগের ধন-কষ্ট নিমিত্ত এক দুর্ভাবনা ছিল এইক্ষণে তাহা দূর হইল, অতএব কিছু কাল সুখে কাল যাপন করিতে পারিব। তদনন্তর মন্ত্রী আসিয়া নিবেদন করিলেন মহারাজ সমুদয় নগরে স্বর্ণবর্ষণ হইয়াছে, অতএব যেরূপ আজ্ঞা করেন তাহা করি। রাজা কহিলেন নগরে ডিণ্ডিম প্রচার করিয়া দাও, যাহার সীমাতে যত স্বর্ণ পড়িয়াছে সে তাহা লয় এবং কেহ কাহার প্রতি অত্যাচার না করে। রাজার এই আজ্ঞাপ্রাপ্তে প্রজাগণ স্বস্ব গৃহ স্বর্ণে পরিপূর্ণ করিল।
পুত্তলিকা এই আখ্যায়িকা সমাপন করিয়া ভােজরাজকে কহিল, রাজা বিক্রমাদিত্য এই রূপ দাতা ও প্রজার হিতকারী ছিলেন। অতএব তােমার কি গুণ আছে যে তাহার সিংহাসনে বসিতে বাঞ্ছ। কর। পুত্তলীর এই বাক্যে রাজা ক্রোধাভিষিক্ত হইলেন, এবং শুভ লগ্নও অতীত হইল। সুতরাং সিংহাসনোপবেশন হইলনা। পর দিবস রাজা পুনৰ্বার আসিয়া সিংহাসনারােহণার্থে পাদ প্রসারণ করিলে
লীলাবতী পঞ্চম পুত্তলিকা
এক দিবস দুই ব্যক্তিতে বাদানুবাদ করিয়া এক ব্যক্তি কহিল অদৃষ্ট প্রধান পদার্থ, অন্য ব্যক্তি কহিল বল প্রধান। অদৃষ্টবাদী কহিল অদৃষ্টানুসারে অতি সামান্য ব্যক্তিও মান্য ও ধন ধান্য সম্পন্ন হয়, অতএব অদৃষ্টই শ্রেষ্ঠ। বল-মতাবলম্বী কহিল মনুষ্য বলবান, হইলে সমস্ত পৃথিবী তাহার বশীভূত হয় অতএব বলই শ্রেষ্ঠ।
এই প্রকার বিবাদ উপস্থিত হইলে, উভয়ে দেবরাজের নিকটে গিয়া করপুটে দণ্ডায়মান হইয়া কহিল, স্বামিন, আমাদিগের এই এই প্রকার বিবাদ উপস্থিত, আপনি আমাদের বিবাদ ভঞ্জন করুন।
ইন্দ্র বলিলেন আমার দ্বারা বিবাদের মীমাংসা হইবেক না, যে ব্যক্তি যােগ-সিদ্ধ হইয়াছেন তাহার দ্বারা ইহার মীমাংসা হইবেক। অতএব তােমরা মর্ত্য লােকে রাজা বিক্রমাদিত্যের নিকটে যাও, তিনি ইহার নিষ্কর্ষ করিয়া দিবেন। এই বাক্যে তাহারা দুই জনে রাজা বিক্রমাদিত্যের সভায় আসিয়া বলিল, আমরা ত্রিভুবন ভ্রমণ করিলাম, কিন্তু কেহ আমাদিগের বিচার করিতে পারিলেন না, অতএব তােমার নিকট আসিলাম, তুমি আমাদের বিবাদের সিদ্ধান্ত কর। রাজা বিক্রমাদিত্য সন্দিহান হইয়া বলিলেন সম্প্রতি তােমর গৃহ গমন কর, ছয় মাস অতীত হইলে পুনর্ব্বার আমিও, তখন আমি ইহার উত্তর করিব। ইহা শুনিয়া উভয়ে প্রস্থান করিল।
পরে রাজা বর্ম্ম পরিধান পূর্ব্বক খড়গ চর্ম্ম লইয়া বিদেশ যাত্রা করিলেন, আর প্রতিজ্ঞা করিলেন যে পর্য্যন্ত ইহার মর্ম না পাইব সে পর্যন্ত স্বদেশে প্রত্যাগমন করিব না। এই সংকল্প করিয়া ভ্রমণ করিতে করিতে সমুদ্রতীরে বহুপ্রজ এক নগরে উপস্থিত হইলেন এবং দেখিলেন অনেক উত্তম উত্তম অট্টালিকা রহিয়াছে, তাহা নানা জাতীয় রত্নে খচিত, সুতরাং তাহার অতি অপর্ব্ব শােভা হইয়াছে। তদবলােকনে রাজা মনে মনে ভাবিলেন যে রাজার এই রাজধানী, না জানি তিনি কেমল ধনবন্ত হইবেন। এই চিন্তা করিতে করিতে নগরে ভ্রমণ করিতে লাগিলেন, এবং যদিও দিবাবসান হইল তথাপি নগরের প্রান্ত পাইলেন না। সন্ধ্যার সময় রাজা দেখিলেন এক বণিক নতশিরা হইয়া স্বীয় পশ্যালয়ে বসিয়া আছেন। তদ্দষ্টে রাজা তাহার সম্মুখে দণ্ডায়মান হইলেন। বণিক রাজাকে দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন তুমি কে কোন দেশ হইতে কি প্রয়ােজনে এখানে আসিয়াছ এবং কাহার অন্বেষণ করিতেছ। রাজা বলিলেন আমার নাম বিক্রম। আমার মনােবাঞ্ছা এই যে, রাজকর্মে নিযুক্ত হইব, কিন্তু অদ্য রাজার দর্শন পাইলাম না, এই জন্য তােমার স্থানে আসিলাম, কল্য পুনর্ব্বার তাহার নিকটে যাইব, যদি তিনি উচিত বেতন প্রদান করেন তবে তাহার কর্ম্ম স্বীকার করিব। বণিক জিজ্ঞাসা করিলেন তুমি কি বেতন বাঞ্ছা কর। রাজা উত্তর করিলেন আমি প্রতি- দিন লক্ষ মুদ্রা চাহি। বণিক কহিলেন তুমি এমত কি কর্ম্ম করিবে যে প্রতিদিন রাজা তোমাকে লক্ষ মুদ্রা দিবেন। ভূপতি উত্তর করিলেন আমি যাহার নিকট থাকি তাহার সহস্র বিপদ হইলেও তাহাকে উদ্ধার করিবার ক্ষমতা রাখি। বণিক বলিলেন তবে আমি তােমাকে প্রতিদিন লক্ষ মুদ্র। দিব, তুমি আমার নিকটে থাক। ইহা বলিয়া রাজাকে আপন কর্মে নিযুক্ত করিলেন, এবং পরদিন প্রাতে লক্ষ মুদ্রা দিলেন। রাজা ঐ লক্ষ মুদ্র। প্রথমতঃ দুই ভাগ করিয়া এক ভাগ আপন ইষ্ট-দেবতার প্রত্যর্থ উৎসর্গ করিয়া ব্রাহ্মণদিগকে বিতরণ করিলেন। দ্বিতীয় ভাগের একাদ্ধ বৈষ্ণব অনাথ অন্ধ আতুর দিগকে দিলেন, অপরাদ্ধে অন্ন ব্যঞ্জন রন্ধন করাইয়া দীন দরিদ্র ও ক্ষুধাতুর তাবৎ লােককে ভােজন করাইলেন। এই রূপে সকল মুদ্রা। ব্যয় হইল। পরে এক অতিথি আগত হইয়া প্রার্থনা করাতে, রাজা স্বীয় খজ বন্ধক রাখিয়া তাহাকে ভােজন করাইলেন। এবং আপনি চণক চৰ্ষণ করিয়া রজনী বঞ্চন করিলেন।
রাজা বণিকের আলয়ে থাকিয়া নিত্য নিত্য এই প্রকার লক্ষ মুদ্রা ব্যয় করিতে লাগিলেন, তাহাতে অদৃষ্টের পরীক্ষা হইল। তদনন্তর বল পরীক্ষার। বৃত্তান্ত বলিতেছি।
কিয়দ্দিবস পরে ঐ বণিক এক অর্ণবযান প্রস্তুত করিয়া কোন দুর দেশে যাইবার ইচ্ছা করিলেন, এবং বিক্রমাদিত্যকে কহিলেন আমি স্থানান্তরে গমন করিব। বিক্রমাদিত্য বলিলেন আমি প্রতিশ্রুত হইয়াছি যখন তােমার কর্ম্ম উপস্থিত হইবে তখন আমি তােমার সহায়তা করিব, এই কারণ তুমি আমাকে প্রতিপালন করিয়াছ, অতএব তােমার সঙ্গে গমন করা আমার অবশ্য কর্ত্তব্য। এই কথায় বণিক তাহাকে সমভিব্যাহারে লইয়া যাত্রা করিলেন। কিছু দিবস পরে মধ্যসমুদ্রে গমন সময়ে মহাসমীরণ উঠিল। তাহাতে জলযান জলমগ্ন হইবার আশঙ্কায় বণিক ঐ স্থানে লঙ্গর করিয়া থাকিলেন। পরে ঝটিকা নিবৃত্তি হইলে বণিক অজ্ঞা করিলেন লঙ্গর তুলিয়া চল। কিন্তু লঙ্গর জলের মধ্যে মৃত্তিকাতে কেমন বদ্ধ হইয়া গিয়াছিল কেহ উঠাইতে পারিল না, সুতরাং বণিক জীবনাশায় নৈরাশ হইয়া পরমেশ্বরকে স্মরণ করিয়া কহিলেন হে ব্রহ্মাণ্ডপতে, তােম বিনা এ অকূল সমুদ্রে ত্রাণকর্তা কেহ নাই, তুমি অগতির গতি এবং দীন হীনের রক্ষাকর্তা, অতএব আমাদিগকে পরিত্রাণ কর। অনন্তর বিক্রমাদিত্যকে কহিলেন দেখ আমরা এই বিপদ সমুদ্রে পড়িয়াছি, কূল দৃষ্টি হয় না, এখান হইতে গমন করিতে না পারিলে অবশ্যই মৃত্যু হইবে। তুমি অঙ্গীকার করিয়াছিলে আমার বিপদ কালে উদ্ধার করিবে, ইহা অপেক্ষা আর অধিক বিপদ কি আছে, আমরা কালের মুখে পড়িয়াছি, অতএব এই বিপদ হইতে আমাদিগকে উদ্ধার কর। বণিকের এই সকল বাক্য শ্রবণ করিয়া বিক্রমাদিত্য খঙ্গ চর্ম্ম গ্রহণ পূর্ব্বক রজ্জ, ধারণ করিয়া সাগরযানের নিমভাগে জলের মধ্যে ডুবিয়া গেলেন, এবং লঙ্গর উত্তোলন করিবার অনেক কৌশল করিলেন কিন্তু কোন প্রকারে পারিলেন না। তাহাতে তিনি জল হইতে অর্ণবযানে আসিয়া কর্ণধারকে বাদাম তুলিয়া দিতে কহিলেন। কর্ণধার বাদাম উত্তোলন করিলে বিক্রমাদিত্য জলে লম্ফ দিয়া পড়িয়া লঙ্গরের রজ্জ কাটিয়া দিলেন। তাহাতে তৎক্ষণাৎ শ্রোতঃ ও বায়ু সহকারে সাগরযান একবারে উড়িয়া চলিল। বিক্রমাদিত্য সাগরযানে উঠিতে না পারিয়া দৈবনির্ব্বন্ধ ক্রমে সাগরে ভাসিয়া চলিলেন।
এই দুদৈবের পর রাজা এক দ্বীপে উঠিলেন। ঐ দ্বীপে সিংহবতী নামে এক কন্যা থাকিতেন। রাজা নগর-দ্বারে যাইয়া দেখিলেন দ্বারের উপর লেখা আছে রাজা বিক্রমাদিত্যের সহিত সিংহবতীর বিবাহ হইবেক। তদৃষ্টে রাজা অতিশয় বিস্ময় যুক্ত হইলেন। পরে নগর প্রবেশ করিয়া এক অপূৰ্ব অট্টালিকাতে উপস্থিত হইলেন। ঐ অট্টালিকা নারীতে পরিপূর্ণ, পুরুষ মাত্র ছিল না। রাজা দেখিলেন সিংহবতী মণিময় পর্যঙ্কে শয়ন করিয়া আছেন, দাসীগণ প্রহরী স্বরূপ চতুর্দিকে উপবিষ্ট আছে। রাজা পর্যঙ্কে উপবেশন করিয়া সিংহবতীর নিদ্রা ভঙ্গ করিলেন। সিংহবতী গাত্রোখান করিলে পর রাজা তাহার কর ধারণ পূর্ব্বক তাহাকে লইয়া সিংহাসনে বসিলেন। সহচরীগণ সিংহাসনের চতুর্দিকে দণ্ডায়মান হইল। অনন্তর কুসুম-মাল্য আনীত হইল, এবং রাজা বিক্রমদিত্য সিংহবতীকে গন্ধর্ব্ব বিধানে বিবাহ করিলেন। পরে উভয়ে সুখে কাল যাপন করিতে লাগিলেন, এবং চন্দ্রের সহিত কুমুদের যেমন প্রণয় রাজারও সিংহবতীতে সেই প্রকার প্রণয় জন্মিল। রাজা বিক্রমাদিত্য সিংহবতীর প্রেমে প্রমত্ত-চিত্ত হইয়া আপনার রাজ্যপাঠ সকল একবারে বিস্মত হইলেন।
রাজার প্রমত্তভাব দর্শনে সিংহবতীর এক প্রিয়সখী স্বীয় রাজ্ঞীর বিচার ও দয়ার কথা বলিতে বলিতে এক দিবস রাজাকে কহিল হে মানবেন্দ্র তুমি এখানে আসিয়া মায়াজালে বদ্ধ হইয়াছ, এই ভাবে থাকিলে এখান হইতে জীবদ্দশায় কখন প্রস্থান করিতে পারিবে। ইহাতে আমার অন্তঃকরণে অতিশয় দুঃখ জন্মিতৈছে, কেননা তুমি অতি ধর্ম্মাত্মা দাত ও পােপকারী, তােমার নিজ রাজ্যে তােমার অবর্তমানে লক্ষ লক্ষ প্রাণী দুঃখ পাইতেছে। সখীর এই বাক্যে রাজার জ্ঞানােদয় হইল, এবং রাজ্যের চিন্তা করিতে করিতে তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন এখান হইতে প্রস্থানের উপায় কি। সখী উত্তর করিল রাজকন্যার অশ্বশালাতে একটা বড় অশ্বিনী আছে, ঐ অশ্বিনী দিবারাত্র সমান ভাবে গমন করিতে পারে, তুমি সেই অশ্বিনীতে আরােহণ করিয়া প্রস্থান কর, নতুবা যাইবার আর অন্য উপায় নাই।
রাজা পর দিবস রাজ্ঞীর সমভিব্যাহারে অশ্বশালাতে যাইয়া অশ্ব সকল নিরীক্ষণ করিতে করিতে উত্তম উত্তম অশ্বের প্রশংসা করিলেন। রাণী কহিলেন ইহার মধ্যে তােমার যে অশ্বে আরােহণের অভিলাষ হয় তাহাতে আরােহণ করিয়া ভ্রমণ কর। পর দিবস রাজা একটা অশ্বে আবােহণ করিয়া রাণীর সাক্ষাতে অশ্ব চালাইতে লাগিলেন। রাণী তাহা দেখিয়া তুষ্ট হইলেন। এইরূপে কতিপয় দিবস গত হইলে রাজা, দাসীর মুখে যে ঘােটকীর বিবরণ শুনিয়া ছিলেন তাহার পৃষ্ঠে আরােহণ করিলেন। রাণী তাহার অভিপ্রায় না জানিয়া সতর্ক হইতে পারেন নাই। তাহাতে রাজা ঐ অশ্বিনীতে আরোহণ করিয়া কশাঘাত করাতে, অশ্বিনী রাজাকে লইয়া বায়ুবেগে গমন করিল, আর ফিরিল না। রাণী ও সখীগণ অনুতাপ করিতে লাগিলেন।
রাজা অম্ববতী নগরে উপনীত হইয়া দেখিলেন পঞ্চম পুত্তলিকা। নদীতটে এক সিদ্ধ পুরুষ যােগাভ্যাস করিতেছেন। তাহা দেখিয়া তিনি অশ্ব হইতে অবরােহণ পূর্বক তাহাকে প্রণাম করিয়া তন্নিকটে বসিলেন। অনস্তর যখন ঐ সিদ্ধ পুরুষের যােগ সমাধা হইল, তখন তিনি রাজাকে দেখিয়া তুষ্ট হইলেন, এবং এক ছড়া পুষ্পমাল্য তাহার কণ্ঠ দেশে অর্পণ করিয়া কহিলেন, তােমাকে বিজয় মাল্য দিলাম, তুমি এই মাল্য কণ্ঠ দেশে ধারণ করিয়া যে স্থানে গমন করিবে সেই স্থানেই জয়ী হইবে, আর তুমি সকলকে দেখিতে পাইবে, তােমাকে কেহ দেখিতে পাইবে না। তদনন্তর ঐ মহাপুরুষ তাহার হস্তে এক গাছি যষ্টি দিয়া কহিলেন প্রথম প্রহর রজনীতে এই যষ্টি ধারণ করিয়া রত্ন ও স্বর্ণালঙ্কারাদি যাহা চাহিবে তাহা পাইবে। দ্বিতীয় প্রহর রজনীতে এই যষ্টি তােমাকে অতি রূপবতী যুবতী প্রদান করিবেক। তৃতীয় প্রহর রাত্রে এই যষ্টি হস্তে করিলে তুমি সকলকে দেখিবে, কিন্তু তােমাকে কেহ দেখিতে পাইবে না। এবং চতুর্থ প্রহর নিশায় ইহা কাল স্বরূপ হইবে এবং ইহার ভয়ে কোন শত্রু তােমার নিকটবর্তী হইতে পারিবে না।
এই সকল কথা বলিয়া তপস্বী রাজাকে বিদায় দিলেন। রাজা তাহাকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করিয়া উজ্জয়িনী নগরাভিমুখে আসিতে লাগিলেন। নগরের অনতিদূরে উপনীত হইয়া দেখিলেন নগর হইতে এক ভাট ও এক ব্রাহ্মণ আসিতেছে। রাজা তাহাদের নিকটবর্তী হইলে, তাহারা বলিল মহারাজ আমরা বহু-দিবসাবধি আপনার দ্বারস্থ ছিলাম, কিন্তু আমাদিগের গ্রহ বৈণ্য প্রযুক্ত রক্ত হস্তে আসিতেছি। রাজা এই কথা শ্রবণ মাত্র ব্রাহ্মপকে যষ্টি ও ভাটকে মাল্য প্রদান করিয়া, ঐ যষ্টি ও মাল্যের যে যে গুণ তাহা বর্ণন করিলেন। ব্রাহ্মণ ও ভাট উভয়ে অতিশয় আলাদিত হইয়া রাজাকে আশীৰ্বাদ করিয়া বলিল মহারাজ অধুনা তুমি দাতা কর্ণ, তােমার তুল্য দাতা ধরণীতে আর নাই। এই প্রকার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ পূর্ব্বক নানা প্রকার আশীর্বাদ করিয়া ব্রাহ্মণ ও ভাট প্রস্থান করিল। রাজাও আপন আলয়ে আসিলেন।
রাজপুরীতে আসিবামাত্র মন্ত্রী ও আমাত্যবর্গ তন্নিকটে উপস্থিত হইলেন, এবং নগরন্থ তাবৎ প্রজা আনন্দ ধ্বনি করিতে লাগিল। পরে যে দুই ব্যক্তি বল ও অদৃষ্টের তারতম্যাবধারণের প্রার্থনা করিয়াছিল তাহারা রাজার আগমন সংবাদে তন্নিকটে উপস্থিত হইয়া কহিল মহারাজ আপনি যে ছয় মাসের নিয়ম করিয়া ছিলেন তাহা অতীত হইয়াছে, এইক্ষণে আমাদের বিবাদের মীমাংসা করুন। রাজা বলিলেন শুন, অদৃষ্ট বিনা কেবল বল কিছুই করিতে পারে না, এবং বল ব্যতিরেকে অদৃষ্ট দ্বারা সম্পূর্ণ উপকার হয়না। অতএব বল ও অদৃষ্ট উভয়ই তুল্য। এই কথা শুনিয়া ঐ দুই ব্যক্তি বিবাদে ক্ষান্ত হইয়া স্ব স্ব স্থানে প্রস্থান করিল।
পুত্তলিকা কহিল মহারাজ তােমাকে এই বিবরণ কহিবার অভিপ্রায় এই যে, তুমি ইহা শ্রবণ করিয়া সিংহাসন আরােহণের মানস পরিত্যাগ কর, যেহেতু রাজা বিক্রমাদিত্যের তুল্য ক্ষমতাবান, ও সদালালঙ্কৃত ব্যক্তিই এই সিংহাসনে বসিবার যােগ্য। তুমি তদুপযুক্ত নহ। এই কথা বলিতে বলিতে সিংহাসনে উপবেশন করিবার কাল অতীত হইল। পরদিবস রাজা পুনর্ব্বার সিংহাসনারােহণার্থ আগমন করিলে,
কামকন্দলা ষষ্ঠ পুত্তলিকা
হাসিতে হাসিতে বলিল, হে ভােজরাজ, রাজা বিক্রমাদিত্য যে সিংহাসনে বসিতেন, তুমি তাহাতে কি সাহসে বসিতে বাসনা কর, তুমি কি আপনার দুর্বুদ্ধি বিবেচনা করিয়া দেখনা, তােমার দুর্বুদ্ধি দর্শনে আমার অন্তঃকরণে দুঃখােদয় হইতেছে। যিনি বিক্রমাদিত্যের তুল্য সৰ্বগুণ সম্পন্ন, তিনিই এই সিংহাসনােপবেশনের উপযুক্ত পাত্র। রাজা বলিলেন বিক্রমাদিত্য এমত কি গুণের কর্ম্ম করিয়া ছিলেন। কামকলা কহিল তাহ কহিতেছি, শ্রবণ কর।
এক দিবস রাজা সভাতে বসিয়া আছেন এমত সময়ে এক ব্রাহ্মণ আসিয়া বলিলেন মহারাজ উত্তর। দিকে অতিদুরে এক অরণ্য আছে, তাহার পরে এক পবব্ত আছে, এবং তাহার পরে এক সরােবরে একস্ফটিকের স্তম্ভ আছে। ঐ স্তম্ভ সুর্য্যোদয় কালে সরােবর হইতে উচ্চ হইতে আরম্ভ হয় এবং সুর্য্য যেমন উর্ধে গমন করেন স্তম্ভও সেই প্রকার ক্রমশঃ উর্ধে বৃদ্ধি পাইতে থাকে, মধ্যারুকালে তাহা সুর্য্যরথের নিকটবর্তী হয়, তখন সূর্য্যদেব রথ স্থগিত করিয়া স্তম্ভের উপর গিয়া আহার করেন। পরে যথােপরি আরোহণ করিলে, রথ যেমন গমন করে স্তম্ভও ক্রমে ক্রমে তেমনি হ্রস্ব হইয়া সন্ধ্যার সময় পুষ্করিণীতে একবারে লীন হয়। এই আশ্চর্য স্তম্ভ এখন পর্যন্ত কেহ দেখেন নাই। অন্যে কি, দেবতা বা গন্ধর্ব্ব ইহারাও তাহার সমাচার জানেন না।
রাজা ব্রাহ্মণের স্থানে এই কথা শুনিয়া তাহা কাহারও সাক্ষাতে প্রকাশ না করিয়া, ব্রাহ্মণকে কিছু অর্থ প্রদানপূর্বক বিদায় করিলেন। পরে তাল বেতালকে স্মরণ করিলেন। তাহারা উপস্থিত হইয়া কহিল মহারাজ কিঙ্করেরা উপস্থিত, আমাদিগের প্রতি কি আজ্ঞা হয়। স্বর্গ পাতাল বা সমুদ্র-পার যেখানে ইচ্ছা হয়, আজ্ঞা করুন, আমরা সেই খানে আপনাকে লইয়া যাইতেছি। রাজা ঈষদ, হাস্য পূর্বক বলিলেন এক কৌতুক দর্শনে উত্তর খণ্ডে গমন করিতে হইবে, তথায় তােমরা আমাকে লইয়া চল। ইহা বলিয়া রাজা তাহাদিগের স্কন্ধে আরােহণ করিলেন। তাল বেতাল তাহাকে স্কন্ধে লইয়া শূন্য দিয়া মুহু ত্তেকের মধ্যে সেই স্থানে উপস্থিত হইল। দেখিলেন সরােবরের চারি দিকে চারি পাষাণময় ঘাট আছে, হংস ও বক প্রভৃতি নানা জাতীয় জলচর পক্ষিগণ আনন্দে ক্রীড়া করিতেছে, ডাহুক চকোর প্রভৃতি অন্যান্য বিহঙ্গমেরা নানাবিধ মধুর ধ্বনি করিতেছে, প্রফুল্ল কমল দল মধ্যে ভ্রমরগণ ভ্রমণ করিতেছে, কোকিলগণ কুহু কুহু ধ্বনি করিতেছে, আর আর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মধুরালাপী পক্ষিগণ নানা প্রকার গান করিতেছে, গন্ধবহ কুসুম সমূহের সুগন্ধ বহন পূর্ব্বক চারি দিক আমােদিত করিয়াছে, সরােবর-তীরস্থ তরুগণ ফলভরে অবনত হইয়া আছে, এবং নানা জাতীয় পক্ষী তাহাতে বসিয়া কৌতুকে আহার বিহার করিতেছে।
রাজা, এই মনােহর শােভা দর্শনে অত্যন্ত আনন্দিত হইয়া, সেই সরসী তীরে যামিনী যাপন করিলেন। নিশাবসানে ভানুদয় হইলে দেখিলেন ব্রাহ্মণ যে স্তম্ভের কথা কহিয়া ছিলেন সেই স্তম্ভ সরােবর হইতে উঠিতে লাগিল। তখন রাজা তাল বেতালকে কহিলেন আমাকে ঐ স্তম্ভের উপর স্থাপন করিয়া তোমরা প্রস্থান কর। তাল বেতাল আজ্ঞা মাত্র রাজাকে স্তম্ভোপরি রাখিয়া অন্তর্হিত হইল। ঐ স্তম্ভ ক্রমে ক্রমে জল হইতে উচ্চ হইতে লাগিল। তাহাতে রাজার অন্তঃকরণে ত্রাস জন্মিতে লাগিল, এবং তিনি সুর্য্যের যত নিকটবর্তী হইতে লাগিলেন তুতই তাঁহার উত্তাপে তাপিত হইয়া দগ্ধ-কলেবর হইতে লাগিলেন। অবশেষে ঐ উত্তাপে শরীর একবারে দগ্ধ হইয়া অঙ্গার বর্ণ হইল।
অনন্তর যখন স্তম্ভ রথের সমান উচ্চ হইল তখন সারথি স্তম্ভোপরি দগ্ধ দেহ দর্শন করিয়া, রথ স্থগিত করাতে অশ্বগুলা লম্ফ দিয়া উঠিল। তাহাতে সুর্য্যদেব চেতন প্রাপ্ত হইয়া দেখিলেন স্তম্ভের উপর এক শব পড়িয়া আছে। তদ্দষ্টে বিস্ময়াপন্ন হইয়া কহিলেন একি আশ্চর্য্য, মনুষ্যের এরূপ সাহস কখন হইতে পারেনা, এব্যক্তি দেবতা কিম্বা গন্ধর্ব্ব অথবা তপস্বী হইবেক, যাহা হউক স্তম্ভোপরি এই মৃতদেহ থাকিতে ভােজন করা হইতে পারে না। ইহা কহিয়া রাজার শরীরে অমৃত সেচন করিলেন। তাহাতে রাজা রাম নাম উচ্চারণ পূর্ব্বক গাত্রোত্থান করিলেন, এবং সুর্য্য দেবকে সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাত পূর্ব্বক করপুটে বলিলেন হে দিবাস্বামিন, আমি কত পুণ্য করিয়াছি যে তাহার ফলে এ শরীর ধারণে আপনার চরণ দর্শন করিলাম। সংসারে সকলেই আপনার দর্শনে ইচ্ছা করেন, কিন্তু যাহার প্রতি আপনি প্রসন্ন হয়েন কেবল সেই ব্যক্তিই আপনাকে দেখিতে পায়। আমার জীবন সার্থক হইল। সূর্য্যদেব জিজ্ঞাসা করিলেন তুমি কে, তােমার নাম কি, তােমাকে দেখিয়া আমার অন্তঃকরণে ত্রাস। জন্মিতেছে। রাজা বলিলেন হে স্বামিন, আমি অম্বাবতী নগরীয় গন্ধর্ব্বসেন রাজার পুত্র, আমার নাম বিক্রমাদিত্য। আমি এক ব্রাহ্মণের স্থানে আপনার কথা শুনিয়া আপনার চরণ দর্শনার্থ আসিয়াছি। এক্ষণে আপনার কৃপায় আমার মনস্কামনা সিদ্ধ হইল, আজ্ঞা হউক বিদায় হই। ইহা শুনিয়া সুর্য্যদেব সন্তুষ্ট হইয়া আপনার কুণ্ডল রাজাকে দিলেন, আর বলিলেন ইহা পরিধান করিলে প্রতিদিন শতভার সুবর্ণ প্রাপ্ত হইবে, আর এখন অবধি নিঃশঙ্কে রাজ্য করিতে পারিবে। তদনন্তর সূর্য্যদেবের রথ গমন করিতে লাগিল, স্তম্ভও ক্রমে ক্রমে নত হইয়া দিবা অবসান হইল। স্তম্ভ জলমগ্ন হইবার কিঞ্চিৎকাল পূর্বে রাজা তাল বেতালকে স্মরণ করিলেন। তাহারা উপস্থিত হইলে রাজা তাহাদের স্কন্ধারােহণ পূর্ব্বক স্ববাসে গমন করিলেন।
অনন্তর যখন রাজা নগর প্রবেশ করেন তখন এক সন্ন্যাসী তাহার সম্মুখে উপস্থিত হইল। ঐ সন্ন্যাসী যােগবলে জানিয়াছিল রাজা সুর্যের কুণ্ডল প্রাপ্ত হইয়াছেন, অতএব রাজাকে বলিল মহারাজ তুমি যে কুণ্ডল পাইয়াছ তাহা আমাকে দান কর, তাহাতে আমার বিস্তর উপকার হইবেক। এই প্রার্থনায় রাজা ঈষদ, হাস্য করিয়া তখনি তাহাকে কুণ্ডল প্রদান করিয়া আহলাদ পূর্ব্বক স্বভবনে গমন করিলেন।
কামকন্দলা এই কথা সমাপন করিয়া ভােজরাজকে কহিল হৈ নৃপতে যদি তােমার এতদ্রুপ ক্ষমতা ও বদান্যতা থাকে তবে সিংহাসনা রূঢ় হও। এই কথায় রাজা ক্ষুব্ধ হইয়া সে দিবস সিংহাসনােপবেশনে ক্ষান্ত থাকিলেন। পরিদবস বররুচি মন্ত্রীকে আহ্বান করিয়া কহিলেন অদ্য আমি কাহারাে নিষেধ শুনিব না, সিংহাসনে বসিব। কিন্তু যখন সিংহাসনে উপবেশনার্থ পাদ প্রসারণ করিলেন, তখন
কামুদী সপ্তম পুত্তলিকা
রাজার পদার্থে পতিত হইল। রাজা বিস্ময় যুক্ত হইয়া পাদ সংহার পূর্বক পুত্তলিকাকে কহিলেন তুমি কি জন্য ভূমিতে পড়িলে। পুত্তলিকা কহিল আমরা সতা যুগের অবলা, তুমি কলিযুগে অবতীর্ণ হইয়াছ। আমরা এক পুরুষের মুখাবলােকন করিয়াছি, তদ্ভিন্ন অন্য কাহারও মুখ দর্শন করি নাই, অতএব প্রথমতঃ আমাদিগের বিবরণ শ্রবণ কর। বিশ্বকর্ম্মা আমাদের জন্মদাতা। আমরা বাহুবল রাজার নিকটে বাস করিতাম, তিনি আমাদিগকে রাজা বিক্রমাদিত্যকে অর্পণ করিয়া ছিলেন। এবং রাজা বিক্রমাদিত্য আমাদিগকে গৃহে আনিয়া রাখিয়াছিলেন। যে পর্যন্ত তাহার সহিত আমাদের বিচ্ছেদ হইয়াছে সে পর্যন্ত আমরা একবার সুখী নহি, কেননা ততুল্য অতুল্য গুণশালী মনুষ্য দুল্লভ।ভোজরাজ বলিলেন বিক্রমাদিত্যের কি গুণ ছিল তাহা বর্ণন কর। পুত্তলিকা কহিল।
এক দিবস রজনীতে রাজা বিক্রমাদিত্য স্বীয় শয়নমন্দিরে শয়ন করিয়াছিলেন, এবং নগরস্থ সমস্ত লােক এমত নিদ্রিত হইয়া ছিল যে কাহারও কিছুমাত্র শব্দ ছিলনা। ঐ নিশীথ সময়ে নদীর উত্তরাংশে এক স্ত্রী অতি উচ্চৈঃ স্বরে রােদন করিতে ছিল। তাহার ক্রন্দন ধ্বনি রাজার কর্ণকুহরে প্রবিষ্ট হইলে, রাজা মনে মনে কহিলেন আমার নগরে কোন্ দুঃখিনী আসিয়া এত রাত্রে এই প্রকার রােদন করিতেছে। ইহা বলিয়া রাজা খজ চর্ম গ্রহণ পূর্ব্বক রােদনধ্বনি লক্ষ্য করিয়া নদীতটে গমন করিলেন, এবং সন্তরণ দ্বারা নদী পার হইয়া দেখিলেন এক পরম সুন্দরী যুবতী দণ্ডায়মান হইয়া রােদন করিতেছে। ঐ যুবতীর সন্নিকট গমন করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, হে সুন্দরি তুমি কি জন্য রােদন করিতেছ, তােমার স্বামি-বিয়োেগ, কি পুত্র-শােক, হইয়াছে আমাকে বল। যুবতী কহিল আমার স্বামী চৌর্য কর্ম্ম করিতেন। পরে নগরপাল তাহাকে ধরিয়া শূল দান করিয়াছে, আমি প্রণয় বশতঃ তাহার নিমিত্ত কিঞ্চিৎ আহারীয় দ্রব্য আনিয়াছি, কিন্তু স্বামী স্তম্ভের উপরে আছেন, আমি নানা যত্ন করিয়া ও তাহাকে দিতে পারিতেছি না, এই জন্য রােদন করিতেছি। রাজা কহিলেন এ সামান্য কথা, ইহার জন্য রােদনের আবশ্যক কি। নারী কহিল এই সামান্য কর্ম্মই আমার পক্ষে দুষ্কর হইয়াছে। রাজা বলিলেন তুমি আমার স্কন্ধে আরােহণ করিয়া তােমার স্বামীকে ভােজন করাও। এই কথায় যুবতী রাজার স্কন্ধে আরােহণ করিয়া শূলস্থ চোরের মাংস ভক্ষণ করিতে লাগিল, তাহাতে তাহার মুখ হইতে রক্ত দ্বারা নির্গত হইয়া রাজার তাবৎ বস্ত্র ও অঙ্গ শােণিতময় হইল। তাহাতে রাজা মনে মনে ভাবিতে লাগিলেন এই নারী সামান্য নারী নহে, অবশ্য কোন মায়াধারিণী হইবেক, আমাকে প্রতারণা করিল। ইহা ভাবিতে ভাবিতে রাজা তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, ললনে, তােমার প্রিয় ভােজন করিতেছেন কি না। নারী বলিল হা, ইনি আহার করিলেন, ইহার উদর পরিপূর্ণ হইয়াছে, এই ক্ষণে তুমি আমাকে স্কন্ধ হইতে অবতরণ করাও। রাজা তাহাকে ভূমিতে নামাইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন কেমন, তৃপ্তি পূর্ব্বক আহার হইল কি না। যুবতী হাস্য করিয়া বলিল আমি কস্কালিনী, তােমার প্রতি তুষ্ট হইয়াছি, তুমি বরপ্রার্থনা কর, আমাকে ভয় করিওনা। রাজা বলিলেন আমি তােমাকে কি জন্য ভয় করিব, এবং তুমি আমার স্কন্ধে আরােহণ করিয়া শবাহার করিলে অতএব তােমার স্থানে কি বর চাহিব। কঙ্কালিনী কহিল আমি যাহাই করিয়া থাকি তাহা চিন্তা করিয়া কি করিবে, তােমার যে বর বাঞ্ছা হয় আমার স্থানে প্রার্থনা কর। রাজা বলিলেন যদি আমাকে অন্নপূর্ণা দান করিতে পার তবে প্রার্থনা করি। কঙ্কালিনী উত্তর করিল অন্নপূর্ণা আমার কনিষ্ঠা সহােদরা, তুমি আমার সঙ্গে আইস, আমি তােমাকে অন্নপূর্ণা দান করিব।
ইহা বলিয়া কঙ্কালিনী রাজা বিক্রমাদিত্যকে নদীতীরে লইয়া গেল, এবং তত্রস্থ এক দেবালয়ের দ্বারে দণ্ডায়মান হইয়া করতালি দিল। তাহাতে দ্বার মুক্ত হইয়া অন্নপূর্ণা নির্গত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন এ ব্যক্তি কে। কঙ্কালিনী কহিল ইনি রাজা বিক্রমাদিত্য, ইনি আমার সেবা করিয়াছেন এজন্য আমি ইহার প্রতি তুষ্ট হইয়া অঙ্গীকার করিয়াছি ইহাকে অন্নপূর্ণ। দনি করিব, অতএব যাহাতে আমার সত্য রক্ষা হয় তাহা কর। এই কথায় অন্নপূর্ণা হাস্য করিয়া রাজার হস্তে একটা ঝলী দিয়া কহিলেন তােমার যখন যে আহারীয় দ্রব্যের প্রয়ােজন হইবে তাহা এই ঝলী হইতে পাইবে।
রাজা এই ভক্ষপ্রদ অমূল্য ঝলী পাইয়া মহা আনন্দে তথা হইতে বিদায় হইলেন। পরে প্রাতঃ- কালে নদীতে স্নানাত্নিক করিয়া সচ্ছদচিত্ত হইয়াছেন এমত সময়ে এক ব্রাহ্মণ তাহার সম্মুখে উপস্থিত হইলেন। রাজা তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, আপনার কিছু আহারের ইচ্ছা আছে। বিপ্র কহিলেন হাঁ আমার অত্যন্ত ক্ষুধা হইয়াছে, যদি কিছু আহারীয় সামগ্রী পাই তবে ভক্ষণ করি। রাজা পুনৰ্বার জিজ্ঞাসা করিলেন কি আহার করিতে বাঞ্ছা হয়। ব্রাহ্মণ বলিলেন পান্ন ভােজনে পূহা হইতেছে। তাহা শুনিয়া রাজা মনে মনে ভাবিতে লাগিলেন যদি প্রকৃাম দিতে পারি তবে মিথ্যাবাদী হইব। ইহা চিন্তা করিয়া ঝলীর মধ্যে হস্তাৰ্পণ করিলেন এবং হস্ত বাহির করিয়া দেখিলেন পৰ্কাই নির্গত হইয়াছে। ঐ পায়ে ব্রাহ্মণের উদর পরিপূর্ণ হইল। আহারান্তে ব্রাহ্মণ বলিলেন আমি ভােজন করিলাম, এইক্ষণে কি দক্ষিণ দিবে দাও। রাজা বলিলেন কি দক্ষিণ চাহ। ব্রাহ্মণ বলিলেন যদি আমাকে ঐ ঝলীটী দাও তবে আমি পরমানন্দিত হই। রাজা তৎক্ষণাৎ ব্রাহ্মণকে ঝলী প্রদান করিয়া গৃহে আসিলেন।
পুত্তলিকা এই আখ্যায়িকা সমাপন করিয়া ভােজরাজকে কহিল মহারাজ দেখ, রাজা বিক্রমাদিত্য এবস্তৃত ক্লেশে যে অন্নপূর্ণার ঝলী পাইলেন তাহা অনায়াসে ব্রাহ্মণকে দিলেন। যদি তােমার এমত সাহস ও বদান্যতা থাকে তবে সিংহাসনে উপবেশন কর, নতুবা পাপগ্রস্ত হইবে। এই প্রকারে সে দিবস অতীত হইল। পরদিবস রাজা পুনর্ব্বার সিংহাসনােপবেশন জন্য আগমন করিলে,
পুহুপাবতী অষ্টম পুত্তলিকা
বলিল মহারাজ তুমি সিংহাসনােপবেশনের যে মানস করিয়াছ তাহা পরিত্যাগ কর। রাজা বলিলেন কিজন্য ত্যাগ করিব। পুত্তলী বলিল। এক দিবস রাজা বিক্রমাদিত্য সভায় উপবিষ্ট আছেন এমত সময়ে এক সূত্রধর আসিয়া রাজাকে সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাত পূর্ব্বক কহিল মহারাজ আমি আপনাকে দর্শন করিতে আসিয়াছি, এবং আপনার জন্য এক ভেট আনিয়াছি। রাজা বলিলেন কি আনিয়াছ লইয়া আইস। এই কথায় সুত্রধর এক কাষ্ঠময় অশ্ব আনিয়া রাজার সম্মুখে স্থাপন করিল। রাজা জিজ্ঞাসা করিলেন এই কাষ্ঠময় অশ্বের কি গুণ। সুত্রধর কহিল এই অশ্ব কিছু আহার ও পান করেনা, অথচ সমুদ্রীয় অশ্বের ন্যায় যেখানে ইচ্ছা সেখানে লইয়া যাইতে পারে। যখন সূত্রধর রাজাকে এই কথা বলিতেছে তখন অশ্ব আস্ফালন ও নৃত্যারম্ভ করিল। রাজা তাহা দেখিয়া মনে মনে তুষ্ট হইলেন, এবং সুত্রধরকে বলিলেন ইহাকে প্রাঙ্গণে লইয়া গিয়া ইহার গুণ প্রদর্শন করাও। সুত্রধর এই কথায় অশ্বারােহণ করিয়া তাহার পৃষ্ঠে কশাঘাত করিল, তাহাতে কাষ্ঠময় অশ্ব এমত বেগে দৌড়িল যে ধূলি ব্যতিরেকে আর কিছু দৃষ্টি গােচর হইলনা। রাজা অশ্বের এই গুণ দর্শন করিয়া মন্ত্রীকে আজ্ঞা করিলেন সুত্রধরকে এক লক্ষ মুদ্রা প্রদান কর। মন্ত্রী কহিলেন মহারাজ ইহা কাষ্ঠময় ঘােটক, ইহার জন্য এক লক্ষ মুদ্রা দেওয়া অনুচিত। রাজা আজ্ঞা করিলেন তবে দুই লক্ষ মুদ্রা দাও। মন্ত্রী মনে মনে ভাবিলেন ইহার পরে আর কোন কথা কহিলে আরাে অধিক অর্থ দিতে আজ্ঞা করিবেন, তাহা উচিত নহে। অতএব আর কোন উত্তর না করিয়া তৎক্ষণাৎ সুত্রধরকে দুই লক্ষ মুদ্রা দিলেন। সুত্রধর ঐ মুদ্রা পাইয়া স্বস্থানে গমন করিল। কিন্তু গমন কালে রাজাকে এই কথা বলিয়া গেল “মহারাজ অদৃষ্টের লিখন কখন খণ্ডন হয় না, তথাপি যৎকালে আপনি এই অশ্বে আরােহণ করিবেন তখন পদাঘাত বা কশাঘাত করিবেন না,,।
সুত্রধরের গমনের পর রাজভূতেরা অশ্বকে অশ্বশালায় বন্ধন করিয়া রাখিল। কয়েক দিবস পরে রাজা ঐ অশ্বকে আনয়ন করিতে আজ্ঞা করিলেন। অশ্ব আনীত হইলে রাজা সভাসদগণকে বলিলেন তােমরা এই অশ্বে আরােহণ কর। সভাসদ গণ পরস্পর মুখাবলােকন করিতে লাগিল, এবং অশ্বের অস্থিরতা দেখিয়া কেহই আরােহণ করিতে সাহস পাইল না। রাজা তাহাতে কুপিত হইয়া কহিলেন। তােমরা কেহ অশ্বারােহণ করিতে পারিলে না, অশ্ব। সজ্জিত করিয়া আন, আমি আপনি আরােহণ করিতেছি। ইহা বলিবামাত্র তাহারা তৎক্ষণাৎ অশ্ব সুসজ্জিত করিয়া আনিল। রাজা অশ্বে আরােহণ করিয়া চালাইবার বিস্তর চেষ্টা করিলেন, কিন্তু কোন প্রকারে আত্মবশে রাখিতে পারিলেন না। তখন, সূত্রধরের কথা বিস্মৃত হইয়া কশাঘাত করিলেন, তাহাতে তুরঙ্গ তড়িতের ন্যায় এমত বেগে দৌড়িল যে একবারে রাজাকে সমুদ্র-পারে এক নিবিড় অরণ্য মধ্যে লইয়া গিয়া এক বৃক্ষের উপর নিক্ষেপ করিয়া চলিয়াগেল। রাজা বৃক্ষ হইতে ভূমিতে পড়িয়া তৎক্ষণাৎ অজ্ঞানাভিভূত হইলেন। কিয়ৎকাল পরে চেতনা হইলে তিনি খেদ করিতে করিতে কহিলেন, হায় কোন নির্জন নিৰ্বান্ধব অরণ্যে আসিয়া পড়িলাম, দেশ নগর রাজধানী বন্ধু বান্ধব পরিবার বর্গ কোথায় থাকিল, দেখি ইহার পরেই বা কি ঘটে।
এই চিন্তা করিতে করিতে রাজা তথা হইতে গাত্রোথান করিয়া অরণ্যের এমত নিবিড়তর প্রদেশে প্রবিষ্ট হইলেন যে তথা হইতে পুনৰ্বার নির্গত হওয়া দুর্ঘট হইল। কিন্তু অনেক ক্লেশে দশ দিবসে সাত ক্রোশ মাত্র পথ ভ্রমণ করিয়া পুনর্ব্বার আর এক বনে পড়িলেন। ঐ অরণ্যও বিবিধ বন্য বৃক্ষাদিতে এমত আচ্ছন্ন ও তিমিরময় যে সম্মুখের দ্রব্যও নয়নােচর হয় না। ঐ বন শূকর গণ্ডার ব্যাট্রাদি নানা জাতীয় হিংস্র জন্তুতে পরিপূর্ণ। এই সকল পশ্বদির ভয়ানক গর্জনে রাজার শরীরে রােমাঞ্চ জন্মিল, এবং শশাণিত শুষ্ক হইতে লাগিল। তিনি কখন পূর্ব্ব, কখন পশ্চিম, কখন উত্তর, কখন বা দক্ষিণাভিমুখে গমন করিতে লাগিলেন, কিন্তু কোন দিকে পথ পাইলেন না। এইরূপে মহাশঙ্কায় পঞ্চদশ দিবস ভ্রমণ করিতে করিতে এক স্থানে গিয়া দেখিলেন তথায় এক অট্টালিকা ও তদ্বহিভাগে এক উচ্চ মহীরুহ এবং তাহার দুই পাশ্বে দুই কূপ আছে, বৃক্ষোপরি এক বানরী বসিয়া আছে, সে কখন বৃক্ষ হইতে অবরোহণ, কখন বৃক্ষ শাখায় আরােহণ করিতেছে। রাজা এই কৌতুক দর্শন করণানন্তর, নিকটবর্তী আর এক বৃক্ষে আরােহণ করিয়া দেখিলেন পূর্বোক্ত অট্টালিকার মধ্যে এক মণিময় পর্য্যঙ্ক এবং সুখভােগের আর আর তাবৎ দ্রব্য রহিয়াছে। ইহা দেখিয়া মনে মনে ভাবিলেন এইক্ষণে আপনাকে প্রকাশ করা পরামর্শ সিদ্ধ নহে, এইখানে কি হয় তাহা প্রথমতঃ দেখা যাউক, তাহার পরে যাহা কর্ত্তব্য করিব। ইহা স্থির করিয়া রাজা বৃক্ষোপরে থাকিলেন।
বেলা দুই প্রহরের সময় এক তপস্বী আসিয়া পূর্বোক্ত বৃক্ষের বাম পাশ্বস্থ কূপ হইতে ৰারি উত্তোলন করিল। তখন বানরী বৃক্ষ হইতে অবতীর্ণ হইলে যােগী এক গণ্ডুষ জল তাহার গাত্রে নিক্ষেপ করিল, তাহাতে সেই বানরী পরম সুন্দরী যুবতী হইল। যােগী তাহাকে অট্টালিকাতে লইয়া গিয়া তাহার সঙ্গে বিলাস করিতে লাগিল। তৃতীয় প্রহরের সময়ে তপস্বী দক্ষিণ পাশ্বস্থ কূপ হইতে জল উত্তোলন করিয়া এক গণ্ডুষ জল ঐ নারীর শরীরে প্রেক্ষণ করিল, তাহাতে সেই নারী বানরী হইয়া বৃক্ষোপরে উঠিল, যােগীও যােগ সাধন জন্য গিরি গহ্বরে প্রবিষ্ট হইল।
এতাবৎ অবলােকন করিয়া রাজা গুপ্ত স্থান হইতে বহির্গত হইয়া বাম পাশ্বস্থ কূপ হইতে বারি উত্তোলন পূর্ব্বক বানরীর অঙ্গে নিক্ষেপ করিলেন। তাহাতে বানরী এমত সৰ্বাঙ্গসুন্দরী যােড়শী হইল যে ইন্দ্রের অপ্সরাও ততুল্য নহে। কিন্তু সে রাজাকে দেখিয়া লজ্জাম্বিতা ও অপােবদনা হইল। রাজা তাহার অলোকিক রূপ দর্শনে বিচলিত চিত্ত হইয়া তাহাকে আপনার নিকটে বসাইলেন। কামিনী সহাস্য আস্তে রাজাকে কহিল আমি তপস্বিনী, আমার প্রতি কুদৃষ্টি করিওনা, কেননা আমি অভিসম্পাত করিলে তুমি ভস্মরাশি হইবে। রাজা কহিলেন আমার নাম বীর বিক্রমাদিত্য, এবং তাল বেতাল আমার আজ্ঞাকারী, অতএব আমি কাহাকে শঙ্কা করি না, তােমার শাপে আমার কিছু হইবেক না। বিক্রমাদিত্যের নাম শ্রবণ মাত্র নারী তাহার পাদ বন্দন পূর্ব্বক কহিল মহারাজ তুমি নরের ঈশ্বর, আমার উপদেশ শুন, শীঘ্র এ স্থান হইতে প্রস্থান কর, নতুবা যােগী আসিয়া দেখিলে তাহার কোপানলে উভয়ে ভস্ম হইব। রাজা কহিলেন তাহাকে কি ভয়, আমি তাহার সম্মুখবর্তী হইয়া সংগ্রামে প্রস্তুত আছি, কিন্তু স্ত্রীহত্যা হইলে পরকালে নরক ভােগ হইবে ইহাই চিন্তার বিষয়। অনন্তর রাজা নারীকে পরিচয় জিজ্ঞাসা করিলেন।
নারী কহিল আমি কামদেবের কন্যা, আমার নাম পুহুপাবতী, আমি যখন দ্বাদশ-বৎসর-বয়স্কা তখন পিতার কোন আজ্ঞা উল্লঙ্ন করিয়া ছিলাম, তজ্জন্য পিতা মাতা উভয়ে কুপিত হইয়া আমাকে এই যােগির হস্তে অৰ্পণ করিয়াছিলেন, তদবধি সন্ন্যাসী আমাকে আনিয়া বানরী করিয়া রাখিয়াছে। আমি এই অবস্থাতে কয়েক বৎসর এই অরণ্যে বাস করিতেছি। অদৃষ্টে যাহা লেখা আছে তাহা কেহই খণ্ডন করিতে পারিবে না ইহা ভাবিয়া আমি নিশ্চিন্ত আছি। রাজা বলিলেন আমি তােমাকে লইয়া যাইতে বাসনা করি। কামিনী উত্তর করিল সে আমার পরম সৌভাগ্য, কিন্তু তুমি সমুদ্র-পারে বাস কর, অতএব কি প্রকারে আমাকে লইয়া যাইবে। রাজা কহিলেন সেজন্য চিন্তা কি, আমি তােমাকে অনায়াসে লইয়া যাইব, তুমি কিছু জানিতে পারিবে না।
এইরূপ কথোপকথন করিতে করিতে অতি আনন্দে রজনী প্রভাত হইল। প্রত্যুষে রাজা দক্ষিণ কূপ হইতে জল উত্তোলন করিয়া তাহার গাত্রে প্রেক্ষণ করিলেন। তাহাতে সে পুনরায় বানরী হইয়া বৃক্ষারােহণ করিল। রাজা লুক্কায়িত ভাবে থাকিলেন। তৎপরেই তপস্বী উপস্থিত হইয়া পূর্ব প্রকরণানুসারে তাহাকে নরদেহ প্রাপ্ত করাইয়া তাহার সঙ্গে বিলাস ভবনে উল্লাস করিল। পরে যােগীর গমনকালে নারী কহিল মহাশয় আমার এক প্রার্থনা আছে, আপনি আমার প্রতি প্রসন্ন হইয়া আমাকে আপনার অনুগ্রহের চিত্ন স্বরূপ কিছু দেউন। তপস্বী এই বাক্যে সন্তুষ্ট হইয়া তাহাকে এক পদ্ম পুষ্প প্রদান পূর্ব্বক কহিল এই পুষ্প হইতে প্রতিদিন এক এক মাণিক্য পাইবে, এবং এ পুষ্প কখন শুষ্ক হইবে ক না। অতএব ইহা যত্নপূর্ব্বক রাখিও। পুহুপাবতী অত্যন্ত আনন্দিত হইয়া ঐ পদ্ম আপন বক্ষঃস্থলে রাখিল। তদনন্তর সন্ন্যাসী তাহাকে বানরী অবস্থায় রাখিয়া প্রস্থান করিলে, রাজা তাহাকে কূপােদক দ্বারা পুনর্ব্বার মনুষ্যাকার ধারণ করাইলেন। পরে সে রাজাকে ঐ পদ্ম পুষ্প দেখাইয়া কহিল ইহা অতি অদ্ভুত সামগ্রী, ইহা হইতে প্রতিদিন এক এক মাণিক্য উৎপত্তি হয়। রাজা কহিলেন ইহা আশ্চর্য্য নহে, সৰ্বশক্তিমান, পরমেশ্বরের ইচ্ছায় কি না হইতে পারে। এই প্রকার কথােপকথন ও অন্যালাপে সে রজনীও সুখে যাপন হইল। ভাতে ঐ পুষ্প হইতে এক মাণিক্য নির্গত হইল। তাহা উভয়ে দেখিলেন, পরে রাজা কহিলেন এখানে বাস করা আর উচিত নহে, তুমি আমার সঙ্গে আইস, আমি তােমাকে আপন দেশে লইয়া যাইতেছি। পুহুপাবতী কহিল মহারাজ আমি শুনিয়াছি তুমি অত্যন্ত দাতা, তাহাতে আমার এই আশঙ্কা হইতেছে পাছে তুমি আমাকে লইয়া গিয়া অন্য কোন ব্যক্তিকে দান কর। অতএব তুমি অগ্রে অঙ্গীকার কর, আমাকে কাহাকে দান করিবে না, আমি দাসী। হইয়া যাবজ্জীবন তােমার চরণ সেবা করিতে পাইব। রাজা বলিলেন তাহা কি কখন হইতে পারে, আপন নারী কে কাহাকে দিয়া থাকে, তাহা লােক ও ধর্ম্ম বিরুদ্ধ। তাহাকে এই প্রকার প্রবােধ দিয়া রাজা তাল বেতালকে স্মরণ করিলেন। তাল বেতাল উপস্থিত হইলে, আজ্ঞা করিলেন আমাকে স্বদেশে লইয়া চল। ইহা বলিয়া রাজা কামিনীকে লইয়া সিংহাসনে উপবিষ্ট হইলেন। তাল বেতাল সিংহাসন সমেত তাহাদিগকে স্কন্ধে লইয়া বায়ুবেগে রাজধানীতে প্রস্থান করিল। অনন্তর তপস্বী আসিয়া প্রাণধিক প্রিয়াকে না দেখিয়া খেদ সাগরে মগ্ন হইল।
রাজা আপন রাজধানীতে উপনীত হইয়া সিংহাসন হইতে অবরােহণ করিয়া ঐ নারীর হস্ত ধারণ পূর্ব্বক অন্তঃপুরে গমন করিলেন। কিন্তু গমন কালে দেখিলেন পথিমধ্যে এক পরম সুন্দর বালক ক্রীড়া করিতেছে। ঐ বালক ঐ কন্যার কোমল হস্তে কমল দর্শন করিয়া রােদন করিতে করিতে বলিল আমি ঐ পুষ্প লইব। রাজা বালকের ক্রন্দনে তাহার হস্ত হইতে পদ্ম লইয়া রােরুদ্যমান বালককে দিলেন। বালক পুষ্প পাইয়া সহাস্য বদনে গৃহে গমন করিল। রাজাও নারী লইয়া অন্তঃপুরে প্রবেশ করিলেন।
প্রাতঃকালে ঐ পদ্ম হইতে এক মাণিক্য নির্গত হইল। বালকের পিতা এক সামান্য বণিক ছিল, ঐ মাণিক্য দেখিয়া তাহা তুলিয়া রাখিল, এবং পদ্মপুষ্প সংগােপন করিয়া অতিশয় যত্ন পূর্ব্বক রাখিল। হইতে প্রতিদিন এক এক মাণিক্য নির্গত হইতে লাগিল। কতক গুলিন মাণিক্য একত্র হইলে, বণিক এক দিবস ঐ সকল মাণিক্য লইয়া রাজার নিকট বিক্রয় করিতে পথি মধ্যে নগরপাল তাহাকে ধৃত করিয়া, তুমি অতিক্ষুদ্র বণিক এ সকল মাণিক্য কোথায় পাইলে ইহা বলিয়া অনেক প্রহার করিল। তাহার পরমাণিক্য গুলি লইয়া রাজার সম্মুখে দিল। রাজাপদ্ম গেল। তাবৎ বৃত্তান্ত অবগত হইয়া বণিককে আনিতে আজ্ঞা করিলেন। নগরপাল বণিককে রাজ-সাক্ষাৎকারে আনয়ন করিলে, রাজা তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন। তুমি সত্য করিয়া বল এই সকল রত্ন কোথায় পাইয়াছ, তাহা হইলে তােমাকে আরাে ধন দিব, কিন্তু মিথ্যা কহিলে নিৰ্বাসন করিয়া দিব। বণিক কহিল হে দীনপালক এক দিবস আমার পুত্র দ্বারে খেলা করিতেছিল, তাহাকে কোন ব্যক্তি এক পদ্ম পুষ্প দিয়াছিলেন। বালক আমার নিকট ঐ পুষ্প আনয়ন করিলে আমি তাহা আপনার নিকট রাখিলাম। রাত্রি প্রভাত হইলে ঐ পদ্ম হইতে এক মাণিক্য নির্গত হইল। এই রূপ প্রতিদিন এক এক মাণিক্য নির্গত হইয়া থাকে। অদ্যাপি ঐ পদ্ম পুষ্প আমার গৃহে আছে। রাজা বলিলেন তুমি যথার্থ কহিয়াছ, অতএব এ সকল মাণিক্য তুমি লইয়া যাও। কিন্তু নগরপাল তােমার প্রতি অতি কুব্যবহার করিয়াছে, তজ্জন্য দণ্ড স্বরূপ তােমাকে লক্ষ মুদ্রা প্রদান করিবেক। ইহা কহিয়া নগরপালের নিকট হইতে এক লক্ষ মুদ্রা লইয়া বণিককে দিলেন।
পুত্তলিকা এই আখ্যায়িকা সমাপন করিয়া বলিল মহারাজ, বিক্রমাদিত্যের এইরূপ ধর্ম্ম ও এইরূপ কর্ম্ম ছিল, তুমি অতি মূখ যে এমত ধর্ম্মশীল ও সৰ্বগুণ বিশিষ্ট রাজাকে হীন জ্ঞান করিয়া আপনাকে প্রধান রূপে গণ্য করিয়া থাক। ভােজরাজ পুত্তলীর এই সকল বাক্য শুনিয়া সে দিবসও মনােহুঃখে ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিতে লাগিলেন, তাহাতে সিংহাসনােপবেশনের কাল অতীত হইল। পরদিবস সিংহাসন সমীপে উপস্থিত হইয়া পুত্তলিকা গণকে জিজ্ঞাসা করিলেন কেমন তােমর অদা কি বল, তােমাদের কথা শুনিয়া আমি বড়ই আলাদিত হইতেছি। তখন
মধ্যমাবতী নবম পুত্তলিকা
কহিল হে ভােজরাজ আমি রাজা বিক্রমাদিত্যের দাতৃত্ব গুণের কিঞ্চৎ প্রসঙ্গ করিতেছি শ্রবণ কর। এক দিন রাজা দেশীয় তাবৎ লােক এবং নানা দেশীয় রাজাকে নিমন্ত্রণ করিয়া মহাসমারােহে যজ্ঞারম্ভ করিয়াছিলেন। ভাট ও ভিক্ষকগণ সেই সংবাদ শুনিয়া দেশ দেশান্তর হইতে আসিয়াছিল। দূরদেশীয় নৃপতিগণ অনেক অনেক লােক সমভিব্যাহারে আগত হইয়া ছিলেন। সভা সম্পত্তির কথা কি কহিব, দেবতাগণও ঐ সভায় অধিষ্ঠিত হইয়া ছিলেন।
রাজা যজ্ঞ করিতেছেন এমত সময়ে এক বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ উপস্থিত হইলেন। রাজা মন্ত্রপাঠ করিতেছিলেন এজন্য ব্রাহ্মণকে দূর হইতেই দেখিয়া মনে মনে প্রণাম করিলেন। ব্রাহ্মণ আগম-বিদ্যাতে পারদর্শী ছিলেন, রাজার মানসিক প্রণাম জানিতে পারিয়া হস্ত প্রসারণ পূর্ব্বক আশীৰ্বাদ করিলেন। পরে মন্ত্রপাঠের বিরতি হইলে রাজা, আগম-সিদ্ধ ব্রাহ্মণ-বৃদ্ধকে কহিলেন মহাশয় বড় কুকর্ম্ম করিয়াছেন, প্রণাম না করিতে করিতে আশীৰ্বাদ করিলেন, বুঝি আপনি জানেন না, প্রণামের অগ্রে আশীর্ব্বাদ করিলে সে আশীৰ্বাদ অতিসম্পাতের তুল্য হয়। ব্রাহ্মণ কহিলেন মহারাজ আপনি মনে মনে প্রণাম করিয়া ছিলেন এইজন্য আমি আশীর্ব্বাদ করিয়াছি। রাজা এই বাক্য শুনিয়া তখনি ব্রাহ্মণকে এক লক্ষ মুদ্রা দিতে আজ্ঞা করিলেন। ব্রাহ্মণ বলিলেন মহা রাজ লক্ষ মুদ্রাতে আমার নিৰ্বাহ হইবেক না, আমার যাহাতে কর্ম্ম সম্পন্ন হয় তাহা বিবেচনা করিয়া দান করুন। এই কথায় ভূপতি তৎক্ষণাৎ তাহাকে পঞ্চ লক্ষ মুদ্রা দিয়া বিদায় করিলেন। পরে, আর আর যে সকল ব্রাহ্মণ আসিয়া ছিলেন তাহাদিগকেও অনেক অর্থ দান করিলেন।
মধ্যমাবতী কহিল হে ভােজরাজ এই জন্য আমি তােমাকে সিংহাসনে উপবেশন করিতে নিষেধ করি। শৃগাল কখন সিংহের এবং কপােত কখন রাজহংসের প্রতিযােগী হইতে পারেনা, বানরের কণ্ঠে মুক্তার হার কখন শােভা পায়না, এবং গতের উত্তম সজ্জা কখন শােভাকর হয়না। অতএব আমার পরামর্শ শুন, সিংহাসনারােহণ করিও না, তাহা হইলে যমের সহিত সাক্ষাৎ করিতে হইবে। এই সকল বাক্যে রাজা মৌন হইয়া থাকিলেন। তাহাতে দিবসেরও অবসান হইল। রাত্রে রাজা সভাসদ গণকে আদেশ করিলেন কল্য অবশ্যই সিংহাসনােপবেশন করিব, কিন্তু পরদিন আরােহণ মানসে পদ প্রসারণ করিলে,
প্রেমবতী দশম পুত্তলিকা
হাস্য করিতে করিতে কহিল মহারাজ প্রথমে আমার এক কথা শ্রবণ কর, তাহার পর সিংহাসনে বসিও। রাজা বলিলেন কি বলিবে বল, শুনিতেছি। ইহা বলিয়া রাজা সিংহাসন সমীপে উপবিষ্ট হইলেন। পুত্তলিকা বলিতে লাগিল।
এক দিবস বসন্ত কালে রাজা বিক্রমাদিত্য আপন উপবনে বসিয়া সঙ্গীত শ্রবণ করিতে ছিলেন, এমত সময়ে বিরহব্যথাকুলিত এক পুরুষ, সমীপে উপস্থিত হইয়া তাহার পদানত হইয়া কহিল, স্বামিন, আমি অনেক ক্লেশ পাইয়া এইক্ষণে আপনকার শরণ লইলাম, আমার দুঃখ দূর করুন। ঐ ব্যক্তি শােকে এমত শীর্ণ-কলেবর হইয়াছিল যে তাহার শরীরে কিছুমাত্র শােণিত ছিলনা, এবং চক্ষের জ্যোতির বিলক্ষণ বৈলক্ষণ জন্মিয়াছিল। আর, অন্ন জল পরিত্যাগ করিয়াও কোন রূপে প্রকৃতিস্থ হইতে পারে নাই। রাজা ঐ বিরহীর এইরূপ করুণ বচনে দয়ার্দ্রচিত্ত হইয়া তৎক্ষণাৎ গীত শ্রবণে বিশ্রাম করিলেন। এবং তাহাকে অত্যন্ত অধৈর্য্য দেখিয়া তাহার ধৈর্য্য সম্পাদনের জন্য নানা প্রকার যত্ন করিলেন, কিন্তু সে তাহাতে কেবল রােদন করিতে লাগিল। রাজা বলিলেন তুমি কেন অধীর হইতেছ, মনঃ স্থির করিয়া আমাকে সবিশেষ বল, কোন ব্যক্তির জন্য এমত শােকাকুলিত হইয়াছ, এবং এখানে আসিবার অভিপ্রায়ইবা কি। এই জিজ্ঞাসায় ঐ ব্যক্তি এক দীর্ঘ নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া বলিল,কলিঙ্গ দেশে আমার বসতি, আমি অতি নির্বোধ মতিহীন। আমাকে কোন তপস্বী বলিয়াছিলেন, কোন স্থানে এক পরম সুন্দরী রাজকন্যা আছে, সে সাক্ষাৎ কামদেবের কামিনী, এবং ততুল্যা ত্রিভুবন-মােহিনী ত্রিলােকের মধ্যে আর নাই। আমি এই ত্রিভুবন-মােহিনীর উদ্দেশে গমন করিয়া ছিলাম, কিন্তু তাহার আশায় নিরাশ হইয়া আসিয়াছি। ঐ ভুবন-মােহিনীর জন্য লক্ষ লক্ষ ভূপতি ভস্মীভূত হইতেছেন। রাজা জিজ্ঞাসিলেন তাহারা কি রূপে ভস্ম হইতেছেন। বিরহী কহিল ঐ রাজকন্যার জনক এক কটাহে ঘূত উত্তপ্ত করিয়া রাখিয়াছেন, এবং এই প্রতিজ্ঞা করিয়াছেন ঐ প্রত্বলিত-ঘূত-কটাহে অবগাহন করিয়া যিনি জীবিতবান উঠিবেন তাহাকে কন্যা সম্প্রদান করিবেন। রাজকন্যার পাণিগ্রহণাভিলাষে লক্ষ লক্ষ ভূপতি তথায় যাইতেছেন, কেহবা সেই কটাহ দর্শনে নিরাশ হইয়া ফিরিয়া আসিতেছেন, কেহবা কন্যা-লাভের উৎকট আকাঙ্ক্ষায় উত্তপ্ত কটাহে পড়িয়া প্রাণ ত্যাগ করিতেছেন। আমি এই ব্যাপার দেখিয়া চমৎকৃত হইয়া আসিয়াছি, এবং ঘেক্ষণ অবধি রাজকন্যার রূপ লাবণ্য অবলােকন করিআছি সেইক্ষণ অবধি হতবুদ্ধি হইয়া, তাহার প্রেমে আপনাকে এই দুরবস্থাগ্রস্ত করিয়াছি। রাজা বলিলেন অদ্য তুমি এই স্থানে অবস্থান কর, কল্য দুই জনে তথায় গমন করিব, এবং যাহাতে তুমি ঐ কন্যা প্রাপ্ত হও তাহা করিব।
এই রূপ আশ্বাস প্রদানপূর্ব্বক রাজা তাহাকে স্নান ভােজনাদি করাইয়া সে দিবস আপনার আলয়ে রাখিলেন। নিশামুখে সঙ্গীতনিপুণ। নারীদিগকে আজ্ঞা করিলেন, তাহারা আপন আপন গুণপনা প্রকাশ করে। রাজাজ্ঞায়, সঙ্গীতবিজ্ঞ পরম সুন্দরী নর্তকীগণ রাজসভায় নৃত্য গীত আরম্ভ করিল। রাজা বিরহীকে কহিলেন এই নর্তকী গণের মধ্যে যাহাকে তােমার অভিলাষ হয় লইয়া এখানে সুখে কাল যাপন কর, আর সে রাজকন্যার চিন্তা করিও না। বিরহী কহিল মহারাজ সিংহ যদিও সপ্তাহ উপবাস করে তথাপি তৃণাহার করে না। আমি ঐ রাজকন্যার প্রেমাকাঙ্ক্ষী, তদ্ভিন্ন অন্য কাহার প্রত্যাশী নহি।
সুমধুর সংগীত শ্রবণে সমস্ত শৰ্বরী অতীত হইল। প্রভাতে রাজা স্নান পূজা করিয়া তাল বেতালকে স্মরণ করিলেন। তাহারা উপস্থিত হইলে, রাজা বলিলেন এই প্রেমিক ব্যক্তি যেখানে বলেন সেইখানে লইয়া চল। সে ব্যক্তি স্বয়ম্বর নগরের নাম কহিল। পরে রাজা তাহাকে আপন সিংহাসনে উপবেশন করাইয়া, তাল বেতালকে ঐস্থানে লইয়া যাইতে আজ্ঞা করিলেন। বীরদ্বয় আজ্ঞামাত্র সিংহাসন লইয়া শূন্যে উঠিল, এবং নিমিষের মধ্যে সেই নগরে উপস্থিত হইল। রাজা উপনীত হইয়া দেখিলেন বাদ্যধ্বনি ও মঙ্গলাচার হইতেছে, এবং রাজকন্যা পুষ্পমাল্য হস্তে ভ্রমণ করিতেছেন। যে সকল রাজনন্দন ঐ কামিনীর কামনায় আসিয়াছেন, তাহারা সকলে দণ্ডায়মান রহিয়াছেন, কাহারো সাহস হইতেছে না যে ঐ কটাহে ঝাপ দেন। যিনি প্রাণের আশা পরিত্যাগ করিয়া কটাহে পতিত হইতেছেন তিনি তখনি দগ্ধ হইয়া যাইতেছেন।
এতাবদবলােকনে রাজা রাজকন্যার নিকটে যাইয়া কিয়ৎক্ষণ তাহাকে নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন। তাহার দেবতুল্য রূপ দর্শনে বিমােহিত হইয়া কহিলেন যাহার গর্ভে এ কন্যা জন্ম গ্রহণ করিয়াছে সে ধন্য। মনুষ্যের কথা কি কহিব এই কন্যাকে দেখিয়া দেবগণ মুগ্ধ হয়েন। ইহা বলিয়া রাজা তাল বেতালকে আহ্বান পূর্ব্বক কহিলেন, আমি এই কটাহে মগ্ন হইতেছি, তােমরা সতর্ক থাক। ইহা বলিয়া রাজা কটাহে ঝাপ দিলেন, এবং তৎক্ষণাৎ দগ্ধ হইলেন। বেতাল অবিলম্বে অমৃত আনয়ন করিয়া তাহার প্রাণ দান করিল। রাজা রাম নাম উচ্চারণ পূর্ব্বক গাত্রোধান করিলেন। ইহা দেখিয়া উপস্থিত ব্রাহ্মণ গণ জয়ধ্বনি করিয়া উঠিলেন। আর আর নৃপতিগণ বিস্ময়াপন্ন হইয়া কহিতে লাগিলেন এ কোন রাজা, প্রথমতঃ দগ্ধ হইলেন, পরক্ষণেই জীবিত হইয়া উঠিলেন, ইনি দেবতা হইবেন, কখন মনুষ্য নহেন। প্রতিজ্ঞা পূর্ণ হইলে রাজকন্যা বিক্রমাদিত্যেরনিকটে আসিয়া তাহার গলদেশে মাল্য প্রদান করিতে উদ্যত হইলেন। রাজা বিরহীকে প্রদর্শন করিয়া বলিলেন আমি ইহার জন্য কটাহে পতিত ও দগ্ধ। হইয়াছিলাম, অতএব ইহাকেই বরণ কর। রাজকন্যা তাহাই করিলেন। পরে কন্যাকা কন্যার বিবাহের আয়ােজন করিতে লাগিলেন, প্রতিবেশিনী নারী ও রাণীগণ মাঙ্গলিক ক্রিয়াতে নিযুক্ত হইল। তাহার পর কন্যাকর্ত্তা বিরহীর সহিত কন্যার বিবাহ দিয়া, নানারত্নবিভূষিত হস্তী অশ্ব শিবিকা ও নানাবিধ বহুমূল্য দ্রব্যাদি এবং যৌতুক স্বরূপ অর্ধেক রাজ্য ও অনেক দাস দাসী প্রদান করিলেন। বিরহী এতাবৎ অবলােকনে অতিশয় আহলাদিত হইল।
বিবাহ নিৰ্বাহ হইলে রাজা বিক্রমাদিত্য কন্যাদাতার নিকট বিদায় চাহিলেন। কন্যাকর্ত্তা তৈজসাদি। তাবৎ দ্রব্য সমভিব্যাহারে দিয়া তাহাকে বলিলেন, তুমি গমন কর, কিন্তু আমার প্রতি স্নেহ রাখিও, আমার এমত শক্তি নাই যে তােমার গুণ বর্ণন করি, তুমি যেরূপ বীরত্ব প্রকাশ করিলে ঈদৃশ বীরত্ব কখন চক্ষে দেখি। নাই এবং কর্ণেও শুনি নাই। এই কলিকালে তুমি অবশ্য কোন অবতার হইবে। আমার একমাত্র জিহ্বা তােমার কত প্রশংসা করিব। আমার এক মাত্র মস্তক, লক্ষ মস্তক কাটিয়া দিলেও তােমার গুণের পুরস্কার হয় না। আমি যে প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলাম। তােমার প্রসাদাৎ তাহা পূর্ণ হইল, আমার এমত আশা ছিলনা যে এই প্রতিজ্ঞা কখন রক্ষা হইবে।
রাজকন্যা কৃতাঞ্জলিপুটে রাজাকে বলিলেন মহারাজ আপনি আমার অসীম দুঃখ মােচন করিলেন। আমার পিতা প্রতিজ্ঞারূঢ় হইয়া এমত কুকর্ম্ম করিয়া ছিলেন যে তিনিও নরকগামী হইতেন এবং আমিও চিরকাল অবিবাহিতা থাকিতাম, যেহেতু আপনি আগমন না করিলে কদাপি এই অসম্ভব প্রতিজ্ঞা রক্ষা হইত না।
বিক্রমাদিত্যের মাহাত্ম্য বর্ণন করিয়া প্রেমবতী পুত্তলী কহিল মহারাজ, রাজা বিক্রমাদিত্য এই প্রকারে প্রাণ পর্য্যন্ত পণ করিয়া যে পরম রূপবতী কন্যা প্রাপ্ত হইলেন তাহা অনায়াসে ঐ বিরহীকে দিলেন, তাহাতে কিছুমাত্র ভার জ্ঞান বা কষ্ট বােধ করিলেন না। তুমি বিদ্যোৎসাহী বট, কিন্তু তােমার এতাদৃশী জিতেন্দ্রিয়তা এবং পরােপকারিতাশক্তি কোথায়। অতএব তুমি কি প্রকারে এই সিংহাসনে আরােহণ করিতে বাঞ্ছা কর।
এই কথা শুনিয়া ভােজরাজ লজ্জায় অধােবদল হইলেন, সিংহাসনােপবেশন করিতে পারিলেন না। পরদিবস পুনৰ্বার উপবেশনের উপক্রম করিলে,
পরমাবতী একাদশ পুত্তলিকা
হাস্য করিয়া কহিল মহারাজ প্রথমে আমার বাক্য শ্রবণ কর, পশ্চাৎ সিংহাসনে পাদনিক্ষেপ করিও।
এক দিবস রাজা বিক্রমাদিত্য উজ্জয়িনী নগরে গমন করিয়া সঙ্গীগণকে বিদায় দিয়া রাত্রে একাকী শয়ন করিয়া আছেন, এমত সময়ে শুনিলেন উত্তরাংশে এক স্ত্রীলােক ক্রন্দন করিতে করিতে উচ্চস্বরে এই কথা বলিতেছে, “এমত কেহ দয়ালু আছে আমাকে এই পাপীর হস্ত হইতে উদ্ধার করিয়া আমার প্রাণ দান করে,,। এবং, মরিলাম মরিলাম বলিয়া, মধ্যে মধ্যে চীৎকার ধ্বনি করিয়া উঠিতেছে। রাজা ঐ ক্রন্দন এবং চীৎকার ধ্বনি শ্রৰণ করিয়া অসি চর্ম্ম গ্রহণ পূর্ব্বক ক্রন্দন লক্ষ্য করিয়া অন্ধকারে একাকী গমন করিলেন। রাজা যখন বন প্রবেশ করিলেন তখন ঐ নারী পুনর্ব্বার সেই প্রকার চীৎকার করিয়া উঠিল। রাজা তাহার নিকটবর্তী হইয়া দেখিলেন, এক যক্ষ এক নারীকে বলাৎকার করলােদ্যত হইয়া প্রহার করিতেছে। রাজা তাহা দেখিয়া যক্ষকে বলিলেন রে পাপিষ্ঠ এই অবলাকে কেন প্রহার করিতেছিস, তাের কি নরকের ভয় নাই। রাজার বাক্যে মনোেযােগ না করিয়া যক্ষ পুনর্ব্বার নারীকে প্রহার করিতে লাগিল। রাজা বলিলেন অরে দুরাত্মন তুই এই নারীকে এক্ষণেই পরিত্যাগ কর, নতুবা আমি তােক সংহার করিব। যক্ষ, রাজার সম্মুখ মুখীন হইয়া বলিল তুই কে এত রাত্রে এখানে আসিয়াছিস, তাের মরণ নিকটবর্তী হইয়াছে, তুই এখনি প্রস্থান কর, নতুবা আমি তােকে ভক্ষণ করিব। এই কথায় রাজা কোপে জ্বলদগ্নিবৎ হইয়া কোষ হইতে অসি আকর্ষণ পূর্ব্বক যক্ষকে লক্ষ্য করিয়া এমত আঘাত করিলেন যে একবারে তাহার মস্তক শরীর হইতে স্বতন্ত্র হইয়া পড়িল। কিন্তু তাহার ছিন্ন মস্তক ও দেহ হইতে তখনি দুই বীর উৎপন্ন হইল। উৎপন্ন হইয়াই তাহারা রাজার সঙ্গে সংগ্রাম আরম্ভ করিল। রাজা বলে কৌশলে এক জনকে সংহার করিলেন। কিন্তু দ্বিতীয় জন তাবৎ রাত্রি তাহার সঙ্গে যুদ্ধ করিয়া প্রভাতে প্রস্থান করিল।
যক্ষ প্রস্থান করিলে রাজা নারীকে কহিলেন এখন আর শঙ্কা নাই, আমার সঙ্গে আইস, দৈত্য পলায়ন করিয়াছে আর আসিবেক না। নারী দীর্ঘ নিশ্বাস পরিত্যাগ পূর্ব্বক কহিল হে জননাথ আমি সপ্তদ্বীপ পৃথিবীর মধ্যে যেখানে থাকিব সেই খান হইতেই যক্ষ আমাকে লইয়া যাইবে। যক্ষের বিনাশ না হইলে আমার পরিত্রাণ নাই, তাহার কারণ এই, যক্ষের শরীর মধ্যে এক মােহিনী আছে, তাহার বলে সে সকল স্থানে গমন করিতে পারে, এবং ঐ মােহিনী এমত মায়া জানে যে দৈত্য মরিলে তাহার শব হইতে আর চাবি দৈত্য উদ্ভব করিতে পারে।
এ কথা শুনিয়া রাজা বন মধ্যে লুক্কায়িত ভাবে থাকিলেন। ক্ষণ কাল পরে। যক্ষ পুনর্ব্বার আসিয়া নারীকে পূৰ্বরূপ প্রহার আরম্ভ করিল, নারী চীৎকার করিতে লাগিল। তখন ভূপতি প্রচ্ছন্ন স্থান হইতে প্রকাশিত হইয়া পুনর্ব্বার যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইলেন, যুদ্ধ করিতে করিতে যক্ষের সম্মুখবর্তী হইয়া তাহাকে এমত খঘাত করিলেন যে তাহার মস্তক দেহ হইতে ছিন্ন হইয়া পড়িল। ঐ সময়ে মোহিনী তাহার দেহ হইতে নির্গত হইয়া অমৃতানয়না প্রস্থান করিল। রাজা। তাল বেতালকে আজ্ঞা করিলেন মোহিনীর গমনাবরোধ কর। আজ্ঞামাত্র তাল বেতাল তাহার কেশাকর্ষণ পর্ব্বক তাহাকে রাজার সম্মুখে আনিল। জিজ্ঞাস! করিলেন হে মৃগনয়নি, গজগামিনি, চন্দ্রবদনি, তোমার হাস্যে কুন্দপুষ্প বৃষ্টি হইতেছে, তোমার সুগন্ধে অন্ধ হইয়া ভ্রমরগণ ভ্রমণ করিতেছে, তুমি যক্ষের উদরে কি প্রকারে ছিলে, আমাকে বল। মোহিনী বলিল মহারাজ আমি পূর্বে স্বর্গবাসিনী ছিলাম, কিন্তু ভ্রমক্রমে শিবের কোন আজ্ঞা অবহেলন করিয়াছিলাম, তাহাতে শিব অসন্তুষ্ট হইয়া আমাকে এই পাপীর হস্তে অর্পণ করিয়াছেন। এই যক্ষ মহাদেবের অনেক সেবা করিয়াছিল, এই জন্য মহাদেব ইহার প্রতি সদয় হইয়া ইহা করিয়াছেন। যক্ষ আমাকে পাইয়া উদর মধ্যে রাখিয়াছিল, তদবধি আমার নাম মোহিনী হইআছে। আমার প্রতি শিবের আজ্ঞা আছে এই যক্ষের সেবা করিতে হইবে, এই জন্য আমি ইহার আজ্ঞাকারিণী হইয়াছি। আপনার বেতাল আমাকে আনিয়াছে সেই জন্য আমি আসিয়াছি, নতুবা আপনি আমাকে ধরিয়া রাখিতে পারিতেন না। রাজা বলিলেল এইক্ষণে তোমার কি অভিলাষ। মোহিনী কহিল তুমি রাজাধিপতি, সকলের পূজ্য, অতএব তােমার সেবাতে নিযুক্ত থাকিবার অভিলাষ করি। ইহা শুনিয়া রাজা বিক্রমাদিত্য তাহাকে গন্ধর্ব বিধানে বিবাহ করিলেন।
পরে, যে নারীকে যক্ষ আক্রমণ করিয়াছিল তাহার পরিচয় জিজ্ঞাসা করিলেন। নারী বলিল মহারাজ সমুদ্র মধ্যে ব্রহ্মপুরী নামে এক দ্বীপ আছে, তাহাকে সিংহলদ্বীপ বলে। আমি তথাকার এক ব্রাহ্মণের কন্যা। এক দিবস সহচরীসমভিব্যাহারে এক সরােবরে স্নান করিতে গিয়াছিলাম। ঐ সরােবর বৃক্ষাদিতে এমত আবৃত যে সূর্য্যেরও মুখ দর্শন হয় না। মান পূজা করিয়া গৃহে আসিব এমত সময়ে এই দৈত্য আমাকে ধরিল। দৈত্য ধর্ম্মজ্ঞান রহিত, আমি কুমারী ধর্ম্মভয়ে ভীত হইয়া ইহার ইচ্ছানুবর্ত্তিনী হই নাই, এজন্য আমাকে তদবধি যন্ত্রণা দিতেছে। তুমি রাজা, আমার ধর্ম ও কুল রক্ষা করিলে, পৃথিবীতে তােমার অতিশয় যশঃ হইবে, আমি আশীৰ্বাদ করি তোমার সহস্র বর্ষ পরমায়ু হউক, আর তােমার এমত পরাক্রম হউক যে কেহ কখন তােমাকে পরাজয় করিতে না পারে। এইরূপ অনেক আশীৰ্বাদ করিলে, রাজা তাহাকে কন্যা সম্বােধন করিলেন। পরে ঐ কন্যাকে ও মােহিনীকে সিংহাসনে বসাইয়া বেতালকে আজ্ঞা করিলেন আমাদিগকে রাজধানীতে লইয়া চল। আজ্ঞামাত্র বেতাল তাহাকে রাজধানীতে লইয়া আসিল। রাজা রাজধানীতে উপনীত হইয়া মন্ত্রীকে আজ্ঞা করিলেন একটা সকুলােদ্ভব জ্ঞানবান, ব্রাহ্মণকুমার অন্বেষণ করিয়া আন। মন্ত্রী অন্বেষণ করিয়া মার্কণ্ডেয় নামে পরম সুন্দর এক ব্রাহ্মণকুমারকে আনিয়া উপস্থিত করিলেন। রাজা ঐ বিপ্রনন্দনকে কহিলেন আমার নিকট এক ব্রাহ্মণকন্যা আছেন, আমি তােমাকে ঐ কন্যা সম্প্রদান করিতে বাঞ্ছা করি, যদি তুমি তাহার পাণিগ্রহণে সম্মত হও, বল, তাহার আয়ােজন করি। বিপ্রতনয় সম্মতি প্রকাশ করিলেন। পরে রাজা বিবাহের উদ্যোগ করিয়া বস্ত্রালঙ্কার দিয়া কন্যাদান করিলেন, এবং ব্রাহ্মণকুমারকে লক্ষ মদ্রা যৌতুক দিলেন। অতএব হে ভােজরাজ তুমি কি বিবেচনায় তাঁহার সিংহাসনে উপবেশন করিতে বাসনা কর। তুমি গুণগ্রাহক বট, কিন্তু রাজা বিক্রমাদিত্যের যেমন ধর্ম্মজ্ঞান ও সাহস ছিল, তােমার সে প্রকার নাই, তােমার এই সিংহাসনে বসিবার বাসনা বিফল।
ইহা শুনিয়া ভােজরাজ কোন উত্তর করিলেন না। পরদিন যখন পুনর্ব্বার সিংহাসননাপবেশন করিতে আগমন করিলেন তখন,
কীর্তিমতী দ্বাদশ পুত্তলিকা
কহিল মহারাজ অবধান কর।
একদিন রাজা বিক্রমাদিত্য সভারূঢ় হইয়া সভাসদ গণকে জিজ্ঞাসা করিলেন আর কোথাও দাত লােক আছে কি না। সভাসদগণ এই কথায় কোন উত্তর করিলেন না, পরে এক ব্রাহ্মণ কহিলেন হে নরােত্তম তােমার তুল্য সাহসী ও দাতা আর নাই, কিন্তু আমার এক নিবেদন আছে তাহা বলিতে সাহস হয় না। রাজা বলিলেন সত্য কথা বলিতে ভয় কি, তুমি স্পষ্ট কহ আমি রুষ্ট হইব না। ব্রাহ্মণ বলিলেন সমুদ্রতীরে এক রাজা আছেন, তিনি ধর্মানুষ্ঠানে অতিশয় রত, এবং প্রতিদিন প্রাতঃস্নান করিয়া লক্ষ মুদ্রা দান করেন, তাহার পর জল গ্রহণ হয়। ইহা ভিন্ন অন্য প্রকার অনেক। দান বিতরণ ও ধর্ম্ম কর্ম্ম আছে। তাদৃশ ধর্মাত্মা পুরুষ আর দেখা যায় না।
এই কথা শুনিয়া রাজা বিক্রমাদিত্য মনে মনে ভাবিলেন ঐ রাজাকে স্বচক্ষে দর্শন করিতে হইবে। পরে তাল বেতালকে স্মরণ পূর্ব্বক তাহাদের স্কন্ধারূঢ় হইয়া সমুদ্রতীরস্থ রাজার রাজধানীতে যাত্রা করিলেন। তথায় উপনীত হইয়া তাল বেতালকে বিদায় দিয়া বলিলেন আমি এই রাজার সেবাতে নিযুক্ত হইব তােমরা প্রস্থান কর, কিন্তু আমার তত্ত্ব করিও। তাহার জিজ্ঞাসা করিল মহারাজ এই রাজার সেবায় নিযুক্ত হইবেন ইহার কারণ কি। রাজা কহিলেন সে কথায় তােমাদের প্রয়ােজন কি, আমি যাহা আজ্ঞা করিলাম তাহা কর। এই বাক্যে তাল বেতাল প্রস্থান করিল।
রাজা পদব্রজে নগর প্রবেশ করিয়া রাজদ্বারে উপনীত হইয়া দ্বারপালকে বলিলেন তােমার রাজাকে গিয়া বল, কোন বিদেশীয় ব্যক্তি কর্ম্ম প্রাপ্তির আশয়ে আসিয়া দ্বারদেশে দণ্ডায়মান আছেন। দ্বারপাল রাজার নিকটে সম্বাদ করিলে রাজা স্বয়ং দ্বারে আসিলেন। বিক্রমাদিত্য তাহাকে দেখিয়া নমস্কার করিলেন। সমুদ্রাধিপতিও তাঁহাকে দেখিয়া নমস্কার পূর্ব্বক কুশলাদি জিজ্ঞাসা করিলেন। বিক্রমাদিত্য কহিলেন মহারাজের অনুগ্রহে সকল মঙ্গল। তদনন্তর রাজা জিজ্ঞাসা করিলেন তােমার নাম কি, তুমি কি নিমিত্ত কোথা হইতে আসিয়াছ। বিক্রমাদিত্য কহিলেন আমার নাম বিক্রম, আমি রাজা বিক্রমাদিত্যের রাজ্যে বাস করি। অন্তঃকরণের বিরাগ জন্য আমি দেশত্যাগী হইয়া এখানে আসিয়াছি। এক্ষণে মহারাজকে দর্শন করিয়া আমার মনটদুঃখ দূর হইল। আমি মহারাজের সেবায় নিযুক্ত হইব। রাজা জিজ্ঞাসিলেন কি বেতন হইলে আমার কর্মে নিযুক্ত হইতে পার। বিক্রমাদিত্য কহিলেন প্রতিদিন চারি। সহস্র মুদ্রাতে আমার দিনপাত হইতে পারে। রাজা বলিলেন তুমি এমত কি কর্ম্ম করিবে যে প্রতিদিন চারি সহস্র মুদ্রা দেওয়া যাইবে। বিক্রমাদিত্য কহিলেন আমি যাহার সেবা করি, অত্যন্ত সঙ্কট উপস্থিত হইলেও তাহাকে উদ্ধার করিতে পারি। ইহা শুনিয়া রাজা। নিত্য নিত্য চারি সহস্র মুদ্রা বেতন অবধারিত করিয়া তাহাকে কর্মে নিযুক্ত করিলেন। রাজা বিক্রমাদিত্য কয়েক দিবস তথায় থাকিয়া দেখিলেন ঐ রাজা প্রতাই লক্ষ মুদ্রা দান করেন। তিনি মনে মনে ভাবিলেন এই দানের অভিপ্রায় কি, এবং কোন, দেবতা তাহাকে ধন দান করেন, তাহা জানিতে পরে এক দিবস দেখিলেন রাত্রি গাঢ়তর অন্ধকারাচ্ছন্ন হইলে রাজা বনে গমন করিতেছেন। ইহা দেখিয়া তিনি তাহার পশ্চাদগামী হইলেন। রাজা নগর পরিত্যাগ করিয়া অরণ্য প্রবেশ করিলেন। ঐ অরণ্য মধ্যে এক সরােবর ও এক দেবালয় ছিল, তাহার সম্মুখে এক কটাহে ঘূত উত্তপ্ত হইতেছিল। রাজা সরােবরে অবগাহন পূর্ব্বক দেবীকে প্রণাম করিয়া উত্তপ্ত ঘূত কটাহে পড়িলেন। পড়িবামাত্র তাবদঙ্গ দগ্ধ হইল। পরে চতুঃষষ্টি যােগিনী আসিয়া তাহার মাংস আহার করিল। অনন্তর এক কঙ্কালিনী আসিয়া রাজার অস্থিতে অমৃত প্রেক্ষণ করিল, তাহাতে রাজা সজীব হইয়া রামনাম উচ্চারণ পূর্ব্বক গাত্রোথান করিয়া দেবীর সম্মুখে দণ্ডায়মান হইলেন। দেবী মন্দির হইতে তাহাকে এক লক্ষ মুদ্রা দিলেন। রাজা তাহা লইয়া গৃহে আসিলেন। যােগিনী গণও স্বস্থানে প্রস্থান করিল।
এই ব্যাপার দেখিয়া রাজা বিক্রমাদিত্যও ঐ উত্তপ্ত ঘূত কটাহে ঝাপ দিলেন, তাহাতে তৎক্ষণাৎ তদ্রুপ দগ্ধ হইলেন, এবং যােগিনীগণ তাহার মাংস ভক্ষণ করিল। তদনন্তর কঙ্কালিনী অমৃত দ্বারা তাহাকে . জীবন দান করিল। পরে তিনি দেবীর সম্মুখে যাইবা মাত্র দেবী তাঁহাকে লক্ষ মুদ্রা প্রদান করিলেন। রাজা বিক্রমাদিত্য ঐ ধন প্রাপ্ত হইয়া পুনর্ব্বার কটাহে পড়িলেন, এবং সেই প্রকার দগ্ধ ও পুনর্জীবিত হইয়া দেবীর সম্মুখে দণ্ডায়মান হইলে, দেবী তাহাকে দুই লক্ষ মুদ্রা দিলেন। এই প্রকার রাজা সাত বার ঐ কটাহে পড়িলেন, এবং প্রতিবার এক এক লক্ষ মুদ্রা অধিক পাইলেন। অনন্তর যখন তিনি পুনর্ব্বার কটাহে ঝাপ দিতে উদ্যত হইলেন তখন দেবী তাহার কর ধারণ পূর্ব্বক বলিলেন বৎস আমি তােমার প্রতি প্রসন্ন হইয়াছি, তুমি বর প্রার্থনা কর। রাজা কৃতাঞ্জলিপুটে কহিলেন জননি আমি যে বর চাহিব যদি তাহা দেন তবে প্রার্থনা করিতে পারি। দেবী বলিলেন, তােমার যে বর ইচ্ছা চাহ আমি দিব। রাজা বলিলেন হে করুণাময়ি তুমি যে থলিয়া হইতে এই মুদ্রা বাহির করিয়া দিলে আমার প্রতি করুণ। করিয়া সেই থলিয়াটী দাও। দেবী এই বাক্য শুনিয়া তৎক্ষণাৎ রাজাকে সেই ঝুলিটী দিয়া অন্তর্হিত হইলেন। রাজা তাহা প্রাপ্তে মহানন্দিত হইয়া রাজধানীতে আসিলেন।
পরদিন রজনীযােগে সমুদ্রতীরস্থ ভূপতি বনে গিয়া দেখিলেন, না সেই দেবীর মন্দির আছে, না সেই কটাহই আছে, কিছুই নাই। ইহাতে রাজা অতিশয় চিন্তিত হইয়া উচ্চৈঃস্বরে রােদন করিতে লাগিলেন। পরে গৃহে আসিয়া অত্যন্ত বিমর্ষভাবে থাকিলেন। প্রত্যুষে সভাসদগণ দেখিল রাজা অতিশয় মান ভাবে আছেন, হাস্য বা কথা কিছুই নাই, কেহ রাজ্য কার্য্যের আলাপ করিলে বিরক্ত হয়েন। এই অবস্থা দেখিয়া মন্ত্রী বিনয়পূর্ব্বক নিবেদন করিলেন, মহারাজ, আপনাকে এই ভাবাক্রান্ত দেখিয়া তাবৎ সভ্য অসুখী হইয়াছে। রাজা বলিলেন অদ্য আমার শরীর অসুস্থ হইয়াছে, তুমি রাজ্য কার্য্য সম্পাদন কর। এই আজ্ঞায় মন্ত্রী রাজ্য কার্য্য করিতে লাগিলেন। অপর ব্যক্তিরা অনুমান করিল রাজা পীড়িত হইয়াছেন, কেহ কেহ ভাবিল রাজা মুগ্ধ হইয়াছেন, কেহ কেহ বলিল রাজা নাই। কিন্তু রাজার প্রকৃতাবস্থা কেহই জানিতে পারিল না।
রাজা বিক্রমাদিত্য নিয়মিত সময়ে রাজসদনে উপস্থিত হইলেন, এবং রাজার বিষন্নভাব অবলােকনে বলিলেন প্রভা আমি আপনকার বিপদকালে উদ্ধার করিব এই প্রতিজ্ঞা করিয়া আপনার বেতনভােগী হইয়াছি, অতএব আপনার কি মনটদুঃখ তাহা আমাকে অকপটে বলুন। রাজা উত্তর করিলেন আমি সে কথা তােমাকে কি কহিব, আমি মানস করিয়াছি এ প্রাণ আর রাখিব না। বিক্রমাদিত্য বলিলেন হে পৃথীনাথ একবার আপনার মনের দুঃখ আমাকে বলুন, তাহার পর যাহা বাঞ্ছা করিবেন। নৃপতি বলিলেন এক দেবী আমার প্রতি সদয় ছিলেন, বত্রিশ সিংহাসন। এবং প্রতিদিন আমাকে লক্ষ মুদ্রা দান করিতেন, ঐ মুদ্রা আমি নিত্য বিতরণ করিতাম। কিন্তু কল্যাবধি দেবী অদৃশ্যমান হইয়াছেন, আমি ধন পাই নাই, তাহাতে আমার নিত্যকর্ম নির্বাহের ব্যাঘাত জন্মিয়াছে। আমার এত অধিক সম্পত্তি নাই যে তাহাদ্বারা নিত্য নৈমিত্তিক ধর্ম্ম কর্ম্ম সকল নির্বাহ অতএব যদি ধর্ম্ম কর্ম্ম করিতে না পারিলাম তবে প্রাণ ধারণে কি ফল। এই সকল বিবেচনা করিয়া আমি প্রাণত্যাগ করা অবধারণ করিয়াছি।
রাজা বিক্রমাদিত্য তাঁহার এই সকল আক্ষেপপাক্তি শ্রবণ করিয়া তখনি দেবীদত্ত ঝলিটী তাহার হস্তে অর্পণ পর্ব্বক কহিলেন আপনার যখন যে অর্থের প্রয়ােজন হইবে তাহা এই তােড় হইতে পাইবেন। রাজা ঐ কথা শুনিয়া মহাদে গাত্রোখান করিলেন, এবং তােড় হইতে এক লক্ষ মুদ্রা বাহির করিয়া দিয়া মন্ত্রীকে বলিলেন নিত্য নিত্য যে সকল ব্রাহ্মণেরা যাহা পাইয়া থাকেন তাহা তাহাদিগকে দাও। মন্ত্রী আজ্ঞানুরূপ তাহা দিলেন।
তদনন্তর রাজা বিক্রমাদিত্য তাহাকে কহিলেন আমি অনেক দিবস হইল এস্থানে আসিয়াছি, যদি অনুমতি হয় স্বদেশে গমন করি। রাজা, উত্তর করিলেন আমি তােমার গুণ কি বর্ণন করিব, তুমি আমার প্রাণদান করিয়াছ। তােমাকে অনুমতি দিলাম। স্বদেশে গমন কর, কিন্তু তথায় গিয়া আমাকে সম্বাদ। লিখিও। তোমার বাসস্থান কোথায় বলিয়া যাও, আমি তােমাকে সর্বদা পত্রাদি লিখিব। বলিলেন আমি অম্বাবতী নগরের রাজা, আমার নাম বিক্রমাদিত্য, আপনার যশঃশ্রবণে আপনাকে দর্শন করিতে আসিয়াছিলাম, আপনার সাহস ধর্ম্ম ও বল দেখিয়া তুষ্ট হইয়াছি, এইক্ষণে বিদায় হই।
রাজা, মহারাজ বিক্রমাদিত্যের পরিচয় পাইয়া তাহার পদানত হইয়া কৃতাঞ্জলিপুটে বলিলেন হে রাজেন্দ্র আমি অতি কুকর্ম্ম করিয়াছি, আপনার পরিচয় না জানিয়া আপনাকে বেতনভােগী করিয়া রাখিয়াছিলাম, এজন্য আমার অপরাধ মার্জনা করিবেন। হে নৃপশ্রেষ্ঠ আপনার যেমত ধর্ম্মের কথা শুনিয়াছিলাম সেই মত দেখিলাম। আপনাকে, আপনার সাহসকে, পরাক্রমকে ও ধর্মকে ধন্য। ইহা বলিয়া রাজাকে সাতিশয় সম্মানপূর্বক বিদায় করিলেন। রাজা তাল বেতালের স্কন্ধারূঢ় হইয়া রাজধানীতে আসিলেন।
কীর্তিমতী পুত্তলিকা এই আখ্যায়িকা সমাপন করিয়া ভােজরাজকে বলিল, মহারাজ, রাজা বিক্রমাদিত্যের এইরূপ সদগণ ও সাহস ছিল, দেখ তিনি এমত অমূল্য ঝুলি পাইয়াও অনায়াসেই দান করিলেন, এবং দান করিয়াও অন্তঃকরণে কিছুমাত্র অনুতাপ করিলেন না। সুর বা নরের মধ্যে তর্ভুল সমুণ কাহারও ছিলনা, তুমি কোন পদার্থ। এই কথা শুনিয়া ভােজ নৃপতি মোনাবলম্বী হইলেন, সিংহাসনারােহণ করিলেন না। পর দিন পুনর্ব্বার তদুপবেশনের বাসনায় তথায় আসিয়া দাঁড়াইলে,
ত্রিলােচনী ত্রয়ােদশ পুত্তলিকা
কহিল, হে নরপতে, বিক্রমাদিত্যের তুল্য যাহার ক্ষমতা তিনিই এই সিংহাসনে বসিবার উপযুক্ত পাত্র। আমি তাহার এক সাহসােদাহরণ কহি শ্রবণ কর। ভােজরাজ বলিলেন হে সুন্দরি আমি বিক্রমাদিত্যের বল ও সাহসের কথা শুনিতে সতত বাসনা করি, অতএব আমাকে তাহা শুনাও। পুত্তলিকা বলিল শুন।
এক দিবস রাজা বিক্রমাদিত্য অমাত্যগণ সমতিবাহারে অশ্বারােহণে মৃগয়া করিতে গিয়াছিলেন। তাহার সঙ্গে এমত বেগগামী এক এক ঘােটক ছিল তাহারা, একবারে সহস্র সহস্র ক্রোশ পথ অনায়াসে গমন করিতে পারিত। রাজা বনপ্রবেশ করিয়া শীকারীগণকে কহিলেন তােমরা শীকার কর আমি দেখি, যে ব্যক্তি ভাল শীকার করিতে পারিবে তাহাকে পুরস্কার দিব, যে শীকার করিতে না পারিবে সে অপদস্থ হইবে। এই আজ্ঞায় সকলে বাজপক্ষী উড়াইয়া পক্ষীশীকার আরম্ভ করিল, রাজা দেখিতে লাগিলেন। পরে রাজাও এক পক্ষী লক্ষ্য করিয়া স্বয়ং এক বাজ ছাড়িলেন, এবং তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ অশ্বারােহণে এমত বেগে গমন করিলেন যে অল্প ক্ষণের মধ্যে অনেক দূরে গিয়া পড়িলেন। তাঁহার সঙ্গীগণ সঙ্গে যাইতে পারিল না। এবং তাহারা তাহার অনুসন্ধান না পাইয়া ক্রমে ক্রমে রাজধানীতে ফিরিয়া আসিল।
রাজা একাকী ঘােরতর অরণ্যে পড়িয়া পথভ্রান্তি প্রযুক্ত ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিতে লাগিলেন। পরে রজনী উপস্থিত হইলে এক নদীতটে উপনীত হইলেন, এবং তথায় অশ্ব হইতে অবরােহণ পূর্ব্বক অশ্বকে বৃক্ষমূলে বন্ধন করিয়া আপনি নদীতীরে ঘােড়ার জিনপােষ বিছাইয়া বসিলেন। কিয়ৎকাল পরে নদীর জল বৃদ্ধি হইতে লাগিল। ক্রমে ক্রমে জল নিকটবর্তী হইলে তিনি উঠিয় কিঞ্চিৎ অন্তরে বসিলেন। নদী ক্রমে ক্রমে পরিপর্ণ হইল। পরে রাজা দেখিলেন নদী দিয়া এক শব ভাসিয়া আসিতেছে, এবং তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ এক পিশাচ ও এক যােগী বিবাদ করিতে করিতে আসিতেছে। যােগী পিশাচকে বলিতেছে তুমি অনেক শব ভক্ষণ করিয়াছ, আমি বহুযত্নে এই শব পাইয়াছি, অতএব ইহা পরিত্যাগ কর, আমি লইয়া যােগ সাধন করি, আর তুমি মনে কর, তােমা হইতে আমি সিদ্ধ হইলাম। পিশাচ বলিতেছে আমাকে এমত নির্বোধ বােধ করিও না যে তােমার বাক্যে ভুলিয়া আমি তােমাকে আপন খাদ্য দ্রব্য ছাড়িয়া দিব। উভয়ে এই প্রকার বিবাদ করিতে করিতে আসিতেছে, এবং মধ্যে মধ্যে বলিতেছে এখানে এমত কেহ নাই যে তাহার দ্বারা আমাদের বিবাদ নিষ্পত্তি হয়, অতএব কল্য রাজসভায় যাইতে হইবে, রাজা যে বিচার করেন তাহাই হবে। ইতিমধ্যে রাজার প্রতি উভয়ের দৃষ্টিপাত হইল। তাহাতে তাহারা হাস্য পূর্ব্বক বলিল, নদীতীরে মনুষ্য দেখিতেছি, চল উহার নিকটে যাই, উনি আমাদিগের বিবাদ ভঞ্জন করিয়া দিবেন।
ইহা বলিয়া উভয়ে শব সহিত রাজার নিকটে আসিল, এবং রাজাকে চিনিতে পারিয়া বিচারের প্রার্থনা করিল। যােগী কহিল মহারাজ আমি বহু আয়সে একটী শব পাইয়াছি, কিন্তু এই পিশাচ উহা লইতে দিতেছে না, আমার সঙ্গে অনর্থক বিবাদ করিতেছে। আমি নানাপ্রকার বিনয় করিতেছি, এবং এ পর্য্যন্ত কহিলাম যে এই শবটী আমাকে ভিক্ষা দাও, কিন্তু তাহাও গ্রাহ্য করে না। পিশাচ কহিল মহারাজ এই যােগী অতি মিথ্যাবাদী, আমি অনেক দুর হইতে অনেক পরিশ্রম করিয়া এই শব আনয়ন করিতেছি, যােগী পথিমধ্যে দেখিয়া যাচ ঞা করিতেছে, কিন্তু আমি এত ক্লেশে যে দ্রব্য আনিলাম তাহা আপনি আহার করিয়া উহাকে কেন দিব। তুমি এই বিবাদের বিচার কর, তুমি যাহা কহিবে তাহাই মান্য করিব।
রাজা কহিলেন তােমরা উভয়েই শ্রেষ্ঠ, আমি তােমাদিগের নিকটে যাহা প্রার্থনা করি যদি তাহা দাও তবে তােমাদের বিচার করিতে পারি। ইহা শুনিবা মাত্র যােগী ঝুলি হইতে এক থলিয়া বাহির। করিয়া রাজার হস্তে অর্পণ পূর্বক বলিল মহারাজ যাহা মনে করিয়া ইহাতে হস্তাৰ্পণ করিবে তাহা তৎক্ষণাৎ পাইবে। পিশাচ বলিল আমি তােমাকে এক ভেলা দিতেছি, ইহা ঘর্ষণ করিয়া যখন কপালে তিলক ধারণ করিবে তখনি আমি তােমার সহায় হইব, এবং তােমার তুল্য, পরাক্রমশালী পুরুষ কেহ হইতে পারিবেনা। রাজা বলি ও ভেলা গ্রহণ করিয়া, পিশাচকে কহিলেন তুমি এই শব যােগীকে দাও, এবং আমার অশ্ব লইয়া ভক্ষণ কর, তাহা হইলে তােমার ক্ষুধা নিবৃত্তি হইবে এবং যােগীরও কর্ম্ম সাধন হইবে। ইহা শুনিয়া পিশাচ অশ্বকে ভক্ষণ করিল, এবং যােগী শব লইয়া মন্ত্র সাধন করিতে গেল।
তখন রাজা বেতালকে স্মরণ করিয়া তাহার স্কন্ধারূঢ় হইয়া আপন নগরাভিমুখে আসিতে লাগিলেন। পথিমধ্যে এক ভিক্ষুক যাইতেছিল। সে রাজাকে দেখিয়া কহিল, মহারাজ, আমি আপনার রাজধানীতে বহু দিবস ছিলাম, কিন্তু আমার অভিলাষ পরিপূর্ণ হয় নাই, এইক্ষণে আমি আপনার স্থানে প্রার্থনা করি, আমাকে কিঞ্চিৎ ভিক্ষা দেউন। ইহা শুনিয়া বাজা তৎক্ষণাৎ তাহাকে সন্ন্যাসীদত্ত পাত্র প্রদান পূর্ব্বক তাহার গুণ ব্যাখ্যা করিলেন। ভিক্ষুক আশীৰ্বাদ করিয়া গৃহে গমন করিল। রাজাও আপন বাটীতে আসিলেন।
ত্রিলােচনী পুত্তলিকা কহিল যে ব্যক্তি এই প্রকার দাতা ও বিচক্ষণ সেই ব্যক্তি এই সিংহাসনােপবেশনের যােগ্য। তদ্ভিন্ন যিনি উপবেশন করিবেন তিনি নরক- গামী হইবেন। এই কথা শুনিয়া রাজা সে দিবস সিংহাসনারােহণ করিলেন না। পর দিবস স্নান পূজা করণানন্তর সভায় আসিয়া অমাত্যবর্গকে আহ্বান করিয়া কহিলেন অদ্য আমার চিত্ত প্রসন্ন আছে, অতএব সিংহাসনােপবেশন করিব। ইহা বলিয়া ব্রাহ্মণ দিগকে একশত গাভি দান করিলেন, তৎপরে গণেশকে প্রণাম করিয়া সিংহাসনে উপবেশনার্থ পদপ্রসারণ করিতেছেন এমত সময়ে,
বিলােচনী চতুর্দশ পুত্তলিকা
কহিল, মহারাজ অগ্রে আমার এক কথা শ্রবণ কর, তৎপরে সিংহাসনে আরােহণ করিও। এই বাক্যে রাজা পদপ্রসারণ নিবৃত্তি করিয়া সিংহাসনের নিকটে আসন পরিগ্রহ পূর্ব্বক বসিলেন। পুত্তলিকা কহিল মহারাজ শ্রবণ কর।
এক দিবস নদীতটস্থ অট্টালিকার উপর নানা প্রকার আমােদ প্রমােদ হইতেছিল, এবং কতিপয় পরম সুন্দরী নারী সংগীতাদি করিতেছিল। রাজা বিক্রমাদিত্য বিমােহিতচিত্তে তাহা শ্রবণ করিতেছিলেন। এমত সময়ে এক নারী এক বালক ক্রোতে, আপন ভবন হইতে অতিবেগে দৌড়িয়া আসিয়া ঐ অট্টালিকার সম্মুখীন নদীতে ঝাপ দিল। পরক্ষণেই এক পুরুষ আসিয়া জলে অবগাহন পূর্ব্বক, ক্ষণবিলম্বে এক হস্তে বালককে ও এক হস্তে নারীকে ধরিয়া, জলমগ্ন। হইয়া মরিবার পূর্বাবস্থায় উচ্চৈঃস্বরে এই কথা কহিতে লাগিল এই তিন জনের প্রাণ রক্ষা করে এমত ধর্ম্মাত্মাকে আছে আমাদিগকে উদ্ধার কর। এবং ঐ পুরুষ খেদ করিতে করিতে কহিল, ক্রোধ অতি কদর্য্য রিপু, তাহাকে বশীভূত করিতে না পারিলে এইরূপ বিপদ গ্রস্ত হইতে হয়, এবং এইরূপ পশ্চাৎ তাপ জন্মে।
রাজা এই সকল খেদোক্তি শ্রবণ করিয়া নিকউস্থ লােক দিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন, কোন ব্যক্তি এই প্রকার চীৎকার করিতেছে। তাহাতে এক পদাতিক কহিল মহারাজ একটা পুরুষ এক স্ত্রী ও এক বালক সহিত জলমগ্ন হইতেছে, এবং পুরুষটা বলিতেছে যদি কেহ পরােপকারী থাক, আমাদিগকে পরিত্রাণ কর। পদাতিক এই কথা বলিতেছে এমত সময় ঐ ব্যক্তি পুনর্ব্বার চীৎকার করিয়া বলিল আমরা তিন জনে জলমগ্ন হইতেছি, যদি কেহ পরমেশ্বরের প্রিয় পাত্র থাক, আমাদিগকে উদ্ধার কর। রাজা এই কথা শুনিয়া অতি ত্বরায় সভা হইতে গাত্রোত্থান পূর্ব্বক বাহিরে গিয়া জলে ঝাপ দিলেন, এবং এক হস্তে নারী ও বালক, ও অন্য হন্তে পুরুষকে ধরিলেন। রাজা অত্যন্ত সন্তরণ সমর্থ ছিলেন, অনায়াসেই সর্ব্ব সমেত উঠিতে পারিতেন, কিন্তু ঐ পুরুষটা জীবনের আশায় তাহাকে এমত জড়াইয়া ধরিল যে তাহাতে তিনি একবারেই সন্তরণ সামর্থ্য রহিত হইলেন, সুতরাং তাহারাে জলমগ্ন হইবার উপক্রম হইল। ইহাতে তিনি ব্যাকুলিত হইয়। পরমেশ্বরের চিন্তা করিতে লাগিলেন, আর কহিলেন হে নাথ আমি ধর্ম্মের জন্য আসিয়াছি, ইহাতে যদি আমার প্রাণ বিয়ােগ.হয় তবে ধর্ম্ম কর্মে কাহারও প্রবৃত্তি হইবেনা। রাজা ইহা বলিয়া বলপূর্ব্বক সন্তরণ দিতে চেষ্টা করিলেন, কিন্তু তাহাতে কোন ফল দর্শিল না। তখন তাহার তাল বেতালকে স্মরণ হইল। স্মরণ মাত্র তাল বেতাল উপস্থিত হইয়া চারি জনকে জল হইতে উত্তোলন পূর্ব্বক নদীতটে স্থাপন করিয়া প্রস্থান করিল।
ঐ ব্যক্তি পুত্র কলত্র সহিত প্রাণদান পাইয়া। রাজার পাদবন্দন পূর্ব্বক কহিল, মহারাজ তুমি আমাদিগের প্রাণ দান করিলে, অতএব তুমি আমাদিগের প্রাণদাতা। অনন্তর রাজা তাহাদিগকে আপন অট্টালিকাতে আনিয়া শুষ্ক বস্ত্র পরিধান করাইলেন, পরে তাহারা সুস্থ হইলে তাহাদিগকে কহিলেন তােমাদিগের যাহা ইচ্ছা আমার স্থানে প্রার্থনা কর। তাহারা কহিল, মহারাজ, আমাদিগকে যাহা দিলেন তাহা অপেক্ষা অধিক আর কি চাহিব। আপনার নিকট চিরক্রীত রহিলাম এবং যাবজ্জীবন আপনার কল্যাণ প্রার্থনা করিব। সম্প্রতি আমাদিগের বিদায়ের অনুমতি দেউন, আমরা গৃহে যাই। রাজা বিক্রমাদিত্য তাহাদিগের বাক্যে সন্তুষ্ট হইয়া তৎক্ষণাৎ তাহাদিগকে অনেক অর্থ প্রদান করিলেন। তাহার পরমানন্দিত চিত্তে হস্তদ্বয় উত্তোলন পূর্ব্বক পরমেশ্বরের নিকট রাজার মঙ্গল প্রার্থনা করিয়া প্রস্থান করিল।
এই আখ্যায়িকা সমাপ্ত হইলে পুত্তলিকা ভােজ রাজকে কহিল, নৃপতে যদি তুমি রাজা বিক্রমাদিত্যের ন্যায় এই প্রকার ক্ষমতাপন্ন হও তবে এই সিংহাসনে উপবেশন কর, নতুবা লােক সমাজে হাস্যাপদ হইবে। এই কথা বলিতে বলিতে সে দিবসের লগ্নও অতীত হইল। পরদিবস রাজা পুনর্ব্বার সিংহাসনে উপবেশন করিবেন এই চিন্তা করিতে করিতে তৎসমীপে আগমন করিলে,
অনুপবতী পঞ্চদশ পুত্তলিকা
কহিল, হে ভােজরাজ, রাজা বিক্রমাদিত্যের যে রূপজ্ঞান ও যে সকল গুণ ছিল, তাহা অত্যাশ্চর্য, আমি তাহা বলিতে ইচ্ছা করি, কিন্তু পাছে যােগ বর্ণনা না হয় এই আশঙ্কা হইতেছে। রাজা বলিলেন সে জন্য চিন্তা নাই তুমি বল। পুত্তলিকা কহিল তবে মনেযােগ পূর্ব্বক শ্রবণ কর।
এক দিবস রাজা বিক্রমাদিত্য সভায় বসিয়া আছেন ইতিমধ্যে কোন স্থান হইতে এক ব্রাহ্মণ আসিয়া তাহার নিকটে চারিটী শ্লোক, পাঠ করিলেন, তাহার অর্থ এই, মিত্রদ্রোহী ও বিশ্বাসঘাতক ব্যক্তি যাবৎ চন্দ্র সুর্য্য থাকিবেন তাবৎ নরক ভােগ করিবে। রাজা শ্লোক শ্রবণে সন্তুষ্ট হইয়া ব্রাহ্মণকে সমুচিত পুরস্কার প্রদান পূর্বক কহিলেন ইহার তাৎপর্যার্থ ব্যাখ্যা করিয়া দ্বামাকে বল। ব্রাহ্মণ বলিতে লাগিলেন।
কোন দেশে এক নির্বোধ রাজা ছিলেন, তাঁহার এক মহিষী ছিল, রাজা তাহাকে অত্যন্ত ভাল বাসিতেন, মুহূর্ত্তেকের নিমিত্ত দৃষ্টির অন্তরালে রাখিতেন, যখন রাজকর্ম্ম করিতেন তখনও সিংহাসনে আপন পাশ্বে বসাইয়া রাখিতেন। মৃগয়া গমনকালে আপনি এক অশ্বে আরোহণ পূর্বক রাণীকে আর এক অশ্বে লইয়া যাইতেন। শয়ন ভোজনাদিও একত্রেই হইত। মন্ত্রী রাজাকে এই প্রকার স্ত্রীপরতন্ত্র দেখিয়া এক দিবস বলিলেন মহারাজ যদি কিঙ্করের অপরাধ মার্জনার আজ্ঞা হয় তবে আমি এক নিবেদন করি। রাজা বলিলেন কি বলিবে বল। মন্ত্রী কহিলেন রাণীকে সর্ব্বদা নিকটে রাখা কাপুরুষের কর্ম্ম, ইহাতে রাজকুলের অমর্য্যাদা হয়, এবং আর আর নৃপতিগণ পরিহাস করিয়া বলেন রাণী আপনাকে বশীভূত করিয়াছেন। অতএব আমার নিবেদন, যদি মহিষী আপনার অতিশয় প্রেয়সীই হয়েন তবে তাহার এক প্রতিমূর্ত্তি চিত্রিত করাইয়া নিকটে রাখুন। হইলে কেহ নিন্দা করিবেক না।
এই পরামর্শ রাজার মনোনীত হইল, অতএব ভখানি মন্ত্রীকে আজ্ঞা করিলেন এক জন চিত্রকর। আনাও। তাহাতে মন্ত্রী এক জন চিত্রকর আনয়ন করাইলেন। ঐ চিত্রকর জ্যোতিষ ও চিত্র বিদ্যাতে অতিপণ্ডিত ছিলেন। চিত্রকর উপস্থিত হইলে রাজ। তাহাকে কহিলেন হে চিত্রকর তুমি আমাকে রাজমহিষীর একখান চিত্রপট প্রস্তুত করিয়া দাও। আমি তাহা সর্ব্বদা সম্মুখে রাখিব। চিত্রকর নতশির হইয়া বলিলেন যে আজ্ঞা, আমি চিত্রপট লিখিয়া দিব। তদনন্তর রাজার স্থানে বিদায় হইয়া বাটীতে আসিয়া চিত্র প্রস্তুত করিতে আরম্ভ করিলেন, এবং কয়েক দিবস শ্রম করিয়া ঐ চিত্র এমত উত্তমরূপে, প্রস্তুত করিলেন যে রাণীকে ইন্দ্রের অরা হইতেও অধিক মনোহারিণী জ্ঞান হইতে লাগিল, অথচ রাণীর যে অঙ্গ যে প্রকার ছিল তাহা অবিকল সেইরূপ হইল।
এই চিত্র প্রস্তুত হইলে চিত্রকর তাহা রাজসমীপে প্রেরণ করিলেন। রাজা অবলোকন করিয়া অত্যন্তু সন্তুষ্ট হইলেন। তিনি দেখিলেন ছাঁচে ঢালিলে যেমত হয়, নখ অবধি মস্তক পর্য্যন্ত সেইরূপ উত্তম হইআছে। কিন্তু জানু দৃষ্টি করিয়া দেখিলেন ঐস্থানে একটা তিল আছে। তাহাতে অন্তঃকরণে এইরূপ সন্দেহ উপস্থিত হইল যে, রাণীর জানুদেশে তিল আছে এব্যক্তি কি প্রকারে দেখিতে পাইল, অবশ্য রাণীর সহিত ইহার সন্দর্শনাদি আছে, তাহা না হইলে কি প্রকারে দেখিতে পাইবে। অতএব কুপিত হইয়া মন্ত্রীকে বলিলেন চিত্রকরকে পুনর্ব্বার ডাকাও। মন্ত্রী আজ্ঞামাত্র তাহাকে ডাকিতে পাঠাইলেন। চিত্রকর মনে করিলেন রাজা তুষ্ট হইয়াছেন, বুঝি পুরস্কার দিবেন এইজন্য আহ্বান করিয়াছেন। পরে চিত্রকর রাজার সম্মুখে উপস্থিত হইলে, রাজা ঘাতক পুরুষকে বলিলেন ইহার মস্তক ছেদন পূর্ব্বক হার দুই চক্ষুঃ বাহির করিয়া আমার নিকটে লইয়া আইস।
এই আজ্ঞা পাইয়া ঘাতক পুরুষ চিত্রকরকে বধ্য ভূমিতে লইয়া চলিল। মন্ত্রী মনে মনে কহিলেন, এমত মূখ রাজা আমি কোথাও দেখি নাই। বিদ্বান, লোক অপরাধী হইলে তাহাকে নির্বাসন করা যায়, পূর্ব্বাপর এইপ্রকার প্রথা প্রথিত আছে, তাহাদের প্রাণদণ্ড করা যায়না। কিন্তু এই রাজার মুখ অমৃতময় এবং অন্তর বিষে পরিপূর্ণ, ইহার কথার সহিত কর্ম্মের ঐক্য নাই। মন্ত্রী মনে মনে এই প্রকার অনেক চিন্তা করিতে লাগিলেন, কিন্তু ভয় প্রযুক্ত রাজাকে কোন কথা বলিতে পারিলেন না। পরে ঘাতক পুরুষের পশ্চাৎ পশ্চাৎ গিয়া তাহাকে কহিলেন তুমি এই নিরপরাধী ব্যক্তিকে বধ করিও না, ইহাকে পরিত্যাগ কর, এবং মৃগ বধ করিয়া তাহার চক্ষু ঃ রাজাকে দেখাও। ঘাতক পুরুষ মন্ত্রীর বাক্যানুসারে একটা হরিণ বধ করিয়া তাহার চক্ষুঃ রাজার নিকটে লইয়াগিয়া বলিল মহারাজ চিত্রকরের নয়ন আনয়ন করিয়াছি। রাজা আজ্ঞা করিলেন ফেলিয়া দাও। চিত্রকর মন্ত্রীর বাটীতে অতি গোপনে থাকিল।
কিয়দিদবস পরে ঐ রাজার পুত্র মৃগয়ার্থে গমন করিয়া এক ঘোর অরণ্যে প্রবিষ্ট হইলেন, এবং তথায় একটা ভীষণমূর্ত্তি বৃহৎ ব্যাঘ্র দেখিয়া মহাভীত হইয়া তুরঙ্গ পরিত্যাগ পূর্বক এক বৃক্ষে আরোহণ করিলেন। পকিন্তু উঠিয়া দেখিলেন বৃক্ষের উপর একটা ঋক্ষ বসিয়া আছে। তদবলোকনে আরো ভীত হইয়া কম্পান্বিত কলেবর হইলেন, সুতরাং বৃক্ষ হইতে ভূমিতে পতিত হইবার উপক্রম হইল তাহা দেখিয়া ভালক কহিল হে কুমার তুমি ভয় করিওনা, আমি তোমাকে ভক্ষণ করিব না, তুমি আমার শরণাগত হইয়াছ, অতএব আমি তোমাকে জীবন দান করিলাম, তুমি স্বচ্ছন্দে এখানে বসিয়া থাক। এই কথা শুনিয়া রাজপুত্রের সাহস হইল, বৃক্ষ হইতে পতিত হইলেন না।
অনন্তর দিবাবসান হইলে ভাল্লুক কহিল এক্ষণে রজনী আগত, কিন্তু এই যে ব্যাঘ্র বসিয়া আছে এ আমাদের উভয়ের শত্রু, আমরা একবারে উভয়ে নিদ্রিত হইলে সে আমাদিগকে নষ্ট করিবার চেষ্টা অতএব আমরা এক এক জন দুই দুই প্রহর কাল করিয়া জাগিয়া থাকি, তাহা হইলে সে আমাদিগকে নষ্ট করিতে পারিবে না। রাজপুত্র বলিলেন এ পরামর্শ উত্তম। ভাল্লুক বলিল তবে আমি প্রথমার্ধ রাত্রি জাগরণ করি তুমি নিদ্রা যাও, পরে তুমি জাগিয়া থাকিবে আমি নিদ্রা যাইব। এই পরামর্শ করিয়া রাজপুত্র শয়ন করিলেন। ভাল্লক জাগৃত থাকিল।
রাজপুত্র নিদ্রাভিভূত হইলে ব্যাঘ্র ঋক্ষকে কহিল অহে ঋক্ষ তুমি অজ্ঞানের কর্ম্ম করিও না। আমরা উভয়ে বনবাসী, এবং মনুষ্য আমাদের উভয়ের শত্রু, করিবে। অতএব এই ব্যক্তিকে রক্ষা করিয়া কেন বিষবৃক্ষ রোপণ করিতেছ। ইহাকে বৃক্ষ হইতে নীচে ফেলিয়া দাও, আমি ভক্ষণ করি, তুমিও আসিয়া ইহার কিয়দংশ মাংস ভোজন কর। আমার বাক্য অবহেলন করি ও না, মণি হস্ত হইতে পড়িলে কখন পুনর্ব্বার হস্তে উঠিয়া আইসে না। তুমি নিদ্রাগত হইলে ঐ ব্যক্তি নিশ্চয়। তোমাকে সংহার করিবে। অতএব আমি যাহা কহিলাম তাহা কর, নতুবা শত্রুবিনাশের এমত সময় আর পাইবেন, পরে মনস্তাপ করিতে হইবে।
ভাল্লুক কহিল অরে অজ্ঞান ব্যাঘ্র বিশ্বাসঘাতকতা অতি অকর্ত্তব্য কর্ম্ম, যে ব্যক্তি আমাদের শরণ লায় তাহাকে নষ্ট করা কোন প্রকারে উচিত নহে। নৃপতিবধ, বৃক্ষচ্ছেদন, গুরু সমীপে মিথ্যা কথন ও কানন দাহন মহাপাপ বটে, কিন্তু সকল অপেক্ষা বিশ্বাসঘাতকতা গুরুতর পাপ, ইহার প্রায়শ্চিত্ত নাই। এই ব্যক্তি আমার শরণ লইয়াছে, অতএব ইহাকে ভক্ষণ করিলাম, তাহাতে কি ক্ষতি। ব্যাঘ্র কুপিত হইয়া বলিল তবে তুমি থাক, আমি তোমাকেও জীবদ্দশায় যাইতে দিবনা। এই প্রকার কথোপকথনে প্রায় রাত্রি দুই প্রহর হইল। তৎপরে রাজনন্দন নিদ্রা হইতে উঠিয়া বসিলেন। ভাল্লুক শয়ন করিল।
ঋক্ষ নিদ্রিত হইলে ব্যাঘ্র রাজপুত্রকে কহিল হে রাজকুমার তুমি অবশ্যই জান, নদী নখী শৃঙ্গী নারী ও অস্ত্রধারী এবং রাজপুরুষকে কখন বিশ্বাস করা কর্তব্য নহে। অতএব তুমি মনোভ্রমে ভাল্লুককে কখন বিশ্বাস করিও না। এ নিদ্রা হইতে উঠিয়া তোমাকে ভক্ষণ করিবে, এ কথা আমাকে এখনি বলিতেছিল, অতএব তাহা না হইতেই তুমি ঐ ঋক্ষকে বৃক্ষ হইতে ফেলিয়া দাও, আমি উহাকে ভক্ষণ করিয়া প্রস্থান করি, তাহার পরে তুমিও স্বচ্ছন্দে গৃহে গমন করিবে। রাজপুত্র ব্যাঘ্রের কথা শুনিয়া ভাবিলেন একথা সত্যই হইবে। অতএব ভূত ভবিষ্যৎ বিবেচনা না করিয়া তখনি ভালককে ঠেলা মারিলেন, কিন্তু তাহাতে তাহার নিদ্রা ভঙ্গ হওয়াতে দুই হস্তে বৃক্ষশাখা ধরিয়া রহিল নীচে পড়িল না। পরে সে রাজপুত্রকে কহিল অরে পাপিষ্ঠ তোমার বাক্যে বিশ্বাস করিয়া আমি তোমার প্রাণ রক্ষা করিলাম, কিন্তু তুমি অজ্ঞানের ন্যায় আপন সত্য পালন না করিয়া আমার প্রাণ নাশে উদ্যত হইয়া ছিলে, কালের বিচিত্র গতি। আমি যদি এখন তোমাকে ধরিয়া আহার করি তবে তোমাকে কে রক্ষা করে। এই কথায় রাজপুত্র কাষ্ঠবৎ হইলেন, এবং মনে করিলেন ভালুক এখনি আমাকে নষ্ট করিবে। কিন্তু সে তাহা করিলনা। রাত্রি প্রভাত হইলে ব্যাঘ্র তথা হইতে প্রস্থান করিল। ঋক্ষ তখন রাজপুত্রের কর্ণমূলে মূত্রত্যাগ করিয়া দিল, আর বলিল তোমার প্রাণবধ করিলে কি হইবে, তোমার রক্ষাকর্তা কেহই নাই, অতএব তোমাকে ছাড়িয়া দিলাম ইহা বলিয়া ভাল্লুক প্রস্থান করিল।
রাজপুত্র তদবধি উন্মত্ত হইলেন এবং তখন তাহার আর কোন কথা কহিবার শক্তি রহিল না। কেবল সসেমিরা সসেমিরা এই কথা বলিতে বলিতে নগরে আসিলেন। রাজা পুত্রের তাদৃশ দশা দর্শন করিয়া বিষাদ সমুদ্রে মগ্ন হইলেন, মহিষীগণ হাহাকার শব্দে রোদন করিতে লাগিলেন এবং বলিলেন হায়, বিধাতা কেন এমন বিড়ম্বন করিলেন। কেহ কেহ অনুমান করিলেন রাজপুত্রকে কেহ যাদু মন্ত্রে অভিভূত করিয়াছে। তাহাতে রাজা মন্ত্রীকে আজ্ঞা করিলেন নগরের মধ্যে যে সকল গুণী জ্ঞানী ও চিকিৎসক আছে তাহাদিগকে আনাইয়া পুত্রের চিকিৎসা করাও। মন্ত্রী নগরস্থ সমস্ত বৈদ্য ও বিজ্ঞ লোক দিগকে আনাইলেন। তাহারা তন্ত্র মন্ত্র যে যাহা জানিতেন তাহা প্রয়োগ করিলেন, কিন্তু তাহাতে কোন উপকার দর্শিল না।
যখন এই সকল লোক রাজপুত্রকে আরোগ্য করিবার আশা ত্যাগ করিল, তখন মন্ত্রী রাজাকে বলিলেন মহারাজ আমার এক পুত্রবধূ আছেন, তিনি অতি গুণবতী। যদি আজ্ঞা হয় তাহাকে আনয়ন করি, তিনি দেখিলে পরমেশ্বরের কৃপায় কুমার। অবশ্য আরোগ্য হইতে পারিবেন। রাজা জিজ্ঞাসা করিলেন তোমার পুত্রবধূ কিপ্রকার চিকিৎসা করেন। মন্ত্রী বলিলেন, তিনি এক যোগীর শিষ্য, যোগীর। স্থানে নানা প্রকার মন্ত্র শিক্ষা করিয়াছেন। ইহা শুনিয়া রাজা তাহাকে আনয়নার্থে আজ্ঞা দিলেন। মন্ত্রী স্বীয় ভবনে গিয়া চিত্রকরকে সমুদায় বৃত্তান্ত জানাইলেন, আর বলিলেন আমি রাজাকে এই প্রকার বলিয়া আসিয়াছি, তুমি নারীবেশ ধারণ করিয়া আমার সঙ্গে আইস। চিত্রকর তাহাতে সম্মত হইয়া স্ত্রী বেশে মন্ত্রী সমভিব্যাহারে শিবিকারোহণে গমন করিলেন। রাজপুরে উপনীত হইলে রাজাজ্ঞায় রাজপুরীস্থ লোকেরা তাহাকে যত্নপূর্ব্বক যবনিকার মধ্যে বসাইল। রাজা রাজপুত্র ও মন্ত্রী তাহার বহির্ভাগে উপবিষ্ট হইলেন। অনন্তর ছদ্মবেশী চিত্রকর রাজপুত্রকে উত্তমাসনে উপবেশন করাইতে বলিলেন। তাহা হইলে পর চিত্রকর রাজপুত্রকে কহিলেন আমি তোমাকে যাহা কহি তাহা মনোেযোগ পূর্ব্বক শ্রবণ কর। বিভীষণ বড় শূর বীর ছিলেন, কিন্তু তিনি আপন ভ্রাতার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা প্রকাশ পূর্ব্বক, রামচন্দ্রের সহিত মিলিয়া আপন ভ্রাতার রাজ্য নষ্ট এবং আপন কুলক্ষয় করিয়াছিলেন। এই লজ্জায় তিনি এক বৎসর মস্তক উত্তোলন করেন নাই, এবং পরিশেষে আপন কর্মের প্রতিফলও পাইয়াছিলেন। ভস্মসুর নামে এক দৈত্য মহাদেবের অনেক তপস্যা করিয়াছিল, তাহাতে মহাদেব প্রসন্ন হইয়া তাহাকে বর দিয়াছিলেন। কিন্তু তাহার পর, সে তজ্জায়া পার্বতীর হরণাভিলাষী হয়। ইহার ফল তখনি পাইল, অর্থাৎ মহাদেবের কোপানলে ভস্ম হইল। অতএব হে যুবরাজ তুমি মিত্রদ্রোহী ও বিশ্বাসঘাতকের কর্ম্ম কেন করিলে। তুমি বনমধ্যে ঋক্ষকে বৃক্ষ হইতে কেন নিক্ষেপ করিতে উদ্যত হইয়াছিলে, সে তোমার উপকার ভিন্ন অপকার করে নাই, তুমি তাহার বিপরীত কেন করিলে। ফলতঃ এইরূপ দুষ্কর্ম করণে তোমার অপরাধ নাই, তুমি যেমন পিতার সন্তান তদুপযুক্ত কর্ম্ম করিয়াছ, ক্ষেত্রে যেপ্রকার বীজ বপন হয় সেই প্রকার ফলই উৎপন্ন হইয়া থাকে। যাহা হউক, তুমি এক্ষণে ক্ষিপ্ত হইয়া কেবল বারম্বার, স সে মি রা, এই চারি। বর্ণের উচ্চারণ করিতেছ, অতএব আমি এক এক মন্ত্র পড়ি, তুমি ঐ ঐ মন্ত্রের আদ্য বর্ণ পরিত্যাগ কর। এই বলিয়া চিত্রকর এক শ্লোক পাঠ করিলেন। তাহ এই,
১। সদ্ভাব প্রতিপন্নানা বঞ্চনে কা বিদগ্ধতা।
বিশ্বাসেনাঙ্কসুপ্তানাং বিনাশে কি পৌরুষ।
২। সেতুবন্ধে সমুদ্রস্য গঙ্গাসাগরসঙ্গমে।
ব্রহ্মহা মুচ্যতে পাপী মিত্রদ্রোহী ন মুচ্যতে।।
২ (অর্থ, সমুদ্রের সেতুবন্ধে ও গঙ্গাসাগরসঙ্গমে যাত্রা করিলে ব্রহ্মহত্যা-পাপীও মুক্ত হয়, কিন্তু মিত্রদ্রোহী কুত্রাপি মুক্ত হয় না)। এই মন্ত্র পাঠে রাজপুত্র এই মন্ত্রের আদ্য বর্ণ সে ত্যাগ করিয়া কেবল মি রা এই বর্ণদ্বয় উচ্চারণ করিতে লাগিলেন। চিত্রকর তৃতীয় মন্ত্রপাঠ করিলেন। যথা,
৩। মিত্রদ্রোহী কৃতঘশ্চ যে চ বিশ্বাসঘাতকাঃ।
তে নর নরকং যান্তি যাবচ্চন্দ্রদিবাকরৌ।।
৩ (অর্থ, মিত্রদ্রোহী, কৃতঘ এবং বিশ্বাসঘাতক ইহারা, যত কাল চন্দ্র সূর্য্য থাকিবেন তত কাল নরকে বাস করিবেক)। এই মন্ত্রপাঠে রাজনন্দন এই মন্ত্রের প্রথম বর্ণ মি ত্যাগ করিয়া কেবল রা এই বর্ণ উচ্চরণ করিতে লাগিলেন। চিত্রকর আর এক মন্ত্র পাঠ করিলেন। যথা,
৪। রাজাসি রাজপুত্রোইসি যদি কল্যাণমিচ্ছসি।
দেহি দানং দরিদ্রেতভা দেবতারাধনং কুরু।।
৪ (অর্থ, তুমি নিজে রাজা এবং রাজার পুত্র, যদি কল্যাণ ইচ্ছা হয়, দরিদ্রদিগকে দান কর এবং দেবতারাধনা কর)। এই মন্ত্রপাঠে রাজতনয় রা ত্যাগ করিয়া অন্যান্য বাক্যালাপ করিতে লাগিলে এবং তখন উহার জ্ঞানোদয় হইল, উন্মাদ রোগ আর থাকিল না।
রাজা পুত্রের রোগশান্তি দেখিয়া অত্যন্ত সন্তুষ্ট হইলেন, এবং চিত্রকরকে মন্ত্রীর পুত্রবধূ বিবেচনায় বলিলেন হে সুন্দরি তুমি কুলের বধূ, বনের জন্তুকে কি প্রকারে জানিতে পারিলে বল। চিত্রকর কহিল আমি বিদ্যাভ্যাস জন্য যে গুরুর নিকটে যাইতাম তাহার যথেষ্ট সেবা করিতাম। তাহাতে তিনি আমার প্রতি প্রসন্ন হইয়া আমাকে এক মন্ত্র দিয়াছিলেন, ঐ মন্ত্র সাধন করিয়া আমি দেবীর অনুগৃহীত হইয়াছি, দেবী আমার অন্তঃকরণে সদা বিরাজমান। আছেন। অতএব আমি রাণীর জানুদেশে তিলের কথা যাহার কৃপায় জানিয়াছিলাম তাহারই কৃপায় বন্য ভালুকের বৃত্তান্ত জানিতে পারিয়াছি।
এই কথা শুনিয়া রাজা অতিশয় সন্তুষ্ট হইলেন, এবং তৎক্ষণাৎ যবনিকা স্থানান্তর করিয়া চিত্রকরকে কহিলেন তুমি যথার্থ সরস্বতীর বরপুত্র, আমি এই ক্ষণে তোমার গুণ জানিতে পারিলাম। ইহা বলিয়া তখনি তাহাকে অসীম সম্পত্তি প্রদান পূর্ব্বক আপনার মন্ত্রিত্ব পদে নিযুক্ত করিলেন।
এই বৃত্তান্ত বলিয়া ব্রাহ্মণ কহিলেন মহারাজ এই চারি মন্ত্রই চারি শ্লোক, এবং এই তাহার তাৎপর্য্য। রাজা বিক্রমাদিত্য শুনিয়া ব্রাহ্মণকে আরো তাধিক পারিতোষিক প্রদান পূর্বক বিদায় করিলেন।
পুত্তলিকা বলিল হে ভোজরাজ তোমার এমত বদান্যতা কোথায়, রাজা বিক্রমাদিত্যের তুল্য সদ্গুনাম্বিত ও দাতা কে আছে। আমি তোমাকে তাঁহার গুণের বিবরণ কহিলাম। এক্ষণে তুমি এই সিংহাসনোপবেশনের উপযুক্ত পাত্র কি না বিবেচনা কর।
এই সকল কথা বার্তায় মে দিবসের লগ্ন অতীত হইল, সুতরাং ভোজরাজ অন্তঃপুরে গেলেন। দিবস প্রত্যুষে পুনর্বার স্নান পূজাদি করিয়া সিংহাসনের সম্মুখে আসিয়া মন্ত্রীকে কহিলেন সিংহাসনারোহণে আমার নিতান্ত বাসনা হইয়াছে। মন্ত্রী কহিলেন মহারাজ আপনি সিংহাসনে বসিবেন সে উত্তম কথা, কিন্তু তাহা হইলে এই সকল পুত্তলিকা রোদন করিয়া প্রাণ ত্যাগ করিবে। রাজা যখন এই কথায় কোন উত্তর করিলেন না, তখন,
সুন্দরবতী ষোড়শ পুত্তলিকা।
কহিল মহারাজ আমি এক বৃত্তান্ত বলি শ্রবণ কর।
উজ্জয়িনী নগরে এক ধনবন্ত বণিক ছিলেন। তিনি নানা প্রকার বাণিজ্য কার্য্য করিতেন। এমত দাতা ছিলেন যে, কোন প্রার্থক তাহার স্থানে গমন করিলে রিক্ত হস্তে ফিরিত না। ঐ বণিকের রত্নসেন নামে এক পুত্র ছিলেন। তিনি অতিরূপবান ও বিদ্বান ছিলেন, মাতা পিতাকে অত্যন্ত ভক্তি করিতেন। পরে তাহার বিবাহের উপযুক্ত বয়স হইলে, বণিক কন্যা অন্বেষণ জন্য দেশদেশান্তরে ঘটক প্রেরণ করিলেন। তাহাদিগকে কহিয়াদিলেন অতিরূপবতী কন্যা দেখিয়া সম্বন্ধ করিবে, তাহা হইলে তোমাদিগকে বহু পুরস্কার দিব।
ঘটকগণ নানা দেশে ভ্রমণ করিতে লাগিলেন। তন্মধ্যে এক জন শুনিলেন সমুদ্র পারে এক ধনাঢ্য বণিকের এক পরম সুন্দরী দুহিতা আছে, তাহার বিবাহার্থে পাত্রান্বেষণ হইতেছে। ইহা শুনিয়া তিনি পোতারোহণে সমুদ্রপারে যাত্রা করিলেন। বণিকের গৃহে উপস্থিত হইয়া তাহাকে সকল সমাচার কহিলেন। বণিক বলিলেন আমার কন্যার বিবাহ জন্য একটা বড় দুর্ভাবনা ছিল, কিন্তু পরমেশ্বরপ্রসাদাৎ আমি ঘরে বসিয়াই তাহার পাত্র প্রাপ্ত হইলাম। তদনন্তর তিনি বণিকপুত্রের সহিত কন্যার সম্বন্ধ স্থির করিয়া ঘটককে কহিলেন তুমি কিয়দিবস এই স্থানে আমি আপন পুরোহিতকে তোমার অবস্থান কর। সঙ্গে দিব, তিনি যাইয়া পাত্রকে টিকা দিয়া আসিবেন। আর তুমিও আমার কন্যাকে দেখিয়া যাও, আপন প্রভুকে গিয়া কহিবে কন্যাকে স্বচক্ষে দেখিয়া আসিআছি। এই কথায় ঘটক কিয়দিবস তথায় থাকিলেন, এবং কন্যাকে দেখিলেন। পরে কন্যাকত্তার পুরোহিতকে সঙ্গে লইয়া উজ্জয়িনী নগরে যাত্রা করিলেন। বণিক পুরোহিতকে বলিয়া দিলেন পাত্রকে টিকা দিয়া শীঘ্র প্রত্যাগমন করিবে।
ঘটক পরমানন্দে পুরোহিতসমভিব্যাহারে নৌকা যোগে যাত্রা করিলেন। কিয়দিবস পরে উজ্জয়িনী নগরে উপনীত হইয়া বণিককে সকল সংবাদ কহিলেন। বণিক কন্যাকত্তার পুরোহিতের সম্মুখে আপন পুত্রকে আনিয়া দেখাইলেন। পুরোহিত তাহাকে দেখিয়া ললাটে তিলক দিলেন। পরে বিবাহের দিবস ধার্য্য করিয়া বলিলেন অমুক দিবসে বিবাহ হইবে, আপনি বিবাহের উদ্যোগ করিয়া শীত্র বর লইয়া আসুন, আমি গিয়া বিবাহের আয়োজন করাই। ইহা বলিয়া পুরোহিত বিদায় হইলেন, এবং সমুদ্র পার হইয়া স্বদেশে প্রত্যাগমন পূর্ব্বক সাধুসমীপে সবিশেষ সমস্ত বৃত্তান্ত নিবেদন করিলেন। বণিক তাহা শুনিয়া বিবাহের দ্রব্যাদি প্রস্তুত করিতে লাগিলেন।
এদিকে বরকর্ত্তা বিবাহের আয়োজন করিতে লাগিলেন। তাঁহার বাটীতে নহবত ও নাগারা খানা বসিল, এবং নানা প্রকার মঙ্গলাচরণ, নৃত্যগীত ও রাগরঙ্গ হইতে লাগিল। যে সকল আত্মীয় কুটুম্বগণ বর লইয়া যাইবেন তাহাদিগকে নূতন বসন দান করিলেন। নগরস্থ তাবৎ লোককে নিমন্ত্রণ করিয়া নিত্য নিত্য নানাবিধ আহারাদি করাইতে লাগিলেন। এই প্রকার বিবাহের পূর্ব্বকত্তব্য কৌলিক ও মাঙ্গলিক কর্ম্ম সকল সম্পন্ন করিতে অনেক দিন লাগিল। তাহাতে বিবাহের অবধারিত দিবস অতিনিকটবর্তী হইল। ফলতঃ এমত কাল রহিল না যে সমদ্র পারে গিয়া নিদ্ধারিত দিবসে বিবাহ সম্পন্ন হয়।
ইহাতে বরকত্তা ও আর আর কুটুম্বের অতিশয় চিন্তাকুলিত হইলেন। বিবাহের দিবস অতি নিকট হইয়াছে, ঐ দিনে ঐ লগ্নে কি প্রকারে বিবাহ হইবেক, তৎকালে এই ভাবনাই প্রবল হইয়া উঠিল, আর আর আমোদ প্রসোদ কিছুই রহিলনা।
বণিক নিরুপায় হইয়া, লগ্ন ভ্রষ্ট হইবার আশস্কায় বিমর্ষ ভাবে আছেন, এমত সময়ে কোন ব্যক্তি তাঁহাকে কহিল যদি প্রজাপতির নির্বন্ধ থাকে তবে অবশ্যই নির্ধারিত লগ্নে বর কন্যার বিবাহ হইবেক, আমি তাহার এক পরামর্শ কহিতেছি তুমি তাহার চেষ্টা দেখ, পরমেশ্বরের কৃপাতে তাহা সিদ্ধ হইতে পারে। বণিক ব্যগ্রতা পূর্ব্বক কহিলেন হে ভ্রাতঃ ভগবান, লজ্জা নিবারণের কর্ত্তা। এক্ষণে যাহাতে আমার কর্ম পণ্ড না হয় তাহার পরামর্শ বল। ঐ ব্যক্তি কহিল কিয়দিবস হইল, এক সূত্রধর এক চতুদ্দোল নির্মাণ করিয়া রাজা বিক্রমাদিত্যকে দিয়াছিল। ঐ চতুর্দোলের গুণ এই, তাহাতে উপবেশন করিয়া যেখানে ইচ্ছা তৎক্ষণাৎ গমন করা যায়। রাজা এই চমৎকার গুণের কথা শুনিয়া সুত্রধরকে দুই লক্ষ মুদ্রা দিয়া তাহা গ্রহণ করিয়াছেন। ঐ চতুর্দোল এক্ষণে তাহার ভাণ্ডারে আছে, তুমি রাজার স্থানে তাহা প্রার্থনা করিয়া লও। তাহা হইলে অনায়াসে তোমার কর্ম্ম সিদ্ধ হইবে।
বণিক এই পরামর্শে পরমাহলদিত হইয়া তৎক্ষণাৎ রাজসদনে গমন করিলেন, এবং রাজদ্বারে উপস্থিত হইয়া দ্বারীকে কহিলেন রাজাকে সংবাদ দাও, আমি তাঁহার নিকট কোন কথা নিবেদন করিব। দ্বারপাল ভূপালকে সংবাদ না দিয়া অগ্রে মন্ত্রীর নিকট সম্বাদ কহিল। মন্ত্রী তাহাকে স্বসমীপে আনয়ন করাইলে, বণিক তাহাকে দণ্ডবৎ হইয়া প্রণাম করিলেন। তদনস্তর বহু বিনয় পুৱঃসর কহিলেন আমি মহারাজকে দর্শন করিবার জন্য আসিয়াছি, আমার এক বিপদ উপস্থিত। মন্ত্রী কহিলেন রাজা অন্তঃপুরে আছেন। বণিক এ কথায় ব্যগ্র চিত্ত হইয়া কহিলেন আমার এক গুরুতর প্রার্থনা ছিল। আমার পুত্রের বিবাহের চারি দিবস কাল অবশিষ্ট আছে, কিন্তু সমুদ্রপারে অনেক দূর যাইতে হইবে। ইহার মধ্যে কন্যাকর্ত্তার ভবনে উপস্থিত হইতে না পারিলে লগ্ন ভ্রষ্ট হইবে, এবং আমি সকলের হাস্যাস্পদ হইব। মন্ত্রী এই কথা শুনিয়া অন্তঃপুরে প্রবেশ পূর্বক রাজাকে সকল বৃত্তান্ত কহিলেন। রাজা তাহা শ্রবণ মাত্র আজ্ঞা দিলেন ভাণ্ডার হইতে চতুর্দোল আনাইয়া বণিককে দাও, এবং তাহার পুত্রের বিবাহে যে যে দ্রব্যের আবশ্যক হয় তাহ দেওয়াও, কোন প্রকারে শুভ কর্মের বিঘ না হয়। মন্ত্রী রাজাজ্ঞানুসারে সাধুকে চতুর্দোল আনয়ন করাইয়া দিলেন, এবং বলিলেন যদি আর কোন দ্রব্যের আবশ্যক হয়, কহ, দেওয়া যাইবে। বণিক বলিলেন মহারাজের কৃপাতে আমার সকলি আছে, কেবল এই চতুর্দোলের প্রয়োজন ছিল, তাহা পাইলাম এখন আপনার অনুগ্রহে সকল কর্ম সিদ্ধ হইবে।
ইহা কহিয়। সাধু চতুর্দোল লইয়া আপন আলয়ে গেলেন, এবং বিবাহের এক দিবস থাকিতে ঘটক ও পুত্র সমভিব্যাহারে চতুর্দোলে উপবিষ্ট হইয়া মুহূর্তেকের মধ্যে কন্যাকর্ত্তার ভবনে উপস্থিত হইলেন। তথায় দেখিলেন সমস্ত নগরে মঙ্গলাচার হইতেছে, এবং সকলে বর আসিবার অপেক্ষায় পথ নিরীক্ষণ করিতেছেন। পাত্র উপনীত হইলে সকলে তাহাকে সমাদর পূর্ব্বক পূর্ব্ব সুসজ্জিত এক স্বতন্ত্র বাটীতে বসাইলেন। কন্যাকর্ত্তা বরকর্ভার যথোচিত সম্মান করিলেন, কিন্তু কেবল তাহাদের তিন জন মাত্র দেখিয়া মনে মনে আক্ষেপ করিয়া জিজ্ঞাসিলেন আপনি এ ভাবে আসিয়াছেন, ইহার কারণ কি। বরকত্তা সমুদায় বিস্তারিত বিবরণ বলিলেন। অনন্তর কন্যাকর্ত্তা স্বীয় কর্মাধ্যক্ষকে বলিলেন কল্য বিবাহ হইবে অদ্য তাহার সকল আয়োজন করিয়া রাখ, কোন বিষয়ে লোক-নিন্দা না হয়। অধ্যক্ষ সকল প্রস্তুত করিল। পরদিবস বরকর্তা বর লইয়া অতি সমারোহে বিবাহ দিতে গেলেন। এবং বিবাহ হইলে পর কন্যাকর্তা হস্তী অশ্ব শিবিকা ও রত্নালঙ্কার এবং আর আর নানা প্রকার দ্রব্য দান করিলেন।
বরকত্তা এই সকল দ্রব্যাদি গ্রহণ পূর্বক পোতারোহণে স্বদেশে যাত্রা করিলেন। কিছু দিন বিলম্বে আপন আলয়ে উপনীত হইয়া ঘটককে উত্তম রূপে বিদায় করিলেন। পরে নানাবিধ বসন ভূষণ ও আর আর নানাজাতীয় উত্তম উত্তম দ্রব্য থালাতে সাজাইয়া চারিট। উত্তম অশ্ব লইয়া রাজাকে উপঢৌকন দিতে গেলেন। রাজা যে খটা দিয়াছিলেন তাহাও প্রত্যপণ করণার্থ সঙ্গে লইলেন। পরে রাজার সম্মুখে উপস্থিত হইয়া রাজাকে ভেট দিয়া বলিলেন মহারাজ আপনার পুণ্য প্রতাপে আমার শুভ কর্ম্ম উত্তম রূপে সম্পন্ন হইয়াছে। সম্প্রতি সেই চতুর্দোল আনিয়াছি গ্রহণ করিতে আজ্ঞা হউক। রাজা হাস্থ্য করিয়া বলিলেন আমি যে দ্রব্য একবার দান করি তাহা কখন পুলগ্রহণ করিনা, অতএব এই খট্টা তোমাকে একবারে দিয়াছি তাহা পুনর্ব্বার লইব না। ইহা কহিয়া রাজা, বণিক যে সকল দ্রব্য ভেট আনিয়াছিল তাহা, এবং নিজ ভাণ্ডার হইতে এক লক্ষ মুদ্রা আনাইয়া তাহার পুত্রকে যৌতুক দিলেন। বণিক তাহাতে অতিশয় আলাদিত হইয়া গৃহে আসিলেন।
এই বৃত্তান্ত বলিয়া পুত্তলিকা কহিল হে ভোেজরাজ দেবরাজও বিক্রমাদিত্যের তুল্য ঐশ্বর্যশালী হইতে পারেন নাই। তুমি কিসের মধ্যে আছ, তুমি এত উচ্চ আশা করিওনা। এই সকল কথায় সে দিবসের শুভ ক্ষণও অতীত হইল। রাজা অন্তঃপুরে গিয়া কোন প্রকারে রজনী বঞ্চন করিলেন। নিশাবসান হইলে সিংহাসনোপবেশন মানসে যখন পুনর্ব্বার উপস্থিত হইলেন, তখন,
সত্যবতী সপ্তদশ পুত্তলিকা
কহিল হে ভোজরাজ অবধান কর।
এক দিবস রাজা বিক্রমাদিত্যের সভাতে স্বর্গীয় শোভা হইয়াছে, অর্থাৎ কোন স্থানে গন্ধর্ব্বগণ নৃত্য গান করিতেছে, কোন স্থানে স্তুতিপাঠকেরা রজার গুণ কীর্ত্তন করিতেছে, কোন স্থানে ব্রাহ্মণেরা বেদপাঠ করিতেছেন, কোন স্থানে মল্লগণ মল্লযুদ্ধে নিযুক্ত হইয়াছে, স্থানান্তরে শীকারীগণ নানা জন্তু লইয়া দণ্ডায়মান আছে। এমত সময়ে তিনি সর্বসমক্ষে প্রস্তাব করিলেন। যিনি স্বর্গের রাজা ইন্দ্র তিনি মর্ত্যলোকের মর্ম্ম অবগত আছেন এবং মত লোকেরা ও তাঁহার বৃত্তান্ত অবগত আছে। কিন্তু পাতালের রাজা কে, তিনি কোন স্থানে থাকেন, আমরা তাঁহার কোন বৃত্তান্ত জানিনা, তোমরা বলিতে পার। ইহা শুনিয়া পণ্ডিত গণের মধ্যে এক জন কহিলেন শেষ নাগ পাতালধিপতি, তাহার মহিষী সকল পদ্মিনী, তিনি শোক সন্তাপ কখন জানেন না, সদা আনন্দে রাজ্য করেন। ফলতঃ তিনি যে প্রকার সুখী সংসারে তল্য সুখী আর নাই।
পাতালেশ্বরের এই বিবরণ শ্রবণ করিয়া রাজা বিক্রমাদিত্য তাহার সহিত সন্দর্শনের আকাঙ্ক্ষী হইলেন, এবং বেতালকে আহ্বান করিয়া আজ্ঞা করিলেন আমাকে পাতাল পুরীতে লইয়া চল। বেতাল আজ্ঞামাত্র তাঁহাকে পাতালে লইয়া চলিল, এবং দুর হইতে রাজার বাটী দেখাইয়া দিয়া বিদায় হইল। রাজা পুরীর সম্মুখে যাইয়া দেখিলেন তাহা কাঞ্চনময়, নানা রত্নে ভূষিত, এবং তাহার জ্যোতিঃ এমত দীপ্তিকর যে তাহাতে দিবা রাত্রি প্রভেদ হয় না। ঐ পুরীর সকল দ্বারে প্রস্ফুটিত পদ্মপুষ্প ঝুলিতেছে, এবং সকল গৃহে সর্ব্বদা আনন্দধ্বনি হইতেছে।
রাজা ভয় ও উল্লাসের সহিত দ্বারে উপস্থিত হইয়া বিনয়পূর্ব্বক দ্বারপালদিগকে বলিলেন তোমরা রাজার নিকটে গিয়া সংবাদ দাও ভূলোক হইতে এক রাজা তাহাকে দর্শন করিতে আসিয়াছেন। এই কথায় এক জন দ্বারী রাজাকে সংবাদ দিতে গেল। রাজা বিক্রমাদিত্য দ্বারে দণ্ডায়মান থাকিয়া মনে মনে কহিতে লাগিলেন আমি এপর্যন্ত আসিয়াছি এই আমার পরম ভাগ্য। তিনি চতুর্দিক হইতে রাম ও কৃষ্ণধ্বনি এবং রাজমন্দির হইতে বেদধ্বনি শুনিতে লাগিলেন।
দ্বারী পাতালেশ্বরের সম্মুখে প্রণতিপুরঃসর দণ্ডাযমান হইলে, তিনি তাহার প্রতি দৃষ্টিপাত করিলেন। দ্বারপাল বলিল, মহারাজ মর্ত্যলোক হইতে এক মনুষ্য আসিয়া দ্বারে দণ্ডায়মান আছেন, তাহার মানস আপনাকে দর্শন করেন। পাতলাধিপতি এই কথা শ্রবণমাত্র গাত্রোত্থান পূর্ব্বক দ্বার দেশে আসিলেন। রাজা বিক্রমাদিত্য তাঁহাকে দর্শন করিয়া অষ্টাঙ্গে প্রণাম করিলেন। পাতালপতি সহাস্য বদনে আশীর্ব্বাদ করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন তোমার নাম কি, কোথা হইতে আসিয়াছ। রাজা বিক্রমাদিত্য কৃতাঞ্জলিপুটে বলিলেন, স্বামিন, আমার নাম বিক্রমাদিত্য, আমি মত্ত লোকের রাজা, আমার অভিলাষ ছিল আপনার চরণ দর্শন করি, এক্ষণে সে অভিলাষ পূর্ণ হইল। ইহাতে আমার কোটি যজ্ঞের ফল এবং চতুঃষষ্টি তীর্থে অবগাহনের পুণ্য হইল। পাতালেশ্বর বিক্রমাদিত্যের নাম শ্রবণমাত্র। তাহাকে আলিঙ্গন করিয়া হস্ত ধারণ পূর্ব্বক স্বীয় সভাতে লইয়া গেলেন, এবং উত্তমাসনে উপবেশন করাইয়া কুশলাদি জিজ্ঞাসা করিলেন। রাজা বলিলেন মহারাজের দর্শনে আমার সমস্ত মঙ্গল। পাতালেশ্বর বলিলেন এখানে আসিতে পথে তোমার অনেক কষ্ট হইয়া থাকিবে। বিক্রমাদিত্য বলিলেন হে নাগরাজ আপনার দর্শনে আমার সকল দুঃখ দূর হইয়াছে। তদনন্তর নাগরাজ রাজা বিক্রমাদিত্যের অবস্থানের নিমিত্ত এক উত্তম স্থান এবং সেবার্থ পরিচারক নিয়োজিত করিয়া, তাহাদিগকে অজ্ঞা করিলেন তোমরা আমার যেপ্রকার সেবা করিয়া থাক ইহার তদপেক্ষা অধিক সেবা করিও। রাজা বিক্রমাদিত্য এই প্রকারে কয়েক দিবস থাকিলেন, তৎপরে কৃতাঞ্জলি হইয়া বলিলেন। হে পাতালেশ্বর অনুমতি হইলে আমি বিদায় হই এবং স্বদেশে গমন করিয়া আপনকার গুণানুবাদ করি। শেষ নাগ হাস্য করিয়া বলিলেন যদি তুমি। স্বদেশ গমন করিবে তবে কিঞ্চিৎ স্মরণসাধন বস্তু লইয়া যাও। ইহা বলিয়া চারিটী রত্ন তাহার হস্তে দিয়া কহিলেন, এই চারি রত্নের চারি গুণ। এক রত্নের গুণ এই, ইহার স্থানে যে রত্ন ও অলঙ্কারাদি চাহিবে তাহা তৎক্ষণাৎ প্রাপ্ত হইবে। দ্বিতীয় রত্নের স্থানে হস্তী অশ্ব শিবিকা যাহা যখন প্রার্থনা করিবে তখনি তাহা পাইবে। তৃতীয় রত্নের গুণ এই, ইহার স্থানে যখন যে অর্থের প্রয়োজন হয় চাহিবামাত্র পাইবে। চতুর্থ রত্ন হইতে পরমার্থ ও সৎকর্ম সাধনের যে কামনা করিবে তাহা পূর্ণ হইবে। চারি রত্নের এই চারি গুণের কথা শ্রবণ করিয়া রাজা বিক্রমাদিত্য বদ্ধাঞ্জলি হইয়া বলিলেন, স্বামিন, আমি আপনার অসীম গুণের কি ব্যাখ্যা করিব, আমাকে চিরজীত কিঙ্কর ভাবিয়া স্মরণে রাখিবেন।
এই প্রকার স্তুতিবাদের পর, রাজা বিক্রমাদিত্য বিদায় হইয়া বেতালের স্কন্ধারোহণে স্বীয় রাজধানীতে যাত্রা করিলেন। রাজধানীর এক ক্রোশ ব্যবধান থাকিতে বেতালের স্কন্ধ হইতে অবতরণ করিয়া পদব্রজে গমন করিতে লাগিলেন। কিয়দ্র গমন করিলে, এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ তাহাকে দেখিয়া বলিলেন আমি অদ্য অনাহারে আছি, আমাকে কিঞ্চিৎ ভিক্ষা দাও। রাজা মনে মনে কহিলেন এই ব্রাহ্মণকে একটী রত্ন দিই। ইহা ভাবিয়া তাহাকে কহিলেন হে ভূদেব আমার স্থানে চারিটী রত্ন আছে, ঐ চারি রত্নের এই এই গুণ, ইহার মধ্যে যে রত্নের অভিলাষ হয় লও। ব্রাহ্মণ চারি রত্নের চারি গুণের কথা শুনিয়া কেন, রত্ন লইবেন তাহা স্থির করিতে পারিলেন না, কহিলেন আমি গৃহ হইতে আসিয়া যাহা গ্রহীতব্য হয় নিবেদন। করিতেছি। ইহা কহিয়া বিপ্র গৃহে গমন করিলেন। রাজা তাহার প্রত্যাগমনপ্রতীক্ষায় তথায় দণ্ডায়মান থাকিলেন।
ব্রাহ্মণ গৃহে গিয়া আপন ভার্য্যা পুত্র ও পুত্রবধূকে সমস্ত বিবরণ কহিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন এই চারি রত্নের। মধ্যে কোন, রত্ন গ্রহণ করি। ব্রাহ্মণী বলিলেন যে রত্নে ধনােৎপত্তি হয় তাহা গ্রহণ কর, তাহা হইলে সকল কর্ম্ম সিদ্ধ হইবে। কেননা ধন হইতে ধর্ম্ম, জ্ঞান, পুণ্য, দান সকলি হইতে পারে। অন্য রত্নের প্রয়োজন নাই। নন্দন বলিলেন হস্তী অশ্ব না হইলে সংসারের শােভা হয় না, ইহারা মনুষ্যের সন্মানবদ্ধনকারী এবং জীবনযাত্রার প্রয়ােজনীয়, কেননা ইহা দেখিয়া সকলে নম্র হয়, এবং দুর্জনেরাও ভয় করে। অতএব সংসারের শােভাবদ্ধনকারী রত্ন গ্রহণ কর। শােভা বিনা কেবল অর্থে জীবনের কি ফল। পুত্রবধূ বলিলেন যে রত্ন হইতে অলঙ্কারাদি লাভ হয় তাহা গ্রহণ করা কত্তব, কেননা তাহা স্ত্রীলােকের অঙ্গভূষণ, এবং তদ্বারা নারীগণ অপসরাতুল্য হয়, পতিহীনা নারীও তাহা পরিধান করিলে অতি সুন্দরী হয়। এবং তাহা বিপদের সম্পদ, যেহেতু বিপদকালে বিক্রয় করিলে। অনেক অর্থ পাওয়া যায়, ফলতঃ তদ্বারা সকলি হইতে পারিবে। স্বামী বাতুল হইয়াছেন, শাশুড়ী ঠাকুরাণীও বিবেচনারহিত, আপনি জ্ঞানবান,। অতএব আমি যে রত্নের কথা বললাম তাহা লইয়া আসুন, তাহাতে সকল কর্মই সিদ্ধ হইবে। বিপ্র বলিলেন তোমরা সকলেই উন্মত্ত হইয়াছ। ধর্ম্ম ব্যতীত সকলি মিথ্যা, কেননা ধর্ম্ম হইতে মনুষ্যের রাজ্যলাভ যশোলাভ এবং সকল কর্ম সিদ্ধ হয়। ধর্ম মনুষ্যের পরম সম্পদ, তাহা হইতে অধিকমূল্য বস্তু পৃথিবীতে আর নাই। দেখ, বলিরাজা ধর্ম্ম কর্ম্ম দ্বারা পাতালে রাজ্য প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। ধর্ম্ম দ্বারা ইন্দ্র স্বর্গের ইন্দ্রত্ব পাইয়াছেন। ধর্ম্ম দ্বারা এই অনিত্য শরীর অমর এবং ভববন্ধন মোন হয়। অতএব আমি ধর্ম্ম পথ ত্যাগ করিব না, ধর্ম্মপ্রদায়ী রত্ন গ্রহণ করিব, ইহাতে যাহা হয় হইবে।
এই প্রকারে চারি জনেই এক এক রত্নের প্রশংসা করিল। কাহার সঙ্গে কাহারো ঐক্য হইল না। তাহাতে ব্রাহ্মণ বিমর্ষ হইয়া রাজার নিকটে গিয়া সমস্ত বিবরণ বর্ণনপূর্ব্বক কহিলেন মহারাজ আমি গৃহে গিয়া ছিলাম, কিন্তু কিছুই স্থির করিতে পারিলাম না, আমাদের চারি জনের চারি প্রকার ইচ্ছা, অতএব আপনি এখানে দাণ্ডাইয়া আর কত ক্লেশ পাইবেন। রাজা বলিলেন যদি তোমাদের চারি জনের চারি অভিলাষ হইয়া থাকে তজ্জন্য চিন্তা কি, আমি এই চারি রত্নই দিতেছি তোমরা চারি জনে লইবে, কেহ ক্ষুন্ন হইবেন। ইহা বলিয়া রাজা তাহাকে চারি রত্ব প্রদান করিলেন। ব্রাহ্মণ মহা আলাদিত হইয়া রাজাকে আশীর্বাদ করিতে করিতে গৃহে প্রস্থান করিলেন।
অতএব হে ভোজরাজ, দেখ, রাজা বিক্রমাদিত্য এই অমূল্য রত্ন দান করিতে কিছুমাত্র কুণ্ঠিত হইলেন। এই কলিকালে এমত দাতা কে আছে। অতএব যিনি রাজা বিক্রমাদিত্যের তুল্য দান করিতে পারিবেন তিনি এই সিংহাসনে উপবেশন করিবেন, তদ্ভিন্ন যিনি ইহাতে পদোত্তোলন করিবেন তাহার নরক বাস। হইবেক। তুমি ব্যগ্র হইওনা, ধৈর্যশালী হও, এবং রাজা বিক্রমাদিত্যের বীরত্ব ও বদন্যতার আর আর বৃত্তান্ত শ্রবণ কর।
ভোজরাজ পুত্তলিকার এই বাক্য প্রবণ করিয়া সে দিবস সিংহাসনারোহণে ক্ষান্ত হইলেন। পর দিবস প্রত্যুষে স্নান পূজা সমাপন করিয়া মন্ত্রীগণ সমভিব্যাহারে আগমন পূর্বক সিংহাসনোপবেশন জন্য চরণেত্তোলন করিলে,
রূপরেখা অষ্টাদশ পুত্তলিকা
কহিল মহারাজ এ কি করিতেছ, প্রথমে আমার এক বাক্য শ্রবণ কর তৎপরে যাহা বাঞ্ছা করিও। রাজা ‘বলিলেন কি বলিতে চাহ। পুত্তলিকা বলিল।
এক দিবস দুই সন্ন্যাসীতে কোন বিষয়ে বিবাদ হইয়াছিল। তাহাতে কেহ কাহাকে পরাস্ত করিতে না পারিয়া, পরিশেষে রাজা বিক্রমাদিত্যের সভাতে উপস্থিত হইয়া বলিলেন মহারাজ আমাদের কোন বিষয়ে সংশয় জন্মিয়াছে, আপনি তাহার মীমাংসা করিয়া দেউন, আমরা তজ্জন্য আপনার স্থানে আসিয়ছি। রাজা জিজ্ঞাসিলেন তোমাদের কি বিবাদ। এক জন কহিল আমি এই কহিতেছি মন প্রধান, জ্ঞান আত্মা ও ইন্দ্রিয়গণ তাহার অধীন। মায়। মোহ পাপ পুণ্য প্রভৃতি সকল কর্ম মন হইতে উদ্ভব হয়, সুতরাং মন সকলের মূল। মনুষ্য কেবল কায়ের ভূপতি, অঙ্গ সকল তাহার আজ্ঞাকারী, কিন্তু তাহারা মনের ইচ্ছানুযায়ী কর্ম করে। দ্বিতীয় সন্ন্যাসী কহিল মহারাজ আমি বলিতেছি জ্ঞান শরীরের রাজা, মন তাহার আজ্ঞাকারী, যেহেতু মন কোন কুকর্মে প্রবৃত্ত হইলে জ্ঞান তাহাকে নিবৃত্ত করিতে পারে। ইন্দ্রিয় সকল মনের বশবর্ত্তী, মন তাহাদিগকে যে পথে চালায় তাহারা সেই পথে চলে। কিন্তু জ্ঞান সকলের প্রধান, মন কুপথগামী হইলে তাহাকে নিবারণ করে, এবং পঞ্চ ইন্দ্রিয় জ্ঞানের বশীভূত থাকে, জ্ঞানদ্বারা ইন্দ্রিয়ের বিকার দূর হইলে মনুষ্যের কোন ভয় ভাবনা থাকেনা, এবং অনায়াসে যোেগ সিদ্ধ হইতে পারে।
রাজা বিক্রমাদিত্য উভয়ের বাক্য শ্রবণ করিয়া তাহাদিগকে বলিলেন তোমাদের বিবাদের আমূল বুঝিলাম, তোমরা কিঞ্চিৎ অপেক্ষা কর, আমি বিবেচনা করিয়া, ইহার উত্তর দিতেছি। কিয়ৎকাল পরে রাজা তাহাদিগকে বলিলেন, হে জিতেন্দ্রিয় যোগীন্দ্র এই মনুষ্যদেহ, অগ্নি জলবায়ু ও মৃত্তিকাতে নির্মিত, এই শরীরের প্রধান কর্মকর্তা মন, তাহার মতানুযায়ী হইয়া চলিলে শরীর অনায়াসেই বিনাশ প্রাপ্ত হইতে পারে। কিন্তু জ্ঞানকে অধিক বলবান বলিতে হইবে, কেননা তাহাতে মনের বিকার জন্মিতে দেয় না, সুতরাং যে মনুষ্য জ্ঞানবান, তাহার শরীর নষ্ট হইতে পায় না। পৃথিবীতে জ্ঞানবান, ব্যক্তিই অমর। যোগী যে পর্যন্ত জ্ঞানদ্বারা সনকে বশীভূত করিতে সমর্থ না হয় সে পর্যন্ত তাহার যোগ সিদ্ধ হয় না।
রাজার এই উত্তর শুনিয়া উভয় সন্ন্যাসী সন্তুষ্ট হইলেন, এবং তন্মধ্যে জন রাজাকে একখান খড়ি দিয়া কহিলেন মহারাজ এই খড়িতে দিবসে যে প্রতিকৃতি লিখিবেন তাহা রজনীতে প্রত্যক্ষ পরিদৃশ্যমান মূর্তিমান জীব হইবে। ইহা বলিয়া যোগীদ্বয় প্রস্থান করিলেন। দ্ভ
রাজা খড়ির অদ্ভুত গুণের কথা শুনিয়া মনে মনে চিন্তা করিতে লাগিলেন কি প্রকারে ইহার পরীক্ষা। হইবে। তৎপরে একটা গৃহে তাবদিবস বসিয়া ভিত্তিতে নানা প্রকার মূর্তি অঙ্কন করিলেন, অর্থাৎ কৃষ্ণ, সরস্বতী ও আর আর অনেক দেবতার মূর্তি লিখিলেন। রাত্রে এই সকল দেবতা মূর্তিমান হইয়া জয়ধ্বনি করিয়া উঠিলেন এবং পরপর কথোপকথন করিতে লাগিলেন। রাজা দেখিয়া বিমোহিত হইলেন, কিন্তু ত্রাস প্রযুক্ত কোন কথা কহিলেন না। রজনী প্রভাত হইলে দেবগণ অন্তর্ধান হইলেন। পুত্তলী সকল ভিত্তিতে যেমন চিত্রিত হইয়া ছিল সেই প্রকার রহিল। রাজা দিবাভাগে পুনর্ব্বার সেই ভিত্তির আর এক ভাগে মাতঙ্গ তুরঙ্গ শকট রথ ও সৈন্য ইত্যাদি নানা মূত্তি লিখিলেন। নিশামুখে ঐ সকল সেনা ও পশু জীবন প্রাপ্ত হইল। রাজা তাহা দেখিয়া অত্যন্ত আহলাদিত হইলেন, এবং মনে করিতে লাগিলেন যোগী আমাকে কি অমূল্য সামগ্রী দিয়া গিয়াছেন। নিশা অবসান হইলে ঐ মত্তি সকল নির্জীব হইল। তৃতীয় দিবসে রাজা, গন্ধর্ব্ব ও অসরা গণের মূর্তি লিখিলেন, এবং তাহাদের হস্তে মৃদঙ্গ বীণা রবাব তানপুরা মোচঙ্গ সেতার পিনাক বাসুরি করতাল প্রভৃতি নানা বাদ্যযন্ত্র দিলেন। রাত্রিযোগে ঐ সকল গন্ধর্ব্ব জীবিত হইয়া সঙ্গীত শাস্ত্রানুসারে সঙ্গীতারম্ভ করিল, এবং বাদ্য-যন্ত্রাদির বাদ্য হইতে লাগিল। অপ্সরাগণ নৃত্য ও নানা কৌতুক করিতে লাগিল।
রাজা প্রত্যহ এই প্রকার দিবাভাগে চিত্রাঙ্কন এবং রাত্রিযোগে তাহাদের ক্রীড়াদি দর্শন করিতেন। রাজকার্য্যও করিতেন না, অন্তঃপুরেও যাইতেন না। রাজ মহিষীগণ তাহার কারণ অবধারণে অক্ষম হইয়া আক্ষেপ পূর্ব্বক পরপর এইরূপ কহিতে লাগিলেন, রাজা আমাদিগকে ত্যাগ করিয়া কেবল বাহিরে থাকেন ইহার কারণ কি। আমরা অনেক দিন অনেক যাতনা পাইলাম, এইক্ষণে তদ্বিরহে আর প্রাণধারণ করিতে পারিনা। এবম্প্রকার বিলাপ করিয়া মহিষীগণ নিশাযোগে শিবিকাররাহণে তাহার নিকটে গিয়া করপুটে কহিলেন মহারাজ আমাদের কি অপরাধ হইয়াছে যে আপনি আমাদিগের প্রতি একবারে এমত নির্দয় হইয়াছেন। রাজা হাস্য করিয়া বলিলেন, হে সুন্দরীগণ, তোমরা এখানে কি নিমিত্ত আসিয়াছ, তোমাদিগের বদনেন্দু কেন মলিন হইয়াছে। রাজমহিষীগণ নতমস্তক হইয়া কহিলেন, স্বামিন, আমাদের দুঃখের কথা কি জিজ্ঞাসা করেন, যদি অনুমতি করেন প্রকাশ করিয়া বলিতে পারি। রাজা বলিলেন বল। তাহাতে মধুরভাষিণী এক চতুর। রাণী কহিলেন মহারাজ আমরা অবলা বালা, কখন কোন যন্ত্রণ জানি না, আপনার আশ্রয়ে সদা সুখে কালযাপন করিয়াছি। সম্প্রতি আপনকার অদর্শন রূপ অনলে অহরহ দগ্ধ হইতেছি। আমাদিগের এই যন্ত্রণা দূর কর। আমরা আর সহ করিতে পারিনা। আর এক রাণী কহিলেন আপনি অঙ্গীকার করিয়াছিলেন আমাদিগকে কখন পরিত্যাগ করিবেন না। অতএব আমাদিগকে কি প্রকারে বিস্মৃত হইয়া আছেন, আমরা আপনাকে না দেখিয়া জীবনূত হইয়াছি।
রাণীরা এইপ্রকার অনেক বিলাপ করিতে লাগিলেন। কিন্তু রাজা মূর্তিগণের ক্রীড়া দর্শনে মোহিত থাকিলেন। নিশাবসানে মূর্তি সকল ম্রিয়মান হইল। তখন রাণীগণ পুনর্ব্বার কহিলেন মহারাজ যেপর্য্যন্ত আপনি আমাদিগকে পরিত্যাগ করিয়াছেন সে পর্যন্ত এই স্থান আপনার অন্তঃপুর হইয়াছে। কিন্তু আমরা আপনার আশ্রিত, আশ্রিত জনের ক্লেশ দিলে পাপভাগী হইতে হইবে। রাজা হাস্য করিয়া বলিলেন তোমরা কেন এত চিন্তা করিতেছ, তোমাদের কি প্রার্থনা আমাকে বল। রাজমহিষীগণ বলিলেন মহারাজ যদি আমরা প্রার্থনা করিলে প্রার্থিত বস্তু পাই তবে প্রার্থনা করি। রাজা বলিলেন যাহা চাহিবে তাহা দিব। মহিষীগণ বলিলেন মহারাজের হস্তে যে খড়িখান আছে তাহা আমাদিগকে দিতে আজ্ঞা হউক। রাজা ঐ খড়িখান তৎক্ষণাৎ তাহাদিগকে দিলেন। রাণীগণ খড়ি লইয়া অন্তঃপুরে প্রবেশ করিলেন, আর কখন তাহা রাজাকে দেখাইলেন না। রাজাও তাহাদের প্রতি পূর্ব্ববৎ সকরুণ হইলেন, এবং রীতিমত রাজ্যকার্য্য করিতে লাগিলেন।
রূপরেখা কহিল দেখ, রাজা বিক্রমাদিত্য এমত অমূল্য দ্রব্য একবারে পরিত্যাগ করিতে কিছুমাত্র বিলম্ব করিলেন না, তোমার এমত গুণ কোথায়। তোমার এমত দ্রব্য থাকিলে তুমি কদাচ তাহা দিতে পারিতে অতএব তুমি সিংহাসনে বসিবার বাসনা ত্যাগ কর, তুমি এ সিংহাসনের যোগ্য নহ।
এই সকল কথায় সে দিবসেও সিংহাসনারোহণ করা হইলনা, রাজা অন্তঃপুরে গমন করিলেন। দিবস প্রত্যুষে প্রাতঃকৃত্যাদি করিয়া পুনর্ব্বার সভায় আসিয়া সিংহাসন সমীপে দণ্ডায়মান হইলে,
তারা ঊনবিংশ পুত্তলিকা
হাস্য করিয়া কহিল, মহারাজ তুমি কি উন্মাদগ্রস্ত হইয়াছ, তুমি এই সিংহাসনে উপবেশন করিলে পাপগ্রস্ত হইবে, ইহা কি একবারও মনে কর না। তুমি রাজা বিক্রমাদিত্যকে কি জ্ঞান করিয়াছ। আমাদের হৃদয়। কমলরূপ, রাজা বিক্রমাদিত্য তাহার মধুকর ছিলেন। তুমি কীট হইয়া কোন সাহসে আমাদের অঙ্গে চরশোত্তোলন করিতে চাহ। রাজা বলিলেন তুমি কোন বিবেচনায় আমাকে কীট বলিয়া ব্যাখ্যা করিলে। পুত্তলী উত্তর করিল তবে এক বিবরণ কহি শ্রবণ কর।
এক দিবস, সামুদ্রিকশাস্ত্রে সুপণ্ডিত সামুদ্রিক নামে এক ব্রাহ্মণ বন গমন করিতে করিতে দেখিলেন, কোন ব্যক্তি ঐ পথ দিয়া গিয়াছে, তাহার চরণচিহ্ রহিয়াছে। ঐ পদচিহ্নে পদ্ম ও উর্দ্ধরেখা আছে। ভদবলোকনে মনে মনে ভাবিলেন এই পথদিয়া কোন রাজপুরুষ গিয়া থাকিবেন, তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিতে হইবে। ইহা ভাবিয়া চিল্লানুগামী হইয়া চলিলেন, ব্রাহ্মণ এক ক্রোশ পথ গমন করিয়া দেখিলেন এক সামান্য মনুষ্য বৃক্ষ হইতে কাষ্ঠ ভগ্ন করিয়া বোর বান্ধিতেছে। বিপ্র তাহার নিকটে গিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন তুমি এই বনে কত ক্ষণ আসিয়াছ। সে কহিল আমি রাত্রি দুই ঘটিকা থাকিতে এখানে আসিয়াছি। ব্রাহ্মণ পুনর্ব্বার জিজ্ঞাসিলেন তুমি আর কোন ব্যক্তিকে এই পথ দিয়া আসিতে দেখিয়াছ কি না। ঐ ব্যক্তি বলিল আমি যে সময়ে আসিয়াছিলাম সে সময়ে, মনুষ্য দুরে থাকুক পশু পক্ষীও দেখিতে পাই নাই। ব্রাহ্মণ কহিলেন তবে তুমি আমাকে তোমার দুই খানি চরণ দেখাও দেখি। এই কথায় সে ব্যক্তি ব্রাহ্মণকে আপনার দুইখানি পদ দেখাইল।
ব্রাহ্মণ দেখিলেন তাহার চরণ রাজলক্ষণাক্রান্ত বটে, কিন্তু তাহার দুরবস্থা দর্শনে মনে মনে চমৎকৃত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন তুমি কত দিবস অবধি এই কর্ম্ম করিতেছ। সে কহিল যে অবধি আমার জ্ঞান উৎপন্ন হইয়াছে সেই অবধি আমি এই কর্ম্ম করিয়া উদরান করিতেছি। বিপ্র কহিলেন তুমি অনেক ক্লেশ পাইতেছ। সে কহিল ইহা ভগবানের ইচ্ছা, তাহার ইচ্ছাতে কোন ব্যক্তি গজারোহণ করে, কেহ পদব্রজে চলে, কেহ বিনা আকাঙ্ক্ষায় অতুল ঐশ্বর্য্য প্রাপ্ত হয়, কেহবা ভিক্ষা করিয়াও উদরান করিতে পারে না, কেহ নানা সুখে উল্লাসিত, কেহ বা অতি দুঃখে ব্যাকুলিত। সুখ দুঃখের মূল পরমেশ্বর। তিনি যাহার অদৃষ্টে যাহা লিখিয়াছেন তাহাকে তাহ। ভোগ করিতে হইবে। তাহা খণ্ডন করা মনুষ্যের সাধ্যনহে।
ব্রাহ্মণ তাহার প্রমুখাৎ এই সকল বাক্য শ্রবণ করিয়া এবং তাহার চরণচিত্ন দর্শন করিয়া মনে মনে কহিলেন হায়, আমি এত পরিশ্রম করিয়া সামুদ্রিক বিদ্যা শিক্ষা করিলাম, সে সকল পরিশ্রম বিফল হইল, আমার জীবনকাল অনর্থক গেল। এইরূপ আক্ষেপ করিতে করিতে ব্রাহ্মণ রাজার সদনে চলিলেন, মনে মনে কহিতে লাগিলেন পুস্তকে যে যে রাজচিত্ন লিখিয়াছে যদি তাহা রাজার চরণে দেখিতে পাই, ভাল, নতুবা সকল পুস্তক ছিন্ন করিয়া অগ্নিতে আহুতি দিব, এবং বৈরাগ্য লইয়া তীর্থে গমন করিব, সংসারের সহিত কোন সম্পর্ক রাখিব না। তিনি আক্ষেপ পূর্ব্বক আরও কহিলেন হায় মিথ্যা কর্ম্মের নিমিত্ত এতকাল বৃথা পরিশ্রম করিলাম, তাহার ফল কিছুই হইল না। এই শাস্ত্রের আলোচনা অপেক্ষা পরমেশ্বরের ভজনা করা উত্তম, তাহাতে যদিও আশু উপকার নাই, কিন্তু চরমে পরম পদার্থ লাভ হইবে।
এবম্বিধ চিন্তা করিতে করিতে দ্বিজবর রাজসভাতে উপস্থিত হইয়া রাজাকে আশীর্বাদ করিয়া দাড়াইলেন। রাজা দণ্ডবৎ প্রণাম পূর্ব্বক জিজ্ঞাসা করিলেন, হে বিপ্ল শ্রেষ্ঠ, তোমার বদন কেন অপ্রফুল্ল দেখিতেছি, তোমার মনে কি দুঃখোদয় হইয়াছে, আমাকে বল। ব্রাহ্মণ কহিলেন, তুমি প্রথমে আমাকে ভোমার দুইখানি চরণ দেখাও, তাহাতে আমার চিত্তের সংশয় দূর হউক। রাজা তৎক্ষণাৎ তাহাকে আপন চরণ দর্শন করাইলেন। তাহাতে কোন রাজলক্ষণাদি দৃষ্টি হইল না। তখন ব্রাহ্মণ অধোবদন হইয়া মৌন থাকিলেন। মনে মনে কহিতে লাগিলেন এখন গ্রন্থ সকল অনলে সমর্পণ করিয়া সংসার পরিত্যাগ পূর্ব্বক সন্ন্যাসী বেশে দেশে দেশে ভ্রমণ করাই কর্ত্তব্য। ইহা চিন্তা করিতেছেন এমত সময়ে রাজা তাঁহাকে জিজ্ঞাসিলেন, হে পণ্ডিতাগ্রগণ্য, তুমি কি জন্য ক্রোধ করিয়াছ, এবং এ প্রকার অভোবদন হইয়া থাকিবার কারণ কি। তোমার মনের কথা প্রকাশ করিয়া কহ, তুমি কি চিন্তা করিতেছ। ব্রাহ্মণ বলিলেন হে রাজরাজেশ্বর, আমি দ্বাদশ বৎসর সামদ্রিক শাস্ত্র পাঠ করিয়াছিলাম, কিন্তু সে পরিশ্রম আমার নিষ্ফল হইয়াছে, এই জন্য আমার মন বিকল হইয়াছে। রাজা বলিলেন তুমি ইহার প্রমাণ কি প্রকারে পাইলে। ব্রাহ্মণ বলিলেন মহারাজ আমি এক ব্যক্তির চরণে উর্দ্ধরেখা ও পদ্ম চিনু দেখিলাম, কিন্তু সে ব্যক্তি অতি দুঃখী, অরণ্য হইতে কাষ্ঠ আনিয়া উদরপূর্ত্তি করে। অনন্তর তোমারও পদ সৃষ্টি করিলাম, ইহাতেও উত্তম চিত্ন নাই, অথচ তুমি ভূপতি। এই জন্য আমার অন্তঃকরণে ক্রোধোদয় হইয়াছে, আমি পাজি পুথি সকল অনলে সমর্পণ করিয়া সংসার পরিত্যাগ করিব।
ভূপাল বলিলেন হে বিপ্রবর তুমি ব্যস্ত হইওনা, এই লক্ষণ কোন ব্যক্তির গুপ্ত, কাহারো দৃশ্যমান থাকে। ব্রাহ্মণ কহিলেন ইহা আমি কি প্রকারে জানিব। তখন রাজা অস্ত্র আনাইয়া আপন চরণের চর্ম উঠাইলেন। ব্রাহ্মণ দেখিলেন তাহাতে কমল ও উর্দ্ধরেখা আছে। অনন্তর ব্রাহ্মণ জিজ্ঞাসিলেন, যে ব্যক্তি কাষ্ঠ বিক্রয় করিয়া উদর পালন করে তাহার রাজলক্ষণ থাকিয়াও কেন তাহার দৈন্যদশা দূর হয় নাই। রাজা বলিলেন তাহার আর কোন দোষের চিঃ থাকিবে, তাহাতেই তাহার সৌভাগ্য নাশ করিয়াছে। পরে, এই কথা প্রমাণের জন্য তাহাকে অন্বেষণ করিয়া আনিয়া দেখিলেন তাহার পদে কাকপদ চিহ্ও আছে। ঐ চিয়ে কখন সৌভাগ্যকে নিকটবর্তী হইতে দেয় না, তাহাতে তাহার রাজলক্ষণ বিফল হইয়াছে। ইহাতে ব্রাহ্মণ অতিশয় আহ্লাদিত হইলেন, এবং বুঝিলেন সামুদ্রিক শাস্ত্র মিথ্যা নহে। পরে রাজাকে আশীর্ব্বাদ করিয়া গৃহে প্রস্থান করিলেন।
এই বিবরণ সমাপন করিয়া পুত্তলিকা কহিল, হে ভোজরাজ, তুমি এমত কি জ্ঞানাভ্যাস করিয়াছ যে। এই সিংহাসননাপবেশন করিবে। দেখ, রাজা বিক্রমদিত্য কেমন পণ্ডিত ছিলেন এবং ব্রাহ্মণের সন্দেহ ভঞ্জনার্থ আপন শরীর কাটিয়া দেখাইলেন। তোমার এমন গুণ কোথায়, যদি তুমি আপন শরীর কার্টিতে তবে সিংহাসনোপবেশনের যোগ্য হইতে পারিবে। হে ভোজরাজ তুমি আপন মনে চিন্তা করিয়া দেখ, মৃত্যু হইলেও মনুষ্যের নাম ধর্ম্ম ও যশঃ যায়না। সুগন্ধযুক্ত পুষ্প যদিও শুষ্ক হয় তথাপি তাহার সুগন্ধ 'দূর হয় না। অতএব যশঃ উপার্জনই মানব-জন্মের সার কর্ম।
এই সমস্ত বাক্য শুনিয়া রাজার জ্ঞানোদয় হইল। তিনি কহিলেন এই সংসার মায়া প্রপঞ্চ মাত্র। ছায়া যেমন অনিত্য, পৃথিবী সেইরূপ। মনুষ্যের জীবন মৃত্যু, চন্দ্র সূর্যের গতির ন্যায়। এবং স্বপ্নে যে প্রকার কৌতুক দর্শন করাযায় সংসারও সেইরূপ। মনুষ্যদেহ ধারণে অনেক যন্ত্রণা ভোগ করিতে হয়। জ্ঞানোপার্জনই কেবল সুখের সাধন।
মনোমধ্যে এই সকল জ্ঞানের কথা পর্যালোচনা করিতে করিতে রাজা স্বীয় মন্দিরে গমন করিলেন। সিংহাসনারোহণ করিলেন না। কোন প্রকারে রাত্রি যাপন করিয়া, পর দিবস অরুণোদয়ানন্তর সভায় আসিয়া সিংহাসনারোহণে উদ্যত হইলে,
চন্দ্রজ্যোতি বিংশ পুত্তলিকা
বলিল মহারাজ আমি এক প্রসঙ্গ বলি শ্রবণ কর।
এক দিবস রাজা বিক্রমাদিত্য হৃষ্টান্তঃকরণে মন্ত্রীকে কহিলেন কার্তিক মাস ধর্ম্মমাস, এই মাসে ধর্ম্ম কর্ম্ম করা কর্তব্য, অতএব শারদ পূর্ণিমার দিবস রাসলীলা হউক। মন্ত্রী রাজাজ্ঞানুসারে দেশ বিদেশীয় ভূপতি পণ্ডিত গণকে নিমন্ত্রণ করিয়া আনিলেন, এবং নগরস্থ ব্রাহ্মণ পণ্ডিত ও যোগী উপস্থিত হইলেন। দেবতাগণও মন্ত্র দ্বারা আহূত হইলেন। এই প্রকার রাসারম্ভ হইলে চতুর্দিক হইতে জয়ধ্বনি হইতে লাগিল। রাজা দেখিলেন সকল দেবতা আসিয়াছেন, কেবল চন্দ্র আইসেন ও নাই। তাহাতে দুঃখিত হইয়া বেতালের স্কন্ধারোহণে চন্দ্রলোকে গমন পূর্ব্বক, চন্দ্রের সম্মুখে দণ্ডবৎ প্রণাম পুরঃসর কৃতাঞ্জলি হইয়া বলিলেন আমার কি অপরাধ হইয়াছে যে আপনি আমার প্রতি নির্দয় হইয়াছেন। সকল দেবতা, আমার প্রতি সদয় হইয়া আগমন করিয়াছেন, কিন্তু আপনার অনাগমনে আমার কর্ম সম্পূর্ণ হইতেছে না, অতএব আপনি আগমন করিয়া আমার কর্ম সম্পূর্ণ করুন, ইহাতে আপনারও ধর্ম এবং যশোলাভ হইবে। যদি আপনি গমন না করেন তবে আমি আপনার সমক্ষে প্রাণত্যাগ করিব। নিশানাথ সহাস্য। বদনে কহিলেন, হে নরোত্তম, আমার অগমনে তুমি ক্ষুন্ন হইওনা, আমি গমন করিলে তাবৎ পৃথিবী অন্ধ কারময় হইবে, এজন্য আমার গমন হইতে পারেনা। আমাকে দর্শন করিবার তোমার যে অভিলাষ ছিল তাহ পূর্ণ হইল। তোমার কর্ম্ম সফল হইবে, তুমি আপন নগরে যাইয়া যে কর্ম্ম আরম্ভ করিয়াছি তাহা সমাপন কর। চন্দ্র, রাজাকে এই প্রকার প্রবোধ বাক্যে সন্তুষ্ট করিয়া অমৃত দিয়া বিদায় করিলেন।
রাজা সেই অমৃত শিবোধার্য্য করিয়া প্রণাম পূর্ব্বক আপন রাজধানীতে প্রত্যাগমন করিতেছেন। পথি মধ্যে দেখিলেন দুই যমদূত এক ব্রাহ্মণের আত্মা পুরুষ লইয়া আসিতেছে। রাজা তাহা বুঝিয়া দণ্ডায়মান হইলেন। ব্রাহ্মণের আত্মা দূর হইতে রাজাকে দেখিয়া কহিল এই রাজার সহিত আমার আলাপ আছে। রাজা ব্রাহ্মণের স্বর-পরিচয়ে যমদূতকে জিজ্ঞাসা করিলেন তোমরা কে। তাহারা কহিল আমরা যমের দাস উজ্জয়িনী নগরে গিয়াছিলাম, তথা হইতে এক ব্রাহ্মণের প্রাণ লইয়া যমরাজের নিকটে যাইতেছি। রাজা বলিলেন তোমরা কোন ব্রাহ্মণের প্রাণ লইয়া যাইতেছ আমার সঙ্গে আসিয়া তাহাকে দেখাইয়া দাও, পশ্চাৎ আপন কর্মে যাইবে। এই কথায় দূতদ্বয় রাজাকে উজ্জয়িনী নগরে লইয়া গিয়া ব্রাহ্মণের মৃত দেহ দেখাইল। রাজা দেখিলেন ঐ ব্রাহ্মণ তাঁহার পুরোহিত, অতএব দূতদ্বয়ের সহিত কথোপকথন করিতে ২ গোপন ভাবে তাহার গাত্রে অমৃত প্রক্ষেপ করিলেন। ব্রাহ্মণ প্রাণ দান পাইয়া রাম নাম উচ্চারণ পূর্ব্বক গাত্রোত্থান করিয়া দাণ্ডাইলে, রাজা তাহাকে প্রণাম করিলেন। ব্রাহ্মণ রাজাকে আশীর্বাদ পূর্ব্বক কহিলেন আমি মহারাজের কৃপাতে জীবন দান পাইলাম। ব্রাহ্মণকে পুনজীবিত দেখিয়া দূতদ্বয় চমৎকৃত হইয়া মনে মনে কহিল হায় রাজা কি করিলেন, আমরা যম সদনে যাইয়া কি কহিব। ইহা ভাবিতে ভাবিতে রিক্তহস্তে শমন সদনে গিয়া সকল বিবরণ কহিল।’ যমরাজ তাহা শুনিয়া মৌন থাকিলেন। এ দিকে রাজা ব্রাহ্মণের হস্ত ধারণ পূর্ব্বক তাহাকে আপন আলয়ে লইয়া গেলেন, এবং অনেক অর্থ দিয়া বিদায় করিলেন।
এই কথা শেষ করিয়া পুত্তলিক। কহিল, হে ভোজরাজ যদি তোমার এমত পুরুষত্ব থাকে তবে সিংহাসনোপবেশন কর, নতুবা এ আশা পরিত্যাগ কর। এই প্রকারে সে দিবসের শুভক্ষণও অতীত হইল, রাজা আপন মন্দিরে গেলেন। রাত্রি কোন প্রকারে বঞ্চন হইল। প্রাতঃকালে রাজা প্রাতঃকৃত্যাদি করিয়া সিংহাসনারোহণার্থ তৎসমীপে আসিয়া দণ্ডায়মান হইলে,
অনুরোধবতী একবিংশ পুত্তলিকা
কহিল হে ভোজরাজ তুমি আপনাকে এই সিংহাসনে বসিবার যোগ্য বিবেচনা করিয়া কেবল বৃথা অহস্কার প্রকাশ করিতেছ। আমি তোমাকে এক বিবরণ বলিতেছি শ্রবণ কর, তাহার পর সিংহাসনে বসিও।
মাধব নামে এক ব্রাহ্মণকুমার ছিলেন। তিনি সাক্ষাৎ কপের ন্যায় রূপবান। যে নারী তাহার সেই অপরূপ রূপ দর্শন করিত সে একবারে মোহিত হইত। ঐ ব্রাহ্মণকুমার সকল প্রকার বিদ্যাভ্যাস করিয়া ছিলেন। সঙ্গীত বিদ্যা উত্তমরূপ জানিতেন। তিনি স্বভাবতঃ সপষ্টবাদী ছিলেন। ফলতঃ ততুল্য মনুষ্য প্রায় দেখাযায় না। তিনি সর্বদা ভ্রমণকারী ছিলেন এবং সকল রাজসভায় যাইতেন, সকল রাজাই তাহাকে সমাদর করিতেন। কিন্তু কোন স্থানে বহুকাল বাস করিতেন না। ব্রাহ্মণকুমার এই প্রকার নানা দেশ ভ্রমণ করিতে করিতে এক সময়, কাম নগরীতে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। কামসেন নামে ঐ নগরের ভূপতি ছিলেন। সঙ্গীত বিদাতে সুনিপুণ কামকন্দলা নামী এক গন্ধর্ব্বকন্যা তাঁহার সভার নর্ত্তকী ছিল। মাধব রাজদ্বারে উপস্থিত হইয়া দ্বারপালকে কহিলেন রাজাকে সংবাদ দেও, আমি তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিব। দ্বারী তাঁহার বাক্য শুনিয়াও অঞতবৎ তুচ্ছ করিল। মাধব পথশ্রান্তি শান্তি জন্য দ্বারদেশে বসিলেন। ঐ সময়ে রাজপুরীর মধ্যে সঙ্গীত হইতেছিল। মাধব তাহা শুনিয়া বারম্বার কহিতে লাগিলেন, রাজা যেমন অপণ্ডিত, সভাসদও সেই প্রকার গুণাগুণ-বিবেচনা শূন্য। দৌবারিক তাহা শুনিয়া কুপিত হইল, কিন্তু কোন উত্তর না করিয়া, রাজার সম্মুখে কৃতাঞ্জলি পুটে দণ্ডায়মান হইল। ভূপতি তাহার প্রতি দৃষ্টি করিলে, দ্বারী কহিল মহারাজ এক বিদেশী ব্রাহ্মণ আসিয়া দ্বারে বসিয়াছে, এবং অনবরত কহিতেছে রাজসভাস্থ সমস্ত লোক মূখ, কেহ গুণের বিচার করেন না। ভূপাল দ্বারপালকে বলিলেন তুমি গিয়া তাহাকে জিজ্ঞাসা কর তিনি কিজন্য ইহাদিগকে সূখ বলিতেছেন।
দ্বারী রাজাজ্ঞানুসারে দ্বারে আসিয়া ব্রাহ্মণকে জিজ্ঞাসা করিল তুমি মহারাজকে অজ্ঞান বলিতেছ ইহার কারণ কি। মাধব কহিলেন দ্বাদশ জন সঙ্গীতকারক তিন সারি হইয়া, চারি চারি জন এক এক শ্রেণীতে দণ্ডায়মান আছে। ইহার মধ্যে যে তিন জন মৃদঙ্গ বাজাইতেছে তন্মধ্যে পূর্বমুখী এক মৃদঙ্গীর এক অঙ্গুলি নাই, তাহাতে মানের ঘরে ভাল চাটি পড়িতেছেনা। এই জন্য আমি সকলকে মূঢ় বিবেচনা করিয়াছি। যদি এই কথায় প্রত্যয় না হয়, যাইয়া প্রত্যক্ষ দেখ।
দ্বারী এই কথা রাজাকে গিয়া বলিল। রাজা পূর্ব্বমুখী চারি জন মৃদঙ্গীকে ডাকিয়া একে একে সকলের হস্ত পরীক্ষা করিয়া দেখিলেন এক ব্যক্তির এক অঙ্গুলি মোম নির্মিত। এতদবলোকনে ভূপতি ব্রাহ্মণকুমারের প্রতি অতিশয় সন্তুষ্ট হইয়া তাহাকে ডাকাইলেন। মাধব সম্মুখে আসিলে, রাজা তাহাকে সম্মান পূর্বক স্বীয় আসনে উপবেশন করাইলেন। এবং আপনি যে প্রকার বস্ত্রাদি পরিধান করিয়াছিলেন, সেই প্রকার বহুমূল্য বস্ত্রাদি আনাইয়া তাহাকে পরিধান করাইলেন। তদনন্তর কামকলাকে ডাকিয়া আজ্ঞা করিলেন ইহার সম্মুখে তুমি আপন গুণ প্রকাশ কর। ইনি সঙ্গীত শাস্ত্রে অতিপণ্ডিত, অতএব যাহা করিবে অতি সাবধানে করিতে হইবে।
কামকন্দলা রাজাজ্ঞা পাইয়া নানা প্রকার রাগালোচনা ও অতি মনোেহর অঙ্গভঙ্গী পূর্ব্বক নৃত্য করিতে লাগিল। ঐ সঙ্গে নানাপ্রকার সুশ্রাব্য বাদ্য হইতে লাগিল। ইতিমধ্যে একটা ভ্রমর ভ্রমণ করিতে করিতে তাহার বক্ষঃস্থলে বসিয়া তাহার কুচদেশে দংশন করিল। ভ্রমরের দংশনে কামকলা কাতর হইল। কিন্তু তখন কাতরতা জানাইলে তাল ভঙ্গ হইবে ইহা ভাবিয়া, চতুরতা পূর্ব্বক কুচের বসন কিঞ্চিৎ উত্তোলন করিল। তাহাতে মধুকর উড়িয়া গেল। মাধব, কামকলার রূপমাধুরী ও সঙ্গীতচাতুরী দর্শনে পূর্বেই বিমোহিতচিত্ত হইয়া ছিলেন, এক্ষণে ভ্রমর-বারণ-চাতুরী দর্শনে পরম পরিতুষ্ট হইয়া, তুমি ধন্য তোমার কর্ম্ম ধন্য, ইহা বলিয়া তৎক্ষণাৎ রাজদত্ত বস্ত্রাভরণ খুলিয়া তাহাকে পারিতোযিক দিলেন।
মাধবের এই কর্ম্ম দেখিয়া রাজা মন্ত্রীকে কহিলেন দেখ এই ব্যক্তি কেমন নির্বোধ, অনায়াসে বারাঙ্গনাকে সকল বস্ত্র ও বহুমূল্য রত্নাদি পুরস্কার করিল। কিন্তু ভিক্ষুক হইয়া আমার সম্মুখে এমত দাতৃত্ব প্রকাশ করা অতি অনুচিত কর্ম্ম। অনন্তর তিনি মাধবকে জিজ্ঞাসিলেন তুমি ইহার কি গুণে মোহিত হইয়াছ, তাহা আমাকে কহ। মাধব কহিলেন মহারাজ তুমি যেমন মূর্খ, তোমার সভাস্থেরাও সেই রূপ। তোমার নকী এমত গুণ প্রকাশ করিল, তাহা কেহ বিচার করিলনা। ইহার কুচতটে মধুকর উপবিষ্ট হইয়া দংশন করিতেছিল, তাহাতে এই নারী, পাছে নৃত্য গীতের ব্যাঘাত হয় এই ভয়ে, আপন শ্বাসরোেধ পূর্ব্বক বক্ষের বস্তু উত্তোলন করিয়া ভ্রমরকে উড়াইয়া দিল, একি সামান্য গুণপনা। এই গুণে আমি ইহাকে বস্ত্রালঙ্কার পুরস্কার দিলাম।
মাধবের এই কথায় রাজা লজ্জিত হইয়া কোন উত্তর করিলেন না, কিন্তু তাহাকে কহিলেন তুমি এই দণ্ডে আমার নগর হইতে স্থানান্তর প্রস্থান কর, নতুবা তোমার হস্ত পদ বন্ধন পূর্ব্বক সমুদ্রে নিক্ষেপ করিব। মাধব কহিলেন মহারাজ আমাকে কি অপরাধে আপনি দেশান্তরিত করিতে চাহেন, এবং কি অপরাধেই বা সমুদ্রে নিক্ষেপ করিবেন। রাজা বলিলেন আমি তোমাকে যাহা দিয়াছিলাম তাহা তুমি আমার সমক্ষেই বেশ্যাকে দান কর, তোমার এত বড় আপদ্ধা, আমি কি উহাকে কিছু দিতে পারিতাম না।
এই কথায় মাধব মলিনবদনে সভাসদন হইতে গাত্রোখান করিয়া বাহির হইলেন, এবং এক বৃক্ষমূলে ব্যাকুলিত ভাবে দাঁড়াইয়া খেদ করিতে করিতে কহিতে লাগিলেন, হায়, এই নির্বোধ রাজা আমাকে নির্বাসল করিবার অনুমতি করিলেন। কিন্তু আমি এদেশ পরিত্যাগ করিয়া, কামকলার বদনেন্দু সন্দর্শনে বঞ্চিত হইলে, আপন প্রাণে বঞ্চিত হইব, এবং এখানে। থাকিলেও এই রাজা প্রাণহন্তা হইবেন। অতএব কি কবি, কোথায় যাই। এবম্বিধ বিবিধ চিন্তা করিতে করিতে কামকলার নামোচ্চারণ পূর্ব্বক রোদন করিতে লাগিলেন।
কামকন্দলা মাধবের রূপ লাবণ্য ও গুণাগুণবিবেকনৈপুণ্য দর্শনে একবারে বিমোহিত হইয়াছিল। অতএব, মাধব সভা হইতে বাহিরে গমন করিলে পর, রাজার স্থানে বিদায় হইয়া তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ এক দুত প্রেরণ করিল। তাহাকে বলিয়াদিল মাধবকে লইয়া আমার গৃহে রাখ, আমি এখনি যাইতেছি। দূত মাধবকে আনিয়া কামকলার আলয়ে বসাইল। কামকলা গৃহে আসিয়া মাধবের সহিত একত্র বসিয়া, রসালাপ করিতে লাগিল। মাধব কহিলেন রাজা অমাকে দেশান্তর গমনের আজ্ঞা দিয়াছেন। কিন্তু তুমি আমাকে আপন গৃহে আনিয়াছ, রাজা ইহা শুনিলে আমার প্রাণ দণ্ড করিবেন। আমার প্রাণ নাশ হইলে আমার দুঃখের শেষ হইবে বটে, কিন্তু তুমিও তাহার কোপানলে ভস্ম হইবে। অতএব যাহাতে প্রাণ বিয়োগ ও অপযশঃ সম্ভব এমত কর্ম্ম অকর্তব্য। কামকলা কহিল আমি এখন তোমাকে ছাড়িতে পারি না। পরমেশ্বর যাহা করেন তাহাই হইবে। ইহ, বলিয়া বাদ্যযন্ত্রাদি আনাইয়া আপনার যে যে গুণ ছিল তাহা প্রকাশ করিতে লাগিল। মাধবও গান বাদ্য করিলেন। এই প্রকার আমোদে আহলাদে অনেক রাত্রি হইল। নিশাবসানের কিঞ্চিৎ অবশিষ্ট থাকিতে কামকুন্দল। মাধবকে কহিল, তুমি অনেক শ্রম করিয়াছি, এই ক্ষণে বিশ্রাম কর। ইহা বলিয়া শয়ন মন্দিরে লইয়া গিয়া তাহার সহিত একত্র শয়ন করিয়া থাকিল।
প্রভাতে প্রভাতিক বাদ্যারম্ভ হইলে, মাধৱ রাজাজ্ঞা স্মরণ করিয়া হতবুদ্ধি হইয়া কামকলাকে কহিলেন হে সুন্দরি রজনী অতি সুখে যাপন করিলাম, কিন্তু এক্ষণে এখানে থাকিলে উভয়েরই প্রাণ বিনাশ হইবে। অতএব, ইহা নাহয় এবং উভয়ে স্বচ্ছন্দে থাকিতে পারি, আমি মনে মনে ইহার এক সদুপায় স্থির করিয়াছি। আমি সম্প্রতি চলিলাম, তুমি নিশ্চিন্ত থাক। আমি সত্য করিয়া যাইতেছি, অতঃপর আসিয়া তোমাকে এখান হইতে লইয়া যাইব। এই কথা শ্রবণ মাত্র কামকন্দলা মূচ্ছাগত হইয়া ভূমিতে পড়িল। মাধব, আপনি ও আপন প্রেয়সী উভয়েরি প্রাণ রক্ষার্থ, তথা হইতে প্রস্থান করিলেন, এবং হা কামকলা হা কামকলা বলিয়া অহর্নিশি ভ্রমণ করিতে লাগিলেন।
মাধবের গমনান্তে কামকলার সখীগণ তাহার মূচ্ছ। বিশ্রান্তি বাসনায় তাহার মুখে সুগন্ধি বারি প্রক্ষেপ করিতে লাগিল। তাহাতে জ্ঞানোদয় হইলে, সে অনবরত দীর্ঘ নিশ্বাস পরিত্যাগ পূর্বক মাধব মাধব বলিয়া রোদন করিতে লাগিল। সখীগণ নানা প্রকার বুঝাইতে লাগিল, কিন্তু কোন প্রকারে তাহার ধৈর্য্য সম্পাদন করিতে পারিল না। গোলাব কপূর চন্দনাদি সুগন্ধীয় সুশীতল দ্রব্য যত তাহার অঙ্গে দিল ততই অধিক অঙ্গদাহ হইতে লাগিল, কেবল মাধবের মধুর নাম শ্রবণে কিঞ্চিৎ স্নিগ্ধ হইতে লাগিল।
মাধব হতাশ্বাস হইয়া বন ভ্রমণ করিতে করিতে মনে মনে ভাবিলেন সংসারে এমন কে আছে যে তাহার নিকটে যাইয়া দুঃখ নিবারণ করি। অনন্তর তাহার স্মরণ হইল, রাজা বিক্রমাদিত্য পরম দয়ালু এবং পর দুঃখহারী, অতএব তাহার শরণাপন্ন হইলে তিনি অবশ্য আমার দুঃখ বিমোচন করিতে পারেন। মনে মনে ইহা স্থির করিয়া উজ্জয়িনী নগরে যাত্রা করিলেন। তথায় উপস্থিত হইয়া তন্নগরস্থ এক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করিলেন রাজার সহিত সাক্ষাতের উপায় কি। সে কহিল। গোদাবরী তীরে এক শিবালয় আছে, রাজা প্রতিদিন শিব দর্শন জন্য তথায় গমন করেন। সেইখানে সাক্ষাৎ হইতে পারে। ইহা শুনিয়া মাধব গোদাবরী তটে মঠে গমন করিলেন, এবং মন্দিরের দ্বারের চৌকাষ্ঠের উপর এই কয়েকটা কথা লিখিয়া রাখিলেন, যথা, “আমি বিদেশস্থ ব্রাহ্মণ অতি দুঃখী এবং বিরহে ব্যাকুলিত, আমি শুনিয়াছি রাজা পরদুঃখ নিবারণ ও গো ব্রাহ্মণকে সদা রক্ষা করেন। অতএব আমি এই নগরে আসিয়াছি, যদি রাজা আমার দুঃখ দূর করেন তবে আমি প্রাণ ধারণ করিব, নতুবা গোদাবরীতে ঝাঁপ দিয়া প্রাণত্যাগ করিব, এই প্রতিজ্ঞা করিয়াছি,,।
রাজা বিক্রমাদিত্যের এই নিয়ম ছিল অন্ন বস্ত্র হীন বা ভূমি ও অন্য দ্রব্যাকাঙ্ক্ষী বা বিবেকী কিম্বা বিরহে পীড়িত কোন ব্যক্তি নগরে আসিলে, তিনি যে পর্যন্ত তাহার দুঃখ নিবারণ না করিতেন সে পর্যন্ত জল গ্রহণ দূরে থাকুক দন্তধাবন করিতেন না। এব পর দিবস প্রাতঃকালে মন্দিরে গিয়া মহাদেবকে প্রদক্ষিণ করিতে করিতে উর্দ্ধে দৃষ্টি করিয়া দেখিলেন কোন ব্যক্তি আপনার দুঃখের বিবরণ চৌকাষ্ঠে লিখিয়া গিয়াছে। রাজা, তাহা পাঠানন্তর, মহাদেবকে প্রণাম করিয়া বাজবাটীতে আসিয়া আজ্ঞা দিলেন মাধব নামে এক ব্রাহ্মণ আমার নগরে আসিয়াছে, যে ব্যক্তি তাহাকে অন্বেষণ করিয়া আনিবে তাহাকে প্রচুর অর্থ পুরস্কার দিব। এই আজ্ঞায় বহুতর লোক মাধবের অন্বেষণে বহির্গত হইল, এবং মাঠ ঘাট হাট উদ্যান উপবন সকল অন্বেষণ করিতে লাগিল, কিন্তু কোন স্থানে কেহ তাহাকে পাইলনা। অনন্তর রাজা এক দূতীকে আহ্বান করিয়া, মাধবের অবস্থা জানাইয়া, আজ্ঞা দিলেন যদি তুমি মাধবকে অনুসন্ধান করিয়া আনিতে পারি তবে তুমি যে অর্থ প্রার্থনা করিবে তোমাকে দিব। দূতী কহিল এ কর্ম্ম অতি সামান্য, আমি এখনি তাহাকে অন্বেষণ করিয়া আনিতেছি।
ইহা বলিয়া দূতী দেবালয়ের দ্বারে গিয়া বসিয়া থাকিল। দিবাবসানে মাধব ভ্রমণ করিতে করিতে তথায় আসিতেছেন। দূতী অন্তরে থাকিয়া দেখিল তাহার মুখ হরিদ্রাবর্ণ, চক্ষু বারিপূরিত, এবং চিত্ত উদাস হইয়াছে। তদবলোকনে মনে মনে সংশয় করিল, এই সেই বিরহাক্রান্ত ব্যক্তি কি না। সময়ে মাধব ঐ স্থানে আসিয়া বসিলেন, এবং ক্ষণেক পরে কামকলা কামকলা বলিয়া দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করিলেন। ইহাতে দূতী তৎক্ষণাৎ তাহার হস্ত ধারণ পূর্ব্বক কহিল আমি রাজাজ্ঞায় তোমার অন্বেষণে আসিয়াছি, তুমি শীঘ্র আমার সঙ্গে আইস, তোমার অতিলাষ পূর্ণ হইবে, তোমার দুঃখে রাজা নিতান্ত দুঃখিত আছেন।
মাধব তাহার সঙ্গে চলিলেন। দূতী তাহাকে রাজার সম্মুখে উপস্থিত করিয়া কহিল, মহারাজ আপনি যাহার নিমিত্ত এত চিন্তিত ছিলেন সেই বিরহী এমত এই। রাজা মাধবকে জিজ্ঞাসা করিলেন তুমি কাহার বিচ্ছেদে এই বিষমশর দশা প্রাপ্ত হইয়াছ। মাধব দীর্ঘ নিশ্বাস ত্যাগপূর্ব্বক কহিলেন, মহারাজ, কামকদলার বিচ্ছেদে আমার এই দুর্গতি হইয়াছে। কামকন্দলা রাজা কামসেনের সভার নর্তকী। তুমি ধর্ম্মাত্মা, আমি তোমার শরণ লইয়াছি। তুমি যদি সেই প্রাণানন্দদায়িনীকে দিয়া আমার প্রাণরক্ষা কর তবে প্রাণ দান পাই। রাজা হাস্য করিয়া কহিলেন হে বিপ্র সে বারাঙ্গনা, তাহার প্রেমে তুমি আপন ধর্ম্ম কর্ম্ম সকল বিসর্জন দাও, ইহা অনুচিত। মাধব কহিলেন, মহারাজ, প্রেমের তন্ত্র স্বতন্ত্র, যে ব্যক্তি প্রেম মন্ত্র পাঠ করে সে আপন শরীর আত্ম। ও ধর্ম কর্ম সকল তাহাতে সমর্পণ করে, তাহার বৃত্তান্ত কি নিবেদন করিব।
রাজা এই কথা শুনিয়া তাহাকে স্ববাসে রাখিলেন, এবং স্বীয় সভার নকীগণকে বলিলেন তোমরা অতি মনোহর বেশ ভূষ করিয়া আইস। নর্তকীগণ নানা অলঙ্কারে ভূষিত হইয়া নিরুপম মোহিনীসজ্জা করিয়া রাজার সভায় আসিলে, রাজা মাধবকে বলিলেন ইহার মধ্যে তোমার যাহাকে অভিলাষ হয় গ্রহণ কর। ব্রাহ্মণনন্দন কহিলেন মহারাজ এই সকল নারী পরম সুন্দরী বটে, কিন্তু কামকলা ভিন্ন অন্য কামিনী আমার কামনীয় নহে। বারিদ-বিনিগর্ত-বারিবিন্দুপ্রত্যাশী চাতকের পিপাসা ঐ বারি ব্যতীত আর কিছু তেই নিবারণ হইতে পারে না। রাজা কামকলার প্রেমে মাধবকে এইরূপ মুগ্ধ দেখিয়া মনে মনে বিবেচনা করিলেন ইহাকে সঙ্গে লইয়া কামকলাকে দিতে হইল, তাহা না হইলে ইহার মনের চাঞ্চল্য দূর হইবেক না, ব্রহ্মহত্যা হইবেক। ইহা ভাবিয়া তিনি মাধবকে বলিলেন, তুমি স্নান পূজা করিয়া কিঞ্চিৎ জলযোগ কর, আমি গমনের আয়োজন করি। পরে তোমাকে সঙ্গে লইয়া গিয়া কামকলাকে দেওয়াইব। মাধব এই কথায় অপার আনন্দ-সাগরে মগ্ন হইয়া আহারাদি করিলেন। রাজা ইতিমধ্যে সৈন্যগণকে সংগ্রাম সজ্জা করিবার আজ্ঞা দিলেন, অনন্তর আপনি সুসজ্জিত হইয়া বিপ্রকুমারকে সমভিব্যাহারে লইয়া যাত্রা করিলেন, এবং চতুরঙ্গ সেনা তাহার সঙ্গে সঙ্গে চলিল।
কয়েক দিবস পরে রাজা কামনগরের দশ ক্রোশ ব্যবধানে উপস্থিত হইয়া তথায় শিবির সন্নিবেশন পূর্ব্বক তনগরস্থ ভূপতিকে পত্র লিখিলেন কামকলা নামে যে গন্ধর্ব্বকন্যা তোমার সভাতে আছে তাহাকে আমার স্থানে প্রেরণ কর, নতুবা যুদ্ধার্থ প্রস্তুত হও। দূত পত্র লইয়া কামনগরের রাজার নিকট সমর্পণ করিলে, কামসেন তাহাকে বলিলেন যদি রাজা সংগ্রাম ইচ্ছা করেন আমি সম্মত আছি। বার্তাবহ এই বার্তা আনয়ন করিলে রাজা বিক্রমাদিত্য স্বীয় সেনাগণকে সুসজ্জিত হইতে অজ্ঞা দিলেন। কিন্তু মনে মনে ভাবিলেন, আমি যে কামকলাকে লইবার জন্য আসিএকবিংশ পুত্তলিকা।য়াছি অগ্রে তাহার প্রেমের পরীক্ষা করিতে হইবে। যদি মাধবের সহিত তাহার যথার্থ প্রণয় হইয়া থাকে তবেই সমর সার্থক হইবে, নতুবা অনর্থক বিবাদে কি প্রয়োজন।
ইহা ভাবিয়া রাজা বৈদ্যবেশে কামনগরে গমন করিলেন, এবং কামকলার গৃহান্বেষণ পূর্বক তাহার দ্বারে উপস্থিত হইয়া দ্বারাঘাত করিতে লাগিলেন। তাহাতে অন্তঃপুর হইতে এক পরিচারিণী আসিয়া তাহার পরিচয় শুনিয়া বলিল তুমি যদি চিকিৎসা বিদ্যাতে সুপণ্ডিত হও এবং আমার নায়িকার রোগ শান্তি করিতে পার তবে অনেক অর্থ পাইবে। ইহা বলিয়া দাসী তাহাকে কামকলার নিকটে লইয়া গেল। রাজা দেখিলেন কামকলা সপন্দহীন শয্যায় পড়িয়া আছে। পরে তাহার ব্যাধি নির্ণয় করিয়া বলিলেন ইহার আর কোন পীড়া নাই, কেবল প্রিয়তমের প্রতি প্রেমাত্তা হইয়াছে। রাজার এই কথায় কামকলা নেত্রোন্মীলন করিয়া বলিল হে বৈদ্যরাজ যদি ইহার কোন ঔষধ জান, বল। রাজা বলিলেন ইহার ঔষধ আমার নিকটে ছিল, কিন্তু এইক্ষণে আমি তাহার কথা কিছু বলিতে পারিনা। কামকলা বলিল তোমার স্থানে কি ঔষধ ছিল। রাজা বলিলেন মাধব নামক এক ব্রাহ্মণ আমার নিকটে আসিয়াছিল, সে বিরহে সস্তাপিত হইয়া উজ্জয়িনী নগরে প্রাণত্যাগ করিয়াছে। এই কথা শ্রবণমাত্র কামকলা হা শব্দ করিয়া অচৈতন্য হইয়া ভূমিতে পড়িল, এবং তৎক্ষণাৎ প্রাণ পরিত্যাগ করিল। তদ্দর্শনে তাহার গৃহজন সকলে রোদন করিতে লাগিল। রাজা তাহাদিগকে বলিলেন তোমরা ক্রন্দন করিও না, ইহার মূচ্ছবেশ হইয়াছে, প্রাণ বিয়োগ হয় নাই, কিঞ্চিৎ বিলম্বে সচেতন হইবে, তোমরা ইহার শান্তি চেষ্টা কর। আমি ঔষধ আনয়ন করিতেছি।
ইহা বলিয়া রাজা স্বীয় শিবিরে গমন করিলেন এবং মাধবকে তাহার মৃত্যু বার্তা কহিলেন। মাধব ঐ সম্বাদ শ্রবণমাত্র দীর্ঘশ্বাস ছাড়িয়া প্রাণত্যাগ করিলেন। তখন রাজা মনে মনে চিন্তা করিতে লাগিলেন, আমি যাহার জন্য এত যত্নে সৈন্যসামন্ত লইয়া আসিলাম, তাহাকে আপনি কালের করাল গ্রাসে নিক্ষেপ করিলাম, হায়, আমি দুই জনের প্রাণ বিয়োগের মূল হইলাম, অতএব আমার জীবন ধারণ করা আর উচিত নহে। ইহা ভাবিয়া রাজা যথানিয়মক্রমে চিত। প্রস্তুত করাইয়া আপনি প্রাণত্যাগ করিবেন প্রতিজ্ঞা করিলেন। মন্ত্রী নিষেধ করিলেন, কিন্তু তাহা না শুনিয়া চিত আরোহণ করিতে উদ্যত হইলেন। বেতাল এই দুর্দৈব দেখিয়া তাহার হস্ত ধারণ পূর্বক কহিল মহারাজ এ কি কর্ম্ম করিতেছেন। রাজা বলিলেন আমা কর্তৃক দুই মহাপ্রাণী নষ্ট হইয়াছে, জন্য আমারও জীবন ধারণ উচিত নহে, কলঙ্কভাগী হইয়া বাঁচিয়া থাকা অপেক্ষা মৃত্যুই ভাল। বেতাল কহিল মহারাজ প্রাণত্যাগ করিবেন না, আমি অমৃত আনয়ন করিতেছি, তদ্বারা উভয়ের প্রাণ দান হইবে। ইহা বলিয়া বেতাল পাতালপুর হইতে অমৃত আনয়ন করিয়া ব্রাহ্মণকুমারের প্রাণদান করিল। রাজা ঐ অমৃত লইয়া গিয়া কামকলার অঙ্গে প্রোক্ষণ করিলেন, তাহাতে সেও পুনর্জীবিত হইয়া উঠিল এবং মাধব মাধব বলিয়া উচ্চৈঃস্বরে ডাকিতে লাগিল। সম্মুখে রাজাকে দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিল তুমি কে, কোথা হইতে আসিয়াছ। রাজা বলিলেন আমি বীর বিক্রমাদিত্য, মাধবের বিরহ-যন্ত্রণা দূর করণার্থ উজ্জয়িনী নগর হইতে তাহাকে এখানে লইয়া আসিয়াছি, তুমি নিশ্চয় জান, তোমার সঙ্গে তাহার সংমিলন করিয়া দিব। ইহা শুনিয়া কামকলা প্রেমানন্দে পুলকিত হইয়া রাজার চরণ ধারণ করিল, আর বলিল হে পুরুষোত্তম তুমি ইহা করিলে আমাকে জীবন দান করিবে, এবং তোমার যে প্রকার যশঃ শ্রবণ করা যায় তাহা আরো বিস্তারিত হইবে।
কামকন্দলা এ কথা বলিলে রাজা স্বীয় শিবিরে প্রত্যাগমন করিলেন। পর দিবস সৈন্য সামন্ত লইয়া কামনগরী আক্রমণ করিলেন। তখন কামসেন রাজা পরাভব মানিয়া অঙ্গীকার করিলেন কামকলাকে প্রেরণ করিবেন। তিনি ইহাও বলিয়া পাঠাইলেন আমি আপনার চরণ দর্শন জন্য যুদ্ধ করিতে চাহিয়াছিলাম, আমার সে অভিলাষ পূর্ণ হইল, এবং আপনার চরণরেণু সম্পর্কে আমার রাজ্যও পবিত্র হইল। তদ- নন্তর রাজা কামসেন রাজা বিক্রমাদিত্যের সহিত সা- ক্ষাৎ করিয়া তাঁহাকে আপন আলয়ে লইয়া গেলেন, এবং বহুতর অর্থ ও অলঙ্কার সহিত কামকন্দলাকে তা- হার সম্মুখে আনাইলেন। রাজা বিক্রমাদিত্য মাধবকে আনাইয়া তাহাকে কামকলা সমর্পণ করিলেন। পরে তথা হইতে আপন রাজধানীতে আসিয়া মাধবকে অনেক অর্থ দিয়া বিদায় করিলেন।
এই বৃত্তান্ত সমাপন করিয়া অনুরােধবতী পুত্তলিকা বলিল হে ভােজরাজ যদি তােমার এই প্রকার সামর্থ্য ও সাহস থাকে তবে সিংহাসনারােহণ কর, নতুবা পতিত হইয়া নরকগামী হইবে। এইরূপে সে দিবসও গত হইল। পর দিবস রাজা পুনর্ব্বার সিংহাসনের সমীপে উপস্থিত হইলে
অনুপরেখা দ্বাবিংশ পুত্তলিকা
কহিল হে রাজন, তুমি সিংহাসনােপবেশনের বাসনা পরিত্যাগ কর, এবং আমি যাহা কহি তাহা শুন।
এক দিবস রাজা বিক্রমাদিত্য সভারূঢ় হইয়া মন্ত্রী- কে জিজ্ঞাসা করিলেন কর্ম্মের দ্বারা মনুষ্যের জ্ঞানােৎ- পত্তি হয়, কি, মাতা পিতার উপদেশানুসারে হইয়া থাকে। মন্ত্রী কহিলেন মহারাজ মনুষ্য পূৰ্বজন্মে যেমন কর্ম্ম করে পরমেশ্বর সেই প্রকার তাহার ফল দেন, তদ- মুসারে বিদ্যা হয়, মাতা পিতার শিক্ষাতে হয় না। তিনি আরও বলিলেন মনুষ্য মনুষ্যকে কি শিখাইতে পারে, যদি তাহা হইত তবে সকলেই পণ্ডিত হইতে পারিত, ফলতঃ পূর্ব্ব জন্মের সুকৃতি ভিন্ন কখন বিদ্যা হয় না। বিধাতা যাহার অদৃষ্টে যাহা লিখিয়াছেন, মনুষ্যের সাধ্য নাই তাহার বিপরীত করে। রাজা বলিলেন মন্ত্রী তুমি এ কি কথা কহিতেছ, সন্তান ভূমিষ্ঠ হইলেই মাতা পিতার উপদেশানুসারে চলে, এবং তাহাদের যে প্রকার ব্যবহারাদি দেখে সেই প্রকার শিখে, ইহাতে পূর্ব জন্মের ফল কি আছে। বালকগণকে যাহা শিখান যায় তাহাই শিখে, আর যেমন সংসর্গে বাস করে সেই প্রকার বুদ্ধিও হয়। মন্ত্রী বলিলেন ধর্মাবতার আমি আপনার কথায় বিতণ্ডা করিতে পারি না, কিন্তু আপনি বিবেচনা করিয়া দেখুন অদৃষ্টানুসারে মনুষ্যের ফলভোগ হইয়া থাকে। রাজা কহিলেন ইহার পরীক্ষা করা কর্তব্য।
তদনন্তর রাজা নরাগম্য এক নিবিড় অরণ্য মধ্যে এক গৃহ নির্মাণ করিতে আজ্ঞা দিলেন। পরে তাহা প্রস্তুত হইলে, তাহার এক পুত্র জন্মিল। ঐ পুত্র মাতৃ গর্ভ হইতে ভূমিষ্ঠ হইবা মাত্র তিনি তাহাকে ঐ স্থানে প্রেরণ করিলেন, এবং তাহার রক্ষার্থ এক ধাত্রী নিযুক্ত করিলেন, সে জন্মান্ধা ও বধিরা এবং বাক শক্তি রহিতা, কোন কথা কহিতে পারিত না, কেবল বালককে দুগ্ধপান করাইত। ইহার কিছু কাল পরে মন্ত্রীর এক পুত্র জন্মিল, এবং রাজপুরোহিতের ও নগরপালের দুই পুত্র হইল। ইহাদিগকেও রাজা সেই প্রকার জন্মান্ধা বধিরা বচনশক্তিরহিতা ধাত্রী দিয়া, সেই অরণ্য গৃহে প্রেরণ করিলেন। বালকেরা ঐ স্থানে থাকিয়া ধাত্রীদিগের স্তন পানে প্রাণ ধারণ পূর্বক প্রবন্ধমান হইতে লাগিল। ঐ গৃহের দুই ক্রোশ অন্তর পর্যন্ত এমত প্রহরী রহিল যে, মনুষ্যশব্দ দূরে থাকুক ঢাক ঢোলের শব্দও তথায় প্রবেশ করিতে পারিত না।
এই প্রকার দ্বাদশ বৎসর অতীত হইলে এক দিবস পুরোহিতের ভার্য্যা ভর্তাকে কহিলেন এক যুগ পূর্ণ হইল আমি পুত্রের মুখাবলোকন করিলাম না। যদি হঠাৎ পরলোক গমন করি তবে তাহাকে আর দেখিতে পাইব না। অতএব তুমি রাজার স্থানে যাইয়া বল, মহারাজ দ্বাদশ বৎসর উত্তীর্ণ হইল আমি পুত্রের মখাবলোকন করি নাই। এইক্ষণে আমার অভিলাষ হইয়াছে তাহাকে গৃহাদি সমর্পণ করিয়া দণ্ডগ্রহণ পূর্ব্বক তপস্যা করি। ব্রাহ্মণীর পরামর্শে ব্রাহ্মণ রাজার সন্নিধানে গমন করিলে, রাজা তাহাকে প্রণিপাত পূর্ব্বক কুশলাদি জিজ্ঞাসা করিলেন। ব্রাহ্মণ আশীর্ব্বাদ করিয়া বলিলেন মহারাজ আপনার কৃপাতে সকল মঙ্গল, কিন্তু আমি এক মানস করিয়া মহারাজের সমীপে আসিয়াছি। রাজা বলিলেন কি মানস। ব্রাহ্মণ তখন সকল বৃত্তান্ত কহিলেন। তাহাতে রাজা মন্ত্রীকে আজ্ঞা করিলেন। চারি বালককে অরণ্য গৃহ হইতে আনয়ন কর।
মন্ত্রী এই আজ্ঞা পাইয়া প্রথমত রাজকুমারকে আনয়ন করিলেন। রাজনন্দনের নখ ও কেশ অত্যন্ত বদ্ধিত এবং তাবৎ শরীর মলিন ও ম্লেচ্ছাকার হইয়াছিল। এই অবস্থাতে তাহাকে রাজার সম্মুখে উপস্থিত করিলে, রাজা তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, হে নন্দন, তুমি এত দিন কোথায় ছিলে, এবং এখন কোথা হইতে আসিতেছ, তোমার কুশল বল। রাজকুমার হাস্য করিয়া বলিলেন মহারাজের কৃপাতে আমার সকল কুশল, বিশেষতঃ অদ্য অধিক কুশলের দিবস উপস্থিত হইয়াছে, কেননা আপনার চরণ দর্শন করিলাম। ইহা শুনিয়া রাজা হৃষ্টান্তঃকরণে মন্ত্রীর প্রতি দৃষ্টিপাত করিলেন। মন্ত্রী কৃতাঞ্জলি হইয়া কহিলেন মহারাজ এ সকল ব্যাপার জন্মান্তরীয় কর্ম্মের ফল মানিতে হইবে।
তদনন্তর রাজা মন্ত্রিপুত্রকে আনয়ন করাইলেন। মন্ত্রিতনয় রাজার সম্মুখে উপস্থিত হইলে, রাজ। দেখিলেন তাহার ভয়ানক মূর্তি, অর্থাৎ ভাল্লুকের ন্যায় নখ ও কেশ বৃদ্ধি হইয়াছে। মন্ত্রিনন্দন অভিবাদন পূর্ব্বক রাজার সম্মুখে দাণ্ডাইলে রাজা জিজ্ঞাসা করিলেন তোমার কুশল সংবাদ কহ, তুমি কোথায় ছিলে এবং কোন স্থান হইতে আগমন করিতেছ। মন্ত্রিপুত্র কহিলেন আমার জন্মগ্রহণমাত্রে আপনি আমাকে নির্বান্ধব নিকেতনে রাখিয়া ছিলেন। জল পাত্র জলপূর্ণ হইলে জলমগ্ন হয় ইহা সকলেই জানে। মনুষ্যগণ জানিতেছে দিন যাইতেছে, এবং দিনও জানিতেছে। সয্য যাইতেছে। সংসারের এই ব্যবহার, ইহাতে কুশলের বিষয় কি আছে। রাজা, মন্ত্রিপুত্রের এই অদ্ভুত বাক্য শুনিয়া, মন্ত্রীকে কহিলেন ইহাকে এই কথা কে শিখাইল, তুমি আমাকে যে কথা বলিয়াছিলে তাহা প্রকৃত, পূর্ব্ব জন্মের কর্মেরই এই সকল ফল বলিতে হইবে।
তদনন্তর রাজা নগরপালের পুত্রকে ডাকাইলেন। সে আসিয়া রাজাকে প্রণাম পর্ব্বক করপুটে দণ্ডায়- মান হইলে, রাজা তাহাকেও সেই প্রকার প্রশ্ন করিলেন। নগররক্ষকের নন্দন কহিল হে পৃথীনাথ আমরা দিবা- রাত্র নগর রক্ষা করি, তথাপি দস্যুবৃত্তি নিবৃত্তি হয় না, ইহাতে সর্ব্বদা দুনামগ্রস্ত হইতে হয়। বিনাপরাধে অপরাধীর ফল হইলে কি প্রকারে কুশল বলিতে পারি।
পরিশেষে রাজা বিপ্রনন্দনকে আনয়ন করাইলেন। ব্রাহ্মণকুমার রাজার সম্মুখে আসিলে, রাজা তাহাকে প্রণাম করিলেন। ব্রাহ্মণতনয় রাজাকে শ্লোক পাঠ পর্ব্বক আশীর্ব্বাদ করিলেন। তদনন্তর রাজা তাহার কুশলাদি জিজ্ঞাসা করিলে, বিপ্রনন্দন কহিলেন মহা- রাজ আমার কুশল জিজ্ঞাসা করিতেছেন, কিন্তু আমা- দিগের পরমায়ু দিনদিন ক্ষয় হইতেছে। মনুষ্য চিরজীবী হইলেই কুশল বলা যাইতে পারে, কিন্তু জীবন মৃত্যু আ- মাদের সঙ্গে সঙ্গেই রহিয়াছে, অতএব কুশলের বিষয় কি। চারি বালকের এইরূপ অপরূপ কথা বার্তা শুনিয়া রাজা মন্ত্রীকে কহিলেন তােমার কথাই যথার্থ। পড়া- ইলেই পণ্ডিত হয় না, পূর্ব জন্মের কর্ম্মবশতঃ পাণ্ডিত্য জন্মে। ইহা বলিয়া, মন্ত্রীর প্রতি সন্তোষের চিহ্রস্বরূপ তাহাকে প্রধানমন্ত্রিত্ব প্রদান করিয়া, সকল রাজকার্যের ভারার্পণ করিলেন। পরে, যে চারি বালককে অরণ্য গৃহে রাখিয়াছিলেন তাহাদের বিবাহ দেওয়াইলেন, এবং তাহাদিগের সংসারযাত্রা নির্বাহ জন্য অনেক বিত্ত সম্পত্তি প্রদান করিলেন।
এতাবৎ বর্ণন করিয়া পুত্তলিকা কহিল, হে ভোজরাজ, কলিযুগে এমত ধর্মাত্মা সত্যপ্রিয় জিতেন্দ্রিয় মনুষ্য কোথায়। যে ব্যক্তি এমত পণ্ডিত, জ্ঞানবান, ও ঐশ্বর্যশালী হইয়া আপনার বিদ্যা বা পরাক্রমের গৌরবে গতি না হন, এবং আপন বাক্যের দৃঢ়তা না করিয়া, কেহ কোন কথা বলিলে তাহার পরীক্ষা এবং বিচার করেন, তাহাকে অবশ্যই সদগুণান্বিত বলিয়া ব্যাখ্যা করা যাইতে পারে। হে ভোজরাজ তুমি এমত গুণশালী নহ, অতএব কি প্রকারে সিংহাসনারোহণ করিতে চাহ, এ দুরাশ পরিত্যাগ কর।
রাজা এই কথায় বিমর্শযুক্ত হইয়া তথা হইতে গাত্রোত্থান পূর্ব্বক অন্তঃপুরে প্রস্থান করিলেন। রাত্রে শয়ন করিয়া ভাবিতে লাগিলেন আমার কুগ্রহে এই সকল ক্লেশ দিতেছে, আমার অদৃষ্টের দোষ কবে খণ্ডিবে এবং সিংহাসনারোহণ করিয়া আমি কবে চরিতার্থ এই প্রকার চিন্তাতে নিশাবসান হইল। প্রত্যুষে রাজা সভায় আসিয়া পুনর্বার সিংহাসনারোহণে উদ্যত হইলে,
আসন পরিগ্রহ পূর্ব্বক বসিলেন, এবং তাঁহার সভাস্থ সমস্ত লোক তাহার চতুর্দিকে উপবিষ্ট হইল। পুত্তলিকা কহিতে লাগিল হে ভূপাল তবে তুমি, রাজা বিক্রমাদিত্যের গুণমাহাত্ম্য শ্রবণ কর।
রাজা বিক্রমাদিত্য যেমন সাহসী, যশস্বী ও পুণ্যাত্মা। ছিলেন কলিযুগে তণ্ডুল্য আর কেহ অদ্যাপি জন্ম গ্রহণ করে নাই, পরে জন্মিবে এমতও অনুভব হয় না। যখন রাজা বিক্রমাদিত্য স্বীয় সহোদর শঙ্কুকে সংহার করিয়া তাহার সিংহাসন রোহণ করিলেন, তখন তাহার প্রধান মন্ত্রীকে কহিলেন অহে মন্ত্রি, পুরাতন লোকদিগের দ্বারা আমার রাজকর্ম্ম নির্বাহ হইবেক না। অতএব তুমি আমাকে রাজকর্ম্মক্ষম বিচক্ষণ বিংশতি জন মনুষ্য আনিয়া দাও, আমি তাহাদের দ্বারা রাজকর্ম্ম করাইব। মন্ত্রী রাজাজ্ঞানুসারে বিংশতি জন রূপবান, সৎকুলোদ্ভব, বিচক্ষণ মনুষ্য আনিয়া দিলেন। রাজা তাহাদিগকে দেখিয়া অতিশয় সন্তুষ্ট হইলেন, এবং সকলকে শিরোপা ও তাম্বুল দান পূর্বক সম্মান করিয়া, উপস্থিত থাকিতে আজ্ঞা দিলেন। কয়েক দিবস পরে, তাহাদিগের কাহাকে মন্ত্রী, কাহাকে নগরপাল, কাহাকে সেনাপতি, এই প্রকার এক এক জনকে এক এক কর্মে নিযুক্ত করিয়া, পুরাতন কর্ম্মকারক গণকে বিদায় দিলেন, এবং রাজকর্মের নুতন নিয়মাদি করিলেন। পুরাতন কর্ম্মকারীর মধ্যে কেবল ঐ প্রধান মন্ত্রীই থাকিলেন।
নুতন লোক নিযুক্ত হইলে পর, কর্ম্মভ্রষ্ট কর্ম্মকারীগণ ঐ মন্ত্রীর সদনে যাইয়া, রাজার রাজ্যশাসনপ্রণালীর বিস্তর প্রশংসা করিতে লাগিল। মন্ত্রী তাহাদের অভিপ্রায় বুবিয়া তাহাদিগকে বলিলেন তোমরা আমার নিকট গমনাগমন করিওনা। আমা দ্বারা তোমাদের মনস্কামনা সিদ্ধ হইবেনা, প্রত্যুত, রাজা শুনিলে মনে করিবেন ইহারা কোন মন্ত্রণা করিতেছে, এবং তাহাতে। কুপিত হইবেন, আমি দুনামের বড় শঙ্কা করি। আমি যাহা কহিলাম ইহাতে তোমরা বিরুদ্ধ বিবেচনা করিওনা। এই কথা শুনিয়া কর্ম্মভ্রষ্ট কর্মচারীগণ তাহার সদনে গমনাগমনে ক্ষান্ত হইল।
অনন্তর মন্ত্রী মনে মনে এই চিন্তা করিলেন রাজার চিত্ততোক কোন কর্ম্ম করা উচিত। পরে এক দিবস তিনি নদীতে স্নান করিয়া জলে দণ্ডায়মান হইয়া জপ করিতেছেন, এমত সময়ে দেখিলেন একটী অতি অপূর্ব পুষ্প ভাসিয়া যাইতেছে, ততুল্য ফুল কখন কাহার দৃষ্টিগোচর হয় নাই। তাহা দেখিয়া মনে মনে ভাবিলেন রাজাকে এই কুসুমটী উপঢৌকন দিলে তিনি অবশ্যই সন্তুষ্ট হইবেন। ইহা ভাবিয়া ফুলটী তুলিয়া লইলেন এবং হৃষ্টান্তঃকরণে গৃহে আসিয়া পরিধেয় বস্ত্রাদি পরিবর্তন পূর্ব্বক রাজার নিকটে গিয়া রাজাকে সেই পুষ্প অর্পণ করিলেন। রাজা পুষ্প পাইয়া অতিশয় আল্লাদিত হইলেন। কিন্তু কহিলেন, যে বৃক্ষে এই পুষ্প জন্মিয়াছে তাহা তোমাকে আনিতে হইবে, তাহা হইলে আমি তোমার প্রতি অত্যন্ত সন্তুষ্ট হইব, নতুবা তোমাকে নগর হইতে নির্বাসন করিয়া দিব।
রাজার এই আজ্ঞায় মন্ত্রী ক্ষুন্ন হইয়া গৃহে প্রত্যা গমন পূবর্বক আক্ষেপ করিতে লাগিলেন আমি পূর্ব্ব জন্মে কি অপরাধ করিয়াছিলাম, তাহার এই প্রতিফল হইল। আমি এমত সুন্দর বস্তু বাজাকে দিলাম, তিনি তাহাতে আহলাদিত হইয়াও আমার প্রতি ক্রোধ করিলেন। হায়, কোন কর্ম্মের কি ফল, কিছুই বুঝ। যায় না। হিত করিলে বিপরীত ঘটে, কালের গতি অতি বিচিত্র। এই প্রকার অনেক বিলাপ ও পরিতাপের পর মনে মনে ভাবিলেন রাজা আমাকে বৃক্ষ আনিতে আজ্ঞা করিয়াছেন, যদি বৃক্ষ আনিয়া দিতে পারি তবে নগর হইতে বহিষ্কত হইব। কিন্তু কোথায় বৃক্ষ পাইব, কোথায় বৃক্ষের উদ্দেশ করিব। যদি ক্লেশ স্বীকার করিয়া অন্বেষণ করিতে যাই, ক্ষতি নাই, কিন্তু প্রাপ্ত না হইলে দ্বিগুণ মনে দুঃখ। যাহা হউক, আমার আসন্ন কাল উপস্থিত দেখিতেছি, কিন্তু অপমান গ্রস্ত হইয়া মরা অনুচিত। যদি মরিতেই হইল অগ্রে বনে যাইয়া বৃক্ষ অন্বেষণ করি, যদি বৃক্ষ না পাই, আপনিই প্রাণ ত্যাগ করিব।
মন্ত্রী মনে মনে ইহা স্থির করিয়া এক জন সুত্রধরকে আহ্বান পূর্ব্বক বলিলেন আমাকে এমন এক খান জলযান নির্মাণ করিয়া দাও যে, তাহা কাণ্ডারী ব্যতিরেকে চলিবে, এবং যে দিকে গমন করিতে ইচ্ছা করিব সেই দিকেই যাইবে। সুত্রধর যেআজ্ঞা বলিয়া, কিছু অগ্রিম মুদ্রা গ্রহণ পূর্ব্বক বিদায় লইল। পরে ঐরূপ আশ্চর্য্য তরণী প্রস্তুত করিয়া মন্ত্রীকে সংবাদ দিলে, মন্ত্রী নদীতীরে যাইয়া তরণী দৃষ্টে অতিশয় তুষ্ট হইলেন, এবং সুত্রধরকে তৎক্ষণাৎ পচখান গ্রাম পুরস্কার। দিলেন। তদনন্তর জলযানে আপন গ্রাসাচ্ছাদনীয় দ্রব্যাদি উত্তোলন করাইয়া, আত্মীয় গণের স্থানে বিদায় গ্রহণ পূর্বক তাহাদিগকে কহিলেন যদি আমি জীবদ্দ শায় প্রত্যাগমন করি তবে তোমাদের সহিত পুনর্ব্বার সাক্ষাৎ করিব, নতুবা এই বিদায় হইলাম। তাহার পরিবারগণ এই কথা শুনিয়া অতিশয় দুঃখিত হইল, মন্ত্রী ও অতিশয় দুঃখিত মনে নৌকারোহণ করিলেন। পরে বাদাম তুলিয়া তরণী ছাড়িয়া দিলেন, এবং যে দিক হইতে পুষ্প ভাসিয়া আসিয়াছিল সেই দিকেই গমন। করিতে লাগিলেন। গমন কালে নদীর দুই পাশ্বের বৃক্ষ। সকল বিশেষরূপে নিরীক্ষণ করিয়া দেখিতে লাগিলেন।
মন্ত্রী এই প্রকারে কয়েক দিবস গমন করিয়া, পরিশেষে এক মহা অরণ্যানীমধ্যে পড়িলেন। তখন পথসম্বল সকল শেষ হইয়াছিল, তাহাতে মনে মনে ভাবিলেন এইক্ষণে জলযানে থাকা আর উচিত নহে, যে জন্য আসিয়াছি তাহার অন্বেষণ করি। মন্ত্রী এই চিন্তা করিতেছেন, নৌকাও বায়ুবেগে গমন করিতেছে, ইতি মধ্যে এক অপূর্ব পর্বত দৃষ্ট হইল। ঐ পর্বতের মধ্য দিয়া নিঝরজল নির্গত হইতেছিল। মন্ত্রী তাহা দেখিয়া সেই স্থানে তরী রাখিয়া তট দ্বারা গিরি আরোহণ করিলেন। পরে, এক নদীতীরদিয়া গমন করিতে করিতে দেখিলেন হস্তী ব্যাঘ্র গণ্ডার প্রভৃতি নানা জাতীয় বন্য জন্তু যথা তথা ভ্রমণ করিতেছে, তাহাদের ভয়ানক চীৎকারে মেদিনী কম্পমানা হইতেছে। মন্ত্রী ইহাতেও ভীত না হইয়া নিয়ে গমন করিতে লাগিলেন। কতক দূর গিয়া দেখিলেন নদীপ্রবাহ দিয়া সেই প্রকার আর একটী পুষ্প ভাসিয়া আসিতেছে। তাহাতে মনে মনে মহানন্দিত হইয়া কহিলেন, সেই প্রকার আর একটী পুষ্প দেখিতে পাইলাম, পরমেশ্বরের কৃপা হইলে, বৃক্ষও দৃষ্ট হইবে। ইহা ভাবিতে ভাবিতে যত অর্থে চলিলেন ততই সেই প্রকার আরো পুষ্প দেখিতে পাইলেন। ইহাতে হৃদ্বোধ হইল অবশ্যই বৃক্ষ পাইব। অনন্তর আরো কিয়দরে যাইয়া দেখিলেন সম্মুখে এক গিরিশিখর এবং তন্নিমে এক অট্টালিকা আছে। তাহার সৌন্দর্য্য সন্দশনে আশ্চর্যান্বিত হইয়া মনে মনে ভাবিলেন অগম্য অবণ্যের মধ্যে এমত রম্য স্থান দেখিতেছি, ইহার মধ্যে অবশ্যই কোন মনুষ্য থাকিবেন। ইহা চিন্তা করিতে করিতে অট্টালিকার অনতিদূরে উপস্থিত হইয়া দেখিলেন এক কঠোর তপস্বী নদীতীরস্থ এক বিটপীস্কন্ধে পাদ বন্ধন পূর্ব্বক অধঃশির হইয়া জলের উপরিভাগে লম্বমান আছেন, তাহার অস্থি চর্ম শুষ্ক হইয়া কাবৎ হইয়াছে, তাহারই শাণিত এক এক ফোটা নদীতে পতিত হইয়া, পুষ্প হইয়া ভাসিয়া যাইতেছে। এই অদ্ভুত ব্যাপার দেখিয়া মন্ত্রী মনে মনে কহিলেন ভগবানের লীলা বুদ্ধির অগম্য। তিনি তৎপরে দেখিলেন আরো বিংশতি জন জটাধারী যোগী যোগাসনে ধ্যানে বসিয়া আছেন, কাহারও বাহ জ্ঞান নাই, সকলে অস্থি চর্ম্ম সার ইয়াছেন, এবং তাহাদের চতুর্দিকে দণ্ড কমণ্ডলু পড়িয়া আছে।
এতাবদবলোকনানন্তর, মন্ত্রী আপন জলযানের নিকট প্রত্যাগমন করিলেন, এবং পথসম্বল ফল মূল আহরণ পূর্ব্বক তরী আরোহণ করিয়া কয়েক দিবসে আপন আলয়ে ফিরিয়া আসিলেন। তাহার গৃহজনেরা তাঁহার প্রত্যাগমনে মহা আহলাদিত হইয়া তাঁহার সাহস ও কৃতকার্য্যতার ধন্যবাদ করিল। অধিকন্তু তাঁহার বাটীতে বাদ্যবাদন এবং নানাপ্রকার মাঙ্গলিক কর্ম্ম হইতে লাগিল।
অনন্তর মহীপাল মন্ত্রীর প্রত্যাগমন সম্বাদ শুনিয়া। তাহাকে আনয়নার্থে অপর এক মন্ত্রীকে প্রেরণ করিলেন। ঐ মন্ত্রী তাহাকে রাজসাক্ষাৎকারে উপস্থিত করিলে, মন্ত্রী রাজার পদানত হইলেন। রাজা তাহাকে উত্তোলন করিয়া কুশলাদি জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলেন। তাহাতে মন্ত্রী গললগ্নবাস হইয়া বলিলেন মহারাজ আমি এক অদ্ভুত ব্যাপার দেখিয়া আসিয়াছি, কিন্তু তাহা কহিলে আপনার প্রত্যয় হইবে না। জিজ্ঞাসা করিলেন, কি অদ্ভুত ব্যাপার। মন্ত্রী বলিলেন মহারাজ আমি এখান হইতে বিদায় হইয়া এক অরণ্যে উপনীত হইলাম, তথা হইতে এক গিরি উল্লম্মান পূর্বক তন্নিষ ভাগে এক অপূর্ব্ব অট্টালিকা দেখিলাম, তন্নিকটে এক যোগী এক বিটপীশাখায় শৃঙ্খলে পাদ বন্ধন পূর্ব্বক নদীর উপর অধঃশিরা হইয়া ঝলিতেছেন। ঐ যোগীর চর্ম অস্থিতে লিপ্ত হইয়াছে, কিন্তু তাহার শরীর হইতে ফোটা ফোটা শোণিত জলে পড়িয়া পুষ্প হইয়া আসিয়া আসিতেছে। ঐ মহীরুহমূলে আরো বিংশতি জন তপস্বী যোগাসনে বসিয়া ধ্যান করিতেছেন, তাহাদের পন্দ বা বাহ্যজ্ঞান কিছুই নাই।
রাজা কিঞ্চিৎ হাস্য করিয়া বলিলেন শুন, আমি তোমাকে এই অদ্ভুত ব্যাপারের তাবৎ বিবরণ কহিতেছি। যে তপস্বীর দেহ বৃক্ষে লম্বমান দেখিয়াছ, তাহা আমার জন্মান্তরীয় দেহ, এবং যে বিংশতি জন যোগী যোগাসনে আছেন দেখিয়াছি, তাহারা আমার দাস। আমি পূর্ব্ব জন্মে অতি কঠোর তপস্যা করিয়াছিলাম, সেই পুণ্যে শঙ্কুকে সংহার করিয়া রাজত্ব পাইয়াছি। এই রাজত্ব প্রাপ্তি পূর্ব্ব জন্মের পুণ্য বলে হইয়াছে, এজন্য আমার ভ্রাতৃবধের অপরাধী হইতে হয় নাই। ঐ সকল দাস পূর্ব্ব জন্মে আমার অনেক সেবা করিয়াছিল এবং আমার সঙ্গে প্রাণ দিয়াছিল, এজন্য আমি তাহাদিগকে রাজ্যের প্রধান প্রধান কর্মে নিযুক্ত করিয়াছি। এই নিগূঢ় ব্যাপার এপর্য্যন্ত কেহ অবগত হইতে পারে নাই এই জন্য, সকলে বলিয়া থাকে, বিক্রমাদিত্য আপন জ্যেষ্টকে সংহার করিয়া রাজ্য লইয়াছেন। কিন্তু ইহাতে আমার অপরাধ নাই, কর্মের যে অবশ্যম্ভাবী ফল তাহাই হইয়াছে। এই বিষয়ের প্রত্যক্ষার্থ, আমি তােমাকে পুষ্প আনয়ন স্থলে প্রেরণ করিয়াছিলাম। এইক্ষণে তােমার প্রতীত হইল। অতএব এ সকল কথা ব্যক্ত করিওনা। কেননা তাহা শুনিলে অন্য লােকে রাজ্য লাভের লােভে যােগারম্ভ করিবে। ইহা বলিয়া রাজা তাহাকে চির কালের নিমিত্ত সকল মন্ত্রীর প্রধান করিয়া রাখিলেন।
করুণাবতী এই বিবরণ সমাপন করিয়া বলিল শুন ভােজরাজ, রাজা বিক্রমাদিত্যের তুল্য যে ব্যক্তি পুণ্যাত্মা, গুণগ্রাহী ও সর্ব্বগুণান্বিত, তিনিই এই সিংহাস- নােপবেশনের ইচ্ছা করিতে পারেন। হে ভোজরাজ তুমি ততুল্য নহ, অতএব তাহার আসনে কি প্রকারে অধ্যাসীন হইবে।
এই কথা শুনিতে শুনিতে সে দিবসের শুভক্ষণ অতীত হইল, সিংহাসনােপবেশন করা হইল না। পর দিবস রাজা পুনর্ব্বার তদভিলাষে সিংহাসনসান্নিধ্যে উপস্থিত হইলে,
চিত্রকলা চতুর্ব্বিংশ পুত্তলিকা
কহিল, হে ভােজরাজ, আমি, রাজা বিক্রমাদিত্যের গুণের এক প্রসঙ্গ কহিতেছি, অবধান কর।
এক দিবস রাজা দশহর যােগে নদীতে স্নানার্থে। গমন করিয়া ছিলেন। তথায় গিয়া দেখিলেন এক পরমসুন্দরী যুবতী নদীতটে দণ্ডায়মান হইয়া কেশ শুষ্ক করিতেছে, তাহার সম্মুখে এক নবীন বণিকতনয় বসিয়া তিলক করিতেছে, এবং পরপর হাস্য রহস্য ও ইঙ্গিত হইতেছে। যুবতী, কখন কখন করচালন চক্ষু মোটন এবং কেশ সঞ্চালন, কখন বা বক্ষঃস্থলের বসন উত্তোলন ও আবরণ, কখন বা দর্পণে বণিকপুত্রের মুখনিরীক্ষণ ও চুম্বনপূর্বক তাহা স্বীয় বক্ষঃস্থলে স্থাপন ইত্যাদি নানা প্রকার অঙ্গভঙ্গি করিতেছে। বণিককুমারও সেই প্রকার আকার ইঙ্গিত করিতেছে। রাজা তাহা দেখিয়া মনে মনে ভাবিলেন ইহারা শেষ কি করে দেখিতে হইবে। ইহা ভাবিয়া স্নান। পূজাদি করিতে লাগিলেন। কিয়ৎকাল পরে যুবতী অঙ্গ আচ্ছাদন পর্ব্বক অবগুণ্ঠন দ্বারা মুখাবরণ করিয়া তথা হইতে প্রস্থান করিল। বণিকনন্দনও তৎপশ্চাৎ পশ্চাৎ গমন করিল। রাজা তাহা দেখিয়া তাহাদের পশ্চাৎ পশ্চাৎ এক দূত পাঠাইলেন, তাহাকে বলিয়া দিলেন ইহারা কোথায় যায়, কি করে তাহা সমৃদয় দেখিয়া আইস। দূত তাহাদের পশ্চাৎ পশ্চাৎ চলিল। যুবতী আপন আলয়ের নিকটবর্ত্তী হইয়া বণিককুমারকে মস্তক মুক্ত করিয়া দেখাইল, পরে বক্ষঃস্থল ধারণ পূর্বক গৃহ প্রবেশ করিল। বণিকপুত্রও আপন বক্ষঃস্থলে হস্তার্পণ করিয়া গমন করিল।
দূত, রাজাকে এই সকল বার্তা কহিলে, রাজা এক বিচক্ষণ পণ্ডিতকে বলিলেন স্ত্রী লোকের চরিত্র শ্রবণে আমার স্পৃহা হইয়াছে, তাহা আমাকে শুনাও। পণ্ডিত কহিলেন মহারাজ আমার কি সাধ্য যে তাহা বর্ণন করি, “স্ত্রিয়াশ্চরিত্রং পুরুষ ভাগ্যং দেবা ন জানন্তি কুততা মনুষ্যাঃ, স্ত্রী লোকের চরিত্র এবং পুরুষের ভাগ্য দেবতারাও জানিতে পারেন না, মনুষ্যের কি সাধ্য। ইহাদের চরিত্র কেবল দেখিলেই প্রত্যয় হইতে পারে, জিহ্বা দ্বারা বর্ণন করাযায় না। রাজা এ কথা শুনিয়া। পণ্ডিতকে কিছু বলিলেন না। তিনি মনে মনে করিলেন ঐ ইঙ্গিতকারী স্ত্রী ও পুরুষ পশ্চাৎ কি করে দেখিতে হইবে।
অনন্তর দিবাবসান হইলে রাজা কিঞ্চিৎ জলযোগ করিয়া সেই দূতকে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন যুবতী যে ইঙ্গিত করিল তুমি তাহার তাৎপর্য কি বুঝিয়াছ। সে কহিল মহারাজ আমি তাহা একপ্রকার বুঝিয়াছি, কিন্তু আপনার সম্মুখে কহিতে সংশয় হইতেছে। রাজা বলিলেন চিন্তা নাই, তুমি নিয়ে বল। মহারাজ ঐ যুবতী মস্তক মুক্ত ও বক্ষঃস্থলে হত্যার্পণ করিয়া এই অভিপ্রায় প্রকাশ করিল, অন্ধকার হইলে আমার সঙ্গে সংমিলন হইবে। বণিকপুত্র ঐ কথায়। আপন বক্ষঃস্থলে করার্পণ করিল, তাহার ভাব এই, সেই সময়ে সাক্ষাৎ হইবে। রাজা বলিলেন তাহাদের অভিপ্রায় তুমি যথার্থ বুঝিয়াছ, আমিও নদীতটে থাকিয়া তাহাদের এই অভিসন্ধি অনুভব করিয়াছি। সম্প্রতি তুমি আমাকে সেই নারীর গৃহ দেখাইয়া দাও। এই কথায় দুত রাজাকে সঙ্গে লইয়া তাহার আলয় প্রদর্শন করাইল। রাজা দূতকে বিদায় দিয়া সেই স্থানে প্রচ্ছন্ন ভাবে থাকিলেন।
ঐ গৃহে একটা গবাক্ষ ছিল, তদ্বারা প্রদীপের আলোক আসিতেছিল এবং ঘরের মধ্যে কখন কখন স্ত্রীলোকটাকে দেখা যাইতেছিল। রাত্রি দুই প্রহর অতীত হইলে রাজা গবাক্ষে একটা ঢেলা মারিলেন। তাহার শব্দ শুনিয়া যুবতী দ্বারের নিকট আসিয়া উকি মারিল, এবং রাজাকে বণিকপুত্র বিবেচনা করিল। পরে, তাহার যে সকল অলঙ্কারাদি ছিল তৎসমুদায় এক খানা বস্ত্রে বন্ধন পূর্ব্বক রাজার নিকটে আসিয়া বলিল আমার অলঙ্কার সকল এই পুঁটলির মধ্যে আছে, ইহা তোমাকে সমর্পণ করিতেছি, তুমি আমাকে লইয়া চল। রাজা বলিলেন আমি তোমাকে এ ভাবে কি প্রকারে লইয়া যাই, তোমার স্বামী বর্তমান আছে, সে যদি জানিতে পারে তবে রাজার নিকটে অভিযোগ করিবে, তাহা হইলে, রাজা আমাদের উভয়ের প্রাণ দণ্ড করিঅতএব অগ্রে তোমার স্বামীকে বিনাশ কর, তৎপরে নিষ্কণ্টক হইয়া উভয়ে সুখ সম্ভোগ করিব।
এই কথায় যুবতী নিঃশব্দপদসঞ্চারে গৃহ প্রবেশ পূর্ব্বক খজ দ্বারা নিদ্রাভিভূত স্বামীর মস্তক চ্ছেদন তৎপরে বাহিরে আসিয়া রাজার হস্তে অলঙ্কার সকল অর্পণ করিল। রাজা তাহা লইয়া অগ্রে অগ্রে চলিলেন, যুবতী তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ চলিল। এই প্রকারে নদীতটে আসিয়া রাজা দাঁড়া ইলেন, এবং মনে মনে চিন্তা করিতে লাগিলেন, যে নারী আপন স্বামী হত্যা করিতে কিছুমাত্র বিলম্ব বা বিবেচনা করিলনা, সে অপরকে সংহার করিবে আশ্চর্য্য কি, অতএব এমত দুশ্চরিত্র নারীকে শীত্র পরিত্যাগ করাই সৎপরামর্শ। ইহা ভাবিয়া রাজা তাহাকে বলিলেন সুন্দরি তুমি এই স্থানে দাড়াও, আমি অগ্রে নদীতে নামিয়া দেখি কত জল আছে, যদি গভীর জল না হয়। তবে তোমাকে এই পথ দিয়া লইয়া যাইব। ইহা বলিয়া রাজা সন্তরণ দ্বারা নদীপার হইতে লাগিলেন, পরে পরপারে উঠিয়া উচ্চৈঃস্বরে কহিলেন আমি নদীপার হইয়া আসিয়াছি, কিন্তু জল অনেক, তোমাকে আনিতে পারিব না।
এই দুর্দৈদব দেখিয়া যুবতী বিবেচনা করিল, আমার অলঙ্কার সকল এই ব্যক্তির হস্তগত হইয়াছে এজন্য আমাকে পরিত্যাগ করিয়া পলায়ন করিল, এখন কি করি, আমার দুই কুল নষ্ট হইল। যাহা হউক, এখন নিশাবসান হয় নাই, অতএব গৃহে গমন করাই উত্তম কল্প, এবং বিনাশিত স্বামীর সহিত সহগমন করি, তাহা হইলে পরকালে সদাতি হইবে। এই বিবেচনা করিয়া গৃহে আসিয়া স্বামীর শবের সমীপে বসিয়া ক্রন্দন ও বিলাপ করিতে লাগিল, এবং উচ্চৈঃস্বরে বলিতে লাগিল আমার সর্বময় স্বামীকে দস্যরা হত্যা করিয়া গৃহ হইতে সর্ব্বস্ব লইয়া যাইতেছে। যুবতীর চীৎকার শুনিয়া গৃহবাসী ও প্রতিবাসীগণ আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল চোর কোথায়। নারী কহিল এই পথদিয়া যাই- তেছে। ইহা শুনিয়া সকলে চোরের অন্বেষণ করিতে প্রবৃত্ত হইল।
যুবতী সেইরূপ রােদন ও শিরে করাঘাত করিতে লাগিল। তাহার আত্মীয়গণ তাহার ধৈর্য্য সম্পাদনের নিমিত্ত নানা প্রকার প্রবােধবাক্যে বুঝাইতে লাগিল। তাহারা বলিল মৃত্যু ভগবানের ইচ্ছ, ইহাতে মনুষ্যের সাধ্য নাই। যখন পরমায়ুঃ শেষ হয় তখন মৃত্যু এক এক রূপ ধারণ করিয়া আইসে। তােমার স্বামীর পর- মায়ুঃ শেষ হইয়াছিল এইজন্য পরলােক গমন করিলেন। পরমায়ুঃ শেষ না হইলে কোন ব্যক্তি কাহাকে নষ্ট করিতে পারে না, এবং শরীর হইতে প্রাণ পুরুষ নির্গত হইলে কেহ কাহার প্রদান করিতে পারেনা। এবম্বিধ। বিবিধ প্রকার বুঝাইয়া অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া করিতে বলিল। যুবতী কহিল পতি বিনা সংসারে আমার আর সম্পত্তি নাই, তাঁহার অবর্তমানে আমার জীবনধারণ অকিঞ্চিৎ- কর, অতএব আমি পতির সঙ্গে সহগমন করিব। ইহা বলিয়া নদীতীরে চিতা প্রস্তুত করাইয়া তাহাতে পতির সঙ্গে প্রাণত্যাগ করিবার প্রতিজ্ঞা করিল, কাহারে। নিষেধ শুনিল না।
এই সহগমন দর্শন জন্য নগরস্থ অনেক লােক একত্র হইল, রাজাও কৌতুকাবিষ্ট হইয়া নদীতটে গমন করিলেন। অনন্তর যুবতী স্বহস্তে স্বামীর মুখাগ্নি করিয়া চিতারােহণ করিল। কিন্তু যখন বস্ত্র ও কেশ প্রজ্বলিত হইয়া অগ্নিশিখা তাহার শরীরে লাগিল, তখন আতঙ্কে চিত হইতে লম্ফ দিয়া ভূমিতে পড়িয়া নদীতে ঝাঁপ দিতে গেল। রাজা এই রহস্থ্য দেখিয়া হাস্য করিয়া বলিলেন হে ললনে এ কি কর্ম্ম করিতেছ। নারী বলিল ইহার মর্ম্ম তুমি কি বুঝিবে, আমার কর্মের যে ফল তাহা আমি পাইলাম, কিন্তু তুমি আপনার ঘরের তত্ত্ব পাইলেন। শুন রাজা, আমরা সাত সখী এই নগরে বাস করি। তাহাদের মধ্যে আমি এক, আর ছয় জন তোমার অন্তঃপুরে আছে। ইহা বলিয়া যুবতী জলমগ্না হইল।
রাজা এই কথা শুনিয়া বিস্ময়াপন্ন হইলেন, এবং গৃহে আসিয়া কাহারো সহিত সাক্ষাৎ না করিয়া গুপ্তভাবে থাকিলেন। পরদিবস নিশীথ সময়ে দেখিলেন তাহার ছয় মহিষী কাঞ্চনপাত্রে মিষ্টান্ন পরিপূর্ণ করিয়া অন্তঃপুরের দ্বার উদ্যাটন পূর্ব্বক উদ্যান দিয়া গিয়া উপবনের মধ্যে এক কুটীরে প্রবেশ করিল। ঐ কুটীরে এক সন্ন্যাসী যোগ সাধন করিতেছিল, রানীগণ তাহাকে প্রণাম করিয়া তাহার সম্মুখে বসিল। যোগীর। যোগ সমাধা হইলে মহিষীগণ মিষ্টান্নপূর্ণ থলি তাহার সম্মুখে দিল। সন্ন্যাসী তাহা ভক্ষণ করিয়া তাল দ্বারা মুখশুদ্ধি করিল। পরে আপন দেহকে মন্ত্র দ্বারা ছয় দেহ করিয়া এক কালে ছয় রাণীর সহিত সুখবিলাস করিতে লাগিল। তৎপরে রাণীরা বিদায় হইয়া গৃহে প্রত্যাগমন করিল। রাজা অন্তর হইতে এই কুৎসিত ব্যাপার দেখিয়া মনে মনে কহিলেন হায়, এ ব্যক্তি যোগী হইয়া কি কুকর্ম্ম করিল, এ আপনার যোগ ও অপরের ধর্ম্ম উভয় নষ্ট করিল। ইহা ভাবিতে ভাবিতে রাজা খঙ্গ হস্তে যোগীর সম্মুখে গিয়া দণ্ডায়মান হইলেন। যোগী মনে মনে সঙ্কুচিত হইয়া বলিল মহারাজ কোথা হইতে আগমন হইতেছে, এবং এখানে আসিবার অভিপ্রায় কি। রাজা বলিলেন তোমাকে দর্শনার্থ আসিয়াছি। যোগী। বলিল তোমার যে কামনা থাকে বল, আমি তাহা পূর্ণ করিব। রাজা বলিলেন তুমি যে বিদ্যা দ্বারা এক দেহকে ছয় দেহ কর তাহা আমাকে দাও, নতুবা আমি তোমাকে বিনাশ করিব। যোগী রাজার এই কথায় ভীত হইয়া মন্ত্রটী বলিয়া দিল। রাজা তাহা পরীক্ষা করিয়া, খঙ্গ প্রহার দ্বারা যোগীকে সংহার করিলেন।
তদনন্তর গৃহে আসিয়া মহিষীগণের নিকটে গেলেন। রাজার আগমন হইলে, তাহারা তাহার সেবায় নিযুক্ত হইল, অর্থাৎ কেহ বায়ু ব্যজন, কেহ হস্ত মুখ প্রক্ষালন, কেহ তাম্বুল আনয়ন করিতে লাগিল। রাজা বলিলেন হে সুন্দরীগণ আমি তোমাদের হিত বাঞ্ছা করি, তোমরা আমার অহিত করিয়া অন্যের উপাসনা কর, ইহা কি তোমাদের উচিত। রাণীগণ বলিল মহারাজ তুমি আমাদের রক্ষাকর্তা, তোমাকে দেখিয়া আমরা অত্যন্ত আনন্দিত হই, আমরা অষ্ট প্রহর তোমার ধ্যান করি। যখন তুমি বাহিরে যাও তখন আমরা, চাকাঙ্ক্ষী চকোরের ন্যায় তোমার প্রত্যাগমন ও দর্শনের আকাঙ্ক্ষী হইয়া থাকি। অল্প জলের মধ্যে মীন যেমন ধড় পড় করে, আমরাও তোমার অদর্শনে সেই প্রকার হই। এবং কমলিনী যেমন জল বিনা শুষ্ক ও ম্লান হয়, তোমার ক্ষমাত্র অদর্শনে আমরাও সেই প্রকার নির্জীব হই।
এই সকল কপট বাক্যে রাজার অন্তঃকরণে অতিশয় ক্রোধোদয় হইল। কিন্তু ক্রোধ সম্বরণ পূর্বক তিনি ঈষৎ হাস্থ্য করিয়া কহিলেন তোমরা যে প্রকার পতি পরায়ণা, আমি তাহা বুঝিয়াছি। কপটযোগী যেমন আপনার এক দেহ ছয় দেহ করে, তোমরা ছয় অঙ্গনা আমার সঙ্গে সেই প্রকার শঠতা আরম্ভ করিয়াছ। মহিষী গণ রাজার এই কথায় স্তব্ধ হইয়া কিঞ্চিৎকাল মেনী থাকিল। পরে বলিল মহারাজ, একি অদ্ভুত কথা কহিলেন, এক যোগী ছয় হয় ইহা আমরা কখন শুনি নাই, এ কথা বিশ্বাসের যোগ্যও নহে। রাজা বলিলেন যদি বিশ্বাস না হয় তবে আমার সঙ্গে আইস, আমি তোমাদিগকে তাহা দেখাইতেছি। ইহা বলিয়া তাহাদিগকে লইয়া বনমধ্যে প্রবেশপূর্ব্বক কুটীরের দ্বার উদঘাটন করিয়া যোগীকে প্রদর্শন করাইলেন। রাণীগণ তাহা দেখিয়া মহালজ্জিত হইল, এবং মনে মনে বুঝিল রাজা আমাদের সকল কুকার্য্য দেখিয়াছেন। পরে রাজা জিজ্ঞাসিলেন তোমাদের এখন প্রত্যয় হইল কি না। রাণীগণ ইহার কি উত্তর করিবেক, নিস্তব্ধ হইয়া রহিল। রাজা তখন আর কোন কথা না বলিয়া একে একে তাহাদের সকলের মস্তক চ্ছেদন করিলেন। পরে গৃহে আসিয়া তাহাদিগের অলঙ্কারাদি নগরস্থ ব্রাহ্মণীদিগকে বিতরণ করলেন, এবং ডিণ্ডিমপ্রচারদ্বারা নগরস্থ সমস্ত বিদ্বান ব্রাহ্মণকে আহ্বান করিয়া প্রত্যেক জনকে এক এক গ্রাম দান করিলেন। তদ্ভিন্ন যে সকল ব্রাহ্মণদুহিতা অবিবাহিতা ছিল তাহাদের বিবাহ দেওচাইলেন। তৎপরে রাজকার্য করিতে লাগিলেন।
পুত্তলিকা বলিল, শুন ভোজরাজ, তুমি পণ্ডিত বট, কিন্তু বিক্রমাদিত্যের তুল্য গুণসম্পন্ন ব্যক্তি এই আসনে উপবেশন করিবেন। তোমার তাদৃশ গুণ নাই অতএব কেন ইহাতে বসিতে বাসনা কর। এই প্রকার কথোপকথনে মে দিবসের শুভ লগ্ন অতীত হইল, রাজা সিংহাসনারোহণ করিতে পারিলেন না। পর দিন পুনর্ব্বার সিংহাসনের সম্মুখে আসিয়া দণ্ডায়মান হইলে,
জয়লক্ষ্মী পঞ্চবিংশ পুত্তলিকা
কহিল হে রাজন, আমি রাজা বিক্রমাদিত্যের এক দিবসের বৃত্তান্ত কহিতেছি শ্রবণ কর।
এক দরিদ্র ভাট নানাদেশীয় রাজাদিগের স্তুতিপাঠ করিয়া কোন প্রকারে দিনপাত করিত। সময়ে ঐ ভাট নানাদেশে নানা রাজসভা ভ্রমণ করিল, কিন্তু কোন স্থানে কপর্দকও লাভ হইল না। তাহাতে এক নিরাশ হইয়া বাটীতে ফিরিয়া আসিল। গৃহে আসিয়া দেখিল তাহার কন্যা যৌবনবতী এবং বিবাহের যোগ দশাপ্রাপ্ত হইয়াছে, অতএব কি প্রকারে তাহার বিবাহ দিবে এই দুর্ভাবনাই প্রবল হইল। তাহার ভার্য্যা কহিল তুমি অনেক রাজসভা ভ্রমণ করিলে, কি উপার্জন করিয়া আনিয়াছ। স্তুতিপাঠক কহিল আমি অকেন রাজসভা ভ্রমণ করিলাম যথার্থ, রাজারা আমার যথোচিত মর্য্যাদা করিলেন, কিন্তু আমার অদৃষ্টে ধন নাই, এই জন্য কোন স্থানে কিছু প্রাপ্তি হয় নাই। কেবল রাজা বিক্রমাদিত্যের সভাতে যাওয়া হয় নাই, তাহার নিকটে একবার গমন করিলে, অন্তঃকরণের ক্ষোভ দূর হয়। তাহার বনিতা কহিল তুমি আর কোন স্থানে যাইও না, সন্তুষ্ট হইয়া গৃহে বসিয়া থাক, অদৃষ্টে ধন থাকিলে এইখানেই পাইবে। ভাট বলিল সে কথা প্রকৃত, কিন্তু শুনিয়াছি রাজা বিক্রমাদিত্য অতি দয়ালু, কোন ব্যক্তি তাহার নিকটে উপস্থিত হইলে কখন নিরাশ হইয়া আইসে না।
ইহা বলিয়া ভাট সিদ্ধিদাতা গণেশ স্মরণ পূর্ব্বক রাজা বিক্রমাদিত্যের সভায় গমন করিল। উপস্থিত হইলে, রাজা তাহাকে প্রণাম করিলেন। ব্রাহ্মণ আশীর্বাদ করিয়া বলিল মহারাজ আমি আপনার নামের সৌরভে এখানে আসিয়াছি, আপনি মর্তলোকে ইন্দ্রাবতার, এবং পরোপকারী, পৃথিবীতে আপনার তুল্য দানশীল মনুষ্য আর নাই। রাজা সভায় হরিশ্চন্দ্র যেপ্রকার দাতা ছিলেন আপনিও সেইরূপ, আপনার যশে তাবৎ জগৎ আচ্ছন্ন করিয়া রাখিয়াছে। আমি কালিকার পুত্র, ভাট বংশে জন্ম গ্রহণ করিয়াছি, সম্প্রতি আমি আপনার স্থানে যাচ ঞার্থ আসিয়াছি, আপনি আমার মনোবাঞ্ছা সিদ্ধি করুন। আমি তাবৎ পৃথিবী ভ্রমণ করিয়া দেখিলাম, আপনি ভিন্ন আমার আশা পূর্ণ হইবার আর স্থান নাই। রাজা জিজ্ঞাসা করিলেন তোমার কি বাসনা প্রকাশ করিয়া বল। ভাট কহিল আমার যেপ্রকার অদৃষ্ট, তাহাতে মনোবাঞ্ছা প্রকাশ করা ধৃষ্টতামাত্র, কিন্তু মহারাজ যদি আমাকে আশ্বাস দেন তবে সাহস করিয়া প্রকাশ করিতে পারি। রাজা বচনদত্ত হইলেন। তখন ভাট কহিল মহারাজ আমার কন্যা দ্বাদশবর্ষীয়া হইয়াছে, তাহার বিবাহ দিবার সামর্থ্য নাই, এই দায় হইতে আমাকে মুক্ত করুন। রাজা ঈষদ্ধান্য পূর্ব্বক মন্ত্রীকে কহিলেন এ ব্যক্তি যাহা চাহে তাহা দাও। ভাট বলিল মহারাজ আপনার যাহা দিবার বাঞ্ছা হয় তাহ আপন সম্মুখে আনাইয়া দেউন, একালে সংসারে কাহাকেও বিশ্বাস হয় না। এই কথায় রাজা দশ লক্ষ মুদ্রা এবং কয়েক থাল হীরা মতি স্বর্ণ ও রজতালঙ্কার পূর্ণ করিয়া তাহাকে দিলেন। ভাট তাহা পাইয়া মহাসন্তোষে রাজাকে আশীর্বাদ পূর্ব্বক গৃহে আসিল, এবং যে সমস্ত মুদ্রা ও অলঙ্কার আনিল কন্যার বিবাহে সমুদয় ব্যয় করিল, কিছুমাত্র রাখিল না। রাজা ভাটকে এতাবৎ সামগ্রী দিয়া, সে তাহা ব্যয় করে কি না তাহা দেখিবার জন্য, তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ দুই দূত প্রেরণ করিয়াছিলেন। দূতগণ দেখিল ব্রাহ্মণ বিবাহে সকল অর্থই ব্যয় করিল, তাহার পরে এক দিব- সের আহার সঙ্গতি রহিল না। বার্তাবহেরা রাজাকে আসিয়া এই বার্তা কহিলে, রাজা আর কয়েক লক্ষ মুদ্রা তাহার বাটীতে পাঠাইয়া দিলেন। এবং অত্যন্ত আহলাদিত হইয়া কহিলেন আমার রাজ্যে এমত সাহসিক লােক বাস করে ইহা বড় আহলাদের বিষয়।
পুত্তলিকা কহিল, হে ভােজরাজ, দেখ রাজা বিক্র- মাদিত্য ভাটকে এত অর্থ দিয়াছিলেন, ভাট তাহা সমস্ত ব্যয় করিলেও রাজা তাহাকে আরো ধনদান করিলেন। যদি তুমি এবম্ভত দান করিতে সমর্থ হও তবে সিংহাসনে উপবেশন কর। নতুবা বৃথা ইচ্ছার অধীন হইও না, তাহাতে কোন লাভ নাই। এই কথা শুনিয়া ভােজরাজ সে দিবস সিংহাসনারােহণ করিলেন না। পরদিবস প্রত্যুষে স্নান পূজা করিয়া তদাররাহণ মানসে সভাতে আসিলে,
বিদ্যাবতী ষড়্বিংশ পুত্তলিকা
কহিল মহারাজ আমি তোমাকে এক জ্ঞানের কথা বলি শ্রবণ কর। মনুষ্য জন্মকালে কিছুই সঙ্গে আনে না, এবং মৃত্যুকালে কোন দ্রব্য তাহার সঙ্গে যায় না। নরদেহ গ্রহণ করিয়া এই সংসারে সৎকর্ম্ম করিলে জীবন সার্থক হয়, এবং যে ব্যক্তি যেমন কর্ম করে সে সেই প্রকার ফলভোগী হয়। পরন্তু মনুষ্যের পরমায়ুঃ অল্প, অতএব ইহার মধ্যে এমত কর্ম্ম করা উচিত, যাহাতে মরণান্তে জগতে জাজ্বল্যমান যশঃ থাকে, ইহলোকে পরলোকে সুখলাভ হয়, আর পুনর্ব্বার মনুষ্যদেহ ধারণ করিতে না হয়। তুমি ইহা নিশ্চয় জানিও, পূর্বজন্মের সুকৃতি ও তপস্যা জন্য ইহজন্মে নরদেহ লাভ হইয়াছে, অতএব দান পরোপকার এবং দেবান করা অবশ্য কর্তৃব্য কর্ম্ম, তদ্ভিন্ন ভববন্ধনমোচনের অন্য কোন উপায় নাই। আমি এইক্ষণেই কহিলাম, মরণকালে কোন দ্রব্য মনুষ্যের সঙ্গে যায়না,এবং সৎকর্ম্ম করিলে চিরকাল নাম থাকে। তাহার প্রমাণ রাজা হরিশ্চন্দ্র, দাতা কর্ণ ও রাজা বিক্রমাদিত্য, বহুকাল হইল ইহার পরলোক গমন করিয়াছেন, মৃত্যুকালে কোন দ্রব্য সঙ্গে লইয়া যান নাই। কিন্তু তাঁহারা সংসারে আসিয়া দান পরোপকার। এবং ধর্ম্মানুষ্ঠান করিয়াছিলেন। এই জন্যই তাঁহাদের নাম অদ্যাপি জগতে জাজ্বল্যমান রহিয়াছে, এবং এই জন্যই তাহারা চিরকাল বৈকুণ্ঠবাসী হইয়া রহিয়াছেন সন্দেহ নাই। ভোজরাজ কহিলেন রাজা বিক্রমাদিত্য কি উত্তম কর্ম্ম করিয়াছিলেন তাহা বর্ণনা কর। বিদ্যাবতী কহিতে লাগিল।
এক দিবস রাজা বিক্রমাদিত্য সভায় বসিয়া আছেন এমত সময়ে তাহার এক পরিচারিণী আসিয়া কহিল, মহারাজ পূজার সময় অতীত হইতেছে, আসিয়া পূজা ১৬ করুন। রাজা এই কথা শুনিয়া মনে মনে ভাবিলেন, দাসী যাহা বলিল তাহা যথার্থ, কেননা আমার পর- মায়ুঃ দিন দিন ক্ষয় হইতেছে, এ পর্যন্ত ধর্ম্ম কর্ম্ম ও দেবার্চনা করিতে পারি নাই। এক্ষণে রাজকার্যের মায়া পরিত্যাগ করিয়া যােগ সাধন করি, তাহা হইলে পরমার্থের কর্ম্ম হইবে। মনুষ্যের জীবন প্রভাতের শিশিরের ন্যায়, এই জীবনের ভরসায়। আমি প্রকৃত কর্ম্ম ভুলিয়া আছি।
এই সকল বিবেচনা পূর্ব্বক রাজা রাজ্যপাঠ ধনজন মিথ্যা জ্ঞান করিয়া, তপস্যা জন্য এক অরণ্যে প্রবেশ করিলেন। কিয়দূরে গিয়া দেখিলেন এক স্থানে কতিপয় তপস্বী মণ্ডলাকারে বসিয়া ধ্যানে মগ্ন আছেন, তাহার মধ্যে কেহ উৰ্দ্ধবাহু, কেহ অধঃশিরা, কেহৰ। পঞ্চাগ্নি জ্বলিয়া তপস্যা করিতেছেন। কেহবা আপ- নার শরীরের মাংস কাটিয়া অগ্নিতে আহুতি দিতেছেন। রাজা তাহাদের এই প্রকার তপস্যা দেখিয়া আপনিও তথায় যােগে বসিলেন। কয়েক দিবস অতীত হইলে, তপস্বীগণ অগ্নিতে আপন আপন দেহ আহুতি দিলেন। রাজাও তাহা দেখিয়া স্বীয় শরীর কাটিয়া অগ্নিতে দিতে লাগিলেন, পরিশেষে আপন শিরচ্ছেদন করিয়া অগ্নিতে সমর্পণ করিলেন।
তপস্বীগণ এই প্রকার বিলয় প্রাপ্ত হইলে পর, তত্রস্থ শিবালয় হইতে এক দুত নির্গত হইয়া একে একে সকল তপস্বীর ভস্ম লইয়া স্বতন্ত্র স্বতন্ত্র রাশি করিল, তাহার পরে মহাদেবের স্থানে তৎসংবাদ কহিলে, তিনি আজ্ঞা করিলেন অমৃত দ্বারা তাহাদের প্রাণদান কর। দূত শিবাজ্ঞায় ভস্মে অমৃত প্রেক্ষণ করিতে লাগিল, তাহাতে সকল তপস্বী ভস্ম হইতে উঠিয়া শিবের ধন্যবাদ করিতে লাগিলেন।
কিন্তু রাজার ভস্মে অমৃত প্রেক্ষিত হয় নাই, তাহাতে তপস্বীগণ একত্র হইয়া মহাদেবকে স্তুতি পূর্ব্বক বলিলেন, আপনি ভক্তের ঈশ্বর এবং অনাথের নাথ, যাহারা আপনার তপস্যা করিতেছিল তাহাদের জীবন দান করিলেন, কিন্তু আমাদের সঙ্গে এক নৃপতি তপস্যা করিতে ছিলেন, তাঁহার প্রতি আপনার কি আজ্ঞা হইল। এই কথায় মহাদেব দূতগণের প্রতি দৃষ্টিপাত করিলেন। দূতগণ তাঁহার অভিপ্রায় বুঝিয়া পুনর্ব্বার অমৃত আনয়নপূর্ব্বক রাজার প্রাণ দান করিল। রাজা প্রাণদান পাইয়া তৎক্ষণাৎ গাতলাখানপর্ব্বক করপুটে দণ্ডায়মান হইয়া মহাদেবের স্তুতি করিতে লাগিলেন। হে দেবাদিদেব, হে বিশ্বেশ্বর, আপনি সংসারের তাবৎ জীবের সৃষ্টি স্থিতি প্রলয় করিতেছেন, আপনি ভিন্ন এই সংসার সমুদ্র পার হইবার আর কোন উপায় নাই। পৃথিবীতে আসিয়া যে ব্যক্তি আপনাকে জানিতে না পারে তাহার জন্ম গ্রহণ বৃথা। মহাদেব রাজার স্তুতি শুনিলেন। পরে আর আর তপস্বীগণ যে যাহা প্রার্থনা করিল তাহা তাহাকে দিলেন। তাহার বিদায় হইলে, পরমেশ্বর ক্ষিতীশ্বরকে কহিলেন তােমার কি অভিলাষ ব্যক্ত করিয়া বল। রাজা কহিলেন হে ত্রিদিবাধিপতে, আপনার কৃপাতে আমার সকলই আছে, এক্ষণে কেবল। এক প্রার্থনা এই, আমার আর মনুষ্য জন্ম গ্রহণ করিতে হয়। আপনি সকল তপস্বীকে উদ্ধার করিলেন, এই মহাপাপী দীন হীনকে মুক্তি পথ প্রদর্শনপূর্বক পরিত্রাণ করুন।
মহাদেব রাজার এই স্তুতিবাক্যে সন্তুষ্ট হইয়া সহাস্য বদনে কহিলেন তোমার তুল্য মনুষ্য কোন কালে জন্মে নাই। তুমি ধীর, বীর, দাতা, জ্ঞানী ও ধর্ম্মশীল। কলিকালে যে সকল নৃপতি জন্মিয়াছেন তুমি তাহাদের উদ্ধারকর্তা। অতএব আমি তোমাকে আজ্ঞা করিতেছি তুমি এখন গিয়া আনন্দে রাজ্য কর, যখন তোমার অন্তকাল নিকটবর্তী হইবে তখন তুমি আমার স্থানে আসিবে, তৎকালে আমি তোমাকে নির্ব্বাণপদ প্রদান করিব। রাজা বলিলেন হে দেবাধিপতে পৃথিবীতে বাস করিয়া,, আপনকার মহিমা জানা যাইতে পারো, অতএব আমাকে এখনি পরিত্রাণ করুন, নতুবা আমি আপনকার সমক্ষে প্রাণ ত্যাগ করিব। মহাদেব বলিলেন পরমায়ুঃ সত্ত্বে প্রাণত্যাগ করিলে যম তোমাকে সপর্শ করিবেনা, সুতরাং অবশ্য তোমাকে অবশিষ্ট পরমায়ু ভোগ করিতে হইবে। অতএব আমার বাক্য অবহেলন করিওনা, তুমি গাত্রোখানপূর্বক গমন কর। বলিয়া মহাদেব রাজার হস্তে এক কমল অর্পণ করিলেন, আর বলিলেন যখন এই কমল শুষ্ক হইবে তখন তুমি জানিবে তাহার ছয় মাস পরে তোমার মৃত্যু হইবে। এবং তখন তুমি আমার নিকটে আসিও। ইহা বলিয়া মহাদেব কৈলাস ধামে গমন করিলেন।
রাজা পুষ্প লইয়া স্বীয় রাজধানীতে আসিলেন। কয়েক বৎসর পরে ঐ কমল মলিন হইতে লাগিল। তখন রাজা বুঝিলেন ছয় মাস পরে তাহাকে ইহলোক ত্যাগ করিতে হইবে। অতএব স্ত্রী পুত্র গণের ভরণ পোষণেপযুক্ত ধন রাখিয়া অবশিষ্ট তাবদ্ধন এবং রাজ্য সম্পত্তি ব্রাহ্মণগণকে উৎসর্গ করিয়া দিলেন। তদনন্তর রাজা সশরীরে স্বর্গে গমন করিলেন।
পুত্তলিকা কহিল, হে ভোজরাজ দেখ রাজা বিক্রমাদিত্য এই সকল কর্ম্ম করিয়াছিলেন, এবং জন্ম মৃত্যু উভয়কে চিনিয়াছিলেন। অতএব তুমি কেন ভান্ত হইতেছ। দেখ, এই পৃথিবীতে কাহারো চিরকাল বাঁচিবার ভরসা নাই, জন্ম মাত্রেই তাহার সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু আসিয়াছে। দুঃখ সুখ পাপ পুণ্য সকলি শরীরের সঙ্গী, গুণ অগুণ জ্ঞান অজ্ঞান সর্ব্ব ঘটেই আছে, এবং নিরাকার এক ব্রহ্ম সকল জীরেতেই আছেন। তুমি এ সিংহাসনে বসিবার বাসনা পরিত্যাগ করিয়া, আপনাকে চিরস্মরণীয় করিবার উপায় দেখ। মনুষ্যের কীর্তিই চিরস্মরণীয় হইবার উপায়।
এই সকল কথায় সে দিবসও গত হইল। ভোজরাজ সিংহাসনোপবেশনে নিরাশ হইয়া অন্তঃপুরে প্রবেশ করিলেন। পরদিবস সুর্যোদয় হইলে স্নান অতএব পূজাদি করিয়া পুনর্ব্বার সভায় আসিয়া উপস্থিত হইলেন। এবং সভাসদ গণকে বলিলেন এই সকল পুত্তলিকা আমাকে মিথ্যা কথা বলিয়া বঞ্চনা করিতেছে, আমি ইহাদিগের বঞ্চনায় আর ভুলিবনা। ইহা বলিয়া সিংহাসনারোহণার্থ পদ প্রসারণ করিলে
জগজ্জ্যোতি সপ্তবিংশ পুত্তলিকা
হাঁ হাঁ করিয়া উঠিল, আর কহিল মহারাজ কি করিতেছ। আমি এক কথা বলি শ্রবণ কর।
এক দিবস রাজা বিক্রমাদিত্য সভাতে বসিয়াছিলেন এমত সময়, এক কথা হইল যে, ইন্দ্রের তুল্য কোন রাজা নাই, কেননা তিনি দেবলোকে রাজ্য করেন। রাজা এই কথা শুনিয়া কোন উত্তর করিলেন না, কিন্তু বেতালকে ডাকিয়া আজ্ঞা করিলেন আমাকে ইন্দ্রপুরীতে লইয়া চল। বেতাল অজ্ঞামাত্র রাজাকে লইয়া বিমানরোহণ করিল, এবং মুহূর্তেকের মধ্যে ইন্দ্রের সভাতে উপস্থিত হইল। রাজা তথায় উপনীত হইয়া দেবরাজকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করিলেন এবং অঞ্জলিবন্ধনপর্ব্বক তাহার সম্মুখে দণ্ডায়মান থাকিলেন। ইন্দ্র তাহাকে দেখিয়া বসিতে আজ্ঞা করিলেন। রাজা উপবেশন করিলে পর দেবরাজ তাহার পরিচয় জিজ্ঞাসা করিলেন। রাজা বলিলেন, স্বামিন আমি অবন্তী নগরের ভূপতি, আমার নাম বিক্রমাদিত্য, আমি আপনার পদ পঙ্কজ দর্শনাভিলাষে এখানে আসিয়াছি। দেবরাজ কহিলেন আমি তোমার নাম শ্রবণ করিয়াছি, এবং তোমার নিকট গিয়া সাক্ষাৎ করিব মানস করিয়াছিলাম, কিন্তু তুমি আপনি আসিয়াছ, ভালই হইল, যাহা হউক সম্প্রতি তোমার যে মনস্কামনা থাকে বল। রাজা বলিলে ন প্রভো আপনার কৃপাতে আমার সকলই আছে, কিছুর অভাব নাই, এবং আমার যাহা আছে তাহা সকলি আপনার দত্ত। দেবরাজ, রাজার এই কথায় প্রসন্ন ও প্রফুল্ল হইয়া তাহাকে স্বীয় মুকুট ও এক পুষ্পরথ প্রদান করিলেন, এবং আশীর্বাদ করিয়া বলিলেন, যে ব্যক্তি তোমার রাজসিংহাসনের প্রতি কুদৃষ্টি করিবে সে অন্ধদশ প্রাপ্ত হইবে। রাজা বিক্রমাদিত্য এই মুকুট ও পুষ্পর থ প্রাপ্ত হইয়া আপন রাজধানীতে আসিলেন। তাঁহার আগমনে সমস্ত রাজধানীতে নানাবিধ আনন্দধ্বনি হইতে লাগিল।
পুত্তলিকার প্রস্তাবে অনাস্থা ও অমনোযোগ করিয়া, ভোজরাজ সিংহাসনে পবেশনজন্য, এক হস্তে সিংহসন অবলম্বনপূর্ব্বক তাহাতে এক পদ উত্তোলন করিলেন। পরে দ্বিতীয় পদ তুলিয়া তাহার উপরে বসিবেন, এমত সময়ে একবারে অন্ধ ও অবশাঙ্গ হইয়া উন্মত্তের ন্যায় কথা কহিতে লাগিলেন। পরে সিংহাসন হইতে হস্ত টানিয়া লইবার ইচ্ছা করিলেন, কিন্তু পারিলেন না, হস্ত সিংহাসনেই লাগিয়া রহিল। এই রহস্য দেখিয়া পুত্তলিকাগণ হাস্থ্য করিতে লাগিল। সভাস্থ সমস্ত লোক বিস্ময়য়ুক্ত হইয়া মনে মনে কহিতে লাগিল, রাজা কিনির্বোধের কর্ম্ম করিলেন, পুত্তলিকার বাক্যে অবহেলন করিয়া কেন সিংহাসনে পদার্পণ। করিলেন। তখন ভােজরাজ মনে মনে বড়ই লজ্জিত হইলেন। পুত্তলিকা কহিল অরে মুখ তুমি আমার বাক্য শুনিলেন, তাহার এই প্রতিফল পাইলে, এখন তােমার দশা কি হইবে। ভােজরাজ বলিলেন আমার উদ্ধারের উপায় বল। পুত্তলিকা বলিল তুমি, রাজা বিক্রমাদিত্যের নাম স্মরণ কর, তাহা হইলে এই বিপদ হইতে পরিত্রাণ পাইবে। ইহা শুনিয়া ভােজরাজ বিক্রমাদিত্যের যােবন করিতে লাগিলেন। তাহাতে সিংহাসন হইতে হস্ত স্বতন্ত্র হইল, এবং অন্ধতা ও উন্মত্ততা দুর হইল। তদনন্তর রাজা অতিশয় ভীত হইয়া সিংহাসন হইতে অবতরণ পূর্ব্বক নীচে দাড়াইলেন। তখন সভাস্থ সমস্ত লােক বলিল এই কলিযুগে রাজা বিক্রমাদিত্যের তুল্য হওয়া কঠিন। পুত্তলিকা বলিল আমি এই জন্যই নিষেধ করিয়াছিলাম, হে ভােজরাজ তুমি আমার কথা অলীক জ্ঞান করিও না। তুমি বিদ্যা শিক্ষা করিয়াছ বটে, কিন্তু জ্ঞান এক স্বতন্ত্র পদার্থ, তাহা ভােমার নাই। তুমি বিক্রমাদিত্যকে আপনার তুল্য বিবেচনা করিওনা। তিনি দেবতুল্য মনুষ্য ছিলেন, ততুল্য জ্ঞান ও তপস্যা তােমার নাই। অতএব তুমি আর এই সিংহাসনোপবেশনে আশা করিওনা, ইহা তােমার দুরাশা মাত্র। পৃথিবীতে আর আর অনেক কর্ম্ম আছে তাহা কর এবং যাহাতে তােমার রাজ্য স্থির থাকে, তোমার প্রতাপ ও প্রভাব বৃদ্ধি হয় এবং জগন্মলে চিরস্থায়িনী কীর্তি থাকে তাহা কর। এই প্রকারে সে দিবস নিস্ফল গেল। রাজা অন্তঃপুরে গিয়া নানা চিন্তায় রজনী বঞ্চন করিলেন। পরদিবস প্রত্যুষে পুনর্বার সিংহাসনের নিকটে আসিলে,
মনোমোহিনী অষ্টাবিংশ পুত্তলিকা
কহিল, হে ভোজরাজ, তুমি বলিতে পার, রাজা বিক্রমাদিত্যের তুল্য বলবান, সাহসী ও জ্ঞানী মনুষ্য এই পৃথিবীতে আর কেহ জন্মিয়াছিলেন কি না। বোধ হয়, কেহই জন্মগ্রহণ করেন নাই। হে ভোজরাজ আমার বাক্য অপ্রকৃত জ্ঞান করিওনা। এক্ষণে আমি যাহা কহিতেছি শ্রবণ কর।
এক দিবস আমি রাজা বিক্রমাদিত্যকে পরিহাসস্থলে কহিলাম, হে স্বামিন, পাতালেশ্বর বলিরাজা অতি বড় রাজা, তুমি তাহার সঙ্গীর তুল্যও নহ। অতএব যদি তোমার রাজ্য নির্বিঘে চলে, তাহা হইলে একবার তাহাকে দর্শন করিয়া আইস। এই কথা শুনিয়া রাজা বিক্রমাদিত্য বেতাকে আজ্ঞা করিলেন আমাকে পাতালপুরে লইয়া চল। বেতাল আজ্ঞমিত্র রাজাকে পাতালপুরে লইয়া উপস্থিত করিল। রাজা পাতাল পুরে উপস্থিত হইয়া পাতালপুরীর শোভা দর্শনে বিস্ময়পন্ন হইলেন, মনে মনে কহিতে লাগিলেন অদ্যাবধি আমি এমত চমৎকার নগর কুত্রাপি দর্শন করি নাই, এ স্থান কৈলাসপুরীর তুল্য, এই রাজ্যের অধিপতি বলিরাজাকে ধন্য।
রাজা বিক্রমাদিত্য এই প্রকার নগর দর্শনে চমংকৃত হইয়া চিন্তা করিতে করিতে বলিরাজার প্রাসাদের সম্মুখে গিয়া দ্বারপালকে কহিলেন, তোমার প্রভুকে সংবাদ দাও, মর্ত্যলোক হইতে রাজা বিক্রমাদিত্য তাহার দর্শনার্থ আসিয়াছেন। দ্বারী বলিরাজাকে সংবাদ কহিলে, বলিরাজা উত্তর করিলেন আমি নর লোকের সহিত সাক্ষাৎ করিনা। দ্বাররক্ষক আসিয়া রাজা বিক্রমাদিত্যকে এই কথা বলিলে, তিনি বলিলেন আমি যেপর্যন্ত তাহার দর্শন না পাইব সেপর্য্যন্ত এস্থান হইতে প্রস্থান করিব না। দৌবারিক বলিরাজাকে এই কথা জানাইল। তিনি কহিলেন বিক্রমাদিত্য কে, দেবরাজ আসিলেও আমি তাহাকে দর্শন দিই না।
এই প্রকার উত্তর করিয়া বলিরাজা দর্শন দিলেন না। রাজা বিক্রমাদিত্য কয়েক দিবস অপেক্ষা করিয়া, রাজদর্শনে নিরাশ হইয়া, আপনাকে ধিক্কার পূর্ব্বক আপন শিরচ্ছেদন করিলেন। এই ব্যাপার দেখিয়া বলিরাজার সভাস্থ সমস্ত লোক বলিলেন বিক্রমাদিত্য অতি অযুক্ত ও অনুচিত কর্ম্ম করিলেন। তখন বলিরাজা ভূতগণকে আজ্ঞা করিলেন অমৃত দ্বারা তাহার জীবন দান কর এবং তাহাকে বল এখন যাইয়া আপন রাজকার্য্য দেখুন, শিবরাত্রির দিবসে আসিলে দর্শন পাইবেন। এই আজ্ঞায়, বলিরাজার এক কিঙ্কর অমৃত লইয়া রাজা বিক্রমাদিত্যের অঙ্গে প্রোক্ষণ করিতে লাগিল। তাহাতে তিনি পুনর্জীবিত হইলে, তাহাকে রাজাজ্ঞা বিজ্ঞাপন করিল। বিক্রমাদিত্য কহিলেন আমাকে একথা বলিয়া কেন প্রতারণা করিতেছ, আমি একথায় প্রত্যয় করিনা, আমি এখনি রাজার সহিত সাক্ষাৎ করিব। ভূতগণ বলিরাজাকে, এই সমস্ত বিক্রমাদিত্যের বাক্য জানাইলে, বলিরাজা কোন উত্তর করিলেন না। রাজা বিক্রমাদিত্য বিলম্ব দেখিয়া পুনর্ব্বার আপনার শিরচ্ছেদন করিলেন। বলিরাজা পুনর্ব্বার ভূত দ্বারা অমৃত প্রেরণ করিলেন, এবং বলিলেন তাহকে বুঝাইয়া বল এখন প্রস্থান করুন। রাজদূত আসিয়া অমৃত দ্বারা তাহার জীবন দানপূর্ব্বক, রাজা জ্ঞাপন করিল। বিক্রমাদিত্য তাহা মানিলেন না।
অনন্তর বলিরাজার মন্ত্রীগণ একবাক্যে বলি রাজাকে বলিলেন মহারাজ, বিক্রমাদিত্যকে নিরাশ করিওনা, কেননা তিনি অতিশয় সাহস প্রকাশ করিয়াছেন। মন্ত্রীগণের মন্ত্রণায় বলিরাজা সিংহাসন হইতে গাত্রোত্থানপূর্বক দ্বার দেশে আসিলেন। বিক্রমাদিত্য তাহার দর্শন পাইয়া কৃতাঞ্জলি পূর্বক কহিলেন মহারাজ, আমাকে ধন্য, আমার অদৃষ্টকে ধন্য, আপনাকে দর্শন করিয়া আমার জন্ম সার্থক হইল। কিন্তু মহারাজ, আমার কি অপরাধ হইয়াছিল যে আমাকে অগ্রে দর্শন দেন নাই, আমি কি সাহসী কিম্বা দাতা নহি। আমি এমত কি পাপ করিয়াছিলাম যে আমার প্রতি আপনি বিরূপ হইয়াছিলেন। বলিরাজা বলিলেন অহে বিক্রমাদিত্য তোমার তুল্য সদণশালী মনুষ্য পৃথিবীতে আর নাই, যথার্থ। কিন্তু তোমাকে যেজন্য দর্শন দিই নাই তাহার কারণ শুন, রাজা হরিশ্চন্দ্র অত্যন্ত দাতা ও সাহসী ছিলেন, এবং গজরাজাও দাতা ও প্রতাপশালী ছিলেন, তাহারা অনেক দান ও সাহস কর্ম্ম করিয়াছিলেন, ইহাতে তাহারা আমার দর্শন পায়েন নাই। তুমি হঠাৎ আসিয়া আমার সহিত সাক্ষাৎ করিবে এমত কি কর্ম্ম করিয়াছ, কিন্তু এক্ষণে তোমার অতি কঠোর তপস্যা দর্শন করিয়া তোমাকে দর্শন দিতে হইল।
রাজা বিক্রমাদিত্য বিনয়পূর্ব্বক কহিলেন মহারাজ আপনি যাহা অজ্ঞা করিতেছেন, যথার্থ। আমি এক্ষণে বিলক্ষণ জানিতেপারিয়াছি আপনি আমাকে দর্শন দিয়া অনেক দয়া প্রকাশ করিলেন, এবং আপনার কৃপাতে আমি অবশ্যই ভবসাগরে পার পাইতে পারিব। বলিরাজা কহিলেন বিক্রমাদিত্য তুমি এইক্ষণে বিদায় হও, এবং আপন রাজ্যে গিয়া রাজকার্য কর। বিদায়ের কথায় রাজা বিক্রমাদিত্য বিমর্শ হইলেন। তাহাতে বলিরাজা এক রত্ন আনাইয়া তাহার হস্তে অর্পণ করিয়া বলিলেন তুমি এই রত্ন লও, ইহার স্থানে যখন যাহা যাচ ঞা করিবে তৎক্ষণাৎ তাহা পাইবে। বিক্রমাদিত্য ঐ রত্ন গ্রহণ পূর্ব্বক বলিরাজাকে প্রণাম করিয়া, বেতালের স্কন্ধারোহণে স্বীয় রাজধানীতে আসিলেন।
রাজা রাজধানীর অনতিদুরে আসিয়া দেখিলেন এক ব্যক্তি পরলোক গমন করিয়াছে, তাহার ভার্য্যা শবদাহনপূর্ব্বক নদীতটে দণ্ডায়মানা বরাদনপরায়ণ। হইয়া এই কথা বলিতেছে, এইক্ষণে পৃথিবীতে আমার আর সহায় সম্পত্তি কিছুই নাই, আমি কি প্রকারে স্বামির শ্রাদ্ধাদি করিয়া শুদ্ধি প্রাপ্ত হইব। এবং কিপ্রকারেই বা উদরান্ন করিয়া জীবনকাল যাপন করিব। রাজা,নারীর এইরূপ অত্যন্ত খেদোক্তি শ্রবণে দয়াদ্রচিত্ত হইয়া, তাহাকে বলিরাজদত্ত রত্ন প্রদানপূর্বক বলিলেন তোমার যে বস্তু অভিলাষ হয়, এই রত্নের স্থানে চাহিলে তৎক্ষণাৎ প্রাপ্ত হইবে। এই কথায় নারী রত্ন লইয়া কৃতকৃতার্থ হইয়া নগরে গমন করিল। রাজাও আপন গৃহে আসিলেন।
পুত্তলিকা কহিল হে ভোজরাজ, রাজা বিক্রমাদিত্য এই প্রকার সাহসী ও পরোপকারী ছিলেন। তুমি সবার স্বর্গ ভ্রমণ করিয়া আসিলেও, ততুল্য হইতে পারিবে না। অতএব তুমি এই দুরাশা পরিত্যাগ কর। রাজা বিক্রমাদিত্য যে যে অলৌকিক কর্ম্ম করিয়াছিলেন তাহ সমস্ত অবগত হও।
এই সকল কথাতে সে দিবসের শুভক্ষণ অতীত হইল, রাজা সিংহাসনে বসিতে পারিলেননা। পরদিবস পুনর্ব্বার মন্ত্রীসমভিব্যাহারে সিংহাসন সমীপে আসিয়া উপস্থিত হইলে,
বৈদেহী ঊনত্রিংশ পুত্তলিকা
কহিল, হে ভোজরাজ তুমি কেন ভ্রান্ত হইয়াছ, তোমাকে সখীগণ এত বুঝাইল তথাপি তোমার জ্ঞানোদয় হইল না। তুমি অগ্রে আমার বাক্য শ্রবণ কর, পশ্চাৎ সিংহাসনারোহণ করিও। রাজা বলিলেন, শুনিতেছি বল। পুত্তলিকা কহিতে লাগিল।
এক দিবস রাজা বিক্রমাদিত্য নিদ্রাবস্থায় স্বপ্ন দেখিলেন, চতুর্দিকে প্রফুল্ল কুসুমোদ্যানবেষ্টিত, নানাবিধ সুস্বাদু সুগন্ধীয় সুখাদ্য দ্রব্যে পরিপূর্ণ, নানা রত্নে খচিত এক অপূর্ব্ব মনোহর স্বর্ণ অট্টালিকাতে, কতিপয় অতি রূপবতী যুবতী রমণী রমণীয় বেশ ভূষায় ভূষিত হইয়া সুকোমল সুমধুর স্বরে গান করিতেছে। এক ভাগ্যবান, তপস্বী বসিয়া তাহা শ্রবণ করিতেছেন। রাজা এই স্বপ্ন দর্শন করিয়া মনে মনে কহিলেন এই অট্টালিকাবাসী তপস্বী সাতিশয় সুখী, বোধ হইতেছে। ইহা চিন্তা করিতে করিতে রাজার নিদ্রাভঙ্গ হইল।
প্রত্যুষ সময়ে, রাজা মান পূজা করিয়া বেতালকে আহ্বান পূর্বক আজ্ঞা করিলেন, আমি স্বপ্নে যে অট্টালিকা দেখিয়াছি তথায় গমন করিব। এই আজ্ঞায় বেতাল তাহাকে স্কন্ধে করিয়া সেই অট্টালিকাতে লইয়া উপস্থিত করিল। রাজা তাহাকে তথা হইতে বিদায় দিয়া অট্টালিকার উদ্যানে প্রবেশ করিলেন। প্রবেশমাত্রেই অট্টালিকার সৌন্দর্য্য সন্দর্শনে মুগ্ধ হইয়া মনে মনে কহিতে লাগিলেন এই অট্টালিকা কে নির্মাণ করিল, মনুষ্যের সাধ্য নাই এমত অপূর্ব্ব প্রাসাদ নির্মাণ করে, ব্রহ্মা আপনিই প্রস্তুত করিয়া থাকিবেন।
অনন্তর রাজা অট্টালিকার মধ্যে প্রবেশ পূর্ব্বক সঙ্গীতকারিণী কামিনীগণ সমক্ষে উপস্থিত হইলেন। তাহারা মনুষ্যান্তর দর্শনে ভয়-চকিত হইয়া গানে ক্ষান্ত হইল। তাহাতে তপস্বী রাজাকে সম্বোধন পূর্বক ক্রোধাভাসে বলিলেন তুমি কিজন্য এখানে আসিয়াছ। এই সকল নারী সুখে সঙ্গীতাদি করিতেছিল, তুমি আসিয়া কেন ভঙ্গ করিলে। আমি তোমাকে এখনি অভিসম্পাত করিয়া ভস্ম করিব। রাজা কৃতাঞ্জলি হইয়া কহিলেন আমি অনভিজ্ঞ, না জানিয়া এখানে আসিয়াছি। আপনাকে দর্শন করিব এই আমার অভিলাষ, আপনি ক্রোধ করিয়া অভিসম্পাত করিলে, আমার সাধ্য কি তাহা সহকরি। আমি আপনার আজ্ঞাকারী, অতএব আমার অপরাধ মার্জনা করুন।
তপস্বী এই কথা শুনিয়া বলিলেন বিক্রমাদিত্য, তুমি যথার্থ কহিয়াছি, আমার বড় ক্রোধ হইয়াছিল। তুমি আপন অপরাধ স্বীকার না করিলে, আমি তোমাকে অভিসম্পাত করিতাম। এখন আমি তোমার বাক্যে তুষ্ট হইলাম, তোমার কি প্রার্থনা বল। রাজা বলিলেন প্রভো আমি কি প্রার্থনা করিব, আপনার অনুগ্রহে আমার সকলি আছে, অন্ন অর্থ অশ্ব রথ কিছুর অভাব নাই। কিন্তু এক দ্রব্য যাচাএর জন্য আমি এখানে আসিয়াছি, যদি কৃপা করিয়া দেন তবে তাহা প্রকাশ করিতে পারি। যোগী বলিলেন তোমার যে বস্তুর প্রার্থনা থাকে বল, আমি অবশ্য দিব। রাজা বলিলেন যদি আমার প্রতি এতাদৃশী দয়া প্রকাশ করিলেন তবে আমাকে এই অট্টালিকা প্রদান করিতে আজ্ঞা হউক। তপস্বী বচনবদ্ধ হইয়াছিলেন, সুতরাং অনিচ্ছক হইয়াও অন্যথা করিতে না পারিয়া, তৎক্ষণাৎ তাহাকে অট্টালিকা দিলেন। আপনি উদাসীন হইয়া নানা তীর্থে ভ্রমণ করিতে লাগিলেন।
রাজা অট্টালিকা পাইয়া হৃষ্টান্তঃকরণে সিংহাসনে উপবেশন করিলেন। কামিনীগণ, তপস্বীর অগ্রে যে প্রকার গান বাদ্য করিতেছিল সেই প্রকার করিতে লাগিল। রাজা তথায় বাস করিয়া নানা প্রকার সুখ সম্ভোগ করিতে লাগিলেন।
যোগী রাজাকে অট্টালিকা দান করিয়া মনে মনে অতিশয় দুঃখিত হইলেন। এবং, তীর্থ পর্যটন করিতে করিতে যাহার সহিত সাক্ষাৎ হইত তাহাকেই আপনার দুঃখের কথা বলিয়া আক্ষেপ করিতেন। একদা এক তীর্থে উপস্থিত হইয়া এক তপস্বীকে আপনার দুঃখের বৃত্তান্ত কহাতে, তপস্বী বলিলেন যদি তোমার ঐ অট্টালিকা পুনগ্রহণের বাসনা থাকে তবে ছদ্মবেশে রাজার স্থানে গিয়া তাহা যাচ ঞা কর, রাজা অতিশয় দাতা, অনায়াসে তোমাকে তাহা দিবেন।
এই পরামর্শে, যোগী এক বৃদ্ধ বিপ্রের বেশ ধারণ পূর্ব্বক ঐ অট্টালিকার দ্বারে উপস্থিত হইয়া করতালি দিতে লাগিলেন। রাজা করতালির শব্দে দ্বারদেশে আসিয়া তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন তুমি কি অভিপ্রায়ে এখানে আসিয়াছ, তোমার যাহা অভিলাষ থাকে প্রকাশ করিয়া বল আমি তাহা পূর্ণ করিব। বিপ্র বলিলেন মহারাজ আমি তাবৎ ধরণী ভ্রমণ করিলাম, কিন্তু যোগ সাধনের উপযুক্ত আশ্রম কোথাও পাইলাম না। রাজা বলিলেন যদি এই অট্টালিকা তোমার মনোনীত হয় তবে লও। এই কথায় ব্রাহ্মণ তাঁহাকে ধন্যবাদ করিতে লাগিলেন। রাজা তাঁহাকে ঐ অট্টালিকা প্রদান করিয়া আপন গৃহে প্রত্যাগত হইলেন।
পুত্তলিকা কহিল, শুন ভোজরাজ, তুমি বিবেচনা না করিয়া রাজা বিক্রমাদিত্যের তুল্য হইতে ইচ্ছা কর, কিন্তু তণ্ডুল্য গুণ না থাকিলে কিপ্রকারে তাহার সিংহাসনে বসিবে। এইরূপ কথোপকথনে সে দিবসও অতীত হইল। রাজা দুঃখিতান্তঃকরণে অন্তঃপুর প্রবেশ পূর্ব্বক, কোন প্রকারে রজনী বঞ্চন করিলেন। পরদিবস মান পূজার পর পুনর্ব্বার সভায় আসিয়া সিংহাসনারোহণার্থ অগ্রসর হইলে,
রূপবতী ত্রিংশ পুত্তলিকা
কহিল, হে রাজন, তুমি কি ক্ষিপ্ত হইয়াছ, তোমার এমত পুরুষত্ব কি আছে যে তুমি এই সিংহাসনে বসিতে আসিয়াছ। আমি তোমাকে রাজা বিক্রমাদিত্যের এক দিবসের বৃত্তান্ত কহি, শ্রবণ কর।
এক সময়, রাজা বিক্রমাদিত্য রজনীযোগে শয়ন করিয়াছিলেন, হঠাৎ তাহার অন্তঃকরণে কি উদয় হইল, তখনি তিনি গাত্রোত্থান করিয়া কটিবন্ধন ও অসি চর্ম্ম গ্রহণ পূর্বক নিশীথ সময়ে নগর ভ্রমণার্থ নির্গত হইলেন। কতক দূর গিয়া দেখিলেন, এক স্থানে চারি জন তস্কর দণ্ডায়মান হইয়া, কোন স্থানে কিপ্রকারে চুরি করিবেক তাহার পরামর্শ করিতেছে। একজন বলিতেছে ভাই অদ্য এমত শুভক্ষণ ও সুবিধা বুঝিয়া চল যাহাতে অবশ্যই ধনলাভ হয়। সুবিধা না বুঝিয়া যাওয়া হইবেনা, তাহা হইলে নিরাশ হইয়া ফিরিয়া আসিতে হইবে। রাজা এই কথা শুনিলেন। পরে তস্করগণ, রাজাকে দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিল তুমি কে। রাজা কহিলেন তোমরা যে ব্যবসায়ী আমিও তাহাই। এই কথায় তস্করগণ রাজাকে সমভিব্যাহারে লইয়া চৌর্য্য কার্য্যে চলিল। কতক দুর গিয়া একজন চোর আর জনকে জিজ্ঞাসিল ভাই, তোমার কি গুণ আছে বল। তাহাতে সে কহিল আমি এমত শুভক্ষণ বলিয়া দিতে পারি, সেইক্ষণে যাত্রা করিলে কখন রিক্তহস্তে ফিরিতে হয় না। আর এক জন কহিল আমি সকল জন্তুর বাক্য বুঝিতে পারি। তৃতীয় জন কহিল আমি কোন স্থানে গমন করিলে, আমাকে কেহ দেখিতে পায়না, আমি সকলকে দেখিতে পাই। চতুর্থ ব্যক্তি কহিল আমার স্থানে এমত এক দ্রব্য আছে তাহাতে আমাকে কেহ নষ্ট করিতে আসিলে নষ্ট করিতে পারেনা। চারিজন চোর এই প্রকার বলিয়া, রাজাকে জিজ্ঞাসা করিল তোমার কি বিদ্যা আছে বল। রাজা বলিলেন যেস্থানে ধনীর ধন প্রোথিত আছে আমি তাহা বলিয়া দিতে পারি। তাহারা বলিল তবে যেখানে ধন আছে সেইখানে আমাদিগকে লইয়া চল, আমরা তোমার সঙ্গে যাইতেছি।
এই কথায় রাজা অগ্রে অর্থে চলিলেন, তস্করগণ পশ্চাৎ পশ্চাৎ চলিল। পরে রাজা তাহাদিগকে আপন আলয়ের পশ্চাদ্বর্ত্তী উদ্যানে আনিয়া, যেস্থানে আপনার ধন প্রোথিত ছিল, তাহা দেখাইয়া দিলেন। তস্করেরা সেই স্থান খনন করিল, এবং মৃত্তিকার মধ্যে এক প্রচ্ছন্ন পুরীতে প্রবেশ পূর্ব্বক দেখিল নানাবিধ স্বর্ণ ও রৌপ্যমুদ্রাতে গৃহ পরিপূর্ণ। তস্করগণ ঐ সমস্ত রত্ন মোট বান্ধিয়া মস্তকে করিয়া লইয়া চলিল। ইহাতে একটা শৃগাল চীৎকার করিয়া উঠিল। তাহা শুনিয়া, যে চোর চতুষ্পদের ভাষা বুঝিত সে বলিল ভাই, শৃগালটা বলিতেছে এ ধন লইয়া কুশল নাই, অতএব ইহা লওয়া হইবেকনা। আর এক ব্যক্তি বলিল শৃগাল যাহা বলে বলুক, হস্তগত ধন কখন ত্যাগ করা হইবেক না, ত্যাগ করিলে আমাদের ধর্মের উপর দোষ আসিবে। আর এক ব্যক্তি কহিল ধন অনেক পাইলাম বটে, কিন্তু বস্ত্র পাইলাম না, অতএব চল অন্য কোন স্থানে যাইয়া বস্ত্র আনি। তাহার পরে চোর্য্য ব্যবসায় একবারে ত্যাগ করিব। চতুর্থ ব্যক্তি কহিল একথা ভাল বলিয়াছ, এইখানে রাজার রজক বাস করে, চল, তাহার ঘরে গিয়া সিঁধ দিই, তাহা হইলে নানাপ্রকার রাজভোগ্য উত্তম উত্তম বস্ত্র পাইব।
তস্করগণ এই পরামর্শ করিয়া, অর্থের মোট সকল জকের গৃহের পশ্চাদ্ভাগে রাখিয়া, তাহার ঘরে সন্ধি খনন করিতে লাগিল। রজকের একটা গর্দভ ছিল, বাহিরে বাঁধা থাকিত। ঐ গর্দভ চোরদিগকে দেখিয়া চীৎকার করিতে লাগিল। তাহাতে রজকের নিদ্রাভঙ্গ হওয়াতে, সে অতিশয় বিরক্ত হইয়া বাহিরে আসিয়া গদ ভকে প্রহার করিতে লাগিল। আর বলিল আমি সমস্ত দিবস শ্রম করিয়া রাত্রে ক্ষণকাল স্বচ্ছন্দে নিদ্রা যাইব, ইহাতেও এই হতভাগা গর্দভটা আমায় নিদ্রা যাইতে দেয় না। তদনন্তর দ্বার বন্ধ করিয়া পুনর্ব্বার নিদ্রা গেল। গদত কতক ক্ষণ পরে পুনর্বার চীৎকার করিতে লাগিল, তাহাতে রজক পুনর্ব্বার বাহিরে আসিয়া তাহাকে সেই প্রকার প্রহার করিল। এই প্রকার পাচ ছয় বার উঠিয়া উঠিয়া প্রহার করিল। অবশেষে আর না পারিয়া, তাহার রঞ্জু চ্ছেদনপূর্বক তাহাকে বাটীর বাহির করিয়া দিয়া, স্বচ্ছন্দে নিদ্রা যাইতে লাগিল। চোরেরাও স্বচ্ছন্দে চুরি করিতে লাগিল।
রাজা মনে মনে কহিলেন ইহাদিগের প্রাক্তনে যে ধন ছিল তাহা আমারি ভাণ্ডার হইতে লইয়া আসিআছে, এইক্ষণে আমি পরধনহরণের সময়ে ইহাদের সঙ্গে থাকিয়া কেন কুকর্মের ও অধর্মের ভাগী হই। ইহা ভাবিয়া রাজা আপন গৃহে আসিলেন। দস্যগণ রজকের গৃহ হইতে বস্ত্রাদি লইয়া প্রস্থান করিল।
রজনী প্রভাত হইলে জনরব হইল রাজভাণ্ডারে চুরী হইয়াছে। নগরপাল চোরের অনুসন্ধানর্থ স্থানে স্থানে চর পাঠাইল, এবং নগরের পথ ঘাট সকল রুদ্ধ করিল। চরগণ অনেক অনুসন্ধানের পর, চারিজন চোরকে বন্ধন করিয়া আনিল। নগরপাল তাহাদিগকে রাজার সম্মুখে উপস্থিত করিলে, তাহারা রাজাকে দেখিয়া মনে মনে ভাবিতে লাগিল এই আকৃতির এক মনুষ্য কল্য আমাদের সঙ্গে চুরি করিতে আসিয়াছিল, কিন্তু যখন আমরা রজকের গৃহে চুরী করি তখন সে আমাদিগকে না বলিয়াই প্রস্থান করিয়াছিল, আপন অংশের ধনও লইয়া যায় নাই।
দস্যুগণ এই চিন্তা করিতেছে এমত সময়ে, রাজা ঈষদ্ধাস্থ্য পূর্ব্বক তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন তোমর। আমার মুখাবলোকন করিয়া মনে মনে কি চিন্তা করিতেছ। যদি মঙ্গল চাহ তবে, যে ধন লইয়া গিয়াছ তাহ শীঘ্র আনিয়া দাও। চোরগণ বলিল মহারাজ আমাদের এক বিষয়ে বড় আশ্চর্য্য বোধ হইয়াছে। কল) রাত্রে আমাদের সঙ্গে আর একজন চোর আসিয়াআমরা যখন চুরি করি তখন সে আমাদের সঙ্গে সঙ্গে ছিল, কিন্তু অংশ লইবার সময় কোথায় গেল জানিতে পারিলাম না। রাজা বলিলেন সে চোর কোথায়। একজন বলিল মহারাজ, আপনি আমার প্রাণ দণ্ডই করুন, বা, মার্জনাই করুন, আমি যথার্থ কহিব, মহারাজ আপনি রজনীতে আমাদের সঙ্গে চুরী করিতে গিয়াছিলেন। কেননা আমরা অনেককে লইয়া চুরী করিয়াছি, কাহাকেও এ প্রকার দেখি নাই যে, আপনার অংশ ত্যাগ করিয়া চলিয়া যায়। অতএব চোর্য্য কার্য্যে আপনিই আমাদের সঙ্গী ছিলেন।
রাজা ঈষদ্ধাস্য পূর্বক চোরকে বলিলেন আমি তোমাদের প্রাণদান করিলাম, তোমরা প্রাণনাশের আশঙ্কা করিওনা। কিন্তু আমি এক কথা বলি, তোমাদিগকে তাহা অবশ্যই করিতে হইবেক। তোমরা এখনপর্যন্ত আর চৌর্য্য কার্য্য করিও না, তাহা হইতে একবারে ক্ষান্ত হও। বরঞ্চ তোমাদের যদি আরো অধিক অর্থের প্রয়োজন থাকে, আমার ভাণ্ডার হইতে লইয়া যাও। দস্যগণ এই কথায় সম্মত হইল, এবং আর যে ধন চাহিল রাজা তাহাদিগকে দিলেন। তাহারা ঐ ধন লইয়া অত্যন্ত সন্তুষ্ট হইয়া স্ব স্ব গৃহে গমন করিল।
পুত্তলিকা বলিল, শুন ভোজরাজ, তুমি রাজা বিক্রমাদিত্যের ন্যায় দাতা কখন হইতে পারিবে না। অতএব সিংহাসনে বসিবার আশা ত্যাগ করিয়া, আপনার রাজকার্য্য পর্যালোচনা কর। রাজা এই কথায় মৌন হইয়া উঠিয়া গেলেন, সিংহাসনে বসিতে পারিলেন। রাত্রি অতিশয় চিন্তায় গেল। রজনী প্রভাত হইবা, মাত্র রাজা পুনর্বার সিংহাসনের নিকটে আসিয়া দণ্ডায়মান হইলেন। মনে মনে কহিতে লাগিলেন হায়, আমার সকল আশা বিফল হইল, আমি এই সিংহাসনে বসিতে পারলাম না, ইহা শুনিলে সকলে আমাকে উপহাস করিবে। আমি আপন নির্মল কুলে কলঙ্ক পঙ্ক প্রলেপ দিলাম। ভোজরাজ মনে মনে এই সকল চিন্তা করিয়া অধোবদনে সিংহাসনের সম্মুখে দণ্ডায়মান থাকিলেন। পুনর্ব্বার মনে মনে কহিতে লাগিলেন রাজা বিক্রমাদিত্য যেপ্রকার মাতৃগন্ত হইতে উদ্ভব হইয়াছিলেন আমিও সেই প্রকার হইয়াছি, অতএব আমি কেন আপন অভিলাষ সিদ্ধ না করিব। ইহা ভাবিতে ভাবিতে কখন কখন তাহার অন্তঃকরণে লজ্জা বোধ, ও কখন কখন ক্রোধোদয় হইতে লাগিল। তাহাতে অধৈর্য্য হইয়া প্রতিজ্ঞা করিলেন অবশ্যই সিংহাসনে উপবেশন করিব। এই প্রতিজ্ঞা করিয়া সিংহাসনে উঠিতে উদ্যত হইলে,
কৌশল্যা একত্রিংশ পুত্তলিকা
কহিল, হে ভোজরাজ তুমি অতি মূখ, তুমি জ্ঞানের কথা শুননা, এবং সাহস যে পদার্থ, তাহাকে অতিসামান্য জ্ঞান কর হে রাজন, পিত্তল কখন কাঞ্চনের ন্যায় গণ্য হইতে পারেন, শীসা কখন হীরকের তুল্য হয় না, এবং নিস্ব কখন চন্দনের গুন প্রাপ্ত হয় না। অতএব তুমি কি সাহসে রাজা বিক্রমাদিত্যের তুল্য হইতে চাই। তোমার ইহাতে লজ্জা হয় না। পুত্তলিকার এই বাক্যে রাজা অতিশয় লড়িত হইয়া মনে মনে আপনাকে ধিক্কার দিতে লাগিলেন। তৎপরে পুত্তলিকা কহিলা হে ভোঙ্গরাজ আমি তোেমাকে রাজা বিক্রমাদিত্যের এক দিবসের বৃত্তান্ত কহিতেছি শ্রবণ কর।
রাজা বিক্রমাদিত্যের মৃত্যুকাল নিকটবর্তী হইলে, তিনি তাহা জানিতে পারিয়া, বাই নগরে জাহুবীতটে এক অট্টালিকা নির্মাণ করাইয়া, তথায় বাস করিতে লাগিলেন। তাবৎ রাজধানীতে ঘোষণা করিয়াদিলেন যাহার যাহা যাচ ঞা করিতে ইচ্ছা হয়, তাহারা তাহার নিকটে যাইয়া প্রকাশ করুক। এই সংবাদ পাইয়া যাবতীয় ব্রাহ্মণ পণ্ডিত ও ভাট ভিক্ষুক তাহার নিকটে উপস্থিত হইল। তাহারা যে যাহা প্রার্থনা করিল রাজা তাহাদিগকে দিতে লাগিলেন।
দেবতাগণ রাজার এইরূপ দানের বৃত্তান্ত শুনিয়া তাঁহার দানশীলতার পরীক্ষাজন্য নানা বেশ ধারণ পূর্ব্বক তাহার নিকটে উপস্থিত হইলেন, এবং যাহার তাহ যাচ ঞা করিলেন। রাজা বিক্রমাদিত্য তাহাদের ইচ্ছানুযায়ী, যিনি যাহা চাহিলেন তাহাই দিলেন। দেবগণ তুষ্ট হইয়া রাজাকে আশীর্বাদপূর্ব্বক বলিলেন বিক্রমাদিত্য, তুমি ধন্য, তোমার মাতা পিতাও ধন্য। তুমি যে কীর্তি করিলে তাহাতে স্বর্গ মর্ত্য পাতালে তোমর নাম চিরকাল স্মরণীয় হইল। রাজা হরিশ্চন্দ্র সত্যযুগে অতি সত্যবাদী ছিলেন, ত্রেতাযুগে বলিরাজা অনেক দান করিয়া ছেন, দ্বাপরে রাজা যুধিষ্ঠির অতিধর্ম্মশীল ছিলেন। কিন্তু কলিযুগে তুমি যেরূপ ধর্ম্ম কর্ম প্রচার ও বীরত্ব প্রকাশ করিলে,এই চারি যুগের মধ্যে কোন রাজা কখন এরূপ করিতে পারেন নাই। রাজা বিক্রমাদিত্যের এই প্রকার গুণানুবাদ ও স্তুতিবাদ করিয়া দেবগণ বিদায় হইলেন।
দেবতাগণের গমনের পর, রাজা বিক্রমাদিত্য বহিঃস্থিত পদার্থ সমুদয় দর্শনার্থ অট্টালিকার এক গরাক্ষে উপবেশন করিলেন। সময়ে যদৃচ্ছাক্রমে এক সুবর্ণমৃগ আসিয়া তাহার দৃষ্টি পথের অতিথি হইল। রাজা তাহাকে সংহার করিবার মানসে ধনুর্বাণ গ্রহণ করিলেন। ঐ মৃগ, রাজাকে ধনুর্বাণধারী দেখিয়া বলিতে লাগিল হে ভূপতে আমি প্রকৃত মৃগ নহি, আমি পূর্ব্বজন্মে ব্রাহ্মণ ছিলাম। এক দিবস ক্ষুধাতুর হইয়া অসময়ে এক ঋষির আশ্রমে উপস্থিতি পূর্ব্বক অন্ন যাচ ঞা করিয়াছিলাম, তাহাতে তিনি ক্রুদ্ধ হইয়া এই বলিয়া আমাকে অভিসম্পাত করিলেন তুই আগামি জন্মে হরিণ হইবি। আমি এই অভিসম্পাতগ্রস্ত হইয়া সাতিশয় দুঃখিত হইলাম, এবং বিনয় বাক্যে তাহাকে কহিলাম প্রভো আপনি আমাকে মৃগ করিলেন, কিন্তু কত দিনে কিপ্রকারে এই পশুজন্ম হইতে আমার মুক্তি হইবে, অনুগ্রহ করিয়া আজ্ঞা করুন। তিনি কহিলেন অতিদাতা রাজা বিক্রমাদিত্য কলিযুগে জন্ম গ্রহণ করিবেন, তাঁহাকে দর্শন করিলে তোমার মুক্তি হইবে। এই কথা বলিতে বলিতে হরিণ তৎক্ষণাৎ মৃগদেই পরিত্যাগ ও দ্বিজদেহ ধারণ পূর্বক রাজাকে যথোচিত সম্বন্ধ না করিয়া স্বস্থানে প্রস্থান করিল। রাজা তাহার শব জাহ্নবীনীরে নিক্ষেপ করিয়া, তাহার পুণ্যার্থে দীন দরিদ্র অনাথদিগকে অনেক অর্থ বিতরণ করিলেন।
পুত্তলিকা কহিল হে ভোজরাজ তুমি রাজা বিক্রমাদিত্যের তুল্য কোন প্রকারে হইতে পারিবে না। ততুল্য ব্যক্তি ব্যতিরিক্ত অন্য কাহারও এই সিংহাসনের অধিকার নাই। অতএব তুমি তাহার এই সিংহাসনে বসিবার বাসনা একবারে পরিত্যাগ কর। এবং, যেস্থান হইতে এই সিংহাসন আনয়ন করিয়াছ সেই স্থানেই পুনর্ব্বার স্থাপন করাও।
এই কথায় ভোজরাজ সিংহাসনোপবেশনে নিতান্ত নিরাশ হইয়া অন্তঃপুরে প্রবেশ করিলেন। এবং, সমস্ত দিবারাত্র অতিমাত্র চিন্তায় মগ্ন থাকিলেন। পর দিবস প্রত্যুষে সন্ন্যাসীর বেশে সিংহাসন সমীপে আসিলে,
ভানুমতী দ্বাত্রিংশ পুত্তলিকা
কহিল, হে ভোজরাজ, আমি তোমাকে এক শেষ কথা বলিতেছি, মনোযোগ পূর্ব্বক শ্রবণ কর। রাজা বিক্রমাদিত্যের মৃত্যু হইলে তিনি ইন্দ্রলোকে গমন করিলেন, তাল বেতালও তাহার সঙ্গে সঙ্গেই অন্তর্হিত হইল। স্বর্গ মর্ত্য পাতাল ত্রিলোকীমধ্যে এই জনরব হইল যে, পৃথিবীর আদিত্য রাজা বিক্রমাদিত্য ইহলোক পরিত্যাগ করিলেন, সমুদয় পৃথিবী শোকান্ধকারে আচ্ছন্ন হইল, পৃথিবী হইতে ধর্মের ধ্বজা একবারে নিশূল হইল। রাজার মৃত্যু সংবাদে রাজ্যের আবাল বৃদ্ধ বনিতা তাবৎ প্রজা হাহাকার শব্দে রোদন করিতে লাগিল। ব্রাহ্মণ পণ্ডিত, ভাট ভিখারীগণ উচ্চৈঃস্বরে রোদন করিতে করিতে কহিতে লাগিল, হায়, যিনি আমাদিগকে আদর পূর্ব্বক প্রতিপালন করিতেন, যিনি আমাদিগের পিতা স্বরূপ সকল বিপদেই রক্ষা করিতেন, তিনি পৃথিবীহইতে একবারে অন্তহিত হইলেন। রাণীগণ রাজার সহগামিনী হইলেন। দাস দাসীগণ, এবং আর আর কর্মকর ও সৈন্য সামন্ত সকলে অনাথ হইয়া বোদন করিতে লাগিল। এই প্রকারে রাজ্যের মধ্যে মহাশোকধ্বনি উপস্থিত হইল।
অনন্তর রাজমন্ত্রী, রাজপুত্র জৈতপালকে রাজা করিয়া তাহার হস্তে সমস্ত রাজ্যের ভারার্পণ করিলেন। জৈতপাল রাজা হইয়া এক দিবস এই সিংহাসনে উপবেশন করিয়াছিলেন। উপবেশনমাত্র মূচ্ছাপন্ন ও জ্ঞানশূন্য হইলেন, এবং সেই মূচ্ছাবস্থাতেই স্বপ্ন দেখিলেন, রাজা বিক্রমাদিত্য তাহাকে বলিতেছেন, বৎস তুমি এক্ষণে এই সিংহাসনে উপবেশন করিও না, যদি কখন আমার সদৃশ সাহসী ও দাতা হইতে পার তবে এই সিংহাসনে বসিও। এইরূপ স্বপ্নে জৈতপালের জ্ঞানোদয় হইল। তখন তিনি সিংহাসন হইতে অবরোহণ করিয়া মন্ত্রীকে আদ্যোপান্ত স্বপ্নের সমস্ত বৃত্তান্ত কহিলেন। মন্ত্রী কহিলেন মহারাজ এক্ষণে এই সিংহাসনে উপবেশন না করিয়া, আমার এক নিবেদন শ্রবণ করুন, অদ্য রজনীতে আপনি শুদ্ধাচার হইয়া ভূমিশয্যায় শয়নপূর্বক মনের মধ্যে রাজাকে ধ্যান করিয়া নিদ্রাগত হউন।
মন্ত্রীর পরামর্শানুসারে রাজা জৈতপাল ভূমিতে শয্যা করিয়া শয়ন করিলেন। নিদ্রাকর্ষণ হইলে স্বপ্ন দেখিলেন রাজা বিক্রমাদিত্য তাহার সম্মুখে আসিয়া বলিতেছেন, হে বৎস তুমি উজ্জয়িনী ও ধারা নগর পরিত্যাগ করিয়া অবন্তীনগরে গিয়া রাজধানী স্থাপন কর, এবং এই সিংহাসন পৃথিবীগন্ত্রে সমর্পণ কর। রজনী প্রভাতা হইবামাত্র রাজা জৈতপাল গাত্রোধান করিয়া, লোেক দ্বারা মৃত্তিকা খনন পূর্ব্বক এই অপর্ব্ব সিংহাসন প্রােথিত করাইলেন। পরে আপনি অবন্তী নগরে রাজধানী স্থাপনপূর্বক তথায় রাজ্য করিতে লাগিলেন। তাহাতে ধারানগর ও উজ্জয়িনী নগর একবারে লােকশূন্য হইল, কিন্তু অবন্তীনগর, নানাদেশীয় ও নানাজাতীয় লােকে পরিপূর্ণ হইয়া উঠিল।
পুত্তলিকা কহিল যিনি যে কর্মের যােগ্য নহেন তিনি সে কর্মে প্রবৃত্ত হইলে, কেবল যে কৃতকার্য্যই হইতে পারেন না এমত নহে, তাহাতে পৃথিবীতে অতিশয় অপযশও বিস্তীর্ণ হয়। পূর্ব্বকালের রাজাদিগের এই নিয়ম ছিল, যিনি যে কর্ম্মের যােগ্য তিনি তাহাই করিতেন। বর্তমান কালের বাজাদিগের সে বােধ নাই, ইহাদের যৎসামান্য প্রাধান্য ও যৎকিঞ্চিৎ সম্পত্তি লাভ হইলেই, প্রজাদিগকে প্রতিপালন করা দূরে থাকুক, অকিঞ্চিৎকর অর্থের জন্য তাহাদিগকে যৎপরোনাস্তি ক্লেশ দেন। সাধু দিগকে রক্ষাকরা দূরে থাকুক, কোন প্রকার স্বার্থ সিদ্ধির উদ্দেশে তাহাদিগকে অশেষবিধ ক্লেশ দিতেও পরাঙ্খ হয়েন না। এবং সত্যের প্রতি বিরত হইয়া কেবল মিথ্যা প্রতারণাতে অবিরত রত হয়েন। হে ভােজরাজ তােমার এতাদৃশ দোষ নাই, যথার্থ বটে, কিন্তু আপনার কতদূর পর্যন্ত ক্ষমতা, তাহা বিবেচনা না করিয়াই, আদিত্যতুল্য রাজা বিক্রমাদিত্যের ভুক্তপূর্ব্ব এই অপূর্ব্ব সিংহাসনে বসিবার বসনা কর,ইহা অতি অনুচিত কর্ম্ম, বলিতে হইবেক।
পুত্তলিকার এই কথা শুনিয়া ভােজরাজসিংহাসনে উপবেশনের বাসনা একবারে পরিত্যাগ করিলেন, এবং অমানবদনে মন্ত্রীকে কহিলেন যেস্থান হইতে সিংহাসন উত্তোলন করা গিয়াছে, সেই স্থানেই ইহা অবিলম্বে পুনঃপ্রােথিত করাও। অনন্তর ভােজরাজ রাজ্যভােগে ঔদাস্থ্য ও অবহেলা করিয়া উদাসীন বেশে, তপস্যা করার্থ তীর্থ যাত্রায় নির্গত হইলেন। তাহার মন্ত্রীরাজ্য শাসন করিতে লাগিলেন।
সমাপ্ত।