প্রত্যুপকার।
এক ব্যক্তি, অশ্বে আরোহণ করিয়া, ইংলণ্ডের অন্তর্গত রেডিং নগরের নিকট দিয়া, গমন করিতেছিলেন। তিনি দেখিতে পাইলেন, একটি বালক, পথের ধারে, কর্দ্দমে পতিত হইয়া রহিয়াছে। তাহার মুখ দেখিয়া, স্পষ্ট বোধ হইল, সে অত্যন্ত যাতনা ভোগ করিতেছে। অশ্বকে দণ্ডায়মান করিয়া সে ব্যক্তি কারণ জিজ্ঞাসা করিলে, বালক কহিল, মহাশয়। পড়িয়া গিয়া, আমার হাত পা ভাঙ্গিয়া গিয়াছে, নড়িতে পারি, বা চলিয়া যাই, আমার এমন ক্ষমতা নাই, এজন্য কাদায় পড়িয়া আছি, উঠিতে পারিতেছি না।
অশ্বারোহী ব্যক্তি অতিশয় দয়াশীল, বালকের অবস্থা দেখিয়া, তাঁহার হৃদয়ে বিলক্ষণ দয়ার সঞ্চার হইল। তিনি অশ্ব হইতে অবতীর্ণ হইলেন, বালককে কর্দ্দম হইতে উঠাইয়া, তাহার উপর আরোহণ করাইলেন, এবং উহার হস্ত ও অশ্বের মুখরজ্জু ধারণ করিয়া, গমন করিতে লাগিলেন।
কিয়ৎক্ষণ পরে, তিনি রেডিং নগরে উপস্থিত হইলেন। তাহার পরিচিত এক বৃদ্ধা স্ত্রী ঐ নগরে বাস করিত। তিনি তাহার আলয়ে গমন করিলেন, এবং কহিলেন, দেখ, যাবৎ এই বালক সুস্থ হইতে না পারে, তোমার আশ্রয়ে থাকিবে, ইহার চিকিৎসা ও শুশ্রূষার নিমিত্ত, যে ব্যয় হইবে, সে সমস্ত আমি দিব, আর, তুমি যে ইহার জন্য যত্ন ও পরিশ্রম করিবে, তাহার জন্যও সমুচিত পুরস্কার করিব। বৃদ্ধা সম্মত হইল। তখন তিনি, এক ডাক্তার আনাইয়া, তাঁহার উপর বালকের চিকিৎসার ভার দিলেন, এবং বৃদ্ধার হস্তে কিছু টাকা দিয়া প্রস্থান কবিলেন।
কিছু দিনের মধ্যেই, বালক, চিকিৎসা ও শুশ্রূষার গুণে, সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভ করিল, তাহার শরীর সবল এবং হস্ত ও পদ কর্মক্ষম হইয়া উঠিল। তখন সে আপন আলয়ে প্রতিগমন করিল, এবং সূত্রধারের ব্যবসায় দ্বারা জীবিকা নির্ব্বাহ করিতে লাগিল।
এই ঘটনার কতিপয় বৎসর পরে, ঐ অশ্বারোহী ব্যক্তি, একদা, রেডিং নগরের মধ্য দিয়া, গমন করিতেছিলেন। এক সেতুর উপরিভাগে উপস্থিত হইলে, অশ্ব, কোনও কারণে ভয় পাইয়া অত্যন্ত চঞ্চল ও নিতান্ত উচ্ছৃঙ্খল হইয়া উঠিল, এবং আরোহীর সহিত নদীতে লম্ফ প্রদান করিল। সে ব্যক্তি সন্তরণ জানিতেন না, সুতরাং, তাঁহার জলে মগ্ন হইবার উপক্রম হইল। অনেকেই সেতুর উপর দণ্ডায়মান হইয়া, এই শোচনীয় ব্যাপার অবলোকন করিতে লাগিল। কিন্তু কেহই, সাহস করিয়া, তাহার উদ্ধারের চেষ্টা করিতে পারিল না
সেই সেতুর অনতিদূরে, এক সূত্রধার কর্ম্ম করিতেছিল। সে, তদুপরি জনতা দেখিয়া ও কোলাহল শুনিয়া, কর্ম্ম পরিত্যাগপূর্ব্বক, তথায় উপস্থিত হইল, জলপতিত ব্যক্তিকে দেখিবামাত্র জলে ঝম্প প্রদান করিল, এবং অনেক কষ্টে তাঁহাকে লইয়া তীরে উত্তীর্ণ হইল। তদ্দর্শনে, সেতুর উপরিস্থিত ব্যক্তিগণ অত্যন্ত আহ্লাদিত হইল, এবং সূত্রধারের সাহস ও ক্ষমতার যথেষ্ট প্রশংসা করিতে লাগিল।
এইরূপে প্রাণরক্ষা হওয়াতে, সেই ব্যক্তি প্রাণদাতাকে ধন্যবাদ প্রদান করিয়া কহিলেন, ভাই, তুমি আজ আমার যে উপকার করিলে, তজ্জন্য আমি চির কালের নিমিত্ত, তোমার কেনা হইয়া রহিলাম। এই বলিয়া, তিনি তাহাকে পুরস্কার দিতে উদ্যত হইলেন। তখন সূত্রধার কৃতাঞ্জলি হইয়া কহিল, মহাশয়। আপনি আমায় চিনিতে পারিতেছেন না। কিছু কাল পূর্ব্বে, আমি ভগ্নহস্ত ও ভগ্নপদ হইয়া, কর্দ্দমে পতিত ছিলাম, আপনি সে সময়ে, দয়া করিয়া, আমার প্রাণরক্ষা করিয়াছিলেন। আপনার কৃত উপকার আমার হৃদয়ে সর্ব্বক্ষণ জাগরূক রহিয়াছে। অধিক কি বলিব, আপনি আমার পিতা আমি অতি অধম, আমি যে কৃতজ্ঞতা দেখাইবার অবসর পাইলাম, তাহাই আমি যথেষ্ট পুরস্কার মনে করিতেছি, আমার অন্য পুরস্কারের প্রয়োজন নাই।
এই বলিয়া, প্রণাম করিয়া, সূত্রধার কর্ম্মস্থানে গমন করিল এবং তিনিও তাহার সৌজন্য ও সদ্ব্যবহার দর্শনে প্রীত হইয়া, স্বস্থানে প্রস্থান করিলেন।
মাতৃভক্তি
স্কট্লণ্ডের অন্তঃপাতী ডণ্ডী নগরে এক দরিদ্রা নারী বাস করিতেন। তাঁহার একমাত্র শিশু সন্তান ছিল। বৃদ্ধা, অনেক কষ্টে ও অনেক পরিশ্রমে, কিছু কিছু উপার্জ্জন করিয়া, নিজের ও পুত্রের ভরণ পোষণ নির্ব্বাহ করিতেন।
লেখা পড়া না শিখিলে মূর্খ হইবে, ও উত্তর কালে অনেক দুঃখ পাইবে, এই ভাবিয়া তিনি, লেখা পড়া শিখাইবার নিমিত্ত, পুত্রকে এক বিদ্যালয়ে পাঠাইয়া দিলেন। পুত্রও, বিলক্ষণ যত্ন ও পরিশ্রম করিয়া উত্তমরূপে শিক্ষা করিতে লাগিল।
ক্রমে ক্রমে, তাহার বয়ঃক্রম দ্বাদশ বৎসর হইল। এই সময়ে, তাহার জননী পক্ষাঘাত রোগে আক্রান্ত হইলেন। তাঁহার অবয়ব সকল অবশ ও অকর্ম্মণ্য হইয়া গেল। তিনি শয্যাগত হইলেন। ইতঃপূর্ব্বে তিনি যাহা উপার্জন করিতেন, তদ্দ্বারা কোন রূপে গ্রাসাচ্ছাদন ও পুত্রের বিদ্যাশিক্ষার ব্যয় নির্ব্বাহ হইত, কিছুমাত্র উদ্বৃত্ত হইত না, সুতরাং, তিনি কিছুই সঞ্চয় করিয়া রাখিতে পারেন নাই। এক্ষণে, তাঁহার পরিশ্রম করিবার ক্ষমতা না থাকায়, সকল বিষয়েই অত্যন্ত কষ্ট উপস্থিত হইল।
জননীর এই অবস্থা ও কষ্ট দেখিয়া, পুত্র মনে মনে বিবেচনা করিতে লাগিল, ইনি অনেক কষ্টে আমায় লালন পালন করিয়াছেন, ইহার স্নেহে ও যত্নেই, আমি এত বড় হইয়াছি, ও এত দিন পর্য্যন্ত জীবিত রহিয়াছি, এখন ইহার এই দশা উপস্থিত, আমার প্রতিপালন ও বিদ্যাশিক্ষার নিমিত্ত, ইনি এত দিন যত্ন ও পরিশ্রম করিয়াছেন, এ সময়ে ইহার জন্য, আমার তদপেক্ষা অধিক যত্ন ও পরিশ্রম করা উচিত, আমি থাকিতে ইনি যদি অনাহারে প্রাণত্যাগ করেন, তাহা হইলে আমার বাঁচিয়া থাকা বিফল। আমার বার বৎসর বয়স হইয়াছে, এ বয়সে পরিশ্রম করিলে, অবশ্যই কিছু কিছু উপার্জ্জন করিতে পারিব।
এই সমস্ত আলোচনা করিয়া, সেই সুবোধ বালক এক সন্নিহিত কারখানায় উপস্থিত হইল, এবং তথাকার অধ্যক্ষের নিকট আবেদন করিয়া, তাঁহার অনুমতিক্রমে, কর্ম্ম করিতে আরম্ভ করিল। তাহার যেমন বয়স, সে তদপেক্ষা অনেক অধিক পরিশ্রম করিতে লাগিল, এইরূপে সমস্ত দিন পরিশ্রম করিয়া, সে যাহা উপার্জ্জন করিত, সমুদয় জননীর নিকট আনিয়া দিত। সেই উপার্জ্জন দ্বারা তাহাদের উভয়ের অনায়াসে গ্রাসাচ্ছাদন সম্পন্ন হইতে লাগিল।
কর্ম্মস্থানে যাইবার পূর্ব্বে, ঐ বালক, গৃহসংস্কার প্রভৃতি আবশ্যক কর্ম্ম সকল করিয়া, জননীর ও নিজের আহার প্রস্তুত করিত, এবং অগ্রে তাঁহাকে আহার করাইয়া, স্বয়ং আহার করিত। সে প্রতিদিন সন্ধ্যাকালে গৃহে আসিত, ইতিমধ্যে জননীর যাহা কিছু আবশ্যক হইতে পারে, সে সমুদয় প্রস্তুত করিয়া, তাঁহার পার্শ্বে রাখিয়া যাইত।
বৃদ্ধা লেখা পড়া জানিতেন না; সুতরাং সমস্ত দিন, একাকিনী শয্যায় পতিত থাকিয়া, কষ্টে কালক্ষেপ করিতেন। পীড়িত অবস্থায় কোনও কর্ম্ম করিতে পারেন না, এবং কেহ নিকটেও থাকে না, যদি পড়িতে শিখেন, তাহা হইলে অনায়াসে দিন কাটাইতে পাবেন। এই বিবেচনা করিয়া সেই বালক, অনেক যত্ন ও পরিশ্রম করিয়া, অল্প দিনের মধ্যে, তাঁহাকে এত শিক্ষা করাইল যে, তিনি, কাহার অনুপস্থিতিকালে, সহজ সহজ পুস্তক পাঠ করিয়া অপেক্ষাকৃত স্বচ্ছন্দে কালক্ষেপ করিতে লাগিলেন।
এই বালক সুবোধ ও মাতৃভক্ত না হইলে, বৃদ্ধার দুঃখের অবধি থাকিত না। ফলতঃ, অল্পবয়স্ক বালকের এরূপ আচরণ সচরাচর দেখিতে পাওয়া যায় না। প্রতিবেশীরা, তাহার চরিত্র দর্শনে প্রীত ও চমৎকৃত হইয়া, মুক্তকণ্ঠে তাহাকে সাধুবাদ প্রদান করিতে লাগিল।
পিতৃভক্তি।
আয়র্লণ্ডের অন্তঃপাতী লণ্ডনডরি নগরে বেকনর নামে এক ব্যক্তি ছিল। সে জাহাজে নাবিকের কর্ম্ম করিত। তাহার পুত্রও, দ্বাদশ বৎসর বয়সে, ঐ ব্যবসায় অবলম্বন করিয়াছিল। পিতা পুত্রে এক জাহাজে কর্ম্ম করিত। বেকনর আপন পুত্রকে উত্তমরূপ সন্তরণ শিক্ষা করাইয়াছিল। মৎস্য যেমন অবলীলাক্রমে জলে সন্তরণ করিয়া বেড়ায়, বেকনরের পুত্রও সন্তরণ বিষয়ে সেইরূপ দক্ষ হইয়াছিল। সে প্রতিদিন, কর্ম্মে অবসর পাইলেই, জাহাজ হইতে ঝম্পপ্রদান করিয়া সমুদ্রে পড়িত এবং জাহাজের চতুর্দিকে সন্তরণ করিয়া বেড়াইত, ক্লান্তিবোধ হইলে, লম্বমান রজ্জু অবলম্বন করিয়া জাহাজে উঠিত।
এক দিবস, বায়ুবেগ-বশে সহসা জাহাজ আন্দোলিত হইলে, কোনও আরোহীর অতি অল্পবয়স্কা কন্যা সমুদ্রে পতিত হইল। বেকনর, দেখিবামাত্র, লম্ফ দিয়া সমুদ্রে পড়িল এবং তৎক্ষণাৎ সেই কন্যার বস্ত্র ধরিয়া, তাহাকে জল হইতে ঊর্দ্ধে তুলিল। অনন্তর, সে কন্যাকে বক্ষঃস্থলে লইয়া সন্তরণ করিয়া জাহাজের প্রায় নিকটে আসিয়াছে, এমন সময় দেখিতে পাইল, একটা ভয়ানক হাঙ্গর তাহাকে আক্রমণ করিতে আসিতেছে। দেখিবা মাত্র, বেকনর ভয়ে কাঁপিতে লাগিল। জাহাজের উপরিস্থ সমস্ত লোক অত্যন্ত ব্যাকুল হইল, এবং বন্দুক লইয়া, হাঙ্গরকে লক্ষ্য করিয়া, গুলি চালাইতে লাগিল, কিন্তু কেহই সাহস করিয়া, তাহার সাহায্যের নিমিত্ত, জলে অবতীর্ণ হইতে পারিল না, সকলেই হায় কি হইল বলিয়া, কোলাহল করিতে লাগিল।
জাহাজ হইতে যত গুলি মারিয়াছিল, তাহাদের একটিও হাঙ্গরের গায়ে লাগিল না। হাঙ্গর ক্রমে ক্রমে সন্নিহিত হইয়া, মুখব্যাদানপূর্ব্বক বেকনরকে আক্রমণ করিতে উদ্যত হইল। তাহার পুত্র অত্যন্ত পিতৃভক্ত ছিল। সে তাহার প্রাণনাশের উপক্রম দেখিয়া, এক তীক্ষ্ণধার তরবারি গ্রহণপূর্ব্বক, সমুদ্রে ঝম্প প্রদান করিল, এবং দ্রুত বেগে হাঙ্গরের দিকে গমন করিয়া, উহার উদরে তরবারি প্রবেশ করাইয়া দিল। তখন হাঙ্গর, কুপিত হইয়া, তাহাকে আক্রমণ করিতে উদ্যত হইল। কিন্তু সে, সন্তরণকৌশলে উহার আক্রমণ অতিক্রম করিয়া, উহাকে উপর্য্যূপরি আঘাত করিতে লাগিল।
এই অবকাশে, জাহাজের উপরিস্থ লোকেরা কতিপয় রজ্জু নিক্ষেপ করিল। পিতা পুত্র এক এক রজ্জু অবলম্বন করিল, তাহারা টানিয়া উহাদিগকে জল হইতে কিঞ্চিৎ ঊর্দ্ধে উঠাইল। এই সময়ে সকলে, উহাদের প্রাণরক্ষা হইল ভাবিয়া, আনন্দধ্বনি করিতে লাগিল। কিন্তু সেই দুর্দান্ত জন্তু মুখব্যাদান ও ঊর্দ্ধে লম্ফ প্রদানপূর্ব্বক, বেকনরের পুত্রের কটিদেশ পর্য্যন্ত গ্রাস করিল, এবং তৎক্ষণাৎ তীক্ষ্ণ দন্ত দ্বারা গ্রস্ত অংশ ছেদন করিয়া লইয়া, জলে পতিত হইল। বালকের কলেবরের অর্দ্ধ অংশ মাত্র রজ্জুতে ঝুলিতে লাগিল।
এই হৃদয়বিদারণ ভয়ঙ্কর ব্যাপার দর্শনে, ব্যক্তি মাত্রেই, হতবুদ্ধি ও জড়প্রায় হইয়া, কিয়ৎক্ষণ দণ্ডায়মান রহিল, অনন্তর সকলেই, শোকে বিকলচিত্ত হইয়া, হাহাকার করিতে লাগিল। বেকনর, জাহাজে উত্তোলিত হইয়া, পুত্রের তাদৃশী দশা দেখিয়া শোকে নিতান্ত বিহ্বল হইল। পার্শ্ববর্ত্তী লোকেরা বলপূর্ব্বক ধরিয়া না রাখিলে, সে নিঃসন্দেহ, সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়া, প্রাণত্যাগ করিত। তাহার পুত্র যতক্ষণ পর্যন্ত জীবিত ছিল, একদৃষ্টে পিতাকে নিরীক্ষণ করিতে লাগিল। আমার প্রাণ যাউক, কিন্তু, পিতার প্রাণ রক্ষা করিয়াছি, এই আনন্দ অনুভব করিতে করিতে, সে প্রাণত্যাগ করিল। তাহার মুখের ভাব দর্শনে, সন্নিহিত ব্যক্তি মাত্রেরই এরূপ বোধ ও বিশ্বাস জন্মিয়াছিল।
ভ্রাতৃস্নেহ।
ইয়ুরোপের অন্তঃপাতী সুইট্জর্লণ্ড দেশ পর্ব্বতে পরিপূর্ণ। ঐ সকল পর্ব্বতের শিখরভূমি নিরন্তর নীহারে থাকে। এজন্য ঐ দেশে শীতের অত্যন্ত প্রাদুর্ভাব। জ্যেষ্ঠের বয়স নয় বৎসর, কনিষ্ঠের বয়স ছয় বৎসর, এরূপ দুই সহোদর, নীহারের উপর দৌড়াদৌড়ি করিয়া, খেলা করিতে করিতে, এক সন্নিহিত জঙ্গলে প্রবেশ করিল, এবং ক্রমে ক্রমে, অনেক দূর যাইয়া পথ হারাইল।
সায়ংকাল উপস্থিত হইল। তদ্দর্শনে তাহারা অতিশয় শঙ্কিত ও গৃহপ্রতিগমনের নিমিত্ত নিতান্ত ব্যগ্র হইয়া পথ অনুসন্ধান করিতে লাগিল, কিন্তু কিছুই নির্ণয় করিতে না পারিয়া, উচ্চৈঃস্বরে রোদন করিতে আরম্ভ করিল।
জ্যেষ্ঠটির বয়স যেমন অল্প, তাহার বুদ্ধি ও বিবেচনা তাহা অপেক্ষা অনেক অধিক হইয়াছিল। সে বিবেচনা করিল, যত চেষ্টা করি না কেন, এই জঙ্গল হইতে বাহির হইতে পারিব না, সুতরাং সে চেষ্টা করা বৃথা, এই স্থানেই রাত্রি কাটাইতে হইবে, কিন্তু নীহারের উপর শয়ন করিলে উভয়েই মরিয়া যাইব। অতএব যেখানে নীহার নাই, এমন স্থান অন্বেষণ করি। এই স্থির করিয়া, সেই বালক নীহারশূন্য স্থানের অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হইল। ঐ সময়ে চন্দ্রের উদয় হওয়াতে, তদীয় আলোকে, পর্ব্বতের পাদদেশে একটি ক্ষুদ্র গহবর লক্ষিত হইল। বালক তন্মধ্যে প্রবিষ্ট হইয়া দেখিল, সেখানে কিছুমাত্র নীহার নাই। তখন সে, কতকগুলি শুষ্ক পর্ণ সংগ্রহ করিয়া, তদ্দ্বারা একপ্রকার শয্যা প্রস্তুত করিল, পরে কনিষ্ঠ ভ্রাতার হস্ত ধরিয়া কহিল, ভাই, আর কাঁদিও না, তোমার কোনও ভয় নাই, এস, এইখানে শয়ন কর।
ইহা কহিয়া, কনিষ্ঠকে শয়ন করাইয়া, আপনিও তাহার পার্শ্বে শয়ন করিল। কনিষ্ঠ বারংবার কহিতে লাগিল, দাদা, বড় শীত। জ্যেষ্ঠ, কনিষ্ঠ ভাইটিকে অত্যন্ত ভাল বাসিত, এবং তাহার কোনও কষ্ট দেখিলে, সে অত্যন্ত কষ্ট বোধ করিত, এক্ষণে, কি উপায়ে তাহার শীতনিবারণ হয়, অনন্যমনে তাহাই চিন্তা করিতে লাগিল, অবশেষে, অন্য কোনও উপায় না দেখিয়া, আপন গাত্র হইতে সমুদয় বস্ত্র খুলিয়া, তাহার গাত্রে দিল, এবং পাছে তাহাতেও তাহার শীত নিবাবণ না হয়, এই ভাবিয়া, স্বয়ং তাহার গাত্রের উপর শয়ন করিল।
এইরূপে, নিজের ও জ্যেষ্ঠের বস্ত্রে আবৃত হওয়াতে ও জ্যেষ্ঠের গাত্রের উত্তাপ পাওয়াতে কনিষ্ঠের অনেক শীত নিবারণ হইল, তখন সে অপেক্ষাকৃত স্বচ্ছন্দ বোধ করিল। তদ্দর্শনে জ্যেষ্ঠের হৃদয় আহ্লাদে পরিপূর্ণ হইল, নিজে অনাবৃত গায়ে থাকাতে, তাহার যে ভয়ঙ্কর কষ্ট হইতেছিল, তাহাকে কষ্ট বলিয়া গণ্য করিল না। যদি তাহারা এই ভাবে অধিকক্ষণ থাকিত, তাহা হইলে অগ্রে জ্যেষ্ঠের, ও কিয়ৎক্ষণ পরে কনিষ্ঠের, নিঃসন্দেহ প্রাণবিয়োগ হইত, কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে তাহা ঘটিতে পারিল না।
সন্ধ্যার পর কিয়ৎকাল পর্য্যন্ত, তাহারা গৃহে প্রতিগত না হওয়াতে, তাহাদের পিতা ও মাতা অতিশয় চিন্তিত হইলেন। কিয়ৎক্ষণ পরে, তাহাদের পিতা অন্বেষণে নির্গত হইলেন, এবং ইতস্ততঃ অনেক অনুসন্ধান করিয়া অবশেষে সেই গহ্বরে উপস্থিত হইয়া দেখিলেন, তাহারা শয়ন করিয়া আছে। তিনি তাহাদের বিষয়ে একপ্রকার হতাশ হইয়াছিলেন, এক্ষণে তাহাদিগকে দেখিতে পাইয়া, আহ্লাদে পরিপূর্ণ হইয়া উঠিলেন। তাহার নয়নে আনন্দাশ্রুধারা বহিতে লাগিল। কিয়ৎক্ষণ পরে, তিনি তাহাদিগকে পর্ণশয্যা হইতে উঠাইলেন, এবং প্রথমতঃ যথোচিত তিরস্কার করিলেন, পরে, কিরূপে জ্যেষ্ঠ কনিষ্ঠের কষ্ট নিবারণের চেষ্টা করিয়াছিল, ইহা অবগত হইয়া, যার পর নাই আনন্দিত হইলেন, এবং জ্যেষ্ঠের ভ্রাতৃস্নেহের আতিশয্য দর্শনে পুলকিত হইয়া, তাহার প্রতি যৎপরোনাস্তি স্নেহ ও অনুরাগ প্রদর্শন পূর্ব্বক তাহাদিগকে সমভিব্যাহারে লইয়া, সত্বর গৃহে প্রতিগমন করিলেন।
লোভসংবরণ।
এক দরিদ্র বালক কোনও বড় মানুষের বাটীতে কর্ম্মে নিযুক্ত হইয়াছিল। তাহার প্রতি গৃহমার্জ্জনা প্রভৃতি অতি সামান্য নিকৃষ্ট কর্ম্মের ভার ছিল। সে, এক দিন, গৃহস্বামিনীর বাসগৃহ পরিষ্কার করিতেছে, এবং গৃহমধ্যে সজ্জিত মনোহর দ্রব্য সকল অবলোকন করিয়া, আহ্লাদে পুলকিত হইতেছে। তৎকালে সে গৃহে অন্য কোনও ব্যক্তি ছিল না, এজন্য সে নির্ভয়ে এক একটি দ্রব্য হস্তে লইয়া, কিয়ৎক্ষণ নিরীক্ষণ করিয়া, পুনরায় যথাস্থানে রাখিয়া দিতেছে।
গৃহস্বামিনীর একটি সোনার ঘড়ী ছিল, সেটি অতি মনোহর, উত্তম স্বর্ণে নির্ম্মিত এবং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র হীরকখণ্ডে অলঙ্কৃত। বালক, ঘড়ীটি হস্তে লইয়া উহার অসাধারণ সৌন্দর্য্য ও ঔজ্জ্বল্য দর্শনে মোহিত হইল, এবং বলিতে লাগিল, যদি আমার এরূপ একটি ঘড়ী থাকিত, তাহা হইলে কি আহলাদের বিষয় হইত। ক্রমে ক্রমে তাহার মনে প্রবল লোভ জন্মিলে, সে ঘড়ীটি অপহরণ করিবার নিমিত্ত ইচ্ছুক হইল।
কিয়ৎক্ষণ পরে, বালক সহসা চকিত হইয়া উঠিল, এবং কহিতে লাগিল, যদি আমি, লোভ সংবরণ করিতে না পারিয়া এই ঘড়ী লই, তাহা হইলে চোর হইলাম। এখন কেহ গৃহমধ্যে নাই, সুতরাং আমি চুরি করিলাম বলিয়া কেহ জানিতে পারিবে না, কিন্তু যদি দৈবাৎ চোর বলিয়া ধরা পড়ি, তাহা হইলে আমার দুর্দ্দশার সীমা থাকিবে না। সর্ব্বদা দেখিতে পাই, চোরেরা রাজদণ্ডে যৎপরোনাস্তি শাস্তি ভোগ করিয়া থাকে। আর যদিই আমি চুরি করিয়া মানুষের হাত এড়াইতে পারি, ঈশ্বরের নিকট কখনও পরিত্রাণ পাইতে পারিব না। জননীর নিকট অনেক বার শুনিয়াছি, আমরা তাহাকে দেখিতে পাই না বটে, কিন্তু তিনি সর্ব্বদা সর্ব্বত্র বিদ্যমান রহিয়াছেন, এবং আমরা যখন যাহা করি, সমুদয় প্রত্যক্ষ করিতেছেন।
এই বলিতে বলিতে, তাহার মুখ ম্লান ও সর্ব্বশরীর কম্পিত হইয়া উঠিল। তখন সে ঘড়ীটি যথাস্থানে স্থাপিত করিয়া, কহিতে লাগিল, লোভ করা বড় দোষ, লোকে, লোভ সংবরণ করিতে না পারিলেই, চোর হয়, আমি আর কখনও কোনও বস্তুতে লোভ করিব না, এবং লোভের বশীভূত হইয়া, চোর হইব না, চোর হইয়া ধনবান্ হওয়া অপেক্ষা, ধর্ম্মপথে থাকিয়া নির্ধন হওয়া ভাল। তাহাতে চির কাল নির্ভয়ে ও মনের সুখে থাকা যায়। চুরি করিতে উদ্যত হইয়া, আমার মনে এত ক্লেশ হইল, চুরি করিলে, না জানি আমি কতই ক্লেশ পাইতাম। এই বলিয়া, সেই সুবোধ, সচ্চরিত্র দরিদ্র বালক পুনরায় গৃহ মার্জ্জনে প্রবৃত্ত হইল।
গৃহস্বামিনী সেই সময়ে পার্শ্ববর্ত্তী গৃহে উপবিষ্টা থাকিয়া, বালকের সমস্ত কথা শুনিতে পাইয়াছিলেন। তিনি তাহাকে তৎক্ষণাৎ এক পরিচারিকা দ্বারা আপন সম্মুখে আনাইয়া, জিজ্ঞাসা করিলেন, অহে বালক। তুমি কি জন্য আমার ঘড়ীটি লইলে না? বালক, শুনিবা মাত্র স্তব্ধ ও হতবুদ্ধি হইয়া গেল, কোনও উত্তর দিতে পারিল না, কেবল, জানু পাতিয়া, কৃতাঞ্জলি হইয়া, বিষণ্ণ বদনে, কাতর নয়নে গৃহস্বামিনীর মুখ নিরীক্ষণ করিতে লাগিল। ভয়ে তাহার সর্ব্বশরীর কাঁপিতে ও নয়ন হইতে বাষ্পবারি বিগলিত হইতে লাগিল।
তাহাকে এইরূপ কাতর দেখিয়া, গৃহস্বামিনী স্নেহবাক্যে কহিতে লাগিলেন, বৎস। তোমার কোনও ভয় নাই, তুমি কি জন্য এত কাতর হইতেছ? আমি, এই খানে থাকিয়া, তোমার সকল কথা শুনিতে পাইয়াছি, শুনিয়া তোমার উপর কি পর্য্যন্ত সন্তুষ্ট হইয়াছি, বলিতে পারি না। তুমি দরিদ্রের সন্তান বটে, কিন্তু আমি কখনও তোমার তুল্য সুবোধ ও ধর্ম্মভীত বালক দেখি নাই, জগদীশ্বর তোমায় যে লোভ সংবরণ করিবার এরূপ শক্তি দিয়াছেন, তজ্জন্য তাঁহাকে প্রণাম কর ও ধন্যবাদ দাও। অতঃপর, সর্ব্বদা এরূপ সাবধান থাকিবে, যেন কখনও লোভে পতিত না হও।
এই বলিয়া, তাহাকে অভয় প্রদান করিয়া, তিনি কহিলেন, শুন বৎস। তুমি যে এরূপে লোভসংবরণ করিতে পারিয়াছ, তজ্জন্য তোমাকে পুরস্কার দেওয়া উচিত। এই বলিয়া, কতিপয় মুদ্রা তাহার হস্তে দিয়া, কহিলেন, অতঃপর, তোমায় আর গৃহমার্জ্জন প্রভৃতি নীচ কর্ম্ম করিতে হইবে না, তুমি, বিদ্যা শিক্ষা করিলে, আরও সুবোধ ও সচ্চরিত্র হইবে, এজন্য কল্য অবধি আমি তোমাকে বিদ্যালয়ে নিযুক্ত করিয়া দিব, এবং অন্ন বস্ত্র পুস্তক প্রভৃতি সমস্ত আবশ্যক বিষয়ের ব্যয় নির্বাহ করিব। অনন্তর, তিনি হস্তে ধরিয়া তাহাকে উঠাইলেন, এবং তাহার নয়নের অশ্রুজল মার্জ্জন করিয়া দিলেন।
গৃহস্বামিনীর এইরূপ স্নেহবাক্য শ্রবণে ও সদয় ব্যবহার দর্শনে, সেই দীন বালকের আহ্লাদের সীমা রহিল না। তাহার নয়নযুগল হইতে আনন্দাশ্রু নির্গত হইতে লাগিল। সে, পর দিন অবধি, বিদ্যালয়ে প্রবিষ্ট হইয়া, যার পর নাই যত্ন ও পরিশ্রম করিয়া, শিক্ষা করিতে লাগিল। কালক্রমে সে বিলক্ষণ বিদ্যা উপার্জ্জন করিল, এবং লোকসমাজে বিদ্বান্ ও ধর্ম্মপরায়ণ ব্যক্তি বলিয়া গণ্য হইয়া, সুখে ও স্বচ্ছন্দে সংসারযাত্রা নির্ব্বাহ করিতে লাগিল।
গুরুভক্তি।
রুশিয়ার রাজমহিষী দ্বিতীয় কেথেরিনের অপত্যস্নেহ অত্যন্ত প্রবল ছিল। কাহারও শিশু সন্তান দেখিলে, তিনি অনির্ব্বচনীয় প্রীতি অনুভব করিতেন। পরিচারকদিগের শিশু সন্তান সকল সর্ব্বদা তাঁহার নিকটে থাকিত। অনাথ বালক বালিকাদিগকে, স্নেহ ও যত্নপূর্ব্বক, লালন ও নিজ ব্যয়ে প্রতিপালন করিতেন। কৰ্মচারীদিগের উপর এই আদেশ ছিল, অনাথ বালক বালিকা দেখিলে, তাঁহার নিকটে আনিয়া দিবে।
এক দিন, পুলিসের লোকেরা, পথিমধ্যে একটি অতি অল্পবয়স্ক বালককে পতিত দেখিয়া, তাহাকে রাজমহিষীর নিকটে আনিয়া দিল। তিনি, সবিশেষ স্নেহ ও যত্ন সহকারে, তাহার লালন পালন করিতে লাগিলেন।
এই বালক রাজমহিষীর সবিশেষ স্নেহপাত্র হইল। সে পঞ্চমবর্ষীয় হইলে, তিনি তাহাকে বিদ্যালয়ে নিযুক্ত করিয়া দিলেন, এবং যাহাতে সে উত্তমরূপ বিদ্যা লাভ করিতে পারে, সে বিষয়ে অত্যন্ত যত্ন করিতে লাগিলেন। সেই বালক বিলক্ষণ বুদ্ধিমান, সুযোগ পাইয়া, আন্তরিক যত্ন ও পরিশ্রম সহকারে, শিক্ষা করিতে লাগিল। বিশেষতঃ, সে স্বভাবতঃ অতিশয় সুশীল ও সুবোধ। যে সমস্ত গুণ থাকিলে, বালক লোকের প্রিয় ও স্নেহভাজন হয়, সেই সকল গুণে অলঙ্কৃত ছিল। ইহা দেখিয়া, রাজমহিষী অত্যন্ত আহ্লাদিত হইতে লাগিলেন। তাহার উপর তদীয় স্নেহ দিন দিন বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। ফলতঃ তিনি তাহাকে আপন গর্ভজাত সন্তানের ন্যায় জ্ঞান করিতেন, এবং সেই বালকও তাঁহাকে আপন জননীর ন্যায় জ্ঞান করিত।
এক দিন, সে বিদ্যালয় হইতে প্রত্যাগমন করিলে, রাজমহিষী তাহাকে, নিকটে আসিবার নিমিত্ত, আহ্বান করিলেন। তিনি, অন্য অন্য দিন, তাহাকে যেরূপ হৃষ্ট ও প্রফুল্লবদন দেখেন, সে দিন সেরূপ দেখিলেন না। তাহাকে নিতান্ত ম্লান ও বিষণ্ণ দেখিতে পাইয়া, তিনি ক্রোড়ে বসাইয়া কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন। বালক রোদন করিতে লাগিল। তিনি তাহার নেত্র মার্জ্জন ও মুখ চুম্বন করিয়া, আশ্বাসবাক্যে কহিলেন, বৎস। তুমি কি জন্য রোদন করিতেছ, বল।
তখন সে কহিল, জননি, আমি আজ বিদ্যালয়ে যতক্ষণ ছিলাম, কেবল রোদন করিয়াছি। সেখানে গিয়া শুনিলাম, আমাদের শিক্ষক মরিয়াছেন, এবং দেখিলাম, তাঁহার স্ত্রী ও সন্তানেরা রোদন করিতেছেন। সকলে বলিতেছেন, তাঁহারা অত্যন্ত দুঃখী, খাওয়া পরা চলে, এমন সঙ্গতি নাই, এবং সাহায্য করে, এমন আত্মীয়ও নাই। এই সকল দেখিয়া শুনিয়া, আমার অত্যন্ত দুঃখ হইয়াছে। মা। তোমায় তাঁহাদের কোনও উপায় করিয়া দিতে হইবে।
সেই বালকের মুখে এই সকল কথা শুনিয়া, রাজমহিষীর অন্তঃকরণে করুণার উদয় হইল। তিনি অবিলম্বে, এক পরিচারককে আহ্বান করিয়া, এ বিষযের অনুসন্ধান করিতে পাঠাইয়া দিলেন, এবং সেই বালকের মুখ চুম্বন করিয়া কহিলেন, বৎস! অল্প বয়সে তোমার এরূপ বুদ্ধি ও বিবেচনা হইয়াছে, ইহাতে আমি কি পর্য্যন্ত প্রীত হইলাম, বলিতে পারি না। যাহাতে তোমার শিক্ষকের পরিবার ক্লেশ না পায়, তাহা আমি অবশ্য করিব, তুমি সেজন্য দুঃখিত হইও না।
কিয়ৎক্ষণ পরে, প্রেরিত পরিচারক প্রত্যাগমন করিল, এবং শিক্ষকের মৃত্যু ও তদীয় পরিবারের অনুপায় বিষয়ে বালক যাহা কহিয়াছিল, সে সমুদয় সম্পূর্ণ সত্য বলিয়া, রাজমহিষীর নিকট জানাইল। তখন তিনি, বালকের হস্তে দিয়া, শিক্ষকের পত্নীর নিকট, আপাততঃ তিন শত রূবল[১] পাঠাইলেন, এবং যাহাতে সেই নিরুপায় পরিবারের স্বচ্ছন্দে ভরণ পোষণ চলে, এবং শিশু সন্তানদিগের উত্তমরূপ বিদ্যাশিক্ষা হয় তাহার অবিচলিত ব্যবস্থা করিয়া দিলেন।
- ↑ রুশিয়াদেশে প্রচলিত রৌপ্য মুদ্রা, মূল্য ১॥৵০।
ধর্ম্মভীরুতা।
পোর্টুগালের রাজধানী লিসবন নগরে অতি নিঃস্ব এক বিধবা স্ত্রী বাস করিত। সে, ১৭৭৬ খৃষ্টাব্দে, এক দিবস রাজবাটীতে উপস্থিত হইল, এবং রাজার সহিত সাক্ষাৎ করিবার প্রার্থনা জানাইল। রাজপুরুষেরা, “তোর মত লোকের রাজার সহিত সাক্ষাৎ হইবার সম্ভাবনা নাই, তুই এখান হইতে চলিয়া যা” এই বলিয়া তাড়াইয়া দিল। সে, তাহাতে ক্ষান্ত না হইয়া, প্রত্যহ যাতায়াত করিতে লাগিল, রাজপুরুষেরা প্রত্যহ তাহাকে তাড়াইয়া দিতে লাগিল।
অবশেষে, এক দিবস, সে রাজাকে পদব্রজে গমন করিতে দেখিয়া, তাঁহার নিকটে উপস্থিত হইল, এবং সম্মুখে একটি বাক্স ধরিয়া কহিল, মহারাজ। কিছুকাল পূর্ব্বে ভূমিকম্প হওয়াতে যে সকল অট্টালিকা পতিত হইয়াছিল, তাহার মধ্যে আমি এই বাক্সটি পাইয়াছি, আমি নিতান্ত দুঃখিনী, আমার ছয়টি সন্তান, অতি কষ্টে দিনপাত করি। এই বাক্সের মধ্যে যে সকল মহামূল্য বস্তু আছে, সে সমুদয় আত্মসাৎ করিলে, আমার দুরবস্থা বিমোচন হয়, আমার পুত্রেরা ধনবান্ বলিয়া গণ্য হইয়া, চিরকাল সুখে ও স্বচ্ছন্দে কাল যাপন করিতে পারে। কিন্তু, মহারাজ, এ পরস্ব, পরস্ব হরণ করা অতি গর্হিত কর্ম্ম। অপকর্ম্ম করিয়া পৃথিবীর সমস্ত সম্পত্তি পাওয়া অপেক্ষা, ধর্ম্মপথে থাকিয়া দুঃখে কালযাপন করা ভাল। আমি এই বাক্স আপনার হস্তে সমৰ্পণ করিতেছি। যে ব্যক্তি ইহার যথার্থ স্বামী তাঁহার অনুসন্ধান ও অবধারণ করিয়া তাহাকে দিবেন, আর আমি যে পরিশ্রম করিয়া, ইহা বহিষ্কৃত করিয়াছি, তজ্জন্য আমাকে কিঞ্চিৎ পুরস্কার দেওয়াইবেন।
রাজার আদেশক্রমে, সেই স্থানেই বাক্স উদ্ঘাটিত হইল। তিনি, উহার মধ্যস্থিত রত্নসমূহের সৌন্দর্য্য দর্শন করিয়া, চমৎকৃত হইলেন, অনন্তর, সেই স্ত্রীলোককে সম্ভাষণ করিয়া কহিলেন, তুমি দুঃখিনী বটে, কিন্তু তোমার তুল্য নির্লোভ ও ধর্মপরায়ণ লোক কখনও দেখি নাই, তুমি যে ঈদৃশ মহামূল্য রত্ন সকল হস্তে পাইয়া ধর্ম্মভয়ে লোভ সংবরণ করিয়াছ, তজ্জন্য আমি তোমাকে সহস্র ধন্যবাদ দিতেছি। আজ অবধি তোমার দুরবস্থা দূর হইল, অতঃপর তোমায় এক দিনের জন্যও, কষ্ট পাইতে হইবে না। আমি তোমার ও তোমার সন্তানদিগের সমস্ত ভার গ্রহণ করিলাম।
এই বলিয়া রাজা কোষাধ্যক্ষকে ডাকাইলেন, এবং অবিলম্বে সেই দুঃখিনী বিধবাকে বিংশতি সহস্র শিয়াস্তর[১] দিতে আদেশ করিলেন। অনন্তর, সেই রত্নসমূহের যথার্থ অধিকারীর সবিশেষ অনুসন্ধান করিবার নিমিত্ত, আজ্ঞা প্রদান করিয়া কহিলেন, যদি বিশিষ্টরূপ অনুসন্ধান করিয়াও প্রকৃত অধিকারীর উদ্দেশ না হয়, তাহা হইলে, এই সমস্ত রত্ন বিক্রীত হইবে, এবং বিক্রয়লব্ধ সমস্ত ধন এই বিধবা ও তাহার পুত্রেরা পাইবে।
- ↑ ইটালি প্রভৃতি দেশে প্রচলিত রৌপ্যমুদ্রা, মূল্য ১৮০
অপত্যস্নেহ।
ইংলণ্ডের রাজধানী লণ্ডন নগরে হোয়াইট্চেপল নামে এক স্থান আছে। তথায় পরস্পর-সংলগ্ন শ্রেণীবদ্ধ কতকগুলি গৃহ ছিল। যাহাদের নিজের বসতিবাটী নাই, এরূপ লোকেরা ভাড়া দিয়া ঐ সকল গৃহে অবস্থিতি করিত। একদা দৈব ঘটনায় তথায় অতি ভয়ানক অগ্নিদাহ উপস্থিত হইল। যেখানে অগ্নি লাগে, তথায় প্রবল বেগে বায়ু বহিতে থাকে, সুতরাং অগ্নি উত্তরোত্তর অধিকতর প্রদীপ্ত হইয়া উঠে। এখানেও অগ্নি, প্রবল বাযুর সহায়তায়, অল্পক্ষণের মধ্যে, বিলক্ষণ প্রদীপ্ত হইয়া উঠিল, অনেকেই গৃহ হইতে বহির্গত হইতে পারিল না। সমবেত প্রতিবেশীরা, অনেক কষ্টে কতকগুলি লোককে বহিষ্কৃত করিল, অবশিষ্ট সমুদয় লোক তন্মধ্যে রহিয়া গেল।
একটী দরিদ্রা স্ত্রীর কতকগুলি শিশুসন্তান ছিল। সে, প্রতিবেশীদিগের সহায়তায়, আপন সন্তানগুলি লইয়া, বহির্গত হইয়াছিল। জগদীশ্বরের কৃপায়, এ যাত্রা পরিত্রাণ পাইলাম, এই ভাবিয়া, সে, তাঁহাকে ধন্যবাদ দিয়া, সাহায্যকারী প্রতিবেশীদিগের যথেষ্ট স্তুতি করিল, পরে একে একে সন্তানগুলির নাম গ্রহণপূর্ব্বক, আহ্বান করিতে গিয়া, জানিতে পারিল, সর্ব্বকনিষ্ঠ শিশু সন্তানটি আনীত হয় নাই, সে গৃহমধ্যে রহিয়া গিয়াছে। তাহাকে না দেখিতে পাইয়া, সেই দরিদ্রা উন্মত্তার ন্যায় হইল এবং সন্তানের স্নেহ ও মায়ার বশীভূত হইয়া, স্বীয় প্রাণবিনাশের শঙ্কা না করিয়া, অকুতোভয়ে, দ্রুত বেগে, অগ্নিরাশির মধ্যে প্রবেশ করিল।
কিয়ৎক্ষণ পরে, সে, এক শিশু সন্তান ক্রোড়ে করিয়া পূর্ব্বস্থানে আগমন করিল। সন্তানের প্রাণ রক্ষা করিয়াছি, এই ভাবিয়া আহ্লাদে উন্মত্তপ্রায় হইল, এবং কিরূপে জ্বলন্ত অধিরোহণী দ্বারা আরোহণ করিল কিরূপে গৃহে প্রবেশপূর্ব্বক দোলা হইতে সন্তান লইয়া পুনরায় গৃহ হইতে নির্গত হইল, এই সমস্ত সন্নিহিত ব্যক্তিবর্গের নিকট বর্ণন করিতে লাগিল। কিয়ৎক্ষণ পরে, আহ্লাদভরে, শিশু সন্তানের মুখ চুম্বন করিতে গিয়া, দেখিতে পাইল, সে তাহার সন্তান নহে। তাহার পার্শ্ববর্ত্তী গৃহে অপর এক স্ত্রীলোক থাকিত, সে, আপন সন্তান পরিত্যাগ করিয়া, পলাইয়া আসিয়াছিল, এ তাহার সন্তান।
যৎকালে সে, শিশু সন্তানকে আনিবার নিমিত্ত গমন করে, তখন অগ্নিশিখায় সমস্ত স্থান এরূপ আচ্ছন্ন হইয়াছিল যে, কিছুমাত্র দেখিতে পাওয়া যায় নাই, সুতরাং স্বীয় গৃহ ভ্রমে অপর গৃহে প্রবেশ করিয়াছিল, এক্ষণে আপন ভ্রম বুঝিতে পারিয়া, শোকে নিতান্ত বিহ্বল হইয়া বিলাপ করিতে লাগিল। অপত্যস্নেহের এমনই মহিমা, সেই স্ত্রীলোক, কোনও মতে স্থির হইতে না পারিয়া, শোকসংবরণ করিয়া, পুনরায় সেই শিশু সন্তানের আনয়ন নিমিত্ত, জ্বলন্ত গৃহের অভিমুখে ধাবমান হইল। সে, গৃহের সম্মুখবর্ত্তিনী হইবামাত্র, উহা দগ্ধ হইয়া ভাঙ্গিয়া পড়িল। তখন সে, একবারে হতাশ হইয়া, হায় কি হইল বলিয়া বিচেতন ও ভূতলে পতিত হইল, এবং অল্প সময় মধ্যেই প্রাণত্যাগ করিল।
অদ্ভুত পিতৃভক্তি।
আমেরিকার অন্তঃপাতী নিউ ইয়র্ক প্রদেশে, এক অতি নিঃস্ব পরিবার ছিল। স্ত্রী পুরুষ উভয়েই বহুদিন অবধি, অকর্ম্মণ্য ও পরিশ্রমে অসমর্থ হইয়াছিল, এজন্য তাহাদের স্বয়ং কিছু উপার্জ্জন করিবার ক্ষমতা ছিল না। তাহাদের এক মাত্র কন্যা, সেই, পরিশ্রম করিয়া, কথঞ্চিৎ তাহাদের ভরণ পোষণ নির্ব্বাহ করিত। দুর্ভাগ্যক্রমে, ১৭৮৩ খৃষ্টাব্দে শীতকালে, ঐ প্রদেশে দুর্ভিক্ষ উপস্থিত হওয়াতে, তাহাদের দিনান্তেও আহার পাওয়া দুর্ঘট হইয়া উঠিল। ফলতঃ, এই সময়ে শীতে ও অনাহারে, তাহারা যৎপরোনাস্তি কষ্ট পাইতে লাগিল।
পিতা মাতার দুরবস্থা দেখিয়া, এবং প্রাণপণে চেষ্টা ও পরি- পরিশ্রম করিয়াও তাঁহাদের আহারাদি সংগ্রহে অসমর্থ হইয়া, কন্যা অতিশয় দুঃখিত ও শোকাভিভূত হইল, এবং কি উপায়ে তাঁহাদের কষ্ট নিবারণ হয়, অহোরাত্র এইমাত্র চিন্তা করিতে লাগিল।
এক দিন কথাপ্রসঙ্গে কোন ব্যক্তি কহিল, অমুক ডাক্তার ঘোষণা করিয়া দিয়াছেন, যদি কেহ আপন সম্মূখের দন্ত বিক্রয় করে, তাহা হইলে তিনি, তিন গিনি[১] করিয়া, প্রত্যেক দন্তের মূল্য দিবেন, কিন্তু ডাক্তার স্বয়ং, সেই ব্যক্তির মুখ হইতে, দন্ত তুলিয়া লইবেন।
এই ঘোষণার কথা শুনিয়া, কন্যা মনে মনে বিবেচনা করিতে লাগিল, আমি নানা চেষ্টা দেখিতেছি, এবং অনেকপ্রকার কষ্টও ভোগ করিতেছি, তথাপি পর্য্যাপ্ত পরিমাণে, পিতা মাতার আহার সংগ্রহ করিতে পারিতেছি না। এক্ষণে, এই উপায় অবলম্বন করিলে, কিছুকালের নিমিত্ত তাঁহাদের দুঃখ দূর হইবে। অতএব আমি, অবিলম্বে ডাক্তারের নিকট গিয়া, সম্মুখের কয়টি দন্ত দিয়া, গিনি আনয়ন করি।
মনে মনে এই আলোচনা করিয়া, কন্যা ডাক্তারের নিকট উপস্থিত হইল এবং কহিল, মহাশয়। আপনি যে ঘোষণা করিয়া দিয়াছেন, তদনুসারে আমি আপনার নিকট দন্ত বিক্রয় করিতে আসিয়াছি, যে কয়টির প্রয়োজন হয়, তুলিয়া লইয়া, আমাকে অঙ্গীকৃত মূল্য প্রদান করুন।
ডাক্তার স্থির করিয়া রাখিয়াছিলেন, কেহই তাহার ঘোষণা অনুসারে, দন্ত বিক্রয় করিতে আসিবে না। এক্ষণে, এই কন্যাকে দন্তবিক্রয়ে উদ্যত দেখিয়া, চমৎকৃত হইয়া, জিজ্ঞাসা করিলেন, অয়ি বালিকে। তুমি কি কারণে ঈদৃশ ক্লেশকর বিষয়ে সম্মত হইতেছ? কাঁচা দন্ত তুলিয়া লইলে, কত কষ্ট হয়, তাহা তোমার বোধ নাই, বিশেষতঃ চির দিনের জন্য অত্যন্ত কদাকার হইয়া যাইবে। তুমি বালিকা, এরূপে দন্ত বিক্রয় করিয়া, টাকা লইবার প্রয়োজন কি, বুঝিতে পারিতেছি না।
কি অবস্থায়, ও কি কারণে, দন্ত বিক্রয় করিয়া, টাকা লইতে আসিয়াছ, কন্যা সজলনয়নে সবিশেষ সমস্ত বর্ণন করিল। ডাক্তার অতিশয় দয়ালু ও সদ্বিবেচক ছিলেন। তিনি, তদীয় পিতৃভক্তি ও মাতৃভক্তির ঐকান্তিকতা দর্শনে, মুগ্ধ ও কিয়ৎক্ষণ স্তব্ধ হইয়া রহিলেন। অনন্তর, তাহার মুখ নিরীক্ষণ করিয়া, অশ্রুপূর্ণ লোচনে, সস্নেহ বচনে কহিলেন, বৎসে। তোমার মত গুণবতী বালিকা ভূমণ্ডলে আছে, আমার এরূপ বোধ হয় না, আমি তোমার দন্ত চাই না, যদি আমি তোমার মত গুণবতী বালিকাকে কষ্ট দি ও কদাকার করি, তাহা হইলে, আমার মত নরাধম আর কেহ নাই। তোমার অসাধারণ গুণের যৎকিঞ্চিৎ পুরস্কারস্বরূপ, আমি তোমায় দশটি গিনি দিতেছি, লইয়া গৃহে যাও, এবং নিশ্চিন্ত হইয়া, পিতা মাতার শুশ্রূষা কর।
এই বলিয়া, দয়ালু ডাক্তার, সেই কন্যার হস্তে দশটি গিনি সমৰ্পণ করিলেন। কন্যা আহ্লাদে পুলকিত হইল। তাহার নয়নদ্বয় হইতে আনন্দাশ্রু নির্গত হইতে লাগিল। অনন্তর, সে, ভক্তিভাবে তাঁহাকে প্রণাম করিয়া, তদীয় অনুমতি গ্রহণ পূর্ব্বক, গৃহে প্রতিগমন করিল।
- ↑ ইংলণ্ড দেশে প্রচলিত স্বর্ণমুদ্রা, মূল্য তৎকালে॥০, এক্ষণে ২৪\।
ধর্ম্মপরায়ণতা।
ফরাসি দেশে এক বিলক্ষণ সঙ্গতিপন্ন ব্যক্তি ছিলেন। তাঁহার বাটীর সন্নিকটে এক বৃদ্ধা বিধবা বাস করিত। অতিশয় দরিদ্রা, তাহার কতকগুলি অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তান ছিল। বৃদ্ধা অতি কষ্টে তাহাদের লালন পালন করিত। সচ্চরিত্রা ও ধর্ম্মপরায়ণা বলিয়া, সে আপন প্রতিবেশী এক সম্পন্ন ব্যক্তির বিলক্ষণ স্নেহপাত্র ও সম্পূর্ণ বিশ্বাসভাজন ছিল।
১৭৯২ খৃষ্টাব্দে, এক দিবস, তিনি সেই বৃদ্ধাকে আহ্বান করিয়া কহিলেন, দেখ, আমি, কোনও কার্য্যের অনুরোধে, কিছু দিনের জন্য, স্থানান্তরে যাইতেছি, ত্বরায় আমার প্রত্যাগমনের সম্ভাবনা নাই, আমার যে কিছু সম্পত্তি আছে, তোমার হস্তে ন্যস্ত করিয়া যাইতেছি, যদি প্রত্যাগমনের পূর্ব্বে আমার মৃত্যু হয়, এবং আমার পুত্র কন্যা না থাকে, তাহা হইলে, তুমি আমার এই সমস্ত সম্পত্তির অধিকারিণী হইবে, আর, যদি তৎপূর্বে অর্থের অভাব জন্য তোমার দুরবস্থা ঘটে, তাহা হইলে, এই সম্পত্তির কিয়ৎ অংশ লইয়া, ব্যয় করিতে পারিবে। এই বলিয়া, আপন সমস্ত সম্পত্তি বৃদ্ধার হস্তে সমর্পণ করিয়া, তিনি প্রস্থান করিলেন।
বৃদ্ধা প্রতিদিন পরিশ্রম করিয়া যাহা উপার্জ্জন করিত, তদ্দ্বারা কোনও রূপে নিজের ও সন্তানগুলির ভরণপোষণের ব্যয় নির্ব্বাহ হইত। সেই সম্পন্ন ব্যক্তির প্রস্থানের কিছু দিন পরেই, সে অতিশয় পীড়িত হইল, সুতরাং প্রতিদিন পরিশ্রম করিয়া যে কিছু উপার্জ্জন করিত, তাহা রহিত হইল, এজন্য তাহার ও সন্তানগুলির কষ্টের পরিসীমা রহিল না। সম্পন্ন ব্যক্তির যেরূপ অনুমতি ছিল, তদনুসারে সে, এমন অবস্থায়, তাঁহার সম্পত্তিব কিয়ৎ অংশ লইয়া, কষ্ট দূর করিতে পারিত। কিন্তু, যেমন অবস্থা ঘটিলে, তাঁহার অনুমতিক্রমে, তদীয় সম্পত্তির কিয়ৎ অংশ লইতে পারি, অদ্যাপি আমার সে অবস্থা ঘটে নাই, এই ভাবিয়া, সে তাহাতে হস্তক্ষেপ করিল না।
কিয়ৎ কাল পরে সেই স্ত্রীলোক ঐ সম্পন্ন ব্যক্তির অবধারিত মৃত্যুসংবাদ পাইল। কিন্তু, তিনি নিঃসন্তান মরিয়াছেন, অথবা তাঁহার সন্তান আছে তাহার কিছুমাত্র জানিতে পারিল না। এজন্য তখনও সে তাঁহার সম্পত্তিতে হস্তাৰ্পণ করিল না। ক্রমে চারি বৎসর অতীত হইল, তথাপি সে ঐ সম্পত্তি স্পর্শ করিল না। সে মনে মনে এই বিবেচনা করিতে লাগিল, যদিও তাঁহার সন্তান না থাকে, অন্য কোনও উত্তরাধিকারী থাকা অসম্ভব নহে, যদি উত্তরাধিকারীও না থাকে, তাহার কেহ উত্তমর্ণও থাকিতে পারে। আমি তাঁহার সম্পত্তি গ্রহণ করিব, আর তাঁহার উত্তরাধিকারী বা উত্তমর্ণেরা বঞ্চিত হইবেন, ইহা কোনও ক্রমে ন্যায়ানুগত নহে।
ক্রমে ক্রমে রোগ ও কষ্ট ভোগ করিয়া বৃদ্ধার শরীর অবসন্ন হইয়া আসিতে লাগিল, তথাপি সে সেই সম্পত্তি আত্মসাৎ করা কিংবা সেই সম্পত্তির কিয়ৎ অংশ লওয়া উচিত বিবেচনা করিল না, কিন্তু, পাছে ন্যস্ত সম্পত্তি যথার্থ অধিকারীর হস্তে অর্পণ না করিয়া মরিয়া যাই, এ দুর্ভাবনায় অস্থির ও অসুখী হইতে লাগিল এবং এ বিষয়ে সবিশেষ অনুসন্ধান করিতে আরম্ভ করিল।
অবশেষে বৃদ্ধা শুনিতে পাইল, ঐ সম্পত্তির অধিকারী প্রুশিয়াদেশে বিবাহ করিয়াছিলেন এবং পত্নী ও কতিপয় শিশু সন্তান রাখিয়া গিয়াছেন। তখন বৃদ্ধার আহ্লাদের সীমা রহিল না। সে অবিলম্বে তাঁহার পত্নীর নিকট এই সংবাদ পাঠাইল যে, আপনার স্বামী আমার নিকট প্রচুর অর্থ রাখিয়া গিয়াছেন, আপনি সত্বর আসিয়া লইয়া যাইবেন। তদনুসারে, তিনি বৃদ্ধার ভবনে উপস্থিত হইলে, সে সমস্ত সম্পত্তি তদীয় হস্তে অর্পণ করিয়া কহিল, আজ আমি নিশ্চিন্ত হইলাম, আমার সকল দুর্ভাবনা দূর হইল। বোধ হয়, আমি অধিক দিন বাঁচিব না, আব কিছু দিন, আমি আপনাদের সংবাদ না পাইলে, আপনারা এই সম্পত্তিতে বঞ্চিত হইতেন।
এই বলিয়া, বৃদ্ধা, যেরূপে ঐ সম্পত্তি তাহার হস্তে ন্যস্ত হইয়াছিল, সবিশেষ সমস্ত বর্ণন করিল। ধনস্বামীর পত্নী, অসম্ভাবিত রূপে প্রভূত সম্পত্তি লাভ করিয়া, যত আহ্লাদিত হইয়াছিলেন, সেই বৃদ্ধা দরিদ্রার বাক্য শ্রবণে ও ব্যবহার দর্শনে, তদপেক্ষা সহস্র গুণে অধিক আহ্লাদিত হইলেন। ফলতঃ, তিনি, তাহার ঈদৃশ অসাধারণ ন্যায়পরতা ও ধর্ম্মপরায়ণতা দর্শনে, অত্যন্ত চমৎকৃত হইয়া, আন্তরিক ভক্তি সহকারে ভূরি ভূরি ধন্যবাদ দিতে লাগিলেন, এবং মনে মনে বিবেচনা করিলেন, এই স্ত্রীলোক যেরূপ সাধু, ইহার তদনুরূপ পুরস্কার করা উচিত, না করিলে, আমি নিঃসন্দেহ অধর্ম্মগ্রস্ত হইব।
এই স্থির করিয়া তিনি সেই বৃদ্ধাকে কহিলেন, অয়ি ধর্ম্মশীলে। তুমি আমাদের যে মহোপকার করিলে, কিয়ৎ অংশে আমায় তাহার পরিশোধ করিতে দাও। বলিয়া, তিনি তাহাকে বহু সহস্র মুদ্রা দিতে উদ্যত হইলেন। তখন বৃদ্ধা কহিলেন, অর্থের লোভ থাকিলে, আমি আপনার সর্ব্বস্বই লইতে পারিতাম, আপনার স্বামী আমায় যথেষ্ট স্নেহ ও অনুগ্রহ করিতেন, আমি যে তাঁহার ন্যস্ত সম্পত্তি যথার্থ উত্তরাধিকারীর হস্তে অৰ্পণ করিতে পারিলাম, তাহাতেই আমি চরিতার্থ হইয়াছি, আমার অপর পুরস্কারের প্রয়োজন নাই, আপনি যদি আমার উপর তাঁহার ন্যায় স্নেহদৃষ্টি রাখেন, তাহাই আমি প্রভূত পুরস্কার জ্ঞান করিব।
পিতৃবৎসলতা।
ইয়ুরোপে যে সকল ভদ্রসন্তানেরা সৈন্যসংক্রান্ত কর্ম্মে নিযুক্ত হয়, তাহারা, প্রথমতঃ কিছু দিন, যুদ্ধকার্য্যের উপযোগী বিষয়ে শিক্ষা পাইয়া থাকে। এই শিক্ষা দিবার নিমিত্ত, স্থানে স্থানে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত আছে। যাহারা ঐ সকল বিদ্যালয়ে প্রবিষ্ট হইয়া থাকে, তাহাদিগকে, ভোজন পরিচ্ছদ প্রভৃতি সমস্ত বিষয়ে, তত্রত্য নিয়মাবলীর অনুবর্ত্তী হইয়া চলিতে হয়, যাহারা অন্যথাচরণ করে, তাহারা বিদ্যালয় হইতে বহিষ্কৃত হইয়া থাকে।
ইংলণ্ডের এইরূপ কোনও বিদ্যালয়ে, একটি বালক নিযুক্ত হইল। সে সুবোধ, সাবধান, সচ্চরিত্র ও কর্ত্তব্য বিষয়ে সম্যক্ অবহিত লক্ষিত হওয়াতে, তথাকার অধ্যক্ষ তাহাকে অত্যন্ত ভাল বাসিতেন। বিদ্যালয়ের নিয়ম অনুসারে, যখন সকল বালক আহার করিতে যাইত, সে বালকও তাহাদের সঙ্গে আহার করিতে বসিত। অন্য অন্য বালকেরা আহারের সময়, গল্প ও আমোদ করিত, কিন্তু সে সেরূপ করিত না। সে, প্রথমে সূপ ভক্ষণ করিয়া, রুটী ও জল খাইয়া উদরপুর্ত্তি করিত, মাংস প্রভৃতি যে সমস্ত উপাদেয় বস্তু প্রস্তুত হইত, তাহা স্পর্শও করিত না। ইহা দেখিয়া তাহার সহচরেরা কারণ জিজ্ঞাসা করিলে, সে কোনও উত্তর দিত না, বিষণ্ণ বদনে মৌন অবলম্বন করিয়া থাকিত।
ক্রমে ক্রমে এই বিষয় অধ্যক্ষের গোচর হইলে, তিনি তাহাকে কহিলেন, অহে যুবক। তুমি এরূপ আচরণ করিতেছ কেন? তোমায় আহার বিষয়ে, এখানকার নিয়ম অনুসারে চলিতে হইবে, সকলে যেরূপ আহার করে, তোমারও সেইরূপ আহার কবা আবশ্যক। এ সাংগ্রামিক বিদ্যালয়, যে বিষয়ে যে নিয়ম বদ্ধ আছে, কোনও অংশে, তাহার কিছু মাত্র ব্যতিক্রম হইতে পারিবে না, অতএব সাবধান করিয়া দিতেছি, অতঃপর, তুমি রীতিমত আহার করিবে, কদাচ অন্যথাচরণ করিবে না।
অধ্যক্ষ এইরূপে সাবধান করিয়া দিলেও, সেই যুবক পূর্ব্ববৎ সূপ, রুটী ও জল মাত্র আহার করিতে লাগিল। অধ্যক্ষ শুনিয়া অত্যন্ত কুপিত হইলেন, এবং তৎক্ষণাৎ তাহাকে আপন নিকটে আনাইয়া, ভর্ৎসনা করিয়া কহিলেন, তুমি অন্যান্য সকল বিষয়ে সুবোধ বটে, কিন্তু এ বিষয়ে তোমায় অত্যন্ত অবাধ্য দেখিতেছি, সে দিন সাবধান করিয়া দিয়াছি, তথাপি তুমি বিদ্যালয়ের নিয়ম লঙ্ঘন করিতেছ। যদি স্বেচ্ছা অনুসারে চলা তোমার অভিপ্রেত হয়, তাহা হইলে, তোমায় বিদ্যালয় হইতে বহিষ্কৃত হইতে হইবে।
এই ভয় প্রদর্শন করাতে, বালক অত্যন্ত ব্যাকুল ও বিষণ্ণ হইল, এবং কৃতাঞ্জলি হইয়া, অশ্রুপূর্ণ লোচনে, কাতর বচনে কহিল, মহাশয়। আমায় ক্ষমা করুন, আমি ইচ্ছা পূর্ব্বক বিদ্যালয়ের নিয়ম লঙ্ঘন, বা আপনার উপদেশে অবহেলা করি নাই। যে কারণে উপাদেয় বস্তু ভক্ষণে বিরত থাকি, তাহা আপনার গোচর করিতেছি। আমার পিতা যার পর নাই নিঃস্ব, অতি কষ্টে আমাদের দিনপাত হয়। যখন বাটীতে ছিলাম, জঘন্য পোড়া রুটী মাত্র খাইতে পাইতাম, তাহাও পর্য্যাপ্ত পরিমাণে নহে, এক দিনও আহার করিয়া পেট ভরিত না। এখানে আমি প্রতিদিন উত্তম সূপ ও উত্তম রুটী পেট ভরিয়া খাইতেছি, এখানে আসিবার পূর্ব্বে, আমি কখনও এরূপ উত্তম ও প্রচুর আহার পাই নাই। আমার পিতা মাতা, প্রায় প্রতিদিন, এক প্রকার উপবাসী থাকেন। আহার করিতে বলিলেই, তাঁহাদিগকে মনে পড়ে, তাঁহাদের আহারের কষ্ট মনে করিয়া, উপাদেয় বস্তু ভক্ষণে আমার প্রবৃত্তি হয় না। সেই সুশীল, সুবোধ বালকের এই সকল কথা শুনিয়া অধ্যক্ষ সাতিশয় চমৎকৃত হইলেন, এবং মনে মনে অত্যন্ত প্রশংসা করিতে লাগিলেন। কিয়ৎক্ষণ পরে, তিনি কহিলেন কেন, তোমার পিতা বহুকাল রাজকর্ম্ম করিয়াছিলেন, তিনি কি পেন্শন পান নাই? বালক কহিল, না মহাশয়। তিনি পেন্শন পান নাই, পেনশনের প্রার্থনায়, এক বৎসর কাল রাজধানীতে ছিলেন, কৃতকার্য্য হইতে পারেন নাই, অবশেষে অর্থাভাবে আর এখানে থাকিতে না পারিয়া, হতাশ হইয়া গৃহে প্রতিগমন করিয়াছেন, তিনি পেন্শন পাইলে, আমাদের এত কষ্ট হইত না।
ইহা শুনিয়া অধ্যক্ষ কহিলেন, আমি অঙ্গীকার করিতেছি, যাহাতে তোমার পিতা পেন্শন পান, তাহার উপায় করিব। আর, যখন তোমার পিতার এরূপ দুরবস্থা শুনিতেছি, তখন তিনি, আনুষঙ্গিক ব্যয় নির্ব্বাহ জন্য, তোমায় আবশ্যক মত অর্থ দিয়াছেন, আমার এরূপ বোধ হইতেছে না, সুতরাং, সে জন্য তোমার বিলক্ষণ কষ্ট হয়, সন্দেহ নাই, আপাততঃ, তুমি তিনটি গিনি লও, ইহা দ্বারা আবশ্যক ব্যয় নির্ব্বাহ করিও, আর যত সত্বর পারি, তোমার পিতার নিকট আগামী ছয় মাসের পেনশন পাঠাইয়া দিতেছি।
বালক শুনিয়া, আহ্লাদসাগরে মগ্ন হইল, এবং অধ্যক্ষের দত্ত তিনটি গিনি, অনিমিষ নয়নে, নিরীক্ষণ করিতে লাগিল, কিয়ৎক্ষণ পরে কহিল, আপনি আমার পিতার নিকট সত্বর টাকা পাঠাইবেন, বলিলেন, কি রূপে ঐ টাকা পাঠাইবেন? অধ্যক্ষ কহিলেন, তোমায় সে ভাবনা করিতে হইবে না, আমরা অনায়াসে তাঁহার নিকট টাকা পাঠাইতে পারিব। বালক কহিল, না মহাশয়। আমি সে ভাবনা করিতেছি না, আমি আপনার নিকট এই প্রার্থনা করিতেছি, যখন আপনি আমার পিতার নিকট টাকা পাঠাইবেন, ঐ সঙ্গে এই তিনটি গিনিও পাঠাইয়া দিবেন, আমি যত দিন এখানে থাকিব, আমার এক পয়সাও প্রয়োজন হইবে না, কিন্তু এই তিনটি গিনি পাইলে, তাঁহার যথেষ্ট উপকার বোধ হইবে।
অধ্যক্ষ, তাহার সদ্বিবেচনা ও পিতৃবৎসলভাব আতিশয্য দর্শনে, অত্যন্ত প্রীত হইলেন, এবং সেই বালকের প্রতি নিরতিশয় সন্তোষ প্রদর্শন করিলেন। অনন্তর তিনি, রাজার গোচর করিয়া, তাহার পিতার পেন্শনের ব্যবস্থা করিয়া দিলেন, এবং আগামী ছয় মাসের পেন্শন ও সেই তিনটি গিনি তাহার পিতার নিকট প্রেরণ করিলেন।
তদবধি, সেই নিঃস্ব পরিবারের, দুঃখের অবস্থা অতিক্রান্ত হইয়া, পুনরায় সুখের ও স্বচ্ছন্দের অবস্থা উপস্থিত হইল।
নিঃস্বার্থ পরোপকার।
পারিস নগরে, হেনল্ট নামে এক বিধবা নারী থাকিতেন। তিনি, নস্য বিক্রয় ব্যবসায় দ্বারা, বহু কাল পর্য্যন্ত, স্বচ্ছন্দে ও সম্মান পূর্ব্বক কাটাইলেন, কিন্তু বায়াত্তর বৎসর বয়সে, অতিশয় নিঃস্ব ও নিতান্ত নিরুপায় হইয়া পড়িলেন। যে গৃহে তাঁহার বিপণি ছিল, তাহার ভাটক দানে অসমর্থ হওয়াতে, তাঁহাকে ঐ গৃহ পরিত্যাগ করিতে হইল। এক্ষণে তাঁহার আর দাঁড়াইবার স্থান রহিল না। তাঁহার দুই পুত্র বিলক্ষণ সঙ্গতিপন্ন ছিলেন, এই দুঃসময়ে তাঁহারা তাঁহার কিছুমাত্র আনুকূল্য করিলেন না।
মারগরেট ডিমলিন নামে তাঁহার এক পরিচারিকা ছিল। সে তেইশ বৎসর তাঁহার নিকটে কর্ম্ম করে। এক্ষণে স্বামিনীর দুরবস্থা দেখিয়া, তাহার অত্যন্ত দয়া উপস্থিত হইল। সে দয়া করিয়া আনুকূল্য না করিলে, নিঃসন্দেহ অনাহারে তাঁহার প্রাণবিয়োগ ঘটিত।
ডিমলিন, প্রথমতঃ, এক প্রতিবেশীর নিকটে উপস্থিত হইল, এবং অনেক বিনয় ও কাতরোক্তি করিয়া এই প্রার্থনা করিল, আপনি অনুগ্রহ করিয়া, আপন বিপণির এক পার্শ্বে, আমার স্বামিনীকে স্থান দিন। তিনি সম্মত হইলে, হেনল্টকে সেই স্থানেই বাস করাইল। তথায়, তিনি পূর্ব্ববৎ নস্য বিক্রয় করিতে লাগিলেন। তদ্দ্বারা যাহা লাভ হইতে লাগিল, তাহাতে তাঁহার সমুদয় ব্যয় নির্ব্বাহ হওয়া কঠিন দেখিয়া, ডিমলিন তাঁহার আনুকূল্যের নিমিত্ত, সূচীকর্ম্ম প্রভৃতি দ্বারা, কিঞ্চিৎ কিঞ্চিৎ উপার্জ্জন করিতে লাগিল।
প্রতিবেশীরা ডিমলিনকে ধর্ম্মিষ্ঠা, দয়াশীলা ও সচ্চরিত্রা বলিয়া জানিত। সুতরাং অনেকেই তাহাকে নিযুক্ত করিবার নিমিত্ত ব্যগ্র হইত। কিন্তু, এমন দুঃসময়ে, আমি ইহাকে পরিত্যাগ করিয়া যাইতে পারি না, আমি গেলে, ইহার কষ্টের সীমা থাকিবে না, ইনি যত দিন জীবিত থাকিবেন, আমি অন্যত্র কুত্রাপি যাইতে পারিব না। এই বলিয়া, সে কাহারও প্রস্তাবে সম্মত হইত না।
এইরূপে, নিরুপায় হেনল্ট যতদিন জীবিত রহিলেন, ডিমলিন, সাধ্যানুসারে তাঁহার পরিচর্য্যা ও প্রাণরক্ষা করিল। কিন্তু, সে তাঁহার কত দূর পর্য্যন্ত উপকার করিতেছে, তিনি তাহা বুঝিতে পারিতেন না। ডিমলিনের নিকট কৃতজ্ঞতা প্রদর্শন দূরে থাকুক, তিনি, অকারণে কুপিত হইয়া, সর্ব্বদা তাহাকে প্রহার করিতেন, ডিমলিন তাহাতেও রুষ্ট বা অসন্তুষ্ট হইত না। বিশেষতঃ, সে তাঁহার নিকটে যে তেইশ বৎসর কর্ম্ম করিয়াছিল, তাহার পনর বৎসরের বেতন পায় নাই। ইহাকেই নিঃস্বার্থ পরোপকার বলে। ফলতঃ ডিমলিনের আচরণ দয়া, ভদ্রতা ও প্রভুভক্তির অদ্ভুত দৃষ্টান্ত।
পারিস নগরে ফ্রেঞ্চ একাডেমি নামে এক প্রসিদ্ধ সমাজ আছে। সৎকর্ম্মে লোকের উৎসাহ বর্দ্ধনের নিমিত্ত, সমাজের অধ্যক্ষেরা প্রতিবৎসর এক এক পারিতোষিক প্রদানের ব্যবস্থা করিয়াছেন। তাঁহাদের বিবেচনায় যে ব্যক্তি সর্বাপেক্ষা প্রশংসনীয় সৎকর্ম্ম করে, সে ঐ পুরস্কার পায়। ডিমলিনের আচরণ শ্রবণে, তাঁহারা এত প্রীত হইলেন যে, সে ঐ বৎসরের পুরস্কারের সর্বাপেক্ষা অধিক যোগ্য, ইহা স্থির করিয়া, তাহাকেই ঐ পারিতোষিক প্রদান করিলেন।
আতিথেয়তা।
মঙ্গো পার্ক নামে এক ব্যক্তি, দেশপর্য্যটন দ্বারা, লোকসমাজে বিলক্ষণ বিখ্যাত হইয়াছিলেন। তিনি, পর্য্যটন করিতে করিতে, আফ্রিকার অন্তঃপাতী বাম্বারা রাজ্যের রাজধানী সিগো নগরে উপস্থিত হইলেন, এবং তত্রত্য রাজার সহিত সাক্ষাৎ করিবার নিমিত্ত, অভিলাষ করিলেন। মধ্যে এক নদী ব্যবধান আছে, তাহা উত্তীর্ণ হইয়া রাজবাটী যাইতে হইবে। সে দিবস, পারঘাটায় এত জনতা হইয়াছিল যে, অন্যূন দুই ঘণ্টা কাল, তাঁহাকে সেখানে অপেক্ষা করিতে হইল।
এই অবকাশে, রাজপুরুষেরা রাজার নিকট সংবাদ দিল, এক হীনবেশ শ্বেতকায় মনুষ্য তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিতে আসিয়াছে। শ্রবণমাত্র, নৃপতি আপন এক অমাত্যকে তাঁহার নিকটে পাঠাইলেন। সে, তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিয়া কহিল, আমি রাজকীয় আদেশক্রমে আপনাকে জানাইতেছি, তাঁহার অনুমতি ব্যতিরেকে, নদী পার হইবেন না। পরে, সে কিঞ্চিৎ দূরবর্ত্তী এক গ্রাম দেখাইয়া দিল, এবং কহিল, অদ্য আপনি ঐ গ্রামে গিয়া রাত্রি যাপন করুন।
পার্ক শুনিয়া অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হইলেন, কিন্তু আর কোনও উপায় নাই দেখিয়া, সেই গ্রামে চলিলেন। পথিমধ্যে রজনী ও ঝড় বৃষ্টি উপস্থিত হইল। কিয়ৎক্ষণ পরে, গ্রামে প্রবিষ্ট হইয়া তিনি স্থান অন্বেষণ করিতে লাগিলেন। কিন্তু বিদেশীয় লোক বলিয়া কেহই সাহস করিয়া তাঁহাকে আশ্রয় দিল না। সুতরাং, তিনি অত্যন্ত বিপদে পড়িলেন। বিশেষতঃ, সেখানে বন্য জন্তুর অত্যন্ত উপদ্রব, অনাবৃত স্থানে থাকিলে, প্রাণনাশের সম্পূর্ণ সম্ভাবনা। অতএব, কি উপায়ে নিরাপদে রাত্রি যাপন করিতে পারি, তিনি এই চিন্তা করিতে লাগিলেন।
অবশেষে, তিনি, অন্য কোনও উপায় দেখিতে না পাইয়া, এক বৃক্ষের স্কন্ধদেশে অশ্ব বন্ধন করিলেন। পরে, বৃক্ষের উপরিভাগে বসিয়া রজনী যাপন করিব তাহা হইলে, বন্য জন্তুতে আক্রমণ করিতে পারিবে না, এই স্থির করিয়া, ঐ বৃক্ষে আরোহণ করিবার উপক্রম করিতেছেন, এমন সময়ে এক বৃদ্ধা কাফরি সেই স্থানে উপস্থিত হইল। সে, তাঁহার আকার প্রকার দেখিয়া, স্পষ্ট বুঝিতে পারিল, ইনি বিদেশীয় লোক, আশ্রয় না পাইয়া, ব্যাকুল ও চিন্তান্বিত হইয়াছেন। তখন, সে তাঁহাকে তাহার অনুগামী হইতে সঙ্কেত করিল। তদনুসারে, তিনি তাহার সমভিব্যাহারে চলিলেন।
বৃদ্ধা, আপন আবাসে উপস্থিত হইয়া, কুটীরের এক অংশে তাঁহাকে থাকিতে দিল। তাহার কন্যারা গৃহকর্ম্মে ব্যাপৃতা ছিল, সে তাহাদিগকে অগ্রে অতিথিসেবার আয়োজন করিতে কহিল। তাহারা, অবিলম্বে এক বৃহৎ মৎস্য সংগ্রহ করিয়া, তাঁহার নিমিত্ত আহার প্রস্তুত করিল, এবং পর্য্যাপ্ত আহার করাইয়া, মাদুর পাতিয়া, তাঁহাকে শয়ন করাইল। এইরূপে অতিথিপরিচর্য্যা সমাপ্ত হইলে, তাহারা পুনরায় গৃহকর্ম্মে নিযুক্ত হইল, এবং অনেক রাত্রি পর্য্যন্ত কর্ম্ম করিতে লাগিল।
কাফরিকন্যারা, বোধ হয়, শ্রমলাঘবের নিমিত্ত, কর্ম্ম করিবার সময় গান করিতে লাগিল। পার্ক কাফরিভাষা কিছু কিছু বুঝিতে পারিতেন। গান শুনিয়া, কাফরিজাতির উপর তাঁহার বিলক্ষণ ভক্তি জন্মিল। দেখিলেন, তিনিই তাহাদের গানের বিষয়। গানের মর্ম্ম এই, “ঝড় বহিতেছিল, বৃষ্টি পড়িতেছিল, দীন হীন শ্বেতকায় মনুষ্য ক্লান্ত হইয়া আমাদের বৃক্ষের তলে বসিয়া ভাবিতেছিলেন, তাঁহার জননী নাই যে দুগ্ধ দেন, স্ত্রী নাই যে আহার প্রস্তুত করিয়া দেন, এস, আমরা শ্বেতকায় মনুষ্যকে আশ্রয় দি, তাঁহার কেহ নাই, তিনি নিরাশ্রয়।”
কাফরিস্ত্রীদিগের দয়া ও সৌজন্য দর্শনে, পার্ক মোহিত ও চমৎকৃত হইলেন। সে রাত্রি তাহারা আশ্রয় না দিলে, তাঁহার দুর্গতির সীমা থাকিত না, হয় ত, প্রাণনাশ পর্য্যন্ত ঘটিত। রাত্রি প্রভাত হইলে, তিনি গাত্রোত্থান করিলেন, গৃহস্বামিনীর নিকটে গিয়া, আন্তরিক ভক্তিসহকারে, তাহাকে শত শত ধন্যবাদ দিলেন, এবং তাহার ও তাহার কন্যাদিগের নিকটে বিদায় লইয়া, রাজধানী অভিমুখে প্রস্থান করিলেন।
দয়াশীলতা।
পারিস নগরে মিজিয়ন নামে এক ব্যক্তি ছিলেন। তিনি সামান্যরূপ ব্যবসায় দ্বারা জীবিকা নির্ব্বাহ করিতেন। কিছু দিন পরে, বিস্তর ক্ষতি হওয়াতে, তাঁহার ব্যবসায় বন্ধ হইয়া গেল। তিনি অত্যন্ত কষ্টে পড়িলেন। লা ব্লোন্দ নামে তাঁহার এক তরুণী পরিচারিকা ছিল। তাঁহার দুঃসময় ঘটাতে, কেবল সেই তাঁহাকে পরিত্যাগ করিয়া গেল না, আর সকলে চলিয়া গেল।
কিছুদিন পরে, মিজিয়নের মৃত্যু হইল। তাঁহার স্ত্রী ও দুই শিশু সন্তান রহিল। কিন্তু তাহাদের ভরণপোষণের কোনও উপায় ছিল না। তাহাদের দুরবস্থা দেখিয়া, লা ব্লোন্দের অত্যন্ত দয়া উপস্থিত হইল। সে, দাসীবৃত্তি করিয়া, ক্রমে ক্রমে পনর শত ফ্রাঙ্ক[১] সঞ্চয় করিয়াছিল, সমুদয় তাহাদের ভরণপোষণে সমর্পণ করিল। ইহা ভিন্ন, তাহার কিছু পৈতৃক ভূসম্পত্তি ছিল, তাহা হইতে সে দুই শত ফ্রাঙ্ক[১] উপস্বত্ব পাইত, তাহাও তাহাদের ব্যয়ে নিয়োজিত হইল। এইরূপে, সে ঐ অনাথ পরিবারের প্রতিপালন করিতে লাগিল। এই দয়াশীলা পরিচারিকাকে নিযুক্ত করিবার নিমিত্ত অনেকে অভিলাষ করিতেন। কিন্তু সে, এইমাত্র উত্তর দিত, আমি যদি ইহাদিগকে পরিত্যাগ করিয়া যাই, কে ইহাদের ভরণপোষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করিবে।
কিছু দিন পরে, মিজিয়নের পত্নীর উৎকট রোগ জন্মিল। ইতঃপূর্ব্বে লা ব্লোন্দ এই নিরুপায় পরিবারের ভরণপোষণে সর্ব্বস্ব ব্যয় করিয়াছিল, তাহার হস্তে আর কিছুই ছিল না। তাহাদের নিমিত্ত, অবশেষে সে, বসন, ভূষণ প্রভৃতি যাহা কিছু ছিল, সমস্ত বিক্রয় করিল।
যে সকল স্ত্রীলোক, হাস্পাতালে গিয়া, রোগীদের পরিচর্য্যা করে, তাহারা কিছু কিছু পাইয়া থাকে। লা ব্লোন্দ, দিবাভাগে, মিজিয়নের পত্নীর শুশ্রূষা করিত, এবং তাহাদের ব্যয় নির্ব্বাহ করিবার নিমিত্ত, রজনীতে হাস্পাতালে গিয়া, রোগীর পরিচর্য্যায় নিযুক্ত হইত।
১৭৮৭ খৃষ্টাব্দের, এপ্রিল মাসের শেষভাগে, মিজিয়নের পত্নীর মৃত্যু হইল। পারিস নগরে, অনাথ বালক বালিকাদিগের ভরণপোষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের নিমিত্ত, দীনাশ্রয় নামে স্থান আছে। কেহ কেহ লা ব্লোন্দকে এই পরামর্শ দিল, অতঃপর তুমি এই দুটি শিশুকে দীনাশ্রয়ে পাঠাইয়া দাও। সে এই প্রস্তাবে অত্যন্ত রোষ ও ঘৃণা প্রদর্শন করিয়া কহিল, আমি ইহাদিগকে কখনও পরিত্যাগ করিতে পারিব না, ইহাদিগকে আমার বাসস্থানে লইয়া যাইব, আমার যে দুই শত ফ্রাঙ্ক আয় আছে, সেখানে থাকিলে, তদ্দ্বারা আমার নিজের ও ইহাদের ভরণপোষণ অনায়াসে সম্পন্ন হইবে।
সাধুতার পুরস্কার।
পারিস নগরে এক ব্যক্তি অতি দরিদ্র ছিলেন। তিনি বহু কষ্টে দিনপাত করিতেন। সুজেট্ নামে এক তরুণী ভ্রাতৃতনয়া ব্যতিরিক্ত তাঁহার কেহই ছিল না। এই ভ্রাতৃকন্যা অতি সুশীলা ও সচ্চরিত্রা ছিল এবং আপন পিতৃব্যকে অত্যন্ত স্নেহ ও ভক্তি করিত। নিতান্ত অসঙ্গতি প্রযুক্ত পিতৃব্য তাহার ভরণপোষণ করিতে পারিতেন না, সে, এক গৃহস্থের বাটীতে দাসীবৃত্তি করিয়া, জীবিকা-নির্ব্বাহ করিত, এবং বেতন স্বরূপ যৎকিঞ্চিৎ যাহা পাইত, তদ্দ্বারা পিতৃব্যের আনুকূল্য করিত।
কিছুদিন পরে, ঐ কন্যার বিবাহের সম্বন্ধ স্থির ও দিন অবধারিত হইল। সমুদয় আয়োজন হইতেছে, দুই তিন দিবসের মধ্যে বিবাহ হইবে, এমন সময়ে, সহসা তাহার পিতৃব্যের মৃত্যু হইল। তাঁহার এমন সঙ্গতি ছিল না যে, অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়ার ব্যয় নির্ব্বাহ হয়। তখন সেই কন্যা বরকে কহিল, দেখ, আমার পিতৃব্যের মৃত্যু হইয়াছে, তাঁহার অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়া নির্ব্বাহের কোনও উপায় নাই, আমি বৈবাহিক পরিচ্ছদ ক্রয়ের নিমিত্ত যাহা সঞ্চয় করিয়া রাখিয়াছি, তদ্ব্যতিরিক্ত আমার হস্তে এক কপর্দ্দকও নাই, এক্ষণে তদ্দ্বারা তাঁহার অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়া সম্পন্ন করি, পরে, পুনরায় সঞ্চয় করিয়া, পরিচ্ছদ ক্রয় করিব, আপাততঃ কিছুদিনের জন্য আমাদের বিবাহ স্থগিত থাকুক।
সুজেট্ যে বাটীতে কর্ম্ম করিত, ঐ বাটীর কর্ত্রী তাহার প্রস্তাব শুনিয়া, উপহাস করিতে লাগিলেন, এবং কহিলেন, তোমার পিতৃব্যের অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়া যেরূপে সম্পন্ন হয় হউক, সে অনুরোধে, উপস্থিত বিবাহ স্থগিত রাখা কোনও মতেই উচিত নহে। অতএব, আমার পরামর্শ এই, অবধারিত দিবসে বিবাহ সম্পন্ন হইয়া যাউক। সুজেট্ তাঁহার পরামর্শ শুনিল না, কহিল, যথাবিধানে পিতৃব্যের অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়া না করিয়া, আমি কদাচ বিবাহ করিব না, যদি করি, তাহা হইলে, আমার মত পাপীয়সী আর কেহ নাই। আর, যদি এ জন্য আমার বিবাহ না হয়, আমি তাহাতেও দুঃখিত নহি।
এই উপলক্ষে বিলক্ষণ বিবাদ উপস্থিত হইল। গৃহস্বামিনী ও বর উভয়ে, নির্দ্ধারিত দিবসে বিবাহ হওয়া আবশ্যক বলিয়া পীড়াপীড়ি করিতে লাগিলেন, সুজেট্ কোনও ক্রমে সম্মত হইল না। অবশেষে গৃহস্বামিনী, কুপিত হইয়া তাহাকে তাড়াইয়া দিলেন, এবং বরও, আর আমি তোমায় বিবাহ করিব না বলিয়া, সম্বন্ধ ভাঙ্গিয়া দিল। সুজেট্ তাহাতে কিছুমাত্র দুঃখিত বা উৎকণ্ঠিত না হইয়া, তৎক্ষণাৎ তথা হইতে প্রস্থান করিল, এবং পিতৃব্যের আলয়ে উপস্থিত হইয়া, অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়ার আয়োজন করিতে লাগিল।
যথাবিধানে অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়া সম্পন্ন করিয়া সুজেট্ বিরলে বসিয়া, পিতৃব্যের শোকে বিলাপ ও পরিতাপ করিতেছে, এমন সময়ে, এক সুশ্রী সুবেশ যুবা পুরুষ সেই স্থানে উপস্থিত হইলেন। ইনি, বহুদিন অবধি, সুজেট্কে জানিতেন, তাহার কর্ম্মচ্যুত হওয়ার ও সম্বন্ধ ভাঙ্গিয়া যাওয়ার কারণ অবগত হইয়াছিলেন। ইনি বিলক্ষণ সঙ্গতিপন্ন, এ পর্য্যন্ত বিবাহ করেন নাই, এক্ষণে সুজেট্কে বিবাহ করিবেন, স্থির করিয়া তাহাকে আপন আলয়ে লইয়া যাইতে আসিয়াছিলেন।
সুজেট্ এই ব্যক্তিকে সুশীল, সচ্চরিত্র ও বিলক্ষণ সঙ্গতিপন্ন লোক বলিয়া জানিত, ইহাকে সহসা উপস্থিত দেখিয়া, শোক সংবরণ পূর্ব্বক, উঠিয়া দাঁড়াইল। ঐ ব্যক্তি ঈষৎ হাস্য করিয়া সাদর বচনে কহিলেন, সুজেট্। শুনিলাম, তুমি কর্ম্মচ্যুত হইয়াছ, এবং বিবাহের সম্বন্ধও ভাঙ্গিয়া গিয়াছে। যদি তোমার আপত্তি না থাকে, আমি তোমার পাণিগ্রহণে প্রস্তুত আছি। সুজেট্ শুনিয়া, সঙ্কুচিত হইয়া কহিল, মহাশয়। আপনি বড় লোক, আমি অতি দীন, আপনি আমায় বিবাহ করিবেন, ইহা কখনও সম্ভব নহে। আপনি পরিহাস করিতেছেন, আমার এই শোকের ও দুঃখের সময়, এরূপে পরিহাস করা উচিত নয়।
এই কথা শুনিয়া, সেই যুবক কহিলেন, অয়ি সুশীলে। ধর্ম্মপ্রমাণ কহিতেছি, তোমায় পরিহাস করিতেছি না, আমি এত নির্ব্বোধ, নিষ্ঠুর ও অধম নহি যে, তোমার মত গুণবতী মহিলার শোকে ও দুঃখে দুঃখিত না হইয়া, পরিহাস করিব, তুমি এক মুহূর্ত্তের জন্যও সে আশঙ্কা করিও না। তুমি জান, আমার বিবাহ হয় নাই, এক্ষণে আমার বিবাহ করা স্থির হইয়াছে, বিবাহ করিতে হইলে, তোমার মত সর্ব্বগুণসম্পন্না কামিনী কোথায় পাইব?
এই সকল কথা শুনিয়া, সুজেট্ কহিল, না মহাশয়। আপনি যাহা কহিলেন, ইহা শুনিয়া আর আমি পরিহাস বোধ করিতেছি না। আপনি আমায় বিবাহ করিলে, আমার সৌভাগ্যের বিষয়, সন্দেহ নাই। কিন্তু সকল লোকে আপনাকে অবজ্ঞা ও উপহাস করিবে, আপনার পক্ষে আমায় বিবাহ করা পরামর্শসিদ্ধ নহে। তখন, তিনি হাস্যমুখে কহিলেন, যদি কেবল এই তোমার আপত্তি হয়, সে জন্য ভাবনা করিতে হইবে না। এক্ষণে উঠ, আর এখানে কাল হরণ করিবার প্রয়োজন নাই, আমার জননী তোমার অপেক্ষায় বসিয়া রহিয়াছেন।
সুজেটের পিতৃব্য একটি বিড়ালকে অত্যন্ত ভাল বাসিতেন। ঐ বিড়াল মরিয়া গেলে পর, উহার চর্ম্ম লইয়া, তিনি বিড়ালের আকৃতি নির্ম্মাণ করাইয়াছিলেন। ঐ আকৃতি তাঁহার শয্যার শিখরদেশে স্থাপিত থাকিত। প্রস্থানকালে সুজেট্ কহিল, দেখ, আমি পিতৃব্যকে অত্যন্ত ভাল বাসিতাম, তাঁহার স্মরণার্থে এই আকৃতিটি লইয়া যাইব। এই বলিয়া উঠাইতে গিয়া, উহার অসম্ভব ভার দর্শনে, সে চমৎকৃত হইল। তখন সেই যুবক, কৌতূহলাক্রান্ত হইয়া, তাদৃশ ভারের কারণ নির্ণয় করিবার নিমিত্ত, বিড়ালের চর্ম্ম ছেদন করিবা মাত্র, স্বর্ণমুদ্রা বৃষ্টি হইতে লাগিল। সুজেটের পিতৃব্য অত্যন্ত কৃপণ ছিলেন, আহারাদির ক্লেশ স্বীকার করিয়াও, সহস্র লুইডোর[১]সঞ্চয় করিয়া রাখিয়াছিলেন। এক্ষণে, তাঁহার সঞ্চিত বিত্ত তদীয় সুশীলা ভ্রাতৃতনয়ার নিরুপম গুণের পুরস্কার হইল।
- ↑ ফরাসিদেশে প্রচলিত স্বর্ণমুদ্রা, মূল্য ২০\টাকা।
পরের প্রাণরক্ষার্থে প্রাণদান।
সেণ্ট এটিয়ন নামে এক ব্যক্তির প্রাণদণ্ডের আদেশ হওয়াতে তিনি লুকাইয়া থাকেন। রাজপুরুষেরা সবিশেষ অনুসন্ধান আরম্ভ করাতে, তিনি প্রকাশভয়ে, অধিকদিন এক স্থানে থাকিতে পারিতেন না, কোনও স্থানে দুই তিন দিন থাকিয়া, স্থানান্তরে প্রস্থান করিতেন। প্রতিক্ষণেই, তাঁহার রাজপুরুষদিগের হস্তে পতিত হইবার আশঙ্কা হইত। যাহার আলয়ে লুকাইয়া থাকেন, পাছে সেই ব্যক্তিই ভয়ে প্রকাশ করিয়া দেয়, এই আশঙ্কায় তিনি কোনও স্থানেই নিশ্চিন্ত হইয়া থাকিতে পারিতেন না। কারণ, যাহারা তাঁহাকে লুকাইয়া রাখিবে, অথবা তাঁহার লুকাইয়া থাকিবার স্থান জানিতে পারিয়াও রাজপুরুষদিগের গোচর না করিবে, তাহাদেরও প্রাণদণ্ড অবধারিত ছিল।
পারিস নগরে পেসক-নাম্নী এক অতি সচ্চরিত্রা দয়াশীলা মহিলা ছিলেন। তিনি অনুসন্ধান করিয়া, এটিয়নের সহিত সাক্ষাৎ করিলেন, এবং কহিলেন, আপনি যে বিষম বিপদে পড়িয়াছেন, তাহার সবিশেষ অবগত হইয়াছি, আপনি আমার আলয়ে চলুন, সেখানে থাকিলে, কেহই সন্ধান পাইবে না।
এই প্রস্তাব শ্রবণ করিয়া, এটিয়ন কহিলেন, আপনি যে আমার দুঃখে দুঃখিত হইয়াছেন, এবং এই বিপদের সময় দয়া করিয়া, আশ্রয় দিতে চাহিতেছেন, ইহাতে আমি কি পর্য্যন্ত উপকৃত বোধ করিতেছি, বলিতে পারি না। কিন্তু এ হতভাগ্যকে আশ্রয় দিলে, আপনি নিঃসন্দেহ বিপদ্গ্রস্ত হইবেন, আপনার প্রাণদণ্ড পর্য্যন্ত ঘটিতে পারে, এই কারণে, আমি আপনার প্রস্তাবে সম্মত হইতে পারি না। যেরূপ দেখিতেছি, আমার রক্ষার কিছুমাত্র সম্ভাবনা নাই, এমন স্থলে, আমি অকারণে আপনার প্রাণদণ্ডের হেতু হইতে পারিব না।
এটিয়নের এই কথা শুনিয়া, পেসক কহিলেন, মহাশয়। আপনি অন্যায় কহিতেছেন, আপনার প্রাণরক্ষার চেষ্টা করিলে, পাছে বিপদে পড়ি, এই ভয়ে আমি, তাহাতে ক্ষান্ত হইয়া, আপন আবাসে নিশ্চিন্তে বসিয়া থাকিব, সাধ্যানুসারে আপনার সাহায্য করিব না, ইহা কখনই হইবে না। আপনি কহিতেছেন, আপনি আমার আলয়ে গেলে, আমারও প্রাণনাশের সম্ভাবনা আছে, কিন্তু বিপদের সময়ে যদি বন্ধুর সাহায্য করিতে না পারি, তাহা হইলে প্রাণ থাকিবার কোনও প্রয়োজন দেখিতেছি না।
অবশেষে এটিয়ন পেসকের যত্ন ও বিনয়ের বশীভূত হইয়া নিতান্ত অনিচ্ছাপূর্ব্বক তাঁহার আলয়ে গমন করিলেন। যাহাতে তিনি সেখানে লুকাইয়া আছেন বলিয়া, কেহ জানিতে না পারে, পেসক, অশেষ প্রকারে, সেইরূপ যত্ন ও কৌশল করিতে লাগিলেন। কিন্তু অল্প দিনের মধ্যেই, এই বিষয় প্রকাশ হইয়া পড়িল। এটিয়নের প্রাণদণ্ড হইল। পেসক তাঁহাকে আশ্রয় দিয়াছিলেন, এই অপরাধে, তিনিও অবিলম্বে তাঁহার অনুগামিনী হইলেন।
যৎকালে, এই দয়াশীল স্ত্রীলোক ধৃত ও রাজপুরুষদিগের সম্মুখে নীত হইয়াছিলেন, তিনি, কিছু মাত্র ভীত বা দুঃখিত হন নাই, তাঁহার আকারে বা কথোপকথনে ভয় বা দুঃখের কোনও লক্ষণ লক্ষিত হয় নাই। প্রাণদণ্ডের আদেশ হইলে, তিনি অকুতোভয়ে তাহাতে সম্মত হইলেন, তাঁহার দয়া, সৌজন্য ও অকুতোভয়তা দর্শনে ব্যক্তি মাত্রেই মুগ্ধ ও বিস্ময়াপন্ন হইয়াছিল।
ভ্রাতৃবৎসলতা।
ইণ্টাফনিস নামে এক ব্যক্তি উৎকট অপরাধ করাতে, পারস্যের অধীশ্বর দারা, অত্যন্ত কুপিত হইয়া, তাহার স্ত্রী পুত্র কন্যা প্রভৃতি পরিবারের ও আত্মীয়গণের প্রাণবধের আদেশপ্রদান করেন। তদীয় পত্নী, নিতান্ত শোকাকুল হইয়া, ক্ষমা প্রার্থনা করিবার নিমিত্ত, প্রত্যহ রাজবাটীতে যাতায়াত করিতে লাগিল। সে অবাধে এইরূপ করাতে, দারার অন্তঃকরণে করুণার সঞ্চার হইল। তখন তিনি, দূত দ্বারা, তাহার নিকট এই কথা বলিয়া পাঠাইলেন, তোমার কাতরতা দর্শনে, রাজার অন্তঃকরণে দয়ার উদয় হইয়াছে, তদনুসারে তিনি তোমাদের এক ব্যক্তিকে ক্ষমা করিতে সম্মত হইয়াছেন, কোন্ ব্যক্তির প্রাণরক্ষা সর্ব্বাপেক্ষা তোমার অধিক প্রার্থনীয়, ইহা জানিবার নিমিত্ত তিনি আমায় তোমার নিকট পাঠাইয়াছেন।
এই রাজকীয় নির্দেশ শ্রবণে, সেই স্ত্রীলোক মনে মনে কিয়ৎ ক্ষণ বিবেচনা করিয়া কহিল, যদি রাজা কৃপা করিয়া আমাদের হতভাগ্য পরিবারের ও আত্মীয়বর্গের মধ্যে কেবল এক ব্যক্তির প্রাণরক্ষায় সম্মতি দেন, তাহা হইলে আমি আমার ভ্রাতার প্রাণরক্ষা প্রার্থনা করি। দূত এই প্রার্থনা রাজার গোচর করিলে, তিনি শুনিয়া সাতিশয় চমৎকৃত হইলেন, এবং সেই দূতকে পুনরায় তাহার নিকট পাঠাইয়া দিলেন। তদনুসারে, দূত পুনরায় তাহার নিকটে গিয়া কহিল, স্ত্রীলোকের ভ্রাতা অপেক্ষা স্বামী অধিক প্রিয়, ও সন্তান অধিক স্নেহপাত্র, ইহাই সর্ব্বদা সর্ব্বত্র লক্ষিত হইয়া থাকে, কিন্তু তোমার আচরণে তাহার সম্পূর্ণ বৈপরীত্য লক্ষিত হইতেছে, তুমি, স্বামী ও সন্তান পরিত্যাগ করিয়া, কি কারণে ভ্রাতার প্রাণরক্ষা প্রার্থনা করিতেছ, রাজা তাহা সবিশেষ জানিতে চাহেন।
তখন সেই স্ত্রীলোক কহিল, আপনি রাজাকে বলিবেন, যদি তিনি আমার স্বামীর প্রাণদণ্ড করেন, ইচ্ছা করিলে, আমি পুনরায় স্বামী পাইতে পারিব, যদি তিনি আমার সন্তানদিগের প্রাণদণ্ড করেন, পুনরায় আমার সন্তান লাভ অসম্ভব নহে। কিন্তু আমার ভ্রাতার প্রাণদণ্ড করিলে, আমি আর ভ্রাতা পাইতে পারিব না, কারণ, আমার পিতা মাতা উভয়েরই মৃত্যু হইয়াছে। এই সমস্ত আলোচনা করিয়া, আমি ভ্রাতার প্রাণরক্ষা প্রার্থনা করিয়াছি, এক্ষণে, তাঁহার যেরূপ অভিরুচি হয়।
দূত, রাজসমীপে উপস্থিত হইয়া, এই সমস্ত নিবেদন করিলে, তিনি, সেই স্ত্রীলোকের উপর যৎপরোনাস্তি প্রীত হইলেন, তাহার প্রার্থনা অনুসারে তদীয় ভ্রাতার প্রাণরক্ষার আদেশ দিলেন এবং তাহার সদ্বিবেচনার পুরস্কারস্বরূপ, তাহার জ্যেষ্ঠ পুত্রেরও অপরাধ মার্জ্জনা করিলেন।
প্রভুভক্তি।
পারিস নগরে লঞ্জিনে নামক এক ব্যক্তি ছিলেন। রাজদণ্ডে প্রাণবধের আদেশ হওয়াতে, তিনি তথা হইতে পলায়ন করিলেন, এবং বেণে নামক স্থানে তাঁহাদের যে বসতিবাটী ছিল, তথায় উপস্থিত হইলেন। তৎকালে, সেই বাটীতে এক পরিচারিকা ব্যতীত আর কেহ ছিল না। তিনি কি অবস্থায় সেখানে উপস্থিত হইয়াছেন, প্রথমতঃ পরিচারিকার নিকট তাহার কিছুমাত্র ব্যক্ত করিলেন না।
কতিপয় দিবস পরে, লঞ্জিনে সংবাদপত্রে দেখিলেন, রাজপুরুষেরা এই ঘোষণা করিয়া দিয়াছেন, যাহারা রাজদণ্ডগ্রস্ত ব্যক্তিদিগকে আশ্রয় দিবে, কিংবা যে সকল পরিচারক অথবা পরিচারিকারা তাদৃশ ব্যক্তিদিগকে গোপন করিয়া রাখিবে, তাহাদেরও প্রাণদণ্ড হইবে। তিনি, তৎক্ষণাৎ পরিচারিকাকে আহ্বান করিয়া কহিলেন, দেখ, রাজদণ্ডে আমার প্রাণবধের আদেশ হইয়াছে, সে জন্য আমি, পারিস পরিত্যাগ করিয়া, এখানে লুকাইয়া আছি, আজ সংবাদপত্রে দেখিলাম, যদি কোনও পরিচারক বা পরিচারিকা ঈদৃশ দণ্ডগ্রস্ত প্রভুকে গোপন করিয়া রাখে, তাহারও প্রাণদণ্ড হইবে। অতএব তুমি অবিলম্বে এই স্থান হইতে প্রস্থান কর, এখানে থাকিলে, তোমার প্রাণদণ্ড হইবে।
এই কথা শুনিয়া পরিচারিকা কহিল, মহাশয়। আমি বহুকাল আপনার আশ্রয়ে আছি, এবং আপনার অন্নে প্রতিপালিত হইয়াছি, এক্ষণে, বিপদের সময়, যদি আমি আপনাকে পরিত্যাগ করিয়া যাই, তাহা হইলে আমা অপেক্ষা কৃতঘ্ন আর কেহই হইতে পারে না, এ অবস্থায়, আমি কখনই, আপনাকে পরিত্যাগ করিয়া, স্থানান্তরে যাইব না। যদি আপনার নিকটে থাকিয়া ও পরিচর্য্যা করিয়া আমার প্রাণদণ্ড হয়, তাহাতে আমি কাতর নহি, বরং শ্লাঘা জ্ঞান করিব, আমি মৃত্যুকে কিছু মাত্র ভয়ানক জ্ঞান করি না। যদি আপনার প্রাণ রক্ষা বিষয়ে, কিঞ্চিত অংশেও, সাহায্য করিতে পারি, জন্ম সার্থক জ্ঞান করিব।
পরিচারিকার উক্তি শুনিয়া ও ভক্তি দেখিয়া, লঞ্জিনে চমৎকৃত হইলেন, এবং কহিলেন, দেখ, আমার উপর তোমার যে এত দূর পর্য্যন্ত স্নেহ ও ভক্তি আছে, ইহাতে আমি কত প্রীত হইলাম, বলিতে পারি না, কিন্তু অকারণে আমি তোমার প্রাণদণ্ড হইতে দিব না, কারণ, তুমি এখানে থাকিয়া, আমার প্রাণ রক্ষা বিষয়ে, কোনও সাহায্য করিতে পারিবে না, লাভের মধ্যে আপনার প্রাণ নাশের পথ করিতেছ। অতএব তুমি অবিলম্বে এখান হইতে চলিয়া যাও, আমি এখানে লুকাইয়া আছি, যদি তুমি ইহা কাহারও নিকট ব্যক্ত না কর, তাহা হইলেই আমি যথেষ্ট উপকৃত হইব।
এইরূপে, লঞ্জিনে পরিচারিকাকে অনেক প্রকারে বুঝাইলেন, সে কোনও ক্রমেই তাঁহাকে পরিত্যাগ করিয়া যাইতে সম্মত হইল না। তিনি বিনয় করিয়া বলিলেন, তথাপি সে সম্মত হইল না, তিনি বিরক্ত হইয়া ভর্ৎসনা করিলেন, তথাপি সে সম্মত হইল না, অবশেষে তিনি কুপিত হইয়া কহিলেন, আমি তোমার প্রভু, তোমায় এই আদেশ করিতেছি, অবিলম্বে আমার আলয় হইতে চলিয়া যাও। তখন সে অশ্রুপূর্ণ লোচনে কাতর বচনে কহিল, আপনি ক্ষমা করুন, প্রাণ থাকিতে আমি, এমন সময়ে, আপনাকে পরিত্যাগ করিয়া যাইতে পারিব না, আমি অনেক কাল আপনার পরিচর্য্যা করিয়াছি। এক্ষণে, পুরস্কারস্বরূপ এই ভিক্ষা চাহিতেছি, কৃপা করিয়া আমায় আপনার নিকটে থাকিতে দেন।
পরিচারিকার ভাব দর্শনে ও প্রার্থনা শ্রবণে, তিনি নিরতিশয় প্রীতি প্রাপ্ত হইলেন, এবং অগত্যা তাহার প্রার্থিত বিষয়ে সম্মতি প্রদান করিলেন। এ দিকে তাঁহার পলায়নসংবাদ প্রচার হইবা মাত্র, রাজপুরুষেরা বিশিষ্ট রূপে তাঁহার অনুসন্ধান আরম্ভ করিয়াছিলেন, কিন্তু সেই প্রভুভক্তিপরায়ণা পরিচারিকা সকল বিষয়ে এরূপ বুদ্ধিকৌশল প্রদর্শন করিতে লাগিল যে, তিনি কোথায় লুকাইয়া আছেন, তাঁহারা কিছু মাত্র অনুধাবন করিতে পারিলেন না। অবশেষে, বিপক্ষপক্ষ অপদস্থ হওয়াতে, লঞ্জিনে প্রাণদণ্ড হইতে পরিত্রাণ পাইলেন।
নিঃস্পৃহতা।
ইংলণ্ডদেশীয় ডিউক অব মণ্টেগু অতিশয় দয়ালু ও দীনপ্রতিপালক ছিলেন। তাঁহার এই রীতি ছিল, নিরাশ্রয় ব্যক্তিদিগের দুঃখ বিমোচনের নিমিত্ত, সর্ব্বদা প্রচ্ছন্ন বেশে ভ্রমণ করিতেন। একদিন প্রাতঃকালে তিনি ঐ অভিসন্ধিতে এক অনাথমণ্ডলীতে উপস্থিত হইলেন, এবং এক বৃদ্ধা স্ত্রীকে সম্মুখে দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, এক্ষণে অত্যন্ত দুঃসময় উপস্থিত, এরূপ সময়ে তুমি কিরূপে দিনপাত কর? যদি আবশ্যক থাকে, বল, আমি তোমার সাহায্য করিতে প্রস্তুত আছি। বৃদ্ধা কহিল, জগদীশ্বরের কৃপায়, আমি স্বচ্ছন্দে আছি, আমার কোনও বিষয়ে অপ্রতুল নাই, যদি দীন দেখিয়া দয়া করিয়া দিতে ইচ্ছা থাকে, ঐ গৃহে এক অনাথা স্ত্রী আছে, তাহাকে সাহায্য দান করুন, অনাহারে তাহার প্রাণ-প্রয়াণের উপক্রম হইয়াছে।
বৃদ্ধার বাক্য শ্রবণ মাত্র, ডিউক মহোদয় নির্দ্দিষ্ট গৃহে প্রবিষ্ট হইলেন এবং সেই অনাথা উপায়বিহীনা স্ত্রীকে কিছু দিয়া পুনরায় বৃদ্ধার নিকটে উপস্থিত হইয়া, তাহাকে কহিলেন, যদি তোমার আর কোনও প্রতিবেশীর অপ্রতুল থাকে, বল। তাঁহার পুনরায় সেই বৃদ্ধার নিকটে যাইবার উদ্দেশ্য এই যে, তাহাকেও কিছু দান করিবেন এবং আর কাহারও অপ্রতুল আছে কি না জিজ্ঞাসা করিলে, সে অবশ্যই আপন অবস্থা নিবেদন করিবে। কিন্তু বৃদ্ধা কহিল, হাঁ মহাশয়। আমার আর এক প্রতিবেশী আছে, সে অত্যন্ত দুঃখী ও অত্যন্ত সৎস্বভাব। ডিউক কহিলেন, অয়ি বৃদ্ধে। আমি এ পর্য্যন্ত তোমার তুল্য নিঃস্পৃহ ও সাধুশীল স্ত্রীলোক দেখি নাই। যদি তুমি বিরক্ত না হও, আমি তোমার নিজের অবস্থা সবিশেষ জানিবার অভিলাষ করি। তখন বৃদ্ধা কহিল, আমি নিতান্ত দুঃখিনী নহি, কাহারও কিছু ধারি না, তদ্ভিন্ন, আমার পনর টাকা সংস্থান আছে।
এই কথা শ্রবণ করিয়া, ডিউক অতিশয় প্রীত ও চমৎকৃত হইলেন, এবং মনে মনে তাহার সুশীলতা ও নিঃস্পৃহতার অশেষবিধ প্রশংসা করিয়া কহিলেন, তোমার যাহা সংস্থান আছে, যদি আমি তাহার কিছু বৃদ্ধি করিয়া দি, বোধ করি, তাহাতে আপত্তি হইতে পারে না। বৃদ্ধা কহিল, আপনি যাহা আজ্ঞা করিতেছেন, তাহাতে আমার সবিশেষ আপত্তি নাই, কিন্তু আপনি আমায় যাহা সাহায্য করিতে চাহিতেছেন, তাহা আমার যত আবশ্যক, অনেকের তদপেক্ষা অনেক অধিক আবশ্যক, যদি আমি উহা লই, তাহাদিগকে বঞ্চনা করা হয়, আমার বিবেচনায় ওরূপ লওয়া গর্হিত কর্ম্ম।
বৃদ্ধার ঈদৃশ উদারচিত্ততা দেখিয়া, মহানুভব ডিউক মহোদয় যৎপরোনাস্তি প্রীত হইলেন, এবং তৎক্ষণাৎ পাঁচটি স্বর্ণমুদ্রা বহিষ্কৃত করিয়া, তদীয় হস্তে প্রদান পূর্ব্বক কহিলেন, তোমায় অবশ্য ইহা গ্রহণ করিতে হইবে, যদি না কর, আমি যার পর নাই ক্ষুব্ধ হইব। বৃদ্ধা, তদীয় দয়ালুতা ও বদান্যতার একশেষ দর্শনে, মোহিত ও চমৎকৃত হইয়া, কিয়ৎক্ষণ স্তব্ধ হইয়া রহিল, অনন্তর, অশ্রুপূর্ণ লোচনে, গদ্গদ বচনে কহিল, মহাশয়। অধিক কি বলিব, আপনি দেবতা, মানুষ নহেন।
রাজকীয় বদান্যতা।
এক দিন, অপরাহ্ণ সময়ে, ইংলণ্ডের অধীশ্বর তৃতীয় জর্জ একাকী পদব্রজে ভ্রমণ করিতেছিলেন। সেই সময়ে, দুইটী দীন বালক সহসা তাঁহার সম্মুখে উপস্থিত হইল। তাহারা তাঁহাকে রাজ্যেশ্বর বলিয়া জানিত না, সামান্য ধনবান্ মনুষ্য জ্ঞানে, তাঁহার সম্মুখে জানু পাতিয়া উপবিষ্ট ও কৃতাঞ্জলি হইয়া, বিষণ্ণ বদনে কাতর বচনে কহিল, মহাশয়। আমাদের অত্যন্ত ক্ষুধাবোধ হইয়াছে, সমস্ত দিন আহার পাই নাই, অনুগ্রহ করিয়া আমাদিগকে কিছু দিন। এই বলিতে বলিতে, তাহাদের গণ্ডস্থল বাহিয়া অশ্রুধারা পতিত হইতে লাগিল। কণ্ঠরোধ হওয়াতে, তাহারা আর অধিক বলিতে পারিল না।
এই ব্যাপার দর্শনে জর্জের অন্তঃকরণে করুণাসঞ্চার হইল। তখন তিনি, তাহাদের হস্ত ধারণ পূর্ব্বক ভূমি হইতে উঠাইলেন, এবং আশ্বাস প্রদান পূর্ব্বক, তাহাদের অবস্থার বিষয়ে, সবিশেষ সমস্ত বর্ণন করিবার নিমিত্ত, কহিলেন। এইরূপে আশ্বাসিত হইয়া, তাহারা কহিল, মহাশয়। আমরা অত্যন্ত দীন, কিছু দিন হইল, আমাদের জননী পীড়িত হইয়াছিলেন, পথ্য ও ঔষধ না পাইয়া, আজ তিন দিন হইল, প্রাণ ত্যাগ করিয়াছেন, তিনি মৃত হইয়া পতিত আছেন, অর্থাভাবে এ পর্য্যন্ত তাঁহার অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়া হয় নাই। আমাদের পিতা আছেন, তিনিও, অত্যন্ত পীড়িত হইয়া, আমাদের মৃত জননীর পার্শ্বে পড়িয়া আছেন, অর্থাভাবে তাঁহার চিকিৎসা হইতেছে না, যেরূপ অবস্থা, তাহাতে তিনিও ত্বরায় প্রাণ ত্যাগ করিবেন, সন্দেহ নাই। এই বলিতে বলিতে, তাহাদের নয়নযুগল হইতে প্রবল বেগে বাষ্পবারি বিগলিত হইতে লাগিল।
সেই দীন পরিবারের দুরবস্থার বিবরণ শুনিয়া, ইংলণ্ডেশ্বর শোকার্ত্ত ও দয়ার্দ্র হইলেন, এবং কহিলেন, তোমরা বাটীতে চল, আমি তোমাদের সঙ্গে যাইতেছি। কিয়ৎক্ষণ পরে, তিনি তাহাদের আলয়ে উপস্থিত হইলেন, এবং তাহাদের বর্ণিত বৃত্তান্ত স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করিয়া, অত্যন্ত শোকাকুল হইয়া, অশ্রু বিমোচন করিতে লাগিলেন। তাঁহার সঙ্গে যাহা ছিল, তৎক্ষণাৎ সেই বালকদিগের হস্তে দিলেন, পরে সত্বর স্বীয় প্রাসাদে প্রতিগমন করিয়া রাজমহিষীকে সবিশেষ সমস্ত শ্রবণ করাইলেন এবং অবিলম্বে, সেই বিপদাপন্ন দীন পরিবারের নিমিত্ত, প্রভূত আহার সামগ্রী, শীতবস্ত্র, পরিধেয় বসন প্রভৃতি যাবতীয় আবশ্যক বস্তু পাঠাইলেন, আর তাহাদের পীড়িত পিতার চিকিৎসার নিমিত্ত, এক জন উত্তম ডাক্তার নিযুক্ত করিয়া দিলেন।
এইরূপ রাজকীয় সাহায্য লাভ করিয়া, সে ব্যক্তি ত্বরায় সুস্থ হইয়া উঠিল। ইংলণ্ডেশ্বর সেই নিরাশ্রয় পরিবারের প্রতি এত সদয় হইয়াছিলেন যে, তাহাদের উপস্থিত বিপদ নিবারণ করিয়াই ক্ষান্ত রহিলেন না, তাহাদের অনায়াসে ভরণ পোষণ নির্ব্বাহের এবং সেই দুই বালকের উত্তমরূপ বিদ্যা শিক্ষায়, বিশিষ্টরূপ ব্যবস্থা করিয়া দিলেন।
মাতৃবৎসলতা।
রোম নগরের কোনও সৎকুলপ্রসূতা নারী উৎকট অপরাধ করাতে, বিচারকর্ত্তারা, প্রাণদণ্ডের আদেশ বিধান করিয়া, তাহাকে কারাগারে অবরুদ্ধ করেন, এবং কারাধ্যক্ষকে আদেশ দেন, অমুক দিন, অমুক সময়ে, অমুক স্থানে, এই স্ত্রীলোকের প্রাণদণ্ড করিবে। সহসা তাঁহাদের আদেশ অনুযায়ী কর্ম্ম সমাধা না করিয়া, কারাধ্যক্ষ বিবেচনা করিলেন, সর্ব্বসাধারণ সমক্ষে বধস্থানে লইয়া গিয়া, এরূপ সদ্বংশসম্ভূতা নারীর প্রণদণ্ড করিলে, ইহার আত্মীয়বর্গের মস্তক অবনত হইবে, তদপেক্ষা উত্তম কল্প এই, আহার বন্ধ করিয়া রাখি, তাহা হইলে অল্প দিনের মধ্যে অনাহারে ইহার প্রাণাত্যয় ঘটিবে। মনে মনে এই সিদ্ধান্ত করিয়া, তিনি ঐ স্ত্রীলোককে অনাহারে রাখিয়া দিলেন।
অবরোধের পর দিন, তাহার কন্যা আসিয়া, কারাধ্যক্ষের নিকট, জননীকে দেখিতে যাইবার অনুমতি প্রার্থনা করিল। তিনি সবিশেষ পরীক্ষা দ্বারা, তাহার সঙ্গে কোনও প্রকার আহার সামগ্রী নাই দেখিয়া, তাহাকে কারাগৃহে প্রবেশ করিতে অনুমতি দিলেন। কন্যা, তদবধি প্রতিদিন, মাতৃসমীপে যাতায়াত করিতে লাগিল। এই রূপে কতিপয় দিবস অতীত হইলে, কারাধ্যক্ষ বিবেচনা করিতে লাগিলেন, কই কন্যা অদ্যাপি ইহার জননীকে দেখিতে আইসে, ইহার তাৎপর্য কি, সে অনাহারে কখনই এত দিন বাঁচিতে পারে না, কিন্তু তাহার মৃত্যু হইলেই বা, এ প্রত্যহ তাহাকে দেখিতে আসিবে কেন। যাহা হউক, ইহার তথ্যানুসন্ধান করিতে হইল। এই বলিয়া, তিনি, সে কোনও প্রকার আহার পায় কি না, ইহার পুঙ্খানুপুঙ্খ সন্ধান করিলেন - কিন্তু তাহার আহার প্রাপ্তির কোনও সম্ভাবনা দেখিতে পাইলেন না। তখন, এই কন্যা, বোধ হয়, স্বীয় জননীর নিমিত্ত, কোনও প্রকার আহার লইয়া যায়, এইরূপ সন্দিহান হইয়া, তিনি স্থির করিয়া রাখিলেন, অদ্য যে সময়ে সে আপন জননীর নিকটে যাইবে, প্রচ্ছন্ন ভাবে অবস্থিত হইয়া, সমুদয় প্রত্যক্ষ ও পরীক্ষা করিব।
নির্দ্ধারিত সময় উপস্থিত হইল। কন্যা যথানিয়মে কারাধ্যক্ষের অনুমতি লইয়া, জননী-সন্নিধানে গমন করিল। কিঞ্চিৎ পরে, কারাধ্যক্ষ প্রচ্ছন্ন ভাবে অবস্থিত হইয়া, অবলোকন করিলেন, কন্যা জননীকে স্তন্য পান করাইতেছে। তিনি তদীয় মাতৃস্নেহের এইরূপ ঐকান্তিকতা দর্শনে, অতিশয় চমৎকৃত হইয়া, মনে মনে তাহাকে শত শত সাধুবাদ প্রদান করিলেন এবং কারাবরুদ্ধা কামিনী, কিরূপে, অনাহারে, এত দিন, প্রাণ ধারণ করিয়া আছে, তাহা বিলক্ষণ বুঝিতে পারিলেন। অনন্তর তিনি এই অদৃষ্টচর অশ্রুতপূর্ব্ব ঘটনার সমস্ত বিবরণ বিচারকর্ত্তাদিগের গোচর করিলে, তাঁহারা কন্যার মাতৃভক্তি ও বুদ্ধি কৌশলের যথেষ্ট প্রশংসা করিলেন, এবং নিরতিশয় প্রীত ও যৎপরোনাস্তি চমৎকৃত হইয়া, কারারুদ্ধা কামিনীর অপরাধ মার্জ্জনা করিলেন। ঐ কামিনী কেবল কারামুক্তা হইলেন, এরূপ নহে, যাবজ্জীবন তাহাদের দৈনন্দিন ব্যয় নির্ব্বাহের জন্য, সাধারণ ধনাগার হইতে মাসিক বৃত্তি নির্দ্ধারিত হইল। বিচারকর্ত্তারা এই পর্য্যন্ত করিয়াই ক্ষান্ত রহিলেন না, যে স্থলে এই অলৌকিক ঘটনা হইয়াছিল, তদুপরি, সর্ব্বসাধারণের প্রতি মাতৃভক্তির উপদেশ স্বরূপ, এক অপূর্ব্ব মন্দির নির্ম্মাণ করাইয়া দিলেন।
বর্ব্বরজাতির সৌজন্য।
আমেরিকার এক আদিম নিবাসী ব্যক্তি মৃগয়া করিতে গিয়াছিল। সে সমস্ত দিন, পশুর অন্বেষণে বনে বনে ভ্রমণ করিয়া, সায়ংকালে অতিশয় ক্লান্ত হইয়া পড়িল, এবং ক্ষুধা ও পিপাসায় একান্ত অভিভূত হইয়া, এক সন্নিহিত ইয়ুরোপীয়ের বাসস্থানে উপস্থিত হইল। অনন্তর, গৃহস্বামীর সন্নিধানে গিয়া, সে আপন অবস্থা জানাইল, এবং কৃতাঞ্জলিপুটে কাতর বাক্যে প্রার্থনা করিল, মহাশয়। কিছু আহার দিয়া আমার প্রাণ রক্ষা করুন। ইয়ুরোপীয় ব্যক্তি শুনিয়া কোপ প্রকাশ করিয়া কহিলেন, যা বেটা, এখানে হইতে চলিয়া যা, আমি তোর জন্যে আহার প্রস্তুত করিয়া রাখি নাই। তখন সে কহিল, মহাশয়। তৃষ্ণায় আমার প্রাণ বিয়োগ হইতেছে, আহার করিতে কিছু না দেন, অন্ততঃ, জল দিয়া আমার প্রাণ দান করুন। এই প্রার্থনা শুনিয়া, ইয়ুরোপীয় কহিলেন, অরে পাপিষ্ঠ। তুই আমার আলয় হইতে দূর হ, আমি তোরে কিছুই দিব না। তখন সে, নিতান্ত হতাশ হইয়া, তথা হইতে প্রস্থান করিল।
এই ঘটনার প্রায় ছয় মাস পরে, ঐ য়ুরোপীয় ব্যক্তি, বয়স্যগণ সমভিব্যাহারে, মৃগয়ায় গমন করিয়াছিলেন। মৃগ অন্বেষণে ইতস্ততঃ বিস্তর ভ্রমণ পূর্ব্বক, পরিশেষে, গভীর অরণ্যে প্রবেশ করিয়া, তিনি বয়স্যগণের সঙ্গভ্রষ্ট হইলেন। সায়ংকাল উপস্থিত হইল। তখন সে ব্যক্তি, কোন্ পথে গেলে, অরণ্য হইতে বহির্গত হইয়া, লোকালয়ে উপস্থিত হইতে পারিবেন, তাহার কিছুই নির্ণয় করিতে পারিলেন না, বয়স্যগণের নাম নির্দেশে করিয়া, উচ্চৈঃস্বরে বারংবার আহ্বান করিতে লাগিলেন, কিন্তু কাহারও উত্তর পাইলেন না। অতঃপর, তাঁহার অন্তঃকরণে বিলক্ষণ ভয়ের উদয় হইতে লাগিল। অধিকন্তু, সমস্ত দিনের পরিশ্রমে, তিনি নিতান্ত ক্লান্ত, এবং ক্ষুধায় ও পিপাসায় একান্ত অভিভূত, হইয়াছিলেন। এই সময়ে, এই অবস্থায়, তিনি, প্রাণ রক্ষা বিষয়ে, একপ্রকার হতাশ হইয়া, লোকালয়ের উদ্দেশ্যে, ইতস্ততঃ ধাবমান হইলেন।
কিয়ৎক্ষণ পরে, আমেরিকার আদিম নিবাসী এক ব্যক্তির পর্ণশালা তাঁহার নয়নগোচর হইল। তখন, কিঞ্চিৎ আশ্বাসিত হইয়া, তিনি সত্বর গমনে কুটীরের দ্বারে উপস্থিত হইলেন, এবং পুরস্কার অঙ্গীকার করিয়া, কুটীরস্বামীকে কহিলেন, তুমি আমাকে আমার আলয়ে পঁহুছাইয়া দাও।
তাঁহার প্রার্থনা শ্রবণ করিয়া, সে ব্যক্তি কহিল, অদ্য সময় অতীত হইয়াছে, আপনি, কোনও ক্রমেই এ রাত্রিতে নির্বিঘ্নে আপন আলয়ে পঁহুছিতে পারিবেন না, কল্য প্রাতে আমি আপনাকে লোকালয়ে পঁহুছাইয়া দিব, আজ আমার কুটীরে অবস্থিতি করুন, আমার যা কিছু সংস্থান আছে, আপনার পরিচর্য্যায় নিয়োজিত হইবে। ইয়ুরোপীয়, নিতান্ত নিরুপায় ভাবিয়া, সে রাত্রি সেই কুটীরে অবস্থিতি করিলেন। কুটীরস্বামী, সাধ্যানুসারে, তাঁহার আহার ও শয়নের ব্যবস্থা করিয়া দিল। রজনী প্রভাত হইলে, সে ব্যক্তি, ইয়ুরোপীয়ের সঙ্গে কিয়ৎ দূর গমন করিল, এবং যে পথে গেলে, তিনি অক্লেশে ও নিরুদ্বেগে, আপন আলয়ে পঁহুছিতে পারিবেন, তাহা দেখাইয়া দিল।
পরস্পর বিদায় লইবার সময় উপস্থিত হইলে, আমেরিকার অসভ্য, ইয়ুরোপীয় সভ্যের সম্মুখবর্ত্তী হইয়া, কিয়ৎ ক্ষণ, অবিচলিত নয়নে, তাঁহার মুখ নিরীক্ষণ করিল, অনন্তর, ঈষৎ হাস্য সহকারে ইয়ুরোপীয়কে জিজ্ঞাসা করিল, আপনি কি পূর্ব্বে আর কখনও, আমায় দেখেন নাই? তিনি, তাহার দিকে সাভিনিবেশ দৃষ্টিনিক্ষেপ করিয়া তৎক্ষণাৎ চিনিতে পারিলেন, দেখিলেন, কিছু দিন পূর্ব্বে, যে ব্যক্তি ক্ষুধার্ত্ত ও তৃষ্ণার্ত্ত হইয়া, তাঁহার আলয়ে গিয়া, জলদান দ্বারা প্রাণদান প্রার্থনা করিয়াছিল, এবং তিনি সেই প্রার্থনা পরিপূরণ না করিয়া, যৎপরোনাস্তি অবমাননা পূর্ব্বক, যাহাকে তাড়াইয়া দিয়াছিলেন, সেই অসময়ে আশ্রয় দিয়া তাহার প্রাণ রক্ষা করিয়াছে। তখন তিনি হতবুদ্ধি হইয়া অধোবদনে দণ্ডায়মান রহিলেন, এবং কি বলিয়া, পূর্ব্বকৃত নৃশংস আচরণের নিমিত্ত, ক্ষমা প্রার্থনা করিবেন, তাহা স্থির করিতে পারিলেন না।
তখন সেই অসভ্যজাতীয় ব্যক্তি গর্ব্বিত বাক্যে কহিল, মহাশয়। আমরা বহুকালের অসভ্য জাতি। আপনারা সভ্য জাতি বলিয়া অভিমান করিয়া থাকেন, কিন্তু দেখুন, সৌজন্য ও সদ্ব্যবহার বিষয়ে অসভ্য জাতি সভ্য জাতি অপেক্ষা কত অংশে উৎকৃষ্ট। সে যাহা হউক, অবশেষে, আপনার প্রতি আমার বক্তব্য এই যে, যে অবস্থার লোক হউক না কেন, যখন ক্ষুধার্ত্ত ও তৃষ্ণার্ত্ত হইয়া আপনার আলয়ে উপস্থিত হইবে, তাহাকে উপযুক্তরূপ আহার-আদি প্রদান করিবেন, তাহা না করিয়া, তেমন অবস্থায়, অবমাননা পূর্ব্বক, তাড়াইয়া দিবেন না। এই বলিয়া, নমস্কার করিয়া, সে প্রস্থান করিল।
ভ্রাতৃবিরোধ।
এক গৃহস্থ ব্যক্তির কিছু ভূমি সম্পত্তি ছিল। তিনি, সাতিশয় যত্ন ও পরিশ্রম সহকারে কৃষিকর্ম্ম করিয়া, স্বচ্ছন্দে সংসারযাত্রা নির্ব্বাহ পূর্ব্বক, বিলক্ষণ সঙ্গতিপন্ন হয়েন। তাঁহার দুই পুত্র ছিল। পাছে উত্তর কালে, বিষয় বিভাগ উপলক্ষ্যে ভ্রাতৃবিরোধ উপস্থিত হয়, এই আশঙ্কায় তিনি, অন্তিম কাল উপস্থিত হইলে, বিনিয়োগপত্র দ্বারা উভয়কে যথাযোগ্য বিষয় বিভাগ করিয়া দিয়া যান। তাঁহার এক উদ্যান ছিল, অনবধানতা বশতঃ তিনি বিনিয়োগপত্রে ঐ উদ্যানের কোনও উল্লেখ করিয়া যান নাই।
তাহারা দুই সহোদরে, ঐ বিনিয়োগপত্র অনুসারে, প্রত্যেকে পৈতৃক বিষয়ের যে অংশ পাইয়াছিল, সুশীল সুবোধ ও পরিশ্রমশালী হইলে, তাহা দ্বারা সুখে, স্বচ্ছন্দে ও সম্মান সহকারে, সংসারযাত্রা নির্ব্বাহ করিয়া যাইতে পারিত। কিন্তু তাহাদের সেরূপ প্রকৃতি ছিল না। বিনিয়োগপত্রে পরিত্যক্ত অবিভক্ত উদ্যান লইয়া, পরস্পর বিরোধ উপস্থিত হইল। সেই উদ্যানের রমণীয়তা ও লাভকরতা উভয় গুণই বিলক্ষণ ছিল, এজন্য উভয়েরই একাকী সম্পূর্ণ উদ্যান অধিকার করিবার সম্পূর্ণ লোভ জন্মিল। সেই লোভ সংবরণে অসমর্থ হওয়াতে উভয়েরই অন্তঃকরণে, ঐ উপলক্ষে, পরস্পরের প্রতি বিষম বিদ্বেষ জন্মিয়া উঠিল। বিষয়লোভ মনুষ্যের অতি বিষম শত্রু। ভ্রাতৃস্নেহ ও হিতাহিতবোধ তাহাদের হৃদয় হইতে এক কালে অন্তর্হিত হইয়া গেল।
উভয়কে বিবাদে উদ্যত দেখিয়া, প্রতিবেশিগণ, মধ্যস্থ হইয়া, তাহাদের বিরোধ ভঞ্জনের যথোচিত চেষ্টা ও যত্ন করিলেন, কিন্তু কৃতকার্য্য হইতে পারিলেন না। উভয়েই বিদ্বেষবুদ্ধির এরূপ অধীন হইয়াছিল যে, উভয়েই কহিল, সর্ব্বস্বান্ত হয় তাহাও স্বীকার, তথাপি উদ্যানের অংশ দিব না। তাহাদের ঈদৃশ ভাব দর্শনে, সাতিশয় বিরক্ত হইয়া, মধ্যস্থগণ নিরস্ত হইলেন। উভয়ের পরমাত্মীয় ও যথার্থ হিতৈষী অতি মাননীয় এক ভদ্র ব্যক্তি, উভয়কে ডাকাইয়া, অশেষ প্রকারে বুঝাইতে লাগিলেন। তিনি কহিলেন, তোমরা কেন অকারণে বিরোধ করিতেছ বল, যেমন উভয়ে, অন্যান্য বিষয়ে, সমাংশভাগী হইয়াছ, বিবাদাস্পদীভূত উদ্যানেও সেইরূপ সমাংশভাগী হও। আমার কথা শুন, অন্যান্য বিষয়ের ন্যায়, উদ্যানও উভয়ে সমাংশ করিয়া লও। রাজদ্বারে আবেদন করিলেও, বিচারকর্ত্তারা সমাংশ ব্যবস্থাই করিবেন, এক জনকে এক বারে বঞ্চনা করিয়া, অপর জনকে কখনই সমস্ত উদ্যান দিবার আদেশ করিবেন না, লাভের মধ্যে, উভয় পক্ষের অনর্থক অর্থব্যয় হইবে, এই মাত্র, আর হয় ত এই বিবাদ উপলক্ষে, উভয়েরই সর্ব্বস্বান্ত হইবে। অতএব, ক্ষান্ত হও, আমি মধ্যবর্ত্তী থাকিয়া সামঞ্জস্য করিয়া, উদ্যানের বিভাগ করিয়া দিতেছি।
এই হিতোপদেশ শ্রবণ করিয়া জ্যেষ্ঠ কহিল, আপনি আমাদের পরম আত্মীয় ও অতি মাননীয় ব্যক্তি, আপনার উপদেশবাক্য শ্রবণ ও আদেশবাক্য প্রতিপালন করা আমাদের সর্ব্বতোভাবে বিধেয়। কিন্তু অংশ করিয়া লইতে গেলে, এমন সুন্দর উদ্যান একবারে হতশ্রী হইয়া যায়, অতএব, আপনি আমার ভ্রাতাকে বুঝাইয়া বলুন, সে, ন্যায্য মূল্য লইয়া, আমাকে সমুদয় উদ্যান ছাড়িয়া দিউক। কনিষ্ঠও শুনিয়া, ঈষৎ হাস্য করিয়া, অবিকল ঐরূপ প্রস্তাব করিল। আত্মীয় ব্যক্তি বিস্তর বুঝাইলেন ও অনেক প্রকার কৌশল করিলেন, কিন্তু কাহাকেও উদ্যানের অংশ গ্রহণে অথবা মূল্য গ্রহণ পূর্ব্বক অংশ পরিত্যাগে সম্মত করিতে পারিলেন না। তখন তিনি, যৎপরোনাস্তি বিরাগ ও অসন্তোষ প্রদর্শন পূর্ব্বক, চলিয়া গেলেন।
অনন্তর, উভয়েই, কর্ত্তব্য নিরূপণ নিমিত্ত, এক এক উকীলের নিকটে গমন করিল, এবং, তথায় অভিলাষানুরূপ উপদেশ ও পরামর্শ পাইয়া, নিরতিশয় উৎসাহ সহকারে, বিবাদে প্রবৃত্ত হইল। এক স্থানে জ্যেষ্ঠের জয়, অপর স্থানে কনিষ্ঠের জয়, এইরূপে কতিপয় বৎসর ব্যাপিয়া, মোকদ্দমা চলিল। অবশেষে, সর্ব্বশেষ বিচারালয়ে সমাংশের ব্যবস্থা অবধারিত হইল। তখন উভয়কেই অগত্যা সেই ব্যবস্থা শিরোধার্য্য করিয়া লইতে হইল।
মোকদ্দমার ন্যায্য ব্যয় তাদৃশ অধিক নহে, কিন্তু আনুষঙ্গিক ব্যয় এত অধিক যে, দীর্ঘ কাল তাহাতে লিপ্ত থাকিলে, প্রায় সর্ব্বস্বান্ত হইয়া যায়। তাহাদের হস্তে যে টাকা ছিল, কিছু দিনের মধ্যে, তাহা নিঃশেষ হইয়া গেল, সুতরাং, টাকা সংগ্রহ করিবার নিমিত্ত, উভয়কেই ভূমি সম্পত্তির কিয়ৎ অংশ বিক্রয় করিতে ও কিয়ৎ অংশ বন্ধক রাখিতে হইল। যে উদ্যানের নিমিত্ত এত আগ্রহ ও এত আক্রোশ, তাহাও, দীর্ঘ কাল উপেক্ষিত হইয়া, শ্রীভ্রষ্ট ও অকিঞ্চিৎকর হইয়া গেল। যখন মোকদ্দমার নিষ্পত্তি হইল, সে সময়ে উভয়ের এত ঋণ হইয়াছিল যে সর্ব্বস্ব বিক্রয় করিলেও, পরিশোধ হইয়া উঠিবে না। তাহারা, অহঙ্কারে মত্ত হইয়া, এবং প্রতিবেশিগণ ও আত্মীয়বর্গের উপদেশ অগ্রাহ্য করিয়া, বিবাদে প্রবৃত্ত হইয়াছিল, এক্ষণে সর্ব্বস্বান্ত করিয়া, অবশেষে, তাহাদিগকে দুর্দ্দশায় কাল যাপন করিতে হইল।
ন্যায়পরায়ণতা।
ইংলণ্ডদেশে লিয়োনার্ড নামে এক বালক ছিল। সে অতি দুঃখীর সন্তান। তাহার পিতা অতি কষ্টে সংসারযাত্রা নির্ব্বাহ করিতেন। দুর্ভাগ্য বশতঃ দ্বাদশ বর্ষ বয়ঃক্রম কালে, লিয়োনার্ডের পিতৃবিয়োগ হয়, তাহার জননীর এরূপ পরিশ্রমশক্তি ছিল না যে, তিনি আপনার ও পুত্রের ভরণ পোষণ নির্ব্বাহ করেন। লিয়োনার্ড প্রতিজ্ঞা করিল, অন্য কাহারও গলগ্রহ হইব না, এবং ভিক্ষা প্রভৃতি নীচ বৃত্তি দ্বারাও জীবিকা নির্ব্বাহের চেষ্টা করিব না, যে রূপে পারি, পরিশ্রম দ্বারা আপন ভরণ পোষণ সম্পাদন করিব।
এইরূপ সঙ্কল্প করিয়া, লিয়োনার্ড কহিতে লাগিল, আমি এক প্রকার লিখিতে ও পড়িতে শিখিয়াছি, যদি আমি সচ্চরিত্র ও পরিশ্রমী হই, কেনই আমি জীবিকা নির্ব্বাহের উপযোগী অর্থ উপার্জ্জন করিতে পারিব না। এই স্থির করিয়া জননীর অনুমতি গ্রহণ পূর্ব্বক, সে এক সন্নিহিত নগরে উপস্থিত হইল। সেই নগরে তাহার পিতার এক পরম বন্ধু ছিলেন, তাঁহার নাম বেনসন। তিনি সঙ্গতিপন্ন লোক এবং বাণিজ্য করিতেন। লিয়োনার্ড, তাঁহার নিকটে উপস্থিত হইয়া, আপন অবস্থা জানাইল, এবং বিনীত ভাবে প্রার্থনা করিল, আপনি কৃপা করিয়া, আমায় আপনার আশ্রয়ে রাখুন, এবং আমার দ্বারা যাহা নির্ব্বাহ হইতে পারে, ঐরূপ কোনও কর্ম্মে নিযুক্ত করুন। আমি অঙ্গীকার করিতেছি, প্রাণপণে পরিশ্রম করিয়া, কর্ম্ম নির্ব্বাহ করিব, প্রাণান্তেও অধর্ম্মাচরণে প্রবৃত্ত হইব না।
দৈবযোগে সেই সময়ে বেন্সনের একটি সহকারী নিযুক্ত করিবার প্রয়োজন ছিল। এক অপরিচিত ব্যক্তিকে নিযুক্ত করা অপেক্ষা, বন্ধুপুত্র লিয়োনার্ডকে নিযুক্ত করা পরামর্শসিদ্ধ বিবেচনা করিয়া, তিনি আহ্লাদ পূর্ব্বক তাহাকে নিযুক্ত করিলেন। লিয়োনার্ড স্বভাবতঃ অতি সুশীল, সচ্চরিত্র, পরিশ্রমী ও ন্যায়পরায়ণ, কর্ম্মে নিযুক্ত হইয়া, যৎপরোনাস্তি আহ্লাদিত হইল, এবং সৎপথে থাকিয়া, প্রাণপণে যত্ন ও পরিশ্রম করিয়া, সুন্দররূপে কর্ম্ম নির্ব্বাহ করিতে লাগিল। যদি দৈবাৎ কখনও আবশ্যক কর্ম্ম করিতে বিস্মৃত হইত, অথবা ভ্রান্তিক্রমে কোনও কর্ম্ম প্রকৃতরূপে সম্পাদন করিতে না পারিত, সে তৎক্ষণাৎ আপনার দোষ স্বীকার করিত, এবং সাধ্য অনুসারে সেই দোষের সংশোধনে যত্নবান হইত।
লিয়োনার্ডের সুশীলতা, সচ্চরিত্রতা ও শ্রমশীলতা দর্শনে, বেন্সন তাহার প্রতি সাতিশয় সন্তুষ্ট হইতে লাগিলেন, এবং ক্রমে তাহার উপর সম্পূর্ণ বিশ্বাস করিলেন ও তাহার হস্তে সকল বিষয়ের ভার দিতে আরম্ভ করিলেন। এই রূপে, অল্প দিনের মধ্যে, সে বিষয়কর্ম্মে নিপুণ, এবং স্বীয় প্রভুর প্রিয়পাত্র ও বিশ্বাসভাজন হইয়া উঠিল।
বেন্সনের স্ত্রী পুত্র আদি পরিবার ছিল না। তিনি একটি স্ত্রীলোকের হস্তে সাংসারিক সমস্ত বিষয়ের ভার দিয়া রাখিয়াছিলেন, স্বয়ং কখনও কোনও বিষয়ে দৃষ্টিপাত বা কোনও বিষয়ের তত্ত্বাবধান করিতেন না। ঐ স্ত্রীলোকের ধর্ম্মজ্ঞান ছিল না, সুতরাং সে সুযোগ পাইলেই অপহরণ করিত। এক্ষণে, সে লিয়োনার্ডের উপর প্রভুর সম্পূর্ণ বিশ্বাস, ও সকল বিষয়ে তত্ত্বাবধানের ভার দেখিয়া, বিবেচনা করিল, এই বালক এখানে বিদ্যমান থাকিলে, আমার লাভের পথ এক কালে রুদ্ধ হইয়া যাইবে, এবং হয় ত, অবশেষে অপদস্থ ও অবমানিত হইয়া, এস্থান হইতে প্রস্থান করিতে হইবে, অতএব, কৌশল করিয়া ইহাকে এখান হইতে বহিষ্কৃত করা আবশ্যক, তাহা না হইলে, আমার পক্ষে ভদ্রস্থতা নাই।
এই সিদ্ধান্ত করিয়া, সেই স্ত্রীলোক, অবসর বুঝিয়া, এক দিন, বেন্সনের নিকট, কৌশলক্রমে কহিতে লাগিল, মহাশয়। আপনি অতি সদাশয়, সকলকেই সজ্জন মনে করেন, আপনি এই বালকের উপর অধিক বিশ্বাস করিবেন না আপনি উহাকে যত সুশীল ও সচ্চরিত্র ভাবেন, ও সেরূপ নহে, অগ্রে সাবধান না হইলে, অবশেষে উহা দ্বারা আপনার অনেক অনিষ্ট ঘটিবে। আমার মনে সন্দেহ হওয়াতে, উহার দিকে দৃষ্টি রাখিয়া, আমি যত দূর জানিতে পারিয়াছি, তাহাতে উহার উপর অত্যন্ত বিশ্বাস করা কোনও ক্রমে উচিত নহে। আমি বহু কাল, আপনার আশ্রয়ে থাকিয়া প্রতিপালিত হইতেছি, আপনার অনিষ্ট সম্ভাবনা দেখিয়া, সতর্ক না করিলে, আমার অধর্ম্মাচরণ হয়, এজন্য আমি আপনাকে এ সকল কথা জানাইলাম।
এই স্ত্রীলোকের উপর বেন্সনের বিলক্ষণ বিশ্বাস ছিল, কিন্তু লিয়োনার্ড যে অতিশয় সুশীল ও সচ্চরিত্র, সে বিষয়েও তাঁহার অণুমাত্র সংশয় ছিল না, এজন্য, তিনি, সেই স্ত্রীলোকের কথায় সহসা বিশ্বাস না করিয়া, বিবেচনা করিলেন, এই বালক যে অধর্ম্মপথে পদার্পণ করিবে, কোনও ক্রমে আমার এরূপ বিশ্বাস হয় না। কিন্তু অত্যন্ত অধার্ম্মিকেরাও বিশ্বাস জন্মাইয়া, সহজে আপন অভীষ্ট সিদ্ধ করিবার নিমিত্ত সম্পূর্ণ ধার্ম্মিকের ভাণ করিয়া থাকে। অতএব, এই স্ত্রীলোকের কথায় একেবারেই উপেক্ষা করিয়া নিশ্চিন্ত থাকা বিধেয় নহে, আমি গোপনে এই বালকের চরিত্র পরীক্ষা করিব।
মনে মনে এইরূপ স্থির করিয়া, বেনসন এক দিন লিয়োনার্ডকে কহিলেন, আমার এই এই বস্তুর অত্যন্ত প্রয়োজন হইয়াছে, যত মূল্যে হয়, সত্বর ক্রয় করিয়া আন। এই বলিয়া যত আবশ্যক তাহা অপেক্ষা অধিক টাকা তাহার হস্তে দিয়া, তিনি তাহাকে আপণে প্রেরণ করিলেন। লিয়োনার্ড, ঐ সমস্ত বস্ত ক্রয় করিয়া, অনতিবিলম্বে প্রত্যাগমন করিল, এবং, ক্রীত বস্তু প্রভুর সম্মুখে রাখিয়া, অবশিষ্ট টাকা তাঁহার হস্তে দিল। লিয়োনার্ড এবিষয়ে এক কপর্দ্দকও অপহরণ করে নাই, ইহা স্পষ্ট বুঝিতে পারিয়া, তিনি অপরিসীম হর্ষ প্রাপ্ত হইলেন, এবং ঐ স্ত্রীলোক যে, কেবল বিদ্বেষ বশতঃ, তাহার গ্লানি করিয়াছিল, তাহা বিলক্ষণ বুঝিতে পারিলেন।
এক দিন, বেন্সন, অনবধানতা বশতঃ কার্য্যালয়ে কতকগুলি মোহর ফেলিয়া গিয়াছিলেন। লিয়োনার্ড সেই গৃহে প্রবিষ্ট হইয়া দেখিল, মোহর পড়িয়া আছে। সেই সময়ে ঐ স্ত্রীলোকও সেই স্থানে উপস্থিত হইল। সে, লোভে আক্রান্ত হইয়া, অথবা লিয়োনার্ডকে অপদস্থ করিবার অভিপ্রায়ে, তাহার নিকট প্রস্তাব করিল, এস, আমরা উভয়ে এই মোহরগুলি ভাগ করিয়া লই। লিয়োনার্ড শ্রবণমাত্রে, সেই ঘৃণিত প্রস্তাবে আন্তরিক অশ্রদ্ধা প্রদর্শন করিয়া কহিল, আমি এই মোহর প্রভুর হস্তে দিব, ইহা তাঁহার সম্পত্তি, পরের ধন অপহরণ করা অতি অসৎ কর্ম্ম, আমি কোনও ক্রমে তোমার প্রস্তাবে সম্মত হইব না।
এই বলিয়া, সেই মোহর লইয়া, লিয়োনার্ড বেন্সনের নিকট উপস্থিত হইল, এবং অমুক স্থানে এই মোহরগুলি পড়িয়া ছিল, এই বলিয়া তাঁহার হস্তে প্রদান করিল। বেন্সন, লিয়োনার্ডের ঈদৃশ অবিচলিত ন্যায়পরায়ণতা দর্শনে, নিরতিশয় প্রীতি প্রাপ্ত হইয়া তাহাকে তৎক্ষণাৎ বিলক্ষণ পুরস্কার দিলেন। ক্রমে ক্রমে এই বালকের উপর তাঁহার এরূপ শ্রদ্ধা ও অনুরাগ জন্মিল যে, পরিশেষে তিনি তাহাকে পুত্রবৎ পরিগৃহীত করিয়া, আপন সম্পত্তির উত্তরাধিকারী করিলেন।