CastFM
টেক্সট সাইজ
120%
মার্জিন
5%
লাইন স্পেসিং
1.5

প্রথম অধ্যায়

আরিস্তোমেনিসের গল্প


কাজের সূত্রে একবার আমাকে থেসালি যেতে হয়েছিল। আমার মায়ের পূর্বপুরুষদের ভিটা সেখানে। সকালবেলা উঁচু পাহাড়ের চড়াই বেয়ে ওঠার পর উতরাই বেয়ে নেমে আসছি। পিচ্ছিল রাস্তা নেমে গেছে নিচে একটা উপত্যকায়। দু’পাশে শিশিরভেজা চারণভূমি আর প্যাঁচপেঁচে চষাখেত। যেতে যেতে আমার সাদা ঘোড়াটা হাঁপাতে লাগল, হাঁটার গতিও ঝিমিয়ে আসছে। ওটার পিঠে জিনের ওপর একটানা জবুথবু বসে আছি। আমারও হাতে-পায়ে খিল ধরে গেছে। লাফিয়ে নেমে পড়লাম। লতাপাতা দিয়ে যত্ন করে ঘষে ঘোড়াটার কপালের ঘাম মুছে দিলাম, কান মলে দিলাম খানিকটা, রাশের দড়ি ছেড়ে দিলাম, তারপর সেটার পাশে পাশে হাঁটতে লাগলাম, যাতে দম ফিরে পায় পশুটা। নাশতা হিসেবে দুই পাশের ঘাসবিচালি চিবাতে চিবাতে এগোচ্ছে ঘোড়া। মাঠের মধ্য দিয়ে ঘুরে ঘুরে নেমে গেছে রাস্তা। দেখি একটু সামনে দুটি লোক ক্লান্ত পায়ে হেঁটে যাচ্ছে, গভীর আলাপে মগ্ন। কী নিয়ে কথা বলছে ওরা— কান পাততে হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিলাম। কাছাকাছি যেতেই তাদের একজন উচ্চ স্বরে হেসে উঠে অন্যজনকে বলল, “থাম, থাম! অনেক হয়েছে! আর একটা কথা বলবি না। তোর এসব উদ্ভট গুলতানি আর নিতে পারছি না।”

আমি গল্পের গন্ধ পেলাম। গল্পবাজ লোকটাকে বললাম, “দয়া করে আমাকে উটকো উৎপাত যদি না ভাবেন তো বলি, সবকিছু থেকে শিক্ষা গ্রহণের বাতিক আছে আমার। হেন জিনিস নেই, যাতে আমার কৌতূহল নেই। আপনার গল্পটা যদি আবার গোড়া থেকে শুরু করেন, আমি ঋণী থাকব। আন্দাজ করছি সামনের খাড়া পাহাড় বেয়ে ওঠার ক্লান্তি ভুলিয়ে দেবে এ কাহিনি।”

সঙ্গে যে লোকটা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসেছিল, সে বাগড়া দিয়ে বসল। “এইসব আজগুবি কথা আমি আর শুনব না। তুমি তো এও বলে বসবে যে জাদুমন্ত্রবলে নদীর স্রোত উল্টো দিকে ছোটানো সম্ভব, সাগরের পানিকে বানিয়ে দেওয়া সম্ভব বরফ, জাদুবলে বায়ুপ্রবাহও থামিয়ে দেওয়া যায়। তুমি বলবে, জাদুটোনা করে সূর্যকে তার মাঝপথে আটকে দেওয়া যায়, চাঁদের গা থেকে ঝরানো সম্ভব বিষাক্ত শিশির, আর গ্রহ-নক্ষত্রদের দিয়ে সম্ভব মানুষজনের অনিষ্ট সাধন। তুমি তো এও দাবি করবে যে জাদুমন্ত্রে দিনের আলো মুছে দিয়ে অনন্ত রাত নামিয়ে আনা সম্ভব।”

আমি গোঁ ধরলাম। বললাম, “হাল ছাড়বেন না তো, ভাই। গল্পটা শেষ করুন।” তারপর অন্য সঙ্গীর দিকে ফিরে বললাম, “আপনার বন্ধুর কথা বিশ্বাস করতে আপনি যে কিছুতেই রাজি নন, সেটা কি বিশ্বাস করতে বাধছে বলে, নাকি আপনি বিশ্বাস না করার গোঁ ধরে আছেন বলে? একটা ঘটনা খুব বিরল আর ব্যতিক্রমী হলে কিংবা বোধবুদ্ধিতে সেটার কূলকিনারা করা কঠিন হয়ে গেলে সেটাকে গুলতানি বলে উড়িয়ে দেওয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ না মোটেই। খুব ধীরস্থির মনে চিন্তা করলে দেখা যাবে, এ রকম অনেক ঘটনা ঘটা শুধু যে সম্ভব তা-ই না, ঘটারই কথা। এই যেমন ধরুন কিনা মাত্র গতকালই রাতে খাবারের টেবিলে কে কত বেশি খেতে পারে, সেই প্রতিযোগিতায় নামতে হয়েছিল আমাকে। ঢাউস সাইজের একটা পলেন্তা পনির মুখে পুরে গিলতে গিয়ে আটকে গেল গলায়। না পারি গিলতে, না পারি ওগরাতে। শ্বাসনালি বন্ধটন্ধ হয়ে সে যে কী ভীষণ কাণ্ড। দম আটকে মরেই গেছিলাম আর কি। অথচ মাত্র ক’দিন আগে অ্যাথেন্সের সদর বাজারের মোড়ে এক কসরত পালোয়ানকে দেখলাম ধারালো একটা তরবারি উল্টো করে ধরে কোঁত করে গিলে ফেলল। আমাদের দাঁড়ানো দর্শকদের কাছ থেকে কিছু পয়সাটয়সা চেয়ে নিল। তারপর লোকটা করল কী, একটা শিকারি বর্শা গিলে ফেলল একইভাবে। তাক লেগে গেলাম। দেখলাম, মাথাটা উল্টো দিকে কাত করে আছে লোকটা, আর বর্শার হাতল খাড়া হয়ে বেরিয়ে আছে মুখ থেকে। আর বিশ্বাস করবেন কি না, দেখি একটা সুন্দরমতন ছেলে হ্যাঁচোড়প্যাঁচোড় করে সেই হাতল বেয়ে ওপরে উঠে যাচ্ছে, যেন জলপাইগাছের ডাল বেয়ে উঠছে একটা সাপ; ছেলেটার গায়ে হাড়গোড় কিছু আছে বলে মনে হলো না। কী বলবেন এটাকে!” এটুকু বলে আমি আবার সঙ্গী গল্পবাজ লোকটার দিকে ফিরে বললাম, “এবার বলুন ভাই, ঝেড়ে দিন আপনার গল্প। আপনার বন্ধু করুক না করুক, আমি আপনার কাহিনি খুব বিশ্বাস করব। শুধু বিশ্বাসই করব না, আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতার নিদর্শন হিসেবে সামনের সরাইখানায় আপনাকে ভোজ খাওয়াব।”

“জ্বি, আপনার প্রস্তাবের জন্য ধন্যবাদ,” বলল লোকটা। “নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করার বিনিময়ে আমি কোনো উপঢৌকন চাই না। সূর্য সাক্ষী, যা বলব, প্রত্যেক বর্ণ সত্য। আর বিকেল নাগাদ থেসালির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শহর হাইপাতায় গিয়ে পৌঁছালে তখন নিজে থেকেই টের পাবেন সত্যি বলছি কি না। ওখানে সবাই জানে আমার ঘটনাটা কী ঘটেছিল। বুঝবেন, এগুলো সবার সামনে ঘটেছে। আমার নাম-পরিচয় দিয়ে নিই আগে। আমি ইজিনেতা দ্বীপের অধিবাসী, সওদাগরি কারবার করি। থেসালি, ইতোলিয়া, বোয়েতিয়া— এসব এলাকায় নিয়মিত যাতায়াত আমার। মধু, পনির— এসব হাবিজাবি জিনিস কিনি। নাম আমার আরিস্তোমেনিস। একবার হলো কী, হাইপাতা থেকে খবর পেলাম, উঁচু মানের বিপুল পরিমাণ পনির ওখানে পানির দরে বিক্রি হবে। দে ছুট। আমাদের কারবারই তো এমন। খবর পেয়েছ কী, ছুট লাগাও। কিন্তু সেবার কপাল মন্দ। শহরে পা দিয়ে শুনি লুপাস নামে এক জাঁদরেল সওদাগর আগের দিন সব হাত করে ফেলেছে। পড়িমরি ছুটে এসে এমন ঠনঠন কপাল! ভীষণ মনমরা হয়ে সন্ধ্যাবেলা গেলাম গণগোসলখানা বা আম-হাম্মামখানায়। সেখানে গিয়ে দেখি কী, আরে আমার পুরোনো বন্ধু সোক্রাতেস যে! তাকে দেখে চেনা ভার, এমন হাড় জিরজিরে মলিনমুখো হয়ে গেছে। একটা নোংরা, শতছিন্ন পুরোনো চাদরে কোনোরকমে শরীর আধখানা মুড়ে মাটিতে বসে আছে, ভিখারিদের মতো। আগে খুব দহরম-মহরম ছিল আমাদের মধ্যে। কিন্তু তবু চট করে তাকে সম্ভাষণ জানাতে কেমন একটু বাধল যেন। শেষে বলেই ফেললাম, ‘কী ব্যাপার, সোক্রাতেস! এসবের মানে কী? এমন বিতিকিচ্ছি অবস্থায় এখানে বসে আছিস কেন? কোনো অপরাধটপরাধ করিসনি তো? জানিস, খাতায়-কলমে তোকে মৃত ঘোষণা করা হয়ে গেছে? তোর পরিবার তোর জন্য শোক পালন করে কুলখানিও সেরে ফেলেছে? তোর সন্তানেরা এখন আদালতের পোষ্য। আর তোর হতভাগা বউ, সে তো কাঁদতে কাঁদতে চোখ প্রায় অন্ধ করে ফেলেছে। তাকে আবার বিয়ের পিঁড়িতে বসতে চাপাচাপি করছে সবাই। আর এখানে তুই বসে আছিস ভূতের মতো! তুই তো আচ্ছা গাড়ল একটা!’

“সোক্রাতেস বলল, ‘শোন আরিস্তোমেনিস, ভাগ্য যে একটা লোককে নিয়ে কত ছিনিমিনি খেলতে পারে, তুই যদি একবার শুনতি, এভাবে বলতে পারতি না।’ বলে লজ্জায় রক্তিম হয়ে চাদরে মুখ ঢাকল সোক্রাতেস। সেটা করতে গিয়ে তার শরীরের নিচের অংশ বেরিয়ে পড়ল।

“আর থাকতে পারলাম না। তাকে ধরে মাটি থেকে তোলার চেষ্টা করলাম। কিন্তু জেদি ভঙ্গিতে গাঁইগুঁই করল সে। ‘আমাকে ছেড়ে দে! বিধিলিপি যা খুশি, আমাকে নিয়ে তা-ই করতে থাকুক, যতক্ষণ খুশি, যেভাবে খুশি।’

“জোরাজুরির একপর্যায়ে সে উঠে আসতে রাজি হলো। আমার দুটো চাদরের একটা খুলে তাকে দিলাম। দ্রুত ঠেলে ঢুকিয়ে দিলাম একটা খাস হাম্মামঘরে। ব্যাপক ঘষে আর দলাইমলাই করে গা থেকে কয়েক স্তরের ময়লা সাফ করে দিলাম। তারপর তাকে নিয়ে এলাম আমার সরাইখানায়। একটা তোশকে বসিয়ে খাবারদাবার আর পানীয় খেতে দিলাম। বাড়ির খবরাখবর জানালাম তাকে। পেটে দানাপানি পড়ায় একটু চাঙা হলো সোক্রাতেস। টুকটাক ঠাট্টা-তামাশাও করতে শুরু করল। মাঝেমধ্যে হেসে উঠছে শব্দ করে। তারপর হঠাৎ ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে কপাল চাপড়ে বলে উঠল, ‘কী যে পোড়া কপাল আমার। লারিসায় গ্ল্যাডিয়েটরদের লড়াই দেখতে গিয়েই বিপত্তির শুরু। মাসিদোনিয়ায় গিয়েছিলাম বাণিজ্যের কাজে। সেখানে কিছু টাকাপয়সা কামিয়ে ১০ মাস পর বাসায় ফিরছি। লারিসা শহরে ঢোকার মুখে একটা বন্য উপত্যকায় পড়লাম ডাকাতের খপ্পরে। বলতে গেলে সবকিছুই নিয়ে গেল ডাকাত দল। শুধু প্রাণটুকু নিয়ে ধুঁকতে ধুঁকতে কোনোক্রমে পৌঁছালাম শহরে। শহরে একটা সরাইখানায় গিয়ে উঠলাম। সেটা চালায় মেরো নামের এক মেয়েলোক। আমি তাকে ঘটনা সব খুলে বললাম। মনে হলো, আমার জন্য সহমর্মী হয়েছে মহিলা। জম্পেশ রাতের খাবার রেঁধে দিল বিনা পয়সায়। কিন্তু সে আসলে এক কুহকিনী। আমাকে জাদুটোনা করে তার দাস বানিয়ে ফেলল। তার কারণেই আজ আমার এই দুর্দশা।’

“আমি রেগে গিয়ে বললাম, যে লোক ঘরগেরস্ত ফেলে এ রকম বিদেশবিভূঁই এক কুহকিনীর দাস হয়ে পড়ে থাকতে পারে, তার এমন পরিণতিই হওয়া উচিত।

“সোক্রাতেস ঠোঁটে আঙুল চাপা দিয়ে বলল, ‘শ্‌শ্...! ওই ডাকিনীর বিরুদ্ধে কিছু বলিস না দোস্ত। শুনে ফেললে সর্বনাশের অন্ত থাকবে না।’

“‘তাই নাকি? জাদুটোনায় খুব পাকা বলছিস? খুব এলেমদার?’

“‘কসম কেটে বলছি, জাদুটোনায় মেরোর চেয়ে এলেমদার কেউ নেই। ও চাইলে আকাশকে মাটিতে নামিয়ে আনতে পারে, মাটিকে তুলে দিতে পারে আকাশে। ও যদি চায় নদীর স্রোত থেমে যাবে, চোখের নিমেষে হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে পাহাড়। মৃত লোককে পায়ের ওপর দাঁড় করিয়ে দিতে পারে ও, দেবতাদের ফেলে দিতে পারে সিংহাসন থেকে। ইচ্ছা করলে ও নক্ষত্রদেরও নিভিয়ে দিতে পারে।’

“‘আরে রাখ এইসব জারিজুরি। ও মহিলা মায়াজালে তোকে বশ করেছে বলে তোর এমন মনে হচ্ছে। আসলে তো সব বুজরুকি।’

“‘না রে দোস্ত। বুজরুকি না। আমি নিজে দেখেছি। শুধু গ্রিক না, ভারতীয়, মিসরীয় নানা জাতের লোকজনকে দাস বানিয়ে রেখেছে সে। একবার এক দাস তাকে ঠকানোর চেষ্টা করেছিল। কী এক মন্ত্র পড়ল শুধু, সেই লোক উদ্বিড়ালে পরিণত হলো। প্রতিবেশী আরেক সরাইখানার মালিক ছিল তার ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বী। রেগে গিয়ে তাকে একটা ব্যাঙ বানিয়ে দিল এই মহিলা। এখন সেই লোক নিজের সরাইখানায় নিজের বানানো চৌবাচ্চায় সাঁতার কেটে বেড়ায়। একবার ডাকিনী-যোগিনী হওয়ার অভিযোগে আদালতে মামলা ঠুকে দিয়েছিল কেউ তার বিরুদ্ধে। সেখানে যে উকিল তার বিরুদ্ধে আদালতে ওকালতি করেছে, তাকে সে ভেড়া বানিয়ে রেখেছে। আদালত চত্বরে গেলেই তাকে দেখতে পাবি। ঘুরে বেড়াচ্ছে আর ব্যা ব্যা করছে। আরেকবার তারই এক দাসের বউ তাকে তুমুল গালিগালাজ করেছিল। রেগে গিয়ে মেরো তাকে এমন অভিশাপ দিয়েছে, সেই মহিলার শরীর ফুলতে ফুলতে এখন হাতির সমান হয়ে গেছে।’

“‘সবাই যেদিন এসব জানবে, সেদিন কী হবে?’

“‘কী আর হবে! শোন বলি, একবার বিচার-সালিস বসেছিল তার বিরুদ্ধে। পরদিন তাকে পাথর নিক্ষেপ করে মেরে ফেলা হবে, সাব্যস্ত হলো। একটা দিন হাতে পাওয়াই যথেষ্ট মেরোর জন্য। রাতের বেলা নিজের কক্ষে একটা গর্ত খুঁড়ে তার সামনে নানা রকম সাধন-ভজন করল সে। তারপর হাইপাতা শহরের সবার দরজায় এমন এক বাণ মেরে দিল, পরদিন কারও দরজা আর খোলে না। খোলে না তো খোলেই না, সাতটা হাতি দিয়ে টানাটানি করলেও না। আটচল্লিশ ঘণ্টায় কেউ বাড়ির বাইরে পা রাখতে পারল না। এমনকি দেয়ালের নিচ দিয়ে সুড়ঙ্গ কাটার চেষ্টা করেও লাভ হয়নি। শেষে জানালাপথে সবাই মেরোর উদ্দেশ্যে সে কী কাকুতি-মিনতি। সবাই কসম কেটে বলল, এ যাত্রা তাদের ছেড়ে দিলে তারা কেউ আর তাকে নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করবে না। বরং তার যাতে কোনো অনিষ্ট কেউ করতে না পারে, এখন থেকে সেটাই হবে তাদের প্রধান দায়িত্ব। তখন মেরোর মন গলল, জাদুর প্রভাব সরিয়ে নিল সে। তবে সালিস সভার মাতবর লোকটাকে সে ছাড়ল না। মাঝরাতে এমন এক বাণ মারল, জানালা-কপাট, দেয়াল-দস্তুরসহ পুরো বাড়িটা তার উড়ে গিয়ে পড়ল ১০০ মাইল দূরের আরেকটা শহরে। সেই শহর এক পাহাড়ের চূড়ায়। পানিটানি নেই। বৃষ্টির পানি সম্বল। শহরের সব বাড়ি এমন গা-ঘেঁষাঘেঁষি যে, এই মাতবরের বাড়ির জন্য কোনো জায়গা সেখানে ছিল না। ফলে তার বাড়িটা শহরের মূল ফটকের বাইরে পাহাড়ের ঢালে কাত হয়ে ঝুলে রইল।’

“আমি বললাম, ‘দ্যাখ, যা শোনাচ্ছিস, ভয়ংকর লাগছে। একটু একটু যে ভয় পেতে শুরু করেছি, সেটা অস্বীকার করব না। একটু কী, ভীষণ ভয়ই লাগছে আসলে। ধর যে, তার পোষা প্রেতাত্মা-টেতাত্মারা যদি কোনোভাবে শুনে ফেলে আমাদের এসব কথাবার্তা, আর গিয়ে মেরোর কানে দেয়, কী হবে? তার চেয়ে চল দোস্ত, কথা না বাড়িয়ে শুয়ে পড়ি। রাত এখনো বাড়েনি। কাল ভোরে উঠেই চম্পট দেব। পা চালিয়ে এ শহর থেকে যত দূরে সরে পড়া যায়, যাব। এখানে আর এক দণ্ড না।’

“আমি কথা শেষ করেছি কি করিনি, দেখি সোক্রাতেস নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। বুঝলাম, ক্লান্ত শরীরে ভরপেট খানাদানার ফল। শোয়ার ঘরের দরজা ভালো করে খিল এঁটে দিলাম। আমার খাট টেনে এনে দরজায় পাল্লার বিপরীতে ঠেস লাগিয়ে দিলাম। তোশক ঝেড়েটেড়ে শুয়ে পড়লাম তার ওপর। কিন্তু ঘুম তো আসে না। সোক্রাতেসের গল্প খালি মাথায় ঘুরছে। মাঝরাতের দিকে একটু তন্দ্রামতন লেগেছে, বিকট শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। দড়াম করে খুলে গেল দরজার পাল্লা। একদল ডাকু একসঙ্গে ধাক্কা দিলেও এত জোরে খোলা সম্ভব ছিল না দরজা। ছিটকিনি, কব্জা, খিল, হুড়কা সব খুলে ছিটকে গেল, এমনকি আমার খাটিয়াটাও। এমনিতেই ঘুণে ধরা খাটিয়া, একটা পা নড়বড়ে, সেটা শূন্যে উঠে উল্টো হয়ে পড়ল আমারই গায়ের ওপর। আমি নিচে, আমার ওপরে খাটিয়া।

“মানুষের মন বড় বিচিত্র কাণ্ড করে। ওই দুর্যোগের মধ্যেও কী মনে করে আমি মশকরা করলাম। নিজেকে বললাম, ‘দ্যাখ বাবা আরিস্তোমেনিস, তুই কেমন কচ্ছপে পরিণত হয়েছিস!’ মেঝেতে চিতপটাং খাটিয়াচাপা হয়ে আছি বটে, কিন্তু টের পেলাম, এতে কিছুটা বরং নিরাপদেই আছি আমি। কচ্ছপ যেমন নিজের খোলসের মধ্যে নিরাপদ থেকে কেবল মাথাটা বের করে, সেভাবে খাটিয়ার খোলসের ভেতর থেকে মাথা বের করে উঁকি দিলাম। দেখি বিকট দর্শন দুই বুড়ি মহিলা ঢুকল ঘরের ভেতর। তাদের একজনের হাতে জ্বলন্ত মশাল। আরেকজনের এক হাতে এক টুকরো স্পঞ্জ, আরেক হাতে খোলা তরবারি। তারা দু’জন গিয়ে দাঁড়াল ঘুমন্ত সোক্রাতেসের সামনে। এক বুড়ি আরেক বুড়িকে বলল, ‘দ্যাখ বোন পানথিয়া, এই সেই বিশ্বাসঘাতক। একে আমি খাইয়ে-পরিয়ে কত যত্নে রেখেছিলাম, কিন্তু এ দিন-রাত আমার সঙ্গে চালাকি করেছে। কৃতজ্ঞতার কোনো ছিটেফোঁটা তো নে-ই এর মধ্যে, এখন উল্টো শহরজুড়ে আমার নামে বদনাম করে বেড়াচ্ছে। পালিয়ে যাওয়ার ষড়যন্ত্র করছে আমার কাছ থেকে। কী ভেবেছে, পালিয়ে গেলে আমি ওর জন্য কান্নাকাটি করব?’ এই বলে বুড়ি আমার দিকে ফিরল। ‘আর ওই যে ওখানে খাটিয়ার তলা থেকে উঁকি দিচ্ছে, এই পাজিটা হলো আরিস্তোমেনিস। ও-ই ফুঁসলেছে আমার সোক্রাতেসকে। এরা দু’জন যদি ভেবে থাকে, আমার নাগপাশ কেটে পালিয়ে যেতে পারবে, এর চেয়ে গর্দভ আর হয় না। আজ রাতে আমাকে নিয়ে কী সব বাজে বাজে কথাই না বলেছে এটা। দেখব, কেমন সন্তাপ করে মরে এ পাজি।’

“আমার শরীরজুড়ে শীতল ঘাম ছুটতে শুরু করল। ভয়ে এমন থরহরি কাঁপতে লাগলাম যে খটাখট আওয়াজ তুলে খাটটা আমার ওপর নাচতে লাগল।

“ততক্ষণে বুঝে গেছি, এই দুই বুড়ির একজন যদি পানথিয়া হয়, তো আরেক বুড়ি মেরো ছাড়া আর কেউ নয়। পানথিয়া মেরোকে বলল, ‘বোন, একে কি এখনই কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলব, নাকি বেঁধে করাতকলে উঠিয়ে দেব, যাতে ধীরে ধীরে শরীর কেটে দুই টুকরো হওয়া তারিয়ে তারিয়ে দেখতে পারি?’

“‘কিছু করতে হবে না। পাজিটাকে রেখে দে। কাল সোক্রাতেসের কবর খোঁড়ার জন্য একজন তো লাগবে।’

“এই বলে ঘ্যাঁচ করে ঘুমন্ত সোক্রাতেলের গলায় তরবারি চালিয়ে দিল মেরো। একটা মৃদু আওয়াজ তুলেই আমার বন্ধু মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল।

“গলা দিয়ে ফিনকির মতো রক্ত ছুটছে। স্পঞ্জ দিয়ে রক্ত মুছে ফেলল সিনথিয়া। তারপর কেটে যাওয়া ক্ষতের ভেতরে স্পঞ্জটা ঢুকিয়ে দিতে দিতে মন্ত্র পড়ল :

‘স্পঞ্জ রে স্পঞ্জ, বলি তোকে, লোনা সাগর জল
না যেন মেশে নদীর জলে, সাবধানে তুই চল’

“এবার দুই বুড়ি আমার কাছে এলো। খাটিয়া সরিয়ে দু’জনে আমার বুকের ওপর বসল। তীব্র চোখে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ আমার দিকে। তারপর উঠে দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল। তারা বেরোনোমাত্র দরজার পাল্লা আপনাআপনি মেঝে থেকে উঠে চৌকাঠের সঙ্গে লেগে গেল; কব্জা, হুড়কা, ছিটকিনি সব যে যার জায়গায় টুপটুপ করে বসে গেল আগের মতো।

“মেঝেতে চিত হয়ে পড়ে আছি। ঠাণ্ডায় জমে গেছে শরীর। বেঁচে আছি বটে, কিন্তু এর চেয়ে তো মরে যাওয়াই ভালো। কাল সকালে সবাই যখন সোক্রাতেসের মৃতদেহ আবিষ্কার করবে, আর দেখবে ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ, তখন সবাই ধরে নেবে আমিই হত্যাকারী। কেউ কি বিশ্বাস করবে আমার ব্যাখ্যা? সবাই বলবে, দুটো অবলা মেয়েমানুষের সঙ্গে পেরে উঠতে পারেননি তো, বীরের মতো সাহায্যের জন্য চিৎকার-চেঁচামেচি করেননি কেন? অনেকে বলবে, আপনি এমন সোমত্থ, সুঠামদেহী একটা লোক, দুটি বুড়ি আপনার বন্ধুর গলা কাটছে, আর আপনি একটা টুঁ-শব্দও করলেন না? সন্দেহ বাতিকগ্রস্ত অন্যরা বলবে, তো আপনার বন্ধুকে ওরা মেরে ফেলল, কিন্তু আপনার গায়ে আঁচড়টিও কাটল না, বিষয়টা কী? আপনাকে ওরা বাঁচিয়ে রাখল কেন? হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী রেখে দেওয়ার জন্য?

“শুয়ে আছি আর এসব সাতপাঁচ চিন্তা মাথায় ঘুরছে।

“রাত ফুরিয়ে আসছে। সাব্যস্ত করলাম, ভোরের আলো ফোটার আগেই গোপনে সটকে পড়তে হবে সরাইখানা থেকে।

“বাক্সপেটরা গুছিয়ে নিলাম। দরজার হুড়কা নামিয়ে রাখলাম। কিন্তু খানিক আগেও যে দরজা শত্রুদের ঢোকার জন্য অমন হাট হয়ে খুলে গিয়েছিল, এখন সেটা আমাকে বেরোতে দিতে রাজি না। তালায় চাবি ঢুকিয়ে এদিক ঘোরাই, ওদিক ঘোরাই, কাজ হয় না। অনেক কায়দা-কসরত, ঝাঁকাঝাঁকির পর তালা খুলল।

“বাইরের উঠানে পা রেখে হাঁক দিলাম, ‘বেয়ারা, এই বেয়ারা, কোথায় গেলি? গেট খুলে দে। ভোরের আগেই আমাকে বের হতে হবে।’

“গেটের গোড়ায় গুটিসুটি ঘুমিয়ে ছিল বেয়ারা। হাঁকডাকে আধজাগনা হলো সে। ঘুমজড়ানো কণ্ঠে বলল, ‘কে? এই রাতের বেলা গেট খুলতে কে বলছেন? জানেন না বাইরে চোর-ডাকাত, বাটপার থিকথিক করছে? জানের মায়া আপনার না থাকতে পারে, বা কোনো অপকর্ম করে সটকে পড়ার ইচ্ছা আপনার থাকলেও থাকতে পারে। কিন্তু আপনার জন্য আমি নিজের জানটা এভাবে কোরবান করার ঝুঁকি নেব কেন? আমি দরজা খুলি আর ডাকুরা দলেবলে ঢুকে পড়ুক আরকি!’

“আমি ঝামটে উঠলাম, ‘ভোর হয়ে এসেছে, বুরবক কোথাকার! আর ডাকুরা তোর কী ক্ষতিটা করবে? তোর আছেটা কী? এত ভয় পাওয়ার কী হলো রে ডরপুক!’

“ঘুমের মধ্যে পাশ ফিরে শুলো বেয়ারা। বিড়বিড় করে বলল, ‘আমি কী করে বুঝব যে, ঘরের মধ্যে আপনি আপনার বন্ধুকে খুনটুন করে এখন রাতের অন্ধকারে সটকে পড়ার পাঁয়তারা করছেন না?’

“ঘুমন্ত বেয়ারার মুখে এ কথা শুনে আমি পাথর হয়ে গেলাম। চর্মচক্ষে নরকের ভেতরটা দেখতে পেলাম। দেখলাম, একটা ক্ষুধার্ত তিন মাথাওয়ালা কুকুর মুখ হাঁ করে আছে। আর সন্দেহ রইল না, মেরো আমাকে হত্যা না করে ছেড়ে দিয়েছে আরও বড় সাজা দেওয়ার জন্য। আমাকে ক্রুশে ঝোলানোর ফাঁদ পেতেছে সে।

“মেরোর পরিকল্পনা বানচাল করার একটাই উপায়।

“আমি আমার ঘরে ফিরে এলাম। গলায় ফাঁস লাগিয়ে ঝুলে পড়ব, যা থাকে কপালে!

“কিন্তু দড়ি পাই কোথায়? নিজের ভাঙা খাটখানার দিকে তাকালাম। ওটার উদ্দেশ্যে বললাম, ‘শোন খাট-খটাশ আমার, এই ত্রিভুবনে একমাত্র তুই-ই আমার আসল বন্ধু, আমার মতো তোকেও আজ নাস্তানাবুদ হতে হয়েছে। আমি যে নিষ্পাপ, তার একমাত্র সাক্ষী তুই। একটু দয়া কর। একটা কিছু দে, যেটা দিয়ে আমি আমার ভবলীলা সাঙ্গ করতে পারি। আমি আর বেঁচে থাকতে চাই না, খাট-খটাশ। এ জীবন রেখে আর কী হবে?’

“খাটিয়ার জবাব নিজে নিজে কল্পনা করে নিলাম। তারপর টেনে বের করলাম সেটার গাঁথুনির একটা দড়ি। এক প্রান্তে একটা ফাঁস বানিয়ে অপর প্রান্তে একটা হুঁকের মতো তৈরি করলাম। সেই প্রান্তটা জানালার শিকে আটকে দিয়ে উঠে দাঁড়ালাম খাটের ওপর। দড়ির ফাঁস গলিয়ে দিলাম গলায়। লাথি কষে সরিয়ে দিলাম খাটিয়া।

“আমার আত্মহত্যার চেষ্টা সফল হয়নি। দড়িটা ছিল পুরোনো আর ঝুরঝুরে। আমার দেহের ভারে সেটা পট করে ছিঁড়ে গেল। দড়াম করে আছড়ে পড়লাম মেঝেতে। কাশতে কাশতে গড়িয়ে গেলাম বন্ধু সোক্রাতেসের লাশের ওপর। কাছেই তোশকের ওপর ছিল তার লাশ।

“ঠিক সেই মুহূর্তে দারোয়ান ঢুকে পড়ল ঘরে। ঢুকেই চিৎকার, ‘এই যে আপনি! একটু আগে না আপনি চলে যাওয়ার তাড়া দেখাচ্ছিলেন খুব। এখানে কী করছেন আপনি? তোশকের ওপর ওভাবে গড়াগড়ি করে শূকরের মতো ঘোঁত ঘোঁত করছেন কেন?’

“আমি জবাব দেওয়ার জন্য মুখ খুলতে যাব, তড়াক করে উঠে বসল সোক্রাতেস। সেটা আমার দেহের চাপে, নাকি দারোয়ানের কর্কশ চিল্লানির চোটে, কে জানে। তবে সে যেন ঘুম ভেঙে এইমাত্র জেগে উঠেছে। আর আমাকে অবাক করে কড়া গলায় কথা বলে উঠল সোক্রাতেস। বলল, ‘শুনেছি মুসাফিররা গালিগালাজ করে সরাইখানার বেয়ারাদের। সেটা যে এমনি এমনি করে না, দেখতেই পাচ্ছি। ক্লান্ত শরীরে একটু ঘুমিয়েছি কি ঘুমাইনি, এই বেয়ারা দ্যাখো, দুমদাম শব্দে ঘরে ঢুকে পড়েছে। আর কী ভীষণ চিল্লাচ্ছে, দ্যাখো, ভেবেছে আমাদের নজর অন্যদিকে ঘুরিয়ে ঘর থেকে জিনিসপত্র হাতিয়ে নেবে। কয়েক মাসে প্রথম একটু ঘুমানোর মতো করে ঘুমিয়েছিলাম, পাজিটা আমার ঘুম নষ্ট করল।’

“সোক্রাতেসের গলার আওয়াজ শুনে আমি খুশিতে লাফিয়ে উঠলাম। বেয়ারাকে বললাম, ‘আরে না, না! তুমি হলে দুনিয়ার সেরা বেয়ারা। তোমার মতো সৎ লোক হয়-ই না। কিন্তু এই যে ভালো করে তাকিয়ে দেখো, এ-ই আমার সেই বন্ধু, যাকে হত্যার ইলজাম তুমি লাগাতে চেষ্টা করছিলে আমার বিরুদ্ধে। দ্যাখো, দ্যাখো, এ-ই আমার বন্ধু, যাকে আমি নিজের বাপ-ভাইদের চেয়েও বেশি ভালোবাসি।’

“আনন্দের চোটে আমি সোক্রাতেসকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেলাম। সোক্রাতেস ঝটকা মেরে আমাকে সরিয়ে দিল। বলল, ‘এহ! ছ্যা! তোর গা থেকে এমন বিশ্রী গন্ধ বেরোচ্ছে কেন রে? মনে হচ্ছে নর্দমার মধ্যে থেকে উঠে এসেছিস!’

“আমি তার হাত চেপে ধরে বললাম, ‘এখন আর কিসের জন্য অপেক্ষা? চল, এক্ষুনি বেরিয়ে পড়ি। বাইরে ভোরের কী তাজা বাতাস।’

“‘নয়, কেন,’ বলে উঠে পড়ল সোক্রাতেস।

“আমার বাক্সপেটরা আরেক দফা পিঠে চাপালাম। সরাইখানার ভাড়া মিটিয়ে দিলাম বেয়ারাকে। দেখতে না দেখতে সোক্রাতেস আর আমি সদর রাস্তায় হাঁটছি।

“শহর ছাড়িয়ে কিছু দূর গেলাম। ভোরের আলোয় পল্লি গ্রাম উদ্ভাসিত হচ্ছে আমাদের চোখের সামনে। তখন প্রথমবারের মতো ভালো করে তাকালাম সোক্রাতেসের দিকে। বিশেষ করে নজর বোলালাম তার গলায়। তরবারির কোপটা কোথায় লেগেছিল বোঝার চেষ্টা করলাম। আঘাতের কোনো ক্ষতচিহ্নই নেই। না কোনো কাটা দাগ, না কোনো স্পঞ্জ উঁকি মারছে। ভাবলাম, কী ভয়ানক দুঃস্বপ্ন রে বাবা! নিশ্চয়ই বেশি মদ পান করে ফেলেছি বলেই এই বিপত্তি। শব্দ করে বলে উঠলাম, ‘ডাক্তাররা কী আর এমনি এমনি বলে, রাতে ভরপেট খেয়ে শুরা পান কোরো না, দুঃস্বপ্নের চোটে ঘাম ছুটে যাবে। উফ্! কী ভীষণ স্বপ্নই না দেখলাম কাল রাতে। দেখি সারা গা রক্ত মাখামাখি।’

“সোক্রাতেস হেসে উঠল। ‘রক্তের কথা বলছিস! আমিও রাতে ভয়ানক দুঃস্বপ্ন দেখলাম। তুই বলার পর এখন মনে পড়ছে : স্বপ্নে দেখলাম যে, কেউ আমার গলা কেটে ফেলেছে। কাটা জায়গাটায় ভীষণ ব্যথাও অনুভব করছিলাম। তারপর কেউ আমার হৃৎপিণ্ডটা টেনে বের করে ফেলল। সেটা এমন অবর্ণনীয় এক অনুভূতি, এখন চিন্তা করলেও কেমন অস্বস্তি লাগছে, হাঁটু কাঁপছে, মনে হচ্ছে যেন এখনই বসে পড়ি পথের ওপর। তোর কাছে খাবারদাবার কিছু থাকলে দে, দোস্ত।’

“পিঠের ঝোলা খুলে রুটি আর পনির বের করলাম। ‘ওই বড় বটগাছটার নিচে গিয়ে নাশতা সারি, চল।’

“দু’জনে খেতে বসার পর লক্ষ করলাম, সোক্ৰাতেসের মধ্যে আগের তরতাজা ভাব ততটা নেই। কেমন ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে ওকে। গোগ্রাসে খাচ্ছে বটে, কিন্তু তার মুখমণ্ডল ক্রমেই বর্ণহীন হয়ে যাচ্ছে। এ মুহূর্তে আমার চেহারাতেও নিশ্চয়ই ও রকমই ফ্যাকাশে ভাব ছড়িয়ে পড়েছে, কেননা ওই দুই ভয়ংকর বুড়ির চেহারা ভেসে উঠছে আমার মনের মধ্যে। গত রাতের সব আতঙ্ক হঠাৎ গ্রাস করল আমাকে। এক টুকরো রুটি ছিঁড়ে মুখে দিতে সেটা গলায় আটকে গেল। গিলতে পারি না, ওগরাতেও পারি না। ধীরে ধীরে উদ্বেগে ছেয়ে যাচ্ছে মন। সোক্রাতেস কি বাঁচবে? বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছু লোকজনের চলাফেরা শুরু হয়েছে। তারা যখন দেখবে, একসঙ্গে হেঁটে যেতে যেতে একটা লোক রহস্যজনকভাবে মারা গেল, তখন স্বাভাবিকভাবেই অপর সঙ্গীর প্রতি সন্দেহ জাগবে তাদের। গোগ্রাসে খেয়ে রুটি আর পনির একাই সাবাড় করল সোজাতেস। তারপর বলল, খুব তেষ্টা পেয়েছে তার। কয়েক গজ দূরে একটা নালা বয়ে গেছে। স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ তার নিস্তরঙ্গ পানি। রাস্তা থেকে দেখা যায় না নালাটা। আমি ডাকলাম, ‘এখানে আয় সোক্রাতেস। দ্যাখ, দুধের চেয়েও সুস্বাদু পানি। চল, খেয়ে নেই।’ জায়গা থেকে উঠে দাড়াল সে। হেঁটে এলো খালের পাড়ে। একটা জুতসই জায়গা খুঁজে উবু হয়ে বসে গপগপ করে খেতে লাগল পানি। কিন্তু পানি খাওয়ামাত্র তার গলার কাঁটা ক্ষত আবার খুলে গেল, সেখান দিয়ে বেরিয়ে এলো সেই স্পঞ্জ, টুপ করে সেটা পড়ল খালের পানিতে। টপটপ করে পানিতে পড়তে লাগল রক্তের ফোঁটা। আমি ছুটে এসে ওর একটা পা ধরে না ফেললে সোক্রাতেস গড়িয়ে পানিতে পড়ে যেত। টেনে তাকে ডাঙায় তুললাম। ততক্ষণে মরে পাথর হয়ে গেছে সোক্রাতেস।


“তড়িঘড়ি অন্ত্যেষ্টি সারলাম। বালুময় মাটি হাত দিয়ে খুঁড়ে খুঁড়ে গর্ত করলাম একটা। সেখানে খালের পাড়ে চিরনিদ্রায় শায়িত করলাম বন্ধুকে। তারপর ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে, ঘামতে ঘামতে মাঠের মধ্য দিয়ে ছুটতে থাকলাম। বারবার দিক বদলাচ্ছি আর ছুটছি, হোঁচট খেয়ে পড়ছি, উঠে আবার ছুটছি, থামছি না একবারও। ছুটছি জনহীন প্রান্তরের সন্ধানে, আমাকে কেউ যেন খুঁজে না পায়।

“ইজিনা দ্বীপে নিজের বাস্তুভিটায় আর ফিরিনি আমি। নিজেকে বন্ধুর হত্যাকারী মনে হয় আমার। বিবেক দংশনে আমি আমার জন্মভূমি পরিত্যাগ করেছি, চিরতরে ছেড়ে গেছি আমার ব্যবসা-বাণিজ্য, আমার স্ত্রী, আমার সন্তানকে। ইতোলিয়ায় নির্বাসিত জীবন বেছে নিয়েছি আমি। সেখানেই বিয়েথা করেছি।”


আরিস্তোমেনিসের গল্প শেষ হলো। তার সঙ্গী যে লোকটা আগে এই গল্প একবর্ণও বিশ্বাস করেনি, সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি আমার গোটা জীবনে একসঙ্গে এত উদ্ভট বাকোয়াজি শুনিনি। এর চেয়ে গাঁজাখুরি কাহিনি কারও পক্ষে বলা সম্ভব নয়। পোশাক-আশাকে আপনাকে তো শিক্ষিত লোক বলেই মনে হয়। তা ভাই, আপনি নিশ্চয়ই এ গল্প সত্যি বলে বিশ্বাস করেননি, তাই না?”

আমি বললাম, “বলতে কী, এই দুনিয়ায় অসম্ভব বলে কিছু আছে, সেটা আমি মানি না। আমাদের জীবনে এমন ঘটনা মাঝেমধ্যে ঘটে, যেগুলো এত মাথামুণ্ডুহীন, বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। সাধারণ লোকে সেটাকে আজগুবি বলে উড়িয়ে দিতে পারে বটে। সত্যি বলতে, আরিস্তোমেনিসের গল্প আমি বিশ্বাস করছি। গল্প বলে আমার পথচলার সময়টা আনন্দে ভরিয়ে দেওয়ার জন্য আমি তার কাছে কৃতজ্ঞ। তার গল্পে বিভোর ছিলাম বলে বুঝতেই পারিনি, পাহাড়ের এমন খাড়া চড়াই বেয়ে কখন উঠে পড়েছি। ওই যে দেখুন, ওটা নিশ্চয়ই শহরে ঢোকার প্রধান ফটক। ঘোড়ার না চেপে শুধু পায়ে হেঁটে এত পথ পাড়ি দিয়ে ফেলেছি, বিশ্বাস করাই কঠিন। আমার ঘোড়াও নিশ্চয়ই আপনাদের ধন্যবাদ জানাবে। আরিস্তোমেনিস তার খাটুনি কমিয়ে দিয়েছে।”

একটু যেতেই আমাদের পথ আলাদা হয়ে গেল। বাঁ দিকের রাস্তা নিল লোক দুটো, কিছু দূর গিয়ে একটা লোকালয়ে মিশেছে রাস্তাটা। সোজা হাঁটতে থাকলাম হাইপাতা শহরের দিকে— আরিস্তোমেনিসের গল্প বিশ্বাস করলে, এ শহরেই বসবাস ভয়ংকর সেই ডাকিনীর।


---E-Book Created By---
Md. Ashiqur Rahman

দ্বিতীয় অধ্যায়

হাইপাতা শহরে


হাইপাতা শহরে ঢুকে প্রথম যে সরাইখানা পড়ল, তার দরজায় কড়া নাড়লাম আমি। এক বুড়ি দরজা খুললেন।

“সুপ্রভাত, আন্টি। এই শহরের খুব গণ্যমান্য এক লোক, নাম মিলো, তার বাড়িটা কোথায় বলতে পারেন?”

বুড়ি মুচকে হাসলেন। “গণ্যমান্য? হ্যাঁ, তা বলতে পারো। কেননা, শহরে ঢুকতে তার বাড়ি সবার আগে পড়ে বটে। নগর দেয়ালের বাইরে ফাঁকা জায়গায় তার বাসা।”

“উনি লোকটা কেমন, একটু বলবেন কি? আর তাঁর বাসায় কীভাবে যাওয়া যাবে?”

“শহরের দিকে মুখ করে থাকা জানালাগুলো ধরে এগোও। জানালার শেষ সারিটার ওপারে একটা গেট পাবে, সেই গেট দিয়ে ঢুকলে একটা কানাগলি। ওই গলিতেই মিলোর বাড়ি। অসম্ভব ধনী সে। কিন্তু পুরো শহরের কলঙ্ক লোকটা। তার মতো এমন নিচু মনের, হাড়কিপ্টা, নোংরা লোক আর পাবে না। লোকটা সুদখোর। ওই একটা কাজই পারে সে। আর কোনো কিছুতে কোনো আগ্রহ নেই। বিশাল বাড়িতে সারা দিন বসে থাকে আর পয়সা গোনে। স্ত্রী আর এক চাকরানি ছাড়া তার সঙ্গে আর কেউ থাকে না।”

বুড়ির কাছে ঠিকানা নিয়ে মিলোর বাড়ির দিকে পা বাড়ালাম। কিছু দূর যেতেই বুড়ির বাতলানো সেই গেটের দেখা মিলল। কিন্তু সেটা আটকানো। আমি গেট ধরে ঝাঁকালাম, হাঁকডাক ছাড়লাম, “কেউ আছেন ভাই!”

বেশ ডাকাডাকির পর এক দাসী বেরিয়ে এলো। “এতক্ষণ ধরে চিল্লাপাল্লা কি আপনিই করছিলেন?”

“জ্বি, আমি গেটে নক করছিলাম।”

“সঙ্গে সোনাদানা কী এনেছেন? জানেন না, সোনারূপা বন্ধক না দিলে টাকা ধার দেওয়া হয় না?”

“ছিঃ! অতিথিদের সঙ্গে এভাবে কথা বলে নাকি!” আমি ঝাড়ি দিলাম। “তোমার মনিব কি বাড়িতে?”

“বাড়িতে। কিন্তু তাতে আপনার কী?”

“কোরিনথিয়ান শহরের দেমিস সাহেবের একটা চিঠি এনেছি তাঁর জন্য।”

“এখানেই দাঁড়িয়ে থাকেন, আমি খবর দিচ্ছি।”

গেট লাগিয়ে দাসী ভেতরে চলে গেল। কিছুক্ষণ পরেই আবার হাজির। “মনিব বলেছেন, আপনি ভেতরে আসতে পারেন।”

মিলো তাঁর খাবার টেবিলে। একটা চিপা সোফায় বসে আছেন। খেতে শুরু করার উপক্রম করেছেন মাত্র। পায়ের কাছে বেকায়দা ভঙ্গিতে বসে আছেন তাঁর স্ত্রী।

আমাকে দেখে সামনের খালি নিচু টেবিলের দিকে হাতের ইশারা করে বললেন, “বেশ ভালো করেছেন, এক্কেবারে খাবার সময় হাজির।”

আমি ধন্যবাদ জানিয়ে চিঠিটা তাঁর হাতে দিলাম। তড়িঘড়ি খুলে চিঠি পড়লেন মিলো। “দেমিস দেখি আপনার কথা লিখেছে। আপনার মতো এ রকম এক তরতাজা তরুণকে আমার কাছে পাঠানোর জন্য দেমিসের প্রতি কৃতজ্ঞ আমি।”

সামনে নিচু টেবিলে দু’জনার বেশি খাবার নেই। তাই স্ত্রীকে ইশারায় ভেতরে পাঠিয়ে দিলেন মিলো। আমাকে বললেন বসে তাঁর সঙ্গে খেতে। আমি দোনোমনা করছি দেখে জামার আস্তিন ধরে টেনে আমাকে মেঝেতে বসালেন মিলো। “আরে বসুন না। চেয়ার-টেয়ার তেমন তো নেই এখানে। চোর-ছ্যাঁচড়দের যন্ত্রণায় কিছু বানাতেও মন চায় না।”

বসলাম অগত্যা।

“পোশাক-আশাক, আচরণ দেখে প্রথমে অনুমান করেছিলাম, বড় ঘরের সন্তান আপনি। এখন দেমিসের চিঠি পড়ে দেখি, ঠিকই ভেবেছি। তবে আমাদের বাড়িটা ছোট বলে হেলাফেলা করবেন না। এই ঘরের সঙ্গে লাগোয়া একটা ঘরে আপনাকে থাকতে দেওয়া হবে। ঘরটা আপনার পছন্দ হলে আমি সম্মানিত বোধ করব।”

আমি কিছু মুখে পোরার আগেই মিলো তাঁর দাসীকে ডাক দিলেন, “ফোতিস, এই ভদ্রলোকের ব্যাগ নিয়ে যাও আমাদের বাড়তি শোবার ঘরখানায়। সাবধানে কোথাও রাখো এটা। আর একটা তোয়ালে এনে দাও, এক টুকরো সাবান দিও। তারপর ওনাকে নিয়ে যাও সবচেয়ে কাছের গণগোসলখানায়। এই লম্বা সফরে ইনি ঘেমে কাহিল হয়ে পড়েছেন দেখতে পাচ্ছি।”

টের পেলাম, সত্যি কী ভীষণ হাড়কিপ্টা মিলো। তবে তাঁকে হেনস্তা করব না বলে ঠিক করলাম। বললাম, “তোয়ালে আর সাবানের কথা ভাববেন না। এগুলো আমি সঙ্গেই নিয়ে ঘুরি। আর আপনার দাসীকে আমার সঙ্গে দেওয়ার দরকার নেই। আমি নিজেই গোসলখানা খুঁজে নিতে পারব। আমি খালি আমার ঘোড়াটার চিন্তা করছি। এতটা পথ আমাকে পিঠে বয়ে এনেছে বেচারা। ফোতিস, তুমি কি দয়া করে ঘোড়াটাকে একটু দানাপানি কিনে দিতে পারবে? এই যে টাকা দিয়ে দিচ্ছি আমি।”

উঠানে গিয়ে বসলাম। ঘোড়াটাকে দানাপানি না দেওয়া পর্যন্ত সেখানেই কাটালাম। তারপর ফোতিস আমার ঘরদোর গুছিয়ে দিল, বিছানা পেতে দিল। এগুলো সারা হলে আমি চললাম গণগোসলখানার দিকে। পথে কাঁচাবাজার হয়ে যেতে হবে। রাতের খাবার কিনে রাখা দরকার। দুপুরে মিলো যা খাওয়াল, রাতে আর তার ওপর ভরসা করতে পারছি না।

মাছের বাজার মাছে ভরা। আমাকে দেখে মাছওয়ালা এক ঝুড়ি মাছের দাম হাঁকল দু শ দ্ৰাকমা।

তুমুল মুলামুলি করলাম। শেষে বিশ দ্রাকমায় রফা হলো। দাম চুকিয়ে মাছের ঝুড়ি হাতে হাঁটছি, পথে পাইথিয়াসের সঙ্গে দেখা। অ্যাথেন্সে আমার সহপাঠী ছিল পাইথিয়াস। সে-ই প্রথমে আমাকে চিনতে পারল। এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল।

“আরে লুসিয়াস, তুই এখানে দোস্ত! বুড়ো শিক্ষক দোসিথিয়াসের ক্লাসের কত বছর পর তোকে আবার দেখছি! কোথায় থাকিস, কী করিস? তোর কোনো খোঁজখবরই তো আমি পাই না। তা, বল দেখি, এই হাইপাতা শহরে কী মনে করে?”

“সে না হয় কাল বলব। কিন্তু দোস্ত পাইথিয়াস, তোর গায়ে একি পোশাক দেখছি রে! ম্যাজিস্ট্রেটের উর্দি কেন তোর গায়ে? আর তোকে পাহারা দিয়ে রাখা উর্দি পরা দুই কনস্টেবল কিসের?”

পাইথিয়াস বলল, “আর বলিস না, আমি এই বাজারের মহাপরিদর্শক। এখান থেকে যা-ই কিনিস, আমাকে খালি আওয়াজ দিবি।”

“দুর্দান্ত। তবে দোস্ত আমার কেনাকাটা সারা। কয়েক সের মাছ কিনলাম এইমাত্র।”

“বলিস কিরে। কই দেখা তো দেখি।”

আমার কাছ থেকে ঝুড়িটা নিয়ে নেড়েচেড়ে খুঁটিয়ে মাছ দেখল পাইথিয়াস। “তা, কত দাম নিল বল তো?”

“অনেক কচলাকচলি করে দাম বিশ দ্রাকমায় নামিয়ে এনেছি।”

“কোন মাছওয়ালা, একবার দেখিয়ে দে।”

মাছের বাজারে ফিরে এসে কোনায় বসা বুড়ো মাছওয়ালাকে দেখিয়ে দিলাম। দেখানোমাত্র চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করে তাকে গালিগালাজ শুরু করল পাইথিয়াস। বলল, “মাছপট্টির মহাপরিদর্শকের বন্ধুর সঙ্গে এই কাণ্ড করো তোমরা? এই পুঁচকে মাছ ক’খানা গছিয়ে বিশ দ্ৰাকমা খসিয়ে নিয়েছ! হাইপাতার মান-ইজ্জত থাকল কিছু? তোমরা ভেবেছ কী, শুধু বকাঝকা করে ছেড়ে দেব আমি? আমার চাকরি থাকতে না!”

এই বলে ঝুড়ি উপুড় করে মাছগুলো মাটিতে ফেলল মহাপরিদর্শক মশাই। তারপর পা দিয়ে পিষে ফেলার নির্দেশ দিল সঙ্গের দুই কনস্টেবলকে। কনস্টেবলরা লাফিয়ে লাফিয়ে মাছগুলোকে পায়ে দলে ভর্তা বানাল। সন্তুষ্ট কণ্ঠে পাইথিয়াস বলল, “নে, এখন বাড়ি যা দোস্ত। দেখলি তো, বজ্জাতটাকে কেমন উচিত শিক্ষা দিলাম।”

এই হলো আমার জ্ঞানী সহপাঠী পাইথিয়াস! তার বাহাদুরিতে আমার রাতের খাবার আর টাকা দুই-ই গচ্চা গেল।

কী আর করা, গণগোসলখানার উদ্দেশ্যে পা বাড়ালাম। বিকেল পর্যন্ত কাটালাম সেখানেই।

মিলোর বাসায় ফিরে বিছানায় গা এলিয়েছি, এমন সময় ফোতিস এসে বলল, “মনিব আপনাকে রাতের খাবার খেতে ডাকছেন।”

দুপুরের মেহমানদারির কথা মনে পড়ল। বললাম, “মনিবকে গিয়ে বলো, লম্বা সফরের ঝক্কিতে শরীর অবশ হয়ে আছে। রাতের খাবারের চেয়ে এখন ঘুম জরুরি।”

ফোতিস চলে গেলে এইবার মিলো নিজে এসে হাজির। হাত ধরে প্রবল টানাটুনি শুরু করল। বললাম, “সত্যি বলছি, আমার ক্ষুধা লাগেনি।”

“আপনি খেতে যেতে রাজি না হওয়া পর্যন্ত আমি এখান থেকে নড়ছি না।”

অগত্যা সঙ্গে যেতে হলো। সেই একই লক্কড়ঝক্কড় সোফা। তাতে নিজেকে এলিয়ে দিয়ে এক কোনায় আমাকে বসতে দিলেন মিলো। দেখি সামনের টেবিল ফাঁকা। রাতের খাবার তখনো বাড়া হয়নি।

গল্প জমানোর মুডে মিলো বললেন, “তা বলুন দেখি, আমাদের বন্ধু দেমিস আছে কেমন? তার বউবাচ্চারা? চাকরবাকরের কোনো সমস্যা হচ্ছে কিনা।”

আমি বিতং করে সব বললাম। তারপর আমি কী উদ্দেশ্যে হাইপাতায় এসেছি, তা জানতে চাইলেন মিলো। আমি আবারও গুছিয়ে-গাছিয়ে দীর্ঘ বর্ণনা দিলাম। তাও খাবারের দেখা নেই। আমার নিজের শহরের হালচাল জানতে চাইলেন মিলো। সেখানকার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নাড়িনক্ষত্র জানতে চাইলেন। আমি কিছুটা বলি, আর খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে প্রশ্ন করেন মিলো। এমনিতে সফরের ধকল। তার ওপর এই ক্লান্তিকর আলোচনা। আমি ঢলে পড়ছিলাম। শেষে তিনি বললেন, খুব বেশি ক্লান্ত বোধ করলে আমি গিয়ে শুয়ে পড়তে পারি।

আমি শূন্য খাবার টেবিল শূন্য রেখে খুশিমনে শোবার ঘরের দিকে পা বাড়ালাম। বিছানায় গা এলাতেই মড়ার মতো তলিয়ে গেলাম ঘুমে।

পরদিন সকাল সকাল ঘুম ভাঙতেই বিছানা ছাড়লাম।

দুনিয়ার যত আজিব, অদ্ভুতুড়ে জিনিসের প্রতি আগ্রহ আমার। মনে পড়ল, আমি এখন থেসালি নামক অঞ্চলটার একেবারে কেন্দ্রস্থলে বসে আছি। জাদুটোনা আর ডাকিনীবিদ্যার আখড়া হিসেবে ভীষণ দুর্নাম এই এলাকার। তা ছাড়া আরিস্তোমেনিস আমাকে যে ভয়ংকর গল্প শুনিয়েছে, সেই গল্পের ঘটনা তো এই হাইপাতা শহরেই ঘটেছে। আর সেখানেই আমি এখন বসে আছি।

কথাটা মনে হতে রোমাঞ্চিত চোখে চারপাশে তাকাতে লাগলাম। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে শুরু করলাম সবকিছু। এই শহরে চোখের সামনে যা কিছু দেখছি, সেগুলো যে আসলেই তাই, হলফ করে কে বলতে পারবে? ডাইনিদের জাদুটোনার অশুভ শক্তি সবখানে, সবকিছুতে কাজ করছে বলে কেবলই মনে হতে লাগল। ভাবলাম, আচ্ছা, একটু আগে পথের ওপর পড়ে থাকা একটা পাথরখণ্ডে যে লাথি কষলাম, সেটা আসলে পাথরে পরিণত হওয়া কোনো মানুষ ছিল না তো? ওই যে গাছের ডালে বসে পাখি ডাকছে, ওরা কি আসলেই পাখি, নাকি পাখির ভেক ধরে থাকা কোনো ডাইনি? তখন চারপাশের গাছপালাগুলোকেও সন্দেহ হতে লাগল।

শহরে ঘুরছি আর ভাবছি, এখানে যেকোনো ঘটনার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। কোনো কিছুতেই চমকে উঠব না। রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা পাথরের ভাস্কর্য বা পথের ধারের গরু-মহিষগুলো পর্যন্ত যদি কথা বলতে শুরু করে, চোখ কপালে তুলব না মোটেই।

চমকে ওঠার মতো তেমন কিছুই অবশ্য চোখে পড়ল না। টো টো করে ঘুরলাম শহরের অলিগলি। শেষে লক্ষ করলাম, আবার সেই কাঁচাবাজারে এসে পৌঁছেছি। চোখে পড়ল অনেক চাকরবাকর সঙ্গে নিয়ে রাস্তায় হাঁটছে এক মহিলা। গায়ের দামি গয়নাগাটি আর কেতাদুরস্ত পোশাক দেখে বোঝা যায় মহিলা সম্ভ্রান্ত বংশের। সঙ্গে সম্ভ্রান্ত চেহারার এক বুড়ো। আমাকে দেখেই বুড়ো হাঁক দিল, “আরে এই তো আমাদের লুসিয়াস!” বলে এগিয়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল। পরে ফিরে গিয়ে মহিলার কানে ফিসফিস করে কী যেন বলল। তারপর আবার আমার কাছে এসে বলল, “আসো, লুসিয়াস। ওনাকে সম্ভাষণ করো, আদর জানাও।”

“কিন্তু আমি তো ওনাকে চিনি না,” বললাম আমি।

মহিলা একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকলেন আমার দিকে। তারপর বললেন, “হুম! সত্যি তো, হুবহু সেই চেহারাই। সালভিয়ার মতোই সেই গোলাপি চিবুক, মসৃণ ত্বক, সেই ইগলের মতো চকচকে চোখ, সেই সটান হয়ে দাঁড়ানোর ভঙ্গি। কী আশ্চর্য মিল!”

এটুকু বলে থামলেন মহিলা। তারপর আবার বললেন, “আমাকে চিনতে পারছিস না লুসিয়াস? ছোটবেলায় আমি তোকে কোলেপিঠে লালন করেছি। আমি তোর মায়ের কাজিন। সেই হিসেবে আমি তোর খালা হই। তোর নানা আমার পালক পিতা ছিলেন। এক বাড়িতে পিঠোপিঠি বড় হয়েছি আমি আর তোর মা। বড় হয়ে তোর মায়ের তো বিয়ে হয়ে গেল সম্ভ্রান্ত পরিবারে। আর আমি সংসার পাতলাম এক সাধারণ গেরস্থ ঘরে। আমি তোর বিরহিনা খালা। ছেলেবেলার গল্প বলতে গিয়ে নিশ্চয়ই আমার কথা বহুবার বলেছে তোর মা। আয় আমার বাসায় ওঠ। নিজের বাড়ি মনে করে থাকবি।”

বড় বেকায়দায় পড়লাম। বিব্রতকর অবস্থা। বুঝিয়ে বললাম, “খালার বাসায় থাকার চেয়ে ভালো তো আর কিছুই হতে পারত না। কিন্তু মিলোর অতিথি হয়ে একবার যখন উঠে পড়েছি, তখন তাঁর বাসা ছেড়ে একই শহরে আরেকজনের বাসায় ওঠা ভদ্রোচিত দেখাবে না। তবে চিন্তা কোরো না, মাঝে মাঝেই তোমার বাসায় দাওয়াত খেতে চলে আসব। আর ভবিষ্যতে এই শহরে এলে সোজা উঠে পড়ব তোমার ওখানে।”

তবু একটু ঢুঁ মারতে হলো খালার বাসায়। কাছেই বাসা তার।

খানদানি বাসা। দামি দামি সব পাথর বসানো। অপূর্ব ভাস্কর্যে ঠাসা। আমি এসব খুঁটিয়ে দেখছি, তখন খালা কাছে এসে ফিসফিস করে বলল, “দ্যাখ লুসিয়াস, তুই তো আমার ছেলের মতো। একটা ব্যাপারে তোকে সাবধান না করে পারছি না। মিলের বউ পামফিলা হচ্ছে ডাকিনী। শহরের সবাই এটা জানে। নানা রকম গুপ্তবিদ্যা চর্চা করে এই মহিলা। তোর মতো তরুণকে খুব সহজেই জাদুবলে বশ করে ফেলতে পারে পামফিলা। বাধা দিতে গিয়েছিস কি রেগে অভিশাপ দেবে। তখন পাথরটাথর হয়ে থাকবি, নাহলে ভেড়াটেড়া বানিয়ে রাখবে। নয়তো জানই কবজ করে ফেলতে পারে। সাবধান থাকিস।”

মুখে যদিও বললাম সাবধান থাকব। কিন্তু খালার বাসা থেকে বেরিয়েই আনন্দে লাফিয়ে উঠলাম আমি। এই তো চাই। এই তো চেয়েছিলাম। গুপ্তবিদ্যা, ডাকিনী-যোগিনী চর্চা! তাও আবার যে বাড়িতে উঠেছি, সেই একই ছাদের তলায়। ঠিক করলাম, পামফিলার কাছেই ডাকিনীবিদ্যা, বান-উচাটনের গোপন কেরামতি শিখতে হবে, যত টাকা লাগে, লাগুক।

ছুটলাম মিলোর বাসার দিকে। মনে মনে বললাম, “এইবার লুসিয়াস! এইবার তোমার সারা জীবনের মনস্কামনা পূরণ হবে। জাদুবিদ্যার গুপ্ত নিয়মকানুন শেখার সেই কবেকার খায়েশ তোমার। ভয় ঝেড়ে ফেলো। বুক শক্ত করে দাঁড়াও। আর এগিয়ে যাও।”

বাসায় ফিরে দেখি চাকরানি ফোতিস ছাড়া আর কেউ নেই। অগত্যা ফোতিসকেই পটাতে শুরু করলাম। রান্নাঘরে রান্না করছিল মেয়েটা। ইনিয়েবিনিয়ে রান্নার প্রশংসা করে তার মন ভজালাম। তারপর জানতে চাইলাম তার মনিবের স্ত্রী পামফিলা সম্পর্কে।

সাবধান হয়ে গেল ফোতিস। তবে বলল, এখন নয়। রাতে ঘর গোছানোর সময় এসে সে বলবে সব কথা।

সারা বিকেল গণগোসলখানায় অস্থির কাটল।

রাতে সেই খুদে টেবিলে খেতে বসেছি মিলোর সঙ্গে। আজ সঙ্গে বসেছে পামফিলা। খেতে খেতে বিরহিনা খালার সাবধানবাণী মনে পড়ল। আড়চোখে তাকালাম পামফিলার দিকে। দেখলাম, একমনে খেয়ে যাচ্ছেন গৃহকর্ত্রী। কোনো দিকে নজর নেই।

রাতে ফোতিসের কাছ থেকে শুনে নিশ্চিত হলাম, পামফিলা আসলেই ডাকিনী। একেক রাতে সে একেক পশুপাখির রূপ ধারণ করে শহরে বেরিয়ে পড়ে। সারা শহর চষে বেড়ায়। ভোরে বাসায় ফিরে আবার মানুষের রূপ ধরে।


থেলিফ্রনের গল্প

এর মধ্যে একদিন বিরহিনা খালা নৈশভোজের দাওয়াত পাঠাল। লিখল, যেতেই হবে। চাকরানি ফোতিসকে বললাম, খালার বাড়ি যাচ্ছি। রাতে খাব না। মনিবদের জানিয়ে দিতে।

ফোতিস বলল, কোনো সমস্যা নেই। তবে একটা ব্যাপারে একটু সাবধান থাকতে হবে। গভীর রাতে হাইপাতা শহরের পথঘাট একেবারেই নিরাপদ নয়। বড়লোকের বখে যাওয়া একদল ছেলেপেলে দলবল নিয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়। এদের বলে মোহোক। পথচারী পেলে এরা হামলা করে বসে। খুনখারাবি, রক্তারক্তিতেই এদের যত আনন্দ। রোমান সৈন্যদের সবচেয়ে কাছের ছাউনিটাও কয়েক মাইল দূরে। ফলে এদের বাধা দেওয়ার কেউ নেই। এরা রাস্তার রাজা। মাঝরাতের আগেই ফিরে আসতে বলল ফোতিস।

খালার বাসায় গিয়ে দেখি শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা সব এসে গেছেন। আইভরির কারুকাজ করা শক্ত কাঠের। টেবিলে খেতে বসেছি সবাই। নরম গদিওয়ালা চেয়ার। পানপাত্রগুলো দামি পাথরের।

সুন্দর পোশাক পরা চাকরবাকরেরা ছোটাছুটি করে খাবার পরিবেশন করছে। প্লেট খালি হওয়ার আগেই ভরে যাচ্ছে খাবারে।

সন্ধ্যা পেরোলে রাতের বাতি জ্বালানো হলো। খাওয়া শেষে আমরাও বসলাম খোশগল্পে। বিরহিনা খালা আমাকে বললেন, “তারপর, লুসিয়াস, ভাগনে আমার! কেমন দেখছ থেসালি? গর্ব শোনাবে, তবু বলি, সারা দুনিয়ার চেয়ে আমরা একটু এগিয়েই আছি। এখানকার মন্দিরগুলো দ্যাখো, বাড়িঘর দ্যাখো। কী অপূর্ব নকশা! আর এই হাইপাতা শহরের কথাই যদি ধরো, কী নেই এখানে! যা চাও, তাই পাবে। বছরের যখনই আসো, এই শহরে সব রকম সুযোগ-সুবিধা আছে।”

আমি সম্মতি জানালাম। বললাম, “আমিও নানা দেশ ঘুরেছি, নানা শহর দেখেছি। কোনো শহরেই এত নিজের মনে হয়নি। তবে বিশেষ করে এখানকার ডাকিনী-যোগিনীদের গুপ্তবিদ্যাচর্চার ব্যাপারটা আমাকে বেশি করে টানে। শুনেছি, এদের বিদ্যার সঙ্গে কেউ নাকি পেরে ওঠে না। এরা অপ্রতিরোধ্য। শুনেছি, মৃতদেহও রেহাই পায় না এদের হাত থেকে। কোথাও কারও অস্বাভাবিক মৃত্যু হলে এরা ছুটে গিয়ে নিহতের শরীর থেকে নানান প্রয়োজনীয় অঙ্গপ্রত্যঙ্গ চুরি করে নিয়ে যায়।”

টেবিলে বসা এক ভদ্রলোক বলে উঠলেন, “আর মৃতদের কথা কেন বলছেন ভাই, জীবিতদেরও কি এরা ছাড়ে নাকি! এই তো ক’দিন আগে আমাদের এক লোক, নাম বলছি না, তার মুখের মাংস খাবলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।”

এ কথা শুনে পুরো আড্ডায় হাসির রোল পড়ে গেল। সবার চোখ চলে গেল টেবিলের কোনায় আয়েশ করে এলিয়ে থাকা এক ভদ্রলোকের দিকে। লোকটা বিব্রত আর লজ্জিত ভঙ্গিতে কুঁকড়ে বসে আছে। খালা বলল, “আরে, লজ্জার কী আছে থেলিফ্রন! তোমার মজার ঘটনাটা না হয় বলেই ফেলো আরেকবার। আমার ভাগনে লুসিয়াস একটু শুনুক। শুনে বুঝুক, কোথায় কোন মুল্লুকে সে এসে পড়েছে।”

মেজবানের অনুরোধ। তাই অনিচ্ছায় হলেও লোকটা তার গল্প শুরু করল : “আমি তখনো মিলেতাস বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। অলিম্পিয়ান গেমস দেখতে গেছি। আসর শেষে বড্ড মন চাইল, গ্রিসের উত্তরাঞ্চলটা একবার ঘুরে দেখি। থেলাসি এলাকার বেশির ভাগ জায়গা ঘুরে বেড়ালাম। অবশেষে একদিন লারিসায় এসে দেখি, সঙ্গের টাকাপয়সা সব ফতুর। কী করে কিছু টাকা কামানো যায়, সেই ধান্দায় শহরের আনাচকানাচে ঘুরে বেড়াচ্ছি। দেখি, বাজারের মাঝে রাস্তার মোড়ে একটা বুড়োমতন লম্বা লোক দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে এহলান করছে : আজ রাতে একটা লাশ পাহারা দিয়ে রাখতে হবে। যে পারবে, বিশাল অঙ্কের নজরানা দেওয়া হবে।

ভিড়ের মধ্যে পাশের লোকটাকে জিজ্ঞেস করলাম, “ব্যাপার কী ভাই? লারিসা শহরে লাশেদের কি উঠে পালিয়ে যাওয়ার বাতিক আছে নাকি?”

লোকটা বলল, “সে কি! শহরে নতুন নাকি! জানেন না, থেসালি অঞ্চলে যেখানেই কেউ মরুক, ডাকিনীরা লাশের মুখের মাংস খুবলে নিয়ে যায়। জাদুটোনার ওষুধ বানাতে নাকি মুখের মাংস দরকার পড়ে।”

“ও, আচ্ছা। তা লাশ পাহারা দিতে কী করতে হয়?”

“সারা রাত জেগে লাশের দিকে তাকিয়ে থাকবেন। একবারের জন্যও এদিক-ওদিক তাকানো যাবে না। ডাকিনীরা নানান ভেক ধরে আসে। কখনো পাখি হয়ে, কখনো কুকুর বা ইঁদুর হয়ে। জাদু করে পাহারাদারকে ঘুম পাড়িয়ে দেয় এরা। একবার চোখ বুজেছেন তো ধরে নিন কেল্লা ফতে। বড় কঠিন কাজ। মাত্র এক শ কি দেড় শ দ্রাকমার জন্য এই সর্বনাশা দায়িত্ব কেউ নিতে রাজি হয় না। ওহ্ বলতেই ভুলে গেছি, পরদিন ভোরে লাশ অক্ষত অবস্থায় বুঝিয়ে দিতে পারলেন তো ভালো, না পারলে খবর আছে! আপনার মুখ থেকে ঠিক ওই পরিমাণ মাংস খুবলে লাশের মুখে এঁটে দেওয়া হবে। এখানকার আইনে এভাবেই বলা আছে।”

শুনলাম বটে। তবে ঘাবড়ালাম না। কী করব, পকেট যে গড়ের মাঠ।

ঘোষকের উদ্দেশ্যে চেঁচিয়ে বললাম, “আমি রাজি। আমি নিচ্ছি কাজটা। বিনিময়ে কী দেবেন?”

“এক সহস্র দ্রাকমা। কেননা, এবারের কাজটা দ্বিগুণ কঠিন। যার লাশ পাহারা দেবেন, তিনি এই শহরের সবচেয়ে ক্ষমতাবান লোকের সন্তান।”

“পরোয়া নেই,” বুক চিতিয়ে বললাম। “শক্ত ধাতুতে গড়া লোক আমি। এক মুহূর্তের তরেও চোখের পাতা ফেলব না।” কথাটা বলে শেষ করেছি কি করিনি, ঘোষক লাফিয়ে নেমে আমাকে টেনে নিয়ে মৃতের বাড়ির দিকে ছুটল। ঢুকিয়ে গেট লাগিয়ে দিল, যেন পিঠটান দিতে না পারি। বিশাল বাড়ি। আলিশান। নানান করিডোর বেয়ে বুড়ো ঘোষকের সঙ্গে চললাম। চলছি তো চলছিই।

অবশেষে একটা শোবার ঘরে এসে ঢুকলাম। ঘরের সব জানালা-টানালা বন্ধ। কালো কাপড় পরা এক মহিলা বসে আধো অন্ধকারে বিলাপ করছিল।

বুড়ো ঘোষক বলল, “এই যে, মা জননী, এই লোক আপনার স্বামীর লাশ পাহারা দেবে আজ রাতে। এই টাকায় সে রাজি হয়েছে।”

অশ্রুসজল চোখে মহিলা আমার দিকে তাকাল। আমার চেহারায় ভরসা করার মতো কিছু যেন খুঁজছে।

বললাম, “একটুও ঘাবড়াবেন না ম্যাডাম। আমার ওপর ভরসা রাখুন।”

উঠে দাঁড়ালেন মহিলা। আমাকে নিয়ে গেলেন পাশের ঘরে। সেখানে মেঝেতে একটা পাথরের স্ল্যাবের ওপর শুইয়ে রাখা তার স্বামীর মরদেহ। পুরোটা সাদা কাপড়ে মোড়ানো। আজ সারা রাত এই মৃতদেহের পাশে বসে থাকতে হবে আমাকে।

আমার কিছু করার নেই। চ্যালেঞ্জটা আমি নিয়ে নিয়েছি।


---E-Book Created By---
Md. Ashiqur Rahman

তৃতীয় অধ্যায়

রাত জেগে লাশ পাহারা


সারা রাত একটা লাশ পাহারা দিতে হবে আমাকে, ডাইনিরা যাতে সেটার মুখের মাংস খুবলে নিয়ে যেতে না পারে।

যার লাশ, তার শোকার্ত স্ত্রী সাতজন সাক্ষী ডেকে আনলেন। তাদের বললেন, “আপনারা সাক্ষী থাকলেন, এই যে লাশের নাক অক্ষত আছে, দুই কান ঠিকঠাক, চোখও কোটরের মধ্যে জায়গামতোই আছে, ঠোঁট পুরোটাই অবিকৃত, চিবুকও তা-ই।”

বলার সময় আঙুল দিয়ে নেড়ে নেড়ে অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো দেখালেন মহিলা। আর পাশে দাঁড়ানো তাঁর সেক্রেটারি একটা কাগজে টুকে টুকে নিল। সেই কাগজে সই করল সাত সাক্ষী। শেষে সিলগালা করা হলো কাগজটা। মহিলা বেরিয়ে যাওয়ার সময় আমি ডাক দিলাম, “সারা রাত জেগে থাকার মতো ইন্তেজাম যাতে থাকে, দয়া করে একটু দেখবেন কি, ম্যাডাম?”

“কী কী লাগবে আপনার?”

“একটা বড় লণ্ঠন, তাতে সারা রাত জ্বলার মতো তেল, কয়েক পাত্র ওয়াইন, গরম পানি, একটা কাপ আর রাতে খাওয়ার জন্য এক প্লেট রান্না করা মাংস আর কিছু সবজি।”

মহিলা রেগে গেলেন, “আবদারের বহর দ্যাখো। এটা মড়ার বাড়ি, কয়েক দিন ধরে চুলাই জ্বলেনি, আর এ কিনা রান্না করা মাংস চায়। আপনার কি ধারণা, সারা রাত ফুর্তি করার জন্য আপনাকে ডাকা হয়েছে? চড়ুইভাতি? আমাদের মতোই বিলাপ করুন সারা রাত, যান।” তারপর সঙ্গের চাকরানিকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “মারহিনা, লণ্ঠনটায় তেল ভরে আন। আর দরজাটা বাইরে থেকে লাগিয়ে দিয়ে রাখবি। পাহারাদার যাতে ভেতরে ঠিকমতো পাহারা দেয়।”

তারা চলে গেল। ঘরের মধ্যে একটা লাশের সঙ্গে আমি একা। চোখের পাতা টানটান করে তাকিয়ে থাকলাম। ঘুম তাড়ানোর জন্য গান ধরলাম গুন গুন করে।

সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নামল। তারপর ধীরে ধীরে গভীর থেকে গভীরতর হলো রাত। রাত বাড়ছে, আর অন্ধকার যেন গাঢ় থেকে আরও গাঢ় হচ্ছে। মধ্যরাত ঘনিয়ে এলো।

শুরুতে একটু একটু অস্বস্তি মতন লাগছিল। কিন্তু যখন দেখলাম দরজার চিপা দিয়ে একটা বেজি সুড়ুৎ করে ঘরে এসে ঢুকল, ভয় গ্রাস করল আমাকে। বেজিটা আমার পাশ ঘেঁষে এসে দাঁড়াল, তাকিয়ে থাকল আমার চোখের দিকে। তাকিয়ে আছে তো তাকিয়েই আছে। এমন বেজি তো জীবনে দেখিনি, বাবা! অনেক কষ্টে গলা দিয়ে শব্দ বের হলো, “যা ভাগ এখান থেকে, নোংরা জানোয়ার কোথাকার। ঘাড় ভেঙে ফেলব কিন্তু। যা, গিয়ে তোর দোস্ত ইঁদুর-টিদুরদের সঙ্গে খেল না! শুনতে পাচ্ছিস? যাবি!”

বেজিটা লেজ গুটিয়ে নিল। তারপর যেভাবে এসেছিল, সেভাবেই বেরিয়ে গেল ঘরের বাইরে। কিন্তু সেটা বেরিয়ে যেতেই কোথা থেকে রাজ্যের ঘুম এসে ধরল আমাকে। টেনে নিয়ে গেল স্বপ্নের রাজ্যে। টুপ করে মেঝেতে গড়িয়ে পড়ে নাক ডাকতে লাগলাম। সে এমন ঘুম যে দেবতা অ্যাপোলো এলেও তাঁর পক্ষে বোঝা শক্ত হবে, ঘরের মধ্যে কোনটা লাশ আর কোনটা জিন্দা মানুষ। আমি যেন মরে কাঠ হয়ে গেছি। আর আমার লাশটাকে এতিমের মতো ফেলে রাখা হয়েছে।

অবশেষে রাতের আঁধার ফিকে হয়ে আসতে লাগল। চৌকিদারের হাঁক শোনা গেল। আমি জেগে উঠলাম। ঘুম ভাঙতেই লণ্ঠনটা হাতে নিয়ে তড়িঘড়ি আগে লাশের কাছে ছুটে গেলাম। ভালো করে পরীক্ষা করে দেখলাম সেটার মুখমণ্ডল। যাক, বাঁচা গেল! কোনো ক্ষতি হয়নি। লাশ যেমন ছিল, তেমনই আছে।

প্রায় তখনই বিধবা মহিলা এসে হাজির। সঙ্গে তাঁর সাত সাক্ষী।

মহিলা লণ্ঠন তুলে নিয়ে লাশের কাছে গেলেন। প্রথমে একটু বিলাপ-টিলাপ করে নিয়ে তারপর গভীর অভিনিবেশে নিরীক্ষা করতে শুরু করলেন লাশটাকে। তারপর হাঁক দিলেন, “এদিকে আসো দেখি, ফিলোদেসপোতাস।”

ভৃত্য এগিয়ে এলো।

“এই যুবককে মজুরি চুকিয়ে দাও। ভালোমতনই পাহারা দিয়েছে ছোকরা।”

ভৃত্য ফিলোদেসপোতাস যখন গুনে গুনে আমার হাতে মুদ্রা তুলে দিচ্ছে, বিধবা বললেন, “এই উপকারের জন্য অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। আপনার কপাল ভালো বলতে হয়, নির্ঝঞ্ঝাটে এই বাসা থেকে বেরিয়ে যেতে পারছেন।”

খুশিতে মুদ্রাগুলো লোফালুফি করতে করতে বললাম, “আমিও আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ, ম্যাডাম। আবার কখনো যদি এ রকম সাহায্যের দরকার হয়, ডাক দেবেন, হাজির হয়ে যাব।”

কথাটা মুখ ফসকেই বলে ফেলেছি। কী বলেছি, ঠাহর করার আগেই দমাদম পিঠের মধ্যে কিলঘুষি, লাথি পড়তে লাগল, আর সঙ্গে গালিগালাজ। সবাই একসঙ্গে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। মারের চোটে নেতিয়ে পড়লাম। তখন আমার দেহটাকে ছুঁড়ে বাড়ির বাইরে ফেলে দেওয়া হলো। দেহটাকে টেনেহিঁচড়ে পাশের রাস্তায় গিয়ে দাঁড়ালাম। একটু একটু করে সংবিৎ ফিরে এলে টের পেলাম, কী গর্দভের মতোই না মন্তব্য করেছি। মার তো খাবই।

ওদিকে, লাশ সৎকারের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। সম্ভ্রান্ত বংশীয় ব্যক্তির লাশ। ফলে সৎকারেও ব্যাপক ঘটা। বিরাট শব-মিছিল চলল সদর রাস্তার মোড়ে। মিছিল যখন বাজারে এসে পৌঁছেছে, এক বৃদ্ধ এলেন ছুটতে ছুটতে। হাপুস নয়নে কাঁদছেন। শোকের চোটে নিজের চুল ছিঁড়ছেন। কফিন আঁকড়ে ধরে বুড়ো মাতম শুরু করলেন। চিৎকার করে বললেন, “হাইপাতার সকলে শুনুন! আপনাদের সবার প্রতি আকুল আরজি আমার। আপনাদের কাছে বিচার দিচ্ছি। এই লাশ আমার হতভাগা ভাইপোর। তার জন্য ইনসাফ চাইছি। তার পাশে একটু দাঁড়ান। তাকে হত্যা করা হয়েছে। সম্পত্তির লোভে তাকে খুন করেছে তারই দুশ্চরিত্র স্ত্রী। এই মহিলা একটা খুনি। কেউ যাতে সন্দেহ না করে, এ জন্য খাবারের সঙ্গে প্রতিদিন অল্প অল্প করে বিষ মিশিয়ে আমার ভাইপোকে মেরে ফেলেছে এই ডাইনি। আপনারা কি এই হত্যার প্রতিশোধ নেবেন না?”

এই বলে আবার হাইমাউ করে বিলাপ করতে লাগলেন বুড়ো। ভিড়ের মধ্যে দ্রুত তাঁর প্রতি সহানুভূতি তৈরি হয়ে গেল। কেউ কেউ জোর গলায় বলে উঠল, “খুঁটিতে বেঁধে পুড়িয়ে মারো ডাইনিটাকে!”

কেউ বলল, “পাথর ছুঁড়ে মারো!” অতি উৎসাহী মাস্তান গোছের একদল লোক তো তক্ষুনি চাবুক হাতে প্রস্তুত।

বিধবার অবস্থা বেগতিক। তবে তিনিও কম যান না। কান্নাকাটির একশেষ করলেন। দেবতাদের উদ্দেশ্যে কসম কাটতে লাগলেন। জনতার উদ্দেশ্যে তাঁরও আকুল আরজি। বললেন, স্বামীর সেবা ছাড়া কোনো দিন কোনো চিন্তা মাথায় ঢোকেনি। এমন জঘন্য অপরাধের কথা তো স্বপ্নেও ভাবতে পারেন না তিনি।

তখন বুড়ো বললেন, “ঠিক আছে। দেবতাদের হাতেই বিচারের ভার ছেড়ে দিই আমরা তাহলে। এখানে আমাদের মাঝে আছেন দেশের সবচেয়ে নামজাদা ওঝা বাবা জাচলাস মিশরাবাদী। অনেক বেশি ফি নেন বটে, তবে আমরা তো তাঁকে দিয়ে এখনই আমার ভাইপোর আত্মা নামিয়ে আনতে পারি।”

ভিড়ের মধ্যে যে লোকটাকে জাচলাস মিশরাবাদী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলো, তিনি একটা সাদা লিনেনের পোশাক পরে আছেন, পায়ে তালপাতার চপ্পল, মাথা কামানো। রীতিমাফিক লোকটাকে সম্মান-টম্মান দেখিয়ে বুড়ো বললেন, “দয়া করে আমার ভাইপোর আত্মাকে অল্প সময়ের জন্য এই পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার বন্দোবস্ত করুন। পরকালের বিধানকর্তাদের বিরক্ত করতে বলছি না। তার আত্মার জন্য সামান্য কয়েকটা মুহূর্তের ছুটি যদি মঞ্জুর করাতে পারেন, কৃতজ্ঞ হই। ও এসে ওর খুনের বদলা নিতে আমাকে একটু সাহায্য করুক। তাতে অন্তত এই বুড়ো বয়সে আমার আত্মা একটু শান্তি পাবে।”

ওঝা মিশরাবাদী সামনে এগিয়ে এসে তার ঝোলা থেকে কী একটা কবিরাজি গুল্ম বের করে লাশের মুখে তিনবার ছোঁয়ালেন। আরেকটা কবিরাজি গুল্ম রাখলেন লাশের বুকে। পুবের আকাশে কেবল সূর্য উঠছে। সেই দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করে সূর্যবন্দনার মন্ত্র পড়তে লাগলেন ওঝা। গোটা বাজারের লোক ভিড় করে দাঁড়িয়েছে। কৌতূহলী চোখে তারা তাকিয়ে আছে। অপেক্ষা করছে, কখন দেখবে অলৌকিক ঘটনা।

ভিড় ঠেলে আমিও এগিয়ে গেলাম। কফিনের ঠিক পেছনে একটা উঁচু পাথরের ওপর দাঁড়ালাম। এখান থেকে ভালো দেখা যাচ্ছে।

লাশের বুক একটু যেন ওঠা-নামা করতে শুরু করেছে। শুকনা রক্তনালিগুলোয় একটু একটু করে রক্ত ছুটছে। নাক দিয়ে বেরোচ্ছে শ্বাস-প্রশ্বাস। তারপর একসময় লাশটা উঠে বসল। ক্ষিপ্ত কণ্ঠে জানতে চাইল, “এই দুনিয়ার যন্ত্রণার মধ্যে আবার কেন ডেকে আনলি তোরা? কী সুন্দর আরামে ছিলাম। জ্বালাতন করিস না। আমাকে আরামে ঘুমাতে দে।”

রেগে গেলেন ওঝা। বললেন, “তুমি তোমার নগরবাসীর সঙ্গে কথা বলবে না? এদের কাছে ফাঁস করবে না তোমার হত্যা-রহস্য? যদি না করো, যদি কোনো কথা লুকাও, কসম কেটে বলছি, যমদূতকে ডেকে পরকালে তোমার জন্য প্যাদানির ব্যবস্থা করব। এমন ঠ্যাঙানি ঠ্যাঙাবে, চৌদ্দগুষ্টির নাম ভুলে যাবে।”

কথা শুনে ঘাবড়ে গেল লাশ। সোজা হয়ে বসল। ভিড়ের দিকে তাকিয়ে গোঙানির গলায় বলে উঠল, “শুনুন ভাইয়েরা, আমার বউটা বজ্জাতের একশেষ। আমাকে সে জাদুটোনা করে বিষ দিয়ে মেরেছে। আর আমি মরতে না মরতেই গোপনে আর একটা বিয়ে করেছে।”

বিধবা বউটা তবু হাল ছাড়ল না। জিন্দা লাশের এই অভিযোগও সে অস্বীকার করল। স্বামীর সঙ্গে এমনভাবে ঝগড়া শুরু করে দিল, যেন নিত্যদিনকার সাংসারিক রুটিনের মধ্যে আছে তারা। ভিড়ের লোকজন দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেল। একদল তো বিধবা বউটাকে এই লাশের সঙ্গেই দাফন করে ফেলে আর কি! আরেক দল বলছে, লাশের কথায় বিশ্বাস কী! জীবিতদেরই বিশ্বাস করা যায় না, আর এ তো অবোধ লাশ।

লাশটা নিজে তখন একটা বুদ্ধি বের করল।

গোঙানির মতো ফাঁপা শব্দ তোলা গলায় বলল, “আমার কথা যে কিরে-কাটা সত্যি, তার অকাট্য প্রমাণ দিচ্ছি। এমন একটা কিছু দেখাচ্ছি, যেটা আমি ছাড়া আর কেউ জানে না। আর কারও পক্ষে জানাই সম্ভব নয়।” এই বলে লাশটা আমার দিকে তাকাল। “ওই যে শিক্ষিত যুবকটাকে দেখছেন, ও আমার লাশ পাহারা দিয়েছে সারা রাত। খুব সজাগ পাহারা দিচ্ছিল। চোখের পাতা ফেলছিল না। চারপাশে ঘুরঘুর করছে ডাইনির দল। নানা ফন্দি-ফিকির। এই বেশ ধরে, সেই বেশ ধরে। কিছুতেই কাজ হয় না। যুবক অতন্দ্র প্রহরী। ঘরের দরজা শক্ত খিল আঁটা। তালার ফুটো দিয়ে দুই ডাইনি ঢুকে পড়ল। একটা বেজির ছদ্মবেশে, আরেকটা ইঁদুরের। তারা যুবকের চারপাশে একটা কুয়াশার কুণ্ডলী ছড়িয়ে দিল। তাতে বেচারা অচেতন। তখন দুই ডাইনি শুরু করল আমার নাম ধরে ডাকাডাকি। চেষ্টা করছিল, আমাকে এমনভাবে জাদুটোনা করতে, যাতে আমি লাশ হয়েও তাদের আদেশ পালন করি। আমি জেগেছি, কিন্তু উঠতে পারছি না, দেহে বল নেই।

“আমার হাঁটু নড়ে না, কনুই চলে না। তখন একটা ঘটনা ঘটল। মড়ার মতো অচেতন পড়ে থাকা ওই যুবকের নাম আর আমার নাম একই। ফলে ডাইনিরা যখন ডাকল, “থেলিফ্রন, থেলিফ্রন, আসো!” ওই যুবক তখন যন্ত্রের মতো সাড়া দিল। একটা নির্জীব মড়ার মতো উঠে দাঁড়িয়ে সে তার মুখমণ্ডল এগিয়ে দিল ডাইনিদের দিকে। ডাইনিরা প্রথমে খুবলে তুলে নিল ছেলেটার নাক, তারপর দুই কান। তবে যাওয়ার আগে নিজেদের কুকীর্তি ঢাকার জন্য তারা যুবকের মুখমণ্ডলে মোমের নাক আর কান বসিয়ে দিয়ে গেল। নিখুঁত নাক আর কান। দেখে বোঝার উপায় নেই। এমনই নিখুঁত যে বেচারা ছেলেটা এখনো টেরই পায়নি ব্যাপারটা।”

লাশের এ কথা শুনে আতঙ্কে আমি আমার নাকে টিপ দিলাম, কানে টিপ দিলাম। টিপ দিতেই সেগুলো খসে পড়ল খটাস করে। ভিড়ের মধ্যে শত শত লোক আমার দিকে আঙুল তুলে হেসে গড়িয়ে পড়ছে।

আমি দরদর করে ঘামছি। পাথর থেকে লাফিয়ে নামলাম। ভিড়ের লোকজনের পায়ের ফাঁক গলে হামাগুড়ি দিয়ে পালাতে লাগলাম ভিতু কুকুরের মতো।

অপমানে আমি আর মিলেতাসে ফিরিনি। এখন নিজের জন্য একটা কাপড়ের নাক বানিয়ে নিয়েছি। আর এমন বড় বড় চুল রেখেছি, যাতে কান ঢাকা পড়ে।”

থেলিফ্রন তার গল্প শেষ করল।

ভোজসভায় আমরা তাকে ঘিরে শুনছি এই গল্প। থেলিফ্রন গল্প শেষ করতেই পুরো ঘরভর্তি লোকের মধ্যে হাসির রোল পড়ে গেল। যে সে হাসি না, একেবারে অট্টহাস্য।

বিরহিনা খালা আমাকে বললেন, “হাইপাতা শহরের পত্তনের সময় থেকে এখানে একটা মজার বার্ষিক উৎসব হয়। আমরা হাস্য দিবস নামে একটা দিবস পালন করি। আগামীকাল সেই উৎসব। আমি চাই তুমি তাতে যোগ দাও। একটা কৌতুক ভেবে এসো। অনুষ্ঠানে তোমারও একটা অবদান থাকা চাই। দেখতেই পাচ্ছ, হাস্যরসের দেবতাকে আমরা শ্রদ্ধার উচ্চাসনে বসিয়ে রেখেছি।

শুনে আমার খুব ভালো লাগল। বললাম, অবশ্যই যোগ দেব, এবং কোনো একটা কৌতুক বানিয়ে আনব। এমন কিছু, যা শুনলে তোমরা বাহবা দেবে।

খেয়ে পেট টইটম্বুর। একসময় আমার ভৃত্য এসে টেবিলের পাশে দাঁড়াল। বলল, মধ্যরাত ঘনিয়ে এসেছে। আমি তড়িঘড়ি উঠে দাঁড়ালাম। বিরহিনা খালার কাছ থেকে বিদায় নিলাম।

বাইরে রাস্তায় নেমে দেখি পা টলছে। অন্ধকার পথঘাট। ভৃত্যের হাতে লণ্ঠন। অর্ধেক পথ যেতেই সেটা বাতাসের ঝাপটায় নিভে গেল। কী মুশকিল। পথঘাট চিনি না। হাতড়ে হাতড়ে এগোচ্ছি। পাথরে হোঁচট খেয়ে পড়ছি শান বাঁধানো রাস্তায়।

অবশেষে নিজের বাসার গলিতে পা রাখলাম। দেখি তিনটা ষন্ডামার্কা লোক সর্বশক্তি দিয়ে মিলোর বাড়ির দরজায় আঘাত করছে। দরজা ভেঙে ঢুকতে চায় তারা। আমরা দুইটা লোক যে সামনে এসে দাঁড়িয়েছি, ভ্রুক্ষেপই করল না। আরও দ্বিগুণ উৎসাহে দরজায় লাথি কষতে লাগল, যেন ছিটকিনি-টিটকিনি উপড়ে পাল্লা দুই ফাঁক করে ফেলবে।

আমাদের দু’জনেরই বুঝতে বাকি থাকল না, এরা ডাকাত। দুর্ধর্ষ ডাকু।

এ রকম পরিস্থিতির জন্য আমার প্রস্তুতি নেওয়াই থাকে। কোমরে গোঁজা খাপ থেকে তরবারি বের করলাম। ঝাঁপিয়ে পড়লাম ডাকুদের ওপর।

তারাও আমাকে আক্রমণ করল। আমি একজন একজন করে তিনজনকেই কুপোকাত করলাম।

আমার তরবারির ঘায়ে তারা আমার পায়ের কাছে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। ওঠার চেষ্টা করল। কিন্তু কিছুক্ষণ হাঁসফাঁস করে তাদের প্রাণবায়ু বেরিয়ে গেল।

হইহল্লায় দাসী ফোতিসের ঘুম ভেঙে গেছে। সে দৌড়ে বেরিয়ে এসে দরজা খুলে দিল। আমি টলতে টলতে বাসায় ঢুকলাম। নিজের ঘরে গিয়ে ধপাস করে শরীর ছেড়ে দিলাম বিছানায়। একমুহূর্তে তলিয়ে গেলাম ঘুমে।

তখনো জানি না ভোর হতেই আমাকে গ্রেপ্তার করা হবে। আনা হবে খুনের অভিযোগ।


---E-Book Created By---
Md. Ashiqur Rahman

চতুর্থ অধ্যায়

গ্রেপ্তার ও বিচার


ভোরের আলো ফুটতে ঘুম ভেঙে গেল। মনে পড়ে গেল গত রাতের নৃশংস কর্মকাণ্ডের কথা। অন্ধকারে নেশার ঘোরে তিন-তিনটা লোককে হত্যা করেছি আমি। মনে পড়তেই লাফিয়ে উঠে বসলাম বিছানায়। হাত-পা কাঁপতে লাগল। দিব্যচোখে দেখতে পেলাম ফাঁসির দড়ি। ফিচফিচ করে কাঁদতে লাগলাম আমি। আমি যে সজ্ঞানে ওই কাজ করিনি, কাউকে হত্যা করার অভিপ্রায় যে আমার ছিল না— দুনিয়ায় এমন কোনো দয়াবান বিচারক কি আছেন, যিনি এই কথাটা বুঝবেন!

আর কী কপাল, ঠিক তক্ষুনি সদর দরজায় জোরে জোরে করাঘাত শুনতে পেলাম। কারা যেন চেঁচিয়ে দরজা খুলতে বলছে।

দরজা খুলতেই এক দঙ্গল লোক হুড়মুড় করে বাড়িতে ঢুকে পড়ল। সবার সামনে হাকিম আর কয়েকজন সেপাই। তারা বাসায় ঢুকেই সব ক’টি ঘরে অবস্থান নিল। হাকিম দুই পেয়াদাকে নির্দেশ দিলেন আমাকে গ্রেপ্তারের। বাধা দিলাম না। আমাকে টেনেহিঁচড়ে বাড়ির বাইরে আনা হলো। রাস্তায় পা রেখেই অবাক হয়ে গেলাম। শত শত লোক রাস্তার দু’পাশে। পুরো হাইপাতা শহর যেন ভেঙে পড়েছে আমার গ্রেপ্তার দেখতে।

মাথা নিচু করে হাঁটছি। অপমানিত, পরাজিত।

বিচার হওয়ার কথা বাজারের মোড়ে। কিন্তু এরা সেই পথে না নিয়ে নানান ঘুরপথ ধরে আমাকে হাঁটাতে লাগল। একটার পর একটা বাঁক নিচ্ছি আর হাঁটছি। আমি যেন বলির পাঁঠা, মুণ্ডুচ্ছেদের আগে সারা শহর প্রদর্শন করানো হচ্ছে।

অবশেষে আদালতের কাঠগড়ায় তোলা হলো আমাকে। হাকিমেরা তাঁদের আসন গ্রহণ করলেন।

পেয়াদারা সবাইকে চুপ করতে বললে চারদিক থেকে উল্টো প্রতিবাদের ঝড় উঠল। সবাই বলল, ছোট্ট আদালতকক্ষে এত বিপুল দর্শক ভিড়ে চিড়েচ্যাপ্টা। তাদের নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। কেউ কেউ আওয়াজ তুলল, এখানে বিচার না করে বরং নাট্যমঞ্চে নিয়ে বিচার করা হোক। জায়গাটা বড়সড়।

বিচারের ব্যাপারে নগরবাসীর এই তুমুল আগ্রহ আর কৌতূহল দেখে বিচারকেরা এজলাস বদলাতে রাজি হলেন। মুহূর্তে আদালতকক্ষের সবাই পড়িমরি ছুটল রঙ্গমঞ্চে। সেখানে গ্যলারির আসন কানায় কানায় ভরে গেল। দরজা-জানালাতেও লোক ঝুলে আছে। অনেকে জায়গা না পেয়ে উঠে গেছে ছাদে। কেউ কেউ দেয়ালে দাড়িয়ে কোনোরকমে ভারসাম্য বজায় রেখেছে। কেউ ভাস্কর্যের ঘাড়ে চড়ে বসে আছে। নিজের নিরাপত্তার ব্যাপারে কারোরই যেন কোনো খেয়াল নেই। পেয়াদারা আমাকে সবার সামনে দিয়ে হাঁটিয়ে মঞ্চে তুলল। যেখানটায় যন্ত্রীরা বসে, সেই জায়গাটার কাছে দাঁড় করানো হলো আমাকে।

কোর্টের পেয়াদারা আবার সবাইকে চুপ হতে বলল। তারপর ডাকা হলো বাদীপক্ষের প্রধান সাক্ষীকে। একটা বুড়োমতো লোক সামনে এসে দাঁড়াল। তাকে আগে কোথাও দেখেছি বলে মনে হলো না। লোকটা তার বয়ান বলে যেতে লাগল। বলছে তো বলছেই। বুড়ো বলল, “আমি এই শহরের চৌকিদার সর্দার। দায়িত্ব পালনে আমি ভীষণ নিষ্ঠাবান। এ তল্লাটে এমন একটা লোকও পাওয়া যাবে না, যে বলতে পারবে, আমি ফাঁকিবাজি করি। কাজেই গত রাতে কী ঘটেছিল, আমি ভালো করে বলতে পারব। মাঝরাতের দিকে, তখন টহল প্রায় শেষ করে এনেছি, শহরের প্রতিটি অলিগলি হেঁটে সবকিছু ঠিকঠাক আছে কি না, চেক করা শেষ, তখন চোখে পড়ল এই যুবক নগর দেয়ালের ঠিক বাইরে উদ্যত তরবারি হাতে ছুটে যাচ্ছে। এগিয়ে গিয়ে দেখি, সর্বনাশ!

“তিনটা লোক এই যুবকের পায়ের কাছে নেতিয়ে পড়ে আছে, তাদের জখম থেকে গলগল করে বেরোচ্ছে রক্ত। চোখের সামনে মারা গেল লোকগুলো। হত্যাকারী যখন বুঝতে পারল, সে কী ভয়ংকর অপকর্ম করে ফেলেছে, তখন সে ছুটে পালিয়ে যায়। তখন যদিও ঘুটঘুটে অন্ধকার, তবু আমরা দেখতে পেলাম, লোকটা কাছাকাছি একটি বাড়িতে ঢুকে পড়ল। ওই বাড়িতে সারা রাত কাটিয়েছে সে। আর আমরাও পাহারা বসিয়ে রেখেছি বাড়ির বাইরে। এমন জঘন্য অপরাধীকে তো আমরা বিনা সাজায় ছেড়ে দিতে পারি না।

“সকালবেলা যুবক পেছনের গেট দিয়ে সটকে পড়ার আগেই আমরা তাকে ধরে ফেলি হাতেনাতে। এখন তাকে এখানে ধরে আনা হয়েছে, বিজ্ঞ হাকিমেরা, আপনাদের বিবেচনার জন্য। তাকে তার কৃতকর্মের উপযুক্ত শাস্তি দিন। এই লোক ঠান্ডা মাথার খুনি। হাতেনাতে ধরা পড়েছে সে। থেসালির স্থানীয় লোক সে নয় বটে, তবু তাকে এমন দৃষ্টান্তমূলক সাজা দিন, যাতে শহরবাসী বহুদিন মনে রাখে তার কথা।”

চৌকিদারের কথা শেষ হতে না হতে পেয়াদা লাফিয়ে সামনে এসে আমাকে বলল, আত্মপক্ষ সমর্থনে আমার যদি কিছু বলার থাকে, বলতে পারি। প্রথমটায় কথাই সরছিল না আমার মুখে। খানিকক্ষণ কাঁদলাম হাউমাউ করে। পরে একটু ধাতস্থ হলে বললাম, “বিজ্ঞ আদালত, আপনাদের নগরের তিন অধিবাসীকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে আমার বিরুদ্ধে। কিন্তু কোন পরিস্থিতিতে আমি তাদের হত্যা করেছি, সেটার যতই সত্য বয়ান আমি তুলে ধরি না কেন, জানি আপনাদের এবং এই সমবেত জনতাকে বোঝানো সম্ভব হবে না, খুন আমি স্বেচ্ছায় করিনি।

“আপনারা যদি মনোযোগ দিয়ে আমার কথা শুনতে রাজি হন তো সংক্ষেপে বলি। আমার কথা শুনলে আপনারা বুঝবেন, যে অপরাধের জন্য আজ আমাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে, সেটা নেহাতই এক আকস্মিক ঘটনা। ক্রোধের বশে এই কাজ করেছি আমি, আর মানুষের উপকারের জন্যই সেটা করা। নইলে আমি অপরাধপ্রবণ লোক নই মোটেও। আমি বলছি গত রাতে কী হয়েছিল। গত রাতে এক ভোজসভা থেকে ফিরছিলাম। রাত একটু বেশিই হয়ে গিয়েছিল আর আমি একটু বাড়াবাড়িই মদ্যপান করে বেসামাল ছিলাম। এই শহরে যার বাড়ি আমি ভাড়া নিয়েছি, সেই মিলোর বাসার সামনে যখন এলাম, দেখি একদল ষন্ডাপান্ডা ওনার সদর দরজা ভেঙে ফেলার চেষ্টা করছে। তার দরজার খিল-কব্জা খুলে ফেলার উপক্রম। বাড়ির সবাইকে হত্যা করবে বলে ঘোষণা দিচ্ছে। তাদের দলের সর্দার তো হুংকার ছাড়ল, ‘বাইরে বেরিয়ে আয় সবাই, দেখি তোদের কত বুকের পাটা। একবার ভেতরে ঢুকতে পারলে, তোদের একটাকেও ছাড়ব না। সবাইকে কচুকাটা করব।’ এ কথা শুনে বিজ্ঞ আদালত, আমি আমার তরবারি খাপমুক্ত করলাম। এ ধরনের আপদের জন্য সব সময় আমার কোমরে তরবারি গোঁজা থাকে। ভয় দেখিয়ে দস্যুদের তাড়িয়ে দেওয়া কর্তব্যজ্ঞান করলাম আমি। কিন্তু বিধি বাম। আমার হাতে অস্ত্র দেখে তারা ভয় তো পেলই না, উল্টো আমার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেল। মারপিট করতে চায়। দস্যুদের মধ্যে যে লোকটা সর্দার গোছের, সে তো সোজা আমার দিকে তেড়ে এলো। দু’হাতে চুলের মুঠো ধরে আমার মাথাটাকে ঝাঁকাতে লাগল সে। আর সঙ্গীদের উদ্দেশ্যে হাঁক দিল, ‘জলদি একটা পাথর এনে এর মাথা থেঁতলে দে তোরা!’

“ভাগ্য ভালো, তার আগেই আমি আমার হাতটা ছাড়িয়ে নিতে পারলাম আর পাশ থেকে চালিয়ে দিলাম তরবারি। লোকটা আমার পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ল। তখন আরেকজন আমার পা টেনে ধরে পায়ে কামড় বসানোর চেষ্টা করতে লাগল। বাধ্য হয়ে তারও পেটে তরবারি চালিয়ে দিলাম আমি। তারপর তরবারি মুক্ত করে ধেয়ে আসতে থাকা তৃতীয় লোকটাকে আঘাত করলাম। সেও লুটিয়ে পড়ল।

“এভাবে লড়াই শেষ হলো। আমার আশ্রয়দাতা গৃহস্বামী ও গৃহকর্ত্রীর প্রাণ রক্ষা করতে পেরে আমি নিজেই নিজেকে অভিনন্দন জানালাম। সত্যি বলতে কি, আমি ভেবেছিলাম, আমার এই কৃতিত্বের জন্য আমাকে শুধু যে ক্ষমা করে দেওয়া হবে তা-ই না, বরং প্রকাশ্যে আমাকে পুরস্কৃত করা হতে পারে। কিন্তু দেখছি কপাল মন্দ। হত্যার অপরাধে আমাকে কাঠগড়ায় তোলা হয়েছে। দেখুন, নিজ দেশে আমি অত্যন্ত সম্মানিত একজন ব্যক্তি। সেখানে আমার বিরুদ্ধে ছোটখাটো কোনো অপরাধের অভিযোগও কখনো ওঠেনি। আমার মান-মর্যাদা সেখানে গগনচুম্বী। এই পুরো রঙ্গশালার কেউ কখনো প্রমাণ করতে পারবে না, গত রাতের আগ পর্যন্ত কারও সঙ্গে কখনো আমার সামান্যতম কাজিয়াও হয়েছে। কাল রাতে আমি যদি দস্যুগিরি করেই থাকি, তাহলে আমি নিহত ব্যক্তিদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছি এমন কোনো জিনিস দেখাক দেখি বাদীপক্ষ। পারবে? পারবে না। হ্যাঁ, আমি খুন করেছি বটে। কিন্তু লোকের ভালোর জন্য করেছি।”

এ কথা বলে আমি আবার কান্নায় ভেঙে পড়লাম। কৃপা চাওয়ার ভঙ্গিতে হাতজোড় করে নতমুখে দাঁড়িয়ে থাকলাম।

কিন্তু আড়চোখে তাকিয়ে দেখি, দর্শকদের কারও মুখেই সহানুভূতির লেশমাত্র নেই। বরং অনেকের চোখে-মুখে কেমন একটা চাপা ফিচেল হাসি। তারা যেন খুব আমোদ পাচ্ছে। দেখি, আমার মেজবান মিলো প্রকাশ্যে শব্দ করে হাসছেন। বুকে শেল বিঁধল। এ-ও কি সম্ভব? এর কি হৃদয় বলে কিছু নেই? বিবেক বলে কিছু নেই? কাল রাতে একে আর এর পরিবারকে বাঁচানোর জন্য কি আমি আমার জীবন বাজি রাখিনি? আমার প্রতি বিন্দুমাত্র সহানুভূতিও থাকতে নেই? মিলো গ্যালারিতে বসে দেখছেন, কীভাবে আমাকে ফাঁসি দেওয়ার বন্দোবস্ত চলছে। আর তিনি অন্যদের সঙ্গে গলা মিলিয়ে হাসছেন।

এরই মধ্যে দেখি, দর্শকদের আসনের সারির মাঝের আইল ধরে এক মহিলা হনহন করে এগিয়ে আসছে মঞ্চের দিকে। তার কোলে একটা বাচ্চা। তার পেছন পেছন এক বুড়ি। দু’জনেই বুক চাপড়াচ্ছে আর তারস্বরে বিলাপ করছে। মঞ্চে উঠে এসে তারা সেই টেবিলটার কাছে গেল, যেটায় তিন দস্যুর লাশ ঢেকে রাখা আছে একটা চাদর দিয়ে। টেবিলের ওপর ঝুঁকে পড়ে তারা আবার বুক চাপড়ে শুরু করল বিলাপ। বুড়ি তারস্বরে চেঁচিয়ে বলল, তিন ডাকুর একজনের মা সে। ছেলেকে হারিয়ে তার বুক খালি হয়ে গেছে। তার সন্তানের হত্যাকারীর কঠিন সাজা দাবি করতে থাকে সে। তার আর্জি, আমাকে যেন কোনোভাবেই ক্ষমা করা না হয়। বুড়ি থামলে সঙ্গের মহিলা বিলাপ করতে করতে বলল, তিন ডাকুর একজন তার স্বামী। তার মৃত্যুতে এখন এক নিঃস্ব বিধবায় পরিণত হতে হয়েছে তাকে। তার কোলের শিশু হয়ে পড়েছে এতিম। স্বামীর হত্যাকারীর রক্ত না দেখা পর্যন্ত তার শোক কমবে না।

এ পর্যায়ে মুখ্য হাকিম উঠে দাঁড়ালেন। উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে বললেন : অস্বীকার করার জো নেই, যা ঘটেছে সেটা একটা অপরাধ, তা যেই দৃষ্টিকোণ থেকেই ব্যাপারটা দেখা হোক না কেন। তবে এখনো একটা কাজ বাকি থেকে গেছে। এই অপকর্মের পেছনে আর কারা জড়িত, কাদের মদদে এ অপরাধ ঘটেছে, তা অনুসন্ধান করা। একটা লোক যত বড় জওয়ান মর্দই হোক না কেন, তিন-তিনটা দশাসই লোককে কাবু করে ফেলা তার একার পক্ষে সম্ভব না। যে দাস লোকটা ভোজসভা থেকে লুসিয়াসকে পাহারা দিয়ে এনেছে, সে রহস্যজনকভাবে গা ঢাকা দিয়েছে। এই অপরাধের সে-ই একমাত্র চাক্ষুষ সাক্ষী। কাজেই সত্য উদ্ঘাটন করতে লুসিয়াসের ওপর নির্যাতন চালানো ছাড়া আর উপায় নেই। তার ওপর চাপ প্রয়োগ করে এই চক্রের বাকি সদস্যদের নাম বের করা জরুরি। কে জানে, তারা হয়তো আরও বড় বড় অপকর্ম করার ষড়যন্ত্র কষছে।

হাকিমের কথা ফুরিয়েছে কি ফুরায়নি, গ্রিস দেশে নির্যাতন করার যত যন্ত্রপাতি প্রচলিত, সব হাজির করা হলো মঞ্চে। একেকটা যন্ত্র দেখে আত্মা কেঁপে যায় : পায়ের তালু পুড়িয়ে দেওয়ার জন্য কয়লার চুলা, ডলা দিয়ে হাড় গুঁড়ো গুঁড়ো করার জন্য জাঁতাকল, শুইয়ে চাবুক কষার বেঞ্চ ইত্যাদি ইত্যাদি। বুঝলাম, কল্লা নামিয়ে দিয়ে একবারে ভবলীলা সাঙ্গ করবে না এরা আমার। বরং তারিয়ে তারিয়ে, যন্ত্রণা দিয়ে মারবে।

নির্যাতন শুরু হবে হবে— এমন সময় সেই বিলাপকারী নচ্ছার বুড়ি আবার দাঁড়াল। বলল, “এই দস্যুটাকে শূলে চড়ানোর আগে বিজ্ঞ বিচারকেরা কি একবার লাশগুলোর চাদর সরানোর অনুমতি দেবেন? উপস্থিত সবাই দেখুক, কী নিষ্পাপ সুন্দর চেহারা ছিল নিহত ব্যক্তিদের। তাতে সবার ক্রোধ আরও বাড়বে আর তারা প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য আরও মরিয়া হয়ে উঠবে।”

তুমুল করতালি। হাকিমেরা নির্দেশ দিলেন আমাকেই কাজটা করতে হবে। অর্থাৎ টেবিলের ওপর রাখা লাশগুলোকে ঢেকে রাখা চাদর আমাকেই সরাতে হবে। আমি অস্বীকৃতি জানালাম। তখন দুই পেয়াদা এসে আমাকে জবরদস্তি করে টেনে নিয়ে গেল টেবিলের কাছে। নিজের অপরাধ আমার নিজেকেই উন্মোচন করতে হবে হলভর্তি দর্শকদের সামনে। বড় নির্দয় শাস্তি। আমি তখনো প্রতিরোধ করছি।

কিছুতেই করব না এ কাজ। আমার হাত মুচড়ে আমাকে দিয়ে চাদর সরাতে বাধ্য করল পেয়াদারা।

আমি চাদর টান দিয়ে সরিয়ে দিলাম।

কিন্তু একি! লাশ কোথায়?

আমি বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে গেলাম। দেখি লাশের জায়গায় চামড়া দিয়ে বানানো তিনটি মদের থলে। সেগুলোর চামড়া কয়েক জায়গায় ফুটো হয়ে আছে। আমারই তরবারির ঘায়ে তৈরি হয়েছে এসব ছিদ্র।

তার মানে রাতের অন্ধকারে, মাতাল অবস্থায় লাল মদে ভরা এসব চামড়ার থলের গায়ে তরবারি চালিয়েছি আমি!

তার মানে, আমাকে বোকা বানানো হয়েছে!

এতক্ষণ ছিল চাপা ফিকফিক হাসি। এবার গগনবিদারী অট্টহাস্য চারদিকে। হেসে গড়িয়ে পড়ছে লোকে। হাসির চোটে পেট চেপে ধরেছে অনেকে।

উল্লাসে ফেটে পড়ে গ্যালারি ডিঙিয়ে নেমে পড়ল সবাই। হইচই হাসির হল্লা। চাদর হাতে আহাম্মকের মতো দাঁড়িয়ে আছি আমি। পাথরের থাম যেন একটা।

আমার মেজবান মিলো এসে আমাকে মঞ্চ থেকে নামিয়ে টেনে নিয়ে যেতে লাগলেন। ভিড়ের এই হট্টগোল আর অবমাননাকর অবস্থা থেকে আমাকে রেহাই দেওয়াই তার উদ্দেশ্য। আমি তখন দুই হাতে মুখ ঢেকে কাঁদছি। আমাকে নানাভাবে সান্ত্বনা দিতে লাগলেন মিলো। কিন্তু অপমানের জ্বালা কমছে না আমার। ইশ্, কী ভীষণ এক রসিকতার পাত্র বানানো হয়েছে আমাকে! সবাই মিলে!

আমরা বাসায় ঢোকার পরপরই হাকিমেরা এসে হাজির। বিচারকের পোশাক না পাল্টেই তারা হাজির হয়েছেন। আমাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে তুষ্ট করতে চান। তারা বললেন, “সম্মানিত লুসিয়াস, আপনার উচ্চ বংশ আর সামাজিক মর্যাদা সম্পর্কে আমরা পুরোপুরি ওয়াকিবহাল। বিশেষ করে আপনার মা যে গ্রিসের এক সম্ভ্রান্ত বংশের মেয়ে, সেটা আমাদের অজানা নয়। কাজেই আপনাকে হেয় করার জন্য আমরা মশকরা করেছি, এটা ভাববেন না কোনোভাবে। ব্যাপার হয়েছে কি, আজ আমাদের হাস্য উৎসব। হাসির দেবতাকে উৎসর্গ করে দিনটা পালন করি আমরা। হাসির দেবতা আমাদের প্রধান দেবতা। আর প্রতিবারই কোনো না কোনো নতুন উদ্ভাবনী তামাশার পরিস্থিতি তৈরি করি আমরা, কাউকে না কাউকে নিয়ে রগড় করি। এখন দেখবেন, আপনি যেখানেই যাবেন, লোকে আপনাকে সহাস্য ভালোবাসার চোখে দেখবে। আপনার সঙ্গে মশকরা করা হয়নি। বরং আপনাকে নিয়ে ঠাট্টা করে হাইপাতা নগরবাসী আজ আপনাকে সর্বোচ্চ সম্মানের আসনে বসিয়েছে। শহরের পরমতম বন্ধু হিসেবে আপনাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। আপনার সম্মানে বাজারের মোড়ে আপনার একটা ভাস্কর্য স্থাপন করা হবে।”

এটুকু শুনে আমার গা-জ্বলুনি কিছুটা কমল। গলা নরম হয়ে এলো। বললাম, “নগরবাসীকে জানিয়ে দিন, তাদের এই সম্মান আমি মাথা পেতে নিচ্ছি। তবে জনসমক্ষে আমার ভাস্কর্য স্থাপনের দরকার নেই। তার বদলে বরং শহরের কোনো সম্মানিত বুজুর্গের ভাস্কর্য বসাতে বলুন তাদের।”

জোর করে মুখে হাসি হাসি ভাব এনে হাকিমদের বিদায় দিলাম।

তাঁরা বিদায় হতে না হতেই বিরহিনা খালার চাকর এসে হাজির। বলে, হাস্য উৎসবের অংশ হিসেবে রাতে তার বাসায় ভোজসভায় আমার দাওয়াত আছে। সেটাই মনে করিয়ে দিতে এসেছে সে। আমি প্রমাদ গুনলাম। বললাম, “দয়া করে খালাকে জানিয়ে দিন, ভোজসভায় যাওয়ার জন্য আমি এক পায়ে খাড়াই ছিলাম। কিন্তু বাদ সেধেছেন আমার মেজবান মিলো। আজ তাঁর বাসাতেই বিরাট ভোজ। আর তিনি কিছুতেই ছাড়বেন না আমাকে। হাজার হলেও আমি তাঁর মেহমান। আমি তাঁর কথা ফেলতে পারব না।”

এরপর মিলো আমাকে নিয়ে চললেন গণগোসলখানায়। সেখানে গিয়ে দেখি, লোকে আমার দিকে তাকিয়ে ফিকফিক করে হাসে। কোনোরকমে গোসল সেরে তড়িঘড়ি বাসায় ফিরে এলাম।

রাতে মিলোর বিস্বাদ খাবার গিলতে হলো।

খানাপিনা শেষ হতেই বললাম, আজ শরীর বড় ক্লান্ত। তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়তে চাই।

বিছানায় শুয়ে সারা দিনের ঘটনার সাত-পাঁচ ভাবছি, এমন সময় দরজায় টোকা।

দরজা খুলে দেখি চাকরানি ফোতিস। সে আমার কাছে মাফ চাইতে এসেছে। কেননা কাল রাতের ষড়যন্ত্রের সঙ্গে তাকেও হাত মেলাতে হয়েছিল। আমি তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললাম, আমি কিছু মনে করিনি। তখন সে বলল, তার অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে সে আমাকে গোপন কিছু কথা বলবে।

আমি বললাম, ঠিক আছে।

ফোতিস তখন নানাভাবে আমাকে দিয়ে কসম কাটাল, আমি যেন ঘুণাক্ষরেও কাউকে কিছু না বলি। কেননা যা সে এখন বলতে যাচ্ছে, তা যেমন গোপন, তেমনি ভয়ংকর। আমি কসম কাটলাম।

ফোতিস বলল, তার গৃহকর্ত্রী প্যামফিল আজ রাতে ডাকিনীবিদ্যা চর্চায় বসবেন। আমি চাইলে গোপনে সেটা দেখার সুযোগ নিতে পারি।

আমি প্রায় লাফিয়ে উঠলাম। এটাই তো চাইছিলাম। এর জন্যই তো ফোতিসকে এত তোয়াজ করেছি এত দিন।

তখনো জানি না, ডাইনি প্যামফিলের গুপ্তবিদ্যা লুকিয়ে দেখতে গিয়ে কী অবিশ্বাস্য এক দুর্বিপাকে পড়তে হবে আমাকে। সেটা দুঃস্বপ্নের চেয়েও ভয়ংকর।


---E-Book Created By---
Md. Ashiqur Rahman

পঞ্চম অধ্যায়

আপুলিয়াসের রূপান্তর


রাতের আঁধারে আমি আর দাসী ফোতিস চললাম গৃহস্থবাড়ির চিলেকোঠায়। সেটাই গৃহকর্ত্রী পামফিলার আস্তানা। চিলেকোঠার একটা ঘরে দরজা লাগিয়ে গোপন তন্ত্রমন্ত্র, বান-উচাটন, ডাকিনি বিদ্যা চর্চা করে পামফিলা। আজ রাতে নিজেকে পাখিতে রূপান্তরিত করবে সে। উড়ে বেড়াবে পুরো শহর। খুঁজবে শিকার। ডাকিনি বিদ্যায় আমার প্রবল কৌতূহল। বলতে কি, এইটার জন্যই কত দূরদেশ পাড়ি দিয়ে এই হাইপাতা শহরে এসেছি। পামফিলার পাখিতে পরিণত হওয়া লুকিয়ে দেখব আমি।

পা টিপে টিপে সিঁড়ি বেয়ে উঠলাম আমি আর দাসী ফোতিস। চিলেকোঠার ঘরের দরজায় পৌঁছালে ফোতিস দরজার একটা ফুটো দেখিয়ে সেখানে চোখ দিতে বলল। আমি ফুটোয় চোখ রাখলাম। দেখলাম পামফিলা একটা আলমারি খুলছে, যেটার ভেতরে অনেকগুলো ছোট ছোট বাক্স। একটা বাক্স খুলল পামফিলা। সেটার ভেতরে একধরনের মলম। আঙুল দিয়ে মলম তুলে তুলে সারা গায়ে মাখতে লাগল পামফিলা— পায়ের পাতা থেকে মাথার চাঁদি পর্যন্ত।

মলম মাখা শেষ হলে পামফিলা একটা জ্বলন্ত প্রদীপের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বিড় বিড় করে শুরু করল মন্ত্র পড়া। তার সারা শরীর কাঁপছে। আর তারপর ধীরে ধীরে আমার চোখের সামনে দেখি তার ত্বকে পালক গজাচ্ছে। দুই হাত ধীরে ধীরে বদলে গিয়ে ডানায় পরিণত হলো। নাক কুঁচকে বেঁকে যেতে যেতে পরিণত হলো পাখির ঠোঁটে। আঙুলের নখ হয়ে উঠল ধারালো নখর। একসময় দেখি আমার সামনে ঘরের মেঝেতে একটা বড়সড় প্যাঁচা দাঁড়িয়ে। পামফিলা পরিণত হয়েছে একটা প্যাঁচায়। সে একটা ভয়ংকর প্যাঁচার ডাক ছাড়ল। ডানা ঝাপটাল কয়েকবার, দেখে নিল ওড়ার উপযোগী হয়েছে কি না। ঘরের মধ্যে একটু ওড়াউড়ি করে প্র্যাকটিসও করে নিল। তারপর জানালা দিয়ে হুস করে বেরিয়ে গেল রাতের আকাশে।

আমি বিস্ময়ে পাথর হয়ে আছি। কয়েকবার চোখ রগড়ে নিলাম। বোঝার চেষ্টা করলাম, স্বপ্ন দেখছি কি না। আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি নাকি? ধাতস্থ হতে বেশ কিছুক্ষণ লাগল। সংবিৎ ফিরে পেতেই ফোতিসের হাত চেপে ধরলাম। বললাম, ওই মলম আমিও খানিকটা মাখতে চাই। এক রাতের জন্য আমিও একটু পাখি হব, রাতের আকাশে শহরটা কয়েকবার চক্কর দেব— এই আমার খায়েশ।

ফোতিস ভয় পেয়ে গেল। কিছুতেই সে রাজি না। আর এটা শর্তও ছিল না। কথা ছিল, আমাকে শুধু, তন্ত্রমন্ত্র দেখার সুযোগ করে দেবে সে। এ আবার কী নতুন আবদার!

কিন্তু আমি নাছোড়বান্দা। বললাম, দরকার হলে সারা জীবন তার দাস হয়ে থাকব, তবু একবার যেন সে সুযোগ করে দেয়।

অগত্যা ফোতিস নিমরাজি। বলল, তার মালকিন তাকে অল্প কিছু বিদ্যা শিখিয়ে-পড়িয়ে দিয়েছে। কেননা সারা রাত শহর চষে বেড়িয়ে ভোরে পামফিলা যখন চিলেকোঠায় ফেরে, তখন তো তাকে আবার মানুষে রূপান্তর করার ওষুধ প্রস্তুত রাখতে হয়। সেই ওষুধ বানানোর কৌশল পামফিলা শিখিয়ে দিয়েছে দাসী ফোতিসকে। তেমন জটিল কিছু নয়। মামুলি কিছু ভেষজ লতাগুল্ম। এই যেমন আজ প্যাঁচা থেকে মানুষে ফিরিয়ে আনতে দরকার হবে ঝরনার পানিতে ভিজিয়ে রাখা ধনেপাতা আর লরেলগাছের পাতা। পামফিলা ওই পানি খানিকটা খাবে, আর বাকিটায় গোসল করবে। আর তাতে আবার মানব শরীর ধারণ করতে পারবে সে।

আমি যদি প্যাঁচা হই, তাহলে সংক্ষিপ্ত ভ্রমণ শেষে আমাকেও সেটাই করতে হবে।

আমি প্রতিশ্রুতি দিলাম, কথার নড়চড় হবে না।

ভয়ে ভয়ে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল ফোতিস। আলমারি খুলল। নিয়ে এলো জাদুর মলমভর্তি ছোট বাক্সটা।

বাক্সটা হাতে নিয়েই দারুণ উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলাম। উত্তেজনায় চুমু খেলাম বাক্সটাকে। আঙুল ডুবিয়ে তুলে আনলাম মলম। মাখতে লাগলাম সারা গায়ে। মাখা শেষ হলে দু’হাত ডানার মতো মেলে ধরে হাত ঝাপটানোর চেষ্টা করতে থাকলাম, পামফিলাকে যেভাবে করতে দেখেছি। কিন্তু হাতের চামড়া ফুঁড়ে তো কোনো পালক বের হচ্ছে না। ব্যাপার কী? চিন্তিত চোখে নিজের শরীরের দিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখি, শরীরে অন্য রকম একটা পরিবর্তন ঘটছে। শরীরে যত লোম আছে সেগুলো মোটা, রুক্ষ আর কোঁকড়ানো হয়ে উঠছে। আর চামড়াটাও হয়ে পড়ছে শক্ত, খসখসে। এরপর হাত আর পায়ের আঙুলগুলো একটার সঙ্গে আরেকটা জোড়া লেগে গিয়ে দুটো শক্ত দলায় পরিণত হলো। টের পেলাম ওগুলো আসলে খুরে পরিণত হয়েছে। এর চেয়েও বড় একটা পরিবর্তন টের পেলাম মেরুদণ্ডে। দেখি মেরুদণ্ডের শেষ অংশটা প্রসারিত হয়ে লেজ বেরিয়ে আসছে। তারপর দেখি আমার মুখমণ্ডল ফুলে উঠছে, মুখটাও প্রসারিত হচ্ছে। মুখের ভেতর থেকে জিব বেরিয়ে এসে ঝুলতে লাগল ল্যাগব্যাগ করে। খাড়া হয়ে উঠল লোমশ কান। বিস্ময় আর আতঙ্কে নিজের এসব পরিবর্তন দেখছি।

একপর্যায়ে বুঝতে আর বাকি থাকল না : পাখি হওয়ার বদলে আমি আসলে একটা গাধায় রূপান্তরিত হয়েছি— একটা সরল, ভারবাহী গর্দভ।

ইচ্ছে করল ফোতিসকে কষে গালিগালাজ শুরু করি। কিন্তু মুখ দিয়ে কথা বের হয় না। বুঝতে পারলাম, গাধার মুখ নিয়ে কথা বলা সম্ভব না। ফলে। অসহায় চোখে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে থাকলাম দাসী ফোতিসের দিকে।

চোখের সামনে আমার এই রূপান্তর দেখে ফোতিসও বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে। শেষে সে মহাবিলাপ শুরু করে দিল। বলল, ভুল করে সে ভিন্ন একটা বাক্স নিয়ে এসেছে। দুটো বাক্স প্রায় একই রকম দেখতে।

ভুল হয়েছে, ভালো কথা। কিন্তু এখন কী করা?

সেটা তো ফোতিসকে জিজ্ঞাসাও করতে পারছি না। তবে ফোতিস নিজে থেকেই বলল, ঘাবড়ানোর কিছু নেই। এটার চিকিৎসা খুবই সহজ। শুধু একটা গোলাপ ফুল চিবাতে হবে আমাকে। তাহলে আমি আবার সেই পুরোনো লুসিয়াস আপুলিয়াসে পরিণত হব। প্রতিদিনই সন্ধ্যাবেলা ঘরে ফুলের তোড়া সাজিয়ে রাখে ফোতিস। আজ রাখেনি। রাখলে এখনই একটা গোলাপ ফুল খাইয়ে আবার মানুষ বানিয়ে দিতে পারত আমাকে। এখন এত রাতে বাড়ির বাইরে বের হওয়া নিরাপদ নয়। ভোর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। আলো ফুটতেই ফোতিস বাইরে গিয়ে একটা গোলাপ ফুল কিনে আনবে। নিজের ভুলের জন্য একটানা নিজেকে বকুনি দিয়ে যাচ্ছে ফোতিস। বলছে, এমন অমনোযোগী কেন যে সে হলো।

আমি দেখছি, চেহারাসুরতে আমাকে যদিও এ মুহূর্তে একটা নিখুঁত গাধাই মনে হচ্ছে, বুদ্ধিসুদ্ধি কিন্তু লোপ পায়নি মোটেও। মানুষের মতোই চিন্তা করতে পারছি আমি। আর সে জন্যই ফোতিসের পাছায় দড়াম করে একটা লাথি কষার প্রবল ইচ্ছা অনেক কষ্টে দমন করা সম্ভব হলো আমার পক্ষে। মালকিনের মতো এই দাসীও একটা ডাইনি ছাড়া তো আর কিছুই না। কিন্তু আবার এ-ও ভাবছিলাম যে এই দাসীই এখন আমার একমাত্র সহায়। একে বিগড়ে দিলে বিপদ হতে পারে। কাজেই মাথা নিচু করে কান ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে আমি আমার ভেতরের ক্রোধ আপাতত হজম করলাম এবং সুবোধ বালকের মতো নিয়তির হাতে নিজেকে সঁপে দিলাম।

নিচে নেমে গেলাম আমি। আঙিনার এক কোণে একটা আস্তাবল। সেখানে ঘোড়া আর গাধাদের রাখা হয়। ঠুক ঠুক করে হেঁটে সেখানে গেলাম। ওখানে আমার নিজের ঘোড়াটা আছে, যেটায় করে আমি এই শহরে এসেছি।

আমার ঘোড়ার পাশেই দেখি একটা গাধা দাঁড়িয়ে আছে। ওটা এই বাড়ির মালিক মিলোর গাধা। ভাবলাম, পশুপাখিদের কৃতজ্ঞতার বোধ ঈশ্বরপ্রদত্ত। ফলে আমাকে এ অবস্থায় দেখলেও হয়তো চিনতে ভুল করবে না প্রাণিগুলো। আর আমার এই দুর্দশা দেখে অন্তত করুণার উদ্রেক হবে তাদের মনে। ভাবলাম, শ্রদ্ধাভক্তিতে গদগদ হয়ে আমাকে তারা আস্তাবলে সম্ভাষণ জানাবে, ঠিক যেভাবে বিদেশি দূতদের রাজপ্রাসাদে সম্ভাষণ জানায় অমাত্যরা। কিন্তু কিসের কী! আমার অনুগত ঘোড়া আর মিলোর হতচ্ছাড়া গাধাটা আমাকে দেখামাত্র এমন গোঁয়ারের মতো ঘাড় বাঁকাল, যেন আমি তাদের খাবারে ভাগ বসাতে এসেছি। আমার বিরুদ্ধে এককাট্টা হয়ে গেল দুটোই। যে পাত্রে তাদের খাবারদাবার, মানে ঘাসবিচালি রাখা হয়, সেটার দিকে যেই পা বাড়িয়েছি, তারা কান নিচু করে পেছন ফিরে পেছনের পা দিয়ে লাথি কষতে শুরু করল আমার মুখে। আমার নিজের ঘোড়া! এই তার কৃতজ্ঞতার নমুনা! আজ মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে আমি নিজ হাতে যেই খাবার তাকে বানিয়ে দিয়েছি, সেই খাবারে ভাগ বসানোর অপরাধে কিনা আমাকে সে লাথি মারছে।

আর না এগিয়ে বিষণ্ণ মনে আস্তাবলের ভেতরেই এক কোণায় গুটিসুটি দাঁড়িয়ে থাকলাম। মনে মনে বললাম, কাল ভোরের আলো ফুটতেই গোলাপ ফুল খেয়ে আবার লুসিয়াস হয়ে নিই আগে, তারপর মজা দেখাব তোদের।

দাঁড়িয়ে আছি, এই সময় চোখে পড়ল আস্তাবলের ওপরের দিকে একটা তক্তায় ছোট্ট মণ্ডপের মতো বানানো হয়েছে। তাতে একটা ঘোড়ামুখো দেবীর ঠান। দেবীর পায়ের কাছে গোলাপ ফুলের অর্ঘ্য দিয়েছে কেউ।

গোলাপ দেখে লোভে চোখ চকচক করে উঠল। সামনের পা দেয়ালে তুলে পেছনের পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলাম। গলাটা বাড়িয়ে দিলাম তক্তায় বসে থাকা দেবীর দিকে। জিব প্রসারিত করলাম যতটা পারা যায়। এই তো, আরেকটু হলে গোলাপ ফুলটাকে নাগালে পেয়ে যাবে জিব। কিন্তু ফাটা কপাল আমার! সেই মুহূর্তে কোথা থেকে উদয় হলো আমার ভৃত্য। সে আমার ফাইফরমাশ খাটে। আস্তাবলের ঘাস-বিচালির মধ্যে কোথাও শুয়েটুয়ে ছিল বোধ হয়। ভৃত্য দেখল, আমি দেবীর নৈবেদ্য খেয়ে ফেলার চেষ্টা করছি। লাফিয়ে উঠে সে হাঁক ছাড়ল, “এ গাধা তো মহাযন্ত্রণা দিচ্ছে দেখছি। দাঁড়া, পিটিয়ে তোর টেংরি ভাঙছি...।”

এদিক-সেদিক খুঁজে ভৃত্য একটা ডান্ডা হাতে নিল। তারপর নির্দয়ভাবে পেটাতে শুরু করল আমাকে। উফ্, সে কী মার। ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠলাম। অবশ্যই গাধার ভাষায়।

পিটুনি আরও চলত। কিন্তু তখন আরেকটা ঘটনা ঘটল। বাইরের দরজায় দমাদম পেটাতে শুরু করেছে কারা যেন। সেই সঙ্গে দূর থেকে “চোর! চোর!” বলে একটা শোরগোল। ভয়ে লাঠি ফেলে চম্পট দিল ভৃত্য। আর তখনই বাড়ির সদর দরজা ভেঙে পড়ল। হুড়মুড় করে উঠানে ঢুকল একদল সশস্ত্র ডাকাত। প্রতিবেশীরা জড়ো হয়ে মিলোকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসার চেষ্টা করল একবার। কিন্তু দস্যুরা তাদের পিটিয়ে তাড়িয়ে দিল।

দস্যুদের হাতে মশাল। সেই আলোয় ঝিলিক দিয়ে উঠছে তাদের তরবারির ফলা। হাতে কুঠারও আছে তাদের। সেই কুঠার চালিয়ে তারা বাড়ির অন্দরমহলে গোলাঘরের দরজা ভেঙে ফেলল। গোলাঘরে হাড়কিপ্টা মিলোর সারা জীবনের ধনসম্পদ সঞ্চয় করে রাখা। সেগুলো সবই বের করে আঙিনায় স্তূপ করল ডাকাতেরা। কয়েক ভাগে ভাগ করে বেঁধেছেদে অনেকগুলো পোঁটলা বানাল। একেক ডাকু কাঁধে তুলে নিল একেকটা পোঁটলা। কিন্তু দেখা গেল, ডাকুর তুলনায় পোঁটলার সংখ্যা বেশি হয়ে গেছে। কী করা?

তখন তাদের চোখ গেল উঠানের আস্তাবলটার দিকে। আমরা তিন অবলা পশু। আমাদের বের করে আনা হলো উঠানে। কাঁধে চাপানো হলো সবচেয়ে ভারী পোঁটলাগুলো। তারপর লাঠি দিয়ে পেটাতে পেটাতে আমাদের বাড়ির বাইরে সদর রাস্তায় এনে ফেলল দস্যুরা। এগোতে শুরু করল শহরের বাইরে পাহাড়ি এলাকার দিকে। আমরা নড়তে না চাইলে পেছন থেকে দমাদম ঘা পড়ছে লাঠির।

এভাবে ডাকুরা রওনা দিলেও একজনকে রেখে গেল শহরে। জনতার সঙ্গে মিশে গেল লোকটা। সে গুপ্তচরগিরি করবে। ডাকুদের ধরতে কী করা হচ্ছে, পুলিশ কী পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে— এসব তথ্য পাচার করবে সে।

শহর শেষ হতেই পাহাড়। অত্যন্ত খাড়া ঢাল। আমরা চলছি তো চলছিই। অন্তহীন এক যাত্রা যেন।

ভোর গড়িয়ে বেলা বাড়তে লাগল। একটা বড় গ্রামের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। সেখানে একটা মেলা বসেছে। দেখি থেসালি শহরের কিছু লোকজনও মেলায় এসেছে। তাদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আমি সাহায্যের জন্য চিৎকার করে ওঠার চেষ্টা করলাম। কিন্তু আমার মুখ থেকে একটা পাশবিক ধ্বনি নির্গত হলো কেবল। আমার এই চেঁচামেচিতে মহাবিরক্ত হলো ডাকুরা। আমার মুখ বন্ধ করার জন্য ধারালো ছুরি দিয়ে ভয়ানক খোঁচা দিতে লাগল আমার চামড়ায়। ব্যথার চোটে চুপ করে গেলাম।

অবশেষে ভাগ্যদেবী একটু প্রসন্ন হলেন। এই অভিশাপ থেকে মুক্তির একটা সুযোগ দেখা দিল। বেশ কয়েকটা খামার আর বড় গৃহস্থ বাড়ি পেরিয়ে যাওয়ার পর চোখে পড়ল সামনে রাস্তার পাশে একটা অপূর্ব বাগান। বাগানে নানা রকম ফুল ফুটে আছে। ভালো করে তাকিয়ে দেখি তার মধ্যে কিছু তরতাজা গোলাপ ফুলও আছে। দেখে প্রাণটা জুড়িয়ে গেল। দ্রুত এগিয়ে গেলাম। গোলাপের ঝাড়ের দিকে গলা বাড়িয়ে দিয়েছি। জিবে জল চলে এসেছে। কিন্তু তখন একটা চিন্তা মাথায় এলো। এখন যদি আমি ফুলটা খাই আর খেয়ে লুসিয়াসে পরিণত হই, এটা দেখে দস্যুরা নির্ঘাত আমাকে হত্যা করবে।

একে তো আমাকে তান্ত্রিক জাদুকর মনে করবে তারা। তা ছাড়া তারা ভাববে, আমি দস্যুদের কথা ফাঁস করে দেব জনসমক্ষে। কাজেই এ মুহূর্তে ফুলের দিকে মুখ বাড়ানো চলবে না। বরং ডাকাত দলের ভেতরেই সবচেয়ে অনুগত পশু হয়ে থাকতে হবে, আর সুযোগ খুঁজতে হবে মোক্ষম সময়ের।

দুপুর নাগাদ কড়া রোদ উঠল। একটা জায়গায় এসে আমরা রাস্তা ছেড়ে একটা ছোট্ট গ্রামের ভেতর ঢুকলাম। থামলাম গিয়ে গ্রামের একটা বাড়ির সামনে। জনা দুই-তিন বুড়ো বেরিয়ে এসে সম্ভাষণ জানাল ডাকুদের। তারা যেভাবে কোলাকুলি করল আর যেভাবে লম্বা খোশগল্পে মেতে উঠল, বুঝতে বাকি থাকল না এরা ডাকাত দলের সাঙাত। দস্যুরা আমার পিঠের পোঁটলা থেকে কয়েকটি থালা বের করে গৃহস্থ বুড়োদের হাতে তুলে দিল এবং ফিসফিস করে বলল এ ব্যাপারে মুখ বন্ধ রাখতে।

এই বাড়িতে যাত্রাবিরতি নেওয়া হবে। আমাদের তিনটি প্রাণীর পিঠ থেকে পোঁটলা-পুঁটলি নামানো হলো। ছেড়ে দেওয়া হলো উঠানে চরে বেরিয়ে ঘাস খেতে। চরে বেড়াচ্ছি, তবে সঙ্গী দুই প্রাণীর উপস্থিতি উপভোগ করছি না আমি। আর তা ছাড়া ঘাস খেতে এখনো তেমন অভ্যস্ত হইনি।

বেড়া টপকে আমি একটা সবজি বাগানে ঢুকে পড়লাম। কিছু কাঁচা সবজি খেয়ে নিলাম পেট পুরে।

ক্ষুধার জ্বালা মিটলে চারপাশটা ভালো করে তাকিয়ে দেখতে শুরু করলাম। খুঁজতে থাকলাম, কোথাও কোনো গোলাপঝাড় চোখে পড়ে কি না। জায়গাটা রাস্তা থেকে অনেক ভেতরে। নির্জন। এখানে যদি একটা গোলাপ খেয়ে ফেলতে পারি, তাহলে সবার অগোচরে মানুষে রূপান্তরিত হয়ে যেতে পারব।

চোখে পড়ল বেশ কিছুটা দূরে একটা নিচুমতো জমির ওপর কিছু গাছগাছালির বেড়া। তাতে অন্য অনেক গাছের সঙ্গে কিছু গোলাপগাছও আছে। আর তাতে ফুটে আছে থোকা থোকা লাল টকটকে গোলাপ ফুল।

মনে মনে ভাগ্যদেবীকে ধন্যবাদ দিয়ে তুমুল জোরে ছুট লাগালাম। কিন্তু এত জোরে ছুটেও আমার দুর্ভাগ্যকে পেছনে ফেলতে পারলাম না আমি। যে জায়গাটাকে নিচু জমি ভেবেছিলাম, সেটা আসলে একটা লুকানো খাল। খালের ধারে যে ফুলগুলোকে টকটকে গোলাপ মনে হয়েছিল, গিয়ে দেখি সেগুলো গোলাপের মতোই দেখতে কিছু বিষাক্ত ঘেঁটু ফুল। রাগে-দুঃখে ঠিক করলাম, ওই ঘেঁটু ফুলই চিবিয়ে খেয়ে আত্মহত্যা করব।

আত্মহত্যা করতে ফুলগুলোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, তখন সবজি বাগানের মালিকের উদয় ঘটল। লোকটা গালিগালাজ করতে করতে দৌড়ে এলো। তার বাগানের সবজি খেয়ে ফেলেছি আমি। ফলে লাঠি দিয়ে পেটাতে শুরু করল আমাকে। সেটা এমনই নির্দয় পিটুনি যে আমার মনে হলো এবার মরেই যাব বোধ হয়। অগত্যা পেছনের দুই পা তুলে লোকটাকে লাথি কষলাম। লোকটা চিৎপাত হয়ে মাটিতে পড়ে গেল। মরার মতো পড়েই থাকল মাটিতে।

দূর থেকে এক মহিলা দাঁড়িয়ে দেখছিল ঘটনাটা। লোকটার বউ হবে হয়তো। সেই মহিলা চিৎকার করতে করতে ছুটে এলো। বলতে লাগল, “এই গাধা আমার বরকে মেরে ফেলল রে। জানোয়ারটাকে মেরে ফেল তোরা!”

প্রতিবেশীরা আমার পেছনে কুকুর লেলিয়ে দিল। “যা! গিয়ে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেল গাধাটাকে,” কুকুরগুলোকে বলল তারা।

মনে মনে প্রমাদ গুনলাম। বুঝলাম, ভবলীলা সাঙ্গ হতে আর দেরি নেই। বাঘা বাঘা কুকুর একেকটা। এরা চাইলে ভালুক কিংবা ষাঁড়কেও কামড়ে ছিঁড়ে ফেলতে পারবে। আমি বাঁচার শেষ চেষ্টা করলাম : বাইরের দিকে না ছুটে আমি গৃহস্থের আস্তাবলের দিকে ছুট লাগালাম প্রাণপণে। গ্রামবাসী কুকুরগুলোকে ডেকে ফিরিয়ে নিল ঠিকই, কিন্তু নিজেরা নিবৃত হলো না। একটা খুঁটির সঙ্গে আমাকে বেঁধে তারা পেটাতে শুরু করল। বুঝলাম, এভাবে মার খেয়েই অক্কা পাওয়ার নিয়তি লেখা ছিল আমার কপালে। খানিক আগে কাঁচা সবজি খেয়ে পাকস্থলী ভরে ফেলেছিলাম। একে তো সেটা হজম হয়নি। তার ওপর পেটে দমাদম লাঠির আঘাত পড়তে থাকায় একটা ঘটনা ঘটল। পেট থেকে দুর্বার বেগে বেরিয়ে আসতে লাগল বদহজম হওয়া সেই সব বস্তু। আর কী যে দুর্গন্ধ। গন্ধের চোটে লোকে লাঠি ফেলে পালাতে দিশা পেল না। এ যাত্রা প্রাণে রক্ষা পেলাম শুধু বদহজমের কল্যাণে।

ওই দিন বিকেলে দস্যুরা আবার বাঁধাছাদা করল। এবার আমার পিঠেই চাপানো হলো সবচেয়ে ভারী বোঝা। একে তো বোঝা বহনের অভ্যাস নেই, তার ওপর লম্বা যাত্রায় ক্লান্ত শরীর। দুপুরে বেদম পিটুনি খাওয়ায় এখানে-ওখানে চামড়া ছিঁড়ে গেছে। সেগুলোয় জ্বালা করছে ভীষণ। হাঁটছি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। এভাবে বেশ কিছু দূর যাওয়ার পর পালানোর একটা ফন্দি এলো মাথায়। নদীর ওপরে পাহাড়ের গা বেয়ে ঘুরে ঘুরে উঠে গেছে আমাদের রাস্তা। ঠিক করলাম, হাঁটু মুড়ে বসে পড়ব পথের ওপর। ভান করব পা মচকে গেছে। যত নির্দয়ভাবেই পেটাক আর তরবারির খোঁচা দিক না কেন, রা করব না। দস্যুরা বুঝতে পারবে, আমার দম ফুরিয়ে গেছে। আধমরা একটা জন্তুকে নিয়ে আর তারা নিশ্চয়ই টানাহেঁচড়া করবে না। এমনিতেই দ্রুত পথ চলার তাড়া আছে তাদের। ফলে তারা আমার পিঠের বোঝা অন্য প্রাণীগুলোর মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে আমাকে নেকড়ে আর শকুনের ভোগের জন্য ফেলে রেখে চলে যাবে।

কিন্তু এই দুর্দান্ত ফন্দিটাও ভেস্তে গেল, সৌভাগ্য নাকি দুর্ভাগ্যবশত বলতে পারব না। আমার পরিকল্পনা টের পেয়েই কিনা কে জানে, মিলোর গাধাটা একই কাজ করল। মানে, পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ল পথের ওপর। ভান ধরল ক্লান্তিতে দম ফুরানোর। পিঠের পোঁটলা-পুঁটলি নিয়ে এমনভাবে শুয়ে পড়ল, যেন মরেই গেছে। চাবুক চলল, তরবারির খোঁচা— কিছুতেই কাজ হয় না। লেজ আর কান ধরে তাকে টেনে দাঁড় করানোর চেষ্টা করল দস্যুরা। আবার ঢলে পড়ে যায় গাধাটা। দস্যুরা যখন নিশ্চিত হলো যে পশুটাকে দিয়ে আর কাজ হবে না, তখন তারা নিজেদের মধ্যে একটা ছোট্ট আলাপ সেরে নিল। সবাই মত দিল, একটা গাধার পেছনে এক মুহূর্ত বিলম্ব করার কোনো মানে হয় না।

তারা গাধার পিঠের মালসামান দুই ভাগ করে আমার আর ঘোড়ার পিঠে তুলে দিল। তারপর তরবারির কোপে হত্যা করল গাধাটাকে। টেনে সেটাকে রাস্তার ধারে নিয়ে এলো। তারপর পাহাড়ের ঢাল বেয়ে সেটাকে নিচে নদীতে ছুঁড়ে ফেলে দিল।

হতভাগ্য কমরেডের পরিণতি দেখে ঢোঁক গিললাম। ঘুণাক্ষরেও এই ফন্দি আর মাথায় আনব না। বরং দস্যুদের দেখাতে হবে আমার মতো তাগড়াই উদ্যমী গাধা আর ত্রিভুবনে হয় না। তা ছাড়া শুনতে পেলাম দস্যুরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছে, তাদের গুহার আস্তানা আর বেশি দূরে নয়। এই লম্বা যাত্রা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে।

একটা নিচু পাহাড় পেরিয়ে আমরা অবশেষে গন্তব্যে পৌঁছালাম।

আমার আর আমার ঘোড়ার পিঠ থেকে লুটের মাল নামানো হলো। সেগুলো বয়ে নিয়ে যাওয়া হলো গুহার ভেতরে। তৃষ্ণায় বুক ফেটে যাচ্ছে। আমি ধুলায় গড়াগড়ি দিয়ে নিজেকে চাঙা করে নেওয়ার চেষ্টা করলাম।

এখানে জায়গাটার একটা বিবরণ দিই। চারপাশে বিশাল উঁচু উঁচু পাহাড়। এবড়োখেবড়ো শরীর পাহাড়ের। চারপাশে ঘন দুর্ভেদ্য জঙ্গল। অরণ্যের বুক চিরে নেমে এসেছে ঝরনা আর পাহাড়ি ছড়া। তাতে গুহা আর তার আশপাশ একটা প্রাকৃতিক দুর্গের মতো হয়ে আছে। গুহার প্রবেশমুখ একটা পাহাড়ের পাদদেশে। গাছের গুঁড়ি দিয়ে বাঁধাই করা প্রবেশমুখ। নিচতলায় লুটের গবাদিপশু রাখার জায়গা। প্রবেশমুখের চারপাশে বেড়া দেওয়া। তাতে জায়গাটা একটা হলরুমের মতো লাগে। আশপাশে ত্রিসীমানায় কোনো ঘরবাড়ি নেই। শুধু একটা কুঁড়েঘর আছে, সেটার অস্তিত্ব পরে জানতে পেরেছিলাম। এই কুঁড়েঘর ব্যবহৃত হয় পাহারা দেওয়ার কাজে। প্রতি রাতে একজন করে প্রহরী থাকে তাতে।


---E-Book Created By---
Md. Ashiqur Rahman

ষষ্ঠ অধ্যায়

দস্যুদের গুহায়


গুহার বাইরে দস্যুরা আমাদের লাগাম দিয়ে বেঁধে রাখল। তারপর একে একে গুহায় ঢুকে পড়ল। দেখলাম এক কুঁজো বুড়ির উদ্দেশ্যে ডাকাডাকি করছে তারা। বুড়ি এদের ফাইফরমাশ খাটে।

একজন বলল, “কী করছিস, ওই ঘাটের মড়া বুড়ি?”

আরেকজন বলে, “ও তো ঘাটের মড়া নয়।”

— “অবশ্যই ঘাটের মড়া।”

— “আরে না। ও হলো যমের অরুচি।”

— “ওই হলো, একই কথা। দ্যাখো, এই অবেলায় কেমন বসে বসে ঝিমাচ্ছে। এই বুড়ি, আমরা এসে গেছি, দেখছিস না! রান্নাটান্না চড়া। কিছু খেতে দে আমাদের। এত ধকল গেছে আমাদের ওপর দিয়ে। তোর তো কাজকর্ম কিছু নেই। খালি বসে বসে আমাদের অন্ন ধ্বংস করা।”

বুড়ি ধড়ফড় করে উঠে বসে। বলে : “আরে কী যে বলে আমার বীরপুরুষেরা। তোদের জন্য দ্যাখ কত কী রেঁধে রেখেছি। মাংস রেঁধেছি, চেখে দ্যাখ, জিব জুড়িয়ে যাবে। রুটি সেঁকে রেখেছি, যত পারিস খাবি। আর গোসলের পানি গরম করে রেখেছি, খেতে বসার আগে গোসল সেরে নে ঝটপট।”

সবাই মিলে হুটোপুটি, হুল্লোড় করে গোসল করল দস্যুরা। তারপর একসঙ্গে টেবিলে খেতে বসল। টেবিলে স্তূপ করা খাবার।

খেতে শুরু করতে না করতেই দস্যুর আরেকটা দল এসে হাজির। আরও বড় দল। তারাও একইভাবে গোসল সেরে নিল। এরাও ডাকাতি করতে বেরিয়েছিল। সঙ্গে করে এনেছে লুটের মাল : টাকাপয়সা, থালাবাসন, সোনার কারুকাজ করা সিল্কের চাদর। এই দস্যুরাও বাকিদের সঙ্গে যোগ দিল খাবার টেবিলে। আর কী যে রাক্ষসের মতো খেতে পারে একেকজন। স্তূপ করে রাখা মাংস আর রুটি। গোগ্রাসে খাচ্ছে। হেঁড়ে গলায় গান ধরছে। একে অন্যের উদ্দেশ্যে খিস্তিখেউড় করছে। খুনসুটি করছে। সবশেষে প্রথম দলের সর্দার গোছের দস্যুটা দাঁড়িয়ে একটা ভাষণ দিতে শুরু করল :

“চুপ করে শোনো সবাই। যে দলটা হাইপাতা শহরে মিলোর বাসায় হানা দিয়েছে, টেবিলের এই প্রান্তে বসেছে তারা। আমি তাদের হয়ে কথা বলছি। আমরা মিলোর বাড়ি একেবারে চেটেপুটে সাফ করে দিয়ে এসেছি। তার জমানো ধনসম্পদের স্তূপ লুট করে এনেছি পুরোটাই। শুধু এখানেই শেষ না। এই লুটে আমাদের দলের একটা প্রাণও খোয়া যায়নি। উল্টো আরও চারটা পা যোগ হয়েছে আমাদের দলে— একটা ঘোড়া আর একটা গাধা। আর তোমরা যারা বোয়েতিয়া শহরে হানা দিয়েছ, তাদের কৃতিত্ব তো তেমন চোখে পড়ছে না কিছুই। লুটের মাল অতি সামান্য। আর যত জন গিয়েছ, ফিরে এসেছ তার চেয়ে সংখ্যায় কম। আর তোমরা তোমাদের দলনেতা লামাকুসকে হারিয়েছ। এই ক্ষতি তো লুটের ওই যৎসামান্য মাল দিয়ে পূরণ হওয়ার নয়। লামাকুস দারুণ সাহসী এক ডাকু ছিল।”

দ্বিতীয় দলের একজন বলল, “একটু বাড়াবাড়ি রকমের সাহসী ছিল। সে জন্যই তো প্রাণটা গেল। যা হোক, ইতিহাসের বইয়ে রাজরাজড়াদের নামের পাশে একদিন তার নামও জ্বলজ্বল করবে।”

“কিন্তু তোমরা তো ছিঁচকে চোরে পরিণত হয়েছ দেখছি। গণগোসলখানায় ঘুরঘুর করে সেখান থেকে সেকেন্ডহ্যান্ড কাপড়চোপড় সরানো, কোনো থুত্থুড়ে বুড়ির ভাঙাচোরা কুঁড়েঘরে সিঁদ কেটে ঢুকে তার খালি আলমারি হাতড়ে বেড়ানো, এগুলো কোনো দস্যুপনার কাজ হলো? ইজ্জত থাকে এতে?”

দ্বিতীয় দলের ভারপ্রাপ্ত দলনেতা তড়াক করে উঠে দাঁড়াল। “বোকার মতো কথা বলবি না। জানিস না, বাড়ি যত বড় হয়, সেটা ডাকাতি করা তত সহজ? যে বাড়িতে দাস-দাসীর কমতি নেই, সেই বাড়িতে সবাই চাচা আপন প্রাণ বাঁচা। কিন্তু যেসব বাড়িতে দাস-দাসী কম, সেগুলোয় তারা নিজেদের ধনসম্পদও খুব লুকিয়ে-টুকিয়ে রাখে, আর দাস-দাসীরাও জানবাজি রেখে সেগুলো রক্ষা করার চেষ্টা করে। আমাদের অভিযানের গল্পটা শোন, তারপর ঠিক করিস আমরা ভীরু কি না।”

এই বলে গল্প শুরু করে দলপতি :

“বিখ্যাত থিবিস শহরে ঢুকলাম আমরা। এই শহরটাকে সবাই সাত ফটকের শহর বলে। সেখানে ঢুকেই জিজ্ঞাসা করতে লাগলাম, শহরের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি কারা। স্বীকার তো করবি, আমাদের পেশার প্রথম কাজ হলো মালকড়ির পাত্তা লাগানো। তো, শহরের এক লোক জানাল, ক্রাইসেরোস নামে এক মহাজন আছে। বাইরে বাইরে লোকটার চলাফেরা ফকির-মিসকিনের মতো। কারণ কী?

“কারণ ধনী হলে সরকারি পদে বসতে হবে, দান-খয়রাত করতে হবে। শুনলাম, হাড়কিপ্টা লোকটা একটা ছোট্ট বাড়িতে একা থাকে। তবে বাড়িটা ছোট হলে হবে কী, দুর্গের মতো দুর্ভেদ্য। সেখানে সারা দিন সে নিজের রত্ন-ভান্ডারের ওপর বসে থাকে ময়লা ছেঁড়া কাপড় পরে। ঠিক করলাম, এই শহরে প্রথম হানাটা ক্রাইসেরোসের বাড়িতেই দিতে হবে। কাজটা খুব কঠিন হবে বলে মনে হলো না। একটা কৃপণের বিপরীতে আমরা এতগুলো দস্যু।

“সন্ধ্যার আঁধার ঘনাতেই আমরা ওই বাড়ির দরজার সামনে জড়ো হলাম। আলোচনা করে ঠিক করলাম, শক্তিপ্রয়োগ করে দরজা বা তালা ভাঙা ঠিক হবে না। লোকটার ডাবল দরজা— মানে একটা দরজার পেছনেই আরেকটা। এক দরজা ভেঙে ফেলার চেষ্টা করলে যে আওয়াজ তৈরি হবে, তাতে লোকটা সতর্ক হয়ে পড়বে। হইচই করে লোকজন জড়ো করে ফেলবে। কাজেই দরজা ভেঙে ফেলার চিন্তা বাদ। এখন কী করা? দলনেতা লামাকুস এগিয়ে এলো। তার মাথায় বুদ্ধি এসেছে। সে দরজার পচা কাঠ খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তালার ফুটোর চারপাশটায় একটা খোঁড়ল তৈরি করল। তারপর সেই খোঁড়লের ভেতর দিয়ে ঢুকিয়ে দিল হাত। ওপাশে দরজার হুড়কা টেনে খুলে ফেলবে— এই তার ইচ্ছা। কিন্তু পাজি ক্রাইসেরোস আমাদের উপস্থিতি আগেই টের পেয়েছে। আর আমাদের কাজকর্মও কোথাও বসে লুকিয়ে দেখছিল সে। লামাকুস দরজার ফুটো দিয়ে হাত ভেতরে ঢোকাতেই ক্রাইসেরোস এক হাতে একটা হাতুড়ি আর আরেক হাতে ইয়া বড় এক পেরেক নিয়ে পা টিপে টিপে এসে বসিয়ে দিল হাতুড়ির বিশাল এক ঘা। পেরেক দিয়ে সে দরজার সঙ্গে গেঁথে ফেলল লামাকুসের হাত। কঁকিয়ে উঠল লামাকুস। কিন্তু হাত বের করতে পারছে না। ক্রুশবিদ্ধ অপরাধীর মতো দরজার তক্তায় গেঁথে থাকা হাত নিয়ে ব্যথায় শরীর মোচড়াতে লাগল সে।

“পেরেক গেঁথেই ছুটে নিজের বাড়ির ছাদে উঠে গেল ক্রাইসেরোস। উঠে গলা সপ্তমে চড়িয়ে মহল্লার লোকজনকে ডাকতে শুরু করল, ‘বাঁচাও! বাঁচাও! আগুন! আগুন!’ এখন কথা হলো, আগুন শুনলে কে আর ঘরে বসে থাকে! নিজের বাড়িও যে পুড়বে তাহলে। ফলে লোকজন পড়িমরি করে ছুটে আসতে শুরু করল।

“আমরা প্রমাদ গুনলাম। লামাকুসকে ফেলে রেখে না গেলে একজনও এখান থেকে পালানোর সুযোগ পাব না। কিন্তু লামাকুসকে ফেলে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। কাজেই একমাত্র যা করণীয়, আমরা সেটাই করলাম। কুড়ালের এক কোপে কনুই থেকে লামাকুসের হাত বিচ্ছিন্ন করে ফেললাম আমরা, অবশ্যই তার অনুমতি নিয়ে। হাতটা দরজায় পেরেকে গাঁথা অবস্থায় ঝুলে থাকল।

“লামাকুসের কাটা কনুই ন্যাকড়া দিয়ে শক্ত করে বেঁধে দিলাম আমরা, যাতে রক্ত না পড়ে, রক্তের দাগ দেখে লোকে যাতে পিছু ধাওয়া করে আমাদের ধরে না ফেলে। দলনেতাকে নিয়ে আমরা ছুটতে শুরু করলাম। ততক্ষণে পুরো শহর জেগে উঠেছে। শোরগোল তুলে সবাই আমাদের ধাওয়া করছে। আমরা পাগলের মতো ছুটছি এ-গলি, সে-গলি। আহত লামাকুস আমাদের সঙ্গে তাল রেখে ছুটতে পারছে না। কিন্তু তাকে ফেলে যাওয়া মানে নিশ্চিত যমের হাতে তুলে দেওয়া। অবস্থা বুঝে লামাকুস তখন এই যন্ত্রণার হাত থেকে তাকে নিষ্কৃতি দেওয়ার জন্য অনুনয় করতে শুরু করল। বলল, মার্স দেবতাকে সাক্ষী রেখে আমরা কসম কেটেছি, একে অপরকে সাহায্য করব। লোকজনের হাতে ধরা পড়ে জনসমক্ষে ক্রুশবিদ্ধ হয়ে অবমাননাকর মৃত্যু চায় না সে। সহযোদ্ধাদের হাতে মরণই হবে তার জন্য সবচেয়ে গৌরবের মৃত্যু। আর মানুষের গলা কাটার পেছনে যে হাত এত দিন ব্যস্ত ছিল, সেই হাত না থাকলে একজন দস্যুর বেঁচে থেকে কী লাভ! ফলে তাকে মেরে ফেলার জন্য অনুনয়-বিনয় করতে থাকল লামাকুস। আমরা কেউ তাতে কান দিচ্ছি না। কে আর যেচে পড়ে ভ্রাতৃঘাতী হতে রাজি হয়, বলো? তখন উপায়ান্তর না দেখে লামাকুস বাঁ হাতে টেনে বের করল তার কোমরের তরবারি। তারপর সেটার চকচকে ফলায় একটা লম্বা চুমু খেয়ে বুকের পাঁজর বরাবর ঘ্যাঁচ করে ঢুকিয়ে দিল তরবারি।

“আমার দেখা সবচেয়ে সাহসী দস্যু লামাকুস। তার মৃত্যু আমাদের সবাইকে গভীরভাবে নাড়া দিল। আমরা যত্ন করে তার লাশ কাপড়ে মুড়িয়ে ইসমেরিয়াস নদীতে ফেলে দিলাম। এই নদী তার দেহ টেনে নিয়ে ফেলবে লোনা সাগরজলে।”

“তার আত্মা চিরশান্তিতে ঘুমাক!” খাবার টেবিলের সবাই একযোগে বলে উঠল, “দলনেতা বীরের মতোই মরেছে। এ রকম এক দুঃসাহসিক জীবনের এটাই উপযুক্ত পরিসমাপ্তি।”

খাবার টেবিলের দস্যুদের গল্প শুনছি আমি গুহার বাইরে দাঁড়িয়ে। খুঁটিতে বেঁধে রাখা হয়েছে আমাকে। ভারপ্রাপ্ত দলপতি এবার তার অভিযানের দ্বিতীয় কাহিনি শুরু করল। সেটা আরও শিহরণ জাগানো।


---E-Book Created By---
Md. Ashiqur Rahman

সপ্তম অধ্যায়


গুহার প্রবেশমুখে একটা খোলা জায়গায় আমাকে আর আমার ঘোড়াকে বেঁধে রাখা হয়েছে। ভেতরে খেতে বসে দুই দল দস্যু গল্পগুজব করছে। একটি দলের ভারপ্রাপ্ত দলনেতা বর্ণনা করছে তাদের সর্বশেষ অভিযানে কী কী বিপত্তি হয়েছে। সে শুরু করল তাদের দ্বিতীয় অভিযানের গল্প।

লোকটা বলল : “আলসিমাস আমাদের দলের সবচেয়ে দক্ষ পরিকল্পনাকারী। সিঁধ কাটতে তার জুড়ি নেই। কিন্তু পোড়া কপাল। তাকেও বেঘোরে প্রাণ দিতে হলো। এক বুড়ির বাড়িতে ঢুকেছিল সে। সোজা উঠে গিয়েছিল চিলেকোঠায়, বুড়ির শোবার ঘরে। সেখানে বিছানায় নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে বুড়ি। আলসিমাসের উচিত ছিল শুরুতেই বুড়িকে গলা টিপে হত্যা করা। কিন্তু বোকাটা তা না করে বুড়িকে ওভাবেই ঘুমন্ত রেখে ঘরের জিনিসপত্র একটা একটা করে জানালা দিয়ে নিচে ফেলতে শুরু করল। নিচে আমরা দাঁড়িয়ে আছি। পটাপট লুফে নিচ্ছি আলসিমাসের ফেলে দেওয়া মালপত্র। এভাবে একে একে পুরো ঘর মোটামুটি সাফ করে ফেলল আলসিমাস। এখন ঘরে জিনিস বলতে কেবল বুড়ির বিছানাটা। সেটাই বা ছাড়ে কেন? বুড়িকে আলতো করে বিছানা থেকে নামিয়ে দিয়ে বিছানাটা জানালা দিয়ে ফেলতে নিয়েছে আলসিমাস, এমন সময় দুষ্টু বুড়ি ঘুম থেকে জেগে গেল। আলসিমাসের পা পেছন থেকে জাপটে ধরে বুড়ি চেঁচিয়ে উঠল, ‘আরে করিস কী, বাছা! আমার ঘরের আসবাবপত্র এইভাবে আমার ধনী প্রতিবেশীর আঙিনায় ফেলছিস কেন?’

“আলসিমাস ভাবল, ব্যাপার কী! এতক্ষণ সে ভুল জানালা দিয়ে জিনিস ফেলছিল নাকি? রাস্তায় না ফেলে জিনিসপত্র সত্যি সত্যি আরেক প্রতিবেশীর আঙিনায় ফেলছে কি না, পরীক্ষা করতে জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে নিচে তাকাল সে। এই সুযোগে শয়তান বুড়িটা পা টিপে তার পেছনে এসে দিল এক ধাক্কা। খুব বেশি জোরে ধাক্কা দিতে হয়নি। একটু আলতো ঠেলাতেই কাজ হয়ে গেল। কয়েক তলা ওপর থেকে পড়ল আলসিমাস— মাথা নিচের দিকে। ফুটপাতের ওপর একটা পাথরে আছড়ে পড়ল সে। বেশিক্ষণ বাঁচেনি। তবে মারা যাওয়ার আগে বুড়ির শয়তানির কথা সে বলে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিল আমাদের কাছে। আমরা তাকে লামাকুসের মতোই নদীর জলে ভাসিয়ে দিলাম। একে একে দু’টি অভিযানে দুই সহযোদ্ধার মৃত্যু আমাদের হতোদ্যম করে ফেলল। ঠিক করলাম থিবিস নামের এই কুফা শহরে আর না। কাছাকাছি আরেকটা শহর আছে, নাম প্লাতাইয়া। মোটামুটি চলনসই শহর। সেখানে গিয়ে শুনি লোকে বলাবলি করছে, সামনেই গ্ল্যাডিয়েটরদের লড়াই আসছে। দেমোকারেস নামে এক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি এটার আয়োজক। লোকটা যেমন ধনী, তেমনি খরচের হাত। শানশওকতের দিকে নজর সারাক্ষণ। আর গ্ল্যাডিয়েটদের লড়াই উপলক্ষে যে আলিশান আয়োজন, দেখে আমাদের চক্ষু চড়কগাছ। শহরে এমন কিছু গ্ল্যাডিয়েটর জোগাড় করে এনেছে সে, কব্জির জোরের খেলায় যাদের জুড়ি নেই। তা ছাড়া বেশ কিছু চোর-বাটপার-দাগি অপরাধীকেও আনা হয়েছে, এরা আগে থেকেই প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত। এদের খাইয়ে-দাইয়ে মোটাতাজা করা হয়েছে। খেলার ময়দানে এদের ছুঁড়ে দেওয়া হবে হিংস্র পশুদের সামনে।

“দেখি শহরজুড়ে ঠেলাগাড়ির ওপরে বড় বড় কাঠের খাঁচা, তার ভেতরে নানান জাতের বুনো হিংস্র পশু। অনেক পশু আনা হয়েছে দূরদূরান্ত থেকে। শহরজুড়ে এই চিড়িয়াখানা প্রতিদিন প্রদর্শন করা হচ্ছে। লোকে দেখছে আর শিহরিত হচ্ছে। দু’দিন পরে এই পশুদের পেটে পড়বে দাগি অপরাধীরা।

“ওই প্রদর্শনীর মধ্যে বিশাল আকারের অনেকগুলো ভালুক দেখতে পেলাম। দু’-একটা ভালুক দেমোকারেস নামে ওই সম্ভ্রান্ত লোকটা নিজেই শিকার করেছে। দু’-একটা অনেক দাম দিয়ে কেনা হয়েছে দালালদের কাছ থেকে। আর কয়েকটা উপহার হিসেবে পাঠিয়েছে তারই বন্ধুবান্ধব, যাদের সঙ্গে তার বড়লোকির প্রতিযোগিতা। এসব ভালুক দেমোকারেস রেখেছে তার বিশাল বাগানবাড়িতে।

“সেখানে অনেক খাতিরযত্ন করা হয় প্রাণীগুলোকে। শহরবাসীর বিনোদনের জন্যই দেমোকারেসের এত আয়োজন, খরচাপাতি। তবে বিধি বাম। প্রচণ্ড গরমে খাঁচার পশুগুলো টুপটুপ করে মরে যেতে শুরু করল। আর তা ছাড়া কী একটা মড়কও ছড়িয়ে পড়ল গরমের কারণে। তাতে সব পশু মরেটরে এখন দেমোকারেসের বাগানবাড়ি খাঁ খাঁ করছে।

“শিগগিরই প্লাতাইয়া শহরের রাস্তাঘাট মুমূর্ষ ভালুকে ভরে গেল। রাস্তায় পড়ে থেকে সেগুলো মৃত্যুর প্রহর গুনছে। গরিব বস্তিবাসী কিছুই বাদ রাখে না। তারা হামলে পড়ল। ছাল ছাড়িয়ে ভালুকের মাংস খেতে দোষ কী?

“এসব দেখেশুনে আমাদের দলের বাবুলুস আর আমার মাথায় একটা ফন্দি এলো। দারুণ ফন্দি।

“একটা মৃত ভালুক রাস্তা থেকে তুলে আমরা আমাদের মেসবাড়িতে আনলাম। ভাব দেখালাম, আমরাও ভালুকের মাংস খাব। বাসায় এনে এমন যত্ন করে ছাল ছাড়ালাম, যাতে মাথা, পিঠ, থাবা— এগুলো অবিকল থাকে। তারপর চাকু দিয়ে খুঁচিয়ে ভেতরের নাড়িভুঁড়ি মাংস সব বের করে আনলাম। তারপর খোলসের মতো চামড়াটা রোদে শুকানো হলো। চামড়া শুকিয়ে কড়কড়ে হয়ে গেলে সবাই হাতে হাত রেখে কসম কাটলাম, বিপদে কেউ কাউকে ছেড়ে যাব না, একে অন্যের জন্য দরকার হলে জান দেব।

“আমাদের মধ্যে সবচেয়ে ধূর্ত আর সবচেয়ে সাহসী লোকটাকে আমরা বেছে নেব। সে ঢুকবে ভালুকের এই খোলসের মধ্যে। বাইরে থেকে সেলাই করে দিলে কারও পক্ষে বোঝার কোনো উপায়ই থাকবে না এটা কোনো ভালুক না, ভেতরে মানুষ পোরা। বাকি সবাই তখন এই জাল দিয়ে ভালুকটাকে নিয়ে যাব দেমোকারেসের বাসায়। তুলে দেব তার হাতে। রাতে সুযোগমতো সেই ভালুক বেরিয়ে আসবে তার খাঁচা থেকে। ভেতর থেকে খুলে দেবে গেট। আমরা ডাকাতের দল ঢুকে পড়ব দেমোকারেসের বাসায়।

“নিজেদের বুদ্ধিতে আমরা নিজেরাই মুগ্ধ হয়ে গেলাম। ভালুক সাজার জন্য কয়েকজনের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে গেল। শেষে বাধ্য হয়ে লটারি করতে হলো। তাতে থ্রাসিলিয়নের নাম উঠল। বেচারা। সামনে যে কী ভয়ংকর বিপদ অপেক্ষা করছে, সে কল্পনাও করতে পারেনি।

“থ্রাসিলিয়ন ঢুকে পড়ল ভালুকের খোলসের মধ্যে। আমরা যখন বাইরে থেকে সেলাই করে দিচ্ছি, সুবোধ বালকের মতো চুপ করে বসে থাকল সে। চামড়াটা এতক্ষণে আবার তুলতুলে নরম হয়ে গেছে। ভালুকের লোম দিয়ে আমরা সেলাইয়ের দাগ ঢেকে দিলাম। চোখ আর নাকের জায়গায় ছিদ্র করে দেওয়া, যাতে থ্রাসিলিয়ন দেখতে পায়, নিশ্বাস নিতে পারে।

“সেলাইয়ের কাজ শেষ হলে দেখলাম, বেশ সুন্দর একটা ভালুকের মতোই দেখাচ্ছে থ্রাসিলিয়নকে। আমরা তার সামনে একটা খাঁচা এনে রাখলে সে এমন নিখুঁতভাবে হামাগুড়ি দিয়ে তাতে ঢুকে পড়ল, যেন সত্যিকারের ভালুক।

“সবকিছু প্রস্তুত। এবার শুধু কাজে নেমে পড়া।

“আমরা নিকানোর নামে দেমোকারেসের এক বন্ধুর নাম জালিয়াতি করে একটা চিঠি লিখলাম।

“নিকানোর থ্রেসিয়া নামে একটা দূরের শহরে থাকে। নিকানোর চিঠিতে লিখেছে, মানে আমরা লিখলাম আরকি, সম্প্রতি গহিন এক অরণ্যে শিকারে বেরিয়ে এই ভালুকটি সে শিকার করেছে, এখন বন্ধুর জন্য সেটা সে উপহার হিসেবে পাঠাচ্ছে।

“সন্ধ্যারাতে আমরা ভালুকের খাঁচা আর জাল চিঠি নিয়ে হাজির হলাম দেমোকারেসের বাসায়। এ রকম বিশাল তাগড়া ভালুক পেয়ে দেমোকারেস খুশিতে আটখানা। বন্ধু নিকানোরের উদ্দেশ্যে বারবার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে লাগলেন। সহকারীকে বললেন, যাতে বকশিশ হিসেবে আমাদের দশ স্বর্ণমুদ্রা দেয়। ততক্ষণে পুরো বাড়ি ভালুক দেখতে জড়ো হয়েছে খাঁচার চারপাশে। তারা বলছে, ‘দ্যাখো, দ্যাখো, কী বিশাল ভালুক! আর কী সুন্দর!’ দেমোকারেস তাদের ধমক দিয়ে তাড়িয়ে দিল।

“দেমোকারেসের বন্ধুবান্ধব তাকে অভিনন্দন জানাতে লাগল। বলল, তার ভাগ্য সুপ্রসন্ন বলতে হবে, না হলে মড়কে চিড়িয়াখানা উজাড় হয়ে যাওয়ার পর এ রকম তাগড়া একখানা ভালুক এসে হাজির হতো না। দেমোকারেস ভালুকটাকে ভেতরে বাগানবাড়িতে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিল। সেখানে দু’-একটা পশু এখনো যা অবশিষ্ট আছে, সেগুলোর সঙ্গে থাকবে এই ভালুক।

“আমরা হায় হায় করে উঠলাম। বললাম, ‘শুনুন মশাই, এই ভালুক দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এসেছে। পথের ক্লান্তি আর গরমে পশুটা কাহিল। একে এখনই অন্য পশুদের সঙ্গে এক খাঁচায় রাখবেন না। তা ছাড়া শুনছি, এখানে পশুদের মধ্যে মড়ক লেগেছে। ওদের সংস্পর্শে এলে এ-ও অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে। বাসার কোনো ঠান্ডা কোনায় একে রাখুন, যাতে বাতাস-টাতাস পায়। সম্ভব হলে চৌবাচ্চার কাছাকাছি রাখুন একে। জানেন তো, পানির চৌবাচ্চা ভালুকেরা খুব পছন্দ করে!’

“কথাটা দেমোকারেসের মনে ধরল। সে বলল, ‘আপনারাই পছন্দমতো একটা জায়গায় খাঁচাটা রাখুন না।’

“মওকা পেয়ে আমি বললাম, ‘আপনি চাইলে মশাই আমরা সারা রাত এখানে থেকে যেতে পারি। ভালুকটাকে প্রয়োজনমতো পানি খাওয়াব, যখন যেটা লাগে জোগান দেব। দীর্ঘ যাত্রা আর গরমে বেচারা ভালুকটা বড়ই কাহিল হয়ে আছে।’

“দেমোকারেস রাজি হলো না। বলল, ‘না, না। এত তকলিফ কেন করবেন! আমার এখানে পশুপাখির যত্ন নেওয়ার মতো অনেক লোকজন আছে। তাদের প্রশিক্ষণও আছে। ভালুককে কীভাবে খাওয়াতে-পড়াতে হয়, এদের নখদর্পণে। আপনারা ভাববেন না।’

“অগত্যা কী করা, আমরা বিদায় নিয়ে পথে নেমে এলাম।

“কিছুদূর যেতে প্রধান সড়ক থেকে একটু দূরে একটা কবরখানা পেলাম। কবর খুঁড়ে আমরা বেশ কিছু কফিন বের করে আনলাম। ভেতরে লাশটাশ, কঙ্কাল যা ছিল, ফেলে দিলাম। এগুলো এখন লুটের মাল ভরে রাখার পাত্র। তারপর দেমোকারেসের বাড়ির ফটকের সামনে সবাই জড়ো হলাম। তরোয়াল হাতে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকলাম। সময় এলে হামলা চালাব।

“রাত গভীর হলো। আমরা অপেক্ষায় থাকলাম কখন পশ্চিমের আকাশে চাঁদ ডুবে গিয়ে চরাচরে ঘুটঘুটে আঁধার নামবে, সকলে তলিয়ে যাবে গভীর ঘুমে।

“যেভাবে শিখিয়ে দেওয়া হয়েছিল, সেভাবে কাজ শুরু করল থ্রাসিলিয়ন। মোক্ষম সময় উপস্থিত হলে সে সন্তর্পণে বেরিয়ে এলো তার খাঁচার ভেতর থেকে। তারপর তরোয়াল দিয়ে একে একে হত্যা করল ঘুমন্ত সব প্রহরীকে। এরপর সে গেটের দারোয়ানকে হত্যা করল। তার কোমরে গোঁজা চাবির গোছা নিয়ে গেট খুলে দিল। আমরা ঢুকে পড়লাম সদলবলে।

“থ্রাসিলিয়ন আমাদের দেখিয়ে দিল বাড়ির গোলাঘর, যেখানে আগের রাতে বাড়ির লোকজনকে সে বিপুল পরিমাণে রূপার থালা জমা করতে দেখেছে। আমরা গোলাঘরের দরজা ভেঙে ফেললাম। আমি দলের লোকজনকে নির্দেশ দিলাম, এখান থেকে সোনাদানা একবারে যতটুকু হাতে নেওয়া যায়, নিয়ে কবরস্থানে চলে যেতে। সেখানে কফিনের মধ্যে লুকিয়ে রাখা হবে লুটের মাল। পরে সময়-সুযোগমতো কোনো এক সময় এসে কফিন তুলে সেগুলো নিয়ে গেলেই হবে। দলের লোকেরা তা-ই করল।

“আমি গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থেকে চারপাশে নজর রাখতে থাকলাম। অপেক্ষা করছি সঙ্গীসাথিরা কখন কবরস্থান থেকে ফেরে। ফিরে আরেক দফা লুটের মালামাল হাতে নেবে তারা। থ্রাসিলিয়ন ভালুকের ছদ্মবেশেই থাকল। ভাবলাম, সারা বাড়ি একটা বুনো ভালুক খোলা অবস্থায় ছুটে বেড়ালে সেটা বরং ভীতি সৃষ্টিতে কাজে লাগবে। ক্রীতদাসেরা কেউ জেগে গেলেও প্রতিরোধ করতে এগিয়ে আসার সাহস পাবে না।

“সবকিছু পরিকল্পনামাফিক নিখুঁতভাবেই এগোচ্ছিল। কিন্তু একটা বিপত্তি ঘটল। দলের সাথিরা তখনো কবরস্থান থেকে ফেরেনি। আমি তাদের জন্য গেটের কাছে দাঁড়িয়ে অস্থিরভাবে অপেক্ষা করছি। এমন সময় এক ক্রীতদাস জেগে গেল। কোনো আওয়াজ-টাওয়াজ পেয়েছে হয়তো। সে পা টিপে টিপে শোবার ঘর থেকে বেরিয়ে দেখতে পেল, উঠানজুড়ে একটা ভালুক ঘুরে বেড়াচ্ছে। দেখে সে আবার সন্তর্পণে ঘরে ফিরে বাকি ক্রীতদাসদের ডেকে তুলল। তাদের বুঝিয়ে বলল পুরো পরিস্থিতি।

“পরমুহূর্তে মশাল, লণ্ঠন, সড়কি-বল্লম নিয়ে হুড়মুড় করে বেরিয়ে এলো তারা। ভেতরবাড়ির সব আলো জ্বলে উঠল। সবার হাতে ধারালো অস্ত্র। তারা বেরোনোর সবগুলো পথ আগলে দাঁড়াল। তারপর ভালুকটাকে কাবু করতে শিকারি কুকুরের খাঁচা খুলে দিল। একদঙ্গল হিংস্র কুকুর লাফিয়ে বেরিয়ে এলো উঠানে।

“হট্টগোলের মধ্যে আমি আলতো করে গেটের বাইরে বেরিয়ে একটা ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে পড়লাম।

“সেখান থেকে দেখতে পেলাম, থ্রাসিলিয়ন বীরের মতো কুকুরগুলোর সঙ্গে লড়ে যাচ্ছে। সে টের পেয়ে গেছে, এদের হাত থেকে নিস্তার নেই তার। তবু আমাদের দলের সম্মানের কথা ভুলে গেল না সে।

“প্রথমে সে কুকুরগুলোর হাত থেকে বাঁচতে দৌড় দিল। তারপর দাঁড়িয়ে পড়ে থাবা চালিয়ে কুকুরগুলোর চোয়াল ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করল। তারপর পিছিয়ে আসতে আসতে দরজা দিয়ে বেরিয়ে রাস্তায় নেমে আবার ছুট লাগাল। কিন্তু তাতেও রেহাই মিলল না। প্রতিবেশীদের যার যা কুকুর আছে, সবগুলো রাস্তায় নেমে এলো। সবাই পিছু ধাওয়া করল ছদ্মবেশী ভালুকের। ঝোপের মধ্যে অসহায় বসে থেকে দেখলাম, হিংস্র কুকুরগুলো কীভাবে কামড়ে থ্রাসিলিয়নের দফারফা করে ফেলতে লাগল। একপর্যায়ে আর বসে থাকতে পারলাম না। আড়াল থেকে বেরিয়ে লোকজনের সঙ্গে মিশে গিয়ে কুকুরগুলোকে নিরস্ত করার সব রকম চেষ্টা চালাতে লাগলাম। চিৎকার করলাম, ‘একটা বনের পশুকে এভাবে মেরে ফেলবেন না। এটা অনেক দামি ভালুক।’

“কে শোনে কার কথা। এর মধ্যে দশাসই চেহারার এক লোক ছুটে এসে থ্রাসিলিয়নের বুকে বিঁধিয়ে দিল একটা বল্লম। তখন বাকিরা তরবারির কোপ বসাতে লাগল।

“বীরের মতোই মারা গেল থ্রাসিলিয়ন। কুকুরের এত কামড় খেয়েছে, তরবারির এত কোপ বসে গেছে মাংসের মধ্যে, কিন্তু প্রতিবারই ভালুকের কণ্ঠে আর্তনাদ করেছে সে, একবারও মানুষের কণ্ঠে চেঁচিয়ে ওঠেনি, একবারও নিজের পরিচয় ফাঁস করে দেয়নি। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নিজের ডাকাত দলকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছে সে। আর এমন লড়াকুর মতো লড়েছে যে, মারা যাওয়ার পরও তার লাশের গায়ে সহজে কেউ হাত ছোঁয়াতে সাহস পায়নি।

“থ্রাসিলিয়নের লাশ সারাটা সকাল ওভাবে পড়ে থাকল রাস্তার ওপর। শেষে এক সাহসী কসাই এগিয়ে এলো। সে বুকের চামড়া চিরে ফেলল। তারপর বিস্ময়ে চেঁচিয়ে উঠে জানাল, ‘আরে এ তো ভালুক নয়, ভেতরে একটা মানুষ লুকিয়ে আছে। একটা দস্যু।’

“থ্রাসিলিয়নের মৃত্যুসংবাদ দলের বাকিদের জানাতে আমি কবরস্থানের দিকে পা বাড়ালাম। সেখানে আমরা লুটের মালামাল বাঁধাছাঁদা করলাম। তারপর পা বাড়ালাম শহর ছেড়ে বাইরে।

“পাহাড়ি পথ বেয়ে দীর্ঘ ক্লান্তিকর যাত্রা। তিন তিনটি অভিযানে আমাদের তিনজন সহযোদ্ধা মারা গেছে। ভাগ্যদেবী আমাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।

“আর এই যে এখানে আমরা। আর এই আমাদের লুটের ধন।”

গল্প শেষ হলে দস্যুরা স্বর্ণপাত্র তুলে ধরে সুরা পান করল। তারপর গুহার মেঝেতে শুয়ে পড়ল।

কিছুক্ষণ গানটান গেয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।


বুড়ি আমাদের দু’জনকে গামলাভর্তি বার্লি খেতে দিল। আমার ঘোড়া তো খুশিতে ডগমগ। এমন খাতিরত্ন সে আগে কখনো পায়নি। আমি তাকে পুরোটাই খেতে দিলাম। ভাগ বসালাম না। বার্লি খেতে আমার ভালোই লাগে। তবে সেটা সেদ্ধ করে স্যুপ বানিয়ে। তার বদলে আমি সন্তর্পণে এগিয়ে গেলাম গুহার সেই কোনার দিকে, যেখানে ভোজের বাড়তি খাবার রেখে দেওয়া হয়েছে। খেতে লাগলাম তৃপ্তিভরে। ক্ষুধার চোটে আমার চোয়াল ব্যথা করছিল। জিব নড়ছিল না।

গভীর রাতে দস্যুরা উঠে তড়িঘড়ি গুহা ছেড়ে বেরিয়ে গেল। এদের কেউ কেউ ভূতের মতো পোশাক পরা। সবাই সঙ্গে তলোয়ার নিল। আমি তখনো খাবার চিবিয়ে যাচ্ছি। আমি লোকটা মানুষ বটে, কিন্তু পেটটা তো গাধার। আর সেই পেটের বিরাট পাকস্থলীতে জায়গার অন্ত নেই। ফলে ভোর পর্যন্ত আমি খেতেই থাকলাম। শেষে সূর্য উঠলে খাওয়া থামিয়ে পাশের ঝরনার পানিতে তৃষ্ণা মেটালাম।

দস্যুরা ফিরে এলো। তাদের মুখ গম্ভীর। এবার তারা কোনো লুটের মাল আনেনি। তার বদলে একটা মেয়েকে বন্দী করে এনেছে। পোশাক-আশাক দেখে বুঝলাম, এ মেয়ে খানদানি পরিবারের। আর সে দেখতেও অপরূপ সুন্দরী। মেয়েটা তখনো হাত-পা ছুঁড়ছে, চুল ছিঁড়ছে, চিৎকার করছে।

দস্যুরা বলল, “আপনি এখানে সম্পূর্ণ নিরাপদ ম্যাডাম। আমরা আপনার কোনো ক্ষতি করব না। একটু শান্ত হোন। এই গুহায় থাকুন কয়েকটা দিন। দেখতেই পাচ্ছেন, পেটের দায়ে এই দস্যুতার পেশা বেছে নিতে হয়েছে আমাদের। নইলে লোক আমরা খারাপ না। আপনাকে এখানে বন্দী করে রাখতে পারলে আপনার কিপ্টে বাবা-মা টাকাপয়সা নিয়ে ছুটে আসবে আমাদের কাছে। হাজার হলেও আপনি তাদের একমাত্র মেয়ে। আর ধনসম্পদের কোনো অভাব নেই আপনাদের।”

এই কথা শুনে মেয়েটা আরও অস্থির হয়ে উঠল। হাউমাউ করে কান্নাকাটি শুরু করে দিল সে।

ডাকাতেরা তখন বুড়িকে বলল, মেয়েটার পাশে বসে তাকে সান্ত্বনা দিতে। তারপর তারা আবার বেরিয়ে পড়ল নতুন কোথাও অভিযান চালাতে।

বুড়ি মাথায় হাত বোলায়, সান্ত্বনা দেয়। কিন্তু কোনো লাভ হয় না। মেয়েটা কেঁদেই যাচ্ছে। তার দুঃখে আমার চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়তে লাগল।

কাঁদতে কাঁদতে আর বিলাপ করতে করতে মেয়েটা একসময় ক্লান্ত হয়ে গেল। তারপর ঢলে পড়ল ঘুমে।

তারপর ঘুম থেকে উঠে আরও বেপরোয়া হয়ে গেল মেয়েটা। বুক চাপড়ে বিলাপ করতে লাগল। আর বলল, এ জীবন সে রাখবে না।

বুড়ি তখন ধমক লাগাল। বলল, এভাবে কান্নাকাটি করে কোনো লাভ নেই। চোখের পানিতে দস্যুদের মন গলবে না। বরং হিতে বিপরীত হতে পারে। রেগে গেলে দস্যুরা তাকে হত্যাও করতে পারে।

এতে কাজ হলো। মেয়েটা বিলাপ বন্ধ করল। সে তখন তার দুঃখের কাহিনি বলল। বলল, কীভাবে দস্যুদের হাতে ধরা পড়েছে সে। জানাল, তেপোলিমাস নামে এক লোকের সঙ্গে তার বিয়ের দিন আজ। একটা মন্দিরে তার বিয়ের অনুষ্ঠান চলছিল। দস্যুরা সেখানে হামলা চালিয়ে তাকে জিম্মি করে এনেছে। কেউ সাহস করে একবার বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেনি। মেয়েটা আশা করছে, তার হবু স্বামী তেপোলিমাস হয়তো তাকে উদ্ধার করতে ছুটে আসবে।

গল্প শুনে বুড়ি দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। বলল, “আসো, তোমার মন ভালো করে দেওয়ার জন্য গল্প বলি তোমাকে। গল্পে গল্পে সময় কাটুক।”

জিম্মি মেয়েটা রাজি হলো।

বুড়িটা একের পর এক গল্প বলে চলল। অপূর্ব সব গল্প। মেয়েটা মুগ্ধ হয়ে শুনছে। বাইরে কান পেতে আমিও শুনছি।


---E-Book Created By---
Md. Ashiqur Rahman

অষ্টম অধ্যায়

দস্যুদের মৃত্যু


লুটের বিরাট এক চালান নিয়ে ফিরল দস্যুরা। তবে বোঝা গেল, ডাকাতি করতে গিয়ে মারপিট করতে হয়েছে তাদের। দেখলাম, দস্যু দলের অনেকেই জখম হয়েছে। সাব্যস্ত হলো, আহত দস্যুরা নিজেদের জখম ব্যান্ডেজ-ট্যান্ডেজ করে গুহাতেই বিশ্রাম নেবে। বাকিরা আবার বেরোবে, পথিমধ্যে লুটের বাকি মালামাল যেখানে লুকিয়ে রাখা হয়েছে, সেখান থেকে সেগুলো আনতে।

দুপুরের খাবার গোগ্রাসে খেয়ে সুস্থ দস্যুরা আমাকে আর আমার ঘোড়াটাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।

খাড়া পাহাড়ের চড়াই বেয়ে উঠছি, উতরাই বেয়ে নামছি। দস্যুরা লাঠি দিয়ে প্রবলভাবে পিটিয়ে পিটিয়ে আমাদের নিয়ে যাচ্ছে। এভাবে ঘুরতে ঘুরতে সন্ধ্যা নাগাদ পৌঁছালাম লুকানো ভান্ডারের ঠিকানায়। আমরা দুই পশু ক্লান্তিতে জেরবার। কিন্তু একটু দম ফেলারও সুযোগ দিল না দস্যুরা। পিঠে চাপিয়ে দিল ভারী ঝেঝা। তারপর ফিরতি পথে ছুট লাগাতে হলো। ওরা এমন তাড়াহুড়ো করছিল যে রাস্তায় পড়ে থাকা একটা বড় পাথরে ধাক্কা খেয়ে আমি উল্টে পড়লাম। শত চেষ্টাতেও ভারী বোঝা নিয়ে উঠে দাঁড়াতে পারছি না। দস্যুরা চেলাকাঠ দিয়ে পেটাতে শুরু করল আমাকে। বেদম প্রহার। কিন্তু আমার পেছনের পা বাজেভাবে মচকে গেছে। খুরও গেছে থেঁতলে। আমি কিছুতেই উঠতে পারছি না।

এক দস্যু খ্যাঁক করে উঠল, “এই অকম্মা গর্দভটাকে আর কত ঘাস-বিচালি খাওয়াব আমরা? এ তো এক্কেবারে অচল হয়ে গেছে।”

আরেক দস্যু বলল, “এই পশুটা যখন থেকেই জুটেছে আমাদের দলে, তখন থেকেই খালি দুর্ভাগ্যের ঘটনা ঘটছে। আমাদের সাহসী বেশ কয়েকজন সহযোদ্ধা মরে গেল। অনেকেই জখম হয়েছে। আর লুটের মালও তেমন জুটছে না।”

দলের নেতা দেখি একমত। বলল, “ঠিক আছে, এই মালামাল গুহায় নিতে দাও আগে। তারপর ঠেলে এটাকে নদীতে ফেলে দেব। শকুনগুলোর জন্য আমাদের উপহার।”

“না, না। এই বদমাশটার জন্য সেটা খুব সহজ মৃত্যু হয়ে যাবে।”

তখন আমাকে হত্যার সবচেয়ে উত্তম আর জুতসই পন্থা কী হতে পারে এই নিয়ে দেখি তর্কে জড়িয়ে গেল পুরো ডাকাত দল। মৃত্যুভয়ে তড়াক করে লাফিয়ে উঠে ওই খোঁড়া পা নিয়েই হনহন করে হাঁটতে লাগলাম। প্রায় উড়ে উড়ে পৌঁছে গেলাম গুহায়।

দস্যুরা আমাদের পিঠ থেকে বোঝা নামিয়ে তাদের আহত সহযোদ্ধাদের ডেকে তুলল। তারপর তাদের নিয়ে আবার চলল লুটের বাকি মালামাল আনতে। এবার আমাকে ফেলে রেখে গেল তারা। সঙ্গে নিয়ে গেল আমার ঘোড়াটাকে।

গুহার বাইরে একা একা সাতপাঁচ ভাবছি। আসন্ন মৃত্যুর কথা চিন্তা করে অস্থির লাগল। নিজেকে বললাম, এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তোমার সর্বশেষ দুর্ভাগ্যের জন্য অপেক্ষা করে কী লাভ, লুসিয়াস? দস্যুরা তোমাকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। সম্ভাব্য সবচেয়ে নিষ্ঠুর পন্থায় তারা হত্যা করবে তোমাকে। ওরা যা ঠিক করেছে, তা ওরা করবেই। কেউ থামাতে পারবে না। নিচে খরস্রোতা নদী আর তার দু’পাড়ে তিরের ফলার মতো ধারালো পাথর দেখতে পাচ্ছ? যে জাদুবিদ্যার প্রতি দুর্বার আকর্ষণ তোমার, সেই জাদুবিদ্যা তোমাকে কী দিয়েছে? তোমাকে গাধা বানিয়ে দিয়েছে দ্যাখো। তা-ও দিয়েছে শুধু গাধার খাটুনি, কিন্তু সেই খাটুনি সওয়ার মতো মোটা চামড়া তো দিল না। ফিনফিনে চিকন চামড়া তোমার। যদি এখনো বেঁচে থাকার সামান্য ইচ্ছা থেকে থাকে তোমার মধ্যে, তো মানুষের মতো সাহস নিয়ে দাঁড়াও। এখনই মোক্ষম সময়। দস্যুরা সব বাইরে। এক পা কবরে যাওয়া ওই বুড়িকে ভয় পাও তুমি? তোমার ল্যাংড়া পায়ের একটা লাথিতেই অক্কা পাবে বুড়ি।

আবার ভাবলাম, পালাব, কিন্তু যাব কোথায়? কে আমাকে আশ্রয় দেবে? কিন্তু এই যে আবার গর্দভের মতো চিন্তা! রাস্তায় একটা বেওয়ারিশ গাধা জুটে গেলে কে না খুশিতে সেটার পিঠে চাপতে চাইবে?

মনস্থির করে ফেললাম পালাব।

যে দড়ি দিয়ে আমাকে খুঁটিতে বেঁধে রাখা হয়েছে শরীরের সব শক্তি একত্র করে সেটায় দিলাম এক হ্যাঁচকা টান। সেটা পটাং করে ছিঁড়ে গেলে লাগালাম ছুট।

বুড়িটার শকুনের চোখ। ছুটে এসে দড়ির অপর প্রান্তটা মুঠোয় আঁকড়ে ধরল। বুড়ির গায়ে এত জোর আগে টের পাইনি। আমাকে গুহার আঙিনার দিকে টেনে নিতে লাগল বুড়ি। কিন্তু যেই মনে পড়ল, দস্যুরা ফিরলেই আমাকে মেরে ফেলবে, অমনি শরীরে আসুরিক শক্তি ভর করল। পেছনের ল্যাংড়া পা তুলে কষে চালিয়ে দিলাম বেমক্কা লাথি। বুড়ি উপুড় হয়ে পড়ে গেল মাটিতে। কিন্তু দড়ি ছাড়ল না। ফলে আমি ছুট লাগালাম, আর বুড়ি আমার পেছন পেছন গড়িয়ে আসতে লাগল।

সাহায্যের জন্য তারস্বরে চেঁচাতে লাগল বুড়ি। কিন্তু ত্রিসীমানায় কেউ তো নেই।

সত্যি কেউ নেই? না, ঠিক না। শারিত নামে ওই মেয়েটা তো আছে, যাকে জিম্মি করে রেখেছে দস্যুরা। বুড়ির চেঁচামেচিতে গুহার ভেতর থেকে ছুটে বের হলো শারিত।

সে এক বিদঘুটে দৃশ্য : বুনো ষাঁড়ের মতো ছুটছি আমি। টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছি দড়ি ধরে রাখা বুড়িকে। মওকা পেয়ে তা নষ্ট করল না শারিত। বুড়ির হাত থেকে কেড়ে নিল দড়ি। তারপর বুঝিয়ে-শুনিয়ে আদর করে আমাকে থামাল। আমি থামতেই লাফিয়ে চড়ে বসল পিঠে। যেই না পিঠে বসছে, অমনি আমাকে বলল ছুট লাগাতে।

আমি এটুকুর জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। এখন তো শুধু নিজের জীবন বাঁচানো নয়, এক তরুণীকে উদ্ধারের দায়িত্বও আমার পিঠে। কাজেই দ্বিগুণ মনোবলে ছুটতে শুরু করলাম আমি।

মুক্তির সুযোগ সমাগত দেখে তরুণী আমার পিঠে বসে প্রার্থনা শুরু করে দিল : “কৃপা করো, ঈশ্বর। দয়া করো আমাকে। আজ এখন, এই মুহূর্তে সমূহ বিপদ থেকে আমাকে উদ্ধার করো। আর হে নিষ্ঠুর ভাগ্যদেবতা, একটিবার সুযোগ দাও আমাকে। এই ক’টা দিন তো অভিশপ্ত কাটালাম। এবার ভাগ্যটা একটু বদলে দাও, করুণা করো।” এটুকু বলে তরুণী আমার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, “আর তুই, প্রিয় গাধা আমার, তোর হাতে এখন আমার জীবন, আমার মুক্তি। তোর ওপরেই আমার সব ভরসা। তুই যদি আমাকে সহিসালামতে বাড়িতে বাবা মায়ের কাছে, আমার স্বামীর কাছে পৌঁছে দিতে পারিস, তো তোর প্রতি আজীবন কৃতজ্ঞ থাকব। কী যে সম্মান দেখাব তোকে, তুই চিন্তাও করতে পারবি না। চাওয়ার আগেই দুনিয়ার সেরা খাবার হাজির হয়ে যাবে তোর পাতে। তোর কেশর, তোর লেজের ডগার চুল চিরুনি দিয়ে আঁচড়ে দেব আমি নিজ হাতে, মাথার লোম সিঁথি কেটে দেব। তোর গলায় পরিয়ে দেব সোনার হার। তোকে নিয়ে শহরে বের করব বিজয় মিছিল, দাস-দাসীরা তোর নামে জয়ধ্বনি দেবে সারাটা জীবন। তোকে বাদাম খাওয়াব, ছোলা খাওয়াব আমি। তাই বলে ভাববি না ভালো খাওয়াদাওয়া, আর আরামের জীবনেই তোর পুরস্কার শেষ হবে। বাড়িতে তোর সম্মানে একটা স্মৃতিস্তম্ভ বানাব আমি। সেখানে একটা ফলকে খোদাই করে আঁকা থাকবে আমাদের এই পালানোর দৃশ্য : আমাকে পিঠে নিয়ে তুই ছুটছিস। দুনিয়ার সেরা লেখকদের দিয়ে লিখিয়ে নেব তোর এই দুঃসাহসের কাহিনি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম লোকে তোর কাহিনি পড়বে। বইয়ের শিরোনাম হবে, উম… কী হতে পারে শিরোনাম, এই ধর : গাধার পিঠে পলায়ন অথবা এক রাজকীয় বংশের তরুণীর জিম্মিদশা থেকে পলায়ন। খুব ভারি জ্ঞান ফলানো বই হবে না নিশ্চয়ই, কিন্তু ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই পেয়ে যাবি তুই। পুরান কাহিনিতে কত অবিশ্বাস্য গল্প বলা আছে। সেগুলো মিথ্যা নয়, তুই তার জলজ্যান্ত প্রমাণ হয়ে থাকবি। ওই যে পৌরাণিক কাহিনিতে আছে, ভেড়ার পিঠে চেপে দার্দেনালেস প্রণালি পেরিয়ে গিয়েছিল ফ্রিকসাস কিংবা ডলফিনের পিঠে সওয়ার হয়েছিল আরিয়ন কিংবা কী করে সাগর পাড়ি দিয়ে ক্রিটে পৌঁছেছিল ইউরোপা। এসব গল্প তো আছেই। তাহলে আমার এই ভ্যাঁ ভ্যাঁ করতে থাকা গর্দভটা কেন ছদ্মবেশী দেবতা হবে না কিংবা এই গাধা যে আগে মানুষ ছিল, এখন গাধায় রূপান্তরিত হয়েছে এ রকম একটা কেচ্ছাকাহিনি বানিয়ে নিতে সমস্যা কী?”

এরকম আবোল-তাবোল বকবক করে যেতে লাগল তরুণী।

যেতে যেতে রাস্তার মোড়ে এসে ঠেকলাম। সামনে দু’দিকে চলে গেছে পথ। রাশ টেনে ধরল তরুণী। চেষ্টা করল আমাকে ডান দিকের রাস্তায় চালাতে। এটাই তার বাড়ির সোজা পথ। কিন্তু আমি জানি, এই পথেই লুটের মাল আনতে গিয়েছে দস্যুরা। আর এই পথেই ফিরবে। কাজেই ঐ পথে পা রাখতে গাইগুঁই করতে লাগলাম। মনে মনে তরুণীকে বলছি : আরে হতভাগা মেয়ে আমার কথা শোন, কী করতে চাস তুই? বাড়ি না ফিরে তুই কি পরপারে ফিরতে চাস? এই পথে যাওয়া মানে আমাদের দু’জনারই দফারফা।

মেয়েটা আমাকে ওই পথে ঠেলছে, আমি রুখে দাঁড়াচ্ছি। এভাবে আমাদের ঠেলাঠেলি চলছেই, এমন সময় দেখি লুটের মাল নিয়ে ওই পথ বেয়ে ছুটে আসছে দস্যুরা। আকাশে ফুটফুটে জোছনা। দূর থেকে দেখেই আমাদের চিনে ফেলল তারা। দূর থেকেই চেঁচিয়ে আমাদের উদ্দেশ্যে ঠাট্টা-তামাশা ছুঁড়ে দিল : “এমন চাঁদের আলোয় কোথায় চললে হে সুন্দরী? পথে ভূতপ্রেত দেও-দানবের ভয় করে না? বাবা-মায়ের কাছে যাচ্ছ? এভাবে লুকিয়ে? আমরা তো তোমাকে এভাবে একা ছেড়ে দিতে পারি না। চলো, আমরা তোমাকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাই।”

এই বলে দস্যুরা এসে আমার রাশ টেনে ধরল। তারপর আরেক দফা পেটাতে শুরু করল আমাকে।

নির্দয় পিটুনি। বুঝলাম, আর রক্ষা নেই। এবার গুহায় নিয়ে জবাই করে ফেলবে আমাকে। ফলে হাঁটতে গিয়ে খোঁড়াতে শুরু করলাম।

এই দেখে এক দস্যু খ্যাঁক করে উঠল, “অ্যাহ্, এখন দ্যাখো হাঁটতে পারছে না, খোঁড়াচ্ছে! আর একটু আগে তো খুব পঙ্খিরাজের মতো উড়ছিল।”

আমরা গুহার বাইরের বেড়া দেওয়া আঙিনায় আবার পৌঁছালাম। দেখি, বুড়ি মরে পড়ে আছে।

তারা এ নিয়ে বিশেষ উচ্চবাচ্য করল না। বুড়ির মৃতদেহ পাহাড়ের ওপর থেকে নিচে নদীতে ফেলে দিল।

মেয়েটাকে শক্ত করে বেঁধে রাখল দস্যুরা। তারপর মরার আগে বুড়ি পরম যত্নে যেসব রান্নাবান্না করেছে, সেগুলো গোগ্রাসে খেতে লাগল। বুড়ির প্রতি মায়া-মমতার তিলমাত্র নেই তাদের আচরণে।

খেতে খেতে বুড়িকে নিয়ে ঠাট্টা-তামাশাও করল তারা।

তারপর মুখের মধ্যে খাবার পুরে চিবাতে চিবাতে তারা আলোচনা করতে লাগল কোন পদ্ধতিতে মেয়েটার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করবে।

একজন বলল, “পুড়িয়ে মেরে ফেললেই তো ল্যাঠা চুকে যায়।”

আরেকজন বলল, “খুঁটির মধ্যে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখি। বনের হিংস্র পশুরা ছিঁড়ে-খুঁড়ে খাবে।”

“শূলে চড়ালে কেমন হয়?” আরেকজন বলল।

“নির্যাতন চালানোর আমাদের নিজস্ব যেসব পদ্ধতি আছে, সেগুলো প্রয়োগ করলেই তো হয়।”

মেয়েটাকে মারার নতুন নতুন তরিকা বের করার রীতিমতো প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল। এর মধ্যে এক দস্যু তার সঙ্গীদের অনেক কষ্টে থামিয়ে বলল, “কমরেডগণ, আমরা হলাম গিয়ে সৌভাগ্যের বীর সেনানী। আমাদের মধ্যে নিয়মনীতি বলে তো একটা ব্যাপার আছে। আমাদের নীতি বলছে, অপরাধের চেয়ে সাজার পরিমাণ বেশি হওয়া চলবে না। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, এই মেয়েটাকে বুনো পশু দিয়ে খাওয়ালে বা শূলে চড়ালে বা পুড়িয়ে মারলে সেটা আমার কাছে অবমাননাকর মনে হবে। তাতে চট করে মৃত্যু ঘটবে মেয়েটার। আমাদের যেভাবে ও অপমান করেছে, তার প্রতিশোধ তো এতে নেওয়া হবে না। কাজেই আমার বুদ্ধি শোনো। চলো, ওকে তিলে তিলে কষ্ট দিয়ে মারি। আজ সকালেই তোমরা ওই গাধাটাকে মেরে ফেলবে বলে কসম কেটেছিলে, মনে আছে? ওটা একটা অলসের ধাড়ি, কুড়ের হদ্দ। কেমন ল্যাংচানোর ভান করে দেখেছ! ও-ই তো আমাদের বন্দিনীকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করছিল। আমি প্রস্তাব দিই কী, আগামীকাল গাধাটাকে নদীর মধ্যে ছুঁড়ে ফেলে না দিয়ে প্রথমে ওটাকে গলা কেটে জবাই করি। তারপর ওর পেটটা চিরে ফেলি। আর যেহেতু গাধাটা আমাদের চেয়ে মেয়েটাকেই বেশি পছন্দ করেছে, কাজেই মেয়েটাকে গাধাটার পেটের মধ্যে ঢুকিয়ে এমনভাবে সেলাই করে দিই, কেবল মাথা আর গলাটা বাইরে বেরিয়ে থাকবে। তারপর দু’জনকেই ওভাবে রোদের মধ্যে ফেলে রাখি। তিলে তিলে কষ্ট পেয়ে মরবে মেয়েটা। দু’জনকেই সাজা দেওয়া হলো, আর প্রতিশোধও নেওয়া হলো। এক ঢিলে দুই পাখি।”

এই ভয়ংকর প্রস্তাবে সবাই সোল্লাসে সম্মতি দিল। শুনে আমার খাড়া কান আরও খাড়া হয়ে গেল। মনে মনে নিজেকে বললাম, তোর কপালে আরও কত খারাবি যে লেখা আছে রে গর্দভ।

রাত পেরিয়ে যখন ভোর হলো, গুহার মধ্যে প্রবেশ করল একটা লোক। দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার ক্লান্তিতে লোকটা হাঁপাচ্ছে। গুহার মুখেই ধপ করে বসে পড়ল সে। অন্য দস্যুরা তাকে যেভাবে সম্ভাষণ জানাল, তাতে বুঝলাম এই লোকও এদের দলেরই একজন। দম ফিরে এলে লোকটা বলল, “মিলোর বাসায় সব ঠিকঠাকই আছে। কোনো ঝামেলা নেই। হাইপাতার নগরবাসীকে নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। মিলোর বাসার ধনসম্পদ লুট করে তোমরা যখন গাধার পিঠে মালপত্র চাপিয়ে রওনা দিয়েছিলে, তোমাদের কী নির্দেশ দিয়েছিলাম মনে আছে? বলেছিলাম, আমি পেছনে থেকে যাচ্ছি, শহরের লোকজনের সঙ্গে মিশে যাব, ঘুরে বেড়াব গুপ্তচর হয়ে, ডাকাতির ঘটনায় খুব ক্ষোভটোভ প্রকাশ করব, চিল্লাপাল্লা করব, আর দেখব এই ডাকাতির ঘটনা তদন্তে কী কী পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে বা কাদের দোষী হিসেবে চিহ্নিত করছে শহরের লোকেরা। তারপর ফিরে এসে তোমাদের জানাব সব কথা। এ রকমই তো কথা ছিল, তাই না। তাহলে শোনো, আমি কী জেনেছি। লুসিয়াস নামে এক লোককে এই ডাকাতির পেছনে সন্দেহ করা হচ্ছে। তার সত্যিকার নাম আমি বের করতে পারিনি। শহরের সবাই মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে গেছে, এই লুসিয়াস লোকটাই আসল কালপ্রিট। সে-ই ডাকাত দলের নেতা। শহরের লোকজন আমাকে বলল, এ নিয়ে আর তদন্তের দরকার নেই, ব্যাপারটা পানির মতো সোজা। লুসিয়াস এক সম্ভ্রান্ত লোকের সুপারিশযুক্ত চিঠি নিয়ে শহরে ঢুকেছে। জাল চিঠি ছিল সেটা। নিজেকেও সে সম্রান্ত বংশের লোক হিসেবে জাহির করেছে। তারপর ওই চিঠি দেখিয়ে মিলোকে ভজিয়ে তার বাসায় ঘর ভাড়া নিয়েছে। মিলো তো অতিশয় সজ্জন ব্যক্তি। দুষ্টু লুসিয়াসকে সে নিজের পরিবারের লোকের মতোই খাতির-যত্ন করেছে। আর এই সুযোগে লুসিয়াস বাড়ির দাসীকে হাত করে বাড়ির কোথায় কী ধনসম্পদ লুকানো আছে, সবকিছুর খবর নিয়েছে। এই লুসিয়াসই যে ডাকাতির মূল হোতা, তার প্রমাণ হলো ডাকাতির ঘটনার পর থেকেই সে গা ঢাকা দিয়েছে। কোথাও তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আস্তাবলে তার সাড়া ঘোড়াটাও নেই। তার মানে ঘোড়ায় চেপে অনায়াসে চম্পট দিয়েছে লোকটা। তার সঙ্গে যে ভৃত্য দেওয়া হয়েছিল, সেটাকে আটক করা হয়েছে প্রভুকে ডাকাতির কাজে সহায়তা করার দায়ে হাকিম তাকে জেলে দিয়েছেন। পরদিন থেকে জেরা করার নামে তার ওপর চলে নির্যাতন। মারের চোটে বেচারার মরো মরো দশা। লুসিয়াসের নিজের এলাকায় তদন্ত দল পাঠানো হয়েছে। ওরা গিয়ে লুসিয়াসের ঘরবাড়ি তল্লাশি করবে। পারলে গ্রেপ্তার করে আনবে।”

গুপ্তচরের মুখে এই বয়ান শুনে আমার ভেতরটা ঘোঁতঘোঁত করে উঠল। পানি এসে গেল চোখে। কোথায় ছিলাম মান্যগণ্য ব্যক্তি আর কোথায় হয়েছি এক হতভাগ্য লাথি-ঝাটা খাওয়া গাধা। মনে মনে ভেবে দেখলাম, বুজুর্গ লোকেরা ঠিক কথাই বলেন, ভাগ্যদেবতা বড় অন্ধ, দুষ্ট লোকদের হাত খুলে দেন। আর ভালো লোকদের দেন দুর্ভোগ। আমার কথাই ধরুন। কী এক হীন জন্তুতে পরিণত হয়েছি, এখানেই শেষ হলে তা-ও ভালো ছিল। এখন নিজের কানে শুনতে হচ্ছে নিজের বিরুদ্ধে অমূলক সব অভিযোগ। ক্ষোভে-দুঃখে প্রতিবাদ করে উঠতে চাইলাম। চেঁচিয়ে বলতে চাইলাম, না, ওই কাজ আমি করিনি, আমি করিনি!

কিন্তু আমার গাধার গলা দিয়ে কেবল নহ! নহ! ধরনের কিছু দুর্বোধ্য ধ্বনি বেরোতে লাগল। ওভাবে চেঁচিয়েই যেতে লাগলাম। কেউ পাত্তা দিল না। ফিরেও তাকাল না।

কিছুক্ষণ চেঁচামেচি করার পর ভাবলাম, আচ্ছা, এভাবে ভাগ্যে শাপশাপান্ত করে লাভ কী। যে রাতে আমাকে একটা গর্দভে পরিণত করে আমারই ভারবাহী পশুর সঙ্গে এক আস্তাবলে থাকতে বাধ্য করা হয়েছে, নিজের গাধার পাশে পাশে আমাকেও মুট বইতে হয়েছে, আমার ইজ্জত-ফিজ্জত যা ছিল সেই দিনই তো সব গেছে। এরপর আর সবকিছুই তুচ্ছ।

তখন আরেকটা চিন্তা মাথায় এলো। এই দস্যুরা তো একটু পরেই আমাকে হত্যা করবে। তারপর শারিতি নামের ওই মেয়েটাকে ঢোকাবে আমার পেটের মধ্যে। কী ভয়ংকর। আমার শরীর কাঁটা দিয়ে উঠল।

গুপ্তচর লোকটা তার পোশাকের সেলাই খুললে তার ভেতর থেকে বেশ কিছু স্বর্ণমুদ্রার থলে বের হলো। লোকটা বলল, আসার পথে পথচারীদের ছিনতাই করতে করতে এসেছে সে। মুদ্রার থলে সে লুটের তহবিলে জমা দিল। তারপর লোকটা দলের মধ্যে তার বিভিন্ন সঙ্গীর কথা জানতে চাইল। জানতে চাইল, তাদের দেখছে না কেন। যখন শুনল, অনেকে মারা গেছে বিভিন্ন অভিযানে, তখন সে বলল, এখন ডাকাতির কাজে কিছুদিন বিরতি দিয়ে তাদের উচিত দল ভারী করার কাজে নেমে পড়া। সে বলল, স্থানীয় যুবকদের দলে ঢোকাতে হবে। প্রথমে তাদের আকর্ষণ করতে হবে, ডাকাতি যে বীরের পেশা, সেটা বোঝাতে হবে। আবার কাউকে কাউকে ভয় দেখিয়ে দলে টানতে হবে।

অনেকে আসবে লুটের মালামালের ভাগ পাওয়ার লোভে। বাকিরা আসবে রোমাঞ্চের তাড়নায়। গুপ্তচর বলল, এরই মধ্যে এ রকম এক লোকের দেখা সে পেয়েছে। লোকটা ভিক্ষুক বটে, কিন্তু খুব লম্বা চওড়া আর সুঠাম দেহ। লোকটাকে সে বলেছে, এই বলিষ্ঠ হাতে ভিক্ষার পাত্র মানায় না। এই হাতে শোভা পায় অন্য কিছু। কিছুক্ষণ একথা-সেকথার পর ভিক্ষুক লোকটা রাজি হয়ে গেছে। একটু দূরে রাস্তার ধারে তাকে দাঁড় করিয়ে রেখে এসেছে গুপ্তচর। দলের অন্যরা রাজি থাকলে নিয়ে আসবে।

দলের সবাই একবাক্যে রাজি। সত্যি তো, এখন ডাকাতি না করে লোকলস্কর খোঁজা শুরু করা উচিত। দস্যু হওয়ার গুণাবলি আছে, এমন লোকজন দিয়ে শূন্যস্থান পূরণ করতে হবে।

সম্মতি পেয়ে বেরিয়ে গেল গুপ্তচর। কিছুক্ষণ পর ফিরে এলো ভিক্ষুককে নিয়ে। চওড়া কাঁধের এক যুবক। ডাকাত দলের সবচেয়ে লম্বা দস্যুটির চেয়েও লম্বা। দাড়ি-গোঁফ না কামালেও কেমন একটা সৌম্য কান্তি চেহারায়। বিশাল বুকের ছাতি। মেদহীন কোমর। ভিখারির ছেঁড়া পোশাকেও তাকে দারুণ দেখাচ্ছে।

ঢুকেই লোকটা ডাকাত দলের উদ্দেশ্যে বলল, “সুপ্রভাত মহোদয়গণ। আপনারা রাজি থাকলে আমি আপনাদের দলে যোগ দিতে চাই। আপনাদের সহযোদ্ধা হতে পারলে আমি নিজেকে ধন্য মনে করব। আপনাদের সেবায় নিজেকে সঁপে দেব। সাহসের কমতি নেই আমার। হাত পেতে ভিক্ষা নেওয়ার চেয়ে লড়াইয়ের ময়দানে মার খেতে বেশি পছন্দ করি আমি। অন্যরা মৃত্যুকে ভয় পায়, আর আমি মৃত্যুকে ঘৃণা করি। এই জীর্ণ পোশাক দিয়ে আমাকে বিবেচনা করবেন না। ভিক্ষা আমার পেশা নয়। একসময় আমি ছিলাম আপনাদেরই মতো একটা ডাকাত দলের সর্দার। মেসিডোনিয়া জুড়ে লুটপাট চালিয়ে ত্রাস সৃষ্টি করেছিল আমাদের দলের ডাকুরা। আমার আসল নাম থ্রাসের হিমাস। এই নাম শুনলে একসময় দেশের আনাচকানাচের লোকেরা ভয়ে থরথর করে কাঁপত। আমার বাবার নাম থেরো। উনিও কুখ্যাত দস্যু সর্দার ছিলেন।

“জন্মের পর মানুষের রক্তে স্নান করানো হয়েছিল আমাকে। বড় হয়েছি দস্যুদের গুহায়। বাবার সাহস পদাঙ্ক অনুসরণ করে তারই যোগ্য উত্তরসূরি হয়ে উঠেছি আমি। কিন্তু যুদ্ধের দেবতা মার্স একবার রুষ্ট হলেন আমার ওপর। কেননা, আমি সম্রাট সিজারের এক উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তার ওপর হামলা চালিয়েছিলাম। ওই কর্মকর্তা ছিলেন এক রাজ্যের গভর্নর। দুই সহস্র স্বর্ণমুদ্রা বেতন ছিল তাঁর। কিন্তু তাঁরও কপাল মন্দ ছিল। শুনবেন পুরোটা?”

“শুনব, শুনব। গোড়া থেকে বলুন।”

“শুনুন তাহলে। যে কর্মকর্তার কথা বলছিলাম, রাজকার্যে লোকটা দারুণ পটু। এ জন্য উন্নতির সিঁড়ি বেয়ে তরতর করে উঠে গিয়েছিলেন তিনি। সম্রাট নিজে তাঁকে খুব পছন্দ করতেন। কিন্তু তাঁকে হিংসা করত অনেকে। তারাই তাঁকে ফাঁসিয়ে দিল এক মিথ্যা অভিযোগে। সম্রাট তাঁকে এক দূরের দ্বীপে নির্বাসনে পাঠালেন। সঙ্গে চললেন তাঁর স্ত্রী প্লোতিনা। বড়ই পতিভক্ত মহিলা। স্বামীর কষ্ট মানে নিজের কষ্ট। আর তা ছাড়া শহুরে জটিল জীবনও তেমন পছন্দ নয় মহিলার। নৌকা বন্দর ছেড়ে সাগরে ভাসতেই মহিলা তাঁর চুল কেটে ছোট করে ফেললেন। গয়নাগাটি গলা থেকে খুলে পরলেন কব্জিতে। তারপর পুরুষের পোশাক-আশাক পরে ফেললেন। এখন তাঁকে দেখে বোঝার উপায় নেই তিনি একজন মহিলা। সাহসও তাঁর কম নয়। তলোয়ার হাতে শত্রুর সঙ্গে সমানে সমান লড়াই চালিয়ে যেতে পারেন।

“নৌকা ভিড়ল জাসিনথুস দ্বীপে। এখানেই নির্বাসন কাটাতে হবে তাঁদের। নৌকা থেকে নেমে সৈকতের কাছেই একটা কুঁড়েঘরে রাত কাটালেন এই দম্পতি।

“ঘটনাচক্রে মেসিডোনিয়ায় ডাকাতি সেরে আমরা তখন ওই পথ দিয়ে ফিরছি। পথে কুঁড়েঘর পেয়ে সেখানেও ঢুঁ মারলাম আমরা। যদি কিছু পাওয়া যায় মন্দ কী? জিনিসপত্র যা পেলাম, নিয়ে রওনা হব, এমন সময় প্লোতিনা স্বামীর ঘরে ছুটে এসে চোর চোর বলে তারস্বরে চিৎকার জুড়ে দিলেন।

সঙ্গী চাকর-বাকর, দাস-দাসীরা ঘুম থেকে জেগে গেল। মহিলা পাড়া-প্রতিবেশীদের উদ্দেশ্যেও ডাকাডাকি শুরু করে দিলেন। দাস-দাসীগুলো ভিতু হওয়ার কারণে সেই যাত্রা বেঁচে গেছি আমরা।

“কিন্তু এই মহিলা বড় দজ্জাল। তিনি ছাড়লেন না। রোমে ফিরে বিচার দিলেন সম্রাটের কাছে। একজন ভদ্রমহিলার আবেদন-নিবেদন শুনে সম্রাট সিজারের মন এমন গলা গলল যে তিনি তাঁর স্বামীকে নির্বাসন থেকে ফিরিয়ে আনলেন। শুধু ফিরিয়েই আনলেন না, কসম কাটলেন এই পরিবারের ক্ষতি করেছে যারা, তাদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেবেন। সম্রাট বলে দিলেন, আজ থেকে হিমাসের দস্যু দলের নামনিশানা থাকবে না। সম্রাট সিজারের হুকুম মানে বোঝেন তো, সেটা তামিল হয়ে গেছে ধরে নিতে হবে। সেনাবাহিনীর নিয়মিত সৈন্যরা নেমে পড়ল। তাদের তাড়া খেয়ে দিন-রাত কুকুরের মতো ছুটতে থাকলাম আমরা। ছুটছি তো ছুটছিই। শেষে হাঁপাতে হাঁপাতে পটপট করে ধরা পড়তে লাগলাম তাঁদের হাতে। পুরো দস্যু দলটাই ধরা পড়ল, শুধু আমি ছাড়া। মৃত্যুর কামড় থেকে কোনোক্রমে বেঁচে গেলাম আমি। মেয়েদের পোশাক, বোরকা পরে বার্লির শিষবাহী এক গাধার পিঠে লাফিয়ে চেপে বসলাম।

“সৈন্যদের কড়া নজরদারির সামনে দিয়ে সন্তর্পণে বেরিয়ে গেলাম আমি। কাপুরুষের মতো পালিয়েছি বটে, তবে বাপের নামের অবমাননা হতে দিইনি। এখনো মওকা পেলেই ছিনতাই-টিনতাই করি, মফস্বলের গৃহস্থ বাড়িতে একাই হামলা চালিয়ে যা পাই কব্জা করি। এই করে করে নিজের জন্য একটা ছোটখাটো স্বর্ণমুদ্রার সঞ্চয় জমিয়েছি রাহা খরচ চালানোর জন্য।”

এই বলে নিজের ভিক্ষার ঝুলি খুলল যুবক। ভেতর থেকে বেরোল দুই সহস্র স্বর্ণমুদ্রা।

যুবক বলল, “এই নিন আপনাদের লুটের তহবিলে এই আমার দান। চাইলে একে আমার ভেটও বলতে পারেন, আপনাদের দলে যুক্ত হতে পারার ভেট। আর আপনারা যদি রাজি থাকেন, তাহলে আমি আপনাদের এই দলের সর্দারি করার দায়িত্বটা নিয়ে নিতে পারি। কথা দিচ্ছি, অতি শিগগিরই এই গুহার পাথুরে দেয়াল আমি সোনায় মুড়ে দিতে পারব।”

পুরো দস্যু বাহিনী এক মুহূর্ত দ্বিধা করল না। সবাই সমস্বরে রাজি হয়ে গেল যুবকের প্রস্তাবে। যুবক সর্দার নির্বাচিত হলো। তাকে পরিচ্ছন্ন আলখাল্লা পরতে দেওয়া হলো। সেটা পরে যুবক এক এক করে প্রত্যেক দস্যুর সঙ্গে কোলাকুলি করল।


এবার নতুন সর্দার টেবিলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আসনে বসলেন। তাঁর নির্বাচন উদযাপন করা হলো খাবার আর মদ পরিবেশন করে।

দস্যুরা নতুন সর্দারকে জানাল তাদের হাতে জিম্মি মেয়েটার কথা। জানাল পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করার কারণে তাকে কীভাবে শাস্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সর্দার জানতে চাইলেন, মেয়েটাকে কোথায় রাখা হয়েছে। দস্যুরা তাকে নিয়ে গেল মেয়েটার কাছে। শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে মেয়েটাকে। তাই দেখে সর্দার বললেন, “বোকার মতো সিদ্ধান্ত নিয়েছ তোমরা। তবে তোমাদের সঙ্গে ঝগড়া করব না আমি। এখন তোমাদের স্বার্থই আমার স্বার্থ। কাজেই এ নিয়ে আমি কী ভাবছি, সেটা তোমাদের বলি। আমার কথা নিতেই হবে এমন নয়। পছন্দ না হলে আমার প্রস্তাব ফেলে দিয়ো। আমার কথা হলো, বুদ্ধিমান দস্যুরা সবার আগে দেখে, কিসে তাদের লাভ, কিসে ফায়দা। প্রতিশোধ নিতে গেলেও লাভের চিন্তা মাথায় রাখতে হবে। মেয়েটাকে তোমরা যেভাবে হত্যা করবে বলে ঠিক করেছ, সেভাবে হত্যা করে কী ফায়দা? তার চেয়ে তাকে যদি কোনো বাজারে নিয়ে গিয়ে দাসী হিসেবে বিক্রি করে দাও, অনেক দামে বেচতে পারবে। আমার কিছু পরিচিত দাস ব্যবসায়ী আছে। তারা ভালো দাম দেবে। এতে প্রতিশোধও নেওয়া হলো, দুটো টাকাও এলো। এখন কোনটা করবে, সিদ্ধান্ত তোমাদের। আমি পরামর্শ দিলাম, কেননা আমার মনে হলো, এতেই তোমাদের সবচেয়ে বেশি ফায়দা।”

তখন দস্যুদের মধ্যে এ নিয়ে তুমুল তর্কাতর্কি বেঁধে গেল। শেষে তারা সাব্যস্ত করল, নতুন সর্দারের পরামর্শই শুনবে। তক্ষুনি মেয়েটার শিকল খুলে দেওয়া হলো।

শিকলমুক্ত হওয়ার পর মেয়েটার চোখ-মুখ কিছুটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল, দেখলাম। সর্দার বলল, “প্রার্থনা করো, মেয়েটাকে বিক্রি করে যাতে ভালো দাম পাই। ওই টাকা দিয়ে দলে নতুন লোকজন কেনা যাবে। চলো, এই উপলক্ষে দেবতার উদ্দেশ্যে ভোগ দিই। তোমরা ১০ জন আমার সঙ্গে চলো। কাছাকাছি কোনো বাজার থেকে কিছু মাংস আর মদ কিনে আনি।”

১০ দস্যুকে নিয়ে নতুন সর্দার বাজার করতে গেলেন। শিগগিরই এক দঙ্গল ছাগল আর ভেড়া কিনে আনলেন। মঙ্গলের দেবতার উদ্দেশ্যে বলি দেওয়ার জন্য বাছাই করা হলো একটা তাগড়াই পাঁঠা। বাকি ছাগল-ভেড়া দিয়ে ভোজ উৎসব হবে। এরই মধ্যে বাকি দস্যুরা জ্বালানি কাঠ জোগাড় করে ফেলেছে। নতুন সর্দার বিরাট কর্মবীর! নিজ হাতে মেঝে ঝাড় দিয়ে সাফসুতরো করে ফেললেন। রান্নার দায়িত্বও নিজে নিলেন। খুব মজা করে রান্না করলেন তিনি। তারপর সব দস্যুকে টেবিলে বসিয়ে নিজ হাতে পরিবেশন করতে শুরু করলেন। তাদের মগে তিনি ঢেলে দিলেন ওয়াইন। মগের ওয়াইন ফুরালে আবার নতুন করে ঢেলে দিচ্ছেন। মেয়েটা গুহার দূরবর্তী এক কোনায় বসে আছে। মাঝেমধ্যেই নতুন সর্দার এটা বা সেটা আনার ছলে মেয়েটার কাছে যাচ্ছেন। লুকিয়ে মেয়েটাকে এটা-সেটা খাবার খেতে দিচ্ছেন। মেয়েটাও দেখি তার কাছ থেকে খাবার নিয়ে খাচ্ছে। ফিসফিস করে মেয়েটার কানে কিছু একটা বলেই আবার চলে আসছেন।

ব্যাপার কী, ঠিকমতো মাথায় ঢুকছিল না। গাধার মাথা তো। কিন্তু একটু পরেই একটু একটু টের পেতে শুরু করলাম। আরে এ তো আসলে দস্যু সর্দার হিমাস নয়। এ তো আসলে ওই মেয়ের হবু বর তেপোলেমাস। কান খাড়া করে শুনলাম, মেয়েটার কাছে গিয়ে সর্দার ফিসফিস করে তার কানে বলছে, “সাহস রাখো শারিত, শিগগিরই তোমার শত্রুদের ব্যবস্থা করছি।”

ভালো করে লক্ষ্য করে বুঝলাম, সর্দার দস্যুদের মদ খাইয়ে খাইয়ে বেহেড মাতাল করে তুললেও নিজে কৌশলে একবারও চুমুক দিচ্ছে না। নিজে আসলে মগে পানি ঢেলে খাচ্ছে। কে জানে, হয়তো মদের মধ্যে কোনো ওষুধ-টষুধ মিশিয়ে দিয়েছে সর্দার। ফলে এরই মধ্যে দেখি দস্যুদের ঢুলুঢুলু চোখ।

দেহ শিথিল হয়ে এসেছে। একপর্যায়ে একে একে মেঝেতে পড়ে গেল সব ক’টা দস্যু।

তেপোলেমাস শক্ত দড়ি দিয়ে সবার হাত-পা বেঁধে ফেললেন। তারপর শারিতকে আমার পিঠে বসিয়ে গুহার বাইরে বের করল আমাদের। মুক্ত হয়ে আমরা পালাতে শুরু করলাম।

শহরের কাছাকাছি আসতেই লোকজন আমাদের ঘিরে ধরল। তাদের মধ্যে শারিতের বাবা-মা, আত্মীয়স্বজনও আছে। মিছিল করে আমরা চললাম শেরিতের বাড়ির উদ্দেশ্যে।

আমার পিঠে শারিত। এভাবে বিজয়ীর বেশে মিছিল করে যেতে যেতে মনে হলো, আমার গাধার জীবন সার্থক হয়েছে।


---E-Book Created By---
Md. Ashiqur Rahman

নবম অধ্যায়

পশুর খামারে অভিশপ্ত জীবন


শেরিতের বাড়িতে আমার আয়েশে জীবন কাটার কথা। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে ওখানেও তাড়া করবে কে জানত।

পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই শেরিত উচ্ছসিত গলায় তার বাবা-মাকে বলতে লাগল, আমার প্রতি কী অসীম কৃতজ্ঞ সে। কীভাবে এর প্রতিদান দেবে বলে আমাকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সে কথাও বলল। বাবা-মা “আচ্ছা, ঠিক আছে” বলে পাশ কাটানোর চেষ্টা করলেও শেরিত নাছোড়বান্দা। ঘুরেফিরে সে এ কথাই বলতে থাকল। একপর্যায়ে বাবা-মায়ের কাছ থেকে কথা সে আদায় করে ছাড়ল।

বাবা-মা অগত্যা একটা সভা ডাকলেন। আত্মীয়স্বজন, মহল্লার গণ্যমান্য মুরব্বিদের ডাকা হলো। তাদের কাছে জানতে চাওয়া হলো, মানুষের পক্ষে একটা গাধাকে কী উপায়ে সর্বোচ্চ সম্মান দেখানো সম্ভব। একজন মাথা চুলকে প্রস্তাব দিল, আমাকে আস্থাবলে রাখা হোক। কোনো রকম কাজটাজ দেওয়া হবে না। সারাক্ষণই সবচেয়ে ভালো খাবারদাবার খেতে দেওয়া হবে, মানে অবশ্যই গাধার খাবার, তার মানে বার্লি, শিমের বিচি আর ছোলা। আরেকজন বলল, গাধাটাকে ছেড়ে দেওয়া হোক। মাঠে চরে বেড়াবে। সেখানে মেয়ে গাধা পেলে বিয়েও করে ফেলতে পারে।

অনেক আলোচনার পর শেষে মাঠে ছেড়ে দেওয়াই সাব্যস্ত হলো।

কাজেই পশুর খামার দেখাশোনা করে যে সর্দার, ডেকে আনা হলো তাকে। আমাকে তার হাতে তুলে দিয়ে বলা হলো, এই গাধাকে বিপুল যত্ন-আত্তি করতে হবে। কোনো অসম্মান যেন না হয়।

খুশি মনে সর্দারের সঙ্গে হেঁটে যেতে শুরু করলাম। মনে মনে ভাবলাম, এত দিন পরে মুক্তির স্বাদ মিলবে। পিঠে আর বাক্সপেটরা বহন করতে হবে না। সবুজ মাঠে ইচ্ছামতো ছুটে বেড়াব। আর অপেক্ষায় থাকব, কখন বসন্তকাল আসে। বসন্ত এলে নতুন নতুন ফুল ফুটবে। তখন কোথাও না কোথাও গোলাপের একটা ঝাড় খুঁজে পাবই।

মনে আশা জাগল, গাধা হয়েই এত খাতিরযত্ন, মানুষে পরিণত হলে গৃহকর্তা না জানি আরও কত সম্মান দেখাবেন।

সর্দারের পশুখামার কয়েক মাইল দূরে গ্রামের ভেতরে। আমাকে সেখানে নিয়ে যাওয়া হলো। আর সেখানে গিয়ে টের পেলাম, খুব বাজে লোকের খপ্পরে পড়েছি। এরা আমাকে মাঠেও ছেড়ে দেবে না, বাড়তি খাতিরযত্নও করবে না। উল্টো কপালে জুটবে ভোগান্তি। বিশেষ করে সর্দারের বউটা অতিশয় দজ্জাল। সেই মহিলা আমাকে ঘানির জোয়ালের সঙ্গে জুড়ে দিল। সারা দিন জোয়াল কাধে ঘুরে ঘুরে এই পরিবারের জন্য শস্য ভাঙতে হয়। একটু গা আলগা দিয়েছি কি একটা গাছের ডাল দিয়ে পিঠে সপাৎ সপাৎ ঘা।

আমাকে দিয়ে বাড়ির সব শস্য ভাঙিয়েও তৃপ্তি হলো না মহিলার। প্রতিবেশীদের শস্যদানাও ভাঙানো হতে লাগল আমাকে দিয়ে। মানে আমাকে দিয়ে টাকা কামানোর ফন্দি। সারা দিন চলল গাধার খাটুনি। ঘানির জোয়াল কাঁধে ঘুরতে থাকো, ঘুরতে থাকো। সন্ধ্যায় ক্লান্ত হয়ে পড়ে যাওয়ার যখন দশা হয়, তখন রেহাই।

আর খাবার? কোথায় বার্লি, কোথায় কী! দলাপাকানো নোংরা ভুসি ঠেলে দেওয়া হলো আমার দিকে।

একদিন মনে হয় আমার ব্যাপারে যেসব নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো মনে পড়ল সর্দারের। তিনি আমাকে মাঠের মধ্যে ছেড়ে দিলেন। এত দিন পর ছাড়া পেয়ে শরীরটা চনমন করে উঠল। মাঠের মধ্যে তুমুল ছোটাছুটি শুরু করলাম। মাঠে কয়েকটা ঘোড়া চরছিল। তাদের একজনের গায়ে ধাক্কা খেলাম। সেটা বোধ হয় আরেকটা ঘোড়ার বউ ছিল। বিরক্ত হয়ে আমার দিকে তেড়ে এলো কয়েকটা পুরুষ ঘোড়া। একটা ঘোড়া সামনের পা তুলে আঘাত করল আমার কপালে। আমি ছিটকে পড়লাম। আরেকটা পেছনের পা তুলে এমন লাথি কষল, আমার দফারফা। প্রাণ বাঁচাতে পড়িমরি ছুটে গিয়ে ঢুকে পড়লাম সর্দারের বাড়িতে। চাই না এমন স্বাধীনতা। তার চেয়ে সারা দিন ঘানি টানাও ভালো।

এবার বাড়ির গিন্নি আমার নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দিলেন। আমার নতুন দায়িত্ব, পাহাড়চূড়া থেকে জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করে আনতে হবে। একটা বালককে দেওয়া হলো আমার রাখাল হিসেবে। সেই ছেলে বজ্জাতের বজ্জাত। আমাকে অযথা পাহাড় বেয়ে ওঠা-নামা করিয়ে খাটিয়ে মারতে লাগল। ধারালো পাথরে ঘষা খেয়ে আমার খুর ক্ষয়ে গেল। দম নিতে গেলেই নির্দয়ভাবে পেটাচ্ছে। হাড়গোড়ে ব্যথা ধরে গেছে। বারবার একই জায়গায় পেটাচ্ছে ছেলেটা। তাতে একসময় চামড়া ছিলে রক্ত বেরোতে লাগল। ছেলেটা ইচ্ছে করেই আমার পিঠে কাঠখড়ের ইয়া ভারী বোঝা চাপিয়ে দিতে লাগল। এত ভারী বোঝ যে একটা হাতিরও টানতে কষ্ট হবে। তা ছাড়া ইচ্ছে করেই বোঝার এক পাশটা ভারী করে রাখছে ছেলেটা। ফলে চলার সময় এক পাশে একটু কেতরে চলতে হচ্ছে। তখন দুই পাশের ভার সমান করার উদ্যোগ না নিয়ে ছেলেটা করছে কী, ভারসাম্য আনতে অপর পাশে পাথর ঝুলিয়ে দিচ্ছে। এতেও তার মন ভরল না। একটা পাহাড়ি অগভীর নদী পেরোনোর সময় নিজের পা ভিজবে বলে সে লাফিয়ে আমার পিঠে চেপে বসল। এমনিতেই বোঝার ভারে আমার নুয়ে পড়ার দশা। তার ওপর এই বাড়তি ভার। নদীর পাড় ভয়ানক পিচ্ছিল। সেটা বেয়ে উঠতে কষ্ট হচ্ছিল। ছেলেটা পেছন থেকে ঠেলে বা ভার কিছুটা কমিয়ে দিয়ে একটু সহযোগিতা করবে কী, উল্টো বেদম পেটাতে শুরু করল পিঠে। মারের চোটে পিঠের লোম উঠে যেতে লাগল। ব্যথার চোটে মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল।

বজ্জাত ছেলেটা আরেকটা শয়তানি ফন্দি বের করল। জঙ্গলের সবচেয়ে ধারালো আর বিষাক্ত একটা কাঁটাঝোপ ছিড়ে এনে বেঁধে দিল আমার লেজের সঙ্গে। হাঁটলে সেটা এপাশ-ওপাশ দুলছে আর আমার পায়ে ভয়ানক খোঁচা লাগছে। ফলে তার মারের হাত থেকে বাঁচার জন্য দৌড়াতে গেলেই কাঁটার খোঁচায় থেমে পড়তে হচ্ছে। আবার কাটার খোঁচার হাত থেকে বাঁচতে থেমে দাঁড়িয়ে থাকলে পিঠে দমাদম পিটুনি। এই পাজি আমাকে মেরেই ফেলবে বোধ হয়।

একদিন সহ্য করতে না পেরে পেছনের পা তুলে লাথি কষলাম। এর প্রতিক্রিয়ায় সে যা করল, নিষ্ঠুরতায় তা সবকিছুকে ছাড়িয়ে যাবে। একটা শুকনো শণের বোঝা চাপাল সে আমার পিঠে। কষে বাঁধল বোঝাটা পিঠের সঙ্গে। তারপর যখন মেষপালকদের গ্রামের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, তখন একজনের রান্নাঘর থেকে চুরি করে কয়লার আগুন এনে শণের বোঝার ওপর ছেড়ে দিল। শুকনো খড়ের মতো শণের বোঝায় চিটপিট করে আগুন জ্বলে উঠল। দেখলাম পুড়ে মারা যাওয়া অবধারিত। দাঁড়িয়ে থেকে কোনো উপায় ভেবে বের করার অবকাশ নেই। তবে ভাগ্যদেবী এবার সাহায্যের হাত বাড়ালেন। দেখলাম পথের পাশে একটা গর্তে আগের দিনের বৃষ্টির পানি জমে আছে। ছুটে গিয়ে গড়িয়ে পড়লাম কাদাপানিতে। গড়াগড়ি দিয়ে কোনোমতে নেভালাম আগুন। উঠে দাঁড়ালাম যখন, পিঠে কোনো বোঝা নেই। কিন্তু পিঠ পুড়ে কয়লা।

বাসায় ফিরে হাড়েবজ্জাত ছেলেটা সব দোষ আমার ওপর চাপিয়ে দিল। সর্দারকে বলল, আমি ইচ্ছা করে জ্বলন্ত কয়লার ওপর গড়াগড়ি দিয়ে আগুন লাগিয়েছি। তারপর দুষ্টু হাসি হেসে সে বলল, “এই অলস গাধার পেছনে কত দিন আর দানাপানি খরচ করবেন আপনারা?”

কয়েক দিন পরে আমাকে কষ্ট দেওয়ার আরেক নতুন বুদ্ধি বের করল ছেলেটা। আমার পিঠে তখন তুলার বোঝা। সে করল কী, পথিমধ্যে প্রথম বাড়িটায় থেমে সব তুলা বিক্রি করে দিল। খালি পিঠে বাসায় ফিরলাম। সর্দার দম্পতিকে সে বলল, আমার গাধামির কারণেই তুলার বোঝা হারিয়ে গেছে। তা ছাড়া সে আমাকে নিয়ে বনে আর কাঠ কাঠতে যেতে রাজি নয় বলে জানিয়ে দিল। “গাধাটা একেবারে অলসের ধাড়ি! নড়তেই চায় না। অলস হলেও না হয় কথা ছিল। ইদানীং সে আরেক উৎপাত শুরু করেছে। রাস্তাঘাটে লোকজন দেখলেই তাকে আক্রমণ করে বসছে। মাত্রই আধা ঘণ্টা আগে রাস্তা দিয়ে আসছি। উল্টো দিক থেকে আসছিলেন এক খানদানি পরিবারের মহিলা। এই গাধা তাকে আক্রমণ করে বসেছে। ছুটে গিয়ে তাকে এমন ধাক্কা দিয়েছে, মহিলা চিতপটাং। তার চিৎকারে প্রতিবেশীরা ছুটে এসে উদ্ধার করে।”

এভাবে একের পর এক ডাহা মিথ্যা বলে যাচ্ছিল ছেলেটা। আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনছি। কিছুই করার নেই। এভাবে বানানো কাহিনীতে কান ভারী হতে হতে একপর্যায়ে সর্দার রাগে ফেটে পড়লেন। আমাকে জবাই করে হত্যার আদেশ দিলেন। বললেন, চামড়াটা শুধু রেখে দিতে। সেটায় লবণ মেখে শুকানো হবে। গাধার আসল মালিককে চামড়াটা ফিরিয়ে দিয়ে বলা হবে, গাধাটাকে বনের নেকড়ে খেয়েছে।

ছেলেটা যেন এর জন্যই অপেক্ষা করছিল। আদেশ হওয়ামাত্র ছুরিতে শাণ দিতে শুরু করে দিল। শাণ দেয় আর আমার দিকে তাকিয়ে ফিকফিক করে হাসে। আমি প্রমাদ গুনলাম।

একটু পরেই জবাই। তখন প্রতিবেশী এক রাখাল পরামর্শ দিল, আজ না করে কাল মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হোক। সেটাই সাব্যস্ত হলো। আমি একটা দিন বাড়তি পেলাম।

পরদিন ছেলেটা আমাকে নিয়ে আবার বনে কাঠ আনতে বের হলো। একটা বিরাট ওকগাছের ডালের সঙ্গে আমাকে বেঁধে রেখে একটু দূরে কাঠ কাটতে গেল। হঠাৎ কাছেই একটা গুহার মুখে উঁকি দিল একটা মাদি ভালুকের মুখ। এই হিংস্র পশুকে দেখে আমার বুদ্ধিশুদ্ধি লোপ পেল। পাগলের মতো দড়ি ছেঁড়ার জন্য টানাটানি করতে থাকলাম। পটাং করে ছিঁড়ে গেল দড়ি। পাহাড়ের ঢালে ছেড়ে দিলাম দেহটা। গড়িয়ে গড়িয়ে নিচে নামছি। সমতলভূমিতে পৌঁছেই ছুট লাগালাম। শুধু ভালুকের হাত থেকে বাঁচার জন্য না, ভালুকের চেয়ে শত গুণে ভয়ংকর ওই ছেলেটার হাত থেকে বাঁচার জন্য ছুটছি।

ঘটনাচক্রে এক পথচারী যাচ্ছিল ওই পথ দিয়ে। একটা ছাড়া গাধা দেখতে পেয়ে লাগাম ধরে ফেলল। তারপর লাফিয়ে উঠে বসল আমার পিঠে। লাঠি দিয়ে পিটিয়ে অচেনা এক পথে নিয়ে যেতে লাগল লোকটা আমাকে। আমার তাতে আপত্তি নেই। যে নির্যাতন সইতে হয়েছে, তার তুলনায় এ তো আদর।

কিন্তু ভাগ্যদেবী আমাকে নিয়ে তামাশা শেষ করেননি। শিগগির নতুন এক ফাঁদে পড়লাম।

রাখালেরা বেরিয়েছিল তাদের একটা হারানো গরুর খোঁজে। আমাকে দেখতেই চিনে ফেলল তারা। জোর করে থামাল। তারপর টেনে নিয়ে যেতে থাকল গ্রামের দিকে।

আমার আরোহী প্রতিবাদ করে উঠল। “আমাকে এভাবে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন কেন? আইনকানুন, সভ্যতা-ভব্যতা কিছুই জানেন না দেখছি আপনারা!”

রাখালেরা বলল, “আইন শেখাতে আসবেন না। আপনি আমাদের গ্রামের গাধা চুরি করে পালাচ্ছেন। এখন বলুন, এই গাধার সঙ্গে রাখাল ছেলেটা কোথায়? তাকে খুন করে কোথায় ফেলে রেখেছেন?”

আরোহী লোকটা প্রতিবাদ করে বলল, আমাকে একলা ঘোরাঘুরি করতে দেখে পিঠে চেপেছে সে। চোর সে নয়। কিন্তু কে শোনে কার কথা। রাখালেরা তাকে নামিয়ে বেঁধে ফেলল দড়ি দিয়ে। তারপর মনের সুখ মিটিয়ে পেটাল। মারের চোটে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল লোকটা। বলল, গাধাটাকে তার মালিকের কাছেই দিতে যাচ্ছিল, যদি কিছু বকশিশ মেলে এই ভরসায়।

রাখালেরা তার কথায় কান দিল না। আমাকে আর লোকটাকে নিয়ে চলল ছেলেটা যেখানে কাঠ কাটছিল সেই জায়গাটায়। ছেলেটা কোথাও নেই। খোঁজাখুঁজি করতে করতে এক জায়গায় ঝোপের মধ্যে মিলল তার দেহাবশেষ। ভালুকে খেয়েছে, বোঝাই যায়। কিন্তু সেটা যে বলব, সে উপায় তো নেই। রাখালেরা মরদেহ তুলে বনের মধ্যে কবর দিল। তারা দু’য়ে-দু’য়ে চার মিলিয়ে ফেলেছে। আমার পিঠের আরোহী লোকটাই খুনি। সে রাখাল ছেলেটাকে খুন করে আমাকে নিয়ে পালাচ্ছিল। পথে গ্রামের রাখালেরা তাকে পাকড়াও করে ফেলেছে। পানির মতো সহজ।

কাজেই আমাকে আর লোকটাকে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো গ্রামে। তাকে বাঁধা হলো একটা খুঁটির সঙ্গে। আগামীকাল তাঁকে খুনের দায়ে হাকিমের হাতে তুলে দেওয়া হবে।

খবর পেয়ে রাখাল ছেলের বাবা-মা ছুটে এলেন। সে কী বিলাপ তাঁদের। মনে মনে ভাবলাম, ভালোই হলো, এই ডামাডোলের মধ্যে আমার মৃত্যুদণ্ডের কথা ভুলে গেছে সবাই। একটা দিন তো বাড়তি বেঁচে থাকা যাবে।

কিন্তু একদণ্ড শান্তিও কপালে নেই আমার। বজ্জাত ছেলেটার মায়ের সব রাগ যতটা না খুনির দিকে, তার চেয়ে বেশি আমার দিকে। বুক চাপড়ে আহাজারি করতে করতে তিনি আমাকে দোষারোপ করতে লাগলেন। আমার দোষ? খুনিটা তার ছেলের উপর হামলা চালানোর সময় আমি কেন রুখে দাঁড়াইনি। আমি লাথি কষতে পারতাম, কামড়ে দিতে পারতাম। কিংবা ছেলেটাকে পিঠে তুলে নিয়ে ছুটে পালিয়েও যেতে পারতাম। তা করিনি বলে খুনিকে পরোক্ষভাবে আমিও সহযোগিতা করেছি। ফলে খুনের দায়ে আমিও সমান দায়ী।

এই কথা বলে আমার শাস্তির ব্যবস্থা মহিলা নিজেই করলেন। বাড়ি গিয়ে ইয়া বড় এক চ্যালা কাঠ এনে বেদম পেটাতে থাকলেন। পেটাতে পেটাতে যখন ক্লান্ত হলেন, তখন থামলেন।

পরদিন সকালে শেরিতের বাড়ি থেকে এক দাস এসে হাজির। সে একটা দুঃসংবাদ দিতে এসেছে। শেরিত আর তাঁর স্বামী তেপোলেমাস মারা গেছেন। তেপোলেমাস মারা গেছেন বনে শিকার করতে গিয়ে এক হিংস্র পশুর আক্রমণে। আর তাঁর মৃত্যুসংবাদ শুনে শোকে আত্মহত্যা করেছেন শেরিত।

খবর শুনে বিষাদে ভরে গেল মন। গ্রামবাসী ও রাখালেরাও চোখের পানি ফেলল। তবে তাদের সামনে আরও বড় দুশ্চিন্তা এসে হাজির। জমিদার দম্পতি মারা যাওয়া মানে এখন জমিদারি হাতবদল হবে। তাদের শত্রুপক্ষ হামলা চালাতে পারে গ্রামে। ফলে পুরো রাখালের গ্রামটা পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। রাখাল সর্দার বাড়ির জিনিসপত্র সব বাঁধাছাঁদা করলেন। বাড়ির পশুদের পিঠে তুলে দিলেন সেগুলো। আমার পিঠেও বোঝা চাপাল। আমি মনে মনে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম। যাক, এরা হয়তো ভুলে গেছে আমার শাস্তির কথা।

সামনের বনে ঘেরা পাহাড় ডিঙিয়ে অপর পাশের সমভূমিতে নেমে এলাম আমরা। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে আসছে। একটা মফস্বল শহর পড়ল পথে। শহরের মাতবরেরা আমাদের বলল রাতে যাত্রা না করতে। এই এলাকায় হিংস্র নেকড়ের বড় উৎপাত। রাস্তাঘাটে মানুষজনকে তুলে নিয়ে যেতে পারে একেকটা বিশাল আকারের নেকড়ে। খামারবাড়ির ভেতরেও ঢুকে পড়ে আক্রমণ চালায় তারা। আমাদের বলে দেওয়া হলো, যে পথ বেয়ে আমরা চলেছি, সেই পথে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে আধখাওয়া লাশ আর হাড়-কঙ্কাল। কাজেই সাবধানে পথ চলতে হবে আমাদের। চলতে হবে কেবল দিনের বেলা। সূর্য যত মাঝ আকাশে, নেকড়েগুলো তত নির্জীব।

কিন্তু রাখালদের মধ্যে কী যেন এক তাড়া। এই নিষেধ শুনতে তারা রাজি নয়। পরদিন ভোর পর্যন্ত অপেক্ষা না করে তারা যাত্রা অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নিল। আমরা আবার রাস্তায় নেমে এলাম।

ভয়ে কাঁপছি আমি। রাস্তার কোনায় না থেকে ভিড়ের মাঝখানে এসে দাঁড়ালাম। এমন হনহন করে চলছি যে কয়েকটা ঘোড়াকেও পেছনে ফেলে দিলাম। আমার এই তটস্থ ভাব দেখে দলের লোকজন বিস্মিত হলো।

নেকড়ের সম্ভাব্য আক্রমণ ঠেকাতে পুরো দলটা অস্ত্রশস্ত্র প্রস্তুত করে রেখেছে। সবার হাতে বর্শা, বল্লম আর তরবারি। অনেকে রাস্তা থেকে পাথর তুলে নিয়েছে। অনেকের হাতে জ্বলন্ত মশাল, যাতে নেকড়েরা কাছে ঘেঁষতে ভয় পায়। এমন সাজসাজ রবের কারণে বাইরে থেকে যে-কেউ দেখলে ভাববে, যুদ্ধ করতে চলেছে একটা সেনাবাহিনী।

এত বিপুল লোকজনের এমন সাড়াশব্দ, আর গনগনে মশাল দোলানোর কারণেই কি না জানি না, কোনো নেকড়ের টিকিও দেখতে পেলাম না আমরা। কিন্তু এতে অন্য এক বিপত্তি বাঁধল। একটা ছোট্ট গ্রামের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিলাম আমরা। গ্রামবাসী ভাবল, ডাকাত পড়েছে। গ্রাম পাহারা দেওয়া বিশাল বিশাল কুকুর লেলিয়ে দিল তারা। নেকড়ে কিংবা ভালুকের চেয়েও হিংস্র সব কুকুর। চারদিক থেকে আমাদের ওপর হামলা চালাল সেগুলো। পশু আর মানুষ উভয়ের পা কামড়ে মাটিতে শুইয়ে দিচ্ছে তারা। বড় করুণ দৃশ্য। এত বড় একটা দলকে নাস্তানাবুদ করে ছাড়ছে একদল কুকুর।

মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দেখা দিল গ্রামবাসীর ছোঁড়া ইটপাটকেল। বাসাবাড়ির চালে উঠে আমাদের উদ্দেশ্যে পাথর ছুঁড়তে লাগল তারা। বৃষ্টির মতো পাথর পড়ছে। মাথা ফেটে অনেকের রক্ত ঝরল। আমার পিঠের ওপর বসে থাকা মহিলাটিরও মাথা ফেটে গেল। আর্তনাদ করে স্বামীকে ডাকতে লাগল মহিলা।

সবাই চেঁচামেচি শুরু করে দিল, “করছেন কী আপনারা! ঈশ্বরের দোহাই থামুন। আমাদের মতো নিরীহ হতভাগাদের ওপর এভাবে হামলা চালিয়ে কী লাভ আপনাদের? আপনারা কি ডাকাত ভেবেছেন আমাদের?”

শুনে ইটপাটকেল বর্ষণ থেমে গেল। কুকুরগুলোকে ডেকে ডেকে ফিরিয়ে নিল গ্রামবাসী। তারা বলল, এভাবে অস্ত্রশস্ত্র দেখে ভুল করে ডাকাতই ভেবেছে তারা। আর সমস্যা নেই, আমরা চাইলে এগিয়ে যেতে পারি।

আমরা এগিয়ে যেতে থাকলাম। পুরো দলের করুণ দশা। কুকুরের কামড়ে কারও পায়ের দফারফা, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে, পাটকেলের আঘাতে কারও মাথা ফেটে গেছে।

ভোরের দিকে একটা বনের ধারে সর্দার থামতে বললেন পুরো দলটাকে। এখানে একটু জিরিয়ে নেওয়া হবে। সবাই গা ছেড়ে দিল। অধিকাংশই ক্ষতস্থান ধুয়ে, রক্ত পরিষ্কার করে মলম লাগাল, ব্যান্ডেজ বাঁধল।

আমরা যখন বিশ্রাম নিচ্ছি, তখন পাহাড়চূড়ায় এক বুড়ো লোকের আবির্ভাব ঘটল। তার চারপাশে ছাগল চরছে। আমাদের একজন তাকে হাতের ইশারায় ডাক দিল। জানতে চাইল, আশপাশে দুধ বা পনির কিনতে পাওয়া যাবে কি না। দু’ তিনবার জোরে জোরে মাথা নেড়ে “না” বলল বুড়ো। বলল, “এখানে দুধ বা পনির পাওয়ার কথা কী করে চিন্তা করলেন? জানেন না কোথায় এসেছেন আপনারা?” বলেই ঘুরে দাঁড়িয়ে হনহন করে হেঁটে চলে গেল।

তার আচরণের মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝলাম না আমরা। এই এলাকার সমস্যাটা কী, এখন কার কাছ থেকে জানা যায়?

তখন আরেক বুড়ো এসে হাজির। ক্লান্ত ভঙ্গিতে পা টেনে টেনে আমাদের কাছে এলো বুড়োটা। লম্বা শরীর, একটা লাঠির ওপর কুঁজো হয়ে ভর দিয়ে আছে। কাছে এসেই হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল। চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছে। বুড়ো বলল, “এত তাগড়া জওয়ান শরীর তোমাদের। আমার মতো এক বুড়োর দিকে একটু সাহায্যের হাত বাড়াও। আমার নাতিকে বাঁচাও। আমার বড় আদরের ধন সে। আমরা দু’জন এই পথ দিয়েই আসছিলাম। বেড়ার ধারে একটা দোয়েল পাখির ডাক শুনে সেটাকে ধরতে গিয়েছিল নাতি। আর তা করতে গিয়ে লতাপাতায় লুকানো একটা গর্তে পড়ে গেছে সে। আর উঠে আসতে পারছে না। কান্নার আওয়াজ পাচ্ছি। তার মানে এখনো বেঁচে আছে। আমার বয়স তো দেখছ। এই বুড়ো বয়সে আমি কী করে গর্তে হাত বাড়িয়ে ছেলেটাকে তুলে আনি। তোমরা এত নওজওয়ান। তোমাদের যে-কেউ সাহায্য করতে পারো। এই অসহায় বুড়োকে দয়া করো। ওই নাতি আমার বংশের শেষ বাতি।”

তার আর্তি দেখে আমাদের দলের এক সাহসী যুবক উঠে দাঁড়াল। কুকুরের হামলা বা পাটকেল-বৃষ্টিতে সে আহত হয়নি। সে জানতে চাইল কোথায় সেই গর্ত। বুড়ো বলল, এই তো কাছেই। তারপর তাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল।

আমরা অবলা পশুরা চরে বেরিয়ে ঘাস খাচ্ছি। দলের অধিকাংশ সদস্য জখম সারাতে ব্যস্ত। একসময় বাক্সপেটরা বেঁধে আবার যাত্রার সময় হয়ে গেল।

কিন্তু সেই যুবক তো এখনো এলো না। তার উদ্দেশ্যে উচ্চস্বরে ডাকাডাকি করা হলো। কোনো সাড়া নেই। তার এক বন্ধুকে পাঠানো হলো খুঁজে দেখতে। সেই বন্ধু কিছুক্ষণের মধ্যে ছুটতে ছুটতে ফিরে এলো। হাঁপাচ্ছে। তার চোখ মুখ ভয়ে সাদা হয়ে গেছে। কাঁপছে থরথর করে। সে যা বলল, শুনে সবার মুখ শুকিয়ে গেল। কাছেই যুবকের আধখাওয়া দেহ পড়ে আছে। দেহের বাকি অংশটা এক বিশাল আকৃতির সাপের হাঁ-করা মুখের ভেতরে। ওই বুড়োর দেখা নেই কোথাও। মুহূর্তে বুঝে গেলাম, একটু আগে ছাগল চরানো ওই বৃদ্ধ কেন সাবধান করে দিয়েছিল। এক ভয়ংকর প্রাণীর আখড়ায় পা রেখেছি আমরা।


---E-Book Created By---
Md. Ashiqur Rahman

দশম অধ্যায়


এক ভয়ংকর পিশাচের আখড়ায় পা দিয়ে ফেলেছি আমরা। সাপের রূপ ধরে আমাদের দলের একজনকে সেটা গিলে খেয়েছে।

মনে পড়ে গেল, ছাগল চরানো বুড়ো রাখাল আমাদের সাবধান করে দিয়েছিল।

ব্যাপারটা বোঝামাত্র পুরো দল তক্ষুনি ওই জায়গা ছেড়ে পালাতে শুরু করল। রীতিমতো হুড়োহুড়ি লেগে গেল পালানোর।

একপ্রকার হাওয়ায় উড়ে পৌঁছে গেলাম পরের লোকালয়ে। একটা গ্রাম সেটা। সেই গ্রামের সরাইখানায় রাত কাটালাম। রাতের বেলা গ্রামের বুজুর্গ লোকজন ভয়ানক এক গল্প শোনাল। এই গ্রামেরই গল্প। আগে যিনি এখানকার খামারের সর্দার বা গোমস্তা ছিলেন, তাঁর কাহিনি। আগের স্ত্রীকে না জানিয়ে গোমস্তা আরেকটি বিয়ে করার পাঁয়তারা করেছিলেন। সেটা জানাজানি হয়ে গেলে তাঁর আগের স্ত্রী আত্মহত্যা করেন। তখন গ্রামের সবাই মিলে ঠিক করে খামার গোমস্তাকে শাস্তি দিতে হবে। কঠিন শাস্তি। সারা গায়ে মধু মাখিয়ে তাঁকে একটা মরা গাছের গুঁড়ির সঙ্গে কষে বেঁধে রাখা হয়। গাছের গুঁড়ি বেয়ে নেমে আসতে থাকে ডাঁসা ডাঁসা পিঁপড়া। মধুর গন্ধে পাগল হয়ে গেছে পিঁপড়াগুলো। কামড়ের পর কামড়ে তারা লোকটাকে খেয়ে ফেলতে শুরু করে। গ্রামের অলিগলিতে সারা দিন সারা রাত ধ্বনিত হয়েছে গোমস্তার আর্তনাদ। সকালে উঠে দেখা গেল গাছের সঙ্গে বাঁধা অবস্থায় একটা কঙ্কাল পড়ে আছে।

গল্প শুনে একদফা শিউরে উঠলাম আমরা। পরদিন সরাইখানার বাইরে পা রেখে একটা গাছের সঙ্গে কঙ্কাল বাঁধা অবস্থায় পড়ে থাকতে থেকে শিউরে উঠলাম দ্বিতীয়বার।

গ্রাম ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম আমরা। একটা নিচু সমভূমি ধরে সারা দিন হাঁটতে হাঁটতে রাতের বেলা একটা শহরে পৌঁছালাম। ছোট্ট কিন্তু ছিমছাম শহর। দিনের পর দিন ভবঘুরের মতো ঘুরে বেড়িয়ে দলের লোকজন অবসন্ন হয়ে পড়েছে। তারা ঠিক করল, এই শহরেই স্থায়ী আসন গাড়বে।

শহরের পশু খামারের গোমস্তার হাতে তুলে দেওয়া হলো আমাদের। আগামী তিন দিন খাইয়ে-দাইয়ে মোটাতাজা করা হবে আমাদের। তারপর তোলা হবে পশুর বাজারে। বিক্রির জন্য নিলামে তোলা হবে আমাদের।

তিন দিন পর ঠিকই নিলামে উঠলাম। নিলামকারী লোকটা তাঁর গলা সপ্তমে চড়িয়ে প্রাথমিক দর হাঁকলেন। আমার সঙ্গী সবগুলো ঘোড়া আর গাধা পটাপট বিক্রি হয়ে গেল। কিন্তু কেউ আর দেখি আমাকে কেনে না। কেউ কেউ আমার কাছে এসে নানাভাবে আমাকে পরীক্ষা করতে লাগল। চোয়াল টেনে খুলে আমার দাঁত দেখল তারা। দাঁত গুনে নাকি বলে দেওয়া যায় পশুর বয়স। এক নোংরা বুড়ো আমার মাড়িতে তার আঙুল ঘষতে লাগল এমনভাবে যে, মহা বিরক্ত হয়ে কষে কামড় বসিয়ে দিলাম আমি। তারপর থেকে দেখি লোকে আর পারতপক্ষে আমার ধারেকাছে ভিড়ছে না।

কিন্তু তাতে আমার বিক্রি হওয়ার সম্ভাবনা আরও কমে গেল। কে আর একটা রোগাটে পটকা গাধা কিনবে!

ডাকাডাকি করতে করতে নিলামকারীর গলাই ভেঙে গেল।

তখন এক বুড়ো হিজড়া এগিয়ে এলো। জানতে চাইল কোথা থেকে আমাকে পাওয়া গেছে। বৃত্তান্ত কী। আমাকে নিয়ে মশকরা শুরু করে দিল নিলামকারী। বলল, “একে আমরা পেয়েছি ক্রীতদাসের বাজারে। দারুণ শক্তসামর্থ্য যুবক ক্রীতদাস ছিল এই গাধা।”

“বয়স কত?” জানতে চাইল হিজড়া।

“ক্যালেন্ডারের হিসাবে পাঁচ বছর। তবে এক্কেবারে সঠিক হিসাব পেতে গেলে শহরের রেজিস্টার খাতা দেখতে হবে। এই গাধা আগে ছিল এক রোমান নাগরিক। পরে গাধা হয়ে গেছে। নিয়ে যান, নানান কাজে লাগবে।”

হিজড়া খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে নানান প্রশ্ন করতে লাগল। তারপর একসময় পানির দরে আমাকে কিনে নিল। ঝোলা থেকে সতেরো দ্রাকমা বের করে গুনে গুনে তুলে দিল নিলামকারীর হাতে। তারপর আমার দড়ি হাতে তুলে নিয়ে চলল বাড়ির উদ্দেশ্যে।

হিজড়ার নাম ফিলেবাস। বাড়ির দরজায় পৌঁছেই ফিলেবাস হাঁক দিল, “কই রে তোরা! দ্যাখ তোদের জন্য কেমন একটা ক্রীতদাস কিনে এনেছি।”

যাদের উদ্দেশ্যে বলা হলো, তারাও একদল মেয়ে হিজড়া। খলবল করে বাইরে বেরিয়ে যখন একটা গাধা দেখতে পেল, তখন তারা মহা হতাশ।

একটা খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা হলো আমাকে।

এই বিদঘুটে পরিবারে একটা ক্রীতদাস আছে। সে-ই শুধু হিজড়া নয়। পুরো পরিবার যখন মিছিল করে শহরে বের হয়, তখন এই ক্রীতদাস সবার সামনে থেকে শিঙ্গা বাজায়। দুর্দান্ত শিঙ্গা বাজায় সে।

পরদিন সকালে সে রকমই এক মিছিলে বের হওয়ার প্রস্তুতি শুরু হলো। রংবেরঙের পোশাক পরেছে সবাই। সেজেছে উৎকট সব সাজে। চোখেমুখে রং মেখেছে। সিল্কের কাপড়ে দেবীকে মুড়িয়ে আমার পিঠে তুলে দিল তারা।

আমরা বের হলাম মিছিলে। শহরের এই রাস্তা, সেই রাস্তা দিয়ে চলেছি আমরা। হিজড়াদের হাতে বিরাট বিরাট তলোয়ার, বল্লম। তারা নর্তন-কুর্দন করছে উন্মাদের মতো। মাথা এমন করে পাক খেয়ে ঘোরাচ্ছে যে খোলা চুল চাকার মতো বনবন করে ঘুরছে।

একসময় ক্লান্ত হয়ে মিছিলটা থামল শহরের এক রাস্তার মোড়ে। তখন লোকজন চারদিকে ঘিরে ধরল ওদের। তারা পয়সা ছুঁড়ে দিতে লাগল মাটিতে। খেতেও দিল এটা-সেটা। আমার কপালেও জুটল কিছু বার্লি। এমনকি আমার পিঠে বাঁধা দেবীর উদ্দেশ্যেও বার্লি নৈবেদ্য দেওয়া হলো।

যা কিছু পাওয়া গেল, সবই কুড়িয়ে-বাড়িয়ে একটা বস্তায় ভরা হলো। সেই বস্তা তুলে দেওয়া হলো আমার পিঠে। আমার ভার শুধু বাড়ল আরকি।

আমি হাঁটছি একটা চলমান মন্দিরের মতো। আমার পিঠে দেবী ও ছোটখাটো একটা মণ্ডপ।

এভাবে প্রতিদিনই মিছিলে বের হই আমরা। নানা রকম কায়দাকানুন করে লোকজনের কাছ থেকে টাকাপয়সা, উপহারসামগ্রী খসানো হয়।

একদিন শহরে ঘুরে ঘুরে এভাবে টাকাপয়সা জুটিয়ে শহরের বাইরে বেরিয়ে এলাম আমরা। হিজড়া সর্দার ঠিক করল এবার কিছু আরাম-আয়েশ করবে। এক কৃষককে ডেকে এনে তাকে বানিয়ে বানিয়ে নানা রকম অশুভ বার্তা দেওয়া হলো। বলা হলো, দেবীকে খুশি করতে ভেড়া বলি না দিলে তার সমূহ বিপদ। ভয়ে কৃষক তার ভেড়া এনে আমাদের হাতে তুলে দিল। রান্না হতে লাগল মাংস। হিজড়ারা সবাই গেল গণগোসলখানায়। ফিরে এসে সবাই মিলে খেতে বসল টেবিলে। কিন্তু খেতে শুরু করতে না-করতেই হিজড়ারা সবাই মিলে আক্রমণ করে বসল কৃষককে।

অবস্থা বেগতিক দেখে আমি ভীষণ জোরে ডাকাডাকি শুরু করে দিলাম। পাশ দিয়ে যাচ্ছিল একদল যুবক। আগের রাতে তাদের বাড়ি থেকে একটা গাধা চুরি গেছে। সেটার খোঁজেই বেরিয়েছে তারা। গাধার ডাক শুনে তারা ছুটে এলো। চেঁচামেচি করে মহল্লার লোক জড়ো করে ফেলল মুহূর্তেই।

অবস্থা বেগতিক দেখে আমি সটকে পড়ে ছুটতে শুরু করলাম।

ছুট, ছুট, ছুট। গ্রাম-গঞ্জ-শহর পেরিয়ে ছুটছি। ছুটতে ছুটতে দেখি সামনে সাগর। ইজিয়ান সাগরের সৈকত। খুব নির্জন সৈকত বলা যাবে না। কেননা পেছনে করিন্থ শহর। লোকে সৈকতে বেড়াতে আসে। আমি পর্যটকদের এড়িয়ে সরে এলাম একটা নির্জন কোণে। তারপর পানির খুব কাছে বালুর ওপর শুয়ে পড়লাম।

পায়ের কাছে ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে। সন্ধ্যা হয়-হয়। সারা দিনের ভ্রমণ শেষে সূর্যের রথ বিদায় নিচ্ছে পশ্চিম আকাশে। আমিও ক্লান্তিতে চোখ বুজলাম। তলিয়ে গেলাম ঘুমের অতলে।

কতক্ষণ ঘুমিয়েছি জানি না, চোখ মেলে দেখি দিগন্ত পেরিয়ে সমুদ্রের ওপর উঠে আসছে পূর্ণিমার চাঁদ, বিশাল আর ঝকঝকে। এই রকম নির্জন মুহূর্তেই চাঁদের দেবী দেখা দেন। তাঁর যে কত ক্ষমতা, কত প্রভাব— আমার জানা ছিল।

ঘুম ঘুম আলস্য কেটে গেল। লাফিয়ে উঠে বসলাম। নেমে গেলাম সমুদ্রের পানিতে। গলা পানিতে গিয়ে সাতবার ডুব দিলাম। আমার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল টপটপ করে।

মনে মনে প্রার্থনা করতে লাগলাম : “হে স্বর্গের দেবী, যে নামেই তোমাকে ডাকা হোক না কেন, আমাকে করুণা করো, এই দুর্দশা থেকে রক্ষা করো আমাকে। আমাকে ফিরিয়ে দাও আমার পুরোনো জীবন। আমাকে লুসিয়াস বানিয়ে দাও আবার। আমি ফিরে যেতে চাই আমার পরিবারের কাছে, স্বজনদের কাছে। আর যদি তা না পারো, আমি আর বেঁচে থাকতে চাই না, ফিরিয়ে নিয়ে যাও এই অভিশপ্ত জীবন।”

মনের ভেতর যত রাগ-শোক ছিল, সব নিংড়ে প্রার্থনা করলাম। তাতে মন কিছুটা হালকা হলো। পানি থেকে উঠে আবার সৈকতের বালুকাবেলায় শুয়ে পড়লাম। ঘুমিয়ে গেলাম আবার। ঘুমের মধ্যে দেখি সাগরের পানি থেকে উঠে আসছে এক নারী দেহ। অপরূপ সৌকর্যময় এক নারী। দেবীর মতো ফুটফুটে মুখ। সেই রূপের বর্ণনা ভাষায় দেওয়া সম্ভব নয়।

দেবী আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন। আমার নাকে এসে লাগল আরব অঞ্চলের সব আতরের গন্ধ।

দেবী আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “তোমার প্রার্থনায় সাড়া না দিয়ে আর থাকতে পারলাম না লুসিয়াস। আমিই প্রকৃতি। এই দুনিয়ার সবকিছুর নিয়ন্তা আমি। নানা নামে নানাভাবে লোকে ডাকে আমায়। নানাভাবে পূজা করে। মনোযোগ দিয়ে আমার আদেশ শোনো। কাল ভোরে আমাকে পূজা দিতে মিছিল করে আসবে পূজারিরা। তারা মৌসুমের প্রথম ফল ও ফসল একটা জাহাজে চাপিয়ে সেই জাহাজ ভাসিয়ে দেবে সাগরের জলে। সেটাই আমার উদ্দেশ্যে তাদের নৈবদ্য। এই অনুষ্ঠানের জন্য অপেক্ষা করো। আমি প্রধান পুরোহিতকে এক্ষুনি স্বপ্নে দেখা দিচ্ছি। স্বপ্নে তাঁকে আদেশ দিচ্ছি যাতে আমার উদ্দেশ্যে হাতে করে গোলাপ ফুলের তোড়া আনেন। ডান হাতে থাকবে সেই ফুলের তোড়া। দ্বিধা কোরো না। সোজা ঢুকে যাও পূজারিদের মিছিলে। আমার আশীর্বাদ থাকবে তোমার সঙ্গে। কাজেই কোনো ভয় নেই। প্রধান পুরোহিতের পাশে চলে যাও। এমনভাবে মুখটা বাড়িয়ে দাও, যেন তাঁর হাতে চুমু খেতে যাচ্ছ তুমি। আলতো করে গোলাপের পাপড়ি ছিঁড়ে নাও মুখে। তোমার গর্দভের জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটবে। মনে রেখো, তোমার জীবনের অভিশাপ মোচনের ক্ষমতা একমাত্র আমারই আছে।”

এই বলে দেবী মিলিয়ে গেলেন হাওয়ায়।

দ্বিতীয়বার ঘুম ভেঙে গেল। স্বপ্ন দেখে মনটা আনন্দে ভরে আছে। ছুটে গিয়ে সাগরের পানিতে দাপাদাপি করলাম কিছুক্ষণ। দেবীর আদেশ মনে মনে আওড়ালাম।

কিছুক্ষণের মধ্যেই পুবের আকাশ লাল করে সূর্য উঠতে লাগল। রাতের আঁধার সরে যাচ্ছে। গোটা চরাচর যেন ভরে উঠছে উৎসবের আলোয়। গাছে গাছে কচি পাতা। ডালে ডালে পাখি ডাকছে। ঘোষণা করছে, বসন্ত এসে গেছে।

দেখি দূর থেকে এগিয়ে আসছে একটা মিছিল। পূজারিদের মিছিল। মিছিলের অগ্রভাগে নানা রকম পোশাক পরা ভাঁড়ের দল, অনেকটা যেমন খুশি তেমন সাজো ধরনের। কেউ সৈনিক সেজে কোমরে তলোয়ার গুঁজেছে, কেউ শিকারি হয়েছে, ছেলেরা কেউ সেজেছে রাজা-রানির সাজে, একজন দেখি আলখাল্লা পরে হাকিম হয়েছে, কেউ সেজেছে দার্শনিক, কেউ জেলে, কেউ পাখি শিকারি। একটা ভালুকও দেখলাম, সেটাকে নারী সাজানো হয়েছে। আর তার পিঠে চাপানো হয়েছে একটা চেয়ার। একটা গাধার পিঠে দেখি ডানা লাগানো হয়েছে আঠা দিয়ে আর গাধার পিঠে চেপে বসেছেন এক বুড়ো।

ভাঁড়ের এই মিছিলের পেছনে দেখি মূল মিছিল। সবার সামনে নারীদের দল। সাদা পোশাক তাদের পরনে। হাতে অপরূপ ফুলের তোড়া। পথের দু’ধারে ফুল ছিটাতে ছিটাতে হাঁটছে তারা।

তাদের পেছনে বাদকের দল। নানা রকম বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে চলেছে তারা। তাদের পেছনে কবিতা আওড়াতে আওড়াতে হাঁটছে একদল যুবক।

অবশেষে দেখি পুরোহিতদের দল। সবার মাঝখানে প্রধান পুরোহিত। তাঁর ডান হাতে ফুলের তোড়া। গোলাপ ফুল। ছটফট করে উঠল মন। তার দিকে তক্ষুনি ছুটে যাওয়ার তীব্র ইচ্ছা কোনো রকমে দমন করলাম। মিছিলে আলতো করে ঢুকে পড়ে একটু একটু করে সরে প্রধান পুরোহিতের ডান পাশে চলে এলাম। পুরোহিতকে দেখে মনে হলো, নিজের পাশে এ রকম এক গাধাকে তিনি দেখতে পাবেন, সেটা যেন আগে থেকেই জানা। বোঝা গেল, আগের রাতে দেবী তাঁকে স্বপ্নে এই দৃশ্যই দেখিয়েছেন।

থেমে গেলেন প্রধান পুরোহিত। ডান হাত বাড়িয়ে ধরলেন আমার মুখের দিকে। আমিও মুখ বাড়িয়ে দিলাম। আমার বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডটা ধড়াস ধড়াস করছে।

চিবিয়ে চিবিয়ে খেতে লাগলাম গোলাপের পাপড়ি। সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হলো রূপান্তর। শরীর থেকে কর্কশ লোম ঝরে গেল, কান ছোট হতে থাকল। খুর মিলিয়ে যাচ্ছে। সামনের পা দুটো হাতে পরিণত হচ্ছে। ঘাড়টাও ছোট হতে হতে গলায় পরিণত হলো। বড় বড় কোদালমার্কা দাঁত ছোট হয়ে আগের অবস্থায় ফিরে গেল। খসে গেল লেজ।

সবাই বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে। প্রধান পুরোহিতের সামনে একটা গাধাকে ধীরে ধীরে মানুষে পরিণত হতে দেখে সবার মুখ হাঁ।

বিস্ময় কাটিয়ে কেউ একজন তার গায়ের চাদর খুলে আমাকে ঢেকে দিল। তখন টের পেলাম, এতক্ষণ, এত মানুষের সামনে আমি আসলে নগ্ন দাঁড়িয়ে ছিলাম।


আমার এই রূপান্তরের খবর দ্রুতই ছড়িয়ে গেল দেশ থেকে দেশে। আমার নিজের শহর মাদুরায় পৌঁছে গেল এই বার্তা। সেখানে আমার পরিবার-পরিজন তখন আমার শোকে মুহ্যমান। তারা ধরে নিয়েছে, আমি মরে গেছি। খবর পেয়ে সবাই ছুটে এলো আমার কাছে। এসে দেখে আমি করিন্থের এক মন্দিরের একটা ছোট্ট কুঠুরিতে বসে আছি। তারা আমাকে মাদুরায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে এসেছে। আমি তাদের বললাম, আমি আর কোথাও ফিরব না। এই মন্দিরই আমার ঠিকানা।

সমাপ্ত


---E-Book Created By---
Md. Ashiqur Rahman